Friday, August 31, 2018

কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকারের উপায়

কিডনি আমাদের শরীরের অন্যতম একটি ভাইটাল অরগান বা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, কিডনি বিকল হলে মৃত্যু নিশ্চিত। তাই কিডনি নিয়ে একটু সচেতনতা দরকার। মানবদেহে কোমরের দু'পাশে দুটি কিডনি থাকে। নানা কারণে আমাদের কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি কিডনি বিকল পর্যন্ত হতে পারে। কিডনী রোগের প্রাদুর্ভাব আজ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। সমগ্র বিশ্বের সাথে সাথে ভারতেও এখন কিডনী রোগ পরিস্থিতি ভয়াবহ। লক্ষণের দুর্বোধ্যতার জন্য ক্রনিক কিডনি রোগে ভুগছেন এমন অনেকেই জানেন না যে তার এই রোগটি আছে। ক্রনিক কিডনি রোগ (CKD) অনেক বছর পরে কিডনি ফেইলিউর সৃষ্টি করে। CKD আছে এমন অনেকেরই সারা জীবনে কিডনি ফেইলিউর হয়না। ষ্টেজ ৩ CKD আছে এমন ৮০% লোকের কিডনি অকেজো হয়না।
কিডনি রোগের যেকোন ষ্টেজের জন্যই কিডনি রোগ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনই হচ্ছে এই রোগ নিরাময়ের মূল শক্তি। কিডনি রোগের লক্ষণ গুলো সম্পর্কে ভালোভাবে ধারণা থাকলে সেই অনুযায়ী নিরাময়ের ব্যবস্থা নেয়া সহজ হয়। আপনার অথবা আপনার পরিচিত কারো যদি কিডনি রোগের এক বা একাধিক লক্ষণ দেখা যায় তাহলে ডাক্তারের সাথে কথা বলে ব্লাড ও ইউরিন টেস্ট করিয়ে নিশ্চিত হোন। কারণ কিডনি রোগের উপসর্গ গুলোর সাথে অন্য স্বাস্থ্য সমস্যার উপসর্গের মিল আছে। আসুন জেনে নেই কিডনি রোগের উপসর্গ গুলো সম্বন্ধে।
এনার্জি কমে যাওয়া , অনেক বেশি ক্লান্ত অনুভব করা অথবা মনোযোগের সমস্যা হওয়া
কিডনির কর্মক্ষমতা যখন মারাত্মক ভাবে কমে যায় তখন রক্তে অপদ্রব্য হিসেবে টক্সিন উত্‍পন্ন হয়। এর ফলে আপনি দুর্বল ও ক্লান্ত অনুভব করেন এবং কোন বিষয়ে মনোযোগ দেয়াটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আরেকটা জটিলতা দেখা দিতে পারে, আর তা হচ্ছে এনেমিয়া। রক্তস্বল্পতার কারণেও দুর্বলতা বা অবসাদ গ্রস্থতার সমস্যা হতে পারে।
ঘুমের সমস্যা হওয়া
যখন কিডনি রক্ত পরিশোধন করতে অপারগ হয় তখন রক্তের টক্সিন প্রস্রাবের মাধ্যমে বাহির হতে পারেনা বলে রক্তেই থেকে যায়। যার কারণে ঘুমের সমস্যা সৃষ্টি হয়। অবেসিটি বা স্থূলতার সাথে ক্রনিক কিডনি ডিজিজের যোগসূত্র আছে। এবং নিদ্রাহীনতা ক্রনিক কিডনি ডিজিজের একটি সাধারণ উপসর্গ।
ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া ও ফেটে যাওয়া
সুস্থ কিডনি অনেক গুরুত্ব পূর্ণ কাজ করে থাকে। কিডনি শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত তরল বাহির করে দেয়, লাল রক্ত কণিকা তৈরি করে, হাড়কে শক্তিশালী করে এবং খনিজ লবণের ভারসাম্য রক্ষা করে। শুষ্ক ও ফেটে যাওয়া ত্বক খনিজ ও হাড়ের অসুখের জন্য ও হতে পারে যা অ্যাডভান্স কিডনি রোগের সহগামী হিসেবে থাকতে পারে যখন কিডনি রক্তের পুষ্টি উপাদান ও খনিজ লবণের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেনা।
ঘন ঘন প্রস্রাব করা
যদি আপনার প্রায়ই মূত্রত্যাগের প্রয়োজন হয় বিশেষ করে রাতের বেলায় তাহলে এটা কিডনি রোগের লক্ষণ। যখন কিডনির ছাঁকনি গুলো নষ্ট হয়ে যায় তখন প্রস্রাবের বেগ বৃদ্ধি পায়। ঘন ঘন মূত্রত্যাগ ইউরিন ইনফেকশনের ও লক্ষণ হতে পারে, পুরুষের ক্ষেত্রে প্রোস্টেট গ্লেন্ড বড় হয়ে গেলেও এই উপসর্গ দেখা দেয়।
প্রস্রাবের সাথে রক্ত গেলে
সুস্থ কিডনি সাধারণত ব্লাড সেল গুলোকে শরীরের ভিতরে রেখে রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ মূত্র হিসেবে বাহির করে দেয়। যখন কিডনি ক্ষতিগ্রস্থ হয় তখন ব্লাড সেল বাহির হতে শুরু করে। প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়ার এই লক্ষণটির কিডনি রোগের সাথে সাথে টিউমার, কিডনি পাথর বা ইনফেকশনেরও ইঙ্গিত হতে পারে।
প্রস্রাবে বেশি ফেনা হলে
প্রস্রাবে অনেক বেশি ফেনা দেখা দিলে বুঝতে হবে যে, প্রস্রাবের সাথে প্রোটিন যাচ্ছে। ডিমের সাদা অংশ ফাটানো হলে যেমন ফেনা বা বাবেল হয় প্রস্রাবের এই বুদবুদ ও ঠিক সেই রকম। প্রস্রাবে অ্যালবুমিন নামক প্রোটিনের উপস্থিতির জন্যই এমন হয়। কিডনির ফিল্টার ড্যামেজ হয়ে গেলে প্রোটিন লিক হয়ে প্রস্রাবের সাথে বাহির হয় বলে প্রস্রাবে ফেনা দেখা দেয়।
চোখের চারপাশে ফুলে গেলে
যখন কিডনি অনেক বেশি লিক করে তখন প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন প্রস্রাবের সাথে বাহির হয়ে যায় বলে চোখের চারপাশে ফুলে যায়।
পায়ের গোড়ালি ও পায়ের পাতা ফুলে গেলে
কিডনির কার্যকারিতা কমে গেলে সোডিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যায় ফলে পা এবং গোড়ালি ফুলে যায়। পায়ের নীচের অংশ ফুলে যাওয়া হার্ট, লিভার এবং পায়ের শিরার দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার লক্ষণ ও হতে পারে।
ক্ষুধা কমে গেলে
এটা খুবই সাধারণ সমস্যা কিন্তু শরীরে টক্সিনের উত্‍পাদন বৃদ্ধি পেলে কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ফল স্বরূপ ক্ষুধা কমে যায়।
মাংসপেশীতে খিঁচুনি হলে
কিডনির কর্মক্ষমতা নষ্ট হলে শরীরের ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা এবং মাংসপেশিতে খিল লাগার সমস্যা দেখা দেয়। যেমন- ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের মাত্রা কমে গেলেও মাংসপেশিতে খিল লাগার সমস্যা দেখা দেয়।
সবসময় শীত বোধ হওয়া
কিডনি রোগ হলে গরম আবহাওয়ার মধ্যেও শীত শীত অনুভব হয়। আর কিডনিতে সংক্রমণ হলে জ্বরও আসতে পারে।
ত্বকে র‍্যাশ হওয়া
কিডনি অকার্যকর হয়ে পড়লে রক্তে বর্জ্য পদার্থ বাড়তে থাকে। এটি ত্বকে চুলকানি এবং র‍্যাশ তৈরি করতে পারে।
বমি বা বমি বমি ভাব
রক্তে বর্জ্যনীয় পদার্থ বেড়ে যাওয়ায় কিডনির রোগে বমি বমি ভাব এবং বমি হওয়ার সমস্যা হতে পারে।
ছোটো ছোটো শ্বাস
কিডনি রোগে ফুসফুসে তরল পদার্থ জমা হয়। এ ছাড়া কিডনি রোগে শরীরে রক্তশূন্যতাও দেখা দেয়। এসব কারণে শ্বাসের সমস্যা হয়, তাই অনেকে ছোট ছোট করে শ্বাস নেন।
পেছনে ব্যথা
কিছু কিছু কিডনি রোগে শরীরে ব্যথা হয়। পিঠের পাশে নিচের দিকে ব্যথা হয়। এটিও কিডনি রোগের একটি অন্যতম লক্ষণ।
যদি উপরোক্ত উপসর্গ গুলো দেখা যায় তাহলে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করে সিমপল ইউরিন টেস্ট (ACR) এবং ব্লাড টেস্ট (eGFR) করিয়ে আপনার কিডনির কোন সমস্যা আছে কিনা নিশ্চিত হোন।
আসুন তাহলে আমরা সংক্ষেপে জেনে নেই কিভাবে আমরা ভয়াবহ কিডনী বিকল থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারি এবং আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনীকে সুস্থ রাখতে পারি।
এই আটটি পদ্ধতি হল-
১. কায়িক পরিশ্রম ও নিয়মিত ব্যায়াম করা
২. উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা
৩. সুপ্ত উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা
৪. স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
৫. পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা
৬. ধূমপান থেকে বিরত থাকা
৭. ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ঔষধ সেবন না করা এবং
৮. নিয়মিত কিডনীর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা

সমসাময়িক সময়ে কিডনী রোগ প্রতিরোধে যে ৮টি স্বর্ণালি সোপানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে খানিকটা আলোকপাত করি ।
কায়িক পরিশ্রম ও নিয়মিত ব্যায়াম করা
কায়িক পরিশ্রম ও নিয়মিত ব্যায়াম কিডনী রোগ প্রতিরোধ করে। পাশাপাশি ডায়াবেটিক ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনে, কোলেস্টেরল কমিয়ে হৃদরোগ প্রতিরোধ করে এবং রক্তনালী সচল রাখে। সমীক্ষায় দেখা গেছে শুধু নিয়মিত হাঁটার কারণে গড় আয়ু ১৩ বছর পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা
উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস কিডনী বিকলের প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত। এ দুটি রোগ শুধু কিডনী বিকলই করে না হৃদরোগ, ব্রেইন স্ট্রোক, অন্ধত্ববরণসহ অসংখ্য রোগের জন্ম দেয়। কাজেই এদের হাত থেকে বাঁচতে হলে রক্ত চাপ এমন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যেন তা ১৩০/৮০ নিচে থাকে। এবংব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে যাতে হিমগ্লোবিন HbA1C লেভেল ৭ এর নিচে থাকে।
সুপ্ত উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা
বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে আমাদের দেশের প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে ২০ থেকে ৩০ ভাগ লোকেরই উচ্চ রক্তচাপ আছে। কিন্তু শতকরা ৫০ভাগ এর অধিক লোকই জানেন না যে তাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে। কারণ এর কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তাই সুপ্ত রক্তচাপ নির্ণয়ের জন্য বছরে ৩/৪ বার রক্তচাপ মাপিয়ে নেয়া উচিত।
স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
পরিমিত সুষম খাবার সুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য। মনে রাখতে হবে যে, অতি ভোজন ও অতি ওজন স্বাস্থ্যের জন্যে ক্ষতিকর। খাবারের সাথে আলগা লবণ পরিহার করতে হবে। অতি মসলাযুক্ত, বেশি ভাজা পোড়া খাবার, অতিরিক্ত ঝাল এবং প্রাণিজ তেল যেমন গরু খাসির চর্বি, ঘি, মাখন নিয়ন্ত্রণ করে খেতে হবে। শুধু পরিমাণে বেশি ও দামি খাবার খেলেই সুখাদ্য হয় না। খাবারের মধ্যে ৫টি উপাদান আছে কি না তা সবসময়ই খেয়াল রাখতে হবে। যেমন শর্করা জাতীয়- ভাত, রুটি, পিঠা। আমিষ জাতীয়- মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল। স্নেহ জাতীয়- সয়াবিন, সরিষার তেল, সানফ্লাওয়ার।
পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করা
জলের অপর নাম জীবন। কিডনী সচল রাখতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করা উচিত। একজন বয়স্ক লোকের প্রতিদিন দেড় থেকে তিন লিটার জল পান করা উচিত। তবে যাদের কিডনীতে পাথর আছে যাদের প্রশ্রাবে ঘন ঘন ইনফেকশন হয়, যারা রোদে এবং কলকারখানায় কাজ করে তাদের জল আরও বেশি পরিমাণ খেতে হবে, যাতে প্রশ্র্রাবের রং জলের মত থাকে অথবা এক থেকে দেড় লিটার প্রশ্রাব হয়। তবে যাদের শরীরের অতিরিক্ত জল জমা আছে তাদের ডাক্তারের নির্দেশ মতো জল পান করতে হবে।
ধূমপান থেকে বিরত থাকা
একটি জনপ্রিয় প্রবাদ বাক্য হচ্ছে - 'ধূমপানে বিষপান'। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি বছর শুধু ধূমপানের জন্য সারা বিশ্বে মৃত্যু হয় ৬৬ লক্ষ মানুষের। ধূমপানের ফলে কিডনী বিকল হয়, কিডনীতে ক্যান্সার হয় , কিডনী ও মূত্রণালিতে ক্যান্সার সৃষ্টি হয়। এছাড়া ধূমপান ফুসফুসের ক্যান্সার, মুখ ও খাদ্যনালির ক্যান্সার, হৃদরোগ, ষ্ট্রোকসহ অসংখ্য মরণব্যধির কারণ। কাজেই এসব রোগ থেকে পরিত্রাণ পেতে ধূমপান পরিহার করতে হবে।
ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ঔষধ সেবন না করা
দীর্ঘমেয়াদী বিভিন্ন ব্যথা-বেদনার ট্যাবলেট খাওয়ার ফলে কিডনী বিকল হয়ে যেতে পারে। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায় যে, ১০ থেকে ১৫ ভাগ কিডনী বিকল হয় ঔষধ খাওয়ার কারণে। এছাড়াও এন্টিবায়োটিকসহ অনেক ঔষধ কিডনীর মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। এই ক্ষতির মাত্রা ঔষুধের মাত্রা ও কতোদিন খাচ্ছে তার ওপর অনেক সময় নির্ভর করে। আবার অনেক সময় এলার্জির কারণে স্বল্প মাত্রার ঔষধেও কিডনী বিকলের কারণ হয়ে দাঁড়ায় কাজেই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ঔষধ সেবন করা উচিত নয়।
নিয়মিত কিডনীর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা
কিডনী রোগ কে বলা হয় নীরব ঘাতক। কারণ ৭০ থেকে ৮০ভাগ কিডনী নষ্ট হওয়ার আগে অনেকসময় কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। অথচ সামান্য রক্ত ও প্রশ্রাব পরীক্ষা করেই এ রোগ সুপ্ত অবস্থায় দেহে আছে কিনা তা নির্ণয় করা যায়। কাজেই যাদের মধ্যে কিডনী রোগের ঝুঁকি বেশি- যেমন যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ আছে, যাদের মুখ ও শরীর ফুলে গেছে, যাদের কিডনীতে পাথর আছে, যাদের প্রশ্রাবে বাঁধা জনিত রোগ আছে, প্রশ্রাবে যাদের ইনফেকশনের ইতিহাস আছে, যাদের বংশে কিডনী রোগের ইতিহাস আছে, যাদের বয়স ৪০ এর উপরে তাদের বছরে দুই বার কিডনী পরীক্ষা করিয়ে নেয়া উচিত।
স্বাস্থ্য একটি অমূল্য সম্পদ এই সম্পদ সংরক্ষণের জন্যে উপরে উল্লিখিত পরামর্শ সমূহ যদি জীবনের শুরু থেকেই মেনে চলা যায় তাহলে শুধু কিডনী নয় সকল অসংক্রামক ব্যাধি থেকেই নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব। কাজেই আসুন সকলেই নিয়মগুলো মেনে চলার চেষ্টা করি। এতে অর্থ ব্যয় হবে সামান্যই। তবে যে উপকার পাওয়া যাবে তা অমূল্য।

চোখের ক্ষীণ দৃষ্টি সমস্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

দেশে ক্ষীণ দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে। শহরের ধুলোময় পরিবেশ, পর্যাপ্ত সবুজ গাছপালা না থাকা, অপরিশোধিত পানি ও কল-কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়াসহ নানা কারণে মানুষের দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাচ্ছে। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে শিশু-কিশোর ও যুবকদের কম্পিউটার, মোবাইলে ইন্টারনেটসহ ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্র ব্যবহারের আসক্তি, খোলা পরিবেশ না থাকায় এ সমস্যা বাড়ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, এই হারে চোখের সমস্যা বাড়তে থাকলে শিগগিরই দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষকে কৃত্রিম উপায়ে দেখতে হবে। চোখের রোগীর সংখ্যা বাড়ার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, জন্মগতভাবে চোখে সমস্যা, ফরমালিনযুক্ত খাবার, খোলা পরিবেশ ও সবুজ প্রকৃতির অভাব এবং শিশু-কিশোর ও যুবকদের অধিক সময় আকাশ সংস্কৃতি বা ফেসবুক ব্যবহার। পাশাপাশি জন্মের পর বিভিন্ন রোগ যেমন চোখে পর্দা পড়া, ছানি পড়া, চোখ ট্যারা এবং অ্যালার্জির কারণে অনেক মানুষ ক্ষীণ দৃষ্টিতে ভোগেন। বিভিন্ন মেডিকেলে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরাও স্বীকার করেছেন, অধিকাংশ সময় বাসাবাড়ি বা অফিসের বদ্ধ পরিবেশে দিনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় হচ্ছে বলে উন্মুক্ত সবুজায়ন দেখার সুযোগ মিলছে না। ফলে চোখের নানা জটিলতায় চশমা ব্যবহার করতে হচ্ছে। গ্রামের শিশুদের তুলনায় শহরের শিশুরা ক্ষীণদৃষ্টি রোগে বেশি ভুগছে। এ মুহূর্তে শিশুদের এ রোগ থেকে মুক্তি দিতে রঙিন শাকসবজি ও ছোট মাছ খাওয়ানো দরকার বলে চিকিৎসকরা মনে করেন।
চক্ষু বিশেষজ্ঞ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চক্ষু বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, যারা চোখে কম দেখেন তাদের চোখ পরীক্ষা করানো উচিত। তিনি বলেন, বাংলাদেশে চশমা পড়ার প্রবণতা খুবই কম। প্রয়োজন হলে চশমা নেয়া উচিত। বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে ফেসবুক, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইল ফোন, টেলিভিশনে আসক্তির কারণে সব শিশুর চোখের দৃষ্টি কমে যাচ্ছে। সময়ের আগেই তাদের চোখে তাই ‘মাইনাস পাওয়ারের’ চশমা উঠছে। দেশের প্রথিতযশা এ চক্ষু বিশেষজ্ঞ  বলেন, লেখার  বোর্ড না দেখলে শিশুরা লেখায় মনোযোগী হবে না। ফলে মেধায় পিছিয়ে পড়বে। তাই বাবা-মার উচিত কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইল ফোন, টেলিভিশনে আসক্তি থেকে বাচ্চাদের দূরে রাখা।
চিকিৎসাবিদরা বলছেন, চক্ষুরোগীর বেশিরভাগই বর্তমানের আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারের শিকার। কারণ, ঢাকা শহর ছাড়াও অন্য শহরগুলোতে বিনোদনের জায়গার অভাব থাকায় ইন্টারনেট, ফেসবুক বা ভিডিও গেমে দীর্ঘ সময় দৃষ্টি রাখছে। এমন অসচেতনতা, ঘরমুখী জীবন ব্যবস্থা এবং পড়াশোনাসহ নানা মানসিক চাপে থাকার কারণেও চোখের সমস্যা বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ‘ভিশন সিপ্রং’ ও বেসরকারি এনজিও ‘ব্র্যাক’ ২০০৬ সাল থেকে একটি পাইলট প্রকল্পে এ নিয়ে কাজ করছে। সংস্থা দুটির প্রতিবেদন মতে, দীর্ঘ ১০ বছরে (২০১৬ পর্যন্ত) তারা দেশের ৬১ জেলায় ৪৬ লাখ ৮৭ হাজার ৬৩৯ জনকে চক্ষু রোগবিষয়ক চিকিৎসা দেয়। এর মধ্যে ৩০ লাখ ৭৬ হাজার ৭৮০ জনই ক্ষীণদৃষ্টিসম্পন্ন রোগী, যা সেবাগ্রহীতাদের শতকরা ৬৬ ভাগ। প্রকল্পটি ৬১টি জেলার ৪৫৬টি উপজেলায় কার্যক্রম চালায়। চোখের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও দেয়া হয়েছে। বিষয়টি মানুষের জন্য খুবই নেতিবাচক দিক। এখন থেকে যদি সচেতন না হওয়া যায় তবে একটা সময় এটি দেশের মানুষের জন্য বড় ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে। আরেক পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ মানুষ দৃষ্টিহীন, এর মধ্যে ৬ লাখ ৮০ হাজার মানুষই যথাসময়ে চোখের ছানি অপারেশন না হওয়ায় অন্ধত্ব বরণ করেন। প্রতি বছর দুই লাখ রোগীর ছানি অপারেশন হলেও এক লাখ ৩০ হাজার লোক চিকিৎসার অভাবে ছানির কারণে অন্ধত্ব বরণ করছেন। অপরদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখ রোগীর মধ্যে চোখের ছানির অপারেশন হয় মাত্র এক হাজার ৩০০ জন রোগীর। চক্ষু চিকিৎসায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান অরবিস ইন্টারন্যাশনাল, সাইট সেভার এবং ডব্লিউএইচও এবং জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতি, বিএনএসবিসহ বিভিন্ন সংস্থাসমূহের মতে, দেশে প্রায় ৪০ হাজার শিশু দৃষ্টিহীনতার শিকার। মোট জনসংখ্যার আড়াই কোটি নিয়মিত চোখের দৃষ্টিশক্তি সমস্যায় ভুগছেন। আবার বয়স্কদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৭ লাখের মতো ছানি রোগী আছেন, যাদের চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো করা সম্ভব।
চিকিৎসকরা বলেন, অব্যাহত নগরায়ন, পরিবর্তিত জীবনযাপন, মাত্রাতিরিক্ত ইলেকট্রনিক্স যন্ত্র ব্যবহার ও আঘাতের কারণে চোখের রোগী বাড়ছে। এ ছাড়া জন্মগত চোখ বাঁকা, আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে, গর্ভবতী মায়ের ভগ্নস্বাস্থ্য এবং অপরিণত বয়সে সন্তান প্রসব, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু ক্ষীণদৃষ্টি সমস্যায় আক্রান্ত হয়। জন্মের সময় অনেক প্রিম্যাচিউর বেবির ক্ষেত্রে ফুসফুসের সমস্যা দেখা দেয়। আর ফুসফুসের চিকিৎসা করাতে গিয়ে বাচ্চার চোখের ক্ষতি হয়।
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটেই প্রতিদিন গড়ে ২৫০ শিশু চোখের সমস্যা নিয়ে আসে। এদের মধ্যে আবার শতকরা ৪০ জনেরই অপারেশন লাগে। চিকিৎসকরা জানান, ২০১০ সালে শিশুদের মধ্যেই চোখের রোগীর হার ছিল ৩৫ শতাংশ, যা বর্তমানে বেড়ে ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এখানে আড়াই হাজার টাকার মধ্যে চোখের অস্ত্রোপচার সম্ভব কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালে একই চিকিৎসা ব্যয় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়।
চিকিৎসকরা জানান, সাধারণত বয়স বাড়া, ডায়াবেটিস রোগ, অনিয়ন্ত্রিত স্টেরয়েড ব্যবহারে চোখের সমস্যা হতে পারে। দেশের কিছু জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে চক্ষু বিভাগ থাকলেও  সেখানে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত জনবল, উন্নত যন্ত্রপাতি, বাজেট ও অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। অনেক চিকিৎসকের মাইক্রো সার্জারি প্রশিক্ষণ নেই বলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগীরা যথাযথ এবং মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আবার প্রাইভেট মেডিকেলে চিকিৎসা ব্যয় বেশি বলে অনেকেই সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য রাখছেন না।
৯০-দশকে শিশুরা টিভির প্রতি আসক্ত ছিল। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে কম্পিউটার, ট্যাব ও মোবাইল ফোন। চোখের চিকিৎসায় দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা বলছেন- কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইল ফোন, টেলিভিশনে আসক্তি শিশুর চোখের দৃষ্টি কেড়ে নিচ্ছে। সময়ের আগেই তাদের চোখে তাই ‘মাইনাস পাওয়ারের’ চশমা উঠছে। দেশের প্রথিতযশা চক্ষু বিশেষজ্ঞরা শিশুদের চোখে সমস্যার তিনটি কারণের কথা বলেছেন। কোনো কোনো শিশু চোখে সমস্যা নিয়েই জন্মায়। ভিটামিন ‘এ’র অভাবজনিত কারণে শিশু রাতকানা রোগে ভুগতে পারে, এমনকি অন্ধও হয়ে যেতে পারে। স্ক্রিনের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকার কারণে শিশুরা চশমা ছাড়া দূরের জিনিস দেখতে পায় না।
চিকিৎসকরা বলেন, চোখ শুকিয়ে যাওয়ার পেছনেও অন্যতম কারণ কম্পিউটার, ট্যাব, মোবাইল ফোন ও টেলিভিশনে আটকে থাকা। শিশুরা যখন কাছ থেকে এই যন্ত্রগুলো ব্যবহার করতে থাকে, মোবাইল ফোনে একমনে খেলতে থাকে, তখন চোখের মণি এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকে। শিশুরা চোখের পাতা ফেলে না। পাতা ফেললে চোখের ভেতরের পানি চোখের মণিকে আর্দ্র করে। পাতা না ফেললে কর্নিয়ার যে পানি, তা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। আস্তে আস্তে চোখ শুকিয়ে যায়। শুষ্ক অনুভব করে বলে শিশু অনবরত চোখ পিটপিট করে। শিশুদের কম্পিউটার-ট্যাব-মোবাইল ফোন, স্কুল-কোচিং-বাসায় পড়া, অনেক রাতে ঘুমাতে যাওয়া, খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠা- এই চক্র থেকে বের করে আনার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার জন্য শিশুর ওপর বাড়তি পড়ার চাপও চোখের স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি নষ্ট করতে পারে। চক্ষু বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুরা যদি সূর্যের আলোয় কিছু সময় কাটায়, তাহলে তার অনেকটা রোগমুক্ত থাকতে পারে।

প্রতিবাদী ওয়াক আউট

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের পদ্ধতি যুক্ত করার  প্রতিবাদে নির্বাচন কমিশনের সভা বর্জন করেছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সভা শুরুর আধা ঘণ্টা পর তিনি নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে সভাস্থল ত্যাগ করেন।
নোট অব ডিসেন্টে ইভিএমে ভোটগ্রহণের বিরোধিতার কারণ হিসেবে একাদশ সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপে ইভিএমের উল্লেখ না থাকা, ইভিএম প্রকল্পের তথ্য না জানা, রাজনৈতিক দলের অনীহা ও ইভিএম সম্পর্কিত যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। পরে মাহবুব তালুকদারকে ছাড়াই কমিশন সভায় ইভিএম রেখেই আরপিও সংশোধনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সিইসি কেএম নূরুল হুদা নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের নোট অব ডিসেন্ট প্রসঙ্গে বলেন, ওনার ভিন্নমত থাকতে পারে, এটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতি।
একজন কমিশনারের আপত্তি থাকলেও বাকি চার কমিশনার আরপিও সংশোধনের পক্ষে মত দিয়েছেন বলে জানান সিইসি। সিইসির ঘোষণার পর গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মাহবুব তালুকদার সভা বর্জনের কারণ সম্পর্কে বলেন, আমি এটার (ইভিএম ব্যবহারের) বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছি। আমি মোটেই চাই না আগামী সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য আরপিও সংশোধন হোক। এখন ওনারা বসে বসে আরপিও সংশোধন করতে থাকবেন আর আমি সেখানে নোট অব ডিসেন্ট দেয়ার পর মূর্তির মতো বসে থাকব, এটা আমার কাছে যথাযথ মনে হয়নি।
মাহবুব তালুকদার আরো বলেন, ওনারা ওনাদের কাজ করুক, আমি আমার কাজ করি। আমার মনে হয়েছে ওখানে বসে থাকাটা সমীচীন না। মাহবুব তালুকদার জানান, এর আগে কোনো কমিশন সভায় ইভিএম প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। অতীতের কমিশন সভার কার্যবিবরণী খুঁজে এমন কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে না বলে দাবি করেন তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে মাহবুব তালুকদার বলেন, আমি একজন গণতন্ত্রমনা মানুষ। সংসদ নির্বাচন এখনও বেশ দূরে। তখনকার অবস্থা কী হবে এই মুহূর্তে বলতে পারি না। অধিকাংশ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল সংলাপে বলেছে ইভিএম চায় না। কেউ যদি বলে চায় তাহলে আমার কিছু বলার নেই। তিনি বলেন, আমি যে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি এটা কারও বিরুদ্ধে নয়। এটা একটা মতের বিরুদ্ধে আমার ভিন্নমত। আমি দ্বিমত পোষণ করতে পারি, ভিন্নমত পোষণ করতে পারি। তাই বলে আমার সহকর্মীদের সঙ্গে আমার কোনো মতবিরোধ নেই।
নোট অব ডিসেন্টে যা লিখেছেন মাহবুব তালুকদার
নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার নোট অব ডিসেন্টে লেখেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ সমর্থন করি না। এমতাবস্থায় ওই নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্তে ভিন্নমত পোষণ করে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ প্রদান করছি। ২৬শে আগস্ট অনুষ্ঠিত সর্বশেষ কমিশন সভার প্রসঙ্গ টেনে ‘নোট অব ডিসেন্টে’ প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ বাকি তিন কমিশনারের উদ্দেশে তিনি লিখেছেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও) সংশোধনে ইসি তিন ধরনের প্রস্তাব উপস্থাপন করে। এর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে বাংলা ভাষায় রূপান্তর-যা একজন পরার্শক তৈরি করে দিয়েছেন। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ইংরেজি আরপিওতে সুনির্দিষ্ট কিছু সংশোধন, সংযোজন বা পরিমার্জন।
সর্বশেষ প্রস্তাবটি হলো-একাদশ সংসদ নির্বাচনে সময়স্বল্পতার কারণে ইভিএম ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধন। নির্বাচন কমিশনের ২৬শে আগস্টের সভায় অন্য দুটি প্রস্তাব বাদ দিয়ে কেবল ইভিএম ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে। ইভিএম ও আরপিও সম্পর্কে আরো বিচার-বিশ্লেষণ ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিমিত্ত কমিশনের সভা ৩০শে আগস্ট পর্যন্ত মুলতবি করা হয়। মাহবুব তালুকদার বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে ইতিমধ্যে ব্যবহার হচ্ছে। এতে রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। সিইসি প্রথম থেকেই বলে এসেছেন রাজনৈতিক দলগুলো সম্মত হলেই কেবল জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। তিনি বলেন, সরকারি দলের পক্ষ থেকে ইভিএম ব্যবহারকে স্বাগত জানানো হলেও প্রধান বিরোধী দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল এর বিরোধিতা করে আসছে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দলগতভাবে সংলাপকালে ইভিএম সম্পর্কে সরকারি দল ও প্রধান বিরোধী দলের অবস্থান ছিল পরস্পর বিরোধী। এ অবস্থায় একাদশ সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার মাধ্যমে ইভিএম ব্যবহারের কোনো সম্ভাবনা নেই। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অধিকতর আলোচনা ও সমঝোতার প্রয়োজন ছিল।
স্থানীয়ভাবে পরীক্ষামূলক ইভিএম ব্যবহারের শুরুতে বলা হয়েছিল উল্লেখ করে মাহবুব তালুকদার বলেন, এজন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকার ইভিএম কেনায় আমি ভিন্নমত পোষণ করেছিলাম। সমপ্রতি ৩৮২১ কোটি টাকার প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলের বিরোধিতার মুখে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার যেখানে অনিশ্চিত, সেখানে এ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ইভিএম কেনা কতটা যৌক্তিক, তা বিবেচনাযোগ্য। এতে সরকারি অর্থের অপচয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বিগত রকিব উদ্দিন কমিশন ইভিএম ব্যবহার বাতিল করে অনেক ইভিএম ধ্বংস করে দেয়। এধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি কখনই কাম্য নয়।
পরিকল্পনা কমিশন অদ্যাবধি প্রকল্পটির সম্ভাব্য যাচাই করে নি বলে তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন,  যে ইভিএম বিএমটিএফ থেকে সরকারি সংস্থার সুবাদে বিনা টেন্ডারে কেনা হচ্ছে, এর অরিজিন কী, কে উদ্ভাবন করেছে কিংবা কোত্থেকে আমদানি করা হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কারিগরি দিক থেকে এটি সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত কিনা তা পরীক্ষা করার প্রয়োজন ছিল। প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করার পর অদ্যাবধি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি বলে জানা যায়।
মাহবুব তালুকদার নোটে বলেন, আরপিও তে শুধু ইভিএম ব্যবহারের যে সংশোধনীটি আনা হয়েছে তা ইতিমধ্যে কমিশন সভায় নানা প্রশ্নের সম্মুখীন। আমি ধারণা করি সর্বসম্মত রাজনৈতিক মতের বিরুদ্ধে ইভিএম ব্যবহৃত হলে তা নিয়ে আদালতে অসংখ্য মামলার সূত্রপাত হবে। অন্য কারণ ছাড়া কেবল ইভিএম ব্যবহারের কারণেই সংসদ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমান ইসির পক্ষে এ ঝুঁকি নেয়া সঙ্গত হবে না।
যন্ত্রের অগ্রগতির যুগে ইভিএম ব্যবহারের বিরোধী নন বলে উল্লেখ করে মাহবুব তালুকদার বলেন, দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঘাটতি তার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। প্রথমত, ইভিএম ব্যবহারের জন্য নির্বাচন কমিশন যাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে তাদের প্রশিক্ষণ অপর্যাপ্ত এবং জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান সম্পর্কে আমি সন্দিহান। দ্বিতীয়ত, অনেক ভোটার অজ্ঞাতপ্রসূত কারণে ইভিএম ব্যবহার সম্পর্কে অনীহা প্রকাশ করেছেন। তারা ইভিএমের বিষয়ে যে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, তা নিরসনের জন্য ব্যাপক প্রচার ও ভোটারদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ছিল। সিটি নির্বাচনে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও ইভিএম কেন্দ্র দখলের অভিযোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে ধীরে ধীরে ইভিএম ব্যবহার বাড়ানো হলে ভোটাররা তাতে অভ্যস্থ হয়ে পড়বেন। এই অভ্যস্থতার জন্য যে সময়ের প্রয়োজন তা একাদশ জাতীয় সংসদের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। তবে স্থানীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবস্থা সাফল্য লাভ করলে ৫-৭ বছর পরে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
গেল বছরের ফেব্রুয়ারিতে কেএম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন ইসি দায়িত্ব নেয়ার পর এ পর্যন্ত অন্তত তিনটি বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিলেন এ নির্বাচন কমিশনার। বর্তমান ইসির অধীনে ৩০শে অক্টোবর থেকে ২৮শে জানুয়ারির মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। জাতীয় নির্বাচন সন্নিকটে আসায় আইন সংস্কারের কাজ বাদ দিয়ে প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো এগোচ্ছিল। কিন্তু আকস্মিকভাবে ইভিএম নিয়ে নতুন প্রকল্প নেয়া ও নির্বাচনী আইন সংস্কার নিয়ে তোড়জোড় শুরু করে ইসি।
এ অবস্থায় রাজনৈতিক বিরোধিতা ও দক্ষ জনবলের বিষয়টি তুলে ধরে ইভিএম নিয়ে আরপিও সংশোধন নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন মাহবুব তালুকদার। সর্বশেষ সিটি নির্বাচনের আচরণবিধি সংশোধন নিয়ে অন্যদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিলেন মাহবুব তালুকদার। এর আগে ইসি কর্মকর্তাদের বদলি নিয়েও আন-অফিসিয়াল (ইউও নোট) দেন তিনি। সেনা মোতায়েন ও গাজীপুরের ভোটে অনিয়ম নিয়েও নিজের মতামত দিয়ে আলোচনায় ছিলেন এ নির্বাচন কমিশনার। বড় নির্বাচনে অনিয়ম রোধে সিইসির এক বক্তব্য নিয়েও সর্বশেষ আলোচিত হন মাহবুব তালুকদার। উল্লেখ্য, কমিশন সভা বর্জন ও নোট অব ডিসেন্ট দেয়ার ঘটনার নজির এটাই প্রথম নয়। এর আগে ২০০৬ সালে ভোটার তালিকা নতুন করে নাকি হালনাগাদ করে ভোটারদের তালিকাভুক্ত করা হবে এ নিয়ে সাবেক এমএ আজিজের কমিশনের দু’জন কমিশনার বিরোধী করে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে বর্জন করেছিলেন ওই সংক্রান্ত সভাও।

