Sunday, December 20, 2015

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সাফল্য! by খলিলউল্লাহ্

চ্যালেঞ্জের মুখে নিকোলাস মাদুরো
১৬ বছর পর ভেনেজুয়েলার জনপ্রিয় সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের সমাজতান্ত্রিক দলের পরাজয় ঘটল ৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে। ২০১৩ সালে চাভেজ মারা যাওয়ার পর নিকোলাস মাদুরো দলের দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তখন থেকেই বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছিলেন মাদুরো হয়তো সমাজতান্ত্রিক দলের জনপ্রিয়তা অটুট রেখে ভেনেজুয়েলার বিপ্লবী নেতা সিমন বলিভারের আদর্শকে ধারণ করে চাভেজ যে বলিভারিয়ান বিপ্লব শুরু করেছিলেন, তা এগিয়ে নিতে পারবেন না। শেষ পর্যন্ত মধ্য ডানপন্থী বিরোধী দলের সংসদীয় নির্বাচনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে তা সত্য হতে শুরু করল। ১৬৭টি আসনের মধ্যে বিরোধী দল ৯৯টি আসনে জয়ী হয়েছে। ২২টি আসনের ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি। সমাজতান্ত্রিক দলের পরাজয়ের পেছনে অর্থনৈতিক দুরবস্থাই প্রাথমিকভাবে দায়ী বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
প্রেসিডেন্টশাসিত সরকারব্যবস্থা হওয়ায় ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত মাদুরো নির্বাহী ও বিচার বিভাগের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখতে পারবেন। কিন্তু সদ্য বিজয়ী এমইউডি সংসদে মাদুরোর নীতি বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এ ছাড়া তারা নিজেরাও নতুন আইন পাস করে দেশে অনেক পরিবর্তন আনবে বলে মনে হয়। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তারা ‘রাজনৈতিক বন্দীদের’ কারাগার থেকে মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে দীর্ঘ ১৬ বছরে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে সমাজতান্ত্রিক দলের সমর্থকেরা থাকায় সদ্য বিজয়ী দল পরিবর্তন কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
তেলের দাম পড়ে যাওয়াই ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণ। তেলসম্পদ থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়েই সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের পথে এগিয়ে যাচ্ছিল ভেনেজুয়েলা। তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর বৈশ্বিক সংগঠন ওপেককে তেলের দাম বাড়াতে ভেনেজুয়েলার অনুরোধের পরও ওপেক তা করেনি। কারণ হিসেবে ওপেক দেশগুলো শেল প্রকল্পের তেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠবে না বলে জানায়। প্রতিযোগিতায় পেরে উঠতে ওপেক দেশগুলো তেলের দাম কমানোর ফলে ভেনেজুয়েলায় অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়, যা সরকারি ব্যবস্থাপনাকে আরও দুর্বল করে দেয়। এই সুযোগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ভেনেজুয়েলাকে বিশ্বের সবচেয়ে ‘বিশৃঙ্খল অর্থনীতির’ দেশ হিসেবে ঘোষণা করতে মোটেও দেরি করেনি। লাতিন আমেরিকার সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির দেশ এখন ভেনেজুয়েলা। সঙ্গে রয়েছে মৌলিক ভোগ্যপণ্যের ভয়াবহ সংকট। অবস্থা এমনই যে ক্রেতারা মৌলিক পণ্যের জন্য দীর্ঘ সারিতে কয়েক দিন অপেক্ষা করেও খালি হাতে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।
কিন্তু নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ হিসেবে শুধু ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক দুরবস্থাকে দায়ী করা হলে এই দুরবস্থা সৃষ্টি হওয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের যে বড় ভূমিকা রয়েছে, তা অপ্রকাশিত থেকে যাবে। চাভেজ ও তাঁর উত্তরসূরি মাদুরো উভয়ই ভেনেজুয়েলাকে চাভেজের ভাষায় ‘একুশ শতকের সমাজতন্ত্রের’ আদর্শে রূপান্তর করতে অবিরাম চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। সে লক্ষ্যে বিশাল তেলসম্পদ থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব ব্যয় করা হচ্ছিল সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড ও দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিতে। তেলসম্পদ থেকে প্রাপ্ত আয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পুনর্বণ্টনমূলক কর্মসূচি চালু করার মাধ্যমে চাভেজ এমন এক উন্নয়ন-প্রক্রিয়ার সূচনা করেছিলেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের দেখিয়ে দেওয়া নব্য উদারনীতিবাদের অর্থনৈতিক কর্মসূচি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। মাদুরোও তা চলমান রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে দেশ চালাচ্ছিলেন। চাভেজের পর লাতিন আমেরিকার অন্য দেশগুলোতেও বামপন্থী বা মধ্য বামপন্থী দলগুলো ধীরে ধীরে ক্ষমতায় আসতে শুরু করে এবং বলিভারিয়ান মতাদর্শে উজ্জীবিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে থাকে।
ভেনেজুয়েলা হলো লাতিন আমেরিকার আঞ্চলিকতাবাদ, কল্যাণমূলক রাষ্ট্রীয় ধারণা ও বলিভারিয়ান আদর্শের চালক। দেশটি ক্যারিবীয় ও মধ্য আমেরিকার দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ঠেকাতে ভর্তুকি দিয়ে তেল বিক্রি করে। যুক্তরাষ্ট্রের ডমিনো তত্ত্ব অনুযায়ী, তেলসম্পদে সমৃদ্ধ এ দেশটিতে সমাজতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করতে পারলে কিউবা, ইকুয়েডর ও বলিভিয়ার মতো দেশগুলো বিপন্ন হয়ে পড়বে, আর্জেন্টিনার নব্য ডানপন্থী সরকার আরও চাঙা হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কলম্বিয়া, পেরু, প্যারাগুয়ে ও মধ্য আমেরিকার বাইরেও লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশে বিস্তৃত হওয়ার পথ সুগম হবে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তনে উঠেপড়ে লাগে।
চাভেজ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। চাভেজ তাঁর আগের রাষ্ট্রপ্রধানদের মতো যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করতে রাজি ছিলেন না। ২০১০ সালে অভ্যুত্থান উসকে দেওয়ার দায়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে কারাকাস থেকে বহিষ্কার করা হলে দেশ দুটির মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক একদমই নিচে নেমে যায়। এক যুগ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় অর্থনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচনী রাজনীতি, অন্তর্ঘাত ও সামরিক অনুপ্রবেশের মাধ্যমে অস্থিরতা তৈরিতে ভূমিকা রাখে। তবে সাম্প্রতিক কালে মাদুরো ক্ষমতায় আসার পর তারা আবারও রাজপথের সহিংসতা উসকে দিয়ে দক্ষতার সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করে। ২০১৪ সালের শুরু থেকেই লিওপোলদো লোপেজের নেতৃত্বে সরকারি স্থাপনা ও কর্মীদের ওপর সহিংস হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। সেসব সহিংসতায় ৪৩ জন নিহত ও ৮৭০ জন আহত হয়। সরকার উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন এনজিও, রাজনৈতিক দল, নেতা, সাবেক ও বর্তমান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বিপুল অর্থ দেয়। ২০১৫ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র আবারও এক সামরিক-বেসামরিক অভ্যুত্থানে ইন্ধন জোগায়, যা সফল হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতাদের মাধ্যমে মৌলিক পণ্যের ব্যাপক মজুত ঘটিয়ে সংকট তৈরি করে। মুদ্রার কালোবাজারি ও চোরাকারবারির মাধ্যমে কলম্বিয়ায় ভোগ্যপণ্য পাচার করেও মৌলিক পণ্যের ভয়াবহ সংকট তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্র ভূমিকা রাখে। এর ফলে মাদুরোর নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক দলের প্রতি জনরোষ সৃষ্টি হলে সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে দলটির পরাজয় নিশ্চিত হয়। মাদুরো বলেছেন, তাঁর দল হেরেছে বলেই যে ভেনেজুয়েলায় সমাজতান্ত্রিক ও বলিভারিয়ান আদর্শের পরাজয় ঘটেছে, তা নয়। অর্থনৈতিক সংকটের কারণেই তাঁর দল হেরেছে, যার পেছনে মূল কারণ ছিল তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধনে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’।
তবে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, জবাবদিহির অভাব ও রুগ্ণ অবকাঠামোর মতো সমস্যাও অর্থনীতি ও উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করায় সমাজতান্ত্রিক দলটির ওপর মানুষের আস্থা হারিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষায় বিভিন্ন দেশে সরকার পরিবর্তনে হস্তক্ষেপের ইতিহাস পুরোনো। ভেনেজুয়েলার সংসদীয় নির্বাচনে সমাজতান্ত্রিক দলের পরাজয় ও ডানপন্থী দলের বিজয়ের মধ্য দিয়ে আবারও সে রকম পুনরাবৃত্তিই হলো।
খলিলউল্লাহ্: জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা, বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ (বিসিএসএস) ও সহকারী সম্পাদক, প্রতিচিন্তা।
khalil.jibon@gmail.com

এই পর্ন তারকাদের আয় শুনলে ভিড়মি খাবেন

কালের কণ্ঠ অনলাইন, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৫: যে ইন্ডাস্ট্রির মোট আয় বছরে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখানে স্টারদের আয় কী রকম কখনও ভেবে দেখেছেন? জানলে চমকে উঠবেন। আয়ের নিরিখে অনেক দেশের বড় বড় স্টারদের অনায়াসে টেক্কা দিতে পারেন এই পর্ন তারকারা। এক নজরে দেখে নিন, আয়ের বিচারে প্রথম ১০ জন পর্ন তারকা কারা এবং তাঁদের বার্ষিক আয় কত।
১০) লেক্সিনটন স্টিলি: এক সময় পেশায় স্টক ব্রোকার ছিলেন একটি নামকরা ফার্মে। ২০০১ সালে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে য়খন হামলা হয়, তখন তিনি সেখানেই ছিলেন। বরাত জোরে বেঁচে গিয়েছিলেন। এঁর বার্ষিক আয় ৬০ লক্ষ মার্কিন ডলার।
৯) কেটি মর্গ্যান: এক সময় জেলবন্ধি জীবন কাটাচ্ছিলেন কেটি। মেক্সিকো থেকে আমেরিকায় মারিজুয়ানা পাচার করতে গিয়ে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। নিজের জামিন এবং মামলা লড়ার খরচ জোগাড় করতেই এই পেশায় আসেন কেটি। এখন অন্যতম ধনী তারকা তিনি। বছরে আয় ৬০ লক্ষ মার্কিন ডলারের কিছু বেশি।
৮) ব্রি ওলসন: ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের শখ ছিল। স্টেজে এক সময় অভিনয়ও করেছেন। তার পর এ পেশায় আসা ঠিক করেন। এ মুহূর্তে আয়ের বিচারে তিনি ৮ নম্বরে রয়েছে। বার্ষিক আয় ৭০ লক্ষ মার্কিন ডলার।
৭) রন জেরেমি: এক সময় শিক্ষক ছিলেন। পরে অভিনেতা হওয়ার আশায় নিউ ইয়র্কের রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষে পর্যন্ত করতে হয়েছে তাঁকে। এখন তাঁকে বেস্ট মেল পর্ন স্টারের আখ্যা দেওয়া হয়। ব্যাঙ্ক ব্যালান্সও সে কথাই বলে। বার্ষিক আয় ৭৫ লক্ষ মার্কিন ডলার।
৬) মারিয়া তাকাগি: এ মুহূর্তে অন্যতম জনপ্রিয় পর্ন অভিনেত্রী। জাপান থেকে সোজা মার্কিন মুলুকে পাড়ি জমানোর পর আয়ের বিচারেও সকলকে টেক্কা দিচ্ছেন। বার্ষিক আয় প্রায় ৮০ লক্ষ মার্কিন ডলার।
৫) জেসি জেন: নিউ ইয়র্কে তিনি রীতিমতো জনপ্রিয়। একটি আর্টিকেলে লেখা হয়েছিল, 'তিনি ২ বার ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট অপারেশন করিয়েছেন। আসলে অপারেশন নয়, ইনভেস্টমেন্ট।' বার্ষিক আয় ৯০ লক্ষ মার্কিন ডলার।
৪) ট্রেসি লর্ডস: আসল নাম নোরা লুইসি কুজমা। মাত্র ১৫ বছর বয়সে এক জন ন্যুড মডেল হিসাবে কেরিয়ার শুরু করেন ট্রেসি। দীর্ঘ কেরিয়ার শেষ করেছেন। তার সঙ্গে বানিয়েছেন বিরাট ব্যাঙ্ক ব্যালান্স। বার্ষিক আয় ১ কোটি মার্কিন ডলার।
৩) পিটার নর্থ: গিয়েছিলেন মডেল হতে, হয়ে গেলেন পর্ন তারকা। একটি ইন্টারভিউতে নিজের মুখেই এ কথা স্বীকার করেছেন নর্থ। একটি প্রাইভেট পার্টিতে মডেলিংয়ের কাজ করার সময় এক পরিচালকের নজরে পড়ে যান তিনি। তার পর প্রচুর পর্ন মুভিতে অভিনয় করেছেন এবং নিজেও পরিচালনার কাজ করেছেন। বার্ষিক আয় ১ কোটি ১০ লক্ষ মার্কিন ডলার।
২) টেরা প্যাট্রিক: ১৯৯৯ সালে পর্ন দুনিয়ায় নিজের কেরিয়ার শুরু করেন টেরা। ২০০৮ সালে অবসর নিলেও নিজের প্রোডাকশন হাউস চালান। বিশ্বজুড়ে নিজের অভিনীত ছবিগুলিকে লাইসেন্স করিয়েছেন। সেই থেকেই বিরাট আয় হয় তাঁর। এখন বছরে আয় করেন দেড় কোটি মার্কিন ডলার।
১) জেনা জেমসন্স: বয়ফ্রেন্ডের ওপর রাগ করে হঠাত্‍ করে ঠিক করেন পর্ন তারকা হবেন, ব্যস যেমন ভাবা তেমন কাজ। হয়েই গেলেন। এ মুহূর্তে রোজগারের বিচারে এক নম্বরে রয়েছেন জেনা। বার্ষিক আয় ৩ কোটি মার্কিন ডলার।
স্পেশাল মেনশন: হ্যাঁ, যাকে খুঁজছেন তিনিও আছেন তালিকায়। সানি লিওন। পর্ন সিনেমায় মুখ দেখানো ছেড়েছেন অনেক দিন হয়ে গিয়েছে, তবে আয়ের বিচারে তিনি আছেন ২১ নম্বরে।

এরশাদ সরকারকে ‘স্বৈরাচার’ বলি কেন? by আলী রীয়াজ

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম লক্ষণ হিসেবে অস্থিতিশীলতার কথা বলা হয়ে থাকে এবং তা যে মোটেই অতিরঞ্জন নয়, তা সবাই জানেন। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, গত ৪৪ বছরে নাগরিকদের আন্দোলনের কারণে মাত্র দুই দফা সরকারকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ঘটনা ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তৎকালীন ক্ষমতাসীন সেনাশাসক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের পতন। এরশাদের পতন ছিল জনগণের শক্তির বিজয়। এই সপ্তাহে এই বিজয়ের ২৫ বছর পূর্তি পালিত হচ্ছে, যা আমাদের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে পেছনে তাকানোর, সেই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের স্মৃতিচারণার। এই বিজয় অর্জিত হয়েছে অনেক আত্মত্যাগের বিনিময়ে, ফলে এই স্মৃতিচারণা কেবল ঘটনাপ্রবাহের নয়, বরং সেসব বীরকে স্মরণেরও সময়। এ-ও আমাদের স্মরণ করতে হবে যে এই আন্দোলনের শেষ পর্যায়ের সূচনা ১৯৯০ সালের অক্টোবরে হলেও তার পেছনে ছিল ১৯৮২ সাল থেকে সূচিত অব্যাহত সংগ্রামের ইতিহাস।
কিন্তু এই সংগ্রামের কারণ কী ছিল? আশু লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার হাতবদল, এরশাদ সরকারের অপসারণ। কিন্তু এই তাগিদটি তৈরি হয়েছিল কেন? ১৯৮২ সাল থেকে ক্ষমতাসীন ওই সরকার আচরণেই কেবল স্বৈরাচার ছিল তা নয়, আকাঙ্ক্ষার দিক থেকেও স্বৈরাচারীদের অন্যতম লক্ষণ—ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী, সম্ভবত চিরস্থায়ী করা—ছিল এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এরশাদ সরকারের পতনের ঘটনা সে কারণেই যথাযথভাবে ‘স্বৈরাচারীর পতন’ বলে চিহ্নিত। এই ঘটনাবলিকে স্মরণ করার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে এর ২৫ বছর পূর্তি পালনের সময়, আমাদের সুস্পষ্টভাবে এই দিকটি মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের এযাবৎ ইতিহাসে একটানা সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতাসীন এরশাদ সরকারকে আমরা কেন ‘স্বৈরাচার’ বলে বর্ণনা করি। এই ‘কেন’ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, অন্যথায় আমরা এই আন্দোলনের যথাযথ মূল্যায়ন করতে সক্ষম হব না।
স্বৈরাচারী ব্যবস্থার সুস্পষ্ট প্রামাণিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রশ্নসাপেক্ষ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অবৈধভাবে, ক্ষমতায় অধিষ্ঠান; ক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে অগণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ ও ক্ষমতাসীন অবস্থায় রাষ্ট্রশক্তির নির্বিচার ব্যবহার। এটি কেবল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বা বিশেষ কোনো সরকারের ক্ষেত্রে কার্যকর তা নয়, পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালেই এর অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যাবে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আগে, তৎকালীন পাকিস্তানে আইয়ুব খানের ‘উন্নয়নের এক দশক’ (১৯৫৮-১৯৬৮)-এর অভিজ্ঞতা যাঁদের আছে এবং যাঁরা এই ইতিহাস পাঠ করেছেন, তাঁরা সহজেই বুঝতে পারবেন, কেন তাকে ‘স্বৈরাচারের এক দশক’ বলা হয় এবং কেন সেনাশাসক আইয়ুব খানকে স্বৈরাচারী ছাড়া আর কিছু বলার সুযোগ নেই। এরশাদ সরকারের ক্ষেত্রে উল্লিখিত লক্ষণগুলোই ছিল প্রধান বৈশিষ্ট্য।
প্রায় নয় বছরের এরশাদ শাসনের আরও কয়েকটি দিক চিহ্নিত করা দরকার, যাতে আমরা এই সরকারের চরিত্র উপলব্ধি করতে পারি। এগুলো হচ্ছে ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ, প্রশাসনিক বা প্রতিনিধিত্বের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ রোধ করা এবং দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। এই প্রবণতাগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুর্নিরীক্ষ ছিল তা নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই ধরনের প্রবণতা তৈরি হয়। সর্বোপরি এরশাদের পূর্বসূরি জেনারেল জিয়াউর রহমানের আমলে আমরা এর কিছু লক্ষণ দেখতে পাই, যে কারণে টেকসই প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি, ক্ষমতা ব্যক্তির হাতেই কেন্দ্রীভূত থেকেছে। কিন্তু এরশাদের আমলে এই প্রবণতাগুলো সরকার ও শীর্ষ ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তির লক্ষ্য হিসেবেই প্রতিভাত হয়। সে কারণে ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সারা পৃথিবীতে ‘রিচেস্ট প্রেসিডেন্ট অব দ্য পুওরেস্ট কান্ট্রি’ (সবচেয়ে গরিব দেশের সবচেয়ে ধনী প্রেসিডেন্ট) পরিচয়ে পরিচিত হন। ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থে রাষ্ট্রক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তার একটি উদাহরণ হচ্ছে তৎকালীন সরকারপ্রধানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যাংক বিসিসিআই, বিশেষ করে এর প্রধান আগা হাসান আবেদির সম্পর্ক। লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস-এ ১৯৯১ সালের ২ নভেম্বর প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছিল যে জেনারেল এরশাদ একটি দেশে বাংলাদেশের কূটনীতিক হিসেবে বিশাল বেতনে নিয়োগ দিয়েছিলেন ব্যাংকের একজন কর্মকর্তাকে, যাতে ওই ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষা হয়।
প্রায় বিস্মৃত এসব ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার কারণ হলো এই দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা যে জেনারেল এরশাদের শাসনের বিষয়টি কেবল একজন ব্যক্তির শাসনের বিষয় ছিল না। স্বৈরাচারী ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন একজন ব্যক্তি, কিন্তু স্বৈরাচারী ব্যবস্থা এই ব্যক্তিকে টিকিয়ে রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে সাজিয়ে তোলে, যা সবার অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে নাগরিকদের আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এটাই যে ১৯৭৫ সাল থেকে যে ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, রাজপথের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তাকে পরাস্ত করা গিয়েছিল। আন্দোলনের এই সাফল্য বিরাজমান ব্যবস্থার বিপরীতে নতুন ধরনের রাজনীতির সম্ভাবনা তৈরি করে দিয়েছিল। এরশাদ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা রাষ্ট্র ও সমাজের গণতন্ত্রায়ণের সম্ভাবনা। সুনির্দিষ্টভাবে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলের কর্মসূচির ভিত্তিতে আন্দোলন হয়েছিল এমন দাবি করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু ওই আন্দোলন ‘স্বৈরাচারী ব্যবস্থা’কে বদলে দিতে চেয়েছিল, এ কথা বললে অতিরঞ্জন হবে না।
এখন প্রশ্ন উঠবে, সেই সম্ভাবনার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে? ওই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অর্জন বলতে আমরা দুটো বিষয়ের দিকে অঙ্গুলিসংকেত করতে পারি—তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা ও সংসদীয় ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন। প্রথমটিকে স্থায়ী সাংবিধানিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করার জন্য দরকার হয় আরেকটি আন্দোলন, ১৯৯৫-৯৬ সালে আমরা সেই আন্দোলনই প্রত্যক্ষ করি। বাংলাদেশের এযাবৎকালের ইতিহাসে সেটি হচ্ছে দ্বিতীয় সফল আন্দোলন। এখন এই ব্যবস্থাই কেবল অপসৃত হয়েছে তা নয়, অন্যদিকে যে প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করা সম্ভব হলে এই ব্যবস্থারই প্রয়োজন হতো না, তাও তৈরি করা হয়নি। ফলে প্রাতিষ্ঠানিকতার বিবেচনায় বাংলাদেশের রাজনীতি খুব বেশি এগিয়েছে এমন দাবি করা যাবে না। সংসদীয় ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন যে ইতিবাচক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিল, তার বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি কেননা এটি ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণের বিকল্প হিসেবে চালু করা হয়নি। সংবিধানের সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা এক জায়গায় একত্র হয়েছে, যা কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উদ্বোধন ঘটাতে পারেনি।
তাহলে স্বৈরাচারীর পতনের ২৫ বছর পূর্তিতে আমরা ওই আন্দোলনের কোন দিকগুলো স্মরণ করব? আমরা স্মরণ করব রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার কোন কোন বৈশিষ্ট্য ও উপাদানের বিরুদ্ধে নাগরিকদের উত্থান ঘটেছিল। সেই ইতিহাস আমাদের মনে রাখা দরকার, বারবার স্মরণ করা দরকার এবং যাঁরা এই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী ছিলেন না, তাঁদের কাছে তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

নগরকেন্দ্রিক স্থাপনার রূপরেখা

একটি অনুমান করা যাক, যদি শুধু স্থাপনা-অবকাঠামো শিল্প ২০৫০ সালের মধ্যে ৩ গিগাটন বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন রোধ করতে পারে, তাহলে সেটি হবে এক বছরে রাস্তা থেকে ৬৩ কোটি গাড়ি তুলে নেওয়ার সমতুল্য। বিষয়টি মোটেও তুচ্ছ নয়। এখন পৃথিবীর শহরের জনসংখ্যা ৩৫০ কোটি। এর সঙ্গে অতিরিক্ত ২৫০ কোটি নাগরিক নতুন করে যুক্ত হলে শহরের পরিবেশ, রাস্তাঘাট, যানবাহন, স্বাস্থ্যরক্ষাসহ জলবায়ুর ওপর কী ধরনের ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। এসব নিয়েই প্যারিসে অনুষ্ঠিত হলো বিশ্বের জলবায়ু–বিষয়ক সম্মেলন কপ-২১। যেখানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য ও স্থাপনাশিল্পের বিষয়টি বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু স্থাপনা কিংবা ভবন খাত থেকেই প্রতিবছর নিঃসরিত সর্বমোট গ্রিনহাউস গ্যাসের এক-তৃতীয়াংশ নির্গত হয়। শক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার ও অনিয়ন্ত্রিত পরিচালনাই হচ্ছে এই নির্গমনের কারণ। সেই সঙ্গে ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই নির্গমনের পরিমাণ দ্বিগুণ বা তিন গুণ হবে। এ ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দ্রুত নগরায়ণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। আমাদের মতো দেশগুলোর অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ বা অন্যকথায় শোচনীয়। কারণ, আমাদের দেশের শহরগুলোর বিশেষ করে শুধু ঢাকার জনসংখ্যা গত ১০ বছরে প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে, আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে তার সংখ্যা হবে প্রায় ২ কোটির কাছাকাছি। ফলে প্রতিবছরই ঢাকায় বিপুল পরিমাণ স্থাপনা অনিয়ন্ত্রিতভাবে নির্মিত হচ্ছে, যার সঠিক পরিসংখ্যান সত্যিই আমাদের ভাবিয়ে তোলে। এর মাশুল হিসেবে নাগরিকদের অধিক মাত্রায় বৈদ্যুতিক বিলসহ অন্যান্য ব্যয়ভার মেটাতে হচ্ছে। একদিকে যেমন শক্তির অপচয় বাড়ছে, তেমনি অন্যদিকে বাড়ছে দূষণের মাত্রা ও কার্বন নিঃসরণের হার। দুর্ভাগ্যজনক হলেও বিষয়টি সত্য যে ইতিপূর্বে বিশ্বের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করলেও স্থাপনাশিল্পে শক্তির ব্যবহার এবং অপচয় রোধকল্পে সঠিক করণীয় নির্ধারণ করতে পারেননি। তবে এবারের কপ-২১ সম্মেলনে এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আগে বিষয়টিকে একপ্রকার পাশ কাটিয়ে যাওয়া হলেও বর্তমানে ‘টেকসই উন্নয়ন রূপরেখায়’ এটা অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ৪৫টির মতো দেশ তাদের জাতীয় উন্নয়নে ইতিমধ্যে পরিবেশবান্ধব স্থাপনাশিল্পের বিষয়টি আমলে নিয়েছে, বিষয়টি ইঙ্গিতপূর্ণ।
অন্যদিকে ‘বিল্ডিং এফিসিয়েন্সি ইন কান্ট্রিস ন্যাশনাল ক্লাইমেট প্ল্যান’-এর তথ্যমতে, বিশ্বের শুধু ৫০টির মতো দেশ তাদের স্থাপনাশিল্পে শক্তির অপচয় রোধ করার জন্য বিশেষভাবে করণীয়র তালিকা প্রণয়ন করেছে। অন্যরা এখনো ওই বিষয়ে সেভাবে পদক্ষেপ নিতে পারেনি, যা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অতীব জরুরি। অন্যদিকে, জাতিসংঘের পরিবেশ-বিষয়ক কর্মসূচি ও ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট বর্তমানে স্থাপনাশিল্পকে পরিবেশবান্ধব করতে এবং উন্নয়নশীল দেশের শহরগুলোতে পরিবেশ খাতে অর্থায়ন বাড়াতে মত দিয়েছে। তারা এ ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড পুনর্নির্ধারণ, স্থাপনাশিল্পে শক্তির ব্যবহার পর্যবেক্ষণ-পর্যালোচনাতে অধিক গুরুত্ব আরোপ করতে বিশেষভাবে আগ্রহী। এখন আমাদের দেখতে হবে, এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করতে আমাদের দেশের শহরকেন্দ্রিক পদক্ষেপ হিসেবে প্রথমে কী করা যেতে পারে: স্থানীয় ও নগরকেন্দ্রিক নীতিমালা প্রণয়ন ও আঞ্চলিক সমন্বয়। তা ছাড়া, আমাদের দেশে বর্তমানে যে বিল্ডিং কোড আছে, সেটিকে অঞ্চলভেদে পরিবেশ ও জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ঢেলে সাজাতে হবে, যার ভিত্তি হবে সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা। এ ক্ষেত্রে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সহ কেন্দ্রীয় হাউস বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। শুধু প্রয়োজন আন্তরিকতা ও সঠিক পৃষ্ঠপোষকতার। অন্যদিকে দেশের স্থপতি-প্রকৌশলী ইনস্টিটিউট তাদের অভ্যন্তরীণ গবেষণা কার্যক্রমের মাধ্যমে নগরকেন্দ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে, তাদের সে সক্ষমতা আছে। এ ক্ষেত্রে ডেনিশ ক্লাইমেট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড যেভাবে বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা করছে, আমরা তা অনুসরণ করতে পারি। সেই সঙ্গে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর মতো আমাদের দেশেও প্রস্তাবিত ‘বিল্ডিং ডে’ পালনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের পরিবেশবান্ধব স্থাপনাশিল্পের বিষয়ে সচেতন করতে পারে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রকল্পের জ্বালানি ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। ঢাকার মেয়রদের পক্ষ থেকে শহরকে সবুজ করার যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে বাড়ির ছাদে গাছ লাগানোর যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয় ও বিজ্ঞানসম্মত। কারণ, গবেষণায় দেখা গেছে, ছাদে সবুজের সমারোহ থাকলে বাড়ির অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমানো সম্ভব, এতে শক্তির সাশ্রয় হবে। এ ক্ষেত্রে স্থপতিরা সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে নগরের পরিবেশ বিপর্যয় রোধ করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে পারেন। আর এ কাজ শুরু করতে হবে নিজ আঙিনা থেকেই। আজ যা স্থানীয়, কাল তা সমগ্র বিশ্বের।
সজল চৌধুরী: সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে জাপানে গবেষণারত।

টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা কঠিন

বাংলাদেশে অব্যাহতভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটে চলেছে; বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু বলে গেলেন, আমাদের অর্থনীতি ‘উড্ডয়ন-সূচনা’র পর্যায়ে আছে। এই প্রীতিকর সংবাদের বিপরীতে জানা গেল, ব্যবসাবান্ধব দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ নিচের দিকে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ব্যবসা- বাণিজ্যবিষয়ক সাময়িকী ফোর্বস এ বছর ব্যবসাবান্ধব দেশগুলোর যে তালিকা প্রকাশ করেছে, সেখানে ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান ১২১ নম্বরে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও এটা বেশ হতাশাব্যঞ্জক অবস্থান। আমাদের ওপরে আছে শ্রীলঙ্কা, ভারত, ভুটান, নেপাল; এমনকি জাতিগোষ্ঠীগত সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদ ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় পর্যুদস্ত দেশ পাকিস্তানও। কোনো দেশের পরিবেশ ব্যবসাবান্ধব না হলে উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি হয়। জানা দরকার কী ধরনের সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা ব্যবসাবান্ধব দেশগুলোর তালিকায় দৃষ্টিকটুভাবে পিছিয়ে আছি। ফোর্বস-এর ওই সমীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে,
তালিকার নিচের দিকের দেশগুলোতে দুর্নীতির মাত্রা অত্যন্ত ব্যাপক এবং বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা খুব কম। সবচেয়ে কম ব্যবসাবান্ধব দেশগুলোর পিছিয়ে থাকার প্রধান দুটি কারণ হলো এই। বাংলাদেশ দুর্নীতির ক্যাটাগরিতে ১২৭তম অবস্থানে। এর চেয়েও খারাপ অবস্থা বাণিজ্যক্ষেত্রে স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতায়—এ দুটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান যথাক্রমে ১৩৭তম ও ১৩১তম। তবে ব্যবসার পরিবেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যেমন পুঁজিবাজারের সক্ষমতা, করভার, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান অপেক্ষাকৃত ভালো। এই ইতিবাচক ক্ষেত্রগুলোর সুফল আরও বেশি মাত্রায় পেতে হলে দুর্নীতি কমাতে হবে, বাণিজ্যক্ষেত্রে স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সহিংসতা, দারিদ্র্য, বৈষম্য ইত্যাদি কমানো; অবকাঠামো, অকৃষি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত করার কোনো বিকল্প নেই।

ভারত-পাকিস্তান আলোচনার বিকল্প নেই by কুলদীপ নায়ার

হিম শীতের মধ্যে হঠাৎ করেই যেন গ্রীষ্মের আবির্ভাব। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দৈবাৎ ১৬০ সেকেন্ডের সাক্ষাতের কারণে বরফ গলতে শুরু করেছে। যদিও আগে মনে হয়েছিল, বরফ এত জমাট বেঁধে গেছে যে তা আর গলবে না। এই উল্টো গতি দেখে বোঝা যায়, পার্থক্যগুলো অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। আসল কারণ সম্ভবত অহমবোধ, ওটাকে সামাল দিতে হবে।
ভারত এই অবস্থানে অনড় ছিল যে তারা সন্ত্রাসবাদ ছাড়া অন্য বিষয়ে কথা বলবে না, রাশিয়ার উফায় বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিতে এই বিষয়টা সমাধান-অযোগ্য বলে মনে হয়েছিল। আবার পাকিস্তান মনে করেছে, আসল বিষয় অর্থাৎ কাশ্মীরের ‘প্রসঙ্গ’ যদি আলোচ্যসূচির শীর্ষে না থাকে, তাহলে কথা বলার কোনো মানে হয় না। এই কারণেই আলোচনা আর চলতে পারেনি। এর পাশাপাশি পাকিস্তান দাবি করে আসছিল, তারা হুরিয়াত নেতাদের সঙ্গে বসতে চায়। আলোচনা অগ্রসর না হওয়ার এটিও একটি কারণ।
দৃশ্যত মনে হচ্ছে, দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে জমে বরফ হয়ে আছে, তাই এই বরফ গলাতে হবে। তাদের মধ্যে দূরত্বও সৃষ্টি হয়েছে। একবার তাদের প্রধানমন্ত্রীরা বৈঠকে মিলিত হলে এই যুদ্ধংদেহী অবস্থান আর থাকবে না, এতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অর্থবহ আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি হবে। যাঁরা কাঠামোভিত্তিক আলোচনার কথা বলেন, তাঁরা এটা বোঝেন না যে আলোচনার ইচ্ছা না থাকলেই মানুষ এসব কারণের দোহাই দেয়। আর যখন গঠনমূলক আলোচনার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়, তখন অন্য সবকিছু পেছনে চলে যায়। তখন প্রধানমন্ত্রীরাও অহম ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের মতো আচরণ করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ বলেছেন, এ বিষয়ে আরও অগ্রগতি হবে। অর্থাৎ কিছু শর্ত মানা না হলে আলোচনা হবে না বলে তাঁদের যে পূর্ব অবস্থান ছিল, সেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে।
আমি চার দশক ধরে উপমহাদেশের ঘটনাপ্রবাহের ওপর নজর রাখছি। আমি অনুধাবন করেছি, আস্থাহীনতা বা অবিশ্বাসের কারণেই এই দেশ দুটির মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠছে না। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু মনে করতেন, এই অবিশ্বাস হচ্ছে রোগের লক্ষণ, সেটা নিজে রোগ না হলেও। আর রোগটি হচ্ছে ভারতবিরোধী অনুভূতি।
পাকিস্তানও একই কথা বলতে পারে। তারপরও এই সত্য এড়িয়ে যাওয়া যাবে না যে দেশ দুটির মধ্যে আস্থা না থাকলে কোনো আলোচনাই ফলপ্রসূ হতে পারে না। এ কারণেই অনেক চুক্তি এখনো কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে। তা সে তাসখন্দ চুক্তি বা শিমলা চুক্তি হোক, বন্ধুত্বের শুভ শব্দগুলো কখনোই বাস্তব হয়নি। কেউ একে অপরকে বিশ্বাস করে না। এমনকি আজও সেই একই গল্প চলছে। দেশভাগ ও মুসলমানদের স্বদেশ পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার সময় যে পরিবেশ ছিল, আজও সেই পরিবেশই বিরাজ করছে। বস্তুত এই অবিশ্বাস বরং ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যকার অবিশ্বাস একটুও কমেনি। ফলস্বরূপ এখনো দুটি দেশেই সংখ্যালঘুদের ওপর নৃশংস হামলা হচ্ছে, সেই খবরও আমরা পাচ্ছি।
সন্দেহ নেই, দেশ দুটির মধ্যে আলোচনা হবে, যদিও ভারত হয়তো তা শুরু করতে একটু অনাগ্রহী হবে। কারণ, এতে ওই সুপ্ত শত্রুতা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। উভয় পক্ষকেই বৈরিতার পুরোনো অধ্যায় বন্ধ করতে হবে, তাদের নতুন করে শুরু করতে হবে। এটা খুব কঠিন মনে হয়। তবু পাকিস্তান সৃষ্টির পর তারা যদি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্র কথা শুনত, তাহলে পরিস্থিতি হয়তো আরেকটু সহজ হতো। তিনি বলতেন, এখন থেকে আপনারা আর হিন্দু বা মুসলমান নন, এখন আপনারা ভারতীয় ও পাকিস্তানি হয়ে উঠেছেন। সেটা ধর্মীয় বোধ থেকে না হলেও অন্যভাবে।
পাকিস্তান জিন্নাহ্র আকাঙ্ক্ষা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। তারা পুরোপুরি ইসলামি রাষ্ট্র হয়ে গেছে, যেখানে ধর্মীয় শক্তিগুলোর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে এখন হিন্দুদের সংখ্যা ২ শতাংশেরও কম, অনেকেই তো ভারতে চলে এসেছিলেন বা বাঁচার জন্য ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। যখন ভারতের বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হলো, তখন পাকিস্তানের অনেক হিন্দু মন্দির ও শিখ গুরুদুয়ারা ধ্বংস করা হয়েছিল।
এই পরিপ্রেক্ষিতে কাশ্মীর নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তার কারণ আমাদের বোধগম্য। ফারুক আবদুল্লাহ ঠিকই বলেছিলেন, কাশ্মীর পাকিস্তানের অধীনে থাকলে সে তারই অংশ হবে আর ভারতের অধীনে যে ভূমি থাকবে তা নয়াদিল্লির সঙ্গেই থাকবে। কিন্তু তিনি আরেকটি কথা বলেছিলেন, সেটা হলো ভারত ও পাকিস্তান উভয়কেই কাশ্মীর থেকে চলে যেতে হবে, এটা বাস্তবসম্মত বা বাস্তববাদী কথা নয়।
ভালো হোক বা মন্দ হোক, যুদ্ধবিরতির জায়গাটা নিয়ন্ত্রণরেখায় পরিণত হয়েছে। সেটা এখন আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একতরফা এই রেখা পরিবর্তন করার চেষ্টা করায় নানা বৈরিতার সৃষ্টি হয়েছে, যা আমরা অতীতেও দেখেছি। কাশ্মীরিরা আজ বিভাজিত, ফলে এটা করার চেষ্টা হলে তাদের সঙ্গে অন্যায় হবে। কিন্তু তারা কাশ্মীরের দুটি অংশকে এক করার জন্য আন্দোলন করছে না, সে তারা রাজপথে যতই নামুক না কেন। মনে হচ্ছে, তারা যেন যুদ্ধবিরতি রেখা নিয়েই সন্তুষ্ট।
লে. জেনারেল খুলওয়ান্ত সিং সে সময় ওই অভিযানটি পরিচালনা করেছিলেন। তাঁকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ভারত ওই রকম সুবিধাজনক অবস্থায় থাকার পরও তিনি থেমে গিয়েছিলেন কেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, সরকারের নির্দেশেই তাঁকে থামতে হয়েছিল। তখনকার প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, কাশ্মীরের যে অংশে পাঞ্জাবি ভাষী মানুষ থাকে, সে অংশটি ভারত নিতে চায় না।
ফারুক আবদুল্লাহর জানা উচিত, কাশ্মীরের কাশ্মীরি ভাষী অংশটা ভারতের সঙ্গেই আছে। উপত্যকার ওপারে পাঞ্জাবি ভাষী মুসলমানরা থাকে, কাশ্মীরিদের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা সত্য যে পুরো কাশ্মীরের শ্রীনগরের অধীনেই থাকা উচিত। কিন্তু রাজ্যটি ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার পর যেসব ঘটনা ঘটেছে, তাতে রাজ্যটি একদম খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেছে।
সেই বন্দোবস্তটি বাতিল করা হলে ভারত ও পাকিস্তান উভয়কেই অনেক মূল্য দিতে হবে। তাদের দুটি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আছে। এটা কাশ্মীরিদের জন্য ন্যায্য না হলেও এ পরিস্থিতিতেই তাদের থাকতে হবে, ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থা বুঝেই তাদের থাকতে হবে। তাদের মধ্যে আরেকটি যুদ্ধ লাগলে তা পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ নেবে, সেটা হলে তো আমাদের কারও অস্তিত্বই থাকবে না।
আলোচনা ছাড়া রাস্তা নেই। ভারত ও পাকিস্তানকে এক টেবিলে বসে সব সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। স্বাভাবিক অবস্থা থাকলেই কেবল এ অঞ্চলে সমৃদ্ধি আসতে পারে, আমাদের সামনে ইউরোপের দৃষ্টান্ত আছে। তারা শত শত বছর একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, অথচ তাদের একটি অর্থনৈতিক ইউনিয়ন আছে, যার মাধ্যমে গ্রিসের মতো মুমূর্ষু রাষ্ট্রও সাহায্য পাচ্ছে। ভারত ও পাকিস্তান এই উদাহরণ থেকে শিক্ষা লাভ করতে পারে।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।

পাঁচ মিনিটেই সোনিয়া-রাহুলের জামিন by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

পাঁচ মিনিটেই জামিন পেলেন সোনিয়া ও রাহুল গান্ধী। তাঁদের সঙ্গে জামিন পেলেন ন্যাশনাল হেরাল্ড মামলায় অভিযুক্ত অন্যরাও।
জামিন পাওয়ার পরেই রাহুল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিথ্যা অভিযোগ এনে ভাবছেন আমরা মাথা ঝোঁকাব। কিন্তু আমরা এক ইঞ্চি পিছু হটব না। আমাদের লড়াই জারি থাকবে।’ সোনিয়া বলেন, ‘সরকারি সংস্থাগুলি দিয়ে আমাদের ভয় দেখানো হচ্ছে। আমরা কিন্তু ভীত নই। সত্য ঠিক প্রকাশিত হবে।’
জামিনের বিরোধিতা করে মামলাকারী বিজেপি নেতা সুব্রক্ষ্মন্যম স্বামী বলেছিলেন, অভিযুক্তরা যেন আদালতের অনুমতি নিয়ে বিদেশ যাত্রা করেন। মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেট লাভলিন সেই আবেদন অগ্রাহ্য করেন। প্রত্যেক অভিযুক্তকে ব্যক্তিগত ৫০ হাজার রুপির জামিন দিয়ে বিচারপতি জানান, পরবর্তী শুনানি ২০ ফেব্রুয়ারি। তবে অভিযুক্তরা কেউই ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার আবেদন জানাননি।
সুব্রক্ষ্মন্যম স্বামী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আগামী বছরের মধ্যেই তিনি এই মামলা জিতবেন। সোনিয়া ও রাহুলসহ সব অভিযুক্তকেই ন্যাশনাল হেরাল্ড সংবাদপত্রের সম্পত্তি হাতানো ও জালিয়াতির অভিযোগে জেলে যেতে হবে।
অন্যদিকে এই মামলাকে বিজেপির রাজনৈতিক চক্রান্ত ও প্রতিহিংসাপরায়ণতা বলে অভিহিত করেছে কংগ্রেস। ফলে, আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি তারা রাজনৈতিক লড়াইও চালিয়ে যাচ্ছে। শনিবার সকাল থেকেই তাই দলে দলে হাজারো মানুষকে কংগ্রেস সদর দপ্তরে জড়ো হতে দেখা গেছে। রাজ্যে রাজ্যেও কংগ্রেস বিক্ষোভ সমাবেশ করে। তবে কংগ্রেস কর্মীদের স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছিল তারা যেন আদালতের সামনে জড়ো না হন, আদালতের বিরুদ্ধে কোনো বিক্ষোভ না দেখান। বেলা তিনটার একটু আগেই সোনিয়া ও রাহুলের সঙ্গে অন্য তিন অভিযুক্ত কংগ্রেসের কোষাধ্যক্ষ মোতিলাল ভোরা, অস্কার ফার্নান্ডেজ ও সুমন দুবে পাটিয়ালা হাউস কোর্টে হাজির হন। ষষ্ঠ অভিযুক্ত শ্যাম পিত্রোদা অসুস্থতাজনিত কারণে হাজিরা দিতে পারেননি।
সোনিয়াদের সঙ্গেই আদালতে যান শীর্ষ কংগ্রেস নেতারা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, প্রিয়াঙ্কা ভডেরা, গুলাম নবি আজাদ, শীলা দীক্ষিত, অম্বিকা সোনি, এ কে অ্যান্টনিদের দেখা যায় সোনিয়া-রাহুলের মতোই আদালতের বাইরে গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে ঢুকতে। আদালতের ভেতর ও বাইরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল জোরদার। আদালত কক্ষে বাইরের লোকজনের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। এমনকি কোর্ট সাংবাদিক ছাড়া অন্যদের প্রবেশও ছিল নিষিদ্ধ। সোনিয়ার হয়ে জামিনের বন্ডে সই করেন এ কে অ্যান্টনি, রাহুলের জন্য প্রিয়াঙ্কা।
জামিন পাওয়ার পর কংগ্রেস নেতারা সবাই চলে যান আকবর রোডে কংগ্রেস সদর দপ্তরে। সেখানে সোনিয়া বলেন, ‘কংগ্রেসের ওপর আক্রমণ বহু বছর ধরে চলে আসছে। বিরোধীদের বিরুদ্ধে এই সরকার সব সরকারি সংস্থাকে লেলিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমরা ভয় পাই না। আমাদের লড়াই চলবে।’
সোনিয়া নাম না করলেও রাহুল সরাসরি নরেন্দ্র মোদির নাম করে তোপ দাগেন। বলেন, ‘এটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ছাড়া আর কিছু নয়। মিথ্যা অভিযোগ এনে উনি ভাবছেন আমরা মাথা ঝোঁকাব। আমি কিংবা আমরা মাথা ঝোঁকাব না। দেশের জন্য, দেশের দরিদ্রদের জন্য আমি ও আমাদের দল সব সময় কাজ করে যাব। কেউ আমাদের আটকাতে পারবে না।’
সুব্রক্ষ্মন্যম স্বামীর অভিযোগ যে রাজনৈতিক এবং এই মামলার আসল মুখ যে নরেন্দ্র মোদি, শনিবার সকাল থেকেই কংগ্রেস তা বলতে শুরু করে। দলের শীর্ষ নেতারা স্পষ্ট বলেন, ‘স্বামী হলেন মুখোশ, মুখ হচ্ছেন মোদি।’ এ কথাও বলা হয়, সাংসদ না হলেও শুক্রবারই স্বামীকে একটা সরকারি বাংলো দেওয়া হয়েছে, তাঁকে জেড শ্রেণির নিরাপত্তাও দেওয়া হয়েছে। ন্যাশনাল হেরাল্ড মামলার জন্যই এই দাক্ষিণ্য।
বিজেপি অবশ্য আগাগোড়াই এই মামলার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক না থাকার কথা বলে আসছে। যদিও তারা এ কথাও বলছে, সোনিয়া ও রাহুল বেআইনিভাবে ন্যাশনাল হেরাল্ডের সম্পত্তি হাতিয়ে নিয়েছেন এবং সে জন্য আদালত তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করবে। বিজেপির নেতা ও মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ দলীয় সংশ্রব না থাকার কথা জানিয়ে রাহুলকে এক হাত নেন। বলেন, ‘রাহুল ডাহা মিথ্যেবাদী।’
বিজেপি মুখপাত্র মুখতার আব্বাস নাকভি বলেন, ‘কংগ্রেস ও দুর্নীতি আজও সমার্থক। ওদের ঔদ্ধত্যই ওদের সর্বনাশ ঘটাবে।’

বদরুদ্দীন উমর: তিনি হার মানেননি by আনু মুহাম্মদ

বাংলাদেশের শিক্ষা, গবেষণা ও রাজনীতির অন্যতম দিকপাল বদরুদ্দীন উমরের আজ ৮৪তম জন্মদিন। ১৯৩১ সালের এই দিনে তিনি বর্ধমানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বাবা আবুল হাশিম এ অঞ্চলে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন, অখণ্ড বাংলার পক্ষে কাজ করেছেন, মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের নেতা হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পের মধ্যে ১৯৫০ সালে তাঁরা সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে উমর সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। পরে এই আন্দোলনের গবেষণায় তিনি পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষে উমর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন ও অর্থশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন, পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্ব বিভাগ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ষাটের দশকে বদরুদ্দীন উমর সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে যে লেখাগুলো লিখেছিলেন, তা ‘বাঙালি মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের’ পথ দেখিয়েছিল। সে সময় বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত সমাজকে শিক্ষিত ও আত্মোপলব্ধিতে সক্ষম করে তুলতে, পাকিস্তানের শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে তাদের ভূমিকা নির্দিষ্ট করতে উমরের এই কাজগুলোর প্রভাব ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। ষাটের দশকের শেষ থেকে তিনি ভাষা আন্দোলন নিয়ে দীর্ঘ গবেষণার কাজ শুরু করেন। কোনো রকম প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই তিনি ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ নামের বৃহৎ গবেষণা সমাপ্ত করেন।
তিন খণ্ডে এটি প্রকাশিত হয়। আহমদ ছফা বলেছিলেন, ‘আর কিছু দরকার নেই, উমর যদি জীবনে আর কিছু না–ও করতেন, তবু এই গ্রন্থের জন্যই তিনি বাঙালি সমাজে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’ সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত অনুসন্ধানে তাঁর গবেষণা ও লেখার পদ্ধতি অসাধারণ। এরপরও তিনি আরও অনেক কাজ করেছেন, এখনো একই রকম সক্রিয়তায় করে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে তাঁর শতাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
শুধু লেখক, গবেষক ও শিক্ষক হিসেবে উমরের যে অবদান, তার তুলনাই খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু তিনি এর মধ্যেই নিজেকে সীমিত রাখতে পারেননি। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মধ্য দিয়ে তাত্ত্বিক হিসেবে তাঁর যে বিপ্লবী অবস্থান তৈরি হয়, তার পূর্ণতার জন্যই তিনি সমাজের বিপ্লবী রূপান্তরের রাজনৈতিক, সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। ষাটের দশকে সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে লিখতে গিয়ে আইয়ুব-মোনেম সরকারের রোষানলে পড়ে তিনি এতটুকু উপলব্ধি করেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত থেকে তাঁর পক্ষে বেশি দূর কাজ করা সম্ভব নয়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন।
পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় রক্তচক্ষু থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্যই তিনি শিক্ষকতা ছেড়েছিলেন। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা সংস্কৃতি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে। সেই পত্রিকার নিয়মিত প্রধান লেখক ছিলেন বদরুদ্দীন উমর ও সইফ-উদ-দাহার। অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ লেখা সে সময় তাতে প্রকাশিত হচ্ছিল। কয়েক সংখ্যা প্রকাশের পরই জরুরি অবস্থার কারণে সংস্কৃতি বন্ধ হয়ে যায় ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে। ১৯৮১ সালে সংস্কৃতি আবার প্রকাশ শুরু হয়। মাঝখানে অনিয়মিত হয়ে গেলেও এখনো তা প্রকাশিত হচ্ছে।
আমাদের সমাজে বুদ্ধিবৃত্তি যেন বাণিজ্যের মধ্যে বসতি গেড়েছে। বাজার, সুশীল সমাজ বা এনজিও জগৎ—এই হলো এ ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের শুরু ও শেষ। এ ধরনের লোকের কাছে বুদ্ধিবৃত্তি তাই ফরমায়েশি বা তোষণমূলক বা অর্থ উপার্জনের মাধ্যম। সুবিধাবাদিতা, লেজুড়বৃত্তি কিংবা দেউলিয়াত্ব প্রগতি চিন্তা ও রাজনীতির প্রবল শক্তিকে এখনো আটকে রেখেছে। বদরুদ্দীন উমরের মতো ব্যক্তি এ রকম সমাজে অস্বস্তির কারণ হওয়ারই কথা। বাংলা ভাষায় মার্ক্সবাদী সাহিত্য উপস্থিত করায় উমর অগ্রণী, ইংরেজিতে পূর্ব পাকিস্তানের শ্রেণি সংগ্রাম ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যা লিখেছেন, তা বাংলাদেশের সমাজ ইতিহাস নিয়ে ইংরেজি ভাষার আগ্রহী পাঠক-গবেষকদের অনেক ভ্রান্তি দূর করবে নিশ্চিতভাবেই। বাংলাদেশে শোষণ, নিপীড়ন, বৈষম্য ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য নিয়ে উমরের ক্ষুরধার লেখা সমাজে অধিপতি চিন্তাকে বিরতিহীনভাবে মোকাবিলা করে যাচ্ছে।
সততা, নিষ্ঠা, আপসহীনতা, দৃঢ়তা—এসব শব্দই উমরের পরিচয়ে নির্দ্বিধায় যোগ করা যায়। উমরের জীবনে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ ও মানুষের মুক্তির রাজনীতির মধ্যে কোনো প্রাচীর নেই, একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। ষাটের দশকের শেষ থেকে উমর সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। কৃষক-শ্রমিকদের সঙ্গেও অনেক কাজ করেছেন। এ দেশে বিপ্লবী আন্দোলন সংগঠন বিস্তারে ব্যর্থতা তো বিরাট, নইলে বাংলাদেশের চেহারা ভিন্ন হতো। ব্যর্থতা না থাকলে ১৬ কোটি মানুষ নিজেদের মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করত, মানুষ ও প্রকৃতি মিলে এক অসাধারণ জীবন আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারতাম। তবে সেই ব্যর্থতা সামষ্টিক, সবারই তাতে দায় আছে।
কিন্তু উমর যেখানে সফল, সেটা হলো তিনি হার মানেননি। বাংলাদেশে এখন বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের যে লড়াই, তা উমরের ভাষায়, ‘৭১-এর অসমাপ্ত মুক্তিসংগ্রামের জের।’ পরাজয়, আত্মসমর্পণ আর দাসত্বের শৃঙ্খল প্রত্যাখ্যান করার শক্তিই এই সংগ্রাম এগিয়ে নেওয়ার পূর্বশর্ত। জীবনের এই পর্যায়ে এসে উমর গভীর তৃপ্তি আর প্রবল অহংকার নিয়ে বলতে পারেন, তিনি আজীবন বিরামহীনভাবে এই শক্তি নিয়েই কাজ করেছেন। তিনি তাঁর যথাসাধ্য ভূমিকা পালনে কিছুমাত্র দ্বিধা বা ক্লান্তি প্রদর্শন করেননি। ৮৪তম জন্মদিনে আজীবন শিক্ষক ও যোদ্ধা বদরুদ্দীন উমরকে গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anujuniv@gmail.com

চুড়ি-ভ্যানিটি ব্যাগ প্রতীকে নির্বাচন অসাংবিধানিক by মিজানুর রহমান খান

‘আমাদের অলংকারসমূহ—এগুলো দাসত্বের প্রতীক ছাড়া আর কী?’ আমাদের নির্বাচন কমিশনকে শাবাশ দিতেই হয়। কারণ, তারা এবারের রোকেয়া দিবস (৯ ডিসেম্বর) উদ্যাপনে ‘যথাযোগ্য’ কাজ করেছে। নারীস্থান রচনার ১১০ বছর পূর্তিতে নির্বাচন কমিশন এই রাষ্ট্রের পক্ষে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে যে অলংকারগুলো সত্যিই নারীর প্রতীক। চুড়িকে তারা নির্বাচনী প্রতীক করেনি। চুড়ি হলো নির্দিষ্টভাবে নারীর নির্বাচনী প্রতীক। ১৯০৫ সালে প্রকাশিত সুলতানাস ড্রিম-এ নয়, রোকেয়া অন্যত্র লিখেছেন, ‘কয়েদিদের জন্য নির্মিত হ্যান্ডকাফ ইস্পাতে তৈরি, আমাদেরটা তৈরি হয় স্বর্ণ ও রৌপ্যে, আমরা যাকে বলি কঙ্কণ।’ এবারের রোকেয়া দিবসের আরও একটি পরিহাস হলো, রোকেয়ার বিয়ে হয়েছিল ১৬ বছর বয়সে। সেই দিক থেকেও এই রাষ্ট্র রোকেয়ার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের ভয়ানক প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, সংসদে বিরোধী দলের নেতা, অন্যতম প্রধান দল বিএনপির শীর্ষ পদে নারী থাকার সময়ে এই ঘটনা কীভাবে ঘটল?
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেছেন, ‘পুরুষ প্রার্থীকে পুতুল, গ্যাসের চুলা বা নারীর জন্য বরাদ্দ করা কোনো প্রতীক দিলে নিশ্চয়ই তাঁরা গ্রহণ করতেন না।’ আসলে ‘নারী বা পুরুষের জন্য বরাদ্দ প্রতীক বলে কি কিছু থাকা উচিত? নির্বাচন কমিশন যুক্তি দিতে পারে, তারা নির্বাচনের জন্য প্রতীক বরাদ্দ করেছে। এটা নারীর জন্য কোনো বরাদ্দ নয়। কিন্তু তাদের যুক্তি টিকবে না, কেউ বিশ্বাস করবে না। কারণ, তারা এই প্রতীকগুলো বেছে বেছে সংরক্ষিত আসনের নারীর জন্য নির্দিষ্ট করেছে। প্রতীকের আকাল পড়েনি। আকাল পড়েছে জ্ঞানের। এটা কোনো ছোটখাটো ভুলত্রুটি নয়, এর মধ্য দিয়ে এই রাষ্ট্রের লিঙ্গ-অসমতাই নয়, মানুষে মানুষে বৈষম্য এবং নানা ভেদাভেদ সৃষ্টি করে শোষণ ও বঞ্চনার পরিবেশ জিইয়ে রাখার কসরতেরও প্রতিফলন ঘটেছে। এটা তাই মানবাধিকারের বিষয়। নারীর মানবাধিকারের বিষয় নয়।
কারণ, যে বীর ও বিচক্ষণ পুরুষেরা এটা করেছেন, তাঁদের মধ্যে একটি বড় অংশ আছেন, যঁারা প্রকারান্তরে সমতাবিরোধী। আইনের সমতায় তঁাদের কোনো বিশ্বাস নেই। আইনের শাসনে তঁাদের বিশ্বাস নেই। তাই এঁদের কেবল নারীবিদ্বেষী হিসেবে দেখলে প্রকৃত রোগ শনাক্ত করতে ভুল হতে পারে। কোনো রোগের চিকিৎসার অর্ধেক সাফল্য নির্ভর করে সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়ের ওপর। যারা চুড়ি-পুতুল নারীর জন্য চিহ্নিত করেছে, তাদের সত্যিকার অর্থে পুরুষবান্ধব বলে মনে করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তারা সভ্যতা ও প্রগতিবিরোধী। তারা নারীকে নারী হিসেবেই দূরে ঠেলে না, তারা এসব করার মধ্য দিয়ে ১৬ বা তার নিচের বয়সের মেয়েদের বিয়ে দেওয়া এবং চার বিবি জোগাড়ের মতো পরিবেশ বাঁচিয়ে রাখা, তাকে আরও শাণিত করার ধান্দা করে। ফতোয়া দিয়ে নারীকে তারা অন্তঃপুরে বন্দী রাখতে চায়। নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় তারা বিশ্বাস করে না। এই মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিরাই যখন রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করে, তখন তারা কেবল নারীর জন্য বরাদ্দ লুট করে না।
এই সমাজের যাঁরা ১৬ বছরে বিয়ের বয়স নামিয়ে মধ্যযুগ নামিয়ে আনতে চান, যাঁরা নারীকে চুড়ি প্রতীক দিয়ে সর্বস্তরে, জনজীবনে নারীকে প্রতীকায়িত করতে চান, তাঁদের বোধোদয় হোক এক শতাব্দী আগেও উপন্যাস লিখতে গিয়ে মহীয়সী রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন পুরুষের প্রতি টিটকারি করেননি। রোকেয়া লিঙ্গ-সমতায় বিশ্বাসী ছিলেন না, এমন দোষারোপ তাঁকে কেউ করেনি। কিন্তু আমাদের নির্বাচন কমিশন সন্দেহাতীতভাবে লিঙ্গবৈষম্য প্রদর্শনের চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে, যা কেবল উচিত-অনুচিত এবং শোভন-অশোভনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে সরাসরি সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন জড়িত। সংবিধানের কয়টি অনুচ্ছেদকে বিষয়টি আঘাত করেছে। আসুন, আমরা পরীক্ষা করে দেখি। ২৮ অনুচ্ছেদ বলেছে, নারী-পুরুষভেদের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না। একজন নারীকে ভ্যানিটি ব্যাগ ও চুড়ি নিয়ে নির্বাচন করতে বাধ্য করাটা তাই এই ২৮ অনুচ্ছেদকে আঘাত করেছে। এর ২ উপদফা বলেছে, ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী–পুরুষের সমান অধিকার থাকবে। এই সর্বস্তরের মধ্যে পৌর নির্বাচনে পুরুষ প্রতীক বেছে নিতে নারীর সম–অধিকারও নিশ্চয় অন্তর্ভুক্ত থাকে। ৩১ অনুচ্ছেদ বলেছে, ‘এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, দেহ ও সুনামের হানি ঘটে।’ চুড়ি, চুলা, ভ্যানিটি ব্যাগ ব্যক্তি হিসেবে কোনো নারী প্রার্থীর সুনামের হানি ঘটাতে পারে। এসব প্রতীক বেছে নিতে বাধ্য করাটা ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার (৩২ অনুচ্ছেদ) থেকে নারী প্রার্থীকে বঞ্চনা করারও শামিল। তাই এতগুলো মৌলিক অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে যে প্রতীক বরাদ্দ, তা আইনসিদ্ধ হতে পারে না। এই আইন বা বিধি সংবিধানকে আঘাত করেছে, তাই এটা চলতে পারে না। নারীদের কিংবা নাগরিকদের উচিত হবে সর্বকালের জন্য ফয়সালা করে তবেই নির্বাচনে যাওয়া।
৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীর প্রাক্কালে নারী প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন শুধু যে নারীর বিরুদ্ধাচরণ করেছে তা-ই নয়, তারা আসলে হীন মানসিকতারও পরিচয় দিয়েছে। গত মে মাসে পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইঁদুর, হারমোনিয়াম, কচ্ছপ—এসব প্রতীক ঠিক করেছিল। তা নিয়ে প্রার্থীরা প্রতিবাদে সরব হয়েছিলেন। এক ধর্মীয় নেতার ছেলে হারমোনিয়াম পেয়ে বলেছিলেন, তাঁকে সবাই টিটকারি দেবে। আরেকজন বলেছেন, তিনি মুলা পাওয়ার পর থেকে প্রতিপক্ষ তাকে মুলি বলে। পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন বলেছিল, এত প্রতীক বরাদ্দ করতে হচ্ছে তাই সবাইকে খুশি করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ইসির একজন কর্তা সংখ্যাধিক্যের দোহাই দেওয়ায় তাঁকে বললাম, এই প্রতীকগুলো সবাইকেই বরাদ্দ দিতেন। কেন নারীকেই চুড়ি বেছে নিতে হবে? পুরুষকে কেন ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে নির্বাচন করা থেকে বঞ্চিত করা হলো। এটাও তো পুরুষের জন্য বৈষম্যমূলক। পাকিস্তানে জুতার ব্রাশ, প্যান্ট, বেবিফিডার, কলা, ব্লেড ও ঝাঁটার বাঁট এবং বিহারে কাঁচা মরিচ, জুতা, চপ্পল ও আইসক্রিমের মতো তেতো প্রতীক নিয়ে নির্বাচন হয়েছে কিন্তু সেখানে নারীর প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ ওঠেনি। ইসি একা নয়, আইন মন্ত্রণালয়ও পরিচয় দিয়েছে তারা লিঙ্গ-সমতায় কতটা অসংবেদনশীল। শাড়ি-চুড়ি ধরনের প্রতীকগুলো নিয়ে বিধি জারির আগে তারা এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন নিয়েছে। এসব প্রতীক দ্রুত বাতিল করে নতুন করে বিধি জারি করা খুবই সম্ভব। কিন্তু যন্ত্রবৎ সময়স্বল্পতার দোহাই দিয়ে তারা তা না করলে অবাক হব না।
বেগম রোকেয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলি, তাঁর স্বপ্নরাষ্ট্রই হোক বিশ্বমানবতার স্বপ্ন। পুরুষস্থানে বসে নারীস্থানের স্বপ্ন এঁকে তিনি রাষ্ট্রনায়কোচিত দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন। এই সমাজের যাঁরা ১৬ বছরে বিয়ের বয়স নামিয়ে মধ্যযুগ নামিয়ে আনতে চান, যাঁরা নারীকে চুড়ি প্রতীক দিয়ে সর্বস্তরে, জনজীবনে নারীকে প্রতীকায়িত করতে চান, তাঁদের বোধোদয় হোক। তাঁদের উদ্দেশে সুলতানার স্বপ্ন থেকে দুই ছত্র: ‘একজন পুরুষ মানুষের চেয়ে সিংহ শক্তিশালী কিন্তু তাই বলে সিংহ মানবজাতির ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে পারে না।’... ‘এমনকি তাদের মস্তিষ্ক নারীর চেয়ে বৃহৎ ও ওজনদার, তাই নয় কি?’ ‘হ্যাঁ, কিন্তু তাতে কী? একজন পুরুষ মানুষের চেয়ে একটি হাতির মস্তিষ্ক অনেক বড় ও ভারী। কিন্তু মানুষ তার ইচ্ছা অনুযায়ী হাতিকে শৃঙ্খলিত ও পরিচালিত করতে পারে।’
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

অতীত নিয়ে অসন্তোষ পৌর নির্বাচন সুষ্ঠু করার তাগিদ- ইসির সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বৈঠক by সিরাজুস সালেকিন ও বেলায়েত হোসাইন

সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে। অতীতের মতো আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন যাতে প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থেকে দায়িত্ব পালন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। গতকাল নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এ নির্দেশনা দেয়া হয়।  বৈঠকে একটি বাহিনীর প্রধানের পক্ষ থেকে নির্বাচনের দিন টেলিভিশনে ভোট কেন্দ্রের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারে বিধিনিষেধ আরোপের পরামর্শ আসলে নির্বাচন কমিশন তা নাকচ করে দেয়। একজন কমিশনার সাম্প্রতিক হয়ে যাওয়া নির্বাচনগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ জায়গা থেকে নির্বাচন পরিচালনা করছে। তারপরও নির্বাচন ভালো হচ্ছে না কেন? পৌর নির্বাচন নিয়ে যাতে কোন প্রশ্ন না উঠে সে ব্যবস্থা করতে হবে। এদিকে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তারা নির্বাচনের পরিবেশ এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করেন। তাদের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, যেহেতু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে তাই নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন নেই। নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘন ও অনিয়মের ঘটনায় রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অপর এক নির্বাচন কমিশনার।
রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ র‌্যাব, আনসার, কোস্টগার্ড, বিজিবি ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসময় উপস্থিত ছিলেন। ২৩৪ পৌরসভার রিটার্নিং কর্মকর্তা  বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে অংশগ্রহণকারী প্রায় সকলেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। মাঠ পর্যায়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা বাড়ানোর অনুরোধ এসেছে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে। বৈঠক সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
টাঙ্গাইল সদর পৌরসভার রিটার্নিং কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, আমাকে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দেয়া হয়েছে। এতে আমাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ সংখ্যাটা বাড়ানোর চিন্তা করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করেন তিনি। হাইকোর্টের আদেশে বিভিন্ন স্থানে বাতিল হওয়া প্রার্থীরা মনোনয়ন ফেরত পাওয়ায় ব্যালট পেপার নিয়ে জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। কুষ্টিয়ার রিটার্নিং অফিসার মুজিবর ফেরদৌস বলেন, হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকায় আমরা অনেকের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছি। কিন্তু হাইকোর্টে গিয়ে অনেকে প্রার্থিতা ফেরত পেয়েছেন। এটা চলমান রয়েছে। নির্বাচনের দু-একদিন আগেও যদি কেউ প্রার্থিতা ফেরত পায়, তাহলে এ বিষয়ে একটা জটিলতা তৈরি হবে। ব্যালট পেপারেও একটা জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ ব্যাপারে ইসির নির্দেশনা চান তিনি।
ভোটকেন্দ্র থেকে গণমাধ্যমের সরাসরি সম্প্রচার সম্পর্কে পুলিশের আইজি একেএম শহিদুল হক বলেন, গত সিটি নির্বাচনে সাংবাদিকদের সঙ্গে একটা ভুল বুঝাবুঝি তৈরি হয়েছে। কারণ, যেখানে প্রিজাইডিং অফিসার বসে কাজ করে সাংবাদিকরা সেখানে গিয়ে সংবাদ পরিবেশন করেন। এতে কাজের কিছু ক্ষতি হয়। আমার মনে হয় তাদের বাইরে থাকাই ভালো। তবে এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সঠিক নির্দেশনা থাকলে এ ধরনের ভুল বুঝাবুঝি তৈরি হবে না। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন আমাদের কাছে ২০১১ সালের মতোই পুলিশ চেয়েছে। কিন্তু ২০১১ সালে ২৬৯টি পৌরসভায় দু’ভাগে নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু এবার ২৩৪টিতে একসঙ্গেই নির্বাচন হচ্ছে। এই অবস্থায় গতবারের মতো পুলিশ সদস্য দেয়া আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে। সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ৩ জন ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ৪ জন পুলিশ সদস্য দেয়ার ব্যাপারে প্রস্তাব রাখেন তিনি। এসময় ইসি সচিব সিরাজুল ইসলাম বলেন, সাধারণ ভোটকেন্দ্রে অতীতের ন্যায় ৫ জন ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ৬ জন পুলিশ সদস্য দেয়া দরকার। প্রয়োজনে টহল পুলিশের সংখ্যা কমানো যেতে পারে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় কমিটি বাস্তবে সব জায়গায় গড়ে উঠেনি। মিডিয়াতে বর্তমান সময়ে নির্বাচন-পূর্ব পরিস্থিতিতে যেভাবে সংবাদ পরিবেশন করা হচ্ছে তা এক ধরনের প্রতিযোগিতা। অপর এক গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে দলীয় কোন্দল বাড়তে পারে। কালো টাকার ছড়াছড়ি হতে পারে। নির্বাচনের সুযোগে ফেরারি আসামিরা এলাকায় আসতে পারে। চলমান সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে।
নির্বাচন কমিশনার শাহনেওয়াজ বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে একটা অভিযোগ এসেছে যে, কমিশনের বক্তব্যে বিভিন্নতা ছিলো। তারা অনেক কিছু স্পষ্ট হতে পারেনি। কিন্তু এটা সঠিক নয়। আমাদের বক্তব্যে কোন বিভিন্নতা ছিল না। কোন বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকলে, আপনারা আমাদের ফোন করতে পারতেন। এসময় রিটার্নিং কর্মকর্তাদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আমরা কোন খবর পাই না। পত্রিকা দেখে আমাদের জানতে হয়। পত্রিকা যা লিখছে- তা যেমন অতিরঞ্জিত, আবার কোন কিছু হচ্ছে না বলে রিটার্নিং কর্মকর্তারা যে চুপ রয়েছেন তাও ঠিক নয়। দুদিক থেকেই সঠিক খবর আসছে না। তিনি রিটার্নিং কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা দায়সারাভাবে কাজ করে যাবেন তা হবে না। এটা আপনাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। কেউ যদি মনে করেন- কোনরকম নির্বাচনটা পার করে দিবো। তাহলে ভুল করবেন। যারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবেন না, আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো।
নির্বাচন কমিশনার আবু হাফিজ বলেন, কিছুদিন আগে যুক্তরাজ্যে যে নির্বাচন হয়েছিল নির্বাচনে কমিশনের পক্ষ থেকে আমি সেই নির্বাচনে গিয়েছিলাম। সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছেন। তারা আমাকে বলেছেন, স্যার আমরা সারা দুনিয়ার নির্বাচন দেখি। আমাদের ভালো লাগে। কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচন দেখলে খুব কষ্ট লাগে। হাফিজ আরও বলেন, সবারই প্রশ্ন নির্বাচন কেন ভালো হচ্ছে না। নির্বাচন কমিশন তো কারো পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে না। তারপরও কেন নির্বাচন ভালো হচ্ছে না? তাই আমি অনুরোধ করবো এ নির্বাচনে যেনো সেই রকম কোন কথা থেকে না যায়, যা মানুষ শুনতে চায় না।
এ প্রসঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দিন বলেন, হাফিজ সাহেব একটা কথা বলেছেন। নির্বাচন কেন ভালো হচ্ছে না। এটা আমরা এত তাড়াতাড়ি আশা করতে পারি না। তবে আমাদের বিশ্বাস দিন পাল্টাবে। পরিস্থিতি আস্তে আস্তে ভালোর দিকে যাচ্ছে। সিইসি বলেন, আমরা অতীতে দেখেছি কোন কেন্দ্র আক্রান্ত হলে আমাদের কর্মকর্তারা অসহায় হয়ে পড়ে। নির্বাচন বন্ধ করে দিতে হয়। পরে আবার নির্বাচন করতে গিয়ে অনেক অর্থ ব্যয় হয়। এটা মোটেও কাঙ্ক্ষিত না। তিনি বলেন, আমাদের কাছে বেশ কয়েক জায়গা থেকে সেনা মোতায়েনের দাবি এসেছে। কিন্তু এখানে সবার কথা শুনে আমরা নিশ্চিত হলাম আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেনা মোতায়েনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। সিইসি বলেন, অনেক জায়গায় সন্ত্রাসী ও মাস্তানরা ধরা পড়ে। কিন্তু খবরের কাগজ সেই রিপোর্ট প্রকাশ করে না। কারণ, নেগেটিভ খবর প্রকাশে তারা বেশি উৎসাহী। এটা তারা উপভোগ করে। কিন্তু আপনাদের পক্ষ থেকে বক্তব্য এসেছে সবকিছু ঠিক আছে। এটা যেনো ঠিক থাকে। সেই দিকে তৎপর থাকতে হবে। কোনভাবেই যেনো দুষ্কৃতিকারীরা প্যারামিটারের ভেতরে না আসতে পারে। ভোটের আগের রাতে যেনো কেন্দ্র দখল না হয়, সেই দিকে সজাগ থাকতে হবে। আগে থেকে সব খবর রাখতে হবে।
বৈঠকে রাজশাহী ও রংপুরে জঙ্গি তৎপরতার আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে। জনসমাবেশ টার্গেট হতে পারে। এই ধরনের কোন পরিস্থিতি যেনো না ঘটে সেদিকে আমরা সজাগ থাকবো। আইনশৃঙ্খলা সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এই সুযোগে সর্বশক্তি দিয়ে এদের আয়ত্তে আনতে হবে। মিডিয়া প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, খবরের কাগজে অতি রঞ্জিত করে লেখা হচ্ছে। কিন্তু সেখান থেকে সঠিক বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে। প্রমাণ পেলে অ্যাকশন নিতে হবে। এখান থেকে অ্যাকশন না নিলে ইসি থেকে সেভাবে অ্যাকশন নেয়া সম্ভব হয় না।
রিটার্নিং কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা অ্যাকশন নেবেন এবং মিডিয়াকেও জানাবেন। তাহলে তারা সানন্দে সেটা কাভারেজ দেবে। এর আগে মিডিয়ার সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির কারণে আমরা কিছুটা অস্বস্তিতে ছিলাম। মিডিয়া থেকে আমাদের হেল্প নিতে হবে। তারা কেন্দ্রে প্রবেশ করবে। সাংবাদিকদেরকে সেই সুযোগ করে দিতে হবে। কিন্তু স্থায়ীভাবে কেউ কেন্দ্রে অবস্থান করবে না।
বৈঠক শেষে সিইসি বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের মতো কোন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতি কমিশনের অনুকূলে রয়েছে। মাঠেও পূর্ণ শৃঙ্খলা থাকবে। তিনি বলেন, সিটি নির্বাচনে সীমিত আকারে সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। এবার এমন কোন পরিকল্পনা নেই। বিজিবি, র‌্যাব বলেছে, তাদের পর্যাপ্ত ফোর্স আছে। সেগুলো মোতায়েন করবেন। পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিক প্রবেশের বিষয়ে তিনি বলেন, অতীতে  কোন ভুল বোঝাবুঝি হয়ে থাকলে এবার যাতে তা না হয়, সেজন্য নির্দেশনা দিয়েছি। সাংবাদিকদের পাস দেব। তারা ভোট কেন্দ্রে যাবেন এবং রিপোর্ট করবেন। তবে ভোটগ্রহণ কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কেন্দ্রে বেশিক্ষণ থাকবেন না। তাতে অন্যরা সুযোগ পাবে।
আগামী ৩০শে ডিসেম্বর ২৩৪ পৌরসভায় একযোগে ভোটগ্রহণ হবে। প্রথমবারের মতো দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এটি।  এতে ২০টি দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মেয়র পদে ৯২৩ প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছেন। সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে লড়াইয়ে রয়েছেন আরও ১১ হাজারের বেশি প্রার্থী। সাড়ে তিন হাজার ভোটকেন্দ্রের এসব পৌরসভায় ভোটার রয়েছে প্রায় ৭১ লাখ।

পুতিনের টান টান হাঁটার রহস্য

একটু খেয়াল করলেই চোখে পড়ে হাঁটার সময় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ডান হাত প্রায় নড়েই না। বাম হাতটি অন্য সবার মতো স্বাভাবিকভাবে নড়াচড়া করে। ডান হাতটি থাকে টান টান। প্রবল পরাক্রমশালী পুতিন বিশ্বের অন্যসব নেতার রক্তচক্ষুকে থোড়াই কেয়ার করেন। ক্ষমতা আর প্রভাবে তিনি একাই এক শ। এ জন্য পুতিনকে নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। তাঁর দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি অনেক বিষয়ই বারবার আলোচনা অসে। এবার এসেছে হাঁটার বিষয়টি। নিন্দুকেরা মুখে খই ফোটাচ্ছেন। প্রশ্ন উঠেছে পুতিন কী তাহলে জটিল রোগে আক্রান্ত?
নিজের দৃঢ়তা প্রকাশ করতে এভাবে হাঁটেন
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন? ছবি: রয়টার্স
নিন্দুকদের মুখে ছাই দিয়ে পুতিন গাড়ি চালাচ্ছেন, ঘোড়া দাবড়াচ্ছেন, সাঁতারও কাটছেন। শুধু তাই নয়, পুতিন একজন দক্ষ ভার উত্তোলক। একই সঙ্গে জুডোর ব্ল্যাক বেল্টধারী। এখনো অনেকের চেয়ে দ্রুত লিখতে পারেন। সই করতে গেলে হাত একটুও কাঁপে না। তাহলে পুতিনের এমন হাঁটার ভঙ্গির রহস্য কী?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞরাও। পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁরা একমত হয়েছেন, পুতিনের ডান হাত বা কাঁধে কোনো সমস্যা নেই। জন্মগত কোনো ত্রুটিও নেই। তবু রহস্য কাটেনি। শেষ পর্যন্ত খাতা-কলম নিয়ে শুরু হয়েছে গবেষণা। পর্তুগাল, ইতালি ও নেদারল্যান্ডসের একদল স্নায়ুবিশেষজ্ঞ কোমর বেঁধে নেমেছেন গবেষণায়। তাঁদের নেতৃত্ব দেন নেদারল্যান্ডসের র‍্যাডবাউড ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক বাস্তিয়ান ব্লোয়েম। গত সোমবার গবেষণার প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে যুক্তরাজ্যের চিকিৎসা সাময়িকী ব্রিটিশ মেডিকেলে জার্নালে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের (ডানে)
সঙ্গে হাঁটছেন প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভ (বামে)
ও ক্রেমলিনের চিফ অব স্টাফ সেরগেই ইভানভ
পুতিন যখন হাঁটেন, ডান হাতটি অনেকটা আড়ষ্ট থাকে। মনে হয় যেন ডান হাতে তিনি কিছু ধরে রেখেছেন। এটি একধরনের অভ্যাস হতে পারে। পুতিন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত—এটা সবারই জানা। স্নায়ুযুদ্ধের সময় কেজিবির প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। কেজিবির সদস্যদের ডান হাতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকত। হাতটি তাঁরা বুকের সঙ্গে আড়াআড়িভাবে রাখতেন, যাতে শত্রু সামনে এলে সহজেই অস্ত্র হাতে মোকাবিলা করা যায়। গবেষকেরা বলছেন, প্রশিক্ষণের সেই অভ্যাস পুতিন এখনো ধরে রেখেছেন।
গবেষকদের ধারণা, পুতিন এটি সচেতনভাবে করতে পারেন। অথবা অভ্যাস বশেও করতে পারেন। হয়তো পুতিন দেখাতে চান, তিনি একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কেজিবির সদস্য। এতে তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তাও প্রকাশ পায়।
২০১২ সালের ৭ মে প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষেক অনুষ্ঠান ও শপথ নেওয়ার পর হেঁটে যাচ্ছেন পুতিন। ছবি: এএফপি
ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপিউটার ভিশন বিষয়ের অধ্যাপক মার্ক নিক্সন বলছেন, মানুষের হাঁটার ভঙ্গিতে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। হাঁটার ধরন দেখে বোঝা যায়, কে আত্মবিশ্বাসী আর কার আত্মবিশ্বাস কম। পুতিনের হাঁটার এই ধরনে তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা প্রকাশ পায়।
শুধু পুতিন নন, তাঁর কয়েক জন সহযোগীও একই ভঙ্গিতে হাঁটেন। আরও নিশ্চিত হতে তাঁদের নিয়েও চলেছে পর্যালোচনা। গবেষকেরা অবাক হয়ে দেখেন, রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভ, সাবেক দুই প্রতিরক্ষামন্ত্রী আনাতোলি সারদিয়োকভ ও সেরগেই ইভানভ একইভাবে হাঁটেন।
হাঁটার সময় পুতিনের ডান হাত খুব কমে নড়ে। ছবি: এএফপি
সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কমান্ডার আনাতোলি সিদোরভের হাঁটার ধরনও একই। দুয়ে দুয়ে চার মেলাতে দেরি হয়নি। পুতিন ও ইভানভ দুজনেই সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা। সারদিয়োকভ ও সিদোরভও সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। সেই অভ্যাস থেকেই তাঁরা এভাবে হাঁটেন। তবে প্রধানমন্ত্রী দমিত্রি মেদভেদেভের সেনাবাহিনী বা কেজিবির সঙ্গে সরাসরি কোনো যোগসাজশ নেই। তাহলে তিনি কেন এভাবে হাঁটেন?
এ প্রশ্নের উত্তরও আছে। হতে পারে মেদভেদেভ আসলে প্রেসিডেন্ট পুতিনকে অনুসরণ করেন। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শুধু হাঁটার ধরন নয় পুতিনের গলার স্বর, তাকানো সবাই অনুসরণ করেন মেদভেদেভ।এমনিতে হালকা মনে হলেও গবেষণার নেতৃত্বে থাকা ব্লোয়েম মনে করেন, এই গবেষণা স্নায়ুবিশেষজ্ঞদের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। এএফপি ও বিবিসি অবলম্বনে

মুসলিম বলেই এত ভয়

মুসলিম বলে ভয়ে ভয়ে দিন কাটছে
জুদেহ ও তাঁর স্বজনদের। ছবি: রয়টার্স
গাড়িতে দুই শিশুকে নিয়ে হিজাব পরে যেতে ভয় করে মা মিরভেট জুদেহর। মনে হয়, মুসলিম বুঝতে পেরে যদি কেউ হামলা করে বসে। তাই টুপি দিয়ে তিনি হিজাবটি ঢেকে রাখেন। কয়েক দিন আগেও স্বচ্ছন্দে সন্তানদের নিয়ে বাইরে যেতেন জুদেহ। গত ২ ডিসেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার সান বার্নার্দিনোতে মুসলিম দম্পতির হামলায় ১৪ জন নিহত হওয়ার পর সব বদলে গেছে। এখন সব কিছুতেই ভয় পান জুদেহ। নিজের ধর্মীয় পরিচয় লুকাতে পারলে যেন বেঁচে যান।
জুদেহর মতো ক্যালিফোর্নিয়ার আরও অনেক মুসলিম পরিবার এরকম ভয়ে দিন কাটাচ্ছে। মুসলিম বাবা-মায়েরা সন্তানদের সাবধান করে দিচ্ছেন। স্কুলে গিয়ে তারা যেন এমন কোনো আচরণ না করে, যাতে বিপাকে পড়তে হয়। ছোট ছোট শিশুদের মনে ধর্ম নিয়ে ভয় ঢুকিয়ে দিতে খারাপ লাগলেও তাদের কিছু করার থাকে না।
আট বছরের ছেলেকে কখনো বন্দুক নিয়ে খেলতে দেন না মা জুদেহ। বারবার সাবধান করেন। বন্ধুরা বন্দুক নিয়ে খেললেও ভুলেও যেন সে তা না ধরে। মুসলিম বলে চলতে-ফিরতে অনেকই বাঁকা মন্তব্য ছুড়ে দেয় জুদেহর দিকে। আট বছরের ছেলেটি জানতে চায়, কেন সবাই তাদের সঙ্গে এ রকম করে। উত্তর খুঁজে পান না মা।
ঘটনা একটা নয়, পরপর কয়েকটি জঙ্গি হামলা হয়েছে পশ্চিমা বিশ্বে। এসব হামলায় কোনো না কোনোভাবে মুসলিম জঙ্গিদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে বা তাঁদের দিকে সন্দেহের তির উঠেছে। গত ১৩ নভেম্বর প্যারিসে জঙ্গি হামলায় ১৩০ জন নিহত হন। এর দায় নেয় আইএস। এর এক মাস না পেরোতেই ক্যালিফোর্নিয়ায় হামলা হয়।
প্যারিসে হামলার আগে থেকেই মুসলিমবিরোধী মনোভাব দেখা দিয়েছে পশ্চিমা বিশ্বে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী রিপাবলিকান প্রার্থী বেন কারসন সেপ্টেম্বর মাসে বলেন, মুসলিম ব্যক্তিরা প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্য নন। প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী আরেক প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম শরণার্থীদের প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ফ্লোরিডার সাবেক গভর্নর জেব বুশ রিপাবলিকান দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী। তিনিও একই সুরে বলেন, সিরীয় শরণার্থী যাঁরা নিজেদের খ্রিষ্টান বলে প্রমাণ করতে পারবেন, তাঁরাই যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার অনুমতি পাবেন।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকে সে দেশের সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছেন। কিন্তু কয়েকটি হামলা বদলে দিয়েছে সব কিছু। এখন মুসলিম মানেই যেন উগ্রপন্থী। ২৭ বছরের সারা হাদদাদ নর্থ ক্যারোলাইনায় ক্যানসার গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। বললেন, ‘কিছুতেই বোঝানো যায় না মুসলিম বলেই আমরা সবাই উগ্রপন্থী নই। আমরাও ফুটবল খেলা দেখতে পছন্দ করি। পপ গান শুনতে ভালোবাসি। মা-বাবার সঙ্গে ‘থ্যাংকস গিভিং ডে’ পালন করি। আমাদের সন্তানেরা সান্তা ক্লজকে দেখলে আনন্দে মেতে ওঠে। কিন্তু দিন শেষে আমাদের পরিচয় কেবল মুসলিম।’
সারা বলেন,৯ / ১১-এর হামলার পর তাঁর কৈশোর ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল। তিনি চান না তাঁর ছয় মাসের মেয়েটিও একইরকম যন্ত্রণা পাক। বাল্টিমোরের বাসিন্দা আরিফ খান বলেন, তিনি চান না তাঁর ছেলে বন্দুকের গুলি বা হামলার ঘটনা শুনে বেড়ে উঠুক। মুসলিম বলে লজ্জা পাক। কিন্তু কাউকে বোঝানো যায় না, সব মুসলিমই উগ্রপন্থী নয়। রয়টার্স অবলম্বনে

মঙ্গলে সিলিকাসমৃদ্ধ পাথরের সন্ধান

মঙ্গলগ্রহের মাউন্ট শার্প এলাকায় ভূতাত্ত্বিক স্তর নিয়ে
গবেষণা করছে কিউরিওসিটি নামের একটি রোবট।
মঙ্গলগ্রহে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা—নাসার পাঠানো রোবটযান কিউরিওসিটি সিলিকাসমৃদ্ধ রহস্যময় পাথরের সন্ধান পেয়েছে। নাসার গবেষকেরা বলছেন, এগুলোতে পাথর গঠনের উপাদান সিলিকন ও অক্সিজেন রয়েছে। পৃথিবীতে যা সচরাচর এটা কোয়ার্টজে দেখা যায়।
মঙ্গলগ্রহে ৪০ মাস ধরে ভূতাত্ত্বিক বিভিন্ন স্তর নিয়ে গবেষণা করছে কিউরিওসিটি। এর মধ্যে গত সাত মাসে যে এলাকার মাটি পর্যবেক্ষণ করছে, সেখানেই কিছু জায়গায় বেশি ঘনত্বের সিলিকার সন্ধান পেয়েছে কিউরিওসিটি।
যুক্তরাষ্ট্রে নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির কিউরিওসিটি গবেষণা দলের সদস্য অ্যালবার্ট ইয়েন দাবি করেছেন, সিলিকাসমৃদ্ধ পাথরগুলো ধাঁ ধাঁর মতো। এই অবস্থা দেখে মনে হয়েছে এগুলো হয়তো পানির কারণে হয়েছে। অ্যাসিডযুক্ত পানি সিলিকা রেখে অন্য উপাদান নিয়ে সরে গেছে। ইয়েন বলেন, আমরা নিশ্চিত তথ্যটি জানতে পারলে মঙ্গলের আদি পরিবেশ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
এর আগে কিউরিওসিটি একটি পাথর খুঁড়ে বাকস্কিন নামে এক ধরনের সিলিকার সন্ধান পেয়েছিল। ট্রাইডিমাইট নামের এক ধরনের খনিজে এই সিলিকা থাকে যা পৃথিবীতে দুর্লভ। আগ্নেয় শিলায় অতি উচ্চ তাপমাত্রায় ট্রাইডিমাইটের উৎপত্তি হতে পারে। বাকস্কিনে ট্রাইডিমাইটের সন্ধান পাওয়ার বিষয়টিকে মঙ্গলগ্রহে ম্যাগমাটিক বিবর্তনের ইতিহাস বহন করছে বলে গবেষকেরা মনে করেন।
কিউরিওসিটি বর্তমানে মঙ্গলগ্রহের হ্রদ, নদী এলাকার প্রাচীন পরিবেশ কেমন ছিল তা বের করতে কাজ করছে। কিউরিওসিটির প্রকল্প পরিচালক অশ্বিন ভাসাভাদা বলেন, ‘মাউন্ট শার্পে আমরা এখন যা দেখছি তা গত দুই বছরের চেয়ে অনেক আলাদা। খুব স্বল্প দূরত্বের মধ্যেও বিশাল পার্থক্য দেখা যায়। মঙ্গলের রসায়ন যেভাবে পরিবর্তন হয়েছে,এখনকার খোঁজ পাওয়া সিলিকা তারই নিদর্শন।’ তথ্যসূত্র: এনডিটিভি।

ইবিতে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে গোলাগুলি, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা ; শিক্ষার্থীদের হলত্যাগের নির্দেশ by সাইফুল্লাহ হিমেল

ইবিতে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ চলাকালে
প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছেন (লালবৃত্ত)
বাংলা বিভাগের ছাত্র আসাদ : নয়া দিগন্ত
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সহসভাপতি গ্রুপের মধ্যে আবারো গুলিবিনিময় হয়েছে। শনিবার বেলা ১টার দিকে পুলিশের উপস্থিতিতে এ ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষ চলাকালে ৮ রাউন্ড গুলি ছোড়া এবং ককটেল বিস্ফোরণ হয়েছে। এতে আব্দুর রহিম, মনির খান, এনায়েত করিম তপুসহ উভয় গ্রুপের ১২ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে ছাত্রছাত্রীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এ দিকে সংঘর্ষের পর ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে নিরাপত্তা জোরদার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সংঘর্ষের পর তাৎক্ষণিক এক জরুরি সিন্ডিকেটে আবাসিক শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেয় প্রশাসন। শীতের ছুটি শেষে ৫ জানুয়ারি সকাল ৯টায় আবাসিক হল খুলে দেয়া হবে। ৬ জানুয়ারি থেকে যথারীতি কাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত বৃহস্পতিবারের সংঘর্ষের জের ধরে শনিবার সকাল থেকেই ইবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সহসভাপতি গ্রুপের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। এতে সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। উভয় গ্রুপের বেশির ভাগ কর্মী স্থানীয় বহিরাগত সন্ত্রাসী বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। বিপুল পরিমাণ র‌্যাব-পুলিশের সামনেই বহিরাগত সন্ত্রাসীরা বিদেশী পিস্তলসহ বিপুল আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলারুদ এবং রামদা, চাপাতি, চাকুসহ দেশী অস্ত্রপাতি নিয়ে ক্যাম্পাস রণক্ষেত্রে তৈরি করে। কিন্তু আগ্নেয়াস্ত্র বহনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ প্রশাসনকে কোনো ব্যবস্থাই নিতে দেখা যায়নি।
সকাল থেকেই উভয় গ্রুপের নেতাকর্মীর মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা লক্ষ্য করা যায়। এতে ক্রমেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। দুপুর ১২টার বাস ক্যাম্পাস ত্যাগ করার পর উভয় পক্ষের নেতাকর্মীর মাঝে দ্রুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে অবস্থার অবনতি ঘটে। একপর্যায়ে সহসভাপতি গ্রুপের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে মিছিল বের করেন। এতে উভয় গ্রুপের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার একপর্যায়ে পুলিশ কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এতে সভাপতি গ্রুপের নেতাকর্মীরা আগ্নেয়াস্ত্রধারী বহিরাগত সন্ত্রাসীসহ পিছুটান দিয়ে বঙ্গবন্ধু হল এলাকায় অবস্থান নেয়। এই সুযোগে সহসভাপতি গ্রুপের কর্মীরা বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে ছাত্রলীগের টেন্ট দখলে নেয়। পরে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি শান্ত হয়। এরপর সহসভাপতি গ্রুপের কর্মীরা ভিসির পদত্যাগের দাবিতে ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরো জানান, এসবই ঘটেছে র‌্যাব-পুলিশের উপস্থিতিতে। পুলিশের উপস্থিতিতে আগ্নেয়াস্ত্র, রামদা, চাপাতি নিয়ে সন্ত্রাসীরা অবস্থান করলেও পুলিশ তাদের কিছুই বলেনি। এ দিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে থাকা অবস্থায় প্রকাশ্যে অস্ত্র বহনকারী সন্ত্রাসীদের বিষয়ে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নানামুখী তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে সংশ্লিষ্টদের মাঝে। তারা বলছে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষ ক্যাম্পাসের ১৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীর নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি। এতে প্রশাসনের প্রতি আমরা আস্থা হারিয়ে ফেলেছি। এ দিকে প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
এ ব্যাপারে ইবি ছাত্রলীগের সভাপতি জানান, ‘আমরা সকাল থেকে টেন্টে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছিলাম। একপর্যায়ে কিছু বহিরাগত সন্ত্রাসী ও পুলিশ আমাদের ওপর অতর্কিত গুলি ছোড়ে। আমাদের নেতাকর্মীদের ধাওয়া দিলে আমরা প্রতিবাদ করেছি।’
প্রভোস্ট কাউন্সিলের সভাপতি প্রফেসর ড. ইকবাল হোসাইন বালেন, ‘প্রশাসনের সিদ্ধান্ত মতে আমরা শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছি। ৫ জানুয়ারি সকাল ৯ টায় আবাসিক হল খুলে দেয়া হবে।
প্রক্টর প্রফেসর ড. মাহবুবর রহমান বলেন, ‘পরিস্থিতি এখন শান্ত আছে। আশা করছি ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসবে।’
ইবি থানার ওসি সফিকুল ইসলাম জানান, ‘আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি করেছি। বর্তমানে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।’

মূল্যবৃদ্ধির শঙ্কায় স্বল্প-আয়ের মানুষ by জি এম রুমি

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ার পরে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে; এ শঙ্কা সীমিত আয়ের মানুষের। এতে চাপের মুখে পড়বে স্বল্প আয়ের বেসরকারি চাকরিজীবী ও শ্রমজীবীদের জীবনযাত্রা। গত ১৫ই ডিসেম্বর প্রকাশ হয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল কাঙ্ক্ষিত অষ্টম বেতন স্কেলের গেজেট। গত ৭ই সেপ্টেম্বর সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার এবং সর্বনিম্ন ৮ হাজার ২৫০ টাকা মূল ধরে এ বেতন কাঠামো মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পায়; যাতে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন দ্বিগুণ হয়। আগামী জানুয়ারি থেকে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় ২১ লাখ চাকরিজীবীর জন্য নতুন এ বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। এমন খবরে ইতিমধ্যেই শাকসবজি, মাছ, মাংসসহ অন্যান্য সব ধরনের জিনিসপত্রের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এমনকি রাজধানীতে বাসাভাড়া বাড়ানোরও ঘোষণা দিয়েছেন বাড়ির মালিকরা।
রাজধানীর বংশালে ভাড়া বাসায় থাকেন আশরাফ। চাকরি করেন একটি ক্লিনিকে। দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে টেনেটুনে কোনো রকম মাস পার করেন। আশরাফ বলেন, দিন দিন বাজারমূল্য বেড়ে চলছে; কিন্তু আয়-ইনকাম একই রয়েছে তিন বছর ধরে। তার ওপর আবার সরকারি চাকরিওয়ালাদের বেতন বাড়বে; এত বাজারের ওপর প্রভাব পড়বে। সংসার আর টেনেটুনেও চালাতে পারবো না। বরিশালের ছেলে মাইনুল হোসেন ঢাকার একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য গ্র্যাজুয়েশন করেছেন। বাড়ি থেকে পাঠানো কিছু টাকা আর টিউশনির আয় দিয়ে খরচ চালান। মাস শেষে চলে ধার-দেনায়। এখনও চাকরি মেলেনি। তার ভাষ্য, পাঁচ বছর ধরে ঢাকায় আছি। দ্রব্যমূল্যের দাম বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। অথচ আমরা যারা ঢাকা শহরে বেঁচে থাকার লড়াই করি, তাদের সে হারে কোনো আয়-ইনকাম বাড়েনি। একপ্রকার আমরা যারা বেকার, মূল্যবৃদ্ধি পেলে আমাদের কষ্টটা আরও একটু বাড়বে বৈকি। বেতন বাড়বে শুনেই বাজারে জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বেড়ে চলছে। তাদের (সরকারি চাকরিজীবী) না হয় বেতন দিগুণ হবে, কিন্তু আমরা যারা দিন আনি দিন খাই তাদের কী হবে? প্রশ্ন রাখেন সিএনজিচালক মোশারফ হোসেন। বেতন বাড়ায় অস্বাভাবিক হারে যাতে দ্রব্যমূল্য না বাড়ে সে জন্য সরকারকে কার্যকর ভূমিকা নেয়ার আহ্বানও জানান মোশারফ।
টাকা গুনে গুনে বাজার করতে হয় গৃহিণী রোমানা শারমিনের। স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। রোমানা বলেন, বাড়িওয়ালা নোটিশ ধরিয়ে দিয়েছেন; জানুয়ারিতে বাড়তি ভাড়া দিতে হবে। স্বামীর সীমিত আয়ে বাসাভাড়া দিয়ে বাকি টাকায় হিসাব করে করে পুরও মাস চলতে হয়। এ অবস্থায় কিছুদিন পর পর দ্রব্যমূল্য বাড়তে থাকলে ম্যানেজ করাটা কঠিন হবে। তবে বেতন বাড়ার পরে মূল্যস্ফীতি হবে না জানিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মীর্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, বিগত পে-স্কেল বিবেচনায় দেখা গেছে। বেতন বাড়লে খুব একটা মূল্যস্ফীতি হয় না। ফলে এতে বাজারে খুব বেশি প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না। আর বেসরকারি চাকরিজীবীদের ন্যূনতম বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা আছে, এর বাইরে তাদের জন্য সরকারের আর কী করতে পারে? প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, তার পরও যদি বাজার বাড়ে তাহলে সরকার তা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গণমাধ্যম, শিল্প-কারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিজীবীদেরও আনুপাতিক হারে বেতন বৃদ্ধির ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের কার্যকর ভূমিকা নেয়া উচিত বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ আনু মুহম্মদ। তিনি বলেন, বেতন বাড়লে দ্রব্যমূল্য তো বৃদ্ধি পাবেই; এর প্রভাবও পড়বে জনজীবনে। মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে সরকারকে বাজার মনিটরিংয়ের ওপর জোর দেয়ার কথাও বলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপক।

‘প্রেমের তথ্য ফাঁস করায় পুলককে খুন করেছি’ by ওয়েছ খছরু

সিলেটে ভাগ্নির সঙ্গে প্রেম ছিল ঘাতক আবদুল কুদ্দুসের। আর এই প্রেমের বিষয়টি জানতো পুলক। মামা-ভাগ্নির প্রেম ও অভিসারের ডুয়েট ছবিও ছিল পুলকের কাছে। সেই অসম প্রেমের বিষয়টিও পুলক মেনে নেয়নি। গোপন প্রেমের বিষয়টি জানিয়ে দেয় এলাকার কয়েকজনের কাছে। আর প্রেমের বিষয়টি ফাঁস করে দেয়ায় পুলকের উপর ক্ষেপে উঠে কুদ্দুস। দুনিয়া ছাড়া করার পরিকল্পনা করে। আর পরিকল্পনা করেই তারা পাখিটিকি হাওরে নিয়ে খুন করে পুলককে। ওদিকে, ঘাতক স্বপনের প্রেম ছিল এক মেয়ের সঙ্গে। সেই মেয়েকে বাদ দিয়ে আরেক মেয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে স্বপন। সেটি জানতো কুদ্দুস। স্বপনের নতুন প্রেমের তথ্য ফাঁস করে দেয়ার হুমকি দিয়ে স্বপনকে খুনের মিশনে নিয়ে যায় কুদ্দুস। কুদ্দুসকে খুনের মিশনে সহায়তা করতে যায় ভাই শাহাব উদ্দিন শাবু। সিলেটের জৈন্তাপুরে এসএসসি পরীক্ষার্থী পুলক চন্দ্র রাউত খুনের ঘটনার ৮ দিন পর গ্রেপ্তার হওয়া তিন ঘাতকই প্রথমে পুলিশের কাছে এবং পরে আদালতে এসব তথ্য জানিয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। গতকাল সিলেটের আদালতে তারা তিনজন খুনের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দিতে তারা জানায়, ‘গোপন প্রেমের তথ্য ফাঁস করায় পুলকে হাওরের নির্জন স্থানে নিয়ে খুন করি। এরপর লাশ কচুরিপানার নিচে গুম করে চলে আসি।’ সিলেটের জৈন্তাপুর থানা পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের পর বৃহস্পতিবার রাতে থানায় রেখে আব্দুল কুদ্দুস, শাহাব উদ্দিন শাবু ও স্বপন বিশ্বাসকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদে তারা পুলককে পূর্ব বিরোধে খুন করা হয়েছে বলে স্বীকার করে। তবে, জিজ্ঞাসাবাদের শেষপর্যায়ে তারা পুলিশ জানায়, গোপন প্রেমের বিষয়টি ফাঁস করে দেওয়ার কারণেই খুন করা হয়েছে পুলককে। পুলক প্রেমের সব ঘটনা জানতো। তার কাছে ছবিও ছিল। সে কয়েকজনের কাছে বিষয়টি জানিয়ে দেয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করে। এদিকে, জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়ার পর গতকাল দুপুরে জৈন্তাপুর থানার এসআই মিন্টু চৌধুরী হাজতে থাকা তিন আসামি কুদ্দুস, সাবু ও স্বপনকে নিয়ে আসেন সিলেটের আদালতে। বিকাল ৩ টার থেকে সিলেটের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কুদরত-ই-খোদার আদালতে তাদের হাজির করা হলে তারা স্ব-ইচ্ছায় খুনের দায়ে স্বীকারোক্তি দেয়। প্রথমে কুদ্দুস খুনের দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তি দেয়। পরে তার ভাই শাবু এবং শেষে স্বপন বিশ্বাস স্বীকারোক্তি দেয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টা পর্যন্ত আদালত তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ করেন। ঘাতক তিনজনই জৈন্তাপুরের চারিকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী। নিহত পুলকও তাদের সহপাঠী। আর যাদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল তারাও একই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাদের এই প্রেমের বিষয়টি স্কুলের অনেক শিক্ষার্র্থীরই জানা ছিল। পুলক শেষে গোপন প্রেমের খবর আত্মীয়-স্বজনদের কাছে জানিয়ে দিয়েছিল। এদিকে, আদালতে ঘাতকরা জানায়, ১০ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সারি এলাকা থেকে তারা পুলককে নিয়ে আসে হরিপুর এলাকায়। সেখান থেকে তারা তাকে নিয়ে যায় পাখিটিকি হাওরের কাছে। আর ওখানে যাওয়ার পর প্রেমের বিষয়গুলো নিয়ে পুলকের সঙ্গে তারা কথা বলা শুরু করে। এবং গোপন বিষয়টি ফাঁস করে দেয়ার কারণ জানতে চায়। আর এসব কথাকাটাকাটির জের ধরে একপর্যায়ে কুদ্দুস গলায় দড়ি পেঁচিয়ে ধরে পুলকের। এ সময় শাবু ও স্বপন পুলককে জাপটে ধরে। একপর্যায়ে পুলক নিস্তেজ হয়ে পড়লে তার লাশ গুম করার চেষ্টা চালানো হয়। পরে লাশটি চিরতরে গুম করে ফেলতে তারা পাখিটিকি হাওরে কচুরিপানার নিচে লাশটি লুকিয়ে রাখে। এরপর তারা তিনজন চলে আসে। খুনের ঘটনার সময় পুলকের হাতে ছিল একটি দামি মোবাইল ফোন। ওই মোবাইল ফোনটি নিয়ে আসে কুদ্দুস। ওই মোবাইল ফোন থেকে তারা পুলকের পিতার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকার মুক্তিপণ আদায় করে। এবং পুলক ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রয়েছে বলে জানায়। এরপর পিতার জিডি’র প্রেক্ষিতে সিলেটের জৈন্তাপুর থানা পুলিশ মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে জানতে পারে ঘাতক কুদ্দুস ব্যবহার করেছে পুলকের মোবাইল ফোন। এরপর পুলিশ কুদ্দুসকে গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে। পুলক অপহরণের ৭ দিন পর বুধবার রাতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে কুদ্দুসকে গ্রেপ্তার। তার স্বীকারোক্তি মতে গ্রেপ্তার করা হয় কুদ্দুসের ভাই শাহাবউদ্দিন শাবুকে। সর্বশেষ স্বপনকে পুলিশের তুলে দিয়েছেন তার পিতা মাতা। এদিকে, গতকাল সিলেটের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তিনজনের স্বীকারোক্তি গ্রহণের পর তাদেরকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মিন্টু চৌধুরী জানিয়েছেন, এখন তিনজনের বক্তব্য যাচাই-বাছাইয়ের পর খুব দ্রুত আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে। পুলিশ পুুলক নিখোঁজের প্রথম দিন থেকে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু ভাগ্য খারাপ পুলিশ ছেলেটিকে জীবিত উদ্ধার করতে পারেনি। তবে, ঘাতকদের যাতে শাস্তি হয় পুলিশ নিরপেক্ষ তদন্ত চালাবে।
স্বপনকে পুলিশে দিলেন মা-বাবা: নিহত পুলক চন্দ্র রাউতের খুনি স্বপন বিশ্বাস খুনের ঘটনার পর থেকে পলাতক ছিল। পুলিশ একাধিক অভিযান চালিয়েও তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। অবশেষে শুক্রবার রাত ১০টার দিকে স্বপনকে থানায় নিয়ে আসেন তার পিতা দুলি বিশ্বাসসহ পরিবারের সদস্যরা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির উপস্থিতিতে তারা স্বপন বিশ্বাসকে জৈন্তাপুর থানা পুলিশের হাতে সোপর্দ করেন। আটকের পর স্বপন বিশ্বাসকে রাতে জৈন্তাপুর থানা পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে খুনের ঘটনা স্বীকার করে বলে জানায় পুলিশ। এ কারণে গতকাল দুপুরে কুদ্দুস, শাবু ও স্বপনকে সিলেটের আদালতে হাজির করা হয়। এদিকে, এসএসসি পরীক্ষার্থী পুলক চন্দ্র দাশ খুনের ঘটনায় রাতেই জৈন্তাপুর থানায় মামলা দায়ের করেছেন পিতা পান্না দাশ রাউত। মামলায় তিনি আটক হওয়া কুদ্দুস, শাবু স্বপনকে আসামি করেন।