Showing posts with label আন্তর্জাতিক নারী দিবস. Show all posts
Showing posts with label আন্তর্জাতিক নারী দিবস. Show all posts

Friday, April 9, 2010

শ্রমিক নারীদের সংগ্রামই তুলে ধরতে হবে -আন্তর্জাতিক নারী দিবস by ফরিদা আখতার

আমরা অনেক নারী সংগঠন যখন আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণার শত বছর পূর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন একটি কথা বারবার আসছিল। সে কথাটি হচ্ছে, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শত বছর পালন করতে গিয়ে কি আমরা অনেক কিছু অর্জিত হয়েছে বলে ‘উদ্যাপন’ করব, নাকি এখনো আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক ও শ্রমজীবী যে নারীরা আছেন, তাঁদের প্রতিদিনের সংগ্রামের কথাটি আর একবার মনে করিয়ে দেব? ডিসেম্বর মাস থেকে এমন একটি নীরব বিতর্ক চলছিল। কিন্তু ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার কাছে গাজীপুরে সোয়েটার কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে যে মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে গেল, তাতে বিতর্কের আর কোনো অবকাশ নেই। ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ শিকাগো শহরে পোশাক কারখানার নারীশ্রমিকেরা তাঁদের অধিকার আদায়ে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। এই আন্দোলনকে বিবেচনায় নিয়ে শ্রমিক নারীদের সংগ্রাম ও আন্দোলনের প্রয়োজনে সে দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণা করার জন্য নারীনেত্রী ক্লারা জেিকন যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, ১৯১০ সালে তা কার্যকর হয়েছে ঠিকই কিন্তু আজ ১০০ বছর পর আমরা যেন সেই তিমিরেই রয়ে গেছি। অর্জন দূরে থাকুক, এ শ্রমিকেরা এখন প্রতিদিন কারখানায় যায় সুস্থ অবস্থায়, ফিরবে কীভাবে তা তারা জানে না। লাশ হওয়ার আশঙ্কা সবার ক্ষেত্রেই রয়ে গেছে। এখন ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে গিয়ে শুধু মজুরির বৈষম্য, কাজের ঘণ্টা ও কাজের সুস্থ পরিবেশ নিয়ে কথা বলা মনে হয় অনেক সহজ বিষয়। প্রাণে বাঁচার নিশ্চয়তা এ শ্রমিকদের যেখানে নেই, সেখানে মজুরি তো খুব বড় কথা নয়।
আমরা এ ঘটনাগুলোকে হত্যাকাণ্ডই বলি, কারণ কারখানার কাঠামোর মধ্যেই আছে মৃত্যুর ফাঁদ। আগুন লাগতেই পারে, কিন্তু প্রাণ বাঁচানোর জন্য বের হতে পারবে না, কারণ গেট বন্ধ থাকে। তালা লাগানো থাকে। গেট কেন বন্ধ থাকে? মনে করা হয়, শ্রমিকেরা এ ধরনের দুর্ঘটনার সময়ও বের হতে গিয়ে কাপড় চুরি করে নিয়ে যেতে পারে। গরিব শ্রমিকেরা জীবিকার জন্য কাজ করতে আসে, তারা চায়, করখানা টিকে থাকুক। দু-একটি কাপড় নিয়ে তাদের পেট তো ভরবে না। তাহলে কেন এমন মনে করা হয়? গরিব বলেই কি? তাহলে এ আচরণ কি বৈষম্যমূলক নয়? শুধু তাই নয়, দুর্ঘটনা ঘটে গেলে তড়িঘড়ি করে আত্মীয়দের কাছে লাশ হস্তান্তর করা, দাফন করা এবং তদন্ত কমিটি ও লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা যেন আগুনের লেলিহান শিখার চেয়েও বেশি দগ্ধ করে। শ্রমিকেরাও জানে, লাখ টাকা পাচ্ছে শুনে অন্য সবাই আশ্বস্ত হয়ে যায়। লাখ টাকা একসঙ্গে পাওয়া কম ভাগ্যের কথা নয়। আগুন লেগে এ ধরনের গরিব পরিবারের একজন সদস্যের মৃত্যু যদি এক লাখ টাকা এনে দিতে পারে, তাহলে তার প্রতি খুব একটা সহানুভূতির প্রয়োজন নেই। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বদৌলতে যে লেলিহান শিখা মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের ড্রইং রুম ঝাঁকিয়ে দিয়েছিল, ক্ষতিপূরণের ঘোষণা তাদের আশ্বস্ত করে। বাহ! টাকা তো পেয়েই যাচ্ছে। কিন্তু গার্মেন্টস শ্রমিকেরা খুব বোঝে এবং তাদের কাছে তাদের ভাইবোন বা সহকর্মীর জীবনের দাম এক লাখ টাকা ঠিক করলেই তারা মোটেও শান্তি পায় না। প্রথম আলোর (২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১০) সাংবাদিক গাজীপুর থেকে এসে লিখেছেন, তেমনি এক শ্রমিকের কথা। ‘এক লাখ টাকা দাম দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলো আমার মায়ের। বোনের লাশের দামও এক লাখ। আর লাশ বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য আরও ১৫ হাজার করে। গরিব গার্মেন্টসে কাজ করে আমার মা আর বোন এখন অনেক বড় লোক হয়ে গেছে।’ মৃত জরিনা বেগমের ছেলে ২০ বছর বয়সী জুয়েল এই বলে বিলাপ করছিলেন সেদিন। এ বিলাপ এক নির্মম প্রহসনকেই তুলে ধরেছে। আমরা এর আগে আরও অনেক আগুন লাগার ঘটনা দেখেছি, দেখেছি সাভারের বাইপাইল ভবন ধসে পড়ার ঘটনা। গত দুই দশকে ১৬৮টি আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে, মারা গেছে ৩০০ জন। ক্ষতিপূরণের ঘোষণা ততবারই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কতজন আজ পর্যন্ত এই ঘোষিত টাকা পেয়েছে? পেলেও তা কোনো সময়ই পূর্ণ অঙ্ক ছিল না। তাই একজন উন্নয়নকর্মী এক লাখ টাকার কথা শুনেই বিড়বিড় করে বলে বসেছিলেন, বুঝেছি, ২৫ হাজার টাকা। অর্থাত্ যদি শেষ পর্যন্ত দেয়, তাহলে সেটা হবে চার ভাগের এক ভাগ। অন্যদিকে আজ পর্যন্ত তদন্ত কমিটি যতই প্রতিবেদন দিক না কেন, দায়ীদের শাস্তি পেতে আমরা দেখিনি। পত্রপত্রিকায় তাঁদের বিরুদ্ধে লেখালেখি ছাড়া আর কোনোভাবে তাঁরা দায়বদ্ধতায় পড়েন না। ফলে সামাজিকভাবে তাঁদের কোনো লজ্জা বা বিব্রত হওয়ার ব্যাপার থাকে না। তাঁরা রাতে মনে হয় শান্তিতেই ঘুমান!
দৈনিক ইত্তেফাক-এর একটি শিরোনাম ছিল, (২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১০) ‘গেট আটকে রেখে আর কত দিন শ্রমিক মারা হবে?’ এটাও ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি গাজীপুর থেকে ঘুরে লিখেছেন। অর্থাত্ যাঁরা সরেজমিনে সেখানে দেখে এসেছেন, তাঁদের কাছে এই মৃত্যু মেনে নেওয়ার মতো নয়। ফ্যাক্টরি নির্মাণে ত্রুটি, অগ্নিনির্বাপণে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা এবং জরুরি দরজা বেশির ভাগ সময় তালাবদ্ধ রাখার কারণেই একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। আমি নিজেও আমার দুই সহকর্মীসহ ২৭ ফেব্রুয়ারি গরিব অ্যান্ড গরিব কারখানায় গিয়েছিলাম। আমরা কারখানার ভেতর ঢুকতে পারিনি। মালিকপক্ষ বাইরের কাউকে ঢুকতে দিতে চান না। সামনে অনেক পুলিশ, যেন একটা রণক্ষেত্র। বোঝা যায় না যে এখানে শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে কোনো উত্কণ্ঠা আছে, বরং মালিককে রক্ষা করাই যেন প্রধান কাজ। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পুলিশ দিয়ে মালিককেই সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু যে শ্রমিক মারা গেল, তাদের পক্ষে কেউ দেখতেও আসতে পারবে না। লোহার বড় গেটটি দেখেছি। এ গেট যদি সিকিউরিটি খুলে না দেয়, তাহলে শ্রমিকেরা কিছুতেই সেটা খুলে বের হতে পারবে না। গেটের ধরনও বলে দেয়, শ্রমিকের নিজের ইচ্ছায় বা প্রয়োজনে বের হওয়ার জন্য গেট বানানো হয়নি, বরং বানানো হয়েছে মালিকের কাপড় রক্ষার জন্য। হায়রে অভাগা দেশ!
যায়যায়দিন পত্রিকায় (২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১০) প্রতিবেদনে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য আছে। প্রতিবেদনে দমকলের সাবেক মহাপরিচালকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘সোয়েটার ফ্যাক্টরিগুলোতে অ্যাক্রেলিক কেমিক্যাল উপাদান থাকে প্রচুর পরিমাণ, এগুলো পুড়লে মারাত্মক টক্সিক (বিষাক্ত) ধোঁয়া উত্পন্ন হয়। কারখানাগুলোতে তাপ ও ধোঁয়া বের হওয়ার পর্যাপ্ত পথ থাকে না। এ কারখানায়ও তা-ই হয়েছে। বিষাক্ত গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়েছিল ভবনটি। এ কারণে বিষাক্ত ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে। আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির হিটলারের গ্যাস চেম্বারের কথা শুনে আঁতকে উঠি, কিন্তু এখনো আমাদের সোয়েটার কারখানায় বিষাক্ত গ্যাস শ্রমিকের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠছে, তা দেখে ও শুনে আঁতকে উঠছি না কেন?
সম্মিলিত নারীসমাজ প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং কারখানার দোষী মালিকদের শাস্তি দাবি করেছে। তবে সব নারী সংগঠনের ঐক্যবদ্ধভাবে গার্মেন্টস ও সোয়েটার কারখানায় দুর্ঘটনার বিষয়টি আন্তর্জাতিক নারী দিবসে তুলে ধরা দরকার। শ্রমিক নারীদের সংগ্রামই আমাদের তুলে ধরতে হবে।
ফরিদা আখতার: নারী আন্দোলনের নেত্রী; উন্নয়নকর্মী।

নারী লেখক, নর লেখক -আন্তর্জাতিক নারী দিবস by শামীম আজাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পর এলো আন্তর্জাতিক নারী দিবস। আর আমি এখনো ঢাকায়। আমি এখনো ঘোরে। কী করে একটি অখণ্ড ফেব্রুয়ারি মাস পেলাম! প্রতিদিন ঢাকার ধুলোয় ধরাশায়ী অবস্থায় বাংলা একাডেমী বইমেলায় ঢুকেছি, তবু মনে হয়েছে এ আমাদের এক আশ্চর্য মোকাম। উড়ছে ধুলো, ঘুরছে পাঠক, লেখক, চিত্রক, চিত্রধারক, প্রকাশক, পাওনাদার, প্রতারক। বক্তৃতা হচ্ছে সেখানে! শ্রোতার আসনে অর্ধেক পুলিশ আর অর্ধেক মানুষ। বাংলাবাজার থেকে জ্যাম আর ঘামে বিরক্ত হয়ে আসছেন প্রকাশক। কিন্তু নজরুল মঞ্চে টিভি ক্যামেরা ও সাংবাদিকদের সামনে তারা হাসছেন। মজুরদের মাথায় করে আসছে তিনতলা বইয়ের দালান। মেলায় চিত্রগ্রাহকদের কাঁধে ঘুরছে আধাডজন টিভি ক্যামেরা। ঘাড় ফেরালেই সাংবাদিক। যাঁরা মেলায় আসেননি বা এসেছেন, তাঁদের জন্য কেবলই সন্দেশ চাই-সংবাদ চাই। মাথার ক্ষুধা এমনই এক গনগনে তাওয়া, সাংবাদিকদের এ মেলা থেকেই পরের মেলার বিষয় তুলে নিতে হবে ক্যামেরা, মোবাইলে অথবা নোটবুকে টুকে টুকে।
বাংলা একাডেমীর বইমেলায় হাত বাড়ালেই কবি-লেখক-প্রাবন্ধিক। তাঁরা নর কিংবা নারী। কেউ কেউ নতুন হলেও নন খুব একটা আনাড়ি। এমন সুযোগ যখন, তখন নারী দিবসের জন্য সাংবাদিকদের ক্যামেরা ও হাতে ‘অতএব ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার’-এর মতোই নারীধরা হয়ে প্রশ্ন করে বেড়াচ্ছেন। নারী লেখক কম কেন? নারীদের লেখা পুরুষ লেখকদের তুলনায় মানুষ কম পড়ছে কি? কেন? নারী কবিদের নাম করতে গেলে মাত্র কয়েকজন কেন পাওয়া যায়? বলা বাহুল্য, শেষ প্রশ্নটির টোপে গেঁথে গেলাম।
আমি তখন লিটলম্যাগ কর্নারে লেখকদের বসার জন্য আল্পনা আঁকা যুগল আমগাছের গোড়ায় বসে পড়েছি। আমি বসার পর সেই সাংবাদিক ভগ্নী-ভ্রাতারাও বসলেন। তখন হঠাত্ করেই আমার একটি তুলনা মাথায় এল। তা গতবারের অলিম্পিক গেমের কথা। লম্বা একটা দৌড় হচ্ছে। সব দেশের প্রতিনিধি এসে দাঁড়িয়েছেন। সেসব প্রতিনিধির সবাই পুরুষ। সংকেত বাজার পর সবাই ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়। কালো, হলুদ, সাদা, গোলাপি, বাদামি রঙের সব দৌড়বিদ জীবন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। টিভি পর্দায় সে দৌড়ের সঙ্গে উড়ছে আমাদের চোখ। কিন্তু দৌড় শুরু হওয়ার পরপরই কিছু দেশের প্রতিনিধি বরাবরের মতোই ভীষণ পেছনে পড়ে গেল। কারণটা কী? এরা তো নারী নয়। তাহলে? দর্শকদের একজন বললেন, সমান পুরুষ হলেও কি এদের অলিম্পিকে খেলার তেমন অভিজ্ঞতা আছে? আরেক জন বললেন, এদের বেশিরভাগই জাতিগতভাবে বেশ দরিদ্র, তাই ছোটবেলা থেকে তেমন পুষ্টিকর খাওয়া হয়নি। একে তো এদের বলহীন দেহ, তার ওপরে এসব দেশে নেই সর্বশেষ প্রযুক্তি, তথ্য ও বিজ্ঞান। বেড়ে ওঠাটা সমান মাপের হয়নি, এমনকি অনুশীলন-কালেও। একজন বললেন, বাংলাদেশের কথা ভাবো, আমরা ভালো খাবার দূরে থাকুক, ভালো ওষুধও তো পাই না। আর এরা প্রাকটিস করবে কী, সংসারের চাপে অন্য কাজ করেই কুল পায় না। এরা অনেকেই হয়তো পার্টটাইমার। ওই পিছিয়ে পড়া পুরুষদের স্থানেই আমাদের দেশের নারী। সমপর্যায়ে সুযোগ-সুবিধা ও অভিজ্ঞতার ব্যবস্থা করে একবার, কোনো একবারও কি তা যাচাই করা হয়েছে?
এ গল্প বলার পর আমাদের আড্ডা বেশ জমে উঠল। তবে শারীরিকভাবে তারা বলশালী এটা মানি। বুদ্ধিতে নয়, কল্পনায় নয়। লেখক তো তাঁর অভিজ্ঞতাই লেখেন। যেকোনো অভিজ্ঞতা যা কিনা তাঁরা সর্বতোভাবে গবেষণা করেছেন, তাই লেখেন নারী লেখক ও পুরুষ লেখক উভয়েই। কিন্তু তা লেখার জন্য সার্বিক যোগ্যতা অর্জন করার সুযোগ নারী কবি বা লেখকের চেয়ে পুরুষের বেশি।
একবার বইমেলায় যদি লেখকের নাম ঢেকে কেবলমাত্র শিরোনাম দিয়ে তা বিক্রি করা হতো, তাহলে একটা মজা হতো নির্ঘাত। যে যে লেখকের নামে তিনি নারী বা পুরুষ বোঝা যায় না, বিষয়বস্তুতেও যদি থাকে না ‘মেয়েদের বিষয়’—এমন নব্য নারী লেখক যে বস্তুগুণে আদৃত হয়েছেন, তার প্রমাণ আছে এন্তার। আর নারী নামে যাঁরা খ্যাত হয়েছেন, ব্যতিক্রম ছাড়া সবাই হয় সমান মাপের পুরুষ লেখকদের চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন, নয়তো কারও (বাবা, বন্ধু, স্বামী) হাতে ধরেই তবে এসেছেন। তবে নারী লেখক যে কম, তাতে আমার কোনো দ্বিমত নেই। যাঁরা আগে মাঠে নামবেন, তাঁরা তো আগে যাবেনই। এ ক্ষেত্রে পুত্রদের নামানো হয় আগে। যে পরিবারে দুজনই কন্যা, তাদের অবস্থানের পরিসংখ্যান নিয়েছি?
আড্ডা আরও জমে উঠল এবং এসে গেল আশির দশকের গোড়ার কথা। আমি তখন সাপ্তাহিক বিচিত্রায় কাজ করতাম। টিমের মধ্যে একমাত্র নিয়মিত নারী সাংবাদিক। লিখি মধ্যবিত্তের জীবনযাপন, নারী নির্যাতন, খাদ্যাভ্যাস, দেশি ফ্যাশন, ঈদের বাজার, ও বড়জোর দেশের শিক্ষালয়গুলোর ব্যবস্থা, কিংবা ঢাকার বিনোদন এসব নিয়ে। আর এসব গতানুগতিক বিষয়ে কাব্য এনে, রোদে রোদে টাঙ্গাইল, রাজশাহী ঘুরে দেশের জাতীয় চরিত্রে দেশি পোশাক আনার জন্য প্রাণান্ত। আর তখনই কি না আমার পুরুষ সহকর্মীরা ধমাধম পোর্ট আনোয়ারা অথবা যুদ্ধাপরাধীরা কে কোথায় আছে অথবা বিমানের কারচুপি লিখে হিরো। শাহাদত চৌধুরী আমাকে তেমন কোনো রিপোর্ট করতে দিতে পেরেছেন কি? আমি তো আর পারব না ক্রিমিনাল শিবিরে ঢুকে এক টেবিলে চা সিগারেট খেয়ে তাঁর কথা বের করতে। অথবা কাজ সেরে রাত দুটো-তিনটায় মতিঝিল থেকে একা রিকশায় ফিরতে। মানলাম, এ আমাদের সমাজ-ব্যবস্থা।
সে সময় সত্তরের শেষার্ধ থেকে আশির পুরোটা দশক আমি যেভাবে যে বিষয় দেখেছি ও লিখেছি, তখন ঢাকার কোনো পুরুষ সহকর্মী হয়তো তা করেননি। কারণ তাদের তো আর ছোটবেলা থেকে নারী অথবা গৃহজীবনের সেসব অভিজ্ঞতা দেওয়া হয়নি। তাই তাঁরা কই মাছের কোরমা কিংবা আরেক জন কিশোরীর কষ্ট জানবেন কী করে? এমনকি আজ অবধি বাংলাদেশি খুব নগণ্য সংখ্যক পুরুষই আছেন, যাঁরা তাঁর স্ত্রীর প্রসবকালে সামনে থেকে সে কষ্টটুকু অন্তত চাক্ষুষ করেছেন। তাহলে এসব সুবিধাবঞ্চিত পুরুষেরা কি করছে? এসব বিষয়ে পিছিয়ে আছে। তাহলে এ ব্যাপারে তাদের পশ্চাত্পদতা নিয়ে কে তাঁদের বকছে! নাকি এ বিষয়গুলো কেবল নারী জাতির বিষয়। একটা প্রচলিত ইংরেজি কথা আছে, ‘যাকে সমালোচনা করছ, তার জুতোয় নিজের পা গলিয়ে দেখ তো দেখি হাঁটতে পার কি না?’ হয় প্রচণ্ড ব্যথা পাবে, পায়ে তোমার ফোস্কা হবে, কোমরে হবে ব্যথা। সে কি আর যা-তা কথা। ‘পুরুষের জন্য সে জুতো মানানসইও তো হতে হবে।’
হাসতে হাসতেই তাই বেগম রোকেয়ার সুলতানার স্বপ্ন-এর কথা বলি। সেখানে সুস্পষ্ট দেখা যায়, নারীকে অবরুদ্ধ রাখলে তার শক্তি ক্ষয় হয় না, ক্ষয় হয় দেশের। লেখককে নারী বলে খুঁজে পেতে বের করলে নিজেদের অসম্পূর্ণতাই আরও সম্পন্ন হয়ে ওঠে।
শামীম আজাদ: কবি, লেখক ও সাংবাদিক
shetuli@yahoo.com

নারীমুক্তির আইনি কিছু উপায় -আন্তর্জাতিক নারী দিবস by মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী

আজ ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। শুধু তা-ই নয়, দিবসটি আজ শত বছরের পূর্ণবয়স্ক। কিন্তু সেটা অঙ্কের হিসাব, বাস্তবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামো কোথাও জ্ঞাতসারে কিংবা কোথাও অজ্ঞাতসারে আজও সমাজে খুঁটা গেড়ে আছে। বর্তমান সময়ে মানুষ-উত্পাদনের যন্ত্র হিসেবে নারীদের কাজ কমেছে যেহেতু একালে জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন জরুরি হয়ে পড়েছে। সন্তানের জন্ম দেওয়া ও তার লালন-পালনের কাজে একজন নারীকে তাঁর বিবাহিত জীবনের পুরোটা ব্যয় করা এখন অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক। তাহলে এটা ভাবতে কিংবা ধরে নিতে কঠিন না হয়ে সহজ হচ্ছে না কেন যে নারী কিংবা পুরুষ উভয়েই ব্যক্তিমানুষ, তাদের প্রত্যেকের রয়েছে পূর্ণ মানবিক মর্যাদা লাভের অধিকার, সঠিক বলতে শুধু অধিকারই নয়, স্বাধীনতাও। বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে উচ্চারিত হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।’ এ বাক্যটি উচ্চারণ করার সময়ে এই দিবসে আশা করব, অতঃপর উচ্চারিত হবে জনগণ, যার অর্ধেক নারী আর অর্ধেক পুরুষ।
প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, শিরোনাম পড়ে নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে আপনার ধারণা হয়েছে এ লেখাটির পরিসর একটি বিষয়ে নির্দিষ্ট। আবার এখান থেকে পড়তে শুরু করার আগে জানিয়ে দিচ্ছি, লেখাটির বিষয় অত্যন্ত স্বল্পপরিসরে নির্দিষ্ট রাখতে চাই ১৯৬৯ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অর্ডিন্যান্সের কয়েকটি ধারার সংশোধন বিষয়ে। এই সঙ্গে আশা করব, জাতীয় সংসদের সদস্যরা সেইমতো অর্ডিন্যান্সটি সংশোধন করবেন এবং আমার সংশোধনী প্রস্তাবগুলো নারীমুক্তির আইনি কিছু উপায় কি না, সেটা বিবেচনার ভার পাঠক-পাঠিকাদের ওপর দিলাম।
উপরিউক্ত অর্ডিন্যান্সের ৭ ধারার বঙ্গানুবাদ এই: ‘তালাক-৭ (১) কোনো ব্যক্তি তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিতে ইচ্ছে করলে যেকোনোভাবে তালাক উচ্চারণ করার পর পরই এরূপ কাজ করেছেন জানিয়ে চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ দেবেন এবং তার একটি অনুলিপি স্ত্রীকে সরবরাহ করবেন। (২) কেউ উপধারা (১)-এর শর্ত লঙ্ঘন করলে তাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে বিনাশ্রম কারাদণ্ড, যার মেয়াদ হতে পারে এক বছর পর্যন্ত কিংবা অর্থদণ্ড যা হতে পারে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কিংবা উভয়বিধ দণ্ড। (৩) উপধারা (৫)-এ বর্ণিত সাপেক্ষে কোনো তালাক স্পষ্টভাবে কিংবা অন্যভাবে প্রত্যাহার করা না হলে, তা কার্যকর হবে না যদি না উপধারা (১) অনুযায়ী চেয়ারম্যানের কাছে নোটিশ পাঠানোর পর ৯০ দিন অতিক্রান্ত হয়। (৪) উপধারা (১) অনুযায়ী নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার লক্ষ্যে একটি সালিস পরিষদ গঠন করবেন এবং সেই সালিস পরিষদ সমঝোতার জন্য প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। (৫) যদি তালাক উচ্চারণের সময় স্ত্রী গর্ভবতী থাকেন, তাহলে তালাক ওই সময় পর্যন্ত কার্যকর হবে না যদি উপধারা (৩)-এ উল্লিখিত মেয়াদ কিংবা গর্ভকালীন সময় (যেটা পরে হয়) শেষ না হয়। (৬) এই ধারা অনুযায়ী তালাক দ্বারা বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে এমন একজন স্ত্রীর তৃতীয় ব্যক্তির সঙ্গে হিল্লা বিয়ে ছাড়াই একই স্বামীর সঙ্গে পুনর্বিবাহ হতে কোনো বাধা থাকবে না। যদি না এরূপ বিবাহবিচ্ছেদ তৃতীয়বারের মতো কার্যকর হয়।’
প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, (৪) উপধারাটি লক্ষ করুন। সালিস পরিষদের কার্যপরিধি ও ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। চেয়ারম্যানের একমাত্র কাজটি হচ্ছে উভয় পক্ষকে তাদের পক্ষে সালিস পরিষদে একজন করে প্রতিনিধির নাম দেওয়ার জন্য নোটিশ প্রেরণ করা এবং সালিস পরিষদের একমাত্র কাজ হচ্ছে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করা। একজন দুর্বিনীত স্বামী যদি সালিস পরিষদে তাঁর প্রতিনিধি না দেন এবং সেটাই স্বাভাবিক, তাহলে (৩) উপধারা অনুযায়ী চেয়ারম্যানের কাছে নোটিশ পাঠানোর ৯০ দিন পরে তালাক আপনা-আপনি কার্যকর হয়ে যাবে। অর্ডিন্যান্সটির (২) ধারার (খ) উপধারায় সালিস পরিষদের চেয়ারম্যান কোন এলাকায় কে হবেন তা বলা আছে। কিন্তু (ক) উপধারায় সালিস পরিষদ গঠনের যে নিয়ম আছে অর্থাত্ চেয়ারম্যান। স্বামীর পক্ষে একজন প্রতিনিধি ও স্ত্রীর পক্ষে একজন প্রতিনিধি নিয়ে সেটা গঠন করা হবে, সেটা নিম্নরূপ সংশোধন করার জন্য আমি প্রস্তাব রাখছি:
‘২ (ক) ৭ ধারার ১ উপধারা অনুযায়ী দেওয়া নোটিশের নিষ্পত্তির জন্য চেয়ারম্যান নোটিশ প্রাপ্তির সাত দিনের মধ্যে দুজন মহিলা ও দুজন পুরুষ সদস্যের মনোনয়ন দেবেন এবং পাঁচ সদস্যর একটি সালিস পরিষদ গঠিত হবে। তবে শর্ত থাকে ২ (খ) ধারায় উল্লিখিত চেয়ারম্যানরা সালিস পরিষদের সদস্য মনোনীত করার উদ্দেশ্যে তাঁদের স্ব-স্ব এলাকায় উপযুক্ত আস্থাবান অন্যূন ১৫ জন সমসংখ্যক মহিলা ও পুরুষের তালিকা প্রস্তুত রাখবেন। আরও শর্ত থাকে যে শুনানির প্রথম তারিখে পক্ষগণের মধ্যে কেউ মনোনীত এক কিংবা একাধিক কোনো সদস্যের মনোনয়নে আপত্তি করলে চেয়ারম্যান অন্য সদস্য কিংবা সদস্যদের মনোনয়ন দেবেন।’
উপরিউক্ত অর্ডিন্যান্সের (৩) ও (৪) ধারা দুটি বাতিল হবে এবং ৭ উপধারা হিসেবে যোগ হবে এই বিষয়গুলো: ‘৭ (১) সালিস পরিষদ সমঝোতার ভিত্তিতে তালাক অকার্যকর করতে ব্যর্থ হলে নিম্নলিখিত রোয়েদাদ দেবেন: (ক) দেনমোহরের পরিমাণ (যদি বকেয়া থাকে); (খ) ইদ্দতকালীন ভরণপোষণের জন্য অর্থের পরিমাণ (যদি ইতিপূর্বে না দেওয়া হয়); (গ) বিবাহকালীন স্বামীর নামে কিংবা স্ত্রীর নামে কিংবা উভয়ের নামে অর্জিত (কিন্তু দান কিংবা হেবামূলে প্রাপ্ত নয়) স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির তুলাংশ বণ্টন; (ঘ) প্রাপ্ত অংশ দ্বারা তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর ভরণপোষণ পর্যাপ্ত না হলে পুনর্বিবাহ না করা পর্যন্ত তা পূরণের জন্য স্বামীর দেয় মাসিক কিংবা বাত্সরিক অর্থের পরিমাণ; এবং (ঙ) নাবালক সন্তান কিংবা সন্তানদের অভিভাবকত্ব সাব্যস্ত ও মাতা যদি অভিভাবক সাব্যস্ত হন তবে সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য পিতা কর্তৃক দেয় মাসিক কিংবা বাত্সরিক অর্থের পরিমাণ। (২) রোয়েদাদে প্রদত্ত অর্থের কিংবা সম্পত্তির মূল্যের পরিমাণ যা হোক না কেন, রোয়েদাদটি ওই এলাকার সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের ডিক্রি গণ্যে সেই সহকারী জজ আদালত কর্তৃক দেওয়ানি কার্যবিধির ২১ আদেশের অন্তর্ভুক্ত নিয়মগুলোর মাধ্যমে রোয়েদাদটি কার্যকর করা যাবে।’
প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, এখন আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, কোনো স্ত্রী তাঁর স্বামীকে তালাক দিতে চাইলে তাঁকে কী করতে হবে। এই অর্ডিন্যান্সের ৮ ধারায় বলা আছে, স্ত্রীকে সে ক্ষেত্রে উপরিউক্ত ৭ ধারা অনুযায়ী নোটিশ দিতে হবে। এই অর্ডিন্যান্সের সবচেয়ে অবমাননাকর ও লজ্জাদায়ক ধারাটি হচ্ছে ৬ ধারা। সেটা হচ্ছে সালিস পরিষদের অনুমতি সাপেক্ষে একাধিক বিয়ে করা যাবে। অথচ সত্য কথাটি হচ্ছে, ইসলাম বহু বিবাহ সমর্থন করে না। অজ্ঞানতার যুগে বাধাহীন নারীকে বিয়ে করার পরিবর্তে সর্বাধিক স্ত্রী গ্রহণের সংখ্যা চার সীমিত করা হয় এই শর্তে যে স্ত্রীদের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম-আচরণ ও সুবিচার করতে হবে (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩)। এ আয়াতটি নাজিল হয় ওহুদ যুদ্ধের পরে। এই যুদ্ধে অনেক মুসলমান শহীদ হওয়ায় এতিম ও বিধবাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। অতঃপর সূরা আন-নিসার ১২৯ আয়াতে বলা হয়: ‘এবং তোমরা যতই আগ্রহ করো না কেন, তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি সমান ব্যবহার করতে কখনোই পারবে না।’
সহিহ আল-বুখারির সপ্তম খণ্ডে ১৫৭ নম্বর হাদিসটি এই: ‘আল-মিসওয়ার বিন মাখরামা বর্ণনা করেন, আমি আল্লাহর রাসূল (সা.) -কে মিম্বর থেকে বলতে শুনেছি, ‘বনি হাসিম বিন আল-মুখিরা আমাকে অনুরোধ করেছেন যে আমি যেন তাদের কন্যার সঙ্গে আলি বিন তালিবের বিবাহে অনুমতি দিই। কিন্তু আমি অনুমতি দিইনি এবং অনুমতি দেব না যতক্ষণ না আলি আমার কন্যা ফাতিমাকে তালাক দেয়। কারণ, ফাতিমা আমার দেহের টুকরা এবং আমি ঘৃণা করি যা সে ঘৃণা করে আর যা তাকে ব্যথা দেয়, তা আমাকেও ব্যথা দেয়।’
উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে সূরা আল-আহজাবের ৫২ নম্বর এই আয়াতটি নাজিল হয়: ‘অতঃপর তোমার (অর্থাত্ আল্লাহর রাসুল) জন্য কোনো নারী বৈধ নয় এবং তোমার স্ত্রীদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণও বৈধ নয়।’ সুতরাং স্ত্রীদের প্রতি সম-আচরণ করতে হবে এই শর্তটি পালন দুঃসাধ্য বিধায় ইসলাম এক বিয়েকে নির্দেশ দেয়। আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁর জামাতাকে আরেকটি বিয়ে করার প্রস্তাবকে অগ্রাহ্য করেছিলেন ওই একই কারণে যে হজরত আলি (রা.) দুই স্ত্রীর প্রতি সম-আচরণ করতে পারবেন না। তিউনিসিয়া ১৯৫৭ সালে আইন করে একাধিক বিয়ে নিষিদ্ধ করেছে। উপরিউক্ত অর্ডিন্যান্সের ৬ ধারাটি অবশ্যই বিলুপ্ত করে তত্স্থলে একাধিক বিয়ে নিষিদ্ধ করে একটি ধারা যোগ করতে হবে।
মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী: অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, আপিল বিভাগ, সুপ্রিম কোর্ট।

নারীবান্ধব উন্নয়ন: সমতাভিত্তিক সমাজের জন্য -আন্তর্জাতিক নারী দিবস by ফাহমিদা খাতুন

প্রতিবছর নারী দিবসের স্লোগানের ভাষা ভিন্ন হলেও সবগুলোর অন্তর্নিহিত বক্তব্য একটিই—নারীর প্রতি বৈষম্য বিদ্যমান, তারা সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ এবং তাদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ১০০ বছর ধরে সারা বিশ্বে একেকটি থিম নিয়ে নারী দিবস পালিত হলেও বিশ্বের কোথাও নারী-পুরুষ সমতা এখনো অর্জিত হয়নি। জাতিসংঘের জেন্ডার উন্নয়ন সূচক এবং জেন্ডার ক্ষমতায়ন সূচক দুটির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে নারী-পুরুষের অবস্থান দেখানো হয় এবং সূচক অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের অবস্থানও দেখানো হয়। জেন্ডার উন্নয়ন সূচকে নারী-পুরুষের মধ্যকার অসমতা প্রতিফলিত হয়। জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন রিপোর্ট-২০০৯ অনুযায়ী বাংলাদেশে জেন্ডার উন্নয়ন সূচক ০.৫৩৬। আর ১৫৫টি দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান ১২৩তম। এই সূচকের অর্থ হচ্ছে, নারীরা পুরুষের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে জেন্ডার ক্ষমতায়ন সূচকের মাধ্যমে দেখানোর চেষ্টা করা হয় নারীরা অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক জীবনে সক্রিয়ভাবে কতটুকু অংশগ্রহণ করতে পারছে। জাতীয় সংসদে পুরুষের তুলনায় শতকরা কতজন নারীর আসন রয়েছে, কতজন নারী মন্ত্রী রয়েছেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক পর্যায়ে কতভাগ নারী, বিভিন্ন পেশাগত এবং কারিগরি কাজে নারীর অংশগ্রহণের হার কত এবং তাদের আয়বৈষম্য ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মতো তথ্যগুলোর মাধ্যমে জেন্ডার ক্ষমতায়ন সূচক তৈরি করা হয়। অর্থাত্ এখানে কিছু নির্ধারিত ক্ষেত্রে সুযোগের বৈষম্য তুলে ধরা হয়। বর্তমানে ১০৯টি দেশের মধ্যে জেন্ডার ক্ষমতায়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৮। আর বাংলাদেশের জন্য এই সূচকটি হচ্ছে ০.২৬৪ অর্থাত্ নারী-পুরুষ বৈষম্য এ ক্ষেত্রে আরও ব্যাপক। সেদিক থেকে এবারের নারী দিবসের স্লোগান সম-অধিকারের মাধ্যমে সবার অগ্রগতি অনেক তাত্পর্যপূর্ণ।
সিমোঁ দ্য বোভায়া তাঁর বিখ্যাত বই দ্বিতীয় লিঙ্গতে বলেছেন, ‘নারী হয়ে কেউ জন্ম নেয় না, নারী হয়ে ওঠে’। এই হয়ে ওঠার পর যে মানবসত্তা তৈরি হয় তাকে বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে হয়। ঘর আর বাহির দুই জায়গাই তার প্রতি সমভাবে তৈরি। এর প্রতিফলন ঘটে নানাভাবে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সম্পদ, চাকরি—সব ক্ষেত্রেই নারীর পাওয়া অসম। ঘরের ভেতর একটি অসম প্রেক্ষাপটে বেড়ে উঠে যখন বাইরে আরেকটি অসম জগতে প্রবেশ করে, তখন সে আগে থেকেই প্রতিযোগিতায় অনেক পিছিয়ে থাকে। তার জন্য ‘লেভেল প্লেইং ফিল্ড’ বা একই সমতলে সুযোগ না থাকার কারণে সে বরাবরই অসম অবস্থায় রয়ে যায়। সেটি কী অর্থনীতিতে, কী রাজনীতিতে—সবর্ত্রই প্রযোজ্য।
অথচ সামাজিক উন্নয়নের প্রধান অনুষঙ্গ যে মানব উন্নয়ন এবং সেই উন্নয়নের জন্য মানবজাতির অর্ধেক অংশ নারীর উন্নয়নও যে অপরিহার্য তা সবারই জানা। কেননা যে উন্নয়ন সমাজের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে হয় না অর্থাত্ যা ‘ইনক্লুসিভ’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক নয় তা টেকসই উন্নয়ন নয়, তার প্রবৃদ্ধির হার যত বেশিই হোক না কেন। আবার যে উন্নয়ন শুধু বস্তুগত এবং প্রাকৃতিক মূলধনের ওপর ভিত্তি করে অর্জিত হয়, সেটিও আকাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন নয়, কেননা মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া সেই অগ্রগতির ধারা বেশি দূর অব্যাহত রাখা যায় না।
আমাদের দেশসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই বর্তমানে যে উন্নয়ন প্রক্রিয়া এবং ধারা চলছে তা অসম এবং অ-অন্তর্ভুক্তিমূলক। এখানে অসমতা দরিদ্র ও ধনীদের মধ্যে, নারী ও পুরুষের মধ্যে। আর তার পেছনে কারণ হলো, এই উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। নারীরা মূলত দুইভাবে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। প্রথমত: সুযোগের অভাব অর্থাত্ বিদ্যমান অর্থনীতি নারীর জন্য কাজের এবং আয়ের পর্যাপ্ত সুযোগ করে দিতে পারে না। তবে সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়াটাই যথেষ্ট নয়। সুযোগ কোনো কাজেই লাগবে না যদি না তার ব্যবহার করা যায়। তাই দ্বিতীয় প্রয়োজনটি হলো সক্ষমতার, যেটির অভাব রয়েছে নারীর। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এই দুটি বিষয়কে তাঁর ‘কমোডিটিজ অ্যান্ড কেপেবিলিটিজ’ প্রবন্ধে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, কাউকে কোনো পণ্য দিলেই তার জীবনযাত্রার মান বদলে যায় না। বদলানোটা নির্ভর করে ওই পণ্যটি ব্যবহার করার সক্ষমতা ওই ব্যক্তির রয়েছে কি না তার ওপর। আমাদের সমাজে যে সুযোগগুলো অর্থনীতিতে রয়েছে, সেগুলো ব্যবহার করার জন্য নারীর উপায় বা ক্ষমতা থাকে না। যেমন, শিক্ষা এবং দক্ষতার অভাবে নারীরা অনেক কাজ করতে পারে না কিংবা শুধু স্বল্প আয়ের এবং নিচু পর্যায়ের কাজগুলোতে অংশ নিতে পারে। এটি এমনকি বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে নিয়োগের ক্ষেত্রেও সত্য, যেখানে শতকরা ৭৫ ভাগ শ্রমিকই নারী। প্রশাসনিক, ব্যবস্থাপনা, করপোরেট খাত ইত্যাদির বেলায়ও এটি বিদ্যমান। আর এ কারণেই দেখা দেয় আয়বৈষম্য। অর্থনীতিবিদ এবং তাত্ত্বিকগণ, যেমন জন স্টুয়ার্ট মিল, অ্যাডাম স্মিথ এবং কার্ল মার্কস যুক্তি দিয়েছিলেন, মানুষের সহজাত ক্ষমতা নয়, বরং শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই উত্পাদনশীলতা বাড়ানো যায়। সমাজের আয়বৈষম্য এই তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। গ্যারি বেকার, থিওডোর শুলজ এবং অ্যাডাম স্মিথের মতো অর্থনীতিবিদেরা তাই তাঁদের বিখ্যাত ‘মানব মূলধন’ তত্ত্বের মাধ্যমে মানব মূলধনের ওপর বিনিয়োগ করতে বলেছেন। তার সুফল যদিও ব্যয়সাপেক্ষ, কিন্তু তা সুদূরপ্রসারী।
আমাদের দেশে মানব উন্নয়নে বিনিয়োগ সাধারণভাবে অনেক কম। যেমন স্বাস্থ্য খাতে ২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেটে যে ব্যয় বরাদ্দ করা হয়েছে তা আমাদের মোট সরকারি ব্যয়ের শতকরা ৬.৩ ভাগ এবং শিক্ষা ও কারিগরি খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে মোট সরকারি ব্যয়ের শতকরা ১৩ ভাগ। সামগ্রিকভাবে মানব উন্নয়নের জন্য বরাদ্দের অংশ মোট বাজেটের শতকরা ২৩.৫ ভাগ। এই বরাদ্দ আগের তুলনায় বেশি হলেও বলার অপেক্ষা রাখে না যে মানব উন্নয়ন সূচকে অগ্রগামী দেশগুলোতে এই বরাদ্দের পরিমাণ আরও বেশি। তা ছাড়া এই বরাদ্দের বেশ কিছু অংশ প্রতিবছরই অব্যবহূত রয়ে যায় আমাদের ব্যয় করার ক্ষমতা এবং দক্ষতার অভাবে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের তৃতীয় আরেকটি অনুষঙ্গ হলো অর্থনৈতিক সুযোগের এবং আয়ের নিরাপত্তা। যেকোনো ধরনের অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা মহামারি, সামাজিক ব্যাধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দরিদ্র জনগণই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যেহেতু তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা কম। তাদের মধ্যে দরিদ্র নারীদের অবস্থা আরও বেশি সঙ্গিন। এ ধরনের বিপর্যয়ের সময়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের সহায়তা না করলে তারা হতদরিদ্রই রয়ে যাবে। সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক ক্ষমতায়নের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ মোট বাজেটের ১৫.২ শতাংশ, যা দিয়ে নারীসহ চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন কার্যক্রমের আওতায় সাহায্য করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় যে কার্যক্রমগুলো নেওয়া হয়ে আসছে সেগুলো প্রশংসার দাবি রাখে। তবে সেখানে নারীদের সংখ্যা আরও বাড়ানোর অবকাশ রয়েছে। এই কর্মসূচিগুলোর গুণগত ও পরিমাণগত মান বাড়িয়ে অধিকসংখ্যক নারীকে এই বেষ্টনীর মধ্যে আনা এবং প্রকৃত সহায়তা তাদের হাতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদ পল স্যামুয়েলসন বলেছিলেন, ‘নারী আসলে পুরুষই, পার্থক্য হলো, তার কম অর্থ আছে’। বিছিন্নভাবে এই বক্তব্যটি অনেক নারীই উচ্চপর্যায়ের কাজের এবং উচ্চ আয়ের মাধ্যমে খণ্ডন করলেও সাধারণভাবে নারী এখনো অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে আছে। বর্তমানে নারী ও পুরুষের আয়ের অনুপাত প্রায় ০.৫১ অর্থাত্ একজন নারী একজন পুরুষের আয়ের অর্ধেক উপার্জন করতে পারছে। কর্মক্ষেত্রে নারীর পদচারণা বেড়ে চলা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো এখনো নারীর কাজের জন্য পুরোপুরি উপযোগী হয়ে ওঠেনি। তবে বৈষম্যের মাত্রা কমানোর জন্য শুধু আয় বাড়ানোই একমাত্র নিয়ামক নয়। নারী-পুরুষের মধ্যকার বৈষম্য ঘুচিয়ে সমতাভিত্তিক উন্নয়নের জন্য সঠিক নীতিমালা এবং যথোপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে মানব উন্নয়নে ব্যয় বাড়ানো যেমন অপরিহার্য, তেমনি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করাও অত্যাবশ্যক। আর সেটি সম্ভব দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে।
ড. ফাহমিদা খাতুন: অর্থনীতিবিদ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ এবং পরিচালক, জনতা ব্যাংক।

Monday, March 8, 2010

নারীবান্ধব উন্নয়ন: সমতাভিত্তিক সমাজের জন্য by ফাহমিদা খাতুন

প্রতিবছর নারী দিবসের স্লোগানের ভাষা ভিন্ন হলেও সবগুলোর অন্তর্নিহিত বক্তব্য একটিই—নারীর প্রতি বৈষম্য বিদ্যমান, তারা সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ এবং তাদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ১০০ বছর ধরে সারা বিশ্বে একেকটি থিম নিয়ে নারী দিবস পালিত হলেও বিশ্বের কোথাও নারী-পুরুষ সমতা এখনো অর্জিত হয়নি। জাতিসংঘের জেন্ডার উন্নয়ন সূচক এবং জেন্ডার ক্ষমতায়ন সূচক দুটির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে নারী-পুরুষের অবস্থান দেখানো হয় এবং সূচক অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের অবস্থানও দেখানো হয়। জেন্ডার উন্নয়ন সূচকে নারী-পুরুষের মধ্যকার অসমতা প্রতিফলিত হয়। জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন রিপোর্ট-২০০৯ অনুযায়ী বাংলাদেশে জেন্ডার উন্নয়ন সূচক ০.৫৩৬। আর ১৫৫টি দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান ১২৩তম। এই সূচকের অর্থ হচ্ছে, নারীরা পুরুষের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে জেন্ডার ক্ষমতায়ন সূচকের মাধ্যমে দেখানোর চেষ্টা করা হয় নারীরা অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক জীবনে সক্রিয়ভাবে কতটুকু অংশগ্রহণ করতে পারছে। জাতীয় সংসদে পুরুষের তুলনায় শতকরা কতজন নারীর আসন রয়েছে, কতজন নারী মন্ত্রী রয়েছেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক পর্যায়ে কতভাগ নারী, বিভিন্ন পেশাগত এবং কারিগরি কাজে নারীর অংশগ্রহণের হার কত এবং তাদের আয়বৈষম্য ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মতো তথ্যগুলোর মাধ্যমে জেন্ডার ক্ষমতায়ন সূচক তৈরি করা হয়। অর্থাত্ এখানে কিছু নির্ধারিত ক্ষেত্রে সুযোগের বৈষম্য তুলে ধরা হয়। বর্তমানে ১০৯টি দেশের মধ্যে জেন্ডার ক্ষমতায়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৮। আর বাংলাদেশের জন্য এই সূচকটি হচ্ছে ০.২৬৪ অর্থাত্ নারী-পুরুষ বৈষম্য এ ক্ষেত্রে আরও ব্যাপক। সেদিক থেকে এবারের নারী দিবসের স্লোগান সম-অধিকারের মাধ্যমে সবার অগ্রগতি অনেক তাত্পর্যপূর্ণ।
সিমোঁ দ্য বোভায়া তাঁর বিখ্যাত বই দ্বিতীয় লিঙ্গতে বলেছেন, ‘নারী হয়ে কেউ জন্ম নেয় না, নারী হয়ে ওঠে’। এই হয়ে ওঠার পর যে মানবসত্তা তৈরি হয় তাকে বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে হয়। ঘর আর বাহির দুই জায়গাই তার প্রতি সমভাবে তৈরি। এর প্রতিফলন ঘটে নানাভাবে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সম্পদ, চাকরি—সব ক্ষেত্রেই নারীর পাওয়া অসম। ঘরের ভেতর একটি অসম প্রেক্ষাপটে বেড়ে উঠে যখন বাইরে আরেকটি অসম জগতে প্রবেশ করে, তখন সে আগে থেকেই প্রতিযোগিতায় অনেক পিছিয়ে থাকে। তার জন্য ‘লেভেল প্লেইং ফিল্ড’ বা একই সমতলে সুযোগ না থাকার কারণে সে বরাবরই অসম অবস্থায় রয়ে যায়। সেটি কী অর্থনীতিতে, কী রাজনীতিতে—সবর্ত্রই প্রযোজ্য।
অথচ সামাজিক উন্নয়নের প্রধান অনুষঙ্গ যে মানব উন্নয়ন এবং সেই উন্নয়নের জন্য মানবজাতির অর্ধেক অংশ নারীর উন্নয়নও যে অপরিহার্য তা সবারই জানা। কেননা যে উন্নয়ন সমাজের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে হয় না অর্থাত্ যা ‘ইনক্লুসিভ’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক নয় তা টেকসই উন্নয়ন নয়, তার প্রবৃদ্ধির হার যত বেশিই হোক না কেন। আবার যে উন্নয়ন শুধু বস্তুগত এবং প্রাকৃতিক মূলধনের ওপর ভিত্তি করে অর্জিত হয়, সেটিও আকাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন নয়, কেননা মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া সেই অগ্রগতির ধারা বেশি দূর অব্যাহত রাখা যায় না।
আমাদের দেশসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই বর্তমানে যে উন্নয়ন প্রক্রিয়া এবং ধারা চলছে তা অসম এবং অ-অন্তর্ভুক্তিমূলক। এখানে অসমতা দরিদ্র ও ধনীদের মধ্যে, নারী ও পুরুষের মধ্যে। আর তার পেছনে কারণ হলো, এই উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। নারীরা মূলত দুইভাবে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। প্রথমত: সুযোগের অভাব অর্থাত্ বিদ্যমান অর্থনীতি নারীর জন্য কাজের এবং আয়ের পর্যাপ্ত সুযোগ করে দিতে পারে না। তবে সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়াটাই যথেষ্ট নয়। সুযোগ কোনো কাজেই লাগবে না যদি না তার ব্যবহার করা যায়। তাই দ্বিতীয় প্রয়োজনটি হলো সক্ষমতার, যেটির অভাব রয়েছে নারীর। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এই দুটি বিষয়কে তাঁর ‘কমোডিটিজ অ্যান্ড কেপেবিলিটিজ’ প্রবন্ধে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, কাউকে কোনো পণ্য দিলেই তার জীবনযাত্রার মান বদলে যায় না। বদলানোটা নির্ভর করে ওই পণ্যটি ব্যবহার করার সক্ষমতা ওই ব্যক্তির রয়েছে কি না তার ওপর। আমাদের সমাজে যে সুযোগগুলো অর্থনীতিতে রয়েছে, সেগুলো ব্যবহার করার জন্য নারীর উপায় বা ক্ষমতা থাকে না। যেমন, শিক্ষা এবং দক্ষতার অভাবে নারীরা অনেক কাজ করতে পারে না কিংবা শুধু স্বল্প আয়ের এবং নিচু পর্যায়ের কাজগুলোতে অংশ নিতে পারে। এটি এমনকি বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে নিয়োগের ক্ষেত্রেও সত্য, যেখানে শতকরা ৭৫ ভাগ শ্রমিকই নারী। প্রশাসনিক, ব্যবস্থাপনা, করপোরেট খাত ইত্যাদির বেলায়ও এটি বিদ্যমান। আর এ কারণেই দেখা দেয় আয়বৈষম্য। অর্থনীতিবিদ এবং তাত্ত্বিকগণ, যেমন জন স্টুয়ার্ট মিল, অ্যাডাম স্মিথ এবং কার্ল মার্কস যুক্তি দিয়েছিলেন, মানুষের সহজাত ক্ষমতা নয়, বরং শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই উত্পাদনশীলতা বাড়ানো যায়। সমাজের আয়বৈষম্য এই তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। গ্যারি বেকার, থিওডোর শুলজ এবং অ্যাডাম স্মিথের মতো অর্থনীতিবিদেরা তাই তাঁদের বিখ্যাত ‘মানব মূলধন’ তত্ত্বের মাধ্যমে মানব মূলধনের ওপর বিনিয়োগ করতে বলেছেন। তার সুফল যদিও ব্যয়সাপেক্ষ, কিন্তু তা সুদূরপ্রসারী।
আমাদের দেশে মানব উন্নয়নে বিনিয়োগ সাধারণভাবে অনেক কম। যেমন স্বাস্থ্য খাতে ২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেটে যে ব্যয় বরাদ্দ করা হয়েছে তা আমাদের মোট সরকারি ব্যয়ের শতকরা ৬.৩ ভাগ এবং শিক্ষা ও কারিগরি খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে মোট সরকারি ব্যয়ের শতকরা ১৩ ভাগ। সামগ্রিকভাবে মানব উন্নয়নের জন্য বরাদ্দের অংশ মোট বাজেটের শতকরা ২৩.৫ ভাগ। এই বরাদ্দ আগের তুলনায় বেশি হলেও বলার অপেক্ষা রাখে না যে মানব উন্নয়ন সূচকে অগ্রগামী দেশগুলোতে এই বরাদ্দের পরিমাণ আরও বেশি। তা ছাড়া এই বরাদ্দের বেশ কিছু অংশ প্রতিবছরই অব্যবহূত রয়ে যায় আমাদের ব্যয় করার ক্ষমতা এবং দক্ষতার অভাবে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের তৃতীয় আরেকটি অনুষঙ্গ হলো অর্থনৈতিক সুযোগের এবং আয়ের নিরাপত্তা। যেকোনো ধরনের অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা মহামারি, সামাজিক ব্যাধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দরিদ্র জনগণই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যেহেতু তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা কম। তাদের মধ্যে দরিদ্র নারীদের অবস্থা আরও বেশি সঙ্গিন। এ ধরনের বিপর্যয়ের সময়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের সহায়তা না করলে তারা হতদরিদ্রই রয়ে যাবে। সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক ক্ষমতায়নের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ মোট বাজেটের ১৫.২ শতাংশ, যা দিয়ে নারীসহ চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন কার্যক্রমের আওতায় সাহায্য করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় যে কার্যক্রমগুলো নেওয়া হয়ে আসছে সেগুলো প্রশংসার দাবি রাখে। তবে সেখানে নারীদের সংখ্যা আরও বাড়ানোর অবকাশ রয়েছে। এই কর্মসূচিগুলোর গুণগত ও পরিমাণগত মান বাড়িয়ে অধিকসংখ্যক নারীকে এই বেষ্টনীর মধ্যে আনা এবং প্রকৃত সহায়তা তাদের হাতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদ পল স্যামুয়েলসন বলেছিলেন, ‘নারী আসলে পুরুষই, পার্থক্য হলো, তার কম অর্থ আছে’। বিছিন্নভাবে এই বক্তব্যটি অনেক নারীই উচ্চপর্যায়ের কাজের এবং উচ্চ আয়ের মাধ্যমে খণ্ডন করলেও সাধারণভাবে নারী এখনো অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে আছে। বর্তমানে নারী ও পুরুষের আয়ের অনুপাত প্রায় ০.৫১ অর্থাত্ একজন নারী একজন পুরুষের আয়ের অর্ধেক উপার্জন করতে পারছে। কর্মক্ষেত্রে নারীর পদচারণা বেড়ে চলা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো এখনো নারীর কাজের জন্য পুরোপুরি উপযোগী হয়ে ওঠেনি। তবে বৈষম্যের মাত্রা কমানোর জন্য শুধু আয় বাড়ানোই একমাত্র নিয়ামক নয়। নারী-পুরুষের মধ্যকার বৈষম্য ঘুচিয়ে সমতাভিত্তিক উন্নয়নের জন্য সঠিক নীতিমালা এবং যথোপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে মানব উন্নয়নে ব্যয় বাড়ানো যেমন অপরিহার্য, তেমনি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করাও অত্যাবশ্যক। আর সেটি সম্ভব দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে।
ড. ফাহমিদা খাতুন: অর্থনীতিবিদ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ এবং পরিচালক, জনতা ব্যাংক।