Wednesday, March 26, 2014

কাছে থেকে দেখা মার্চ ’৭১

মার্চ ১৯৭১: স্বাধীনতার দাবিতে
শিল্পীরাও রাজপথে নেমে এসেছেন
প্রকাশিতব্য সংকলন গ্রন্থ অবরুদ্ধ ঢাকায় মঈদুল হাসানের যে লেখাটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তার অংশবিশেষ এখানে ছাপা হলো। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে পাকিস্তান সরকার পূর্ব বাংলাকে পুরোপুরি সামরিক কর্তৃত্বের অধীনে আনে। কিন্তু পূর্ব বাংলায় তাদের হাতে যে পরিমাণ সেনা ছিল, তা গণবিস্ফোরণ দমনের জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। আকাশপথে প্রতিদিন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সেনা এনে এবং সমুদ্রপথে ভারী অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদসহ নানা ধরনের সামরিক যান পাঠিয়ে আর শহরের বিভিন্ন স্থানে শক্ত অবস্থান নির্মাণ করে তারা তাদের শক্তি বৃদ্ধি করে চলে। অন্যদিকে অসহযোগ আন্দোলনের গতিও দ্রুত বাড়ছিল। এর কার্যকারিতা আরও বৃদ্ধি পায় যখন ৬ মার্চ প্রাদেশিক জনপ্রশাসনের সদস্যরা নির্বাচিত দলের প্রতি তাঁদের আনুগত্য প্রকাশ করেন। তাঁদের পেশাদারির সাহায্যে এই আন্দোলন এক সমান্তরাল সরকারের রূপ দেয়। কিন্তু তার পরও এটা ছিল অহিংস আন্দোলন। নেতৃত্বের মধ্যে এমন কেউ ছিলেন না, যিনি জনগণকে সশস্ত্র না করার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন কিংবা সশস্ত্র শত্রুপক্ষকে পরাস্ত করতে সেনাবাহিনীর বিক্ষুব্ধ বাঙালি অংশের সঙ্গে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ ১০ বা ১১ মার্চ সন্ধ্যায় আমার বাসায় এলে তাঁর সঙ্গে আমার একান্তে কথা বলার সুযোগ হয়। তিনি পাকিস্তানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দিহান ছিলেন। কারণ, তারা আগের মতোই সেনা সমাবেশ ঘটাচ্ছিল। তিনি মূলত আমার কাছ থেকে জানতে এসেছিলেন, কোনো কূটনৈতিক সূত্র থেকে আমি কিছু জানতে পেরেছি কি না; বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইয়াহিয়া ও শেখ মুজিবের বিরোধ মিটমাট করার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছি কি না। আমাদের ৫ মার্চের বৈঠকের পর থেকেই এই ধারণাটি মনে হয় তাঁকে তাড়িত করছিল। আমি জানি না, তিনি তাঁর দলের ভেতর থেকে বা অন্য কোথাও থেকে এ রকম কোনো ইঙ্গিত পেয়েছিলেন কি না।
আমি কিছুটা কৌতুক করেই তাঁকে বলেছিলাম, তিনি তাঁর নেতার কাছ থেকে কেন বিষয়টি নিশ্চিত করছেন না। কেননা শেখ মুজিব ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ডের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেছিলেন। আমি ইতিমধ্যে ঢাকায় নিযুক্ত চেকোস্লোভাকিয়ার কনসাল জেনারেল ড. ড্যালিবর ক্রুলিস ও সোভিয়েত দূতাবাসের প্রথম সচিব (রাজনৈতিক) ইউরি পেত্রোভের মতো দুই ওয়াকিবহাল কূটনীতিকের কাছে ব্যাপারটি জানতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তাঁরা কেউ কিছু জানতেন না। এ ছাড়া তাজউদ্দীন আহমদকে আমি আরও জানাই ব্রিটেন, পশ্চিম জার্মানি, অন্যান্য কিছু ইউরোপীয় দেশ ও জাপান তাদের কনস্যুলেটের লোকজনদের এখান থেকে জরুরিভাবে বিমানে সরিয়ে নিতে শুরু করেছে। এতে অদূর ভবিষ্যতে কী ঘটতে চলেছে, তা তাদের আচরণ থেকে স্পষ্ট। এসব বিবেচনায় নিয়ে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, পাকিস্তানের তৎপরতা নস্যাৎ করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে আগাম সামরিক আঘাত করার যে প্রস্তাবটি ছিল, তা আপনারা নতুন করে খতিয়ে দেখবেন কি না? আমার বাসার লনের সেই মৃদু আলোয় তিনি কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর বললেন, তাঁদের এটা করা উচিত, তবে এটা তাঁর ক্ষমতার বাইরে। ৭ মার্চের পরবর্তী সপ্তাহে ছয় দফার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের বদলে এক দফার দাবি অর্থাৎ স্বাধীনতার অঙ্গীকারসহ মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশের সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকল। দেশের দুই অংশের মধ্যে সব রকম যোগাযোগ কার্যত বন্ধই হয়ে গেল। পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারী পশ্চিম পাকিস্তানি ধনী ব্যক্তিদের দেশ ছাড়ার হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেল। ইয়াহিয়ার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পেল।
ফলে প্রতিদিনই নতুন নতুন গুজব ও তত্ত্ব তৈরি হতে থাকল। শেষে প্রায় বিনা ঘোষণায় ইয়াহিয়া খান ১৫ মার্চ ঢাকায় আসেন। পরদিন থেকে ইয়াহিয়া ও মুজিবের মধ্যে বৈঠক শুরু হয়। পরবর্তী ছয় দিন তাঁদের বৈঠক চলতে থাকে। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তেজনাপূর্ণ আর কিছুটা বিদ্ঘুটে হয়ে পড়ে। শীর্ষ পর্যায়ে আপস-মীমাংসার জন্য আলাপ-আলোচনা চলছিল। আবার অসহযোগ আন্দোলনও অব্যাহত ছিল। পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে স্থানে স্থানে সংঘর্ষ চলছিল। প্রতিদিনই নতুন নতুন সেনা আকাশপথে আসছিল। কূটনীতিকদের দেশ ছাড়ার হারও বেড়ে চলছিল। শহরের মধ্যে পাকিস্তানি সেনারা নতুন নতুন চৌকি আর ক্ষুদ্র বাংকার তৈরি করছিল। খবর ছড়িয়ে পড়ে যে চট্টগ্রাম বন্দরে অনেক অস্ত্র ও গোলাবারুদ এসে পৌঁছেছে। বেসামরিক প্রতিরোধের কারণে সেগুলো খালাসের অপেক্ষায় আছে। ইয়াহিয়ার সঙ্গে যেসব সামরিক অধিনায়ক ঢাকায় এসেছিলেন, তাঁদের সম্পর্কে অনেকের মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে। কারণ, রাজনৈতিক আপসরফায় তাঁদের ভূমিকা ছিল না। এ সময় পূর্ব পাকিস্তানে থাকা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙালি ইউনিটগুলোকে (ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট) পশ্চিম পাকিস্তান বা পূর্ব পাকিস্তানে দূরবর্তী স্থানগুলোতে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকের প্রথম পাঁচ-ছয় দিনে বাইরে থেকে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। ২১-২২ মার্চ জোর খবর ছড়িয়ে পড়ে যে কিছুটা স্বতন্ত্রভাবে কাজ করে যাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক) হলকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের নেতাদের চাপে কেন্দ্রীয় সরকারে অংশগ্রহণ করার পরিবর্তে অবস্থান পাল্টিয়ে মুজিব অনতিবিলম্বে কনফেডারেশনের জন্য চাপ দিচ্ছেন। এমন সময় মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক ভেঙে যেতে পারে—এই সম্পর্কিত শঙ্কাটি হঠাৎ ২২ মার্চ দূরীভূত হয়। ছয় বা সাতটি বৈঠকের পর সংশয়ী সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মুজিব জোর দিয়ে বলেন, যথেষ্ট অগ্রগতি না হলে তিনি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বৈঠক চালিয়ে যেতেন না।
আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ব্যক্তিগত পর্যায়ে অত্যুৎসাহে দাবি করেন, পাকিস্তানের সামরিক সরকার তাদের কনফেডারেশনের প্রস্তাব প্রায় মেনে নিয়েছে। পরদিন ২৩ মার্চ ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিশাল যৌথ সমাবেশে শেখ মুজিব বলেন, যে নেতা বিনা রক্তপাতে তাঁর দাবি আদায় করতে পারেন, তিনিই হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ নেতা। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলেননি বা তাঁর নিজের কোনো কৃতিত্ব দাবি করেননি। কিন্তু তাঁর এ কথায় পরিষ্কার ইঙ্গিত ছিল যে সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে এবং তা শুধু স্বাক্ষরের অপেক্ষায় আছে। এসব বিবৃতি দেশের প্রায় সব প্রধান সংবাদপত্রে ২৪ মার্চ প্রকাশিত হয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি, এসব খবর আওয়ামী লীগের সবচেয়ে আলোকিত অংশকেও দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান তখন গুলশানের উত্তর সীমান্তে থাকতেন। আমার বাসা ছিল গুলশান ১ নম্বর মার্কেটের পেছন দিকে। ২৪ মার্চ সন্ধ্যার দিকে তিনি আমার বাসায় এসে এক ঘণ্টা পর তাঁর বাসায় রাতের খাবারে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। আমি সেখানে পৌঁছে দেখি ড. কামাল হোসেন ওয়াশিংটন পোস্ট-এর টোকিও প্রতিনিধিকে (তাঁর নাম সম্ভবত সেলিগ হ্যারিসন) দেশের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে তাঁর দলের অবস্থান জানাচ্ছেন। কামাল হোসেন ছিলেন আলোচনা কাজে শেখ মুজিব কর্তৃক নিয়োজিত দুই সর্বোচ্চ প্রতিনিধির মধ্যে একজন, যাঁরা ইয়াহিয়া খানের পক্ষের আলোচকদের সঙ্গে আপসরফার মাধ্যমে কনফেডারেশনের ঐকমত্যের খসড়া প্রস্তুত করছিলেন। তখনকার বিপরীতধর্মী চিত্র লক্ষ করে আমি বিশাল ধাঁধায় পড়ে যাই।
একদিকে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার সামরিক প্রস্তুতি বৃদ্ধি, অন্যদিকে চট্টগ্রাম, খুলনা, রংপুর ও ঢাকার উপকণ্ঠ মিরপুরে সেনাবাহিনী ও অবাঙালিদের (বিহারি) সঙ্গে বাঙালিদের সংঘাত। এ সংঘাত তখন হঠাৎ বেড়ে যায়। আবার সরকারের মতিগতি পরিবর্তনের ফলে মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকের অগ্রগতির খবরও প্রচারিত হয়। এ দুই বিপরীতধর্মী খবরের মাঝে পড়ে হতবুদ্ধি হওয়ার মতো অবস্থা আমার। এর আগে ২২ মার্চ সন্ধ্যায় পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রধান ওয়ালী খান আমার বাসায় এসেছিলেন। সেদিন তিনি আমাকে ও আমার অভ্যাগতদের যা বলেন, সেটা শুনে পুরো ব্যাপারটি আমার জন্য আরও গোলমেলে হয়ে যায়। তিনি বলেন, সেদিন সকালে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে। তিনি প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি (ইয়াহিয়া) যে অবস্থায় পৌঁছেছেন সেখান থেকে বেরোনোর জন্য কোন পথে এগোতে চান। জবাবে ইয়াহিয়া সরাসরি বলেন, তাঁর একটি পথই তো খোলা, আর তা হচ্ছে গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে যাওয়া। ওয়ালী খান আরও বলেন, মুজিবকে তিনি ইয়াহিয়ার এই উক্তি সঙ্গে সঙ্গেই অবহিত করেছেন। ওয়ালী খান পশ্চিম পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের এক কিংবদন্তি নেতার ছেলে। তিনি নিজেও সত্যনিষ্ঠ অকপট পাঠান হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরস্পরবিরোধী এই দুই অবস্থানের মধ্যে বিভ্রান্ত হয়ে আমি আওয়ামী লীগের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কামাল হোসেনের কাছ থেকে পরিস্থিতি সম্বন্ধে জানার সুযোগটি গ্রহণ করি। রেহমান সোবহানের বাসায় সেদিন যখন কামাল হোসেন ওয়াশিংটন পোস্ট-এর টোকিও প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন সেখানে সালমা সোবহান ও হামিদা হোসেনও উপস্থিত ছিলেন। ওয়াশিংটন পোস্ট-এর সংবাদদাতাকে আশা ও উদ্দীপনামূলক কথা শোনানো হলো। সেনাবাহিনীর উগ্র মহলের কারণে পরিস্থিতি অনিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের সর্বশেষ প্রস্তাব মেনে নেওয়া ছাড়া ইয়াহিয়ার আর কোনো পথ নেই। তাঁকে সামরিক আইন তুলে নিতে হবে,
পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনসহ প্রদেশগুলোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। অবশ্য ইয়াহিয়ার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সরকার সাময়িকভাবে পরিচালিত হতে পারে। ইতিমধ্যে সংবিধান প্রণয়নের জন্য জাতীয় সংসদকে প্রাদেশিক ভিত্তিতে দুই ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে। কামাল হোসেনের কথা অনুযায়ী এই সবকিছুর ভিত্তিতে আর এক-দুই দিনের মধ্যেই ইয়াহিয়া ও মুজিবের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। কামাল হোসেনকে আমি আওয়ামী লীগের একজন মেধাবী নেতা বলেই মনে করতাম। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় তাঁর পরিস্থিতির মূল্যায়নকে আমি গ্রহণ করতে পারিনি। বরং দলের প্রধানের আশাবাদে তাঁকেও এভাবে ভেসে যেতে দেখে কিছুটা বিরক্ত হই। পুরোটা সময় আমি বিস্ময়ে নিশ্চুপ ছিলাম। কিন্তু সেই সংবাদপত্র প্রতিনিধি পরিস্থিতি সম্পর্কে আমার মত জানতে চেয়ে চাপাচাপি করলে আমি অবশেষে মুখ খুলি। আমার ভেতরে জমে ওঠা বাষ্প বের করে দিয়ে বলি, পরিস্থিতি সম্পর্কে যা শুনলাম তা এ রকম, একটা লোক এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে সবেগে নিচে পড়ে যাচ্ছে, পড়তে পড়তে মাটির কাছাকাছি একটি তলার এক জানালায় একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলছে, ‘সো ফার সো গুড!’ (এখন পর্যন্ত বেশ ভালোই চলছে) কিন্তু ২৪ মার্চেই সমঝোতার বিষয়ে ইয়াহিয়ার দেওয়া আশাবাদ দৃশ্যমানভাবে ফিকে হয়ে আসে যখন, শেখ মুজিব সংবাদপত্রকে আবার বলেন যে তিনি শিগগিরই কোথায় থাকবেন তা তিনি জানেন না, কিন্তু সংগ্রাম অবশ্যই চলবে।
আমার মনে হয়েছিল, কিছু অজানা বিষয় তাঁর বিচারবুদ্ধিকে প্রভাবিত করছে। আর তাঁর নিজস্ব বিচার-বিবেচনাই দলের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নিয়ামক ভূমিকা পালন করত। আমার এ রকম সংশয়ের সত্যতা খুঁজে পাই সত্তর দশকের শেষ ভাগে, যখন অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনার একটি কপি হাতে পাই। পাকিস্তানের সামরিক জান্তা সেই আক্রমণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল ১৮ মার্চ। সেটির একটি করণীয় অংশ থেকে এখানে উদ্ধৃত করছি, ‘উচ্চতর পর্যায়ে রাষ্ট্রপতিকে আলোচনা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করা হচ্ছে। এমনকি মুজিবকে ধোঁকাও দেওয়া যেতে পারে। মানে ভুট্টো রাজি না হলেও রাষ্ট্রপতি ২৫ মার্চ তারিখে ঘোষণা করবেন যে তিনি আওয়ামী লীগের দাবি মেনে নিয়েছেন।’ (সূত্র: সিদ্দিক সালিক: উইটনেস টু সারেন্ডার, পৃষ্ঠা ২২৮) এই ধোঁকা দেওয়ার পরিকল্পনা স্পষ্টতই কার্যকর হয়েছিল। ২৫ মার্চ আওয়ামী লীগের নেতারা কনফেডারেশনের নীতিমালার চুক্তিতে স্বাক্ষর করার আমন্ত্রণের জন্য সারা দিন ফোনের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু ইয়াহিয়া খান চুপিসারে সন্ধ্যাবেলা ঢাকা ত্যাগ করেন। সম্পূর্ণ হতবিহ্বল পরিস্থিতিতে এই অঞ্চলের নিরস্ত্র জনগণের বৃহত্তম আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে; শুরু হয় ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ।
মঈদুল হাসান: মূলধারা ’৭১ গ্রন্থের লেখক ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক।

মুক্তির সংগ্রাম শুরু হোক

একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর সেই অবিস্মরণীয় বক্তৃতায় আমাদের সংগ্রামের রূপরেখাটি ঘোষণা করেছিলেন—তিনি বলেছিলেন, সংগ্রামটি স্বাধীনতার এবং মুক্তির। ওই বক্তৃতার প্রতিটি কথা তিনি প্রত্যয় নিয়ে বলেছিলেন, একটা প্রতিজ্ঞাও ছিল প্রতিটি ঘোষণার পেছনে, প্রজ্ঞা তো ছিলই। এই প্রজ্ঞার প্রতিফলন ছিল তাঁর স্বাধীনতা ও মুক্তিকে আলাদা করে দেখায়। স্বাধীনতা হচ্ছে প্রধানত বস্তুগত, ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত। ভৌগোলিক স্বাধীনতা হয়, যা নয় মাস যুদ্ধ করে আমরা অর্জন করেছি। অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও হয়, যা কিছু মানুষ অর্জন করেছে। কিন্তু মুক্তি অনেক ব্যাপক বিষয়। উত্তর উপনিবেশী তত্ত্ববাদী ও সক্রিয় যোদ্ধা ফ্রানৎস ফাঁনো লিখেছিলেন, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক মুক্তি যতটা সহজ, মনের উপনিবেশ মুক্তি ততটা নয়। একাত্তরে আমাদের যে মুক্তির সংগ্রাম শুরু হয়েছিল, তা প্রকৃতই একটি কঠিন সংগ্রাম। এই সংগ্রামে আমরা তিন পা এগোলে দুই পা পেছাই, কারণ, আমাদের শিক্ষাকে তার বাহন করতে পারিনি, সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি, শ্রেয়চিন্তাকে তলিয়ে দিতে দিয়েছি বস্তু-মোহের আড়ালে। পড়ার ও চিন্তার সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে বসেছে লোভের সংস্কৃতির কাছে।
দেশের একটা বিশালসংখ্যক মানুষকে পড়ার সংস্কৃতিতে সম্পৃক্ত করা তো দূরের কথা, অক্ষরজ্ঞানই তো আমরা দিতে পারিনি। এক বিশালসংখ্যক মানুষকে এখনো দারিদ্র্য-চক্র থেকে তুলে আনতে পারিনি। এসবের ফলে মুক্তির মূলমন্ত্রটি সবার কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না। একটি পতাকা পেয়ে আমরা সবাই গর্বিত—আমরা যে স্বাধীন এ কথা ওই পতাকাটি আমাদের জানিয়ে দেয়। কিন্তু মুক্তি যে প্রয়োজন—মনের মুক্তির, বুদ্ধির মুক্তির, বিবেকের মুক্তির, যা ছাড়া স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদটি পাওয়া হয় না—তা বুঝতে আমরা ক্রমাগত অপারগ হচ্ছি। অসংখ্য শহীদের রক্তঝরা এই মার্চে কিছু বাঙালি তরুণ পাকিস্তানি পতাকা হাতে মাঠে গিয়ে ওই দেশের ক্রিকেট দলের জন্য চিৎকার করেছে, ওরা হেরে গেলে অশ্রুপাত করেছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে এ নিয়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। খেলাধুলায় একটা বিদেশি দলকে সমর্থন করাই যায়, কিন্তু এই সমর্থন কত দূর নেওয়া যায়? এই মার্চে একেবারে পাকিস্তানের পতাকা হাতেই বিশ্বস্ততা দেখাতে হবে? খেলাধুলা তো সংস্কৃতিরই একটি অংশ। সেই সংস্কৃতি যেখানে সমৃদ্ধ হচ্ছে আমাদের গর্বের আর বিজয়ের গল্পে, সেখানে এ কোন ছবি আমরা দেখছি? এই তরুণদের ঘৃণা জানাচ্ছে অন্য তরুণেরা, কিন্তু কেন তারা এ ধরনের ঘটনাকে স্বাভাবিক মনে করছে, কেন মার্চের ইতিহাস তাদের ভেতর কোনো অহংকার জাগাচ্ছে না, তা কি আমরা ভেবে দেখেছি? ভেবে দেখলে আমরা অভিযোগের একটা আঙুল নিজেদের দিকেই তুলতাম। এই ৪৩ বছরে চিরমুক্তির আর বিবেক জাগানোর কাজটা কি আমরা করেছি অভিনিবেশ নিয়ে? নাকি একাত্তরকে আমরা ক্রমাগত দূরে ঠেলে দিচ্ছি জাগতিক চিন্তার প্রাবল্যে? রাজনৈতিক হানাহানি সব দেশেই অল্পবিস্তর থাকে, কিন্তু এ দেশে তা আমাদের ইতিহাস ধরে টান দেয়।
একটি দল সবটাই দখলে নিতে চাইলে আরেকটি দল আরও এক ধাপ এগিয়ে একাত্তরের ইতিহাসটাকেই নিজেদের মতো করে লিখে নিতে চায়, যেখানে বঙ্গবন্ধু নেই, তাজউদ্দীন নেই, দেশের মুক্তিকামী কেউ নেই, আছেন তাদের কিছু কুশীলব। এই মনগড়া ইতিহাসে যুদ্ধাপরাধীরাও ধোয়া তুলসীপাতা হয়ে যায়। আর ইতিহাস যা ভোলায়, ইতিহাসের অহংকার যা ভোলায়, তা হচ্ছে ভ্রষ্টাচার। দুর্নীতি হচ্ছে অনেক ভ্রষ্টাচারের একটি মাত্র। বাংলাদেশের সর্বত্র এখন ভ্রষ্টাচারের জয়। তবে না, সব হারিয়ে যায়নি, কারণ একাত্তর কখনো হারানোর বস্তু নয়। একাত্তর এমনি এক অস্তিত্ব, যা প্রাণের মতো জেগে থাকে। তাকে কিছুদিন চাপা দেওয়া যায়, আড়াল করা যায়, হয়তো ভুলে থাকা যায়, কিন্তু একটুখানি ফিরে গেলে একাত্তর আবার হাত বাড়িয়ে টেনে নেয়, মানুষকে জাগাতে থাকে। এই জাগরণ দেখছি কয়েক বছর ধরে। আজ যে সমবেত কণ্ঠে কয়েক লাখ মানুষ জাতীয় সংগীত গাইবে, তা এই জাগরণের একটা লক্ষণ মাত্র। আসল জাগরণটা হচ্ছে মানুষের চিন্তার। তার প্রকাশ ঘটতে কিছুটা সময় লাগবে হয়তো, কিন্তু তা বাংলাদেশকে দূরের বন্দরে ঠিকই পৌঁছে দেবে। একাত্তরে সবাই এক হয়েছিল বলে আমরা অসাধ্য সাধন করেছিলাম। আজও যখন একটা জায়গায় সবাই দাঁড়াব, হূদয়ে দুলবে লাল-সবুজ পতাকা, বাজবে ‘আমার সোনার বাংলা’, তখন কোনো বাধাই আর আমাদের আটকাতে পারবে না। ৫০তম স্বাধীনতাবার্ষিকী যেদিন আমরা উদ্যাপন করব, সেদিন হয়তো দেখব, বন্দরটা খুব কাছেই। কারণ, সবাই একটা জাহাজে উঠে একই উদ্দেশে যাত্রা করছে।
দুই শুরুটা করতে হবে শিক্ষা দিয়ে। সেই শিক্ষা, যা জীবনঘনিষ্ঠ, বিজ্ঞানমনস্ক এবং ভবিষ্যৎমুখী। তারপর শুরু করতে হবে মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা। একটি শিক্ষিত এবং আত্মপ্রত্যয়ী জাতি মূল্যবোধের চর্চা যত নিষ্ঠা নিয়ে করতে পারে, শিক্ষাবঞ্চিত জাতি তা পারে না। তারপর বদলাতে হবে কুসংস্কার, বেরিয়ে আসতে হবে লোভের সংস্কৃতি থেকে এবং ভাবতে হবে, দেশটা আমাদের অনেক দিয়েছে, এখন দেশটাকে দেওয়ার সময় এসেছে। এবং এই দেওয়াটা নিঃস্বার্থ হলে দেশও দেবে দুই হাত উজাড় করে, যেমন মাটি দেয় কৃষকদের। আর ফিরতে হবে একাত্তরে, শহীদদের স্বপ্নের কাছে। ওই স্বপ্ন যেদিন সবার স্বপ্নে রূপ নেবে, সেদিন মুক্তি আসবে বাংলাদেশের।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পোলিও নির্মূলে সাফল্য

এ বছরের ২৭ মার্চ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য হয়ে উঠতে পারে এক অবিস্মরণীয় দিন। সত্তরের দশকের শেষ থেকে পোলিও নির্মূলের যে লড়াই চলছে, তাতে অবশেষে জয়ী হতে চলেছে এই অঞ্চল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২৭ মার্চ এই অঞ্চলকে পোলিওমুক্ত বলে ঘোষণা করার সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গোটা বিশ্বকে বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করেছে। এককভাবে কোনো দেশকে পোলিওমুক্ত ঘোষণা করা যায় না। কারণ, ভাইরাসের যাতায়াত সর্বত্র। সে রাষ্ট্রীয় বা ভৌগোলিক সীমানা মানে না। সে কারণেই এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা। লক্ষ্যমাত্রার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছেও একবার হেরে যেতে হয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে। প্রায় তিন বছর পোলিওমুক্ত থাকার পর ২০১১ সালের ১৩ জানুয়ারি ভারতে এক রোগীর শরীরে পোলিও ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী টানা তিন বছর একটি অঞ্চলে যদি একজন রোগীর শরীরে সংক্রমণ দেখা না দেয়, শুধু তাহলেই অঞ্চলটি পোলিওমুক্ত বলে স্বীকৃতি পেতে পারে। ২০১১ সাল থেকে টানা তিন বছর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১১টি সদস্যদেশকে কঠোরভাবে নজরদারি করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সদস্যদেশগুলো প্রতিটি প্রতিবেদন নিরপেক্ষ পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করেছে। তারপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞরা আবার প্রতিটি দেশের তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করেন।
তার পরই আসে সিদ্ধান্ত, যার ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের রিজিওনাল সার্টিফিকেশন কমিশন ভারতের নয়াদিল্লিতে তাদের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে যাচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আগে আমেরিকা (১৯৯৪), পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল (২০০০) ও ইউরোপ (২০০২) অঞ্চলকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পোলিওমুক্ত বলে ঘোষণা করে। এই শুভ মুহূর্তে লাখ লাখ স্বাস্থ্যকর্মীর কথা বারবার মনে পড়ছে। কোনো প্রতিকূলতাই তাঁদের কাছে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তাঁরা পৌঁছেছেন সব শিশুর কাছে। বহু শিশু আছে, যাদের বসবাস দুর্গম এলাকায়, যারা বস্তিতে থাকে, যারা পথশিশু, যারা যুদ্ধবিগ্রহ কিংবা ঝড়-ঝঞ্ঝা-বন্যা-ভূমিকম্পের কারণে ভিটেমাটি ছাড়া। এদের সবার কাছে পৌঁছেছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। পোলিও নির্মূলে আসলে এই অঞ্চলের সরকারগুলো এবং সব শ্রেণী-পেশার মানুষ আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। পোলিও নির্মূলে সামাজিক অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক। টিকা দেওয়ার সুফল সম্পর্কে প্রচার করেছেন স্থানীয়, প্রথাগত ও ধর্মীয় নেতারা। সাধারণ মানুষের মনে টিকা সম্পর্কে যে ভুল ধারণা কাজ করে, তাঁরা তার অবসান ঘটিয়েছেন। তাঁদের সবাই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। আরও উল্লেখ্য, অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক, জাতীয়, স্থানীয়, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারে, তারই একটি মডেল এ কর্মসূচি। গ্লোবাল পোলিও ইরাডিকেশন ইনিশিয়েটিভ এবং প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, রোটারি ইন্টারন্যাশনাল, ইউনিসেফ এবং ইউনাইটেড স্টেটস সেন্টারস ফর ডিজিজেজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন এখন বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনসহ অনেক সহযোগী সংস্থার সহযোগিতা পায়। পোলিও নির্মূলের সরাসরি সুফল হচ্ছে বহু শিশুর প্রাণ রক্ষা এবং সারা জীবনের পঙ্গুত্ব প্রতিরোধ। এই সাফল্য প্রমাণ করে, হাম ও রুবেলার মতো রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও একই রকম সাফল্য লাভ করা সম্ভব। আরও যে কথাটি মনে করিয়ে দিতে চাই তা হলো, পোলিও প্রতিরোধের মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে।
বহু পরিবার সুস্থ ও উৎপাদনমুখী জীবন পেয়েছে। এক দিক থেকে পোলিও নির্মূল কর্মসূচি পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে জোরদার করেছে। স্বাস্থ্যকর্মী ও সমাজকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। শিশুরা যেসব রোগে ভোগে, সেগুলো প্রতিরোধে টিকা ও স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থার উন্নয়নে যন্ত্রপাতি দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পোলিও নির্মূল হচ্ছে সবার শেষে। তবে, আমাদের লক্ষ্য সুদূরপ্রসারী। টিকার মাধ্যমে যে রোগগুলো প্রতিরোধ করা যায়, তার তুলনায় ম্যালেরিয়া, এইচআইভি/এইডস ও যক্ষ্মা রোধ অনেক সহজ। আমরা এখনো বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে টিকা দেওয়া কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। কিন্তু অপেক্ষাকৃত সাধারণ রোগগুলো প্রতিরোধে আরও অনেক কিছু করতে হবে। পোলিও নির্মূল কর্মসূচি যেভাবে এগিয়েছে, একই কাঠামো অনুসরণ করে এই রোগগুলোও প্রতিরোধ করতে হবে। আমরা ইতিমধ্যে বেশ কিছু সুফল পেয়েছি। দারুণ একটা নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। এতে অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ করা সহজ হয়েছে। যেমনটা আমরা দেখেছি এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে। যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মাঠকর্মী ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যাপকভিত্তিক নেটওয়ার্ক এখন সফলভাবে কাজ করছে। কোথায় গেলে নিরাপদ প্রসব সম্ভব, কোথায় যক্ষ্মার চিকিৎসা পাওয়া যায় এবং কীভাবে এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়, সেসব তথ্য নিয়ে যাওয়ার সুযোগ আমাদের রয়েছে। কারণ, পোলিও নির্মূল কর্মসূচির বদৌলতে আমরা এখন জানি, সেসব শিশু কোথায় থাকে, যাদের কাছে পৌঁছানো ছিল খুবই কঠিন। অন্য কোনো স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আবার তাদের কাছে না যাওয়ার কোনো অজুহাত দেখানোর আর সুযোগ রইল না। তবে তাদের পরিবার এবং পুরো কমিউনিটির কাছে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য-তথ্য নিয়ে যাওয়া এখন আর কোনো কঠিন কাজ নয়।
ড. পুনম ক্ষেত্রপাল সিং: আঞ্চলিক পরিচালক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া।

যাত্রীর লেখা চিঠিতে টাইটানিক ডোবার বিবরণ

টাইটানিক জাহাজ
উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে ১৯১২ সালের ১৫ এপ্রিল টাইটানিক জাহাজ ডুবে যাওয়ার সময় এক আরোহী লিখেছিলেন চিঠিটি। ওই চিঠিতে রয়েছে সেই দুর্ঘটনার রাতের আতঙ্ক ও বীরত্বের ‘অবিস্মরণীয় দৃশ্যাবলির’ প্রত্যক্ষ বিবরণ। ফরাসি ভাষায় লেখা চিঠিটির প্রেরক ছিলেন রোস অ্যামেলি ইকাহ নামের এক নারী। তিনি ১৯৫৫ সালের ৮ আগস্ট ওই চিঠি লিখেছিলেন। তত দিনে টাইটানিক দুর্ঘটনার অন্তত ৪৩ বছর পেরিয়ে গেছে। ডুবন্ত জাহাজ থেকে বেরিয়ে যাত্রীদের বাঁচার আকুতি, প্রাণপণ চেষ্টা এবং ‘চরম আতঙ্ক’ ও ‘মহিমান্বিত বীরত্বের’ বর্ণনা-সংবলিত ওই চিঠির প্রেরক লিখেছেন, দুর্ঘটনার ৪৩ বছর পরও তিনি দুঃস্বপ্ন দেখেন। ইকাহ ছিলেন টাইটানিকের যাত্রী ও বিত্তশালী মার্কিন নারী মার্থা স্টোনের পরিচারিকা। মার্থা ও ইকাহ একটি ছোট নৌকায় (লাইফবোট) চড়ে প্রাণে বাঁচেন।
পরে তাঁরা কার্পাথিয়া নামের একটি উদ্ধার-জাহাজে চড়ে নিউইয়র্কে পৌঁছান। ইকাহ সম্ভবত বেঁচে যাওয়া আরেক নারী যাত্রীর মেয়ের উদ্দেশে চিঠিটি লিখেছিলেন। নীল কালিতে লেখা ওই চিঠিতে প্রাপক নারীকে ‘মাদাম অসি’ সম্বোধন করা হয়। এ ছাড়া আরও কয়েকটি চিঠি লিখেন তিনি যা প্রায় দুই বছর আগে নিলামে তোলা হয়। ইকাহ লিখেন, ‘১১টার দিকে মিসেস মার্থা ও আমি শুয়ে পড়ি। প্রায় এক ঘণ্টা পর, যখন জাহাজটি পূর্ণ গতিতে চলছিল, আকস্মিক এক আঘাতে আমরা বিছানা থেকে পড়ে যাই।’ নিজেদের সামলে মার্থাকে পোশাক পরতে সহায়তা করেন ইকাহ। এরপর তাঁরা বাইরে বেরিয়ে যান। সেখানে আতঙ্ক ও বীরত্বের সমন্বয়ে অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। অনেক পুরুষ স্ত্রীকে লাইফবোটে তুলে নিজে ডুবন্ত জাহাজে রয়ে যান। আর লাইফবোটের যাত্রীদের সাহস জোগাতে নাবিকেরা প্রশস্তিগীতি গাইছিলেন। পিটিআই।

সমাবেশ ছাড়াই ফিরলেন রাহুল

কলকাতায় গতকাল সমাবেশমঞ্চে সমর্থকদের
উদ্দেশে হাত নাড়েন রাহুল। ছবি: ভাস্কর মুখার্জি
পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে গতকাল মঙ্গলবার কর্মীসমাবেশ করতে পারলেন না কংগ্রেসের সহসভাপতি রাহুল গান্ধী। বিকেলে কালবৈশাখীর আঘাতে ভেঙে পড়ে মঞ্চ। গতকাল জলপাইগুড়ি ও ত্রিপুরার কর্মীসমাবেশ সেরে কলকাতায় এসেছিলেন রাহুল গান্ধী। এসেই তিনি চলে যান শহীদ মিনার ময়দানে। সেখানে তিনি অপেক্ষমাণ কংগ্রেস কর্মী ও সাধারণ মানুষের দিকে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান। মাঠ সমাবেশের উপযুক্ত না থাকায় তিনি চলে যান।
তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জাতীয় কংগ্রেসের সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে আসেন কংগ্রেসের সহসভাপতি রাহুল। সকালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির চা-বাগান এলাকা নাগরাকাটায় কর্মীসমাবেশে যোগ দেন। এখানে তিনি বক্তব্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কড়া সমালোচনা করেন। রাহুল অভিযোগ করেন, সরকারে পরিবর্তন আসার পর বাংলা যেভাবে এগোনোর কথা ছিল, সেভাবে এগোয়নি। মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে রাজ্য সরকার। তিনি দাবি করেন, কেন্দ্রীয় সরকার পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য যেভাবে পশ্চিমবঙ্গে বরাদ্দ দিয়েছে, তা অন্য কোনো রাজ্যে দেয়নি। রাজ্য সরকার সেই অর্থ ব্যয় করতে পারেনি। বক্তৃতার পর রাহুল জলপাইগুড়ি আসনে কংগ্রেসের প্রার্থী জোসেফ মুন্ডার সঙ্গে দলীয় কর্মীদের পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি কংগ্রেসপ্রার্থীদের বিপুল ভোটে জয়ী করতে সবার প্রতি আহ্বান জানান। নাগরাকাটার সমাবেশ শেষে রাহুল ত্রিপুরায় যান।

বেফাঁস মন্তব্যে বিপাকে অভিনেতা দেব

দেব
আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী চলচ্চিত্র তারকা দেব বেফাঁস মন্তব্য করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তবে দেব পরে ওই মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চান। কলকাতার একটি দৈনিকে সাক্ষাৎকার দেন অভিনেতা দেব। সাক্ষাৎকারে তিনি কীভাবে নির্বাচন উপভোগ করছেন, এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ধর্ষিত হওয়ার মতো অনুভূতি হচ্ছে। হয় চিৎকার করো, না হলে উপভোগ করো।’ সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার গভীর রাতে দেব খুদে ব্লগ লেখার সাইট টুইটারে বার্তা দিয়ে ক্ষমা চান। তিনি লিখেন, ‘আমি রাজনীতিতে নতুন। কাউকে আমি আঘাত দিতে চাইনি।’

কেজরিওয়ালকে কালি ও ডিম নিক্ষেপ

অরবিন্দ কেজরিওয়াল
ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বারানসি আসনে বিজেপির সমর্থকদের তোপের মুখে পড়েছেন আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তারা তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে ডিম ছুড়ে মারে। এছাড়া একজন তাঁর মুখে কালি নিক্ষেপ করে। উত্তর প্রদেশের বারানসিতে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের কাছে মোদির সমর্থকেরা কেজরিওয়ালবিরোধী স্লোগান দেয়। তাঁকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে বারানসি ত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করে। তাদের সামাল দিতে নিরাপত্তাকর্মীদের হিমশিম খেতে হয়। বারানসির জনগণ চাইলে অরবিন্দ এই আসনে মোদির বিরুদ্ধে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। গতকাল সমাবেশে তিনি বলেন, তিনি মোদির বিরুদ্ধে প্রার্থী হচ্ছেন। এনডিটিভি ও আইএএনএস।