Tuesday, June 2, 2015

সম্পর্ককে কাঁটাতারের বাইরে নিতে হবে : এম হুমায়ুন কবির by ফারুক ওয়াসিফ

হুমায়ুন কবির
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর সামনে রেখে প্রথম আলো মুখোমুখি হয় বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার দেব মুখার্জি ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফারুক ওয়াসিফ
প্রথম আলো :  ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে আসছেন। গণমাধ্যমে এটা এমনভাবে উপস্থিত, যেন বিষয়টি দুই নেতা ও দুই দলের।
হুমায়ুন কবির : আসলে সম্পর্কটা হয় দুই দেশ ও দুই জনগণের মধ্যে। সরকার এখানে মাধ্যম। সরকার বদলায়, কিন্তু জনগণ থাকে এবং দেশের প্রধান শক্তি হচ্ছে জনগণ। তাই সরকার পরিবর্তন হলেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কটা থাকে। তাই সম্পর্কটা দুই দেশের সরকার ও জনগণের মধ্যে হতে হবে। সেই ভিত্তিতেই একাত্তর সালে দুই দেশ ও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক হয়েছিল। কিন্তু পরে সমস্যা হওয়ার কারণ, সম্পর্কটা শুধু সরকারি পর্যায়ে বা দলীয় স্তরে চলে গেলে অ্যালিয়েনেশন বা দূরত্ব তৈরি হয়।
প্রথম আলো : ভারতের নিরাপত্তা নীতিতে প্রায়ই বাংলাদেশ সমস্যা হিসেবে হাজির হয়; অন্যদিকে বাংলাদেশ কিছু বকেয়া সমস্যা সমাধানে আগ্রহী। একদিকে স্থলসীমান্ত চুক্তি, আরেক দিকে কাঁটাতারের বেড়া। একদিকে অনুকূল বাংলাদেশ, অন্যদিকে ভারতে বাংলাদেশি নাগরিক ও পণ্য চলাচলে বাধা। এই দ্বিধা কাটানোর উপায় কী?
হুমায়ুন কবির : কোনো দুই রাষ্ট্রের স্বার্থ একই হবে, তা মনে করার কারণ নেই। ভারত বড় দেশ, তার নিজস্ব স্বার্থ, অভিপ্রায় ও লক্ষ্য আছে। বাংলাদেশেরও তেমনটাই আছে। তবে প্রতিযোগিতা ও ভিন্নতা যেমন থাকতে পারে, তেমনি সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের সুযোগও বিস্তর। ভারত অনেকগুলো বিষয়ে বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল। যেমন নিরাপত্তা প্রশ্নে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ যথেষ্ট ইতিবাচকভাবে হাত বাড়িয়েছে। স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুসমর্থিত হওয়ায় আরও একটা বড় সমস্যা কমল। দ্বিতীয় বিষয়টা বিশ্বাসের। ভারতকে উপলব্ধি করতে হবে যে কাঁটাতার বন্ধুত্বের ভালো নিদর্শন নয়। কাজেই বাংলাদেশকে যদি ভারত বিশ্বাসভাজন বন্ধু বা অংশীদার ভাবে, তাহলে কাঁটাতারের বেড়ার কী প্রয়োজন? আমরা এখন পরস্পরের আস্থা অর্জনে সচেষ্ট আছি, সুতরাং সম্পর্ককে কাঁটাতারের বাইরে নিতে হবে। তৃতীয়ত, পরস্পরের জনশক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ বাড়াতে হবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ভারতের অন্যতম বিদেশ থেকে অর্থ প্রেরণকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর কারণ, অনেক ভারতীয় বাংলাদেশে কাজ করে।
প্রথম আলো : বাংলাদেশিরাও কি একইভাবে আইনি প্রক্রিয়ায় পারমিটের মাধ্যমে ভারতে কাজে যেতে পারে না?
হুমায়ুন কবির : কাঁটাতারের বাইরে সম্পর্ককে নিতে হলে এই দিকে ভাবতে হবে। ভারতের অনেক জায়গাতেই বাইরের শ্রমিকের কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ভারতের সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী এল কে আদভানি বলেছিলেন, বাংলাদেশের কেউ আগ্রহী হলে ভারতে অস্থায়ীভাবে কাজ করার সুযোগ পেতে পারে। মোদি এ ব্যাপারে উদ্যোগী হতে পারেন। ভারত সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষের ধারণা তাহলে আরও ইতিবাচক ও স্বচ্ছ হবে এবং ভারত যে আমাদের ইতিবাচক অংশীদার, সেটাও মানুষের কাছে প্রমাণ করা সম্ভব হবে।
প্রথম আলো : গত সাত-আট বছরের অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশে ভারতের সেই ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি?
হুমায়ুন কবির : খানিকটা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে গত নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে শক্তিশালী করায় উভয় দেশেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে শক্তিশালী, অংশগ্রহণমূলক ও কার্যকর গণতন্ত্র ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে শক্তিশালীই করবে। শেষ বিচারে, মানুষই কিন্তু নীতির সমর্থক বা প্রতিবন্ধক। যেহেতু আমরা প্রতিবেশী, যেহেতু আমাদের ভাগ্য প্রায় একে অপরের সঙ্গে জড়িত, যেহেতু আগামী দিনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোও একই সূত্রে গাঁথা, সেই বিবেচনায় আগামী দিনের প্রেক্ষাপটে মানুষের অংশগ্রহণ ও ব্যাপক জনসমর্থনই কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সহযোগিতার রক্ষাকবচ।
প্রথম আলো : বর্তমানে দুই দেশের যান চলাচল নিয়ে যে কথা হচ্ছে, সেটা কি আগের একমুখী ট্রানজিট সম্পূর্ণ করার অংশ? নাকি তার মধ্যে বাংলাদেশের চাহিদা মেটানোরও শর্ত আছে। নেপাল-ভুটান কিংবা আরও দূরবর্তী দেশের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন তো বাংলাদেশেরও আছে।
হুমায়ুন কবির : অসম্পূর্ণ ট্রানজিটের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করাও যেমন আছে, আরও কয়েকটি স্তরও আছে। নীতিগত দিক থেকে বাংলাদেশেরও তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার দরকার আছে। বিশ্বায়িত পৃথিবীতে আমরা যদি আমাদের কাজ, বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং মানুষে–মানুষে যোগাযোগের জন্য যদি বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ চাইতে পারি, তাহলে প্রতিবেশীদের সঙ্গেও তা হওয়া প্রয়োজন। সেই বিবেচনাতেই আঞ্চলিক যোগাযোগের বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। এবারেও এ ব্যাপারে বেশ কিছু চুক্তিও প্রধানমন্ত্রী মোদির সফরের সময় সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। ভারত তার স্বার্থে সুবিধা চাইবে, এটা দোষের কিছু না। তবে আমাদের চাওয়াকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব এবং মানুষের সামনে তুলে ধরব? এটা স্তরে স্তরে হওয়া উচিত। যেমন: ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য বাংলাদেশকে ব্যবহার করতে চায়। এতে বাংলাদেশের সহযোগী হওয়া উচিত। পরের স্তরে নেপাল-ভুটানকে নিয়ে সড়ক-রেল যোগাযোগের যে কথা উঠছে, সেটাও ইতিবাচক। মনে রাখতে হবে, আরও বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে আমরা তিনটি শক্তিকে উত্থানের মুখে দেখতে পাচ্ছি: চীন, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্মিলিত সংস্থা তথা আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো। ভারতের সঙ্গে যে কানেকটিভিটির কাজ আমরা করছি, তা হলো প্রথম স্তর। দ্বিতীয় স্তরে যেতে হলে বাংলাদেশকে আসিয়ানের সঙ্গে কানেকটিভিটি তৈরি করতে হবে, তৃতীয় স্তরে করতে হবে চীনের সঙ্গে। ভারতের হয়তো এ ব্যাপারে স্পর্শকাতরতা আছে। আমি মনে করি, ভারতের সঙ্গে যাদের প্রতিযোগিতা আছে তাদের হয়ে নয়, বরং সবার মধ্যে সেতুবন্ধ রচনার সুযোগটা বাংলাদেশের জন্য রাখতে হবে এবং বাংলাদেশেরও যথাযথভাবে এই দৃষ্টিভঙ্গিটা তুলে ধরতে হবে।
প্রথম আলো : জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ভারতের সঙ্গে আমাদের কোথায় কোথায় সহযোগিতা হতে পারে, সে বিষয়ে যথেষ্ট গবেষণা আমাদের কি আছে?
হুমায়ুন কবির : ভারতের সঙ্গেই আমাদের থাকতে হবে যেহেতু, সেহেতু তাকে তো বুঝতে হবে। ভারতে গত ৩০ বছরে যেভাবে পরিবর্তন হয়েছে, তার যথাযথ মূল্যায়ন ও উপলব্ধি থাকতে হবে। এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে ভারতকে বোঝায় আমাদের ঘাটতি আছে।
প্রথম আলো :ইদানীং দেখা যাচ্ছে, ভারতের নেতারা যখন আমাদের দেশে আসেন, তার সঙ্গে বা আগে-পিছে তাঁদের নায়ক-নায়িকা ও শিল্পী-সাহিত্যিকেরাও আসেন। একে কোন ধরনের কূটনীতি বলবেন?
হুমায়ুন কবির : ভারত তার রাষ্ট্রশক্তি তথা হার্ড পাওয়ারের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক শক্তি তথা সফট পাওয়ারকেও আমাদের সামনে প্রদর্শন করছে। তাদের টেলিভিশন, সিনেমা এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন নিয়েই তারা বাংলাদেশে উপস্থাপিত হয়। এবং ভারত এটা করে দলীয় চিন্তার বাইরে। বিপরীতে আমরা আমাদের যে সাংস্কৃতিক শক্তি ও রসদ আছে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চমৎকার সব আইডিয়া আছে—যা আমাদের যথেষ্টভাবেই আছে—সেগুলোকেও দলনিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করা চাই। আমরা দলীয়করণ ও রাজনৈতিকীকরণের মাধ্যমে এই সাংস্কৃতিক শক্তিকে দুর্বল করে রাখছি। ভারত কিন্তু সেটা করে না। ভারতের এই সার্থকতা থেকে আমাদেরও শিখতে হবে যে, কীভাবে আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক সক্ষমতাকে কাজে লাগাব।
প্রথম আলো : সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপে ভারত ও চীনের রেষারেষিতে অস্থিতিশীলতা আসছে। বাংলাদেশেও কি অনুরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে?
হুমায়ুন কবির : ভারতকে এটা চিন্তায় আনতে হবে, ভারত-চীনের লড়াই প্রতিবেশী দেশগুলোর স্থিতিশীলতার প্রতি কোনো হুমকি যেন না হয়। অন্যদিকে ভারত-চীনের লড়াইয়ের পাশাপাশি সহযোগিতাও তো আছে। এই সহযোগিতার ক্ষেত্রে প্রবেশ করে আমরা সবার জন্যই অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারি এবং প্রতিবেশীরাও তাতে উপকৃত হতে পারে। এই ইতিবাচক ধারণাকাঠামোকে আমাদের প্রাধান্যের মধ্যেও নিয়ে আসতে হবে। যাতে ভয় থেকে বেরিয়ে এসে সহযোগিতার মাত্রা বাড়াতে পারি। অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী দেশ হিসেবে আমাদের এ বক্তব্য সামনে আনা উচিত। সমৃদ্ধ বাংলাদেশ, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, স্থিতিশীল বাংলাদেশ, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব নিয়ে চলা বাংলাদেশ শুধু ভারতের জন্যই নয়, উপমহাদেশের জন্যও বিরাট অবদান রাখতে পারে।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
হুমায়ুন কবির  ধন্যবাদ।

উচ্চমাত্রায় নিয়ে যাবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক : দেব মুখার্জি by সোহরাব হাসান

দেব মুখার্জি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর সামনে রেখে প্রথম আলো মুখোমুখি হয় বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার দেব মুখার্জি ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাব হাসান
প্রথম আলো :  ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন বাংলাদেশ সফরকে কীভাবে দেখছেন?
দেব মুখার্জি : প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এমন একসময়ে বাংলাদেশ সফরে যাচ্ছেন, যখন দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের যে উদ্বেগ ছিল, তা দূর করতে বাংলাদেশ কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নে বহু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্থলসীমান্ত চুক্তি যার সাম্প্রতিক ও উল্লেখযোগ্য ঘটনা। নরেন্দ্র মোদির দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের অঙ্গীকারের পরিপ্রেক্ষিতে আমি আশা করব, এই সফর বাংলাদেশ-ভারতের বর্তমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের উচ্চমাত্রায় নিয়ে যাবে।
প্রথম আলো : মোদির সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা সংযোগ (কানেকটিভিটি)। বহু বাংলাদেশি মনে করে এতে ভারতই বেশি লাভবান হবে।
দেব মুখার্জি : আমি মনে করি, সফরের উদ্দেশ্য বহুমাত্রিক। দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর ও জোরদার করাই এ সফরের উদ্দেশ্য। সংযোগ (কানেকটিভিটি) অবশ্যই ভারতের স্বার্থের একটি এলাকা। কাঠমান্ডুতে গত সার্ক শীর্ষ বৈঠকে দক্ষিণ এশিয়ার সব ভ্রাতৃপ্রতিম দেশই এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। আপনার মনে হয়তো বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতে যাওয়ার বিষয়টি রয়েছে, সেটি অবশ্যই ভারতের স্বার্থ। এটি বাংলাদেশেরও স্বার্থরক্ষা করবে, তারা পণ্য পরিবহনের জন্য যেমন ফি পাবে, তেমনি তার অবকাঠামোরও উন্নয়ন হবে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ভারতের মধ্যে দিয়ে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে সংযোগ (কানেকটিভিটি) সুবিধা লাভ করেছে। অংশীদারেরা ঐকমত্য পোষণ করলে পশ্চিমের দিকেও এটা সম্প্রসারিত হতে পারে। আমি মনে করি না, সহযোগিতার ক্ষেত্রে কেউ অধিক সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি চিন্তা করে। এটি দেখতে হবে সামগ্রিক সম্পর্কের ভিত্তিতে।
প্রথম আলো : দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যবৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে? বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা প্রায়ই নন-ট্যারিফ বাধার অভিযোগ এনে থাকেন।
দেব মুখার্জি : বাণিজ্যবৈষম্য ও নন-ট্যারিফ বাধা দুটো ভিন্ন বিষয়। আমি এটা বুঝতে অপারগ যে কোনো দেশ বাণিজ্যবৈষম্যের অভিযোগ আনতে পারে। আমরা এখন পণ্য বিনিময়ের যুগে নেই। কয়েক দশক আগ পর্যন্ত পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে যা ছিল, সেটাও এখন নেই। প্রতিটি দেশই পণ্য আমদানি করে তার প্রয়োজনের ভিত্তিতে, যেখান থেকে সে সুবিধা পাবে। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বিরাট বাণিজ্যবৈষম্য আছে, যেখান থেকে আমরা তেল আমদানি করে থাকি। আমি যদি ভুল না করে থাকি বাংলাদেশ ভারত থেকে অনেক পরিমাণে তুলা ও সুতা আমদানি করে থাকে। এটা তাদের রপ্তানির আয় বাড়ায়। বাজার ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটলে, বাংলাদেশ পাকিস্তান বা উজবেকিস্তান বা অন্য কোথাও থেকে এটি আমদানি করবে। বেলজিয়ামের সঙ্গেও ভারতের বিরাট বাণিজ্যবৈষম্য আছে। যেখান থেকে আমরা কাচা হীরক আমদানি করি এবং পরবর্তীকালে তা পরিশীলিত আকারে অন্যান্য
দেশে রপ্তানি করি। সেখান থেকে আমরা মুনাফাও করি অনেক। যদি সমসুযোগ থাকে তাহলে অভিযোগের অবকাশ থাকে না। তবে আমি এটাও মনে করি, বাণিজ্যবৈষম্য নিয়ে কোনো দেশই সন্তোষজনক অবস্থায় নেই। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, সমসুযোগ ও বৈষম্যহীন পরিস্থিতি ধরে রাখা। রপ্তানিকারক দেশকে তার পণ্য প্রতিযোগিতার মাধ্যমে রপ্তানি করতে হবে।
আপনি যে নন-ট্যারিফ বাধার কথা বলেছেন। বাংলাদেশ যদি মনে করে, তাদের উৎপাদিত পণ্য ভারতীয় বাজারে প্রবেশে অন্যায্যভাবে বাধা দেওয়া হচ্ছে, তাহলে সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং তার প্রতিকার হওয়া উচিত। আমি এর সঙ্গে যোগ করতে চাই, ভারত বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার পর ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে।
বাণিজ্য কখনো প্রতিশ্রুতি দেয় না, ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করে না। বাজারব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এটি ওঠানামা করে। বাণিজ্য দুই দেশের মধ্যে অংশীদারি ও আন্তনির্ভরতার বন্ধন তৈরি করে না। বাণিজ্য বৃদ্ধি অবশ্যই একটি দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো, ভোক্তা ও ব্যবসায়ীর চাহিদা অনুসারে এটা ঘটে থাকে। আমার মত হলো, আমাদের বিনিয়োগের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। এটা দুই অংশীদারের উন্নয়ন ও কল্যাণ নিশ্চিত করে তাদের বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারে। নানা কারণে বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগের পরিমাণ বেশি নয়। ভারত সরকারের উচিত ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করা। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার ও শিল্পের উচিত হবে বড় আকারে ভারতীয় বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো। বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগ কেবল অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর জন্য পণ্য উৎপাদন করবে না বরং তা ভারতেও শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে রপ্তানি হবে।
প্রথম আলো : গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি যখন সই হয়, তখন আপনি বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার ছিলেন। এরপর ১৯ বছর পর স্থলসীমান্ত চুক্তিটি ভারতীয় সংসদে অনুমোদন পেল। এত দীর্ঘ সময় লাগল কেন?
দেব মুখার্জি : অনুমোদনের জন্য সীমানা চিহ্নিতকরণের নানা জটিল ও কষ্টসহিষ্ণু প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। মাঠের পরিস্থিতি বিবেচনায় ১৯৭৪ সালের সীমান্ত চুক্তির কিছু সংশোধনও করতে হয়েছে, যা ২০১১ সালের প্রটোকলে সংযুক্ত করা হয়েছে। সংসদে চুক্তির নবায়ন না হওয়া সব সময় খবর হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোনো দেশের সরকারের পক্ষ থেকেই এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। দুই দেশের সম্পর্কও সব সময় এমন অবস্থায় ছিল না, যাতে এটি আনা যায়। এ ছাড়া তিন বিঘাসহ কিছু এলাকা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধিতাও ছিল। আমার ধারণা, ২০১০ সালেই প্রথম এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে সামনে নিয়ে আসা হয়। ঔপনিবেশিক শাসনের নির্বোধ দায় ঘোচানোর জন্য দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কূটনীতিক এবং মাঠপর্যায়ে যাঁরা কাজ করেছেন, আমি তাঁদের ধন্যবাদ দেব।
প্রথম আলো :দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন কী কী বিষয় অগ্রাধিকার পেতে পারে? পানিবণ্টন, জ্বালানি সহযোগিতা বা অন্য কিছু?
দেব মুখার্জি : দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নের নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে আমি আশা করব, দুই সরকারপ্রধান ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট অন কো-অপারেশন ফর ডেভেলপমেন্ট অনুসরণ করবেন। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরকালে এটা স্বাক্ষরিত হয়। এতে পারস্পরিক সহযোগিতার সব ক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অবকাঠামো ও যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। জ্বালানি ক্ষেত্রেও ইতিমধ্যে ভালো অগ্রগতি হয়েছে, এটিকে আরও বাড়ানো যেতে পারে।
নদীর পানিবণ্টনের ক্ষেত্রে আমাদের স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। গঙ্গার পানিবণ্টন সমস্যার সমাধান পেতে কয়েক দশক লেগেছে। তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণে এই চুক্তি সম্ভব হয়েছে। একইভাবে আমি আশা করব, তিস্তার ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। কিন্তু আমরা ৫০টির বেশি নদীর পানিবণ্টনের সমাধান বের করতে শত বছর অপেক্ষা করতে পারি না। প্রকৃত ঘটনা হলো, বাংলাদেশ–ভারত উভয়েরই পানির সমস্যা আছে। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় এর কৃষি, নৌপরিবহন, মৎস্য, বাস্তুতন্ত্র, লবণাক্ততা রোধের ব্যাপারে নদীর ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে ভারতের ৩০ কোটি মানুষ গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল। এই সংখ্যাটা বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। পানি ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। দুই দেশকেই খুঁজে বের করতে হবে, কীভাবে পানির সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যায়। এসব নদীর পানির একটা অংশ আসে নেপাল, চীন ও ভুটান থেকে। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহের ২০ শতাংশ আসে চীনের তিব্বত থেকে। পানিবণ্টনে এসব দেশের সক্রিয় অংশগ্রহণও থাকা দরকার। যেটা আমি আগেও বলেছি, সে ক্ষেত্রে ভারত এর পুরো মালিকানা দাবি করতে পারে না। যদিও প্রতিবেশী দেশগুলো এমনটিই মনে করে। আবার বাংলাদেশও বলতে পারে না, চিরদিন তারা একই রকম প্রবাহ পাবে। এখানে দেওয়া-নেওয়া থাকতে হবে, একে অপরের সমস্যা বুঝতে হবে।
প্রথম আলো : বিজেপি নেতা রাজনাথ সিং বলেছেন, শিগগিরই তিস্তার পানিবণ্টন সমস্যার সমাধান হবে। এই শিগগিরই কবে শেষ হবে?
দেব মুখার্জি : আমি আন্তরিকভাবে আশা করি খুব দ্রুত।
প্রথম আলো : সীমান্তে বেসামরিক নাগরিক হত্যা বন্ধ হচ্ছে না কেন?
দেব মুখার্জি : সীমান্তে হত্যা গভীর বেদনাদায়ক এবং এটি হওয়া উচিত নয়। আমরা কিশোরী ফেলানীর মৃত্যুর বিষয়টি অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে স্মরণ করি। ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের গুলি ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়ার পর আমার বিশ্বাস সীমান্তে হতাহতের ঘটনা অনেক কমেছে। সীমান্তে বাংলাদেশ-ভারত উভয়ের নাগরিক মারা যাচ্ছে। সীমান্তের দুই পাশে মাফিয়া চক্রের চোরাচালান হচ্ছে সমস্যার মূল। গরুর পাশাপাশি মাদক ও ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র বাংলাদেশে চোরাচালান হয়ে যাচ্ছে। দুই সরকারের দায়িত্ব এই চোরাচালান বন্ধ করা। চোরাচালানিরা সব সময় সশস্ত্র থাকে এবং প্রায়ই সীমান্তরক্ষীদের ওপর হামলা চালায়। সমস্যার মূল কারণ দূর না করতে পারলে আমি মনে করি না সীমান্তের সহিংসতা বন্ধ হবে। তবে গুলি ব্যবহার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে আসা উচিত। কিন্তু আমাদের আলোচনায় এটা মনে হওয়া উচিত নয় যে সীমান্তে যারা অপরাধ সংঘটিত করে, আমরা তাদের সমর্থন করছি।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ
দেব মুখার্জি : ধন্যবাদ।

নির্বাচন এখন নির্বাসনে! by সোহরাব হাসান

একটি রাষ্ট্র তখনই গণতান্ত্রিক হয়, যখন তার প্রতিটি অঙ্গ ও প্রতিষ্ঠান সংবিধান মোতাবেক চলে বা চলতে দেওয়া হয়। আমাদের রাষ্ট্রের চালকেরা এ ব্যাপারে সব সময়ই অনুদার ছিলেন এবং এখনো আছেন। ফলে স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও আমরা রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ (নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইনসভা) এবং তার অধীন প্রতিষ্ঠানগুলো সংহত করতে পারিনি। বরং ঔপনিবেশিক আমলে যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল, সেসব প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক কাঠামোটিও এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। গ্রিসের নগর রাষ্ট্রে সব নাগরিককে এক জায়গায় ডেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো, কিন্তু বর্তমান যুগে সেটি তো সম্ভব নয়। এ কারণেই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনপ্রতিনিধি বাছাই বা নির্বাচন প্রথা চালু আছে। পৃথিবীতে এমন একটি দেশ দেখানো যাবে না, যেখানে গণতন্ত্র আছে, অথচ নির্বাচন নেই। অথচ আমাদের নেতা–নেত্রীরা সেই নির্বাচনকেই নির্বাসনে পাঠানোর সমস্ত আয়োজন করেছেন।
বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে নির্বাচনমুখী হলেও এখন সেটি আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। আগে এই আতঙ্কটা জাতীয় নির্বাচনেই সীমিত ছিল, এখন তা বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনেও ছড়িয়ে পড়েছে। এফবিসিসিআই নির্বাচন সম্পর্কে গতকাল সহকর্মী শওকত হোসেন লিখেছেন, যার মোদ্দাকথা হলো সরকারের সমর্থন ছাড়া কেউ এই সংগঠনের শীর্ষ পদে জয়ী হবেন, এমনটি ভাবতে পারেন না। বছর দুই আগে অনুষ্ঠিত বিএমএ (বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন) নির্বাচনে সরকার-সমর্থক চিকিৎসকেরা জয়ী হলে বিরোধী পক্ষ ভোট কারচুপির অভিযোগ আনে। অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচন নিয়েও। প্রথম আলোয় এ-সংক্রান্ত রিপোর্ট ছাপা হলে সংশ্লিষ্টদের টনক নড়ে।
আমরা সাংবাদিকেরা দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের গণতন্ত্রায়ণের কথা বললেও নিজেদের যে প্রতিষ্ঠান জাতীয় প্রেসক্লাব, তার গণতন্ত্রায়ণের কথা ভাবি না। এই প্রতিষ্ঠানে বহু সদস্য আছেন, যাঁরা ১৫-২০ বছর আগে সাংবাদিকতা পেশা থেকে বিদায় নিয়েছেন। আবার একটানা ২০-২২ বছর ধরে সাংবাদিকতা পেশায় থেকেও অনেকে প্রেসক্লাবের সদস্য হতে পারেন না। প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়ার জন্য কে কত বছর সাংবাদিকতা করেছেন, সেটি বিবেচ্য নয়, বিবেচ্য হলো পরিচালনা কমিটির ‘রহমত’ আছে কি না। বর্তমানে প্রেসক্লাব নির্বাচন নিয়ে যে জটিলতা দেখা দিয়েছে, তার মূলে রয়েছে কোটারি স্বার্থ। এই কোটারি স্বার্থই প্রখ্যাত কবি ও অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলার সম্পাদক শামসুর রাহমানের সদস্যপদও আটকে দিয়েছিল। মাননীয় হাইকোর্ট বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচন স্থগিত করেছেন ত্রুটিপূর্ণ ভোটার তালিকার কারণে। আমরা মনে করি, ব্যক্তিবিশেষের সঙ্গে ব্যক্তিবিশেষের সমঝোতা প্রেসক্লাবে নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান দেবে না। প্রতিষ্ঠানকে দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, পেশার জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রকৃত সাংবাদিকদের প্রেসক্লাবের সদস্যপদ দিতে হবে।
গত ২৮ এপ্রিল তিন সিটি করপোরেশনের (ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম) যে নির্বাচন হয়ে গেল, তাতে এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়েই জনমনে প্রবল সন্দেহ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। নির্বাচন মানে সবার মধ্য থেকে পছন্দসই প্রার্থী বাছাই করার সর্বজনীন প্রক্রিয়া, যা এখানে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় সরকার সংস্থার এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতে যে সুবাতাস বইতে পারত, তা সরকার, সরকারি দল ও নির্বাচন কমিশন নস্যাৎ করে দিয়েছে। নির্বাচনে নানা অনিয়ম, কারচুপি নিয়ে যারাই সমালোচনা করছে, ক্ষমতাসীনেরা তাদের ওপর খড়্গহস্ত। ভোট কারচুপির কথা এলেই কথায় কথায় তাঁরা জিয়াউর রহমান ও এরশাদের তথাকথিত ‘গণভোটের’ উদাহরণ দেন। এ দেশে আইয়ুব থেকে এরশাদ—সামরিক শাসকের কোনো নির্বাচনই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এসব জবরদস্তির নির্বাচনে জনরায়ের প্রতিফলন ঘটেনি। সামরিক শাসকেরা জনগণের রায় নিয়ে ক্ষমতায় আসেন না। তাঁরা ক্ষমতাকে জায়েজ করতে দুটি কাজ দক্ষতার সঙ্গে করেন। এক. বিরোধী দল থেকে লোক ভাগিয়ে এনে নতুন দল করা, দুই. যেনতেন নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ গঠন করে নিজেদের অপকর্ম জায়েজ করেন।
ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগও করা হয় যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়ী হয়েছেন বলেই নাকি গণমাধ্যম, টিআইবি ও নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো ঈর্ষান্বিত হয়ে তাদের পেছনে লেগেছে। বিএনপি প্রার্থীরা জয়ী হলে সবাই চুপ মেরে যেতেন। তাঁদের এই ধারণা ও অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য। গণতন্ত্র পরাজিত হয়েছে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়ী হয়েছেন বলে নয়। গণতন্ত্র পরাজিত হয়েছে নির্বাচনে ভোটাররা স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি বলে। আওয়ামী লীগ নেতাদের মনে থাকার কথা ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে যখন তাঁরা জয়ী হন, তখন দেশের তাবৎ গণমাধ্যম, দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক সেই নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে সাধুবাদ জানিয়েছিল। খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের আমলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়ে গণমাধ্যম কীভাবে দেখেছে, তা-ও ক্ষমতাসীনদের ভুলে যাওয়ার কথা নয়। সমস্যা হলো সাদাকে সাদা ও কালোকে কালো বলা অনেকেই পছন্দ করেন না। বিশেষ করে, যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন। বিএনপি আমলে মাগুরা উপনির্বাচন ও ঢাকা-১০ উপনির্বাচন কিংবা আওয়ামী লীগ আমলের টাঙ্গাইল উপনির্বাচনে গণতন্ত্র সত্যি সত্যি পরাজিত হয়েছিল।
