Wednesday, January 27, 2016

জাতিসংঘ মহাসচিব 'সন্ত্রাসে উসকানি' দিচ্ছেন : নেতানিয়াহু

জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসে উসকানি’ দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষার লড়াই নিয়ে বান কি মুনের এক বক্তব্যের প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার নেতানিয়াহুর এই প্রতিক্রিয়া।
গত সোমবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া এক ভাষণে বান কি-মুন ফিলিস্তিনিদের লড়াই প্রসঙ্গে বলেন, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখানো মানব চরিত্রেরই অংশ। অবশ্য সম্প্রতি ইসরাইলিদের ওপর ছুরি হাতে ফিলিস্তিনিদের হামলার নিন্দা জানান জাতিসংঘ মহাসচিব।
তিনি বলেন, কিছু ফিলিস্তিনি, বিশেষ করে তরুণরা চরম দুর্দশা আর গভীর বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে এ ধরণের হামলায় উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। “অর্ধ শতক ধরে চলে আসা জবরদখল এবং থমকে থাকা শান্তি প্রক্রিয়া জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে, যাতে ফিলিস্তিনিদের হতাশা বাড়ছে।”
এর প্রতিক্রিয়ায় এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেন, “জাতিসংঘ মহাসচিবের বক্তব্যে সন্ত্রাসবাদে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।… সন্ত্রাস কোনোভাবেই বৈধতা পেতে পারে না।”
আল-আকসা মসজিদে প্রবেশে বাধাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সংঘাত-সহিংসতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই সহিংসতায় গত অক্টোবর থেকে ১৫৫ জনের বেশি ফিলিস্তিনি, ২৮ জন ইসরাইলি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরিত্রিয়ার একজন করে নাগরিক নিহত হয়েছেন।
বিবিসি লিখেছে, জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুন এতোদিন বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করে এসেছেন। তবে দায়িত্বের মেয়াদ ফুরিয়ে আসায় সোমবার নিরাপত্তা পরিষদে তিনি আরও সরল ভাষায় নিজের মনোভাব প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলেই মনে হয়েছে।
নেতানিয়াহু তার বিবৃতিতে বলেন, ফিলিস্তিনি খুনিরা কোনো রাষ্ট্র চায় না, তারা একটি রাষ্ট্রের ধ্বংস চায় এবং জোর গলায় সেটা বলে।” জাতিসংঘ বহু দিন আগেই তার নিরপেক্ষ অবস্থান এবং নৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে বলেও মন্তব্য করেন ইসরাইলি নেতা।

প্রধান বিচারপতি সম্পর্কে পার্লামেন্টে পাল্টা বক্তব্য দুঃখজনক : সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি

সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহা সম্পর্কে পার্লামেন্টে পাল্টা বক্তব্য দেয়া দুঃখজনক। এটা বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করবে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার এটাকে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে আনতে চাইছে।
আজ বুধবার সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতির কক্ষে এক ব্রিফিংয়ে খন্দকার মাহবুব হোসেন এসব কথা বলেন।
অবসরে যাওয়া বিচারপতিদের রায় লেখা এবং রায়ে স্বাক্ষর করাকে অসাংবিধানিক বলে প্রধান বিচারপতি যে বাণী দিয়েছেন তা সমর্থন করে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, অবসরে যাওয়া বিচারপতিরা রায় লিখলে বা রায়ে স্বাক্ষর করলে তা অনৈতিক হবে। এটা করা ঠিক হবে না।
তিনি বলেন, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি একটি মামলার রায় যে দিন দেন সেই দিনই অবসরে যান। কিন্তু পরে তিনি রায়ে আর স্বাক্ষর করেননি।
মাহবুব হোসেন আরো বলেন, প্রধান বিচারপতি যেটা বলেছেন আইনের বিধান মোতাবেক অবসরে যেয়ে রায় লেখা আইনসম্মত হবে না। বিচারপতিরা শপথের পর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অবসরে গেলে আর শপথ থাকে না। এজন্য অবসরে যাওয়ার পর রায় লেখা বা স্বাক্ষর করা আইনসম্মত নয়।
তিনি বলেন, আমাদের জাতীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় অবসরে যাওয়ার পর লেখা হয়েছে। এটা ঠিক হয়নি। এতে বিচার প্রার্থীরা হয়রানির শিকার হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে এটা না হয় সেটাই প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য।
উল্লেখ্য, গত ১৭ জানুয়ারি বর্তমান প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে দেয়া এক বাণীতে বলেন, বিচারপতিরা অবসরে যাওয়ার পর রায় লেখা অসাংবিধানিক।

‘৮০-৯০ ভাগ মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায়’ -গোলাম মওলা রনি

মার্কিনভিত্তিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) জরিপের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মওলা রনি। তিনি বলেন, জরিপ অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার পক্ষে ৬৮ ভাগ মানুষ মত দিয়েছে। আমার মনে হয় এ সংখ্যাটা সঠিক নয়। আরও বেশি হবে। বাংলাদেশের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ মানুষই চায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে আসুক। আর এটি একটি দ্রুব সত্য। কারণ বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচনমুখী। এ কারণে বেশির ভাগ মানুষই চায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হোক। এমনকি বিএনপির সমর্থক যারা তারাও মনে করে না যে বেগম খালেদা জিয়ার অধীনে একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে। আবার আওয়ামী লীগের সত্যিকার অর্থে লোকজন যারা স্বার্থপর নয় তারাও মনে করেন না যে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে। আমাদের দেশে শান্তিপ্রিয় লোকের সংখ্যাই বেশি। সকলেই চায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। আইআরআইর জরিপে আরও বলা হয়েছে ৭২ শতাংশ মানুষ সরকারের কাজ নিয়ে সন্তুষ্টÑ এ বিষয়ে রনি মানবজমিনকে বলেন সত্যিকার অর্থে দেশের মানুষ স্বস্তিতে নেই মানুষ সামনে কুয়াশা দেখতে পাচ্ছে। যেখানে একটা গণতান্ত্রিক সরকার থাকে। যেখানে একটা সুষ্ঠু শাসন ব্যবস্থা থাকে সেখানে মানুষ একটা কর্মপরিকল্পনা করতে পারে। বর্তমানে কোন ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ কোন কর্মপরিকল্পনা করতে পারছে না। এখন দেশের মানুষের মধ্যে একটা ভয় কাজ করছে। আজ বা কাল কি যেন একটা হয়ে যায়। অনিশ্চয়তা কখনও গণতান্ত্রিক সুখ শান্তির বিষয় হতে পারে না। শান্তি ও সমৃদ্ধি হচ্ছে যেখানে মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে স্বপ্ন দেখতে পারবে এবং স্থির থাকতে পারবে। কিন্তু বাংলাদেশে এখন সবকিছুই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন গোলাম মওলা রনি।
হাস্যকর জরিপ
মিথ্যা। ডাহা মিথ্যা। পরিসংখ্যান। কোন কোন সময় পরিসংখ্যানকে মিথ্যা এবং ডাহা মিথ্যার চেয়েও বড় মিথ্যা মনে করা হয়। আর জরিপের সত্যতা নিয়ে সারা দুনিয়াতেই প্রশ্ন আছে। বাংলাদেশে খুব কম জরিপই সত্য হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। মার্কিন ভিত্তিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইন্সটিটিউট (আইআরআই)-এর একটি জরিপ বাংলাদেশে আবারও বিপুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে সংস্থাটি বাংলাদেশ নিয়ে চারটি জরিপ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এসব জরিপের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। যদিও খুব বেশি সংখ্যক লোকের ওপর পরিচালিত না হওয়াই এসব জরিপের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। সর্বশেষ জরিপে নানা বিপরীতমুখী তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। জরিপের ফল অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষের কাছে ক্রমাগতভাবে গণতন্ত্র অপেক্ষা উন্নয়ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে অনেক পর্যবেক্ষকই এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা মনে করেন, রাজনীতি প্রিয় বাংলাদেশের মানুষের কাছে গণতন্ত্র সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা। যদিও পূর্ণাঙ্গ অর্থে গণতন্ত্র কখনও এ ভূমে ছিল না। জরিপে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোর জনপ্রিয়তার তথ্যও উঠে এসেছে। এটাই সম্ভবত, জরিপের সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং অংশ। এতে বলা হয়েছে, স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় সময় ও বিটিভি। জরিপ অনুযায়ী, ৫৯ শতাংশ মানুষ টিভি চ্যানেল থেকে সংবাদ পেয়ে থাকেন। আর এদের মধ্যে ২৩ শতাংশের পছন্দের চ্যানেল সময় টিভি। ১৮ শতাংশের পছন্দ বিটিভি। এরপর রয়েছে যথাক্রমে এটিএন, এনটিভি, আরটিভি, চ্যানেল আই, ইটিভি, ৭১, বাংলা ভিশন, ২৪ ও মাইটিভি।
জরিপে অংশগ্রহণকারী ৫১ শতাংশ মানুষ মনে করেন, গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা সমৃদ্ধশালী অর্থনীতির চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, ৮৮ শতাংশ মনে করেন, গণতন্ত্রে কিছু সমস্যা থাকলেও এটা অন্য যে কোন ধরণের সরকার ব্যবস্থার তুলনায় উত্তম। পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনা উচিত বলে মনে করেন ৬৮ শতাংশ মানুষ। ২৩ শতাংশ এর বিপক্ষে মত দিয়েছেন। আর ৯ শতাংশ এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করেন নি বা জানেন না উত্তর দিয়েছেন। একই জরিপে সরকারের প্রতি জনসমর্থন বাড়ার চিত্রও ফুটে উঠেছে। ৭২ শতাংশ বলেছেন তারা সরকারের কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট। গত জুনের জরিপ থেকে তা ৬ পয়েন্ট বেশি। যে মানুষ সরকারকে সমর্থন করছে তাদের একটি বড় অংশই আবার বলছে, উন্নয়ন অপেক্ষা গণতন্ত্র জরুরি। এ বিষয়টির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জরিপে অংশগ্রহনকারীদের বেশিরভাগ দেশের অর্থনীতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। দেশ যেদিকে এগিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে তাদের মনোভাব ইতিবাচক। প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ বলেছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত ভালো, বা মোটামুটি ভালো। ৭২ শতাংশ মনে করেন তারে অর্থনৈতিক অবস্থা সামনের বছরে উন্নতি হবে। ১০ জনে ৯ জন বলেছেন, মৌলিক পন্যসামগ্রী কেনার মতো যথেষ্ট আয় তাদের পরিবারের রয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সরকার কয়েকবছর ধরেই উন্নয়নের বিষয়টি প্রচারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। জরিপের ফলও তা সমর্থন করে।
এলোমেলোভাবে বাছাই করা প্রাপ্তবয়স্ক ২৫৫০ জন ভোটারের সাক্ষাতকার থেকে এ জরিপটি সম্পন্ন করে আইআরআই। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার্স’ এর সহযোগিতায় জরিপটি পরিচালনা করা হয়। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের বেছে নেয়া হয়েছে ,দেশের ৬৪টি জেলার সব কটি থেকে।

‘৩০ লাখ শহীদের তালিকা প্রকাশ করুন’ -গয়েশ্বর

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেয়ার আগে মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের তালিকা পত্রিকায় প্রকাশ করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। আজ নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আরাফাত রহমান কোকোর প্রথম মৃত্যু ার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত দোয়া মাহফিলে তিনি এ আহ্বান জানান। গয়েশ্বর রায় বলেন, রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার প্রতিবাদ ও ঘৃণা সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া হবে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশ হবে। কথায় কথায় রাষ্ট্রদ্রোহিতা, সত্য কথায় রাষ্ট্রদ্রোহিতা আর মিথ্যা কথা বলে  দেশপ্রেম, এই নীতিতে বিশ্বাস করি না। সত্য যত নির্মম হোক সত্য সত্যই। ইতিহাস সঠিকভাবে লিখতে হয়। কে কত লাখ বললোÑ এটা বড় কথা নয়। গুনে গুনে ৩০ লাখ শহীদের নাম পত্রিকায় প্রকাশ করুন। তিনি বলেন, ৩০ লাখ শহীদের নামের তালিকা যদি জনগণের সামনে উপস্থিত করতে পারেন তারপর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যত খুশি মামলা করেন। শহীদের সংখ্যা ৩০ লাখ হোক বা ৬০ লাখ হোক তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব আছে। তাদের তালিকা থাকবে না কেন। বিএনপির এই সিনিয়ল নেতা বলেন, এই শহীদদের নামে এলাকায় এলাকায় স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করতে হবে। শহীদ পরিবার আমাদের কাছে অধিকার রাখে তাদের পাশে দাঁড়ানোর এবং তাদের ভাল মন্দ দেখার। রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করার। এ জন্য সরকারকে বলবো মামলা যতই দেন লাভ হবে না। দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নিজের ভাল থাকার জন্য মামলার ভয়ে কৌশল অবলম্বন না করে বুক টান করে রাজপথে হাঁটুন। নেত্রীর দিক  থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন না। আমরা যত চুপ করে থাকি না কেন মামলা আমাদের ছাড়বে না। সহকর্মীদের গুমের মিছিল অনেক বড় হয়ে গেছে। শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করতে হবে। নিখোঁজ গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে হবে। রক্ত ও জীবন দিয়ে বিএনপি  চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।  মিলাদ মাহফিলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, যুববিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ, সহ-দপ্তর সম্পাদক  আব্দুল লতিফ জনি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এরশাদের রাজনীতির গন্তব্য by আলফাজ আনাম

