Friday, April 11, 2014

ভ্রান্তময় জগতের গল্প

একটা উপন্যাস হাতে এলে এর ভেতরের গল্পটা কী- তা জানার ইচ্ছা জাগে। একটা গল্প- মানুষের, অ-মানুষের, না-মানুষের অথবা কোনো জীবের বা কোনো জড়ের অথবা কোনো গল্পই নেই হয়তো তাতে। এসব বিষয় তাড়িত করে বৈকি, নতুন কিছুর খুঁজ তাতে আছে কি না, তা জানার বাসনা জাগে।
আর পড়তে শুরু করলে বর্ণনা, গদ্যের গঠন, সংলাপ ইত্যাদি লেখাটি পড়তে তাড়িত করে, আবার অনেক সময় থেমে যেতেও ভূমিকা রাখে। পাঠকভেদে নিশ্চুয় রুচির তারতম্য রয়েছে। যা হোক, জাবেদ আমিনের এই ভ্রান্ত মৌনতায় পড়তে শুরু করার আগে শিরোনামটা এক প্রকার অনাগ্রহ জাগায়। মনে হয়, এই নামটা তো মনে বিশেষ কিছুর উদ্রেগ করেনি, দাগ কাটেনি। তবে পড়তে শুরু করা মাত্র গল্প টেনে নেয়। মনে হয় ঝরঝরে, সরল অথচ গাঁথুনি শক্ত তেমন এক গদ্যের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
তেমনি এক গল্প রয়েছে উপন্যাসটিতে। আকাশ একটি চরিত্র, যার উপস্থিতি উপন্যাসজুড়েই। শ্রাবণী একটি চরিত্র- খানিকটা রহস্য, উচ্ছলতা, আরবানিটি ইত্যাদি ঘিরে আছে যাকে। এর বাইরে নানা গল্প, বাঁক ইত্যাদি উপন্যাসটিকে একটি আকর্ষণীয় চরিত্রটি দিয়েছে। একদিকে আকর্ষণীয় করেছে বটে, কিন্তু অন্যদিকে অতিনাটকীয়তা উপন্যাসটিকে ঠেলে দিয়েছে খানিক বিপজ্জনক জায়গায়। কেননা, আকাশ আমেরিকা থেকে ফেরার পথে তার বাবার মেয়ের (প্রথম স্ত্রীর) তার প্রতি অনুরাগ এক প্রকার অস্বস্তি তৈরি করে। আবার আরবানিটির যে ব্যাপার, সে ক্ষেত্রে এতে অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু তার জন্য ভিত্তিটা তৈরি হওয়ার আগেই গল্পটা শেষ হয়ে যায়। সবমিলিয়ে লেখক একটি কাহিনীর বর্ণনা দিতে চেয়েছেন। সে ক্ষেত্রে শুরুর মনোযোগটা শেষ পর্যন্ত একইরকম থাকেনি বলেই মনে হয়েছে। তবে শুরুতে যে গদ্যের আভাস, তাতে তাকে সম্ভাবনাময় বলাই যায়। এটি তার প্রথম উপন্যাস। নিশ্চুয় পরেরগুলোতে আরও অন্যরকম গল্প, ভঙ্গী ইত্যাদির সন্ধান আমরা পাব।
এই ভ্রান্ত মৌনতায় : জাবেদ আমিন, প্রচ্ছদ : ধ্র“ব এষ, প্রকাশক : অনন্যা, মূল্য : ১৩০ টাকা।
ফারুক আহমেদ

অক্ষৌহিণী শিল্পের উন্মুক্ত দুর্গ

সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতি বিষয়ক ছোট কাগজ অক্ষৌহিণী (সম্পাদক : ড. সোলায়মান কবীর, নির্বাহী সম্পাদক : আহমেদ বাসার) বের হল এবারের (২০১৪) বইমেলায়। দীর্ঘ বিরতির পর প্রকাশ পেল এর তৃতীয় সংখ্যা। এই অনিয়মিত হয়ে যাওয়া লিটল ম্যাগাজিনের হরহামেশা সত্য আমাদের দেশে। শুধু নিজেদের আকাক্সক্ষা, আগ্রহ, শিল্পের অসীম অনুরাগ ছাড়া শিল্প-সাহিত্যের এ কাজটি সম্ভব নয়। কেননা কোনো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এখানে নেই, নেই বিজ্ঞাপনী অর্থের সমাহার। তবুও দীর্ঘকালের একটি আগ্রহকে মনের ভেতর পুষে রেখে সবাইকে নতুন করে জাগানো কম কৃতিত্বের কথা নয়। শিল্পের প্রতি একান্ত আত্মনিবেদনই কেবল এখানে কার্যকর সত্য।
একটা গভীর তাৎপর্য ব্যতিরেকে সাহিত্যপত্র নামাঙ্কিত হয় না। অক্ষৌহিণীর বিরাট চক্রব্যুহে কালিক সীমানার প্রসঙ্গটি জ্বলজ্বলে। সেই সঙ্গে যাপিত মানুষের দ্রোহ, জীবনযুদ্ধ কিংবা সংগ্রামশীল সত্তা এর প্রতিটি লেখায় স্পষ্ট। আর লিটল ম্যাগাজিন তো তাই-ই। কালের সত্যকে উপস্থাপন না করে তার উপায় নেই। কোনো কথাকে বাসী করা এখানে চলে না।
আমাদের পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত গণ্ডির সঙ্গে আরও বিস্তৃত বহু বিষয়-আশয় অথবা ভূগোল এখানে সন্নিবেশিত। অক্ষৌহিণীতে এই বিচিত্রতাকে ধরার মানসিকতা সম্পাদনা পর্ষদের সুচিন্তিত ভাবনার ফসল। আর লেখক যারা কীনা এর রচনার অংশীদার বলাবাহুল্য, তারা বহুভঙ্গিম ও বহুবিধ সম্ভাবনাকে একত্রীভূত করেছেন। এটা পূর্ব ঘোষিত নয়, পুনরায় হয়ে উঠবার প্রসঙ্গ। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা- এই ত্রিভূবনের বাংলাভাষী লেখকরা এখানে শিল্পের সমপঙ্ক্তিতে দণ্ডায়মান। শিল্পের এত শাখায় শিল্পী-সাহিত্যিকদের লেখা অন্তর্ভুক্ত করাও রীতিমতো যুদ্ধঘোষণা করার শামিল। কারণ সম্পাদক মহাশয়দের এতে জেরবার হওয়ার অবস্থা।
তবে এখানে সত্তরের সাহিত্য মূল্যায়নের পর্বটি সংক্ষিপ্ত না হয়ে বিস্তৃত হতে পারত। তবুও আমাদের প্রতিনিধিত্বশীল ভাবুক-চিন্তক তাদের বক্তব্যে মহল যার যার বিশেষত্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষ সংখ্যা ছাড়া এ সময়ের লিটলম্যাগ সম্পাদক নন শুধু, গ্রন্থও করতে চান না। অন্যদিকে প্রকাশকদের হৃদযন্ত্রের অবস্থা সহজগ্রাহ্য। অক্ষৌহিণী তার বর্তমান সংখ্যাটিতে আমাদের সত্তরের সাহিত্যের বিশেষ মূল্যায়ন পর্বটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার। রফিকুল্লাহ খান, সুশান্ত মজুমদার, আলী রিয়াজ ও পারভীন জলি এ পর্বটি সম্পন্ন করেছেন। সত্তরের বাংলাদেশ তা সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে গৌরবান্বিত, কতটা শিল্পিতভাবে উপস্থাপিত এমনকি দুর্বলতায় অধ্যুষিত এর চমৎকার মূল্যায়ন করেছেন এবং গুরুত্ববহ সিদ্ধান্ত তারা উপস্থাপন করেছেন।
প্রবন্ধে উপনিবেশের সাহিত্য, উপনিবেশ বিরোধিতার প্রসঙ্গকে বৈশ্বিক আবহে যথেষ্ট বোধগম্য করে চিহ্নিত করেছেন মহীবুল আজিজ। কবি নুরুল হুদা তার প্রবন্ধে আমাদের কবিতা, কবিতার আন্দোলন, এর উচ্ছ্বাস কিংবা থিতিয়ে যাওয়া, সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে নিমিজ্জত স্বদেশ, শিল্প-আয়োজকদের সংকীর্ণতার ত্র“টি প্রভৃতি আশা ও নিরাশার দারুণ সব সত্য কথা বলেছেন। সাইমন জাকারিয়া আমাদের দেশীয় নাট্যাঙ্গিক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন নাট্যজন সেলিম আলদীনকে নিয়ে। প্রসঙ্গত ভিন্ন সংস্কৃতির জনগোষ্ঠীর কথা এখানে অন্যতম বিবেচ্য। গল্পকার মঞ্জু সরকার, সেলিনা হোসেন কিংবা আরও কজনের গল্পে আমাদের বাংলাদেশের বঞ্চিত মানুষ ও সংশ্লিষ্টজনের সুখ-দুঃখের অমর প্রসঙ্গ গভীরভাবে নাড়া দেয়। রায়হান রাইনের অনুবাদ কেরালার কবি বালাচন্দ্রন চুল্লিক্কাদের কবিতা আমাদের কন্টিনেন্ট সাহিত্যের আরেক বিশ্ব।
সৃষ্টিশীল সাহিত্যে সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় অংশ কবিতাভাগ। এ ছাড়াও অনুবাদ কবিতা, মুক্তগদ্য, গল্প, গ্রন্থালোচনা প্রভৃতি নানামাত্রার লেখা অক্ষৌহিণীর এ সংখ্যায় এনে দিয়েছে বৈচিত্র্যের স্বাদ। বাংলার তিন ভূবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবিদের লেখা, কলাকুশল, ধরনের বিচিত্রতা, গুচ্ছকবিতা নানা প্রসঙ্গেই কবিতা ভাগটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। আমাদের কবিতার অনেক উজ্জ্বল মুখই এখানে স্থান করে নিয়েছেন। পুরাণে অক্ষৌহিণী ২১৮৭০০ সংখ্যক সেনাবিশিষ্ট বিরাট যোদ্ধাদলের নাম। আয়োজনে অক্ষৌহিণীর সম্পাদনা পর্ষদ সে বিষয়টিকে হয়ত মাথায় রেখেছিলেন। বিচিত্র প্রসঙ্গে, নানামাত্রিক ভাবনায়, বিষয় বিন্যাসে, শৈল্পিক অনুভববেদ্যতায় সংখ্যাটি আমাদের লিটলম্যাগ সাহিত্য চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বলে বিবেচিত হওয়ার প্রত্যাশা রাখে। অক্ষৌহিণীর এই ধারা অব্যাহত থাকুক। তার সৈন্য সেনা দলের সংখ্যা, সাহিত্যমূল্য ও কলেবর বৃদ্ধি হয়ে শিল্পপত্রটি মহীরুহ হয়ে উঠুক এটাই চাওয়ার।
খোরশেদ আলম

