Showing posts with label মেহেদী হাসান. Show all posts
Showing posts with label মেহেদী হাসান. Show all posts

Tuesday, June 10, 2025

ঢাকার ৪ থানায় বিভিন্ন নামে সক্রিয় অর্ধশতাধিক অপরাধী দল by মেহেদী হাসান

রাজধানীর পশ্চিমাঞ্চলের চারটি থানা—আদাবর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায় বিভিন্ন অপরাধী দল গড়ে উঠেছে। জনবহুল এই অঞ্চলে মাদক, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ নানা ধরনের অপরাধে সক্রিয় অপরাধী চক্র। প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়ে তারা নানা অপকর্মে জড়াচ্ছে। আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অপরাধের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তারা খুনোখুনিতেও জড়িয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি হাজারীবাগে আলাদা দুটি খুনের ঘটনার পর এ অঞ্চলের অপরাধী দলগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে আদাবর, মোহাম্মদপুর ও হাজারীবাগে এমন অন্তত অর্ধশত অপরাধী দল সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ৫ আগস্টের পর ১০ মাসে এসব অপরাধী দলের হাতে খুন হয়েছেন অন্তত ১১ জন।

পুলিশ ও র‍্যাবের দেওয়া তথ্য বলছে, ৫ আগস্টের পর এই চারটি থানা এলাকা থেকে মাদক, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও হত্যায় জড়িত অন্তত দেড় হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এর মধ্যে র‍্যাবের হাতেই গ্রেপ্তার হয়েছে ১ হাজার ৫৬ জন। এদের অধিকাংশের বয়স ১৫ থেকে ২২ বছরের মধ্যে।

পুলিশের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন সময় অপরাধী দলের সদস্যদের আইনের আওতায় আনা হলেও দ্রুততম সময়ে জামিনে ছাড়া পেয়ে নতুন করে অপরাধে জড়াচ্ছে। এসব অপরাধী দলের কোনোটিকে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা প্রশ্রয় দিচ্ছে, আবার কোনো অপরাধী দলকে রাজনৈতিক দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা প্রশ্রয় দিচ্ছেন। ফলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তারা খুনোখুনিতেও জড়াচ্ছে।

গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের রায়ের বাজারের সাদেক খান কাঁচাবাজার এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুটি অপরাধী দল ‘অ্যালেক্স ইমন’ ও ‘ডাইল্লা’ গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সংঘর্ষের সময় ডাইল্লা গ্রুপের সদস্য নাছির বিশ্বাস ও মুন্না নামের দুই তরুণ নিহত হন। দুটি অপরাধী দলের সদস্যরাই চুরি-ছিনতাই, মাদক, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িত। অ্যালেক্স ইমন গ্রুপকে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল প্রশ্রয় দেন। জোড়া খুনের মামলাতেও পিচ্চি হেলালকে আসামি করা হয়েছে।

যদিও নাছির বিশ্বাসের বড় ভাই সুমন বিশ্বাস প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, তাঁর ভাই নাছির পেশায় রাজমিস্ত্রি, কোনো অপরাধী দলের সদস্য ছিলেন না। দুটি অপরাধী দলের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে নাছির নিহত হন। তবে স্থানীয় সূত্র এবং পুলিশ বলছে, নাছিরের বিরুদ্ধে মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে থানায় মামলা রয়েছে।

এদিকে গত মার্চ ও এপ্রিলে এক মাসের ব্যবধানে মোহাম্মদপুরের শের শাহ সুরী সড়কে আবাসন ব্যবসায়ী মনির আহমেদের বাসায় ঢুকে গুলির ঘটনায় দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর বিরোধের তথ্য উঠে এসেছে। মনির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি চন্দ্রিমা রিয়েল এস্টেটের পরিচালক। এক সন্ত্রাসী তাঁর কাছে চাঁদা চেয়েছিল। এর জেরেই গুলির ঘটনা ঘটেছে। এখন তিনি বাসা থেকে বের হতে ভয় পান।

এ ঘটনা তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা  বলেন, ঘটনাটি মূলত দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর দ্বন্দ্বের জেরে ঘটেছে। ওই ব্যবসায়ীও একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

ঢাকার পশ্চিমাঞ্চলের অপরাধপ্রবণ চারটি থানার মধ্যে আদাবর ও মোহাম্মদপুর থানা দুটি ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের মধ্যে পড়েছে। এই বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশি তৎপরতায় এ অঞ্চলে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য অনেক কমে এসেছে। ছিনতাই, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এলেও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটে।

তারা ভাসমান অপরাধী, স্থায়ী ঠিকানা নেই

হাজারীবাগের জাফরাবাদে গত ১৫ মে গভীর রাতে একটি পরিবারের সাতজনকে কুপিয়েছে ‘পাটালি গ্রুপ’ নামে একটি অপরাধী গ্রুপের সদস্যরা।

সম্প্রতি জাফরাবাদের ইত্যাদির মোড়ে গিয়ে কথা হয় ভুক্তভোগী পরিবারটির সঙ্গে। বাড়িতে ঢুকতেই দেখা যায়, চেয়ারে বসে আছেন গৃহকর্তা আবুল কাশেম। বাঁ হাতের পুরোটাই ব্যান্ডেজ মোড়ানো। সেদিনের ঘটনা জিজ্ঞাসা করতেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ঘটনার দিন গভীর রাতে তিনজন বাসায় উঁকি দিচ্ছিলেন। কেন বাসায় উঁকি দিচ্ছিলেন, জিজ্ঞেস করতেই পরিবারের সাতজনকে কুপিয়ে জখম করে পালিয়ে যায় তারা।

এ ঘটনার পর পুলিশ অভিযানে নেমে ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। এদের ২০ জনের বেশি পাটালি গ্রুপের সদস্য বলে জানিয়েছে পুলিশ। অভিযানে পাটালি গ্রুপের দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যক্তি শাহিনকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তবে পাটালি গ্রুপের প্রধান আলমগীর ওরফে ফর্মা আলমগীর এখনো পলাতক।

পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, পাটালি গ্রুপে কতজন সদস্য আছে, এর সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে সংখ্যাটা ৭০ জনের কম নয়। এই দলের সদস্যরা ভাসমান, স্থায়ী কোনো ঠিকানা নেই। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। তারা ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবেও কাজ করে। এক এলাকায় অপরাধের পর অন্য এলাকায় চলে যায়।

ঢাকার পশ্চিমাঞ্চলের চারটি থানা এলাকার সীমান্ত ঘেঁষে গাবতলী–সদরঘাট বেড়িবাঁধ সড়ক চলে গেছে। এর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বুড়িগঙ্গা নদী। এ অঞ্চলে নিম্নআয়ের অনেক মানুষ বসবাস করেন। বেড়িবাঁধ–সংলগ্ন চাঁদ উদ্যান, ঢাকা উদ্যান, চাঁন মিয়া হাউজিং, বছিলা, জাফরাবাদ, রায়েরবাজার, গণকটুলী এলাকায় অপরাধী গ্রুপগুলো বেশি সক্রিয়। এই অপরাধী দলগুলো ‘অদ্ভুত’ ধরনের নামে পরিচিত। যেমন ‘টিন এজ টর্নেডো’, ‘পাটালি গ্রুপ’, ‘লও ঠেলা গ্রুপ’, ‘কবজি কাটা গ্রুপ’, ‘ডার্ক স্ট্রাইকার্স’, ‘রেড ভলক্যানো’, ‘ডাইল্লা গ্রুপ’, ‘অ্যালেক্স ইমন গ্রুপ’, ‘লেভেল হাই গ্রুপ’, ‘চাঁন গ্রুপ’, ‘মাউরা গ্রুপ’, ‘ভাইবা ল’, ‘লাল গ্রুপ’, ‘ঠোঁটে ল গ্রুপ’, ‘লাড়া-দে’, ‘মেমোরি গ্রুপ’ ইত্যাদি। অপরাধী দলগুলো নিজেরাই এসব নাম ধারণ করে ফেসবুকে পোস্ট দেয়।

পুলিশের মোহাম্মদপুর অঞ্চলের সহকারী কমিশনার এ কে এম মেহেদী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, মোহাম্মদপুর অঞ্চলে অনেক ভাসমান অপরাধী বসবাস করে। বিভিন্ন দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তারা নানা ধরনের অপরাধে যুক্ত হয়।

খুনোখুনি থেমে নেই


হাজারীবাগের জাফরাবাদে গত ১৫ মে সন্ধ্যায় একটি কিশোর দলের হাতে খুন হন আলোকচিত্রী নুরুল ইসলাম। বিয়ের অনুষ্ঠানের ছবি তোলার কথা বলে তাঁকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে খুন করে ১০-১২ জনের একটা কিশোর দল। তারা নুরুল ইসলামের কাছ থেকে উন্নত মানের দুটি ক্যামেরাও ছিনিয়ে নেয়।

নুরুল ইসলামের বড় ভাই ওসমান গনি বলেন, নুরুল ইসলামের সঙ্গে কারও কোনো শত্রুতা ছিল না। শুধু ক্যামেরা ছিনিয়ে নিতেই ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়।

নুরুল খুনের আধা ঘণ্টা আগে হাজারীবাগের জিগাতলা বাসস্ট্যান্ডে মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে একটি অপরাধী দলের হাতে খুন হন স্নাতকপড়ুয়া সামিউর রহমান।

পুলিশের ধানমন্ডি অঞ্চলের সহকারী কমিশনার শাহ মোস্তফা তারিকুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন অপরাধী দল এ অঞ্চলে সক্রিয় ছিল। পুলিশের তৎপরতায় পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আছে। এখন ভাসমান কিছু অপরাধী হাজারীবাগ ও ধানমন্ডির ‘বর্ডার’ এলাকায় কখনো কখনো সক্রিয় হয়।

আদাবর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায় সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা কমে যাওয়ার সুযোগে অপরাধী দলগুলো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। গত ১০ মাসে এ অঞ্চলে বিভিন্ন অপরাধী দলের হাতে ১১ জন খুন হয়েছেন। শুধু মোহাম্মদপুরেই খুন হয়েছেন সাতজন।

মোহাম্মদপুর অঞ্চলে ‘ভয়ংকর’ অপরাধী দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক আলোচনায় আসে ‘কবজি কাটা’ গ্রুপ। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এই দলের সদস্যরা কবজি কেটে ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিত। এই দলের ভাড়াটে খুনিও রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর রাতে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী বিল্লাল গাজীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবে তারা এই খুন করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে কবজি কাটা গ্রুপের প্রধান আনোয়ার হোসেন র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন।

গত ২৭ মে মোহাম্মদপুরে সেনাবাহিনীর অভিযানে ফরিদ আহমেদ বাবু ওরফে এক্সেল বাবু নামে এক সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর জানিয়েছে, এক্সেল বাবুর বিরুদ্ধে ঢাকার বিভিন্ন থানায় হত্যা, অস্ত্র, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং ভূমি দখলের অভিযোগে ১৫টির বেশি মামলা রয়েছে। ‘টিন এজ টর্নেডো, ‘কবজি কাটা গ্রুপ’সহ অন্তত চারটি অপরাধী দলের নেতৃত্ব দেন এক্সেল বাবু। কবজি কাটা গ্রুপের প্রধান আনোয়ার হোসেন ওরফে কবজি কাটা আনোয়ারের গডফাদার হিসেবেও পরিচিত তিনি।

এদিকে গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অপরাধী দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে চারজন খুন হয়েছেন। মুজাহির ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অসি আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, জেনেভা ক্যাম্পে অবাধে মাদক ব্যবসা চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের জানানো হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।

দীর্ঘদিন ধরে মোহাম্মদপুর এলাকায় বসবাস করেন ব্যাংকার এ এস এম নিয়াজ মোর্শেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকা অনেক দিন ধরেই অপরাধপ্রবণ এলাকা। তবে ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়। এ অঞ্চলের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর হতে হবে। জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

মাদক, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ নানা ধরনের অপরাধে সক্রিয় অপরাধী চক্র
মাদক, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ নানা ধরনের অপরাধে সক্রিয় অপরাধী চক্র। প্রতীকী ছবি

Friday, April 15, 2022

গল্প- বাড়ি বানানোর পরিকল্পনা by লিডিয়া ডেভিস

অনুবাদ : মেহেদী হাসান। পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে বয়ে চলা রাস্তাটা থেকে আমাকে জমিটা দেখানো হল। আর সাথে সাথেই আমি জমিটা কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। জমির দালাল তখন যদি আমাকে জমিটির খারাপ দিক সম্পর্কে অবগত করত, তাহলে সেই মুহূর্তে আমি তার কথায় কর্ণপাত করতাম না। আশেপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আমি মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম : লম্বা উপত্যকা জুড়ে গ্রীষ্মের বৃষ্টিতে খানিকটা তলিয়ে যাওয়া লাল টকটকে আঙ্গুরের ক্ষেত; বেশ দূরে বুনো হলুদ রঙের লতাপাতা এবং কাঁটাগাছের ঝোপঝাড়ে ভরা ক্ষেত এবং এগুলোর পেছনে জঙ্গলে আচ্ছাদিত পাহাড়ের ঢালু; উপত্যকার মাঝখানে সামান্য উঁচু জায়গায় একটা খামার বাড়ির ধ্বংসস্তূপ : এটার বাগানের প্রাচীরের ভাঙা পাথরের ভেতর থেকে একটি তুন্ত গাছ গজিয়েছে এবং পাশেই মাটির উপর বিছিয়ে থাকা বাদামী রঙের পঁচে যাওয়া নাশপাতিগুলোর উপর প্রাচীন নাশপাতি গাছটির ছায়া পড়েছে।

গাড়ির উপর ঝুঁকে পড়ে দালালটি বলল, ‘এখনও একটা কক্ষ অটুট আছে। কক্ষটি ময়লা আবর্জনায় ভরা। অনেক বছর ধরে এখানে নানা ধরনের জীব-জন্তুর বাস’। আমরা পায়ে হেঁটে বাড়িটাতে ঢুকলাম। মেঝের টাইলসের উপর জীব-জন্তুর নাদা জমে ঘন হয়ে আছে। পাথরগুলোর মাঝখান দিয়ে বাতাস এসে গায়ে লাগল এবং সুউচ্চ ছাদের ভেতর দিয়ে সূর্যালোক দেখতে পেলাম। তবে এগুলোর কোন কিছুই আমাকে দমাতে পারল না। আমি সেই দিনই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করিয়ে নিলাম।

এক টুকরো জমি খুঁজে পাওয়া এবং সেই জমির উপর বাড়ি বানানোর জন্য আমি এত বছর ধরে অপেক্ষা করে আছি যে, মাঝে মাঝে মনে হয় এই পৃথিবীতে আমার আগমনের আর কোন উদ্দেশ্য নেই। এই আকাঙ্ক্ষা আমার ভেতরে জন্ম নেয়ার পর থেকে আমার সকল শক্তি-সামর্থ্য এটা পূরণে নিয়োজিত : স্কুলের পাঠ চুকানোর সাথে সাথেই পাওয়া চাকরীটি খুবই ক্লান্তিকর এবং জঘন্য, তবে চাকরীটিতে আমার কাজের বোঝা বাড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে বেতন বাড়তে থাকে। খুব কম টাকায় দিনাতিপাত করতে আমি খুবই সাদামাটা জীবন-যাপন করি এবং নিত্য নতুন বন্ধু-বান্ধব জোটানো এবং নিজেকে উপভোগ করার হাতছানি থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখি। চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে নিজেকে জমি খোঁজার কাজে নিয়োজিত করার মত টাকা-পয়সা সঞ্চয় করতে আমার অনেক বছর সময় লেগে যায়। রিয়েল এস্টেটের দালাল আমাকে এক জমি থেকে আরেক জমিতে নিয়ে যেতে থাকে। জমি দেখতে দেখতে আমি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি এবং আসলে কী যে খুঁজছি তার দিশা হারিয়ে ফেলি। অবশেষে এই উপত্যকা আমার নজরে আসার সাথে সাথেই আমি বুঝতে পারলাম যে, আমার মাথা থেকে একটা বিশাল বোঝা নেমে গেল।

গ্রীষ্মের উষ্ণতা যখন বাড়িটির উপর ঝুলে থাকে, কালি-ঝুলি মাখা আমার এই রাজকীয় কক্ষের ভেতরে আমি বেশ মজেই থাকি। ঝাড়পোছ করে নানা ধরনের আসবাবপত্র দিয়ে কক্ষটি সাজাই এবং কোনার দিকে একটা ছবি আঁকার বোর্ড স্থাপন করি, যেখানে আমি বাড়িটাকে নতুন করে বানানোর পরিকল্পনার কাজ শুরু করি। কাজ থেকে চোখ তুলে জলপাই’র পাতায় সূর্যের আলো দেখে বাইরে যাওয়ার জন্য মন আনচান করে ওঠে। বাড়ির পাশে ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়ানোর সময় আমি সারা জীবন শহরে কাটানো ক্লান্ত ও উৎসুক চোখে লতাগুল্মের ভেতর দিয়ে উড়ে বেড়ানো ম্যাগপাই এবং দেয়ালের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া টিকটিকির দিকে তাকিয়ে থাকি। ঝড়ো বাতাসে আমার জানালার পাশের সাইপ্রেস গাছগুলো নুয়ে পড়ে।

এরপর আসে শরতের কনকনে শীত এবং শিকারীরা আমার বাড়ির আশপাশ দিয়ে ঘুরঘুর করতে শুরু করে। তাদের রাইফেলের গুলির শব্দে আমি আতঙ্কিত হয়ে উঠতে থাকি। পার্শ্ববর্তী ক্ষেতে সুয়ারেজ-ট্রিটমেন্ট চত্বরের একটা পাইপ ফেটে যায় এবং ভয়ানক দুর্গন্ধে চারপাশের বাতাস ভরে ওঠে। ফায়ারপ্লেসে আগুন ধরানোর পরও আমার রুম কখনই গরম হত না।

একদিন আমার জানালার কাছে এক তরুণ শিকারীর শরীরের ছায়া দেখতে পাই। লেদারের জ্যাকেট পরা লোকটির কাঁধে রাইফেল। আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে আমার দরজার নিকটে এসে কড়া না নেড়েই ধাক্কা দিয়ে দরজাটি খুলে ফেলে। দরজার ছায়ায় দাঁড়িয়ে সে আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার চোখজোড়া ছিল কোমল নীল এবং পাতলা লালচে দাড়িতে তার ত্বক কোনমতে ঢাকা পড়েছিল। তৎক্ষণাৎ তাকে আমার আধা-পাগল মনে হয় এবং আমি আতঙ্কিত হয়ে উঠি। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে : তারপর রুমের ভেতরে কী আছে সেসব বেশ কিছুক্ষণ ধরে দেখার পর দরজা বন্ধ করে চলে যায়।

আমার ভেতরটা রাগে গজ গজ করতে থাকে। এমনভাবে লোকটি আমার ছোট্ট পাথুরে কলমটি নাড়াচাড়া করে এবং এমন রূঢ়ভাবে আমাকে নিরীক্ষণ করে, মনে হয় যেন সে চিড়িয়াখানা দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। আমি ভয়ানক ক্রুদ্ধ হয়ে রুমের ভেতরে পায়চারী করতে থাকি। তবে এই অজপাড়া গায়ে আমার এই নিঃসঙ্গ জীবনে সে কৌতুহল জাগিয়ে তোলে। এবং বেশ কিছুদিন পর তাকে দেখার জন্য আমি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠি।

সে আবার আসে এবং এবার সে আর দরজার সামনে ইতস্তত করে না, সোজা হেঁটে ঘরের ভেতরে ঢুকে একটা চেয়ারে বসে আমার সাথে কথা বলতে শুরু করে। তবে তার মুখের ভাষা আমি বুঝতে পারি না। সে একটা শব্দ দুই-তিন বার করে বলে এবং তা সত্ত্বেও সে কী বলতে চাচ্ছে, তা কেবল ধারণা করতে পারি। এবং যখন আমি তার কথার উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি, আমার শহুরে ভাষা বুঝতে তার একই ধরনের সমস্যা হয়। তার সাথে কথাবলা বন্ধ করে আমি তাকে এক গ্লাস মদ এনে দেই। তবে সে তা ফিরিয়ে দেয়। সে অদ্ভুতভাবে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় এবং খুব কাছ থেকে আমার জিনিসপত্র নিরীক্ষণ করার চেষ্টা করে। দেয়ালের পাশে আমার বইয়ের তাক থেকে সে দেখা শুরু করে। বইয়ের তাকটি ঢাকা ছিল এমন একটা কাপড় দিয়ে, যার উপর ছিল আমার বিশেষ পছন্দের বিভিন্ন স্থাপত্যের বাড়ির প্রিন্ট— বাড়িগুলোর কিছু ছিল প্যারিসের প্লাস দি ভোস (Place des Vosges)-এর রাজকীয় বাড়িগুলোর মতো এবং কিছু ছিল মোনপাহনাস (Montparnasse)-এর পেছনে দরিদ্র লোকদের কোয়ার্টারগুলোর মতো। অবশেষে সে আমার ছবি আঁকার বোর্ডের নিকট আসে, যেখানে সে কিছুক্ষণের জন্য থেমেবোর্ডের দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করে ব্যাপারটা কী তা জানার জন্য অপেক্ষা করে। আমি একটা বাড়ির বানানোর পরিকল্পনা করছি এই সত্যটি বুঝতে তার বেশ সময় লাগে এবং বুঝতে পারার পর সে প্রতিটি কক্ষের দেয়ালের কয়েক ইঞ্চি ওপর দিয়ে আঙুল ঘোরাতে থাকে। পরীক্ষা করে দেখা এবং আঙুল ঘোরানো শেষে সে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। এরপর সে একপাশে এমন ব্যঙ্গাত্মকভাবে তাকায়, যার অর্থ আমি ধরতে পারি না এবং এরপর সে চলে যায়।

আমি আবার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠি এই ভেবে যে, সে আমার রুমে অনধিকার প্রবেশ করে আমার গোপনীয়তা জেনে গেল। তা সত্ত্বেও আমার রাগ পড়ে যাওয়ার পর চাই যে, সে ফিরে আসুক। এই ঝড়ো বাতাসের মধ্যেও সে পরের দিন এল। এবং কয়েকদিন পর আবারও এল। আমি তার প্রতীক্ষায় বসে থাকতে শুরু করি। সে প্রতিদিন অনেক ভোরে শিকারে বের হত এবং সপ্তাহে বেশ কয়েকবার শিকারের পর মাঠ থেকে হেঁটে আমার এখানে চলে আসত, মাঠের সাদা মাটির ওপর রোদ পড়ে চকচক করত। তার মুখ আনন্দে ঝলমল করত এবং সে প্রাণ শক্তিতে এতটাই ভরপুর থাকত যে, তা ভেতরে আটকে রাখতে পারত না : কয়েক মিনিট পরপর চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে দ্রুত হেঁটে দরজার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাত, বেসুরো ভাবে শিষ বাজাতে বাজাতে রুমের মাঝখানে ফিরে এসে চেয়ারে বসে পড়ত। ধীরে ধীরে তার শক্তি ফুরিয়ে আসত এবং এক পর্যায়ে সব শক্তি শেষ হয়ে গেলে সে চলে যেত। সে কখনই কোন কিছু খেত না এবং খেতে বললে সে অবাক হয়ে যেত—যেন খাবার বা পানীয় ভাগ করে খাওয়া অন্তরঙ্গতার প্রকাশ।

আমাদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করা তেমন সহজ ছিল না, তবে একত্রে করার মতো অনেক কাজ আমরা জুটিয়ে নিয়েছিলাম। দেয়ালের ফাটল বন্ধ করা এবং ফায়ারপ্লেসের জন্য কাঠ জড়ো করে দিয়ে সে শীতকালের জন্য প্রস্তুতি নিতে আমাকে সাহায্য করে। কাজ করার পর আমরা ক্ষেতে ও জঙ্গলে বেড়াতে যেতাম। আমার বন্ধুটি আমাকে তার পছন্দের জায়গাগুলো দেখায়—কাঁটাগাছের কুঞ্জ, খরগোশের আস্তানা এবং পাহাড় গায়ে একটা গুহা। তাকে দেখানোর মত একটা জিনিসই আমার ছিল এবং আমার মতই তার কাছেও এটাকে রহস্যাবৃত এবং চিত্তাকর্ষক মনে হয়েছে।

সে আমার সাথে দেখা করতে এলেই আমরা প্রথমে নীলনকশাটির কাছে যেতাম, যেখানে আমি আরেকটি কক্ষ যুক্ত করেছি অথবা আমার পড়ার কক্ষের পরিধি বাড়িয়েছি। তাকে দেখানোর জন্য সেখানে সবসময় কোন না কোন পরিবর্তন থাকত, কারণ পরিকল্পনার উন্নতিকল্পে আমি কখনও থেমে থাকি নি এবং সার্বক্ষণিক কাজ করে গিয়েছি। মাঝে মাঝে সে আমার পেন্সিল তুলে নিত এবং এলোপাতাড়ি এমন কিছু আঁকত যা আমার মনে কখনও আসে নি—একটি ধূমপান কক্ষ অথবা আলু রাখার ভূগর্ভস্থ ভান্ডার।

তবে পরিকল্পনাটি নিয়ে ব্যস্ত থাকা এবং বন্ধুর সাথে সময় কাটানো একটা ভয়ঙ্কর সত্য থেকে আমার চোখ ফিরিয়ে রাখে : আমি যতই আমার এই বাড়িটাতে বাস করতে থাকি এবং সময় যতই গড়িয়ে যেতে থাকে আমার বাড়ি বানানোর সম্ভবনা ততই ফিকে হয়ে উঠে। টাকা-পয়সা হাত গলে বেরিয়ে যেতে থাকে এবং আমার স্বপ্নও এটার সাথে সাথে উবে যেতে শুরু করে। আশেপাশে কোন বাজার না থাকা এই গ্রামটিতে খাবারের দাম ছিল শহরের চেয়ে দ্বিগুন। ভাল রাজমিস্ত্রি এবং ছুতার, এমনকি গরীবরাও ছিল দুষ্প্রাপ্য এবং তাদের মজুরী এখানে অনেক বেশী : কয়েক মাসের জন্য তাদের কাজে লাগালে আমার কাছে চলার মত আর তেমন কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। এসব জানার পরও আমি হাল ছাড়ি নি, তবে আমাকে জর্জরিত করে রাখা এইসব প্রশ্নের কোন উত্তর আমার জানা ছিল না।

শুরুতে বাড়ির নীলনকশা আমার সকল সময় এবং মনোযোগ কেড়ে নিত কারণ এই নীলনকশা থেকেই আমি আমার বাড়ি তৈরী করতে চেয়েছি। ধীরে ধীরে এই নীলনকশাটি আমার কাছে সত্যিকারের বাড়ির চেয়েও বেশী জীবন্ত হয়ে ওঠে : পেনসিলে আঁকা রেখাগুলোর মাঝে আমি কল্পনায় আরো বেশী সময় কাটাতে থাকি, যে রেখাগুলো আমি আমার খুশী মত পরিবর্তন করতাম। তবে আমি যদি খোলাখুলি স্বীকার করতাম যে, বাড়িটি তৈরীর আর কোন সম্ভাবনা নেই তাহলে নীলনকশাটা তার আবেদন হারাত। সুতরাং বাড়ি তৈরীতে আমি বিশ্বাস হারাই নি যদিও আমার এই বিশ্বাসের তলা থেকে বাড়ি তৈরির সম্ভাবনা ক্রমান্বয়ে ধ্বসে যেতে থাকে।

গ্রামটির আশেপাশে কয়েক মাস অন্তর অন্তর নতুন বাড়ি গজিয়ে ওঠা আমার পরিস্থিতিকে আরো বেশী নাজুক করে তোলে। জমিটা কেনার সময় এই উপত্যকায় একমাত্র যে স্থাপনাগুলো ছিল, তা হল মাঠের মধ্যে চষা জমির উপর উবু হয়ে বসে থাকা পাথরের কুঁড়েঘর যেগুলোর ভেতরটা গুহার মতই অন্ধকার। দলিলে সাক্ষর করার পর আমি এখানে দাঁড়িয়ে একরের পর একর পরিত্যক্ত আঙুর এবং ফসলের ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। এরপর চোখ চলে গিয়েছিল দিগন্তে যেখানে গ্রামটি একটি ছোট্ট পাহাড়ের উপর জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। দুর্গের মত দেখতে গ্রামটির গীর্জার বুরুজগুলো উপরে গুচ্ছবদ্ধ। আর এখন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত এই এলাকাটির এখানে সেখানে লাল মাটির উপরে ক্ষত চোখে পড়ে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই ক্ষতের উপর থেকে খোস-পাঁচড়ার মত জেগে উঠে নতুন বাড়ি। এইসব পরিবর্তন মানিয়ে নেয়ার মত সময় এই অঞ্চলটির ছিল না : এক বাড়ির কাজ শেষ হতে না হতেই আরেকটা বাড়ির তৈরীর জন্য ওক গাছ কাটা শুরু হয়ে যেত।

আমি ভয় এবং সন্দেহের সাথে একটা বাড়ি কাজ এগিয়ে যেতে দেখি, কারণ আমার বাড়ি থেকে এটার দূরত্ব ছিল মাত্র কয়েক মিনিটের হাঁটাপথ। যে পরিকল্পিত গতিতে এটার কাজ এগোতে থাকে তা আমাকে নাড়িয়ে দেয় এবং মনে হয় যেন এটা আমার পরিস্থিতিকে বিদ্রুপ করছে। পান্ডুর বর্ণের দেয়াল এবং জানালায় সস্তা লোহার গ্রিলের বাড়িটা দেখতে কুৎসিত।

বাড়িটার কাজ শেষ হওয়ার এবং বাড়িটির পাশে শেষ চারা গাছটি রোপন হওয়ার সাথে সাথে বাড়ির মালিক পরিবার নিয়ে শহর থেকে গাড়ি চালিয়ে এসে পুরো সেইন্টডে এখানে কাটিয়ে যায়। এরা বারান্দা থেকে উপত্যকার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন তারা বক্সসিটে বসে অপেরা উপভোগ করছে। আবহাওয়া ভাল থাকলে প্রত্যেক সাপ্তাহিক ছুটিতে তারা বাড়িটাতে আসে এবং এই প্রত্যন্ত অঞ্চলটাকে তাদের রেডিও’র শব্দে ভরিয়ে ফেলে। আমি গোমড়া মুখে জানালা দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে তাদের কাজকর্ম দেখি।

সবচেয়ে খারাপ ঘটনাটা হল, সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে আমার বন্ধুটি আমার সাথে দেখা করতে আসা বন্ধ করে দিল। আমি জানতাম যে আমার প্রতিবেশীরা তাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। একদিন দূর থেকে উঠানের মধ্যে তাদের মাঝখানে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। আমার নিজেকে খুব অসহায় লাগে। অবশেষে আমাকে মনে মনে স্বীকার করতে হল যে, আমার পরিস্থিতি কতটা নাজুক। মনে হল জমিটা বিক্রি করে দিয়ে অন্য কোথাও চলে যাই।

আশা করলাম যে, শহুরে লোকদের কাছ থেকে জমিটির ভাল দাম পাব। তবে যখন আমি রিয়েল এস্টেটের দালালের শরণাপন্ন হলাম, সে আমাকে খোলাখুলি বলল, যেহেতু পাশের জমিতে একটা সুয়ারেজ ইয়ার্ড আছে এবং আমার বাড়ি বসবাসের অযোগ্য তাই, এই জমি বিক্রি করা প্রায় অসম্ভব। সে আরো বলল যে, আমার প্রতিবেশীরাই কেবল এই জমি কেনার ব্যাপারে আগ্রহী হতে পারে। যারা সত্যিকার অর্থে এখানে আমার উপস্থিতিতে বিরক্ত এবং আমাকে এখান থেকে বিদায় করার জন্য নামমাত্র একটা মূল্য দিতে রাজী। তারা এই দালালকে জানিয়েছে যে তাদের বাহির উঠানের সামনে আমার বাড়িটি একটা চক্ষুশূল এবং তাদের বন্ধু-বান্ধব বেড়াতে এলে এটা তাদের জন্য বিব্রতকর হয়ে দাঁড়ায়। এটা শুনে আমি খুবই মর্মাহত হলাম। আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলাম যে, এই জমি কখনই আমার প্রতিবেশীদের নিকট বিক্রি করব না। কখনই আমার উপর দিয়ে তাদেরকে টেক্কা দিতে দিব না। আমি কোন কথা না বাড়িয়ে দালালটির কাছ থেকে চলে আসি। যখন আমি বিষন্ন মনে দরজার বাইরে পা রাখি তখন তার অন্য রুমে হেঁটে যাওয়ার এবং তার বউয়ের সাথে কথা বলার এবং উচ্চস্বরে হাসার শব্দ শুনতে পাই।

এটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়।

কয়েক সপ্তাহ পর আমার বন্ধুটি যখন কোন কিছু না জানিয়ে আমার এখানে আসা একবারে বন্ধ করে দেয় তখন আমার তিক্ততা কানায় কানায় ভরে উঠে। আমি হতাশার সাগরে নিমজ্জিত হই এবং সিদ্ধান্তে আসি যে, বাড়ি বানানোর পরিকল্পনা বাদ দিয়ে শহরে গিয়ে আমার পুরাতন চাকরীতে ফিরে যাব। আমার প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তিরা আমার জায়গায় নেয়ার মত এমন কাউকে খুঁজে পায় নি যে, এই দীর্ঘ কর্ম ঘন্টা হাসি মুখে সহ্য করবে এবং নিজেকে এই অন্তহীন জটিলতার মধ্যে নিক্ষেপ করবে। তারা বেশ কয়েকবার চিঠি লেখে আমাকে ফিরে আসতে বলেছে এবং বেশী বেতনের প্রস্তাব দিয়েছে। আমার মনে হল আমি খুব সহজেই আমার পুরাতন জীবনে ফিরে যেতে পারি। তাহলে এই গ্রামাঞ্চলে আমার এই থাকাটাকে একটা দীর্ঘ ছুটি কাটানো বলে চালিয়ে দেয়া যায়। এমনকি কিছুক্ষণের জন্য আমার মধ্যে এই উপলব্ধি আসে যে আমি শহুরে জীবন এবং অফিসে আমার পরিচিতদের অভাব অনুভব করছি, যারা আমাকে বিশেষ করে কর্মক্লান্ত দিন শেষে পানীয় কিনে খাওয়াত। জমির দালালটিকে আমার প্রতিবেশীদের কাছে জমি বিক্রির প্রস্তাব দিতে বলি এবং নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করি যে আমি সঠিক কাজটিই করছি। তবে এই কাজে আমার হৃদয় টানে নি। জিনিসপত্র বাঁধার সময় এবং বাড়ির ক্ষুদ্র চৌহদ্দির মধ্যে শেষবারের মত হেঁটে বেড়ানোর সময় নিজেকে একজন বদলে যাওয়া মানুষ মনে হতে থাকে।

প্রথম সূর্যালোকে আমার সুটকেস দরজার বাইরে আসে এবং আমার ভাড়া করা ট্যাক্সিটি ধুলো-ধূসরিত রাস্তা দিয়ে হেলেদুলে আমার কাছে চলে আসে। এবং আমি সত্যি সত্যি চলে যাচ্ছিলাম। মনে হল আমি বোধ হয় একটু তাড়াহুড়া করে ফেলছি। তরুণ বন্ধুটির কাছ থেকে বিদায় না নিয়ে যাওয়াটা বোধ হয় ঠিক হবে না, যে বন্ধুটির নামও আমি জানি না। ট্যাক্সি চালককে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে পরের দিন ঠিক এই সময়ে আসতে বলি। সে আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে গাড়ি নিয়ে চলে যায়। ট্যাক্সির পেছনে ধুলো ঘূর্ণি হয়ে উঠে গাড়ির পেছন পেছন যেতে থাকে। আমি সুটকেসগুলো রুমের ভেতরে নিয়ে এসে বসে থাকি। আমার বন্ধুটিকে কিভাবে খুঁজে বের করা যায় তা ভেবে কিছুটা সময় ব্যয় করার পর আমার মনে হল যে, বোকার মত কাজ করে ফেলেছি। এরকম শোচনীয় পরিস্থিতিতে নিজেকে আরেকটা দিন ধরে রাখার কোন মানে হয় না এবং তাকে খুঁজে পাওয়াও সম্ভব নয়। অফিসের কর্তাব্যক্তিরা যখন দেখবে যে আমি অফিসে এসে উপস্থিত হই নি তখন বিরক্ত হয়ে উঠবে। তারা আমার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে আমার খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করবে। এবং খোঁজ নিতে না পেরে পুরোপুরি হতাশ হয়ে যাবে। সকাল গড়িয়ে যেতে থাকে এবং আমি আরো বেশী অস্থির ও নিজের প্রতি রেগে উঠি। আমার মনে হয় যে, বিশাল ভুল করে ফেলেছি। তবে এটা ভেবে একটু স্বস্তি পাই যে, পরের দিন সবকিছু পরিকল্পনা মাফিক হবে এবং শেষমেষ মনে হবে যে এই দিনটি আমাকে কখনও পার করতে হয় নি।

সেই দীর্ঘতপ্ত বিকেলে ছোট ছোট পাখিরা কাঁটাময় ঝোপঝাড়ে ডানা ঝাপটাতে থাকে এবং মাটি থেকে মিষ্টি গন্ধ ভেসে ওঠে। আকাশ ছিল মেঘশূন্য এবং সূর্য জমিনের বুকে কালো ছায়া ফেলছিল। আমি চারপাশের সৌন্দর্য থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে কাচারী ঘরের দেয়ালের পাশে বসে থাকি। আমার মন পড়ে থাকে শহরে এবং গ্রামের এই বন্দীদশা একঘেয়ে লাগতে শুরু করে। ঘরে রাতের বেলায় খাওয়ার মত কিছু ছিল না, তবে গ্রামের দিকে হেঁটে যেতেও ইচ্ছা করছিল না। ঠান্ডায় এবং ক্ষুধায় কাতর হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিছানায় নির্ঘুম শুয়ে থাকি।

সূর্যাদয়ের আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়ি। আমি এমন ভয়ঙ্কর ক্ষুধার্ত ছিলাম যে, মনে হল যেন পেটে পাথর গজিয়েছে। ভাবলাম ট্রেন স্টেশনে গিয়ে সকালের নাস্তা সারা যাবে। জানালার বাইরে সবকিছু অন্ধকারে ঢাকা। অন্ধকার জঙ্গলের ওপাশে পুবের আকাশ ফর্সা হয়ে এলে দমকা হাওয়া এসে গাছের পাতা নাড়িয়ে দিল। ধীরে ধীরে গাছের পাতারা সবুজ রঙ ফিরে পেল। জঙ্গলে এবং বাড়ির পাশে পাখ-পাখালির কলকাকলী জেগে উঠে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। আমি খুব মনযোগ দিয়ে পাখিদের কল-কাকলী শুনলাম। অবশেষে যখন ট্যাক্সিটি চলে এল তখন এখানে এতই ভাল লেগে গেল যে, এখান থেকে চলে যেতে মন সায় দিল না। ট্যাক্সি চালক রাগারাগি করে চলে গেল।

পুরো সকালবেলা এবং বিকেল অব্দি আগের দিন ঠিক যেমনভাবে বসে ছিলাম সেভাবে আমি কাচারী ঘরে বসে রইলাম, তবে আজকে আমি অধৈর্য হয়ে পড়ি নি বা অন্য কোথাও যেতে মন উৎসুক হয় নি। আমার সামনে যা ঘটে চলে তাতে আমি মগ্ন হয়ে পড়ি—জঙ্গলের ভেতরে পাখদের হারিয়ে যাওয়া, পোকা-মাকড়দের পাথরের গা বেয়ে হেঁটে বেড়ানো—যেন আমি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছি, যেন আমি নিজের অনুপুস্থিতে সবকিছু চেয়ে চেয়ে দেখছি। অথবা এমন জায়গায় আছি যেখানে আমার থাকা উচিত নয়, যেখানে আমাকে কেউ চায় না, কিছুক্ষণের জন্য আলোর পেছনে পড়ে গিয়ে আমি নিজের ছায়া হয়ে উঠেছি; স্যুটকেসের ফিতা শীঘ্রই আটোসাটো হবে এবং আমি চলে যাব নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেতে : আমি আবার স্বাধীন হয়ে উঠব।

সন্ধ্যা নামার সময় আমি বুঝতে পারি নি যে, আমি ক্ষুধার্ত। বেশ হালকা বোধ হতে থাকে। আমি বসে বসে কিসের জন্য যেন অপেক্ষা করতে থাকি। প্রচণ্ড শীত এবং অন্ধকার তাড়িত হয়ে ঘরের ভেতরে এসে শুয়ে পড়ি এবং নানা ধরনের দুঃস্বপ্ন দেখি।

পরের দিন সকালবেলায় সবচেয়ে কাছের ক্ষেতটির দূর প্রান্তে ধীরে ধীরে হেঁটে আসতে থাকা একটা অবয়ব চোখে পড়ে। আমার মনে হল যেন একটি বিশাল শূন্যতা ভরে উঠল। শূন্যতাটির কথা না জেনেই আমি সেই কবে থেকে আমার বন্ধুর প্রতীক্ষায় বসে আছি। তাকে দেখার সাথে সাথে তার দ্বিধা অস্বাভাবিক মনে হতে শুরু হল এবং এটা আমাকে ভয় পাইয়ে দিল। সে হলরেখার ওপর দিয়ে হেলেদুলে আসছে, সে তার নাকটি এমনভাবে উপরে তুলে রেখেছে যেন স্প্যানিয়েল কুকুরের মত বাতাসের গন্ধ শুকছে এবং মনে হল কোথায় যাচ্ছে তা সে জানে না। তাকে এগিয়ে আনার জন্য তার দিকে দৌড়ে যাই এবং কাছাকাছি এসে দেখতে পাই যে, কপালে ব্যান্ডেজ বাঁধা এবং মুখ ভয়ানক ফ্যাকাসে। কাছে আসতেই সে হতচকিত হয়ে যায় এবং আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন আমি তার অপরিচিত। আমি তাকে ধরে ধরে নিয়ে আসি। বাড়িতে ঢোকা মাত্রই সে আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। ক্লান্তিতে সে থরথর করে কাঁপছিল। সে এত বেশী শুকিয়ে গেছে যে তার গালে গর্ত পড়ে গেছে এবং তার হাত হয়ে উঠেছে নখরের মত, চোখ জ্বরে জবা ফুলের মত লাল। আমি ডাক্তার ডাকতে গ্রামে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠি। তবে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হওয়ার পর সে অনেকটা ধীর-স্থির ভাবে কথা বলতে শুরু করে। অনেকক্ষণ ধরে সে কিছু একটা বলে এবং আমি কিছু না বুঝেই বিছানার পাশে বসে শুনে যাই। সে তার হাত দিয়ে বেশ কয়েকটা অঙ্গভঙ্গি করল এবং অবশেষে আমি বুঝতে পারি যে, শিকার করার সময় সে কোন একটা দূর্ঘটনার শিকার হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে যখন আমি তাকে মনে মনে গালাগাল দিচ্ছি তখন সে কোন এক হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে।

সে অবিরত কথা বলতে থাকে এবং সে কী বলছে সেদিকে মনযোগ দেয়া আমার জন্য কঠিন হয়ে উঠে। আমি অধৈর্য হয়ে উঠি। কিছুক্ষণ পর আমি এটা আর নিতে না পেরে উঠে দাঁড়িয়ে রুমের ভেতরে পায়চারি করতে শুরু করি। অবশেষে সে চুপ করে এবং রুমের এক কোনে জানালার নীচে আঙুল নির্দেশ করে। আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না কারন সেখানে জানালা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। হঠাৎ আমি বুঝতে পারলাম যে, সে ছবি আকার বোর্ডের দিকে আমার মনযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে যা ওখান থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে। মানে, সে আমার বাড়ির নীলনকশাটা দেখতে চায়। মোড়ক খুলে নীলনকশাটা তার হাতে দিলাম। তারপরও তাকে অসন্তুষ্ট মনে হল। পকেট হাতড়ে একটা পেনসিল বের করে তাকে দিলাম। সে নীলনকশার উপর আঁকতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যে সে পুরো কাগজটি কিনারা পর্যন্ত জটিল সব চিত্র দিয়ে ভরে ফেলল। তার দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে কাগজটির দিকে তাকিয়ে থেকে অবশেষে আমি একটি টাওয়ারের ছবি চিনতে পারলাম এবং এমন একটা কিছু যাকে এই সব আঁকিবুঁকির মধ্যে একটা দরজা বলে বোধ হল। পৃষ্ঠাটি ভরিয়ে ফেললে আমি তাকে আরো পৃষ্ঠা এনে দিলাম এবং সে আঁকতে থাকল। আঁকার সময় তার হাত থামে নি বললেই চলে এবং যা সে এঁকেছে তার মধ্যে এমন জটিলতা আছে যা, বহু নিঃসঙ্গ দিনের চিন্তা এবং অনুশীলনের ফলেই কেবল আয়ত্ত করা সম্ভব। যখন সে এতই ক্লান্ত হয়ে পড়ল যে, পেনসিল নড়ানোর মত শক্তিও আর অবশিষ্ট রইল না, তখন সে ঘুমিয়ে পড়ল। সেই সন্ধ্যায় আমি তাকে রেখে গ্রামে খাবারের খোঁজে গেলাম।

ক্ষেত-খামার পাড়ি দিয়ে বাড়িতে ফেরার সময় লাল রঙের ভূ-দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে মনে হল যে আমি এটার সাথে গভীরভাবে পরিচিত, যেন এখানে আসার অনেক আগে থেকেই এটা আমার। এটাকে ছেড়ে যাওয়ার চিন্তাকে তাৎপর্যহীন মনে হল। কয়েক দিনের মধ্যে আমার ক্ষোভ এবং হতাশায় ভাটা পড়ে, এখন সেই শুরুর দিককার মত যে জিনিসের দিকেই তাকাই না কেন, মনে হয় যেন একটা খোলস অথবা একটা খোসা যা ফেঁটে গিয়ে একটা নিখুঁত ফল বের হয়ে পড়বে। ক্লান্ত হওয়া সত্ত্বেও, আমার মন সম্মুখ পানে ধাবিত হল : আমি বাড়ির পাশের এক ফালি জমি পরিষ্কার করে নিয়ে একটা আস্তাবল তৈরী করে সাদা-কালো গাভীদের নিয়ে এসে সেখানে ঢোকালাম আর ভীত-সন্ত্রস্ত মুরগীরা এগুলোর চারপাশে হেঁটে বেড়াতে লাগল। প্রতিবেশীর বাড়িটাকে আড়াল করার জন্য বাড়ির সীমানা দিয়ে একসার সাইপ্রেস গাছ লাগালাম। ধ্বসে পড়া দেয়ালটি ভেঙ্গে ফেলে একই পাথর দিয়ে আমার নিজস্ব খামার বাড়ি তৈরী করে ফেললাম। শেষ হওয়ার পর মনে হল এটা যার চোখে পড়বে তারই ঈর্ষা জাগ্রত হবে। আমার স্বপ্ন সত্যি হবে, প্রথমে যেমনটা হওয়ার কথা ছিল।

আমি সম্ভবত প্রলাপ বকছিলাম। ব্যাপারটির এমন পরিণতি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। তবে আমি যখন ক্ষেতের উপর হলরেখার গভীরে এক পা দিয়ে এবং আরেক পা দিয়ে হলরেখার চূড়া অতিক্রম করে হেঁটে আসছিলাম, এই আশঙ্কায় আমি খুবই খুশী হয়ে উঠি যে, যেকোন সময় আমার হতাশা এবং নৈরাশ্য পঙ্গপালের মত আকাশ অন্ধকার করে দিয়ে আমার উপর নিমজ্জিত হবে। সন্ধ্যাটা স্নিগ্ধ, আলো নরম ও কমনীয়, পৃথিবীটা পক্ষাঘাতগ্রস্থ এবং আমি, অনেক নীচে, একমাত্র সচল প্রাণী।

Thursday, March 12, 2020

কুয়েতের মরুভূমিতে তাজমহল মসজিদ অনন্য ইসলামী স্থাপত্য by মেহেদী হাসান

সিদ্দিকা ফাতেমা জোহরা মসজিদ। অবস্থান কুয়েত এয়ারপোর্টের কাছে। তবে এটি তাজমহল মসজিদ নামেই পরিচিত সবার কাছে। কারণ এটি দেখতে ভারতের আগ্রায় অবস্থিত জগৎবিখ্যাত তাজমহলের মতো। আর শুধু এটাই এ মসজিদের জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ।
তাজমহলের মতো গঠন ছাড়া এ মসজিদের তেমন কোনো আলাদা জৌলুশ বা বৈশিষ্ট্য নেই। দূর থেকে এ মসজিদের প্রতি চোখ পড়তেই যে কারোর মনে হবে যেন তাজমহল দেখা যাচ্ছে। মরুভূমিতে তাজমহল। এ মসজিদের প্রতি চোখ পড়া মাত্র দর্শকদের স্মরণ করিয়ে দেয় আগ্রার তাজমহলের কথা। তাই এ মসজিদের প্রতি মানুষের ভালোবাসা মূলত তাজমহলের প্রতিই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। মসজিদটি নির্মাণের পর থেকেই সবার কাছে জনপ্রিয়তা পায়। এ মসজিদের প্রতি মানুষের আগ্রহ আর ভালোবাসা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে প্রায় ৪০০ বছর পরও তাজমহলের অসাধারণত্বের কথা।
মসজিদটি কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে অবস্থিত হওয়ায় খুব সহজে এটি দর্শকদের চোখে পড়ে। দেখতে তাজমহলের মতো হওয়ায় শুধু মুসলিম নন অমুসলিমদেরও অনেকে চলার পথে গাড়ি থামিয়ে কিছুক্ষণের জন্য হলেও নেমে পড়েন এ মসজিদের সামনে। ছবি তোলেন। এরপর মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেন আসলেই তিনি তাজমহল দেখছেন কি না। দর্শকদের সামলাতে আর তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রায় সব সময় ব্যস্ত থাকতে হয় মসজিদের খাদেমদের।
মসজিদটি নির্মাণ শুরু হয় ২০০৮ সালে। শেষ হয় ২০১১ সালে। এর মার্বেল পাথর আনা হয়েছে ইরান থেকে। তাজমহলের মার্বেল পাথর সাদা। এর মার্বেল পাথর কিছুটা বাদামি। ভারত ও ইরানের কারিগর দ্বারা মার্বেল পাথরের কারুকাজ করানো হয়েছে।
মসজিদের পাশে তৈরি করা হয়েছে একটি লাইব্রেরি। রয়েছে নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা কমিউনিটি সেন্টার, অভ্যর্থনা কেন্দ্র। মসজিদের মোট মুসল্লি ধারণক্ষমতা চার হাজার। এর মধ্যে ৫০০ নারীর একসাথে আলাদা স্থানে সালাত আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে এক হাজার গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। কুয়েতের সংসদ সদস্য হাসান জওহারের ব্যক্তিগত উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে মসজিদটি। তাজমহলের অনুকরণে নির্মিত মসজিদটি নির্মাণের আগে ভারতের কাছ থেকে অনুমতি নেয়া হয়েছে।

Wednesday, November 20, 2019

শ্রেণিকক্ষে গাইড বই কি বাধ্যতামূলক? by মেহেদী হাসান

পঞ্চম শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থী ক্লাসে গাইড বই নিয়ে যায়নি। সে কারণে শিক্ষক ওই শিক্ষার্থীর ডায়েরিতে লাল কালি দিয়ে লিখেছেন গাইড বই নিয়ে আসেনি। শুধু তাই নয় নির্দিষ্ট একটি প্রকাশনা সংস্থার গাইড বইয়ের নাম উল্লেখ করে তিনি এ কথাটি লিখেছেন ডায়েরিতে।
ঘটনাটি ঘটেছে কয়েকদিন আগে রাজধানীর বনশ্রীতে অবস্থিত নামকরা একটি স্কুলে। পঞ্চম শ্রেণীর ওই শিক্ষার্থীর অভিভাবক তার সন্তানের ডায়েরিতে শিক্ষক কর্তৃক এ ধরনের লেখা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়েছেন। মোবাইলে তিনি ডায়েরির ওই পাতার একটি ছবিও তুলে রেখেছেন।
যে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ডায়েরিতে এ ধরনের লেখা লিখেছেন সেই স্কুলের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক এ প্রতিবেদককে জানান, পঞ্চম শ্রেণী থেকে শুরু করে উপরের বিভিন্ন ক্লাসেও শিক্ষকেরা ক্লাসে গাইড থেকে পড়ান। গাইড থেকে বাসায় পড়া দেন শিক্ষার্থীদের। সে কারণে বিভিন্ন শ্রেণীতে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে গাইড নিয়ে যেতে হয়। স্কুল থেকে দুই তিনটি প্রকশনা সংস্থার গাইড কিনতে বলে দেয়া হয়। পঞ্চম শ্রেণী থেকেই অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের সব বিষয়ের জন্য একাধিক গাইড কিনে দেন।
অনেক অভিভাবক জানান, এ চিত্র শুধু এ স্কুলে নয়। রাজধানীর আরো অনেক স্কুলের শিক্ষকরাও গাইড থেকে ক্লাসে পড়ান। আর সব স্কুলের সব শিক্ষার্থীকেই গাইড কিনতে হয় বাধ্যতামূলকভাবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক জানান, আমি আমার পঞ্চম শ্রেণীপড়–য়া মেয়ের জন্য গাইড কিনতে একটু দেরি করেছিলাম। সেজন্য আমার মেয়ে আর স্ত্রী আমার কান ঝালাপালা করে দিয়েছে গাইড না কেনা পর্যন্ত। মেয়ে প্রতিদিন বলত তার সব সহপাঠীরা প্রতিদিন ক্লাসে গাইড নিয়ে আসে। টিচার গাইড থেকে পড়ায়। তার গাইড না থাকার কারণে সে পিছিয়ে পড়ছে। শিক্ষকেরা বকা দিচ্ছে তার গাইড না থাকার জন্য।
শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণরূপে এভাবে গাইড নির্ভর হওয়া, ক্লাসে গাইড পড়ানো, স্কুল কর্তৃক গাইড কিনতে বাধ্য করা প্রভৃতি বিষয়ে অনেক অভিভাবক জানিয়েছেন, গাইড ছাড়া বর্তমানে সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অচল। তা ছাড়া পঞ্চম শ্রেণী ও অষ্টম শ্রেণীর পাবলিক পরীক্ষার কারণেও শিক্ষার্থীদের গাইড ও কোচিং প্রাইভেট নির্ভর হতে বাধ্য করেছে।
অনেক অভিভাবক তীব্র ক্ষোভের সাথে জানান, সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা আর ঘনঘন পাবলিক পরীক্ষার মাধ্যমে এই উপকার হয়েছে যে, আগে এসএসসি পর্যন্ত পড়ালেখা শেষ করতে কোনো ধরনের নোট গাইডের প্রয়োজন হতো না। আর বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণী থেকে অবশ্যই শিক্ষার্থীদের গাইড পড়তে হবে। আর জিপিএ প্রতিযোগিতার কারণে চতুর্থ শ্রেণী থেকেই এখন অনেক অভিভাবক শুরু করেন বাচ্চাদের কোচিং প্রাইভেট। অথচ একটা সময় ছিল যখন পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের গাইড পড়ানোর কথা কল্পনাই করা যেত না। আর বর্তমানে সম্পূর্ণ তার উল্টো চিত্র। বিশেষ করে সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা আর সমাপনী পরীক্ষা চালুর মাধ্যমে শিক্ষার এই পরিণতি হয়েছে। এসব কারণে শিক্ষার ব্যয়ও বেড়েছে কয়েক গুণ। আর হয়রানির তো শেষ নেই।
ক্ষুব্ধ অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেছেন কোনো কোনো স্কুল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে নির্দিষ্ট কিছু গাইড কিনতে বাধ্য করে অভিভাবকদের। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে এই নোংরা সংস্কৃতি।
অনেক অভিভাবক অনুরোধ করেছেন সৃজনশীল ব্যবস্থা আর সমাপনী ও জেএসসি পরীক্ষা যাতে সরকার বন্ধ করে সেজন্য দয়া করে একটু লেখেন পত্রিকায়।
যে স্কুলের শিক্ষক শিক্ষার্থীর ডায়েরিতে লাল কালি দিয়ে নির্দিষ্ট একটি কোম্পানির গাইড বই ক্লাসে না আনার বিষয় উল্লেখ করেছেন সেই স্কুলের মাধ্যমিক শাখার একজন ইংরেজি শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বলেছেন, এটি দুর্ভাগ্যজনক। আমরা শিক্ষার্থীদের গাইড কেনার কথা বলি সত্য কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো কোম্পানির গাইড কেনার কথা বলি না। অভিভাবক যেটা ভালো মনে করেন সেটিই কেনেন।

Thursday, August 22, 2019

শিশুদের ভাষার আগে ব্যাকরণ শেখাচ্ছে স্কুল! by মেহেদী হাসান

শাওন রাজধানীর বনশ্রীর একটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। কয়েক দিন আগে তার অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তার ইংরেজি বিষয়ের প্রশ্ন ছিল মোট তিন পৃষ্ঠার। এর মধ্যে ইংরেজি গ্রামার বিষয়ে তিনটি প্রশ্ন ছিল। এগুলো হলো গ্রামার কাকে বলে উদাহরণ দাও, সাউন্ড কাকে বলে, অ্যালফাবেট কাকে বলে উদাহরণ দাও।
শাওন এ প্রতিবেদককে জানায়, ব্যাকরণ বিষয়ে স্কুল থেকে তাদের জন্য কোনো বই পাঠ্য করেনি। তবে ইংরেজি বিষয়ে স্কুল থেকে তাদেরকে যে শিট দেয়া হয়েছে তাতে এক পৃষ্ঠায় ইংরেজি গ্রামার বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। সেখান থেকেই স্কুলের পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছে।
শাওনের ইংরেজি প্রশ্নপত্রে যেসব প্রশ্ন এসেছে তার অনেক কিছুই মূল বইয়ে নেই। সাধারণত অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষা হয় বইয়ের প্রথম অর্ধাাংশ থেকে। শাওনের ইংরেজি বিষয়ের প্রশ্নপত্রে এমন সব প্রশ্ন রয়েছে, যা দ্বিতীয় শ্রেণীর জন্য সরকারিভাবে পাঠ্যকৃত ইংরেজি বইয়ের প্রথম অর্ধাংশে তো নেই-ই পুরো বইয়ে নেই। প্রশ্নপত্রে বাংলা থেকে ইংরেজি ও ইংরেজি থেকে বাংলায় ট্রান্সলেশন এসেছে। বাংলা থেকে ইংরেজি ট্রান্সলেশনের মধ্যে একটি বাক্য রয়েছে ‘কত দিনে এক সপ্তাহ?’। আবার ইংরেজি থেকে বাংলাকরণের মধ্যে একটি বাক্য রয়েছে! 'ডব যধাব ধ ারষষধমব.'
শাওনের অভিভাবক এ প্রতিবেদককে বলেন, উই হ্যাভ এ ভিলেজ’ এটা কোন জাতের বাক্য। এ ছাড়া কি আর কোনো অর্থবোধক সহজ কথা দুনিয়ায় নেই?
এ ছাড়া প্রশ্নপত্রে সত্যমিথ্যা নির্ণয়, বাক্য রচনা ও প্যারাগ্রাফ রাইটিং রয়েছে। শাওন জানায়, যেসব প্রশ্ন বইয়ে নেই তা স্কুল থেকে দেয়া শিট থেকে এসেছে পরীক্ষায়।
দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল থেকে গ্রামার বই পাঠ্য করা না হলেও রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলে তৃতীয় শ্রেণী থেকে ভারী ইংরেজি গ্রামার বই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইংরেজি পরীক্ষায় ব্যাকরণ থেকে করা হয় কঠিন সব প্রশ্ন। বিভিন্ন স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীর জন্য পাঠ্য করা হয়েছে ২৬০ পৃষ্ঠার ইংরেজি গ্রামার বই। এ বইয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে টেন্স, পার্টস অব স্পিচ, সেন্টেন্সসহ ব্যাকরণের যাবতীয় বিষয়। এ ছাড়া এ বইয়ে আরো যেসব বিষয় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ভাওয়েল, কনসোনেন্ট, ওয়ার্ড অ্যান্ড সিলেবল, সাবজেক্ট অ্যান্ড প্রেডিকেট, জেন্ডার, নাম্বার, কেস প্রভৃতি।
তৃতীয় শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীর একজন অভিভাবক এ প্রতিবেদককে বলেন, আমি যখন এইচএসসিতে পড়ি তখন দু’জন ইংরেজি শিক্ষকের যৌথভাবে লেখা একটি ইংরেজি গ্রামার বই পড়েছিলাম। ২৫ বছর পরে তাদেরই লেখা গ্রামার বই এখন দেখতে পাচ্ছি আমার তৃতীয় শ্রেণী পড়ুয়া সন্তানের জন্য পাঠ্য করা হয়েছে। বইয়ের ওপর লেখা রয়েছে ফর ক্লাস থ্রি। কিন্ডার গার্টেন, মাদরাসা ও প্রাইমারি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য রচনা করা হয়েছে এ বই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ অভিভাবক বলেন, এ বই দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। তৃতীয় শ্রেণীর শিশুদের জন্য কী করে তারা ব্যাকরণ বই লিখতে পারলেন। তা-ও আবার এত বড় এবং বিস্তারিতভাবে।
এ অভিভাবক বলেন, যেখানে তৃতীয় শ্রেণীর একটি শিশু ভালো করে নিজের মাতৃভাষাই শেখেনি সেখানে তার ওপর স্কুল থেকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বিশাল এ ইংরেজি ব্যাকরণ বই। তৃতীয় শ্রেণীর একটি শিশু ইংরেজি ভাষারই বা কী জানে। এত ছোট শিশুদের ওপর কেন চাপানো হলো এ বিশাল ব্যাকরণ বইয়ের বোঝা? মানুষের নীতিনৈতিকতা কত নিচে নামতে পারে তার উদাহরণ এ বই।
রাজধানীর অনেক স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীতেও পড়ানো হচ্ছে অতি পরিচিত এ দুই লেখকের লেখা ইংরেজি গ্রামার বই। বনশ্রীর চতুর্থ শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, স্কুলে বিশাল ব্যাকরণ বই পাঠ্য করা হয়েছে; কিন্তু স্কুল থেকে এসব তেমন কিছু শেখানো হচ্ছে না। পুরো কোর্স শেষ করতে পারে না। অনেক বিষয় স্কুলে আদৌ টাচই করা হয় না; কিন্তু পরীক্ষায় সেসব বিষয়ে প্রশ্ন আসে। আসলে শিক্ষকদের কাছে যারা প্রাইভেট পড়ে তাদেরকে পরীক্ষার আগে প্রশ্ন বলে দেন অনেক শিক্ষক। আর তারা পরীক্ষায় ভালো করে। আমার মেয়েকে প্রাইভেট পড়াতে পারিনি। সে ইংরেজি পরীক্ষায় মোটেই ভালো করতে পারেনি।
চুতর্থ শ্রেণীর আরেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, কোনো দিন কি কেউ শুনেছেন, স্কুলের ক্লাসে শিক্ষার্থীরা ব্যকরণ শিখতে পারে ভালো করে? গণিত যেমন কোচিং বা প্রাইভেটে শিখতে হয় তেমনি ব্যাকরণও শিক্ষার্থীরা মূলত শেখে কোচিং প্রাইভেটে অথবা মা-বাবার কাছে। আর অনেকে শেখে নিজে বই পড়ে। আসলে এসব বই পাঠ্য করে শিক্ষার্থীদের ওপর যেমন মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে তেমনি অভিভাবকদেরও ঠেলে দেয়া হয়েছে হয়রানির মধ্যে। বাধ্য করা হচ্ছে এই ছোট শিক্ষার্থীদের কোচিং প্রাইভেট পড়তে শিক্ষকদের দ্বারস্থ হতে।
অনেক অভিভাবক ক্ষোভের সাথে জানিয়েছেন, বিভিন্ন স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষ যা ইচ্ছা তা করে যাচ্ছে; কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ বিষয়ে কোনো দেখভাল করছে না। তাদের সঠিক তদারকি থাকলে কোনো স্কুল এভাবে তৃতীয় শ্রেণীর জন্য গ্রামার বই যেমন পাঠ্য করতে পারত না তেমনি কোনো লেখক-প্রকাশকও এসব বই লেখা ও প্রকাশে আগ্রহী হতেন না। তাদের মতে, যেসব স্কুল এসব বই পাঠ্য করেছে তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। শিক্ষার নামে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জিম্মি দশা থেকে মুক্ত করা উচিত।

Wednesday, August 7, 2019

অপরিকল্পিত নগরায়ন থেকে ডেঙ্গুর উৎপত্তি -আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন by মেহেদী হাসান

বাংলাদেশের মতো মওসুমি বায়ুর দেশে ব্যাপক আকারে ডেঙ্গু জ্বর ছড়িয়ে পড়ার পেছনে অন্যতম কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ন।

জলাবদ্ধতা, নির্মাণাধীন ভবন ও বড় বড় প্রকল্প এলাকায় নিয়মিত জমে থাকা পানি থেকে ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়াসহ মশাবাহিত বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দিচ্ছে। বর্তমানে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গু বাংলাদেশের অর্থনীতি, সামাজিক ও স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। আন্তর্জাতিক কোনো কোনো গণমাধ্যমে বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে মহামারী আকারে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) উদ্ধৃতি দিয়ে এসব খবরে বলা হয়েছে বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক এবং পরিস্থিতি এভাবে অব্যাহত থাকলে এটি মহামারী আকার ধারণ করবে।

তুরস্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর খবরে বলা হয়েছে জলাবদ্ধতা, নির্মাণাধীন ভবন ছাড়াও ঢাকায় মেট্রোরেলসহ ব্যাপকভিত্তিক অনেক নির্মাণ প্রকল্প এলাকায় নিয়মিত পানি জমে থাকছে, যা এডিস মশাসহ অন্যান্য মশার অন্যতম প্রজনন কেন্দ্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং এ পানি অপসারিত হতে কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লাগে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ৯০ ভাগ রোগী ঢাকার।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী এ বছর জুলাই মাসের ২৪ তারিখ পর্যন্ত আট হাজার ৫৬৫ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছে। গত বছর ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৪৫০।

এ বছর শুধু জুলাই মাসেই ছয় হাজার ৪২১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে, যা গত বছর এ সময়ের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি। একে অনেকে মহামারীর সাথে তুলনা করছেন। ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত অনেকের মৃত্যুর তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে প্রকৃত ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রদত্ত তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি।
২০০০ সালের আগ পর্যন্ত মূলত ঢাকায় বিচ্ছিন্ন কিছু ডেঙ্গু আক্রান্তের রেকর্ড রয়েছে। ২০০০ সালে ডেঙ্গু ব্যাপক আকার ধারণ করে। সে বছর ৫ হাজার ৫৫১ জন আক্রান্ত হয়, যার মধ্যে ৯৩ জন মারা যায়। এরপর প্রায় প্রতি বছর নিয়মিতভাবে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটছে।

অন্যান্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও এ ডেঙ্গু জ্বরের ভাইরাস আসার পর এখানকার উপযোগী পরিবেশে তা টিকে থাকছে।
বর্তমানে একমাত্র ইউরোপ ছাড়া সব মহাদেশের বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মওসুমি ও মওসুমি বায়ু অঞ্চলে এর প্রাদুর্ভাব বেশি। ফিলিপাইনে এ বছর ৪৫৬ জন মারা যাওয়ার পর রাষ্ট্রীয় সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

১৭৭৯ সালে ডেঙ্গু নামকরণের পর ১৭৮০ সালে সর্ব প্রথম এশিয়া আফ্রিকা ও উত্তর আামেরিকায় ডেঙ্গু মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ডেঙ্গু রোগ ও তা ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাস বিষয়ে বলা হয়েছে অধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত অপরিকল্পিত শহরাঞ্চল যেখানে সুষ্ঠু পানি, পয়ঃ ও বর্জ ব্যবস্থাপনা নেই সেখানে এটি ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেশি।
চীনের মেডিক্যাল এনসাইক্লোপেডিয়া অনুযায়ী সম্ভবত প্রথম ডেঙ্গু রোগীর সন্ধান পাওয়া যায় সে দেশে ২৬৫ থেকে ৪২০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। বিষাক্ত পানি আর উড়ন্ত পোকার মাধ্যমে সে সময় এক প্রকার রোগ ছড়িয়ে পড়ার তথ্য রয়েছে।

Friday, June 21, 2019

যে কারণে অলৌকিক স্বপ্নটা ছোঁয়া গেল না... by মেহেদী হাসান

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩৮২ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে হেরেছে বাংলাদেশ। কিন্তু প্রশংসা কুড়িয়েছে বিশ্লেষক থেকে সাবেকদের।
ম্যাচ জিততে না পারলেও হৃদয় জিতেছে বাংলাদেশ—কথাটা এ দেশের ক্রিকেটভক্তদের কাছে পুরোনো। ২০১২ এশিয়া কাপ থেকে অনেকবারই এ প্রশংসায় ভাসতে হয়েছে। কালও ফিরে আসল কথাটা। অস্ট্রেলিয়ার ৩৮২ রানের পাহাড়ে উঠতে গিয়ে থামতে হয়েছে অল্প একটু পথ বাকি থাকতে। সেই পথটুকু সংখ্যায় মাত্র ৪৮ রান। এমন লড়াই দেখে হৃদয় না সঁপে পারেননি পাকিস্তানের সংবাদকর্মী আজমল জামি। তাঁর টুইট, ‘শুধু লড়াকু মানসিকতাটুকু দিয়ে বাংলাদেশ আবারও অসংখ্য হৃদয় জিতে নিল।’
প্রতিপক্ষ চার শ ছুঁইছুঁই রান করলে স্বাভাবিকভাবেই বোলারদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা কাল ম্যাচ শেষে হারের কারণ ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘আমরা ৪০-৫০ রান বেশি দিয়েছি শেষের দিকে। না হলে ব্যাটসম্যানরা ভিন্ন মানসিকতা নিয়ে খেলতে পারত, রান তাড়ার ধরনটাও ভিন্ন হতো।’ সহজ কথায় লক্ষ্যটা সাড়ে তিন শ-র মধ্যে থাকলে ব্যাটসম্যানদের ওপর চাপটা একটু কম থাকত। কিন্তু কাল বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং দেখে কি মনে হয়েছে, জেতার জন্য ব্যাটসম্যানরা ভীষণ চাপ নিয়ে ফেলেছেন?
হ্যাঁ, চাপ তো থাকবেই। তা আড়াই শ-তিন শ রান তাড়া করতে গেলেও থাকে। তবে লক্ষ্য যখন চার শ ছুঁই ছুঁই তখন তাড়া করায় আলাদা কিছু থাকতে হয়। তামিম ইকবাল ব্যাটসম্যান বলেই বোধ হয় খামতিটা ধরতে পারলেন—তাঁর ব্যাখ্যা, ‘আমাদের এ রকম বড় রান তাড়া করার অভিজ্ঞতা বেশি নেই। সবাই কিছু না কিছু ভুল করেছি বলেই পারিনি।’ আসলে ভুল তো সেরা দলেরও হয়। আর এই রান তাড়া করতে নামলে বেশির ভাগ সময়ই হবে না। বাংলাদেশের মতো দল কুড়ি বার তাড়া করতে নামলে হয়তো একবার হবে। কাল কিন্তু সেই একবার হওয়ানো—মানে ‘অলৌকিক’ কিছু ঘটানোর সুযোগটা ভালোই ছিল।
হারের ব্যবধান দেখে বাজে বোলিং-ফিল্ডিং, ক্যাচ ছাড়ার খামতিগুলো চোখে বিঁধবেই। এসব না হলে ম্যাচটা বাংলাদেশ জিততেও পারত। তবে এসব ঘটে যাওয়ার পর ব্যাটিংয়ে নেমে জয়ের সম্ভাবনা ছিল। তা হয়নি তামিমের সেই ‘কিছু না কিছু ভুল’ আর একটি খামতির জন্য। খামতির কথায় পরে আসছি। আগে দু-একটি ভুল নিয়ে কথা বলা যায়। বাংলাদেশ গোটা ৫০ ওভার খেলে ৮ উইকেটে ৩৩৩ রান তুলেছে—ওয়ানডেতে দলের সর্বোচ্চ সংগ্রহ—১১৬টি বলে ‘ডট’ দিয়ে! অর্থাৎ বাকি ১৮৪ বল থেকে এ রান তুলেছেন ব্যাটসম্যানেরা। এবার হারের ব্যবধানটা দেখে নিশ্চয়ই কষ্ট বাড়ছে? আরেকটু স্ট্রাইক রোটেট করতে পারলে কিন্তু হয়ে যেত!
পাল্টা যুক্তি আসতে পারে, অস্ট্রেলিয়া তো তাঁদের ইনিংসে ১১১ বল ‘ডট’ দিয়েও ওই রানপাহাড় গড়েছে। অমন পাহাড় টপকাতে চাই চার-ছক্কার পসরা, স্ট্রাইক রোটেট করা কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে? সত্যিই তাই। চার-ছক্কাই চাই। চার মারায় অস্ট্রেলিয়ার (৩৪) চেয়ে খুব একটা পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ (৩০)। পার্থক্যটা আসলে বিগ হিটিংয়ে। ১০টি ছক্কা মেরেছে অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানেরা সর্বসাকল্যে মেরেছেন ৪ ছক্কা। দুই দলের মাঝে এই যে ছয়টি ছক্কার ব্যবধান সেটি আসলে সামর্থ্যের। খামতিটাও ঠিক এখানেই। বাংলাদেশ দলে স্বীকৃত ‘বিগ হিটার’ নেই। আর বিগ হিটার ছাড়া এমন রান পাহাড়ে উঠতে গেলে যত বেশি সম্ভব স্ট্রাইক রোটেট করার বিকল্প কি?
এবার ব্যাটিংয়ের ধরনে তাকানো যাক। তার আগে একটা প্রশ্ন—কে বেশি আক্রমণাত্মক, তামিম না সৌম্য? সাম্প্রতিক সময়ে সৌম্যকে মনে হলেও বাংলাদেশ দলের অভিজ্ঞ সমর্থক মাত্রই তামিমের স্ট্রোক প্লে-র সামর্থ্য সমন্ধে জানেন। এমন রান তাড়ার শুরুতে অভিজ্ঞতার সঙ্গে দরকার পড়ে বোলারদের ‘সেট’ হতে না দেওয়ার কৌশল। সৌম্য থাকলে পরের কাজটুকু হয়তো হয়ে যেত। সেটি না ঘটায় দায়িত্বটা নিতে হতো তামিমকেই। কিন্তু বাংলাদেশের এ ওপেনার নিজে ‘সেট’ হতে বেশি সময় নিতে গিয়ে বোলারদের চড়ে বসার সময় করে দিয়েছেন।
দলের প্রথম ছয় ব্যাটসম্যানের মধ্যে শুধু তামিমের স্ট্রাইকরেটই এক শ-র নিচে। আর চার শ ছুঁই ছুঁই সংগ্রহ তাড়া করতে নেমে দলের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যানের স্ট্রাইকরেট ৮৩.৭৮ হলে তা বেশি করে চোখে লাগাই স্বাভাবিক। পাওয়ার প্লে-র মধ্যেও বোলারদের ওপর খুব একটা চড়াও হতে দেখা যায়নি তামিমকে। অন্তত ডাউন দ্য উইকেট গিয়ে বোলারের লাইন-লেংথ এলোমেলো করে দেওয়ার চেষ্টাটা করতে পারতেন সাম্প্রতিককালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অন্যতম সেরা এ ওপেনার।
খেলার ধরনের কথা উঠলে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের প্রসঙ্গ চলে আসে। তাঁর ১০ বলে ৩২ রানের ‘ক্যামিও’তে বোলারদের লাইন-লেংথ এলোমেলো হয়েছে, তাতে রান বের করতে আসল সুবিধাটা হয়েছে অন্য প্রান্তের ব্যাটসম্যানদের। অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্যটা ছিল পরিষ্কার—৪০ ওভার শেষে গড়ে সাড়ে ছয়ের ওপরে রানরেট থাকায় ওখান থেকে উড়াল দিতে চেয়েছে দল। সেটা ম্যাক্সওয়েলের চেয়ে ভালো আর কে পারে! সে জন্য স্টিভ স্মিথের মতো ব্যাটসম্যানকেও নামতে হয়েছে ছয়ে।
কিন্তু বাংলাদেশ দলে কাল কোনো ব্যাটসম্যানই শুরু থেকে বোলারদের ওপর চড়াও হননি। সেট হওয়ার পর যা একটু চড়াও হতে দেখা গেছে মাহমুদউল্লাহকে। ততক্ষণে ৫৪ বলে দরকার ১৩৩। তা দেখে ক্রিকেট রসিক মাত্রই বলতে পারেন, এই তো ম্যাচ পালালে বল বাড়ে! আসলে ব্যাটিংটা বেশ ভালোই করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু রানের ঘাটতিটুকু দেখলে শুধু আফসোসই বাড়বে, ইস! শুরুতে যদি একটু মেরে খেলা যেত, কিংবা কোনো একজন ব্যাটসম্যান যদি ম্যাক্সওয়েলের মতো একটা ‘ক্যামিও’ উপহার দিতে পারতেন তাহলে হয়তো হয়ে যেত। কি হতো?
অলৌকিক কিছু ঘটানোর যে স্বপ্ন কাল দেখা হয়েছিল তা ছুঁয়ে দেখা যেত। এবার হলো না বটে। তবে কালকের ব্যাটিংটুকু বুঝিয়ে দিয়েছে সামনে এসব হওয়ার দিন আসছে! অর্থাৎ শুধু হৃদয় জিতে সন্তুষ্ট থাকা নয়, সঙ্গে ম্যাচও।

Saturday, March 16, 2019

‘শেবাগ স্যার, ভেজা প্যান্ট এখন...’ by মেহেদী হাসান

বীরেন্দর শেবাগ এখন কোথায়?
না, ‘নজফগড়ের নবাব’ কোথাও পালিয়ে যাননি। শেবাগ আছেন বহাল তবিয়তেই। প্রশ্নটি আসলে রসিকতার ছলে ঘুরপাক খাচ্ছে টুইটারে। শেবাগ নিশ্চয়ই তা দেখছেন। নিশ্চয়ই একটু অনুশোচনাও হচ্ছে। হয়তো ভাবছেন, কী ভেবে যে ওই বিজ্ঞাপনে অংশ নিয়েছিলাম!
গত জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট ও ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে বিরাট কোহলির দল। একেবারে তৃপ্তির ঢেকুর তোলা আতিথ্য পাওয়া বলতে যা বোঝায় আর কি। এরপর এল অস্ট্রেলিয়াকে ভারতের আতিথ্য দেওয়ার পালা। অতিথিদের ভালোভাবে ‘সৎকার’ করতে একটি বিজ্ঞাপন বানিয়েছিল ভারতের টিভি চ্যানেল স্টার স্পোর্টস। যা দেখলে যে কোনো অস্ট্রেলিয়ানেরই বুঝে ফেলার কথা, ভারতে ঠিক কী ধরনের আতিথ্য অপেক্ষা করছে তাঁদের দলের জন্য।
বিজ্ঞাপনটি টিভিতে না দেখে থাকলে হয়তো আর কপালে নেই। কারণ কাল অস্ট্রেলিয়ার কাছে ওয়ানডে সিরিজ হেরেছে ভারত। স্টার স্পোর্টস দেখার অভিজ্ঞতা থাকলে ব্যাপারটা বুঝে ফেলার কথা। ভারত সিরিজ হেরেছে আর স্টার স্পোর্টস ওই বিজ্ঞাপন সম্প্রচার করবে, পাগল নাকি! যেখানে নাকি ভারতের জয় ছাড়া প্রায় আর কোনো ম্যাচ-ই দেখানো হয় না। সে যাকগে, সেই বিজ্ঞাপনের মূল কুশীলব ছিলেন শেবাগ আর একগাদা দুগ্ধপোষ্য শিশু, আর বিষয়বস্তু—শিশুদের মূত্র!
বিজ্ঞাপনের শুরুতেই দেখা গেছে দুগ্ধপোষ্য শিশুর দল অস্ট্রেলিয়ার জার্সি পরে একটি ড্রেসিংরুমে ঢুকছে। সে সঙ্গে শেবাগের কণ্ঠে আদুরে ডাক, ‘ওলে ওলে ওলে। দেখ কে এসেছে এখানে? অস্ট্রেলিয়ার পুরো বাহিনী চলে এসেছে। ওলে ওলে ওলে।’এ কথা বলেই শিশুদের কোলে নেওয়ার জন্য এগিয়ে গেলেন শেবাগ। নিজেদের নিয়ে মশগুল শিশুদের দেখিয়ে শেবাগের ধারাবর্ণনা তখন চলছিল, ‘আমরা যখন অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিলাম, তখন ওরা জিজ্ঞেস করেছিল বেবি সিটিং করবে? আমরা বলেছিলাম, সবাই চলে আস, অবশ্যই করব।’
শেবাগের এ কথার গভীরে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজে ঋষভ পন্তের সঙ্গে টিম পেইনের স্লেজিং চালাচালি। মেলবোর্ন টেস্টে পেইন তাঁকে বলেছিলেন, ‘তুমি বেবি সিট করতে পার? আমি বউকে নিয়ে একদিন সিনেমা দেখে আসব, তুমি একটু বাচ্চাদের দেখে রাখবে।’ বিজ্ঞাপনের ওই পর্যন্ত দেখার পর মনে হবে অস্ট্রেলিয়া দলের সবাইকে বাচ্চাকাচ্চাসহ ভারত ঘুরে যাওয়ার অনুরোধ। কিন্তু ভুল ভাঙবে তারপরই। বিজ্ঞাপনে শিশু বলতে অস্ট্রেলিয়া দলকেই বোঝানো হয়েছে সেটি বুঝতে অপেক্ষা করতে হবে শেষ পর্যন্ত। যখন দেখা গেল কোলে বসা শিশুর কারণে প্যান্ট ভিজে গেছে শেবাগের। তখনই শেবাগের মুখে স্বগতোক্তি, ‘শুধু একটাই চিন্তা ওরা আমাদের একাগ্রতা দেখে আবার মূত্র ত্যাগ না করে।’
ভারতকে তাঁদের মাটিতে টি-টোয়েন্টি সিরিজে হোয়াইটওয়াশের পর ওয়ানডে সিরিজও জিতল অস্ট্রেলিয়া। সেটিও প্রথম দুই ম্যাচ হারের পর শেষ তিন ম্যাচে টানা জয় তুলে নিয়ে! এরপরই টুইটারে প্রশ্ন উঠেছে—একাগ্রতাটা আসলে কারা দেখাল, আর মূত্র ত্যাগটা কারা করল?
শেবাগ কাল এই প্রশ্নের জবাব পাওয়ার পর নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, মজায় মাথা ধরে! ভারতের এই সাবেক ওপেনারকে টুইটারে পরামর্শ দিয়েছেন ভারতেরই এক ক্রিকেটপ্রেমী, ‘স্যার, বাচ্চারা তো আপনার বাচ্চা-কাচ্চা দেখাশোনার পরিকল্পনা জলে ভিজিয়ে দিল। ভেজা প্যান্ট এখন খুলে ফেলুন। আমরা সিরিজ হেরে গেছি।’
স্টার স্পোর্টসেই সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছে এই সিরিজ হার। কিন্তু চ্যানেলটির কী সুমতি ফিরবে? না, বিজ্ঞাপনের নীতি নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠছে না। সেই সুযোগও নেই। বিপণনের এই যুগে ভোক্তারা যা পছন্দ করবেন সেটা-ই সহি। সুমতির কথা উঠছে অন্য কারণে। বেশির ভাগ সময়েই দেখা গেছে, ভারতকে অকুণ্ঠ সমর্থন আর প্রতিপক্ষকে ব্যঙ্গ করে তাঁদের বানানো বিজ্ঞাপন শেষ পর্যন্ত বুমেরাং!
‘মওকা মওকা’ তো মনে আছে? ২০১৫ বিশ্বকাপে স্টার স্পোর্টসের এই ধারাবাহিক পর্বের বিজ্ঞাপন তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া বেশ কিছু দলকে ব্যঙ্গ করে বানানো এই বিজ্ঞাপন পরে ভারতের জন্য-ই বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে বিরাট কোহলিদের হারের পর। নানা প্রান্তের ক্রিকেটপ্রেমীদের হাজারো ফোনকলে ‘মওকা মওকা’ গান শোনার যন্ত্রণা পোহাতে হয়েছে বিসিসিআইকে।
২০১২ সালে ইংল্যান্ড দলের ভারত সফর নিয়েও বিজ্ঞাপন বানিয়েছিল স্টার স্পোর্টস। ‘আঙরেজো কি পুঙ্গি’—মনে পড়ে? ‘পুঙ্গি’ অর্থ বীণ—যা সাপের খেলা দেখানোর সময় সাপুড়েরা বাজিয়ে থাকেন। ওই বিজ্ঞাপনের শুরুতে এক সাপুড়েকে বীণ বাজাতে দেখা যায়। এরপর ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে বলা হয়, সাপুড়ে তো ইংরেজদের ‘পুঙ্গি’ বাজিয়ে দিল। কিন্তু ভারতীয় দল কি ইংরেজদের ‘পুঙ্গি’ বাজাতে পারবে? পারেনি। এক অর্থে বলা যায়, ভারতের বাদ্যযন্ত্র ভারতকেই বাজিয়ে শুনিয়েছিল ইংল্যান্ড দল, টেস্ট সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতে।
চার বছর আগের সেই বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের আগে ‘#ওন্টগিভইটব্যাক’ ক্যাম্পেইনও করেছে স্টার স্পোর্টস। ভারত যেহেতু সেবার ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন, তাই ‘শিরোপা ফেরত দেব না’—এই স্লোগান পুঁজি করে বিজ্ঞাপনও ছেড়েছিল টিভি চ্যানেলটি। ফল মিলেছে হাতেনাতে। দল ফাইনালেই উঠতে পারল না।
কিন্তু বিপণনের এই বিশ্বে এসব কোনো শিক্ষণীয় বিষয় না। খেলাধুলায় তো নয়-ই। মাঠের বাইরে গোটা বিষয়টাই বাণিজ্য। দল কেমন করল, সমর্থকেরা কীভাবে নিলেন, প্রতিপক্ষ দলের সম্মানহানি হলো কি না—এসব এখন স্রেফ কথার চালিয়াতি। হোক না স্বস্তা, জনপ্রিয়তা আর পয়সা খাঁটিয়ে লাভের টাকা তুলে নেওয়াই মুখ্য। আর তাই সামনের দিনগুলোতেও ভারতের সিরিজে হয়তো এমন আরও বিজ্ঞাপন চোখে পড়বে। দুয়ারে তো বিশ্বকাপ। এবার কী তাহলে—‘উইউইলউইনইটব্যাক’?
পরিণতি জানা আছে তো!

Monday, January 18, 2016

শিশুদের জন্য ডিজিটাল শিক্ষা by মেহেদী হাসান

পুরোপুরি ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশু আনন্দের সঙ্গেই
শিখতে পারে। মডেল: আরোহী, ​ছবি: খালেদ সরকার
সারি সারি ডেস্কে পেটমোটা সব কম্পিউটার। সামনে বসে আছে একদল শিশু। ভাবভঙ্গি গুরুগম্ভীর হলেও উত্তেজনায় চোখ চকচক করছে। আজ নতুন কিছু শিখবে তারা, মজার কিছু। গত শতকের আশির দশকের ঘটনা এটি। তা-ও আবার মার্কিন মুলুকে। স্টিভ জবসের অ্যাপল কম্পিউটার সবে পরিচিতি পেতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে তিনি একবাক্যে ঘোষণা দিলেন, ‘কিডস কান্ট ওয়েট’। গোটা দুনিয়া কম্পিউটার হাতে এগিয়ে যাবে আর শিশুদের বেলায় বলা হবে ‘আগে বড় হও’, তা চলবে না! ১০-১১ বছরে প্রথম কম্পিউটার দেখেছেন স্টিভ জবস। প্রথম দেখায় প্রেম। আর তাই শিশুশিক্ষায় কম্পিউটারের অন্তর্ভুক্তি ছিল অ্যাপলের অগ্রাধিকার। শিশুদের জন্য মজার মজার সব কম্পিউটার সফটওয়্যার তৈরি করেছে তারা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কম্পিউটার সরবরাহে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। মোটকথা, শিক্ষা যেন অ্যাপলের ‘ডিএনএ’তেই ছিল।
শনিবার বেসিস সভাকক্ষে আনন্দ কম্পিউটার্সের প্রধান নির্বাহী মোস্তাফা জব্বার পুরোনো স্মৃতি এভাবেই রোমন্থন করছিলেন। সে সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে অ্যাপল কম্পিউটার ইনকরপোরেটেডের সেই উদ্যোগ দেখে অনুপ্রাণিত হন। নিজ দেশে এমন কিছু শুরুর কথা ভাবেন। অ্যাপলের কিছু সফটওয়্যার কিনে আনেন তিনি। বাংলায় রূপান্তরের চেষ্টা করেন। তবে সেই চেষ্টায় সফলতার মুখ দেখে যখন নিজেরা নতুন করে অ্যানিমেশন ও শব্দ সংযোজনার মাধ্যমে এমন সফটওয়্যার তৈরির উদ্যোগ নেন। মূলত সেটাই ছিল বিজয় শিশুশিক্ষা তৈরির ইতিকথা।
এরপর ১৯৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর গাজীপুরে আনন্দ মাল্টিমিডিয়া স্কুল স্থাপন করা হয় পরীক্ষামূলক ভিত্তিতে। ধীরে ধীরে সারা দেশেই স্কুলের নতুন নতুন শাখা খোলা হয়। এই স্কুলগুলোতে বিজয় শিশুশিক্ষার মাধ্যমে কম্পিউটারভিত্তিক শিক্ষার হাতেখড়ি দেওয়া হয় শিশুদের। এদিকে চলতে থাকে বিজয় শিশুশিক্ষার উন্নয়ন। ২০১১ সাল নাগাদ প্রাক–প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের জন্য পূর্ণাঙ্গ সফটওয়্যার তৈরি হয়। মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘এরপর আমার স্বপ্ন ছিল স্কুলের বাচ্চাদের হাতে কম্পিউটার পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু ৪০-৫০ হাজার টাকার কম্পিউটার তো আর দেওয়া সম্ভব না। কম খরচের কম্পিউটারের খোঁজে লেগে পড়ি। এদিকে আমাদের সফটওয়্যারের উন্নয়ন চলছেই। প্রিস্কুল পর্বের কাজ হলো, পাঠ্যবই ধরে প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণিও হলো। কিন্তু আমরা চাইছিলাম সফটওয়্যারটি শুধু শ্রেণিকক্ষে না, শিশুদের হাতে পৌঁছে দিতে।’এর মধ্যে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় নেত্রকোনার পূর্বধলার এক স্কুলের অধ্যক্ষের সঙ্গে। সৈয়দ আরিফুজ্জামান নামের সেই অধ্যক্ষের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেন তাঁরা। এরপর গত বছরের শেষে এই প্রচেষ্টার উদ্বোধন করা হয়। মোস্তাফা জব্বার জানান সারা দেশে এই শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়াই এখন আমাদের পরিকল্পনা। এ বছর পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিষয়বস্তু (কনটেন্ট) তৈরি করব আমরা।
পূর্বধলার স্কুলে ডিজিটাল শিক্ষা
নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার আরবান একাডেমির অধ্যক্ষ সৈয়দ আরিফুজ্জামানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিদ্যালয়টির ডিজিটাল শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথমে বিজয় শিশুশিক্ষার প্রাক্-বিদ্যালয় বিষয়বস্তুগুলো শ্রেণিকক্ষে বড় পর্দায় দেখানো শুরু করি। এতে বেশ ভালো ফল পাওয়া যায়। শিক্ষার্থীরা আগ্রহের সঙ্গে পড়াশোনা করে।’ এরপর তিনি ভেবে দেখেন, যদি প্রতিটি শিশুর হাতে তা পৌঁছে দেওয়া যায়, তবে আরও ভালো হয়। এর মধ্যে বিজয় শিশুশিক্ষা দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা উপকরণ তৈরি করে ফেলে। এগিয়ে আসে বেসরকারি সংস্থা ডিনেট। ওদিকে মোস্তাফা জব্বার সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ে চেষ্টা চালিয়ে যান স্বল্পমূল্যে ট্যাবলেট কম্পিউটারের খোঁজে। অবশেষে সব ব্যবস্থা হয়ে গেলে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর আরবান অ্যাকাডেমির প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া ৪০ শিক্ষার্থীর হাতে কি-বোর্ডযুক্ত ট্যাবলেট কম্পিউটার তুলে দেওয়া হয়। ‘স্বদেশ’ নামের এই ট্যাবলেট কম্পিউটার বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে শিশুদের পাঠদানের উপযোগী করে। প্রতিটি ট্যাবলেটে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের প্রথম শ্রেণির সিলেবাস অনুসরণ করে তৈরি করা বিজয় প্রাথমিক শিক্ষা-১ সফটওয়্যার ইনস্টল করা আছে৷ উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে চলা এসব কম্পিউটার ও ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষের কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে বিজয় ডিজিটাল৷ সৈয়দ আরিফুজ্জামান ২০১৮ সালের মধ্যে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর হাতে এই ট্যাবলেট কম্পিউটার পৌঁছে দেওয়ার আশা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘খুব দ্রুত এই শিক্ষার্থীরা ট্যাবলেট কম্পিউটারের ব্যবহার আয়ত্ত করে ফেলেছে। শিখছেও দ্রুত। এই মাধ্যমে শিক্ষা খুব কার্যকর হচ্ছে।’
আশির দশকে যুক্তরাষ্ট্রে যে বিপ্লবের সূচনা হয়েছে, আমাদের দেশে তা হচ্ছে এত দিন পর। তবু তো চাকা গড়াল! সে জন্যও উদ্যোক্তারা একটা ধন্যবাদ তো পেতেই পারেন। তথ্যপ্রযুক্তির হাত ধরে একদিন জ্যোতির্ময় বাংলাদেশ গড়ে উঠবে এমনটাই সবার প্রত্যাশা।

Thursday, December 31, 2015

মাওলানা সাঈদীকে খালাস দিলেন বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা by মেহেদী হাসান

মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দিলেন বিচারপতি মো : আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা। আপিল আবেদনের লিখিত রায়ে বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা বলেছেন, রাষ্ট্রপক্ষ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে আনীত কোনো অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। আসামি পক্ষ সফলভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে তিনি রাজাকার বাহিনী এবং শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন না ও কোনো অপরাধ করেননি। আসামি পক্ষ আরো প্রমাণ করতে পেরেছে যে, ঘটনার সময় তিনি পিরোজপুর ছিলেন না, যশোর ছিলেন।
বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা রায়ে লিখেছেন ১৯৭১ সালে তিনি রাজাকার বাহিনী ও শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন এবং এ হিসেবে তিনি বিভিন্ন অপরাধ করেছেন মর্মে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা প্রমাণের দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রপক্ষের। কিন্তু তারা তা প্রমাণ করতে পারেনি।
রায়ে তিনি আসামি পক্ষের আপিল আবেদন গ্রহণ করে মাওলানা সাঈদীকে সব অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দিয়ে নির্দোষ ঘোষণা করেছেন। অপর দিকে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন তিনি। বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা মাওলানা সাঈদীকে খালাসের পক্ষে দীর্ঘ রায়ে সাক্ষীদের সাক্ষ্য, অন্যান্য তথ্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করে যুক্তি তুলে ধরেছেন।
১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মাওলানা সাঈদীকে আটটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন। এর মধ্যে দুইটি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মাওলানা সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। সে সময়কার প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে এ রায় দেন।
বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। ৬১৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় মূলত লিখেছেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (বর্তমানে প্রধান বিচারপতি) এবং বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা। বেঞ্চের অপর সদস্য তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন, বিচারপতি এ এইচ এম শাসসুদ্দীন চৌধুরী (বর্তমানে অবসরে) এবং বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিক বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার রায়ের সাথে একমত পোষণ করেছেন রায়ে।
অপর দিকে মাওলানা সাঈদীকে তিনটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড, একটি অভিযোগে ১২ বছর এবং আরেকটি অভিযোগে ১০ বছর কারাদণ্ড দিয়ে বেঞ্চের চারজন বিচারপতি যে রায় দিয়েছেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত রায় দিয়েছেন বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা। তিনি তার ২৪৪ পৃষ্ঠার রায়ে মাওলানা সাঈদীকে সবগুলো অভিযোগ থেকে খালাস দিয়ে তাকে নির্দোষ ঘোষণা করেছেন।
বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দীন চৌধুরী রায়ে ২৩৮ পৃষ্ঠার ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মামলার উদাহরণের সাহায্যে।
রাষ্ট্রপক্ষ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মোট ২০টি অভিযোগ আনে ট্রাইব্যুনালে। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-১ মাওলানা সাঈদীকে ইব্রাহীম কুট্টি ও বিশাবালী হত্যাকাণ্ডের দু’টি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেন। অপর ছয়টি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও সাজা উল্লেখ করা হয়নি।
ট্রাইব্যুনালে যে আটটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয় সেগুলো হলো ৬, ৭, ৮ (ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা), ১০ (বিশাবালী হত্যা), ১১, ১৪, ১৬ ও ১৯।
রাষ্ট্রপক্ষ ছয়টি অভিযোগে সাজা উল্লেখের দাবি জানিয়ে আপিল আবেদন করে। অপর দিকে আসামিপক্ষ মাওলানা সাঈদীর বেকসুর খালাস করে আপিল আবেদন করে।
২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মাওলানা সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন আপিল বিভাগ। ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত আটটি অভিযোগের মধ্যে তিনটি পৃথক অভিযোগে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড অপর দু’টি অভিযোগের একটিতে ১২ বছর এবং আরেকটিতে ১০ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। অপর তিনটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়।
আলোচিত ইব্রাহীম কুট্টি হত্যাকাণ্ডে ১২ বছর জেল এবং বিশাবালী হত্যাকাণ্ডে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। বিশাবালী হত্যার অভিযোগসহ আরো দু’টি অভিযোগে মাওলানা সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে আপিলের রায়ে।
রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন গ্রহণ করে যে তিনটি অভিযোগে সাজা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো হলো ৭, ১৬ ও ১৯ নং অভিযোগ।
১৬ নম্বর হলো গৌরাঙ্গ সাহার তিন বোন মহামায়া, আনু ও কমলাকে অপহরণ করে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেয়ার অভিযোগ। এ অভিযোগে আপিল বিভাগের রায়ে মাওলানা সাঈদীকে আমৃত্য কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। অপর দিকে ১৯ নম্বর অভিযোগ হলো মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১০০ থেকে ১৫০ জন হিন্দুকে জোর করে ধর্মান্তরকরণ। এ অভিযোগেও মাওলানা সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
সাত নম্বর অভিযোগ ছিল শহিদুল ইসলাম সেলিমের বাড়িতে আগুন দেয়া। এ অভিযোগে ১০ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
৭, ১৬ ও ১৯ নম্বর অভিযোগে ট্রাইবু্যুনাল মাওলানা সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করলেও কোনো সাজা উল্লেখ করেননি। আপিল বিভাগের রায়ে এ তিন অভিযোগের বিপরীতে সাজা উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া আরো তিনটি অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল মাওলানা সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করলেও সে তিনটি অভিযোগে আপিলের রায়ে খালাস দেয়া হয়েছে। এ অভিযোগ তিনটি হলো (৬) পাড়েরহাটবাজারে দোকানেপাটে লুটপাটে নেতৃত্ব প্রদান এবং অংশ নেয়া, (১১) মাহবুবুল আলম হাওলাদারের বাড়িতে লুট এবং তার ভাইকে নির্যাতন এবং (১৪) ১৯৭১ সালে হোগলাবুনিয়া এলাকায় হিন্দুপাড়ায় আক্রমণ এবং শেফালী ঘরামী নামে একজন মহিলাকে রাজাকার কর্তৃক ধর্ষণে সহায়তা এবং সেখানে উপস্থিত থাকা।
বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা ইব্রাহীম কুট্টি, বিশাবালী হত্যাসহ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত সবগুলো অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দিয়েছেন।
মাওলানা সাঈদী ১৯৭১ সালে পিরোজপুরে সংঘটিত অপরাধ স্থলে ছিলেন না। তিনি ১৯৭১ সালের আগে থেকেই যশোর নিউ টাউনে ভাড়া থাকতেন। এপ্রিলে তিনি ধানঘাটা হয়ে মহিরনের সদরুদ্দীন পীর সাহেবের বাড়িতে যান। এরপর সেখান থেকে পীরের শিষ্য দোহাখোলা রওশন আলী মাওলানা সাঈদীকে তার বাড়িতে নিয়ে রাখেন সপরিবারে। আসামিপক্ষের দাবি পিরোজপুরে সংঘটিত অপরাধের সাথে পাকিস্তান আর্মি, রাজাকার এবং শান্তি কমিটির সদস্যরা জড়িত ছিল, মাওলানা সাঈদী নন। বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা তার রায়ে এ তথ্য তুলে ধরে বলেন, আসামিপক্ষ তাদের দাবি প্রমাণে সক্ষম হয়েছে।

Monday, November 2, 2015

দেশ বিভক্ত বলেই দুই পক্ষকে কবরস্থানে যেতে হচ্ছে -প্রকাশক হত্যায় বিশিষ্টজনের প্রতিক্রিয়া by মেহেদী হাসান

প্রতিবাদের নতুন ভাষা- ‘আমি বিচার চাই না’। শনিবারের হামলায় নিহত প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনের পিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হকের এ উক্তিই এখন প্রতিবাদের নতুন স্লোগান হয়ে ফিরছে মানুষের মুখে মুখে। পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে গেলে একজন পিতা বলতে পারেন তিনি তার সন্তান হত্যার বিচার চান না তা দায়িত্বশীল সবার প্রতি অনুধাবনের অনুরোধ জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশিষ্টজনেরা। অতি রাজনীতি ও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার নীতি পরিহার করে জাতীয়ভাবে সমস্যা মোকাবেলার উদ্যোগ নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। তা না হলে জাতিকে বড় আকারে এর খেসারত দিতে হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সাবেক প্রফেসর, সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, আমরা দেখেছি বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের ঘটনার পর অতি রাজনীতি করা হয়েছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে আসল ব্যাপার চাপা পড়ে গেছে। অতীতে এ ধরনের কোনো ঘটনার সুরাহা হয়নি। পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকলে আজ এ ধরনের ঘটনা ঘটত না। প্রফেসর মাহবুব উল্লাহ বলেন, দেশ নিয়ে ছেলেখেলা করা যায় না। দেশকে এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করতে জাতীয়ভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। কিন্তু তার কোনো কিছু লক্ষ করা যাচ্ছে না। বরং মানুষে মানুষে দূরত্ব সৃষ্টির চেষ্টা চলছে শুধু। এটা আমাদের কারোর জন্যই শুভ নয়।
প্রকাশক দীপন হত্যার পর দার্শনিক ও কবি ফরহাদ মজহার লিখিত আকারে ফেসবুকে তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, জাগৃতি প্রকাশনার দীপনসহ শুদ্ধস্বরের আহমেদুর রশীদ টুটুল ও অন্য দুই লেখক সুদীপ কুমার ও তারেক রহিমের খবর পেয়ে পাথর হয়ে আছি। দীপনের বাবা আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেছেন, ‘আমি কোনো বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যারা ধর্মনিরপেতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন উভয় প দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পরে শুভবুদ্ধির উদয় হোক। এটুকুই আমার কামনা। জেল-ফাঁসি দিয়ে কী হবে।’
অবিশ্বাস্য শোক মাথায় নিয়ে আবুল কাশেম ফজলুল হক এই কথাটা স্পষ্টভাবে বলতে পেরেছেন।
আমরা দেশকে বিভক্ত করে দিয়েছি। আমরা দুই পই আমাদের সন্তানদের হারাতে থাকব। আমরা কাঁদতে ভুলে যাব। নিজ সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়ে গোরস্থানের দিকে যাব আর সন্তানের রক্তে আমাদের শরীর ভিজে যাবে।
কে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী সেকুলার মুক্ত বুদ্ধিওয়ালা আর কে ধর্মান্ধ বা ইসলামি জঙ্গি গোরস্থান তার বিচার করে না। শুধু কবরের ওপর ঘাস গজায়, আর একদা ঐতিহাসিকেরা গবেষণা করতে বসেন কিভাবে একটি জাতি তাদের বেকুবির জন্য ধ্বংস হয়ে গেলো।
যেহেতু আমরা মৃত্যু নিয়ে ভাবতে অভ্যস্ত নই, তাই জীবনের কোনো মূল্য আমরা দিতে জানি না। আমি দেখছি, বিভক্ত ও দ্বিখণ্ডিত বাংলাদেশে দুই দিক থেকে দুটো মিছিল গোরস্থানের দিকে যাচ্ছে। দীপন, আমি প্রাণপণ এই বিভক্তি ঠেকাতে চেষ্টা করেছি। এই ভয়াবহ বিভাজনের পরিণতি সম্পর্কে আমি জানপরান সবাইকে হুঁশিয়ার করার চেষ্টা করেছি। চেষ্টা করে যাব। কিন্তু তাতে কি যারা চলে গেছে তারা ফিরে আসবে?
ফরহাদ মজহার লিখেছেন, এই লাশের ভার অনেক ভারী, বাংলাদেশ বহন করতে পারবে কি? সেই দূরদর্শিতা ও বিচণতার চর্চা আমরা করি না, যা আমাদের গোরস্থানের দিকে নয়, সপ্রতিভ জীবনের দিকে নিয়ে যায়। কে জাগে?
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) সাখাওয়াত হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হক একজন উঁচু স্তরের গুণী মানুষ। তার মতো লোক যখন বলেন, বিচার চাই না তখন আমরা বুঝতে পারি কতটা ক্ষোভ, দুঃখ-যন্ত্রণা নিয়ে তিনি এ ধরনের কথা বলেন। কোনো ধরনের ব্যবস্থার প্রতি যখন আর কারোর কোনো বিশ্বাস থাকে না, আস্থা থাকে না তখনই মানুষ এ ধরনের কথা বলেন। তার এ কথার মধ্য দিয়ে সব কিছু স্পষ্ট। সব কথাই তিনি বলে দিয়েছেন। এটাই সবার কথা এখন।
তিনি বলেন, একের পর এক হত্যার পর আমরা শুধু রাজনৈতিক কথাবার্তা শুনে আসছি। দোষারোপের রাজনীতি চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এ ছাড়া আর কিছু হয় না। কথায় কথায় জঙ্গিবাদ মৌলবাদ বলা হচ্ছে। এর পরিণতি ভালো হতে পারে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রফেসর আসিফ নজরুল প্রকাশক ও ব্লগার হত্যা বিষয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, সার্বিক অবস্থার কতটা ধস নেমেছে তার প্রমাণ এটা। সন্তান হত্যার পর পিতা বলছেনÑ তিনি বিচার চান না। এর আগে আরেকজন বলেছেন, তিনি তার স্বামী হত্যার বিচার চান না। একজন প্রকাশক, যিনি নিজে লিখছেন না, অন্যের লেখা প্রকাশের কারণে তাকেও হত্যা করা হচ্ছে। দেশে এক ধরনের ত্রাসের রাজত্ব চলছে। মানুষের মন থেকে বিশ্বাস ও আস্থা ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতা আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। এ অবস্থায় একটি জাতি চলতে পারে না। পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে গেলে একজন মানুষ বলতে পারেন তিনি বিচার চান না তা অনুধাবন করা উচিত দায়িত্বশীল সবার।
প্রফেসর আসিফ নজরুল বলেন, সরকারের ধারাবাহিক ব্যর্থতার ফলে একের পর এক এ ধররের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে রাজনীতি থাকতে পারে, সরকার হয়তো রাজনৈতিক ফায়দাও নিতে পারে কিন্তু সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. শাহ এহসান হাবীব বলেন, একের পর এক হত্যার ঘটনা ঘটে চলেছে কিন্তু এর কোনো বিচার হচ্ছে না। প্রকৃত খুনিরা ধরা পড়ছে না। অনেক ঘটনায় অনেককে ধরে আমাদের সামনে হাজির করা হচ্ছে কিন্তু তারা আসল অপরাধী কিনা তা জানা যাচ্ছে না। কিছুদিন পর আর কোনো খোঁজখবর থাকে না। ফলে সাধারণ মানুষের মনে নানা ধরনের সন্দেহ দানা বাঁধছে। মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফল অত্যন্ত খারাপ হতে বাধ্য। প্রফেসর আবুল কাসেম বিচার চাই না মর্মে যে উক্তি করেছেন তারপরও যদি কর্তৃপক্ষের টনক না নড়ে তাহলে সামনে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে একজন লিখেছেন, কে কার কাছে কিসের প্রতিবাদ করবে? কে কার কাছে কিসের বিচার চাইবে? কে চিহ্নিত করবে আততায়ীকে? রক্তের এই স্রোত, মৃত্যুর এই ধারা দেশকে কোথায় নিয়ে যাবে? কতটা অন্ধকার নামলে আমরা বুঝব যে আলো নেই? কে জেগে আছে এই রাত্রির গুহায়? জীবনের এই অপচয়, এই অপঘাত, এই মৃত্যু, এই রক্তের স্রোত কি আমাদের প্রশ্ন করতে শেখাবেÑ আমি কী ভূমিকা পালন করেছিলাম?
একের পর এক হত্যা, ধর্ষণসহ নানা কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে প্রচণ্ড নিরাপত্তাহীনতা। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু শনিবারের হামলায় আহতদের হাসপাতালে দেখতে গিয়ে বলেছেন, গোপন-অতর্কিত হামলা থেকে কেউই নিরাপদ নয়, আমিও নই। ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন, পরিকল্পিত কিলিং মিশন প্রতিরোধ ঠেকানো সহজ নয়। অনেকে প্রশ্ন করেছেনÑ এ যদি হয় অবস্থা তাহলে সাধারণ মানুষের আর থাকল কী?
২০১৩ সালে নিহত হন ব্লগার রাজীব হায়দার। এরপর চলতি বছরই হত্যা করা হয় চারজন ব্লগারকে। সর্বশেষ গতকাল হত্যা করা হলো নিহত ব্লগার অভিজিৎ রায়ের লেখার প্রকাশক ফয়সাল আরফিন দীপনকে।

Sunday, October 4, 2015

পরীক্ষা মানেই প্রশ্ন ফাঁস! হতাশ শিক্ষার্থী চাকরিপ্রার্থী ও অভিভাবক by মেহেদী হাসান

পরীক্ষা মানেই প্রশ্নপত্র ফাঁস; এটিই যেন এখন স্বাভাবিক ঘটনা। প্রশ্নপত্র ফাঁস এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায়ও এখন এটি ঘটতে শুরু করেছে। পাবলিক পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের নিয়োগ পরীক্ষায় একের পর এক ঘটে চলেছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। ২০০৯ সালের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যে পরিমাণ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি অতীতে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে গত চার বছরে বিভিন্ন পরীক্ষায় মোট ৬৩টি বিষয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। অপর একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় একই সময়ে ৩০টিরও বেশি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ও অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত কয়েক বছরে প্রায় সব পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের রেকর্ড সম্পন্ন হয়েছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরি প্রার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যেও দীর্ঘ দিন ধরে বিরাজ করছে তীব্র ক্ষোভ এবং হতাশা। বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা প্রমাণিত হলেও বাতিল করা হয়নি পরীক্ষা। ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সাথে মূল প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া গেলেও অনেক সময় কর্তৃপক্ষ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। কখনো কখনো সাজেশন বলেও বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অনেককে গ্রেফতার করা হলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির তেমন কোনো নজিরও চোখে পড়ছে না। অনেকের মতে এসব কারণেই থামছে না প্রশ্নপত্র ফাঁসের কেলেঙ্কারি।
গত কয়েক বছরে শিক্ষা খাত সবচেয়ে বেশি কলঙ্কিত হয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায়। প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ বিভিন্ন কারণে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থায় একের পর এক কেলেঙ্কারি যেন লেগেই আছে। এ মুহূর্তে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে আন্দোলনে মাঠে রয়েছেন মেডিক্যালে ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা।
চলমান শিক্ষক আন্দোলনের মধ্যেই ঘটে যায় দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ছাত্র আন্দোলন তথা ভ্যাট বিরোধী আন্দোলন। এ আন্দোলন শেষ না হতেই আবার মাঠে নামলেন মেডিক্যালে ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা। গত ১৮ সেপ্টেম্বর মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষার আগের রাত থেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে এবং এ অভিযোগে সরকারি চাকরিজীবী ও চিকিৎসকসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ইতোমধ্যে গ্রেফতারকৃতদের একজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বরের ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা গ্রহণের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা।
পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস উৎসব
২০১২, ২০১৩ এবং ২০১৪ সাল ছিল পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের হিড়িকের বছর। ২০১৪ সালে বছরজুড়ে একের পর এক পাবলিক পরীক্ষায় ঘটতে থাকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। সমাপনী, এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায় প্রায় প্রতিটি বিষয়ে মুড়ি মুড়কির মতো মানুষের হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র। এ ছাড়া জেএসসি বা জেডিসি পরীক্ষায়ও তখন প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে।
২০১৪ সালে প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষার শুরু থেকেই প্রতিটি বিষয়ে একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এবং অভিযোগ আসতে থাকে। ফাঁস হওয়া অনেক প্রশ্নের সাথে পরীক্ষার হলের প্রশ্নপত্র হুবহু মিলে যায়। তারপরও একটি পরীক্ষা স্থগিত ছাড়া অন্যসব পরীক্ষা চালিয়ে নেয়া হয়। ২০১৪ সালে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নপত্র ফাঁস ছিল এইচএসসির। পরিস্থিতি বেগতিক আকার ধারণ করায় স্থগিত করা হয় ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা। তবে বাংলা, ইংরেজি প্রথম পত্র, গণিত, রসায়ন, পদার্থ বিজ্ঞানসহ বিষয়ের প্রশ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। এ সত্ত্বেও এসব পরীক্ষা বাতিল করা হয়নি।
২০১২ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রাথমিকের সমাপনী পরীক্ষায়ও একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস ঘটতে থাকে। ২০১৪ সালে সমাপনী পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে ধুমধামের সাথ।
২০১৩ সালে সমাপনী পরীক্ষায় ইংরেজি এবং বাংলা বিষয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তদন্তে প্রমাণিত হয়। ইংরেজি ৮০ এবং বাংলা ৫৩ শতাংশ প্রশ্ন মিলে যায় ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সাথে। তবু এ পরীক্ষা বাতিল হয়নি। প্রাথমিক ও গণশিা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এস এম আশরাফুল ইসলাম তখন জানান তদন্তে প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রমাণিত হয়েছে। তবে পরীা বাতিল করা হচ্ছে না।
২০১২ সালেও সমাপনী পরীক্ষায় বাংলা ও গণিতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে।
২০১৪ সালে সমাপনী পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন জেলায় দায়ীদের শাস্তি দিয়েছেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে সোচ্চার অনেকে অনলাইনে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রণালয়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তাদের কাছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু তারপরও প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার গত ৪ ডিসেম্বর নেত্রকোনা কেন্দুয়ায় একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া গেলেও এর পক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।
২০১৩ সালের এসএসসি ও সমানের পরীায়ও সব প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। গণিত, ইংরেজি প্রথম পত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া যায়।
এ ছাড়া ২০১৩ সালে ৪ নভেম্বর থেকে শুরু হয় জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীায় ইংরেজি, গণিত, পদার্থ, রসায়ন, হিসাববিজ্ঞানসহ অন্যান্য বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিা অধিদফতর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।
নিয়োগ পরীক্ষায়ও প্রশ্নপত্র ফাঁস এমন মহামারী আকার ধারণ করেছে যে, সরকারি সর্বোচ্চ নিয়োগ পরীক্ষা তথা বিসিএস পরীক্ষায়ও প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষা স্থগিতের ঘটনা ঘটল। ২০০৯ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক নিয়োগ, বিসিএস, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, সমাজসেবা কর্মকর্তা, খাদ্য অধিদফতরের কর্মকর্তা, অডিট, এনবিআর, থানা ও উপজেলা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিইও), মেডিক্যাল, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ও অভিযোগ উঠেছে। ইসলামী ব্যাংকেরও নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে ২০১২ সালে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের ভিত্তিতে স্থগিত করা হয় ৩৩তম বিসিএস লিখিত পরীা ও অগ্রণী ব্যাংকের নিয়োগ পরীা। একই কারণে প্রাইমারি স্কুলে সহকারী শিক নিয়োগের পরীক্ষাও ১৭ জেলার বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩৪তম বিসিএসের লিখিত পরীার প্রশ্ন ফাঁসেরও অভিযোগ রয়েছে।
২০১৩ সালের ৩১ মে ফাঁস হয়ে যায় অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার নিয়োগ পরীার প্রশ্ন। ওই দিন বিকেল ৪টায় পরীা থাকলেও সকাল ৯টা থেকেই হাতে লেখা প্রশ্ন পরীক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সত্যতা পাওয়ার পর ১২ জুন ওই পরীা বাতিল করা হয়।
২০১০ সালের ৮ জানুয়ারি প্রাইমারি স্কুলে সহকারী শিক নিয়োগ পরীার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীা হলেও পরীা বাতিল হয়নি। একই বছর ২৮ আগস্ট উপজেলা প্রাথমিক শিাকর্মকর্তা নিয়োগের লিখিত পরীার প্রশ্ন ফাঁস হয়। একই বছর ৮ জুলাই সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের সহকারী নিয়োগ পরীার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায় পরীা স্থগিত করা হয়। একই বছর ১৬ জুলাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কর্মকর্তা পদে নিয়োগের লিখিত পরীার প্রশ্ন ফাঁস হয়। এতে ওই পরীা বাতিল করে কর্তৃপ।
২০১১ সালে অডিট বিভাগের নিয়োগ পরীার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। ২০১২ সালের ২৭ জানুয়ারি ফাঁস হওয়া প্রশ্নেই খাদ্য অধিদফতরের নিয়োগ পরীা নেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ওই পরীা বাতিল করা হয়। ২৭ জুলাই জনতা ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীার আগের রাতে পুরান ঢাকার একটি হোটেল থেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নসহ ১৬ জনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ২০১২ বছরের ৩ আগস্ট জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা পদে নিয়োগের বাছাই পরীার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সাথে পরীায় হলের প্রশ্নের হুবহু মিল থাকলেও পরীা বাতিল বা তদন্ত হয়নি। একই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর ফাঁস হওয়া প্রশ্নেই এটিইও পদে প্রিলিমিনারি পরীা হয়। ২০১২ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ৩৩তম বিসিএস লিখিত পরীার প্রশ্ন ফাঁস হয়। এ ঘটনায় ৬ অক্টোবর পিএসসি পরীা স্থগিত করে। ২০১৩ সালের ১২ অক্টোবর প্রাইমারি স্কুলে প্রধান শিক নিয়োগ পরীার প্রশ্নপত্র ফাঁসেরও অভিযোগ ওঠে।
ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা ঘিরে গড়ে উঠছে জালিয়াতচক্র। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ চক্র প্রশ্ন ফাঁসসহ উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষার হলে বাইরে থেকে উত্তর বলে দেয়ার কৌশল রপ্ত করে ভর্তি ইচ্ছুকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে বড় অঙ্কের অর্থ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এ চক্রের অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে ইতোমধ্যে। ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে এ চক্র প্রযুক্তির সাহায্যে জালিয়াতির আশ্রয় নেয়।
বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে আন্দোলন করছে মেডিক্যালে ভর্তি ইচ্ছুকরা। গত ১৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে তারা পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে। এর আগেও ২০১০-১১ সালে মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। সে বছর ৩০ সেপ্টেম্বর প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় সিন্ডিকেট চক্রের ২৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ২০১৪ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ পাওয়া যায়। ৫২টির মধ্যে ৪১টি প্রশ্ন মিলে যায় ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সাথে।
প্রশ্ন ফাঁসের রেকর্ড
ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে গত ছয় বছরে । ১৯৭৯ সালে এসএসসি পরীায় সর্বপ্রথম প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ১৯৭৯ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ২৯ বছরে ৫৫টি পরীার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়। আর গত ছয় বছরে ৩০টিরও বেশি পরীার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে।
প্রশ্ন ফাঁস, মামলা ও তদন্ত
বিভিন্ন পরীায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে গত ছয় বছরে রাজধানীতে ৭০টি মামলা হয়েছে। তবে এসব মামলায় শাস্তি পাওয়ার তেমন নজির নেই। অনেকে প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়েছে। অনেক মামলা আর সচল নেই। প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় অনেক তদন্ত কমিটি হয়েছে। তদন্তে অনেক ঘটনা প্রমাণ হয়েছে। তদন্তে প্রশ্ন ফাঁস বন্ধে অনেক সুপারিশও করা হয়েছে। কিন্তু তারও তেমন কোনো বাস্তবায়ন নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রকাশিত একটি তথ্যে দেখা যায়, গত ৩৫ বছরে অন্তত ৭৮টি পরীার প্রশ্ন ফাঁস হলেও তদন্ত কমিটি হয়েছে ২৩টিতে। আর বাতিল ও স্থগিতের ঘটনা ঘটেছে ১২টির মতো পরীক্ষায় ।
বার্ষিক পরীায়ও প্রশ্ন ফাঁস!
কুড়িগ্রামের চিলমারি উপজেলায় গত বছর ডিসেম্বর মাসে মাধ্যমিক স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ১ ডিসেম্বর উপজেলার সব উচ্চবিদ্যালয়ে চারটি সেটের মাধ্যমে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে বার্ষিক পরীা শুরু হওয়ার পর প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে বিভিন্ন স্কুলে।
টিআইবির অনুসন্ধান
গত ৫ আগস্ট রাজধানীতে টিআইবির প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন পাবলিক পরীায় ৪০টি ধাপে প্রশ্ন ফাঁস হয়। তার মধ্যে ২৩টি ধাপ থেকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মডারেশন, বিজি প্রেসে কম্পোজ, প্রুফ দেখা, সিলগালা করা ও বিতরণ এবং পরীার দিন পরীা কেন্দ্রে শিকদের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে শিাবোর্ড, মাধ্যমিক শিা অধিদফতর, প্রাথমিক শিা একাডেমি, কোচিং সেন্টার, গাইড বই ব্যবসায়ী ও সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন সরাসরি জড়িত। ফাঁস হওয়া প্রশ্নে আকারভেদে ২০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থের লেনদেন হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক শিা সমাপনী (পিইসি), জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি), মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) এবং উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) এ চারটি পাবলিক পরীার প্রশ্ন প্রণয়ন, মডারেশন, ছাপানো, সংরণ ও বিতরণের প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত এ গবেষণা কার্য পরিচালনা করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭৯ সালে প্রশ্ন ফাঁসের প্রবণতা শুরু হলেও ২০১২, ২০১৩ এবং ২০১৪ শিাবর্ষ সব বছরকে ছাড়িয়ে গেছে। গত চার বছরে গবেষণার অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন পাবলিক পরীায় ৬৩টি প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট, মোবাইল ও আত্মীয়স্বজন এ চারটি মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের হাতে পৌঁছায়।
গবেষণার সার্বিক পর্যবেণে দেখা যায়, প্রশ্ন ফাঁসের সাথে সরকারি ও বেসরকারি উভয় অংশীজন জড়িত। প্রশ্ন প্রণয়ন, ছাপানো ও বিতরণে এবং তদারকির সাথে সম্পৃক্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ কোনো না কোনো পর্যায়ে প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িত। প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, প্রশ্ন প্রণয়নের দীর্ঘ প্রক্রিয়া, ম্যানুয়াল পদ্ধতির সাথে অনেকের সম্পৃক্ততাও প্রশ্ন ফাঁসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
প্রতিবেদনের সারমর্ম তুলে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তথাকথিত সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখা ও প্রশ্নপত্র দিয়ে শিার্থীদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টিকে অস্বীকার করার প্রবণতা, বিষয়টি ‘সাজেশন কমন পড়া’, ‘গুজব’ বলে অস্বীকার করা, তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করা, প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়া এবং ঘটনার পুনরাবৃত্তি নীতি। এ ছাড়া পাবলিক পরীা অপরাধ আইনে শাস্তি কমানো, কোচিং বাণিজ্যে বন্ধে প্রণীত নীতিমালা অস্পষ্টতা, গাইড বই বন্ধে আইনের শিথিলতা, বিভিন্ন সময় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ না করা, প্রশ্ন ফাঁসের সাথে যুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়া, একই শিক প্রতিবছরই প্রশ্ন প্রণেতা হিসেবে নিয়োগ, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর তদারকি ও প্রয়োজনীয় পদেেপর ঘাটতি, পরিবর্তিত শিা ও পরীা কাঠামোর ওপর শিকদের যথাযথ ও পর্যাপ্ত প্রশিণের অভাব, বিজি প্রেসে পর্যাপ্ত তদারকি ও নিরাপত্তা না থাকা, শিাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, বিকল্প প্রশ্ন না থাকা, প্রশ্ন গণনায় ম্যানুয়ালি করা, সচেতনতার ঘাটতি। এর ফলে সার্বিক শিা কাঠামোতে নৈতিকতার অবয়, শিার গুণগতমানের অবনতি পরিলতি হচ্ছে। একে শিার্থীদের মাঝে পড়াশোনার ঘাটতি, মেধাবীদের তুলনায় রেজাল্টে কম মেধাবীরা এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতায় ল্য করা গেছে।
নৈতিকতার বিপর্যয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর এমিরিটাস সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, প্রশ্ন ফাঁস ঘটনার সাথে আমাদের সমাজের অনৈতিকতার বিপর্যয়ের চিত্রও প্রকাশ হয়ে পড়েছে। সমাজে অনৈতিকতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। মা-বাবাও দৌড়াচ্ছেন সন্তানের জন্য ফাঁস হওয়া প্রশ্ন জোগাড় করার জন্য। সন্তানও মা-বাবাকে দ্বিধাহীনভাবে বলছে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন জোগাড় করে দেয়ার জন্য। মা-বাবা সে আহ্বানে সাড়া দিচ্ছেন। কারণ প্রশ্ন জোগাড় করতে না পারলে তার সন্তানতো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। একেবারে কোমল অবস্থায়ই একজন শিশুকে অনৈতিকতার দিকে ধাবিত করা হচ্ছে । মা-বাবা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী মিলে সবাই অনৈতিক সুবিধা নেয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এই যে চিত্র এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক জাতির জন্য।
প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। গত ২৭ নভেম্বর অনলাইন পোর্টাল বিডিনিউজটুয়েন্টিফোরডটকম-এ তিনি লিখেছেন ‘ছোট ছোট শিশুদের অন্যায় করতে শেখানো হচ্ছে। সারা পৃথিবীর কোথাও এই নজির নেই, যেখানে একটি রাষ্ট্র তার দেশের শিশুদের অন্যায় করতে শেখায়। একটা দেশের মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে দেয়ার কি এর চেয়ে পরিপূর্ণ কোনো পদ্ধতি আছে? নেই। সারা পৃথিবীতে কখনও ছিল না, ভবিষ্যতেও কখনও থাকবে না। শুধু আমাদের দেশেই কিছু আমলা আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানুষ একটা শিাব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করার একটি প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। যে জাতি শৈশবে অন্যায় করতে শিখে বড় হয়, সেই জাতি দিয়ে আমরা কী করব?’
জাফর ইকবাল লিখেছেন ‘এই দেশের শিাব্যবস্থার হর্তাকর্তা বিধাতারা, আপনাদের কাছে করজোড়ে প্রার্থনা করি, আমাদের দেশের শিশুদের আপনারা মুক্তি দিন। এই শিশুগুলো যদি কোনো পরীা না দিয়ে শুধু বইগুলো নাড়াচাড়া করে সময় কাটিয়ে দিত তাহলে অন্তত তাদের একটা সুন্দর শৈশব থাকত, তারা অন্তত অন্যায় করা শিখত না। আমাদের শিশুদের লেখাপড়ার দরকার নেই, দোহাই আপনাদের, তাদের ক্রিমিনাল করে বড় করবেন না! ’
হতাশায় মেধাবীরা
‘প্রশ্ন যদি হবে ফাঁস পড়ব কেন বার মাস’ স্লোগান ধারণ করে বর্তমানে আন্দোলন করছেন মেডিক্যাল ভর্তি ইচ্ছুকরা। প্রশ্ন ফাঁসের কারণে অনেক অমেধাবী যেমন পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করছে তেমনি অনেক অমেধাবীরা ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারছে। আবার অনেক অযোগ্যরা পাচ্ছে ভালো চাকরি। না পড়েই যদি প্রশ্ন ফাঁসের কারণে এসব পাওয়া যায় তাহলে মেধাবীরা ১২ মাস কষ্ট করে কেন পড়বে এ প্রশ্নের কোনো জবাব নেই জাতির কাছে। এ প্রশ্ন সত্যিই অনেক বেদনার অনেকের কাছে।
রাজধানীর হলিক্রস কলেজের অভিভাবক সালমা নাজু জানান, এইচএসসি পরীক্ষার সময় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় তার মেয়ে ভীষণভাবে ভেঙে পড়ে। এ কলেজের মেয়েরা সবাই পড়াশুনায় ভালো। কিন্তু পরীক্ষার সময় ফাঁস হওয়া প্রশ্ন নিয়ে অন্যদের কাড়াকাড়ির দৃশ্য দেখে তার মেয়েসহ অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীরা কান্না ধরে রাখতে পারেনি। সারা বছর এত কষ্ট সাধনার পর এখন সবাই পরীক্ষার আগে প্রশ্ন পেয়ে যাচ্ছে এবং পরীক্ষার খাতায় তা গড় গড় করে লিখে দিয়ে আসছে। সালমা নাজু জানান, প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় পরীক্ষার সময় সে এবং তার মেয়ে যে মানসিক কষ্ট পেয়েছেন তা কোনো দিন ভুলতে পারবেন না।
প্রশ্ন ফাঁস বিষয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং ছাত্রছাত্রীদের সাথে কথা বলার সময় তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা এবং বেদনার চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় ভেঙে পড়েছেন অসংখ্য মেধাবী ছাত্রছাত্রী, চাকরিপ্রার্থী এবং তাদের মা-বাবা। রাজধানীর বিভিন্ন নামকরা কলেজের এইচএসসি পড়–য়া শিক্ষার্থীরা আগের বছরগুলোতে প্রশ্ন ফাঁসের স্মৃতিচারণ করে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তারা দেখেছে কিভাবে তাদের সামনে অমেধাবীরা, যারা হয়তো ঠিকমতো পাসই করতে পারত না তারাও জিপিএ ৫ পেয়ে উল্লাসে মেতে উঠেছে ফল প্রকাশের পর। তাদের মতে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা এবং উদারনীতিতে খাতা মূল্যায়নের কারণে ভালোমন্দ সব একাকার হয়ে গেছে। সারা বছর তাদের পরিশ্রম মূল্যহীন হয়ে গেছে।

