Friday, January 2, 2026

একটি জাতিরাষ্ট্র কখন, কেন ব্যর্থ হয় by হাসান ফেরদৌস

মার্কিন চিন্তাবিদ রবার্ট রটবার্গের বয়স এখন ৯০। তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও বিশ্ব শান্তি ফাউন্ডেশনের দীর্ঘদিনের সভাপতি। জীবনের বড় সময়ই তিনি কাটিয়েছেন আধুনিক জাতিরাষ্ট্র কেন ব্যর্থ হয়—এই প্রশ্নে গবেষণায়। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থের নাম হোয়েন স্টেটস ফেইল; কজেস অ্যান্ড কনসিকুয়েন্সেস। অর্থাৎ যখন জাতিরাষ্ট্র ব্যর্থ হয়, তার ফলাফল কী দাঁড়ায়।

২০০৪ সালে প্রকাশিত সেই গ্রন্থে রটবার্গ লিখেছিলেন, জাতিরাষ্ট্র ব্যর্থ হয় তখনই, যখন সে নিজের মৌলিক দায়িত্ব পালন করতে পারে না, অথবা তা পালনে করতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়ে। এই সব মৌলিক দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনগণের জন্য প্রাথমিক রাজনৈতিক অধিকার ও সেবা প্রদান করা।

আজকের বাংলাদেশ দ্রুত একটি ব্যর্থ জাতিরাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে, কারণ তার ওপর যে মৌলিক দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে, তার কোনোটাই সে পূরণে সক্ষম নয়। অথবা আরও স্পষ্ট করে বলি, সে দায়িত্ব পালনে সম্ভবত সে আদৌ ইচ্ছুক নয়। বাংলাদেশ নিয়ে এমন কঠোর ও হৃদয়বিদারক কথা আমি কখনো বলিনি, বলব সে কথাও ভাবিনি। গত কয়েক দিনের ঘটনা আমাকে এই কথা ভাবতে বাধ্য করেছে। কারণ হিসেবে আমি চারটি ঘটনার কথা বলব।

এক.

শরিফ ওসমান হাদির হত্যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এই হত্যার আগাম সংবাদ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে ছিল না, এমন দাবি তারা করতেই পারে। কিন্তু সে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পনেরো দিন পরও কেন হত্যাকারী ধরা পড়ল না? আমরা ইন্টারনেটে দেশি-বিদেশি সূত্র থেকে সে হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের তাবৎ ঠিকুজিকুষ্টি জেনে বসে আছি অথচ এখনো দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অন্ধকারে ঘুষি ছুড়ছে।

শোনা যাচ্ছে, প্রধান খুনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। কীভাবে, কার বাহনে, কার প্রহরায়? কেউ কেউ বলছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মতি ও সমর্থনেই তাঁদের দেশ ছেড়ে পালানো সম্ভব হয়েছে। এ কথা সত্যি হলে আমরা তো অনায়াসেই বলতে পারি, রাষ্ট্র তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে শুধু ব্যর্থ নয়, দায়িত্ব পালনে সে অনাগ্রহীও বটে।

দুই.

ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় অথবা সে হত্যাকাণ্ডকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের দুটি প্রধান সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা হয়েছে। কার্যালয় দুটি আগুন দিয়ে আংশিক জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। একাধিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর হয়েছে। এই কাজে যাঁরা নেতৃত্ব দেন; যাঁদের অশুভ চক্র বা উগ্রবাদী নামে বর্ণনা করা হচ্ছে, তাঁরা সংবাদপত্র দুটির ভবন জ্বালিয়ে দেওয়াতেই সন্তুষ্ট ছিলেন না, সম্ভবত তাঁরা এই দুই দপ্তরে কর্মরত সাংবাদিকদের পুড়িয়ে মারতেও চেয়েছিলেন।

আক্রান্ত হওয়ার পর ভবনে আটকে পড়া একজন সাংবাদিক ফেসবুকে জানিয়েছেন, চারদিকে আগুনের ধোঁয়ায় তাঁর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। এখন আমরা জানি, একজন দুজন নয়, বিপুলসংখ্যক উন্মত্ত জনতা খুব পরিকল্পিতভাবে এতে অংশ নিয়েছিল।

বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি টিভি চ্যানেলে পুরো ঘটনা সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছে, বিদেশে বসে আমরাও তা দেখেছি। সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সরকারি কর্তৃপক্ষ জানতেন না, সেটাও নয়। শুরু থেকেই পত্রিকা দুটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তারপরও কেন পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হলো না?

এই প্রশ্নের দুটির সম্ভাব্য উত্তর অধ্যাপক রবার্ট রটবার্গ কুড়ি বছর আগেই দিয়ে রেখেছেন: যাদের সে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল, তারা হয় সে দায়িত্ব পালনে সক্ষম নয়, অথবা তা পালনে আগ্রহী নয়।

এমন অভাবিত ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে শুকনা দুঃখ প্রকাশ ছাড়া একজনও তাঁদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেননি, সে জন্য ক্ষমা চাননি। পদত্যাগের তো প্রশ্নই উঠছে না। শাসক মহল যদি দায়িত্ববান হতো, তাহলে এই ব্যর্থতার দায়ভার তাঁদের কেউ না কেউ মাথায় পেতে দায়িত্ব থেকে সরে যেতেন।

ফুটবল খেলার মাঠে উচ্ছৃঙ্খল জনতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস পদত্যাগ করেছেন।

২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলা রোধে ব্যর্থতার জন্য ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বরাজ পাতিল পদত্যাগ করেছিলেন। ২০১৯ সালে ইস্টারের রোববার বোমা হামলা রোধে ব্যর্থতার জন্য শ্রীলঙ্কার পুলিশ প্রধান পুজিথ জায়াসুন্দ্রা পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। ২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে ভয়াবহ ফেরি দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী চুং হন-ওয়ান শুধু হাঁটু মুড়ে ক্ষমাই চাননি, পদত্যাগ করে দায়িত্ব থেকে সরেও গিয়েছিলেন।

দায়িত্ব পালনে এই ব্যর্থতা অথবা অনাগ্রহের একটা ফল হলো, এতে সব ধরনের সহিংসতা ‘নরমালাইজড’ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ঠিক সে ঘটনাটাই ঘটেছে। মবতন্ত্র এখন আর অভাবিত কোনো ব্যাপার নয়, নিয়মিত ব্যাপার। আর যাঁরা এই সহিংসতাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চান, তাঁরা সরকারের তরফ থেকে এই স্পষ্ট সিগন্যাল পেয়ে যান যে সহিংসতা যত তীব্র হোক না কেন, উদ্বেগের কিছু নেই।

তিন.

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়জন ডিন একযোগে তাঁদের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন। না, স্বেচ্ছায় নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদেরএকজন নেতা প্রকাশ্যে এই ছয়জনের নাম উল্লেখ করে তাঁদের পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। তাতেও সন্তুষ্ট না হয়ে তিনি ছয় অধ্যাপকের অফিসে গিয়ে তালা লাগিয়ে আসেন। অধ্যাপকদের ‘অপরাধ’, তাঁরা বিগত সরকারের সমর্থক ছিলেন। ঠিক এই অভিযোগে শিক্ষকদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে, এমন আইন কোথায় লেখা আছে, আর এই সিদ্ধান্ত ছাত্র সংসদের এক ছাত্র তাঁর অনুগত সমর্থকদের জোরে বাস্তবায়িত করবেন, সে নিয়মই–বা কবে থেকে বহাল হলো?

 বলাই বাহুল্য, বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারের কেউ এ ব্যাপারে তাঁদের দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসেননি। হয় তাঁরা সে দায়িত্ব পালনে অক্ষম অথবা অনাগ্রহী।

চার.

ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু দাস নামের এক কারখানা শ্রমিককে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সত্যি কোনো অবমাননা হয়েছে বা কী সেই অবমাননা, তার কোনো সদুত্তর নেই। হত্যার পর দীপু দাসের লাশ বিবস্ত্র করে একটি গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

এই অবিশ্বাস্য বর্বরোচিত কাজটি চোখের পলকে ঘটে যায় তা নয়, বেশ লম্বা সময় ধরে ঘটেছে। কয়েক শ লোক সেটা প্রত্যক্ষ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন, পুলিশ কোথায়, কারখানা কর্তৃপক্ষ কোথায়, স্থানীয় সরকারি প্রশাসনই–বা কোথায়? নেই, হয় তারা দায়িত্ব পালনে অপারগ, অথবা অনাগ্রহী।

রবার্ট রটবার্গ ব্যর্থ রাষ্ট্রের যে তিন লক্ষণ সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন, ওপরের এই চার উদাহরণ থেকে স্পষ্ট যে বাংলাদেশ ক্রমে তেমন একটি রাষ্ট্রের পথে হাঁটছে। উদাহরণ বাড়ানো যায়, কিন্তু তাতে একই কথার পুনরাবৃত্তি হবে।

সত্যি সত্যি রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে তার নাগরিকদের কী দুর্দশা হয়, তা বুঝতে দয়া করে আজকের হাইতি, সোমালিয়া বা সুদানের দিকে তাকিয়ে দেখুন। স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পর আমরাও সেই একই মহাদুর্যোগে নিক্ষিপ্ত হব, সে কথা লিখতে আমার হাত কাঁপছে। কিন্তু এ কথা যে মোটেই অতিরঞ্জন নয়, তাতেও বড় কোনো ভুল নেই।

এই ব্যর্থতা আমাদের নিয়তি নয়। দেশটা আমাদের সবার। তা ব্যর্থ হোক, দেশি-বিদেশি চক্র তা চাইতে পারে, কিন্তু আমরা তা চাইব কেন? এই অবনমন ঠেকানোর ক্ষমতা আমাদের রয়েছে, কিন্তু সে জন্য চাই ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে নাগরিক ঐক্য। ইতিমধ্যে দেখেছি মবতন্ত্রের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্যের একটি প্রাথমিক উদ্যোগ এসেছে। আপাতত উদ্যোগটি নাগরিক ও সুশীল সমাজ পর্যায়ে প্রতিবাদে সীমিত, এই প্রতিবাদ কার্যকর হতে হলে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ প্রয়োজন। শুধু প্রতিবাদ নয়, চাই জবাবদিহি।

অধিকাংশ সভ্য দেশে এ–জাতীয় সংকটের সময় একাধিক ‘প্রেশার পয়েন্ট’ কাজ করে—যেমন আদালত, আইন পরিষদ, মানবাধিকার কমিশন ও সংবাদমাধ্যম। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম ছাড়া আর অন্য কোনো প্রেশার পয়েন্ট কার্যকর নয়। তার আশু সম্ভাবনাও নেই। অতএব সংবাদমাধ্যমকে একই সঙ্গে জাতির বিবেক ও জাতির পথপ্রদর্শকের দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমার বিশ্বাস, সে দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা তার রয়েছে।

এক শ বছরের আগে, ১৯০৪ সালে জোসেফ পুলিৎজার মন্তব্য করেছিলেন, কোনো দেশের উত্থান ও পতন সে দেশের সংবাদপত্রের উত্থান-পতনের সঙ্গে জড়িত। সৎ, দক্ষ ও জনস্বার্থে নিবেদিত সংবাদপত্রের পক্ষেই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে ভণ্ডামি ও প্রহসন থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

আমাদের সংবাদমাধ্যমের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ—দেশকে তারা ভণ্ডামি ও প্রহসনে নিক্ষেপ করবে, না তাকে বাঁচাতে জননৈতিকতাকে আয়নার মতো তুলে ধরবে? এর উত্তর তারাই দেবে, সে আশা করি।

* হাসান ফেরদৌস, সাংবাদিক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-28%2Fget42jmq%2FMasukArt27122025.jpg?rect=0%2C0%2C2000%2C1333&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

একটি অখ্যাত কবর ও ইরাকের আশ্চর্য অতীতের গল্প by তানিয়া গুডসুজিয়ান ও ইব্রাহিম আল মারাশি

বাগদাদের বাব আল শারকি এলাকার পুরোনো অ্যাংলিকান কবরস্থানে এক শতাব্দীর বেশি সময় আগে সমাহিত বিদেশিদের দেহ শুয়ে আছে। রোদে পুড়ে যাওয়া পাথরের ফাঁকে ফাঁকে শুকনা ঝোপঝাড় গজিয়েছে। অনেক সমাধিফলকের লেখাই এখন ক্ষয়ে যাওয়ায় তা পড়া কঠিন হয়ে উঠেছে।

এখানে আসা বেশির ভাগ মানুষ খুঁজে ফেরেন গার্ট্রুড বেলের কবর। তিনি ‘কুইন অব দ্য ডেজার্ট’ নামে পরিচিত। হলিউডে তিনি অমর হয়ে আছেন। অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর আধুনিক ইরাক গঠনে তাঁর ভূমিকার জন্য তাঁকে কেউ প্রশংসা করেন, কেউ আবার সমালোচনা করেন।

কিন্তু বেলের কবর থেকে একটু দূরেই রয়েছে আরেকটি পুরোনো সমাধিফলক, যা কৌতূহলী চোখ আকর্ষণ করবেই। সেটি ব্রিটিশ নৌবাহিনীর রিজার্ভ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার চার্লস হেনরি কাউলির কবর। ১৮৭২ সালে বাগদাদে জন্ম নেওয়া কাউলি ১৯১৬ সালে কুটের কাছে এক যুদ্ধে নিহত হন। ওই যুদ্ধে তাঁকে ভিক্টোরিয়া ক্রস প্রদান করা হয়েছিল।

গার্ট্রুড বেলের মতো পরিচিত নাম না হলেও কাউলির জীবনের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, একসময় ইরাক কীভাবে নদীনির্ভর বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের কেন্দ্র ছিল। এই নেটওয়ার্ক শুধু বাণিজ্য নয়; বরং গোটা অঞ্চলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এই ইতিহাস নতুন করে গুরুত্ব পায় গত সেপ্টেম্বরের একটি বিতর্কিত এবং তথ্যগতভাবে ভুল মন্তব্যের পটভূমিতে।

মন্তব্যটি করেছিলেন মার্কিন ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক কর্মী থেকে তুরস্কে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত হওয়া টম ব্যারাক। ব্যারাক বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্য বলে কিছু নেই। এখানে আছে শুধু গোত্র আর গ্রাম। তার যুক্তি ছিল, আধুনিক রাষ্ট্রগুলো আসলে ঔপনিবেশিক শক্তির তৈরি করা কৃত্রিম কাঠামো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরের বন্দোবস্ত নিয়ে কেউ কেউ বলেন, সাইকস পিকো চুক্তি কৃত্রিম রাষ্ট্র গঠন চাপিয়ে দিয়েছিল, যা পরে অস্থিরতার জন্ম দেয়। কিন্তু সেই সমাজগুলোকে আদিম বা অসভ্য বলা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং ভুল একটি দাবি। এই দৃষ্টিভঙ্গি যে বিষয়টি উপেক্ষা করে, তা হলো সাইকস পিকো চুক্তির সীমান্তগুলো ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে আঁকা হলেও সেগুলো মরুভূমি থেকে নতুন কোনো সভ্যতা তৈরি করেনি।

ইউরোপীয় মানচিত্রবিদেরা আসার বহু আগেই ইরাকের দীর্ঘ ইতিহাস গড়ে উঠেছিল। সেই ইতিহাস ছিল বহুভাষিক, বাণিজ্যনির্ভর, শিক্ষিত ও ভবিষ্যৎ–মুখী। এই ইতিহাসই এমন সব সংশোধনবাদী ব্যাখ্যার সরাসরি প্রতিবাদ করে। টম ব্যারাকের এ ধরনের ধারণা পশ্চিমে বহু আগেই এডওয়ার্ড সাঈদ ও ওরিয়েন্টালিজম (প্রাচ্যবাদ) বিষয়ে পুরো একাডেমিক ধারার মাধ্যমে খণ্ডিত হয়েছে।

লরেন্স অব অ্যারাবিয়া বা গার্ট্রুড বেলের মতো পরিচিত নাম না হলেও কাউলির জীবন গভীরভাবে দেখলে এমন এক সময়ের জানালা খুলে যায়, যখন দাজলা ও ফোরাত নদী ছিল মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান যোগাযোগপথ। এই নদীগুলোর নিয়ন্ত্রণ মানে ছিল বাজার, কূটনীতি ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ।

ইউফ্রেটিস অ্যান্ড টাইগ্রিস স্টিমশিপ নেভিগেশন কোম্পানির একজন জ্যেষ্ঠ ক্যাপ্টেনের ছেলে এবং আর্মেনীয় পারস্য বংশোদ্ভূত এক নারীর সন্তান হিসেবে কাউলি টাইগ্রিস নদীর তীরে বড় হন। স্টিমশিপের ক্যাপ্টেন, নদীর নাবিক, ব্যবসায়ী ও দোভাষীদের মধ্যে বেড়ে উঠে তিনি খুব ভালোভাবে বুঝেছিলেন যে এই নদীগুলোই ইরাকের অর্থনীতির প্রাণ।

আরবি ভাষা ও আরও কয়েকটি ভাষায় দক্ষ কাউলি সহজেই এক সংস্কৃতি থেকে আরেক সংস্কৃতিতে বিচরণ করতেন। তিনি সীমান্তের চেয়ে বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক প্রাচীন মেসোপটেমিয়া বহুসাংস্কৃতিক জীবনের প্রতিচ্ছবি ছিলেন।

ইরাকের সাংস্কৃতিক জীবনও ইউরোপীয় আলোর অপেক্ষায় ছিল না। রাজা ফয়সাল প্রথম পশ্চিমা ধাঁচের যে টুপি পরতেন এবং যাকে তিনি অগ্রগতির প্রতীক বলে ঘোষণা করেছিলেন, সেই আল সিদারা আসার এক হাজার বছর আগেই আল মুতানাব্বি শাসকদের উত্থান-পতন ও ক্ষমতার প্রকৃতি নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন।

পরবর্তী সময়ে মুল্লা আব্বুদ আল কারখি এমন কিছু তীক্ষ্ণ কবিতা লেখেন, যেখানে অটোমান শাসনের ভাঙন ও ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মাঝখানে আটকে পড়া একটি সমাজের উদ্বেগ ফুটে ওঠে। তাঁর কবিতায় পরিচয়, সার্বভৌমত্ব ও আধুনিকতা নিয়ে প্রাথমিক চিন্তার প্রকাশ দেখা যায়।

বাস্তবতা হলো, ইরাকিরা ইতিহাসের নীরব ভুক্তভোগী ছিলেন না। তাঁরা নিজেদের সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সক্রিয়ভাবে বুঝেছেন এবং ব্যাখ্যা করেছেন।

আজ অবশ্য একসময়কার সেই শক্তিশালী নদীগুলো আর আগের মতো প্রবাহিত হয় না। অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনের ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন, উজানের পানি সরিয়ে নেওয়া এবং খরার কারণে নদীগুলোর প্রাণশক্তি কমে গেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য এখন এসব নদীর গুরুত্বও খুব সামান্য। কারণ, বাণিজ্য অনেক আগেই স্থলপথে সরে গেছে।

তবে যে বিষয়টি একেবারেই কমে যায়নি, তা হলো ইরাকের দীর্ঘ ঐতিহাসিক ঐতিহ্য। কিউনিফর্ম লিপি, গণিত ও আইনের সূচনাকাল থেকে শুরু করে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস প্রমাণ করে যে ইউরোপীয় হস্তক্ষেপের আগেও মধ্যপ্রাচ্যে সুসংগঠিত সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পরিচয় বিদ্যমান ছিল।

কাউলির কবর এবং তাঁর প্রতিনিধিত্ব করা হারিয়ে যাওয়া সেই জগৎ আজ আবার একটি সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে। ইরাকের ঐক্য ও বৃহত্তর অঞ্চলের সংহতি সব সময়ই স্বাভাবিকভাবে গড়ে উঠেছে। তা তেল, যুদ্ধ বা সাম্রাজ্যের কারণে নয়; বরং মানুষ, ভাবনা ও অর্থনীতিকে যুক্ত করার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। ইরাকের নদীগুলোর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মধ্যপ্রাচ্যের অভিযোজনের ক্ষমতাই বরাবর তার সবচেয়ে বড় শক্তি ও পরিচয়।

তানিয়া গুডসুজিয়ান, কানাডীয় সাংবাদিক ও আল–জাজিরা ইংলিশ অনলাইনের সাবেক মতামত সম্পাদক
ইব্রাহিম আল মারাশি, ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি সান মারকোসে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-22%2Fvgy4d6q2%2Firaqkk.JPG?rect=75%2C0%2C890%2C593&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বাগদাদের একটি সেতু পার হচ্ছেন ইরাকের অধিবাসীরা। ১৯৩২ সালের ইরাক। ছবি : এএফপি

ট্রাম্পকে ঘায়েলের দুই গোপন অস্ত্র ইউরোপের হাতে! by জনি রায়ান

যা একসময় কল্পনাও করা যায়নি, সেটাই ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন আর ইউরোপের বন্ধু নয়; বরং প্রতিপক্ষ। ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা নীতিতে যে স্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা আছে, তা ইউরোপের নেতাদের আর কোনো দ্বিধায় থাকার সুযোগ দিচ্ছে না। এর চেয়েও গুরুতর বিষয় হলো ইউরোপের ভেতরেই ইউরোপে চলমান পদ্ধতির বিরোধিতা তৈরি করা এখন যুক্তরাষ্ট্রের খোলাখুলি ঘোষিত নীতি। অর্থাৎ এখন আর গোপনে নয়, ওয়াশিংটন প্রকাশ্যেই ইউরোপকে দুর্বল করতে চায়।

এ বাস্তবতার ভেতরেই রয়েছে এক স্পষ্ট বার্তা, ইউরোপ হয় লড়বে, নতুবা ধ্বংস হবে। অর্থনৈতিক, নিয়ন্ত্রক ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতার মতো কিছু শক্তিশালী তুরুপের তাস আছে ইউরোপের হাতে। ইউরোপের নেতারা যদি সতর্কতা ঝেড়ে ফেলে সাহসী ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তবে এসব তাস কার্যকরভাবে খেলানো সম্ভব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বাজি এখন এতটাই বিশাল যে ‘মেগা’ (কট্টর জাতীয়তাবাদী শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান) সমর্থকদের পেনশন পর্যন্ত একটি ভঙ্গুর এআই বুদ্‌বুদের টিকে থাকার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ এখন মার্কিন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি, যা ভোক্তা ব্যয়ের সমান গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরের প্রথমার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রায় ৯২ শতাংশ এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাদ দিলে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় নগণ্য, মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। ডোনাল্ড ট্রাম্প যতই সাহসী বক্তব্য দিন না কেন, তাঁর অর্থনৈতিক ভিত্তি মোটেও শক্ত নয়।

ট্রাম্পের রাজনৈতিক জোটও ভঙ্গুর। জুলাই মাসে ও চলতি মাসে ট্রাম্প সিনেটে রিপাবলিকানদের বাধ্য করার চেষ্টা করেছিলেন তাঁর প্রস্তাবিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিষেধাজ্ঞা (মোরাটোরিয়াম) পাস করাতে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোকে নিজেদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা তৈরিতে বাধা দিত। তবে ট্রাম্পের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