বাংলাদেশের বিনোদনমূলক রাজনীতির প্রধান নায়ক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। নানা সময়ে নিস্তরঙ্গ রাজনীতিতে তিনি প্রধান চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হন। চলে আসেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তার প্রতিষ্ঠিত দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একসময়ের ফার্স্ট লেডি এবং সংসদে বিরোধী দলের নেতা রওশনের সাথে এরশাদের বিরোধ নতুন নয়। এবার তিনি সামনে এনেছেন তার ভাইকে। ভাই, ভাবী আর দেবরের কাজিয়া এখন সাধারণ মানুষের চর্চার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আর এভাবে জাতীয় পার্টি নামের রাজনৈতিক দলের অস্তিত্বের কথা মানুষ জানতে পারছে। বাস্তবতা হচ্ছে, যত দিন এই বিরোধ থাকবে তত দিন জাতীয় পার্টির নাম উচ্চারিত হবে। যখন আর বিরোধ থাকবে না তখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। এ কারণে মাঝে মাঝে জাতীয় পার্টির মালিক ও কর্মীরা নিজেদের মধ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে নিজেদের অস্তিত্বের কথা জানান দেন।
বাংলাদেশে অনেক অদ্ভুত রাজনীতির জন্ম দিয়েছে জাতীয় পার্টি। এখন যেমন দলটি একই সাথে বিরোধী দল আবার একই সাথে ক্ষমতাসীন দলের অংশ। এরশাদের কোন কথাটি নিজের আর কোনটি অন্যের তা বোঝা খুব দুষ্কর। তবে তিনি সম্প্রতি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ নিজের প্রয়োজনে, নির্বাচনের প্রয়োজনে জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী করবে। প্রকৃতপক্ষে জাতীয় পার্টি আর আওয়ামী লীগের রাজনীতি পরস্পরের পরিপূরক। এই রাজনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়েছে এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণের পরিকল্পনার শুরু থেকেই। এ কারণে উর্দি পরে এরশাদ যখন নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন তখন আওয়ামী লীগ অখুশি হয়নি। এরপর বৈধতার সঙ্কটে থাকা এরশাদকে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে বৈধতা দেয়ার দায়িত্বটি সানন্দে করেছে আওয়ামী লীগ। তখন আওয়ামী লীগের রাজনীতির একটি নাটাই ছিল এরশাদের হাতে। এরশাদের আকাক্সক্ষার বাইরে আওয়ামী লীগ যেতে পারেনি। সময়ের বিবর্তনে শুধু পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। ’৮৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যেমন এরশাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল তেমনি ’৯৬-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়ে তার প্রতিদান এরশাদকে দিতে হয়েছে। এর পরের নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগের সাথে ছিলেন এরশাদ। এরশাদের জাতীয় পার্টির রাজনীতির নাটাই এখন আওয়ামী লীগের হাতে। এরশাদ এখন যে সিদ্ধান্ত নিতে চান না কেন আওয়ামী লীগের ইচ্ছা পূরণ করেই তা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ও মন্ত্রিসভা থেকে সরে আসার বিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাকে সম্মানিত করেছেন। এখন হুট করে আলোচনা ছাড়া পদ ছেড়ে দিতে পারি না। আমরা আশা করি দলের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী আমাদের সহযোগিতা করবেন।’ এই বক্তব্যর মধ্য দিয়ে এটা স্পষ্ট যে, এরশাদের স্বাধীনভাবে দলের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো ক্ষমতা নেই। প্রধানমন্ত্রী যতটা স্বাধীনভাবে চলার সুযোগ দেবেন তিনি ততটুকুই পাবেন-এর বেশি কিছু নয়।
এরশাদের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হচ্ছে, আওয়ামী লীগ নির্বাচনের প্রয়োজনে জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী করবে। এখানে শক্তিশালী না বলে বরং বলতে পারি জাতীয় পার্টিকে টিকিয়ে রাখবে। কারণ ভোটের রাজনীতির হিসাব। জাতীয় পার্টি অনেক আগেই একটি আঞ্চলিক দলে পরিণত হয়েছে। বৃহত্তর রংপুর ও সিলেটের দু-একটি উপজেলা ছাড়া সারা দেশে জাতীয় পার্টির কোনো রাজনৈতিক ভিত্তি নেই। কিন্তু গত কয়েক বছরের স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফল বলছে দেশের উত্তরাঞ্চলে জাতীয় পার্টি অবস্থান হারিয়ে ফেলছে। বৃহত্তর রংপুরের গাইবান্ধা, রংপুরের একাংশ, নীলফামারী ও কুড়িগ্রামে উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌরসভা নির্বাচনে জামায়াত ও বিএনপি প্রার্থীরা বেশির ভাগ উপজেলা ও পৌরসভায় বিজয়ী হয়েছেন। ঐতিহ্যগতভাবে এ অঞ্চলে আওয়ামী লীগের অবস্থান দুর্বল। এ ছাড়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে যেভাবে দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে তাতে বিেেরাধী দলের প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ও জনসমর্থন আরো বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবে আগামীতে যদি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাহলে বৃহত্তর রংপুরে জাতীয় পার্টি অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারবে না। এ অঞ্চলে জাতীয় পার্টি দুর্বল হওয়ার অর্থ হচ্ছে, বিএনপি-জামায়াতের শক্তি বৃদ্ধি। কারণ জাতীয় পার্টির স্থান আওয়ামী লীগ দখল করতে পারবে না। ভোটের রাজনীতির হিসাবের কারণে জাতীয় পার্টিকে আওয়ামী লীগ টিকিয়ে রাখবে।
জাতীয় পার্টির জন্য সঙ্কট হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের বলয় থেকে যেমন বের হতে পারবে না, তেমনি ক্ষমতাসীনদের সমর্থনে টিকে থাকতে চাইলে ন্যূনতম জনসমর্থন হারাতে হবে। উভয় সঙ্কটে পড়ে জাতীয় পার্টি একটি মাঝামাঝি পথ খুঁজতে চাইছে। সরকারের আশ্রয়ে থেকে বিরোধী দলের ভূমিকা নেয়া। কিন্তু সেই কাজটি সহজ নয়। কারণ নির্বাচন ছাড়াই যারা এবারে মন্ত্রী ও এমপি হয়েছেন তারা তো পদ-পদবি ছাড়তে চাইবেন না। অপর দিকে ক্ষমতাসীন দল পুরোপুরি বিরোধী দলের ভূমিকায় জাতীয় পার্টিকে নামিয়ে নাটাই হাতছাড়া করতে রাজি হবে না। এই পরিস্থিতি এরশাদ বোঝেন না এমন নয়।
এখন এরশাদ তার গৃহপালিত বিরোধী দলের ইমেজ কাটিয়ে উঠতে চান। যাতে আগামী দিনে অন্তত রংপুরের মানুষের কাছে ভোট চাইতে পারেন। এই কৌশলের অংশ হিসেবে তিনি তার ভাইকে সামনে এনেছেন। তিনি বোঝাতে চাইছেন জি এম কাদের শুধু তার উত্তরসূরি নন তার অবস্থান সরকারবিরোধী। জাতীয় পার্টিকে তিনি বিরোধী দলের ভূমিকায় নিতে চান। কিন্তু জি এম কাদের আবার বলছেন তাকে কো-চেয়ারম্যান করার প্রস্তাবটি তার ভাবীর কাছ থেকে এসেছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, পারিবারিক সম্পত্তি জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে ভাই, ভাবী ও দেবরের মধ্যে এক ধরনের আলোচনা আগেই হয়েছে। জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান করার গল্প নিজেই বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘একটি পারিবারিক কারণে রওশনের সাথে সাক্ষাৎ করি। তখন তিনি নিজেই বললেন, দল বাঁচাতে হবে। তোমার ভাই তোমাকে কো-চেয়ারম্যান করতে পারেন। আমি বললাম, এমন পদ তো গঠনতন্ত্রে নেই। তিনি বললেন, চেয়ারম্যানের ক্ষমতা আছে পদ সৃষ্টি করার। পরে তা আমি ভাইকে জানাই।’ (প্রথম আলো, ২১ জানুয়ারি ২০১৬)। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বাবলু-আনিস আর রাঙ্গার ভবিষ্যৎ নিয়ে। কারণ জাতীয় পার্টি যদি কিছুটা খোলস বদলাতে চায় তাহলে দলের মধ্যেও কিছু পরিবর্তন আনতে হয়। এ ক্ষেত্রে বাবলু-আনিসের প্রভাব স্বাভাবিকভাবে কমে আসবে। কারণ একসময় রওশনের সমর্থন নিয়ে জি এম কাদেরকে তারা কোণঠাসা করে ফেলেছিলেন। এরা জাতীয় পার্টির ভবিষ্যতের চেয়েও নিজেদের স্বার্থ বড় করে দেখেছেন। এখন রওশন পুরোপুরিভাবে এদের পরিত্যাগ করতে পারছেন না। ফলে মুখরক্ষার জন্য এরশাদের কাছে তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছেন। কিন্তু ইতোমধ্যে এরশাদ সে আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন। ফলে রহুল আমিন হাওলাদারকে নিয়ে জি এম কাদের মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা এ কথা বলতে চাইছেন আমরা আওয়ামী লীগের অনুগ্রহপুষ্ট নই, স্বাধীন বিরোধী দল হতে চাই।
প্রশ্ন হচ্ছে, গৃহপালিত বিরোধী দল থেকে স্বাধীন বিরোধী দলে রূপান্তর হওয়ার এই নাটকে কি ক্ষমতাসীনদের সায় আছে? ঘটনা পরম্পরায় মনে হচ্ছে পুরো প্রক্রিয়াটা পরিকল্পনামাফিক হচ্ছে। মনে রাখতে হবে জি এম কাদের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণের বিরোধিতা করলেও ক্ষমতাসীন দলের সাথে তার বরাবরই ভালো যোগাযোগ। তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। আওয়ামী লীগের সাথে জাতীয় পার্টির সম্পর্কের রসায়ন তিনি খোলাসা করেছেন। তিনি বলছেন, অতীতের রাজনীতিতে আমরা শক্তিশালী ছিলাম বলে আওয়ামী লীগকে আমরা সহযোগিতা করতে পেরেছি। আমাদের সহযোগিতা ছাড়া আওয়ামী লীগ কখনো সরকার গঠন করতে পারেনি। জাপাকে তাদের লাগবে। শুধু এখানেই থেমে থাকেননি তিনি, অতীত সম্পর্কের ব্যাখাও দিয়েছেন। বলেছেন, ১৯৯৬ সালে জাপাকে নিয়ে তারা (আওয়ামী লীগ) সরকার গঠন করেছে। ২০০১ সালে আমাদের সাথে তারা জোট করেনি, হেরেছে। ২০০৮ সালে মহাজোট করেছে, জিতেছে। ২০১৪ সালেও তারা জাপাকে নিয়েই সরকার গঠন করেছে। জি এম কাদের আওয়ামী লীগের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্কের যে দিকটি তুলে ধরেছেন তা আওয়ামী লীগের অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এটাই বাস্তবতা। এই বাস্তবতা এরশাদ-জি এম কাদের যেমন বোঝেন, প্রধানমন্ত্রী বা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারাও বোঝেন। জি এম কাদের আগাম নির্বাচনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। জাতীয় পার্টির ভেতরের এই পরিবর্তনের পেছনে কি তাহলে ছোট পরিসরের গৃহপালিত বিরোধী দল থেকে বড় পরিসরের বিরোধী দলের পরিকল্পনা কাজ করছে? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে আমাদের হয়তো আরো কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে।
বিএনপির বিকল্প বিরোধী দল হওয়ার স্বপ্ন এরশাদ বা জি এম কাদের দেখলেও ভোটের রাজনীতির বাস্তবতা ভিন্ন। জাতীয় পার্টি এখন ক্ষয়িষ্ণু এক রাজনৈতিক দল। বুড়ো ঘোড়াকে যত চেষ্টা করা হোক আর যৌবন ফিরে পাবে না। এমনকি বৃহত্তর রংপুরেও জাতীয় পার্টি আগের অবস্থানে ফিরে আসতে পারবে না। রদবদল আর রূপান্তরের যত নাটক করা হোক না, জাতীয় পার্টি-আওয়ামী লীগ সমঝোতার রাজনীতি শুধু রওশন এরশাদের মতো বিরোধী দলের নেতা তৈরি করবে। প্রকৃত বিরোধী রাজনীতির কোনো ক্ষেত্র জাতীয় পার্টি তৈরি করতে পারবে না। সে সক্ষমতাও নেই।
alfazanambd@yahoo.com

