Monday, August 12, 2013

সেদিন সংবিধানই হত্যা করা হয়েছিল by মাহমুদুল বাসার

মহাত্তা গান্ধী স্বাধীন ভারতের প্রতিষ্ঠাতা বলা যায়। কিন্তু তিনি সাংবিধানিক কিছু ছিলেন না। জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন না। প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতি ছিলেন না। তাকে হত্যার পর ভারতে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কোনো সংকট দেখা দেয়নি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছিলেন জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। সেই সূত্র অনুসারে বঙ্গবন্ধু ছিলেন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক। জেনারেল ওসমানী মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি। ১৯৭৫ সালের মধ্য আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে বাংলাদেশে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতাই হত্যা করা হয়েছিল। এরপর লাগাতার হত্যাকাণ্ড চলতে থাকে, একেবারে কর্নেল তাহের পর্যন্ত হত্যার ধারা বেগবান গতিতে চলতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধা নিধন চলতে থাকে নির্বিচারে আর চলতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের শিকড় উপড়ানোর কাজ।
বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রের ফাউন্ডার এই স্বীকৃতি সংবিধানে দেয়া হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তিনিই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, তার ঘোষণাকে ভিত্তি করে প্রথমে হান্নান তারপর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন, এই স্বীকৃতিও সংবিধানে দেয়া হয়েছে। এরপর তিনি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম সাংবিধানিক প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, এটাও সাংবিধানিক স্বীকৃতির উজ্জ্বলতম ইতিহাস। তাই বঙ্গবন্ধু হত্যা আর সংবিধান হত্যা প্রায় একই কথা।
২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ের চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দেশের সর্বোচ্চ আদালত ঐতিহাসিক রায় দিয়ে বলেছিলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর যারা ক্ষমতায় এসেছিলেন তারা প্রত্যেকে ১৯৭২ সালের জনগণের প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রণীত সংবিধান লংঘন করে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে এসেছিলেন। সে সময়ের প্রতিটি আইন অবৈধ।
১৫ আগস্টের পর অনায়াসে ঘটতে থাকে সংবিধান লংঘন। কীভাবে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর প্রধান হলেন? কীভাবে রাষ্ট্রপতি হলেন? কীভাবে তিনি গণভোটের প্রহসন করলেন? কীভাবে তিনি একই সঙ্গে তিনটি পদ দখলে রেখেÑ রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকÑ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেছিলেন? ১৯৭৮ সালে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার ঈদগাহ ময়দানে জেনারেল ওসমানীর সমর্থনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে মরহুম মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেছিলেন, সব ক্ষমতা দুই পকেটে নিয়ে জিয়াউর রহমান নির্বাচনে নেমেছেন, ভাঙ্গা থানার ওসি সাহেব যদি নির্বাচনে নামেন তাহলে তো তার সঙ্গে কেউ প্রতিযোগিতায় পারবে না।
বঙ্গবন্ধু সংবিধান পরিবর্তন করেছিলেন, সরকার পরিচালনার সিস্টেম পরিবর্তন করেছিলেন কিন্তু সংবিধান লংঘন করেননি। তিনি এ-ও বলেছিলেন, দরকার হলে সিস্টেম আবার পরিবর্তন করে সংসদীয় ধারায় ফিরে আসা হবে। সংসদে দাঁড়িয়ে জাতির সামনে জবাবদিহি করে বলেছিলেন, কম দুঃখে সিস্টেম পরিবর্তন করিনি।
এই জবাবদিহিতা ছিল একজন সিভিল সরকারপ্রধানের বৈশিষ্ট্য। জেনারেল ওসমানী এবং নূরে আলম সিদ্দিকী যখন সংসদে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুকে তুলোধুনো করে কঠোর সমালোচনা করছিলেন, তখন তিনি হাসছিলেন, ক্রুদ্ধ হননি, ক্ষেপে যাননি। তিনি ক্ষেপে গিয়েছিলেন সিরাজ শিকদারের ওপর। তিনি কাউকে জোর করে বাকশালে যোগদান করতে বাধ্য করেননি। বঙ্গবিবেক আবুল ফজল, আবু জাফর শামসুদ্দীনসহ তার অগণিত অনুরাগী বাকশালে যোগদান করেননি। ৪টি পত্রিকা রেখে বাকি সব পত্রিকা বন্ধের কুপরামর্শ দিয়েছিলেন এনায়েতুল্লাহ্ খান, বাকশালে যোগদান করেছিলেন আতাউর রহমান খান। এই দুজনই বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর বঙ্গবন্ধুর ১৪ পুরুষ শ্রাদ্ধ করে সমালোচনা করেছিলেন। আর আবুল ফজল এবং আবু জাফর শামসুদ্দীন বঙ্গবন্ধুর অপমানের বিরুদ্ধে, ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে আমৃত্যু লিখে গেছেন। এটাই বোধ করি ইতিহাসের নিয়ম।
দীর্ঘ একুশ বছর আমরা সাংবিধানিক সংকট মোকাবেলা করেছি বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের অবকাঠামো, তার স্পিরিট, তার মর্মবাণী সবই ধসে পড়েছিল ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর। সেই সংবিধান আজও মূল অবস্থানে ফিরে আসতে পারেনি। ভেবে মর্মাহত হই, সেদিন বিরোধী দলের এক মহিলা সংসদ সদস্য সংসদে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের মহাভাষণের প্যারোডি করে, ব্যঙ্গ করে বক্তৃতা দিয়েছেন। জানি না, এরা ক্ষমতায় এলে বঙ্গবন্ধুর মর্যাদা কোথায় নিক্ষেপ করবেন।
লেখক : মাহমুদুল বাসার, কলাম লেখক, গবেষক

জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, না করা by বিভুরঞ্জন সরকার

হাইকোর্টের এক রায়ে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণার পর স্বাধীনতাবিরোধী এই দলটির রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিও জোরালো হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাসী নাগরিক সমাজ এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে আইনি প্রক্রিয়ায় জামায়াত নিষিদ্ধ করার দাবি তোলা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতকে অপরাধী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে স্বাধীনতাবিরোধীদের স্থান না দিতে এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে যাতে তারা স্থান না পায়, তাও নিশ্চিত করার পরামর্শ আদালত সরকারকে দিয়েছেন। কিন্তু সরকার এই পরামর্শ বিবেচনায় নেবে কি না তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবির প্রতি সরকার যে সহমত পোষণ করে না সেটা স্পষ্ট হয়েছে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বক্তব্য থেকেই। সৈয়দ আশরাফ গত ৩ আগস্ট বলেছেন, জামায়াতে ইসলামকে নিষিদ্ধ করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা কোনো ইস্যুতে একমত প্রকাশ করে সাধারণত বক্তৃতা-বিবৃতি দেন না। আওয়ামী লীগ যা বলে বিএনপির অবস্থান হয় তার বিপরীতে। আবার বিএনপি কোনোকিছুতে হ্যাঁ বললে আওয়ামী লীগ অবধারিতভাবেই তাতে না বলে। কিন্তু জামায়াত নিষিদ্ধের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলের দুই নেতা প্রায় এক সুরে কথা বলেছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ২ আগস্ট বলেছেন, বিএনপি কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা সমর্থন করে না। রাজনীতিকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় মোকাবেলা করা উচিত। সৈয়দ আশরাফ এবং মির্জা ফখরুল জামায়াত নিষিদ্ধের প্রশ্নে প্রায় অভিন্ন মত প্রকাশ করলেও আওয়ামী লীগের অন্য নেতা-মন্ত্রীরা কিন্তু ভিন্ন কথা বলেছেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সংবিধানের সঙ্গে গঠনতন্ত্র সাংঘর্ষিক হওয়ায় জামায়াত ইসলামের নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা সঠিক ও স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করে বলেছেন, এর মাধ্যমে জামায়াত এদেশে থাকার অধিকার হারিয়েছে। বাংলাদেশে থাকার কোনো অধিকার নেই তাদের। আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেছেন, উচ্চ আদালতে জামায়াতের নিবন্ধনকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এটি জামায়াত নিষিদ্ধের প্রথম ধাপ। এখন আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জামায়াত নিষিদ্ধ হবে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহবুবউল আলম হানিফ বলেছেন, রাজনীতি কলুষমুক্ত করতে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়া জরুরি। তথ্যমন্ত্রী ও জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেছেন, জামায়াতকে দলগতভাবে নিষিদ্ধ করা দরকার এবং এর প্রত্যেক সদস্যের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়াও দরকার। জামায়াত একটি সশস্ত্র জঙ্গিবাদী সংগঠন, তার গণতন্ত্রে থাকার অধিকার নেই। দেখা যাচ্ছে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা না করা নিয়ে সরকারি দলের মধ্যে ভাবনাচিন্তার ঐক্য নেই। এ অবস্থায় হাইকোর্ট জামায়াতের নিবন্ধন নিষিদ্ধ করলেও জামায়াতের রাজনীতি খুব শিগগিরই দেশে বন্ধ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তারা যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য যে তৈরি আছে সেটা বোঝা যায় তাদের কর্মসূচি ঘোষণার ধরন দেখে। জামায়াত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা হিসেবে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে আপিল করেছে। আবার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য আগামী ১৩, ১৪ আগস্ট সারাদেশে ৪৮ ঘণ্টার হরতাল আহ্বান করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে দণ্ড ঘোষণার পর দেশে জামায়াত-শিবির ব্যাপক সহিংসতা চালিয়েছে। সরকার জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে আছে। জামায়াত-শিবিরের অনেক নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছে। কেউ কেউ আÍগোপনে আছে। জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে বলে মনে করা হলেও বাস্তবে এখনও তারা হিংসাÍক কর্মকাণ্ড থেকে এতটুকুও দূরে সরেনি। জামায়াত-শিবির নানামুখী অপতৎপরতা চালিয়েও তাদের নেতাদের দণ্ডের হাত থেকে মুক্ত রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। সরকার একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের প্রশ্নে অবিচল রয়েছে।
নিষিদ্ধ না করলেও বর্তমান সরকারের আমলে জামায়াতের পক্ষে প্রকাশ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ হবে বলে মনে হয় না। সেক্ষেত্রে জামায়াত আগামী দিনগুলোতে আসলে কোন কৌশল অবলম্বন করবে সেটা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানারকম জল্পনা-কল্পনা চলছে। জামায়াতের প্রধান মিত্র বিএনপির মধ্যেও জামায়াতকে নিয়ে নানারকম হিসাব-নিকাশ চলছে। জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ হোক অথবা তাদের নিবন্ধন বাতিল থাকুকÑ এই দুটোর কোনোটাতেই বিএনপির কোনো লোকসান নেই বলে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ধারণা। জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্ত যদি বহাল থাকে তাহলে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। জামায়াত নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপির লাভ দু’দিক থেকে। এক. নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির কোনো ধরনের সমস্যা থাকবে না। দুই. দলীয় প্রার্থী না থাকায় জামায়াতের ভোট পাবে বিএনপি। কারণ জামায়াতের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা কখনোই আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে না। আবার জামায়াত যদি নিষিদ্ধও হয় তাহলেও বিএনপিরই লাভ। কারণ সেক্ষেত্রেও অন্য কোনো দলের চেয়ে জামায়াতের বিএনপিতেই লীন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অন্য কোনো ইসলামী দলের সঙ্গে মিশে গেলে জামায়াতের রাজনীতি এক ধরনের ঝুঁকির মধ্যেই থাকবে। কিন্তু বিএনপিতে মিশলে তারা থাকবে ঝুঁকিমুক্ত। কারণ রাজনীতিতে যত প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থানই গ্রহণ করুক না কেন, বিএনপিকে অনেকেই সাম্প্রদায়িক দল হিসেবে সেভাবে মনে করে না। নিষিদ্ধ হওয়া কিংবা নিবন্ধন বাতিল হওয়াÑ দুই ক্ষেত্রেই অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে থাকার কোনো বিকল্প নেই জামায়াতের সামনে। মাঠের আন্দোলন যদি জামায়াত তীব্র করতে পারে তাহলে চূড়ান্ত বিচারে এর সুফল বিএনপির ঘরেই যাবে। জামায়াত এটা ভালো করেই জানে যে আগামী নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে ক্ষমতায় যেতে না পারলে জামায়াতের দুর্দিন শেষ হবে না। সেজন্য জামায়াত যত প্রতিকূলতার মধ্যেই পড়–ক না কেন, নির্বাচনের সময় তারা বিএনপির পক্ষেই সর্বশক্তি নিয়ে প্রচারণায় নামবে।
জামায়াতের সঙ্গে এক ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা আওয়ামী লীগ তথা সরকারের পক্ষ থেকেও আছে বলে শোনা যায়। বিএনপি থেকে জামায়াতকে আলাদা করার কৌশল আওয়ামী লীগ যদি নিয়েও থাকে তাহলে এতে রাজনৈতিকভাবে তাদের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। জামায়াতও এটা খুব ভালো করেই বোঝে যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে থেকে তাদের লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি। তাই তারা সরকারের কোনো ফাঁদে পা দেবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিশ্বাস করেন না। রাজনৈতিক চাতুরিতে জামায়াতের সঙ্গেই আওয়ামী লীগ পেরে উঠবে বলে মনে হয় না। তবে জামায়াতের মতো একটি সন্ত্রাসী দলের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে বিএনপি কতদিন একসঙ্গে চলতে পারবে সে প্রশ্নও কারও কারও মনে আছে। বিএনপি এখনও নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলেই দাবি করে থাকে। অন্যদিকে জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারী দল। এছাড়া জামায়াতকে গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়।
জামায়াত-শিবিরের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ তথা সরকারকেও তার অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। জামায়াত-শিবিরকে শুধু আইনগতভাবে মোকাবেলা করতে চাইলে তাতে সাময়িক কিছু ফল পাওয়া গেলেও এই প্রক্রিয়ায় তাদের শিকড় উপড়ে ফেলা যাবে না। রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবেও তাদের বিচ্ছিন্ন করার সর্বাÍক পরিকল্পনা সরকারের থাকতে হবে। ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জামায়াত-শিবিরের কৌশল মোকাবেলা করতে হলে একমুখী তৎপরতায় ফল পাওয়া যাবে না। জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির প্রতি দেশের মানুষের ব্যাপক সমর্থন নেইÑ এটা যেমন সত্যি তেমনি তারা একেবারে জনবিচ্ছিন্ন এমনটা ভাবাও ঠিক নয়। নানা ধরনের অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দেয়া থেকে শুরু করে বেহেশতি দরজা দেখানোর লোভ-প্রলোভনসহ নানাভাবে এরা মানুষের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে এবং এক্ষেত্রে যে তারা একেবারে ব্যর্থ নয়, তার প্রমাণও আছে। একাত্তরে দেশবিরোধী গণধিকৃত ভূমিকা পালনের পরও জামায়াত যে কোথাও কোথাও নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারেÑ এটাকে কোনোভাবেই হালকা করে দেখা ঠিক নয়। সে জন্যই কেবল কথার ফানুস উড়িয়ে কিংবা আইনি ভয় দেখিয়ে জামায়াতকে জনবিচ্ছিন্ন করা যাবে না, সেজন্য দরকার সমন্বিত রাজনৈতিক উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনা। জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক-সামাজিক শক্তিকে একযোগে কাজ করতে হবে। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে জামায়াত-শিবিরকে মোকাবেলা করলে তারা সাংগঠনিকভাবে হয়তো কিছুটা দুর্বল হবে কিন্তু এভাবে তাদের নির্মূল করা যাবে না। জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করলেও এরা একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে না। এদের কার্যপদ্ধতি সুচারু এবং সুসংগঠিত। মসজিদ-মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে এরা সক্রিয় থাকবে, সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে এবং অনুকূল পরিস্থিতি পেলে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। যেমনটা তারা করেছিল মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়কালে। এটা মনে রাখতে হবে যে, দারিদ্র্য-বৈষম্য-পশ্চাৎপদ চিন্তাচেতনাই হল জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির প্রধান ভিত্তি। সমাজে যদি ধর্ম বৈষম্য না থাকে, বেকারত্ব না থাকে, কোনো মানুষ যদি শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত না থাকে, দেশে যদি ন্যায়বিচার-সুশাসন নিশ্চিত হয় তাহলে জামায়াত-শিবির শুধু পরলোকের সুখ-সুবিধার কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারবে না। সেজন্য জামায়াত-শিবিরকে কার্যকরভাবে মোকাবেলার পূর্বশর্ত হল অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন এবং বৈষম্য কমিয়ে একটি সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রসর হওয়া। ওই পথে না এগিয়ে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে বাগাড়ম্বর করাটা শূন্যে গাদা ঘুরানোরই নামান্তর।
জামায়াত-শিবির কতটা হিংস ও পৈশাচিক হতে পারে তার প্রমাণ তারা একাত্তরে আলবদর-আলশামস বাহিনী গঠন করে বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের রাতের অন্ধকারে চোখ বেঁধে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে যেমন দিয়েছে, তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশেও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রগ কেটে কিংবা ঠাণ্ডা মাথায় খুন করে দিয়েছে। ইসলামের নাম করে তারা অসংখ্য নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে। ধর্ম এবং রাজনীতিকে একাকার করে জামায়াত-শিবির যে কত ধরনের অপকর্ম করতে পারে তার প্রমাণ অতি সাম্প্রতিককালেও তারা দিয়েছে। এই সন্ত্রাসী শক্তিকে যারা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে বা করার কৌশল নিচ্ছে তাদের সবাইকে একসময় চরম মূল্য দিতে হবে। জামায়াত-শিবির আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যে সম্পৃক্ত তার তথ্যও এখন আমাদের অজানা নয়। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী এক ধরনের ঐকমত্য তৈরি আছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার দেশের অভ্যন্তরে জঙ্গিবাদের সহযোগী রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে কেন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে এটা অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়। তবে এটা ঠিক এই অপশক্তির বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত এবং অপরিকল্পিত ও বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা ঠিক হবে না।
বিভুরঞ্জন সরকার : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

জনগণই সব দুরভিসন্ধি ব্যর্থ করে দেয় by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

গণতান্ত্রিক পরিবেশে ও সাংবিধানিক নিয়মে জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর। পাঁচ বছর পার হলে এ সরকারের আর ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার থাকবে না। এ নিয়মের ব্যত্যয় হলে মনে হবে, নির্বাচন ও জনগণের ভোটাধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলার চেষ্টা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্যেও এর আভাস পাওয়া গেছে। তিনি বলেছেন, আমার কাছে খবর আছে আগামীতে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় যাবে। এটা অনভিজ্ঞ, অযৌক্তিক ও অবিবেচনাপ্রসূত একটি মন্তব্য। আগামীতে কে বা কোন দল ক্ষমতায় যাবে, এটি নির্ধারণ করবে জনগণ ভোটের মাধ্যমে। এ খবর আগেই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে থাকার কথা নয় এবং থাকার প্রশ্নই আসে না। এ খবর জয় আগেই কিভাবে পেলেন তা নিয়ে জনগণ, রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সর্বত্রই তোলপাড় চলছে। এটি কোনো গণতন্ত্রের ভাষা নয় বলে মানুষ বলাবলি করছে। তার এ কথায় জনগণ কষ্ট পেয়েছে; ক্ষুব্ধ হয়েছে। ক্ষুব্ধ জনগণ রাজপথে নেমে এলে গণবিস্ফোরণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। কাজেই নির্বাচন ও জনগণের ভোটাধিকার নিয়ে কোনো টালবাহানা না করে সরকার যথাসময়ে একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। এটিই সবার প্রত্যাশা। তা না করে সরকার যদি একতরফা কোনো নির্বাচনের পথে হাঁটে অথবা পঞ্চদশ সংশোধনীর সুযোগ নিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে, তাহলে তা ক্ষমতাসীনদের জন্য বুমেরাং হতে বাধ্য। এ ধরনের কোনো দুরভিসন্ধি ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য জনগণ প্রস্তুত। এর জন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তি বা আন্দোলনের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কারণ বর্তমানে গণমাধ্যম ও জনগণের সম্মিলিত শক্তি যে কোনো রাজনৈতিক শক্তির চেয়ে বেশি শক্তিশালী। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন তার উদাহরণ। সেখানে জনগণ ও গণমাধ্যমের শক্তিই পালন করেছে নিয়ামকের ভূমিকা। এই দুই শক্তি ব্যর্থ করে দিয়েছে নির্বাচনে প্রভাব খাটানোর সব মেশিনারি। সুতরাং ভোটারবিহীন একতরফা কোনো নির্বাচন বা সংবিধানের দোহাই দিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার দিন শেষÑ এই বাস্তবতা ক্ষমতাসীন দল যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করবে, তত তাদের সর্বনাশের সম্ভাবনা কমে আসবে।
কিছুদিন আগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত করে সরকার দেশ-বিদেশে সবার প্রশংসা কুড়িয়েছে। ওই নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে। জনগণ যাকে ভোট দিয়েছেন, তিনিই নির্বাচিত হয়েছেন। এটিই গণতান্ত্রিক নিয়ম। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে এ নিয়মের ধারাবাহিতা বজায় রাখা অপরিহার্য। রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, রাষ্ট্রের ভিত্তিও জনগণ। জনগণ যাকে খুশি ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে। তাদের রায় নিয়ে আগেভাগেই মন্তব্য করা সমীচীন নয়। যারা রাজনীতি করেন বা করার ইচ্ছা রাখেনÑ এ সত্যটি তাদের স্মরণে থাকা অনস্বীকার্য। সরকারদলীয় নেতারা কথায় কথায় যে অসাংবিধানিক সরকারের হুমকি দেন, দেশের বর্তমান বাস্তবতায় তার সম্ভাবনা কতটুকু? এক-এগারোর নায়কদের বর্তমান অবস্থা সবার জানা। তাদের দুরবস্থা দেখে মনে তো হয় না কোনো অসাংবিধানিক শক্তি রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করবে।
তবে দেশ বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় সময় অতিত্র“ম করছে। শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, এই সংকটের তাৎপর্য আরও গভীরে প্রথিত। বাংলাদেশ একটি উদার গণতান্ত্রিক মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিকÑ এটি যারা চায় না, তারা বাংলাদেশকে নিয়ে বিপজ্জনক খেলা খেলছে। এ খেলার শেষ কোথায়, তা কেউ জানে না। বাংলাদেশকে কুক্ষিগত করা এবং বিদেশী শক্তির কর্তৃত্ব কায়েম করাই এ খেলার উদ্দেশ্য হতে পারে বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন।
বর্তমানে দেশে যে সংকট চলছে, তা গত তিন বছর আগেও ছিল না। সমস্যাগুলো সুকৌশলে সৃষ্টি করা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের মধ্য দিয়ে মূলত সংকটের আবির্ভাব। সরকার একতরফা আদালতের ওপর দায় চাপিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করেছে। দেশে বর্তমানে যে অবস্থা তাতে আরও দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দিয়েছেন উচ্চ আদালত। কিন্তু সরকার আদালতের এ মতকে কোনো গুরুত্ব দেয়নি; আর তাতেই সংকটের সূত্রপাত। এ সংকট এখন প্রান্তসীমায় এসে পৌঁছেছে। ফলে দেশ এক অস্থির-অশান্ত সময় অতিত্র“ম করছে। এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য দেশের ১৬ কোটি মানুষ আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছেন। সংকট উত্তরণের প্রধান উপায় হল সংকটের অস্তিত্ব স্বীকার করা, সামনের নির্বাচন ও নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে দেশের রাজনীতি একটা ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। এই সংকট সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। ঘটছে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। প্রতিটি ঘটনাতেই অযাচিতভাবে শক্তি প্রয়োগ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আইন-শৃংখলা বাহিনী ও জনগণকে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করানো হচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। পরিস্থিতি এমন একটা অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, মিছিল দেখলেই পুলিশ গুলি চালাচ্ছে। গত কয়েক মাসে পুলিশের গুলিতে প্রায় দুশ নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আহত হয়েছে হাজার হাজার, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কখনও ঘটেনি। অপরিণামদর্শী রাজনীতির কারণে জাতি আজ সুস্পষ্টভাবে বিভক্ত। এই বিভক্তি ধীরে ধীরে চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে, সূত্রপাত হচ্ছে সংঘাত-সংঘর্ষের। ঘরে ঘরে ভাইয়ে ভাইয়ে তৈরি হচ্ছে বিরোধ। একে অপরের বাড়ি-ঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। ধ্বংস করা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ। দিন যত যাচ্ছে, এটা বেড়েই চলেছে। সব সামাজিক শক্তি এখন মুখোমুখি। একে অপরকে ধ্বংস করতে ভেতরে ভেতরে সবাই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে হয়। নির্বাচন ও ক্ষমতায় যাওয়া নিয়ে দেশে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া দুঃখজনক।
অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধের বিচার বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার। এটি রাজনৈতিক ট্রাম্পকার্ড বা নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের দরকষাকষির মাধ্যম হতে পারে না। এমনটি হলে যুদ্ধাপরাধের বিচারের মূল চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটি নিয়ে রাজনৈতিক খেলা মানুষ মেনে নেবে না। এ নিয়ে রাজনীতি করলে দেশ ভয়াবহ সংকটে নিপতিত হবে। আগামী নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। আর নির্বাচন অনিশ্চিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাজনীতিক, ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের মানুষ। সবার স্বার্থে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অপরিহার্য। আর এটি অব্যাহত রাখার বিষয়টি এখন সর্বতোভাবে সরকারের ওপরই নির্ভর করছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করলে জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি দেশও এক অনিবার্য বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবে। এ ব্যাপারে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে দেশ অন্ধকার সুড়ঙ্গের দিকে ধাবিত হবে। রাজনীতিকদের এ বোধোদয় যত তাড়াতাড়ি হয়, ততই তাদের ও দেশের মঙ্গল।
প্রধানমন্ত্রী বলছেন, অসাংবিধানিক সরকার এলে দেশে আগামী ১০ বছরেও কোনো নির্বাচন হবে না। এমনটিই যদি হয়, তাহলে সে পথ বন্ধ করতে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কেনÑ এ প্রশ্ন দেশবাসীর। কেননা অসাংবিধানিক সরকার জনগণের অমঙ্গল ডেকে আনে। জনগণ ভোট দিয়ে কাউকে ক্ষমতায় বসায় তাদের ভালো-মন্দ দেখভাল করার জন্য। জনগণের অমঙ্গল হয় এমন কিছু দেশে ঘটার আশংকা দেখা দিলে তা রোধ করা জনগণের নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর নৈতিক দায়িত্ব। এ দায়িত্ব রাজনীতিকরা পালন না করলে জনগণ তাদের স্বার্থে সে দায়িত্ব নিজেই হাতে তুলে নেয়। তারা আপন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে দেশ ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে যে কোনো দুরভিসন্ধি ব্যর্থ করে দেয়।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ঘুরে দাঁড়াতে গিয়ে বসে পড়বে না তো? by মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার

সরকারের শেষ বছরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে ‘জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের ব্যারোমিটার’, ‘অ্যাসিড টেস্ট’ বা ‘হাইভোল্টেজের নির্বাচন’ প্রভৃতি নামে আখ্যায়িত পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মহাজোট সরকার বড় ব্যবধানে, ০-৫ নির্বাচনী ম্যাচে হোয়াইট ওয়াশ হওয়ার পর তাদের জনপ্রিয়তার মাত্রা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পেয়েছে। বিশেষ করে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সব রকম উপায় অবলম্বন প্রশাসন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি, এনবিআরের চেয়ারম্যানকে ব্যবহার করাসহ সর্বশক্তি নিয়োগ করেও যখন সরকার সমর্থিত আকর্ষণীয় ইমেজের প্রার্থীর এক লাখ ছয় সহস্রাধিক ভোটের ব্যবধানের বিশাল পরাজয় ঠেকাতে পারেনি, তখন জনপ্রিয়তার নিুমুখী গতি সম্পর্কে সরকারের ধারণা হয়েছে। আলোচ্য হোয়াইট ওয়াশের পর সরকার সম্পর্কে তৃণমূল পর্যায়ের অনেক ভাসমান ভোটারই যখন ভাবছেন, ‘দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ’, অথবা, ‘করিয়াছ মেলা ভুল, দিতে হবে মাশুল’ এমন এক সংকটের সময়ে সরকারি দলের নেতা-মন্ত্রীরা দলীয় নেতা-কর্মী-সমর্থকদের চাঙ্গা করাতে মহাজোটের আবার ঘুরে দাঁড়ানোর তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন। তারা বলছেন, সংসদ নির্বাচনে ভোটাররা ভিন্ন বিবেচনায় ভোট দেন। তাদের ভাষায়, ভোটারদের কাছে সরকারের ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলে দশম সংসদ নির্বাচনে সরকারি দলের জয় সুনিশ্চিত। সরকারদলীয় নেতা-মন্ত্রীদের এ ঘুরে দাঁড়ানোর তত্ত্বকে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় এবং অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সুনিশ্চিত করতে চেয়েছেন। জয় বলেছেন, তার কাছে তথ্য আছে, আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসবে। অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমার কাছে কোনো তথ্য না থাকলেও বিশ্বাস আছে আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসবে।’ জয়ের বক্তব্য বিরোধী পক্ষ কর্তৃক ব্যাপকভাবে সমালোচিত হওয়ার পর সরকারদলীয় কোনো কোনো নেতা বলেছেন, জয় জরিপের ভিত্তিতে এ কথা বলেছেন। তবে তিনি কবে কোথায় কাদের দিয়ে কেমন জরিপ করালেন, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
এ কথা সত্য যে, রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তা সব সময় এক রকম যায় না। দলগুলোর পারফরম্যান্সের সঙ্গে জনপ্রিয়তার হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। তবে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রিয়তা সরকারের মেয়াদান্তে কিছুটা হ্রাস পেয়ে থাকে। কারণ এসব সমস্যাসংকুল দেশে সরকারের পক্ষে জনগণের সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হয় না। তবে সব সমস্যার সমাধান না করেও জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে সাধ্য অনুযায়ী তাদের সঙ্গে নিয়ে সমস্যা সমাধানে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে কোনো সরকারের পক্ষে জনপ্রিয়তা ধরে রাখা অসম্ভব নয়। কিন্তু মহাজোট সরকারের ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটেনি।
নবম সংসদ নির্বাচনে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় মহাজোট সরকার প্রথম থেকেই জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে দলীয় স্বার্থে কাজ করছে। এ সরকার জনগণের মতামত নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। জনগণ চেয়েছে ঐক্য ও সহমর্মিতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করে দেশ ও দেশের উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যেতে, কিন্তু সরকারের রাজনীতিতে ঐক্য ও সহমর্মিতার পরিবর্তে প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি প্রতিফলিত হয়েছে। জনগণ চেয়েছে সরকার গঠনের পরপরই ডিসিসি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। কিন্তু সরকার রাজনৈতিক জয়-পরাজয়ের অংক করে সাড়ে চার বছরেও সে নির্বাচন দিতে পারেনি। জনগণ চেয়েছে জাতীয় সংসদকে কার্যকর করতে সরকার সফল হোক। কিন্তু বিরোধী দলকে কোণঠাসা করতে গিয়ে সরকার সংসদকে কার্যকর করতে পারেনি। জনগণ চেয়েছে সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নিক। কিন্তু দলীয় মূল্যসন্ত্রাসী সিন্ডিকেটকে ছাড় দিতে গিয়ে সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে সফল হতে পারেনি। জনগণ চেয়েছে সরকার দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করুক। কিন্তু সরকার পদ্মা সেতু, শেয়ারবাজার, ব্যাংকিং সেক্টরের লুটপাট, হলমার্ক, ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ গ্র“পসহ বড় বড় দুর্নীতির ক্ষেত্রে নমনীয় ভূমিকা পালন করেছে। জনগণ চেয়েছে সরকার প্রতিটি স্থানীয় সরকার এককে নির্বাচিত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করুক। কিন্তু সরকার বিভক্ত ডিসিসি এবং জেলা পরিষদে নির্বাচন না দিয়ে দলীয় লোকজনকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। জনগণ চেয়েছে সরকারদলীয় অঙ্গসংগঠনগুলো জনগণকে সঙ্গে নিয়ে শান্তি ও উন্নয়ন সুনিশ্চিত করুক। কিন্তু দলীয় অঙ্গ সংগঠনগুলোকে সরকার টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজি এবং মারামারি-খুনোখুনি থেকে বিরত রাখতে পারেনি। সর্বোপরি জনগণ চেয়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হোক। কিন্তু সরকার গণইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে ক্ষমতায় থেকে নিজেদের নিয়োজিত নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন করে ক্ষমতা ধরে রাখার পরিকল্পনা করেছে। এভাবে পদে পদে সরকার গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্রমান্বয়ে গণসমর্থন হারিয়েছে, যার প্রতিফলন ঘটেছে ১৫ জুন চার সিটি কর্পোরেশন এবং ৬ জুলাই গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জনগণের দেয়া রায়ে। রশি যেমন আগুনে পুড়ে গেলেও তার পাক ছাড়ে না, সরকারি দলের অবস্থা যেন অনেকটা সে রকমই এখন। স্থানীয় নির্বাচনে জনগণের ‘না’ শোনার পর ঘুরে দাঁড়ানোর কথা বলা ছাড়া সরকারদলীয় নেতা-মন্ত্রীদের আর বলার কিইবা আছে। নেতা-কর্মী-সমর্থকদের চাঙ্গা রাখার জন্য তারা সে বুলি আওড়েছেন। কিন্তু জনগণকে সঙ্গে নিয়ে, তাদের দাবি মেনে নিয়ে সরকার যদি ঘুরে দাঁড়াতে চাইত, তাহলে হয়তো সে চেষ্টা বিফল হতো না। কিন্তু সরকার নিজ অবস্থানে অনড় থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর যে তত্ত্ব প্রচার করছে তাতে মনে হচ্ছে, এভাবে ঘুরে দাঁড়াতে গিয়ে সরকারকে শেষ মুহূর্তে বড় রকমের হোঁচট খেতে হতে পারে। অবশ্য সরকার যদি মনে করে, আমরা প্রতিযোগিতাই হতে দেব না। প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ না নিলে কার সঙ্গে প্রতিযোগিতা হবে? আমরা এরশাদকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিয়ে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করিয়ে সে নির্বাচনে বিজয় অর্জন করব, তাহলে ভিন্ন কথা। প্রধান বিরোধী দলকে নির্বাচনের বাইরে রেখে যেনতেন রকম নির্বাচন করলে কী পরিমাণ সহিংসতা হবে এবং ওই নির্বাচন দেশে-বিদেশে কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে এবং ওই রকম একতরফা নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করতে পারলেও সে সরকারের আয়ু কতদিন বা কত মাস হবে সে সম্পর্কেও সরকারকে ভাবতে হবে।
সরকার যদি এই কট্টর গণবিরোধী লাইনে না গিয়ে পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে গণরায় পাওয়ার পরপরই নির্দলীয় সরকারের দাবি মেনে নিয়ে বিরোধী দলকে ইস্যুবিহীন করে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে সাংগঠনিক কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে সংসদ নির্বাচনে বিরোধী দলের উদ্দেশে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিত, তাহলে হার-জিত যাই হোক না কেন, সরকার নিজেকে গণবিরোধী অবস্থান থেকে সরিয়ে এনে নির্বাচনে একটি সম্মানজনক ফলাফল করতে পারত। কিন্তু সরকার সে লাইনে না গিয়ে গণবিরোধী অবস্থানে থাকায় ভোটাররা সরকারের এ অবস্থান পছন্দ করবে বলে মনে হয় না। ‘জামায়াত’ ও ‘জয়’ কার্ড খেলে সরকার তার জনপ্রিয়তা উদ্ধারের যে মিশনে নেমেছে, তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। জামায়াত নিষিদ্ধ হলে লাভ হবে বিএনপি ও জামায়াতের। কারণ এ দলটি নিষিদ্ধ হলে নিশ্চয়ই দলটির সব নেতা-কর্মী-সমর্থক আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক বাড়াবেন না। তারা আওয়ামীবিরোধী শিবিরেই তাদের সমর্থন দেবেন। আর তারা যদি আবার নতুন নামে রাজনীতি শুরু করেন, তাহলে স্বাধীনতা বিরোধিতার কলংক মুছে ফেলে তারা নতুন উদ্যমে রাজনীতি শুরু করতে পারবেন। এতে আওয়ামী লীগের লাভের পাল্লা ভারি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বিএনপি সম্মিলিত প্রার্থী দিলে এ দলটির সমর্থন পাবে কিন্তু তখন আর দলটির বিরুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী বা রাজাকারদের সঙ্গে জোট বাঁধার অভিযোগ আনীত হবে না। জয় বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র এবং প্রধানমন্ত্রীর পুত্র হলেও তৃণমূল পর্যায়ে তার পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে এখনও সময় লাগবে। তিনি উচ্চশিক্ষিত হলেও স্থানীয় রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ে তার আরও অধিক সময় দেশে থেকে তৃণমূল পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের সময় দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কাজেই তাকে নিয়ে গ্রামগঞ্জ সফর করলেই যে ভোটারদের মতামত আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকে পড়বে, এমনটা মনে করার সঙ্গত কারণ নেই।
ঘুরে দাঁড়ানোর অংশ হিসেবে রমজানের পর থেকে আওয়ামী লীগ টানা সাংগঠনিক কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে। এসব কর্মসূচিতে সরকারি দল নির্বাচনী প্রচারণা, দলীয় প্রার্থী বাছাই এবং তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতাদের দূরত্ব হ্রাসের উদ্যোগ নেবে। তাছাড়া দলীয় প্রচারণায় সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে সরকারদলীয় মন্ত্রী-নেতারা বিরোধী দলের অপপ্রচারের জবাব দেবেন। তারা হেফাজত এবং ড. ইউনূস ইস্যু সম্পর্কে দলীয় অবস্থান স্পষ্ট করবেন এবং একই সঙ্গে চালাবেন দলীয় ইমেজ উদ্ধার এবং নির্বাচনী প্রস্তুতির কর্মসূচি। এ ছাড়া শরিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে মহাজোটের ঐক্য শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেবেন। সরকারদলীয় নেতাদের প্রদত্ত এসব কর্মসূচির ঘোষণা শুনতে ভালো। তবে এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, রমজানের পর বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটও পূর্ণ শক্তি নিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবিতে মাঠে নামবে। হরতালের পর লাগাতার হরতাল দিয়ে বিরোধী দল সরকারকে নির্দলীয় সরকারের দাবি মানতে বাধ্য করতে চাইবে। কাজেই বিরোধীদলীয় ওই জোরালো আন্দোলন মোকাবেলা করে উল্লিখিত সাংগঠনিক কর্মসূচিগুলো সরকারি দলের নেতারা কতটা মনোযোগের সঙ্গে সম্পন্ন করতে পারবেন, সে বিষয়ে ভাবার আছে।
সরকারি দলকে মনে রাখতে হবে, তারা রমজান-পরবর্তী রাজনীতির যে ছক এঁকেছেন, সে কাজে বিরোধী দলের নির্দলীয় সরকারের দাবি মেনে নিয়ে অগ্রসর হলে এক রকম সাড়া পাবেন, আর বিরোধীদলীয় দাবি না মেনে ওই কাজে অগ্রসর হলে তাদের কর্মকাণ্ডে গণপ্রতিক্রিয়া আসবে অন্য রকম। বিরোধী দলের প্রধান দাবি না মেনে অগ্রসর হলে সরকারদলীয় কর্মসূচি প্রবল বিরোধীদলীয় লাগাতার আন্দোলনে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিরোধী দল যে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফাঁদে পা দেবে না, সে বিষয়টি তাদের নেতারা একাধিকবার নিশ্চিত করেছেন। কাজেই তাদের জন্য রমজানের পর দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন তীব্রতর করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। সরকারি দলকে আরও মনে রাখতে হবে, যৌক্তিকতা ও গণসমর্থনের দিক থেকে রমজান-পরবর্তী রাজনীতিতে বিরোধী দল সরকারি দলের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে থাকবে। এসব ভেবে সরকারি নীতিনির্ধারকদের উচিত ছিল পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের রায়ের সময় থেকে রমজান-পরবর্তী রাজনীতি শুরু হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে গণমুখী কাজ করে জনগণের মনে ইতিবাচক ভাবমূর্তি নির্মাণে মনোযোগী হওয়া।
তবে আলোচ্য সময়ে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা তেমন ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়তে পারেননি। এর পরিবর্তে ওই সময় বেশ কয়েকজন সরকারদলীয় এমপির কোটি কোটি টাকা উপার্জনের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। উদীয়মান আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম মাওলা রনির সাংবাদিক পিটিয়ে আহত করা, ছাত্রলীগ-যুবলীগের চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি অব্যাহত থাকা এবং তার জের ধরে যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদককে তারই আরেক সহকর্মীর পায়জামা-পাঞ্জাবি টুপি পরে রোজার মাসে ফিল্মি ভঙ্গিমায় গুলি করে হত্যা করার সিসিটিভি ফুটেজ ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার মধ্য দিয়ে অনুধাবন করা যায়, রমজানের পরে সরকারের ঘুরে দাঁড়ানোর আহ্বান দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে আবেদন সৃষ্টি করতে পারেনি। এ ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে ছাত্রলীগও উল্লিখিত সময়ে পিছিয়ে থাকেনি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নতুন কমিটি ছাত্রী হল, বিজ্ঞানাগার ও প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের ৮০ কোটি টাকার চলমান কাজে ২ শতাংশ চাঁদা দাবি করে ওই নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিয়ে শ্রমিকদের মারধর করে (প্রথম আলো, ১৬-০৭-১৩), দলীয় কর্মী হত্যা মামলার আসামি অস্ত্রধারী ক্যাডার হিসেবে পত্রিকায় ছবি প্রকাশিত হলেও সেই তৌহিদ আল তুহিনকে রাবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক করা হয়, রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রোকনউজ্জামান রিন্টু গভীর রাতে ফুর্তি করতে গিয়ে বান্ধবীসহ ধরা পড়ার পর ৫ লাখ টাকা দিয়ে ছাড়া পাওয়ার খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয় (মানবজমিন, ৩০-০৭-১৩)। এছাড়া রমজানে মূল্যসন্ত্রাসী সিন্ডিকেটগুলোকেও সরকার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। এ সময় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চুরি-ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের আসামি জামিন নিয়ে জেল থেকে বের হয়। সব মিলিয়ে পাঁচ সিটি নির্বাচনের পর থেকে রমজান পর্যন্ত সরকারি দল এমন কোনো ইতিবাচক ভাবমূর্তি নির্মাণ করতে পারেনি, যা দেখে জনগণ ঈদ-পরবর্তী সরকারি দলের রাজনৈতিক কর্মসূচির সমর্থনে ঝাঁপিয়ে পড়বেন।
এসব দেখে সমসাময়িক রাজনীতি বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, ঈদ-পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় প্রত্যাশিত সফলতা পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মতো গণঅপছন্দের কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াতে গিয়ে দলটি ঘুরে দাঁড়াতে না পেরে বসে পড়লে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়