Monday, September 14, 2015

এখন গেম বানাচ্ছে রূপকথা by মেহেদী হাসান

নিজের কাজে মগ্ন রূপকথা
এক বিকেলে রাজধানীর নিকেতন এলাকায় ওদের বাসায় গিয়ে দেখা গেল রোবলক্সে তৈরি গেম খেলছে ওয়াসিক ফারহান। রূপকথা নামেই যে বেশি পরিচিত। রোবলক্স কম্পিউটার গেমের একটি প্ল্যাটফর্ম। যেখানে গেমাররা সহজেই নিজের গেমের দুনিয়া তৈরি করে নিতে পারেন। তবে গেমে পরিবর্তন আনতে জানতে হয় প্রোগ্রামিং ভাষা লুয়া।
মাত্র নয় বছর বয়সী রূপকথা এই লুয়া ভাষাটি জানে। তাই নিজের মতো করে গেম, গেমের চরিত্রগুলো বানিয়ে নিতে পারে সহজেই। লুয়া দিয়ে রূপকথা এখন পর্যন্ত ১১টি গেম বানিয়েছে রোবলক্সে। রূপকথার কাছে জানতে চাইলাম কীভাবে সে কাজ করে। কাজে বাধা পড়ায় কিছুটা বিরক্ত হয়ে আবার ডুবে যায় তার গেমের দুনিয়ায়। এরপর একসময় বলে, ‘আমি স্ক্রিপ্টিং করি।’
নিজের বাসায় ওয়াসিক ফারহান দিনের বেশির ভাগ সময়ই দুহাতে দুটি কম্পিউটার নিয়ে একমনে গেম খেলে, ওয়েবে ঘোরে কিংবা প্রোগ্রামিং করে চলে। তার ধ্যানজ্ঞান দুই মনিটরের পর্দাতেই নিবদ্ধ। ওয়াসিক ফারহানকে নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। আড়াই–তিন বছর বয়স থেকেই তার কম্পিউটার প্রতিভার কথা প্রচারিত। ২০১২ সালে ‘রিপলিস বিলিভ ইট অর নট’-এর ২৫ নভেম্বরের কমিক স্ট্রিপে দেখা যায়, ধ্যানমগ্ন এক শিশু ল্যাপটপ কম্পিউটারে কাজ করছে। ওপরে লেখা ‘বিস্ময় বালক’, নিচে ‘মাত্র ছয় বছর বয়সেই বাংলাদেশের ওয়াসিক ফারহান রূপকথা কম্পিউটার সফটওয়্যার প্রোগ্রাম করতে পারে’। বিস্ময় বালকই বটে। এই বয়সেই রূপকথা ঠাঁই করে নিয়েছে অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে। দেশ-বিদেশেও তার উদাহরণ টেনে কথা বলা হয়।
রূপকথার মা সিনথিয়া ফারহিন ও বাবা ওয়াসিম ফারহান জানালেন, বয়স এক বছর গড়াতে না গড়াতেই কি-বোর্ড, মাউস নিয়ে নাড়াচাড়ার শুরু। এরপর যত বড় হয়েছে, কম্পিউটারে রূপকথার দক্ষতা বেড়েছে। ধীরে ধীরে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শিখে নিচ্ছে রূপকথা। সি, সি ++, জাভা স্ক্রিপ্টে কাজ করতে পারে। এখন ব্যস্ত লুয়া নিয়ে, যাতে রোবলক্সে নিজের গেমের দুনিয়া তৈরি করা যায়।
রূপকথার বর্তমান কাজের মধ্যে আছে রিশার ভুতুড়ে বাড়ি নামের একটি গেম। শতবর্ষী এক বাড়ির আবহে তৈরি হচ্ছে গেমটি। সাতটি ঘরে রহস্যের জাল ভাঙতে হবে গেমারকে। এ ছাড়া মিশন ইম্পসিবল নামের শুটিং গেম তৈরি শুরু করেছে বলেও জানান সিনথিয়া ফারহীন। রিশার ভুতুড়ে বাড়ির অনেকখানিই তৈরি হয়ে গেছে। গ্রাফিকসও চমৎকার। শিগগিরই শেষ হবে এর কাজ।
বিস্ময়কর কম্পিউটার প্রতিভার জন্য সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের উদ্ভাবন তহবিল থেকে ১০ লাখ টাকা অনুদান পেয়েছে রূপকথা। এর আওতায় মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় করে গেম বানাতে হবে রূপকথাকে। পাশাপাশি এই গেমের পরিকল্পনা চলছে এখন। প্রথম কিস্তি হিসেবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের দ্বিতীয় রাউন্ডে পেয়েছে পাঁচ লাখ টাকার অনুদান। রূপকথাকে অনুদান দেওয়ার কারণ হিসেবে অনুদান কমিটি উল্লেখ করেছে, মাত্র ছয় বছর বয়সে পৃথিবীর সর্বকনিষ্ঠ কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে রিপ্লিস বিলিভ ইট অর নটে স্থান করে নিয়েছে রূপকথা। তাকে আরও বেশি উৎসাহিত করা উচিত।
মা-বাবার একমাত্র সন্তান ওয়াসিক ফারহানের জন্ম ঢাকায়। কম্পিউটার টেবিলটি তাঁর পছন্দের জায়গা, সেখানেই কেটে যায় সারাটা সময়। মাঝেমধ্যে বল খেলতে পার্কে যায় মা-বার সঙ্গেই। এখনো কোনো বিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য ভর্তি না হলেও বিভিন্ন ওয়েবসাইট ঘেঁটে বাড়িয়েছে নিজের জ্ঞানের পরিধি। কলম ধরে তেমন একটা লিখতে না পারলেও কম্পিউটারে টাইপ করার গতি বিস্ময়কর। আর টাইপও করে নির্ভুলভাবে। মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবেও নাম লিখিয়েছে সে।
১০ সেপ্টেম্বর প্রথম আলো অনলাইনের জন্য রূপকথার কাজের একটি ভিডিও চিত্র ধারণা করা হয় সফটওয়্যার ও গেম তৈরির প্রতিষ্ঠান ব্লু স্কিমের কার্যালয়ে। সে সময় ব্ল স্কিমের সিনিয়র ডেভেলপার গাজী মঞ্জুরুল হাসান বলেন, ‘রূপকথা প্রোগ্রামিং জানে। তবে তাকে কিছু করতে বললে হ্যাঁ বা না কিছু বলে না। কাজটা নিজের মতো করে শেষ করে।’
প্রোগ্রামিং করা বা নতুন কোনো বিষয় শেখা কীভাবে? রূপকথা জানায়, বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও ইউটিউবে টিউটোরিয়াল দেখে দেখে শেখে সে। আর এভাবেই শিখতে শিখতে ছোটবেলাতেই বড়দের কাজ করে যাচ্ছে রূপকথা।

Monday, April 27, 2015

সমান সুযোগ ছাড়াই নির্বাচন by মেহেদী হাসান

আগামীকাল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচন কমিশন (ইসি) সবার জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে পারেনি; সরকার সমর্থক প্রার্থী ছাড়া এ অভিযোগ এখন সব মহলের। তাই নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই ছড়িয়ে পড়ছে ভীতি আর আতঙ্ক। এত দিন পর্যন্ত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিরোধী প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও তা এখন ছড়িয়ে পড়ছে ভোটার থেকে সাধারণ নগরবাসীর মধ্যে। বিশেষ করে নির্বাচনী মাঠে সেনা মোতায়েন না রেখে তাদের ব্যারাকে রাখার সর্বশেষ যে সিদ্ধান্ত ইসি নিয়েছে তাতে উদ্বেগের মাত্রা বেড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে ৮৬ শতাংশের অধিক ভোটার মনে করেন নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হয়নি। গত ১৭ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ নির্বাচনী এলাকার ৪৬১ জন ভোটারের ওপর পরিচালিত হয় এ জরিপ। সিটি নির্বাচনের পরিবেশ এখন এতই ভীতিজনক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, বিএনপি এখন ভোটকেন্দ্রের জন্য পোলিং এজেন্ট পাচ্ছে না। যারা পোলিং এজেন্ট ও নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য নাম জমা দিয়েছিলেন তাদের অনেকে নাম প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন ভয়ে। এত দিন পর্যন্ত বিরোধী প্রার্থী এবং নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়া কর্মীদের ওপর হামলা ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি-ধমকি চলছে। কিন্তু এখন অনেক এলাকায় ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাবধান করে দেয়া হচ্ছে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার ব্যাপারে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের আইডি কার্ড জব্দ করার খবর বেরিয়েছে সরকার সমর্থক প্রার্থীদের পক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে। রোববার মধ্যরাত থেকে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে নির্বাচনী প্রচারণা। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত বেশির ভাগ কাউন্সিলর প্রার্থী মাঠেই নামতে পারেননি। প্রচারণার মাঠ থেকে এ পর্যন্ত সাতজন কাউন্সিলর প্রার্থীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে শত শত কর্মী-সমর্থককে। গুমেরও শিকার হয়েছেন কয়েকজন কর্মী। ঢাকা উত্তর ও দণি সিটি করপোরেশন মিলিয়ে ৯৩টি সাধারণ ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিল প্রার্থী ৬১ জনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। কারো কারো বিরুদ্ধে আট-দশটি করে মামলা রয়েছে এবং এর প্রায় সবই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা। কেউ কেউ জামিন পেলেও তারা ভয়ে নির্বাচনী প্রচারণার মাঠে নামতে পারছেন না। মামলা, গ্রেফতার ও হুমকির কারণে অনেক প্রার্থী এলাকা ছাড়া, অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। গতকাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষ থেকে ইসিতে শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে। প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকদের হামলা ও প্রাণনাশের হুমকি, বাড়ি, অফিস ও স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর, মারধরের ঘটনা, প্রার্থী ও কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি, প্রচারণা চালাতে না দেয়াসহ গ্রেফতার বিষয়ে শতাধিক অভিযোগ করা হয়েছে প্রার্থীদের পক্ষ থেকে। কিন্তু এসবের কোনো প্রতিকার হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন প্রার্থীরা। ১৮ মার্চ সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই ইসির বিরুদ্ধে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরির ব্যর্থতা ও পক্ষপাতমূলক আচরণসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে একের পর এক আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও সে ক্ষেত্রে ইসির বিরুদ্ধে নির্বিকার ভূমিকা পালনের অভিযোগ রয়েছে। গত শনিবার রাত ৩টার দিকে কারওয়ান বাজার এলাকায় হামলার শিকার হন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মেয়রপ্রার্থী মাহী বি চৌধুরী। এ সময় তার স্ত্রী ও গাড়িচালকও আহত হন। একই দিন রাজধানীতে বিএনপিসমর্থিত এক কাউন্সিলর প্রার্থীর মিছিলে গুলি, জামায়াতের এক প্রার্থীর মিছিলে ককটেল হামলা এবং সরকার সমর্থক এক বিদ্রোহী প্রার্থীর ওপর হামলায় আঙুল কাটার ঘটনা ঘটেছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে চার দফা আক্রমণের শিকার হয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়ার ওপর আক্রমণকারীদের নাম-পরিচয় ও ছবি প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। এমনকি এরা ছাত্রলীগ-যুবলীগের কোনো পদে রয়েছে তাও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এসব আক্রমণকারী বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ ঘটনার পর নির্বাচন নিয়ে ভীতি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। বিএনপি প্রার্থীদের পক্ষে পোলিং এজেন্ট প্রত্যাহার করে নেয়া একজন কর্মী জানান যেখানে সরাসরি বিএনপি চেয়ারপারসনের ওপর হামলা হয় সেখানে ভোটকেন্দ্রের মধ্যে তাদের নিরাপত্তা কে দেবে। তাই ভীত হয়ে তিনি নির্বাচনী দায়িত্ব পালন থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকে প্রায় প্রতিদিন বিএনপি-জামায়াতের, কোনো না কোনো প্রার্থী ও তাদের অনেক কর্মী-সমর্থকের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটছে সরকার সমর্থক প্রার্থীর পক্ষের লোকজন কর্তৃক। সরকারদলীয় প্রার্থীদের একের পর এক আচরণবিধি লঙ্ঘন আর বিরোধী প্রার্থীদের প্রচারণা চালাতে না দেয়া, গ্রেফতার, মামলা ভয়ভীতি, বাড়ি তল্লাশি প্রতি পদে পদে শুরু থেকে ইসির বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত নির্বাচন ঘিরে যেসব ঘটনা ঘটেছে তাতে নির্বাচন কমিশন সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেনিÑ এ অভিযোগ এখন সর্বত্র। নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে বলে অভিযোগ বিরোধী প্রার্থীদের। নির্বাচনী প্রচারে বিরোধী প্রার্থী এবং তাদের কর্মীদের ওপর সরকারদলীয় লোকজন কর্তৃক হামলার ঘটনা ঘটলেও ইসি কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের অধীন। শুধু নির্বাচন কমিশন নয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধেও বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ভূমিকা পালনের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা গেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে বিরোধীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরপেক্ষ নয়। তারা নিরপেক্ষ আচরণ করছে না ব্যাপক দলীয়করণের কারণে। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনকে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে নির্বাচন আদৌ সুষ্ঠু হয় কি না তা নিয়েই সংশয় ছড়িয়ে পড়েছে বিরোধী মহলে। গতকাল দুপুরের পর নির্বাচন নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া অভিযোগ করেছেন, সেনা মোতায়েনকে ভোট ডাকাতির ক্ষেত্রে বাধা মনে করছে সরকার। তারা সশস্ত্র বাহিনীর ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। তাই এ ক্ষেত্রে সরকারকে সহায়তার জন্য কাজ করছে নির্বাচন কমিশন। সরকারের ভোট ডাকাতির পরিকল্পনার দোসর হয়ে ইসি গুপ্ত কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়রপ্রার্থী মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস, উত্তরের মেয়রপ্রার্থী তাবিথ আউয়ালসহ অনেক প্রার্থী। রোববার নির্বাচনী প্রচারণার সময় আফরোজা আব্বাস অভিযোগ করেছেন সরকার ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচন করতে চায়। তাবিথ আউয়াল অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না তা নিয়ে সংশয় আছে। সেনা মোতায়েন নিয়ে ইসির সর্বশেষ তালবাহানা এ সংশয় আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ঢাকা দক্ষিণের মেয়রপ্রার্থী আবদুল্লাহ আল কাফী অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনে হুমকি-ধমকি আর অর্থের ছড়াছড়ি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ নির্বাচন কমিশন।