Friday, November 29, 2013

‘ঝাঁপ দিলি তুই মরণ যমুনায়’ by সিরাজুর রহমান

খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে যাত্রা ধরনের এক রকম নাটক গ্রিসে খুবই জনপ্রিয় হয়। এশিলাস, সোফোক্লিস আর ইরিপাইডিস নাট্যকারদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ছিলেন।
এ নাটকগুলো সাধারণভাবেই গ্রিক ট্র্যাজেডি নামে পরিচিত। নাটকগুলো উপকথা-ভিত্তিক হলেও সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলি দ্বারা প্রভাবিত ছিল। গ্রিক ট্র্যাজেডির একটা বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে ট্র্যাজেডিগুলো যে ঘটবে, আগে থাকতেই সে সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। কিন্তু ট্র্যাজেডিগুলো ঘটা প্রতিরোধের কোনো চেষ্টা কেউ করেননি।

ঠিক যেন বর্তমান বাংলাদেশ। বাংলাদেশ আজ সর্বনাশের গভীর খাদের একেবারে কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। দাঁড়িয়েছে বলা ভুল হবে। খাদে পড়ে যেতে শুরু করেছে। কিন্তু এ সর্বনাশ যারা ঠেকাতে পারতেন তারা পায়ের ওপর পা তুলে দিব্যি আয়েশে নিশ্চেষ্ট বসে আছেন। ইতিহাসে আছে, রোম যখন পুড়ছিল সম্রাট নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। আসলে তিনি ‘লুট’ (দোতারা জাতীয় বাদ্যযন্ত্র) বাজিয়ে এবং গান করে নিজের সঙ্গীত প্রতিভা জাহির করতে চেয়েছিলেন।
দেশের জনসমর্থন সরকারের পক্ষে নেই। দেশের এবং বিদেশের বিভিন্ন মিডিয়ার জরিপ অনুযায়ী ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষ বর্তমান সরকার এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন সম্ভব বলে মনে করে না। তারা তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিতে না হলেও নিদেন একটা নির্দলীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে নির্বাচন চায়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী গোঁ ধরে বসে আছেন। তার অধীনে এবং তার খেয়াল-খুশি অনুযায়ী তিনি নির্বাচন করবেনই করবেন, কেননা তা না হলে তিনি পাকাপোক্তভাবে গদি ও গণভবন দখল করে রাখতে পারবেন না। অন্যদিকে দেশ-বিদেশের সবাই এখন বুঝে গেছে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং তার নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোট কিছুতেই এই প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচন হতে দেবে না। তারা জানে এ ব্যাপারে দেশের মানুষ পুরোপুরি তাদের সঙ্গে আছে।
মার্কিন সরকার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন, চীন, এমনকি জাতিসংঘও বার বার বলেছে, নির্বাচন করার আগে সরকারের উচিত বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপের ভিত্তিতে সবার গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা সামনা-সামনি তাদের ‘হ্যাঁ’ বলেছেন, কিন্তু পেছনে হাত দিয়ে দলের সমর্থকদের ইশারায় বলেছেন ‘না’। এবং বিদেশিরা সামনে থেকে সরে গেলেই তিনি বিরোধীদের টেনিস খেলার টেকনিকে ‘রং-ফুট’ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। বনানীতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আদৌ কোনো বৈঠক হয়েছে কি না জানি না, কিন্তু স্পষ্টতসই সরকারি অনুপ্রেরণায় জোর প্রচারণা হয়েছে যে বৈঠক অবশ্যই হয়েছে এবং ‘মেঘের কোলে রোদ’ অবশ্যই হেসেছে। বাংলাদেশের শান্তিকামী মানুষ মনে মনে খুবই আশাবাদী হয়েছিল।
এদিকে শেখ হাসিনা তার মহাজোটের ভেতরেই ঘুঁটি চালাচালি করে নতুন কয়েকজন মন্ত্রী এবং ১১ জন উপদেষ্টা নিয়োগ করে ঘোষণা দিলেন যে, তিনি একটা ‘সর্বদলীয়’ নির্বাচনী মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। বাংলাদেশের সবচাইতে কম শিক্ষিত মানুষটিও আপনাকে বলে দেবেন, তার নিজের জোটের তিন দল থেকে কয়েকজনকে মন্ত্রী নিয়োগ করলে সেটাকে সর্বদলীয় বলা যায় না। খালেদা জিয়া তার ১৮ দলের জোটের প্রতিনিধিদের নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের কাছে আপিল করতে গেলেন। তাদের দাবি ছিল নির্বাচনী পদ্ধতি সম্বন্ধে সংলাপ এবং সমঝোতা হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা বিলম্বিত করার জন্য প্রেসিডেন্ট যেন ইলেকশন কমিশনকে নির্দেশ দেন। জনাব আবদুল হামিদ তাদের হতাশ করলেন, প্রমাণ করলেন যে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার চাইতে তিনি আওয়ামী লীগ দলীয় প্রেসিডেন্ট হওয়াই বেশি পছন্দ করেন।

মারাত্মক নির্বাচনী তফসিল
ভেতরে ভেতরে তিনি শেখ হাসিনাকে নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অনুমোদন দেন এবং তার পরপরই সরকারের ক্রীড়নক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদ গত সোমবার রাত সাড়ে সাতটায় বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতারে ভাষণ দিয়ে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করেন। এরপর যা হয়েছে তা থেকে বিরোধী দল ও জোট সম্বন্ধে একটা সঠিক বর্ণনা পাওয়া যায়। সিইসির ভাষণের পরপরই জোট ও বিএনপির নেতা খালেদা জিয়া নেতাদের একটা বৈঠক ডাকেন। আরও পরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের মারফত ঘোষণা দেন যে মঙ্গল ও বুধবার বিএনপি ও ১৮ দলের জোট দেশব্যাপী অবরোধ কর্মসূচি পালন করবে।
লক্ষণীয় যে, মাত্র দিনদুয়েক আগেও খালেদা জিয়া এবং অন্য নেতারা পরিষ্কার বলেছিলেন, সংলাপ ও সমঝোতা ছাড়া নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হলে তারা লাগাতার হরতাল এবং সড়ক, রেল ও নদী পরিবহন অবরোধ করবেন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এবার আর ভুল করেনি। তারা নেতাদের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা না করে তফসিল ঘোষণার পরপরই, অর্থাত্ সোমবার রাত আটটা থেকেই অবরোধসহ সরকারের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ কর্মসূচি শুরু করে। এ সংক্রান্ত সর্বোচ্চ তিতন ব্যক্তি, অর্থাত্ প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি ও সিইসির অন্যায্য এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের প্রতিকারের দায়িত্ব বিরোধী দলের নেতাদের ওপর সম্পূর্ণ ছেড়ে না দিয়ে নিজেদের হাতেই তুলে নিয়েছে জনতা। আমার মনে হয় এ ব্যাপারটি থেকে বিএনপির কোনো কোনো নেতা শিক্ষা নিতে পারলে উপকৃত হবেন। তাদের বুঝতে হবে, নেতা হতে হলে জনতার সামনে থাকতে হবে, পেছনে থেকে নেতা হওয়া যায় না।

যে শিক্ষা সরকারকে জরুরিভাবে নিতে হবে
বাংলাদেশের সর্বত্র হরতাল ও অবরোধ চলছে। দেশের অবশিষ্ট অংশের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। যানবাহন ভাংচুর এবং সম্পত্তি পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগের ক্যাডার এবং দলীয়কৃত পুলিশ ও র্যাব মানুষ খুন করছে, জখম করছে, রক্ত ঝরাচ্ছে। ভুয়া অভিযোগে পুলিশ যাকে পাচ্ছে তাকেই গ্রেফতার করছে।
সরকারকেও বড় একটা শিক্ষা নিতে হবে সোমবার রাতের ঘটনাগুলো থেকে। তারা দেশে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছে, বিএনপির শীর্ষ নেতাদের অনেককে গ্রেফতার করে রেখেছে, গ্রেফতারের ভয়ে অন্যরা পলাতক আছে। সরকার ভেবেছিল বিএনপির নেতৃত্বকে দুর্বল করে ফেলা হলেই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ভেস্তে যাবে। এখন তাদের বুঝে নেয়া উচিত যে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিতে, অন্তত নির্দলীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে নির্বাচন সত্যিকারের একটা গণদাবি, শুধু খালেদা জিয়ারই নয়।
সরকারের গলাবাজ প্রচারবিদরা বিদেশিদের চোখে ধুলো দেয়ার কোনো চেষ্টারই ত্রুটি রাখবে না। কিন্তু সেটা অরণ্যে রোদনেরই শামিল হবে। বিদেশিদের চোখ হাসিনার গুপ্তচরদের চাইতেও বেশি তীক্ষষ্ট। মাত্র চার দিন আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট একটা সর্বসম্মত প্রস্তাবে সংলাপের ভিত্তিতে সবার গ্রহণযোগ্য একটা স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠান করার দাবি জানিয়েছে। তার দু’দিন আগে (২০ নভেম্বর) মার্কিন কংগ্রেসের পররাষ্ট্র কমিটিও এক আলোচনা সভায় একই দাবি জানিয়েছে। এ কমিটির চেয়ারম্যান কংগ্রেসম্যান স্টিভ শ্যাভোট কিছুদিন আগেই স্বচক্ষে বাংলাদেশের পরিস্থিতি দেখে গেছেন।
একই তারিখে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা এক সম্পাদকীয় প্রবন্ধে বাংলাদেশের বর্তমান সঙ্কটের জন্য শেখ হাসিনাকেই দায়ী করেছে। পত্রিকাটি ২০১১ সালে সংবিধান পরিবর্তন, মানবাধিকারের চূড়ান্ত অবমাননা, তথাকথিত আন্তর্জাতিক আদালতে রাজনৈতিক বিচার এবং বিরোধী দলগুলোকে বাদ দিয়েই নির্বাচনী প্রস্তুতির জন্য শেখ হাসিনার গদি-লিপ্সাকেই দায়ী করেছে। তাত্পর্যপূর্ণভাবে পত্রিকাটি বাংরাদেশের বিরুদ্ধে অবরোধের সম্ভাবনারও ইঙ্গিত দিয়েছে। তাত্পর্যপূর্ণভাবেই চীনও ‘স্বাধীন ও সমৃদ্ধ’ বাংলাদেশ দেখতে চায় বলে জানিয়েছে।

বাংলাদেশ কি উত্তর কোরিয়া হয়ে যাবে?
বিগত প্রায় পাঁচ বছরে সরকার বিদেশি দাতা ও বন্ধুদের সঙ্গে যে ধরনের আচরণ করেছে তাতে বাংলাদেশ বিশ্ব সমাজে উত্তর কোরিয়ার মতোই একঘরে ও অচ্ছুত হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। প্রথমেই বিচার-বহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকারের অবমাননার নিন্দায় বিশ্ব সমাজ সোচ্চার হয়েছে। শেখ হাসিনা তার স্বভাব-সুলভ গোঁয়ার্তুমি দিয়ে কারও পরামর্শই শোনেননি। ইলিয়াস আলীর মুক্তির দাবি জানিয়েছে ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র। ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে তার এবং গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাপারে বিশ্ব সমাজ, বিশেষ করে মার্কিন প্রশাসন ও নেতাদের তিনি রীতিমত অপমান করেছেন। পদ্মা সেতু দুর্নীতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারে বাধা দিয়ে ঋণদাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর ক্রোধের উদ্রেক করা হয়েছে। এখন আবার রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনের জন্য সংলাপের ব্যাপারে তিনি ভারত ছাড়া গোটা বিশ্বের উপদেশ ও পরামর্শকে উপেক্ষা করে তাদের প্রতি অসৌজন্য দেখিয়েছেন।
বিশ্বায়নের যুগে কোনো দেশই বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারে না। একমাত্র চীন ছাড়া আর কোনো দেশের সঙ্গেই উত্তর কোরিয়ার সদ্ভাব কিংবা কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। চীনও এখন উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে অস্বস্তি দেখাচ্ছে। বাংলাদেশেরও হয়েছে সেই দশা। ভারত ছাড়া আর কোনো দেশ ঢাকার সরকারের ওপর প্রীত নয়। বাংলাদেশ বিদেশি ঋণের ওপর একান্তভাবে নির্ভরশীল। পদ্মা সেতুর দুর্নীতির বিচার না হলে বিশ্বব্যাংক সেতুর অর্থায়ন করতে অস্বীকার করেছে। ক্রমে ক্রমে অন্যান্য দেশ থেকেও ঋণ সম্পূর্ণ থেমে না গেলেও কমে আসবে। সেই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগও।
সরকারের ভ্রান্ত নীতি, বিশেষ করে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত অবিমৃশ্যকারিতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশী শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে। বিদেশি রেমিট্যান্স হু-হু করে পড়ে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি বাণিজ্যিক সুবিধা দিতে অস্বীকার করছে বাংলাদেশকে। এদিকে দেশের ভেতরের সম্পদও লুটপাট হয়ে মালয়েশিয়া, দুবাই এবং লন্ডনে সম্পত্তিতে লগ্নি হয়ে গেছে। বর্তমান দুর্বৃত্ত সরকারকে গদিচ্যুত করা না হলে দেশ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। কিন্তু তাতে শেখ হাসিনার কী এসে যায়? তিনি দেশটাকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার পরিকল্পনা করেছেন বলেই মনে হয়।
সিরাজুর রহমান

নির্বাচন কমিশন (ইসি) চাইলেও সেনা মোতায়েন হচ্ছে না by ফারুক হোসাইন

নির্বাচন কমিশন (ইসি) চাইলেও সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে না। সেনাবাহিনী নামিয়ে আন্দোলন ঠেকিয়ে নির্বাচন করার চেষ্টায় সিইসি সেনা মোতায়েন করতে চাচ্ছেন।
এনিয়ে ইসিতে দফায় দফায় মিটিং করা হয়। সরকারের ইংগিতে কমিশন এ ব্যাপারে একমত হয়। কিন্তু গতকাল স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র‌্যাবের মহাপরিচালক, বিজিবির মহাপরিচালক, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং অন্য বাহিনী ও বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর সিইসি জানান, সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে না। আপাতত নির্বাচনের মাঠে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, আনসার ও কোস্টগার্ড থাকবে। চলমান আন্দোলন ঠেকাতে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানোর ইসির আগ্রহের কঠোর সমালোচনা করেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেন, নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের নামে ইসি দেশপ্রেমী সেনাবাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি নামাতে চায়। সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ সম্প্রতি এক টেলিভিশন টকশোতে নির্বাচনের অনেক আগেই সেনা মোতায়েনে ইসির সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, এতো আগে সেনাবাহিনী নামানো হলে তাদেরকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হবে। সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানোর সিইসির অতি আগ্রহে বিস্ময় প্রকাশ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজনের) সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, একতরফা নির্বাচনে সেনাবাহিনী জড়ালে জনগণ মনে করবে, তারা একটি পক্ষ নিয়েছে। আমরা আমাদের এই বাহিনীকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে চাই। একতরফা নির্বাচনে দীর্ঘমেয়াদে সেনা মোতায়েন হলে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের প্রশ্ন উঠবে। একতরফা একটি নির্বাচনে দীর্ঘমেয়াদে সেনা মোতায়েন করা হলে এটা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে কাক্সিক্ষত না-ও হতে পারে। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, সরকারের আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন একদলীয় নির্বাচনের ফলে জনরোষ থেকে রক্ষা পেতে সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করে তাদের বিতর্কিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে।
বিরোধী দলের আন্দোলন কর্মসূচিতে সারাদেশ অচল ও স্থবির হয়ে পড়ায় পাতানো নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন কমিশন সদস্যরা। বিরোধী দলের আন্দোলন রোধে তাই আগেভাগেই সেনা মোতায়েনের কৌশল গ্রহণ করেছিলেন তারা। তবে কমিশন সদস্যরা সেনা মোতায়েনে আগ্রহ প্রকাশ করলেও মোতায়েন করা হচ্ছে না সেনাবাহিনী। দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, ইসির প্রচেষ্টা সত্ত্বেও একতরফা নির্বাচনের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীকে নামানোর চেষ্টা সফল হয়নি।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজিব ওয়াজেদ কলকাতার ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান এখন নেই। এই মুহূর্তে এমন কোনো জেনারেল বা সেনা কর্মকর্তা নেই যার অভ্যুত্থানের খায়েশ রয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থা বাংলার জনগণ মেনেও নেবে না। তিনি বলেন, আমাদের দেশের সুশীল সমাজের একটি অংশ ক্ষমতায় যেতে চায়, কেননা সেনা সমর্থনেই তাদের ক্ষমতায় আসার পথ তৈরি হওয়া সম্ভব। আর এরাই সামরিক হস্তক্ষেপের কথা বলছে। কিন্তু একটি অভ্যুত্থান সফল করতে হলে ক্ষমতা কেড়ে নেয়ার জন্য আগে শেখ হাসিনার নাগাল পেতে হবে। তিনি বলেন, যারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন- গণভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন তারা সবাই শেখ হাসিনার অত্যন্ত বিশ্বস্ত। তারা কাউকে সুযোগ দেবে না। প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের মুখে হঠাৎ এধরনের বক্তব্য শুনে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেন।
হঠাৎ করে সকলকে অবাক করে দিয়ে নির্বাচন কমিশন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই দেশ জুড়ে চলছে আন্দোলন। বিরোধীদলের আন্দোলনে অচল হয়ে পড়েছে সারাদেশ। পাতানো নির্বাচন ঠেকাতে পথে নেমে এসেছে সারাদেশের মানুষ। তিন দিনের অবরোধে সারাদেশ থেকে ঢাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কর্মসূচিতে পুলিশের গুলি ও সহিংসতায় নিহত হয়েছে বিজিবি সদস্যসহ ১৮জন। সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, চীন, জার্মানীসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র। আর তাই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই সহিংসতা ও অচলাবস্থায় চিন্তিত হয়ে পড়েছে ইসি। সহিংসতা ঠেকাতে ও জনগণের আন্দোলন প্রতিহত করতেই আগেভাগে সেনা মোতায়েনের চেষ্টা করেন কমিশন সদস্যরা। দেশের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনার জাবেদ আলী প্রথম বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই দেশজুড়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে। তার এই ঘোষণার পর থেকেই সেনা মোতায়েনের বিষয়টি ঘুরপাক খেতে থাকে। এ নিয়ে ইসির কয়েকটি সভায় আলোচনাও হয়। সাংবাদিকরাও বিষয়টি নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের কাছে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে জানতে চান।
এদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই গত সোমবার আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে ইসি। তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৫ জানুয়ারি রোববার ভোট নেওয়া হবে। তফসিল ঘোষণার পরপরই তা প্রত্যাখ্যান করে টানা ৭১ ঘণ্টার রাজপথ, রেলপথ ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। রাজধানীসহ সারাদেশেই রাজপথে নেমে আসে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। শুরু হয় হামলা, ভাঙচুর ও প্রতিরোধ। অবরোধে সহিংসতায় সারাদেশে নিহত হয়েছেন বিজিবি সদস্যসহ ১৮জন। বিরোধীদলের অবরোধ কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা ও জান-মালের ব্যপক ক্ষতির কারণে বিপাকে পড়ে যায় ইসি। সহিংসতা এড়ানোর পন্থা খুঁজতে গত বুধবার অবরোধের দ্বিতীয় দিন তিন দফা বৈঠকে বসেন তারা। ইসি সূত্রে জানা যায়, ইসির এই বৈঠকগুলোয় প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা ছিলো আন্দোলন ঠেকাতে সেনা মোতায়েন করা। বুধবার বৈঠকে কমিশনের সদস্যদের সবাই সেনাবাহিনী নামানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। আর তাই ওই দিনই কমিশন সদস্যরা ঘোষণা করেন প্রয়োজনে আগেই সেনাবাহিনীকে নামানো হবে। কমিশনের এই ঘোষণার পর থেকেই তা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও বুদ্ধিজীবীরা। এতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ এবং অন্যান্য কমিশনাররা ছাড়াও উপস্থিত আছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র‌্যাবের মহাপরিচালক, বিজিবির মহাপরিচালক সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপ্যাল স্টাফ অফিসার সহ সংশ্লিষ্টরা।
ইসির বৈঠক : জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের বিষয়ে এক্ষুণি সিদ্ধান্ত হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দীন আহমেদ। নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে ইসির এক বৈঠকে গতকাল এই সিদ্ধান্ত হয়। কাজী রকিব উদ্দীন আহমেদের সভাপতিত্বে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রসচিব সি কিউ কে মোশতাক, পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার, র‌্যাবের মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমান, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু বেলাল মো. শফিকুল হক এবং অন্য বাহিনী ও বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। কবে থেকে সেনা মোতায়েন করা হবে এমন প্রশ্নের উত্তরে সিইসি বলেন, সেনা মোতায়েনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সঙ্গে কমিশনের বৈঠকে। সাধারণত মনোনয়ন প্রার্থীদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। আগামী ১৩ ডিসেম্বর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময়। সে হিসেবে ১৩ ডিসেম্বরের আগে সেনাবাহিনী মোতায়েন হচ্ছে না। কাজী রকিব বলেন, আপাতত নির্বাচনের মাঠে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, আনসার ও কোস্টগার্ড থাকবে। তবে নির্বাচন যেহেতু এক দিনে হবে তাই নিয়মিত বাহিনীর পক্ষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না-ও হতে পারে। তাই আগে যেমন সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে, এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না। একতরফা নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে নামানো হলে বাহিনীটি বিতর্কিত হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, না, বিতর্কের কিছু নেই। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশন যেমন চাইবে তারা সব সময় তেমন সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। সিইসি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার আশা এখনো ছাড়িনি। সমঝোতা হলে সব দলের অংশ গ্রহণের মধ্য নিয়ে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে।

আরো বেগবান হয়ে রাজধানীর বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে থাইল্যান্ডের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ

থাইল্যান্ডে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে চাপের মুখে থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা গতকাল বৃহস্পতিবার থাই পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে জয়লাভ করেছেন।
বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি অনাস্থা ভোটের প্রস্তাব আনলেও ইংলাকের দল ফিউ থাই পার্টি সহজে ভোটে জয়লাভ করে। ইংলাক সরকার ২০১০ সালের সহিংসতার পর থাইল্যান্ডের বৃহত্তম সরকারবিরোধী আন্দোলনের মুখোমুখি হয়েছে। জাতিসংঘের প্রধান বান কি মুন দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার আহ্বান জানিয়েছেন। বান কি মুন দেশটির সব দলকে সহিংসতা থেকে বিরত থাকার এবং আইন ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মান দেখানোর অনুরোধ জানান। রয়টার্স, এএফপি, বিবিসি অনলাইন।

গত রোববার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার পদত্যাগের দাবিতে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা দেশটির বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি কার্যালয় দখল করে প্রতিবাদ করে। তাদের দাবি, ইংলাক তার ভাই ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার নির্দেশমতো দেশ পরিচালনা করছেন। ইংলাক সিনাওয়াত্রার সরকারের পদত্যাগের দাবিতে চলা আন্দোলন আরো বেগবান হয়েছে। গত বুধবার রাজধানী ব্যাংককের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। হাজার হাজার সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারী ইতোমধ্যে ব্যাংককে মোট ১৪টি মন্ত্রণালয় এবং বেশ কয়েকটি সরকারি দফতর অবরোধ করেছে। গত বুধবার অন্তত ১৯টি প্রাদেশিক সরকারের কার্যালয়ের বাইরেও জড়ো হয় হাজারো বিক্ষোভকারী। তবে এখনো পর্যন্ত এই আন্দোলন অহিংস রয়েছে।
বতর্মান প্রধানমন্ত্রীর নির্বাসিত ভাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে ২০০৮ সালে দুর্নীতির দায়ে কারাদ- দেন আদালত। তাকে দায়মুক্ত করতে পার্লামেন্টে একটি বিল পাসের চেষ্টা করেন প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা। এর প্রতিবাদে গত রোববার শুরু হয় বিক্ষোভ। ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়সহ বেশ কয়েকটি সরকারি কার্যালয় অবরোধ করেছে বিক্ষোভকারীরা। পার্লামেন্ট ভবন অবরোধেরও পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সরকার হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছে, আন্দোলনকারীদের পার্লামেন্ট ভবন অবরোধের সুযোগ দেয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রীর মহাসচিব সুরানন্দ ভেজ্জাজিভা বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের দমনে সেনা নামানোর পরিকল্পনা সরকারের নেই। শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিক্ষোভ চলছে। পুলিশই তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
গত সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভ করার অভিযোগে বিরোধী নেতা সুথেপ থাংসুবানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা সুথেপ ইংলাকের সরকারকে উৎখাত করতে ও সরকারি সব মন্ত্রণালয় দখল করে নেয়ার জন্য সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সরকারি কর্মকর্তাদের প্রয়োজনে কারফিউ জারি করার বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছেন। তবে তিনি তাদের সতর্ক করে এও বলেন, সবার উচিত আইন মেনে চলা ও জনতার আইন ব্যবহার না করা। ২০০৬ সালে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে থাকসিন ক্ষমতাচ্যুত হন। তখন থেকে থাইল্যান্ডে বেশ কয়েকবার রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। প্রথমে শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে তা সহিংস রূপ ধারণ করে। ২০১০ সালের রক্তাক্ত বিক্ষোভের পর থেকে সবচেয়ে বড় ধরনের সংকট চলছে দেশটিতে।

অবরোধে লন্ডভন্ড ট্রেনের শিডিউল

তিন দিনের অবরোধে ল-ভ- হয়ে গেছে ট্রেনের সিডিউল। প্রতিটি ট্রেন চলছে দেরিতে। এর মধ্যে কোনটা ১৩/১৪ ঘন্টা দেরিতে গন্তব্যে এসে পৌঁছাচ্ছে।
ঢাকা-ময়মনসিংহের রেল যোগাযোগ চালু হয়েছে ৩৭ ঘন্টা পর। গতকালও ঢাকার সাথে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নাটোর ও বগুড়ার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। অবরোধের কারণে যাত্রীদের ভোগান্তির সীমা ছাড়িয়ে গেছে। একই সাথে নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছেন রেল কর্মী ও যাত্রীরা। আতঙ্কের মধ্যে কাটছে রেল কর্মীদের দিন। চলার পথে কখন কোথায় দুর্ঘটনা ঘটে সে আশংকায় তাদের পরিবার পরিজনদেরও ঘুম হারাম হয়ে গেছে। নাশকতারোধে রেল কর্তৃপক্ষ যে নিরাপত্তা জোরদারের কথা বলছে তা মানতে নারাজ রেল কর্মীরা। তাদের মতে, পর্যাপ্ত ট্রালভ্যান না থাকায় সামান্যতম নিরাপত্তাও দিতে পারছে না রেল কর্তৃপক্ষ। বিশেষ কিছু স্থানে পাইলট (জরুরী ইঞ্জিন) রাখা হলেও তা কার্যক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অবরোধের তৃতীয় দিনে নওগাঁর আত্রাইয়ের থাওয়াই পাড়া এলাকায় ও ২৪৮ নম্বর ব্রিজের কাছে বুধবার রাতে ৩২ ইঞ্চি রেলপাত কেটে ফেলায় হয়। এতে সৈয়দপুরের সঙ্গে ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনার সঙ্গে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা সকল প্রকার রেল যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে পড়ে। স্থানীয়  রেল প্রকৌশলী বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী আফজাল হোসেন জানান, অবরোধকারীরা রাতের অন্ধকারে নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার থাওয়াই পাড়া এলাকায় ৩২ ইঞ্চি রেলপাত কেটে ফেলে। রেলকর্মী মাহমুদু হাসান ভোর রাতে রেললাইন কাটা দেখতে পেয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগে সংবাদ দেয়। খবর পেয়ে রেলকর্তৃপক্ষ সান্তাহার থেকে প্রয়োজনীয় লোকবল ও সরঞ্জামাদি নিয়ে গিয়ে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে রেললাইনের কাটা অংশ মেরামত করে। এর ফলে রেল যোগাযোগ পুনরায় স্বাভাবিক হয়। এই রেললাইন কাটার ফলে সৈয়দপুরের সঙ্গে ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনার রেল যোগাযোগ প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা বিছিন্ন ছিল। অন্যদিকে, কুমিল্লার অশোকতলা রেল ক্রসিংয়ের ২০০ গজ দক্ষিণে উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিন ও দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। বুধবার দিবাগত রাত সোয়া একটায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর থেকে চট্টগ্রামের সঙ্গে ঢাকা ও সিলেটের ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। কুমিল্লার স্টেশনমাস্টার সফিকুর রহমান জানান, ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দুটি বগির কয়েকজন যাত্রী সামান্য আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া আটটার দিকে বিকল ইঞ্জিনটি উদ্ধার করে মেরামত করা হয়েছে। অপরদিকে, বগুড়ায় অবরোধকারীরা রেললাইন উপড়ে ফেলায় ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোররাতে বগুড়ার সাবগ্রামের ছাতিয়ান তলায় ৭২ ফুট রেলের লাইন উপড়ে ফেলেছে অবরোধকারীরা। এতে বগুড়ার সব রুটের রেল চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েকটি স্টেশনে আটকা পড়েছে চারটি ট্রেন। এরফলে আটকা পড়েছেন কয়েক হাজার ট্রেনযাত্রী।  রেলওয়ে সূত্রে জানায়, ভার রাতে অবরোধকারীরা বগুড়ার সাবগ্রামের ছাতিয়ান তলায় ৭২ ফুট রেললাইন উপড়ে ফেলায় বগুড়ার সঙ্গে লালমনিরহাট ও সান্তাহারের ট্রেন চলালচ বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে লালমনিরহাট এক্সপ্রেস, করতোয়া এক্সপ্রেস, রংপুর এক্সপ্রেস ও  কলেজ ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়ে।
গত তিন দিনে রেলপথ অবরোধের কারণে একেবারে ভেঙ্গে পড়েছে ট্রেনের সিডিউল। কমলাপুর স্টেশন সূত্র জানায়, গতকাল প্রতিটি ট্রেনই দেরিতে কমলাপুর স্টেশনে এসে পৌঁছেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা সুবর্ণ এক্সপ্রেস ৪ ঘন্টা, ওয়ান আপ মেইল ১৩ ঘন্টা, রংপুর এক্সপ্রেস ১১ ঘন্টা, একতা ৫ ঘন্টা দেরিতে কমলাপুর স্টেশনে এসে পৌঁছেছে। একইভাবে পশ্চিমাঞ্চলের ট্রেনগুলোও ৪ থেকে ১০ ঘন্টা দেরিতে চলাচল করছে। এতে করে ট্রেনের যাত্রীদের সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ট্রেন চালক (এলএম) জানান, তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ডিউটি করছেন। পরিবার পরিজনও শঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। রেল কর্তৃপক্ষ যেভাবে নিরাপত্তা জোরদারের কথা বলছে বাস্তবে তার কিছুই হচ্ছে না। রেল পুলিশের কোন ট্রলিভ্যান না থাকায় সব ট্রেনই চলছে সীমাহীন ঝুঁকি নিয়ে। ট্রলি থাকলে ট্রেনের আগে তা চালিয়ে নিয়ে রেল লাইন ঠিক আছে কি না তা জানা যেতো বলে একজন চালক জানান। তার মতে, প্রতিটি ট্রেনের আগে একটা ট্রলি বা ছোট আকারের কোন যান রেলের উপর দিয়ে চালিয়ে নিয়ে গেলে অন্তত দুর্ঘটনা থেকে রেহাই মিলতো। ওই চালক বলেন, রেল কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা বলতে আমাদেরকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, “দেখে শুনে সতর্কতার সাথে যান”। আমরা যেভাবে চলি তাতে দেখে শুনে যাওয়ার কোন উপায় নেই। এমতাবস্থায় আমরাও নিরাপত্তাহীন, যাত্রীরাও বটে।

