Monday, July 21, 2025

ইসরায়েলের স্নাইপাররা এমনভাবে গুলি ছুড়ছিলেন, যেন পশু শিকার করছেন: গাজার বাসিন্দা

ট্যাংক থেকে নির্বিচার গোলাবর্ষণ করা হচ্ছিল, ইসরায়েলের স্নাইপাররা এমনভাবে গুলি ছুড়ছিলেন যেন তাঁরা ‘জঙ্গলে পশু শিকার করছেন’। কথাগুলো বলছিলেন গাজা নগরীর বাসিন্দা কাসেম আবু খাতের। গতকাল রোববার ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তিনি। তাঁর চোখের সামনেই নিহত হন কয়েক ডজন ফিলিস্তিনি।

গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানিয়েছেন, রোববার উপত্যকাটিতে ত্রাণ সংগ্রহ করতে যাওয়া ৯৩ জনকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। এর মধ্যে ৮০ জনকে হত্যা করা হয়েছে উপত্যকাটির উত্তরে। নয়জন নিহত হয়েছেন দক্ষিণে রাফা এলাকার কাছে। আর চারজনকে হত্যা করা হয়েছে খান ইউনিসে।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, ইসরায়েল থেকে তাদের ত্রাণবাহী ২৫টি ট্রাক গাজা নগরীর কাছে পৌঁছালে ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিরা সেখানে ভিড় করেন। এ সময় ইসরায়েলি সেনারা গুলি চালান। তবে ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গাজা নগরীর কাছে হাজার হাজার মানুষের ভিড় তাদের কাছে হুমকি বলে মনে হয়েছিল। তাই তারা সতর্কতামূলক গুলি ছুড়েছে।

গাজায় ত্রাণ নিতে যাওয়া মানুষের ওপর হামলার ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বেশির ভাগ হামলা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরিচালিত বিতর্কিত সংস্থা গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) ত্রাণকেন্দ্রের কাছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে জাতিসংঘ জানিয়েছিল, গত মে মাসের শেষ সময় থেকে ত্রাণকেন্দ্রে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত ৮০০ জন নিহত হয়েছেন।

এ হত্যাকাণ্ডের মধেই বিতর্কিত ত্রাণ সংস্থা জিএইচএফের একটি ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে জড়ো হওয়া ক্ষুধার্ত ও অসহায় ফিলিস্তিনিদের ওপর মরিচের গুঁড়া ছুড়েছেন ইসরায়েলি সেনারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। আল-জাজিরার ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা সানাদ ২০ সেকেন্ডের ওই ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেছে।

শনিবার প্রকাশিত ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, গাজার দক্ষিণাঞ্চলের রাফা শহরের শাকুশ এলাকায় ইসরায়েলি সেনারা মরিচের গুঁড়ার স্প্রে ব্যবহার করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করছেন। পুরুষ, নারী ও শিশুরা চারদিকে ছুটে পালিয়ে যাচ্ছেন। কারও মুখ কাপড় দিয়ে ঢাকা। কেউ আবার পিঠে ময়দার বস্তা তুলে নিয়ে আতঙ্কে ছুটে যাচ্ছেন। মুঠোফোনে ভিডিওটি ১০ জুলাই ধারণ করা হয়।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় হামাস। এতে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন। ইসরায়েল থেকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয় প্রায় আড়াই শ জনকে। সেদিন থেকেই গাজায় নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। তাদের চলমান হামলায় উপত্যকাটিতে প্রায় ৫৯ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৪২ হাজারের বেশি মানুষ।

ইসরায়েলের সেনা সদস্য
ইসরায়েলের সেনা সদস্য। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের ওপর মরিচের গুঁড়া ছুড়লেন ইসরায়েলি সেনারা: যুদ্ধের বর্বরতার নিন্দায় পোপ

গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ডটিতে গতকাল রোববার মানবিক সহায়তা নিতে আসা ফিলিস্তিনিদের ওপর গুলি চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এতে ৯৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অনেকে।

এদিকে গাজা যুদ্ধের বর্বরতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন পোপ লিও চতুর্দশ। একই সঙ্গে তিনি শান্তির আহ্বান জানিয়েছেন।

গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানায়, গাজার উত্তরাঞ্চলে ত্রাণবাহী ট্রাক পৌঁছানোর পর ৮০ জন নিহত হন। আর দক্ষিণে রাফার কাছে একটি ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রের কাছে ৯ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর এক দিন আগে এই এলাকায় বহু মানুষ নিহত হন।

সংস্থাটির মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, উপত্যকার দক্ষিণের খান ইউনিসের আরেকটি ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রের কাছে আরও ৪ জন নিহত হয়েছেন।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, তাদের খাদ্য বহনকারী ২৫টি ট্রাকের একটি বহর গাজা সিটির কাছে পৌঁছালে বিপুলসংখ্যক ক্ষুধার্ত মানুষের ভিড় লেগে যায়। এই ভিড়ের মধ্যে গুলি চালানো হয়।

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী নিহতের সংখ্যা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তারা বলেছে, গাজা সিটির কাছে হাজারো মানুষ জড়ো হলে সেনারা ‘তাৎক্ষণিক হুমকি প্রতিহত করতে’ সতর্কতামূলক গুলি চালান।

গাজায় ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের তীব্র সংকটের কারণে মানুষ ত্রাণকেন্দ্রগুলোয় ভিড় করছেন। আর সেখানেই ইসরায়েলি গুলিতে প্রাণহানি ঘটছে।

জাতিসংঘের হিসাবে, গত মে মাসের শেষ দিক থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০০ জন ত্রাণপ্রত্যাশী নিহত হয়েছেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলা পর গাজা যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। ইসরায়েলে হামলায় ১ হাজার ২১৯ জন নিহত হন। সেদিন ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যায় হামাস।

জবাবে সেদিন থেকেই গাজায় নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরায়েল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৫৮ হাজার ৮৯৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাঁদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক।

গাজা সিটির হলি ফ্যামিলি গির্জায় আশ্রয় নেওয়া তিন ব্যক্তির নিহত হওয়ার ঘটনায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত বৃহস্পতিবার পোপ লিও চতুর্দশের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। নেতানিয়াহু দাবি করেন, ভুলবশত ছোড়া গোলাবারুদের আঘাতে এ ঘটনা ঘটেছে।

গতকাল রোববার প্রার্থনার পর পোপ গাজায় চলমান যুদ্ধের বর্বরতার নিন্দা জানান। তিনি শান্তির আহ্বান জানান। গাজার একমাত্র ক্যাথলিক গির্জায় ইসরায়েলি হামলার কয়েক দিন পর তিনি এ আহ্বান জানান।

পোপ বলেন, ওই হামলা ছিল গাজার বেসামরিক জনগণ ও প্রার্থনাস্থলগুলোর ওপর ধারাবাহিক সামরিক আক্রমণের অংশ।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বৃহস্পতিবার গাজার হলি ফ্যামিলি গির্জায় হামলা চালায় ইসরায়েল। গির্জাটির সঙ্গে প্রয়াত পোপ ফ্রান্সিস নিয়মিত যোগাযোগ করতেন।

ঘটনার দিন জেরুজালেমের রোমান ক্যাথলিক নেতা গ্যাব্রিয়েল রোমানেল্লি জানিয়েছিলেন, গির্জায় হামলায় প্রাণহানি ছাড়াও অনেকে আহত হয়েছেন।

ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের ওপর মরিচের গুঁড়া ছুড়লেন ইসরায়েলি সেনারা

গাজায় বিতর্কিত ত্রাণ সংস্থা জিএইচএফের একটি ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে জড়ো হওয়া ক্ষুধার্ত ও অসহায় ফিলিস্তিনিদের ওপর মরিচের গুঁড়া ছুড়েছেন ইসরায়েলি সেনারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে এমন দৃশ্য দেখা গেছে।

আল–জাজিরার ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা সানাদ ২০ সেকেন্ডের ওই ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেছে। এতে দেখা গেছে, গাজার দক্ষিণাঞ্চলের রাফা শহরের শাকুশ এলাকায় ইসরায়েলি সেনারা মরিচের গুঁড়ার স্প্রে ব্যবহার করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করছেন।

মুঠোফোনে ভিডিওটি ১০ জুলাই ধারণ করা হয়। শনিবার রাতে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, তিনজন সশস্ত্র ইসরায়েলি সেনা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত জিএইচএফের ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে ফিলিস্তিনিদের ওপর মরিচের গুঁড়া ছুড়ছেন।

ভিডিওতে আরও দেখা যায়, পুরুষ, নারী ও শিশুরা চারদিকে ছুটে পালিয়ে যাচ্ছেন। কারও মুখ কাপড় দিয়ে ঢাকা। কেউ আবার পিঠে ময়দার বস্তা তুলে নিয়ে আতঙ্কে ছুটে যাচ্ছেন।

ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত শনিবার বলেছে, মে মাসের শেষ দিকে জিএইচএফ গাজায় কার্যক্রম শুরু করার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৮৯১ জন খাবারের খোঁজে গিয়ে নিহত হয়েছেন।

১৫ জুলাই জাতিসংঘ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৬৭৪ জনেরই মৃত্যু হয়েছে জিএইচএফের ত্রাণকেন্দ্রগুলোর আশপাশে।

গাজায় ইসরায়েলের দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা পূর্ণ অবরোধ কিছুটা শিথিল করার পর উপত্যকায় জিএইচএফের ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়। কার্যত জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন বিশাল ত্রাণ সরবরাহ নেটওয়ার্ককে পাশ কাটিয়ে বিতর্কিত এ কার্যক্রম চলছে।

গতকাল রোববার গাজায় ইসরায়েলি হামলায় আরও ৮৪ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৭৩ জনই ত্রাণ সংগ্রহের জন্য জড়ো হওয়া সাধারণ মানুষ।

এর আগে গত শনিবার গাজা উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলি হামলায় ১১৬ ফিলিস্তিনি নিহত হন। এর মধ্যে অন্তত ৩৮ জন ছিলেন ত্রাণপ্রত্যাশী।

গাজার বাসিন্দা মাহমুদ মোকাইমার বলেন, তিনিও অন্য মানুষদের সঙ্গে জিএইচএফের ত্রাণকেন্দ্রের দিকে যাচ্ছিলেন। ইসরায়েলি সেনারা প্রথমে সতর্কতামূলক গুলি ছোড়েন। এরপর সরাসরি গুলি চালান।

বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে মোকাইমার বলেন, ‘দখলদার বাহিনী আমাদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালায়।’

মোকাইমার বলেন, তিনি অন্তত তিনজনের নিথর দেহ মাটিতে পড়ে থাকতে ও আহত বহু মানুষকে দৌড়ে পালাতে দেখেছেন।

গাজার দেইর আল-বালাহ শহর থেকে আল–জাজিরার প্রতিবেদক হিন্দ খোদারি বলেন, ইসরায়েল যদি গাজায় আর কোনো খাবার ঢুকতে না দেয়, তাহলে ফিলিস্তিনিদের সামনে খাবারের জন্য জীবন ঝুঁকিতে ফেলা ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না।

হিন্দ খোদারি আরও বলেন, মা–বাবারা জানেন, জিএইচএফের ত্রাণকেন্দ্রে গেলে গুলিতে মারা পড়তে পারেন, তবুও যান। কারণ, না গেলে তাঁদের শিশুদের না খেয়ে থাকতে হয়। বাজারে কিছুই কেনার মতো অবস্থা নেই, সবকিছুর দাম খুব বেশি।

গাজার অনেক জায়গায় শিশু, এমনকি নবজাতকেরাও না খেয়ে মারা যাচ্ছে।

রোববার গাজা নগরীর আল-আকসা মারটায়ার হাসপাতালের একটি সূত্র আল–জাজিরাকে বলেছেন, রাজান আবু জাহের নামের চার বছর বয়সী এক শিশু অপুষ্টি ও অনাহারের কারণে মারা গেছে।

শনিবার আল-শিফা হাসপাতালের পরিচালক বলেছেন, সেখানে দুজন ফিলিস্তিনি অনাহারে প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে ৩৫ দিন বয়সী এক শিশুও আছে।