মেগা আন্দোলনের স্টিভ ব্যাননপন্থী অংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে ব্যাপক কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কায় ভীত এবং শিশুরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কী দেখছে, তা নিয়েও উদ্বিগ্ন। মেগা ভোটাররা বড় মাত্রার প্রযুক্তির রাজনৈতিক ক্ষমতা গভীরভাবে অবিশ্বাস করেন। তাই প্রযুক্তি নীতি ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দুর্বলতাগুলোর একটি।

ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন ডার লেনের হাতে এমন দুটি শক্তিশালী হাতিয়ার আছে, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বুদ্‌বুদ ফাটিয়ে দিতে পারে। তিনি যদি এগুলো ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি গুরুতর সংকটে পড়তে পারে।

প্রথম হাতিয়ারটি হলো এএসএমএল। নেদারল্যান্ডসের এই কোম্পানি এমন এক প্রযুক্তির ওপর বৈশ্বিক একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রাখে, যাকে বলা হয় এক্সট্রিম আলট্রাভায়োলেট লিথোগ্রাফি। এটি অত্যাধুনিক চিপ বানানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি আলো ব্যবহার করে মাইক্রোচিপ তৈরি করে এবং আধুনিক চিপ উৎপাদনে এগুলো অপরিহার্য। বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি কোম্পানি হিসেবে বিবেচিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া এই যন্ত্রগুলোর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল।

এ যন্ত্রের রপ্তানি সীমিত করলে নেদারল্যান্ডসের জন্য তা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হবে এবং ইউরোপের জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন সিদ্ধান্ত হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এ ক্ষতির পরিমাণ হবে অনেক বেশি। ইউরোপ যদি যুক্তরাষ্ট্রে অথবা তাইওয়ানে এ যন্ত্র রপ্তানি ধীর করে বা বন্ধ করে দেয়, তাহলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান এবং একে ভর করে গড়ে ওঠা ডেটা সেন্টারগুলো একেবারে দেয়ালে ঠেকবে। এইভাবে ইউরোপ চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বাড়বে, নাকি সংকুচিত হবে, সে বিষয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে ইউরোপের হাতে থাকা দ্বিতীয় হাতিয়ারটি ব্যবহার করা তুলনামূলকভাবে সহজ। সেটি হলো ইউরোপের বহুদিন ধরে অবহেলিত তথ্য সুরক্ষা আইন কঠোরভাবে কার্যকর করা। যুক্তরাষ্ট্রে চলমান মামলার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত গোপন নথি দেখায়, গুগলের মতো কোম্পানিগুলো কতটা দুর্বল সাধারণ তথ্য সুরক্ষা আইন প্রয়োগের সামনে। অন্যদিকে মেটা এখনো মার্কিন আদালতে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনি, তাদের অভ্যন্তরীণ সিস্টেম কীভাবে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে, কারা সেই তথ্য দেখতে পারে কিংবা কী উদ্দেশ্যে তা ব্যবহৃত হয়।

এ অনিয়ন্ত্রিত তথ্য ব্যবহারের সুযোগ কোম্পানিগুলোকে বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলকে প্রশিক্ষণ দিতে সাহায্য করছে, যা ইউরোপীয় আইনের আওতায় সম্পূর্ণ বেআইনি।

এদিকে ব্রাসেলস যদি কেবল আয়ারল্যান্ডকে বাধ্য করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়মগুলো ধারাবাহিক ও কঠোরভাবে কার্যকর করতে, তাহলে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ভয়াবহ পরিণতির মুখে পড়বে। তথ্যের জবাবদিহির নিয়ম মানতে হলে তাদের পুরো প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা একেবারে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জানাতে হবে যে নিয়ম না মানা পর্যন্ত তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পণ্য ইউরোপের মূল্যবান বাজারে নিষিদ্ধ থাকবে। এই দুই দিকের একসঙ্গে আঘাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বুদ্‌বুদ টিকে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম।

মেগা ভোটাররা তাঁদের সাংবিধানিক অধিকার বা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হারানোর জন্য ভোট দেননি। কিন্তু ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা ট্রাম্প গভীরভাবে অজনপ্রিয় একটি প্রযুক্তি খাতের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় স্থিতিশীলতা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ কারণে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে (মিডটার্ম) তিনি মারাত্মকভাবে দুর্বল অবস্থায় পড়বেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ঝুঁকির ভারসাম্য স্পষ্টভাবে ইউরোপকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করছে। এক বছর ধরে আপসের নীতি দেখিয়েছে যে নমনীয়তা ট্রাম্পকে আরও সাহসী করে তোলে। সংযমের যুক্তিগুলো দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে।

ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি ইউরোপের নেতাদের দুর্বল মনে করেন এবং বিশ্বাস করেন যে তাঁরা তাঁদের নাগরিকদের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান রক্ষা করতে অক্ষম। এখন পর্যন্ত ইউরোপের প্রতিক্রিয়া সেই ধারণাকেই শক্ত করেছে। ইউরোপ যদি এখন ক্ষমতা ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে এ সংঘাতের চূড়ান্ত ফলাফল হয়তো ওয়াশিংটনে নয়, ব্রাসেলসেই নির্ধারিত হবে।

জনি রায়ান, পরিচালক, এনফোর্স (আইরিশ কাউন্সিল ফর সিভিল লিবার্টিজের একটি বিভাগ)
- গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন ডার লেনের হাতে এমন দুটি শক্তিশালী হাতিয়ার আছে, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বুদ্‌বুদ ফাটিয়ে দিতে পারে।
ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন ডার লেনের হাতে এমন দুটি শক্তিশালী হাতিয়ার আছে, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বুদ্‌বুদ ফাটিয়ে দিতে পারে। ছবি : এএফপি

সোমালিল্যান্ডকে কোন মতলবে ইসরায়েল স্বীকৃতি দিচ্ছে, এতে আরব বিশ্বের ঝুঁকি কতটা

আরব নিউজের বিশ্লেষণঃ জাতিসংঘের প্রথম ও একমাত্র সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে আফ্রিকার দেশ সোমালিয়ার ভূখণ্ড থেকে আলাদা হওয়া সোমালিল্যাল্ড প্রজাতন্ত্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটা এ অঞ্চলের অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকদের সম্ভবত বিস্মিত করেনি।

ইসরায়েল গত শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বিতর্ক সৃষ্ট করেছে। এ দিন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আবদিরাহমান মোহামেদ আবদুল্লাহির সঙ্গে স্বীকৃতির একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন।

সোমালিল্যান্ড ১৯৯১ সালে সোমালিয়ার কাছ থেকে নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করে। এরপর তিন দশক পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত বিশ্বের কোনো দেশ তাদের স্বীকৃতি দেয়নি। তাই অঞ্চলটি সব সময় একধরনের কূটনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল। ইসরায়েলের স্বীকৃতির মাধ্যমে তা কিছুটা কমল।

ইসরায়েলের স্বীকৃতিকে ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন আবদুল্লাহি। সোমালিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অঞ্চলটিকে ইসরায়েল সরল কোনো বিবেচনা থেকে স্বীকৃতি দেয়নি। বরং স্বীকৃতির পর্দার আড়ালে সাবধানী হিসাব-নিকাশ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভূরাজনীতির সমীকরণ কাজ করেছে।

স্বীকৃতি না দিলেও যুক্তরাজ্য, ইথিওপিয়া, তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মতো কিছু দেশ সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। রাজধানী হার্গিসায় এসব দেশের লিয়াজোঁ অফিস রয়েছে।

স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে সোমালিল্যান্ড নিয়ে কয়েক দশকের আন্তর্জাতিক সংযম ভাঙল ইসরায়েল। দেশটি বুঝেশুনেই এটি করেছে। এ পদক্ষেপের মাধ্যমে ইসরায়েল নিজেকে এমন একটি স্বঘোষিত দেশের প্রধান সুবিধাভোগী হিসেবে হাজির করেছে, যেটি অনেক দিন ধরে আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের আসন দাবি করে আসছিল।