পাকিস্তানের নয়া সেনাপ্রধান লে. জেনারেল রাহিল শরীফ

পাকিস্তানের নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাহিল শরীফকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আজ (বৃহস্পতিবার) আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটির ৬,০০,০০০ সদস্যের শক্তিশালী সেনাবাহিনীর দায়িত্ব গ্রহণ করবেন তিনি।
এর আগে জেনারেল রাহিল বিদায়ী সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক পারভেজ কিয়ানির পিএসও এবং পাক সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

পাকিস্তানের সর্বোচ্চ সেনাপদক নিশানে হায়দারপ্রাপ্ত মেজর শাব্বির শরিফের ছোট ভাই তিনি। ১৯৭১ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে নিহত হয়েছেন মেজর শাব্বির। এছাড়া পাক সেনাবাহিনীর জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ কমিটির (সিজিসিএসসি) চেয়ারম্যান হিসেবে লেফটেন্যান্ট রাশেদ মেহমুদকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের দফতর থেকে দেয়া এক বার্তায় এই দুই নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া নওয়াজ শরীফ গতকাল জেনারেল রাহিল এবং জেনারেল রাশেদের সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠক করেছেন। দু’টি বৈঠকই আধা ঘণ্টা স্থায়ী হয়।
এর আগে টানা ছয় বছর দায়িত্ব পালনের পর পাক সেনাবাহিনীর বর্তমান প্রধান জেনারেল কিয়ানি অবসরে যাবেন বলে গতমাসে ঘোষণা দেন। তিনি সে সময় বলেন, পাকিস্তানে গণতন্ত্রের প্রতি সেনাবাহিনীর পুরো সমর্থন রয়েছে এবং সেনাবাহিনী চায় গণতন্ত্র শক্তিশালী হোক। পাকিস্তান যখন তালিবান সহিংসতা, ভারতের সঙ্গে টানাপড়েন এবং ন্যাটো বাহিনীর সঙ্গে মতপার্থক্য বৃদ্ধিসহ নানা সংকটে নিমজ্জিত তখন সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন জেনারেল রাহিল।
পাকিস্তানের কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করছেন, তালিবান সহিংসতা দমনে নতুন সেনাপ্রধান হয়তো আপষহীন নীতি গ্রহণ করবেন। জেনারেল রাহিল শরিফ সেনা পরিবারের সন্তান। তার বাবা দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন এবং বড় ভাই সর্বোচ্চ সেনা খেতাব পেয়েছেন। তাই পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের উপজাতীয় অঞ্চলকে জঙ্গিমুক্ত করতে তিনি দ্বিধা করবেন না বলেই মনে করছেন এসব বিশ্লেষক। সূত্র : আইআরআইবি

পুলিশ দিয়ে মানুষ হত্যার বিচার হবে : জয়নুল আবেদীন

পুলিশ দিয়ে মানুষ হত্যার দায়ে শেখ হাসিনার একদিন জনতার আদালতে বিচার হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন।
তিনি বলেন, ‘পুলিশ দিয়ে মানুষ হত্যায় যারা দায়ী থাকবে তাদের একদিন বিচারের আওতায় আনা হবে।’

গতকাল সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির দক্ষিণ হলে ১৮ দলের ডাকা অবরোধ কর্মসূচির সমর্থনে বিক্ষোভ শেষে তিনি এ কথা বলেন।
সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে না আনলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘শেখ হাসিনা আপনি খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করার কথা বলেছেন। আপনি যে পুলিশ দিয়ে শত শত গুলি করাচ্ছেন। শত মায়ের কোল খালি করছেন। আপনি যেদিন ক্ষমতা থেকে চলে যাবেন, হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে। সেদিন জনতার আদালতে আপনার বিচার হবে।’
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘দেশে এখন সমস্যা একটাই, শেখ হাসিনা। যে মুহূর্তে আপনি সরকার প্রধান না থাকার ঘোষণা দেবেন, তখন সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এই ঘোষণা না দিলে বাংলাদেশের জনগণ আপনাকে টেনে ক্ষমতা থেকে নামাবে।’
এর আগে অবরোধের সমর্থনে সুপ্রিমকোর্ট এলাকায় মিছিল করে বিএনপি জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা। মিছিলে অংশ নেন, অ্যাডভোকেট গাজী কামরুল ইসলাম সজল, অ্যাডভোকেট আবেদ রাজা, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, ব্যারিস্টার রাগিব রউফ চৌধুরী, মির্জা আল মাহমুদসহ অর্ধশত আইনজীবী।

বিএনপি-জামায়াত নেতাদের গ্রেফতার করুন : জয়

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় অভিযোগ তুলে বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিতে চায় বললেও প্রকাশ্যে তারা সহিংসতার পথ অবলম্বন করছে।

গতকাল দুপুরে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে তার অফিসিয়াল পাতায় এক স্ট্যাটাসে তিনি আরও বলেন, বিএনপির সঙ্গে থেমে থেমে আলোচনা চলছে। তথাপিও, তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত মিথ্যাচার অব্যাহত রয়েই গেছে। ব্যক্তিগতভাবে তারা আমাদের ক্রমাগত বলেই চলেছে যে, তারা নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। অথচ প্রকাশ্যে তারা সহিংসতার পথ অবলম্বন করছে। জয় আরও বলেন, আমরা বারবার বিএনপিকে সংলাপে বসবার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে যাচ্ছি। নির্বাচিত সর্বদলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে তাদের একটি বড় ছাড় প্রস্তাব আমরা দিয়ে রেখেছি। বিএনপিকে সর্বদলীয় সরকারে তাদের পছন্দমত যে কোনো মন্ত্রণালয় নেয়ার জন্যও আমরা প্রস্তাব দিয়ে রেখেছি।
মিথ্যাচারই হলো বিএনপির চরিত্র—মন্তব্য করে তিনি বলেন, তারা মিথ্যাচার করেই চলে, ক্ষমতায় থাকলে নির্বাচনে কারচুপি করে এবং তারা মানুষ হত্যা করে। আবারও প্রতিবাদের নাম করে তারা সাধারণ মানুষের ওপর বোমা হামলা, ককটেল হামলা ও অগ্নিসংযোগে লিপ্ত হয়েছে।
সজীব ওয়াজেদ আরও বলেন, সারা দেশে তারা আমাদের নেতা-কর্মীদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। আমাদের কর্মীদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের রগ কেটে দেয়া হচ্ছে এবং তাদের ওপর অন্য অনেক ধরনের নৃশংসতা চালানো হচ্ছে। এগুলো প্রতিবাদের ভাষা নয়। এগুলো হত্যাযজ্ঞ। এগুলো বন্ধ হওয়া দরকার। বিএনপি-জামায়াতের যেসব নেতা গত দুই সপ্তাহে এই হত্যার জন্য দায়ী তাদের সবাইকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। আমাদের নির্বাচন এবং গণতন্ত্র—মিথ্যাবাদী, সন্ত্রাসী আর যুদ্ধাপরাধীদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকতে পারে না।

‘ঘেন্না করি এই রাজনীতি রে’

‘দেশে এটা কী হচ্ছে? রাজনীতির নামে মানুষরে পোড়াইয়া মারছে! ক্ষমতার কাড়াকাড়িতে জান যাচ্ছে সাধারণ মানুষের। তাঁদের তো কিছু হচ্ছে না।
তাঁরা সাধারণ মানুষের কথা কী ভাবছেন? এর নাম কী রাজনীতি? এইডা যদি রাজনীতি হয়, তাইলে ঘেন্না করি এই রাজনীতি রে।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের চতুর্থ তলায় ব্লু জোনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেশের বর্তমান রাজনীতি নিয়ে এভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সুলতানা।
সুলতানার ভাই আবু তালহা গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় শিশুপার্কের সামনে বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে বার্ন ইউনিটে চিকিত্সা নিচ্ছেন। সিদ্দিকবাজারের বাসিন্দা তালহা ওই দিন সন্ধ্যায় মিরপুরে বোনের বাসায় যাচ্ছিলেন। তাঁর শরীরের ১৫ শতাংশ পুড়ে গেছে।
তালহার বড় ভাই মোহাম্মদ আবুল হাসান প্রথম আলো ডটকমকে জানান, সাত বোন ছয় ভাইয়ের মধ্যে তাঁর অবস্থান দশম। স্ত্রী আর দুই কন্যা নিয়ে সিদ্দিকবাজারে ভাড়া বাসায় থাকতেন। বড় মেয়ে এবার জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। আবুল হাসান জানান, স্যানিটারি পণ্যের ব্যবসা করে সংসার চালান তালহা। ভাইয়ের পরিবারের ভবিষ্যত্ নিয়ে আশঙ্কা তাঁর চোখেমুখে। তিনি বলেন, ‘তার যদি কিছু অইয়া যায়, তাইলে পরিবারের যে কী হবে! আমরা সবাই কাজকর্ম করে জীবন সংগ্রামে আছি। এমন কোনো সম্পদ নাই যে সেটা দিয়ে চলব।’ দেশের বর্তমান রাজনীতি নিয়ে ক্ষোভের শেষ নেই তাঁরও।

কে আমাগোরে খাওয়াইবো

একমাত্র ছেলে আর স্বামীকে নিয়ে শাহনাজ পারভীনের সংসার। ছেলের বয়স আট বছর। থাকেন ঢাকার মিরপুরের দোয়ারীপাড়ায়। গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধায়। বাসচালক স্বামীর রোজগারে কোনো রকম কেটে যায় দিন। তবু তাঁরা সুখী। সেই সুখের সংসারে হানা দিয়েছে পেট্রলবোমার আগুন।
শাহবাগে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রলবোমায় মারাত্মকভাবে আহত মাহবুব হাল না ছেড়ে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ রাখার শেষ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পারেননি। মত্স্যভবন থেকে শাহবাগের কাছে শিশুপার্কের বিপরীত দিকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন মাহবুব। তাঁর শরীরের ৩০ শতাংশ আগুনে পুড়ে যায়। হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্বামীর পাশে বসে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন শাহনাজ। অজানা আশঙ্কা তাঁকে বারবার আতঙ্কিত করে তুলছিল। শাহবাগের ঘটনায় নাহিদ নামের একজনের মৃত্যু শাহনাজের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বারবারই বলছেন, কী হবে তাঁর স্বামীর জীবনে। তাঁকে কি শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যাবে?
সবার কাছেই তাঁর একই কথা, ‘আমার পোলাডারে লইয়া কেমনে বাঁচুম? কার কাছে যামু। কে আমাগোরে খাওয়াবে? আমাগো তো আর উপায় নাই। আমার স্বামীডারে কেন আগুন দিল? কী অপরাধ করছিল সে।’
শাহনাজ-মাহবুবের একমাত্র ছেলে আট বছরের সাহিলও অপেক্ষায় ছিল বার্ন ইউনিটের সামনে। বৃহস্পতিবার সকালে বাবার সঙ্গে শেষ কথা হয় তার। তারপর বেরিয়ে যান বাবা। সাহিলের কথা, ‘মা শুধুই কাঁদে। বাবা কখন ভালো হয়ে বাসায় যাবে জানি না।’

অপরাজনীতির হাত থেকে মুক্তি দিন
‘কী ছিল এই বাসযাত্রীদের অপরাধ? তাঁদের ওপর কেন এই হিংসার আগুন? তাঁরা তো রাজনীতিও করেন না। তাহলে কেন তাঁদের ওপর হামলা?’
ষাটোর্ধ্ব আবদুল কুদ্দুস শরীফ চোখের পানি মুছতে মুছতে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছিলেন সংবাদকর্মীদের কাছে। তাঁর ছেলে শফিকুল ইসলাম বংশাল শাখা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা। অফিস শেষে বাসায় ফেরার পথে শাহবাগে নাশকতার শিকার হয়ে বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়েছেন। তাঁর শরীরের ২৩ শতাংশ পুড়ে গেছে।
আবদুল কুদ্দুস শরীফ জানান, শরীয়তপুরের বাসিন্দা হলেও রাজধানীর মিরপুরের পীরেরবাগে স্থায়ী বসত গড়েছেন। তিন ছেলে এক মেয়ের মধ্যে শফিকুল দ্বিতীয়। একান্নবতী পরিবার হিসেবে সবাই এক সঙ্গেই থাকেন। শফিকুল ইসলামের দেড় বছর বয়সী সন্তানকে নিয়ে চিন্তিত আবদুল কুদ্দুস শরীফ। আধো আধো বোলে ‘বাবা বাবা’ করে শফিকুলকে খুঁজে বেড়াচ্ছে শিশুটি। প্রতিদিনের মতো আজও অপেক্ষায় রয়েছে কখন বাবা বাড়ি ফিরবেন।
ছেলের এরকম দুর্ঘটনায় বেশ ক্ষুব্ধ শরীফ। তাঁর মতে, স্বাধীনতাবিরোধী চক্র দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে। বিদেশি শক্তিগুলো বাংলাদেশকে নিয়ে চক্রান্ত করছে। রাজনীতিবিদেরা যদি দেশের মানুষের কথা না ভাবেন তাহলে দেশের ভবিষ্যত্ অন্ধকার বলে মন্তব্য করেন তিনি। নিজের সন্তানের এই দুর্দশা দেখে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, এ রকম ঘটনা যেন আর কারও সন্তানের ক্ষেত্রে না ঘটে।

শুধুই কান্না আর হাহাকার
শাহবাগের নাশকতার ঘটনায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন অগ্নিদগ্ধ অন্য সবাই। তাঁদের একেকজনের কমপক্ষে ১০ থেকে ৫৯ শতাংশ পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার পরিচালক সামন্তলাল সেন। সেখানকার অবস্থা পুরোপুরিই বিষণ্ন। কান্না আর আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে পড়েছে।
চিকিত্সক-নার্সসহ সবাই ব্যস্ত রোগীদের সেবা দিতে। কিন্তু তাঁদের মধ্যেও কষ্ট আর হতাশা। কারণ আগুনে পোড়া রোগীদের জীবন অনিশ্চিত। খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এসব রোগী। তার পরও অগ্নিদগ্ধ রোগীদের স্বজনদের তাঁরা আশ্বাস দেন।
বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন পার্থ শংকর পাল প্রথম আলো ডটকমকে বলেন, ‘আগুনে পোড়া রোগীদের বিষয়ে কোনো কিছু বলা কঠিন। কারণ কখন যে তাঁদের শরীরের অবস্থার অবনতি ঘটে, তা বলা যায় না। তবে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি তাঁদের সুস্থ করে তোলার। চিকিত্সার কোনো ত্রুটি হচ্ছে না।’

সড়ক দুর্ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নিহত

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকের সামনে শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী নিহত হয়েছেন। তাঁর নাম সাবরিনা জাহান। তিনি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। সাবরিনার বাড়ি বগুড়ার কাহালু উপজেলায়। তাঁর বাবার নাম হামিদুর রহমান। এ ঘটনার পর বেলা একটা থেকে দুইটা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা ফটকে শিক্ষার্থীরা গাড়ি ভাঙচুরের চেষ্টা করলে পুলিশ রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেটে মঞ্জুর আহমেদ ও ইমরুল কায়েস নামের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দুই শিক্ষার্থী বিদ্ধ হন। বেলা দুইটার দিকে প্রশাসনের আশ্বাসে অবরোধ তুলে নেন শিক্ষার্থীরা।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, সকাল ১০টার দিকে সাবরিনা চারুকলা বিভাগের বান্ধবী জীবন নাহার সুমির সঙ্গে রিকশায় করে বিনোদপুর বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে পৌঁছালে রিকশার সামনের একটি অংশ ভেঙে গেলে তাঁরা দুজন রাস্তায় পড়ে যান। এ সময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি অটোরিকশা সাবরিনাকে চাপা দিলে তাঁর মাথায় আঘাত লাগে। স্থানীয়রা সাবরিনাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। সাবরিনার বান্ধবী সুমি সামান্য আহত হয়েছেন। রিকশা ও অটোরিকশা চালক পালিয়ে গেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-উপদেষ্টা অধ্যাপক ছাদেকুল আরেফিন প্রথম আলো ডটকমকে বলেন, সাবরিনার লাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে রাখা হয়েছে। তাঁর পরিবারকে খবর দেওয়া হয়েছে। বিকেলে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হবে।

একটি ছবি ও একটি ট্রেন- আমরা এই রাজনীতির তীব্র নিন্দা জানাই by মাহফুজ আনাম

আজ আমরা এমন এক ছবির কথা লিখছি, যা ছাপতে পারিনি। লিখছি এমন এক ট্রেনের কথা, যে ট্রেনের ৫০০ জন যাত্রী হয় মারা পড়তেন, নয় তো মারাত্মকভাবে আহত হতেন। ছবিটি আমরা ছাপতে পারিনি। এটি ছিল খুব হূদয়বিদারক, অতি জীবন্ত আর বড় বেশি সামঞ্জস্যহীন।
এটা ছিল আনোয়ারা বেগমের (৪০) ছবি। সরাসরি তাঁর মাথা লক্ষ্য করে ছোড়া ককটেলের আঘাতে মগজের কিছু অংশ উড়ে যায়। আমাদের প্রতিবেদক জায়মা ইসলাম ওই দৃশ্যের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, ‘চিকিত্সকেরা যখন আনোয়ারার মাথায় পেঁচানো কাপড় সরালেন, অনুধাবন করলেন তাঁর মাথা থেকে গলগলিয়ে বের হতে থাকা রক্ত বন্ধ করাটাই যথেষ্ট কাজ নয়, তাঁর খুলিটা রক্ষা করা হবে আসল কাজ। অস্ত্রোপচারের টেবিলে আনোয়ারা চাঁদির হাড়ের টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল, বের হয়ে ছিল তাঁর মগজের উপরিভাগ। ক্ষত থেকে বের হচ্ছিল গান পাউডারের উগ্র গন্ধ।’

আনোয়ারা বেগম সাধারণ মানুষ। একটি ব্যাংকে রান্নাবান্নার কাজ করতেন। সেদিন কাজ শেষে তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। পথে বিরোধী দলের মিছিল দেখে এক পাশে সরে দাঁড়ান তিনি। তখনো জানতেন না আর মাত্র কয়েক গজ দূরেই তাঁর মৃত্যু। দেশে যা ঘটছে, এর সঙ্গে যার কোনো সম্পর্কই নেই, রাস্তার পাশে দাঁড়ানো এমন একজনকে লক্ষ্য করে ককটেল ছোড়া হলো কেন, তা বোধগম্য নয়। এখানে শুধু একটা জিনিসই বোঝা যায়, একজন মানুষকে হত্যার লক্ষ্য হচ্ছে আতঙ্ক সৃষ্টি।

সাবেদ আলী নামের একজন সিএনজি অটোরিকশা চালকের গাড়ি লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা ছোড়া হলে তিনি আগুনে দগ্ধ হন। এতে তাঁর মুখমণ্ডল ও শরীরের ১৫ শতাংশ পুড়ে যায়। তার বাম হাতের মাংস হাড় পর্যন্ত পোড়ে।

রুবেল নামের আরেক সিএনজি অটোরিকশা চালকের গল্পও একই। ককটেল বিস্ফোরণে তাঁর গাড়িতে আগুন লাগে। তাঁর বেলায় যা ঘটেছে, দুর্বৃত্তরা প্রথমে অটোরিকশা উল্টে দেয়। এতে ভেতরে আটকা পড়েন তিনি। এর পর ককটেল ছোড়া হয়। হামলাকারী যে তাঁকে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল, এখানে তা পরিষ্কার। একজন সাহসী পথচারীর চেষ্টায় রক্ষা পান তিনি।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপিএর দুজন কর্মী পরস্পরের দিকে ফুটন্ত পানি ছুড়ে মারেন। এ পানি গায়ে পড়ে সাত বছরের শিশু রাকিবের। শরীরের ১৫ শতাংশ ঝলসে যায় তার।

গত মঙ্গল ও বুধবাররের সহিংসতায় ১৬ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে বুধবারই মারা গেছেন সাতজন। গত জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়ে মারা গেছেন ২৯০ জন। একই সময়ে দুই শিশু নিহত হয় এবং ১৪ বছরের মনিরসহ ১৯ জন গুরুতর আহত বা দ্বগ্ধ হয়েছে। বাবার সঙ্গে ঘুরতে বের হয়েছিল মনির। ৪ নভেম্বর রাস্তার পাশে রাখা বাবার ভ্যানগাড়িতে ঘুমিয়ে ছিল মনির।  এ সময় ওই গাড়িতে লাগানো আগুনে দগ্ধ হয় সে।

চট্টগ্রামগামী মেঘনা এক্সপ্রেস ট্রেনে ৫০০ জন যাত্রী ছিল। চাঁদপুর ও লাকসামে রেললাইন উপড়ে ফেলা হয়েছিল। দুই কৃষক সময় মতো সতর্ক করে দেওয়ায় ট্রেনটি বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায়। শেষ রাতে ওই রেলপথের ৬০ ফুট উপড়ে ফেলা হয়েছিল। এতে ভোর পাঁচটার দিকে রওনা হয়ে যাওয়া ট্রেনটি বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হতো।  আকাশে ওড়ার সময় পেতে রাখা বোমার বিস্ফোরণে একটি বিমানের যে ক্ষতি হয়, রেললাইন উপড়ে ফেলার ভয়াবহতাও একই রকম। এটা কীভাবে আমাদের নিয়তি হতে পারে? দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যেসব সাধারণ মানুষ জড়িত নয়, রাজনৈতিক উদ্দেশে ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের হত্যার পরিকল্পনা কীভাবে করতে পারে দেশের নাগরিকদের একটি অংশ?

যে রাজনীতির লক্ষ্য মানুষ হত্যা করা, তা কখনো জনগণের রাজনীতি হতে পারে না। আজকাল ভেবেচিন্তেই মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। যেন রাজনৈতিক কর্মকান্ডের নামে কিছু খুনিকে রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, যাদের মূল লক্ষ্য হত্যা করা, যানবাহন ও দোকানে আগুন দেওয়া। অন্য কথায় বলতে গেলে, তাদের কাজ হলো সর্বোচ্চ ভীতি ও আতঙ্ক ছড়ানো।

তা নাহলে যাত্রী সেজে হিউম্যান-হলারে আগুন দেওয়ার ঘটনার ব্যাখ্যা কী দেব? তারা চালকের পালানোর পথ বন্ধ করার চেষ্টা চালায়, যাতে তিনি পুড়ে মরেন। এ ধরনের সাধারণ যাত্রী সেজে গণপরিবহনে ওঠে। এক পর্যায়ে তারা উঠে পড়ে। গান পাউডার ছিটিয়ে চলন্ত বাস থেকে লাফিয়ে নামার শেষ মুহূর্তে জ্বলন্ত দেশলাই কাটি ছুড়ে মারে।

এটি কীভাবে অবাধ নির্বাচনের দাবিতে চলমান আন্দোলনের অংশ হতে পারে?

বাংলাদেশে আজ বিরোধীদলের কর্মীরা দেদার মানুষ মারছেন। এখানে একজন পথচারী মারা পড়েন তো সেখানে মারা যাচ্ছে একজন স্কুলছাত্র, আরেক জায়গায় হত্যা করা হচ্ছে কোনো সিএনজি অটোরিকশা চালককে। এসব হত্যার ঘটনা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং পূর্বপরিকল্পিত হত্যার হিসেবে অবশ্যই নিন্দনীয়।

এ বছরের শুরুতে রাজনৈতিক আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নেওয়ার পর থেকে যাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হত্যা করা হয়েছে, তাদের রক্ত স্পষ্টতই খালেদা জিয়ার হাতে লেগে আছে। আমরা বিশেষত এ ব্যাপারে তাঁর দোষ ধরতে পারি যে নিরীহ পথচারীদের মৃত্যুতে তিনি কখনো নিন্দা জ্ঞাপন করেননি, বিশেষ করে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনায়, যারা কোনোভাবেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়।  এতগুলো মৃত্যুর ঘটনায় তিনি কখনো সামান্য সহানুভূতি বা সমবেদনা জানাননি।

যাই হোক, আমাদের প্রধানমন্ত্রী কি বলতে পারবেন এসব ঘটনার জন্য তাঁর কোনো দায়দায়িত্ব নেই? তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো একটি মীমাংসিত প্রশ্ন নতুন করে তাঁর তুলে ধরাটাই কি বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মূল কারণ নয়? তিনি কি সর্বান্তকরণে বলতে পারবেন, বিরোধী দলকে আলোচনায় আনতে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিয়েছেন? একটি সমাধানের লক্ষ্যে সরকার ও শাসক দলের পক্ষ থেকে যে যথেষ্ট নমনীয়তা দেখানো হয়েছে, খতিয়ে দেখতে গেলে এই দাবি কি টিকবে? প্রধানমন্ত্রীর ব্যাপক সাফল্যের সব দাবি যদি আমরা মেনেও নিই, তিনি যে বিরোধী দলের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতায় (অনেকে বলেন এ মনোবৃত্তি তাঁর কখনো ছিল না) পৌঁছাতে এবং স্বাধীনতার উত্সব বলে পরিচিত নির্বাচনমুখী শান্তির পথ এনে দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ, এর প্রমাণ রয়েছে।

আবারও বলছি, এ বছর ৪৮ দিনের হরতালে মারা গেছে ২৯০ জন। এর মধ্যে শুধু অক্টোবর-নভেম্বরেই মারা যান ৩৪ জন। এ ছাড়া দুই শিশু নিহত ও ১৯ জন আহত হয়।

কারা এসব মৃত্যুর জন্য দায়ী?

আমরা এখানে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, রাজনৈতিক কারণেই এ সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। এটি জনসমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা। বিরোধী দল গণআন্দোলনের পথে যাওয়ার বদলে সহিংসতা ও হত্যার পথ বেছে নিয়েছে। শুরু তারা গণআন্দোলন গড়ার চেষ্টা করছে বলে মনে হয়েছে। রাজপথে কোনো গণসমাবেশ নেই, নেতা-কর্মীরা মাঠে নেই, আছে কেবল সন্ত্রাসীরা, যাদের কাজই হলো মানুষের শরীরে ও সম্পত্তিতে আগুন লাগানো।

মানুষের হূদয় ও মনকে জয় করার কোনো চেষ্টা চলছে না, চলছে কেবল মানুষকে সন্ত্রস্ত করার চেষ্টা। তারা ৪৮ ঘণ্টার ‘অবরোধ’ কর্মসূচির সময়  যেভাবে বাড়াল, এতে জনগণকে নিয়ে না ভাবার বিষয়টি বরং জোরালো হয়ে ওঠে। ‘অবরোধের’ চরিত্র হরতালের মতো হওয়ার কথা নয়। শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার মতো শহুরে নাগরিকদের বিচরণের কিছু বিষয় এ ধরনের আন্দোলনের আওতামুক্ত থাকার কথা। তবে শহরের ভেতরে চলাফেলা করলেই বেপয়োরা হামলার শিকার হয়েছে মানুষ। যেসব বিদ্যালয় খোলা রাখ চেষ্টা চলেছে, তাদের প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হয়েছে।

এসব ঘটনায় মৃত্যুর জন্য যদি বিরোধীদলকে দায়ী করা হয়, তবে একইভাবে এর দায়ভার সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের ওপরও বর্তায়। এ পরিস্থিতির সমাধানে ক্ষমতাসীন দল সত্যিকার অর্থে কখনো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।  সংলাপের জন্য জনগণের যে দাবি, তা পূরণে বিরোধীদলের সঙ্গে আলোচনায় বসার কোনো সত্যিকার পদক্ষেপ  নিতে দেখা যায়নি। সংলাপের আমন্ত্রণ সত্ত্বেও একের পর এক অবমাননাকর মন্তব্য সমঝোতার সম্ভাবনাকে নস্যাত্ করে দিয়েছে। বিরোধী দলের নেতাদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার, জামিন নামঞ্জুর ও রিমান্ডে পাঠানোর মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হয়, ক্ষমতাসীন দল সফল কোনো সংলাপ চায় না, বরং পরোক্ষভাবে সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে।

সহিংসতা ও মৃত্যুর জন্য আমরা বিরোধী দলকে এককভাবে দায়ী করার পাশাপাশি সহিংসতার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সরকার ও ক্ষমতাসীন দলকেও দায়ী করব। কারণ তারা সমাধানের বদলে আমাদের রাজনীতিকে আরও সংঘাতের পথে ঠেলে দিচ্ছে। এ লেখাটি যখন লিখছিলাম তখন খবর পেলাম, গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর শিশুপার্কের সামনে একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে চারজন নারীসহ ১৯ যাত্রী দগ্ধ হন। গান পাউডার দিয়েই হোক আর পেট্রোল বোমা মেরেই হোক, হামলাটি যেভাবে চালানো হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। অবরোধের চরিত্র কী হবে—এ বিষয়ে বিরোধী দল সচেতনভাবে অস্পষ্টতা জিইয়ে রেখেছে। এটি কখনো হরতালের মতো হবে না।

আমরা এ রাজনীতির নিন্দা জানাই এবং এর প্রতি তীব্র ক্ষোভ, ঘৃণা ও চরম বিরক্তি প্রকাশ করছি। আমরা রাজনীতির নামে সহিসংতা ও মৃত্যুর এ উন্মত্ততার অবসান চাই। এই অনৈতিক, কুরুচিপূর্ণ, নৃশংস, স্বার্থান্বেষী ও ধ্বংসাত্মক রাজনীতির প্রতি আমাদের ধৈর্য এখন শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে এবং আমরা এর মূলনীতির প্রতি চরম বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছি। এটা গণতন্ত্র হতে পারে না।

মাহফুজ আনাম, সম্পাদক, ডেইলি স্টার

খোলা চোখে- সত্য-মিথ্যা ও রাজনীতির ঘোলা জল by হাসান ফেরদৌস

গল্পটা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হককে নিয়ে; তবে এর সত্য-মিথ্যা আমার পক্ষে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একবার এক নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় একটা বই হাতে নিয়ে হক সাহেব বললেন, ‘আমি পবিত্র কোরআন হাতে নিয়ে বলছি, নির্বাচিত হলে আপনাদের প্রত্যেকের বকেয়া কৃষিঋণ মাফ করে দেব।’

অরণ্যে রোদন- মায়ের রক্ত তোমার হাতে by আনিসুল হক

‘প্রিয় আনিসুল হক স্যার, খবরে শুনলাম, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার পদত্যাগপত্র বাতিল করেছেন, সমন্বিত পরীক্ষা পুনর্বহাল করা হয়েছে। খবরে আরও শুনলাম, বৃহস্পতিবার অবরোধ বাড়ানো হয়েছে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত। শুক্রবার সকাল ১০টায় শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা।

মত দ্বিমত- প্রধানমন্ত্রীর অনড় অবস্থানই বাধা by খোন্দকার মাহবুব হোসেন

একতরফাভাবে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন নিয়ে সংঘাতময় অবস্থা আরও ঘনীভূত হয়েছে। দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার নির্বাচনকালীন ‘সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা’ও গঠন করেছে। অথচ সেখানে প্রধান বিরোধী দল অনুপস্থিত।

জাতীয় নির্বাচন- ওদের গোপনে কথা বলতে দিন by শান্তনু মজুমদার

জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মধ্যে সমঝোতার আশাবাদের মৃত্যু খোঁজা ঠিক হবে না। বিবদমান দুই পক্ষ কিন্তু অনানুষ্ঠানিকভাবে হলেও পরস্পরকে ছাড় দিচ্ছে। সরকারপক্ষ প্রধানমন্ত্রী পদ ছাড়া মন্ত্রিসভার যেকোনো পদ প্রধান বিরোধী দলের জন্য অবারিত করে রাখার কথা বলছে।

পাকিস্তান- গণমাধ্যমের ওপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা by হামিদ মির

‘সাংবাদিক হওয়ার চেষ্টা কোরো না, পাকিস্তানে সাংবাদিকতা খুবই বিপজ্জনক।’ কলেজছাত্র অবস্থায় আমার একটি লেখা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হতে দেখে বাবা আমাকে এটা বলেছিলেন তিন দশক আগে। বাবা ছিলেন পাঞ্জাবের লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার শিক্ষক এবং বিখ্যাত কলাম লেখক।

গোয়েন্দাবৃত্তি ও তথ্য ফাঁস- স্নোডেন কত দিন রাশিয়ায় থাকবেন? by মশিউল আলম

আমেরিকান হুইসলব্লোয়ার এডওয়ার্ড স্নোডেনের বাবা লনি স্নোডেন গত মাসে রাশিয়ায় ছেলের সঙ্গে এক সপ্তাহ কাটানোর পর আমেরিকা ফিরে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, তাঁর ছেলের কাছে আরও অনেক গোপন তথ্য আছে, সেগুলোর প্রকাশ নিশ্চিত করতে তাকে আরও কিছুদিন রাশিয়াতেই থাকতে হবে।

সন্ত্রাসবাদ- পাকিস্তানে শান্তি কত দূর? by মশিউল আলম

এ মাসের ২ তারিখ থেকে পাকিস্তানি তালেবানের সঙ্গে নওয়াজ শরিফের সরকারের শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঠিক তার আগের দিনই মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনী সিআইএর ড্রোন হামলায় তালেবানের প্রধান নেতা হাকিমুল্লাহ মেহসুদ চার সহযোগীসহ নিহত হলে সব ভেস্তে গেছে।

নেপালে নির্বাচন- জনগণ কি এবার গণতান্ত্রিক সংবিধান পাবে? by মহিউদ্দিন আহমদ

পাশের দেশ নেপালে ১৯ নভেম্বর গণপরিষদের নির্বাচন হলো। জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে পার্লামেন্টারি ধাঁচের সরকারব্যবস্থা নেপালে কয়েক দশক ধরে চালু থাকলেও দেশটিতে এখন পর্যন্ত সংবিধান চালু করা যায়নি। পাঁচ বছরের ব্যবধানে এটা দ্বিতীয় গণপরিষদ নির্বাচন।

গল্প- আকাশে ওড়ার ফর্মুলা by ইন্দ্রজিৎ সরকার

দুই-দু গুণে চার হয়—এটা আর কে না জানে। ছোট মামাও সেটা জানেন বিলক্ষণ। কিন্তু তাঁর ব্যাপার-স্যাপারই আলাদা। তিনি প্রশ্ন করবেন, ‘দুই-দু গুণে কেন পাঁচ বা তিন হয় না, বলতে পারিস?’ বুঝতেই পারছ, আমাদের বলতে পারার কথা নয়।

বিকিনিতে সোহা আলী খান প্রথম

ঝামেলা পিছু ছাড়ছে না সোহা আলী খানের। অভিনেতা কুনাল খেমুর সঙ্গে প্রেম নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে তাকে ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এরই মধ্যে মা শর্মিলা ঠাকুর ও বড় ভাই সাইফ আলী খানের সঙ্গেও প্রেমিককে নিয়ে বিরোধে জড়িয়েছেন তিনি। এর রেষ কাটতে না কাটতেই নতুন করে আবারও আলোচনার জন্ম দিয়েছেন সোহা।

‘মিস্টার জয়ি বি কারভেলহো’ নামের নতুন একটি ছবিতে বিকিনি পড়ে ক্যামেরাবন্দি হন তিনি। এ ধরনের পোশাকে এটিই তার প্রথম ছবি। ছবির পরিচালক সামির তিওয়ারি। এতে আরও যারা অভিনয় করবেন তাদের মধ্যে জাভেদ জাফরি এবং আরশাদ ওয়ারসি অন্যতম। ছবিটিতে শুধু বিকিনি পড়েই ক্ষান্ত হননি সোহা। একটি ক্যাবরের গানে খোলামেলা হয়ে অভিনয় করেছেন তিনি।
রৌদ্রোজ্জ্বল বিচে বিকিনি পরে বেশ সাবলীলভাবেই ক্যামেরাবন্দি হয়েছেন সোহা আলী খান। এ বিষয়ে তিনি বলেন, নিজের মতো করেই এই ছবিতে কাজ করেছি। আর বিকিনি পরে কাজ করতে কোন সমস্যা কিংবা বিব্রত বোধ করিনি। বরং এই পোশাকটিতে কাজ করতে ভালই লেগেছে। এই ছবিতে আসলে সাধারণ পোশাকে দেখা যাবে না আমাকে। বিভিন্ন ধরনের পুলিশের পোশাক, ক্যাবরে পোশাক, তোয়ালে এবং বিকিনিতে দেখা যাবে। ছবিটি নিয়ে আমি অনেক আশাবাদী। এটি আমার ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলেই আমার বিশ্বাস।

গল্প- গাশশির রাত by বদরুন নাহার

আশ্বিন মাসের শেষ দিনের উৎসব হয় রাতের। কিন্তু মিয়াবাড়ির উঠোনে দুপুর রোদে গোবর-মাটির প্রলেপে গোল চক্রাকৃতির মসৃণতা তৈরি করে ময়না। চারটা কলাগাছের খুঁটি চারদিকে মাটি খুঁড়ে বসিয়ে দেয় সিরাজ, ফেদু, জরি আর মমেনা।

আল বেরকাম্যু: জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি- অ্যাবসার্ডিস্ট যখন মানবতাবাদী by মাসরুর আরেফিন

গত সপ্তাহে নিউইয়র্কের স্ট্র্যান্ড বুক স্টোরে ঢুকতেই চোখ পড়ল বড় আকারের একটা ব্যানার ঝুলছে, তাতে লেখা ‘আলবের কাম্যু—জন্মশতবর্ষের উদ্যাপন’। এর নিচেই একটা টেবিলজুড়ে কাম্যুর যত উপন্যাস আর এগুলোর ওপর খাড়া করে রাখা আলজেরিয়ান ক্রনিকলস, কাম্যুর ইংরেজিতে সদ্য প্রকাশ হওয়া শেষ বই।

আমি স্বপ্নের জাল বুনি by পার্থ প্রতিম মজুমদার

ষাট যখন দরজায় ধাক্কা দেওয়ার জন্য উন্মুখ তখন ‘অ্যাকশন’ বলার সঙ্গে সঙ্গে যেমন একজন অভিনেতা সুন্দর করে অ্যাঙ্গেল দিয়ে তাকায়, আমি আজকাল রাস্তায় যেতে যেতে নিজেই নিজেকে ‘অ্যাকশন’ বলি আর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাই, গুনগুন করি ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে...’।

