Monday, October 27, 2025

যুক্তরাষ্ট্রই কি আসলে ইসরায়েলের স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণ করে দিচ্ছে

সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক উচ্চপর্যায়ের মার্কিন কর্মকর্তাকে ইসরায়েল সফরে যেতে দেখা গেছে। প্রথমে গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার ইসরায়েল সফরে যান। এরপর গত মঙ্গলবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং গত বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দেশটি সফর করেন।

তাঁদের সবার লক্ষ্য পরিষ্কার—গাজায় যুক্তরাষ্ট্র–সমর্থিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি যেন ভেঙে না যায়, তা নিশ্চিত করা। এর মানে হলো, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ইসরায়েল সরকার যেন গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি থেকে সরে না আসতে পারে, তা নিশ্চিত করা। দুই বছরের যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে চলতি মাসের শুরুতে ওই যুদ্ধবিরতি হয়।

ইসরায়েলে মার্কিন কর্মকর্তাদের ঘন ঘন সফরকে গাজায় আবারও হামলার অজুহাত খুঁজতে থাকা চরম ডানপন্থী নেতানিয়াহু সরকারকে চাপ দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গাজায় দুই বছরের যুদ্ধে ৬৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

ইসরায়েলে এ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য পেয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইসরায়েলের আনুগত্যের প্রমাণ দেয়। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, ওয়াশিংটন কিছু করতে বললে, ইসরায়েল শেষ পর্যন্ত তা মেনে নেয়।

সাবেক ইসরায়েলি দূত এবং নিউইয়র্কে নিযুক্ত কনসাল জেনারেল অ্যালন পিনকাস বলেন, ‘অবশ্যই ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ে থাকা একটি রাষ্ট্র।’

পিনকাস এ ক্ষেত্রে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার বদৌলতে দেশটির প্রতি ইসরায়েলের যে নির্ভরতা তৈরি হয়েছে, সেটিকে ইঙ্গিত করেছেন। যেমন ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোটি কোটি ডলার সহায়তা পেয়েছে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সমালোচনা বা নিষেধাজ্ঞা প্রতিহত করতে জাতিসংঘে হওয়া ভোটাভুটিতে ওয়াশিংটন বেশ কয়েকবারই ভেটো দিয়েছে। এ ছাড়া সামরিক সুরক্ষা তো আছেই।

মূলত দীর্ঘদিনের সে সহায়তাকেই চাপপ্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ট্রাম্প প্রশাসন। এটা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুব বিরল একটি ঘটনা। এবার তারা সরাসরি ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া অনুযায়ী আচরণ করতে বাধ্য করছে এবং প্রকাশ্যেই ওয়াশিংটনের চাপপ্রয়োগের বিষয়টি সামনে আনছে। এই চাপের কিছুটা এসেছে স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকেই।

টাইম সাময়িকীতে গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি নেতানিয়াহুকে গাজায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া থেকে থামিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, ‘আপনারা জানেন, আমি তাঁকে থামিয়েছি। না হলে তিনি যুদ্ধ চালিয়েই যেতেন। সেটা হয়তো বছরের পর বছর ধরে চলত।’

একই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, যদি ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরকে নিজেদের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চালিয়ে যায়, তবে ইসরায়েলকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া বন্ধ করে দেবে যুক্তরাষ্ট্র। পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবটি গত বুধবার ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে প্রাথমিকভাবে অনুমোদন পেয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সও ইসরায়েলি পার্লামেন্টে এই প্রস্তাব নিয়ে ভোটাভুটির বিরোধিতা করেন এবং এটিকে ‘অত্যন্ত বোকামি’ বলে উল্লেখ করেন।

নেতানিয়াহু সে বার্তা বুঝতে পেরেছেন। তাঁর কার্যালয় এ ভোটাভুটিকে ‘রাজনৈতিক উসকানি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। যদিও তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের সদস্যরাও প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। নেতানিয়াহু নিজেও আগে পশ্চিম তীরকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিকে সমর্থন দিয়েছিলেন।

ইসরায়েলের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবটা তুলনামূলক বেশি। এটি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দেশগুলোর একটি। আর ইসরায়েল দেশটির ঘনিষ্ঠ মিত্র। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ইসরায়েলের একটি বড় সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে।

তবে যেকোনো কারণেই হোক, বিভিন্ন সময়ে মার্কিন প্রশাসনগুলোকে ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা করতে দেখা গেছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম তিন মাসে যুক্তি দেখিয়েছিলেন, গাজায় আরও বেশি ধ্বংসযজ্ঞ চালানো থেকে ইসরায়েলকে বিরত রাখতে দেশটিকে প্রকাশ্য সমর্থন জানানো দরকার।

তবে সে যুক্তি কাজে দেয়নি। নেতানিয়াহু বারবারই যুদ্ধবিরতির চেষ্টা উপেক্ষা করেছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব পালনকালে ট্রাম্পও ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়েছিলেন এবং দেশটিতে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর ট্রাম্পের সে অবস্থানে বদল দেখা যায়। দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে তুলনামূলক বেশি বিরোধপূর্ণ পথ অনুসরণ করছেন। এখন পর্যন্ত তাঁর এ অবস্থান কাজেও লেগেছে।

চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ কনসাল্টিং ফেলো ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেন, ‘বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সতর্ক অবস্থার মধ্যে রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল নানা কথা বলতে পারে—যেমনটা তারা এখন বলছেও। কিন্তু আসলে তাদের লক্ষ্য কী, তা একেবারেই স্পষ্ট।’

গত সপ্তাহে সিবিএস নিউজের সিক্সটি মিনিটস অনুষ্ঠানে এক সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গ টেনে আনেন মেকেলবার্গ। ওই সাক্ষাৎকারে উইটকফ বলেছেন, সেপ্টেম্বরে কাতারের দোহায় হামাসের আলোচক দলের ওপর ইসরায়েল হামলা চালানোর পর তিনি এবং ট্রাম্পের জামাতা কুশনারের মনে হয়েছিল, তাঁরা ইসরায়েলের দিক থেকে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার।

আর সাক্ষাৎকারে কুশনার বলেছেন, তাঁর শ্বশুর ট্রাম্প মনে করেছিলেন যে ইসরায়েলিরা তাদের কর্মকাণ্ডে ‘কিছুটা নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে’। তারা যেন এমন কাজ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।

অক্টোবরের প্রথম দিকে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে ভাষণ দেওয়ার সময় ট্রাম্প বিভিন্ন দুর্নীতির মামলায় নেতানিয়াহুকে ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের প্রতি আহ্বান জানান। ২০১৯ সাল থেকে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে এসব দুর্নীতির মামলা হয়েছে।

মেকেলবার্গ বলেন, ‘এমন হতে পারে যে ট্রাম্প হয়তো নেতানিয়াহুকে বলেছেন, দেখুন আমি আসব, নেসেটে কথা বলব, এমনকি আপনার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনাও করতে পারি। তবে বিনিময়ে আপনাকে আমার নির্দেশিত পরিকল্পনা অনুসরণ করতে হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া পূরণ করতে গিয়ে ইসরায়েল তার স্বাধীনতা হারাচ্ছে—এমন গুঞ্জন নিয়ে নেতানিয়াহু ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বিষয়টি স্পষ্ট করতে চাই। এক সপ্তাহে তারা বলে, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আবার আরেক সপ্তাহে তারা বলে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এটা একেবারেই বাজে কথা।’

তবে নেতানিয়াহু এমন দাবি করলেও যুক্তরাষ্ট্র যে ইসরায়েলের নীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে, তার কিছু আলামত দেখা গেছে। গাজায় যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে কূটনৈতিক চাপ ছাড়াও আরও অনেক নজির আছে, যেখানে ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের নীতিনির্ধারণ করে দিয়েছে।

নেতানিয়াহুর সর্বশেষ ওয়াশিংটন সফরের সময় গাজা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। পর্যবেক্ষকদের কারও কারও মতে, এটি একটি কৌশল। নেতানিয়াহু ইসরায়েলে ফেরার আগে প্রকাশ্যভাবে চুক্তির শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করার জন্য এ কৌশল খাটানো হয়েছে।

একই সফরে নেতানিয়াহুকে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুহাম্মদ বিন আবদুলরহমান বিন জসিম আল থানির কাছে দোহায় ইসরায়েলি হামলার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়েছিল। এ ছাড়া জুনে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ১২ দিনের যুদ্ধ চালায়। ওই সংঘাত বন্ধে হওয়া যুদ্ধবিরতির শুরুতে ইসরায়েল হামলা চালানোর পরিকল্পনা করলেও ট্রাম্পই তখন নেতানিয়াহুকে থামিয়েছিলেন।

অ্যালন পিঙ্কাসের মতো পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, এসব পদক্ষেপ নেতানিয়াহু ও অন্যদের মনে করিয়ে দিচ্ছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কতটা অসম, বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে।

পিঙ্কাস বলেন, ‘এগুলো ইসরায়েলের স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণ করে দিচ্ছে। এগুলো নেতানিয়াহু ও অন্যদের জানিয়ে দিচ্ছে যে তাঁরা পরামর্শ ছাড়া নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে স্বাধীনভাবে চলতে ফিরতে পারেন, কিন্তু এর বেশি নয়।’

এ ছাড়া এসব পদক্ষেপের কারণে নেতানিয়াহুর এটা বুঝে যাওয়ার কথা যে যুক্তরাষ্ট্রে এখন তাঁর শক্তপোক্ত কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। ডেমোক্র্যাটরা তাঁকে মেনে নিতে পারছেন না, জনমত তাঁর বিপক্ষে এবং রিপাবলিকান পার্টির অনেকেও তাঁকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। এখন আর তিনি এক পক্ষকে অন্য পক্ষের বিপরীতে ব্যবহার করতে পারবেন না।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলছেন। ১৩ অক্টোবর, ২০২৫, পশ্চিম জেরুজালেম
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলছেন। ১৩ অক্টোবর, ২০২৫, পশ্চিম জেরুজালেম। ছবি: রয়টার্স

মার্কিন রাজনীতিতে ঝড় তোলা জাহরান মামদানি যেভাবে রাজনীতিতে

নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপোর্টঃ জাহরান মামদানি তখন ব্রঙ্কস হাই স্কুল অব সায়েন্সের ছাত্র। এটি নিউইয়র্কের সবচেয়ে সম্মানিত পাবলিক স্কুলগুলোর একটি। স্কুলের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হয়ে তিনি খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন ভোটার, সমর্থক, কর্মী। তার প্রচারণা ব্যর্থ হয়।

আংশিক কারণ ছিল এক অসম্ভব প্রতিশ্রুতি: ‘সব ছাত্রের জন্য স্থানীয় ফলের টাটকা জুস।’ পরে তিনি স্বীকার করেন, আমি এমন কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যা বাস্তবে করা সম্ভব ছিল না। এ খবর দিয়ে অনলাইন নিউ ইয়র্ক টাইমস একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে আরও বলা হয়, কিন্তু অন্য এক প্রচারণা দারুণভাবে এগোচ্ছিল। এটা তার কাছে অনেক বেশি অর্থবহ ছিল। তখন নিউইয়র্ক সিটির কোনো পাবলিক স্কুলেই ক্রিকেটকে আনুষ্ঠানিক খেলা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। দক্ষিণ এশীয় পটভূমি থেকে আসা মামদানি ও তার বন্ধুদের কাছে এটি ছিল একটি প্রিয় খেলা। তাই তারা নিজেরাই স্কুলে ক্রিকেট টিম গঠনের উদ্যোগ নেন। তারা মাঠে মাঠে ঘুরে ব্যাট, প্যাড আর সাইনআপ তালিকা জোগাড় করেন। ফেসবুকে মামদানি লেখেন, এই খেলায় খেলতে হলে ব্রাউন হওয়া বাধ্যতামূলক না। ধীরে ধীরে তারা ছাত্র ও শিক্ষক- উভয় পক্ষকেই বোঝাতে সক্ষম হন যে, এটি সত্যিকারের একটি দলীয় খেলা।
সহপাঠী অবনীত সিং বলেন, জাহরান তখন যেন নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছিল। স্কুলে দেখা যেত, সে ছোটাছুটি করছে। সবাইকে বলছে, ‘আমরাই স্কুলের ক্রিকেট দল।’ আসলে দল হওয়ার আগেই তাকে দল হিসেবে অভিনয় করতে হয়েছিল।

শৈশব থেকে নেতৃত্বের শিক্ষা: ২০১০ সালে ব্রঙ্কস সায়েন্স থেকে স্নাতক হওয়ার পনেরো বছর পরও মামদানির জীবনীতে সেই ক্রিকেট দলের কথাই প্রধানভাবে উল্লেখ করা হয়। কারণ, এটি শুধু এক তরুণ আইনপ্রণেতার প্রাথমিক উদ্যোগ নয়- এটি তার সংগঠক মানসিকতারও প্রতীক। আজ তিনি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন। জুনিয়র বছরে পৌঁছানোর পর মামদানির প্রচেষ্টায় নিউইয়র্কের স্কুল সিস্টেম ক্রিকেটকে আনুষ্ঠানিক খেলার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। মাসের পর মাস বৈঠক, পরিকল্পনা ও তদবির শেষে তাদের দল প্রথমবারের মতো শহরের অনুমোদন পায়। মামদানি পরে বলেন, এই ঘটনাই আমাকে সংগঠনের শক্তি ও বাস্তবতা পরিবর্তনের ক্ষমতা শিখিয়েছিল।

ছোট শহর থেকে বৃহৎ দিগন্তে: উগান্ডায় জন্ম নেয়া এবং ভারতীয় বুদ্ধিজীবী দম্পতির সন্তান হিসেবে মামদানির বেড়ে ওঠা নিউইয়র্কে। তবু তার শৈশবের নিউইয়র্ক ছিল ছোট। সীমিত বন্ধুবৃত্তের এক সাদা মধ্যবিত্ত দুনিয়া। ব্রঙ্কস সায়েন্সেই প্রথম তিনি বর্ণ, শ্রেণি ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য সহ প্রকৃত নিউইয়র্ককে চিনতে শেখেন। সেখানে তিনি শিখেছেন কিভাবে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়, কীভাবে নিজের পরিচয়কে গ্রহণ করতে হয়, এমনকি কৌতুকে ভরা কৈশোরে নিজের ‘ব্রাউন’ পরিচয় নিয়েও গর্ব করতে হয়। তার এক ক্যাম্পেইন স্লোগান ছিল- হোয়াট ক্যান ব্রাউন ডু ফর ইউ?  আর একবার স্কুলে পরে ছিলেন টুপি। তাতে লেখা- ‘উগিন্ডিয়াস ফাইনেস্ট’।

অসমতার পাঠ: ব্রঙ্কস সায়েন্স নিউইয়র্কের আটটি স্পেশালাইজড স্কুলের একটি। সেখানে ভর্তি সম্পূর্ণভাবে এক পরীক্ষার উপর নির্ভরশীল। এই ব্যবস্থাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে বর্ণবৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। মামদানি নিজেও বলেন, আমি নিজের চোখে দেখেছি নিউইয়র্কের পাবলিক স্কুলগুলো কতটা বিভাজিত। দীর্ঘদিন তিনি এই ভর্তি পরীক্ষা বাতিলের দাবি তুলেছিলেন, যদিও সাম্প্রতিক নির্বাচনের আগে তিনি একে ‘সংঘাতপূর্ণ ইস্যু’ বলে নরম অবস্থান নিয়েছেন।

কমিউনিটি ও রাজনৈতিক শিকড়:
ব্রঙ্কস সায়েন্সে প্রায় ৭০০ সহপাঠীর মধ্যে মামদানি ছিলেন পাতলা গড়নের প্রাণবন্ত এক কিশোর। তিনি নিজেকে দিয়ে আলাদা হয়ে উঠেছিলেন। ইতিহাস শিক্ষক মার্ক কাগান বলেন, চৌদ্দ বছর বয়সী সব ছেলের মধ্যে ব্যক্তিত্ব থাকে না। কিন্তু জাহরানের মধ্যে কিছু আলাদা ছিল। প্রথমে ধনী শ্বেতাঙ্গ সহপাঠীদের সঙ্গে মিশলেও, পরে মামদানি ক্রমে ঘনিষ্ঠ হন সেই ক্রিকেট দলের ছেলেদের সঙ্গে- যারা ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারের সন্তান। তাদের অনেকেই নিম্নবিত্ত। এই সম্পর্কই শ্রেণি-সংবেদনশীলতা, সংগঠনের দক্ষতা এবং সমাজ পরিবর্তনের বিশ্বাস তার রাজনীতির মূলভিত্তি গড়ে দেয়। তিনি নিজের হাইস্কুল ইয়ারবুকে লিখেছেন, আমি বোলার হতে ভালোবাসি। কারণ খেলার গতিপথ অনেকটা আমার হাতে থাকে। এই কথাই যেন আজ তার রাজনীতিতেও প্রতিধ্বনিত হয়।

নিউইয়র্কের ভবিষ্যৎ ও পুরনো স্কুলের গর্ব: আজও ব্রঙ্কস সায়েন্সের সাবেক ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মামদানির উত্থান নিয়ে আলোচনা থেমে নেই। কেউ গর্বিত, কেউ বিস্মিত- একই স্কুল থেকে এত বামপন্থী একজন রাজনীতিক বেরিয়েছে, তা অনেকের কাছে অবাক করার মতো। মামদানি নিজেও মজা করে তার পুরনো ব্যর্থ নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, নিউইয়র্ক পোস্ট আমার সেই ‘জুস ফর অল’ প্রচারণা নিয়ে লিখেছিল। আমি এখন শুধু বলতে পারি-  ‘গো উলভারিনস!’ বছরখানেক আগে ম্যানহাটনের এক অনুষ্ঠানে তিনি দর্শকের ভিড়ে বসে থাকা তার পুরনো শিক্ষক কাগানকে চিনে ফেলেন। অনুষ্ঠান শেষে শিক্ষক বলেন, ও আসলে তেমন বদলায়নি, শুধু এখন দাড়ি রেখেছে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/186116_Abul-7.webp

চাপে থাকা নেতানিয়াহু কি আগাম নির্বাচনের দিকে নজর দিচ্ছেন

ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতির কারণে ব্যাপক চাপে রয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সরকারে নিজ জোটের অনেক মিত্রই এখন তাঁর বিরোধিতা করছেন। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতা হারানোর শঙ্কা দেখা দিয়েছে তাঁর। বিশ্লেষকেরা বলছেন, নেতানিয়াহুকে দেখে মনে হচ্ছে পিঠ বাঁচাতে আগাম নির্বাচনের দিকে নজর দিচ্ছেন তিনি।

বর্তমানে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে নেতানিয়াহুর কট্টরপন্থী জোট সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। পার্লামেন্টে ১২০ আসনের ঠিক অর্ধেক—৬০ আসন রয়েছে তাদের। ফলে সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট আনা হলে তা থেকে বাঁচার সুযোগ কম। এরই মধ্যে ২০ অক্টোবর থেকে আবার নেসেটে অধিবেশন শুরু হয়েছে। এটি সরকারের জন্য বড় একটি হুমকি।

গাজায় টানা দুই বছর ধরে চরম নৃশংসতা ও জাতিগত নিধন চালানোর পর ১০ অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় নেতানিয়াহু সরকার। তবে সরকারি জোটের অনেক দল এর বিপরীতে গিয়ে দাবি করে, গাজায় হামলা চালিয়ে যেতে হবে। আপাতত তারা জোট ত্যাগ না করলেও সরকারে থাকার জন্য নানা দাবি নিয়ে দর-কষাকষি বাড়িয়েছে।

২০২৬ সালের জুনেই কি নির্বাচন

স্বাধীন বিশ্লেষক মাইকেল হরোউইৎজ এএফপিকে বলেন, ‘গাজায় যুদ্ধবিরতির কারণে সরকারি জোট দুর্বল হয়ে পড়েছে। নেতানিয়াহুর জন্য বিষয়টি আর চলতি মেয়াদের শেষ পর্যন্ত সরকারি জোট টিকিয়ে রাখা নয়। তিনি বরং আগামী নির্বাচনে জয়লাভের জন্য একটি অবস্থান তৈরির দিকে নজর দিচ্ছেন, তা আগাম নির্বাচনের আয়োজন করে হলেও।’

১৮ অক্টোবর টেলিভিশনে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। সেখানে তিনি বলেছিলেন, আগামী নির্বাচনেও লড়বেন তিনি। জয়ের আশাও করছেন। ইসরায়েলের সংবিধান অনুযায়ী, ওই নির্বাচনে ২০২৬ সালের শেষ ভাগ নাগাদ আয়োজন করতে হবে। তবে জোট থেকে কোনো দল সরে দাঁড়ালে আগাম নির্বাচনের আয়োজনও করতে পরেন তিনি।

এরই মধ্যে জোট থেকে সরে দাঁড়ানোর হুমকি দিয়ে রেখেছেন ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামান বেন-গভির। আরেক কট্টরপন্থী দল সেফারডিক শাস পার্টির ১১ আইনপ্রণেতা সরকার থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছে। এর আগে ইউনাইটেড তোরাহ জুদাইসম নামে আরেকটি জোট নিজেদের সরকার ও জোট—দুটি থেকেই সরিয়ে নিয়েছে।

নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অমিত সেগালসহ কয়েকজন সাংবাদিকের তথ্য অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালের জুন মাসে আগাম নির্বাচনের আয়োজন করতে পারেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী। তবে এর আগপর্যন্ত সরকার টিকিয়ে রাখার জন্য জোটসঙ্গীদের সঙ্গে নেতানিয়াহুকে কোনো না কোনো কূটকৌশল খাটিয়ে চলতে হবে।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিভিন্ন মামলা চলছে। এরপরও আগামী নভেম্বরে তাঁকেই আবার দলের প্রধান নির্বাচিত করতে যাচ্ছে লিকুদ পার্টি। কারণ, দলটির হাতে বিকল্প কোনো প্রার্থী নেই। আর গাজা ইস্যুতে ইসরায়েলের ভেতরে লিকুদ পার্টি নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিলেও বিভিন্ন জরিপ বলছে—দলটিই এখনো অন্যদের চেয়ে জনপ্রিয়তায় এগিয়ে রয়েছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-06-30%2F46otmpdd%2FUntitled-2.png?rect=0%2C0%2C3670%2C2447&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি: রয়টার্স

বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যৌন সম্পর্ক: ধর্ষণের নতুন ধারায় ৪ মাসে ২১০ মামলা by নাজনীন আখতার

সরকারি একই দপ্তরে চাকরির সুবাদে ২০২২ সালে দুজনের পরিচয়। এক বছর পর দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নারীর অভিযোগ, বন্ধুর বাসায় বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার নাম করে তাঁকে ধর্ষণ করেন সহকর্মী প্রেমিক। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে তাঁর সঙ্গে একাধিকবার যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। সবশেষ নারী বিয়ে না করলে ঘটনা সবাইকে বলে দেবেন বলে হুমকি দেন। তখন প্রেমিক তাঁকে রংপুরে নিজের গ্রামের বাড়ি আসতে বলেন।

নারীর ভাষ্য, প্রেমিকের কথামতো তিনি গত ২ এপ্রিল রংপুর শহরে যান। প্রেমিকের পরিবারের সদস্যরা এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। পরদিন সকালে গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দেন। রাতে প্রেমিক শহরের একটি আবাসিক হোটেলে নারীকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে কক্ষ ভাড়া করেন। আবার যৌন সম্পর্ক করেন। পরদিন নাশতা কেনার কথা বলে হোটেল থেকে বেরিয়ে প্রেমিক আর ফিরে আসেননি। এই অবস্থায় নারী তাঁর প্রেমিকের গ্রামের বাড়ি গিয়ে বিয়ের দাবিতে অনশন করেন চার দিন। ১৫ দিনের মধ্যে পারিবারিকভাবে বিয়ের ব্যবস্থার আশ্বাস দিয়ে তাঁকে ফেরত পাঠান প্রেমিকের পরিবারের সদস্যরা।

তবে প্রতিকার না পেয়ে গত ২২ এপ্রিল রংপুরের তাজহাট থানায় প্রেমিককে আসামি করে বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের অভিযোগ করেন নারী। থানা-পুলিশ ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ ’-এর ৯খ ধারায় অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে।

অন্তর্বর্তী সরকার চলতি বছরের ২৫ মার্চ ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে। আইনের ধারা ৯ক-এর পর নতুন ধারা ৯খ সংযোজন করা হয়েছে। ৯খ ধারায় ‘বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম’ করলে দণ্ডের বিষয়ে বলা আছে।

আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, নতুন এই ধারা কার্যকরের পর গত জুলাই মাস পর্যন্ত চার মাসে সারা দেশে ‘বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম’ করার অভিযোগে ২১০টি মামলা হয়েছে।

আইনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড। আর বিয়ের প্রলোভনে যৌনকর্ম করার দণ্ড সর্বোচ্চ ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড।

রংপুরের তাজহাট থানার মামলার এজাহারে নারী অভিযোগ করেন, ২০২৩ সালের ১২ মে থেকে ২০২৫ সালের ৩ এপ্রিল পর্যন্ত বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁকে একাধিকবার ধর্ষণ করেন আসামি।

এই নারী প্রথম আলোকে বলেন, তিনি বড় ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। মামলায় কোনো অগ্রগতি আছে বলে তাঁর জানা নেই। তবে তিনি ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী।

রংপুরের তাজহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহজাহান আলী প্রথম আলোকে বলেন, মামলা হওয়ার পর আসামি হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছেন। তাঁরা মামলার অভিযোগপত্র তৈরির কাজ করছেন।

৯খ ধারায় গত ১ জুলাই রাজধানীর মতিঝিল থানায় মামলা করেন চট্টগ্রামের এক তরুণী। তাঁর ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় ঢাকার বাসিন্দা এক তরুণের (২৫)। তরুণ তাঁকে ঢাকায় এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বলেন।

এজাহারে তরুণী বলেছেন, তিনি ঢাকায় এলে তাঁকে একটি হোটেলের কক্ষ ভাড়া করে থাকার ব্যবস্থা করেন তরুণ। বিয়ের আশ্বাস দিয়ে তাঁকে একাধিকবার ধর্ষণ করেন।

এই মামলার বিষয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিক তদন্তে মেয়েটির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।

ধর্ষণের মামলা

গত ১৪ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং অপরাধ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান তুলে ধরে। ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত অপরাধের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়।

পরিসংখ্যান অনুসারে, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১০ মাসে সারা দেশে ধর্ষণের মামলা হয় ৪ হাজার ১০৫টি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ধর্ষণের মামলা হয় ৩৯২টি। ফেব্রুয়ারিতে ৩৩৭টি। মার্চে ৪৮৩টি। এপ্রিলে ৫৩৭টি। মে মাসে ৫০৩টি। আর জুনে ৪৯২টি।

বছরভিত্তিক হিসাবে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ধর্ষণের মামলা হয়েছে ২ হাজার ৭৪৪টি। ২০২৪ সালে ৪ হাজার ৩৯৪টি। ২০২৩ সালে ৫ হাজার ১৯১টি। ২০২২ সালে ৬ হাজার ৩২টি। ২০২১ সালে ৬ হাজার ৩৪১টি। ২০২০ সালে ৬ হাজার ৫৫৫টি।

আইনে যে কারণে নতুন ধারা

গত মার্চ মাসের শুরুর দিকে মাগুরায় একটি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদ-বিক্ষোভের মধ্যে ধর্ষণ মামলার বিচার দ্রুত করার জন্য আইনে সংশোধন আনে অন্তর্বর্তী সরকার।

সংশোধনে শিশু ধর্ষণ অপরাধের বিচারে আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন, ছেলেশিশুদের প্রতি যৌনকর্মকে ‘বলাৎকার’ নামে অন্তর্ভুক্ত করা, ধর্ষণের মামলায় তদন্ত ও বিচারের সময় কমানো, ‘বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম’ করার দণ্ড নামে নতুন ধারা সংযোজন করা হয়েছে। আর ধর্ষণের মামলায় ডিএনএ পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে।

অধ্যাদেশে ৯খ ধারা সংযোজন করে ‘বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম করিবার দণ্ড’ রাখার বিষয়ে গত ২৮ মার্চ প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ধর্ষণের অভিযোগে যেসব মামলা হয়েছে, সেসব মামলা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এখানে দুই ধরনের মামলা হয়। একটি হচ্ছে প্রতারণামূলক সম্মতি আদায় বা বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ। অপরটি কোনো ধরনের সম্পর্ক ব্যতীত ধর্ষণ, যেমন মাগুরার শিশুটির ঘটনা। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে মামলার আধিক্য রয়েছে। এসব মামলার কারণে সম্পর্ক ব্যতিরেকে ভয়াবহ ধর্ষণের ঘটনার বিচার বিলম্বিত হতো। সম্পর্ক ব্যতিরেকে নৃশংস ধর্ষণের মামলার দ্রুত বিচার করতে ‘বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম করিবার দণ্ড’ ধারা যুক্ত করে একে আলাদা করা হয়েছে। প্রথমোক্ত অপরাধগুলোর তদন্ত ও বিচারের সময়সীমা কমানো হয়েছে; কিন্তু দ্বিতীয় ধরনের অপরাধের (‘বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম’) ক্ষেত্রে এই সময়সীমা কমানো হয়নি, এসব অপরাধের শাস্তিরও আলাদা সাজার বিধান (সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড) রাখা হয়েছে।

একই সাক্ষাৎকারে আইন উপদেষ্টা বলেন, বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম’–সংক্রান্ত ধারার মাধ্যমে নতুন কোনো অপরাধকেও সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। এটি ধর্ষণের প্রচলিত সংজ্ঞার মধ্যেই সুপ্ত ছিল, এমন অভিযোগে বহু মামলাও হতো আগের আইনে। পার্থক্য হচ্ছে, এখন এগুলোর বিচার নতুন বিধান অনুসারে হবে। অন্যদিকে ‘বিয়ের প্রলোভন’ ছাড়াও অন্য রকমভাবে প্রতারণা করে যৌন সম্পর্কের সম্মতি আদায়ের চেষ্টা হতে পারে, সেসব অপরাধকে ধর্ষণের প্রচলিত সংজ্ঞা অনুসারে বিচার করা হবে।

‘আলাদা ধারা ইতিবাচক’

ফউজুল আজিম বলেন, ‘বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম’ আলাদা ধারা হওয়ায় ভুক্তভোগী নারীরা ন্যায়বিচার পাবেন, অপরাধীরও শাস্তি হবে। আলাদা ধারা করার দিকটি ইতিবাচক। এর প্রভাব মূল্যায়ন করতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। তবে এই ধারারও অপব্যবহারের আশঙ্কা থাকে। সাক্ষ্য পর্যালোচনার মাধ্যমে বিচারক তাঁর প্রজ্ঞা দিয়ে অপব্যবহার ঠেকাতে পারবেন, সেই সুযোগ রয়েছে।

নতুন ধারায়ও ‘ভুয়া মামলা’

গত ১৮ জুন রাজধানীর পল্লবী থানায় এক নারী তাঁর বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে ‘বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্মের’ অভিযোগে মামলা করেন। মামলাটির বিষয়ে থানা-পুলিশের ভাষ্য হলো, তদন্ত করতে গিয়ে দেখা যায়, এক ব্যক্তির সঙ্গে এই নারীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল। এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আগে ‘বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের’ মামলা করেছিলেন নারী। সেই মামলায় তিনি এই বাড়িওয়ালাকে সাক্ষী করেছিলেন। পরে আসামির সঙ্গে নারীর ‘সমঝোতা’ হয়। তখন সেই ব্যক্তির পরামর্শে নারী বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে ‘বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের’ অভিযোগে মামলা করেন। তদন্তে এসব তথ্য বেরিয়ে এলে নারী ‘ভুয়া মামলা’ করার বিষয়টি স্বীকার করেন। মামলাটি প্রত্যাহার করতে চান।

পুলিশের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, মামলা তুলে ফেলার কিছু প্রক্রিয়া আছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মামলাটিতে ‘চূড়ান্ত প্রতিবেদন’ জমা দেবে পুলিশ।

সংশোধিত অধ্যাদেশে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা হলে তা প্রতিহত করার বিধান আছে বলে প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। এ প্রসঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আইনের ১৭ ধারায় সংশোধন আনা হয়েছে। বিচারকের যদি মনে হয়, এটা মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা, সে ক্ষেত্রে বিচারক সাজা (ক্ষতিপূরণ, সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড) দিতে পারবেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2021-03%2Fcfdc48ad-b728-4faf-9a73-1c8347f627de%2Fbf24ffa6-1883-4aef-bb61-e6f96698eda8.jpg?rect=88%2C0%2C630%2C420&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif