Tuesday, February 2, 2016

বিশ্বের সবচেয়ে দামি প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট

অ্যাপলকে হটিয়ে বিশ্বের দামি প্রতিষ্ঠান গুগল।
গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট বিশ্বের সবচেয়ে দামি প্রতিষ্ঠান হিসেবে অ্যাপলকে হটিয়ে শীর্ষস্থান দখল করেছে। বর্তমানে অ্যালফাবেটের মূল্য ৫ হাজার ৬৮০ কোটি মার্কিন ডলার। অ্যাপলের মূল্য ৫ হাজার ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলার।
আজ মঙ্গলবার বিবিসি অনলাইনের খবরে জানানো হয়, বছরের চতুর্থ প্রান্তিক, অর্থাৎ, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই তিন মাসের প্রান্তিক আয় ঘোষণা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে গুগলের মুনাফা হয়েছে ৪৯০ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৭০ কোটি ডলার বেশি। প্রান্তিক আয় ঘোষণার সময় মুনাফা বাড়ার খবরে গুগলের শেয়ারের দাম বেড়েছে ৯ শতাংশ। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে দামি প্রতিষ্ঠান হিসেবে অ্যাপলকে টপকে গেছে অ্যালফাবেট।
এই প্রথমবারের মতো অ্যালফাবেট গুগল থেকে পৃথকভাবে প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রান্তিক আয় ঘোষণা করেছে। এর মধ্যেই গুগলের সার্চ ইঞ্জিন, ইউটিউবসহ অন্যান্য ব্যবসা থেকে আয়ের হিসাব রয়েছে। বার্ষিক ভিত্তিতে অ্যালফাবেট মোট ১ হাজার ৬৩০ কোটি আয় করেছে, যার মধ্যে গুগলের আয় বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৩৪০ কোটি মার্কিন ডলার। কিন্তু অন্য ব্যবসাগুলো থেকে ৩৬০ কোটি ডলার লোকসান হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। গুগলের অনলাইন বিজ্ঞান থেকে আয় বাড়ার কারণেই মূল আয় বেড়েছে।
বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান মিজোহো সিকিউরিটিজের গবেষক নিল ডোশি বলেন, ‘মোবাইল বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রটির দখল গুগল চালিয়ে যাবে। দুই থেকে তিন বছর আগে গুগলের জন্য মোবাইল ছিল বড় চিন্তার একটি বিষয়। ডেস্কটপ ব্যবসায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে চিন্তায় ছিল গুগল। কিন্তু মোবাইলে এখন অধিক সার্চ ও মোবাইল বিজ্ঞাপন থেকে আয় ডেস্কটপ থেকে আসা আয়ের কাছাকাছি চলে এসেছে।’
বিশ্লেষকেরা বলছেন, অ্যালফাবেট বর্তমানে বিভিন্ন প্রকল্পে নিজেদের বিনিয়োগ বাড়িয়ে চলেছে। প্রযুক্তি নিয়ে গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের এই উদ্যোগের পুরস্কৃত হয়েছে। চালকবিহীন গাড়ি, বেলুনের মাধ্যমে ইন্টারনেট, গুগল গ্লাসসহ বিভিন্ন প্রকল্পে গুগলের বিনিয়োগের পরিমাণ কিংবা লাভ নিয়ে আরও বেশি স্বচ্ছ হওয়ার বিষয়ে গুগলের ওপর চাপ ছিল। গুগল ভেঙে অ্যালফাবেটে রূপান্তরিত হলেও গুগল এখনো আয়ের দিক থেকে যথেষ্ট ভালো করছে এবং বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার মতো অবস্থানে আছে অ্যালফাবেট।
গুগলের সবচেয়ে বেশি আয় বেড়েছে বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে। এর মধ্যে পেইড ফল ক্লিকস বা বিজ্ঞাপনদাতারা তাঁদের বিজ্ঞাপনে ক্লিকের ওপর বেশি অর্থ খরচ করেছেন।
২০১০ সালে মাইক্রোসফটকে হটিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দামি প্রতিষ্ঠান হয় অ্যাপল। এর দুই দশক আগে আইবিএমকে হটিয়ে শীর্ষস্থানে এসেছিল মাইক্রোসফট।
এক নজরে অ্যালফাবেটের উত্থান
১ ফেব্রুয়ারি গুগলের শেয়ারের দাম বেড়ে হয়েছে ৭৫০ মার্কিন ডলার
২০০৪ সালে ৮৫ ডলারে শেয়ার বিক্রি শুরু করেছিল গুগল।

রাস্তার স্মার্ট বাতি!

রাস্তার স্মার্ট বাতি!
রাস্তা আলোকিত করতে যে বাতিগুলো ব্যবহার করা হয়, এগুলো স্মার্ট হচ্ছে। মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা রাস্তায় ব্যবহার উপযোগী সৌরশক্তি ও বায়ুচালিত এক ধরনের স্মার্ট বাতি তৈরি করছেন, যা মশা মারতে, ফোন চার্জ দিতে ও দুর্ঘটনার সময় সংকেত পাঠাতে ব্যবহার করা যাবে। এই বাতি বিদ্যুৎ না থাকলেও চলবে।
মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দাবি করেছেন, তাঁরা বাতি এমনভাবে নকশা করছেন, যাতে দক্ষিণ এশিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যবহার করা হয়। প্রচলিত স্ট্রিট লাইটের বদলে পরিবেশবান্ধব ও মশা নিধনের উপযোগী এই স্মার্ট বাতি ব্যবহার করা সম্ভব। বাতিতে আছে বিশেষ প্রযুক্তির বাক্স, যাতে অতিবেগুনি রশ্মি, টাইটানিয়াম ডাইঅক্সাইড ও কার্বন ডাইঅক্সাইড মশাকে টেনে আনে। এটি মানুষের নিঃশ্বাসের মতো মশাকে বোকা বানায়। মশা এ বাক্সের কাছে এলে এর সঙ্গে থাকা পাখার আঘাতে তা মারা পড়ে। বন্যার সময়েও এ বাতি কাজ করে। বন্যার পানি কতটা তা বলে দিতে পারে। বাতির মাথার ওপরে থাকা অ্যানটেনা সংকেত দেখাতে পারে। এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকলে এই বাতি থেকে মোবাইল ফোনে চার্জ দেওয়ার সুবিধাও থাকবে। ইতিমধ্যে মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এ রকম আটটি বাতি স্থাপন করা হয়েছে। গবেষকেরা শিগগিরই এ ধরনের বাতি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা করেছেন।

ঢাকা–ইসলামাবাদ পাল্টাপাল্টি? by রাহীদ এজাজ

ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনের এক কর্মীকে ‘সন্দেহজনক গতিবিধি’র কারণে গতকাল সোমবার পুলিশ আটক করে। পরে তাঁকে ছেড়েও দেওয়া হয়। এরই মধ্যে ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশনের এক কর্মীর নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া যায়। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ছয় ঘণ্টা পর গভীর রাতে তিনি বাসায় ফেরেন।
জানতে চাইলে পাকিস্তানে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সোহরাব হোসেন গত রাতে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস শাখার কর্মী মো. জাহাঙ্গীর হোসেন দাপ্তরিক কাজ শেষ করে প্রতিদিন তাঁর মেয়ে যে কোচিং সেন্টারে পড়ে, সেখানে যান। এরপর মেয়েকে নিয়ে বাসায় ফেরেন। গতকালও তাঁর ওই কোচিং সেন্টারে যাওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে তিনি সেখানে না যাওয়ায় জাহাঙ্গীরের মেয়ে বাসায় ফোন করে। এরপর জাহাঙ্গীরকে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। কিন্তু তাঁর সঙ্গে থাকা মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সেটিও বন্ধ পাওয়া যায়। ইসলামাবাদের স্থানীয় সময় রাত ১২টার দিকে তিনি বাসায় ফেরেন।
এর আগে জাহাঙ্গীরের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছিল বলে বাংলাদেশের হাইকমিশনার জানান। তিনি বলেন, জাহাঙ্গীরকে উদ্ধারের জন্য ইসলামাবাদের চ্যান্সেরি পুলিশের প্রধান এবং স্থানীয় কূটনৈতিক কোরের ডিনের সহায়তাও চাওয়া হয়েছিল।
এদিকে ঢাকায় ‘সন্দেহজনক গতিবিধি’র কারণে ‘জিজ্ঞাসাবাদ’-এর জন্য আটক হওয়া পাকিস্তান হাইকমিশনের কর্মীও হাইকমিশনের প্রেস শাখায় কাজ করেন।
পাকিস্তান হাইকমিশন বলছে, তাদের প্রেস শাখার কর্মী আবরার আহমেদ খানকে গতকাল বেলা ১১টার দিকে গুলশানে তাঁর বাসার কাছ থেকে আটক করা হয়। এর সাত ঘণ্টা পর হাইকমিশনের জিম্মায় তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার প্রথম আলোকে বলেন, সন্দেহজনক গতিবিধির কারণে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল আবরার আহমেদ খানকে গুলশান এলাকা থেকে আটক করে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গুলশান থানায় নেওয়া হয়। তাঁর কাছে সাড়ে তিন হাজার ভারতীয় রুপি পাওয়া গেছে। পরে পাকিস্তান হাইকমিশনের কর্মী হিসেবে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ায় তাঁকে হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিবের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ বিষয়ে পাকিস্তান হাইকমিশন গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করে, গতকাল বেলা ১১টার দিকে ‘ডিবি’ লেখা জ্যাকেট পরা চার-পাঁচজন ব্যক্তি হাইকমিশনের প্রেস শাখার সহকারী ব্যক্তিগত সচিব আবরার আহমেদ খানকে তাঁর বাসার কাছ থেকে আটক করেন। আবরারের বাসাটি গুলশান ২-এ আগোরার কাছাকাছি অবস্থিত। আবরারকে বেঁধে নিয়ে ওই ব্যক্তিরা একটি সিলভার রঙের মাইক্রোবাসে চড়ে তাঁর অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে ঢোকেন এবং তাঁর মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে অভিযোগ করা হয়, ছাড়া পাওয়ার পর আবরার পাকিস্তান হাইকমিশনকে জানিয়েছেন, গুলশান থানায় নেওয়ার আগে তাঁকে হাতকড়া পরিয়ে ও চোখ বেঁধে মাইক্রোবাসে করে ঘণ্টা চারেক ঘুরেছিলেন ওই ব্যক্তিরা। তখন ডিবির লোকজন তাঁর কাছে পাঁচ কোটি টাকা দাবি করেন। অন্যথায় জাল ভারতীয় রুপির মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। তাঁকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করে নদীতে ‘ভাসিয়ে’ দেওয়ারও হুমকি দেওয়া হয়।
পাকিস্তান হাইকমিশনের এই অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএমপির মুখপাত্র মারুফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এসব অভিযোগ সঠিক নয়। সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আবরারকে আটক করা হয়নি, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর পর থেকে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক। সর্বশেষ গত ২২ নভেম্বর বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকরের প্রতিবাদে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতি দেয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকায় পাকিস্তানের হাইকমিশনার সুজা আলমকে গত ২৩ নভেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে প্রতিবাদপত্র দেওয়া হয়। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ৩০ নভেম্বর ইসলামাবাদে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার মৌসুমী রহমানকে তলব করে পাকিস্তান একাত্তরের গণহত্যার দায় অস্বীকার করে।
জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে ঢাকা থেকে পাকিস্তানি কূটনীতিক ফারিনা আরশাদকে প্রত্যাহারের জের ধরে ইসলামাবাদ থেকে বাংলাদেশের কূটনীতিক মৌসুমী রহমানকে ফিরিয়ে নিতে বলে পাকিস্তান।

একটি পরিবারে কয়টি গাড়ি, আইন আসছে

পরিবারপ্রতি গাড়ি সংখ্যার ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ করে দিয়ে ‘সড়ক পরিবহন আইন’ করতে যাচ্ছে সরকার। গতকাল সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মোটর ভেহিক্যাল অর্ডিন্যান্স-১৯৮৩ এর পরিবর্তে দুটি ভিন্ন আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ার কথা জানান। সংসদ সদস্য হাজি সেলিম মন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রেখেছিলেন, একটি পরিবারে একটির বেশি গাড়ি ব্যবহার করা যাবে না- মর্মে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে কি-না? রাজধানীর যানজটের জন্য ব্যক্তিগত গাড়িকেই প্রধানত দায়ী করা হয়। অনেকেই বলেন, ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে যানজট সহনীয় হয়ে আসবে। হাজি সেলিমের প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, একটি পরিবারে একটির বেশি গাড়ি ব্যবহার করা যাবে না- মর্মে নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। তবে খসড়া সড়ক পরিবহন আইনে পরিবারপ্রতি গাড়ির সংখ্যার ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। মন্ত্রী আরও  জানান, বহু প্রত্যাশিত ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়ক আগামী মে মাসে প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন। চার লেন মহাসড়ক প্রকল্পের কাজ একদম শেষ পর্যায়ে। মন্ত্রী আরও জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চার লেন প্রকল্পের ১৯২ কিলোমিটারের পুরোটাই শেষ হয়েছে। এটা গত সপ্তাহে শেষ হয়েছে। আমি নিজেই রোববার প্লেনের টিকিট বাতিল করে রাতে বাসে এসেছি। পথে পথে প্রকৌশলীদের দ্রুত ফিনিশিং লেয়ারের কাজ শেষ করার তাগিদ দিয়েছি। তিনি জানান, এই প্রকল্পের মধ্যে ২৫৪টি কালভার্ট, ১৪টি বাইপাস (৩২ কি.মি.) পথ রয়েছে। ওবায়দুল কাদের প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে নিজ নিজ এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তার তালিকা জমা দিতে বলেছেন। তালিকা অনুযায়ী বর্ষা মৌসুমের আগেই ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা মেরামত করে যানচলাচলের উপযোগী করবেন বলে তিনি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমের আগেই সব ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা মেরামত করা হবে। যেসব রাস্তা যান চলাচলের অনুপযোগী আছে, সেগুলো যানচলাচলের উপযোগী করা হবে। এ জন্য সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে তালিকা চাই। আপনারা তালিকা দিলে আমরা কাজ করতে পারবো। যানজট নিরসনে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, ঢাকা শহরের যানজট নিরসন ও নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার জন্য ২০ বছরের অধিক পুরাতন বাস-মিনিবাস ও ২৫ বছরের অধিক পুরনো পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পুরাতন জরাজীর্ণ ট্যাক্সিক্যাবের পরিবর্তে ঢাকা মহানগরীতে আধুনিক মানসম্মত ট্যাক্সিক্যাব চালু করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, রাজধানীর যানজট নিরসনে জাল বা ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী গাড়িচালক, যান্ত্রিক ত্রুটিপূর্ণ, রংচটা ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে জরুরি সতর্কীকরণ গণবিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হচ্ছে। বিআরটিএ ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে পরিচালিত মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবারও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে মামলা দায়ের, জরিমানা আদায় ও গাড়ি ডাম্পিং স্টেশনে পাঠানো হচ্ছে। সংরক্ষিত নারী আসনে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য নূর-ই-হাসনা লিলি চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জানান, গত বছরের ১৫ই জুন ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান ও নেপালের মধ্যে পরিবহন সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এ চুক্তির ফলে চার দেশের মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ি, যাত্রীবাহী যানবাহন ও পণ্য পরিবহনের জন্য পণ্যবাহী যান চলাচল করতে পারবে। ইতিমধ্যে ভারত, বাংলাদেশ ও নেপাল চুক্তিটি অনুসমর্থন করেছে। ভুটানও খুব শিগগিরই চুক্তিটি অনুসমর্থন করবে। চার দেশের অনুসমর্থনের পর চুক্তিটি বাস্তবায়ন হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তৎপরতা নেই ইসলামী দলগুলোর by আহমেদ জামাল