ভারতের উন্নয়ন পথ ও বৈপরীত্য by আনু মুহাম্মদ

শিগগিরই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ দ্বিতীয় দফা ঋণচুক্তি করতে যাচ্ছে। প্রথম ঋণচুক্তির তুলনায় আরও কঠিন শর্তে গ্রহণ করা হচ্ছে এই ঋণ। এই পর্বে ঋণের পরিমাণ ২০০ কোটি ডলার। উল্লেখ্য, এর সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকেরা প্রতি দেড় মাসে দেশে পাঠান। এই ঋণের টাকায় ভারত থেকে ৫০০ ট্রাক ও ৫০০ বাস কেনা, ট্রানজিট রুটে অবকাঠামো উন্নয়নসহ ১৩টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। এই চুক্তির আওতায় বিভিন্ন নির্মাণ ও পণ্য ক্রয়ের শতকরা ৬৫ ভাগ কিনতে হবে ভারত থেকে। বিভিন্ন প্রকল্প পরামর্শকদের শতকরা ৭৫ ভাগ আসবেন ভারত থেকে। প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট ভারতীয় ব্যক্তিদের কর ও ভ্যাট শোধ করবে বাংলাদেশ। (প্রথম আলো, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৬) বস্তুত বাংলাদেশের অবকাঠামো নির্মাণে ভারতের ট্রানজিট রুট এখন সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। দেশের অন্য মহাসড়ক ও সড়কগুলোর দুর্দশা অব্যাহত আছে।
বলা বাহুল্য, ঋণচুক্তির এই মডেল বহু পুরোনো। ‘বিদেশি সাহায্য’ নামে এই ধরনের ঋণ দিয়েই বিশ্বের পশ্চিমা দেশগুলো প্রান্তিক দেশগুলোতে নিজেদের পণ্যবাজার তৈরি করেছে, নাগরিকদের কর্মসংস্থান করেছে, বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিনিয়োগের পথ তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবির মতো সংস্থাগুলো এই ঋণের ফাঁদে ফেলেই বহুজাতিক পুঁজির পথ প্রশস্ত করেছে। ভারতের বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠী সে রকম পরাশক্তির ভাব নিয়েই অগ্রসর হচ্ছে এখন। চীন, যুক্তরাষ্ট্র কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী, কখনো একই পথে ঐক্যবদ্ধ। সম্প্রতি নেপাল বৃহৎ রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের শক্তি প্রদর্শনের নমুনা দেখেছে, তাকে মোকাবিলাও করেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি-রাজনীতির গতিমুখ নির্ধারণে ভারতের ভূমিকা, রাজনীতি এবং অর্থনীতির গতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্ধারক। কাঁটাতার দিয়ে ঘেরাও হয়ে থাকলেও বাংলাদেশে ভারতের পণ্য আমদানি, নিয়োগ ও বিনিয়োগ বাড়ছে। বাংলাদেশ এখন ভারতের প্রবাসী–আয়ের অন্যতম উৎস। ট্রানজিটের মধ্য দিয়ে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগোলিক–অর্থনৈতিক মানচিত্র পরিবর্তিত হওয়ার পথে।
ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটার পর জাতীয়তাবাদী উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে ভারত যাত্রা শুরু করে। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাগুলো সেই কাঠামোতেই গ্রহণ করা হয়। জাতীয় শিল্পের ভিত্তি নির্মাণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে জাতীয় প্রতিষ্ঠান ও দক্ষ জনশক্তির বিকাশ, বিভিন্ন রাজ্যে এবং কেন্দ্রীয়ভাবে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ, শিক্ষা-চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণ এবং ভূমি সংস্কারের বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার মধ্য দিয়ে সত্তরের দশকের মধ্যে ভারত একটি টেকসই শিল্প ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়। এর ওপর দাঁড়িয়েই বিকশিত হয় বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী।
ভারতের অর্থনৈতিক নীতি স্তরে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে নব্বই দশকের শুরুতে মনমোহন সিংয়ের হাত ধরে। তখন সর্বজনের সম্পদ বৃহৎ ব্যক্তিগোষ্ঠী মালিকানায় স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই পুঁজিমুখী বা ‘নয়া উদারতাবাদী’ সংস্কারের মধ্য দিয়ে অর্থনীতির ওপর বৃহৎ বেসরকারি শিল্প ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর আধিপত্য সম্প্রসারিত হয়েছে। তারপরও নবরত্ন বলে পরিচিত নয়টি বড় বড় ক্ষেত্র (তেল, গ্যাস, এনার্জিসহ আরও অন্যান্য খাত) রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায়, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পরিচালিত হতে থাকে। এখন পর্যন্ত মাইনিং কিংবা তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, উত্তোলনের ব্যাপারে ভারতীয় সংস্থা রাষ্ট্রীয়ভাবে ৮০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে। বিদ্যুৎ খাতের বড় অংশও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে।
আশির দশক থেকে বাংলাদেশ যেভাবে নির্বিচার আমদানি বৃদ্ধি করেছে, যেভাবে জাতীয় সম্পদ বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার পথ নিয়েছে, ভারত সে রকম উৎসাহ কখনোই দেখায়নি। বরং বাংলাদেশের নির্বিচার আমদানি ও বিদেশি কোম্পানি–নির্ভরতার পথ ভারতের এসব শিল্পগোষ্ঠীর জন্য সুবিধাজনক হয়েছে। এখন এসব সংস্থা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে পুঁজি বিনিয়োগ করছে, সমুদ্রে তেল, গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কাজ করছে। মোদি সরকারের আমলে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর টাটা, রিলায়েন্স, আদানিসহ বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর অংশীদারত্ব বৃদ্ধির চেষ্টা বেড়েছে। ভারতে নতুনভাবে বিন্যস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত খাত, বেসরকারি খাত, যৌথ বিনিয়োগ, একক বিদেশি বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে ভারতে দেশি বৃহৎ পুঁজি, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পুঁজি ও বহুজাতিক পুঁজির যে মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে, তার সংবর্ধন, পুঞ্জিভবন ও সম্প্রসারণের অনেক বেশি চাপ এখন। এর সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে দেশের ভেতরে ও বাইরে ভারতের সামরিক ব্যয় ও তৎপরতাও বাড়ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বড় অংশীদার।
তবে এই উন্নয়নধারার ভেতরেই আছে বৈপরীত্যের চাপ, আছে একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি ও বঞ্চনা বৃদ্ধির উপাদান। তাই ভারত প্রসঙ্গে অরুন্ধতী রায় ২০০১ থেকে শুরু করে এই শতকের প্রথম দশকের প্রবণতা সারসংক্ষেপ করেছেন এই বলে যে এই দশক ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আবার বিশ্বসভায় অর্থনৈতিক ও পারমাণবিক শক্তি হিসেবে ভারতের আবির্ভাবকাল। এই বছরগুলো কারও কারও জন্য অভাবনীয় সম্পদ ও সমৃদ্ধি এনেছে, অন্যদের জন্য তা এমন দুস্থতা, অনাহার, এমন হতাশা এনেছে যে তাদের জীবনকে আর মনুষ্যজীবন বলা যায় না। গুজরাটের মুসলমানদের জন্য তা এনেছে গণহত্যা। ভারতের মুসলমানদের জন্য তা হিন্দু ফ্যাসিবাদের ভূত। লক্ষাধিক কৃষকের জন্য তা এনেছে আত্মহত্যা। করপোরেশনগুলোর জন্য এই সময় দিয়েছে বিপুল মুনাফা। দান্তেওয়াদার আদিবাসীর জন্য এই বছরগুলো এনেছে বলপ্রয়োগে উচ্ছেদ এবং সরকারি নিষ্ঠুর গৃহযুদ্ধ। কাশ্মীর, মণিপুর ও নাগাল্যান্ডের মানুষের জন্য তা এনেছে ‘স্বাভাবিকতা’র নামে অবিরাম সামরিক দখলদারি।’ (দ্য শেইপ অব দ্য বিস্ট, ২০০৮)
উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের বিশাল অঙ্ক বেকারত্বের কোনো সুরাহা দেখাতে সক্ষম হয়নি। অরুন্ধতী রায় ভারত প্রসঙ্গে যা বলেছেন তা দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের জন্যই প্রযোজ্য, ‘কোটি কোটি মানুষের জমি দখল করে রাষ্ট্র তা “জনস্বার্থে” তুলে দিচ্ছে বৃহৎ করপোরেশনগুলোর হাতে। ২০ বছরের বিশাল প্রবৃদ্ধির পর ভারতের মোট শ্রমশক্তির ৬০ শতাংশ মানুষকেই বেঁচে থাকতে হচ্ছে আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে। শতকরা ৯০ ভাগ শ্রমিক কাজ করছেন অসংগঠিত খাতে।’ (ক্যাপিটালিজম, এ ঘোস্ট স্টোরি, ২০১২)
কৃষি বিপর্যয়ের কারণে ভারতে প্রতিবছর কৃষক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। কৃষিতে বৈশ্বিক বহুজাতিক কোম্পানির আধিপত্য বিস্তার, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নীতি ও সরকারের বৈরী নীতির কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষক আত্মহত্যার ঘটনা যে শুধু অব্যাহত থাকছে তা-ই নয়, কোনো কোনো অঞ্চলে তা বেড়েছে। ২০১৫ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জয়তী ঘোষ এক গবেষণাপত্রে লিখেছেন, ‘গত বছরের তুলনায় এই বছরে মহারাষ্ট্রে আত্মহত্যা বেড়েছে শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ। শুধু বর্ধমানেই এ বছরে আত্মহত্যার সংখ্যা উঠেছে ১০৬ জনে। এ ছাড়া রাজস্থান ও পাঞ্জাব থেকেও আত্মহত্যার নতুন নতুন খবর পাওয়া যাচ্ছে।’ (বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন: সর্বজনকথা, আগস্ট ২০১৫)
ভারতের প্রবীণ শিক্ষক ও গবেষক উষা পাটনায়েক ভারতের দারিদ্র্য হ্রাসের সরকারি দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিস্তৃত বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃতপক্ষে ২০০৪-০৫-এর তুলনায় দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। উষা বলেছেন, ‘ইতিমধ্যে ভারতের মধ্যেই আরেকটি সাব-সাহারান আফ্রিকা তৈরি হয়েছে। ভারতের গ্রামীণ মানুষের শতকরা ৫০ ভাগ বা ৩৫ কোটিরও বেশি মানুষ সাব-সাহারান আফ্রিকার গড় পরিমাণের চেয়ে কম খাদ্যশক্তি গ্রহণ করে।’ দারিদ্র্য নিয়ে তথ্য-উপাত্তের এই ভ্রান্তি ও বিভ্রান্তি বাংলাদেশের জন্যও সত্য।
ভারতে কৃষি, বন, নদী, পানি, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক-এডিবি-সমর্থিত বিভিন্ন প্রকল্প জনগণের সম্পদ বেসরকারীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণের আয়োজন করেছে। এসব প্রকল্প ভারতের মানুষকে ছাপিয়ে এখন প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের জন্য ফারাক্কা বাঁধ সব সময়ই একটি মরণফাঁদ, আর এর সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে গজলডোবাসহ আরও অনেক বাঁধ এবং আরও ভয়ংকর আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প। বাংলাদেশ অংশে তিস্তাসহ অনেক নদী এখন মরণাপন্ন। ব্রহ্মপুত্র নদে বাঁধ দেওয়ার চীনা পরিকল্পনা ভারত ও বাংলাদেশ দুই দেশের জন্যই হুমকি হয়ে উঠেছে। সুন্দরবন ধ্বংস করে হলেও ভারতের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি এনটিপিসি তার বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। বন, নদী, জমি দখল এখন এই অঞ্চলের উন্নয়নের প্রধান ভাষা।
বৃহৎ পুঁজির আত্মসম্প্রসারণের তাগিদ পূরণে ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী তৎপরতার একটি বড় ক্ষেত্র এখন ভূমি। কৃষকের জমি কিংবা সাধারণ সম্পত্তি হিসেবে এখনো টিকে থাকা জমি উন্নয়নের নামে ব্যক্তিমালিকানায় অর্থাৎ বৃহৎ করপোরেট গ্রুপের হাতে তুলে নেওয়ার জন্য আইন সংস্কার থেকে বলপ্রয়োগ—সবই চলছে। ২০০৫ সালে গৃহীত সেজ (স্পেশাল ইকোনমিক জোন) অ্যাক্টের মাধ্যমে বৃহদায়তন কৃষিজমি খুব কম দামে বৃহৎ ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেওয়ার আইনি ব্যবস্থা হয়। কর, শুল্ক ও বিধিমালা যতটা সম্ভব ছাড় দিয়ে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কংগ্রেস আমলে এ-বিষয়ক একটি বিল সংসদে পাস হয়েছিল। ২০১৫ সালে তার সংস্কার করে ভূমি দখল বা অধিগ্রহণকে আরও নিরাপদ করার চেষ্টা করা হয়েছে। আগে রুটিনমাফিক জনসম্মতি ও সামাজিক অভিঘাত সমীক্ষার যা কিছু বিধান রাখা হয়েছিল, সেগুলোও তুলে নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে ভারতজুড়ে একদিকে দখলদার বা অধিগ্রহণের সুবিধাভোগীদের উন্মাদনা, অন্যদিকে কৃষক ও গ্রামীণ মজুরদের আর্তনাদ, প্রতিবাদ ও সংঘাত চলছে।
ভারতে ‘জনস্বার্থে’ ভূমি অধিগ্রহণের নামে ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর হাতে জমি তুলে দেওয়ার নীতি ও কর্মসূচি বিষয়ে গবেষণা করে সমাজবিজ্ঞানী মাইকেল লেভিন দেখিয়েছেন, ‘রাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে বৃহৎ পুঁজিপতি গোষ্ঠীর জমির দালালে পরিণত হয়েছে।’ কৃষকসহ গ্রামীণ মানুষদের উচ্ছেদ করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিলাসবহুল হোটেল, গলফ মাঠ, ক্যাসিনো, বহুতল আবাসিক ভবন, সুপার মার্কেট তৈরির মহাযজ্ঞ চলছে। গ্রামীণ বেকারত্ব বাড়ছে, তবে গ্রামীণ ধনীদের জমির মূল্য বৃদ্ধিতে লাভ হচ্ছে, গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।
ভূমির ওপর ভারতের বড় ব্যবসায়ীদের এই আগ্রাসন এখন সীমান্ত অতিক্রম করতে ছটফট করছে। বাংলাদেশে দেশি বড় ব্যবসায়ী দখলদারেরা ইতিমধ্যে নদী, বন, পাহাড়, জমি দখলে অনেক এগিয়ে। দুই দেশেই এ ক্ষেত্রে বহুজাতিক পুঁজি, বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠী, দেশি বৃহৎ ব্যবসায়ী, ভূমিদস্যু, আমলা, সন্ত্রাসী, কনসালট্যান্ট ও সরকার—সবাই একাকার।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu/anujuniv@gmail.com

প্রকল্পের নাম- আসল বিরোধী দল by সাজেদুল হক

‘আসল বিএনপি’ নামে একটি দল কিছুদিন আগে সংবাদ শিরোনাম হয়েছিল। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় দখল করতে গিয়ে ধাওয়ার শিকার হয়েছিল দলটি। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ অবশ্য এই দখল প্রচেষ্টাকারীদের বলেছেন, টোকাই। রাজনীতিতে অনেকেই অনেক সময় এ ধরনের উপমা ব্যবহার করে থাকেন। যদিও আসলে এ ধরনের উপমা ব্যবহার করা উচিত নয়। খুব কম আদম সন্তানই স্বেচ্ছায় টোকাই হন। ভাগ্য-প্রবঞ্চনা তাদেরকে পরিণত করে টোকাইয়ে। সে কাহিনী আলাদা।
আসল বিএনপি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ কি তা বলা বা বুঝার সময় এখনও আসেনি। তবে আসল বিরোধীদল নামে অন্য একটি প্রকল্প যে সক্রিয় হাল জমানার রাজনীতিতে তা স্পষ্ট। ৫ই জানুয়ারির বিখ্যাত নির্বাচন বাংলাদেশে অনেক নতুন কিছুরই আমদানি করেছে। যা হয়তো পৃথিবীর ইতিহাসেই নজিরবিহীন। গৃহপালিত বিরোধী দল বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। তবে একইসঙ্গে সরকার এবং বিরোধী দলে থাকার রেকর্ড জাতীয় পার্টিরই। এ নিয়ে অবশ্য সারা দুনিয়াতেই কৌতূহল তৈরি হয়। সে কৌতূহল দুই বছরেও মিটেনি। এই যখন পরিস্থিতি তখন রাজনীতিতে চাঞ্চল্য তৈরির চেষ্টা করছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। রংপুর গিয়েই তিনি আচমকা ঘোষণা দেন জাতীয় পার্টিতে কো-চেয়ারম্যান নামে একটি পদ তৈরি হয়েছে। ওই পদে তিনি নিয়োগ দেন তার ছোটভাই জিএম কাদেরকে। একইসঙ্গে কাদেরকে নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও ঘোষণা করেন এরশাদ। এ কথা অবশ্য সত্য, জিএম কাদের পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। এরশাদের ঘোষণায়, জাপার রাজনীতিতে চাপান উতোর তৈরির একটি দৃশ্য দেখানোর চেষ্টা চলে। ঢাকায় জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু ঘোষণা করেন, রওশন এরশাদ জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। যদিও কয়েক ঘণ্টাতেই সে ঘোষণা উবে যায়। বাবলু মহাসচিবের পদ হারান। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে চিঠি চালাচালি হলেও দৃশ্যত এরশাদের সিদ্ধান্তই মেনে নেন সবাই।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, জাতীয় পার্টির এসব নাটকীয়তা রাজনীতিতে খুব বেশি চাঞ্চল্য তৈরি করতে পারেনি। এসবই পূর্ব-পরিকল্পনার বাস্তবায়ন বলে মনে করেন তারা। মূলত জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল হিসেবে দাঁড় করানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এসব ঘটনা ঘটছে। সরকারের সামনে আপাত দৃষ্টিতে কোন চ্যালেঞ্জ না থাকলেও এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে। আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কারও কারও মধ্যেও রয়েছে চাপা অসন্তোষ। এ অবস্থায় জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে। বুঝানো হচ্ছে জাতীয় পার্টিতে সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই।
কোন কোন পর্যবেক্ষক মনে করেন, নাটকীয়ভাবে দেশে মধ্যবর্তী নির্বাচনও হতে পারে। তাছাড়া, শুধু ২০১৯ সাল নয়, নীতি-নির্ধারকদের দৃষ্টি আরও বহুদূরে। সে দৃষ্টিকে কেন্দ্র করেই নেয়া হচ্ছে নানা প্রকল্প। ২০ দলীয় জোটে ভাঙন সৃষ্টির তৎপরতা এরইমধ্যে কিছুটা সফলতার মুখ দেখেছে। জোটের শরিকদের সঙ্গে বিএনপির এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বিএনপির ভেতরেও কিছু তৎপরতার খবর আসছে। যদিও এতে এখনও তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি। তবে খালেদা জিয়ার কোন মামলা চূড়ান্ত পরিণতির দিকে গেলে রাজনীতিতে আরও নাটকীয়তার জন্ম হতে পারে।

অরুণাচল প্রদেশে প্রেসিডেন্টের শাসন চ্যালেঞ্জ করেছে কংগ্রেস

অরুণাচল প্রদেশে কেন্দ্রীয় সরকারের পরামর্শে প্রেসিডেন্টের শাসন জারি নিয়ে ভারতের রাজনীতিতে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি আমলে নিয়েছে। এর আগে কেন্দ্রীয় সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে। প্রথম দিকে হাই কোর্ট আবেদন আমলে নিলেও পরক্ষণে তা প্রত্যাখ্যান করে। ফলে বাধ্য হয়ে কংগ্রেস সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছে। উল্লেখ্য, অরুণাচল প্রদেশে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস ও এর বিদ্রোহীদের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সেখানকার বিধানসভার প্রায় অর্ধেক এমপি বিদ্রোহ করে যোগ দিয়েছে বিজেপিতে। তাদের মধ্যে রয়েছে গভর্নর জেপি রাজখোয়াও। তার নেতৃত্বে এক গ্রুপ বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। অন্যদিকে রয়ে যায় স্পিকার, মুখ্যমন্ত্রী নাবাম তুকির নেতৃত্বে আরেক গ্রুপ। স্পিকার বিশেষ নির্দেশে বিধানসভা তালাবদ্ধ করে রেখেছেন। ফলে বিদ্রোহীরা এর ভিতর প্রবেশ করতে পারছে না। এতে গভর্নর সম্প্রতি একটি কমিউনিটি হলে অধিবেশন আহ্বান করেন। এ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে যখন উত্তেজনা তুঙ্গে তখন ২৬শে জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে অরুণাচলে প্রেসিডেন্টের শাসন জারি করা হয়। সেই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে কংগ্রেস। অনলাইন এনডিটিভি বলছে, ওই প্রদেশে ক্ষমতাসীন ছিল কংগ্রেস। কিন্তু সেখানে প্রেসিডেন্টের শাসন জারির একদিন পরে সে নির্দেশের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আবেদন করেছে কংগ্রেস। সে আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। অরুণাচলে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস সেখানে কেন্দ্রীয় সরকার অর্থাৎ প্রেসিডেন্টের শাসন জারি করাকে প্রজাতন্ত্র দিবসে গণতন্ত্র হত্যা হিসেবে অভিহিত করেছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত রাজ্য অরুণাচল প্রদেশ। সেখানে কেন্দ্রের শাসন জারি সংক্রান্ত এক নির্দেশে প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জী স্বাক্ষর করেছেন মঙ্গলবার। এর ফলে ওই রাজ্য সম্পর্কে সরকার যে নীতি গ্রহণ করেছে তিনি তাতে সম্মতি দিলেন। এর আগে সোমবার তার সঙ্গে সাক্ষাত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। এ সময় তিনি অরুণাচল প্রদেশে কেন্দ্রীয় শাসন জারির প্রেক্ষিত ব্যাখ্যা করেন প্রেসিডেন্টকে। পরে মঙ্গলবার রাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি দেয়। এতে বলা হয়, অরুণাচল প্রদেশে সাংবিধানিক বিধি ভেঙে দেয়া হয়েছে। এর ফলে সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের শাসন জারি থাকবে। কংগ্রেস অভিযোগ করছে, কেন্দ্রীয় সরকার ওই রাজ্যের সরকারকে অস্থিতিশীল করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, যে সরকার বিজেপি বা তাদের মিত্রদের দ্বারা পরিচালিত নয়। উল্লেখ্য, গত ডিসেম্বরে এ রাজ্য রাজনৈতিক সঙ্কটে পড়ে। ওই সময়ে রাজ্য কংগ্রেসের প্রায় অর্ধেক এমপি দলের সঙ্গে বিদ্রোহ করে যোগ দেন বিজেপিতে। তারা স্পিকার ও মুখ্যমন্ত্রী নাবাম তুকিকে সরিয়ে দিতে বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দেয়। বিধানসভার এ অধিবেশন আহ্বান করেন গভর্নর জেপি রাজখোয়া। স্পিকারের নির্দেশে যেহেতু বিধানসভা তালাবদ্ধ ছিল তাই এমপিরা একটি কমিউনিটি হলে বৈঠকে বসেন। এ জন্য গভর্নরকে বিজেপির এজেন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করেছে কংগ্রেস। কংগ্রেস বলেছে, বিদ্রোহীদের জন্য একটি অধিবেশন আহ্বান করে গভর্নর বিজেপির এজেন্টের মতো কাজ করেছেন। গুয়াহাটি হাই কোর্টে তাই কংগ্রেস একটি আবেদন করেছে। তাতে তরা বলেছে, ডিসেম্বরে গভর্নর যে বিধানসভা আহ্বান করেছিলেন সেটা সংবিধানের লংঘন। কারণ, এ অধিবেশন আহ্বানের আগে মুখ্যমন্ত্রী নাবাম তুকি ও তার মন্ত্রীপরিষদের সঙ্গে কোন পরামর্শ করা হয় নি। এ বিষয়ে স্পিকার হাই কোর্টে একটি পিটিশন করেন। কিন্তু প্রথমে হাই কোর্ট কংগ্রেসের বিদ্রোহীদের অধিবেশনে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল তা সাময়িক স্থগিত করেন। তার পর পরই কোর্ট ওই আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। এতে বাধ্য হয়ে স্পিকার ছুটে যান সুপ্রিম কোর্টে। এখন সেখানেই লড়াই চলছে কেন্দ্রীয় সরকার ও কংগ্রেসের মধ্যে। উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তি দাঁড় করছে যে, অরুণাচল প্রদেশে আইন শৃংখলার অবনতি হয়েছে। ৬ মাস যাবত সেখানে বিধানসভার কোন অধিবেশন হয় নি। এমপিদেরকে বিধানসভার ভিতরে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছিল না। কারণ, পার্লামেন্ট ভবন তালাবদ্ধ করে রেখেছিলেন স্পিকার।

সময় শ্রম মেধা নেতৃত্ব by সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তথা সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার শেষ হয়েছে ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে। আফ্রিকার উত্তর অংশ ছিল একটি বিশাল রণাঙ্গন। একাধিক ব্যক্তি মিত্রবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন; তবে এখানে একজনের নাম উল্লেখ করছি তিনি হলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মন্টগোমারি। তখনকার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (বর্তমানের বাংলাদেশ-উত্তরপূর্ব ভারত-বার্মা-থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুর) ছিল একটি বিশাল রণাঙ্গন। এই রণাঙ্গনে মিত্রবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল উইলিয়াম স্লিম। মন্টগোমারি এবং স্লিম উভয়েই সফল সেনাপতি ছিলেন; কালক্রমে চার তারকা জেনারেল হয়েছিলেন; উভয়েই সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ র‌্যাংক ‘ফিল্ড মার্শাল’-পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন; উভয়েই ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সেনাপ্রধান হয়েছিলেন। মন্টগোমারি এবং স্লিমের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বা কর্মপদ্ধতির দু’টি আঙ্গিক উল্লেখ করছি। আফ্রিকার উত্তর অংশে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার দ্বিতীয় বছরের শেষাংশে, মন্টগোমারি যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন, মিত্রবাহিনী পরাজিত হতে হতে নাস্তানাবুদ অবস্থায়; তাদের মনোবল একদম নিচে। মন্টগোমারি দিনভর কাজ করতেন। রাত ৮টার দিকে রাতের খাবার খেতেন এবং ৯টার মধ্যে নিজের ‘ক্যারাভান’ বা অস্থায়ী বাঙ্ঘরের মধ্যে ঢুকে যেতেন রাতের বিশ্রামের জন্য। পরের দিন সকাল ৮টার দিকে নাস্তা খেতেন। রাতে মন্টগোমারি কিছুক্ষণ বাইবেল পড়তেন, কিছুক্ষণ হালকা কিছু পড়তেন, কিছুক্ষণ যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করতেন এবং বাকি সময়টুকু ঘুমোতেন। অধীনস্থ সব স্টাফ অফিসার ও কর্মকর্তাদের প্রতি কঠোর নির্দেশ ছিল যে, তারা যেন মন্টগোমারিকে রাতের খাবারের পর এবং সকালের নাস্তার আগে কোনো বিষয়ে বিরক্ত না করেন। একজন মধ্যপর্যায়ের স্টাফ অফিসার জিজ্ঞাসা করেছিলেন, স্যার, রাতে যদি শত্রু আমাদের অবস্থানের ওপর এমন কোনো প্রকারের আক্রমণ করে যে আমাদের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যায়, তাহলেও কি আপনাকে জানাব না? তার উত্তরে মন্টগোমারি বলেছিলেন না, জানাবে না। কারণ সারা দিনও যদি তোমরা বুঝতে না পারো যে, শত্রু রাতে এটা করতে পারে, তা হলে আসলেই তোমরা অযোগ্য এবং তোমাদের আমার স্টাফ অফিসার হিসেবে রাখাটাও আমার জন্য অযোগ্যতা। তোমার অযোগ্যতার জন্য তুমি মরবে এবং আমার অযোগ্যতার জন্য আমি মরব। তখন আমরা বার্মায় আসি। বার্মার বর্তমান নাম মিয়ানমার। ৪ জানুয়ারি ২০১৬ সকালে ভূমিকম্প হয়েছিল। সেই ভূমিকম্পের এপি সেন্টার বা মূল উৎপত্তিকেন্দ্র ছিল ইম্ফল নামক একটি নগরীর অতি কাছে। ঢাকা থেকে প্রায় সাড়ে ৩০০ কিলোমিটার পূর্ব দিকে এবং সিলেট থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পূর্ব দিকে ইম্ফল নগরী অবস্থিত। উত্তর-পূর্ব ভারতে যে সাতটি প্রদেশ আছে, তার মধ্যে অন্যতম মনিপুরের রাজধানী হচ্ছে ইম্ফল। ১৯৪২ সালের শেষ দিকের কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম অংশীদার দেশ ছিল জাপান। জাপানিরা বঙ্গোপসাগর দিয়ে এসে বার্মার উপকূলে নামে। রেঙ্গুন শহর দখল করে এবং উত্তর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ব্রিটিশ বাহিনী পেছনে, অর্থাৎ উত্তর দিকে হটতে হটতে পর্যুদস্ত হয়ে যায়; তাদের মনোবল একদম নিচে নেমে যায়। ওই সময় লেফটেন্যান্ট জেনারেল স্লিমকে সেনাপতি বানিয়ে দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি খোলামেলা প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তিনি বলতেন, আমার অফিস এবং আমার আবাসস্থলের দরজা দিন এবং রাতের সব ঘণ্টা এবং মিনিটে, সবার জন্য খোলা। তিনি বলতেন, এটা যুদ্ধক্ষেত্র এবং এখানে চব্বিশটা ঘণ্টাই আমরা যুদ্ধে লিপ্ত। বিশ্রামের কাজ সেটাও যুদ্ধের অংশ। বিশ্রাম নেবো এই অজুহাতে সিদ্ধান্ত প্রার্থনা করা বা সিদ্ধান্ত দেয়া যেন বিলম্বিত না হয় এটা আমাদের খেয়াল করতে হবে। সম্মানিত পাঠক, খেয়াল করুন যে, দুজন অতি বিখ্যাত সফল সেনাপতি মন্টগোমারি এবং স্লিম একেবারেই বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিলেন। দু’জনই ইতিহাসে বিখ্যাত। সম্মানিত পাঠক, আপনারা যুদ্ধের ময়দানে ব্যস্ত নয়। তারপরও মনে করুন যে আপনারা মধ্যপর্যায়ের সেনা অফিসার। জেনারেল মন্টগোমারি এবং জেনারেল স্লিমের মধ্যে কার বৈশিষ্ট্যকে বেশি পছন্দ করবেন? খুবই কঠিন প্রশ্ন। উত্তর নির্ভর করবে আপনার নিজের বৈশিষ্ট্যের ওপর। এই উদাহরণগুলো সেনাবাহিনী থেকে দিলাম কিন্তু বৈশিষ্ট্য বা প্রবণতাগুলো ব্যবসা ও রাজনীতি সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিভাবে প্রযোজ্য সেটা আপনি চিন্তা করলেই পাবেন। মন্টগোমারি এবং স্লিম উভয়েই সাফল্য উপহার দিয়েছিলেন; তাই ইতিহাস উভয়কেই সম্মানিত করছে। যদি একজন সাফল্য না দিতেন এবং অপরজন দিতেন, তাহলে ইতিহাস এবং গবেষকেরা, যিনি সাফল্য দিয়েছিলেন তাকেই বাহবা দিতেন এবং তার বৈশিষ্ট্যকেই সম্মান করতেন। যিনি সাফল্য না দিতেন, তার বৈশিষ্ট্যকে তিরস্কার করতেন। এই উভয় নেতা তাদের কাছে মজুদ সৈন্য সংখ্যা, তাদের অধীনস্থ অফিসারদের মেধা, তাদের সামনে পড়ে থাকা ‘সময়’, তাদের বিপরীতে শত্রু বাহিনীর কর্মপদ্ধতি ও চিন্তাভাবনা ইত্যাদিকে মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলেই তারা সফল হয়েছিলেন। ইতিহাসের একটি কঠোর বাক্য উল্লেখ করে এই অনুচ্ছেদ শেষ করছি। বাক্যটি হলো- ‘সাকসেস হ্যাজ মেনি ফাদারস; ফেইলিউর ইজ এন অরফ্যান।’ বাংলায় ভাবার্থ দাঁড়াবে অনেকটা এরকম : ‘সন্তানের সাফল্যের কৃতিত্ব নেয়ার জন্য অনেকেই বাপ হিসেবে সামনে আসবে, সন্তানের ব্যর্থতার দায়িত্ব নেয়ার জন্য কোনো বাপ পাওয়া যাবে না। কারণ বলা হবে যে, ছেলেটি এতিম।’ এখন আমরা সময় এবং মেধা নিয়ে কিছু কথা বলব।
সময়ের কাজ এবং নেতার কাজ
নয়া দিগন্তে বুধবার ১৩ জানুয়ারি ২০১৬ প্রকাশিত কলামের নাম ছিল ‘পরিকল্পিতভাবে সময়ের ব্যবহার’। ওই কলামের শেষাংশ থেকে কয়েকটি বাক্য এখানে রিপিট করছি। উদ্ধৃতি শুরু। সময় প্রসঙ্গ। সময়ের সাথে সম্পর্ক ঘড়ির। ঘড়ি অন্ততপক্ষে তিন প্রকার- দেওয়াল ঘড়ি, টেবিল ঘড়ি ও হাতঘড়ি। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির নির্বাচনী প্রতীক হলো হাতঘড়ি। সোয়া আট বছর আগে এই প্রতীক দাবি করার সময় নিজের অন্তরে একটি সিদ্ধান্ত ছিল, সিদ্ধান্তটি হলো এরূপ : যেদিন সমগ্র বাঙালি জাতি বা বাংলাদেশী ঘড়ি ধরে চলাচল করতে অভ্যস্ত হবে, সেদিন আমাদের কোনো কিছুতেই কেউ ঠেকাতে পারবে না। সময়ের কাজ সময়ে করতে হয় এবং কোন কাজের জন্য কোন সময়টি উপযুক্ত সেটাও সময়মতো নির্ধারণ করতে হয়।... সময়মতো কাজ করতে গেলে অনেক উপাদান লাগে। যথা শ্রম, অর্থ ও মেধা। এসব উপাদান একত্র করে উপকার পেতে হলে শক্তিশালী অনুঘটক লাগে। সেই অনুঘটকের নাম নেতা বা নেতৃত্ব। নেতার কাজ চিন্তা করা, পরিকল্পনা করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এবং সিদ্ধান্ত বা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য গ্রিন সিগন্যাল দেয়া। একবার কাজ শুরু হয়ে গেলে নেতার কাজ কাজের অগ্রগতি মনিটর করা। উদ্ধৃতি শেষ। আজকের কলামে উপাদান শ্রম, অর্থ, মেধা ইত্যাদি সম্পর্কে লিখব।
শ্রম এবং শ্রমিকের প্রকারভেদ
শ্রম যিনি দেন তিনি শ্রমিক। শ্রম অন্তত দুই প্রকার- কায়িক শ্রম ও মানসিক শ্রম। একজন ছাত্র পরীক্ষার আগে দুই প্রকার শ্রম দেয়। পরীক্ষা সামনে রেখে, সময়ের স্বল্পতাকে বিবেচনায় রেখে বুদ্ধি খরচ করে নির্ধারণ করে কোনটুকু পড়বে, কখন পড়বে? এটা হলো মানসিক শ্রম বা বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম। ওই ছাত্রকেই পড়ার জন্য, পড়ার চেয়ার-টেবিলে সশরীরে অনেকক্ষণ বসে থাকতে হয়। এটা দৈহিক শ্রম। অনেক ছাত্রই প্রাইভেট টিউটর বা কোচিং সেন্টারে গিয়ে পড়ে। কোচিং সেন্টারের শিক্ষক বা বাড়িতে এসে পড়ানো প্রাইভেট টিউটর নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে ছাত্রদের দেখিয়ে দেন, কোনটা কখন পড়লে সময় এবং পরিশ্রম সাশ্রয় হবে। এই নির্দিষ্ট আলোচনা এগিয়ে নেয়ার আগে একটি বাস্তব উদাহরণ দিই। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝির কথা। আমি তখন ঢাকা মহানগরের উত্তর-পশ্চিমাংশের মিরপুর সেনানিবাসে ‘ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ’-এ একজন প্রশিক্ষক। বছরে চারটি সেমিস্টার হতো। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে তৃতীয় সেমিস্টার চলাকালে ছাত্রদের নিয়ে তিন রাত চার দিনের জন্য দূরে যাওয়া হতো সামরিক অনুশীলনের জন্য। সারা দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার পর সারারাত ধরে ছাত্রদের পরিস্থিতির মূল্যায়ন (সামরিক পরিভাষায় : এপ্রেসিয়েশন অব দি সিচুয়েশন) লিখতে হতো। সকাল ৬টায় মূল্যায়নপত্র জমা দিতে হতো। মূল্যায়ন লেখার সময় গভীর রাতে ঝিমুনি আসবে দেখে ছাত্ররা এক গামলা ঠাণ্ডা পানি নিতো এবং ওই গামলার মধ্যে পা ভিজিয়ে রাখত। মশা কামড়াবে দেখে ধূপ জ্বালিয়ে রাখত। অর্থাৎ বসে বসে শ্রম দেয়ায় যে কষ্টের কাজ সেটাই বোঝাতে চাইলাম। আলোচনায় ফিরে যাই। এরূপ সময়ের চাপ দিয়ে, শারীরিক কষ্ট দিয়ে, ছাত্রদের কাজ করানোর উদ্দেশ্য হতো, যুদ্ধের ময়দানে এই অফিসারেরা যেন পরিশ্রান্ত অবস্থায় চিন্তাভাবনা করতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে তার প্র্যাকটিস করানো। অন্য উদাহরণে যাই। নির্মাণশ্রমিকেরা মাথায় করে ইট এবং সিমেন্টের বস্তা টানেন, ঢাকা মহানগরের সদরঘাটে অথবা চট্টগ্রাম মহানগরের চাক্তাইয়ে অথবা মেঘনা নদীর তীরে চাঁদপুরে শ্রমিকেরা নৌকা বা লঞ্চ বা বার্জ থেকে মালামাল মাথায় করে নামিয়ে তীরে আনেন। এটা দৈহিক শ্রম। ঢাকা মহানগরের মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে ৫০০ রাজনৈতিক কর্মী রাজপথ দিয়ে স্লোগান দিতে দিতে হেঁটে নয়া পল্টনে বিএনপি অফিসের সামনে এলেন, এটা হচ্ছে দৈহিক শ্রম। বড় রাজনৈতিক নেতা বক্তৃতা দেবেন, সেজন্য শ্রোতামণ্ডলী মাঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকেন এটা যুগপৎ মানসিক এবং দৈহিক শ্রম। কোথায় শ্রম দিতে হবে, কখন দিতে হবে, কতটুকু দিতে হবে এটা নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নির্ধারণ করার দায়িত্ব শ্রমদাতার একলা নয়; যিনি নেতা, তারও দায়িত্ব। কারণ, কত কম শ্রমে কত বেশি ফল অর্জন করা যায় সেটা নির্ধারণ করাই হচ্ছে নেতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। রাজনৈতিক কর্মীর শ্রমের আরো উদাহরণ আছে। মিটিংয়ে যাওয়া, দলীয় বই-পুস্তক পড়া, দলীয় ব্যক্তিদের কথাবার্তা শোনা, টেলিভিশনের নিউজ দেখার মাধ্যমে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত থাকা, সমমনা রাজনৈতিক কর্মীদের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ রাখা ইত্যাদি সবই শ্রম দেয়ার উদাহরণ। আমাদের দেশে আমরা শ্রমিক বলতে শুধু কৃষি ক্ষেত্রে বা শিল্পকারখানায় যারা দৈহিকভাবে কাজ করেন তাদেরই বুঝাই। এটা অর্ধেক-বাস্তব। কিশোর-কিশোরী বা বয়স্ক গৃহকর্মীরাও শ্রমিক। গাড়ি চালনার ড্রাইভারও শ্রমিক। মসজিদ বা মন্দির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য যিনি শ্রম দেন তিনিও শ্রমিক। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও শ্রম দেন এবং বৃহত্তর আঙ্গিকে তাদেরও শ্রমিক বলা যাবে। একজন সৈনিক বা একজন সামরিক অফিসারকে শান্তিকালে বা যুদ্ধের মাঠে অনেক শ্রম দিতে হয় এবং সেই আঙ্গিকে তারাও শ্রমিক। শ্রমের মর্যাদা দেয়া অতি গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকের শ্রম ছাড়া বর্তমান সভ্যতা গড়ে উঠতে পারত না। ইতিহাসের একটি তথ্য অনেকের মনে আছে যে, বিশ্ববিখ্যাত তাজমহল বানাতে ২০ হাজার শ্রমিকের ২২ বছর সময় লেগেছিল।
রাজনৈতিক কর্মীর দক্ষতা ও অদক্ষতা
শ্রমিকদের অনেক প্রকারে ভাগ বা পরিচিত করা যায়। তবে একটি প্রকার হলো দক্ষতার ভিত্তিতে অর্থাৎ দক্ষ শ্রমিক ও অদক্ষ শ্রমিক। ইংরেজি পরিভাষায় স্কিল্ড লেবার এবং আনস্কিল্ড লেবার। স্কিল্ড লেবারের বেতন বেশি এবং উন্নয়নগামী দেশে তাদের চাহিদা বেশি। আনস্কিল্ড লেবারের চাহিদা থাকলেও বেতন কম। একটি কঠিন প্রশ্ন, রাজনীতির অঙ্গনে কি স্কিল্ড এবং আনস্কিল্ড শব্দটি প্রযোজ্য? অর্থাৎ স্কিল্ড রাজনৈতিক কর্মী এবং আনস্কিল্ড রাজনৈতিক কর্মী- এ ধরনের পরিচয় কি প্রযোজ্য? এ প্রসঙ্গে আলোচনা আরেক দিন করব। তবে এই অনুচ্ছেদের উপসংহারে বলতেই হবে যে, রাজনীতির অঙ্গনেও শ্রম না দিলে কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অগ্রগতি বা প্রমোশন হবে না; তেমনি ওই দলেরও কোনো অগ্রগতি হবে না। রাজনৈতিক কর্মীর পক্ষ থেকে দেয়া শ্রমের উদাহরণ ওপরে দিয়েছি।
মেধার প্রয়োজন ও মেধা যাচাই
মেধা ব্যতিত অনেক কাজ সম্ভব নয়। ওপরের অনুচ্ছেদের শ্রম ও শ্রমিক প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছি স্কিল্ড এবং আনস্কিল্ড লেবারের কথা। শুরুতে সব শ্রমিকই একরকম থাকে; কিন্তু যাদের মেধা আছে তারা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার জন্য যোগ্য হয় এবং তারা স্কিল্ড লেবার হয়। মেধার প্রয়োজনীয়তা, গুরুত্ব সব ধরনের পেশায় আছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বেশির ভাগ পেশা বা কর্মযজ্ঞে প্রবেশের জন্য মেধার প্রয়োজন এবং পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই হয়। বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে, মেডিক্যাল পড়ার জন্য ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই হয়। চট্টগ্রাম, ঢাকা, রাজশাহী ইত্যাদি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য পরীক্ষা হয়। আদালতে আইনজীবী হিসেবে পেশা শুরু করার আগে পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা ও যোগ্যতা যাচাই হয়।
সেনা অফিসার হওয়ার জন্য পরীক্ষা
সামরিক বাহিনীতে অফিসার হিসেবে ঢোকার জন্য ব্যতিক্রমধর্মী পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা বা যোগ্যতা যাচাই হয়। এই পর্যায়ে সেনাবাহিনীতে অফিসার হওয়ার জন্য যে প্রক্রিয়া তার উদাহরণ টানছি। কারণ এটার সাথে এই কলামের পরবর্তী আলোচনার কিছুটা সম্পর্ক আছে। প্রথমে দরখাস্ত করতে হয়। তারপর সেনানিবাসে ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে গিয়ে প্রাথমিক মৌখিক পরীক্ষা ও প্রাথমিক ডাক্তারি পরীক্ষা দিতে হয়। যারা পাস করে, তারা কিছু দিন পর লিখিত পরীক্ষা দেয়। তাতে যারা পাস করে তাদের কিছু দিন পর ইন্টার সার্ভিসেস সিলেকশন বোর্ডের (বাংলা অনুবাদ দাঁড়াবে ‘আন্তবাহিনী নির্বাচনী পর্ষদ’) সামনে যেতে হয়; এর সংক্ষেপ হলো আইএসএসবি। আইএসএসবিতে পরীক্ষা দুই ধাপের। প্রথম ধাপ শেষ হয়ে যায় প্রথম দিনের প্রথম পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে। এই প্রথম ধাপ মূলত বুদ্ধির পরীক্ষা বা আইকিউ টেস্ট এবং প্রাথমিক মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা। যারা প্রথম ধাপ পাস করে, তারা দ্বিতীয় ধাপে পরবর্তী আরো প্রায় ষাট ঘণ্টা থাকে। গ্রুপ টেস্টিং অফিসারদের (সংক্ষেপে জিটিও) তত্ত্বাবধানে মাঠে পরীক্ষা চলে দুই সকাল। মনস্তত্ত্ববিদদের তত্ত্বাবধানে ইনডোর বা ঘরের মধ্যে পরীক্ষা চলে একটি পুরো বিকাল। কোনো একসময় আধা ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টাব্যাপী একটি মৌখিক পরীক্ষা হবে প্রত্যেকের জন্য। আইএসএসবিতে পরীক্ষাটিকে ত্রিমাত্রিক বা থ্রি-ডাইমেনশনাল বলা যায়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আইএসএসবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। তার আগে শুধু সেনাবাহিনীর জন্য সিলেকশন বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৩ সালের আগস্টে। সাধারণত আইএসএসবি পরীক্ষার মেয়াদ সাড়ে তিন দিন; পরীক্ষা শেষে দেখা যায় যে, নির্বাচিত বা পাস করা তরুণের সংখ্যা কম; নির্বাচিত হয়নি বা পাস করেনি এমন তরুণের সংখ্যা বেশি। এটা আপাতত খুবই একটি বেদনাদায়ক তথ্য। সতেরো আঠারো উনিশ বছরের কিশোর বা তরুণেরা যখন মনোনীত হয় না, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের মন খারাপ থাকে। তাদের একটা কথা নির্বাচকেরা আন্তরিকভাবে বোঝাতেন এবং এখনো বোঝান। ওই কথাটি আমি এখানে উদ্ধৃতির মধ্যে উল্লেখ করছি। ‘আপনি সেনাবাহিনীতে অফিসার হওয়ার নিমিত্তে প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হননি। এর মানে এই নয় যে, আপনি অমেধাবী বা আপনি সার্বিকভাবে অযোগ্য একজন কিশোর বা তরুণ। বরং এটা বলাই শ্রেয় যে, আপনার মেধা বা আপনার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো সেনাবাহিনীর অফিসারের জন্য উপযুক্ত না হলেও, অন্য যেকোনো একটি ভালো পেশার জন্য উপযুক্ত। আপনি হয়তো ভালো ডাক্তার হবেন অথবা ভালো প্রকৌশলী হবেন অথবা ভালো জনসংযোগ কর্মকর্তা হবেন অথবা ভালো মার্কেটিং কর্মকর্তা হবেন অথবা ভালো গবেষক হবেন। আপনি মনোবল হারাবেন না। আপনি এগিয়ে যান।’
রাজনীতিতে মেধার প্রয়োজনীয়তা আছে কি?
উপরের দীর্ঘ বর্ণনার পর এই অনুচ্ছেদের এই স্থানে আমার পক্ষ থেকে যে প্রশ্নটি উপস্থাপন করছি সেটি হলো, রাজনীতির অঙ্গনে মেধার কোনো প্রয়োজন আছে কি না, থাকলে কতটুকু এবং কোন আঙ্গিকে প্রযোজ্য? বাংলাদেশের বর্তমান সার্বিক রাজনৈতিক অঙ্গনে মেধার মূল্য, মেধাবীদের আকর্ষণ করার প্রক্রিয়া এবং মেধাবীদের কাজে লাগানোর প্রক্রিয়া কতটুকু সুষ্ঠু, কতটুকু সক্রিয়, কতটুকু স্বাগতম ইত্যাদি অবশ্যই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। রাজনীতি যেহেতু এমন একটি পেশা, যা অন্য সব পেশা ও কর্মযজ্ঞকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবান্বিত করে। অতএব, রাজনীতির অঙ্গনে মেধাকে যথাযথভাবে স্বাগতম জানানো, পুষ্টি ও পানি দিয়ে সবল করা এবং কাজে লাগানো অতি গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে।
উপসংহার
গত বুধবার ২০ জানুয়ারি আমার লেখা কলাম প্রকাশিত হয়নি। কারণ ঠিক একদিন আগে ১৯ জানুয়ারি আমার ভিন্নধর্মী কলাম বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের জীবনকর্ম বের হয়েছিল। যা হোক, দুই সপ্তাহ আগে, বুধবার ১৩ জানুয়ারি ২০১৬ প্রকাশিত কলামে সর্বশেষ অনুচ্ছেদে আমরা বলেছিলাম, ‘সময় মতো কাজ করতে গেলে অনেক উপাদান লাগে। যথা শ্রম, অর্থ ও মেধা। এসব উপাদান একত্র করে উপকার পেতে হলে শক্তিশালী অনুঘটক লাগে। সেই অনুঘটকের নাম নেতা বা নেতৃত্ব।’ এই চারটি উপাদান- সময়, শ্রম, অর্থ ও মেধা সম্পর্কে আলোচনা গত সপ্তাহেও করেছিলাম, এই সপ্তাহেও করলাম। আশা করি আগামী দুই সপ্তাহও করব। আলোচনার উদ্দেশ্য- যেন সামাজিক অঙ্গনে, ব্যবসায়িক অঙ্গনে, রাজনীতির অঙ্গনে এগুলোর ব্যবহার এবং ব্যবহারের পর ফলাফল প্রসঙ্গে আমাদের সচেতনতা বাড়ে।
লেখক : মেজর জেনারেল (অব:), চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com

বাংলাদেশে দুর্নীতি কমেনি, ব্যাপকতা উদ্বেগজনক

বাংলাদেশে গত একবছরে দুৃর্নীতি কমেনি। ২০১৫তেও এর ধারা অপরিবর্তিত ছিল। বাংলাদেশের দুর্নীতির ব্যাপকতা এখনো উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)।
সূচকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে এখানে দুর্নীতির মাত্রা অধিক। ১৬৮টি দেশের মধ্যে এবার বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৯তম। গত বছর ছিল ১৪৫তম।
আজ সকালে ঢাকাস্থ টিআইবি অফিসে দুর্নীতির ধারণা সুচক বা সিপিআই প্রকাশ করে এই তথ্য জানানো হয়। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামন এই তথ্য প্রকাশ করেন।
টিআই বলছে, ২০১৪ সালে ১৭৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল নিম্নক্রমে ১১৪তম। স্কোর ছিল ২৫। এবারও স্কোর ২৫, কিন্তু নিম্নক্রমে অবস্থান ১১৩তম। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেযে কম দুনীতিগ্রস্ত ভুটান। তাদের স্কোর ৬৫ এবং অবস্থান ২৭। ভারত ৭৬তম, শ্রীলঙ্কা ৮৩তম, পাকিস্তান ১১৭তম, নেপাল ১৩০তম।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের এ অবস্থানে আমরা সন্তুষ্ট না। আরো ভাল করা যেতো।

নিজের বেলায় ষোলো আনা! by সামছুর রহমান

উত্তরা রাজউক মার্কেটের পার্কিংয়ের জায়গাজুড়ে
বসানো হয়েছে অবৈধ দোকানপাটl -প্রথম আলো
বেসমেন্ট বা ভূতলের গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা স্থাপনা উচ্ছেদে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিশেষ অভিযান চলছে। ভবনে আসা যানবাহনের কারণে সড়কে যানজট সৃষ্টি হয় বলেই এই অভিযান। কিন্তু নিজেদের প্রতিষ্ঠানের বেলায় সে নিয়ম মানছে না রাজউক।
বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে ১৮ জানুয়ারি থেকে উত্তরার বেশ কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে। তবে ৭ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত রাজউক কর্মচারী কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সের বেসমেন্টে গড়ে ওঠা ৫৭টি দোকান এখনো বহাল আছে। রাজউক বলছে, ভবনটির নকশায় বেসমেন্টে দোকান করার অনুমতি আছে।
রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ) আসমাউল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজউকের নিজস্ব ভবন বলে ছাড় দেওয়া হচ্ছে কি না, এটি যুক্তিসংগত প্রশ্ন। ভবনটির নকশায় অনুমোদিত আছে বলে জানি, পরীক্ষা করে দেখতে হবে কতটুকুর অনুমোদন আছে। নয়তলা ভবনের হিসাবে পার্কিংয়ের পর্যাপ্ত জায়গা রাখা আছে কি না, তাও প্রশ্নসাপেক্ষ।’
গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, ৭ নম্বর সেক্টরে ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের পশ্চিম পাশে নয়তলা রাজউক কর্মচারী কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সটি অবস্থিত। কমপ্লেক্সের বেসমেন্টের চারপাশে দোকান। বেসমেন্টের দোকানে প্রবেশের জন্য তিনটি সিঁড়ি আছে। বেসমেন্টের মাঝখানে গাড়ি রাখার জন্য একটু ফাঁকা জায়গা। সেখানে তিনটি গাড়ি ও কয়েকটি মোটরসাইকেল রাখা। গাড়ি প্রবেশের জন্য একটা ঢালু পথ আছে।
দোকানমালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কমপ্লেক্সটি রাজউকের কর্মচারীদের কল্যাণ সমিতির। ২০০০ সালে মার্কেট নির্মাণের পর থেকেই তাঁরা এখানে ব্যবসা করছেন। দোকানের জায়গাগুলো রাজউক স্থায়ীভাবে বিক্রি করেছে। এখন কেউ নিজেই দোকান পরিচালনা করছেন, কেউ ভাড়া দিয়েছেন।
রাজউক কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুল মালেক বলেন, ‘আমাদের এটি মার্কেট ভবন। গাড়ি এসে বেশিক্ষণ থাকে না। নকশায় অনুমোদন নিয়ে কিছু দোকান করা হয়েছে। পার্কিংয়ের জন্য যথেষ্ট জায়গা আছে।’ তবে গতকাল দেখা যায়, কমপ্লেক্সে আসা গাড়িগুলো ভবনের সামনের রাস্তায় রাখা। বেসমেন্টের গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা স্থাপনা যানজট সৃষ্টি করছে বলে গত রোববার উত্তরার ছয়টি মার্কেটে অভিযান চালিয়ে এ ধরনের শতাধিক স্থাপনা উচ্ছেদ করে রাজউক। রাজউক কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সের খানিক দূরে অবস্থিত কুশল সেন্টারের বেসমেন্টের ১৭০টি দোকান ভেঙে দেয় উচ্ছেদকারীরা। এ সময় রাজউক কমপ্লেক্সেরও সামনের দুটি দোকান, র্যাম্প, সিঁড়ি ভেঙে দেওয়া হয়। তবে বেসমেন্টের দোকানগুলোর বিষয়ে কিছু করা হয়নি।
গতকাল কুশল সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, উচ্ছেদ হওয়া দোকানের লোকজন জড়ো হয়ে আছেন। ভাঙা জিনিসপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দোকানি বলেন, ‘কুশল সেন্টারের বেসমেন্টে দোকান বেআইনি, তা মেনে নিচ্ছি। উচ্ছেদ করল, তা-ও মানলাম। কিন্তু রাজউকের কমপ্লেক্স বলে সেখানে দোকান থাকবে, এটা এক দেশে দুই আইনের মতো ব্যাপার।’
এ বিষয়ে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান ও নগর পরিকল্পনাবিদ নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজউক যদি বেসমেন্টে দোকান করে, তাহলে অন্যরাও করার অনুমতি চাইবে। বেসমেন্টে দোকান না করার আইন সবার জন্য প্রযোজ্য হবে। রাজউকের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রযোজ্য। কারণ, রাজউক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।’ রাজউক আশপাশের ভবনের বেসমেন্টে গড়ে ওঠা দোকানপাট ভেঙে দেওয়ায় আতঙ্কে আছেন রাজউক কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সের দোকানিরাও। মিতু অ্যাডসের স্বত্বাধিকারী নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘দোকানের কিছু হলে আমরা পথে বসে যাব। রাজউক নিজে বিক্রি করছে। ভাঙতে হলে আগে আমাদের পুনর্বাসন করতে হবে।’ এসব দোকানের বিষয়ে রাজউকের সদস্য আসমাউল হোসেন বলেন, পুরাতন ভবনগুলোর ক্ষেত্রে বেসমেন্টে পার্কিং না রাখার সমস্যা বেশি। রাজউক কমপ্লেক্সের বেসমেন্টের দোকানের বিষয়ে কী করা হবে, তা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হবে। যদি নকশা সংশোধনের প্রয়োজন হয়, তাহলে সংশোধন করা হবে।

পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে সম্মেলন- পুলিশ বিভাগ গঠনের দাবি

পৃথক পুলিশ বিভাগ গঠনের দাবি উঠেছে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্মেলন থেকে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নিজেই এ দাবি করেছেন। এ ছাড়া পুলিশের শৃঙ্খলার দায়িত্ব পুরোপুরি বাহিনীর ওপর অর্পণ, অধিদপ্তর নয় দাপ্তরিকভাবে ‘পুলিশ সদর দপ্তর’ ঘোষণা, যানবাহন, আবাসন, ঝুঁকি ভাতাসহ বিভিন্ন দাবিও উঠেছে সম্মেলন থেকে।
গতকাল মঙ্গলবার পুলিশ সপ্তাহের প্রথম দিনে নিয়মিত কর্মসূচি হিসেবে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ঘণ্টাব্যাপী সম্মেলন হয়। রাজধানীর রাজারবাগে পুলিশ টেলিকম মিলনায়তনে এই সম্মেলনে পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন সব কর্মকর্তা অংশ নেন। অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোজাম্মেল হক খান। এই সম্মেলনকে পুলিশের নীতিনির্ধারণী বৈঠক হিসেবে দেখা হয়।
সম্মেলন শেষে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক সম্মেলনে তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, পুলিশের আইজি পদটা জ্যেষ্ঠ সচিবের। কিন্তু বর্তমান আইজিপি জ্যেষ্ঠ সচিব নন। পুলিশে দুটি গ্রেড ওয়ান পদ আছে। একটা হলো অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন), আরেকটি হচ্ছে অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি)। এখন এ দুটি পদের মধ্যে একজন কেবল গ্রেড ওয়ান পদমর্যাদায় রয়েছেন। পুলিশ অনেক দিন থেকেই পৃথক পুলিশ বিভাগের দাবি করে আসছে। পৃথক পুলিশ বিভাগ হলে পুলিশ নিজেদের কাজগুলো নিজেরা দ্রুত করতে পারবে। কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়বে না।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা প্রথম আলোকে বলেন, আলাদা বিভাগ হলে পেশাগত বিষয়গুলো অনেক সহজতর হবে। যে রকম সশস্ত্র বাহিনীর একটা পৃথক বিভাগ রয়েছে। তার একটা যৌক্তিকতা রয়েছে। সেই যৌক্তিকতা পুলিশের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ হতে পারে। তবে এটা নিয়ে নির্মোহ আলোচনার প্রয়োজন।
নুরুল হুদা বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশেই পৃথক পুলিশ বিভাগ আছে, পুলিশ মন্ত্রী আছে। পৃথক বিভাগ হলে পুলিশ সরাসরি মন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করতে পারবে। এখন পুলিশপ্রধান দেশের অন্য সংস্থাগুলো যেমন মৎস্য অধিদপ্তর, পশুপালন অধিদপ্তরের প্রধানের মতো একজন কর্মকর্তা। কিন্তু আইজিপির তো দায়দায়িত্বের পরিধি অনেক বেশি। যদিও আইজিপির পদমর্যাদা বাড়ানো হয়েছে, পুলিশে দুটি গ্রেড ওয়ান পদও রয়েছে। তাঁর মতে, পৃথক বিভাগ হলে পুলিশের বাজেট, আর্থিক বিষয়ের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে হবে না। আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত খুব দ্রুত দেওয়া যাবে।
তবে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের আদলে পৃথক পুলিশ বিভাগ করলে জটিলতা বাড়বে বলে মনে করেন সাবেক সেনাপ্রধান ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা আরও বাড়ানো যেতে পারে। সচিব বাড়ানো যেতে পারে, লোকবল বাড়ানো যেতে পারে।
আরও দাবি: সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া পুলিশের ঝুঁকি ভাতার দাবি তুলে ধরে বলেন, পুলিশ ঝুঁকি ভাতা পায় না। তবে র্যাবে গেলে পুলিশ কর্মকর্তারাই ঝুঁকি ভাতা পান।
কমিশনারের কথার সূত্র ধরে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, ডিএমপি কমিশনার ভুল তথ্য দিচ্ছেন। র্যাব ঝুঁকি ভাতা পায় না। র্যাবের আলাদা ভাতা রয়েছে। এখন সেই ভাতাও কমানো হচ্ছে।
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু নিবারণ আইনে কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিপীড়নের অভিযোগ উঠলে তার তদন্তের জন্য যে কমিটি করা হয়, তার প্রধান হলেন জেলা প্রশাসক। আর মহানগর এলাকায় এ রকম ঘটনা ঘটলে তার তদন্ত করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। একটি শৃঙ্খলা বাহিনীর শৃঙ্খলা রক্ষা নিয়ে সংবিধানের ৪৫ ধারায় যা বলা হয়েছে, আইনের এ অংশটুকু তার পরিপন্থী। তিনি আইনের এ অংশে দেওয়া ক্ষমতার অপব্যবহারের আশঙ্কা ব্যক্ত করেন।
পরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা পুলিশের শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ মানতে চাইছেন না।
সম্মেলনে বিপ্লব কুমারের বক্তব্য প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রসচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের পরামর্শে আইনে ওই ধারা রাখা হয়েছিল। তা ছাড়া এখন পর্যন্ত ওই আইনে কোনো কর্মকর্তাকেই অভিযুক্ত করা হয়নি। তাহলে এটা নিয়ে অপব্যবহারের আশঙ্কা কেন।
সম্মেলনে গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ বলেন, সরকারের দাপ্তরিক কাগজপত্রে পুলিশ সদর দপ্তরকে পুলিশ অধিদপ্তর হিসেবে লেখা হয়। কিন্তু এমনিতে তা পুলিশ সদর দপ্তর হিসেবেই পরিচিত। তিনি দাপ্তরিক কাগজপত্রে পুলিশ সদর দপ্তর লেখার দাবি জানান।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রসচিব বলেন, পুলিশ সদর দপ্তর লেখার কোনো সরকারি আদেশ নেই। পুরোনো কাগজপত্রেও অধিদপ্তর লেখা রয়েছে।
রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি হুমায়ুন কবীর বলেন, প্রযুক্তি দরকার। থানা ও ফাঁড়ির সীমানা দেয়াল নেই। জেলা পর্যায়ে মোবাইল ট্র্যাকার প্রয়োজন।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ডিআইজি মাহাবুবুর রহমান বলেন, তদন্তের স্বার্থে জাতীয় মনিটরিং সেন্টারের (এনএমসি) বৈধ আড়িপাতা ব্যবস্থায় পিবিআইয়ের প্রবেশাধিকার প্রয়োজন।
সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার কামরুল আহসান পুলিশের যানবাহনের অপর্যাপ্ততার কথা বলেন। তিনি প্রিজন ভ্যান বাড়ানোর কথা বলেন।
এ ছাড়া সম্মেলনে কর্তব্যরত অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী পুলিশ সদস্যদের জন্য ন্যূনতম ১৫ বছর বেতন ও রেশনের ব্যবস্থা করা, পুলিশের আবাসন সুবিধার উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান তাঁর বক্তব্যে পুলিশের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘সব জায়গায় সবাই আপনাদের প্রশংসা করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সেনাপ্রধান, সদ্য সাবেক নৌবাহিনীর প্রধান আপনাদের কাজের প্রশংসা করেছেন। এমনকি এরশাদ সাহেবও আপনাদের প্রশংসা করে গেছেন। জানুয়ারি থেকে টানা ৯১ দিন আপনারা যে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন, তার জন্য পুরো দেশবাসী আপনাদের স্বীকৃতি দিয়েছে। আপনারা পরীক্ষিত। পরীক্ষায় পাস করেছেন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আপনারা অনেক যৌক্তিক দাবির কথা বলেছেন। ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্রসচিব বিষয়গুলো পরিষ্কার করেছেন। প্রধানমন্ত্রী ৫০ হাজার পুলিশ সদস্য বাড়ানোর কথা বলেছেন। গাড়ির যে সমস্যা রয়েছে, তা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী।
সম্মেলনের ধন্যবাদ জ্ঞাপন পর্বে অতিরিক্ত আইজিপি মোখলেসুর রহমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমাদের দোষ-ত্রুটি হওয়া সম্ভব। বিচ্যুতি ঘটে। সেগুলো যাতে না ঘটে সে জন্য চেষ্টা চলছে। কিন্তু দু-একজনের বিচ্যুতির জন্য ঢালাওভাবে বলা হয় পুলিশ এটা করেছে, পুলিশ ওটা করেছে। কিন্তু দোষী সব পুলিশের শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। এই শাস্তির বিষয় আর গণমাধ্যমে আসে না। আমি বিচ্যুতিকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে বলছি না। কিন্তু দু-একটি বিচ্যুতির জন্য পুরো বাহিনীর গায়ে যেন কালিমা না লাগানো হয়।’

পুরস্কারের রাজনীতি by কুলদীপ নায়ার

প্রজাতন্ত্র দিবসে যাঁরা পুরস্কার পেয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমি অশ্রদ্ধা পোষণ করি না। পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে অনেকেই নিজের কাজে চূড়ান্ত উৎকর্ষ অর্জন করেছেন সন্দেহ নেই, কিন্তু বাকিরা মূলত ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে এই পুরস্কার পেয়েছেন। ঘটনাচক্রে এবার ক্ষমতাসীন দল হচ্ছে বিজেপি। আগের কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধেও এই অভিযোগ আছে যে তারা নিজেদের পছন্দমাফিক মানুষদের এই পুরস্কার দিয়েছে।
এই ব্যাপারটা ভারতের সংবিধানপ্রণেতাদের চিন্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁরা পুরস্কার বাতিল করেছিলেন। এ কারণেই ব্যাপক গণ-আন্দোলনের মুখে যখন গান্ধীবাদী নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ ক্ষমতায় আসেন, তখন তিনি এই ধারায় ছেদ টানেন। এই ধারাটা শুরু করেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, যেসব ব্যক্তি সাহিত্য, অর্থনীতি ও বিজ্ঞানের জগতে উৎকর্ষ অর্জন করেছিলেন, তিনি তাঁদের সম্মানিত করতে এই পুরস্কার চালু করেন। তবে এ পুরস্কারের সঙ্গে টাকা দেওয়া হতো না, কারণ এটা এতই সম্মানিত পুরস্কার ছিল যে তা টাকার মূল্যে মাপা যেত না। নেহরুও এই পুরস্কার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে চাননি। তিনি কস্মিনকালেও ভাবেননি, এই পুরস্কারের মনোনয়ন রাজনৈতিক বিবেচনায় করা হবে, সরকার তার চাটুকারদের দল সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ এই পুরস্কার দেবে।
আমার মনে আছে, আজ থেকে ৫০ বছর আগে যখন এই পুরস্কার চালু হয়, তখন সেটা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন নেহরু স্বয়ং। পরবর্তীকালে এই কাজটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে ন্যস্ত করা হয়, যেটা আবার দেখভাল করতেন ওই মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব। তিনি আবার এই দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত তথ্য কর্মকর্তার ওপর অর্পণ করেন। আর এভাবেই এ কাজ আমার হাতে চলে আসে, কারণ তখন আমি ছিলাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা।
এই পুরস্কারের মনোনয়ন প্রক্রিয়াটা ছিল স্বেচ্ছাচারী, অর্থাৎ তার নির্দিষ্ট নীতি ছিল না। প্রধানমন্ত্রীসহ অন্য কয়েকজন মন্ত্রী অনেকের নাম প্রস্তাব করতেন, আর আমি তথ্য কর্মকর্তা হিসেবে সেগুলো ফাইলবন্দী করতাম। আর প্রজাতন্ত্র দিবসের এক মাস আগে আমি ওই নামগুলোর সংক্ষিপ্ত তালিকা করতাম। তবে আমাকে এ কথা অবশ্যই বলতে হবে যে এই তালিকা প্রণয়নে আমি নিয়ম অনুসরণ করিনি। এরপর আমি ওই তালিকাটি দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসচিবের কাছে পাঠিয়ে দিতাম, তারপর সেটা যেত স্বরাষ্ট্রসচিবের দপ্তরে, আর শেষমেশ তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর টেবিলে যেত। আমি যে তালিকা করতাম, সেটার তেমন নড়চড় হয়েছে বলে আমি দেখিনি।
কিন্তু সবচেয়ে কঠিন কাজটা ছিল মানপত্র লেখা, এ কাজের জন্য আমি একটি অভিধান বা রোজেটের থিসোরাস খুলে বসতাম। ক্ষেত্রবিশেষে আমি জীবনী নিয়ে বসতাম। মূলত এসব বিবরণে ওই ব্যক্তির কিছু বিবরণ থাকত, অর্থাৎ তিনি কি একজন বিজ্ঞানী, একাডেমিক নাকি অর্থনীতিবিদ। এতে আমার কিছুটা সুবিধা হতো, কিন্তু তার ভিত্তিতে মানপত্র প্রণয়ন করা বেশ কঠিন কাজ ছিল।
এই পুরো প্রক্রিয়া এতটা অগোছালো ছিল যে শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। আদালত বলেন, এই মনোনয়নের জন্য একটি বাছাই কমিটি গঠন করা হোক, বিরোধী দলের একজন নেতা যার সদস্য হবেন। তবে এই কমিটি গঠিত হওয়ার পর এই কাজে কিছুটা শৃঙ্খলা আসে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওই মানপত্র প্রণয়নের কাজ আমাকেই করতে হয়েছে।
নামের গেজেট নোটিফিকেশনের খসড়া প্রণয়ন করত রাষ্ট্রপতি ভবন। আমার মনে আছে, একবার রাষ্ট্রপতি মিসেস ল্যাজারাসের নাম প্রস্তাব করেছিলেন, আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও সুপারিশ করি, যাতে এই বিখ্যাত শিক্ষাবিদ মিসেস ল্যাজারাসকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়, আর সে মতে গেজেট নোটিফিকেশন প্রস্তুত করে তা জনসমক্ষে প্রকাশও করা হয়।
সেতার বাদক বিলায়েত খান পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ দুটোই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এই যুক্তিতে যে তাঁর কনিষ্ঠদের যে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, সেটা তিনি নিতে পারেন না। এতে বোঝা যায়, ভারতে ভুল সময়ে ও ভুল মানুষকে ভুল পুরস্কার দেওয়ার প্রবণতা আছে।
কিন্তু রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ ওই নোটিফিকেশন দেখে বললেন, তিনি তো তাঁর নার্স ল্যাজারাসের নাম প্রস্তাব করেছিলেন, অন্ধ্র প্রদেশের কারনুল থেকে হায়দরাবাদে আসার সময় এই নার্স তাঁর শ্বাসকষ্টের চিকিৎসা করেছিলেন। তখন আমরা সবাই খুব বিব্রত হই যে একজন ভুল মানুষকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তখন আর কিছুই করার ছিল না, কারণ তাঁর নামটি ইতিমধ্যে জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল। সেবার দুজন ল্যাজারাসকে ওই পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।
দুই বছর আগে যখন কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল, তখন তারা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত হোটেলওয়ালা সন্ত সিং চাতালকে পদ্মভূষণ পুরস্কার দেয়, যদিও তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ঝুলছিল। এ নিয়ে শোরগোল পড়ে গেলেও কংগ্রেস সরকার তখন সাফাই গেয়ে বলল, তিনি ভারতীয় হিসেবে একজন পরিচিত ব্যক্তি, যিনি বিদেশে দেশের নাম সমুজ্জ্বল করেছেন। আবার এমন ঘটনাও আমরা দেখেছি, যেখানে পুরস্কারের জন্য মনোনীত ব্যক্তিরা এই কারণে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন যে নির্বাচকেরা তাঁদের কাজ মূল্যায়ন করার যোগ্য নন।
যে শিক্ষাটা নিতে হবে তা হলো আদৌ পুরস্কার থাকা উচিত কি না। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দল নিজের কর্মী বা দলের সঙ্গে যারা কোনো না কোনোভাবে যুক্ত, তাদের ‘স্বীকৃতি’ দিতে চায়। এর আসল লক্ষ্যটা এ কারণেই বিনষ্ট হয়ে গেছে। যেমন শচীন টেন্ডুলকারের কথাই ধরুন না কেন, সন্দেহ নেই, ডন ব্র্যাডম্যানের পর তিনই ছিলেন বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান। কিন্তু যখন হকির জাদুকর ধ্যান চাঁদের নাম ভারতরত্ন পুরস্কারের জন্য বিবেচনাই করা হলো না, তখন কি তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া উচিত হয়েছে? কিংবদন্তির অ্যাথলেট মিলখা সিং পদ্ম পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে আলোড়ন তুলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ভারতরত্ন ছাড়া অন্য পুরস্কারের ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ নেই, কারণ এর আগেই তাঁর ছেলেকে পদ্ম পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।
আর একাডেমিশিয়ানদের মধ্যে রোমিলা থাপার পদ্ম প্রত্যাখ্যান করে আরেকটি দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন, তিনি বলেছিলেন, তিনি নিজের সমকক্ষদের দ্বারা মূল্যায়িত হতে চান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমলাদের দ্বারা নয়। বিখ্যাত সেতার বাদক বিলায়েত খান পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ দুটোই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এই যুক্তিতে যে তাঁর কনিষ্ঠদের যে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, সেটা তিনি নিতে পারেন না। এতে বোঝা যায়, ভারতে ভুল সময়ে ও ভুল মানুষকে ভুল পুরস্কার দেওয়ার প্রবণতা আছে।
উল্লিখিত নজির থেকে বোঝা যায়, এসব পুরস্কার স্রেফ মেধার বিবেচনায় দেওয়া হয় না। এই অভিযোগ থেকেই যাবে, কারণ নির্বাচকদের সরকারই মনোনীত করে। বিরোধী দলের কাউকে নিলেও কাজ হবে না, কারণ সেখানে তিনি সংখ্যালঘু হয়েই থাকবেন। এই পুরস্কারের গুরুত্ব নিয়েও দেশে বিতর্ক হওয়া উচিত। হয়তো এখন তার গুরুত্ব তেমন একটা নেই, স্বাধীনতার পর যেমনটা ছিল।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