গাশশির রাত by বদরুন নাহার

আশ্বিন মাসের শেষ দিনের উৎসব হয় রাতের। কিন্তু মিয়াবাড়ির উঠোনে দুপুর রোদে গোবর-মাটির প্রলেপে গোল চক্রাকৃতির মসৃণতা তৈরি করে ময়না। চারটা কলাগাছের খুঁটি চারদিকে মাটি খুঁড়ে বসিয়ে দেয় সিরাজ, ফেদু, জরি আর মমেনা। সবই গাশিশর আয়োজন। এই সব জোগাড় না হলে গাশিশর রাত আর গাশিশর রাত হয়ে ওঠে না, জমে ওঠে না সবার অপেক্ষার আসর। অনেকে মনে করে গভীর রাতেই উৎসবের শুরু। কিন্তু সন্ধ্যা রাতের চক্রটা আরও বড়, সারা বাড়িজুড়ে, এমনকি বাড়ির সামনে হালট ধরে নদীর পাড় পর্যন্ত। আয়োজনের নেতৃত্বে ময়না। সেঝো মিয়ার মেয়ে সে, গ্রামের হিসাবে বিয়ের বয়স পার হয়ে যায়। বাড়ির ছোটদের নিয়ে দৌড়ঝাঁপে জোগাড়যন্ত্র সেরেছে। এবার আলা মিয়া বাড়িতে থাকায় সবাই খুশি। সে থাকলে আসর জমে। দু-মাস পর বাড়ি ফিরেছে সে। কৃষক ঘরের বিবাগী মানুষ আলা। চাষে মন নাই, কখনো যাত্রা দলের সঙ্গে কখনো বা জারি গানের দলের সঙ্গে নিরুদ্দেশ হয়। ফিরে আসে ভিনদেশি গল্প নিয়ে। চক্র সাজানো হয়েছে নকশি কুলা-ডালায়, তাতে পাটের আঁশ, পিপলের পাতা, কাঁচা হলুদ, হলুদের ফুল, তুলসীপাতা, নিমপাতা, বেতের ডগা, দূর্বা, নারকেলসহ নানা লতাপাতার জোগাড়।
মিয়াবাড়ির রাখাল জয়েদ আলী জমিয়ে রাখা তালের আঁটি কেটে ভেতরের শাঁস বের করেছে। বাড়ির সব ছেলেরা বসে আড্ডা-গান আর পাশা খেলবে, এমনকি নারীরাও কেউ কেউ জমায়েত হয়। সারা রাত পাহারা দিতে হবে, আজ বাড়িতে যেন চুরি না হয়। চোরদের চুরির কারবারির ভূতভবিষ্যৎও আজকের ওপর নির্ভর করে, তাই রাতজাগা এই আসর। চোররা আজ কবরের মাটি চুরি করবে। সে মাটি সিঁধ কাটার আগে যদি গেরস্থের টিনের চালে ছিটিয়ে দেওয়া যায়, তবে নিশ্চিত কবরের লাশের মতো নিশ্চুপ ঘুমে রাত পার করবে গেরস্থ। এসব গল্প গ্রামের কে না জানে। প্রতিবছরই তারা এই আশ্বিনের রাতে আসর জমায়, জোলাভাতি করে। আশ্বিনের রান্না খাবার কার্তিকের সকালে খেয়ে রোগবালাই দূর করে ফলবান হয়ে উঠবে কৃষক। এটাই গাশিশর নিয়ম। রাত হতেই ছেলেপেলেদের সঙ্গে কুলা হাতে বেরিয়েছে ময়না। তার কালো গায়ে লাল ডোরা দাগের শাড়ি, হাতে মনোহারির লাল বালা। কানে সোনালি রঙের বাউটি। কালো তাগার সঙ্গে একটি মাত্র সোনার ধান তাবিজে পূর্ণিমার আলোয় ঝকমক করে কণ্ঠার হার। আজকে তাকে হেমিলিনের বাঁশিওয়ালার মতো লাগে। সারা বাড়ির সে চক্করে তার সঙ্গে ফেদু, লাইলি, মমেনা, আক্তার ও সিরাজরা। তাদের হাতে নানা অনুষঙ্গ, বাচ্চারা কলাপাতার বাঁশিতে ফুঁ দিতে থাকে। কুলা পেটাতে পেটাতে সুর তোলে—
ভূত আমার পুত,
পেতনি আমার ঝি।
বুকে আছে আল্লা-নবী,
ভূতে করব কী? ভূত তাড়ানো শেষে হলে হালট ধরে নদীর পাড়ে যেতে যেতে আবার কুলা-ডালায় বাড়ি পড়ে। সম্মিলিত সুরে চলে ছড়া—
গাশিশ জাগো জাগো
ভ্যালা কইরা জাগো
ইঁচার গুদা, ফলসির গুদা
ঢোল বাজাও গ্যা
দক্ষিণ মুরা। ডুম ডুম করে কুলা-ডালা বাজিয়ে তারা বাড়ির আম-কাঁঠাল-নারকেলগাছের কাছে যায়। যেসব গাছে ফল হয় না তার গোড়ায় পাটের আঁশ বাঁধে। আথালের গাছে পাট বাঁধা শেষ করে দাঁড়াতেই বলাই মাঝির বউকে দেখতে পায় ময়না। বলাইয়ের বউ হাসতে হাসতে বলে, ‘আইলো ময়না, আইজ তোর ঠ্যাঙ্গেও পাট বাইন্ধা দিই। আর বছর গাশিশ আওনের আগে যাতে তোর বিয়ার ফুল ফোটে।’ ময়নার কালো মুখে যে উৎসবের আলো জ্বলে উঠেছিল সেটি সহসা নিভে যায়। ফেদু তা দেখে বলে, ‘জমলা দাদি তুমার এত ঠ্যাহা ক্যান? হেই কি তোমারডা খায় না পরে?’ জমিলা বিদ্রূপের হাসি হাসে, ‘ওলো মাগি, তুই তো দেহি ডাগর হইয়া গ্যাছোস। টরটর কইরা কথা কস।’ মমিনা জমিলাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে বলে, ‘যাও তো তুমি, পোলাপানের পিছনে তোমার এত কী কাম।’ তারা সবাই জমিলাকে পাত্তা না দিয়ে নিজেদের চক্কর শেষ করে। জোলাবাতির রান্নাও শেষ। বাড়ির সব ঘর থেকে মুষ্টির চাল জোগাড় করে তারা জোলাবাতির রান্নায় জরিনাকে বসিয়ে গিয়েছিল। কাল সকালে সবাই এই রান্না খাবে। কিন্তু ময়নার মুখটা সেই থেকে থমথমে। এবাড়ি-ওবাড়ি ভিন্ন ঘর ভিন্ন চুলা হলেও পূর্ণিমা রাতে চাঁদের আসরের কোনো দ্বিভাজিত আল নেই। উঠোনের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা খড়ের গাদাও শরিক আলো-আঁধারির আসরে। ইতিমধ্যে লোকজন গোল হয়ে বসে যায়, গোল আরও হয়—গোল হয় পূর্ণ বয়স্ক চাঁদ। ময়না দেখে মেঝো মিয়ার বাড়ির লজিং মাস্টার লিয়াকত আসরের কোণে বসা। কয়েক মাস হলো আক্তারকে পড়াতে এ বাড়িতে ঠাঁই করে নিয়েছে সে। ময়না তাকে নদীর ঘাটে নাইতে দেখেছে, কাছারিতে বসে বই পড়তে দেখেছে। চোখাচোখি হলেও কখনো কথা হয় নাই। সবাই আলা মিয়ার মুখের দিকে চেয়ে। সে চোখ বন্ধ করে বিড়িতে দীর্ঘ টানের জমা ধোঁয়া সমবেত সবার উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে গেয়ে ওঠে—
জ্যৈষ্ঠ মাসের বিষুদবারে
বাজানে না আইল...
লাল ভিটার নয়া কাঁঠাল
জামাইয়ে না খাইল...
ও সখী বাজানে না আইল গান থামিয়ে আলা মিয়া সবার দিকে তাকায়। লিয়াকত আড়ে-আড়ে ময়নাকে দ্যাখে, কালো দেহে সোনার তাবিজ চাঁদের আলোয় ঝকমক করে। আলা খানিক দম নিয়ে বলে, ‘বিষুদবারের পর বিষুদবার যায়...।’ সে এবার গানের রেশ ধরে আখ্যানে ঢোকে, ‘বিষুদবারের পর বিষুদবার যায়, নয়া বউ বেড়ার ফাঁক দিয়ে দ্যাখে বৈঠার টানে একে একে সব কেরাই নাও হঁইটা চইলা যায়। ঘাটে ভেড়ে না। কন্যার মন সারা দিন আইটাই আইটাই করে...এই বুঝি একখান নাও ভেড়ে। কিন্তু না, কোনো নাও সে ঘাটে ভেড়ে না।’ এই পর্যন্ত বলে আলা মিয়া সোজা চেয়ে থাকে আকাশে চাঁদের দিকে। উপস্থিত সবার চোখে তখন মাটিলেপা উঠান পেরিয়ে বাঁশের বেড়ার ফাঁকে বিষাদগ্রস্ত নয়া বউ ভাসে। আনমনা ময়না দ্যাখে, লজিং মাস্টারের চোখ দুটো তার মুখে কী যেন খুঁজে ফিরছে। কেউ বা ঘোমটার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা বিষাদময় ছবি দেখতে পায়—আলা মিয়ার চিবুকের দিকে তাকিয়ে, জয়েদ আলীর দাড়ির দিকে তাকিয়ে কিংবা খড়ের গাদার আড়ালে, এমনকি চাঁদের দিকে তাকিয়ে কেউ দেখে বিষাদ মুখ! আসরে বসা ছবির মুন্সি গলা খাঁকারি দেয়—‘আহা রে...।’ তারপর মসৃণ হুঁকো গুড়গুড় শব্দে টানে। হুঁকোর মাথায় আগুন জ্বলে উঠলে সেই আলোয় সবার চোখে ধরা পড়ে আকাশে চাঁদের মুখেও বিষাদের ছায়া, নাওয়ের দুলুনি। আলা মিয়া সে বিষাদকে বাড়াতেই যেন বউয়ের পরিচয়টা আরও খোলাসা করতে চায়, ‘এক জোষ্টিও যায়নাইকা, কইন্যার বিয়া হইচ্ছে। গ্যাছে বছরও সখীগো লগে নিয়া লাল ভিটায় আম কুড়াইছে, সিঁদুরে আম, কাঁচামিঠ্যা আর গুটিপোকা আম। কইন্যা নিশ্চিত এই বছর লাল ভিডায় কাঁডাল ধরছেই। তার নিজে হাতে লাগানো গাছখান...।’—বলতে বলতে আলা মিয়া সুদূরে তাকায়।
তাকে লক্ষ করে সবাই চেয়ে থাকে সুদূরের দিকে। কতক্ষণ...। সবাই কেমন অস্থির হয়ে ওঠে। বাসু মাঝির তর সয় না, বলে, ‘নয়া বিবির তারপর কী হইল?’ লজিং মাস্টার লিয়াকতের চোখ আবার ময়নার চোখে পড়লে মাথা নামিয়ে মাটিতে আঁকিবুঁকি কাটে ময়না। তার মনে হয়, নয়া বউয়ের কষ্টকে সে আঁকড়ে ধরতে পারত! সে ভাবে, ভিন গাঁয়ে বউ হয়ে যাওয়ার সময় আঁচল ভরে মায়া নিয়ে যাবে, নয়া বউয়ের মতো দুঃখে ভাসবে। অস্ফুট স্বরে বলে, ‘আ দুইখঃ!’ আলা মিয়া বলে, ‘নয়া বিবির চোখে জল। বাজানে না আসে। মাচায় বিরাট কোলায় বাদা ধানের হুড়ুম ভরা, কাঁডাল আইলে না মিয়ারে দিবো খাইতে। নয়া বিবির কেবল কাঁডালের হাউস না, হাউসের মইধ্যে হাউস থাকে। আহা রে বাবা-মার আদোইরা কইন্যা...।’—শেষ কথাটার মধ্যে হাহাকারের সুর রেখে, চোখেমুখে প্রচণ্ড কষ্টরেখা এঁকে সবার দিকে তাকায় সে। অনেকের কণ্ঠে তখন অস্ফুট স্বর, ‘আহা রে...।’ দীর্ঘশ্বাসের মতো বিড়িতে টান দিতে দিতে আলা মিয়া বলে, ‘আদোইরা কইন্যা, সবে বিয়া হইচ্ছে, বছরও ঘুরে নাই। কইন্যার মাইরে দেখবার মন চায়, ভাইরে দেখবার মন চায়, সইয়ের লগে গপ্পো করবার মন চায়। মনডা তার আনচান। আহা রে জীবন...।’ মমেনার চোখ টলমল করে, জয়েদ আলীর মুখে গড়িয়ে পড়ে পানি—সবার চোখে জীবন তখন হাহাকারময়। আলা মিয়ার দীর্ঘ উচ্চারণের উপস্থিত সবার চোখে নির্মম বেদনা হয়ে ভেসে বেড়ায় জীবন। ময়নার মনে হয়, আহা রে কী কষ্ট! আলা মিয়া সবার জীবনকে ভাসিয়ে দিয়ে ফিরে যায় নয়া বউয়ের জীবনে। —‘বাপে না আইলেও বিষুদবারের হাট থিকা নয়া বউয়ের লিগা বাতাসা কিইনা সোয়ামি ঘরে ফিরে।’ মুখে দুষ্টু হাসি টেনে আলা বলে, ‘বউ তখন স্বামী-সোহাগী।’ গেয়ে ওঠে— আরে না দেইহ্যা ছিলাম ভালো দেইহ্যা আমার কুল গেল। ‘নয়া বউ সোয়ামিরে দেইখা কুলচিন্তা হারায়।
কিন্তু আদর-সোহাগ শ্যাষেও কন্যার চোহে ঘুম নাই। পাশে সোয়ামি নাক ডাইকা ঘুমায়...। হের তহন আবার বাজানের কথা মন হয়।’ এমন বিষাদমাখা নয়া বউয়ের গল্প জমে উঠলেও বাচ্চারা কেউ কেউ ঘুমিয়ে পড়ে। বড়দের কেউ গল্পের বাকি অংশ হয়তো শোনেও না, নিজের দুঃখের ভেলায় ভাসে। কেউ আবার লজ্জায় লাল, কাহিনিতে সোহাগী স্বামীর আগমনে। ময়নার কোলের মধ্যে আক্তার ঘুমিয়ে পড়েছে, তাকে ঘরে দিতে যাবে; কিন্তু নয়া বউয়ের গল্প থেকে উঠতে পারে না। তার পা অবশ হয়ে আসে। আলা মিয়া বলে, ‘জইষ্টো মাসে শেষদিন বাজানে তার আইলো। নয়া বউয়ের সোয়ামির তখন মাঠের খ্যাত-খামারির কামে রাত-দিন এক কইরা ফ্যালাইছে। মিয়ায় কয়, হেই বর্ষার কালে যাইবো। কন্যার তখন সোয়ামি ছাইড়া একা বাজানের লগে যাইবার মন চায় না, শাশুড়ি-ননদ বুঝাইয়া তারে নাওয়ে তুইলা দেয়।’ ময়না আক্তারকে ঘরে নিয়ে যায়। ফিরতি পথে ভাইজানের ঘরের পাশে মেঝো মিয়ার ঘর। দুই ঘরের মাঝখানে যে ফান্দি, তার মধ্যে দিয়ে উঠানে আসতেই কার যেন ছায়া—ছায়া দেখা যায়। ময়নার ভয় ভয় লাগে, চোর না তো! ভীত কণ্ঠে সে বলে, ‘ক্যাডা?’ ছায়া কাছে আসে, ময়না দু-পা পেছায়। ছায়া বলে, ‘চমকাইছোনি? আমি, আমি...লিকত।’ ময়না চিনতে পারে লজিং মাস্টারকে। লিয়াকত হাসতে হাসতে বলে, ‘নয়া বউয়ের দুঃখ সইবার পারবা?’ লজ্জায় মাথা নত করে ময়না। কানের কাছে মুখ নিয়ে লিয়াকত ফিসফিস করে, ‘আমাগো বাড়ির নয়া বউ হইবা?’ ময়না দৌড়ে পালায়। সে আসরে ফেরে না। ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ে। তার মা শুয়েছিল, তখনো ঘুমায়নি, আসর না ভাঙতেই ময়নাকে ফিরতে দেখে আবাক হয় সে! বলে, ‘ফাত কইরা হাইডা আইলি? কী হইছে?’
—‘আলা ভাই নয়া বউয়ের কষ্টের কথা হুনাইলো।’
—‘ধুর পাগলি, হেইয়া তো গপ্পো।’ ময়না কিছু বলে না, তার ইচ্ছা করে আকাশে উড়াল দিতে। জানালার আর্শিতে দেখে পূর্ণিমার চাঁদের বুকে লিয়াকতের মুখ। সে চোখ বোজে, কানে বাজে—নয়া বউয়ের দুঃখ সইবার পারবা?

জনগণ কি এবার গণতান্ত্রিক সংবিধান পাবে?

নেপালে একটি ভোটকেন্দ্রে অপেক্ষমাণ ভোটার
পাশের দেশ নেপালে ১৯ নভেম্বর গণপরিষদের নির্বাচন হলো। জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে পার্লামেন্টারি ধাঁচের সরকারব্যবস্থা নেপালে কয়েক দশক ধরে চালু থাকলেও দেশটিতে এখন পর্যন্ত সংবিধান চালু করা যায়নি। পাঁচ বছরের ব্যবধানে এটা দ্বিতীয় গণপরিষদ নির্বাচন। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম গণপরিষদের মেয়াদ ছিল দুই বছর। ওই সময়ের মধ্যে সংবিধান তৈরি করা যায়নি। গণপরিষদ তার মেয়াদ বাড়িয়েছিল আরও দুই বছর।
এর মধ্যে সরকার বদল হয়েছে পাঁচবার। চারজন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু সংবিধান লেখা হয়নি। এবার অনুষ্ঠিত হলো দ্বিতীয় গণপরিষদ নির্বাচন। অন্তর্বর্তী সংবিধান অনুযায়ী নবনির্বাচিত গণপরিষদকে এক বছরের মধ্যে সংবিধান তৈরি করতে হবে। তারপর গণপরিষদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনসভায় রূপান্তরিত হবে। নেপালের রাজনৈতিক ব্যবস্থা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের চেয়ে আলাদা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এখানে হোঁচট খেয়েছে বারবার। শত শত বছর ধরে চলে এসেছিল নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র। কখনো রানা পরিবার, কখনো বা শাহ পরিবারের বংশানুক্রমিক শাসন। বহুদলীয় ব্যবস্থায় প্রথম সাধারণ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয় রাজা মহেন্দ্রর আমলে, ১৯৫৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। ১০৯টি আসনের মধ্যে নেপালি কংগ্রেস পেয়েছিল ৭৪টি, গোর্খা পরিষদ ১৯টি এবং কমিউনিস্ট পার্টি নয়টি। নেপালি কংগ্রেসের নেতা বি বি কৈরালা প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। নির্বাচনের আগে রাজা নিজেই একটি সংবিধান জারি করেছিলেন।
সেই সংবিধানে দেওয়া ক্ষমতাবলে তিনি দুই বছর পার না হতেই কৈরালার সরকার বাতিল করে দেন। এরপর রাজা স্থানীয় সরকারভিত্তিক পঞ্চায়েতব্যবস্থা চালু করেন। বহুদলীয় ব্যবস্থা লোপ পায়। সেই থেকেই নেপালে বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন চলছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে, নেপালে তখন দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া একটি অস্ত্রের চালান তখন নেপালি কংগ্রেসের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আসে। মুক্তিযুদ্ধে নেপালের জনগণের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে কিছুদিন আগে নেপালের কয়েকজন বিশিষ্ট রাজনীতিককে মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা দিয়ে বাংলাদেশ সরকার কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। এটা নেপালি জনগণের প্রাপ্য ছিল। ১৯৯০ সালে নেপালে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য জোরদার গণ-আন্দোলন হয়। বীরেন্দ্র বিক্রম শাহ তখন রাজা। আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ১৫ এপ্রিল পঞ্চায়েতরাজ শেষ হয়। একটা অন্তর্বর্তী সংবিধান চালু হয়, প্রবর্তিত হয় সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। সাধারণ নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয় দুবার। ২০০১ সালে রাজা বীরেন্দ্র রহস্যজনকভাবে সপরিবারে নিহত হলে তাঁর সহোদর জ্ঞানেন্দ্র সিংহাসনে বসেন। এর আগেই, অর্থাৎ ১৯৯৬ সালেই নেপালের কমিউনিস্ট পার্টিতে ভাঙন ধরেছিল এবং পুষ্পকমল দহলের নেতৃত্বে একদল তরুণ রাজতন্ত্রের পুরোপুরি উচ্ছেদসহ নানা দাবিতে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করেছিলেন। দহল ‘প্রচণ্ড’ নামেই পরিচিত। ২০০৬ সালের ৭ নভেম্বর প্রচণ্ডর নেতৃত্বাধীন মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি এবং অন্য সাতটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ছয় দফা সমঝোতা হয়। গণ-আন্দোলনে রাজা জ্ঞানেন্দ্র পিছু হটতে বাধ্য হন।
মাওবাদীরা ১০ বছরের সশস্ত্র লড়াই থেকে সরে আসেন। ২০০৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথম গণপরিষদের অভ্যুদয় ঘটে। গণপরিষদ প্রথমেই রাজতন্ত্রের অবসান ঘটায়। রাজপ্রাসাদকে জাদুঘর বানিয়ে দেয় এবং ক্ষমতাচ্যুত রাজাকে আয়কর দিতে বাধ্য করে। এরপর নেপালে আসে আরও বড় পরিবর্তন। ‘হিন্দু রাজ্য’ থেকে নেপাল রূপান্তরিত হয় একটা সেক্যুলার ফেডারেল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রচণ্ডের নেতৃত্বে সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও দলগুলোর মধ্যে আড়াআড়ি লেগেই ছিল। অন্তর্বর্তী সংবিধানে বলা ছিল, সবকিছুই হবে ঐকমত্যের ভিত্তিতে। প্রচণ্ডের প্রস্তাব অনুযায়ী দুই-তৃতীয়াংশ গণপরিষদ সদস্যের ভোটে সংবিধান পাস করার নিয়ম গৃহীত হয়। তার পরও সংবিধানের ব্যাপারে একমত হওয়া যায়নি। ফলে গণপরিষদ ভেঙে দেওয়া হয় বছর খানেক আগে। নতুন গণপরিষদ তৈরি হতে যাচ্ছে। দেখা যাক, এবার সংবিধান তৈরি হয় কি না। ৬০১ সদস্যবিশিষ্ট নেপালের গণপরিষদে প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে ২৪০ জন নির্বাচিত হন। এ ছাড়া নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো প্রদত্ত ভোটের সমানুপাতিক হারে প্রতিনিধিত্ব পায়। এ রকম প্রতিনিধির সংখ্যা ৩৩৫। নির্বাচিত গণপরিষদ নাগরিক সমাজের মধ্যে থেকে বাকি ২৬ জনকে মনোনীত করে। দলগুলোকে আগে থেকেই প্রতিনিধিদের তালিকা জমা দিতে হয়।
সমানুপাতিক প্রতিনিধিদের মধ্যে নির্দিষ্টসংখ্যক মহিলা, বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ও নিম্নবর্ণের মানুষের প্রতিনিধি থাকতে হয়। দলগুলো যে তালিকা জমা দেয়, তার মধ্য থেকেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রতিনিধি মনোনীত হন। সুতরাং প্রত্যক্ষ ভোটে কোনো দল যদি একটি আসনও না পায়, সমানুপাতিক ভোটের পদ্ধতিতে তারাও কিছু আসন পেতে পারে। এ জন্য দুটো পৃথক ব্যালট ব্যবহার করা হয়, একটা প্রত্যক্ষ নির্বাচনের জন্য এবং অন্যটা সমানুপাতিক পদ্ধতিতে দলের জন্য। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ১২৪। নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, ২৪০ আসনের মধ্যে নেপাল কংগ্রেস পেয়েছে ১০৫টি, কমিউনিস্ট পার্টি-মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী (ইউএমএল নামেই পরিচিত) ৯১টি এবং মাওবাদীরা ২৬টি। অন্য সব দল মিলে পেয়েছে ১৮টি। মাওবাদীরা ২০০৮ সালের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও এবার তাদের বিপর্যয় হয়েছে। এর প্রধান কারণ, দলের বিভক্তি। এর আগে ৯৪ জন গণপরিষদ সদস্য নিয়ে মাওবাদী নেতা মোহন বৈদ্য আলাদা হয়ে যান। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি আমলানির্ভর কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মোহন বৈদ্যের দল এবং আরও ৩২টি ছোট ছোট দলের একটা মোর্চা নির্বাচন বর্জন করে।
তারা বোমাবাজিও করে। নির্বাচনের আগে থেকেই তারা হরতাল ডাকে। কিন্তু নেপালের বিপুলসংখ্যক নাগরিক হরতাল উপেক্ষা করে নির্বাচন কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভোট দেন। ভোট প্রদানের হার ছিল ৭০ শতাংশের ওপর। নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর মাওবাদী নেতা প্রচণ্ড সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনে ‘আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র’ ও ‘ভোট কারচুপি’র অভিযোগ তোলেন এবং ভোট গণনা থেকে তাঁর দলের প্রতিনিধিদের প্রত্যাহার করে নেন। এটা সম্ভবত এই অঞ্চলের নষ্ট রাজনৈতিক সংস্কৃতি। জিতে গেলে সবই ঠিক, আর হেরে গেলে কারচুপির অভিযোগ। প্রচণ্ডের অভিযোগ কেউ পাত্তা দেননি। নির্বাচন উপলক্ষে নেপালে বিদেশ থেকে অনেক পর্যবেক্ষক এসেছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কার্টার সেন্টার, এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশন এবং নেপাল ইলেকশন অবজারভেশন কমিটির আমন্ত্রণে আসা পর্যবেক্ষকদের দল। সবাই বলেছে, নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। জিমি কার্টার স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, এবারের নির্বাচন আগের নির্বাচনের চেয়েও নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। এর পরপরই প্রচণ্ড কার্টারের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর সুর নরম হয়ে পড়ে। তিনি দাবি তোলেন, দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে সংবিধান তৈরি ও সরকার গঠনের অন্তর্বর্তী সংবিধানের ধারাটি বাতিল করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধারাটি পুনর্বহাল করতে হবে। তিনি আরও বলেন, তিনি পুনর্নির্বাচন চাচ্ছেন না, এটি সুষ্ঠু পর্যালোচনা ও তদন্ত হতে হবে।
প্রচণ্ড দুটো আসনে দাঁড়িয়েছিলেন, একটিতে হেরে যান। অন্যটিতে তিনি মাত্র ৯০০ ভোটের ব্যবধানে জয় পান। মাওবাদীরা নির্বাচনে কম আসন পেলেও তারা নেপালের রাজনীতিতে অনেকগুলো নতুন বিষয় নিয়ে এসেছিল এবং প্রচলিত ধারার রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে অনেক আশার সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছিল। বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, নিম্নবর্ণের মানুষ, অবহেলিত অঞ্চল এবং মহিলাদের প্রতিনিধিত্বের ব্যাপারে তাদের ভূমিকা ছিল জোরালো। সমানুপাতিক ভোটের গণনা এখনো চলছে। এখানেও নেপালি কংগ্রেস এগিয়ে। তারপর ইউএমএল এবং অনেক পেছনে মাওবাদীরা। কংগ্রেস ছোট ছোট দক্ষিণপন্থী দল নিয়ে সরকার গঠন করতে পারে অথবা টেকসই সরকারব্যবস্থার জন্য কংগ্রেস এবং ইউএমএলের জোট সরকারও হতে পারে। এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। নেপালের বড় দলগুলোতে গোষ্ঠীগত কোন্দল ব্যাপক। কংগ্রেস নেতা সুশীল কৈরালা ও শের বাহাদুর দেউবার মধ্যে প্রধানমন্ত্রিত্বের পদ নিয়ে বিরোধ আছে। ইউএমএলের মধ্যে প্রধানমন্ত্রিত্বের দাবিদার তিনজন: জালানাথ খানাল, মাধব কুমার নেপাল ও কেপি ওলি। দেখা যাক, শেষমেশ ঘটনা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। তবে নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণের যে ব্যাপকতা ও আগ্রহ দেখা গেছে, তাতে গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থার ওপর তাঁদের আস্থাই প্রমাণ করে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই আস্থার প্রতি সম্মান দেখাবেন, সবাই এটাই আশা করেন।
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক। নেপালের নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
mohi2005@gmail.com

মায়ের রক্ত তোমার হাতে

কী অপরাধ করেছিলেন এই নারীর মা আনোয়ারা বেগম?
প্রিয় আনিসুল হক স্যার, খবরে শুনলাম, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার পদত্যাগপত্র বাতিল করেছেন, সমন্বিত পরীক্ষা পুনর্বহাল করা হয়েছে। খবরে আরও শুনলাম, বৃহস্পতিবার অবরোধ বাড়ানো হয়েছে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত। শুক্রবার সকাল ১০টায় শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। আমার আপু মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পাননি।
আমার বাবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন হেডমাস্টার। তাঁর সাধ্য নেই মেয়েকে বেসরকারি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর। সাধারণত মেডিকেলের প্রশ্ন আর অ্যাগ্রিকালচারের প্রশ্নের ধরন এক রকম হয়। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেওয়ার শখ আপুর সেই ৬ অক্টোবর থেকে, যেদিন মেডিকেলের রেজাল্টে আপুকে হার মানতে হলো। কিন্তু স্যার, যদি সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত অবরোধ হয়, তাহলে উত্তরাঞ্চলের পরীক্ষার্থীরা কীভাবে ঢাকায় সকাল ১০টার পরীক্ষায় অংশ নেবেন? জানি, চান্স পাওয়া অনেক কঠিন, কিন্তু আমার আপুর কি পরীক্ষাটাই দেওয়া হবে না? ইতি, ক্লাস এইটে পড়ুয়া একজন ছোট ভাই।’ আমার ফেসবুক পাতায় এই চিঠিটা এসেছিল গত বুধবার। এটা আমি ফেসবুকে প্রকাশও করেছিলাম। আর এদিকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শুক্রবারের ভর্তি পরীক্ষা স্থগিত করেছে। সেই খবরটাও জানলাম ফেসবুকেই নিচের বার্তাটার মাধ্যমে: ‘ব্রেকিং নিউজ শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা স্থগিত। স্যার, এভাবে আর কত? এভাবে পেছাতে পেছাতে তো দেশটা পিছিয়ে যাচ্ছে। ইবি ভর্তি পরীক্ষা তো তিনবার পেছাল। চবির ভর্তি পরীক্ষা হতে হতে স্থগিত আছে।
এভাবে পেছালে যাঁরা পরীক্ষা দিচ্ছেন, তাঁদের পরীক্ষা দেওয়ার মানসিকতা থাকে? আসলেই উদ্ভট এক উটের পিঠে চলছে স্বদেশ।’ যেহেতু আগের বার্তাটা প্রকাশ করেছিলাম, ফলে পরীক্ষা স্থগিতের খবরসমেত এই বার্তাটাও প্রকাশ করাটা জরুরি হয়ে পড়ল। প্রকাশ করলাম। এর আগে এই বার্তা পেয়েছিলাম: ‘অনেকে, যাঁরা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারবেন না, তাঁরা হয়তো ভবিষ্যৎ সাফল্যের চাবি-ই পাবেন না; কিন্তু আমরা যারা চাবি পেয়েছি, তারা তো চাবি পেয়েও তালা খুলতে পারছি না। আমাদের PGCB-এর Asst. Manager (Elec/Mech) post-এ পরীক্ষা ২৩ নভেম্বর সকাল ১০টা (বুয়েট), কিন্তু শুক্রবার ভোর পাঁচটা পর্যন্ত অবরোধ। যাঁরা ঢাকার বাইরে থেকে আসবেন পরীক্ষা দিতে, তাঁরা তো দিতে পারবেন না। কী হবে এই দুই নেত্রীর নোংরা রাজনীতি করে? এ রকম অনেক অনেক চিঠি এসে আমার ফেসবুকের ইনবক্স ভরে গেছে। দুই এই বার্তাগুলো থেকে আমরা কী বার্তা পাচ্ছি? রাজনীতি নাকি মানুষের কল্যাণের জন্য? রাজনীতি নাকি দেশের ভালোর জন্য? একটা দিন হরতাল হলে, ধর্মঘট হলে, অবরোধ হলে মানুষকে কত রকমের দুঃখ-কষ্ট-হয়রানির মধ্যে পড়তে হয়; এই চিঠিগুলো তার সামান্যই উদাহরণ। এসব বার্তা নিশ্চয়ই ক্ষমতান্ধ, ক্ষমতাবধির, ক্ষমতাপাষাণ আমাদের নেত্রীদের কাছে পৌঁছাবেও না, তাঁদের মনে সামান্য বিচলনও সৃষ্টি করতে পারবে না। মানুষ মারা যাচ্ছে, মানুষ পুড়ে যাচ্ছে—সেসব খবরেই যাঁরা বিচলিত হন না, কার ভর্তি পরীক্ষা হলো কি হলো না, তাতে তাঁদের কী এসে যায়? তাঁদের দরকার ক্ষমতা। কী অপরাধ করেছিলেন ব্যাংক কর্মচারীদের জন্য রান্নার কাজ করা আনোয়ারা?
কেন তাঁর মাথা বরাবর বোমা ছুড়ে মারা হলো? কী অপরাধ করেছিলেন সিএনজিচালিত ট্যাক্সিচালকেরা? বর্বরতার কোন স্তরে আমরা নেমে গেছি যে আমরা যাত্রীবোঝাই বাসে, চালক বা যাত্রীসমেত ট্যাক্সিতে পেট্রল ঢেলে আগুন দিচ্ছি, গান পাউডার ছুড়ে আগুন দিচ্ছি? কেন নির্বিচারে ককটেল ছুড়ে মারছি? এগুলোকে বলে রাজনৈতিক কর্মসূচি? এটা কি পোড়ামাটি নীতি যে আমি এই দেশের মানুষ চাই না, গাছপালা চাই না, শুধু পোড়ামাটি থাকলেই চলবে? আর অবরোধ ও হরতালের মধ্যে পার্থক্য কী? প্রথম আলোয় বিএনপির নেতাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, অবরোধ হলো সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করা, কিন্তু দোকানপাট স্কুল-কলেজ খোলা থাকতে পারে। যানবাহন বন্ধ থাকলে স্কুল খোলা থাকবে কী করে? শুধু যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে ভর্তি পরীক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে তা নয়, জুনিয়র ও প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার অর্ধকোটি শিশুকে আর তাদের পরিবারগুলোকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে চরম উৎকণ্ঠা ও হয়রানির অন্ধকূপে। আর সব ক্লাসের শিক্ষার্থীদেরই বার্ষিক পরীক্ষার সময় এটা। রোম পুড়ছে, তাঁরা বাঁশি বাজাচ্ছেন? অবরোধ মানে এত দিন জানতাম রেলপথে, রাজপথে মানুষের সমাবেশ। আওয়ামী লীগ যখন অবরোধ ডেকেছিল, তখন ঢাকার কোন কোন পয়েন্টে কোন নেতা থাকবেন, তা আগের দিনেই প্রকাশ করে সেসব জায়গায় কর্মীদের সমবেত হতে বলা হয়েছিল—সেটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। পত্রিকান্তরে পড়লাম,
বেগম জিয়া নাকি বিএনপির নেতাদের বিভিন্ন পয়েন্টের দায়িত্ব দিয়েওছিলেন, কিন্তু কেউ তাঁর আদেশও মানেননি। অবরোধ ডাকা হবে, আর রাজপথে নেতা-কর্মীরা থাকবেন না; রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হবে ভাড়া করা দুর্বৃত্তদের, যারা ব্যাগে করে ককটেল নিয়ে বা পেট্রলবোমা নিয়ে বা গান পাউডার নিয়ে অতর্কিতে হামলা করবে কোনো যানবাহনের ওপরে, গোপনে কোনো রেলপথের ফিশপ্লেট খুলে রাখবে, স্লিপার উপড়ে রাখবে—এটা কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন হতেই পারে না। এটা একেবারেই সন্ত্রাসবাদী কৌশল। বিএনপির মতো একটা গণসংগঠনের পক্ষে এ কাজটা কি ঠিক হচ্ছে? আমার বলতে দ্বিধা নেই যে আজকের সংকটের মূলে এই সরকার। উচ্চ আদালতের নির্দেশে দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার সুযোগ রাখা হয়েছিল। দেশে-বিদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল গ্রহণযোগ্য একটা বিষয়। এই সরকারের অনেক ভালো কাজ থাকা সত্ত্বেও সরকার যে জনপ্রিয়তা হারিয়েছিল, তার সবচেয়ে বড় কারণ হলো, এই ব্যবস্থা তুলে দেওয়া। কারণ, তাতে প্রত্যেক ভোটারের মর্যাদাকে আঘাত করা হয়েছে। সংকট সৃষ্টি করে সেটা সমাধানের জন্য সরকার সংলাপ ও সমঝোতার চেয়ে পুলিশি পদক্ষেপকে শ্রেয়তর বিকল্প হিসেবে নিয়েছে। নির্মমভাবে বিরোধী কর্মসূচিকে দমন করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। বিরোধীদের বিক্ষোভ কর্মসূচি তাই জনসমাবেশভিত্তিক না হয়ে ককটেল-বোমা-আগুনভিত্তিক হওয়ার পেছনে সেটা একটা বড় কারণ।
কিন্তু সরকারের সৃষ্টি করা এই পিছল ফাঁদে কেন বিরোধী দল পা দিল, সেটাও একটা প্রশ্ন। যেকোনো দাবি, তা যত মহৎই হোক না কেন, জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া তা অর্জন করা যায় না। ১৯৫২ সালের ছোট্ট শহর ঢাকার মিছিলে ৩০ হাজার লোক হয়েছিল। স্কুলের ছাত্রীরা পর্যন্ত মিছিলে অংশ নিত। ১৯৬৯ সালে সারা দেশের প্রতিটি রাজপথে লাখ লাখ মানুষ বেরিয়ে এসেছিল। ১৯৭১ সালের মার্চে রাস্তায় থাকত শুধু মানুষ আর মানুষ। ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলনে জরুরি অবস্থা কারফিউ ভেঙে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল বলেই এরশাদ সরকারের পতন ঘটেছিল। এমনকি ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনে জনতার মঞ্চে যোগ দিতে মতিঝিল অফিসপাড়া থেকে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। বিএনপির আন্দোলনে মানুষ কই? আর দুই দলের দুই জোটের নেতাদের কাছে প্রশ্ন, আপনাদের কাছে কোনটা বড়—দেশ, নাকি ক্ষমতা? মানুষের জীবনের কি কোনোই মূল্য নেই আপনাদের কাছে? এখনো সময় আছে, একপক্ষীয় নির্বাচন থেকে সরে আসুন। সরকারপক্ষ কিছু ছাড় দিক, যাতে বিএনপির একটা সম্মানজনক পথ থাকে নির্বাচনে আসার। বিএনপির পক্ষ থেকেও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইতিবাচক মনোভাব নিয়েই এগিয়ে আসা উচিত। দ্বিতীয় কথাটা আজকের দিনে অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল এর আগে একটা লেখা লিখেছিলেন সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে। এই দেশে মেডিকেল কলেজগুলোর জন্য একটা অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা হয়,
তার মাধ্যমেই বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে ছেলেমেয়েরা ভর্তি হতে পারে। কিন্তু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা হয় আলাদা। শুধু যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা আলাদা হয়, তা নয়, অনেক সময় বিভাগগুলোর পরীক্ষাও হয় আলাদা। আগে যখন বিআইটি ছিল, তখন দেশের বিভিন্ন আইটির পরীক্ষা একসঙ্গে হতো, এখন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিটির আলাদা পরীক্ষা হয়, একটায় তো আবার বিভাগে বিভাগে আলাদা পরীক্ষা হয়। এর অন্যতম কারণ পরীক্ষার ফি, বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় হয়, শিক্ষক-কর্মচারীরাও কিছু টাকা পান। ছাত্রছাত্রীদের ভোগান্তিটা হয় চরম। তাঁরা এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটছেন পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। টাকা নষ্ট হচ্ছে, সময় নষ্ট হচ্ছে; কখনো একই দিনে দুই প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা। তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় কোনটা ছাড়বেন, কোনটা ধরবেন। এই চরম অমানবিক ভোগান্তি থেকে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে সমন্বিত পরীক্ষার আয়োজন করা কি যায় না? ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল সেই চেষ্টা করছেন। সফল হতে পারেননি। শুধু দুটি বিশ্ববিদ্যালয় রাজি হয়েছিল, সেটা নিয়েও বাধা।
ড. ইয়াসমীন হক ও মুহম্মদ জাফর ইকবালকে তাই পদত্যাগ করতে হয়েছিল। যা-ই হোক, এটা ভালো যে তাঁরা পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করেছেন। আমি ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের এই উদ্যোগের প্রতি দুই হাত তুলে পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি। স্বপ্ন দেখছি, একদিন মেডিকেল কলেজগুলোর মতো অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানই একটি অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হয়রানির হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে। তবে তারও আগে, এই রাজনৈতিক হানাহানি বন্ধ করে একটা সমঝোতায় আসার জন্য নেতাদের আকুল আবেদন জানাই। মনে রাখবেন, একটা মানুষের প্রাণ অনেক মূল্যবান, যা আমরা ফিরিয়ে দিতে পারি না, তা কেড়ে নেওয়ার অধিকার আমাদের কারোরই নেই। অবরোধের বোমায় মৃত আনোয়ারা বেগমের মেয়ে নাসিমা বিলাপ করে বলেছেন, কোনো বড় রাজনীতিবিদ তো হরতালে প্রাণ হারান না। আমার মায়ের মৃত্যুর জন্য তাঁরাই দায়ী। আমার মায়ের রক্ত তাঁদের হাতে। আরব দেশের সব সুগন্ধি কি পারবে রাজনীতিবিদদের হাত থেকে রক্তের এই গন্ধ দূর করতে?
আনিসুল হক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।

এইডস ও যুবসমাজের দায়িত্ব

যুবসমাজ এইডস প্রতিরোধে অসাধারণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তারা যদি অবাধ ও অনিরাপদ যৌনাচার থেকে বিরত থাকে, তাহলেই এইডস প্রতিরোধ সম্ভব। গণসচেতনতা সৃষ্টি, ধর্মীয় অনুশাসন ও ইসলামের বিধিবিধান মেনে চললে এইডস প্রতিরোধ সম্ভব। বর্তমান সমাজে তথা দেশ-বিদেশে যে পতিতাবৃত্তি চলছে, কোনো ধর্মই একে সমর্থন করে না; এ ব্যাপারে ইসলাম সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। পতিতাবৃত্তির দরুন অবাধ যৌন মিলনের ফলে মানুষ সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এইডস নামক মরণব্যাধিতে। বিভিন্ন জটিল রোগসহ উচ্ছৃঙ্খলতার জন্য দায়ী ব্যভিচার নামক সামাজিক অনাচার। তাই ইসলাম অশ্লীলতা এবং ব্যভিচারের কদর্যতা ও নোংরামির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে; এটিকে হীন ও মন্দ কর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং মানবসভ্যতার জন্য বড় ধরনের হুমকি সাব্যস্ত করেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা জোরালো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বলেছেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তীও হয়ো না, নিশ্চয়ই এটি অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট আচরণ।’ (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত-৩২) ইসলাম ব্যভিচারের পথ চিরতরে বন্ধ করে পৃথিবীতে যুবক-যুবতীদের সুস্থ-সুন্দর বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনযাপনে সমর্থ মানুষকে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে। যুবক-যুবতীর মধ্যে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের বাইরে কোনো দৈহিক মিলন ইসলাম অনুমোদন করে না। বৈধ স্ত্রী ব্যতীত অন্য নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের কারণেই এইডসের মতো প্রাণসংহারী ব্যাধির জন্ম হয়। কেননা এইডসের ভাইরাস বহনকারী আক্রান্ত পুরুষের মাধ্যমে নিজেদের অজ্ঞতার কারণে নারীও এইচআইভি পজিটিভ হয়ে যায়। অথচ বিবাহিত নারী-পুরুষের মিলনে এইডসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই, যদি তাদের কেউ বিপথগামী না হয়। বৈবাহিক সম্পর্ক বহুগামিতার মূলে কুঠারাঘাত হেনেছে। ব্যভিচার প্রতিরোধ তথা সুস্থ জীবনযাপনের জন্য ইসলাম বিয়ের নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) যুবকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যাদের সামর্থ্য আছে তারা যেন বিবাহ করে, কারণ বিবাহ পবিত্রতা রক্ষার এবং দৃষ্টিকে সংযত রাখতে সাহায্য করে। অপরদিকে যাদের সামর্থ্য নেই তারা যেন রোজা রাখে, কারণ রোজা যৌনক্ষুধা সংবরণে সহায়ক।’ (বুখারি ও মুসলিম) ইসলাম যুবসমাজ তথা নর-নারীকে লজ্জাহীনতা পরিহারের দিকনির্দেশনা দিয়েছে, যেন তারা নিজেদের ব্যভিচার ও যৌন অপরাধ থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হয়। কেননা একজন নির্লজ্জ বেহায়া মানুষ তার নৈতিক মূল্যবোধকে অবদমনপূর্বক খেয়ালখুশি অনুযায়ী যেকোনো কাজ করতে পারে। যুগে যুগে অতি উৎসাহী, বিকৃত চিন্তা-চেতনার অনুসারী কিছুসংখ্যক লোক শয়তানের প্ররোচনায় নানা রকম অসামাজিক, নির্লজ্জ বেহায়াপনা, অশ্লীল ও পাশবিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে যুবসমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। অথচ ইসলামে নৈতিকতাবিবর্জিত মানুষকে পশু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ ও পশুর মধ্যে একমাত্র পার্থক্য হচ্ছে লজ্জা।’ পক্ষান্তরে নৈতিকতায় উৎকর্ষ অর্জনকারী মানুষ আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মর্যাদাবান বলে বিবেচিত হয়। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যৌন অঙ্গের হিফাজতকারী পুরুষ ও নারী আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও নারী, এদের জন্য আল্লাহ রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান।’ (সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩৫) পৃথিবীতে সমাজ-সভ্যতাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য অশ্লীলতা ও অশালীনতা থেকে বেঁচে থাকার জন্য ইসলাম মানবজাতিকে নির্দেশ দিয়েছে। ঘৃণ্য অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, অশালীন আচার-আচরণের মাধ্যমেই ভয়ংকর মহামারি রোগ সৃষ্টি হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘যখন কোনো জাতির মধ্যে অশ্লীলতা প্রকাশ্যভাবে চলতে থাকে, তখন তাদের মধ্যে প্লেগ এবং এমন অভিনব দুরারোগ্য ব্যাধি দেওয়া হয়, যা তাদের পূর্বপুরুষেরা কখনো শোনেনি।’ (দায়লামি) নবী করিম (সা.) আরও বলেছেন, ‘যখনই কোনো জাতি বা সম্প্রদায় অশ্লীল ও ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত হয়, তখন তাদের মধ্যে এমন এক ভয়ংকর মহামারি দেখা দেয়, যা তারা অতীতে কখনো দেখেনি।’ (ইবনে মাজা) যুবসমাজ পড়ালেখা বা কাজের ফাঁকে এইডস প্রতিরোধে করণীয় দিক নিয়ে শিক্ষামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। পল্লি এলাকার অশিক্ষিত জনগণের কাছে এ কর্মসূচি পালন করা যেতে পারে। এ ছাড়া শহর অঞ্চলেও এইডসে আক্রান্ত এলাকায় এ কর্মসূচি পালন করা যায়। যুবসমাজ এইডসে আক্রান্ত জনগণ ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে এইডস প্রতিরোধসংক্রান্ত উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। ‘মানুষের জীবন একটাই, একে বাঁচাও’ মূলমন্ত্র সামনে নিয়ে এ কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে। যুবসমাজকে এইডস প্রতিরোধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। যেসব ছাত্র এইডসে আক্রান্ত, তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে দেশব্যাপী ছাত্রকল্যাণ তহবিল গঠন করা যেতে পারে। এইডস প্রতিরোধ করতে দেশব্যাপী যুবসমাজ প্রতিটি জেলায় ‘এইডস প্রতিরোধে যুবসমাজ’ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এ সংগঠনে সমাজের সব যুবক ভাই ও বোনেরা সদস্য হয়ে এইডস প্রতিরোধে কাজ করবে। এইডস প্রতিরোধে যুবসমাজ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সেমিনার ও প্রদর্শনীর আয়োজন করতে পারে। এইডস প্রতিরোধ করতে হলে এইডসবিরোধী বই প্রকাশ করাও অত্যাবশ্যক। এইডস সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টির জন্য সচেতন জনগোষ্ঠী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংগঠন এমনকি দলমত-নির্বিশেষে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। এইডস প্রতিরোধে নৈতিকতার অনুশীলন ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার প্রচারণায় গণমাধ্যম সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এইডস থেকে বেঁচে থাকার জন্য যুবসমাজসহ ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক সব পর্যায়ে ব্যাপক জনসচেতনতা ও সাবধানতা অবলম্বন করা একান্ত প্রয়োজন।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক ।
dr.munimkhan@yahoo.com

ভারতের পর এবার চীনের চন্দ্রাভিযান

ভারতের পর এবার চন্দ্র অভিযানের পথে নেমেছে চীন। বিশ্বশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার অভিপ্রায়ে চীন আগামী মাসে প্রথমবারের মতো মনুষ্যবিহীন মহাকাশযান চাঁদে পাঠাবে। চাঁদে বসবাসকারী চীনা রূপকথার একটি চরিত্রের নামে মহাকাশযানটির নাম রাখা হয়েছে ‘উতু’। মঙ্গলবার চীনা কর্মকর্তারা এ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বলে বুধবার জানিয়েছে বিবিসি অনলাইন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনারা মহাশূন্য কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে।
জুনে চীনের তিনজন নভোচারী পৃথিবীর চারদিকে কক্ষপথে ১৫ দিন ধরে অবস্থান করে। এ সময় তারা তাদের মহাশূন্যযানটি মহাশূন্যের একটি পরীক্ষামূলক গবেষণাগারের নোঙ্গর (ডকিং) করে। দেশটি ২০০৭ সালে চাঁদের চারদিকে প্রদক্ষিণ করার জন্য ‘চ্যাঙ্গি’ নামের একটি মহাশূন্যযান পাঠিয়েছিল। চাঁদের পৃষ্ঠে চ্যাঙ্গির পরিকল্পিত ধ্বংসের আগে এটি ১৬ মাস ধরে চাঁদকে প্রদক্ষিণ করে। উতুর উৎক্ষেপণ ডিসেম্বরের প্রথম দিকে করা হবে বলে জানিয়েছেন চীনা কর্মকর্তারা। তবে নির্দিষ্ট কোনো তারিখের ঘোষণা দেয়া হয়নি। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি উতু চাঁদের বুকে নামবে বলে জানিয়েছেন তারা। উতু থেকে একটি অবতরণকারী যান একটি রোভারকে নিয়ে চাঁদের পৃষ্ঠে ঘুরে বেড়াবে। তিনমাস ধরে চাঁদের রঙধনু উপসাগর নামে পরিচিত এলাকায় নমুনা সংগ্রহ করবে রোভারটি। ইন্টারনেটে লাখ লাখ মানুষের মতামত নিয়ে উতু নামটি গ্রহণ করা হয় বলে জানিয়েছেন চীনা কর্মকর্তারা। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের পর চীনই একমাত্র রাষ্ট্র যারা নিজ উদ্যোগে মহাশূন্যে মানুষ পাঠাতে পেরেছে।

অন্যরকম হট সেক্স আবেদনময়ী সানি লিওনকে দর্শকরা খুঁজে পাবেন

এরই মধ্যে একাধিক বলিউড ছবিতে অভিনয় করেছেন বিশ্বের শীর্ষ পর্নো তারকা সানি লিওন। এসব ছবিতে অভিনয় করে আলোচনায়ও এসেছেন তিনি।

এদিকে ‘শুটআউট এট ওয়াদআলা’ ছবির একটি আইটেম গানেও পারফর্ম করেছেন সানি। ‘লায়লা’ নামক সেই গানটিতে দেশীয় পোশাকে সানির আবেদনময়ী রূপই দেখতে পেয়েছেন দর্শক। এর পরপরই ‘রাগিনি এমএমএস’ ছবির কাজ শেষ করেন তিনি।

তবে এই ছবিটি মুক্তির আগেই সানি লিওন অভিনীত তিন নম্বর ছবি মুক্তি পেতে যাচ্ছে। ছবির নাম ‘জ্যাকপট’। এ ছবিতে এক তরুণ অভিনেতার বিপরীতে ব্যাপক রগরগে দৃশ্যে কাজ করেছেন তিনি। তবে নতুন খবর হলো এই ছবির শুটিং সম্পূর্ণ শেষ করার পরই এর জন্য একটি নতুন আইটেম গান নির্মাণ করা হয়েছে।
ছবির প্রচারণার জন্য মূলত আইটেম গানটি করা হয়েছে। এ গানটিতে পারফর্ম করেছেন সানি লিওন। এখানে একেবারেই ছোট ছোট মিনিস্কার্টে নাচতে দেখা যাবে সানিকে। গানটিতে সানির সঙ্গে দেখা যাবে কোরিওগ্রাফার গনেশকেও। গানটি ছবির ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে সামনের সপ্তাহ থেকেই গানটি ইউটিউব ও টিভি চ্যানেলগুলোতে একসঙ্গে মুক্তি দেয়া হবে বলে জানা গেছে। এই গানটির বাইরেও ‘জ্যাকপট’-এর অন্য গানগুলোতে সানির আবেদনময়ী রূপ দেখা যাবে। তবে নতুন আইটেম গানটি নিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত সানি।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমার করা প্রথম আইটেম গান ‘লায়লা’ দর্শকরা দারুণ পছন্দ করেছেন। আমার বিশ্বাস দ্বিতীয় আইটেম গানটি দর্শকরা আরও বেশি পছন্দ করবেন। কারণ, এ গানটি আরও বড় আয়োজনের।

তাছাড়া এখানে আমাকে উপস্থাপনও করা হয়েছে ভিন্নভাবে। এ গানটিতে অন্যরকম হট সানি লিওনকে দর্শকরা খুঁজে পাবেন। সব মিলিয়ে গানটি নিয়ে আমি খুব আশাবাদী। আশা করছি দর্শকরাও উপভোগ করবেন।