Tuesday, March 24, 2015

সুস্থ রাজনীতিতে অপশাসনের স্থান নেই by রফিকুল ইসলাম মিয়া

পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী পেট্রলবোমা হামলা ও আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন ৫৬ জন। বন্দুকযুদ্ধে ৩৩, গুলিবিদ্ধ লাশ ৭, গণপিটুনিতে মৃত্যুর সংখ্যা ৩। মানুষ মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি আশরাফুল মাখলুকাত। জীবন্ত, নিরীহ ও অসহায় আদম সন্তানকে মেরে হত্যা করার হৃদয়বিদারক দৃশ্য অসহনীয়। সভ্যতা, গণতন্ত্র, মানবতা সবই যেন নীরব ও নিথর হয়ে যায় এ অমানবিক বীভৎস রূপ দেখে। যে কোনো মূল্যে তার অবসান ঘটাতে হবে অনতিবিলম্বে। মহান আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে বলেছেন- একজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা সমগ্র মানব জাতিকে হত্যা করা। আরও বলেছেন, সৎ কর্মে আদেশ প্রদান করবে, অসৎ কর্মে নিষেধ করবে এবং বিপদে ধৈর্য ধারণ করবে। সূরা লোকমান এর ১৭ আয়াতে বলা হয়েছে- হে প্রিয় বৎস যদি কোনো বস্তু সরিষার বীজ পরিমাণও হয় আর তা পাথরের অভ্যন্তরে কিংবা আকাশে বা পাতালের অভ্যন্তরে থাকে তাও এনে আল্লাহ উপস্থিত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ বড়ই সূক্ষ্মদর্শী, প্রজ্ঞাময়। মানুষ হত্যাসহ সব অপরাধের বিচার করবেন কেয়ামতের দিনে। সেই বিচারে দুনিয়ায় সাক্ষ্য আইন কার্যকর নয়। মানুষের হাত, পা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আল্লাহ কথা বলার অধিকার দেবেন এবং সেই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সাক্ষী প্রদান করবে। সুতরাং কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা, বানোয়াট সাক্ষী দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
আমাদের আইনে প্রত্যক্ষ সাক্ষীই সর্ব উৎকৃষ্ট সাক্ষী। প্রত্যক্ষ সাক্ষী না পাওয়া গেলে অন্যের কাছে ঘটনার বিবরণ শোনার সাক্ষী বা পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে প্রকৃত ঘটনার উৎপাটন করার বিধান রয়েছে। পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, বোমা তৈরির বিস্ফোরক আমদানিতে সব দলের লোকই জড়িত। কোন দলের তার সংখ্যাও উল্লেখ করা হয়েছে রিপোর্টে। প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে না পারলে ভয়ঙ্কর এ হত্যাকাণ্ড থেকে জাতিকে রক্ষা করা যাবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। হত্যাকারী বা অপরাধকারীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে না। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য হত্যাকারীদের কেউই ব্যবহার করতে পারে না। এ জাতীয় রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে যাতে কোনো অবস্থাতেই অপরাধচক্র ব্যবহৃত হতে না পারে সে ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সবচেয়ে সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে।
সুশাসনের অভাবে অপরাধচক্রই দানা বাঁধে এবং ক্রমান্বয়ে শক্তি সংগ্রহ করে দানবে পরিণত হয়। আমরা যে যাই বলি না কেন মানুষের বিবেক কখনো মিথ্যা ও অন্যায়ের আশ্রয় দেয় না। সে জন্যই মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি। মিথ্যাচার, অন্যায়, পাপে লিপ্ত হলে আমাদের বিবেকের আয়নায় কালো পর্দা পড়ে। অন্যায় সীমারেখা ছাড়িয়ে গেলে বিবেকের স্বচ্ছ আয়নায় কালো দাগ ঘনীভূত হয়। বিবেকের পবিত্র নূর আচ্ছাদিত করে ফেলে। তখন ন্যায়-অন্যায় ভুলে গিয়ে লোভ-লালসার বশীভূত হয়ে পাশবিক কাজে মানুষ নিয়োজিত হয়। আল্লাহর ওপর গভীর বিশ্বাস, আস্থা ও আল্লাহর নির্দেশ মান্য করলেই বিবেকের পবিত্র নূর সব সময় উজ্জীবিত থাকে এবং সব ধরনের মিথ্যাচার লোভ-লালসা ও অন্যায় থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব হয়। মানুষকে ফাঁকি দেওয়া যায়, মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করা যায়, মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে তা হয়তো প্রমাণ করা যায়, দুনিয়ার আদালতে বিচারে দণ্ডও দেওয়া যায়; কিন্তু আল্লাহ প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব জানেন। আল্লাহর রসুল যখন মদিনায় হিজরত করাকালীন শত্রুদের হাত থেকে বাঁচার জন্য গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন তখন একমাত্র সাথী হজরত আবু বকর (রা.) বলেছিলেন আমরা এই গুহায় দুজন নই, তিনজন। আল্লাহ সব সময় আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহতায়ালা সব সৃষ্টি বস্তুকে বেষ্টন করে আছেন। সৃষ্টির কোনো কিছুই তার সীমারেখার বাইরে নয়। আমরা কে কি করছি ভালো-মন্দ সবই আল্লাহ জানেন এবং দেখেন।
নিরাশার মধ্যে আমি আশায় বুক বেঁধে আছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস বর্তমান মহাসংকটের হাত থেকে এ জাতি শিগগিরই মুক্তি পাবে। বোমা মেরে হত্যা, গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যার অবসান ঘটবে। সভ্যতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বিজয় হবে। আকাশের কালো মেঘের অবসান ঘটবে। অমাবস্যার তিরোধানের পর পূর্ণচন্দ্র উদ্ভাসিত হবে। আমার আশার কারণ এ দেশের সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষ শান্তি চায়, খেয়েপরে বাঁচতে চায়। তারা পরিশ্রমী, উদ্যোগী, উদার ও গণতন্ত্রকামী। উগ্রবাদী মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। এদেশের মানুষ চরমপন্থি ও উগ্রবাদকে পছন্দ করে না। তারা ধর্মপরায়ণ। কিন্তু ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি পছন্দ করে না। হজরত শাহজালাল, শাহ পরানের দেশের মানুষ উদার। হিন্দু-মুসলমান, খ্রিস্টান সব ধর্মের মানুষ শত শত বছর ধরে একসঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করছে। ইসলামে উগ্রবাদের কোনো স্থান নেই। আল্লাহর নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। পবিত্র কোরআনে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করা হয়েছে।
এ দেশের মূল ধারার রাজনীতিতে জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদের কোনো স্থান নেই। মুসলিমপ্রধান দেশ হয়েই বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি উদার সহনশীল রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা সবাই একই ভাষায় কথা বলি। দলমত নির্বিশেষে সবাই মহান ভাষা আন্দোলন ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপন করি। আমাদের দেশে অল্প সংখ্যক উপজাতিও রয়েছে- তারাও বাংলা ভাষার চর্চা করে। আমাদের ভাষা যেমন এক, তেমনি সংস্কৃতিও এক। এ রকম ভাষা সংস্কৃতির অধিকারী রাষ্ট্র পৃথিবীতে খুব বেশি নেই। আমাদের দেশের বর্তমান প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা একজন উপজাতি। দল-মত নির্বিশেষে সবাই প্রধান বিচারপতিকে সংবর্ধনা প্রদান করেছেন।
জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদী চরমপন্থিদের উত্থান ঠেকাতে হলে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। উগ্রবাদীরা যাতে সমাজে কোনো স্থান না পায় সে জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। একতাবদ্ধভাবে উগ্রবাদকে রুখে দাঁড়াতে হবে। শুধু বক্তব্য প্রদান করেই বিষবৃক্ষের অস্তিত্ব সমূলে বিনষ্ট করা যাবে না। সেই বিষবৃক্ষকে অঙ্কুরেই উৎখাত করতে হবে। ইনসাফভিত্তিক সমাজব্যবস্থা, শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা, দুর্নীতি অপশাসন শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা এবং সব শ্রেণির মানুষের ন্যূনতম বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করা, চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা, অর্থনৈতিক লুণ্ঠনের অবসান এবং সর্বোপরি গণতন্ত্র ও আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠা চরমপন্থিদের অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার মূল হাতিয়ার। রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার অবসান ঘটিয়ে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব বিনাশ করতে হবে অঙ্কুরেই। দেশপ্রেম ও সব মানুষের প্রতি ভালোবাসা রাজনীতির পাথেয় হওয়া উচিত। বঞ্চিত অসহায় হতদরিদ্র, দুর্বল শ্রেণির মানুষেরও বেঁচে থাকার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তা মনেপ্রাণে গ্রহণ করা ব্যতীত সত্যিকারের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। যেনতেনভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার এবং যেভাবে হোক ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ গণতন্ত্রে নেই। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া এবং জনগণের ম্যান্ডেটেই ক্ষমতায় টিকে থাকা গণতন্ত্রের মূল শর্ত। এ সত্যকে পাশ কাটিয়ে গণতান্ত্রিক সমাজ কায়েম করা সম্ভব নয়। জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার স্বীকার না করে এবং এসব অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বাস্তবমুখী কোনো কর্মসূচি গ্রহণ না করে শুধু কথায় কথায় গণতন্ত্রের কথা বলা হলে গণতন্ত্র বিকশিত হয় না। সুস্থ রাজনীতিতে হত্যা, গুম, খুন, মিথ্যা মামলা, হামলা, দুর্নীতি, অপশাসনের কোনো স্থান নেই।
বর্তমানে দেশে কোনো রাজনীতির সমস্যা নেই, আছে শুধু আইনশৃঙ্খলা সমস্যা। এ কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করলে বিরাজমান পরিস্থিতির কোনো যৌক্তিক সমাধান সম্ভব নয়। টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ব্যবস্থার কথা ভাবতে হবে। কঠিন বাস্তবতাকে সবার উপলব্ধি করতে হবে। সমস্যার গভীরে যেতে হবে। উপলব্ধি করতে হবে কেউ কাউকে উৎখাত করা সম্ভব নয়। সত্যিকারের অপরাধীদের বিচার করতে হবে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার অবসান ঘটাতে হবে। প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের যেমন আইন মোতাবেক বিচার করতে হবে, তেমনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার অভিযুক্তদের রিমান্ডে এনে অহেতুক হয়রানিরও অবসান ঘটাতে হবে। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী সবাইকে ভোগের পরিবর্তে ত্যাগের বিষয়টি স্মরণ রাখতে হবে। ভোগই সব সর্বনাশের মূল। ভোগের স্থলে ত্যাগই হোক আজকের দাবি।
আমাদের স্মরণ রাখতে হবে কোনো মানুষের হক নষ্ট করলে আল্লাহ তা কখনো ক্ষমা করবেন না। আল্লাহকে সাক্ষী রেখে মানুষের হক বিনষ্ট করা থেকে আমাদের নিবৃত হতে হবে। তবেই আমরা বর্তমান সংকট থেকে মুক্তি পাব এবং পরকালে আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন। আমিন।
লেখক : রাজনীতিক।

দুই সন্তানসহ আইএসে বৃটিশ বাংলাদেশী তরুণী

আইএস-এ যোগ দিতে এবার দুই শিশু সন্তানসহ ঘর ছাড়লেন বৃটিশ বাংলাদেশী রেহেনা বেগম। গত ১৪ই ফেব্রুয়ারি তিনি হিথরো বিমানবন্দর দিয়ে ইস্তাম্বুল যান। সেখান থেকে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে তুরস্কের গাজিয়ানটেপ শহর হয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে সিরিয়া পৌঁছেন। সম্প্রতি পূর্ব লন্ডনের বেথনালগ্রীন একাডেমির তিন শিক্ষার্থীকে সিরিয়া গমনে সহায়তাকারী মোহাম্মদ আল রাশেদকে গ্রেপ্তার করা হলে তার ল্যাপটপের থাকা তথ্য অনুযায়ী রেহেনার সিরিয়া গমনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। বৃটেনের রয়েল ব্যাংক অব স্কটল্যান্ডের কর্মকর্তা  ৩৩ বয়সী রেহেনা বেগমের স্বামী আজিজুল ইসলাম একজন ক্যাব ড্রাইভার। তিনি তার ৮ বছর বয়সী ছেলে ও ৩ বছর বয়সী মেয়ের জন্য খুবই উদ্বিগ্ন। তিনি  তার স্ত্রীকে ফেরত আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দীর্ঘ ১৪ বছরের সংসার ফেলে, দুটি শিশু সন্তানের ভবিষ্যত নষ্ট করে সে কেন এমন কাজ করলো তা ভাবতে পারছি না।  রেহেনার স্বামী জানান, সে একজন স্বাভাবিক বৃটিশ-বাংলাদেশী, এমনকি কখনও হিজাবও পরতো না। হঠাৎ করে গত কয়েক বছর ধরে সে পরিবর্তিত হতে থাকে। তার এ পরিবর্তন আমার খুব ভালো লেগেছিলো, কিন্তু এমনটি হবে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।
গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি পূর্ব লন্ডনের বেথনালগ্রীন একাডেমির তিন শিক্ষার্থী শামীমা আক্তার (১৫), খাদিজা সুলতানা (১৬), আমিরা আবাসি (১৫) পরিবারের অজান্তে জঙ্গি সংগঠন আইএস-এ যোগ দিতে যুক্তরাজ্যের গেটউইক বিমানবন্দর দিয়ে তুরস্কে যায়। তুরস্কে তাদেরকে সিরিয়া গমনে  সহায়তাকারী মোহাম্মদ আল রাশেদকে গ্রেপ্তার করা হলে রেহেনার সিরিয়া যাবার বিষয়টি বের হয়ে আসে।
এর আগে গত ২১শে মার্চ বৃটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান জানিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে হাসপাতালে সেবা দিতে ৯ বৃটিশ মেডিকেল ছাত্রী সিরিয়া গেছেন। এ দলে রয়েছে চারজন ছাত্রী এবং পাঁচ ছাত্র। তারা  গত ১২ই মার্চ এসব ছাত্রছাত্রী সুদানের রাজধানী খার্তুম থেকে বিমানে করে তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে  পৌঁছায়। সেখানে থকে একদিন পর বাসে করে সিরিয়া যান তারা।  পত্রিকাটি এসব ছাত্র-ছাত্রীর নাম ও পরিচয় প্রকাশ করেছে। তারা হলেন- মামুন আব্দুল কাদির, নাদা সামি কাদের, রওয়ান কামাল জয়নুল আবেদিন, তাসনিম সুলায়মান হোসেইন, ইসমাইল হামাদুন, তামের আহমেদ আবু  সেবাহ, মোহাম্মাদ উসামা বাদরি মোহাম্মাদ, হিশাম মোহাম্মাদ ফাদাল্লাহ ও সামি আহমেদ কাদির। তাদের সবার বয়স ২০ বছর অথবা তার চেয়ে কম। তারা সবাই এখন সিরিয়ার তেল আবিয়াদ এলাকায় অবস্থান করছেন। ওই এলাকাটি আইএসআইএলর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এসব ছাত্র-ছাত্রী সবাই বৃটেনে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং সেখানেই বড় হয়েছেন। পরে লেখাপড়ার জন্য সুদানে অবস্থান করছিলেন।

