Thursday, November 5, 2015

অরুন্ধতী রায়ও পুরস্কার ফিরিয়ে দিলেন

অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদে এবার পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিলেন ভারতীয় লেখক অরুন্ধতী রায়। পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়া সাহিত্যিকদের তালিকায় এবার যুক্ত হলো তাঁর নাম।
আজ বৃহস্পতিবার এনডিটিভি ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে জানানো হয়, ভারতে সম্প্রতি কয়েকটি ‘ভয়ংকর হত্যাকাণ্ডের’ প্রতিবাদে অরুন্ধতী রায় জাতীয় পুরস্কার ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ২৪ জন চলচ্চিত্র নির্মাতা তাঁদের অর্জিত জাতীয় পুরস্কার আজ ফেরত দেন।
ভারতে সম্প্রতি বাড়িতে ঢুকে স্বাধীন মত প্রকাশকারী একজন শিক্ষাবিদকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে গুজবের জেরে সহিংস হামলায় আরও দুজন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনার প্রতিবাদে এর আগেও অন্তত ৫০ জন লেখক-বুদ্ধিজীবী তাঁদের অর্জিত বিভিন্ন পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় তাঁর লেখা ‘কেন আমি পুরস্কার ফিরিয়ে দিচ্ছি’ শিরোনামের একটি নিবন্ধ আজ প্রকাশিত হয়েছে। এতে তিনি লিখেছেন, সাম্প্রতিক ভয়াবহ ঘটনাগুলো ‘গভীরতর অসুস্থতার লক্ষণ’।
‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ শীর্ষক বইয়ের জন্য ১৯৯৭ সালে বুকার পুরস্কার পান লেখক অরুন্ধতী রায়। তিনি বলেন, ২০০৫ সালে পাওয়া সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তখন কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় ছিল। ফলে তাঁকে যেন কংগ্রেস বনাম বিজেপির পুরোনো বিতর্কে জড়ানো না হয়।

জাতীয় সংলাপ চান খালেদা জিয়া

বর্তমান সময়কে ক্রান্তিকাল আখ্যা দিয়ে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, সংকট উত্তরণে সরকার কর্তৃত্ববাদী মনোভাব থেকে সরে এসে একটি জাতীয় সংলাপের সূচনার পরিবেশকে উন্মুক্ত করবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
আজ বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ কথা বলেন খালেদা জিয়া। চিকিৎসার জন্য তিনি দেড় মাসের বেশি সময় ধরে লন্ডনে অবস্থান করছেন। বিএনপির মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপন বিবৃতিতে সই করেন।
বর্তমান সংকটকে রাজনৈতিক আখ্যা দিয়ে এর জন্য সরকারকে দায়ী করে খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, ‘সরকার নিজেই এই সংকট সৃষ্টি করেছে, যা ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতর হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশে অবাধ নিরপেক্ষ ও সকল দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর থেকেই দেশে রাজনৈতিক সংকটের সূচনা। এ সংকট উত্তরণে সরকারকে সময় থাকতেই এর উপায় বের করতে হবে। আমাদের দল মনে করে, একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনতিবিলম্বে একটি নির্বাচনের আয়োজন এখন জরুরি।’
খালেদা জিয়া বলেন, ঘরে-বাইরে এখন কেউই নিরাপদ বোধ করছেন না। চারদিকে আতঙ্ক, উত্কণ্ঠা ও উদ্বেগ গোটা জাতিকে গ্রাস করেছে, যেন সামনে ঘোর অন্ধকার। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একটি ভোটারবিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর সরকার প্রধান অচিরেই আরেকটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার পর দেশে আজ এক সর্বগ্রাসী কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থায় বিপর্যস্ত। দেশ আজ গভীর সংকটেও নিপতিত। এখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নেই। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুজন সদস্য মাত্র ১৩ দিনের ব্যবধানে দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত হয়েছেন। অতি সম্প্রতি দুজন বিদেশির দুঃখজনক হত্যাকাণ্ডের পর একজন প্রকাশকও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, ‘হিংসাশ্রয়ী রাজনীতির চর্চা করে সরকার দেশের সকল বিরুদ্ধমতকে দমনে আজ বেপরোয়া। তারা শুধু বিএনপিই নয়, নাগরিক সমাজ, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যেমন—ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার বিরুদ্ধেও সরকারের সমালোচনা করায় ক্ষুব্ধ। এমনকি সরকারি রোষানলের বাইরে গণমাধ্যমও নয়। যারাই সরকারের অপশাসন, দুঃশাসন, দুর্নীতির সমালোচনা করছে, সরকার তাদের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত।’
সরকার বিএনপিকে সন্ত্রাসী চরিত্রের কালিমা দিতে চাইছে বলে অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি একটি গণতন্ত্র পন্থার দল। বিএনপি কোনোভাবেই কোনো ধরনের উগ্রপন্থাকে সমর্থন করে না।
বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, ‘এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমরা জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছি, সর্বদলীয় বৈঠকের কথাও বলেছি। আমি বারবার জাতীয় সংকট মোকাবিলায় জরুরিভাবে জাতীয় সংলাপের আহ্বান জানিয়েছি আন্তরিকভাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও সত্য যে, সরকার আমাদের সে দাবির প্রতি এখন পর্যন্ত কর্ণপাত করেননি।’
খালেদা জিয়া ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া, সকল পর্যায়ে বিচার ব্যবস্থায় স্বাধীন বিবেচনাবোধে কাজ করতে উৎসাহিত করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে বাধা না দেওয়া, দলীয়করণকৃত প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া এবং নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পুনর্গঠন করা, সব রাজবন্দীদের মুক্তি দেওয়া ও মিথ্যা মামলা তুলে নেওয়ার দাবি জানান।
খালেদা জিয়া বলেন, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে তাঁরা হিংসাশ্রয়ী-অসহিষ্ণু রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেবন না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম, নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রের সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান দলীয় রাজনীতির প্রভাবের বাইরে কাজ করতে পারবেন।
বিএনপির চেয়ারপারসন অভিযোগ করেন, পরিস্থিতির উন্নতির জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ না নিয়ে সরকার বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ধরপাকড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে কারাগারে পাঠানোর সমালোচনা করেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, কারাগারে মির্জা ফখরুলের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটাই স্বাভাবিক। সরকার জেনে বুঝে একজন অসুস্থ মানুষকে পুনরায় কারাগারে পাঠানোর মধ্য দিয়ে তার জীবনে স্বাস্থ্য ঝুঁকিকে বাড়িয়ে তুলেছে।
বিএনপির চেয়ারপারসন অবিলম্বে দলের মির্জা ফখরুল, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, এম কে আনোয়ার, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র এম এ মান্নান, সাংবাদিক শওকত মাহমুদ, যুগ্ম মহাসচিব আমান উল্লাহ আমান, রুহুল কবীর রিজভী, সাবেক সংসদ সদস্য দেওয়ান সালাউদ্দিন বাবু, কেন্দ্রীয় সদস্য সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জি কে গউস, কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি শরিফুল আলম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে হাফিজুর রহমান ও জহিরুল হকসহ দলের এবং অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের গ্রেপ্তার হওয়া কর্মী ও নেতাদের আশু মুক্তির দাবি জানান।

ইতালীয় নাগরিক হত্যা: তিন সন্দেহভাজনের বাসায় দূতাবাসের কর্মকর্তারা by নজরুল ইসলাম

ইতালির নাগরিক সিজার তাবেলা হত্যায় তিন সন্দেহভাজনের বাসায় গিয়ে তাঁদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছেন ঢাকায় ইতালীয় দূতাবাসের কর্মকর্তারা। এঁদের মধ্যে বিএনপির নেতা সাবেক কমিশনার এম এ কাইয়ুমের ছোট ভাই এম এ মতিনও রয়েছেন।
গতকাল বুধবার মধ্যরাতে ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় গতকাল বেনাপোল থেকে মতিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মিনহাজুল আরেফিন রাসেলের জবানবন্দিতে মতিনের নাম এসেছে বলে পুলিশ দাবি করেছে।
সিজার তাবেলা হত্যা মামলায় গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) এ পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। এঁদের মধ্যে যে দুজনের বাসায় ইতালীয় দূতাবাসের কর্মকর্তারা গিয়েছেন, তাঁরা হলেন তামজিদ আহম্মেদ রুবেল (৩৫) ও শাখাওয়াত হোসেন ওরফে শরিফ (৩৫)। গ্রেপ্তার বাকি দুজন হলেন মিনহাজুল আরেফিন রাসেল (৪০) ও রাসেল চৌধুরী (৩৫)। এঁদের মধ্যে রাসেল চৌধুরী ছাড়া বাকি তিনজন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। রাসেল চৌধুরীকে গত মঙ্গলবার দ্বিতীয় দফায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
গত মঙ্গলবার মধ্য বাড্ডার গুদারাঘাটে তামজিদের বাসায় গেলে তাঁর মামা মাইনউদ্দিন আহমেদ ওরফে তৌহিদ মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, গত ২৭ অক্টোবর বেলা তিনটার দিকে দুজন বিদেশি তাঁদের বাসায় যান। তাঁরা নিজেদের ইতালীয় দূতাবাসের কর্মকর্তা বলে পরিচয় দেন। এঁদের একজন ইংরেজিতে কথা বলেন, আরেকজন ছিলেন দোভাষী। দোভাষী ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে কথা বলে তা ইংরেজিতে রূপান্তর করে সঙ্গী কর্মকর্তাকে বলেছেন এবং তিনি ল্যাপটপে তা লিখে নিয়েছেন।
মাইনউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, তামজিদকে কবে, কোথা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁর বিষয়ে কেন বাড্ডা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে, তা জানতে চান কর্মকর্তারা। জবাবে তিনি বলেছেন, তামজিদ ১২ অক্টোবর নিখোঁজ হন। ২১ অক্টোবর তাঁরা বাড্ডা থানায় জিডি করেন। ২৬ অক্টোবর টিভি দেখে তাঁরা জানতে পারেন, তাঁকে ইতালির নাগরিক হত্যায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ তাঁকে কয়েক ঘণ্টা আগে ধরেছিল বলে দাবি করে সংবাদ সম্মেলনে।
মাইনউদ্দিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের বলেছেন, তামজিদের বিরুদ্ধে আগে থানায় কোনো মামলা কিংবা জিডি ছিল না। তাঁর বাসায় এর আগে কখনো পুলিশও আসেনি। তামজিদ তাঁদের কিছু বলেছেন কি না—ইতালীয় দূতাবাসের কর্মকর্তাদের এই প্রশ্নের জবাবে মাইনউদ্দিন বলেছেন, ডিবি পুলিশের চাপের মুখে তামজিদ হত্যার দায় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন বলে তাঁদের জানিয়েছেন। এ ছাড়া কারাগারে দেখা করতে গেলে তামজিদকে তাঁরা খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখেছেন।
শাখাওয়াত হোসেন ওরফে শরিফের মধ্য বাড্ডার গুদারাঘাটের বাড়িতে ইতালীয় দূতাবাসের কর্মকর্তারা গিয়েছেন গত ১৬ অক্টোবর বেলা তিনটায়। বাড়ির তত্ত্বাবধানকারী মো. রিপন গত মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, দুজনের একজন ইংরেজিতে কথা বলেছেন, আরেকজন বাংলায়। কর্মকর্তারা জানতে চেয়েছেন, শাখাওয়াত কবে, কোথা থেকে, কীভাবে ধরা পড়লেন? জবাবে তিনি বলেছেন, ১৪ অক্টোবর মধ্যরাতে সাদা পোশাকের ১৪-১৫ জন এসে নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিলে তিনি বাড়ির প্রধান ফটক খুলে দেন। এরপর তাঁরা সরাসরি ছয়তলায় শাখাওয়াতের ঘর থেকে তাঁকে আটক করেন। ওই সময় শাখাওয়াতকে হাতুড়িপেটাও করা হয়। ওই সময় তাঁরা গ্যারেজে থাকা শাখাওয়াতের মোটরসাইকেলটি টেনে রাস্তায় নিয়ে তালা ভেঙে ফেলেন এবং সেটি নিয়ে যান। এই মোটরসাইকেলটি হত্যার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে বলে পুলিশ দাবি করেছে। ২৬ অক্টোবর ডিবি পুলিশ সংবাদ সম্মেলন করে শাখাওয়াতকে গ্রেপ্তার ও মোটরসাইকেল উদ্ধারের কথা জানায়।
ইতালীয় দূতাবাসের কর্মীরা বাড়ির তত্ত্বাবধানকারী মো. রিপনের কাছে জানতে চান শাখাওয়াতের বিরুদ্ধে থানায় কোনো মামলা আছে কি না। তিনি তাঁদের জানিয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। শাখাওয়াতের বড় ভাই মোহাম্মদ হোসেন ভূঁইয়া এই কথোপকথনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামির পরিবারের সঙ্গে ইতালীয় দূতাবাসের কর্মকর্তারা কথা বলেছেন কি না, জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক মো. জিহাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, দূতাবাস চাইলে আসামিদের বিষয়ে নিজেদের মতো করে খোঁজখবর নিতে তাঁদের বাসায় যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে তাঁকে তারা কিছু জানায়নি।
অভিযুক্তদের বাড়িতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে গতকাল দুপুরে জানতে চাইলে ঢাকায় ইতালীয় দূতাবাসের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে দূতাবাসের সূত্র নিশ্চিত করেছে, রাষ্ট্রদূত মারিও পালমা ও দূতাবাসের কনসুলার বিভাগের প্রধান জভানি চিয়ানি এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সরাসরি খোঁজ-খবর রাখছেন।
দুই আসামির জবানবন্দিতে হত্যায় জড়িত হিসেবে ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার এম এ কাইয়ুমের ছোট ভাই এম এ মতিনের নাম এসেছে বলে পুলিশ দাবি করেছে। তাঁর বাসাও মধ্য বাড্ডার গুদারাঘাটে। দিন তিনেক আগে ইতালীয় দূতাবাসের কর্মকর্তা পরিচয়ে দুজন তাঁদের বাসায়ও যান।
মতিনের স্ত্রী মুসাররাত জাহান দিলরুবা প্রথম আলোকে বলেন, দুই ব্যক্তি তাঁদের ইতালীয় দূতাবাসের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে তাঁদের বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁরা নিরাপত্তাকর্মীর কাছে জানতে চান মতিন কোথায় আছেন, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা আছে কি না। জবাবে নিরাপত্তাকর্মী তাঁদের বলেছেন, ২০ অক্টোবর এশার নামাজে যাওয়ার সময় বাসার কাছ থেকে সাদা পোশাকের কিছু ব্যক্তি ডিবি পরিচয়ে মতিনকে তুলে নিয়ে গেছেন। এখন পর্যন্ত তাঁর খোঁজ মেলেনি। নিরাপত্তাকর্মী তাঁদের জানিয়েছেন, মতিনের বিরুদ্ধে থানায় কোনো মামলা কিংবা জিডি নেই।

ব্রাদারহুডকে নিয়ে ভোল পাল্টালো মিশরের স্বৈরশাসক সিসি

মিশরীয় স্বৈরশাসক আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি বলেছেন, তার দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল মুসলিম ব্রাদারহুড আবার প্রকাশ্য ভূমিকা রাখতে পারে। ব্রিটেন সফরের প্রাক্কালে বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সিসি এ মন্তব্য করেন।
এর মাধ্যমে সিসি দৃশ্যত ব্রাদারহুডের প্রতি সুর নরম করার ইঙ্গিত দিলেন, যিনি ক্ষমতা দখলের পর এই দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে রাখা হয়েছে।
‘সমস্যা সরকার বা আমাকে নিয়ে নয়। এটা জনমত নিয়ে, মিশরীয়দের নিয়ে। মিশরীয়রা শান্তিপ্রিয় এবং তারা সহিংসতা পছন্দ করেন না। তারা ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল এবং তাদের নিয়ে শঙ্কিত,’ দাবি করেন সিসি।
সিসি জনগণের দোহাই দিলেও ২০১১ সালে স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতনের পর সিসির ক্ষমতা দখলের আগে মিশরে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে তার প্রতিটিতেই ব্রাদারহুড বিপুল জয় পেয়েছে এবং এসব নির্বাচন নিয়ে কেউ প্রশ্নও তোলেনি।
ব্রাদারহুডের ব্যাপারের নমনীয় অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়ে সাক্ষাৎকারে সিসি আরো বলেন, ‘এই দেশটা এত বড় যে তা আমাদের সবাইকে সঙ্কুলানের জন্য যথেষ্ট। তারা (ব্রাদারহুড) মিশরের অংশ এবং মিশরীয় জনগণকে অবশ্যই নির্ধারণ করতে হবে যে তারা কি ভূমিকা পালন করতে পারে।’
২০১৩ সালের জুলাইয়ে বন্দুকের নলের মাথায় ক্ষমতা দখলের পর সিসি ব্রাদারহুডের শত শত নেতাকর্মীকে হত্যা করেছেন এবং অন্তত ৪০,০০০ নেতাকর্মীকে কারাবন্দী করেছেন। এদের মধ্যে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিসহ অনেককেই প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে ফাঁসির দণ্ড দেয়া হয়েছে।
বুধবার ব্রিটেন সফর শুরু করেছেন সিসি। তবে ব্রিটেনের বহু গণমাধ্যমে সিসিকে স্বৈরশাসক আখ্যা দিয়ে তাকে স্বাগত জানানোর জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে।
ব্রিটেনের বিরোধীদলীয় নেতা সিসিকে ব্রিটেনে স্বাগত জানানোর সমালোচনা করে একে ‘মানবিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের অবমাননা’ বলে মন্তব্য করেছেন।

প্রেসিডেন্ট না-হলেও সরকারে নেতৃত্ব দেব আমিই : সু চি

মিয়ানমারের বিরোধী নেত্রী আং সান সু চি অঙ্গীকার করেছেন, সে দেশের আসন্ন নির্বাচনে তার দল জিতলে তিনিই সরকারের নেতৃত্ব দেবেন – যদিও তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না।
মিয়ানমারে আগামী ৮ নভেম্বর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেটা হবে সে দেশে গত ২৫ বছরের মধ্যে প্রথম উন্মুক্ত নির্বাচন।
কিন্তু এই নির্বাচনে সু চি’র দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) যদি জেতে, তাহলেও দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে তার সাংবিধানিক বাধা রয়েছে।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যে সংবিধানের খসড়া তৈরি করেছে, তাতে বলা হয়েছে বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করলে কেউ দেশের প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না।
আং সান সু চি-র প্রয়াত স্বামী মাইকেল অ্যারিস ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক, ফলে নতুন সংবিধান অনুযায়ী দেশের প্রেসিডেন্টর পদ মিস সু চি’র জন্যও রুদ্ধ।
কিন্তু এই পটভূমিতেও সু চি আজ দেশের বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গনে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছেন এভাবে তাকে আটকানো যাবে না – কারণ ভোটে তার দল জিতলে সরকার পরিচালনা করবেন তিনিই।
বিরোধী নেত্রী জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট হতে না-পারলেও নতুন সরকারের প্রধান হবেন তিনিই।
তবে পাশাপাশি একজন প্রেসিডেন্টকেও নিয়োগ করা হবে, যিনি ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসির আদর্শ ও নীতি অনুসরণ করে কাজকর্ম চালাবেন।
মিয়ানমার থেকে বিবিসির এক সংবাদদাতা বলেছেন, আং সান সু চি’র এই বক্তব্যকে দেশের সেনাবাহিনীর উদ্দেশে ছুড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তিনি আরো বলছেন, মিস সু চি’র এই বক্তব্যকে অসাংবিধানিক বলেও চিহ্নিত করা হতে পারে। সূত্র : বিবিসি

আমাদের ‘ভোঁতা বিবেক’ by ইলিরা দেওয়ান

শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী (টুটুল) ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রকাশক-লেখক সম্পর্ক। সে সুবাদে তিনি যে কতটা নিখাদ উদার মনের একজন সেটি না বলে আমি কোনোভাবে নিবন্ধের শিরোনামের প্রসঙ্গে যেতে পারছি না। ২০১১ সালের কথা। পত্রিকায় মাঝে মাঝে লেখালেখি করি। সে সুবাদে আমার অর্ধশতাধিক লেখা জমা হয়েছে। বন্ধুদের পরামর্শে প্রকাশিত লেখাগুলোর একটি সংকলন প্রকাশ করার সাধ একদিন আমার মনেও জাগল। আমার এক সাংবাদিক বন্ধুর কাছে এই বিষয়ে পরামর্শ চাইলে তিনি এককথায় শুদ্ধস্বরের কর্ণধার টুটুল ভাইয়ের কাছে আমাকে পাঠিয়ে দিলেন। একদিন গুটি গুটি পায়ে শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের দ্বিতীয় বা তৃতীয় তলায় (ঠিক মনে নেই) শুদ্ধস্বরের অফিসে গিয়ে হাজির হই। টুটুল ভাইয়ের সঙ্গে পরিচিত হলাম। তিনি প্রথম সাক্ষাতে আমার সঙ্গে যে আন্তরিকতা নিয়ে কথা বললেন এবং আমাকে বই প্রকাশের ব্যাপারে আশ্বস্ত করলেন, এতে আমি বুঝে গেছি আগামী বইমেলায় আমার বই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে! এবং হয়েছেও তাই।
একই দিনে দৃর্বৃত্তদের হাতে খুন হলেন লেখক-প্রকাশক জাগৃতির স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপন এবং আহত হলেন শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরীসহ দুজন ব্লগার-লেখক। প্রকাশক দীপন হত্যা ও তিন লেখক-প্রকাশককে হত্যাচেষ্টার প্রতিবাদে ১ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদতলে ‘শিক্ষক-শিক্ষার্থী লেখক ও নাগরিকবৃন্দ’-এর ডাকে এক বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। সকালে টিভির স্ক্রলে এ সংবাদ দেখে অফিসের উদ্দেশে বাসা থেকে একটু আগেই বেরিয়ে পড়ি। পরে অফিস থেকে সরাসরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির চত্বরে সকাল ১০টার আগেই পৌঁছাই। পৌঁছে টিএসসির পরিবেশ দেখে মনে হলো দেশে কোথাও কিছুই ঘটেনি! সবকিছু স্বাভাবিক। বেলা পৌনে ১১টার দিকে কলাভবনের দিক থেকে ৩০-৪০ জন ছাত্রছাত্রীর একটি মিছিল রাজু ভাস্কর্যের দিকে এগিয়ে গেল, এরপরে মাইক সচল হলো। আমিও মাইকের আওয়াজে সমাবেশের সামনে গিয়ে বসে পড়লাম। একে একে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রকাশক, বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন স্তরের বক্তারা আসতে শুরু করলেন।
কিন্তু সমাবেশ শুরুর পর থেকে আমার বিবেককে যে বিষয়টি বারবার ধাক্কা দিচ্ছিল সেটি হলো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্রে প্রকাশক হত্যা ও হত্যাচেষ্টার প্রতিবাদ সমাবেশে ১০০ ছাত্রও প্রতিবাদ জানাতে এলেন না কেন! আমাদের ‘বিবেক’ ‘অনুভূতি’ কি তাহলে এতটাই ভোঁতা হয়ে গেছে? ২৪ ঘণ্টাও পেরোয়নি, মাত্র ১২ ঘণ্টা আগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঁচ মিনিট হাঁটাপথ দূরত্বে আজিজ সুপার মার্কেটে একজন মুক্তমনা মানুষ দিনদুপুরে খুন হলেন, অথচ আমাদের প্রতিবাদের ক্ষোভটুকু এর মধ্যে নিভে গেল! দীপন, আপনি আমাদের ক্ষমা করবেন!
পরে অবশ্য বিভিন্ন মহল থেকেই প্রতিবাদ হয়েছে। গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যোগে অাধা বেলা হরতালও হয়েছে। এখনো প্রতিবাদ হচ্ছে।
আসলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের মস্তিষ্ককে ভোঁতা করে ফেলছে। নইলে যে তরুণসমাজ বিবেক দ্বারা তাড়িত হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তারা কেন আজ নীরব হয়ে পড়ছে?
আমরা বলছিলাম অতীতে সব আন্দোলনের সূতিকাগার নামে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। এর প্রতিটি আবাসিক হলে কম করে হলেও ৫০০ থেকে ৮০০ ছাত্রছাত্রী অবস্থান করেন। সেই হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রী থাকার কথা। কেবল পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনের জন্যই কি এই সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী এসেছেন? আমাদের কি তাহলে এই কথা বিশ্বাস করতে হবে যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তাঁদের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিবেক জাগ্রত করতে পারেননি! সদ্য সন্তানহারা পিতা যখন সন্তানের মৃত্যুর বিচার না চেয়ে পুরো জাতির মুক্তির জন্য ‘শুভবুদ্ধির উদয়ের’ আহ্বান জানান তখন আমাদের মতো ‘ভোঁতা বিবেক’সম্পন্ন জীবদের মাথা নুয়ে পড়াটাও কম হয়ে যায় বৈকি!
বিচারহীনতার সংস্কৃতি একদিকে সন্ত্রাস, হত্যা, খুন, রাহাজানির মাত্রাকে নীরবে প্রশ্রয় দিচ্ছে, অন্যদিকে নিত্যদিনের খুন, রাহাজানি আমাদের বিবেককে ঘুমিয়ে রেখেছে। কারও মৃত্যু আমাদের মন কাঁদায় না, বিবেককেও জাগায় না! পেট্রলবোমার আগুনে মানুষ ঝলসে যাচ্ছে, তাতে কী হয়েছে! ফাস্ট ফুডের দোকানে বসে ঝলসানো গ্রিল, শিক কাবাব ছাড়া যে আমার ব্রেকফাস্ট করার ষোলো আনা পূর্ণই হয় না! মায়ের পেটের শিশু গুলিবিদ্ধ হয়েছে তো কী হয়েছে, আমার দেশের ১৬ কোটি জনশক্তি আছে না! যাকে ইচ্ছা তাকে গুলি করব, বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে রিকশার ওপর গাড়ি তুলে দেব—কার বাপের সাধ্য আমাকে আইনের জালে আটকায়?
রাষ্ট্রের বিচারহীনতার সংস্কৃতি কতটা প্রকট হলে একজন সন্তানহারা পিতা সন্তান হত্যার বিচার চান না! আর কতটা অন্ধকারে নিমজ্জিত হলে আমাদের হুঁশ হবে, আমাদের এবার জাগতে হবে! আর কত মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর আমরা জানব দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সামান্য অবনতি হয়েছে! তাহলে কি ব্লগার, দেশি-বিদেশি নাগরিকেরা একে একে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’র শিকার হতেই থাকবেন যতক্ষণ না সরকারের গায়ে তা না লাগে? আর সরকারের গায়ে লাগেনি সেটাই বা বলি কী করে? এই তো মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সন্ত্রাসীদের হাতে দুজন পুলিশ সদস্য মারা গেলেন।
আসলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের মস্তিষ্ককে ভোঁতা করে ফেলছে। নইলে যে তরুণসমাজ বিবেক দ্বারা তাড়িত হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তারা কেন আজ নীরব হয়ে পড়ছে? তবে সবাই যে নীরব নয়, সেটাও লক্ষ করি গত কয়েক দিনের কর্মসূচিতে। কিন্তু এই রুটিন প্রতিবাদ কর্মসূচি কিংবা প্রতিবাদকারীদের ক্ষীণকণ্ঠ সন্ত্রাসীদের নিবৃত্ত করতে কিংবা রাষ্ট্র নামের কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙাতে পারবে কি?
ইলিরা দেওয়ান: মানবাধিকারকর্মী।
ilira.dewan@gmail.com

সতর্কতার শৈথিল্য আছে

মুহাম্মাদ নুরুল হুদা
মাত্র ১৩ দিনের ব্যবধানে দুর্বৃত্তরা ছুরিকাঘাত করে ও কুপিয়ে হত্যা করেছে দায়িত্বরত দুই পুলিশ সদস্যকে। গতকাল এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূরুল হুদার সঙ্গে কথা বলেন শেখ সাবিহা আলম
প্রথম আলো: দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে নিরাপত্তাচৌকিতে হামলা হলো...
নূরুল হুদা: মনে হচ্ছে নিরাপত্তাচৌকিতে পুলিশের যতটুকু সতর্কতা নেওয়া প্রয়োজন ছিল, ততটুকু নেওয়া হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী একজন যখন তল্লাশি করবেন, অন্যজন তখন সতর্কভাবে পাহারা দেবেন। যাঁরা নিরাপত্তাচৌকিতে দায়িত্ব পালন করেন, তাঁরা তো এ বিষয়গুলো জানেন। তল্লাশির বিষয়টি খুবই সূক্ষ্ম একটা বিষয়। মানুষ হয়রানির অভিযোগ তোলে, বলে যে তার চলাচলের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। মনে হচ্ছে, ঠিক যে মাত্রায় সতর্কতা নেওয়া দরকার, সে মাত্রায় নেওয়া হয়নি।
প্রথম আলো: পরপর পুলিশের ওপর হামলা সামগ্রিকভাবে বাহিনীর মনোবলের ওপর কোনো প্রভাব কি ফেলছে?
নূরুল হুদা: সেটা মনে করছি না। পুলিশের চাকরিটাই ঝুঁকির। কেউ একজন অতর্কিতে এসে কোনো একজন পুলিশকে হত্যা করলে পুরো বাহিনীর মনোবল ভেঙে যাবে, বিষয়টা তা নয়। অন্য পেশার ক্ষেত্রে হয়তো এমনটা হতে পারে। তবে যেটা মনে হচ্ছে, এ পরিস্থিতিতে যথেষ্ট সতর্কতা নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা শৈথিল্য আছে। যারা হামলা করছে, তারা তো মনে হচ্ছে মরিয়া।
প্রথম আলো: শুধু লেখালেখির জন্য এ পর্যন্ত বেশ কয়েকজনকে হত্যা করা হলো, পরপর দুজন বিদেশি খুন হলেন, জাগৃতির কর্ণধারকে খুন করা হলো, হামলার শিকার হলেন বেশ কয়েকজন। পুলিশ কোনো ঘটনারই সুরাহা করতে পারছে না। আপনি কি মনে করেন, পুলিশের দক্ষতার অভাব রয়েছে?
নূরুল হুদা: একেবারেই অগ্রগতি নেই তা কিন্তু বলা যাবে না। রাজীবের হত্যাকারীদের কিন্তু পুলিশ ধরে ফেলেছে। এটা অবশ্য সত্য যে যত দ্রুত হত্যাকারীদের ধরে আইনের হাতে সোপর্দ করা দরকার ছিল, সেটা হয়নি। আসলে কোনো কোনো নীতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি সব সময়ের জন্য এক হওয়া দরকার। একটি নীতি স্থির করে সে অনুযায়ী কৌশল ঠিক করতে হবে। দেখা যাচ্ছে, কোনো সরকারের সময় এ ধরনের অপরাধের বিষয়ে যতটা গুরুত্ব দেওয়া দরকার ছিল, ততটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেলে চলবে না।
প্রথম আলো: তার মানে, আপনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো গাফিলতি দেখছেন না?
নূরুল হুদা: এ ধরনের হামলা সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্যের অপর্যাপ্ততা আছে। সুনির্দিষ্টভাবে যে দক্ষতা থাকা দরকার, সেদিকে আরও মনোযোগী হতে হবে। ওরা তো আর সাজ সাজ রব নিয়ে হামলাটা করছে না। সে কারণে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাটা যথেষ্ট শক্ত হওয়া দরকার ছিল। গোয়েন্দা তথ্য সময়মতো হাতে থাকা প্রয়োজন ছিল।

পঁচাত্তরের নভেম্বর: পাল্টা অভ্যুত্থানে জিয়ার ক্ষমতা গ্রহণ by এইচ এম এ গাফফার

পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ও শাফায়াত জামিল যখন বঙ্গবন্ধুর খুনি চক্রকে উৎখাত করার উদ্যোগ নেন, তখন ২২তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন লে. কর্নেল হালদার মোহাম্মদ আবদুল গাফফার। সে সময়ের ঘটনাবলি ও তাঁর নিজের সংশ্লিষ্টতার প্রসঙ্গটি তুলে ধরেছেন এই লেখায়।
আগেই বলেছি, ৬ নভেম্বর মধ্যরাতের পর থেকেই সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা জাসদের সদস্য তথা ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ নামক অবৈধ গোপন দলের সৈনিকেরা একটি প্রতিবিপ্লব শুরু করে। তারা স্বাধীনতাযুদ্ধের ‘ঘোষক’ হিসেবে সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে জেনারেল জিয়ার যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল, তা কাজে লাগিয়ে তাদের তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের পক্ষভুক্ত করার পরিকল্পনা করেছিল। বস্তুত কর্নেল তাহের, হাসানুল হক ইনু প্রমুখেরা জেনারেল জিয়াকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে নিজেদের জিম্মায় ঢাকা শহরের কোথাও নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জেনারেল জিয়ার প্রতি অনুগত কিছু সৈন্য তাঁকে ঘিরে রেখেছিল এবং নিরাপত্তা দিচ্ছিল। ফলে জিয়াকে গণবাহিনীর হেফাজতে যেতে হয়নি। এমতাবস্থায় বাধ্য হয়েই কর্নেল তাহের নিজেই মে. জেনারেল জিয়াউর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে যান এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ২৩ দফা দাবিদাওয়া তাঁর কাছে উত্থাপন করেন। ধারণা করা হয়, সেই সাক্ষাতের সময়ই কর্নেল তাহের বুঝতে পেরেছিলেন যে জিয়া তাঁর দলের, বিশেষত রাজনৈতিক দাবিদাওয়া মেনে নেবেন না, বরং জিয়া তাঁর নিজের ক্ষমতার ও সমর্থনের ভিত্তিকেই সংগঠিত করে তুলবেন। ষড়যন্ত্র ও নিরপরাধ সেনা অফিসারদের রক্তের পিচ্ছিল পথে জাসদের নেতারা ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা ভেঙে পড়তে শুরু করেছিল তখনই।
সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট থেকে দ্রুত খবর আসছিল যে সেখানকার কমান্ডাররা ও সাধারণ সৈনিকেরা জেনারেল জিয়ার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছে। ঢাকা সেনানিবাসেও জাসদের সদস্যরা বাদে ব্যাপকসংখ্যক সাধারণ সৈন্য জিয়ার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছিল। জাসদের মিথ্যা প্রচারণায় এবং আপন মা-ভাইদের কর্মকাণ্ডের কারণে ইতিমধ্যে জেনারেল খালেদ মোশাররফের মতো একজন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা ভারতীয় এজেন্টরূপে ব্র্যান্ড হয়ে গিয়েছিলেন। ৭ নভেম্বর সকালেই খবর ছড়িয়ে পড়ল যে বঙ্গভবন থেকে মে. জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল নাজমুল হুদা ও লে. কর্নেল হায়দার একটি জিপ গাড়ি নিয়ে সাভারের দিকে যাওয়ার পথে বিপ্লবীদের হাতে নিহত হয়েছেন। জানা যায় যে জেনারেল জিয়া এঁদের অক্ষত অবস্থায় ও সসম্মানে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা শিকার হয়েছিলেন একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের। তাঁদের নিহত হওয়ার বিষয়ে একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়।
শোনা যায়, মোহাম্মদপুরের আসাদগেটের কাছে তাঁদের গাড়িটি নষ্ট হয়ে গেলে তাঁরা নির্মীয়মাণ জাতীয় সংসদ ভবনে অবস্থিত ১০ম ইস্ট বেঙ্গলে আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। পায়ে হেঁটে তাঁরা ১০ম ইস্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক লে. কর্নেল নওয়াজীশের অফিসে যান। উল্লেখ্য, এই রেজিমেন্ট মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই ২ নম্বর সেক্টরের অধীন ফেনীর বেলোনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়। খালেদ মোশাররফ মনে করেছিলেন, যেহেতু এটি তাঁর নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, তাই তিনি সেখানে আশ্রয় পাবেন। একটি বর্ণনামতে, তাঁরা যখন নওয়াজীশের অফিসে যান, তখন উচ্ছৃঙ্খল বিপ্লবী সৈনিকেরা তাঁদের ঘিরে ধরে এবং তাঁদের ব্যাটালিয়নের গাড়ির গ্যারেজে নিয়ে যায়। শুনেছি তাঁদের তিনটি চেয়ারে বসানো হয় এবং তাঁদের জিজ্ঞেস করা হয় যে মৃত্যুর পূর্বে তাঁদের কোনো চাওয়া-পাওয়া আছে কি না! খালেদ তাঁর পকেট থেকে একটি সিগারেট বের করে ঘাতক সৈনিকদের অনুমতি নিয়ে ধূমপান করেন। সিগারেট খাওয়া শেষ হলে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘ওকে, আই অ্যাম রেডি।’ এরপর তাঁদের প্রথমে গুলি করে এবং পরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়।
অন্য একটি বর্ণনামতে জানা যায়, জিয়ার অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ব্রিগেডিয়ার মীর শওকতের (পরে লে. জেনারেল) ব্যক্তিগত আদেশে লে. কর্নেল নওয়াজীশ তাঁদের হত্যার উদ্যোগ নেন। কথিত আছে, লে. কর্নেল নওয়াজীশের আদেশে ক্যাপ্টেন আসাদ ও ক্যাপ্টেন মনসুর তাঁদের হত্যায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই বর্ণনামতে, মূল হত্যাকারীদের আড়াল করার জন্যই হত্যায় ‘বিপ্লবী সৈনিক’দের জড়িয়ে গল্প ফাঁদা হয়েছিল।
৬ নভেম্বর দিবাগত রাতে কর্নেল শাফায়াত জামিল বঙ্গভবন থেকে পালানোর সময় পাঁচিল থেকে লাফ দিয়ে নামতে গিয়ে নিজের পা ভেঙে ফেললেন। তাঁকে আহত অবস্থায় সাধারণ মানুষ নারায়ণগঞ্জে নিয়ে যায়। এ খবর জেনারেল জিয়ার কাছে পৌঁছালে তিনি তাঁকে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করার আদেশ দেন এবং তাঁর কোনো ক্ষতি না করার নির্দেশ দেন। এরপর শাফায়াত জামিলকে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা সিএমএইচে আনা হয় চিকিৎসার জন্য। এদিকে খালেদ মোশাররফসহ, হুদা ও হায়দারের লাশও ঢাকা সিএমএইচে আনা হলো। সারা দিন তাঁদের আত্মীয়স্বজন অনেক চেষ্টা করল মৃতদেহ দাফনের জন্য, কিন্তু তাঁদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হলো না। পরদিন সকাল ১০টায় খালেদের ছোট বোনের কাছে তাঁর লাশ হস্তান্তর করা হলো জানাজা ও দাফনের জন্য।
জেনারেল জিয়া গৃহবন্দী অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার পরই দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারির সদর দপ্তরকে নিজের দপ্তর হিসেবে ব্যবহার করছিলেন। সেখানে মীর শওকতও ছিলেন। পরবর্তী সময়ে শুনেছি, একজন অফিসার যখন এসে খালেদের মৃতদেহ সিএমএইচে আনা হয়েছে এই মর্মে খবর আনেন, তখন মীর শওকত আলী হাসিমুখে বলেন, ‘হোয়ার আর দ্য আদার বার্ডস?’ কেউ এর কোনো উত্তর মীর শওকতকে দেয়নি।
পট পরিবর্তনের পর ফোর বেঙ্গলের সৈনিকেরা আমার নিরাপত্তার জন্য যারপর নাই চিন্তিত হয়ে পড়ল। সুবেদার ইদ্রিস মিয়ার সিদ্ধান্তে সৈনিকদের একটি সশস্ত্র দল আমাকে এসকর্ট করে নারায়ণগঞ্জে আদমজী জুট মিলে নিয়ে যায়। সৈনিকদের দাবির মুখে জেনারেল জিয়া নিজে প্রতিশ্রুতি দেন যে আমার কোনো শারীরিক বা চাকরির ক্ষতি করা হবে না।
এরপর আমি স্বেচ্ছায় অন্য অনেকের মতোই আমার সৈন্যদেরসহ অস্ত্র সমর্পণ করে বন্দিত্ব বরণ করলাম। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত সব অফিসারকে প্রথমে গণভবনে এবং পরে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের একটা পরিত্যক্ত বাড়িতে বন্দী করে রাখা হলো। গণভবনে বন্দী থাকাকালে মীর শওকত, কর্নেল মঞ্জুর (পরে মে. জেনারেল) এবং সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন র্যাঙ্কের ভিআইপিরা আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। অনেকে অনেক সান্ত্বনার কথা বলতেন। তাঁদের মুখেই আমরা জানতে পেরেছিলাম যে আমাদের কোর্ট মার্শাল করা হবে।
আমরা তখন গণভবনে বন্দী। আমার পাশের রুমে বন্দী ছিলেন মেজর হাফিজ, ক্যাপ্টেন হাকিমুল্লাহ, মেজর ইকবাল ও ক্যাপ্টেন তাজুল ইসলাম। তাঁরা এক রাতে বন্দিদশা থেকে পালালেন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থানরত প্রথম ইস্ট বেঙ্গলে পৌঁছে যেতে সক্ষম হন। ওই ব্যাটালিয়নের সৈনিকেরা এই পলাতক অফিসারদের নিজেদের জীবনের বিনিময়ে হলেও রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। এ অবস্থায় কোনো উপায় না দেখে জিয়াউর রহমান নিজে হেলিকপ্টারে করে প্রথম ইস্ট বেঙ্গলে পৌঁছান। তিনি বহু অনুনয়-বিনয় করে সৈনিকদের বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে তিনি আটক অফিসারদের কোনো ক্ষতি করবেন না।
কিন্তু খালেদ মোশাররফ, হুদা, হায়দারদের পরিণতির কথা মনে রেখে সৈনিকেরা তাঁর ওপর আস্থা রাখতে পারছিল না। সৈনিকদের দাবির মুখে তিনি বাধ্য হলেন এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দিতে যে ঢাকায় ফিরে তিনি সব আটক অফিসারের মুক্তির ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু এরপরও সৈনিকেরা তাঁকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তারা জিয়াউর রহমানকে বাধ্য করলেন মাথায় পবিত্র কোরআন শরিফ নিয়ে এ ব্যাপারে শপথ করতে। এভাবেই সৈনিকদের ও জিয়াউর রহমানের মধ্যে আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি আপসরফা হয়েছিল।
এদিকে আমাদের তথাকথিত কোর্ট মার্শাল শুরু হলো ’৭৬ সালের সম্ভবত জানুয়ারি মাসে। আমাকে যখন কোর্ট মার্শালের চেয়ারম্যান কর্নেল (পরে মেজর জেনারেল) আবদুল লতিফের সামনে নেওয়া হলো, তখন আমি চেয়ারম্যানকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক হিসেবে ব্রিগেড কমান্ডারের লিখিত আদেশ পালন করা কি অন্যায়?’ তিনি বললেন, ‘অন্যায় নয়।’ আমি বললাম, ‘যদি অন্যায় না হয়, তাহলে আমার ব্রিগেড কমান্ডারের লিখিত আদেশ পালন করার জন্য আমাকে কি দোষী সাব্যস্ত করা যাবে? (আমি তাঁকে কর্নেল শাফায়াত জামিলের লিখিত আদেশের কপিটি দেখালাম) আমি মনে করি, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ।’ কর্নেল লতিফ আমার নিকট থেকে পাওয়া কাগজটি হাতে নিয়ে পড়লেন এবং পরীক্ষা করলেন। এরপর তিনি কোর্ট মার্শাল মুলতবি করলেন এবং পরবর্তী শুনানির একটি তারিখ ঠিক করলেন। আশ্চর্যের বিষয়, সেই পরবর্তী শুনানির দিনটি আর কোনো দিন আসেনি।
জিয়াউর রহমান প্রথম ইস্ট বেঙ্গলে তাঁর দেওয়া কথা অনুসারে আমাদের আর কোনো বিচার করেননি। একদিন সন্ধ্যার পর ডিজিএফআই অফিসার্স মেসে কর্নেল শাফায়াত জামিল ছাড়া আমাদের সব বন্দী অফিসারকে জড়ো করা হলো এই বলে যে জেনারেল জিয়ার পক্ষ থেকে আমাদের মুক্তির সিদ্ধান্ত শোনানো হবে। এমন সময় মেজর জেনারেল এরশাদ, ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত আলী ও ব্রিগেডিয়ার মঞ্জুর আহমেদ সেখানে উপস্থিত হলেন। জেনারেল এরশাদ একটি লিখিত আদেশ পাঠ করে শোনালেন যে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (রাষ্ট্রপতি আবু সায়েম ততদিনে অপসারিত হয়েছেন) মে. জেনারেল জিয়াউর রহমান আমাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন এবং অনতিবিলম্বে আমাদের মুক্তি দেওয়া হবে। তবে আমাদের সামরিক বাহিনীর চাকরিতে বহাল রাখা হবে না। লে. কর্নেল এবং তার ওপরের র্যাঙ্কে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের সামরিক বাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হলো এবং মেজর ও তাঁর নিচের র্যাঙ্কে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হলো। আমরা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এই ঘোষিত আদেশ শুনলাম এবং মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিলাম সামরিক বাহিনী থেকে চিরবিদায় নেওয়ার জন্য। বলা হলো, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যে ক্যান্টনমেন্টে যে যেখানে ছিলেন, সেখান থেকে বিদায় নিতে হবে।
জানতাম নতুন যে জীবন সামনে, সেখানে নতুন করেই শুরু করতে হবে সবকিছু, শূন্য থেকেই।
লে. কর্নেল (অব.) হালদার মোহাম্মদ আবদুল গাফফার (বীর উত্তম): অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। মুক্তিযুদ্ধকালে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক। পরবর্তী সময়ে ২২তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক। জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী।

