Showing posts with label ভাষাসৈনিক. Show all posts
Showing posts with label ভাষাসৈনিক. Show all posts

Sunday, December 6, 2009

উপেক্ষিত ভাষাসৈনিক মঞ্জুর হোসেন -স্মরণ by এম আর মাহবুব

ভাষা আন্দোলনের অনেক ইতিহাসই চাপা পড়ে যাচ্ছে। অনেক ভাষাসৈনিকই থেকে যাচ্ছেন দৃষ্টির আড়ালে। এদিকে ফেব্রুয়ারি এলেই ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ্যমে নতুন নতুন ভাষাসৈনিকদের দেখতে পাচ্ছি আমরা। এত দিন তাঁরা কোথায় ছিলেন, কীভাবেই বা তাঁরা ভাষাসৈনিক, প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া কঠিন। ঐতিহাসিকভাবে যাঁদের অবদান স্বীকৃত, কিন্তু এখন যাঁদের নিয়ে আলোচনা হয় না, তাঁদেরই একজন মঞ্জুর হোসেন। তাঁকে নিয়েই আজ কথা বলব।
মঞ্জুর হোসেনের জন্ম ১৯২৮ সালের ১৫ জুন, নওগাঁ জেলার সুলতানপুর গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মোবারক আলী, মায়ের নাম নুরুন নাহার। তিনি ১৯৪৩ সালে নওগাঁ কেডি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৪৫ সালে কলকাতা থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৫৯ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। চিকিত্সাবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করা সত্ত্বেও সরকারি চাকরির মোহ ত্যাগ করে তিনি আজীবন সাধারণ মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। এমবিবিএস পাস করে জন্মভূমি নওগাঁয় এসে চিকিত্সক হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গ্রামের সাধারণ মানুষের পাশে থেকে তাদের চিকিত্সাসেবা দিয়েছেন। গরিব রোগীদের বিনা পয়সায় চিকিত্সা করতেন, এমনকি তাদের ওষুধ পর্যন্ত কিনে দিতেন। কথিত আছে, তিনি ঘোড়ার গাড়িতে গ্রামেগঞ্জে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে রোগীর সেবা করতেন। অনেক জটিল রোগীকে ঢাকা পাঠিয়ে তাদের চিকিত্সার সব ব্যবস্থা করে দিতেন ‘গরিবের ডাক্তার’ বলে খ্যাত মঞ্জুর হোসেন। চিকিত্সার পাশাপাশি সাংবাদিকতার সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন। তাঁর বাবার উদ্যোগ ও সম্পাদনায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক দেশ বাণীর সম্পাদনার দায়িত্ব নেন ১৯৬০ সালে। পত্রিকা প্রকাশ করতে গিয়ে তাঁকে বিভিন্ন সময় কারাবরণসহ নানা নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। তিনি আবৃত্তি, সংগীতচর্চা ও লেখালেখি করতেন।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন একজন নির্লোভ, ত্যাগী, সত্ ও আদর্শ মানুষ। সারা জীবন সংসার ও নিজের জন্য কিছুই সঞ্চয় করেননি। নিজের শক্তি, শ্রম ও মেধা বিলিয়ে দিয়েছেন নওগাঁবাসী তথা দেশ ও জাতির জন্য। ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) রাজশাহী জেলার সভাপতি পদে আসীন ছিলেন।
বায়ান্নর ভাষা আন্দালনে অত্যন্ত সাহসী ও সংগ্রামী ভূমিকা পালন করেছিলেন মঞ্জুর হোসেন। তখন তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৃশেষ বর্ষের ছাত্র। ভাষা আন্দোলনে সরকারবিরোধী বিপ্লবী নেতা হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজে তিনি ‘বিপ্লব দা’ নামে পরিচিত ছিলেন। ১৯৪৯ সালে সরকারি স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ দিবসে মঞ্জুর হোসেন বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি হলে সেদিন সন্ধ্যায় তিনি সাহসী ও দৃপ্তকণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘চুয়াল্লিশ ধারা ভাঙবই ভাঙব।’ অন্যদিকে মেডিকেল ব্যারাকের এক স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশে এর প্রতিবাদে বক্তব্য দেন। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে গোলাম মাওলার কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায়ও তিনি ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। তা ছাড়া গভীর রাতে ফজলুল হক হলের পুকুরপাড়ে ১১ জন ছাত্রনেতার ১৪৪ ধারা ভাঙার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের গোপন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের একমাত্র প্রতিনিধি মঞ্জুর হোসেন। তিনি ২১ ফেব্রুয়ারি আমতলার সভায় ছাত্র জমায়েত ও সভা সফল করতে ঢাকা মেডিকেলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন। তিনি সভায় উপস্থিত থেকে ১৪৪ ধারা ভাঙার মিছিলেও অংশ নেন। একুশের আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিনি কারাভোগ করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনারের অন্যতম কারিগর হলেন মঞ্জুর হোসেন। ভাষা আন্দোলন ছাড়াও পরবর্তীকালে সংঘটিত এ দেশের বহু গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক ছিলেন তিনি।
তত্কালীন সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়ার কারণে তাঁকে ১৭ বার গ্রেপ্তার করা হয়। এই মহান ত্যাগী ভাষাকর্মী ১৯৬৮ সালের ৪ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। গতকাল ছিল তাঁর মৃত্যুদিবস।
মৃত্যুকালেও তাঁর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। ভাষাসংগ্রামে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ২০০২ সালে ‘একুশে পদক’ (মরণোত্তর) দেওয়া হয়।

Sunday, November 15, 2009

রিয়েল এস্টেট এজেন্ট সমাচার -দুই দু’গুণে পাঁচ by আতাউর রহমান

আমাদের দেশে আমরা বলি ‘ডেভেলপার’ (‘ইউনিভার্সিটি’ ইত্যাকার আরও অনেক ইংরেজি শব্দের মতো এটাও বাংলা ভাষায় আত্তীকরণ করা হয়ে গেছে); বিলেতে ও মার্কিন মুলুকে ওরা বলে ‘রিয়েল এস্টেট এজেন্ট’। দুটোর মধ্যে অবশ্য খানিকটা গুণগত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়—আমাদের দেশে এরা বাসস্থানপ্রত্যাশী ব্যক্তিদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে কইয়ের তেলেই কই ভাজে (তাও যদি সময়মতো প্রতিশ্রুতি পালন করত); আর ওসব দেশে ওরা নিজেদের অর্থায়নে বাসস্থান তৈরি করে অতঃপর বিক্রি করে, উপরন্তু মালিকের পক্ষ থেকে জমি-বাড়ি বিক্রি ও ভাড়া প্রদান ইত্যাদি যাবতীয় কার্যও সম্পাদন করে থাকে।
তো গল্প আছে: এক অনভিজ্ঞ রিয়েল এস্টেট সেলসম্যান কাস্টমারকে অন্ধকারে রেখে পানির নিচের একখণ্ড জমি বিক্রি করার পর তার বসের কাছে জানতে চাইল, কাস্টমার জমি দেখার পর রেগে গিয়ে যদি অ্যাডভান্সের টাকা ফেরত চায়, তাহলে সে তা ফেরত দেবে কি না। বস তখন রেগে গিয়ে বললেন, টাকা ফেরত? তুমি কী ধরনের সেলসম্যান হে? যাও এবং গিয়ে ওর কাছে একটা স্পিডবোট কিংবা নৌকা বিক্রি করে এসো।
আরও আছে: শহরের একটি অভিজাত এলাকায় বসবাসকারী এক ভদ্রলোক একই বাসায় দীর্ঘদিন বাস করায় ক্লান্ত হওয়ায় বাসাটি বিক্রি করে অন্যত্র স্থানান্তরের উদ্দেশে একটি রিয়েল এস্টেট এজেন্সির শরণাপন্ন হলেন। পরের রোববারের পত্রিকার পাতায় এজেন্সি কর্তৃক প্রদত্ত তাঁর বাসার বিবরণসংবলিত বিজ্ঞাপন পাঠ করে তিনি তড়িঘড়ি এজেন্টকে টেলিফোন করলেন। অতঃপর তিনি বললেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বাসাটি বিক্রি করব না। পত্রিকায় প্রদত্ত আপনাদের বিজ্ঞাপন পড়ে আমার প্রতীতি জন্মেছে যে আমি সারা জীবন এ রকম একটা বাসার স্বপ্নই দেখেছিলাম।
আমাদের দেশেও বাসস্থানসংক্রান্ত এ ধরনের চটকদার বিজ্ঞাপন প্রায়ই পরিলক্ষিত হয়। এই যেমন ইদানীং পত্রিকার পাতায় ও রাস্তার মোড়ে মোড়ে একটি বিজ্ঞাপন শোভা পাচ্ছে: ‘চার লাখ টাকায় ফাইভ স্টার হোটেলের মালিকানা।’ ভাবখানা এই যে মাত্র চার লাখ টাকায় একটি পাঁচ তারা হোটেলের মালিক হওয়া যাবে। তাই বিজ্ঞাপনটি বিলেতি জোক বুকে বহু আগে পঠিত একটি চটি গল্পের স্মরণ পাইয়ে দেয়:
এক লোক গাড়ির শোরুমে গেছে ক্যাশ পয়সায় একটি মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি কিনতে। তার কাছে ২০ পেনি শর্ট পড়ে গেল। পাশ দিয়ে একজন পরিচিত লোক যাচ্ছিল। সে দৌড়ে গিয়ে ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমাকে ২০ পেনি ধার দাও।’ লোকটি বলল, কেন? প্রত্যুত্তরে সে বলল, ‘আমি একটা মার্সিডিজ গাড়ি কিনব।’
‘তাহলে এই নাও ৪০ পেনি’, লোকটি পয়সাটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘আমার জন্যও একটা কেনো।’
তা রিয়েল এস্টেট এজেন্ট তথা ডেভেলপারদের চরিত্র দুনিয়ার সর্বত্রই প্রায় সমান—মানুষকে পটিয়েপাটিয়ে রাজি করানোয় লোকগুলো সিদ্ধহস্ত। তবে এতদসত্ত্বেও পাশ্চাত্যে ওরা ন্যূনতম একটা সততার মাপকাঠি মেনে চলে। এই যেমন রিয়েল এস্টেট এজেন্ট কাস্টমারকে বোঝাচ্ছে, ‘এই বাড়িটার সুবিধা-অসুবিধা দুটোই আছে—অসুবিধা হচ্ছে, এটার দক্ষিণ দিক পানীয় তৈরির কারখানাসংলগ্ন আর উত্তর দিক চামড়া তৈরির কারখানাসংলগ্ন।’
‘তাহলে সুবিধাটা কী?’ কাস্টমার জিজ্ঞেস করল।
সুবিধাটা হচ্ছে, এজেন্ট জবাব দিল, ‘আপনি সব সময়ই বলতে পারবেন, বাতাসটা কোন দিক থেকে বইছে।’
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আরও অনেক কিছু অবলোকন করা যায়। কাস্টমারকে ভুলিয়েভালিয়ে একবার বড়শিতে গেঁথে ফেলতে পারলেই ব্যস, কেল্লা ফতে। জমি কিংবা ফ্ল্যাট হস্তান্তরের সময়সীমাসংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির বরখেলাপিকে এারা কোনো অন্যায়ই মনে করে না। তা ছাড়া ফ্ল্যাটের দাম শনৈঃ শনৈঃ বাড়লে কোনো ছলছুতায় বুকিং বাতিল করে ডাবল পয়সা কামানোতেও কোনো অপরাধবোধ নেই। পাশের ফসলি জমির মালিক ওর জমি স্বেচ্ছায় বিক্রি করতে না চাইলে নিজের জমি ভরাটের নামে ওর জমি বালু দিয়ে ভরাট করে দাও অথবা চতুষ্পার্শ্বের জমি কিনে ফেলে ওকে বেকায়দায় ফেলে দাও; ব্যাটা ওর জমি বিক্রি না করে যাবে কোথায়? ইত্যাদি আরও কত কী! পাশ্চাত্যে আইনের শাসন প্রচলিত আছে বলে এসব কাজ করে সহজে পার পাওয়া যায় না; কিন্তু আমাদের দেশ বলেই সহজে পার পাওয়া যায়।
আতাউর রহমান: রম্য লেখক। ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক।