Wednesday, October 28, 2009

দোদি ফায়েদের বাবা স্কটল্যান্ডের প্রথম প্রেসিডেন্ট হতে চান

ব্রিটেনের প্রয়াত প্রিন্সেস ডায়ানার প্রেমিক দোদি ফায়েদের বাবা মোহাম্মদ আল-ফায়েদ বলেছেন, তিনি চান আগামী বছরের গণভোটে স্কটল্যান্ডের জনগণ নিজেদের যুক্তরাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করুক। আর তিনিই হবেন স্কটল্যান্ডের প্রথম প্রেসিডেন্ট।
মিসরীয় বংশোদ্ভূত এই কোটিপতি ব্যবসায়ী বলেন, স্কটিশদের সঙ্গে দারুণ ঐক্য অনুভব করেন তিনি। দ্য সানডে টাইমস পত্রিকা এ কথা জানায়।
৮০ বছর বয়সী মোহাম্মদ আল-ফায়েদ ওই পত্রিকাকে বলেন, ‘স্বাধীনতা অর্জনের জন্য স্কটল্যান্ডের যে সহায়তারই প্রয়োজন হবে, আমি সেটা দেব। তোমরা স্কটরা যখন স্বাধীনতা অর্জন করবে, তখন আমি তোমাদের প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য প্রস্তুত। আমি ৪০ বছর ধরে ইংল্যান্ডে বসবাস করছি। কিন্তু এখন আমি স্কটল্যান্ডে থাকতে চাই।’
পরিকল্পিত গণভোটে স্কটল্যান্ড যদি ব্রিটেন থেকে আলাদা হয়ে যায়, তাহলে তাঁকে স্কটল্যান্ডের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মোহাম্মদ আল-ফায়েদ বলেন, ‘তোমরা স্কটরা দীর্ঘকাল ধরে অচেতন অবস্থায় ছিলে। এখন সময় হয়েছে জেগে ওঠার এবং ইংরেজ ও তাঁদের ভয়ঙ্কর রাজনীতিকদের কাছ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করার।’
আল-ফায়েদের অভিযোগ, ব্রিটিশ সরকার দোদি ও ডায়ানাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল। ১৯৯৭ সালে প্যারিসে এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন প্রিন্সেস অব ওয়েলস ডায়ানা ও তাঁর প্রেমিক দোদি ফায়েদ।

সিআইএর পক্ষে ভাইদের বিরুদ্ধে কাজ করেছি

কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল কাস্ত্রো ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর ছোট বোন হুয়ানিতা কাস্ত্রো বলেছেন, তিনি ১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে নির্বাসনে যাওয়ার আগে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা—সিআইএতে নিজের দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। হুয়ানিতা গত রোববার স্পেনিশ ভাষার এক টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে চাঞ্চল্যকর এ তথ্য দিয়েছেন। খবর রয়টার্স অনলাইনের।
ফিদেল কাস্ত্রো (৮৩) ও রাউল কাস্ত্রো (৭৮) সম্পর্কে স্মৃতিচারণা করে একটি বই লিখেছেন ৭৬ বছর বয়সী হুয়ানিতা। বইটির প্রকাশনা উপলক্ষে স্পেনিশ ভাষার টেলিভিশন ‘ইউনিভিশন নোতিসিয়াস-২৩’কে দেওয়া সাক্ষাত্কারে হুয়ানিতা এসব তথ্য দিয়েছেন। হুয়ানিতা বলেন, চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দুই ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা নেই।
বইটি গতকাল সোমবারই প্রকাশিত হওয়ার কথা। মেক্সিকোর সাংবাদিক মারিয়া আন্তোনিয়েতা কলিন্সের সঙ্গে যৌথভাবে লেখা ওই বইয়ের নাম ফিদেল অ্যান্ড রাউল, মাই ব্রাদারস, দ্য সিক্রেট হিস্ট্রি।
ফিদেলের সমালোচক হুয়ানিতা বলেন, ১৯৫৯ সালে বিপ্লবের শুরুর দিকে স্বৈরশাসক বাতিস্তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার সময় তিনি তাঁর ভাই ফিদেলকে সহায়তা করেছিলেন। তবে ফিদেল কিউবার ক্ষমতায় বসে বিরোধীদের যেভাবে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন এবং দেশকে ধীরে ধীরে সমাজতন্ত্রের দিকে নিয়ে গেছেন, তিনি সে বিষয়গুলো সমর্থন করতে পারেননি। চারপাশে এ রকম অন্যায়-অবিচার দেখতে দেখতে একপর্যায়ে তাঁর মোহমুক্তি ঘটে।
মিয়ামি-প্রবাসী হুয়ানিতা আরও বলেন, ‘ফিদেল সরকারের বিরোধী অনেক নির্যাতিত লোককে আমি ওই সময় হাভানায় আমার বাড়িতে আশ্রয় ও সহায়তা দিয়েছিলাম। এভাবে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়ানোর কারণে কিউবায় আমার অবস্থান করা কঠিন হয়ে পড়ে।’
স্মৃতিচারণা করে হুয়ানিতা বলেন, ‘ওই সময় একদিন এক ব্যক্তি আমার কাছে সিআইএর সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব নিয়ে আসে। ওই ব্যক্তি ছিল ফিদেল ও আমার খুবই ঘনিষ্ঠ। তারা (সিআইএ) আমার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে চায়। কারণ, তাদের তখন অনেক কিছুই বলা ও জানার দরকার ছিল। যেমন, আমি ওই ঝুঁকি নিতে রাজি কি না। আমিও তাদের কথা শোনার জন্য তৈরি ছিলাম। যদিও প্রথম দিকে ভড়কে গিয়েছিলাম। তার পরও তাদের প্রস্তাবে আমি রাজি হয়ে যাই। এভাবে ফিদেলের চিরশত্রু সিআইএর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক তৈরি হয় আমার।’

অস্ট্রেলিয়ায় বর্ণবাদী হামলার শিকার শিখ যুবক

অস্ট্রেলিয়ায় এবার এক ভারতীয় শিখ যুবক বর্ণবাদী হামলার শিকার হয়েছেন। গত রোববার মেলবোর্নের একটি বাসস্ট্যান্ডে ঘুমন্ত অবস্থায় ২২ বছর বয়সী ওই যুবককে পিটিয়েছে একদল তরুণ। তারা তাঁর পাগড়ি খুলে ফেলে। খবর পিটিআইর।
দ্য অ্যাজ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইপিং রেলস্টেশনের কাছে কপার স্ট্রিট এলাকায় একটি বাসস্ট্যান্ডে গত রোববার স্থানীয় সময় রাত পৌনে একটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পাঁচজনের একটি দল ওই শিখ যুবকের ওপর চড়াও হয়।

নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে বিড়ম্বনার শিকার হলেন শহিদ কাপুর

শাহরুখ খানের পর এবার যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরে হয়রানির শিকার হলেন আরেক বলিউড তারকা শহিদ কাপুর। তাঁর সফরসঙ্গী স্পটবয় মঞ্জুর আলমের নামের আগে ‘মোহাম্মদ’ শব্দটি থাকার কারণে নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে তাঁকে প্রায় দেড় ঘন্টাব্যাপী জিজ্ঞাসাবাদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। এ সময় অভিনেতা শহিদ কাপুরও আটকা পড়েন।
বলিউডে ‘মামু’ নামে পরিচিত মঞ্জুর আলম শহিদ কাপুরের ছোটবেলা থেকেই তাঁর দেখাশোনার দায়িত্বে আছেন। তিনি বর্তমানে শহিদ কাপুরের সার্বক্ষণিক সঙ্গী এবং এই অভিনেতার যাবতীয় পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারও মঞ্জুর দেখেন। নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই শেষ করেন শহিদ কাপুর। সমস্যা সৃষ্টি হয় তাঁর সফরসঙ্গী মঞ্জুর আলমকে নিয়ে। তাঁদেরকে জানানো হয় মঞ্জুর আলমের নামের আগে মোহাম্মদ থাকায় তাঁর নামের আলাদা ছাড়পত্র প্রয়োজন। এ সময় নিউইয়র্কের ইমিগ্রেশন পুলিশ মঞ্জুরকে একটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। ইংরেজিতে পারদর্শিতা না থাকায় জিজ্ঞাসাবাদের পুরো সময় মঞ্জুর আলমের দোভাষীর ভুমিকা পালন করেন শহিদ কাপুর। বিদেশের মাটিতে এই বিড়ম্বনার মুহূর্তে তিনি যেন নিজেকে একা মনে না করেন সেদিকে শহিদ সচেষ্ট ছিলেন।
শহিদ কাপুরের সঙ্গে এর আগে অনেকবার বিদেশ সফর করলেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবারের মতো গেয়েই এ রকম বিড়ম্বনার মুখে পড়লেন মঞ্জুর। শহিদ কাপুর বর্তমানে আদিত্য চোপরার একটি ছবির কাজে যুক্তরাষ্ট্র রয়েছেন।

পাকিস্তানের কিছু স্কুল খুলেছে

ছয় দিন বন্ধ থাকার পর পাকিস্তানের বেশ কিছু স্কুল গতকাল সোমবার আবার খুলেছে। রাজধানী ইসলামাবাদে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বোমা হামলার পর দেশটির সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আতিকুর রেহমান জানান, কেন্দ্রীয় শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন ৪১৭টি স্কুল গতকাল আবারও খোলা হয়েছে। স্কুল চলাকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশের অধিকাংশ স্কুল খুলেছে। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আগামী ২ নভেম্বর খুলবে।
বেলুচিস্তান প্রদেশের শিক্ষামন্ত্রীকে গত রোববার অজ্ঞাত পরিচয় বন্দুকধারীরা গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনায় প্রদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আরও তিন দিন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইসলামাবাদের অধিকাংশ বেসরকারি স্কুল গতকাল খুলেনি। স্কুলগুলো আরও অন্তত এক সপ্তাহ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
দেশটির দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে তালেবান জঙ্গিদের নির্মূল করতে সেনা অভিযান চলছে। জঙ্গিরা এই অভিযানের প্রতিবাদে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রাশিয়া-চীন-ভারত ত্রিপক্ষীয় বৈঠক আজ

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বেঙ্গালুরুয় আজ মঙ্গলবার রাশিয়া, চীন ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হবে। ত্রিপক্ষীয় এ বৈঠকে যোগ দিতে বেঙ্গালুরু পৌঁছেছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ও চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়াং জাইচি। এ বৈঠকে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, সন্ত্রাসবাদ, পাক-আফগান পরিস্থিতি ও জাতিসংঘের সংস্কারের বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে। এ ছাড়া বাণিজ্য ও শিল্প খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলোচনা করবেন। বৈঠক শেষে একটি যৌথ ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁদের।
এদিকে এ বৈঠকের পার্শ্ববৈঠক হিসেবে চীন ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও অনুষ্ঠিত হবে। ওই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্কের বিষয়গুলোই গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণা ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়াং জাইচি ওই বৈঠকে অংশ নেবেন।
গত রোববার এস এম কৃষ্ণা সাংবাদিকদের বলেন, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায় শুরু করার আশা করছেন তাঁরা।

দক্ষিণ কোরিয়ায় অর্থ আত্মসাতের মামলায় এক বিজ্ঞানী দোষী সাব্যস্ত

গবেষণার অর্থ আত্মসাত্ করার মামলায় হোয়াং উ-সুক (৫৬) নামের একজন বিজ্ঞানীকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার একটি আদালত। গতকাল সোমবার এই অপরাধের জন্য ওই বিজ্ঞানীকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তা তিন বছরের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়, হোয়াং জানতেন তাঁর গবেষণা দলের সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তগুলো যথাযথ ছিল না। তবে এক ব্যক্তির দাখিল করা আরেকটি প্রতারণার অভিযোগ থেকে হোয়াংকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। হোয়াংয়ের গবেষণায় ওই ব্যক্তিও অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন।
তিন বছর বিচার চলার পর আদালত এই রায় ঘোষণা করেন। ২০০৬ সালের জুনে হোয়াংয়ের বিরুদ্ধে এই মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০৪ সালে মার্কিন বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্স-এ প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে হোয়াং দাবি করেন, ক্লোন করা একটি মানব ভ্রূণ থেকে বিশ্বের প্রথম ‘স্টেম সেল লাইন’ (একই গোত্রের এক গুচ্ছ স্টেম সেল) সৃষ্টি করেছেন তিনি। পরের বছরই একই সাময়িকীতে তিনি জানান, তাঁর দল নতুন স্টেম সেল লাইনস সৃষ্টি করেছে। তাঁদের এই দাবি থেকে বিজ্ঞানীরা আশান্বিত হয়েছিলেন, এই উদ্ভাবনের মাধ্যমে ক্যানসার, বহুমূত্র ও পারকিনসনসের মতো রোগের চিকিত্সা পদ্ধতি আবিষ্কার করা সম্ভব। এ জন্য হোয়াংকে পুরস্কৃতও করা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় তাঁকে ‘সুপ্রিম সায়েন্টিস্ট’ উপাধি দেওয়া হয়।
তবে ২০০৫ সালের নভেম্বরে অভিযোগ ওঠে, হোয়াং ও তাঁর গবেষণা দল কোনো ধরনের স্টেম সেল আবিষ্কার করেনি। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর হোয়াং ক্ষমা চান। কিন্তু পরে দক্ষিণ কোরিয়ার স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল নেটওয়ার্ক এমবিসি সংবাদ প্রকাশ করে, হোয়াংয়ের পুরো গবেষণাটিই ছিল এক ধরনের জালিয়াতি। এ ঘটনায় ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে সাউথ কোরিয়া ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (এসএনইউ) এক তদন্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়, হোয়াংয়ের গবেষণা দলের প্রাপ্ত ফলাফল পুরোপুরি ভ্রান্ত ও প্রতারণামূলক। তাঁরা কোনো স্টেম সেল তৈরি করেননি।

মাওবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযানে অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত- সাক্ষাত্কারে অরুন্ধতী রায়

বুকার পুরস্কার পাওয়া বিখ্যাত ভারতীয় কথাসাহিত্যিক অরুন্ধতী রায় অভিযোগ করেছেন, অর্থনৈতিক স্বার্থদ্বন্দ্বের কারণেই ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে মাওবাদীদের সঙ্গে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ চলছে। তিনি এই অর্থনৈতিক স্বার্থদ্বন্দ্বের জন্য ভারত সরকারকে দায়ী করে বলেন, খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ রাজ্যগুলোতেই মাওবাদীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ চলছে। মাওবাদীদের দমনের নামে এই রাজ্যগুলোতে যে নিরাপত্তা অভিযান চলছে, তার পেছনে আছে খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ রাজ্যগুলো সামরিকীকরণের হীন উদ্দেশ্য। এই রাজ্যগুলোতে ‘যুদ্ধ’ সরকারেরই সৃষ্টি। তিনি আরও বলেন, যেকোনো যুদ্ধে প্রয়োজন একটি শত্রুপক্ষ। সরকার মাওবাদীদের শত্রুপক্ষ বানিয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য এই ‘যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা’য় মেতে উঠেছে। গত রোববার ভারতের একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে অরুন্ধতী এসব কথা বলেন।
মাওবাদীদের সঙ্গে সরকারের আলোচনার ব্যাপারে অরুন্ধতী রায় বলেন, ‘সরকারের উচিত মাওবাদীদের সঙ্গে শর্তহীন আলোচনার আয়োজন করা।’
তিনি বলেন, মাওবাদীরা একদিনে তৈরি হয়নি। কেউ যখন প্রশাসনের মদদে চূড়ান্ত নির্যাতনের শিকার হন, সামাজিক নিপীড়নে তাঁর পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন তাঁর হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। মাওবাদীরা তো এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে। দ্য হিন্দু অনলাইন|

ইরাকে বোমা হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ওবামা

ইরাকে গত রোববারের ভয়াবহ দুটি আত্মঘাতী গাড়িবোমা হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ইরাকে গত দুই বছরের বেশি সময়ের মধ্যে এই হামলাকে তিনি ‘ঘৃণ্য ও ধ্বংসাত্মক’ বলে উল্লেখ করেন। ওই হামলায় ১৫৫ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে প্রায় ৬০০ জন।
প্রেসিডেন্ট ওবামা এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমি ইরাকের জনগণের ওপর এই জঘন্য হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। যাঁরা এ ঘটনায় তাঁদের নিকটজনদের হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছি।’
কানাডাও এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেন, এই নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ হামলার ঘটনায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। তবে আমরা বিশ্বাস করি এ ধরণের হামলা ইরাকি জনগণকে দুর্বল করে দেবেনা।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী নুরি আল মালিকি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এ ঘটনার জন্য আল-কায়েদা এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সমর্থকদের দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, এ ধরনের সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী হামলা ইরাকি জনগণকে আল-কায়েদাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে চলমান লড়াই থেকে সরিয়ে নিতে পারবে না।
গত রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুটি ভয়াবহ আত্মঘাতী গাড়িবোমা হামলা চালানো হয়। এতে আশপাশের অনেক গাড়ি ধ্বংস হয়। এ ছাড়া ভবন ও রাস্তার নিচে অবস্থিত পানির পাইপ ধ্বংস হয়ে যায়। এতে রাস্তা পানিতে তলিয়ে যায়।
বাগদাদের বিচার ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ব্যস্ত মোড়ে প্রথম হামলা চালানো হয়। যে গাড়িতে করে হামলা চালানো হয়, সেটি রাস্তার মধ্যে পার্কিং করা ছিল। দ্বিতীয় হামলাটি ঘটে বাগদাদের বাইরে সালিয়েহ এলাকায় প্রাদেশিক সরকারের কার্যালয়ের ভবনে। এতে আশপাশের বেশ কয়েকটি ভবনও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ১২ জন বিচার ও শ্রম মন্ত্রণালয় ও বাগদাদের প্রাদেশিক সরকারের কর্মী।

সেরা করপোরেট প্রতিষ্ঠান পুরস্কার ঘোষণা করল আইসিএমএবি

দেশের করপোরেট তথা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের কার্যক্রম ও প্রকাশিত প্রতিবেদনসমূহ তথ্যসমৃদ্ধ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে আইসিএমএ বাংলাদেশ ‘বেস্ট করপোরেট পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড ২০০৮’ দিয়েছে।
আইসিএমএবি ২০০৭ সালে এ পুরস্কার চালু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালের জন্য আইসিএমএ বাংলাদেশ চারটি খাতে, যথা—ব্যাংকিং, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা ও ওষুধশিল্প-প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এ পুরস্কার দেয়।
জাতীয় সংসদের স্পিকার মো. আবদুল হামিদ সম্প্রতি প্রধান অতিথি হিসেবে এবারের বিজয়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ ফারুক খান। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন আইসিএমএবির প্রেসিডেন্ট এ বি এম সামছুদ্দিন, সাবেক প্রেসিডেন্ট এ কে এম দেলোয়ার হোসেন, পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান মো. আবদুর রশিদ ও সেক্রেটারি মো. জসিম উদ্দিন আকন্দ।
এবার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং ক্যাটাগরিতে সোনালী ব্যাংক লি. প্রথম, জনতা ব্যাংক লি. দ্বিতীয় ও অগ্রণী ব্যাংক লি. তৃতীয় পুরস্কার পায়। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লি. ও প্রাইম ব্যাংক লি. যৌথভাবে প্রথম, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লি. দ্বিতীয় ও ন্যাশনাল ব্যাংক লি. তৃতীয় পুরস্কার পায়।
বিদেশি ব্যাংক ক্যাটাগরিতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক লি. প্রথম, এইচএসবিসি লি. দ্বিতীয় ও কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলোন লি. তৃতীয় পুরস্কার পায়।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আইডিএলসি লি. প্রথম, প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লি. দ্বিতীয় ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ তৃতীয় পুরস্কার পায়।
বীমা খাতে গ্রিন ডেলটা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লি. প্রথম, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লি. দ্বিতীয় ও প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লি. তৃতীয় পুরস্কার পায়।
ওষুধশিল্প-প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লি. প্রথম, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যাল লি. দ্বিতীয় ও ওরিয়ন ইনফিউশন লি. তৃতীয় পুরস্কার পায়।

ইউরোমানির জরিপে সেরা ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট ব্যাংক হয়েছে এইচএসবিসি

ইউরোমানি ক্যাশ ম্যানেজমেন্টের জরিপে বাংলাদেশে সেরা ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট ব্যাংক নির্বাচিত হয়েছে দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন (এইচএসবিসি)।
একই সঙ্গে এইচএসবিসি এশিয়ারও সেরা ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট ব্যাংক নির্বাচিত হয়েছে।
ইউরোমানি ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট নয় বছর ধরে এই জরিপ চালিয়ে সেরা ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট সেবা প্রদানকারী ব্যাংকগুলোকে স্বীকৃতি দিয়ে আসছে।
এইচএসবিসি বাংলাদেশের গ্লোবাল পেমেন্টস অ্যান্ড ক্যাশ ম্যানেজমেন্টের প্রধান আহমেদ সাইফুল ইসলাম বলেন, এই স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে এইচএসবিসি বাংলাদেশ গ্রাহকদের অভিনব ও দক্ষ ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
এশিয়া ও বাংলাদেশে সেরা ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট ব্যাংক নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি এইচএসবিসি এবার স্থানীয়ভাবে আরও ১১টি দেশে শীর্ষস্থানে রয়েছে।
এই দেশগুলো হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনাই, হংকং, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, মালয়েশিয়া, ম্যাকাও, মরিশাস, সিঙ্গাপুর, শ্রীলংকা ও তাইওয়ান।
এইচএসবিসি এশিয়া-প্যাসিফিকের গ্লোবাল পেমেন্টস অ্যান্ড ক্যাশ ম্যানেজমেন্টের প্রধান জন লরেন্স বলেন, ‘এই স্বীকৃতি গ্রাহকদের সঙ্গে আমাদের মজবুত সম্পর্ক তৈরি করবে এবং ক্যাশ ম্যানেজমেন্টে অভিনব ও দূরদর্শী নেতৃত্ব স্থাপনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’

চট্টগ্রামে আজ থেকে পুঁজিবাজার মেলা

চট্টগ্রামের ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আজ মঙ্গলবার থেকে দুই দিনব্যাপী ‘তৃতীয় পুঁজিবাজার মেলা’ শুরু হচ্ছে। এ মেলায় ব্যাংক, বীমা, ব্রোকারেজ হাউসসহ ৩০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে এ মেলার আয়োজন করেছে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)।
গত রোববার সিএসই মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান সংস্থার সহসভাপতি ফখর উদ্দিন আলী আহমদ। এ সময় মেলার নানা দিক তুলে ধরে বক্তব্য দেন সহসভাপতি এ কিউ আই চৌধুরী, পরিচালক তারেক কামাল, এ এস এম শহীদুল্লাহ ও সিএসইর ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আতিকুজ্জামান।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, মেলায় বিনিয়োগকারী, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী ও সাধারণ মানুষ পুঁজিবাজারবিষয়ক খুঁটিনাটি বিষয়ে জানার সুযোগ পাবেন। কোন ব্রোকারেজ হাউস কী সুবিধা দিচ্ছে তাও মেলায় প্রচার করবে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো। মেলার প্রধান পৃষ্ঠপোষক গ্রামীণফোন। এ ছাড়া যৌথভাবে আরও ১৬টি প্রতিষ্ঠান পৃষ্ঠপোষকতা করছে।
মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম ক্লাব মিলনায়তনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে দুপুরে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খন্দকার।
দুই দিনের এ মেলায় পুঁজিবাজার বিষয়ে পাঁচটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। এসব সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে চট্টগ্রাম ক্লাব মিলনায়তনে। আজ মঙ্গলবার বিকেলে পুঁজিবাজারবিষয়ক দুটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। কাল বুধবার তিনটি বিষয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। এসব সেমিনারে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদেরা আলোচক হিসেবে অংশ নেবেন। মেলার সমাপনী অনুষ্ঠান হবে নগরের পাঁচলাইশে দি কিং অব চিটাগাং কমিউনিটি সেন্টারে।
সিএসইর সহসভাপতি ফখর উদ্দিন আলী আহমদ বলেন, আগামী বছর দুই স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ার লেনদেন হবে দ্বিগুণ। কারণ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা এখন বাড়ছে। এখন পুঁজিবাজার থেকে জ্বালানি, বিদ্যুত্ ও অবকাঠামো খাতে অর্থ সংগ্রহ সম্ভব।
তিনি বলেন, ২০০৫ সালে প্রথম পুঁজিবাজার মেলা অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামে। সেবার পাঁচ হাজার দর্শক-সমাগম হয়েছিল। ২০০৮ সালে সিলেটের মেলায় হয় ২০ হাজার দর্শক। এবার দর্শকসংখ্যা আরও বেশি হবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০০৫ সালে এই স্টক এক্সচেঞ্জে দিনে গড়ে লেনদেন হতো পাঁচ কোটি টাকা। এখন দিনে গড় লেনদেন হচ্ছে ৬৩ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম ছাড়াও দেশের প্রধান নয়টি শহরে সিএসইর শেয়ার লেনদেন হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৫ সালের ১০ অক্টোবর ৩০টি তালিকাভুক্ত কোম্পানি এবং ৭১ জন সদস্য নিয়ে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ যাত্রা শুরু করে। তখন সিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৮৯৮ কোটি টাকা। ১৪ বছর পর সিএসইর বাজার মূলধন এখন এক লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি।

গৃহায়ণ পুনঃ অর্থায়ন তহবিলে আরও ২০০ কোটি টাকা দেওয়া হতে পারে

গৃহায়ণ পুনঃ অর্থায়ন স্কিমের আওতায় আরও ২০০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা ভাবছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ইতিমধ্যে ৫০০ কোটি টাকার তহবিল প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। ব্যাপক চাহিদার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুনভাবে অর্থ দিয়ে এই স্কিমটি সচল রাখার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
বার্তা সংস্থা ইউএনবি পরিবেশিত খবরে বলা হয়েছে, এটির ফলে সীমিত আয়ের মানুষের নিজের একটি বাসস্থান পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান ইউএনবিকে বলেছেন, ‘এটি একটি ভালো প্রকল্প। আমরা এটি অব্যাহত রাখব। এ জন্য ২০০ কোটি টাকা দেওয়া হবে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ৩০০ কোটি টাকা নিয়ে এই পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠন করে। সে সময় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই তহবিলের বিপরীতে ১০ শতাংশ হারে গৃহঋণ প্রদান করত। পরবর্তী সময়ে এই তহবিলে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকা করার পাশাপাশি সুদের হার কমিয়ে নয় শতাংশ ধার্য করা হয়।
বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ শতাংশ সুদে এই তহবিল থেকে অর্থ নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে গৃহায়ণ ঋণ প্রদান করেছে। এসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের মাত্র নয় শতাংশ হার সুদে সর্বোচ্চ ২০ বছরের জন্য ২০ লাখ টাকা করে গৃহঋণ হিসেবে প্রদান করছে।
এমনিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব তহবিল থেকে গৃহায়ণ খাতে যে ঋণ প্রদান করে থাকে, তাতে গড়ে ঋণের সুদের হার ১৩ থেকে ১৬ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করে। এত চড়া সুদের কারণে অনেকেই ঋণ নিতে পারেন না। আবার যাঁরা ঋণ নিয়ে থাকেন, তাঁদের অনেকেই প্রয়োজনের চেয়ে কম ঋণ পান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবশ্য সম্প্রতি এক নির্দেশনায় গৃহায়ণ সুদের সর্বোচ্চ হার ১৩ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃ অর্থায়ন স্কিমের আওতায় গৃহঋণ পেতে অবশ্য কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। গ্রাহক ঢাকা শহরে সর্বোচ্চ এক হাজার ২৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট ক্রয়ের জন্য এই ঋণ পাওয়ার যোগ্য। তাঁর মাসিক আয় সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকার বেশি হতে পারবে না।
এ ছাড়া গ্রাহকের নিজের নামে বা তাঁর স্বামী/স্ত্রী বা সন্তানদের নামে ঢাকাসহ ছয় সিটি করপোরেশন এলাকায় বা নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী বা গাজীপুরে কোনো বাড়ি থাকতে পারবে না।
তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগও পাওয়া গেছে। ফ্ল্যাট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে ১২৫০ বর্গফুটের বেশি আয়তনের ফ্ল্যাটের জন্য কেউ কেউ এই স্বল্পসুদে ঋণ নিয়েছেন।
জানা গেছে, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান ফ্ল্যাটের মোট আয়তনকে কমিয়ে এই সীমার মধ্যে দেখিয়ে গ্রাহককে এ ঋণ পেতে সুযোগ করে দিয়েছে। এ রকম অনিয়মের ফলে প্রকৃত অনেক গ্রাহকই বঞ্চিত হয়েছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চাহিদা বাড়ায় গত কয়েক মাসে গড়ে ব্যাংকগুলো ৪০-৫০ কোটি টাকা এই তহবিল থেকে সংগ্রহ করছে। এর ফলে তহবিল প্রায় নিঃশেষ হয়ে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে আরও জানা গেছে, এই তহবিলের আওতায় সবচেয়ে বেশি ঋণ প্রদান করেছে ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং লিমিটেড। এরপর রয়েছে আইডিএলসি ও ন্যাশনাল হাউজিং।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে আরও দেখা যায়, ২০০৭-০৮ অর্থবছর শেষে দেশে গৃহায়ণ ঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছিল ১৪ হাজার ২৫০ কোটি টাকা।

ডিএসই: বড় ধরনের দরপতনে লেনদেন শেষ

বড় ধরনের দরপতন দিয়ে আজ মঙ্গলবার ঢাকা শেয়ারবাজারের (ডিএসই) লেনদেন শেষ হয়েছে। সাধারণ সূচক ২৯ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে৩৩১১ পয়েন্টে।
ঢাকা শেয়ারবাজারে আজ মোট লেনদেন হয়েছে ৮০৩ কোটি টাকা, যা গতকালের তুলনায় ৩৪৩ কোটি টাকা কম।
এ ছাড়া আজ লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দাম কমেছে ১৮৩টির এবং বেড়েছে ৪৪টির।
লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে যমুনা অয়েল, বেক্সিমকো টেক্সটাইল, বেক্সিমকো লিমিটেড, তিতাস গ্যাস ও সামিট পাওয়ার লিমিটেড।

