Thursday, October 2, 2025

গাজার সঙ্গে ৮ মুসলিম দেশের কেন এই বড় বিশ্বাসঘাতকতা? by হাসান বোখারি

অনেক দিন ধরেই ইহুদিবাদীরা বেশ চিন্তিত। হলিউড থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া জগৎ পর্যন্ত—সবদিকেই ইসরায়েলকে বয়কট করার দাবি জোরালো হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে তরুণ সমাজের কাছে ইসরায়েল এখন সবচেয়ে ঘৃণিত রাষ্ট্র হয়ে উঠছে। এমনকি ইহুদিবাদীদের শক্ত ঘাঁটি আমেরিকাতেও তরুণ প্রজন্ম ইসরায়েল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অনেকে এখন ইসরায়েলকে কৌশলগত বোঝা মনে করছেন। তারা গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা এবং আগ্রাসী যুদ্ধগুলোর জন্য আমেরিকার নিরবচ্ছিন্ন সমর্থনের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলছেন। তাদের যুক্তি, কোটি কোটি মার্কিন করদাতার অর্থ এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ একটি গণহত্যার কাজে লাগানো হচ্ছে, যা কেবল বিশ্বজুড়ে আমেরিকার প্রতি ঘৃণা তৈরি করবে—অথচ সেই করের টাকা ও সামরিক সম্পদ এর চেয়ে ভালো কাজে ব্যবহার করা যেত। বিশ্বজুড়ে গাজা যুদ্ধ নিয়ে বয়ানের লড়াইয়ে ইসরায়েল হেরে যাচ্ছে।

ভিকটিমের ওপর দোষ চাপানোর কৌশল

বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যে জনমত তৈরি হয়েছে, আশ্চর্যজনকভাবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তা নিয়ে একেবারেই বিচলিত নন। তার একমাত্র লক্ষ্য হলো দুর্নীতি মামলা এড়িয়ে যতটা সম্ভব ইসরায়েলের ক্ষমতায় থাকা। তবে ইসরায়েল নিয়ে চিন্তিত কট্টর ইহুদিবাদীদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে বিশ্বজুড়ে বয়ানের লড়াইয়ে ইসরায়েলের হেরে যাওয়া নিয়ে।

পরিস্থিতি পাল্টাতে তারা একটি পুরোনো কিন্তু কার্যকর কৌশল পুনরায় ব্যবহার করেছে; দোষ সম্পূর্ণভাবে ভিকটিমের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। এই কৌশলটি ২০০০ সালের ক্যাম্প ডেভিডের ব্যর্থতার পরেও কাজে লাগানো হয়েছিল, যখন বিল ক্লিনটন এবং এহুদ বারাক আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার সব দোষ ইয়াসির আরাফাতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।

পুরোনো এই মার্কিন-ইসরায়েলি কৌশল (যা ক্যাম্প ডেভিড ২০০০ এবং অসলো চুক্তির পরেও বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে) এবারও প্রয়োগ করা হয়েছে। এখানে ইসরায়েলের একটি প্রস্তাবকে আমেরিকার প্রস্তাব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আর আরবরা তা গ্রহণ করলেই ইসরায়েল তখন সেই প্রস্তাবকে নিজেদের সুবিধামতো বদলে ফেলে।

তবে, এটি ২০০০ সাল নয়, ২৫ বছর পেরিয়ে গেছে। হাজার হাজার (কিছু অনুমান মতে প্রায় ২ লাখ) ফিলিস্তিনি গণহত্যার শিকার হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন আর বয়ানের লড়াইয়ে আগের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে পারছে না। তাদের কিছু ‘বলির পাঁঠার’ প্রয়োজন। দুঃখজনকভাবে, তারা সেই বলির পাঁঠা খুঁজে পেয়েছে কথিত ‘মুসলিম বিশ্বেই’।

মুসলিম বিশ্বের বিরাট বিশ্বাসঘাতকতা

মুসলিম বিশ্বের আটটি প্রভাবশালী দেশ (কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, পাকিস্তান, জর্ডান ও মিশর) তাড়াহুড়ো করে ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনাটির অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে। এই পদক্ষেপকে ফিলিস্তিনের প্রতি বিরাট বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।

মনে হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের এই আটটি দেশ নিজেরাই পুরোনো মার্কিন-ইসরায়েলি কৌশলের শিকার হয়েছে। নেতানিয়াহু ট্রাম্পের পরোক্ষ সমর্থনে এই ২০ দফা পরিকল্পনার মূল পয়েন্টগুলো সাজিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি ঘোষণা করেন, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র কখনও গঠিত হবে না এবং আইডিএফ (ইসরায়েলি সেনাবাহিনী) গাজা উপত্যকার বিশাল অংশ দখল করে থাকবে।

মুসলিম বিশ্বের কাছে ট্রাম্পের দেওয়া একটি প্রতিশ্রুতি ছিল, ইসরায়েল পশ্চিম তীর দখল করবে না। নেতানিয়াহু সেটিও বাদ দিয়ে দিয়েছেন। যদিও নেতানিয়াহু বিপজ্জনক হারে পশ্চিম তীরে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপন এবং সম্প্রসারণ করায় ট্রাম্পের সেই প্রতিশ্রুতি অর্থহীনই ছিল।

নেতানিয়াহুর সাজানো ছাড়াও গাজা নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা ভয়াবহ একটি দলিল। এতে যে সুনির্দিষ্ট সময়রেখা ও প্রক্রিয়া যুক্ত করা হয়, তা মূলত ইসরায়েলের সুবিধাকে মাথায় রেখে। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিরা কী পাবে তা অস্পষ্ট এবং ধোঁয়াচ্ছন্ন।

এখানে ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বৈশিষ্ট্য দেওয়া হলো, যা আটটি মুসলিম দেশ মেনে নিয়েছে:

১. একজন ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার আগেই সব ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দিতে হবে। (নেতানিয়াহুকে সব জিম্মি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চুক্তি থেকে সরে আসার সুযোগ দেওয়া হয়েছে)।

২. গাজা শাসন করবে ‘বোর্ড অফ পিস’ নামে একটি আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ, যার প্রধান হবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ব্রিটিশ মিডিয়া যে ব্যক্তিকে ‘গণবিধ্বংসী প্রতারণার হাতিয়ার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে সেই টনি ব্লেয়ার থাকবেন ‘ভাইসরয়’ হিসেবে।

৩. ২০২০ সালের ট্রাম্পের যে শান্তি পরিকল্পনা ছিল, সেটিকে গ্রহণ করতে হবে। সেই পরিকল্পনা ফিলিস্তিনি নিয়ন্ত্রণের অধীনে থাকা এলাকাকে মারাত্মকভাবে আরও সংকুচিত করে দিয়েছে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে দখলকৃত অঞ্চল থেকে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের জাতিসংঘের দাবির বিপরীতে এই পরিকল্পনা কার্যত একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণাকে বাতিল করে দেয়।

৪. হামাসকে সম্পূর্ণরূপে নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে। এ কাজটি সম্পন্ন হবে এই মুসলিম দেশগুলোর বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) দ্বারা। অথচ ইসরায়েলি বাহিনী গাজার বিশাল অংশ দখল করে থাকবে এবং যতক্ষণ না তারা আইএসএফের কাজের অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট হচ্ছে, ততক্ষণ তাদের প্রত্যাহারের বিষয়ে ভেটো দেওয়ার অধিকার থাকবে। কোনো দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে সুরক্ষিত আছে, সেই বিষয়টিকেই এ দাবি উপেক্ষা করেছে।

৫. চুক্তিতে বহুবার ‘নতুন গাজা যেন তার প্রতিবেশীদের জন্য কোনো হুমকি সৃষ্টি না করে’ এই কথাটির উল্লেখ রয়েছে। এর মাধ্যমে গণহত্যা ও যুদ্ধের জন্য নির্যাতিত ভিকটিমদেরকেই দোষী করা হয়েছে, যাদের ভূমি দখল করা হয়েছে।

৬. গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলের প্রত্যাহারের কোনো সময়সীমা নেই। তবে ইসরায়েল গাজা উপত্যকার অভ্যন্তরে অনির্দিষ্ট একটি নিরাপত্তা পরিধিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য দখল করে থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

৭. ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে যেকোনো অগ্রগতিকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) সংস্কারের একটি অস্পষ্ট শর্তের অধীন করা হয়েছে। পিএ সেখানে যথেষ্ট ‘সংস্কার’ করেছে কিনা, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ইসরায়েলের কাছেই থাকবে।

মুসলিম নেতাদের নীরব সম্মতিতে ট্রাম্প আরও ঘোষণা করেন যে, হামাসকে আগামী তিন বা চার দিনের মধ্যে এই পরিকল্পনা মেনে নিতে হবে। অন্যথায় তিনি নেতানিয়াহুকে নতুন উদ্যমে গণহত্যা পুনরায় শুরু করার জন্য পূর্ণ সমর্থন দেবেন

সুতরাং, ট্রাম্পের পরিকল্পনায় এটি কোনো শান্তি চুক্তি নয়, বরং এটি একটি চরমপত্র। এই চুক্তি ইসরায়েলের হাতে হত্যা ও অনাহারের মুখে থাকা ২০ লাখ ফিলিস্তিনির জীবন ও মর্যাদাকে কাজে লাগিয়ে হামাসকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার চেষ্টা করছে।

আটটি মুসলিম দেশ কর্তৃক এই পরিকল্পনা গ্রহণ করে আব্রাহাম চুক্তির চেয়েও বড় বিশ্বাসঘাতকতা করছে (কারণ আব্রাহাম চুক্তি অন্তত ২১ শতকের সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যার আগে হয়েছিল)। এই পরিকল্পনাকে সমর্থন করে আটটি মুসলিম দেশ ফিলিস্তিনিদের আগ্রাসী ও সন্ত্রাসী হিসেবে চিত্রিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে।

অন্যদিকে, ইসরায়েল এবং তার গণহত্যার কাজগুলোকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে। তারা বিশ্বজুড়ে চলমান বয়ানের লড়াইকে ইসরায়েলের পক্ষে ঘুরিয়ে দিতে একটা বড় আঘাত হেনেছে।

এটি আমাকে বিখ্যাত পাকিস্তানি চিন্তাবিদ ইকবাল আহমেদের একটি উক্তি মনে করিয়ে দেয়: ‘আমরা দুর্বৃত্তদের সময়ে বাস করছি। এটি মুসলিম ইতিহাসের অন্ধকার যুগ, আত্মসমর্পণ ও দালালির যুগ, যা উন্মাদনা দ্বারা পরিচালিত।’

বিশ্বাসঘাতকতার কারণ ও পরিণতি

কেউ প্রশ্ন করতে পারে, কী কারণে এই আটটি মুসলিম দেশ এমন জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতায় অংশ নিল? মনে হচ্ছে প্রতিটি অংশগ্রহণকারী দেশের ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে। যেমন:

১. অজনপ্রিয় ও অবৈধ সরকারগুলোর টিকে থাকার জন্য ট্রাম্পের সমর্থন প্রয়োজন (মিশর ও পাকিস্তান)।

২. সিরিয়ার একটি অংশে ভাগ বসানোর সুযোগ (তুরস্ক)।

৩. ট্রাম্পের পরিকল্পনার অধীনে গাজায় তৈরি হতে যাওয়া ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে’ অর্থনৈতিক সুবিধা লাভের সুযোগ। পাশাপাশি, যুদ্ধ চললে ইসরায়েলি আগ্রাসন থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের রক্ষা করতে অস্বীকার করবে—এই ভয়ও কাজ করেছে (সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতার)।

নির্মম পরিহাস হচ্ছে, জুডাসের মতো এই দেশগুলোও তাদের বিশ্বাসঘাতকতার ফল বেশি দিন উপভোগ করতে পারবে না। কোনো বিদেশি শক্তির পুতুল হয়ে উঠলে জনপ্রিয়তাহীন ও অবৈধ সরকারগুলোর দুর্বলতা আরও বেড়ে যায়। সিরিয়া নিয়ে  ইসরায়েলের স্পষ্ট নীতি আছে। সিরিয়া ইসরায়েলির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করার ইচ্ছাশক্তি ও শক্তি অজর্ন করার আগ পর্যন্ত ইসরায়েল দেশটিকে স্থিতিশীল হতে দেবে না।

আর গাজার ধ্বংসাবশেষ ও লাশের ওপর দাঁড়িয়ে যারা অর্থনৈতিক লাভ ও নিরাপত্তা আশা করছে, তারা শিগগিরই জানবে যে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ (গ্রেটার ইসরায়েল) গঠনের প্রকল্পটি ইসরায়েলের জন্য নাৎসি জার্মানির ‘বৃহত্তর জার্মানি’ প্রকল্পের মতোই অবিচ্ছেদ্য। দস্তয়েভস্কির ‘অপরাধ ও শাস্তি’ উপন্যাসের একটি চরিত্রের ভাষায়, একজন ফিলিস্তিনি এই বিভ্রান্ত মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে বলতে পারে: ‘তোমাদের সবচেয়ে বড় পাপ হলো তোমরা নিজেদের ধ্বংস করেছ এবং কোনো কারণ ছাড়াই বিশ্বাসঘাতকতা করেছ!’

ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের সামনে পথ

এই বিরাট বিশ্বাসঘাতকতা ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকে খুব কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে। আগেও তারা মুসলিম দেশগুলো থেকে উল্লেখযোগ্য সহায়তা পাচ্ছিল না, এখন তারা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যক্ত হয়েছে। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের সামনে কী কী বিকল্প আছে?
ট্রাম্পের পরিকল্পনা মেনে নিলে কেবল নেতানিয়াহুরই জয় হবে (যে জয় তিনি এখনও যুদ্ধক্ষেত্রে পাননি)। কিন্তু এতে গণহত্যা থামবে সেটিও নিশ্চিত হবে না।

পরিকল্পনাটিতে ইসরায়েলি জিম্মিদের পুনরুদ্ধার করার পরে ইসরায়েলের পক্ষে সব প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

পরিকল্পনা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করলে নেতানিয়াহু ও তার আমেরিকান মিত্ররা আটটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশের পরোক্ষ সমর্থন নিয়ে গণহত্যা পুনরায় শুরু করতে পারবে। একই সঙ্গে হামাসকে ‘বাধা সৃষ্টিকারী’ হিসেবে চিত্রিত করে বয়ানের লড়াইয়ে সুবিধা আদায় করে নিতে পারবে।

সম্ভবত ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের জন্য সেরা বিকল্প হলো ট্রাম্প পরিকল্পনার অস্পষ্ট বিষয়গুলির জন্য স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং সুদৃঢ় গ্যারান্টি চাওয়া।

নিঃসন্দেহে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু সেই গ্যারান্টি দেবেন না। তারা তাদের নিজস্ব অসৎ উদ্দেশ্য পূরণের জন্য হামাস এটিকে প্রত্যাখ্যান করেছে বলে তেমনটি চিত্রিত করার চেষ্টা করবেন। তবে তাদের এই দাবি ভিত্তিহীন প্রমাণিত হবে এবং গণহত্যা পুনরায় শুরু হলেও বয়ানের লড়াই ফিলিস্তিনই প্রভাবশালী থাকবে। গণহত্যা পুনরায় শুরু হলে ইসরায়েলি জিম্মিদের উদ্ধারের সম্ভাবনাও কমে যাবে, ফলে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসার আশাও ভেঙে যাবে।

এখানে হেনরি কিসিঞ্জারের বিখ্যাত উক্তিটি প্রাসঙ্গিক: ‘প্রথাগত সেনাবাহিনী যদি না জিতে তাহলে তারা হারে, আর গেরিলা বাহিনী না হারলেই জিতে যায়।’

ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যদি আগামী বছর ইসরায়েলিদের ভোটে নেতানিয়াহু ক্ষমতাচ্যুত না হওয়া পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে, তবে আশা আছে যে ইসরায়েল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতায় ডুবে যাবে। এমনটি হলে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্ভব হতে পারে, যা ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ বাহিনীর অক্ষুণ্ন থাকার গ্যারান্টি দেবে এবং গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার নিশ্চিত করবে।

* হাসান বোখারি, পাকিস্তানি শল্যচিকিৎসক, ইতিহাসবিদ, ফিলিস্তিনবিষয়ক গ্রন্থপ্রণেতা। পাক-ফিলিস্তিন ফোরামের সদস্য।
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ: রাফসান গালিব

গাজার সঙ্গে ৮ মুসলিম দেশের কেন এই বড় বিশ্বাসঘাতকতা?

ট্রাম্পের ‘শান্তি’ প্রস্তাবে অস্পষ্ট থাকল স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা ‘শান্তি’ প্রস্তাবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিষয়টি অস্পষ্টভাবে এসেছে। অথচ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য যুগের পর যুগ ফিলিস্তিনিরা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য বিশ্বজনমত জোরদার হয়েছে। এমনকি ইসরায়েলের মিত্র বলে পরিচিত দেশগুলোও ফিলিস্তিনিদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের পক্ষে সমর্থন দিচ্ছে।

হোয়াইট হাউসে গত সোমবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প। এরপর নেতানিয়াহুকে পাশে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে গাজা যুদ্ধ বন্ধের জন্য ২০ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি। এতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ‘অস্পষ্টতা’ এবং প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত না থাকায় এ পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

গাজার শাসকগোষ্ঠী হামাস ট্রাম্পের প্রস্তাব নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। যদিও ট্রাম্প তাঁর প্রস্তাবের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে তিন থেকে চার দিনের সময় বেঁধে দিয়েছেন। না হলে হামাসের চরম পরিণতি হবে বলে হুমকি দিয়েছেন তিনি।

এদিকে ট্রাম্পের ‘শান্তি’ প্রস্তাবের পরও গাজায় নির্বিচার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। গাজায় প্রতি মিনিটে বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। গতকাল হামলায় ৪২ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

প্রস্তাবে অস্পষ্টতা

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের ২০ দফা প্রস্তাবে শর্ত সাপেক্ষে এবং অস্পষ্টভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনা ঘোষণার সময় ট্রাম্প বলেন, ‘কয়েকটি মিত্রদেশ “বোকার মতো” ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে…তারা সত্যিই এটা করেছে। কারণ, আমি মনে করি যা ঘটছে, তাতে তারা ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।’

এ ক্ষেত্রে প্রস্তাবে গাজার উন্নয়ন এবং ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের (পিএ) ‘সংস্কার’কে শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এমনকি তারপরও একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের আলোচনা শুরু ‘হতে পারে’ কিনা নিশ্চিত নয়।

স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র নিয়ে অস্পষ্টতার বিষয়টি নেতানিয়াহুর বক্তব্যেও এসেছে। দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, নেতানিয়াহু তাঁর টেলিগ্রাম চ্যানেলে বলেছেন, সোমবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তখন নেতানিয়াহুর কাছে জানতে চাওয়া হয়, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিষয়ে তিনি একমত হয়েছেন কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘না, কোনোভাবেই নয়।’ তিনি বলেন, ট্রাম্পের দেওয়া ২০ দফা প্রস্তাবে এ ধরনের কিছু নেই।

স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিষয়ে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অস্পষ্টভাবে রয়েছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নেতানিয়াহুর সাংঘর্ষিক বক্তব্য এবং তাঁর সরকারে অতি রক্ষণশীল শরিকদের অবস্থানের কারণে ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগোনো কঠিন হবে। আর শেষ পর্যন্ত হামাস অতীতের মতো ‘মেনে নিয়েছি, তবে কথা আছে’—এ ধরনের জবাব দিলে ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।

ট্রাম্পের পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, যদি উভয় পক্ষ (ইসরায়েল ও হামাস) প্রস্তাব মেনে নেয়, তবে যুদ্ধ মুহূর্তেই থেমে যাবে। গাজায় আটক সব জীবিত ও মৃত জিম্মিকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ফিরিয়ে দেওয়া হবে আর ইসরায়েলে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হবে। নতুন ব্যবস্থায় গাজা শাসনের দায়িত্ব নেবে একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট সরকার, যার তত্ত্বাবধানে থাকবে আন্তর্জাতিক একটি পর্ষদ (বোর্ড অব পিস)। সেখানে হামাসের কোনো ভূমিকা থাকবে না। ইসরায়েলও গাজা দখল করবে না বা এই ভূখণ্ডকে নিজের সঙ্গে যুক্ত করবে না।

ইউরোপ, রাশিয়া, চীন, সৌদি আরব, তুরস্ক, ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন দেশ এবং ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে মধ্যস্থতার দায়িত্বে থাকা মিসর ও কাতার ট্রাম্পের প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। যদিও একই সঙ্গে এখনই এই প্রস্তাবের সাফল্য নিয়ে আশাবাদী না হওয়ার কথা বলছে কাতার।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ‘সব পক্ষকে’ ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। মহাসচিবের ডেপুটি মুখপাত্র ফারহান হক এক বিবৃতিতে গুতেরেসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘আমাদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত এই সংঘাতের কারণে সৃষ্টি হওয়া ব্যাপক ভোগান্তি লাঘব করা।’ গুতেরেস আশা প্রকাশ করেন, পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করবে।

প্রস্তাব নিয়ে হামাসের অবস্থান

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের পরিকল্পনাটি নিয়ে যে আলোচনা হয়েছিল, তাতে হামাস যুক্ত ছিল না। এই পরিকল্পনায় হামাসকে নিরস্ত্র করার কথা বলা হয়েছে, যা হামাস এর আগেও প্রত্যাখ্যান করেছে।

হামাসের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, এই পরিকল্পনা ‘সম্পূর্ণভাবে ইসরায়েলের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট’ এবং এর মাধ্যমে হামাসকে নির্মূল করার ‘অসম্ভব শর্ত’ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে আলোচনা সম্পর্কে অবহিত এক কর্মকর্তা গতকাল রয়টার্সকে বলেন, হামাসের আলোচকেরা ‘সদিচ্ছা নিয়ে এটি পর্যালোচনা করবেন এবং এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানাবেন’।

প্রস্তাবের বিষয়ে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, হামাস কর্মকর্তারা সোমবার রাতে পুরো পরিকল্পনাটি হাতে পেয়েছেন। বিষয়টি তাঁরা ‘দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পর্যালোচনার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ নিয়ে গতকাল তাঁদের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।

মাজেদ আল-আনসারি আরও বলেন, সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে আগবাড়িয়ে আশাবাদী হওয়া ঠিক হবে না। তবে তিনি বলেন, পরিকল্পনাটিতে ‘সার্বিক বিষয় স্থান পাওয়ায়’ কাতার এ নিয়ে ইতিবাচক।

তবে কাতারের হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুলতান বারাকাত আল-জাজিরাকে বলেছেন, ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনা ‘সমস্যাজনক’ এবং হামাসের জন্য এটি গ্রহণ করা হবে একেবারেই ‘অবিবেচকের কাজ’।

বারাকাত বলেন, এই পরিকল্পনার শুরুতেই হামাসকে তাদের সব চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার এমন এক পক্ষের কাছে ছেড়ে দিতে হবে, যাদের তারা বিশ্বাস করে না। তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প যেভাবে নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়িয়ে পরিকল্পনাটি ঘোষণা করেছেন, তা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে প্রস্তাবটি ইসরায়েলের স্বার্থের দিকেই বেশি ঝুঁকে আছে।

সময় বেঁধে দিয়েছেন ট্রাম্প
শান্তি পরিকল্পনার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানাতে হামাসকে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ২০ দফা প্রস্তাবের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানাতে হামাস তিন থেকে চার দিন সময় পাবে।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা কেবলই হামাসের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছি।’ তাঁর দাবি, সব আরব দেশ, মুসলিম দেশগুলো এতে সম্মতি দিয়েছে। ইসরায়েল সম্মতি দিয়েছে। হামাস যদি সম্মতি না দেয়, তাহলে চরম পরিণতি হবে।

হামাস যদি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তাহলে ইসরায়েলের যেখানে যা করা দরকার, তিনি তা করতে দেবেন। আর তারা সহজেই এটি করতে পারবে। প্রস্তাব না মানলে হামাসকে চড়া মূল্য দিতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন।

গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, এটা হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের ধরন, লক্ষ্য ও সময়সীমার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হবে। তাই বলা যায়, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনারা কবে ফেরত যাবেন, সেটার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি। কীভাবে ও কখন এটা বাস্তবায়িত হবে, তা-ও স্পষ্ট নয়।

এতে আরও বলা হয়েছে, গাজা অঞ্চলটি যেকোনো ‘সন্ত্রাসী হুমকি’ থেকে যথাযথভাবে সুরক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল ‘নিরাপত্তা পরিধি’ বজায় রাখবে। তবে এসব শর্ত কখন পূরণ হবে, শর্তপূরণের মানদণ্ড কে নির্ধারণ করবে, সেসবের উল্লেখ নেই।

এদিকে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘এমন কিছু ঘটছে না।’ হামাস যদি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, সে ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পূর্ণ সমর্থন দিয়ে বলেছেন, ‘হামাসকে নির্মূল করার জন্য সামরিক অভিযান পুরোপুরি সম্পন্ন করুন।’

ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, গাজায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজে একটি ‘অস্থায়ী আন্তর্জাতিক বাহিনী’ যুক্ত থাকবে। কিন্তু এ বাহিনী কোথা থেকে আসবে, কারা এতে যোগ দেবে এবং এর ক্ষমতা কতটা হবে, সেসব বিষয়ে কোনো কিছুই এখনো স্পষ্ট নয়। কোন কোন দেশ গাজায় সেনা পাঠাতে রাজি হবে কিংবা কোন কোন দেশকে এ পরিকল্পনার আওতায় গ্রহণযোগ্য ধরা হবে, তা নিয়েও কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজা পরিচালনার জন্য একটি ‘অস্থায়ী অন্তর্বর্তী প্রশাসন’ গঠন করা হবে। এ প্রশাসনে থাকবে একটি বেসামরিক অরাজনৈতিক ফিলিস্তিনি কমিটি। এ কমিটির সদস্যরা গাজার বিষয়গুলো তদারকির কাজ করবেন। তবে কমিটি কীভাবে গঠন করা হবে, কে কমিটির সদস্যদের নির্বাচন করবেন—এসবের বিস্তারিত কিছুই জানানো হয়নি।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের সংস্কার কার্যক্রম শেষ করতে না পারছে, যতক্ষণ গাজাকে নিরাপদ করতে এবং কার্যকরভাবে আবারও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মতো সক্ষম হয়ে না উঠছে, ততক্ষণ গাজার নিয়ন্ত্রণ অস্থায়ী অন্তর্বর্তী প্রশাসনের হাতে থাকবে বলেও ট্রাম্পের পরিকল্পনায় জানানো হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ কবে নাগাদ গাজার নিয়ন্ত্রণ বুঝে নিতে সক্ষম হয়ে উঠছে, সেই সত্যায়নই-বা কে করবে, সেসব নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। এ জন্য ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে কী কী মানদণ্ড অর্জন করতে হবে, সেটাও জানানো হয়নি। এ ক্ষেত্রে সময়সীমার কথাও কিছু উল্লেখ নেই। এটা অস্পষ্ট একটি ঘোষণামাত্র।

বিবিসির হোয়াইট হাউস প্রতিবেদক টম বেটম্যান বলেছেন, এই পরিকল্পনা গাজার যুদ্ধ-পরবর্তী ভবিষ্যতের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের একটি পরিবর্তন। এতে একটি চুক্তি মেনে নিতে নেতানিয়াহুর ওপর ওয়াশিংটন এই বছর যে চাপ প্রয়োগ করেছে, তার চেয়ে আরও বেশি চাপ যুক্ত করা হয়েছে।

গাজায় হামলা চলছে
কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্যেও গাজায় হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। আল-জাজিরার খবরে বলা হয়, গাজায় গতকাল কয়েক ঘণ্টা ধরে প্রতি মিনিটে বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে।

গতকাল গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগের ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ৪২ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ত্রাণ আনতে যাওয়া ৫ জন রয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৯০ জন। ২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা শুরুর পর গতকাল পর্যন্ত ৬৬ হাজার ৯৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৬৮ হাজার ৫৩৬ জন।

যুদ্ধের পাশাপাশি গাজায় খাবার, জ্বালানি ও স্বাস্থ্য সরঞ্জাম প্রবেশে কড়া বিধিনিষেধ বজায় রেখেছে ইসরায়েল। এতে এখন পর্যন্ত ৪৫৩ ফিলিস্তিনি খাবার না পেয়ে অপুষ্টির শিকার হয়ে মারা গেছেন বলে হালনাগাদ তথ্যে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৫০টি শিশুও রয়েছে।

মৃত্যুর ঝুঁকি আছে জেনেও ত্রাণ নিতে যান ফিলিস্তিনিরা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল–সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের দেওয়া ত্রাণ নিয়ে ফিরছেন কয়েকজন। গতকাল গাজার নুসেইরাতের নেতজারিম করিডর এলাকায়
মৃত্যুর ঝুঁকি আছে জেনেও ত্রাণ নিতে যান ফিলিস্তিনিরা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল–সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের দেওয়া ত্রাণ নিয়ে ফিরছেন কয়েকজন। গতকাল গাজার নুসেইরাতের নেতজারিম করিডর এলাকায়। ছবি: এএফপি

পাকিস্তানের পারমাণবিক জুয়া, মধ্যপ্রাচ্যে শুরু পরাশক্তির নতুন খেলা by জাসিম আল-আজ্জাউই

ওয়াশিংটন, তেল আবিব ও তেহরান—এই তিন রাজধানী হঠাৎই ঘটা এমন একটি ঘটনা নিয়ে হিসাব–নিকাশ করছে, যেটিকে ওপর থেকে দেখলে একটি সাধারণ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সৌদি আরব ও পাকিস্তানের গভীরতর কৌশলগত সম্পর্কটা এর চেয়ে বড় কিছু বলেই গুঞ্জন রয়েছে। অনিশ্চিত হলেও এটি এমন একটি পথরেখার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে ইরান যদি পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণের পথ থেকে সরে না আসে, তাহলে সৌদি আরব পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতির দাবা খেলা হঠাৎ এক পাশে ঝুঁকে পড়েছে এবং প্যাঁচগুলো নতুন ও বিপজ্জনক অবস্থানে সরে যাচ্ছে। এ পরিবর্তন ভূমিকম্পের মতো। পাকিস্তান তার পরমাণু ছাতা সৌদি আরব পর্যন্ত সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দিয়েছে। এটি একটি অপ্রত্যাশিত ঘোষণা। এ ঘোষণা আরব উপদ্বীপ থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ পর্যন্ত কৌশলগত হিসাব-নিকাশ পুনর্বিন্যস্ত করছে।

১৯৭০-এর দশকে সৌদি আরব গোপনে পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে অর্থায়ন করেছিল। এটি ইরানি বিপ্লব ও আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় নেওয়া পদক্ষেপ ছিল। সে নিরাপত্তা বিনিয়োগের ফল এখন ফলতে শুরু করছে।

এটি সেই ধ্রুপদি উদাহরণ। এটাকে প্রয়াত হেনরি কিসিঞ্জার ‘পারমাণবিক বিস্তারের প্যারাডক্স’ বলেছিলেন। তাঁর মতে, পারমাণবিক বিস্তার রোধ করার চেষ্টা অনেক সময় এমন অস্থিরতা তৈরি করে, যা শেষমেশ সেটিকে আরও দ্রুত বাড়িয়ে দেয়।

পাকিস্তানের ইতিহাস এটিকে একমাত্র দেশ বানিয়েছে, যা সৌদি আরবকে শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তব সাহায্যও দিতে সক্ষম। ইসলামাবাদের কাছে শুধু পারমাণবিক বোমা আছে তা নয়, এ কিউ খানের উত্তরাধিকারও আছে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে কীভাবে একসময় পারমাণবিক জ্ঞান সীমান্ত পার হয়ে বিক্রি হতো।

যদিও এখন পাকিস্তান দাবি করে, পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর দেশটির কঠোর নিয়ন্ত্রণ আছে। কিন্তু অর্থনৈতিক সমস্যা ও উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগের ওপর নির্ভরতার কারণে সৌদি আরব এমন একটি সুবিধা পাচ্ছে, যেটা আগে ছিল না। ফলে এমন সম্ভাবনা তৈরি হয় যে সামরিক সহযোগিতা শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক সহযোগিতায় রূপান্তর হতে পারে।

পাকিস্তান-সৌদি আরব চুক্তির ভাষা অনেকটা ন্যাটোর মতো, যেখানে বলা হয়েছে ‘যেকোনো এক দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণ হলে, তা দুই দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসাবে ধরা হবে।’ কিন্তু এটি ন্যাটোর মতো নয়।

এই পদক্ষেপের সময়কে মোটেই আকস্মিক বলা যায় না। ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সামরিক লড়াই একধরনের কৌশলগত ‘পরীক্ষা’ হিসেবে কাজ করেছে। মে মাসের সংঘর্ষের সময় পাকিস্তানের বিমানবাহিনী নিখুঁত আক্রমণ ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধের সক্ষমতা দেখিয়েছে। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নয়নের কারণে এটা সম্ভব হয়েছে।

এ অভিযানে সৌদি আরব স্পষ্ট একটা বার্তা পায়—পাকিস্তানের কাছে এমন সামরিক সক্ষমতা ও প্রযুক্তি আছে, যেটা দিয়ে দেশটি তার পারমাণবিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারে। নিশ্চিত করেই ভারত এ অগ্রগতিকে খুবই ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কেননা এখানে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত।

ঘটনাটিকে বোঝার জন্য শুধু ইসলামাবাদ বা রিয়াদের দিকে নয়, বেইজিংয়ের দিকেও তাকাতে হবে। চীনের ভূমিকা শান্তিপূর্ণ পরিকল্পনাকারীর মতো। বেল্ট অ্যান্ড রোড বিনিয়োগ, বিশেষ করে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের মাধ্যমে, বেইজিং পাকিস্তানকে একটি কৌশলগত সহযোগী হিসেবে গড়ে তুলেছে। পাকিস্তান যদি সৌদি আরবকে পারমাণবিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়, তবে আসলে এটি উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব বাড়ানোর মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।

এর মাধ্যমে বেইজিং সরাসরি জড়িত না হয়েই ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি পিছিয়ে যায়, সে ক্ষেত্রেও বেইজিং সৌদি আরবকে সুরক্ষা দিতে পারবে। এটা খুবই চমকপদ মহাকৌশল।

এ অঞ্চলের জন্য এর ফল হতে পারে পারমাণবিক বিস্তারের একটি চেইন প্রতিক্রিয়া। দীর্ঘদিন ধরে অঘোষিত পারমাণবিক শক্তি হিসেবে থাকা ইসরায়েলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র বা তার নিয়ন্ত্রণ যদি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতে চলে যায়, তাহলে শক্তির ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে যাবে। ইরানের জন্য বার্তাটি আরও স্পষ্ট—তেহরান এটিকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখবে এবং মনে করবে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য তার বিপক্ষে চলে গেছে, ফলে তার নিজস্ব পারমাণবিক কর্মসূচি ত্বরান্বিত হবে।

সৌদির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, এটি একটি ব্যাপক প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি, যা সব ধরনের সামরিক সক্ষমতাকে অন্তর্ভুক্ত করে। ঠিক এ ব্যাপকতার কারণে ইরান আতঙ্কিত হবে এবং এটি একটি বিপজ্জনক অস্ত্র প্রতিযেগিতা শুরু করতে পারে।

এ কৌশলগত পরিবর্তনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার প্রধান রক্ষক। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্রের নজর যখন এশিয়ার দিকে যাচ্ছে এবং চীন সেখানে প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন নতুন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

সৌদি আরব তাদের বিশাল সম্পদ ও বাড়তে থাকা ক্ষমতার সঙ্গে এখন কেবল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নির্ভরশীল থাকতে চায় না। পাকিস্তানের ‘উদ্যোক্তাভিত্তিক প্রতিরোধ’ প্রস্তাব হচ্ছে ঠিক সেই বিকল্প, যা এত দিন সৌদি আরব খুঁজছিল।

* জাসিম আল-আজ্জাউই, মধ্যপ্রাচ্যের সাংবাদিক
- মিডলইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-28%2Fdeg1vff2%2Fpakistansaudi.JPG?rect=0%2C25%2C584%2C389&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
পাকিস্তানের ইতিহাস এটিকে একমাত্র দেশ বানিয়েছে, যা সৌদি আরবকে শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তব সাহায্যও দিতে সক্ষম। ছবি : রয়টার্স

কী এই গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা, কেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু?

ভূমধ্যসাগর থেকে গাজা উপকূলের দিকে যাত্রা করা আন্তর্জাতিক নৌবহর গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা বর্তমানে আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গের নেতৃত্বে পরিচালিত এই নৌবহর মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশে গাজার দিকে এগোচ্ছে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নৌবহরটি গাজার উপকূল থেকে প্রায় ৩৭০ কিলোমিটার (২০০ নটিক্যাল মাইল) দূরে অবস্থান করছে। অংশগ্রহণকারীরা সবকিছু সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং নৌবহরের প্রতিটি জাহাজে খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা সংরক্ষিত রয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও, নৌবহরের সদস্যরা শান্ত এবং সজাগভাবে তাদের যাত্রা চালিয়ে যাচ্ছেন।

নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে অংশগ্রহণকারীরা আশঙ্কা করছেন, ইসরায়েলি বাহিনী যে কোনো মুহূর্তে নৌবহরকে থামাতে বা আটকাতে পারে। তবে, নৌবহরের নেতা ও অংশগ্রহণকারীরা জোর দিয়ে বলেছেন, এই অভিযান শুধু মানবিক সহায়তা বহন করছে। আগামী কয়েক দিন নৌবহর গাজার উপকূলে পৌঁছানোর জন্য এগোবে, যেখানে মানবিক সহায়তা বিতরণ করা হবে।

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা কী?

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা হলো একটি আন্তর্জাতিক নৌবহর, যা বিভিন্ন দেশ থেকে অংশগ্রহণকারী স্বেচ্ছাসেবক, মানবাধিকারকর্মী এবং পরিবেশকর্মী নিয়ে গঠিত। এর মূল লক্ষ্য হলো-

# গাজার অবরুদ্ধ জনগণের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। # আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণ করে মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরা। # রাজনৈতিক চাপ ও মানবিক সংকট উভয়ের সমন্বয় ঘটানো।

নৌবহরের প্রতিটি জাহাজে খাদ্য, ওষুধ এবং জরুরি সামগ্রী রয়েছে। যদিও এটি মানবিক উদ্যোগ, তবুও গাজার রাজনৈতিক ও সামরিক সংবেদনশীলতার কারণে আন্তর্জাতিক মনোযোগ এবং বিতর্ক তৈরি হচ্ছে।

কেন এত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু?

গাজার অবরুদ্ধ অবস্থা এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা এই নৌবহরকে সরাসরি আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত করেছে। মূল কারণগুলো হলো-

নিরাপত্তা ও হুমকি : ইসরায়েল নৌবহরকে ‘বিপৎসীমা’-তে প্রবেশ করেছে বলে ঘোষণা করেছে।

আন্তর্জাতিক আইন : ক্রোয়েশিয়ার আইনজীবী মোরানা মিলজানোভিচ সতর্ক করেছেন, আন্তর্জাতিক জলসীমায় বা ইসরায়েলের আঞ্চলিক জলসীমায় বেসামরিক জাহাজ আটকানোর বৈধ অধিকার নেই যদি না অপরাধ সংঘটনের বা নিরাপত্তা হুমকির প্রমাণ থাকে।

মানবিক সহায়তা : নৌবহরটি শুধু খাদ্য ও ওষুধ বহন করছে, তাই এটি নিছক মানবিক উদ্যোগ। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকলেও মানবিক নৌবহর আটকানোর আইনি ভিত্তি তৈরি হয় না।

বর্তমান পরিস্থিতিতে নৌবহরের সব অংশগ্রহণকারী নিরাপদে নৌকায় অবস্থান করছেন। সামনের কয়েক দিনে নৌবহর গাজার উপকূলে পৌঁছে মানবিক সহায়তা বিতরণ করবে। তবে রাজনৈতিক ও সামরিক সংবেদনশীলতার কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর কাড়া এবং কূটনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এক কথায়, গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা কেবল একটি মানবিক অভিযান নয়; এটি আন্তর্জাতিক জলসীমা, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার মিলিত ক্ষেত্র, যা এ মুহূর্তে আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

ছবি : সংগৃহীত

গাজা শান্তি পরিকল্পনায় আসলেই কি ট্রাম্প আর নেতানিয়াহুর সমঝোতা হয়েছে

আল-জাজিরার এক্সপ্লেইনারঃ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে গতকাল সোমবার বৈঠকের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, নেতারা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি স্থাপনের ‘কাছাকাছি’ পৌঁছে গেছেন।

হোয়াইট হাউসে আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প এ সম্পর্কে বলেন, অন্ততপক্ষে, খুব, খুবই কাছাকাছি।

ট্রাম্প গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধ করতে এবং ফিলিস্তিনি অঞ্চলে এখনো জিম্মি থাকা ইসরায়েলি নাগরিকদদের মুক্তি নিশ্চিত করতে নতুন করে ‘২০ দফা গাজা পরিকল্পনা’ প্রকাশ করেছেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো আল-জাজিরাকে বলেছে, হামাসের আলোচক দল ট্রাম্পের পরিকল্পনাটি নিয়ে পর্যালোচনা করছে।

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর গতকালের বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক:

নেতানিয়াকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ট্রাম্প।

সংবাদ সম্মেলন শুরু হতেই ট্রাম্প বলেন, ‘সবাইকে অনেক ধন্যবাদ। এটি একটি বড় দিন, খুবই সুন্দর দিন, সম্ভবত সভ্যতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি এটি। আমি শুধু গাজার কথা বলছি না। গাজা একটি বিষয়, কিন্তু আমরা গাজাকে ছাপিয়ে আরও অনেক কিছু নিয়েও কথা বলছি। পুরো বিষয়টির কথা বলছি, সব সমস্যার সমাধান করার বিষয়ে কথা বলছি।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী (ইসরায়েলি) নেতানিয়াহু আর আমি অনেক জরুরি বিষয় নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষ করেছি। এর মধ্যে আছে ইরান, বাণিজ্য, আব্রাহাম চুক্তির সম্প্রসারণ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা গাজার যুদ্ধ কীভাবে শেষ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেছি। তবে এটি বড় কোনো দৃশ্যপটের একটি অংশমাত্র, যা হলো মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি। আসুন, এটিকে মধ্যপ্রাচ্যে চিরস্থায়ী শান্তি বলা যাক।’

নেতানিয়াহু ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্য নেতাদের পাশাপাশি তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও ইউরোপের নেতাদেরও ধন্যবাদ জানিয়েছেন ট্রাম্প।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘অঞ্চলটিজুড়ে আমাদের যত বন্ধু ও সহযোগী দেশ আছে,  তাদের সঙ্গে আজ বিকেলে ব্যাপক পরামর্শের পর আমি আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের শান্তির মূলনীতি প্রকাশ করছি। আমাকে বলতেই হবে, এটা মানুষ সত্যিই পছন্দ করেছে।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট পরিকল্পনার কিছু মূল প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, পরিকল্পনার আওতায় আরব ও মুসলিম দেশগুলো অঙ্গীকার করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে লিখিতভাবে বলেছে যে গাজাকে সামরিকীকরণ থেকে মুক্ত করতে হবে এবং তা দ্রুত করতে হবে। হামাস ও অন্য সব সন্ত্রাসী সংগঠনের সামরিক সক্ষমতাগুলো নিষ্ক্রিয় করতে হবে। আর তা অবিলম্বেই করতে হবে।

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ‘হামাসের সঙ্গে বোঝাপড়ার জন্য আমরা দেশগুলোর (আরব) ওপর নির্ভর করছি। আর আমি শুনছি যে হামাসও তা করতে চাচ্ছে। এটা ভালো খবর।’

গাজা শাসন

ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর একটি অরাজনৈতিক টেকনোক্র্যাট (অনির্বাচিত প্রতিনিধি) নেতৃত্ব গাজা পরিচালনা করবে। তারা গাজা উপত্যকার দৈনন্দিন কাজকর্ম সামলাবে। তবে সেই ফিলিস্তিনি নেতৃত্বকে বেছে নেওয়ার কাজটা ফিলিস্তিনের জনগণ করতে পারবে না। বরং একটি নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা কাজটি করবে।

পরিকল্পনায় আরও বলা হয়, ‘বোর্ড অব পিস’ নামের সংস্থাটি শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ তদারক করবে। ট্রাম্প বলেন, চুক্তির সাফল্য নিশ্চিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নেতাদের একত্র করার দায়িত্বে থাকবে সংস্থাটি। আর তিনি নিজেই সেই তদারক কর্তৃপক্ষের প্রধান হিসেবে ভূমিকা পালন করবেন।

ট্রাম্প বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প নামে পরিচিত এক ভদ্রলোক এর নেতৃত্ব দেবেন। এটাই আমি চাই। কিছু অতিরিক্ত কাজকর্ম করতে হবে। তবে এটা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে আমি তা করতে রাজি।’

ট্রাম্প ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘ওই সংস্থায় অন্য নেতারাও থাকবেন। আমরা এটা যথাযথভাবে করব, আমাদের একটি বোর্ড থাকবে। বোর্ডে থাকতে চাওয়া মানুষদের একজন হলেন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। ভালো মানুষ, খুবই ভালো মানুষ। এ ছাড়া অন্যরাও থাকছেন। ওই সংস্থায় হামাস ও অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কোনো ভূমিকা থাকবে না।’

গাজার নিরাপত্তা

ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামের একটি বাহিনী গঠনের কথা বলা হয়েছে। গাজার নিরাপত্তা তত্ত্বাবধানে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের আরব ও অন্য সহযোগী দেশ মিলে এই বাহিনী গঠন করা হবে।

পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে, এই বাহিনী হবে দীর্ঘমেয়াদি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সমাধান। সীমান্ত এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসরায়েল ও মিসরের সঙ্গে কাজ করবে আইএসএফ। পাশাপাশি নতুন প্রশিক্ষিত ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে সহায়তা করবে তারা।

কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দেন যে ইসরায়েল ভিন্ন কিছু ভাবছে।

নেতানিয়াহু বলেন, ভবিষ্যতে নিরাপত্তা সীমারেখা গড়ে তোলাসহ সেখানকার নিরাপত্তার দায়িত্বে (গাজায়) ইসরায়েল থেকে যাবে। গাজায় একটি শান্তিপূর্ণ বেসামরিক প্রশাসন থাকবে, যার পরিচালনার ভার হামাস বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ওপর থাকবে না। যারা ইসরায়েলের সঙ্গে সত্যিকারের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তারাই কেবল এ প্রশাসনকে পরিচালনা করবে।

নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য ট্রাম্পের পরিকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ট্রাম্পের পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, যদি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ কিছু সংস্কার করে, তবে দীর্ঘ মেয়াদে তারা গাজার শাসনভার নিতে পারে।

হামাসের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা

ট্রাম্প বলেন, ‘আজ আমরা যে পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছি, তার শর্তগুলো মেনে নেওয়া না-ওয়ার বিষয়টি এখন হামাসের ওপর নির্ভর করছে। আর আবার বলতে হচ্ছে, আগে যে হামাসকে আমরা মোকাবিলা করেছি, তার চেয়ে এখনকার হামাস ভিন্ন। কারণ আমার ধারণা, তাদের ২০ হাজারের বেশি সদস্য নিহত হয়েছেন।’

আল-জাজিরার মারওয়ান বিশারা বলেন, প্রস্তাবটিকে ‘হামাসের জন্য আত্মসমর্পণ’ হিসেবেই দেখা হবে।

বিশারার মতে, ট্রাম্পের পরিকল্পনা হামাসের কাছে একটি আলটিমেটাম। তা হলো হয় আত্মসমর্পণ করর, নইলে যুক্তরাষ্ট্র তার সবচেয়ে ভালো বন্ধু ইসরায়েলের পাশে দাঁড়াবে।

পরিকল্পনাটি উপস্থাপন করতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হলো ফিলিস্তিনিদের তাদের ভবিষ্যত নির্ধারণের সুযোগ দেওয়া।

ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘অনেক ফিলিস্তিনি শান্তিতে জীবনযাপন করতে চান। আমি তাদের অনেককেই দেখেছি এবং এ ব্যাপারে তাদের সমর্থন আছে। আমি ফিলিস্তিনিদের বলছি, তারা যেন তাদের ভাগ্যের দায়িত্ব নেয়। কারণ, সেটাই আমরা তাদের গড়ে দিচ্ছি।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা তাদের নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের দায়িত্ব দিচ্ছি। আর এ জন্য তাদের সম্পূর্ণভাবে সন্ত্রাসবাদের নিন্দা জানাতে হবে ও নিষিদ্ধ করতে হবে এবং একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে যাত্রা করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। তারা তাদের পুরোনো জীবন চায় না। হামাসের সঙ্গে তারা কষ্টের জীবন কাটিয়েছে।’

গাজার থেকে আল-জাজিরার প্রতিনিধি তারেক আবু আজউম বলেন, ফিলিস্তিনিরা এখনো ট্রাম্পের এই পরিকল্পনার সাফল্য নিয়ে সন্দিহান।

আবু আজউম বলেন, অনেক ফিলিস্তিনি বিশ্বাস করেন যে হামাসকে সামরিকীকরণমুক্ত করা ও উৎখাত করাসংক্রান্ত বর্তমান দাবিগুলো হয়তো প্রত্যাখ্যান করা হবে। তবু তাঁরা আশা রাখেন, যেকোনোভাবেই হোক ইসরায়েলি সেনাদের গাজা থেকে প্রত্যাহার করতে হবে, ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি দিতে হবে।

‘ইসরায়েল নিজেই কাজটি শেষ করবে’

পরিকল্পনায় সম্মতির পর যেসব কাজের ধারা অনুসরণ করা হবে, তা সম্পর্কে কথা বলেছেন উগ্র ইহুদিবাদী নেতা নেতানিয়াহু।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প), হামাস যদি আপনার পরিকল্পনায় সম্মত হয়, তবে প্রথম ধাপ হবে সীমিত পরিসরে সেনা প্রত্যাহার, এরপর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের সব জিম্মিকে মুক্তি দিতে হবে।’

নেতানিয়াহু বলেন, ‘পরবর্তী ধাপ হবে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যা হামাসকে সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্র ও গাজাকে সামরিকীকরণমুক্ত করার দায়িত্ব নেবে। যদি ওই আন্তর্জাতিক সংস্থা সফল হয়, আমরা স্থায়ীভাবে যুদ্ধের সমাপ্তি টানব। নিরস্ত্রীকরণ ও সামরিকীকরণমুক্ত করার কাজটি কতটা হলো, তার মাত্রা বিবেচনা করে আরও সেনা প্রত্যাহার করা হবে। তবে অদূর ভবিষ্যতের জন্য নির্ধারিত নিরাপত্তাসীমানার মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনী থেকে যাবে।’

পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান হলে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট, হামাস যদি আপনার পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে অথবা তারা তা মেনে নেওয়ার ভান করে, পরে সেটি ভঙ্গ করার চেষ্টা করে, তাহলে ইসরায়েল নিজেই কাজটি শেষ করে দেবে। এটা সহজ উপায়ে করা যেতে পারে অথবা কঠিন উপায়ে। তবে এটি করা হবে। আমরা সহজ উপায়টি পছন্দ করি, তবে এটা করতে হবে।’

ওয়াশিংটন ডিসির ‘ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজ’-এর ফেলো ফিলিস বেনিস আল-জাজিরাকে বলেন, এখানে ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ রক্ষিত হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

বেনিসের মতে, জিম্মিদের ফিরে পাওয়ার পর ইসরায়েল যে আবারও যুদ্ধে ফিরে যাবে না, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ, তাদের নানা অজুহাত দেখানোর সুযোগ থেকে যাচ্ছে। তখন তারা ট্রাম্পকে বলতে পারে, ‘মি. প্রেসিডেন্ট, আমরা যে ধরনের সহযোগিতা আশা করেছিলাম, তা পাচ্ছি না, তাই আবার যুদ্ধে ফিরতে হবে। এর জন্য দুঃখিত।’

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

সিরিয়ায় ‘ব্যর্থ’ আল-শারা, নির্বাচন কি শাপে বর হবে by জাসিম আল-আজ্জাওয়ি

আগস্টের শুরুর দিকে কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) কুর্দি-অধ্যুষিত উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার মানবিজের কাছে সিরিয়ান সরকারি বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলি চালায়। উত্তরের এই উত্তেজনা এসেছিল দক্ষিণের সুয়াইদা অঞ্চলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কয়েক সপ্তাহ পর, যেখানে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন এবং প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। দ্রুজ ও সুন্নি বেদুইন গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সহিংসতা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলেছে এবং এখনো পুরোপুরি থামেনি।

মার্চ মাসে সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের অনুগত গোষ্ঠীগুলো লাতাকিয়া ও টারতুস উপকূলীয় অঞ্চলে সরকারি বাহিনী এবং মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ জন নিহত হন, যাঁদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক; ১ লাখ ২৮ হাজার ৫০০ জন বাস্তুচ্যুত হয়।

বারবার সংঘটিত এই সহিংসতা প্রকাশ করে দিচ্ছে সেই খোলামেলা সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে, যেটিকে একসময় আসাদ ক্ষমতা ধরে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এখন তাঁর অনুপস্থিতিতে, সেই বিভাজনগুলো আরও বিস্তৃত হচ্ছে—দশকের পর দশক ধরে চলা অনিষ্পন্ন ক্ষোভ, জমি নিয়ে বিরোধ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিস্তারের কারণে।

আসাদকে অপসারণের পর ক্ষমতায় আসা প্রেসিডেন্ট আহমাদ আল-শারা এখনো সব গোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ, তাঁর প্রধান মনোযোগ ছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে। তাঁর ইসলামপন্থী ঝোঁক সংখ্যালঘুদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে। দ্রুজ, আলাউই, খ্রিষ্টান ও কুর্দিরা আশঙ্কা করছে যে তিনি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হলে আরও সহিংসতা ঘটতে পারে।

আগামী সেপ্টেম্বরের নির্বাচন শারা সরকারের জন্য আনুষ্ঠানিক বৈধতা বয়ে আনতে পারে। তবে প্রকৃত নিরাপত্তা ও পুনর্মিলন ছাড়া এই নির্বাচন বিদ্যমান বিভাজনকে আরও গভীর করার ঝুঁকি তৈরি করছে এবং এমন একটি ক্ষমতার কাঠামোকে শক্তিশালী করছে, যা প্রকৃতপক্ষে ঐক্যবদ্ধ জাতির বদলে কেবল কিছু সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করবে।

পুনর্গঠন ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রেসিডেন্ট আল-শারা তাঁর জাতীয় কৌশলে মূলত পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এখানেই প্রধানত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছে।

মে মাসে আলেপ্পো শহরে (সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর) এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে আল-শারা সিরিয়ানদের পুনর্গঠন প্রচেষ্টায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ হয়েছে আর এখন আমাদের দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হয়েছে।’

দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে আল-শারা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। উপসাগরীয় দেশগুলোর সহায়তায় তিনি একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছেন: যুক্তরাষ্ট্র সরকার আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়েছে এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র সংগঠন হায়াত তাহরির আল-শামকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’-এর তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে।

তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এসডিএফকে নতুন নিরাপত্তাকাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনাকেও সমর্থন জানায়।

ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে, দামেস্কের নতুন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া ইরানের প্রভাব কমাতে এবং সিরিয়াকে হিজবুল্লাহসহ অন্যান্য আঞ্চলিক প্রতিনিধিদের করিডর হওয়া থেকে বিরত রাখতে সহায়ক হবে।

অন্যদিকে আল-শারার কাছে এটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বৈধতা সুনিশ্চিত করার একটি সুযোগ।

সিরিয়ার প্রতিবেশী তুরস্কও আল-শারার জাতীয় কৌশলে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দেশটি যুদ্ধ ছাড়া সামরিক সহায়তা, যেমন প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছে সিরিয়ার নিরাপত্তা অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য। পাশাপাশি তারা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা রাখার পরিকল্পনা করছে। এ মাসে তুরস্ক সিরিয়ায় প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে, যা উত্তরের জ্বালানি–সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করছে।

এদিকে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোও সিরিয়ার অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে ব্যাপক বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জুলাইয়ে সৌদি আরব ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের রিয়েল এস্টেট ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ ঘোষণা করে।

এর দুই সপ্তাহ পর সিরিয়ান সরকার কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে গণপরিবহন ও রিয়েল এস্টেট খাতে ১৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করে।

তবে অনেক সমালোচক যুক্তি দেন, অর্থনৈতিক সহায়তা একটি দেশের পুনর্গঠনের জন্য অপরিহার্য হলেও, এককভাবে এটি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না। ঝুঁকি রয়েছে যে টাকা ও উন্নয়ন প্রকৃত ক্ষোভ ও বিভাজনগুলোকে ঢেকে রাখবে, যা ভবিষ্যতে আবারও সংঘাত উসকে দিতে পারে।

নতুন সিরিয়ান সরকারের জন্য প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জরুরি প্রয়োজনের সঙ্গে জনগণের অভিযোগ-অভিমত ও ক্ষোভ নিরসনের সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বের করা।

আইনসভার নির্বাচন

অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা নিরসনের একটি উপায় হলো গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জন আস্থা অর্জন করা। আল-শারা সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় নির্বাচনের ডাক দিয়েছেন। তবে সাধারণ সিরিয়ানরা সেখানে ভোট দিতে পারবেন না। কারণ, ২১০ আসনের মধ্যে ১৪০টি আসন বেছে নেবে স্থানীয় নির্বাচনী কমিটি এবং বাকি ৭০টি আসন সরাসরি প্রেসিডেন্ট নিজে মনোনীত করবেন। কোনো আসনই সরাসরি জনগণের ভোটে পূরণ হবে না।

এই কাঠামো মূলত একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক হিসাব। এটি নতুন নেতৃত্বকে নিয়ন্ত্রিত ফলাফলের নিশ্চয়তা দেয় এবং একই সঙ্গে সার্বিক জাতীয় ভোট আয়োজনের জটিলতা এড়ায়; বিশেষত তখন, যখন দামেস্ক এখনো দেশের সব ভূখণ্ডের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই এবং নিরাপত্তাও নিশ্চিত নয়।

তবে এই নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে অনেক সিরিয়ানই অবিশ্বাসের চোখে দেখবেন, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো। তাদের কাছে এটি সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠদের পক্ষে পক্ষপাতমূলক বলে মনে হবে।

কেউ কেউ হয়তো নির্বাচন বর্জনের পথ বেছে নেবেন, একে অবৈধ ঘোষণা করবেন কিংবা ভিন্ন উপায়ে তাঁদের গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করবেন। কারণ, এই ব্যবস্থায় তাঁদের অর্থবহ কণ্ঠস্বর থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিবিড়ভাবে এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবে এবং এটি যদি সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল সংসদ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়, তবে তারা সমালোচনামূলক অবস্থান নেবে।

এর ফলে নতুন সরকারের নবগঠিত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং পূর্ণ কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও সমর্থন পাওয়ার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

দামেস্কের জন্য আরও জরুরি সমস্যা হলো—এই নির্বাচন দেশটির গভীর ক্ষত সারাতে কোনো ভূমিকা রাখবে না, বিশেষত চলমান সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে। তাই সিরিয়ার এখন সবচেয়ে প্রয়োজন একটি সর্বজনীন জাতীয় পুনর্মিলন প্রক্রিয়া।

ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি

সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকার এখনো ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির জন্য কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা উপস্থাপন করতে পারেনি। বাশার আল-আসাদের আমলে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ, যার মধ্যে ছিল গণগ্রেপ্তার, নির্যাতন ও রাসায়নিক হামলা—এগুলো আলোচনার বাইরে রয়ে গেছে। সাম্প্রদায়িক হত্যাযজ্ঞের জন্য দোষীদের জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

জবাবদিহির অনুপস্থিতি কেবল নৈতিক ব্যর্থতা নয়, কৌশলগত ব্যর্থতাও বটে। অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার মতো আইনগত কাঠামো না থাকলে সিরিয়ার ক্ষত আরও গভীর হবে।

সিরিয়ার প্রয়োজন একটি নতুন সামাজিক চুক্তি। জনগণ আর সেই পুরোনো দায়মুক্তির ভিত্তি মেনে নেবে না, যা অতীত শাসনকে টিকিয়ে রেখেছিল।

ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির প্রক্রিয়াটি অবশ্যই নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হতে হবে। বাশার আল-আসাদের দীর্ঘকালীন এক পরিবারকেন্দ্রিক শাসন, যা আলাওয়ি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল, এর প্রেক্ষাপটে নতুন সরকার এককভাবে বিচারক হতে পারে না।

রাষ্ট্র–নেতৃত্বাধীন কোনো প্রক্রিয়াকে সহজেই নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায় বা পুরোনো শাসনের অনুগতদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ হিসেবে দেখা হতে পারে। এই ধারণা দূর করতে এবং ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের, বিশেষ করে জাতিসংঘের, সহায়তা সিরিয়ার জন্য অত্যন্ত উপকারী হবে।

দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’-এর মতো একটি কাঠামো শক্তিশালী কৌশল হতে পারে। এটি শুধু শাস্তির দিকে মনোযোগ না দিয়ে অতীতের অপরাধ—যেমন গণহত্যা, নির্যাতন ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনাগুলো উন্মোচনের ওপর অগ্রাধিকার দেবে।

এ প্রক্রিয়া সিরিয়াকে শাস্তিমূলক বিচারব্যবস্থা থেকে দূরে সরাতে সাহায্য করতে পারে, যা সমাধান না দিয়ে কেবল শুদ্ধীকরণে মনোযোগ দেয়। এটি নতুন শাসনব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা তৈরি করতে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী বয়ান নয় বরং একটি যৌথ দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে নতুন সামাজিক চুক্তি প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করতে পারে।

একই সঙ্গে এটি ফেডারেলিজমের দাবিকে প্রশমিত করতে পারে, যা দেশের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করছে।

সিরিয়ার রূপান্তর কখনোই সহজ হতো না। কিন্তু বর্তমান সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও সামরিকীকৃত রাজনীতির সিরিয়াকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আনুষ্ঠানিক অগ্রগতিকে অভিনন্দন জানানোর বাইরে যেতে হবে। তাদের অবশ্যই নাগরিক সমাজকে সহায়তা করতে হবে এবং অতীত ও বর্তমান অপরাধের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তুলতে হবে।

অন্যথায় সিরিয়ার ভবিষ্যৎ ভয়ংকরভাবে অতীতের মতোই হয়ে উঠবে—নতুন নেতৃত্ব থাকবে। কিন্তু সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার পুরোনো চক্র একই রকম অব্যাহত থাকবে।

* জাসিম আল-আজ্জাওয়ি, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সাংবাদিক এবং গণমাধ্যম প্রশিক্ষক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মনজুরুল ইসলাম

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2024-12-26%2Fk23178qy%2F2024-12-26T105841Z588710960RC2WWBAN2RSORTRMADP3SYRIA-SECURITY.JPG?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
দামেস্কের সড়কে সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর দুই সদস্য। সিরিয়া, ২৬ ডিসেম্বর। ছবি: রয়টার্স

গুপ্তচরাবৃত্তির অভিযোগে দুই ফিলিস্তিনি শিশুকে আটক করল ইসরায়েল

অধিকৃত পশ্চিম তীরের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর হেবরনে মাত্র পাঁচ ও ছয় বছর বয়সী দুই ফিলিস্তিনি শিশুকে আটক করেছে ইসরায়েলি সেনারা। সোমবার পুরনো শহরের ভেতরে ঘটে এই ঘটনা। সেনারা দাবি করেছে, শিশুরা নাকি এক ইসরায়েলি দখলদার বসতির বাড়ি ‘গোয়েন্দাগিরি’ করছিল।

তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শিশুরা আসলে বাড়ির কাছেই ফুটবল খেলছিল। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ওয়াফার প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় আধা ঘণ্টা আটক রাখার পর ফিলিস্তিনি বাসিন্দা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মীদের হস্তক্ষেপে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।

অভিযুক্ত দুই শিশু আতঙ্কে কাঁদছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এ সময় একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায়— সশস্ত্র এক ইসরায়েলি সেনার সামনে কাঁদতে কাঁদতে হাত ধরে আছে দুই শিশু। অন্য এক ভিডিওতে দেখা যায়, স্থানীয়রা সেনাদের সঙ্গে যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু সেনারা তাদের বারবার উপেক্ষা করছে।

হেবরনের আইন আসকার পাড়ার বাসিন্দা বদর আল-তামিমি আনাদোলু এজেন্সিকে বলেন, ‘শিশুরা আতঙ্কে কাঁদছিল, এখনো তারা ভয়ের মধ্যে আছে। সেনারা যে বাড়িটি কিছুদিন আগে দখল করে নিয়েছিল সেটি সংস্কার করছিল। শিশুরা অসচেতনভাবে সেই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে যায়। আর সেটাকেই গোয়েন্দাগিরি বলে অভিযোগ করা হয়।’

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ লিখেছে, ‘এটি ফিলিস্তিনিদের প্রতিদিনের নিষ্ঠুর বাস্তবতার প্রতিফলন। ফিলিস্তিনি শিশুদের জীবন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও চলাফেরার অধিকার প্রতিনিয়ত অস্বীকার করা হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই শিশুদের হত্যা, আহত কিংবা নির্বিচারে আটক করছে ইসরায়েলি বাহিনী।’

অধিকৃত পশ্চিম তীরে দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনিদের চলাফেরায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ, কারফিউ ও নির্বিচারে গ্রেপ্তারের মতো নীতি চালু রয়েছে। তবে ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় গণহত্যা শুরু হওয়ার পর থেকে পশ্চিম তীরেও পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। প্রতিদিনই সেখানে গণগ্রেপ্তার ও শিশুদের আটকের মতো ঘটনা ঘটছে।

প্রসঙ্গত, গাজায় গত দুই বছরে ইসরায়েলি হামলায় ২০ হাজারেরও বেশি শিশু নিহত হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আটক দুই ফিলিস্তিনি শিশু। ছবি : সংগৃহীত
ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আটক দুই ফিলিস্তিনি শিশু। ছবি : সংগৃহীত


সেকালের শামসুল হক, একালের ‘জ্বালাময়ী’ জালাল—তাঁদের ‘পরিণতি’ কেন এমন হয় by গওহার নঈম ওয়ারা

আগস্ট ২৬, ২০২৫ রাতের ঘটনা পরদিন সকালে প্রায় সবগুলো চ্যানেল দেখাচ্ছিল বারবার। মনে হচ্ছিল, একই স্ক্রিপ্ট পড়ছেন সবাই। ডাকসুর ভিপি পদপ্রত্যাশী এক ছাত্র তাঁর রুমমেটকে ‘খুন’ করার চেষ্টায় রক্তাক্ত করেছেন। হলের ছাত্ররা তাতে উত্তেজিত হয়ে তখনই তার ‘হাতবিচার’ করতে উদ্যত হয়েছিলেন।

প্রভোস্ট প্রমুখ গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর আবাসিক সিট বাতিল করে উত্তেজিত ছাত্রদের দাবির মুখে তাঁকে পুলিশের হাওলা করে দিয়েছেন। হত্যাচেষ্টার জন্য অভিযুক্ত করে মামলাও করেছে হল কর্তৃপক্ষ। আজকাল কোনো খবরেই আর গা ভাসাই না।

যে হলের ঘটনা, সে হলে ১৯৭৪ সালে পাশের হল থেকে ধরে এনে সাতজনকে গুলি করে মারা হয়েছিল। সেই ঘটনায় কত দিন পরে কারা মামলা করেছিলেন। খুনিদের চিনতেন সবাই, পরের দিন সব পত্রিকায় একই বয়ান ছাপা হয়েছিল। যখন সব বয়ান, সব স্ক্রিপ্ট মিলে যায়, তখন মনে হয় কলকাঠি অন্য কেউ নাড়ছেন নিরাপদ কোনো জায়গায় বসে। টিভির ছবিতে অভিযুক্ত ব্যক্তির চেহারা বোঝা যাচ্ছিল না।

ফেসবুকে দেখে মনে হলো কোথায় যেন দেখেছি। নাম ও চেহারার মিল জালাল আহমেদ সাকিনের—পেকুয়া, কক্সবাজার। আজ থেকে ১০–১১ বছর আগে ৯ আগস্ট ২০১৪ সালে বায়তুল মোকাররমের উত্তর ফটক থেকে পুলিশ তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল (গুম বলা চলে)। যত দূর মনে পড়ে, প্রায় দুই মাস তাঁর কোনো হদিস ছিল না। এ প্রসঙ্গে তখনকার ডিবির ভাষ্য ছিল, ‘রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। তাই আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগায় গ্রেপ্তারের প্রায় দুই মাস পরে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা হলো।’ (প্রথম আলো, ১৪ অক্টোবর ২০১৪)।

তখন জালাল আহমেদ সাকিনের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগ ছিল—জালাল ‘নির্বাচিত সরকারকে উচ্ছেদের লক্ষ্যে ২৪ পাতার একটি খসড়া বই লিখে সহিংস আন্দোলনের মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ করেছেন। আসলে কর্তৃত্ববাদী একটি সরকারকে সরাতে কী কী কৌশল অবলম্বন করা যায়; কোন তরিকায় বিরোধী সমমনাদের ঐক্য গড়ে তোলা আর অটুট রাখা যায়, এসব নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা তিনি লিখে ফেলেছিলেন কাগজে।

বলা যায়, দেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য তাঁর থিসিস ছিল সেটি। সেটি নিয়েই তিনি ছুটে যেতেন পরিবর্তনপ্রত্যাশীদের কাছে।’ আগস্টের ৯ তারিখে আটকের পর তাঁকে কথিত রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় আটক দেখানো হয় ৪ অক্টোবর। পল্টন থানায় রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাটি করেন তৎকালীন ডিবির উপপরিদর্শক মিজানুর রহমান। আরও দিন চারেক পর ১৩ অক্টোবর মহানগর হাকিম রেজাউল করিমের আদালতে ১০ দিনের রিমান্ড চায় ডিবি।

আদালত ১৯ অক্টোবর রিমান্ড শুনানির পর এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তারপর সবাই তাঁর কথা ভুলে যান একসময়। জামিন হতে হতে এক বছর কেটে যায় কারাগারে। যে ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে জালাল জড়িত ছিল, তারাও হাত গুটিয়ে নেয়। এ যেন আরেক শামসুল হক ট্র্যাজেডি।

যে তরুণ শামসুল হকের সাহসের ওপর ভর করে পাকিস্তান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন মুসলিম লীগকে চ্যালেঞ্জ করে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। দল করার আগেই উপনির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রার্থী টাঙ্গাইলের করটিয়ার প্রতাপশালী জমিদার খুররম খান পন্নীকে বিপুল ভোটে হারিয়ে সারা পাকিস্তানে সাড়া ফেলে দেন। নির্বাচনের পর ৮ মে ১৯৪৯ সালে ঢাকাবাসীর পক্ষে ‘পূর্ববঙ্গ মুসলিম লীগ কর্মী শিবির’ আইন পরিষদের সদস্য জননেতা শামসুল হককে ভিক্টোরিয়া পার্কে গণসংবর্ধনা দেয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক বলছিলেন, ‘ছেলেতুল্য এই শামসুল হকই বাংলার ভাবি প্রধানমন্ত্রী হবে এই ভবিষ্যদ্বাণী করছি।’

১৯৪৭-৫২ সালে অনেকেই শামসুল হককে পূর্ব পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ চিফ মিনিস্টার বলে কল্পনা করতেন। সেই শামসুল হককে পার্টির নেতারা মানসিক রোগী হিসেবে জেলে রেখে চলে আসেন। জালালও কি মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন?

এই প্রশ্নের কিছুটা উত্তর মেলে তাঁর এক শুভানুধ্যায়ীর লেখায় ‘পরিবার ও পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্নতা, বৈদ্যুতিক শক-সহ নানা প্রক্রিয়ায় নিপীড়ন জালালকে মানসিকভাবে পর্যদস্ত করে ফেলে। আটক থাকাকালে নানা থেরাপি, আন্দোলনে মাথায় আঘাত, বিপন্ন জীবন—সব মিলিয়ে জালালের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা জেল–জুলুমের বাইরে খোলা বাতাসে থাকা আর দশজনের মতো থাকার কথা নয়।

জানা যায় মেধাবী ছেলে জালালও সেটি বুঝত, কিছু থেরাপিও নিয়েছেন। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে পূর্ণ চিকিৎসা করাতে পারেননি। সাংবাদিকতার সামান্য একটি চাকরিতে তার পড়ালেখার খরচ মেটানো কঠিন ছিল। বন্ধুরা তাঁকে বলেছিলেন সরকারের সহায়তায় চিকিৎসা নিতে। জালাল রাজি হননি। নিজের চিকিৎসা নিতে সরকারি পয়সা নিতে নিজের কাছে নিজেকে ছোটো লাগে—এই ছিল তাঁর জবাব।

তবে আহত জালাল দমে যাননি। ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন; কিন্তু কিছু কিছু আঘাত মানুষের মন ও মস্তিষ্ককে এমনভাবে ক্ষতবিক্ষত করে যে তার আর উপশম হয় না। যেমন হয়নি কিংবদন্তি ছাত্র জননেতা শামসুল হকের।

জালালের আরেক বন্ধু বলছিলেন, ‘জ্বালাময়ী জালালের আগুন জ্বালানো ঝলক আমরা দেখেছি ২০১৮ সালের আন্দোলনে। ২০১৮ সালে নুর-ফারুক-রাশেদ গ্রেপ্তার, পুরো আন্দোলনের হাল ধরেছিলেন জালাল। জানুয়ারি মাসে রিট হওয়ার পর টিএসসিতে প্রথম ৩০-৩৫ জনের ছোট্ট মিটিংয়ে যে স্ফুলিঙ্গ জ্বলে, সেই স্ফুলিঙ্গ থেকেই জেগে ওঠেন জালাল। কথিত মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ থেকে জানে মেরে ফেলার হুমকি দিলে আমরা আড়ালে চলে গেলেও জালাল আরও সামনে আসেন। জানুয়ারি মাসে যখন অল্প কজন শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি, টিএসসি ও শাহবাগ ঘুরে ঘুরে সমর্থক সংগ্রহের কাজ চালাচ্ছিলেন, সেই সময় থেকেই জালাল সক্রিয়ভাবে আন্দোলন সংঘটিত করতে থাকেন। অন্যদের আড়ালে থেকে কাজ করার পরামর্শ দিলেও তিনি সামনেই থেকে যান বুক ফুলিয়ে বুলেটের সামনে। জালাল বলেছিলেন, “রক্ত না দিলে পরিবর্তন আসে না। আমি রক্ত দেব।”’

জালাল রক্ত দিয়েছেন ঠিকই। ২০১৩ সালে রক্ত দিয়েছেন। ২০১৮ সালে রক্ত দিয়েছেন। ২০২৪ সালে রক্ত দিয়েছেন। ২০১৮ সালে নুর, ফারুক ও রাশেদ গ্রেপ্তার, পুরো আন্দোলনের হাল ধরেছিলেন জালাল। তাঁদের কারামুক্ত করতে দৌড়েছিলেন জালাল।

বিনিময়ে কী পান জালাল? বারবার আহত হয়ে, জেলে গিয়ে, নিপীড়ত হয়ে নস্যাৎ হয় পড়াশোনা, রুদ্ধ হয় মসৃণ ক্যারিয়ার। এমনকি স্নাতক শেষ হতে হতে পেরিয়ে যায় জীবনের এক দীর্ঘ দশক।

জালাল মানসিকভাবেও অনেকটা একা হয়ে যান এরই মধ্যে। গণ–অভ্যুত্থানোত্তর বাংলাদেশে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠাঁই হয় তাঁর। আশা ছিল, তাঁর দল জালালের আপসহীনতা ও সাহসের মূল্যায়ন করবে। কিন্তু হায়! ওর বন্ধু বা সমবয়সীরা কেউ তো হলে নেই। আর যারা মাস্টার্সে পড়েন, তাঁরাও তাঁর পাঁচ-ছয় বছরের জুনিয়র। বয়সের পার্থক্য মানসিকতার পার্থক্যকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। একদিকে যেহেতু জালাল দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামে এত অবদান রেখেছেন, আর তিনি এত সিনিয়র, তাই জুনিয়রদের থেকে একটু সম্মান ও শ্রদ্ধা আশা করতেন।

অন্যদিকে গণ–অভ্যুত্থানোত্তর বাংলাদেশের তরুণদের মনে কাউকে না গোনায় ধরার যে উত্তরাধুনিক ঢেউ বয়ে গেছে, তার সঙ্গে জালালের প্রত্যাশার সংঘর্ষ ঘটে। তার ওপর আছে ক্যাম্পাসে নানামাত্রিক রাজনৈতিক চাল-প্রতিচাল। কাকে ডাউন করে কে উঠবেন, এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা পেয়েছে যেন।

তাৎক্ষণিকভাবে সিট বাতিল করে পুলিশের হাতে খুনের আসামি হিসেবে জালালকে তুলে দেওয়ার আগে হল কর্তৃপক্ষকে এগুলো বিবেচনা করা উচিত ছিল। তাঁরা বলতে পারেন, বিক্ষুব্ধ  শিক্ষার্থীদের নিবৃত্ত করার আর কোনো পথ খোলা ছিল না। তাঁরাও প্রাণের ভয়ে ছিলেন, তাই জালালকেই বলি দিতে হয়েছে।

সেদিন রাতে জালালের পক্ষে দু–একজন দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের ক্ষীণস্বর হল কর্তৃপক্ষের কান পর্যন্ত যায়নি। তাঁরা বলেছিলেন ‘মব’ না করে জালালকে উদ্ধার করে সবকিছু শুনে ঠান্ডা মাথায় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

যে হলের এই ঘটনা, তার পাশের হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ও ডাকসু নির্বাচনের প্রার্থী আবদুল ওয়াহেদ জানান, ‘ঘটনার পর আবদ্ধ রুমে জালালের আত্মহত্যার আশঙ্কা করছিলাম। তাই বলি যে এ রকম ঘটনা ঘটলে রুমের সামনে অবস্থান করা শিক্ষার্থীদের দায় নিতে হবে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম ও পুলিশের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা কথা দেন, তাঁর গায়ে হাত তোলা হবে না। কিন্তু রুম থেকে বের হওয়ার পর তাঁকে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সামনেই প্রচণ্ড মারধরে রক্তাক্ত করে ফেলা হয়। সে সময় তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করি যে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ঠিক হচ্ছে না। জালাল দোষী হলেও আইন অনুযায়ী তাঁর শাস্তি হোক; কিন্তু হামলা ও মারধর সমাধান নয়। তখন একদল শিক্ষার্থী আমার মুঠোফোন কেড়ে নেন এবং জালালের ওপর হামলার ভিডিও ফেসবুক থেকে ডিলিট করতে বাধ্য করেন। এ সময় তাঁরা আমার গায়েও হাত তোলেন। এ ছাড়া আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া মুঠোফোনটি থানা থেকে এক ঘণ্টা পরে উদ্ধার করেছি।’

এ লেখা প্রকাশের আগেই হয়তো জালালের জামিন হবে কিংবা হবে না। তবে তাঁকে নিয়ে এখন কেউ ভাবছে না। যেমন আওয়ামী লীগ ভাবেনি তাদের পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা স্তম্ভ শামসুল হকের কথা। পাগলা গারদে পাঠিয়ে পার্টি থেকে বহিষ্কার করে দায় সেরেছিলেন সবাই। তাঁর শূন্য চেয়ারটা সারা জীবনের জন্য দখলের প্রত্যাশায় থাকা ব্যক্তিরা কেন তাঁকে নিয়ে ভাববেন?

তবে নতুন বাংলাদেশে শামসুল হকদের নিয়ে ভাবতে হবে। ভাবতে হবে আন্দোলনের অন্যতম রূপকার কেন এভাবে হারিয়ে যাবেন। জেল আর রিমান্ডের অত্যাচারে জেরবার হওয়া নেতা– কর্মীদের সঠিক চিকিৎসা আর মানসিক পুনর্বাসনের অঙ্গীকার করতে হবে।

* গওহার নঈম ওয়ারা, লেখক ও গবেষক
- wahragawher@gmail.com

‘জালাল রক্ত দিয়েছেন ঠিকই। ২০১৩ সালে রক্ত দিয়েছেন। ২০১৮ সালে রক্ত দিয়েছেন। ২০২৪ সালে রক্ত দিয়েছেন।’
‘জালাল রক্ত দিয়েছেন ঠিকই। ২০১৩ সালে রক্ত দিয়েছেন। ২০১৮ সালে রক্ত দিয়েছেন। ২০২৪ সালে রক্ত দিয়েছেন।’ ছবি: সংগৃহীত

কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা স্থগিত রাখলেন লাদাখের নেতারা by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

লাদাখের আন্দোলনকারী ব্যক্তিরা কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা স্থগিত করে দিলেন। তাঁরা বলেছেন, ২৪ সেপ্টেম্বরের সহিংসতার জন্য কারা দায়ী, তার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে। সেই তদন্তের ভার দিতে হবে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত কোনো বিচারপতিকে।

একই সঙ্গে আন্দোলনকারী ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ম্যাগসাইসাই পুরস্কারপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ, প্রকৌশলী ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুকসহ গ্রেপ্তার করা সবার নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে।

সোনম ওয়াংচুককে কেন্দ্রীয় সরকার ‘পাকিস্তানি চর’ বলেছে। বলেছে, জনতাকে তিনিই সহিংসতায় উসকানি দিয়েছেন। তাঁকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

লেহ্‌ অ্যাপেক্স বডির (ল্যাব) চেয়ারম্যান থুপস্টান ছেওয়াং ও কো-চেয়ারম্যান শেরিং দোরজি গতকাল সোমবার আলোচনা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বলেন, বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও গ্রেপ্তার করা সবাইকে মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনায় অংশ নেবেন না।

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী–অধ্যুষিত লেহ্‌র আন্দোলনকারী নেতাদের এ সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন মুসলিমপ্রধান কারগিলের নেতারা। কারগিল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের (কেডিএ) নেতা সাজ্জাদ কারগিলি একই দিন সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দেন, ল্যাবের সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাঁরা সম্পূর্ণ একমত। তাঁদেরও দাবি, ওয়াংচুকসহ গ্রেপ্তার করা সবাইকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে।

সাজ্জাদ কারগিলি বলেন, পৃথক রাজ্যের মর্যাদা ও লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত করার দাবি নিয়ে কোনোরকম আপস সম্ভবপর নয়। ল্যাব ও কেডিএ এই বিষয়ে অনড় থাকবে। দাবি না মেটা পর্যন্ত তাঁরাও আলোচনা স্থগিত রাখার পক্ষে।

লাদাখের দুটি জেলা। লেহ্‌ ও কারগিল। ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত এ ধূসর পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দারা বৌদ্ধ ও মুসলমান। জনসংখ্যা মাত্র তিন লাখ। পৃথক রাজ্যের মর্যাদা ও ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত হওয়ার দাবিতে দুই সম্প্রদায়ই একমত। এ ছাড়া তাঁরা চান স্থানীয় লোকজনের চাকরির জন্য এক পৃথক পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন ও লোকসভায় আরও একটি আসন বৃদ্ধি। বর্তমানে গোটা লাদাখের জন্য লোকসভায় আসন রয়েছে একটি।

ল্যাবের সিদ্ধান্ত ও তাকে কেডিএ সমর্থন জানানোর পর গতকাল রাতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক বিবৃতি জারি করা হয়। তাতে বলা হয়, আলোচনার জন্য সরকারের দরজা খোলা থাকছে। কেন্দ্রীয় সরকারের গড়ে দেওয়া উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির সঙ্গে আলোচনায় ইতিমধ্যে অনেক বিষয়ে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। সরকার চায়, আলোচনা অব্যাহত থাকুক।

আগামী ৬ অক্টোবর সেই আলোচনার পরবর্তী দিন। কিন্তু ২৪ সেপ্টেম্বরের সহিংসতায় চারজনের মৃত্যু, বহু মানুষের আহত হওয়া ও সোনম ওয়াংচুকসহ অনেকের গ্রেপ্তার পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। লেহ্‌তে এখনো কারফিউ চলছে। যদিও কয়েক ঘণ্টার জন্য তা শিথিল করা হচ্ছে।

ল্যাব নেতা থুপস্টান ছেওয়াং ও শেরিং দোরজি এবং কেডিএ নেতা সাজ্জাদ কারগিলি দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন, এত দিন ধরে চলা আন্দোলন একমুহূর্তের জন্যও অশান্ত হয়নি। সোনম ওয়াংচুকের আন্দোলনের শক্তি শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহ, অনশন। তিনিও সব লাদাখির মতোই শান্তিপ্রিয় মানুষ, গান্ধীবাদী। কাজেই ২৪ সেপ্টেম্বর সহিংসতার জন্য কারা প্রকৃত দায়ী, তা জানা দরকার।

