Monday, May 1, 2017

পার্বত্য এলাকায় নিখোঁজ তরুণরা গভীর জঙ্গলে by কাজী সোহাগ

একটি ছোট্ট ঘটনা পাল্টে দেয় এক চাকমা যুবকের জীবন। ২০১৩ সালে কর্ণফুলী কলেজে ভর্তি হয়। ক’দিন পরই বন্ধুদের সঙ্গে মারামারি করে। তারপর রাজনৈতিক প্যাঁচে পড়ে মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। পুলিশ খোঁজা শুরু করে। কলেজ থেকে পালায় সে। ভয়ে বাড়ির কাউকে ঘটনাটি জানায়নি। আশ্রয় পায় একই গোত্রের এক বড় ভাইয়ের কাছে। তার পরামর্শে কলেজ ও এলাকা ছেড়ে পাড়ি জমায় পাহাড়ের দুর্গম জঙ্গলে। অস্ত্র তুলে নেয় হাতে। বিনিময়ে মাসে ১০ হাজার টাকা আয় শুরু হয় তার। তিন পার্বত্য জেলায় এ ঘটনা শুধু ওই যুবকেরই নয়। এরকম শত শত যুবক রয়েছে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে। গত কয়েক বছরে প্রায় ৯শ’ জন উপজাতি এলাকা ছাড়া হয়েছেন। পারিবারিক বিরোধ, আর্থিক দুর্বলতা, প্রেমঘটিত বিষয়সহ নানা কারণে ব্ল্যাকমেইলের শিকার হচ্ছেন ওইসব তরুণরা। এসব কারণে যারা বিধ্বস্ত তাদের ধরতে ওত পেতে থাকেন পার্বত্য অঞ্চলে সক্রিয় সশস্ত্র গ্রুপের সদস্যরা। দুর্গম পাহাড়ের পাশাপাশি অনেককে পাঠানো হচ্ছে দেশের বাইরে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়াসহ আরো কয়েকটি দেশে। পড়াশোনার জন্য তাদের পাঠিয়ে সেখানে সংগঠনের জন্য গড়ে তোলা হয় কমিউনিটি। বছরে একবার বা দুইবার তারা দেশে আসে বিপুল অঙ্কের ফান্ড নিয়ে। সশস্ত্র দলকে চালাতে ব্যবহার হয় ওই ফান্ডের টাকা। তিন পার্বত্য জেলার দুর্গম পাহাড়ে সম্প্রতি এ ধরনের তৎপরতা শুরু করেছে ৭ সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন। এগুলো হচ্ছে- আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (এআরএসও), ন্যাশনাল ইউনাইটেড পার্টি অব আরাকান (এনইউএ), আরাকান লিবারেশন পার্টি (এএলপি), পিপলস পার্টি অব আরাকান (পিপিএ), আরাকান আর্মি (এএ), আরাকান রোহিঙ্গা ইসলামী ফ্রন্ট (এআরআইএফ), ডেমোক্রেটিক পার্টি অব আরাকান (ডিপিএ)। সম্প্রতি এ তালিকায় নতুন করে যোগ হয়েছে ধর্মীয় উগ্রপন্থি সংগঠন ৯৬৯। এসব সংগঠনের ভাণ্ডারে রয়েছে হালকা থেকে ভারী অস্ত্রের বিশাল মজুত। এদিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে আগ্রহী সেই চাকমা যুবক বর্তমানে রাঙ্গামাটিতে এক দুর্গম স্থানে নিজেকে গৃহবন্দি করে রেখেছেন। সম্প্রতি মানবজমিনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে প্রথমে আমাকে ঘরছাড়া করা হয়। এরপর ব্ল্যাকমেইল করে দলে ভেড়ানো হয়।  পরে দুর্গম পাহাড়ের জঙ্গলে নিয়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তার সঙ্গে ১৫১ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। চলতি বছর ১১শ’ জনকে অস্ত্র প্রশিক্ষণের টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। মূলত রণকৌশল, অস্ত্র চালনা, সমাজ-বিজ্ঞান ও শারীরিক চর্চা করানো হয় ট্রেনিংগুলোতে। তিনি বলেন, প্রথমে রাঙ্গামাটির মানিকছড়িতে তাকে নেয়া হয়। সেখানে পড়াশোনার সব সার্টিফিকেটসহ কাগজপত্র কেড়ে নেয়া হয়। ভবিষ্যতে যেনো কখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে না পারি সে পথ বন্ধ করতে এ কাজ করা হয়। এরপর তাকে পাঠানো হয় বান্দরবানের গভীর জঙ্গলে। সেখানে টানা সাড়ে চার মাস প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে সে হ্যান্ড গ্রেনেড ছোড়া, জি-থ্রি চালানো, রকেট লাঞ্চার ছোড়া, নাইন এমএম পিস্তল চালানোসহ মাইন পাতা ও তা বিস্ফোরণের প্রশিক্ষণ কোর্স শেষ করে। এছাড়া মাও সেতুং-এর বই পড়ানো হতো নিয়মিত। তিনি জানান, মূলত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযানের জন্য তাদের প্রস্তুত করা হয়। তিন পার্বত্য জেলা নিয়ে জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টিকে উৎসাহ হিসেবে নিতে বলা হয়। একই গ্রুপের আরেক সদস্য মানবজমিনকে জানান, প্রশিক্ষণের জন্য অস্ত্রের কোনো ঘাটতি নেই। নতুন আর চকচকে অস্ত্র দিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। গভীর জঙ্গলে গিয়ে যদি কেউ প্রশিক্ষণ নিতে অস্বীকার করে তাহলে তাকে বিচারের মাধ্যমে গুলি বা জবাই করে হত্যা করা হয়। লাশ ফেলে রাখা হয় জঙ্গলে। এরকম বহু উপজাতিকে জীবন দিতে হয়েছে। কিন্তু এগুলোর হিসাব কারও কাছে নেই। পরিবার থেকে তারা নিখোঁজ হলেও পার্বত্য জেলার থানাগুলোতে এ নিয়ে পরিবারের কোনো সদস্য জিডি বা মৌখিক অভিযোগ করেন না। এ ধরনের উদ্যোগ নিলে ওই পরিবারের ওপর নানা নিপীড়ন চালানো হয়। তাই নিখোঁজ মানেই ‘সশস্ত্র গ্রুপে’ যোগ দেয়া-বিষয়টি এমন স্বাভাবিকতা পেয়েছে। তিন পার্বত্য জেলা নিয়ে কাজ করা গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, দলীয় কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি তাদের দিয়ে অস্ত্র আনা-নেয়ার কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে প্রায় নিয়মিত এসব অতাধুনিক অস্ত্র উদ্ধার করা হচ্ছে তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে। মানের দিক দিয়ে এসব অস্ত্র যেমন অত্যাধুনিক তেমনি দামের দিক দিয়েও ব্যয়বহুল। স্থানীয় গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, পাহাড়িদের হাত ঘুরে এসব অস্ত্র এখন পৌঁছে যাচ্ছে দেশে সক্রিয় বিভিন্ন জঙ্গিদের হাতে। ব্যবহার হচ্ছে দেশবিরোধী সন্ত্রাসী কাজে। আটক জঙ্গিরা পাহাড় থেকে অস্ত্র সংগ্রহের বিষয়টি এরইমধ্যে স্বীকার করেছে।

সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আইন বাতিলে সুপ্রিম কোর্ট পিছপা হবে না



প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, সংবিধান সুপ্রিম কোর্টকে জুডিশিয়াল রিভিউ করার ক্ষমতা দিয়েছে। সংবিধানের ৫ম, ৭ম, ৮ম ও ১৩তম সংশোধনী সংবিধানের মূল স্তম্ভের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় তা বাতিল করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ভবিষ্যতেও যদি এ ধরনের কোনো বিধান বা আইন হয় এবং তা যদি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় তা বাতিলে পিছপা হবে না সুপ্রিম কোর্ট। সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে এখানে কোনো দ্বি-মত নেই। গতকাল রোববার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ভূমি আইন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও প্রথম ব্যাচের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি এসব কথা বলেন। প্রধান বিচারপতি বলেন, আমাদের সংবিধানে আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগের কথা বলা হয়েছে। একটি বিভাগ আরেকটি বিভাগের উপর প্রাধান্য বজায় না করে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন সেজন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই। কারণ এটাই হলো সংবিধানের নীতি। এটাই হওয়া উচিত। কিন্তু পরিপূরক হিসেবে কিভাবে কাজ করব প্রশ্নটা সেখানে? তিনি বলেন, সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ক্ষমতার  উৎস জনগণ। প্রশ্ন হচ্ছে যদি কোনো আইন অন্য প্রচলিত আইনের পরিপন্থি হয় সেটি বেআইনি হয়ে যাবে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর প্রণীত সংবিধানে আইনের শাসন ও জুডিশিয়াল রিভিউ করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। আর এই জুডিশিয়াল রিভিউর একমাত্র ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের। এখন যদি একটি আইন আরেকটি আইনের পরিপন্থি হয় সেটি অবৈধ ঘোষণা করবে সুপ্রিম কোর্ট।
প্রধান বিচারপতি বলেন, জাতীয় সংসদের দুই তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্য ঐকমত্য হলেই সংবিধান সংশোধন করতে পারেন। শুধু দুই-তৃতীয়াংশ নয় সকল সংসদ সদস্যরা সংবিধানকে স্ক্র্যাপ (বাতিল) করতে পারেন সেই ক্ষমতা আছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট যদি দেখে এতে সংবিধানের মূল ভিত্তি নষ্ট হয়ে গেছে, আইনের শাসনের প্রতি আঘাত এসেছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে জনগণের ফান্ডামেন্টাল রাইটস যেসব অধিকার রয়েছে, তাহলে আমরা ততটুকু বেআইনি বলে দেব।
প্রধান বিচারপতি বলেন, একটি দেশের উন্নয়নের মাত্রা যদি শুধু টাকা দিয়ে নির্ণয় করা হতো তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই সেই স্বীকৃতি পেতো। তবে এর পূর্ব শর্ত হলো আইনের শাসন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকার এবং জনগণকে আইন মেনে চলতে হবে। আমি আইন মানবো না, আরেক জনকে বলবো তুমি আইন মেনে চলো এটা একতরফা হয়ে যায়। পুলিশকেও আইন মানতে হবে। প্রতি পদে পদে আইনের শাসন মেনে চলতে হবে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রী হোক যদি আইন অমান্য করে তাহলে পুলিশের ক্ষমতা থাকবে জরিমানা করার। যদি এই জরিমানা করার পর ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে তিরস্কার বা আইজিপির কাছে নালিশ করি বা আদালত অবমাননার রুল জারি করি তাহলে তার চাকরি চলে যাবে। জন মেজর নিজে গাড়ি চালিয়ে গিয়ে কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যালারিতে বসে খেলা দেখছে- এটাই হবে আইনের শাসন। এজন্য আমাদের অনেক কিছুতেই পরিবর্তন আনতে হবে। সংস্কার করতে হবে আইনের।
তিনি বলেন, আজকে বলা হচ্ছে দেশে ডিজিটালাইজেশন করা হবে। এটা ছাড়া কোনোভাবেই উন্নয়ন হবে না। কিন্তু আমরা ডিজিটালাইজেশনের অর্থ জানি না। এভিডেন্স অ্যাক্টে ডিজিটালাইজেশনের সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা নেই। প্রধান বিচারপতি বলেন, আমেরিকার সিনেটের ৯০ ভাগ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৮০ ভাগ সদস্যই ল’ ব্যাকগ্রাউন্ডের। বৃটেনের অধিকাংশ প্রধানমন্ত্রী একই পেশার। আপনি যত ক্ষমতাধরই হোন না কেন যেমন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভিবাসী ইস্যুতে এত হুমকি-ধামকি দিলো, তাকে সারা বিশ্বের প্রেসিডেন্ট বলা হয়। এরা আকার ইঙ্গিতে যা বলে সেগুলো আমরা মেনে চলি। সে দেশে কেউ অপরাধ করলে পালিয়ে গেলে অন্য দেশ থেকে ধরে নিয়ে যায়। এত ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্টের অভিবাসী ইস্যুতে জারি করা আদেশ স্থগিত করে দিয়েছেন একজন বিচারক। আইনের শাসন হলো সেটাই। এজন্য আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে হবে। যত ক্ষমতাধরই হোন না কেন টুঁ-শব্দ করেন না।
প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা যখন কোনো রায় দেই তাতে অনেক সময় প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়।  তখন কষ্ট লাগে। এটা কিন্তু সংবিধান না মানারই শামিল। আমরা কোনোমতেই নিজেদের সভ্য হিসেবে দাবি করতে পারবো না যতদিন পর্যন্ত সংবিধান ও আইনের শাসন না মেনে চলি। এমনকি সিদ্ধান্ত আমার বিরুদ্ধে গেলেও আমি মাথা পেতে নেব।
তিনি বলেন, সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। এর অভিভাবক সুপ্রিম কোর্ট। সুপ্রিম কোর্ট যে ব্যাখ্যা দেবে সেটা মানতে হবে। সংবিধানই সুপ্রিম কোর্টকে এই ক্ষমতা দিয়েছে। তিনি বলেন, সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে সুপ্রিম কোর্ট সময়ে সময়ে যে নির্দেশনা দিয়ে থাকে এটা মেনে চলতে হবে। তখনই আমরা নিজেদেরকে পৃথিবীর বুকে সভ্য দেশ হিসেবে দাবি করতে পারবো। ভূমি আইন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান রিচার্ডসনের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে ভিসি অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান, ট্রেজারার অধ্যাপক মো. সেলিম ভূঁইয়া এবং আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সরকার আলী আককাস উপস্থিত ছিলেন।