সোমালিল্যান্ডকে জায়নবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েলের স্বীকৃতি নিয়ে আরব নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন সৌদি আরবে নিযুক্তত জিবুতির রাষ্ট্রদূত দিয়া-এদ্দিন সাইদ বামাখরামা। তাঁর মতে, এ পদক্ষেপ গভীরভাবে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।

বামাখরামার ভাষায়, ‘একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা শুধু একটি আইনি পদক্ষেপ বা বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা নয়। বরং এর কাঠামোগত গভীর প্রভাব রয়েছে। এ ধরনের প্রভাবের মধ্যে একই জাতির নাগরিকদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৃদ্ধি, রাষ্ট্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে ক্ষয় করা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দ্বার উন্মুক্ত করা অন্যতম।’

সমালোচকেরা মনে করেন, ইসরায়েল অনেক দিন ধরে নানা ছদ্মবেশে এ অঞ্চলে আরও ভাগাভাগি করার পক্ষে লবিং করে আসছে।

অনেক আরব দেশ মনে করে, সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়া ইসরায়েলের পুরোনো এক কৌশলের ধারাবাহিকতার অংশ। ইসরায়েলের কৌশলটি হলো—শক্তিশালী কেন্দ্রশাসিত আরব ও মুসলিম দেশকে দুর্বল করতে সীমান্তবর্তী বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে উসকে দেওয়া।

সোমালিল্যান্ডের স্বীকৃতিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং সোমালিয়ার ফেডারেল সরকারের কাঠামোর মধ্যে গৃহীত জাতীয় সমঝোতার চেষ্টাকে ক্ষুণ্ন করার উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জিবুতির রাষ্ট্রদূত বামাখরামা বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সব সময় এমন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কারণ, তারা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতার বিপদ এবং এর ভয়াবহ মাশুলের চেয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে প্রাধান্য দিয়েছে।’

সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক নজির লঙ্ঘন করেছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটি ‘স্বীকৃতি দেওয়াকে’ আঞ্চলিক সংহতি ভাঙার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে—বিভিন্ন পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ উঠেছে।

ইসরায়েল এর আগেও বিভিন্ন রাষ্ট্রবহির্ভূত শক্তি বা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়েছে। এ সমর্থনকে তাঁরা ঝুঁকিতে থাকা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে হেফাজত করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছে। উদাহরণ হিসেবে লেভান্ট (সিরিয়াসহ ভূমধ্যসাগরের পূর্ব তীরবর্তী) অঞ্চলের দ্রুজ এবং লেবাননের ম্যারোনাইট সম্প্রদায়ের কথা বলা যায়।

ইসরায়েলের এই ‘পেরিফেরি ডকট্রিন’ বা প্রান্তীয় নীতির মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে দুটি উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে। একদিকে ইসরায়েলের আঞ্চলিক মিত্র তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে জাতিগত বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর স্বশাসনের ধারণার স্বীকৃতি মেলে। এটা ইসরায়েলের ইহুদি রাষ্ট্র হওয়ার বৈধতাকেও সমর্থন করে।

তবে সোমালিল্যান্ডের ক্ষেত্রে স্পষ্টত ভিন্ন নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। এখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেওয়ার যুক্তি নেই। কারণ, সোমালিল্যান্ড প্রধানত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল। এখানে যুক্তিটি আগাপাশতলা ভূরাজনৈতিক।

ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলে নিজেদের কৌশলগত অবস্থানকে গভীর করতে চাইছে। কারণ, অঞ্চলটিতে দেশটি ঐতিহাসিকভাবে নিঃসঙ্গ। সোমালিল্যান্ডের স্বীকৃতিকে ‘আব্রাহাম চুক্তির চেতনার’ সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন নেতানিয়াহু। এর অর্থ হলো—হর্ন অব আফ্রিকার স্বঘোষিত দেশটির জনসংখ্যা নয়, বরং নিজেদের নিরাপত্তা, সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহই ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য।

সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের প্রথম বড় অর্জন—কূটনৈতিক বলয়ে প্রভাব বিস্তার। ইসরায়েলের দাবি, আব্রাহাম চুক্তিতে সোমালিয়ার যোগ না দেওয়া কৃত্রিম বাধা হিসেবে কাজ করছিল। এখন তা দূর হলো।

ইসরায়েলের দাবি, স্বাধীনভাবে কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসম্পন্ন প্রায় ৬০ লাখ মানুষের দেশ সোমালিল্যান্ড আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দিতে খুব আগ্রহী ছিল।

সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহি জানান, ‘আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তির পথে একটি পদক্ষেপ’ হিসেবে তাঁর দেশ আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেবে। তবে, এই শান্তি এমনিতে আসেনি, এসেছে সম্পূর্ণ বিনিময়ের মধ্য দিয়ে, তা হলো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

ইসরায়েল এখন ‘সোমালিল্যান্ড মডেল’-কে সামনে এনে নানা যুক্তি দিতে পারবে। দেশটি হয়তো বলবে, সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত স্বার্থ পূরণ হলে আরও অনেক আরব ও মুসলিম দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ইচ্ছুক।

ইসরায়েলের এ যুক্তি আরব লিগ ও  ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) ঐক্যবদ্ধ অবস্থানকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। বিভিন্ন আরব ও মুসলিম দেশের সংস্থা দুটির দীর্ঘদিনের অবস্থান ছিল—ফিলিস্তিন সংঘাতের অবসান না করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা যাবে না। কিন্তু এখন তা আরও বেশি নাজুক হয়ে পড়েছে।

সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিয়ে ইসরায়েলের দ্বিতীয় বড় অর্জন—হর্ন অব আফ্রিকায় সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সম্ভাবনা। এডেন উপসাগরের কৌশলগত স্থান এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে সোমালিল্যান্ডের অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রপথের নজরদারি করার জন্য এটি বেশ উপযুক্ত।

সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলের উপস্থিতি ক্রমশ ঝুঁকি বৃদ্ধি করবে। কারণ, অঞ্চলটির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি ছোট সাগরের ওপরে ইয়েমেন। ইয়েমেনের ভূখণ্ডের একটি বড় অংশ হুতিরা নিয়ন্ত্রণ করে। হুতিরা এমন একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী যারা ‘ইসরায়েলের ধ্বংস’ কামনা করে।

ইসরায়েল হয়তো দাবি করবে, সোমালিল্যান্ডে তাদের সামরিক বা গোয়েন্দা উপস্থিতি হুতি হামলার হুমকি মোকাবিলায় সমুদ্রপথের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করবে। কিন্তু অঞ্চলটির অন্যান্য দেশ তা মনে করে না। তারা মনে করে, এতে করে উত্তেজনা বরং বাড়তে পারে।

সৌদি আরবে নিযুক্ত জিবুতির রাষ্ট্রদূত বামাখরামা সতর্ক করে বলেন, সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতি এই অঞ্চলকে কার্যত ‘বারুদভর্তি বিস্ফোরকের কূপে’ পরিণত করবে।

এই কূটনীতিক বলেন, ‘ইসরায়েল ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল স্থানটিতে যদি সামরিক ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে...তাহলে তা লোহিত সাগরের তীরবর্তী দেশ মিসর, সৌদি আরব, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও জিবুতির বিরুদ্ধে তেল-আবিবের কৌশলগত সাফল্য হিসেবে গণ্য হবে।’

জিবুতির রাষ্ট্রদূত যুক্ত করেন, লোহিত সাগর একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ। এর ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যে কোনো ধরনের পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া এ অঞ্চলে ভয়াবহ ফল বয়ে আনবে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-30%2Fgdf5hbpy%2FIsrael%E2%80%99s-Prime-Minister-Benjamin.png?rect=3%2C0%2C1194%2C796&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়া–সংক্রান্ত নথিতে সই করছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁকে মুঠোফোনে কিছু দেখাচ্ছেন ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার। ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি

মানবসদৃশ আন্তঃক্রিয়ামূলক এআই নিয়ন্ত্রণে খসড়া নীতিমালা চীনের

প্রকাশ ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ চীনের সাইবার নিয়ন্ত্রক সংস্থা গত শনিবার জনমতের জন্য প্রকাশিত এক খসড়া নীতিমালা প্রকাশ করেছে। এর লক্ষ্য এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সেবা তদারকি আরও কড়া করা যেগুলো মানবচরিত্র অনুকরণ করে এবং ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আবেগঘন যোগাযোগে জড়িত হয়। এই পদক্ষেপটি ভোক্তামুখী এআই-এর দ্রুত বিস্তারকে নীতিগত কাঠামোর মধ্যে আনার বেইজিংয়ের প্রচেষ্টাকে নতুন করে তুলে ধরে। সেখানে নিরাপত্তা ও নৈতিক মানদণ্ড আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

প্রস্তাবিত নীতিমালাটি চীনের সাধারণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত সব এআই পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এগুলোতে মানবব্যক্তিত্বের অনুকরণ, চিন্তাধারা ও যোগাযোগের ধরন প্রতিফলিত হয় এবং টেক্সট, ছবি, অডিও, ভিডিও বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আবেগপূর্ণ মিথস্ক্রিয়া গড়ে ওঠে। খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, সেবা প্রদানকারীদের ব্যবহারকারীদের অতিরিক্ত বা অতিমাত্রায় ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করতে হবে এবং কোনো ব্যবহারকারীর মধ্যে আসক্তির লক্ষণ দেখা গেলে উপযুক্ত হস্তক্ষেপ করতে হবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পণ্যের সম্পূর্ণ জীবনচক্রজুড়ে নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে এবং অ্যালগরিদম পর্যালোচনা, তথ্য-নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। খসড়াটি সম্ভাব্য মানসিক ঝুঁকির দিকেও বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে- প্রদানকারীদের ব্যবহারকারীর অবস্থা শনাক্ত করতে হবে, তাদের আবেগ ও সেবার ওপর নির্ভরতার মাত্রা মূল্যায়ন করতে হবে। যদি দেখা যায় কোনো ব্যবহারকারী অতিমাত্রার আবেগপ্রবণ অবস্থায় রয়েছে বা আসক্ত আচরণ প্রদর্শন করছে, তবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে হস্তক্ষেপ করতে হবে।
একই সঙ্গে প্রস্তাবিত ব্যবস্থা কিছু বিষয়বস্তু ও আচরণগত ‘লাল রেখা’ নির্ধারণ করেছে। যেমন, সেবাগুলো এমন কোনো কনটেন্ট তৈরি করতে পারবে না, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ, গুজব ছড়ায়, অথবা সহিংসতা ও অশ্লীলতা প্রচার করে।

mzamin

কেন্দ্রীয় প্রকল্প থেকে এবার সরানো হলো মাহাত্মা গান্ধীর নাম, ঢুকল ‌‘রাম’

এত দিন ভারতের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্প থেকে ধীরে ধীরে মুছে দেওয়া হচ্ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধীর নাম। এবার নরেন্দ্র মোদি সরকার ছেঁটে ফেলল ভারতের জাতির জনক ‘মহাত্মা’ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে। ২০ বছর ধরে চলে আসা গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্প, যার পোশাকি নাম ‘মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্ট’ বা সংক্ষেপে ‘মনরেগা’, তা আমূল বদলাতে আজ মঙ্গলবার লোকসভায় নতুন বিল পেশ করা হয়েছে। সেই বিল থেকেই মুছে দেওয়া হলো মহাত্মা গান্ধীর নাম। সে জায়গায় কৌশলে ঢোকানো হয়েছে ‘রাম’।

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে ‘মহাত্মা’ আখ্যা দিয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

নতুন এই বিলের নাম ‘বিকশিত ভারত—গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ)’। বিলের ইংরেজি আদ্যক্ষরগুলো নিলে দাঁড়ায় ‘ভিবি—জি রাম জি’। কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান আজ বিলটি লোকসভায় পেশ করেন।

বিলের বিরোধিতায় নেমেছে গোটা বিরোধীপক্ষ। তারা চায়, বিল প্রত্যাহার করা হোক। বিলের বিরোধিতায় তারা গান্ধীজির ছবি নিয়ে ওয়েলে নেমে আসে। কিন্তু সংসদে সরকারপক্ষের সমর্থন, যা তাতে শরিক দলগুলো বিরুদ্ধে ভোট না দিলে বিলটি আইনে রূপান্তর হওয়া স্রেফ সময়ের প্রতীক্ষা।

কংগ্রেস নেত্রী ওয়েনাড থেকে নির্বাচিত প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বিল পেশের সময় বিরোধিতা করে বলেন, ২০ বছর ধরে চলে আসা এই আইন দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা গ্রামীণ মানুষদের অক্সিজেনের মতো। দরিদ্র মানুষের জীবনধারণের একমাত্র উপায়। এই বিলকে সমর্থন করেছিলেন দলমত–নির্বিশেষে সবাই। দরিদ্রদের বঞ্চিত করাই নতুন বিলের লক্ষ্য।

প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেন, এই আইনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মহাত্মা গান্ধীর নাম। তাঁকেও ছেঁটে ফেলা হচ্ছে। বিজেপি সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘মহাত্মা গান্ধী আমাদের পরিবারের সদস্য নন। তিনি কোটি কোটি ভারতবাসীর পরিবারের একজন।’

গ্রামের দরিদ্রদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে ২০০৫ সালে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার মনরেগা আইন প্রণয়ন করেছিল। তাতে বছরে ১০০ দিনের কাজের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। দৈনন্দিন মজুরি রাজ্যে রাজ্যে যা ধার্য হয়েছিল, তা ১০০ শতাংশই দিত কেন্দ্রীয় সরকার। আঞ্চলিক প্রয়োজন অনুযায়ী ওই প্রকল্পের অধীন খাল–নদী–পুকুর খনন করা হতো। রাস্তা তৈরি করা হতো। এভাবে সৃষ্টি করা হতো গ্রামীণ সম্পদের। মুখে মুখে ওই আইন পরিচিত হয়েছিল ‘১০০ দিনের কাজ’ হিসেবে।

নতুন বিলে মোদি সরকার ১০০ দিনের বদলে ১২৫ দিন কাজ দেওয়ার কথা বলেছে। তবে সেই সঙ্গে জানিয়েছে, চাষের মৌসুমে প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকবে, যাতে চাষের ক্ষতি না হয়। বিরোধীদের আপত্তি এ নিয়েও। তবে সবচেয়ে বেশি আপত্তি নতুন বিলে খরচের দায় রাজ্যের ঘাড়েও চাপানোর। এই বিল অনুযায়ী, যেসব কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিধানসভা নেই, সেখানকার কাজের ১০০ শতাংশ ভার নেবে কেন্দ্রীয় সরকার। গোটা উত্তর–পূর্বাঞ্চল ও হিমালয়ের পাদদেশের উত্তরাখন্ড, হিমাচল প্রদেশ এবং জম্মু–কাশ্মীরের ক্ষেত্রে কেন্দ্র দেবে খরচের ৯০ শতাংশ। এর বাইরে সব রাজ্যের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার বইবে মোট খরচের ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ এই বিল আইনে পরিণত হলে অধিকাংশ রাজ্যের ঘাড়ে চাপবে বাড়তি বোঝা।

মোদি সরকারের শরিক অন্ধ্র প্রদেশের শাসক দল টিডিপি এই বাড়তি খরচ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে; যদিও তারা বিলটির বিরোধিতা করবে না বলে জানিয়েছে। কেরালা থেকে নির্বাচিত সিপিএম সদস্য জন ব্রিটাস বলেছেন, এই বিল আইন হলে তাঁদের মতো ছোট রাজ্যের ঘাড়ে বার্ষিক দুই থেকে আড়াই হাজার কোটি রুপির বাড়তি বোঝা চাপবে। তাঁর প্রশ্ন, কেন্দ্র কেন এই বিল আনল, তা বোধগম্য নয়।

পুরোনো আইন অনুযায়ী, ১০০ দিনের কাজের জন্য কেন্দ্রের কাছে বিভিন্ন রাজ্য সরকারের বকেয়া পাওনা ৯ হাজার কোটি রুপির বেশি। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বকেয়া পশ্চিমবঙ্গের; মোট ৩ হাজার ৭০০ কোটি রুপি। এই রাজ্যে ২০২২ সালের পর থেকে মনরেগার কাজও বন্ধ। রাজ্য সরকার দাবি জানিয়েই চলেছে। কেন্দ্র বকেয়া দিচ্ছে না।

প্রধানমন্ত্রী মোদি কখনো মনরেগার প্রয়োজনীয়তা ও উপযোগিতা মেনে নেননি; বরং একটা সময় তিনি এই প্রকল্প তুলে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন। পরে ২০১৫ সালে লোকসভায় কংগ্রেসিদের প্রতি কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘আমার বিচার–বুদ্ধি ও বিবেচনাবোধ বলছে, এ প্রকল্প রেখে দেওয়াই উচিত। কারণ, এটা আপনাদের ব্যর্থতার জীবন্ত স্মারক। স্বাধীনতার ৬০ বছর পরও আপনারা মানুষকে দিয়ে গর্ত খোঁড়াচ্ছেন।’

যদিও পরের বছর নোট বাতিলের পর শহর ছেড়ে গ্রামে ফেরা দরিদ্র মানুষদের মুশকিল আসান হয়ে উঠেছিল এই প্রকল্প। কোভিডের সময়েও। প্রতিশ্রুতিমতো বছরে ২ কোটি মানুষকে চাকরি দিতে ব্যর্থ মোদি সরকার মনরেগায় তৈরি বছরে ২৩৫ কোটি শ্রমদিবসকে সরকারের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে।

প্রকল্পটি বাতিল না করে প্রধানমন্ত্রী মোদি অবশ্য তাঁর রাজনৈতিক লক্ষ্য পূর্ণ করছেন। ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে তিনি একে একে কংগ্রেস আমলের প্রকল্পগুলোর নাম বদলে নতুন নাম দিয়ে তা চালু করেছেন। বোঝাতে চেয়েছেন, উন্নতির কৃতিত্ব তাঁরই। তা করতে গিয়ে তিনি বাদ দিয়েছেন নেহরু, ইন্দিরা ও রাজীবের নামের প্রকল্পগুলো। যেমন জওহরলাল নেহরু আরবান রিনিউয়াল মিশনের নামকরণ করেছেন অটল বিহারি বাজপেয়ীর নামে। ইন্দিরা আবাস যোজনা ও রাজীব আবাস যোজনার নাম বদলে করেছেন প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা। রাজীব গান্ধী গ্রামীণ বিদ্যুতিকরণ যোজনার নাম দিয়েছেন দীনদয়াল উপাধ্যায়ের নামে। এই বদল অভিযান থেকে এতকাল মুক্ত ছিলেন মহাত্মা গান্ধী। মোদি এবার তাঁকেও ছেঁটে ফেললেন।

মোদিঘনিষ্ঠ কংগ্রেসি শশী থারুরও এই বদল মেনে নেননি। আজ তিনি বলেন, মহাত্মা গান্ধীর নাম সরিয়ে ফেলা ‘অনৈতিক’। তিনি আরও বলেন, এটা শুধু এক প্রশাসনিক পদক্ষেপই নয়, এটা গ্রামীণ উন্নয়নের দর্শনের ওপর আঘাত।

সরকার ও বিজেপি তাদের মতো করে বিরোধীদের মোকাবিলা করছে। কৃষিমন্ত্রী বিল পেশ করে বলেছেন, গান্ধীজির আদর্শ মেনেই সরকার কাজ করছে। তাই তাঁদের সাফল্যের হার বিরোধী আমলের চেয়ে বেশি। তাঁর প্রশ্ন, রাম নামে বিরোধীদের আপত্তি কেন?

ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের অন্যতম অগ্রনায়ক মহাত্মা গান্ধী, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি
ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের অন্যতম অগ্রনায়ক মহাত্মা গান্ধী, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ফাইল ছবি

জনসংখ্যা বাড়াতে চীনে গর্ভনিরোধক পণ্যের দাম বাড়ছে

চীনে জন্মহার দ্রুত কমে যাওয়ায় নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দেশটিতে কনডমসহ সব ধরনের গর্ভনিরোধক পণ্যের ওপর ১৩ শতাংশ বিক্রয় কর আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিশু যত্ন ও বিয়েসংক্রান্ত সেবাকে করমুক্ত করা হয়েছে।

চীনা কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, তরুণদের বিয়ে ও সন্তান নিতে উৎসাহ দেওয়া। এর আগে, নব্বইয়ের দশকে কঠোর ‘এক সন্তান নীতি’ চালুর সময় গর্ভনিরোধক পণ্যে কর ছাড় ছিল। প্রায় ৩২ বছর পর সেই সুবিধা তুলে নেওয়া হলো।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, টানা তিন বছর ধরে চীনে জন্মহার কমেছে। ২০২৪ সালে দেশটিতে জন্ম নেয় মাত্র ৯৫ লাখ শিশু, যা এক দশক আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। এতে ভবিষ্যতে কর্মক্ষম মানুষের ঘাটতি ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার একদিকে গর্ভনিরোধকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করছে, অন্যদিকে শিশু ও বয়স্কদের যত্ন এবং বিয়েসংক্রান্ত সেবায় কর ছাড় দিচ্ছে।

তবে কনডমে কর আরোপ নিয়ে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। অনেকেই বলছেন, কনডমের দাম বাড়িয়ে জন্মহার বাড়ানো সম্ভব নয়। একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, কনডমের দাম আর সন্তান লালন-পালনের খরচের পার্থক্য সবাই জানে।

বিশেষজ্ঞরাও এই নীতির কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, গর্ভনিরোধকের দাম বাড়লে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে, কিন্তু এতে জন্মহার বাড়বে না।

বিশ্লেষকদের ধারণা, সন্তান পালনের উচ্চ ব্যয়, কঠিন শিক্ষা ব্যবস্থা এবং জীবনযাত্রার খরচই মূলত তরুণদের সন্তান নেওয়া থেকে বিরত রাখছে—যা শুধু কর নীতির পরিবর্তনে সমাধান করা কঠিন।

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

এই দেশটি গত ৫ বছরে সবচেয়ে বেশি ভারতীয়কে বিতাড়িত করেছে, যুক্তরাষ্ট্র নয়

গত পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভারতীয় নাগরিককে বিতাড়িত করেছে সৌদি আরব। এ সংখ্যাটা গত পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিতাড়িত হওয়া ভারতীয় নাগরিকের তুলনায় অনেক বেশি।

ভারতের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উপস্থাপিত আনুষ্ঠানিক তথ্য–উপাত্ত থেকে এমনটা জানা গেছে।

অবৈধ অনুপ্রবেশ নয়, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অতিরিক্ত সময় থেকে যাওয়া এবং শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে এমন বিতাড়নের ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, এই সংখ্যা দিয়ে বোঝা যায় উপসাগরীয় দেশে অভিবাসনসংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘনের সমস্যাটা কত বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং বলেন, অনেক দেশের সরকার বিতাড়িত হওয়া মানুষদের তথ্য নিয়মিতভাবে দেয় না। তবে বিতাড়নের জরুরি সনদের মধ্যে বিতাড়িত হওয়া মানুষের সংখ্যা জানা যায়। আর এটা ভারতীয় নাগরিকদের বিরুদ্ধে বিদেশে নেওয়া আইনি পদক্ষেপসংক্রান্ত একটি নির্ভরযোগ্য সূচক।

সরকারি তথ্য অনুসারে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সৌদি আরব বিশ্বব্যাপী ভারতীয় নাগরিকদের বহিষ্কারের ক্ষেত্রে শীর্ষ স্থানে ছিল।

রিয়াদে অবস্থিত ভারতীয় মিশন থেকে প্রকাশিত তথ্য–উপাত্ত বলছে—২০২১ সালে ৮ হাজার ৮৮৭ জন, ২০২২ সালে ১০ হাজার ২৭৭ জন, ২০২৩ সালে ১১ হাজার ৪৮৬ জন, ২০২৪ সালে ৯ হাজার ২০৬ জন এবং ২০২৫ সালে এ পর্যন্ত ৭ হাজার ১৯ জন ভারতীয় নাগরিককে বিতাড়িত করেছে সৌদি আরব।

কর্মকর্তারা বলেছেন, সৌদি আরবে বিদেশিদের বসবাসের ক্ষেত্রে জারি থাকা কঠোর নিয়মকানুন (ইকামা), শ্রমবিষয়ক সংস্কার এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নিয়মিত অভিযানকে কেন্দ্র করে এত বেশি সংখ্যক ভারতীয় নাগরিককে বিতাড়িত করা হয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এবং শ্রমবাজারে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত সরকারি নীতির কারণে এমন ঘটনা ঘটছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য–উপাত্তেরর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকা এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব এখনো ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া, অনুমতি ছাড়া কাজ বা স্থায়ী বাসিন্দাসংক্রান্ত নিয়ম ভঙ্গের জন্য অনেক মানুষকে বিতাড়িত করছে।’

অপরদিকে সৌদি আরব থেকে যত ভারতীয়কে বিতাড়িত করা হয়েছে, সে তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিতাড়িত হওয়া ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যাটা কম। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত ভারতীয় মিশনের তথ্য বলছে—২০২১ সালে ৮০৫ জন, ২০২২ সালে ৮৬২ জন, ২০২৩ সালে ৬১৭ জন, ২০২৪ সালে ১ হাজার ৩৬৮ জন এবং ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৪১৪ জন ভারতীয় নাগরিককে বিতাড়িত করেছে সৌদি আরব।

যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো, নিউইয়র্ক, আটলান্টা, হিউস্টন, শিকাগোতে অবস্থিত ভারতীয় মিশনগুলোর তথ্যও বলছে, সেখান থেকে বিতাড়িত হওয়া ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা সৌদি আরবের তুলনায় অনেক কম। এসব জায়গার বেশির ভাগ থেকে বিতাড়িত হওয়া ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা দুই অঙ্কের ঘরে।

কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন, মূলত ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া বা বসবাস–সম্পর্কিত নিয়মভঙ্গের কারণে বেশির ভাগ বিতাড়নের ঘটনা ঘটে থাকে, গণহারে আটকের কারণে নয়। এ ছাড়া অনেক ভারতীয় নাগরিকের ভ্রমণসংক্রান্ত বৈধ নথি থাকার কারণে জরুরি শংসাপত্রের প্রয়োজন কম হয়।

ভারত সরকার বলেছে, ‘বিদেশে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।’

বিতাড়নের ক্ষেত্রে আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে এবং নাগরিকদের সময়মতো দেশে ফেরত পাঠাতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে ভারতীয় কূটনৈতিক মিশনগুলো সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি সড়ক
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি সড়ক। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

কাশ্মীরে জৈইশ ও হিজবুল কমান্ডারদের খোঁজে ২০০০ সেনা জওয়ান

ভারতের কাশ্মীরে জৈশ ই মুহাম্মদ ও হিজবুল কমান্ডারদের খোঁজে বড় মাপের অভিযান শুরু  হয়েছে। প্রায়  ২০০০ সেনা জওয়ানকে এই অভিযানে নামানো হয়েছে বলে সংবাদ সংস্থার খবর। তুষারে ঢাকা উপত্যকা দিয়ে যাতে জঙ্গিরা অনুপ্রবেশ না করতে পারে, তার জন্য ধরে ধরে অপারেশন চালাচ্ছে সেনাবাহিনী। জানা গেছে, কাশ্মীরে জৈইশ ই মোহাম্মদির জঙ্গিদের ধরতে এই অভিযান শুরু হয়েছে। এরই সঙ্গে তাদের স্থানীয় কমান্ডারকেও ধরার চেষ্টায় রয়েছে সেনা জওয়ানরা।

এছাড়া হিজবুল মুজাহিদিনের কমান্ডারের খোঁজও করছে সেনাবাহিনী। ছাত্রু গ্রাম এবং আশেপাশের এলাকায় সেনার এই অভিযান বিগত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলছে। সংবাদ সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, কাশ্মীরে জৈইশের স্থানীয় কমান্ডার সাইফুল্লাহ ও তার  সহযোগী  আদিল-  এই দু’জনেই এখন কিশতওয়ারের ডোডা অঞ্চলের পাহাড়ে লুকিয়ে আছে। এই জঙ্গিদের একেক জনের মাথার দাম ৫ লাখ  রুপি করে।

এই আবহে কিশতওয়ারের ছাত্রু নামক গ্রাম থেকে এই তল্লাশি অভিযান শুরু হয়েছে। ডোবা অঞ্চলের সেওজধারে চিরুনি তল্লাশি চলছে। পাশাপাশি কিশতওয়ারের এলাকাতেও অভিযান শুরু হয়েছে শনিবার থেকে। অন্যদিকে আরেক অভিযানে কিশতওয়ারের পাদ্দের সাবডিভিশনে হিজবুল জঙ্গি কমান্ডার জাহিঙ্গির সারুরির খোঁজ শুরু করেছে সেনা। এছাড়াও তার দুই সহযোগী মুদ্দাসির এবং রিয়াজেরও খোঁজ চালানো হচ্ছে।

mzamin

ভিড় ঠেলে জনতার সঙ্গে জানাজায় পাকিস্তানের স্পিকার

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় শরিক হতে বুধবার ঢাকায় এসেছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ ব্লকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও সমবেদনা জানিয়ে আমন্ত্রিত বিদেশি অতিথিদের সঙ্গে তাঁর জানাজায় যোগ দেওয়ার কথা ছিল। ভিড়ের কারণে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে বিদেশি অতিথিদের জন্য নির্ধারিত স্থানে গিয়ে তিনি জানাজা পড়তে পারেননি। ভিড়ের মধ্যেই তিনি বাংলাদেশের লোকজনের পাশে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়ার জানাজা পড়েছেন।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় আসার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানাতে জাতীয় সংসদ ভবনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে আলোচনা করেন সার্কভুক্ত দেশের উচ্চপর্যায়ের অতিথিরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি এন ধুংগিয়েল, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত ও দেশটির উচ্চশিক্ষামন্ত্রী আলী হায়দার আহমেদ এবং শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ।

জাতীয় সংসদ ভবনে আলোচনার আনুষ্ঠানিকতা সেরে শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়া বাকি পাঁচ অতিথি একটি বাসে ওঠেন। সার্কভুক্ত পাঁচ দেশের উচ্চপর্যায়ের অতিথিদের বহনকারী বাসটিতে ছিলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুকসহ কয়েকজন কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদ।

জানা গেছে, খালেদা জিয়ার জানাজা রীতিমতো জনসমুদ্রে পরিণত হওয়ায় সার্কভুক্ত পাঁচ দেশের উচ্চপর্যায়ের অতিথিদের বহনকারী বাসটি ভিড়ে আটকে ছিল প্রায় আধা ঘণ্টা। পরে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক আড়ংয়ের লালমাটিয়া শাখার উল্টো দিকে দেশি–বিদেশি অতিথিদের বহনকারী গাড়ি থেকে নেমে পড়েন। গাড়ি থেমে নেমে খানিকটা এগিয়ে তিনি জনতার সঙ্গে জানাজায় শামিল হন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-31%2Fdkm7t6bn%2FCapture.PNG?rect=3%2C0%2C357%2C238&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক