Sunday, April 22, 2018

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিদেশীদের রহস্যজনক বিচরণ

মিয়ানমারের রাখাইনে সংগঠিত জাতিগত নিধনের মুখে এদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মানবিক সেবার নামে এনজিওরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। দিন দিন বাড়ছে এনজিও’র সংখ্যা। ক্যাম্প গুলোতে কতটি এনজিও কাজ করছে তার সঠিক তথ্য উপাত্ত কারো কাছে নেই। তবে প্রশাসনের অভিমত ১০৫টি এনজিও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করছে। এসব এনজিও গুলোতে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে বেশির ভাগ বিদেশী নাগরিক। এদের অধিকাংশ এদেশে ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে এসে স্থায়ীভাবে চাকুরী করার সুযোগে তারা বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দরা বলছেন এনজিওদের উপর গোয়েন্দা নজরদারীর অভাব জনিত কারণে এসব এনজিওরা প্রত্যাবাসন বিরোধী কর্মকান্ডে লিপ্ত রয়েছে। যে কারণে প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হচ্ছে। কক্সবাজার র‌্যাব-৭ এর সদস্যের হাতে পৃথক অভিযানে আটক এ পর্যন্ত ৭৬জন বিদেশী নাগরিক বিভিন্ন শর্তে মূছলেকা নিয়ে ছাড়া পেলেও তারা যথারীতি দায়িত্ব পালন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও রোহিঙ্গা অধ্যূষিত ইউনিয়ন পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী  সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এনজিওদের উপর সরকারি ও গোয়েন্দা নজরদারী না থাকার কারনে কিছু কিছু এনজিওতে কর্মরত বিদেশীরা অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি তুমব্রু সীমান্তের শূণ্যরেখায় আশ্রয় নেওয়া প্রায় ৬ হাজার রোহিঙ্গা থেকে এক পরিবারের ৫ সদস্য মিয়ানমারে পালিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে কতিপয় এনজিও’র ইন্ধন রয়েছে। তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার কুটকৌশল অবলম্বন করে নিজেদের আখের গোছানোর জন্য অবৈধ ভাবে চাকুরীতে বহাল তবিয়তে অবস্থান নিয়ে প্রত্যাবাসন বিরোধী রোহিঙ্গাদের উৎসাহ যোগাচ্ছে। এসব বিদেশী নাগরিকদের আটক করে তাৎক্ষণিক ভাবে স্ব স্ব দেশে পাঠিয়ে দেয়া না হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরো জটিল হতে পারে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নিকারুজ্জামান চৌধুরী জানান, ক্যাম্পে কর্মরত এনজিও গুলোতে দায়িত্ববান বিদেশীদের শনাক্ত করণ ও তাদের বৈধতা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখার জন্য প্রতি মাসে একটি করে এনজিও মাসিক সমন্বয় সভার আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু ওই সভায় বিদেশীরা উপস্থিত থাকেন না। তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করে থাকেন।
কক্সবাজার র‌্যাব-৭এর কোম্পানী কমান্ডার মেজর রুহুল আমিন জানান, গত ২৩শে ফেব্রুয়ারী সড়কপথে অভিযান চালিয়ে বৈধ কাগজপত্র না থাকায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত ১১জন বিদেশী নাগরিককে আটক করে থানায় সোপর্দ করা হয়। অনুরুপ ১১ই মার্চ আরো ৩৯জন বিদেশী নাগরিককে আটক করা হয়। তাদের কাছে কোন বৈধ কাগজপত্র না থাকায় থানা পুলিশের নিকট হস্তান্তর করা হয়। সর্বশেষ গত ১৯ শে এপ্রিল বুধবার সড়কপথে ক্যাম্পে কর্মরত যানবাহনে তল্লাশী চালিয়ে ১৬জন বিদেশীকে আটক করা হয়। এরা হচ্ছে- জার্মানের নাগরিক ও নাফ রেডিও কমিউনিটি ৯৯.২ এফএম’র মার্শাল ও অ্যান্ড্রুস লাঙ্গ, আমেরিকার নাগরিক ও বেসরকারি সেবা সংস্থা এসএএলটিএফএলআই’র এনটওনিটি মেরি ও আন্ড্রে লুনিসিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও হেল্প দ্যা নিডি’র স্যামুয়েল কে হাসলাম, মেডিলাইন বেলী হাসলাম এবং টাটুম এডলি নেলসন, ট্রাসি মিচেল হাসলাম, মালাইসা ডান নেলসন, জন স্টিভেন ইভলিন এবং যুক্তরাজ্যের নিজার নাগিব দাহান, মার্কাস জেমস ভ্যালান্সি, মাজাফার, খালিদ হোসাইন, ইফতেখার মাসুদ এবং ড্যানিশ রিফিউজি কাউন্সিলের লিন্ডসে গ্রিম সু।
পরে তাদেরকে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন মেনে চলা, যাতায়াতের সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখা ও বিকেল ৫টায় ক্যাম্প ত্যাগ করবে এমন মর্মে লিখিত মুচলেকা নিয়ে এসব বিদেশীদের ছেড়ে দেয় পুলিশ।
এ বিষয়ে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের বলেন, বিদেশী নাগরিকরা এদেশের আইনের প্রতি যাতে শ্রদ্ধাশীল থাকেন সে কারণেই মাঝে মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালান। তিনি আরো বলেন, র‌্যাবের হাতে আটক সেই ১৬ বিদেশী নাগরিকের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে এবং তিনটি লিখিত শর্তে মুচলেকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৮৫ শতাংশ টিউবওয়েল অকেজো

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন দাতা সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত টিউবওয়েলের মধ্যে ৮৫ শতাংশ অকেজো হয়ে পড়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে এই পরিস্তিতি ধারণ করেছে। কিছু কিছু টিউবওয়েলে পানির দেখা মিললেই তা দিয়ে চাহিদা পুরণ হচ্ছেনা। ফলে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প গুলোতে দেখা দিয়েছে খাবার পানির তীব্র সংকট। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর পানির চাহিদা পুরনের লক্ষ্যে গভীর নলকূলের স্থাপনের কাজ শুরু করলেও তা অদ্যবধি শেষ না হওয়ার কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পানির জন্য হাহাকার অবস্থা বিরাজ করছে।
আজ রবিবার সকালে উখিয়ার মধূরছড়া, লম্বাশিয়া, ময়নারঘোনা, তাজনিমারখোলা ক্যাম্প ঘুরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়। রোহিঙ্গাদের অভিযোগ ক্যাম্প গুলোতে টিউবওয়েল স্থাপনের নামে সম্পৃক্ত ঠিকাদারগণ টাকা লুটপাট করে তাদের দায়িত্ব শেষ করেছে। যে কারনে টিউবওয়েল স্থাপনের মাস না পুরাতেই অধিকাংশ টিউবওয়েল পানি শূণ্য হয়ে পড়েছে।
কুতুপালং লম্বাশিয়া ক্যাম্প গুলোতে প্রচন্ড তাপমাত্রায় পলিথিনের ঝুপড়ি গুলো থেকে আগুণের ফুলকি উঠছে বলে রোহিঙ্গাদের অভিমত। রোহিঙ্গা মাঝি হামিদ হোসেন জানান, তার ক্যাম্পের একটি টিউবওয়েলেও পানি নেই। অনেকেই বাজার থেকে বোতলজাত পানি ক্রয় করে পান করছেন। অন্যান্য কাজের জন্য পানির অভাবে শিশু ও বৃদ্ধরা নাখাল হয়ে পড়ছে। আক্রান্ত হচ্ছে বিভিন্ন রোগে। সে জানায়, পানি সমস্যা নিবারণের জন্য সরকারি ভাবে গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছে। তবে কবে নাগাদ পানি পাওয়া যায় তাও সঠিক করে বলা যাচ্ছেনা।
থাইংখালী তাজনিমারখোলা রোহিঙ্গা ক্যাম্প। এ ক্যাম্পে রয়েছে প্রায় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গারা আশ্রয় নেয়ার শুরুতেই নলকূপ বসানোর হিড়িক পড়েছিল। এনজিওগুলো নামমাত্র টিউবওয়েল বসিয়ে কোটি কোটি টাকা দাতা সংস্থা থেকে হাতিয়ে নিয়েছে। ক্যাম্পের হেড মাঝি মোহাম্মদ আলী জানান, স্থানীয় প্রতিবেশীর বাড়ী থেকে অনেকেই পানি সরববারহ করছে। এসব এলাকায় স্থানীয়রাও রোহিঙ্গাদের পানি দিতে বিরক্তবোধ করছে। এমতাবস্থায় রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগ খাল, নালা, পুকুর ও জলাশয়ের পানি ব্যবহার করছে। যে কারণে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে অসংখ্য রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, শিশু। ওই ক্যাম্পে স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত ব্রাকের স্বাস্থ্যকর্মী লিলুফা ইয়াসমিন জানান, ক্যাম্পে বর্তমানে পানি বাহিত রোগ আশঙ্কাজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অতি সহসায় বৃষ্টিপাত না হলে রোহিঙ্গাদের পরিনতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এমন মন্তব্য করেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মেজবাহ উদ্দিন।
এব্যাপারে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন বলেন, উখিয়া-টেকনাফ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সরকারি ভাবে ৭শ গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। উখিয়ায় স্থানীয়দের জন্য ৫শ গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন দাতা সংস্থা ক্যাম্প গুলোতে ৫হাজার ৫৩টি অগভীর নলকূপ ও ৪৭৩টি গভীর নলকূপ স্থাপন করেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনাবৃষ্টির ফলে পানির স্তর ৫০ থেকে ৬০ ফুট নিচে চলে যাওয়ার কারনে বর্তমানে ৮৫শতাংশ নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। যে কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্প গুলোতে তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছে। পানি চাহিদা পুরনের জন্য তাদের কাভার ভ্যান গুলো দিয়ে পানি সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নিকারুজ্জামান চৌধুরী জানান, অনাবৃষ্টির কারনে ক্যাম্প গুলোতে পানি সমস্যার সৃষ্টি হলেও তা সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও বিভিন্ন এনজিও সংস্থা কাজ করছে।

রনিকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ, পালিয়ে বেড়াচ্ছে রাশেদ!

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনিকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। কিন্তু রনির হুমকিতে প্রাণভয়ে সপরিবারে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন মামলার বাদি ইউনিএইড কোচিং সেন্টারের মালিক মো. রাশেদ মিয়া।
গত বৃহস্পতিবার রাতে রাশেদ মিয়া ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বেধড়ক মারধর করার অভিযোগে চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
এর আগে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অতিরিক্ত ফি ফেরতের জন্য চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষ ড. জাহিদ খানকে বেদম মারধর করেন নুরুল আজিম রনি। মারধরের এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
এ ঘটনায় নগরীর চকবাজার থানায় চাঁদাবাজি ও প্রাণেহত্যার উদ্দেশ্যে মারধরের অভিযোগ এনে একটি মামলা দায়ের করেন অধ্যক্ষ ড. জাহিদ খান।
এই দুই মামলায় গ্রেপ্তারের জন্য চকবাজার থানার পুলিশ এবং পাঁচলাইশ থানার পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজছে নুরুল আজিম রনিকে। পুলিশের ভাষ্য, কোথাও খুঁেজ পাওয়া যাচ্ছে না রনিকে।
কিন্তু ইউনিএইড কোচিং সেন্টারের মালিক রাশেদ মিয়া বলছেন, মামলার পর রনি তাঁকে খুঁজতে সদলবলে তার বাসায় গিয়েছিলেন। সেখানে না পেয়ে কোচিং সেন্টারে গিয়ে খোঁজাখুঁিজ করেছেন। সেখানে না পেয়ে তারা হুমকি দিয়ে আসেন। এরপর বিভিন্ন অপরিচিত নাম্বার থেকে তাঁকে প্রাণ নাশের হুমকি দিচ্ছেন।
রাশেদ মিয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, আগেই আঁচ করেছিলাম যে, মামলা হলে রনি ও তার সহযোগীরা আমাকে হত্যার চেষ্টা করবে। তাই সপরিবারে আমি বাসা ছেড়ে আতœীয়ের বাসায় আশ্রয় নিয়েছি।
তিনি বলেন, নুরুল আজিম রনি সদলবলে বুক ফুলিয়ে চট্টগ্রাম মহানগর দাপিয়ে বেড়ালেও পুলিশ খুঁজে পাচ্ছে না তাকে। আমাকে খুঁজতে রনি বাসা ও কোচিং সেন্টারে যাওয়া এবং মুঠোফোনে প্রাণ নাশের হুমকির বিষয়ে আমি পাঁচলাইশ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছি।
জিডিতে রনি ছাড়াও অজ্ঞাত পরিচয়ে আরও সাত-আটজন জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করেছি। এছাড়া রনি সদলবলে দাপিয়ে বেড়ানোর বিষয় নিয়ে পুলিশকে বারবার তথ্য দেয়া সত্ত্বেও পুলিশ রনি ও তার সহযোগীদের এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
পুলিশের এই ভুমিকাকে রহস্যজনক উল্লেখ করে রাশেদ মিয়া বলেন, মারধর খেয়ে প্রাণে তো কোনোরকমে বেঁচে আছি। এবার মামলা করে পরিবার-পরিজন নিয়ে প্রাণ হারানোর শঙ্কায় আমি চরম উৎকন্ঠায় মানবেতর দিন যাপন করছি।
একই কথা বলেছেন চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষ ড. জাহিদ খানও। তিনি বলেন, আমাকে মারধর ও চাঁদা দাবির ঘটনায় মামলা দায়ের করা হলেও চকবাজার থানার পুলিশ নুরুল আজিম রনিকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি। রনিকে গ্রেপ্তারে পুলিশ না কি অভিযানও চালিয়েছে। অথচ আমাকে মারধরের ঘটনার ১৬ দিন পর কোচিং সেন্টারের মালিক রাশেদ মিয়াকে মারধর ও চাঁদা দাবির ঘটনা ঘটিয়েছে রনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল হুদা বলেন, মামলা দায়েরের পর রনিকে গ্রেপ্তারে পুলিশ একাধিক অভিযান চালিয়েছে। কিন্ত তাঁকে পাওয়া যায়নি।
একই ভাষ্য পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিউদ্দিন মাহমুদের। তিনি বলেন, মামলা দায়েরের পর থেকে নুরুল আজিম রনি আতœগোপনে রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে। রাশেদ মিয়াকে হুমকির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে রাশেদ মিয়া একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন। যা আমরা তদন্ত করে দেখছি।  
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার রাতে ইউনিএইড কোচিং সেন্টারের মালিক রাশেদ মিয়া নুরুল আজিম রনি ও তার বন্ধু নোমান চৌধুরী রাকিবের নাম উল্লেখ করে ৭/৮ জনের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি ও মারধরের অভিযোগে পাঁচলাইশ থানায় মামলা দায়ের করেন।
ওই রাতে মারধরের সিসিটিভি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যা ভাইরাল হয়ে উঠে। এতে নুরুল আজিম রনিকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠে। এরপর নুরুল আজিম রনি নিজের ফেসবুক ওয়ালে ছাত্রলীগের চট্টগ্রাম মহানগর পদ থেকে সরে দাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের বরাবরে অব্যাহতির জন্য আবেদন করেন।
এর দুদিন পর গত শনিবার কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে নুরুল আজিম রনিকে সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে অব্যাহতি দেন। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত করেন জাকারিয়া দস্তগীরকে। 
এর আগে গত ৩১ মার্চ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অতিরিক্ত ফি ফেরতের জন্য চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষ ড. জাহিদ খানকে চকবাজার থানার কয়েকজন পুলিশের সামনে মারধর করে। মারধরের সিসিটিভি ভিডিও ফুটেজটিও ভাইরাল হয়ে উঠে। এ সময়ও তুমুল সমালোচিত হয় নুরুল আজিম রনি।
এ ঘটনায় নুরুল আজিম রনিসহ তার সহযোগী ছাত্রলীগের ৮/৯ জন নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে ৩০-৩২ জনের নামে একটি মামলা দায়ের করেন অধ্যক্ষ জাহিদ খান। তবে এর আগে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নুরুল হুদা নুরুল আজিম রনির এই পদক্ষেপকে যুক্তিসঙ্গত বলে সমর্থন করেন। ফলে রনিকে গ্রেপ্তারে সংশয় প্রকাশ করেন অধ্যক্ষ ড. জাহিদ খান।