একেবারেই নিষ্ক্রিয় আর নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে ইসলামী দল এবং সংগঠনগুলো। কালেভদ্রেও তাদের তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। মঞ্চ- ময়দান দূরে থাক, ঘরোয়া বৈঠক এমনকি সংবাদ মাধ্যমে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয়ার ক্ষেত্রেও অনেকটা সীমিত হয়ে পড়েছে তারা। পারস্পরিক ঐক্য এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে এমনটি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
সূত্রমতে, এক সময় খেলাফত আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামী আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, নেজামে ইসলাম পার্টি, সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদসহ অন্তত এক ডজন ইসলামী দল ও সংগঠনের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে গত এক দুই বছরের মধ্যে ধীরে ধীরে ঝিমিয়ে পড়ে তারা। রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা ধর্মীয় কোনো ইস্যুতেই তাদের অস্তিত্ব তেমন প্রকাশ পাচ্ছে না। তবে একমাত্র ইসলামী আন্দোলন সীমিত আকারে কিছু তৎপরতা চালাচ্ছে। বিষয়টি স্বীকার করে খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা জাফরুল্লাহ খান বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতির শিকার’। ইসলামী দলগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, রাজধানীর বাড্ডায় পবিত্র কোরআন পোড়ানো, ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় মাদরাসায় হামলাসহ বিভিন্ন ঘটনার প্রতিবাদে আমরা সোচ্চার আছি। তবে প্রতিকূল অবস্থার কারণে ঐক্যবদ্ধভাবে সেটা প্রকাশ করা যাচ্ছে না। সরকারও সে সুযোগ দিচ্ছে না।
গত ৭ই জানুয়ারি ২০দলীয় জোট থেকে বের হয়ে যায় মরহুম মুফতি ফজলুল হক আমিনীর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ঐক্যজোট। এই জোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, দেশের চলমান পরিস্থিতিতে কেবল ইসলামী দল কেন, কোনো দলই স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা চালাতে পারছে না। তবু আমরা নিজস্ব পরিকল্পনা এবং কর্মকৌশল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। সম্প্রতি জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে আমরা সেটার প্রমাণ দিয়েছি। তিনি বলেন, সব কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান হতে হবে এমন নয়, অপ্রকাশ্যে অনেক কার্যক্রম হয় এবং হচ্ছে। ইসলামী দলগুলো সেভাবেই নিজস্ব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। বাংলাদেশ জমিয়তে উলামার সভাপতি মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ বলেন, দেশে প্রচলিত ইসলামী দলগুলো মৌলিকভাবে সংগঠিত নয়। তৃণমূলে তাদের জনসম্পৃক্ততাও তেমন আছে বলে মনে হয় না। আবেগের ওপর ভিত্তি করে আবেগি ইস্যু নিয়ে তারা চলে। কিন্তু আবেগ দিয়ে তো বেশি দিন চলা যায় না। এখন যেহেতু কোনো আবেগি কিংবা উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নেই তাই তাদের কর্মতৎপরতাও নেই। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদসহ নানা দোষে দুষ্ট হলেও একমাত্র জামায়াতই এদেশে একটি পরিপক্ব দল। তাদের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচিও আছে। আছে নিজস্ব কর্মী বাহিনী। এছাড়া, অন্য কোনো ইসলামী দলের নিজস্ব কোনো কর্মসূচি নেই বলে মনে করেন শোলাকিয়া ঈদগাহের এই ইমাম। 
তবে এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেন চরমোনাই পীরের সংগঠন ইসলামী আন্দোলনের ঢাকা মহানগর আমীর অধ্যাপক এটিএম হেমায়েত উদ্দিন। তিনি বলেন, সরকার চায় না ইসলামী দলগুলো সক্রিয় থাকুক। সরকারের উচ্চ মহল থেকে বলা হচ্ছে সীমিত গণতন্ত্র এবং বেশি উন্নয়ন। তাই আমরা কোনো প্রোগ্রাম করতে চাইলে পুলিশ প্রশাসন থেকে সহজে অনুমতি পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, এক সময় যে কোনো ইস্যুতে যখন তখন আমরা মুক্তাঙ্গন, পল্টন ময়দান, প্রেস ক্লাবসহ যে কোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে যেতাম, সমাবেশ করতাম। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবু আমরা যতটা পারছি সভা-সমাবেশ করছি। দলীয় কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করছি। তবে সেটা আগের তুলনায় অনেক কম। অবশ্য সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে কিছু দল বা সংগঠন আগের মতো সক্রিয়তা দেখাতে পারছে না বলেও মন্তব্য করেন অধ্যাপক হেমায়েত।
সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদের জয়েন্ট সেক্রেটারি ড. খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, আমাদের সংগঠনটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক, তবে ইসলামবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড দেখলেই আমরা এর প্রতিবাদে সোচ্চার হই। কিন্তু এই সংগঠনের কিছু নেতা কোনো না কোনোভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ফলে চলমান পরিস্থিতিতে তারা নানামুখী ভয়ভীতির মধ্যে আছেন। তবু সম্প্রতি একাধিক ব্যক্তির ইসলামবিরোধী বক্তব্যের বিরুদ্ধে আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছি। এতে প্রতিকারও পেয়েছি। তবে যতই প্রতিকূলতা থাকুক না কেন নাস্তিক মুরতাদদের ইসলামবিরোধী যে কোনো তৎপরতায় আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও মাঠে নামবো।
হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মইন উদ্দিন রুহী বলেন, চারদিকে সরকারের নানা দমন- পীড়নের কারণে ইসলামী দল এবং সংগঠনগুলো কোনো গণতান্ত্রিক স্পেস পাচ্ছে না। গোয়েন্দা নজরদারি এবং তৎপরতার কারণে তারা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডও চালাতে পারছে না। ইসলামী দল বা সংগঠনগুলোর নীরবতার এটা অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, তবে যতটা নিষ্ক্রিয়তা বলা হচ্ছে, আমরা ততটা নিষ্ক্রিয় নই। নানা কৌশলে সীমিত পর্যায়ে হলেও সক্রিয় আছি। সময়ের পরিবর্তনে সেটা দেখা যাবে। এদিকে প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মাসব্যাপী দাওয়াতি কার্যক্রম শুরু করে ইসলামী আন্দোলন। এ সময়  দলের সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করীম বলেছেন, বর্তমানে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনৈসলামীকরণ প্রক্রিয়া চলছে। সমাজ ব্যবস্থা দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হচ্ছে। সর্বত্র দুর্নীতির করালগ্রাসে জাতি নিমজ্জিত। দুর্নীতি, মাদকাসক্ত ও বিকারগ্রস্ত লোক দ্বারা সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি আশা করা যায় না। তিনি বলেন, মানুষ অধিকারবঞ্চিত হয়ে হাহাকার করছে। দেশের সর্বত্র অশান্তির আগুন জ্বলছে। মানুষ শান্তির আশায় দিগ্বিদিক ছুটছে। স্বাধীনতার পর থেকে শাসকগোষ্ঠী জনগণকে বার বার ধোঁকা দিয়ে কখনো নতুন বাংলা, কখনো সোনার বাংলা, কখনো সবুজ বাংলার কথা বলে এখন ডিজিটাল বাংলার কথা বলছে। তবে শান্তি, ইনসাফ ও অধিকার ফিরে পেতে ইসলামী আন্দোলনের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
সংগঠনের ঢাকা মহানগর সভাপতি অধ্যাপক এটিএম হেমায়েত উদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ, রাজনৈতিক উপদেষ্টা অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ূম প্রমুখ বক্তব্য দেন।

মিয়ানমারে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু- সু চির সামনে চার চ্যালেঞ্জ by সোহরাব হাসান

পার্লামেন্ট থেকে ফেরার পথে অং সান সু চি।
তাঁর দল এনএলডির বিপুল নির্বাচনী জয়ের পর
নেপিডোতে গতকাল পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন বসে
নতুন পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরুর মাধ্যমে মিয়ানমারে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলো গতকাল। নোবেল বিজয়ী অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) গত নভেম্বরে নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করলেও গণতন্ত্রে উত্তরণের সংগ্রাম শেষ হয়নি।
২০০৮ সালের সংবিধান অনুযায়ী, ৬৬৪ সদস্যের পার্লামেন্টে শতকরা ২৫ ভাগ আসন সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত আছে। গতকাল পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের প্রথম অধিবেশনটি ছিল বিজয়ী এনএলডি ও ইউএসডিপির সদস্যদের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর। উভয় দলের সাংসদেরা মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক ধারাকে এগিয়ে নেওয়া এবং শান্তি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
তবে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, অং সান সু চি এক নজিরবিহীন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার প্রথম ধাপ শেষ করেছেন। গতকালের অধিবেশনের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় ধাপ শুরু হলো। এ মুহূর্তে তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে এমন একজনকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা, যাঁর প্রতি জনগণ ও সেনাবাহিনী উভয়ই আস্থা রাখতে পারবে। কাজটি মোটেই সহজ নয়।
কেননা সেনাবাহিনীর আস্থা ছাড়া এনএলডির পক্ষে সরকার পরিচালনা সম্ভব নয়। পার্লামেন্টের উভয় পরিষদে দলটি ৮০ শতাংশ আসনে জয়ী হলেও সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত ২৫ শতাংশ আসন থাকায় তাদের নাখোশ করা যাবে না। সংবিধান অনুযায়ী সু চি নিজে প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। সংবিধানের ৫৯(এফ) ধারায় বলা আছে, কোনো নাগরিক বিদেশিকে বিয়ে করলে তিনি মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হওয়ার অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। অবশ্য প্রেসিডেন্ট যে-ই হোন না কেন, ক্ষমতার চাবি যে সু চির হাতেই থাকবে, তা এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।
ইয়াঙ্গুনের কূটনৈতিক মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়, সু চির সামনে এখন অনেক চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, তিনি জনগণের কাছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে ওয়াদা করেছেন, সেটি পূরণ করতে শাসনকাঠামোয় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, পার্লামেন্টে যতটা সম্ভব সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ কমাতে হবে। বর্তমান পার্লামেন্ট সম্পর্কে জনগণের উৎসাহ প্রচুর। আগের পার্লামেন্টের নির্বাচিতদের বেশির ভাগই সেনাবাহিনী থেকে আসায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁদের তেমন যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু এবার এনএলডি থেকে যাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের বেশির ভাগই বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশা থেকে এসেছেন। এঁদের একটি বড় অংশ প্রথমবারের মতো পার্লামেন্ট সদস্য হয়েছে।
মিয়ানমারে কাজ করেন এমন একটি বিদেশি সংস্থার প্রধান প্রথম আলোকে টেলিফোনে জানান, বিজয়ী দলটির সঙ্গে সেনাবাহিনীর অধিকারীদের আলোচনা চলছে। আশা করা হচ্ছে, এই আলোচনা একটি যৌক্তিক পর্যায়ে যাবে। যিনিই প্রেসিডেন্ট হোন না কেন, তাঁকে সেনাবাহিনীর আস্থা অর্জন করতে হবে। তবে প্রথমেই এনএলডি হোঁচট খেয়েছে উচ্চ পরিষদের ডেপুটি স্পিকার পদে একজন জাতীয়তাবাদী আরাকানকে মনোনীত করে, যা সংখ্যালঘুদের ভীতির কারণ হতে পারে।
এনএলডির সূত্র জানায়, প্রেসিডেন্ট পদে এখন পর্যন্ত দুজনের নাম শোনা যাচ্ছে। এঁদের একজন হলেন এনএলডির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ১৯৮৮ সালের ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানের নেতা টিন উ, যিনি নে উইন সরকারের আমলে সেনাপ্রধান ছিলেন। বর্তমানে তাঁর বয়স ৯০। দ্বিতীয় জন সু চির ব্যক্তিগত চিকিৎসক টিন মিও উইন। তিনি এনএলডির প্রভাবশালী নেতা হলেও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন। তাঁকে সেনা নেতৃত্ব মেনে নেবেন কি না, সেই প্রশ্ন থাকছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির, গবেষণাসূত্রে মিয়ানমারের সঙ্গে যাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে, দেশটির নতুন পার্লামেন্টের যাত্রা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, আপাতদৃষ্টিতে মিয়ানমারের এই নবযাত্রা উৎসাহব্যঞ্জক। কেননা এই যাত্রায় এমন একজন নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যিনি সারা বিশ্বে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের জন্য প্রশংসিত। কিন্তু তাঁর সামনে চ্যালেঞ্জটিও ছোট নয়। সু চির বড় চ্যালেঞ্জ হবে সেনাবাহিনীর সঙ্গে কীভাবে সমঝোতা করেন এবং কীভাবে জনগণকে দেওয়া গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম করার ওয়াদা পূরণ করেন। মিয়ানমারে যে জাতিগত সমস্যা আছে, তা কীভাবে মোকাবিলা করেন। সর্বোপরি মিয়ানমারে যে উগ্রপন্থার উত্থান ঘটছে, সেটি মোকাবিলা করে তিনি কীভাবে রোহিঙ্গাসহ সব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করেন, তাঁর ওপরই সু চির সাফল্য নির্ভর করছে।
বিবিসি, এএফপি ও রয়টার্সের খবরে বলা হয়, এনএলডির কয়েক শ এমপি শপথ নেওয়ার পর গতকাল মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোয় পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশনও শুরু হয়। দলটির এমপিরা হালকা গেরুয়া রঙের পোশাক পরেছিলেন। তবে তাঁদের নেতা সু চি পার্লামেন্ট ভবনে প্রবেশ করেন গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কোনো কথা না বলেই। তাই নতুন পার্লামেন্টের যাত্রা এবং এর ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে তাঁর বক্তব্য শুনতে পারেননি তাঁরা।
১৯৬২ সালে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর এবারই প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা পার্লামেন্টে নেতৃত্বের আসনে বসলেন। ক্ষমতাসীন দল হিসেবে পার্লামেন্টে আসন গ্রহণ করলেও এনএলডি সরকারের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটবে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর, এপ্রিলে।
এনএলডির বিপুল বিজয়ের পরও জান্তা প্রণীত সংবিধানের আওতায় দলটিকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করেই দেশ চালাতে হবে। মন্ত্রিসভার স্বরাষ্ট্র, সীমান্ত ও প্রতিরক্ষা-বিষয়ক পদগুলোও সেনাবাহিনীর জন্য নির্ধারিত। তবে এনএলডির নেতৃত্বে পার্লামেন্টের এই যাত্রা মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণে আরেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সামরিক সরকারবিরোধী সংগঠন ‘৮৮ জেনারেশন স্টুডেন্টস’-এর নেতা এবং দীর্ঘ ২০ বছর কারাবন্দী থাকা এমপি পেয়ন চো শপথ নেওয়ার পর বলেন, ‘বহু বছর পর মিয়ানমারের জনগণের পছন্দে নির্বাচিত এক পার্লামেন্টের যাত্রা শুরু হলো। এখন আমাদের কাজ হলো প্রতিশ্রুতি পূরণ করা এবং জনগণের জীবনে পরিবর্তন আনা।’
আগামী মার্চের শেষে পদত্যাগ করবেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন। নতুন পার্লামেন্টের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজই হবে তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচন। এনএলডির কিছু সদস্য জানান, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মনোনয়ন-প্রক্রিয়া এ মাসের শেষ দিকে শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এ সপ্তাহেই পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার নিয়োগে মনোযোগ দিচ্ছে এনএলডি। গত সপ্তাহে এসব পদের জন্য মনোনীত ব্যক্তিদের নাম ঘোষণা করা হয়। মনোনীত ব্যক্তিদের মধ্যে উইন মিন্টকে নিম্নকক্ষের স্পিকার এবং উইন খাইং থানকে উচ্চকক্ষের স্পিকার হিসেবে এনএলডির পছন্দের কথা নিশ্চিত করেছেন সু চি।
নতুন পার্লামেন্ট একজন নতুন চেয়ারম্যানও বাছাই করবে। এসবের বাইরে ৮ ফেব্রুয়ারি প্রাদেশিক ও আঞ্চলিক পরিষদের অধিবেশন শুরুর প্রস্তুতি নেবে এনএলডি। পরিষদগুলোর বেশ কটিই জাতিগত সংখ্যালঘুদের দখলে।
নতুন পার্লামেন্টের এ যাত্রা শুরুর সঙ্গে মিয়ানমারের প্রায় সোয়া পাঁচ কোটি মানুষের প্রত্যাশার পাহাড়ও বড় হচ্ছে। তাঁরা চান, সামরিক শাসনের জাঁতাকলে স্থবির হয়ে যাওয়া অর্থনীতি পুনরুদ্ধার থেকে শুরু করে জাতিগত সংঘাতে অস্থিতিশীল হয়ে পড়া দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার মতো সবকিছু রাতারাতি করবে এনএলডি।
এ প্রসঙ্গে পার্লামেন্টের বিদায়ী স্পিকার এবং সু চির ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত রাজনীতিক শোয়ে মান বলেন, মানুষের পাহাড়সম প্রত্যাশার এই চ্যালেঞ্জ পূরণে এনএলডিকে সঠিক লোক বাছাই এবং তাঁকে সঠিক স্থানে বসাতে হবে। আর এটাই নির্ধারণ করবে সরকারের দক্ষতা।

বেতনবৃত্তান্ত by সৈয়দ আবুল মকসুদ

কিছুদিন যাবৎ বাংলার মাটিতে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ: বেতন। ড্রয়িংরুমে, সরকারি অফিসে, আদালতের সেরেস্তাখানায়, রেস্তোরাঁর টেবিলে, রাস্তার পাশের চা-দোকানে, তেমাথার বটতলায়, খেলার মাঠে, কসাইখানা থেকে শুঁড়িখানায়—কোথায় নেই বেতন নিয়ে আলোচনা। বাসে ও ট্রেনের কামরায় বসে যাত্রীরা ঝিমুনি বাদ দিয়ে বেতন নিয়ে আলোচনা করেন। গ্রামের হাটুরেরা হাটবারে বেচাকেনা করে বাড়ি ফেরার সময় আলোচনা করেন বেতন নিয়ে; তাঁদের নিজেদের বেতন-ভাতা বলে কিছু নেই, রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে কারা কত বেতন পান বা কার বেতন কত বাড়ল, তাই নিয়ে আলোচনা। মুদি দোকানদারের নিজের বেতনের প্রশ্ন আসে না, কিন্তু অন্যদের বেতন বাড়ার কথায় তাঁর খুশি সীমাহীন।
মুক্তবাজার অর্থনীতির মৌসুমে বাংলার মাটিতে সবকিছুর মাপকাঠি আজ বেতন। রাষ্ট্রের কল্যাণে কার কী অবদান তা নয়, কার বেতন কত, সেটাই প্রধান বিবেচ্য বিষয়। এমনকি যে কবির বেতন বেশি, তাঁর কবিতায় শিল্পগুণ যেমন বেশি, তাঁর কাব্যের কদরও বেশি। কার বেতন কত, তাই নিয়ে মুক্ত আলোচনার ফলে আজ বাংলার বহু পরিবারে বিপর্যয় পর্যন্ত দেখা দিয়েছে। যেমন ধরুন, আমাদের পরিচিত হেকতম আলী চৌধুরীর পরিবারের স্নায়ুযুদ্ধ।
চৌধুরী সাহেবের ফাটা কপাল। ছেলে নেই, চার-চারটে মেয়েকেই সুপাত্রে সমর্পণ করতে পেরেছেন। নিজে জেলা শহরে তিনতলা বাড়িতে থাকেন। তাঁর শরীর ৭৮ বছরেরও মাশাল্লাহ ভালো, কিন্তু স্ত্রীকে নিয়েই পেরেশানে থাকেন। ফরকুন্দা বেগম ছিলেন যুবতী বয়স থেকেই ভোজনরসিক। মিষ্টি-মাংসের প্রতি প্রবল ঝোঁক। আস্ত একটা মোরগের সিনা-রান গিলা-কলিজাসহ খেয়ে ফেলতেন। মেজো মেয়ে হওয়ার পরেই মুটিয়ে যান। অনেক দিন থেকে ডায়াবেটিসে ও হার্টের সমস্যায় মর-মর। হঠাৎ অবস্থা খারাপ। মেয়েদের কাছে মুহূর্তে মোবাইলে খবর যায়। চার মেয়েই স্বামীদের নিয়ে ছুটে আসেন। বড় মেয়ের জামাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। মেজো জামাই অতিরিক্ত সচিব। তৃতীয় মেয়ের স্বামী একটি প্রাইভেট ব্যাংকের (যে ব্যাংকের ঋণখেলাপির পরিমাণ বিপুল) ডিএমডি এবং ছোট জামাই সাবেক এমপি। তিনি প্রথম জীবনে জ্ঞানসাগর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। বিশেষ উপায়ে ডিগ্রিটা নেওয়ার পর সড়ক ও জনপথ বিভাগে সাব-কন্ট্রাকটারি করতেন। রাজনীতিতে ভালো করায় সংসদেও গিয়েছিলেন। শুল্কমুক্ত দামি গাড়ি হাঁকান। এখন রাজউকের প্লটে বাড়ি নির্মাণের কাজ চলছে। শাশুড়ির খবর শুনে বাড়ির বাথরুমের ফিটিংসের মালপত্র কেনা বাদ দিয়ে ছুটে এসেছেন।
চৌধুরী ভিলার সামনে মেজো, সেজো ও ছোট জামাইয়ের তিনটি দামি গাড়ি দাঁড়ানো। এমন সময় ভটভট শব্দ করে ইজিবাইক নিয়ে বড় জামাই ড. খালিদ বাহাউল্লাহ এলেন সস্ত্রীক। চৌধুরী সাহেব বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। মেয়েকে বললেন, তোমরা বাসস্ট্যান্ড থিকা ফোন করতা। একটা গাড়ি পাঠাইয়া দিতাম। ড. বাহাউল্লাহর শ্বশুরের কথা শুনে গা জ্বালা করে ওঠে। ভায়রার গাড়িতে উঠবেন!
রাষ্ট্রের সেবায় কে কত গুরুত্বপূর্ণ তার ওপর নির্ভর করে মর্যাদা, কে কত টাকা বেতন পান সেটা নয় বিপত্তি ঘটে রাতে খাবারের সময়। টেবিলে গিয়ে বসেন মেজো জামাই সচিব সমির শেখ, সেজো ডিএমডি জামশেদ তোফাদার এবং ছোট জামাই সাবেদ আলী সাবু। বড় জামাই আসেন না। কাজের মেয়েটি গিয়ে বলে, দুলাভাই-আপা আসেন। দুলাভাইরা বইয়া রইছে আপনেগো লাইগা। ড. বাহাউল্লাহ নিম্মিকে বলেন, বলে দাও এখন আমি খাব না। মাথা ধরেছে। রাতে এক গেলাস দুধ দিয়ো।
কাজের মেয়েটি চলে গেলে নিম্মি বলেন, খেয়ে নিলেই পারতা। তোমার মাথা ধরল কখন?
ড. বাহাউল্লাহ খুব নিচু স্তরে ধমকে ওঠেন, তোমার যদি সেই আক্কেল থাকত, তাহলে তোমার আব্বা আমার ঘাড়ে তোমাকে চাপাত না। তুমি জানো, ওই টেবিলে গিয়ে বসলেই বেতনের কথা উঠবে? সমির, জামশেদ, সাবু সবাই বেতনের প্রসঙ্গে ঘাঁটাঘাঁটি করবে।
প্রফেসর বিশেষভাবে শঙ্কিত ছিলেন তাঁর এক মামাশ্বশুরকে নিয়ে। ভদ্রলোক সারা জীবন কিছুই করেননি। ভগ্নিপতির ওপরই চলেছেন। বেশি কথা বলেন। কার বেতন কত—এই সব নিয়ে তাঁরই যত মাথাব্যথা। যা হোক, সবাই এক রকম না। পাশের বাড়ির দূরসম্পর্কের এক চাচিশাশুড়ি এলেন জামাইদের সঙ্গে দেখা করতে। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। এখন রিটায়ার করেছেন। টেলিভিশন দেখেন। খবরের কাগজও পড়েন। কোথায় কারা কী দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করেন, সে খবর রাখেন। বড় জামাইয়ের সঙ্গেই তাঁর অনেকক্ষণ কথা হয়। কথা প্রসঙ্গে একটি পুরোনো গল্প বড় দুলামিয়াকে স্মরণ করিয়ে দেন:
মোগল সম্রাট তাঁর ছেলেকে বিদ্যাশিক্ষা দিতে শিক্ষক রেখে দেন। একদিন সম্রাট দেখেন যুবরাজ তার ওস্তাদের পায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছে আর ওস্তাদজি নিজের হাতে পা ধুচ্ছেন। তা দেখে সম্রাট ক্ষুব্ধ হন এবং পুত্রকে বকুনি দিয়ে বলেন, এটা স্রেফ বেয়াদবি। তুমি নিজের হাতে ওস্তাদজির পা ধুইয়ে দাও। এই কাহিনিতে শিক্ষকের মর্যাদার কথাই বলা হয়েছে।
বেতন হলো কর্মমূল্য। বেশি বেতনে ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্য বাড়ে, মর্যাদা নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সত্যেন বসু, রমেশ মজুমদার যে বেতন পেতেন, তার চার গুণ বেশি পেতেন ঢাকা ডিএম—জেলা প্রশাসক। বাংলাদেশ বিমানের বিদেশি এমডি আমাদের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের বেতন-ভাতা যোগ দিলে যা হয়, তার দ্বিগুণের বেশি বেতন পান। প্রাইভেট ব্যাংকের অনেক এমডিও তাই। রাষ্ট্রের সেবায় কে কত গুরুত্বপূর্ণ, তার ওপর নির্ভর করে মর্যাদা, কে কত টাকা বেতন পান সেটা নয়।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।

চাপের মুখে মানবাধিকার -এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদন by আনু মুহাম্মদ

বাংলাদেশের মানুষ কতটা গণতান্ত্রিক পরিবেশে বাস করছে, তা বোঝার জন্য আমাদের আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্ট দেখার অপেক্ষা করতে হয় না। নিজেদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা আর নানা রকম হুমকি, হয়রানি, বিধিনিষেধ কিংবা আরোপিত নিয়ন্ত্রণ (সেলফ সেন্সরশিপ) সত্ত্বেও গণমাধ্যমে যতটুকু খবর প্রকাশিত হয়, তাতেই এটা স্পষ্ট যে মানবাধিকার লঙ্ঘনে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এখন প্রায় অপ্রতিরোধ্য।
স্বাভাবিক চিন্তা-মত প্রকাশের পথ বন্ধ করার জন্য আইসিটি আইন দিয়ে ত্রাসের আবহাওয়া সৃষ্টি করা হয়েছে। সংবাদপত্র-টিভি চ্যানেল শুধু নয়, ফেসবুকও এখন চাপের মুখে। যেন মত প্রকাশ করতে না দিলে সেই মত সমাজ থেকে উবে যাবে! ফেসবুকে মন্তব্য করার জন্য একের পর এক আটক হচ্ছে, আবার কোনো কিছু না করেও আটক, গুম, খুন হচ্ছেন তরুণ যুবকেরা। গ্রেপ্তার, আটক, ক্রসফায়ার এখন শুধু নিপীড়নের নাম নয়, বাণিজ্যেরও বিষয়। অবিরাম ‘ক্রসফায়ারে’ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মানুষ মারা যাচ্ছে।
অন্যদিকে, সাত খুনের আসামি অসুস্থতার নামে বহাল তবিয়তে বাস করছেন হাসপাতালের আরামদায়ক কক্ষে। ত্বকীর খুনিসহ অনেক খুনির রক্ষায় নিয়োজিত আছে প্রশাসন। পথে, ঘরে, ঘাটে, বাজারে, প্রতিষ্ঠানে নারীর ওপর যৌন–সন্ত্রাস চলছেই। পাহাড়ে, সমতলে সংখ্যালঘু জাতি ও ধর্মের মানুষের ওপর হামলা-মামলা, জমি-সম্পত্তি দখলে কোনো বিরতি নেই। সাংসদসহ ÿক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধেই উঠছে ‘সংখ্যালঘু’দের জমি দখলের অভিযোগ। খুনি-লুটেরাদের বিরুদ্ধে কথা বললে আটক, ক্রসফায়ারের হুমকি। জমি-টাকা-প্রতিষ্ঠান দখল করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি করছে সরকারি দলের বিভিন্ন পক্ষ।
এই পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুললে বলা হচ্ছে ‘উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র ছাড় দিতে হবে’। বারবার সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ার দৃষ্টান্ত টানা হয়। সেসব দেশে কি জাতীয় সংস্থাকে ডুবিয়ে কমিশনের লোভে বিদেশি কোম্পানির হাতে দেশের সম্পদ তুলে দেওয়া হয়েছে? এসব দেশে কি ভিআইপি হলে যা খুশি তা-ই করা সম্ভব? এসব দেশে কি প্রতিষ্ঠানের বদলে জমিদারি স্বেচ্ছাচারিতা চলে? সেসব দেশে কি নদী-নালা খাল-বিল, পাহাড়—সবই দখলের বিষয়? সেখানে কি কতিপয়ের লোভ মেটানোর জন্য সুন্দরবনের মতো অনবায়নযোগ্য-অতুলনীয় প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করা হয়েছে? সেখানে কি জ্বালানি খাতে দায়মুক্তি আইন দিয়ে সব অনিয়ম-দুর্নীতিকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে?
উন্নয়নের নামে একদিকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার ঘটে চলেছে; অন্যদিকে টাকার অভাবে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, সড়ক, রেলওয়ে ধুঁকছে। বিশাল ব্যয়বহুল প্রকল্পকে সরকারের সাফল্য হিসেবে হাজির করা হচ্ছে। কিন্তু প্রতিটি প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়াচ্ছে অস্বাভাবিক। বিশ্বের মধ্যে প্রতি কিলোমিটার সড়ক, ফ্লাইওভার, সেতুর খরচ এখন বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। এর জন্যই কি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পথে এত প্রতিবন্ধকতা?
বাংলাদেশে গত ৪৪ বছরে জিডিপি বেড়েছে বহুগুণ, বিপুল বিত্তশালী তৈরি হয়েছে, ভবনসহ সড়ক, গাড়ি, বাড়ি বেড়েছে অনেক। কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও চর্চার বিকাশ ঘটেনি। গণতন্ত্র মানে যেমন শুধু ভোট দেওয়ার অধিকার বোঝায় না, উন্নয়ন বলতেও তেমনি শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধি বোঝায় না। কিন্তু গণতন্ত্রের ন্যূনতম শর্ত সর্বজনীন ভোটাধিকারও এখন আক্রমণের মুখে। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো, নৃশংসতার পক্ষে সমাজে নানা পক্ষ তৈরি করছে সম্মতি। কাউকে সন্ত্রাসী বললে ক্রসফায়ার, কাউকে চোর বললে নৃশংস নির্যাতন, কাউকে নাস্তিক বললে কুপিয়ে হত্যা—এসব কিছুর পক্ষে নানা যুক্তি সমাজে তৈরি করা হচ্ছে। অপরাধের জন্য আইন-বিচার, কথার উত্তর কথা, লেখার উত্তর লেখা—এতটুকু সহিষ্ণুতা আশা করাই যেন দিনে দিনে আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
অনেক সময়ই গণতন্ত্র হরণ করার পক্ষে উন্নয়ন ছাড়া আরেকটি যুক্তি দেওয়া হয় এভাবে যে ‘জঙ্গি’, ‘মৌলবাদী’, যুদ্ধাপরাধীদের থাবা থেকে দেশকে মুক্ত করতে কিছুদিনের জন্য গণতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ দরকার। ফলাফল হচ্ছে উল্টো। প্রকৃতপক্ষে অগণতান্ত্রিক, আর তার সুযোগে দখল-লুণ্ঠনের বিস্তার ঘটিয়ে অগণতান্ত্রিক শক্তি দমন করা যায় না। দীর্ঘ মেয়াদে তা বরং অধিকতর অগণতান্ত্রিক শক্তিরই জায়গা তৈরি করে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) প্রতিবেদনে বাংলাদেশের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এই নেতিবাচক প্রতিবেদন আমাদের সবার জন্য লজ্জার। এই লজ্জা আরও বাড়ে দেশের মানবাধিকার কমিশনের অকার্যকর ভূমিকার কারণে।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anujuniv@gmail.com

উসকানি দেওয়াই লেখকের কাজ by আলী রীয়াজ

একুশে গ্রন্থমেলার প্রস্তুতি নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মেলার প্রস্তুতি-বিষয়ক তথ্য জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে একাডেমির মহাপরিচালক প্রকাশকদের উদ্দেশে সাবধানতা অবলম্বনের উপদেশ দিয়েছেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, গত বছরের মেলায় রোদেলা প্রকাশনীর স্টল বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে একজন সাংবাদিক জানতে চাইলে একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘আমরা চাই প্রকাশকেরা এমন কিছু বই প্রকাশ না করুন, যেটা উসকানিমূলক। আর এ ধরনের কিছু করা হলে অঘটন ঘটতে পারে।’
এবারের বইমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে গত বছর সংঘটিত তিনটি ঘটনার প্রেক্ষাপটে—এর একটি রোদেলা প্রকাশনীর স্টল বন্ধ করে দেওয়া, দ্বিতীয়টি হচ্ছে বইমেলা থেকে ফেরার পথে লেখক অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ড এবং তৃতীয়টি হচ্ছে গত বছর ৩০ সেপ্টেম্বর দুটি প্রকাশনা সংস্থায় একই সঙ্গে হামলা, যাতে জাগৃতি প্রকাশনীর ফয়সল আরেফিন দীপন নিহত হন। এর আগে ২০০৪ বাংলা একাডেমির বইমেলা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথে আক্রান্ত হয়েছিলেন লেখক হুমায়ুন আজাদ, সৌভাগ্যবশত তিনি সেই যাত্রা বেঁচে যান; কিন্তু অভিজিৎ সবার সামনেই নিহত হন, তাঁর স্ত্রী রাফিদা বন্যা গুরুতরভাবে আহত হন। এই ঘটনার এখনো সুরাহা হয়নি, তদুপরি তাঁর প্রকাশক দীপন নিহত হয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন আরও চারজন লেখক। এসব কারণে এই বছর মেলার নিরাপত্তার বিষয়ে সবার উদ্বেগ আছে, সেই প্রেক্ষাপটে একাডেমির মহাপরিচালক যখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানান যে বইমেলায় ‘রেকর্ড নিরাপত্তার’ ব্যবস্থা হচ্ছে, দুই শতাধিক সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো বইমেলা ‘পর্যবেক্ষণ করা হবে’ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্তসংখ্যক সদস্য মেলার নিরাপত্তায় থাকবেন, তখন নিশ্চয় মানুষের ভেতরে খানিকটা হলেও আশা তৈরি হয়।
কিন্তু সেই সংবাদ সম্মেলনে ‘উসকানিমূলক’ প্রকাশনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান আমাদের উদ্বিগ্ন করে। কোন প্রকাশনা কার কাছে ‘উসকানি’ বলে বিবেচিত হবে, আমরা কখনোই তা বলতে পারব না। প্রশ্ন হচ্ছে, কে তা নির্ধারণ করবে? তা ছাড়া কে, কবে এই মানদণ্ড তৈরি করেছে, কারা এই শনাক্তকরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা জানি না। প্রকাশনার ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা আসলে চিন্তার স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণের রূপ। বাংলাদেশে আমরা যে ইতিমধ্যেই এই অবস্থার মধ্যে পতিত হয়েছি, তা আমাদের স্বীকার বা অস্বীকারের ওপর নির্ভর করে না। বিরাজমান এই পরিস্থিতি বিষয়ে আলাদা করে বলার দরকার কতটা, সেটা পাঠকেরা জানেন। কিন্তু তার আগে শুধু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, এই বইমেলা ‘একুশের গ্রন্থমেলা’। একুশে ফেব্রুয়ারির মর্মবাণী কি এই নয় যে আমরা প্রচলিত কিছুকে অস্বীকারে পিছপা হব না? ১৯৭৮ সালে আবুল ফজলের প্রকাশিত গ্রন্থের নাম ছিল একুশ মানে মাথা নত না করা। আজকের বিবেচনায় ওই প্রকাশনা কি উসকানিমূলক বলেই বিবেচিত হতো?
একুশের বইমেলার সঙ্গে বাংলাদেশের অধিকাংশ লেখকের ব্যক্তিগত অনেক স্মৃতি জড়িত আছে। আমি তার ব্যতিক্রম নই। মেলার ইতিহাস যাঁরা জানেন, তাঁদের স্মরণে থাকবে ১৯৭৮-৭৯ সালে মেলা হতো সপ্তাহব্যাপী, বড়জোর ১৫ দিন। উৎসবের আলোকচ্ছটাহীন সেই মেলার আয়োজক বাংলা একাডেমি নয়, যদিও তার প্রাঙ্গণেই এই আয়োজন, কিন্তু আয়োজক হাতে গোনা প্রকাশকেরা। নির্ধারিত কয়েকটি স্টলের বাইরে খোলা জায়গায়, বটতলায় তরুণ লেখকেরা নিজেরাই টেবিল-চেয়ার জোগাড় করে নিজেদের অর্থে প্রকাশিত বই সাজিয়ে বসতেন বিক্রির জন্য। লেখকদের সেই আয়োজনে যশের আকাঙ্ক্ষা যে থাকত না তা নয়, কিন্তু তার সবটাই খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার জন্য ছিল, তা বললে সত্যের অপলাপ হবে। প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে তরুণদের দ্রোহের প্রকাশও ছিল সেসব প্রকাশনা। ১৯৭৮ সালের শেষে আমরা কয়েক বন্ধু মিলে নিজেদের অর্থে কিংবা বন্ধুদের দেওয়া সাহায্যে নিজেদের বই বের করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৯৭৯ সালের বইমেলায় নিজেদের বই নিজেরাই ছেপে নিয়ে হাজির হয়েছিলাম। আমরা মানে আমি, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, মোহন রায়হান ও আবিদ রহমান। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতার বই উপদ্রুত উপকূল যদিও শেষ মুহূর্তে আহমদ ছফার কল্যাণে বুক সোসাইটির নাম দিয়ে বের হয়েছিল, উদ্যোগটা ব্যক্তিগতই ছিল। সেই বইয়ের কবিতাগুলোর মধ্যে ছিল ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ শিরোনামের কবিতা। সেই কবিতার এই পঙ্ক্তি, ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন’ নিশ্চয় কারও কাছে উসকানিমূলক বলেই বিবেচিত হয়েছিল। মোহন রায়হানের কাব্যগ্রন্থের নাম ছিল জ্বলে উঠি সাহসী মানুষ—এর চেয়ে প্রত্যক্ষ প্ররোচনা আর কি কিছু হতে পারে? মেলায় প্রকাশিত আমার প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ বাঙালি জাতীয়তাবাদ-এর অন্যতম প্রবন্ধ ছিল আগের বছরের গ্রীষ্মকালে ‘স্বরূপ অন্বেষা’ সংকলনে প্রকাশিত প্রবন্ধ ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্ধিত রূপ’।
১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা একাডেমির এক আলোচনা সভায় খন্দকার আবদুল হামিদের দেওয়া বক্তৃতায় ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের’ যে ধারণা বলা হয়েছিল, ১৯৭৮ সাল নাগাদ তা সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় রাষ্ট্রীয় আদর্শে রূপ নিয়েছে। কিন্তু সামরিক শাসকের সেই আদর্শিক অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করার তাগিদ থেকেই সেদিন এই প্রবন্ধ এবং বই লেখার সাহস করেছিলাম। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত সাহিত্য সাময়িকী সমকাল-এর ১৯৭৮ সালের এপ্রিল সংখ্যায় (বর্ষ ১৯, সংখ্যা ৪) বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক আবদুল হকের লেখা ‘দোদুল্যমান জাতীয়তা’ শিরোনামের প্রবন্ধ ছাড়া আর কারও লেখায় সেদিন এই বিষয়কে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল বলে মনে পড়ে না। এই রকম একটা বই প্রকাশের ক্ষেত্রে ভরসা ছিল বইমেলা—পাঠকের হাতে তুলে দেওয়া যাবে। এক অপরিচিত তরুণের এই বই প্রকাশের দায়িত্ব কেউ নেবে—এমন আশা করিনি, বন্ধুর প্রেসের নামে প্রকাশনীর নাম দিয়ে সেই বই বেরিয়েছিল। বইয়ের ভূমিকায় সেই কারণেই লিখেছিলাম ‘তারুণ্য একধরনের শক্তি ও সাহস জোগায়, একধরনের ঔদ্ধত্যের প্ররোচনাও দেয় বৈকি—এই গ্রন্থ তার প্রমাণ।’ শক্তি দিয়ে নয়, যুক্তি ও তথ্য দিয়েই যে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করতে হয়, আমাদের অগ্রজ লেখক ও শিক্ষকদের সেই শিক্ষা আমার ঔদ্ধত্যের উৎস ছিল। আত্মপ্রচারের উদেশ্যে এই প্রসঙ্গের অবতারণা করিনি, শুধু এ কথা বলার জন্যই এই প্রসঙ্গের অবতারণা যে সেদিন এবং তার পরে প্রতিবছর প্রতিটি বইমেলা আমাদের মতো আরও অসংখ্য তরুণকে ‘উসকানিমূলক’ লেখা লেখার এবং প্রকাশ করার, রাষ্ট্রযন্ত্রের অনাচারের বিরুদ্ধে, সমাজে প্রচলিত পশ্চাৎপদ ধ্যানধারণা ও বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছে।
লেখক-প্রকাশকদের এ ধরনের উসকানিমূলক লেখা ও প্রকাশনার বাইরেও বইমেলা অনেক কথিত উসকানির গৌরবের অংশীদার। একটা উদাহরণ দিই। ১৯৭৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভোরে একাডেমির কবিতা পাঠের আসরে নির্মলেন্দু গুকণ পাঠ করেছিলেন ‘আমি আজ কারও রক্ত চাইতে আসিনি’ কবিতাটি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ‘শেখ মুজিব’—এই দুটি শব্দ যখন প্রায় নিষিদ্ধ, সেই সময় নির্মলেন্দু গুাণ পাঠ করলেন, ‘সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি,/ রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেই সব গোলাপের একটি গোলাপ গতকাল/ আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।/আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।’
প্রচলিত চিন্তা ও শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর উসকানি কেবল তরুণদের বিষয় নয়; যেকোনো স্বাধীন চিন্তাশীল লেখক ও বুদ্ধিজীবীর দায়িত্বই হচ্ছে এই চ্যালেঞ্জ অব্যাহত রাখা। একজন স্বাধীন বুদ্ধিজীবী কিসের উসকানি দেবেন? এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমরা কাজী মোতাহার হোসেনের শরণাপন্ন হতে পারি। বিংশ শতাব্দীর কুড়ির দশকে শিখা গোষ্ঠীর দ্বিতীয় বার্ষিক প্রতিবেদনে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন কী, তা ব্যাখ্যা করে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমরা চক্ষু বুঝিয়া পরের কথা শুনিতে চাই না বা শুনিয়াই মানিয়া লইতে চাই না; আমরা চাই চোখ মেলিয়া দেখিতে, সত্যকে জীবনে প্রকৃতভাবে অনুভব করিতে। আমরা কল্পনা ও ভক্তির মোহ আবরণে সত্যকে ঢাকিয়া রাখিতে চাই না। আমরা চাই জ্ঞান শিক্ষা দ্বারা অসার সংস্কারকে ভস্মীভূত করিতে এবং সনাতন সত্যকে কুহেলিকা মুক্ত করিয়া ভাস্বর ও দীপ্তিমান করিতে।...এক কথায় আমরা বুদ্ধিকে মুক্ত রাখিয়া প্রশান্ত জ্ঞান দৃষ্টি দ্বারা বস্তু জগৎ ও ভাবজগতের ব্যাপারাদি প্রত্যক্ষ করিতে ও করাইতে চাই।’ লেখকের কাজ হচ্ছে সব ধরনের সাবধানবাণীকে অগ্রাহ্য করে যাঁরা ভক্তির মোহ আবরণে সত্যকে ঢেকে রাখতে চান, তাঁদের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়া।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

বিচারপতির ওপর বিএনপির অহেতুক আক্রমণ by মইনুল ইসলাম

জিয়াউর রহমানের অবৈধ ক্ষমতা দখলকে সাংবিধানিক বৈধতা প্রদানে সংবিধানের যে পঞ্চম সংশোধনী গৃহীত হয়েছিল, ওই সংশোধনীকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে প্রদত্ত ঐতিহাসিক রায়ের কারণে ইতিহাসে স্থায়ী সম্মান ও শ্রদ্ধার আসন অর্জন করেছেন বিচারপতি খায়রুল হক। আর এটাই বিএনপির জন্য গাত্রদাহের কারণ হয়েছে।
উল্লেখ্য, পঞ্চম সংশোধনীর প্রবক্তা জিয়াউর রহমান অবৈধ সামরিক শাসনের গায়ে ‘সিভিলিয়ান ডেমোক্রেসির’ জোব্বা পরানোর উদ্দেশ্যে সুবিধা-শিকারি রাজনীতিবিদ, সামরিক অফিসার, সিভিল আমলা ও ব্যবসায়ীদের জড়ো করে প্রথমে জাগদল এবং পরে বিএনপির জন্ম দিয়েছিলেন। সে কারণে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের কাছে যে বিচারপতি খায়রুল হক শত্রু হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন হাইকোর্টের রায়ের পর থেকেই। পরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ওই রায় চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করায় বিএনপি সরাসরি ওই ইস্যুতে বিচারপতি খায়রুল হককে গালমন্দ করতে পারছে না, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা–সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় প্রদানের পর তাঁকে উদ্দেশ করে অপমানজনক গালাগালের তুবড়ি ফোটাচ্ছেন বিএনপির বাক্যবাগীশ নেতারা।
সম্প্রতি তাঁরা প্রধান বিচারপতির একটা বক্তব্যের কারণে বিচারপতি খায়রুল হককে ব্যক্তিগত আক্রমণ করার স্বর্ণ-সুযোগ পেয়ে গেছেন। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা সম্প্রতি তাঁর মতামত ব্যক্ত করেছেন যে বিচারপতিরা অবসর গ্রহণের পর চাকরিরত থাকাকালীন তাঁদের প্রদত্ত সংক্ষিপ্ত রায়কে পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায়ে পরিণত করে তাতে স্বাক্ষর করার যে রেওয়াজ এ দেশের উচ্চ আদালতে চালু রয়েছে, সেটাকে তিনি সংবিধান পরিপন্থী মনে করেন। কারণ, তিনি মনে করেন, বিচারপতিরা সংবিধান সমুন্নত রাখার যে শপথ নেন, অবসর গ্রহণের পর তা আর বলবৎ থাকে না। ভবিষ্যতে তিনি এই প্রথাটি আর চলতে দেবেন না বলে অঙ্গীকার ঘোষণা করেছেন। (অবসর গ্রহণের চার বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও কোনো কোনো বিচারপতির নাকি লিখিত রায় লিখে স্বাক্ষর প্রদানের কাজ সম্পন্ন করার সময় হয়নি।) বলা বাহুল্য, তাঁর এই মতামত সারা দেশের আইনজ্ঞ ও সংবিধান-বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, যদিও তিনি অতীতে প্রদত্ত কোনো রায় এর ফলে অবৈধ হবে না বলে স্পষ্ট মত প্রদান করেছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্য তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। বিএনপির সংকটাপন্ন রাজনীতির জন্য এই ইস্যুটা টনিক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের ব্যাপারে আমি পক্ষে-বিপক্ষে কিছু বলতে চাই না। তবে সংক্ষিপ্ত রায় যেহেতু শপথের অধীনে থাকাকালীনই দেওয়া হয়েছে, অতএব পরে এর পূর্ণাঙ্গ লিখিত ব্যাখ্যাসংবলিত রায়ে ওই সংক্ষিপ্ত রায়ের কোনো ব্যত্যয় না করা হলে সেটা অসাংবিধানিক কেন হবে, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। আর এই প্রথা তো এ দেশে বহুদিন ধরেই চালু রয়েছে, কেউ তো প্রশ্ন তোলেননি? অসমাপ্ত রায়গুলো লিখে জমা দেওয়া না হলে বিচারপতি শামসুদ্দিনের পেনশনের ফাইলে স্বাক্ষর করা হবে না মর্মে যে সিদ্ধান্ত প্রধান বিচারপতি গ্রহণ করেছিলেন, সেখান থেকেই এই ইস্যুটির উৎপত্তি বলে ধারণা করা যাচ্ছে। বিচারপতি শামসুদ্দিনও দাবি করে চলেছেন, ‘এই প্রথা ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বহু দেশেই প্রচলিত রয়েছে। সুদূর পাকিস্তান আমল থেকেই এ দেশে প্রথাটি বহাল রয়েছে।’ তিনি এ প্রসঙ্গে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, বিচারপতি মোস্তাফা কামাল ও বিচারপতি খায়রুল হকের নাম উল্লেখ করেছেন।
অপরদিকে, বিএনপির পক্ষ থেকে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন ভারত ও পাকিস্তানে সম্প্রতি অবসরকালীন রায় লেখা নিষেধ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন। বোঝা যাচ্ছে, এটা হয়তো অদূর ভবিষ্যতে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট মামলার বিষয়ে পরিণত হবে এবং শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ের মাধ্যমেই এর ফয়সালা হবে। সে জন্য, বিএনপি যদি সুনিশ্চিত অবস্থান গ্রহণ করে যে প্রধান বিচারপতির এহেন মন্তব্যের কারণে বিচারপতি খায়রুল হক কর্তৃক লিখিত ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল–সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়টি ‘বাতিলযোগ্য’ হয়ে গেছে, তাহলে কালবিলম্ব না করে তাদের রিট করাই হবে যৌক্তিক পদক্ষেপ। কিন্তু তা না করে বিএনপির বিভিন্ন নেতা যেভাবে অশিষ্ট ভাষায় বিচারপতি খায়রুল হকের বিরুদ্ধে আক্রমণ শাণাচ্ছেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর গ্রেপ্তার দাবি করা চরম অশিষ্টতারই পরিচায়ক।
আমার মতে, বিএনপির নেতারা অহেতুক বিচারপতি খায়রুল হককে অপমান করছেন। যেহেতু নিজের সমর্থনে পত্রপত্রিকায় বা গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়াটা তাঁর পক্ষে শোভন হবে না, তাই এহেন একতরফা গালাগাল ভদ্রজনোচিত নয়। আইনকানুন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ব্যক্তিমাত্রই স্বীকার করবেন যে অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে ‘অসাংবিধানিক’ ঘোষণাসংবলিত রায় একটি ঐতিহাসিক রায়। তবে এ সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়েও ভিন্নমত ছিল এবং ৪-৩ সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিদের মতামতের ভিত্তিতেই ওই রায় প্রদত্ত হয়েছিল। আবার, ঐকমত্য পোষণকারী বিচারপতিদের লিখিত ব্যাখ্যায় ভিন্নতা ছিল। ওই ভিন্নমতগুলো প্রদান করতে অস্বাভাবিক বিলম্ব হওয়াতেই ওই রায়ের চূড়ান্ত লিখিত ও স্বাক্ষরিত ভার্সনটি প্রকাশে ১৬ মাস সময় লেগে গিয়েছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিদের সংক্ষিপ্ত রায়ে বলা হয়েছে, নির্বাচিত সংসদ চাইলে আরও দুইবারের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখতে পারবে। লিখিত ব্যাখ্যায় বিচারপতি খায়রুল হক ‘নির্বাচিত সাংসদদের’ মধ্য থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সদস্যদের নিযুক্ত করার কথা লিখেছেন, যা মূল রায়ের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। কিন্তু মূল লিখিত রায় প্রকাশের আগেই নির্বাচিত সংসদ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে ফেলেছে, যেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে সংসদ আর প্রয়োজনীয় মনে করেনি। এর দায় কেন বিচারপতি খায়রুল হকের ওপর বর্তাবে? এটা একান্তই সংসদের এখতিয়ারভুক্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
প্রকৃতপক্ষে, বিএনপির নেতা-কর্মীরা বিচারপতি খায়রুল হককে অহেতুক ‘নন্দ ঘোষ’ বানাচ্ছেন! তাঁদের কাছে হয়তো কখনোই এ সত্য গ্রহণযোগ্য হবে না যে জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনকে কোনো বিবেকবান বিচারক কোনো আইনি যুক্তিতেই বৈধতা দিতে পারেন না। সামরিক শাসনকে ‘লেজিটিমেসি’ প্রদানের জন্য ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দলবিধি আদেশ জারি করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতাসীন সামরিক সরকারপ্রধানের পদের সর্বময় ক্ষমতা অপব্যবহার করে রাষ্ট্রের গোয়েন্দা এজেন্সিগুলোর ব্ল্যাকমেল বা লোভনীয় টোপের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল গঠন করে জালিয়াতিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে সেটাকে জিতিয়ে এনে সামরিক শাসনের গায়ে গণতন্ত্রের লেবাস পরালেই অবৈধ ক্ষমতা দখলকে যে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া যায় না, সেটাই এ দেশের হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করার রায় দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
আমার দৃঢ়বিশ্বাস, এই ঐতিহাসিক রায় যুগ যুগ ধরে নন্দিত হবে এবং এ জন্য বিচারপতি খায়রুল হকের ভূমিকাও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁকে ছোট করার জন্য বিএনপির মরিয়া প্রয়াস আদতে বিএনপির প্রশ্নবিদ্ধ জন্মবৃত্তান্তকেই বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। অর্থের লোভে কিংবা পদের লোভে তিনি এই রায়গুলো দিয়েছেন—এই হাস্যকর প্রলাপগুলো অচিরেই বন্ধ করা হোক। অবসরে যাওয়ার পর বাংলাদেশের একাধিক প্রধান বিচারপতি আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হয়েছেন। বিচারপতি এ টি এম আফজাল, বিচারপতি মোস্তাফা কামাল, বিচারপতি তাফাজ্জল ইসলাম এ ক্ষেত্রে নিকট অতীতের নজির। তাঁদের মধ্যে দুজনকে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারই নিয়োগ দিয়েছিল। তাহলে, বিচারপতি খায়রুল হক একই পথ অনুসরণ করে কীভাবে দোষ করলেন?
বিএনপি নিজেদের ক্ষীয়মাণ জনপ্রিয়তাকে পুনরুদ্ধারকল্পে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঘোষণা, ২৫ মার্চের রাতে বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তার, ২৬ মার্চের বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা—সবকিছুকে নিয়ে একের পর এক বিতর্ক সৃষ্টি করছে। স্বীকৃত ইতিহাসকে অস্বীকার করে এসব আবোলতাবোল বক্তব্য দিয়ে তারা কী ফায়দা হাসিল করতে চাইছে? বিএনপির জন্মের আগের ইতিহাসকে তাদের নিজের মতো করে সাজিয়ে নেওয়ার বদমতলব কি পরিত্যাগ করার সময় আসেনি? ১৯৭৮ সালে জন্ম নেওয়া বিএনপির ১৯৪৭-১৯৭১ সালের সংগ্রামের ইতিহাসকে অস্বীকার করার কী যুক্তি থাকতে পারে? ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়ে পণ্ডিতি করে নতুন নতুন তত্ত্ব আবিষ্কারের মাধ্যমে তারেক রহমান বিএনপির রাজনীতিকে কোথায় দাঁড় করাতে চাইছেন?
৩০ লাখ শহীদ সম্পর্কে পাকিস্তান প্রশ্ন তুলতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের তিন দফায় প্রধানমন্ত্রীর কুরসিতে বসা খালেদা জিয়া ৪৫ বছর পর পাকিস্তানের এই প্রোপাগান্ডায় শরিক হবেন কেন? কাকে কী মেসেজ দিতে চাইলেন তিনি? আর ভুল স্বীকার না করে কিছু কিছু পদলোভী বিএনপি নেতা যেভাবে খালেদা জিয়ার এই মারাত্মক ভুলকে বাহবা দিয়ে চলেছেন, সেটা কি আদতেই বিএনপির উপকার করছে? বিএনপির ভুলের পর ভুলের এই কাফেলায় বিচারপতি খায়রুল হককে টার্গেট করাটাও একটা বড় ভুল মনে করি।
বিচারপতিদের অবসর গ্রহণের পর সংক্ষিপ্ত রায় লেখা এবং স্বাক্ষর করার বিরুদ্ধে প্রধান বিচারপতির ঘোষিত অবস্থানকে অবলম্বন করে আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অদূর ভবিষ্যতে সংবিধানে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন এক্ষণে বিএনপির জন্য দিবাস্বপ্নের শামিল হবে। আর এই উদ্দেশ্যে বিচারপতি খায়রুল হককে যতই বিতর্কিত করা হোক না কেন, তিনি দেশবাসীর কাছে শ্রদ্ধাভাজনই থাকবেন।
মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ভাষা নিয়ে কিছু সেকেলে ভাবনা by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাস শুরু হলে ভাষা নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনাও যেন ১১ মাসের ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে। একটি মাস ভাষা থাকে আমাদের মনোভূমিতে, পতাকা উড়িয়ে। ফেব্রুয়ারি শেষ হলে সেই পতাকা আবার আমরা নামিয়েও ফেলি, আমাদের মনোযোগ দখল করে নেয় অন্য সব জাগতিক বিষয়। ভাষা নিয়ে এই এক মাসের সক্রিয়তাকে অনেকে বর্ণনা করেন আনুষ্ঠানিক অথবা আচারধর্মী হিসেবে। কিন্তু আমি মনে করি, এরও আবশ্যকতা আছে। আচারের পেছনে একটা প্রস্তুতি থাকে, কাল গণনা থাকে, তাগিদও থাকে (তাগিদটা প্রচল থেকে ছিটকে না পড়ার।) আচার যাঁরা পালন করেন, তাঁদের অন্তত একটি অংশ আচারের পেছনের উদ্দেশ্য এবং নিষ্ঠাকে জানতে চায়, বুঝতে চায়।
ফেব্রুয়ারিতে ভাষা নিয়ে যত কথা হয়, তার পেছনেও নিষ্ঠা থাকে, আবেগ থাকে, উদ্দেশ্য থাকে। একটা উদ্দেশ্য বাংলা ভাষাকে আরও কত স্বাস্থ্যবান, বেগবান করা যায়, উচ্চশিক্ষার উপযুক্ত মাধ্যম করা যায়, আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি-দর্শন-বিজ্ঞানচিন্তার আরও গতিশীল বাহন করা যায়, তার পথ খোঁজা। কারও উদ্দেশ্য থাকে বাংলা ভাষার ইতিহাসটা জানার, এর শ্রেষ্ঠ ব্যবহারকারীদের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার। কারও উদ্দেশ্য থাকে এর শুদ্ধতাকে দৃশ্যমাধ্যম, বিজ্ঞাপন, সস্তা বিনোদনের কেন্দ্রীয় ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তৈরি নানা বিকৃতি থেকে বাঁচানো। আবার কারও উদ্দেশ্য থাকে এটি প্রমাণ করা যে এই বিকৃতি আসলে বিকৃতি নয়, এটি ভাষার বহমানতার একটি পরিচয় এবং একে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করে নেওয়া উচিত। আমি মনে করি, এই শেষ উদ্দেশ্যটিকেও (যার সঙ্গে প্রথম তিনটি উদ্দেশ্যেরই আপাত একটা বিরোধ আছে) খোলা মন নিয়ে দেখতে হবে, যেহেতু এতে যে বিতর্ক তৈরি হবে, তা শেষ পর্যন্ত ভাষার শক্তিটাই তুলে ধরবে। মৃত ভাষা, মৃতপ্রায় ভাষা নিয়ে কোনো বিতর্ক হয় না। বিতর্ক পক্ষ-বিপক্ষের শক্তি ও দুর্বলতা এবং যুক্তি-অযুক্তিগুলোই প্রমাণ করে। অনেকে এ রকম ভাবেন যে উত্তরাধুনিক যুগে শুদ্ধ-পবিত্র-সুন্দর এসব বিষয়কে আর এককবিশিষ্ট ও ধ্রুব বলে ধরা যায় না। আমিও কিছুটা তা-ই মনে করি। শুদ্ধ অথবা সুন্দর বলতে যা বোঝায়, তা কোন অথবা কার সংজ্ঞা থেকে? সেই সংজ্ঞা কি তৈরি করছে ক্ষমতা? ক্ষমতার কোনো প্রতিষ্ঠান? প্রাচ্যবাদ দেখিয়েছে, পশ্চিমের তৈরি ‘মান’ পুবকে মানহীন প্রমাণ করে তার ওপর সাংস্কৃতিক উপনিবেশ চাপিয়ে দিয়েছে। কেন? না, পুব অসভ্য, তাকে সভ্য করতে হবে। পশ্চিমের মান ছুঁতে পারলে পুব সভ্য হবে।
তারপরও উত্তরাধুনিকতার সূত্র ধরেই বৈশ্বিক, সর্বজনীন কোনো মানের বিপরীতে স্থানীয়, লোকজ মানের কাছে গেলেও কিছু বিষয়ে (কিছু বিশ্বাসে) একটা মতৈক্য দেখা যায়। লোকজ বিশ্বাস মাটি থেকে উঠে আসে, ওপর থেকে কেউ তা চাপিয়ে দিতে পারে না। ফলে সেই বিশ্বাসে সুন্দর ও সত্যের যে বিষয়গুলো থাকে, সেগুলোর প্রতিফলন থাকে মানুষের প্রতিদিনের কৃত্যে, চর্চায় ও চিন্তায়। এ জন্য কেউ যদি ভাষার শুদ্ধতা খুঁজতে যায় এ রকম একটি বিশ্বাস থেকে যে সেই শুদ্ধতার দেখা মিলবে মায়ের ভাষার ভেতরের সৌন্দর্যে, তাহলে তাকে সেকেলে বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো কারণ নেই।
আমি নিজেকে সেই সেকেলেদের দলে আবিষ্কার করি। কারণ, আমি জানি এবং আমার অভিজ্ঞতায় সঞ্চিত আছে ভাষার এই সৌন্দর্যের বিষয়টি। আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটি ভাষার ভেতরে একটা গান আছে, যে গানটি বাজাতে পারেন এর উৎকৃষ্ট চর্চাকারীরা। অনেক বছর আগে একবার পদ্মায় নৌকায় যেতে যেতে আমার হাত থেকে রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্র নিয়ে এক বন্ধু এর কিছু অংশ পড়ে শুনিয়েছিল। না, সেই গান পদ্মা অথবা প্রকৃতি তৈরি করেনি, আমার বন্ধুও কোনো কাজী সব্যসাচী ছিল না, সেই গান ছিল ভাষার। রবীন্দ্রনাথ তা বাজিয়েছেন। এই গান বাজিয়েছেন নজরুল-জীবনানন্দ-শামসুর রাহমান-সৈয়দ হক। ভাষার সবচেয়ে ভালো প্রকাশ সাহিত্যে, তবে এই প্রকাশ আমি দেখেছি জগদীশচন্দ্র বসুর বিজ্ঞান লেখাতেও, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের চিঠিপত্রেও। আমাদের সময়ে আমরা যে বাংলা ভাষা ব্যবহার করি, তাতে আর সেই গান বাজে না। এটি বাজার সম্ভাবনা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাংলা ভাষা এখন শুধু বিশেষ্য নয়, বিশেষণ নয়, ক্রিয়াপদও বিসর্জন দিচ্ছে ইংরেজি-হিন্দির কাছে। এখন বাংলা ভাষা এক ভয়ানক শঙ্কার ভাষা। অনেকে বলেন, এটিই স্বাভাবিক। হতে পারে। কিন্তু আমার ভয় এই ‘স্বাভাবিক’ ভাষা তার একটি মৌল স্বভাব ইতিমধ্যেই হারিয়েছে, এবং তা ভেতরের গানটাকে বাজতে না দিয়ে, সেই সম্ভাবনা নষ্ট করে ফেলে। এখন এই স্বাভাবিক, এফএম ভাষা, দুর্দান্ত বাংলিশ ভাষা কী সাহিত্য রচনা করে, তা দেখার জন্য আমি অপেক্ষা করি।
অথচ আমি যখন কোনো ইংরেজকে, কোনো ইতালীয়কে, কোনো আরব বা ইরানিকে তাদের মাতৃভাষায় কথা বলতে শুনি, তখন তার ভেতরে যে একটা গান আছে, তা বুঝতে পারি। একবার ইরানে গিয়ে আমি এক চা-খানায় দুই ঘণ্টা বসে অনেকের কথা শুনে টের পেলাম, এরা নিখাদ মাতৃভাষা চর্চা করছে। পরদিন এক অধ্যাপককে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন ইংরেজি ও অন্য ভাষার শব্দ আছে, তবে প্রায় সবই বিশেষ্য, কিন্তু ইরানিরা তাদের আত্তীকৃত করে নিয়েছে। আমরাও হাজার হাজার বিদেশি শব্দ নিয়েছি, কিন্তু বাংলার জলহাওয়ায় তাদের ধুয়ে শুকিয়ে নিজের করে নিয়েছি। কিন্তু এখন যে ক্রিয়াপদ ধার করছি ইংরেজি থেকে, হিন্দি থেকে, সেগুলোকে কি পারব আমাদের জলহাওয়ায় ওই রকম প্রক্রিয়াজাত করতে? কে জানে। তবে ক্রিয়াপদ হচ্ছে ভাষার পা। পা হারালে ভাষা কীভাবে চলে?
২. আমার সেকেলে চিন্তার আরেকটি হচ্ছে, কোনো জাতির ভাষায় শৃঙ্খলা না থাকলে তার চিন্তাভাবনাতেও শৃঙ্খলা থাকে না। আমি দেখি, আমাদের তরুণদের এক বড় অংশ মনের কথাটা বুঝিয়ে বলতে পারে না। বিশ্বাস না হয়, টেলিভিশনে ‘তাহাদের কথা’ ধরনের অনুষ্ঠান দেখুন, যেখানে উপস্থাপক একটি চলতি বিষয়ের ওপর পথচারীদের বক্তব্য নেন। খুব কমই সঠিকভাবে একটা পূর্ণ বাক্য বলতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্ক দলে নাম লেখাতে আসা শিক্ষার্থীদের অনেকের মধ্যেও দেখি বাক্য শেষ করতে না পারার দুর্বলতা। ইংরেজি নয়, বাংলাতে, নিজের মাতৃভাষাতেও গুছিয়ে, সঠিকভাবে বলতে যদি ১৮-১৯ বছরের একজন শিক্ষার্থী অপারগ হয়, তাহলে বিস্ময়টা আর বিস্ময় থাকে না, ভীতিতে রূপান্তরিত হয়। এই ভাষা চর্চাকারীরা তাহলে কোন ভাষা শিখেছে? বাংলা ভাষা, নাকি ‘স্বাভাবিক’ বাংলা ভাষা?
ভাষার অনেক রূপ, সে আমরা জানি। ভাষার আঞ্চলিক রূপ থাকে, বৈঠকি রূপ থাকে; বন্ধুদের ভেতর একধরনের ভাষা চলে, পরিবারের ভেতরও। আবার ভাষার একটা প্রমিত রূপ থাকে, যা সাজিয়ে-গুছিয়ে আমাদের সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞানচিন্তার কথাগুলো প্রকাশ করে। এখন দেখি প্রমিত শুনলেই অনেকে লাফিয়ে পড়েন। প্রশ্ন তোলেন, প্রমিত আবার কী? আমি বলি, প্রমিত বলে কিছু নেই ধরে নিলেও প্রতিদিনের ‘স্বাভাবিক’ ভাষা দিয়ে আমরা কত দূর যেতে পারি, কতটা গুছিয়ে সব প্রকাশ করতে পারি? ইংরেজ-আরব-জাপানি-চেক, সবাই তো দেখি সুন্দর গুছিয়ে কথা বলে, তারা যাকে প্রমিত বলে, সেই ভাষায়। ইংরেজি, আরবিরও অনেক রূপ। কিন্তু একটা রূপকে তারা বেছে নেয় তাদের শ্রেষ্ঠ চিন্তাগুলোর বাহন হিসেবে।
একসময় আমরাও নিয়েছিলাম। তখন আমরা অঞ্চলে বলতাম আঞ্চলিক ভাষা, বন্ধুদের সঙ্গে ইয়ার দোস্তির ভাষা; কিন্তু শ্রেণিকক্ষে সাহিত্য-দর্শন আলোচনায় চলত একটা প্রমিত ভাষা। সেটি পশ্চিমবঙ্গের নয়, সেটি একান্ত আমাদের। সেটি বুর্জোয়া ভাষাও নয়, যে-কেউই তা আয়ত্তে নিতে পারত। ভাষার সব রূপে যে বিরাজ করতে পারে সমান দক্ষতায়, এই ফেব্রুয়ারিতে তাকে আমার সালাম। যার কথা শুনলে ভাষার গানটা শুনতে পাই, তাকে সালাম।
৩. এখন বৈশ্বিক পুঁজির দিন। পুঁজি চায় ব্যবসা বাড়াতে। পণ্যের, সামগ্রীর, সেবার। সে জন্য চাই বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য প্রকৃত-মেকি চাহিদা সৃষ্টি করা। এবং সে জন্য চাই চমক। আর চাই একটা দেশের সব মানুষ যাতে একইভাবে পণ্যের দিকে আকৃষ্ট হয়, সে জন্য একটি সাধারণ পণ্য-ভাষা তৈরি করা, যাতে অঞ্চল, শহর-গ্রাম ইত্যাদির কোনো প্রভেদ থাকবে না।
আমাদের ‘স্বাভাবিক’ বাংলা ভাষার এখন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত একই রূপ। এতে পণ্য ঠাকুরদের দারুণ সুবিধা। এই ভাষা দিয়ে পশ্চিমের সব পণ্য সবখানে বিক্রি করা যাবে। লোকে ডাবের পানি ছেড়ে কোক খাবে, পিঠা ছেড়ে খাবে বার্গার।
বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। যত ভাবব, তত ভাষাকে সুন্দর করার জন্য আমরা পথ খুঁজে পাব।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বিজেপির বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ মেহবুবার

সরকার গঠন নিয়ে বিজেপি ও পিডিপির ভাবনা কী, আজ মঙ্গলবারের মধ্যে তা চূড়ান্তভাবে জানানোর নির্দেশ দিয়েছেন জম্মু-কাশ্মীরের রাজ্যপাল এন এন ভোরা। দুই দলের নেতাদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে রাজ্যপাল বলেছেন, সরকার গড়ার বিষয়ে তাঁদের দলের ভূমিকা ও মনোভাব কী তা জানানো হোক।
এই দুই দলের জোট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী পিডিপির মুফতি মুহাম্মদ সাঈদের মৃত্যুর পর থেকে রাজ্যে রাজ্যপালের শাসন জারি রয়েছে। মুফতি-কন্যা মেহবুবা মুফতি শোকপর্বে দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন। কিন্তু মৃত্যুর তিন সপ্তাহ কেটে গেলেও মেহবুবা এখন পর্যন্ত বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গড়ার বিষয়ে মনস্থির করেননি। বরং বিজেপির কোর্টে বলটা ফেলে দিয়ে তিনি বলেছেন, তাঁর বাবার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির যে চুক্তি হয়েছিল, সেই চুক্তি গত ১০ মাসে বাস্তবায়িত হয়নি। নতুন সরকার গড়ার আগে সেই চুক্তি বাস্তবায়নে বিজেপি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিক। না হলে স্রেফ মুখ্যমন্ত্রী হতে তিনি সরকার গড়তে রাজি নন। গত রোববার দলের শীর্ষ নেতাদের যে বৈঠক ডাকা হয়, তাতে মেহবুবা বলেন, এই জোট সরকারের শরিক হওয়ার সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল। বিজেপির বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগও তিনি করেন।
রাজ্যপালের নির্দেশ পাওয়ার পরই রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব জম্মুতে বৈঠকে বসেন। তারপর তাঁরা দিল্লি রওনা দেন। সভাপতি অমিত শাহর সঙ্গে আলোচনা করে তাঁরা রাজ্যপালকে দলীয় অভিমত জানাবেন। দিল্লিতে বিজেপি সূত্রে জানা গেছে, মুফতি মুহাম্মদ সাঈদের সঙ্গে যে সমঝোতা হয়েছিল, তা মেনে চলতে অসুবিধা নেই। কিন্তু তার বাইরে নতুন কোনো শর্ত বিজেপির কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
শ্রীনগর থেকে পিডিপি সূত্রের খবর, বিজেপির সঙ্গে জোট বাঁধার প্রশ্নে দল মোটামুটি দ্বিধাবিভক্ত। যাঁরা মনে করেন এই জোট পিডিপির ক্ষতি করছে, তাঁরা চান সুশাসন দিয়ে দল মানুষের মন জিতুক। এই মহলের মতে, ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লাহ দীর্ঘদিন এনডিএ সরকারের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন। উপত্যকায় তাঁর কোনো প্রভাব পড়েনি।

ড্রোন কাহিনি ও এক বালিকার আর্তি by মনজুরুল হক

ড্রোন হামলায় স্বজন হারানো পাকিস্তানের
নাবিলা এখন বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবিরোধী কণ্ঠ
যুদ্ধটা শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডা অঙ্গরাজ্যের মরুভূমিতে। এক হাজারের বেশি ড্রোনের পাইলট সেখানে পালাক্রমে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা টিভি মনিটরের সামনে বসে থেকে যেন খেলে চলেছেন টান টান উত্তেজনায় ভরা ভিডিও গেমস। দিনে তাঁদের গড়পড়তা পরিচালনা করতে হয় ৬৫টি মিশন, যেগুলোর লক্ষ্যবস্তুর বিস্তৃতি হচ্ছে আফ্রিকা মহাদেশের বুকজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গড়ে ওঠা জঙ্গিঘাঁটি থেকে শুরু করে ইয়েমেনের গিরিখাত হয়ে সিরিয়ার পাহাড়ি ভূখণ্ড ধরে ইরাকের মরুভূমি এবং সেখান থেকে আরও পূর্ব দিকে আফগানিস্তানের দূরবর্তী সব গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত। নেভাডা থেকে সেসব জায়গার দূরত্ব কয়েক হাজার মাইল।
ভিডিও গেমস যাঁরা খেলছেন, তাঁরা স্কুলগামী বালক কিংবা ভিডিও গেমসে বুঁদ হয়ে থাকা নেশাগ্রস্ত যুবক নন, বরং পেশাদার সৈনিক। সেই কাজের জন্য তাঁরা যে নিয়মিতভাবে বেতন পাচ্ছেন তা-ই কেবল নয়, সেই সঙ্গে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠার পর জুটছে পদস্থ সেনা কর্মকর্তার পদবিও। আর কাজটা তাঁদের জন্য অনেক সহজ এ কারণে যে তাঁদের মধ্যে অনেককেই ভিডিও গেমসের নেশায় মোহাচ্ছন্ন থাকা অবস্থায় সৈনিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিরীহ সাধারণ মানুষ হত্যার মানসিক যন্ত্রণা থেকেও এঁরা মুক্ত। কেননা, ভিডিও মনিটরেই তা কেবল তাঁদের প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। ড্রোন হামলায় এ পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার একটি হচ্ছে আফগানিস্তানের সীমান্ত বরাবর অবস্থিত পাকিস্তানের উপজাতীয় এলাকা উত্তর ওয়াজিরিস্তান ও আশপাশের কয়েকটি অঞ্চল। তালেবান আর আল-কায়েদার শক্ত ঘাঁটি হিসেবে সেই সব এলাকা অনেক দিন থেকেই পরিচিত। তবে জঙ্গি আস্তানা হিসেবে পরিচিত হওয়ার কারণেই হয়তো সন্ত্রাসবাদী হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যও আবার হতে হচ্ছে পশ্চাদ্বর্তী সেই সব অঞ্চলকে, কেননা মানুষকে ভয় দেখিয়ে আধিপত্য বজায় রাখা হচ্ছে জঙ্গিদের একটি প্রধান কৌশল।
তাই দ্বিমুখী সেই ভীতিকর অবস্থার মধ্যে বসবাস করতে হওয়ায় দুই দিক থেকে আসা আঘাতেই চরম দুর্দশার মধ্যে পড়তে হচ্ছে সেখানকার লোকজনকে। অন্যদিকে তাঁদের সেই বঞ্চনা আর দুর্দশাকে পুঁজি করে প্রচারযুদ্ধে একে অন্যকে ঘায়েল করার জন্য চালিয়ে যাওয়া প্রচেষ্টায়ও অজান্তেই জড়িয়ে পড়ছেন সেই এলাকারই কিছু মানুষ। এই দ্বিতীয় দলের মধ্যে থেকে মালালা ইউসুফজাই নামের বালিকাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দিয়েই কেবল বসে নেই প্রচারযুদ্ধের পশ্চিমের কান্ডারিরা, সেই বালিকাকে এখন বিশ্বের আনাচকানাচে পাঠিয়ে কতটা নির্মম সন্ত্রাসী জঙ্গিরা, তা প্রমাণের চেষ্টাও তারা সমানে করে চলেছে। সে রকম ঢাকঢোল পেটানো প্রচারের কল্যাণে তালেবান আর আল-কায়েদার অন্যায় আচরণের শিকার হওয়া ও সেই সঙ্গে নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এক সাহসী বালিকা হিসেবে মালালার পরিচয় আমরা জেনে নিচ্ছি এবং বালিকার সাহসের কাহিনি পাঠ করে আবেগে আমরা হচ্ছি আপ্লুত।
তবে মালালার সেই বীরত্বের কাহিনি গল্পের পুরোটা নয়। সম্পূর্ণ সেই গল্পে আরও রয়েছেন বিশ্বজুড়ে নাম-পরিচয়হীন অনেক মানুষ, নেভাডার মরুভূমি থেকে উড়ে আসা হন্তারক দানবের হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রাণপণে এদিক-সেদিক ছুটে যাওয়ার পরও নিজেদের জীবন বাঁচাতে ব্যর্থ হচ্ছেন যাঁদের অনেকে। পাল্লায় ভারী সেই অবহেলিত দলটিতে মালালার ঠিক বিপরীতে আছে প্রায় একই বয়সের অন্য এক বালিকা, নাম যার নাবিলা রেহমান।
গত বছরের নভেম্বর মাসে বাবার হাত ধরে নাবিলা এসেছিল জাপানে তার জীবনে ঘটে যাওয়া এমন কিছু মর্মান্তিক ঘটনার কথা জাপানবাসীকে জানাতে, মালালাকে নিয়ে মত্ত থাকার ডামাডোলে যার কিছুই আমরা সেভাবে শুনতে পাইনি। ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে নাবিলার বয়স যখন ছিল ১২ বছর, পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে সেই দিনটি সে বাড়িতেই কাটিয়েছিল, ঈদের আসন্ন প্রস্তুতি হিসেবে স্কুল বন্ধ থাকায় পরিবারের কাজে সাহায্য করছিল সে এবং কল্পনায়ও ভাবেনি বাড়ির আশপাশের নিরাপত্তা ভেদ করে আকাশ থেকে ছুটে আসা হন্তারক আঘাত হানবে তাদের সেই পুরো পরিবারের ওপর। সেটা ছিল ২০০২ সাল থেকে শুরু হওয়া এলাকার ওপর মার্কিন সামরিক বাহিনীর চালিয়ে যাওয়া অগণিত ড্রোন হামলার একটি, যে হামলায় নাবিলার বৃদ্ধা পিতামহী তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণ হারান এবং নাবিলা ও তার এক বোনসহ আরও কয়েকজন গুরুতরভাবে আহত হন।
২০১২ সালের অক্টোবর মাসে চালানো সেই ড্রোন হামলার পরপর পলায়নপর পাঁচ জঙ্গির ঘটনাস্থলে ঘায়েল হওয়ার কথা মার্কিন সামরিক বাহিনী বিশ্ববাসীকে জানিয়ে অভিযানের সাফল্যের উল্লেখ করেছিল। তবে ঘটনা হচ্ছে, সেদিনের সেই হামলায় নিহত হয়েছিলেন পাঁচজন নয়, মাত্র একজন, আর তিনি হলেন নাবিলার মাতামহী। অন্য যে কয়েকজন এতে আহত হন, সেই দলে নাবিলাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সবাই তাঁরা সেদিন জড়ো হয়েছিলেন শসাখেতের ফলন তুলে আনতে, বন্দুক হাতে সন্ত্রাসী কোনো অভিযান চালাতে নয়। সে রকম এক নিষ্কলঙ্ক মুহূর্তেই তাঁদের ওপর আঘাত হানে প্রাণঘাতী ড্রোন।
জাপানের সমাবেশে নাবিলা সেদিন শুনিয়ে গেছে তার কৈশোরের স্বপ্নভঙ্গের কথা, আর সেই সঙ্গে আরও বলে গেছে নতুন যে স্বপ্ন সে এখন দেখছে, সে কথাও। নাবিলার নিজের বয়ানে তার সেই বক্তব্য ছিল এ রকম: ‘আমি খুশি যে (মালালা) ইউসুফজাই অত্যন্ত সম্মানিত একটি পুরস্কার পেয়েছে। এটা নিশ্চয় সুখবর, তবে আমি চাই যুদ্ধ যেন বন্ধ হয়। আমি আরও চাই সমাজ যেন শিক্ষিত হয়। আর এটাই হচ্ছে আমার চাওয়ার একমাত্র লক্ষ্য।’
সন্দেহ নেই, বালিকার চাওয়ার ব্যাপ্তি খুবই সীমিত। তবে আকাশজুড়ে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করে যারা এখন বিশ্বের মোড়ল হিসেবে ছড়ি ঘোরানোর পাঁয়তারায় ব্যস্ত, সীমিত সেই চাহিদার দিকে কর্ণপাতের বিন্দুমাত্র ইচ্ছা বা কোনো রকম সময় তাদের একেবারেই নেই। ড্রোন হামলায় হতাহত সবার দেহে সন্ত্রাসী-জঙ্গি ছাপ মেরে দিয়ে কালক্ষেপণ না করে প্রচার করা তাদের সব বার্তা, সেই পরিষ্কার ইঙ্গিত আমাদের দিচ্ছে।
ধাতু আর কলকবজায় তৈরি রোবট যুদ্ধে ব্যবহার করা কতটা যুক্তিসংগত, রোবটের আবিষ্কারকেরা কিন্তু শুরু থেকেই নৈতিক সেই প্রশ্ন তুলে আসছেন। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মূল লক্ষ্য মানবকল্যাণ হয়ে থাকলে রোবটের ব্যবহার কল্যাণকর কাজেই সীমিত থাকা উচিত। তবে সভ্যতার ইতিহাস আমাদের বলে দেয় যে যুদ্ধবাজরা মানবকল্যাণকে সব সময় নিজেদের সংকীর্ণ লক্ষ্যে কাজে লাগাতে তৎপর। ড্রোন নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলতে থাকা খেলাও হচ্ছে সেই ধারাবাহিকতারই একটি দিক, যা কিনা সাধারণ মানুষের জীবনকে করে তুলছে বিপর্যস্ত। ড্রোন বা চালকবিহীন বিমানও এক অর্থে হচ্ছে রোবট, মানুষের জীবন সহজ করে দেওয়ার জন্য নানা রকম কাজে যেটা ব্যবহার করা সম্ভব। তবে সমরবলে বলীয়ানরা অন্য যে স্বপ্ন এর মধ্য দিয়ে দেখতে শুরু করেছে তা হলো, পৃথিবীর বড় অংশকে নিজেদের বশংবদ করে রাখার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত করতে জুতসইভাবে সেটাকে কাজে লাগানো। ঠিক সে রকম স্বপ্নই দেখেছিল বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির লেখক জুলে ভার্নের একটি উপন্যাসের খলনায়ক, পরিণতি হিসেবে নিজের পতন যে শেষ পর্যন্ত ডেকে আনে। নেভাডার মরুভূমির স্বপ্নচারীদেরও সেই একই পরিণতি এখন প্রত্যাশা করছে বিশ্বের বিবেকবান জনতা।
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।

নয়া আতঙ্ক জিকা, সতর্কতা by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও হাসনাইন মেহেদী

বিশ্বজুড়ে এখন নতুন আতঙ্কের নাম জিকা ভাইরাস। মধ্য ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে এ ভাইরাসের সংক্রমণ। এশিয়ার কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে ভাইরাসটি প্রতিরোধে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে ৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষ। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কেউ জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হননি। বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
জিকা ভাইরাস মহামারিতে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি হিসেবে ঘোষণা করা হবে কিনা তা নিয়ে গতকাল জেনেভায় বৈঠকে বসে সংস্থাটি। আলজাজিরার খবরে বলা হয়, বৈঠকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগ দেন আক্রান্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিরা। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞরা। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বৈঠক চলছিল। বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে তা আজ প্রকাশ করার কথা রয়েছে। জিকা ভাইরাস প্রতিরোধে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণে চাপের মুখে রয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এর আগে সংস্থাটি স্বীকার করে, সাম্প্রতিক ইবোলা মহামারি প্রতিরোধে তাদের পদক্ষেপ যথেষ্ট বেগবান ছিল না।
জিকা ভাইরাস কী: জিকা ভাইরাস ইতিমধ্যে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়লেও এ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই অনেকেরই। ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশার কামড়ে জিকা ভাইরাসের সংক্রমণ হয়ে থাকে। এ ভাইরাসের এখনও কোনো প্রতিষেধক তৈরি হয়নি। এর কোনো চিকিৎসাও নেই। গবেষকরা বলছেন, জিকা ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরি করতে ৩-৫ বছর লাগতে পারে। এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সামান্য জ্বর, চোখের এক ধরনের প্রদাহ বা মাথাব্যথার মতো লক্ষণ দেখা যেতে পারে। তবে জিকা ভাইরাসের ৮০ শতাংশ সংক্রমণেই কোনো লক্ষণ প্রকাশ না-ও পেতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। জিকা ভাইরাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এতে আক্রান্ত নারীদের প্রসব করা শিশুর মস্তিষ্ক অপুষ্ট ও অবিকশিত অবস্থায় থাকে। জন্ম নেয়া শিশুর মাথার আকারও ছোট হয়। চিকিৎসাশাস্ত্রে এ বিকলাঙ্গতার নাম মাইক্রোসেফালি। ব্রাজিলে এ রোগের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর দেশটিতে অবিকশিত মস্তিষ্কবিশিষ্ট শিশুর জন্মের হার বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে ইকুয়েডর, এল সালভাদর, কলম্বিয়া ও জ্যামাইকা নারীদের সন্তান ধারণ বিলম্বিত করার পরামর্শও দিয়েছে। দেশগুলো বলছে, এ ভাইরাস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানার আগ পর্যন্ত যেন নারীরা সন্তান ধারণ না করেন।
প্রথম শনাক্ত ২০১৪-এর অক্টোবরে: এখন পর্যন্ত জিকা ভাইরাসে সবচেয়ে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়েছে ব্রাজিল। অক্টোবর মাসে দেশটির উত্তর-পূর্বে অপুষ্ট ও অবিকশিত মস্তিষ্ক নিয়ে শিশুদের জন্ম বেড়ে গেছে বলে লক্ষ্য করা হয়। তখন থেকে এখন পর্যন্ত মাইক্রোসেফালি আক্রান্তের ২৭০টি ঘটনা নিশ্চিত হওয়া গেছে। সন্দেহের তালিকায় রয়েছে ৩৪৪৮টি ঘটনা। এরপর ধীরে ধীরে সংক্রমণের খবর আসে কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, এল সালভেদর, জামাইকা ও পুয়ের্তো রিকোতে। ব্রাজিলের পর সবচেয়ে বেশি সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে কলম্বিয়াতে। দেশটি জানিয়েছে, এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ। এদের দুই তৃতীয়াংশই নারী। এছাড়া ইউরোপ আর উত্তর আমেরিকাতেও ছড়িয়ে পড়ে সংক্রমণের ঘটনা। সেখানে ভাইরাসে আক্রান্ত কয়েক ডজন ঘটনা শনাক্ত করা হয়।  
বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ সতর্কতা: জিকা ভাইরাস আতঙ্কে ইতিমধ্যে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে ভ্রমণের ব্যাপারে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এ ভাইরাস সংক্রমণের বিরুদ্ধে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বানও জানিয়েছেন। আমেরিকা অঞ্চলে পুর্তো রিকো দিয়ে শুরু হলেও এখন বেশ কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে জিকা ভাইরাসের সংক্রমণ। ব্রাজিল, ডেনমার্ক, যুক্তরাষ্ট্র, এল সালভাদরসহ আরও কয়েকটি দেশে এ ভাইরাসে আক্রান্তদের খোঁজ পাওয়া গেছে। এ পরিস্থিতিতে আমেরিকা অঞ্চলে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সতর্কতা জারি করেছে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো। এছাড়া এসব অঞ্চলে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিজ নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের জনস্বাস্থ্য সংস্থা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল এবং অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগ।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে গর্ভবতী নারীরা: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা: এবিএম আব্দুল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, ডেঙ্গুর মতোই জিকার লক্ষণ। এটি আসলে এডিস মশার কামড়ে হয়ে থাকে। আমাদের দেশে এখনও এরকম রোগীর কোনো রিপোর্ট হয়নি। এটা যে কোনো বয়সের লোকের হতে পারে। উপসর্গ হলো- জ্বর, ফুসকুড়ি, হাড়ের জোড়ায় ব্যথা, চোখের প্রদাহ। মায়ের কাছ থেকে গর্ভস্থ শিশুর শরীরে সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। সুস্থ ব্যক্তিকে কামড়ানোর মাধ্যমে ভাইরাসটি মশা ছড়িয়ে দেয়। রক্তের মাধ্যমেও জিকা ভাইরাস ছড়াতে পারে। তবে এমনটা কম ঘটে। তিনি বলেন, জিকা ভাইরাস অন্যদের জন্য তেমন সিরিয়াস নয়। তবে গর্ভবতী নারীদের জন্য আসলেই আতঙ্কের বিষয়। শিশুদের ‘মাইক্রোসেফালি’ রোগ হওয়ার কারণে মাথা ছোট হয়ে থাকে। এই রোগ হলে শিশুদের মস্তিষ্কের গঠন ঠিকমতো হয় না। ফলে শিশুর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হওয়া, শারীরিক বৃদ্ধি অস্বাভাবিক বা বিলম্বিত হওয়া থেকে শুরু করে অকালে মারা যাওয়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়? তিনি বলেন, মশা নিধন করার ব্যবস্থা করতে হবে। মশা থেকে বাঁচার জন্য স্প্রে করতে হবে। এটি দিনে কামড়ায়। তাই মশারি টানিয়ে ঘুমাতে হবে। বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়ার সময় ফুলপ্যান্ট এবং মোজা পরতে হবে। বিদেশে থেকে যারা বাংলাদেশে আসছেন, তাদের দিকে নজর রাখতে হবে। লক্ষণগুলো দেখতে হবে। বিশেষ করে যেসব দেশে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের না আসাই ভালো বলে তিনি মন্তব্য করেন। এই বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ভয়ের কারণ নেই। তবে জিকা ভাইরাস নিয়ে টেনশন আছে। জিকা ভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। ভ্যাকনিশেনও নেই।  তিনি আরও জানান, প্যারাসিটামল, পানি, সরবত খেতে হবে। চিকিৎসা না করলেও ভালো হবে বলে অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ জানিয়েছেন।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমান এ বিষয়ে মানবজমিনকে বলেন, আমাদের এখানে এ ধরনের ঘটনা পাওয়া যায়নি।  সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।

পাষণ্ড

নির্মম। মর্মান্তিক। হৃদয়বিদারক। কোনো শব্দেই বোঝানো যাবে না ঘটনার অভিব্যক্তি। শিশু জন্মের আনন্দ এখানে মৃত্যুর নির্মমতায় মোড়া। পাষণ্ডতার শিকার যেখানে নিষ্পাপ শিশু। এমনই এক ঘটনা গতকাল ঘটেছে রাজধানীতে। ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুসন্তানকে জন্মের পরই পাঁচতলা থেকে ছুড়ে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন এক মা। তার দাবি, নিজে অন্যের লালসার শিকার হয়ে সন্তান ধারণ করেছিলেন। আর শিশুটিকে এ কারণে জন্মের পর হত্যার চেষ্টা চালান। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল শিশুটির প্রতি। পাঁচতলা থেকে ফেলে দেয়া শিশুটি কিছুটা আহত হলেও তাকে নিয়ে তেমন শঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
রাজধানীর বেইলি রোডে গতকাল দুপুরে ঘটে নির্মম ঘটনাটি। খবর পেয়ে ওই নবজাতক ও তার মাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে পুলিশ। নবজাতকের মায়ের নাম বিউটি আক্তার। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ষোল বছরের এই কিশোরী জানিয়েছে, এ সন্তানের জনক তার ভগ্নিপতি। সামাজিক মর্যাদার কথা চিন্তা করেই নবজাতককে জন্মের পরই জানালা দিয়ে ফেলে দেন। খবর পেয়ে পুলিশ, মিডিয়াকর্মী ও আশপাশের লোকজন ওই বাড়ির সামনে ভিড় জমান।
নিউ বেইলি রোডের ২৬ নম্বর প্রপার্টি ম্যানসনের পাঁচতলায় থাকতেন বিউটি আক্তার। ভবন ঘেঁষে রাস্তার পাশেই দোতলা একটি মার্কেট। ওই মার্কেটের ছাদ থেকেই নবজাতককে উদ্ধার করা হয়। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ওই মার্কেটের সায়মা ফ্যাশনের আবদুর রহমান জানান,  সময় তখন দুপুর সাড়ে ১২টা। হঠাৎ করে কিছু একটা ছুঁড়ে ফেলার শব্দ পান তিনি। সঙ্গে শিশুর কান্নার শব্দ। ভেতরের সিঁড়ি দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে দোতলায় ওঠেন তিনি। কান্নার শব্দ শুনে দোতলার বারান্দায় গিয়ে নবজাতককে দেখে কাঁপতে থাকেন আবদুর রহমান। তিনি বলেন, যা দেখলাম তা কল্পনা করিনি। বারান্দায় বাচ্চাটি কান্নাকাটি করছিল। তার শরীরে তখনও রক্ত লেগে আছে। পানির একটি ঝারের মধ্যে পড়েছিল ওই শিশু। যে কারণে শিশুটি বেঁচে গেছে বলে মনে করেন তিনি।
তাৎক্ষণিকভাবে আশপাশের লোকদের বিষয়টি জানানো হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে নবজাতককে উদ্ধার করে মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ। সেখানেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে এই শিশুকে। রমনা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম জানান, নবজাতকের মা বিউটি একজন কিশোরী। প্রায় ১০ মাস আগে কুমিল্লায় তার বড় বোন লিপি আক্তারের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল বিউটি। সেখানে তার ভগ্নিপতি নীরব তাকে ধর্ষণ করেছে বলে দাবি করেছে সে। বিউটি দাবি করেছে, ঘুমের ওষুধ সেবন করিয়ে তাকে ধর্ষণ করেছে নীরব। পরবর্তীতে গর্ভবতী হয়ে পড়ে বিউটি। কিন্তু লজ্জায় একথা কাউকে জানায়নি সে।
গতকাল সকাল ৮টা থেকেই অসুস্থ ছিল বিউটি। বাসার কাজ না করে দরজা বন্ধ করে তার কক্ষে শুয়ে ছিল। দুপুরের আগে বাসার ওই রুমেই পুত্র সন্তান প্রসব করে। সামাজিক নানা বিষয় চিন্তা করে তাৎক্ষণিকভাবে নবজাতককে জানালা দিয়ে ফেলে দেয়। কিন্তু পাশের দ্বিতীয় তলার মার্কেটের খোলা বারন্দায় পানির ঝারে পড়ে বেঁচে যায় শিশুটি। খবর পেয়ে পুলিশ ওই বাড়ি টার্গেট করে অনুসন্ধান চালিয়ে অসুস্থ অবস্থায় বিউটি আক্তারকে খুঁজে পায়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বিষয়টি স্বীকার করে সে। পরবর্তীতে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অন্যদিকে নবজাতককে বড় মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ওই হাসপাতালের ব্যবস্থাপক আসাদুর রহমান জানান, নবজাতককে এনআইসি বিভাগে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে সে আশঙ্কামুক্ত বলে জানান তিনি।
ওই বাড়ির গৃহকর্তা আজমল হকের স্ত্রী ফিরোজা হক জানান, বিউটি গর্ভবতী ছিল তা তারা বুঝতে পারেননি। এমনকি সন্তান প্রসব করেছে তাও টের পাননি তারা। ওই বাসায় পরিবারের সদস্য ছাড়া বাইরের কেউ থাকেন না বলে জানান তিনি। বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী ইসমাইল জানান, রোববার সন্ধ্যায়ও বিউটিকে পাশের দোকানে আসা-যাওয়া করতে দেখেছেন তারা। তখনও মনে হয়নি সে গর্ভবতী।
বিউটি আক্তারের গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার নওকর গ্রামে। বেইলী রোডের ২৬ নম্বর প্রপার্টি ম্যানননের আজমল হক ও ফিরোজা হকের বাসায় ৯ বছর ধরে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছে সে।

যানজট: স্বল্পমেয়াদি কয়েকটি পদক্ষেপ by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

রাজধানী ঢাকার যানজট অনেক আগেই অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ঢাকায় বসবাসরত ও কর্মোপলক্ষে আগত কারও পক্ষে এখন ঢাকায় দিনে-রাতে দুটির বেশি প্রোগ্রাম করা সম্ভব নয়। যানজটকে বাস্তবতা মেনে নিয়ে রাজধানীর মানুষ এখন তাদের দিনের কর্মসূচি প্রণয়ন করে।
ঢাকার যানজট প্রচলিত অর্থে কোনো ‘স্থানীয়’ সমস্যা নয়। এ মহানগরে সারা দেশ থেকে প্রতিদিন মানুষ আসে নানা কাজে, নানা প্রান্তে তাদের যেতে হয়। এখানে সচিবালয়, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর অফিস, মন্ত্রীদের অফিস, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের হেড অফিস, দূতাবাস, বিদেশি সংস্থার অফিস, বেসরকারি সংস্থার প্রধান কার্যালয়, আরও কত কী!
যেকোনো সমস্যার তিন ধরনের সমাধান থাকে। স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি। যানজট নিরসনে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি কয়েকটি সমাধানের কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। ফ্লাইওভার ও মেট্রোরেল নির্মাণ। প্রথমটির ফল পেতে আরও দুই থেকে তিন বছর, দ্বিতীয়টির ফল পেতে পাঁচ থেকে সাত বছর লাগতে পারে। দুটোই গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় কাজ। মেট্রোরেল যানজট সমস্যার অনেকটা সমাধান করতে পারবে বলে মনে হয়। কারণ, মেট্রোরেল একসঙ্গে কয়েক হাজার যাত্রী নিয়ে চলাচল করবে। কিন্তু ফ্লাইওভার যানজট নিরসনে খুব একটা বড় ভূমিকা রাখতে পারবে না বলে অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছেন। ফ্লাইওভার যেমন অনেক গাড়িকে রাস্তা থেকে ওপরে নিয়ে যাবে, তেমনি প্রতিবছর আরও হাজার হাজার নতুন গাড়ি রাস্তায় নামবে। গাড়ি কেনার ব্যাপারে বাংলাদেশে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। টাকা থাকলে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য অনেকে গাড়ি কিনছেন। কাজেই ফ্লাইওভার যানজট নিরসনে বড় ভূমিকা পালন করবে না। ঢাকার মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার ও চট্টগ্রামে বহদ্দারহাটের ফ্লাইওভার তার দুটি প্রমাণ। কিন্তু সরকার ফ্লাইওভার নির্মাণে দারুণ উৎসাহী।
সরকার যেদিকে মনোযোগ দিচ্ছে না, তা হলো স্বল্পমেয়াদি সমাধান। এ ব্যাপারে সরকার সক্রিয় নয় বলে যানজট সমাধানে সরকারের অনাগ্রহ প্রকাশ পায়। স্বল্পমেয়াদি সমাধান কী কী? এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা কয়েকটি ধারণা এখানে বলতে পারি।
১. সরকার পর্যায়ক্রমে এক বছরের মধ্যে ৫০০ আধুনিক এসি ও নন-এসি বাস রাস্তায় নামানোর জন্য প্রাইভেট সেক্টরকে নানা প্রণোদনা দিতে পারে। বাস কোম্পানি গঠন, রুট প্ল্যান, বাস স্টপ, বাসের রং নির্ধারণ করে দিতে পারে। ঢাকার জন্য যারা বড় বাস আমদানি করবে (দুই বছর), তাদের নানা আর্থিক প্রণোদনা (ঋণ, কর হ্রাস, আয়কর দুই বছর মওকুফ) দিতে পারে। রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও লক্কড়ঝক্কড় বাসের মালিকদের বাস আমদানির জন্য অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে, যাতে তাঁরা ঢাকা শহরের মূল রাজপথে রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা আর না চালান। রিকশা ও অটোরিকশার যাত্রীরা যেন প্রধান রাস্তার পাশে সব রকম গন্তব্যে বাসে করে যেতে পারে। পুরান ঢাকার জন্য কয়েকটি কোম্পানি করে নতুন ও পরিকল্পিত রুটে মাইক্রোবাস চালানোর ব্যবস্থা করা যায়। (বড় বাস সেখানে না চালানোই ভালো হবে।) ঢাকায় (এ মাথা থেকে ও মাথা, স্টপ, নন-স্টপ এক্সপ্রেস) পরিকল্পিত রুটে সীমিত কোম্পানির মাধ্যমে, এসি ও নন-এসি আধুনিক বাস চলাচল করলে আমাদের ধারণা ৫০ শতাংশ গাড়ির চলাচল কমে যাবে। পাশাপাশি নির্ধারিত স্থান ছাড়া গাড়ি পার্কিং করতে না দিলে, ‘নিষিদ্ধ’ জায়গায় গাড়ি পার্কিং করলে ন্যূনতম ৫০০ টাকা দণ্ড দিতে হলে, পার্কিং জোনেও এক বা দুই ঘণ্টার বেশি পার্কিং করলে ঘণ্টাপ্রতি টাকা দণ্ড দিতে হলে অনেকে কর্মদিবসে গাড়ি ব্যবহার করবেন না। শুক্র, শনি ও সরকারি ছুটির দিনে এসব শর্ত শিথিল করা যায়। এগুলো নতুন চিন্তা নয়। উন্নত দেশে এগুলো সবাই দেখেছেন। মন্ত্রী, সচিব, এমপিরাও দেখেছেন। কিন্তু তাঁরা বিদেশের এসব ভালো দৃষ্টান্ত নিজের দেশে বাস্তবায়ন করতে পারেননি। কেন পারেননি, সে কথা কোনো মন্ত্রী, সচিব ও এমপির মুখে কখনো শুনিনি।
সম্প্রতি উত্তর সিটির মেয়র আনিসুল হক বলেছেন, তিনি অচিরেই ঢাকায় ৫০০ বাস নামাবেন। তাঁর এই পরিকল্পনা বিস্তারিত জানা যায়নি। তবে এটুকু বলতে পারি, বাস নামানো তাঁর কাজ নয়। তা ছাড়া সরকারি কোনো সংস্থা বাস না নামালেই ভালো হয়। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সরকারের কাজ ব্যবসা করা নয়।’ আমরা বিআরটিসির ব্যর্থতা দেখেছি। মেয়র সাহেব তাঁর পরিকল্পনার কথা যোগাযোগমন্ত্রীকে বলতে পারেন, যাতে মন্ত্রী ঢাকায় ৫০০ বাস নামানোর জন্য একটা নীতিমালা ও প্রণোদনা ঘোষণা করেন। বাসের ব্যবসা করবে প্রাইভেট সেক্টর।
২. ঢাকার হকার-অধ্যুষিত ফুটপাত পর্যায়ক্রমে মুক্ত করতে পারলে অনেক নাগরিক রাস্তা ছেড়ে ফুটপাত দিয়ে চলাচল করতে পারবে। তবে তার আগে থানা পর্যায়ে হকারদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা বরাদ্দ করতে হবে ঘণ্টা হিসেবে ভাড়া নিয়ে। সব হকারের দোকান হবে অস্থায়ী। তারও আগে হকারদের ফি দিয়ে লাইসেন্স নিতে হবে। উন্মুক্ত জায়গা পাওয়ার ভিত্তিতে হকার-সংখ্যা নির্ধারণ হবে। এভাবে ছয় মাসের মধ্যে ঢাকার হকারবহুল সব ফুটপাত হকারমুক্ত করা সম্ভব। শুক্র ও শনিবার বড় মাঠে বা বিশেষ এলাকায় ‘হলিডে মার্কেট’ (হকারদের) বসার অনুমতি দেওয়া যায়। নাগরিকেরা ফুটপাত ব্যবহার করে হেঁটে কাছের গন্তব্যে যেতে পারলে অনেকে বাস, রিকশা বা অটো নিতে আগ্রহী হবে না। এতেও যানবাহনের ব্যবহার কিছুটা কমবে, রাস্তা পরিষ্কার হবে।
৩. গাড়ি পার্কিং ঢাকার একটি সমস্যা। পার্কিং সম্পর্কে ঢাকায় কোনো সরকারি নীতি নেই। শুধু কিছু জায়গায় ‘নো পার্কিং’ সাইন দেখা যায়। তবে ‘ইয়েস পার্কিং’ কোথায়, তা চিহ্নিত নয়। ঢাকার কোনো কর্তৃপক্ষ পার্কিং-নীতি ঘোষণা করেনি। এ ব্যাপারে একটা নীতিমালা ঘোষণা করা দরকার। ‘নো পার্কিং’ ও ‘ইয়েস পার্কিং’ চিহ্নিত করা দরকার। এই মুহূর্তে শহরে খালি জায়গায় অন্তত কুড়িটি বহুতল পার্কিং ভবন সরকারিভাবে তৈরি করা উচিত। জনবহুল, অফিসবহুল এলাকায় বহুতল পার্কিং ভবন তৈরি করতে হবে। ঘণ্টা হিসেবে ফি দিয়ে গাড়ি পার্কিং করতে হবে। সরকারের এই প্রকল্প সফল হলে একই মডেলে প্রাইভেট সেক্টরকে সরকারি জমিতে বহুতল পার্কিং ভবন তৈরির জন্য প্রণোদনা দিতে হবে। কোনো ব্যস্ত সড়কে গাড়ি পার্কিং করতে দেওয়া যাবে না। মতিঝিলে সিটি সেন্টারে গাড়ি পার্কিং করতে হবে। নিজের অফিসের সামনে বা পাশে গাড়ি পার্কিং নিষিদ্ধ করতে হবে। অনেক দূর হেঁটে পার্কিং জোনে গাড়িতে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বিভিন্ন গন্তব্যে আধুনিক এসি বাস রুট চালু হলে এমনিতে গাড়ি চলাচল হ্রাস পাবে। তাতে পার্কিং সমস্যাও হ্রাস পাবে।
৪. ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারে দিল্লির মতো জোড়-বেজোড় গাড়ি এক দিন পরপর চলাচলের নীতিটি ঢাকায়ও চালু করা যায়। তবে তার আগে ৫০০ নতুন বাস বিভিন্ন রুটে চালু করতে হবে। বিভিন্ন সরকারি অফিসে, সচিবালয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের (সচিবসহ) জন্য আধুনিক এসি মাইক্রোবাস (ছয়-সাতজন) দেওয়া যেতে পারে, যাতে এক যানবাহনেই ছয়-সাতজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এক অফিস ভবনে যাতায়াত করতে পারেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এভাবে চলাচল করেন। এতে তাঁদের সম্মানহানি হয়েছে বলে কেউ বলেননি।
৫. ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে গাড়ি ক্রয়ের ব্যাপারে একটা নীতিমালা করা দরকার। শহরের রাস্তায় কত গাড়ি চলতে পারে, তার সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে। এ রকম কয়েকটি স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ নিলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের যানজট অনেকাংশে হ্রাস পেতে পাবে।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, এই কাজগুলো কে করবে? আমাদের উত্তর: সরকার করবে। অনুমান করছি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (ট্রাফিক পুলিশ ও পুলিশ), দুই সিটি করপোরেশন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় (বাস আমদানির উদার ব্যবস্থা) প্রধানত এই কাজগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এসব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা যদি এই উদ্যোগ নেন, তাহলে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সহায়তা করবেন। তবে মন্ত্রীরা নিজের উদ্যোগে অনেকে কাজ করতে চান না। তাঁরা চান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা। সে রকম সমস্যা হলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে কাজের তালিকাগুলো পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী সেভাবে নির্দেশনা দিতে পারেন। কে নির্দেশনা দিচ্ছেন, জনগণের কাছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। জনগণ চায় তাদের সমস্যার সমাধান হোক। দ্রুত হোক।
এসব পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে যদি ঢাকা ও চট্টগ্রামের যানজট হ্রাস পায়, তাহলে কৃতিত্ব পাবেন বর্তমান সরকার, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রী-মেয়ররা। বিএনপি বা কোনো বিরোধী দল এই কৃতিত্বের দাবিদার হবে না।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

চিকিৎসক কি রোগীর প্রতিপক্ষ? by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

ধর্মঘটের কারণে চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে শিশুটি
জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ একবার ঠাট্টা করে বলেছিলেন, তিনি সবচেয়ে অপছন্দ করেন ডাক্তারদের। কেন? তাঁর সরস জবাব, ‘শরীরটা আমার, অথচ এই শরীর সম্পর্কে আমার চেয়ে তিনি বেশি জানেন, এটা মেনে নিতে কষ্ট হয়’ (হুবহু উদ্ধৃতি নয়)। কথাটা হ্ুমায়ূনের স্বভাবসুলভ রসিকতাচ্ছলেই বলা। তবে এ কথার মধ্যে কোথায় যেন রোগীর আসল অবস্থার একটা পরিচয়ও পাওয়া যায়। চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করার সময় যেকোনো রোগীর চেহারায় যে একটা অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে, এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তখন তাঁর সামনে ত্রাতার ভূমিকায় থাকেন চিকিৎসক। তাঁর চেহারার দিকে তাকিয়ে যেন নিজের ভাগ্য বুঝতে চেষ্টা করেন রোগী। সেই চেহারায় আশ্বাস বা অভয় পেলে প্রায় শিশুর সারল্যে হাসেন যন্ত্রণাকাতর রোগীও। এই হচ্ছে চিকিৎসক-রোগীর সম্পর্ক। কিন্তু এই চিকিৎসক যদি কোনো কারণে প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠেন, রোগীর জীবনের জন্য এর চেয়ে বড় শঙ্কার কারণ আর কিছুই হতে পারে না।
চট্টগ্রামের চিকিৎসকেরা ২০ থেকে ২৪ জানুয়ারি পাঁচ দিন কর্মবিরতি বা ধর্মঘট পালন করেছেন সাধারণ রোগীদের বিরুদ্ধে। ধর্মঘট রোগীদের বিরুদ্ধে বলছি এ কারণে যে সরকারি কোনো সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বা অন্য কোনো দাবিদাওয়ার জন্য নয়, একজন রোগীর মৃত্যুর কারণটি ‘অপচিকিৎসা’ দাবি করে তাঁর আত্মীয়স্বজন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা করলে এই কর্মবিরতির বা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) চট্টগ্রাম শাখার নেতারা। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উদ্বেগ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও সাংবাদিক নেতাদের মধ্যস্থতায় পঞ্চম দিনে এসে শর্ত সাপেক্ষে চিকিৎসকেরা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে নিলে আপাতত স্বস্তি এসেছে নগরবাসীর জীবনে।
সরকারি হাসপাতালগুলো অবশ্য ধর্মঘট ও কর্মবিরতির আওতামুক্ত ছিল। স্বাভাবিকভাবেই এসব হাসপাতালে রোগীদের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়েছে চিকিৎসক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে। বেসরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে যাঁরা চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে গেছেন, তাঁদের দুর্ভোগের কিছু সচিত্র বিবরণ পত্রপত্রিকায় এসেছে বটে, কিন্তু প্রকৃত ক্ষতির নির্ভুল কোনো পরিসংখ্যান আমাদের হাতে নেই। বিএমএর সমাবেশে একজন চিকিৎসক নেতা স্বীকার করেছেন, এই অঞ্চলে ৬০ শতাংশ রোগী বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও চিকিৎসকের ওপর নির্ভরশীল। যদি তাঁর পরিসংখ্যানকে সঠিক ধরে নিই, তাহলে এই বিরাট অঙ্কের মানুষের রোগযন্ত্রণা ও চিকিৎসাবঞ্চনার খোঁজ কতটুকুইবা জানা সম্ভব আমাদের পক্ষে?
সেদিন চিকিৎসকের অবহেলা বা ভুল চিকিৎসায় প্রসূতি মেহেরুন্নেছার মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করে ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত আত্মীয়স্বজন স্থানীয় একটি ক্লিনিকে ভাঙচুর চালান। এটা কিছুতেই সমর্থনযোগ্য নয়। আদৌ অবহেলা বা ভুল চিকিৎসা হয়েছে কি না, তা হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষমাণ আত্মীয়স্বজন বুঝে না-বুঝে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ভাঙচুর চালাতে শুরু করবেন, এটা খুবই খারাপ দৃষ্টান্ত। কিন্তু সত্যিই যদি কারও মনে হয় যে তাঁর নিকটজনটি অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার শিকার, তাহলে প্রতিকার চাওয়ার অধিকার কি তাঁর নেই?
নিহত মেহেরুন্নেছার বাবা খায়রুল বশর তাঁর মেয়ের চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ এনে মামলা করেন দুজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। প্রায় একই সময়ে হার্নিয়ার অপারেশনের পরে রোগীর পেটে গজ-ব্যান্ডেজ রেখে দেওয়ার অভিযোগে আরও একটি মামলা হয় অন্য এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। এতে খেপে গেছেন চিকিৎসকেরা। তাঁরা প্রাইভেট চিকিৎসা ও চেম্বার বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়ে বসেন। আশ্চর্য, মেয়ে সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন মনে করলে একজন শোকার্ত বাবা আদালতের দ্বারস্থও হতে পারবেন না? এক সংবাদ সম্মেলনে বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার নেতারা দাবি করেন, চিকিৎসায় অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার বা কাউকে হয়রানি করা যাবে না।
প্রশ্ন উঠছে, চিকিৎসায় ভুল বা অবহেলা ছিল কি না—এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেওয়ার অধিকার কার? মেহেরুন্নেছার বাবা মনে করেছেন আদালতে ফয়সালা হবে। তাই তিনি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। চিকিৎসকেরা মনে করছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ে যথেষ্ট ধারণা না থাকলে তাঁর এ বিষয়ে মত বা রায় দেওয়ার এখতিয়ার নেই। বিএমএ বলছে, ‘কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উঠলে আগে চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি বিষয়টির তদন্ত করবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।’ এ-সংক্রান্ত আইন করতেও সরকারের কাছে দাবি জানান তাঁরা। উত্তম প্রস্তাব। কিন্তু চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব যদি অন্য চিকিৎসক পালন করেন, সে ক্ষেত্রে অভিযোগকারী কতটা আশ্বস্ত হতে পারবেন?
প্রসঙ্গক্রমে সাম্প্রতিক কালের একটি উদাহরণ দিতে চাই। ওয়াহেদা নামের পাঁচ বছর বয়সী এক মেয়ে একটি চলন্ত পিকআপের ধাক্কায় পায়ে মারাত্মক আঘাত নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছিল গত ২৪ আগস্ট। ওই দিনই অর্থোপেডিক বিভাগে মেয়েটির বাঁ পা কেটে ফেলতে হয়। রোগীর ফাইলেও লেখা ছিল, ‘বাঁ পায়ে গুরুতর আঘাত রয়েছে’।
কিন্তু বিস্ময়কর তথ্য হলো, কিছুদিন পর বাঁ পায়ে মারাত্মক আঘাত পাওয়া শিশুটির বাঁ হাতটিও কেটে ফেলতে হয়েছে! ওয়াহেদার বাবা মোজাহের আহমদ বলেছেন, তাঁর মেয়ের পা ও পেট ছাড়া আর কোথাও আঘাতের চিহ্ন ছিল না। বাঁ হাতে আঘাত থাকলে সেটির এক্স-রে করা হতো। কিন্তু পা ছাড়া আর কিছুর এক্স-রে করা হয়নি। নাম-পরিচয় উল্লেখ করতে ইচ্ছুক নন, এমন কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ করে মোজাহের বুঝতে পেরেছেন, পায়ের অপারেশনের পর চিকিৎসকেরা বাঁ হাতে ক্যানোলা দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্যানোলাটি শিরায় না ঢুকে ভুলে মাংসে চলে যায়। এর ফলে ইনজেকশন দিলে হাতটি ফুলে যায়। পরে হাতে অস্ত্রোপচার করে ইনজেকশনের পানি বের করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু হাতটি ধীরে ধীরে কালো হয়ে যেতে থাকে। পরে বাধ্য হয়ে হাতটি কেটে বাদ দিতে হয়। পায়ের চিকিৎসার জন্য এসে দরিদ্র মোজাহের ও মরিয়ম দম্পতির ছোট্ট মেয়েটি তার হাতও হারাল। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলেন মোজাহের। বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকেও এ ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন হাসপাতালের পরিচালক। কিন্তু তদন্ত কমিটি যথারীতি অভিযোগের ‘সত্যতা’ পায়নি।
সবিনয়ে বলি, চিকিৎসকদের দিয়ে চিকিৎসার ত্রুটি বা গাফিলতির তদন্ত করানো হলে আর যা-ই হোক, ভুক্তভোগীর কাছে তা বিশ্বাসযোগ্য হবে বলে মনে করি না। এযাবৎ সে রকম কোনো উদাহরণ সৃষ্টি হয়নি। এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা পরিষদের আহ্বায়ক মাহফুজুর রহমানের বক্তব্যটি বরং তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়। প্রবীণ এই চিকিৎসক বলছেন, বিএমডিসির তত্ত্বাবধানে একটি কমিটি গঠন করা যায়, যেখানে চিকিৎসক, আইনজীবী ও প্রশাসনের কর্মকর্তারাও থাকবেন। কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ এলে ওই কমিটি তদন্ত করে প্রথমে প্রতিবেদন দেবে। এর ভিত্তিতেই মামলা বা পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
আমরা চাই না চিকিৎসকেরা ভুল–বোঝাবুঝির শিকার হয়ে সাধারণ রোগীদের কাছে অপদস্থ হোন। কিন্তু সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদালতের আশ্রয় নিতে পারবেন না, এমন নজির বিশ্বের কোনো সভ্য সমাজে আছে বলে আমাদের জানা নেই। এমনকি ইউরোপ-আমেরিকায় চিকিৎসকেরা তটস্থ থাকেন কখন রোগী তাঁদের বিরুদ্ধে অপচিকিৎসার দায়ে মামলা বা ক্ষতিপূরণ দাবি করে বসেন। সাম্প্রতিক ঘটনায় তিন চিকিৎসকের জামিন আবেদন মঞ্জুর করে আদালত বলেছেন, ‘রোগীদের জিম্মি করার অধিকার চিকিৎসকদের সংগঠন সংরক্ষণ করে না। চিকিৎসকেরা অপরাধ করলে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না—এটি গোষ্ঠীগত দাম্ভিকতা। গোষ্ঠীগত স্বার্থে অপরাধীকে আড়াল করা যাবে না।’ মামলার সুষ্ঠু তদন্তে বিঘ্ন সৃষ্টি হয় এমন কোনো ধরনের অনৈতিক প্রভাব বিস্তার কিংবা চাপ প্রয়োগ থেকে বিরত থাকতে চিকিৎসকদের সংগঠন বিএমএর চট্টগ্রাম শাখাকে সতর্ক করেন আদালত।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক ও প্যাথলজিক্যাল সেন্টারে অভিযান চালিয়ে সম্প্রতি ভ্রাম্যমাণ আদালত বহু অনিয়ম ও জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছেন। লাখ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানকে। বিএমএর সমাবেশে ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিরুদ্ধেও বিষোদ্গার করা হয়েছে। কোনো কোনো বক্তা বলেছেন, র্যাব-পুলিশ দিয়ে অভিযান চালিয়ে চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরীক্ষায় অনিয়ম ধরা কী করে সম্ভব?
ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন ল্যাবে অভিযান পরিচালনার সময় তো সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিনিধি, ওষুধ প্রশাসনের লোকজন সঙ্গে নিয়ে যান। তাহলে মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিকের ব্যবহার, টেকনোলজিস্টের অনুপস্থিতি বা নমুনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে নানা অনিয়মের জন্য এই অভিযান পরিচালনা ও জরিমানার বিষয়টি নিয়ে চিকিৎসকদের গাত্রদাহের কারণটি বোধগম্য হলো না।
চিকিৎসকদের হেয় করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। এ দেশে বহু শ্রদ্ধেয় চিকিৎসক আছেন, তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত মানবিক উদ্যোগের কথা আমরা জানি। গরিবদের বিনা মূল্যে চিকিৎসার পাশাপাশি নিজের টাকায় ওষুধ কিনে দিয়ে তাদের সুস্থ করে তোলার দায়িত্ব পর্যন্ত পালন করেছেন কত চিকিৎসক, তার ইয়ত্তা নেই। তাঁরা কি আমাদের প্রতিপক্ষ হতে পারেন? কিছুতেই নয়। তাহলে আমি, আমার মা-বাবা বা সন্তানসন্ততি কার চিকিৎসায়, কার সেবা-শুশ্রূষায় রোগ-শোক জয় করে বেঁচেবর্তে আছি?
দু–একজনের দায়িত্বে অবহেলা বা এ ধরনের কাজের জন্য একটি পেশার মানুষকে দায়ী করা চলে না। চিকিৎসক ও রোগী প্রতিপক্ষ নন, বরং চিকিৎসকের আশা ও আশ্বাসে ভরা মুখটির দিকে তাকিয়ে যেন আমাদের রোগক্লিষ্ট মুখে ফুটে ওঠে অনাবিল হাসি।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com