ডিগ্রিহীন ইতিহাসবিদ by মুহাম্মদ শামসুল হক

ডিগ্রি দূরে থাক, নিম্ন মাধ্যমিকের গণ্ডিও তিনি পেরোতে পারেননি। কিন্তু সমাজ-সংস্কৃতি বা ইতিহাস বিষয়ে যে গবেষণা করেছেন, তা দৃষ্টান্তমূলক; তিনি চট্টল তত্ত্ববিদ আবদুল হক চৌধুরী। তাঁর একটি বই চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ভারতীয় কথাশিল্পী সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ কলকাতার দেশ-এ লিখেছিলেন, ‘এ তো একটা সাংস্কৃতিক মহাফেজখানা গড়ে তুলেছেন ভদ্রলোক। কি বিশাল, বিস্তারিত এবং শ্রেণীবদ্ধ মহাফেজখানা। চৌদ্দটি পরিচ্ছেদে চট্টগ্রামের মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তাবত্ আচার-অনুষ্ঠান, বিশ্বাস, আদর্শ, জীবনযাপন পদ্ধতি এবং লৌকিক-অলৌকিক যা কিছু বেঁচে থাকার জন্য জরুরি—সবই সাজিয়ে দিয়েছেন। (দেশ, মে ১৯৮২, কলকাতা)
বাংলা একাডেমী প্রকাশিত চারটিসহ ১২টি গবেষণামূলক গ্রন্থ রয়েছে আবদুল হক চৌধুরীর। এসব গ্রন্থে চট্টগ্রামের বহু প্রাচীন কীর্তি ও নিদর্শনের বিবরণ, চট্টগ্রামের মুসলমানদের লৌকিক আচার-অনুষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা, পাঁচ শতাধিক কবি-সাহিত্যিক-গবেষকের পরিচিতি, প্রাত্যহিক জীবনের ওপর নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গবেষণা, চট্টগ্রাম ও আরাকানের রাজনৈতিক-সামাজিক ইতিহাস ইত্যাদি প্রকাশ পেয়েছে। চট্টগ্রামের সঙ্গে সিলেটের একটি ঐতিহাসিক যোগসূত্রের সন্ধান করছিলেন তিনি। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময় সিলেট অঞ্চল ঘুরে বহু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে তিনি লিখেছেন সিলেটের ইতিহাস প্রসঙ্গ (১৯৮১)। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থ চট্টগ্রামের ইতিহাস প্রসঙ্গ (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৭৬), চট্টগ্রামের চরিতাভিধান (১৯৭৯), চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতি (১৯৮০), শহর চট্টগ্রামের ইতিকথা (১৯৮৫), চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির রূপরেখা (১৯৮৮, বাংলা একাডেমী), চট্টগ্রাম-আরাকান (১৯৮৯), চট্টগ্রামের ইতিহাস বিষয়ক প্রবন্ধ (১৯৯২), প্রাচীন আরাকান রোইঙ্গা হিন্দু ও বৌদ্ধ বড়ুয়া আধিবাসী, (১৯৯৪, বাংলা একাডেমী), বন্দর শহর চট্টগ্রাম (১৯৯৪, বাংলা একাডেমী), প্রবন্ধ বিচিত্রা (১৯৯৫ বাংলা একাডেমী)।
এর মধ্যে চট্টগ্রামের ইতিহাস প্রসঙ্গ ও চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগে স্নাতকোত্তর শ্রেণীর সহায়ক বই হিসেবে তালিকাভুক্ত। তাঁর বহু প্রবন্ধ-নিবন্ধ-সাক্ষাত্কার পত্রপত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশ বেতারের বেতার কথিকা লেখক ও বিশেষজ্ঞ বক্তা হিসেবেও তাঁর সুনাম ছিল।
শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামান লিখেছেন, ‘ইতিহাসের উপাদান সমাজের নানা স্তরে ছড়িয়ে থাকে, নানা কিছুর মধ্যে এ সম্পর্কে আবদুল হক চৌধুরী যে সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন, সেটা এক হিসেবে আমাদের বিশ্বাস জাগ্রত করে। এর কারণ, এ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে খুব বেশি ইতিহাস আমাদের দেশে লেখা হয়নি।’
আবদুল হক চৌধুরীর জন্ম ১৯২২ সালের ২৪ আগস্ট রাউজান থানার নওয়াজিশপুর গ্রামে। এক ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি বড়। অষ্টম শ্রেণীর গণ্ডি পেরোতে পারেননি তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘বাল্যকাল থেকেই আমি ছিলাম রোগা। বছরের ছয় মাস কাল আমি পেটের কামড়িতে শয্যাগত থাকতাম। তাই আমাকে স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিল প্রায় ৯ বছর বয়সে। স্বগ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণী পাস করার পর পার্শ্ববর্তী ডাবুয়া মধ্য ইংরেজি স্কুলে দু’বছর লেখাপড়া করি। এই সময় আমি মাসিক ‘মোহাম্মদী’ ও মাসিক ‘বুলবুল’ পত্রিকার গ্রাহক হয়েছিলাম। অতঃপর ১৯৩৮ সালে রাউজান হাইস্কুলে ভর্তি হই। এবং রীতিমতো পড়াশুনা করি। ষান্মাষিক পরীক্ষা দিয়ে বোনের বিয়ে উপলক্ষে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে বাড়িতে আসি। বিয়ের এক সপ্তাহ পর ১৯৪০ সালে ৩রা অক্টোবর তারিখে আমার পিতা পরলোক গমন করেন। অষ্টম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষা আর দেওয়া হলো না। পিতার মৃত্যুর পর এক মাসের মধ্যে বিষয় সম্পত্তির ঝামেলায় পড়তে হল। গ্রাম্য টাউট টর্নীরা আমাকে দুটি দেওয়ানী মোকদ্দমায় জড়িয়ে ফেলে। ফলে আমার লেখাপড়ার এখানেই ইতি হলো।’
রাউজান উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ার সময় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রীশচন্দ্র চৌধুরী এবং গ্রন্থাগারিক সারদাচরণ চক্রবর্তীর অনুপ্রেরণায় তিনি নিয়মিত পাঠাগারে গিয়ে বই পড়তেন। ১৯৪২ সালে তাঁর বাবার স্থাপিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে ’৪৭ সাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছর শিক্ষকতা করেন। এ সময় তিনি রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি থানার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে রাজা-বাদশাহদের আমলের স্মারক নিদর্শনের পরিচিতি এবং এ ব্যাপারে কিংবদন্তি সংগ্রহ শুরু করেন। একই সঙ্গে বয়স্ক নারী-পুরুষদের সঙ্গে আলাপ জমিয়ে স্থানভেদে মানুষের বর্তমান আচার-আচরণ ও প্রাচীন আমলের কথা জেনে নিতেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিন রোববার স্থানীয় মোহাম্মদ ডাক্তার মেমোরিয়াল লাইব্রেরি থেকে প্রচুর পুরোনো পত্রপত্রিকা ও বই সংগ্রহ করে এনে পড়তেন। আবদুল হক চৌধুরীর গবেষণাকর্মের ব্যাপারে অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিলেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। ১৯৪৩ সালে চিঠি বিনিময়ের মাধ্যমে সাহিত্যবিশারদের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। ’৪৪ সালে সাহিত্যবিশারদ এক চিঠির মাধ্যমে তাঁর গ্রাম সূচক্রদণ্ডীতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। সেখানে সাহিত্যবিশারদের কথা ও কাজের নানা দিক আবদুল হক চৌধুরীর মনে দাগ কাটে।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের বেশ কয়েক বছর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। কিন্তু তাতে তেমন সফল হতে পারেননি। ব্যবসার বাইরে মূলত পড়ালেখা ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের দিকে মনোনিবেশ ছিল বেশি। লেখালেখিতে তাঁর হাতেখড়ি স্বাধীনতার পর আহমদ শরীফের সহযোগিতায় ইতিহাস পত্রিকার পঞ্চম বর্ষ ১-৩ সংখ্যায় (১৩৭৮ বাংলা) তিনখানা চিঠি প্রকাশের মাধ্যমে। বিষয় ছিল ‘বার ভূঁঞা প্রধান ঈশা খাঁ সম্পর্কে নতুন তথ্য।’ ১৯৭২ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিরামহীনভাবে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লিখে গেছেন তিনি। ১৯৯৪ সালের ২৬ অক্টোবর ৭২ বছর বয়সে তিনি মারা যান।
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আবদুল হক চৌধুরীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে স্মরণসভায় মুনতাসীর মামুনের দেওয়া বক্তব্য থেকে উদ্ধৃত করে শেষ করি—‘আমাদের দেশে যাঁরা শিক্ষকতা করেন, তাঁদের অনেকেই ভাবেন তাঁরাই সব জানেন। যাঁরা লেখালেখি করেন তাঁদের অনেকেই লেখেন দুর্ভেদ্য ভাষায়। কিন্তু আবদুল হক চৌধুরীর মতো গবেষকরা মানুষের অন্তরে পৌঁছানোর জন্য লিখেন অত্যন্ত সরল ও সাবলীল ভাষায়। গবেষণা কর্মের সব রীতি ঠিক রেখে ইতিহাস রচনা করে তিনি হয়ে উঠেছেন মহান।

প্রতিবন্ধীদের জন্য আইন: কিছু প্রস্তাব by শাহরিয়ার হায়দার ও দিবা হোসেন

১৯ অক্টোবর ২০০৯ ‘পঞ্চম জাতীয় প্রতিবন্ধী সম্মেলনে’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিবন্ধীদের অধিকার রক্ষায় যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসার দাবি রাখে। তিনি বলেছেন, প্রতিবন্ধীদের অধিকার রক্ষায় তাঁর সরকার আইন প্রণয়ন করবে, যাতে প্রতিবন্ধীরা যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠে সমাজে অবদান রাখতে পারে (প্রথম আলো, ২০ অক্টোবর, ২০০৯)। তাঁর এই ঘোষণা আমাদের আশ্বস্ত করেছে।
যাঁরা প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিয়ে ভাবেন, তাঁরা সব সময়ই এর একটা আইনগত ভিত্তির তাগিদ অনুভব করে থাকেন। এখানে একটি তথ্য সংযুক্ত করতে চাই, বর্তমান সরকারই ১৯৯৬-০১ সময়কালে ‘বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১’ প্রণয়ন করেছিল, যা ২০০১ সালের ৯ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে এবং ১ আগস্ট ২০০১ তারিখ থেকে আইনটি বলবত্ হয়। সবাই ভেবেছিল, প্রতিবন্ধীদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় অন্তত একটি আইন বলবত্ হলো। বিগত আট বছরে এই আইনের সঠিক বাস্তবায়ন কতটুকু হয়েছে, তা নিয়ে নানা মত রয়েছে।
প্রথমেই দৃষ্টি দিতে চাই বিদ্যমান আইনটির শিরোনামের দিকে। ২০০১ সালে বলবত্ হওয়া আইনটিকে ‘প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন’ বলা হয়েছে। ‘কল্যাণ’ শব্দটি নিয়ে সেই সময়েই প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো ভিন্নমত পোষণ করেছিল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঘোষণাপত্র এবং রাষ্ট্রীয় সংবিধান অনুযায়ী প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রযোজ্য সুযোগ-সুবিধাগুলো তাদের অধিকার হিসেবে বিবেচিত হয়। এখানে ‘কল্যাণ’ শব্দটি ঠিক সেই অর্থ বহন না করে অনেকটা সহানুভূতিমূলক একটি মনোভাবের সৃষ্টি করতে পারে। তাই এই আইনটি নতুন করে তৈরি/সংশোধনী যা-ই করা হোক, নামকরণটা ‘বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী অধিকার আইন’ করাটাই সংগত। বিদ্যমান আইনের ৩ নম্বর ধারায় ‘প্রতিবন্ধীর সংজ্ঞা ও প্রতিবন্ধী চিহ্নিতকরণ’ অংশে কিছুটা বিভ্রান্তি রয়ে গেছে। এখানে প্রতিবন্ধীর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ‘মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন’ ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদের একটি সহজ ব্যাপার বুঝতে হবে যে, ‘প্রতিবন্ধিতা’ ও ‘মানসিক ভারসাম্যহীনতা’ কখনোই এক বিষয় নয়। রাষ্ট্রীয় এই আইনে ‘প্রতিবন্ধিতা’ ও ‘মানসিক অসুস্থতা’কে গুলিয়ে ফেলাটা মোটেই সমীচীন হয়নি। ২০০১-এর আইনটিতে মোট ছয় ধরনের প্রতিবন্ধিতার সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এখানে আরও কিছু প্রতিবন্ধিতা (শিখন প্রতিবন্ধিতা, অটিজম) যুক্ত করার সময় এসেছে।
আইনটির তফসিল ‘ক’ (ছ) অংশে প্রতিবন্ধীদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য কিছু ধারার উল্লেখ রয়েছে। এগুলো বেশ যুগোপযোগী এবং কার্যকর হলেও কিছু বিষয় অস্পষ্ট রয়ে গেছে। যেমন তফসিল ছ (৫)-এ বলা হয়েছে, ‘হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী প্রতিবন্ধীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে প্রযোজ্য স্থানে ঢাল ও বাঁকানো রাস্তা, সিঁড়ি ও র্যাম্প নির্মাণের সুযোগ সৃষ্টি করা।’ সরকারি স্থাপনায় সরকার এটা করবে কিন্তু বেসরকারি পর্যায়ে (সিনেমা হল, শপিং কমপ্লেক্স) এই কাঠামো নির্মাণের দায়িত্বটা কার, সেটা নির্দিষ্ট নয়। এই আইনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তফসিল ‘ঘ’ ‘প্রতিবন্ধীগণের শিক্ষা’। শিক্ষার মাধ্যমেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পৃথিবীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম হতে পারবে। তাই শিক্ষার ওপরই বেশি দৃষ্টি দেওয়া উচিত ছিল। মাত্র সাতটি পয়েন্টে প্রতিবন্ধীদের শিক্ষাকে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা আরও সুনির্দিষ্ট ও ব্যাপক হওয়া প্রয়োজন। আমরা আশা করি, আইনটির সংশোধনী বা নতুন আইন প্রণয়নের সময় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হবে। প্রয়োজনে প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার পেশাজীবী যাঁরা আছেন, তাঁদেরও সংশ্লিষ্ট করতে হবে। আশার কথা এটাই, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০৯-এর খসড়ায় প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার বিষয়ে প্রশংসাযোগ্য কিছু কৌশলের উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তা আইনে পরিণত হতে হবে।
পৃথিবীর অনেক দেশেই প্রতিবন্ধীদের জন্য একাধিক আইন প্রচলিত রয়েছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার জন্য রয়েছে Individual with Disabilities Education Improvement Act (IDEA-2004) এবং তাদের অন্যান্য অধিকারের জন্য আছে Americais with Disabilities Act। এতে করে সুবিধা তা হলো, শিক্ষার মতো ব্যাপক একটি বিষয়কে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে একত্রে দেখতে গিয়ে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হয় না। বাংলাদেশেও প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার জন্য একটি পৃথক আইন করে তাদের শিক্ষাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়া (যা শিক্ষানীতি ২০০৯-এর খসড়ায় উল্লেখ হয়েছে) এবং তাদের স্বাস্থ্য, পুনর্বাসন, প্রশিক্ষণ, যাতায়াতসুবিধা, কর্মসংস্থান ইত্যাদির জন্য একটি আলাদা আইন করে এই বিষয়গুলো সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে রাখা যেতে পারে। এ ছাড়া, প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসনের জন্য ‘প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন ফান্ড’ তৈরির বিধান করা যেতে পারে। সেখান থেকে প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, অর্থ সহায়তা, বৃত্তি, সহায়ক উপকরণ ক্রয় বা চিকিত্সার জন্য অর্থ প্রদান করা হবে। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে নিয়ে একটি ‘প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন নীতিমালা’ প্রণয়ন করা উচিত।
বিদ্যমান আইনটিতে প্রতিবন্ধীদের জন্য সরকারি, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নিয়মিত চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। এখানে নির্দিষ্ট থাকতে হবে যে, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই কোটা কত শতাংশ হবে। আমরা মনে করি, সরকারি প্রতিষ্ঠানে ৩ শতাংশ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা থাকা প্রয়োজন। এ ছাড়া আইনে সংযুক্ত করতে হবে, চাকরিরত অবস্থায় কেউ প্রতিবন্ধিতার শিকার হলে তাকে তার পদ থেকে বরখাস্ত করা যাবে না। যদি সে তার পদে কাজ করতে সমর্থ না হয়, তবে তাকে অন্য পদে স্থানান্তর করতে হবে; তবে তাকে পূর্ব পদে প্রদত্ত বেতন ও সুবিধার কোনোরূপ হ্রাস করা যাবে না এবং এই প্রতিবন্ধিতার জন্য তাকে পদোন্নতি থেকেও বঞ্চিত করা যাবে না।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষায় প্রণীতব্য আইনটির মুখ্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনার জন্য কিছু সুপারিশ উল্লেখ করছি: ১. রাষ্ট্রের অন্য সব সাধারণ নাগরিকদের মতো প্রতিবন্ধীদের নাগরিক হিসেবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোতেও সম-অধিকার প্রদান করতে হবে। ২. প্রতিবন্ধীদের প্রতি যেকোনো ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণই আইনের দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। ৩. প্রতিবন্ধীদের পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হবে। ৪. রাষ্ট্রীয় বাজেট, যেকোনো সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কার্যক্রম এবং সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে প্রতিবন্ধীদের সংযুক্ত করতে হবে। ৫. সরকার ও তার প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিবন্ধীদের ব্যাপারে সুনজর দিতে হবে এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবদানের স্বীকৃতি ও পুরস্কার দিয়ে তাদের উত্সাহিত করার বিভিন্ন বিধান থাকতে হবে। ৬. একইভাবে রাষ্ট্রের প্রতি প্রতিবন্ধীদেরও সুনির্দিষ্ট দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে হবে। তাদের অবশ্যই রাষ্ট্রের বিভিন্ন আইন, নীতিমালা, আদেশ, সামাজিক নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইনটি প্রায় এক দশকের পুরোনো হতে চলল। এখন এর সংশোধন বা নতুন একটি আইন প্রণয়নের সময় এসেছে। যুগের সঙ্গে তাল মেলানোর উপযুক্ত ও যথার্থ কৌশলই হলো পরিবর্তন—যেটা বর্তমান সরকারেরও একটি ঐকান্তিক প্রয়াস। আমরা আশা করতে পারি, প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর ২০০১-এর প্রতিবন্ধী আইনটিকে যুগোপযোগী করার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।
শাহরিয়ার হায়দার ও দিবা হোসেন: শিক্ষক, বিশেষ শিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
durbasha@gmail.com, diba_h@yahoo.com

পৃথিবী এগিয়ে চলেছে -গদ্যকার্টুন by আনিসুল হক

১৩ অক্টোবর প্রথম আলোয় ‘বাংলাদেশের সামুদ্রিক অঞ্চল: সহজ পাঠ’ শীর্ষক একটি লেখায় বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে কীভাবে নির্ধারিত হতে পারে, তা নিয়ে বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী আমার মতামত হিসেবে বলেছেন, ‘সমদূরত্ব নীতি-পদ্ধতি অনুযায়ী এ তিনটি দেশের জলসীমা নির্ধারণ করা সঠিক হবে।’ তিনি আমার মত কিছুটা ভুলভাবে উদ্ধৃত করেছেন। আমার এ বিষয়ে প্রকৃত মত হলো, সমদূরত্ব নীতি-পদ্ধতি অনুযায়ী এ তিনটি দেশের সার্বভৌম সমুদ্রের জলসীমা নির্ধারণ করা সঠিক হবে। প্রকৃতপক্ষে এই নীতিতেই এই তিনটি দেশের তটরেখার সন্নিহিত সীমানা নির্ধারণ করা আছে, যার বিস্তার তটরেখা থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল এবং সন্নিহিত এলাকা ধরে মোট ২৪ নটিক্যাল মাইলের বেশি হবে না। এভাবে পেট্রোবাংলার সমুদ্র তটবর্তী গ্যাস ব্লকের মানচিত্রও তৈরি করা আছে। তবে বিষয়টি একেবারে সহজ পাঠ নয়।
সার্বভৌম সমুদ্র ও একচ্ছত্র অর্থনৈতিক এলাকা: UNCLOS III-এর ৩ ও ১৫ ধারায় প্রতিটি দেশের সমুদ্র তটরেখা (ভাটার রেখা) থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল (১ নটিক্যাল মাইল=১.৮৫২ কিলোমিটার) ওই দেশের সার্বভৌম সমুদ্র বলা হয়েছে, যা দুই দেশের স্থলসীমা থেকে টানা সমদূরত্ব রেখার মাধ্যমে নির্ণীত হবে। এই অংশের নিরাপত্তা নিজ নিজ দেশের দায়িত্বে হবে, তবে বিদেশি কোনো জাহাজের নিরপরাধ অতিক্রমণের সুযোগ থাকবে। ধারা ৩৩ মোতাবেক আরও ১২ নটিক্যাল মাইল সন্নিহিত এলাকা হবে, যেখানে একই প্রকার অধিকার ও দায়িত্ব বর্তাবে। UNCLOS III-এর ৫৫, ৫৬, ৫৭ ধারা অনুযায়ী প্রতিটি দেশের সমুদ্র তটরেখা (ভাটার রেখা) থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল ওই দেশের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক এলাকা হবে। এই অংশের সব সম্পদের মালিকানা, ব্যবহার ও উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট দেশের এখতিয়ারভুক্ত হবে।
মহীসোপান: UNCLOS III-এর ৭৬ ধারা অনুযায়ী একচ্ছত্র অর্থনৈতিক এলাকা বলতে তটরেখা থেকে সার্বভৌম সমুদ্র এবং সন্নিহিত এলাকা নিয়ে মহীসোপানের ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সমুদ্র এলাকা বোঝাবে, যখন প্রাকৃতিকভাবে প্রসারমাণ সমুদ্রতল ওই পর্যন্ত না পৌঁছায়। প্রাকৃতিকভাবে প্রসারমাণ সমুদ্রতল এই দূরত্ব ছাড়িয়ে গেলে মহীসোপানের সীমা এই ধারার ৪ ও ৬ উপধারা অনুযায়ী হবে। উপধারা ৪ এর এ(১) অনুযায়ী মহীসোপানের সীমা ওই দূরত্ব পর্যন্ত হবে, যে দূরত্বে ওই দূরত্বের ১% গভীর পলি জমা পাওয়া যাবে। তবে ৪ এর এ(২) অনুযায়ী এই সীমা মহীসোপানের ঢাল থেকে অনূর্ধ্ব ৬০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে হবে, যা নির্ণয়যোগ্য নির্দিষ্ট রেখা দ্বারা চিহ্নিত করতে হবে। ৫ উপধারা অনুযায়ী মহীসোপানের সীমা ২৫০০ মিটার গভীরতা থেকে ১০০ নটিক্যাল মাইলের বেশি হতে পারবে না। ৬ উপধারা অনুযায়ী মহীসোপানের সীমা তটরেখা থেকে ৩৫০ নটিক্যাল মাইলের বেশি হতে পারবে না, তবে এই ধারা খাড়ির বেলায় প্রযোজ্য হবে না। ৭ উপধারা অনুযায়ী একটি দেশ তার সমুদ্রসীমা অনূর্ধ্ব ৬০ নটিক্যাল মাইলের রেখাসমূহের দ্বারা চিহ্নিত করবে।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা: বাংলাদেশের সার্বভৌম সমুদ্রসীমা UNCLOS III-এর ৩, ১৫ ধারা অনুযায়ী পশ্চিমে হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মধ্যস্রোত ধরে ভারত ও বাংলাদেশের তটরেখা থেকে সমদূরত্বে হবে। এই রেখা ৩৩ ধারা অনুযায়ী সন্নিহিত অঞ্চলসহ ২৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত দীর্ঘ হবে, তবে তা Swatch of No Ground বা অতল সমুদ্রের খাড়ি পার হয়ে যাবে না। এরপর এই রেখা ৭৬.৩, ৭৬.৪ (এ১, এ২ এবং বি) ও ৭৬.৫ অনুযায়ী দুই দেশের নদীগুলোর বাহিত পলির বিভাজন রেখা Swatch of No Ground বা অতল সমুদ্রের খাড়ি ধরে গভীর সমুদ্রের দিকে যাবে।
বাংলাদেশের সার্বভৌম সমুদ্রসীমা UNCLOS III-এর ৩, ১৫ ধারা অনুযায়ী পূর্বে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের ছেড়া দ্বীপ ও ওয়েস্টার দ্বীপের মাঝামাঝি তটরেখা ধরে সমদূরত্বে হবে। এই রেখা ৩৩ ধারা অনুযায়ী সন্নিহিত অঞ্চলসহ ২৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত দীর্ঘ হবে, তবে নিকটবর্তী দক্ষিণমুখী খাড়ি পার হয়ে যাবে না। এরপর এই রেখা ৭৬.৩, ৭৬.৪ (এ১, এ২ এবং বি) ও ৭৬.৫ অনুযায়ী দুই দেশের নদীগুলোর বাহিত পলির বিভাজন রেখা বা ৯২ ডিগ্রি ১৫ মিনিট দ্রাঘিমা বরাবর বঙ্গোপসাগরে দক্ষিণমুখী যে খাড়ি আছে, সেই খাড়ি ধরে গভীর সমুদ্রের দিকে যাবে।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা পশ্চিম ও পূর্ব দিকে ওপরে বর্ণিত দুই রেখা বরাবর অগ্রসর হয়ে কুয়াকাটা অথবা কক্সবাজার তটরেখা থেকে সরাসরি ৩৫০ নটিক্যাল মাইল দূরত্ব পর্যন্ত হবে, অথবা দূরসমুদ্রে ২৫০০ মিটার গভীরতা থেকে বাইরের দিকে ১০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত হবে। তবে এই রেখা কখনোই পার্শ্ববর্তী দেশের নদীগুলোর পলির দ্বারা গঠিত প্রাকৃতিকভাবে প্রসারমাণ সমুদ্রতলকে অন্তর্ভুক্ত করবে না বা বিভাজন রেখা অতিক্রম করবে না।
ভারতের দাবি: জানামতে, ভারত চলতি ২০০৯ সালের ১১ মে জাতিসংঘের কাছে UNCLOS III-এর ধারা ৭৬-এর ৮ উপধারা অনুযায়ী বঙ্গোপসাগরে তার মহীসোপানের দাবি দাখিল করেছে। এই দাবিতে ভারত UNCLOS III-এর ধারা ৭৬.৩, ৭৬.৪ (এ১, এ২ এবং বি), ৭৬.৫ ও ৭৬.৬ লঙ্ঘন করে Swatch of No Ground বা অতল সমুদ্রের পূর্ব দিকে বাংলাদেশের পলি দ্বারা গঠিত মহীসোপানের ওপর দাবি জানিয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
মিয়ানমারের দাবি: জানামতে, মিয়ানমার ২০০৮ সালের ৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘের কাছে UNCLOS III-এর ধারা ৭৬-এর ৮ উপধারা অনুযায়ী বঙ্গোপসাগরে তার মহীসোপানের দাবি দাখিল করেছে। এই দাবিতে মিয়ানমার UNCLOS III-এর ধারা ৭৬.৩, ৭৬.৪ (এ১, এ২ এবং বি), ৭৬.৫ ও ৭৬.৬ লঙ্ঘন করে ৯২ ডিগ্রি ১৫ মিনিট দ্রাঘিমা বরাবর বঙ্গোপসাগরে দক্ষিণমুখী খাড়ির পশ্চিমে বাংলাদেশের নদীর পলি দ্বারা গঠিত মহীসোপানের ওপর দাবি জানিয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
দক্ষিণ তালপট্টি: দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপটি ভাটায় জাগে, জোয়ারে ডুবে যায়। এই দ্বীপটি হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মধ্যস্রোতের পূর্বে অবস্থিত বিধায় বাংলাদেশের অংশ। প্রয়োজনে দুই দেশের যৌথ জরিপের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে আসা যেতে পারে।
ম. ইনামুল হক: প্রকৌশলী; সাবেক মহাপরিচালক, পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা।
minamul@gmail.com

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক -অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে by মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ

 বিগত যেকোনো সময়ের তুলনায় সম্ভবত এখনই বাংলাদেশ-ভারতের সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক সুদৃঢ় এবং সুসংহত করার সবচেয়ে অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করছে। উভয় দেশের বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে এ কথার সারবত্তা উপলব্ধি করা যায়। বাংলাদেশে ডিসেম্বর ২০০৮ সালের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের পক্ষে বিপুল গণরায় এবং এ বছরের এপ্রিল-মের লোকসভা নির্বাচনে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে গঠিত সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চার উপর্যুপরি দ্বিতীয় বিজয় একযোগে দুই দেশের রাজনীতিতে যে গুণগত পরিবর্তন সূচিত করেছে, ’৭৫ পরবর্তীকালে তা নিতান্তই অচিন্তনীয় ছিল। ঢাকা ও দিল্লিতে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই দুই দেশের সরকার তাদের মধ্যকার সুসম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে বেশ কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে গত সাড়ে তিন দশকের পুঞ্জীভূত অবিশ্বাস ও সন্দেহের বরফ গলতে শুরু করেছে এবং বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয়ের পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধানের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
এ বছরের শুরুতে সবার আগে ভারতের তত্কালীন বিদেশমন্ত্রী তথা ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি ঢাকায় এসেছিলেন বাংলাদেশের নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানাতে। ওই সময় দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগসংক্রান্ত দুটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর ১৫ জুলাই মিশরের শরম আল শেখ সৈকত শহরে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের মধ্যে অত্যন্ত হূদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
সম্প্রতি ৭ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি ভারতে সরকারি সফরে যান। সফরকালে তিনি ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি, পানিসম্পদমন্ত্রী পবন কুমার বনসলের সঙ্গেও সাক্ষাত্ করেন। সফর শেষে একটি যৌথ প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। দুই দেশের সম্পর্কের বহুমাত্রিক ঐতিহ্যের আলোকে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, দুই দেশের সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচন এ সম্পর্ককে আরও প্রসারিত ও বিকশিত করার ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
দুই মন্ত্রী দুই দেশের বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয় নিয়েও আলোচনা করেন। তাঁদের আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক সংযোগব্যবস্থা, ত্রিপুরার পালাতোনায় বিদ্যুত্ প্রকল্পের বৃহদাকার যন্ত্রাংশ নিয়ে যেতে আশুগঞ্জ নদীবন্দর ব্যবহার করতে দিতে বাংলাদেশের সম্মতি ইত্যাদি স্থান পায়। বাংলাদেশের সঙ্গে নেপাল ও ভুটানের সংযোগব্যবস্থা সুগম করতে ভারতও সম্মত হয়। উভয় পক্ষ বিদ্যুত্ খাতে সহযোগিতা বাড়াতে একমত হয়। ভারত দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুত্ গ্রিড আন্তসংযোগের সম্ভাব্যতা পরীক্ষা করে দেখতে সম্মত হয় এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাংলাদেশকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ সরবরাহ করতেও রাজি হয়। এ ছাড়া তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহের সুষ্ঠু বণ্টনব্যবস্থা দ্রুত চূড়ান্ত করার বিষয়েও উভয় পক্ষ অভিন্ন মত পোষণ করে। এ ব্যাপারে দুই পক্ষ নিজ নিজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কারিগরি ও অন্যান্য দিক খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দেয়। ভারত টিপাইমুখ বাঁধের বিষয়ে বাংলাদেশকে আশ্বাস দেয় যে এমন কিছু করা হবে না যাতে বাংলাদেশের কিছুমাত্র ক্ষতি হয়।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিদ্যমান সব প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া পুরোপুরি কার্যকর করতে উভয় পক্ষ একমত হয়। বাংলাদেশ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ-ত্রিপুরার সীমান্তের সবরুম-রামগড় সীমান্তপথসহ অন্যান্য সীমান্তের হাটব্যবস্থা চালু করতে এবং বাংলাদেশ ও মিজোরামের মধ্যে দেমাগিরি-তেগামুখ স্থলপথ উন্মুক্ত করতে উভয় পক্ষ একমত পোষণ করে।
কূটনৈতিক মহলের ধারণা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির দিল্লি সফর সম্ভবত এ বছরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বহু প্রতীক্ষিত ভারত সফরের প্রস্তুতি মাত্র। দীপু মনি বলেছেন, অতি শিগগির তিনটি চুক্তি সই করা হবে—ফৌজদারি অপরাধমূলক বিষয়ে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি, সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীদের প্রত্যর্পণসংক্রান্ত চুক্তি ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং অবৈধ মাদক পাচার প্রতিরোধসংক্রান্ত চুক্তি। এসব চুক্তি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় স্বাক্ষরিত হবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান সম্পর্কের উষ্ণতা যে দীর্ঘস্থায়ী সুফল বয়ে আনবে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। আমাদের এ দুই দেশ বিগত সময়ের তিক্ততা ও অবিশ্বাস দূরে ফেলে যত দ্রুত জনগণের কল্যাণে দুই দেশের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারবে ততই আমাদের মঙ্গল। আমরা বিশ্বাস করি, দুই দেশের বর্তমান নেতৃত্ব এ বিষয়ে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ও তত্পর।
মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ: সংসদ সদস্য।ভারত ও মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত

ধন পাপাশ্রিত: সামন্ততন্ত্রের জমিদার ও গণতন্ত্রের ভূমিদার -সহজিয়া কড়চা BY সৈয়দ আবুল মকসুদ

ধন পাপাশ্রিত। আমার মতো অজ্ঞানীর কথা নয়। আড়াই হাজার বছর আগের কোনো ভারতীয় মুনি-ঋষির কথা। অঢেল ধন শুধু পাপের মাধ্যমেই অর্জন সম্ভব বলে আগের দিনের মহামানবেরা মনে করতেন। তাঁরা আরও মনে করতেন, অর্জিত ধনসম্পদ তার মালিককে প্ররোচিত করে নানা রকম অনাচার ও পাপকাজে।
অত দূরের প্রাচ্যের মনীষীর কথা যদি অগ্রাহ্যও করি, ফরাসি বিপ্লব-পরবর্তী ফরাসি দার্শনিক মঁশিয়ে প্রুদোর কথা ফেলে দিই কীভাবে? তিনি বলেছেন, প্রপার্টি ইজ থেফ্ট—বিত্তবৈভব ও ভূসম্পত্তি হলো চুরির ফসল। যাদের কম আছে তাদের থেকে অপহরণ না করে, অবৈধ উপায়ে ছিনিয়ে না নিয়ে, অন্যকে শোষণ না করে কারও পক্ষে বিত্তবান হওয়া সম্ভব নয়। সেটা ১৭৯৩ সালে মহামাননীয় কর্নওয়ালিশের সময় যেমন সত্য ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশেও সমান সত্য। ১৯৫০ সালে জমিদারি ব্যবস্থা বিলুপ্ত ঘোষণার আগে এ দেশে ছিল পুরোপুরি অর্থাত্ নির্ভেজাল সামন্ততন্ত্র। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত আমরা আছি গণতন্ত্রের নামে এমন এক ছদ্মবেশী সামন্ততান্ত্রিক অবস্থায়, যার পাপগুলোকে চট করে ওপর থেকে দেখে বোঝা যায় না।
আজ সম্পদে সয়লাব বাংলাদেশ—সাত কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা সত্ত্বেও। সনাতন সামন্তবাদী সমাজে আমরা দেখেছি গরুর হাট বসতে। বিশ্বায়ন-পরবর্তী নবসামন্তবাদী সমাজে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে বসছে গাড়ির হাট। ১৯৬৯ সালে ঢাকার দোকানে খেলনা গাড়ি যত বিক্রি হয়েছে, ২০০৯ সালে প্রতিদিন তার দশ গুণ বেশি বিক্রি হয় বিলাসবহুল মোটরগাড়ি। যারা সবেমাত্র ধন আহরণের পথে নেমেছে, তারা শোরুমের নতুন গাড়িতে হাত দিতে পারছে না; সিএনজি নিয়ে শুক্রবারে ছুটছে শেরেবাংলা নগরে গাড়ির হাটে। বউ এবং বাপের বাড়ির লোকেরা বায়না ধরেছে—গাড়ি চাই। সেকেন্ড হ্যান্ড, থার্ড হ্যান্ড ছাড়া গত্যন্তর নেই। সুতরাং কোরবানির ঈদের আগে গরু ও ডিপ ফ্রিজ কেনার আগেই একটা গাড়ি চাই। ঠিকাদারের বিলটা আটকে দিতে পারলে লাখখানেক পাওয়া যাবে। নতুন দলীয় পরিচয় নিয়ে যে বড় কর্তা এসেছেন, তাঁর চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র। প্রথম দিন শ্রমিক-কর্মচারীরা এই স্লোগানসহ তাঁকে গলায় ফুলের মালা দিয়ে এনে চেয়ারে বসিয়ে দিয়েছে। সুতরাং গাড়ির হাটের ক্রেতা হওয়ায় আর অসুবিধা নেই।
সেদিন এক ক্ষুদ্র সরকারি কর্মকর্তা পৌনে ১১টার সময় অফিসে ঢুকে বাঁ-হাত কানে লাগিয়ে মোবাইল ফোনে খুব জোরে জোরে কথা বলছিলেন এবং ডানহাতে রুমালে কপাল ও গলার ঘাম মুছছিলেন। বয়স্ক পিয়ন লোকটি বলছিলেন, উনি গাড়ি কেনার আগে পৌনে এক ঘণ্টা লেট করতেন, গাড়ি কেনার পর থেকে দেড় ঘণ্টা লেট করছেন। দোষ তাঁকে মোটেই দেওয়া যাবে না। তাঁর গাড়ি যদি রাস্তায় যানজটে আটকে থাকে তাঁর কী করার আছে? তিনি গাড়ির মালিক। এরপর থেকে গাড়ি তাঁকে অফিসে নিয়ে আসলে আসবেন, না আসলে আসবেন না। বেতনের চেক পেতে কোনো সমস্যা হবে না।
২০০৯ সালে প্রতিদিন চট্টগ্রাম বন্দরে কয়টি করে আমদানি করা নতুন গাড়ি খালাস হয়, সে হিসাব থাকলেও থাকতে পারে; কিন্তু ঢাকায় শোরুম থেকে কত গাড়ি বিক্রি হয় তার হিসাব সম্ভবত কোথাও নেই। তা ছাড়া প্রতিদিন ঢাকার রাস্তায় কত গাড়ি চলাচল করে তার হিসাব বিআরটিএ বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের পক্ষেও বলা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে বিপুল বিত্তের বহিঃপ্রকাশ নানাভাবে ঘটছে—গাড়ি তার মধ্যে একটি উপাদান মাত্র।
১৯০৯ সালে ঢাকার রাস্তায় কী পরিমাণ প্রাইভেট গাড়ি চলাচল করত? কেউ বলতে পারবে বলে মনে হয় না। আমি অনেক তথ্যবিশারদকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তাঁরাও পারেননি। তারপর অনুসন্ধান করে জানতে পারলাম: কুড়ি শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত ঢাকায় প্রাইভেট মোটরগাড়ি ছিল দুটি। একটি ঢাকার নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহর, দ্বিতীয়টি সৈয়দ আওলাদ হোসেনের। তিন মাইল লম্বা এক মাইল প্রস্থ শহরে সুপরিসর রাস্তা ছিল মাত্র দুটি: ইসলামপুর ও নবাবপুর রোড। নবাব বাহাদুর বা সৈয়দ সাহেব যেদিন বাড়ি থেকে বের হতেন দুই পাশের বাড়িঘর ও রাস্তার লোকজন হাঁ করে তাকিয়ে থাকত গাড়ির দিকে—বাপরে, টম্টমের তিন গুণ বেশি দ্রুত গতিতে ছুটে চলে!
আজ কোনো ওভারব্রিজ বা কোনো উঁচু জায়গা থেকে অনেকে তাকিয়ে দেখে ঢাকার রাস্তায় গাড়ির স্রোত। লাল পিঁপড়া বা শুঁয়োপোকার মতো তিড়তিড় করে এগোচ্ছে গাড়ির অন্তহীন লাইন। গাড়ি বাংলাদেশে তৈরি হয় না। অন্য দেশ থেকে ডলার দিয়ে কিনে আনতে হয়। গাড়ি চালানোর জন্য যে জ্বালানি সেই ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনও বিদেশ থেকে আনতে হয়। গাড়ির সিটকভার থেকে ভেতরে যেসব শোপিস শোভা পায়, তাও বাংলাদেশে তৈরি নয়—খাঁটি বিদেশি।
ঢাকা শহরের প্রথম দুই গাড়িঅলাই ছিলেন জমিদার অর্থাত্ জমিদারি ছিল তাঁদের আয়ের একমাত্র উত্স। প্রজাদের কাছ থেকে পেতেন খাজনা। সেটা সম্ভবত শোষণ বা পাপের পথেই আহরিত হতো। কিন্তু জমির মালিকানা ছিল প্রজার। প্রজার জমি তাঁরা কখনোই জবরদখল করতেন না। আভিজাত্য প্রকাশের জন্য প্রয়োজন হতো গাড়ির। তাই প্রয়োজন না হলেও গাড়িতে তাঁদের চড়তে হতো, কারণ তাঁরা নবাব বা জমিদার। তবে স্বীকার করতেই হবে, ব্যক্তিজীবনে মানুষ হিসেবে নবাব সলিমুল্লাহ ও সৈয়দ আওলাদ হোসেন ছিলেন সত্যিকারের শরিফ, ন্যায়পরায়ণ ও জনদরদি।
আজ সাবেকী সামন্ত্রতন্ত্র নেই, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গণতন্ত্র। এ গণতন্ত্র সেকালের সামন্ত্রতন্ত্রের বাপ। আজ প্রত্যেকেই জমিদার হওয়ার চেষ্টা করছে। তাই আজ গণতন্ত্র আর গাড়িতে দেশ একাকার। উপজেলা চেয়ারম্যান, নির্বাহী অফিসার ও অন্যান্য কর্মকর্তার জন্য আমদানি হচ্ছে বিলাসবহুল গাড়ি। কর্মস্থান যেখানেই হোক, তাঁরা এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা সরকারি গাড়িতে ঘুরে বেড়াবেন ঢাকা শহরেই নবাব সলিমুল্লাহর মতো। কারণ আজ সবাই নবাব। একজন ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে বলেছেন, ঢাকার রাস্তার জিপ-জাতীয় গাড়ির তিন ভাগের এক ভাগ ঢাকার বাইরের সরকারি কর্মকর্তাদের। ঢাকার এক শ কিলোমিটারের মধ্যে একটি বড় সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আমাকে বলেছেন, তাঁর কলেজের ৪৫ জন মহিলা শিক্ষকের সবাই ঢাকায় থাকেন, তাঁদের স্বামী-সন্তানরা ঢাকায়, তাঁদের অধিকাংশের গাড়ি আছে, কিন্তু তাঁরা সপ্তাহে একদিনের বেশি কলেজে আসেন না। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ আমাদের বন্ধু, সম্ভবত এখনো তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ি নেই। কিন্তু তাঁর কলেজগুলোর অধিকাংশ শিক্ষকের গাড়ি আছে। যদি তিনি যেতে চান তা হলে আমি তাঁকে ওই কলেজে নিয়ে যেতে পারি, যেখানে তাঁর ৪৫ জন নারী শিক্ষক ঢাকা থেকে গিয়ে নিয়মিত ক্লাস নেন না, বেতনটা নেন। ঢাকার রাস্তা আর বাড়িঘর, ফ্ল্যাট প্রভৃতি এমনিতেই গাড়ি আর মানুষে ভরে যায়নি। বলতে ইচ্ছা হয়: কর্মস্থান হোক যথাতথা বসবাস হোক ঢাকায়।
জমিদারদের কথা বাদ দিয়ে এখন একালের ভূমিদারদের প্রসঙ্গে যাওয়া যাক। যদিও সেটা অর্থশাস্ত্র, সমাজতত্ত্ব ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয়। ওসব পর্যন্ত আমার বিদ্যার দৌড় নেই।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা পাওয়া বেশির ভাগ দেশে বেশি দিন গণতন্ত্র কার্যকর ছিল না। বেসামরিক শাসকরা প্রথমে স্বৈরশাসক হয়ে ওঠেন। মানুষ জাতীয়তাবাদী নেতাদের ওপর অসন্তুষ্ট হতে থাকে। অগণতান্ত্রিক শক্তি সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। কয়েক বছরের মধ্যেই বহু দেশে সামরিক শাসন আসে। সেসব দেশের মধ্যে পাকিস্তান একটি। আমরাও একসময় পাকিস্তানের অংশ ছিলাম। কাজেই সামরিক শাসন আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি।
পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশেও সামরিকতন্ত্রের সূচনা মার্কিন সহযোগিতায়। পাকিস্তানে দুইবার এবং বাংলাদেশে দুইবার সামরিক শাসকদের জামিনদার হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। মধ্যরাতে ক্ষমতায় আসা সামরিক শাসকদের বাধাবিঘ্ন দূর করে তাঁদের ক্ষমতা সংহত করার প্রতিশ্রুতি ছিল আমেরিকার পুঁজিবাদীদের। তাতে বাংলাদেশে অতি দ্রুত একটি ভুয়া পুঁজিবাদী অর্থনীতি বিকশিত হয়। জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনের সময় থেকে দেশে একটি বড় মুত্সুদ্দি-দালালশ্রেণী গড়ে ওঠে। দেশে শিল্পপুঁজি নয়, বণিকপুঁজি তৈরি হয়। ওই শ্রেণীটি দেশে শিল্পকারখানা গড়ে তোলার চেয়ে নানা রকম আন্তর্জাতিক চোরাচালান, মাদক ব্যবসা সোনাদানা পাচার, গরিব মানুষ ও রাষ্ট্রের ভূসম্পত্তি দখল ইত্যাদির মাধ্যমে প্রায় রাতারাতি অকল্পনীয় ধনসম্পদের অধিকারী হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ এখন সত্যি সত্যি সোনার বাংলা, কারণ এখানে সোনার চেয়েও ভূমির মূল্য বেশি। ভূমিকে কেন্দ্র করে ১৯৭৫ সালের পর এক বিত্তশালী চক্র গড়ে উঠেছে। ওই চক্রের মধ্যে সব দলের ও সব রকম রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষই আছে। এদের ধন ১০০ ভাগ পাপাশ্রিত, এদের সম্পদ, দার্শনিক প্রুদোর ভাষায়, ১০০ ভাগ চুরির মাল বা চৌর্যবৃত্তির ফসল।
নানা রকম দস্যুবৃত্তির মাধ্যমে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অর্থাত্ সরকারি মদদে দ্রুত সম্পদশালী হয়েছে অনেকে। নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, সাধারণ দুর্বল মানুষের জায়গাজমি লুণ্ঠিত হয়েছে প্রশাসনের নাকের ডগায়। আগের দিনের জমিদারদের জমিদারি সরকারের কাছ থেকে কিনতে হতো, এ কালের ভূমিদারদের মাস্তানদের আনুকূল্যে প্রায় বিনামূল্যে জমি জোগাড় হয়ে যায় এবং তা উচ্চমূল্যে বিক্রি করে অর্জিত হয় বিপুল অর্থ।
সনাতন সামন্ত যুগেও সামন্তপ্রভুদের হাতে ধন পুঞ্জীভূত হতো পাপের পথে, কিন্তু আধুনিক সামন্তবাদী-গণতন্ত্রের যুগে ধনসম্পদ নবযুগের নবাব ও ভূমিদারদের হাতে সঞ্চিত হচ্ছে পাপের পথেও, চুরির মাধ্যমেও। চুপিচুপি চুরিও নয়, প্রকাশ্য লুণ্ঠন। জলাশয় ও জনপদ উজাড় হচ্ছে রাতারাতি। নবযুগের নবাবদের ও গণতন্ত্রের ভূমিদারদের দর্প বীরের মতো। তারা
দুনিয়াকে বা ধরাকে মনে করেন সরা বা মাটির হাঁড়ির ঢাকনা। অর্থাত্ যা খুশি তা-ই করে টিকে যাওয়া সম্ভব।
এই উপমহাদেশে জাতীয় বুর্জোয়ারা অর্থাত্ অপর্যাপ্ত ধনসম্পদশালীরা পরাধীন যুগে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখা শুধু নয়, জাতীয়তাবাদী-আন্দোলন-সংগ্রামেও ভূমিকা রেখেছেন। জামশেদজি টাটা ছোট থেকে বড়, বড় থেকে বড়তর হয়েছেন শিল্পপ্রতিষ্ঠা করে পুঁজিবাদী ধারায় জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নতিতে অবদান রেখে। জামশেদজির দৈনন্দিন খাওয়া-দাওয়ার পেছনে খরচের একটি তালিকা আমি কোথাও দেখেছিলাম। সেকালের অঙ্কটা বলে লাভ নেই, হিসাব করে দেখেছি, এখনকার টাকায় তা ৫০ টাকার মতো। একালের অতি অল্প সময়ে হয়ে ওঠা ধনকুবেরের এক দিনের খাওয়া খরচের টাকায় টাটাজির দিব্যি মাস দুয়েক চলে যেতে পারত। বলিষ্ঠ মানবিক মূল্যবোধ ছিল তাঁদের। বিত্তের আস্ফাালন ছিল না। ব্যবসার বাইরে জনকল্যাণমূলক কাজকে প্রাধান্য দিতেন।
ভারতে জামশেদজি একা ছিলেন না। বিড়লা, গোয়েঙ্কা, ডালমিয়াদের সবারই একটি বুর্জোয়া মূল্যবোধ ছিল এবং আজও আছে। বুর্জোয়াসুলভ আভিজাত্য তাঁরা রক্ষা করেছেন খুব যত্নের সঙ্গে। পাকিস্তানে আদমজি, ইস্পাহানি, বাওয়ানি ও তাঁদের শ্রেণীর শিল্পপতিদের ন্যূনতম আভিজাত্যবোধ ও মূল্যবোধ ছিল। তাঁদের সামাজিক আচার-আচরণ একটি স্তরের নিচে কস্মিনকালেও নামতে দিতেন না। কোনোক্রমেই নিজেদের মর্যাদা তাঁরা ক্ষুণ্ন হতে দিতেন না। পুঁজিবাদী উত্পাদনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করেই তাঁরা সন্তুষ্ট থাকতেন। অন্য কোনো ব্যাপারে তাঁরা মাথা ঘামাতেন না বা মাতব্বরি করা পছন্দ করতেন না। সত্যিকারের শিল্পপতি ও বুর্জোয়াদের সেটাই চরিত্র। নোংরা হওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভবই নয়। জাতীয় বুর্জোয়াদের ধনসম্পদও যে পাপাশ্রিত নয়—তা বলব না, কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম পাপ তাঁদের স্পর্শ করে। ভূমিদারদের পাপ পরিমাপযোগ্য নয়।
জাতীয় বুর্জোয়া পুঁজিপতি শ্রেণী ও মুত্সুদ্দি পুঁজির লুম্পেন শ্রেণীর মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। বর্তমান দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি আর লুম্পেন শ্রেণী এক অনঢ় মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ। এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে আমাদের রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যাবে।
অসুস্থ দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির সুযোগে কেউ কেউ যেকোনো উপায়ে সম্পদ লুণ্ঠনের মাধ্যমে অর্থনীতিতে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে, সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করছে, মধ্যবিত্তকে রাতারাতি বড়লোক হয়ে উঠতে উত্সাহিত করছে। বাস্তবিক পক্ষেই তারা রাষ্ট্রকে অকার্যকর করার পথ তৈরি করছে। আগের দিনের সামন্ত যুগের জমিদারদের সঙ্গেও শাসকদের একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল, বর্তমান বাংলাদেশি গণতন্ত্রে ভূমিদারদের সঙ্গে যদি রাজনীতিক ও শাসকশ্রেণীর অবিচ্ছেদ্য বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে তাতে শেষ পর্যন্ত ক্ষতি রাজনীতিবিদদেরই। ওই অঢেল সম্পদশালী ও ভূমিদারদের তাতে বিশেষ ক্ষতি হবে না। যেকোনো বড় সংকটে দেশ থেকে তারা পালিয়ে যেতে পারবে, কিন্তু বিপদে ফেলে যাবে রাজনীতিকদের। যেমনটি ঘটেছিল ২৮ পৌষের (১১ জানুয়ারি ২০০৭) পরে। পাপাশ্রিত ধনসম্পদের মালিকদের কম পৃষ্ঠপোষকতা তারেক রহমান দেননি। সবচেয়ে বড় আঘাতটা লাগল তারেক রহমানেরই, তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় ধন্যদের নয়। সুতরাং গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও জনকল্যাণমূলক রাজনীতির স্বার্থে মুত্সুদ্দি পুঁজিপতিদের সঙ্গে সত্ ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকদের বন্ধুত্ব নয়, দূরত্ব রক্ষা করাই সুবুদ্ধির কাজ। সরকারি ও বিরোধী উভয় পক্ষের রাজনীতিকেরা বিষয়টি ভেবে দেখবেন।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