সালমান রুশদির প্রশংসা করায় লেখিকার ওপর হামলা

দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক লেখিকা জয়নাব প্রিয়া দালা বিতর্কিত লেখক সালমান রুশদির লেখার প্রশংসা করেছিলেন। আর সেটাই তার জন্য কাল হয়েছে। সারা বিশ্বে মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়া রুশদির সুনাম করায় তার ওপর হামলা চালানো হয়েছে। গত সপ্তাহে ওই লেখিকার মুখম-লে ইট দিয়ে সজোরে আঘাত করা হয়। তাকে গালিগালাজও করা হয়। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা পিটিআই। গত সপ্তাহে দেশটির পূর্ব উপকূলীয় শহর ডারবানের একটি স্কুলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে রুশদির লেখার প্রশংসা করেছিলেন তিনি। গত শনিবার নিজের লেখা একটি উপন্যাস ‘হোয়াট অ্যাবাউট মিরা’র মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা ছিল দালার। ওই একই দিন ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকার দিবস। কিন্তু, সেই দিন আহত হওয়ার কারণে মোড়ক উন্মোচনের তারিখটি পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। ঘটনার বিবরণে বলা হচ্ছে, হোটেল থেকে বের হওয়ার পর দালাকে অনুসরণ করে অজ্ঞাত ৩ ব্যক্তি। হোটেল থেকে ওই লেখিকা তার গাড়ি নিয়ে বের হন। ওই ৩ ব্যক্তিও অপর একটি গাড়িতে তাকে অনুসরণ করে এবং রাস্তার পাশে গাড়ি থামাতে বাধ্য করে তাকে। দালা গাড়ি থামালে, তার গাড়ির কাছে আসে ২ ব্যক্তি। একজন তার গলায় ছুরি ধরে এবং আরেকজন তাকে গালিগালাজ করতে থাকে এবং ইট দিয়ে সজোরে মুখে আঘাত করে। এদিকে এ হামলাকে ‘মর্মান্তিক ও অবমাননাকর’ বলে মন্তব্য করেছেন সালমান রুশদি। একটি টুইট-বার্তায় রুশদি লিখেছেন, এ ঘটনা শুনে আমি ব্যথিত। আশা করি আপনি ভালোভাবে সুস্থ হয়ে উঠছেন। অনেক শুভকামনা রইলো। জবাবে দালা বলেছেন, আপনাকে ধন্যবাদ। আমার পাশে আমার পরিবার ও সন্তানরা রয়েছে এবং আমি সুস্থ হয়ে উঠছি। হামলার ঘটনায় স্থানীয় থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন দালা। এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।

নাটকীয় সিদ্ধান্ত শিগগিরই by কাফি কামাল

অতীতের সিটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা...
সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলের নাটকীয় সিদ্ধান্ত শিগগিরই। চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে যাবার বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিলেও এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। দলের ও জোটের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে আলাপ করেছেন খালেদা জিয়া। এ ব্যাপারে আজকালের মধ্যেই নিজেদের অবস্থান জানাবে বিএনপি। তফসিল ঘোষণার পাঁচদিনেও বিএনপি তাদের অবস্থান ঘোষণা না করলেও ইতিবাচক মনোভাব নিয়েই সামনে এগোচ্ছে দলটি। তারই অংশ হিসেবে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টির দাবিতে কিছু বিষয়ে আলাপ করতে নির্বাচন কমিশনে যাবে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল। গতরাতে চেয়ারপারসনের সঙ্গে তার কার্যালয়ে অবস্থানরত দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান গণমাধ্যমকে জানান, আজকালের মধ্যেই নিজেদের অবস্থান জানাবে বিএনপি। এছাড়া চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান মানবজমিনকে জানান, বিএনপি সবসময় নির্বাচনের ব্যাপারে ইতিবাচক। এ নিয়ে নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে দু-একদিনের মধ্যেই নিজেদের অবস্থান জানাবে বিএনপি। সিটি নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করলে বা কাউকে সমর্থন দেয়া হলে পরিবেশ সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন পরামর্শ নিয়ে একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনেও যেতে পারে। তবে এখনও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। দলীয় সূত্র জানায়, সিটি নির্বাচনের তফসিল নিয়ে আপত্তি রয়েছে বিএনপির। তারা মনে করে, নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি না করে তড়িঘড়ি করেই তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। এখন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিলে তফসিল পেছানো, নির্বাচনকালীন সেনাবাহিনী মোতায়েন, বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও হয়রানী বন্ধ, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার, নির্বাচনী প্রচারের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি, দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সব কার্যালয় খুলে দেয়া এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিশ্চিত করাসহ কিছু বিষয়ে ইসির কাছে দাবি জানাবে। এদিকে অতীতে নির্বাচন বর্জন পরবর্তী অভিজ্ঞতা ও বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিটি নির্বাচনকে ইতিবাচকভাবেই দেখছে বিএনপি। ইতিমধ্যে দলের নেতাকর্মী ও পেশাজীবী মহলের কাছে মতামত নেয়া হয়েছে। তা বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিন সিটিতে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকাও প্রণয়নের কাজ চলছে। সূত্র জানায়, ঢাকা ও চট্টগ্রামে দলের নেতাদের নিয়ে একটি এবং কৌশলগতভাবে বিকল্প প্রার্থীদের নিয়ে আরেকটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সিটি নির্বাচনে অংশ নেয়া বিএনপির জন্য শেষ পর্যন্ত কতটা লাভজনক হবে, প্রার্থীরা অবাধে প্রচার-প্রচারণার কতটা সুযোগ পাবেন, সরকার ও প্রশাসনের তরফে কেমন আচরণ করা হতে পারে এবং চলমান আন্দোলনে এর কতটা প্রভাব পড়বে তা নিয়ে বিএনপিতে চলছে শেষ মুহুর্তের হিসাব-নিকাশ। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলাপে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে আশ্বস্ত হতে পারলে দলের প্রার্থী দেয়া হতে পারে। এছাড়া নির্বাচনের পাশাপাশি আন্দোলন অব্যাহত রাখা বা শেষ পর্যন্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটাতে না পারলে সে ক্ষেত্রে বিকল্প প্রার্থীদের সমর্থন দিতে পারে বিএনপি। দলীয় সূত্র জানায়, বিকল্প প্রার্থী সমর্থন দেয়া হলে ঢাকা উত্তরে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক কারাবন্দি মাহমুদুর রহমান মান্না, ঢাকা দক্ষিণে বিকল্প ধারার প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ছেলে মাহী বি চৌধুরী এবং চট্টগ্রামে মনজুর আলমকেই সমর্থন দেয়া হতে পারে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতৃত্বের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের উপর। বিএনপির কয়েকটি সূত্র জানায়, চলমান আন্দোলনের ট্র্যাক পরিবর্তনের একটি উপলক্ষ্য হিসেবেও বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে ভাবা হচ্ছে সিটি নির্বাচনকে। বিএনপির কয়েক নেতা জানান, নির্বাচনে গেলে বয়কটের পথ খোলা রাখবে বিএনপি। সরকারের আচরণ দেখে যদি মনে হয় তারা নির্বাচনে কারচুপি বা তাদের প্রার্থীকে জয়ী করতে যেকোনো পন্থা অবলম্বনে মরিয়া সেক্ষেত্রে বিএনপি তাৎক্ষণিকভাবে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেবে। ওদিকে সমমনা ও শুভাকাঙ্ক্ষী বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে নির্বাচন পরিচালনায় একটি মঞ্চ তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বিশিষ্ট নাগরিক ও পেশাজীবীদের এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। আজ-কালের মধ্যেই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।

বিমানটির ধ্বংসাবশেষের সন্ধান লাভ, নিহত ১৪৮

জার্মান উইংস নামের উড়োজাহাজটির মডেল নম্বর এ৩২০
লুফথানসা এয়ারলাইন্সের জার্মান কেরিয়ার জার্মানউয়িংসের এয়ারবাস এ৩২০ ফ্লাইট 4U 9525 বিমানটির ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাওয়া গেছে। ফ্রান্সের আল্পস পর্বতমালার ২ হাজার মিটার উচ্চতায় বিমানটির ধ্বংসাবশেষের খোঁজ মিলেছে বলে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। বিমানটির ৬ জন ক্রুসহ ১৪৮ যাত্রীর কারো বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই বলে ফরাসি প্রধানমন্ত্রী ফ্রঁসোয়া ওলাঁদ জানিয়েছেন। যাত্রীদের বেশিরভাগই জার্মান নাগরিক বলেও ওলাঁদ জানিয়েছেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ম্যানুয়েল ভালও যাত্রীদের কেউ জীবিত নেই বলে তার আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন। স্পেনের বার্সেলোনা এয়ারপোর্ট থেকে জিএমটি ৮টা ৫৫ মিনিটে বিমানটি উড্ডয়ন করে বলে স্পেনিশ এয়ারপোর্ট অপারেটর আয়েনার একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন।  তবে  এ বিষয়ে বিস্তারিত বা বিমানটির যাত্রীদের বিষয়ে আরো জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।  খবর বিবিসি ও দ্য হিন্দুর
১৪৮ জন যাত্রী নিয়ে উড্ডয়নের প্রায় ২ ঘন্টা পর এয়ারবাস এ-৩২০ বিমানটি বিপর্যয় সংকেত [ডিস্ট্রেস সিগনাল] পাঠায়। তখন বিমানটি বারসেলনেত ও ডিগনে নামে দুটি এলাকার মধ্যবর্তী আল্পস পর্বতমালার কোনো এক এক  দুর্গম এলাকার উপরে ছিল এবং সেখানেই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। বিমানটি ৩৮ হাজার ফুট উপর দিয়ে উড়ছিল। তবে নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় বিমানটি ৬,৮০০ ফুট নিচে নেমে আসে। আর তখনই বিধ্বস্ত হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিমানটি স্পেনের বার্সেলোনা এয়ারপোর্ট থেকে জার্মানির ডুসেলডর্ফ শহরে যাচ্ছিল।
এদিকে, ফ্রান্সের বিইএ দুর্ঘটনা তদন্তকারী সংস্থা দুর্ঘটনার কথা নিশ্চিত করেছে। সেই সঙ্গে সংস্থাটির একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, বিমানটির দুর্ঘটনাস্থল তদন্তে তারা একটি বিশেষজ্ঞ দল পাঠাচ্ছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রঁসোয়া ওলাঁদ বলেন, দুর্ঘটনার অবস্থা দেখে অামাদের ধারণা যে বিমানটির যাত্রীদের কেউ হয়তো বেঁচে নেই।' তিনি আরো বলেন, 'দুঘর্টনাটি এমন একটি অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছে যেখানে যাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য।'
জার্মানউয়িংস ও লুফথানসার পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে বিমানটির নিহত যাত্রীদের পরিবারের সদস্যের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা হয়েছে। তবে কি কারণে বিমানটি দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে তা জানা যায়নি। খবর দ্য হিন্দু, বিবিসি ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার
উল্লেখ্য, চলতি বছর এটাই সবচেয়ে বড় বিমান দুর্ঘটনা। গত বছর মোট তিনটি বড় ধরনের বিমান দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। এর মধ্যে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট এমএইচ ৩৭০ ও ফ্লাইট এমএইচ১৭  যথাক্রমে ৮ মার্চ ও ১৭ এপ্রিল দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। আর এয়ারএশিয়ার ফ্লাইট কিউ জেড ৮৫০১ বিমানটি  ২৮ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার জাভা সাগরে বিধ্বস্ত হয়।  এর মধ্যে ফ্লাইট এমএইচ ৩৭০ বিমানটির এখনো কোনো হদিস মিলেনি। বিমানটিতে মোট ২৩৯ জন যাত্রী ছিল।  ফ্লাইট এমএইচ ১৭ বিমানটির ২৯৬ জন যাত্রীর সবার মৃত্যু হয়।  এয়ারএশিয়ার বিমানটিরও সব যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে।

‘শিগগিরই আন্দোলনের নতুন রূপরেখা’

শিগগিরই চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের নতুন রূপরেখা প্রণয়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন ২০ দলের মুখপাত্র ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব বরকতউল্লাহ বুলু। একইসঙ্গে বিজয় অর্জন না হওয়া পর্যন্ত চলমান আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বরকতউল্লাহ বুলু বলেন,  আইনি শাসনের অবসান, নিয়ন্ত্রিত বিচার ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক  দেশব্যাপী তা-ব ও রাষ্ট্রের সকল অঙ্গকে কুটকৌশলে আয়ত্তে নিয়ে অবৈধ ক্ষমতা চিরস্থায়ীকরণের উন্মাদনায় লিপ্ত হয়েছে আওয়ামী লীগ। জাতীয় জীবন অবরুদ্ধ, বাকশালী বন্দিশালায় গণতন্ত্র নামক শব্দটি ক্ষতবিক্ষত। শাসকগোষ্ঠীর অন্ধপ্রতিহিংসা ও ক্ষমতার মোহে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব বিপন্নপ্রায়। তিনি বলেন, দেশ থেকে সামাজিক ন্যায় বিচার তিরোধানের ফলেই মুক্তিযুদ্ধের সকল অর্জন আজ ধূলিস্যাত হয়ে গেছে। শাসকগোষ্ঠী ক্রসফায়ারের মাধ্যমে দেশব্যাপী ধারাবাহিক গণহত্যা, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে অপহরণের পর অস্বীকার, গুম, গণগ্রেপ্তার, মামলা-হামলা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন এখন বাংলাদেশে যেন রেওয়াজে পরিণত করেছে। বিএনপির এই যুগ্ম মহাসচিব বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সকল দরজা বন্ধ করে দিয়ে বর্তমান সংবিধানকে মানবিক ও নাগরিক অধিকার হরণের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগকে পরিণত করা হয়েছে সরকারের অবৈধ আদেশ পালনের প্রতিষ্ঠান রূপে। প্রশাসনে নিরপেক্ষ লোকদের বসানো হচ্ছে ‘ওএসডি’ নামক অপমানজনক ও কর্মহীন পদে। ফলে রাষ্ট্র ক্রমান্বয়ে পরিণত হচ্ছে অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ ও লুটেরাদের অভয়ারণ্যে। আন্দোলনের নতুন রূপরেখার ইঙ্গিত দিয়ে বরকতউল্লাহ বুলু বলেন, প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষমূলক অপরাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে গণদাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার জন্য দেশের আপামর জনসাধারণকে সঙ্গে নিয়ে ২০ দলীয় জোট আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে। বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন সংগ্রাম চলবে। অচিরেই দেশবাসীর আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে এবং সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করতে আন্দোলনের নতুন রুপরেখা ও কৌশল প্রত্যক্ষ করবে শাসকগোষ্ঠী। তিনি বলেন, দেশের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ নির্দলীয় সরকারের অধীনে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ জাতীয় নির্বাচন চায়। সমগ্র জাতি আজ সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রামে লিপ্ত। জনগণ ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনের বিজয় পতাকা উড়াবেই ইনশাআল্লাহ। সালাহউদ্দিন আহমেদকে সন্ধান দেয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদকে গুমের পক্ষকাল অতিক্রান্ত হতে যাচ্ছে। অথচ  এ বিষয়ে সরকারের কোন মাথাব্যথা নেই। সারা দেশ থেকে এভাবে বিরোধী দলীয় শ’ শ’ নেতাকর্মীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন ধরে নিয়ে গিয়ে গায়েব করার ঘটনায় গোটা জাতিকে ভাবিয়ে তুলেছে। অবিলম্বে সালাহউদ্দিন আহমেদের নিখোঁজ নাটকের অবসান ঘটানোর জন্য সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

‘দুই-একদিনের মধ্যে নির্বাচনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত’

স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দীর্ঘ প্রায় তিন মাস পর প্রকাশ্যে আলোচনা সভায় বক্তব্য রেখেছেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হলে ঘোষিত তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি যাবে বলে মন্তব্য করেছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান। এ বিষয়ে দুই-একদিনের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে বলে জানান তিনি। আজ বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বিএনপি আয়োজিত আলোচনা সভার তিনি এসব কথা জানান। মাহবুবুর রহমান বলেন,  সিটি নির্বাচনে প্রার্থী নিয়ে বিএনপির কোন সমস্যা নেই। তবে নির্বাচনে অংশ নিতে আমাদের শর্ত থাকবে। প্রার্থীদের নির্বিঘেœ কাজ করার সুযোগ করে দিতে হবে। যাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে তাদের বিষয়টিও সরকারকে বিবেচনা করতে হবে। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিএনপি অবশ্যই নির্বাচনে যাবে এবং বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে। বিএনপি সরাসরি প্রার্থী দেবে নাকি অন্য কাউকে সমর্থন করবেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির এই সিনিয়র নেতা বলেন,  সুশীল সমাজের সদস্যদের মধ্যে আমাদের লোক আছে। তাদেরকেও সমর্থন দিতে পারি। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের সভাপতিত্বে  আলোচনা সভায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মে. জে. (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শওকত মাহমুদ, আবদুল হালিম, ব্যারিস্টার হায়দার আলী, বিএফইউজের সাবেক সভাপতি রুহুল আমিন গাজী প্রমুখ বক্তব্য দেন। এছাড়া দর্শক সারিতে বসে ছিলেন বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা মেজর (অব. ) আখতারুজ্জামান, নির্বাহী কমিটির সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, শ্রমিক দলের সভাপতি মো. আনোয়ার হোসেন, মহিলা দলের সভানেত্রী নূরে আরা সাফা, জাসাসের সভাপতি এমএ মালেক, সাবেক এমপি বিলকিস ইসলাম,  মহিলা দলের ঢাকা মহানগরের সভানেত্রী সুলতানা আহম্মেদ, সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমীনসহ দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কয়েক শতাধিক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করছেন দলের সহ-দপ্তর সম্পাদক আসাদুল করিম শাহীন। পরে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) শিল্পীরা গান পরিবেশন করেন।

‘সুষ্টু নির্বাচন হলে জয়ের ব্যাপারে সন্দেহ নেই’

সুষ্টু নির্বাচন হলে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই বলে জানিয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। তিনি বলেছেন, সরকার এই সময়ে নির্বাচন সামনে এনেছে আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য। এছাড়া তারা যে আন্দোলনের প্রচন্ড চাপে পরেছে তা কাটানোর জন্য এই নির্বাচনের আয়োজন। তবে সুষ্টু নির্বাচন হলে এতে যে আমরা জিততে পারবো তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। গতকাল নিউইয়র্কে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ এর নিখোঁজের ঘটনায় এ সংবাদ সম্মেলন করেন খোকা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি যেহেতু ১০ বছর ধরে অভিভক্ত সিটির মেয়র ছিলাম এখন বিভক্ত সিটিতে নির্বাচনে যাওয়াটা সমীচীন মনে করি না। এছাড়া স্বাস্থ্যগত দিক দিয়ে আমার নির্বাচন করার মতো অবস্থা নেই। বিএনপি এমন একটি দল যে কোন সিটি করপোরেশন এ প্রার্থী দেয়ার মতো অন্তত ১০ জন লোক পাওয়া যাবে। সুতরাং আমাকেই থাকতে হবে এমন কোন কথা নেই। লিখিত বক্তব্যে সাদেক হোসেন খোকা বলেন, চিকিৎসার জন্য এই দেশে আসার পর প্রথম কয়েক মাস আমি সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকান্ড থেকে নিজেকে দুরে সরিয়ে রেখেছিলাম  কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে আমরা দেখতে পেলাম যে, দেশের বর্তমান অনির্বাচিত-অবৈধ সরকার আন্দোলন-লড়াইরত  ন্যায্য দাবি মেনে দ্রুত একটি সত্যিকার নির্বাচন দেয়ার পরিবর্তে উল্টো দেশবাসীর ওপর একনায়কতান্ত্রিক জুলুম-নিপীড়ন তথা ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাত্রা দিন দিন বাড়িয়েই চলেছে। একদিকে সরকারের নিয়োজিত সন্ত্রাসী ও গোয়েন্দা এজেন্টদের দিয়ে যাত্রীবাহী যানবাহনে পেট্রোল বোমা মেরে দেশবাসীর ন্যায্য আন্দোলন-লড়াইকে  সন্ত্রাসী তৎপরতা  হিসাবে চিহ্নিত করার অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে জনগণের বিরুদ্ধেই এক অকল্পনীয় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালানোর কাজে লেলিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, দুরভিসন্ধিমূলকভাবে পেট্রলবোমা মেরে এবং কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে  নিরীহ জনসাধারণকে  হত্যার এক পৈশাচিক উন্মাদনায় মেতে উঠেছে সরকার। একই সঙ্গে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বৃহত্তম রাজনৈতিক বিএনপি এবং এর জোটভুক্ত অপর দলগুলোর কার্যালয় তালাবদ্ধ করে দিয়ে এসব দলের অধিকাংশ নেতাদেরকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, চেয়ারপার্সনের  উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু, যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ ও মো: শাহজাহান এবং যুবদল সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ প্রায় ২০ হাজার নেতা-কর্মীকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে দফায় দফায় রিমান্ডে নেয়ার মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কালো অধ্যায়কে ক্রমশ: বিস্তৃত করে চলেছে।  অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আমাদের দল বা জোটের পক্ষে কেউ কথা বললেই তাকে অমানবিক কায়দায় ধরে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমদ, যিনি একই সঙ্গে দলের মুখপাত্রও ছিলেন, গত ১০ই মার্চ রাতের বেলায় রাজধানীর উত্তরার মতো তুলনামূলক সুরক্ষিত আবাসিক এলাকা, যেখানে সার্বক্ষনিক পুলিশী টহলের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের সোসাইটি কতৃক নিয়োজিত প্রহরীরা  রাতভর প্রতিটি সড়কের মোড়ে  মোড়ে পাহারায় থাকে, সেই এলাকার একটি  বাসা থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর একদল সদস্য তাকে ধরে নিয়ে যায়, যা ওই বাড়ির নিরাপত্তা রক্ষী, অন্যান্য কর্মচারি এবং আশপাশের বাসিন্দারা সুস্পষ্টভাবেই দেখেছে।  তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার মুহুর্তে ওই বাড়ি  এবং আশপাশের এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক গাড়িও অবস্থান নেয়, যা গত কয়েক দিনে দেশের প্রধান প্রধান সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া সালাহউদ্দিনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ৩ দিন আগে তার তিনজন গাড়িচালক ও একজন কর্মচারীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, যাদেরকে সালাহউদ্দিনের অবস্থানের ব্যাপারে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবদের পর কারাগারে পাঠিয়ে  দেয়া হয়েছে। তাদের অপরাধ কি সে ব্যাপারে পুলিশ আজও কিছুই বলেনি। সালাহউদ্দিনকে তার যে বন্ধুর বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেই বন্ধু হাবিব হাসনাতের ড্রাইভার এবং কর্মচারীকেও পুলিশ ধরে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এসব ঘটনা সংবাদপত্রে বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে। সুতরাং সরকারী বাহিনীই যে সালাহউদ্দিনকে তুলে নিয়ে গেছে, এ নিয়ে সন্দেহ বা সংশয়ের নুন্যতম কোন অবকাশ নেই।

সালাহ উদ্দিনের নিখোঁজ হওয়া: কিছু সতর্কবাণী by আসিফ নজরুল

বিএনপির নেতা সালাহ উদ্দিন আহমদ নিখোঁজ হয়েছেন প্রায় দুই সপ্তাহ হলো। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার পেছনে সরকারের কোনো বাহিনীর লোকজন জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি এমনকি বেঁচে আছেন কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কারণ রয়েছে। চৌধুরী আলম ও ইলিয়াস আলীর মতো পরিণতি যদি সালাহ উদ্দিন আহমদেরও হয়ে থাকে, তাহলে এই ঘটনা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র আবারও জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। আতঙ্কজনক বিষয় হচ্ছে, নিখোঁজ বা গুমের এসব ঘটনা একের পর এক ঘটে চললেও সরকারকে এতে আদৌ বিচলিত মনে হচ্ছে না, এমনকি সরকারের কাউকে এর কোনো দায় নিতে হচ্ছে না। গুমের মতো রক্ত হিম করা অপরাধ যেন সমাজের অপরাধ সংস্কৃতিতে গ্রহণযোগ্য বিষয় হয়েও দাঁড়িয়েছে। মাহমুদুর রহমান মান্না ২১ ঘণ্টা এবং সালাহ উদ্দিনের অনেক দিন ধরে নিখোঁজ থাকার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশের দায়িত্বটুকু পালন করেনি দেশের বহু গণতান্ত্রিক দল ও মানবাধিকার সংগঠন। এখতিয়ারবহির্ভূত বিভিন্ন বিষয়ে বিবৃতি দানে সদা তৎপর মানবাধিকার কমিশনকেও বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা গুম হলে এ জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা যায়নি।
এই সুযোগে সালাহ উদ্দিনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা আড়াল করার জন্য নানা হাস্যকর এবং খেলো কথাবার্তা বলা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। সরকারের দাবিমতে, সালাহ উদ্দিন যদি অবিশ্বাস্যভাবে লুকিয়ে থাকেন বা তাঁকে যদি বিএনপিও গুম করে থাকে (!), তাঁকে খুঁজে বের করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব সরকারের। সালাহ উদ্দিনের স্ত্রী ও পরিবার তাঁর সন্ধানের আকুতি ব্যক্ত করেছেন, হাইকোর্ট তাঁকে খুঁজে বের করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তার পরও সরকার এই দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। সরকারের কর্মকাণ্ডে তাঁকে খুঁজে বের করার কোনো বিশ্বাসযোগ্য আগ্রহ বা তৎপরতাও লক্ষ করা যায়নি; বরং বিভিন্ন আলামত ও তথ্য অনুসারে সালাহ উদ্দিনকে সরকারের বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে বলে বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে।
প্রথমত, সালাহ উদ্দিন নিখোঁজ হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে পুলিশ তাঁর দুজন গাড়িচালক ও একজন কর্মচারীকে আটক করে। এই আটক যে সালাহ উদ্দিনের আত্মগোপনে থাকা বিভিন্ন আশ্রয়স্থলের খোঁজ বের করার জন্য, তা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আটক ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুসারে পুলিশ দু-এক জায়গায় অভিযান চালিয়েছিল, সে তথ্যও পরে জানা গেছে। এসব তথ্য প্রমাণ করে, সরকার খুব জোর দিয়ে সালাহ উদ্দিনের খোঁজ করছিল।
দ্বিতীয়ত, সালাহ উদ্দিন যে বাড়িতে ছিলেন, তার দারোয়ানের বক্তব্য অনুসারে, সরকারি বাহিনীর লোকজন সালাহ উদ্দিনকে হাতকড়া পরিয়ে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন অনুসারে এলাকার লোকজনও একই রকম ভাষ্য দিয়েছেন এবং তাঁদের কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি গাড়ি ঘটনাস্থলের কাছে ছিল বলেও জানিয়েছেন। তাদের উপস্থিতিতে সাদা মাইক্রোবাস নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে প্রকাশ্যে সালাহ উদ্দিনকে তুলে নেওয়া লোকজন সরকারের বাহিনীর লোক না হলে অন্য কে হবেন?
তৃতীয়ত, এই সরকারের ট্র্যাক রেকর্ডের কারণেও তার বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। অতীতে সরকারের বিরুদ্ধে নানা সময়ে গুমের অভিযোগ করেছে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলো। সরকার এসব অভিযোগের জবাব দিতে পারেনি, নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তির কোনো হদিস করতে পারেনি এবং সবচেয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ, একটি গুমের ঘটনায়ও সরকার কোনো বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করেনি। ফলে জনগণের একটি বিরাট অংশের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে উঠছে যে এই সরকার, বিশেষ করে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গুম করার ক্ষেত্রে একটি অভ্যস্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সালাহ উদ্দিন নিখোঁজ হওয়ার পর বিভিন্ন উপহাসমূলক মন্তব্য এবং ইলিয়াস আলীর ঘটনার মতো হাস্যকর উদ্ধার অভিযান এ ধারণাকে আরও জোরালো করতে পারে।
----২.
সালাহ উদ্দিন আহমদ কোনো সন্ত্রাসী ছিলেন না। আমার জানামতে, তিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা করেছেন সারা জীবন। বিএনপির সাম্প্রতিক আন্দোলনে নেতা-কর্মীদের নির্বিচার গ্রেপ্তারকালে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। রুহুল কবির রিজভীর গ্রেপ্তারের পর তিনি দলের পক্ষে হরতাল-অবরোধ পালনের ঘোষণাসহ বিভিন্ন বিবৃতি দিয়েছেন। এসব কর্মসূচি পালনকালে পেট্রলবোমা, ককটেল নিক্ষেপসহ নানা নাশকতাপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে, বহু নিরীহ মানুষ এতে প্রাণ দিয়েছেন। সরকারি বাহিনীগুলোও নাশকতা প্রতিরোধের নামে বিরোধী দলের বহু নেতা-কর্মীকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, আরও বহু মানুষ নানা নির্যাতন ও জেল–জুলুমের শিকার হয়েছেন।
এই সার্বিক ঘটনায় সালাহ উদ্দিনের ব্যক্তিগত দায় খুঁজে পাওয়া কঠিন। অতীতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ আরও বহু দলের ডাকা কর্মসূচি পালনকালে গানপাউডার, বোমা, এমনকি লগি-বইঠার আঘাতে রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষের হৃদয়বিদারক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এসব নাশকতার জন্য হরতাল-অবরোধ বা অন্য কোনো উত্তপ্ত কর্মসূচি আহ্বানকারী কোনো রাজনৈতিক নেতার কখনোই বিচার হয়নি। বর্তমান সরকার যদি মনে করে, তারা শুধু তাদের আমলের বিরোধী দলের নেতাদের নাশকতার জন্য বিচার করবে, তাহলে তা একচোখা নীতি হতে পারে, তবে বিশ্বাসযোগ্যভাবে এসব বিচার করার অধিকার সরকারের অবশ্যই রয়েছে।
সালাহ উদ্দিনকে তাই গ্রেপ্তার করে বিচারের সম্মুখীন করলে তা নিয়ে তেমন প্রশ্ন উঠত না। কিন্তু তাঁকে যদি বিনা বিচারে গুম করা হয়, তাহলে এই অধিকার কারও নেই। আর তাঁকে যদি সরকার গুম না করে থাকে, তবু তাঁকে জীবিত বা মৃত খুঁজে বের করার দায়িত্ব অবশ্যই সরকারের। কিন্তু অতীতের ঘটনাগুলোর মতো সালাহ উদ্দিনের ক্ষেত্রেও সরকারকে এ কাজে আন্তরিক মনে হচ্ছে না। যে অপরাধের জন্য অভিযোগের তর্জনী সরকারের দিকে, সেই ঘটনার তদন্ত না করে এটি নিয়ে নির্মম হাস্য-রসিকতা করলে অভিযোগের তর্জনী আরও জোরালো হয়ে ওঠারই কথা।
পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, সরকার এসব অভিযোগকে কোনো পাত্তাই দিতে চাইছে না। অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাউকে ধরে নিয়ে তা স্বীকার করলেই মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো একজন নেতৃস্থানীয় রাজনীতিককে সরকারি বাহিনীর পরিচয় দিয়ে মধ্যরাতে বাসা থেকে তুলে নিয়ে ২১ ঘণ্টা নিখোঁজ রাখা হয়। তাঁকে পুলিশে সোপর্দ করায় তাঁর সংগঠনের নেতারা এই বলে আনন্দ প্রকাশ করেছেন যে তাঁকে অন্তত গুম করে ফেলা হয়নি। আরও যা শোচনীয়, গুমের শিকার কিছু পরিবার এখন গুমের বিচার পর্যন্ত চাইছে না। গত বছর ৩০ আগস্ট মৌলিক অধিকার রক্ষা কমিটির অনুষ্ঠানটিতে দেখেছি, পরিবারের সদস্যরা শুধু জানতে চাইছেন, মেরে ফেলা হলে কোথায় পুঁতে রাখা হয়েছে তাঁদের বাবা বা সন্তানকে! পাশে দাঁড়িয়ে প্রাণভরে শুধু দোয়া পড়তে চান তাঁরা! শুধু এটুকুর জন্য হৃদয়ছোঁয়া আর্তি জানিয়েছিলেন তাঁরা দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে।
গুম তার পরও থেমে থাকেনি। আবু বকর সিদ্দিক বা মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো ভাগ্যবান কারও কারও ক্ষেত্রে দু-এক দিনের মধ্যে ফিরে আসার ঘটনা ঘটেছে। বোঝা গেছে, ফিরে যাঁরা আসবেন, তাঁরা আসলে দ্রুতই আসবেন। যত সময় যাবে, ততই তাঁরা আর কোনো দিন ফিরে আসবেন না—এই ভীতিকর আশঙ্কা আরও জোরদার হবে।
----৩.
আমি আগেও লিখেছি, গুম সবচেয়ে গুরুতর অপরাধগুলোর একটি। গুম যেকোনো ধরনের হত্যাকাণ্ড থেকেও ভয়াবহ এ কারণে যে এতে হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তির সৎকার করার ন্যূনতম মানবিক কর্তব্য পর্যন্ত পালন করা যায় না, গুমের শিকার ব্যক্তির পরিবার তার রেখে যাওয়া সহায়-সম্পত্তি পর্যন্ত ভোগ করতে গিয়ে নানা বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ে। গুম প্রতিরোধের জন্য ২০০৭ সালে সম্পাদিত আন্তর্জাতিক চুক্তিতে গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। বলা হয় যুদ্ধ, জরুরি অবস্থা, চরম রাজনৈতিক বিপর্যয়—কোনো অবস্থাতেই কাউকে গুম করার বৈধতা নেই। ২০১০ সালের ২৩ ডিসেম্বর কার্যকর হওয়ার পর এ পর্যন্ত ৪২টি রাষ্ট্র এর পক্ষ হয়েছে, ৯৩টি রাষ্ট্র এটি স্বাক্ষর করেছে। আমাদের দুর্ভাগ্য, এই আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুসমর্থন দূরের কথা, এটি স্বাক্ষরই করেনি বাংলাদেশ (দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত ও মালদ্বীপ এটি স্বাক্ষর করেছে)। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে এই সরকার আগের নির্বাচনের সময় নির্বাচনী ইশতেহারে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এবার ৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের আগে সেই প্রতিশ্রুতি পর্যন্ত দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেনি সরকার। এটি হয়তো তাই আশ্চর্যজনক নয় যে ৫ জানুয়ারি-পরবর্তী সরকারের আমলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বেড়েছে, বেড়েছে গুম আর অপহরণের ঘটনাও।
এসব ঘটনা প্রতিরোধে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো জোরালো বা অর্থবহ ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি। রাজনৈতিক সুবিধাবাদের ভাগীদার হয়ে বা নৈতিক মনোবল হারিয়ে নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশও গুম প্রতিরোধে বা গুম সংঘটনে সরকারের ভূমিকা নিয়ে সোচ্চার হয়নি। অথচ এটি হওয়া খুবই জরুরি ছিল, এখনো আছে।
এ দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাঁচাতে চাইলে রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজকে গুম, অপহরণ আর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে সোচ্চার হতে হবে। এই সরকারের আমলে নিরাপত্তার আশঙ্কা নেই বলে যাঁরা ভাবেন, তাঁদের মনে রাখতে হবে, এই ধারা বন্ধ না হলে ভবিষ্যতেও ঝুঁকিটা থাকবে। বাঁচতে চাইলে তাই গুম-উধাও আর বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা নেই এ দেশে। স্বাভাবিক সৎকারের নিশ্চয়তা আছে কি? এটিও হারিয়ে যাওয়ার আগে আমাদের সবার চৈতন্যোদয় হওয়া প্রয়োজন। কারণ, এরপর সর্বনাশের আর কিছু বাকি থাকে না।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বোকা হ্যাকার, কনফিডেন্ট শশী থারুর ও অভিমানী লোটাস কামাল by মিনার রশীদ

বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট ম্যাচে বিতর্কিত আম্পায়ারিং দেখে অস্ট্রেলিয়ার রিকি পন্টিংসহ ক্রিকেট জগতের আরো অনেকেই ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে তুমুল বিতর্ক ও সমালোচনার প্রবল ঝড় শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশের ক্রিকেট-ভক্তরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্রভাবে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করে চলেছেন।
আম্পায়ারিং ও আইসিসির বিরুদ্ধে সবাই সরব হয়েছেন।
এই ম্যাচটি নিয়ে ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী শশী থারুর একটি মন্তব্য করেছিলেন। তার সেই মন্তব্যটি নিয়ে একটু গবেষণা করলে আমাদের অনেক প্রশ্নের জবাব বেরিয়ে আসতে পারে। বাংলাদেশ ইংল্যান্ডকে হারানোর পর উচ্ছ্বসিত শশী থারুর টুইট করেন, ‘ধন্যবাদ বাংলাদেশ; ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ভারতের বিশ্বকাপ সেমি ফাইনালে ওঠার রাস্তা সহজ করে দিলে তোমরা।’ এই টুইটের পরই শশী থারুর ওয়েবসাইট হ্যাক করে প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশের হ্যাকার গ্রুপ ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার্স।
এটা বাংলাদেশের প্রতি এই কংগ্রেস নেতার সহজাত অবজ্ঞা নয়, এটা ছিল সব রহস্য জানানোর ছিদ্র (Tell tale hole)। জানি না এখান থেকে সতর্ক বার্তাটি গ্রহণ করার মতো প্রজ্ঞা আমাদের এখনো অবশিষ্ট আছে কি না।
শশী থারুর কোনো জ্যোতিষী নন। তিনি এক সময়কার ঝানু কূটনীতিবিদ, নির্মম রাজনীতিবিদ। আইপিএল ক্রিকেট বাণিজ্যে তিনি একজন বড় মাপের বণিক। স্ত্রী সুনন্দা পুস্করের রহস্যজনক মৃত্যুর পরও ভারতের আইন তাকে তেমনভাবে পাকড়াও করতে পারেনি। সেই শশী থারুরের কথাটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আমাদের দেশের বোকা হ্যাকাররা উপলব্ধি করতে পারেনি। আমরা দ্বিধান্বিত থাকলেও এই শশী থারুর নিশ্চিত ছিলেন যে আসলেই কী ঘটতে যাচ্ছে। বর্তমান মাত্রার প্রজ্ঞা ও শুকনো আবেগ নিয়ে এই শশী থারুরদের রাডারের বাইরে আমরা কখনোই যেতে পারব না। নান্দনিক কর্মকাণ্ড অথবা খেলাধুলা এবং রাজনীতির মধ্যকার সুড়ঙ্গটির ম্যাপ শশী থারুরদের কাছে স্পষ্ট থাকলেও আমরা বরাবরই থাকি বেখেয়াল। ফলে শশী থারুরদের ভবিষ্যৎবাণী সব সময় সঠিক হয়। শশী থারুরদের বানানো সিঙ্গাড়া খেতে খেতে অবাক বিস্ময়ে আমরা ভাবতে থাকি, সিঙ্গাড়ার ভেতরে আলুটি ঢুকল কিভাবে?
ক্রিকেট অনিশ্চয়তার খেলা। ভারতের টিম নিঃসন্দেহে টপ ফর্মে থাকলেও বাংলাদেশ টিম একেবারে ফেলনা ছিল না। তারপরেও যে তিনটি রক্ষাকবচ বা ভাবনা এখানে শশী থারুরকে এই কনফিডেন্স বা নিশ্চয়তাটুকু দিয়েছিল তা ছিল নিন্মরূপ:
১. আইসিসি এখন অনেকটা ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল হয়ে পড়লেও আম্পায়াররা কখনোই ইংল্যান্ড দলের ওপর এই ধরনের কাজটি করার দুঃসাহস দেখাতে পারত না। টুইটটি করার আগে এই কথাটি শশী থারুরের ভালো করেই জানা ছিল। রাজনৈতিকভাবে মাথা নিচু বা বেখেয়াল একটি জাতি খেলাধুলা বা অন্যান্য ক্ষেত্রেও কখনোই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। বাংলাদেশের বিভ্রান্ত পলিটিশিয়ান, ভয়বাদ বা সুবিধাবাদে আক্রান্ত প্রশাসনিক কর্মচারী বা কর্মকর্তা কিংবা শুধু আনন্দ আহরণে মশগুল ডিজুস প্রজন্মের পক্ষে এই কথাটি উপলব্ধি করা সম্ভব হবে না। গোলামকে নিয়ে মনিব সর্বোচ্চ ফুর্তি করতে পারে, কিন্তু কখনোই নিজের প্রতিপক্ষ বা নিজের জন্য সেই ধরনের হুমকি হতে দেবে না। দরকার পড়লে খেলাধুলার সেই নিষ্পাপ পুতুলটিকেও রাজনীতির অদৃশ্য সুতা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
২. ভারতে আইপিএলে খেলতে পারা এ দেশের যেকোনো ক্রিকেটারের জন্য পরম সৌভাগ্যের বিষয়। সেই ধরনের আকাক্সক্ষা বা একই ধরনের মুলা ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের সামনে নেই। কাজেই ভারতের বিরুদ্ধে মাঠের ভেতরে এবং বাইরে দাঁড়ানোর নৈতিক ও মানসিক বল বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের স্বভাবতই কম। মানবমনের এই রসায়নটি ক্রিকেট বাণিজ্যের পাকা বণিক শশী থারুর ভালো করেই জানেন।
৩. ইংল্যান্ডের সরকার আমাদের সরকারের মতো ভারতের বশংবদ নয়। যেকোনো কিছু (দরকার পড়লে ক্রিকেটের জয়) দেয়ার বিনিময়ে ক্ষমতায় থাকার তাগিদ তাদের নেই। কাজেই অনিশ্চয়তার খেলায় নিশ্চিত বিজয়ের জন্য এই তিনটির যেটি দরকার, ঝানু শশী থারুররা সেটিই ব্যবহার করবেন।
অর্থাৎ সোজা আঙুলে ঘি উঠলে পরম প্রশান্তিতে খাবেন। না উঠলে ওপরের কৌশলের যেকোনোটিকে ব্যবহার করবেন। এটিই ছিল শশী থারুরের সহজ ও নিশ্চিত হিসাব।
পুরো খেলাটিতে শশী থারুরের এই হিসাব বা ধারণাটিরই প্রতিফলন ঘটেছে। শুধু খেলার বেনিফিট অব ডাউটগুলোই নয়, ভারতকে কত বেশি বেনিফিট দেয়া যায় সেই প্রচেষ্টার কোনোটিই আইসিসি অবশিষ্ট রাখেনি। বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক এবং নৈতিক দুর্বলতা আইসিসিকে এই অতিরিক্ত সাহসটি জুগিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পানি বিরতির পর খেলার গতিটি কেন পুরো বদলে গেল সেটিও গবেষণার বিষয়। পানি বিরতির আগ পর্যন্ত যেখানে গড় রান রেট ছিল চারের নিচে, পানি বিরতির পর তা লাফিয়ে লাফিয়ে ওপরে উঠে যায়। মাশরাফির অঝোরে কান্নার মূল কারণটিও কোনো দিন বের হবে কি না জানি না।
লেখার শুরুতে যে টেল টেইল হোল বা রহস্য উন্মোচনের ছিদ্রের কথা বলেছি সেই ছিদ্রটি বন্ধ করার জন্য এনালগ ও ডিজিটাল আবেগ এবং ঠুনকো অভিমান ব্যবহার করা হচ্ছে। লোটাস কামালের অভিমান, ক্রিকেট ক্যাপ্টেনকে প্রধানমন্ত্রীর ফোন সব কিছু কেন যেন সেই ‘টেল টেইল ছিদ্র’ বন্ধ করার প্রচেষ্টা বলেই মনে হচ্ছে।
বর্তমান সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী ও আইসিসির সভাপতি আ ফ ম মোস্তফা কামাল বা ওরফে লোটাস কামাল বড় অভিমান করেছেন। তিনি নিজে যে সংগঠনটির সভাপতি সেই আইসিসিকে অনেক গরম গরম বা কঠিন কঠিন কথা শুনিয়ে দিয়েছেন। তা নিয়ে সারা বিশ্বে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই কঠিন কাজগুলো করলেও যে সহজ কাজটি এখনো তিনি করছেন না, তাহলো পদত্যাগ। কারণ এখন সত্যি সত্যি পদত্যাগ করলে ‘গৃহস্থ ও টক দইওয়ালা’র ঘটনা সৃষ্টি হয়ে পড়ে কি না!
তিনি যখন আইসিসির সভাপতি হন তখন সরকার ও সরকারবান্ধব মিডিয়া এমন একটা ধারণা দিতে চেষ্টা করে যে এটাও বর্তমান সরকারের বিশ্বজয়ের একটা ধারাবাহিকতামাত্র। ক্রিকেটে বাংলাদেশের ‘হেডম’ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অনেকেই তখন বগল বাজিয়েছিলেন। গতকাল জাতি তার কাছ থেকে সেই ‘হেডম’টিই দেখতে পেয়েছে। তিনি জানিয়েছেন আম্পায়ারদের এই অবিচারের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করবেন, পদত্যাগ করবেন।
আইসিসির বিরুদ্ধে তার এই মারাত্মক ‘হেডম’ দেখে আমার আবার সেই যাত্রার নায়িকার ডায়ালগটি মনে পড়ে যায়। যাত্রাপালার সেই নায়িকা মুহুর্মুহু তালির মধ্য দিয়ে ভিলেনের উদ্দেশে উচ্চারণ করেন, ‘ছেড়ে দে শয়তান, তুই আমার দেহ পাবি তো মন পাবি না।’ একই কায়দায় আ ফ ম মোস্তফা কামাল আইসিসিকে অনেকটা দেহটি দিয়েছেন, মনটি ক্রিকেট ভক্তদের জন্য রেখে দিয়েছেন। তার এই আপিলের হুমকি ও পদত্যাগের হুমকি (এখনো পদটি ত্যাগ করেননি) আমাদের অনেক প্রশান্তি দিলেও বাস্তবতার নিরিখে এর কোনো মূল্য নেই।
মিনার রশীদ
ক্রিকেট একটি খেলা ছাড়া অন্য কিছু নয়। তারপরও এখান থেকে প্রাপ্ত উপলব্ধি বা বোধটুকু যদি এই লোটাস কামালেরা জীবনের অন্য জায়গায় কাজে লাগাতেন, তবে এই অভাগা জাতির আসলেই উপকার হতো। খেলাধুলায় হারলে একটা জাতির জীবন বেশির পক্ষে দুই আনা মিছে হতে পারে। কিন্তু নিজেদের সব ভূ-রাজনৈতিক খেলা বা সুবিধাগুলো অন্যের হাতে তুলে দিয়ে এই গুণধররা জাতির জীবনকে ষোলো আনাই মিছে বানিয়ে ফেলেছেন; রাজনৈতিক, মানসিক, নৈতিক এবং আবেগগতভাবে পঙ্গু বানিয়ে ফেলেছেন, সে দিকে কোনো খেয়ালই নেই।
জানি না গত বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট ম্যাচটি আমাদের সেই হুঁশটি কিছুটা ফেরাতে পেরেছে কি না!
minarrashid@yahoo.com

গান্ধীই ভারতের প্রথম কর্পোরেট এজেন্ট : অরুন্ধতী

ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী ভারতের প্রথম কর্পোরেট এজেন্ট ছিলেন বলে দাবি করেছেন প্রখ্যাত লেখক অরুন্ধতী রায়। শনিবার একটি চলচ্চিত্রবিষয়ক অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেন তিনি। রোববার হিন্দুস্থান টাইমস এ খবর দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘গান্ধীই এই দেশের (ভারতের)
প্রথম কর্পোরেট স্পন্সরড এনজিও। এই দেশে তাকে উপাসনা করা সর্বশ্রেষ্ঠ মিথ্যা। যে দলিত, নারী ও দরিদ্র সম্পর্কে ভয়ংকর জিনিস লিখেছে।’ গোরাখপুরের গোকুল অতিথি ভবনে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী দশম গোরাখপুর চলচ্চিত্র উৎসবের এবারের বিষয় ছিল ‘প্রতিরোধের সিনেমা’।

বিহারে নকল ঠেকাতে গুলি

ভারতের বিহার রাজ্যে ধর্মীয় রীতি-নীতির মতো সামাজিক রেওয়াজগুলোর অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ হল ‘নকল’। সরকারের প্রচার-প্রচারণা, পুলিশের ধরপাকড়েও এ প্রজন্ম ধ্বংসের জীবাণুটিকে ধ্বংস করা যায়নি। অবস্থা এমন যে, বুধবার রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী নিজেই বলেছেন, এখানে নকল ছাড়া পরীক্ষা অসম্ভব। বিহারের বৈশালির একটি স্কুলের চারতলা ভবনে স্বজনদের দেয়াল বেয়ে নকল সরবরাহের ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর এ মন্তব্য করেন শিক্ষামন্ত্রী।
তারপরই নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। শুরু হয়েছে ধরপাকড়, লাঠিচার্জ। শেষ পর্যন্ত শূন্যে ফাঁকা গুলি ছুড়েও দমানো যাচ্ছে না ‘নকল ঐতিহ্য’। গুলির ঘটনাটি ঘটেছে পাটনায়। নকল ঠেকাতে গুলি চালাতে হয়েছে পুলিশকে। শনিবারও দশম শ্রেণীর বোর্ড পরীক্ষায় নকল সরবরাহে মরিয়া ছিলেন পরীক্ষার্থীদের আত্মীয়-স্বজনরা। পাটনার বৈশালির একটি স্কুলে নকলে সাহায্য করতে আসা লোকজনের ভিড় থামাতে শূন্যে গুলি ছুঁড়তে হয়েছে পুলিশকে। কয়েক জায়গায় লাঠিচার্জও করা হয়েছে। গত দু’দিনে নকলে সাহায্য করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে ১০০০-র কাছাকাছি মানুষকে। তার মধ্যে শনিবারই গ্রেফতার হন ১০০ জন,
অধিকাংশই পরীক্ষার্থীদের স্বজন। বহিষ্কার করা হয়েছে প্রায় ৭০০ পরীক্ষার্থীকে। জনপ্রতি জরিমানা করা হয়েছে ২০০০ রুপি। অন্যদিকে এ ঘটনায় বিহার সরকারের কাছ থেকে কেন্দ্র রিপোর্ট তলব করবে বলে জানিয়েছেন দেশটির মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী উপেন্দ্র কুশওয়াহা। বিহার সরকার ব্যর্থ বলেও দাবি করেন তিনি। বিহারে এবার দশম শ্রেণীর বোর্ড পরীক্ষায় বসছেন মোট ১৪.২৬ লাখ ছাত্রছাত্রী। রাজ্যজুড়ে ১ হাজার ২১৭টি পরীক্ষা কেন্দ্রে ১৭ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে পরীক্ষা, চলবে ২৪ মার্চ পর্যন্ত। শুক্রবার পাটনা হাইকোর্টের ভর্ৎসনা এবং নকল বন্ধে কড়া নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এদিন সবক’টি কেন্দ্রে নিরাপত্তারক্ষীর সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। এএফপি।

সংকটে পাশে চাই যুক্তরাষ্ট্রকে

আফগানিস্তানের চলমান সংকট মোকাবেলা ও স্থিতিশীলতা অর্জনে অধিক মার্কিন সামরিক ও আর্থিক সহায়তা চান দেশটির প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি। এ লক্ষ্যে শনিবার চারদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছেন তিনি। সঙ্গে আছেন প্রধান নির্বাহী আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ। কাবুলের বর্তমান শাসনব্যবস্থা নিয়ে ওবামা প্রশাসনকে আশ্বস্ত করতে চান তারা। খবর ওয়াশিংটন পোস্টের। ছয় মাস আগে ক্ষমতাগ্রহণের পর ওয়াশিংটনে এটাই প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর।
আশরাফ ঘানি যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণেতাদের জানাতে চান- তার সরকার সঠিক পথে রয়েছে। তবে মার্কিন সাহায্য প্রাপ্তি অতটা সহজেই হবে না বলে মন্তব্য ওয়াশিংটন পোস্টের। এ সফরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে প্রথমবারের মতো বৈঠক করবেন আশরাফ ঘানি। বৈঠকে দু’দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ সংশ্লিষ্ট নানা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার কথা রয়েছে। কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক নাসরুল্লাহ সানেকজাই বলেন, ঘানি তাদের এ বার্তা দিতে চান যে এটা তো আপনাদের তৈরি সরকার। কাবুলকে সাহায্য করা ছাড়া ওয়াশিংটনের বিকল্পও নেই। মন্ত্রিসভায় ১৬ নতুন নাম ঘোষণা : আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি শনিবার মন্ত্রিসভা সম্পূর্ণ করতে নতুন ১৬ জনের নাম ঘোষণা করেছেন। প্রায় দুই মাস আগে পার্লামেন্টে প্রস্তাবিত দুই-তৃতীয়াংশ মন্ত্রীদের নাম বাতিল হয়ে যায়। ঘানির শপথ গ্রহণ ও নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী আবদুল্লাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে আফগানিস্তানে একটি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করার ছয়মাস পর মন্ত্রিসভার ২৫ সদস্যের মধ্যে মাত্র আটটি পূরণ হয়। জানুয়ারির শেষার্ধ্বে প্রস্তাবিত অন্যদের নাম পার্লামেন্টে বাতিল হয়ে যায়। শনিবার মন্ত্রিসভায় ঘোষিত ১৬ জনের নাম এখন পর্যন্ত পার্লামেন্টের নিুকক্ষে অনুমোদিত হয়নি। নতুন সরকার গঠনে বিলম্ব হওয়ায় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি অস্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত হওয়ার আশংকা সৃষ্টি হয়েছে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে দেশটি থেকে ন্যাটো তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়।

রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর অধীনে জাতীয় সরকার এবং সংবিধান by ইকতেদার আহমেদ

বাংলাদেশের সংবিধানের বর্তমান বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নির্বাচিত হন। অপর দিকে যে সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন মর্মে রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হন রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ লাভ করেন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য হলেও তাদের উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তারা নিজ নিজ পদে বহাল থাকেন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী চার কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হতে পারে। এ চারটি কারণের প্রথমটি হলো মেয়াদ অবসানের কারণে পদ শূন্য হওয়া, আর অপর তিনটি হলো মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে পদ শূন্য হওয়া।
প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য হওয়া বিষয়ে সংবিধানে যে বিধানাবলি রয়েছে তাতে উল্লেখ আছে- প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য হবে যদি তিনি কোনো সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট পদত্যাগপত্র দেন অথবা তিনি সংসদ সদস্য না থাকেন। তা ছাড়া সংবিধানে উল্লেখ আছে, প্রধানমন্ত্রী সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারালে পদত্যাগ করবেন কিংবা সংসদ ভেঙে দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকে লিখিতভাবে পরামর্শ দেবেন। এরূপ পরামর্শের ক্ষেত্রে অন্য কোনো সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন নন এ মর্মে রাষ্ট্রপতি সন্তুষ্ট হলে তিনি সংসদ ভেঙে দেবেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যিনি নিয়োগ লাভ করেন তিনি একজন সংসদ সদস্য। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবে যদি (ক) তার নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হতে ৯০ দিনের মধ্যে তিনি তৃতীয় তফসিলের নির্ধারিত শপথ নিতে ও শপথপত্রে স্বাক্ষর দিতে অসমর্থ হন; (খ) সংসদের অনুমতি না নিয়ে তিনি একাদিক্রমে ৯০ বৈঠক দিবস অনুপস্থিত থাকেন; (গ) যদি সংসদ ভেঙে যায়; (ঘ) তিনি সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের (২) দফার অধীন অযোগ্য হয়ে যান অথবা (ঙ) এ সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বর্ণিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
উপর্যুক্ত কারণ ছাড়াও একজন সংসদ সদস্য স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরয্ক্তু পত্রযোগে নিজে পদত্যাগ করতে পারেন এবং এরূপ ক্ষেত্রে স্পিকার যে তারিখে পত্র পাবেন ওই তারিখ থেকে পদত্যাগী সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হয়ে যায়।
উপর্যুক্ত বিধানে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের (২) দফার অধীন অযোগ্য হওয়া অথবা ৭০ অনুচ্ছেদে বর্ণিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়া বিষয়ের উল্লেখ থাকায় উভয় অনুচ্ছেদের বিধানাবলি অবলোকন অত্যাবশ্যক। অনুচ্ছেদ ৬৬(২) এ উল্লেখ রয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না যদি (ক) কোনো উপযুক্ত আদালত তাকে অপ্রকৃতিস্থ বলে ঘোষণা করেন; (খ) তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর দায় থেকে অব্যাহতি লাভ না করে থাকেন; (গ) তিনি কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন; (ঘ) তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দু’বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তার মুক্তি লাভের পর পাঁচ বছরকাল অতিবাহিত না হয়ে থাকে; (ঙ) তিনি ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ যোগসাজশকারী (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশের অধীন কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত হয়ে থাকেন; (চ) আইনের মাধ্যমে পদধারীকে অযোগ্য ঘোষণা করছে না, এমন পদ ছাড়া তিনি প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকেন অথবা (ছ) তিনি কোনো আইনের অধীন অনুরূপ নির্বাচনের জন্য অযোগ্য হন।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ নম্বর ৭০ রাজনৈতিক দল থেকে পদত্যাগ বা দলের বিপক্ষে ভোট দেয়ার কারণে আসন শূন্য হওয়া সংক্রান্ত। এ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হয়ে কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তিনি যদি ওই দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দেন তাহলে সংসদে তার আসন শূন্য হবে।
রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর পদ অথবা একজন সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়া বিষয়ে সংবিধানে যেসব বিধান উল্লেখ রয়েছে তা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মৃত্যুর কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার বিষয় সংবিধানে উল্লেখ থাকলেও একই কারণে প্রধানমন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের পদ বা আসন শূন্য হবে কি না সে বিষয়ে সংবিধানে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো কিছু উল্লেখ করা হয়নি। যদিও ইতঃপূর্বে সংসদ সদস্যের মৃত্যু হওয়া-পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শূন্য পদ পূরণের অসংখ্য নজির রয়েছে।
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা বহাল থাকা আস্থায় এ পর্যন্ত কোনো প্রধামন্ত্রীর পদে বহাল থাকাকালীন মৃত্যু হয়নি। মৃত্যু-পরবর্তী কে প্রধানমন্ত্রী হবেন এ বিষয়ে সংবিধান নিশ্চুপ থাকলেও এরূপ ক্ষেত্রে যিনি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন তাকে যে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন, এ প্রশ্নে কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই।
আমাদের দেশ বর্তমানে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এ ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান। আমাদের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীকে যেরূপ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে এরূপ ক্ষমতা সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা অনুসৃত হয়, এমন অন্য কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রীর নেই। আমাদের দেশে এ পর্যন্ত দলীয় সরকারের অধীনে যত সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এর প্রতিটিতে ক্ষমতাসীন দল বিজয়ী হওয়ার কারণে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নিরপেক্ষ হয় না, দেশের সাধারণ জনমানুষের মধ্যে এমন বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে। এ ধারণার কারণেই দেখা যায়, মেয়াদ অবসান বা মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে কোন ধরনের সরকারের অধীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, এ প্রশ্নে বড় দু’টি দল দ্বিধাবিভক্ত।
বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দাবি সূত্রেই একসময় আমাদের দেশে জাতীয় সংসদের নির্বাচনের জন্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার চালু করা হয়েছিল। এরপর আওয়ামী লীগ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে একতরফাভাবে এ ব্যবস্থাটির অবসান ঘটিয়ে দলীয় সরকারের অধীন সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। নবপ্রবর্তিত ব্যবস্থায় একটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দেশের প্রধান বিরোধী দল, এর জোটভুক্ত অপরাপর দল এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র দলের বর্জনের মুখে এ নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। এ নির্বাচনটিতে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের জন্য উন্মুক্ত আসনের অর্ধেকেরও বেশি প্রার্থী বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। অবশিষ্ট যেসব আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতে ভোটার উপস্থিতি এত নগণ্য ছিল যে গণতন্ত্রের মাপকাঠিতে এগুলোকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলার অবকাশ নেই। দেশে-বিদেশে সব মহল এমনটিই বলেছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে এর মূলে রয়েছে নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি কী হবে সে প্রশ্নে বড় দু’টি দলের বিপরীতমুখী অবস্থান। এ বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে এক দিকে দেশের স্থিতিশীলতা ক্ষুণœ হচ্ছে, অপর দিকে উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের সচেতন মানুষ যেমন উদ্বিগ্ন, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রও উদ্বিগ্ন। এ বাস্তবতায় নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে দেশবাসীর সামনে বর্তমানে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব রয়েছে। এর প্রথমোক্তটি হলো রাষ্ট্রপতির অধীন জাতীয় সরকার গঠনের মাধ্যমে নির্বাচন পরিচালনা। দ্বিতীয়টি হলো প্রধানমন্ত্রীর অধীন জাতীয় সরকার গঠনের মাধ্যমে নির্বাচন পরিচালনা। আর শেষোক্তটি হলো জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে প্রধানমন্ত্রীর অধীন জাতীয় সরকার গঠনের মাধ্যমে নির্বাচন পরিচালনা। এ বিকল্প প্রস্তাবগুলোর কূটনৈতিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্মুখে উপস্থাপন করা হলে আওয়ামী লীগ অদ্যাবধি তাদের মতামত ব্যক্ত করেনি, যদিও তিনটি বিকল্পের প্রথমোক্ত ও শেষোক্তটি বিএনপির কাছে গ্রহণযোগ্য দলটির একাধিক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এমন মনোভাব ব্যক্ত করেছেন।
আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একাধিক নেতা উল্লেখ করেছেন রাষ্ট্রপতির অধীন জাতীয় সরকার গঠনের কোনো বিধান সংবিধানে না থাকায় এরূপ সরকার গঠন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এ প্রশ্নে দেশের সচেতন জনমানুষের অভিমত সংবিধানে কী আছে বা নেই তার চেয়ে বড় কথা দেশের সাধারণ জনমানুষের অভিপ্রায় বা আকাক্সক্ষা কী বা তারা কী চায়। প্রণিধানযোগ্য, ’৯০-এর গণ-আন্দোলনপরবর্তী কর্মরত প্রধান বিচারপতিকে প্রধান করে যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়েছিল তা সংবিধানসম্মত ছিল না। পঞ্চম সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সংবিধানের একাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এ অস্থায়ী ব্যবস্থাটিকে বৈধতা দেয়া হয়। অনুরূপ সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন যে নবম সংসদ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়, সে সরকারও সংবিধান সম্মতভাবে গঠন করা হয়নি। সে সরকারটিকে আজ পর্যন্ত সংসদের মাধ্যমে অনুমোদনও দেয়া হয়নি। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসংক্রান্ত মামলার আপিলের রায় দেয়ার সময় যদিও প্রসঙ্গক্রমে মামলার বিষয়বস্তু না হওয়া সত্ত্বেও অপ্রাসঙ্গিকভাবে এ সরকারটির কার্যক্রমকে বৈধতা দেয়া হয়েছে, কিন্তু সংসদের বৈধতার অনুপস্থিতিতে সে বৈধতা কতটুকু সিদ্ধ, এ প্রশ্নটির সন্তোষজনক সুরাহা প্রয়োজন।
আমাদের সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের কিছু বিষয় সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোট ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছিল। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সে গণভোটব্যবস্থা রহিত করা হয়। সংবিধানবহির্ভূত যেকোনো বিষয়ে গণভোট আয়োজনে সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে কোনো বিধিনিষেধ নেই। ইতঃপূর্বে আমাদের দেশে জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতি রাষ্ট্রপতি হিসেবে জনগণের আস্থা আছে কি না এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে কর্মরত প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের গৃহীত পদক্ষেপের প্রতি আস্থা যাচনা করে তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এ তিনটি গণভোট সংবিধান ও দেশের আইন দিয়ে সমর্থিত না হলেও দেশের জনগণের সমর্থন ও সম্মতির মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। এ তিনটি গণভোটে প্রদত্ত ভোটের হার বিষয়ে বিতর্ক থাকলেও জনগণের কাছে এগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বিষয়ে বিতর্ক নেই। আমাদের আগামী সংসদ নির্বাচন রাষ্ট্রপতি না প্রধানমন্ত্রীর অধীন জাতীয় সরকার দিয়ে অথবা জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে প্রধানমন্ত্রীর অধীনে জাতীয় সরকার দিয়ে অনুষ্ঠান প্রশ্নে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের আকাক্সক্ষা বা অভিপ্রায় জানতে চাওয়া হলে তা কোনোভাবেই সংবিধান বা আইনের পরিপন্থী হবে না, বরং দেশের স্থিতিশীলতার সপক্ষে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
ইকতেদার আহমেদ
বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি বাংলা ভাষাভাষী একটি জাতির সমন্বয়ে বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত। রাষ্ট্র গঠনে একই জাতির সমরূপতা একটি বিরল বিষয়। এরূপ দেশ ও জাতি দ্রুত সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে যায়। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এ বিষয়ে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। আমাদের দেশের জনগণ এসব রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থেকে পরিত্রাণ চায়। আর তাই অতিসত্বর সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে কী ধরনের জাতীয় সরকারের অধীন যে সংসদ নির্বাচন এবং পরবর্তী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সে বিষয়ে সমঝোতায় উপনীত হওয়া জরুরি। এ বিষয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মনোভাব ইতিবাচক বলে সরকারের মনোভাবও ইতিবাচক হবে এমন প্রত্যাশা পূরণ হলে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির অগ্রযাত্রাকে কোনো অশুভ শক্তি ব্যাহত করতে পারবে না।
লেখক : সাবেক জজ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com