উত্তরাঞ্চলে দুই শ’ নদী ও এক হাজার বিল ভরাট- সেচ সঙ্কটে পাঁচ লাখ হেক্টর বোরোজমি

গ্রীষ্মকাল আসার আগেই পানিশূন্য
তাড়াশের নন্দকুজা নদী : জাকির আকন্দ
ভারত অভিন্ন নদীতে বাঁধসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণ করে ইচ্ছেমতো পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে ভাটির বাংলাদেশের শত শত নদ-নদী, খাল, বিল, হাওর, বাঁওড়ে পর্যাপ্ত পানির প্রবাহ থাকছে না। বছরের পর বছর পলি জমে সঙ্কুচিত হচ্ছে বিল ও নদীগুলোর আয়তন। ফলে শুষ্ক মওসুমে উত্তরাঞ্চলের দুই শতাধিক নদী, শাখানদী, উপনদীসহ এক হাজারের বেশি বিল ভরাট হয়ে আবাদী জমিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এতে নদী ও বিলনির্ভর প্রায় পাঁচ লাখ হেক্টর বোরোজমিতে সেচসঙ্কট দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, ১৯৬৪-৬৫ সালে দেশে হাইব্রিড জাতের ধান আবাদ শুরু হয়। সেই সময় থেকে সেচের জন্য শ্যালো মেশিন ব্যবহার হয়ে আসছে। তখন নদী, বিল, জলাশয় থেকে শ্যালো মেশিনের সাহায্যে ফসলি জমিতে সেচ দেয়া হতো। ১৯৭৩ সালের পর থেকে ভারত অভিন্ন নদ-নদীতে নানা অবকাঠামো নির্মাণ করে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। ফলে শুষ্ক মওসুমে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ না থাকায় দেশের উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীগুলো মরা পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া বছরের পর বছর নদ-নদী, খাল, বিল, জলাশয়ে পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় সেচকার্যক্রম সম্পূর্ণ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভশীল হয়ে পড়েছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে।
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের একসময়ের খড়স্রোতা নন্দকুজা, ভদ্রাবতী, সরস্বতী, ইছামতি, গুমানী, আত্রাই, গুড় নদী, করতোয়া, ফুলঝোর, তুলসী, চেঁচুয়া, ভাদাই, চিকনাই, বানগঙ্গা, ঝরঝরিয়া, কাকন, কানেশ্বরী, মুক্তাহার, কাকেশ্বরী, সুতিখালি, গোহালা, গাড়াদহ, স্বতী, ভেটেশ্বর, ধরলা, দুধকুমার, সানিয়াজান, তিস্তা, ঘাগট, ছোটযমুনা, নীলকুমার, বাঙ্গালী, বড়াই, মানস, কুমলাই, সোনাভরা, হলহলিয়া, জিঞ্জিরাম, বুড়িতিস্তা, যমুনেশ্বরী, মহানন্দা, টাঙ্গান, কুমারী, রতœাই, পুনর্ভবা, ত্রিমোহনী, তালমা, ঢেপা, কুরুম, কুলফি, বালাম, ভেরসা, ঘোড়ামারা, মালদহ, চারালকাঁটা, পিছলাসহ দুই শতাধিক নদী, শাখানদী ও উপনদী নব্যতা হারিয়ে মরা নদীতে রূপান্তরিত হয়েছে।
এ ছাড়া পাবনা, নাটোর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহী জেলার ঘুঘুদহ বিল, গাজনার বিল, শিকর বিল, কাজলকুড়ার বিল, ধলকুড়া বিল, ইটাকাটা বিল, গন্ডার বিল, পাইকশার বিল, বেহুলার বিল, হাড়গিলার বিল, দীঘলাছড়ার বিল, বোছাগাড়ীর বিল, ইউসুফ খাঁর বিল, নাওখোয়া বিল, ঢুবাছরি বিল ও কাঁকড়ার বিলসহ সহস্রাধিক বিল শুকিয়ে সমতলভূমিতে পরিণত হয়েছে। একসময় এসব বিলে সারা বছরই পানি থাকত। আর এখন বছরের নয় মাসই পানি থাকে না। ফলে কৃষকেরা নানা রকম ফসলের আবাদ করছেন।
কুড়িগ্রামের ১৮২টি বিলের মধ্যে দীঘলাছড়ার বিল, বোছাগাড়ীর বিল, ইউসুফ খাঁর বিল, নাওখোয়া বিল, চুবাছরির বিল, কুশ্বার বিল, মেরমেরিয়ার বিল, চাছিয়ার বিল, হবিছরি বিল, পেদিখাওয়া বিল, কয়রার বিলসহ বেশির ভাগ বিলে ফসলের আবাদ হচ্ছে। অন্য বিলগুলোতে বছরের আট মাসের বেশি সময় পানি থাকে না। দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট জেলার বিলগুলোর একই অবস্থা। চলনবিলে এক হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে বেঁচে আছে ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে মাত্র ৮৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় সারা বছর পানি থাকে। পানি শুকিয়ে গেলে বিলগুলো ফসলি জমিতে রূপান্তরিত হয়।
নদী-বিলের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় পাঁচ লাখ হেক্টর বোরোজমিতে সেচ ব্যাহত হচ্ছে। কৃষিকাজ হয়ে পড়েছে গভীর-অগভীর নলকূপনির্ভর। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। খনন ও সংস্কারের অভাব, অপরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণ, বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ ও বিল রক্ষায় পর্যাপ্ত উদ্যোগ না নেয়ায় উত্তরাঞ্চল থেকে নদী-বিলের অস্তিত্ব এক এক করে মুছে যাচ্ছে।
রাজশাহী ও রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলে দুই শতাধিক নদী ও সহস্রাধিক বিল শুকিয়ে যাওয়ায় ভূ-উপরিস্থ পানির অভাবে প্রায় ১২ লাখ হেক্টর এক ফসলি জমি তিন ফসলিতে পরিণত করা সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যে পাবনা জেলায় এক লাখ ৩৪ হাজার হেক্টর, সিরাজগঞ্জে ৯১ হাজার হেক্টর, রাজশাহী জেলায় ৯০ হাজার হেক্টর, নওগাঁ জেলায় এক লাখ ২০ হাজার হেক্টর, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৮৭ হাজার হেক্টর, নাটোর জেলায় ৬৬ হাজার হেক্টর, বগুড়া জেলায় ৩১ হাজার হেক্টর, জয়পুরহাট জেলায় ১৪ হাজার হেক্টর, গাইবান্ধায় ৬৯ হাজার হেক্টর, রংপুর জেলায় ৬৭ হাজার হেক্টর, নীলফামারী জেলায় ৬৭ হাজার হেক্টর, লালমনিরহাট জেলায় ৫১ হাজার হেক্টর, কুড়িগ্রাম জেলায় এক লাখ হেক্টর, দিনাজপুর জেলায় এক লাখ ২৫ হাজার হেক্টর, ঠাকুরগাঁও জেলায় ৬৩ হাজার হেক্টর এবং পঞ্চগড় জেলায় ৭৯ হাজার হেক্টর এক ফসলি জমি সেচের পানির অভাবে তিন ফসলিতে রূপান্তর করা যাচ্ছে না।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সমতার এক জরিপ প্রতিবেদনে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলে বিলের সংখ্যা এক হাজার ৫৬১টি। এর মধ্যে সহস্রাধিক বিলের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। পলি জমে বিলের মুখ ভরাট হয়ে যাওয়া এবং পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বছরের বেশির ভাগ সময় এসব বিল শুকনা থাকে। বছরের পর বছর বিলগুলোতে পলি জমছে। গভীরতা হৃাস পাচ্ছে। পরিণত হচ্ছে নিচু সমতল ভূমিতে। দীর্ঘ দিন সংস্কার ও খননের উদ্যোগ না নেয়ায় বিলের পানির নির্দিষ্ট ধারাটিও হারিয়ে যাচ্ছে।
উত্তরাঞ্চলে বন্যার সময় আসা পলি জমছে বিলে। বন্যার পানি নেমে গেলে থেকে যাচ্ছে পলি। একপর্যায়ে গোটা বিল এলাকাই পরিণত হচ্ছে ধুধু প্রান্তরে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানী ড. মো: রেদওয়ানুর রহমানের প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, ২৬ বছর আগেও চলনবিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ১৬টি নদী, ৩৯টি বিল ও ২২টি খাড়িতে বছরজুড়েই ৬ থেকে ১২ ফুট পানি থাকত। ফলে সারা বছরই নৌচলাচল করত। কিন্তু বছরের পর বছর পলি জমে এসব নদী, বিল ও খাড়ি ভরাট হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণ, ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে এবং ১৯৮০-এর দশকে পানি উন্নয়ন বোর্ড বড়ালের (পদ্মা) উৎসমুখে স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে চলনবিলের বিভিন্ন নদী বিল জলাশয় ও খাড়িগুলোয় পলি জমে ক্রমে ভরাট হয়ে গেছে। তা ছাড়া বিলের মাঝ দিয়ে যথেচ্ছভাবে সড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ, ভূমি দখল করে বসতি ও দোকাপাট স্থাপন করায় নদী, বিল ও খাড়িগুলো সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে।

ইরানি প্রেসিডেন্টের সম্মানে নগ্ন ভাস্কর্য ঢেকে দিল ইটালি

বাক্স দিয়ে নগ্ন ভাস্কর্যগুলো ঢেকে দেয়া হয়।
ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি চলমান ইটালি সফরকালে সেদেশের কিছু নগ্ন ভাস্কর্য ঢেকে দেয়া হয়েছে। ইটালির একটি মিউজিয়ামে বাণিজ্য চুক্তির পর ইরানের প্রেসিডেন্ট এবং ইটালির প্রধানমন্ত্রী নিজেদের মাঝে আলোচনা করেন।
কিন্তু সেই মিউজিয়ামে কিছু নগ্ন ভাস্কর্য আছে। সে নগ্ন ভাস্কর্যগুলো দেখে ইরানের প্রেসিডেন্ট বিব্রত হতে পারেন, এমন আশংকায় সেগুলো ঢেকে দেয়া হয়।
অফিসিয়াল নৈশভোজের সময় সেখানে অ্যালকোহলও রাখবে না ইটালির সরকার। কারণ ইসলামী রাষ্ট্র ইরানে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী অ্যালকোহল পান করা নিষিদ্ধ।
ইরানের প্রেসিডেন্টের ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান দেখানোর জন্য ইটালির সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও ফ্রান্স সেগুলো অনুকরণ করবে না। বর্তমানে ইউরোপ সফরে থাকা ইরানের প্রেসিডেন্টের পরবর্তী গন্তব্য ফ্রান্স।
অবরোধ উঠে যাবার পর অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে মি: রুহানি এখন ইউরোপ সফর করছেন।ইটালির ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে মি: রুহানি বলেছেন ইরান হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে নিরাপদ এবং স্থিতিশীল দেশ।
তিনি বলেন, “ উগ্রপন্থা মোকাবিলার জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে একমাত্র উপায়। বেকারত্ব সন্ত্রাসবাদের জন্ম দেয়।”
ইটালি সফরকালে ইরানের প্রেসিডেন্ট পোপ ফ্রান্সিসের সাথেও দেখা করেন।
সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর সাথে কাজ করার জন্য ইরানের প্রতি আহবান জানান পোপ ফ্রান্সিস।
সুত্রঃ বিবিসি

ছাত্রের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক: শিক্ষিকা গ্রেপ্তার

কিশোর ছাত্রের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে ফেঁসে গেছেন শিক্ষিকা জুলিয়ান বি. লাফাবে (২৫)। ওই ছাত্রকে যৌন উত্তেজিত করতে তাকে কমপক্ষে ১৩০০০ রগরগে এসএমএস পাঠিয়েছেন তিনি। এ অঋিঐেঠসে গ্রেফতার করা হয়েছে ওই শিক্ষিকাকে। এ ঘটনা ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে। সেখানকার ভ্যালি হাই স্কুলের শিক্ষিকা জুলিয়ান। তিনি বিবাহিতা। তারই এক ছাত্রের পড়াশোনায় বিশেষ তত্ত্বাবধানের প্রয়োজন হয়। ১৬ বছর বয়সী ওই ছাত্রের পড়াশোনা এগিয়ে নেয়ার দায়ভার পড়ে তার ওপর। এ সুযোগে তিনি তার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এ বিষয়টি ধরা পড়ে একজন নজরদারির চোখে। হাতেনাতে ধরা পড়েন তিনি। কেটিএনভি-টিভি এ খবর দিয়ে জানিয়েছে, ধরা পড়ার পর তাকে তুলে দেয়া হয়েছে পুলিশের হাতে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ওই ছাত্রকে তিনি ১৩ হাজারের বেশি উত্তেজনা সৃষ্টিকারী এসএমএস পাঠালেও ওই ছাত্র বুঝতে পারে নি যে, সে ভুল করছে না ঠিক করছে। বলা হয়েছে, ওই ছাত্র ও জুলিয়ান প্রতিদিন একান্তে অনেকটা সময় কাটাতো। এ সময়ে তাদের মধ্যে কি সব কথাবার্তা হলো তা অনুমেয়। ১৬ই জানুয়ারি ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর গ্রেপ্তার করা হয় জুলিয়ানকে। এরপর তাকে জামিন দেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে স্কুল থেকে তাকে প্রশাসনিক উপায়ে ছুটি দেয়া হয়েছে। আগামী মার্চে আদালতে তার হাজিরা দেয়ার কথা রয়েছে।