বানিয়াচংয়ে ধান ক্ষেতে মাছ চাষ by মখলিছ মিয়া

রাসায়নিক সার ছাড়াই ধানের সঙ্গে মাছ চাষ করে অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন কৃষক এহিয়া রেজা। চলতি মৌসুমে ৪ বিঘা জমিতে ধানের সঙ্গে মাছ চাষ করে সফল হয়েছেন। ই"ছাশক্তির কারণেই তিনি সফলতার মুখ দেখেছেন বলে তিনি জানান। আর এতে কৃষক এহিয়া রেজা প্রশংসা কুড়িয়েছেন। বানিয়াচং সদরের ৩নং দক্ষিণ পূর্ব ইউনিয়নের পূর্ব আদম খানী গ্রামের বাসিন্দা এহিয়া রেজা। গতকাল সরেজমিন ৩নং দক্ষিণ পূর্ব ইউনিয়নের পূর্ব আদম খানী গ্রামের বাসিন্দা এহিয়া রেজার ৯নং ব্লকের চাষকৃত জমিগুলো পরিদর্শন করে দেখা যায়, সবুজের সমারোহ সোনালি ফসলে ভরপুর তার চাষকৃত ধানি জমি। সঙ্গে দেখা গেছে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন ধরনের মাছের সমারোহ। কথা হয় উদ্যমী কৃষক এহিয়া রেজার সঙ্গে, কিভাবে কোনো প্রকার রাসায়নিক সার ব্যবহার ছাড়াই এত সুন্দর ফসল লাগানো সম্ভব হয়েছে। উত্তরে তিনি জানালেন, বেশ অনেক দিন ধরে তিনি মাছ চাষ করে আসছেন, কিভাবে মাছের সঙ্গে ধান চাষও করা যায় এবং কোনো প্রকার রাসায়নিক সারের ব্যবহার ছাড়াই জমিতে চাষাবাদ করা যায়, এজন্য তিনি প্রায়শই ইন্টারনেটের মাধ্যমে এ বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে থাকেন এক সময় তিনি সন্ধান পান আন্দালিব হাসান নামে জনৈক একজন ব্যবসায়ীর। তার সঙ্গে তিনি তার এ আগ্রহের কথা জানান, তখন তিনি প্রাকৃতিকভাবে তৈরি সারের সঙ্গে তার আমদানিকৃত দক্ষিণ কৃরিয়ার হিতু ধাজোয়া এবং বিএস গ্রীন অ্যাকসিলেন্ট নামে দু’টি সার স্বল্প পরিসরে ব্যবহারের জন্য তাকে পরামর্শ দিলেন। তার পরামর্শ অনুযায়ী তিনি ৪ বিঘা জমিতে দু’জাতের হিতু ধাজোয়া ১০০ গ্রাম এবং বিএস গ্রীন অ্যাকসিলেন্ট ১০০ গ্রাম সার ব্যবহার করেছেন। যার বাজার মূল্য মাত্র ৭০০ টাকা। বর্তমানে তার চাষকৃত জমিতে দেখা গেছে পাশের অন্যান্য জমির তুলনায় ধানের ফলন বেশি হয়েছে। আশা করা হচ্ছে তার জমিতে এ বছর বাম্পার ফলন হবে। অথচ অন্যান্য জমির কৃষক তার চেয়ে বহুগুণে অনেক টাকা খরচ করে রাসায়নিক সার ব্যবহার করেও জমিতে আশানুরূপ ফসল পা"েছন না। বরং, অধিকাংশ জমিগুলোর ধানের পাতা লালচে রং ধারণ করে ধানের চারাগুলো মরে যেতে দেখা যা"েছ। ধানের পাশাপাশি তিনি ৪ বিঘা জমিতে মাছ চাষ করেও সফল হয়েছেন। প্রতিদিনই তার এ প্রদর্শনিটি দেখতে অনেক মানুষ ভিড় জমা"েছ। এদিকে কৃষক এহিয়া রেজার রাসায়নিক সার ব্যতীত বোরো ধানের বাম্পার ফলন দেখে অনেক কৃষক আগামীতে তার ফর্মুলা অনুযায়ী চাষাবাদ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তার সহযোগিতা চেয়েছেন। তিনিও কৃষকের সোনালি ফসল ফলাতে তার অর্জিত অভিজ্ঞতা বিনিময় করে কৃষকদের সহেযাগিতা করার মনোবাসনা ব্যক্ত করেন। এ ব্যাপারে এ ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রবীর চন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমাদের কৃষকগণ প্রায় জমিতেই অধিকহারে রাসায়নিক সার ব্যবহার করছেন যার ফলে প্রায় জমির ধানের পাতাই লালচে রং ধারণ করছে, রাসায়নিক সার অধিকহারে ব্যবহারের ফলে জমিতে আশানুরূফ ফলন হ"েছ না। প্রাকৃতিকভাবে তৈরি সারগুলো সঠিকভাবে জমিতে প্রয়োগ করলে জমির উর্বরা শক্তি ব"দ্ধি পাবে এবং ফসলও ভালো হবে বলে তিনি জানান।

ধানের শীষে ছত্রাক রোগ, কৃষক দিশাহারা by এম এ রাজ্জাক

তাহিরপুর উপজেলার বিভিন্ন হাওরে উচ্চ ফলনশীল ব্রি-২৮ ধানের শীষে ছত্রাকজনিত রোগ দেখা দিয়েছে। ধানের শীষ বের হলেই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে ধান গাছ। হাওরের জমিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এ রোগটি। আক্রান্ত জমির ধান গাছে কৃষকরা বালাইনাশক ব্যবহার করেও ধানের চারা রোগ মুক্ত করতে পারছেন না।
তাহিরপুর উপজেলায় গত বছর আগাম পাহাড়ি পানি এবং অতিরিক্ত শিলা বৃষ্টিতে হাওরের ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কয়েকদিনের মধ্যেই ব্রি-২৮ ধান কাটা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এমন অবস্থায় কৃষকরা এখন দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। কৃষকরা জানিয়েছেন, জমিতে চাষ করা ব্রি-২৮ ধানের শীষ বের হওয়ার পরই শীষ হলুদ রং ধারণ করে সাদা হয়ে যাচ্ছে। আর শীষের নিচের অংশের গিঁটের ভেতর কালো রং ধারণ করছে। কৃষকরা জানায়, এ বছর ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ ভালো হয়েছে। আবহাওয়া এখন পর্যন্ত অনুকূলে রয়েছে। নদীতে পানির চাপ নেই। হাওরে ধানের অনেক ভালো ফলন হয়েছে। কিন্তু ধান রোগাক্রান্ত হওয়ায় তাদের সব শ্রম আর স্বপ্ন ভেঙে যেতে বসেছে।
উপজেলার মাটিয়ান হাওরে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকরা জমিতে স্প্রেয়ার দিয়ে ছত্রাকনাশক দিচ্ছেন। আর স্প্রে করতে তাদের সহযোগিতা করছেন পরিবারের নারী ও শিশুরা। জমিতে ছত্রাকনাশক ছিটানোর কাজে নিয়োজিত রমিজ উদ্দিন (৪৮) জানান, ফজরের আজানের পর থেকেই এ কাজ করছেন। বৃদ্ধ বাবা ধলাই মিয়া (৭২) ও মা পুলকজান (৬০) প্রয়োজনীয় পানির জোগান দিচ্ছেন। রমিজ উদ্দিন জানান, ৫ কিয়ার জমির রোগ সারাতে তিনি ১২০০ টাকার ওষুধ কিনেছেন। তিনি বলেন, মনকে বুঝাতে টাকা আর পরিশ্রম করছি। বিষ দিয়ে কেউ ধান রক্ষা করতে পারছে না। পুলকজান বলেন, গেল দু‘বছর ধান পাইছি না। আমার পুতের ১৪ কিয়ার (১ কিয়ার=৩০ শতক) জমির ধানের মধ্যে ৫ কিয়ার জমির পুরো ধান নষ্ট অইয়া গেছে। বাকি ধানের জমিনেও রোগ অইছে। রোগ সারাতে টেকা আর শ্রম দিয়েও ধান রক্ষা হচ্ছে না। কৃষকরা আরো বলেছেন, আগাম জাতের ধান হিসাবে কৃষকরা এ বছর ব্রি-২৮ ধানের চাষ করেছেন। হাওরের ৮০ ভাগ জমিতেই এই ধানের চাষ হয়েছে। কিন্তু জমির ধানে ব্লাস্ট রোগের আক্রমণে কৃষকরা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। রোগ সারাতে ধানের জমিতে কৃষকরা ছত্রাকনাশক ন্যাটিভো বা ট্রুপার স্প্রে করছেন। কিন্তু রোগমুক্ত হচ্ছে না ধান গাছ। এ অবস্থায় নিরুপায় হয়ে পড়েছেন রোগাক্রান্ত জমির কৃষকরা।
মাটিয়ান হাওরের উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বলেন, গত বছর পানিতে ফসল ডুবেছে। এর আগের বছর গেল শিলাবৃষ্টিতে। এ বছর ফসলরক্ষা বাঁধের কাজের পরিমাণ ও মান খুব ভাল। কিন্তু ধানের ব্লাষ্ট রোগ সব অর্জন শেষ করে দিচ্ছে।
মাটিয়ান হাওরপাড়ের জামলাবাজ গ্রামের কৃষক আব্দুল হক (৭৫) বলেন, হাওরের ধান কোনদিন রোগাক্রান্ত হয়নি। বাপ-দাদার আমল থেকে কোনোদিন ধানের রোগ সারাতে বিষও দিইনি। কিন্ত এ বছর বিষ দিয়েও ধানের ফলন রক্ষা করতে পারছি না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুস সালাম এ বিষয়ে বলেন, সীমিত আকারে হাওরের ব্রি-২৮ ধানে ব্লাস্ট রোগ দেখা দিয়েছে। তারা এ রোগ থেকে ধান রক্ষায় সর্বাত্মক কাজ করে যাচ্ছেন। তার দাবি তাহিরপুরে এ বছর ধানের ক্ষতির পরিমাণ পাঁচ থেকে ছয় হেক্টরের বেশি হবে না।

টাঙ্গাইলে কৃষকের মাথায় হাত by সাইফুল ইসলাম সানি

টাঙ্গাইলের সখীপুরে ইরি-বোরো মৌসুমের শেষ সময় এখন। মাঠে মাঠে সোনালী ফসল দোল খাচ্ছে। কয়েকদিন পরই ধান কাটার উৎসবে মেতে উঠবে কৃষক পরিবারগুলো। প্রতিটি কৃষকের চোখে-মুখে পাকা ফসল ঘরে তোলার হাসি থাকার কথা। এ যেন প্রতিটি কৃষকের আজন্ম এক স্বপ্ন। কিন্তু কৃষকের সেই স্বপ্নে আগুন দিয়েছে ব্লাস্ট নামের ছত্রাক। ব্লাস্টের আক্রমণে বিস্তৃর্ণ ফসলের মাঠ ক্রমেই পুড়ে যাচ্ছে। দূর থেকে দেখে মনে হয়, মাঠের ফসল পেকে গেছে। কিন্তু কাছে গিয়ে কৃষকের মাথায় হাত! ধানের পেটে চাল নেই! কৃষকের মুখে ভাষা নেই। শুধুই হাহাকার। বুধবার সরজমিন উপজেলার কয়েকটি এলাকা ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে উপজেলার প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। রোপণের কিছুদিন পরেই কিছু ক্ষেতে ব্লাস্টের আক্রমণ দেখা দেয়। কৃষি অফিসও এলাকায় ব্যাপক প্রচারণাসহ কৃষকদের পরামর্শ দিতে থাকে। পরে কৃষকের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু মৌসুমের শেষের দিকে এসে ফসলগুলো পুনরায় ব্লাস্টের আক্রমণের শিকার হয়েছে। কৃষি অফিস আরো জানায়, সাধারণত ব্রি-২৮ জাতের ধানে এ রোগটি বেশি আক্রমণ করেছে। আগামীতে কৃষকদের ব্রি-২৯ জাতের বীজ রোপণ করার পরামর্শ দেয়া হবে।  এ বিষয়ে একাধিক কৃষক ও স্থানীয় সার-বীজ ডিলারের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, ধানের চারা রোপণের কিছুদিন পর সবুজ পাতায় কালো দাগ দেখা দেয় এবং ধানের পাতা পচে যেতে থাকে। ওই সময় কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে ট্রাইসাইক্লাজোল উপাদানের ট্রুপার-৭৫ ডব্লিউ পি, সেলট্রিমা জাতীয় বিভিন্ন ছত্রাকনাশক স্প্রে করা হয়। এতে কৃষকের মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু মৌসুমের শেষের দিকে এসে ধানের শীষ বের হওয়ার তিন-চারদিন পরই শীষগুলো মরে যাচ্ছে। ধানের পেটে কোনো চাল নেই। মনে হয় ধানগুলো পেকে গেছে। কাছে গিয়ে দেখা যায় শীষের সবক’টি ধানই চিটে। কৃষি কর্মকর্তারা পুনরায় স্প্রে করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু তাতেও সুফল পাচ্ছেন না বলে জানান কৃষকরা। উপজেলার ছোটমৌশা গ্রামের কৃষক নজিম উদ্দিন বলেন, ‘আমার ধানক্ষেতে তিন বার বিষ দিছি (দিয়েছি)। কিন্তু এই হিনজা মরা (শীষ মরা) রোগ ভালো হইলো না। শেষে সব ধান মইরা গেল।’
উপজেলার প্রতিমা বংকী গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন বলেন, ‘আমার দুই একর জমিতে দুই-একটা শীষ মরা দেইখাই ক্ষেতে বিষ দিয়েছি। কিন্তু কোনো কাজ হয় নাই। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বিদ্যুতের প্রি-পেইড মিটারে হাজার হাজার টাকা ভরে সেচ দিয়েছি। টাকাও গেল, ধানও গেল। এখন আর কোনো আশা নাই।’
বুধবার দুপুরে উপাজেলার কয়েকটি গ্রাম ঘুরে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। কৃষকের চোখের সামনেই ক্ষেতের সোনার ফসলগুলো ধীরে ধীরে পুড়ে যাচ্ছে। এ দৃশ্য একজন কৃষকের কাছে বড়ই নির্মম।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাও মুঠোফোনে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘ভাই, মনটা ভালো নেই। মাঠের অবস্থা ভালো না! সারা দেশে একই অবস্থা।’ এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফায়জুল ইসলাম ভূইয়া মানবজমিনকে বলেন, ‘সাধারণত স্প্রে করার পর নতুন করে এ রোগ আক্রমণ করার কথা নয়। অনেক সময় কৃষক স্প্রে’র ডোজ না মেনে কম পরিমাণে স্প্রে করেন। যে কারণে হয়তো ছত্রাকটি পুরোপুরি ধ্বংস হয় না। আমরা উপজেলার প্রতিটি অঞ্চলে গিয়ে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি। তারপরও শেষ রক্ষা হবে কি না জানি না।’ তিনি কৃষকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান।

হ্যান্ডসেটের ওপর শুল্ক কর সংস্কারের প্রস্তাব by কাজী সোহাগ

দেশে উৎপাদিত মোবাইল হ্যান্ডসেটের ওপর শুল্ক কর সংস্কারের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এতে সারচার্জ বাদ দিয়ে শুল্কহার ১ ভাগ করার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে হ্যান্ডসেটের ওপর ১০ ভাগ শুল্ককর ও ১ ভাগ সারচার্জ আদায় করা হচ্ছে। অন্যদিকে অগ্রিম আয়কর ৫ ভাগ বাদ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ খাত থেকে মোট আরোপিত শুল্ক ১৬ ভাগ থেকে কমিয়ে ১ ভাগ করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইম্পোরটার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমপিআইএ) এর  পক্ষ থেকে এসব প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এছাড়া নির্মিত মোবাইল আমদানির ক্ষেত্রে আরোপিত শুল্ক কর সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে মোট আরোপিত শুল্ক (টিটিআই) ৩০ দশমিক ১৯ ভাগ থেকে কমিয়ে ২২ দশমিক ১৯ ভাগ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি এসব প্রস্তাব উল্লেখ করে এনবিআর চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছেন বিএমপিআইএ’র সভাপতি রুহুল আলম আল মাহবুব। কর সংস্কার প্রস্তাবের যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনে যে বিশাল বিনিয়োগ প্রয়োজন তা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে শুল্ক সুবিধা ১০ ভাগ থেকে কমিয়ে ১ ভাগ না করলে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং প্রতিটি মোবাইলফোনের মূল্য বেড়ে গ্রাহক কমে যাবে। তিনি বলেন, প্রতিটি বিনিয়োগকারী বিশাল বিনিয়োগ করে মোবাইল কারখানা স্থাপন করেছেন। তাই এ শিল্পের জন্য অন্তত আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি প্রণোদনামূলক শুল্ক কর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। বিএমপিআইএর সভাপতি বলেন, ইতিমধ্যে ৭টি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান দেশে মোবাইল ফোন শিল্প-কারখানা স্থাপন করেছেন ও করতে যাচ্ছেন। এটি ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে আরো একধাপ এগিয়ে যাওয়া। বর্তমান সরকারের প্রণোদনার কারণে দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারে এক নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। তিনি বলেন, মোবাইল ব্যবহারে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে নবম বৃহত্তম দেশ। এটা কম গৌরবের নয়। যার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে দিকনির্দেশনা পেয়েছে। নির্মিত মোবাইল আমদানির ক্ষেত্রে আরোপিত শুল্ক কর সংস্কারের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রচলিত শুল্ক করের হার ১০ ভাগ থেকে কমিয়ে ৫ ভাগ, অগ্রিম আয়কর ২ ভাগের পরিবর্তে ১ ভাগ করতে। সারচার্জ বাদ দিয়ে মূসক অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এসব প্রস্তাবের যুক্তি তুলে ধরে বলা হয়েছে, বাজার চাহিদা অনুযায়ী বর্তমানে যে পরিমাণ ফোন আমদানি হচ্ছে, তার ৩০ ভাগ স্মার্টফোন আমদানি হওয়ার কথা। কিন্তু অতিরিক্ত শুল্কের কারণে আমদানি হচ্ছে মাত্র ২৩ ভাগ। ২০১৬ হতে ২০১৭ সালে স্মার্টফোনের প্রবৃদ্ধি মাত্র ১ ভাগ। ফলে স্মার্ট ফোন বিক্রির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। বরং অবৈধ পথে মোবাইল ফোন আমদানি  উৎসাহিত হচ্ছে। এতে আরো বলা হয়েছে, দেশে তৈরি মোবাইল দিয়ে মোবাইলের বিপুল চাহিদা সহসাই মেটানো সম্ভব নয়। এ কারণে অন্তত আগামী দুই বছরের জন্য ফোর-জি তথা ইন্টারনেটের বিস্তৃতি বাড়ানোর জন্য নির্মিত মোবাইল আমদানির ক্ষেত্রেও শুল্ক কর হার কমানো প্রয়োজন। এনবিআর চেয়ারম্যানকে দেয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকারের যুগান্তকারী ডিজিটাল বাংলাদেশ পরিকল্পনা আমাদের দেশের উন্নয়নে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। এটি অত্যন্ত গর্বের বিষয় যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছি। এটিও বলার অপেক্ষা রাখে না যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারই জাতীয় উন্নয়নে প্রযুক্তির ভূমিকা সম্যক উপলব্ধি করেছেন এবং একে প্রণোদনা দিচ্ছেন। এরই অন্যতম প্রকাশ হচ্ছে ২০১৭ সালে দেশে মোবাইল ফোন শিল্প কারখানার নীতিমালা প্রকাশ ও অনুমতি প্রদান। চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে গতি আনার জন্য বর্তমান সরকার সমপ্রতি ফোরজি লাইসেন্স প্রদান করেছেন। কিন্তু বাজার গবেষণা বলছে উচ্চ শুল্কের কারণে গত বছর স্মার্টফোনের বাজার মাত্র ১ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে যা আগের বছরে বেড়েছিল ৩৩ ভাগ। এতে বরা হয়েছে, দেশে তৈরি এবং বিদেশ থেকে আনা উভয় মোবাইল ফোনের জন্যই আগামী কয়েক বছরের জন্য একটি বিশেষ শুল্ক ও কর ব্যবস্থা অবলম্বন করে, ডিজিটাল বংলাদেশ বাস্তবায়ন, সরকারের সামগ্রিক রাজস্ব অর্জন এবং সেই সঙ্গে দেশবাসীর কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছানোর সহায়ক হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। চিঠিতে এনবিআর চেয়ারম্যানকে বলা হয়েছে, আমরা আপনাকে নিশ্চিত করতে চাই যে, উপরোক্ত শুল্ক হারে অবৈধ আমদানি হ্রাস পাবে এবং সদ্য আবির্ভূত মোবাইল মেনুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রিজের বিকাশ ঘটবে। এতে বাংলাদেশের বাজারে স্মার্টফোনের প্রবৃদ্ধি বজায় থাকবে যা ডিজিটাল বাংলাদেশ এর লক্ষ্য অর্জন ত্বরান্বিত করবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, চলতি বছর দেশে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানি করা হবে ১২ হাজার কোটি টাকার। হ্যান্ডসেটের সংখ্যা হবে ৩ কোটির বেশি। প্রায় ৫৫টি হ্যান্ডসেট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এক বছরের মধ্যে প্রায় ১৫শ’ মডেলের মোবাইল ফোন বাংলাদেশে নিয়ে আসবে।