ফিরে দেখা উপজেলা নির্বাচন by ভ্রান্তিহরণ পোদ্দার

বিগত সংসদের মতো উপজেলা নির্বাচনও সমালোচিত হয়েছে। মূলত আওয়ামী ইস্যু সৃষ্টি এবং তা নিজেদের প্রয়োজনে ধামাচাপা দিতে অধিক করিৎকর্মা। বিদায়ী ২০১৪ সালের সবচেয়ে সমালোচিত ঘটনা ছিল ৫ জানুয়ারির তামাশার নির্বাচন। একদলীয় নির্বাচন এর আগে হলেও এ নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। এ ধরনের প্রার্থী ও ভোটারবিহীন নির্বাচন বিশ্বে নজিরবিহীন। বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ হয়েছিলেন ১৫৩ জন। ভোটার উপস্থিতির সংখ্যা ছিল পাঁচ শতাংশেরও কম। রাজধানীরই ২৯টি কেন্দ্রে কোনো ভোটার ভোট দেননি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ উপলব্ধি করতে পেরেছিল, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে তাদের পক্ষে ক্ষমতায় ফিরে আসা সম্ভব নয়। তাই তারা পরিকল্পিতভাবেই বিরোধীদের নির্বাচন বর্জনের মুখে ঠেলে দেয় এবং একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে প্রহসনে লিপ্ত হয়। বিশ্ববাসী বিস্ময়ের সাথে প্রত্যক্ষ করেছে, নির্বাচনের জনগণের সাথে প্রতারণা এবং ধিক্কার জানিয়েছে ক্ষমতাসীনদের এই ভূমিকাকে।
সরকারের পাতানো নির্বাচন নিয়ে যখন বিশ্ব জনমত সোচ্চার এবং দলগুলো রাজপথে আন্দোলনরত, তখনই আওয়ামী লীগ বিশ্ব জনমতকে বিভ্রান্ত ও বিরোধী জোটের আন্দোলন ভিন্নপথে প্রবাহের জন্য নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। তারা মনে করেছিল, সংসদ নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলো উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেবে না বরং নির্বাচনের নামে ক্ষমতাসীন দল আবারো ফাঁকা গোল করবে। দীর্ঘ দিনের আন্দোলনে বিরোধী জোট অনেকটাই তখন পরিশ্রান্ত ও অগোছালো। আর মনে করা হয়েছিল যে, জামায়াত তো রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন হয়েছে এবং জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা শূন্যের কোটায় নেমেছে। এমন বৈরী পরিস্থিতিতে জামায়াতের পক্ষে নির্বাচনে অংশগ্রহণ সম্ভব হবে না।
৫ জানুয়ারির নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ওপর যে তাণ্ডব চলেছে, তা গা শিউরে ওঠার মতো। জানা গেছে, ওই নির্বাচনের আগে ও পরে পুলিশ ও যৌথ বাহিনী, র‌্যাব এবং আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসীদের হাতে ২০ দলীয় জোটের ২৯১ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। গুম হয়েছেন ৬০ জন। বিশেষত গত বছরের অক্টোবর থেকে প্রায় তিন মাস সরকারবিরোধী আন্দোলন করেছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। ওই সময় এসব নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন বলে এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে। সারা দেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে নিহত ও গুমের তালিকা করা হয়েছে। দেখা যায়, লক্ষ্মীপুরে নিহত হয়েছেন ২৯ জন ও গুম ৬ জন। সাতক্ষীরায় নিহত ২৯ জন, গুম ৫ জন। গুমের সংখ্যা ঢাকা মহানগরীতে সবচেয়ে বেশি। এখানে গুম হয়েছেন ২১ জন। ঢাকায় গুম হওয়াদের মধ্যে ১৫ জন ছাত্রদলের। তবে মহানগরীতে নিহতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। নিহত হয়েছেন জামায়াতের মহানগরীর একজন মজলিশে শূরা সদস্য। সারা দেশে নিহত ২৯১ জনের মধ্যে জামায়াতেরই অন্তত ১৪০ জন। আর গুম হয়েছেন সাতজন। বাকিরা সবাই বিএনপি ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। সরকার মনে করেছিল বিরোধী জোটের এমন বেহাল দশার মধ্যে উপজেলা নির্বাচন দিলে অপ্রস্তুত অবস্থায় তারা নির্বাচন থেকে বিরত থাকবে। সে আশায় বুক বেঁধেই আওয়ামী লীগ চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে।
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাচনে কাঠরা আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়
কেন্দ্রের ২ নম্বর নারী বুথে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী
গোলাম মুর্তজা খানের আনারস প্রতীকে সিল মারা হচ্ছে। ছবি: জহুরুল ইসলাম
৫ দফার এই নির্বাচনে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে সরকার সমর্থিত প্রার্থী নাকানি-চুবানি খাওয়ার পর সরকার উপলব্ধি করতে পেরেছে, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে তাদের পক্ষে আর কিছুই করা সম্ভব নয় । প্রথম পর্বে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১০২ উপজেলায়। এ নির্বাচনেও কেন্দ্র দখল, ভোট ডাকাতি, জাল ভোট ও ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। তা সত্ত্বেও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে। প্রথম দফার নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারম্যান পদে ৪৪টি, পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৩২ ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৩৪টি পদে বিজয়ী হয়। জোটের অন্যমত শরিক জামায়াতে ইসলামীর ফলাফল ক্ষমতাসীন দলের কাছে বিস্ময়কর। দলটি মাত্র ২৭ উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী দিয়ে ১৩টি, পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান পদে ২৯টি উপজেলায় প্রার্থী দিয়ে ২৩টি এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ১৪ জন প্রার্থী দিয়ে ১০টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। দ্বিতীয় দফা নির্বাচনেও বিএনপি জোট প্রার্থীরা চমকপ্রদ সাফল্য অর্জন করেছেন। বিএনপি প্রার্থীরা দ্বিতীয় দফায় ৫২টি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছেন। পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান পদে ২৯ এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৪৪ জন প্রার্থী বিজয়ী হন। অপর পক্ষে সীমিত সংখ্যক প্রার্থী দিয়ে জামায়াত রীতিমতো চমকে দিয়েছে। দলটি চেয়ারম্যান পদে ২৭ জন প্রার্থীর বিপরীতে আটজন, পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৪০ জনের বিপরীতে ৩৫ জন ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ১৪ জনের বিপরীতে ৯ জন প্রার্থী জয়ী হয়েছেন।
বিরোধী জোট বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী দুই পর্বের নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে উল্লেখযোগ্য ফলাফল অর্জন করে। দেখা যায়, প্রথম পর্বের নির্বাচনে বিএনপি পেয়েছে ভাইস চেয়ারম্যানের ৩২টি পদ, আওয়ামী লীগ ২৩টি, জামায়াতে ইসলামী ২৪টি ও জাতীয় পার্টি তিনটি। দ্বিতীয় পর্বে বিএনপি পেয়েছে ৩২টি, আওয়ামী লীগ ৩৭টি, জামায়াতে ইসলামী ৩৪টি ও জাতীয় পার্টি একটি। দুই পর্বের নির্বাচনে মহাজোট সরকার সম্মিলিতভাবে ভাইস চেয়ারম্যান পদ লাভ করেছে ৬৪টি (আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টি)। অপর পক্ষে দুই পর্বের নির্বাচনে ১৯ দলীয় (পরে ২০ দল) জোট সম্মিলিতভাবে ভাইস চেয়ারম্যান পদ লাভ করেছে ১২২টি (বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী)। অর্থাৎ দুই পর্বের নির্বাচনে ১৯ দলীয় জোট আওয়ামী জোটের চেয়ে ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৫৮টি পদে এগিয়ে। মোট ৪৮৮টি উপজেলায় পঞ্চম দফা নির্বাচন শেষে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ চেয়ারম্যান পদে ২৫৫, বিএনপি ১৬০, জামায়াতে ইসলামী ৩৬, জাতীয় পার্টি তিন এবং অন্যান্য ৩১টিতে জয়ী হয়েছেন।
প্রথম ও দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে ‘ট্রাডিশন’ অনুযায়ী ভোট ডাকাতি করে ক্ষমতাসীনেরা ফলাফল পুরোপুরি তাদের পক্ষে নিতে পারেনি। ফলে তারা পুকুর চুরির পরিবর্তে সাগর চুরির পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এ কথার প্রমাণ মেলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের বক্তব্য থেকে। দুই দফা উপজেলা নির্বাচনে সরকারদলীয় প্রার্থীদের লেজেগোবরে অবস্থা হওয়ার পর তিনি ঘোষণা দিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগের ‘যথাযথ প্রস্তুতির অভাবে’ নির্বাচনে খারাপ ফল করেছে। আগামী নির্বাচনগুলোতে তারা সর্বশক্তি নিয়োগ করে ফলাফল নিজেদের অনুকূলে নেবে। আর তারা যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে ও সর্বশক্তি নিয়োগ করে শেষ পর্বের নির্বাচনগুলোতে ফলাফল নিজেদের অনুকূলে কিভাবে নিয়েছিলেন, তা ৩১ মার্চ পঞ্চম দফার নির্বাচনের পর ১ এপ্রিল জাতীয় দৈনিকগুলোর শিরোনাম থেকে স্পষ্ট। সে দিনের দৈনিক ইত্তেফাকের শিরোনাম ছিল ‘কেন্দ্র দখল ও ভোট বর্জন থামছে না’, প্রথম আলো ‘শেষটাও ভালো হলো না’, কালের কণ্ঠ ‘শান্তিপূর্ণ ভোট ডাকাতি, কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই, সংঘর্ষ, বোমা ও আগুন’, সমকাল ‘শেষ ধাপেও কেন্দ্র দখল ও জাল ভোট’, ইনকিলাব ‘সিল মারার মহোৎসব’, নয়া দিগন্ত ‘পঞ্চম দফায়ও ভোট ডাকাতি’। ২ এপিল প্রথম আলোতে শিরোনাম করা হয়েছে ‘নির্বাচনব্যবস্থা তছনছ, প্রশ্নের মুখে আ. লীগ,’ কালের কণ্ঠে শিরোনাম করা হয়েছে ‘৭৯ উপজেলায় ভোট ডাকাতি’, যুগান্তরের শিরোনাম ‘নির্বাচন সম্পূর্ণ সুষ্ঠু হয়েছে তা বলা যাবে না-ইসি শাহ নেওয়াজ। উল্লিখিত ঘটনাপ্রবাহ, দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকগুলোর শিরোনাম ও নির্বাচন কমিশনার শাহ নেওয়াজের স্বীকৃতি থেকে বিগত চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনের বাস্তবচিত্র ফুটে উঠেছে।
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার কন্দর্পপুর সরকারি প্রাথমিক
বিদ্যালয় কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার ছিনতাই
করা হয়। পরে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ছবি: শাহ আলম
আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে তাদের প্রধান অন্তরায় মনে করেছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোটকে। আর জামায়াতকে জোট থেকে বিচ্ছিন্ন করার কূটকৌশলের পাশাপাশি জামায়াতের নেতাদের বিচারের মুখোমুখি করে এবং তাদের একের পর এক প্রাণদণ্ডে দণ্ডিতও করা হয়। শীর্ষ নেতাদের মুক্তির দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করতে গিয়ে নিহত হন প্রায় দেড় শ’ নেতাকর্মী। লাখ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা দেয়া হয়। কারারুদ্ধ করা হয় প্রায় ৫০ হাজার নেতাকর্মীকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারি দলের সন্ত্রাসীদের হামলায় পঙ্গুত্ব বরণ করেন শত শত নেতাকর্মী। শীর্ষ নেতারা নির্যাতনের শিকার হন এবং তাদের কারো কারো পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি পরানো হয়। এমতাবস্থায় সরকার মনে করেছিল, জামায়াতের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। তাই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাথে পাল্লা দেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। অভিজ্ঞমহল মনে করছেন, জামায়াতের ওপর নির্যাতন জামায়াতের জন্যই শাপেবর হয়েছে। তাই চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনে জামায়াতের যে ফলাফল, তা সরকারের জন্য উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো বিষয় বৈ কী! জামায়াত ২০০৯ সালের উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ৬৯ জন প্রার্থী দিয়ে বিজয়ী ২৪ জন। চেয়ারম্যন পদে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ২৪,৭৭,২২৪। পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান ৭৪ জন প্রার্থী দিয়ে বিজয়ী হয়েছেন ২৭ জন। প্রাপ্ত ভোট ২৩,০২,১০১। মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ২৬ প্রার্থী দিয়ে বিজয়ী ১৪ জন, প্রাপ্ত ভোট ১০,৫৮,৬১৫। পক্ষান্তরে ২০১৪ সালে ১১৩ জন চেয়ারম্যান প্রার্থীর মধ্যে বিজয়ী হয়েছেন ৩৬ জন, প্রাপ্ত ভোট ৩৮,২১,৭০৭। পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান ২৪৬ জন প্রার্থীর দিয়ে বিজয়ী ১২৯ জন, প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা ৯৫,৫২,২৬৪। মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৭৫ প্রার্থীর মধ্যে ৩৬ জন বিজয়ী হয়েছেন, প্রাপ্ত ভোট ৩০,৪৭,৩৬৯। মূলত বিগত ২০০৯ সালের নির্বাচনের চেয়ে চেয়ারম্যান পদে ভোট সংখ্যা বেড়েছে ১৩,৪৪,৪৮৩, পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান পদে বেড়েছে ৭২,৫০,১৬৩ ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ভোট বেড়েছে ১৯,৮৮,৭৫৪।
নির্যাতন, হত্যা-সন্ত্রাস-নৈরাজ্য চালিয়ে কোনো আদর্শকে সাময়িকভাবে হেনস্তা ও দাবিয়ে রাখা গেলেও নির্মূল করা সম্ভব নয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়েও আওয়ামী লীগ প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতে অনেক কিছু করেছিল। জাসদ অভিযোগ করে, হত্যা করা হয়েছিল তাদেরসহ হাজার হাজার বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীকে। বরং আওয়ামী লীগকেই এ জন্য চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। যদি সরকার উপজেলা নির্বাচনে ভোট ডাকাতি ও অবৈধ প্রভাব বিস্তার না করত, তাহলে ফলাফল আরো অন্যরকম হতো। সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে ভোটার মনের সংশয় থাকত না।
bhpoddar@gmail.com

হারিয়ে যাওয়া মানুষ যায় কোথায়? by কাজী সুমন

১০ই মার্চ রাত ১০টা। উত্তরার একটি বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদকে। তার পরিবারের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই নিয়ে গেছে তাকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনাও তাই। এরপর এখন পর্যন্ত হদিস মিলেনি তার। বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে এভাবে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছেন বহু মানুষ। গত ৫ বছরে নিখোঁজ হয়েছেন শতাধিক। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, গত দুই মাসে সারা দেশে ২১ জন মানুষ গুম হয়েছেন। এরমধ্যে জানুয়ারিতে ১৪ জন এবং ফেব্রুয়ারিতে নিখোঁজ হয়েছেন ৭ জন। ওদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, গত দুই মাসে বিরোধী জোটের ৩৬ জন নেতাকর্মী গুম হয়েছেন। এদের মধ্যে কয়েকজনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। কয়েকজনকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। বাকি ১৮ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। এর আগে ২০১৩ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলাকালীন বিরোধী জোটের ৬৫ জন নেতাকর্মী গুম হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছিল বিএনপি। সবগুলো গুমের ঘটনার ধরন ছিল একই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাদের আর কোন খোঁজ মেলেনি। তবে ভাগ্যক্রমে নিখোঁজের সাড়ে তিন মাস পর সিলেটের যুক্তরাজ্য প্রবাসী নেতা মুজিবুর রহমানসহ কয়েকজন ছাত্রদল নেতাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। এভাবে মানুষ নিখোঁজের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। নিখোঁজ হওয়াদের উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তেমন কোন তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি।
এ ব্যাপারে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর নির্বাহী পরিচালক নাসিরউদ্দিন এলান মানবজমিনকে বলেন, প্রতি মাসেই মানুষ নিখোঁজ হচ্ছে। আমরা এই তালিকা প্রকাশ করছি। কিন্তু এ ধরনের জলজ্যান্ত মানুষ হারিয়ে যাওয়া খুবই উদ্বেগজনক এবং অগ্রহণযোগ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি মানুষগুলোকে না নিয়ে থাকে তাহলে তো খুঁজে বের করার দায়িত্ব তাদের। সে যে দলেরই হোক কিংবা যে মতেরই হোক।  এ ধরনের ঘটনা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য খারাপ ফল বয়ে আনবে। মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে মানুষ নিখোঁজ হচ্ছে। আমরা এসব ঘটনায় উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়ে আসছি। কিন্তু এসব মানুষ নিখোঁজের পর সরকারের উচ্চ মহল থেকে যে ধরনের কথাবার্তা বলা হচ্ছে, এতে যারা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছেন তারা আরও উৎসাহিত হচ্ছেন। ফলে এ ধরনের ঘটনা না কমে ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনীতিবিদদের গুমের সংস্কৃতি শুরু হয়। ২০১৩ সালের শেষদিকে তা উদ্বেগজনকহারে বেড়ে যায়। চলতি বছরের শুরুতেই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দেয় বিরোধী জোট। ফের শুরু হয় গুমের ঘটনা। গত ৫ই জানুয়ারি পুলিশ পরিচয়ে হাফিজুর রহমান (৪০) ও সাগর আলী (২৫) নামে দুজনকে আটক করা হয়। এরপর থেকে তাদের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।  ৯ই জানুয়ারি কবি নজরুল সরকারি কলেজের ছাত্রদল নেতা জসিমউদ্দিন, সুজন চন্দ্র দাস, রোমান আহমেদ, কেএম নজরুল হাসান ও ইরফান আহমেদ ওরফে ফাহিমকে ডিবি পরিচয়ে আটক করা হয়। চারদিন পর তাদের মিরপুর থানায় একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়।  ১৫ই জানুয়ারি দুপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সাদা পোশাকের কয়েকজন লোক চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কল্যাণপুর স্কুল এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে মতিউর রহমান, মোজাম্মেল হোসেন মোজা, মো. আবু তাহের শিশির, শ্যামল কুমারসহ ৫ জনকে। এরমধ্যে মতিউর রহমানকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়। ৮ দিন পর ককটেলসহ মোজাম্মেল হোসেন মোজা, মো. শিশিরসহ চারজনকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। ১০ই ফেব্রুয়ারি বিএনপির সমর্থক আইনজীবী সোহেল রানা বন্ধু রিংকুসহ নিখোঁজ হন। উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টর থেকে তাদের তুলে নিয়ে যায় ১০-১২ জন যুবক। এরপর রিংকুকে ছেড়ে দিলেও এখনও হদিস মেলেনি সোহেল রানার। গত ১৮ই ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মির্জা আব্বাসের বোনের ছেলে মাজেদুর রশীদ (৪৫) কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায়। এরপর কয়েকদফা সংবাদ সম্মেলন করে মাজেদুরকে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানান তার স্ত্রী। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তার কোন হদিস মেলেনি। গত ২২শে ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে বসুন্ধরার এক বাসা থেকে বনানী থানা বিএনপির নেতা ও জিয়া পরিষদ ঢাকা মহানগরের আহ্বায়ক এডভোকেট রেজাউর রহমান ফাহিমকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় এক মাস পার হলেও এখনও পর্যন্ত তার কোন হদিস পাচ্ছে না পরিবার। বিভিন্ন থানা, ডিবি অফিস ও র‌্যাব তাকে আটকের বিষয়টি অস্বীকার করেছে। ২৩শে ফেব্রুয়ারি রাতে গুলশানের বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে আটক করা হয় নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাকে। ২১ ঘণ্টা পর ধানমন্ডি থেকে আটক দেখিয়ে তাকে গুলশান থানায় হস্তান্তর করা হয়। ২৬শে ফেব্রুয়ারি দুপুর সোয়া দুইটার দিকে যমুনা ফিউচার পার্কের দ্বিতীয়তলা থেকে ছাত্রদল তিতুমীর কলেজ শাখার কর্মী মেহেদী হাসান রুয়েলকে আটক করে সাদা পোশাকধারী পুলিশ। এ সময় তার সঙ্গে একই কলেজের শুভ নামে আরেক ছাত্রকেও আটক করা হয়। কিন্তু শুভকে এয়ারপোর্ট এলাকায় ছেড়ে দেয়া হলেও খোঁজ মেলেনি মেহেদী হাসানের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তরফ থেকে মেহেদীকে আটকের বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছে। গত ৬ই মার্চ রাজধানীর শুক্রাবাদ এলাকা থেকে ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আনিসুর রহমান তালুকদার খোকনকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায়। কিন্তু পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তরফে তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি অস্বীকার করা হয়।  এখন পর্যন্ত তার কোন হদিস পায়নি পরিবার।
এর আগে  গুমের প্রথম ঘটনাটি ঘটে ২০১০ সালের ২৫শে জুন। ওই দিন রাতে রাজধানীর ইন্দিরা রোড থেকে ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৫৬নং ওয়ার্ড কমিশনার ও বিএনপি নেতা চৌধুরী আলমকে সাদা পোশাকের কিছু লোক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ পাঁচ বছরেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। ২০১২ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে ফেরার পথে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্র আল-মোকাদ্দেস ও ওয়ালিউল্লাহকে  হানিফ এন্টারপ্রাইজের গাড়ি থেকে র‌্যাব পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায়। ওই বছরের ১লা এপ্রিল রাজধানীর উত্তরা থেকে র‌্যাব পরিচয় তুলে নিয়ে যায় সিলেট জেলা ছাত্রদলের সহসাধারণ সম্পাদক ইফতেখার আহমদ দিনারকে। ২০১২ সালের ১৭ই এপ্রিল গুমের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে। ওই দিন রাত সোয়া ১২টার দিকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় সিলেট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী ও তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক মো. আনসার আলীকে। নিজের বাসায় ফেরার পথে বনানীর ২ নম্বর সড়ক থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে তাদের তুলে নিয়ে যায়। ২০১৩ সালের ২৭শে নভেম্বর কুমিল্লার লাকসাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম হিরু ও পৌর বিএনপির সভাপতি হুমায়ুন কবির পারভেজকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায়। ওই বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে রাজধানী থেকে গুম হন সূত্রাপুর থানা ছাত্রদল সাংগঠনিক সম্পাদক সম্রাট মোল্লা, ৭৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি খালেদ হাসান সোহেল, বংশাল থানা ছাত্রদলের সহসভাপতি মো. সোহেল, বিএনপি নেতা মো. হোসেন চঞ্চল, বংশাল ৭১নং ওয়ার্ড ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. পারভেজ, একই ওয়ার্ডের ছাত্রদল নেতা মো. জহির, ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমন, একই ওয়ার্ডের বিএনপি নেতা তানভীর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল নেতা আসাদুজ্জামান রানা, মাজহারুল ইসলাম রাসেল ও আল আমিন, তেজগাঁও থানা স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা কাউসার ও এসএম আদনান চৌধুরী, তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক মো. তরিকুল ইসলাম, সবুজবাগ থানা ছাত্রদল সভাপতি মাহবুব হাসান সুজন, একই থানার ছাত্রদল নেতা ফরহাদ হোসেন, মুন্সীগঞ্জ কে কে গভর্মেন্ট হাইস্কুলের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র কামরুল হাসান কনক, সূত্রাপুর থানা ছাত্রদল সভাপতি সেলিম রেজা পিন্টু, ৫৭নং ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক সোহেল ও রানা। গত বছরের ৪ঠা মে সুনামগঞ্জ শহীদ মিনারে এক অনশন শেষে সিলেট ফেরার পথে টুকেরবাজার এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সুনামগঞ্জের বাসিন্দা ও যুক্তরাজ্য যুবদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রবাসী মুজিবুর রহমানকে গাড়িচালকসহ তুলে নিয়ে যায়। সৌভাগ্যবশত পরে তাদের খোঁজ মিলে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি- বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা আহসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীও সৌভাগ্যবান। নিখোঁজের পর তাকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। নারায়ণগঞ্জে ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ সাতজনের অবশ্য তেমন সৌভাগ্য হয়নি। নিখোঁজের পর তাদের লাশ পাওয়া যায় নদীতে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনেও বলেছেন, গুমের ঘটনাগুলো তদন্তের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আর প্রায় সব গুমের ক্ষেত্রেই অভিযোগ উঠেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে। এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে প্রশ্নটি- হারিয়ে যাওয়া মানুষ যায় কোথায়?

বিএনপিতে আলোচনায় ৬ ইস্যু by কাফি কামাল

ঘোষিত তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে এখনও নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেনি বিএনপি। তবে নির্বাচনের ব্যাপারে ইতিবাচক ইঙ্গিত এসেছে বিরোধী জোটের তরফে। সুষ্ঠু পরিবেশ পেলে নির্বাচনী প্রস্তুতির ও জয়ের ব্যাপারেও আত্মবিশ্বাসী তারা। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন পেশাজীবীদের দুটি প্রতিনিধি দল। সাক্ষাৎ শেষে দুটি প্রতিনিধি দলই নির্বাচনের ব্যাপারে শীর্ষ নেতৃত্বের ভূমিকা ইতিবাচক সে ইঙ্গিতের কথা বলেছেন। বিষয়টিকে উড়িয়ে দেননি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে কার্যালয়ে অবস্থানকারী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেল। তারা বলেন, বিএনপি নির্বাচনের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। দলের ও জোটের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে শিগগিরই অবস্থান পরিষ্কার করা হবে। যদিও দলের বিভিন্ন পর্যায়ে সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে রয়েছে নানামুখী মতামত। জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে চলমান অনির্দিষ্টকালের আন্দোলনের মধ্যে নির্বাচনের পক্ষে-বিপক্ষে ও লাভ-ক্ষতি নিয়ে যুক্তি-তর্ক এবং চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিবেচনা করা হচ্ছে ওয়ান-ইলেভেনের সময় সিটি নির্বাচন ও ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বর্জনের অভিজ্ঞতা। এমন পরিস্থিতিতে সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্ব পাচ্ছে ৬টি ইস্যু। বিএনপি স্থায়ী কমিটি, কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপে এসব বিষয় উঠে এসেছে। তারা বলছেন, সরকার পরিবেশ তৈরি না করলে ইতিবাচক মনোভাব থাকলেও বিএনপির পক্ষে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা কঠিন হবে। ইস্যুগুলো হচ্ছে- ১. বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহার ও তার কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের যাতায়াতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বাধা তুলে নেয়া, ২. নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ নেতাকর্মীদের মুক্তি দেয়া, ৩. বিরোধী দলকে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন ও জনসম্পৃক্ততামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে বাধা না দেয়া এবং কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের তালা খুলে দেয়া, ৪. অব্যাহতভাবে মামলা দায়ের ও গণগ্রেপ্তার বন্ধ, ৫. দলের যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদসহ বিএনপি, অঙ্গদল ও জোটের নিখোঁজ নেতাদের সন্ধান বা তাদের উদ্ধারে আন্তরিকতার সঙ্গে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ এবং ৬. নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রশাসনের নিরপেক্ষ আচরণ নিশ্চিত করা। এসব ইস্যুতে বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে দল ও জোটের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের কথা বলেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তবে বৈঠকটি কখন হতে পারে এব্যাপারে এখনও কিছু জানানো হয়নি দলীয় ফোরামে।  নেতারা জানান, দীর্ঘদিন থেকেই বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলের গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালনে বাধা দিচ্ছে সরকার। সরকারি দলের নেতাকর্মী ও প্রশাসনের প্রতিবন্ধকতার কারণে একাধিক ঘোষিত কর্মসূচি পালন করতে পারেনি বিএনপি। এমন পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে কর্মসূচি পালন ও জনসংযোগের সুযোগ না পেলে নির্বাচনে উৎসাহী হবে না নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে গ্রেপ্তারের ঝুঁকি নিয়ে নির্বাচনী জনসংযোগে তারা সক্রিয় হতে পারবেন না। ফলে জনমত অনুকূলে থাকলেও ফলাফল পক্ষে আনা কঠিন হবে। তারা বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়া পৌনে তিন মাস ধরে তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। আন্দোলন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে প্রথমে তাকে অবরুদ্ধ করা হলেও পরবর্তীতে আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কৌশল হিসেবে তিনি নিজেই কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। তবে খাবার সরবরাহ ও যোগাযোগ সমস্যা চলছে দুই মাস ধরে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। নেতারা বলেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে প্রার্থী, প্রার্থীর নির্বাচন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের নানা প্রয়োজনে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হবে। তৃণমূল নেতা-কর্মীদের যোগাযোগ ও যাতায়াতের সুযোগও দরকার। অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহার না হলে একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যেই থাকতে হবে বিরোধী নেতাকর্মীদের। ওদিকে চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতাদের বড় একটি অংশ বর্তমানে কারাবন্দি। অন্যরা কৌশলগত নিরাপদ অবস্থানে থেকে আন্দোলন করছেন। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের কারাগারে রেখে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া যেমন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য কঠিন তেমনি কঠিন তাদের সহযোগিতা ছাড়া বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের নির্বাচনী লড়াই। এছাড়া আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিরোধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে দায়ের হয়েছে বিপুল সংখ্যক মামলা। এখন নতুন মামলা দায়ের ও গণগ্রেপ্তার বন্ধ না হলে তাদের পক্ষে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে না। আর এটাই হবে বিএনপির নির্বাচনে যাবার সিদ্ধান্তগ্রহণে বড় বাধা। নেতারা জানান, চলমান আন্দোলনে দলের যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের সন্ধান ও উদ্ধারের কার্যকর উদ্যোগ না থাকলে নির্বাচনে উৎসাহী হবেন না নেতাকর্মীরা। এছাড়া আন্দোলনে একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তৃণমূল থেকে প্রশ্ন আসতে পারে, কিসের আশা ও ভরসায় এ অংশগ্রহণ। এদিকে সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ব্যাপারে পরস্পরের মতামত জানার চেষ্টা করছেন। সেখানেও প্রধান্য পাচ্ছে এসব ইস্যু। এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন বিএনপি একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং আপাতত গন্তব্যহীন আন্দোলনের পথে চলছে। এ আন্দোলনের যৌক্তিক ভিত্তিকে দৃঢ় করতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ একটি সুযোগ হতে পারে। এছাড়া বিএনপিকে এখন জঙ্গিবাদের যে তকমা সেঁটে দেয়া হচ্ছে তা থেকে উত্তরণেরও একটি পথ হতে পারে। তারা বলেন, বিএনপি নির্বাচনে যাবার ঘোষণা দিয়ে সরকারের প্রতি কিছু শর্ত দিতে পারে। তারা বলতে পারে এতদিন সরকার পতন আন্দোলনে ছিলাম, আন্দোলন এবং নির্বাচন আলাদা বিষয়। ফলে নির্বাচনের প্রয়োজনে এসব শর্ত পূরণ জরুরি। তখন বল চলে যাবে সরকারের কোর্টে। সেসব শর্ত পূরণে সরকার আন্তরিক না হলে দেশের মানুষ ও আন্তর্জাতিক মহলে বিএনপির দাবি জোরদার হবে। দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক মহলকে বোঝানো যাবে, সরকারই বিএনপিকে নির্বাচনের পথে আসতে দিতে চায় না। উল্লেখ্য, ২০০২ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ডিসিসি নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকাসহ কাউন্সিলর পদে ৯০ ভাগ বিএনপি দলীয় প্রার্থীরা বিজয়ী হন। ওয়ান ইলেভেন ও মহাজোট সরকারের সময় দুইবার নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়া হলেও তা ভেস্তে যায়। ২০১১ সালের ৩০ই নভেম্বরে ৫৬টি ওয়ার্ড নিয়ে ‘দক্ষিণ’ ও ৩৬টি ওয়ার্ড নিয়ে ‘উত্তর’ নামে দুই ভাগ হয় ডিসিসি। এরপর পঞ্চম দফা অনির্বাচিত প্রশাসক দিয়ে চলছে ডিসিসি।

নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেছে -ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ

গত বছর ৫ জানুয়ারির একদলীয় নির্বাচনের কারণে নির্বাচন কমিশন ও দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা কমে গেছে বলে মনে করছে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইডব্লিউজি)। নির্বাচন কমিশনের প্রতি বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইসিকে পেশাগত ও নিরপেক্ষ আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছে তারা। প্রার্থীরা যাতে নির্ভয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল ও নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারে এবং ভোটাররা ভীতিকর অবস্থা কাটিয়ে নির্বিঘেœ ভোট দিতে পারেন সে ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছে তারা।
গতকাল জাতীয় প্রেস কাবে এক সংবাদ সম্মেলনে তারা এ অভিমত ব্যক্ত করে। লিখিত বক্তব্যে গ্রুপের পরিচালক ড. মো: আব্দুল আলীম বলেন, ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের পর নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেছে। এ জন্য সবার আগে এ বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি। স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের অঙ্গীকার এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এটি সম্ভব। নির্বাচন কার্যক্রমের প্রতিটি পদক্ষেপে পেশাগত আচরণ, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা প্রদর্শনের মাধ্যমে এ বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
তিনি বলেন, একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের আয়োজন করা হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রার্থীরা যাতে নির্ভয়ে ও নিশ্চিন্তে মনোনয়নপত্র দাখিল এবং নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারে সে জন্য নির্বাচন কমিশনকে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ভোটাররাও যাতে ভীতিকর অবস্থা কাটিয়ে নির্বিঘেœ ভোট দিতে আসতে পারে সে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ড. আলীম বলেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সবাইকে অবশ্যই নিরাপত্তা বাহিনী এবং নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সমান নজরে দেখতে হবে। কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যেন কোনো অবস্থাতেই নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তিতে প্রভাব না ফেলে তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের অভাব জনগণের মধ্যে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে পরে না। এর ফলে সমাজে সঙ্ঘাত বেড়ে যায়, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে, ভীতিময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়, প্রতারণা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না এবং সার্বিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। তাই নির্বাচন কমিশন শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে যাবতীয় ব্যবস্থা নেবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
ড. আলীম আরো বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন একটি অরাজনৈতিক নির্বাচন। কিন্তু মেয়র প্রার্থীদের মনোনয়ন দলীয়ভাবে হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় ফোরামে প্রার্থী নির্বাচন করছে, সংবাদ সম্মেলনে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করছে এবং দলের অন্য প্রার্থীদের প্রার্থী হওয়া থেকে বিরত থাকতে বলছে। এটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের উচিত এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ নারী ভোটকেন্দ্রে নারী কর্মকর্তা নিয়োগেরও আহ্বান জানায়।
সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির স্টিয়ারিং গ্রুপের সদস্য তালেয়া রেহমান বলেন, আমরা ৫ জানুয়ারির একদলীয় প্রহসনমূলক নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি চায় না, একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন চাই। সিটি করপোরেশন নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু ও অবাধ হয় সে ব্যাপারে তাদের উদ্যোগ নিতে হবে। সব প্রার্থীর জন্য সম সুযোগের ক্ষেত্র নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাতে নির্বাচন নিয়ে আমাদের উদ্বেগ রয়েছে। তবে যেহেতু দীর্ঘ দিন পর একটি নির্বাচন হচ্ছে তাকে গ্রহণযোগ্য করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, যেন ভোটাররা নির্বিঘ্নে  ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে।
তালেয়া রেহমান বলেন, রাজনৈতিক দলের প্রধান কাজ হচ্ছে জনগণের হয়ে কাজ করতে জনপ্রতিনিধিত্ব করা। এ ক্ষেত্রে পেট্রলবোমা নিপে বা সহিংসতা কোনো রাজনৈতিক দলের কাছেই কাম্য হতে পারে না।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন গ্রুপের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ড. নাজমুুল আহসান কলিমউল্লাহ, এ এইচ এম নোমান, হারুন অর রশীদ, বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক, কামরুল হাসান মঞ্জু প্রমুখ।

‘টাকার জন্য গলা টিপে খুন করি’ by ওয়েছ খছরু

‘টাকার জন্য অপহরণ করি শিশু আবু সাঈদকে। এরপর প্রথমে আমার বাসায় ও পরে কনস্টেবল এবাদুরের বাসায় বন্দি রাখি। কিন্তু সাঈদ চিনে ফেলে সবাইকে। এ কারণে তাকে গলা টিপে খুন করি। খুনের সময় এবাদুর সাঈদের পা ও মাছুম শরীর ধরে রাখে।’ সিলেটের স্কুলছাত্র আবু সাঈদ হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে অপহরণ ও খুনের ঘটনার নেতৃত্বদানকারী র‌্যাবের কথিত সোর্স আতাউর রহমান গেদা মিয়া। গতকাল সিলেটের মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট-১ সাহেদুল করিমের আদালতে টানা আড়াই ঘণ্টার জবানবন্দিতে সে এ তথ্য জানায়। গেদা মিয়া আলোচিত এ অপহরণ ও খুনের ঘটনার অন্যতম হোতা। সে পুলিশ ও র‌্যাবের সোর্স হওয়ায় নগরীর বৃহত্তর কুমারপাড়া ও বন্দরবাজার এলাকায় দাপট খাটাতো। ১৪ই মার্চ স্কুলছাত্র আবু সাঈদের লাশ উদ্ধারের দিনই পুলিশ গেদাকে গ্রেপ্তার করেছিল। লাশ উদ্ধারের পর দিনই গ্রেপ্তারকৃত পুলিশ কনস্টেবল এবাদুর রহমান খুনের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়। তার পরদিনই এ ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত ওলামা লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাকিবও জবানবন্দি দেয়। কিন্তু গেদা সহজেই খুনের ঘটনা স্বীকার না করায় পুলিশ ১৬ই মার্চ আদালত থেকে তাকে ৩ দিনের রিমান্ডে নেয়। প্রথম দফা রিমান্ডে গেদা খুনের ঘটনার দায় স্বীকার না করলেও ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল বলে জানায়। কিন্তু সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এ কারনে ১৯শে মার্চ পুলিশ ফের আদালতে হাজির করে গেদার ৭ দিনের রিমান্ড জানায়। আদালত তার ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিলেটের কোতোয়ালি থানার এসআই ফয়েজ আহমদ জানিয়েছেন, দ্বিতীয় দফা রিমান্ডে সোর্স গেদা মিয়া খুনের ঘটনা স্বীকার করেছে। এবং সে সত্য কথা বলায় এবাদুর ও রাকিবের জবানবন্দির সঙ্গে তার বক্তব্যের মিল পাওয়া যায়। তিন দিনের রিমান্ড শেষে গতকাল বেলা ২টার দিকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে গেদাকে সিলেটের সিএমএম-১ এর আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় গেদার মাথায় ছিল হেলমেট ও পরনে ছিল বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট। আদালতে হাজির করার পর বেলা আড়াইটা থেকে আদালতে তার জবানবন্দি শুরু হয়। আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিতে গেদা জানায়, ‘টাকার জন্য সে ও বাকি চারজন মিলে স্কুলছাত্র আবু সাঈদকে অপহরণের পরিকল্পনা করে। নগরীর জিন্দাবাজারে একটি রেস্টুরেন্টে বসে তারা অপহরণের পরিকল্পনা করে। রেস্টুরেন্টের ওই বৈঠকে সে ছাড়াও ওলামা লীগ নেতা রাকিব, মাছুম ও এক সিকিউরিটি কর্মচারী ছিল। ১০ই মার্চ সন্ধ্যায় তারা পরিকল্পনা করে চলে যায়। কথামতো পরদিন ১১ই মার্চ তারা রায়নগর, দর্জিবন্দ এলাকায় অবস্থান নেয়। বেলা ১১টার দিকে সে ও মাছুম মিলে অপহরণ করে আবু সাঈদকে। অপহরণের সময় সাঈদের মুখ হাত দিয়ে চেপে ধরা হয়। প্রথমে তার বাসায় এবং পরে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে পুলিশ কনস্টেবল এবাদুরের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয় আবু সাঈদকে।’ গেদা আদালতে আরও জানায়, ‘অপহরণের পর দিন বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তারা খুন করে আবু সাঈদকে। আবু সাঈদকে আগের রাতে মুখ বেঁধে রাখা হয়েছিল।’ খুনের ঘটনার বিবরণ দিয়ে গেদা মিয়া জানায়, ‘খুনের সময় কেউ আসছে কি না সেজন্য পাহারা দেয় রাকিব। আর এবাদুর স্কুলছাত্র সাঈদের পা ও মুহিবুল ইসলাম মাছুম শরীর ধরে রাখে। এরপর আমি গলা টিপে আবু সাঈদকে খুন করি। খুনের পর লাশ গুম করে রাখার পরিকল্পনা করি। সেজন্য ৭টি বস্তার ভেতরে লাশ বন্দি করে চিলেকোটা রেখে দিই।’ গেদা জানায়, খুনের পর সে মোবাইল ফোনে সাঈদের পরিবারের কাছে টাকা দাবি করে। এরপর সে আবু সাঈদের বাসায় যায়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথাও বলে। আবু সাঈদকে খুঁজে বের করতে সেও পুলিশের সঙ্গে কাজ করবে বলে জানায়। পরিবারের কেউ যাতে তাকে সন্দেহ করতে না পারে সেজন্য সাঈদের বাসায় গিয়েছিল বলে জানায় গেদা। এছাড়া, রাস্তায় সাঈদের মামাদের সঙ্গে দেখা হলেও সে এ ব্যাপারে কথা বলেছে। সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। আদালতে গেদা অজ্ঞাত এক ব্যক্তির পরিচয় বলেছে। ওই অজ্ঞাত ব্যক্তি একটি সিকিউরিটি কোম্পানির কর্মচারী। গেদার পরিচিত। এ কারণে খুনের ঘটনার শুরু থেকে ওই সিকিউরিটি কর্মচারী তার সঙ্গে ছিল। খুনের পর আর সিকিউরিটি কর্মচারীর সঙ্গে তার দেখা হয়নি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গতকাল আদালতপাড়ায় সাংবাদিকদের কাছে জানিয়েছেন, পুলিশের কাছে ওই সিকিউরিটি কর্মচারীর পরিচয় বলেছে গেদা। কিন্তু গোপনীয়তা স্বার্থে তারা তার পরিচয় প্রকাশ করছেন না। তবে, তাকে গ্রেপ্তারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে, আদালতে টানা আড়াই ঘণ্টা জবানবন্দি গ্রহণের পর বিকাল ৫টার দিকে গেদাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এদিকে, আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত ৩ জনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিল। আর বাকি দুজন এখনও গ্রেপ্তার হয়নি। তাদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ ইতিমধ্যে বেশ কয়েক জায়গায় অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। কোতোয়ালি থানা পুলিশ জানিয়েছে, পলাতক দুজনের পরিচয় শুরুতেই পাওয়া গেলে তাদের গ্রেপ্তার সহজ হতো। এরপরও পুলিশ তাদের গ্রেপ্তারে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে বলে জানায়। সিলেটের শাহমীর (রহ.) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্র আবু সাঈদ। ১১ই মার্চ তাকে অপহরণের পর ১৪ই মার্চ পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। লাশ উদ্ধারের দিন থেকেই উত্তপ্ত রয়েছে সিলেটে। আবু সাঈদের খুনের প্রতিবাদে প্রতিদিনই সিলেটে হচ্ছে বিক্ষোভ। ঘাতকদের ফাঁসির দাবি করছে সর্বস্তরের মানুষ। গতকালও রায়নগর এলাকায় ৫ এলাকার মানুষ গণমছিল ও সমাবেশ করে। সমাবেশ থেকে ঘাতকদের ফঁসির দাবি করা হয়। এ সময় বক্তারা বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, তাদের সোর্স এবং ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠনের নেতারা মিলে অপরাধ সিন্ডিকেট গড়েছিল। আর তাদের অপরাধের কাছে হার মানলো বিবেক। বক্তারা এ ঘটনার দৃষ্টান্দমূলক শাস্তির দাবি তুলে বলেন, অপহরণ ও খুনের ঘটনাকারীদের ফাঁসি না হলে কেউ নিরাপদ থাকবে না। ভবিষ্যতে এরকম আরও অনেক ঘটনা ঘটতেই থাকবে। স্থানীয় লোকজনের গণমিছিলটি রায়নগর পয়েন্ট থেকে শুরু হয়ে শহরের বিভিন্ন প্রদক্ষিণ করে কুমারপাড়া পয়েন্টে পথসভায় মিলিত হয়। মো. মতিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও মো. ইউনুছ আহমদের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, নাহেদ আহমদ, মাসুক গাজী, শিপলু আহমদ, সোলেমান মিয়া, জামাল উদ্দিন, সারোয়ার, নাচু, সুমন মিয়া, রোমন মিয়া, আউয়াল, লুকু, আশরাফুজ্জামান আজম, ছালামিন মিয়া, ফরহাদ, রিপন, আনোয়ার, রিয়াদ, অর্ঘ, নূর মিয়া, পাপ্পু, রাজু মিয়া, নাছিম, কবির প্রমুখ।