কবি by নেয়ামতউল্যাহ

রুবেল হয়েছে ক্লাবের সভাপতি; তাও শিশু-কিশোর ক্রীড়া সংগঠন। পরিচিত শিশুরা রুবেলের নাম শুনলেই ভয় পায়; দেখলে গোপনে লুকায়; বৃদ্ধরা রুবেলের নাম শুনে লুঙ্গি নষ্ট করে; যুবক-কিশোর রাস্তার বাইরে অযথাই সাইড দিতে গিয়ে গর্তে পড়ে। রুবেল রাজনৈতিক দলের অস্ত্রধারী ক্যাডার; সে-ই এখন পাড়ার ক্লাব সভাপতি; ভাবতেই আতংক! রুবেলকে দেখলেই মানুষ অযথা নতুন নতুন গল্প তৈরি করে; অনেক হাসি-ঠাট্টা মেশানো, চটকদার।
ক্লাব সভাপতি হয়ে অভিষেক অনুষ্ঠানে স্টেডিয়ামে কনসার্টের আয়োজন করেছে রুবেল; সঙ্গে ভূরি ভোজ ও ভূরি পানিয়ের। পানীয় শুধু উঁচু লেবেলের মানুষের, যারা ভগবানের মস্তক থেকে সমাজে পয়দা হয়েছেন। এ উঁচু লেবেলের মানুষের মধ্যে কিছু সুশিল রয়েছেন; যারা সংস্কৃতিচর্চা করেন; সিদ্ধিতে দম দেন; ইদানীং বাবা সেবন করে নিজেকে নিশাচর প্রাণী করে তুলে সৃষ্টি ছাড়া সংস্কৃতিবান মনে করছেন।
যাই হোক কনসার্টের মাইকিংয়ে বলা হয়েছে ঢাকা থেকে আগত শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করবেন। তাই দর্শকের ভিড়। উঁচু লেবেলের সঙ্গে যারা সুশিল রয়েছেন তার মধ্যে ব্রাহ্মণীয় আছেন, তাদের একজন আমাদের সবার প্রিয় ননী গোপাল চক্রবর্তী; লোকে বলে ননীবাবু। উনি দেব-দেবতা,ধর্ম মানেন না; মানেন না গরু এবং ছাগলের জাত; সব তিনি এক ছুরিতে কেটে, রাঁধেনও এক চুলোয়। এক চুলায় যখন রাঁধা তখন এক পেটে যেতে কেন বাধা। বলুন! ওর কাছে শুনতে পেলাম ঢাকা থেকে যিনি গান গাইতে এসেছেন তিনি আড়ালের গান পরিবেশন করেন, যে কথা কেউ বলে না; অথবা শুনতে পছন্দ করেন কিন্তু মানতে দারুণ নারাজ। ঢাকা থেকে আগত ব্যান্ডের নাম দেউরক্যা ব্যান্ড শিল্পি।
কনসার্ট শুরু হল নির্ধারিক সময়ে; প্রথমে যে গানটি হল- সেটি তথাকথিত রাজনীতিবিদ, সমাজের অনাচার, অন্যায় এসব নিয়ে; গানের কথা অসাধারণ। দর্শকদের মনে কি রকম সাড়া দিল, কি দিল না, তা নাইবা বললাম। বিনে পয়সায় গান শোনানোর একটা সুবিধা আছে, তা হল, শিল্পি যা শোনাবে, তাই শুনতে হবে। কিছু শ্রোতা সব সময় প্রতিবাদী, কিছু শ্রোতা ওই দেউরক্যা শিল্পিদের গানই শুনতে গিয়েছিল; তারা আরও শোনার জন্য শিল্পিদের উৎসাহিত করল; কিছু দর্শক উল্টো কাজ করে বসল। তারা দেউরক্যা শিল্পিদের উদ্দেশে ভুয়া, বাড়িত যান, উকুন, এডি যাইয়্যা ডাকাত গান, টান দিছেননি জাতীয় মন্তব্য করল। এ একটু উশৃংখল নাচা-গানা দেখার জন্য এ সুযোগে আয়োজক গোষ্ঠী তাদের চেলাদের দিয়ে কটূক্তি কর্ম সম্পাদনের মাত্রা বাড়িয়ে দিল। বেফাঁস চেলাদের নিয়োজিত করল দর্শক সারিতে, মঞ্চের পেছনে, আশপাশে; চেলাদের কটূক্তি সীমাছাড়া হলে উপস্থাপক; (যিনি উপস্থাপক না ক্যানভাচার, তাই সন্দেহ হতে লাগল) পড়ে সদ্য হওয়া সভাপতি ও সংস্কৃতিসেবী ননীবাবু উশৃংখল দর্শকদের না থামিয়ে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বললেন, ঢাকা থেকে আগত শিল্পীদের ধন্যবাদ! দর্শক চাইলে পরে আরও গান শোনাবেন দেউরক্যা ব্যান্ড শিল্পিরা।
কি আর করা আড়ালের শিল্পিরা মঞ্চের আড়ালে চলে গেলেন।
২.
পর্দার ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, ঢাকা থেকে আসা শিল্পী ধামাকা-২০ অর্ধনগ্না বসে আছে (বিশ কি বিষ বলতে পারব না; তবে একবার দেখলে দারুণ সেঁদিয়ে শরীরের পরতে পরতে উত্তেজনা সৃষ্টি করে)। বের হয়ে আসা ছাড়া উপায় নেই। দর্শক সারিতে বসলে মঞ্চে আসেন শিল্পী ললিতা। একজন দর্শক-শ্রোতা বললেন দ্যা ... খ! কি বড় নাবিডা, খাইতো ইচ্ছা করে। অনেকে যাত্রার নায়িকাদের দেখে যেমন শিস বাজায়, তেমনি শিস বাজালেন। ললিতা প্রথমে এসেই গাইলেন, তুমি বাসর রাতে দিয়োনাকে বাত্তি নিবাইয়্যা ... আর দর্শক শ্রোতাদের বাঁধ ভাঙা উল্লাশ। যেন আকাশ ভেঙে যাবে। রাতের পাখিরা ঘুম ভেঙে বাসা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে; যেমন এলাকায় কোনো বিপদ হলে, আগুন লাগলে কিম্বা ঝড় এলে পাখিরা বেরিয়ে পড়ে। মেতে ওঠে রাতের ভোলা।
৩. যারা আড়ালের গান গায়; সত্তার গান গায়; জীবনের গান গায়; সেই দেউরক্যা ব্যান্ড দলের শিল্পিরা বেরিয়ে এলেন; তাদের সঙ্গে কিছু দর্শক বেরিয়ে এলেন সড়কে। দলের সঙ্গে ছিলেন শিল্পি দলের রুমেন, তিনি বললেন, আপনারা আসছেন কেন?
দলের সোহাগ বললেন,আপনারা গান শোনা ছেড়ে এলেন কেন? ওরা কি মনে করবে বলুন তো!
শিল্পির দলের আরেক সঙ্গী বললেন, আমরাতো গাইতে জানি না।
সঙ্গী বাহাউদ্দিন বলল,আমরা আপনাদের গান শুনতে আইছিলাম। আপনাদের গান আমার পছন্দ। আমরা কবির কবিতা আবৃত্তিরও খুব ভক্ত।
কবি নব্বই দশকের নামকরা কবি অতুল; যার চারটি বই এরই মধ্যে বেশ নাম করেছেন। কবি এখনও চোখ মুছছেন; তিনি শিল্পিদের এ অপমান সহ্য করতে পারেননি। শিল্পিদের পদ্ম বললেন, আমরা যার আমন্ত্রণে এসেছি, সেই ননীবাবু কোথায়?
সঙ্গের কেউ কেউ হেসে উঠলেন। আমাদের ভোলার একজন বললেন, তিনি এ সময়ে এখানে উপস্থিত থাকবেন না। পরে এসে দুই পক্ষ থেকে ক্ষমা চাইবেন। কবি ননীবাবু সম্পর্কে কোনো মন্তব্য না করে বলেন,যা হওয়ার, হয়েছে, চলেন আমরা বাসায় যাই। মানুষ গুলা এমনই।
৪.
পরের দিন কবি, বাহাউদ্দিন, রুমেন, সোহাগ এবং ঢাকা থেকে আসা ব্যান্ড দলের সব মাঝের চরে গেলেন। তুলাতুলি খেয়াঘাটে পৌঁছানোর পরই দেখা হল মদনপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের সঙ্গে। তিনি কৃষকদের বিনা অর্থে সার দেয়ার জন্য একটি নৌকায় সারবোঝাই করছেন; আরেকটি নৌকা সাজানো হচ্ছে চেয়ারম্যান ও তদন্ত কর্মকর্তা যাওয়ার জন্য। সেখানে কয়েকটি চেয়ার আছে; আছে দুটি ছাতা। চেয়ারম্যান রুস্তম ফরাজী কবি দলের সবাইকে সাদরে আমন্ত্রণ জানালেন। বাড়তি আপ্যায়নের জন্য কিছু চিপস, চানাচুর ভাজা ও মিনারেল ওয়াটার নিলেন। চেয়ারম্যান কবিকে খুব সম্মান করতেন; কবির সম্মানেই তার সঙ্গীদের সম্মান করছেন। এক সময় ট্রলার ছাড়ল। শীতের আমেজ, ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। নদীতে জালের আধিক্য নেই; মাঝে মাঝে নৌকার তলা বেধে যাচ্ছে ডুবোচরে। সেই ফাঁকে সবার একটু শীতল জল ছুঁয়ে দেখা। আর অসাধারণ তৃপ্তি ...! শিল্পীরা স্বাদগ্রহণ করছে প্রকৃতির। ট্রলারের ধপ-ধপ শব্দের সঙ্গে কখনও গিটারে টান, কখনও মন্দিরাতে টুং টাং; বাঁশিতেও সুর তুলছে কেউ। শিল্পীদের সঙ্গে কবির কথা হচ্ছিল নানা বিষয় নিয়ে। আর প্রশ্ন করছিল, ওদের কি এটা করা ঠিক হয়েছে? দর্শক শ্রোতা না নিত, দুঃখ ছিল না। প্রশ্নের জবাবে কবি গাইলেন ওরা আছিল অজাত কুজাত! সুজাত আছিল আমার তরে। দুঃখ বাড়ল সেই খানে সই, আমার জাতের অবিচারে।
কবি ঢাকার শিল্পী ও তার ভক্তকুল নিয়ে যে চরে যাচ্ছেন সে চরের নাম মদনপুর, লোকে ডাকে মাঝের চর। কবি বলেন, ম্যাঘনার মাঝে পলি পড়ে চর পড়ায় লোকে এরে মাঝের চর কয়, এহানে যারা আশ্রয় নিছে হেরাসব মূল ভূখণ্ড থেকে আইছে; হেরা আশ্রয়হীন। তাগো জমি ঘর বংশ মর্যাদা সবই ম্যাঘনা ভাইঙ্গা নিছে। যদি আবার ম্যাঘনা সে জমি-জিরাত ফিরায়া দেয়, সেহানে চোখ যাইব জোতদারের; সব মিল্লা লড়াই কইর‌্যা আদায় করত হবে; তার লাইগ্যা থাকতে হয় লাডি-টিয়ার শক্তি। অ্যার লাইগ্যা বহু বছর পর যদিও ম্যাঘনা বাপ-দাদার জমি-জিরাত ফিরায়ে দেয়, সেটাও আর ফেরত পাওয়া যায় না। বড় কঠিন হয়ে পড়ে, শিল্পী। কবি চলতি-আঞ্চলিত ভাষা মিলিয়ে কথা বলছেন খুব শব্দ করে। তাও এক কথা বারবার বলতে হচ্ছে শিল্পিদের বারবার প্রশ্নে। কারণ নৌকার ইঞ্জিনের শব্দটা খুবই বিকট।
রুমেন ও বাহাউদ্দিন উঁচু গলায় গান গাইছিল। কিন্তু শোনা যাচ্ছিল না। কবি বলেন, কি গান গাও! এমন কপাল শোনাও যায় না, শব্দযন্ত্র গ্রামডারেও খাইয়্যা ফেলছে।
রুমেন বলে, আমরা ট্রলার আর বাথরুম শিল্পী। আমরা নিজেরা গাই, নিজেরা শুনি। আপনেরা শুনবেন ট্রলার ধ্বনী। কবি বলেন, বাহ! কেমন কাব্য করে কইলা।
বাহাউদ্দিন বলে, ওস্তাদ! আমনের লগে থাকতে থাকতে এমন হইছে কবি বলেন, তুমি এট্টু বেশিই কও! আমরা সবাই হেসে উঠি।
নৌকা মাঝের চরের কাছে চলে এসেছে। চোখে আসে ছোট ছোট কুঁড়ে ঘর। তাও উঁচু সাইক্লোন সেল্টারের মতো। শিল্পীরা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, ঘরগুলো এমন মাচার মতো উঁচু কেন!
কবি বলেন, এ্যহানে বছরের পেরায় ছয় মাস জোয়ারের পানিতে সব ডুইব্যা থাহে। পথঘাট চিনায় না, হুদা পানি আর পানি; এর লাইগ্যা খর দিয়া তৈরি ঘরগুলো ওঠে মাচার ওপর; নিচে থাহে গরু-বাছুর, উপরে থাহে মানুষ, জোয়ারেরসুম সোতে দোল খায়।
এটা কি করে সম্ভব! শিল্পীর গলায় অবাক বিস্ময়।
কবি মুচকি হেসে বলে, এই দ্যাশে সব সম্ভব। হোনলে আরও অবাক হইবা, ওই ছোট্ট মাচার মাইধ্যে পাঁচ-ছয়ডা পোলাইন লইয়্যা এ্যট্টা পরিবার বাস করে। অনেকসুম বাপে পোলারে বিয়া করাইয়্যা বউ আনে, মাইয়্যা বিয়া দিয়া জামাই আনে; পোলা-বউ, জামাই-মাইয়্যা একপাশে, অন্যপাশে শ্বশুর-শাশুড়ি ফরজ কাম করে, এ্যর নাম জীবন।
শিল্পী আরও অবাক হয়ে বলে, দুটো দম্পতিই হয়তো একসঙ্গে সেক্স করে?
অবশ্যই, হেইডাই তো কইলাম। কবির উত্তর।
যান্ত্রিক বিকট শব্দের মধ্যে কথা বলতে বলতে ট্রলারটি মধুপুরা আশ্রয়ণ প্রকল্পে এসে পড়েছে তখন সূর্য তেতে উঠেছে। আচমকা শব্দটা কমে যাওয়ায় সবার চোখ যায় গুচ্ছ ঘরের দিকে। এতক্ষণ ছিল ঘন সবুজের ক্ষেত। বোরোর আবাদ চরে কৃষকদের মধ্যে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করে। বাধে জোতদারের উত্তেজনা। চরে একটু বাজার মতো বসলেই একটা হোটেল বসে। সেখানে জেনারেটরে রাতে টিভি-ভিসিডিতে বাংলা সিনেমা প্রদর্শিত হয়। কোনো টিকিট নেই। ক্রেতারা ছবি দেখে আর জিলাপি খায়, আঙ্গুলি খায়, সঙ্গে চা। বেজে যায় রাত বারো। তার পর মাঠ ভেঙে, খাল ভেঙে নদী সাঁতরে কুঁড়েতে ফেরে। বাঁশের সিঁড়ি বেয়ে মাচায় ওঠে। আশ্রয়ণ প্রকল্পে যারা বসত করে তাদের অবশ্য এমন সমস্যা নেই, শুধু দুর্যোগ ছাড়া। তাও ক্ষেত-খাল নদী ভাঙতে হয়।
ঘাটে ট্রলার ভিড়তেই শতশত শিশু ছেলেমেয়ে তাদের দেখতে আসে। তাদের শরীরে ধুলো কাঁদার পোশাক। মাথার চুল জট বাঁধা, পরনের হাপ প্যান্টটিও ময়লা। কারও গায়ে অবশ্য গেঞ্জি আছে। তাও ময়লা হয়ে গেছে । কবি এ চরে অনেক এসেছে। অপরিচিত কেউ চরে এলে, কোথা থেকে অতিথি পাখির মতো ঝাঁকে ঝাঁকে শিশুরা দেখতে আসে। কবি শিল্পীদের উদ্দেশ করে বলেন, আমনাগো বরণ করতে শিশুর দল আইছে; শুধু আমনেরা না... গো, নতুন কেউ আইলে ওরা তারে বরণ করে নেয়; এইডা অগো নিয়ম; অগো কোনো চাহিদা-পত্র নাই, বিমিতে কিচ্ছু দিত অইব না।
নৌকার সবাই ভাঙন সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে উঠছে চরায়। প্রায় আধা মাইল মেঠোপথ হেঁটে শিল্পীর দল পৌঁছাল মধুপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে। মধুপুর মদন পুরের একটি গ্রামের নাম; বড় মিঠা নাম; এক সময় এ গাঁয়ের অনেক জৌলুস ছিল; ভোলার অনেক বড় মিয়ার জন্মু এ গাঁয়ে। শিল্পীদের প্রধান, যার মেয়েদের মতো লম্বা চুল তিনি বললেন, অনেক দিন পর মেঠো পথ দিয়ে হাঁটছি।
শিল্পী দল যখন হাঁটছিল তখন মেঠোপথে হাজার হাজার পোকা হাঁটছিল। এ পোকা ফসলের ক্ষেত ছাপা করে দিয়েছে। এ জন্য চরের কৃষকের মনে আনন্দ নেই। তারা রাতে ঘুমাতে পারছে না। পোকা এসে তাদের চুলে, কানে, বালিশে বেয়ে বেয়ে উঠছে। শরীরে উঠলে পুরো শরীর শিরশির করে ওঠে। ভুল করে হাত চলে যায় পোকার গায়ে। পোকাগুলো এমন নরম, একটু চাপ পড়লেই গলে যায়। মেখে যায় গতরে। কাঁটাগুলো গেঁথে যায় শরীরে। চুলকে ওঠে শরীর; আর ঘিন ঘিন। ওয়াক! থু! পেট ভরে বমি হয় কারও। ভাত তরকারি রান্না করে রাখলে সকালে উঠে দেখে পানি ভাতের মধ্যে ভেসে ভেসে পোকা; তরকারির মধ্যে পোকা থাকে চিংড়ি মাছের মতো। চরের মানুষেরা অজান্তে অনেক পোকা খেয়ে ফেলেছে; স্ত্রীর বুক হাতরালে পোকা; বুকের দুধ খেতে গেলে শিশুর মুখে পোকা চলে যায়; শিশুকে বুকের মধ্যে আগলে রাখার সেকি আপ্রাণ চেষ্টা মায়ের! পোকায়-পোকায় জর্জরিত। এ যেন মহামারী আকার ধারণ করেছে। শিল্পী দলের সঙ্গে যখন চেয়ারম্যান যাচ্ছিল, তখন তাকে কৃষকরা এসে পোকার সমস্যাগুলো বলছিল, আর কাঁদছিল। চেয়ারম্যান এসব কথা শুনে বিরক্ত হচ্ছেন। আর বলছেন, যাও মিয়া! যাও! কি করুম, চিন্তা নাই আল্লাহ সব ঠিক কইর‌্যা দিব। চরের মানুষের সমস্যাপূর্ণ সব ঘটনা শুনে কবির মন খারাপ হয়ে যায়। কৃষকদের দুখের কথা আবারও মন দিয়ে শুনলেন। তার বন্ধু বড় কৃষি কর্মকর্তা, তার সঙ্গে মোবাইলে কথা বললেন; এবং কৃষকদের সমস্যা সমাধানের জন্য একজন কৃষি কর্মকর্তা আসবেন বললেন। আর কৃষকরা সকলে, সমস্বরে বললেন, আলহামদুলিল্লাহ! তারা কবির জন্যও দোয়া করলেন; চেয়ারম্যানের জন্য দোয়া করলেন।
মাঝের চরের মাঝের উঠানে গানের আসর বসল। সূর্য মাথার ওপর। চেয়ারম্যান সবাইকে গানের আসরে আসতে বললেন। মাটির বিছানায় শতশত শিশু বসে পড়ল। অন্য কেউই এল না। শিল্পীরা বসলেন ধানের খড় বিছিয়ে। তবে যখন গান শুরু হল, তখন নারী-পুরুষের ভিড় বাড়ল। সবাই তন্মুয় হয়ে শুনছে। এ গান তাদের কাছে নতুন কিন্তু তাদেরই কথা, এটা তারা বুঝতে পারল। গানের মধ্যে রং চা এলো, সঙ্গে ঘরে ভাজা মুড়ি। গান গায়, চা খায়। এমনি করে পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলতে শুরু করেছে।
এমন সময় এক বৃদ্ধ হাঁপাতে হাঁপাতে চেয়ারম্যানের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে, বলেন, ও চেয়ারম্যান সাব! ও চেয়ারম্যান সাব! আইজ দুই দিন ধইর‌্যা আঁর পোয়াতি মাইয়্যার প্যাট ব্যদনা ওঠছে, কিন্তুক কিছুতে কিছু অইতাছে না, কি করুম বোজদাছিনা, চরে ডাকতোর নাই। লোকটা তখনও হাঁপাচ্ছে, চেয়ারম্যানের পায়ের কাছে উপুড় হয়ে পড়েছে। চেয়ারম্যান সবার দিকে তাকায় আর পা ঝাড়ি দিয়ে বলেন, আরে করও কি! করও কি! তোমার মাইয়্যার প্যাট ব্যদনা ওটছে আমি কি করুম! আমি কি ডাক্তার না কবিরাজ? সদর হাসপাতালে লইয়্যা যাও।
চেয়ারম্যান সাব ট্যাহা নাই, বৃদ্ধ লোকটা তখনও কাঁদতে থাকে। নৌকা ভাড়া করে সেই বৃদ্ধ আর তার প্রসূতী মেয়েকে ভোলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হল। সঙ্গে পাঠানো হল দুজন চৌকিদার আর চরের জ্যেষ্ঠা দাইকে।
চরবাসীর পক্ষ থেকে প্রবীণ মনতাজ পাটওয়ারী বললেন, আমনেরা আমাগো মেহমান, সরম করে ক্যামনে কই, দুগা ডাইল ভাত খাইয়্যা যাইতেন যদি ...! আমগো কষ্ট কোনো দিন দূর অইব কিনা জানি না, তয় গান হুনাইয়্যা আমগো মন ভালা কইর‌্যা দিছেন। আমনেরা দুরপেরকাল খালি প্যাডে যাইবেন এইডা ভালা দ্যাহাইব না। কি দিয়া আমনেগো খেদমত করুম কন! শিল্পী, কবি এবং বেড়ানি দল মুখ চাওয়া চাওই করছেন। কি করবেন! কি করে ফেলবেন মুরব্বির কথা। কবি বললেন, মুরব্বি এত করে যখন কইতাছেন...
সূর্য মাথার ওপর থেকে যখন পশ্চিমে চলে যাচ্ছিল, সেই ফাঁকে ঘন কালো মেঘ ঢেকে যায় আকাশ; কারুর তা খেয়াল থাকে না। ভাত খেয়ে গান শুরু হল; আবার সেখানে চা মুড়ি এলো; গান চলতে থাকে।
শেষ
সেদিন কতক্ষণ গান চলেছে. জানি না; কবির দেউরক্যা ব্যান্ড শিল্পী দল কখন চর থেকে এসেছে, তাও জানি না; চরে গেলে চরবাসীর মুখে শোনা যায়, সেদিন নাকি চরাচরে তুমুল বর্ষণ হয়েছিল; অনেক বাজ পড়েছিল; সেদিনের মুষল বৃষ্টিতে গজব ফসল পোকা চিরতরে হারিয়ে গেছে; নদীতে প্রচুর মাছ পড়েছিল; কবি-শিল্পী আছে কি নেই কিচ্ছু আসে যায় না চরবাসীর; মদনপুরবাসী তাদের মনে রেখেছে।
(গল্পের চরিত্রগুলো পরিচিত হলেও কাল্পনিক)

যে জগতে আমি বিরাজ করি কবিতার জন্য তাকে বোঝাই যথেষ্ট মনে হয়েছে by নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আমি কি আপনাকে নীরেনদা বলতে পারি?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : কবিতা লেখো তুমি?
শিমুল : চেষ্টা করি।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : তাহলে অবশ্যই বলতে পারও। আরে দাদা তো আমাদের কথার, সম্বোধনের একটি ভিন্ন মাত্রাও দেয়। আর সামনের অক্টোবরে নব্বইয়ে পড়ব, শরীরটাও খুব সায় দেয় না, মনের বয়স কিন্তু আমার এখনও তোমারই মতোন।
শিমুল : নীরেনদা, বাংলাদেশ তো আপনাকে স্বাগত জানাল প্রাণ খুলে। আপনি কালি ও কলমের পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে কবিতা শুনিয়ে বলছিলেন মহাজ্ঞানী মহাজন, যে পথে করে গমন সেই পথে নতুন লেখকরা যেন না যায়। নতুন পথ যেন তারা তৈরি করে। তারপর কবিতা বিষয়ে বক্তৃতা দিলেন। বিভিন্ন পত্রিকার সাংবাদিক, সাহিত্য সম্পাদকরাও দেখলাম আপনার সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছেন, এই যে এলেন, কেমন লাগছে?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : এটা আমার দেশ। আমার ট্রাজেডি এই যে আমার দেশ আমার মাতৃভূমি বটে কিন্তু জন্মভূমি নয়। আমার জন্ম ফরিদপুরে। মানে তো বাংলাদেশে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে আমার দেশ ভারতবর্ষ। বাংলাদেশও আমার দেশ, জন্মভূমি অর্থে। আর আমি যখন জন্মেছি তখন তো পুরোটাই ভারতবর্ষ। তো আমার দেশে আমি এসেছি, স্বাগত জানানোর তো আপাতপক্ষে কিছু নেই। যেটুকু তোমরা হইচই করছ, আমার মনে হয় সে আমার কবিতাকে তোমরা গ্রহণ করেছ সেজন্য করেছ।
শিমুল : আপনি জন্মেছেন ১৯২৪ সালে, এখন ২০১৪ সাল। জীবনের দিকে ফিরে তাকালে কোন কোন ঘটনাগুলো সবার আগে চোখে ভেসে ওঠে?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : তুমি তো আমার পুরো আত্মজীবনী জানতে চাইছ। সেটার একটা অংশ আমি লিখেছি। তবে জীবনের দিকে তাকালে সবার আগে নিজের বিষাদগুলোর কথা মনে পড়ে। ব্রিটিশরাজ দেখেছি, ভারতবর্ষের খণ্ড খণ্ড হয়ে যাওয়া, আমাদের স্বাধীনতা লাভ, স্বাধীন বাংলাদেশকে দেখা, পশ্চিমবঙ্গের এক ধরনের সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির দিকে যাওয়া এসবই আমার জীবনের বড় ঘটনা। ব্যক্তি হিসেবে বড় ঘটনা বলতে হবে, ধরো আমার প্রথম কবিতার বইটা যখন বেরুলো সেটা। এর চেয়ে বেশি ব্যক্তিগত পারসোনালাইজড ঘটনাগুলোর কথা নাই বা বলি।
শিমুল : আপনার ইন্টারভিউর জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম, তো আনন্দবাজারের রবিবাসরীকে দেয়া একটা সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছেন, ‘আমার মনে হয় কবিতাই আমার মাতৃভাষা।’ সারা জীবনে তো গদ্যও লিখেছেন প্রচুর। খবরের কাগজে কাজ করেছেন।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : আমি মনেই করি কবিতা আমার মাতৃভাষা। গদ্য নয়। গদ্য আমি বাধ্য হয়ে লিখি। খবরের কাগজে কাজ করার কারণে লিখতে হয়েছেও প্রচুর। কিন্তু কেবলই মনে হয়, কবিতাকে ফাঁকি দিয়ে, তার থেকে সময় চুরি করে নিয়ে আমি গদ্যকে দিচ্ছি। গদ্য লিখতে আমার ভালো লাগে না।
শিমুল : অর্থাৎ এই নব্বইতে এসেও আপনি এত কবিতা লেখার পর আরও কবিতা লিখতে চান। আপনার মনে হয়, যে সময়টুকু জীবনের কবিতাকে দিলেন, আরও বেশি দেয়া উচিত ছিল? বাংলাভাষার কবি হিসেবে নিজেকে কত নম্বর দেন আপনি?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : অবশ্যই। আরও অনেক বেশি দেয়া উচিত ছিল। যত সময় দেয়ার দরকার ছিল তা দিতে পারিনি। তবে আমার মনে হয় না আমি কম লিখেছি। নম্বরপ্রথায় আমার আস্থা নেই। যা করেছি, তা পাঠকেরাই, অনুজ কবিরাই বলবে।
শিমুল : আপনার প্রায় সব কবিতাই একটা না একটা গল্প বলে। অথচ যখন শুরু করেছিলেন, বাংলা ভাষায় তখনও সেভাবে কবিতায় গল্প বলার প্রচলন ছিল না। যদি না আমরা রবিঠাকুরের ‘দুই বিঘে জমি’ কিংবা ‘ক্যামেলিয়া’র মতো কিছু কবিতাকে আলাদা রাখি। নিজের কবিতায় গল্প বলবেন এটা কবে ঠিক করলেন?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : তবে কবিতায় গল্প বলার বিষয়ে কি জানো, সম্পূর্ণ গল্পটা তো আর আমি কবিতায় ধরে দিতে পারব না। গল্পের একটা আভাস আছে, একটা ইঙ্গিত আছে আমার কবিতায়। একটা আন্দাজ দিতে পারব। এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলি, আমাদের বাংলা সাহিত্যের কবিতা সেই গোড়া থেকেই গল্প বলে। মহাভারত পুরোটা জুড়েই গল্প আর গল্প। একগাদা গল্পের সমষ্টি। আমাদের মঙ্গলকাব্য গল্প ছাড়া আর কি! আর সেগুলো তো পদ্যেই লেখা। ছন্দে লেখা গল্প।
শিমুল : আমাদের ময়মনসিংহ গীতিকা কিংবা পাঁচালি?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : হ্যাঁ, পাঁচালি গল্প ছাড়া আর কি! দেখ পাঁচালিতে কি রয়েছে! আসলে মানুষ হচ্ছে ভোগবাদী। তকমাপ্রিয়। আমি তকমা চাই না। কবিতায় গল্প বলার ব্যাপারটা নতুন নয়।
শিমুল : তাহলে দাদা আপনার স্বাতন্ত্রটা কোথায়?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : দাঁড়াও পাঁচালির গল্পটা বলে নিই। বলছি আমি যা করেছি তা-ও। পাঁচালিতে কি রয়েছে! একটা পরিবার খুব অশান্তিতে ভুগছে, পরিবারের যিনি শ্মশ্রুমাতা, শাশুড়ি ঠাকরুন, তিনি বনে গেছেন আত্মহত্যা করতে। তারপর সেখানে বনলক্ষ্ণীর সঙ্গে দেখা। বনলক্ষ্ণী জিজ্ঞেস করছে, বনে এসছো কেন? শাশুড়ি ঠাকরুন বলছে, আমি আত্মহত্যা করতে এসেছি। কেন? বলছে যে আমার সাতটা ছেলে, সাতপুত্র, কর্তা হয়ে, সাতপুত্র সাত হাঁড়ি হয়েছে এখন, সতত বঁধুরা মোরে করে জ্বালাতন। কেমন! বনলক্ষ্ণী বললেন তুমি বাড়ি ফিরে যাও। বুড়িবারে সন্ধ্যাকালে মিলি বামাগণ, বুড়িবার মানে বৃহস্পতিবার, বামাগণ মানে নারীগণ, সকলে লক্ষ্ণীর পূজা করো আয়োজন। তাহলে দেখবে সংসারে আবার শান্তি ফিরে আসবে। এটা গল্প ছাড়া আর কি! গল্প পুরনো ব্যাপার আর কবিতার মধ্যে গল্প বলাটা নতুন কিছু না।
শিমুল : কিন্তু আপনার কথনভঙ্গি! গদ্যের চলনে অন্তমিলের মৌলিক খেলা!
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : আসল কথাটা তা নয়। আসল কথাটা হচ্ছে, লিরিক কবিতা, লিরিক কবিতায় গল্প বলার চলনটা ছিল না। লিরিক কবিতার আমরা একটা ভুল ব্যাখ্যা করি। লিরিক কবিতাকে আমরা বলি গীতি কবিতা। না গীতি কবিতা নয়, এটা পারসোনালাইজড পয়েট্রি।
শিমুল : পারসোনালাইজড মানে কি কাস্টোমাইজড দাদা?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : একেবারে ব্যক্তিগত উচ্চারণ বলতে যা বোঝায়। নিজের মতো। এখানে গদ্যের মধ্যেও কবিতার সেই গীতসুধাটা থাকে। তো সে অর্থে আমি কোনো নতুন কাজ করিনি। যেটা করেছি, সেটা হল আমি আমার ভাষায় করেছি, এবং আমি মনে করি, আমি যদি গল্প ঢুকিয়েও থাকি কবিতার মধ্যে সেটা কোনো অন্যায় করিনি।
শিমুল : তা অন্যায় করেননি মোটেও। আপনাকে প্রথম চিনেছিলেন আপনার বন্ধু কবি অরুণকুমার সরকার। আপনার প্রথম বই নীলনির্জনে বেরুবার গল্পটা শুনতে চাই। প্রথম বই তো সব কবির কাছেই মহাআরাধ্য হীরকমণিমুক্তার মতো, স্পেশাল
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : কবিতা না লিখে তো আমার উপায় ছিল না। কিন্তু নিজের পয়সা দিয়ে বই আমার বের করার কোনো ইচ্ছা কোনোকালেই ছিল না।
শিমুল : অরুণকুমার সরকার আপনার বই বের করে দিয়ে বলেছিলেন, কবিতা না লিখলে তুই তো মরেই যাবি!
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : এক দিন হঠাৎ আমার কাছে অরুণ সরকার এসে বলেন, আমার বন্ধু, যে, তোমার কাছে সিগনেট প্রেসের দিলীপ গুপ্ত মশায়, সিগনেট তখনকার কালে ভীষণ নামকরা পুস্তক প্রকাশন প্রতিষ্ঠান, তারা তখন নেহরুর ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া বের করেছে, এবং বড় কবিদের, বড় লেখকদের বই বের করে যাচ্ছে, তার মধ্যে অরুণ এসে বলল, তোমার একটি বই দিলীপবাবু চেয়েছেন। তুমি একটা ম্যানুস্ক্রিপ্ট তৈরি করে দাও। আমি সত্যি বলছি, আমি বিশ্বাস করিনি, উনি বললেন যে, সত্যিকথা বলছি, তৈরি করে দাও, তোমার নাম করে চেয়েছেন দিলীপবাবু। তো ওর জোরাজুরিতে বিশ্বাস করতে হল, একটা পাণ্ডুলিপি তৈরি করে দিলাম, অরুণকুমারের হাতেই দিয়ে দিলাম, তিনি গিয়ে দিলীপবাবুর হাতে দিলেন, বই বেরিয়ে গেল। বই বেরুবার পর কিন্তু আমি জানতে পারলাম দিলীপবাবু আমার বই চাননি। তিনি অরুণের বই চেয়েছিলেন। তিনি অরুণকুমার সরকারের বই চেয়েছিলেন, বই বেরিয়ে গেছে আমার।
শিমুল : এটা কি ইচ্ছে করেই করেছেন তিনি?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : একদম ইচ্ছে করেই করেছে। আমি জেনে তো রেগেমেগে ওকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা তুমি কেন করলে। তোমার বই উনি চেয়েছেন আর তুমি আমাকে বললে আমার বই চেয়েছেন, এটা তুমি কেন করলে? আমার বই বেরুনো দরকার ঠিকই কিন্তু তোমার বইও তো বেরুনো দরকার! তুমি আমার কাছে চাইলে কেন? আমি চার্জ করলাম।
শিমুল : অরুণকুমার সরকার কি বললেন?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : অরুণ হেসে বলল, তুমি আমার চেয়ে বড় কবি এমন কথা ভেবে কিন্তু বলিনি। তুমি ভেবো না তুমি আমার চাইতে ভালো লেখ। কিন্তু তোমার বই বেরুনো দরকার আমার চাইতে বেশি। এ জন্য আমি নিজের বই না করে তোমার বই দিয়েছি।
শিমুল : নীরেনদা আপনি উলঙ্গ রাজার জন্য পেয়েছেন আকাদেমি পুরস্কার, সেই কবিতায় যে সত্যবাদী, সরল, সাহসী একটি শিশুকে খুঁজছিলেন, যে বলবে, ‘রাজা, তোমার কাপড় কোথায়?’ তাকে কি দেখেছেন আপনি আপনার জীবনে? পেয়েছেন তার দেখা?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : বাচ্চারা তো এত সব ধান্দাবাজি বোঝে না আমাদের মতো। আমরা বড় যত হই তত ধান্দাবাজ হই। কার প্রশংসা করব, তার কাছ থেকে আমার কিছু পাওয়ার আছে কি না এসব ভেবে কাজ করি, চারদিক কতগুলো চাটুকারের দ্বারা পরিবৃত হয়ে গেছে, এরা আমাদের মন রেখে কথা বলে। বাচ্চারা এসবের ধার ধারে না, এই কারণে সত্য বলতে তাদের কোনো বাধা নেই, সত্য কথাটা একমাত্র তারাই বলে। তো, এটা যেমন হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের গল্পে এটা আছে, এই যে একই গল্পের নানান ভার্সন নানান ভাষায় ছড়িয়ে আছে, চালাক জোলা আর বোকা রাজার গল্প, আসলে কোনো রকম কাপড় নেই, সে কাপড় পরানোর একটা ভঙ্গি করে। হাওয়ায় হাত ঘুরিয়ে, রাজাকে বোকা বানিয়ে টাকা নিয়ে চম্পট দেয়।
শিমুল : আহা রাজসত্র, চোখে দেখা যায় না!
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : হ্যাঁ, এত পাতলা সুতো যে চোখে দেখা যায় না। এ গল্পটা ঠাকুমার কাছে ছেলেবেলায় শুনেছিলাম। তারপর মনে হয়েছে চারদিকের অবস্থা দেখে, যে কেউ সত্য কথাটা বলছে না। সবাই যে শাসক তার মন রেখে কথা বলছেন।
শিমুল : নীরেনদা, এই কবিতার নির্যাস আপনি যেখান থেকে নিয়েছেন সে সোর্সটা আপনি বললেন, আপনার সব থেকে জনশ্র“ত যে কবিতা অমলকান্তি, সেটি ওপার বাংলায় যেমন এখানেও আবৃত্তিশিল্পীরা বহুবার আবৃত্তি করেছে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমিও মঞ্চে পড়েছি বহুবার, এমনকি অমলকান্তি তো বাংলাদেশে চলচ্চিত্রেও রূপায়িত হয়েছে, পারভেজ চৌধুরী অমলকান্তি চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন, সে কবিতার সোর্স বা নির্যাসটি কীভাবে পেয়েছিলেন? অমলকান্তি কি আপনি?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : না, আমি নামটা পাল্টানোর কোনো দরকার বোধ করিনি। অমলকান্তি আমার বন্ধু। ইশকুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম। এভাবেই তো কবিতাটা শুরু, এর প্রত্যেকটি কথা সত্য। আমার স্কুলের যে বন্ধু তার নাম অমলকান্তিই বটে। গরিব ঘরের ছেলে। এক দিন, খেলার মাঠে বসে ময়দানে কথা বলছিলাম, নিজেদের মধ্যে, কে কি হতে চায়! কেউ মাস্টার হতে চায়, কেউ ডাক্তার হতে চায়।
শিমুল : অমলকান্তি রোদ্দুরই হতে চেয়েছিল? বড় বেশি কাব্যিক না চাওয়াটা?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : বটে! কিন্তু ও যে রোদ্দুরই হতে চেয়েছিল। গরিব ঘরের ছেলে, বস্তিতে থাকত। এমন একটা বস্তিতে থাকে যেখানে রোদ্দুর ঢুকত না। ফলে ওর কাছে রোদ্দুর একটা প্রিয় জিনিস। কিন্তু সেই রোদ্দুরটা সে পাচ্ছে না। সে নিজেই রোদ্দুর হয়ে যেতে চাইছে।
শিমুল : আপনার কবিতা সম্পর্কে একটা উক্তি তো বহুল আলোচিত, আপনি বলেন, কবিতা কল্পনালতা নয়, এই কথা কেন? কবিতা ক্ষেত্রে তো সব সময়ই কল্পনার অবকাশ থেকে যায়। কয়েক দশকে তো আমরা এমন অনেক কবিদের দেখছি তারা তাদের কল্পনার অন্য এক জগতের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিতে চান। কিন্তু আপনার কবিতা অনেকাংশেই সমাজবাস্তবতানির্ভর। সেখানে তেমন করে কল্পনার সুযোগ নেননি কেন?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : আমার কল্পনা অত্যন্ত দরিদ্র। অত্যন্ত দরিদ্র। যে জগতে আমি বসবাস করি, বিরাজ করি কবিতার জন্য তাকে জানা বোঝাই আমার যথেষ্ট মনে হয়েছে। কল্পনার প্রয়োজন হয়নি আমার। কিংবা বলতে পারও, কল্পনার ধার আমি ধারিনি।
শিমুল : কিন্তু যারা কল্পনালতায় ভেসে কবিতা লেখেন তাদের কবিতা কি আপনি পছন্দ করেন?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : তা করি। সব ধরনের কবিতাই আমি পছন্দ করি। সেটা কোনো কথা নয়। কিন্তু আমার কল্পনা এত দরিদ্র আমি কিছু কল্পনা করতে পারি না, আমি চারপাশের মানুষদের দেখি, তাদের সুখ-দুঃখের খবর রাখি। হাটে-বাজারে যাই, তাদের কথা শুনি। বাসে-ট্রামে চলাফেরা করি, মানুষ দেখি, আমার হালে একটা গাড়ি হয়েছে, আমার গাড়িও ছিল না, আর গাড়ি আমি পছন্দও করিনি, সারাজীবন ট্রামে বাসে যাতায়াত করেছি, লোকের কথা শুনেছি, যা শুনেছি, যা নিয়েছি তা থেকেই আমার কবিতা হয়ে যায়। আমার কিছু কল্পনা করতে হয় না।
শিমুল : আপনার কবিতা এত নিখুঁত ছন্দে ঢালা কীভাবে হয়। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার নামে আপনার একটা কবিতা আছে। প্রিয়তমাসু। আমি নিজেও প্রচুর পড়েছি সেটি মঞ্চে। (আমি পড়তে শুরু করি স্মৃতি থেকে)
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : বাহ! খুব সুন্দর পড়েছ কবিতাটি, ছন্দটা ধরতে পেরেছ।
শিমুল : দাদা এই যে এ কবিতায় আপনি বলছেন, ‘এবং তুষার মৌলি পাহাড়ে কুয়াশা গিয়েছে টুটে,/ এবং নীলাভ রৌদ্রকিরণে ঝরে প্রশান্ত ক্ষমা,/ এবং পৃথিবী রৌদ্রকে ধরে প্রসন্ন করপুটে।/ দ্যাখো, কোনোখানে কোনো বিচ্ছেদ নেই। //’’ আপনার কবিতা এত নিখুঁত ছন্দময়, অথচ আপনি যেন পাঠককে সেটা বুঝতে দিতে চান না, গদ্যছলনার মুখোশে ঢেকে দেন যেন, এটা কেন করেন? সচেতনভাবেই করেন? নাকি লিখতে লিখতে আপনার সেই প্যাটার্নটা দাঁড়িয়ে গেছে?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : দীর্ঘ সময় ধরে লিখছি, একটা ব্যাপার তো তৈরি হয়েছেই। যাতে আমি বলি আমিত্ব, তুমি হয়তো স্বতঃস্ফূর্ততা বলছ। আমি যেভাবে মানুষ কথা বলে সেটা ব্যবহার করতে চেষ্টা করেছি কবিতায়।
শিমুল : নীরেনদা, আপনি কি মুখের ভাষার কথা মানে প্রাত্যহিক ব্যবহারিক ভাষার কথা বলছেন? কতটা নিলেন মুখের ভাষা থেকে?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : হুম, যাপিত জীবনে মানুষের ব্যবহার করা ভাষা। মুখের ভাষা। আমি মনে করি, তার থেকে কবিতার অনেক কিছু নেয়ার আছে। আমি সবটা এখনও নিয়ে উঠতে পারিনি। খামতি থেকে গেছে। কিন্তু মানুষ মুখের ভাষায় যেভাবে কথা বলে, এর চেয়ে ভালো কবিতার উপাদান আর হয় না। আমার কবিতার ভাষা একটা বানিয়ে তোলা নয়। গদ্যটা মানুষ নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য বলে যায়, নির্মাণ করে। কিন্তু মুখের ভাষার মতো অথেনটিক, অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ এবং অত্যন্ত জেনুইন ভাষা আর কিছু হতে পারে না, নির্মিত গদ্যের ভঙ্গি স্বতঃস্ফূর্ত হতে পারে না।
শিমুল : নীরেনদা, আমাদের এখানেও তো, মানে ঢাকায়, যদিও আপনার অনেক পরে, মুখের ভাষায় লেখা হচ্ছে কবিতা, আপনি কি পড়েছেন সেগুলো?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : তোমাদের এখানে বা আমাদের ওখানে বলে কিছু আমি বিশ্বাস করি না, পুরোটাই আমার, একই ভাষায় আমরা লিখি। মুখের ভাষায় যারাই লিখেছে তারা ভালো করেছে বলে আমার মনে হয়। ঢাকার কিছু পত্রপত্রিকা পাই, অনেকের সংলাপনির্ভর লেখা, বা আঞ্চলিক কবিতা আমি আগ্রহ করে পড়ি। ভালো লাগে।
শিমুল : বাংলাদেশের কাদের কবিতা পড়েছেন বা ভালো লেগেছে নাম করতে পারেন?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : নাম করতে চাই না, অনেকের কবিতাই আমার ভালো লাগে।
শিমুল : ছেলেবেলায় তো ওস্তাদ রেখে গান শিখেছিলেন, গান ছেড়ে দিয়ে কবিতায় কেন মনোনিবেশ করলেন? কবিতায় যে এলেন সেটা কি কোনো একটা মিরাকলের কারণে? কোনো একটা গোধূলির কারণে?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : তালিম করে গান শিখতে হয়েছে। সেটা আমার কান তৈরি করে দিয়েছিল সেই ছোটবেলাতেই। গান নিয়ে চাওয়াটা বোধহয় ছিল না। গান আমি এখনও ভীষণ ভালোবাসি। কিন্তু কবিতা আমাকে নিজের মধ্যে ডুবিয়ে নিয়েছে। গান খুব ভালোবাসি, কালকেই যেখানে গেলাম, একটি মেয়ে, কৃষ্ণকলি বলে নাম, কি গাইল, ভগবান কি গলা ওকে দিয়েছেন! ওর গলাটা, ওখানে সুর নিয়ে ও যে খেলা করছে, অসাধারণ, আমার, আমার তো রবীন্দ্রনাথের কবিতা মনে পড়ে গেল, গাইছে কাশিনাথ, নবীন যুবা, ধ্বনিত সভাগৃহ আজি, ডানা মেলিতেছে সাতটা সুর, সাতটা যেন পোষা পাখি, এই মেয়েটির কালকে গান শুনছিলাম, গলায় খেলা করছে যেন পোষা পাখির মতো, গানের কথাও খুব চমৎকার।
শিমুল : কৃষ্ণকলি শুনলে খুবই আপ্লুত হবে নীরেনদা! সহোদরা কবিতায় আপনি বলছেন,
‘না, সে নয়। অন্য কেউ এসেছিল। ঘুমো তুই ঘুমো।
এখনও রয়েছে রাত্রি, রোদ্দুরে চুমো
লাগেনি শিশিরে। ওরে বোকা,
আকাশে ফোটেনি আলো, দরজায় এখনো তার টোকা
পড়েনি। টগর-বেলা-গন্ধরাজ-জুঁই
সবাই ঘুমিয়ে আছে, তুই
জাগিসনে আর। তোর বরণডালার মালাগাছি
দে আমাকে, আমি জেগে আছি।
না রে মেয়ে, না রে বোকা মেয়ে,
আমি ঘুমোবো না। আমি নির্জন পথের দিকে চেয়ে
এমন জেগেছি কত রাত,
এমন অনেক ব্যথা-আকাক্সক্ষার দাঁত
ছিঁড়েছে আমাকে। তুই ঘুমো দেখি, শান্ত হ’য়ে ঘুমো।
শিশিরে লাগেনি তার চুমো,
বাতাসে ওঠেনি তার গান।
ওরে বোকা,
এখনও রয়েছে রাত্রি, দরজায় পড়েনি তার টোকা।’
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী : সহোদরা, দুই বোনের দুঃখের কথোপকথন। বুঝতেই পারা যাচ্ছে যে এক বোন যে কষ্টের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, রাত জেগে জেগে, সেই কষ্টের ভেতর দিয়ে তার দিদিও এক দিন গিয়েছিল, দিদির মনে পড়ে যাচ্ছে তার নিজের জীবনের কথা, এই কষ্টটা সেও এক দিন ভোগ করেছে।
শিমুল : নমস্কার দাদা। ভালো থাকবেন।

বিয়ের কথা স্বীকার মোদির

বিয়ের কথা স্বীকার মোদির
ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদি প্রথমবারের মতো স্বীকার করলেন, তিনি বিবাহিত। তাঁর স্ত্রী রয়েছে। ১৭ বছর বয়সে প্রায় সমবয়সী এক তরুণীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। ওই নারীর নাম যশোদাবেন। লোকসভা নির্বাচনে ভাদোদারা আসনে বুধবার মনোনয়নপত্র জমা দেন মোদি। মনোনয়নপত্রের নির্ধারিত ফরমে স্ত্রীর নাম যশোদাবেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। যশোদাবেন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক। তিনি মোদির নিজ শহর ভাদনগর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে ব্রাহ্মণওয়াদা গ্রামে থাকেন। বিয়ের দুই সপ্তাহ পর তাঁরা আলাদা হয়ে যান।
রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সাবেক কর্মী ৬৩ বছর বয়সী মোদি গত চারটি বিধানসভা নির্বাচনে নির্ধারিত ফরমে স্ত্রীর নামের জায়গা খালি রেখেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেসই প্রথম চ্যালেঞ্জ করে। আইনি পরামর্শ মেনে মোদি এবারই প্রথম নিজের বৈবাহিক অবস্থা স্পষ্ট করলেন। এখন স্ত্রীর অস্তিত্ব স্বীকার করায় নারী ভোটারদের মধ্যে মোদির জনপ্রিয়তা কমে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, এতে নিঃসঙ্গ যশোদাবেনের প্রতি তাঁদের সহানুভূতি এবং মোদির প্রতি অশ্রদ্ধা বাড়তে পারে। নির্বাচনে প্রত্যেক প্রার্থীকেই নিজ স্ত্রীর আয় ও সম্পদের তথ্য দিতে হয়। মনোনয়নপত্রে মোদি লিখেছেন, যশোদাবেনের আয়সংক্রান্ত কোনো তথ্য তাঁর জানা নেই। নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে মনোনয়নপত্রের সব ঘর পূরণ করার ব্যাপারে ভারতের নির্বাচন কমিশন এবার বাধ্যবাধকতা আরোপ করে। তাই মোদি এবার বৈবাহিক অবস্থা কী উল্লেখ করবেন, তা নিয়ে জনসাধারণের জল্পনা-কল্পনা ছিল। টাইমস অব ইন্ডিয়া।

মমতার বক্তব্যের সিডি চেয়েছে নির্বাচন কমিশন

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
কর্মকর্তাদের বদলির আদেশ মেনে নিলেও পার পাচ্ছেন না ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্যের সিডি চেয়েছে কমিশন। এরই মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার মালদহে একজন নির্বাচনী কর্মকর্তাকে মারধর করেছেন তৃণমূলকর্মীরা। নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তাসহ আটজনকে বদলির আদেশ দেন। কিন্তু মমতা নির্বাচন কমিশনের ওই সিদ্ধান্ত মানবেন না বলে ঘোষণা দেন। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের কঠোর অবস্থানের কারণে মমতা ওই কর্মকর্তাদের বদলির আদেশ মেনে নেন। তবে বিভিন্ন জনসভায় তিনি নির্বাচন কমিশন নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এখন সেই মন্তব্যের সিডি চেয়ে পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন। গত সোম ও মঙ্গলবার বর্ধমান, হুগলি ও বাঁকুড়ার বিভিন্ন সমাবেশে নির্বাচন কমিশন নিয়ে নানা বেফাঁস মন্তব্য করেন মমতা। তিনি এমন কথাও বলেন, ১৬ মে নির্বাচনপর্ব চুকে যাওয়ার পর তিনি নির্বাচন কমিশনকে দেখিয়ে দেবেন। কমিশন তিন জেলা প্রশাসকের কাছে মমতার ওই মন্তব্যের সিডি চেয়েছে। এদিকে বুধবার পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সচিবালয় নবান্ন ভবনের মাত্র ২০০ মিটার দূরে মন্দিরতলায় একদল তৃণমূল-সমর্থক হাতে দলীয় পতাকা নিয়ে নির্বাচন কমিশনার বিনোদ জুৎসির কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। বিক্ষোভকারীরা অবিলম্বে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। এ ঘটনারও সিডি নির্বাচন কমিশন হাওড়ার জেলা প্রশাসকের কাছে চেয়েছে।
মালদহে মারধর: গতকাল দুপুরে মালদহের মানিকচক এলাকায় ২০০-২৫০ মোটরসাইকেলের একটি মিছিল বের করেন কর্মী-সমর্থকেরা। বিনা অনুমতিতে এত মোটরসাইকেলের মিছিল দেখে আপত্তি তোলেন নির্বাচন কমিশনের কর্মীরা। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মিছিলকারীরা কমিশনের কর্মীদের মারধর করেন।

শুধু মা ও ভাইয়ের আসনে প্রচার চালাবেন প্রিয়াঙ্কা

কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর মেয়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী
(ডানে) স্বামী রবার্ট ভদ্রকে নিয়ে গতকাল ভোট
দিতে নয়াদিল্লির একটি কেন্দ্রে যান। ছবি: এএফপি
কংগ্রেসের প্রধান সোনিয়া গান্ধীর মেয়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী কেবল নিজের মা ও ভাইয়ের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেবেন। দেশে ‘মোদি ঝড়’ চলছে—এমন কথাও নাকচ করে দেন প্রিয়াঙ্কা। নয়াদিল্লি আসনের লোদি রোডে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোট দেন প্রিয়াঙ্কা ও তাঁর স্বামী রবার্ট ভদ্র। এরপর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘মোদি ঝড়’ বলে আসলে কিছু নেই। আর কংগ্রেস নেতাদের অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি (প্রিয়াঙ্কা) কেবল উত্তর প্রদেশের রায়বেরেলি ও আমেথি আসনে নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রমে অংশ নেবেন। ওই দুটি আসনে যথাক্রমে তাঁর মা সোনিয়া ও ভাই রাহুল প্রার্থী হয়েছেন।
কংগ্রেসের বেশ কয়েকজন নেতা তাঁদের নির্বাচনী প্রচারণায় প্রিয়াঙ্কার উপস্থিতি কামনা করছেন। ৪২ বছর বয়সী প্রিয়াঙ্কা দুটি শিশুসন্তানের জননী। রাহুল ও সোনিয়া নিজ নিজ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় প্রিয়াঙ্কা অনুপস্থিত ছিলেন। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর স্বামী রবার্ট ভদ্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিজেপি নেতারা তাঁর সমালোচনা করে থাকেন। কংগ্রেসশাসিত হরিয়ানা রাজ্যে ভূমি ব্যবসায় রবার্ট বাড়তি সুবিধা পেয়েছেন বলে নরেন্দ্র মোদি অভিযোগ করেছেন। এ ব্যাপারে গতকাল প্রশ্ন করলে রবার্ট ভদ্র কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এনডিটিভি ও আইএএনএস।

ভোটেও পিসি সরকারের জাদু?

বারাসাতে নির্বাচনী প্রচারণায় পিসি সরকার। ছবি: ভাস্কর মুখার্জি
যেখানে যান, সেখানেই মানুষের ঢল। তাঁকে একনজর দেখতে রাস্তার দুপাশে মানুষের ভিড়। তিনিও মিশে যাচ্ছেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে। করছেন করমর্দন। কখনো ছোট্ট শিশুকে কোলে টেনে আদর করছেন। আবার অনেকের আবদার রক্ষা করতে গিয়ে একটু-আধটু জাদু দেখাচ্ছেন।
এভাবে প্রতিদিন পশ্চিমবঙ্গের বারাসাতের আনাচেকানাচে বিরামহীন নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন বিশ্ববিখ্যাত জাদুকর পি সি সরকার (জুনিয়র)। পিসি সরকার এবার লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির টিকিটে উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাত আসনে প্রার্থী হয়েছেন। অবশ্য তিনি থাকেন দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জে। প্রতিদিনই তিনি বারাসাতের বিভিন্ন এলাকা ঘুরছেন। সঙ্গে থাকছেন স্ত্রী জয়শ্রী সরকার। গত মঙ্গলবার বারাসাত আসনের অশোকনগর ও কল্যাণগড় এলাকায় প্রচারণা চালান পিসি সরকার। এ সময় তাঁর সমর্থকেরা নানা স্লোগান দেন। তাঁকে একনজর দেখতে রাস্তার দুপাশে মানুষের ভিড় জমে যায়। অনেকে এসে তাঁকে জাদু দেখানোর আবদার করছেন। পিসি সরকার এই প্রথম লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার, সাবেক মন্ত্রী বামফ্রন্টের নেতা মোর্তজা হোসেন ও কংগ্রেসের ঋজু ঘোষাল। ২০০৯ সালের নির্বাচনে তৃণমূল-কংগ্রেস জোটের প্রার্থী হিসেবে কাকলি ঘোষ পাঁচ লাখ ২২ হাজার ৫৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বামফ্রন্টের সুদিন চট্টোপাধ্যায় পান তিন লাখ ৯৯ হাজার ৬২৯ ভোট। আর বিজেপির প্রার্থী ব্রতীন সেনগুপ্ত পেয়েছিলেন ৫৫ হাজার ৩৫ ভোট।
গতবার দ্বিমুখী লড়াই হলেও এবার লড়াই নতুন মাত্রা পাবে। তৃণমূল এবং বামফ্রন্টের মধ্যে মূল লড়াই হলেও কংগ্রেস ও বিজেপি বেশ ভালোই ভোট কাটবে। তাই আখেরে পিসি সরকার না জিতলেও ভাগ্যের চাকা ঘুরে যেতে পারে বামফ্রন্ট প্রার্থীর। তবে এসব ভেবে হাল ছাড়তে চান না পিসি সরকার। পিসি সরকার ও তাঁর সমর্থকেরা মনে করছেন, মমতার ভূমিকার কারণে অনেকে এখন তৃণমূলবিমুখ। আবার সিপিএমের ওপরও মানুষ ক্ষুব্ধ। কংগ্রেসের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। ফলে ভাসমান অনেক ভোট এবার পিসি সরকারের বাক্সে যেতে পারে। তা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গেও লেগেছে মোদি হাওয়া। সব মিলিয়ে রাজনীতির ময়দানেও জাদু দেখাতে পারেন পিসি সরকার। মঙ্গলবার প্রথম আলোকে পিসি সরকার বলেন, এই আসনে তাঁর জয় নিশ্চিত। পিসি সরকার আশাবাদী হলেও তৃণমূল বা বামফ্রন্টের মতো এই আসনে সাংগঠনিক কাঠামো নেই বিজেপির। তাই ব্যক্তি পিসি সরকারের ভাবমূর্তি কাজে লাগিয়ে বিজেপি কতটা সাফল্য পাবে সেটি দেখার বিষয়। পরে প্রথম আলোকে এই বিশ্বখ্যাত জাদুশিল্পী বলেন, ‘অনেক দিন বাংলাদেশে যাই না। নির্বাচনের পর বাংলাদেশ যাওয়ার ইচ্ছে আছে।’

দিল্লিতেও দলের চেয়ে বড় হয়ে উঠলেন মোদি

মধ্য দিল্লির লোদি রোডে একটি স্কুলে ভোট দিয়ে বেলা সাড়ে ১১টায় বেরিয়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বললেন, কোথাও তিনি মোদি-হাওয়া দেখতে পাননি। হাওয়া বইছে কি বইছে না, সেই বিতর্ক পাশে সরিয়ে বলা যায়, বিকেল পর্যন্ত দিল্লির যা ভোট-চিত্র, তা নিরুত্তাপ হলেও শতাংশের হার ৭০ ছুঁই ছুঁই হলেও হতে পারে। গত ডিসেম্বরে বিধানসভা ভোটে যে উন্মাদনা দেখা গিয়েছিল, লোকসভা ভোটের দিনে সেই উন্মাদনা দেখা গেল না। তবে ভোটের হার যথেষ্টই। ডিসেম্বরের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৬৮ শতাংশ। দিল্লির বিধানসভা ভোটে ওটাই ছিল সর্বোচ্চ। কিন্তু লোকসভায় ১৯৭৭ সালের ভোট এখনো পর্যন্ত সেরা। ৭১ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট পড়েছিল সেবার। ‘মোদি হাওয়া’ এবার সেই হিসাবকে উল্টে দেবে কি না, সেই আগ্রহ প্রথম হলে দ্বিতীয় আগ্রহ কংগ্রেসের সাতে সাত রেকর্ডের হাল কী হবে। কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী নয়াদিল্লির আসনটি নিশ্চিত। এখানে কংগ্রেসের সাবেক মন্ত্রী অজয় মাকেনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির মুখপাত্র মীনাক্ষী লেখি। আর আছেন আম আদমি পার্টির (এএপি) প্রার্থী সাংবাদিক আশিস খেতান। কংগ্রেসের হিসাবে, এই আসন ছাড়াও চাঁদনি চক ও পূর্ব দিল্লি আসনে দল ভালো লড়াইয়ে রয়েছে। চাঁদনি চকে কংগ্রেসের সাবেক মন্ত্রী কপিল সিবালের প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির রাজ্য সভাপতি হর্ষবর্ধন ও এএপির সাংবাদিক আশুতোষ।
পূর্ব দিল্লিতে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিতের ছেলে সন্দীপের প্রতিদ্বন্দ্বী যতটা বিজেপির মহেশ গিরি, ততটাই এএপির রাজমোহন গান্ধী। তিনি মহাত্মা গান্ধীর নাতি। এএপির পালে ডিসেম্বরে যে হাওয়া ছিল, এবার তা সেভাবে উপলব্ধি হয়নি। এএপির প্রচারেও সেই উদ্দীপনা দেখা যায়নি। এতেই আশার আলো দেখছে কংগ্রেস। কংগ্রেসের ভোটই ডিসেম্বরে এএপি পেয়েছিল। লোকসভায় সেই সমর্থন কংগ্রেস ফিরে পাবে বলে আশা করছে। দিল্লির মুসলিমরা যাঁরা এএপিকে বেছে নিয়েছিলেন, এবার তাঁরা মোদিকে রুখতে কংগ্রেসকে পছন্দ করতে পারেন। যদিও বিজেপির দিল্লি প্রদেশের সভাপতি হর্ষবর্ধন ভোট দিয়ে বলেছেন, দিল্লির সঙ্গে দেশের মানুষও শক্তিশালী ও স্থিতিশীল সরকার গড়তে বিজেপিকে ভোট দেবে। এবারের ভোটের বিশেষত্ব নরেন্দ্র মোদি। এই প্রথম দিল্লি ও দেশের প্রায় সব কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী কে, তা ছাপিয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে মোদির ছবি। বিজেপি ও মোদি দেশজুড়ে সমার্থক হয়ে গেছে। দিল্লিতে ভোট দিয়ে অনেকে প্রকাশ্যেই জানালেন, প্রার্থী নয়, তাঁরা ভোট দিলেন মোদিকে। দিল্লিতে যে ভোট হয়ে গেল, তাতেও বিজেপির প্রার্থীরা বড় না হয়ে, বড় হয়ে উঠেছেন মোদি।

ভারতে মোদি-উন্মাদনা, বাইরে অস্বস্তি

নরেন্দ্র মোদি
জনমত জরিপে যে সব সময় সঠিক ইঙ্গিত বা পূর্বাভাস মেলে না, তার বড় প্রমাণ ভারত নিজেই। ২০০৯ এবং তারও আগে ২০০৪ সালে অধিকাংশ জরিপে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নির্বাচনী সাফল্যের পূর্বাভাস সঠিক হয়নি। এবারের নির্বাচনেও সব জরিপেই এগিয়ে আছেন বিজেপির নতুন নেতা নরেন্দ্র মোদি। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পিউ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের জরিপেও দেখা যাচ্ছে মি. মোদি প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রতিযোগিতায় ভালো ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। তবে, তাঁর এই উত্থানের আশায় তাঁর সমর্থকেরা যতটা উন্মুখ, বিদেশিরা যে ঠিক ততটাই উৎসাহী, তা নয়। লন্ডন থেকে প্রকাশিত বৈশ্বিক সাময়িকী দি ইকোনমিস্ট তার চলতি সংখ্যায় ‘নরেন্দ্র মোদিকে কি কেউ ঠেকাতে পারবে?’ (ক্যান অ্যানিওয়ান স্টপ নরেন্দ্র মোদি?) প্রচ্ছদকাহিনিতে বলেছে যে ‘মি. মোদিই সম্ভবত ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। তবে, তার অর্থ এই নয় যে তাঁর তা হওয়া উচিত।’ সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদিকে বিজেপি বাছাই করার সিদ্ধান্তটি নিয়েছিল গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর।
তার ঠিক সপ্তাহ দুয়েক পর, ৩০ সেপ্টেম্বর, বৈশ্বিক নীতিগবেষণাকেন্দ্র, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) লন্ডনে এক সেমিনারের আয়োজন করে, যার বিষয়বস্তু ছিল ভারতে ভবিষ্যৎ বিজেপি সরকারের নীতি ও কর্মসূচি। বিজেপির ভবিষ্যৎ ভারতনীতি ব্যাখ্যা করতে সেদিন দিল্লি থেকে এসেছিলেন বিজেপির জাতীয় কোষাধ্যক্ষ এবং দলের প্রচার ও যোগাযোগ কমিটির প্রধান। লোকসভার সদস্য গোয়েল এর আগে বাজপেয়ি সরকারে জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে উপ-উপদেষ্টাও ছিলেন। মোদির বাণিজ্যবান্ধব নীতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বিভিন্ন দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। প্রশ্ন ওঠে পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে, বিশেষ করে বৃহৎ প্রতিবেশী চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে। কেননা, ভারতের অরুণাচল রাজ্যের সীমানা নিয়ে ইতিমধ্যেই চীনের সঙ্গে উত্তেজনা সৃষ্টির ঘটনা ঘটেছে। আর, কট্টর জাতীয়তাবাদী হিসেবে বিজেপির যে পরিচিতি, তাতে ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান ছাড়াও অন্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে দেশটির ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নিয়ে উদ্বেগ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। গোয়েল জানান যে ভারতের ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিষয়টিতে তাঁর দল যেমন আপসহীন, তেমনি অর্থনৈতিক সহযোগিতার নীতিতেও তাঁরা অঙ্গীকারবদ্ধ। চীনের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যে উভয় দেশেরই যে লাভ,
সে বিষয়ে তাঁরা খুবই সচেতন এবং চীনও মোদির নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এর পর যুক্তরাজ্য ও ব্রিটেনসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলোও আলামত বুঝতে পেরে সুর পাল্টেছে। ফোর্ড এবং জেনারেল মোটর্সের কারখানা প্রতিষ্ঠার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করেছে। সেখানকার জনপ্রতিনিধিদের কয়েকজন মোদির ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পক্ষে প্রকাশ্যেই বক্তব্য দিয়েছেন। ব্রিটিশ রাজনীতিকেরাও এদিক দিয়ে পিছিয়ে নেই। ভারতের গুজরাটি বংশোদ্ভূতদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্রিটেনে ব্যবসা-বাণিজ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত। গুজরাটের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কোন্নয়নের অংশ হিসেবে সম্প্রতি আহমেদাবাদের সঙ্গে হিথ্রোর সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালু হয়েছে। ভারতের ভৌগোলিক প্রতিবেশীদের কথা এ ক্ষেত্রে একেবারেই আলাদা। ব্যক্তি বা দলের কারণে প্রতিবেশীদের সম্পর্কে সময়ে সময়ে হূদ্যতা যেমন বাড়তে পারে, তেমনি টানাপোড়েনও হতে পারে। নরেন্দ্র মোদির সম্ভাব্য উত্থান সেই আশঙ্কাকেই জোরদার করছে, অন্তত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিজেপির বহুদিনের পুরোনো অভিযোগ হচ্ছে যে বাংলাদেশিরা অর্থনৈতিক কারণে ভারতে গিয়ে আশ্রয় গাড়ছে এবং এর ফলে ভারতের অর্থনীতিতে যেমন চাপ তৈরি হচ্ছে, তেমনি দেশটির সামাজিক-সাংস্কৃতিক চেহারাটাও পাল্টে যাচ্ছে। এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিজেপির পক্ষ থেকে বিস্ময়কর অভিযোগটি করেছেন দলের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী, নরেন্দ্র মোদি। গত ৩১ মার্চ তিনি আসামের এক জনসভায় বলেছেন যে ‘বাংলাদেশি সেটেলারদের জায়গা করে দিতে ওই রাজ্যে গন্ডার ধ্বংস করার চক্রান্ত হচ্ছে।’
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ১৬ মের পর ‘চুন চুন কি হিসাব লিয়া যায়েগা’ (এক এক করে হিসাব বুঝে নেওয়া হবে)। (সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে, মার্চ ৩১, ২০১৪।) মোদি ওইটুকুতেই থামেননি। তিনি বলেছেন, ‘গন্ডার কি আসামের গর্ব নয়? বর্তমানে ওগুলোকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র চলছে। আমি খুব গুরুত্বের সঙ্গে এই অভিযোগ করছি। সরকারে (কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার) যাঁরা আছেন, তাঁরা বাংলাদেশিদের রক্ষায় এই ষড়যন্ত্র করছেন।’ এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় বিজেপির পক্ষ থেকে বাংলাদেশিদের কথিত অনুপ্রবেশ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে অনেক আগে থেকেই। তবে, বাংলাদেশ থেকে দেশান্তরিত হওয়া মানুষজনের মধ্যে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের ফেরত না পাঠিয়ে তাদের পুনর্বাসনের নীতি বিজেপি অনুসরণ করবে বলে ঘোষণা করেছেন মোদি। ২২ ফেব্রুয়ারি আসামের শিলচরে এক জনসভায় তিনি বলেন, হিন্দু অভিবাসীদের আশ্রয়শিবির বন্ধ করে তাদের তাঁর সরকার পুনর্বাসন করবে (টাইমস অব ইন্ডিয়া, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪)। ভারতে এ ধরনের নীতি অনুসৃত হলে তা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বিপদ কমাবে নাকি বাড়িয়ে দেবে, সে প্রশ্ন ওঠাটা অযৌক্তিক নয়। ভারতে অবৈধ বাংলাদেশিদের অর্থনৈতিক অভিবাসনের অভিযোগ নতুন নয়। তবে, বিজেপি ক্ষমতায় থাকলে বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি একটু বেশিই হয়ে থাকে। এর আগে, অটল বিহারি বাজপেয়ির নেতৃত্বে বিজেপি যখন ক্ষমতায় ছিল, সে সময় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একাধিক বক্তৃতা-বিবৃতিতে দাবি করেন যে ভারতে দুই কোটি (২০ মিলিয়ন) অবৈধ বাংলাদেশি বসবাস করছে।
একাধিকবার দিল্লি ও মুম্বাইয়ে এই অবৈধদের ধরার জন্য অভিযানও পরিচালিত হয়। তারপর উভয় দেশের মধ্যে মাসের পর মাস চলতে থাকে পুশইন আর পুশব্যাকের পাল্টাপাল্টি ঠেলা। ২০০৩ সালের জুনে আদভানি এক সরকারি সফরে লন্ডনে আসেন এবং ভারতীয় হাইকমিশনে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। বিবিসির হয়ে ওই সংবাদ সম্মেলনে আমি গিয়েছিলাম। তখন তাঁর কাছে দুই কোটি বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসীর হিসাবের ভিত্তি জানতে চাইলে তিনি শেষ পর্যন্ত স্বীকার করে নেন যে ওই অনুমান সম্ভবত সঠিক নয় এবং ২০ লাখ ভুলক্রমে ২০ মিলিয়ন বা দুই কোটি হয়ে থাকতে পারে। অবৈধ বাংলাদেশিদের আশ্রয় দিতে গন্ডার উচ্ছেদের কথিত ষড়যন্ত্র সে রকম কোনো অঙ্ক কি না, বিজেপির নেতাদের কাছে বাংলাদেশ সেই ব্যাখ্যা হয়তো চাইতে পারত। কিন্তু, ছোট প্রতিবেশীর রাজনীতিতে বৃহৎ শক্তির জন্য নাক গলানো যত সহজ, তার উল্টোটা তা ততটাই কঠিন। বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য অনিষ্পন্ন বিষয়ে বিজেপি কতটা আগ্রহী হবে, তা-ও নিশ্চিত করে বলা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। বিজেপির নেতাদের বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতিতে তার যে আভাস মেলে, তা বাজপেয়ি আমলের নীতির মতোই হবে বলে অনেকের ধারণা। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নাটকীয় কোনো পরিবর্তন আশা করার কোনো কারণ নেই। কাশ্মীর নিয়ে বিরোধ, সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়ার অভিযোগ এবং আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় শিগগিরই কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। নরেন্দ্র মোদির উত্থানে দক্ষিণ এশিয়ায় যে বিষয়টির ঝুঁকি সবচেয়ে বাড়বে,
তা হলো সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিস্তৃতি। এমনিতেই কয়েক দশক ধরে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে সাম্প্রদায়িকতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তান ও বাংলাদেশে এখন কিছুটা চাপের মুখে থাকলেও ভারতে হিন্দুত্ববাদী উগ্র গোষ্ঠীগুলোর উত্থান তাদের নতুন করে উজ্জীবিত করতে পারে। মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কায় কতিপয় উগ্র বৌদ্ধ গোষ্ঠীর কার্যক্রম ইতিমধ্যেই বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। ধর্মভিত্তিক ডানপন্থী রাজনীতির এই উত্থানের সম্ভাবনায় তাই অনেকেই উদ্বিগ্ন। ভারতের সাড়ে ৮১ কোটি ভোটারের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ হচ্ছে তরুণ। আর, পিউ রিসার্চের জরিপে দেখা যাচ্ছে, ত্রিশের নিচে বয়স এমন তরুণদেরও সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ নরেন্দ্র মোদিকেই ভারতের আধুনিকায়নের রূপকার হিসেবে ভাবছে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতেও যে উন্নয়ন সম্ভব, মোল্লাতান্ত্রিক ইরান তার প্রমাণ। কিন্তু, সেই উন্নয়নকে কোনোভাবেই আধুনিকতার সমার্থক বলা যায় না। গুজরাটে ২০০২ সালের দাঙ্গায় সহস্রাধিক মুসলমানের প্রাণহানির ঘটনায় প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা, মুসলমানদের আতঙ্ক দূর করতে কোনো ধরনের অঙ্গীকার প্রদানে অস্বীকৃতি এবং মুসলিমবিরোধী ভোট দলে টানার কৌশলের জন্য মোদির সমালোচনা করে ইকোনমিস্ট লিখেছে, যাঁরা এখন তাঁর প্রশংসা করছেন, তাঁরাও জানেন না তিনি শেষ পর্যন্ত কী করবেন এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া কী হবে। ইকোনমিস্ট আরও বলছে, এ কারণেই তারা ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদে মোদিকে সমর্থন করতে পারছে না। তবে, জনমত জরিপগুলো ভুল না হলে ভারত যে পথে এগোচ্ছে, তাতে পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার অজানা আশঙ্কা বাড়বে বৈ কমবে না।
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন।

আমার দ্বিতীয় বাড়ির কথা

এবিএম মূসা
প্রথমা প্রকাশন এবিএম মূসার আত্মজীবনীর কাজ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে আসে, তখনই তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। ফলে তাঁর জীবদ্দশায় এটি প্রকাশিত হতে পারেনি। এবিএম মূসার প্রকাশিতব্য আত্মজীবনীর নির্বাচিত অংশ প্রথম আলোয় প্রকাশিত হবে। আজ ছাপা হলো প্রথম পর্ব।
ঢাকা শহরে ভাড়া বাড়িতে থাকতাম, তারপর নিজের বাড়ি হলো। বাড়ির নাম ‘রিমঝিম’। সেই বাড়ির বয়স ৪১ বছর। আমার একটি দ্বিতীয় বাড়ি আছে। তারও একটি নাম আছে। নামটি হচ্ছে প্রেসক্লাব। সেই বাড়িটির, দালানটির নয়, বয়স হয়ে গেল ৫১ বছর। সেই পঞ্চাশের দশকের শেষ বা ষাটের দশকের প্রথম থেকে আমরা যারা সাংবাদিকতা করছি, এখনো আল্লাহ হায়াত দারাজ করায় বেঁচে আছি এবং পরবর্তীকালে যারা এসেছে, তাদেরও সবারই দ্বিতীয় বাড়ি এই প্রেসক্লাব। হিসাব করে বলতে পারব না এই সেকেন্ড হোমে ৫১ বছরের কতখানি সময় কাটিয়েছি,
আর কতখানি থেকেছি নিজের বাড়িতে কিংবা আপন দপ্তরে। নিজের বাড়ির প্রতিদিনের ক্ষণগুলোর সঙ্গে মিশে আছে প্রেসক্লাবে কাটানো সময়ের অনেক হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, আমোদ-বিবাদের ঘটনাবলি। প্রথমে চুয়ান্ন সালে যখন সংবাদ-এর সম্পাদক, আমাদের অনেকেরই শিক্ষাগুরু, খায়রুল কবির ঢাকায় সাংবাদিকদের জন্য একটি ক্লাবের কথা বললেন। আমরা প্রথমে তাঁর ধারণার সবটুকু বুঝতে পারিনি। তারপর যখন তাঁর উদ্যোগে একটি লাল সুরকির বাড়িতে প্রথম মিলিত হলাম, তখনো বুঝিনি এই দালানটিই শেষ পর্যন্ত আমাদের মিলনস্থান হয়ে যাবে! খায়রুল কবির মাসিক ১০০ টাকা ভাড়ায় এই বাড়িটি নিলেন। সেই ভাড়াও কখনো দেওয়া হয়নি। অবশ্য অনেক স্মৃতিবিজড়িত সেই লাল ইটের দালানটি নেই। পরবর্তীকালে অবিমৃষ্যকারী কোনো ক্লাব কর্তৃপক্ষ সেটি ভেঙে তথাকথিত আধুনিক কংক্রিটের বাক্স বানিয়েছে। তবু কল্পনায় ভেসে ওঠে কাঠের গেটটি পার হয়ে গোলাকার চত্বরটি ঘুরে একটি ছোট হলঘরে ঢোকার ছবিটি। আমরা অনেকেই তখন সদ্য সাংবাদিকতা পেশায় ঢুকেছি। সেই যুগে বড়দের সঙ্গে পেশাদারি প্রয়োজন ছাড়া কথা বলারই সাহস ছিল না। তাই সেই হলঘরকে এড়িয়ে চলে যেতাম পেছনের উঠানে অথবা দোতলায়।
সেই হলঘরে তখন বসে থাকতেন সাংবাদিক জগতের কিংবদন্তির মহাপুরুষেরা। অবজারভার-এর আবদুস সালাম, ইত্তেফাক-এর তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আজাদ-এর আবুল কালাম শামসুদ্দীন এবং তাঁদের চেয়ে একটুখানি বয়ঃকনিষ্ঠ কিন্তু ঘনিষ্ঠ দৈনিক সংবাদ-এর জহুর হোসেন চৌধুরী ও মর্নিং নিউজ-এর এস জি এম বদরুদ্দিন। তুমুল তর্ক চলত সেই ঘরটিতে, যার আওয়াজ আমরা বাইরে বসে পেতাম। মাঝেমধ্যে উঁকি মেরে দেখতাম বর্ষীয়ানদের উত্তেজিত আচরণগুলো। পরে ভাবতাম লঙ্কাকাণ্ড ঘটছে, কিছুক্ষণ পরই দেখতাম একে একে বা জোড়ায় জোড়ায়, কখনো একসঙ্গে প্রায় গলাগলি করে তাঁরা বেরিয়ে যাচ্ছেন। আমরা ছোটরা তখন কী করতাম? ভাবতে অবাক লাগছে। নিজেদের তখন বয়স ও পেশাগত জীবনের কালসীমার বিচারে কত কনিষ্ঠই না ভাবতাম! চুপচাপ দোতলায় উঠে যেতাম, যেখানে গিয়ে তাস খেলতাম অথবা পেছনের উঠানে আমগাছের নিচে কাঠের চেয়ারে বসে গুলতানি মারতাম। শতাব্দীপ্রাচীন সেই আমগাছগুলো, বিশেষ করে একটি পেয়ারাগাছের জন্য এখনো মায়া জাগে। আমাদের মধ্যেও নানা ধরনের তর্ক-বিতর্ক হতো। দেদার চা খাওয়া হতো। প্রথম থেকেই ক্লাবের ক্যানটিনটি চালু করেছিলেন অবাঙালি পিটিআইয়ের প্রতিনিধি বালান সাহেব। এক আনায়, মানে ছয় পয়সায় চা, দুই পিসের বাটার টোস্ট একখানা। তখনই চালু হয়েছিল প্রেসক্লাবের ঐতিহ্যবাহী আন্ডাপুরি। ঢাকায় তখন এই খাবারটির নতুনত্ব এতই প্রচার লাভ করেছিল যে বাইরের বন্ধুবান্ধব আবদার ধরতেন, ‘দোস্ত, তোদের ক্লাবের আন্ডাপুরি খাওয়াবি?’ দুপুরে ভাত-ডাল-মাছ, সঙ্গে ভাজি।
দিতে হতো আট আনা। ৫০ পয়সায় পেটপুরে খাওয়া। রোববারে ফিস্ট, বিশেষ খাওয়া। সবাই আসতাম সপরিবারে, মানে যাদের পরিবার ছিল। বিশেষ খাওয়াদাওয়া মানে পোলাও, মুরগি, ডিম এবং পুডিং—মূল্য এক টাকা ২৫ পয়সা মাত্র। মজার ব্যাপার, এখনো এবং তখনো প্রেসক্লাবে যাওয়া মানেই খাওয়া আর অবসরের আড্ডা। চমৎকার এসব খাদ্য যারা রাঁধত, তাদের মধ্যে ছিলেন রোজারিও। তখনকার দিনে ভালো বাবুর্চিদের সবাই ছিল খ্রিষ্টান। এই রোজারিওকে নিয়ে আমার জীবনে মজার একটা ঘটনা ঘটেছিল। প্রায় ২৭ বছর পর আমি কমনওয়েলথ প্রেস সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে গিয়েছিলাম। থাকতাম ইন্টারকন্টিনেন্টালে, খেতাম অখাদ্য সব পাশ্চাত্য খাবার। একদিন ডাইনিং রুমে খেতে বসেছি, এমন সময় সাদা চামড়ার একজন বেয়ারা ঢেকে-ঢুকে একটি ট্রে আমার সামনে রেখে গেল। ঢাকনা খুলে দেখি এক প্লেট সাদা ভাত, সঙ্গে গরুর গোস্তের কারি আর এক বাটি একেবারে খাঁটি মসুরের ডাল। অবাক হয়ে বেয়ারার দিকে তাকাতেই সে হেসে দূরে দাঁড়ানো একজনের দিকে ইশারা করল। কালো চামড়ার সাদা অ্যাপ্রোন পরা ব্যক্তিটি হাসতে হাসতে এগিয়ে এলেন, ‘স্যার, আমাকে চিনতে পেরেছেন? আমি এখানকার হেড শেফ। আপনাদের প্রেসক্লাবে বাবুর্চি ছিলাম। আমি রোজারিও। যেদিন হোটেলে আপনি ঢুকেছেন, সেদিনই দেখেছি। হেড বাবুর্চি হলেও মাঝেমধ্যে ডাইনিং রুমে এসে গেস্টদের খাওয়া-দাওয়া দেখি। আপনাকে চিনতে পেরে,
আপনার কিছুই না খেয়ে উঠে যাওয়া দেখে ভাবলাম, স্যারের কষ্ট দূর করতে হবে। এখন থেকে রোজ রাতে আপনি ভাত-ডাল-মাছ বা মাংস পাবেন। আমি নিজে আলাদা করে রান্না করব।’ আবেগাপ্লুত হয়ে একঘর সাদা চামড়ার লোকজনকে অবাক করে দিয়ে রোজারিওকে জড়িয়ে ধরলাম। যে ঘটনাটির উল্লেখ করলাম, তখনকার দিনে ক্লাবের সদস্য আর কর্মীদের মধ্যে অন্তরঙ্গ সম্পর্কের একটি উদাহরণ মাত্র। যার উষ্ণতার ছোঁয়া বিদেশে গিয়েও পেয়েছি। উমিদ খান, আবদুল হক, ফরমান আলী—সব বেয়ারা সিডনির রোজারিওর মতোই এ রকম দরদ দিয়ে চায়ের কাপটি টেবিলে রাখত। বেয়ারা কুদ্দুস সবার ফুটফরমাশ খাটতে খাটতে হয়রান হয়ে যেত। সর্বক্ষণ দৌড়াত বাইরে থেকে সিগারেট আর খিলি পান আনার জন্য। বলছিলাম সেকেন্ড হোম অর্থাৎ দ্বিতীয় বাড়ির কথা, এরা সবাই ছিল সেই বাড়ির অন্য বাসিন্দা, মালিক ও সদস্যদের একান্ত আপনজন। আরেকটি উদাহরণ দেব। পঞ্চান্নর বন্যায় ঢাকা শহর ভেসে গিয়েছিল। আমার শ্বশুর আবদুস সালাম পরিবারের অন্য সবার সঙ্গে অন্তঃসত্ত্বা আমার স্ত্রীকে নিয়ে প্রেসক্লাবের দোতলায় আশ্রিত হলেন। সেখানে একদিন আমার বড় মেয়ের জন্ম হলো। সেই মেয়েকে উমিদ খান কাঁথায় মুড়িয়ে বুকে জড়িয়ে বারান্দায় পায়চারি করে কান্না থামাত। কাঁথার ময়লা পরিষ্কার করে ধুয়ে দিত। এখন প্রেসক্লাবের অডিটোরিয়ামে অনেক বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। প্রেসক্লাবের জীবনের প্রথম বিয়ের আসরটিও হয়েছিল আমার মেয়ে রুমার বিয়ের অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে। মানিক মিয়া ও সালাম সাহেবরা এলে আবদুল হক দৌড়ে গিয়ে সোফায় তাঁদের বসিয়ে তাঁদের পায়ের জুতা খুলে মুছে দিত।
আর কত নাম বলব, সবার কথা মনে পড়ছে না। এখন যখন সদ্য পেশায় আগত নতুন কোনো সদস্যকে বাচ্চা বেয়ারাদের ওপর হম্বিতম্বি করতে দেখি, তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবি, কোথায় গেল সেই মধুর সম্পর্কের দিনগুলো! শুধু সাংবাদিকদের বিনোদনকেন্দ্র নয়, এই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গেও আমাদের ক্লাবটির একটি ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। এই দেশের ইতিহাসের অনেক অধ্যায় এ ক্লাবেই লিখিত হয়েছে। সে-সংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ কেউ লিপিবিদ্ধ করেছেন কি না, জানি না। রাজনৈতিক নেতারা এ ক্লাবে সভা করে মিছিল নিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুন নেভাতে গিয়েছেন বিভিন্ন এলাকায়। আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে নয়জন রাজনৈতিক নেতা প্রথম একটি যুক্ত বিবৃতি দিয়েছিলেন। বাষট্টিতে। সেই বিবৃতিটির খসড়া করেছিলেন তাঁরা এই ক্লাবের দোতলায় বসে, এক গোপন সভায় মিলিত হয়ে। ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী, নুরুল আমিন, হামিদুল হক চৌধুরী, আতাউর রহমান খান ও শেখ মুজিব থেকে শুরু করে আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন সেই সভায়। রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধকরণের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূত্রপাতও এই প্রেসক্লাব থেকেই। সেই সময় প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় এই ক্লাবের মিলনায়তনেই প্রথম মিলিত হয়েছিলেন। ভাবতে অবাক লাগে, আজকে সাংবাদিক সমাজের নিজেদের চরম সংকটকালে যখন তাদের প্রাণ ও পেশা হুমকির মুখে, প্রেসক্লাবের সদস্যদের কোনো প্রতিরোধী ভূমিকা নেই। এখানে আমন্ত্রিত হয়ে আসতেন আগা খান, জেনারেল আজম খান,
উপমহাদেশের বিখ্যাত নেতারা। রাজনীতির উত্তাল দিনগুলোতে এই ক্লাব ছিল সবার অভয়াশ্রম, সেফ জোন। অতীত ও সাম্প্রতিক কালে, অর্থাৎ কয়েক বছর আগেও পুলিশের মার খেয়ে রাজনৈতিক নেতারা এখানে এসে আশ্রয় নিতেন। এখন অবশ্য এর ব্যতিক্রমী কিছু ঘটছে। বাইরের রাজনৈতিক ঝাপটা যাতে ক্লাবের গায়ে না লাগে, বিদ্যমান সংকটকালে রাজনীতিবিদদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার জন্য, তাঁরা যেন পুলিশের ধাওয়া খেয়ে এর চত্বরে ঢুকতে না পারেন, সে জন্য প্রধান গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর বন্ধ না করলেই বা কী? পুলিশ ক্লাবের ভেতরে ঢুকে যায়। টিয়ার গ্যাস ছোড়ে। এমনকি সাংবাদিকও পিটিয়েছে। আইয়ুব, মোনায়েম বা এরশাদের আমলেও ক্লাব ছিল দুর্ভেদ্য দুর্গ। এখন আর তা নেই। সাংবাদিক সমাজের অনৈক্য আজ ক্লাবের নিরাপত্তার পরিবেশটিকে ধ্বংস করে দিয়েছে, ঐতিহ্য বিনষ্ট করেছে। রাজনীতির ইতিহাসে অবদান রাখার চেয়েও প্রেসক্লাব সাংবাদিকদের অধিকার আদায় ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এনেছে অনেক বেশি। এখান থেকে বয়সের ভারে ন্যুব্জ মওলানা আকরম খাঁর নেতৃত্বে সব মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক আইয়ুব খানের প্রেস অর্ডিন্যান্সের প্রতিবাদে মিছিল করেছেন। আমার ছাদ-খোলা গাড়িতে দাঁড়িয়ে মওলানা সাহেব সারা ঢাকা ঘুরেছেন, সেই গাড়িটি চালানোর সুখময় স্মৃতি এখনো আমাকে রোমাঞ্চিত করে।
সাংবাদিকদের ঐক্যের প্রতীক ছিল এই ক্লাব। চারবার সভাপতি ও তিনবার সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক সমাজের ইউনিয়ন ছিল এই দালানে। এখনো আছে, তবে দ্বিধাবিভক্ত, কর্মকাণ্ডের ঐক্যটি আর নেই। আমি ক্ষোভে-দুঃখে জ্বালা অনুভব করি যখন দেখি আমার সেই ইউনিয়নটি, আমি এককালে যার সভাপতি ও সম্পাদক ছিলাম, ক্লাব কর্তৃপক্ষ তার মাঝ বরাবর বিভক্তির দেয়াল তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে। অথচ ক্লাবে ইউনিয়নের জন্য একটি ঘর পেতে আমাকে মালিক ও সম্পাদকের সঙ্গে একসময় রীতিমতো ঝগড়া করতে হয়েছে। তাঁদের যুক্তি ছিল, ক্লাবটি শুধু পেশাদার সাংবাদিকদের নয়, তাঁদেরও বটে। এ ক্লাব থেকেই পাকিস্তানে প্রথম সাংবাদিকদের ওয়েজ বোর্ড গঠনের দাবি উঠেছিল। সেই বোর্ডের প্রথম সভাও হয়েছিল বিচারপতি সাজ্জাদ আহমদ জানের সভাপতিত্বে এ ক্লাবেরই দোতলার হলঘরে। সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন ইউনিয়নের তখনকার সভাপতি, পরবর্তীকালে ডেইলি স্টার-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক বন্ধু এস এম আলী, আমি ছিলাম সাধারণ সম্পাদক।
আগামীকাল: খেলার মাঠে রাজনৈতিক চেতনা
এবিএম মূসা: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

হার মানলেন মমতা : বদলি নির্দেশ কার্যকর

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্দেশ কার্যকর করলেন পঞ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা। কমিশনের চাপে নতিস্বীকার করে অপসারিত অফিসারদের অন্যত্র বদলির নির্দেশ দিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। নির্বাচন কমিশনের কথায় সরকার চলবে না। পুলিশ সুপারদের বদলি করা হবে না। নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা থাকলে আমাকে গ্রেফতার করুক- সোমবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন কমিশনকে এমন হুমকি দেয়ার সত্ত্বের বুধবার পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বদলির আদেশ দিলেন মমতা ব্যানার্জি। তবে নির্বাচন শেষে তাদের আবার আগের স্থানেই ফিরিয়ে আনবেন।
মঙ্গলবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে তা আগেই জানিয়েছিলেন মমতা। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ মোতাবেক এদিন উত্তর চব্বিশ পরগনার জেলা প্রশাসক সঞ্জয় বনসল ও ২ জন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে স্বরাষ্ট্র দফতরে ওএসডি পদে বদলি করা হয়েছে। আবার পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার ভারতী ঘোষ ও মুর্শিদাবাদের এসপি হুমায়ুন কবীরকে সিআইডি-র বিশেষ সুপার পদে বদলি করা হয়েছে। বর্ধমানের এসপি সৈয়দ মির্জা ও মালদার এসপি রাজেশ যাদবকে সরিয়ে আনা হয়েছে পুলিশ ডাইরেক্টরের ওএসডি পদে। এদিন বদলির নির্দেশ দিয়ে ওই খালি পদগুলোতে অফিসারও নিয়োগ করেছে রাজ্য সরকার। উত্তর ২৪ পরগনার জেলা প্রশাসক সঞ্জয় বনসলের স্বরাষ্ট্র দফতরের ওএসডি পদে বদলির পর তার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ওঙ্কার সিং মিনাকে। পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার ভারতী ঘোষের জায়গায় আনা হয়েছে শিসরাম ঝাঝোরিয়াকে। সূত্রের খবর, সম্প্রতি পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুরে রাজনৈতিক সংঘর্ষের প্রসঙ্গ টেনে পুলিশ সুপার ভারতী ঘোষকে রবিবার সতর্ক করে কমিশন। মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ওয়াকার রাজাকে। এর আগে হুমায়ুন কবীর জেলার পুলিশ সুপার ছিলেন।

গুঞ্জন শুনি

নিজের বয়সের চেয়ে অনেক ছোট নায়িকাদের নিয়ে ছবি করা দক্ষিণী সুপারস্টার রজনীকান্তের এখন ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথম ঐশ্বর্য রাই বচ্চনের সঙ্গে ২০১০ এ রোবো। এবার মুক্তি পেতে যাচ্ছে দিপীকা পাড়ুকোনের সঙ্গে কোচাদাইয়া। সম্প্রতি ছবিটি মুক্তি পাওয়ার আগেই শুরু হয়েছে নতুন গুঞ্জন। কোচাদাইয়ার মাধ্যমে পরিচালনায় পা ফেলা রজনীকন্যা সৌন্দর্য নাকি আবার ছবি বানাবেন বাবাকে নিয়ে।
নায়িকা হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে সোনাক্ষী সিনহার কাছে। এখনও পুরোপুরি সম্মতি না দিলেও গুঞ্জন মাফিক মোটামুটি হ্যাঁ বলার জন্যই নাকি প্রস্তুতি নিচ্ছেন সোনাক্ষী। কিন্তু উল্টো হিসাব দিচ্ছে রজনীর ঘনিষ্ট সূত্র। সোনাক্ষীর বাবা শত্র“ঘœ আর রজনী নাকি প্রায় কাছাকাছি বয়েসী। একসঙ্গে ছবি করার বরাতে বন্ধুত্বটাও চাঙ্গা। সেখানে বন্ধুর মেয়ের সঙ্গে নায়কের চরিত্রে অভিনয় করাটা নাকি রজনী খুব একটা সহজভাবে নিতে পারছেন না। ‘বিনোদ-অক্ষয়’ খান্না কিংবা ‘ঋষি-রণবীর’ জুটির বিপরীতে মাধুরী দিক্ষীত পর্দা কাঁপাতে পারলেও নিতান্ত বন্ধুর মেয়ে বলে সোনাক্ষীর বিপরীতে অভিনয়ে রজনীর অস্বস্তির বিষয়টি অনেকেই তার পেশাদারিত্বের অভাব হিসেবেই দেখছেন।