৬৬ বছর পর মুখ দেখাদেখি

ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে আলাদা হয়ে যাওয়ার ৬৬ বছর পর মুখ দেখাদেখি হচ্ছে চীন-তাইওয়ানের। প্রথমবারের মতো আলোচনার টেবিলে বসতে যাচ্ছে বৈরী এ দেশ দুটি। সবকিছু ঠিক থাকলে শনিবার সিঙ্গাপুরে মা ইং জিউ এবং শি জিনপিং মুখোমুখি টেবিলে বসবেন। মঙ্গলবার তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট মা ইং জিউর কার্যালয় থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়। এরই মধ্যে এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বৈঠকের বিরুদ্ধে তাইপেতে পার্লামেন্ট ভবনের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেছে দেশটির সাধারণ নাগরিকদের একটি দল। খবর এএফপি, সিএনএনের। এ বৈঠককে ঐতিহাসিক বলে এরই মধ্যে আখ্যা দিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। চলছে আলোচ্যবিষয় নিয়ে জল্পনা-কল্পনা। গণমাধ্যমগুলো বলতে শুরু করে, ৬৬ বছর পর এই বুঝি গলতে শুরু করেছে বৈরী এ দু’দেশের মধ্যকার বরফ। তাইপে সরকারের মুখপাত্র জানিয়েছেন, পুরো তাইওয়ান প্রণালীজুড়ে শান্তি স্থাপন করার জন্য উভয় দেশ আলোচনায় বসতে যাচ্ছে। বেইজিংও এ খবর নিশ্চিত করেছে। এ আলোচনা দু’দেশের বৈরী সম্পর্ক উন্নয়নে সাহায্য করবে বলে জানিয়েছে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট।
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র এলিজাবেথ ট্রুডো বলেন, ‘আমরা আশা করছি দুই দেশ তাদের সম্পর্ক উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাবে এ আলোচনার মাধ্যমে।’ এদিকে বৈঠকের ঘোষণা প্রচারিত হওয়ার পরই তাইপের পার্লামেন্ট ভবনের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেছে সেখানকার সাধারণ নাগরিকরা। তারা বলছে চীন তাদের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণœ করে চলেছে, তাই চীনের সঙ্গে বৈঠকে বসা অনর্থক। ১৯৩৫ সালে মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে চীনে কমিউনিস্ট পার্টির লং মার্চ শুরু হলে চিয়াং কাই শেকের নেতৃত্বে ক্ষমতায় থাকা জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্টদের বিজয়ের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে চীনের সেই গৃহযুদ্ধের। সেই সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাইওয়ান। জাতীয়তাবাদীরা সদলে আশ্রয় নেয় চীনের এককালের প্রদেশ ফরমোজায়। এ ফরমোজাই পরে তাইওয়ান নামে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এ বিচ্ছিন্নতা কখনও মেনে নেয়নি চীন। তাইওয়ানকে নিজেদের একটি প্রদেশ বলেই দাবি করে আসছে তারা। অন্যদিকে তাইওয়ান ৬৬ বছর ধরেই নিজেদের দাবি করে আসছে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে চেষ্টা শুরু করেন মা ইং। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এ আলোচনায় বসার কথা জানাল তাইওয়ান। তাইওয়ানের কালকথা তাইওয়ান। দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরের মাঝামাঝি অবস্থিত চীনের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের একটি দ্বীপ। ১৬২০ থেকে ১৬৬২ সালের ডাচ শাসনামলে দ্বীপটি মূল ভূখণ্ডের স্বীকৃতি পায়। ১৮৯৫ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জাপানের নিয়ন্ত্রণে ছিল তাইওয়ান। ১৯৪৯ সালে চিয়াংকাই তাইওয়ানকে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করে এবং সামরিক শাসন জারি করে।
* ১৯৭৮ সালে চিয়াংয়ের পুত্র চিং কুও দ্বীপটির শাসনভার গ্রহণ এবং ১৯৮৭ সালে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করে।
* ১৯৮৮ সালে চিং কুওয়ের সহকারী লিটেং হুই দ্বীপটি দখলে নেয় এবং ১৯৯৬ সালে প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
* স্বাধীনতাকামী ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টির প্রধান চেন-ছুই-বিয়ান ২০০০ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
* দুর্নীতির অভিযোগে ডিপিপি অভিযুক্ত হয় এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে ম্যা উন জিউ নির্বাচিত হন।
* বিতর্কিত বাণিজ্যিক চুক্তির কারণে ম্যা উন সমালোচিত হন এবং ২০১৪ সালের সান ফ্লাওয়ার মুভমেন্টে ২০০ ছাত্র পার্লামেন্ট দখল করে।
* মাত্র ২৩টি স্বাধীন দেশ তাইওয়ানকে স্বীকৃতি দেয়।

মিয়ানমারে আরব বসন্তের শংকা

মিয়ানমারের গণতন্ত্রায়ণ প্রক্রিয়ায় ‘আরব বসন্তের মতো রক্তপাত ও চরম বিশৃংখলা’র আশংকা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে থেইন সেইনের পেজে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। এতে মিয়ানমারে আরব বসন্ত স্টাইলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী রোববার দেশটির বহুল কাক্সিক্ষত নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল যদি পরাজিত হয় তাহলে রক্তপাত দেখা দিতে পারে।
ছড়িয়ে পড়তে পারে আরব বসন্তের মতো বিশৃংখলা। প্রেসিডেন্টের এ সতর্কতা পোস্ট নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। খবর মিয়ানমার টাইমসের। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে ফেসবুকে থেইন সেইনের পেজে প্রকাশ করা ভিডিওটি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সম্পাদনা করা হয়েছে। চার মিনিটের ওই ভিডিওতে জুড়ে দেয়া হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সহিংসতা এবং মিয়ানমারে গণতন্ত্রের পথে ফেরার বিষয়। পাশাপাশি উপস্থাপন করা হয়েছে আপাতদৃষ্টিতে মিয়ানমারের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং গণতন্ত্রের দিকে ধাবিত হতে থাকার সময়ের উন্নয়ন, সঙ্গে রয়েছে আবহসঙ্গীত। দেয়া হয়েছে ভারি মেটাল সাউন্ড। এটি শেষ হয়েছে ‘অনলি হোয়েন পিস প্রিভেইলস উইল ডেমোক্রেটাইজেশন বি ইমপ্লিমেন্টেড’ বা শুধু যখন শান্তি বজায় থাকে তখনই গণতন্ত্রায়ন বাস্তবায়ন হয়। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন একজন সাবেক জেনারেল। সেনাবাহিনী সমর্থিত ইউএসডিপি দলের হয়ে তিনি ক্ষমতায় রয়েছেন। এই সেনাবাহিনীকে দেখা হয় মিয়ানমারের স্থিতিশীলতার গ্যারান্টার হিসেবে। কারণ তারাই কয়েক দশক ধরে মিয়ানমার শাসন করেছে। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের পরিচালক জাও হাতায় বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন,
‘গণতন্ত্রের পথে মিয়ানমারের পরিবর্তনই ভিডিওতে প্রকাশ পেয়েছে।’ মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন সেনা সমর্থিত দল ইউএসডিপির প্রধান এবং সাবেক স্বৈরশাসক থেইন সেইনের দল কয়েক দশকের সামরিক শাসনের পর নিজেদের মিয়ানমারকে স্থিতিশীল উন্নয়নের দাবিদার হিসেবে উপস্থাপন করছে। জাও হাতায় বলেন, ২০১১ সালে সেনাবাহিনী একটি আধা সামরিক সংস্কারবাদী সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর থেকে মিয়ানমার স্থিতিশীল রয়েছে, যেখানে অন্য দেশগুলো এমন পরিস্থিতিতে ‘রক্তপাত, বিস্ফোরণ ও সহিংস আন্দোলনে জর্জরিত’ থাকে। তিনি আরও বলেন, ‘ওই দেশগুলোর তুলনায়, আমরা সবাই জানি যে, আমাদের দেশ ধাপে ধাপে এগোচ্ছে। এখনই আমেরিকা বা সিঙ্গাপুরের মতো হয়ে উঠতে পারব না আমরা। সে জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।’ মিয়ানমারে গণতন্ত্র পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি সরকার পালন করবে না বলে বিরোধীদলীয় নেতা অং সান সুচিসহ অনেকেই আশংকা প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহারকারী মিয়ানমারের স্থানীয়দের অনেকেই প্রেসিডেন্ট কার্যালয়কে ভিডিও প্রকাশের পর ভণ্ডামির অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। বিগত কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারের জান্তা সরকার দেশ শাসন করেছে শক্তির প্রচণ্ড অপব্যবহারের মাধ্যমে, ভিন্ন মত প্রকাশের সব পথ বন্ধ করে দিয়েছিল এবং নির্বাচনের বিষয়টিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গেছে।

চট্টগ্রামের শুঁটকির সুখ্যাতি দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও

এক সময় চট্টগ্রামে বিয়ে কিংবা নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে স্থানীয় ‘লাক্ষা শুঁটকি’ ছাড়া আপ্যায়নের কথা চিন্তা করা যেত না। কালের বিবর্তনে সাগরে লাক্ষার আকাল ও অস্বাভাবিক দাম বেড়ে এটি এখন ‘অনেকটা সোনার হরিণ’। তাই সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা না গেলেও ‘লাক্ষা’ শুঁটকি ঠাঁই নিয়েছে বিত্তবানদের ঘরে। কিন্তু লাক্ষা-রূপচাঁদা ছাড়াও আরও অনেক নানা পদের শুঁটকি এখনও চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের মুখরোচক সুস্বাদু প্রিয় খাবার।
এই শুঁটকি এখন শুধু চট্টগ্রামের নয়, এর সুখ্যাতি দেশের নানা প্রান্ত ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে রয়েছে এর বেশ কদর। মূলত কর্ণফুলী নদী ও সাগরের বদৌলতেই চট্টগ্রাম শুঁটকির জন্য খ্যাতি অর্জন করেছে। এ কারণে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার ছাড়া শুঁটকির বৃহৎ বাজারও গড়ে উঠেছে চট্টগ্রামে। সাধারণত ভাদ্র মাস থেকে এর মৌসুম শুরু হয়। প্রায় ৬-৭ মাস মৌসুম থাকে। এ সময় শুঁটকি তৈরি করতে প্রচুর পরিমাণে মাছ শুকানো হয়। বর্ষা শুরু হলে আর মাছ শুকানো যায় না। কিন্তু এই শীতেই বেশি বিক্রি হয় নানা পদের এসব শুঁটকি। দেশের নানা প্রান্ত থেকে অর্ডারে আছদগঞ্জে শুঁটকির ঘাটতি দেখা দেয়। শুঁটকি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নগরীর বাকলিয়া এলাকায় কর্ণফুলী নদীর তীরে (কর্ণফুলী সেতু এলাকা) ৯১ সালের আগে হাতেগোনা কয়েকজন ব্যবসায়ী এখানে কাঁচা মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি শুরু করেন।
দেখাদেখিতে বর্তমানে শতাধিক মাচানে শুঁটকি তৈরি চলছে। এখান থেকে প্রতি সপ্তাহে শতাধিক টন শুঁটকি নগরীর পাইকারি বাজার আছাদগঞ্জে সরবরাহ করা হয়। নদীর তীরবর্তী হওয়ায় এখানে শুঁটকি তৈরিতে তুলনামূলক খরচ কম পড়ে। নদী ও সাগর থেকে মাছ আহরণ করে সহজ পথে এখানে আনা যায়। বাকলিয়া ছাড়াও পশ্চিম পটিয়ার কর্ণফুলীর তীর ঘেঁষে ইছানগর, ডাঙাচর, জুলধা, কর্ণফুলী মিলে মোট ৯টি চাঙা নিয়ে শুঁটকি পল্লী গড়ে উঠেছে। প্রতি মৌসুমে অন্তত ৮ কোটি টাকার শুঁটকি কর্ণফুলী তীর থেকে সরবরাহ করা হয়। নগরীর বাকলিয়া তীরে শুঁটকি শুকিয়ে বাজারে সরবরাহকারী হরিপদ দাশ জানান, ৯১ সালে ১০-১২ জন ব্যবসায়ী এখানে শুঁটকি তৈরির কাজ শুরু করেন। দেখাদেখিতে বর্তমানে শতাধিক মাচান গড়ে উঠেছে। এসব শুঁটকি নগরীর পাইকারি বাজার আছাদগঞ্জে বিক্রি করা হয়। তিনি বলেন, কোনো কিছু (মেডিসিন) ব্যবহার ছাড়াই প্রকৃতির নিয়মে মাছ শুকানো হয়। সূর্য আর রোদের তাপই হচ্ছে বড় ফরমালিন।

শারজায় কোণঠাসা ইংল্যান্ড

সিরিজ বাঁচাতে শারজা টেস্টে জয়ের কোনো বিকল্প নেই ইংল্যান্ডের সামনে। কিন্তু চতুর্থ ইনিংসে ২৮৪ রান তাড়া করে জেতা সহজ কোনো কাজ নয়। ৪৬ রানে দুই উইকেট হারিয়ে কাজটা আরও কঠিন করে তুলেছেন কুকরা। চতুর্থ দিন শেষে জয়ের পাল্লা কিছুটা হলেও ঝুঁকে পড়েছে পাকিস্তানের দিকে। ২-০তে সিরিজ জিততে আজ শেষদিনে আট উইকেট চাই পাকিস্তানের। আর সিরিজ বাঁচানো জয়ের জন্য ইংল্যান্ডের প্রয়োজন আরও ২৩৮ রান। ক্রিজে থাকা দলের সেরা দুই ব্যাটসম্যান অধিনায়ক অ্যালিস্টার কুক (১৭*) ও জো রুটের (৬*) ওপর নির্ভর করছে ইংল্যান্ডের ভাগ্য। শেষদিনের ভাঙা উইকেটে পাকিস্তানি স্পিনারদের বিপক্ষে আজ তারা কতক্ষণ টিকতে পারেন সেটাই দেখার। দ্বিতীয় ইনিংসে ইংল্যান্ডের দুটি উইকেটই নিয়েছেন শোয়েব মালিক। আগের দিনই যিনি জানিয়ে দিয়েছেন, এটাই তার শেষ টেস্ট। সাদা পোশাকে বিদায়ী ম্যাচটা স্মরণীয় করে রাখতে প্রথম ইনিংসেও চার উইকেট নিয়েছেন এই পাকিস্তানি অলরাউন্ডার। মালিকের পাশাপাশি আজ ইয়াসির শাহ ও জুলফিকার বাবরের স্পিনও সামলাতে হবে ইংল্যান্ডকে।
এশিয়ার মাটিতে ২০৯ রানের বেশি তাড়া করে জেতার রেকর্ড নেই কুকদের। কাল ২৮৪ রানের জয়ের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বিনা উইকেটে ৩৪ তুলে ফেলেছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু নিজের পরপর দুই ওভারে মঈন আলী ও ইয়ান বেলকে ফিরিয়ে ইংলিশদের ব্যাকফুটে ঠেলে দেন মালিক। এর আগে পাকিস্তানের লড়াই করার মঞ্চটা সাজিয়ে দিয়েছেন মেহাম্মদ হাফিজ। তার ১৫১ রানের অনবদ্য ইনিংসে ভর করেই পাকিস্তানের দ্বিতীয় ইনিংস থামে ৩৫৫ রানে। আগের দিন ৯৭ রানে অপরাজিত থাকা হাফিজ কাল শুরুতেই একবার জীবন পেয়ে ক্যারিয়ারের নবম টেস্ট সেঞ্চুরি তুলে নেন। পঞ্চম উইকেটে অধিনায়ক মিসবাহ উল-হকের (৩৮) সঙ্গে তার ৯৩ রানের জুটিই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পরে সপ্তম উইকেটে আসাদ শফিক (৪৬) ও সরফরাজ আহমেদের (৩৬) আরেকটি কার্যকর জুটিতে পাকিস্তানের লিড আড়াইশ’ ছাড়িয়ে যায়। ৪৪ রানে তিন উইকেট নিয়ে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে সফল বোলার স্টুয়ার্ট ব্রড। আরেক পেসার জেমস অ্যান্ডারসনের ঝুলিতে গেছে দুই উইকেট। এএফপি।
স্কোর কার্ড
পাকিস্তান প্রথম ইনিংস ২৩৪ (শোয়েব মালিক ৩৮, মিসবাহ ৭১, সরফরাজ ৩৯। অ্যান্ডারসন ৪/১৭)।
ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংস ৩০৬ (কুক ৪৯, বেল ৪০, টেলর ৭৬, বেয়ারস্টো ৪৩, প্যাটেল ৪২। ইয়াসির শাহ ৩/৯৯, শোয়েব মালিক ৪/৩৩)।
পাকিস্তান দ্বিতীয় ইনিংস
রান বল ৪ ৬
হাফিজ ক বেল ব আলী ১৫১ ২৬৬ ১৫ ৩
আজহার রানআউট ৩৪ ১১৫ ০ ০
মালিক এলবিডব্লু ব অ্যান্ডারসন ০ ১ ০ ০
ইউনুস এলবিডব্লু ব ব্রড ১৪ ৩৯ ১ ০
রাহাত ব অ্যান্ডারসন ০ ১২ ০ ০
মিসবাহ এলবিডব্লু ব ব্রড ৩৮ ৮৬ ২ ১
শফিক ব ব্রড ৪৬ ১০৯ ৪ ১
সরফরাজ ব প্যাটেল ৩৬ ৩৬ ৪ ০
ইয়াসির ক ব্রড ব রশীদ ৪ ১৬ ১ ০
ওয়াহাব রানআউট ২১ ২৭ ২ ০
বাবর নটআউট ০ ৪ ০ ০
অতিরিক্ত ১১
মোট (অলআউট, ১১৮.২ ওভারে) ৩৫৫
উইকেট পতন : ১/১০১, ২/১০৫, ৩/১৪৬, ৪/১৫২, ৫/২৪৫, ৬/২৫৭, ৭/৩১২, ৮/৩১৯, ৯/৩৫৪, ১০/৩৫৫।
বোলিং : অ্যান্ডারসন ২৬-৮-৫২-২, ব্রড ২৩-৬-৪৪-৩, প্যাটেল ১৯-১-৭৯-১, মঈন আলী ২১.২-১-৭২-১, আদিল রশীদ ২৯-৩-৯৭-১।
ইংল্যান্ড দ্বিতীয় ইনিংস
রান বল ৪ ৬
মঈন আলী এলবিডব্লু ব মালিক ২২ ৪৩ ২ ০
কুক নটআউট ১৭ ৫৯ ১ ০
বেল ব মালিক ০ ৬ ০ ০
রুট নটআউট ৬ ২৫ ০ ০
অতিরিক্ত ১
মোট (২ উইকেটে, ২২ ওভারে) ৪৬
উইকেট পতন : ১/৩৪, ২/৩৪।
বোলিং : রাহাত আলী ২-০-১৩-০, ওয়াহাব রিয়াজ ২-০-১০-০, জুলফিকার বাবর, ৯-২-১১-০, শোয়েব মালিক ৭-৩-৮-২, ইয়াসির শাহ ২-০-৪-০।

সময় এখন আমব্রিনের

সময় মেনে চলা মেয়েটির নিত্যদিনকার অভ্যাস। দেখা হওয়ার কথা ছিল বেলা ১১টায়। ঠিক সময়ের আগেই যথাস্থানে হাজির। সময়ের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের ভাবটা এখনকার শিল্পীদের মধ্যে সাধারনত দেখা যায় না। আমব্রিন তার ব্যতিক্রম। সময়ের কাজ সময়ে করতেই ভালোবাসেন। তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল এসএ হক অলিক পরিচালিত ‘আয়না ঘর’ ধারাবাহিক নাটকের শুটিং স্পটে বসে। সেদিনের আড্ডাটাও জমেছিল বেশ। কথার ফাঁকে ফটোসেশন। তাড়া ছিল শুটিংয়ের। পরিচালকও চেয়ে আছেন সময়ের পানে। এরমধ্যেই চলছে ক্যামেরার ক্লিক আর আড্ডা। ২০০৭ সালে লাক্স চ্যানেলে আই প্রতিযোগিতায় শীর্ষ দশে ঠাঁই হয়েছিল আমব্রিন। সেটাকে পুঁজি করেই সামনে এগিয়ে চলা। পথ চলেছেন নিজের আঁকা ছকে। ক্যারিয়ারের শুরুতেই কাজ করার সুযোগ পেয়ে যান আফজাল হোসেনের পরিচালনায় ‘চলো বিয়ে করি’ নাটকে। প্রথম নাটকেই অভিনয়ে নিজেকে প্রমান করার চেষ্টা ছিল তার। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত বহু নাটকে অভিনয় করেছেন আমব্রিন। ধারাবাহিক নাটকেও তার প্রথম পথচলা আফজাল হোসেনের নির্দেশনায় বিটিভিতে প্রচারিত ‘ফুল মিয়া’ নাটকের মাধ্যমেস। বিজ্ঞাপনে আমব্রিনের প্রথম দেখা মিলে তানভীর হাসানের নির্দেশনায় বাংলা লিংকের কল ব্লকের কমার্শিয়ালে। এখন পর্যন্ত এক ডজনেরও অধিক বিজ্ঞাপনে মডেল হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বনফুল, বসুন্ধরা, বেঙ্গল ও বাংলালিংকের বিজ্ঞাপন।
সর্বশেষ আমব্রিন নাদিমের নির্দেশনায় একটি ফ্রিজের বিজ্ঞাপনে মডেল হিসেবে কাজ করেছেন। তবে যেখানে আমব্রিনের শৈল্পিক উপস্থিতি এ সময়ে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় তা হচ্ছে উপস্থাপনা। এ মাধ্যমে তার উপস্থিতি দর্শককে মুগ্ধ করছে নিয়মিত। প্রথম উপস্থাপনা করেন এনটিভি’র ‘মিউজিক-ই ফোনি’ অনুষ্ঠানে। এতে টানা দু’বছর উপস্থাপনা করে বেশ দর্শকপ্রিয়তা পান তিনি। বর্তমানে উপস্থাপনা নিয়েই বেশি ব্যস্ত আমব্রিন। এনটিভি’র ‘উদ্দীপন’, দেশ টিভিতে ‘সিনেমা এক্সপ্রেস’, আরটিভিতে ‘মিউজিক স্টেশন’ ও এশিয়ান টিভিতে ‘এশিয়ান কিচেন’ অনুষ্ঠানের নিয়মিত উপস্থাপনা করছেন। তার সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞতা হুমায়ুন আহমেদের প্রতি। প্রয়াত এ কথাসাহিত্যিকের পরিচালনায় ‘নিশিকাব্য’ নাটকে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এ প্রসঙ্গে আমব্রিন বলেন, ‘স্যারের সঙ্গে কাজ করতে পারাটা আসলেই সৌভাগ্যের। যারা কাজ করেছেন তারা নিশ্চয়ই বিষয়টি অনুভব করেন। অসাধারন সব গল্পের রূপকার তিনি। ক্যারিয়ারে এ কাজটিই আমাকে অভিনয়ে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি এনে দিয়েছে। কারণ স্যারের নাটকের প্রতি আলাদা নজর থাকে দর্শকের।’ অন্যসব নির্মাতার প্রতিও তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আমব্রিন বলেন, ‘আমার সৌভাগ্য যে এদেশের প্রতিথযশা অনেক নির্মাতার নির্দেশনায় কাজ করতে পেরেছি। সবার প্রতিই কৃতজ্ঞআমি। মডেলিং, অভিনয়, উপস্থাপনা তিনটিতেই কাজ করতে আমার ভীষণ ভালো লাগে।’ ইন্টেরিয়র আর্কিটেক্চার বিষয়ে পড়াশোনা করলেও মিডিয়াতে কাজ করাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে আমব্রিন বলেন, ‘মিডিয়া আমার অনেক ভালো লাগার। আজীবন এখানেই থাকতে চাই।’

রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য by আলী ইমাম মজুমদার

রাষ্ট্রপতি সম্প্রতি নিজ জেলা কিশোরগঞ্জ সফরকালে বলেছেন, ‘রাজনীতি ব্যবসায়ীদের পকেটে চলে গেছে।’ তিনি আরও বলেছেন, এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এবং এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এমনই কথা বলেছেন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতিও। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্যে আমাদের রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অস্বাভাবিক মাত্রায় অংশগ্রহণের বিষয়টিকে বেদনাহত বলে উল্লেখ করেন। তিনি এটাও বলেন যে উন্নত দেশগুলোর আইনপ্রণেতাদের সিংহভাগ আইনের ছাত্র। আর আমাদের দেশে ঘটে চলছে এর বিপরীত ঘটনা। চলমান রাজনীতির এ দিকটির সুবিধাভোগীরা ছাড়া দেশে রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ নেই।
রাজনীতি রাষ্ট্র পরিচালনার হাতিয়ার। রাজনীতিবিদেরাই হন দলের নীতিনির্ধারক, আইনপ্রণেতা কিংবা মন্ত্রী। তাঁরাই হন সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান। আমাদের উপমহাদেশে আধুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা চালু হয় ব্রিটিশ শাসনামলে। তখন দুটি প্রধান দল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতৃত্বে ছিলেন মূলত আইনজীবীরা। সমাজের অন্য পেশাজীবীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ থাকলেও মূল ভূমিকায় আইনজীবীরাই থাকতেন। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরাও অবশ্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করতেন দলগুলোকে। তাঁদের কেউ কেউ দলের নীতিনির্ধারণী পদ, আইনপ্রণেতা বা মন্ত্রী হয়েছেন কোনো কোনো ক্ষেত্রে। তবে তুলনামূলক বিচারে তা ছিল অতি স্বল্প অনুপাতে। ছাত্রজীবনেই আইন পড়ে ওকালতি ও পাশাপাশি রাজনীতি করার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন কেউ কেউ। সেভাবেই তাঁরা পেশা বা রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হতে সক্রিয়ও থাকতেন।
তখন ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা সন্তুষ্ট ছিলেন নিজ অবস্থানে। তবে রাজনৈতিক দল বা নেতাদের সঙ্গে প্রকাশ্য বা গোপনে একটি সুসম্পর্ক রাখার প্রয়োজন তাঁরা সব সময়ই অনুধাবন করে এসেছেন। আর রাজনৈতিক নেতারাও এ বিষয়ে তাঁদের বিমুখ করতেন না। গরজটা ছিল উভয় পক্ষেরই। দল চালাতে, নির্বাচন করতে টাকা লাগে। তা জোগান দিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরাই। এ ধরনের সম্পর্কের সুফল নিতেও ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা স্বাভাবিকভাবেই সচেষ্ট ছিলেন। রাষ্ট্রশক্তির শুভেচ্ছা তাঁদের প্রয়োজন হয়। আর সে শুভেচ্ছা আসতে পারে ক্ষমতায় থাকা রাজনীতিকের কাছ থেকে। বিরোধী দলও কোনো সময়ে ক্ষমতায় চলে আসতে পারে, এটাও তাঁদের অনেকেই বিবেচনায় রাখেন। আর সে বিবেচনা থেকেই বিস্তার ঘটান সম্পর্ক।
রাষ্ট্র পরিচালনা একটি ব্যাপক বিষয়। এর তিনটি প্রধান অঙ্গের দুটি হলো নির্বাহী বিভাগ ও জাতীয় সংসদ। সংসদীয় ব্যবস্থায় এ দুটি একে অন্যের পরিপূরক। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব মূলত সরকারের। তাদের সমাজের সব শ্রেণি ও পেশার স্বার্থ বিবেচনায় নিতে হয়। সরকার গঠিত হয় জনগণ দ্বারা নির্বাচিত সাংসদদের মধ্য থেকে। তাঁরা সংসদের কাছে জবাবদিহিও করেন। সরকার পরিচালনার জন্য আইন প্রণয়ন, করারোপ ও অর্থ বরাদ্দের কর্তৃত্ব জাতীয় সংসদের। রাজনীতিবিদেরা সমাজের সব স্তরের মানুষের চাহিদা সম্পর্কে অবগত। অনেক দেশেই তাঁদের অনেকে আইন পেশা থেকে আসেন। আমাদের ঐতিহ্যও তা-ই ছিল। আর আইন পেশা থেকে না এলেও তরুণ বয়স থেকে সারাক্ষণ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকলে জনগণের প্রত্যাশা সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণাই থাকে তাঁদের। যেমনটা ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কিংবা মাওলানা ভাসানীর মতো নেতাদের।
তরুণ বয়স থেকে সারাক্ষণ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকলে জনগণের প্রত্যাশা সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণাই থাকে তাঁদের। যেমনটা ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কিংবা মাওলানা ভাসানীর মতো নেতাদের তবে রাজনীতিতে এবং মূলত জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ীদের প্রবল আধিক্য রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে তাঁদের প্রতি অতিরিক্ত আনুকূল্য দেখানোর ঝুঁকি থাকে। একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে গত সময়ে কয়েকটি নির্বাচনের তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, ১৯৫৪, ১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে নির্বাচিত সাংসদদের মাঝে ব্যবসায়ীদের অনুপাত ছিল যথাক্রমে ৪, ১৩, ৩৪, ৪৮, ৫১ ও ৬৩। তাহলে এতে কোনো ভিন্নমত পোষণের সুযোগ নেই যে ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের হাতে ক্রমবর্ধমান হারে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে। অন্য পেশাজীবীরা ক্রমান্বয়ে চলে যাচ্ছেন প্রান্তিক অবস্থানে।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা সমাজের অত্যন্ত আবশ্যকীয় ও সম্মানিত ব্যক্তি। তাঁরা ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করেন। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সে বিনিয়োগের সুফলও ভোগ করেন বটে। তবে এর সুফল বহুমাত্রিক। প্রধানত কর্মসংস্থান হয়। তা ছাড়া, বিনিয়োগের ফলে দেশের ব্যাংক, বিমা, পরিবহন অবকাঠামোসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রবৃদ্ধির ধারা দেখা দেয়। আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য বেড়ে যায় ভোগ। এতে উৎপাদন ও আমদানি বাড়ে। সরকার আয়কর, ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক পায়। এ শ্রেণিটিকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। আজ দেশে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটছে, এতে তাঁদের ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। সে ভূমিকা জোরদার করতে সরকার তাঁদের বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দেয়। তবে নীতিনির্ধারণে ব্যবসায়ীদের ব্যাপক ভূমিকার জন্য কোনো কোনো আনুকূল্যের মাত্রা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
আর রাজনীতিতে তাঁদের প্রবেশের বিষয়? তাঁরা জোর করে এ অবস্থানে আসেননি। ক্ষেত্রবিশেষে ডেকে আনা হয়েছে। রাজনীতিতে তাঁদের অংশগ্রহণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ এখানে অসংগত হবে না। ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর দুটি সামরিক শাসনকালে ক্ষমতাসীনেরা নতুন রাজনৈতিক দল গড়তে গিয়ে ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের একটি অংশকে রাজনীতিতে টেনে এনেছেন। আবার তখনকার নির্বাচনগুলোও ছিল মূলত নিয়ন্ত্রিত এবং কোনোটা ভোটারবিহীন। তাই নির্বাচিত হওয়ার জন্য জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ার প্রয়োজন হতো না। আবার অনেক পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদকে নিজের দলে নিতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে বেশুমার ঋণ দিয়ে ব্যবসায়ী বানিয়ে ফেলা হয়। সে অগ্রযাত্রা আর থেমে রইল না। ১৯৯০-এর পটপরিবর্তনের পরেও রাজনীতি ক্রমান্বয়ে তাঁদের হাতেই যাচ্ছে। এর জন্য অবশ্য নিন্দুকেরা মনোনয়ন-বাণিজ্য নামের একটি অনাসৃষ্টির কথা বলে থাকেন।
সেটা যা-ই হোক, প্রকৃত রাজনীতিবিদেরা যে আজ রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন, এটা তো তথ্যই বলে দিচ্ছে। আরেকটি দিক, ভালো ছাত্রদের রাজনীতির প্রতি অনীহা এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সুস্থ রাজনীতির প্রতিকূল পরিবেশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয় না আজ প্রায় সিকি শতাব্দী। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও একই রকম। এসব প্রতিষ্ঠান থেকেও বেশ কিছু নেতা এসে রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এবং এখনো কেউ কেউ রাখছেন। তবে তাঁদের প্রকৃত উত্তরসূরি নেই বললে ভুল হবে না। তাহলে রাজনীতিবিদ আসবেন কোথা থেকে, এটা কি আমাদের সত্যিকারের রাজনীতিকেরা চিন্তা করেন না! রাজনীতিবিদ হঠাৎ করে হওয়া যায় না। এর জন্য অনেক ত্যাগ, তিতিক্ষা ও দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে পথ পাড়ি দিতে হয়। এ অবস্থায় রাজনীতিকের শূন্যস্থান পূরণ করতে নিয়ে আসা হচ্ছে ব্যবসায়ী এবং সামরিক ও বেসামরিক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের। অবশ্য রাজনীতি করার অধিকার সবারই আছে। অধিকার আছে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করারও। তবে দেশের প্রধান দুটো দল এ বিষয়ে কোনো সচেতন উদ্যোগ না নিয়ে বরং বিপরীত ধারাতে চলছে বললে অত্যুক্তি হবে না। দেশকে বিরাজনীতিকরণের দায় তাদের ওপরও আসে।
রাষ্ট্রপতি প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে। কিন্তু তা করতে হলে দেশের চলমান রাজনীতিকে নিয়ে আসতে হবে একটি মর্যাদাসম্পন্ন অবস্থানে। নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। দলগুলোর মাঝে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে। থাকবে না শত্রুতা এবং অকারণে চরিত্র হননের প্রচেষ্টা। এমনটা করা গেলে দেশের সব শ্রেণি, পেশার উৎকৃষ্ট লোকেরাই রাজনীতিতে আসবেন। তাঁরা তাঁদের শ্রম ও মেধায় উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি করবেন দেশ ও জাতিকে। আর এর বিপরীতটা কী হয়, তার নজির আমাদের সামনেই রয়েছে। রাজনীতিবিদেরা নির্বাসিত হতে চলেছেন রাজনীতি থেকে। চালকের আসনে ক্রমান্বয়ে অবস্থান নিচ্ছেন ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ দেশে বাণিজ্য করতে এসেছিল। কিন্তু তখনকার ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ইত্যাদি সুযোগে তারা নিয়ে নেয় রাষ্ট্রক্ষমতা। সে সময়কার অবস্থার কথাই রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শিবাজি-উৎসব’ কবিতায় লিখেছেন:
‘বণিকের মানদণ্ড দেখা দিল পোহালে শর্বরী
রাজদণ্ডরূপে।।’
এ বক্তব্য আজকের পরিপ্রেক্ষিতেও প্রাসঙ্গিক। আমরা কিন্তু চাই রাজদণ্ড থাকুক রাজনীতিবিদদের হাতেই।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

