Monday, September 30, 2013

কন্যা শিশুর বিয়ে নয় by সফিউল আযম

আজ ৩০ সেপ্টেম্বর, জাতীয় কন্যা শিশু দিবস। কন্যা মানেই বধূ নয়; করবে তারা বিশ্বজয়Ñ এই প্রতিপাদ্যকে ঘিরে সারাদেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। সাধারণত একটি দিবস সামনে আসে এবং একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এ বছর কন্যাশিশু দিবসটির প্রতিপাদ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু এবং এদের মধ্যে ৪৮ শতাংশই কন্যাশিশু। শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও রক্ষায় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হলেও আজও দেশের অধিকাংশ কন্যাশিশুর বিয়ে হচ্ছে ১৮ বছরের আগেই। আজ সময় হয়েছে শিশুবিয়ে নামক অভিশাপকে সমাজ থেকে দূর করার। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক এন্ড হেলথ সার্ভে-২০০৭ এর তথ্য অনুযায়ী দেশে এখনও ১৮ বছরের আগে ৬৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে এবং দুই দশক ধরে এ হারের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। আর ১৯ বছরের আগেই গর্ভবতী হচ্ছে ৬৬ শতাংশের এক শতাংশ। বাংলাদেশে নারীর গড় বিয়ের বয়স ১৫ বছর ৩ মাস। ইউনিসেফের তথ্যমতে, শিশু বিবাহের হারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়। গত ৩০ বছরে শিশুবিবাহ আনুপাতিক হারে হ্রাস পেলেও বিশেষত গ্রামাঞ্চলে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমস্যাটা প্রকট। আইসিডিডিআরবি এবং প্ল্যান বাংলাদেশের যৌথ জরিপ-২০১৩ মতে, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষায় শিক্ষিত শতকরা ২৬ জনের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছরের আগেই এবং নিরক্ষর নারীদের ক্ষেত্রে এই হার শতকরা ৮৬।
১৯২৯ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনটি সংশোধন করা হয় ১৯৮৪ সালে। এ আইন অনুযায়ী পুরুষের বিয়ের আইনসম্মত বয়স ২১ বছর এবং নারীর ১৮ বছর। এর ব্যতিক্রম হলে বিয়ের সঙ্গে জড়িত বর-কনের অভিভাবক, আত্মীয়, ইমামসহ সবার শাস্তির বিধান রয়েছে। জড়িত পুরুষদের এক মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা এক হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডই হতে পারে। বর ও কনে দুজনই নাবালক হলে তাদের কোনো শাস্তি হবে না। ছেলে সাবালক ও মেয়ে নাবালক হলে ছেলের এক মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা এক হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডই হতে পারে। একথা ঠিক যে, বেশিরভাগ সময় বর ও কনে পক্ষের সমঝোতার কারণে বিয়ে নথিভুক্ত হয় না এবং আইন-শৃংখলা বাহিনীর নজরে আসে না। কারণ পরিবারগুলো মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে সর্বদা উদ্বিগ্ন থাকে। অজ্ঞতা, অসচেতনতা, কুসংস্কার, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, যৌন হয়রানি, কন্যা শিশুর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব প্রভৃতি কারণে বাল্যবিয়ে বেশি হচ্ছে এ কথা বলা যায়।
একটি কথা প্রচলিত আছে, শিশুবিয়ে মানে শিশুর পেটে শিশুর জন্ম। বাস্তবে দেখা যায়, সন্তান জন্ম দেয়া ও লালন-পালন করা অল্পবয়স্ক একজন মেয়ের পক্ষে অনেকাংশে সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। এ অবস্থায় মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকে। ২০০৮ সালের পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক কৌশলপত্রে জানা যায়, কিশোরীদের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার জাতীয় গড়ের প্রায় দ্বিগুণ এবং শিশুমৃত্যু জাতীয় গড়ের প্রায় ৩০ গুণ। শিশুবিয়ের শিকার মেয়েরা বেশিরভাগ সময় অসুস্থ থাকে, স্বাস্থ্যহীনতা, পুষ্টিহীনতা ও দুর্বলতায় ভোগে। ফলে জন্ম নেয়া শিশুটি পরবর্তী সময়ে নানা সমস্যায় পতিত হয়। অল্প বয়সে সন্তান ধারণের ফলে শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। ফলে পুরুষদের মধ্যে বহুবিবাহের আশংকা থেকে যায়। ইউনিয়ন পরিষদের স্ট্যান্ডিং কমিটিগুলো কার্যকর করা হলে শিশুবিয়ের মাত্রা কমে যাবে অনেকাংশে। এটি প্রতিরোধে করণীয় এবং এর শাস্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের বিলবোর্ড, পোস্টার প্রকাশ এবং তৃণমূলে তা ছড়িয়ে দেয়া জরুরি। সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিশুবিয়ে বন্ধ করতে পরিবার থেকেই এ প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন। পাঠ্যপুস্তকে শিশুবিয়ের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে সচেতনতামূলক প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করা হলে শিশুরা অল্প বয়সে বিয়ের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে আগে থেকেই সতর্ক হয়ে যাবে। সরকারি-বেসরকারি নেটওয়ার্ক করে জাতীয়ভাবে প্রতিরোধ কর্মসূচি গড়ে তোলা, থানা ও জেলা পর্যায়ে শিশুবিয়ে বিষয়ক প্রতিরোধ ও তথ্য সংরক্ষণ সেল তৈরি করা এবং এ বিষয়ে পরিসংখ্যানগত তথ্য আপডেট করা এবং তা গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা করা, গণসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, শিক্ষক, মসজিদের ইমাম ও জনপ্রতিনিধিদের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান, শিশুর জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করা, যাতে শিশুর প্রকৃত বয়স নির্দিষ্ট করা যায়। প্রত্যেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে শিশুবিয়ে বিষয়ে সবাইকে সচেতন করা হলে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যাবে। আসুন, সবাই মিলে শিশুবিয়ে নামক সামাজিক ব্যধিটিকে সমাজ থেকে দূর করি।
সফিউল আযম : উন্নয়নকর্মী

একটি দরকারি নির্বাচনী ইশতেহার by ড. কেএইচএম নাজমুল হুসাইন নাজির

রাজনৈতিক নেতাদের কথাবার্তা, জনসভা, টকশো, পত্রপত্রিকা বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার নড়াচড়া দেখে মনে হয় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পালে মৃদু হাওয়া লেগেছে। যদিও অনেকের সন্দেহ এখনও কাটেনি নির্বাচন আদৌ হবে কিনা অথবা হলে কিভাবে হবে। যাই হোক, দলগুলো কম বেশি ব্যস্ত যোগ্য প্রার্থী বাছাই করার কাজে। সঙ্গে সঙ্গে চলছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের জনসংযোগ, জনগণের কাছে করছেন বিভিন্ন ধরনের ওয়াদা। চমক লাগানো নির্বাচনী ইশতেহার সাজাতে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতা, উপদেষ্টা বা থিংকট্যাংকদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে বলা যায়। দেশ ডিজিটাল না এনালগ হবে এ নিয়ে বিশ্লেষণের শেষ নেই। ক্ষমতার মসনদে অধিষ্ঠিত থাকা বা হওয়ার চেষ্টায় নেই গাফিলতি। অভিযোগ আছে- জেতার পর বেশিরভাগ নির্বাচিত প্রতিনিধি তাদের নিজ নির্বাচনী এলাকায় যান কদাচিৎ। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বলেন ভিন্ন কথা। তাদের ভাষায় রাজধানীতে না থাকলে, আলোচনা-বাহাস না করলে এলাকার জন্য অর্থ বরাদ্দ কিভাবে আসবে। কথায় যুক্তি একেবারে নেই বলা যাবে না। যাই হোক, গণতান্ত্রিক দেশ বলে কথা। জনগণের ভোটেই হবে চূড়ান্ত ফয়সালা।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এদেশের গণতন্ত্র অনেকটা ভোটাভুটি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। জনগণের কথা যাদের ভাবার কথা তারা খুব কমই ভাবেন বলে মনে হয়। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে অপরিপক্ব বললে অত্যুক্তি হবে না। অপরিপক্বতার পাশাপাশি সীমাহীন দুর্নীতি, সন্ত্রাস, অপশাসন, হত্যা, গুম, খুন ইত্যাদির কথা আমরা সবাই কম-বেশি জানি। এত কিছুর পরও দেশ ধারাবাহিকভাবে এগোচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তথ্যপ্রযুক্তিতে এগিয়েছে দেশ। তিন বেলা না খেয়ে থাকতে রাজি কিন্তু এক ঘণ্টা মোবাইল, ফেসবুক ও টুইটার ছাড়া থাকতে পারি না। খাদ্যপণ্য সংরক্ষণে এসেছে যুগান্তকারী সাফল্য, যার কল্যাণে দেশে এখন পচা ফল পাওয়া কঠিন। আবিষ্কৃত হয়েছে ফরমালিন পদ্ধতি, কার্বাইড পদ্ধতি, কীটনাশক পদ্ধতি আরও কত কী! সব পদ্ধতির রয়েছে ক্যারিশমাটিক গুণ। তাই এগুলো দেদারসে ব্যবহার হচ্ছে আমাদের মৌসুমি ফল, শাকসবজি, খাদ্যশস্য, শিশুখাদ্য, পানীয়, মুড়ি, বেকারি পণ্য, জিলাপি, ফাস্ট ফুড, পশুখাদ্য, ওষুধ ইত্যাদিতে।
সম্প্রতি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আমার লেখা ‘খাদ্যে ভেজাল : একটি ভিন্ন রকম পর্যালোচনা ও করণীয়’ শীর্ষক একটি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বোঝানোর চেষ্টা করেছি খাদ্যে ভেজালের কারণে কিভাবে আমরা তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছি। নিকষ-কালো অন্ধকারের দিকে গোটা জাতি কিভাবে একটু একটু করে ধাবিত হচ্ছে। বর্ণনা করেছি দেশে বর্তমানে ভেজালের মাত্রা কত ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। ভেজালের ব্যাপ্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, চার, পাঁচ বা ছয়স্তরবিশিষ্ট কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী বা দুর্ভেদ্য গ্রিন জোনও এর আওতামুক্ত নয়। ভেজাল এক নীরব ঘাতক হয়ে জাতির ওপর খড়গ হয়ে দেখা দিয়েছে। অবস্থার ভয়াবহতা এমন যে ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত সচেতন হয়েও ভেজালের হাত থেকে রেহাই পাওয়া অসম্ভব। মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা বিষ-মিশ্রিত খাবার নাকি খাবার মিশ্রিত বিষ খাচ্ছি। ভেজালের কারণে খাদ্য-চিকিৎসার সঙ্গে অন্যসব মৌলিক চাহিদাও কোনো না কোনোভাবে প্রভাবান্বিত হচ্ছে। চিকিৎসক ও গবেষকদের ভাষ্যমতে, অনেক সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে খাদ্যে ভেজাল, যা নৈতিকতার অবক্ষয় থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক চাপ পর্যন্ত সুবিস্তৃত।
নির্বাচন এলে জনগণ অনেক আশা নিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার নিশ্চয়তা পেলেই জনগণ খুশি। অনেককে বলতে শুনেছি- জীবনধারণের খাদ্যেরই যদি নিরাপত্তা না থাকল, তাহলে হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র কিনে কী হবে? সহজ সমীকরণে বলা যায়, দেশের জনগণই যদি ভালোমতো না বাঁচল, ডিজিটাল বা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ দিয়ে কী হবে? দেশের মানুষ যদি জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে শেষই হয়ে গেল, তাহলে ভিশন-২১ বা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়ে কী হবে? ভবিষ্যৎ প্রজন্ম (দেশের শিশুরা) যদি স্টুপিড হয়ে বেড়ে ওঠে, তাহলে দেশের প্রবৃদ্ধি বা রিজার্ভ গগনচুম্বী হয়ে কী লাভ? গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে ২০২১ সালে দেশের সিংহভাগ মানুষ ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হবে। দেশে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা। খাদ্যপণ্যে ভেজালের সঙ্গে আপস করার নজির পৃথিবীর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। দুঃখজনক যে আমাদের দেশে শক্তিশালী সিন্ডিকেটের প্রভাবে ভেজালবিরোধী অভিযান অনেক সময় বন্ধ হয়ে যায়। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যায় অপরাধীরা। আমাদের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। বুঝে না বুঝে আমরা যারা নিজ হাতে ভেজাল মেশাই, খাদ্যপণ্যে বিভিন্ন ক্ষতিকর কেমিক্যাল বা কীটনাশক ব্যবহার করি, কেউই ভেজালের বিস্তৃত জাল থেকে রেহাই পাচ্ছি না- এটা সত্যিকারভাবে আমরা কদাচিৎ অনুধাবন করি।
বিষয়টা এমনও নয় যে, সরকারি দলের সমর্থকরা ক্ষমতার জোরে সব রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে খাদ্যে ভেজালের ভয়াবহ পরিণতি থেকে বেঁচে যাবে আর বিরোধী দল ভেজাল খেয়ে মরবে। এ রকম হলে সবার আগে আমাদের দেশে সে চর্চা শুরু হতো- অবস্থা দৃষ্টে সে রকমই মনে হয়। বস্তুত ধর্ম-বর্ণ সবার স্বার্থ এখানে সমানভাবে জড়িত। তাই বিষয়টি অনেক গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। খাদ্যে ভেজালের অন্তর্নিহিত কারণগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সমাধান করার বাস্তবসম্মত অঙ্গীকার হতে পারে আগামী নির্বাচনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। অনেকের মতে, অন্য অনেক ইশতেহারের চেয়ে এর গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয় বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশি। কাজেই ১৪ বা ১৮ দলীয় জোটের সবাইকে সত্যিকারভাবে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে এবং নির্বাচনী ইশতেহারের মধ্যে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সত্যিকারভাবে অনুধাবন করতে পারলে নিশ্চয় তা শুধু ওয়াদার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সহজেই বাস্তবায়িত হবে। কয়েক দিন আগে বিরোধীদলীয় নেতা এক জনসভায় সমাজ থেকে মাদক নির্মূলের ঘোষণা দিয়েছেন। মাদক সমাজকে ঘুণপোকার মতো কুরে কুরে খাচ্ছে- সন্দেহ নেই। অবশ্যই মাদকের কবল থেকে সমাজের ঐশীদের বাঁচাতে হবে। সময়োচিত এ ধরনের ওয়াদা বা সিদ্ধান্তের জন্য সাধুবাদ জানাই। মাদকের মাধ্যমে বিশেষ করে দেশের যুবসমাজের একাংশ ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে ভেজালের মাধ্যমে মাদকসেবীর সঙ্গে অন্য সবাই ধ্বংস হচ্ছে। গর্ভের শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ- সবাই ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কাজেই ভেজালের গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়। ইচ্ছা করলে অনেক কঠিন কাজও যে অসম্ভব নয়, তা বিগত জোট সরকারের শিক্ষাঙ্গনকে নকলমুক্ত করার কৃতিত্ব থেকেই বোঝা যায়- যা সব মহলে হয়েছিল প্রশংসিত। বিরোধীদলীয় নেতার সময়োপযোগী ওয়াদার সূত্র ধরে জনসাধারণের একজন হিসেবে আশা করতে চাই, ১৮ দলীয় জোট যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে সমাজ থেকে সত্যিকারভাবে মাদক দূর হবে। তেমনিভাবে আশা থাকবে, আগামীতে যে জোটই ক্ষমতায় আসুক, খাদ্যে ভেজালরূপী জাতীয় বিপর্যয়কে সমাজ থেকে দূর করতে প্রয়াস পাবে।
দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাকে সামনে রেখে, মানুষের চাহিদা বা দেশের সার্বিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার নিরিখে, এক কথায় তাৎক্ষণিক বা সুদূরপ্রসারী জনকল্যাণকে প্রাধান্য দিয়ে। খাদ্যে ভেজাল একটি বড় ধরনের জাতীয় সমস্যা- এটা অনস্বীকার্য। সার্বিক বিবেচনায় খাদ্যে ভেজাল রোধ দেশের সচেতন মহলের গণদাবিতে পরিণত হয়েছে বলে অনেকের মতো আমারও মনে হয়। পাশাপাশি অচেতনদেরও দরকার সমানভাবে। দারুণ এ সুযোগকে যে কোনো দলের লুফে নেয়ার কথা। আশা করব, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে স্থান দেবে। সেই সঙ্গে সত্যিকারভাবে সে ওয়াদা বাস্তবায়নের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হবে, অন্তত নিজের স্বার্থের কথা ভেবে হলেও।
ড. কেএইচএম নাজমুল হুসাইন নাজির : সহযোগী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি ও হাইজিন বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; গবেষক, ইয়াংনাম ইউনিভার্সিটি, দক্ষিণ কোরিয়া

একতরফা নির্বাচন করার ক্ষমতা নেই সরকারের by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

ইতিহাসের নজিরবিহীন কূটনৈতিক তৎপরতা ও দেশের সুধীসমাজের প্রাণান্তকর চেষ্টার পরও নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে বিরোধী দলের কোনো সংলাপ ও সমঝোতার সম্ভাবনা দৃশ্যমান হচ্ছে না। দু’পক্ষই পয়েন্ট অব নো রিটার্নের রাজনীতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। ক্ষমতাসীন দল হয়তো মনে করছে, বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনায় বসলেই তাদের রাজনীতির বারোটা বেজে যাবে; মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা রাজপথ ছেড়ে ঘরে ঢুকে যাবে, ফলে নির্বাচনে তাদের করুণ পরাজয় ঘটবে। যার জন্য তারা কোনো সংলাপ-সমঝোতায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না। একটা একতরফা নির্বাচনের পথে ক্ষমতাসীন দল হাঁটছে। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় একতরফা নির্বাচন করার মুরোদ ক্ষমতাসীন দলের নেই, ক্ষমতার একবারে শেষ পর্যায়ে তারা নির্দ্বিধায় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ হারাবেন। বাংলাদেশের অনেক জেলায় তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, যেমনটা থাকেনি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায়ের পর। ওই সময় বাংলাদেশের প্রায় ৪০টি জেলা প্রশাসন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও রাজশাহীসহ আরও অনেক জেলা বলতে গেলে বেশ কয়েক দিন রাজধানী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। ওই সব জেলার সরকারদলীয় কর্মী তো বটেই, জেলা প্রশাসকরা পর্যন্ত তাদের নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। কাজেই বিরোধী জোট ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুললে, অন্তত ওই সব জেলায় একতরফা নির্বাচন করা সরকারের জন্য নিঃসন্দেহে দুরূহ হবে।
বিরোধী দল মনে করছে, সংলাপ-সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার না হলে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে গিয়ে তারা কোনো সুবিধা করতে পারবে না। কাজেই চূড়ান্ত আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া তাদের সামনে বিকল্প কোনো পথ আর খোলা নেই। তাতে আগামী দিনে দেশের রাজনীতিতে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই। রাজনীতিকে পয়েন্ট অব নো রিটার্নের দিকে ঠেলে দেয়া ক্ষমতাসীনদের কোনোভাবেই সমীচীন হবে না। কেননা এ থেকে চূড়ান্তভাবে তারা কোনো সুবিধা পাবেন বলে মনে হয় না। উপরন্তু তারা চরম বেকায়দায় নিপতিত হবে। কারণ রাজনৈতিকভাবে তারা ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। একমাত্র সমঝোতার রাজনীতিই এ বেকায়দা থেকে তাদের বের করে আনতে পারে। ২০০৬ সালে বিএনপি যদি সমঝোতার রাজনীতির পথে হাঁটত, বিরোধী দলের দাবি মেনে নিত; তাহলে তারাই আবার হয়তো ক্ষমতায় যেত; ওই সময় সমঝোতা ও বিরোধী দলের দাবি না মেনে বিএনপি ইতিহাসের নজিরবিহীন বেকায়দায় নিপতিত হয়েছে। নিকট অতীতের এমন একটি দৃষ্টান্ত ক্ষমতাসীনদের সামনে দৃশ্যমান থাকলেও, তারা এ থেকে কোনো শিক্ষা নিচ্ছেন না। তারা রাজনীতিকে অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দিচ্ছেন। তারা কি একবার ভেবে দেখেছেন তাদের চার পাশের চিত্র? তাদের মন্ত্রী-এমপিরা জনরোষের শিকার হচ্ছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিদেশেও।
১০ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যে আক্রমণের শিকার হন তখ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, ২৮ ডিসেম্বর নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বায়তুল মোকাররম মসজিদে জুতা-বৃষ্টির শিকার হন, ৮ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলের ভাসানী হলে পাটমন্ত্রী লতিফ ছিদ্দিকী দলীয় কর্মীদের তোপের মুখে পড়েন, ২৮ জানুয়ারি রাজধানীর কারওয়ান বাজারে শিবির কর্মীদের হামলার মুখে পড়েন অর্থমন্ত্রীর গাড়িবহর, এতে এক পুলিশ সদস্য মারাত্মকভাবে আহত হন, ১৪ নভেম্বর আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের গাড়িবহরে হামলা চালায় শিবির কর্মীরা, এ হামলায় মন্ত্রীর গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পানিসম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনের বাড়িতে হামলা চালায় স্থানীয় জনতা, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী রাজু উদ্দিন আহাম্মেদ রাজু ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন নিজ দলের বিক্ষুব্ধ কর্মীদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন। তা ছাড়া বেশ কয়েকজন এমপিও জনতার হাতে লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, বরিশালের ২ আসনের এমপি মনিরুল ইসলাম, কুষ্টিয়া ১ আসনের এমপি আফসার উদ্দিন আহাম্মেদ, নারায়ণগঞ্জের এমপি কবরী সারোয়ার ও নজরুল ইসলাম বাবু, ঢাকার এমপি সানজিদা খানম, নড়াইলের এমপি ফজিলাতুন্নেছা, গফরগাঁওয়ের এমপি গিয়াসউদ্দিন, যশোরের এমপি আঃ ওহাব প্রমুখ। সুতরাং এসব বিবেচনায় নিলে কোনোভাবেই রাজনীতিকে অশ্চিয়তায় ঠেলে দেয়ার যুক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না; বরং দল ও দেশের স্বার্থে, সমঝোতার রাজনীতিই ক্ষমতাসীনদের জন্য অধিকতর মঙ্গল বয়ে আনবে। বিএনপির আন্দোলন করার মুরোদ নেই, বিএনপি সরকার উৎখাতের শক্তি রাখে না- এসব অযাচিত ও অনাকাক্সিক্ষত মন্তব্য করাও সমীচীন নয়। বিএনপি সরকার উৎখাত করতে যাবে কোন দুঃখে? বিএনপি বর্তমান সরকারের প্রথম থেকেই ইতিবাচক রাজনীতির পথে হাঁটছে। সরকার অগণিত ইস্যু তৈরি করলেও বিএনপি এগুলোকে রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলেনি। উদাহরণ দিতে গেলে এমন বহু দেয়া যাবে। একমাত্র শেয়ার মার্কেট বিপর্যয়কে বিএনপি যদি রাজনৈতিক ইস্যু বানাত, তাহলে অবধারিত বেকায়দায় পড়ত সরকার। বর্তমান সরকারের সময়ে বিএনপির এ ইতিবাচক রাজনীতি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের জন্য মাইলস্টোন হয়ে থাকবে। কিন্তু বর্তমানে পয়েন্ট অব নো রিটার্ন আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া বিএনপির সামনে বিকল্প পথ কী? ক্ষমতাসীনরা জাতিসংঘের আবেদনে সাড়া দিচ্ছেন না, আমেরিকার আবেদনে সাড়া দিচ্ছেন না, ইউরোপীয় ইউনিয়নের আবেদনও প্রত্যাখ্যান করছেন। তা ছাড়া চীন, ভারত, কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশসহ ইতিহাসের এক নজিরবিহীন কূটনেতিক তৎপরতার পরও সরকারের বোধোদয় হচ্ছে না, তাদের টনক নড়ছে না।
বিরোধী দলের চাওয়াটা কি বড় কিছু? তারা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন চাচ্ছেন মাত্র। এটা দেয়ার মতো মনমানসিকতা যাদের নেই, তাদের দ্বারা দেশের কী উপকার আশা করা যায়? যারা শুধু ক্ষমতাকেই বড় করে দেখেন, জনগণের চাওয়া-পাওয়ার কোনো মূল্য দেন না বা দিতে জানেন না, তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। রাজনৈতিক সংকটের সমাধান না হলে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার পাশাপাশি অযাচিত হস্তক্ষেপ ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মধ্যে পড়তে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করতে চান কেন? এবং বিরোধী দলকে অলআউট আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিচ্ছেনই-বা কেন? এ প্রশ্ন আজ সমগ্র জাতির। প্রধানমন্ত্রী আজ কথায় কথায় সংবিধানের দোহাই দিচ্ছেন। কিন্তু ১৯৯৫ সালে তার তত্ত্বাবধায়ক দাবিও তো অসাংবিধানিক ছিল। দেশের স্বার্থে বিএনপি কি সেই অসাংবিধানিক দাবি মেনে নেয়নি? তাহলে আজ এত প্রশ্ন কেন? প্রশ্ন এ জন্য যে, আওয়ামী লীগ নিজেকে ছাড়া অন্য কাউকে চেনে না। অন্যের চাওয়া-পাওয়ার মূল্য আওয়ামী লীগের কাছে গৌণ।
রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া থাকে। এসব দাবি নিয়ে বিতর্কও থাকে। কিন্তু বিরোধী দলের নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি নিরেট গণতান্ত্রিক ও সর্বজনীন দাবি। এ দাবি না মানলে সরকার অনিবার্য বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে। প্রধানমন্ত্রীকে মনে রাখতে হবে, ২০০৬ সালে একজন বিচারপতিকে নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধান হিসেবে মেনে নেয়া হয়নি; তাহলে একজন দলীয় প্রধানকে বিরোধী দল মেনে নেবে কোন যুক্তিতে? সে যুক্তিটা জাতির সামনে দাঁড় করানো প্রধানমন্ত্রীর অবশ্যই দায়িত্ব। পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে হারার পর আগামী জাতীয় নির্বাচন দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত করাই যদি ক্ষমতাসীন দল একমাত্র সান্ত্বনা মনে করে, তাহলে করও কিছু বলার নেই। কিন্তু পরিস্থিতি পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, ওই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল ছাড়া অন্য কোনো দল অংশ নেবে না। এরই মধ্যে মহাজোটের শক্তিশালী শরিক জাতীয় পার্টি ঘোষণা দিয়েছে সব দল নির্বাচনে না এলে তারাও নির্বাচনে অংশ নেবে না। আর কিছু দিন ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করার পর ইনু-মেননরাও হয়তো উল্টো সুরে কথা বলবেন। তখন হয়তো দেখা যাবে ক্ষমতাসীনদের বাগাড়ম্বর ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেছে। তখন তাদের বোধোদয় হলে হতেও পারে। কিন্তু এতে তাদের লোকসানের পাল্লাটা অনেক ভারী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কেননা বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিরোধী দলে যারা থাকেন, তারা এমনিতেই একটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকেন; আর সরকার যদি তাদের উস্কে দেয়, তাহলে তো কোনো কথাই নেই।
নির্বাচনে জয়পরাজয় অনিবার্য, অবিশ্যম্ভাবী; এ বাস্তবতা মেনেই রাজনীতি করতে হয়। নির্বাচনে হারব বলে সংলাপ করব না, সমঝোতা করব না, তা হতে পারে না। রাজনীতিতে পরাজয়কে সহজভাবে মেনে নিতে হবে এবং বিজয়কে সহিষ্ণুতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। আপনি কত বড় রাজনীতিবিদ সেটি বড় কথা নয়, আপনার কর্মকাণ্ড ও দৃষ্টিভঙ্গি দেশের জন্য কতটা ইতিবাচক ও মঙ্গলজনক জাতির কাছে সেটিই বড় বলে বিবেচ্য। কেউ যদি বিশ্বের সব ক্ষমতা পেয়ে যান আর আত্মাকে হারান তাতে কোনো প্রশান্তি নেই। শুধু ক্ষমতার জন্য বন্ধু, শুভাকাক্সক্ষী ও উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্রের মতামতকে অগ্রাহ্য ও দেশের সুধীসমাজ এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে অপমান-অপদস্থ করা কোনো বড় মনের পরিচয় হতে পারে না। কোনো পেশাদার রাজনীতিক এমন জঘন্য ভুল করতে পারেন না। এটার একটা নেতিবাচক ফল রাজনীতির জন্য অবশ্যই আছে, যার শিকার হতে হবে সব রাজনীতিবিদের।
পরিশেষে বলতে চাই, বর্তমান সরকার একদলীয় ও একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে একটি ভুল গল্পের নাটক মঞ্চস্থ করতে যাচ্ছে। এটা দেশের জন্য, তাদের দলের জন্য, সর্বোপরি দেশের গণতন্ত্র, সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা ও সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য কোনোভাবেই ভালো ফল বয়ে আনবে না। এর ফলে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হবে, তাতে নিঃসন্দেহে ফায়দা লুটবে ওৎ পেতে থাকা দেশী-বিদেশী অপশক্তি।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বিএনপির নতুন ধারার রাজনীতিটা কী? by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

বিএনপি ঘোষণা দিয়েছে তারা আগামী নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে দেশকে নতুন ধারার রাজনীতি উপহার দেবে। এই নতুন ধারার রাজনীতিটা কী তা অবশ্য এখনও তারা খোলাসা করে বলেননি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানা না হলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি যাবে না, তা অনেকের কাছেই এখনও স্পষ্ট নয়, কিন্তু খালেদা জিয়া ইতিমধ্যেই নির্বাচনী প্রচারণা অভিযানে নেমে গেছেন এবং এই প্রচার অভিযানে তার একটি কথা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বারবারই বলছেন, ‘বিএনপি আর প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি করবে না।’ ‘দেশনেত্রী’কে তার উপদেষ্টারা এ কথাটা বুঝিয়ে দিয়েছেন কিনা জানি না যে, ‘বিএনপি আর প্রতিহিংসার রাজনীতি করবে না’, এই কথা দ্বারা দলনেত্রী স্বীকার করে নিলেন, তারা এতদিন প্রতিহিংসার রাজনীতি করেছেন। এটা যদি খালেদা জিয়ার সরল স্বীকারোক্তি হয় এবং তার দল জামায়াত, হেফাজতসহ উগ্র মৌলবাদী চক্রগুলোর সন্ত্রাসী রাজনীতির বাহুবন্ধন ত্যাগ করে গণতান্ত্রিক রাজনীতির সুস্থ ও প্রসারিত মধ্যপথে নেমে আসবে তার ইঙ্গিত হয়, তাহলে বিএনপি নেত্রীর নতুন ধারার রাজনীতির ঘোষণাটির তাৎপর্য স্পষ্ট হয়। তা না হলে দলনেত্রীর এই ঘোষণা হয়তো অদূর ভবিষ্যতেই প্রমাণিত হবে- এটা নতুন বোতলে পুরনো মদ ঢেলে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা। আমি বিএনপির নেতৃস্থানীয় একাধিক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছি, তারা নতুন ধারার রাজনীতি বলতে কী বোঝাচ্ছেন। তারা আমাকে স্পষ্ট করে কিছু বোঝাতে পারেননি। কেবল বলেছেন, বিএনপি আর অতীতের ধারায় রাজনীতি করবে না। আমার প্রশ্ন, দলটির এই অতীতের ধারা কী? দেশের অনেক নিরপেক্ষ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মতেই, বিএনপির চরিত্র ও রাজনীতির বৈশিষ্ট্য হল (ক) একজন সেনাপ্রধানের ক্ষমতায় থাকার প্রয়োজনে সেনা ছাউনিতে সেনাশাসনের সিভিল ফেস হিসেবে বিএনপির জন্ম নেয়া। (খ) পাকিস্তানে যেমন মস্ক এন্ড মিলিটারির মিলনে একটি অগণতান্ত্রিক এবং আরও সাম্প্রদায়িক শাসক শক্তি গড়ে উঠেছিল, বাংলাদেশেও তার অনুকরণ করা হয় এবং বিএনপির পেছনে একদিকে ক্যান্টনমেন্ট এবং অন্যদিকে স্বাধীনতার যুদ্ধে পরাজিত সাম্প্রদায়িক ও কট্টর মৌলবাদী দলগুলো জড়ো হয়।
(গ) স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত হওয়া মুসলিম লীগের রাজনীতির উত্তরাধিকার বিএনপি গ্রহণ করে এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই অসাম্প্রদায়িক নামটি তার পরিচয় হয়। ভারতে এই একই কাজটি করেছে কট্টর সাম্প্রদায়িক বিজেপি। মহাÍা গান্ধীকে হত্যার পর হিন্দু মহাসভা নামক ঘাতক দলটি নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর ভারতীয় জনতা দল বা বিজেপি এই অসাম্প্রদায়িক নামের খোলসে এই দলটির আবির্ভাব ঘটে। শিবসেনা, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ইত্যাদি জঙ্গি হিন্দুত্ববাদী উপদলগুলোর সংমিশ্রণে বিজেপি আরও উগ্র সাম্প্রদায়িক দলে পরিণত হয়। অতীতের হিন্দু মহাসভার চেয়েও বিজেপির সাম্প্রদায়িক উগ্রতা বেশি। যদিও দলটির বাইরের খোলস হচ্ছে বাংলাদেশের বিএনপির মতো গণতান্ত্রিক। তারা গণতান্ত্রিক সেজে কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় গিয়ে একাধিকবার দেশ শাসনও করেছে। কিন্তু এই দলের হাতেই গুজরাটের গোধরা হত্যাকাণ্ড এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংসসহ সংখ্যালঘু নিপাত বা এথনিক ক্লিনসিংয়ের জঘন্য মানবতাবিরোধী ঘটনাগুলো ঘটেছে এবং বর্তমানেও তারা গুজরাটে মুসলিম নিধনের হোতা এবং বুচার অফ গুজরাট নামে পরিচিত নরেন্দ্রনাথ মোদিকে আগামী সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী করার ঘোষণা দিয়েছে।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি এই অসাম্প্রদায়িক নামের আড়ালে দলটি অতীতের মুসলিম লীগ রাজনীতির উত্তরাধিকার গ্রহণ করে। অতীতের মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে উগ্র মৌলবাদীদের অনুপ্রবেশ ঘটেনি; কিন্তু বাংলাদেশে বিএনপির রাজনীতিতে তা ঘটেছে এবং এখন তার চেহারা প্রকাশ্য।
অতীতে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ রাজনীতি বর্তমানের বিএনপি রাজনীতির চেয়ে অনেক বেশি গণতান্ত্রিক ও মৌলবাদমুক্ত ছিল। পূর্ব পাকিস্তানে নূরুল আমিনের সর্বশেষ মুসলিম লীগ সরকার ’৫২-এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে গুলি চালিয়েছে, প্রাদেশিক পরিষদের ৩৫টি উপনির্বাচন ঠেকিয়ে রেখেছে, ৪৫ হাজার রাজনৈতিক বন্দিতে কারাগার ভরে ফেলেছে এ কথা সত্য; কিন্তু ১৯৫৪ সালে সম্পূর্ণ অবাধ ও নিরপেক্ষ যে নির্বাচনটি তারা অনুষ্ঠান করেছে, তার নজির কী বিএনপির কুষ্ঠিনামায় নেই।
