Saturday, February 29, 2020

এক ফোঁটা অশ্রু থেকে জন্ম হয় রুদ্রাক্ষ by মঞ্জুর মোর্শেদ রুমন

রুদ্রাক্ষের মালা হাজার বছর ধরে হিন্দু সম্প্রদায়, বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং বাউলদের ব্যবহার করতে দেখা যায়। কিন্তু এর উৎপত্তি বা ক্রমবিকাশ সম্পর্কে অনেকেই হয়তো জানি না। আসুন জেনে নেই রুদ্রাক্ষের আদি-অন্ত। বিস্তারিত জানাচ্ছেন মঞ্জুর মোর্শেদ রুমন-
রুদ্রাক্ষ শব্দটি সংস্কৃত ভাষার। যার অর্থ রুদ্রের চোখ বা শিবের চোখ। পৌরাণিক কাহিনি মতে, দুর্বিনীত অসুর ত্রিপুরকে বধ করতে গিয়ে শিব দীর্ঘকাল অপলক নেত্রে যুদ্ধ করেন। যে কারণে তার অবসাদগ্রস্ত চোখ থেকে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে এক ফোঁটা অশ্রু। সেই অশ্রুকণা থেকেই জন্ম হয় রুদ্রাক্ষের।
রুদ্রাক্ষ ফুল Elaeocarpaceae পরিবারের সদস্য। এর বৈজ্ঞানিক নাম Elaeocarpus ganitrus। রুদ্রাক্ষ গাছ দেখতে কিছুটা বকুল গাছের মতো। পরিপক্ক গাছের শেকড়ে ঝাউ-শিমুল-বুদ্ধনারিকেল গাছের মতো অধিমূল দেখা যায়। গাছের ফল দেখতে গাঢ় নীল রঙের। যে কারণে এর ইংরেজি নাম বলয়ে marble তরী বা বলয়ে berry beads।

রুদ্রাক্ষের ক্ষেত্রে মুখ সংখ্যা অতি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষই দেখতে পাওয়া যায় সবচেয়ে বেশি। তবে ১ থেকে শুরু করে ৩৮ মুখী পর্যন্ত রুদ্রাক্ষের সন্ধানও পাওয়া যায়। সহজলভ্য নয় বলে ১৪ থেকে ২১ মুখী রুদ্রাক্ষের মূল্যও বেশি।
যাবতীয় নানামুখী রুদ্রাক্ষের মধ্যে সবচেয়ে দুর্লভ বোধ হয় সুশ্রী এবং গোলাকার একমুখী রুদ্রাক্ষ। যা আজকাল অতিশয় দুর্লভ। শোনা যায়, ভারতের টাটা কোম্পানি ৭০ লাখ টাকা মূল্যের একটি একমুখী রুদ্রাক্ষ বংশ পরম্পরায় রক্ষা করে আসছে।

Tuesday, February 25, 2020

বিডিআর হত্যাকাণ্ড: অমীমাংসিত রহস্য by সাইয়েদা নাজনিন ফেরদৌসি

ঢাকার পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ১১তম বার্ষিকী স্মরণ করা হচ্ছে। বিদ্রোহের নামে সঙ্ঘটিত বর্বর হত্যাকাণ্ডে নিহতদের পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীরা সামনে এগিয়ে যেতে শিখেছেন। কিন্তু তারা এটাও বলেছেন, “জীবন কখনও আর আগের মতো হবে না”। যদিও সামান্য কয়েকজন বিধবা আবারও বিয়ে করেছেন, কিন্তু বীভৎস স্মৃতি তাদেরকে আজীবন তাড়া করে ফিরবে।
২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) বিদ্রোহীরা ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা এবং ১৭ জন বেসামরিক ব্যক্তিতে হত্যা করে, যেটার শেষ হয় বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে। তৎকালীন বিডিআর প্রধানসহ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যার এই ঘটনা জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে ‘বড় হত্যাযজ্ঞ’। আমরা জানি যে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ৯ মাসের দীর্ঘ যুদ্ধে ৪৭ জন সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়েছিলেন। আর এখানে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা নিহত হলো মাত্র ৩৩ ঘন্টায়।
আমার জন্য এটা একটা কঠিন আতঙ্কের ঘটনা, যেটার ক্ষত কোনদিনই পুরোপুরি দূর হবে না। যে কোন জীবিত প্রাণীর জন্য কোন ধরনের নিষ্ঠুরতাই আমার কল্পনার বাইরে… আর এখানে আমরা ৭৪ জন মানুষকে বিবেচনাহীনভাবে হত্যা করার কথা বলছি।
যদি এটা বুঝতে পারি যে দুর্ভাগা পরিবারগুলোর জন্য এটা কি পরিমাণের ভয়াবহ কঠিন ছিল এবং কি অপূরণীয় ক্ষতি তাদের হয়েছে, তবে বাস্তবতা হলো এই পরিবারগুলোর ব্যাপারে অন্যদের চেয়ে কিছুটা বেশি জানি আমি, কারণ ৫৭ জন নিহত সেনা কর্মকর্তাদের একজন কর্নেল মজিবুল হক ছিলেন আমার বোনের স্বামী। আমি তাদের কথা আমার বোনের কাছ থেকে শুনেছি, তাদের বেশ কয়েকজনের সাথে বিভিন্ন সময় আমার বোনের বাসায় কথা হয়েছে, আর প্রতি বছর আয়োজিত দোয়া মাহফিলে তাদের প্রায় সবার সাথেই সাক্ষাত হয়েছে আমার।
আমি খুব ভালভাবে স্মরণ করতে পারি যে ২০০৯ সালের ওই দুই দিন এবং পরবর্তী তিনটি বার্ষিকীতে বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সাথে আলোচনা হয়েছে, নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাতকার নেয়া হয়েছে, নিহতদের ভিডিও ফুটেজগুলো মিডিয়াতে সম্প্রচারিত হয়েছে, পত্রিকাগুলোতে নিবন্ধ, উপসম্পাদকীয়, বিশেষ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে।
২০০৯ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি নিয়ে জনপ্রিয় গীতিকার ও গায়ক হায়দার হোসেনের অসামান্য গানটির সাথে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের সময় সেখানকার ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ মিলিয়ে প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেলে বারবার প্রচার করা হয়েছে। অমর গানটির শুরুতেই হায়দার হোসেন লিখেছেন:
“নির্মমতা কতদূর হলে জাতি হবে নির্লজ্জ?
আমি চিৎকার করে কাঁদিতে চাহিয়া করিতে পারিনি চিৎকার”

আমরা, কর্নেল মজিবুল হকের পরিবারের সদস্যরা একটা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট করেছে এবং ট্রাস্টের পক্ষ থেকে হায়দার হোসেনকে শহীদদের জন্য তার হৃদয়গ্রাহী গানটির জন্য স্বীকৃতি দিয়েছে। গানটি শুনলেই যে কারো চোখে পানি চলে আসবেই।
তবে, অজানা কারণে, এই গানটি আর টেলিভিশনে প্রচার করা হয় না। যদিও গানটি এখনও প্রতি বছর এই দিনে সোশাল মিডিয়ায় প্রচার করা হয়, এটা কি চরম হতাশার নয় যে বছরে একবার শহীদদের আত্মার স্মরণও বিধিনিষেধের মধ্যে চলে এসেছে? আমাদের জন্য খুবই যাতনাদায়ক এটা।
আমি অস্বীকার করছি না যে এই দিনটিকে একেবারের স্মরণ করা হয় না। সেনা কবরস্থানে যেখানে হতভাগা নিহতরা শুয়ে আছেন, তাদের কবরে প্রতি বছরই ফুল দেয়া হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা সেখানে ফুল দিচ্ছেন এবং মিডিয়া চ্যানেলগুলো সেই ভিডিও ধারণ করছে এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কেউ কেউ নিহতদের পরিবারের আয়োজিত দোয়া মাহফিলে অংশ নিচ্ছেন।
কিন্তু এই দিনটি নিয়ে এ ধরনের উদাসীনতা নিহতদের পরিবার ও বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে কেবল অসন্তোষই তৈরি করবে। তারা এখনও মনে করেন তাদেরকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয়নি, কারণ তাদের তিনটি প্রধান প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়নি এখনও:
১. বর্বর এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও উদ্দেশ্য খুঁজে বের করা। এটা কোন যৌক্তিক বিষয় নয় যে আধাসামরিক বাহিনীর একদল লোক সশস্ত্র বিদ্রোহের ডাক দেবে এবং সাধারণ জনতা পরিবেষ্টিত একটি কম্পাউন্ডের ভেতরে হত্যার উৎসব শুরু করে দেবে। তারা খুব ভালো করেই জানতো সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে এবং সেনাবাহিনীর সংখ্যার কাছে তারা খুবই ক্ষুদ্র হয়ে পড়বে। যে কোন যৌক্তিক চিন্তার দিক থেকে, এটা আত্মঘাতী ছাড়া কিছুই নয়।
মানসিক অদক্ষতার বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া যায় না। গুটিকয়েকের মাথায় এটা খেলতে পারে কিন্তু একটা বড় গ্রুপের কাছে নয়। বিদ্রোহের নেতারা অন্তত এটা জানতেন বলে ধরে নেয়া যায় যে, তাদের এই কর্মকাণ্ড তাদেরকে যেখানে নেবে, সেখান থেকে ফেরার কোন পথ থাকবে না এবং তাদেরকে কোর্ট-মার্শালসহ মারাত্মক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে;
২. বিচারের সমস্ত্র প্রক্রিয়া এবং তাদের শাস্তি বাস্তবায়নের কাজ শেষ করা। সবাই বিচার ও রায় নিয়ে খুশি নয়… বিচারের আগে কাস্টডিতে মারা গেছে প্রায় ৫০ জন আর তারা যেটাকে আইনি প্রক্রিয়া বলছে, এতে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। এর পরও তারা রায়ের বাস্তবায়ন দেখতে চায়।
২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর, বিদ্রোহে জড়িত থাকার দায়ে ১৫২ জন অভিযুক্তের মধ্যে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করে হাইকোর্ট, যাদেরকে নিম্ন আদালতেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। হাইকোর্টের তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ অপরাধীদের ‘সর্বোচ্চ বর্বর’ এবং ‘ঠাণ্ডা মাথার ঘাতক’ আখ্যা দিয়ে তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। অভিযুক্ত ও দোষির সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অপরাধ মামলা এটা।
৩. ২৫ ফেব্রুয়ারিকে ‘শহীদ সেনা দিবস’ ঘোষণা করা। নিহতদের পরিবারের কাছে এটা কোনভাবেই বোধগম্য নয় যে, নিহত সেনা কর্মকর্তা – যাদের অনেকেই উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ছিলেন – তাদের জন্য এই সম্মান কেন দেয়া হচ্ছে না। তাদের দক্ষতা এবং আনুগত্যের সেবাকে অবশ্যই স্বীকৃতি দিতে হবে।
সেনাবাহিনীতে মেজর পদে পদোন্নতির আগে একজনকে অবশ্যই কমপক্ষে ১০ বছর সেনাবাহিনীকে সার্ভিস দিতে হয় এবং কমপক্ষে দুই বছর ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। অধিকাংশ ক্যাপ্টেনই পাঁচ থেকে ছয় বছর দায়িত্ব পালনের পর একটা পর্যায়ে মেজর হিসেবে প্রমোশন পান। তাই এটা হিসেব করা খুব একটা কঠিন নয় যে, দুই দিনেরও কম সময়ে আমরা সম্পদের বিবেচনায় কি হারিয়েছি।
আসলে যেখানে জনগণের জানার অধিকারের প্রশ্ন রয়েছে, সেখানে রাষ্ট্রের নাম দিয়ে সেনাবাহিনীর ব্যাপারে অতিরিক্তি গোপনীয়তার কোন সুযোগ নেই। বাস্তবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জনগণের প্রতি অবশ্যই একটা স্বচ্ছতার গ্যারান্টি থাকতে হবে, যে জনগণের জন্যই আসলে রাষ্ট্র টিকে আছে।

Saturday, February 22, 2020

মোগল আমলের চকবাজার যেভাবে বিখ্যাত

খাবারের জন্য এখনো বিখ্যাত চকবাজার
ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এলো মোগল আমলে গড়ে ওঠা ঢাকার এককালের প্রাণকেন্দ্র চকবাজার। যদি পুরনো ঢাকায় এমন দুর্ঘটনা এবারই প্রথম নয়।
ইতিহাসবিদরা বলেন, পুরনো ঢাকার এই চকবাজারের সূচনা হয়েছিলো মোগল আমলে। আর তখন থেকেই ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এই চকবাজার।
ব্যবসার পাশাপাশি এই চকবাজারে আছে হোসেনি দালান, বড় কাটরা, ছোটো কাটড়া কিংবা শাহী মসজিদের মতো নানা ধরণের স্থাপত্যকর্ম।
তবে এই চার শ' বছর পরে এসে ঢাকা অনেক বিস্তৃত হয়েছে সব দিকেই। কিন্তু ব্যবসায়িক বিবেচনায় গুরুত্ব হারায়নি চকবাজার।
যদিও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম শাহনাওয়াজ বলছেন, অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল চকবাজার। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর ব্রিটিশ, পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশ আমলেও এর ভেতরকার কোনো পরিবর্তন হয়নি।
"জনসংখ্যা আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বেড়েছে। রাস্তাঘাট অলিগলি সেই সরুই রয়ে গেছে। সে কারণেই বুধবার রাতে দুর্ঘটনায় রাস্তায় থাকা মানুষও মারা গেছে।"
অধ্যাপক এ কে এম শাহনাওয়াজ চকবাজার নিয়ে গবেষণা করেছেন।
তিনি বলছেন, "চক শব্দটা এসেছে ফার্সি শব্দ থেকে। বাণিজ্যিক গুরুত্ব নিজেই গড়ে উঠেছে এই চকবাজার।"
"মোগলরা আসার পর থেকে চকবাজার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে সতের শতকে। পরে বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবেই দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু চকবাজারের রাস্তাঘাট নিয়ে ভবিষ্যৎ চিন্তা কেউ করেনি"।
শাহনাওয়াজ বলেন, এক সময় বিয়ের কেনাকাটার প্রধান বাজার ছিলো চকবাজার। এমনকি বরযাত্রীদের চকবাজার ঘুরে যাওয়ার একটা রীতি ছিল।"
কিন্তু এখন সেইসব রীতিনীতি বিদায় নিলেও পুরনো অনেক স্থাপত্যে সমৃদ্ধ হয়ে আছে বাংলাদেশের ঢাকার পুরনো অংশের এই চকবাজার।
২০০১ সালের হিসেবে, এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ বাস করে। পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি ভবনেই রয়েছেন কেমিক্যাল কারখানা, গোডাউন কিংবা অন্য কোনো ধরণের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
তবে অপরিকল্পিত ভবন, সরু রাস্তা, নোংরা অলিগলির পাশাপাশি গত দু দশকে এই চকবাজার এখন রীতিমত এক অগ্নিকাণ্ড।
কারণ, এই চকবাজারের যত্রতত্র গড়ে উঠেছে উচ্চ মাত্রার দাহ্য পদার্থের মজুত, প্লাস্টিক কারখানা, পারফিউম কারখানা- যেগুলোর সবই তৈরি হয়েছে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই।
এর আগে ২০১০ সারে পুরনো ঢাকার নিমতলীতে অগ্নিকান্ডে ১২০ জন নিহত হবার পর সব কেমিক্যাল কারখানা সরিয়ে নেয়ার কথা বলেছিলো কর্তৃপক্ষ।
উচ্চ মাত্রার কেমিক্যাল বিপণন ও সংরক্ষণ নিষিদ্ধও করা হয়েছিলো।
বাংলাদেশের পরিবেশ পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক মো: সামসুল আলম বলছেন, ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা গেলে চকবাজারের এই দুর্ঘটনা ঘটতোনা।
পুরনো ঢাকার সরু রাস্তাঘাট বরাবরই নানা দুর্ঘটনায় আলোচনায় এসেছে। পুরনো ঢাকার অন্য অংশের মতো চকবাজারের রাস্তাও অনেক সরু আর সরু রাস্তার ওপরেই বিদ্যুৎসহ নানা পরিষেবার তারের জটলা।
যেখানে সেখানে ট্রান্সফরমার যার একটি বিস্ফোরণ থেকেই চকবাজারের বুধবার রাতের দুর্ঘটনার সুচনা বলে মনে করা হচ্ছে।
রাসায়নিকের পাশাপাশি চকবাজারের জমে ওঠা অন্য দুটি ব্যবসায়িক পণ্য হলো- প্লাস্টিক দ্রব্য ও পারফিউম।
ফলে ওই এলাকায় নিয়ম-বহির্ভূতভাবে গড়ে উঠেছে প্লাস্টিক ও পারফিউমের কারখানা।
সামসুল আলম বলছেন, "উচ্চ মাত্রার দাহ্য পদার্থের মধ্যে একটি রয়েছে প্লাস্টিক দানা। এতে আগুন লাগলে নিয়ন্ত্রণ খুবই কষ্টের হয়ে যায়"।
তবে রাসায়নিক দ্রব্য, প্লাস্টিক দ্রব্য ও পারফিউমের বাইরে আরো একটি বিষয়ের জন্য আকর্ষণীয় এই চকবাজার। সেটি হলো খাবার।
বিশেষ করে রোজার সময় বাহারি ধরণের ইফতার সামগ্রীর দোকানে ভরে যায় চকবাজারের রাস্তাঘাট যেখানে ভিড় করেন লাখ লাখ মানুষ।
চকবাজারের কাবাব কিংবা বিরিয়ানি খেতে প্রতিদিনই সেখানকার রেস্টুরেন্ট বা খোলা দোকানে ভিড় করেন শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে যাওয়া মানুষ।
সূত্র :  বিবিসি

Thursday, February 20, 2020

জেনে নিন ফিটকিরির বিভিন্ন উপকারিতা

ফিটকিরি একপ্রকার অর্ধস্বচ্ছ কাচ সদৃশ কঠিন পদার্থ যার স্বাদ মিষ্টি ও কষা এবং অত্যন্ত শুষ্ক প্রকৃতির। মূলত: এটি খনিজ দ্রব্য। পরে বিজ্ঞানীগণ ল্যাবরেটরীতে কৃত্রিম ফিটকিরি তৈরি করেন। এটি খুব সাধারণ সস্তা ও সহজলভ্য বস্তু। ফিটকিরি কয়েক প্রকার। তবে ওষুধে ব্যবহারে জন্য লাল রং এর কাচ সদৃশ বা স্বচ্ছ ফিটকিরি সবচেয়ে উত্তম। চলুন জেনে নিই ফিটকিরির নানাবিধ উপকারিতা...
এন্টিসেপ্টিক হিসেবে:- বাড়িতে কারো চামড়া কেটে গেলে, ছিলে গেলে ঐ জায়গা জলে ধূয়ে ফিটকিরি দিলে রক্ত পড়া বন্ধ হয়। জীবাণু সংক্রমণ হয় না। দাড়ি শেভ করার সময় নাপিত ফিটকিরি ঘষে দেয়।
মুখের ঘা এ উপশম:- অনেক সময় মুখের চারপাশে ঘা হয়। এই ঘা এর উপশমও ফিটকিরি করতে পারে। মুখের ঘাতে ফিটকিরি ব্যবহারের নিয়ম- ১ চামচ ফিটকিরির গুড়াঁ ও ১ গ্লাস জল নিন। জল একটা পাত্রে চুলায় দিন। ফুটে উঠলে ফিটকিরির গুড়াঁ মিশিয়ে নিন ও চুলা বন্ধ করে নিন। জল কুসুম গরম অবস্হায় আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। এবার এটা দিয়ে কুলকুচি করে নিন, দিনে ২-৩ বার করুন, আরাম পাবেন।
ত্বকের যত্নে:- আগেরদিনে মেয়েরা রূপচর্চায় ফিটকিরি ব্যবহার করত। কারণ ফিটকিরি ত্বকে বলিরেখা পড়তে দেয় না। এছাড়া মুখে ব্রণ, ফুসকুড়ি, ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, চামড়া কুচকে যাওয়া রোধে ফিটকিরি ব্যবহার করা যায়। এজন্য মুখ ভালো করে ধুয়ে সারা মুখে অনেকক্ষণ ধরে ফিটকিরি ঘষুন। অথবা ফিটকিরি চূর্ণ জলে গুলে ওই জলখে মাখুন। শুকিয়ে গেলে ভালো করে মুখ ধুয়ে নিন। এভাবে কিছুদিন করলে মুখের উজ্জ্বলতা বাড়বে এবং ব্রণ-ফুসকুড়ির সমস্যা কমবে।
দাঁত ও মুখের যত্নে:- ফিটকিরি এ্যান্টিব্যকটেরিয়াল পদার্থ। তাই দাঁতের রোগ সারাতে ভালো কাজ দেয়। মুখের দুর্গন্ধও দূর করে ফিটকিরি। এজন্য জলে ফিটকিরি গুলে সে জলয়ে কুলকুচি করতে হবে। এতে দাঁতের যন্ত্রণা ও মুখের দুর্গন্ধ দূর হবে।
আঙুলে হাজা:- যারা জল নিয়ে বেশি কাজ করেন অনেক সময় তাদের হাত ও নখের কোনে ঘা হয় কিংবা পায়ের পাতা ফোলা কমাতে ফিটকিরি ব্যবহার করা যায়। এক টুকরো ফিটকিরি জলে দিয়ে জলটা ভালোকরে গরম করে তারপর ঠাণ্ডা করে নিয়ে তাতে পা দুটো ডুবিয়ে রাখতে দ্রুতই বেশ আরাম পাওয়া যাবে।
ব্রন-ফুসকুড়ি:- মুখে ব্রন-ফুসকুড়ি হচ্ছে? মুখ ড্রাই হয়ে, চামড়া কুঁচকে যাচ্ছে? চিন্তা করবেন না। ভালো করে মুখ ধুয়ে নিয়ে, সারা মুখে অনেকক্ষণ ধরে ফটকিরি ঘষুন। বা ফিটকিরি চূর্ণ জলে গুলে, মুখে মাখুন। শুকিয়ে গেলে, কিছুক্ষণ পর মুখটা ধুয়ে ফেলুন। এ ভাবে কিছু দিন করলে, মুখে ঊজ্জ্বলতা ফিরবে। ব্রন-ফুসকুড়ির হাত থেকেও মুক্তি পাবেন।
হঠাত্‍ রক্ত:- সেভ করতে গিয়ে গাল কেটে গেলে এখনো সেলুনে ফিটকিরি ঘষে দেয়। এছাড়া আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে হঠাত্‍ রক্তপাত শুরু হলে ফিটকিরি চূর্ণ করে ওই স্থানে লাগালে রক্তপাত মুহূর্তেই বন্ধ হবে।
টনসিলে আরাম:- ঠাণ্ডা লেগে গলা ব্যাথা হলে বা গ্ল্যান্ড ফুলে গেলে গরম জলেমটি লবণ ও ফিটকিরি চূর্ণ মিশিয়ে দিনে কয়েকবার গার্গল করলে বেশ আরম পাওয়া যাবে।
উকুন ধ্বংসে:- চুলে উকুন হয়েছে? চিন্তা নেই, ফিটকিরিই দূর করে দিবে উকুন। ১/২ লিটার জলে ৪ গ্রাম ফিটকিরি মিশিয়ে নিন। এবার মাথার তালুতে লাগান। ৩০ মিনিট পরে শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে ১/২ দিন ব্যবহার করুন।
অধিক ঘাম ও প্রতিকার:- গরমে তো ঘাম হবেই। কিন্তু যারা বেশি ঘামেন, পরনের পোশাক ভিজে যায়, তাদের এই অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারে এক টুকরো ফিটকিরি। গোসলের সময় এক টুকরো ফিটকিরি জলে ভালোভাবে মিশিয়ে ওই জলে ঢালুন। এভাবে কয়েকদিন গোসল করলে স্বস্তি মিলবে।
ডিওডেরেন্ট হিসেবে:- ফিটকিরি বা ফিটকিরির গুঁড়া শরীরের দুর্গন্ধ দূর করতে সাহায্য করে। এটাকে প্রাকৃতিক ডিওডেরেন্ট বলা যায়। ফিটকিরির টুকরা ভিজিয়ে আন্ডারআর্ম বা বগলে ঘষুন, ২ মিনিট অপেক্ষা করে ধুয়ে ফেলুন। অথবা গোলাপজলের সাথে ফিটকিরির গুঁড়া মিশিয়ে বগলে লাগান। ৫-১০ মিনিট পরে ধুয়ে ফেলুন। এটা দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারি ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলে। তবে প্রতিদিন ব্যবহার না করে সপ্তাহে ২ দিন ব্যবহার করুন।
মাথা ব্যথা সারাতে:- লাল কাচা ফিটকিরি ১ গ্রাম ও ছোট এলাচি বীজ ৬ গ্রাম উভয় উপাদানকে পৃথক পৃথক কুটে পিষে কাপড়ে ছেঁকে নিতে হয়। অল্প কিছু জলসহ পান করলে মাথা ব্যথা দ্রুত সেরে যায়।
কান ব্যথা:- ফিটকিরি ভেজে গুড়া করে সামান্য একটু গুড়া কানে দিতে হয়। তারপর কয়েক ফোঁটা লেবুর রস অথবা পেঁয়াজের রস কানে দিলে কান ব্যথা চলে যায়।
পা ফাটা উপশমে:- ফিটকিরি খুব দক্ষতার সঙ্গে পা ফাটা আরোগ্য করতে পারে। পায়ের মরা চামড়া তুলে পা কে নরম ও মসৃণ করে তোলে। পায়ের ফাটা ভালো করতে একটা প্যাক তৈরি করুন। একটা বাটিতে ২ চা চামচ ফিটকিরি গুঁড়া , ১ চা চামচ নারিকেল তেল ও ১ চা চামচ মধু মিশিয়ে নিন। পা ভালো করে ধুয়ে, শুকিয়ে নিন। এরপর প্যাক লাগিয়ে ৫ মিনিট ম্যাসাজ করুন। তারপর ১০-১৫ রেখে কুসুম গরম জলে ধুয়ে নিন। ভালো ফল পেতে সপ্তাহে ২-৩ বার ব্যবহার করুন।
দাঁত ব্যথা:- ভুনা ফিটকিরি, লবণ ও বাবলা গাছের ছাল সমপরিমাণ নিয়ে সূক্ষ্ম করে পিষলে এমন মাজন হয় যা দিয়ে দাঁত মাজলে দাঁত ব্যথা চলে যায়।
ব্রণ দূর করতে:- প্রাকৃতিক উপায়ে ব্রণ দূর করতে ফিটকিরি অত্যন্ত কার্যকর।মাত্র-৩ উপাদানেই তৈরি করুন ব্রণের জন্য ফেসপ্যাক।১ চা চামচ ফিটকিরির গুড়াঁ, ২ চা চামচ মুলতানি মাটি, ২ চা চামচ গোলাপজল একসাথে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। ব্রণে লাগিয়ে ১০-১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।ভালো ফল পেতে সপ্তাহে ১ বার ব্যবহার করুন। ২ মাস নিয়মিত ব্যবহারে লক্ষণীয় উন্নতি দেখা যাবে।
জল বিশুদ্ধকরনে:- দূষিত জলে কিছু ফিটকিরি মেশালে জলের ময়লাগুলো নিজেরা নিজেদের সাথে লেগে ভারি হয়ে জলের নীচে জমা হয়। উপরে বিশুদ্ধ জল অবস্থান করে। ফিটকিরির ব্যবহার জলশুদ্ধকরনে খুব জনপ্রিয়। প্রতি ১ লিটার জলে ১ গ্রাম ফিটকিরি বা ফিটকিরির গুঁড়া ব্যবহার করুন। ময়লা বা কাঁদাযুক্ত জলেরি মিশিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট রেখে দিন। এরপরে দেখবেন কাঁদা সব নিছে জমা হয়েছে, এখন উপরে ভালো জল ছেঁকে নিন।
বলিরেখা দূর করতে:- ফিটকিরি ত্বককে টানটান করতে সাহায্য করে। ১চামচ ফিটকিরির গুড়াঁ ও ২ চামচ গেলাপজল বা জল মিশিয়ে মুখে লাগান ( চোখ বাদে)। কিছুক্ষণ পরে মুখ ধুয়ে ফেলুন। ফিটকিরির গুড়াঁ না থাকলে, একটা ফিটকিরির টুকরা ভেজা মুখে ঘষুন। কিছু সময় পরে মুখ ধুয়ে ফেলুন। ত্বকের বলি রেখা দূর করে, আপনাকে করে তুলবে সতেজ ও লাবন্যময়ী।
ক্রিয়াবিদের পায়ের যত্নে:- ফিটকিরিতে আছে অ্যান্টিমাইক্রোবাইয়াল উপাদান। এটা ক্রিয়াবিদের পায়ে ফাঙ্গাসকে মেরে ফেলে। একারনে ক্রিয়াবিদের পায়ের যত্নে ফিটকিরি ব্যবহার করা যায়। গোলাপজলের সাথে ফিটকিরির গুঁড়া মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে পা ও পায়ের পাতাতে লাগিয়ে রাখুন। শুকালে কুসুম গরম জলে ধুয়ে ফেলুন। অন্যভাবে, হালকা গরম জলে ফিটকিরির গুঁড়া মিশিয়ে পা কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রেখে পা ধুয়ে, মুছে নিন।
আরও কিছু উপকারিতা নিম্নরুপ:-
১) মুখের ভেতরে কোনও ঘা হলে, সেখানে ফিটকিরি লাগান। জ্বালা করতে পারে, কিন্তু তাড়াতাড়ি ঘা শুকাবে। তবে লালা গিলে ফেলবেন না। আর শিশুদের থেকে দূরে রাখবেন ফিটকিরি।
২) ব্যাকটেরিয়ার ফলে মুখে গন্ধ হয়। ফিটকিরি ব্যাকটেরিয়া দূর করতে সক্ষম। এক গ্লাস জল ফোটান। তার মধ্যে এক চিমটি লবণ দিয়ে মেশান। এবারে ফিটকিরির গুঁড়া মেশান। মিশ্রণ ঠান্ডা হলে, তা দিয়ে কুলকুচি করুন।
৩) শিশুদের মাথায় প্রায়ই উকুন ও উকুনের ডিম হয়। জলে ফিটকিরি গুঁড়া মিশিয়ে তার মধ্যে একটু চা গাছের তেল (টি ট্রি অয়েল) মেশান। এবারে ১০ মিনিট ধরে মাসাজ করুন স্ক্যাল্পে। এর পরে শ্যাম্পু করে নিন।
৪) মুখে ব্রণ হলে ফিটকিরি ব্যবহার করতে পারেন। এক চামচ মুলতানি মাটি, দু'চামচ ডিমের সাদা অংশ ও এক চামচ ফিটকিরি গুঁড়ো দিয়ে প্যাক বানান। প্যাকটি মুখে লাগিয়ে ১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।
৫) দাড়ি কামানোর পরে বা কেটে গেলে ফটকিরি লাগিয়ে ঠান্ডা জলয়ে ধুয়ে ফেলুন।
৬) বয়সের ছাপ পড়লে এক টুকরো ফিটকিরি জলে ভিজিয়ে তা মুখে ঘষুন। তার পরে ঠান্ডা জলয়ে মুখ ধুয়ে ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে নিন।
৭) ডিওডোর‌্যান্ট হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। ফিটকিরির গুঁড়োর সঙ্গে গন্ধরস মেশান। গন্ধরস বা মস্তকি এক ধরনের গাছের আঠা বিশেষ।
৮) পায়ে শিরায় টান পড়লে ফিটকারির গুঁড়ো, হলুদ এবং জল দিয়ে একটি পেস্ট বানান। ব্যথা হলে সেখানে লাগান।

অকার্যকর মেগাসিটি: ঢাকা কেন নর্দমায় সয়লাব

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহর ঢাকা
কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের জনাকীর্ণ রাজধানী ঢাকায় নর্দমা পরিস্কারের কাজ করেছেন সুজন লাল। বহু দুর্ভোগের সাক্ষী তিনি। কিন্তু ২০০৮ সালের ঘটনাটা ছিল সবচেয়ে করুণ। একদিনের ভারি বৃষ্টির কারণে স্বাভাবিকভাবেই রাস্তাগুলো ডুবে গেছে। সাতজন কর্মী রামপুরায় ম্যানহোল পরিস্কারের কাজ করছে। সাধারণত ক্লিনাররা নর্দমার কোথাও আবর্জনা আটকে গেলে সেগুলো পরিস্কার করার সময় দড়ি ধরে রাখেন যাতে পানির তোড়ে ভেসে না যান। কিন্তু এই গ্রুপটা ছিল নতুন। তাদের জানা ছিল না এ রকম পরিস্থিতিতে কি ধরনের বিপদ আসতে পারে। নর্দমার পানি সেদিন গিলে নিয়েছিল তাদের।
পথচারীরা হাতুরি বেলচা দিয়ে রাস্তা খুঁড়ে ফেলেছিল। এক পর্যায়ে তিনজনকে পাওয়া গেলো, মৃত। বাকি চারজনের অবস্থা খুবই গুরুতর। এদের একজন হাসপাতালে মারা যায়। সুজন বললেন, “ওই ঘটনায় আতঙ্ক ভর করে আমাদের মধ্যে। বহু মাস এরপর নর্দমার দিকে তাকাতেও ভয় করতো।”
বাংলাদেশের প্রবল বর্ষার মৌসুমে ঢাকা মাসে কয়েকবার পানির নিচে চলে যায়। ড্রেনগুলোতে অতিরিক্ত চাপ আর শহর নিচু হওয়ায় বাথটাবের মতো সবসময় পানি ভর্তিই থাকে ঢাকা। ঢাকা ট্রিবিউনের মতো পত্রিকাগুলোর পাতা পানিতে ডোবা বাসের ছবিতে ভর্তি হয়ে যায়। শহর বিশেষজ্ঞদের সেই পুরনো অভিমত: ‘আবারও পানির নিচে ঢাকা’ অথবা ‘সেই একই পুরনো অবস্থা’।
২০১৭ সালের জুলাইয়ে ভারি বৃষ্টিপাতের সময় পথচারীদের এমনকি রাস্তার এপার ওপার যেতেও রিক্সা ব্যবহার করতে হয়েছে।
ঢাকা শহরের স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা এতটাই খারাপ যে বর্ষাকালে তা প্রায়ই উপচে পড়ে, ছবি: গেটি ইমেজ
সড়কের পাশে তুমুল বৃষ্টির মধ্যে কাজ করতে বের হয় নর্দমা ক্লিনারদের। অনেকে ম্যানহোলে বাঁশ দিয়ে গুঁতাতে থাকেন। অন্যেরা হয়তো অর্ধ-উলঙ্গ হয়ে তরল নর্দমার মধ্যে দাঁড়িয়ে খালি হাতে আবর্জনা তুলছে। এই নর্দমার মধ্যে গলাপর্যন্ত ডুবে কাজ করার ছবি বিশ্ব মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর এই ক্লিনারদের কাজকে বিশ্বের সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজের তকমা দেয়া হয়।
জাতিসংঘ হ্যাবিটেটের মতে, ঢাকা পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল শহর। প্রতি বর্গকিলোমিটারে এখানে ৪৪,৫০০ জনেরও বেশি মানুষের বসবাস। প্রতিদিনই গ্রাম্য এলাকা থেকে আরও মানুষ আসছে। ক্লিনারদের মাসিক রোজগার গড়ে ২২৫ পাউন্ডের মতো। নিজেদের স্বাস্থ্য ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জনসংখ্যার ভাড়ে ন্যুব্জ এখানকার অবকাঠামোগুলোকে কোনরকমে ঠেকিয়ে রেখেছেন তারা।
বহু বহু মানুষ, অতি সামান্য সম্পদ
অতিরিক্ত জনসংখ্যা বলতে বোঝায় কোন একটা নির্দিষ্ট জায়গায় ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষের বসবাস। অথবা, বিদ্যমান সম্পদ দিয়ে যত মানুষের জীবন নির্বাহ সম্ভব, তারও অতিরিক্ত মানুষ। এ সব বিবেচনায় ঢাকা একেবারে আদর্শ উদাহরণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশান সায়েন্স বিভাগের প্রজেক্ট ডিরেক্টর অধ্যাপক নুরুন্নবী বললেন, “পৃথিবীতে ঢাকার চেয়েও বড় শহর রয়েছে। কিন্তু আপনি যদি সেগুলোর বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতির দিকে তাকান, তাহলে জনসংখ্যার বিচারে ঢাকা পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল মেগাসিটি।”
অতিরিক্ত ঘনবসতি না থাকলেও শহর ঘনবসতিপূর্ণ হতে পারে। সিঙ্গাপুর একটি ছোট্ট দ্বীপ। সেখানকার জনসংখ্যার ঘনত্বও কম নয়। প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১০,২০০ জন। কিন্তু খুব অল্প মানুষই একে অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ বলবে। নাগরিকদের বসতির জায়গা সঙ্কুলানের জন্য বহুতল ভবন গড়া হয়েছে। উপরের দিকে বেড়েছে শহর। অনেক জায়গায় ছাদেও স্কাই-গার্ডেন তৈরি করা হয়েছে।
জনসংখ্যা অতিরিক্ত হয়ে ওঠে তখন, যখন বারতি মানুষের ব্যবস্থাপনার আর কোন উপায় থাকে না।
‘বাধ্য হয়ে এ কাজ করছি’
সুজন বললেন, সরকার ঢাকা শহরটাকে ভালোভাবে পরিচালনার চেষ্টা করছে। কিন্তু যতটা আশা ছিল, ততটা সফল হয়নি তারা। ঢাকার মধ্যভাগে মোটামুটি ধরনের ফ্লাটে পরিবার নিয়ে বাস করে সে। দুধ চায়ে চুমুক দিতে দিতে কথা বলছিল সে। পাশেই পানিতে ডুবে থাকা চিপা রাস্তা দিয়ে ঘন্টা বাজিয়ে চলছে রঙচঙা রিক্সাগুলো।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার বেশির ভাগ মুসলিম হলেও সুজনের মতো আরও অনেক হিন্দু রয়েছে এ পেশায়। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হিন্দুদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হয়। এখনও তারা বৈষম্যের শিকার। সুজন আবার দলিত শ্রেণীর হিন্দু। পুরো এশিয়াতেই তাদেরকে দেখা হয় ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে। এবং নিকৃষ্ট ধরনের কাজ করতে হয় তাদের। বাংলাদেশে তাদেরকে ডাকা হয় মেথর নামে। অর্থ হলো যারা বিষ্ঠা পরিস্কার করে।
বর্ষাকালজুড়ে ঢাকায় বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করে, ছবি: এএফপি
সুজন জানালেন, “দাদার সূত্রে অনেকটা উত্তরাধিকারের মতো এ কাজ পেয়েছেন তিনি। অন্য কোন কাজের দক্ষতাও নেই আমার।” সুজন দীর্ঘদেহী, চল্লিশোর্ধ বয়স, লম্বাটে চিকন চেহারা আর ছিমছাম ছাঁটের গোফ রয়েছে তার। “আমার পরিবার চালাতে হয়। বাচ্চাদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করতে হয়। সাথে রয়েছে মাসিক ভাড়া আর বিল পরিশোধের চাপ। “আমি বাধ্য হয়ে এই কাজ করছি, যদিও আমি জানি এই কাজ আমার জন্য অসম্মান আর অপমানের কারণ হবে।”
সে জানালো, “পচে যাওয়া বর্জ্যের কারণে নর্দমার নালাগুলো অ্যাসিডিক ও বিষাক্ত হয়ে আছে। তাই ক্লিনাররা শতভাগ নিশ্চিত যে তাদের স্বাস্থ্য সমস্যা হবেই। বিশেষ করে চর্মরোগ হবেই। প্রায়ই তারা এটা বুঝতেও পারে না। স্থানীয় মদের দোকান থেকে তারা মদ কিনে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে থাকে। ঘুমিয়ে গেলেই দুনিয়া থেকে অন্য জগতে চলে যায় তারা। তাদের জ্ঞান থাকলে হয়তো তারা বুঝতে পারতো, স্বাস্থ্যের কি ক্ষতি হচ্ছে তাদের।”
সবচেয়ে নিম্ন বাসযোগ্য শহর
ঢাকায় বসবাস করা মানেই নানা দুর্ভোগের মধ্যে থাকা। যারা গরিব, তারা গজিয়ে ওঠা বস্তিগুলোতে গাদা করে থাকে, যেখানে সংক্রামক রোগব্যাধি এবং আগুন বাতাসের গতিতে ছড়ায়। ঢাকার জনসংখ্যার ৪০ শতাংশই বস্তিবাসী। মধ্য আর উচ্চবিত্ত শ্রেণীকে আবার তাদের বড় একটা সময় রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকতে হয়। এই শহর প্রায় নিয়মিত ‘সবচেয়ে নিম্ন বাসযোগ্য শহরের’ তালিকার উপরের দিকে থাকে। এ বছর নাইজেরিয়ার লাগোস এবং যুদ্ধ-বিধ্বস্ত লিবিয়া ও সিরিয়ার রাজধানীর পরেই ঢাকার অবস্থান।
আর অনেকটা মজা করে সেটাকেই একটা উন্নতি হিসেবে মন্তব্য করলেন অধ্যাপক নুরুন্নবী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের অফিসে বসে কথা বলছিলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটাতে বেশ কিছু গাছপালা থাকার কারণে একটা সবুজ চেহারা পেয়েছে ক্যাম্পাস, যেটা রাজধানীর আর অন্য কোথাও দেখা যাবে না। নিজের বিষয়টাকে অনেকটা হাস্যরস আর আশাবাদের মিশ্রন হিসেবে দেখেন অধ্যাপক নবী। তিনি বললেন, “এই র‍্যাংকিংয়ে কয়েক বছর আমরা এক নম্বরে ছিলাম।”
সব সময় অবশ্য চিত্রটা এমন ছিল না। নবী মনে করার চেষ্টা করলেন। ষাটের দশকে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হওয়ার আগে ঢাকায় শূন্য সড়কে পথ চলতে হতো। পুরনো ঢাকায় মুঘল আমলের ক্যানালগুলোতে গোসল করতো মানুষ। ওই এলাকায় এখনও কয়েক শতাব্দি পুরনো বাড়িঘর রয়েছে। যদিও এগুলোর অনেকগুলো উন্নয়নের চাপায় হারিয়ে গেছে। ক্যানালগুলোও ভর্তি হয়ে গেছে। আর সেই সাথে বন্ধ হয়ে গেছে নর্দমা নিষ্কাষণের পথগুলো।
পৃথিবীর আরও বহু জায়গার মতোই বাংলাদেশেও দ্রুত, অপরিকল্পিত শহরায়ন হয়েছে। অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধার সাথে যুক্ত হয়েছে বিশ্বায়ন। সাথে এসেছে গ্রামীণ ও উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয়। সে কারণে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ রাজধানীতে আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করেছে। এতে প্রচুর চাপ পড়েছে সীমিত সম্পদের উপর। অধ্যাপক নবী বললেন, “আমরা দেখছি গ্রামীণ এলাকা থেকে প্রচুর মানুষ শহরের দিকে আসছে। মানুষ আসছে তো আসছেই। তাদের বসবাসের জন্য যথেষ্ট আবাসনের ব্যবস্থা কি আমাদের আছে? গরিব মানুষদের বসবাসের জন্য ব্যবস্থা কোথায়?
ঢাকার একজন স্যুয়ারেজ ক্লিনার, ছবি: বারক্রফট
ঢাকায় শহর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে হ-য-ব-র-ল অবস্থায় ভাগাভাগি হয়ে আছে। নবী বললেন, “সরকারের বিভিন্ন সেবাদানকারী কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এ শহরের দুরবস্থার একটা বড় কারণ।”
দুজন আলাদা মেয়রসহ সরকারের সাতটি দফতর জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ করছে। এই জটিলতার কারণে একে অন্যের উপর দায় চাপানোটা সহজ হয়ে গেছে। গত জুলাই মাসে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাইদ খোকন হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে বলেন এ পরিস্থিতির জন্য ওয়াসা দায়ী। কিন্তু তাদেরকে কাজে দেখা যায় না। এর পরপরই খোকনকে দোষারোপ করে ওয়াসা। এর আগে, ঢাকা উত্তরের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকও বিভিন্ন জলমগ্ন এলাকা ঘুরে দেখেছেন। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি এমন প্রশ্নও করেন যে: “কেউ একজন আমাকে বলুন, এর কি সমাধান?”
‘এ জাতির লোকেরা আরও বহু গল্প লিখবে’
কিন্তু অকার্যকর প্রশাসন বাংলাদেশে কাজ সম্পাদনের জন্য সবসময় বাধা হয়ে থাকেনি। এই দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার ব্যাপারে প্রশংসা পেয়েছে।
কিছু শহরবিদ এখন বস্তিগুলোর ব্যাপারে বিদ্যমান নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে অন্যভাবে ভাবতে চাইছেন। শহরের বিস্তারের ফলে যেহেতু জন্ম হার কিছুটা কমে, তাই তাদের মতে এটাকে খানিকটা সমাধানের অংশও ভাবা যেতে পারে।
অনেকে মনে করেন যে শহুরে এলাকার সীমিত পরিসরে যে সব সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠছে, সেগুলো পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং সরকারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে।
নবী বলেন, “রাজনৈতিক দলের কথা ভুলে যান, কিন্তু এ দেশের মানুষ আরও অনেক গল্প লিখবে। একদিন জনগণ জেগে উঠবে এবং রাজনীতিবিদরা তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হবে।”

Wednesday, February 19, 2020

কবিতা- প্রকৃতির আহাজারি, মানুষের বিলাপ by আশরাফ আহমেদ

‘হারানোর মিছিলে প্রকৃতি’ নামে একটি কবিতাটি
ছাপার পর পড়ে মনে হলো অনেক কথা বলা হয়নি এতে;
অবশ্য, এ বিষয়ে কবিতা, কাহিনি, প্রবন্ধ, গবেষণা-চলতেই থাকবে-এসব শেষ হওয়ার মত নয়;
যদ্দিন বিশ্বে ধনতন্ত্র, মুনাফার ব্যাপার থাকবে
বায়ুদূষণ সঙ্গে চলবে অবিরত দুরন্ত অপ্রতিরোধ্য গতিতে
কল-কারখানার দূষিত বর্জ্য, নির্গত ধোঁয়া কার্বন হয়ে বইবে নিরবধি আকাশে, বাতাসে, সমুদ্র ,পাহাড় পর্বতে
বিশ্ব চরাচরে ,পাতালে, অন্তরিক্ষে-সর্বত্র অব্যাহতভাবে।
কবিতায় বলেছিলাম ছোট এক দারকিনি প্রজাতির মাছের কথা আর সঙ্গে টক-মিষ্ট এক ফলের কথা;
কেমন করে, কখন, কোথায় উধাও হয়ে গেল সৃষ্টিগুলো?
বলেছিলাম মানুষের সীমাহীন লোভ, অবিবেচনার কথা;
আর ও বলেছি:
উফসী ধান আর মাছ চাষের কারণে
কেমিক্যাল সার, কীটনাশক ওষুধ
ফলন বাড়ানোর এই সব মহৌষধ প্রয়োগের কারণে
স্বাদে অতুলনীয় দেশজ মাছ ইদানীং প্রায় বিলীন
আমাদের বিশ্ব থেকে, অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের
পরিবেশ দূষণের অমোঘ নিয়মে!
বলেছিলাম প্রায় বৃক্ষশূন্য রঘুনন্দন পাহাড়ের কথা
শাল, সেগুন সুরভিত পাহাড়টিতে গজারি, সোনারু, নানা জাতের বাঁশ, ছন, উলু, কাঠসহ হাজারো নির্মাণ সামগ্রী যে পাহাড়টিতে অনায়াসে পাওয়া যেত।
লোভাতুর মহালদাররা হাতি দিয়ে টেনে আনত
মুনাফার আশে নির্বিচারে ছোট-বড় বাছ বিচার না করে।
ছোট বেলা দেখেছি রকমারি হরিণ, বাঘ, বনমোরগ,
বানর, হনুমান, নানা জাতের পাখি, বনকুকুর, মতুরা
কত সব বন্য প্রাণী হামেশাই এদের দেখা মিলত।
রঘুনন্দন আজ বিরান, সম্পদ লুণ্ঠনে আর নিধনের বলিকাষ্ঠে নিস্তর আর খোলা মাঠসম সমতল প্রান্তর।
পাহাড়ি জিভধর ছড়ার ঝিরঝির পানি, সোনালি বালি,
দু–চারটে ছোট মাছ, ঢলে ভাটি থেকে আসা
উজানি কই, মাগুর সন্ধ্যে হতেই বাঁশের কুপির আলোতে ঝুপড়ি পলো দিয়ে মাছ ধরা-সে সব আজ আর নেই ।
ঢল হয়, মাছ আসে না, নেই ভাটিতে মাছ, হাঁস কিছুই
উজানে প্রাণ কোম্পানি আরও কত কারখানা বর্জ্য দিয়ে
বিনাশ করেছে ভাটি অঞ্চলের এসব সম্পদ।
ইটের ভাটা, দালান কোঠা, যত্রতত্র কল-কারখানা,
দোকান-পাট দখল করেছে বিভিন্ন কায়দায় সব জায়গা
ধানি আর পতিত জমি, সবজি ফল-ফলাদি চাষের ভূমি
কিছুই বাদ পড়েনি-এমনকি শ্মশান স্থান, খেলার মাঠ
গো-চারণ ভূমি, খাল-বিল, নদী-নালা গিলেছে গোগ্রাসে নিতান্ত নির্দয়ে, অবহেলা, আর নির্মম নির্লজ্জে।
মানুষের নির্দয়তা, লোভ-লালসা, ক্ষমতার অপব্যবহার
কালো টাকা, মস্তানের দুর্দান্ত দাপটে সহায় সম্বলহীন আদম সন্তান, কষ্টে-সৃষ্টে বেঁচে আছে ধুঁকেধুঁকে মৃতপ্রায়!

পৃথিবীর অন্যতম সেরা রানওয়ে স্পর্শ করার মুহূর্তে by জনি হক

নিস কোত দা’জুর বিমানবন্দরের রানওয়ে
নতুন গন্তব্যে যাওয়া ভ্রমণপিপাসুদের জন্য বরাবরই রোমাঞ্চকর। বিশেষ করে উড়োজাহাজে চড়ে মুগ্ধকর কোথাও পৌঁছালে অন্যরকম আনন্দ হয়। যেমন ফ্রান্সের নিস। ইস্তানবুল হয়ে তার্কিশ এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজে চড়ে সেখানে পৌঁছাতে লাগলো সোয়া দুই ঘণ্টা। এর রানওয়ে দেখতে যেন ছবির মতো! বিমান অবতরণের চোখধাঁধানো রানওয়েগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।
যুক্তরাজ্য ভিত্তিক এভিয়েশন প্রতিষ্ঠান প্রাইভেট ফ্লাইয়ের দৃষ্টিতে— ২০১৯ সালে যেসব রানওয়েতে উড়োজাহাজের অবতরণ সবচেয়ে সুন্দর দেখাবে, সেই তালিকায় তৃতীয় হয়েছে ফ্রান্সের নিস কোত দা’জুর। এটি দেশটির ব্যস্ততম বিমানবন্দরের মধ্যে তৃতীয়। জানালায় তাকিয়ে যতদূর চোখ যায় শুধু নীল জলরাশি দেখেছি। ইচ্ছে হচ্ছিল, সাগরের জলে কিছুক্ষণ মন ভিজিয়ে দীর্ঘযাত্রার ক্লান্তি কাটানো গেলে ভালোই হতো।
নিস কোত দা’জুর বিমানবন্দর
নিসের রানওয়ে স্পর্শ করার সময় বিমানের আসনে বসে মনে হবে বুঝি সাগরের জল পা ছুঁয়ে যাবে! এই বিমানবন্দরে নামার ঠিক আগ মুহূর্তে উপভোগ করা যায় রূপবতী ভূমধ্যসাগর। ভ্রমণপ্রেমী সবারই মন জয় করার মতো রানওয়ে এটি। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর চারপাশের অপূর্ব দৃশ্য মুগ্ধ করে যাত্রীদের। সেখান থেকে মনোরম উপকূলীয় সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
বেসরকারি জেট বিমানের বুকিং প্ল্যাটফর্ম প্রাইভেট ফ্লাইয়ের বার্ষিক এই জরিপে অংশ নিয়েছে ভ্রমণ বিশেষজ্ঞ ও এভিয়েশন ভক্তদের একটি প্যানেল। বিশ্বের ১২৯টি বিমানবন্দরের মধ্য থেকে নির্বাচন করা হয়েছে সেরা ১০। এর মধ্যে নিস অন্যতম। প্রায়ই ভ্রমণকারীরা নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছাতে তড়িঘড়ি করেন। তবে ফ্রান্সের এই শহরে যাওয়ার বেলায় জানালা দিয়ে নীল জলরাশির সুন্দর উপভোগ করতে চায় সবার মন।
নিস কোত দা’জুর বিমানবন্দরের টার্মিনাল-১
নিস কোত দা’জুর ছিমছাম একটি বিমানবন্দর। খুব বেশি বড় নয়, কিন্তু বেশ পরিপাটী। এক নম্বর টার্মিনাল থেকে দুই নম্বরের কিছুটা দূরত্ব আছে। একটি থেকে অন্যটিতে যাওয়ার শাটল বাস আছে। তার্কিশ এয়ারলাইনস অবতরণ করেছে এক নম্বরে। উড়োজাহাজ থেকে নেমে ইমিগ্রেশনের দিকে এগোতেই বাইরে চোখে পড়লো, ‘নাইস টু মিট ইউ’। নিসের বানান ইংরেজি নাইস। বাইরে চোখ মেলে রানওয়ের অপূর্ব দৃশ্য উপভোগের সুযোগ হাতছাড়া করিনি।
নিস কোত দা’জুর বিমানবন্দরের বাইরের চারপাশ নয়নাভিরাম
বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে সোজা তাকাতেই চোখে পড়লো ‘আই লাভ নিস’ লেখা লাল, নীল ও সাদা রঙা স্ট্যান্ড। পর্যটকরা এর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি ও সেলফি তোলায় ব্যস্ত। এক যুগল এসে তাদের ছবি তুলে দেওয়ার অনুরোধ করলো। হাতে অঢেল সময়, তাই আনন্দ নিয়ে তাদের ফ্রেমবন্দি করলাম। এখান থেকে দাঁড়িয়ে দূর পাহাড়ের হাতছানি উপভোগ্য মনে হলো। রাত ৭টা বেজে গেছে। কিন্তু সূর্য হাসিমুখে দিব্যি রোদ্দুর মেলে রেখেছে। ফ্রান্সে সে অস্ত যাবে রাত ৯টার পর!
নিস বিমানবন্দরের বাইরে লেখক

খুশকি দূর করে অ্যালোভেরা

অ্যালোভেরা
ঝলমলে খুশকিমুক্ত চুলের জন্য অ্যালোভেরা ব্যবহার করতে পারেন। অ্যালোভেরার রস ও জেল চুলে নিয়ে আসবে প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা। জেনে নিন চুলের যত্নে কীভাবে ব্যবহার করবেন অ্যালোভেরা।
*অ্যালোভেরা পেস্ট করে চুলের গোড়ায় লাগান। ১ ঘণ্টা পর ভেষজ শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন চুল। মাসে দুইবার ব্যবহার করুন।
*সপ্তাহে দুইবার অ্যালোভেরার রস দিয়ে চুল ধুয়ে নিন। এটি নিয়মিত করলে দূর হবে খুশকি। এছাড়া শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে চুলের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত অ্যালোভেরার রস লাগান। তারপর সুতির কাপড় দিয়ে ১৫ মিনিট মুড়ে রাখুন। চুল খুলে প্রাকৃতিকভাবে শুকিয়ে নিন।   
*অ্যালোভেরার জেল চুলের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত লাগান। পুরোপুরি না শুকানো পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। শুকিয়ে গেলে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
*৩ টেবিল চামচ অ্যালোভেরা জেলের সঙ্গে ১ টি ডিমের সাদা অংশ মেশান। মিশ্রণটি চুলে লাগান। নিয়মিত এটি ব্যবহার করলে খুশকি দূর হওয়ার পাশাপাশি জৌলুস বাড়বে চুলের।  
*অ্যালোভেরার পেস্ট তৈরি করুন। পেস্টটি মাথার তালুতে ঘষে লাগান। শুকিয়ে গেলে হালকা গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন মাথা। প্রতি মাসে দুইবার করলে খুশকি থেকে মুক্তি পাবেন।
তথ্য: বোল্ডস্কাই

বর্ষপূর্তি বিশেষ: গ্লোবাল ফোর্থ এস্টেট কিংবা সাংবাদিকতার নতুন যুগ by বাধন অধিকারী

শাসকশ্রেণির মতাদর্শ প্রচারের স্বার্থ থেকে উৎপত্তি হলেও বিকাশের একপর্যায়ে এসে সংবাদমাধ্যম স্বীকৃত হয়েছে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ফোর্থ এস্টেট (চতুর্থ স্তম্ভ) হিসেবে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারের তিনটি বিভাগের (আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগ) প্রতি ওয়াচ ডগের ভূমিকা পালনকারী হিসেবে দেখা হয় সংবাদমাধ্যমকে। সে হিসেবে সংবাদমাধ্যমের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক এলিটদের বিপরীতে সাধারণ মানুষের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কথা। তবে আদতেও কি তা হয়? হয় না। নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড হারম্যান তাদের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট: দ্য পলিটিক্যাল ইকোনমি অব ম্যাস মিডিয়া’ বইতে করপোরেট সংবাদমাধ্যমের চরিত্র উন্মোচন করেছিলেন। মুনাফাভোগী সংবাদমাধ্যমগুলো কীভাবে স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের মধ্য দিয়ে শাসকশ্রেণির পক্ষে ভূমিকা পালন করে তা দেখিয়েছিলেন প্রচারণা মডেলের মধ্য দিয়ে। সব দেশেই সংবাদমাধ্যমের ‘ফোর্থ এস্টেট’ ভূমিকা তাই প্রশ্নবিদ্ধ। স্বতন্ত্র ও ওয়াচডগ স্টেট/স্তম্ভ হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের আর তিনটি স্তম্ভের মতো করেই সংবাদমাধ্যমকে তাই রাষ্ট্রের চতুর্থ অঙ্গ হিসেবেই অবতীর্ণ হতে দেখা যায়।
ইরাক যুদ্ধের কালে আমরা দেখতে বাধ্য হয়েছি ‘এমবেডেড জার্নালিজম’র নামে কী করে সাংবাদিকতা ক্ষমতাশালী মার্কিন রাষ্ট্র ও মিলিটারি করপোরেশনের ‘রক্ষিতা’য় রূপান্তরিত হয়েছিল। অবজারভার পত্রিকা ২০০৩ সালে হিসাব কষে দেখিয়েছিল ইরাক যুদ্ধের কাভারেজ থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার মুনাফার পরিকল্পনা করেছে রয়টার্স। লন্ডনভিত্তিক নিউ স্টেটসম্যান পত্রিকায় লেখা নিবন্ধে সাংবাদিক জন পিলজার পরিসংখ্যান হাজির করেছিলেন, ইরাক যুদ্ধের সময় বিবিসি’র যুদ্ধবিরোধী কাভারেজের হার ছিল ২ শতাংশ। গার্ডিয়ান পত্রিকার তথ্যানুসারে, ১৯৯১ সালে বিবিসি তার সংবাদকর্মীদের বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যুর ছবি দেখানোর ব্যাপারে ‘সতর্ক’ থাকতে নির্দেশ দিয়েছিল। কিছুদিন পরেই ১৯৯১ সালের ক্রিসমাসের আগে লন্ডনের মেডিক্যাল এডুকেশন ট্রাস্ট জানায়, ‘নিখুঁঁত আঘাত’ এবং এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় দুই লাখেরও বেশি ইরাকি নারী-পুরুষ-শিশু মারা গেছে। এই চরম সত্য সংক্রান্ত একটি সংবাদও বিবিসি প্রচার করেনি। কমবেশি সেই এমবেডেড বাস্তবতার মধ্যেই আমাদের মূলধারার সাংবাদিকতা ঘুরপাক খাচ্ছে এখনও।
ইরাক যুদ্ধ নিয়ে উইকিলিকস-এর ভূমিকা ছিল অনন্য। ২০১০ সালে উইকিলিকস-এর ফাঁস করা গোপন নথির মধ্যে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগান যুদ্ধ সম্পর্কিত ৭৬ হাজার এবং ইরাক যুদ্ধ সম্পর্কিত আরও ৪০ হাজার নথি ছিল, যা যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও পেন্টাগনকে চরম বেকায়দায় ফেলে দেয়। অ্যাসাঞ্জ নথি ফাঁসের পর এক সংবাদ সম্মেলনে নিজেই বলেছিলেন, ইরাক যুদ্ধের আগে থেকেই যে সত্য আড়ালের প্রচেষ্টা চলছে, দলিল ফাঁস করে দিয়ে সেই সত্যটিকেই মানুষের সামনে আনা হয়েছে। উইকিলিকস-এ মার্কিন সেনা গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক বিশ্লেষক চেলসি ম্যানিং কর্তৃক ফাঁস করে দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে, মার্কিন সেনাবাহিনী আফগানিস্তানে শত শত বেসামরিক নাগরিক হত্যা করেছে। ২০১০ সালে উইকিলিকস-এর ফাঁস হওয়া তথ্যের মধ্যে ছিল একটি ভিডিও, যেখানে দেখা গেছে, ইরাকের বাগদাদে মার্কিন হেলিকপ্টার থেকে চালানো হামলায় কীভাবে বেসামরিক নাগরিকদের মরতে হয়েছে। ভিডিওতে একটি কণ্ঠকে বলতে শোনা গেছে, ‘সবাইকে জ্বালিয়ে দাও’। উইকিলিকস-এর উন্মোচন ছাড়া এসব কি আমরা জানতে পারতাম, ‘রক্ষিতা সাংবাদিকতা’র মধ্য দিয়ে?
করপোরেট সংবাদমাধ্যম সংবাদ নির্মাণে তার নিজস্ব মুনাফামুখীন দৃষ্টিভঙ্গি আর সামগ্রিক নব্য উদারবাদী বাজার ব্যবস্থার পক্ষে যে নিত্য প্রচারণা জারি রেখেছে একটি ক্রম-কর্তৃত্বতান্ত্রিক কর্তৃপক্ষীয় ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে, অ্যাসাঞ্জের উইকিলিকস তার বিপরীতে জনগণের মিডিয়া আকারে হাজির হওয়া এক অনন্য সংবাদপ্রতিষ্ঠান, যেখানে সংবাদসূত্র হতে পারেন বিশ্বের যে কেউ। আর নয়া যোগাযোগ প্রযুক্তির সুবিধাকে সঙ্গে নিয়ে বৃহৎ পুঁজির কারবার না হওয়ার কারণে, আরও নির্দিষ্ট করে বললে করপোরেট মিডিয়ার মতো মুনাফামুখীন দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে থাকার কারণে উইকিলিকস-এর কোনও স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের মধ্য দিয়ে যেতে হয় না। সে কারণে করপোরেট মিডিয়া যেখানে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের নামে রাষ্ট্রের চতুর্থ অঙ্গে রূপান্তরিত হয়েছে, উইকিলিকস সেখানে আবির্ভূত হয়েছে ‘গ্লোবাল ফোর্থ এস্টেট হিসেবে’।
গ্লোবাল ফোর্থ এস্টেট বিষয়টির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কথিত জাতীয় স্বার্থের বিরোধাত্মক সম্পর্কের প্রশ্ন। রাষ্ট্রপরিচালনাকারী ক্ষমতাশালীদের পক্ষ থেকে জাতীয় স্বার্থ আর জনস্বার্থকে এক করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। জাতীয় স্বার্থের অজুহাতেই জনগণের কাছ থেকে গোপন করা হয় জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
তবে রাষ্ট্র যদি জনগণের হয়, জনগণ যদি রাষ্ট্রের মালিক হয়, তাহলে তাদের কাছে থেকে তথ্য গোপন করার নাম জাতীয় স্বার্থ হতে পারে কি? এই প্রশ্ন থেকেই উইকিলিকস-এর সাংবাদিকতার সূচনা। এই প্রশ্ন থেকেই উইকিলিকস-এর স্লোগান ‘উই ওপেন গভর্নমেন্ট। কথিত জনস্বার্থের বিপরীতে জনগণের স্বার্থকে সামনে এনে উইকিলিকস আমাদের সামনে নতুন দিনের সাংবাদিকতার নিশানা হয়ে হাজির হয়। জাতীয় স্বার্থের নামে সংঘটিত ইরাক আগ্রাসন, যুদ্ধবাজ অর্থনীতি, ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’র পেছনের রাজনীতিকে উন্মোচন করে অভাবনীয় সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে।
অগ্রসর প্রযুক্তির যুগে দক্ষ প্রযুক্তিবিদ হিসেবে উইকিলিকস-এর কারিগরেরা এমন একটি যোগাযোগ পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, যেখানে কোনও রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী প্রযুক্তি দক্ষতায় পৌঁছাতে পারে না। কে উইকিলিকসকে তথ্য দিলো, তা আজও যান্ত্রিক পদ্ধতিতে বের করা যায়নি। উইকিলিকস তার সংবাদসূত্রের শতভাগ গোপনীয়তা নিশ্চিত করে কোনও ধরনের সেন্সরশিপ ও তথ্যগত সম্পাদনা ছাড়া জনসম্মুখে হাজির করে। ইতিহাসকে তারা ‘অতীত’ থেকে টেনে বের করে বর্তমানে স্থাপিত করেছে। সত্যিকারের সাংবাদিকতার অপরাধেই যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র-ডেনমার্ক-ইকুয়েডরের বিচারিক সন্ত্রাসের বলি হচ্ছেন উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের মধ্য দিয়ে হ্যাকিং ও গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে বিচারিক হত্যাকান্ডের মুখোমুখি করতে তৎপর ক্ষমতাশালীরা। তার সুরক্ষার প্রশ্ন আজ সাংবাদিকতার সুরক্ষার প্রশ্ন হিসেবে হাজির হয়েছে।

বইমেলার দিগন্ত-ছোঁয়া আকাশ by সেলিনা হোসেন

২০১৭ সালের ডিসেম্বরের ২১ তারিখে শুরু হয়েছিল খড়দহ বইমেলা। ১৮ বছর ধরে এই বইমেলা বছরে একবার আয়োজিত হচ্ছে। আমার কখনো এই বইমেলায় যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তবে এই বইমেলার খবর পত্রিকায় পড়েছি। যাদের এই বইমেলায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল তাদের কাছে বইমেলা সম্পর্কে গল্প শুনেছি। তারা ভালোলাগার কথাই বেশি করে বলত। আমার ধারণা হয়েছিল ছোট বইমেলার বড় পরিসর নিয়ে খড়দহ বইমেলা লেখক-পাঠকের প্রাণের বইমেলা হয়েছে। এ বছর মেলা আয়োজক কমিটি সিদ্ধান্ত নেন যে এখন থেকে বাংলাদেশের একজন লেখককে এই মেলার উদ্বোধনী দিনে আমন্ত্রণ জানান হবে। বইমেলা কমিটির সিদ্ধান্ত আমার পক্ষে আসে। বইমেলার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন শ্রী কাজল সিনহা। আমি উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য মানস চক্রবর্তীর কাছ থেকে আমন্ত্রণ পত্র পাই। খড়দহ বইমেলা দেখার সুযোগ আমি পাই। সেদিন মঞ্চে অনেকে ছিলেন। ছিলেন কথাসাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী। সবার বক্তৃতার পরে গান গেয়েছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন।
খড়দহ মেলার পরিসর অনেক বড় নয়। চারদিকের বসতির মাঝে একটি মাঠ ব্যবহৃত হয় এই মেলার জন্য। দেখলাম ৪০টি বইয়ের স্টল আছে। মাঠভর্তি মানুষের উপস্থিতি দেখে মনে হয়েছে ছোট বইমেলার বড় দিগন্ত। মেলাজুড়ে মানুষের উপস্থিতি বইয়ের হাত ধরে। এমন দৃশ্যটি আমার মাঝে সীমান্ত পেরিয়ে আসার আনন্দ আকাশ-ছোঁয়া করে ফেলে। এই বইমেলার যে বিষয়টি আমার আরও ভালো লেগেছে তাহলো ঘনবসতির মাঠে অনুষ্ঠিত মেলা মানুষের দোরগোড়ার আয়োজন। শিশুদের হাত ধরে বাবা-মায়েরা মেলায় আসছে। বই কিনছে। গাড়ি ভাড়া করে দূরে কোথাও যেতে হচ্ছে না। হাতের কাছে এত বই না কিনে কি উপায় আছে! দুচারটা তো কিনতেই হয়। এভাবে বইমেলার ছোট আয়োজনে মানুষ হাতের কাছে বই পায়। বই পৌঁছে যায় বড়দের কাছে, ছোটদের কাছেও। খড়দহ মেলা প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আমি প্রাণের টান অনুভব করি।
একজন লেখক হিসেবে বইমেলা আমার কাছে আপন অস্তিত্বের মতোই একটি বিষয়। বাংলা একাডেমিতে ৩৪ বছর চাকরি করে অমর একুশে গ্রন্থমেলা আমি দেখেছি খুব কাছে থেকে প্রতিদিন, প্রতিটি সময়ে। এর চরিত্র শুধু বই প্রকাশ এবং বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই বইমেলা ভাষা আন্দোলনের শহীদের রক্তে প্রতিষ্ঠিত বাংলা একাডেমি কর্তৃক আয়োজিত এবং একুশে ফেব্রুয়ারির উপলক্ষ হলেও সারা মাস জুড়ে বইমেলার আবেদন জাতীয় মননের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমি জানি না সারা মাস জুড়ে অন্য কোনো দেশে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় কি না। বাংলা একাডেমি আয়োজিত ফেব্রুয়ারি বইমেলাটি আমাদের একদম নিজস্ব বইমেলা। নিজেদের লেখক, নিজেদের প্রকাশনা এবং নিজেদের ভাষার পাঠকের মহাসম্মেলন এই মেলাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। জাতিসত্তার এমন অসাধারণ রাখিবন্ধন করেছে আমাদের অমর একুশে গ্রন্থমেলা।
এছাড়াও আমি বিভিন্ন সময়ে ভারতের তিনটি প্রদেশের বইমেলায় আমন্ত্রিত হয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। ১৯৯৬ সালে প্রথম যাই দিল্লিতে। ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ দিন ধরে চলেছিল এই মেলাটি। এটি ছিল দিল্লির দ্বাদশ বিশ্ব বইমেলা। মেলার থিম ছিল ‘সার্ক দেশসমূহ’। সার্কদেশসমূহের সাতজন লেখক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। মেলার উদ্বোধন করেছিলেন পাকিস্তানের কবি আহমদ ফরাজ। আমাকে দেয়া হয়েছিল ইংরেজি ও হিন্দি বইয়ের তালিকা (ক্যাটালগ) অবমুক্ত করার জন্য। সাতটি দেশের সাতজন লেখকই কিছু না কিছু করেছিলেন। বইমেলাটির আয়োজন করেছিল ‘ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া। আমার লিখিত ভাষণে আমি বলেছিলাম, ‘আমি মনে করি বইমেলা এমন সম্মেলনের ও অঙ্গীকারের প্রতীক, যা একটি বিশেষ দেশের সীমানাকে ছাড়িয়ে যায়। বই যেভাবে দ্বন্দ্ব ও উত্তেজনা হ্রাস করে মানুষকে শান্তি ও সৌহার্দ্যরে পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তেমনটি আর কিছু পারে বলে আমি মনে করি না এবং বইমেলাই আমি বিশ্বাস করি, মারণাস্ত্র, সামরিক শাসন, স্বৈরাচার, অসাম্য এবং অন্য যা কিছু মানুষকে মানুষ হিসেবে খর্ব করে, তার বিরুদ্ধে শপথ উচ্চারণ করার এবং নিজেদের আত্মাকে বিকিয়ে না দেয়ার জন্য অঙ্গীকার ঘোষণার সর্বোত্তম সুযোগ এনে দেয়। এই বিশ্বমেলা আয়োজনের জন্য আমি ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়াকে অভিনন্দন জানাই।’ মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল দিল্লির প্রগতি ময়দানে। পাশাপশি বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান। অসংখ্য লেখক, অজস্র বই আমার জন্য ছিল এক বিপুল অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন দেশ থেকে, বিশেষ করে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লেখক এবং প্রকাশকরা আমার মনোযোগ কেড়েছিল। তাদের সঙ্গে কথা বলে আমি অনেক কিছু জানতে পারি। মোজাম্বিক থেকে এসেছিলেন একজন নারী, তার নামটা ভুলে গেছি, তিনি অত্যন্ত কর্মনিষ্ঠ মহিলা। তার নিজের প্রকাশনা সংস্থা ছিল এবং আফ্রিকার কোনো একটি বইয়ের সংগঠনের তিনি সভাপ্রধান ছিলেন।
ওয়াইএমসিএ’র গেষ্ট হাউসে আমরা একসঙ্গে ছিলাম। তার প্রকাশনা সংস্থা থেকে বেশ কয়েকটি বই কিনি। পরিচয় হয়েছিল দিল্লির ‘কালি ফর উইম্যান’-এর স্বত্তাধিকারী উর্বশী বুটালিয়ার সঙ্গে। তার সংস্থাটি সে সময়ে নারী বিষয়ে বই প্রকাশের জন্য বেশ নাম করেছিল। উর্বশী এখন জুবান (Zuban) নামে প্রকাশনা সংস্থা চালায়। প্রগতি ময়দান একটি বিশাল এলাকাজুড়ে, অনেক সময় এই মাথা থেকে ঐ মাথায় যেতে গাড়ি ব্যবহার করছিল মেলা কর্তৃপক্ষের লোকজন। অন্যথায় সাধারণের জন্য গাড়ি প্রবেশ নিষেধ। ব্যাংক, পোস্ট অফিস, টেলিফোন অফিস ইত্যাদিসহ প্রয়োজনীয় সবকিছুই ছিল সে মেলা প্রাঙ্গণে। পরে শুনেছিলাম এই ময়দানটি বিভিন্ন ধরণের মেলা আয়োজন করার জন্য স্থায়ী জায়গা। প্রগতি ময়দানে গিয়ে পরিচিত হওয়ার অসংখ্য মানুষ এখনো আমার স্মৃতির এক গভীর সঞ্চয়। বইমেলা আমার জন্য দেশের সীমানা তুলে দিয়েছিল প্রত্যক্ষভাবে।
পরে যে বইমেলাটি আমাকে টেনেছে সেটি হলো ‘আগরতলা বইমেলা। ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত হয় অষ্টাদশ আগরতলা বইমেলা।
ঐ বইমেলায় উপস্থিত থাকার জন্য আমি নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম ত্রিপুরা সরকারের তথ্য, সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রী জীতেন্দ্র চৌধুরীর কাছ থেকে। বইমেলা আয়োজিত হয়েছিল ‘রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবন’ প্রাঙ্গণে। বইমেলার উদ্বোধক ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী কবি অনিল সরকার। বিশেষ অতিথি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গ্রন্থাগার মন্ত্রী নিমাই পাল এবং ত্রিপুরার প্রবীণ কথাসাহিত্যিক বিমল চৌধুরী। প্রদীপ জ্বালিয়ে বইমেলা উদ্বোধন করা হলে সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে উঠে পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে আলোর মালা। অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলা ও ককবরক ভাষায় রবীন্দ্রনাথ লিখিত জাতীয় সঙ্গীত পরিবশেন করে শিল্পীরা। আয়োজনটি ছোট ছিল কিন্তু প্রাণের আবেগে ভরপুর ছিল। স্থানীয় লেখকরা আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। তাদের আলোচনা থেকে ত্রিপুরা সাহিত্যের একটি ধারণা পাওয়া যায়। কয়েকদিন ত্রিপুরা থেকে তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে বইমেলার আবহকে আমার একটি ভিন্নমাত্রার অনুষঙ্গ মনে হয়েছিল। ছোট আয়োজনটি মাতিয়েছিল অনেক বেশি করে।
কলকাতার বইমেলায় আমি অনেকবার গিয়েছি। এই বইমেলাটিও আমার জন্য অনেক বড় একটা স্মৃতি হয়ে আছে। কারণ, মাতৃভাষায় লেখা বই কিন্তু অন্যদেশ ও সংস্কৃতির মানুষের কথা তাই এই বইমেলায় যেতে তাগিদ অনুভব করি। ১৯৯৯ সালে কলকাতা বইমেলার থিম ছিল ‘বাংলাদেশ’। আমাকেও একটি প্রবন্ধ পড়তে হয়েছিল। সেবার গড়ের মাঝে বইমেলা হয়েছিল।
এই মেলায় একটুখানি ধাক্কা খাই, কারণ প্রতিষ্ঠিত লেখকরা ভালো ব্যবহার করেননি। বাংলাদেশ থিম কান্ট্রি হলেও বাংলাদেশের লেখকদের আলোচনা অনুষ্ঠানের সময় তারা মেলায় উপস্থিত থেকেও আড্ডা দিয়েছেন অন্যত্র। মনে হয়েছিল, লেখকদের সঙ্গের দরকার নেই। বই কেনা হোক আনন্দের। লেখকদের উদাসীনতা দেখে ভেবেছিলাম এই বইয়ের প্রাচুর্য কিন্তু লেখকদের হৃদয় খোলা নয়। বই চাই, লেখকের উষ্ণতা চাই না এটা তো হয় না, যেটা আমি দিল্লি কিংবা আগরতলায় পাইনি।
দিল্লি এবং আগরতলায় যেসব লেখকের সঙ্গে দেখা হয়েছে তারা বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। সালটা মনে নেই, মনে আছে কোনো এক সময়ে ঢাকার ‘মুক্তধারা’র স্বত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহা ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজের বইয়ের পসরা বসিয়েছিলেন বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। ঘাসের উপর চট বিছিয়ে রেখে দেয়া বইগুলো ফুলের মতো ফুটেছিল।
পাঠক উবু হয়ে বসে বই দেখেছিলেন। মনে হচ্ছিল এ এক অন্য জগৎ। এই মেলাকে আস্তে আস্তে বড় হতে দেখেছি। স্টল তৈরি হতে দেখেছি। ছোট পরিসরে মেলার আয়োজন দেখেছি। এসব সত্তর দশকের কথা। মানুষের ভিড় কম ছিল। স্টলের সংখ্যা কম ছিল। ঘুরে ঘুরে বই দেখার আনন্দ ছিল বেশি। বই খুঁজতে ঠেলাঠেলি করতে হয়নি। অনায়াসে পেয়ে যেতাম নিজের পছন্দের বই।
আশির দশকে মেলার বড় পরিবর্তন হয়। ১৯৮৪ সালে বইমেলার আনুষ্ঠানিক নাম রাখ হয় ‘অমর একুশে বইমেলা।’ এ বছর একাডেমি প্রাঙ্গণের বিভিন্ন জায়গায় মাটি ফেলে ভরাট করে মেলার আয়তন বাড়ানো হয়। মাটি ফেলা হয় পুকুরের পশ্চিম পাড়ে। ভরাট করা হয় বর্ধমান ভবনের উত্তর ও ক্যাফেটেরিয়া ভবনের দক্ষিণ দিক। আশির দশকে এটি একটি দিক ছিল যে মেলার আয়তন বাড়ানো। আরেকটি দিক ছিল এই বছরে মেলার দিনও বাড়ানো হয় ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আগে একুশের বইমেলার সময় ছিল মাত্র কয়েকদিন। এ সময়ের বইমেলা উদ্বোধন করতেন দেশের বরণ্যে কেউ।
মেলার এমন পরিবেশে বিশ্বাস করতাম বইমেলা মানুষের সাংস্কৃতি চেতনাকে পরিশীলিত করে। তথ্য প্রযুক্তির এই সময়েও বলতে চাই বইয়ের বিকল্প নেই। বড় করে শ্বাস নিলে একুশের চেতনায় প্লাবিত হয়ে থাকা মেলা প্রাঙ্গণ জাতির ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ জায়গা।
নব্বইয়ের দশকে বইমেলা আরো বড় হয়। বইমেলা উদ্বোধন করতে আসেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। এখন পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। এই অনুষ্ঠান বিভিন্ন চ্যানেলে সরাসারি প্রচারের ব্যবস্থা করার ফলে দেশের দূর অঞ্চলের মানুষ দেখতে পাচ্ছে।
প্রতিদিন বইমেলার খবর প্রচারিত হয় দৈনিক পত্রিকা ও ইলেক্ট্রনিক চ্যানেলে। এভাবে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের নানা কর্মকাণ্ড একুশের বইমেলাকে সম্প্রসারিত করেছে। ফলে সমস্যা দেখা দিয়েছে জায়গার। তাই প্রশ্ন উঠেছে বইমেলাকে অন্য কোথাও সরিয়ে নেয়া যায় কিনা তা ভেবে দেখার জন্য। বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী ময়দানের বিশাল প্রাঙ্গণ জুড়ে বইমেলা আয়োজিত হয়।
আরও একটি বইমেলার কথা উল্লেখ করতে চাই। এই বইমেলার আয়োজন করেছিল আদিবাসী মান্দি জনগোষ্ঠী। বইমেলার স্লোগান ছিল ‘বই হোক মান্দিদের আত্মবিকাশের মন্ত্র।’ আত্মবিকাশের অর্থ অনেক বড়, আমি মনে করি বইমেলা দিয়ে শুধু বই কেনা বা পড়ার অভ্যাসটা গড়ে তোল নয়। এর অর্থ নিজের বিকাশকে পূর্ণাঙ্গ করা। ব্যক্তিমর্যাদাকে বিকশিত করা এবং জাতিগোষ্ঠীর মর্যাদাকে রাষ্ট্রীয় অধিকার আদায়ের মধ্য দিয়ে সমুন্নত করা। বই আত্মবিকাশের সহায়ক শক্তি। আজকের এই আলোকিত মুখের কাছে আমার দাবি, তারা তারুণ্যপ্রদীপ্ত হয়ে বইয়ের মাধ্যম নিজেদের যোগ্য করে তুলবে।
মান্দী ভাষার উদীয়মান তরুণ কবি মিঠুন রাকসাম যখন এই বইমেলার আয়োজন করে, এটি কোনো সামান্য ঘটনা নয়, এটি একটি শুভ, বি-শা-ল ঘটনা। আমরা যখন বলব যে আমাদের বৈচিত্র্য আছে, আমাদের জাতিসত্তার মধ্যে যে বৈচিত্র্য আছে, যাদের নিজেদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে সারা বিশ্বের দরবারে যেতে পারবে, বলতে পারবে- এই আমি, এই আমার মান্দি জনগোষ্ঠী, এই আমি, এই আমার আইন, এই আমার ইতিহাস, এই আমার ঐতিহ্য, এই আমার গল্প, এই আমার কবিতা, এই আমার নাটক, এই আমার পাহাড়, মধুপুরের গড়, পর্বত-জঙ্গল সবকিছুর ভেতরে আমাদের অস্তিত্ব আছে। এই অস্তিত্বের যে ভবিষ্যৎ নিয়ে আজকের বইমেলার শুরু, উদ্বোধন তার ভেতর দিয়ে।
বই কোনো একটি কাগজের পাতা নয়, বই কোনো একটি দুই মলাটের কোনো কিছু নয়, বই একটি অসাধারণ শক্তি। আমি মনে করি, আজকের প্রযুক্তির দিনে, বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট, ইমেইল, মোবাইল, সবকিছুর পরও বই আমাদের সেই শক্তি, যে শক্তির ভেতর দিয়ে আমরা আমাদের নিজেদের আবিষ্কার করতে পারি। প্রতিটি লেখা প্রতিটি অক্ষর আমাদের জীবন হয়ে থাকবে।
ইদানিং বাংলাদেশের প্রকাশকরা বিভিন্ন স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বইমেলার আয়োজন করে। তাদের লক্ষ্য ছেলেমেয়েদের হাতের নাগালে বই পৌঁছে দেয়া। একবার ছায়ানট ভবনের নালন্দা স্কুলে আয়োজিত হয়েছিল বইমেলা। আমি আমন্ত্রিত অতিথি ছিলাম। দেখলাম ছেলেমেয়েরা বই কিনছে। ষষ্ঠ শ্রেণির একটি মেয়ে আমার ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাসটি এনে আমাকে বলল, ‘আপনার এই বইটি আমাকে দিতে হবে। আমার কাছে যে টাকা ছিল তা শেষ হয়ে গেছে।’ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আমি বই আর বইমেলার বিষয়টি গভীর ভালোবাসায় দেখতে পাই। আমি ওর মাথায় হাত রেখে বলি, ‘মাগো তোমার যে বই ভালোলাগে তা নাও। টাকার কথা ভাবতে হবে না।’ একটি বইয়ের জন্য ও দাবী জানিয়েছে, আবদার করেনি। বইমেলার সার্থকতা এখানে।
এমন অনেক ছোট ছোট বইমেলার নানা অভিজ্ঞতা আমার আছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে গিয়েছিলাম হুগলির কোন্নগরের নবগ্রাম হীরালাল পাল কলেজে। অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল কলেজের বাংলা বিভাগ। হুগলি শহরে অনেক ছোটবড় বইমেলা দেখে প্রাণমাতানো আনন্দ নিয়ে দেশে ফিরে আসি। বারবারই ভাবি এভাবে বইমেলা মানবজীবনের প্রগতির ধারাকে অক্ষুণ রাখবে। জনজীবনের অধিকারের লড়াইয়ে প্রেরণা দেবে।
জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষা রক্ষার সহায়ক শক্তি হবে। যত ছোট আকারের হোক না কেন কোনো জনগোষ্ঠীর ভাষা বিলুপ্ত হবে না। বইমেলা ধারণ করবে মানবজাতির সৃজনশীল মেধা। বিকশিত হবে জ্ঞান। চর্চিত হবে শুভ ও কল্যানের বোধ।
২০১৯ সালের ৫ জানুয়ারি খড়গপুর বইমেলায় আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলাম। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় অনুষ্ঠিত এই মেলা আমার সামনে আর এক দিগন্ত। লেখক-পাঠকের মিলনমেলায় স্নাত হই। নিজের বইয়ের নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় পাঠককে।
আমরা সবাই জানি বইয়ের সীমান্ত নেই। সীমান্ত ছাড়িয়ে বই পৌঁছে যায় মানুষের কাছে। এশিয়ার মানুষ হয়ে জানতে পারি আফ্রিকার সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের রূপরেখা। জানতে পারি ইউরোপ-আমেরিকা-ল্যাটিন আমেরিকার জীবন। বই মানবজাতির অক্ষয় সাধনা।

Tuesday, February 18, 2020

বিশ্বে বিমান ছিনতাইয়ের যত দুর্ধর্ষ ঘটনা

দিনটি ছিল ১৯৮৪ সালের ৩ ডিসেম্বর। কুয়েত সিটি বিমানবন্দরের অবস্থা বেশ স্বাভাবিক। কুয়েত এয়ারওয়েজ-এর একটি বিমান পাকিস্তানের করাচি যাবার জন্য তৈরি। নির্ধারিত সময়ে বিমানটি আকাশে উড়ে। কিন্তু উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরেই ছিনতাইকারীরা বিমানের দখল নেয়।
লেবাননের চারজন শিয়া ছিলেন ছিনতাইকারী। ছিনতাইকারীরা বিমানটির দিক পরিবর্তন করে ইরানের তেহরানে নিয়ে যায়। তেহরানের অবতরণের পর নারী, শিশু এবং মুসলিমদের ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু মার্কিন সংস্থা ইউএসএআইডি'র দুই কর্মকর্তাকে গুলি করে হত্যা করে। ছয়দিন জিম্মি অবস্থার পর ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী বিমানটিতে অভিযান চালায় এবং নয়জনকে মুক্ত করে।
ইজিপ্ট এয়ার ছিনতাই
১৯৮৫ সালের ২৩ নভেম্বর ইজিপ্ট এয়ারের একটি বিমান ৯২ জন যাত্রী এবং ছয়জন ক্রু নিয়ে গ্রিসের এথেন্স থেকে মিসরের কায়রো যাচ্ছিল। ফাইট এটেন্ডেডরা যখন যাত্রীদের মাঝে খবরের কাগজ বিতরণ করছিলেন তখন একজন যাত্রী জোর করে ককপিটে ঢুকে যায়।
বাকি দুইজন ছিনতাইকারীদের মধ্যে একজন সামনে এবং অপরজন পেছনে। তখন তারা অস্ত্র বের করে। যাত্রীদের নড়াচড়া করতে নিষেধ করে তাদের কাছ থেকে পাসপোর্ট কেড়ে নেয়া হয়। এক পর্যায়ে ছিনতাইকারীদের একজন এক যাত্রীর পাসপোর্ট দিতে বলে।
সে ব্যক্তি ছিল মিসরের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। তিনি ব্যাগ থেকে পাসপোর্ট বের না করে একটি পিস্তল বের করেন এবং এক ছিনতাইকারীকে গুলি করেন।
এতে সে ছিনতাইকারী মারা যায়। সে সময় ককপিট থেকে অপর ছিনতাইকারী বেরিয়ে আসে। তাদের মধ্যে মাঝ আকাশে শুরু হয় গোলাগুলি। তখন বিমানের কেবিন প্রেশার নেমে যায় এবং অক্সিজেন মাসক নেমে আসে। ছিনতাইকারীরা বলে বিমান তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে এবং কাউকে নড়াচড়া করতে নিষেধ করে। রাত নয়টার দিকে বিমানটি মাল্টায় অবতরণ করে। সেখানে নেমে ছিনতাইকারীরা বিমানের জন্য জ্বালানী তেল দাবি করে।
কিন্তু বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলে, যাত্রীদের মুক্তি না দিলে জ্বালানী তেল দেয়া হবে না। কিন্তু ছিনতাইকারীরা তাদের দাবিতে অনড় থাকে। এক পর্যায়ে তারা বলে জ্বালানী তেল না দিলে প্রতি ১০ মিনিটে একজন যাত্রীকে হত্যা করা হবে।
এভাবে তারা কয়েকজন যাত্রীকে গুলি করে প্লেনের বাইরে রানওয়েতে ফেলে দেয়। কিন্তু তারপরেও জ্বালানী তেল সরবরাহ করেনি মাল্টা কর্তৃপক্ষ। পরেরদিন বিকেলে মাল্টা সরকারের অনুমোদন নিয়ে মিসরের কমান্ডোরা বিমানটিতে অভিযান চালিয়ে পণবন্দী দশার অবসান ঘটায়। সে ঘটনায় দুই ছিনতাইকারীসহ ৫৯ জন মানুষ মারা যায়। বিমানে হামলার কারণে ২৭ জন আহত হয়।
প্যান অ্যাম বিমান ছিনতাই
১৯৮৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। ভারতের মুম্বাই থেকে প্যান অ্যাম-এর বিমানটির গন্তব্য ছিল নিউইয়র্ক। মুম্বাই থেকে ছেড়ে আসার পর বিমানটি পাকিস্তানের করাচি বিমানবন্দরে নামে। সে বিমান ছিনতাইয়ের রক্তাক্ত অবসান হয়। ২২ জন নিহত এবং ১৫০ জন আহত হয়েছিল। ফিলিস্তিনী অস্ত্রধারীরা সে বিমানটিতে অস্ত্র নিয়ে উঠেছিল। বিমানটি যখন টারমার্কে দাঁড়ানো অবস্থায় ছিল, সে সময় নিরাপত্তা রক্ষীদের ছদ্মবেশ ধারণ করে বিমানে ঢুকে পড়ে। বিমানে ঢুকেই অস্ত্রধারীরা কেবিন ক্রুদের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে বলে, তাদের পাইলটের কাছ নিয়ে যেতে হবে।
তখন কেবিন ক্রুদের মধ্যে একজন বেশ দ্রুততার সাথে পাইলটদের জানিয়ে দেয় যে বিমানে অস্ত্রধারীরা প্রবেশ করেছে। তখন পাইলটরা বেশ দ্রুততার সাথে বিমান থেকে বেরিয়ে যায়। ছিনতাইকারীরা পাইলটদের ফিরিয়ে আনার জন্য নানা চাপ দিচ্ছিল।
কারণ তাদের উদ্দেশ্য ছিল বিমানটিকে ইসরায়েল অথবা সাইপ্রাসে নিয়ে যাওয়া। পাইলটরা বিমানে ফিরে না আসায় একজন যাত্রী গুলি করে হত্যা করে বিমান থেকে নিচে ফেলে দেয়া হয়।
এর মাধ্যমে ছিনতাইকারীরা পাইলটদের ফিরে আসার জন্য চাপ তৈরি করছিল। ছিনতাইকারীরা আমেরিকান যাত্রীদের খুঁজছিল। সে বিমানে ছিনতাইকারীদের গুলিতে নিহত হয়েছিল ভারতীয় কেবিন ক্রু নিরজা। যাকে নিয়ে সাম্প্রতিক বছরে বলিউডে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।
যখন সন্ধ্যার হয় তখন বিমানের ভেতরেও অন্ধকার নেমে আসে। তখন বিমানের তিনটি দরজা খুলে দেয়া হয়। অন্ধকারের মধ্যে অস্ত্রধারীরা বিষয়টি বুঝতে পারেননি। সে সুযোগে অনেক যাত্রীকে নামিয়ে দেন কেবিন ক্রুরা। এক পর্যায়ে অস্ত্রধারীরা বিমান ছেড়ে পালিয়ে যাবার সময় পাকিস্তানী নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে।
এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান ছিনতাই
১৯৯৯ সালের ২৪ জানুয়ারি। বড়দিন উদযাপনের ঠিক আগের দিন। ১৮০ জন যাত্রী নিয়ে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইট কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করে। বিমানে আকাশে উঠার ৩০ মিনিট পর ছিনতাইকারীরা বিমানের দখল নেয়। এরপর বিমানটিকে পাকিস্তানের আকাশ সীমায় নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান হওয়ায় সেটিকে অবতরণের অনুমতি দেয়া হয়নি।
তখন বিমানে জ্বালানী প্রায় শেষ হয়ে আসছিল। বিমানটি ভারতের আকাশ সীমায় ফিরে এসে অমৃতসর বিমানবন্দরে অবতরণ করে। কিন্তু বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সেটিকে জ্বালানী সরবরাহ করছিল না। বিমানের ভেতর থেকে পাইলট কন্ট্রোল রুমকে জানায় যে চারজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। পরিস্থিতি আরো অবনতির আশংকায় বিমানটিকে কিছু জ্বালানী দেয়া।
ভারত সরকার পাকিস্তানের সাথে কথা বলে। এরপর সেটি উড়ে যায় পাকিস্তানের লাহোর বিমানবন্দরে। সেখানে বিমানটিকে নামার অনুমতি দেয়া হয়। সেখান থেকে জ্বালানী নিয়ে বিমানটি চলে যায় দুবাইতে।
সেখানে যাবার পর ছিনতাইকারীরা ২৭ জন যাত্রীকে ছেড়ে দেয় এবং নিহতদের মধ্যে একজনের লাশ হস্তান্তর করা হয়। এরপর বিমানটি চলে আসে আফগানিস্তানের কান্দাহার বিমানবন্দরে। সেখানে বিমানের ভেতরেই যাত্রীরা ছয়দিন ছিলেন।
যাত্রীদের পণবন্দী করে ছিনতাইকারীরা ভারতের কারাগারে আটক তাদের ৩৬জনকে ফেরত চায়। এছাড়া তারা ২০০ মিলিয়ন ডলারও দাবি করে। ভারতের কারাগারে আটক তিন জনকে মুক্তি দেবার বিনিময়ে বিমান ছিনতাইয়ের নাটকের অবসান ঘটে।
৯/১১ আমেরিকায় বিমান ছিনতাই
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকায় চারটি বিমান ছিনতাই করে ১৯ জন ছিনতাইকারী। সে বিমানগুলো দিয়ে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। সে হামলার পরিকল্পনাকারী ছিলেন আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন।
সকাল ৮:৪৬ মিনিটে বস্টন থেকে লস এঞ্জেলসগামী আমেরিকান এয়ার লাইন্স-এর বিমান ছিনতাই করে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত করে।
৯:০৩ মিনিটে বস্টন থেকে লস এঞ্জেলস গামী ইউনাইটেড এয়ার লাইন্স-এর বিমান ছিনতাই হয়। বিমানটি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দক্ষিণ টাওয়ারে আঘাত করে। ৯:৩৭ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইন্স-এর আরেকটি ফ্লাইট ছিনতাই করে ওয়াশিংটনে পেন্টাগন ভবনে আঘাত করে
১০:০৩ মিনিটে ইউনাইটেড এয়ার লাইন্স-এর আরেকটি বিমান ছিনতাই করা হয়। কিন্তু সেটি পেনসিলভানিয়াতে বিধ্বস্ত হয়।

রাজনৈতিক বাণিজ্য-চক্র by শুভময় মৈত্র

কমলেন্দু ধরের লেখা ‘ভারতীয় রাজনীতির বিপণন’ দু’টি ভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক দলিল। বইটির প্রথমভাগ প্রকাশিত হয়েছিল প্রায় তিন দশক আগে, ১৯৯০-তে। সেই অংশটুকু রেখে, তার সঙ্গে পরবর্তী সময়ের কথা যোগ করে, সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে বইটির পরিবর্ধিত সংস্করণ। বইটি লেখার উদ্দেশ্য সোজা কথায় পেশ করা হয়েছিল প্রথম পর্বের ভূমিকাতেই— “একটি স্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে বইটি লেখা। আজকের ভারতীয় রাজনীতি কীভাবে পণ্য বিপণনের পদ্ধতিতে পণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে তা প্রমাণ করা।” অঙ্কের ভাষায় প্রমাণের শুরুতে কিছু স্বীকার্য (পসটুলেট) থাকে। সেটি থেকে ধাপে ধাপে আঙ্কিক যুক্তিসহকারে প্রমাণ করতে হয় বিভিন্ন উপপাদ্য এবং অনুসিদ্ধান্ত। যেমনটা আমরা দেখি ইউক্লিডের জ্যামিতিতে। সমাজবিদ্যা বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রমাণ সেভাবে আসে না। সেখানে যুক্তিগুলো সামাজিক এবং রাজনৈতিক, আর দাবির অনেকটা জায়গা জুড়ে থাকে পরিসংখ্যান। অর্থাৎ এখানে যুক্তিগুলো মেনে নেওয়ার মতো হলেও, বিশ্বাসযোগ্য হলেও, সবসময়েই একটু জায়গা থাকে একমত না হওয়ার। আর লেখক সুযোগ খোঁজেন একই মত বারবার বিভিন্ন শব্দবন্ধে প্রকাশ করে নিজের বক্তব্যকে জোরালো করে তোলার। গবেষণামুখী এই বইটিতেও সেই ধারা বর্তমান।
ভারতীয় রাজনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা পুঁজিবাদের কথা অত্যন্ত সাবলীলতার সঙ্গে পেশ করেছেন লেখক। সেই নিরিখে রাজনীতি যে একটি পণ্য, তা যথেষ্ট প্রত্যয়ের সঙ্গে ব্যক্ত করা হয়েছে, পেশ করা হয়েছে এ দেশে সেই বিমূর্ত পণ্য বিপণনের ধারাবিবরণী। এই বইটির আলোচনায় রাজনীতিকে বিমূর্ত (অ্যাবস্ট্র্যাক্ট) বলা যেতেই পারে। কারণ, তার বিভিন্ন রূপ বাজারে কেনাবেচা হয়, যদিও বিষয়টির মূল অবয়ব অস্তিত্বহীন। হয়তো আর কিছুদিন পরে এই ধরনের আলোচনা হবে যে, “চলুন তো আজ বিকেলে সিটি সেন্টারে গিয়ে কিছুটা ডানপন্থী রাজনীতি বিক্রি করে আসি”, কিংবা “আজ সন্ধ্যায় কি যাদবপুর থেকে অল্প অতিবাম রাজনীতি কিনে আনা সম্ভব?” তবে চেতনার ততটা উত্তরণ আমাদের সমাজে এখনও ঘটেনি। রাজনীতি তাই পণ্য হিসেবে বিক্রিত অথবা বিকৃত হয় পরোক্ষভাবে। কমলেন্দুবাবুর বইটির প্রচ্ছদে সেই কারণেই বোধ হয় এদিক-ওদিক ছড়ানো আছে কিছু শব্দ, যেমন ওপরের দিকে ‘নীতি’, ‘আদর্শ’, ‘নৈতিকতা’, ‘সততা’ আর নীচে ‘উত্তর-সত্য’ কিংবা ‘রাজনৈতিক বাণিজ্য চক্র’। ভারতীয় রাজনীতির পণ্যায়নের প্রেক্ষাপটে মাথার শব্দগুলোর গুণগত মান বিচার করা হয়েছে যুক্তি অথবা পরিসংখ্যান দিয়ে।
কী-কী বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে বইটিতে? অতীতে লিখিত অংশটির শুরুতে লেখক অনেকটা জায়গা নিয়ে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, কেন তিনি রাজনীতিকে পণ্য বলছেন। এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে এসেছে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক দল বা নেতা-নেত্রীদের সম্পর্ক। পরের অধ্যায়েই ভারতের আর্থসামাজিক রেখাচিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি সারণি ২-তে (পৃ. ২৮) সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর সম্পদের পরিমাণ পেশ করেছেন। বিভিন্ন তথ্যের সাহায্যে লেখক উপলব্ধি করাতে চেয়েছেন যে, আমাদের দেশের রাজনৈতিক পথচলা মূলত একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থে এবং সেখানেই পণ্য হিসেবে রাজনীতির বিপণন। দ্বিতীয় অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে ভারতীয় পণ্য-বাজারের বিপণন আর প্রচারের প্রসঙ্গ। এখানে কিন্তু মূল বক্তব্য পণ্যের বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত। আমেরিকা এবং তার মিত্র দেশগুলোর প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে লেখক জানিয়েছেন (পৃ. ৩৮, দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ), “সেসমস্ত দেশে শুধু পণ্য বিকোবার জন্য বিপণন বা বিজ্ঞাপনের নিত্যনতুন চমক তার বাহারি মোড়ক তৈরি হচ্ছে না, সেখানকার রাজনীতিও অনেকদিন আগে থেকেই বিপণন আর বিজ্ঞাপনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।” এখানে কিছুটা সমালোচনার পরিসর আছে। প্রথম কথা হল এই বিবৃতিটি রাজনীতিকে পণ্য হিসেবে দেখানোর জন্যে সম্পূর্ণ নয়। জীবনের প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই রাজনীতি জড়িয়ে থাকে, ফলে তা বিপণন কিংবা বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেও থাকবে। সুতরাং এক্ষেত্রে আলোচনার সাপেক্ষে অনুসিদ্ধান্তের বিষয়টি ততটা পরিষ্কার নয়। দ্বিতীয়ত বাক্যটি দু’-তিনবার পড়লে এটাও বোঝা যাবে যে, ব্যকরণগত কিছু সমস্যা আছে এখানে। বইটিতে এই ধরনের বাক্য কিংবা মুদ্রণপ্রমাদ কম হলেও খুঁটিয়ে পড়লে তা কখনও কখনও চোখে পড়ে। বাংলা ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আর দু’-একটি বিষয় উত্থাপন করা জরুরি। পৃষ্ঠা সতেরোর শেষ বাক্যে লেখা হয়েছে “রাজনীতিতে পুঁজির এই বিনিয়োগ থেকে পুঁজিবাদীদের যে মুনাফা আসে তা অর্থ, প্রতিপত্তি, সম্মান ও অন্যান্য উপকরণের মাধ্যমে ফিরে আসে।” একই বাক্যে দু’বার ‘আসে’ শব্দটি ব্যবহার না করে প্রথম ‘আসে’-টিকে বাদ দিলে হয়তো ভাল শোনাত।
বইটির তৃতীয় পরিচ্ছেদ ‘ভারতীয় রাজনীতির বিপণনে রাজনৈতিক সাইবারনেটিকস’। ভারতের আর্থসামাজিক পটভূমিতে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির প্রাসঙ্গিকতা অত্যন্ত গভীরতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই অধ্যায়ে। লেখক প্রযুক্তিকে কিছুটা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছেন এখানে। আশির দশকে এ রাজ্যের বামপন্থীদের মতটাও এমনই ছিল যে, মানুষের কাজ কেড়ে নেবে গণকযন্ত্র। সে মত গ্রহণযোগ্য নয়। তবে রাজনৈতিক সাইবারনেটিকস কেন এবং কীভাবে বিপণন ব্যবস্থার অংশীদার হয়ে উঠেছে, তা নির্ভুল যুক্তিসহকারে আলোচিত হয়েছে। যে-জায়গায় লেখকের প্রশংসা প্রাপ্য, তা হল সাইবারনেটিকস নিয়ে তিনি আলোচনা শুরু করেছেন নব্বইয়ের দশকে। যোগাযোগ ব্যবস্থার যে-অসাধারণ উন্নতি আমরা এখন দেখছি, সেদিকে কিন্তু প্রায় তিরিশ বছর আগেই দিকনির্দেশ করেছেন গ্রন্থকার। আজকের দিনে প্রযুক্তির বিষয়ে সবাই যতটা সড়গড়, সেই সময় কিন্তু বিষয়টা নিয়ে জনগণ ততটা অবহিত ছিল না।
প্রথম পর্বের পরবর্তী অধ্যায় ‘ভারতীয় রাজনীতিতে ভাবমূর্তির বিপণন’। এই অংশটি বেশ দীর্ঘ এবং অনেক ক্ষেত্রেই সুখপাঠ্য। এই পরিচ্ছেদের শুরুর দিকেই উঠে এসেছে গাঁধীজিকে নিয়ে আলোচনা। লেখক মনে করিয়ে দিয়েছেন “জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে বা তারও কম সময়ে গান্ধিজিই গণআন্দোলন আর জাতীয় কংগ্রেসকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। আন্দোলনের ক্ষেত্রে তাঁর কথাই শেষ কথা।” পণ্য এখানে রাজনীতি নয়, ভাবমূর্তি। আর কীভাবে তা রাজনীতির আঙিনায় সুযোগ বুঝে বেচা হয়, তাই নিয়ে যথেষ্ট আকর্ষক আলোচনা আছে বইটির এই পর্যায়ে। এই পর্বে এবং তার পরের অধ্যায় ‘উপসংহারের বদলে’-তে আছে বেশ কিছু সেই সময়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সে সব সাদাকালো ছবি এবং প্রচার দেখলে বোঝা যায় তখন রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব হয়তো ছিল আজকের মতোই, তবে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে আগ্রাসী মনোভাব কিছুটা কম ছিল। বিজেপির পথ চলার শুরু সেই সময়টায়।
প্রায় তিন দশক পরে পুনঃপ্রকাশিত বইটির দ্বিতীয় অংশটি নতুনভাবে লেখা। ‘কথামুখ’ নাম দেওয়া সূচনায় লেখক পরবর্তী চারটি অধ্যায়ের প্রতি সংক্ষেপে আলোকপাত করেছেন। সেই অধ্যায়গুলি হল ‘ভারতীয় রাজনীতির বিপণনে ল্যাংটা’, ‘ভারতের উন্নয়ন অর্থনীতিতে দারিদ্র’, ‘ভারতীয় রাজনীতির বাণিজ্যচক্র ও কমপ্যাশনেট গণতন্ত্র থেকে মাস্কুলার গণতন্ত্রে উত্তরণ’ এবং ‘ভারতীয় রাজনীতির বিপণনে গণমাধ্যমের ভূমিকা’। উপসংহারে ‘উত্তর-সত্য’ সংক্রান্ত আলোচনা। এই পর্যায়ের প্রথম অধ্যায়ে যেমন গাঁধীজির কাজকর্মের সমালোচনা আছে, তার চেয়েও অনেক বেশি নিন্দা করা হয়েছে তাঁর উত্তরসূরি কংগ্রেসের নেতানেত্রীদের। তবে ‘নেকেড ফকির’ গোছের দু’টি শব্দের অনুকরণে ‘ল্যাংটা’ শব্দটি ব্যবহার না করলেই বোধ হয় ভাল শোনাত। বাম রাজনীতির আলোচনায় এই ভাগে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো পরিসংখ্যান ১৭৫ পৃষ্ঠায় সারণি ১-এ। সেখানে দেওয়া আছে বিভিন্ন লোকসভা নির্বাচনে সিপিআই এবং সিপিএমের প্রাপ্ত ভোটের অংশ। পুরো সারণিটা ছোট করে টুকে দেওয়ার লোভ সংবরণ করা কঠিন— ৬.৪% (১৯৫০), ৯.৬% (১৯৬০), ৮.৪% (১৯৭০), ৮.৮% (১৯৮০), ৭.৬% (১৯৯০), ৭.০% (২০০৪), ৩.৯% (২০০৯), ২.৬% (২০১৪)। সংসদীয় গণতন্ত্রে বাম রাজনীতির পক্ষে জনমত এভাবে কমার বিপদ নিয়ে আরও বিশদে আলোচনা করার ক্ষেত্র প্রস্তুত। কারণ, ২০১৯-এর লোকসভায় এই ভোট শতাংশ আরও কমার সম্ভাবনা আছে।
পরের অধ্যায়ে প্রচুর পরিসংখ্যান সহকারে পেশ করা হয়েছে উন্নয়ন অর্থনীতির নামে কীভাবে দারিদ্রকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে দেশজুড়ে। লেখক যথার্থই বলেছেন, “পরিণতিতে ভারতের এক বিপুলসংখ্যক দেশবাসীর জীবন-জীবিকা গভীর থেকে গভীরতর সংকটের মুখোমুখি।” তবে লেখক যখন এই বই শেষ করছেন, সেই সময়েই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বেশ বড় মাপের কৃষক আন্দোলন। বামেদের ভোট হয়তো তাতে বাড়বে না, তবে বিজেপি, কংগ্রেস বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে বারবার ঘোষণা করতে হচ্ছে কৃষকদের জন্য বিভিন্ন জনমুখী প্রকল্প। যদিও তার বাস্তবায়ন গভীর জলে। পরের পরিচ্ছেদে ভারতীয় রাজনীতির বাণিজ্যিক চক্র বোঝাতে গিয়ে লেখক প্রশ্ন করেছেন, “দেশবাসীর কোনো মৌলিক সমস্যার সমাধান না হলেও প্রতি বছর এই নির্বাচনপ্রক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে কেন চলছে?” এ প্রশ্ন সহজ, উত্তর জানা, আর সে উত্তরই মনোযোগ সহকারে আর-একবার বিশদে ফিরে দেখেছেন কমলেন্দুবাবু। প্রসঙ্গক্রমেই এসেছে দরদি গণতন্ত্র থেকে পেশিবহুল গণতন্ত্রের কথা। এসেছে নির্বাচনের খরচ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের গোচরে থাকা কিছু পরিসংখ্যান। রাজনীতির বিপণনে গণমাধ্যমের ভূমিকার কথা ব্যক্ত হয়েছে এরপর। অন্তর্জালে ভাসিয়ে দেওয়া অসত্য সংবাদের সুনামি নিয়ে যথার্থ আলোচনা করেছেন লেখক। সবশেষে ব্যাখ্যা করা হয়েছে পোস্ট-ট্রুথ অথবা উত্তর-সত্যের কথা। সত্য নয়, অতিদ্রুত অন্তর্জালের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অর্ধসত্যই এখন বিশ্বজুড়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী। এই প্রসঙ্গে ব্রেক্সিট কিংবা ‘অচ্ছে দিন’-এর গুলিয়ে যাওয়া আধসেদ্ধ সত্যের কথা উল্লেখ করেছেন লেখক। তাঁর হতাশা ফুটে উঠেছে একেবারে শেষে— “বর্তমান রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের স্তরে যে পরিবেশ বিরাজমান সেখানে গণতান্ত্রিক মুক্তচিন্তা গড়ে উঠতে পারে না।”
বইটির অন্তিম প্রচ্ছদে লেখা হয়েছে, “রাজনীতি ও রাজনৈতিক শব্দযুগলের মধ্যেই জড়িয়ে আছে অর্থবহ নীতি ও নৈতিক শব্দ দুটি। সমাসে পূর্বপদে ও উত্তরপদে বর্ণ যুক্ত না হলে ‘রাজ’ অর্থহীন শব্দ মাত্র।” লেখক হয়তো একবার মনে করিয়ে দিতে পারতেন যে, রাজনীতি রাজার নীতি নয়, বরং নীতির রাজা। তবে তাঁর বাম মনোভাব এ বইয়ে সুস্পষ্ট। তাই হয়তো ‘রাজ’ তাঁর কাছে অর্থহীন। বেশ অনেকটা সময় ধরে ভারতের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল এই বইটি, রাজনীতিতে যারা উৎসাহী তাদের কাছে অবশ্যপাঠ্য। বিশেষ করে এই লোকসভা নির্বাচনের আবহে তো বটেই। বইয়ের শেষে আছে নির্ঘণ্ট। সেই তালিকায় আমলাশোলের পরেই আছে আমেরিকা। নমো অ্যাপের পরেই নাগপুর পেরিয়ে নাথুরাম গডসে। রাজীব গাঁধী, রাশিয়া, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ আর রাহুল গাঁধী পরপর। একেবারে শেষের দিকে হাজি মস্তান, হার্দিক পটেল, হিন্দুস্থান থমসন, হিন্দুস্থান ইউনিলিভার আর হিন্দু মহাসভা পর্যায়ক্রমে এক নতুন রাজনীতির দিশা দেখায়। নির্ঘণ্টে সব রাজনৈতিক চরিত্র এবং শব্দ মিলেমিশে একাকার। সেটাই আমাদের দেশজ রাজনীতির আসল রূপ। সেই রাজনীতি যে পণ্য হিসেবে মুনাফা লুটবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। সব মিলিয়ে তাই বইটা দু’বার পড়তে মন্দ লাগল না।

পেসমেকার ব্যবহারকারীর সতর্কতা by ডা. শরদিন্দু শেখর রায়

আমাদের হৃৎস্পন্দন ছন্দময়। স্বাভাবিকভাবে মিনিটে ৬০ থেকে ১০০ বার স্পন্দিত হয়। ব্যায়াম, পরিশ্রম, বিশ্রাম, জ্বর, উদ্বেগসহ নানা কারণে এই হার ওঠা–নামা করে। হৃৎস্পন্দন নিয়ন্ত্রণের জন্য হৃদ্‌যন্ত্রের ভেতরই আছে ছোট্ট নোড, যা থেকে স্পন্দনবার্তা তৈরি হয়ে হৃৎপিণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে। এই নোডে বা বার্তা ছড়িয়ে পড়ার পথে কোনো বাধা বা সমস্যা দেখা দিলে হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত হয়ে পড়ে। একে হার্ট ব্লক বলা হয়। হৃদ্‌যন্ত্রের নানা রোগে, বিশেষ করে হার্ট অ্যাটাকের পর এমনটা হতে পারে।
অনিয়মিত হৃৎস্পন্দনে মাথা ঝিম ঝিম করা, মাথা ঘোরা, চোখে অন্ধকার দেখা, হঠাৎ চেতনা হারানো বা পড়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ হতে পারে। ইসিজির মাধ্যমে এটি শনাক্ত করা যায়। কারণ নির্ণয়ে ইকোকার্ডিওগ্রাফি, এনজিওগ্রামসহ আরও পরীক্ষার দরকার হতে পারে। রোগনির্ণয়ের পর কারও কারও কৃত্রিম পেসমেকারের প্রয়োজন হতে পারে।
কৃত্রিম পেসমেকার হলো ব্যাটারিচালিত পাতলা হাতঘড়ির মতো একটি জেনারেটর, যা বুকের ত্বকের নিচে ছোট্ট অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে স্থাপন করা হয়। এর বিশেষ ধরনের তার শিরার মধ্য দিয়ে হৃদ্‌যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এই যন্ত্রে তৈরি বার্তা হৃৎপিণ্ডে পৌঁছে স্পন্দন স্বাভাবিক ও নিয়মিত রাখে। আধুনিক পেসমেকার স্বাভাবিক নোডের মতোই পরিশ্রম, বিশ্রাম, ঘুম, টেনশনে পরিবর্তিত হৃৎস্পন্দন তৈরি করে। এটি এমনভাবে তৈরি যে হৃৎপিণ্ড যখন স্বাভাবিক স্পন্দন তৈরি করে, তখন তা নিষ্ক্রিয় থাকে। আবার প্রয়োজন হলে সচল হয়। যন্ত্রের ব্যাটারি ১০ থেকে ১৫ বছর পর পরিবর্তন করতে হয়।
আধুনিক পেসমেকার দৈনিন্দন জীবনে প্রভাব ফেলে না বললেই চলে। তবু ব্যবহারকারীর কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা ভালো।
  • • বুকের যেদিকে লাগানো, সে পাশের হাত দিয়ে ভারী কিছু না তোলাই ভালো। পেসমেকার লাগানো ত্বকের উপরিভাগে ম্যাসাজ, খোঁচাখুঁচি, নাড়ানোর চেষ্টা করা যাবে না।
  • • চুম্বক ও বিদ্যুৎ–চুম্বকীয় তরঙ্গ পেসমেকারের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে পারে। মুঠোফোন অন্তত ছয় ইঞ্চি দূরে রাখা ভালো। যে পাশে পেসমেকার, সে পাশের কানে ফোন ধরা এবং বুকপকেটে মুঠোফোন রাখা চলবে না।
  • • উচ্চমাত্রার বিদ্যুৎ–চুম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহৃত হয়—এমন ভারী কলকারখানার যন্ত্রপাতি থেকে দূরে থাকা ভালো। মেটাল ডিটেক্টর অন্তত ছয় ইঞ্চি দূরে ধরতে হবে। বিমানবন্দরের মতো জায়গায় নিরাপত্তাতল্লাশির সময় পেসমেকার পরিচয়পত্র দেখান, বিকল্প ব্যবস্থায় তল্লাশির অনুরোধ করুন।
  • • চিকিৎসায় বা পরীক্ষা–নিরীক্ষার সময় পেসমেকারের বিষয়ে খোলাখুলি আলাপ করবেন।
>>>হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

Monday, February 17, 2020

সঙ্ঘাত আর সহিংসতার আতঙ্কের দিকে চোখ ফেরানো by মেহর এফ হোসাইন

বিষয়টি বেশ ভয়াল। আরেকটি নৃশংসতার খবর পাওয়া গেল এবং এরপর ক্রোধ, ক্ষোভ, নিন্দা ইত্যাদি ইত্যাদিও দেখা গেল বিশ্বজুড়ে। তারপর বিশ্ব চলল বিশ্বের গতিতে। মানুষের প্রাণহানি স্রেফ সংখ্যায় নেমে এসেছে, নৃশংস ঘটনাগুলো স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়ে গেছে, তারপর সবই বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছে।
সবকিছুই বদলে গেছে ২০১৫ সালে।
ওই বছরের ২ সেপ্টেম্বর রাতের পর্দা সবেমাত্র কেটে গেছে। এজিয়ান সাগরে বেলাভূমিতে একটি শিশু চুপচাপ, নিশ্চুপ ঘুমিয়ে আছে। শিশুটি আর কোনো দিন জাগবে না, তবে বিশ্বের বিবেককে বেশ ভালোভাবেই নাড়া দিয়ে গেছে।
তিন বছর বয়সের সিরিয়ান উদ্বাস্তু অ্যালান কুর্দি নিরাপত্তা, শান্তি আর স্থিতিশীলতার আশায় নতুন দেশে পাড়ি দিচ্ছিল। তার মা-বাবাই তার মনে ওই আশার আলো সঞ্চার করেছিল। অবশ্য সে তুলনামূলক নিরাপদ উপকূলে পৌঁছাতে পেরেছিল, তবে জীবিত নয়, মৃত। তার মৃত্যু আরো অনেক হতাহতের চেয়ে বেশি কিছু ছিল। সে কেবল একটি সংখ্যাই ছিল যেটা বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে।
নেভি ব্লু শর্ট আর লাল টি-শার্ট পরা কুর্দি আফগান-বংশোদ্ভূত আমেরিকান উপন্যাসিক খালেদ হোসাইনিকে উদ্দীপ্ত করেছে। তার নতুন উপন্যাস সি প্রেয়ারে কুর্দিকে তিনি অমরত্ব দান করেছেন। ব্রিটিশ ইলাস্ট্রেটর ড্যান উইলিয়ামসের ইলাস্ট্রেটেডের বইটি সাধারণ কোনো গ্রন্থ নয়।
লেবাননের পূর্বাঞ্চলে মার্জ শহরে একটি অস্থায়ী উদ্বাস্তু শিবিরের তাবু থেকে উঁকি দিচ্ছে এক সিরীয় উদ্বাস্তু শিশু, ছবি: এপি
সঙ্ঘাত আর সহিংসতার আতঙ্ক প্রায়ই বিজয়ের ভাষ্যে, ক্ষতির বর্ণনায় এবং অনেক সময় জীবনহানি ও বিলুপ্তির শ্রেণিবিভাগে ধরা পড়ে। যুদ্ধের ইতিহাস অন্যান্য আকারেও তুলে ধরা হয়ে থাকে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো অ্যানা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি। এটি হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি অধিকৃত নেদারল্যান্ডসের তার ইহুদি পরিবারের জীবনলিপি।
ইরানি বংশোদ্ভূত ফরাসি শিল্পী ও গ্রন্থকার মারজানি স্যাট্রাপি একই কাজ করেছেন পারসেপোলিস এক ও দুই নামের গ্রাফিক উপন্যাসে। তিনি ইসলামি বিপ্লবের পর প্রতিবেশী ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানে কিশোরদের বসবাসের বিপদ নিয়ে লিখেছেন।
মাল্টায় জন্মগ্রহণ করা আমেরিকান কার্টুনিস্ট জো স্যাক্কো ফিলিস্তিনের সঙ্ঘাতের শিকারদের নিয়েও একই কাজ করেছেন। তিনি সহিংসতা, বাস্তুচ্যূতি ও মৃত্যুর ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন।
তবে কুর্দির দুর্ভাগ্য সে তার কাহিনী তুলে ধরার মতো অবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি। তবে তার কথাই তুলে ধরার দায়িত্বটি নিয়েছেন হোসাইনি।
তিনি তথ্য সংগ্রহ করেছেন তার বাবার কথা থেকে। সি প্রেয়ার বাড়ি, পরিবার ও ভালোবাসার কথা-চিত্র তুলে ধরে মনছোঁয়ায়। বইটিতে সিরিয়ান নগরী হোমসে এ পল্লী গ্রামের ছবি বেশ অবলীলায় তুলে ধরা হয়েছে। বইটি পড়তে পড়তে সিরিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামের খামার বাড়িতে আনায়াসেই ঢুঁ মেরে আসা যাবে। হোমস নগরীকে প্রাণবন্ত একটি স্থান হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। চমৎকার একটি স্থান হিসেবেই চোখের সামনে ভাসছে সবকিছু।
তবে যুদ্ধের ভয়াবহ তিনি তুলে বেশ নির্মমভাবে। বোমা, ক্রোধ, ক্ষুধা, মৃত্যু ইত্যাদি ভয়াবহ খারাপ বিষয়গুলো সামনে চলে এসেছে। এখনো যারা জীবিত আছে, তারা কিন্তু এই নৃশংসতা কখনো ভুলে থাকতে পারবে না।
তবে এই বর্ণনা তুলে ধরাটাই কি যথেষ্ট?
মর্যাদা আর শান্তি কেড়ে নেয়া হলে মানুষ নীরব হয়ে যায়। ফলে হোসাইনির এই বর্ণনা পাঠ করাও হৃদয়বিদারক।
ভয়ঙ্কর কথা হলো, যুদ্ধ আর সহিংসতার তাণ্ডব থেকে মানুষ ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। কিন্তু তাদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আত্মরক্ষার জন্য ছুটতে গিয়ে আমরা বুঝতে পারছি, আমরা আমন্ত্রিত নই, আমরা অনাকাঙ্ক্ষিত।
সিরিয়ার দেই এজ-জর শহরে ভবনের ধ্বংসস্তুপের মাঝ দিয়ে হেটে যাচ্ছে এক শিশু, ছবি: রয়টার্স
এই বিপর্যয়কর সময়ে আমার সন্তান যখন নিথর দেহে উপকূলে পড়ে থাকে, বাবা হিসেবে আমি কী করতে পারি? প্রার্থনা করা ছাড়া কি আমার আর কিছু করার আছে।?
আছে। তা হলো যেসব শক্তিশালী লোক মনে করে, তারা নিয়তি গড়ার ক্ষমতা রাখে, তাদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয়া। এটি তাদের জন্য যেমন কল্যাণকর, পুরো বিশ্বের জন্যই কল্যাণকর। এজিয়ান সাগরের উপকূলে যে শিশুটির নিথর দেহ ভেসে এসেছে, সে কিন্তু মানুষের নির্দয়তার কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। যারা যুদ্ধ ছড়াচ্ছে, তাদেরই যুদ্ধের আগুনে পুড়ে মরার কথা। সবচেয়ে নাজুক শিশুটি কেন সবসময় সবচেয়ে বেশি নির্মমতার শিকার হবে?

Sunday, February 16, 2020

ইয়াবা ট্যাবলেট যে রোগের ওষুধ! by ডা. মো. সাঈদ এনাম

চেম্বারে অশান্ত সজিব। এটা টান দেয় তো ওটা ধরে। কখনো স্টেথোস্কোপ কখনোও বা কলম। টেবিলের উপর থেকে পেপার ওয়েটটা হাতে নিলো। চোখমুখে রাজ্যের বিস্ময়। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেটা দেখে আবার ঠাস করে রেখে দিল। সঙ্গে আসা মা ভাবলেন, টেবিলের গ্লাসটা বোধহয় ভেঙ্গেই ফেললো এবার!
‘স্যার সরি’ বলে, না পেরে অনেকটা জোর করে ধরেই তাকে চেয়ার বসিয়ে দেবার চেষ্টা করলেন। কখন কী করে বসে, এই ভেবে।
সজীব নার্সারিতে পড়ে। অসম্ভব দুষ্টুমি করে। অশান্ত চঞ্চল সারাক্ষণ। মিস, স্যার কারো কথাই শোনে না। পড়ায় কোনও মন নেই। জোর করে সামনে বই মেলে ধরলে দুই এক মিনিট পড়ে কি পড়ে না। অন্য কিছুতে ব্যস্ত হয়ে যায়।
ক্লাসে একে চিমটি দেয় তো ওর খাতা ছিঁড়ে ফেলে। বাধা দিলে, রেগে গিয়ে মারামারি শুরু করে। সমসাময়িক বাচ্চাদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করা, ফেলে দেয়া ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। প্রতিদিন তার নামে অভিযোগ আসে অভিভাবকদের কাছ থেকে, এটা করেছে, ওটা করেছে। একে মেরেছে তো ওকে ধরেছে। মা বাবা যারপরনাই অপমানিত, বিরক্ত।
সেদিন স্কুলের মিস ডেকে বললেন, ‘আপা আপনার বাচ্চাকে আমরা একেবারে সামাল দিতে পারছি না। ক্লাসে বসিয়ে রাখাই দায়। বলা নেই কওয়া নেই হুট করে দৌঁড়ে ক্লাস থেকে বের হয়ে যায় যখন তখন। একেবারেই মনযোগ নেই ক্লাসে। বলে কয়ে আদর করে মনযোগী করলেও মনযোগ ধরে রাখে না। সারক্ষণ চঞ্চলতা।’
আরো জানালেন, শুধু সহপাঠী নয়; মিস ও স্যারদের সঙ্গে অনেক সময় দুর্ব্যবহার করে, তাদের নাম ধরে ডাকে।
প্রতিদিন স্কুলে গিয়ে এটা ওটা হারিয়ে আসবে। কোথায় রাখে কাকে দেয় মনে খেয়াল নেই। এজন্যে প্রতিদিন তাকে নতুন কলম, বই, পেন্সিল কিনে দিতে হয়। কেবল স্কুল বা ক্লাসেই যে এরকম করছে তা না। ঘরেও একই ব্যাপার। সেদিন সিঁড়ি থেকে এক লাফ দিয়ে পড়েছে নিচে। হাত পা ছুলেছে, কেটেছে। কিন্তু ওতে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। রক্ত ঝরলেও সে ব্যথা পেলো কী পেল না, বুঝাই গেল না। উঠে আবার ভুঁ দৌড়। বলা নেই কওয়া নেই, কারনে অকারনে ছোট বোনটিকে হঠাৎ মেরে বসে। চেয়ার থেকে ফেলে দেয়। তার দুষ্টুমিতে এখন সবাই তটস্থ, বিরক্ত।
কারো কথা শোনে না। যা নিষেধ করা হয় সেটাই দেখা যায়, বেশি করে করে। বাসায় প্রায়ই গ্যাসের চুলার আগুন বাড়িয়ে দিয়ে কাছে দাঁড়িয়ে থাকে!
এটা ওটা আগুনে দিয়ে দেয়। ভয় বিপদ বুঝে না। সেদিন নাকি প্রতিবেশীর এক পোষা ময়না পাখিকে খাঁচা থেকে বের করে এক আছাড়েই মেরে ফেললো। তাছাড়া স্কুলে যেতে আসতে এটা ওটা দিয়ে রাস্তার কুকুর বিড়ালদের ছুড়ে মারা আঘাত করা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
এতক্ষন ধরে সজিবের আম্মা অভিযোগগুলো বলতে বলতে প্রায় হাঁফিয়ে গেলেন। অভিযোগ কোনটা বলবেন কোনটা না এমন অবস্থা। সজীব তাদের একমাত্র ছেলে। বিয়ের অনেক বছর পর, অনেক সাধনার পর আল্লাহ তার কোল জোড়ে দিয়েছেন, যেন এক ফালি চাঁদের টুকরা। কিন্তু তাঁর এমন আচরনে তিনি আর পারছেন না।
এবার অনেকটা কেঁদে কেঁদে বললেন, স্যার দুষ্টামিতে বিরক্ত হয়ে দুদিন আগে আমি ছেলেটিকে খুব মেরেছি। মারার পর খুব খারাপ লেগেছিল আমার যাদুর টুকরা, সোনা বাবুটার হাউমাউ কান্না দেখে।’
মার খেয়ে কেঁদে কেঁদে বললো, মা তুমি আমাকে মারলে, আমি তোমার সঙ্গে আর থাকবো না।
স্যার, আমি সারা রাত ঘুমাতে পারিনি, ছটফট করেছি। কেনো মারতে গেলাম ভেবে। কিন্তু আমি আর পারছি না যে। বাচ্চারা দুষ্টুমি করে কিন্তু তার এটা কী ধরনের দুষ্টুমি। সেদিন তার দাদুভাইয়ের হাত থেকে তাসবীহ কেড়ে নিয়ে জানালা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। যে দাদুর কলিজার টুকরা সে কিনা…”,
তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না। চোখের পানি মুছলেন। সজীবের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। মায়ের কান্না দেখে এবার সে একটু চুপচাপ বসে থাকার চেষ্টা করলো।
...দুই...
মীনা চৌধুরী দম্পতির (ছদ্মনাম) একমাত্র সন্তান সজিব। বিয়ের পর দীর্ঘদিন তাদের সন্তান হয়নি। স্বামী পেশায় আর্কিটেক্ট। কারোরই কোন শারীরিক সমস্যা ছিলোনা। যখন তারা আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন, তখনই হঠাৎ একদিন মিনা তার গর্ভে সজিবের অস্তিত্ব টের পান।
প্রথমে শাশুড়ি কে কথাটি পাড়েন। শাশুড়ি পাত্তা দিলেন না। কারন বিয়ের পর থেকে এভাবে অনেকবার তার এরকম হালকা পাতলা লক্ষন দেখা দিয়েছে, কিন্তু না। প্রতিবার তাদের স্বপ্ন ভংগ হয়েছে।
তারপর ও শাশুড়ি কথাটি শুনে সঙ্গে সঙ্গে কোরান খতমের নিয়ত করলেন, নফল নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন। আল্লাহ যদি মরার আগে একবার নাতি নাতনীর মুখ দেখান। নোটন চৌধুরী (ছদ্মনাম) বড় আদরের ছেলে তার। নোটনের বাবা মারা গিয়েছেন তার নোটনের বিয়ের পরপর। জীবিত থাকতে তিনি নোটন কে ডেকে সুন্দর সুন্দর ক’টা নাম দিয়ে বলতেন, যদি কখনো নাতী, নাতনী আসে, তাহলে সেই নাম গুলো রাখতে।
কিন্তু বিয়ের পর বেশ ক’বছর যখর তাদের কোন সন্তান হচ্ছিলোনা তখন বেশ ভেংগেই পড়ছিলো নোটন। কেবল ই মায়ের পাশে বসে বলতো, “আম্মু তুমি দোয়া করো। শুনেছি মায়ের দোয়া বিফলে যায়না, বাবার দেয়া নাম গুলো যেনো বিফলে না যায়..”।
তিনি প্রতিবার ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, বাবা ধৈর্য ধর। আমি দোয়া করছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোকে সন্তানের মুখ দেখাবেন। তোর বাবার দোয়া আছে। দেখিস তার দেয়া নাম গুলো বিফলে যাবে না।
যাইহোক বউমা মীনা যখন বললো, মা আমার শরীরটা কেমন জানি লাগছে, তিনি তখন কিছু না বলে, এবারও তিনি জায়নামাজ নিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে গেলেন। পরদিন তারা স্বামী-স্ত্রী ক্লিনিকে গেলেন। খুব একটা আশাভরসা নিয়ে না। তবুও গেলেন।
সেখানে মীনার এক বাল্যবান্ধবী ডা. তনুশ্রী সাহা গাইনি বিভাগের ডাক্তার। তাকে কথাটি পাড়লেন মীনা। তনুশ্রী গুরুত্ব দিয়ে ভালোভাবে দেখলেন তাকে। খটকা লাগলো। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কিছু না বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে বান্ধবীকে মীনাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, মীনা তোর স্বপ্ন মনে হয় এবার সত্যি হচ্ছে…।
মীনা আর নোটন চৌধুরী ক্লিনিক থেকে বাসায় এসে সোজা পড়লেন শাশুড়ির পায়ে। বললেন, আম্মা, আপনার দোয়া আল্লাহ শুনেছেন। তিনি তখনও মানত করা নফল নামাজে। সালাম ফিরিয়েই বললেন, কী বলছিস তুই মীনা?
শাশুড়ি মাঝেমধ্যে তাকে তুই বলে সম্বোধন করতেন। তবে খুব আবেগের কিছু হলে তখন তিনি এমনটি করেন। শাশুড়ির মুখে তুই শুনলে মীনার খুব ভালো লাগে। তার মা-বাবা তাকে তুই বলতেন। তাই শাশুড়ির এমন ডাকে তার ভালো লাগে।
শাশুড়ি বললেন, জানিস কাল রাতে আমি স্বপ্নে দেখেছি, একটা হলুদ-লাল জামা পড়ে একটা ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে আমার সঙ্গে দুষ্টুমি করছে।
মীনার কোল জোড়ে এসেছে সজিব। তারা ভেবেছিলেন তাদের মেয়ে হবে যেহেতু শাশুড়ি স্বপ্নে দেখেছিলেন একটা মেয়ে শিশু তার সঙ্গে খেলছে। যাহোক, সজীবের জন্মের পর তারা সবাই হজ করেন। অনেক আশা আকাঙ্ক্ষার ধন, তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন তাদের।
...তিন...
ইদানীং সজীবের এমন দুষ্টুমি আর চঞ্চলতায় তারা ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। কী করবেন, কোথায় যাবেন ভেবে পাচ্ছেন না। গত আট ন’মাস মাস যাবৎ সজিবের এই আচরন। প্রথম প্রথম অতি চঞ্চলতা ভেবে এটা তেমন পাত্তা দেননি। কিন্তু এখন তা একেবারে অসহনীয় হয়ে পড়েছে তাদের জন্যে। একটা চাকরি করতেন মীনা। সজীবের এসব অতি দুষ্টুমি আর অমনোযোগী স্বভাবের ভয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে সারাক্ষণ তাকে দেখাশুনা করছেন। না জানি ছেলেটা কখন কী করে বসে?
শিশু ডাক্তারদের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। তারা প্রায়ই ঘুমের ওষুধ দেন। এসব খেয়ে ক’দিন মরার মতো ঘুমায়। কিন্তু পরে যেই সেই। কোন উন্নতি নাই। একজন মিস বললেন, আপা সাইকিয়াট্রিস্ট দেখান। তিনি চমকে গেলেন। তার ছেলে কি পাগল?
তার মন মানলো না। তাদের স্বামী-স্ত্রী কারো বংশেই কোন মানসিক রোগী নেই। তবে সজীবের দাদার মেজাজ একটু চড়া ছিল। প্রচণ্ড রাগী মানুষ ছিলেন। এর বিশেষ কিছুই না। সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানোর কথা শোনে তিনি কিছুটা চিন্তিত ছিলেন। তিনি শুনেছেন, শিশুদেরও মানসিক সমস্যা হয়। ক’দিন থেকে তাই দিনরাত নেট ঘাঁটছিলেন। আসলেই কী হয়েছে তার ছেলের, সে কেন এমন করে। ইন্টারনেট খুঁজতে খুঁজতে একটা আর্টিকেলে তার চোখ আটকে যায়। মনে হলো তিনি যেনো কিছু একটা পেয়েছেন। বাচ্চার সকল উপসর্গই মিলে গেছে আর্টিকেলের রোগটির সঙ্গে। আর্টিকেলে রোগটির নাম এ.ডি.এইচ.ডি (ADHD)। ইংরেজীতে এটেনশন ডিফিসিট হাইপার এক্টিভিটি ডিসওর্ডার বলে।
তিনি বললেন, স্যার আমার বাচ্চাটি কি তবে এ.ডি.এইচ.ডি’র (ADHD) রোগী। যদিও লন্ডন প্রবাসী তার বড়বোন বলেছেন সিমটমটা নাকি কিছুটা অটিজমের মতো। কিন্তু অটিজমের শিশুরা ডাকলে বুঝে না যে তাকে কেউ ডাকছেন বা তাকে কেউ কিছু বলতে চাইছেন। সজীবতো সবই বুঝে। শুধু বুঝে বললে ভুল হবে, বেশি বুঝে…”
আমি মীনাকে বললাম, আপনি ঠিক ধরতে পেরেছেন। আপনার বাচ্চার এ.ডি.এইচ.ডি’র ADHD সিমটম রয়েছে। একেবারে টিপিক্যাল সিমটম। তবে আপনার ভয় বা মন খারাপ করার কোনো কারন নেই। এ রোগের খুব ভালো ভালো কার্যকরী চিকিৎসা রয়েছে। ওকে কোন ধরনের শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করবে না করে বরং ধৈর্য ধরে আদর যত্ন ভালোবাসা দিয়ে তাকে বার বার বুঝানোর চেষ্টা করতে হবে। ধৈর্যহারা হলে চলবে না। একে বিহেভিয়ার থেরাপি বলে। বয়স কম বলে আপাতত তাকে মেডিসিন দেয়ার দরকান নেই।
...চার...
বাচ্চাদের ADHD এ.ডি.এইচ.ডি রোগ আমাদের দেশে বেশ পাওয়া যায়। সচেতন অভিভাবকরা কিংবা স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকারা খুব সহজেই ক্লাসে শিশু সন্তানের মধ্যে এ রোগের লক্ষণটি শনাক্ত করতে পারেন।
দেশে শতকরা কতজন শিশু এ রোগে আক্রান্ত তার সঠিক কোন পরিসংখ্যান না থাকলেও আমেরিকায় কয়েকটি স্টাডিতে দেখা গেছে, তাদের দেশে শতকরা পাঁচ থেকে দশজন শিশুদের মধ্যে এই এডিএইচডি (ADHD) রোগের লক্ষণ পাওয়া যায় । মেয়ে শিশুদের চেয়ে ছেলেদের মধ্যে এ রোগটি বেশি দেখা দেয়। পরিণত বয়সেও এ রোগের দেখা মেলে।
এডিএইচডি রোগটি হয় মূলত ব্রেইনের ডোপামিন ও এপিনেফ্রিন নিউরোট্রান্সমিটার তৈরি নিঃসরণ ও সরবরাহের মধ্যে কিছুটা গোলযোগ থাকায়। ব্রেইনের ফ্রন্টাল কর্টেক্স (FRONTAL CORTEX), ব্যাসাল গ্যাংগলিয়া (BASAL GANGLIA), লিমবিক সিস্টেম (LIMBIC SYSTEM) , রেটিকুলার একটিভেটিং সিস্টেম (RETICULAR ACTIVATING SYSTEM) ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ এরিয়াতে ডোপামিন ও এপিনেফ্রিন নিউরোট্রান্সমিটার পর্যাপ্ত পরিমানে না থাকায় শিশু বা বয়স্কদের মধ্যে এই ADHD এডিএইচডি রোগের লক্ষণ দেখা দেয়।
এডিএইচডি রোগের চিকিৎসা:
ব্রেইনের গুরুত্বপূর্ণ এরিয়া যা একাগ্রতা, মনোযোগ, কর্মচঞ্চলতা, আচার ব্যবহার, বিবেক বিবেচনা নিয়ন্ত্রণ করে সে এরিয়া গুলোতে ডোপামিন ও এপিনেফ্রিন নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণ বা সরবরাহ ওষুধ দিয়ে বাড়িয়ে দেয়া বা ব্রেইনকে স্টিমুলেট করাই হলো এ রোগের প্রধান চিকিৎসা। মিথাইলফেনিডেট ও মিথামফেটামিন জাতীয় ঔষধ ব্রেইনে ডোপামিন ও এপিনেফ্রিন নিউরোট্রান্সমিটারের নিঃসরণ বাড়ায়। এগুলোকে ব্রেইন স্টিমুলেটিং ড্রাগ বলে। তাছাড়া নন স্টিমুলেট হিসেবে এটোমোক্সিটিন নামের একটি মেডিসিন রয়েছে। তবে সাধারণত ছয় বছরের নিচে এডিএইচডি (ADHD) রোগের চিকিৎসায় স্টিমুলেটিং বা ননস্টিমুলেটিং কোন ড্রাগ ই ব্যবহার হয় না। এর পরিবর্তে বিহেভিয়ার থেরাপি বা এমিট্রিপটাইলিন জাতীয় ওষুধের বেশি জোর দেয়া হয়।
এডিএইচডি’র চিকিৎসায় মিথামফিটামি সম্পর্কে তথ্য
এডিএইচডি’র চিকিৎসায় মিথামফিটামি উপযোগী হলেও তা শরীরের জন্য বিষাক্ত এবং তীব্র আসক্তি তৈরি করে বিধায় এর ব্যবহার কম। আমাদের বর্তমান সমাজে কিশোর-কিশোরী ও যুবসমাজ মাদক হিসেবে যে ইয়াবা ট্যাবলেট নিচ্ছে তা হলো মূলতঃ এই মিথামফেটামিন।
মাত্রাতিরিক্ত, অনিয়ন্ত্রিতভাবে মিথামফিটামিন ট্যাবলেট ব্যবহারে দেহে হিরোইন, মরফিন, কোকেনের মতো একধরনের পাগলামি ভাব আসে। মারাত্মক আসক্তি তৈরি হয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে যায় এবং দেহে তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করে বলে মিথামফেটামিন ড্রাগটি সাইকিয়াট্রিস্টরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রেসক্রাইব করেন।
ইতিহাসে মিথামফেটামিন
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধরত সৈনিকদের ডিপ্রেশন কাটাতে মানসিকভাবে চাঙ্গা করতে, ভয় কমাতে ও তাদেরকে দিবাস্বপ্নে বিভোর রাখতে এই কেমিক্যালের বহুল ব্যবহার হয়েছিল। তবে তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আর ক্ষতিকারক পরিণামের জন্যে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়।
বর্তমানে মিয়ানমার হচ্ছে এই মিথামফেটিমিন মাদক বা ইয়াবা ট্যাবলেটের পৃথিবীর শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশ। বাংলাদেশের পাশে অবস্থিত হওয়ায় দুই দেশের চোরা কারবারীরা এই কেমিক্যালের অপব্যবহার করে এ দেশের কিশোর কিশোরী ও যুব সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
লেখক: ডা. মো. সাঈদ এনাম
সাইকিয়াট্রিস্ট, স্বাস্থ্য গবেষক ও লেখক।
>>>রূপকেয়ার