শিক্ষার পরিবেশ

উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর অনেক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। তারপর কেন পড়াশোনার এই স্পৃহা আর থাকে না? কিছুদিন থেকে প্রায়ই প্রকাশিত হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদ।
এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে যথেষ্ট বই নেই, আবাসিকব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; এমনকি হলরুম, গ্যালারি, ক্লাসরুম, সাউন্ড-সিস্টেম কিছুই নেই। সর্বোপরি শিক্ষার কোনো উপকরণই যথেষ্ট নয়। আটটি বিভাগে তিনটি শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে, অথচ যথেষ্টসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতির অশুভ তত্পরতাসহ নানা কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত দুরবস্থা দূর করে শিক্ষার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নিবেন এই প্রত্যাশা করছি।
জনৈক ছাত্র
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষানীতির সহজ পাঠ by মুহম্মদ জাফর ইকবাল

এবারের শিক্ষানীতি নিয়ে দেশের মানুষের অনেক আগ্রহ, খবরের কাগজ খুললেই দেখতে পাই, কোথাও না কোথাও সেটা নিয়ে সেমিনার বা আলোচনা হচ্ছে, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে। এটা খুব চমত্কার একটা ব্যাপার, দেশের মানুষ যদি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে আগে হোক পরে হোক, আমরা চমত্কার একটা শিক্ষাব্যবস্থা পাব, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
এ শিক্ষানীতিটা দাঁড় করানোর জন্য সরকার কিন্তু কোনো কমিশন তৈরি করেনি, সরকার একটা কমিটি তৈরি করেছে; সোজা কথায় সরকার এ কমিটির সদস্যদের বলেছে তাদের একটু সাহায্য করতে। শুধু তাই নয়, সরকার একেবারে গোড়া থেকে শুরু করে নতুন একটা শিক্ষানীতি তৈরি করতেও বলেনি, একেবারে পরিষ্কার করে বলে দিয়েছে, শিক্ষানীতি ২০০০-কে ‘অধিকতর সময়োপযোগী করে পুনর্গঠন’ করে দিতে। শুধু তাই নয়, সরকার এ কমিটিকে একেবারে সময় বেঁধে দিয়েছিল, কমিটি তাদের প্রথম মিটিং করেছে ৩ মে, কাজ শেষ করেছে সেপ্টেম্বরের ২ তারিখে। কেউ কেউ একে এক ধরনের তাড়াহুড়ো মনে করতে পারেন, কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, এটা খুব ভালো একটা পরিকল্পনা। সরকার যদি ডিসেম্বরের ভেতর কাজ চালানোর মতো একটা নীতি দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারে, তাহলে একে বাস্তবায়ন করার জন্য হাতে চার চারটা বছর পেয়ে যাবে, যেটা আগে কখনো কেউ পায়নি। সবচেয়ে বড় কথা, এ শিক্ষানীতিটা আগামী ১০০ বছরের জন্য পাথরে খোদাই করে ফেলা হচ্ছে তা নয়, এখানে পরিষ্কার করে বলা আছে, সময় আর অবস্থা বিবেচনায় এতে প্রয়োজনীয় রদবদল করা যাবে। এটা হচ্ছে শুরু।
শিক্ষানীতি পুনর্গঠনের যে কমিটি করে দেওয়া হয়েছিল, আমি এর একজন সদস্য ছিলাম, সরকারকে খসড়াটা না দেওয়া পর্যন্ত আমরা এটা কারও কাছে প্রকাশ করিনি। আমরা সরকারের তৈরি করে দেওয়া একটা কমিটি মাত্র, সরকার চাইলে আমাদের খসড়া নীতিটা নিজের মতো করে কাটছাঁট করে প্রকাশ করতে পারত—আমি ভেতরে ভেতরে সেটা নিয়ে এক ধরনের দুশ্চিন্তায় ছিলাম, কিন্তু সরকার তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার পর আমি অত্যন্ত স্বস্তি ও আনন্দের সঙ্গে আবিষ্কার করলাম, সরকার আমাদের দেওয়া নীতিমালাটাই একটা দাঁড়িকমাও পরিবর্তন না করে হুবহু প্রকাশ করেছে। এখন নানা ধরনের আলোচনা, সমালোচনা, সুপারিশ আসছে, আমরা আশা করব, সরকার সেগুলো হাতে নিয়ে খসড়াটাকে চূড়ান্ত করে নেবে। শিক্ষানীতি কমিটি তাদের দায়িত্ব পালন করে দিয়েছে, একে চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার জন্য সরকার কাদের দায়িত্ব দেবে আমরা এখনো তা জানি না।
খসড়া শিক্ষানীতিটা দেশে মোটামুটি একটা উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। এটা প্রণয়ন করার আগে আমরা অনেক সংগঠনের সঙ্গে কথা বলেছি, শিক্ষা নিয়ে আগ্রহী এ দেশের প্রগতিশীল মানুষেরা কীভাবে চিন্তা করেন, আমরা মোটামুটিভাবে সেটা বুঝতে পেরেছিলাম এবং আমাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব, সেভাবে শিক্ষানীতি ২০০০-কে পুনর্গঠন করেছি। খসড়াটা প্রকাশিত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়াকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এক ভাগ একে গ্রহণ করেছেন এবং একে পূর্ণাঙ্গ করার জন্য আরও কী কী বিষয় সংযোজন বা পরিবর্তন করা যায়, সে সুপারিশ করেছেন। অন্য ভাগ একে প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাঁদেরও দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এক ভাগ রাজনৈতিক বা ধর্মীয় কারণ দেখিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন (খবর পেয়েছি, মসজিদে মসজিদে এ শিক্ষানীতিকে প্রত্যাখ্যান করে ইসলামকে ‘রক্ষা’ করার একটা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।) অন্য ভাগ একে প্রত্যাখ্যান করেছেন এটা যথেষ্ট প্রগতিশীল নয় বলে, দুর্ভাগ্যক্রমে তাঁদের সমালোচনাটা আমার চোখে পড়েছে, কিন্তু ঠিক কোথায় কোথায় পরিবর্তন করে শিক্ষানীতিটা মোটামুটিভাবে কাজ চালানোর মতো করে ফেলা যায়, তাঁরা সে ব্যাপারে কোনো বক্তব্য রাখছেন না।
শিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহী বুদ্ধিজীবী কিংবা রাজনৈতিক কারণে এর বিরোধিতা করার জন্য কেউ কেউ একে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছেন, কিন্তু দেশের বেশির ভাগ মানুষ কিন্তু এখনো ঠিক করে জানে না, এর ভেতর কী আছে। এর কারণ, এ শিক্ষানীতিতে অধ্যায় রয়েছে ২৯টি, সংযোজনী সাতটি। সব মিলিয়ে পৃষ্ঠা ৯৭। অনেক তথ্য ঠেসে দেওয়া হয়েছে বলে রোমান্টিক উপন্যাসের মতো সহজ পাঠ্য নয়, যাঁদের কৌতূহল আছে, শুধু তাঁরাই হয়তো কষ্ট করে পড়বেন। ওয়েবসাইটে পিডিএফ করে দেওয়া হলেও ফন্টটি সংযোজন করা হয়নি, কাজেই কম্পিউটারে বাংলা ফন্ট না থাকলে এটা পড়ার উপায় নেই (শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ বিষয়টা খেয়াল করা উচিত ছিল)। পত্রপত্রিকায় ছাড়াছাড়াভাবে এর কিছু বিষয় লেখা হয়েছে, সেটা পড়ে পুরো শিক্ষানীতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আমার মনে হয়, দেশের সাধারণ মানুষেরও এটা জানা দরকার। যে মা তাঁর বাচ্চাকে দুই বেলা স্কুলে নিয়ে যান এবং ফিরিয়ে আনেন, যে বাবা তাঁর সন্তানের পড়ার খরচ কোথা থেকে আসবে তা নিয়ে দুর্ভাবনা করেন, কিংবা যে কিশোর বা কিশোরী প্রাইভেট আর কোচিংয়ে ছোটাছুটি করে গাইড বই মুখস্থ করতে করতে অবাক হয়ে ভাবে, এ দেশে কি একজন মানুষও নেই যে তাদের কথা ভাবেন—তাদের সবারই জানা দরকার শিক্ষানীতিতে কী আছে। আমি তাই খুব সংক্ষেপে শিক্ষানীতির কয়েকটা বিষয় এখানে লিখেছি। একবারে যেন পড়ে ফেলা যায়, তাই লেখাটা হবে ছোট এবং যেহেতু লিখছি ‘আমি’, তাই ‘আমার’ কাছে যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, সেগুলোই এখানে উঠে আসবে এ সীমাবদ্ধতাটুকু যদি কেউ মেনে নিতে রাজি থাকেন, তাহলে পড়তে শুরু করতে পারেন।
২.
প্রাথমিক বা প্রাইমারি শিক্ষা দিয়ে শুরু করা যাক। আমরা দেখেছি, এ দেশের বিত্তশালী মানুষের ছেলেমেয়েরা প্রাইমারি স্কুল শুরু করার আগে প্রি-স্কুলে এক-দুই বছর যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। এ শিক্ষানীতিতে দেশের সব শিশুর জন্য এক বছরের প্রি-স্কুল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং পরিষ্কার করে বলে দেওয়া হয়েছে, সেটা যেন হয় খুব আনন্দময় পরিবেশে। এ দেশে যত বাবা-মা আছেন, তাঁরা ছেলেমেয়েকে ভালো স্কুলের প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি করানোর জন্য তাঁদের বাচ্চাদের একটা ভয়ঙ্কর ভর্তি পরীক্ষার ভেতর দিয়ে নিয়ে যান। শিক্ষানীতিতে একটা শিশুকে এ রকম হাজারো রকম তথ্য মুখস্থ করিয়ে বিষয়ভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষাকে নিষিদ্ধ করতে বলা হয়েছে।
আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষা খুব দুর্বল, পাবলিক পরীক্ষাগুলো হয় ১০ বছর এবং ১২ বছরের মাথায়, তাই যেটুকু লেখাপড়া করতে হয় পরীক্ষায় ভালো একটা ফলের জন্য, সেটা তখনই করা হয়। প্রাথমিক স্তরের পর যদি একটা পাবলিক পরীক্ষা থাকত, তাহলে স্কুলগুলো সেই পরীক্ষায় ভালো করার জন্য হলেও লেখাপড়ায় মনোযোগী হতো। এখন প্রাইমারি স্কুল থেকে পাস করে বের হওয়া ছাত্র কতটুকু জানে সেটা সম্পর্কে কারও বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। তবে ক্লাস ফাইভের পরই একটা পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়, দশম শ্রেণীর পর যে প্রথম পাবলিক পরীক্ষা হয়, সেটাকে বরং অষ্টম শ্রেণীর পর নিয়ে আসা যেতে পারে। এটা করা হলে আরও একটা অনেক বড় ব্যাপার ঘটে যেতে পারে। শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছে, ‘প্রাথমিক শিক্ষা হবে সর্বজনীন, বাধ্যতামূলক, অবৈতনিক এবং সকলের জন্য একই মানের’ যার অর্থ আমাদের দরিদ্র দেশের দরিদ্র বাবা-মায়ের সন্তানেরা আরও তিন বছর সরকারের খরচে পড়তে পারবে।
আট বছরের প্রাথমিক শিক্ষা করার একটা বাস্তব দিকও রয়েছে। আর্থসামাজিক কারণে অনেক ছেলেমেয়েই পড়াশোনা শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যেতে পারে না, তাদের যদি জোর করেও অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে অন্তত সেই পড়ালেখাটা দিয়েও তারা কোনো একটা বৃত্তিমূলক কাজে ঢুকে যেতে পারবে। পাঁচ বছরের প্রাথমিক শিক্ষায় সেটা সম্ভব নয়। এসব কিছু বিবেচনা করে শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত বিস্তৃত করার কথা বলা হয়েছে। হুট করে সেটা করার কোনো পরিকল্পনা নেই; ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময় নেওয়া হয়েছে। এর জন্য অনেক অবকাঠামো দাঁড় করাতে হবে, অনেক শিক্ষকের নিয়োগ দিতে হবে। টাকাগুলো কোথা থেকে আসতে পারে, শিক্ষানীতিতে তারও একটা ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে (৭৯)।
প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত নেওয়া হবে, এর অর্থ এ রকম নয় যে এখন ছেলেমেয়েরা পঞ্চম শ্রেণীতে যেটুকু পড়ে, ভবিষ্যতে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত সময় নিয়ে সেটুকু পড়বে। অষ্টম শ্রেণীতে যা পড়া দরকার, তারা সেটাই পড়বে, আমরা সেটাকে বলব প্রাথমিক স্তর—এটাই হচ্ছে আসল কথা।
এবার প্রাথমিক শিক্ষায় দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বলা যায়—এতদিন সাধারণ, ইংরেজি মাধ্যম আর মাদ্রাসার সবাই নিজের নিজের বিষয় পড়েছে। এ শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছে, অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত মৌলিক কিছু বিষয় সবাইকে একইভাবে পড়তে হবে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে বিষয়গুলো শুরু হবে বাংলা ইংরেজি আর গণিত দিয়ে। তৃতীয় শ্রেণী থেকে শুরু হবে বাংলাদেশ স্টাডিজ, জলবায়ু পরিবর্তনসহ পরিবেশ (যার ভেতর বিজ্ঞানের সূচনা করা হবে) এবং ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা। অতীতে ধর্ম শিক্ষা দিতে গিয়ে ছোট বাচ্চাদের ঘোরতর সাম্প্রদায়িক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে, সে রকমটি যেন না ঘটে, তাই শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছে, ধর্ম শিক্ষার একটা গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘শিক্ষার্থীর বাংলাদেশের মূল চারটি ধর্ম সম্পর্কে পরিচিতি’ ঘটানো। শুরুতে একটা শিশু যদি অন্য ধর্ম সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়, তাহলে সে সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা নিয়ে বড় হতে পারবে। এ ছাড়া তৃতীয় থেকে যে নৈতিক ও ধর্ম শিক্ষা শুরু হবে, সেটা হবে জীবন আর গল্পের ভেতর দিয়ে। ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে আরও দুটি বিষয় যুক্ত হবে, সে দুটো হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি (এর সঙ্গে বিজ্ঞান) এবং একটি কর্মমুখী শিক্ষা। শিক্ষানীতির ভেতর আসলে এত খুঁটিনাটিতে যাওয়ার কথা নয়, কিন্তু ইচ্ছে করে এটি রাখা হয়েছে যেন সবাই বুঝতে পারে, কখন একটা বাচ্চা কী পড়বে। আমাদের দেশে ১৯৯৫ সালের পর কারিকুলামের কোনো পরিবর্তন করা হয়নি, শিক্ষানীতিতে তাই নতুন শিক্ষাক্রম আর পাঠ্যসূচির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং প্রাথমিক স্তরের ছেলেমেয়েদের হাতে যেন আকর্ষণীয় আর সুন্দর বই তুলে দেওয়া যায়, সেটার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত দেশের সব ছেলেমেয়ে মূল বিষয়গুলো একই শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিতে পড়বে, পাঠ্যবইগুলোও হবে এক। আমরা জানি, আমাদের দেশে দুই ধরনের ইংরেজি মাধ্যম চালু আছে, প্রচলিত ইংরেজি মাধ্যমে এসএসসি, অন্যটি ও লেভেল। এ শিক্ষানীতিতে ইংরেজি মাধ্যম রেখে দেওয়া হয়েছে কিন্তু তাদের ইংরেজি ভাষায় হলেও মূল বিষয়গুলো একই পাঠ্যসূচিতে পড়তে হবে। শিক্ষানীতিতে যখন মাদ্রাসা শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, তখন আলিয়া ও কওমি দুই মাদ্রাসাই বোঝানো হয়েছে। আলিয়া মাদ্রাসা আমাদের দেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অংশ হিসেবে আছে, কওমি মাদ্রাসাকে এর আওতায় আনা হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণ, ইংরেজি মাধ্যম বা মাদ্রাসা—প্রতিটা ধারাই মূল বিষয়ের বাইরে নিজেদের প্রয়োজনে বাড়তি বিষয় পড়াতে পারবে।
এবার পরীক্ষার বিষয়ে আসা যায়। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে কোনো আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা থাকবে না। তৃতীয় শ্রেণী থেকে বছরে দুটি অর্ধবার্ষিক আর বার্ষিক পরীক্ষা নেওয়া হবে। পঞ্চম শ্রেণীর পরীক্ষা হবে আঞ্চলিক, আর সেটার ওপর নির্ভর করে ছাত্রছাত্রীদের অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত বৃত্তি দেওয়া হবে। আগেই বলা হয়েছে, অষ্টম শ্রেণীর পরীক্ষাটা হবে পাবলিক পরীক্ষা, সেই পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর কর দশম শ্রেণী পর্যন্ত বৃত্তি দেওয়া হবে। শিক্ষানীতিতে খুব স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছে, পরীক্ষাগুলো হবে সৃজনশীল পরীক্ষাপদ্ধতিতে।
৩.
প্রাথমিক শিক্ষার পর স্বাভাবিকভাবেই আসে মাধ্যমিক শিক্ষার ব্যাপারটা। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন অবশ্যই সেটাকে ১২ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত করা। ১২ বছর পর গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষাটা হবে, তবে দশম শ্রেণীর পরীক্ষাটা পুরোপুরি স্কুলের একটা বার্ষিক পরীক্ষা হিসেবে রাখা হয়নি, আঞ্চলিক পরীক্ষা হিসেবে খানিকটা গুরুত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে দুই কারণে। প্রথমত এ পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে ছাত্রছাত্রীদের দুই বছরের জন্য বৃত্তি দেওয়া হবে, দ্বিতীয়ত কারিগরি শিক্ষায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ছাত্রছাত্রীরা দশম শ্রেণী শেষ করে পড়তে শুরু করবে, তাই এর খানিকটা গুরুত্ব আছে। শিক্ষাক্রম বা বিষয় তালিকায় খুব বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়নি, তবে কিছু যৌক্তিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। যেমন, বিজ্ঞান পড়ার জন্য উচ্চতর গণিত বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাবলিক পরীক্ষায় একটা বিষয় না হলে ছাত্রছাত্রীরা পাছে একটা বিষয়কে হেলাফেলা করে, সে জন্য সামাজিক বিজ্ঞানকে (যার ভেতর থাকবে বাংলাদেশ স্টাডিজ) একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীতে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
তবে আমার মতে, মাধ্যমিক শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটা এসেছে মাদ্রাসা শিক্ষায়। আগে তারা অনেক বিষয়ে কম পড়েই মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের সমান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, ব্যাপারটা তাদের জন্য মোটেও ভালো হয়নি। খুব সহজে অনেক বেশি নম্বর পেয়ে তারা এক ধরনের সুবিধা পেত সত্যি, কিন্তু উচ্চশিক্ষার সুযোগের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এ শিক্ষানীতিতে প্রথমবারের মতো তাদেরও অন্যদের সমান মানের লেখাপড়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। তারা শুধু যে মাধ্যমিক পর্যায়ের অন্যদের সমান লেখাপড়া করবে তা নয়, তারা আসলে একই প্রশ্নপত্রে একই সঙ্গে পরীক্ষা দেবে; শুধু মাদ্রাসার জন্য নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের পরীক্ষা নেবে মাদ্রাসা বোর্ড। কিছু বিষয় শিক্ষাবোর্ড, কিছু বিষয় মাদ্রাসা বোর্ড পরীক্ষা নেবে; সেটা কোনো ধরনের জটিলতা তৈরি করবে কি না সেটা নিয়ে কেউ কেউ আশংকা প্রকাশ করেছেন, তাঁদের আশ্বস্ত করার জন্য বলা যায়, কম্পিউটারের ডেটাবেইসে রাখা তথ্যগুলো যোগ-বিয়োগ করে এর চেয়ে অনেক জটিল বিষয় অনেক সহজে সমাধান করে ফেলা যায়।
শিক্ষানীতিতে বলা আছে, ১২ বছর পরের পাবলিক পরীক্ষা হবে সৃজনশীল পদ্ধতি এবং মূল্যায়ন হবে গ্রেডিং পদ্ধতিতে। এ পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে বৃত্তি দেওয়া হবে। বর্তমান গ্রেডিং পদ্ধতিতে মাত্র কয়েকটা ধাপ থাকার কারণে ছাত্রছাত্রীদের সূক্ষ্মভাবে মূল্যায়ন করা যায় না। সব বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রেডিংয়ের একটা অভিন্ন পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়েও সে পদ্ধতি চালু করা হবে, যেন দেশে একটা পদ্ধতি থাকে।
এ শিক্ষানীতিতে আমার একটা প্রিয় অংশ হচ্ছে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার বিষয়টুকু। অতীতে সব সময়ই আকার ইঙ্গিতে বা সোজাসুজি বলা হয়েছে, দেশের দরিদ্র মানুষেরা এ ধারায় লেখাপড়া করবে, যদিও এ দেশের জন্য এটা একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সত্যি কথা বলতে কি, এ ধারা থেকে বের হয়ে আসা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা দেশের উন্নয়নে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছেন। এ শিক্ষানীতিতে প্রথমবার বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষাকে তার প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে, এটা হচ্ছে অত্যন্ত দ্রুত জনশক্তি তৈরি করার ধারা, এমনকি ভবিষ্যতে কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করার জন্যও সুপারিশ করা হয়েছে।
বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা নিয়ে একেবারে অষ্টম শ্রেণী থেকে শুরু করে ছাত্রছাত্রীরা যেন বিভিন্ন দক্ষতা মান অর্জন করতে পারে, এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। একজন ছাত্র বা ছাত্রী বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার ধারায় এসে তার উচ্চশিক্ষার পথ যেন রুদ্ধ না হয়ে যায় সেটা নিশ্চিত করা হয়েছে।
বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষাকে অন্যান্য মাধ্যমিক শিক্ষার ধারার সঙ্গে সমন্বয় করে বিষয়গুলো নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এ ধারায় শিক্ষক-ছাত্রের অনুপাত হবে ১:১২ যদিও অন্যান্য ধারায় সেটি ১:৩০। আমাদের দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজে এখন একজন শিক্ষক মাঝেমধ্যে কয়েক শ ছাত্রছাত্রীকে পড়ান (কিংবা পড়ানোর ভান করেন)। তাঁদের কাছে ৩০ জন ছাত্রছাত্রীর একটা ক্লাসকে নিশ্চয়ই স্বপ্নের মতো মনে হয়। শিক্ষানীতিতে একটু স্বপ্ন দেখতে দোষ কী!
৫.
এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুব দুরবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছে, তাদের না আছে অবকাঠামো, না আছে জনবল, না আছে সম্মানজনক বাজেট। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমরা যখনই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিচিতি হই, তখন এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার করি, তাঁরা প্রায় সময়ই হাজার হাজার কোটি টাকার কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। আমরা কেউই অস্বীকার করি না যে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অনেক বেশি প্রয়োজনীয় হচ্ছে দেশের প্রাথমিক-মাধ্যমিক স্কুলের লেখাপড়া, কিন্তু শুধু সেগুলোর দিকে নজর দিতে গিয়ে এ দেশের উচ্চশিক্ষার দিকে ঠিক করে নজর দেওয়া হচ্ছে না—দেশের একটা বড় ক্ষতি হচ্ছে। যদি উচ্চশিক্ষার জন্য আলাদা একটা মন্ত্রণালয় থাকত, তাহলে হয়তো উচ্চশিক্ষার ব্যাপারটা আরও বেশি গুরুত্ব পেত। তাই এ শিক্ষানীতিতে উচ্চশিক্ষার জন্য একটা আলাদা মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ করা হয়েছে।
সাধারণভাবে উচ্চশিক্ষায় আমরা লেখাপড়া ও গবেষণা নিয়ে যা আশা করি, তার সবই এ শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছে। যে দুটো বিষয় আলাদা করে বলা যায়, তার একটা হচ্ছে কেন্দ্রীয়ভাবে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটা কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা। সারা দেশে ভর্তি পরীক্ষার ফরম বিতরণ ইত্যাদি নিয়ে যেসব ঘটনা ঘটছে, আমার ধারণা, এর কারণে সবাই নিশ্চয়ই এটা দেখতে চাইবে। দ্বিতীয় আরেকটা বিষয় শিক্ষানীতিতে স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছে, সেটা হচ্ছে, চার বছরের স্নাতক ডিগ্রিকে সমাপনী ডিগ্রি হিসেবে বিবেচনা করা। এমনিতেই সেশন জটের কারণে চার বছরের স্নাতক ডিগ্রি শেষ করতেই ছয়-সাত বছর লেগে যায়, তারপর সবাই স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্স ডিগ্রি করতে শুরু করেন, যার অর্থ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হতে হতে একজন ছাত্র রীতিমতো মধ্যবয়স্ক হয়ে যান। শিক্ষানীতিতে বেশ স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, উচ্চশিক্ষায় যাঁরা শিক্ষকতা করবেন, তাঁরা ছাড়া অন্য কারও মাস্টার্স করার কোনো প্রয়োজন নেই।
৬.
শিক্ষানীতির সব বিষয়কে এ ছোট আলোচনার মধ্যে আনা সম্ভব নয়; কিন্তু শিক্ষকদের মর্যাদা দেওয়ার জন্য এ শিক্ষানীতিতে যেসব প্রস্তাব রাখা হয়েছে, এর কয়েকটা উল্লেখ করা দরকার। এ শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে সচিবের পদমর্যাদার সমান করে এর সঙ্গে মিল রেখে বিশ্ববিদ্যালয় আর কলেজের অধ্যক্ষ আর শিক্ষকদের পদমর্যাদা নির্ধারণ করতে হবে এবং বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকদের বেতন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সমান করতে হবে। মাধ্যমিক আর প্রাথমিকের শিক্ষকেরা যদি প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন, তাহলে আট ও ১০ নম্বর গ্রেডে, আর যদি প্রশিক্ষণ না নিয়ে থাকেন, তাহলে এক ধাপ নিচের গ্রেডে বেতন নির্ধারণ করার কথা সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে।
দেশের প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকদের নিজের দায়িত্বের বাইরে অনেক ধরনের কাজ করতে হয় (শুনে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। গ্রামে স্যানিটারি ল্যাট্রিন কতগুলো আছে, মাঝেমধ্যে ক্লাসে পড়ানো বন্ধ করে সেগুলোও গুনতে হয়।) এ শিক্ষানীতিতে তাই বেশ স্পষ্ট করে বলে দেওয়া আছে, ছুটির সময় ছাড়া অন্য সময়ে তাঁদের এ ধরনের কাজে লাগানো যাবে না।
শিক্ষকদের নির্বাচনের জন্য একটা শিক্ষক নির্বাচন ও উন্নয়ন কমিশনের কথা বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে যোগ্য শিক্ষকদের নির্বাচন করে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টাও অনেক বিস্তারিতভাবে এ শিক্ষানীতিতে বলা আছে। শিক্ষা প্রশাসনে শিক্ষকেরা থাকেন না বলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নানা ধরনের যন্ত্রণা সহ্য করে, তাই এখানে খুব স্পষ্ট করে বলা আছে, ‘শিক্ষা প্রশাসনে একেবারে সচিব থেকে শুরু করে সকল স্তরে যোগ্য শিক্ষকদের নিয়োগ দিতে হবে।’
৭.
এ শিক্ষানীতি বা অন্য কোনো শিক্ষানীতিই আসলে বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতের সব বিষয়কে ধারণ করতে পারবে না। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য শিক্ষানীতিকে ক্রমাগত পরিমার্জন করতে হবে। এ দায়িত্বগুলো পালন করার জন্য সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্য এ শিক্ষানীতিতে আইনের মাধ্যমে একটা জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করার কথা বলা হয়েছে। যোগ্য শিক্ষক, শিক্ষানুরাগী, প্রশাসক বা জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশনের মতো একটা শক্ত শিক্ষা কমিশন তৈরি করে দেওয়া হলে সেই কমিশন দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সব সময় দেখেশুনে রাখতে পারবে।
৮.
শিক্ষানীতিতে যা যা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, এতক্ষণ আমি সেগুলো লেখার চেষ্টা করেছি। যাঁরা ধৈর্য ধরে এতক্ষণ পড়ে এসেছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন, আমি শিক্ষানীতির দর্শন বা আদর্শ অংশগুলো লিখিনি, লিখেছি অত্যন্ত বাস্তব বিষয়গুলো, যেগুলো সরাসরি আমাদের ছেলেমেয়েদের জীবনকে স্পর্শ করবে। আগেই বলা হয়েছে, আমার এ লেখাটা মোটেও শিক্ষানীতির পূর্ণাঙ্গ রূপ নয়, এটা ‘আমার’ দৃষ্টিতে দেখা অত্যন্ত খণ্ডিত একটা রূপ। লেখা শেষ করে আমি আবার শিক্ষানীতিটার মধ্যে চোখ বুলিয়ে গেছি, সাধারণ মানুষ যে বিষয়গুলোতে বা যে বাক্যগুলোতে আগ্রহী হতে পারে, সেগুলো কাগজে টুকেছি, টোকা শেষ হওয়ার পর গুনে দেখেছি, ৪০টা বিষয় লেখা হয়েছে। এ লেখায় ৪০টা নতুন বিষয়-বাক্য লেখা সম্ভব নয়, তাই ৪০টা থেকে বেছে ১৫টা বিষয় সংক্ষেপে লিখি—এক লাইনে, আমার ধারণা, যে কেউ বিষয়গুলোকে স্বাগত জানাবেন। বিষয়গুলো এ রকম:
১) শিক্ষাকে মুনাফা অর্জনের লক্ষ্য হিসেবে মুনাফা অর্জনের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। ২) আদিবাসী বা ক্ষুদ্র জাতি-সত্তার ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য তাদের ভাষায় কথা বলতে পারে, এ রকম শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে এবং তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে যেন বিকাশ করতে পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। ৩) লেখাপড়ার বিষয়টা এমনি এমনি ছেড়ে না দিয়ে প্রত্যেক শ্রেণী বা বিষয়ে আগে থেকে প্রান্তিক যোগ্যতা ঠিক করে নিয়ে সেই যোগ্যতা অর্জন করার লক্ষ্যে লেখাপড়া করতে হবে। (১২ বছর ইংরেজি পড়ে অনেকে এক লাইন ইংরেজি লিখতে পারে না এ রকম ব্যাপার যেন না ঘটে।) ৪) প্রাইমারি স্কুলে অনেক বাচ্চা ঝরে পড়ে, তারা স্কুলে আসে ক্ষুধার্ত হয়ে, ফিরে যায় ক্ষুধার্ত থেকে। কাজেই দুপুরে স্কুলে গরম খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। গরম খাবার কথাটা লেখা হয়নি, বোঝানো হয়েছে। ৫) পশ্চাত্পদ এলাকার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে হবে, যেমন, হাওর এলাকায় বর্ষার পানি নেমে আসে, সবাই পানিবন্দী হয়ে যায়। তাদের জন্য বা তাদের মতো অন্যদের জন্য আলাদা সময়সূচি করতে হবে। ৬) মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীদের প্রজননস্বাস্থ্য শিক্ষা দিতে হবে, শিক্ষানীতির নারীশিক্ষা অধ্যায়ে এটা আরও একবার লেখা হয়েছে বলে অনেকের ধারণা হয়েছে, এটা বুঝি শুধু মেয়েদের জন্য বলা হয়েছে; আসলে সবার জন্যই বলা হয়েছে। ৭) আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেভাবে গবেষণা হয় না, কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো আন্ডারগ্র্যাজুয়েট বিশ্ববিদ্যালয়। সব বিশ্বব্যািলয়ে গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম শুরু করে জোরেসোরে গবেষণা করার কথা বলা হয়েছে। ৮) তথ্যপ্রযুক্তির কথা বলা হলেই আমরা সবাইকে কম্পিউটার শেখানোর কথা বলি, কিন্তু কম্পিউটার যে আসলে একটা ‘টুল’ এবং লেখাপড়া শেখানোর জন্য যে কম্পিউটারকে নানাভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটা আমরা লক্ষ করি না। শিক্ষানীতিতে সেটা সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ৯) আমাদের অনেকের ধারণা, মেয়েরা শুধু মেয়েলি বিষয় পড়বে (যেমন গার্হস্থ্য বিজ্ঞান) শিক্ষানীতি সেটাকে পুরোপুরি বাতিল করে বলেছে, মেয়েদের লেখাপড়ার পূর্ণ স্বাধীনতা আছে, তাদের যেটা ইচ্ছে সেটা পড়বে, কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া যাবে না। ১০) এতদিন প্রতিবন্ধীদের লেখাপড়া ছিল সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে, এটাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার কথা বলা হয়েছে। ১১) প্রতিটি প্রাইমারি স্কুলে লাইব্রেরি তৈরি করে ছোট বাচ্চাদের হাতে গল্পের বই তুলে দেওয়া হবে। ১২) জেনারেল এরশাদের আমলে বাংলাদেশের স্কুলের লাইব্রেরিয়ান পদটি বাতিল করে দেওয়ায় সারা দেশে কোনো হাইস্কুলে আর কার্যকর লাইব্রেরি নেই। লাইব্রেরিয়ানের পদ সৃষ্টি করে সব হাইস্কুলে আবার নতুন করে লাইব্রেরি কার্যকর করতে হবে। ১৩) এখন বোর্ডের বই লেখার জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, কয়েকজন লিখে জমা দেন, একজনেরটা বেছে নেওয়া হয়। তা না করে যাঁরা আসলেই ভালো বই লিখতে পারবেন, তাঁদের খুঁজে বের করে বই লেখার দায়িত্ব দিতে হবে। ১৪) স্কুল কমিটিতে নারী অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে সেগুলোকে আরও বেশি কার্যকর করা হবে। ১৫) ২০০৮-০৯ সালে শিক্ষার জন্য জাতীয় আয়ের মাত্র ২ দশমিক ২৭ শতাংশ খরচ করা হয়েছে, যদিও ‘ডাকার ফ্রেমওয়ার্ক’ অনুযায়ী বাংলাদেশ শিক্ষার জন্য জাতীয় আয়ের ছয় শতাংশ ব্যয় করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। সরকারকে দ্রুত তার অঙ্গীকার পালনের কথা বলা হয়েছে।
পাঠকদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটার আগে থামা উচিত। ধর্মান্ধ মানুষেরা এর মধ্যেই এ শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে মাঠে নেমে পড়েছে। যারা মনে করেন, বাংলাদেশটা ধর্মান্ধ মানুষের নয়, আমাদের, তাঁদের হয়তো মাঠে নামার প্রয়োজন নেই, কিন্তু তাঁরা যেন নিজেদের পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারগুলো অন্যদের জানাতে দ্বিধা না করেন।
আমাদের পরের প্রজন্মকে যেন আমরা চমত্কার একটা শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে যেতে পারি, সে দায়িত্ব কিন্তু গুটিকতক মানুষের নয়—এ দেশের সবার।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

বাপ্পী থেকে মাসুম—র‌্যাবের হাতে কেউই নিরাপদ নয় -সাংবাদিক নির্যাতন

যে নিষ্ঠুরতার শেষ দেখা যাচ্ছে না, র‌্যাবের ‘অপরাধ দমন’ হয়ে উঠছে তারই শিরোনাম। যাদের দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তারাই জনমনে তৈরি করছে নিরাপত্তাহীনতার বোধ। ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এর সাংবাদিক এফ এম মাসুমকে আটক-নির্যাতন র‌্যাবের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের সাম্প্রতিক নজির।
এফ এম মাসুমকে যে উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাঁর সাংবাদিকতার পরিচয় সম্পর্কে সজ্ঞান হয়েই তাঁকে নিপীড়ন করা হয়েছে, তা ভাবা অমূলক নয়। তাঁকে সবার সামনে প্রহার করে তাঁর ঘরে মাদকদ্রব্য রেখে তা ভিডিওতে ধারণ করা এবং মাদকব্যবসায়ী হিসেবে অভিযুক্ত করার মতো কাজ যে কোনো আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা করতে পারে, এটা অভাবনীয়। কিন্তু এই অভাবনীয় অমানবিক কাজই করা হয়েছে।
অপরাধী ও আইনের রক্ষকদের আচরণের মধ্যে পার্থক্য লোপ পেলে কেবল আইনের শাসনই হুমকিগ্রস্ত হয় না, সমাজের মানবিকতার ভরসাটাই ভেঙে পড়ে। আইনের নামে এ রকম ক্ষমতার অপব্যবহার ঘটলে, রক্ষক এভাবে ভক্ষকে পরিণত হলে নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা বলে কিছু আর থাকে না। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন তখন মিথ্যা হয়ে যায়। কিছুদিন আগে র‌্যাবের ‘ক্রসফায়ারে’ নিরপরাধ যুবক বাপ্পী নিহত হওয়ার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সাংবাদিক নির্যাতনের এই ঘটনা সেই কঠিন সত্যই প্রকাশ করে গেল।
আরেক দিক থেকে এ ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। সব সরকারের আমলেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে সাংবাদিক ও সংবাদ-প্রতিষ্ঠানগুলো আক্রান্ত হয়েছে। এ বিষয়ে অপরাধী গোষ্ঠী আর সরকারি সংস্থার আচরণ অনেক সময়ই একাকার হয়ে যায়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন এ ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে, অন্যায় ঘটে থাকলে তার জবাবদিহির আশ্বাস দিয়েছেন এবং দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এর আগে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদকে পুলিশ আহত করলে তিনি একইভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন। উপর্যুপরি এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে দুঃখ প্রকাশ করা কৌশল হিসেবে ভালো হতে পারে, কিন্তু এটা নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় বহন করে না। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এ ধরনের দুঃখ প্রকাশ অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। আমরা দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নিশ্চয়তা ও তার বাস্তবায়ন দেখতে চাই।

সিইসির প্রস্তাব যৌক্তিক, আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিন -নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ পদ্ধতি

প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন, কিন্তু এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতার বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনারদের ওপর। তাঁরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে চাইলেই বলা যায়, প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃত অর্থে স্বাধীন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে নির্বাচন কমিশনারদের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনাররা কীভাবে নিয়োগ পেতে পারেন, সে ব্যাপারে একটি প্রস্তাব দিয়েছেন বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার। সামগ্রিক বিচারে তাঁর এই প্রস্তাবকে যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়। তখন যাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। একটি নিরপেক্ষ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিয়ে তাঁরা প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতাকে উঁচুতে তুলে ধরতে পেরেছেন। প্রতিষ্ঠানটি তার এই ধারা অব্যাহত রাখুক—এটাই প্রত্যাশিত। বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের আমলেই নির্বাচন কমিশনের কমিশনারদের মেয়াদ শেষ হবে। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে যাতে অহেতুক কোনো বিতর্ক ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন না ওঠে, সে জন্য কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি কার্যকর ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি বেছে নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার যে প্রস্তাব রেখেছেন, তাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য একটি সংসদীয় কার্য-উপদেষ্টা কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। স্পিকারের নেতৃত্বে এই কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর নেতারা থাকবেন। এই কমিটি থেকে নির্বাচন কমিশনারদের নাম প্রস্তাব করা হবে। আমরা মনে করি, সরকারি ও বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণে এ ধরনের একটি কমিটির মাধ্যমে নাম প্রস্তাব করা হলে কমিশনারদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কা অনেক কমে যাবে। সব পক্ষের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যাঁরা কমিশন গঠন করবেন, তাঁদের পক্ষে সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে নির্বাচন পরিচালনা ও প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সরকারি দল ও বিরোধী পক্ষের মিলেমিশে একমত হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি আমাদের রাজনীতিতে বিরল। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে দুই পক্ষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ থাকলে এবং আলোচনার মাধ্যমে একমত হওয়া গেলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তা গুণগত পরিবর্তনের সূচনা ঘটাতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেরাই একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন করতে পারে, তবে এ ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বাইরের কোনো শক্তির হস্তক্ষেপের আশঙ্কা অনেক কমে যাবে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো প্রকৃত অর্থেই তা চায় কি না, সেটা তাদের প্রমাণ করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক মহলের মধ্যে আলাপ-আলোচনা জরুরি। সবচেয়ে বড় কথা, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ ব্যাপারে মতৈক্য হতে হবে। একটি শক্তিশালী ও প্রকৃত অর্থে স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অবস্থান ধরে রাখতে এ ধরনের উদ্যোগের বিকল্প নেই।

তাঁরা ডাক্তার হয়ে কী করবেন -রোগী বাঁচাবেন, না মারবেন

শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রনেতা নামধারী ব্যক্তিরা যখন হল দখল, টেন্ডারবাজিসহ নানা অন্যায় কাজে লিপ্ত হন, তখন উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। কিন্তু আরও বেশি উদ্বিগ্ন হতে হয়, যখন দেখি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা এসব অসত্ উদ্দেশ্যে নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছেন। শনিবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। নবীন শিক্ষার্থীদের নিজ দলে টানার প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত সহিংসতায় রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে কর্তৃপক্ষ দুপুরেই অনির্দিষ্টকালের জন্য কলেজ বন্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু সংঘর্ষের জের চলতে থাকে রাত পর্যন্ত। ছাত্রাবাসের কয়েকটি কক্ষে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। কয়েকজন শিক্ষার্থীও আহত হন।
শুধু চট্টগ্রামে নয়, একই দিন ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজেও প্রথম বর্ষে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের শুভেচ্ছা জানানোকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে মৃদু হাতাহাতি ও পরে রাতে ছাত্রাবাসে সংঘর্ষ হয়। এখানেও বেশ কয়েকটি কক্ষ ভাঙচুর করা হয়। গতকাল দুপুরে সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে ক্লাস বর্জন করেন। তাঁরা অধ্যক্ষের কক্ষের সামনে অবস্থান নেন। ছাত্রাবাসে হামলা ও ভাঙচুরের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কলেজের ডিন ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠকে বসেন অধ্যক্ষ।
এ ধরনের ঘটনা নতুনও নয় শেষও নয়; বিচ্ছিন্ন তো নয়ই। দল বা ব্যক্তির প্রভাববিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব সংঘর্ষ বাধে। কারণ প্রভাব বজায় রাখতে পারলে চাঁদাবাজি-দখলবাজির সুবিধা। অথচ দেশের সেরা শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মেডিকেল কলেজগুলোতে ভর্তির সুযোগ পান। তাঁরাই যদি এ রকম অপরাধমূলক কাজে যুক্ত হয়ে পড়েন, তাহলে তাঁদের কাছে আমরা কী আশা করতে পারি? পাঁচ বছর পর তাঁরা ডাক্তার হয়ে যে চিকিত্সাসেবায় নিয়োজিত হবেন, সেখানে তাঁদের মনোভাবে ‘সেবা’ বলতে কিছু অবশিষ্ট থাকবে কি? তাঁরা মানুষ বাঁচানোর আদর্শ বহন করতে পারবেন কি? রোগী বাঁচাবেন, না মারবেন?
সবাই মারামারি করেন না, সবাই অন্যায় কাজে যুক্ত হন না, এটা সত্য, কিন্তু তাতে নিরুদ্বিগ্ন থাকার উপায় নেই, এটাও সত্য। কারণ গুটিকয় উচ্ছৃঙ্খল শিক্ষার্থীর সহিংসতার কাছে সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত জিম্মি। ইচ্ছা থাকলেও তাঁরা কিছু করতে পারেন না। ক্ষমতাসীন মহল অনেক সময় কিছু শিক্ষার্থীর এসব অসত্ কাজে উত্সাহ দেয়। দলের লোক—এই যুক্তিতে বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়।
এর পরিণাম হয় ভয়াবহ। আজ শিক্ষার্থী হিসেবে মারামারি করেন, কাল ডাক্তার হয়ে হাসপাতালে ওই একই উদ্দেশ্যে মারামারিতে জড়িত হন। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এ রকম ঘটনা কয়েক বছর ধরে চলছে। এর গোড়াপত্তন হয়েছে ছাত্রাবস্থায়, মেডিকেল কলেজগুলোতে।
শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা নিন্দনীয়, তবে বিশেষভাবে নিন্দনীয় মেডিকেল কলেজগুলোতে হানাহানি। মানুষ বাঁচানোই যাঁদের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত, তাঁরা কেন পরস্পরের বুকে গুলি চালাবেন বা লাঠালাঠিতে মাতবেন? যাঁরা হানাহানি করতে চান, তাঁদের অন্য কোথাও যেতে হবে, মেডিকেল কলেজ তাঁদের জন্য নয়।