‘স্বজনদের ফিরিয়ে দাও’

‘আমার বাবা মারুফ জামানের নিখোঁজের ৯ মাস হয়েছে। প্রতিদিন সকালে আমি আমার বাবার রুমে যাই। বাবা সকালে উঠেই এক কাপ চা পান করতেন।সেই চায়ের কাপটি সেখানেই রয়েছে। পাঁচ বছর আগে আমার মা মারা যান। বাবা না থাকায় আমরা ভাইবোন সবাই ভেঙে পড়েছি। এভাবে একটি মানুষ নিখোঁজ থাকবে সেটি কীভাবে মেনে নেয়া যায়। আর কত অপেক্ষা করবো? দয়া করে আমার বাবাকে আপনারা আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেন। কথাগুলো বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানের মেয়ে সামিহা জামান। তার কান্নায় সভাস্থলের পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। 
গতকাল সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে ‘মায়ের ডাক’ প্রতিবাদী সমাবেশ গুম ও জোর করে অন্তর্ধানের শিকার এমন ৪০টি পরিবার উপস্থিত হন। অনেকেই নিখোঁজ হওয়া পরিবারের সদস্যদের ছবি নিয়ে এসেছিলেন। তাদের কান্না আর আকুতিতে এক বেদনাঘন আবহ তৈরি হয়। নিখোঁজ হওয়াদের মা, ভাইবোন আর স্ত্রী সন্তানের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ।
অনুষ্ঠান থেকে জানানো হয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ২৫ বার সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এই পরিবারের সদস্যরা কেউ ছাত্র, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ করতেন চাকরি। বাড়ি, কর্মস্থল অথবা রাস্তা থেকে তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে নিখোঁজ। বছরের পর বছর তাদের অপেক্ষায় স্বজনরা। অপেক্ষার যেন শেষ নেই। নিদারুণ কষ্ট নিয়ে পার হচ্ছে এই পরিবারগুলোর প্রতিটি দিন, মুহূর্ত। সভা থেকে জানানো হয়, গত ৫ বছরে গুমের শিকার হয়েছেন ৭২৭ জন। গুমের পর কেউ কেউ ফিরে এলেও অনেকেই নিখোঁজ রয়েছেন।
অনুষ্ঠানে গুম হওয়া সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন মারুফা ইসলাম বলেন, ২০১৩ সালে আমার ভাইকে বাসা থেকে র‌্যাব তুলে নিয়ে যায়। এরপর তার কোনো খোঁজ নেই। প্রেস ক্লাবের বারান্দায় আমরা ২৫ বার এসে দাঁড়িয়েছি। আমরা একটি স্বাধীন দেশে বাস করি এটা ভাবতে অবাক লাগে। একটি মানুষকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর আর কোনো খোঁজ মেলে না। তিনি আরও বলেন, আপনারা বলতে পারেন? আর কত অপেক্ষা করবো। সেদিনের অবুঝ শিশুরা এখন বুঝতে শিখেছে, তাদের বোঝাতে পারি না তাদের বাবা কোথায় কীভাবে আছে?
নিখোঁজ হওয়া পিন্টুর বোন রেহানা খানম মুন্নি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ২০১৪ সালে আমার ভাই পিন্টুকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাদা পোশাকধারীরা তুলে নিয়ে যায়। এখন পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পুলিশ ও র‌্যাবের কাছে ধর্না দিয়ে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। একটা লোক হারিয়ে যাবে, তার দায় কী সরকারের নেই? কার কাছে বিচার দেবো? ছেলের আশায় থেকে আমার মা পাগল হয়ে গেছেন।
নিখোঁজ মোয়াজ্জেম হোসেনের মা সালেহা বেগম জানান, আমার ছেলে নির্দোষ ছিল। আইন অনুযায়ী যদি সে ভুল করে তাহলে তার বিচার করেন। কিন্তু, এটা কোন নিয়ম  চালু করেছেন যে, মানুষের খোঁজ পাওয়া যাবে না।
নিখোঁজ মাসুমের বোন ফাওজিয়া ইসলাম বলেন, তার ভাইকে ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর উত্তরার একটি প্রাইভেট কোচিং থেকে ধরে নিয়ে গেছে ডিবি পুলিশের নাম করে। মাসুম সরকারি তিতুমীর কলেজের ফিন্যান্সের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। সক্রিয় কোনো দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
অনুষ্ঠানে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, প্রতিবারই একই কথা শুনি। পাঁচ বছর ধরে একটা মানুষকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের প্রশ্ন রয়েছে যে, এদের কান্না কী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তিদের কানে যায় না? তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে আপনাদের কান্নার পাত্তা এই সরকার দেবে না। নির্বাচনের পর নতুন সরকার আসবে নাকি পুরনো বোতলে নতুন মদ আসবে- এ কথা কেউ জানে না।
তিনি আরও বলেন, বুঝে-শুনে গুম করা হয়েছে। এসব গুম মূলত রাজনৈতিক। যারা গুম হয়েছে তারা হয় বিএনপি করে আর না হয় অন্য দল করে। রাজনীতিতে ভয়ের ত্রাস কায়েম করে রাখার জন্য গুমকে জিইয়ে রাখা হয়েছে। এই অন্যায় অত্যাচারের প্রতিকার আছে। প্রতিজ্ঞা করুন যারা আমার সন্তানকে নিয়ে গেছে তাদের কাউকে ভোট দেবেন না।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, সভ্য দেশে গুম মেনে নেয়া যায় না। এতে আইনের শাসন বাধাগ্রস্ত হয়। অনেকেই গুমের শিকার হয়ে ফিরে এসেছেন। কারও লাশও পাওয়া গেছে ডোবাতে, নালাতে। এখন তাও পাওয়া যায় না। এমন অবস্থায় দেশের প্রত্যেক বিবেকবান নাগরিককে আমাদের সজাগ হতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, প্রেস ক্লাবে যারা পরিবারের নিখোঁজদের সন্ধানের দাবি করছেন তাদের এটি যৌক্তিক দাবি। এই দাবি রাষ্ট্রকে অবশ্যই মেনে নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে এসময় অন্যানের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট রফিক সিকদার ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকী।

‘বিতর্কিত’ ইভিএমের পক্ষে হুদা কমিশনের রায়

খোদ কমিশনেই আপত্তি থাকার পরও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে (ইভিএম) ভোট গ্রহণের বিধান যুক্ত করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের প্রস্তাব  অনুমোদন করেছে ইসি। রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত উপেক্ষা করে গতকাল এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সিইসিসহ চার কমিশনার। এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে সভা বর্জন করেন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। প্রস্তাবিত আইনটি আগামী সপ্তাহে ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
তবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএমে ভোট গ্রহণ হবে কিনা সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এছাড়া আরপিওতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় রাখা হয়নি সেনাবাহিনী’কে। নির্বাচন ভবনে আরপিও সংশোধন সংক্রান্ত সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) খান মো নুরুল হুদা সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। এর আগে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবনে সিইসির সভাপতিত্বে দু’দফা বৈঠক করে কমিশন এ সিদ্ধান্ত নেয়।
এদিকে ইভিএম এর বিধান যুক্ত করে আরপিও সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন করার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে বৈঠক বর্জন করেন মাহবুব তালুকদার। বৈঠক শেষে সিইসি সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বলেন, আমরা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-৭২ এর কিছু সংশোধনের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে ইভিএম ব্যবহার করে ভালো ফল পেয়ে জাতীয় নির্বাচনে এই বিধান যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখন এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয় ও সংসদে পাঠানোসহ অন্যান্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আইনটি সংশোধন হবে।
সিইসি জানান, মাহবুব তালুকদারের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থাকলেও কমিশনে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতের ভিত্তিতে সংস্কারের পক্ষে সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিইসি আরো বলেন, উনি (মাহবুব তালুকদার) ভিন্নমত পোষণ করেছেন। এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। কিন্তু, আমরা চারজন সম্মত হয়েছি। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সুযোগ তৈরির জন্য এই সংশোধনী আনা হয়েছে।
তবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে কিনা এ বিষয়ে কমিশন এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। ইভিএম নিয়ে আইনে সংশোধনী আনা হবে। এটা নিয়ে আমরা একটা মেলা করবো। সবার মতামত নেবো। সেখানে পরিবেশ পরিস্থিতি যদি অনুকূলে থাকে তখন সিদ্ধান্ত হবে। আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যমে আমরা প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে রাখছি। ২০১০ সালে ইভিএম চালু হয়। তবে এতদিন শুধু স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে এটি ব্যবহার করা হয়ে আসছে। সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচনে ১০০ আসনে ইভিএম ব্যবহারের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে সাংবাদিকদের জানান ইসি সচিব হেলালুদ্দীন।
সাংবাদিকরা এদিন এ বিষয়টি নজরে আনলে সিইসি বলেন, এভাবে বলা তার উচিত হয়নি। কারণ, আমি স্পষ্ট করে বলছি, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইন আগে পাস হোক। সবার মতামত নেই। তখন যদি সম্ভব হয় একাদশে (একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম) ব্যবহারের বিষয়ে দেখা যাবে। ইভিএম কেনার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইভিএম কেনার বিষয়ে এখনো কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। আমাদের নিজস্ব কিছু ইভিএম রয়েছে। আমরা সেগুলো দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চালাচ্ছি।
উল্লেখ্য, গত বছর অংশীজনদের সঙ্গে ইসির সংলাপে আলোচিত বিষয় ছিল ইভিএম। ৩৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল সংলাপে অংশ নিয়েছিল। ২৩টি দল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম নিয়ে নিজেদের মতামত জানিয়েছিল। এর মধ্যে বিএনপিসহ ১২টি দল ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে মত দেয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ সাতটি দল ইভিএমের পক্ষে।
তিনটি দল পরীক্ষামূলক ও আংশিকভাবে এবং একটি দল শর্ত সাপেক্ষে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছিল। ইসি এতদিন বলে এসেছে, সব দল না চাইলে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে না। কিন্তু এর মধ্যে দেড় লাখ ইভিএম কেনার জন্য ৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে ইসি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইসিকে ইভিএম সরবরাহ করবে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ)। ‘নির্বাচন ব্যবস্থায় অধিকতর স্বচ্ছতা আনয়নের লক্ষ্যে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ক্রয়, সংরক্ষণ ও ব্যবহার’ শীর্ষক পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্পের অধীনে দেড় লাখ ইভিএম সংগ্রহ করতে চায় ইসি। অবশ্য ১৯শে আগস্ট এই প্রকল্প নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি।

শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার যথার্থ: জয়

সাংবাদিক শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার যথার্থ (এপ্রোপ্রিয়েট) বলে বর্ণনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে ও তার তথ্যপ্রযুুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। তার দাবি, গত মাসে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্রবিক্ষোভ চলাকালে গুজব ছড়িয়ে দিয়ে সহিংসতায় উস্কানি দিচ্ছিলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মিডিয়া আউটলেট রিয়েল ক্লিয়ার পলিটিক্সে প্রকাশিত একটি লেখায় এমন মন্তব্য করেছেন সজীব ওয়াজেদ জয়। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা বাসস। ওই লেখায় জয় লিখেছেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দ্রুততার সঙ্গে সহিংসতায় রূপ নেয়। এই সহিংসতায় রূপ নেয়ার জন্য যারা দায়ী তাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশি ফটো সাংবাদিক শহিদুল আলম। সহিংসতায় তিনি উস্কানি দিয়েছিলেন বলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা সত্ত্বেও তিনি সেলিব্রেটি হওয়ার কারণে তার পক্ষে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হচ্ছে।
জয় বলেছেন, ঢাকায় কলেজ পড়ুয়া দু’জন শিক্ষার্থীকে একটি বাস চাপা দেয়ার পর তারা মারা যায়। এ ঘটনায় বেদনাহত শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে। তারা নিরাপদ সড়কের দাবি জানায়। তবে সরকার তাদের কথা শুনেছে এবং প্রশ্নাতীতভাবে তাদেরকে ‘হ্যাঁ’ বলেছে।
তিনি বলেছেন, সরকার ট্রাফিক আইন উন্নত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বেপরোয়াভাবে গাড়িচালকদের বিরুদ্ধে শাস্তি বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এতে বিক্ষোভ সফল হয়েছে। কিন্তু দেশের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতারা এটাকে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের একটি সুযোগ হিসেবে দেখে। এতে ছাত্রদের আন্দোলনে অনুপ্রবেশ ঘটায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সদস্যরা। কখনো কখনো তাদেরকে শিক্ষার্থীদের পোশাক পরিয়ে নামায় এবং পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করে তোলে। কিন্তু বিএনপির ওই উস্কানি বেশিদূর এগুতে পারে নি।
ওই লেখায় জয় লিখেছেন, শহিদুল আলম বিএনপির পাশাপাশি ভূমিকা রাখাকে বেছে নেন এবং যথার্থভাবেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ছাত্রদের মৃত্যু সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেয়ার জন্য তিনি সামাজিক ও প্রথাগত মিডিয়া আউটলেট দুটি মাধ্যমকেই ব্যবহার করেছেন। এতে বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠে এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রধান কার্যালয়ে হামলা হয়।
ওই লেখায় আরো বলা হয়েছে, শহিদুল আলমের মিথ্যা ও প্ররোচণামূলক তথ্যের কারণে অনেক মানুষ আহত হয়েছেন। আর ওই হামলায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এক সদস্য স্থায়ীভাবে অন্ধ হয়ে যান। শহিদুল আলমের বিতর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির জন্যই শুধু তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নি। একই সঙ্গে তার সর্বশেষ কথাবার্তা বাস্তবেই ক্ষতির কারণ হয়েছিল। মিস্টার আলমের বক্তব্যে একটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পরিণত হয় আইন না মানা এক সহিংসতায়।
জয় আরো লিখেছেন, তরুণ ছাত্রদের বিক্ষোভকে হাইজ্যাক করে এবং তাদের জীবনকে বিপদের মুখে ফেলে দিয়ে, পাশাপাশি আরো অনেক বাংলাদেশির জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়ার নাম রাজনীতি নয়। এটা সন্ত্রাস।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জয় বলেছেন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক ভিন্নমত অবাধে প্রকাশ করে আসছেন শহিদুল আলম। কখনো তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছেন। আবার কখনো তিনি কঠোর সমালোচনা করেছেন। কিন্তু প্রতিটি সময় সরকার তার অবাধ মত প্রকাশের অধিকারকে সুরক্ষিত রেখেছে। এটা এমন একটি অধিকার যা সব বাংলাদেশির আছে। জনগণের নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে সরকার শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার করেছে, প্রকৃতপক্ষে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া সরকারের জন্য জরুরি ছিল। এক্ষেত্রে শহিদুল আলম একজন ভিকটিম নন। তার কর্মকাণ্ডে প্রচুর মানুষের ক্ষতি হয়েছে।

দুর্নীতির শীর্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা -টিআইবি’র রিপোর্ট

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেই সেবাগ্রহীতারা সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির শিকার। এ বাহিনীর কাছে দুর্নীতির শিকার হচ্ছে ৭২ দশমিক ২ ভাগ সেবাগ্রহীতা। আর আইনি সেবা পেতে ৪৯ দশমিক ৮ ভাগ মানুষকে গুনতে হচ্ছে ঘুষের টাকা। একইভাবে ২৩টি সেবা খাতে প্রাত্যহিক ও গুরুত্বপূর্ণ সেবা পেতে ঘুষ-দুর্নীতিতে গলদঘর্ম হতে হচ্ছে  সাধারণ মানুষকে। দেশে দুর্নীতির এমন চিত্র উঠে এসেছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০১৭’ এ। গতকাল সকালে রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই জরিপের ফলাফল তুলে ধরা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, প্রোগ্রাম ম্যানেজার ড. সুমাইয়া খায়ের এবং রিসার্চ ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবি’র গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. ওয়াহিদ আলম, প্রোগ্রাম ম্যানেজার ফারহানা রহমান ও ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ নূরে আলম।
টিআইবির ২০১৭ সালের খানা জরিপে তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ২৭টি সেবা খাতে এই জরিপ চালানো হয়। এর মধ্যে প্রধান ১৫টি খাত হলো- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, ভূমি, সেবা, কৃষি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, বিচারিক সেবা, বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং, বিআরটিএ, কর ও শুল্ক, এনজিও, পাসপোর্ট, বীমা এবং গ্যাস। দেশের ৮টি বিভাগের ৬৪টি জেলার গ্রাম ও শহরাঞ্চলের ১৫ হাজার ৫৮১টি খানা বা পরিবারের উপর চূড়ান্তভাবে এই জরিপ চালানো হয়। তাতে সেবাখাতে ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষমতার অপব্যবহারকে দুর্নীতি হিসেবে ধরা হয়েছে। এই দুর্নীতির আওতার মধ্যে রয়েছে ঘুষ, সম্পদ আত্মসাৎ, প্রতারণা, দায়িত্বে অবহেলা, স্বজনপ্রীতি ও প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন ধরনের হয়রানি। খাতগুলোর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেই মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির শিকার হচ্ছে।
এই বাহিনীগুলোর কাছে গত বছর গ্রামাঞ্চলের ৭৬ ও শহরাঞ্চলের প্রায় ৭১ভাগ খানা প্রধান বা পরিবারের কর্তা দুর্নীতির শিকার হয়েছে। অপরদিকে দুর্নীতিতে দ্বিতীয় স্থানে থাকা পাসপোর্ট সেবা পেতে ৬৭, বিআরটিতে ৬৫, বিচারিক সেবায় ৬০, ভূমি সেবায় প্রায় ৪৯, শিক্ষায় ৪২, স্বাস্থ্যে (সরকারি) ৪২, কৃষিতে ৪১, বিদ্যুতে প্রায় ৩৯, গ্যাসে ৩৮, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ২৬, বীমায় ১২, কর ও শুল্কে ১১, ব্যাংকিংয়ে প্রায় ৬, এনজিওতে (ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ) ৫ ভাগ সেবা গ্রহীতা দুর্নীতির শিকার।
অপর দিকে এসব ক্ষেত্রে সেবা পেতে ঘুষ দিতে হয় প্রায় ৫০ ভাগ সেবা গ্রহীতাকে। ঘুষে শীর্ষে রয়েছে বিআরটিএ। গত বছর ৬৩ ভাগ সেবা গ্রহীতাকে বিআরটিতে ঘুষ গুণতে হয়। দ্বিতীয় স্থানে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের কাছে প্রায় ৬১ ভাগ সেবা টাকা দিয়ে পেতে হয়েছে। প্রায় ৬০ ভাগ মানুষকে পাসপোর্টের জন্য অর্থ দিতে হয়। এছাড়া ভূমি সেবায় প্রায় ৩৮, শিক্ষায় ৩৪, বিচারিক সেবায় প্রায় ৩৩, কৃষিতে ৩০, স্বাস্থ্যে প্রায় ১৯, বিদ্যুতে ১৮, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ১৮, গ্যাসে প্রায় ১২ ভাগ সেবাগ্রহীতাকে ঘুষের টাকা গুনতে হয়। দু’বছর পর পর পরিচালিত জরিপের মধ্যে ইতিপূর্বে ২০১৫ সালের তুলনায় ৮ দশমিক ৩ পয়েন্ট কম। তবে ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে সেবা খাতে ঘুষের শিকার খানার হার কমলেও ঘুষ আদায়ের পরিমাণ বেড়েছে।
২০১৭ সালে একজন সেবাগ্রহীতাকে গড়ে ৫ হাজার ৯৩০টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। ২০১৫ সালে তা ছিল ৪ হাজার ৫৩৮ টাকা। সর্বোচ্চ ঘুষ আদায়ের হয় গ্যাস (৩৩,৮০৫ টাকা), বিচারিক সেবা (১৬,৬৮৮ টাকা) ও বীমা খাত (১৪,৮৬৫ টাকা)। জাতীয়ভাবে প্রাক্কলিত মোট ঘুষের পরিমাণ গত ২০১৫ সালের জরিপে ৮ হাজার ৮২১ কোটি টাকা থাকলেও গত বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা। যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের (সংশোধিত) ৩.৪% এবং বাংলাদেশের জিডিপি’র ০.৫%। ঘুষ প্রদানের প্রধান কারণ হলো ঘুষ না দিলে সেবা মিলবে না এমন ধারণা বা মানসিকতা। ঠিক এই কারণে ৮৯ ভাগ সেবাগ্রহীতা ঘুষ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ ছাড়া হয়রানি বা জটিলতা এড়াতে ঘুষ দিচ্ছে ৪৭ ভাগ মানুষ। নির্ধারিত ফি না জানা ও নির্ধারিত সময়ে সেবা পেতে ঘুষ দিচ্ছে যথাক্রমে ৩৭ ও ২৩ ভাগ সেবাগ্রহীতা। অন্য কারণগুলোর মধ্যে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দ্রুত সেবা পাওয়া ও অবৈধ সুযোগ-সুবিধা আদায়।
অপর দিকে দুর্নীতির ক্ষেত্রে দেখা গেছে প্রায় ৫০ ভাগ মানুষই ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায়ের ফাঁদে পড়ে তাতে শিকার হচ্ছেন। দায়িত্বে অবহেলার জন্য দুর্নীতির শিকার প্রায় ৪০ ভাগ সেবাগ্রহীতার।
এ ছাড়া জরিপে দেখা গেছে, শিক্ষিতদের চেয়ে কম বা অশিক্ষিতরা বেশি ঘুষ বা দুর্নীতির শিকার। শিক্ষিত পেশাজীবীদের চেয়ে কৃষক, জেলে, পরিবহন শ্রমিক, কামার, কুমার, প্রবাসী, কাঠমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি ইত্যাদি স্বল্প বা অশিক্ষিত পেশাজীবীদেরকে বেশি টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়। স্বল্প আয়ের লোকেদেরকেই ঘুষের বোঝা বেশি বইতে হচ্ছে। যেমন ১৬ হাজার টাকার নিচে যাদের আয় তাদের আয়ের ২ দশমিক ৪১ ভাগ টাকা যাচ্ছে ঘুষে। অন্য দিকে ৬৪ হাজার টাকা বেশি যাদের আয় তাদেরকে ঘুষে দিতে হচ্ছে দশমিক এক দুই ভাগ টাকা। তবে আশার কথা হলো, বয়স্কদের চেয়ে অল্প বয়স্ক তরুণরা কম দুর্নীতির শিকার।
সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না এই মানসিকতা আমাদের মধ্যে চলে এসেছে। যাদের ওপর দায়িত্ব তারা দুর্নীতিকারীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনছেন না। জনগণকে প্রদত্ত অঙ্গীকার সরকার যথাযথভাবে পালন না করায় সমাজের অপেক্ষাকৃত কম সুবিধাভোগী মানুষের ওপর ঘুষের বোঝা ও বঞ্চনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘুষ ও দুর্নীতি মেনে নেওয়া সার্বিকভাবে আমাদের জীবনের সংস্কৃতিতে পরিণত হচ্ছে, যার ফলে জাতি হিসেবে আমরা আমাদের আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা ও আত্মসম্মানবোধ হারাচ্ছি।
সংবাদ সম্মেলনে কিছু সূচক ও খাতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও সার্বিকভাবে দেশের দুর্নীতির চিত্র উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, সরকারি খাতে বেতন-ভাতা বৃদ্ধিতে দুর্নীতি ও ঘুষের পরিমাণ কমে যাবে বলে অনেকের প্রত্যাশা থাকলেও গবেষণার ফলাফল বিবেচনায় আশাব্যঞ্জক কিছু বলা যাচ্ছে না। কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও ঘুষের লেনদেন কমেছে যার পেছনে বর্ধিত  বেতন-ভাতাসহ অন্য কারণ থাকতে পারে। কিন্তু যারা দুর্নীতি করে অভ্যস্ত তাদের জন্য বেতন-ভাতা কোনো বিষয় নয়। তারা বেতন-ভাতার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ আয় করেন দুর্নীতি, ঘুষ ও অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে।
সাংবাদিকের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরো বলেন, সকল পর্যায়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে এবং প্রত্যেক নাগরিককে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরি করতে হবে। সেবাগ্রহীতা, সেবা প্রদানকারী, পর্যবেক্ষক ও তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, সরকার, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যদি দুর্নীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে আন্তরিক হন এবং দুর্নীতির বিচারের সময় যদি দুর্নীতিকারীর পরিচয়, অবস্থান প্রভৃতি বিবেচনা করার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নির্দেশনা না থাকে তাহলে দুর্নীতির মাত্রা এত বেশি হতো না।
জবাবদিহিতার ক্ষেত্রগুলোকে আরো বেশি প্রসারিত করার পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন যত বেশি স্ব স্ব দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাবে জবাবদিহিতার ক্ষেত্র তত বেশি শক্তিশালী হবে বলে ড. জামান অভিমত ব্যক্ত করেন।
সংবাদ সম্মেলনে সেবাখাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে টিআইবি ১২ দফা সুপারিশ পেশ করে। এর মধ্যে রয়েছে, বিভাগীয় পদক্ষেপের পাশাপাশি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ কার্যকর করা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুদৃঢ় নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়ন ও প্রয়োগ করে তার ভিত্তিতে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া রয়েছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সেবাদানের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নের ভিত্তিতে পুরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থা করা, সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গণ-শুনানির মতো জনগণের অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা ও জন-অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সামাজিক আন্দোলন জোরদার করাসহ গণমাধ্যমের সক্রিয়তা বৃদ্ধি করা। ‘তথ্য অধিকার আইন ২০০৯’ ও ‘তথ্য প্রকাশকারীর সুরক্ষা আইন ২০১১’ এর কার্যকর বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ সকল অংশীজনের সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি করা।
উল্লেযোগ্য অপর সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে সেবাগ্রহীতার সঙ্গে  সেবাদাতার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ হ্রাসে অনলাইনে স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ বৃদ্ধি, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সুর্নিদিষ্ট অভিযোগ নিরসন প্রক্রিয়া প্রচলন ও কার্যকর করার পাশাপাশি নাগরিক সনদের কার্যকর বাস্তবায়ন করা এবং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় ধাপ ও অন্যান্য বাধা দূর করতে পদ্ধতিগত সংস্কার করা। এছাড়াও জনবল, অবকাঠামো ও লজিস্টিকস এর ঘাটতি দূরীকরণে সেবাখাতগুলোতে আর্থিক বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি এদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধে সকল পর্যায়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করার সুপারিশ করে টিআইবি।

পোশাক খাতে আরো সংস্কার প্রয়োজন -সেমিনারে সিপিডি

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করে, রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে অনেকটা পরিবর্তন হলেও সংস্কার আরো প্রয়োজন রয়েছে। এ ছাড়া পোশাক শিল্পে শোভন কাজের পরিবেশ কার্যক্রমের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। বেশির ভাগ উদ্যোগ শুধু কর্মস্থলের নিরাপত্তা কেন্দ্রিক। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে আরএমজি খাতবিষয়ক সিপিডি আয়োজিত সেমিনারের মূল প্রবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সভাপতিত্বে সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন আন্তঃপার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সভাপতি ও সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী, বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বসু, এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
প্রবন্ধে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, গার্মেন্ট খাতে নতুন পণ্য উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। বাড়ছে না প্রযুক্তির ব্যবহারও। কাজেই পরিকল্পিত বিনিয়োগ না হলে আগামীতে এ খাতটি প্রতিকূলতায় পড়ে যাবে। এ খাতে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে স্বল্প সুদের ঋণ দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। প্রবন্ধে তিনি বলেন, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর এ খাতটি সামাজিক সূচকে এগিয়েছে। কিন্তু অন্যভাবে অর্থনৈতিক সূচকে পিছিয়ে পড়ছে।
সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, পোশাক খাত অনেক দূর এগিয়েছে। আজকে পোশাক খাতের উন্নয়নের মূল কারিগর শ্রমিক সমাজ। দেশের রপ্তানি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। তাই এ খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ খাত উন্নয়নে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে হবে। একসঙ্গে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে শ্রমিকদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিযোগিতার বিশ্বে বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে টিকে থাকতে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নীতি সহায়তা দিতে হবে। ন্যায্য মজুরি দিয়ে শ্রমিকদের সম্মান করতে মালিকদের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, শ্রমিকরা পশু নয়, তাদের মূল্যায়ন করুন। কারণ শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করেই তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্ববাজারে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, পোশাক খাতে রপ্তানি আয় ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছর এ খাতে রপ্তানি আয় ৫০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে, যা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এটি অর্জনে আমাদের রপ্তানির গতি আরো  বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মনীতির পরিবর্তন করতে হবে।বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বসু বলেন, পোশাক খাতে নামিদামি কোম্পানির প্রবেশ ঘটেছে। শ্রমিকের উন্নয়ন, বিল্ডিংয়ের নিরাপত্তাসহ গুণগত অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তবে এ উন্নয়নের গতি আরো বাড়াতে হবে।
শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বড় ধাক্কা আসে রানা প্লাজার ট্র্যাজেডি। এ দুর্ঘটনা আমাদের অনেক কিছু শিক্ষাও দিয়েছে। আর এ থেকে শিক্ষা পেয়ে পোশাক ক্রেতাজোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের জরিপ, শ্রমিক সেফটি, ফায়ার সেফটি, বিল্ডিং সেফটির মতো উন্নয়ন হয়েছে। তিনি বলেন, এখন আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা। আমরা মালিক-শ্রমিক মিলে মাথা আরো উঁচু করে দাঁড়াতে চাই। একই সঙ্গে সরকারের ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নে বড় ধরনের ভূমিকায় থাকতে চাই। গবেষণায় বলা হয়, দেশের পোশাক কারখানাগুলোয় পারিবারিক প্রাধান্য রয়েছে। কারখানাগুলোর অধিকাংশই দ্বিতীয় প্রজন্ম দ্বারা পরিচালিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসেছে তৃতীয় প্রজন্মও। সিপিডি বলছে, ৬৫ শতাংশ গার্মেন্ট দ্বিতীয় প্রজন্ম দ্বারা পরিচালিত। ৮৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের ৩ জন পরিচালকের মধ্যে দু’জনই একই পরিবারের। সেসব প্রতিষ্ঠানে কোনো স্বাধীন পরিচালক নেই। একই সঙ্গে ৫৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান একই গ্রুপের ভিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি দিচ্ছে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর দেশে ১৯ শতাংশ কারখানা গড়ে উঠেছে। তবে আশঙ্কার বিষয়, এর বড় অংশটিই ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত। গবেষণায় কারিগরি উন্নয়নের ক্ষেত্রে বলা হয়, ২১ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। খুবই নিম্ন মানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ১৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। আর ছোট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৪ শতাংশে উন্নত প্রযুক্তি এবং ৩৮ শতাংশে মধ্যম ও বৃহৎ পরিসরে প্রযুক্তির ব্যবহার হয়। এ ছাড়া, বিকেএমইএ’র চেয়ে বিজিএমইএ’র প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা ৩.১ শতাংশ বেশি। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, পোশাক কারখানাগুলোর উন্নয়নে প্রযুক্তির অভিমুখী অবশ্যম্ভাবী। এ উন্নয়নের লক্ষ্যে কর্মকৌশল ও ব্যবস্থাপনা হতে হবে শ্রমিকদের স্বার্থে। সামগ্রিকভাবে যে নীতি কাঠামো আছে এবং সরকারের পক্ষ থেকে যেসব প্রণোদনা দেয়া হয় সেগুলোকে পুনর্বিবেচনা করা দরকার। যে উত্তরণ আমরা চাচ্ছি, সেই রূপান্তরের সঙ্গে এই নীতিগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ কি-না সেগুলো আরেকটু ভালো করে বিবেচনা করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, প্রযুক্তির উন্নয়নের ক্ষেত্রে কারখানার আয়তন ও স্থান সম্পৃক্ত। সব কারখানায় প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটছে না। কারখানায় ব্যবস্থাপনা পরিচালনার ক্ষেত্রে খুব একটা উন্নয়ন হচ্ছে না। প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের উৎপাদনশীলতা এখনও খুবই নিম্ন।
বিজিএমইএ’র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ফারুক হাসান বলেন, অনেক গার্মেন্ট পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে গেছে। মালিকানায় পরিবর্তন আসছে। শুধু দ্বিতীয় প্রজন্ম নয়, কোনো কোনো কোম্পানিতে তৃতীয় প্রজন্মও এসেছে। করপোরেট ম্যানেজমেন্ট শুরু হয়েছে। দিনে দিনে পরিবর্তন আসছে। ভবিষ্যতে মূলধনের জন্য আমাদেরকে শেয়ার মার্কেটেও যেতে হবে। এ ছাড়া পোশাক রপ্তানি বাড়লেও বাইরে থেকে জনবল আমদানি কমেছে। আমরা চাই, ভবিষ্যতে যেন টপ ম্যানেজমেন্টের কর্মী দেশেই গড়ে ওঠে।
দিনব্যাপী এই আলোচনায় কয়েকটি সেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সিপিডির বিভিন্ন গবেষকসহ পোশাক খাতের মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা এতে উপস্থিত ছিলেন।

অবশেষে শ্রম আইনে সংশোধনী আসছে by দীন ইসলাম

আহার ও বিশ্রামের বিরতি ছাড়া শ্রমিকের কর্মঘণ্টা ১০ ঘণ্টার বেশি হতে পারবে না। এ ছাড়া কারখানা ও শিল্পের ক্ষেত্রে প্রতি সপ্তাহে একদিন এবং দোকান ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেড়দিন ছুটি নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহন প্রতিষ্ঠানে  কর্মরত পাইলট, প্রকৌশলী ও কেবিন ক্রুরা ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে পারবে। এসব বিধান রেখে শ্রম আইনে সংশোধনী আনতে যাচ্ছে সরকার।
আগামী সোমবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠেয় মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে শ্রম আইনের সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য উঠবে। আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে খাবার কক্ষ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ২৫ জনের বেশি শ্রমিক নিযুক্ত থাকেন এমন প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা যাতে তাদের সঙ্গে আনা খাবার খেতে এবং বিশ্রাম করতে পারেন সেজন্য পানির ব্যবস্থাসহ একটি কক্ষ থাকতে হবে।
এ ছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার কক্ষের ব্যবস্থা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। সংশোধনীতে বলা হয়েছে, শ্রমিকরা ইচ্ছা প্রকাশ করলে যৌথ দরকষাকষি প্রতিনিধি বা অংশগ্রহণকারী কমিটির সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কাজ করে পরে ওই সাপ্তাহিক ছুটি উৎসব ছুটির সঙ্গে যোগ করে ভোগ করতে পারবে।
সেক্ষেত্রে সাপ্তাহিক ছুটির দিনের কাজের জন্য কোনো বেশি ভাতা দেয়া হবে না। চাকরি থেকে বাদ দিতে কি কি প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হবে ওই বিষয়টিও সংশোধনীতে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো শ্রমিক বিনা নোটিশে বা বিনা অনুমতিতে ১০ দিনের বেশি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে মালিক ওই শ্রমিককে ১০ দিনের সময় দিয়ে এই সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে বলবে এবং চাকরিতে পুনরায় যোগদানের জন্য নোটিশ দেবে।
এমন ক্ষেত্রে ওই শ্রমিক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা প্রদান বা চাকরিতে যোগদান না করলে সংশ্লিষ্ট শ্রমিককে তার আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আরো সাত দিন সময় দেবে। তাতেও যদি সংশ্লিষ্ট শ্রমিক চাকরিতে যোগদান বা আত্মপক্ষ সমর্থন না করেন তবে ওই শ্রমিক অনুপস্থিতির দিন থেকে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছে বলে গণ্য হবে। এর আগে ২০১৬ সালে সরকার নতুন শ্রম আইন পাস করে। তবে এটি শ্রমিকবান্ধব হয়নি বলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আলোচনা সমালোচনা করতে থাকে। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় বিশাল সংখ্যক শ্রমিক হতাহতের পর নতুন করে এটি আলোচনায় আসে।
বিশেষত শ্রমিকের সংঘবদ্ধ হওয়া বা ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারের বিষয়টি আলোচিত হয়। সমালোচনার মুখে ওই বছরই সরকার আইনটিতে বেশকিছু সংশোধনী আনে। এর পর কারখানার ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনে গতি আসলেও শ্রমিকের হয়রানি, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের প্রক্রিয়াগত জটিলতা কমেনি বলে অভিযোগ উঠে। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (ইপিজেড) পূর্ণাঙ্গ ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার বিষয়টি নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে আপত্তি তোলা হয়।
একই সঙ্গে শ্রম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ইপিজেড এলাকার কারখানার শ্রমমানকে তাদের পরিদর্শনের আওতায় আনাসহ বেশকিছু ইস্যু সামনে আসে। গত বছর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল লেবার কনফারেন্সে (আইএলসি) এ বিষয়ে অগ্রগতি অর্জনের জন্য সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বাংলাদেশকে ‘স্পেশাল প্যারাগ্রাফ’-এর আওতায় আনা হয়। এর পর শ্রম আইনের সংশোধনীর বিষয়ে গুরুত্ব বাড়ায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে গঠিত কমিটির মতামতের ভিত্তিতে গত মে মাসে তা চূড়ান্ত করা হয়। এটি চূড়ান্ত করার পর ওই মাসেই অনুষ্ঠিত চলতি বছরের আইএলসিতে এ অগ্রগতি তুলে ধরে সরকার। সেই সঙ্গে তা আগামী সেপ্টেম্বর নাগাদ পাস হবে বলেও সরকারের তরফে আশ্বস্ত করা হয়। ফলে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নেয় আইএলসি। আগামী অধিবেশনেই এর সংশোধনী আসতে যাচ্ছে।

Thursday, August 30, 2018

শহিদুল আলমের গ্রেপ্তার দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি সম্পর্কে কী বার্তা দেয় by আদিত্য অধিকারী

বাসচাপায় রাজপথে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে ছাত্রবিক্ষোভ সৃষ্টি হয় তা নিয়ে ৫ই আগস্ট আল জাজিরা টেলিভিশনকে সাক্ষাৎকার দেন বাংলাদেশি আর্টিস্ট, লেখক ও সংগঠক শহিদুল আলম। তিনি বলেন, তরুণ  ছাত্রদের এই বিক্ষোভ শুধু পরিবহন খাত নিয়েই নয়, দেশের করুণ অবস্থাও এ ক্ষোভে রশদ যুগিয়েছে। বাংলাদেশে যেসব অনিয়ম হচ্ছে তিনি তার সবকিছু তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ব্যাংক লুট হচ্ছে। মিডিয়ার গলা চেপে ধরা হয়েছে। বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে। গুম হচ্ছে। সব স্তরে ঘুষ চলছে। শিক্ষায় দুর্নীতি হচ্ছে।
ওইদিনই সাদা পোশাকে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা মধ্যরাতে তার ঢাকার বাসায় হাজির হন। কোনো ব্যাখ্যা বা ওয়ারেন্ট ছাড়াই তাকে তুলে নিয়ে যান। যখন তাকে আদালতে হাজির করা হয় তখন তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিলেন অন্যের ওপর ভর করে।
তাকে অবশ্যই নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই তার বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী প্রচারণা ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেয়ার জন্য বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার অধীনে অভিযোগ গঠন করা হয়। তার জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। যদি তিনি অভিযুক্ত হন তাহলে তার সাত বছরের জেল হতে পারে।
শহিদুল আলমকে অশোভন, অন্যায়ভাবে ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এতে তীব্র নিন্দা প্রকাশ করা হচ্ছে। বিশ্বের সব স্থান থেকে তার মুক্তি দাবি করা হচ্ছে। এই মনোযোগ আকৃষ্ট হয়েছে শহিদুল আলমের ব্যতিক্রমী অর্জন ও তার আন্তর্জাতিক খ্যাতির জন্য। একজন ফটোসাংবাদিক হিসেবে তিনি ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছেন।
তিনি তুলে ধরেছেন ভিকটিমরা নয়, সক্রিয় এজেন্ট হলেন প্রান্তিক মানুষ। এ ছাড়া তিনি রাষ্ট্রীয় নৃশংসতার চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি সমানভাবে একজন ইনস্টিটিউট বিল্ডার ও তরুণ ফটো সাংবাদিকদের প্রদর্শক। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ফটো বিষয়ক এজেন্সি দৃক পিকচার লাইব্রেরি, দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে অভিজাত ছবির উৎসব ছবিমেলা ও পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউট। পাঠশালায় নেপালিসহ শত শত ফটোগ্রাফারকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
একজন শহিদুল আলমকে অতিক্রম করে এমনকি বাংলাদেশের বাইরেও এ ঘটনার বড় প্রভাব রয়েছে।  তাকে গ্রেপ্তার একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার দিকে দৃষ্টিপাত করে, যার প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশসহ বিশ্বের বড় অংশগুলোতে।
আরো খোলামেলাভাবে বলতে গেলে, এটা করেছে রাষ্ট্র, যারা মাঝে মাঝেই মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সরকারের যেকোনো সমালোচককে ক্রিমিনালাইজ বা অপরাধী হিসেবে নিয়ে তাদের বিচার করছে দক্ষিণ এশিয়ার সরকারগুলো। তার মধ্যে রয়েছে সুপরিচিত ব্যক্তি এবং সামাজিক মিডিয়ায় ব্যক্তিগত মত প্রকাশকারী নাগরিকরা। 
ফেসবুকে সরকারের সমালোচনামূলক পোস্ট অথবা মন্তব্য শেয়ার করার কারণে বেশ কিছু মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বাংলাদেশে। এখানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের পরিবর্তে আরো কঠোর একটি লেজিসলেশন আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে রিপোর্ট করার কারণে দুই সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অফিসিয়াল সিক্রেট আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
গত সপ্তাহে ভারতে বেশ কিছু উচ্চ মাপের অধিকারকর্মী ও বোদ্ধাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটা সুস্পষ্টভাবে সরকারের প্রতিশোধ। নেপালেও সরকার একটি প্রস্তাব পাস করেছে, যার ফলে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে সাংবাদিকরা রিপোর্ট করতে পারবেন না। 
সরকারগুলো দাবি করেছে যে, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য এসব পদক্ষেপ জরুরি। ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য এ অঞ্চলের শাসকরা জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী সেন্টিমেন্ট জাগিয়ে তেলার চেষ্টা করেছে। যেসব সংগঠন অধিকতর সুবিচারের জন্য প্রচারণা চালায় তাদেরকে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর চর হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
এসব উদ্দেশের নেপথ্য কারণ স্পষ্ট। সরকারগুলো তাদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণাকে ইতিহাসে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাদের সামনে যে ইভেন্ট আছে তাকেই একমাত্র বৈধ বলে মনে করে। নিরপেক্ষ নাগরিক সমাজের গ্রুপগুলোর সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে তারা মুক্তভাবে তাদের সিদ্ধান্তকে দমিয়ে রাখতে চায়। এ প্রক্রিয়ায় তারা চেষ্টা করছে একটি আতঙ্কগ্রস্ত, নিজেদের দিকে তাকিয়ে থাকা ও বিদেশাতঙ্ক জনগোষ্ঠী সৃষ্টি করতে।
শহিদুল আলমকে মুক্তির যে প্রচারণা শুরু হয়েছে তা শুধু একজন ব্যক্তির নয়, যাকে অন্যায়ভাবে বিচার করা হচ্ছে। আরো বেশি করে বলা যায়, সমগ্র অঞ্চলজুড়ে গণতান্ত্রিক স্পেসের ওপর যে আগ্রাসন তার বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ। এটা হলো সংকীর্ণ মানসিকতার জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। খেয়াল-খুশিমতো ক্ষমতার ব্যবহারের প্রতিবাদ। এই প্রচারণার উদ্দেশ্য হলো সহনশীলতা, আইনের শাসন ও বেশির ভাগ প্রান্তিক মানুষের অধিকার।
বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হয়তো অনুধাবন করে থাকবেন শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার করে তার সরকার শুধুই আন্তর্জাতিক বৈধতা হারিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃস্থাপনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে শহিদুল আলমের মুক্তি।
নেপাল সফরে থাকা অন্য সরকারগুলোর প্রধানদের একই বিষয়ে স্বীকৃতি দেয়া উচিত। তাহলো সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের সদস্যদের ওপর হামলা বড় ধরনের শত্রুতা ও ক্ষমতাসীনদের প্রতি ক্ষোভ বৃদ্ধি পায়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাধা এমন যেসব লেজিসলেশন আছে তা বাতিল করা হবে জরুরি, যদি রাষ্ট্রগুলো তাদের জনগণের আস্থা ফিরে পেতে চায়।
(নেপাল টাইমসে প্রকাশিত ‘দ্য ডেথ অব ডেমোক্রেসি’ শীর্ষক লেখার অনুবাদ)

যেসব শিশুর সামনে পিতামাতাকে গুলি করেছে মিয়ানমারের সেনারা

কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শিশুদের মধ্যে ৬ হাজারের বেশি এতিম অথবা তাদের সঙ্গে তাদের পরিবারের কেউ নেই। এসব শিশুর বেশির ভাগের পিতামাতাকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের চোখের সামনে গুলি করে হত্যা করেছে। তাদের একজন রায়হান। তার বয়স ১০ বছর। তাদের গ্রামে যখন সেনাবাহিনী হানা দেয় তখন রায়হান তার বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলছিল। অকস্মাৎ সে দেখতে পায় তাদের এক প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে ধোয়া উঠছে। আস্তে আস্তে আগুনের শিখা আকাশে ছড়িয়ে পড়ে। রায়হান বুঝে নেয় কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। এক বছর আগে এমন ঘটনা ঘটে তার গ্রামে। রায়হান বলে, এমন অবস্থায় আমার পিতামামা ও বোনেরা আমাকে জড়িয়ে ধরে দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করে। কিন্তু আমার পিতামাতাকে ধরে ফেলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তারা আমাদের সামনেই গুলি করে হত্যা করে। এ সময় আমার বোনেরা তাদের দিকে দৌড়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে সেনারা তাদেরকেও গুলি করে হত্যা করে। তখন কি করতে হবে আমি বুঝতে পারি নি। ভয়ে আমার হাতপা কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল আমার দেহ থেকে সব রক্ত শেষ হয়ে গেছে। মনে হচ্ছিল আমি অচল হয়ে গেছি। বুঝতে পারছিলাম না দৌড়ে পালাতে পারবো কিনা। বুঝতে পারি নি কোথায় যাচ্ছি আমি। মাটিতে পড়ে আছেন আমার পিতামাতা ও বোনদের লাশ। সে দৃশ্য আমাকে হৃদয়ে ঝড় তুলছে। তবু তাদেরকে পিছনে ফেলে আমি ছুটতে থাকি।
দৌড়াতে দৌড়াতে রায়হান পৌঁছে যায় সামনের এক গ্রামে। সেখান থেকে রোহিঙ্গা মুসলিমদের একটি গ্রুপ পালাচ্ছিল। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় রায়হান। তারপর তিন দিন ধরে হাঁটতে থাকে। এরপরই নাগাল পায় বাংলাদেশের। রায়হান বলে, আমাকে ওই গ্রুপের কেউই চিনতো না। আমি বুঝতে পারি নি কি করতে হবে। আমি শুধু ওই দলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছুটতে থাকি। ওই দিনগুলোতে আমার আর কিছু খাওয়া হয় নি।
গত বছর আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী যে নৃশংসতা চালায় তাতে কমপক্ষে ৭ লাখ মানুষ পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। তার মধ্যে সবচেয়ে বিপন্ন অবস্থায় যারা আছে তারা হলো এতিম, নিঃসঙ্গ শিশুরা। এ সপ্তাহে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, পিতামাতা বা অভিভাবক নেই এমন রোহিঙ্গা শিশুকে আলাদা করা হয়েছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের জরিপে দেখা গেছে ১৩৯টি রোহিঙ্গা শিশু নিঃসঙ্গ বা তাদের পিতামাতা নেই। এমন শিশুদের আলাদা করে তাদের দূরবর্তী পরিবার বা পালক পিতামাতার কাছে দেয়া হয়েছে ক্যাম্পে। কিন্তু এক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে জটিলতা। ইউনিসেফের মতে, কক্সবাজারে পুরো শরণার্থী শিবিরের মোট জনসংখ্যার মধ্যে শতকরা ১০ ভাগই অভিভাবক ছাড়া অবস্থান করছে।
রায়হান এখন তার পিতামাতাকে ভীষণ মিস করে। সে আশ্রয়শিবিরে তার এক নিকট আত্মীয়াকে খুঁজে পেয়েছে। এতে রায়হান নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে করে। তারপরও তার মধ্যে হতাশা। সে বলে, এখন আমার ওই আন্টি ছাড়া আমি জানি না আর কোথায় আমার জায়গা আছে। আবার আমি আগের মতো ফুটবল খেলা শুরু করেছি।
রায়হানের মতো আরেক শিশু আরেফা। যখন সেনাবাহিনী তার গ্রামে হানা দেয় তখন তার বয়স ১৬ বছর। সে তখন পানি আনতে গিয়েছিল। ফিরতে গিয়ে সে দূর থেকে দেখতে পায় তাদের বাড়ির বাইরে সেনাবাহিনী। তা দেখে সে একটি জঙ্গলের আড়ালে লুকায়। দেখতে থাকে সেনারা গুলি ছুড়ছে। প্রথমে তারা গুলি করছে বয়স্ক মানুষদের দিকে। তারপর শিশুদের দিকে। যখন প্রাপ্ত বয়স্করা তাদেরকে থামার অনুরোধ করে তখন সেনারা তাদের দিকেও গুলি ছোড়ে। এ সময় আরেফার সামনে যাদেরকে হত্যা করা হয় তার মধ্যে ছিল তার পিতা, মাতা, সাত ভাই ও বোন। তাদের লাশ পিছনে ফেলে সে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। এখন একা একা অবস্থান করছে। মাঝে মাঝে কাউন্সিলিং পাচ্ছে। ২৩ বছর বয়সী বাংলাদেশী নৃবিদ্যার ছাত্রী কেয়া তার সঙ্গে সপ্তাহে একবার সাক্ষাত করেন। কেয়া সেভ দ্য চিলড্রেনের হয়ে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বলেছেন, আরেফার মনের ভিতর এতটাই ক্ষত যে সে পালক পিতামাতার সঙ্গে বসবাস করতে পারবে না। এখন আরেফার বয়স ১৭ বছর। সে একা একা বসবাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে এরই মধ্যে সবাইকে হারিয়েছে। সে অন্য কোন পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতে চায় না।
কেয়া যাদেরকে দেখাশোনা করেন তাদের মধ্যে আরেকজন তাসমিন। তার বয়স ১৫ বছর। মারাত্মক বিকলাঙ্গ সে। তার রয়েছে জন্মগত ত্রুটি। সে তার পা ব্যবহার করতে পারে না। মিয়ানমারে তার পিতা একজন বেকারির ব্যবসায়ী ছিলেন। তার ওপরই পুরোপুরি নির্ভর করতে হতো তাকে। তাসমিনকে দেখাশোনার জন্য পৃথিবীর বুকে একমাত্র তার পিতাই ছিলেন। গত বছর যখন সেনাবাহিনী তাদের বাড়িতে হানা দেয় তখন তাসমিন রান্নাঘরে পালায়। সে দেখতে পায় গ্রামের ২০ থেকে ৫০ বছর বয়সী পুরুষদেরকে সেনারা লাইন দিয়ে দাঁড় করাচ্ছে। এরপর তাদেরকে গুলি করে হত্যা করছে। তাদের মধ্যে ছিলেন তার পিতাও। এ ঘটনার পর হামাগুঁড়ি দিয়ে ১২ দিন ধরে বাংলাদেশের দিকে অগ্রসর হয় সে। নিজের হাতের ওপর ভর করে সামনে এগুতে থাকে শরীরটাকে নিয়ে। কেয়া বলেন, বাংলাদেশে এই আশ্রয়শিবিরে যখন সে আসে তখন তার শরীর ভরা ছিল রক্ত। তার হাতে কেটে গিয়েছিল। সেখানে সংক্রমণ দেখা দিয়েছিল। তাসমিন এখন এক পালক পরিবারের আশ্রয়ে আছে। সহায়তা কর্মীরা তাকে একটি হুইল চেয়ার দিয়েছে। দেয়া হচ্ছে মানসিক কাউন্সিলিং।
এ অবস্থায় সেভ দ্য চিলড্রেন বলছে, এই আশ্রয় শিবিরে এসব এতিম শিশু অপহরণ, যৌনতা ও শ্রমে নিয়োজিত হওয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশে সেভ দ্য চিলড্রেনের ডিরেক্টর মার্ক পিয়ার্স বলে, ১২ মাস আগে আমাদের টিমের সদস্যরা দেখতে পান এসব শিশু একা একাই বাংলাদেশে আসছে। তখন তারা এতটাই হতাশায়, ক্ষুধার্ত ও নিঃশেষিত অবস্থায় ছিল যে, কথা পর্যন্ত বলতে পারছিল না। (লন্ডনের দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট অবলম্বনে)

জর্ডানে জেসমিনের ওপর বর্বরতা by রিপন আনসারী

‘মদ খেয়ে প্রতিরাতে বাসার মালিক ও তার ছেলে যৌনক্ষুধা মিটাতো। মারধর, গরম খুন্তি দিয়ে পিঠে ছেঁকা আর  সারাদিন পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে আটকে রাখতো। এভাবে ওই বাসায় কয়েক মাস নির্যাতনের পর তুলে দেয়া হয় সোনিয়া নামের এক বাংলাদেশির কাছে। জর্ডানের দাম্মাম শহরের সোনিয়ার বাসাটি ছিল মিনি পতিতালয় তা জানা ছিল না।  ভেবেছিলেন বাঙালির কাছে আশ্রয় পেয়েছি ভালো থাকবো। তা আর হলো না।
আমার মতো আরো ২০ নারীকে দিয়ে ওই নারী যৌনকাজে বাধ্য করতো। একবার  পালিয়ে গিয়েও রক্ষা পাইনি। আবার ধরে নিয়ে  আমাকে তার বাসার নিচতলায় ভারতের নাগরিক নির্মাণ শ্রমিক গরজিদের কাছে তুলে দেয়।  কোনোভাবেই নিজেকে আর রক্ষা করতে পারলাম না। এক পর্যায়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ি। পরে সোনিয়া  টের পেয়ে আমাকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়। দুই মাস জেল খাটার পর পেটে সন্তান বহন করে ১৮ই এপ্রিল ওই দেশের সরকারের সহায়তায় দেশে ফিরে আসি।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে লোমহর্ষক নির্যাতনের এই কাহিনী তুলে ধরেন জর্ডান ফেরত এক নারী।  মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার বাস্তা গ্রামের দরিদ্র এক রিকশাচালক তারা মিয়ার মেয়ে এখন কন্যা সন্তানের জননী। এ দায় কার, এনিয়ে দিশাহারা পরিবারটি। তাছাড়া, সমাজ এই পরিবারের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। গেল বৃহস্পতিবার সিংগাইরের একটি ক্লিনিকে পিতার নাম অন্য পরিচয়ে কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। তার দাবি এই সন্তানের পিতা ভারতীয় নাগরিক গরজিদ।
ওই নারী জানান, ১০ মাস তাকে বাসায় আটকে রেখে যৌনকাজে বাধ্য করা হলেও একটি টাকাও তুলে দেয়া হয়নি তার হাতে। শূন্য হাতেই তিনি বাড়ি ফিরেছেন। তিনি তার জীবনটা নষ্ট করার জন্য সোনিয়া আক্তারের উপযুক্ত শাস্তি দাবি করেন। সেই সঙ্গে এই কন্যা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। সামাজিক ভাবে কি পরিচয় দেবেন এই সন্তানের। প্রতিবেশীরা নানা ধরনের কথা  শোনাচ্ছেন তাকে ও তার পরিবারকে। তিনি জানান, শেষমেশ কোনো উপায় না পেয়ে মঙ্গলবার সিংগাইর থানায় মামলা করতে বাধ্য হয়েছি।
কথা হয় তার পিতা তারা মিয়ার  সঙ্গে। তিনি পেশায় একজন রিকশাচালক। নিজের জমি নেই। শ্বশুরবাড়িতে ছোট একটি টিনের দোচালা ঘরে বসবাস করেন। তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে এই মেয়ে সবার বড়। অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে ১৫ বছরের মেয়েকে ২৫ বছর দেখিয়ে পাসপোর্ট করে দেয় স্থানীয় আদম ব্যবসায়ী কাশেম আলী। এরপর ১০ হাজার টাকা ঋণ করে ২০১৬ সালের ২৩শে অক্টোবর জর্ডানে পাঠানো হয়। কথা ছিল তার মেয়েকে নিয়ে বাসাবাড়িতে কাজ দেবেন। কিন্তু জর্ডানে যাওয়ার পর মেয়ের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। দালাল কাশেমের কাছে মেয়ের খোঁজ নিলে সে জানিয়ে দেয় জর্ডানে পাঠানো হয়েছিল কিন্তু সেখান থেকে সে  পালিয়ে গেছে। এর দায়িত্ব সে নিতে পারবে না। মেয়ের সন্ধান চেয়ে কাসেমের বিরুদ্ধে একটি  মামলাও করা হয়েছিল। দেড় বছর পর জানা যায় সিংগাইর উপজেলার চান্দহুর ইউনিয়নের চরচামটা গ্রামের নিহাজ উদ্দিনের মেয়ে সোনিয়ার কাছে জর্ডানে আছে। সোনিয়ার সঙ্গে মোবাইলফোনে কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত হই।  
তারা মিয়া জানান, অবিবাহিত মেয়ে বিদেশ থেকে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে ফিরেছে। এলাকায় কানাঘোষা হচ্ছে। লজ্জায় বাড়ির বাইরে বের হতে  পারি না। নানাজনে নানা কথা বলে। সমাজের মাতবর আলেক উদ্দিন কোরবানি ঈদের আগে জানিয়ে দেন সমাজ থেকে তাদের বাদ দেয়া হয়েছে। সমাজের মানুষ তাদের পাশে নেই। কিন্তু যাদের জন্য আজ তার মেয়ের এই অবস্থা তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান তিনি। এছাড়া বাধ্য হয়ে জর্ডান প্রবাসী সোনিয়াসহ আরো ৫ জনের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার  সিংগাইর থানায় মামলা করা হয়েছে।
তিনি জানান, বড় আশা করে মেয়েকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু মেয়ে নানা নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন। মেয়ের কন্যা সন্তান কার পরিচয়ে বড় হবে তা নিয়েই বেশি দুশ্চিন্তায় তিনি।
স্থানীয় দালাল আবুল কাশেমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অনেক নারী শ্রমিককে তিনি বিদেশে পাঠিয়েছেন। এমন ঘটনা কারো সঙ্গে হয়নি। এর জন্য তিনি দায়ী নন, সোনিয়া নামের নারী তাকে দিয়ে খারাপ কাজ করিয়েছে। তারা মিয়া মামলা করেছিল, পরে বিদেশ থেকে ফেরার পর স্থানীয়ভাবে বসে মামলাটি আপোষ করা হয়েছে।
সিংগাইর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খন্দকার ইমাম হোসেন জানান, অন্তঃসত্ত্বা হয়ে নারী শ্রমিক দেশে এসে সন্তান প্রসবের ঘটনার খবর শোনার পর  মেয়েটির পরিবারকে আইনগত সহায়তার আশ্বাস দিয়েছি। মঙ্গলবার  ভুক্তভোগী ওই নারী থানায় ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করলে এদের মধ্যে দুই আসামিকে আটক করা হয়েছে।

‘ঐক্য হলে সরকার হেরে যাবে’ by কাফি কামাল

রাজনীতিতে পরিবর্তন ও ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা জাতীয় ঐক্যের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরামের মধ্যে গড়া ঐক্য প্রক্রিয়ায়  বিএনপিসহ আরো রাজনৈতিক দলগুলোকে যুক্ত করায় ভূমিকা রাখছেন তিনি। গতকাল ঐক্য প্রক্রিয়ার বিষয়ে মানবজমিনের সঙ্গে আলাপে বিস্তারিত তুলে ধরেন।
ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, জাতীয় ঐক্যের আহ্বানকারীরা মনে করেন, ঐক্য হলে সরকার হেরে যাবে। কারণ দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়। পরিবর্তনের জন্য একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দরকার। একবার নয়, ভবিষ্যতেও যেন সুষ্ঠু নির্বাচন হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে এখন সুশাসন নেই, সুবিচার নেই। মামলার ফ্যাক্ট ডিসাইড করে আইনমন্ত্রী। বা অন্য জায়গা থেকে। উল্টোদিকে এই জাতীয় ঐক্য যদি নির্বাচনে জিতে তারাও কী ১ লাখ লোককে কারাগারে পাঠিয়ে দেবে? তারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কোনোরকম জিঘাংসা হবে না। ন্যায়বিচারের ব্যত্যয় ঘটবে না। তিনি বলেন, ড. কামাল হোসেন যখন আইনমন্ত্রী ছিলেন তখন দেশে লোক ছিল ৭ কোটি এবং অ্যাটর্নি জেনারেলসহ তার অফিসে ছিল একজন ডেপুটি ও একজন সহকারী। এখন দেশের লোক ১৬ কোটি। কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসে ১০০ জন লোক। আর একশ’জন থাকায় তারা মামলা তৈরি করে, হয়রানি তৈরি করে। আগে কখনও কোনো সরকারই খুন-খারাবির আসামি ছাড়া রাজনৈতিক কেসে হাইকোর্টে ফাইট করতো, সুপ্রিম কোর্টে নয়। যেটা এখন খালেদা জিয়া ও শহিদুলের ক্ষেত্রে করছে।
এ ধরনের জিঘাংসা হবে না। পুলিশ ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় ক্যাডার হিসেবে ব্যবহার করা হবে না। তারা এসব প্রতিশ্রুতি দিতে চায়। এই যে কোটা আন্দোলন, এখানে কোটা উঠিয়ে দিলেই হবে না। সেখানে সংস্কারের দরকার আছে। সম্মিলিত জাতীয় ঐক্যের মূল লক্ষ্য- নিরপেক্ষতা ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা। জনগণ যেন দ্রুত বিচার ও নায্যবিচারটা পায়। সব ব্যাপারেই উনারা ওয়ার্ক করছেন। সে ওয়ার্কের ভিত্তিতে পরিবর্তন করতে চান। ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, সবাই একত্রে না হলে কিছুই হবে না। এটা তো আইনের সরকার নয়, আইন দিয়ে তো চলে না। সবাই সম্মিলিত না হলে দেশের মঙ্গল হবে না, নিজেদেরও মঙ্গল হবে না। দেশের স্বার্থেই আজকে সবাইকে সম্মিলিত হয়ে, যৌথভাবে অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তিনি বলেন, তারা বিশ্বাস করেন- জনগণ পরিবর্তন চায়। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সম্মিলিত জাতীয় ঐক্য নির্বাচিত হবে। তখন অবশ্যই এ সম্মিলিত ঐক্য প্রক্রিয়া সংবিধানসহ সর্বক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে পারবে। তারা নির্বাচিত হলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন। এখন যে নিবর্তনমূলক আইন আছে তা থাকবে না। পুলিশ ও প্রশাসনকে দলীয়করণের অবসান করবেন। ছাত্ররা যে আন্দোলন করেছেন তারা সে আন্দোলনকে যৌক্তিক মনে করেন। প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি ও ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠা করবেন। কেন্দ্রিকতা কমাবেন। সংবিধানের ১৫, ৫৯, ৬০ বিধিগুলো বাস্তবায়ন করবেন। এ জন্য তারা একটি গ্রুপ করেছেন। সে গ্রুপ জনগণ কি চায়, কোথায় কোথায় কি কাজ করতে হবে তা ঠিক করবে।
সম্মিলিত ঐক্য নির্বাচিত হলে সে সরকারের নেতৃত্বে নিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলের গুঞ্জন সম্পর্কে তিনি বলেন, বি. চৌধুরী বলেছেন- উনি কোনোটাই হতে চান না। তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো পদ-পদবির দাবি করেননি। তিনি ক্ষমতার ভারসাম্য চান। বিএনপি যদি এ প্রক্রিয়ায় আসে এবং তারা যদি নির্বাচনে ১৫০টির বেশি আসন পায় তাহলে বাকিদের পরোয়া করবে না, ভুলে যাবে, তখন কি হবে? তবে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বি. চৌধুরীর প্রস্তাব গৃহীত বা আলোচিত হয়নি। অতএব এটা নিয়ে এখন আর কথা না বলাই ভালো। আর ড. কামাল হোসেন তো এ প্রসঙ্গে কোনো কথাই বলেননি। জাফরুল্লাহ বলেন, ঐক্যপ্রক্রিয়ায় যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে সেটা হচ্ছে- প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর। আর ভারসাম্য হচ্ছে সেটা, যেখানে ১০ জনের মন্ত্রিসভা হলে বিএনপিরই ৮ জন থাকবে না।
কিন্তু নির্বাচনে না জিতলে কিছুই করা যাবে না। আসন বণ্টন সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসন বন্টন নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। কথা হয়েছে, যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে। যারা রাজনীতিকে ব্যবসা নয়, সেবা হিসেবে দেখেন। সেক্ষেত্রে রাজি হলে রাজনীতির বাইরে থাকা কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিও রাজনীতিতে আসতে পারেন, বিভিন্ন দলের প্রার্থী হতে পারেন। তবে এটা প্রাক আলোচনায় এসেছে যে, বিএনপি ২০০ আসনে নির্বাচন করুক, অন্যদের ১০০টি আসন ছেড়ে দিক। সেক্ষেত্রে বিএনপি ১৪০টিও পেতে পারে। আর আওয়ামী লীগও সিট পাবে। তবে এভাবে ভাগ বাটোয়ারা করে কোনো লাভ হবে না।
আগামী নির্বাচন কাদের অধীনে চায় জাতীয় ঐক্যের অংশীজনেরা- এমন প্রশ্নের জবাবে প্রবীণ এ পেশাজীবী বলেন, একটা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই হওয়া উচিত। জাতীয় ঐক্যের আহ্বানকারীরাও বলেছেন নিয়ম অনুযায়ী সংসদ ভেঙে দিতে হবে। একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আলোচনা করতে হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী গোঁ-ধরে বসে আছেন- তিনি সংবিধানের মধ্যেই থাকবেন। উনি উনার কথা বলছেন না, উনি বলছেন, আমি সংবিধানের বাইরে কিছু করবো না। সংবিধান হলে আউটগোয়িং প্রাইম মিনিস্টার থাকেই। এটাই হচ্ছে উনার চালাকি। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই নির্বাচন হবে। প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচনকালীন একটি ক্ষুদ্র মন্ত্রিসভা হবে। সেখানে টেকনিক্যাল কারণে বিএনপির মতো যারা সংসদে নেই তাদের মনোনীত ব্যক্তিরাও থাকতে পারেন, বাইরে থেকে কয়েকজন উপদেষ্টাও নেয়া যেতে পারে।
তবে তাদের নিরপেক্ষতা দৃশ্যমান ও প্রমাণিত হতে হবে। আর যদি শেখ হাসিনার অধীনে না হয়, আবার বিদ্যমান সংবিধানও রক্ষা করতে হয় সেক্ষেত্রে বর্তমান সংসদের মধ্য থেকেই কেউ একজন সে সরকারের নেতৃত্ব দিতে পারেন। ধরেন, তোফায়েল আহমেদ বা অন্য কেউ একজন। এতে আওয়ামী লীগেরই কথাও থাকলো। আপাতত, এ সংবিধানে বাইরে যাবার সুযোগ নেই। আর সংবিধান পরিবর্তন করে বিকল্প কিছু করার সময়ও কম। যদি আরো আগে থেকে আন্দোলনের মাধ্যমে সেটা হতো তাহলে অন্য কথা ছিল।
জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো দাবি আদায়ে কবে আন্দোলনে যেতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাস্তায় কবে নামবে সেটা এখনো জাতীয় ঐক্য ঠিক করতে পারেনি। যুগপৎ আন্দোলনটা কখন হবে? নির্বাচন তো গায়ে এসে গেছে। আন্দোলন আর বেশি করার সময় নেই। আন্দোলনের সময় আছে মাত্র এক থেকে দুই মাস। বড়জোর দুই মাস। তারপর তো নির্বাচনের জন্য প্রত্যেককেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তে হবে। এই দুই মাসে তাদের জনগণকে জানাতে হবে, তারা কি চায় এবং কীভাবে চায়।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরাম যে আহ্বান জানিয়েছে সেখানে জামায়াত ও স্বাধীনতা বিরোধী দল ছাড়া সবার অংশগ্রহণের সুযোগ আছে। বিএনপির সে প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ আছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের বেশিরভাগই সেটা চায়। এছাড়া জামায়াতকেও বাস্তবতা বুঝতে হবে। আমি মনে করি, জামায়াতকে ছাড়া ঐক্য হলেও তাদের অখুশি হওয়ার কিছু নেই। বরং তাদের এ প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানানো উচিত। তারা বলতে পারে, যদি আমাদের কারণে ঐক্যপ্রক্রিয়ায় অন্তরায় তৈরি হয় তবে আমাদের বাদ দেন। আমাদের সঙ্গে না নিলেও আমরা চাই আপনাদের এ যাত্রা সফল হোক। জামায়াত এটাও বলতে পারে যে, ক্ষমতায় গেলে আপনারা আমাদের প্রতিও ন্যায়বিচার করবেন। আবার পরিবর্তনের আন্দোলনে অংশ নেয়ার অধিকার তো তাদের আছেই। সেক্ষেত্রে তারা এ ঐক্যপ্রক্রিয়ার বাইরে তাদের মতো আন্দোলন করতে পারে।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারামুক্তির প্রসঙ্গে জাতীয় ঐক্যের মনোভাব সম্পর্কে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, আমি সব সময় বলি- সুষ্ঠু বিচার হলে খালেদা জিয়া খালাস পাবেন। সরকার উনাকে হয়রানি করছে। তার মানে এটা নয় যে, উনি গণতন্ত্রের জন্য কারাভোগ করছেন। জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কেউ তার মুক্তির ব্যাপারে দ্বিমত নয়। তারা সবাই বলছে, খালেদা জিয়ার প্রতি ন্যায়বিচার হোক, সুবিচার হোক। এছাড়া যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরামের বৈঠকে যে ৭ দফা প্রস্তাব উঠে এসেছে সেখানে কিন্তু পরিষ্কার বলা আছে, নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক মামলার আসামিদের মুক্তি দেয়া হোক এবং নির্বাচনের আগে নতুন করে কাউকে গ্রেপ্তার বা হয়রানি যেন না করা হয়।
নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যের বিজয় হলে যে সংসদ গঠন হবে তাতে কে নেতৃত্ব দেবে- বিএনপি নাকি অন্য দল? এমন প্রশ্নের উত্তরে ঐক্যপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, এগুলো এখন পর্যন্ত আলোচনায় আসেনি। তবে বিশ্বে এখন বহু নজির তৈরি হচ্ছে। ভারতের কর্ণাটকে কংগ্রেস মেজরিটি পেয়েও ছেড়ে দিয়েছে। মালয়েশিয়ায় আনোয়ার ইবরাহীমের দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ছাড় দেয়ায় মাহাথির মুহাম্মদ ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু এসব আসলে পরের ধাপ। আগে আন্দোলন, আন্দোলনের মাধ্যমে নির্বাচনের দাবি আদায় এবং নির্বাচনে বিজয়ের পর বাকি সব।
আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কূটনীতিকদের ভূমিকা প্রসঙ্গে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, দিল্লি বা ওয়াশিংটন নয়, আমি মনে করি- আমাদের মূল ফ্যাক্টর হলো জনগণ। দিল্লি বা ওয়াশিংটনের দিকে চেয়ে থেকে লাভ নেই। আমাদের ঘর যদি ঠিক থাকে তারা কেউ কিছু করতে পারবে না। আমাদের উচিত সবার আগে জনগণকেই মর্যাদা দেয়া এবং তাদের সঙ্গে কথা বলা। কেবল ভারত ও আমেরিকাকে না ধরে থেকে সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক গড়তে হবে। বিশেষ করে আমাদের ওআইসির দেশগুলোর সঙ্গে আরো ভালো এবং বেশি সম্পর্ক থাকা দরকার। সর্বোপরি আমাদের মূলশক্তি জনগণ।

ভিন্নমত গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ -ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট

ভিন্নমত হলো গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ। তাই ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ না দেয়া হলে গণতন্ত্রের এই রক্ষাকবচ বিস্ফোরিত হবে। বুধবার একটি পিটিশনের জবাবে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই মন্তব্য করেছেন। ভারতের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার অভিযানকে চ্যালেঞ্জ করে ওই পিটিশনটি দাখিল করা হয়। এর জবাবে প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের ওই বেঞ্চ বলেছে, গ্রেপ্তারকৃত বুদ্ধিজীবীদের জেলে পাঠানো যাবে না। বড়জোর তাদের গৃহবন্দি রাখা যেতে পারে। আগামী ৬ই সেপ্টেম্বর এই বিষয়ে পরবর্তী শুনানি না হওয়া পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ নিজগৃহে তাদের ওপর নজরদারি করতে পারবে বলে জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
এ খবর দিয়েছে এনডিটিভি ও আল জাজিরা।
খবরে বলা হয়, বর্ণভিত্তিক সহিংসতা উস্কে দেয়া ও মাওবাদী সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে মঙ্গলবার পাঁচজন বুদ্ধিজীবীকে গ্রেপ্তার করে মহারাষ্ট্র পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে মানবাধিকার সংগঠন পিইউসিএলের প্রধান সুধা ভরদ্বাজ, মানবাধিকার কর্মী ও প্রাবন্ধিক গৌতম নওলাখা ও মাওবাদীদের প্রতি সহানুভূতিশীল কবি ভারভারাও রয়েছেন। পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা গত বছরের শেষের দিকে কোরেগাঁও অঞ্চলে সংঘটিত সহিংসতায় উস্কানি দিয়েছেন। তখন উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে দলিত হিন্দুদের সহিংসতা হয়। এতে অন্তত একজন নিহত হন। এর প্রেক্ষিতে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পরে বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরকে এভাবে গ্রেপ্তারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে রিট করেন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ রোমেলা থাপার, বামপন্থি বুদ্ধিজীবী প্রভাত পট্টনায়ক, সতীশ দেশপাণ্ডেসহ আরো কয়েকজন। ওই রিটের প্রেক্ষিতে বুধবার সুপ্রিম কোর্টে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিচারপতিরা প্রশাসনের ভূমিকার সমালোচনা করেন। বিচারপতি ওয়াইবি চন্দ্রচূড় বলেন, মনে হচ্ছে সরকার সবপক্ষকে স্তব্ধ করে দিতে চায়। পরে সুপ্রিম কোর্ট পিটিশনের পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত গ্রেপ্তারকৃত বুদ্ধিজীবীদের গৃহবন্দি করার জন্য সরকারকে অনুমতি দেন। এছাড়া, পাঁচ বুদ্ধিজীবী গ্রেপ্তারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়েরকৃত পিটিশনের বিষয়ে কেন্দ্র ও মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকারকে নোটিশ পাঠিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। পিটিশনের জবাব দেয়ার জন্য কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে আগামী বুধবার পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। পরেরদিন বৃহস্পতিবার এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবারো শুনানি হবে। পাশাপাশি দেশব্যাপী অভিযান ও গ্রেপ্তারের ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দেখার আহ্বান জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

উত্তাল গুজরাটের রাজনীতি: বাংলাদেশি পাটের বস্তা আমদানি কেলেঙ্কারি

চার হাজার কোটি টাকার কথিত চিনাবাদাম কেলেঙ্কারি নিয়ে গুজরাটের রাজনীতি উত্তাল ছিল। কিন্তু মঙ্গলবার গুজরাটের গান্ধীনগরে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সেই একই কথিত কেলেঙ্কারিতে যুক্ত করা হলো বাংলাদেশের নাম।
গুজরাটের বিধান সভার বিরোধী দলীয় নেতা ও সিনিয়র কংগ্রেস নেতা পরেশ ধানানি এদিন বলেছেন, আরো একটি ‘নতুন কেলেঙ্কারি’ উদ্ঘাটিত হয়েছে। আর সেটা হলো রাজ্যের বিজেপি সরকার ওই চিনেবাদাম বোঝাই করার জন্য বাংলাদেশের কয়েকটি সংস্থার কাছ থেকে পাটের থলি আমদানি করেছিল। আর তাতেও তারা দুর্নীতি করেছে।
বাংলাদেশের কোন কোন সংস্থার কাছ থেকে বিজেপি সরকার পাটের থলি আমদানি করেছে, সে বিষয়ে কংগ্রেস নেতা কোনো ইঙ্গিত দেননি। তবে বিধান সভার বিরোধী দলীয় নেতা আরো আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, ‘পাটের থলে কেলেঙ্কারির উৎপত্তিটা বাংলাদেশেই নিহিত থাকতে পারে।’ (দি অরিজিন অব দি হেসিয়ান স্যাকস স্ক্যাম মে লে ইন বাংলাদেশ।’)
বিরোধী দলীয় নেতা মি. ধানানির অভিযোগ, এই পাটের থলে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করতে গিয়ে রাজ্য সরকার বাংলাদেশে প্রায় ৫০ কোটি টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়, মঙ্গলবার রাজ্য কৃষিমন্ত্রী আর সি ফালদুর সঙ্গে বৈঠকের পরপরই তিনি ওই সংবাদ সম্মেলন ডাকেন।
কংগ্রেস নেতা ধানানি বংলাদেশে কার কার কাছ থেকে পাটের থলে সংগ্রহ করেছে, তাদের প্রত্যেকের নাম, কত দরে এবং মোট কি পরিমাণ কেনা হয়েছে, তার হিসাব অবিলম্বে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি এ বিষয়ে তদন্ত চালানোর দাবি করেছেন। তিনি বাংলাদেশ থেকে এ পর্যন্ত যতো পাটের থলে কেনা হয়েছে, তার মধ্যে কতোটা ইতিমধ্যে ব্যবহৃত এবং কতোটা অব্যবহৃত এবং সেসব থলে এখন কোথায় কি অবস্থায় রয়েছে, তার তথ্য প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছেন।
মি. ধানানি এ প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ করেন যে, চিনেবাদাম কেলেঙ্কারি তদন্তে এর আগে বারংবার বিজেপি সরকারের কাছে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানালেও সরকার সে বিষয়ে নীরবতা পালন করছে। তিনি বলেন, চার হাজার কোটি টাকার চিনেবাদাম কেলেঙ্কারির ঘটনায় সরকার যদি বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ প্রদান না করে তাহলে আমি আবারও ৭২ ঘণ্টার আমরণ অনশনে বসবো।
কংগ্রেস নেতা এর আগে একই বিষয়ে রাজ্যের আমেরেলিতে ৭২ ঘণ্টার এক অনশন ধর্মঘটে অংশ নিয়েছিলেন।
ওই সংবাদ সম্মেলনে কংগ্রেস নেতা পরেশ ধানানি অভিযোগ করেন যে, কৃষিতে ভর্তুকির নামে গুজরাটের বিজেপি সরকার গত ৩ বছরের ব্যবধানে এক লাখ কোটি টাকার কেলেঙ্কারি করেছে। তার কথায়, কৃষি খাতে ‘মোদিফিকেশন’ চলছে। আর তার আওতায় প্রাইভেট কোম্পানিগুলোকে কৃষকদের ‘লুট’ করে সর্বস্বান্ত করার লাইসেন্স দিয়েছে। নামকরণ করেছে শস্যবীমা স্কিম, যার আওতায় এক কোটি রুপির বেশি প্রিমিয়াম দিয়েছেন কৃষকরা। কিন্তু সরকারের কাজ হলো কৃষকদের ফতুর করা। তিনি এই স্কিম বাতিল করে বরাদ্দকৃত টাকা গ্রাম পঞ্চায়েতদের মাধ্যমে সরাসরি বিতরণের দাবি জানিয়েছেন।

জনকল্যাণের জন্যই রাজনীতি ভোটের জন্য নয়

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ জনগণের কল্যাণে রাজনীতি করে, ভোটের জন্য নয়। ক্ষমতা আমাদের কাছে কোনো ভোগের বস্তু নয়, এটা আমাদের দায়িত্ব। গতকাল গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে গোপালগঞ্জে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতাল ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এবং গোপালগঞ্জের পার্শ্ববর্তী ৮ জেলার ২০ উপজেলায় কমিউনিটি ভিশন সেন্টারের উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজনীতি করি জনগণের জন্য। রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য। ভোট দেয়া না দেয়া এটা জনগণের অধিকার। কিন্তু জনসেবা করবো, জনগণকে একটু সুখ শান্তি দেবো, তাদের রোগে চিকিৎসা দেবো, তাদের একটু উন্নত জীবন দেবো, তাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবো-এটাতো রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আমাদের অঙ্গীকার। শেখ হাসিনা বলেন, কি অদ্ভুত আমাদের দেশের মানুষের চরিত্র যে বিএনপি-জামায়াত জোট ২০০১ সালের পর ক্ষমতায় এসেই এই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো বন্ধ করে দিলো।
শুধু এই একটা অজুহাতে যে এই ক্লিনিকে যারা কাজ করবে এবং যারা স্বাস্থ্যসেবা পাবে, তারা সব নৌকায় ভোট দেবে। তিনি বলেন, আমাদের দুর্ভাগ্য ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারেনি, ক্ষমতায় আসলো বিএনপি-জামায়াত জোট। তারা ক্ষমতায় এসেই এই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো বন্ধ করে দিয়ে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবা বন্ধ করলো। স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি মানুষের মৌলিক অধিকার এ কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এজন্যই জাতির পিতা স্বাধীনতার পর যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে প্রতিটি গ্রামে অন্তত ১০ শয্যার একটি করে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। আর বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে এই স্বাস্থ্যসেবা আধুনিকায়নের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কাজ করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতাল ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের ২০ উপজেলার কমিউনিটি ভিশন সেন্টারের কর্মকর্তা, চিকিৎসক এবং উপকারভোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালিক এবং প্রধানমন্ত্রীর সাবেক উপদেষ্টা ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। স্বাস্থ্য বিভাগের সচিব সিরাজুল হক খান অনুষ্ঠানে প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন।
এছাড়া, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, প্রখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. দীন মোহাম্মদ নুরুল হক এবং ভারতের মুম্বাইয়ের অরবিন্দ চক্ষু হাসপাতালের চেয়ারম্যান আর. ডি. রবীন্দ্রান বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতাল ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউট গোপালগঞ্জ থেকে অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় অন্ধত্ব নিবারণ কর্মসূচির আওতায় গোপালগঞ্জে এই চক্ষু হাসপাতাল ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এবং ২০ উপজেলায় কমিউনিটি ভিশন সেন্টার স্থাপন করা হচ্ছে। অরবিন্দ আই কেয়ার সিস্টেম ভারত থেকে সরবরাহকৃত আধুনিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে কমিউনিটি ভিশন সেন্টারগুলোতে চক্ষু চিকিৎসা পাবে জনগণ। পর্যায়ক্রমে সারা দেশে এই কমিউনিটি ভিশন সেন্টার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য সরকারের রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এর আওতায় হতদরিদ্র রোগীদের চক্ষু চিকিৎসার জন্য ২০ কোটি টাকার একটি ট্রাস্ট ফান্ড গঠনেরও ঘোষণা দেন অনুষ্ঠানে। কমিউনিটি ভিশন সেন্টার স্থাপিত ২০ উপজেলা হচ্ছে- গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়া, কোটালিপাড়া, কাশিয়ানী এবং মকসুদপুর, বাঘেরহাটের ফকিরহাট, নড়াইলের লোহাগড়া ও কালিয়া, মোল্লারহাট, চিতলমারি, রামপাল, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, সদরপুর, আলফাডাঙ্গা, বোয়ালমারি, খুলনার রূপসা, দিঘলিয়া, তেরোখাদা, মাদারীপুরের রাজৈর, পিরোজপুরের নাজিরপুর ও রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ। চক্ষু চিকিৎসার এই প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের চোখে ছানি পড়া, গ্লুকোমা, ডায়াবেটিক চক্ষু রোগী, রেটিনোপ্যাথি, কিশোর চক্ষুরোগ, চোখের আঘাতসহ অন্যান্য চক্ষু রোগ শনাক্ত করা এবং এর তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেয়া হবে এসব সেন্টারে।
এরপর আরো উন্নত সেবার জন্য তারা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতাল ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা সেবা নিতে পারবে। চক্ষু রোগে আক্রান্তদের সচেতনতা ও চিকিৎসায় সহযোগিতা করতে জনপ্রতিনিধিসহ সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি চক্ষু চিকিৎসকসহ এ সেবায় জড়িতদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ছোটবেলা থেকেই পড়ে এসেছি অন্ধজনে দাও আলো। এর চেয়ে মহৎ কাজ আর কিছু হতে পারে না। তিনি বলেন, একজন মানুষের দৃষ্টি শক্তি ফিরে পাবে, সে তার আপনজনকে দেখবে, এই সুন্দর পৃথিবীকে দেখবে, এটা অনেক বড়, মানবতার কাজ। এ সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে থেকে আজীবন ত্যাগ স্বীকার করে যাওয়া মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের অবদানের কথা স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, আমি সব সময় মনে রাখি যে আমার বাবা দেশ স্বাধীন করে গেছেন।
কাজেই জনগণের সেবা করাটাই আমার প্রথম কর্তব্য। মানুষের সেবা করাটাকে আমি কর্তব্য হিসেবে নেই। সরকার প্রধান বলেন, আমরা জেলা পর্যায়ে মেডিকেল কলেজ করেছি। দেশের প্রথম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছি। দুটো মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যে করা হয়েছে। আরো একটা করার পরিকল্পনা আছে। এভাবে পর্যায়ক্রমে আমাদের লক্ষ্য, প্রতিটি ডিভিশনাল হেডকোয়ার্টারে আমরা একটা করে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় করে দেবো।

রোহিঙ্গা ইস্যু: জাতিসংঘে আলাপ হলো, উদ্যোগ নেই

রোহিঙ্গা ইস্যুতে জোরালো বিতর্ক হয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে। সেখানে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নৃশংস নির্যাতনের বিচার  দাবি করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরাঁ। পাশাপাশি মঙ্গলবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি মিয়ানমারের এ অপরাধকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে নেয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছে সুইডেন ও নেদারল্যান্ডস।
কিন্তু মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠবন্ধু রাষ্ট্র চীন মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্ভাব্য সব উপায় অবলম্বন করে মিয়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবর্তনে কাজ করতে দেয়া উচিত। ওদিকে অস্কার বিজয়ী অভিনেত্রী ও জাতিসংঘের শুভেচ্ছাদূত কেট ব্লানচেট বলেছেন, আমরা রোহিঙ্গাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছি। তিনি মঙ্গলবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বক্তব্য দেন।
ব্লানচেট বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ওপর যে ভয়াবহ গণহত্যা চালিয়েছে তার বীভৎস চিত্র তার মনের ভেতর। এমন অভিজ্ঞতার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবিরে তাদের ভয়াবহ দুর্ভোগ নিজের চোখে দেখেছেন তিনি। কেট ব্লানচেট নিজে একজন মা। তাই শরণার্থীদের প্রতিটি শিশুকে দেখে তার মনে নিজের সন্তান যেন জেগে উঠেছিল। আবেগতাড়িত কেট ব্লানচেট নিরাপত্তা পরিষদের কাছে প্রশ্ন রাখেন, নিজের শিশুকে আগুনে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে এই দৃশ্য কোনো মা সহ্য করতে পারেন? আমাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই। আমরা রোহিঙ্গা ইস্যুতে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা যেন আবার ব্যর্থ না হই। বার্তা সংস্থা এপির খবরে এ কথা বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংস নির্যাতনের বছরপূর্তিতে মঙ্গলবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক বসে। সেখানে জাতিসংঘ মহাসচিব ওই আহ্বান জানান।
বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদেরকে দেখা হয় বহিরাগত হিসেবে, যদিও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা সেখানে বসবাস করছে। ১৯৮২ সাল থেকে সেখানে প্রায় সব রোহিঙ্গার নাগরিকত্ব প্রত্যাখ্যান করা হয়। এর ফলে তারা হয়ে পড়ে রাষ্ট্রহীন। তাদের চলাফেরা ও মৌলিক অধিকার প্রত্যাখ্যান করা হয়। গত বছর ২৫শে আগস্ট আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা) হামলা চালায় নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের ওপর। এতে তাদের কয়েকজন নিহত হয়। এর প্রতিশোধ নিতে সেনারা নিরস্ত্র সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর চালাতে থাকে নৃশংস নির্যাতন। ধর্ষণ, হত্যা, নির্যাতন, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়।
বিষয়টিকে জাতিসংঘ মহাসচিব জাতি নিধন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি মঙ্গলবার নিরাপত্তা পরিষদের কাছে জাতিসংঘের তদন্ত ও সুপারিশের বিষয়ে কথা বলেন। বলেন, এসব তদন্ত ও সুপারিশ জাতিসংঘের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পরিষদ বা সংগঠনের গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার দাবি রাখে। তিনি বলেন, জবাবদিহি বা বিচারের মেকানিজম বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ, পক্ষপাতহীন, নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি মিয়ানমারের যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে তা নিশ্চিত করতে কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘে নিযুক্ত সুইডেনের উপ রাষ্ট্রদূত কার্ল স্কাউ আরো একটু এগিয়ে বলেছেন, মিয়ানমারের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী যে ভয়াবহ মাত্রায় নৃশংসতা চালিয়েছে তাতে তার দেশ রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠানোর আহ্বান জানায়। তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি সামনে এগিয়ে যাওয়ার এখনই সময়। এ বিষয়ে পরিষদের সদস্যদের মধ্যে একটি প্রস্তাবের বিষয়ে আমাদের উচিত পরামর্শ করা।
নিরাপত্তা পরিষদের ওই অধিবেশনে বক্তব্য দেন মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত ইউ হাউ ডো সুয়ান। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের সঙ্গে তার সরকার কেন সহযোগিতা করেনি সে বিষয়ে তিনি বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, তারা পক্ষপাতিত্বহীন হবে কি না এ নিয়ে উদ্বেগ ছিল বলে তার সরকার ওই মিশনকে সহযোগিতা করেনি। তিনি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের এই বৈঠকের আগে প্রকাশ করা হয়েছে ওই রিপোর্ট। ফলে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের উদ্দেশ্য, পক্ষপাতিত্বহীনতা ও আন্তরিকতা নিয়ে গুরুত্বর প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় উগ্রপন্থি একটি গ্রুপ যে হামলা চালিয়েছিল তার প্রেক্ষিতে প্রতিটি নাগরিকের জান ও মালের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য মিয়ানমারের নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা অভিযান চালিয়েছে। এর ফলে অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে মিয়ানমার সরকার একটি ইন্ডিপেন্ডেন্ট কমিশন অব ইনকুয়ারি গঠন করেছে।
তারা এক বছরের মধ্যে রিপোর্ট দেবে। এতে নেতৃত্বে রয়েছেন ফিলিপাইনের সাবেক উপ পরারাষ্ট্রমন্ত্রী রোজারিও মানালো। তার সঙ্গে আছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত জাপানের সাবেক রাষ্ট্রদূত কেনজো ওশিমা ও মিয়ানমারের দুজন সদস্য। নিরাপত্তা পরিষদে বক্তব্য দেন চীনের জাতিসংঘে নিযুক্ত উপ রাষ্ট্রদূত উউ হাইতাও।
তিনি বলেন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে রাখাইন ইস্যুটি দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধান করা উচিত। এখন যে বিষয়ে জোর দেয়া উচিত তা হলো যত তাড়াতাড়ি পারা যায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন শুরু করা। এক্ষেত্রে কোনো পূর্বশর্ত দেয়া উচিত নয়। প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া চলাকালে অবাধে চলাফেরা ও নাগরিকত্বের মতো বিষয়গুলো আস্তে আস্তে সমাধান করা উচিত। এক্ষেত্রে রাখাইনে যে দারিদ্র কমে আসছে সেদিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের।
তাই ধৈর্য ধরা উচিত এবং মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনাকে প্রমোট করা উচিত। এক্ষেত্রে একটি ভারসাম্য ও সংঘাতহীন একটি পদক্ষেপের আহ্বান জানান জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া। তিনি বলেন, রাখাইনের গভীর সমস্যাকে শান্তিপূর্ণ ও কূটনৈতিক উপায়ে সমাধান করা উচিত। তিনি আশা করেন, এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই ধৈর্যের পরিচয় দেবেন।
পরিষদে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন। তিনি বলেন, প্রতি সপ্তাহেই রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নতুন নতুন প্রমাণ মিলছে। তাদের বিরুদ্ধে যে নৃশংস অপরাধের প্রমাণ বেরিয়ে আসছে তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি নিরাপত্তা পরিষদকে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান। এক্ষেত্রে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, কিন্তু তা এখন পর্যন্ত ন্যূনতমভাবে শুরুও করা যায়নি। যতক্ষণ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের তাদের নিরাপরাত্তা, নিজেদের বাড়ি ফেরা, চলাফেরার স্বাধীনতা, কাজ করার সুযোগ, মিয়ানমারে তাদের নাগরিকত্বের দাবি মেটানো হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া শুরু করা যাচ্ছে না।
নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বৃটিশ মন্ত্রী লর্ড তারিক আহমাদ। তিনি বলেন, অনেক দেশই এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করছে। বাংলাদেশকে সহায়তা করার নতুন করে প্রতিশ্রুতি রয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যা রাজনৈতিকভাবে সমাধানের একটি চুক্তি রয়েছে। তবে যা করার তার মধ্যে জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যারা এসব অপরাধ করেছে তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। ২০১৭ সালের আগস্টের পর জাতিসংঘের এজেন্সি ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এটা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।

লেখক ও সমাজকর্মীদের গ্রেপ্তারে ভারতে তীব্র প্রতিক্রিয়া

ভারতের পুলিশ মঙ্গলবার বিভিন্ন রাজ্যে হানা দিয়ে ৫ জন খ্যাতনামা লেখক, বুদ্ধিজীবী ও মানবাধিকার কর্মীকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় দেশ জুড়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন  বুদ্ধিজীবী থেকে রাজনীতিবিদ সকলেই। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার, অর্থনীতিবিদ প্রভাত পট্টনায়েক, সতীশ দেশপান্ডে, মায়া দারনাল প্রমুখ ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ধৃত ৫ জনের মুক্তি দাবি জানিয়ে বুধবারই আবেদন করেছেন। বুধবার বিকেলেই এই আবেদনের শুনানী হওয়ার কথা। মঙ্গলবার হায়দরাবাদ থেকে কবি ভারভারা রাও, ফরিদাবাদ থেকে শীর্ষ মানবাধিকার সংগঠন পিপলস ইউনিয়ন অফ সিভিল লিবার্টিজ বা পিইউসিএলের প্রধান সুধা ভরদ্বাজ, দিল্লি থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী গৌতম নওলাখা, মহারাষ্ট্র্রের থানে থেকে আইনজীবী  ও মানবাধিকার কর্মী অরুণ ফেরেরা এবং মুম্বই থেকে আইনজীবী ভেনন গঞ্জালভেজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরা প্রত্যেকেই বামপন্থী হিসেবে সুপরিচিত। পুলিশের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে হত্যার এক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে এদের যোগসাজশ পাওয়া গিয়েছে। এই গ্রেপ্তারের নিন্দা করে লেখিকা অরুন্ধতী রায় বলেছেন, ঠিক যেন জরুরি অবস্থা। ওদের উচিত গোরক্ষার নামে যাঁরা গণপিটুনি দিয়ে সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে এবং উস্কানি দিচ্ছে, তাঁদের গ্রেপ্তার করা। ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ টুইটারে গ্রেপ্তারের নিন্দা করে বলেছেন, এটি খুবই উদ্বেগজনক। দেশের স্বাধীন কন্ঠগুলো রুদ্ধ করার এই অভিযান বন্ধ করতে সুপ্রিম কোর্টের এখনই হস্তক্ষেপ করা উচিৎ। সমাজবিজ্ঞানী রণবীর সমাদ্দার বলেছেন, এই গ্রেপ্তারের ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়। দেশজুড়ে এরকম ঘটনা আরও ঘটছে। রাজনীতি নিয়ে সুস্থ আলোচনার পরিবেশটাই নষ্ট হতে চলেছে। বিরুদ্ধে কথা বললেই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। মানবাধিকার কর্মী রণজিৎ সুর বলেছেন, যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁরা প্রত্যেকেই বিজেপি-আরএসএসের অসাধু কার্যকলাপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছিলেন। দেশজুড়ে দলিত-আদিবাসী এবং মুসলিমদের উপরে যে ভাবে নির্যাতন চালানো হচ্ছে, তার প্রতিবাদ করছিলেন এঁরা। গুজরাটের দলিত নেতা জিগ্নেশ মেবাণি, সাংবাদিক পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা নকুল সিংহ, সমাজকর্মী স্বামী অগ্নিবেশ ও আরও অনেকে এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন,  বিজেপির বিরুদ্ধে যাঁরাই সুর চড়িয়েছেন, তাঁদেরই পরিণতি ভয়ানক হয়েছে। ধৃত ৫ জনই পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য লড়াই চালাচ্ছেন। এঁদের গ্রেপ্তারের একটাই উদ্দেশ্য, ভয় দেখানো। ২০১৯ লোকসভা ভোটের আগে এভাবে মেরুকরণের রাজনীতি করতে চাইছে বিজেপি।  ৫ বিশিষ্ট লেখক ও সমাজকর্মীকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানিয়ে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, ভয়-ভীতির পরিবেশ সৃষ্টির বদলে ভারতের উচিত মত প্রকাশ, সভা সমিতি গঠন এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা করা। এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, বিদ্বজ্জনদের প্রতিবাদী ভাবমূর্তি এবং কাজকর্মের জন্যই কি তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে?

‘বিএনপির সঙ্গে আলাপ হবে’ -ড. কামাল

জাতীয় ঐক্যের ব্যাপারে বিএনপির সঙ্গে আলাপ হবে বলে জানিয়েছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেছেন, দেশে এখন স্বৈরতন্ত্র চলছে। আমাদের লক্ষ্য হবে  গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া। ডিসেম্বরের নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কিনা উপস্থাপিকার এমন প্রশ্নে ড. কামাল বলেন, অংশগ্রহণমূলক হবে বলে আশা করি। কিন্তু আশা দেখি না। বেসরকারি টেলিভিশন ‘ডিবিসি নিউজ-এর টকশো ‘রাজকাহন’-এ গণফোরাম সভাপতি এসব কথা বলেন। মঙ্গলবার রাতে অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয়।
এতে ড. কামাল ছাড়াও অংশ নেন সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নবনীতা চৌধুরী। শুরুতেই সঞ্চালক ড. কামাল হোসেনকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করেন জাতীয় ঐক্য মূলত কিসের জন্য? এই জোটে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে কিনা? ড. কামাল হোসেন বলেন, বিএনপি বলছে, তারা গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। জাতীয় ঐক্যেরও লক্ষ্য গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া। এ হিসেবে বিএনপির সঙ্গে আমাদের আলাপ হবে।
উপস্থাপিকা জানতে চান বিএনপি মহাসচিবের সঙ্গে একান্ত আলাপে সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক বি. চৌধুরী বলেছেন- জোট ১৫০টি আসন চায়। তাহলে একটা ব্যালেন্স অব পাওয়ার নিশ্চিত হবে। জবাবে ড. কামাল বলেন, কি ধরনের ইলেকশন হয় তা দেখতে হবে। প্রথমত দেখবো গ্রহণযোগ্য ইলেকশন হবে কিনা। দ্বিতীয়ত, জনগণ নির্ভয়ে ভোট দিয়ে সরকার পরিবর্তন করার সুযোগ পাবে কিনা।
একই প্রশ্নে মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, এই জোটে যে ফেসগুলো দেখি তাদের সবার একটি রাজনৈতিক অতীত আছে।
নবনীতা চৌধুরীর প্রশ্ন- ঐক্য প্রক্রিয়া মালয়েশিয়া মডেলকে মাথায় রেখে কিনা? ক্ষমতায় যাওয়া হবে এবং আনোয়ার ইব্রাহীমের মতো খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করা হবে?
ড. কামাল বলেন, দুই দেশের সঙ্গে তুলনা করলে হবে না। আমরা মূলত গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাই। ভোট হয়ে যাবার পর কেউ হেরেছে, কেউ জিতেছে- এর মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় না।
উপস্থাপিকার প্রশ্ন- বিএনপির ভোট রয়েছে। আপনারা কি ঠিক করলেন রাশ টেনে রাখবেন। এই ব্যবস্থাটা কি গণতান্ত্রিক? ড. কামাল বলেন, এরকম দাবি তো আমরা করি নাই। জোটবদ্ধভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেইনি। ড. কামাল বলেন, সিট নিয়ে আলোচনা অবশ্যই হবে। তখন কে কত সিট চাচ্ছে, পাচ্ছে তার সুরাহাও হবে।
উপস্থাপিকার প্রশ্ন-কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, সরকার গঠন করলে আপনাকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করবেন। এই প্রস্তাব কোথা থেকে এলো? ড. কামাল বলেন, আসলে এটা আমার কথা ছিল না।
নবনীতার প্রশ্ন- আওয়ামী লীগ কেন মনে করে আপনি ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত। তাদের নেতারা বলছেন- ১/১১-এর মতো অনির্বাচিত সরকার আনার কুশীলবদের মধ্যে আপনি একজন। আইনমন্ত্রী বলছেন আপনি জুডিশিয়াল ক্যু করার চেষ্টা করছেন?
ড. কামাল বলেন, এটা ভিত্তিহীন এবং মানহানিকর বক্তব্য। এটা টোটালি মিথ্যা। মানহানির মামলা করে সময় নষ্ট করতে চাই না। আমি মনে করি এটা সম্পূর্ণ মানহানিকর।
ড. কামাল বলেন, ২০০৭ সালে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে হলে শেখ হাসিনা কি কি বিষয় আলোকপাত করেছেন সেটা দেখেন। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে সকলে সমান সুযোগ পায় না। সংবিধানের কথা এলে ড. কামাল বলেন, আইন-সংবিধান আমাকে দেখানোর দরকার নেই। দেশে তথাকথিত ইলেকশন হয়েছে। এখন স্বৈরশাসন চলছে দেশে। আমাকে সংবিধানের কথা বললে দুঃখ লাগে।