বিচার চাই না, শুভবুদ্ধির উদয় হোক by প্রফেসর আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী

দীপনের শোকাহত বাবা অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হকের উপরিউক্ত বক্তব্য দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ। গত ৩১ অক্টোবর শনিবার বিকেলে জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক মালিক ফয়সাল আরেফীন দীপন শাহবাগের নিকটে আজিজ সুপার মার্কেটে নিজ কার্যালয়ে নৃশংসভাবে খুন হন। একই সময় লালমাটিয়ায় ব্লগার অভিজিতের বইয়ের আরেক প্রকাশক শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে হামলা হয় এবং সেখানে প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুলসহ তিনজনকে কুপিয়ে আহত করে হামলাকারীরা। তারা বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।
দীপনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর প্রথমে টেলিভিশনে দেখতে পাই। একই সময়ে বন্ধুবর মনসুর মুসা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমার ছেলে টেলিফোনে আমাকে একই খবর দেন। অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ওই রাতেই আমার স্ত্রীসহ ফজলুল হকের পরিবাগের বাসায় যাই। আমাদের মতো আরো অনেক বন্ধু, সহকর্মী, সুহৃদ শোক জানাতে সেখানে সমবেত হয়েছেন; সবাই বিমর্ষ। আমি ফজলুল হকের পাশেই বসলাম। তিনি তখন আমাদেরকে সেদিনকার দীপন হত্যার পূর্বাপর ঘটনার আংশিক বর্ণনা দিলেন এবং অত্যন্ত দৃঢ়চিত্তে এ কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করলেন। ‘সাংবাদিকদেরকে বলেছি আমি বিচার চাই না, আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক।’ ছেলের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে শোকে মুহ্যমান পিতার এমন প্রতিক্রিয়া, হৃদয়ের এমন আর্তনাদ আর কেউ বুঝুক বা না বুঝুক, আমার কাছে তা ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার। কারণ, আবুল কাশেম ফজলুল হক ছিলেন আমার দীর্ঘ দিনের বন্ধু এবং সহকর্মী। তার চিন্তাচেতনা ও জীবনদর্শনের সাথে আমি পরিচিত ছিলাম। অতএব, এ ধরনের একজন ব্যক্তির এমন প্রতিক্রিয়া আমার কাছে তাই স্বাভাবিক মনে হয়েছে।
দীপনের শ্বশুর অধ্যাপক জালালুর রহমানও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেছেন। তিনি আমার আরেক বন্ধু সহকর্মী এবং নিকট প্রতিবেশী। ঈশা খাঁ রোডে একই বিল্ডিংয়ে আমরা বসবাস করেছি। তার ছেলেমেয়েরা এবং আমার ছেলেরা একই সাথে বেড়ে উঠেছে। অতএব, দীপনের শ্বশুরের পরিবারও আমার খুব কাছের। মোটামুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকার একটি অপেক্ষাকৃত নির্মল পরিবেশেই দীপন ও জলি অন্যান্য ছেলেমেয়েদের সাথে বেড়ে উঠেছিল। কিন্তু কেউ কি কখনো দীপনের এ করুণ পরিণতির কথা ভেবেছিল?
ফজলুল হক ও আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একই ব্যাচের ছাত্র; তিনি পড়তেন বাংলায় আর আমি পড়তাম সমাজবিজ্ঞানে। দু’জনই সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র ছিলাম। দু’জনই ইস্ট হাউজে থাকতাম। এমএ শেষ বর্ষে একই রুমে থেকেছি। হলের ১৭৬ নম্বর কক্ষটি বলতে গেলে তখন ‘এসএম হল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের’ ঠিকানা ছিল; কারণ আমরা দু’জনই এই সংগঠনের সদস্য ছিলাম এবং তখনকার গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার কারণে স্বৈরাচারী আইয়ুব শাহির রোষানলে পতিত হয়েছিলাম। সে কাহিনী এখানে অপ্রাসঙ্গিক বিধায় তার বর্ণনা করা থেকে বিরত রইলাম। শুধু বলে রাখতে চাই, আমাদের বন্ধুত্ব ছিল আদর্শভিত্তিক, ন্যায় ও সত্যের পক্ষে ছিল আমাদের অবস্থান। বুদ্ধির মুক্তি ও চিন্তার স্বাধীনতায় ছিলাম অবিচল। ছাত্রজীবন সমাপ্ত করার পর আমরা দু’জনই (কিছুটা সময়ের ব্যবধানে) শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করি এবং আমাদের কর্মস্থল ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। জ্ঞানচর্চার এ পীঠস্থানে বলা যায় যে একসাথেই বিচরণ করেছি এবং প্রায় একই সময়ে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে অবসর নিয়েছি। এ নাতিদীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে ফজলুল হকের সাথে সদাসর্বদা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল- এমনটা বলা যাবে না, তবে অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। এতে করে আমি বলতে পারি, ছাত্রজীবনে ফজলুল হক যে চিন্তাচেতনার মানুষ ছিলেন, সেখান থেকে তার মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাই বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘কঠোর বিচার চাই’র প্রথাগত দাবি তার কাছে মূল্যহীন মনে হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘মামলা করতে হয়, তাই নিয়ম অনুযায়ী একটি হত্যা মামলা হয়তো আমি রুজু করব, আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, আইন মেনেই মামলা করতে হবে।’ কিন্তু তিনি জানেন, বিচার চাইলেই বিচার পাওয়া যায় না। ন্যায়বিচার নিশ্চিত এখন প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। তা ছাড়া আসল কথা হলো হত্যা, গুম, খুনের মতো মারাত্মক অপরাধের মূল কারণ খুঁজে বের করতে হবে এবং গুম-খুনের সে কারণ নির্মূলের মধ্যেই এর সমাধান নিহিত আছে। সে পথে না হেঁটে শুধু ‘বিচার চাই’ স্লোগান বিফলে যেতে বাধ্য। তা ছাড়া বর্তমানে এ দেশে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে, সেখানে বিচার দাবি করে লাভ কী? বর্তমান বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। এটা দেশবাসীর অজানা নয়। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। গণন্ত্রের অনুপস্থিতিতে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। অগণতান্ত্রিক সমাজে ‘আইনের শাসনে’র কথা বলা- অরণ্যে রোদন ছাড়া আর কিছুই নয়। এহেন পরিস্থিতিতে আবুল কাশেম ফজলুল হকের মতো একজন সচেতন মানুষ যদি ‘বিচার চাই না’ বলেন, তাহলে কি তাকে দোষ দেয়া যায়? ‘বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে’- এটাও তো এ দেশের বাস্তবতা। অনেকেই ফজলুল হকের এ ধরনের বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন; তাকে অপবাদ দিয়েছেন। তাদের সঙ্কীর্ণ মনমানসিকতার কারণেই আজ এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ফজলুল হক একজন শিক্ষক, একজন সচেতন নাগরিক, চিন্তাশীল মানুষ। এ রাষ্ট্রের কলুষিত রাজনীতির অভিজ্ঞতা তিনি তিলে তিলে সঞ্চয় করেছেন। প্রত্যক্ষ করেছেন স্বৈরাচারী শাসকদের দাপট, অত্যাচার, নির্যাতন; দেখেছেন বিবাদ, বিভাজনের রাজনীতি; দেখেছেন কিভাবে ছলে বলে কৌশলে গণতন্ত্রকে হত্যা করে ক্ষমতার মসনদ পাকাপোক্ত করার প্রয়াস পায়, কী করে ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করে। এ অভিজ্ঞতার আলোকেই বর্তমান সঙ্কট উত্তরণের জন্য তিনি বিচার দাবি না করে শুভবুদ্ধির উদয়ের আহ্বান জানিয়েছেন। আবেগতাড়িত হয়ে ফজলুল হক এমন কথা বলেননি; তার উপলব্ধি থেকেই বলেছেন। তিনি যথার্থই অনুধাবন করেছেন যে, বর্তমান সঙ্কটের ধরন রাজনৈতিক এবং রাজনৈতিক সমঝোতাতেই এর সমাধান নিহিত রয়েছে। আইন, আদালত, পুলিশ বাহিনী দিয়ে এর মূলোৎপাটন সম্ভব নয়।
ইতঃপূর্বে এ ধরনের আরো হত্যাকাণ্ড সংঘঠিত হয়েছে। ব্লগার অভিজিত হত্যার বিচার কি হয়েছে? তার বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকজন প্রবীণ অধ্যাপক ড. অজয় রায় তো ছেলেহত্যার বিচার চেয়েছিলেন? তিনি কি বিচার পেয়েছেন? দেশে অহরহ গুম, খুনের ঘটনা ঘটছে। এর শেষ কোথায়? এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার কি হয়েছে? বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে জাতি আজ আক্রান্ত। আবার বিচার যদি ন্যায়বিচার না হয়, তাহলে সে বিচার হয় অর্থহীন। পক্ষপাতদূষ্ট বিচার সমাজের ক্ষত আরো বাড়িয়ে দেয়। তাই ফজলুল হকের মতো অনেকেই মনে করেন, শুধু আইনের বিচারে এ ধরনের সম্যার সমাধান সম্ভব নয়। এ সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।
বিবদমান সব পক্ষের সমঝোতার জন্য শুভবুদ্ধির উদয়ের প্রয়োজন। তা হলেই সমস্যার সমাধান হবে। বিচার, পুলিশ ও আইন-আদালত দিয়ে তো একজনকে শাস্তি দেয়া যায়। কিন্তু তাতে জাতীয় উন্নতি সম্ভব না। বর্তমান সমস্যা রাজনৈতিকভাবে আগে সমাধান করতে হবে। সেই সাথে নিতে হবে আইনগত ব্যবস্থা। যদি রাজনৈতিকভাবে সমাধান করা না যায়, শুধু আইনগত ব্যবস্থা দিয়ে এটি সমাধান করা যাবে না। অপরাধ বিজ্ঞানীরা অপরাধের কারণ অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। অপরাধের সঠিক কারণ নির্ণয় করতে না পারলে অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। শুধু লোক দেখানো কোনো প্রকার শাস্তি দিয়ে অপরাধ দমন সম্ভব নয়। নৃশংস খুনের মতো বড় অপরাধের একটি প্রধান কারণ আজকের বিরাজমান অনৈক্য, বিভাজন ও প্রতিহিংসা চরিতার্থ। ফজলুল হক সম্ভবত এর প্রতি এ সময়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছেন। জাতি আজ বিভক্ত। জাতীয় ঐক্য সম্পূর্ণ বিনষ্ট। জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে আজো ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিভেদ-বিদ্বেষ, হিংসা-প্রতিহিংসা ক্রমেই বেড়ে চলছে। ফজলুল হক এ অবস্থার নিরসন চেয়েছেন। তাই তিনি উচ্চারণ করেছেন- ‘যারা ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয় পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক।’ এ দেশের সচেতন ও দেশপ্রেমিক নাগরিকদের উপলব্ধিও একই ধরনের। যেসব শক্তি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী, দেশের উন্নতি ও শান্তি চায় এবং গণতন্ত্র ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী, সেসব শক্তির মধ্যে সমঝোতা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক রেষারেষি, হিংসা-প্রতিহিংসা পরিহারের প্রয়োজন। এই বিভাজন ও অনৈক্য পরিহারের জন্য ফজলুল হক ‘শুভবুদ্ধির উদয়ে’র জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা চলে যে, আজ রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ‘শুভবুদ্ধির’র উদয়। কেবল শুভবুদ্ধিই সব অশুভকে বিনাশ ও ধ্বংস করতে পারে। শুভবুদ্ধির উন্মেষের জন্য প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা পালন করতে পারেন।
আজকের সমাজ ও রাষ্ট্রে অশুভ শক্তির যে উত্থান ও আক্রমণ, তাতে করে মানুষের জীবন সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত। অশুভ ও শুভ শক্তির দ্বন্দ্ব চিরন্তন। শুভকে পরাজিত করে অশুভ শক্তি প্রাধান্য বিস্তার করলে সমাজে দেখা দেয় অস্থিরতা, নৈরাজ্য- যা ডেকে আনে ধ্বংস। আর অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে শুভ শক্তির জয় হলে প্রতিষ্ঠিত হয় মানবতা, বিকশিত হয় সুন্দর; ধ্বংসের বিপরীতে শুরু হয় সৃষ্টি। এরই ধারাবাহিকতায় গণতান্ত্রিক সমাজ ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। বাংলাদেশেও আমরা অশুভ শক্তির পরাজয় কামনা করি। আমরা চাই সব কিছুতে ‘শুভ’র বিজয় অর্জিত হোক। তা হলেই কেবল আমরা মুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতে পারব। তাই ফজলুল হকের কথার প্রতিধ্বনি করে বলতে চাই- সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক।
শুভবুদ্ধির উদয়ের জন্য সমাজে এক বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে পারেন লেখক, কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ অন্যান্য পেশাজীবী। এক কথায়, যাদেরকে বলা হয় বুদ্ধিজীবী। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ অশুভ শক্তির পক্ষে কাজ করছে। ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলই এদের প্রধান লক্ষ্য। হীন স্বার্থ চরিতার্থের জন্য এরা অশুভ শক্তির পদলেহনে মত্ত। শাসকের মনোরঞ্জন ও স্তুতিতে এরা দক্ষ ও পটু। পদ-পদবির লোভে তারা নানাভাবে ক্ষমতাবান ও শক্তিধরকে তুষ্ট রাখতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। দালালি ও পদলেহনের প্রতিযোগিতায় যারা অগ্রগামী থাকেন তারা অশুভ শক্তিধরের নৈকট্য লাভ করেন এবং বড় বড় পদবি ও পুরষ্কার লাভ করেন। এ প্রতিযোগিতায় যারা পেছনে থাকেন তারাও ছিটেফোঁটা হালুয়া-রুটি ও ছোটখাটো আনুকূল্য থেকে বঞ্চিত হন না। এরূপ পরিস্থিতিতেও ন্যায় ও সত্যের পূজারি স্বল্পসংখ্যক বুদ্ধিজীবীকে শুভশক্তির পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যায়। শত নিপীড়ন ও নির্যাতনকে উপেক্ষা করে তারা তাদের বিশ্বাসে অবিচল থাকেন। সর্বকালে, সর্বসমাজে এই উদাহরণের প্রমাণ মেলে। মানবেতিহাসে চাটুকার ও দালাল বুদ্ধিজীবীদের অনৈতিক কার্যকলাপের যেমন প্রমাণ পাওয়া যায়- তেমনি নির্লোভ ও ত্যাগী বুদ্ধিজীবীদের ন্যায় ও শুভশক্তির পক্ষে অবস্থানের কাহিনীও লিপিবদ্ধ আছে। আমাদের অবস্থান শুভশক্তির পক্ষে হোক। কামনা করি, সংশ্লিষ্ট সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক। তা হলে হয়তো ছেলেহারা বাবা আবুল কাশেম ফজলুল হক সান্ত্বনা খুঁজে পাবেন এবং নিহত দীপনের আত্মাও শান্তি লাভ করবে।
প্রফেসর আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী
পরিশেষে, আমি দীপনের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি এবং তার শোকসন্তপ্ত বাবা-মা, বোন, স্ত্রী ও তার ছেলেমেয়ের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করি।
লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি, সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানী।

হাই অ্যালার্ট তবুও উদ্বেগ by নুরুজ্জামান লাবু

একের পর এক খুনের ঘটনা। হামলা। খুন হয়েছেন বিদেশী নাগরিক, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য, ব্লগার ও প্রকাশক। খুনের ধরনও প্রায় অভিন্ন। বোমা হামলা হয়েছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী শিয়া সম্প্রদায়ের আশুরার শোক মিছিলে। একের পর এক ঘটনায় চারদিকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। উদ্বেগ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যেও। নাশকতার আশঙ্কা উঠে এসেছে গোয়েন্দাদের তথ্যে। বিদেশী দূতাবাসগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে বিদেশীদের ওপর হামলার নির্ভরযোগ্য তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। এমন অবস্থায় দেশের তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। দেশের সব কারাগারে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গতকাল দুর্বৃত্তদের হামলায় পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার পর পুলিশকেও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সরকার ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হলেও থামছে না হামলা ও খুনের ঘটনা। এতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা উদ্বেগ কাটছে না কিছুতেই।
এদিকে জনসমাগমস্থল, বাস, রেল, নৌ-টার্মিনাল, পাওয়ার স্টেশন, গ্যাস বিতরণকেন্দ্র, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, বিনোদনকেন্দ্র, বিদেশী নাগরিকদের অফিস ও বাসভবনে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ঢেলে সাজানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে পুলিশের চেকপোস্টগুলোকে। সর্বোচ্চ সতর্কতায় থাকতে বলা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। প্রয়োজনের সময় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্যই একটি মহল এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। সকল ঘটনারই রহস্য উদঘাটন এবং প্রতিরোধে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, হামলাকারীরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে হামলা করলেও তারা সবাই আসলে এক। একই কায়দায় সব ঘটনা ঘটছে। একারণে পুলিশকে আরও বেশি সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। পুলিশের ভারপ্রাপ্ত আইজিপি জাভেদ পাটোয়ারী বলেছেন, এসব হামলা পরিকল্পিত। পুলিশকে সতর্কতার সঙ্গে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে বিব্রত অবস্থায় পড়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। নানাভাবে চেষ্টা করেও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর টার্গেট কিলিং কিংবা বোমা হামলা ঠেকাতে পারছেন না। ১৩ দিন আগে রাজধানী ঢাকার অন্যতম প্রবেশ পথ গাবতলী ও গতকাল আশুলিয়ায় পুলিশের চেকপোস্টে হামলা চালিয়ে দুই পুলিশ সদস্যকে হত্যার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দফায় দফায় বৈঠক করছেন। আলোচনা চলছে কর্মকৌশল নিয়ে। নির্দেশনা দেয়া হয়েছে পুলিশি চেকপোস্টে সদা সতর্ক থাকার জন্য। এছাড়া, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দেশের তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বাস-রেল-নৌ টার্মিনালেও নিরাপত্তা বাড়ানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে অবস্থানরত বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন সময় পার করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এমনিতেই দুই বিদেশী নাগরিক খুন হওয়ার কারণে বিশ্বে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় আবার যদি কোন বিদেশী নাগরিক খুন হন তাহলে পরিসি্থিত আরও বেশি ঘোলাটে হয়ে যাবে। তৃতীয় কোন পক্ষ এই সুযোগ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একারণে বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য সতর্কতামূলক নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। একইভাবে দেশের আন্তর্জাতিক তিন বিমানবন্দরেও হামলার আশঙ্কা রয়েছে। কোন দেশের বিমানবন্দরে হামলা মানে ওই দেশ নিরাপত্তা ব্যবস্থা তলানিতে ঠেকেছে বলে মনে করা হয়। একারণে যে কোন ধরনের হামলা ঠেকাতে তিন বিমানবন্দরেই নেয়া হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। গত সোমবার থেকে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামের শাহ আমানত ও সিলেটের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির ডগ স্কোয়াড মোতায়েন করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুলিশের চেকপোস্টে হামলার ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে চেকপোস্টে দায়িত্বপালনকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মনোবল ভেঙে যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, রাজধানী ঢাকার পর আশুলিয়ায় পুলিশের চেকপোস্টে হামলার ঘটনা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এসব পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। দুর্বৃত্তরা পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব এসব হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। সূত্র জানায়, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে রাতের বেলা চেকপোস্টে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শতভাগ সতর্কতা থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে কাউকে তল্লাশির সময় ‘গান পয়েন্টে’ থাকাসহ বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হেলমেটসহ আত্মরক্ষামূলক সব ধরনের সরঞ্জাম রাখতে বলা হয়েছে। এছাড়া চেকপোস্টে দায়িত্বরতরা এমনভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে যাতে চারদিকই নজরদারি করা যায়।
এদিকে দুই বিদেশী নাগরিক হত্যার পর আরও এমন ঘটনা ঘটতে পারে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। কূটনৈতিক পাড়ায় কড়া তল্লাশিসহ গোয়েন্দা নজরদারি, প্রতিটি রাস্তায় চেকপোস্ট এবং বিদেশী নাগরিকরা যেসব এলাকায় যাতায়াত বা অবস্থান করেন সেসব এলাকাতেও কড়া গোয়েন্দা নজরদারি ও নিরাপত্তা বিধান করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঠ পর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্যে তারা বিভিন্ন রকম ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন। দেশকে অস্থিতিশীল করতে একটি গোষ্ঠী উঠে পড়ে লেগেছে। তারা যে কোন মূল্যে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে চায়-এমন তথ্য রয়েছে গোয়েন্দা ভাষ্যে। একারণে কারাগারগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থান বা স্থাপনা, জনসমাগমস্থল, পাওয়ার  স্টেশন, গ্যাস বিতরণকেন্দ্র, বিনোদন কেন্দ্রে নাশকতার আশঙ্কা থাকায় এসব স্থানগুলোতে কড়া গোয়েন্দা নজরদারির নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।  এসব স্থানের বহিঃবেষ্টনী ও আন্তঃবেষ্টনীতে নিরাপত্তা দেয়াল, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, গমনাগমন নিয়ন্ত্রণ ও ওয়াচ টাওয়ার বা সমজাতীয় ব্যবস্থাপনায় সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া সিসিটিভি মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। পুলিশ সূত্র জানায়, রাজনৈতিক বিরোধী জোটের পাশাপাশি নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একারণে জঙ্গি সংগঠনগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য বলা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র জানায়, গত ২৬শে অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশের ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার, সব পুলিশ কমিশনার, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, র‌্যাবসহ পুলিশের সব ইউনিটে একটি চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের মাধ্যমে কারাবন্দি যুদ্ধাপরাধীদের মুক্ত করতে এবং বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে একটি ‘সন্ত্রাসী গ্রুপ’ যে কোন ভিআইপিকে অপহরণ ও হত্যার পরিকল্পনা করেছে বলে উল্লেখ করা হয়। এই গ্রুপটি দেশের যে কোন বিমানবন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাইয়েরও নীলনকশা করেছে বলে ওই চিঠিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। চিঠিতে সারা দেশে নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীকে এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এদিকে গতকাল সরজমিন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়ে দেখা যায়, বিমানবন্দর এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা পালন করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। যেকোন ধরনের নাশকতা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তৎপর ভূমিকা পালন করছে। চেকপোস্টের মাধ্যমে জনসাধারণকে তল্লাশির পর বিমানবন্দর এরিয়ায় প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে। পুরো বিমানবন্দর এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে। দর্শনার্থীদের ভেতরে প্রবেশে এখনও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ বিষয়ে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ পরিচালক জাকির হোসেন মানবজমিনকে জানান, উপরের নির্দেশ ছাড়া দর্শনার্থীদের নিষেধাজ্ঞা আপাতত তোলা হচ্ছে না। এছাড়া, বাকি সবকিছু নরমাল রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, নিরাপত্তায়  দায়িত্বরতদের একটু সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর বেশি কিছু নয়। পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, নিরাপত্তা জোরদারের আদেশ আমরা সচরাচর পেয়ে থাকি। তবে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আমরা একটু বেশি সতর্ক থাকছি। যেকোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আমরা তৎপর রয়েছি। বিমানবন্দর এবং এর আশেপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
পরিস্থিতি উদ্বেগজনক
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মুহাম্মদ নুরুল হুদা
সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মুহাম্মদ নুরুল হুদা। তিনি বলেছেন, নির্দিষ্ট একটি পক্ষ ধারাবাহিকভাবে খুনের শিকার হওয়ায় উদ্বেগ বহু গুণ বেড়ে গেছে। এ উদ্বেগ নিরসন করতে হবে। দ্রুত ও যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রতিরোধ করতে হবে টার্গেট কিলিং। মানবজমিনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, প্রাণনাশের হুমকি পেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরির (জিডি) পরও ব্লগার নীলাদ্রি খুন হন। হামলার শিকার হন শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুল। তারা যেহেতু চেয়েছিলেন, তাই তাদের তো সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দেয়ার প্রয়োজন ছিল। নিরাপত্তার শৈথিল্যের কারণেই তারা খুন ও হামলার শিকার হয়েছেন। যারা খুনের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন তাদের তো প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিতেই হবে। আর টার্গেট কিলিং চলছেই। বন্ধ করা যাচ্ছে না। এটাকে আমি পুলিশের অসহায়ত্ব হিসেবে দেখি না। তবে ঘাটতি আছে। গোয়েন্দা তথ্যে ঘাটতি থাকতে পারে। তা কাটিয়ে উঠতে হবে। প্রয়োজন হলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। তবে যে আসামি ধরা পড়ছে না তাও নয়।
তিনি বলেন, কারা, কেন এ হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটাচ্ছে তা জানা যাচ্ছে না। রহস্য অনেক সময় অনুদ্ঘাটিত রয়ে যাচ্ছে। এর কারণ হলো হোতারা নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য। আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ করে। তারা নিজেরা প্রকাশ না করলে, তা অনেক সময় জানা যায় না। আবার পুলিশও অনেক সময় স্পর্শকাতর তথ্যগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রকাশ করে না। বাধ্যবাধকতাও নেই। তবে তথ্য না জানালে যে নিরাপত্তা দেবে না, তা তো নয়।
ঘটনার পর পর সরকারের পক্ষ থেকে এসব হামলাকে বিএনপি-জামায়াতের নাশকতা বলে দাবি করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নুরুল হুদা বলেন, যারা এসব কথা বলছেন তারাই ভালো বলতে পারবেন। তাদের এমন বক্তব্যের পেছনে ওই দলগুলোর আন্ডারগ্রাউন্ডের তৎপরতা সম্পর্কে তথ্য থাকতে পারে। সন্দেহও থাকতে পারে। তবে শুধু সন্দেহ থেকে কারও দিকে আঙুল তুললে চলবে না। প্রমাণ থাকতে হবে। রাজনীতিবিদরা রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেন, তা-ই স্বাভাবিক। তা চলছে। চলবে। কিন্তু বেফাঁস বক্তব্য দেয়া ঠিক নয়। এতে তদন্ত ব্যাহত হয়। অপরাধীরা সুযোগ নেয়। আবার মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে যাদের বিচার হচ্ছে তাদের বাঁচানোর তৎপরতা থাকতে পারে। তাদের সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে এমন গোষ্ঠীও তাদের সমর্থন নিয়ে এসব ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। কাছাকাছি মতাদর্শের গোষ্ঠীর মধ্যে সহানুভূতি ও সাদৃশ্য থেকে এমন হামলা ও খুনের তৎপরতা অস্বাভাবিক নয়। কারণ উদ্দেশ্য একটাই। পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তোলা। সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলা।
সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশে পুলিশ বিভাগে বিশেষ কোনো টিম নেই উল্লেখ করে বলেন, অন্যান্য দায়িত্বের পাশাপাশি পুলিশকে ওই দায়িত্বও পালন করতে হয়। কিন্তু ইদানীং সন্ত্রাসী ঘটনা বেশি ঘটছে। বাড়ছে জঙ্গি তৎপরতা। এ অবস্থায় সন্ত্রাস দমনে পৃথক টিম গঠন প্রয়োজন বলে মনে হচ্ছে।

শুভবুদ্ধির জাগরণ চাই by আবুল মোমেন

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এখন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ভোগ করছে। বলা হয়ে থাকে, নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চরম দুর্নীতির জন্ম দেয়। তবে দেখা গেছে, সর্বাত্মক ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি শোচনীয় হয়। প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনের মর্মান্তিক হত্যা ও অপর তিনজনের ওপর হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাতে সমগ্র জাতি স্তম্ভিত, শোকার্ত। দীপনের বাবা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত একজন শিক্ষক, একমাত্র ছেলের মৃত্যুতে চরম শোকের মুহূর্তেও অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ মত ব্যক্ত করেছেন। প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বিচার চাই না, হত্যাকারীদের শুভবুদ্ধির জাগরণ চাই।’ তিনি বলেছেন, ‘আমি আইনে বিশ্বাস করি, তাই মামলা করব, কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ড নিছক ধর্মীয় বিষয় নয়, এর পেছনে আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত আছে।’ এ সময় তাঁর শোকার্ত চেহারার আড়ালে একজন রক্ত-মাংসের বাবার মর্মান্তিক যন্ত্রণা ঢাকা থাকেনি। প্রত্যেক সংবেদনশীল মানুষ এই শোকার্ত বাবার সমব্যথী হয়েছেন। কিন্তু কী বললেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও দলের মুখপাত্রের ভূমিকা পালনকারী মাহবুব উল আলম হানিফ? তিনি তাঁকে উপহাস করলেন, প্রতিপক্ষ বানালেন?
একজন শোকার্ত বাবার ব্যক্তিগত শোকের মুহূর্তে উচ্চারিত বক্তব্যের গভীরতা বোঝার ক্ষমতা ক্ষমতায় থাকা মানুষের না-ও থাকতে পারে। কেননা, এই অবস্থায় অনেকেই কেবল ক্ষমতার বিচারেই পক্ষ-প্রতিপক্ষ হিসেবে পৃথিবীকে দেখতে জানেন। দৃষ্টি ও বিবেচনাশক্তিকে আরও একটু প্রসারিত করে এর নিকট ও সুদূরপ্রসারী কুশীলবদের দেখার মতো ক্ষমতা তাঁরা হারিয়ে ফেলেন। বলতে দ্বিধা নেই, তাঁর বক্তব্য যেকোনো সংবেদনশীল মানুষের মনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এর ধাক্কা লাগবে আওয়ামী লীগের গায়ে। এসব গায়ে না মাখলে আখেরে দলের ও দেশেরও ক্ষতি। তাই শোকের পাশাপাশি সচেতন মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও বেড়ে যায়।
যারা দীপনের মতো মুক্তমনা মানুষদের হত্যাযজ্ঞে নেমেছে, তারা কেবল বাংলাদেশে তৎপর তা নয়, ধর্মান্ধ মানুষের তৎপরতা ভারত-পাকিস্তানে যেমন আছে, আছে মধ্যপ্রাচ্যে-আফ্রিকায়, এমনকি ইউরোপ-আমেরিকাতেও তাদের তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এ ধরনের চরমপন্থী মতাদর্শের উত্থানের সময় এবং তৎপরতার ক্ষেত্রগুলো বিচার করলে এর পেছনের উদ্দেশ্য আমরা বুঝতে পারব। সেই সূত্রে স্মরণ করিয়ে দেব মধ্যপ্রাচ্যে কৃত্রিমভাবে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা এবং সৌদি আরবের বর্তমান রাজবংশকে ক্ষমতায় বসানোর পেছনে তৎকালীন ইঙ্গ-যুক্তরাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকার কথা।
এমনকি এই সেদিন সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ভাঙার সূচনাকর্মটির ক্ষেত্র হিসেবে পোল্যান্ডকে বাছাই করা, সে দেশের একজন বন্দরশ্রমিক ওয়ালেসাকে নায়ক বানানো (আজ তিনি বিস্মৃত) এবং এই সময়ে পোলিশ বংশোদ্ভূত একজনকে পোপ বানিয়ে দূতিয়ালির কাজে লাগানোর গভীর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথাও স্মরণ করা যায়। এসবই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা শক্তির চাল। তারা যেকোনো মূল্যে সারা বিশ্বের অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিপতি থাকতে চায়।
আফগানিস্তানে সোভিয়েত হস্তক্ষেপ বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন কাজ হয়নি। ইরান ও ভারতের মধ্যবর্তী ও চীনের নিকট প্রতিবেশী এই পাহাড়ি দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলগত গুরুত্ব অনস্বীকার্য। যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের নিয়ে কী করল? জঙ্গি ইসলামি তালেবানদের সমর্থন দিল, তাদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে শক্তিশালী করে তুলল। পরবর্তীকালে মুসলিম-অধ্যুষিত বিরাট অঞ্চলজুড়ে নিজেদের শক্তি বাড়ানোর জন্য তারা আল-কায়েদা সৃষ্টি করল। একসময় আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারির অবসান হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তাঁবেদারির কাল শুরু হলো। গোত্রভিত্তিক সমাজটিতে অস্থিরতা দেখা দিল এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে লিপ্ত সে দেশে এখনো শান্তি আসেনি, মুসলমানরা ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে ব্যস্ত রয়েছে।
জজিরাতুল আরবে সৌদি বংশকে ক্ষমতায় বসিয়ে সাম্রাজ্যবাদ মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদের দখল নিয়েছে। কে না জানে এসব রাজা-বাদশাহ ইসলামসম্মত জীবনাদর্শের পরিপন্থী ভোগবিলাসের জীবনেই অভ্যস্ত। তদুপরি মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার তাঁবেদার আরও রাষ্ট্র সৃষ্টির ব্যাপারে তারা প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করে থাকে। আরব-ইসরায়েল কোনো যুদ্ধেই সৌদি আরব অংশ নেয়নি। কিন্তু আরব বিশ্বের দুই স্বাধীনচেতা শাসক ইরাকের সাদ্দাম হোসেন ও লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও তার আগ্রাসী বাহিনীকে সব রকম সহযোগিতা দিয়েছে সৌদি সরকার। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র সিরিয়া ছাড়া সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র বলয়ের বাইরে আর কোনো দেশ নেই। তাই ঠিক ইরাকের মতোই এখানেও শাসক পরিবর্তনের ধুয়া তুলেছে তারা। ঠিক আগের মতোই সৌদি আরব রয়েছে তাদের পাশে। ইরাক থেকে সিরিয়ায় অস্থিরতা নৃশংসতায় লিপ্ত জঙ্গি ইসলামি দল আইএস বা আইসিস সবই একসুতোয় গাঁথা।
ইসলামের নামে জঙ্গিবাদের আদি উদ্গাতা কারা? বহুকাল ধরে আমাদের দেশের আলেম-মাওলানারা ওয়াহাবি পন্থা ও মওদুদিবাদীদের ধর্মীয় ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে এসেছেন। কারণ, এঁরা ইসলামের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা হাজির করে দেশে অনেককাল ধরেই অস্থিরতা সৃষ্টির কাজ করেছেন। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তানে কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে দাঙ্গার কারণে বিচারে মওদুদির ফাঁসির রায় হয়েছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে সে আদেশ মওকুফ হয়েছিল। একইভাবে তারা এ দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের বিরোধিতা করে ক্ষান্ত হয়নি, পাকিস্তান সরকারের দোসর হিসেবে পরিকল্পিতভাবে ঠান্ডা মাথায় দেশের চিন্তাবিদ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। সেই সময়ও দখলদার পাকিস্তান সরকারকে মদদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এখনো পরাজিত এই শক্তি বাঙালি মুসলমানদের চিরায়ত মানবিক ধর্মসাধনার ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের পথে অশান্তি ও অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আমাদের দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে আখেরে কার লাভ? আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এতে বিএনপি লাভবান হবে। কিন্তু কার্যত আওয়ামী লীগ-বিরোধিতার সূত্রে তখন সব ধারার ধর্মান্ধ গোষ্ঠী তৎপর হয়ে এক হবে এবং তারা ক্ষমতার অংশীদার হবে এবং কিছুকালের মধ্যেই ক্ষমতার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে। যেহেতু ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন দলের মধ্যে মতপার্থক্য তীব্র এবং তারা যেহেতু গণতান্ত্রিক কোনো মূল্যবোধেই বিশ্বাস করে না, তাই তাদের মধ্যে পরস্পর ব্যাপক সংঘাত অনিবার্য, যা ইরাক, আফগানিস্তানসহ মুসলিম দেশে দেশে চলছে। বিএনপি এই দ্বন্দ্ব ও বিশৃঙ্খলা সামাল দিতে ব্যর্থ হবে এবং দেশ চরম অস্থিরতা ও নৈরাজ্যে আবর্তিত হবে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের পরিণতি কী হয়—একনায়ক, নয় তো নৈরাজ্য?
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ আকারে ছোট হলেও এর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সামরিক, কৌশলগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে দেশটির ভূমিকা হতে পারে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাই আমরা দেখি, এ দেশের গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে চীন-জাপানে প্রতিযোগিতা, ভারতের আগ্রহ, সহায়তার প্রতিযোগিতায় বিশ্বব্যাংকও এগিয়ে আসছে, যার অর্থ পশ্চিমও তাদের স্বার্থ দেখতে পাচ্ছে এখানে। যুক্তরাষ্ট্র অনেক রকম চুক্তিতে আমাদের আবদ্ধ রাখতে চায়, নানা সামরিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে আমাদের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে।
বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের সম্পর্কে আমরা তো জড়িয়ে আছিই। ফলে অস্থিরতার সুযোগ নেওয়ার পক্ষ রয়েছে অনেক। দুর্ভাগ্যের বিষয়, মুসলিম দেশে ইসলামের জঙ্গি ব্যাখ্যা হাজির করে দেশকে অস্থিতিশীল করার অপশক্তির অভাব কখনো হয় না। মনে হয় এরা ধর্মগ্রন্থ ও ধর্মীয় সাহিত্যের মর্ম উপলব্ধি করে পাঠ করে না। ফলে শক্তিশালী চতুর স্বার্থান্বেষীর দল এদের ব্যবহার করে নিজেদের সুদূরপ্রসারী স্বার্থ হাসিল করে নিচ্ছে।
বাংলাদেশে অতীতে এরা পারেনি। আমাদের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অবক্ষয় এবং ক্রমাগত অসহিষ্ণু দ্বন্দ্বের কারণে সমাজের অভ্যন্তরে নীরব প্রচারণা চালিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এরা ব্যাপক বিভ্রান্তি তৈরি করতে পেরেছে। তাতে রাজনৈতিক সংকট গভীর হয়েছে। এরা এই সংকটের সদ্ব্যবহার করে তলেতলে শক্তি সঞ্চয় করে এখন আঘাত করে চলেছে। এ সময়ে অতীতের মতোই রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক জাগরণ দরকার এবং সেই সঙ্গে প্রকৃত আলেম-ওলামাদের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
গুপ্তহত্যার ঘটনা ইসলামকে নিচে নামাচ্ছে। কারণ, ইসলাম নিশ্চয় এমন ধর্ম নয়, যা যুক্তির যুদ্ধে বিজয়ী হতে অক্ষম, যে ধর্মে অসির চেয়ে মসি এবং শহীদের রক্তের চেয়ে জ্ঞানীর কলমের কালি শক্তিশালী ও পবিত্র বলা হয়েছে, সে ধর্ম কি জ্ঞান ও লেখনীর লড়াইয়ে অসমর্থ? মুসলিম সমাজ কি কাপুরুষের আচরণ চিনতে অপারগ? আর যা-ই হোক, ইসলাম কাপুরুষদের ধর্ম নয়, এসব ঘটনা এ ধর্মকে কলুষিত করছে। এই সূত্রে রবীন্দ্রনাথের ‘ধর্মমোহ’ কবিতার কথা মনে পড়ছে—
‘ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে
অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।
....
বিধর্ম বলি মারে পরধর্মেরে,
নিজ ধর্মের অপমান করি ফেরে,’
ধর্মের মোহজালে জড়িয়ে এরা নিজে মরে, অন্যকে মারে এবং বারংবার নিজের ধর্মকেই অপমান করে যায়। শেষ দুই পঙ্ক্তিতে কবি বলেছেন:
‘ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো,
এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক আনো।’
কীভাবে জ্ঞানের আলোক আনব? ক্ষমতায় বসে কেবল বিএনপির ছায়া দেখে আঁতকে উঠলে হবে? আর শোকার্ত মানুষের প্রতি নিষ্ঠুর বাক্য উচ্চারণ করলে চলবে? আমি মনে করি, সুস্থ সাংস্কৃতিক চেতনায় সম্পন্ন সামাজিক জাগরণ আজ অগ্রাধিকার পাওয়া দরকার। রাজনীতিকে সেটারই সহযোগী হয়ে পরিশুদ্ধ হতে হবে। তবেই আমরা মুক্তিযুদ্ধের অভীষ্ট এমন এক মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ কায়েম করতে সক্ষম হব, যেখানে ইসলাম ও অন্য সব ধর্ম ও মত মর্যাদার সঙ্গে বিকশিত হতে সক্ষম হবে।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।