Thursday, May 24, 2018

প্রহরী এসে জানান, মাহাথির একটি অনুরোধ করেছেন

রাজনীতিতে যা যা দেখার আছে আনোয়ার ইব্রাহিম তার সবই দেখেছেন। কারাগার দেখেছেন, প্রতারণা দেখেছেন, আদালত দেখেছেন, সবচেয়ে উঁচু কার্যালয় দেখেছেন, আবার নির্বাসনও দেখেছেন। আর গত সপ্তাহে সমকামিতার দায়ে দণ্ডিত এই রাজনীতিবিদ কারাগার বিজয়ীর বেশে থেকে ছাড়া পেয়ে একেবারে নতুন আলোতে স্বাধীনতার মুখও দেখেছেন। আনোয়ার  বলেন, আমি সবসময় গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও উদারমনা ধ্যান-ধারণা সমপর্কে কথা বলেছি। কিন্তু এসব অভিজ্ঞতা অর্জন করা সমপূর্ণ ভিন্ন এক বিষয়। এতে করে আপনি আপনার আদর্শগুলোকে আরো মূল্যায়ন করতে শিখবেন। তিনি বলেন, আপনার কাছ থেকে যখন স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হবে, তখন সেটা হবে নির্যাতন। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে বৃটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের রোববারের সংস্করণ অবজারভারে আনোয়ার ইব্রাহিমের এক বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। তাতে এসব কথা বলেছেন দেশটির সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী।
বহুদিন ধরে মালয়েশিয়ায় সংস্কার ও আশার মুখ হয়ে আছেন ইব্রাহিম। বর্তমানে নতুন অর্জিত স্বাধীনতা বেশ ভালোভাবেই উপভোগ করছেন তিনি। রাজার কাছ থেকে রাজ ক্ষমাতো পেয়েছেনই, তার সঙ্গে এই প্রথমবারের মতন তার সংস্কারবাদী চিন্তাধারাকে সমর্থন জানিয়েছে মালয়েশিয়ার জনগণ। স্বাধীনতা অর্জনের পর এই প্রথমবারের মত দেশটিতে ক্ষমতায় এসেছে বিরোধীদলীয় সরকার।
বিষয়টি আরো অসাধারণ করে তুলেছে ৯২ বছর বয়সী ঝানু রাজনীতিবিদ, মালয়েশিয়ার দীর্ঘতম সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা মাহাথির মোহাম্মদের আগমন। ইব্রাহিমের বদলে তার দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন মাহাথির। অথচ এককালে এই মাহাথিরই ইব্রাহিমকে সমকামিতার অভিযোগে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু এই প্রথমবার নিজ দল বারিসান ন্যাসিওনাল নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে লড়েছেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল নিজের শিষ্য নাজিব রাজাককে পরাজিত করা। সফলও হয়েছেন মাহাথির। গড়েছেন ইতিহাস। প্রয়োজনের খাতিরে শত্রুকে বন্ধু বানিয়েছেন। সুযোগের সঠিক ব্যবহার করেছেন ইব্রাহিমও।
১৯৮১  থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত টানা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মাহাথির। তখন বারিসান ন্যাসিওনাল জোটের অংশ ইউএমএনও দলের প্রধান হিসেবে নির্বাচনে লড়েন তিনি। আনোয়ার তখন তার প্রিয় শিষ্য। ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত সবকিছু ঠিকই ছিল। কিন্তু আনোয়ার যেই একবার সাহস করে মাহাথিরের বিরোধিতা করলেন, তৎক্ষণাৎ তাকে বরখাস্ত করা হলো। কারাগারে পাঠানো হলো সমকামিতার অভিযোগ এনে। ১৫ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন আনোয়ার। তবে ছয় বছর পরে ২০০৪ সালে তাকে মুক্ত করে দেয়া হয়। এই ছয় বছর তার পরিবারের সঙ্গেও দেখা করতে দেয়া হয়নি তাকে।
জেল থেকে ছাড়া পেয়ে নতুন দল গঠন করেন আনোয়ার ইব্রাহিম। নাম দেন পাকাতন হারাপান (পিকেআর)। পুনরায় যখন রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পেলেন তখন ক্ষমতায় নাজিব রাজাক। ২০১৩ সালের নির্বাচনে নাজিবের কাছে হারলেন। কিন্তু জনগণের কাছে তার জনপ্রিয়তা আরো বাড়লো। নাজিব আতঙ্কিত হয়ে তাকে আবার সমকামিতার অভিযোগ এনে কারাগারে পাঠালেন। আনোয়ারের ভাষ্যমতে, আমি তাকে কখনোই সমর্থন করিনি। তার বিরুদ্ধে আমার শক্ত অবস্থান ছিল। তৎকালীন সময়ে সে এই বিষয়টি বেশ ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছিল। একারণেই সে আমায় শেষ করে দিতে চেয়েছিল।
দ্বিতীয়বার কারাগারে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে আনোয়ার বলেন, এটা জেনে কারাগারে থাকা সহজ ছিল না যে, ২০১৩ সালের নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হলে আমরা জিততাম আর আমি কারাগারে থাকতাম না। দেশের রাজনৈতিক সিস্টেমের ওপর ক্ষোভ জন্মায়নি? এমন প্রশ্নের সোজা জবাব দিয়ে আনোয়ার বলেন, হ্যাঁ। কিন্তু দীর্ঘ সময় জেলে কাটানোর পর, এত বছর পার হওয়ার পর, আপনার ভেতরে আসলে সেই তিক্ততাটা থাকে না। আমি কোনো মহান মানবহিতৈষী, দরদি মানুষ হওয়ার ভান করছি না। কিন্তু সত্যিই আমার মধ্যে আর সেই তিক্ততা নেই। সবশেষে আপনি সিদ্ধান্ত নেবেন আর খুলতে থাকা নাটক মেনে নেবেন।
এইবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বিস্ময়কর উপাদান ছিল মাহাথির-আনোয়ার জোট। আর এই বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি হতবাক হয়েছিলেন আনোয়ার নিজে। কেননা, যতকিছুই ঘটুক, এইবার মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে উত্থান-পতনের ঘটনা যতটা না রাজনৈতিক ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল ব্যক্তিগত আর প্রতিশোধমূলক।
১৯৯৮ সালে উপ-প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর আনোয়ারকে তার সরকারি বাসভবন ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়। আনোয়ারের তখন ছোট একটি পরিবার। ছোট ছোট সন্তান। সন্তানদের জন্য মাহাথিরের কাছে কয়েকদিন সময় চেয়েছিলেন আনোয়ার। জবাবে আনোয়ারের বাসভবনের পানির ও বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দিয়েছিলেন মাহাথির।  সমকামিতার অভিযোগে অভিযুক্ত আনোয়ার আদালতের বাইরে দাঁড়িয়ে মাহাথিরকে এমনভাবে বর্ণনা করেছিলেন: মাহাথির একজন ভীতু, যিনি নিজের অপকর্মের দায়ভার নিতে রাজি নন। তার ক্ষমতার লালসা অনিবারণীয়। প্রতিক্রিয়ায় কারাগারে আনোয়ারকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেননি মাহাথির। এমনকি ২০০৪ সালে আনোয়ার ছাড়া পাওয়ার পরও মাহাথির তার প্রতিশোধ অব্যাহত রাখেন। ২০০৫ সালে এক বক্তব্যে তিনি বলেন, একজন সমকামী প্রধানমন্ত্রী থাকার কথা চিন্তা করুন। কেউ নিরাপদ থাকবে না। প্রতিক্রিয়ায় মাহাথিরের বিরুদ্ধে অপবাদের অভিযোগে মামলা করার ব্যর্থ চেষ্টা চালান আনোয়ার।
এই বছরের জানুয়ারিতে আনোয়ারের সঙ্গে কারাগারে দেখা করতে যান মাহাথির। পুনর্মিলনের ও সহযোগিতার প্রস্তাব রাখেন মাহাথির। আনোয়ার জানান, মাহাথিরের আগমন নিয়ে বেশ সন্দেহপ্রবণ ছিলেন তিনি। প্রাথমিক পর্যায়ে মাহাথিরকে তিনি বলেন, কি কারণে আমি আপনার সঙ্গে হাত মেলাতে যাবো? আমি আপনাকে ক্ষমা করে দেবো। বিদায়। ব্যাস এটুকুই। আনোয়ার বলেন, কিন্তু তার সঙ্গে আলোচনার পরও আমি লোকটাকে যেভাবে চিনি- আত্মবিশ্বাসে ভরা, কিছুটা অসংযত একজন মানুষ- হঠাৎ করে আমায়, তার চিরশত্রুকে কারাগারে দেখতে আসার মানে হচ্ছে হয়তো তিনি মরিয়া বা আসলেই তার মধ্যে কিছু পরিবর্তন এসেছে। আর ঠিক তাই ঘটেছে।
আনোয়ার সম্মতি দিলেও তার সন্তানরা মাহাথিরকে মেনে নিতে চায়নি। তিনি বলেন, আমার সন্তানেরা নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি হয়নি। তারা কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। তারা বুঝতে পারছিলো না, কেন আমি এই মানুষটার সঙ্গে দেখা করেছি যে আমাদের জীবনগুলো নরক বানিয়ে দিয়েছে। প্রসঙ্গত, আনোয়ারের মেয়ে নুরুল ইজ্জাহ বর্তমানে নিজ যোগ্যতায় বিরোধী দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন।
আনোয়ার বলেন, তারা আমার সঙ্গে সম্মত হতে চায়নি। আমায় বলেছিল, আমার মাহাথিরের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে যাওয়া উচিত নয়। বলেছিল, আপনি নির্যাতিত হয়েছেন, আমরা সবাই নির্যাতিত হয়েছি, তার কারণে। কিন্তু আমি তাদের বললাম, যখন তোমার পুরনো কথিত শত্রু এসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, চলো অতীত ভুলে বন্ধু হয়ে যাই, তখন তুমি কিইবা করতে পারো? এমন প্রস্তাবে না বলা কঠিন।
যাই হোক, মাহাথির তার কর্মের জন্য আনোয়ারের কাছে সঠিকভাবে ক্ষমা চাইতে ব্যর্থ হয়েছেন। যদিও তিনি বলেছেন, আনোয়ারকে বরখাস্ত করা তার ঠিক হয়নি। আনোয়ারের ভাষ্যমতে, মাহাথিরের কাছ থেকে এটুকুই যথেষ্ট।
কারাগারে থাকাকালীন অবস্থায়ই বাইরের পরিস্থিতি টের পাচ্ছিলেন আনোয়ার। একসময়কার শত্রুতাপরায়ণ প্রহরীরা আচানক ভালো ব্যবহার করা শুরু করলো। বাইরে যে বিরোধী দলের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছিল তা নিশ্চিত বুঝেছিলেন তিনি। এমনকি নির্বাচনের দিন প্রহরীরা চুপিচুপি এসে এটাও বললো যে, তারা আনোয়ারের দলকে ভোট দিয়েছেন। তবে সবশেষে আরো একটি চমক বাকি ছিল আনোয়ারের জন্য। নির্বাচনের রাতে এক প্রহরী এসে তাকে একটি ফোন ধরিয়ে দেয়। প্রহরী জানায়, প্রধানমন্ত্রী (মাহাথির) তাকে একটি অনুরোধ করেছেন। নাজিব এটা মানতে চাননি যে, তিনি নির্বাচনে হেরে গেছেন। আনোয়ার কি তাকে বোঝাবে যাতে তিনি পরাজয় মেনে নেন?
নাজিবের সঙ্গে তিক্ত ইতিহাস সত্ত্বেও আনোয়ার কথা বলতে রাজি হন। আনোয়ার জানান, নাজিবের সঙ্গে ফোনালাপের সময় তিনি যা পেয়েছিলেন তা হচ্ছে, অপরপ্রান্তে একজন প্রচণ্ড ভীতু মানুষ কথা বলছেন। নাজিব প্রত্যাখ্যানের ভারে চূর্ণ হয়ে গিয়েছিলেন। আনোয়ার জানান, দ্বিতীয় ফোনকলের পরও নাজিব পরাজয় মেনে নিতে চাননি। তিনি বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন।
পরিহাস হচ্ছে একদিকে আনোয়ার যখন জেল থেকে ছাড়া পেলেন, নাজিব তখন জেলে যাওয়ার পথে আছেন। কারাগার নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জন্য কোনো উপদেশ দিবেন কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে আনোয়ার মুচকি হেসে বলেন: ভালো আইনজীবী রাখা আর অনুশোচনা প্রকাশ করা দরকার।

বাংলাদেশকে উপেক্ষা করে নিজেদের বিপদ ডাকছি -পলিসি ফোরামের নিবন্ধ by আইজ্যাক কফির

১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে পূর্ব পাকিস্তান একটি স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ হিসেবে জন্ম নেয়। এরপর থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আধিপত্যের পালাবদল হয়েছে দু’টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে। এর একটি হলো বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি।
১৯৪১ সালে ভারতীয় ইসলামপন্থি নেতা আবুল আলা মওদুদী প্রতিষ্ঠিত জামাতে ইসলামীর একটি মিত্র দল বিএনপি। ১৯৭১ সালে এই জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। কেননা, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানের ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা প্রত্যাখ্যান করে। তখন থেকেই জামায়াত বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। যদিও ২০১৩ সালে দলটির নিবন্ধন বাতিল করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার জামাতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে মদত দেয়ার অভিযোগ তুললে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়।
আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মুহাম্মদ এ আরাফাত রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের বিষয়ে বলেন, ‘জামায়াত একটি উগ্র মৌলবাদী দল যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। স্বাধীনতার বিরোধিতা করে তারা নিজেদের জনগণকে হত্যা করেছে। এ দলটি নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। তাদের আদর্শ ও কর্মকাণ্ড গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা বিরোধী।’
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে উগ্রপন্থা উত্থান নিয়ে যাদের উদ্বেগ রয়েছে তাদের জন্য বাংলাদেশকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সুনির্দিষ্টভাবে কয়েকটি বিষয় রয়েছে যা বাংলাদেশিদের সালাফি জিহাদিজমে সমর্থন দিতে উৎসাহিত করতে পারে।
প্রথমত, জামায়াতে ইসলামী ও আল-কায়েদার মতো জঙ্গি সংগঠনগুলো দাবি করে, যেহেতু বাংলাদেশ ব্লগার ও নাস্তিকদেরকে তাদের অনৈসলামিক মতবাদ প্রচারের অনুমতি দেয়, তাই এ দেশ ইসলামকে ত্যাগ করেছে। আল-কায়েদার নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরি দেশটির বিরুদ্ধে মুসলিমদের হত্যার অভিযোগ করেছেন।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসবাদের হুমকিকে অব্যাহতভাবে ভিন্নমত দমন ও বিরোধীদের দুর্নাম করতে ব্যবহার করছে।
এ বছরের শুরুতে খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয় যা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আড়াই লাখ ডলার (২,৫২,০০০ ডলার) অর্থ আত্মসাতের দায়ে অভিযুক্ত হওয়ার পর খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। আর তার ছেলেকে দেয়া হয় ১০ বছরের কারাদণ্ড। বিএনপি দাবি করেছে, এ বিচার ও রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তারা অকারণেই এমনটি বলেনি। এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে বিএনপির ৩ হাজারেরও বেশি কর্মীকে জেলে ঢুকিয়েছে সরকার।
বিএনপি আরো অভিযোগ করেছে যে, শেখ হাসিনার শাসনামলে নিরাপত্তা বাহিনী ভিন্নমতের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বিচারবহির্ভূত হত্যা, জোরপূর্বক গুম ও নির্যাতনের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনী জড়িত।
ভিন্নমত চর্চার সুযোগ কমিয়ে এবং তা মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহার করে সরকার এই অভিযোগের ভিত্তি স্থাপন করেছে যে, দেশ একদলীয় শাসনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
এটা সরকার বিরোধীদেরকে ইসলামের ব্যানারে সমবেত হতে উৎসাহিত করতে পারে। যার সাহায্যে আওয়ামী লীগের দুর্নীতি, কীভাবে দলটি ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানুষকে নিগ্রহ করছে এবং একটি ধর্মভিত্তিক দলের অধীনে বাংলাদেশ কীভাবে একটি সমৃদ্ধ সমঅধিকারের দেশে পরিণত হবে- এসব মতবাদ প্রচার করা হতে পারে।
বার্মার রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী আরেকটি উদ্বেগের বিষয়। তাদের ওপরে চালানো নির্যাতনের সঙ্গে মিয়ানমারের সাবেক জেনারেল নে উইনের উগ্র-জাতীয়তাবাদী ‘মিয়ানমারাইজেশন’ নীতি ও তার বৌদ্ধ ধর্মবিশ্বাসের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের জাতীয়তা ছিনিয়ে নেয়া হয়। কার্যত নিজের দেশেই তাদের রাষ্ট্রহীন করা হয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে। পাকিস্তান, সোমালিয়া ও ইয়েমেনের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি যে, শরণার্থী শিবির নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। সুন্দর ভবিষ্যতের কথা বলে মানবপাচারকারী, চোরাচালানকারী ও উগ্রপন্থিরা শরণার্থীদের দুর্দশার সুযোগ নিতে পারে। আল-কায়েদা ও দায়েশ (ইসলামিক স্টেট) রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশার সুযোগ নেয়ার প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে বাংলাদেশের সরকার এখনো দেশে বিদেশি জিহাদিদের উপস্থিতির কথা স্বীকার করে নি।
বাংলাদেশ টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি সময় অতিবাহিত করেছে। গত বছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭.২ শতাংশে পৌঁছেছে। পরপর তিন বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল সাত শতাংশের ওপরে। যা হোক, সরকার শুধু ঢাকা শহরেই উন্নয়ন করছে এমন দাবি তুলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সফলতাকে খাটো করে দেখা হচ্ছে। এটা শুধু মানুষকে কাজের খোঁজে রাজধানীতে পাড়ি জমাতেই উৎসাহিত করছে। এটাই বুঝিয়ে দেয় যে, কেন দেশের শহুরে জনগোষ্ঠীর ৩৬ শতাংশই ঢাকায় বসবাস করে। যা ঢাকাকে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহরে পরিণত করেছে।
এই অর্থনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশে আধুনিকীকরণ করেছে যেখানে এখন একটি এলজিবিটি ম্যাগাজিন আর ধর্মনিরপেক্ষতা ও ব্লগের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। একইসঙ্গে আধুনিকায়ন বর্তমান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অসন্তোষ তৈরি করছে। একই সঙ্গে দুর্বল অবকাঠামো, মৌলিক সেবা ও নিরাপত্তায় সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।
এই পরিবেশে জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম বা ছাত্রশিবিরের মতো ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আল কায়েদা নিজেদেরকে মিত্র হিসেবে উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ বলতে যা বোঝায় তার বিরুদ্ধে মতবাদ প্রচার করছে।
নিজেরাই সন্ত্রাসী হামলা করার পরিবর্তে আল কায়েদা বাংলাদেশের মুসলিমদেরকে এই বার্তা দিচ্ছে যে, তারা নিজেদের সরকারের কাছেই হামলার শিকার। যাতে সমর্থন দিচ্ছে পশ্চিমারা। আল কায়েদার নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরি দাবি করেছেন, ‘বাংলাদেশ একটি বৃহৎ কারাগারে পরিণত হচ্ছে। যেখানে মুসলিমদের ধার্মিকতা, সম্মান ও পবিত্র স্থানের মর্যাদা লঙ্ঘন করা হচ্ছে। তাদের জীবন বিপন্ন। তারা নির্যাতিত হচ্ছে। দেশটি ইসলামের সঙ্গে রাজনৈতিক, সামরিক ও আদর্শগতভাবে যুদ্ধ করছে।’
এদিকে, দায়েশের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। এদের কর্মীরা বাংলাদেশে কয়েকটি বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। তারা ইতালিয়ান বিদেশিদের আনাগোনা আছে এমন একটি ক্যাফেতে আক্রমণ করেছে। যাতে প্রায় ২০ জন নিহত হয়েছে। এছাড়া, ইতালিয়ান ত্রাণকর্মী সিজার তাবেলাকে হত্যা করেছে।
বাংলাদেশ এমন বহু ঘটনার সম্মুখীন হয়েছে যা এ দেশকে আল কায়েদা ও দায়েশের কাছে লোভনীয় করে তুলেছে। উভয় দলই দেশের কিছু গঠনতান্ত্রিক জটিলতার সুযোগ নিতে চাচ্ছে। আমরা বাংলাদেশকে উপেক্ষা করে নিজেদেরই বিপদ ডেকে আনছি।
[উপরের লেখাটি পলিসিফোরামে প্রকাশিত আইজ্যাক কফিরের লেখা ‘ইগনোরিং বাংলাদেশ অ্যাট আওয়ার পেরিল’ শীর্ষক নিবন্ধ থেকে অনূদিত। আইজ্যাক কফির অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রোগ্রামের পরিচালক এবং অস্ট্রেলিয়ান স্ট্যাটেজিক পলিসি ইন্সটিটিউটের কাউন্টার টেরোরিজম পলিসি সেন্টারের প্রধান। আর পলিসিফোরাম অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ক্রফর্ড স্কুল অব পাবলিক পলিসির একটি উদ্যোগ যেখানে এশিয়া ও এশিয়া প্যাসিফিকের নানা ইস্যুতে বিশ্লেষণ ও বিশেষজ্ঞ অভিমত প্রকাশিত হয়। আইজ্যাক কফিরের এ লেখাটি এশিয়ান করেসপন্ডেন্টেও প্রকাশিত হয়েছে]

হাসিনা-মোদি বৈঠকে যে আলোচনা হতে পারে

পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বিষয়াদি নিয়ে বৈঠক হবে আগামীকাল। সেই বৈঠকে মোদি চাইলে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন ও চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী দিল্লির এক গণমাধ্যম প্রতিনিধির প্রশ্নের জবাবে এমনটাই জানান। মন্ত্রী বলেন, ভারত বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মুক্তিযুদ্ধকালে প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়াসহ বাংলাদেশ সৃষ্টিতে ভারতের যে অবদান তা বাংলাদেশ কখনো ভুলেনি। মন্ত্রী বলেন, দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট, বিশেষত বাস্তুচ্যুতদের ফেরাতে ভারতের কার্যকর সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আগে যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন সেটি মোদির সঙ্গে আলোচনায় পুনর্ব্যক্ত করবেন তিনি। তবে ওই বৈঠকে ঝুলে থাকা তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে কি-না তা স্পষ্ট করেননি মন্ত্রী। তিনি বলেন, এ নিয়ে কাজ চলছে। যা ক্রমশ প্রকাশ্য হবে। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী কাল কলকাতা যাচ্ছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর একাধিক উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য-সচিব এবং গুণীজনরা তার সফর সঙ্গী হলেও সেই তালিকায় নেই পানিসম্পদ মন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা। ভারতীয় গণমাধ্যম সূত্রে এরই মধ্যে খবর বেরিয়েছে যে, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর বাগড়ায় ২০১১ সালে খসড়া চূড়ান্ত হয়েও ঝুলে যায় তিস্তা। সেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এখনো অনড় অবস্থানে রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রধানমন্ত্রী মোদির মধ্যকার আনুষ্ঠানিক আলোচনায় মমতা আমন্ত্রিত হলেও তার উপস্থিতির বিষয়ে এখনো ধূম্রজাল রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীও এ নিয়ে খোলাসা করে কিছু বলেননি। তিনি শুধু বলেছেন, সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মমতা ব্যানার্জির দেখা হবে।
ডিলিট পাচ্ছেন শেখ হাসিনা: এদিকে পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে অবস্থিত কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তনে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার (ডি.লিট) উপাধি পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী ২৬শে মে (শনিবার) সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে এই উপাধি দেয়া হবে। বুধবার বিকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এই তথ্য নিশ্চিত করেন। প্রধানমন্ত্রীর কলকাতা সফর সামনে রেখে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হকসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিস্তারিত: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে দুদিনের সরকারি সফরে শুক্রবার কলকাতা যাচ্ছেন। এই সফরে তিনি শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন এবং আসানসোলে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডক্টরেট অব লিটারেচার (ডিলিট) গ্রহণ করবেন। দুই প্রধানমন্ত্রী শান্তিনিকেতনে নবনির্মিত বাংলাদেশ ভবনের উদ্বোধন করবেন এবং সেখানে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। বাংলাদেশ বিমানের একটি ভিভিআইপি ফ্লাইট প্রধানমন্ত্রী ও তার সফর সঙ্গীদের নিয়ে শুক্রবার সকালে শাহজালাল বিমানবন্দর ছেড়ে সকাল ৯টায় (স্থানীয় সময়) কলকাতায় নেতাজী সুবাস চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছবে। বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে কলকাতা থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার উত্তরে বীরভূম জেলার বোলপুর শান্তিনিকেতনে যাবেন। বিশ্ব ভারতীর উপাচার্য প্রফেসর সবুজ কলি সেন শান্তিনিকেতনে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাবেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র ভবনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাবেন। এরপর শেখ হাসিনা বিশ্ব ভারতীর সমাবর্তনে যোগ দেবেন। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়টির আচার্য ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি উপস্থিত থাকবেন। এরপর দুই প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধন করবেন। এই ভবনে নির্মিত হয়েছে আধুনিক থিয়েটার, প্রদর্শনী কক্ষ, বিশাল লাইব্রেরি। এই লাইব্রেরিতে রয়েছে সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস এবং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক সম্পর্কিত গ্রন্থ। এছাড়া ভবনের প্রবেশ দ্বারের দুই প্রান্তে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুর‌্যাল স্থাপন করা হয়েছে। এরপর শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এখান থেকে শেখ হাসিনা কলকাতা ফিরে এসে জোড়াসাকো ঠাকুরবাড়ি পরিদর্শন করবেন। সন্ধ্যায় হোটেল তাজ বেঙ্গলে কলকাতা চেম্বার নেতারা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। শনিবার প্রধানমন্ত্রী আসানসোলে যাবেন। সেখানে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ সমাবর্তনে শেখ হাসিনাকে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি প্রদান করবে। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণের পর মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বর্ণপদক প্রদান করবেন। অনুষ্ঠানে পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী বক্তৃতা করবেন। এরপর তিনি কলকাতায় ফিরে নেতাজী সুবাস বসু জাদুঘর পরিদর্শন করবেন। প্রধানমন্ত্রী শনিবার রাতে দেশে ফিরবেন।
২৫ কোটি রুপি ব্যয়ে বাংলাদেশ ভবন: ওদিকে শান্তিনিকেতনে ‘বাংলাদেশ ভবন’ উদ্বোধনের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে বাংলাদেশ ভবন নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ২৫ কোটি রুপি। বাংলাদেশ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ ও সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১০ কোটি রুপির সমতুল্য একটি এককালীন স্থায়ী তহবিলও গঠন করা হবে। বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত এই তহবিলের অর্জিত লভ্যাংশ থেকে প্রতি বছর বাংলাদেশের ১০ জন শিক্ষার্থীকে এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য ফেলোশিপ দেয়া হবে। এ বিষয়ে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ ভবন নির্মাণ পরবর্তী পরিচালনা কার্যক্রম সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্বাক্ষরিত হবে।
হাসিনা-মোদির বৈঠক হতে পারে ৪৫ মিনিট
৪৫ মিনিটের বৈঠক হতে পারে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠানের ফাঁকে তাদের মধ্যে এই বৈঠক হবে। বিশ্ব ভারতী সমাবর্তনের সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে শুক্রবার সাক্ষাৎ করবেন নরেন্দ্র মোদি। এ সময় তাদের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন, আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাস, মিয়ানমার থেকে দলে দলে রোহিঙ্গাদের দেশ ত্যাগ করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার মতো ইস্যু এতে থাকতে পারে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইন্যু ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে ঢাকা থেকে বলেছেন, শেখ হাসিনার সফরে প্রধান এজেন্ডা হলো সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি। তবে যখন দুই প্রধানমন্ত্রী সমাবর্তনের পাশাপাশি এক টেবিলে বসবেন তখন স্বাভাবিকভাবেই দু’দেশের মধ্যকার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা হবে। সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ওই বৈঠক হতে পারে ৪৫ মিনিটের। তবে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তিতে আসার পক্ষে নন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলছেন, এমন চুক্তি করা হলে তার রাজ্য পানি সংকটে ভুগতে পারে। প্রেসিডেন্সি কলেজের সাবেক প্রিন্সিপাল অমল মুখোপাধ্যায় বলেছেন, হাসিনা-মোদির আলোচনার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উপস্থিত থাকবেন কিনা তা আমি নিশ্চিত নই। তিস্তার পানি বণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হতে পারে। তবে পর্যাপ্ত পানি বণ্টনের চুক্তিতে আসতে না পারার জন্য ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া শুভকর নয়। এটা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। উল্লেখ্য, সিকিম থেকে পশ্চিমবঙ্গের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে আসা তিস্তা নদীর পানির সমবণ্টন দাবি করছে বাংলাদেশ। ২০১১ সালে অন্তর্বর্তী একটি চুক্তি করা হয়। তাতে ভারতকে এই নদীর পানির শতকরা ৪২.৫ ভাগ ও বাংলাদেশকে ৩৭.৫ ভাগ পনি দেয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু ওই চুক্তি স্বাক্ষর করা হয় নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার কারণে। বিকল্প হিসেবে তিনি তোরসা নদীর মতো নদীর পানি বণ্টনের প্রস্তাব দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামনেই জাতীয় নির্বাচন। তাই এ বিষয়ে একটি চুক্তি শেখ হাসিনার জন্য খুবই গুরুত্ব বহন করে। বিদ্যাসাগর ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর শিবাজি প্রতীম বসুর মতে, বাংলাদেশ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কট্টরপন্থিরা এরই মধ্যে চাপ সৃষ্টি করছে এবং প্রশ্ন তুলছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতের কাছ থেকে কি পেলেন। এখনও গুরুত্বপূর্ণ তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি বাস্তবায়িত হয় নি। তিনি আরো বলেন, দেশের কেন্দ্রীয় কাঠামোর দিকে লক্ষ্য রেখে দৃষ্টিভঙ্গি নিতে মমতাকে অনুমোদন দিয়েছেন মোদি। তার ভাষায়, নরেন্দ্র মোদি ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উভয়ের কাছে এটি একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন। যদি মমতা আরো পানি বণ্টনে সম্মত হন তাহলে তা রাজনীতিতে তার ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে। মনে রাখতে হবে যে, আগামী বছরেই লোকসভা নির্বাচন হওয়ার কথা।

দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা by মহিউদ্দিন অদুল

দেশে চলছে মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের করা মাদক ব্যবসায়ীদের জেলাভিত্তিক টপটেন তালিকার সঙ্গে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ডের তালিকার সমন্বয়ে চলছে এই সর্বাত্মক অভিযান। গত এক সপ্তাহেই মাদকবিরোধী অভিযানে র‌্যাব-পুলিশের সঙ্গে  ‘বন্দুকযুদ্ধে’ প্রাণ হারিয়েছে ৩৭ জন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি এরা সবাই মাদক ব্যবসায়ী। এরপর নড়ে চড়ে বসেছে দেশের মাদক সাম্রাজ্য। গা-ঢাকা দিয়েছে দেশের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা। দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে অনেকে। ফলে রাঘববোয়াল ধরতে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের আস্তানায় চালানো অভিযানে এখন অনেক ক্ষেত্রেই ধরা পড়ছে চুনোপুঁটি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দীন আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর মাদকবিরোধী সর্বাত্মক অভিযান চলছে। এখন পুলিশ ও র‌্যাব আইন মেনে অভিযান পরিচালনা করলে অনেকক্ষেত্রে মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে। তারাও জবাবে আত্মরক্ষার্থে আইন মেনে প্রতিরোধ করতে গিয়ে গুলি ছুড়ছে। এতে কিছু মাদকব্যবসায়ী নিহত হচ্ছে। এই ভয়ে জড়িতরা গা-ঢাকা দিতে বা পালাতে পারে।
সংস্থাটির পরিচালক (অপারেশন্স ও গোয়েন্দা) সৈয়দ তৌফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, জেলা ভিত্তিক টপটেনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকা নিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। অভিযান শুরুর পর থেকে সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ ভারতে পালিয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও পুলিশ-র‌্যাব সূত্র জানায়, ৪ঠা মে থেকে মাদকবিরোধী অভিযান জোরালোভাবে শুরু করে র‌্যাব, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযানের সঙ্গে শুরু হয় মোবাইল কোর্ট। কয়েক মাস আগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের করা মাদক ব্যবসায়ীদের জেলাভিত্তিক টপটেন তালিকার সঙ্গে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ডের তালিকার সমন্বয়ে এই অভিযান চলছে। এই তালিকায় প্রায় প্রতিটি জেলা থেকে শীর্ষ ১০ জন করে মাদক ব্যবসায়ীর নাম উঠে এসেছে। অল্প কয়েকটিতে অবশ্য ১০ জনের কম নাম এসেছে। সারা দেশে ওই টপটেন তালিকায় ৬৫০ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর নাম উঠে আসে। এছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন প্রয়োগের ক্ষমতা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী পুলিশ, এলিট ফোর্স র‌্যাব, সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবিরও মাদক ব্যবসায়ীর তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে কাস্টমস ও শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। এছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুরোধে একই কাজ করে থাকে ডাক বিভাগের কর্মকর্তা, আনসার ও গ্রাম পুলিশের সদস্যরা। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর থেকে বিশেষ করে র‌্যাব ও পুলিশ দেশের বিভিন্ন জেলায় মাদকবিরোধী ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরু করে। এতে বিভিন্ন জেলায় এলাকাভিত্তিক শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা গ্রেপ্তার হতে থাকে।
এ পর্যন্ত অন্তত এক হাজার মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হয়। উদ্ধার হতে থাকে মাদকের বড় বড় চালান। অভিযানে র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীদের একের পর এক ‘বন্দুকযুদ্ধে’র খবর আসতে থাকে। এরমধ্যে গত ১৫ই মে থেকে ৮ দিনে প্রাণ গেছে ৪৩ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর। গতকাল বুধবার ৮ জন মারা গেছে। কিন্তু অভিযান যতই গড়াচ্ছে ততই সতর্ক হয়ে যাচ্ছে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরা। তারা গা-ঢাকা দিতে শুরু করেছে। এলাকা বদল করছে। ভিন্ন এলাকায় আত্মগোপন করছে। অনেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে আত্মগোপন করেছে। অনেকে পালাচ্ছে বিদেশে। শুধু তাই নয়। মাদক ব্যবসা করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যাওয়া মাদক ব্যবসায়ীদের অনেকের বিদেশে থাকার নিরাপদ স্থানও রয়েছে। তাদের কেউ কেউ এরই মধ্যে সেসব দেশে সটকে পড়েছে। প্রাণে বাঁচতে তাদের অনেকেই গা-ঢাকা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, মাদক মামলায় বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়া বন্দিরা সাধারণ জামিনের জোর চেষ্টা চালান। কিন্তু এই অবস্থায় জীবনের ঝুঁকি এড়াতে সম্প্রতি বন্দি মাদক বিক্রেতাদের জামিনে মুক্তির চেষ্টা কমে গেছে বলে জানিয়েছে একাধিক আদালত ও কারাসূত্র।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানায়, রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের অনেকেই এরই মধ্যে বিভিন্ন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন কয়েকজনের সীমান্ত পারের খবর আসছে বলে জানান এক কর্মকর্তা। সাতক্ষীরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী ভারতে পালিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা। তারা সীমান্তে গিয়ে ওপারের লোকদের সঙ্গে টাকার বিনিময়ে লিয়াজোঁ করছে। তারপর তাদেরকে ভারতের ভেতরে বিভিন্ন রাজ্যে গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছে। সেখানে দু’তিন হাজার টাকা থেকে কয়েক লাখ টাকার লিয়াজোঁ হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এদিকে গত মঙ্গলবার রাজধানীর মাদকের আখড়া হিসেবে পরিচিত জেনেভা ক্যাম্পে অভিযান চালানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ইশতিয়াক, নাদিম ওরফে পঁচিশ, আরশাদ, চোরা সেলিমসহ শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরা। কিন্তু তাদের কারও টিকিট পায়নি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তাদের পরিবর্তে কয়েকজন ছিঁচকে মাদক বিক্রেতাকে ধরে আনে তারা। অপরদিকে গতকাল মঙ্গলবার চানখাঁরপুলে অভিযান চালিয়েও অনেকটা হতাশ হতে হয়েছে। তবে অন্যতম মাদক বিক্রেতা রিপনকে ১ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট ও ২ কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের অন্যতম মাদক ব্যবসায়ী মমতাজ ওরফে ফারুক র‌্যাবের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। এরপর চট্টগ্রামের বরিশাল কলোনির অপর শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ইউসুফ ভারতে পালিয়ে যান। কিন্তু তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় কলকাতা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছে। কুমিল্লার অন্যতম শীর্ষ গাঁজা ব্যবসায়ী গঙ্গানগর মহল্লার আবুল হোসেন। সালদানদী রেলস্টেশনের কাছে তার বাড়ি হওয়ায় ট্রেনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক পৌঁছান। অভিযান চালানো হলেই তিনি কুমিল্লা সীমান্তের নোম্যান্স ল্যান্ড দিয়ে ভারতে পালিয়ে যায়।
ওই অভিযানের সঙ্গে সম্পৃক্ত সংস্থাটির সহকারী পরিচালক খোরশেদ বলেন, ওই চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযান চালানো হয়। কিন্তু তারা গা-ঢাকা দিয়েছে। আবার মাদকের আয়ে ব্যাপক বিত্তবৈভবের মালিক বনে যাওয়া ইশতিয়াক দেশ ছেড়ে পালিয়েছে বলেই ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া গত কয়েকদিনে সাতক্ষীরাসহ একাধিক সীমান্ত দিয়ে বহু মাদক বিক্রেতা ভারতে পালিয়েছে। সীমান্তের ভারতীয় দালালদের সঙ্গে টাকার বিনিময়ে লিয়াজোঁ করে তারা সে দেশে আত্মগোপন করছে।

কোন দেশে কত ঘণ্টা রোজা

এবার মে মাসে রোজা শুরু হয়েছে। তাই বাংলাদেশে রোজার সময় দীর্ঘ হয়েছে। মোট ১৫ ঘণ্টা রোজা। ফজর থেকে মাগরিব পর্যন্ত মোট ১৫ ঘণ্টা রোজা রাখতে হয়ে বাংলাদেশের মুসলমানদের। মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকার অনেক দেশেই রোজা ১৫ ঘন্টা রোজা এবার। রোজার সময় যেহেতু সূর্য ওঠা ও অস্ত যাওয়ার ওপর নির্ভর করে তাই সারাবিশ্বে এই তারতম্য হয়ে থাকে। এবার সারা পৃথিবীতে ১০ ঘণ্টা থেকে শুরু করে ২২ ঘণ্টা পর্যন্ত রোজা রাখতে হচ্ছে বিভিন্ন দেশের লোকেদের। জেনে নেই কোন দেশে কত ঘণ্টা রোজা-
সারা পৃথিবীতে সর্বোচ্চ সময় রোজা রাখতে হয় গ্রিনল্যান্ডে। সেখানে ২১ ঘণ্টা রোজার সময়
নরওয়ে- ২০ ঘণ্টা। নরওয়েসহ সব স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশ তথা ফিনল্যান্ড, সুইডেনের মতো দেশগুলোতে রোজা ২০-সাড়ে ১৯ ঘণ্টা।
রাশিয়া, ডেনমার্ক, জার্মানি,কানাডা, পোল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, কাজাখস্থান, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্সে ১৯- ১৮ ঘণ্টা রোজা।
অন্যদিকে ইতালি, রোমানিয়া, স্পেইন, পর্তুগাল, গ্রিস, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, উত্তর কোরিয়া, তুরস্ক, জাপান, আফগানিস্তান, মরোক্কো, ইরান, পাকিস্তান, ইরা্‌ লেবানন, সিরিয়ায় রোজার সময় ১৭ থেকে ১৬ ঘণ্টার মতো।
এছাড়া মিসর, ফিলিস্তিন, কুয়েত,ভারত, হংকং, ওমান, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সুদান, ইয়েমেন, ইথিওপিয়া, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ডে রোজার সময় ১৫ থেকে ১৪ ঘণ্টা।
দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো তথা মালোয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোতে ১৩ ঘণ্টা রোজার সময়।
এর চেয়ে কম সময়ও রোজা রাখে অনেক দেশের মুসলমানরা। যেমন – অ্যাঙ্গোলা, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া, জিম্বাবুয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার রমজানের সময় ১২-১১ ঘণ্টার মধ্যে।
সবচেয়ে কম সময় রোজা রাখছে এবার চিলি। মাত্র ১০ ঘণ্টা। বাংলাদেশে যখন শীতকালে রোজার মাস পড়ে সেসময় বাংলাদেশেও সময় এরকম কমে যায়।
সূত্র: আল জাজিরা।

কেন হতাশ তরুণ সমাজ? by উৎপল রায়

মেহেরপুর থেকে উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে রুবেল ঢাকায় আসেন ২০১২ সালে। সংসারে তিনিই বড় সন্তান। রুবেলের বাবা ছিলেন মেহেরপুর জেলা জজ আদালতের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। বাবার সামান্য পেনশনের টাকা ও অল্প জমির আয়ে তিন ভাইবোন ও মাকে নিয়ে কোনোমতে চলছে সংসার। দুই বছর আগে বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ সম্পন্ন করেন। বড় ছেলে হওয়ায় সঙ্গত কারণেই তার ওপর সংসারের দায়িত্ব বর্তায়। তিনি এখন থাকেন মিরপুরের একটি মেসে। এই কয়েক বছরে পড়াশুনার পাশাপাশি কিছু রোজগারের আশায় নানা চেষ্টা করেছেন তিনি। পড়ার খরছ যোগাতে পরিচয় গোপন করে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের ফুটপাথে  কাপড়ও বিক্রি করেছেন। বিবিএ পাস করার পর সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ইন্টারভ্যু দিয়েছেন। কিন্তু চাকরি নামক ‘সোনার হরিণ’ অধরা তার কাছে। হতাশ সজল বলেন, উচ্চশিক্ষিত হয়েও আমি বেকার। নিজেকে সবসময় ছোট মনে হয়। পুরো পরিবার আমার ওপর নির্ভর করছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে আমি হতাশ। এ হতাশা বোঝানো যাবে না।  
মো. ওয়ালীউল্লাহ ওলি (২৯)। ২০১৪ সালে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। এরপর পেরিয়ে গেছে ৪ বছর। কিন্তু চাকরি এখনো অধরা ওলির কাছে। মাদারীপুরের ছেলে ওলি থাকেন মিরপুরের কাজীপাড়ার একটি মেসে। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে না পারছি নিচে নামতে না পারছি উপরে ওঠতে। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমাও প্রায় শেষের পথে। শুধু আমি নই, আমার বন্ধুদের অনেকেরই একই অবস্থা। ওলি জানান, ঘুষ, তদবির আর রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া এখন আর চাকরি হয় না। আর চাকরি না পাওয়ায় পরিবার, স্বজনদের চাপ রয়েছে। সামাজিকভাবেও হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছি। এলাকায় গেলেই সবাই জানতে চায় কেন চাকরি হচ্ছে না? নিজেকে সবসময় ছোট মনে হয়। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে আমি হতাশ।
কেবল বেকারত্বের জন্য নয়, চারদিকে খুন, ধর্ষণ, সড়কে মৃত্যুর মিছিলসহ নানা নেতিবাচক ঘটনা ঘটছে। এতে করে আমাদের মতো তরুণদের হতাশা আরো বাড়ছে। কিশোরগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী প্রিতী বলেন, যখন কলেজে পড়া শুরু করি তখন থেকেই ইচ্ছে ছিল চাকরি করবো, নিজের পায়ে দাঁড়াবো। কারো মুখাপেক্ষী হবো না। গৃহিণী হয়ে থাকবো না। কিন্তু চাকরির বাজারের যে অবস্থা তাতে পড়াশুনা শেষ করে একটি মানসম্মত চাকরি পাবো কি না এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। 
শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে তরুণদের হতাশার একটি বড় কারণ কর্মসংস্থানের অভাব বা বেকারত্ব। শিক্ষিত বেকারদের মধ্যে এ হতাশা আরো বেশি বলে মনে করেন তারা।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাত বলেন, শুধু শিক্ষিত বেকার নয়, গ্রামাঞ্চলে তরুণ যুব সমাজ ব্যাপকহারে বেকার রয়েছে। আর ব্যাপকহারে বেকারত্বের কারণেই কিন্তু বেকারদের একটি অংশ মাদকে আসক্ত হচ্ছে।  এসব হতাশা, নিরাশা থেকেই হয়। তরুণদের এই হতাশা নিরাশা দূর করাও কিন্তু একটি জাতীয় দায়িত্ব। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ, মাদকের বড় কারণই হচ্ছে হতাশা ও নিরাশা। এটি চাকরি পেয়েও হতে পারে আবার চাকরি না পেয়েও হতে পারে। একজন যদি এম এ পাস করে ৩ হাজার ৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করে তাহলে তার এই চাকরি পাওয়া এবং বেকার থাকার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আবার  কোনোক্ষেত্রে যদি বেতন কমও হয় কিন্তু আশা থাকে যে ২/৩ বছর পার করলে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা আছে, তাহলেও হয়তো চালিয়ে নেয়া যায়। মূল কথা হলো কাজটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দু’বছর আগে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন আল মাসুদ সজীব। বর্তমানে টিউশনির টাকায় নিজের খরছ চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, চাকরির জন্য বিশেষ করে সরকারি চাকরির জন্য গত দু’বছর ধরে চেষ্টা করছি। কিন্তু হচ্ছে না। তরুণ সমাজের বেশির ভাগই প্রত্যাশা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছে না। শিক্ষিত তরুণদের জন্য চাকরির বাজারটা ক্রমেই যেন সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। এতে করে অনেকেই চাপে পড়ে হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে। আর হতাশা থেকে অনেকেরই সামাজিক অবক্ষয় ঘটছে। তিনি বলেন, কর্মসংস্থানের অভাব যেমন দেখতে পাচ্ছি তেমনি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো যুগোপযোগী ও ঢেলে সাজানোরও প্রয়োজন রয়েছে।
আজহার করিম শাহেদ। খুলনার পাইকগাছা থেকে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ঢাকায় এসেছিলেন। উচ্চশিক্ষিত হয়েছেনও। কিন্তু মূল যে উদ্দেশ্য ছিল চাকরি সেটি এখনো অধরা তার কাছে। তিনি এখনো বেকার। তিনি বলেন, চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা পেরিয়ে যাচ্ছে। পরিবারকে কিছুই দিতে পারছি না। বেকার বলে বিয়েও করতে পারছি না। যাকে বিয়ে করবো আমার বেকারত্বের জন্য সেই প্রেমিকাও হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারি চাকরি পেতে গেলে ঘুষ দিতে হয়। রাজনৈতিক যোগাযোগ থাকতে হয়। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ শিক্ষার্থীদের সে উপায়ও নেই। বেসরকারি চাকরিতেও আমার সনদের মূল্যায়ন হয় না। এ অবস্থায় দুঃসহ জীবন পার করছি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, বেকারত্ব থাকলে যা হয়, এটির একটি হলো সামাজিক প্রভাব অন্যটি অর্থনৈতিক এই দু্‌’দিক দিয়েই ক্ষতি হচ্ছে। সামাজিক দিক হলো বেকারদের তো সিকিউরিটি অব লাইফ অর্থাৎ যেটি আয়কে বোঝায়, সেটা তাদের নেই। তাদের প্রতিনিয়ত পরিবারের কাছে হাত পাততে হচ্ছে। আর হাত পাতলে সবসময় পাওয়াও যায় না। একজন শিক্ষিত যুবক যখন পরিবারের কাছে টাকা চায় তখন সব পরিবারই সবসময় তা দিতে পারে না। এতে বেকারদের মনে হতাশাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এবং এ থেকে তারা সামাজিক অপরাধ, অস্থিরতা ও বেআইনি কাজে লিপ্ত হয়। তিনি বলেন, এটি কিন্তু আমাদের জন্য বিরাট সমস্যা। এ অবস্থা যদি বাড়তে থাকে তাহলে এটি দেশকে ভীষণ অস্থিতিশীল ও অস্থির করে তুলবে। তাই এ নিয়ে জরুরিভিত্তিতে চিন্তা করা উচিত। 
অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, শিক্ষিত তরুণ সমাজের হতাশার দুটো কারণ রয়েছে। একটি হচ্ছে কর্মসংস্থানের পরিমাণের সংকট। অন্যটি স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার জায়গায় একটি সংকট আছে। তিনি বলেন, হতাশা থেকে বেকারদের একটি অংশ অপরাধজনক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে। আর বেকারদের  বৃহৎ একটি অংশ জীবনবাজি রেখে ঝুঁকি নিয়ে বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করছে-এটিও হতাশা থেকেই। দেশের প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তনের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের আরো বেশি কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী প্রয়োজন। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, রাষ্ট্র তরুণদের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে না। কাজ না পাওয়াতে তরুণরা হতাশায় ভুগছে। আর এ হতাশা থেকে তরুণদের একটি অংশ নানা সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থী পাস করে কর্মজীবনে প্রবেশ করবে- এটি একটি স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু বাবা মায়েরা অনেক কষ্ট করে সন্তানকে পড়াশুনা করান, স্বপ্ন দেখে। কিন্তু পাস করে চাকরি ক্ষেত্রে সেই সন্তান কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাবা মা স্বজনদের স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে না।
স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। আর এ থেকেই কোনো কোনো তরুণ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ দুঃস্বপ্ন ভুলে থাকার জন্য মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে তারা হতাশা ভুলে থাকার জন্য মাদক গ্রহণ করছে অন্যদিকে মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তৌহিদুল হক বলেন, একদিকে আমরা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে তরুণদের একটি অংশকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছি অন্যদিকে সেই অপরাধের জন্য তাদের বিচার হচ্ছে। এটি স্ববিরোধী। তিনি বলেন, তরুণ সমাজ নিয়ে আমাদের আরো বেশি ভাবতে হবে। আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে বেকারত্ব  বাড়ছে। একই সঙ্গে তরুণদের হতাশাও বাড়ছে। শুধু পাসের সংখ্যা বাড়িয়ে কোনো লাভ হবে না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এমন পর্যায়ে নিতে হবে যেন তরুণদের বেকারত্বের হতাশায় ভুগতে না হয়।

হৃদয়ভাঙা মৃত্যু

রক্তনালিতে টিউমারে আক্রান্ত সাতক্ষীরার মুক্তামণি গতকাল সকাল আনুমানিক সাড়ে ৭ টায় মারা গেছে। মুক্তামণির বাবা ইব্রাহিম হোসেন মানবজমিনকে বলেন, মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে মুক্তামণির প্রচণ্ড জ্বর আসে। এর পর থেকে আমার সোনাপাখি আর কোনো কথা বলেনি। অথচ আমার সোনাপাখি কারো সঙ্গে কথা না বলে এক মুহূর্তও থাকতে পারতো না। দুই বোন এক ভাই-এর মধ্যে মুক্তামণি আর হিরামণি ছিল যমজ বড় বোন। সবার ছোট হচ্ছে ভাই আল আমিন। হিরামণি ক্লাস ফাইভে পড়লেও মুক্তামণি ক্লাস টু পর্যন্ত পড়াশোনার পর আর নিয়মিত করতে পারেনি। জন্মের দেড় বছরের মাথায় তার ডান হাতে ছোট্ট একটি টিউমারের মতো দেখা যায়। এরপর স্থানীয় হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার থেকে শুরু করে সাতক্ষীরার সকল ডাক্তার দেখিয়ে সর্বশেষ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েও আমার পাখিকে বাঁচাতে পারিনি বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন মুক্তামণির বাবা।
মুক্তামণির মা আসমা খাতুন মেয়েকে সব সময় চোখে চোখে রাখতেন বলে জানান বাবা ইব্রাহিম। তিনি বলেন, মঙ্গলবার সকালে জ্বর আসার পর মুক্তামণিকে বলেছিলাম, চলো মা আর একবার ঢাকায় যেয়ে ডাক্তার দেখিয়ে আসি। জবাবে মুক্তামণি বাবাকে বলে, আব্বা আমি আর কোথাও যেতে চাই না। মুক্তামণির শরীরে রক্ত ছিল না বললেই চলে। তাই অনেক বুঝিয়ে বলার পর সাতক্ষীরা সদরে গিয়ে শরীরে রক্ত দিতে যেতে রাজি হয় মুক্তা। সুস্থ থাকাকালীন মুক্তামণি বাবাকে বলতো, আব্বা আমি সুস্থ হয়ে বোনের সঙ্গে স্কুলে যাবো। তোমাদের সঙ্গে কুটুম বাড়ি বেড়াতে যাবো। আমার সোনাপাখির আর কোথাও যাওয়া হবে না। না কুটুম বাড়ি, না স্কুলে। মারা যাওয়ার আগে বাবার কাছ থেকে পানি পান করার পরই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে মুক্তা। উপজেলার কামারবাসা গ্রামে নিজ বাড়িতে মারা যায় স। শেষবারের মতো মুক্তামণিকে দেখতে শ’ শ’ মানুষ তাদের বাসায় ভিড় জমিয়েছেন। এ সময় সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ফরহাদ জামিল মুক্তামণির বাসায় এসে পরিবারকে সমবেদনা জানান।
মুক্তামণির বোন হীরামণি বলেন, ইচ্ছে ছিল, বোন সুস্থ হলে ওকে নিয়ে একসঙ্গে স্কুলে যাবো। কিন্তু তা আর হলো না।’ কথাগুলো বলছিল মুক্তামণির যমজ বোন হীরামণি। রক্তনালির টিউমারে আক্রান্ত মুক্তামণি বুধবার সকালে মারা যাওয়ার পর হীরামণি এভাবেই শোকাতুর ভাবে কথাগুলো বলছিলো। সাতক্ষীরার কামারবাইশালের মুদির দোকানদার ইব্রাহিম হোসেনের দুই যমজ মেয়ে হীরামণি ও মুক্তামণি। প্রথমে হাতে টিউমারের মতো হয়। ছয় বছর বয়স পর্যন্ত টিউমারটি তেমন বড় হয়নি। কিন্তু পরে তা ফুলে ক্রমান্বয়ে বড় হতে থাকে। এরপর থেকেই মুক্তামণি বিছানাবন্দি হয়ে পড়ে। সাতক্ষীরা, ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় নানা চিকিৎসা চলে। তবে ভালো হয়নি বা ভালো হবে, সে কথা কেউ কখনো বলেননি। গণমাধ্যমকর্মীদের মাধ্যমে খবর প্রকাশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনায় আসে মুক্তামণির খবর। গত বছরের ১১ই জুলাই মুক্তাকে ভর্তি করানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। এরপরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তামণির চিকিৎসার দায়িত্ব নেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মুক্তামণিকে ভর্তি করা হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে বার্ন ইউনিটের কেবিনে ছিল ছয় মাস। গত বছরের ১২ই আগস্ট তার হাতে অস্ত্রোপচার হয়। এ সময় তার ডান হাত থেকে প্রায় তিন কেজি ওজনের একটি টিউমার অপসারণ করেন চিকিৎসকরা। পরে দুই পায়ের চামড়া নিয়ে দুই দফায় তার হাতে লাগানো হয়। তবে সাময়িকভাবে হাতের ফোলা কমলেও তা সমপ্রতি আগের চেয়েও বেশি ফুলে গিয়েছিল। রক্ত জমতে থাকে ফোলা জায়গায়। আর ড্রেসিং করতে কয়েক দিন দেরি হলেই হাত থেকে দুর্গন্ধ বের হতো এবং আগের মতো হাত থেকে অসংখ্য সাদা পোকা বেরিয়ে আসতো। মুক্তামণির বয়স হয়েছিল ১২ বছর। গত বছরের ২২শে ডিসেম্বর এক মাসের ছুটিতে বার্ন ইউনিট থেকে মুক্তামণি বাড়ি ফেরে। তবে ওর আর ঢাকায় ফেরা হয়নি।
মুক্তামণির বাবা ইব্রাহিম সাংবাদিকদের বলেন, মুক্তামণির ডান হাতের অবস্থা খারাপ দেখে ১৫ দিন আগে ডা. সামন্ত লাল সেনের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলেন। এ সময় তিনি মুক্তার দু’টি ছবি পাঠানোর কথা বলেন। ছবি দেখে তার হাতের অবস্থা খারাপ বলে জানান ডাক্তার। এরপর গত বুধবার সামন্ত লাল ফোন করে মুক্তামণির খোঁজ-খবর নিয়ে রোজার পরে তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। মুক্তামণির অবস্থার অবনতির পাশাপাশি জ্বর এলে তিনি মঙ্গলবার আবার সামন্ত লালের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানান।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘মুক্তামণির মৃত্যুর সংবাদ শুনেছি, এটা তো খুবই খারাপ খবর।’ ‘জীবনে বহু রোগীর চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলেছি, আবার বহু রোগীর মৃত্যুও দেখেছি। কিন্তু মুক্তামণির মৃত্যু আমার জন্য হার্ট ব্রেকিং খবর। ছোট্ট এ শিশুটির ধুঁকে ধুঁকে মারা যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না’।
তিনি বলেন, ‘ও যে রোগে ভুগছিল সেটা নিয়ে এমন সময়ে আমাদের কাছে এসেছে যখন আর কোনও উপায় ছিল না। আরও আগে যদি আসতো তাহলে ডেফিনিটলি আমরা সেটা সারিয়ে তোলার চেষ্টা করতাম।’ ‘গতকাল আমি তার বাসায় স্থানীয় সিভিল সার্জনকে দিয়ে চিকিৎসকও পাঠিয়েছিলাম। আমার চিকিৎসকরা গিয়েছিলেন। গত এক সপ্তাহ ধরে ওর বাবার সঙ্গে কথা বলেছি। আসতে বলছিলাম। কিন্তু ওরা কিছুতেই ঢাকায় আসতে চায়নি।
সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন তওহীদুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, অবস্থার অবনতি হয়েছে শুনে গতকাল দুপুরে তিনি সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ফরহাদ জামিল ও অর্থোপেডিক্স বিশেষজ্ঞ মো. হাফিজুল্লাহকে মুক্তামণির বাড়িতে পাঠান।
এ বিষয়ে ফরহাদ জামিল গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি ও হাফিজুল্লাহ মঙ্গলবার দুপুরে মুক্তামণির বাড়িতে গিয়েছিলেন। মুক্তামণির শরীরে তখন জ্বর ছিল। রক্তশূন্যতায় ভুগছিল সে। হাতের ক্ষত আরও বেড়ে গিয়েছিল। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। তার রোগ শরীরে ছড়িয়ে পড়েছিল। ভালো করে সে কথা বলতে পারছিল না। বিষয়টি তারা ডা. সামন্ত লাল সেনকে বিস্তারিত জানান। তবে মুক্তামণি ও তার বাবা ইব্রাহিম হোসেন আর ঢাকায় যেতে চাচ্ছিলেন না।
সাতক্ষীরার মুক্তামণিকে দাদার কবরের পাশে শায়িত করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার দক্ষিণ কামারবায়সা গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে দুপুর আড়াইটার দিকে মুক্তামণির জানাজা সম্পন্ন হয়। মুক্তামণিকে শেষবারের মতো দেখতে আসেন সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার সাজ্জাদুর রহমান, স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক শাহ আবদুল সাদী ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মেরিনা আক্তার।
উল্লেখ্য, মুক্তামণির কী অসুখ জানেন না চিকিৎসকরাও!’ এই শিরোনামে একটি অনলাইনে খবর প্রকাশিত হয়। পরে অন্যান্য সংবাদমাধ্যমেও এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন আসে। বিষয়টি নজরে আসার পর অনেকেই মুক্তার চিকিৎসায় হাত বাড়ান। পরে মুক্তামণির চিকিৎসার দায়িত্ব নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর গত বছরের ১২ই জুলাই রক্তনালির টিউমারে আক্রান্ত মুক্তামণিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। প্রথমে তার রোগটিকে বিরল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরে বায়োপসি করে জানা যায়, তার রক্তনালিতে টিউমার হয়েছে। তখন তার উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে যোগাযোগ করেন বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকরা। মুক্তামণির সব রিপোর্ট দেখে সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা তার চিকিৎসা করতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর ঢামেক’র চিকিৎসকরাই তার অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেন। এরপর মুক্তামণির হাতে গত বছরের ৫ই আগস্ট প্রথম অস্ত্রোপচার হয়। শুরুতে তার হাতের ফোলা অংশে অস্ত্রোপচার করে তা ফেলে দেন চিকিৎসকরা। পরে দুই পায়ের চামড়া নিয়ে দুই দফায় তার হাতে লাগানো হয়। ঢামেকের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের পরিচালক অধ্যাপক আবুল কালামের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি দল মুক্তামণির স্কিন গ্রাফটিং (চামড়া লাগানো) অপারেশনে অংশ নেন। পরে মুক্তামণির হাত আবার ফুলে যাওয়ায় ফোলা কমানোর জন্য হাতে প্রেসার ব্যান্ডেজ বেঁধে দেয়া হয়।

চালু হচ্ছে ডিজিটাল কাবিননামা by দীন ইসলাম

বাল্যবিবাহ রোধ করতে ডিজিটাল কাবিননামা বা ইলেকট্রনিক বিবাহ নিবন্ধন চালু করতে যাচ্ছে সরকার। এ জন্য ‘কাজী পোর্টাল’ তৈরি করা হবে। এটা হবে অনেকটা ইমাম পোর্টালের আদলে। কাজী পোর্টালে থাকবে বিবাহ সংক্রান্ত সব তথ্য। দেশের সব নিকাহ রেজিস্ট্রারদের (কাজী) এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। প্রথম পর্যায়ে কুড়িগ্রাম, খুলনা ও ঠাকুরগাঁও জেলায় পাইলট আকারে ডিজিটাল কাবিননামার কাজ শুরু হয়েছে। সারা দেশে বিষয়টি কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় এনিয়ে যাচাই বাছাইয়ের কাজ শুরু করেছে আইন ও বিচার বিভাগ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রোগ্রাম। প্রথম অবস্থায় ধাপে ধাপে বিভিন্ন জেলায় বয়স যাচাই করার সিস্টেমসহ ১৮ বছরের নিচে মেয়েদের ডাটাবেজ, বিবাহ নিবন্ধন, জেলা রেজিস্ট্রার, শিক্ষক, ঘটক, ইমাম, পুরোহিত, স্থানীয় প্রশাসন ও প্রতিনিধিদের ডাটাবেজ তৈরি করা হবে। এরই মধ্যে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি এনজিও সারা দেশে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছে। আইন ও বিচার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রোগ্রাম প্রথম এ ধারণা নিয়ে কাজ করতে শুরু করে। এরপর গেল বছরের শেষে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব আবু সালেহ শেখ মোহাম্মদ জহিরুল হকের সভাপতিত্বে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
ওই বৈঠকে ইলেকট্রনিক বিবাহ নিবন্ধন কীভাবে করা যায় ওই বিষয়টি খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলায় ‘বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিবাহ নিবন্ধনের আগে এসএমএস সিস্টেম’ সংক্রান্ত একটি প্রকল্পে অর্থায়ন করছে সরকার। এ প্রকল্পে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিবাহ নিবন্ধনের আগে প্রকৃত বয়স যাচাই পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন বিধিমালা এবং হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন নীতিমালা অনুযায়ী বিবাহ নিবন্ধককে বয়স প্রমাণের সার্টিফিকেট যাচাই করে বিবাহ নিবন্ধন করতে হয়। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সহায়তা পেতে জাতীয় হেল্প লাইন ১০৯ ব্যবহার করা হচ্ছে। এরই মধ্যে কুড়িগ্রামের প্রকল্পের কাজ ঠিকভাবে শেষ হয়েছে। সব কাজীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইলেকট্রনিক বিবাহ সিস্টেম চালু হলে হাতে লেখার প্রয়োজন পড়বে না। ডাটাবেজ নির্ভরশীল শর্টকোড ব্যবহারের মাধ্যমে এসএসসি, এইচএসসি সনদ, জন্ম সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করে বর ও কনের বয়স নিরূপণ করা যাবে। এরপরই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধসহ সবকিছু ডিজিটালাইজেশন করা সম্ভব হবে। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব আবু সালেহ শেখ মোহাম্মদ জহিরুল হক মানবজমিনকে বলেন, ইলেকট্রনিক বিবাহ নিবন্ধন সারা দেশে চালু হলে এটা হবে ডিজিটাল বাংলাদেশের আরেক ধাপ অগ্রগতি। এটা নিয়ে আমরা কাজ করছি। আশা করছি, সহসাই চালু করতে পারবো।