Monday, June 16, 2025

ইরানের পাল্টা হামলায় বিস্মিত ইসরাইল: বিশ্লেষক

ইরানের টানা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রমাণ হয়েছে যে, সামরিক কমান্ডারদের হত্যার পরও দেশটি দ্রুত সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতা রাখে। এ মন্তব্য করেছেন ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফট’-এর সহসভাপতি ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ত্রিতা পারসি।

সিএনএন’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইসরাইল ধারণা করেছিল, তারা ইরানের সামরিক নেতৃত্ব ও কমান্ড-কন্ট্রোল কাঠামোকে ধ্বংস করতে পেরেছে। কিন্তু বাস্তবে ইরান দ্রুত সেই কাঠামো পুনর্গঠন করেছে।

পারসি আরও বলেন, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একাধিক স্তর ভেদ করে আঘাত হানছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

তিনি জানান, ইসরাইলের অপারেশন রাইজিং লায়ন অভিযানে ইরানের রেভ্যুলুশনারি গার্ডস বাহিনীর শীর্ষ নেতা, বিমানবাহিনী প্রধান এবং সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে হত্যার মাধ্যমে ইসরাইল ভেবেছিল তারা তেহরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে দিয়েছে। কিন্তু ইরানের জবাবে এখন সেটি ভুল প্রমাণিত হচ্ছে।

সোমবার ভোররাতে ইরানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরাইলের একাধিক স্থানে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তেল আবিব ও হাইফার মতো শহরে আবাসিক ভবনে আঘাত হানে এসব ক্ষেপণাস্ত্র। নিহত ও আহতের সংখ্যা বাড়ছে, দুই পক্ষেই প্রাণহানি হচ্ছে।

ওদিকে তেহরানেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বহু মানুষ সরে যাচ্ছে। ইসরাইলের টানা বিমান হামলার পর এবার ইরানও পূর্ণ শক্তিতে জবাব দিচ্ছে, যা পুরো অঞ্চলকে এক ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ এখন আর সীমিত নয়- এটি এক পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে, যার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে বৈশ্বিক রাজনীতিতেও পড়বে।

দাউ দাউ করে জ্বলছে ইসরায়েল

ইরান-ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলা ঘিরে উত্তেজনা বেড়েছে। দুই দেশই শনিবার রাতভর পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। রোববার (১৫ জুন) সারা দিন হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। রাতে ফের কয়েক ডজন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান।

ইসরায়েলের বন্দরনগরী হাইফা তেল আবিবে ও নেগেভ বিমানঘাঁটিতে আঘাত করেছে ইরানের এসব হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র। এতে দাউদাউ করে জ্বলছে ওই এলাকা।

ইসরায়েলি উদ্ধারকারী সংস্থা জাকা জানিয়েছে, সেখানকার একটি ভবন মিসাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তুর্কি সংবাদ সংস্থা আনাদুলু এজেন্সির এক ভিডিওতে শহরে বিস্ফোরণের দৃশ্য ধরা পড়ে। এতে হাইফার আকাশ থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। এ ছাড়া বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ক্যামেরায় হাইফা শহরে বিস্ফোরণের দৃশ্য ধরা পড়ে।

ইসরায়েলি জাতীয় জরুরি সেবা সংস্থা জানিয়েছে, হাইফায় ইরানের মিসাইলের আঘাতে অন্তত চারজন আহত হয়েছে। তবে এখন হতাহতের সংখ্যা নিরূপণ করা হচ্ছে।

ইসরায়েলি ফায়ার ও রেসকিউ সার্ভিস জানিয়েছে, একটি ভবনে সরাসরি মিসাইল আঘাত হানার খবর পেয়েছে তারা। এটি একটি আবাসিক ভবন। তাদের উদ্ধারকারীরা এখন ঘটনাস্থলে রওনা দিয়েছে।

বিবিসি এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ‘ইসরাইলি প্রতিরক্ষাব্যবস্থার স্তরগুলো’ ভেদ করে গেছে। যদিও ইসরাইলি সামরিক বাহিনী এ নিয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জেরুজালেম ও তেল আবিবের রাতের আকাশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কারণ ‘আয়রন ডোম’ ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে প্রতিহত করার চেষ্টা করছে।

ইসরায়েলের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের একটি শহর সিজারিয়ায় প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর পারিবারিক বাসভবনের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এ তথ্য জানিয়েছে দ্য ইকোনমিক টাইমস।

ইসরায়েলি গণমাধ্যমের মতে, ইরানি হামলায় হাদেরার একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ফিলিস্তিন ক্রনিকলের মতে, পশ্চিম তীরের বসতি, গোলান হাইটস, গ্যালিলি এবং হাইফা অঞ্চলসহ মধ্য ও উত্তর ইসরায়েলজুড়ে বিমান হামলার সাইরেন সক্রিয় করেছে ইসরায়েল।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইসরায়েলি হোম ফ্রন্ট কমান্ড ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের জন্য নির্দেশনা জারি করেছে, তাদের আশ্রয়কেন্দ্রের চলে যেতে বলা হয়েছে। কারণ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে আঘাত করেছে। তবে বাধা দেওয়ার পরও দক্ষিণ গোলান হাইটসেও আগুন লাগার কথা জানিয়েছে তারা।

এ ছাড়া ইসরায়েলে রোববার (১৫ জুন) স্থানীয় সময় রাতে ইরানের চালানো ক্ষেপণাস্ত্র তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে সরাসরি আঘাত হেনেছে বলে জানা গেছে। ইরানের সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে।

মেহের নিউজ ওই হামলার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। তবে স্বাধীনভাবে ভিডিওটি যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে ইরান হামলা করেছে কি না, এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি ইসরাইলি বাহিনী।

আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ইসরাইলিদের তাদের নিরাপত্তার জন্য ‘গুরুত্বপূর্ণ এলাকা’ ত্যাগ করতে বলেছে। ইরান নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে উল্লেখ করে দেশটির রাষ্ট্রীয় টিভিতে সম্প্রচারিত একটি ভিডিও বিবৃতিতে ইসরাইলিদের প্রতি এ আহ্বান জানানো হয়েছে।

সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল সাইয়্যাদ বলেন, ‘আপাতদৃষ্টিতে সুরক্ষিত বাংকার বা আন্ডারগ্রাউন্ড শেল্টারও আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারবে না।’

ইসরায়েলের বন্দরনগরী হাইফা তেল আবিবে ও নেগেভ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। ছবি : সংগৃহীত
ইসরায়েলের বন্দরনগরী হাইফা তেল আবিবে ও নেগেভ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। ছবি : সংগৃহীত


ইরানে ইসরায়েলের হামলার আসল যে কারণ by ওরি গোল্ডবার্গ

ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত চতুর্থ দিনে পৌঁছেছে এবং উভয় পক্ষেই হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। যদিও ইরানের প্রতিক্রিয়া ভয়াবহ ছিল, তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলে যাচ্ছেন, তাঁদের চালানো হামলা আরও ভয়াবহ।

ইসরায়েল বলছে, ইরানের বিভিন্ন পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় তাদের হামলা চালানোটা খুবই জরুরি ছিল এবং সে হামলাগুলো তারা সফলভাবে চালিয়েছে।

ইসরায়েল তার জনগণকে এই হামলার পক্ষসমর্থন করে বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। কিন্তু সেগুলোর কোনোটাই আসল কারণটি ব্যাখ্যা করে না। কেন ইসরায়েল সরকার একতরফাভাবে কোনো উসকানি ছাড়াই এই হামলা চালাল, তার কোনো ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক মনে হচ্ছে না।

ইসরায়েল সরকার বলছে, এই হামলা ‘প্রতিরোধমূলক’ ছিল; এর লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির এক আসন্ন ও অনিবার্য হুমকি মোকাবিলা করা। কিন্তু এই দাবি সমর্থন করার মতো কোনো প্রমাণ তারা দিতে পারেনি। বরং ইসরায়েলের হামলাটি অত্যন্ত পরিকল্পিত ও দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুত করা হয়েছিল বলে মনে হচ্ছে।

কোনো হামলাকে প্রতিরোধমূলক হামলা বলতে হলে সেটিকে আত্মরক্ষার অংশ প্রমাণ করতে হয় এবং এর পেছনে একটি জরুরি পরিস্থিতি থাকতে হয়। কিন্তু এমন কোনো জরুরি পরিস্থিতি আসেনি যা দিয়ে সেই দাবি করা যেতে পারে।

ইসরায়েল আরও দাবি করছে, ১২ জুন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা গেছে, ইরান ২০০০ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ সংক্রান্ত চুক্তির (এনপিটি) শর্ত লঙ্ঘন করেছে।

সে কারণেই তারা হামলা করেছে বলে তাদের দাবি। কিন্তু আইএইএ নিজেও এমন দাবি সমর্থন করেনি। ওই প্রতিবেদনে এমন কিছু নেই যা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আগেই জানত না।

ইসরায়েল সরকার আরও বলছে, এই ‘প্রতিরোধমূলক’ হামলার আরেকটি লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নেতৃত্বশূন্য করে দেওয়া বা ধ্বংস করা। কিন্তু নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের মতে, ইসরায়েলের একার পক্ষে এই কর্মসূচিকে ধ্বংস করা সম্ভব নয়।

যেভাবে ইসরায়েলি অভিযান চলছে, তা দেখে বোঝা যাচ্ছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ধ্বংস করা আসল লক্ষ্য ছিল না।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বিভিন্ন সামরিক ও সরকারি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। তারা ইরানের মিসাইল ঘাঁটি, গ্যাসক্ষেত্র, তেল ডিপো থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় আঘাত হেনেছে। তারা একের পর এক ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতাদের হত্যা করেছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আলী শামখানি। তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা ছিলেন। মনে করা হয়, তিনি গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলা আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

আলী শামখানির হত্যা এবং তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজনকে টার্গেট করে হত্যা করার ঘটনায় ইসরায়েলের প্রিয় কৌশলগুলোর প্রতিফলন ঘটেছে। ইসরায়েল প্রায়ই সেই সব ব্যক্তিদের হত্যা করার চেষ্টা করে যাঁদের ব্যাপারে দেশটি মনে করে যে, তাঁদের মৃত্যুতে তাঁদের পরিচালিত একটি ব্যবস্থা বা প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়বে।

সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনায় বিঘ্ন ঘটানোর উদ্দেশ্যেই শামখানিকে হত্যা করা হয়েছে। যেভাবে এই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটানো হয়েছে, তাতে বোঝা যায়, ইরানের সরকারি কাঠামো ও নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার সব স্তরে ইসরায়েল নিজের শক্তি দেখাতে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছে। এটি নেহাতই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ‘নেতৃত্বশূন্য’ করার চেষ্টা নয়।

তৃতীয় যে ব্যাখ্যাটি দেওয়া হচ্ছে, তা হলো, ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য সম্ভবত তেহরানে ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ শুরু করা। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই এটি বলেছেন। তিনি ‘ইরানের গর্বিত জনগণকে’ ‘একটি মন্দ ও দমনমূলক শাসনব্যবস্থা থেকে মুক্তির’ জন্য রুখে দাঁড়াতে আহ্বান জানিয়েছেন।

ইসরায়েল মনে করছে, ইরানে একতরফাভাবে বোমাবর্ষণ করলে ইরানিরা তাদের সমর্থন করবে। এটা ঠিক তেমনই ভুল ভাবনা, যেমনটা তারা গাজা নিয়ে করে। তারা ভাবে, যদি গাজায় ফিলিস্তিনিদের অনাহারে রাখা যায় এবং তাদের মেরে ফেলা যায়, তাহলে ফিলিস্তিনিরা নিজেরাই হামাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে আর তাদের শাসন শেষ করে দেবে।

ধরুন, এমন কিছু সত্যও হলো। কিন্তু কেবলমাত্র ইসরায়েলের হামলার অপেক্ষায় সব ইরানি বসে আছে—এমন ধারণা ইরানের রাজনীতির বাস্তবতা সম্পর্কে গভীর অজ্ঞতা প্রকাশ করে।

সন্দেহ নেই অনেক ইরানি ইসলামিক রিপাবলিক বিরোধী। কিন্তু রাজনৈতিক মতাদর্শ যা-ই হোক না কেন, বেশির ভাগ ইরানি নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব ও বিদেশি হস্তক্ষেপ থেকে স্বাধীনতা বজায় রাখতে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁরা বাইরের কোনো শক্তির চাপিয়ে দেওয়া এজেন্ডা মেনে চলতে রাজি নন।

অনেক ইসরায়েলি (যাঁরা নিজেদের নেতানিয়াহুর কঠোর সমালোচক বলে মনে করেন) হামলার শুরুতেই যেমন করে সবকিছু ভুলে গিয়ে সরকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, ঠিক তেমনি ইসলামিক রিপাবলিকবিরোধী অনেক ইরানিও এখন দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হওয়ায় জাতীয় পতাকার পেছনে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন।

তাই ইসরায়েল ইরানে হামলা চালিয়ে গণ-বিদ্রোহের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে—এই ধরনের দাবি নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে চালানো এক ধরনের বাকোয়াজ ছাড়া আর কিছু নয়।

ইসরায়েল এসব কারণে ইরানে হামলা চালায়নি। তাহলে এই হামলার পেছনে কী কারণ ছিল?

গাজায় যে গণহত্যামূলক অভিযান চলছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে নেতানিয়াহু জানেন, তাঁর সরকারের হাতে সময় ও বিকল্প দুই-ই ফুরিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক সমাজ এমনকি আঞ্চলিক মিত্ররাও এখন স্পষ্টভাবে ইসরায়েলের সমালোচনা শুরু করেছে। কেউ কেউ তো একতরফাভাবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির প্রক্রিয়ায় আছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ইসরায়েলের দখলদারির বৈধতা নিয়ে যে রায় দেবে, সেটিও অপেক্ষমাণ। এরই মধ্যে ইসরায়েল ও তার সেনাবাহিনী বহু হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। তারপর তারা তা অস্বীকার করেছে। শেষ পর্যন্ত তাদের মিথ্যা বলার প্রমাণ ধরা পড়েছে।

এ কথা বলার সুযোগ নেই যে ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে নেওয়া হয়েছে। বরং, নেতানিয়াহু বহু বছর ধরেই এই হামলার পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন। কেবল সময়ের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সেই সময় এসে গেছে শুক্রবার।

এটি এক প্রকার মরিয়া চেষ্টা। সেই চেষ্টা বিশ্বের দৃষ্টি আবার ইসরায়েলের দিকে ফেরানো এবং ইসরায়েলকে সেই অবস্থা ফিরিয়ে দেওয়া যেখানে তারা সবকিছু করেও দায়মুক্ত থাকতে পারত।

ইরান এখনো বহু পশ্চিমা শক্তির চোখে একটি সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। ইসরায়েল যখন একতরফা ও প্রাণঘাতী হামলা চালায়, তখন ধর্মীয় প্রতিশ্রুতি থেকে শুরু করে হলোকাস্ট পর্যন্ত নানা পুরোনো যুক্তি সামনে আনা হয়। এই ধরনের চেনা বক্তব্যের সাহায্যে নেতানিয়াহু চেষ্টা করছেন সেই পুরোনো ‘স্ট্যাটাস কু’ বা অপরাধ করেও শাস্তি না পাওয়ার অবস্থা আবার প্রতিষ্ঠা করতে; যাতে ইসরায়েল আবারও যা ইচ্ছা তাই করতে পারে।

এখন ইসরায়েলের কাছে ‘নিরাপত্তা’ মানে এক ধরনের বিশ্বাস, যা তারা সবচেয়ে পবিত্র নীতি বলে মানে। এটা তারা এমনভাবে দেখে, যেন এই ধারণাই তাদের পরিচয়ের মূল জায়গা।

কিন্তু আসলে, এই বিশ্বাসটা গড়ে উঠেছে ইহুদি শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার ওপর। মানে, তারা ধরে নেয় যে শুধু ইহুদিদের কর্তৃত্ব থাকলেই ইহুদিদের জীবন নিরাপদ থাকবে।
এই ‘নিরাপত্তা’র মানে হলো, ইসরায়েল যাকে খুশি, যতক্ষণ খুশি, যেখানে খুশি, যখন খুশি হত্যা করতে পারে, এবং এর জন্য কোনো জবাবদিহি করতে হয় না।

এই যে ‘নিরাপত্তা’র কথা ইসরায়েল বারবার বলছে, এটাই এখন তাদের সব কাজের পেছনে মূল চালিকাশক্তি। গাজা থেকে শুরু করে ইয়েমেন, লেবানন, সিরিয়া এবং এখন ইরান পর্যন্ত—সব জায়গায় ইসরায়েল এই ‘নিরাপত্তা’র দোহাই দিয়েই পদক্ষেপ নিচ্ছে।

এই ধরনের নিরাপত্তাভিত্তিক শাসনব্যবস্থা থেমে থাকার নয়। এটা ক্রমেই বিস্তৃত হবে।
নেতানিয়াহু যখন ইরানে হামলা চালান, তখন তিনি অনেকটাই সর্বস্ব বাজি রেখে দেন। তাঁর লক্ষ্য একদিকে ইসরায়েলের জন্য একচেটিয়া দায়মুক্তির দাবি প্রতিষ্ঠা করা। মানে, যা ইচ্ছা করা যাবে, জবাবদিহির দরকার নেই।

আরেকদিকে, তিনি নিজেকেও বাঁচাতে চাইছেন। আন্তর্জাতিক আদালত থেকে শুরু করে ইসরায়েলের ভেতরের মামলা থেকে বাঁচতে চাইছেন।

প্রশ্ন হলো, এই পদক্ষেপ কি সত্যিই তাঁকে রক্ষা করবে? ইসরায়েলিরা কি তাঁকে ক্ষমা করে দেবে? তাঁর ঘরোয়া ব্যর্থতা আর গাজায় যেসব ভয়ংকর কাজ তিনি করেছেন, সেসব কি সবাই ভুলে যাবে?

এখন যেভাবে অনেক ইসরায়েলি খুশি হচ্ছে, উল্লাস করছে, তাতে মনে হতে পারে—হ্যাঁ, হয়তো তাই হতে যাচ্ছে।

হার্ডওয়্যার দোকান থেকে খাবারের দোকান পর্যন্ত মানুষ লাইন দিয়ে জিনিসপত্র কিনছে। এতে মনে হচ্ছে, ইসরায়েলিরা এখন ‘যেভাবে হোক, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখো’ মানসিকতায় আছে।

এই ধরনের চুপচাপ, মানিয়ে নেওয়া মানুষজন হয়তো নেতানিয়াহুর জন্য সুবিধাজনক। কিন্তু এমন মনোভাব একটি সচেতন ও সাহসী সমাজ গড়ে তোলার পথে বড় বাধা।

- আল জাজিরা থেকে নেওয়া
- অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
* ওরি গোল্ডবার্গ, আল জাজিরার কলাম লেখক ও মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ।

ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধ্বংসপ্রাপ্ত ইসরায়েলের একটি ভবনের ধ্বংসাবশেষ দেখছেন এক ইসরায়েলি সেনা।
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধ্বংসপ্রাপ্ত ইসরায়েলের একটি ভবনের ধ্বংসাবশেষ দেখছেন এক ইসরায়েলি সেনা। ছবি: এএফপি

নেতানিয়াহুর ইরান আক্রমণ: পরিকল্পিত ফাঁদে ট্রাম্প by ফার কিম বেং

১৩ জুন, শুক্রবার ভোরে একের পর এক বিস্ফোরণে প্রকম্পিত হলো তেহরানের আকাশ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এই হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনা।

আগের হামলাগুলোর মতো এবারের হামলাটি কৌশলগতভাবে গোপন রাখা হয়নি। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু খোলাখুলিভাবে এই অভিযানের অনুমোদন দিয়েছেন।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা জবাব দিতে শুরু করে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় ও তেল আবিব ও জেরুজালেমে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এই উসকানি ও প্রতিশোধের চক্র মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নয়। কিন্তু এবারের পাল্টাপাল্টি হামলার সময়, এর আন্তর্জাতিক অভিঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার ওপর সম্ভাব্য যে প্রভাব ফেলবে, তার কারণে ভিন্ন।

মাত্র কয়েক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় ফিরেছেন। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। ট্রাম্প বলেছিলেন, রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসার ক্ষেত্রে জেলেনস্কির অনিচ্ছাই হচ্ছে ইউরোপের এই প্রলম্বিত সংঘাতের মূল কারণ। তাঁর মতে, কিয়েভের এই অবস্থান বিশ্বকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

কিন্তু নতুন সংকটের সূত্রপাত ইউক্রেন থেকে হয়নি; বরং এটি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র নেতানিয়াহুর কাছ থেকে। নেতানিয়াহু এমন একতরফা একটি সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছেন, যেখানে তিনি ওয়াশিংটনকে টেনে আনতে পারেন। এটি এমন এক সংঘাত, যেটি ওয়াশিংটন শুরু করেনি। এটিকে তারা নিয়ন্ত্রণও করতে পারবে না।

এখানে বিরোধাভাসটি সুস্পষ্ট। নেতানিয়াহুর এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়াই হয়েছে (যদিও এ নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে)। হামলাটি ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন বাইডেনের পর ট্রাম্প প্রশাসনও মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে ক্লান্তি প্রকাশ করেছে।

ইরাক ও আফগানিস্তানে দুই দশকের যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতে জড়ানোর আগ্রহ, এখন সর্বনিম্ন। অথচ একজন মিত্র নেতার একক সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আবারও নতুন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত ইউক্রেনের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

ইরান যে তাৎক্ষণিক পাল্টা জবাব দেবে, সেটা অবাক করার মতো বিষয় ছিল না। বিশ্বের ১০০ কোটির বেশি মুসলমানের জন্য শুক্রবার আধ্যাত্মিক ঐক্যের দিন। ফলে এটি সামরিক সিদ্ধান্তের চেয়ে বেশি কিছু ছিল। এটি ছিল প্রতীকী একটি পদক্ষেপ।

সন্ধ্যার আগেই ইরানের ড্রোন ইসরায়েলে আঘাত হানতে শুরু করে। রাত বাড়তে না বাড়তে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েলে আঘাত হানে। সামনে আরও হামলার আশঙ্কা প্রবল। তেহরান ইতিমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছে, ইরাক, সিরিয়া, কাতার ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোও তাদের বৈধ টার্গেট হিসেবে বিবেচিত হবে। কেননা, ইরানের দৃষ্টিতে, ইসরায়েলের এই হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
এটাই হচ্ছে একটা ফাঁদ। মিত্ররা যখন এককভাবে পদক্ষেপ নেয় (বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলে) তখন তারা অনিচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের সহযোগীদেরও একধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলে।

যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার সরাসরি অনুমোদন দেয়নি। কিন্তু যতক্ষণ না তারা ইসরায়েলের রক্ষক এবং অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, ততক্ষণ দেশটি এর প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিতেও রয়েছে। নেতানিয়াহুর বেপরোয়া সিদ্ধান্তের সামনে ওয়াশিংটনের নীরবতা ও অস্পষ্টতা—অনেকের চোখে সম্মতির ইঙ্গিত হিসেবে ধরা পড়তে পারে। আর ভূরাজনীতিতে, অনেক সময় ধ্যান-ধারণাই বাস্তবতা হয়ে ওঠে।

ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের পরিণতিও ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। মালয়েশিয়ায় অপরিশোধিত তেলের দাম ১০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তবে বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়বে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো যে দেশগুলো তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তারা নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপে পড়বে। ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে এরই মধ্যে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা পুঁজিবাজারগুলোকেও আরও চাপে ফেলবে।

নেতানিয়াহু হয়তো বিশ্বাস করেন, ইরানে হামলা ঘরোয়া রাজনীতিতে তাঁর অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক সংকটে রয়েছেন। দুর্নীতির অভিযোগ, গণবিক্ষোভ এবং অতি জাতীয়তাবাদী জোটসঙ্গীদের চাপ—সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সংকটে।

ইরানে হামলা চালিয়ে নেতানিয়াহু হয়তো তাঁর সমর্থকদের উজ্জীবিত করতে চাইছেন এবং ঘরোয়া অসন্তোষ থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতে চাইছেন। নেতানিয়াহু হয়তো নিজেকে ইসরায়েলের শেষ প্রতিরক্ষা প্রাচীর হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছেন। কিন্তু এটি একটি বিপজ্জনক জুয়া।

যদি ইরানের পাল্টা আরও বিস্তৃত বা প্রাণঘাতী হয়, তবে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও গভীর হবে। কেননা, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার ট্রমা এখনো তারা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

ইসরায়েলে পরিচালিত সাম্প্রতিক জরিপগুলো থেকে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে জনমনে হতাশা ক্রমে বাড়ছে। সে কারণেই শক্তিশালী নেতা হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করার এই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।

ট্রাম্পের জন্যও এই মুহূর্ত সমানভাবে নাজুক। তিনি আবার ক্ষমতায় এসেছেন নতুন কোনো যুদ্ধে না জড়িয়েই ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু আগামী কয়েক দিনে ইরান যদি নিজেদের দেওয়া হুমকির মতো করে মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালায়, তবে ট্রাম্পকে কঠিন এক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এই মুহূর্তে যা সবচেয়ে বেশি দরকার তা হলো, জরুরি কূটনীতি। যুক্তরাষ্ট্রকে, তুরস্ক, কাতার—এমনকি নিরপেক্ষ ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে মিলিত হয়ে, তেহরানের সঙ্গে গোপনে সংলাপ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

ইসরায়েলকে দৃঢ়ভাবে এই পরামর্শ দেওয়া উচিত যে উত্তেজনা বাড়ানো কৌশলগত স্বার্থ সিদ্ধি করতে পারবে না। ইরানকেও বুঝতে হবে যে অতিরিক্ত প্রতিশোধ আন্তর্জাতিক মহলে তাদের প্রতি যে সামান্য সহানুভূতি এখনো আছে, সেটুকুও নষ্ট করে দিতে পারে।

এই সংকট এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা সম্ভব। কিন্তু এর জন্য ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা প্রয়োজন। নীরবতা কেবল ভুল–বোঝাবুঝিকে বাড়িয়ে তুলবে।

কে কতটা বড় শক্তি, তার বিচার অনেক সময় যুদ্ধ শুরু করার ধরনে নয়; বরং যুদ্ধ ঠেকানোর দক্ষতা দিয়ে মাপা হয়। নেতানিয়াহুর এই হামলা যেন বিস্ফোরকের সুতায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। এখন অন্যদের দায়িত্ব, এই আগুন যেন বিস্ফোরকের গুদামে না পৌঁছায়, তার ব্যবস্থা করা।

* ফার কিম বেং, মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক ইসলামিক ইউনিভার্সিটির আসিয়ান স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক
- এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি : রয়টার্স

মরিয়া ইরান তছনছ ইসরাইল

পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে ইসরাইল ও ইরানের সংঘাত। একটি পুরো মাত্রার যুদ্ধ বলতে যা বোঝায়, তার প্রায় সব উপাদান উপস্থিত। লক্ষণীয়, ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোম’কে ভেদ করে দেশটিতে ভয়াবহ হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে ইরান। ফলে তছনছ হয়ে গেছে ইসরাইল। বহু ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। নিহত হয়েছে কমপক্ষে ১৩ জন। এ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজগ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, ইসরাইলের ভয়াবহ ক্ষতিতে শোকার্ত দেশ। খুব দুঃখজনক ও কঠিন সময় পার করছে ইসরাইল। ক্ষয়ক্ষতি কেমন হলে প্রেসিডেন্ট এমন মন্তব্য করতে পারেন, তা সহজেই অনুমেয়। এমন অবস্থায় আশার বাণী শুনিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক ভারত ও পাকিস্তানের মতো সহসাই যুদ্ধ বন্ধ হবে। এই যুদ্ধে ইরানে ক্ষয়ক্ষতি অবর্ণনীয়। ইসরাইল দাবি করেছে তারা শনিবার রাতভর ইরানের ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে। তিনদিনে ইরানের কমপক্ষে ৭২০টি সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করেছে। পাশাপাশি ইরানের রেভ্যুলুশনারি গার্ডের প্রধান এবং সেনাপ্রধানসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের ও বিপুল সংখ্যক পারমাণবিক বিজ্ঞানীকে হত্যা করেছে ইসরাইল। সঙ্গে তো বেসামরিক স্থাপনা, প্রাণহানির খবর আছেই। এই ক্ষতির সঙ্গে ইসরাইলের ক্ষতি তেমন বড় নয়। কারণ তারা ইসরাইলের সামরিক বা প্রশাসনিক কোনো স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে এমন কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

তবে বিবিসি, সিএনএন, আল জাজিরা ইসরাইলের বিধ্বস্ত ভবনগুলোর যে ছবি প্রকাশ করেছে তা ভয়াবহ। গত রাতে এ খবর লেখার সময়ও ইসরাইলের হামলায় তেহরানের আকাশ ছিল ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে তেহরান। পশ্চিমাঞ্চলে একাধিক আবাসিক এলাকায় বিস্ফোরণ হয়েছে। ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সেস জানিয়েছে, ইরানে হামলা অব্যাহত আছে। ওদিকে পাল্টা জবাব দিচ্ছিল ইরানও। ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষায় অনেক মিডিয়া সেখানে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি প্রকাশ করছে না। তারপরও যেসব তথ্য বেরিয়ে আসছে, তাতে বলা হয়েছে বিপুল পরিমাণ আবাসিক ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইসরাইলের কেন্দ্রস্থলে, তেল আবিবে হামলায় বিধ্বস্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছে বহু মানুষ।

অন্যদিকে ইরানে তেলের ডিপো সহ বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন জ্বলছে। একইভাবে আগুন জ্বলতে দেখা যায় ইসরাইলের বিভিন্ন স্থানে। সেখানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে। সেখানে স্থানীয়দের বিভিন্ন বাংকারে অবস্থান নিতে নির্দেশনা দিয়েছে ইসরাইল কর্তৃপক্ষ। লোকজন এমন গোপন স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন এমন ছবি প্রকাশ করেছে বিভিন্ন মিডিয়া। ইসরাইলের এই যে অবস্থা এমনটাও হওয়ার কথা ছিল বলে অনেকে মনে করেন না। কারণ, তাদের আছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোম। তা ভেদ করে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে বিভিন্ন ভবনে। ইসরাইল যতই বলুক তারা আকাশে ধ্বংস করে দিয়েছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, তা যে পুরো সত্য এমন না।

ইসরাইলের ধ্বংসস্তূপ দেখে বলে দেয়া যায় ইরানের পাশাপাশি ইসরাইলও এখন তছনছ হয়ে গেছে। তবে  যে কোনো সময় ‘তেহরানকে জ্বালিয়ে দেয়ার’ হুমকি দিচ্ছে ইসরাইল। ইরানও পাল্টা হুমকি দিচ্ছে। তবে তাদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে দেশকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য সামরিক, পারমাণবিক ও রেভ্যুলুশনারি গার্ডের যেসব শীর্ষ কর্মকর্তা ছিলেন, তাদের শেষ করে দিয়েছে ইসরাইল। পারমাণবিক স্থাপনা, তেলক্ষেত্র বা তেলের ডিপোতে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে ইসরাইল। জবাবে ইরান বলছে, ইসরাইল হামলা বন্ধ করলে ইরানও বিরত হবে। এ যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করছে তারা। মার্কিন প্রশাসন থেকে তা অস্বীকার করা হলেও বিষয়টি অনেকটাই স্পষ্ট। অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের নীরব দর্শকের ভূমিকায় এই যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের মদতে ইসরাইল এই যুদ্ধ করছে। তাদের সমর্থনকারী বিশ্ব মোড়লরা আছেন। সেক্ষেত্রে দৃশ্যত একা লড়াই করছে ইরান। তাকে সমর্থন দেয়ার কেউ নেই। এমন সময়ে লড়াইয়ের তৃতীয় দিনে বন্ধু হিসেবে ইয়েমেনকে পাশে পেয়েছে ইরান। রোববার ইয়েমেন থেকে ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করা হয়েছে।

একইসঙ্গে তেল আবিব থেকেও ইয়েমেনের  যোদ্ধাগোষ্ঠী হুতিদের লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালানো হয়েছে। ইসরাইল জানিয়েছে, তাদের নিশানায় ছিলেন হুতিদের সামরিক বাহিনীর চিফ অফ স্টাফ মুহাম্মদ আল-ঘামারি। তবে তার কোনো ক্ষতি হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। এমন অবস্থায় একের পর এক হামলা-পাল্টা হামলায় জ্বলছে ইরান ও ইসরাইল। এর মধ্যে দৃশ্যত ক্ষয়ক্ষতি ইরানে বেশি। তবে ইসরাইলেও কম নয়। সেখানে কমপক্ষে ১৩ জন নিহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে ৯ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকা পড়ে আছে অনেক মানুষ। তাদের পরিণতি জানা যায়নি। গতকাল এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাদেরকে উদ্ধারের চেষ্টা করছিল ইসরাইলি উদ্ধারকর্মীরা।

শনিবার রাতে ইসরাইল ও ইরান উভয়েই হামলা-পাল্টা হামলা তীব্র থেকে তীব্রতর করে তোলে। সংঘর্ষে ইতিমধ্যেই বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে। এই যুদ্ধ শুধু দুটি দেশের দ্বন্দ্ব নয়- এটি গোটা মুসলিম বিশ্ব, পশ্চিমা শক্তি এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক কাঠামোর জন্য এক ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ নিয়ে বিশ্বনেতাদের মধ্যে যৎসামান্য যে নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে তাতে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, সহসাই বা কয়েকদিনের মধ্যে এই সংঘাত থেমে যাবে।

হোয়াইট হাউস ও ইসরাইলি কর্মকর্তাদের মতে, এই লড়াই চলবে সপ্তাহের পর সপ্তাহ। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক ভিডিও বার্তায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, আয়াতুল্লাহ (আলি খামেনি)-এর শাসকগোষ্ঠীর প্রতিটি স্থাপনা ও প্রতিটি টার্গেটে হামলা করছে ইসরাইল। ইরানও পাল্টা হুমকি দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইসরাইল শত্রুতা অব্যাহত রাখলে তাদের হামলা আরও তীব্র হবে। ওদিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী বলেছে, ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তর সহ রাজধানী তেহরানে অনেক টার্গেটে ব্যাপক হামলা করেছে ইসরাইলের বিমান বাহিনী। ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম রিপোর্টে বলেছে, প্রশাসনিক ভবনের অল্প ক্ষতি হয়েছে।

ইরানের দক্ষিণে ‘সাউথ পার্স’ প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রেও হামলা করেছে ইসরাইল। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র। এ ছাড়া সাহারান তেল ডিপোতে হামলা করেছে তারা। এতে সেখানে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে থাকে। হাইফায় অবস্থিত একটি তেল শোধনাগারে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে দাবি করেছে তেহরানে তেল বিষয়ক মন্ত্রণালয়। ইসরাইল দাবি করছে তারা ইরানের সামরিক, পারমাণবিক, তেলক্ষেত্রে হামলা করেছে। কিন্তু ইরানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ রেজা জাফরঘান্ড বলেছেন- ইসরাইলের হামলায় নিহত ও আহতদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। এ বিষয়ে পরিষ্কার পরিসংখ্যান দেয়া হয়নি। অন্যদিকে ইসরাইলের বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত করে সাধারণ নাগরিকদের হত্যার অভিযোগ এনেছে ইসরাইল। সিএনএনের একটি টিম রোববার ইরানের হামলায় ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হওয়া ইসরাইলের কেন্দ্রীয় অঞ্চল বাত ইয়াম শহর পরিদর্শন করে।

স্থানীয় সময় শনিবার রাত আড়াইটার দিকে সেখানে বৃষ্টির মতো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে বেশ কিছু আবাসিক ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সেখান থেকে মৃতদের উদ্ধার করা হয়েছে। বাকিরা আটকে ছিল। তাদেরকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছিল। অন্যদিকে ইরানের পারমাণবিক, সামরিক ও প্রশাসনিক এলাকার কাছে অবস্থানকারী নাগরিকদের সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইসরাইল। আতঙ্কে রাজধানী তেহরানের মানুষ অন্যত্র সরে যাচ্ছিলেন। সিএনএনের খবরে বলা হয়, তারা উত্তরে কাস্পিয়ান সাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। এই অঞ্চলটি গ্রামীণ এবং প্রায় বিচ্ছিন্ন একটি এলাকা। অধিবাসীরা বলেছেন, এতে রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম সৃষ্টি হয়। ফলে তাদের চলার গতি স্থির হয়ে পড়ে। নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে একটি পরিবারের এক সদস্য বলেছেন, তিনি ছোট্ট দুই সন্তান ও প্রবীণ পিতামাতাকে নিয়ে সরে যাচ্ছেন। তার ভাষায়- আমি ঘর ছাড়তে চাই না। কিন্তু তাই বলে তো আমার ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাকে এই অবস্থায় রাখতে পারি না। আমি আশা করি যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নিলে এই দুটি দেশকে থামাতে পারে।

প্রেসিডেন্ট হারজগ: ‘ভয়াবহ ক্ষতি’তে শোকার্ত দেশ, খুব দুঃখজনক ও কঠিন সকাল পার করছে ইসরাইল: ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বলেছেন, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কমপক্ষে ৮ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। এরপর দেশটি রোববার একটি ‘খুব দুঃখজনক ও কঠিন সকাল’ পার করছে। হারজগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক বার্তায় বলেন, তিনি এই হামলাকে ‘অপরাধমূলক ইরানি হামলা’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। আহতদের দ্রুত সুস্থতা ও নিখোঁজদের নিরাপদে খুঁজে পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করছেন।  এর আগে জানানো হয়েছিল, তেল আবিবের দক্ষিণে বাত ইয়াম শহরে হামলার পর অনেক মানুষ নিখোঁজ রয়েছে বলে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়। হারজগ বলেন, এই শোকের মুহূর্তে পুরো জাতি একসঙ্গে দাঁড়িয়েছে। আমরা আমাদের নাগরিকদের পাশে আছি, যারা আজ (রোববার) সকালে ভীষণ বেদনা ও ক্ষতির মধ্যে পড়েছেন।

ইরানের আকাশসীমা দখলের দাবি ইসরাইলের ‘আকাশে যুদ্ধবিমান দেখা যাবে, তেহরান জ্বলবে’: ইরানের রাজধানী তেহরানের আকাশসীমার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়ার দাবি করেছে ইসরাইল। পাশাপাশি তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে- ইরান যদি আরও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে, তবে ‘তেহরান জ্বলবে’। ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজের এই হুঁশিয়ারি এসেছে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রেক্ষিতে। উল্লেখ্য, ইরানের সর্বশেষ হামলার ভয়াবহতা খুবই গভীর। শনিবার দিবাগত রাতে ইরানের নতুন ধরনের ‘হাজ ক্ষেপণাস্ত্র’ হামলার পর ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানিতে বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়েছেন ইসরাইলি প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজগ। তিনি বলেছেন, ভয়াবহ ক্ষতিতে শোকার্ত তার দেশ। রোববারের সকালের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, খুব দুঃখজনক ও কঠিন সকাল পার করছে ইসরাইল। ওদিকে লন্ডনের প্রভাবশালী অনলাইন গার্ডিয়ান এক রিপোর্টে বলছে, ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) শনিবার সকালের দিকে তেহরানের আশপাশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর ব্যাপক হামলা চালিয়েছে এবং তারা জানায় তারা ‘আকাশপথে সর্বোচ্চ শ্রেষ্ঠত্ব’ অর্জন করেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা দেন, খুব শিগগিরই তেহরানের আকাশে ইসরাইলি যুদ্ধবিমান দেখা যাবে। এরপরেই ইরানের কঙ্গান বন্দরের একটি বিশাল গ্যাস শোধনাগারে বিস্ফোরণ ঘটে। ইরানি সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, এটি ইসরাইলি ড্রোন হামলার ফল, যদিও ইসরাইল তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। এর পাশাপাশি রোববার ভোরে নতুন করে উভয় পক্ষ হামলা চালায়। ইসরাইল জানায়, তারা তেহরানে সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এর কিছু ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে আঘাত হানে।

তেহরানে শাহরান তেল ডিপো ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ভবনে হামলার খবরও নিশ্চিত করেছে ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। একইসঙ্গে তেহরান সংলগ্ন একটি আবাসিক ভবনে আঘাতে অন্তত ৬০ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করছে ইরান। এর মধ্যে ২০ জন শিশু। ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা এ পর্যন্ত ১৫০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে শত শত বোমা ফেলেছে এবং ইরানের দুই শীর্ষ জেনারেল গোলাম-রেজা মারহাবি ও মোহাম্মদ হোসেইন বাঘেরিকে হত্যা করেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ঘোষণা দিয়েছেন, ইসরাইলি হামলা চললে আরও কঠোর ও ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়া আসবে। নতুন রেভ্যুলুশনারি গার্ডস কমান্ডার বলেছেন, আমরা নরকের দরজা খুলে দেবো। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন বা ফ্রান্স যদি ইসরাইলের সহায়তায় ইরানের ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করে, তবে তাদের ঘাঁটি ও নৌবাহিনীকেও লক্ষ্যবস্তু বানানো হবে।

ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে ইসরাইলের হামলা: ইসরাইল নিশ্চিত করেছে তারা ইরানের রাজধানী তেহরানে অবস্থিত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে বিমান হামলা চালিয়েছে। এর আগে ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এই হামলার খবর দেয়। ইসরাইলি ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা বিপুল পরিমাণ গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তেহরানের একাধিক স্থানে হামলা চালিয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিএনএন। আইডিএফ বিবৃতিতে বলেছে, লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল ইরানি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তর, এসপিএনডি পারমাণবিক প্রকল্পের প্রধান কার্যালয় এবং আরও কিছু স্থান, যেখানে ইরানি সরকার তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি গোপনে পারমাণবিক আর্কাইভ লুকিয়ে রেখেছিল। উল্লেখ্য, ইরান যদিও তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে, তবুও তারা বারবার দাবি করে এসেছে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং তারা পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছে না। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, হামলায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রশাসনিক ভবনে সামান্য ক্ষতি হয়েছে। ওই একই এলাকায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা অর্গানাইজেশন অব ডিফেন্স ইনোভেশন অ্যান্ড রিসার্সের একটি দপ্তরেও আরেকটি হামলা চালানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং সিএনএনের জিওলোকেট করা কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, হামলার পরপরই ওইসব এলাকা থেকে ধোঁয়া উড়ছে।

ইসরাইল আক্রমণে ইরানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ‘হাজ কাসেম’: ইরান দাবি করেছে ইসরাইলের ওপর হামলায় তারা নতুন ধরনের নির্দেশনাযুক্ত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। ইরানের রাষ্ট্র-সমর্থিত সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, শনিবার রাতভর হামলার সময় ইসরাইলে ‘হাজ কাসেম’ নামের গাইডেড ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিএনএন। ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল আজিজ নাসিরজাদেহ ৪ঠা মে ইরানি টেলিভিশনে বলেন, এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং ইসরাইলের অন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোকে পাশ কাটাতে সক্ষম। বার্তা সংস্থা তাসনিমের তথ্য অনুযায়ী- এই ক্ষেপণাস্ত্রটি ‘সলিড ফুয়েল’চালিত। এর পাল্লা ১২০০ কিলোমিটার। এটি ‘ম্যানুভারেবল ওয়ারহেড’ দিয়ে সজ্জিত, যা মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম ভেদ করতে পারে। এতে উন্নত নেভিগেশন সিস্টেম রয়েছে, যা সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই ক্ষেপণাস্ত্রটির নামকরণ করা হয়েছে কাসেম সোলেইমানির নামে। উল্লেখ্য, কাসেম সোলাইমানি ছিলেন ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কোরের কুদস ফোর্সের প্রধান। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক হামলায় ইরাকে নিহত হন তিনি। তখনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন ডনাল্ড ট্রাম্প।

ইরানের সামনে বিকল্প কী? পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি!: ইসরাইলের হামলার জবাবে ইরান ভয়াবহ পাল্টা হামলা চালালেও দৃশ্যত বড় কোনো অর্জন এখনো নেই তাদের। তারা ইসরাইলের কোনো বড় সামরিক ঘাঁটি, সামরিক স্থাপনা বা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে এমন কোনো খবর পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে তাদের যেমন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হয়েছেন, ইসরাইলে তেমনটি ঘটেনি। তবে ইরানের হামলায় ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে ইসরাইলে। ক্রমশ সে চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে। এমন অবস্থায় ইরানের সামনে বিকল্প কী তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পারমাণবিক কর্মসূচি বিষয়ক মধ্যস্থতাকারী অ্যালান আইয়ার বলেন, ইরানের বিকল্পগুলো খুবই অপ্রতুল এবং সংকুচিত। তারা অন্তত সামান্য সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখাতেই বাধ্য। কারণ এতে তাদের ঘরোয়া মর্যাদা রক্ষা হয়। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ইসরাইল এতটাই শক্তিশালী ও প্রস্তুত যে, ইরান তেমন কোনো কৌশলগত ক্ষতি করতে পারছে না। ফলে ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাদের হামলা বন্ধ করানো প্রায় অসম্ভব। তিনি আরও বলেন, ইরান কূটনৈতিক পথ ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু তাদের আন্তর্জাতিক মিত্রের সংখ্যা কম। আর ইসরাইল বারবার প্রমাণ করেছে, আন্তর্জাতিক মতামত উপেক্ষা করে তারা নিজের সামরিক লক্ষ্য পূরণে অটল। আইয়ারের মতে, ইরানের সবচেয়ে সম্ভাব্য কৌশল হলো- এই পরিস্থিতিকে সহ্য করা, যতটা সম্ভব প্রতিশোধ নেয়া এবং পরে একটি নতুন প্রতিরক্ষা কৌশল গ্রহণ করা। এই কৌশলের মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশ হলো- এই নতুন কৌশলে তারা সম্ভবত পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ বেছে নিতে পারে-কেবল সক্ষমতা ধরে রাখা নয়, বাস্তবে অস্ত্র তৈরি করতে পারে।

মার্কিন স্বার্থে হামলা চালালে ইরানকে অভাবনীয় শক্তিতে জবাব দেয়া হবে- ট্রাম্প: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান ও ইসরাইল সংঘর্ষে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা নেই। সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন- শনিবার দিবাগত রাতে ইরানে যেসব হামলা হয়েছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এদিকে ইরান আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্ররা ইসরাইলকে সাহায্য করে, তাহলে তার জবাব দেবে তেহরান। এই প্রেক্ষিতে ট্রাম্প বলেন, যদি আমাদের ওপর কোনোভাবেই ইরান আক্রমণ চালায়, তাহলে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী এমন শক্তি দিয়ে জবাব দেবে যা পৃথিবী এর আগে কখনো দেখেনি। তবে এর পাশাপাশি তিনি আশার বাণীও দিয়েছেন। বলেছেন, আমরা খুব সহজেই ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে একটা চুক্তি করাতে পারি এবং এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারি।

তার এই মন্তব্য ইরান-ইসরাইল উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ ভূমিকার ইঙ্গিত দেয়। ট্রাম্পের বক্তব্য একদিকে যেমন শক্তি ব্যবহারের হুঁশিয়ারি, অন্যদিকে তেমনি শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনাও তুলে ধরছে।

mzamin
ইরানের হামলায় বিধ্বস্ত ইসরাইলের একটি আবাসিক ভবন

ইসরাইল-ইরান সংঘাত যখন তীব্র হচ্ছে, তখন রাশিয়ার নজর যেদিকে

রাশিয়া কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যমূলক পদক্ষেপ বজায় রেখেছে। ইরানের সাথে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি ইসরাইলের সাথে তার উষ্ণ সম্পর্ককে দৃঢ় করার চেষ্টা করছে। এই সপ্তাহান্তে ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনাগুলোতে ইসরাইল সামরিক হামলা চালিয়ে শীর্ষ জেনারেল ও বিজ্ঞানীদের হত্যা করেছে। প্রতিক্রিয়ায় তেহরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এর জেরে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে মস্কো।  উভয় পক্ষের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য সূক্ষ্ম কূটনৈতিক দক্ষতার প্রয়োজন। তবে এটি রাশিয়ার জন্য ‘পাওয়ার ব্রোকার’ হবার সুযোগ খুলে দিতে পারে,  যাতে তারা সংঘর্ষের অবসান ঘটাতে ভূমিকা নিতে পারে। মস্কোর কিছু পর্যবেক্ষক আরও যুক্তি দেন যে, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে সংঘর্ষের উপর মনোযোগ ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকে বিশ্বব্যাপী মনোযোগ সরিয়ে নিতে পারে এবং কিয়েভের প্রতি পশ্চিমা সমর্থনকে দুর্বল করে রাশিয়াকে সুবিধা করে  দিতে পারে।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান উভয়ের সাথেই কথা বলেছেন, সংঘাত কমাতে সাহায্য করার প্রস্তাব দিয়েছেন। পেজেশকিয়ানের সাথে তার ফোনালাপে, পুতিন ইসরাইলি হামলার নিন্দা জানিয়েছেন এবং তার সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, রাশিয়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির আশেপাশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার  লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইসরাইলি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একটি বিবৃতি জারি করেছে, যেখানে তারা স্পষ্টতই এই হামলাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেছে এবং সতর্ক করে দিয়েছে যে, এই উস্কানির সমস্ত পরিণতি ইসরাইলি নেতৃত্বের উপর বর্তাবে। উভয় পক্ষকে উত্তেজনা কমাতে এবং সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে রাশিয়া। কিন্তু ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের কঠোর ভাষায় নিন্দা জানানো সত্ত্বেও, মস্কো তেহরানের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থনের বাইরে অন্য কিছু দেয়ার কোনও ইঙ্গিত দেয়নি।

নেতানিয়াহুর সাথে তার ফোনালাপে পুতিন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সাথে সম্পর্কিত সমস্ত সমস্যা সমাধানের গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছিলেন। আরও উত্তেজনা বৃদ্ধি রোধ করার জন্য পুতিন মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে এক বিবৃতিতে বলেছে ক্রেমলিন।সেইসঙ্গে বলা হয়েছে, সমগ্র অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে বিপর্যয়কর পরিণতি এড়াতে রাশিয়ান পক্ষ ইরান ও ইসরাইল উভয়ের নেতৃত্বের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে। শনিবার পুতিন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ফোনে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। পুতিনের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ বলেছেন যে, ক্রেমলিন নেতা মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা চালানোর জন্য রাশিয়ার প্রস্তুতির উপর জোর দিয়েছেন এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন-ইরান আলোচনার সময় পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য চুক্তি খুঁজে বের করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেয়ার প্রস্তাব করেছেন।

শীতল যুদ্ধের সময় মস্কো এবং তেহরানের মধ্যে সম্পর্ক প্রায়শই উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর, নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বড়  শয়তান’ বলে অভিহিত করেছিলেন, একইসঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমালোচনা করতেও ছাড়েননি। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া-ইরান সম্পর্ক গভীর হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হওয়ার পর মস্কো ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার এবং অস্ত্র ও প্রযুক্তির শীর্ষ সরবরাহকারী হয়ে ওঠে। রাশিয়া বুশেহর বন্দরে ইরানের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে যা ২০১৩ সালে কার্যকর হয়। ২০১৫ সালে ইরান এবং ছয়টি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে রাশিয়া অংশ নিয়েছিল, যেখানে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক তদন্তের জন্য উন্মুক্ত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে চুক্তি থেকে সরে আসার পর রাশিয়া রাজনৈতিক সমর্থন প্রদান করেছিল।

২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, রাশিয়া এবং ইরান বাশার আল-আসাদের সরকারকে শক্তিশালী করার জন্য একত্রিত প্রচেষ্টা চালায়। তারা আসাদকে দেশের বেশিরভাগ অংশ পুনরুদ্ধারে সহায়তা করেছিল, কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিরোধীদের তীব্র আক্রমণের পর তার শাসনের দ্রুত পতন রোধ করতে ব্যর্থ হয়। ২০২২ সালে যখন মস্কো ইউক্রেনে পূর্ণ মাত্রায় আক্রমণ শুরু করে, তখন পশ্চিমারা অভিযোগ করে যে তেহরান শাহেদ ড্রোন সরবরাহ এবং পরে রাশিয়ায়  উৎপাদন শুরু করার জন্য ক্রেমলিনের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক সম্পর্কের স্বার্থে জানুয়ারিতে, পুতিন এবং পেজেশকিয়ান ‘ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।

শীতল যুদ্ধের সময়, মস্কো ইসরাইলের আরব শত্রুদের সশস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। ১৯৬৭ সালে ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে যায় , ১৯৯১ সালে আবার তা পুনরুদ্ধার করা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া-ইসরাইল সম্পর্ক দ্রুত গভীর এবং শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তেহরানের সাথে মস্কোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও, পুতিন বারবার ইসরাইলি স্বার্থ নিজের বিবেচনায় রেখেছেন। তিনি নেতানিয়াহুর সাথে উষ্ণ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বজায় রেখেছেন, যিনি ইউক্রেন যুদ্ধের আগে প্রায়শই রাশিয়া ভ্রমণ করতেন। রাশিয়া এবং ইসরাইলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক সিরিয়ার উন্নয়নসহ নাজুক এবং বিভেদমূলক বিষয়গুলো মোকাবেলায় তাদের সহায়তা করেছে।  

যদিও রাশিয়া ইরানকে অত্যাধুনিক S-300 বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সরবরাহ করেছিল, যা ইসরাইল গত বছর ইরানে তাদের হামলার সময় ধ্বংস করে দিয়েছিল বলে দাবি করেছিল, মস্কো ইসরাইলি উদ্বেগের প্রতিক্রিয়ায় অন্যান্য অস্ত্র সরবরাহ থেকে বিরত রয়েছে। বিশেষ করে, রাশিয়া ইরানের প্রয়োজনীয় Su-35 যুদ্ধবিমান সরবরাহ বিলম্বিত করেছে যাতে তারা তাদের পুরনো নৌবহর আপগ্রেড করতে পারে। ইসরাইলের সাথে ক্রেমলিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তেহরানে অসন্তোষের সূত্রপাত করেছে, যেখানে রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের কিছু সদস্য মস্কোর উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে। ইসরাইল এবং ইরান উভয়ের সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রাখা এখন ফলপ্রসূ হতে পারে, যার ফলে মস্কো উভয় পক্ষের কাছেই বিশ্বস্ত  অবস্থানে পৌঁছে যাবে এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে ভবিষ্যতের যেকোনো চুক্তিতে সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারী হয়ে উঠবে।

শুক্রবারের হামলার অনেক আগে, পুতিন ট্রাম্পের সাথে তার ফোনালাপে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা করেন। রাশিয়ান নেতার সামনে  ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকে সরে আসার এবং বিশ্বব্যাপী বিষয়গুলোতে  ওয়াশিংটনের সাথে আরও বিস্তৃতভাবে জড়িত হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ পরামর্শ দিয়েছেন যে রাশিয়া ইরান থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিতে পারে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও  ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসাবে এটিকে বেসামরিক চুল্লি জ্বালানিতে রূপান্তর করতে পারে। ইসরাইলি হামলার পর ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির উপর কঠোর বিধিনিষেধ মেনে নেবে এমন একটি চুক্তির আলোচনার সম্ভাবনা ম্লান। কিন্তু যদি আলোচনা আবার শুরু হয়, তাহলে রাশিয়ার প্রস্তাব চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উঠে আসতে পারে। অনেক পর্যবেক্ষক বিশ্বাস করেন যে ইসরাইলি হামলা সম্ভবত বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বাড়িয়ে দেবে এবং মস্কোকে সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করবে বিশেষ করে যখন এর অর্থনীতি সংকটে রয়েছে।

মস্কোভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক রুসলান পুখভ একটি মন্তব্যে লিখেছেন, ‘এটি ইউক্রেন এবং পশ্চিম ইউরোপে তার মিত্রদের রাশিয়ার তেল রাজস্ব হ্রাসের আশা ম্লান করে দেবে, এই রাজস্ব  রাশিয়ার সামরিক বাজেট পূরণের জন্য অপরিহার্য।’

মস্কোর কিছু ভাষ্যকার আরও যুক্তি দেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত সম্ভবত ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকে পশ্চিমা মনোযোগ এবং সম্পদকে সরিয়ে দেবে এবং রাশিয়ার জন্য তার যুদ্ধক্ষেত্রের লক্ষ্য অর্জন সহজ করে তুলবে। ক্রেমলিনপন্থী বিশ্লেষক সের্গেই মার্কভ বলেছেন, ‘ইউক্রেনের প্রতি বিশ্বের মনোযোগ দুর্বল হয়ে পড়বে। ইসরাইল এবং ইরানের মধ্যে যুদ্ধ ইউক্রেনে রাশিয়ান সেনাবাহিনীর সাফল্যে সহায়তা করবে।’

সূত্র : সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

mzamin

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন: ইসরাইলের হামলা ইরানে শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তনের বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি করেছে by জেসন বার্ক

ইরানের ওপর ইসরাইলের হামলা হলো এক ধরনের ধারাবাহিক ঘটনার সর্বশেষ পরিণতি। এর সূচনা হয়েছিলো ২০২৩ সালের  ৭ অক্টোবর গাজা থেকে ইসরাইলের ওপর চালানো যোদ্ধাগোষ্ঠী হামাসের আক্রমণে। ওই সব ঘটনাই একের পর এক তেহরানকে দুর্বল করে তুলেছে এবং সামরিকভাবে ইসরাইলকে আরও শক্তিশালী করেছে। এসব ধারাবাহিকতা ছাড়া শুক্রবার ইরানে সরাসরি চালানো এই নতুন আক্রমণ বাস্তবে সম্ভব হতো না।

এর মধ্যে প্রথম ধাপ ছিল গাজায় ইসরাইলের আক্রমণ। এটি রক্তক্ষয়ী এবং প্রাণঘাতী হামলা। বিশেষত ফিলিস্তিনিদের জন্য। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হামাসকে এর মাধ্যমে এতটা দুর্বল করে দেওয়া হয় যে, তারা আর ইসরাইলিদের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো বড় হুমকি হতে পারেনি। হামাসকে বলা হয় ‘প্রতিরোধ অক্ষ’। এর একটি অংশ হলো- একটি জোট। নিজের প্রভাব বিস্তার এবং ইসরাইলকে তার পারমাণবিক প্রকল্পে হামলা থেকে বিরত রাখার জন্য ইরান গত এক দশকে এই জোট গড়ে তুলেছিলো। তাই এই আক্রমণের আঞ্চলিক প্রভাব গভীর।

এরপর ২০২৪ সালের এপ্রিলে সিরিয়ার দামেস্কে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস কমপ্লেক্সে বোমা হামলা চালায়। সেখানে সাতজন নিহত হন। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান প্রথমবারের মতো সরাসরি ইসরাইলে ড্রোন হামলা চালায়। যদিও তা কার্যকর হয়নি। বহু বছর ধরে যুদ্ধে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রক্সি, গুপ্তহত্যা ও সীমান্তের বাইরের হামলার মাধ্যমে লড়াই করলেও, এই প্রথম দুই দেশের মধ্যে প্রকাশ্যে যুদ্ধ চলছে।

শরত মৌসুমের দিকে হামাস অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন ইসরাইল মনোযোগ দেয় লেবাননভিত্তিক এবং ইরান-সমর্থিত অন্য যোদ্ধাগোষ্ঠী হিজবুল্লাহর দিকে। তাদেরকে প্রতিরোধ অক্ষের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ মনে করা হয়।  সেপ্টেম্বরে হিজবুল্লাহর পুরো নেতৃত্ব ও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ ধ্বংস করে দেয় ইসরাইল এবং দক্ষিণ লেবাননের গভীরে অভিযান চালায়। সেখানে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়নি তাদের। এমনকি হিজবুল্লাহর সমর্থকরাও স্বীকার করে নেন যে, তারা বড় ধরনের পরাজয় বরণ করেছে।

উল্লেখ্য, হিজবুল্লাহর হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়ায় সিরিয়াতে বিদ্রোহীরা হামলা চালালে তারা প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের হয়ে লড়াই করতে পারেনি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদের পতনের মাধ্যমে ইরান-সিরিয়ার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ভেঙে যায়। এতে ইরানের প্রতিরোধ অক্ষ আরও দুর্বল হয়ে পড়ে, সিরিয়ায় ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো প্রকাশিত হয়ে পড়ে এবং ইসরাইলি যুদ্ধবিমানগুলো আরও সহজেই ইরানে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
সিরিয়া ও ইরাকের ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা বুঝতে পেরেছে যে ইসরাইলকে আক্রমণের হুমকি বাস্তবে রূপ দেওয়াটা বোকামি। ফলে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাই একমাত্র গোষ্ঠী, যারা এখনও ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। তারা লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে এবং তেল আবিবের দিকে কয়েকটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। যদিও তা কৌশলগত কোনো ক্ষতি করতে পারেনি।  

২০২৫ সালের বসন্তের শুরুতে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দেশের নিরাপত্তা রক্ষার ভার প্রক্সিদের হাতে তুলে দেন। তার এ সিদ্ধান্ত যে কত বড় ভুল ছিল, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অন্যদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই স্বল্পমেয়াদী সুযোগ কাজে লাগাতে বহুদিন ধরে পরিকল্পিত একটি বড় সামরিক আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এপ্রিলে হামলা চালানোর এক সময়সীমা পেরিয়ে যায়, যদিও সেই সময় মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া ছিল। তিনি তেহরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য মাত্র ৬০ দিনের সময় দিয়েছিলেন। ইসরাইল দাবি করে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। সেই সময়সীমা গত সপ্তাহে শেষ হয়ে যায়।

শুক্রবার নেতানিয়াহু ইরানিদের উদ্দেশে বলেন, তিনি আশা করেন ইসরাইলের সামরিক অভিযান ‘তোমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পথ পরিষ্কার করবে।’

ইসরাইলের লক্ষ্য যদি ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের আগের সময়ের মতো ইরানকে আবারও ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রে পরিণত করা না-ও হয়, তবে তারা যেসব লক্ষ্যবস্তু বেছে নিয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে এই দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। এটি এ কারণে যে ইরানের বর্তমান শাসন কাঠামোর নেতৃত্বে এখনও রয়েছেন সেই সব ব্যক্তি,  যারা রেজা শাহ পাহলভির পতনের পর বা তারও আগে ইসলামি বিপ্লবের পথিকৃৎ ছিলেন।

শুক্রবারের প্রথম দফার হামলায় নিহতদের মধ্যে আছেন অনেক জ্যেষ্ঠ অফিসার। তারা ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রথম দিকের সদস্য। এই বাহিনীই ছিল ধর্মীয় নেতাদের নতুন শাসনব্যবস্থা রক্ষার মূল কাণ্ডারি এবং পরবর্তীতে ইসলামী বিপ্লবের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হন তারা। এদের অনেকেই ইরান-ইরাক যুদ্ধের (১৯৮০-১৯৮৮) অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, যা ঐতিহাসিকদের মতে, বর্তমান শাসনের ভিত্তি গড়ে দেয়।

প্রথম দফার হামলায় নিহত পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের মধ্যে একজন আইআরজিসির প্রধান হোসেইন সালামি একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। খামেনির ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা আলি শামখানি। তিনি আগে থেকেই লক্ষ্যবস্তু ছিলেন। ১৯৭০-এর দশকে ছিলেন একজন গোপন ইসলামি বিপ্লবী এবং পরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন। খামেনি নিজে ১৯৮৯ সালে আয়াতোল্লাহ খোমেনির উত্তরসূরি হিসেবে ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু তার ইসলামি রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে।
এই যুদ্ধ শেষ হলে ইরান আবার যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল-ঘেঁষা হবে। তা অত্যন্ত অস্বাভাবিক সম্ভাবনা। তবে যা খুবই সম্ভব, তা হলো যারা শাহকে সরিয়ে ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন এবং তারপর বহু দশক ধরে শাসন করে এসেছেন, তাদের ক্ষমতা চূড়ান্তভাবে এবং সম্ভবত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
(জেসন বার্ক, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা প্রতিবেদক। তার এ লেখাটি অনলাইন গার্ডিয়ানে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ)

mzamin