গাজা উপত্যকার একটি এলাকায় ত্রাণের জন্য জড়ো হয়েছেন ফিলিস্তিনিরা। ২০ জুলাই ২০২৫
গাজা উপত্যকার একটি এলাকায় ত্রাণের জন্য জড়ো হয়েছেন ফিলিস্তিনিরা। ২০ জুলাই ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

কেন জনশূন্য, ভুতুড়ে হয়ে পড়ছে ইতালির এই শহর -বিবিসি

ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় ফ্রেগোনা শহরের সরু মূল সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় মেয়র জাকোমো দে লুকা কিছু দোকানপাট দেখালেন। এর মধ্যে আছে দুটি সুপারমার্কেট, একটি সেলুন, কিছু রেস্তোরাঁ। কিন্তু দোকানগুলোর শাটার ফেলে রাখা। সাইনবোর্ডগুলো মলিন। এখন আর চালু নেই।

ইতালির অনেক শহরের মতোই পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত সুন্দর শহর ফ্রেগোনা এখন প্রায় জনশূন্য। কারণ, স্থানীয় বাসিন্দারা আগের চেয়ে অনেক কম সন্তান নিচ্ছেন, অনেকে আবার বড় শহরে চলে যাচ্ছেন, কেউ কেউ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।

এখন স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও বন্ধ হওয়ার পথে। আর এ নিয়েই সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় আছেন শহরের মেয়র।

দে লুকা ব্যাখ্যা করে বলেন, নতুন বছরে প্রথম শ্রেণির ক্লাস চালু করা যাচ্ছে না। কারণ, সেখানে মাত্র চারজন শিশু আছে। তাঁরা এটা বন্ধ করে দিতে চান।

নিয়ম অনুযায়ী, স্কুল পরিচালনার জন্য তহবিল পেতে হলে প্রতিটি ক্লাসে অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থী থাকতে হয়।

ভেনিস শহর থেকে গাড়ি চালিয়ে ফ্রেগোনায় যেতে এক ঘণ্টা লাগে। মেয়রের হিসাব অনুযায়ী, ফ্রেগোনার জনসংখ্যা গত দশকে প্রায় এক–পঞ্চমাংশ কমেছে।

চলতি বছর জুন মাস পর্যন্ত ফ্রেগোনা শহরে মাত্র চারটি শিশুর জন্ম হয়েছে। শহরের বাকি প্রায় ২ হাজার ৭০০ বাসিন্দার বেশির ভাগই প্রবীণ।

দে লুকার কাছে রিসিপশন ক্লাস (প্রাথমিক শ্রেণি) বন্ধ হয়ে যাওয়া যেন এক মোড় ঘোরানো ঘটনা। তিনি আশঙ্কা করছেন, যদি শিশুরা ফ্রেগোনার বাইরে গিয়ে পড়ালেখা শুরু করে, তাহলে তারা আর এ শহরের দিকে ফিরে তাকাবে না।

এ কারণে মেয়র এখন আশপাশের এলাকা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এমনকি কাছের একটি পিৎজা কারখানাতেও গেছেন। তাঁর একটাই চেষ্টা, যেভাবেই হোক সেখানকার অভিভাবকদের রাজি করানো, যেন তাঁদের সন্তানদের ফ্রেগোনার স্কুলে ভর্তি করান এবং স্কুলটি বাঁচিয়ে রাখার সুযোগ তৈরি হয়।

বিবিসিকে মেয়র বলেন, ‘আমি মিনিবাস পাঠিয়ে শিশুদের সেখান থেকে নিয়ে আসার প্রস্তাব দিয়েছি। আমরা প্রস্তাব দিয়েছি, শিশুরা চাইলে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত স্কুলে থাকতে পারবে। সব খরচ দেবে পৌরসভা।’

দে লুকা আরও বলেন, ‘আমি ভীষণ উদ্বিগ্ন। যদি এভাবে চলতেই থাকে, এ এলাকা শেষ হয়ে যাবে।’

দেশজুড়েই সমস্যা

ইতালির জনসংখ্যা সংকট শুধু ফ্রেগোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গত এক দশকে পুরো দেশের জনসংখ্যা কমেছে প্রায় ১৯ লাখ। টানা ১৬ বছর ধরে জন্মহার কমছে।

ইতালির একজন নারী এখন গড়ে মাত্র ১ দশমিক ১৮ হারে সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। এটি দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে কম জন্মহার। এ হার ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় হার ১ দশমিক ৩৮-এরও নিচে। আর স্থিতিশীল জনসংখ্যার মানদণ্ড ২ দশমিক ১ হার থেকে তো অনেকটাই নিচে।

সন্তান জন্মে উৎসাহ দিতে নানা উদ্যোগ নেওয়ার পরও জর্জিয়া মেলোনির ডানপন্থী সরকার জন্মহার বাড়াতে পারেনি।

ফ্রেগোনার মূল চত্বরে ভ্যালেন্তিনা দোত্তোর নামের স্থানীয় এক নারীর সঙ্গে বিবিসির আলাপ হয়। তাঁর সঙ্গে ছিল ১০ মাসের মেয়ে দিলেত্তা।

ভ্যালেন্তিনা বলেন, একটা সন্তান নেওয়ার আগে এখন অনেক চিন্তা করতে হয়।
দিলেত্তার জন্মের প্রথম বছরে ভ্যালেন্তিনা সরকার থেকে মাসে প্রায় ২০০ ইউরো (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২১ হাজার টাকা) ভাতা পান। তবে অল্পের জন্য তিনি সরকারের নতুন ঘোষিত ‘বেবি বোনাস’ স্কিম পাননি। এ স্কিমের আওতায় ২০২৫ সালে জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্য এক হাজার ইউরোর নতুন অনুদান ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকার নতুন করে কর রেয়াত এবং বাবা-মায়ের জন্য ছুটির সময়সীমাও বাড়িয়েছে। তবুও বাস্তব জীবনের খরচ, অনিশ্চয়তা আর ভবিষ্যতের চিন্তাই মানুষকে সন্তান নেওয়া থেকে পিছিয়ে রাখছে।

তবে ভ্যালেন্তিনাকে এখন কাজের জায়গায় ফিরতে হচ্ছে। কারণ, সাশ্রয়ী দামে শিশুসেবা পাওয়া এখনো খুব কঠিন।

ভ্যালেন্তিনা বলেন, ‘শিশু কম, কিন্তু শিশুদের রাখার জায়গাও খুব কম। আমি ভাগ্যবান। কারণ, আমার দাদি আমার মেয়েকে দেখাশোনা করেন। তা না হলে আমি জানি না তাকে কোথায় রেখে যেতাম।’

এ কারণেই ভ্যালেন্তিনার অনেক বন্ধু মা হতে সাহস পান না।

ভ্যালেন্তিনা বলেন, ‘চাকরি, স্কুল, খরচ—সবকিছু মিলিয়ে এটা কঠিন কাজ। কিছুটা সহায়তা পাওয়া যায়, তবে তা সন্তান নেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।’

‘এতে সমস্যা মিটবে না’

ভেনেতো অঞ্চলের কিছু কোম্পানি নিজেদের উদ্যোগেই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে।

ফ্রেগোনা থেকে একটু নিচের দিকে নামলেই ভেনেতো নামের বড় এ শিল্প এলাকার দেখা পাওয়া যায়। সেখানে অনেক ছোট ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এমনই একটি কোম্পানি ইরিনক্স। তারা অনেক আগেই বুঝেছিল যে কর্মীদের সন্তানদের দেখাশোনা নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। তাই ইরিনক্স আরও সাতটি কোম্পানির সঙ্গে মিলে কারখানার কাছেই একটি শিশু দেখাশোনার কেন্দ্র খুলে দেয়। এটি একদম ফ্রি না হলেও অনেকটা সস্তা আর সুবিধাজনক। এটি ইতালিতে নেওয়া প্রথম এমন ধরনের উদ্যোগ।

ইরিনক্সের কর্মকর্তা মেলানিয়া সান্দ্রিন বলেন, ‘আমার ছেলেকে মাত্র দুই মিনিটের দূরত্বে কোনো জায়গায় রাখতে পারাটা আমার জন্য সুবিধাজনক। কারণ, আমি চাইলে যখন খুশি ওর কাছে যেতে পারি।’

এই শিশু যত্ন কেন্দ্র না থাকলে মেলানিয়ার পক্ষে চাকরিতে ফেরা কঠিন হতো। কারণ, তিনি নিজের বাবা-মায়ের ওপর নির্ভরশীল হতে চাননি। আর সরকারি অনুদানে পরিচালিত শিশু যত্ন কেন্দ্রগুলো সাধারণত পুরো দিনের জন্য শিশুদের নেয় না। জায়গাও কম।

ভ্যালেন্তিনার মতো মেলানিয়া এবং তাঁর বন্ধুরাও কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে গিয়ে দেরি করে সন্তান নিয়েছেন। সন্তান জন্মের সময় তাঁদের বয়স ছিল ৩০-এর কোটার শেষের দিকে। দ্বিতীয় সন্তান নেবেন কি না, এখনো তিনি নিশ্চিত নন।

মেলানিয়া বলেন, এটা সহজ কাজ নয়।

ইরিনক্স কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাটিয়া দা রস মনে করেন, ইতালিকে জনসংখ্যা সমস্যা মোকাবিলায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে।

কাটিয়া বলেন, ‘শুধু এক হাজার ইউরো অনুদান দিয়ে কিছু হবে না; বরং বিনা মূল্যে শিশু যত্ন কেন্দ্রের মতো সেবাগুলো পাওয়া দরকার। যদি আমরা পরিস্থিতি বদলাতে চাই, তাহলে আমাদের জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।’

অভিবাসনের সংখ্যা বাড়ানোটা এ ক্ষেত্রে আরেকটি সমাধান হতে পারে। এটি ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য অনেক বেশি বিতর্কিত বিষয়।

ইরিনক্স কারখানায় বর্তমান কর্মীদের ৪০ শতাংশের বেশি বিদেশি।

এসব কর্মী কোন কোন দেশের, তা কারখানার একটি দেয়ালে টাঙানো মানচিত্রে পিন দিয়ে চিহ্নিত করা আছে। মঙ্গোলিয়া থেকে শুরু করে বুরকিনা ফাসো পর্যন্ত নানা দেশ থেকে এই কর্মীরা এসেছেন।

কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাটিয়া দা রোস বলছেন, জন্মহার হঠাৎ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তাই ভেনেতো অঞ্চলের মতো অর্থনীতি সচল রাখতে ইতালিতে আরও বেশি বিদেশি শ্রমিক প্রয়োজন।

তবে শুধু অভিবাসনও পাশের শহর ত্রেভিসোর একটি স্কুলকে রক্ষা করতে পারেনি। গত মাসে পাসকোলি প্রাথমিক স্কুল চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, সেখানকার ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা এতটাই কমে গিয়েছিল যে স্কুল চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হচ্ছিল না।

শেষ দিনে এক বিদায় অনুষ্ঠানে স্কুলের সিঁড়িতে মাত্র ২৭ জন শিশু জড়ো হয়েছিল।
এলিনোরা ফ্রানচেস্কি নামের এক অভিভাবক তাঁর আট বছর বয়সী মেয়েকে শেষবারের মতো ওই স্কুল থেকে নিয়ে আসার অভিজ্ঞতা উল্লেখ বলেন, ‘এটা সত্যিই দুঃখজনক দিন’। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে মেয়েকে অনেক দূরের অন্য একটি স্কুলে নিয়ে যেতে হবে তাঁকে।

তবে এলিনোরা মনে করেন, শুধু জন্মহার কমে যাওয়াই এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী নয়। পাসকোলি স্কুলটি বিকেলে কোনো ক্লাস চালাত না। এর জন্য কর্মজীবী অভিভাবকদের পক্ষে সন্তানদের সেখানে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে অনেকেই সন্তানদের অন্য স্কুলে ভর্তি করান।

জাতিসংঘের এক পূর্বাভাস বলছে, আগামী ২৫ বছরে ইতালির জনসংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ কমে যেতে পারে, অর্থাৎ জনসংখ্যা তখন ৫ কোটি ৯০ লাখ থেকে ৫ কোটি ৪০ লাখে নেমে আসতে পারে। এর পাশাপাশি প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়বে। এতে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও জোরালো হবে।

সরকার এখন পর্যন্ত যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলো এ সংকটের মূলে পৌঁছাতে পারেনি।

তবে এলিনোরা মনে করেন, শুধু অর্থনৈতিক অনুদান দিয়ে হবে না। অভিভাবকদের বাস্তব সেবা ও কার্যকর সহায়তা দরকার, যেটা সন্তান লালনপালনের করার পথটা সহজ করবে।

ইতালির ফ্রেগোনা শহর
ইতালির ফ্রেগোনা শহর। ছবি: বিবিসির এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া

ওবামাকে গ্রেপ্তারের কৃত্রিম ভিডিও পোস্ট করে ট্রাম্প: আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই গ্রেপ্তার করেছে। এ সময় তাকে হ্যান্ডকাফ পরানো হয়। কারাগারের ভিতর ওবামা কমলা কয়েদিদের কমলা রঙের পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছেন। না, এই খবর সত্য নয়। কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে বানানো এমন ভিডিও পোস্ট করেছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এ নিয়ে শোরগোল চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। এ খবর দিয়ে অনলাইন এনডিটিভি বলছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সোমবার সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে লক্ষ্য করে আক্রমণ আরও জোরদার করেছেন। তিনি ট্রুথ সোশালে এআই-সৃষ্ট ওই ভিডিও পোস্ট করেছেন। তাতে দেখা যাচ্ছে- এফবিআই ওবামাকে ওভাল অফিসে গ্রেফতার করছে। ভিডিওটির শুরুতে ওবামার একটি বক্তব্য শোনা যায়। তিনি বলছেন, ‘বিশেষত প্রেসিডেন্ট আইনের ঊর্ধ্বে।’ এরপর ভিডিওতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজনীতিবিদদের কণ্ঠে শোনা যায়- ‘আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।’ কৃত্রিমভাবে তৈরি দৃশ্যে দেখা যায়, এফবিআই এজেন্টরা সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে গ্রেফতার করছে। একই সময়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনরত ট্রাম্প পেছনে বসে হাসছেন। ভিডিওর শেষে দেখা যায়, ওবামা কারাগারের ভেতরে কমলা রঙের বন্দির পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছেন। ট্রাম্প ভিডিওটি কাল্পনিক বলে কোনো সতর্কীকরণ দেননি, যা সমালোচকদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। সমালোচকরা একে ‘চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন কয়েক সপ্তাহ আগে ওবামার বিরুদ্ধে ট্রাম্প ‘উচ্চপর্যায়ের নির্বাচনী জালিয়াতি’র অভিযোগ তোলেন। এর আগের সপ্তাহে মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড দাবি করেন, তার হাতে চমকপ্রদ ও অপ্রতিরোধ্য প্রমাণ আছে যে, ওবামা প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তারা ২০১৬ সালের নির্বাচনের পর ট্রাম্প-রাশিয়া যোগসাজশ তত্ত্ব সাজিয়েছিলেন। যাতে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি ঠেকানো যায়। তিনি সাবেক ওবামা প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়ার আহ্বান জানান। গ্যাবার্ড এক্সে লিখেছেন, আমেরিকানরা অবশেষে সত্য জানবে- ২০১৬ সালে ওবামা প্রশাসনের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা কীভাবে গোয়েন্দা তথ্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কার্যত একটি বহু বছরের অভ্যুত্থানের পথ সুগম করেছিলেন, যা আমেরিকার জনগণের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করেছে এবং আমাদের গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রকে দুর্বল করেছে।

তবে ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের দপ্তর একটি ১১৪ পৃষ্ঠার নথি প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের নভেম্বর নির্বাচনের আগেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ধারাবাহিকভাবে মূল্যায়ন করেছিল যে, রাশিয়া সাইবার মাধ্যম ব্যবহার করে নির্বাচনে প্রভাব ফেলছে- এমন কোনো প্রমাণ নেই।

নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্টের দৈনিক প্রতিবেদনের খসড়ায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী অবকাঠামোর বিরুদ্ধে সাইবার হামলা চালিয়ে সাম্প্রতিক মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করেনি।

mzamin

গাজায় আরও ৬৭ হত্যা, অনাহারে ১৮ মৃত্যু

গাজার উত্তরে জাতিসংঘের ত্রাণবাহী লরির জন্য অপেক্ষায় থাকা কমপক্ষে ৬৭ জনকে ইসরাইলি সেনারা হত্যা করেছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, তাদের ২৫টি ট্রাকের ত্রাণ বহর ইসরাইলি চেকপয়েন্ট পেরোনোর পর ‘ক্ষুধার্ত মানুষের বিশাল ভিড়ের মুখোমুখি হয়। ইসরাইলিরা তাদের ওপর গুলি চালায়। ওদিকে ২৪ ঘন্টায় অনাহারে গাজায় মারা গেছেন কমপক্ষে ১৮ জন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বলেছে, তারা তাৎক্ষণিক হুমকি মোকাবিলায় সতর্কতামূলক গুলি চালায়। নিহতের সংখ্যা নিয়েও তারা আপত্তি তুলেছে। শনিবার গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলে, গাজায় চরম ক্ষুধা দ্রুত বাড়ছে এবং তাদের চিকিৎসা কেন্দ্রে চরম অবসাদগ্রস্ত ও ক্লান্ত অবস্থায় ক্রমবর্ধমান সংখ্যক মানুষ আসছেন। তারা জানায়, ক্ষুধার কারণে শরীর শুকিয়ে যাওয়া শত শত মানুষ মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছেন। জাতিসংঘও বলেছে, গাজার মানুষ অনাহারে ভুগছে। জরুরি ত্রাণ সরবরাহের আহ্বান জানিয়েছে তারা।

গাজার উত্তরে অনেক আহতকে গাজা সিটির শিফা হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালের মেডিকেল ডিরেক্টর ড. হাসান আল-শায়ের রবিবার জানান, হাসপাতালটি অতিমাত্রায় চাপে আছে। হাসপাতালের বাইরে এক নারী বলেন, পুরো জনসংখ্যাই এখন মৃত্যুর মুখে। তিনি আরও বলেন, শিশুরা ক্ষুধায় মারা যাচ্ছে। কারণ তাদের খাওয়ার কিছু নেই। মানুষ কেবল পানি আর লবণ খেয়ে বেঁচে আছে... শুধু পানি আর লবণ।

গাজার সিভিল ডিফেন্স সংস্থা হালনাগাদ তথ্য দিয়ে জানিয়েছে, রবিবার গাজাজুড়ে ইসরাইলি হামলায় মোট ৯৩ জন নিহত এবং বহু লোক আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৮০ জন নিহত হন উত্তর গাজায়, ৯ জন রাফাতে ত্রাণ বিতরণ পয়েন্টের কাছে এবং আরও ৪ জন খান ইউনিসে ত্রাণকেন্দ্রের কাছে নিহত হয়েছেন।

গাজা সিটিতে কাসেম আবু খাতের এএফপিকে বলেন, তিনি এক ব্যাগ আটা আনতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে পেলেন মরিয়া ভিড় আর প্রাণঘাতী হুড়োহুড়ি। তিনি বলেন, ট্যাংকগুলো এলোমেলোভাবে আমাদের ওপর শেল নিক্ষেপ করছিল। ইসরাইলি স্নাইপাররা এমনভাবে গুলি চালাচ্ছিল যেন বনজঙ্গলে পশু শিকার করছে। আমার চোখের সামনে ডজন ডজন মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং কাউকে বাঁচানো যায়নি।

ডব্লিউএফপি এক বিবৃতিতে বলেছে, ত্রাণ নিতে আসা সাধারণ মানুষের ওপর সহিংসতা পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য। তারা জানিয়েছে, অপুষ্টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। ৯০,০০০ নারী ও শিশুর জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। প্রায় প্রতি তিন জনে একজন কয়েকদিন ধরে খাবার পাচ্ছে না। মে মাসের শেষ দিক থেকে প্রায়দিনই ত্রাণের সন্ধানে থাকা ফিলিস্তিনিদের হত্যার খবর আসে। শনিবারই দক্ষিণ গাজার দুটি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের কাছে ইসরাইলি গুলিতে কমপক্ষে ৩২ জন নিহত হয় বলে মন্ত্রণালয় জানায়।

অনেক ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু মার্কিন ও ইসরাইল-সমর্থিত বিতর্কিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ)-এর ত্রাণকেন্দ্রগুলো। সেখান থেকে ইসরাইলি সেনা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বেসরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ করে। তবে জাতিসংঘের আনা ত্রাণ কেন্দ্রের কাছেও হামলা হয়েছে।

এদিকে, ইসরাইলি সেনারা কেন্দ্রীয় গাজার এক জনবহুল এলাকা খালি করার নির্দেশ দিয়েছে। সেখানে ২১ মাসের যুদ্ধে তারা এখনও স্থল অভিযান চালায়নি। রবিবার আইডিএফ জানায়, দেইর আল-বালাহ শহরে থাকা বাসিন্দা ও আশ্রয় নেয়া বাস্তুচ্যুতদের তাৎক্ষণিকভাবে সরে গিয়ে ভূমধ্যসাগরের উপকূলে আল-মাওয়াসির দিকে যেতে হবে। এই সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ, যা একটি আসন্ন আক্রমণের ইঙ্গিত দিতে পারে, হাজার হাজার ফিলিস্তিনির মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। একইসঙ্গে ইসরাইলি জিম্মিদের পরিবারও ভয় পাচ্ছে, তাদের প্রিয়জনরা ওই শহরেই আটক থাকতে পারে।

আইডিএফ ওই এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে এখনও স্থলবাহিনী মোতায়েন করেনি। রবিবার ইসরাইলি বাহিনী দেইর আল-বালাহর দক্ষিণ-পশ্চিম জেলার মানুষের ঘরে ঘরে লিফলেট ছড়িয়ে দিয়ে দক্ষিণে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। ইসরাইলি সেনারা জানায়, শত্রুর সক্ষমতা ও সন্ত্রাসী অবকাঠামো ধ্বংসে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে এখনো ওই এলাকায় প্রবেশ করেনি।

ইসরাইলি সূত্র রইটার্সকে জানায়, সেনারা এতদিন ওই এলাকায় প্রবেশ করেনি। কারণ তাদের সন্দেহ, সেখানে হামাস হয়তো জিম্মিদের আটকে রেখেছে। গাজায় আটক থাকা ৫০ জিম্মির মধ্যে কমপক্ষে ২০ জন জীবিত বলে বিশ্বাস করা হয়। গাজার ২০ লাখের বেশি মানুষের বেশির ভাগকেই ইসরাইল-হামাস যুদ্ধে একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে।

রবিবার পোপ লিও চতুর্দশ যুদ্ধের বর্বরতার অবসান এবং অন্ধভাবে শক্তি প্রয়োগের বিরোধিতা করার আহ্বান জানান। তার মন্তব্য আসে কয়েকদিন পর, যখন ইসরাইলি হামলায় গাজার একমাত্র ক্যাথলিক গির্জায় বহু প্রাণহানি ঘটে। তা নিয়ে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন।

mzamin

গণ–অভ্যুত্থানের মালিকানা কাদের হাতে চলে যায় by আনু মুহাম্মদ

বাংলাদেশের ইতিহাসে গণ–অভ্যুত্থানের একটি বড় প্রভাব বিস্তারকারী ভূমিকা চিহ্নিত করা কঠিন নয়। ১৯৫২ সাল থেকে আমরা এটি বিশেষভাবে লক্ষ করতে পারি। সে সময় ভাষা আন্দোলন যখন একটি গণ–অভ্যুত্থানের রূপ নেয়, তখনই পাকিস্তান সরকার ভাষার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। যদিও এখনো বাংলা ভাষার পরাজিত প্রান্তিক অপমানিত অবস্থা, তারপরও এই আন্দোলনের শক্তিই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যাত্রাপথ তৈরি করেছিল। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লিগকে ধরাশায়ী করে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের বিজয় এর প্রত্যক্ষ ফল।

এরপর জাতীয় পর্যায়ে দেশকাঁপানো গণ–অভ্যুত্থান আমরা দেখেছি ১৯৬৯, ১৯৯০ এবং সর্বশেষ ২০২৪–এ। শ্রমিক–কৃষকের ব্যাপক অংশগ্রহণে উত্তাল ১৯৬৯–এর গণ–অভ্যুত্থান পাকিস্তানের ‘লৌহমানব’ বলে পরিচিত সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের পতন ঘটিয়েছিল, তা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের শক্তি তৈরি করেছিল।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসন, সপরিবার রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব হত্যার পর সামরিক শাসন শুরু হয়। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যার পর ১৯৮২ সালে দ্বিতীয় দফা সামরিক শাসন শুরু হলে ১৯৮৩ সাল থেকে সামরিক শাসক এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৮৭ সালের নভেম্বরে পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হলেও ১৯৯০ সালের গণ–অভ্যুত্থান বাংলাদেশের সামরিক শাসক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দশকব্যাপী দুর্নীতিগ্রস্ত স্বৈরশাসনের অবসান ঘটায়।

এরপরও আমরা বেশ কয়টি ছোট–বড় গণপ্রতিরোধ দেখেছি। যেমন ১৯৯২ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলন থেকে গণ–আদালত, ১৯৯৬ সালে গণপ্রতিরোধে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা অন্যতম। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর বাংলাদেশে কার্যত আর কোনো নির্বাচন হয়নি। দেশের নির্বাচনব্যবস্থার মধ্যে ধস নেমেছিল। ২০১৪ সাল থেকে হাসিনা সরকার ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ অনির্বাচিত সরকার। ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান সেই সরকারের পতন ঘটিয়েছে।

এটা মনে রাখা দরকার যে গণ–অভ্যুত্থান এক দিনে হঠাৎ করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে না। এর পেছনে লম্বা ইতিহাস থাকে। ষাটের দশকে সামরিক শাসনবিরোধী লড়াই থেকে ১৯৬৯–এর গণ–অভ্যুত্থান, আশির দশকে সামরিক শাসনবিরোধী লড়াই থেকে ১৯৮৭ ও ১৯৯০–এর গণ–অভ্যুত্থান হয়। ২০১৪ থেকে গণতন্ত্র; নিরাপদ সড়ক আন্দোলন; সুন্দরবন আন্দোলন; কোটা সংস্কার আন্দোলন; গুম-খুন-অত্যাচারবিরোধী আন্দোলন এবং নিরাপত্তা–ভোটের অধিকারসহ জনস্বার্থের বিভিন্ন লড়াই থেকে ২০২৪–এর গণ–অভ্যুত্থানের শক্তি তৈরি হয়েছে।

এগুলো দেখাচ্ছে যে বাংলাদেশের জনগণের ওপর অবিচার, শোষণ, অত্যাচার, দখল, আধিপত্য, স্বৈরশাসন ইত্যাদির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ–প্রতিরোধক্রমে কীভাবে গণ–অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আসলে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে গণ–অভ্যুত্থান হচ্ছে এই জনপদের মানুষের প্রতিবাদ–প্রতিরোধের সর্বোচ্চ বিন্দুর রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ভাষা।

১৯৬৯, ১৯৯০ ও ২০২৪—এই তিন গণ–অভ্যুত্থানেই তিন স্বৈরশাসকের, আইয়ুব-এরশাদ-হাসিনার পতন হয়। তিন শাসনকালেই স্বৈরশাসনের প্রধান যুক্তি ছিল উন্নয়ন, তিন শাসকের মধ্যে প্রথম দুজন ছিলেন জেনারেল, তৃতীয়জন রাজনৈতিক পরিবারের লড়াই, অর্জন এবং নিপীড়নের অভিজ্ঞতার অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও নিজেই কুশাসন, দুর্নীতি ও নিপীড়নে কুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

আইয়ুবের পতন হয় তাঁর প্রচারিত উন্নয়ন দশক উদ্‌যাপনের পর, এরশাদের পতন হয় একই রকম দশকের শেষে এবং হাসিনার পতন হয় অনির্বাচিতকালে কথিত উন্নয়ন দশকের মহাসড়কে অবস্থানকালে। তিন আমলেই জিডিপি বেড়েছে, শানশওকতও দেখা গেছে কিন্তু সেই সঙ্গে বেড়েছে বিবিধ বৈষম্য। দেশে পুঁজিবাদের বিকাশ ও বৈষম্য বৃদ্ধি সামগ্রিক নীতিকাঠামোর মধ্য দিয়েই ঘটেছে। স্বৈরশাসন তারই রাজনৈতিক রূপ।

মনে রাখতে হবে যে তিন আমলেই এই উন্নয়ন মডেলের প্রধান কারিগর ছিল বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি গোষ্ঠী। তিন আমলেই ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে বৃহৎ ব্যবসায়ী এবং সামরিক-বেসামরিক আমলা ও নানা বাহিনীর হাতে। একদিকে সম্পদ কেন্দ্রীভবন, অন্যদিকে মানুষের ওপর নজরদারি, জুলুম অভিন্ন বৈশিষ্ট্য ছিল। শেষ দশকে নজরদারি, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বেড়ে যায় অনেক বেশি।

১৯৬৯–এ গণ–অভ্যুত্থান প্রবল রূপ নেয় আসাদুজ্জামান নামের একজন রাজনৈতিক সংগঠক মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার পর। ১৯৮৭ সালে নূর হোসেন, ১৯৯০ সালে ডা. মিলনের নিহত হওয়ার ঘটনাও একই রকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল, ২০২৪ সালেও রংপুরে শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পরই আন্দোলন তীব্র হয়। এরপরও সরকার যখন নির্বিচার হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রাখে, তখনই ২০২৪–এর গণ–অভ্যুত্থান অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে।

১৯৬৯ ও ১৯৯০ সালে এর নেতৃত্ব ছিল সবার চেনাজানা রাজনৈতিক দল ও নেতাদের হাতে। ১৯৬৯ সালে আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ এবং তাদের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন ছিল মূল ভূমিকায়, মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্ব গণ–অভ্যুত্থানে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। আওয়ামী লীগের ৬ দফা, ন্যাপের ১৪ দফা এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা ছিল এর চালিকা শক্তি। ১৯৯০ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮ দল, বিএনপির নেতৃত্বে ৭ দল এবং বামপন্থী ৫ দল এই তিন জোট এবং তাদের সম্মিলিত ‘তিন জোটের রূপরেখা’ ছিল প্রধান গন্তব্য।

কিন্তু ২০২৪–এর গণ–অভ্যুত্থানে এ রকম কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য ও নেতৃত্ব ছিল না। প্রতিরোধ আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও অসংখ্য নতুন নতুন কেন্দ্র গড়ে ওঠা ছিল এবারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

তবে রাজনৈতিক লক্ষ্য ও কেন্দ্র অনির্দিষ্ট থাকলেও দেয়ালের গ্রাফিতি ও জনসমাবেশ থেকে গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছে। সে সময় সৃষ্ট দেয়ালচিত্রগুলোকেই তাই গণ–অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সেখানে যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে, গত ১২ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার ও তাদের ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলো তা থেকে অনেক পেছনে চলে গেছে, কোথাও কোথাও বিপরীতে অবস্থান নিচ্ছে।

গণ–অভ্যুত্থানে সব ধর্ম-মত, লিঙ্গ, জাতি, শ্রেণির মানুষ অংশ নিয়েছে। অপ্রতিরোধ্য শক্তি, সংহতি ও গণতান্ত্রিক চৈতন্য খুবই শক্তিশালী পর্যায়ে গেছে এই সময়। কিন্তু আন্দোলন শেষ হয়ে যাওয়ার পর অসহিষ্ণু বা নিপীড়ক একেকটা পক্ষ আবির্ভূত হচ্ছে। মতপ্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করা, সহিংসতা বা চাপ সৃষ্টি করা, হামলা-হুমকির একটা নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। সেটা অনেক ক্ষেত্রেই ধর্মের নামে হচ্ছে।

উগ্র ধর্মবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতায় শুধু ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু মানুষেরাই নন, ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সুফি–আহমদিয়া–বাউল ধারার মানুষেরাও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বাস করছেন। শিল্পকর্মসহ মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন চিহ্ন আক্রান্ত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জোরজবরদস্তি ও দখলদারত্ব চলতে থাকায় তা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া দাঁড়াতে দিচ্ছে না।

সারা দেশে মব সন্ত্রাস, খুন-জখম-সহিংসতা, দখল, চাঁদাবাজি, হুংকারের পাশাপাশি সরকারি প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়, কোথাও কোথাও প্রশ্রয়দানের ভূমিকা বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর বহু ঘটনাই ঘটছে গণ–অভ্যুত্থানের ওপর গোষ্ঠী মালিকানা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদগ্র বাসনা থেকে।

এসবের মধ্য দিয়ে আবার প্রত্যাশার উচ্চস্থান থেকে হতাশার চোরাবালিতে পতিত হওয়ার চিত্রই ক্রমে স্পষ্ট রূপ নিচ্ছে। এ রকম পরিস্থিতি কখন দেখা দেয়? যখন নারী, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, ভিন্ন লিঙ্গ-ধর্ম-জাতির মানুষসহ গণ–অভ্যুত্থানের মূল কারিগরদের দূরে ঠেলে দেওয়া হয়। জনগণের বৃহৎ অংশ এটাকেই স্বাভাবিক ধরে কোনো না কোনো নেতা–নেত্রীর ওপর পরের ভার ছেড়ে দেন।

ধারাটা বরাবর এমনই হওয়ার কারণে বারবার গণ–অভ্যুত্থানের মালিকানা শুধু নয়, দেশের মালিকানাও চলে যায় ক্ষুদ্র সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর হাতে। মানুষকে শেখানো হয় অমুক বা তমুক নেতা বা নেত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে ঝাঁপিয়ে পড়তে। নিজে স্বপ্ন দেখার শক্তি বিসর্জন দিয়ে নেতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে জনগণের ভূমিকা হয়ে যায় নিষ্ক্রিয় অনুসারীর।

প্রকৃতপক্ষে কোনো নেতা–নেত্রী নয়, মানুষ যখন নিজেরা নিজেদের মুক্তির স্বপ্ন দেখতে শিখবে, সাহস করবে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিজেরা দেশের মালিকানা নিতে সক্রিয় হবে, সরব থাকবে, তখনই কেবল বারবার হতাশায় পতিত হওয়ার পর্ব থেকে আমাদের মুক্তির সূচনা হতে পারে।

* আনু মুহাম্মদ, শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের খবরে উল্লোসিত জনতা। জাতীয় সংসদ এলাকা, ৫ আগস্ট ২০২৪
স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের খবরে উল্লোসিত জনতা। জাতীয় সংসদ এলাকা, ৫ আগস্ট ২০২৪ ছবি: প্রথম আলো

তীব্র ক্ষুধার মধ্যে গাজায় হামলা জোরদারের ঘোষণা ইসরাইলের: ভোর থেকে কমপক্ষে ১১৬ হত্যা

তীব্র ক্ষুধার যন্ত্রণায় মৃত্যুর দিন গুনছেন গাজাবাসী। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল পরিচালিত ত্রাণ সহায়তা কেন্দ্রগুলো যেন মৃত্যু ফাঁদ। রোববার স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, ত্রাণপ্রার্থী ৩০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে তেল আবিব। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে গাজার মধ্যাঞ্চলে হামলা জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে দখলদাররা। এদিকে দেইর আল বালাহতে হামলা জোরাদের ঘোষণায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে উপত্যকাটিতে আটক জিম্মিদের পরিবার। তারা বলছে এতে জিম্মিদের জীবন হুমকির মুখে পড়বে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এতে বলা হয়, গাজায় ২১ মাস ধরে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। এতে উপত্যকাটির বেশির ভাগই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এছাড়া ইসরাইলি বাহিনীর বাধার মুখে তীব্র ক্ষুধার যন্ত্রণায় ভুগছে গাজার নিরীহ মানুষ। উত্তরাঞ্চলীয় শহরে অবস্থিত আল শিফা হাসপাতালের চিকিৎসকদের তরফে জানানো হয়েছে,  জাতিসংঘ পরিচালিত একটি ত্রাণ সহায়তা ট্রাকের সামনে ভিড় লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। এতে ৩০ জন নিহত এবং কয়েক ডজন আহত হয়েছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে দাবি করেছে দখলদাররা।

সহায়তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় খাদ্য সংকট তীব্র হয়েছে। এতে শত শত গাজাবাসী মৃত্যুর প্রহর গুনছে বলছে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তারা জানিয়েছে, ক্ষুধার যন্ত্রণায় ভুগতে থাকা শত শত গাজাবাসীর মৃত্যুর ঝুঁকি সম্পর্কে আমরা সতর্ক করেছি। এক্ষেত্রে গাজার মানুষের কাছে জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য সহায়তা পৌঁছানো দরকার বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

গাজার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শহর দেইর আল বালাহের মানুষকে তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে দক্ষিণে সরে যেতে নির্দেশনা দিয়ে আকাশ থেকে লিফলেট ফেলেছে ইসরাইলি বাহিনী। তারা হামাস নির্মুলের নামে সাধারণ মানুষের ওপর ক্রমাগত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

গাজায় ভোর থেকে কমপক্ষে ১১৬ হত্যা
রোববার ভোর থেকে দখল করে নেয়া গাজায় অব্যাহতভাবে গুলি চালিয়ে কমপক্ষে ১১৬ জনকে হত্যা করেছে ইসরাইলি বাহিনী। এর মধ্যে নিহত ৩৮ জন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) পরিচালিত খাদ্য বিতরণকেন্দ্রে গিয়েছিলেন খাদ্য সংগ্রহে। কিন্তু বিনিময়ে তাদেরকে বুলেটবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানিয়েছেন, খান ইউনিসের দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং রাফার উত্তর-পশ্চিমে দুটি স্থানে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, মে মাসের শেষ দিকে জিএইচএফ চারটি বিতরণকেন্দ্র চালু করার পর থেকে ইসরাইলি সেনা ও বেসরকারি সামরিক ঠিকাদারদের গুলিতে প্রায় ৯০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর আগে জাতিসংঘ ও অন্যান্য দাতব্য সংস্থা পরিচালিত প্রায় ৪০০ কেন্দ্র প্রতিস্থাপন করে এসব বিতরণকেন্দ্র চালু করা হয়েছিল।

ওদিকে জর্ডানের রাজধানী আম্মানের আল-তাফাইলা জেলায় গাজার প্রতি সংহতি জানিয়ে শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছে। আল জাজিরা নিশ্চিত করেছে, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, বিক্ষোভকারীরা গাজার সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে স্লোগান দিচ্ছে এবং ইসরাইলের ক্ষুধাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের নীতি ও চলমান আগ্রাসনের নিন্দা করছে।

অন্যদিকে ইসরাইলে বিশাল জনসমাগমে বিক্ষোভকারীরা গাজায় আটক ৫০ জীবিত ও মৃত বন্দির মুক্তি এবং যুদ্ধের অবসানের জন্য একটি সমন্বিত চুক্তির দাবি তুলেছে। তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমরা জানি চুক্তির খসড়া রয়েছে, যা নেই তা হলো শেষ ধাক্কা। সেই দৃঢ়তা যা কেবল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই আনতে পারেন। আমরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অনুরোধ করছি, এগিয়ে আসুন। আপনার ক্ষমতা ব্যবহার করুন। বিশ্বকে দেখান যে স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ। জিম্মি ইতাই চেনের (যার মৃতদেহ গাজায় আছে) বাবা রুবি চেন এ কথা বলেন। বিক্ষোভকারীরা ‘বড়, সুন্দর চুক্তি’ করার আহ্বান জানিয়ে ট্রাম্পের উদ্দেশে ব্যানারও প্রদর্শন করেন। লিওর রুদায়েফের (যার মৃতদেহ গাজায় আছে) ছেলে নাদাভ রুদায়েফ সরাসরি ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, সব পক্ষকে চাপ দিতে আপনি যা পারেন করুন, দয়া করে।

ওদিকে, রামাল্লাহর কাছের আল-মুগাইয়ির গ্রামে ইসরাইলি বাহিনীর অভিযানে ডজনখানেক মানুষ কাঁদানে গ্যাসে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এর আগে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা গ্রামে প্রবেশের চেষ্টা করলে স্থানীয়রা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। অন্যদিকে, রামাল্লাহ সংলগ্ন নীলিন গ্রামে এক ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। বসতি স্থাপনকারীরা একটি নির্মাণাধীন বাড়িতে হামলা চালায় এবং প্রতিরোধকারী গ্রামবাসীর দিকে গুলি ছোড়ে, যদিও আর কোনো হতাহতের খবর নেই। গাজার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

mzamin

চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ হবে পাথর আর তির-ধনুক দিয়ে... by তুষার কান্তি চাকমা

মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত যুদ্ধের ইতিহাস। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ সংঘাতের মধ্য দিয়েই তার পথ তৈরি করেছে। খ্রিষ্টপূর্ব ১২৭৪ সালে সংঘটিত কাদেশ যুদ্ধকে প্রাচীনতম নথিভুক্ত যুদ্ধ হিসেবে ধরা হয়, যা আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগের ঘটনা। তবে এর আগে কতশত, সহস্র যুদ্ধ হয়েছে, তার কোনো লিখিত ইতিহাস নেই। শুধু রক্তাক্ত নিঃশব্দতা।

জাতি, সভ্যতা ও ভূখণ্ডের উত্থান–পতনের মূল চালিকা শক্তিই ছিল যুদ্ধ। ১২০০ সালের দিকে কেউ চিনত না মঙ্গলদের। কিন্তু ১২১৮ সালে চেঙ্গিস খানের উত্থানের পর মধ্য এশিয়ার খাওয়ারিজম সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়। এরপর ১৪০০ সালের মধ্যে গড়ে ওঠে ইতিহাসের বৃহত্তম সাম্রাজ্য। মঙ্গলদের হাতে কোটি কোটি মানুষ প্রাণ হারান।

বাগদাদের পতনের পর ফোরাত নদীর পানি রক্তে লাল হয়েছিল দিনের পর দিন।
এরপর এসেছে গ্রিক, রোমান, পারস্য ও মোঘলদের যুদ্ধগাথা। এসেছে দুটি মহাযুদ্ধ, যা গোটা পৃথিবীর মানচিত্র ও মানবতার বোধকে পাল্টে দিয়েছে। তবু মানুষ থেমে থাকেনি। যুদ্ধ যেন মানবজাতির বিবর্তনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

মানুষ কখনো স্থায়ী শান্তিতে বিশ্বাস করেনি, আজও করে না। যুদ্ধের ন্যায্যতা প্রমাণে কত হাস্যকর যুক্তি যে আমরা দিতে পারি! লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু আমাদের বিবেককে নড়াতে পারে না। গাজা উপত্যকায় হাজার হাজার নিরীহ ফিলিস্তিনির মৃত্যুও আমাদের দৃষ্টিকে ঝাপসা করতে পারে না। কারণ, পাশ্চাত্য শক্তিগুলো নিরন্তর ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

যুদ্ধ করার জন্য আজ আর প্রকৃত কোনো কারণের প্রয়োজন হয় না, কেবল একটি অজুহাতই যথেষ্ট। ‘তোমার বাবা পানি ঘোলা করেছিলেন’ ধরনের যুক্তিই এখন যথেষ্ট। ইসরায়েল ১৯৭৩ সাল থেকে প্রায় ১০০টি পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে বসে আছে। সবাই জানে, কিন্তু কেউ স্বীকার করে না। অন্যদিকে ইরান যেন একটিও বোমা তৈরি না করে। এ দ্বিচারিতা আমাদের সভ্যতার নির্মম বাস্তবতা।

জনাথন সুইফট তাঁর ব্যঙ্গাত্মক রচনায় লিলিপুট ও ব্লেফুস্কু নামের দুটি জাতির কথা বলেন,যারা শত বছর যুদ্ধ করেছে ডিম ভাঙার পদ্ধতি নিয়ে—এক পক্ষ ডিমের মোটা দিক দিয়ে, অপর পক্ষ সরু দিক দিয়ে ভাঙার পক্ষে। বাস্তবেও আমাদের যুদ্ধের কারণ প্রায় তেমনই তুচ্ছ ও হাস্যকর।

আজকের যুদ্ধ আর আগেকার মতো সম্মুখ সমর নয়। গ্লাডিয়েটরদের হাতাহাতির দিন পেরিয়ে গেছে। এখন দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়, যাদের ভৌগোলিক দূরত্ব হাজার মাইল। এক দেশের যুদ্ধবিমান আরেক দেশের নিউক্লিয়ার স্থাপনায় বোমা ফেলছে এবং প্রতিপক্ষ তাদের রাজধানীতে মিসাইল ছুড়ে দিচ্ছে। যুদ্ধ এখন বোতামে চাপ, রাডার ফাঁকি, স্যাটেলাইট আর ড্রোনের খেলা।

নৌযুদ্ধও বদলে গেছে। এখন আর ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান’-এর মতো তরবারি হাতে জাহাজে ঝাঁপিয়ে পড়া নয়। এখন আধুনিক যুদ্ধজাহাজ বা সাবমেরিন থেকে দূরবর্তী টার্গেট ধ্বংস করা হয় বোতাম টিপেই। পারমাণবিক সাবমেরিন মাসের পর মাস পানির নিচে থেকে যেকোনো শহর ধ্বংস করে দিতে পারে।

আকাশযুদ্ধেও পরিবর্তন এসেছে। ‘টপ গান’–এর মতো যুদ্ধবিমান কামান দিয়ে শত্রু ভূপাতিত করার যুগ পেরিয়ে গেছে। এখন ২০০ কিলোমিটার দূর থেকে শত্রুর বিমান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। কিছু বিমান রাডারেও ধরা পড়ে না। এটি যেন মহাভারতের মতো—মেঘনাদ আড়াল থেকে আক্রমণ করছে, অর্জুন দূর থেকে শত্রু সেনাকে বাণে বিদ্ধ করছে।

ড্রোন প্রযুক্তি যুদ্ধকে করেছে আরও ভয়াবহ। ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরানে পরমাণুবিজ্ঞানী হত্যা কিংবা হামাসের নেতাদের সুনির্দিষ্টভাবে টার্গেট করে বিস্ফোরণ—সবই ড্রোন ও রিমোট কন্ট্রোল প্রযুক্তির উদাহরণ। যুদ্ধ এখন মানুষবিহীন, মনুষ্যত্বহীন, কিন্তু নিখুঁত।
আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কিসে হবে জানি না, তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ হবে পাথর আর তির–ধনুক দিয়ে।’ অনেকেই বলেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়তো ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে, শুধু আমাদের তা বুঝে ওঠা বাকি।

চীনের অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত উত্থান আজ বিশ্বকে চমকে দিচ্ছে। ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান, বিমানবাহী রণতরি, নতুন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি—সবই নতুন যুদ্ধ বাস্তবতার দিকচিহ্ন। চীনের পরোক্ষ সহায়তায় পাকিস্তান ভারতের গর্ব ‘রাফাল’ বিমান ভূপাতিত করেছে। পশ্চিমা প্রাধান্যের যুগ কি তবে শেষ? পশ্চিমারা হয়তো তা মানতে চায় না, তাই তারা শেষ পর্যন্ত মরিয়া প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদেরই বানানো নিয়ম আজ তাদেরই অনৈতিকতা প্রমাণ করছে।

বিশ্ব এখন এমন এক যুদ্ধ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে, যেখানে যুদ্ধ মানে শুধু গোলাবারুদের সংঘর্ষ নয়, এটি প্রযুক্তির, নৈতিকতার, রাজনৈতিক দ্বিচারিতার ও আন্তর্জাতিক হিপোক্রেসির ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি।

মানবসভ্যতা আজ ভয়াবহ এক বাস্তবতার মুখোমুখি। যেকোনো মুহূর্তেই ঘটে যেতে পারে আণবিক যুদ্ধ। আর তা যদি হয়, আমাদের উত্তরসূরিরা যে পাথর আর তির–ধনুক যুদ্ধ করবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। রবার্ট ওপেনহাইমার নেভাদায় পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের পর শ্রীমদ্‌ভগবদ্‌গীতার একটি শ্লোকের অনুছায়ায় বলেছিলেন, ‘নাউ আই এম বিমাক ডেথ, দ্য ডেস্ট্রয়ার অব ওয়ার্ল্ডস’। সে পথেই আজ মানুষ ধেয়ে যাচ্ছে।

* তুষার কান্তি চাকমা, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল।

বাংলাদেশে ‘পুশ ইনে’ বিপদে ভারতীয়রাই by সালেহ উদ্দিন আহমদ

ভারতে সবচেয়ে ‘বিখ্যাত’ বাংলাদেশি এখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়া ৫ আগস্টের পর অনেক আওয়ামী লীগপন্থী রাজনীতিবিদ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। বাংলাদেশে ভারতের যত ‘পুশ ব্যাক’ হচ্ছে, স্বভাবতই এসব বাংলাদেশিদের তার বাইরে রাখা হয়েছে। 

২.
নিয়তির কী পরিহাস! ভারতে আসল বাংলাদেশিদের ‘মেহমান’ বানিয়ে, ‘পুশ ব্যাকের’ জন্য ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে হাজার হাজার ভারতীয় নাগরিককে ‘বাংলাদেশি’ বলে হেনস্তা করা হচ্ছে। এঁদের মধ্যে রয়েছেন বাংলা ভাষাভাষী অনেক হিন্দু ও মুসলমান। এই সব দরিদ্র লোকগুলোকে ভারত সরকার ব্যবহার করছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘বাংলাদেশকে শায়েস্তা করার’ রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য।

বিজিপিশাসিত রাজ্যগুলোও এই পুশ ব্যাককে ব্যবহার করছে নিজ নিজ রাজ্যে অবাঙালি ভোটারদের মন জয় করে বিজেপির ভোট বাড়াতে।

১৭ জুলাই ‘বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে বাঙালিদের ওপর অত্যাচার’-এর প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস কলকাতায় এক মিছিল বের করে। কলকাতার বাংলা পত্রিকা আনন্দবাজার জানায়, মিছিল শেষে মমতার প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার বক্তৃতায় সিংহভাগজুড়েই ছিল বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে বাঙালিদের হেনস্তার অভিযোগ।

প্রতিবাদ সভায় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বিজেপিশাসিত রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার এবং বাংলাদেশি তকমা দিয়ে আটক করা গণতন্ত্রের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ।

ভারতীয় সংবাদপত্রগুলোতে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই সব বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া অসহায় ভারতীয় নাগরিকদের হৃদয়বিদারক কাহিনিগুলো ক্রমান্বয়ে প্রকাশ পাচ্ছে। কিন্তু ভারত সরকার নির্বিকার। মোদি সরকার এই বিষয়গুলো নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য না করলেও তাদের কর্মকাণ্ড সাক্ষ্য দেয় তাদের মূল উদ্দেশ্য কী।

৩.
আসাম থেকে বিবিসির একটা প্রতিবেদন, প্রকাশ পায় জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে।
ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্য আসামের বারপেটা জেলার বাসিন্দা ৫৮ বছর বয়সী সোনা বানু। তিনি বলেন যে ২৫ মে তাঁকে স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে ডেকে পাঠানো হয় এবং পরে তাঁকে বাংলাদেশ সীমান্তের এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁকে এবং আরও প্রায় ১৩ জনকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, কেন যে তাঁকে অন্য দেশে পাঠানো হলো, তা তাঁকে বলা হয়নি; এই পরিস্থিতিতে তিনি খুব ভয় পেয়েছিলেন। সোনা বানু বলেন, তিনি সারা জীবন আসামে বসবাস করেছেন, তিনি একজন ভারতীয় নাগরিক এবং বাংলাদেশ থেকে আসা ‘অবৈধ অভিবাসী’ নন।

‘তারা আমাকে বন্দুকের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমি মশা এবং জোঁকে ভরা হাঁটু পর্যন্ত জলের মধ্যে দুই দিন খাবার বা জল ছাড়াই কাটিয়েছি’, সোনা বানু চোখের জল মুছতে মুছতে বিবিসির প্রতিবেদককে বলেন। দুই দিন সীমান্তবর্তী এলাকায় রাখার পর, তাঁকে বাংলাদেশের পাশের একটি পুরোনো কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

সেখানে দুই দিন থাকার পর, বাংলাদেশি কর্মকর্তারা তাঁকে এবং আরও কয়েকজনকে সীমান্তের ওপারে ভারতীয় কর্মকর্তাদের কাছে নিয়ে যান। ভারতীয় কর্মকর্তারা শেষমেশ তাঁদের ভারতে তাঁদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। এই সব কথা মনে পড়লে এখনো সোনা বানুর বুক কেঁপে ওঠে।

সোনা বানুকে কেন হঠাৎ করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল এবং তারপর ফিরিয়ে আনা হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়। তবে তাঁর ঘটনাটি সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি, যেখানে আসামের কর্মকর্তারা অতীতে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ সন্দেহে তথাকথিত ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ‘বিদেশি ঘোষিত’ ব্যক্তিদের আটক করে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দিয়েছেন। বিবিসি কমপক্ষে ছয়টি ঘটনা খুঁজে পেয়েছে, যেখানে লোকেরা বলেছে যে তাদের পরিবারের সদস্যদের তুলে নেওয়া হয়েছে, সীমান্তবর্তী শহরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশে ‘পুশ’ করা হয়েছে।

ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী, আসাম পুলিশ এবং রাজ্য সরকারের কর্মকর্তারা বিবিসির প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি।

৪.
ভারতীয় ‘পুশ ব্যাক’ নিয়ে আল–জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে আসে ভারত কীভাবে নিজ দেশের দরিদ্র নাগরিকদের ‘পুশ ব্যাকে’ ব্যবহার করছে।

৩১ মে, ৬৭ বছর বয়সী এই সাইকেল মেকানিক ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্য আসামে তাঁর বাড়িতে ফিরে আসেন, চার দিন ধরে বাংলাদেশে আটকে থাকার পর।

আলীর সপ্তাহব্যাপী হেনস্তা শুরু হয় ২৩ মে, যখন পুলিশ তাঁকে আসামের মরিগাঁও জেলার একটি ছোট গ্রাম কুয়াডালের তাঁর ভাড়া বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। সরকারি অভিযানটি ছিল ‘ঘোষিত বিদেশি নাগরিকদের’ বিরুদ্ধে। ২৩ মে পুলিশ আলীকে তুলে নেওয়ার পর তাঁকে আসামের গোয়ালপাড়া জেলার মাটিয়াতে ১২৪ মাইল দূরে অবস্থিত একটি আটক কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।

তিন দিন পর ২৭ মে ভোরের দিকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সৈন্যরা তাঁকে এবং পাঁচজন মহিলাসহ আরও ১৩ জনকে একটি ভ্যানে করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নিয়ে যায়। তাদের বলা হয় তারা যদি ফিরে আসতে চেষ্টা করে, তাদের গুলি করা হবে। একজন ভারতীয় সাংবাদিক বলেছেন, বিএসএফ তাদের ভয় দেখতে চারটি রাবার বুলেটের গুলি ছুড়েছে।

বাংলাদেশি গ্রামবাসীর ক্রুদ্ধ প্রতিবাদের পর বাংলাদেশের বিজিবি সৈন্যরা আলীকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের একটি সীমান্ত পয়েন্টে ফেলে দেয়, যেখান থেকে তিনি ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ১০ ঘণ্টার যাত্রা করে বাড়ি ফিরে আসেন।

আসামভিত্তিক দ্য সেন্টিনেল সংবাদপত্রের ৩১ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে এই ঘটনায় বিএসএফ বিজিবি থেকে ৬৫ জন ভারতীয় নাগরিককে পেয়েছে।

‘বাংলাদেশি’ পরিচয় দিয়ে উচ্ছেদের ঘটনায় আসামে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে বরাক উপত্যকার বাঙালি–অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সাম্প্রতিক এক মন্তব্যে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। তিনি বলেছেন, আগামী আদমশুমারিতে কেউ মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা উল্লেখ করলে তাঁকে ‘বিদেশি’ বলে চিহ্নিত করা হবে।

‘বাংলাদেশি তাড়ানোর’ এই সব ঘটনা এখন বিজেপিশাসিত অন্য রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। দিল্লি, বিহার ও মহারাষ্ট্রের অনেকগুলো ঘটনা সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।

৫.
ভারতের এক রাজ্যের যাযাবর শ্রমিকেরা অন্য রাজ্যে দল বেঁধে গিয়ে কাজ করেন, এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু আজকাল বাংলা ভাষাভাষী শ্রমিকদের জন্য এটা কঠিন হয়ে উঠেছে। কারণ, ভারতের অনেক রাজ্যেই ‘বাংলা বললেই বাংলাদেশি’ নীতি প্রয়োগ করে তাঁদের হেনস্তা করা হচ্ছে এবং অনেককে বাংলাদেশে জোর করে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এমনি একটা ঘটনা উঠে এসেছে সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টে, পশ্চিমবঙ্গের যাযাবর শ্রমিকদের এক মামলায়। কাজের সূত্রে দিল্লিতে গিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকেরা। সেখানে শুধু বাংলায় কথা বলার ‘অপরাধে’ তাঁদের আটক করা হয়েছে। সন্দেহ করা হয়েছে, তাঁরা বাংলাদেশি। অভিযোগ, বেআইনিভাবে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় তাঁদের আটকে রাখা হয়েছিল। পরিচয়টুকুও যাচাই করা হয়নি।

বীরভূমের পাইকরের এই ছয়জন যাযাবর শ্রমিককে বাংলাদেশি সন্দেহে দিল্লিতে আটক করা হয়েছিল এবং তারপর তাঁদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে আদালতে জানান মামলাকারীর আইনজীবী।

থানা থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশি সন্দেহে যাঁদের আটক করা হয়েছিল, তাঁদের বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের ‘পুশ’ করিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।

কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার এক খবরে জানা যায়, কলকাতা হাইকোর্ট কেন্দ্রের এই ‘বাংলাদেশি শনাক্তকরণ’ কার্যক্রম নিয়ে একগাদা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন কেন্দ্রকে ‘হঠাৎ করে কেন দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাদেশি শনাক্ত করার কাজ শুরু হলো? এর পেছনে কারণ কী? সব রাজ্যের জন্য কেন জুন মাস বেছে নেওয়া হলো?

পূর্বপরিকল্পিতভাবেই কি এটা করা হচ্ছে? অভিযোগ উঠছে, বাংলায় কথা বলার জন্য আটক করা হচ্ছে, এটা কি সত্য।’

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিজেপি দলের সংসদ নেতা শুভেন্দু অধিকারী এখন রোহিঙ্গাদের নিয়ে এক নতুন জুজু তুলেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গেও অনুপ্রবেশ করছে রোহিঙ্গারা। তাঁর অদ্ভুত দাবি, অবিলম্বে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চাই।

৬.
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর, কিছু বছর ধরে ভারত, পাকিস্তান এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ‘মাইগ্রেশন’ বা স্থানান্তর একটা অতি সাধারণ ব্যাপার ছিল। কারও জন্য এটা ছিল পারিবারিক প্রয়োজন, কারও জন্য ছিল ঐচ্ছিক সিদ্ধান্ত। সব সরকার এটাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছিল। তখনকার দিনে কোনো সরকারই এসবের তেমন কোনো কাগজপত্র বা নথি সংরক্ষণ করেনি।

ভারতে বিজেপি সরকার পরবর্তীকালে বিভিন্ন আইন জারি করে বেছে বেছে বিভিন্ন গোষ্ঠীর লোকজনকে কাগজপত্র দেখানোর জন্য হয়রানি করছে। এই হয়রানি কখনো ভাষাভিত্তিক, কখনোবা ধর্মভিত্তিক আবার কখনো এলোপাতাড়িভাবে, বিশেষত, অন্য রাজ্যে আসা বাংলা কথা বলা শ্রমিকদের ওপর। এই সব হয়রানির একটা চরম পদক্ষেপ হলো বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’।

এর সঙ্গে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা রিফিউজিদের তুলনা করলে দেখা যাবে এক ভিন্ন চিত্র। এদের বলা হতো ‘বিহারি রিফিউজি’। ঢাকার মোহাম্মদপুর, খুলনার খালিশপুর, চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, রংপুরের সৈয়দপুর এই সব এলাকায় বিহারিরা আশ্রয় গড়ে তোলে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেক দিন বিহারিরা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিতে অস্বীকার করেছে। তখন বাংলাদেশ সরকার যৌক্তিকভাবে এদের ভারতে ‘পুশ ব্যাক’ করতে পারত, কারণ এরা এসেছিল ভারত থেকে। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো সরকারই সেই অমানবিক পথটা বেছে নেয়নি।

৭.
বাংলাদেশিরা জীবিকার জন্য ভারতে যায়, এটা একটা প্রচারণা বা অযৌক্তিক কথা। এটা সত্য, অনেক বাংলাদেশি ঝুঁকি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, কানাডা ও আমেরিকায় যায় ভালো জীবন ও জীবিকার সন্ধানে। কিন্তু ভারতকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা অযৌক্তিক।

আইএমএফের ২০২৫ সালের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ভারতীয়দের মাথাপিছু গড় আয় ২৯৩৭ ইউএস ডলার।  আর বাংলাদেশিদের মাথাপিছু গড় আয় ২৭৭৪ ইউএস ডলার, খুবই কাছাকাছি। ভারতে পেশাজীবীদের চাকরিবাজার বাংলাদেশ থেকেও অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক। আর শ্রমজীবীরা অবশ্যই ভারতের কোনো শহরে কাজ করে বাংলাদেশ থেকেও বেশি পারিশ্রমিক পাবেন না; ভারতের যেসব শহরে পারিশ্রমিক কিছুটা বেশি যেমন মুম্বাই, দিল্লি সেসব জায়গায় থাকা-খাবার খরচও আকাশচুম্বী।
সুতরাং এটা কোনো যুক্তিতেই টিকবে না যে বাংলাদেশিরা ভারতে অবৈধভাবে কাজ করতে যাবে।

ভারত সরকারকে এই ‘পুশ ব্যাক’ ব্যাপারটা বন্ধ করতে হবে। এতে কত কত দরিদ্র ভারতীয় নাগরিক যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং নিজেদের দেশের নেতৃবৃন্দের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠছে, তা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমগুলোর রিপোর্টেই তুলে ধরা হয়েছে।

একজন মানুষ শুধু ভোটের ঘুঁটি নন, তিনি দেশের একজন নাগরিক এবং একটা পরিবার। দুই দেশের বা দেশের নেতাদের মাঝে যদি কোনো সমস্যা থাকে, সেটা আলাপ–আলোচনা করে মেটানো যায়, কিন্তু নিজ দেশের কিছু নাগরিকের জীবন ধ্বংস করে সমস্যার সমাধান খোঁজা খুব অমানবিক।

* সালেহ উদ্দিন আহমদ, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- ই-মেইল: salehpublic711@gmail.com

ফিলিস্তিনি স্বীকৃত রাষ্ট্র হলে গাজা মেরিন গ্যাসক্ষেত্রের মালিকানা নিশ্চিত হবে

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলে গাজা উপকূলের গাজা মেরিন গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের বৈধ অধিকার ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে নিশ্চিত হবে। এমনটাই বলছেন প্রকল্পটির প্রাথমিক পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞ মাইকেল ব্যারন। তার নতুন বই অনুযায়ী, এই গ্যাসক্ষেত্র থেকে বর্তমান বাজারদরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার আয় হতে পারে। ১৫ বছরে কমপক্ষে ১০০ মিলিয়ন ডলার আয়ের সুযোগ রয়েছে এখান থেকে, যা ফিলিস্তিনিদের বিদেশি সাহায্যনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়তে সহায়তা করবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান।

১৯৯০-এর দশক থেকেই এই গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের পরিকল্পনা চলছে। কিন্তু মালিকানা ও আইনি বিতর্কে কাজ থমকে আছে। সম্প্রতি ফিলিস্তিনি মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে আইনজীবীরা ইতালির রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইএনআই’কে চিঠি দিয়ে সতর্ক করেন যে, ইসরাইলের জ্বালানি মন্ত্রণালয় যে ‘জোন জি’এলাকায় ছয়টি লাইসেন্স দিয়েছে, তার শতকরা ৬২ ভাগ ফিলিস্তিনের দাবিকৃত সামুদ্রিক এলাকায় পড়ে। তাদের মতে, ইসরাইলের এসব লাইসেন্স বৈধ নয় এবং ইএনআই-এরও এসব অধিকার বৈধভাবে অর্জনের সুযোগ নেই।

ফিলিস্তিন ২০১৫ সালে জাতিসংঘ সমুদ্র আইন কনভেনশনে যোগ দিয়ে তাদের সামুদ্রিক সীমা ও একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করে। ইসরাইল ইউএনসিএলওএসের সদস্য নয়। ব্যারনের মতে, তেল কোম্পানির নিবন্ধিত দেশগুলো যদি ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে আইনি অনিশ্চয়তা দূর হবে। ফিলিস্তিন পাবে নতুন রাজস্ব উৎস ও ইসরাইলের বাইরে স্বাধীন জ্বালানি সরবরাহ।

গ্লোবাল উইটনেস দাবি করেছে, গাজা উপকূলের সমান্তরাল চলা ইস্ট মেডিটারেনিয়ান গ্যাস পাইপলাইন অবৈধ। কারণ এটি ফিলিস্তিনের সামুদ্রিক জলসীমা অতিক্রম করছে অথচ ফিলিস্তিন কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না। ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন ইসরাইলের আশকেলন থেকে মিশরের আরিশে গ্যাস পরিবহন করে, যেখানে গ্যাস তরল আকারে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত হয়।

ব্যারন বলেন, ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে স্পষ্টভাবে তাদের জলসীমা, ভূগর্ভস্থ সম্পদ, তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের আইন প্রণয়ন ও লাইসেন্স প্রদানের ক্ষমতা দিয়েছে। এই প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ইয়াসির আরাফাতের রাষ্ট্রগঠন পরিকল্পনার মূল অংশ ছিল।
২০০০ সালে বৃটিশ গ্যাস গ্রুপ (বিজি গ্রুপ) ও ফিলিস্তিনি কনসোলিডেটেড কন্ট্রাক্টরস কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে গাজা মেরিনে গ্যাস আবিষ্কৃত হয়।

গাজা বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করে জ্বালানি সংকট নিরসনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ইসরাইলি আদালত জলসীমাকে কোনো দেশের নয় ঘোষণা করে। কারণ ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ পূর্ণ সার্বভৌম রাষ্ট্র নয় বলে লাইসেন্স প্রদানের ক্ষমতা অস্পষ্ট ছিল। হামাস ২০০৭ সালে গাজা দখলের পর ইসরাইল প্রকল্প আটকে দেয়, যাতে রাজস্ব হামাসের হাতে না যায়। ফলে বিজি গ্রুপ প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়। ২০২৩ সালের জুনে ইসরাইল মিশরীয় প্রতিষ্ঠান ইজিএএস’কে গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের অনুমোদন দেয়, তবে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ায় কাজ থেমে যায়। গাজা মেরিনের মজুত প্রায় ৩০ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস। ইসরাইলের নিজস্ব জলসীমায় ১০০০ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাসের বেশি মজুদের তুলনায় এটি ক্ষুদ্র। কিন্তু ফিলিস্তিনের জন্য এটি একমাত্র উল্লেখযোগ্য জ্বালানি সম্পদ।

সম্প্রতি জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেসকা আলবানিজ এক প্রতিবেদনে বলেছেন, আন্তর্জাতিক আদালতের রায় অনুযায়ী করপোরেশনগুলোকে ইসরাইলের দখলকে সমর্থনকারী যেকোনো কার্যক্রম থেকে সম্পূর্ণ ও শর্তহীনভাবে সরে আসতে হবে। তিনি বলেছেন, কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব হলো ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা, দখল বজায় রাখা নয়। ইসরাইল এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করেছে।

mzamin

পুতিনকে কড়া হুমকি দিলেন ট্রাম্প, এরপর কী হবে... by ম্যাক্সমিলিয়ান হেস

১৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ নিয়ে তাঁর নীতিতে আমূল পরিবর্তন আসছে। তিনি ঘোষণা করেন, ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণে আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট পাঠানো হয়েছে, তার বাইরে অতিরিক্ত ইউনিট পাঠানো হবে।

বর্তমানে ইউক্রেনের শহরগুলো প্রতিদিন শতাধিক রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হচ্ছে। হোয়াইট হাউস থেকে ফাঁস হওয়া নথি থেকে জানা যাচ্ছে, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। ট্রাম্প ফোনালাপে জেলেনস্কির কাছে জানতে চেয়েছেন, মস্কোতে সরাসরি আঘাত হানতে ইউক্রেনের কী ধরনের অস্ত্র প্রয়োজন।

ট্রাম্প একই সঙ্গে রাশিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর সবচেয়ে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যদি ক্রেমলিন ৫০ দিনের মধ্যে, অর্থাৎ ৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যুদ্ধবিরতিতে না আসে, তাহলে যারা রাশিয়ার তেল কিনবে, তাদের ওপর তিনি ১০০ শতাংশ ‘সেকেন্ডারি ট্যারিফ’ বা বাড়তি শুল্ক আরোপ করবেন।

কিন্তু ট্রাম্পের এ কঠিন শাসানি বাস্তবে বিশেষ কোনো কাজে দেবে বলে মনে হচ্ছে না। রুশ কর্মকর্তারা ট্রাম্পের মস্কোতে হামলার হুমকি নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করে রীতিমতো হাস্যকর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। কারণ, ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্র আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাঠালে তা ইউক্রেনের জন্য কিছুটা সহায়তা হবে বটে, কিন্তু ট্রাম্প যেভাবে বলছেন, সেভাবে বিশাল পরিসরে তা সরবরাহ করতে কয়েক মাস লেগে যাবে।

আর তেল নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ট্রাম্প যে হুমকি দিয়েছেন, তা বাজারে কোনো বড় প্রভাব ফেলেনি।

রাশিয়ার প্রতি ট্রাম্পের অবস্থানে এ পরিবর্তন আসাটা খুব একটা অপ্রত্যাশিত নয়। ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্প রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি সহানুভূতিশীল মনে হলেও ইউক্রেন ও রাশিয়া–সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। আর এটি পুতিনের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত।

ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি বাড়াতে চান। অন্যদিকে পুতিনও, বিশেষ করে ইউরোপের পাইপলাইন বাজার হারানোর পর তাঁর দেশের গ্যাস রপ্তানি বাড়াতে চাইছেন।

গ্যাস রপ্তানি বাড়ানোর কথা মাথায় রেখে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ কারণে তিনি ভবিষ্যতের আর্কটিক নৌপথগুলোকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। অন্যদিকে রাশিয়াও চীনের সমর্থন ধরে রাখতে তাদের নিজস্ব আর্কটিক রুটকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। পুতিন ইউক্রেনের যতটা সম্ভব খনিজ সম্পদ রাশিয়ার জন্য দখল করতে চান। ট্রাম্পও সেই খনিজ সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নিশ্চিত করতে চান।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প বলেছিলেন, এক দিনেই তিনি ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত মেটাবেন। এখন তিনি নিজেই স্বীকার করছেন, সংঘাত মেটানোর সময়টা আরেকটু বাড়িয়ে বলা উচিত ছিল।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রতি ট্রাম্পের মনোভাব অতীতে খুব ভালো ছিল না। এর মূল পেছনের ঘটনা হলো ২০১৯ সালের ‘ইমপিচমেন্ট কেলেঙ্কারি’। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি জেলেনস্কিকে চাপ দিয়েছিলেন যেন ইউক্রেনে বাইডেন ও তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত শুরু করা হয়, কিন্তু জেলেনস্কি তা শোনেননি। এ ঘটনা মার্কিন রাজনীতিতে প্রচণ্ড আলোড়ন তোলে এবং ট্রাম্প প্রথমবার ইমপিচমেন্টের মুখে পড়েন। তখন থেকেই জেলেনস্কিকে ট্রাম্প ‘বিশ্বাসযোগ্য’ মনে করতেন না।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। ইউক্রেনের সরকার, বিশেষ করে জেলেনস্কি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চুক্তি করেছে, যার মূল বিষয় হলো ইউক্রেনের খনিজ সম্পদ।

ইউক্রেনের মাটিতে প্রচুর গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রয়েছে (যেমন লিথিয়াম, যা ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়) এবং যুক্তরাষ্ট্র এসব খনিজ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে আগ্রহী। এ সমঝোতা ট্রাম্পের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এতে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে। ফলে জেলেনস্কির প্রতি তাঁর পুরোনো বিরূপ মনোভাব অনেকটাই নরম হয়ে এসেছে।

কিছুটা দেরিতে হলেও ট্রাম্প এখন বুঝতে পেরেছেন, পুতিন আন্তরিকভাবে কোনো আলোচনা করতে চান না। মে ও জুন মাসে কিয়েভ ও মস্কোর মধ্যে শান্তি আলোচনা হলেও তাতে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

ট্রাম্প যখনই দেখেছেন, পুতিন আলোচনার সময় অনেক বেশি দাবি করছেন, সম্ভবত ট্রাম্প তখনই উপলব্ধি করেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা আর এগোনো সম্ভব হবে না। ট্রাম্প বুঝতে পেরেছেন, পুতিন শুধু দক্ষিণ ও পূর্ব ইউক্রেনের দখল করা অঞ্চলগুলো ধরে রাখতে চাচ্ছেন না; বরং নতুন করে উত্তর ইউক্রেনে একটি ‘বাফার জোন’ও গড়ে তুলতে চাইছেন।

রাশিয়া প্রশ্নে ট্রাম্পের পরিবর্তিত অবস্থানের তেমন প্রভাব দেখা না যাওয়ার প্রধান দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, রাশিয়ার তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের একার বাড়তি শুল্ক আরোপের হুমকি মানুষের কাছে কোনোভাবে বিশ্বাসযোগ্য হবে না। কারণ, ট্রাম্প নিজেই সব সময় তেলের দাম বাড়া নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। গত জুনে যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক হামলা চালায়, তখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়। এর পরপরই ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেন, তিনি এ মূল্যবৃদ্ধিতে ‘অসন্তুষ্ট’। এ থেকে বোঝা যায়, তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ঠিক রাখতে তেলের দাম বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নিতে চান না। তাই রাশিয়ার তেল নিয়ে এ কঠিন হুমকিও বাস্তবে কার্যকর হতে পারে, এটি সবাই বিশ্বাস করবে না।

দ্বিতীয়ত, এ হুমকির কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ আছে। ট্রাম্প আগে একই কৌশল ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করেছিলেন। মার্চ মাসের শেষ দিকে তিনি বলেছিলেন, যারা ভেনেজুয়েলার তেল কিনবে, তাদেরও তিনি শাস্তি দেবেন। এতে প্রথমে কিছুটা প্রভাব পড়ে, তেল রপ্তানি কিছু কমে যায়। কিন্তু এরপর চীন ওই তেল বেশি করে কিনতে শুরু করে, ফলে আবার ভেনেজুয়েলার রপ্তানি বেড়ে যায়।

রাশিয়ার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। রাশিয়ার সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা চীন। কিন্তু চীন ও ট্রাম্প ইতিমধ্যে একধরনের ‘শুল্কযুদ্ধ’-এ জড়িয়ে আছেন। অর্থাৎ ট্রাম্প চীনের ওপর নানা ধরনের আমদানি শুল্ক বসাচ্ছেন এবং চীনও পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছে। এমন অবস্থায় চীন যদি দেখে, ট্রাম্প আবার রাশিয়ার তেল নিয়ে নতুন শুল্ক চাপাতে চাইছেন, তাহলে তারা সেটা পাত্তাই দেবে না; বরং তারা আরও বেশি করে রাশিয়ার তেল কিনে রাশিয়ার পাশে দাঁড়াতে পারে।

আসলে ট্রাম্পকে নিজের কৌশল বদলাতে হবে। রাশিয়ার ওপর এমন অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যা পুতিনকে আন্তরিকভাবে আলোচনায় বসতে বাধ্য করবে। তবে সেটি একা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে করা সম্ভব হবে না। এর জন্য ওয়াশিংটনকে তার মিত্রদের নিয়ে কাজ করতে হবে। কিন্তু ওয়াশিংটন এখন তার মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে তর্কাতর্কিতে লিপ্ত। ফলে এটি এখন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

অবস্থাদৃষ্টে বোঝা যাচ্ছে, রাশিয়ার তেলের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা চাপানো সহজ হবে না। কারণ রাশিয়া এমন কিছু মানবে বলে মনে হয় না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ভারতকে প্রভাবিত করার সুযোগ আছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে খুব বেশি তেল কিনত না। কিন্তু এখন ভারতের আমদানি করা তেলের প্রায় ৪০ শতাংশই আসে রাশিয়া থেকে। এখন রাশিয়া ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে।

ভারতের জ্বালানিমন্ত্রী হারদীপ সিং পুরি গত সপ্তাহে বলেছেন, ভারত আপাতত তাদের তেল নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনবে না। তবে তিনি এটাও বলেছেন, এর আগে যখন তেলের দামের ওপর সর্বোচ্চ সীমা বসানো হয়েছিল, তখন ভারত তা মান্য করেছিল। জি-৭ দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সেই সীমা নির্ধারণ করেছিল বাইডেন প্রশাসন। এর উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার তেল বিক্রি বন্ধ না করে তাদের আয় সীমিত রাখা। কারণ, জি–৭ দেশগুলো চায়নি তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হোক। এখন ট্রাম্পও একই কারণে তেলের বাজারে বড় কোনো ঝাঁকুনি দিতে চান না। এমনকি বাইডেনের অর্থমন্ত্রী জ্যানেট ইয়েলেনও তখন বলেছিলেন, এর লক্ষ্য ছিল এই ব্যবস্থায় ভারতসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশ যেন সস্তায় তেল কিনতে পারে, তার ব্যবস্থা করা।

তবে মন্ত্রী পুরি এও বলেছেন, যদি রাশিয়ার তেল নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে কোনো বড় সমঝোতা হয়, তাহলে ভারত নিজেদের নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে, যদি ট্রাম্প তাঁর রাশিয়ার বিরুদ্ধে হুমকি সত্যি করে তুলতে চান, তাহলে তাঁকে একা কিছু না করে অন্য মিত্রদের সঙ্গে মিলে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।

ট্রাম্প যদি সত্যিই যুদ্ধের গতিপথ পাল্টাতে চান, তাহলে তাঁকে ইউক্রেনকে আরও বেশি সমর্থন দিতে হবে। তিনি বলছেন, রাশিয়ার প্রতি তাঁর নতুন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। কিন্তু সেটি কি কেবল কথার কথা হিসেবে থাকবে, না কি বাস্তবে কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে? আদতে এই প্রশ্নের জবাব ট্রাম্প তাঁর মিত্রদের সঙ্গে কতটা একজোট হয়ে কাজ করতে পারেন এবং পুতিনের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য কতটা মূল্য দিতে রাজি হন, তার ওপর নির্ভর করছে।

- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া
- ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
* ম্যাক্সিমিলিয়ান হেস, ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ফেলো এবং লন্ডনভিত্তিক রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষক।

দুই ভাইয়ের এক বউ

ভারতের হিমাচল প্রদেশে এক নারীকে বিয়ে করেছেন দুই ভাই। বিয়েতে উপস্থিত হয়েছিলেন গ্রামের শত শত মানুষ । ঘটনাটি ঘটেছে প্রদেশের সিরমাউর জেলার ট্রান্স-গিরি অঞ্চলের শিল্লাই গ্রামে। হাট্টি উপজাতির দুই ভাই সেখানে একই নারীকে বিয়ে করেছেন। বহুপতি প্রথা বা বহুগামিতার অধীনে এই বিয়ে হয়। এ বিয়ে স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘জোড়িদারা’ নামে। বিয়ের কনে সুনীতা চৌহান। তার বর দুই ভাই হলেন প্রদীপ নেগি ও কপিল নেগি। তারা জানান, কোনো চাপ ছাড়াই তারা স্বেচ্ছায় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ১২ জুলাই শুরু হওয়া তিন দিনের এই বিয়েতে স্থানীয় লোকগীতি ও নৃত্য অনুষ্ঠান উৎসবের রূপ নেয়। বিয়ের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।

হিমাচল প্রদেশের রাজস্ব আইন এই প্রাচীন উপজাতি প্রথাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। শুধু ট্রান্স-গিরির বাদহানা গ্রামেই গত ছয় বছরে এমন পাঁচটি বিয়ে হয়েছে। সুনীতা কুনহাট গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বলেন, এই প্রথা সম্পর্কে আমি জানতাম এবং নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা যে বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি, তা আমি সম্মান করি।

প্রদীপ শিল্লাই গ্রামের সরকারি দপ্তরের কর্মচারী। তিনি বলেন, আমরা প্রকাশ্যে এই প্রথা পালন করেছি। কারণ আমরা এতে গর্বিত। এটি আমাদের যৌথ সিদ্ধান্ত। ছোট ভাই কপিল বিদেশে কাজ করেন। তিনি যোগ করেন, আমি হয়তো বাইরে থাকি। কিন্তু এই বিয়ের মাধ্যমে আমরা স্ত্রীর জন্য ভালোবাসা, সমর্থন ও স্থিতি নিশ্চিত করছি ঐক্যবদ্ধ পরিবার হিসেবে।

হাট্টি উপজাতি হিমাচল-উত্তরাখণ্ড সীমান্তের একটি সম্প্রদায়। তাদের তিন বছর আগে তফসিলি উপজাতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই উপজাতিতে বহুপতি প্রথা চালু ছিল। তবে নারীদের সাক্ষরতার হার বৃদ্ধির সঙ্গে এবং অর্থনৈতিক উন্নতির কারণে এমন বিয়ে কমে গেছে। এখনো কিছু গ্রামে গোপনে এ ধরনের বিয়ে হয় এবং সমাজে তা মেনে নেয়া হয়। তবে তার সংখ্যা খুবই কম, জানান স্থানীয় প্রবীণরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রথার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পারিবারিক কৃষিজমি বিভক্ত হওয়া রোধ করা। আজও উপজাতি নারীদের পৈতৃক সম্পত্তিতে অংশ নিয়ে সমস্যা থাকে। প্রাচীনকালে পরিবারের জমি অক্ষত রাখতে ও যৌথ পরিবারের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও বোঝাপড়া বজায় রাখতে এমন বিয়ে চালু হয়েছিল।

কেন্দ্রীয় হাট্টি সমিতির সাধারণ সম্পাদক কুন্দন সিং শাস্ত্রী বলেন, হাজার বছর আগে পরিবারের কৃষিজমি টিকিয়ে রাখতে এই প্রথার জন্ম হয়েছিল। এছাড়া বড় পরিবার মানে বেশি নিরাপত্তা, পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় বিচ্ছিন্ন কৃষিজমির যত্ন ও চাষাবাদে পরিবারের উপস্থিতি জরুরি।

হাট্টি সম্প্রদায়ের প্রায় তিন লাখ মানুষ সিরমাউরের ট্রান্স-গিরি অঞ্চলের ৪৫০টি গ্রামে বাস করেন। সেখানে কিছু গ্রামে এখনো এই বহুপতি প্রথা দেখা যায়। একইভাবে উত্তরাখণ্ডের জৌনসার বাবর উপজাতি অঞ্চল ও হিমাচলের কিন্নৌর জেলাতেও একসময় এ প্রথা প্রচলিত ছিল। এই অনন্য উপজাতি প্রথাকে ‘জাজদা’ নামেও ডাকা হয়। বিয়ের দিনে কনে বরপক্ষের গ্রামে শোভাযাত্রায় আসেন এবং বরবাড়িতে ‘সিন্জ’ নামের এক আচার হয়। স্থানীয় ভাষায় মন্ত্রপাঠ, পবিত্র জল ছিটানো, শেষে গুড় খাওয়ানো ও কুলদেবতার আশীর্বাদে তাদের দাম্পত্য জীবনে মধুরতা কামনা করে অনুষ্ঠান শেষ হয়।

mzamin