গোটা মুসলিম লীগ সরকার মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনসহ প্রদেশের ওই নির্বাচনে শুধু পরাজিত হওয়া নয়, জামানত হারিয়েছে; কিন্তু নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করার জন্য তারা প্রশাসনকে ব্যবহার করেনি; রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চালায়নি, নির্বাচনের সময় নির্যাতন চালিয়ে হিন্দু ভোটদাতাদের দেশ ছাড়া করেনি। সবচেয়ে বড় কথা, তখনকার ছোট-বড় মৌলবাদী দলগুলোকে নির্বাচনের সময় তাদের পক্ষে টানার চেষ্টা করেনি। ’৫৪-এর নির্বাচনের সময় শক্তিশালী না হলেও জামায়াত দলটি ছিল। শক্তিশালী মৌলবাদী দল ছিল নেজামে ইসলাম। নেজাম বরং হক-ভাসানীর যুক্তফ্রন্টে যোগ দিয়েছে। মুসলিম লীগের পক্ষে যায়নি। মুসলিম লীগের এই কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এই দলটিরই ঐতিহ্য ও রাজনীতির উত্তরাধিকারী বিএনপির কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ভারতে বিজেপি যেমন অতীতের হিন্দু মহাসভার সাম্প্রদায়িক নীতির সঙ্গে উগ্র হিন্দুত্ববাদের যোগ ঘটিয়েছে; বাংলাদেশেও তেমনি মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বিএনপির হাতে উগ্র মৌলবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশটির গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য এক সর্বনাশা পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
সেনা ছাউনিতে জন্ম নিয়ে বিএনপি বহুকাল সেনাশাসনের সিভিল ফেস হিসেবে কাজ করেছে। তার ক্ষমতার পেছনে ছিল পাকিস্তানের মতো ‘মিলিটারি এন্ড মস্ক’। বর্তমানে তার সর্বাধিক নির্ভরতা জামায়াতের মতো ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী এবং হেফাজতের (পেছনে হিজবুত ইত্যাদি হিংস্র মৌলবাদী সংস্থা) ওপর। নির্বাচন নিয়ে বিএনপির একাধিকবার কারসাজি ও জালিয়াতি; তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বিকৃত ও কলুষিত করা, নির্বাচনে প্রশাসনকে ব্যবহার, তাদের শাসনামলের অসংখ্য রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, নির্বাচনকালে (২০০১) প্রতিদ্বন্দ্বী দলের নির্বাচনপ্রার্থী, কর্মী, সমর্থক- বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটদাতাদের ওপর নির্মম অত্যাচার আজ প্রমাণিত ইতিহাস। বিএনপির নেতানেত্রীরা আজ তা গলার জোরে অস্বীকার করতে পারেন; কিন্তু তাতে ইতিহাস মুছে ফেলা যাবে না।
এটা উপমহাদেশের ইতিহাসের এক চরম ট্রাজেডি- দুই শতাব্দীর বিদ্রোহ, বিপ্লব ও আন্দোলন দ্বারা যে উপমহাদেশ গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সেই উপমহাদেশের বিরাট অংশ ভারতে আজ উগ্র হিন্দু মৌলবাদী বিজেপি দ্বিতীয় বৃহত্তম দল এবং যে বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় জাতিতত্ত্বের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত লড়াই করে স্বাধীন হয়েছে সেই বাংলাদেশে আজ সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্র মৌলবাদনির্ভর বিএনপি দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। তারা একাধিকবার ক্ষমতায় গেছে। দেশটির মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি ও সেক্যুলার চরিত্রকে ধ্বংস করেছে এবং তাদের আবারও ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা (আশংকা) আছে।
বাংলাদেশের জনমানসে এখন একটা অদ্ভুত পরস্পরবিরোধী মানসিকতা কাজ করছে। যাদের সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাৎ হয় তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ আওয়ামী লীগ সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন এবং বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপির জয় এবার ঠেকানো যাবে না।’ সঙ্গে সঙ্গে তারাই আবার বলেন, ‘এবার বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশ শুধু আধা তালেবানি রাষ্ট্র হবে না; সেক্যুলারিস্ট দলগুলোর ওপর এমন নির্যাতন নেমে আসবে, নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর এমন অত্যাচার শুরু হবে, যা ২০০১ সালের বর্বরতাকেও হার মানাবে, বিএনপির সহযোগী জামায়াত শুধু ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের জেল থেকে খালাস করে আনবে না, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী যে মুষ্টিমেয় বুদ্ধিজীবী এখনও সরব ও সক্রিয় তাদের হয় ’৭১-এর মতো নিপাত, না হয় দেশ ছাড়া করার ব্যবস্থা করবে। একই মুখে এ ধরনের পরস্পরবিরোধী কথা শুনে আমি তাদের বলি, আপনারা দেশের সচেতন মানুষ যদি এই আশংকাই করেন যে, বিএনপি (দোসর জামায়াত-হেফাজত) আবার ক্ষমতায় আসতে পারে এবং এলে আফগানিস্তানের মতো ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে, তাহলে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের যত বড় দোষত্র“টিই থাকুক, তার বিরোধিতায় আপনারা এমন উচ্চকণ্ঠ কেন? আপনারাই তো বিএনপি-জামায়াতের আবার ক্ষমতায় আসার পথ সুগম করে দিচ্ছেন। আমার এই কথার সদুত্তর অধিকাংশ বন্ধুর কাছ থেকে পাই না।
অদ্ভুত এক সাইকি এখন কাজ করছে দেশের এক বিরাট সংখ্যক মানুষের মনে। তারা আওয়ামী লীগ সরকারকে আর পছন্দ করছেন না। আবার বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশে কী ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটবে সেই ভয়ে তারা ভীত। এই ভয় থেকে তারা শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হলে বিএনপিকে ভোট দেবেন কিনা তাও এখন পর্যন্ত এক সন্দেহের বিষয়। সম্ভবত দেশের এক বিপুলসংখ্যক ভোটদাতার মনের এই সন্দেহ ও ভয়ের কথা অনুমান করেই বিএনপি নেত্রী এখন তার নির্বাচনী প্রচারণায় ‘আর প্রতিহিংসার রাজনীতি করব না’ এই কথাটি বারবার বলে এই সন্দেহ ও ভয় দূর করার চেষ্টা করছেন এবং বিএনপি নতুন ধারায় রাজনীতি করবে বলে দেশবাসীর মনে নতুন ধাঁধা সৃষ্টি করতে চাইছেন। কিন্তু বিএনপির রাজনীতির এই নতুন ধারাটি কী হবে, তা জানতে চেয়ে বিএনপির নেতৃস্থানীয় একাধিক বন্ধুর কাছ থেকে কোনো স্পষ্ট ধারণা পাইনি। এই নতুন ধারাটি কি তাহলে সোনার পাথর বাটি?
বিএনপি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল। অবশ্যই ইচ্ছা করলে সে তার রাজনীতিতে নতুন ধারার জন্ম দিতে পারে। এই ধারাটি হল- সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্র মৌলবাদী রাজনীতি ত্যাগ করে গণতান্ত্রিক রাজনীতির উদার ও মধ্যপথে অবিলম্বে চলে আসা। জামায়াত, হেফাজত ইত্যাদি স্বাধীনতা-বিরোধী ও গণবিরোধী চক্রগুলোর জোট থেকে বেরিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ছোট-বড় দলের সঙ্গে নতুন করে জোট গঠন করা। ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ কোনো ভূমিকা গ্রহণ না করা। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সুস্পষ্ট কর্মসূচিভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামা; আওয়ামী-বিরোধিতার নামে গোটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান না নেওয়া। সহিংস ও সন্ত্রাসী রাজনীতি পরিহার করে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পথে দাবি-দাওয়া আদায়ের চেষ্টা করা। সংসদে ফিরে যাওয়া। পারবেন বিএনপি নেতানেত্রীরা এই শর্তগুলো পূরণ করে সুস্থ, স্বাভাবিক, গণতান্ত্রিক রাজনীতির নতুন ধারা সৃষ্টি করতে? বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি তা পারবে তা আমার মনে হয় না। এটা পারার আন্তরিকতাও তাদের মধ্যে নেই। থাকলে জামায়াতের সহিংস ও সন্ত্রাসী রাজনীতির সঙ্গে মিতালি তারা আরও দৃঢ় করতেন না। ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার মুখে সমর্থন করেও সেই বিচার ও দণ্ড ভণ্ডুল করার জন্য হেফাজতি তাণ্ডবে সমর্থন জানাতেন না এবং তাদের দ্বারা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখলের নীলনকশা তৈরি করতেন না।
বিএনপি নতুন ধারার রাজনীতি করবে ঘোষণা দেয়ার পর যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির আদেশ ঘোষিত হওয়ার পর তাকেসহ যুদ্ধাপরাধী, মানবতার শত্র“দের রক্ষার জন্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের নেতৃত্বে তাদের আইনজীবীদের ঝাঁপিয়ে পড়া কোন নতুন ধারার রাজনীতির আভাস দেয়? সব শেষে অক্টোবর মাসের শেষ দিক থেকে আবার হরতালের নামে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও সন্ত্রাসের রাজনীতিতে ফিরে যাওয়া কি হবে বিএনপির নতুন ধারার রাজনীতি? আর এই রাজনীতি দ্বারা কি বিএনপি দেশবাসীকে বেশিদিন বিভ্রান্ত করে রাখতে পারবে?

সংলাপ, না অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণাম by বদিউল আলম মজুমদার

প্রথম আলো থেকে কয়েকটি উদ্ধৃতি
‘আমি সংবিধানে বিশ্বাস করি। যা হবে সংবিধান মোতাবেক হবে। তার থেকে একচুলও নড়া হবে না’—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (১৮/০৮/১৩)।
‘তাদের সঙ্গে কিসের সংলাপ? যারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকীতে কেক কেটে ফুর্তি করে, তাদের সঙ্গে আপস হবে না’—আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম (১৫/০৮/১৩)।
‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আগামী নির্বাচন নিয়ে জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, তা-ও তাঁদের বলা হয়েছে। আমরা তাঁদের জানিয়েছি সবকিছুই হবে সংবিধানের আলোকে’—পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি (১৯/০৮/১৩)।
‘আলোচনাই সমাধানের একমাত্র পথ, এর বিকল্প যুদ্ধ’—আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম (১৮/০৬/১১)।

এটি সুস্পষ্ট যে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি ঐকমত্যে পৌঁছার ব্যাপারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তার মত পরিবর্তন করেছে, যদিও সংলাপ ও সমঝোতার পক্ষে সারা দেশে ব্যাপক জনমত বিরাজ করেছে। অতীতে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিরোধ নিরসনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ আগ্রহী ছিল। এমনকি কয়েক মাস আগেও সরকারের পক্ষ থেকে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে বিরোধী দলকে চিঠি দেওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়ের মাত্র কয়েক মাস আগে কেন হঠাৎ করে এই মত পরিবর্তন? এটি কি শুধু সৈয়দ আশরাফের বক্তব্য অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকীতে খালেদা জিয়ার কেক কেটে জন্মদিন পালনের জন্য? নাকি অন্য কোনো কারণে?
নিঃসন্দেহে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকীতে ঘটা করে বিরোধী দলের নেতার জন্মদিন উদ্যাপন অন্তত অশোভন ও দৃষ্টিকটু। এর মাধ্যমে জাতির জনকের প্রতি চরম অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়, যা আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কাম্য নয়। আশা করি, তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাববেন এবং ভবিষ্যতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত কর্ম থেকে বিরত থাকবেন।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: খালেদা জিয়ার এমন আচরণের প্রতিক্রিয়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং সৈয়দ আশরাফ কি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে অনিশ্চয়তা দূর করার লক্ষ্যে সংলাপে বসার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারেন? জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেখানে জড়িত, সেখানে সংলাপের সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণরূপে নাকচ করে দেওয়া তাঁদের বক্তব্য কি যৌক্তিক? এ ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে সংলাপের সঙ্গে জন্মদিন পালনের সম্পর্কই বা কী? খালেদা জিয়ার ওপর রাগ করে কি তাঁরা পুরো জাতির ভবিষ্যৎকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারেন? এটি কি তাঁদের নিজেদের এবং তাঁদের দলের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ?
যথাসময়ে ও সবার অংশগ্রহণে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন যথাসময়ে না হলে—যে আশঙ্কা নিয়ে নাগরিকদের বিরাট অংশের মধ্যে ইতিমধ্যেই সংশয় সৃষ্টি হয়েছে, কিংবা এতে প্রধান বিরোধী দল অংশ না নিলে, সারা দেশে সংঘাত অনিবার্য। এমনি পরিস্থিতিতে অতীতের মতো আমাদের গণতান্ত্রিকব্যবস্থা আবারও ভেঙে পড়তে পারে। আবারও অনির্বাচিত ব্যক্তিরা ক্ষমতা দখল করতে পারে, যা আমাদের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করবে। অতীতে আমরা দেখেছি যে এ ধরনের সরকার জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ বয়ে আনেনি। ভবিষ্যতেও এর ব্যতিক্রম হবে বলে আমাদের মনে হয় না। তাই অনেকের মনে প্রশ্ন, খালেদা জিয়ার ওপর অভিমান করে আওয়ামী লীগ কি পুরো জাতিকে ভয়াবহ সংকটের দিকে ঠেলে দেওয়ার মতো বিরাট ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত?
এ ছাড়া খালেদা জিয়া তো এ বছরই প্রথম ১৫ আগস্ট তাঁর জন্মদিন পালন করছেন না। প্রায় গত দুই দশক থেকেই তিনি এই কাজটি করে আসছেন। তাই এ অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়টি নতুন নয়। এই ইতিহাস জেনেই আওয়ামী লীগ তার ‘দিনবদলের সনদ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে ‘সংঘাতময় রাজনীতির ঐতিহ্য পেছনে ফেলা’ এবং ‘সংকটের আবর্তে’ নিমজ্জমান অবস্থা থেকে দেশকে পুনরুদ্ধার করে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ, সুখী-সুন্দর জীবন গড়ে তোলাই...বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একমাত্র ব্রত হিসেবে ঘোষণা করে। দিনবদলের সনদে আরও সুস্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করে যে ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্টাচার ও সহিষ্ণুতা গড়ে তোলা হবে।’
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরও ৩১ ডিসেম্বর ২০০৮ অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দল সম্পর্কে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন: ‘অবশ্যই খালেদা জিয়ার সহযোগিতা চাইব। কারণ, তিনিও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, দেশ চালিয়েছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা আছে। সংসদে সকলের অভিজ্ঞতা নিয়েই চলতে হবে...বিরোধী দল সম্মত থাকলে মন্ত্রিত্ব দেব...বিরোধী দলকে সংখ্যা দিয়ে বিচার করব না।’ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিরোধী দল থেকে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ দেওয়ারও অঙ্গীকার করেন।
লক্ষণীয় যে সংবাদ সম্মেলনে দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যেহেতু বিজয় অর্জন করেছি, তাই সবকিছু ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে।’
শেখ হাসিনা বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান: ‘আসুন, সব ভেদাভেদ ভুলে দেশের মানুষের জন্য একসঙ্গে কাজ করি। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলও রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার। বিরোধী দলের ইতিবাচক সমালোচনা, পরামর্শ এবং সংসদকে কার্যকর করতে তাদের ভূমিকা ও মর্যাদা সমুন্নত রাখব।’
তিনি জাতিকে আশ্বস্ত করেন: ‘আমরা প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। হানাহানির রাজনীতি পরিহার করতে চাই। দেশে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি উপহার দিতে চাই’ (প্রথম আলো, ১ জানুয়ারি ২০০৯)।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি তাঁর এসব অঙ্গীকার রক্ষা করতেন, তাহলেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন ঘটত এবং সমাজে সত্যিকারের দিনবদলের সূচনা হতো। আমাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হতো। জনগণও হাঁফ ছেড়ে বাঁচত, কারণ, তারা অতীতের অপশাসন ও সংঘাতের রাজনীতি নিয়ে অতিষ্ঠ এবং এখন তা আবারও ফিরে আসার আশঙ্কায় আতঙ্কগ্রস্ত। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে হানাহানির রাজনীতির অবসান তথা দিনবদলের প্রত্যাশায় জনগণ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটকে ২০০৮ সালে ভূমিধস বিজয় উপহার দিয়েছিল।
এটি সুস্পষ্ট যে গত নির্বাচনে জেতার পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সবার, বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দলের সহযোগিতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করার জন্যও বদ্ধপরিকর ছিল। এখন মেয়াদের শেষ দিকে এসে তারা বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপেও বসতে চায় না। এমনকি এটা করতে গিয়ে তারা রাষ্ট্রকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতেও দ্বিধান্বিত নয়! কিন্তু কেন? অনেকের আশঙ্কা যে এ ধরনের আচরণ পরিবর্তনের পেছনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য পরাজয়ের ভয়ই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একের পর এক সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এ ভয় স্বাভাবিকভাবেই আরও তীব্র হয়েছে।
প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ এখন সংবিধান সমুন্নত রাখার কথা বলছে এবং এ জন্য যেকোনো মূল্য দিতেও যেন তারা প্রস্তুত। ১৯৯৫-৯৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও একইভাবে সংবিধান মানার কথাই বলেছিলেন। বস্তুত, আওয়ামী লীগ-বিএনপি নির্বিশেষে সব সরকারি দলের আচরণই এক—ক্ষমতায় থাকলে তারা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। আর বিরোধী দলে গেলে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে। আর এ ধরনের সুবিধাবাদের রাজনীতিই আমাদের বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ।
লক্ষণীয় যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রায় প্রতিনিয়তই জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আবার ফিরিয়ে আনলে তারা আর সহজে ক্ষমতা ছাড়বে না এবং তাদের পেছনের সামরিক শক্তি দীর্ঘমেয়াদিভাবে আমাদের ওপর জেঁকে বসবে। কিন্তু সমঝোতার ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে তার পেছনে সামরিক শক্তি থাকতে হবে কেন? এ ছাড়া আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা কিন্তু ভিন্ন। ২০০৭ সালে সংবিধানে যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান না থাকত, তাহলে মহাজোটের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ার পর আমাদের দেশে সামরিক শাসন জারি হতো। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির জন্যই কি আজ আমাদের অপেক্ষা করতে হবে?
পরিশেষে, খালেদা জিয়াকে অতীতে আমরা বলতে শুনেছি, ব্যক্তির চেয়ে দল বড় এবং দল থেকে দেশ বড়। তাঁকে আজ জাতির সামনে প্রমাণ করতে হবে যে এ কথা তিনি আসলেই বিশ্বাস করেন। একইভাবে প্রধানমন্ত্রীকেও জাতির সামনে দৃশ্যমান করতে হবে যে ব্যক্তিগত আবেগ ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর কল্যাণে তিনি কষ্টকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
কারণ, ব্যক্তি শেখ হাসিনা এখন সরকারপ্রধান এবং তাই তাঁকে শুধু পরিবার ও দলের নয়, এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের স্বার্থের কথা ভাবতে হবে। এ ছাড়া সংলাপ ও সমঝোতা করতে হয় প্রতিপক্ষের সঙ্গে, সুহূদদের সঙ্গে নয়।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।