সিলেটে অপরাধে ‘নারী সিন্ডিকেট’ by ওয়েছ খছরু

সিলেটে ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে নারীরা। তাদের ঘিরে তৈরি হয়েছে অপরাধ নেটওয়ার্ক। আর এসব অপরাধে এখন অস্থির হয়ে পড়েছে নগর সিলেট। ইয়াবা ব্যবসা, বাসা-বাড়িতে নিরাপদ সেক্স জোন, ছিনতাই, ব্ল্যাকমেইলের ঘটনা ঘটাচ্ছে নারীরা। একই সঙ্গে খুনের মহোৎসবে জড়িয়ে পড়ছে তারা। সম্প্রতি সময়ে সিলেট পুলিশের হাতে অপরাধে জড়িত এরকম বেশ কয়েকজন নারীর তথ্য এসেছে। এসব তথ্য এখন যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশের একটি সূত্র। এক সময় রাজনৈতিক গ্রুপের অপরাধে কেঁপে উঠতে সিলেট। রাজনীতির আড়ালে সব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করেন উপ গ্রুপের প্রধানরা। সে দৃশ্যপটের অনেকখানি পরিবর্তন এসেছে। নারী কেন্দ্রিক অপরাধ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে সিলেটে। আর একেক সিন্ডিকেটের একেক নারী নিজেদের সিন্ডিকেট প্রধানের দায়িত্ব পালন করছে। সিলেটের মীরাবাজারে মা ও ছেলে খুনের ঘটনার পর পুলিশ বেশ কয়েকজন নারীর সন্ধান পেয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজন জিজ্ঞাসাবাদও করেছে। সিলেটে ইয়াবা নেটওয়ার্কে নারীরা জড়িত রয়েছে সেটি অনেক আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পরিষ্কার ছিল। স্বামীর ব্যবসা নিরাপদে পরিচালনা করতে দক্ষিণ সুরমার অপরাধরাজ্যের কিছু এলাকায় নারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। তবে ইতিমধ্যে ওই সব নারীর মধ্যে অনেককেই র‌্যাব গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশও দক্ষিণ সুরমা থেকে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। বোরকার আড়ালে এসব নারীদের অপরাধকর্ম নিয়ে খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও হতবাক। সিলেটের দিলারা বেগম। রোকেয়া খুনের ঘটনার পর থেকে সে আড়ালে চলে গেছে। বাড়ি সুনামগঞ্জে। বসবাস করতো নগরীর নয়াসড়ক এলাকায়। মূল নাম দিলারা হলেও সে নিজেকে রিনা নামে পরিচয় দিতো। নয়াসড়ক এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে দিলারা সেক্স জোন গড়ে তুলেছিল। পুলিশ জানিয়েছে- দিলারা আগে সিলেটের সমাজের উঁচুদরের মানুষের কাছে পতিতা ছিল। হোটেল-মোটেলে ছিল তার অবাধ যাতায়াত। প্রায় দুই বছর ধরে দিলারা নিজেকে বদলে ফেলে। নিজে বাসা ভাড়া নিয়ে সে তার বাসাকে গড়ে তুলেছিল অপরাধ জোনে। ইয়াবা নেটওয়ার্কের সঙ্গেও জড়িত দিলারা। আরেক মহিলা হোসনে আরা বেগম। শহরতলীর ইলিয়াস মিয়ার স্ত্রী। হোসনে আরার বাড়িও সুনামগঞ্জে। শহরতলীর কুমারগাঁওয়ের পীরপুরে বাসা ভাড়া নিয়ে ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। পীরপুরের ওই বাসার মালিক আজির উদ্দিন জানিয়েছেন- ‘হোসনে আরার চরিত্রে কখনো মনে হয়নি সে অপরাধী। ধরাপড়ার পর আমরা বিষয়টি জানলাম। তার বাসায় মাঝেমধ্যে অচেনা পুরুষ আসতো বলে জানান তিনি।’ নগরীর নয়াসড়ক এলাকায় হেনা নামের আরো এক মহিলার খোঁজ পেয়েছে পুলিশ। মধ্য বয়সী হেনাও বাসা ভাড়া নিয়ে নানা কর্মকাণ্ড চালাচ্ছিল। দিলারার সঙ্গেও হেনার সম্পর্ক ছিল। একই এলাকার বাড়ি হওয়ার কারণে তারা একে অপরের সহযোগিতা নিয়ে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাতো। শহরতলীর ইসলামপুরের মিনারা নামের আরেক মহিলা নানা অপরাধের হোতা। তাকে ঘিরে একটি অপরাধী নারী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। ওই নেটওয়ার্কে ইয়াবা ব্যবসা জমজমাট। সিলেটের মীরাবাজারে রোকেয়া বেগম ও তার ছেলে রবিউল ইসলাম রূপম খুন হওয়ার পর থেকে মিনারা আত্মগোপনে চলে যায়। ইসলামপুর এলাকার লোকজন জানান, বেশ কয়েকজন নারী রয়েছে মিনারার আস্তানায়। এক সময় মিনারা নগরীর কুমারপাড়া এলাকায় বসবাস করতো। এরপর শিবগঞ্জ, মিরাবাজারসহ বেশ কয়েকটি স্থানীয় বসবাস করেছে। এসব এলাকায়ও তার নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। শাম্মী নামের একটি তরুণী নাটক শোবিজে এক সময় ব্যস্ত থাকতো। কিন্তু এখন সে পুরোপুরি আন্ডারগ্রাউন্ডে। শাম্মীর বেশ কয়েকজন সহযোগীও সিলেটে নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত। সিলেটের উপশহর এলাকায় রয়েছে নারীদের কয়েকটি সিন্ডিকেট। অভিজাত এলাকা উপশহরের বিভিন্ন বাসা-বাড়ি ভাড়া নিয়ে কয়েকজন নারী নিরাপদে অপরাধ কর্ম পরিচালিত করছে। কখনো কখনো কেউ সামাজিক কর্মকাণ্ডের আড়ালেও চালাচ্ছেন এসব ব্যবসা। নগরীর গার্ডেন টাওয়ারও বারবার আলোচনা এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, সিলেটের মিরাবাজারে মা ও ছেলে খুনের ঘটনার পর পুলিশ প্রথমে প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান চালিয়ে রোকেয়া সঙ্গে সম্পর্ক থাকা বেশ কয়েকজন মহিলাকে শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে কয়েকজনকে এখনো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা নগর ছেড়ে পালিয়েছে। পরবর্তীতে তানিয়া গ্রেপ্তারের পর তার মুখ থেকেও এসব তথ্যের সত্যতা মিলেছে। রোকেয়ার সঙ্গে দিলারার ইয়াবা নিয়ে ব্যবসায়ীক বিরোধ ছিল। এই বিরোধের কারণের তানিয়া আক্তার তান্নিকে দিলারার আস্তানা থেকে সরিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল রোকেয়া। সিলেট মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে জানিয়েছেন- সিলেটের অপরাধী নারীদের ভয়ঙ্কর রূপ ইতিমধ্যে পরিষ্কার হয়েছে। এখন পুলিশ অপরাধ ঠেকাতে মূল হোতা নারীদের দিকে নজর দিয়েছে। তাদের সম্পর্কে আরো খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। এখনই এই অপরাধী নারীদের থামাতে না পারলে রোকেয়ার মতো আরো ঘটনা ঘটতে পারে বলে জানান তিনি।

সুন্দরবন এখন স্ক্র্যাপ জাহাজের ভাগাড়, হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য by মো. আবু সাঈদ শুনু

ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইড সুন্দরবন এখন স্ক্র্যাপ (মেয়াদ উত্তীর্ণ) জাহাজের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। একের পর এক ডুবছে পণ্যবোঝাই লাইটার জাহাজ। সুন্দরবনে নদীতে পণ্যবোঝাই লাইটারেজ জাহাজডুবির ঘটনা আগে থেকে ঘটলেও ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে এসে জাহাজডুবির ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে যায়। সাড়ে ৩ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম সংরক্ষিত এই বনের নদীতে তলা ফেটে ডুবেছে পণ্যবোঝাই ১০টি লাইটার জাহাজ। সুন্দরবন ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের কোনো উদ্ধারকারী জলযান না থাকায় দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না ডুবে যাওয়া এসব জাহাজ ও পণ্য। ডুবে যাওয়া এসব জাহাজে থাকা ফার্নেস অয়েল, সার, কয়লা, সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল ক্লিঙ্কার, স্লাগ, জিপসান ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে হুমকির মুখে পড়েছে ম্যানগ্রোভ এই সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য। ডুবে যাওয়া অনেক লাইটার জাহাজ উত্তোলন না করায় দ্রুত পলি পড়ে ভরাট হচ্ছে সুন্দরবনের নদ-নদী। বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ জানায়, ১৯৯৪ সালের আগস্টে সুন্দরবনের কাছে পশুর চ্যানেলের বানিশান্তা এলাকায় একটি তেলবাহী জাহাজ ডুবে গেলে প্রথম বড় ধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে সুন্দরবন। ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে তেল। এরপর ১৯৮৮ সালের ১লা জুলাই মোংলা বন্দরের কাছে একটি তেলবাহী লাইটার কার্গো জাহাজ দুর্ঘটনায় পশুর চ্যানেলে তেল ছড়িয়ে পড়লে সুন্দরবন আবারো বড় ধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে।
একই বছরের ১০ই আগস্ট সুন্দরবনের মাজহার পয়েন্টে অপর একটি তেলবাহী লাইটার কার্গো দুর্ঘটনায় পড়ে উচ্চমাত্রার সালফারযুক্ত তেল ছড়িয়ে পড়ে সুন্দরবনে। সুন্দরবনে নদীতে পণ্যবোঝাই লাইটারেজ জাহাজডুবির ঘটনা আগে থেকে ঘটলেও ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে এসে জাহাজডুবির ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে যায়। ওই বছরের ১২ই সেপ্টেম্বর পূর্ব সুন্দরবনের মধ্যে মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলে ৬৩০ টন সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল নিয়ে তলা পেটে ডুবে যায় লাইটার জাহাজ ‘এমভি হাজেরা-২’। একই বছরের ৩০শে সেপ্টেম্বর পূর্ব সুন্দরবনের মধ্যে মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলে ৬০০ টন সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল নিয়ে তলা পেটে ডুবে যায় লাইটার জাহাজ ‘এমভি য়ন শ্রী-৩’। একই বছরের ২৪শে নভেম্বর পূর্ব সুন্দরবনের হরিণটানা এলাকায় তলা ফেটে ডুবে যায় তিনতলা বিশিষ্ট যাত্রীবাহী লঞ্চ ‘এমভি শাহীদূত’। একই বছরের ৯ই ডিসেম্বর পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের শ্যালা নদীতে তলা ফেটে সাড়ে ৩ লাখ লিটার ফার্নেস অয়েল নিয়ে ডুবে যায় ‘ওটি সাউদার্ন স্টার-৭’ নামের একটি অয়েল ট্যাংকার। সাড়ে ৩ লাখ লিটার ফার্নেস অয়েল নদ-নদী ও বনের প্রায় ৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে সুন্দরবন। এ ঘটনা দেশে-বিদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ওই সময়ে ম্যানগ্রোভ এই সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ছুটে আসতে হয় খোদ জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ প্যানেলদের। এরপর ২০১৫ সালের ৫ই মে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের মরাভোলা নদীতে তলা পেটে ডুবে যায় ‘এমভি জাবালে নূর’ নামের সার বোঝাই একটি লাইটার জাহাজ। সুন্দরবনের নদীর পানিতে গলে ছড়িয়ে যায় ৫০০ টন পটাশ সার। একই বছরের ১১ই সেপ্টেম্বর পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা নদীতে তলা ফেটে ডুবতে ডুবতে অন্য একটি লাইটার জাহাজের সহয়তায় মোংলায় পৌঁছাতে সক্ষম হয় আরো একটি কয়লা বোঝাই লাইটার জাহাজ।
ওই একই বছরের ২৭শে অক্টোবর সুন্দরবনের মধ্যে মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলে তলা ফেটে ৫১০ টন কয়লা নিয়ে ডুবে যায় ‘এমবি জিয়ারাজ’ নামের একটি লাইটার জাহাজ। ২০১৬ সালের ১৯শে মার্চ পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের শ্যালা নদীতে ১ হাজার ২৩৫ টন কয়লা নিয়ে তলা ফেটে ডুবে যায় ‘এমভি সি হর্স-১’ নামের একটি লাইটার জাহাজ। ২০১৭ সালের ১৩ই জানুয়ারি সুন্দরবনের মধ্যে মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলের মোহনায় ১ হাজার টন কয়লা বোঝাই ‘এমভি আইচগাতি’ নামের একটি লাইটার জাহাজ ডুবোচরে ধাক্কা খেয়ে তলা ফেটে ডুবে যায়। একই বছরের ৫ই জুন সুন্দরবনের মধ্যে মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলে ৮২৫ টন সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল স্লাগ নিয়ে তলা ফেটে ডুবে যায় ‘এমভি সেবা’ নামের অপর একটি লাইটার জাহাজ। সর্বশেষ গত ১৫ই এপ্রিল ভোরে মোংলা বন্দর চ্যানেলের পশুর নদীর হারবাড়িয়ায় সুন্দরবনের মধ্যে ৭৫০ টন কয়লা বোঝাই একটি লাইটার জাহাজ এমভি বিলাস ডুবে যায়। কয়লাবোঝাই এই জাহাজডুবির পর এখনো শুরু হয়নি উদ্ধার অভিযান। সুন্দরবনে প্রতিটি জাহাজ জাহাজডুবির পর বন বিভাগের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে উঠে আসে সুন্দরবনের নদ-নদীর মূল চ্যানেল না চিনে জাহাজ চালানো, ফিটনেসবিহীন স্ক্র্যাপ (মেয়াদ উত্তীর্ণ) জাহাজের চলাচল, লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালকদের কারনে সুন্দরবনে ডুবোচরে জাহাজ উঠিয়ে দেয়ায় স্ক্র্যাপ জাহাজগুলোর তলা ফেটে দূর্ঘটনা ঘটছে।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের খামখেয়ালী পানার কারেনে এসব লাইটার মেয়াদ উর্তিন্ন জাহাজগুলো পন্য পরিবহন করে আসছে। সুন্দরবন বিভাগ প্রতিটি জাহাজডুবির পর বনের জলজপ্রাণীসহ জীববৈচিত্র্যের প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে আদালতে মামলা করলেও তা এখনো রয়েছে বিচারাধীন। অন্যদিকে ডুবে যাওয়া অনেক লাইটার জাহাজ উত্তোলন না করায় দ্রুত পলি পড়ে ভরাট হচ্ছে সুন্দরবনের নদ-নদী। সুন্দরবন গবেষক ও সেভ দ্যা সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম সুন্দরবনে একের পর এক লাইটার জাহাজডুবির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সুন্দরবনের মধ্যে মোংলা বন্দরের পশুর চ্যনেল ও নদ-নদীতে স্র্ক্যাপ (মেয়াদ উত্তীর্ণ) জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ না করায় ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইড এই বনের নদ-নদী এখন ডুবন্ত জাহাজের ভাগাড়ে পরিনত হয়েছে। এত করে সুন্দরবনের গাছের শ্বাসমূলসহ জীববৈচিত্র্য, বিলুপ্তপ্রায় ইরাবতিসহ ৬ প্রজাতির ডলফিন, কয়েকশ’ প্রজাতির মাছসহ জলজ প্রাণীর প্রজননে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। ড. ফরিদ গত বছর ইউনেস্কোর বার্ষিক সভায় গৃহীত ‘সুন্দরবন সুরক্ষায় কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষা’ দ্রুত করতে সরকারের কাছে দাবি জানান। খুলনা বিশ্ব বিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বারবার লাইটার জাহাজ ডুবির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সুন্দরবনে জলভাগে এভাবে পণ্যবোঝাই লাইটার জাহাজ ডুবির কারণে জাহাজের পণ্য দ্রবীভূত হয়ে ম্যানগ্রোভ এ বনের পানি দূষিত হচ্ছে। এর ফলে সুন্দরবনের কয়েক শত প্রজাতির মাছসহ জলজপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। দুর্ঘটনার পর দ্রুত সময়ের মধ্যে ডুবে যাওয়া জাহাজ ও পণ্য ওঠানো সম্ভব হলে সুন্দরবনে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি অনেক কম হতো।
বাগেরহাট পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মাহমুদ হাসান বলেন, সুন্দরবনে প্রতিটি জাহাজডুবির পর বন বিভাগের গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে ভিত্তিতে সুন্দরবনের জলজপ্রাণিসহ জীববৈচিত্র্যে ক্ষতির কারণে আদালতে মামলা করা হয়েছে। এসব মামলার কোনোটিরই বিচার কাজ এখনো শেষ হয়নি। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমোডর এ কে এম ফারুক হাসান বলেন, সুন্দরবন রক্ষাসহ মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলে ছড়িয়ে পড়া তেল জাতীয় পদার্থ দ্রুত অপসারণের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ পশুর ক্লিনার-১ নামে নিজস্ব বর্জ্য অপসারণকারী জাহাজ কিনেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধারের জন্য মোংলা বন্দর উদ্ধারকারী জলযান কেনার বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছে। উদ্ধারকারী জলযান কেনার বিষয়ে একটি প্রস্তাব দ্রুত নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

নিরাপত্তা পরিষদ প্রতিনিধি দলের কাছে রোহিঙ্গা বর্বরতার চিত্র তুলে ধরবে বাংলাদেশ by মিজানুর রহমান

রোহিঙ্গা নিধন নিয়ে স্বীকারোক্তি মিয়ানমারের সেনাপ্রধানের
রাখাইন ও রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সরজমিন দেখতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সফরে আসা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ প্রতিনিধি দলের কাছে বর্মী নৃশংসতার করুণ চিত্র তুলে ধরবে ঢাকা। তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠকে এটি তুলে ধরা হবে। নিরাপত্তা পরিষদ বরাবরই রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরব। সেখানে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের জন্য পশ্চিমা বিশ্ব প্রস্তাব আনলেও চীন ও রাশিয়ার আপত্তিতে তা আটকে যায়। এবারের প্রতিনিধি দলের চীন-রাশিয়াসহ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ও অস্থায়ী সব সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিই থাকছেন। তাদের কাছে ঢাকার অবস্থান ও চাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করা হবে। একই মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রেক্ষাপটে কফি আনান কমিশনের প্রস্তাবনা বাস্তবায়নে নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ কামনা করা হবে। সেই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের স্বভূমে টেকসই প্রত্যাবাসনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের জবাবদিহিতা ও স্বাধীন অনুসন্ধানের ওপরও গুরুত্বারোপ করা হবে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনকালে তাদের সঙ্গে সর্বোচ্চ সংখ্যক নির্যাতিত নারী-পুরুষ ও শিশুর সাক্ষাৎ এবং মতবিনিময়ের আয়োজন থাকছে। সেখানে তারা ভিকটিমদের মুখ থেকে সরাসরি বর্মী বর্বরতার লোমহর্ষক ঘটনাগুলো শুনতে পারেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন- কক্সবাজারের উখিয়াস্থ রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন ছাড়াও নো-ম্যান্সল্যান্ডে আশ্রয় নেয়া বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের বাসিন্দাদের অবস্থাও সরজমিন দেখানো হবে নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদের। পরিষদের ৫ স্থায়ী সদস্য- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন এবং অস্থায়ী ১০ সদস্যের দূতরা আগামী ২৯শে এপ্রিল বাংলাদেশে পৌঁছাবেন। তারা এখানে দু’দিন কাটাবেন। সেগুনবাগিচার কূটনীতিকরা জানিয়েছেন- প্রতিনিধি দলের ১৫ সদস্য রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বা স্থায়ী প্রতিনিধি ছাড়াও দেশগুলোর এ অঞ্চলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কূটনীতিকদের অনেকে ওই সময়ে বাংলাদেশ সফর করবেন। সফরের প্রথম দিনেই (২৯শে এপ্রিল) তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও নো-ম্যান্সল্যান্ডের কাছাকাছি এলাকা সরজমিন ঘুরে দেখবেন। ঢাকায় ফিরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের সাক্ষাৎ-বৈঠক ও মতবিনিময় হবে। ৩০শে এপ্রিল সেই সব বৈঠকাদি হওয়ার সূচি চূড়ান্ত হয়েছে। ওই দিন সরকার প্রধান তার পূর্বনির্ধারিত অস্ট্রেলিয়া সফর শেষে দেশে ফিরবেন। আর তার সঙ্গে বৈঠকের জন্যই নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের প্রস্তাবিত ঢাকা সফর দু’দিন পেছানো হয়েছে। পূর্বের প্রস্তাবনা অনুযায়ী ২৭-২৮শে এপ্রিল সফরটি হওয়ার কথা ছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নিউ ইয়র্কের কূটনৈতিক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য মতে, ঢাকায় আসার আগে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা ইরাক সফর করবেন। ২৬শে এপ্রিল থেকে তাদের যাত্রা শুরু হবে। যা শেষ হবে ১লা-২রা মে মিয়ানমার সফরের মধ্য দিয়ে। নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান সভাপতি (এপ্রিলের জন্য) জাতিসংঘে নিযুক্ত পেরুর স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত গুস্তাভো মেজা-সুআদ্রা চলতি মাসের শুরুতে রাখাইন ও কক্সবাজার সফরের সিদ্ধান্তের কথা জানান। এই সময়ে ইরাক সফরের কথাও জানান। সভাপতি সুআদ্রা সেই সময় সাংবাদিকদের বলেন, সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিষয়টি তাদের সফরের মূল ফোকাস। নিরাপত্তা পরিষদ প্রতিনিধিদের মিয়ানমার সফরে অং সান সুচি সরকার সবুজ সংকেত দিয়েছে জানিয়ে সুআদ্রা সে সময় বলেন- পরিষদ সদস্যরা রাখাইন রাজ্য সফরে আগ্রহী। কিন্তু মিয়ানমার সেই সুযোগ দেবে কি-না? তাদেরকে সেই অনুমতি দেয়া হবে কিনা- তা তখন নিশ্চিত হয়নি। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো মেজা সুয়াদ্রা গণমাধ্যমকে এ-ও বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিরা আশা করছেন তারা মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য রাখাইন রাজ্য সফর করতে পারবেন। মিয়ানমার সরকার তাদের অনুমতি দেবে। ওই রাজ্যে বিদ্রোহীদের দমনের নামে বর্মী সেনারা বর্বর কায়দায় যে অভিযান চালিয়েছে তা থেকে প্রাণে বাঁচতে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে এখনো কিছু রোহিঙ্গা রয়েছেন। সেই সময়ে নিরাপত্তা পরিষদ সভাপতি বলেন, রাখাইনের বাস্তব পরিস্থিতি দেখার চেয়ে তাদের সফরে ভালো কিছু আর হতে পারে না। উল্লেখ্য, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এই সফরকে আয়োজন করছে বৃটেন, কুয়েত ও পেরু।

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে যেসব খাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। ২০১৭ সালের ওপর প্রণীত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে সবচেয়ে গুরুত্বর যেসব মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটেছে তার মধ্যে রয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, খেয়াল-খুশিমতো ও বৈআইনিভাবে আটকে রাখা, নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের হাতে জোর করে গুম করা, নাগরিক স্বাধীনতা সীমাবদ্ধতা। রয়েছে সংবাদমাধ্যম, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধতা। দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় আপস করা হয়েছে। সীমাবদ্ধতা রয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের স্বাধীনতা নেই। রয়েছে দুর্নীতি, সহিংসতা, লিঙ্গগত বৈষম্য, যৌনতা বিষয়ক অপরাধ, ধর্মীয় বিষয়। আর রয়েছে জবাবদিহির অভাব। এখনও মানবপাচার একটি গুরুত্বর সমস্যা হয়ে আছে। রয়েছে শ্রমিকদের অধিকারের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা। শিশুশ্রমের অবস্থা একেবারে বাজে। এ ছাড়া রয়েছে নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের হাতে নির্যাতনের অভিযোগ থেকে তাদের দায়মুক্তি দেয়ার ব্যাপকতা। নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা যেসব নির্যাতন বা হত্যাকাণ্ড ঘটায় তা তদন্তে বা বিচার প্রক্রিয়ায় সরকার সীমিত পদক্ষেপ নিয়েছে। পুলিশ ও নিরাপত্তামূলক সেবাখাতগুলোতে জনগণের রয়েছে অনাস্থা। এজন্য তারা ফৌজদারি কোনো ঘটনা রিপোর্ট করতে বা সরকারি বাহিনীর সহায়তা নেয়া থেকে বিরত থাকেন। রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধানে জনগণের জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার দিয়েছে। কিন্তু অসংখ্য রিপোর্টে বলা হচ্ছে, সরকার অথবা তার এজেন্টরা খেয়াল-খুশিমতো অথবা বেআইনিভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে যাচ্ছে। ঘেরাও, গ্রেপ্তার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর অন্যান্য অপারেশন চালানোর সময় ঘটছে সন্দেহজনক মৃত্যু। নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা ঘন ঘন বলে থাকেন, তারা শেষ রাতের দিকে সন্দেহজনক অপরাধীকে সঙ্গে নিয়ে অপরাধ সংঘটনের স্থান বা আস্তানার খোঁজে অপারেশন চালাতে বের হন। উদ্দেশ্য থাকে অস্ত্র উদ্ধার বা ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করা। বলা হয়, যখন ওই সন্দেহভাজন অপরাধীর সহযোগীরা পুলিশের দিকে গুলি ছোড়ে তখন সন্দেহভাজন ব্যক্তি নিহত হন। সরকার যথারীতি এটাকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যাকাণ্ড, গানফাইট বা এনকাউন্টারে হত্যা বলে দাবি করে। র‌্যাব ও পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে অপরাধীদের গোলাগুলিকে এভাবেই বর্ণনা করা হয়। তবে মিডিয়া মাঝে মাঝেই এটাকে পুলিশের বৈধতা দেয়া বলে বর্ণনা করে।
মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন ও মিডিয়াগুলো এমন সব ক্রসফায়ারের অনেকগুলোকে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে আখ্যায়িত করে। কোনো কোনো আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে ১৬২ জনকে। আরেকটি মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন অধিকারের হিসাবে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা ২০১৭ সালের প্রথম ১০ মাসে বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যা করেছে ১১৮ জনকে। ১২ই মে র‌্যাব গুলি করে হত্যা করে রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার রকিবুল হাসান বাপ্পি ও লালন মোল্লাকে। র‌্যাবের দাবি, নিষিদ্ধ ঘোষিত পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির একটি বৈঠকে ঘেরাও চালায় তারা। এ সময় বন্দুকযুদ্ধে মারা যায় ওই দুজন। কিন্তু নিহতদের পরিবারের সদস্যদের দাবি, তাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকেরা গ্রেপ্তার করে কয়েক মাস আগে। ফলে এই এনকাউন্টার নিয়ে যে বিতর্ক তা রয়েই গেছে। শুক্রবার এ রিপোর্ট প্রকাশ করেন যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন জে সুলিভান। ওই রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধান সংবাদমাধ্যম সং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে। কিন্তু এই অধিকারের প্রতি মাছে মাঝেই সম্মান দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। সংবিধানে সংবিধানের সমালোচনাকে রাষ্ট্রদ্রোহের সমান করে দেখানো হয়েছে। এমন রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে কেউ অভিযুক্ত হলে তাকে তিন বছর থেকে যাবজ্জীবন সাজা পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ২০১৬ সালে বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়া, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব মাহমুদুর রহমান মান্না ও সাংবাদিক কনক সারওয়ারসহ উচ্চপর্যায়ের অনেক ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে মান্না ও কনক সারোয়ারের বিচারপ্রক্রিয়ায় অগ্রসর হয়নি সরকার। ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ে এমন বক্তব্যকে সীমাবদ্ধ করেছে আইন। কিন্তু ঘৃণামূলক বক্তব্যের সংজ্ঞা কি তা পরিষ্কার করে বর্ণনা করা হয়নি। এর ফলে হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে সরকার বড় শক্তি ব্যবহার করার সুযোগ পায়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যায়, বিদেশি বন্ধুপ্রতীম দেশের বিরুদ্ধে যায়, আইনশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে যায়, নৈতিকতার বিরুদ্ধে যায়, আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে, মানহানি হয় অথবা অপরাধকে উসকে দেয় এমন সব বক্তব্য সীমিত করতে পারে সরকার। বাংলাদেশে প্রিন্ট ও অনলাইন নিরপেক্ষ মিডিয়া সক্রিয় রয়েছে। তারা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। যেসব মিডিয়া সরকারের সমালোচনা করেছে তারা সরকারের নেতিবাচক চাপের মুখে পড়েছে। মাঝে মাঝে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোসহ কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক হামলা, হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শন করে। এতে গত অক্টোবরে একটি অনলাইন নিউজ আউটলেটের একজন সাংবাদিক উৎপল দাসের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। বলা হয়, অক্টোবরে উৎপল নিখোঁজ হলেও ডিসেম্বরে তাকে ফিরে পাওয়া যায়। তার পর উৎপল দাস যে বক্তব্য দিয়েছেন তার ফিরে আসা নিয়ে তাতে দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে। তবে পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ ভীতি প্রদর্শনের পদ্ধতি অনুসরণ করে তাকে জোর করে গুম করা হয়েছিল। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর ও সামাজিক মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মুবাশ্বের হাসান গত বছর ৪৪ দিন নিখোঁজ ছিলেন। দ্য ওয়্যার নামে একটি সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট অভিযোগ করে যে, একটি বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা এই নিখোঁজের জন্য দায়ী। এর ফলে ওই ওয়েবসাইটটি ব্লক করে দেয় সরকার। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের মতে, ১৭ই মে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিদেশের দূতবাসগুলোতে চিঠি পাঠানো হয়। বাংলাদেশি কোন সাংবাদিক বিদেশ সফরে গেলে তাদের ওপর নজরদারি করতে নির্দেশনা দেয়া হয় ওই চিঠিতে। এতে আরো বলা হয়, বাংলাদেশের নিরপেক্ষতা নিয়ে সাংবাদিকরা অভিযোগ করেছেন, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞাপন অর্থনীতিকে নিজেদের হাতের মুঠোয় রেখে মিডিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তারা একইভাবে বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে তাদের বিজ্ঞাপন না দিতে বা ধরে রাখতে চাপ প্রয়োগ করেছে। বেসরকারি মালিকানাধীন সংবাদপত্রগুলো সাধারণত বিভিন্ন রকম মতপ্রকাশের স্বাধীনতা উপভোগ করে থাকে। কিন্তু রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সেলফ সেন্সরশিপ একটি বড় সমস্যা রয়ে গেছে। বিজ্ঞাপনী খরচ নিজেরা হাতের মুঠোয় ধরে রেখে বিজ্ঞাপনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে সরকার। সরকারের সমালোচনা করলে মিডিয়াকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। বহুবার সরকারি কর্মকর্তারা বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিবৃতি প্রচার না করার কারণে বেসরকারি মালিকানাধীন টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে হুমকি দিয়েছেন। প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনামূলক রিপোর্ট প্রকাশ করে। এজন্য তাদের প্রধানমন্ত্রীর ইভেন্টগুলোতে প্রবেশের সুযোগ দেয়া হয় না।
এটা পর্যবেক্ষকদের অভিমত। ক্ষমতাসীন দলের ক্ষতি হচ্ছে কোনো রিপোর্টে -এমনটা মনে করলেই সরকার তাতে হস্তক্ষেপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই রিপোর্টে আরো বলা হয়, ২২শে সেপ্টেম্বর মিয়ামনারের সংবাদভিত্তিক পোর্টাল মিজিমা ডট কমের একটি রিপোর্টের উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, ওই রিপোর্টটি ২৩শে সেপ্টেম্বর স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল যমুনা টিভি ও ডিবিসি নিউজ প্রচার করে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে। কিন্তু তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয় ওই রিপোর্ট প্রত্যাহার করতে। এতে বলা হয়, ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব ও জটিলতার শিকার হচ্ছেন বলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অনেক সাংবাদিকের অভিযোগ। বড় সব সংবাদমাধ্যমসহ স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা প্রবেশের ঢল নিয়ে রিপোর্ট করার সুযোগ পায়। কিন্তু সেপ্টম্বরে মিয়ানমারের দুজন সাংবাদিককে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে আটক করা হয়। আন্তর্জাতিক অনেক মিডিয়ার সাংবাদিক টুরিস্ট ভিসার অধীনে বাংলাদেশ সফর করেন। কিন্তু একই রকম ভিসা ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রবেশের কারণে পুলিশ ওই দুজন সাংবাদিককেই আটক করে। দুই সপ্তাহ তাদেরকে আটকে রাখার পর মুক্তি দেয়া হয়। তবে তাদের দেশ ছাড়তে বারণ করা হয়। এর চার সপ্তাহ পরে কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার করে।
ওই রিপোর্টে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বর্ণনা উল্লেখ করে বলা হয়, ২০১৭ সালে নিরাপত্তা হেফাজতে থাকা ৫৩ জনকে হত্যা করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। অন্যদিকে অধিকার বলছে, বছরের প্রথম ছয় মাসে ৬ বন্দিকে হত্যা করেছে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা। নওগাঁ জেলার স্থানীয় এক নেতা মাজহারুল ইসলামের পরিবার অভিযোগ করেছেন, মাজহারুল ইসলামকে র‌্যাব তুলে নিয়ে যায়। তারপর নির্যাতন করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। ৮ই সেপ্টেম্বর তার পরিবার বলে, সিঙ্গারহাট বাজারে একটি চায়ের দোকান থেকে মাজহারুলকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। পরে তাকে তার বাড়িতে আটকে রাখে। এ সময় র‌্যাব সদস্যরা তার ওপর নির্যাতন করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এরপর তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায় র‌্যাব। সেখানে ৯ই সেপ্টেম্বর মারা যান তিনি। হাসপাতাল থেকে রিপোর্টে বলা হয়, মাজহারুলের শরীরে বহু ক্ষত ছিল। ১৮ই সেপ্টেম্বর তার স্ত্রী শামিমা আখতার স্বপ্না র‌্যাব-৫ এর কোম্পানি কমান্ডারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে একটি হত্যা মামলা করেন। এজন্য স্বপ্নাকে মোবাইল ফোনে হুমকি দেয়া হয়। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় অফিসের নেতাকর্মীদের মধ্যে সহিংস সংঘাত হয়েছে। এমন ঘটনায় ২০১৭ সালের প্রথম নয় মাসে ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ৩৫০৬ জন। জাতীয় নির্বাচন যখন ঘনিয়ে আসছে তার আগে ক্ষমতার লড়াইয়ে রাজনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘাত হয়। এতে আহত হন ৫৬ জন। গুলিতে আহত যুবলীগের এক তরুণ নিহত হন।
ওই রিপোর্টে বাংলাদেশে গুম সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপ ও মিডিয়ার রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশে গুম ও অপহরণ অব্যাহত রয়েছে। এর জন্য বেশির ভাগই দায়ী নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা। অভিযুক্ত এমন গুমের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা কিছু মানুষকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই মুক্তি দিয়েছে। গ্রেপ্তার দেখিয়েছে কাউকে। আবার কাউকে পাওয়া গেছে মৃত অবস্থায়। অন্যদের কোনো খোঁজই পাওয়া যায়নি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, ওই বছরে ৬০টি জোরপূর্বক গুমের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৬ সালের আগস্টে কর্তৃপক্ষ বিরোধীদলীয় তিনজন সাবেক রাজনীতিকের ছেলেদের নিরাপত্তা হেফাজতে নেয়। সাত মাস পরে কর্তৃপক্ষ তার মধ্যে হুম্মাম হাদের চৌধুরীকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু বছরের শেষ পর্যন্ত মীর আহমেদ বিন কাশেম ও আমান আজমি ছিলেন নিখোঁজ। ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের অফিস থেকে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। এতে দাবি করা হয়, কমপক্ষে ৪০ জন গুম হয়েছেন। জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স বাংলাদেশ সফরের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করে। কিন্তু তাদের সেই অনুমতি দেয়া হয়নি। ওদিকে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বার বার জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাদের দাবি, ভিক্টিম নিজের ইচ্ছায় পালিয়ে আছে। তবে ৪ঠা জুলাই বিচার বিভাগীয় এক তদন্তে বলা হয়, জোরপূর্বক গুমের ঘটনা ঘটেছে এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে। এপ্রিল মাসে র‌্যাবের একজন সিনিয়র অফিসার সুইডিশ রেডিওকে সাক্ষাৎকার দেন। তাতে তিনি স্বীকার করেন যে, তার ইউনিট নিয়মিতভাবে বিভিন্ন জনকে তুলে নিয়ে যায়, তাদেরকে হত্যা করে এবং মৃতদেহ ফেলে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই রিপোর্টে খেয়াল-খুশিমতো গ্রেপ্তার আটকের বিষয়টিও তুলে আনা হয়। বলা হয়, এমন গ্রেপ্তার বা আটক সংবিধান অনুমোদন করে না। কিন্তু ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে কর্তৃপক্ষ কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই যে কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক করতে পারে। আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ তাদের গ্রেপ্তারকে বৈধতা দেয়ার জন্য ব্যাপকভাবে এই আইনের ব্যবহার করে থাকে। সংবিধান যেকোনো ব্যক্তিকে অবৈধভাবে গ্রেপ্তার বা আটক রাখাকে আদালতে চ্যালেঞ্জ জানানোর অধিকার দিয়েছে। কিন্তু সরকার সাধারণত এটা অনুসরণ করে না। বিশেষ দুটি গোয়েন্দা সংস্থা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। তাদের এ কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে সন্দেহজনক সন্ত্রাসী, বিরোধীদলীয় সদস্য, সুশীল সমাজ ও অন্যদের ক্ষেত্রে। একটি বাহিনী ও নিরাপত্তা রক্ষাকারী অন্য বাহিনীর ওপর বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের ভিতরে অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত করে তাদেরকে শাস্তি দেয়ার মেকানিজম আছে সরকারের। কিন্তু এই মেকানিজম নিয়মিত প্রয়োগ করা হয় না। নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা দায়মুক্তি নিয়ে নিয়ম লঙ্ঘন করে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিক্ষোভ হোক অথবা সন্ত্রাসী ঘটনার জবাবে নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের পদক্ষেপের সময় হোক- এসব ক্ষেত্রে খেয়াল-খুশিমতো গ্রেপ্তার করা হয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই এসব ব্যক্তিকে আটক রাখে সরকার। মাঝে মাঝে তারা আটক ব্যক্তির কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করে। গত বছর পুলিশ গণগ্রেপ্তার চালিয়েছে। তারা এ সময়ে গ্রেপ্তার করেছে ১৪ হাজার মানুষকে। এর মধ্যে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী রয়েছেন প্রায় ২ হাজার। এ সময়ে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশ বিভিন্ন অভিযোগে পর্যায়ক্রমে গ্রেপ্তার অভিযান চালিয়েছে। এতে বলা হয়, আইন অনুযায়ী বিচার বিভাগ স্বাধীন। তবে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে সেই স্বাধীনতা নিয়ে আপস করা হয়েছে। ২০১৪ সালে ষোড়শ সংশোধনী পাস করে জাতীয় সংসদ। এর ফলে পার্লামেন্ট কোনো বিচারপতিকে অপসারণের অধিকার পায়। কিন্তু গত বছরে সুপ্রিম কোর্ট ওই সংশোধনীকে অসাংবিধানিক বলে রুল দেয়। এর ফলে তখনকার প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে পার্লামেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী। এর ফলে পদত্যাগ করেন প্রধান বিচারপতি ও তিনি দেশ ছেড়ে যান। তখনকার ওই প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার দাবি, সরকার তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছে। তবে সরকার এমন অভিযোগ অস্বীকার করে। উল্টো বছরের শেষের দিকে ওই বিচারপতির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনে সরকার। মানবাধিকার বিষয়ক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এটা করা হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক। রাজনৈতিক কারণে বন্দি রাখা বা জেলে আটকে রাখার রিপোর্ট পাওয়া গেছে। বিরোধীদলীয় অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি বলেছে, খেয়াল-খুশিমতো গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের নেতাকর্মীদের। এতে আরো বলা হয়, আইনে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অনুমতি থাকলেও এই অধকারকে সীমিত করে দিয়েছে সরকার। আইন সরকারকে কোনো স্থানে চারজনের বেশি মানুষের সমাবেশ নিষিদ্ধ করার অধিকার দিয়েছে। ঢাকায় প্রতিবাদ, বিক্ষোভ করার আগে অনুমতি নিতে হয় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছ থেকে। এর মাধ্যমে বিরোধী দলের সভা সমাবেশকে চাপিয়ে রাখা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে শক্তি প্রয়োগ করে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দল। ২০১৭ সালে বিরোধী দলের সদস্যদের বহু সমাবেশ প্রতিরোধ করে দিয়েছে পুলিশ। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির শ্রম বিষয়ক কমিটি ১লা মে শ্রমিক দিবসে ঢাকায় র‌্যালি করার অনুমতি চেয়েছিল। কিন্তু তাদেরকে তা দেয়া হয়নি।

সিলেটে যেভাবে সোহাগের লাশ গুম করে ঘাতকরা by ওয়েছ খছরু

সিলেটে নিহত সোহাগের লাশ গুম করার জন্য বস্তাবন্দি করা হয়েছিল। পাশের ফিসারিজ থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল বস্তা। এরপর হাত-পা ভেঙে লাশ বস্তার ভেতর ভরা হয়। সোহাগ খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া দীপু ও সায়েম জবানবন্দিতে এ কথা জানিয়েছে। সিলেটে আলোচিত এ খুনের ঘটনায় পুলিশ তিন জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তিন জনই আদালতে খুনের দায় স্বীকার করে বক্তব্য দিয়েছে। সর্বশেষ সিলেটের  সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হরিদাস কুমারের আদালতে তারা এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এর আগে তারা সিলেটের কোতোয়ালি থানা পুলিশের কাছেও একই বক্তব্য দেয়। সিলেটের ঘাষিটুলা এলাকা অন্যতম ক্রাইম স্পটে পরিণত হয়েছে। উঠতি বয়সী তরুণদের অপরাধের ‘স্বর্গরাজ্যে’ নদী তীরবর্তী ওই এলাকা। ঘাষিটুলা এলাকার গোরস্থান রুট অন্যতম ক্রাইম জোন। বিকাল হলেই উঠতি অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয় ওই এলাকা। এলাকার শাকিলসহ কয়েক তরুণ এলাকাকে পরিণত করেছিল সন্ত্রাসী আস্তানায়। সূত্র জানিয়েছে, প্রায় ২০ জনের একটি সিন্ডিকেট ওই এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতো। তারা ইয়াবা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। পাশাপাশি গাজা ও ফেনসিডিলের হাট বসিয়েছিল। ওই সিন্ডিকেটের সব সদস্যরাও সেবন করতো ইয়াবা। নেশায় বুঁদ থাকে সব সময়। ওই আস্তানার নিয়ন্ত্রক শাকিলের মাদক ব্যবসার সবকিছু দেখভাল করতো ঘাষিটুলা এলাকার সোহাগ আহমদ। সোহাগের মূল বাড়ি বগুড়া। সে তার পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় বাস করছিল। নগরীর কাজিরবাজার এলাকার মৎস্য আড়তে টোকাই হিসেবে কাজ করতো সে। পাশাপাশি শাকিলের নিয়ন্ত্রণে থাকা মাদকের হাটের পরিচালনা করতো। মাদক ব্যবসার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ বাঁধে। টাকা আটকে রাখে সোহাগ। এতে ক্ষুব্ধ হয় শাকিল ও তার সিন্ডিকেট। তারা সোহাগের কাছে টাকার জন্য চাপ দেয়। ১লা বৈশাখ সন্ধ্যায় কাপড় কেনার জন্য নিজ বাড়ি ঘাষিটুলা থেকে বের হয়েছিল সোহাগ। আর বালুর মাঠ এলাকায় মোবাইল ফোনে তাকে ডেকে নেয় শাকিল। এ সময় সেখানে অবস্থান করছিল গ্রেপ্তার হওয়া জয় আহমদ দীপু ও সায়েম আহমদসহ কয়েকজন। তর্কাতর্কির একপর্যায়ে শাকিল গলা কেটে সোহাগকে খুন করে। ঘটনার দুই দিনের মাথায় পুলিশ প্রথমে খুনের ঘটনার মূল হোতা শাকিলকে গ্রেপ্তার করে। শাকিল আদালতে দায় স্বীকার করে বক্তব্য দেয়। এরপর বৃহস্পতিবার আলোচিত এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিলেটের কোতোয়ালি থানার এসআই আব্দুল বাতেন অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করেন জয় আহমদ দীপু ও সায়েম আহমদকে। সায়েম আহমদ নগরীর ঘাষিটুলা ও জয় আহমদ দীপু বেতেরবাজার এলাকার বাসিন্দা। তারাও মাদক সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য। গ্রেপ্তারের পরপরই সায়েম ও দীপু খুনের ঘটনা স্বীকার করে বক্তব্য দেয়। পুলিশ জানায়- সায়েম ও দীপু বলেছে যে তারা খুনের ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেখানে ছিল। তারা সহযোগিতাও করেন। সোহাগকে হত্যার পর তারা লাশ নিয়ে বেকায়দায় পড়ে। এ সময় তাদের একজন পার্শ্ববর্তী ফিসারিজ থেকে মাছের খাদ্য রাখা বস্তা নিয়ে আসে। হাত-পা ভেঙে তারা সোহাগের লাশ ওই বস্তার ভরে। এরপর তারা লাশ গুম করে রাখতেই গাভিয়ার খালে ফেলে দেয়। তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল বাতেন জানিয়েছেন- গ্রেপ্তার হওয়া শাকিল, দীপু ও সায়েম একই সিন্ডিকেটের সদস্য। তাদের সঙ্গে আরো কয়েকজন রয়েছে। সবাই মিলে লাশ গুমের চেষ্টা চালায়। তিনি বলেন- এখনো খুনের ঘটনায় জড়িত কয়েকজন বাইরে রয়েছে। তারা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশ প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান শুরু করেছে। খুব দ্রুত তারা গ্রেপ্তার হবে বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা। ঘাষিটুলা এলাকার লোকজন জানিয়েছেন, গোরস্থান রুটে আগে সব সময় ১৫-১৬ জন তরুণ বসে আড্ডা দিতো। তারা ছিনতাইসহ নানা কর্মকাণ্ডে জড়িত। কয়েক মাস আগে তাদের নিষেধ করেছিলেন মুরব্বিরা। কিন্তু ওই তরুণদের বেপরোয়া আচরণের কারণে শেষ পর্যন্ত ভয়ে আর কেউ মুখ খুলেননি। এলাকায় তাদের হামলায় কয়েকজন যুবকও আহত হয়েছে। ১লা বৈশাখের দিন থেকে হঠাৎ করে নীরব হয়ে পড়েছে গোরস্থান রুট এলাকা। সেখানে আর ওই যুবকদের দেখা যাচ্ছে না। তারা অন্য কোথায়ও জড়ো হচ্ছে না। সোহাগ খুনের ঘটনার পর এলাকার ওই তরুণদের রহস্যময় আচরণ প্রথমে তাদের প্রতি সন্দেহ দেখা দেয়। কোতোয়ালি থানা পুলিশ সোর্স নিয়োগ করে ওই এলাকায় মূল অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

আতঙ্ক কাটছে না কোটা আন্দোলনকারীদের by ফররুখ মাহমুদ

কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের মাঝে আতঙ্ক কাটছে না। প্রশাসনের একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে এই আতঙ্ক আরো বাড়ছে। শিক্ষাবিদরা প্রশাসনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বলছেন, আন্দোলনকে রাজনৈতিক দিক থেকে নয়, গুরুত্ব মূল্যায়ন করতে হবে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতি সহনশীল হতে হবে। একই সঙ্গে কেউ যদি ধ্বংসাত্মক কাজ করে এবং সেটি প্রমাণিত হয় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, আন্দোলনকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা ঠিক নয়। এটি শিক্ষার্থীদের উদ্বিগ্নতা, ক্ষোভ থেকে হয়েছে। সেটাকে সেভাবে দেখাই উচিত ছিল। শুরু থেকে যারাই করুক না কেন এখন খুঁজে খুঁজে বের করছেন তারা শিবির, ছাত্রদল বা হাবিজাবি- এ কাজটা আমার পছন্দ হয় না। আন্দোলনের মেরিট হিসেবে তাদের মূল্যায়ন করা উচিত। তিনি আরো বলেন, কেউ যদি সেখানে সরকারকে বিপদে ফেলার জন্য অর্ন্তঘাতমূলক কিছু করে সেটার বিচার আপনারা করেন। সেটার জন্যও তো কেউ আপনাকে আটকাচ্ছে না। ঢালাওভাবে সব শিক্ষার্থীর অপদস্ত করার কারণ তো আমি দেখি না। আর গণতান্ত্রিক দেশে শিক্ষার্থীদের অধিকার থাকবে না একটা আন্দোলন করার? তারা তো ধ্বংসাত্মক কাজ করেনি। ভিসির বাসভবনে যারা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে তাদের খুঁজে বের করুন। এরা তো অনুপ্রবেশকারী। যারা চারুকলাতেও আগুন দিয়েছে। এর অপবাদ সবার ওপর দেয়া উচিত হবে না। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, যারা আন্দোলন করেছে তাদের খুঁজে বের করা মোটেও উচিত হচ্ছে না। এটা অশিক্ষকসুলভ আচরণ। রাতের বেলায় হল থেকে বের করতে হবে কেন? ধামরাই থেকে বাবাকে সকালে আসতে বলতে পারতেন। ছাত্রীরা বের হয়ে গেছে সেটা শুনে প্রধানমন্ত্রী উদ্বিগ্ন হয়েছেন। হল প্রশাসন হলো না। প্রশাসনের আরো বেশি সহনশীল হওয়া উচিত ছিল। তিনি আরো বলেন, তদন্তের নামে যা চলছে, এটা হল প্রশাসন করতে পারে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনী করতে পারে। এভাবে একটা ছাত্রীর ফোন জব্দ করা অমানবিক ব্যাপার। আপনি যদি নিশ্চিত হোন ছাত্রী দোষ করেছে তাহলে প্রক্টরের সহযোগিতা নেন। আশা করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি পরিবার। এটাতে ভাঙন তারা চাইবেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ বলেন, সুফিয়া কামাল হলের ঘটনায় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত যথাযথ মনে হয়নি। আরো দূরদর্শিতার প্রয়োজন ছিল। কাউন্সেলিংয়ের দরকার হলে সেটা হল প্রশাসন করবে। টিএসসিতে একটি কাউন্সেলিং সেন্টার রয়েছে। তিনি বলেন, মামলার বিষয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। প্রশাসনকে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তবে ভিসির বাসায় হামলার বিষয়ে যারা জড়িত তাদের বিচার হওয়া উচিত।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা শিক্ষার্থীবান্ধব নয়। এ ধরনের সংকটের ক্ষেত্রে প্রশাসন ধারাবাহিকভাবে বা ঐতিহ্যগতভাবে যে ধরনের ভূমিকা পালন করে সেরকম ভূমিকা এখনো দেখছি না। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে এমন একটি ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসন শুধু প্রশাসকই নয়, শিক্ষকও বটে। শিক্ষকসুলভ আচারণ, শিক্ষকসুলভ আলোচনা বা কথাবার্তার প্রয়োজন ছিল সেগুলোর প্রচণ্ড ঘাটতি রয়েছে। সে ঘাটতির কারণেই শিক্ষকদের ওপর শিক্ষার্থীদের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সুফিয়া কামাল হলে যে ঘটনা ঘটেছে তার প্রেক্ষিতে প্রভোস্টের যে ভূমিকা সেটি খুবই অনভিপ্রেত এবং শিক্ষক সুলভ না। এটা অপরাজনীতি চর্চার একটি বহিঃপ্রকাশ। এ সংকটকে আরো জটিল করে তুলছে। এখানে দূরদর্শিতা এবং শিক্ষকসুলভ আচরণ খুবই প্রয়োজন। এটাই কাম্য। শিক্ষার্থীরাও এমন আচরণ প্রত্যাশা করে। তিনি আরো বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের একধরনের বোধের যে প্রকাশ সেটা শুধু কোটা সংস্কারের অবস্থান না। আমাদের আবাসিক হলগুলোতে যেরকম মিনি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প তৈরি করে রাখা হয়েছে, হিটলারের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মতো। যেখানে একজন শিক্ষার্থীর ন্যূনতম পরিবেশ দরকার পড়াশোনার জন্য, তার সুস্থ জীবনযাপনের জন্য সেটা আমরা আবাসিক শিক্ষকরা নিশ্চিত করতে পারিনি। নিশ্চিত করতে পারিনি বলেই আমরা হাফিজুরের মৃত্যু দেখেছি, আবু বকরের মৃত্যু দেখেছি, আমরা এহসানকে দেখলাম একটা ক্যালকুলেটরের জন্য চোখ অন্ধ করে দিলো প্রায়। ফলে হলগুলোর অব্যবস্থাপনাও শিক্ষার্থীদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। তার প্রকাশটাও কোটা সংস্কার আন্দোলনে ঘটেছে। আমাদের আগে থেকেই সচেতন হওয়ার কথা ছিল। হাফিজুর, এহসানদের ঘটনার পরও আমরা নির্লিপ্ত ছিলাম। বিশেষ করে হলের দায়িত্বে থাকা প্রভোস্ট বেশির ভাগ দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেন। ব্যতিক্রমও রয়েছেন। তানজিম উদ্দিন খান বলেন, রাজনৈতিক অভিলাষ চরিতার্থ করার জন্যই আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের দূরে ঠেলে দিই এবং অবহেলা করি। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নীরব ছিল না। তারা সরব ছিল একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতি। সেটাই পরিস্থিতিকে আরো বেসামাল করে। যারা সরকারি দল করে সেটা যে সময়ই হোক না কেন তারা ক্যাম্পাসে অনেক শক্তিশালী থাকে। প্রশাসনের দায়িত্ব এই শক্তির ভারসাম্য আনা; বিশেষ করে আইনি দিক থেকে, নিয়মনীতির দিক থেকে, বিশ্ববিদ্যালয় যেভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত সেভাবে পরিচালনা করে এ শক্তির ভারসাম্য এনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
গত ১৯শে এপ্রিল গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হলের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে হল থেকে বের করে দেয়া হয়। এ ঘটনায় দেশব্যাপী ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। রোকেয়া হলে এক অনুষ্ঠানে গিয়ে চার ছাত্রীর বিক্ষোভের মুখে পড়েন ভিসি অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে বের করে দেয়া ছাত্রীদের শুক্রবার বিকালে ও রাতে আবারো হলে তুলে নেয় প্রশাসন। এ বিষয়ে হল প্রভোস্ট অধ্যাপক সাবিতা রেজওয়ানা বলেন, কাউকে হল থেকে বের করা হয়নি। তাদের ওইদিন রাতে তাদের স্থানীয় অভিভাবকের কাছে দেয়া হয়েছে। যাতে তারা তাদের সন্তানদের কাউন্সেলিং করে। শুক্রবার তারা সবাই হলে ফিরেছেন। তিন ছাত্রীর দুজন হলের খেলায়ও অংশ নিয়েছেন। একজন সন্ধ্যায় হলের ছাত্রীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সাধারণসভায় বক্তৃতা করেছেন। যেখানে হলের প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাধিক ছাত্রী অংশ নিয়েছিল। তিনি বলেন, এদের তাদের পরিবার আবার বাসায় নিতে পারেন। বাসায় ও হলে আমরা তাদের কাউন্সেলিং করবো। এ ঘটনায় ছাত্রীদের মাঝে যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে সেটি এখনো কাটেনি। একাধিক ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও তারা এসব বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করা শর্তে এক ছাত্রী বলেন, প্রভোস্ট দুই হাজার ছাত্রীর ছাত্রত্ব বাতিলের হুমকি দেয়ায় আমরা ভয়ে আছি। হলে এখনো হয়রানি করা হচ্ছে বিভিন্নভাবে। সব মেয়ে আতঙ্কের মধ্যে আছে। ছাত্রী হলের এ ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে ছাত্র হলগুলোতেও। একই সঙ্গে ভিসির ভবন ভাঙচুরসহ অন্য মামলাগুলোর কারণে শিক্ষার্থীরা ভীতির মধ্যে রয়েছেন। আন্দোলনকারীদের নেতা নুরুল হক নূর বলেন, অজ্ঞাতনামা মামলা দিয়ে প্রশাসন শিক্ষার্থীদের হয়রানির চেষ্টা করছে। শিক্ষার্থীরা ভীতির মধ্যে রয়েছে। আমরা দাবি জানিয়েছি, মামলা প্রত্যাহার করার। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, দায়ের করা ৪টি মামলার মধ্যে তিনটি করেছে পুলিশ। অপরটি করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পুলিশ জানায়, বেশ কিছু ভিডিও ফুটেজ দেখে আসামিদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কারা জড়িত সে সর্ম্পকে কোনো তথ্য দেয়নি তারা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি পেলে পুলিশ ক্যাম্পাসেও তদন্ত শুরু করবে বলে জানা গেছে। এদিকে ভিসির বাসায় হামলার ঘটনার তদন্ত এগুচ্ছে ধীরগতিতে। এ বিষয়ে কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, আমরা কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়েছি। নিজেরাও কয়েকটি সভা করেছি। কাজ এগুচ্ছে। এখনই কিছু বলা যাবে না। আরেকটু সময় লাগবে। পরে আমরা বিস্তারিত জানাবো।
ভীতি ছড়াচ্ছে ছাত্রলীগ: আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের এখনো হুমকি দিচ্ছে ছাত্রলীগ এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এফ রহমান হল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এস এম ইয়াসিন আরাফাতকে। আরাফাত ছাত্রীদের বের করে দেয়ার খবর শুনে ওই দিন রাতেই একা সুফিয়া কামাল হলের সামনে গিয়ে প্রতিবাদ করে। হলে ফিরলে হল সভাপতি হাফিজুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরে তাকে হল থেকে বের করে দেয়া হয়। এ বিষয়ে এস এম ইয়াসিন আরাফাত বলেন, আমাকে ছাত্রলীগের নেতারা আন্দোলনে যাওয়ার কারণে হুমকি দেন। হল থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। হলে থাকলে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে এর দায়ভার তারা নেবেন না বলে জানান। আমার রুমমেটকেও শাসান তারা।
শিক্ষকদের কর্মসূচি: আজ সকাল ১১টায় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে মানববন্ধন করবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। সচেতন শিক্ষকবৃন্দের ব্যানারে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।

ডাকসুর সাবেক চার ভিপি যা বললেন-

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে অভ্যুত্থান হিসেবে আখ্যায়িত করে ডাকসুর সাবেক নেতারা বলেছেন, সম্প্রতি বাংলাদেশের মানুষ এমন আন্দোলন দেখেনি। বর্তমান সময়ে আওয়ামী লীগ আন্দোলন ভাঙতে রেকর্ড করেছে। সর্বজনীন কর্মসংস্থানের দাবিতে এই আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার জন্য তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। শনিবার জনপরিসর আয়োজিত ‘কোটা সংস্কার ছাত্রকম্পের ন্যায্যতা’ শীর্ষক আলোচনায় তারা এসব কথা বলেন। বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ডাকসুর সাবেক ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ, মাহমুদুর রহমান মান্না ও আমান উল্লাহ আমান অংশ নেন। গৌতম দাসের সঞ্চালনায় আলোচনা সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, আন্দোলনকে স্তিমিত করাটাই ছিল তাদের স্ট্রাটেজিক পন্থা। ওবায়দুল কাদের ১৫ জন ছাত্রকে ডেকে এক মাসের বিশাল এক সময় বেঁধে দিলেন যাতে আন্দোলন না করতে পারে। কোটা সংস্কারের এই আন্দোলনের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। আজ ৪৭ বছর পরেও মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিদের কেন সুযোগ দিতে হবে। তাদের সম্মানিত করলে তাদের অন্যভাবে করেন, কিন্তু মেধার ওপর হাত দিয়ে কেন করতে হবে। ছাত্রদের এই আন্দোলন কেউ কখনো দাবিয়ে রাখতে পারবে না। আমি তাদের স্যালুট জানাই। মেধাবীদের একটা বড় অংশ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। এ আন্দোলনকে অব্যাহত রেখে নিয়ে যেতে হবে সর্বজনীন কর্মসংস্থানের দাবিতে। এদিনকে নিতে হবে সেদিনের কাছে।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ছাত্ররা যখন কোটা আন্দোলন করলো একটা বড়সড় ব্যাপার ঘটে গেল। ক্ষমতাসীনরা বলে যেকোনো থেকে কিছুতে রাজনীতি আনা যাবে না অথচ তারাই সব কিছুতে রাজনীতি নিয়ে আসে। কোটা আন্দোলনকারী ছাত্রদেরও তারা রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। এই অভ্যুত্থানের মতো আন্দোলন আর শিগগির হয়নি। আমি গত কয়েক দশকে এমন দেখিনি। বর্তমান সময়ে আওয়ামী লীগ আন্দোলন ভাঙতে রেকর্ড করেছে। শেখ হাসিনা এই ব্যাপারে বেশ পাকা। ছাত্রদের ওপর কীভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। ছেলেদের ওপর গুলি চালানো হয়েছে। মান্না আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কথার পরে আমি শুনেছি মানুষ বলেছে, আমরা যা চাইছি আর ওনি কি দিয়েছেন। পরে তো কিছুই দিলেন না।
সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা অনেক আচরণ করেছি। কিন্তু রাত দুইটার সময় যে ছাত্রীরা বের হয়ে আসছে তা আমাদের সময়ও হয়নি। কিন্তু কতটা খারাপ পর্যায়ে গেলে ছাত্রীরা হল থেকে তাদের ছাত্র ভাইদের জন্য বেরিয়ে আসে। গত পরশু রাত দুইটার দিকে ন্যক্কারজনকভাবে ছাত্রীদের বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বের করে দিয়েছে। আমাদের সময় এমন ঘটনা ঘটেনি। স্বৈরাচারের সময়ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এভাবে পুলিশ ঢুকতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে পুলিশ ঢুকতে হলে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করে নিতে হতো। যারা সেই সময় দায়িত্বে ছিল তাদের পুলিশ প্রয়োজন হলে ইনডাইরেক্ট আমাদের বলতেন। সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে কেমন অবস্থায়। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের চিত্র ফুটে উঠছে। আজ বাংলাদেশ কি অবস্থায় রয়েছে। তিনি আরো বলেন, কীভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকে চোখ বেঁধে নেয়া হয়েছে। এটা পাকিস্তানি আমলের স্টাইল। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এহেন অবস্থায় সারা দেশের মানুষ আতঙ্কে আছে। আমাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য এ ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনকে সমর্থন করছি।
আমান উল্লাহ আমান বলেন, আমাদের সংবিধান রয়েছে মানুষে মানুষে বৈষম্য করা যাবে না, নারী-পুরুষে বৈষম্য করা যাবে না। কিছু সময় মানুষের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সেটা ছিল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। আজ ছাত্রসমাজ যে দাবি নিয়ে আন্দোলন করেছে তা যৌক্তিক। মাত্র দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধার জন্য ৩০ ভাগ কোটা। মাত্র ৯৭ দশমিক ভাগ মানুষের জন্য ৪৪ শতাংশ। অথচ বাকি দুই দশমিক ৬৩ ভাগ মানুষের জন্য কোটা ৫৬ ভাগ। এটা হতে পারে না। মেধাবীদের সামনে আশা দুরূহ হয়ে পড়েছে। এজন্যই কোটা সংস্কার প্রয়োজন। ছাত্রছাত্রীদের ন্যায্য আন্দোলনে নিপীড়ন চালানো হয়েছে। ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করা হয়েছে। এ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঢাবি ভিসির বাসভবনে হামলা একটা নির্দিষ্ট মহল করেছে। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য, মেধাবীদের দ্বারা বাংলাদেশ তোলার জন্য সকলে কোটা সংস্কারে একমত। সুফিয়া কামাল হলে ছাত্রলীগ সভাপতি ইশরাত জাহান এশার বহিষ্কারের কথা উল্লেখ করে আমান বলেন, ছাত্রলীগ তাকে বহিষ্কার করে কয়েক ঘণ্টা পরে বিশ্ববিদ্যালয় বহিষ্কার করেছে। আবার ছাত্রলীগ বহিষ্কারাদেশ ফিরিয়ে নিলে, বিশ্ববিদ্যালয়ও তা ফিরিয়ে নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ও এখন ছাত্রলীগের পেছনে হাঁটছে।

ট্রাম্প ও জেমস কোমির আলোচনার মেমো ফাঁস

রাশিয়া কানেকশনসহ বিভিন্ন বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাবেক এফবিআই পরিচালক জেমস কোমির আলোচনা হয়েছিল। কোমি এই আলোচনার সময় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নোট করেছিলেন। পরে তা রাশিয়া কানেকশন তদন্তের দায়িত্বে থাকা স্পেশাল কাউন্সেল মুয়েলারকে প্রদান করেন। কোমির লেখা এসব মেমো পর্যালোচনা শেষে বৃহস্পতিবার বিকালে বিচার বিভাগ তা মার্কিন কংগ্রেসের কাছে হস্তান্তর করে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওই মেমোগুলো সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যায়। এসব মেমোতে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মার্কিন ম্যাগাজিন দ্য আটলান্টিক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
এতে বলা হয়, ফাঁস হওয়া মেমোতে এই বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে যে, ট্রাম্প তদন্তে বাধা দিচ্ছেন। তবে বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের সমর্থকরা জোর দিয়ে বলেন, এসব মেমোতে কোমি কোথাও উল্লেখ করেন নি যে, তিনি তদন্ত কার্যক্রমে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন। তারা বলেন, ট্রাম্প ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করেননি। তবে এসব মেমোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রথমত, এসব মেমোতে কোমির বরখাস্ত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। ধারণা করা হয়, তদন্ত কার্যক্রম ব্যাহত করার জন্যই কামিকে বরখাস্ত করা হয়। দ্বিতীয়ত, মেমোর লেখাগুলো পুরোপুরি বর্ণনামূলক। এখানে খুঁটিনাটি সব কিছু উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষণী কিছু লেখা হয়নি।
কোমির লেখা মেমো স্পেশাল কাউন্সেল রবার্ট মুয়েলারের কাছে হস্তান্তর করার পর থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার জেমস কোমিকে মিথ্যাবাদী ও তথ্য ফাঁসকারী আখ্যায়িত করেছেন। তার দাবি, মেমোতে শুধু কোমির নিজের বক্তব্য লেখা হয়েছে। ওই মেমোর ভিত্তিতে কোনো তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা সম্ভব না। ফাঁস হওয়া মেমোতে কোমি লেখেন, বিভিন্ন সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে সংবাদমাধ্যমে এই কথা বলার জন্য অনুরোধ করেন যে, ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত করা হচ্ছে না। গত বছরের ৩০শে মার্চ এক বৈঠকে ট্রাম্প কোমিকে বলেন, যদি এই বিষয়টি ছড়িয়ে দেয়া যায়, তাহলে খুবই ভালো হবে। এসময় জেমস কোমি ট্রাম্পকে স্মরণ করিয়ে দেন আসলেই তারা ট্রাম্পের বিষয়ে তদন্ত করছেন না। এই ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন হলে বিচার বিভাগের সম্মতিতে তা করতে হবে। পরের মাসে কোমিকে আবারো এই বিষয়ে অনুরোধ করেন ট্রাম্প। কোমি তাকে জানান, এই বিষয়টি তিনি অ্যাটর্নি জেনারেলকে জানিয়েছেন। তবে তার থেকে এখনো কোনো সাড়া মেলেনি।
মেমোতে কোমি লেখেন, নির্বাচনের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে মাইকেল ফিনের নাম ঘোষণা করেন ডনাল্ড ট্রাম্প। পরবর্তীতে রুশ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে ভাইস-প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে মিথ্যা তথ্য দেন ফ্লিন। বিষয়টি জানার পরেও তাকে বরখাস্ত করেননি ট্রাম্প। পরে ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদনে বিষয়টি প্রকাশিত হয়। এমনকি তখনো ফ্লিনকে পুরোপুরি ভালো মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করে হোয়াইট হাউস। পরে এই বিষয়ে জেমস কোমি সাক্ষ্য দেন। কিন্তু ফ্লিনের বিরুদ্ধে তদন্ত না করতে চাপ প্রয়োগ করেন ট্রাম্প। মেমোতে এটা পরিষ্কার হয় যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা মাইকেল ফ্লিনের বিষয়ে খুবই সংবেদনশীল।
মেমোতে বলা হয়, ট্রাম্পকে মস্কোর একটি হোটেলে যৌনকর্মী কেলেঙ্কারির বিষয়ে জানান কোমি। তিনি প্রেসিডেন্টকে বলেন, এই বিষয়ে তার বিরুদ্ধে জোরালো অভিযোগ উঠতে পারে। কিন্তু ট্রাম্প এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেন। তখন মিস ইউনিভার্সেল অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রাশিয়া গিয়েছিলেন ট্রাম্প। ওই সফরে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দেখা হয় ট্রাম্পের। একদিন পুতিন তাকে বলেন, ‘আমাদের কাছে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরী যৌনকর্মী রয়েছে।’
রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের উদ্ধৃতি দিয়ে ট্রাম্প যৌনকর্মীদের নিয়ে যা বলেন তা আসলেই বিস্ময়কর। দু’জন রাষ্ট্রপ্রধানের একে অপরকে এমন কথা বলা অস্বাভাবিক। যাই হোক, ব্লুমবার্গকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে পুতিনও ট্রাম্পের বিষয়ে মুখ খোলেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প একজন পরিণত মানুষ। অনেক বছর ধরেই তিনি সুন্দরী প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরী রমনীদের সাক্ষাৎ পেয়েছেন তিনি। এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে রমণীদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য তিনি মস্কোর হোটেলে ছুটে গেছেন। যদিও এটা সন্দেহাতীত যে, আমাদের মেয়েরা সবচেয়ে সুন্দরী।
কোমির লেখা মেমোতে দেখা যায়, তৎকালীন এফবিআই পরিচালক প্রেসিডেন্টকে বুঝতে হিমশিম খেয়েছেন। বিশেষ করে পূর্বের প্রেসিডেন্টদের তুলনায় ট্রাম্প অন্য রকম। মেমোতে ট্রাম্পের সঙ্গে কথোপকথনের বিস্তারিত বর্ণনা লেখেন জেমস কোমি। তিনি লেখেন, ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা ছিল খুবই এলোমেলো। প্রায়ই অন্য বিষয়ে কথা হতো। হঠাৎ করেই আবার মূল বিষয়ে ফিরে আসতেন তিনি। যার কারণে পূর্বের বিষয়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে বের করা কষ্ট। পুরো আলোচনায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প খুবই অস্পষ্ট, অসংলগ্ন ও বিতর্কিত কথা বলতেন।

সিরিয়া পরিস্থিতি: মুখোমুখি পরাশক্তিরা -ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদন

সিরিয়ার বারোয়ারি যুদ্ধের ময়দানে প্রতিনিয়ত উত্তেজনা বাড়ছে। সিরিয়ায় বিবদমান বিভিন্ন পক্ষ একে অপরের অবস্থান নিয়ে উত্তপ্ত হুঁশিয়ারি বিনিময় করলেও, সরাসরি কেউ কারো প্রতি সামরিক আক্রমণে যায়নি। সিরিয়ায় আমেরিকার আক্রমণ নিয়ে যত কথাই বলুক না কেন রাশিয়া, শেষ পর্যন্ত কিন্তু সরাসরি সংঘাতে জড়ায়নি এই দুটি দেশ। বরং এই সপ্তাহে হাওয়া উল্টোদিকেই বইছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রামেপর সঙ্গে দেখা করার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন বলে শুক্রবারই জানিয়েছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। তবে তিনি বলেছেন, এর জন্য আমেরিকার পক্ষ থেকে বিস্তারিত জানার জন্য অপেক্ষা করছে রাশিয়া। আলোচনার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুতিনকে হোয়াইট হাউসে নিমন্ত্রণ করেছিলেন মার্চ মাসে। গত ৭ই এপ্রিল সিরিয়ায় পূর্ব ঘৌটার বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত সর্বশেষ শহর দুমায় রাসায়নিক হামলার অভিযোগ ওঠে। সেখানে প্রায় ৭০ জন শ্বাসকষ্টে মারা যায়। অসুস্থ হয় আরো পাঁচশ’র বেশি মানুষ। এর সপ্তাহখানেকের মধ্যেই সিরিয়ার তিনটি রাসায়নিক অস্ত্রভান্ডার লক্ষ্য করে শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। জার্মানি ও তুরস্ক এ হামলা সমর্থন করলেও চীন, ইরান, জর্ডান ও ইরাক বিপক্ষে অবস্থান নেয়। রাশিয়া ১৪ই এপ্রিল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডেকে এ হামলার বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব তোলে। বলিভিয়া ও চীন ছাড়া ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদে আর কেউ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়নি। এদিকে ওই হামলায় আমেরিকার নেতৃত্বাধীন বিমান হামলায় ফ্রান্সের অংশগ্রহণের প্রতিবাদে ফ্রান্স সরকারের দেয়া মর্যাদাপূর্ণ লেজিওঁ দ’নর খেতাব ফিরিয়ে দেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ। সম্মাননা ফিরিয়ে দেয়ার সময় আসাদ বলেন, তিনি এমন কোনো দেশের পুরস্কার পরবেন না, যারা আমেরিকার দাস। অবশ্য আসাদকে দেয়া এ খেতাব প্রত্যাহারে ‘আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম’ শুরু হয়েছে, ফরাসি সরকারের এমন ঘোষণার কয়েকদিনের মধ্যে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট নিজেই তার সম্মাননা ফেরত দিলেন।বাবার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় বসেই ফ্রেঞ্চ সরকারের কাছ থেকে লেজিওঁ দ’নরের সর্বোচ্চ পদক ‘র্গ্যান্ড ক্রসে’ ভূষিত হয়েছিলেন আসাদ।
২০১১ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকে সিরিয়া নিয়ে ইরান এবং আমেরিকা সমপর্কের মধ্যে উত্তেজনাও এখন চরমে। দুটি দেশই সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে একে অপরের উপস্থিতি নিয়ে হুমকি-ধামকি বিনিময় করলেও এখন পর্যন্ত সেটি সামরিক তৎপরতায় গড়ায়নি। সিরিয়ার ময়দানে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পক্ষের সেনারা মার্কিন মদতপুষ্ট কুর্দি বাহিনী এবং তাদের বিমান ঘাঁটিতে হামলা করছে। আসাদের পক্ষের সেই সেনাদেরই লক্ষ্য করে আক্রমণ করছে আমেরিকা। যদিও এখন পর্যন্ত তারা ইরানিয়ান রেভুলশনারি গার্ডের ওপর হামলা চালায়নি। ইরানের রেভ্যুলশনারি গার্ড আসাদের পক্ষের যোদ্ধাদের এবং সিরিয়ার পক্ষের সামরিক বাহিনীকে সরাসরি সহযোগিতা করছে। অন্যদিকে সিরিয়ায় নাক গলানো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার সতর্ক করে আসলেও এখন পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে ইরানের মদতপুষ্ট যোদ্ধাদের আমেরিকার সৈন্য বা দেশটির সমর্থনে থাকা সেনাদের সরাসরি আক্রমণের কোনো নির্দেশ বা ইঙ্গিত দেয়নি। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রামপ গত মাসে ইরানের কট্টর সমালোচক জন বল্টনকে জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত করেছেন। জাতিসংঘে আমেরিকার দূত নিকি হ্যালি আগুনে ঘি ঢেলেছেন আরও বেশি। তিনি বলেছেন, সিরিয়ার যুদ্ধে ইরানের অনুপ্রবেশ ঠেকানো ট্রামপ প্রশাসনের মূল লক্ষ্যের একটি। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মূল শত্রু দেশগুলোর একটি হচ্ছে ইসরাইলে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানাচ্ছে, সিরিয়ার মাটিতে ইরানের বাহিনীকে আক্রমণের আগে ইসরায়েলকে মার্কিন গোয়েন্দারা তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে নেয়ার ব্যাপারে বলেছে। ওয়াশিংটনে আরব সেন্টারের প্রধান জো ম্যাকারন বলেছেন, ‘আমরা এখন দেখছি আগ্রাসী এবং রক্ষণশীল উপদেষ্টাদের পরামর্শে আমেরিকা সিরিয়ার ময়দানে নামছে। ইসরায়েলের ইন্ধনে আমেরিকার ওই যুদ্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনার, যা সমপূর্ণ বিপরীত ‘তবে ট্রামপ নিজে পেন্টাগনকে নিয়ে পরিস্থিতি ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করছেন। ভবিষ্যতে হয়তো ইসরায়েলের লড়াই তাদের নিজেদেরই করতে হবে,’ বলেন তিনি। এদিকে দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন এটা অতিরঞ্জিত।
ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহামের প্রফেসর স্কট লুকাস বলেন, দু’পক্ষের (ইরান ও আমেরিকা) মধ্যে চূড়ান্ত সংঘাতের কোনো সুযোগ নেই। কেননা দু’পক্ষই যা পাবে, তার চেয়ে অনেক বেশি দিতে হবে। আপনাকে এর জন্য প্রচুর সমপদ নিয়োগ করতে হবে। এবং কেউই জানেনা এটা কতোদূর গড়াবে!
বিশ্লেষকরা বলছেন, উত্তেজনা টানটান থাকলেও সিরিয়া নিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে সামরিক কোনো পদক্ষেপ নেবে না আমেরিকা, ইরান এবং রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলো।

সন্তানের কান্না, মায়ের আকুতিতে ভারি পরিবেশ: গুম-হত্যার শিকার ৫০ পরিবার একমঞ্চে

‘কেউ ছাত্র, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ করতেন চাকরি। বাড়ি, কর্মস্থল অথবা রাস্তা থেকে তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে নিখোঁজ। বছরের পর বছর তাদের অপেক্ষায় স্বজনরা। সেই অপেক্ষার যেন শেষ নেই। নিদারুণ কষ্ট নিয়ে পার হচ্ছে তাদের প্রতিটি দিন।
স্বজনদের দাবি, তারা যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন তাহলে তাদের আইনের মাধ্যমে বিচার করা হোক। কিন্তু, এভাবে একজন মানুষ বছরের পর বছর নিখোঁজ হয়ে থাকবেন- এটি মেনে নেয়া যায় না।
দেশে নিখোঁজ হওয়া এবং নিখোঁজের পরে বিভিন্ন স্থানে লাশ পাওয়া গেছে এমন ৫০ জনের পরিবারের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ এর গণশুনানিতে এ দাবি করা হয়। সংগঠনের সদস্যরা গতকাল সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের হলরুমে তাদের স্বজনদের ছবি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। তাদের কান্না আর আকুতিতে এক বেদনাঘন আবহ তৈরি হয়। নিখোঁজ হওয়াদের মা, ভাই-বোন আর স্ত্রী সন্তানের কান্নায় ভারি হয়ে উঠে পরিবেশ। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন। গুম হওয়া মানুষদের পরিবারদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর পক্ষ থেকে দেয়া পরিসংখ্যানে দাবি করা হয়েছে, ২০১৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনে আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৭২৭ জন। এদের মধ্যে কেউ কেউ ফিরে এলেও অধিকাংশই নিখোঁজ। তাদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ২৫ বার সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে স্মারক লিপি দেয়া হয়েছে। কিন্তু, সরকারের পক্ষে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
আয়োজকদের অন্যতম সংগঠক এনডিপির সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর হোসেন ঈসা বলেন, আরও প্রায় ২৫টি পরিবারের আসার কথা ছিল। কিন্তু, বিভিন্ন কারণে আসতে পারেননি। অনুষ্ঠানে নিখোঁজ হওয়া পিন্টুর বোন রেহানা খানম মুন্নি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ২০১৪ সালে আমার ভাই পিন্টুকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাদা পোশাকধারীরা তুলে নিয়ে যায়। এখন পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পুলিশ ও র‌্যাবের কাছে ধর্না দিয়ে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। একটা লোক হারিয়ে যাবে তার দায় কী সরকারের নেই? কার কাছে বিচার দেবো? ছেলের আশায় থেকে আমার মা পাগল হয়ে গেছেন।
নিখোঁজ হওয়া সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন আফরোজ ইসলাম আঁখি লিখিত বক্তব্যে বলেন, প্রথমে আমরা ২০১৩ সালের আমাদের সন্তানদের সন্ধানের দাবিতে এই জাতীয় প্রেসক্লাবে আটজন মা ও কারও কারও বাবা, স্ত্রী, সন্তান, ভাই ও বোন হাজির হয়েছিলাম। সময়ের ব্যবধানে সেই সংখ্যা বেড়ে ঢাকায় আমরা ২০ পরিবার আপনাদের সামনে হাজির হয়েছিলাম। সময় অনেক দূর গড়িয়ে গেছে, দিন থেকে মাস, মাস থেকে বছর, বছর থেকে প্রায় অর্ধ-যুগের কাছাকাছি এসেও আজও আমরা আমাদের প্রিয়জনের কোনো সন্ধান পাইনি। আজ সারাদেশ থেকে গুম হওয়া শত শত পরিবারের প্রিয়জনরা আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি।
আপনারা বলতে পারেন? আর কত অপেক্ষা করবো। সেদিনের অবুঝ শিশুরা এখন বুঝতে শিখেছে তাদের বুঝাতে পারি না তাদের বাবা কোথায় কী ভাবে আছে? গুম হওয়া মুন্নার বাবা নিজাম উদ্দিনের শেষ আকুতি কেউ রক্ষা করতে পারলো না। তিনি বেঁচে থাকতে বলেছিলেন, আমার মুন্নাকে ফিরিয়ে না দিলে তার কবর দেখিয়ে দিন। অসহায় পিতা সন্তানের কবর না দেখতে পেরে তিনি নিজেই কবরবাসী হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, সূত্রাপুরে পারভেজ হোসেনের পিতা ও শ্বশুর তারাও না ফেরার দেশে। খালেদ হাসান সোহেলের পুত্র আরিয়ান আকাশের দিকে তাকিয়ে বাবাকে খুঁজে, চঞ্চলের পুত্র আহাদ ঘুমের ঘরে বাবা বাবা বলে চিৎকার করে, সুমনের কন্যা আরোয়ান বাবার ছবির দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, ড্রাইভার কাওসারের শিশুকন্যার দিকে তাকানো যায় না। তিনি আরও বলেন, আমার ভাই সুমনকে র‌্যাব-১ এর গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয়। তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
নিখোঁজ মাসুমের বোন ফাওজিয়া ইসলাম বলেন, তার ভাইকে ৪ঠা ডিসেম্বর ২০১৩ সালে উত্তরার একটি প্রাইভেট কোচিং থেকে ধরে নিয়ে গেছে ডিবি পুলিশের নাম করে। মাসুম সরকারি তিতুমীর কলেজের ফিন্যান্সের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তিনি আরও বলেন, সক্রিয় কোনো দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
শাহিনুর আলমের ছোট ভাই মেহেদি হাসান বলেন, আমার ভাইয়ের নামে কোনো মামলা ছিল না। সে কোনো রাজনীতি করতো না।
২০১৪ সালের ২৯শে এপ্রিল র‌্যাব-১৪ ভৈরব ক্যাম্পের সদস্যরা এসে তাকে ধরে নিয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, আমরা সব জায়গায় খুঁজেও তাকে পাইনি। সাতদিন পর জানতে পারি আমার ভাইয়ের লাশ পাওয়া গেছে। পরে আমরা বিচারের আশায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে একটি মামলা করি। কিন্তু, অজ্ঞাত কারণে সেই মামলা এখনও ঝুলে আছে। কোনো শুনানি হয়নি। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর নদীতে লাশ পাওয়া যায় চট্টগ্রামের ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি নুরুল আলম নুরুর।
তার স্ত্রী সুমি আক্তার অনুষ্ঠানে বলেন, তার চোখের সামনেই পুলিশ পরিচয়ে তার স্বামীকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাসায় এসে কলিংবেল চেপে পুলিশ পরিচয় দেওয়ায় তিনি গেট খুলে দেন। খালি গায়েই তার স্বামীকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামীকে এক সেকেন্ডও সময় দেয়া হয়নি। আমাদের আশা ছিল নিয়ে গেছে যখন কোর্ট থেকে জামিনের আবেদন করবো। কিন্তু তার আগেই ভোর ৪টায় খবর আসে তার লাশ পাওয়া গেছে কর্ণফুলী নদীর পাড়ে। আমরা সকাল ৭টায় সেখানে পৌঁছাই। তার মাথায় দুটি গুলি করা হয়েছে। ৩ মাসের বাচ্চা রেখে গেছে সে। সেই বাচ্চা বড় হয়ে গেছে এখন। বাবা বলে কিছু নাই তার। মঞ্জুরুল মওলা নামে এক মাদরাসা শিক্ষার্থী জানান, ‘২০১৫ সালে আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ২ দিন থানায় রাখা হয়। থানা থেকে দ্বিতীয় দিন রাতে নির্জন জায়গায় আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, সেখানে মাথায় অস্ত্র ঠেকানো হয় বলেও জানান তিনি। এরপর তিনি সেখান থেকে কীভাবে জীবিত ফেরত এসেছেন সেই কথা মনে পড়লে আজও ভয়ে থাকেন। অনুষ্ঠানে বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, আমরা এখনও বিশ্বাস করি যে, আমরা একটি সভ্য সমাজে বাস করি। একটি মানুষ দিন দুপুরে নিখোঁজ হয়ে যাবে রাষ্ট্র কোনো দায় নেবে না- এটা হতে পারে না। এই গুমের অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে। সাবেক সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, রাষ্ট্রের যারা কর্তাব্যক্তি আছেন তাদের বলবো জাতীয় প্রেসক্লাবে এসে দেখে যান গুম হওয়া স্বজনেরা কীভাবে আর্তনাদ করছে। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি যে, যারা নিখোঁজ হয়েছে তাদের উদ্ধার করতে। আর যারা বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তাদের জন্য যারা দায়ী তাদের যেন বিচার করা হয়।
গুম হওয়া সাজেদুল ইসলাম সুমনের বৃদ্ধ মা হাজেরা খাতুনের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক আসিফ নজরুল, ড. মাহফুজুল্লাহ, অধিকারের সভাপতি ড. অধ্যাপক সিআর আবরার, গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জুনায়েদ সাকি, সিপিবির রুহিন হোসেন প্রিন্স ও অধিকার-এর পরিচালক নাসির উদ্দিন এলানসহ প্রমুখ।

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে নোংরা রাজনীতিতে সরকার -ফখরুল

কারাবন্দি খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও চিকিৎসা নিয়ে সরকার নোংরা রাজনীতি করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, কারাগারে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে আমরা খবর পাচ্ছি। আর এতে কেবল আমরাই নই, সারা দেশ ও জাতি উৎকণ্ঠিত। কিন্তু সরকার তার সুচিকিৎসার উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো নোংরা রাজনীতি করছে। এ বিষয়ে সরকারের মন্ত্রীদের মন্তব্য ও কটূক্তি সকল শিষ্টাচারবহির্ভূত এবং চক্রান্তের বহিঃপ্রকাশ। সরকার দেশনেত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি করে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চায়, বেগম জিয়াকে রাজনীতি ও আসন্ন নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চায়। মির্জা আলমগীর বলেন, আমরা সরকারকে বলবো- এখনো সময় আছে অবিলম্বে দেশনেত্রীকে মুক্তি দিয়ে তাকে তার পছন্দনীয় চিকিৎসকের ও বিশেষায়িত হাসপাতাল ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। কারাগারে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে তার দায়-দায়িত্ব পুরোটাই সরকারকে বহন করতে হবে। আমরা নোংরা রাজনীতি বাদ দিয়ে সরকারকে সোজা পথে তাকে মুক্তি দেয়ার দাবি জানাচ্ছি। গতকাল সকাল সোয়া ১১টার দিকে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি। মির্জা আলমগীর বলেন, সংবাদপত্র সূত্রে জানতে পেরেছি সরকার গঠিত মেডিকেল টিম দেশনেত্রীকে পরীক্ষা করতে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে প্রফেসর ডা. মালিহা রশিদের নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি মেডিকেল টিম তাকে দেখতে যান। খালেদা জিয়া বেশকিছু ব্যাধিতে আক্রান্ত। এর মধ্যে এক্যুইট রিউমেটিক আর্থারাইটিস তাকে বেশ কষ্ট দিচ্ছে। তিনি বলেন, চিকিৎসকরা যে পরীক্ষাগুলো করেছেন সেখানে এমআরআই ও অন্যান্য যেসব বিশেষায়িত পরীক্ষাগুলো করা দরকার তা করা হয়নি। মাঝখানে তাকে একবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল, যেখানে তার এক্স-রে করানো হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, চিকিৎসকরা যে পরামর্শ দিয়েছেন সে অনুযায়ী তার একটা বিশেষ ধরনের এমআরআই (স্পাইনাল) করা জরুরি। এছাড়া তার হোল এবডুমিনের আল্টাসোনোগ্রাফি করা প্রয়োজন। তার রক্তের বিভিন্ন রকমের পরীক্ষা করা প্রয়োজন। সে জন্য তারা (চিকিৎসকরা) বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দেখানোর জন্য সুপারিশ করেছেন। সেগুলো হচ্ছে- ইমুটোলজিস্ট, অর্থালমোজিস্ট চোখের জন্য (তার চোখ লাখ হয়ে গেছে), ফিজিক্যাল মেডিসিন, নিউরো মেডিসিন এবং ইন্টারন্যাল মেডিসিন। খালেদা জিয়াকে এসব বিশেষজ্ঞ দেখানো জরুরি। মির্জা আলমগীর বলেন, চিকিৎসকরা অতি দ্রুত খালেদা জিয়ার বিশেষ এমআরআই করার জন্য বলেছেন। তারা অবিলম্বে তার পছন্দনীয় ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য সুপারিশ করেছেন। অথচ এ ব্যাপারে কারা কর্তৃৃপক্ষ কোনো বক্তব্য আমাদের কাছে ও জাতির সামনে দেননি। চিকিৎসকরা কারাগারে দেশনেত্রীর জন্য যে অর্থোপেডিক বেড-এর সুপারিশ করেছেন তাও সরবরাহ করা হয়নি। বিএনপি চেয়ারপারসন প্রসঙ্গে সম্প্রতি ‘হায়াত-মউত আল্লাহর হাতে’ বলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের দেয়া বক্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা আলমগীর। তিনি বলেন, ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্য ভয়ঙ্কর অশনি সংকেত। তিনি বলেন, ১৮ই এপ্রিল চেয়ারপারসনের সঙ্গে আমিসহ দলের তিনজন সিনিয়র নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ বাতিল করে আমাদের ফিরিয়ে দেয়া হয়। ২০শে এপ্রিল খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যদের অনুমতি থাকা সত্ত্বেও সাক্ষাৎ করতে পারেনি। অথচ সুস্পষ্টভাবে কোনো কারণও দেখানো হয়নি। জেলের ভেতর থেকে টেলিফোনের মাধ্যমে মির্জা আব্বাসকে জানান, ‘আজ সম্ভব হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া এই দেশের গণমানুষের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী। মিথ্যা সাজানো মামলায় তাকে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানোর মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে তাকে এবং তার দলকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া। গণবিচ্ছিন্ন ও রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া সরকারের ২০১৪ এর মতো একতরফা নির্বাচনের প্রহসনের মধ্য দিয়ে আবারো ক্ষমতা দখলই মূল উদ্দেশ্য। আইনের বিধানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দেশনেত্রীকে জামিন না দেয়া, কারাগারে তাকে প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা, সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা- এটা অমানবিক। মির্জা আলমগীর বলেন, যে কারাগারে, যে কক্ষে তাকে রাখা হয়েছে তা সংবিধান পরিপন্থি। সরকারি ডাক্তারদের সুপারিশকৃত অর্থোপেডিক বেড খালেদাকে সরবরাহ না করা, ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের দিয়ে তার চিকিৎসার সুযোগ না দেয়া এবং দলের নেতৃবৃন্দ ও পরিবারের সদস্যদের তার সঙ্গে দেখা করতে না দেয়া অত্যন্ত হীনউদ্দেশ্যমূলক। বিএনপি মহাসচিব বলেন, রাজনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সাহস সরকারের নেই। তারা এখন জনগণ থেকে একারণেই বিচ্ছিন্ন। তাই দেশনেত্রীর ওপর বলপ্রয়োগ করে এবং দেশনেত্রীকে কারাগারে আটকে রেখে ২০১৪-এর মতো একতরফা নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চায়। ক্ষমতা দখল করে রাখতে চান। বাংলাদেশের সচেতন গণতন্ত্রকামী মানুষ তাদের সে সুযোগ দেবে না। এখনো সময় আছে অবিলম্বে দেশনেত্রীকে মুক্তি দিয়ে তাকে তার পছন্দনীয় চিকিৎসকের মাধ্যমে হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করুন। বিএনপি মহাসচিব সরকারের উদ্দেশে বলেন, এত ভয় কেন? দেশনেত্রীকে মাঠে নামতে দিন, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে দিন, যথেচ্ছ পুলিশ ব্যবহার বন্ধ করুন। দেখুন আপনারা কোথায় দাঁড়াতে পারেন। রাজনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার সাহস আপনাদের নেই। সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও কেন্দ্রীয় নেতা কামরুদ্দিন ইয়াহিয়া খান মজলিস এ সময় উপস্থিত ছিলেন। এদিকে কারা সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে আজ সাক্ষাতের সুযোগ পাবেন বিএনপি নেতারা। সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার নির্ধারিত সাক্ষাৎটি রোববার দুপুরে হওয়ার কথা রয়েছে। দুপুর ২টার পর বিএনপি নেতারা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাবেন।

এবার বাস চাপায় পা গেল রোজিনার

রাজধানীতে বিআরটিসির বাসচাপায় পা হারিয়েছেন রোজিনা আক্তার নামের এক তরুণী। তিনি রাজধানীর বনানী এলাকায় সড়ক পার হওয়ার সময় বাসে চাপা পড়েন। কাওরান বাজার এলাকায় দুই বাসের চাপায় হাত হারানো রাজীবের মৃত্যুশোক কাটতে না কাটতেই এ ঘটনা ঘটলো। আহত রোজিনাকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনাস্থলেই রোজিনার ডান পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টা থেকে পৌনে নয়টার দিকে রাস্তা পারাপার হতে গিয়ে দ্রুতগামী একটি বিআরটিসি দ্বিতল বাসের নিচে পড়ে যান রোজিনা। এ সময় রাস্তায় থাকা পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে ফুটপাথে নিয়ে আসেন। এ ব্যাপারে প্রত্যক্ষদর্শী শাহজালাল হোটেলের ম্যানেজার খোকন মিয়া জানান, আমি হোটেলের কাজে ব্যস্ত ছিলাম। মাঝে মাঝে রাস্তার দিকে খেয়াল করছিলাম। দেখলাম মেয়েটি রাস্তার পশ্চিম পাশ থেকে পূর্ব পাশে যেতে চাইছে। তার আগে ৩-৪ জন পার হয়ে গেছেন। মেয়েটি কয়েকবার এগিয়ে আবার পেছনে ফিরে আসলো। তখন আনুমানিক রাত পৌনে নয়টা হবে। দেখলাম দুই-তিনবার চেষ্টা করেও রাস্তা পার হতে পারেনি। শেষবার যখন চেষ্টা করেছে তখনই একটি বিআরটিসির দোতলা বাস সামনে এসে পড়ে। আর মেয়েটি ওই বাসের নিচে পড়ে যায়। ওই সময়ই তার ডান পা শরীর থেকে আলাদা হয়ে যায়। আমিসহ আরো কয়েকজন ধরাধরি করে তাকে ফুটপাথে নিয়ে আসি। ততক্ষণে মেয়েটির পা থেকে প্রচুর রক্ত বের হয়। আর ফুটপাথের ওপর রক্ত ছড়িয়ে যায়। তখন দুজন লোক দিয়ে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। খোকন মিয়া জানান, শুক্রবার ছিল ওই এলাকার মার্কেটগুলোর সাপ্তাহিক বন্ধের দিন। শাহজালাল হোটেল ও তার পাশের একটি মুদি দোকান ছাড়া বাকি দোকান সব বন্ধ থাকে। তাই ব্যস্ততাও একেবারে থাকে না বললেই চলে। আর রাতের বেলায় লোকজনের আনাগোনা ও গাড়ির সংখ্যাও কমে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ পর পর আসা গাড়িগুলো দ্রুতগতি সম্পন্ন ছিল। রোজিনা যখন রাস্তা পার হচ্ছিল তখনও যানবাহনের সংখ্যা খুব কম। সেসময় বিআরটিসি বাসটির পেছনে রাস্তায় আরো কয়েকটি প্রাইভেট কার আসছিল। বাসটি যখন রোজিনাকে ধাক্কা দেয় পেছনের গাড়িগুলো থেমে যায়। সঙ্গে লোকজন ভিড় করে বিআরটিসির দ্বিতল বাসটি আটকে ফেলে এবং চালককে ধরে মারতে মারতে পুলিশে সোপর্দ করে।
এদিকে চেয়ারম্যানবাড়ি এলাকার ফুটওভার ব্রিজের নিচে একটি চায়ের দোকানে বসা কয়েকজন যুবক জানিয়েছেন, ঘটনার সময় তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। একটি মেয়েকে বিআরটিসির দ্বিতল বাস সজোরে ধাক্কা দিয়েছে। এ সময় তারাই বাসটিকে আটক করে এবং যাত্রীদের নামিয়ে বাসের চালককে ধরে ফেলেন। পরে ঘাতক চালককে পুলিশের হাতে তুলে দেন। এদের মধ্যে নাসির নামের এক যুবক জানান, আমি তখন হোটেলে শাহজালাল হোটেলের সামনে দাঁড়ানো ছিলাম। দেখলাম হঠাৎ করে একটি মেয়ে বাসের ধাক্কা খেয়ে রাস্তায় পড়ে যায়। মেয়েটির চিৎকার শুনে চারদিক থেকে লোকজন ছুটে আসে। পরে হোটেলের কয়েকজন কর্মচারী আর রাস্তায় থাকা অন্য পথচারীরা মেয়েটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগের সিডি ওয়ার্ডের জি-৮০ নাম্বার কক্ষে চিকিৎসাধীন রোজিনার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ঘোষগাঁও গ্রামে। তার বাবার নাম রসুল মিয়া, মা রাবেয়া বেগম। রোজিনার বাবা মো. রসুল মিয়া বলেন, রোজিনা নিকেতনের ১২ নম্বর সড়কে সাংবাদিক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে গত ৫ থেকে ৬ বছর ধরে কাজ করছে। ৬ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে রোজিনা দ্বিতীয়। নিজের সামান্য কৃষিজমি থাকলেও বর্গা জমি চাষাবাদ করে ৮ সদস্যের সংসার চালাতে হয়। এছাড়া রোজিনার গৃহকর্তা তাকে প্রতিমাসে যে ৬ হাজার টাকা পাঠাতেন সেটা দিয়ে সংসার খরচ চলতো। ঘটনার পরপরই রাত ৯টায় রোজিনার গৃহকর্তা তাকে ফোন দিয়ে মেয়ের দুর্ঘটনার কথা জানান। হাসপাতালের বেডে মৃদুকণ্ঠে রোজিনা জানান, ছুটির দিন তিনি তার বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করতে মহাখালীর আমতলীতে গিয়েছিলেন। ফেরার সময় চেয়ারম্যানবাড়ীর কাছে দাঁড়িয়েছিলেন। আরো ৭-৮ জন পথচারীর সঙ্গে রাস্তা পার হতে গিয়ে রোজিনা একটু সামনে এগিয়ে যান। এসময় বিআরটিসির একটি বাস দেখে সে বাসটিকে থামানোর জন্য একাধিকবার সিগন্যাল দেন। হাসপাতালের কনসালটেন্ট ডা. মো. মিরাজউদ্দিন মোল্লা বলেন, যখন রোজিনাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় তখন তার পা প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল। শুক্রবার রাতেই তার পায়ের একটি জরুরি অপারেশন করা হয়েছে। শনিবার আর একটি অপারেশন করা হয়। এবং পর্যায়ক্রমে তাকে আরো ৩-৪টি অপারেশন করা হবে। এই ধরনের দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে রোগীর মাথা এবং পেটে আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এর থেকে কিডনিতেও প্রভাব পড়তে পারে। ইতিমধ্যে তার বেশকিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেয়া হয়েছে। রোজিনা মানসিকভাবে আতঙ্কের মধ্যে আছেন। তার অবস্থা স্থিতিশীল নয়। ৭২ ঘণ্টা না গেলে তার সার্বিক পরিস্থিতি বলা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে বনানী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় বিআরটিসির বাসটি জব্দ এবং চালক শফিকুল ইসলাম (৩২)কে আটক করা হয়েছে।
এদিকে আহত রোজিনার চিবিৎসা খরচ বহন করার কথা জানিয়েছে বিআরটিসি। গতকাল বিআরটিসির কর্মকর্তারা রোজিনাকে দেখতে হাসপাতালে যান।