Tuesday, November 12, 2013

সরল গরল- বিচার প্রশাসনের নির্বাচনী সাজ by মিজানুর রহমান খান

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হিসেবে বিচার প্রশাসনকেও নিরপেক্ষ নির্বাচনী সাজ দেওয়ার দাবি রাখে। গত ২৭ অক্টোবরে সংবিধানের ৯০ দিনের মধ্যে ঢুকে পড়েছি।

শহীদের উত্তরাধিকার- আজও পরাজিত নূর হোসেন! by ফারুক ওয়াসিফ

২৪ বছরের নূর হোসেন আর বড় হননি। তাঁর সে সময়ের সহযোদ্ধারা ধনে-প্রাণে অনেক বড় হয়েছেন। অন্তত দুজন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।

ফিলিপাইনে ত্রাণের জন্য হাহাকার

ফিলিপাইনে গত শুক্রবারে প্রলয়ংকরী টাইফুন আঘাত হানার চার দিন পর দেশটির সরকার আজ মঙ্গলবার ‘জাতীয় দুর্যোগ অবস্থা’ জারি করেছে। দুর্গত এলাকায় ত্রাণের জন্য চলছে হাহাকার।

হরতালের আগুন- অলৌকিক কিছুর অপেক্ষায় রোগী-স্বজন-চিকিৎসক by শেখ সাবিহা আলম

সেই ১৫ বছর বয়স থেকে তাঁতীবাজারে সোনার দোকানে কাজ করেন মন্টু পাল (৩৫)। যাঁর দক্ষ হাতে তৈরি হয় নানাপদের অলংকার, তাঁর স্ত্রী সঞ্জু পাল চিরটা কাল নিরাভরণই থেকে গেলেন।

‘বিএনপি সন্ত্রাসী দল, এরা মানুষের জাত না’

বিএনপিকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে ও তাঁর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়।

শচীন দেব বর্মণের আদি নিবাসটি রক্ষা করুন by সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী

উপমহাদেশের কিংবদন্তি গায়ক ও সুরকার শচীন দেব বর্মণ ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লার চর্থায় এক বিশাল রাজপ্রাসাদসম অট্টালিকায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তদানীন্তন ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্যের অর্থানুকূল্যে যুবরাজ নবদ্বীপচন্দ্র বর্মণ ৬০ একর জমিতে, সামনে-পেছনে বড় দীঘি ও পৃথক অন্দরমহলসহ এ ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন। চর্থার বাসভবনেই শচীন বাবু তার জীবনের প্রথম ১৯টি বছর অতিবাহিত করেন। স্কুল পর্ব শেষ করে ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে আইএ ও বিএ পাস করেন। লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গীতের চর্চা চালিয়ে যান। পিতা নবদ্বীপ চন্দ্র বর্মণ ছিলেন নিপুণ সেতার শিল্পী ও মার্গ সঙ্গীতের গায়ক। মা নির্মলা দেবীও সঙ্গীতের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। তাদের হাতেই শচীনের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে হাতেখড়ি। তার আত্মজীবনীমূলক লেখা ‘সরগমের নিখাদ’ থেকে জানা যায়, গ্রাম-বাংলার লোকসঙ্গীতের প্রতি তাকে প্রথম আকৃষ্ট করেন বাড়ির দুই গৃহভৃত্য মাধব ও আনোয়ার। মাধব সহজ সুর করে রামায়ণ পড়ে শোনাত, যা যুবরাজকে করত মোহিত। অপরদিকে আনোয়ার দোতারা বাজিয়ে ভাটিয়ালি গান গেয়ে তাকে গ্রাম-বাংলায় নিয়ে যেত। বিভিন্ন জেলার গ্রাম ও গ্রামান্তরে লোক গানের খোঁজে ঘুরে বেড়িয়েছেন শচীন দেব। পরে তার অনুপম সৃষ্টি হিন্দি ও বাংলা গানগুলো আমাদের ঐতিহ্যবাহী ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, সারি, মুর্শিদি, বাউল, ঝুমুর গানের ভিত্তির ওপর রচিত হয়। শচীন দেব যে অপূর্ব সঙ্গীত জগৎ তৈরি করেছিলেন, তার মূল উপাদান হচ্ছে উচ্চাঙ্গসঙ্গীত ও আমাদের লোকগীতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। পরে রবীন্দ্রসঙ্গীত তৃতীয় ধারা হিসেবে যোগ দেয়।
চর্থার রাজপ্রাসাদেই গড়ে উঠেছিল সঙ্গীতের বিভিন্ন ধারার এক অপূর্ব মিলন কেন্দ্র। সেখানে আসতেন আলাউদ্দিন খান, হিমাংশু দত্ত ও অন্যান্য দিকপাল। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম অনেকবার এসেছেন এ রাজপ্রাসাদে এবং গান গেয়েছেন শচীন দেবের সঙ্গে।
১৯৩১ সালে তার বাবা তদানীন্তন ত্রিপুরার প্রধানমন্ত্রী নবদ্বীপ মৃত্যুবরণ করেন। শচীন দেব ইচ্ছা করলে ত্রিপুরা বা কুমিল্লায় ফিরে এসে একটি উচ্চ রাজপদে অধিষ্ঠ হয়ে রাজপ্রাসাদেই আরাম-আয়েশে দিন কাটাতে পারতেন। কিন্তু সঙ্গীত পাগল শচীন দেব সেসব প্রলোভন উপেক্ষা করে সঙ্গীতের কঠিন জীবন বেছে নেন। কলকাতায় ছোট একটি ঘর ভাড়া নেন। কিন্তু তার সঙ্গীত জীবনে প্রবেশটা মসৃণ ছিল না। তদানীন্তন সর্ববৃহৎ রেকর্ড প্রস্তুতকারী কোম্পানি এইচএম ভির অডিশনে ফেল করেন শচীন ১৯৩২ সালে। কারণ তার কণ্ঠস্বর ও গানের সুর নাকি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রত্যাখ্যাত হয়েও শচীন সাধনা চালিয়ে যান ও সার্থক হন। ওই বছরই হিন্দুস্তান মিউজিক্যাল প্রডাক্টস বের করে শচীনের প্রথম রেকর্ডকৃত দুটি গান- পল্লীগীতির আদলে গাওয়া ‘ডাকিলে কোকিল রোজ বিহানে’ ও ঠুমরী অঙ্গের রাগপ্রধান গান ‘এ পথে আজ এসো প্রিয়’। গান দুটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
শচীন দেব ১৯৪৪ সালে বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) পাড়ি দেন বিখ্যাত বাঙালি চিত্র পরিচালক শশধর মুখার্জির আমন্ত্রণে। তার সুরারোপিত গান ‘মেরা সুন্দর স্বপ্না বীত গ্যায়া’ তদানীন্তন বলিউডে বিশাল সাড়া জাগায়। গানটির শিল্পী ছিলেন ফরিদপুরের গীতা রায় (পরে দত্ত)। একের পর এক হিট গানের সুরকার শচীন দেব অত্যন্ত কম সময়ে নিজকে অধিষ্ঠিত করেন মুম্বাই ফিল্ম জগতের এক দিকপাল হিসেবে। পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত হন ১৯৬৯ সালে। তিনি শ্রেষ্ঠ গায়ক ও সঙ্গীত পরিচালকের পুরস্কার পেয়েছেন ডজনখানেক।
কিংবদন্তী গায়ক শচীন দেবের অনেক ভক্ত ছিলেন সারা উপমহাদেশে। তাদের মধ্যে একজন তার প্রিয় নাতির নামকরণ করেন তার প্রিয় গায়কের নামে। নাতিটি ক্রিকেট জগতের কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান শচীন টেন্ডুলকার।
কুমিল্লা থেকে হাজার মাইল দূরে বোম্বে গিয়েও শচীন দেব বাংলাদেশকে ভোলেননি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি গান গেয়ে আমাদের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করেন এবং উদ্বাস্তুদের জন্য সাহায্য তহবিল গড়ে তোলেন। ১৯৭১ সালে তার লেখা ‘তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল’ গানটির মধ্য দিয়ে উজাড় করে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রতি তার সব ভালোবাসা। যার শেষ পঙ্ক্তিটি ছিল ‘বাংলা জনম দিলা আমারে, তোমার পরান, আমার পরান, এক নাড়িতে বাঁধারে। মা-পুতের এই বাঁধন ছেঁড়ার সাধ্য কারো নাই, সব ভুলে যাই তাও ভুলি না, বাংলা মায়ের কোল।’
গভীর পরিতাপের বিষয়, শচীন বাবু বাংলাদেশকে না ভুললেও আমরা তাকে ভুলে গেছি। বছর কয়েক আগে সস্ত্রীক কুমিল্লায় বেড়াতে গিয়েছিলাম পুত্রবধূ ডেনা ও নাতি ফয়সালকে নিয়ে। কুমিল্লা আমার প্রিয় শহর। পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসের জেলা প্রশাসনের ট্রেনিং নিতে এ শহরে আমার প্রথম পোস্টিং হয়েছিল ১৯৬৯ সালে। এ শহরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি আমাকে আজও মোহিত করে।
চর্থার শচীন দেব বর্মণের বাসভবনটি দেখতে গিয়েছিলাম। পাকিস্তানি আমলে তার প্রাসাদসম বাড়িটি পরিত্যক্ত ঘোষিত হয় এবং তা মিলিটারি গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বাংলাদেশ আমলে প্রথমে পশু চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে এবং বর্তমানে হাঁস-মুরগির খামার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দীঘি দুটিতে মাছের চাষ হচ্ছে। খামারের সরকারি ভবনটি শচীন দেবের আদি রাজপ্রাসাদটি প্রায় ঢেকে ফেলেছে। সেই ভবনটি পেছন দিক দিয়ে অতি কষ্টে ঢুকে এক জরাজীর্ণ প্রাসাদসম বাড়ির ভগ্নাংশের সামনে দাঁড়াই। মনে হচ্ছিল যুগযুগের অবহেলা ও অযত্নে বাড়িটি যে কোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়বে। ভবনটির বুকে পাথরের শিলালিপিতে লেখা আছে তার গৌরবময় নাম ও পরিচয়। লেখা আছে কবে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এখানে এসেছিলেন ও গান গেয়েছিলেন শচীন দেবের সঙ্গে। সারা দালানটি ঘিরে রেখেছে জঙ্গল ও হাঁটু সমান উঁচু উঁচু ঘাস।
আমাদের জাতীয় দৈন্য ও উদাসীনতা দেখে রাগেদুঃখে চোখে পানি আসছিল। সারা কুমিল্লা শহরে কি হাঁস-মুরগি ও মাছের খামারের জন্য আর কোনো জায়গা ছিল না? এ প্রাসাদসম অট্টালিকা কি সারানো যায় না? এটাকে শচীন দেবের স্মৃতিভবন হিসেবে গড়া যায় না? শুধু এই ভবনটিকে পুঁজি করে কুমিল্লাকে গড়া যেত উপমহাদেশের এক বিখ্যাত সঙ্গীত কেন্দ্র ও প্রদর্শনশালা হিসেবে। মুম্বাই ও কলকাতার সিনেমা জগতের দিকপালরা আসতেন তাকে শ্রদ্ধা জানাতে। প্রতিবছর ১ অক্টোবর লোকগানের এক আন্তর্জাতিক জলসা বসানো যেত এখানে।
সেই রাতে কুমিল্লায় ভালো ঘুম হয়নি। বারবার মনে হয়েছে, আমাদের জতীয় দৈন্য ও উদাসীনতা কি এতটাই অপরিমেয়? নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে আমরা কি এতটাই অক্ষম? সরকার ও কুমিল্লাবাসীর কাছে আমার আকুল আবেদন, এই ঐতিহ্যবাহী ভবনটি রক্ষা করতে এগিয়ে আসুন এবং গড়ে তুলুন শচীন স্মৃতি সঙ্গীতভবন আমাদের উত্তরসূরিদের জন্য। সেটাই হবে আমাদের সুযোগ্য সন্তান শচীন দেবের প্রতি আমাদের যোগ্য সম্মান।
সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র সচিব

সর্বত্র একই প্রশ্ন- দেশ কোন পথে? by তারেক শামসুর রেহমান

শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গিয়েছিলাম। ছিলাম বেশ কিছুদিন। হৃদযন্ত্রে ছোটখাটো অপারেশনও হয়েছে। নিউইয়র্কের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনেক জায়গাতেই ঘুরে বেড়িয়েছি দীর্ঘ চার মাস। নিউইয়র্ক থেকে ওয়াশিংটন, ডালাস, অস্ট্রিন, হিউস্টন ও পেনসেলভেনিয়া- যেখানেই গেছি, বাংলাদেশীরা একটা প্রশ্নই আমাকে করেছেন : কোন পথে বাংলাদেশ? রাজনীতি বিজ্ঞান আর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্র হিসেবে আমি বুঝতে চেষ্টা করেছি তাদের মনোভাব। কিন্তু সত্যিকার অর্থেই তাদের সবার প্রশ্নের জবাব দেয়া আমার জন্য অত সহজ ছিল না। দ্বিতীয় দফা ৬০ ঘণ্টার হরতালের মাঝে আমার ঢাকায় ফেরা। ঢাকায় ফিরে সেই পুরনো প্রশ্নের মুখোমুখি আমি। যেসব প্রশ্নের মুখোমুখি আমি হয়েছিলাম যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র। দুই নেত্রীর মাঝে ফোনালাপ হল। তা মিডিয়ায় ফাঁসও করা হল। এটি কতটুকু সঠিক হয়েছে, কিংবা এর সঙ্গে নৈতিকতার প্রশ্নটি কতটুকু জড়িত- এ প্রশ্নটি আমার কাছে যতটুকু না গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ এই ফোনালাপের বক্তব্য আমাদের জাতীয় নেতাদের ‘ইমেজ’ বৃদ্ধিতে আদৌ সাহায্য করেছে কি-না? নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে আমার জার্মানি প্রবাসী বন্ধু মুকিত চৌধুরী এবং স্থানীয় একটি বাংলা পত্রিকার সম্পাদক নাজমুল আশরাফের সঙ্গে আলাপচারিতায়ও আমি এর কোনো জবাব দিতে পারিনি।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দুই নেত্রীর ওপর- এটা অস্বীকার করা যাবে না। এটা বাস্তবতা। কিন্তু লন্ডনের বহুল পঠিত ও গ্রহণযোগ্য নিউজ ম্যাগাজিন ‘দি ইকোনমিস্ট’ দুই নেত্রীর ফোনালাপকে যখন ‘বৃথা’ ও ‘স্রেফ ঝগড়া’ কিংবা বাংলাদেশের রাজনীতিকে ‘পুতুল নাচে’র সঙ্গে তুলনা করে, তখন আমার মাথা হেট হয়ে যায়। দুই নেত্রীর মধ্যকার আলাপের বিষয়বস্তু হওয়া উচিত ছিল নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে, সেখানে অতীত টেনে আনা উচিত হয়নি। একজন অপরজনকে অভিযুক্ত করার প্রবণতাও ভালো নয়। এ দেশের মানুষ জানে কে কতবার হরতাল দিয়েছে। এখন একে অপরের ওপর দোষ চাপানোর প্রবণতা বর্তমান সংকট নিরসনে আদৌ কোনো ভূমিকা রাখবে না। ঢাকায় এসে সংবাদপত্রে দেখলাম, প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল জনসভায় বলেছেন, আলোচনার পথ খোলা আছে। আবার বেগম জিয়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় দু’দলের মহাসচিব পর্যায়ে সংলাপের প্রস্তাব করেছেন। তাহলে কোথায় সেই ‘আলোচনা’ বা ‘সংলাপ’? দু’দল কি তাদের নিজেদের স্বার্থের বাইরে যেতে পারছে? আমি যুক্তরাষ্ট্রে এ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি অজস্রবার।
আসলে আমাদের জাতীয় নেতাদের মনমানসিকতায় যদি পরিবর্তন আনা না যায়, তাহলে সমস্যা যা আছে, তাই থেকে যাবে। আমি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে এটাও লক্ষ্য করেছি, সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলেছেন, ‘খালেদা দুর্বৃত্তপনার আশ্রয় নিয়েছেন’ (যায়যায়দিন, ৪ নভেম্বর)। প্রধানমন্ত্রী যখন স্বয়ং সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন, তখন বিরোধীদলীয় নেত্রীকে এভাবে আক্রমণ করে বক্তব্য রাখা কতটুকু যৌক্তিক তা আমার মাথায় আসে না। প্রবীণ জাসদ নেতা মাঈনুদ্দিন খান বাদলের একটি বক্তব্যও প্রকাশিত হয়েছে অনলাইন সংবাদপত্রে (বাংলামেইল ২৪ ডটকম)। তাতে বেগম জিয়াকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছেন, ‘হু ইজ শি, কুলাঙ্গার নেত্রী’। বেগম জিয়া কে, সমাজে, রাজনীতিতে তার অবস্থান কোথায়, জনাব বাদলের তা অজানা নয়। এভাবে একজন জাতীয় নেতা সম্পর্কে অভদ্রজনিত মন্তব্য বেগম জিয়াকে নয়, বরং জনাব বাদলকেই খাটো করেছে। জনাব বাদল প্রথমবারের মতো সংসদে এসেছেন, তাও আবার তার নেতা হাসানুল হক ইনুর মতো নৌকা মার্কা প্রতীক নিয়ে। জাসদের ‘মশাল’ মার্কায় তিনি বিজয়ী হননি। মধ্য ষাটের দশকের এই প্রবীণ নেতা শিক্ষিত। তিনিই যদি বিরোধীদলীয় নেত্রী সম্পর্কে অভদ্রজনিত শব্দ ব্যবহার করেন, তা কি পরোক্ষভাবে তার কর্মীদের উৎসাহিত করবে না এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করতে! আসলে আমাদের রাজনীতিকরা একটা বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে আছেন। পরস্পরকে ঘৃণা করা, বিরোধী পক্ষকে আক্রমণ করে অভদ্রজনিত শব্দ ব্যবহার করা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অনেক মন্ত্রীও এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করেন। এতে করে তাদের মর্যাদা বাড়ে না। বিদেশে তাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয় না। বেগম জিয়াকে ‘কুলাঙ্গার’ হিসেবে আখ্যায়িত করে জনাব বাদল কাউকে কাউকে খুশি করে থাকতে পারেন, কিন্তু নিজের নামের প্রতি তিনি সুবিচার করেননি। তার শিক্ষা, তার সংস্কৃতির প্রতি তিনি অবিচার করেছেন।
ঢাকার সংবাদপত্রগুলোয় এখন খবর একটাই- একটি সর্বদলীয় সরকার হচ্ছে, যেখানে বিএনপির কোনো প্রতিনিধিত্ব থাকছে না। প্রধানমন্ত্রী বলছেন, বিএনপি যে ক’টি মন্ত্রণালয় চায়, যে মন্ত্রণালয় চায়, তা তাদের দেয়া হবে। কিন্তু সর্বদলীয় সরকারে যোগ দেয়া তো বড় কথা নয়- বড় কথা ও মূল কথা হচ্ছে, সর্বদলীয় সরকারের প্রধান কে হবেন? মন্ত্রীদের কথায় তো এটা স্পষ্ট হয়েছে, শেখ হাসিনাই হচ্ছেন এ সরকারের প্রধান। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিজে কখনও বলেননি, তিনি এ দায়িত্বটি নেবেন না। মূল সমস্যাটা তো এখানেই। তিনি একটি দলের প্রধান। তিনি যদি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হোন, তাহলে নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তা কোথায়? কারা সেই সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকবেন, তাদের নামধামও পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। আমু, তোফায়েল, মেনন, ইনুর নাম পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। তারা কি নিরপেক্ষ? তারা মন্ত্রী হবেন, আবার নির্বাচনও করবেন- সেই নির্বাচন কি নিরপেক্ষ হবে? তারা এক একজন হাইপ্রোফাইল নেতা। মন্ত্রী হলে প্রটোকল নিয়ে নিজ নির্বাচনী এলাকায় যাবেন। এতে করে কি পরোক্ষভাবে তিনি বা তারা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করবেন না? দলীয় লোকদের নিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা যাবে না।
প্রধানমন্ত্রী একটা কথা প্রায়ই বলেন, তিনি সংবিধানের বাইরে যাবেন না। এটা ভালো। কিন্তু সংবিধান তো বাইবেল নয় যে তাতে পরিবর্তন আনা যাবে না। এর আগের এক লেখায় আমি উল্লেখ করেছি, জাতির বৃহত্তম স্বার্থে, নির্বাচনের নিরপেক্ষতার স্বার্থে অনেক দেশেই একটি নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দেশের সংসদীয় ইতিহাসের একটি বড় দুর্বলতা হচ্ছে, এখানে ক্ষমতাসীন দল নানা প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের ফলাফলকে তাদের অনুকূলে নেয়ার চেষ্টা করে। দলীয় সরকারের অধীনে যখনই নির্বাচন হয়েছে, তখনই এ প্রবণতা বেড়েছে। ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনের ‘কিছু ঘটনার’ পুনরাবৃত্তি হতে আমরা দেখেছি পরেও। মাগুরা উপ-নির্বাচনের দৃষ্টান্ত দেয়া হয়। কিন্তু বর্তমান জোট সরকারের আমলে ভোলার উপ-নির্বাচনে কী হয়েছিল, তা সংবাদপত্র সাক্ষ্য দেয়। তাই আমু-তোফায়েল-মেনন কিংবা ইনুর মতো হেভিওয়েট নেতাদের মন্ত্রিসভায় নিয়ে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা যাবে না। বরং এটা পরিণত হবে মহাজোট সরকারের ক্ষুদ্র সংস্করণে। তাতে মূল সমস্যার সমাধান হবে না। এর বাইরে ক্ষুদ্র দলগুলোর (যেমন সিপিবি, বাসদ ইত্যাদি) প্রতিনিধিত্বও যদি থাকে, সে ক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠবে- যেখানে প্রধানমন্ত্রী বারবার বলছেন, অনির্বাচিতদের দিয়ে গঠিত সরকার তিনি মেনে নেবেন না, সেখানে এসব ছোট ছোট দলের সংসদে প্রতিনিধিত্ব কোথায়? বিএনপিকে সর্বদলীয় সরকারে নেয়ার দায়িত্ব সরকারের। বলা হয়েছে, বিএনপিকে দুটি কিংবা তিনটি মন্ত্রণালয় দেয়া হবে। এটা কি হাস্যকর ব্যাপার নয়! দুটি বা পাঁচটি মন্ত্রীর জন্য কি বিএনপি বা ১৮ দল আন্দোলন করছে! কোনো কোনো মহল বিএনপিকে ভেঙে ফেলার যে অলিক চিন্তা করছে, তা কতটুকু সফল হবে, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। বিএনপির অনেক নেতার নামও আসছে, যারা ‘তৃণমূল বিএনপি’ নামে সংগঠিত হতে চায়। কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম। মূলধারার বাইরে গিয়ে কেউই সফল হতে পারেনি।
‘রাজনীতির বল’টা এখন সরকারের কোর্টে। সরকার যদি চায় বিএনপিকে নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে মাইনাস করতে, তাতে সরকার সফল হবে সন্দেহ নেই। কিন্তু এতে সমস্যার সমাধান হবে না। নির্বাচন একটা হবে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে। নতুন একটি মহাজোট সরকারের রূপই আমরা দেখব নির্বাচনের পর। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, একটি নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা সরকারকে গ্রহণ করতেই হবে এবং আমার ধারণা ‘একতরফাভাবে’ যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তার বয়স হবে দু’বছর এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়েই আমরা নির্বাচনকালীন সরকারের একটি স্থায়ী রূপ পাব। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকালীন সরকারের একটি স্থায়ী রূপ দরকার। রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক- কাদের নিয়ে এ সরকার গঠিত হবে, সে বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে। সরকার প্রয়োজনে একটি কমিশন গঠন করতে পারে, যারা সরকারকে মতামত দেবেন। তবে এটা নিশ্চিত, ক্ষমতাসীন সরকারের প্রধানকে রেখে যে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’, তা সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য হবে না। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থেই এমন একটি ‘কর্তৃপক্ষ’ প্রতিষ্ঠা করা দরকার, যাদের কাজ হবে তিন মাসের মধ্যে জাতিকে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেয়া। কীভাবে এটা করা যায়, কীভাবে একে সংবিধানের অংশ করা যায়, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে একাধিক বিকল্প ভাবনা আসতে পারে। নির্বাচন কমিশনকে সাংবিধানিকভাবে নিরপেক্ষ করা, সিইসি তথা নির্বাচন কমিশনারদের বাছাই প্রক্রিয়া একটি সার্চ কমিটির মাধ্যমে করা, তিন মাসের জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করা, সাংবিধানিক পদের অধিকারীদের নিয়ে এই কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করা, একটি গার্ডিয়ান কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি নানা ভাবনা আসতে পারে। মূল বিষয় একটিই- একটি দলনিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করা, যারা নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তা দেবে। রাষ্ট্রপতি কিংবা স্পিকারের কথা ভাবনায় থাকলেও বাস্তবতা হচ্ছে উভয়েই দলীয়ভাবে নির্বাচিত। স্পিকার আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হবেন। তাহলে তিনি কি নিরপেক্ষ? রাষ্ট্রপতি এখন আর রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। কিন্তু দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে কি তিনি থাকতে পেরেছেন? নিরপেক্ষ একটি কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয়তা এ কারণেই।
দুই নেত্রীর ফোনালাপের তিক্ততার পর আদৌ সংলাপ হবে বলে আমার মনে হয় না। তাই সরকার বড় ধরনের একটি ‘রাজনৈতিক ঝুঁকি’ সামনে রেখেই এগোচ্ছে। দু’দফা ৬০ ঘণ্টার হরতালের পর এখন ৮৪ ঘণ্টার হরতাল চলছে। এটা সত্য, এতে করে ১৮ দলের লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। কিন্তু হরতালে সহিংসতা বেড়েছে। হরতালে কোনো নেতা ‘প্রাণ’ হারাননি। প্রাণ হারিয়েছেন কয়েকজন সাধারণ মানুষ, যারা জীবিকার জন্য, খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য রাস্তায় বের হয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে অনেকেই আমাকে বলেছেন, তারা আর বাংলাদেশের চলমান রাজনীতির ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। অনেকেই এখন আর বাংলাদেশে আসতে চাচ্ছেন না। এক ধরনের হতাশায় পেয়ে বসেছে প্রবাসীদের। চার মাস আগে যখন দেশ ছেড়েছিলাম তখন যে পরিস্থিতি ছিল, আজ তাতে এতটুকুও পরিবর্তন আসেনি। বরং ‘রাজনৈতিক ঘৃণা’, ‘রাজনৈতিক তিক্ততা’, ‘ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার স্পৃহা’ আরও বেড়েছে। যদি ‘সমঝোতা’ না হয়, যার সম্ভাবনাই বেশি, তাহলে সরকারকে একটি বড় ‘রাজনৈতিক ঝুঁকি’ নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। এতে জাতির কতটুকু মঙ্গল হল, সে প্রশ্ন থেকেই গেল।
ড. তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ক্ষমতার চেয়ে জনগণ বড় by ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

জন ডান নামক এক ইংরেজ কবির একটি কবিতা রয়েছে ‘Go and Catch a Falling Star’ শিরোনামে। কবিতাটি ১৫৯৫ থেকে ১৬০০ সালের মধ্যে কোনো এক সময় প্রকাশিত হয়। সে কবিতায় কবি কিছু অসম্ভবের কথা বলেছেন। তিনি বলেছিলেন, আকাশ থেকে খসে পড়া তারা ধরতে, ম্যানড্রেক গাছের শেকড় থেকে মানব সন্তান নিতে, অতীতকে ফিরিয়ে আনতে, শয়তানকে তাড়া করে তার ঘর খুঁজে বের করতে এবং মৎস্যকন্যার গান শুনতে। এগুলো সবই আসলে অসম্ভব। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের এই স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু আজ হঠাৎ এতদিন পর সেই কবিতার প্রসঙ্গ তোলার কারণ দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক অবস্থা। আসন্ন সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীদের বক্তব্য ও ভাবভঙ্গি খুবই চিন্তার বিষয়। গণতন্ত্রের কথা মুখে বলেন সবাই, কিন্তু কর্মকাণ্ডে মনে হয় তারা স্বৈরতন্ত্রের ধারক। নির্বাচিত সংসদ সদস্য হয়েও এক দলের সংসদ সদস্যরা সংসদে যান না, আর অন্য দলের সদস্যরা সে সময় সংবিধান সংশোধন করেন নিজেদের মতো করে। নির্বাচন নিয়ে এই দড়ি টানাটানি দেখে মনে হয়, তাদের মনে একটাই চাওয়া, আর তা হচ্ছে যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতায় যাওয়া। অর্থাৎ এ যেন ‘বিচার যাই করো না কেন, তালগাছটা কিন্তু আমার।’ এ দেশের ১৬ কোটি মানুষ শুধুই তাদের হাতে খেলনা। নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় বসা নিয়ে যে নাটক হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে, তা দেখে মনে হয়- বাঘে মহিষে শেষ পর্যন্ত এক ঘাটে জল খেলেও আমাদের দেশের দুই নেত্রী দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে একসঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে পারেন না। পারলে তাদের গাত্রদাহ হয়। এজন্যই জন ডানের ওই কবিতার কথা লেখা। জন ডানের সেই কবিতায় যেমন অনেক অসম্ভব সম্ভাবনার কথা আছে, আমাদের দুই নেত্রীর দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে আলোচনায় বসা তেমনই অসম্ভব। ক্ষমতার স্বার্থের কারণে দেশের বৃহত্তর স্বার্থ, জগণের স্বার্থ তারা দেখতে পান না।
বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ বলবেন, তারা জনগণের জন্য রাজনীতি করেন। দেশের প্রধান একটি রাজনৈতিক দল তো এ স্লোগান প্রায়ই প্রচার করে বেড়ায়- ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’। কিন্তু দেশের চেয়ে যে তাদের কাছে নিজেদের স্বার্থ বড় এবং দেশ ও জনগণের চেয়ে প্রকৃতপক্ষে সেটাই সবসময়ই বড় করে দেখা হয়, তা কিন্তু মোটেও প্রচার করা হয় না। এটা শুধু ওই রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই নয়; বরং অন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো কি সত্যিকার অর্থেই জনগণের জন্য, জনগণের স্বার্থের জন্য রাজনীতি করে? নিশ্চয় নয়। যদি তাই করত, তাহলে ওই সব রাজনৈতিক দলের হাতে এদেশের জনগণকে বারবার জিম্মি হতে হতো না, জনগণকে বারবার বলির পাঁঠা হতে হতো না।
গত ২৭, ২৮ ও ২৯ অক্টোবরের হরতাল শেষ হতে না হতেই আবারও ১০, ১১, ১২ ও ১৩ নভেম্বর হরতালের ডাক দিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, বাংলাদেশ হরতালের দেশ হতে চলেছে। বস্তুত হরতাল যেন এদেশের সংস্কৃতিতে নতুন এক মাত্রা হিসেবে যোগ হয়েছে। একটি সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, এ দেশের শতকরা ৯৫ ভাগ লোকই হরতাল পছন্দ করেন না। তা সত্ত্বেও জনগণকে বারবার হরতালের কালো থাবার কবলে পড়তে হচ্ছে। হরতাল যেন এ দেশের জনগণের কাছে ভাগ্যদেবীর এক ‘আশীর্বাদ’। এটি বিভিন্ন সংগঠনের দাবি আদায়ের জন্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের একটি মাধ্যম এবং তা একটি গণতান্ত্রিক অধিকারও বটে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে হরতালের কারণে অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের ওপর যে দীর্ঘস্থায়ী কুপ্রভাব পড়ছে, তা সামাল দেয়ার মতো ক্ষমতা আমাদের দেশের আছে কি? হরতালের কারণে অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাব্যবস্থা, উন্নয়ন-অগ্রগতিসহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত হচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য। পাশাপাশি বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে, বিনিয়োগ কার্যক্রম নিরুদ্যম হয়ে পড়ছে। হরতালের কারণে এ দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী সমাজসহ সবাই এখন রীতিমতো বিষিয়ে উঠেছেন। হয়ে পড়েছেন উদ্বিগ্ন। হরতাল আহ্বানকারীরা এদেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিসহ খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের কথা না ভেবেই বারবার হরতাল আহ্বান করছেন।
হরতালে দেশের সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। শিক্ষার্থীরা পড়ছেন সেশনজট নামক কালো থাবার কবলে, যা তাদের জীবনে বয়ে আনছে অপূরণীয় ক্ষতি। এটা সব গণতান্ত্রিক দেশেই স্বীকৃত যে, রাজনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে দেশকে অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাসহ সবদিক থেকে এগিয়ে নেয়া। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর উল্টোটি হচ্ছে।
দেশে বারবার হরতালের কারণে বাধাগ্রস্ত হয় মানুষের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড। হরতাল পঙ্গু করেছে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা, শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রকে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দেশের ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী মহল, সাধারণ মানুষ, সুশীল সমাজসহ সব রাজনৈতিক দলের দ্রুত সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। প্রয়োজন দাবি আদায়ে হরতালের বিকল্প কোনো পন্থা খুঁজে বের করা। সবাই মিলে হরতালকে ‘না’ বলার ব্যাপারেও সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি। এ ক্ষেত্রে সব রাজনৈতিক দলের স্মরণ রাখা প্রয়োজন, যে দল হরতাল আহ্বান করে দেশে অস্থিশীলতা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, এর কুপ্রভাব পরবর্তী নির্বাচনে ওই দলের ওপর পড়ে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের এটাও বোঝা উচিত, জনগণ এখন আর বোকা নয়। তারা যে সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো যে কোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম, তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ তারা ইতিমধ্যে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভালোভাবেই দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। দেশ-জাতির বৃহত্তর স্বার্থে তথা আমাদের সবার প্রিয় এ দেশটির সার্বিক উন্নয়ন-অগ্রগতির পথকে সুগম করতে সব দলেরই হরতাল পরিহার করা উচিত। এখন সময় এসেছে দেশকে এগিয়ে নেয়ার। হরতালের কারণে এ দেশটি সবদিক থেকে পিছিয়ে যাক, এমনটি কারও কাম্য হতে পারে না। দেশের এই ক্রান্তিকালে সরকারি দল, বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক দলকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই একসঙ্গে আলোচনায় বসে সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস (ইউআইটিএস); অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য

জনগণকে আন্দোলনে যুক্ত করতে হবে by ফরহাদ মজহার

যুগান্তরে গত সপ্তাহের লেখায় এখনকার রাজনৈতিক কর্তব্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। দেখুন, বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবিতা, ২ নভেম্বর ২০১৩। একই লেখা দুই-একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পয়েন্ট আরও ব্যাখ্যা করে চিন্তাওয়েবে (www.chintaa.com) তোলা রয়েছে ‘গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবিতা : এখনকার রাজনৈতিক কর্তব্য ও বুদ্ধিজীবিতা’ শিরোনামে। এখন রাজনৈতিক কর্তব্য নির্ণয়ের দিকে নজর রেখেই লিখছি। ইতিমধ্যে আঠারো দলের হরতাল ও সমাবেশ শেষ হয়েছে। এ লেখা যখন লিখছি, তখন বিরোধী দলের ওপর নতুন করে দমন-পীড়ন শুরু হয়েছে। স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এম কে আনোয়ার ও ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়াকে গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেফতার করেছে। গভীর রাতে খালেদা জিয়ার বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় গ্রেফতার হয়েছেন ব্যবসায়ী আবদুল আউয়াল মিন্টু ও বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস। বেগম জিয়ার গুলশানের বাসা ঘিরে রেখেছে পুলিশ ও আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। অন্যদিকে শেখ হাসিনা তার ভাষা বদলাননি। একদিকে বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন, জেল-জুলুম আর অন্যদিকে তাদের সংলাপে ডাকা এ এক পরাবাস্তব পরিস্থিতি। সরকারপক্ষীয় গণমাধ্যমগুলো ক্রমাগত প্রচার করে বেড়াচ্ছে হরতালে কত ক্ষতি। মানুষের প্রাণহানির দায়দায়িত্ব তারা একতরফা বিরোধী দলের ওপরই চাপিয়ে নিজেদের দায়দায়িত্ব থেকে খালাস পেতে চাইছে। অথচ উচিত ছিল আইনশৃংখলা বাহিনী কোথায় কোথায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করে প্রাণহানি ঘটিয়েছে, নাগরিকদের আহত করেছে, আর কোথায় হরতালকারীদের কারণে ক্ষতি হয়েছে, সেসবের সঠিক সংবাদ পরিবেশন।
এর মধ্যেও শেখ হাসিনা ভোটের দাওয়াত দিচ্ছেন, ভোট চাইছেন। ক্ষমতায় থেকে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে তিনি ভোট চাইতে পারেন কিনা এই প্রশ্ন কোনো গণমাধ্যম তুলেছে দেখিনি। বলাবাহুল্য, আঠারো দলীয় জোট আরও কঠোর কর্মসূচি দিয়েছে। এই লেখা যখন লিখছি, হরতাল তখন চলছে। রাজনৈতিক বিভাজন দেশকে নিশ্চিত সংঘাতের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে এর পরিণতি কী দাঁড়াবে তা আন্দাজ করা মুশকিল। তবে ক্ষমতাসীনরা রাজনৈতিক বৈধতা হারিয়েছে অনেক আগেই। এর বিপরীতে আঠারো দলীয় জোটের পক্ষে গণসমর্থনের জোর কতটুকু তা গণমাধ্যমের পক্ষপাতিত্বের কারণে বোঝা মুশকিল। তবে ক্ষমতাসীনদের প্রতি সমর্থন যে কমেছে সেটা নানান জরিপে আগেই প্রকাশিত। উদার রাজনৈতিক পরিমণ্ডল বজায় থাকলে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে বিএনপিই ক্ষমতায় আসত তাতে সন্দেহ নেই। ক্ষমতাসীনরা সে কারণেই সংবিধান বদলিয়েছে এবং দমন-পীড়ন এমনভাবে চালাচ্ছে যাতে বিএনপিকে বাদ দিয়েই নির্বাচন করা সম্ভব হয়।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। বলপ্রয়োগের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা ও রাজনৈতিক ইস্যুর মীমাংসা করার হিসাব আলাদা। সে ক্ষেত্রে বিরোধী দলকে জনগণের বৈধ প্রতিনিধি হতে হলে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষাকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে ধারণ করতে হবে। যদি শেখ হাসিনা নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রত্যাখ্যান করে তথাকথিত সর্বদলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার পথে চলে যান, তাহলে এই দাবির আর কোনোই উপযোগিতা নাই। সংলাপের রাজনীতির কফিনে শেখ হাসিনা শেষ পেরেকটি মেরে দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতাদের গ্রেফতার করে। খালেদা জিয়ার অরাজনৈতিক ব্যক্তিগত সহকারীকে গ্রেফতার করার রাজনৈতিক অর্থ সুস্পষ্ট। খালেদা জিয়া গৃহে অন্তরীণ নাকি মুক্ত এই প্রশ্ন এখন প্রধান জিজ্ঞাসা। এ পরিস্থিতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মৃত লাশের কফিন গোরস্থানে বহন করে যাওয়ার অধিক রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে না। গণতান্ত্রিক লড়াই-সংগ্রামে জয়ী হতে হলে গণতান্ত্রিক দাবি-দাওয়া সুস্পষ্ট ও পরিচ্ছন্নভাবে হাজির করা দরকার। খালেদা জিয়া ও বিরোধীদলীয় জোটের সামনে এটাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
জনগণের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা ধারণ করতে পারে সেই দাবি-দাওয়া কেমন হতে পারে? সে ব্যাপারে আলাদাভাবে আলোচনা জরুরি। তবে কয়েকটি বিষয় জনগণের কাছে স্পষ্ট। জনগণের প্রথম ও প্রধান গণতান্ত্রিক দাবি হচ্ছে, ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার বিপরীতে নাগরিক ও মানবিক অধিকার সংবলিত একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক সংবিধান ও গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র। এর জন্য দরকার ইসলাম-বিদ্বেষী রাজনীতি জনগণকে যেভাবে বিভক্ত ও বিষাক্ত করেছে, রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসাবে জনগণের মধ্যে সেই বিভক্তির নিরসন। বিশেষ বিশেষ আত্মপরিচয়ের সামাজিক পরিমণ্ডলের ঊর্ধ্বে জনগণের মধ্যে নাগরিক চেতনার উন্মেষ ঘটানো। যাতে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসাবে পরিগঠন মজবুত হতে পারে।
দুই.
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও জনগণের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য জনগণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে শক্তিশালী জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। ক্ষুদ্র দেশ চতুর্দিকে বৈরী রাষ্ট্র দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকলে চরিত্রের দিক থেকে এই ব্যবস্থা গণপ্রতিরক্ষার চরিত্র পরিগ্রহণ করে বা করতে বাধ্য। এই ব্যবস্থার আরেকটি নীতি বা দর্শন হচ্ছে প্রতিবেশী দেশের গণতান্ত্রিক জনগণের সঙ্গে মৈত্রীর চর্চা। এই মৈত্রী জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যও জরুরি। দিল্লির আধিপত্য ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার অর্থ ভারতের কিংবা মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক জনগণের বিরোধিতা নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য এই মৈত্রীর চর্চা জরুরি। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে পরাশক্তির নিরন্তর হস্তক্ষেপ বা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান অবশ্যই জরুরি। কিন্তু দিল্লির প্রশ্ন এখন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হচ্ছে দিল্লি পরিষ্কারই জানিয়ে দিয়েছে যে শেখ হাসিনাই ক্ষমতায় আবার প্রত্যাবর্তন করুক, তারা তাই চায়। এই পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম মূলত দিল্লির আগ্রাসন ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামেরই নামান্তর। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়।
জনগণের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ আকাক্সক্ষা হচ্ছে, জীবন-জীবিকা ও সামাজিক ইনসাফ নিশ্চিত করা। শ্রমিকদের ন্যূনতম আট হাজার টাকা মজুরি নিশ্চিত করা এবং কৃষককে অবাধ বাজার ব্যবস্থার শোষণ থেকে রক্ষা করা; বিশেষত কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থাকে বহুজাতিক কোম্পানি ও দেশের দুষ্ট ব্যবসায়ীদের হাত থেকে রক্ষা করা প্রধান কর্তব্য হয়ে উঠেছে। কৃষকের হাতে থাকা খাদ্য ও বীজ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে তা কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার পথ আত্মঘাতী পথ। এই পথ থেকে দ্রুত ফিরে আসতে হবে। চতুর্থ ইস্যু হচ্ছে, প্রাণ, পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা। 
পঞ্চম দাবি হচ্ছে, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সক্ষম ও মজবুত করে তোলার সঠিক অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন। এই নীতির মর্মকথা বাজার ব্যবস্থাকে অবাধ করা নয়, বরং তাকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শৃংখলার অধীনে এনে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির অভিমুখী করা। বাজার ব্যবস্থা কায়েম অর্থনীতির উদ্দেশ্য হতে পারে না, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের উপায় হতে পারে।
আমি মনে করি, এই পাঁচটি সংক্ষিপ্ত অথচ মৌলিক গণতান্ত্রিক দাবি লিবারেল রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের মধ্যে অর্জন করা সম্ভব। যারা ন্যূনতম বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী, তাদের এই দাবিগুলো সমর্থন না করার কোনো কারণ নাই।
তিন.
আমার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে গত লেখায় কিছু ধারণা দিয়েছি। এখানে আরও দুই-একটি কথা বলব।
বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের মূল জায়গাটা হচ্ছে বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে। আমার অবস্থান হচ্ছে, এখনকার লড়াই হচ্ছে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের গণতান্ত্রিক লড়াই। এ লড়াইয়ে মতাদর্শিক বিভাজনের ভেদরেখা কারা বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে আর কারা তার রূপান্তর কামনা করে তার দ্বারাই ঠিক হবে। কে ইসলামপন্থী, কে সেক্যুলার সেই তর্ক গৌণ। রাজনীতি কংক্রিট রাষ্ট্র ও বিদ্যমান ক্ষমতার চরিত্র নিয়ে জনগণের মধ্যে নানান মতাদর্শিক বিভ্রান্তি, বিরোধ ও বিভাজন রয়েছে। এ ব্যাপারে কোনোই সন্দেহ নাই। মতাদর্শের মীমাংসা রাষ্ট্র গঠনের তৎপরতার দিক থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যাপার না। ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে যারা লড়বে ও লড়ছে তাদের ঐক্যটাই এখন দরকার। মতপার্থক্যের সুরাহার লক্ষ্যে নতুনভাবে রাষ্ট্র গঠনের গণতান্ত্রিক কর্তব্য জনগণকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়া আমাদের এখনকার প্রধান কাজ। আমি বর্তমান বাস্তবতায় এই রাজনীতিকেই সঠিক মনে করি। যারা রাজনীতির এই মূল জায়গায় না গিয়ে নানা বাগাড়ম্বরে এই ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার পক্ষে ওকালতি করে, আমি তাদের বিরোধিতা করি। গণতন্ত্রের শত্র“ গণ্য করি। লক্ষ্য করি, তারা মূল জায়গায় না থেকে অবান্তর প্রশ্ন নিয়ে কূটতর্ক করে, যা বুদ্ধিজীবিতার দিক থেকে ফলপ্রসূ কোনো পরিণতি বয়ে আনে না। এ ক্ষেত্রে মতাদর্শিক বিভক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয় হচ্ছে ইসলাম প্রশ্ন।
বাংলাদেশে ইসলাম নিয়ে কথা বলা রীতিমতো বিপজ্জনক ব্যাপার। সম্ভবত বাংলাদেশই পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে ইসলামের ইতিহাস, দর্শন, রাষ্ট্রচিন্তা, সমাজচিন্তা, অর্থনীতি, আইন ও ফিকাহ সম্পর্কে কারও আন্তরিক আগ্রহকে তুমুল সন্দেহ করা হয়। এমনকি আলেম-ওলামা মওলানা মুফতি না হলে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত কেউ যে ইসলামে আন্তরিকভাবেই আগ্রহী হতে পারেন, এটা বিশ্বাস করানো রীতিমতো কঠিন। বড়ই আজব দেশ। এ ধরনের আগ্রহ যারা পোষণ করেন তাদের রীতিমতো নাস্তানাবুদ হতে হয়। নিন্দা বিদ্বেষের শিকার হতে হয়। আমার ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। তবে সন্দেহ নাই, ইতিহাস ও দর্শনের একনিষ্ঠ ছাত্র হওয়ার কারণে ইসলাম আমার বিপুল বিস্ময় ও আগ্রহের বিষয়। একইভাবে ইহুদি-খ্রিস্টীয় ধর্ম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার গ্রিক-খ্রিস্টীয় ভিত্তি এবং উপমহাদেশের এ অঞ্চলের সনাতন বা লোকায়ত ধর্ম ও ধর্মচর্চার ভাব ও ইতিহাসকে আমি আমার কল্পনা, মনন, ঐতিহ্য ও ভাবচর্চার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলেই মনে করি। এর মধ্যে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ধর্ম যেমন আছে, একইভাবে আছে বাংলার কবি, সাধক ও ভাবুকদের বিশাল ভাণ্ডার। যারা আমার কবিতা ও এ ক্ষেত্রে আমার কাজ সম্পর্কে অবহিত তারা তা জানেন। এ ব্যাপারে নিজের ঢাক নিজে পেটানোর ইচ্ছা বিশেষ নাই।
ইসলামের ইতিহাস ও দর্শনই শুধু আমার আগ্রহের বিষয় নয়, ইসলামপন্থা বা ইসলামী রাজনীতির নানান চরিত্র ও বয়ান, তাদের সম্ভাব্য ঐতিহাসিক অভিমুখ এবং ইসলামী রাজনীতির সীমা ও সম্ভাবনা সম্পর্কেও আমি বিপুল আগ্রহী। বিশ্ব ইতিহাস পৃথিবীর একটি বৃহত্তম ধর্মকে বাদ দিয়ে যেমন কল্পনা করা অসম্ভব, তেমনি আমি মনে করি উপমহাদেশে ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে ইসলামকে বিচার না করলে তার পরিণতি এই উপমহাদেশের জন্য কখনোই কোনো ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না। বাংলাদেশ তো দূরের কথা। এই কথাগুলো আমি কমপক্ষে গত ২৫ বছর ধরেই বলছি। দুই হাজার এক সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগন হামলার পর কথাগুলো ইতিহাস ও বাস্তবতার কারণেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর পরেও যারা ইসলাম নিয়ে কথা বলি বলে আমাকে নিন্দা করেন, তাদের মধ্যে ইসলাম-বিদ্বেষ প্রকট ও প্রবল। যারা তুলনামূলক ভাবে সহনশীল, এই অসুখ নাই, তাদের গোড়ার মুশকিল হচ্ছে মুসলমান ও ইসলামকে তারা সমার্থক গণ্য করেন। ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি বাংলাদেশে অবশ্যই আছে এবং তারা অনেক সময় সঙ্গত কারণেই উৎকণ্ঠিত ও উদ্বিগ্ন বোধ করেন। আমিও করি। তাদের সঙ্গে আমার পার্থক্য হচ্ছে, অসম অর্থনৈতিক ও ক্ষমতার ভারসাম্যহীন বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় মুসলমানরা তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য লড়বেই। এটাই বাস্তবতা। যেহেতু এই স্বার্থ রক্ষার দায় সমষ্টিগতভাবে মুসলমানরা বোধ করেন, অতএব অধিকাংশ সময় তাদের এই রাজনীতি সাম্প্রদায়িক রূপ পরিগ্রহ করে। ‘সাম্প্রদায়িকতা’ আসলে কী, সেই তর্কে আমি এখানে প্রবেশ করব না। মেনে নেব যে মুসলমান নিজেদের পরিচয় ধর্ম দিয়ে নির্ণয় করার মধ্য দিয়ে তাদের ধর্ম বিশ্বাসের বাইরে অন্য সব ধর্মাবলম্বী বা ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষকে যদি নিজের ‘অপর’ গণ্য করে তাহলে অবস্থা বিশেষে বা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অপরের প্রতি শত্র“তা হিসাবে হাজির হতে পারে। হয়ও বটে। একই কথা ‘বাঙালি’ সম্পর্কেও খাটে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে একমাত্র পরিচয় গণ্য করে তার ভিত্তিতে অন্য সব পরিচয়ে পরিচিত জনগোষ্ঠীকে নিজের ‘অপর’ গণ্য করাও সমান সাম্প্রদায়িকতা। মুশকিল হচ্ছে ইসলামের প্রতি সহনশীল ব্যক্তিরা এই শেষের কথা মানতে চান না। তারা উগ্র ও সাম্প্রদায়িক ‘বাঙালি’ না হতে পারেন। কিন্তু বাঙালিত্বে বিশ্বাসী। ইসলাম যে বাঙালির ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ সেটা তাই তারা মানতে রাজি না। তাদের সঙ্গে এখানে আমার ঘোরতর পার্থক্য আছে। ধর্ম, ইতিহাস, দর্শন ও ভাবুকতার দিক থেকে ইসলামের সঙ্গে মোকাবিলার সঠিক নীতি ও কৌশল গ্রহণ না করে ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মের অবাস্তব ও অসম্ভব বিরোধ জিইয়ে রাখলে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার মোকাবিলা অসম্ভব, এটাই আমার অবস্থান। আশা করি তারা আমার নিন্দা করলে আমার অবস্থান যুক্তির সঙ্গে নাকচ করবেন।
সমাজে ইসলামপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে দুটো শক্তিশালী ধারা আছে। একটি স্পষ্টতই সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিস্ট। এদের চেনা এখন তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে গিয়েছে। এদের ঘোর ইসলাম-বিদ্বেষ যখন চোখে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দেয়া হয়, তখন একে তারা ‘উসকানি’ বলে গণ্য করে। অন্যের মত সহ্য করতে না পেরে এরা থানা পুলিশ করে, আর মিথ্যাচার, কুৎসা প্রচার ও চরিত্র হনন তো আছেই। এই ধারা জাতিবাদী রাজনীতি নামে পরিচিত। বাঙালির নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে তৈরি হওয়া ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ এই ধারার আদর্শ।
জাতীয়তাবাদী উগ্রতা বর্জিত আরেকটি ধারা হচ্ছে পাশ্চাত্যের সেক্যুলার ধারা। যারা কোনো কাটছাঁট না করে কিংবা বাংলাদেশের ইতিহাস ও বাস্তবতাকে বিবেচনায় না নিয়ে ইউরোপীয় সেক্যুলারিজমকে (বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতাকে) বিমূর্ত ফর্মুলা হিসাবে বাংলাদেশে কায়েম করতে চায়। সাম্রাজ্যবাদের যুগে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার প্রান্তে অবস্থিত একটি দেশে ইংল্যান্ডের বা ইউরোপীয় মডেলে একটি ‘আধুনিক রাষ্ট্র’ কায়েম করার অধিক চিন্তা করতে এই ধারা শোচনীয়ভাবে অক্ষম। তাদের ধারণা বাংলাদেশকেও ইউরোপীয় ইতিহাসের ঘাটগুলো ইউরোপীয় কায়দায় পার হতে হবে। আধুনিক রাষ্ট্র সম্পর্কে তাদের ইউরোপীয় ধারণার কারণে তারা সঙ্গত কারণেই রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করার কথা বলে। যাকে আমরা সুশীল বা লিবারেল রাজনীতি বলি এই ধারা সেই রাজনীতিরই অংশ। তবে অন্য সুশীলদের সঙ্গে আমি যে সুশীলদের কথা বলছি তাদের পার্থক্য আছে। পার্থক্য হচ্ছে লিবারেল আদর্শ বাস্তবায়ন করতে সুশীলরা সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তির গোলামি ও দাসত্ব শুধু নয়, সুবিধা বুঝে সেনাবাহিনীর কাঁধে লিবারেল নীতি বিসর্জন দিয়ে ভর করে। এক-এগারোর সময় আমরা যা দেখেছি। পাশ্চাত্যের লিবারেল রাজনীতি যারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, যাদের কথা এখন বলছি, তারা নীতি বিসর্জন দিয়ে সেনাশাসনের পক্ষে দাঁড়ান না।
আমি এ ধারার ব্যক্তিদের পাশ্চাত্যপ্রীতি সত্ত্বেও আমার রাজনৈতিক মিত্র মনে করি, যদি তারা চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন। তবে দেখা যায়, তারা ইসলামী মতাদর্শ প্রচারের বিপক্ষে দাঁড়ান। এদের ইসলাম-বিদ্বেষ আলেম-ওলামাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা মাদ্রাসার ছাত্রদের বিচার করার মানদণ্ডে ধরা পড়ে। এদের অনেকের আজগুবি ধারণা হচ্ছে, ইসলামপন্থীদের দিয়ে আমি গণতন্ত্র কায়েম করতে চাই। ইসলামের সঙ্গে গণতন্ত্রের বিরোধ আছে, সে বিরোধ মৌলিক এবং সেটা ভিন্ন বিতর্ক। কিন্তু এই চিন্তা তাদের মধ্যে কাজ করে কেন? আসলে ইউরোপীয় গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পর্কে তাদের ধারণা অপরিচ্ছন্ন ও অস্পষ্ট। সেই তর্ক এখানে না তুলেও বলা যায় তারা ‘গণতন্ত্র’ বলতে রাষ্ট্র বোঝেন না, কয়েকটি আচার ও আদর্শ বোঝেন। যদি বুঝতেন তাহলে এটাও বুঝতেন যে, গণতন্ত্র মাত্রই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, ধর্মতাত্ত্বিক রাষ্ট্র নয়। আর আমি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের জন্য লড়ছি, যে লড়াইয়ে মজলুম সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আজ হোক কাল হোক বিপুল স্রোতের মতো যুক্ত হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। অতএব সেক্যুলারিস্টরা গণতন্ত্র চাইবার পরেও যখন আলাদাভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেন, আমি তাকে ধর্ম-বিদ্বেষ, বিশেষত ইসলাম-বিদ্বেষ হিসাবেই বুঝি।
কিন্তু আমি আগেও বহুবারই বলেছি, ইউরোপীয় এনলাইটমেন্টের যে ইতিবাচক অর্জন, আমি তার বিরোধিতা করি না। কিন্তু সে অর্জনকে আমি সর্বজনীন মনে করি না। ইউরোপই দুনিয়ার ইতিহাস নয়। যারা তা মনে করেন তারা ইউরোপকেই দুনিয়ার আদর্শ মনে করেন। আমি করি না। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিপ্লব বাংলাদেশের মতোই হবে। ইউরোপের মতো হবে না। তার সম্ভাব্য রূপ কী হতে পারে সেই আলোচনায় তারা আগ্রহী হলে এই মতপার্থক্য নিরসন রাজনীতির এই তাৎপর্যপূর্ণ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হতে পারে। ইসলাম নিয়ে আলোচনা এই জায়গা থেকে করলেই সেটা সবচেয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হবে।

হামাসের প্রথম নারী মুখপাত্র

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে নিজেদের নতুন এবং আধুনিকভাবে তুলে ধরতে এই প্রথমবারের মতো একজন নারী সাংবাদিককে সরকারের মুখপাত্র নিয়োগ করেছে গাজা উপত্যকার ক্ষমতাসীন দল ও ফিলিস্তিনি মুক্তি সংগঠন হামাস। সোমবার আল জাজিরা জানায়, হামাসের কার্যক্রমকে ইতিবাচক এবং নতুনভাবে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে ইসরা আল মোদাল্লালকে দলটির মুখপাত্র হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। ২৩ বছর বয়সী ইসরা অনর্গলভাবে ব্রিটিশ উচ্চারণে ইংরেজি বলতে পারঙ্গম। গাজায় নিজের কার্যালয়ে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরা বলেন, ‘আমরা নতুন করে অন্যভাবে সামনে এগিয়ে যেতে চাই। বিভিন্ন ইস্যুগুলোকে আমরা মানবিকভাবে তুলে ধরতে চাই।’ তালাকপ্রাপ্ত ইসরা চার বছরের এক শিশু কন্যার মা। অন্যসব নেতার মতো তিনি হামাসের তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসেননি। এমনকি অন্য নেতাদের মতো তার কার্যালয়ে গাজার প্রধানমন্ত্রী ও হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ার কোনো ছবিও নেই। নিজের কাছে পবিত্র কুরআন শরিফ রাখার সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকান ইতিহাসের বইও রাখেন ইসরা।
অন্যান্য হামাস মুখপাত্রদের থেকে ইসরার খানিকটা ভিন্নতা রয়েছে। তিনি ইসরাইলকে অন্য হামাস নেতাদের মতো ‘ইহুদিবাদী’ বলতে নারাজ। তিনি নিজেকে শুধু হামাস অনুগত মনে করেন না। বরং পশ্চিম তীরের প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও সরকারের সঙ্গেও কাজ করতে চান তিনি। এই প্রসঙ্গে ইসরা আল মোদাল্লাল বলেন, ‘আমি হামাস নই, আমি একজন ফিলিস্তিন আন্দোলন কর্মী যে নিজের দেশকে ভালোবাসে।’ ইসরার জন্ম গাজায় হলেও একজন টিনএজার হিসেবে তার বেড়ে ওঠা ব্রিটেনে। ব্র্যাডফোর্ড বিদ্যালয়ের পর তিনি গ্র্যাঞ্জপ্রকৌশল কলেজে লেখাপড়া করেন। উল্লেখ্য, গাজায় বেড়ে ওঠা মোদাল্লালের উঠতি জীবনের ৫ বছর কেটেছে ব্রিটেনে। সে সময় ব্রিটেনের বার্ডফোর্ড হাইস্কুল ও গ্রাঞ্জ টেকনোলজি কলেজে শিক্ষাজীবন অতিবাহিত করেছেন মোদাল্লাল।

বিচার প্রশাসনের নির্বাচনী সাজ

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হিসেবে বিচার প্রশাসনকেও নিরপেক্ষ নির্বাচনী সাজ দেওয়ার দাবি রাখে। গত ২৭ অক্টোবরে সংবিধানের ৯০ দিনের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। মন্ত্রীদের পদত্যাগ দেখি, স্বভাবে পরিবর্তন দেখি না। পুলিশও আগের মতো মারকুটে। জনপ্রশাসনের কোনো নিরপেক্ষতা দেখি না। সংসদ অধিবেশন চলমানরত অবস্থায় মওদুদ আহমদ, এম কে আনোয়ারের জামিন নাকচ হওয়া দেখে ভাবতে বসি, এ থেকে পরিত্রাণ কী। ভাবি, এখানেই তো নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বড় ভূমিকা থাকবে। বর্তমান আইনমন্ত্রী, বিশেষ করে আইন প্রতিমন্ত্রী অধস্তন আদালতের প্রশাসনকে প্রায় পাঁচ বছর বিরাটভাবে প্রভাবিত করেছেন। ২০১১ সালে বাহাত্তরের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদটি জীবিত করা হয়নি। যদি করা হতো, তাহলে বিচারকদের বদলি ও কর্মস্থল নির্ধারণের মালিক-মোক্তার থাকতেন সুপ্রিম কোর্ট। এখন সরকারের হাতে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সর্বদলীয় সরকার অপরিহার্য মনে হলে সর্বদলীয় প্রশাসনও লাগবে। সে থেকে বিচার প্রশাসন বাইরে থাকতে পারে না। সামনে হয়তো আরও চমক ও ধরপাকড় আসবে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও সরে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু তখনো তাঁর রেখে যাওয়া স্থায়ী সরকার পাথরের মতো চেপে থাকবে।
বিচার প্রশাসনে একটি জগদ্দল পাথর আছে। জামিন নাকচ হওয়া দেখে তাই মনে হয়। আদালতের হাত লম্বা। বর্তমানে ইসির হাতও অনেক লম্বা। বিচার প্রশাসনে একটা ব্যাপকভিত্তিক রদবদল হতে হবে। অন্যথায় ইসি দেখতে চাইলে দেখবে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য তাদের নেওয়া পদক্ষেপগুলো সুফল দিচ্ছে না। মওদুদ আহমদ, এম কে আনোয়ার ও রফিকুল ইসলাম মিয়া বিএনপির সামনের সারির নেতা। তাঁদের আটককে যদি রাজনৈতিক কৌশল বলা হয়, তাহলে আদালত তার অংশ হতে পারে না। এমনকি অযথা তেমনটা প্রতীয়মান হলেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিচার বিভাগকে বে-আবরু করার যুক্তিতেও নির্দলীয় সরকার বাতিল হয়েছে। এখন ভিন্নভাবে সেই একই বে-আবরু হওয়ার কাণ্ড চলতে পারে না। রাজনৈতিক নেতাদের হয়রানি সামনের দিনগুলোতে আরও তীব্র হবে। সহিংস হরতাল ডাকার দায়ে কারও বিচার হবে না। সন্দেহভাজন বা তাঁদের নামে হয়তো ধরপাকড় চলবে। বহু লোক জামিনের জন্য দাঁড়াবেন। জামিন চাই, বিচার চাই না। জামিন নিন, বিচার দেব না। এতে রাষ্ট্র প্রশ্নবিদ্ধ হবে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতিমধ্যে তেমনই একটি চরিত্র। আপাতদৃষ্টিতে ভিত্তিহীন ও বানোয়াট অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে কয়েকটি মামলায় জড়ানো হয়েছে। জেলে পাঠানো হয়েছে। তাঁর জামিন নামঞ্জুর করা হয়েছে। তাঁর বিচারের প্রস্তুতি কোথাও নেই। এ-সংক্রান্ত বিষয় প্রধানত নিম্ন আদালতের। সুষ্ঠু নির্বাচনের সঙ্গেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অবিচ্ছেদ্য।
অধস্তন আদালতের স্বাধীনতা অত্যন্ত সীমিত। নির্বাচনে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে। এর কারণ, নির্বাচনকালে অধস্তন আদালতের বিচারকদের সমন্বয়ে প্রাক্-নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের তদন্তে কমিটি হবে। প্রতি জেলায় অন্তত একটি করে। তাতে বিচারকেরাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বাড়াবাড়িও তাঁদেরই রুখে দেওয়ার কথা। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ বলেছে, ইসির দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হবে। প্রায় দুই হাজার বিচারকের নিম্ন আদালত প্রশাসন নিয়ন্ত্রণে একটি ‘দ্বৈত প্রশাসন’ কাজ করে। এর এক প্রান্তে আইন মন্ত্রণালয়, অন্য প্রান্তে সুপ্রিম কোর্ট। আওয়ামী লীগ শাসনামলে অধস্তন আদালত সরকারের একচ্ছত্র ছকে চলেছেন। সেই ছকটি কী রকম? কখন কাকে কোথায় বদলি করা হবে, তার প্রস্তাব করবে আইন মন্ত্রণালয়। আর তা অনুমোদন করবে সুপ্রিম কোর্টের জিএ কমিটি। সংবিধান ও রায় আমাদের শাসকগোষ্ঠী যখন লাগে তখন লাগায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আওয়ামী লীগ ফেলতে চায়নি। কিন্তু তাদের হাত-পা বাঁধা। সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন বলে কথা! একই সুপ্রিম কোর্ট বলেছিলেন, তাঁর সঙ্গে পরামর্শ ছাড়া আইন মন্ত্রণালয়ের বিচার শাখার সচিব নিয়োগ দেওয়া যাবে না। কিন্তু সেটা তাদের মনে ধরেনি। তাই তারা সুপ্রিম কোর্টকে অগ্রাহ্য করেছে। গত বছরের ডিসেম্বরের কথা। সারা দেশ থেকে জেলা ও দায়রা জজরা সুপ্রিম কোর্টে এসেছেন। জেলা জজদের বার্ষিক সম্মেলন। একজন বিচারক সেখানে ‘আইনসচিব’ সম্বোধন করেছিলেন।
প্রধান বিচারপতি তখন যথার্থই উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তিনি তো তাঁর সামনে কোনো আইনসচিবকে দেখেন না। এ নিয়ে আপিল বিভাগের একাধিক রায় আছে। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে ও সাধারণত জ্যেষ্ঠ বিচারককে আইনসচিব করতে হবে। আইনসচিব হলেন ‘বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা’। কারণ, কোনো বিচারক কখন, কোথায় কতক্ষণ থাকবেন, তার প্রস্তাব করবেন আইনসচিব। এটা একটা স্পর্শকাতর কলকাঠি। আইনমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাঁরা সুপ্রিম কোর্টকে আইনসচিব নিয়োগে কিছুই জানাবেন না। শফিক আহমেদ ও কামরুল ইসলাম হাসতে হাসতে মাসদার হোসেন মামলায় দেওয়া সুপ্রিম কোর্টের রায় জবাই করলেন। ওই ভদ্রলোক আগেই উপসচিব (প্রশাসন) ছিলেন। ওই সময় তাঁকে পদোন্নতি দিয়ে ২৪ ঘণ্টার জন্য ঢাকা জজশিপে তাঁর যোগদান দেখানো হলো। এরপর তাঁকে আইনসচিব পদে বসিয়ে যা করা হলো, তার নাম দিয়েছি উদ্বাহু নৃত্য। উপসচিব (প্রশাসন) পদে রেখে আইনসচিব করা ব্যক্তিকেই পরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচার শাখার যুগ্ম সচিব (প্রশাসন) ও অতিরিক্ত সচিবের (প্রশাসন) শূন্য পদে বসানো হয়। এভাবে সরকার সুপ্রিম কোর্টের রায় করাত দিয়ে কেটে অনির্মল বিষাদানন্দ লাভ করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চকে বিব্রত হতে দেখলাম। সেটা এখন বলব। যে দেশে প্রধান বিচারপতির চাহিবামাত্র আস্ত একটা সংবিধান ছাপা হয়ে যায়, সে দেশেই এবং একই সরকারের আমলে আরেকজন প্রধান বিচারপতির উষ্মা অরণ্যে রোদন হিসেবে প্রমাণিত হয়। পুরো একটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ও সরকারের মেয়াদ পার করল কথিতমতে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ পছন্দের ব্যক্তিকে আইনসচিব বহাল রেখে। তাহলে প্রশ্ন, সর্বদলীয় আমলে কি এই পাথরটা সরানো হবে? কয়েক মাস আগে আইনসচিবের পদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট হলো। ভাবলাম, এবার বুঝি একটি হিল্লে হবে। কিন্তু কী দেখলাম। হাইকোর্ট রুল জারির উদ্যোগ নিলেন। অ্যাটর্নি জেনারেল বাধা দিলেন। বারবার সময় নিলেন। কয়েক দফায় প্রায় চার মাস কাটল। শেষতক শুনানি হলো না, রুল জারি হলো না। হাইকোর্টের যে বেঞ্চটি অ্যাটর্নি জেনারেলের চাপাচাপিতে কেবল সময় বাড়াচ্ছিলেন, তাঁরা বিব্রত হলেন। কোনো কারণ দেখানো হলো না। কেউ জানল না। এখন কিন্তু ইসির বোঝার কথা, আইনসচিব পদে সরকার যাঁকে ঠেকনা দিয়ে এতকাল রাখল, তাঁকে সরানো উচিত হবে। হিম্মতওয়ালা বনতে হলে কিছু তো প্রমাণ দিতে হবে। বিচার প্রশাসনের বন্ধ্যত্বের আরও নজির আছে।
রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক প্রেষণভিত্তিক পদগুলোতে বিচারিক কর্মকর্তাদের স্থলাভিষিক্ত হওয়া সব সময় একটি প্রতিযোগিতামূলক বিষয়। রাজধানী ঢাকার পুলিশ বিভাগ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যদি নির্বাচনী পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে ইসিকে ঢাকার বিচার প্রশাসনের দিকেও নজর দিতে হবে। এ-সংক্রান্ত তথ্যাবলি নির্দেশ করে যে আওয়ামী লীগের শাসনামলে সৃষ্টি হওয়া একটি শক্তিশালী কোটারি প্রেষণে থাকা পদগুলোকে খামচে ধরে আছে। সুপ্রিম কোর্টের বিধান হলো, কোনো বিচারক একটি কর্মস্থলে টানা তিন বছরের বেশি থাকবেন না। ইসি যদি দেখতে চায়, তাহলে তারা দেখতে পাবে যে, এখানে একটি নৈরাজ্য বাসা বেঁধে আছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে, বিচার প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, আইন কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেসব বিচারিক কর্মকর্তা ওই নীতি লঙ্ঘন করে আছেন, তার সঙ্গে নির্বাচনের আবার সম্পর্ক কী? এটা না দেখতে চাইলে, না বুঝতে চাইলে কাউকে বোঝানো কঠিন। এর মুখ্য কারণ একটি মুখচেনা গোষ্ঠী তারা নানাভাবে বর্তমান সরকারের শাসনামলে আশীর্বাদপুষ্ট থেকেছে। অনেকে হয়তো অনিচ্ছায় ঠেকায় পড়ে নিজেকে চলতি হাওয়ার পন্থী করেছেন। কিন্তু সামগ্রিক বিচারে ঢাকাভিত্তিক অধস্তন আদালত প্রশাসনে একটি ক্ষমতাসীন দল কিংবা তাদের মদদপুষ্ট কিংবা সুবিধাভোগী অংশ বিনি সুতার জাল বিস্তার করে ফেলেছে।
ব্যতিক্রম বাদে এটাই সাধারণ বাস্তবতা। যেমন একজন অতিরিক্ত দায়রা জজকে দুই বছর পরে মুখ্য বিচারিক হাকিম পদে নিয়ে আসা হলো। তাঁর পাঁচ বছর পার হলো। কিন্তু তাঁর বদলি হচ্ছে না। আইন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা যিনি চট্টগ্রামে গেলেন দু-এক মাসের জন্য। তিনিই মুখ্য বিচারক হিসেবে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে চলেছেন। ওই দুই মাস বাদে ঢাকায় তাঁর চাকরি পাঁচ বছরের বেশি সময় গড়িয়ে গেছে। একইভাবে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন, বিচার প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, আইন কমিশন, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কার্যালয়—প্রায় সর্বত্রই পাঁচ থেকে সাত বছর চাকরি করা লোকদের ভিড় চোখে পড়বে। আবার এমনও নয় যে সুপ্রিম কোর্টের জিএ কমিটি নিজেদের তৈরি করা বিধানের ব্যত্যয়ে বিচলিত। আইন মন্ত্রণালয়কে চিঠি লিখে সরকারকে বিব্রত করার কথা শুনিনি। দীর্ঘদিন জেলা জজের ১১টি পদ শূন্য রয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় প্রায় নয় মাস আগে এই ১১টি শূন্য পদের বিপরীতে ১৭ জন অতিরিক্ত জেলা জজের নাম পাঠিয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। জেলা জজ পদে উন্নীত হয়ে টানা পাঁচ বছর জেলা জজের দায়িত্ব পালন না করলে তিনি সচিব স্কেল পাবেন না। চাকরিতে ২৫ বছর পার করা অনেকে প্রমাদ গুনছেন।
প্রায় পাঁচজন ইতিমধ্যে গভীরভাবে হতাশ। কারণ, তাঁরা এখন জেলা জজ হলেও আর পাঁচ বছরের শর্ত পূরণ করতে পারবেন না। প্রায় পাঁচ লাখ টাকা করে তাঁরা বঞ্চিত হবেন। জিএ কমিটিকে ক্ষতিপূরণ আইনে ফেলার দেশ আমরা এখনো গড়তে পারিনি। ইসি জনপ্রশাসনে হাত দেবেন কি না জানি না। বিচার প্রশাসনে হাত দিলে আরও ভয়। সাবেক কমিশনার ছহুল হোসাইন মহীউদ্দীন খান আলমগীরের মামলায় কথা বলতে গিয়ে আদালত অবমাননায় জড়িয়েছিলেন। প্রথম আলোর অনুষ্ঠানে সাবেক সিইসি বললেন, তিনি ভবিষ্যতে দেখবেন, আপিল বিভাগ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈধতার প্রশ্ন ঠিকই নিষ্পত্তি করেছেন। তিনি ঠিক। তবে সে জন্য হয়তো সরকার বদল দেখতে হবে। এতক্ষণ যা বললাম, তাতে বর্তমান ইসি শক্তি পাবেন, না ভড়কে যাবেন? তাঁরা যা-ই হোন, এটা অনস্বীকার্য যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ছাড়া ইসির স্বাধীনতার প্রশ্নটি অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক ও অপাঙেক্তয় থেকে যাবে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

সংকটে মালদ্বীপ

মালদ্বীপে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফের ভোট বন্ধের নির্দেশের পর দেশটি গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে। রোববার দ্বিতীয় দফার ভোট হওয়ার কথা ছিল। শনিবার প্রথম দফা ভোটে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদের জয়লাভের পর সুপ্রিমকোর্ট ভোট বন্ধের নির্দেশ দেয়। সংবিধান অনুযায়ী ১১ নভেম্বরের মধ্যে দেশটিতে নতুন প্রেসিডেন্টকে শপথ নিতে হবে। এদিকে যথাসময়ে নির্বাচন না হওয়ায় সোমবার পার্লামেন্টের স্পিকার আবদুল্লাহ শহিদ তত্ত্বাবধায়ক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ওয়াহিদকে তার মেয়াদ শেষের বিষয়ে হুশিয়ার করেন এবং এ মেয়াদ বাড়ানো যাবে না বলেও জানান। স্পিকার প্রেসিডেন্ট ওয়াহিদকে জানান, সংবিধান অনুযায়ী তার দেশ শাসনের অধিকার নেই। কারণ ওয়াহিদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। রোববার দ্বিতীয় দফা নির্বাচন সম্পন্ন হলে একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতেন। কিন্তু আমেরিকাসহ আর্ন্তজাতিক বিশ্বের চাপ সত্ত্বেও সুপ্রিমকোর্ট বিতর্কিত এ নির্দেশ জারি করে। ওয়াহিদকে লেখা চিঠিতে স্পিকার আরও জানান, প্রেসিডেন্টের মেয়াদ বাড়ানোর কোনো বিধান নেই। প্রথম দফা ভোটে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ প্রায় ৪৭ শতাংশ ভোট পান। বর্তমানে ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে তিনি সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। নাশিদ আদালত ও ওয়াহিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, তার ক্ষমতায় আসায় বাধা দিতেই ভোট বন্ধের নির্দেশ জারি করা হয়েছে। একসময়ের রাজনৈতিক বন্দি ও পরিবেশকর্মী মোহাম্মদ নাশিদ ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত বহুদলীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন।
এর মধ্য দিয়ে মামুন আবদুল গাইয়ুমের ৩০ বছরের কঠোর শাসনের অবসান ঘটে। কিন্তু বিচার বিভাগসহ নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে মতভেদের কারণে ২০১২ সালের ফেব্র“য়ারিতে নাশিদ পদত্যাগে বাধ্য হন। একে তিনি ‘অভ্যুত্থান’ বলে বর্ণনা করেন। এরপর চলতি বছর ৭ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কোনো প্রার্থীই সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় ২৮ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফা ভোট গ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু ভোটার তালিকা ত্র“টিপূর্ণ থাকার অভিযোগে ২৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিমকোর্ট দ্বিতীয় দফা অনুষ্ঠেয় নির্বাচন বন্ধ ও প্রথম দফার ভোট বাতিল করে। ফলে নতুন করে ১৯ অক্টোবর নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। কিন্তু সংশোধিত ভোটার তালিকা অনুমোদনে অস্বীকৃতি জানান নির্বাচনে অপর দুই প্রার্থী আবদুল্লাহ ইয়ামেন ও কাশিম ইব্রাহিম। ফলে সে উদ্যোগও ব্যর্থ হয়। এরপর সর্বশেষ ৯ নভেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এদিকে তত্ত্বাবধায়ক প্রেসিডেন্ট ওয়াহিদ রোববার রাতে পদত্যাগ না করার অঙ্গীকার করেন। সুপ্রিমকোর্টের হস্তক্ষেপের নিন্দাপ্রকাশ যুক্তরাষ্ট্রের : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোমবার মালদ্বীপের সুপ্রিমকোর্টের ফের নির্বাচন স্থগিত করার নিন্দা জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে দেশটি জানায়, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সুপ্রিমকোর্টের বারবার অন্যায্য হস্তক্ষেপ দেশটির গণতন্ত্রকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। জনগণের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়ার পাঁয়তারা চালাচ্ছে। এদিকে, শ্রীলংকা এক বিবৃতিতে সুপ্রিমকোর্টের এমন সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দাজ্ঞাপন করেছে। এএফপি।

টেলিভিশনে শিষ্টাশিষ্ট ও বিশিষ্ট কথন

বৃক্ষ তোমার নাম কী, ফলেই পরিচয়। অর্থাৎ আমগাছে আমই ধরে, জাম না। আর জামগাছে জামই ধরে, জামরুল নয়। কিন্তু টিভি নামক বিবিধ নামের বৃক্ষকুলের ফুল ও ফল দেখে কোনটা কোন টিভি, সেটা চেনা খুবই কষ্টকর। আমাদের দেশে চ্যানেলের সংখ্যা যতই বাড়ছে, আশঙ্কাজনকভাবে ততই কমছে চ্যানেলের মান। আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোয় ইদানীং বিভিন্ন রিয়েলিটি শোর চেয়েও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে টক শো। এর মধ্যে কিছু কিছু টক শো বেশ বিনোদনমূলকও বটে। রাজনৈতিক কিংবা বিভিন্ন জাতীয় ইস্যু বা সমস্যা নিয়ে আলাপ-আলোচনার অনুষ্ঠানকে এখন আর তেমনভাবে ‘আলোচনা অনুষ্ঠান’ বলা হয় না, বলা হয় ‘টক শো’। স্যাটেলাইট টেলিভিশন আসার পর এই ‘টক শো’ শব্দটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এটি ইতিবাচক দিক। একসময় দেশে একটি মাত্র টেলিভিশন ছিল, অর্থাৎ বিটিভি। এ প্রচারযন্ত্রটি সব সময়ই থাকে সরকারনিয়ন্ত্রিত। সেদিক থেকে সব দল ও মতের ব্যক্তিদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট টেলিভিশন এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। যে যা বলতে চাইছেন, যে যা ভাবছেন, যে যেই আদর্শে বিশ্বাসী, যে যেই দল করেন—সবাই সবার কথা মন খুলে এসব টক শোয় বলতে পারেন। যাঁর যা খুশি মন-প্রাণ খুলে,
এমনকি হাত-পা ছুড়েও বলা যায়। অনেক সময় দেখা যায়, দুই পক্ষের ঝগড়া চলছে, অথচ অনুষ্ঠানের সময় শেষ। তখন সঞ্চালক বাধ্য হয়ে ওই অবস্থাতেই অনুষ্ঠান শেষ করছেন। স্বাধীন মত প্রকাশে হস্তক্ষেপ করাটা যেমন সমর্থনযোগ্য নয়, তেমনি কথা বলার স্বাধীনতা পেয়ে যে যা ইচ্ছা তা-ই বলবেন (প্রচার-অযোগ্য), সেটাও কাম্য নয়। একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি যদি অন্যজনকে চোর, ডাকাত, দুর্নীতিবাজ ও মিথ্যুক বলে গালি দেন, তাহলে আগামী প্রজন্ম এ থেকে কী শিক্ষা নেবে? আবার সিভিল সোসাইটির কেউ কেউ যখন একজন আরেকজনকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন, তখন সিভিল আর আনসিভিল অর্থাৎ শিষ্ট ও অশিষ্টর পার্থক্য নির্ণয় করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। টেলিভিশনের টক শোগুলোয় যাঁদের দেখা যায়, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশ আলোচকেরই রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে তাঁরা কে কী বলবেন, তা দর্শকমাত্রই জানেন এবং বোঝেন। মুখে আমরা যতই নিরপেক্ষ বা বস্তুনিষ্ঠ বলে দাবি করি না কেন, কিছু কিছু টক শোয় আলোচক নির্বাচন, সঞ্চালকের প্রশ্ন ও আচরণ দেখলেই তাঁদের পক্ষপাতমূলক আচরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিছু কিছু টক শোয় দেখা যায়, দুজন আলোচক এক পক্ষের, আরেকজন থাকেন অন্য পক্ষের। আর সঞ্চালকও থাকেন ওই দুজনের পক্ষে। ফলে টক শো চলাকালে ভিন্নমতের একজনের ওপর ত্রিমুখী আক্রমণ লক্ষ করা যায়।
যে কারণে টক শোগুলোয় অনেক সময় অনেক বক্তাকে সঞ্চালকের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি এত কথা বলছেন কেন? আপনি তো সঞ্চালক। আমাকে কথা বলতে দিন কিংবা বলতে না দিলে ডেকেছেন কেন?’ ইত্যাদি। টিভি চ্যানেলের মতো আজকাল কিছু পত্রিকার কলাম লেখকদের নাম ও শিরোনাম দেখলেই বোঝা যায়, তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস কী এবং উপসংহারে তিনি কী বলবেন। সবচেয়ে বড় কথা, দর্শক ও পাঠকেরা সবই বোঝেন; কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, ‘সবাই যে বোঝেন, সেটা এঁরা বোঝেন না।’ দর্শকেরা চ্যানেলের কাছ থেকে দল নয়, দেশের কল্যাণ ও শান্তির স্বার্থে নিরপেক্ষ এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ভূমিকা আশা করেন। ফুটবল খেলায় যিনি মোহামেডান সমর্থন করেন, তাঁকে যেমন কখনো আবাহনীকে সমর্থন করানো যাবে না। আবার ক্রিকেটে যিনি যে দল সমর্থন করেন, তিনি কখনোই অন্য দলকে সমর্থন করেন না। ভারত বা পাকিস্তান ক্রিকেট দলের সমর্থকদের বেলায় এ কথা বেশি প্রযোজ্য। তেমনি বাংলাদেশে যে যেই দল কিংবা পার্টি সমর্থন করুন না কেন, কোনো যুক্তি দিয়েই তাঁকে অন্য দল সমর্থন করানো যাবে না।
এসব সমর্থকের সবাই নিজ নিজ দলীয় আদর্শে বিশ্বাসী। তবে রাজনৈতিক বিশেষ সুবিধা কিংবা অর্থনৈতিক সুবিধা লাভের শর্তে কিছু ব্যক্তির দলীয় বিশ্বাস ও সমর্থনের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটে। যে কারণে দল বদল কিংবা দল ত্যাগ হয়। সম্প্রতি একটি টক শোয় একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা তাঁর আলোচনার একপর্যায়ে বলেই ফেললেন, তিনি যা বলছেন, তা কারও পছন্দ হোক বা না হোক, তাঁর কিছু করার নেই। কারণ, তাঁকে দলীয় অবস্থান থেকেই কথা বলতে হবে। অর্থাৎ তাঁর ব্যক্তিগত চিন্তা-চেতনা বা মতামত বলে কিছু নেই। টক শোয় মাঝেমধ্যে কিছু কিছু ব্যক্তি আসেন, যাঁদের কোনো দল নেই, তেমনি দলীয় বলও নেই; কিন্তু দেশের প্রতি আছে ভালোবাসা, আছে মমত্ববোধ, আছে সৎ সাহস। তাই নির্ভয়ে সত্য কথা বলতে পারেন। তাঁদের কথা শুনতে ভালো লাগে। মানুষ আশার আলো দেখতে পায়। কিছুদিন আগে এক টিভি দর্শক একটি চ্যানেলের লাইভ অনুষ্ঠানে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আচ্ছা ভাই, আপনারা মিডিয়ায় এই দুই দলের লোকদের না ডেকে দেশের উন্নতি-অগ্রগতির লক্ষ্যে বিভিন্ন সেক্টরের বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের ডেকে আলোচনা করাতে পারেন না?
তাতে দেশের মানুষ উপকৃত হবে।’ আপনারা মিডিয়ায় এসব আলাপ কমিয়ে দিয়ে দেশের বিভিন্ন সম্ভাবনা, সমস্যা ও এর সমাধান নিয়ে আলোচনা করেন। তাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অনেক মেধাবী মানুষ টেলিফোনের মাধ্যমে সরাসরি অনেক পরামর্শ দিতে পারেন। তখন দেশে একটি জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা শুরু হবে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু শব্দ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যেমন সংঘাত, সংঘর্ষ, সাংঘর্ষিক, রণপ্রস্তুতি, রণক্ষেত্র, অনিশ্চয়তা, ধরপাকড়, তল্লাশি, হুমকি, বোমা বিস্ফোরণ, ফোনালাপ, সংবিধান ইত্যাদি। আরও কথা প্রায়ই শোনা যায়—ব্যাপক প্রস্তুতি, জিরো টলারেন্স। ব্যাপক প্রস্তুতি কথাটি ব্যবহূত হয় কর্মসূচি পালন কিংবা সমাবেশ আয়োজনের ক্ষেত্রে। আর জিরো টলারেন্সের বিষয়টি তো সবার জানা। আবার তাঁরাই বলছেন, জনগণের জন্যই তাঁরা সব বলছেন, সব করছেন। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে বাড়ছে জনদুর্ভোগ। এসব শব্দের পরিবর্তে সম্ভাবনা, অগ্রগতি, উন্নয়ন ও দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হওয়ার মতো কথা বেশি শুনতে পেলে ভালো লাগত। অবশ্য কে কোন উদ্দেশ্যে কী লিখলেন কিংবা টক শোয় কে কী উদ্দেশ্য নিয়ে কী বললেন, তা নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষ ততটা চিন্তিত নন। কারণ, গ্রামগঞ্জের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ সারা দিনের কর্মক্লান্তির পর সন্ধ্যার পরেই ঘুমিয়ে পড়েন। আজকাল তো শহরের অনেকেই আছেন, যারা সূর্য যে পূর্বদিকে ওঠে, সেটাই দেখেন না। কারণ, সারা রাত জেগে তাদের অনেকেই ঘুমাতে যান শেষ রাতে, ওঠে দুপুরের পরে। তাদের অনেকেই শীতের সকালের শিশিরসিক্ত ঘাস দেখেননি, দেখেননি পুকুরের মাছ।
তারা ঘাসে হাঁটে না, হাঁটে ঘরের মেঝেতে বিছানো কার্পেটে। সুতরাং সাধারণ পা-ফাটা মানুষের সঙ্গে তাদের চিন্তা-চেতনার বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমরা যে যা-ই বলি না কেন, যত যুক্তি-তর্কই উপস্থাপন করি না কেন—সাধারণ মানুষ দেখে, কখন তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হবে, কখন সে শান্তিতে ঘুমাতে পারবে, সস্তায় চাল-ডাল কিনে পরিবারের সবার জন্য দু’মুঠো খাবারের ব্যবস্থা করতে পারবে। আজকাল বিভিন্ন টক শোয় দেখা যায়, সংবিধানের নানা অনুচ্ছেদসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত একেকজন একেকভাবে দিচ্ছেন, বিশ্লেষণ করছেন। এ ক্ষেত্রে পত্রিকার মতো টেলিভিশনেও ভুল তথ্য প্রচারের জন্য সংশোধনী প্রচার করা উচিত। প্রয়োজনে দুঃখ প্রকাশ কিংবা ক্ষমা চাওয়ার বিধান থাকা উচিত। অন্যথায়, যখন যাঁর যা খুশি, তা-ই বলতে থাকবেন। তাই বলে বেসরকারি খাতে প্রতিষ্ঠিত টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রণ করাটাও যৌক্তিক নয়। এ জন্য একটি স্বচ্ছ নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। এর বাইরেও প্রতিটি চ্যানেলের নীতি-নির্ধারকদেরও তাঁদের টেলিভিশনে কী প্রচারযোগ্য আর কী প্রচার-অযোগ্য, সেটা কঠোরভাবে নিজেদেরই নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। আমরা বাড়ির ড্রয়িং রুমে বসে কিংবা অফিসে বসে যে ধরনের আলোচনা বা ঝগড়া-বিবাদ করি, সেটা টেলিভিশনে করাটা শোভন নয়। যেহেতু টেলিভিশন দেখে অনেকেই প্রভাবিত হন, আবার অনুপ্রাণিতও হন। তাই টেলিভিশনে প্রদর্শিত এ ধরনের আচরণ কারও কাছে উদাহরণ হোক, সেটা কাম্য নয়।
হানিফ সংকেত: গণমাধ্যম-ব্যক্তিত্ব
hanifsanket@gmail.com

অপরিকল্পিত নগরায়ণের দায়

সমাজে ঘটে চলছে একের পর এক দুর্ঘটনা। প্রতিটি সেকেন্ডে দেশের কোথাও না কোথাও চলছে কোনো না কোনো ছোট-বড় অপরাধ। খবরের কাগজ খুললেই খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই থেকে শুরু করে চোখের সামনে ধরা দেয় হাজার রকমের অপরাধের চিত্র। এসব অপরাধ আমাদের ঠেলে দিচ্ছে বড় কোনো সহিংসতার দিকে। ব্রিটিশ ক্রাইম সার্ভের (বিসিএস) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর পৃথিবীতে প্রায় ১০ দশমিক ৭ মিলিয়ন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এর পেছনে অনেক কারণ থাকলেও একটি কারণকে কখনো আলোচনার সামনে সঠিকভাবে আনা হচ্ছে না, সেটি হচ্ছে নগরের অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, সঠিক নকশা প্রণয়ন ও সমন্বয়ের অভাব। সাধারণ পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায়, অন্ধকারাচ্ছন্ন ও জনসমাগম কম—অপ্রশস্ত রাস্তা—যার সঙ্গে প্রধান কোনো সড়কের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে, এমন জায়গাগুলোতে ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধের প্রবণতা বেশি থাকে। যখন নগরের কোথাও একটি সুউচ্চ স্থাপনা তৈরি করা হয়, তখন স্থাপনার পেছনে-পাশে বিদ্যমান খালি জায়গার সঠিক নকশা ও সমন্বয়ের অভাবে তৈরি হতে পারে ‘নেগেটিভ স্পেস’, যা ভবিষ্যতে বিভিন্ন শ্রেণীর বয়সের মানুষের জন্য সামাজিক অপরাধ সংঘটনের নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়।
আমরা যখন কোনো বাড়ির নকশা প্রণয়ন করি, তখন সাধারণত বাড়ির সামনে অনেক অংশজুড়ে খোলা সবুজ জায়গা রেখে দিই। সেখানে অনেক ক্ষেত্রেই সুউচ্চ অধিক ডালপালাযুক্ত নানা গাছ রোপণ করা হয়। পরে সুরক্ষার জন্য ৭ থেকে ১০ ফুট উচ্চতার সীমানাপ্রাচীর তৈরি করা হয়। এ কারণে স্থাপনাটির সামনের ফুটপাতটি স্থাপনাটিতে বসবাসকারীরা দেখতে পারে না, তাই এ ধরনের ফুটপাতে যেকোনো ধরনের অপরাধ নিমেষেই যে কেউ করে নির্দ্বিধায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এ ছাড়া ফুটপাতের পাশের ডাস্টবিনগুলোর বেশির ভাগই থাকে অপরিষ্কার এবং স্বভাবতই সেখানে জনসমাগম কম থাকে। তাই সন্ধ্যার পর অনেক ক্ষেত্রেই সেই স্থানটি হয়ে ওঠে অনিরাপদ। সংঘটিত হয় সামাজিক অপরাধ। প্রয়োজনের তুলনায় যদিও আমাদের সবুজ অরণ্যের পরিমাণ অনেক কম, তথাপি এই সবুজকে বুঝে-শুনে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারলে এটিই হতে পারে বিপদের কারণ। আজ থেকে ছয়-সাত বছর আগে আমাদের শহরের পার্কগুলোতে (ধানমন্ডি পার্ক) বসার জায়গাগুলোর ওপরের অংশে সিমেন্টের তৈরি রংবেরঙের ছাতা তৈরি করা হয়েছিল। নির্মাণগত ত্রুটি কিংবা ব্যবস্থাপনার অভাবে সেই ছাতাগুলো মাটিতে ভেঙে পড়লে,
সন্ধ্যার পরপরই সেই ছাতার ভাঙা ছাউনির অংশের নিচে চলত অপরাধমূলক কার্যকলাপ। বর্তমানে ফ্ল্যাটনির্ভর যান্ত্রিক জীবনে এককেন্দ্রিকতা এমনভাবে জায়গা বিস্তার করেছে যে একই ভবনের পাশাপাশি দুটি ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠছে না। এতে করে অপরাধের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এ কারণেই প্রায়ই দেখা যায়, পাশের ফ্ল্যাটে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেও নকশা প্রণয়নে ত্রুটির জন্য কেউ জানতেই পারছে না যে দেয়ালের ওপাশে কী ঘটছে? সামাজিক গতিময়তার কথা চিন্তা না করে শুধু শহরকেন্দ্রিক আবাসন সমস্যার সমাধান কিংবা সৌন্দর্যবর্ধনের কথা চিন্তা করলে সেখানে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার প্রবণতা বাড়বে, এটাই বাস্তবতা। যার কারণে, বিশেষ করে আমাদের যুবসমাজ খুব সহজেই যেকোনো অপরাধে লিপ্ত হতে পারে। সামাজিক গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ফুটপাত, রাস্তা থেকে শুরু করে এমনকি পার্কের রাস্তায়ও নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর সামাজিক গতিশীলতা বাড়ায় এমন কোনো পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। যেমন, ছোট ছোট কফিশপ, গিফট কর্নার, বুক কর্নার ইত্যাদি। যে ছোট্ট শিশুটি ইট-পাথরের জঞ্জালে ভরা ঘরের বদ্ধ চার দেয়ালের মাঝে বেড়ে উঠছে, সবুজ বড় খেলার মাঠের অভাবে আমাদের সমাজে যাকে আজ আমরা সৃষ্টিশীল কোনো স্থানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারছি না বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে, সেই ছেলেটিই একদিন খুঁজে নেবে বাড়ির পাশের কোনো অপরিকল্পিত অন্ধকার জায়গা, পরিত্যক্ত ছাদ কিংবা বাড়ির অনাদরে ফেলে রাখা ঝোপ-জঙ্গলে ভরা পেছনের অংশ, অরক্ষিত নদীর পাড় কিংবা পাশাপাশি দুটি ভবনের মধ্যবর্তী অপ্রশস্ত পরিকল্পনাহীন ফাঁকা স্থান,
যেখানে দিনের বেলায়ও সূর্যের আলো পৌঁছায় না। বিশ্ববিখ্যাত স্থপতি অস্কার নিউম্যান ‘ডিফেন্সিবল স্থান’কে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন যেকোনো ধরনের হাউজিং প্রকল্পের ক্ষেত্রে। তাঁর মতে, বাসস্টপ, যাত্রীছাউনি, খোলা জায়গা, বসার বেঞ্চ, খেলার মাঠ, নগরের জলাভূমিসহ প্রতিটি অংশে অপরাধ সংঘটনের মাত্রা অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায় শুধু পরিকল্পিত নকশা প্রণয়ন ও চলমান ধ্যান-ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে। নগরের পরিকল্পনা এমনভাবে করতে হবে, যেখানে বসবাসরত প্রত্যেকটি মানুষ তার চারপাশের সবকিছুকেই নিজেদের বলে ভাবতে শেখে, যার ফলে পরস্পরের মধ্যে একটি শক্তিশালী কমিউনিটি বন্ডিং বিদ্যমান থাকবে। আমাদের সমাজের প্রতিটি উপাদানের সঙ্গে অন্য উপাদানগুলো কোনো না কোনোভাবে জড়িত। যদিও সামাজিক অপরাধ শুধু কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না। তথাপি একটি সুষ্ঠু পরিকল্পিত নগর এনে দিতে পারে সৌহার্দ্যপূর্ণ সামাজিক সম্পর্ক, যার অভাব এখন আমরা প্রতিদিনই উপলব্ধি করছি। কারণ, সামাজিক অপরাধের প্রবণতা কমাতে পারলে অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক বিকাশে দেশ লাভ করবে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, আর এর জন্য চাই সমাজের সর্বস্তরের সচেতনতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। সজল চৌধুরী: সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।
মাহফুজ ফারুক: পরিবেশ ও স্থাপত্যবিষয়ক সাংবাদিক।

সময়ের অ্যালবাম থেকে কয়েকটি ছবি

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি গঠিত হয়েছে সম্প্রতি। কমিটির ঘোষণা এসেছে কেন্দ্র থেকে। স্থানীয় নেতাদের প্রতি কতটা অনাস্থা ও অবিশ্বাস-সন্দেহের জন্ম হলে কেন্দ্র থেকে কমিটি ঘোষিত হয়, তা সহজে অনুমেয়। ধারণা করা হয়েছিল, কেন্দ্র থেকে কমিটি ঘোষণা করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে সবার কাছে, যথাযথ মূল্যায়ন হবে ত্যাগী ও যোগ্য ছাত্র-কর্মীদের। কিন্তু এই প্রক্রিয়াও যে শেষ পর্যন্ত সবাইকে খুশি করতে পারেনি, তার প্রমাণ কমিটি ঘোষণার পর ছাত্রলীগের একাংশের প্রতিক্রিয়া। এই ক্ষুব্ধ অংশটি কমিটি ঘোষণার পর প্রতিবাদ জানিয়ে মিছিল করেছে, সমাবেশ করেছে। এটি তারা করতেই পারে। কিন্তু যেকোনো ক্ষোভ-দুঃখ-অপ্রাপ্তি-বঞ্চনার দায় সাধারণ নগরবাসীকে কেন বহন করতে হবে, এ প্রশ্নের কোনো জবাব মেলে না। ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণার পর পদবঞ্চিত ছাত্রনেতা ও তাঁদের সমর্থকেরা অর্ধশতাধিক গাড়ি ভাঙচুর করেছেন, ভীতি-আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন নগরজুড়ে। বিএনপিসহ ১৮ দলের ৬০ ঘণ্টার সহিংস হরতালে অবরুদ্ধ থাকার পর নগরবাসী যেদিন প্রথম পথে বেরিয়েছিল অফিস-আদালত-স্কুল-কলেজের নিয়মিত কাজে যোগ দিতে, এমনকি বাজার-সওদা করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার আয়োজন করতে, সেদিনই হঠাৎ তাদের ওপর নেমে এল এই ‘খাঁড়ার ঘা’। একদিকে চলেছে গাড়ি ভাঙচুরের মহোৎসব, অন্যদিকে স্কুলগামী শিশুটিকে নিয়ে মায়ের আতঙ্কিত ছোটাছুটি, হাসপাতালগামী রোগীর চিকিৎসার বিষয়টি স্থগিত রেখে আপাতত নিকটে দাঁড়ানো সাক্ষাৎ মৃত্যু থেকে নিজেকে রক্ষা করার অসহায় প্রয়াস। হরতাল ডেকে মানুষের জানমালের ক্ষতি সাধন করার জন্য বিরোধী দলকে অবিরাম সমালোচনা করে যাচ্ছেন সরকারি দলের নেতা-নেত্রীরা। কিন্তু নিজেদের দলের ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরাই যখন এ রকম ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত, সে বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য কী, তা খুব জানতে ইচ্ছে করে।
কারণ, এক পক্ষকাল অতিক্রান্ত হলেও এ নিয়ে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরে থাক, এর জন্য নিন্দা প্রকাশ করতেও দেখা যায়নি সরকারি দলের কোনো নেতা-নেত্রীর। পদবঞ্চিত ছাত্রলীগের কর্মী-সমর্থকদের দাবি, উৎকোচের বিনিময়ে অযোগ্য ব্যক্তিদের কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। এই দাবিকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না এই কারণে যে এর আগে কেন্দ্র থেকে ঘোষিত যুবলীগের কমিটিতে এমন দু-একজন যুবকের নামও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, চট্টগ্রাম শহরে যাঁদের পরিচিতি সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ হিসেবে। কিন্তু পদবঞ্চিত হলেই নিরীহ পথচারীর ওপর, কিছু যানবাহনের ওপর হামলা চালিয়ে সেই ক্ষোভ প্রকাশ করতে হবে—এমন অদ্ভুত আচরণ কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। কিছুদিন আগে একই ঘটনা ঘটিয়েছেন ছাত্রদলের কর্মীরা। একইভাবে স্থানীয় বিএনপির দ্বিধাবিভক্ত নেতাদের ওপর আস্থাহীনতার কারণে কেন্দ্র থেকে কমিটি ঘোষিত হয়েছিল ছাত্রদলের। সেখানেও পদবঞ্চিতরা নিজেদের কার্যালয়ে আগুন দিয়ে ও গাড়ি ভাঙচুর করে ভীতি-আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন নগরজুড়ে। হরতাল ঘোষণা হলে তা ‘সফল’ করতে আগের দিন গাড়ি ভাঙচুর হবে, অগ্নিসংযোগ হবে—এসব এখন স্বাভাবিক নিয়মে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষ হয়তো নিয়তি বলেই মেনে নিয়েছে এটাকে। নতুন উপসর্গ হিসেবে যুক্ত হয়েছে কমিটি ঘোষণা। হরতাল ঘোষণা করা হলে সাধারণ মানুষ নিজেদের মতো করে সতর্কতা অবলম্বন করে। কিন্তু দলের কমিটি ঘোষণা করা হলে সেই প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগও থাকে না তাদের হাতে। অতএব, আমরা কি এখন দাবি করতে পারি, ছাত্রলীগ বা ছাত্রদলের কমিটি গঠনের দিন-তারিখও জানিয়ে দিতে হবে আগেভাগে, যাতে পদবঞ্চিতদের হামলা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সতর্কতা অবলম্বনের সময়-সুযোগ থাকে? সরকারি ও বিরোধী দলের রাজপথের কর্মীদের মধ্যে একটি অলিখিত সমঝোতা আছে বলে মনে হয়।
রাজপথে তাণ্ডব চালানোর ব্যাপারে উভয়েরই সমান আগ্রহ ও অধিকার। ‘তুমি ভাঙো, আমিও ভাঙি’। ‘তাল’ আছে ‘হর’ নেই হরতালের দিনগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই বিএনপির কাজীর দেউড়ির কার্যালয়ের সামনে সভা-সমাবেশ হয়ে থাকে। বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল এসে জড়ো হয় এখানকার দলীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তায়। পুলিশ এই রাস্তার দুদিক থেকে চলাচল বন্ধ করে বিএনপির সভা-সমাবেশ নির্বিঘ্ন করার ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। সভা-সমাবেশ শেষে মিছিল নিয়ে অল্প কিছু দূর ঘুরে আসেন নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা। এতেও সামনে-পেছনে পুলিশের উপস্থিতি থাকে, যাতে আওয়ামী লীগ বা তাদের অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে কোনো ধরনের সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা না ঘটে। কিন্তু পুলিশ দুই দলের সংঘর্ষ ঠেকাতে পারে বটে, অন্তঃকোন্দল ঠেকাতে পারে না। কিছুদিন ধরে দেখা যাচ্ছে, বিএনপির কার্যালয়ের সামনে সভা-সমাবেশে নিজেদের মধ্যে নিয়মিত হাতাহাতি-মারামারির ঘটনা ঘটছে। নগর বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সমর্থকেরা পরস্পরের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন ছোটখাটো বাদ-বিসংবাদের সূত্রে। এমনও দেখা গেছে, ছাত্রদলের একাংশের মিছিল দলীয় কার্যালয়ের দিকে আসতে দেখে অপর অংশের নেতা-কর্মীরা ছোটাছুটি, হুড়োহুড়ি শুরু করেছেন। তাতে ভীতি-আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়। সর্বশেষ ৬ নভেম্বর ছাত্রদল-যুবদলের দুই গ্রুপের মধ্যে এ রকম হাতাহাতির একপর্যায়ে যুবদলের এক নেতা প্রকাশ্যে পিস্তল বের করে তাক করেছেন প্রতিপক্ষের উদ্দেশে। অস্ত্রসহ সেই নেতার ছবিও ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। তবে সবচেয়ে হাস্যকর ঘটনাটি ঘটেছে ৩ নভেম্বর হরতালের সমর্থনে নগর বিএনপির মিছিলটিতে।
মিছিলের অগ্রভাগে থাকার জন্য হাতাহাতি-ধাক্কাধাক্কির একপর্যায়ে দেখা যায়, মিছিলের সামনে থাকা ব্যানারটি ছিঁড়ে দুই টুকরা হয়ে গেছে। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মীর মোহাম্মদ নাছির, শাহাদাত হোসেন, গোলাম আকবর খোন্দকার প্রমুখ নেতার হাতে থাকা ব্যানারের ছেঁড়া অংশটিতে লেখা ছিল ‘তাল সফল করুন’। ‘হর’ লেখা অপর অংশটি তখন অন্য গ্রুপের হাতে। ভয়ংকর খেলনা! সুরমা ও লাল মিয়াকে কোনো দিন খেলনা কিনে দিতে পারেননি তাদের মা-বাবা। তাই রাস্তায় কখনো বিত্তবান পরিবারের শিশুদের পরিত্যক্ত খেলনা কুড়িয়ে পেলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় তারা। ৫ নভেম্বরও নগরের ঝাউতলা এলাকায় সে রকম একটি খেলার ‘বল’ খুঁজে পেয়ে সুরমা (৯) খুশিতে ডগমগ হয়ে চিৎকার করে মাকে ডেকে বলছিল, ‘মা বল পাইছি, বল পাইছি...।’ কিন্তু সেই আনন্দ স্থায়ী হয়নি তার। মুহূর্তের মধ্যে বলসদৃশ বস্তুটি বিস্ফোরিত হয়ে মায়ের চোখের সামনেই ঝলসে গেছে সুরমার শরীর। লাল মিয়া (১০) নামের কিশোরটিও সুরমার দিকে ছুটে এসেছিল দুর্লভ খেলনা পাওয়ার আনন্দ ভাগ করে নিতে। সুরমার মা মনোয়ারা বেগমের আহাজারিতে ভারী হয়ে আছে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রাঙ্গণ। লাল মিয়ার অচেতন দেহ কোলে তুলে নিয়ে নিথর দাঁড়িয়ে ছিলেন তার বাবা। অভিব্যক্তিহীন চেহারা। কার কাছে বিচার চাইবেন তিনি? ব্যতিক্রমী কোনো ঘটনা তো নয় এটি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিতই ঘটছে। কখনো বা এই শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে এ ধরনের ককটেল। ২০০ টাকার বিনিময়ে এগুলো ছুড়ে মারার দায়িত্বও দেওয়া হচ্ছে তাদের হাতে। হায় শৈশব! বহুকাল আগে কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’ শিশুর জন্য কতটা বাসযোগ্য হলো বাংলাদেশ?
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com