এই নেতারা বলেন, আন্দোলনের পেছনে ‘বিদেশি হাত’ থাকার অভিযোগ নিতান্তই দুর্ভাগ্যজনক। লাদাখ অত্যন্ত স্পর্শকাতর এলাকা। এখানকার প্রত্যেক মানুষ দেশপ্রেমিক। লাদাখের দুই দিকে দুই দেশের সীমান্ত। কারগিলের দিকে পাকিস্তান, চীনের দিকে লাদাখের পূর্বাঞ্চল। যুদ্ধের সময় সেনাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লাদাখিরা লড়াই করেছেন। তাঁরা জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ। সেই মানুষদের ‘বিদেশি’ তকমা দেওয়ার অর্থ তাঁদের বিপথচালিত করার চেষ্টা।

সাজ্জাদ কারগিলি বলেছেন, তাঁরা পৃথক রাজ্যের দাবি তুলেছেন বিধানসভা পাবেন বলে। পৃথক রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া সম্ভব না হলে অন্তত বিধানসভা দেওয়া হোক; যাতে গণতান্ত্রিক অধিকার পাওয়া যায়, বর্তমানে তা নেই। যাবতীয় সিদ্ধান্ত ছয় বছর ধরে কেন্দ্রই নিচ্ছে।

লাদাখি নেতারা জানাচ্ছেন, ৩৭০ অনুচ্ছেদ থাকাকালীন তাঁরা অন্যদের অধীন ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের স্বাতন্ত্র্য বজায় ছিল, জনবিন্যাসে পরিবর্তন ঘটেনি। ৩৭০ অনুচ্ছেদ প্রত্যাহার করার পর তাঁরা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মর্যাদা পেলেও স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলছেন। জনজাতি এলাকায় যেকেউ এসে জমি কিনছেন, জনবিন্যাসে পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলছেন। এটা রুখতেই তাঁরা ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত হওয়ার দাবি জানাচ্ছেন।

আন্দোলনকারী নেতারা বলেছেন, ভোটের সময় বিজেপি নিজেই এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অথচ এখন সরকার তা গায়েই মাখতে চাইছে না। লাদাখের জনগণ মনে করছেন, তাঁদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হচ্ছে।

লেহ্‌র সড়কে বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা। অদূরে অগ্নিসংযোগ করা পুলিশের গাড়ি থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে
লেহ্‌র সড়কে বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা। অদূরে অগ্নিসংযোগ করা পুলিশের গাড়ি থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। ছবি: এএফপি

ট্রাম্প কি ব্রিকসের চর হয়ে কাজ করছেন by জিম ও’নিল

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে কাজ করছেন, তখন তাঁর অনেক কাজকর্ম অদ্ভুত ও বিভ্রান্তিকর মনে হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রিকস‍+ নামে যে বড় উদীয়মান অর্থনীতির জোট (যেখানে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং আরও কয়েকটি দেশ আছে), সেটির ব্যাপারে তাঁর আচরণ খুবই অস্বাভাবিক।

ট্রাম্প মুখে বলেন, তিনি চান না এই ব্রিকস‍+ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চলা বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করুক। কিন্তু বাস্তবে তাঁর যেসব কাজকর্ম দেখা যাচ্ছে, তাতে অনেক সময় মনে হয় তিনি যেন উল্টো এই ব্রিকস+ গোষ্ঠীকেই সাহায্য করছেন, যাতে তারা আরও
শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে এবং তাদের বৈশ্বিক লক্ষ্য পূরণ করতে পারে।

এখন যদি ব্রিকস দেশগুলোর সঙ্গে ট্রাম্পের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যায়, তিনি চীন আর রাশিয়ার ব্যাপারে তুলনামূলকভাবে নরম আচরণ করেছেন। অথচ এই দুই দেশই গণতন্ত্রবিহীন রাষ্ট্র এবং তাদের ‘শক্তিশালী’ নেতাদের প্রতি ট্রাম্পের প্রশংসা উপচে পড়ছে।

সত্যি বলতে, তাঁর এ নরম আচরণের কারণ হয়তো অর্থনৈতিকভাবে ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া এড়ানো। যেমন তিনি যখন ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তখন চীনও পাল্টা শুল্ক দিয়েছিল এবং বিরল খনিজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছিল। ফলে মার্কিন শেয়ারবাজার ও ডলারের মান পড়ে গিয়েছিল। এমনকি মার্কিন সরকারি ঋণের সুদহারও বেড়ে গিয়েছিল।

কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে ট্রাম্প এতটা সহনশীল নন, ফলে অদ্ভুত কিছু পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, তিনি সুইজারল্যান্ডের মতো ঐতিহ্যগতভাবে বন্ধুসুলভ দেশের প্রতি অত্যন্ত কঠোর হয়েছেন। অথচ ছোট অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বাণিজ্যঘাটতিতে তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না। এ ধরনের অযৌক্তিক আচরণ শেষ পর্যন্ত অনেক দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে উৎসাহিত করবে।

তারপর আসে রাশিয়ার কথা। ট্রাম্প মাঝেমধ্যে ভ্লাদিমির পুতিনকে হুমকি দেন বা সমালোচনা করেন। কিন্তু বেশির ভাগ সময় তিনি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চান, এমনকি ক্রেমলিনের সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তি করার চেষ্টা করেন।

এর বিপরীতে তিনি ব্রাজিলকে আক্রমণ করেছেন, বিশেষ করে ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিক্রিয়ায় ব্রাজিল সরকারকে এক অর্থে হুমকি দিয়েছেন।

বলসোনারোর বিচার করার জন্য লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় দেশ ব্রাজিলের রপ্তানি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। তবে ব্রাজিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর ততটা নির্ভরশীল নয়। আর যে বাণিজ্যের ওপর তারা নির্ভরশীল, তার বড় অংশই চীনের সঙ্গে। আর চীন তাদের ব্রিকস অংশীদার।

ভারতও ট্রাম্পের কঠিন ব্যবহারের শিকার হয়েছে। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে। অথচ ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর অনেকেই ভেবেছিল, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকায় ভারত খুব দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যচুক্তি করবে। কিন্তু ভারত সব সময় কূটনীতিতে স্বাধীন অবস্থান নিয়েছে। তার ওপর ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কিনছে। এটি ট্রাম্পকে হতাশ করেছে। কারণ, তিনি ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে চাইছিলেন।

কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতকে দূরে ঠেলে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই চীনকে ঠেকাতে চায়, তবে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা দরকার। সম্প্রতি ট্রাম্প একজন শীর্ষ পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎ করেছেন। এতে ভারত হয়তো চীনের প্রস্তাবগুলোর প্রতি আরও ইতিবাচক হতে পারে। এ মাসেই মোদি সাত বছর পর প্রথমবারের মতো চীন সফর করছেন।

আগেও আমি যুক্তি দিয়েছি, যদি চীন ও ভারত তাদের পার্থক্য ভুলে একসঙ্গে কাজ করতে পারে এবং আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে, তাহলে তা ব্রিকস‍+ এর জন্য বিশাল পরিবর্তন বয়ে আনবে। শুধু তা–ই নয়, এটি এশিয়া, এমনকি বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাবে। আরও বেশি দেশ এশিয়ার দুই মহাশক্তি চীন ও ভারতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।

এখানে সাম্প্রতিক কানাডার জি–৭ সম্মেলনের কথা মনে করা দরকার। সেখানে ট্রাম্প বলেছিলেন, ২০১৪ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর রাশিয়াকে এই গ্রুপ থেকে বাদ দেওয়া একটা ভুল ছিল এবং এসব বৈঠকে চীনকেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

ওই সময় আমি বলেছিলাম, ট্রাম্পের এ মন্তব্য যথেষ্ট যৌক্তিক। আমার ২০০১ সালের মূল ব্রিক (বিআরআইসি) প্রবন্ধেও আমি একই কথা বলেছিলাম। আমি বলেছিলাম, তখনকার জি-৮-এ (যেখানে রাশিয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল) চীন, ব্রাজিল ও ভারতকেও নেওয়া উচিত ছিল। আর ইউরোপীয় অংশকে একীভূত করে শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নকে রাখা উচিত ছিল (ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালিকে আলাদা না রেখে)।

আজও আমি এ পরিবর্তনকে স্বাগত জানাব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, ট্রাম্প এখন উল্টোটা করছেন। তিনি চীন ও রাশিয়ার প্রতি নরম মনোভাব দেখাচ্ছেন, অথচ ব্রাজিল, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জি-৭ মিত্রদেরও দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। এতে ব্রিকস‍+ ও অন্যদের মধ্যে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিকল্প খুঁজে বের করার তাগিদ তৈরি হচ্ছে।

আজকের বিশ্বে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে একটি উন্নত জি-২০, যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি ও নতুন উদীয়মান শক্তিগুলোকে জায়গা দেওয়া হবে। ঘটনাচক্রে, যুক্তরাষ্ট্র ২০২৬ সালে জি–২০ আয়োজন করবে। সেটি হবে ট্রাম্পের জন্য বৈশ্বিক নেতৃত্ব দেখানোর এক অসাধারণ সুযোগ। তবে তিনি আদৌ তা করতে পারবেন কি না, সেটি অন্য প্রশ্ন।

* জিম ও’নিল, যুক্তরাজ্যের সাবেক অর্থমন্ত্রী ও গোল্ডম্যান স্যাক্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট নামের বড় একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবেক চেয়ারম্যান
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-22%2Fkvidbqmz%2FtrumpxichinCopy.jpg?rect=0%2C0%2C800%2C533&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সাত বছর পর এ মাসের শেষে চীন সফরে যাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি। ছবি: রয়টার্স

ইন্দোনেশিয়ায় স্কুলের ভবন ধস, ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ৯১ শিক্ষার্থী

ভবন ধসে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সাক্ষি হলো ইন্দোনেশিয়া। দেশটির একটি ইসলামিক স্কুলের ভবন ধসে পড়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছে ৯১ জন শিক্ষার্থী। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার দুইদিন পরও তাদের উদ্ধারে হিমশিম খাচ্ছে উদ্ধারকর্মীরা। স্কুলের উপস্থিতি নথি পর্যালোচনা করে নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।

এতে বলা হয়, জাভা প্রদেশে অবস্থিত শতবর্ষ পুরোনো আল খোঁজিনি ইসলামিক বোর্ডিং স্কুলের একটি প্রার্থনা হল ভেঙে পড়লে ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। ভবনটি যখন ধসে পড়ে তখন কিশোর বয়সী শত শত ছেলে শিক্ষার্থী সেখানে দুপুরের নামাজ পড়ছিল। জানা গেছে, ভবনটিতে অনুমোদনহীন সম্প্রসারণের কাজ চলছিল।

উদ্ধার কাজে যুক্ত হয়েছেন তিন শতাধিক উদ্ধারকর্মী। তারা মরিয়া হয়ে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের উদ্ধারের কাজ করছেন। এই ঘটনায় এ পর্যন্ত কমপক্ষে তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং শতাধিক আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকের মাথায় আঘাত পেয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা মঙ্গলবার রাতে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষের সংখ্যা ৩৮ থেকে সংশোধন করে ৯১ জন বলে জানিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, কমপক্ষে ছয়জন শিশু এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত আছে, তবে কংক্রিটের স্ল্যাব এবং ভবনের অন্যান্য ভারী ও নাজুক অংশের কারণে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে। ভারী সরঞ্জাম প্রস্তুত থাকলেও সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কারণ তাতে আরও ধস সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

উদ্ধারকর্মীরা সংকীর্ণ ফাঁক দিয়ে এখনো আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের কাছে অক্সিজেন, পানি এবং খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন যাতে তারা বেঁচে থাকতে পারে। আটকে পড়া শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগই দ্বাদশ থেকে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। যাদের বয়স ১২ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রার্থনা হলটি আগে দুই তলা ছিল, কিন্তু অনুমতি ছাড়াই আরও দুটি তলা যোগ করা হচ্ছিল। পুলিশের মতে, সম্ভবত পুরাতন ভবনের ভিত্তি আরও দুটি ফ্লোরের ভার বহন করতে পারেনি এবং কংক্রিট ঢালার সময় এটি ধসে পড়ে।

mzamin