রাজনৈতিক দলের সেকাল ও একাল by সৈয়দ আবুল মকসুদ

রাজনৈতিক দল কী এবং রাজনৈতিক নেতাদের কী কাজ, তা দেখে আসছে এ দেশের মানুষ বহু বছর থেকে। জীবনে আমি কোনো দলের কার্যালয়ে খুব কমই গিয়েছি। গেলেও গিয়েছি স্বাধীনতার আগে, কোনো নেতার সঙ্গে দেখা করতে। তবে কয়েকটি দলের কর্মকাণ্ড দেখে আসছি ছোটবেলা থেকে। বড় নেতাদের কর্মকাণ্ড দেখেছি কাছে থেকে। যে দলকে আমি সমর্থন করেছি তার কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে বিশেষ ছিল না। গণতান্ত্রিক দলগুলোর জনসভায়ও উপস্থিত থেকেছি।
চিরকাল কোনো কিছু একই রকম থাকবে, তা আশা করা ঠিক নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুতেই পরিবর্তন আসে। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসে। পোশাক-আশাকে পরিবর্তন আসে। চালচলনে পরিবর্তন আসে। ৬০-৭০ বছর আগে এ দেশের বড় নেতারা পাম্প শু, ঢোলা পায়জামা, লম্বা কালো শেরওয়ানি এবং কালো টুপি পরতেন। পঞ্চাশের দশকে দেখেছি অধিকাংশ নেতাকে রাবারের জুতা, পায়জামা ও লম্বা শার্ট পরতে। সে শার্টও এখনকার শার্টের মতো নয়। তাতে পকেট থাকত তিনটি। দুই পাশে দুটি মস্ত বড় পকেট। তাতে অল্পস্বল্প বাজার করে রাখা যেত। সাধারণত ওই পকেটে তাঁরা রাখতেন টাকা-আধুলি ও খুচরা পয়সা। ওপরের বুকপকেটে থাকত কিছু কাগজপত্র, পাঁচ-দশটি টাকা এবং অবধারিতভাবে একটি ফাউন্টেন পেন। কেউ কেউ চশমাটা ভাঁজ করে বুকপকেটে রাখতেন। কারও কারও জামার বুকপকেট থাকত কলঙ্কিত—ফাউন্টেন পেনের বেরিয়ে পড়া কালির ছ্যাবড়ানো দাগ। কোনো কোনো নেতা পশ্চিম পাকিস্তানে যেতেন কারও থেকে একটা শেরওয়ানি ও জুতা ধার করে। ষাটের দশকে শার্ট-পায়জামা, প্যান্ট-শার্ট এবং পাঞ্জাবি-পায়জামা একই সঙ্গে চলত। মোটের ওপর এই ছিল বাহাত্তরের জানুয়ারির আগের পোশাকপরিচ্ছদের অবস্থা।
সুখ ও সমৃদ্ধি আসে সত্তরের দশক থেকে। একেবারে নিম্নমধ্য থেকে এক লাফে উচ্চ। পারমিট, টেন্ডার ইত্যাদি যাঁরা অতি দ্রুত হস্তগত করতে পেরেছেন এবং যাঁরা যথেষ্ট স্মার্ট, তাঁরা স্যুট-কোটে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। বঙ্গীয় রাজনীতির সঙ্গে পায়জামা-পাঞ্জাবির একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সত্তরের দশক থেকে ফিনফিনে আদ্দির পাঞ্জাবি ও দামি টেট্রনের পায়জামা এবং তার ওপরে একটা হাতকাটা কটির মতো। যে ধরনের পোশাকে সুগঠিত দীর্ঘদেহী বঙ্গবন্ধুকে নায়কোচিত লাগত, সেই পোশাকেই অনেক ভুঁড়িঅলা বা পাতলা লিকলিকে অনেককে কার্টুনের মতো মনে হতো। আশির দশক নাগাদ এ দেশের রাজনৈতিক নেতাদের পোশাক-আশাক, বাড়ি-গাড়ি ও জীবনযাপনে যে পরিবর্তন আসে, তেমনটি আমেরিকায় আসতে ১০০ বছরের ওপরে লেগেছে। যানবাহনের প্রশ্নে পঞ্চাশের দশকে তো বটেই, ষাটের দশকেও ঢাকার অনেক নেতার অবলম্বন ছিল বাইসাইকেল। দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাঁরা যাতায়াত করতেন লঞ্চে বা ট্রেনে, প্রত্যন্ত এলাকায় নৌকায়। সত্তরের দশক পর্যন্ত দেশের রাস্তাঘাটও ছিল শোচনীয়। যোগাযোগের অসুবিধা সত্ত্বেও দেশের সব অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে নেতাদের সম্পর্ক সৃষ্টি হতো ব্যক্তিগত পর্যায়ে।
এখন কেউ ভাবতেও পারবে না সদরঘাট মোড় থেকে টাউন সার্ভিস বাস ইসলামপুর, মিটফোর্ড, চকবাজার, লালবাগ, আজিমপুর হয়ে নিউমার্কেট-নীলক্ষেত মোড় পর্যন্ত চলত। পঞ্চাশের দশকে ওই রুটে আমরা বাসে, রিকশায়, সাইকেলে বা হেঁটে বাংলাবাজার থেকে আজিমপুর-লালবাগ আসতাম। মিটফোর্ড পার হয়ে মোগলটুলী-চকবাজার এলে আব্বা আমাকে দেখাতেন একটি বাড়ি। ১৫০ নম্বর মোগলটুলী। ইতিহাসের সাক্ষী। ওই বাড়িতে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের প্রক্রিয়ার শুরু। তারপর টিকাটুলী কে এম দাস লেনের ‘রোজ গার্ডেন’ নামক বাড়িতে দলের আত্মপ্রকাশ। পঞ্চাশের দশকে এবং ষাটের প্রথম কিছুকাল আওয়ামী লীগের কার্যালয় ছিল নবাবপুরে। কোনো জৌলুশ ছিল না, কিন্তু তা মুখরিত থাকত বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের আনাগোনায়। তারপর অফিস আসে পুরানা পল্টন। সবশেষে গুলিস্তান-জিন্নাহ অ্যাভিনিউতে। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ। ওই সব কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় নেতা ও দলীয় সাধারণ কর্মীদের মধ্যে অবাধে মেলামেশা হতো। পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের লোকেরা সবার নাম টুকে রাখতেন তাঁদের খাতায়। ঝুঁকি নিয়ে নিচের দিকের নেতারা দলীয় কার্যালয়ে যাতায়াত করতেন।
এক দল থেকে আরেক বা একাধিক দলের জন্ম হতে পারে। সেটা স্বাভাবিক। তাকে দলের ভাঙন বলে না। কোন্দলও বলে না। ১৯৫৭ সালের ২৫ জুলাই আওয়ামী লীগ থেকে বামপন্থীরা বেরিয়ে অন্য আরও কয়েকটি দলকে নিয়ে গঠন করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি সন্তোষের লুঙ্গি-পরা এক বৃদ্ধের নেতৃত্বে। প্রথমে অফিস ছিল না। লিয়াকত অ্যাভিনিউর রয়েল স্টেশনারির ওপরে ব্যারিস্টার শওকত আলী খানের বাড়িতেই দলের কাজ চলত। সন্তোষের বৃদ্ধও ওই বাড়িতে এসে উঠতেন। ঢাকায় তাঁর অস্থায়ী বা স্থায়ী বাসা বা বাড়ি ছিল না। টিপু সুলতান রোডে ‘স্টেপ-ইন’ নামক এক বাড়িতেও উঠতেন। কখনো মগবাজারে সাইদুল হাসানের (একাত্তরে শহীদ) বাড়িতে।
পরে ন্যাপের অফিস হয় নবাবপুর-ঠাটারিবাজারের কাছে ‘নাইল ভ্যালি’ হোটেলের দোতলায়। সেখানেই থাকতেন আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ পাস করা কৃষকনেতা হাজী দানেশ, হাতেম আলী খান প্রমুখ। হাজী দানেশ নিজের হাতে ডাল, ভাত, তরকারি রান্না করে খেতেন এবং ন্যাপ কর্মীরা গেলে তাঁদেরও খেতে দিতেন। ন্যাপকে বাইরে থেকে নানাভাবে আর্থিক সাহায্য করতেন ডাক্তার আবদুল ওয়াদুদ, জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আওয়ামী লীগের সঙ্গেও সাইদুর রহমান স্যারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।
সেকালের আর একটি প্রধান দল কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সম্পর্কে কিছু না বলাই ভালো। এখনকার তরুণেরা মনে করবে গুল মারছি। পুরানা পল্টনে ছিল ঢাকা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির কার্যালয়। সেখানে থাকতেন জ্ঞান চক্রবর্তী, খোকা রায়, সুনীল রায়, অনিল মুখার্জি। কোনো দিন লক্ষ্মীবাজার থেকে হেঁটে আসতেন রণেশ দাশগুপ্ত। খোকা রায় সকালে উঠে পার্টির অফিস নিজের হাতে ঝাড়ু দিতেন। মাছ-তরকারি কুটে রান্নাবান্নাও করতেন। আমাদের মতো নির্বোধ ছোকরারা ওই সব বিষয়বুদ্ধি-বিবর্জিত নেতার কথা শুনতাম আর ভাবতাম, এই বুঝি দেশটায় বিপ্লব এল আর বদলে গেল পুরোনো সমাজটা।
এখন সকালবেলা খবরের কাগজ পড়ে এবং সন্ধ্যাবেলা টিভি চ্যানেলে খবর শুনে পুরোনো দিনের সব আজেবাজে স্মৃতি মাথার মধ্যে জড়ো হয়। সেখানে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি প্রভৃতি ছিল রাজনৈতিক দল। নেতারা ছিলেন জনগণের নেতা। রাজনৈতিক দল ডিপার্টমেন্ট স্টোর বা হাঁস-মুরগি বা গরু-ছাগলের খামারের মতো প্রতিষ্ঠান নয়। দলের নেতা ইচ্ছামতো একে বরখাস্ত ওকে নিযুক্তি দিতে পারেন না ডিপার্টমেন্ট স্টোরের মালিক বা চেয়ারম্যানের মতো। রাজনৈতিক দলের অফিস আর কোনো কোম্পানির চিফ এক্সিকিউটিভের কার্যালয় এক রকম নয়।
৫০-৬০ বছর আগে ধড়িবাজ-বাটপার ধরনের লোকের রাজনীতিতে স্থান ছিল না। সেখানে রাজনীতিই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, দলের আলিশান কার্যালয় নয়। তখন ‘আসল’ দলের লোকেরা নকল দলের অফিস দখল করতে ট্রাক নিয়ে দিগ্বিজয়ী বীর আলেকজান্ডারের মতো অভিযানে বের হতেন না। তারপর ধাওয়া–পাল্টাধাওয়া, মারপিট ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ। দাউ দাউ করে জ্বলছে ট্রাক আর তার সওয়ারিরা ভোঁ-দৌড় দিতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে ভাঙছেন হাঁটু।
রাজনীতি আর মন্ত্রিত্ব, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত, সংসদে বিরোধী দলের নেতৃত্ব—সবই একসঙ্গে ককটেল বানানো শুধু কলিযুগেই সম্ভব। ধারণা করা যায় কি কোনো দেশে বিরোধী দলের কোন্দল মেটাতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা হচ্ছে? ভাবা যায়, আওয়ামী লীগ বা ন্যাপের নেতারা নিজেদের বিরোধ মেটাতে গভর্নর মোনায়েম খানের শরণাপন্ন হচ্ছেন? মন্ত্রিত্ব বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা না নিয়ে বাইরে থেকে সরকারকে সমর্থন দিলে তা হতো সততা। ব্যক্তিস্বার্থে রাষ্ট্রকে ব্যবহার করার নাম রাজনীতি নয় এবং জনগণকে ছাগল মনে করা ঘোরতর অন্যায়। কামরুল হাসানের জীবনের শেষ ছবিটির কথা মনে পড়ে, যার ক্যাপশন: দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার কবলে। কী অমোঘ সত্য কথা বলেছেন নেতা: ‘আওয়ামী লীগ তার প্রয়োজনেই জাপাকে শক্তিশালী করবে।’
একজনের ১০টি বছর মন্ত্রিত্ব করেও সাধ মেটেনি। এখন আবার সরকারি দলে যাওয়ার জন্য এক পায়ে খাঁড়া। শুধু হাতছানির হাতটা নড়তে দেখলেই হয়। আগে নেতাদের দেখেছি দল শক্তিশালী করাকে মন্ত্রিত্বের চেয়ে সম্মানজনক মনে করতেন। ১৯৫৭-তে শেখ মুজিব মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দলের সাধারণ সম্পাদক হওয়াই বড় দায়িত্ব মনে করেছেন। মনে আছে, ১৯৭৪-এ এ এইচ এম কামারুজ্জামান আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর জায়গায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন ও পানিসম্পদমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাককে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেখানে এখন বিরোধী দলের পরিচয় দিয়ে মন্ত্রিত্ব কামড়ে পড়ে থাকা নির্লজ্জতা নয় কি?
বিএনপি ও জাতীয় পার্টি দুটোরই জন্ম ক্ষমতাসীন অবস্থায়। তাই সরকারের বাইরে থেকে যে রাজনীতি হয়, তা মানতে তারা বাধ্য নয়। কোনো দলের জাতীয় কাউন্সিল অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। তাতে পূর্ববর্তী বছরগুলোর নেতাদের কাজের মূল্যায়ন হয় এবং আগামী বছরগুলোতে নতুন নেতৃত্ব কী করবেন, তা ঠিক করা হয়। দল যদি প্রাইভেট কোম্পানিতে পরিণত হয় তাহলে এক কাউন্সিল থেকে আরেক কাউন্সিল থোড় বড়ি খাড়া—খাড়া বড়ি থোড় মাত্র।
বিএনপি যদি ডান্ডি ডাইংয়ের আর একটি ভ্রাতৃপ্রতিম প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে, তাহলে মার্চে কাউন্সিল করেও লাভ নেই, বরং ২০১৯-এর মার্চে গিয়ে করলেই ভালো। স্মৃতি থেকে যেটুকু মনে পড়ে, বিএনপির কোনো মহাসচিবই স্বাধীনমতো কাজ করা শুধু নয়, পুরো মেয়াদ পার করতে পারেননি। হয় পরপারে গেছেন, নয়তো পদ থেকে হয়েছেন বরখাস্ত। মান্নান ভূঁইয়ার প্রতি খালেদা জিয়া ভদ্রজনোচিত আচরণ করেননি। কে এম ওবায়দুর রহমান ভালো নেতা ছিলেন। এক রাত আগেও জানতেন না যে তিনি পদ হারাচ্ছেন। দলের সেক্রেটারি বানাতে হয় তরুণ ও দক্ষ নেতাকে। বুড়োরা ইমামতি করতে পারেন, দলের নেতৃত্ব নয়। মির্জা আলমগীরের মতো একজন অসাম্প্রদায়িক ভদ্র ও প্রগতিশীল নেতাকে শুধু ভারই বহন করতে হলো।
তবু আশা করি, নেতারা শুভবুদ্ধির পরিচয় দেবেন। বাংলাদেশের পথভ্রষ্ট রাজনীতি তার অতীত ঐতিহ্য থেকে শিক্ষা নেবে এবং এ বছর স্বাভাবিক ধারায় ফিরে এসে মানুষকে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে মুক্তি দেবে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।