আমাদের প্রশ্ন, যে কাজ ক্ষমতা জবরদখলকারী সামরিক শাসকেরা করেন, সেই কাজ কেন জনগণের মধ্য থেকে উঠে আসা আওয়ামী লীগ করবে? সিটি নির্বাচনে এবার যে পরিমাণ কারচুপি, অনিয়ম ও জবরদস্তি হয়েছে, তার খুব সামান্যই এসেছে গণমাধ্যমে। কিন্তু সেটিও ক্ষমতাসীনেরা সহ্য করতে পারছেন না। তাঁদের দাবি, বিএনপি কারচুপি করলে নাকি গণমাধ্যম মুখে কুলুপ এঁটে থাকে, আর আওয়ামী লীগ আমলে কিছু ঘটলেই হইচই শুরু হয়। তাঁরা এই অভিযোগের পক্ষে একটি প্রমাণও দেখাতে পারবেন না।
অনেক হতাশার মাঝেও মানুষ সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে একটু আশার আলো দেখতে চেয়েছিল। তারা ভেবেছিল, সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ হলে ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে সুস্থিরতা আসবে। কিন্তু আসেনি। আওয়ামী লীগ একটি বড় সুযোগ হারাল। সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী, দেশে এক মুহূর্তের জন্যও অনির্বাচিত সরকার দ্বারা পরিচালিত হতে পারবে না। কিন্তু নির্বাচিত সরকারকে তো প্রমাণ করতে হবে যে তাদের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া সম্ভব। ১৯৯৫–৯৬ সালে বিএনপি সেটি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল বলেই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা এসেছিল। উচ্চ আদালতের রায়ে সেটি বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু এবার আওয়ামী লীগ যখন ব্যর্থ হলো, তখন বিকল্প কী? ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে ক্ষমতাসীনেরা দাবি করেন, বিএনপি আসেনি বলেই তারা একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভালো নির্বাচন করতে পারেননি। মানলাম। কিন্তু সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ সত্ত্বেও কেন নগরবাসীরা ভোট দিতে পারলেন না? তিন মাসের পেট্রলবোমা মারা আন্দোলন করে যখন বিএনপি সর্বমহলে নিন্দিত ও ধিক্কৃত, তখনই নির্বাচন কমিশন কৌশল হিসেবে তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। ক্ষমতাসীনেরা সম্ভবত ভেবেছিলেন বিএনপি নির্বাচনে আসবে না। কিন্তু তাদেরও একটি এক্সিট দরকার ছিল এবং নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি কথা প্রায়ই বলেন। বিএনপি ও জামায়াত তিন মাস ধরে পেট্রলবোমা মারা আন্দোলন করার পরও মানুষ কীভাবে তাদের ভোট দেয়? দেয় এ কারণে যে মানুষ মনে করে, বিএনপি আগুনে–বোমা ছুড়ে দেশের যে ক্ষতি করেছে, আওয়ামী লীগ তার চেয়ে কোনো অংশে কম ক্ষতি করেনি। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, দুপুর ১২টা পর্যন্ত নির্বাচন করেই বিএনপি-সমর্থক তিন মেয়র প্রার্থীর ৩৫ শতাংশ ভোট পাওয়া অবাক কাণ্ডই বটে। তাই প্রধানমন্ত্রীকেই উপলব্ধি করতে হবে এত কিছুর পরও কেন মানুষ বিএনপি-জামায়াতকে ভোট দিচ্ছে। তাহলে কি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এমন কিছু করছেন, যা বিএনপির আগুনে–বোমার চেয়েও ভয়ংকর। প্রতিদিন পত্রিকা খুললে, টিভির সুইচ অন করলেই ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের তাণ্ডব দেখতে পাই। সাংসদের হাতে উপজেলা চেয়ারম্যান, এক কাউন্সিলরের হাতে আরেক কাউন্সিলর খুন হন। ছাত্রলীগ মারছে যুবলীগকে, যুবলীগ মারছে আওয়ামী লীগকে। সাংসদের হাতে নাজেহাল হচ্ছেন উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, ওসি। গত ছয় বছরে কোনো ক্যাম্পাসে ছাত্রদল নেই, শিবির দু-একটি ক্যাম্পাসে থাকলেও অনেক আগেই তাদের মাজা ভেঙে গেছে। সরকারবিরোধী আন্দোলনও এখন নেই। তাহলে দেশের বিভিন্ন স্থানে এই সন্ত্রাস কারা চালাচ্ছে? সেটি বনেদি আওয়ামী লীগারই হোক আর পিপিপি বা প্রেজেন্ট পাওয়ার পার্টির নবাগতই হোক, সরকার দায় এড়াতে পারেন না।
সরকারি দলের নেতারা পেট্রলবোমার জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করলেও এ পর্যন্ত সরকার কজনকে ধরেছে? লালবাগে কবজি উড়ে যাওয়া যুবদলের কর্মী কিংবা বোমাসহ আরও দু-একজনের বাইরে কাউকেই তারা ধরতে পারেনি। রাজশাহীতে দুই শিবির কর্মীকে ধরিয়ে দিয়েছে স্থানীয় মানুষ। তাতে পুলিশের তেমন কৃতিত্ব নেই। কিন্তু আমরা যখন দেখি বাসে পেট্রলবোমা মারার জন্য হিন্দু ছেলে নয়ন বছারকে ধরে পুলিশ শিবির কর্মী বানায় কিংবা তার ধর্ম পরিচয় প্রথমে তারা বিশ্বাসই করে না, পরে যখন জানা গেল সে প্রকৃত হিন্দু, তখন তাঁকে ছাত্রদলের কর্মী বানায়, তখন মানুষ কেবল ওই পুলিশের ওপরই বীতশ্রদ্ধ হয় না, আস্থা হারায় তাঁদের পরিচালনাকারী সরকারটির ওপরই। যখন পুলিশ পেট্রলবোমাবাজদের ধরতে না পেরে গয়রহ হাজার হাজার নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে, কিংবা বিরোধী দলের নেতাদের রিমান্ড দাবি করে, তখন বুঝতে বাকি থাকে না সরকারের ওপর মানুষ কতটা অনাস্থা প্রকাশ করে। একটি মিথ্যা মামলা ও অবিশ্বস্ত রিমান্ডের জন্য সরকারের কমপক্ষে ৫ শতাংশ করে ভোট কমছে। আর যতই সময় যাবে, ততই তার ভোট আরও কমতে থাকবে।
অনেক বছর আগে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবিচার দেখে নাট্যকার আবদুল্লাহ আল–মামুন লিখেছিলেন সুবচন নির্বাসনে। এখন সম্ভবত লেখার সময় এসেছে নির্বাচন নির্বাসনে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab০3@dhaka.net

অভিবাসীদের দ্বীপে সাংবাদিক ঢুকতে দিচ্ছে না মিয়ানমার

সাগরে ভাসমান ৭ শতাধিক অভিবাসীকে উদ্ধারের পর তাদের জনমানবহীন যে দ্বীপটিতে রাখা হয়েছে সেখানে সাংবাদিক প্রবেশ করতে দিচ্ছে না মিয়ানমার নৌবাহিনী। গত সপ্তাহে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ৭৪ নারী ও ৪৫টি শিশুসহ মালয়েশিয়াগামী ৭২৪ জন অভিবাসন প্রত্যাশীকে সাগর থেকে উদ্ধারের ঘোষণা দেয়। এরপর থেকেই ইরাওয়াদ্দি নদীর মোহনায় অবস্থিত থামি হ্লা নামের ওই দ্বীপটিতে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে আসছেন সাংবাদিকরা।
সাংবাদিকরা ছোট ছোট নৌকায় করে থামি হ্লা দ্বীপে প্রবেশের চেষ্টা করলে মিয়ানমার নৌবাহিনীর টহল সেনারা তাদের গতিরোধ করে ফেরত পাঠায়। এমনকি সাংবাদকিদের ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজগুলোও মুছে ফেলতে বাধ্য করা হচ্ছে বলে জানান পার্শ্ববর্তী দ্বীপ হায়ইগায়িতে অবস্থান করা বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদক। এছাড়া ফিরে আসা সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, আসার সময় তাদের কাছ থেকে পুনরায় ওই দ্বীপে প্রবেশের চেষ্টা না করার প্রতিশ্র“তি সংবলিত দলিলপত্রেও জোর করে স্বাক্ষর রাখা হয়েছে! নোবেলজয়ীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান : মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের গণহত্যার মতো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হচ্ছে বলে নোবেল বিজয়ীদের করা মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে দেশটির সরকার। তাদের দাবি, সরকার রাখাইন রাজ্যে বৌদ্ধ ও মুসলিমদের মধ্যে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে। খবর এপির। মিয়ানমারের পত্রিকায় রোববার প্রকাশ হওয়া দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এ ধরনের ভারসাম্যহীন ও নেতিবাচক মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করছে মিয়ানমার সরকার। এর আগে একদল নোবেল বিজয়ী এক বিবৃতিতে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর চালানো অত্যাচার গণহত্যার চেয়ে কম নয় বলে উল্লেখ করে। বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার ডেসমন্ড টুটু, ইরানের শিরিন এবাদি ও পূর্ব তিমুরের সাবেক প্রেসিডেন্ট জোসে রামোস হোর্তা রয়েছেন।
নোবেল বিজয়ীদের বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে পাল্টা বিবৃতি দেয়া হল। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, একচোখা হয়ে এ ধরনের মন্তব্য করা হয়েছে। রাখাইন রাজ্যে বৌদ্ধ ও মুসলিমদের মধ্যে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে মিয়ানমার সরকার। জাতীয়ভাবে নিরীক্ষার মাধ্যমে মিয়ানমারে অনেকদিন ধরে বসবাস করা ‘বাঙালিদের নাগরিকত্ব মঞ্জুর করা হবে’। মিয়ানমারে বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম রয়েছে। দেশটির বাইরে রয়েছে আরও প্রায় ১০ রোহিঙ্গা। দেশটির সরকার হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব স্বীকার করে না। তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। রাখাইন রাজ্যে বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গাদের ওপর হামলা চালিয়ে আসছে উগ্রপন্থী বৌদ্ধরা। ২০১২ সালে এ ধরনের এক দাঙ্গায় হাজারও রোহিঙ্গা নিহত ও দেড় লাখ গৃহহীন হয়। এ ঘটনার পর থেকে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন সংস্থা ও রাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়ার আহ্বান জানালেও মিয়ানমার সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে আসছে। সম্প্রতি আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে মানবপাচারকারীদের নৌকায় ভাসমান অবস্থায় কয়েক হাজার রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশীর সন্ধান পাওয়া যায়। এছাড়া থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় বিদেশ গমনেচ্ছুদের নির্যাতন শিবির এবং লাশ পাওয়ার ঘটনায় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়ার বিষয়টি আবারও উঠে এসেছে।

অস্থায়ী পাঠশালায় পাঠদান শুরু

ভয়াল ভূমিকম্পের ধকল কাটিয়ে অবশেষে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরছে নেপাল। ৩৫ দিন বন্ধ থাকার পর দেশটির হাজারও বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ আবারও মুখরিত হল শিশুদের প্রাণবন্ত পদচারণায়। ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হাজার হাজার স্কুলে সীমিত আকারের পাঠ কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। নেপালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লাভেদও অবস্তি বলেন, অস্থায়ী ক্লাস রুমগুলোতে আগামী দু’বছর পর্যন্ত ক্লাস চলবে। নতুন স্কুল ভবন নির্মাণের পর পুরোদমে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হবে।
তিনি আরও বলেন, শিশুদের বেশিক্ষণ বিদ্যালয়ে ধরে রাখা হবে না। মূলত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই শিশুদের শিক্ষাগত কার্যক্রম সীমিত রাখা হবে। শিশুদের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে ধাঁধা এবং ছবির বইসহ নানা বিনোদনমূলক শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করেছে জাতিসংঘ। গত ২৫ এপ্রিল ৭ দশমিক ৯ মাত্রার প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প এবং এরপর থেকে ধারাবাহিক মৃদু থেকে শক্তিশালী ভূকম্পনে দেশটির প্রায় ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং বিধ্বস্ত হয়েছে ২৫ হাজারেরও বেশি শ্রেণীকক্ষ। অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নতুন করে কাজ শুরু করেছে বাঁশ, কাঠ ও তারপুলিনের মতো নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহারের মাধ্যমে অস্থায়ী ভিত্তিতে। বিবিসি জানিয়েছে, দুর্যোগ-পরবর্তী মানসিক আঘাত থেকে শিশুদের বের করে নিয়ে আসার জন্য দলবদ্ধ কাজের ওপর প্রাথমিক পর্যায়ে গুরুত্ব দেয়া হবে। রাজধানী কাঠমান্ডু এবং এর আশপাশের জেলাগুলোতে মে মাসজুড়ে সব বিদ্যালয় বন্ধ রেখেছিল নেপাল সরকার। ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গোর্খা, সিন্ধুপালচক এবং নুয়াকোটে ৯০ শতাংশেরও বেশি বিদ্যালয় ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে। ২৫ এপ্রিল আঘাত হানা ভূমিকম্পে স্কুলগুলো ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর অনেক শিশু খেলার মাঠে বাঁশের তৈরি অস্থায়ী শ্রেণীকক্ষ বা তাঁবুতে শিক্ষা গ্রহণ করছে। ৮ বছর বয়সী সহজ শ্রেষ্ঠা তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে হেঁটে হেঁটে রাষ্ট্র পরিচালিত মদন স্মারক স্কুলে প্রবেশ করে। স্কুলটি কাঠমান্ডু উপত্যকায় অবস্থিত।
তার মা মিনা শ্রেষ্ঠা বলেন, ভূমিকম্পে তাদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তারা তাঁবুতে বাস করার পর থেকে ছেলেটি তাদের কাছ থেকে দূরে থাকতে এমনকি শৌচাগারে যেতেও ভয় পায়। তিনি আরও বলেন, ‘ভূমিকম্প-পরবর্তী কম্পন এখনও চলছে। তাদের স্কুলে পাঠিয়ে আমরা উদ্বেগের মধ্যে রয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘তবে শিক্ষকরা সেখানে শিশুদের নিরাপত্তার ব্যাপারে আমাদের আশ্বস্ত করেছে। তার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে এবং পুনরায় লেখাপড়া শুরু করলে অন্তত তার মন কিছুটা হলেও ভালো হয়ে যাবে।’ স্কুলের খেলার মাঠে বাঁশ দিয়ে শ্রেণীকক্ষ তৈরি করা হয়েছে। ইঞ্জিনিয়াররা ভূমিকম্পের পর যেসব ভবনকে ‘নিরাপদ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সেখানেও কিছু ক্লাস হচ্ছে। শিশুরা ছবি আঁকা ও খেলার সময় শিক্ষকরা তাদের পাশে বসে থাকেন। নয় বছর বয়সী মুসকান বজ চারিয়া বলে, ‘আমরা দীর্ঘদিন বাড়িতে ছিলাম। এখন আমার বন্ধুদের সঙ্গে আবার খেলাধুলা করতে পেরে খুবই ভালো লাগছে।’ উচ্চ শ্রেণীগুলোর ছাত্রছাত্রীরা ভূমিকম্পের সময় তাদের পরিবারের কি অবস্থা হয়েছিল বন্ধুদের কাছে তা বর্ণনা করে। শিক্ষা বিভাগের মহাপরিচালক দিল্লি রামরিমাল আগামী সপ্তাহগুলোতে আরও স্কুল খুলবে বলে আশা করছেন। এএফপি।

থাইল্যান্ডের উত্তরণ ব্যাহত হচ্ছে by থিতিনান পংসুধিরক

থাইল্যান্ডের ৮৩ বছরের সাংবিধানিক শাসনের ইতিহাসে দ্বাদশ সামরিক অভ্যুত্থানের এক বছর পর এবং অপরাধমূলক অবহেলার দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার বিতর্কিত বিচার শুরু হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির ভবিষ্যৎ খুব বিপজ্জনকভাবে অনিশ্চিত বোধ হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে দেশটিতে সামরিক বাহিনীর চাপানো শান্তির সঙ্গে রাজা ভূমিবল আদুলাদেজের প্রায় সাত দশকের শাসনামল-বিষয়ক ক্রমবর্ধমান উদ্বেগও সহাবস্থান করবে। আপস ও পারস্পরিক ছাড়, যেটি বর্তমানে খুবই বিরল, দেওয়ার ব্যাপারটির মধ্যে নির্বাচনী গণতন্ত্রের সদর্থক দিকগুলো কি ভালোভাবে প্রতিফলিত হবে? এর ফলে কি থাইল্যান্ডের যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে এত বিবাদ, তাতে কি পরিবর্তন আসবে? বর্তমানে এর গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করছে অভিজাতদের পরিচালিত রাজতন্ত্রকেন্দ্রিক আধিপত্য পরম্পরা।
বিগত কয়েক বছরে তিনটি প্রধান বিষয় থাইল্যান্ডের রাজনীতি নির্ধারণ করেছে। প্রথমত, ইতিপূর্বে অভ্যুত্থানের পর যে পরীক্ষিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা দেখা যেত, এবার তা অনুসরণ না করে গত মে মাসে জান্তা ক্ষমতা দখল করার পর সরাসরি শাসন পরিচালনার জন্য ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর পিস অ্যান্ড অর্ডারকে মনোনীত করে। আর অভ্যুত্থানের নেতা জেনারেল প্রায়ুত চান–ওচা পরিচিত ও সক্ষম মানুষকে মনোনয়ন না দিয়ে নিজে প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেন।
চার তারকা জেনারেলরা মন্ত্রিত্বের শীর্ষ পদগুলোতে আসীন হন, তাঁরা বাণিজ্য থেকে শুরু করে পরিবহন, শ্রম ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রীও একজন জেনারেল, তিনি পেশাদার কূটনীতিক নন। উপপ্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের নতুন টেকনোক্র্যাট ও অর্থমন্ত্রী ২০০৬-০৭ সালের সেনা অভ্যুত্থানের পরও একই পদে আসীন ছিলেন।
এই মনোভঙ্গির কারণে নতুন সেনা সরকার অসমন্বিত অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছে। আর তারা অস্পষ্ট নীতিগত কৌশল গ্রহণ করেছে এবং তার বাস্তবায়নের হারও খুব ধীর। এর পরিবর্তনের সম্ভাবনাও নেই বললে চলে। থাইল্যান্ডের নতুন সেনা নেতারা মনে করেন, তঁাদের কাজ হচ্ছে দুর্নীতি দূর করা, রাজনীতিবিদদের পথে রাখা ও পুরোনো ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা। এর মূলে রয়েছে রাজতন্ত্র ও সেনাবাহিনীর মধ্যকার অটুট বন্ধন। যেখানে শাসনের দৈনন্দিন বিষয়গুলো দেখভাল করে আমলাতন্ত্র।
হ্যাঁ, এটা ঠিক যে থাইল্যান্ডের সামরিক শাসকেরা গণদাবি অগ্রাহ্য করেন না বা বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মেলানোর আশু কর্তব্য অস্বীকার করেন না। বরং তারা একধরনের নির্বাচনী শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে চান, যেটা থাই প্রতিষ্ঠান ও প্রথার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করতে পারবে। তারা দেশটাকে কয়েক ধাপ পেছনে ও কয়েক ধাপ পাশে নিতে চান, আর সেখান থেকে তারা সম্পূর্ণ নতুন লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করতে চান।
এ মুহূর্তে এর অর্থ দাঁড়ায় এ রকম: শৃঙ্খলা, বশবর্তিতা, দায়িত্ব ও আত্মোৎসর্গের মতো রক্ষণশীল মূল্যবোধগুলো গ্রহণের জন্য প্রচার চালানো হচ্ছে। বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রথাগত খাকি ইউনিফর্ম পরতে এবং নারীদের প্রথাগত পোশাক পরতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে জান্তার কর্মসূচির মধ্যে বিশেষ করে থাই রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারটিও রয়েছে। বিশেষ করে, সিনাওয়াত্রা পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত রাজনীতিকদেরসহ অন্য রাজনীতিকদেরও প্রান্তে ঠেলে দেওয়ার কর্মসূচিও জান্তার রয়েছে। আর অভ্যুত্থান-পরবর্তী অরাজক কালের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি হচ্ছে ইংলাক সিনাওয়াত্রার অভিশংসন। ইংলাকের ভাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে ২০০৬ সালে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল, এরপর থেকে তিনি স্বেচ্ছা নির্বাসনে আছেন। এদিকে ইংলাককে দুই বছরের জন্য রাজনীতি থেকে নির্বাসিত করা হয়েছে।
জান্তার ক্ষেত্রে উভয়সংকট হচ্ছে, থাকসিনের বিপুলসংখ্যক সমর্থকেরাও প্রান্তিক হয়ে পড়েছে। সামরিক ও প্রায়ুতের চরম শাসনের মুখে তাদের বলার মতোও কিছু আর নেই। যদিও দেশে থাকসিনের এত জনপ্রিয়তা আছে যে ২০০১ সালের পর তারা নির্বাচনে হারেনি। এখন তারা নিশ্চুপ থাকলেও সুযোগ পেলেই তারা রাজনীতির ময়দানে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। ভবিষ্যতে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠলে তাদের সঙ্গে অবশ্যই বোঝাপড়া করতে হবে।
এদিকে জান্তা নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে তার পছন্দমতো ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত স্থাপন করতে চায়। এই প্রচেষ্টাই গত এক বছরে দেশটির রাজনীতির তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি, এর মধ্যে নতুন সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে ৩৬ সদস্যের কনস্টিটিউশন ড্রাফটিং কমিটি (সিডিসি) ও ২৫০ সদস্যের ন্যাশনাল রিফর্ম কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে।
গত মাসে যে খসড়া সংবিধান প্রণয়ন শেষ হলো, তা নিয়ে বেশ উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, এতে রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিকদের ওপর বেশ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। আর আমলা ও বিচারকদের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তারা নির্বাচিত ব্যক্তিদের নেওয়া নীতিগত সিদ্ধান্ত বদলাতে পারবেন। এমন সংবিধানের আলোকে নির্বাচন হলে বৈধ ফল না পাওয়ার আশঙ্কাই বেশি। ভালো খবর হচ্ছে, জান্তা আগামী বছর সংবিধানের খসড়ার ওপর গণভোট আয়োজনে রাজি হয়েছে।
সামরিক শাসন পথঘাট পরিষ্কার করছে, আবার রাজনৈতিক ব্যবস্থার টুঁটিও চেপে ধরেছে। আর নতুন অনির্ণীত ব্যবস্থায় দীর্ঘ উত্তরণকালের সূচনা করেছে। অভ্যুত্থানবিরোধীরা নির্বাচনী গণতন্ত্রে ফিরতে চায়, আর ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্বে অভু্যত্থানপন্থীরা উত্তরোত্তর সামরিক বাহিনীর প্রতি ঘেঁষছে। যদিও এই ব্যবস্থায় ক্ষমতার কিছু ভাগ পাওয়া যায়, সেই আশায়।
থিতিনান পংসুধিরক
থাইল্যান্ড বর্তমানে কর্তৃত্ববাদ ও গণতন্ত্র এবং অতীত ও বর্তমানের মধ্যকার ফাঁদে পড়েছে। রাজতন্ত্রের কাল দীর্ঘই হবে, সেটা শেষ না হলে এই পরিস্থিতি উত্তরণের সম্ভাবনাও খুব কম। সেই সময় থাই জনগণকে তাদের একদা বিখ্যাত আলোচনার দক্ষতা কাজে লাগিয়ে দেশের সামগ্রিক স্বার্থে কার্যকর সমঝোতা অর্জন করতে হবে। যে জনগণ বর্তমানে অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ ও আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জের মুখে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
থিতিনান পংসুধিরক: চুলালোংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব সিকিউরিটি অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিসের অধ্যাপক ও পরিচালক।

এরদোগানকে নিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম পোস্টার

ইস্তাম্বুল বিজয়ের বার্ষিকী উপলক্ষে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান এবং প্রধানমন্ত্রী আহমেদ দাবুতোগলুর একটি পোস্টার বিশ্বের বৃহত্তম পোস্টার হিসেবে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্থান দখল করে নিয়েছে। ৪৭০৯ বর্গমিটার আকারের পোস্টারটি তৈরি করেছে তুরস্কের ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি)। অটোম্যান শাসকদের ইস্তাম্বুল বিজয়ের ৫৬২তম বার্ষিকীতে ইস্তাম্বুলে পোস্টারটি প্রদর্শন করা হয়। শুক্রবার ইস্তাম্বুলে এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী অংশগ্রহণ করেন। এরদোগান ও দাবুতোগলুর ছবি সংবলিত পোস্টারটির ক্যাপশন বা স্লোগান হচ্ছে, ‘জনগণই আমাদের জন্য যথেষ্ট’। পোস্টারটি উন্মুক্ত করতে ১০০ লোকের প্রয়োজন পড়ে। পরে গিনেস কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর একে বিশ্বের বৃহত্তম পোস্টারের স্বীকৃতি দেয়। এর আগে ২০১৪ সালে বিশ্বের বৃহত্তম পোস্টারটি প্রদর্শন করা হয় ভারতে যার আকার ছিল ৩ হাজার ৩৬১ বর্গমিটার।
১৪৫৩ সালের ২৯ মে অটোম্যান সুলতান মাহমুদ দ্বিতীয় ইস্তাম্বুল দখল করেন। তখন এর নাম ছিল কনস্ট্যান্টিনোপল। এর আগে প্রায় ১ হাজার বছর বাইজেনটাইনরা এটি শাসন করেন। ইস্তাম্বুল দখলের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে তুরস্কে নতুন যুগের সূচনা হয়। এরদোগান ইস্তাম্বুল বিজয়কে ‘তুর্কি জাতির অন্যতম বৃহত্তম জয়’ বলে মন্তব্য করেন। প্রায় ৮০০ বছর আগেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন বাস্তবে যার রূপায়ন করেন সুলতান মাহমুদ। মহানবী বলেছিলেন, ‘একদিন কনস্ট্যান্টিনোপল জয় করা হবে। সেই বিজয়ী কমান্ডার এবং তার সৈন্যরা কতই না রহমতপুষ্ট।’ তুরস্কে আগামী ৭ জুন অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ইস্তাম্বুল বিজয়ের ওই অনুষ্ঠানে বিশাল শোডাউন করে ক্ষমতাসীন একেপি। এতে ৫ লক্ষাধিক মানুষ অংশগ্রহণ করেন। এপি।

আত্মীয়তার বন্ধনে রাজনীতি-৭, মির্জা-বিশ্বাস-জামান পরিবার by কাফি কামাল

মোগল ও বৃটিশ আমলে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের নামের সঙ্গে ভূস্বামী, পেশাগত, ধর্মীয় ও সম্মানসূচক কিছু পদবি যুক্ত হয়। কালের বিবর্তনে পদবির গুরুত্ব ম্লান হলেও রাজনীতিতে সেসব পদবিধারী কিছু পরিবার অটুট রেখেছেন তাদের প্রভাব। দেশের রাজনীতিতে দুইটি বিখ্যাত মির্জা পরিবার হলো পাবনা ও ঠাকুরগাঁওয়ের মির্জা পরিবার। জিয়া সরকারের মন্ত্রী ছিলেন পাবনার মির্জা আবদুল হালিম। তার চাচাতো ভাই মির্জা আবদুল আওয়ালও ছিলেন জিয়া সরকারের এমপি। মির্জা আওয়ালের ছোট ভাই হলেন আওয়ামী কৃষক লীগের সাবেক সভাপতি, সাবেক সচিব ড. মির্জা আবদুল জলিল। আবার মির্জা আওয়ালের ভাগনে হলেন এরশাদ সরকার ও বিএনপি সরকারের সাবেক এমপি মেজর (অব.) মঞ্জুর কাদের। আবার মঞ্জুর কাদেরের সম্পর্কে চাচা হলেন বাম নেতা ও ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন। বাম নেতা টিপু বিশ্বাসের ভগ্নিপতি হলেন বিএনপি দলীয় সাবেক মন্ত্রী মির্জা হালিম। টিপু বিশ্বাসের এক ভাগনে হলেন পাবনা জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরিফ ডিলু। সে সূত্রে ডিলুর খালু হচ্ছেন মির্জা হালিম। পাবনা জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ মাহতাবউদ্দিন বিশ্বাসের ভাগনে হলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। তিনি আবার বাম নেতা টিপু বিশ্বাসের সম্পর্কে ভাতিজা। শিমুল বিশ্বাসের বেয়াই হলেন পাবনা পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট তসলিম হাসান সুমন। শিমুল বিশ্বাসের বড় ছেলে তানভীর রহমান বিশ্বাস পারিবারিকভাবে বিয়ে করেছেন সুমনের মেয়ে তাহিজদ হাসান তরণীকে। আবার তসলিম হাসান হলেন পাবনা জেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি মেজর (অব.) খন্দকার সুলতান মাহমুদের শ্যালক। এছাড়া মির্জা পরিবারের দূরসম্পর্কীয় আত্মীয় হলেন বিএনপি সরকারের সাবেক এমপি পাবনার আবদুর রশিদ মির্জা। এ মির্জা আবদুর রশিদের ছেলে মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ছিলেন ওয়ান ইলেভেনের জরুরি সরকারের অর্থ উপদেষ্টা। ঠাকুরগাঁওয়ের মির্জা পরিবারের প্রধান ছিলেন এরশাদ সরকারের মন্ত্রী মির্জা রুহুল আমিন (চোখা মিয়া)। তার বড় ছেলে হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছোট ছেলে মির্জা ফয়সল জেলা বিএনপির সিনিয়র নেতা। মির্জা আলমগীরের বোনজামাই হলেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান। আবার বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী মির্জা গোলাম হাফিজ এবং ভাষাসৈনিক ও কমিউনিস্ট নেতা প্রয়াত মির্জা নুরুল হুদা কাদের বকস হলেন মির্জা আলমগীরের সম্পর্কে চাচা।
মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম প্রধান সংগঠক ও জাতীয় চার নেতার একজন শহীদ এ এইচ এম কামরুজ্জামান। তার ছেলে আওয়ামী লীগ নেতা ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের এমপি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক প্রতিমন্ত্রী এ বি এম তাজুল ইসলাম জাতীয় নেতা কামরুজ্জামানের ভায়রা। ফলে তিনি লিটনের খালু। আবার লালমনিরহাট-৩ আসনের এমপি আবু সালেহ মোহাম্মদ সাইদ জাতীয় নেতা কামরুজ্জামানের মেয়ের জামাই এবং রাজশাহী-৫ আসনের এমপি সাবেক প্রতিমন্ত্রী ওমর ফারুক চৌধুরী হলেন কামরুজ্জামানের ভাগনে।
রাজনীতিক ও দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার দুই ছেলে হলেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। মইনুল হোসেন বঙ্গবন্ধু সরকারের এমপি ও ওয়ান ইলেভেন সরকারের আইন উপদেষ্টা ছিলেন। মানিক মিয়ার ছোট ছেলে জাতীয় পার্টি (জেপি) সভাপতি ও আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তিনি এরশাদ ও শেখ হাসিনার সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিএনপির প্রথম আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। তার স্ত্রী তাসমীমা হোসেন নিজেও একজন সাবেক এমপি। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর আপন মামা হলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। জাতীয় পার্টির নির্বাহী এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। তার স্ত্রী পারভিন পিকেএসএফ-এর ডেপুটি ম্যানেজার। আনিসুল ইসলাম মাহমুদের শাশুড়ি শামসুন নাহার পরাণ নিজে নারী নেত্রী ও ঘাসফুল এনজিওর প্রতিষ্ঠাতা। পরাণের ভাই হলেন মে. জেনারেল (অব.) সাঈদ। আনিসুল ইসলাম মাহমুদের শ্বশুরপক্ষীয় আত্মীয় হলেন জাতীয় পার্টি (জাফর)-এর সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর। আর কাজী জাফরের চাচা কাজী জহিরুল কাইয়ুম ছিলেন কুমিল্লা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা ও ১৯৭০-এর এমএনএ। ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের বেয়াই হলেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। ব্যারিস্টার মইনুলের ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন ব্যারিস্টার আনিস।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদ ছিলেন। তার পিতা গমিরউদ্দিন প্রধান ছিলেন পাকিস্তানের সর্বশেষ বাঙালি স্পিকার। শফিউল আলম প্রধানের নানি ও বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর মা হলেন আপন দুই বোন। সেই সূত্রে টুকু হলেন প্রধানের মামা এবং এরশাদ সরকারের মন্ত্রী প্রয়াত ডা. মতিন হলেন খালু। আওয়ামী লীগ সরকারের এমপি রওশন জাহান সাথী হলেন জাসদের প্রয়াত শীর্ষ নেতা কাজী আরেফ আহমেদ। আবার সাথীর পিতা মশিউর রহমান ছিলেন যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোটের মাওলানা আবুল হাসনাত। তিনি ইসলামী ঐক্যজোটের প্রয়াত চেয়ারম্যান মুফতি ফজলুল হক আমিনীর ছেলে। আমিনী হলেন মাওলানা মাহমুদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুরের মেয়ের জামাই। আবার হাফেজ্জী হুজুরের ছেলে হলেন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমীর মাওলানা আহমুল্লাহ আশরাফ।
আওয়ামী লীগ সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রী ও আইসিসির পদত্যাগকারী সভাপতি আ হ ম মোস্তফা কামাল ওরফে লোটাস কামাল। তার ভায়রা হলেন ঝালকাঠির এমপি ও ব্যবসায়ী বিএইচ হারুন। কামাল ও হারুনের শ্যালক হলেন আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক এমপি ডা. এইচ বি ইকবাল। আবার বিএইচ হারুন এমপি ও দৈনিক ইনকিলাবের প্রকাশক-সম্পাদক ও জমিয়তুল মোদার্রেছিনের সভাপতি এ এম এম বাহাউদ্দিন পরস্পরের বেয়াই। হারুনের ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন বাহাউদ্দিন। বাহাউদ্দিনের পিতা ছিলেন মাওলানা মান্নান জিয়া সরকারের এমপি ও এরশাদ সরকারের ধর্মমন্ত্রী।
কক্সবাজারের মহেষখালী-কুতুবদিয়ার সাবেক এমপি ও বিএনপি নির্বাহী কমিটির সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ। ফরিদের ভায়রা হলেন টেকনাফের বিখ্যাত এমপি আওয়ামী লীগের আবদুর রহমান বদি। ফরিদের জেঠাতো ভাইয়ের ছেলে বর্তমান আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি আশেক উল্লাহ। ফরিদের চাচা হলেন আওয়ামী লীগ নেতা ও ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের এমপি প্রার্থী ড. আনসারুল করিম। তার সম্পর্কে ভাই হলেন মুসলিম লীগ নেতা মৌলভী জাকারিয়া। কক্সবাজার সদর আসনের বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি লুৎফর রহমান কাজলের শ্বশুর হলেন মহেশখালী আসনের আওয়ামী লীগ সাবেক এমপি ইসহাক মিয়া। কক্সবাজারের আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক এমপি ও পরে গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রয়াত অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলামের ভায়রা হলেন একই আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম। কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত মোজাম্মেল হক, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আহমদ হোসেন ও সাংগঠনিক সম্পাদক সিরাজ মোস্তফা সম্পর্কে ভায়রা।
রাজধানীর মিরপুরের ঐতিহ্যবাহী মোল্লা পরিবারের প্রতিষ্ঠা হলেন কুজরতউল্লাহ মোল্লা। তিনি টানা ২৭ বছর মিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার ছেলে প্রয়াত হারুন উর রশিদ মোল্লা আওয়ামী লীগ নেতা ও মিরপুর পৌরসভার একাধিকবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে তার বদলে ড. কামাল হোসেনকে মনোনয়ন দেয়া হলে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে এমপি নির্বাচিত হন। হারুন মোল্লার দুই ছেলে এখলাস উদ্দিন মোল্লা ও ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা। ইলিয়াস মোল্লা ঢাকা-১৬ আসনের এমপি এবং তার ভাই এখলাস মোল্লা বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়। আবার কুজরত উল্লাহ মোল্লার নাতিন জামাই হলেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডক্টর মাহদী আমিন। মাহদীর নানা আবদুল আউয়াল ছিলেন বৃহত্তর কুমিল্লা জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও কুমিল্লা পৌরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যান। মাহদীর নানীর চাচাত ভাই জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী আবদুর রশিদ ইঞ্জিনিয়ার এবং আরেক ভাইয়ের বেয়াই হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। মাহদী আমিনের ছোট বোনের নানা শ্বশুর শিল্পপতি ও জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি আনোয়ার হোসেন। আপন চাচাতো বোনের শ্বশুর হলেন জাতীয় পার্টির ও বিএনপির সাবেক এমপি শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর। মাহদী আমিনের শাশুড়ির দাদা আবদুল হামিদ চিশতি ছিলেন গুলশান পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান ও বনানী চেয়ারম্যান বাড়ির জনক। এই সূত্র ধরে মাহদী আমিনের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে আওয়ামী লীগের এমপি ও সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ। আবার বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রী শিল্পপতি হারুনার রশিদ খান মুন্নু। তার মেয়ের জামাই হলেন বিএনপি সরকারের জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ও দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক কারান্তরীণ প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমান। তারেক আরেক মেয়ে আফরোজা খান রিতা হলেন মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি।

মুসলিম দেশ মরক্কোয় নারীদের ‘বিপ্লব’

প্রায় শতভাগ মুসলমানের দেশ মরক্কোয় মসজিদ, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজে গিয়ে ‘নতুন দিনের ডাক’ দিচ্ছে নারীরা৷ ধর্মের আলোকে এগিয়ে যেতে বলছেন৷ বলছেন, ইসলামে নারী-পুরুষের সমান অধিকার স্বীকৃত, সে অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে৷  উত্তর আফ্রিকার সুন্নি মুসলমান অধ্যুষিত দেশ মরক্কো৷ ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার, নারী নির্যাতন, বাল্যবিবাহের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যাপারগুলো যেন সে দেশের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে৷ তবে এ অবস্থার পরিবর্তনে উদ্যোগী হয়েছে সরকার৷ সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার জন্য অভূতপূর্ব এক সুযোগ দেয়া হয়েছে নারীদের৷ মরক্কোর মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, কারাগার, এমনকি বাড়ি বাড়ি গিয়েও নারীর প্রতি ইসলামের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গির কথা জানাচ্ছেন সবাইকে৷ মরক্কোয় ইসলামের উদারতার বাণী প্রচারে ব্যস্ত এই নারীরা মরশিদাত নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত৷
মর্শিদাতরা ইসলামি মৌলবাদকে প্রতিহত করতে ধর্ম সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ শুরু করেছিলেন ২০০৬ সালে৷ তার তিন বছর আগে কাসাব্লাঙ্কা শহরে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়েছিল ইসলামী জঙ্গিরা৷ তারপর থেকেই মৌলবাদকে প্রতিহত করার উপায় খুঁজছিল সরকার৷ গত ৯ বছরে মর্শিদাতদের অক্লান্ত চেষ্টায় মরক্কোয় লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে৷ এখন নারী বিদ্বেষী বক্তব্য শুনলে নারীরাই তার প্রতিবাদ করেন৷ অপমান-অত্যাচার চুপ করে সহ্য করার মানসিকতা ধীরে ধীরে কমছে৷ মেয়েরা টাইম বোমার মতো৷ ওরা যে কোনো সময় বিস্ফোরিত হয়ে পরিবারের সুনাম নষ্ট করতে পারে৷ ওদের তাড়াতাড়ি বিয়ে দেয়াই ভালো – এমন কথা শুনলে মরক্কোর অনেক মেয়েই আর প্রতিবাদ করতে ভয় পায়না৷
এক গহনার দোকানে ঠিক এই কথাই শুনেছিলেন হানানে৷ সেদিন প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে বলেছিলেন, এসব কথা বলবেন না৷ ইসলাম বাল্যবিবাহ সমর্থন করেনা৷ তাছাড়া মেয়েরা এখন ঘরে-বাইরে সবখানেই কাজ করে সমাজের অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে৷ হানানে নিজেও একজন মরশিদাত৷ সবার মাঝে ইসলামের আলো ছড়ানোই তাঁর কাজ৷ মুসলিম দেশগুলোতে নারীদের দুরবস্থা দেখে হানানের খুব খারাপ লাগে৷ তবে নারীর অমর্যাদার জন্য তিনি ইসলাম ধর্মকে দায়ী মনে করেন না৷ তাঁর মতে, মরক্কোসহ অনেক মুসলিম দেশই দীর্ঘকাল অজ্ঞতা এবং স্থবিরতার সঙ্গী ছিল৷ তাই অনেকেই জেনে বা না জেনে ইসলামস্বীকৃত গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার থেকেও নারীদের বঞ্চিত রেখেছে৷
মরশিদাতদের তৎপরতায় মরক্কোর সমাজে পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে৷ অন্যান্য মুসলিম প্রধান দেশগুলোতেও মর্শিদাতদের নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে৷ ইসলাম এবং নারী অধিকার সম্পর্কে ভাষণ দিতে অনেক মুসলিম দেশ থেকে আমন্ত্রণও পাচ্ছেন মরশিদাতরা৷
এ মুহূর্তে ৪০০ মরশিদাত মরক্কোর বিভিন্ন শহরে কাজ করছেন৷ তাঁদের নিয়ে ইতিমধ্যে একটা চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে৷ চলচ্চিত্রের নাম,কাসাব্লাঙ্কা কলিং, অর্থাৎ কাসাব্লাঙ্কা ডাকছে৷ মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কা শহরেই কয়েকদিন আগে অনুষ্ঠিত হলো বাল্যবিবাহবিরোধী এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন৷ সেই সম্মেলনে প্রদর্শিত হয়েছে ছবিটি৷ এ বছর আল জাজিরা টেলিভিশনেও দেখানো হবে কাসাব্লাঙ্কা কলিং৷
সূত্র: ডয়চে ভেলে

‘তোর বাসার ফ্ল্যাটে লাশ পড়ে আছে, গিয়ে দেখ’ by ওয়েছ খছরু

গ্রেপ্তারকৃত কেয়ারটেকার আবদুল কাদির
‘তোর বাসার ফ্ল্যাটে লাশ পড়ে আছে, গিয়ে দেখ।’ এ কথা বলেই ফোন কল কেটে দেয় ভাড়াটে মিজান। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে। কে এই মিজান-  সেটিও বাসার তদারক আবদুল কাদির সঠিকভাবে জানাতে পারেননি। এ কারণে পরিচয়হীন ওই তরুণীর লাশ পড়ে আছে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হিমাগারে। পুলিশ বলছে, পলাতক থাকা মিজানকে গ্রেপ্তার না করলে ওই তরুণীর পরিচয় পাওয়া সম্ভব নয়। তবে তাকে খুন করার পর মিজার পালিয়ে গেছে। তবে, পুলিশ ভাড়াটের সন্ধান পেতে গ্রেপ্তার করেছে বাসার তদারক আবদুল কাদিরকে। আবদুল কাদির পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের আগে সাংবাদিকদের জানিয়েছিল, প্রায় ১৫ দিন আগে মিজানের ফ্ল্যাটে ওই তরুণী এসেছিল। তবে, তিনি তার পরিচয় জানেন না। এদিকে, করেরপাড়ার একটি ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতনামা তরুণীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। রোববার রাতে জালালাবাদ থানার এসআই প্রদীপ সরকার বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত করেরপাড়ার সুফিয়া মঞ্জিল মোহনা বি-৩৮/১ নম্বর ৫ম তলা ফ্ল্যাট বাড়ির  কেয়ারটেকার আবদুল কাদিরকে রোববার পুলিশ ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে আদালতে হাজির করে। পরে আদালত তাকে জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। ধৃত কাদির বিশ্বনাথ উপজেলার  গোয়াহরি গ্রামের মৃত চমক আলীর পুত্র। স্থানীয়রা জানান, টমটমচালক পরিচয় দিয়ে মিজান নামের এক ব্যক্তি ওই  ৫ তলা বিল্ডিংয়ের ৪র্থ তলার ৪০১ নং ফ্ল্যাটে ভাড়া হিসেবে তার স্ত্রী-সন্তানসহ বসবাস করে আসছিলেন। গত মাসের ১৫ তারিখে ওই বাসায় এসে অজ্ঞাত পরিচয় এক তরুণী থাকতো। গত ২৯শে  মে সন্ধ্যার সময় ভাড়াটে মিজান স্ত্রী-সন্তান মার্কেটে যাওয়ার কথা বলে কেয়ারটেকার কাদিরকে বলে বের হয়ে যান। রাত ১০ টার দিকে মিজান কাদিরকে মুঠোফোনে জানান, ‘তারা রাতে বাসায় ফিরবেন না’। পরদিন সকাল ৮ টার দিকে মিজান কেয়ারটেকার কাদিরকে আবারও ফোনে জানায়, ‘তোর বাসার ফ্ল্যাটে লাশ পড়ে আছে, গিয়ে দেখ।’ এ খবর পেয়ে বাসার তদারক আবদুল কাদির ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখতে পান দরোজা খোলা। ফ্ল্যাটের ভেতরে উত্তর পশ্চিম কোনের রুমে খাটের উপরে একজন অজ্ঞাতনামা তরুণীর লাশ পড়ে আছে। পরে কাদির বাসার লন্ডন প্রবাসী মালিকের স্ত্রীসহ ঘটনাটি অন্যান্য লোকজনকে জানান। পরে ঘটনার খবর পেয়ে জালালাবাদ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে অজ্ঞাতনামা পরিচয় যুবতীর লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে। মামলার বাদী জালালাবাদ থানার এসআই প্রদীপ সরকার জানান, সুরতহাল প্রস্তুতের সময় লাশের গলায় জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এতে পুলিশের ধারণা করছে, অজ্ঞাত যুবতী পরিবারের কেউ হবেন। তাকে পরিকল্পিতভাবে খুন করে অন্যরা পালিয়ে গেছে। এ ঘটনায় পুলিশ ভাড়াটে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে বাড়ির কেয়াটেকার আবদুল কাদিরকে আটক করেছে। সিলেটের জালালাবাদ থানার ওসি আক্তার হোসেন গতকাল মানবজমিনকে জানিয়েছেন, ময়নাতদন্ত শেষে নিহত তরুণীর লাশ সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মরচ্যুয়ারিতে রাখা হয়েছে। কোন স্বজনের সন্ধান পেলে তাদের কাছে তার লাশ হস্তান্তর করা হবে। আর আবদুুল কাদিরের মুঠোফোনটি এ হত্যাকাণ্ডের আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের ক্লু-উদঘাটনের তদন্ত চলছে। এদিকে, স্থানীয় এলাকাবাসী জানিয়েছেন, বেনামে অনেকেই এসে ওই এলাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে অপরাধ কর্ম সংগঠিত করে। আর অপরাধ সংগঠনের পর তারা গোপনে চলে যায়। এ ব্যাপারে তারা স্থানীয় পুলিশের সহায়তা কামনা করেছেন।