Thursday, September 1, 2016

যে কারণে ব্রা পড়তে চান না সানি লিওন

বলিউডে নায়িকাদের পোশাক নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বিতর্কের শুরু বিকিনি নিয়ে। এই পোশাকটি বলিউডে অনেক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে হয়তো পরিচালকের চাপে কিংবা নতুন চলচ্চিত্র জগতে পা দিয়ে ‘স্টার’ তকমা পাওয়ার লোভে খোলামেলা হয়েছেন। এই তাদেরই অনেকে আবার নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে এক সময় বলেছেন, না, আর বিকিনি পরবেন না।
প্রসঙ্গটি এ কারণেই বলা যে, সম্প্রতি এমন একজনের মুখে এ ধরনের কথা শোনা গেছে যিনি খোলামেলার জন্যই বিখ্যাত। সিনেমার শ্যুটিংয়ের প্রয়োজনে তিনি কতবার যে বিকিনি পরেছেন নিজেও জানেন না। একবার তো সিনেমার কাজ শেষে পরিচালকের প্রতি প্রতিশোধ নিতে তিনি নিজেই পরিচালককে নকল বিকিনি পোশাক উপহার দিয়ে খবরের শিরোনাম হয়েছেন।
পাঠক এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন তিনি কে? হ্যাঁ, সানি লিওনের কথাই বলঅ হচ্ছে। সানি লিওন এবার বলিউডে অন্য ধরনের চরিত্রে অভিনয় করার কথা ভাবছেন। পর্নস্টার থেকে বলিউড স্টারের তকমা আদায় করে নেওয়া সানি লিওন বলছেন, ‘মস্তিজাদের পর আমি আরও দুটো সিনেমা করছি। কিন্তু এরপর আমি অন্যরকম চরিত্রে অভিনয় করার কথা ভাবব।
সাংবাদিকরা এ সময় তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, তার কাছ থেকে দর্শকরা আগামী দিনে ঠিক কী প্রত্যাশা করতে পারে? সানি লিওন বলেছেন, ‘অন্তত এটা বলতে পারি- সানি লিওন সব সময় বিকিনি পরে ঘোরে না। এর বাইরেও আমায় অন্য অনেক ভূমিকায় দেখা যাবে।’ এ উত্তর শোনার পর প্রশ্ন উঠেছে তাহলে কি সানি লিওনের বিকিনিতে অরুচি ধরে গেল!

শান্তির পথে মিয়ানমার

মিয়ানমারের শাস্তি সম্মেলনে বুধবার বিদ্রোহী
নেতাদের সঙ্গে অং সান সুচি -এএফপি
মিয়ানমারে দশকের পর দশক ধরে চলা গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সুচি। বিদ্রোহী বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্র“পের সঙ্গে ঐতিহাসিক শান্তি সম্মেলনে তিনি এ আহ্বান জানান। একুশ শতকের পাংলং শান্তি সম্মেলন নামের এ ঐতিহাসিক আলোচনাকে শান্তি প্রতিষ্ঠার অনন্য সুযোগ হিসেবে অভিহিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। চার দিনব্যাপী এ সম্মেলন বুধবার রাজধানী নেইপিদোতে শুরু হয়েছে। সম্মেলনে সরকার, পার্লমেন্ট, সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধি, বিভিন্ন দলের আমন্ত্রিত রাজনীতিবিদ, সশস্ত্র ও অসশস্ত্র জাতি নিয়ে গঠিত বিভিন্ন সংগঠন এবং সুশীল সমাজের নাগরিকসহ প্রায় ১৬০০ প্রতিনিধি যোগ দিয়েছেন। সম্মেলনের লক্ষ্য সংলাপের মাধ্যমে জাতিগত সবাইকে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ এবং গণতান্ত্রিক ফেডারেল ইউনিয়ন গঠন করা। খবর এএফপি, বিবিসি ও মিয়ানমার টাইমসের। শান্তি সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন, মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচি, সেনাপ্রধান মিন ওয়াং হিয়াং। এতে প্রেসিডেন্ট উ টিন কিয়াও এবং দুই ভাইস প্রেসিডেন্ট উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া এতে জাতিগত ১৭টি সশস্ত্র সংগঠনও অংশ নেয়।
সম্মেলনে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি এবং মিয়ানমারে থাকা বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে সুচি বলেন, এটা আমাদের সবার জন্য অনন্য সুযোগ, যা আমাদের ইতিহাসের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। আসুন এই অপূর্ব সুযোগটিকে প্রজ্ঞা, সাহস ও উদ্যমের সঙ্গে ব্যবহার করি এবং আলোকিত ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করি।’ তিনি বলেন, ‘যতদিন পর্যন্ত না আমরা জাতীয় সংহতি ও ঐক্য নিশ্চিত করতে পারছি, ততদিন আমরা টেকসই স্থায়ী ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করতে পারব না। আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হলেই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।’ সুচি আরও বলেন, ঐতিহাসিক এ শান্তি আলোচনায় বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে সমান মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার ব্যাপারে তিনি অঙ্গীকারবদ্ধ। এর আগে মঙ্গলবার জাতিসংঘের মহাসচিব এ শান্তি আলোচনা উপলক্ষে মিয়ানমারে পৌঁছেছেন। ওইদিন সুচির সঙ্গে বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে বান মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এ সময় তিনি রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধানের জন্য সুচির সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। মিয়ানমারের প্রায় ৬ কোটি জনগোষ্ঠীর ৪০ শতাংশই উপজাতি গোষ্ঠীর। ১৯৬২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মিয়ানমারের ক্ষমতা দখল করে সামরিক বাহিনী।
তবে তারও আগে, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের অধীনতা ছিন্ন করে স্বাধীনতা লাভের সময় থেকেই দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠী। গত কয়েক দশক ধরে গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সহিংসতায় কয়েক হাজার লোক নিহত হয়েছে। গত নভেম্বরে মিয়ানমারের ঐতিহাসিক নির্বাচনে দেশটির গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সুচির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) বিপুল ব্যবধানে জয় লাভ করে। এরপর বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসার কথা জানান সুচি, যিনি কার্যত দেশটির প্রকৃত নেতা। এর আগে গত অক্টোবরে ক্ষমতাসীন সামরিক সরকারের সঙ্গে দেশটির আটটি সশস্ত্র গোষ্ঠী একটি চুক্তিতে সম্মত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় এবারের শান্তি আলোচনায় বিদ্রোহীরা অংশ নিয়েছে। নির্বাচনে জয়লাভের কয়েক মাসের মধ্যেই অধিকাংশ বিদ্রোহী গ্রুপকে আলোচনার টেবিলে ফেরানো সুচির সফলতা বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

দক্ষিণ চীন সাগরে নৌ অধিকার রক্ষায় মিত্রদের পাশে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র

নয়াদিল্লিতে জন কেরি
দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর সেখানে নৌ চলাচলের স্বাধীনতার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছে। দুই দিনের ভারত সফরের শেষ দিনে গতকাল বুধবার রাজধানী নয়াদিল্লিতে এ কথা বলেন জন কেরি। কেরি তাঁর বক্তৃতায় সাগর নিয়ে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের সাম্প্রতিক রায় মেনে নেওয়ার জন্য চীন ও ফিলিপাইনের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের কোনো সামরিক সমাধান নেই।’ কেরি বলেন, আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওই সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অধিকার নেই। তবে তাঁর দেশ চলাচলের অধিকারের বিষয়ে পক্ষে অবস্থান নেবে। নৌ চলাচল এবং আইনের শাসনের উল্লেখ করে কেরি বলেন, ‘আমি একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই। তা হলো, আমরা আমাদের অধিকার সমুন্নত রাখব। এর পাশাপাশি আমাদের বন্ধু দেশগুলোর অধিকারের বিষয়েও তাদের পাশে থাকব।’ কেরি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্য দেশগুলো নৌ চলাচলের স্বাধীনতা, সমুদ্র-সংক্রান্ত প্রথা ও রীতিনীতির বিষয়ে শ্রদ্ধাশীল। চীন দক্ষিণ চীন সাগরের প্রায় পুরো অংশকেই নিজের বলে দাবি করে। তবে পাল্টা দাবি আছে ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও তাইওয়ানের। গত কয়েক মাসে চীন সাগরের ছোট ছোট দ্বীপে একটি ছোট বিমানবন্দরসহ বেশ কিছু স্থাপনা তৈরি করেছে। তবে গত মাসে ফিলিপাইনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ অনুমোদিত একটি ট্রাইব্যুনাল রায় দেয়,
দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চীনের দাবির কোনো আইনি ভিত্তি নেই। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, দক্ষিণ চীনের দাবি করা দ্বীপগুলোতে তারা নৌ নজরদারি অব্যাহত রাখবে। নৌ চলাচলের স্বাধীনতার বিষয়টি সমুন্নত রাখতেই এ তৎপরতা অব্যাহত রাখবে তারা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এ তৎপরতার জন্য বড্ড নাখোশ চীন। জন কেরি বলেন, ‘আমরা বারবার চীন ও ফিলিপাইনকে দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে আদালতের রায় মেনে চলার জন্য আহ্বান জানিয়েছি।’ আগামী রোববার থেকে চীনে জি-২০ নেতাদের বৈঠক শুরু হচ্ছে। ওই বৈঠকে সমুদ্রসীমা নিয়ে তপ্ত আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হয়। এর আগেই কেরি দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে এ মন্তব্যগুলো করলেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, নিজ ভূখণ্ডে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অন্য দেশকেও শামিল করা উচিত পাকিস্তানের। নিউইয়র্কে আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যে অনুষ্ঠেয় আলোচনার কারণে নিজেকে ‘বিচ্ছিন্ন’ ভাবার কোনো কারণ নেই ইসলামাবাদের। এদিকে গত মঙ্গলবার ভারত-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় কৌশলগত ও বাণিজ্য সংলাপে (এস অ্যান্ড সিডি) ‘পাকিস্তান থেকে সৃষ্ট’ সন্ত্রাসবাদ এবং অন্যান্য কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও বাণিজ্যিক স্বার্থ নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সহযোগিতা বাড়ানো এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বিষয়ে ঐকমত্য হয়। বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে দুই দেশের আরও অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন।

রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিন: বান কি মুন

বান কি মুন
রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। মিয়ানমার সফরে এসে গত মঙ্গলবার দেশটির অঘোষিত প্রধান অং সান সু চির সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানান মুন। মিয়ানমারের ১০ লাখের বেশি মুসলিম সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর অনেকেরই নাগরিকত্ব নেই। তাদের ভোটাধিকার এবং চাকরির অধিকারও নেই। মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে বান কি মুন বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি কেবল তাদের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন নয়। এই মানুষগুলো অনেক প্রজন্ম ধরে এ দেশে বাস করছে।
দেশের অন্য নাগরিকেরা নাগরিকত্ব বা যে আইনি স্বীকৃতি পায় তাদেরও তা পাওয়ার অধিকার আছে।’ ২০১২ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় এক লাখ ২০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। এদের অনেকেরই ঠিকানা এখন আশ্রয় শিবির। কয়েক হাজার রোহিঙ্গা উন্নত জীবনের আশায় সাগর পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। সাগর পথে অনেকেই ডুবে মারা গেছে বা মানব পাচারকারীদের হাতে পড়েছে।

আকস্মিক সফরে মেক্সিকোয় ট্রাম্প

আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকানদলীয় প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প আকস্মিকভাবে মেক্সিকো সফর করেছেন। স্থানীয় সময় বুধবার মেক্সিকোতে দেশটির প্রেসিডেন্ট পিনা নিয়েতোর সঙ্গে তার বৈঠক করার কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া সামলানোর বিষয়ে একটি প্রস্তাব দেয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে নিয়েতোর সঙ্গে ট্রাম্পের এ বৈঠক সবাইকে আগ্রহী করে তুলেছে। খবর বিবিসি ও রয়টার্সের। মঙ্গলবার এক টুইট বার্তায় ট্রাম্প নিজেই তার মেক্সিকোযাত্রার কথা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে তিনি সেখানে যাচ্ছেন। টুইটার বার্তায় বলা হয়, ‘আমি মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছি এবং তার সঙ্গে আগামীকালের বৈঠক নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।’ ট্রাম্প ও পিনা নিয়েতোর বৈঠকের বিষয়টি মেক্সিকান সরকারও বুধবার নিশ্চিত করেছে। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট পিনা নিয়েতোও এক টুইটে বলেন, ‘মেক্সিকোর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আমি সবসময়ই আলোচনায় আগ্রহী; আরও বিশেষ করে যেখানে মেক্সিকানদের রক্ষা করার বিষয় থাকে।’ নিয়েতোর দফতর জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীকেই আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মেক্সিকানদের ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘ধর্ষক’ হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে মার্কিন নাগরিকদের চাকরি না পাওয়ার পেছনেও মেক্সিকান অভিবাসীদের দায়ী করেছেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের ভাষ্য, সস্তা শ্রমের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো মেক্সিকোর নাগরিকদের বেশি সুযোগ দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তুলে দেয়ার ইচ্ছার কথাও বারবার বলেছেন এ আবাসন ব্যবসায়ী। তাৎক্ষণিকভাবে এর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন পিনা নিয়েতো। তিনি বলছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প জিতে গেলে যুক্তরাষ্ট্র যদি এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা হাতেও নেয়, সেখানে মেক্সিকো অর্থ ব্যয় করবে না। প্রত্যুত্তরে ট্রাম্প বলেছিলেন, প্রয়োজনে অভিবাসী মেক্সিকানদের রেমিটেন্স আটকে দেয়াল নির্মাণের ব্যয় আদায় করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রে বিপুলসংখ্যক মেক্সিকান অভিবাসী রয়েছে। এদের পাঠানো রেমিটেন্সের ওপর দরিদ্র মেক্সিকানরা অনেকাংশে নির্ভর করে। সেজন্য ট্রাম্পের বক্তব্য দেশটির জনগণকে শঙ্কিত করে তুলেছে। ধনকুবের এই ব্যবসায়ীর এসব বক্তব্যের প্রতিবাদে মেক্সিকোতে বিক্ষোভ হয়েছে; খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উৎসব ইস্টার সানডেতে ট্রাম্পের মৃত্যু কামনা করে পোড়ানো হয়েছে কুশপুত্তলিকা। জনমত জরিপে ডেমোক্রেটদলীয় প্রার্থী হিলারির চেয়ে বেশ খানিকটা পিছিয়ে আছেন ট্রাম্প।
এ জন্য অভিবাসী, মুসলমান ও মেক্সিকানদের নিয়ে তার ‘তির্যক মন্তব্য’কে দায়ী করা হচ্ছে। অনেকে অবশ্য ট্রাম্পের এ ধরনের বক্তব্যকে ‘প্রচার পাওয়ার কৌশল’ হিসেবেও অ্যাখ্যা দিয়েছেন। রিপাবলিকান প্রাইমারিতে জয় পেলেন ম্যাককেইন : নভেম্বরের কংগ্রেসে নির্বাচনের জন্য দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করেছেন বর্ষীয়ান রিপাবলিকান সিনেটর জন ম্যাককেইন। এএফপি জানায়, আগামী নভেম্বরে পুনরায় সিনেট সদস্য পদে নির্বাচনের জন্য রিপাবলিকানদের সমর্থন পেয়েছেন আরিজোনা রাজ্যের ৮০ বছর বয়সী এ সিনেটর। এর আগে ৬ বছর মেয়াদের এ পদে টানা ৫ বার নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ২০০৮ সালে বারাক ওবামার বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে হেরে যান ভিয়েতনাম যুদ্ধের এই বীর। তবে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ট ট্রাম্প তাকে সমর্থন করবেন না বলে হুমকি দেন। কিন্তু চাপের মুখে ম্যাককেইনকে সমর্থন দিতে বাধ্য হন তিনি। প্রেসিডেন্ট ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদে কংগ্রেসের দখল নিয়েছে রিপাবলিকানরা। এবারও তা ধরে রাখার জন্য লড়ছে তারা।

দুদককে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে

ঘটনাটি খুব আগের নয়। গত বছরের জানুয়ারির। জেনারেল বুদি গুনাওয়ান ইন্দোনেশিয়ার পুলিশপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। নিয়োগের দশ দিন না পেরোতেই ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতে মাঠে নেমে পড়েন তিনি। দেশটির দুর্নীতি দমন সংস্থা কেপিকের কমিশনার বামবাং উইদান্তোকে গ্রেফতার অভিযানে নামে তার বাহিনী। কারণ এর বছরখানেক আগে কেপিকে গুনাওয়ানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনেছিল। তদন্ত করতে গিয়ে তার ব্যাংক হিসেবে ৪৩ লাখ ডলারের খোঁজ পায় কেপিকে। এ টাকা ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমেই গুনাওয়ান অর্জন করেছে, তদন্তে এর প্রমাণও হাজির করে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি। অথচ রাষ্ট্রপতি উইদাদো এমন একজনকেই পুলিশপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন, যিনি শুধু দুর্নীতিগ্রস্তই নন, দায়িত্ব পেয়েই নিজের ক্ষোভ মেটাতে খড়গহস্ত হয়ে ওঠেন কেপিকের বিরুদ্ধে। বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি ইন্দোনেশিয়ার সাধারণ মানুষ। চুপ না থেকে ‘সেভ কেপিকে’ স্লোগানের বিরুদ্ধে নেমে পড়েন আন্দোলনে। শেষ পর্যন্ত সরকার জনতার আন্দোলনের চাপে পুলিশপ্রধান হিসেবে গুনাওয়ানের নিয়োগ বাতিল করতে বাধ্য হয়। এর মাধ্যমে কেপিকের প্রধান আব্রাহাম সামাদ ও সদস্য বামবাং উইদান্তোর মর্যাদা ফিরিয়ে দিতেও বাধ্য হন রাষ্ট্রপতি য়োকো উইদাদো।
দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা কেপিকের ওপর ইন্দোনেশিয়ার জনগণের এত আস্থার কারণ কী? কেনইবা তারা কেপিকে’কে বাঁচাতে এভাবে মাঠে নেমে পড়েন। এ ক্ষেত্রে কিছু তথ্যের দ্বারস্থ হলেই হয়তো বিষয়টি খোলাসা হবে। ২০০৪ থেকে ২০০৯- এই পাঁচ বছরে যাদের দুর্নীতির ঘটনা তদন্ত, বিচার ও অভিযোগ প্রমাণ করেছে সংস্থাটি, তাদের মধ্যে ছিলেন অনেক রথী-মহারথী, প্রভাবশালী ব্যক্তি। তারা কারা? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জেনে হয়তো পিলে চমকাবে? এর মধ্যে ছিলেন সেদেশের ‘৪৫ সংসদ সদস্য, আট মন্ত্রী, আট প্রাদেশিক গভর্নর, একজন গভর্নর, অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের তিন প্রসিকিউটর, তিন রাষ্ট্রদূত, চার কাউন্সিল জেনারেল এবং একজন পুলিশপ্রধান।’ এজন্যই বলা হয়ে থাকে, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও দমনে এশিয়ার শক্তিশালী সংস্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম ইন্দোনেশিয়ার কেপিকে। এর বিপরীতে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন সংস্থা দুদকের অবস্থান কী? দুদকের ক্ষেত্রে সরকারি এমন কোনো চাপ এলে কি জনতা ঢাল হবে? টিআইবির সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, শতকরা মাত্র ৯.১ ভাগ মানুষ মনে করে দুদক ভালো কাজ করছে। বাকি ৮২.৯ ভাগ মানুষের আস্থা নেই প্রতিষ্ঠানটির ওপর। তারা মনে করে, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা বিবেচনা করে দুদক ব্যবস্থা নেয়।
গত মার্চে কমিশন পুনর্গঠনের আগে প্রভাবশালীদের দায়মুক্তি দেয়ার হিড়িক পড়েছিল। অভিযোগ উঠেছিল, এর মাধ্যমে শুধু রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক আনুগত্য নয়, কর্তাব্যক্তিদের কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবেও লাভবান হয়েছেন। এ কারণে সে সময় দুদককে অনেকেই দায়মুক্তি কমিশন বলতেও ছাড়েননি। আস্থার চরম সংকটের মাঝেই সাবেক আমলা ইকবাল মাহমুদের নিয়োগ চেয়ারম্যান হিসেবে। দায়িত্ব নিয়েই তিনি জনতার দিল জিততে চান- এমন অঙ্গীকার করেছেন। শুরু করেছেন দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার অভিযান। এখানেই থেমে থাকেননি। দুর্নীতি দমনের পাশাপাশি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রতিরোধ কার্যক্রমের ওপর। তাই প্রথমবারের মতো দুদকের ৫ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। গণমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শুদ্ধাচার কৌশলপত্র বাস্তবায়নে নিয়োগপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, সুশীলসমাজ, এনজিও ও দাতাসংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাদাভাবে ছয়টি মতবিনিময় সভা করেছেন দুদকের নতুন চেয়ারম্যান। এতে দুর্নীতি প্রতিরোধে নানা পরামর্শ ও সুপারিশ বেরিয়ে এসেছে। এসব মতবিনিময়ে প্রধানত দুর্নীতি প্রতিরোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক ও আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারলে আস্থার সংকট থেকেই যাবে। এছাড়া বিভিন্ন সময় দুদককে কার্যকর করতে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ওয়ার্কিং গ্র“পের কর্মশালায় ৭৭টি পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছিল। এতেও গুরুত্ব পেয়েছিল রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়টি।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দুদকের খসড়া কর্মপরিকল্পনায় কতটা স্থান পেয়েছে দুর্নীতি প্রতিরোধে ‘রাজনীতিকদের’ কাজে লাগানোর বিষয়টি? পরিকল্পনায় রাজনীতিকদের যুক্ত করে দুর্নীতি প্রতিরোধ কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি অনুপস্থিত। শুধু তাই নয়, কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে আলাদা কোনো মতবিনিময়ও করেনি দুদক। বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের প্রথম ডেপুটি চেয়ারম্যান ও উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নুরুল ইসলাম দুর্নীতি প্রতিরোধের অন্যতম চলক মনে করেন ‘রাজনীতিকদের’। ‘দুর্নীতি, দুর্নীতির নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবর্তনের চালকরা : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থে তিনি বলছেন, ‘দুর্নীতির ওপর কার্যকর আক্রমণ দরকার।’ এজন্য ‘দুর্নীতি দমনের প্রতি দায়বদ্ধ একদল রাজনৈতিক নেতা’ তৈরি করতে হবে। তার মতে, ‘একজন নেতা সমমনা সমর্থক বা সহকর্মীদের নিয়ে সাহসে বলীয়ান হয়ে রাজনৈতিক দৃশ্যপটে আবির্ভূত হবেন এবং পরিবর্তনের দাবি তুলবেন। দুর্নীতির নিয়ন্ত্রণ এবং একটি উন্নত শাসনব্যবস্থার জন্য পারিপার্শ্বিক অবস্থাই নেতা তৈরি করতে পারে অথবা নিজের রূপকল্প বাস্তবায়নে নেতারা দৃশ্যপটে হাজির হয়ে পারিপার্শ্বিকতা তৈরি করতে পারেন।’ এরকম রাজনীতিকদের প্রয়োজনীয়তা কেন? ড. নুরুল ইসলাম বলছেন, যদি সামনের দিকের রাজনৈতিক নেতারা দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ঐক্যবদ্ধ না হন অথবা নিজেরাই দুর্নীতিগ্রস্ত হন, তবে নিচের সারির নেতারা দুর্নীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন। যখন নেতারা/নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব দুর্নীতির প্রতি নির্লিপ্ত থাকেন অথবা নিজেরা দুর্নীতিতে অংশ নেন তখন সব ক্ষেত্রেই দুর্নীতি লাগামহীন হয়।’
সৎ রাজনীতিকরাই ভারতের গুজরাট রাজ্যের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছেন। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালও এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারেন। দুর্নীতিবিরোধী নাগরিক গোষ্ঠীর আন্দোলনের নেতা থেকে আম আদমি পার্টি গঠন এবং পরবর্তী সময়ে রাজনীতিক হিসেবে দিল্লির মসনদে বসে তিনি কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে অন্যতম ‘চলক’ হিসেবেই কাজ করছেন। গত অক্টোবরে ঘুষের অভিযোগে নিজের মন্ত্রিসভার খাদ্য ও পরিবেশমন্ত্রী অসীম আহমেদ খানকে বরখাস্ত করতে কোনো কার্পণ্য করেননি। এ সিদ্ধান্ত দেয়ার পর দৃঢ়ভাবেই বলেছিলেন, ‘আমার সন্তানও যদি এমন কাজ করে, তবে আমি ছাড়ব না।’ বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী এমন রাজনীতিক কি বিরল? একেবারেই না, অধস্তনরা ঘুষ নিয়েছেন কিন্তু নিজ উদ্যোগে তা ফেরত দিয়েছেন এমন এমপি, মন্ত্রী, চেয়ারম্যান ও মেয়র কিন্তু এ দেশে আছেন। দুদককে তাদের খুঁজে বের করে দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজে লাগাতে হবে। কর্মপরিকল্পনায় বিষয়টি যোগ করতে হবে।
এত গেল দুর্নীতিবিরোধী রাজনীতিকদের কাজে লাগানোর আলোচনা। কিন্তু যারা দুর্নীতির সহায়ক, আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত, তাদের ক্ষেত্রে দুদকের অবস্থান কী হবে? আইনে-বিধানে এ ক্ষেত্রে দুদক স্বাধীন হলেও কাজেকর্মে সংস্থাটির অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ। গত মার্চে শুরু হওয়া গ্রেফতার অভিযানের ৬ মাসে ২৬৮ জনের মতো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কেউ ব্যাংকার, কেউ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। কিন্তু তাদের মধ্যে দুর্নীতিগ্রস্ত জনপ্রতিনিধি বা রাজনীতিক বলতে গেলে নেই। আলোচিতদের মধ্যেও কেউ নেই। তাহলে কি বলা যায়, রাজনীতির মানুষরা দুর্নীতি করেন না? যদিও এ সময়েই কয়েকজন এমপির বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে দুদকের অবস্থান ধরি মাছ না ছুঁই পানি। অন্যদিকে যেসব দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছেন, তাদের অনেকেই গোঁফে তা দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বিশেষ করে বেসিক ব্যাংক দুর্নীতির ক্ষেত্রে যাকে মূল হোতা বলা হচ্ছে তিনি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাই শুধু কর্মপরিকল্পনা নয়, এসব ক্ষেত্রে সাহসী হতে হবে দুদককে। আবার সরকারি ও বিরোধী মতের রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে দুদকের দ্বিমুখী অবস্থানও খোলাসা করতে হবে। ইন্দোনেশিয়ার দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা কেপিকের মতো জনতার মন জয় করতে হলে দল-মত নির্বিশেষে রাজনীতিক-আমলাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে প্রতিষ্ঠানটিকে।
দুদকের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আয়োজিত ছয়টি মতবিনিময় সভায় সুপারিশ করা হয়েছে, রাজনীতিক-আমলাদের সম্পত্তির বিবরণী জমা এবং তা মনিটরিং ও যাচাই-বাছাইয়ের। অবশ্য এ ক্ষেত্রে দুদক তার অবস্থান স্পষ্ট করেনি। সংস্থাটির চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘সম্পত্তির হিসাব খতিয়ে দেখা বিশাল বিষয়। এটা কারা মনিটর করবে, কীভাবে করবে, দুদক এককভাবে সিদ্ধান্ত নেবে না।’ প্রাথমিক তথ্য ও তদন্তের ভিত্তিতে দুদক আইনের ২৬ ধারা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি নিজে যে কোনো ব্যক্তির সম্পত্তির বিবরণী খতিয়ে দেখতে পারে। আবার দুদক যদি মনে করে এর জন্য আলাদা একটি স্বাধীন তদারকি কমিশন গঠন করা উচিত কিংবা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে পারে, তা নির্ধারণ করাও জরুরি। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের বক্তব্য এ ক্ষেত্রে সোজাসাপ্টা। তার মতে, ‘দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষের নাম প্রকাশ করে তাকে লজ্জায় ফেলার সম্ভাবনা থাকলে দুর্নীতির আশংকা কমে।’ এ ক্ষেত্রে অ্যাডাম স্মিথকে কোট করেছেন তিনি, ‘প্রশংসাযোগ্য হওয়াই আমাদের নৈতিক লক্ষ্য হওয়া উচিত। মানুষকে সত্যিই প্রশংসা করলে সে উৎসাহিত হয়, ঠিক যেমন নিন্দা তাকে প্রতিহত করে।’
‘দুর্নীতিবাজদের অবশ্যই বিব্রত হতে হবে, লজ্জায় পড়তে হবে’- এমন কথা খোদ দুদক চেয়ারম্যানও বলেছেন। এ ক্ষেত্রে কথা ও কাজের মিল থাকলেই কেবল দুর্নীতি দমনে দুদকের স্বপ্নের বাস্তবায়ন হবে। তখন সরকারি সেবা পেতে বা ব্যবসায় কাউকে ঘুষ দিতে হবে না। স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক সুবিধা ঘুষ ছাড়াই ভোগ করতে পারবে সাধারণ মানুষ। তবে এ স্বপ্নের বাস্তবায়ন একদিনে হবে না। উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলামের মতে, এ ক্ষেত্রে কাজ হবে ‘স্নোবল ইফেক্টে’র মতো। প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী নুড়ি আকারের ছোট ছোট বরফখণ্ড ঢালু পাহাড় বেয়ে গড়িয়ে পড়তে পড়তে বিশালাকার ধারণ করে। একইভাবে দুর্নীতিবিরোধী ছোট ছোট কর্মকাণ্ডের যোগফল মোড় ঘুরিয়ে বড় ফল এনে দিতে পারে। এভাবে ৫৩টি দেশে ২০০টি প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়নের উদাহরণ রয়েছে। এটি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে আংশিকভাবে হলেও দুর্নীতি প্রতিরোধে সফলতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
আলমগীর স্বপন : সাংবাদিক
almswapn45@gmail.com

বিনিয়োগ উন্নয়ন আইন আজ কার্যকর হচ্ছে

দেশের বহুল আলোচিত বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আইন আজ থেকে কার্যকর হচ্ছে। এই আইনের আওতায় একত্রিত হবে প্রাইভেটাইজেশন কমিশন ও বিনিয়োগ বোর্ড। এই দুই সংস্থা মিলে নাম দেয়া হয়েছে (বিডা)। দুটি লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে এই আইন করেছে সরকার। প্রথমত, বেসরকারি খাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ উৎসাহিত করা; দ্বিতীয়ত, সরকারি খাতে শিল্প-কারখানার জন্য অব্যবহৃত ভূমির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আইনটির কার্যকর বাস্তবায়ন দরকার। জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে দেশে মূল সমস্যা বিনিয়োগ সংকট। গত অর্থবছরে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। টানা কয়েক বছর পর্যন্ত এই হার ২২ শতাংশের মধ্যেই আটকে রয়েছে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে এই বৃত্ত ভাঙতে হবে। তিনি বলেন, প্রাইভেটাইজেশন কমিশন এবং বিনিয়োগ একত্রিত হওয়ায় বিনিয়োগের খরা কাটবে এই নিশ্চয়তা নেই। তবে আইন করার পর বিনিয়োগ বাড়াতে আইনটির কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। জানা গেছে, ২৫ জুলাই কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী সংসদে বিডা বিল-২০১৬ উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে তা পাস হয়। এরপর ১ আগস্ট রাষ্ট্রপতি বিলে স্বাক্ষর করলে তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।
নতুন আইনের বিধান অনুযায়ী, বিনিয়োগ বোর্ড এবং প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের অধীনে সব কর্মকর্তা-কর্মচারী বিডায় অন্তর্ভুক্ত হবেন। আর দুটি সংস্থার সব সম্পত্তি ও দায় বিডার মালিকানায় অর্পিত হবে। আইনটি কার্যকর হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে চেয়ারম্যান ও অর্থমন্ত্রীকে ভাইস চেয়ারম্যান করে বিডার ১৭ সদস্যবিশিষ্ট গভর্নিং বোর্ড গঠন করা হবে। বাণিজ্য, শিল্প, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের মতো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা এ বোর্ডের সদস্য হবেন। তাছাড়া শিগগিরই সরকার একজন নির্বাহী চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে নির্বাহী কমিটির ছয়জন সদস্য নিয়োগ দেবে। এছাড়া কোনো অনুমোদিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান এই আইন ভঙ্গ করলে ওই প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বাতিল হবে বলে আইনে উল্লেখ করা হয়েছে। আইনের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কিত ধারায় বলা হয়েছে- বিনিয়োগ বোর্ড এবং বেসরকারিকরণ কমিশন উভয়ই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ দুটি প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করা প্রশাসনিকভাবে সুবিধাজনক ও সাশ্রয়ী। বিনিয়োগ উন্নয়ন পরিবেশ সৃষ্টি ও সরকারি মালিকানাধীন অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের ভূমির অধিকতর দক্ষ ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে লক্ষ্যে সামগ্রিক বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সূত্র জানায়, দুই প্রতিষ্ঠান একত্রিত করতে ২০১৪ সালের মার্চে কেবিনেট সচিবকে চিঠি দেন প্রধানমন্ত্রী।
এরপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মঈন উদ্দীনকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির সুপারিশের আলোকে আইনটি তৈরি করা হয়। ৩৬টি ধারা বিশিষ্ট আইনের কিছু ধারার উপধারা রয়েছে। আইনে দেশী-বিদেশী উদ্যোক্তাদের সরাসরি বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়ায় শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করতে পারবেন। কোম্পানির নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং অন্যান্য কার্যক্রম সহজী করতে কর্তৃপক্ষকে অধিকতর ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন এবং সংস্কারের কার্যক্রমের জন্য কর্তৃপক্ষকে আরও শক্তিশালীকরণের প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি করণের ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণ আরও সহজ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বেসরকারি খাতে দ্রুত শিল্পায়নে দেশী-বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা এবং আন্তঃমন্ত্রণালয়ে ওয়ান স্টপ সার্ভিস কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। আইনে বেসরকারি শিল্প স্থাপনে এলাকা এবং খাতভিত্তিক তফসিল এবং বিশেষ সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জমি ইজারা এবং শেয়ার হস্তান্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে।
নিবন্ধিত কোম্পানির উন্নতি-অবনতি পর্যালোচনা করে পরামর্শের দেয়ার ক্ষমতা থাকছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের উপযোগিতা এবং প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে গবেষণার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। এ ব্যাপারে জনগণকে সচেতন করার বিধান রয়েছে। বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ কিন্তু সরকারি কোনো কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত নয়, এমন ব্যক্তিকেও কমিটিতে সম্পৃক্ত করে বিনোয়োগের পরিবেশ উন্নয়নের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে কর্তৃপক্ষে। জানা গেছে, বেসরকারি বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিনিয়োগ বোর্ড কাজ করছে। বিনিয়োগ বোর্ডের বিরুদ্ধে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতাসহ অনেক অভিযোগ রয়েছে উদ্যোক্তাদের। ফলে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আসছে না। অন্যদিকে অলাভজনক ও লোকসানি সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি মালিকানায় হস্তান্তরের মাধ্যমে সরকারি ব্যয় কমানোর জন্য ১৯৯৩ সালে প্রাইভেটাইজেশন কমিশন গঠন করা হয়।

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি আইএসপন্থী!

সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) প্রতিষ্ঠাতা। ট্রাম্পের ভাষায়- তারা উভয়ই অসৎ ও নির্বোধ। কিন্তু ট্রাম্পের এমন বিদ্রূপাত্মক অভিযোগ এটাই স্পষ্ট করে যে, যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কেউ আইএসকে সাহায্য করে থাকেন, তাহলে তিনি একমাত্র ট্রাম্প। রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাওয়া ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতিসংক্রান্ত এক ভাষণে আইএস বধে একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা প্রকাশ পেয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অকার্যকর আরও যেসব মন্তব্য করেছেন তিনি, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আগে মুসলিম দেশের অভিবাসীদের তাদের মতাদর্শগত পরীক্ষা দিতে হবে, মুসলিম অভিবাসীদের তার ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিনেই বের করে দেয়া হবে ইত্যাদি। ট্রাম্পের দাবি, তিনি একজন বাস্তববাদী এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য নিজেকে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন। ট্রাম্পের মূল ‘বাস্তবসম্মত’ পদ্ধতি হল, সিরিয়ায় ওবামা প্রশাসনের চেয়ে বেশি সামরিক বাহিনীর প্রয়োগ। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, তার এ প্রক্রিয়া আইএসকে ধুলায় ধূসরিত করবে। বস্তুতপক্ষে, এ ধরনের একটি সামরিক হস্তক্ষেপ জ্বলন্ত আগুনের ওপর গ্যাসোলিন ঢেলে দেয়ার শামিল।
অবশ্যই এটা বোঝার ক্ষমতা নেই ট্রাম্পের। যদিও তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, মার্কিন জেনারেলদের চেয়ে আইএস সম্পর্কে বেশিই জানেন ট্রাম্প। বর্তমান জটিল গতিবিদ্যার প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতা, সাম্প্রদায়িকতার দাবানল এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে প্রসারিত মধ্যপ্রাচ্যের প্রক্সি যুদ্ধের ব্যাপারে নিতান্তই অন্যমনস্ক ট্রাম্প। এমনকি হিলারি ও ওবামাকে নিয়ে এমন মন্তব্য করায় এ ধারণাটি স্পষ্ট যে, আইএস কোথা থেকে বা কেমন করে উত্থান হয়েছে- এ ব্যাপারে সম্যক জ্ঞানও ট্রাম্পের নেই। সত্য হল, ‘ইসলামের ভেতরেই সংঘাতে’র কারণে আইএসের জন্ম, ইসলাম ও পশ্চিমার মধ্যে দ্বন্দ্বে নয়। এটা বলারও অপেক্ষা রাখে না, পশ্চিমা- বিশেষ করে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি আইএসের উত্থানে প্রধান ভূমিকা রাখেনি। ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ইরাক আক্রমণ দেশটির সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে দিয়েছে, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতি করেছে, এমনকি একটি সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে দেশটিকে। এর ফলেই জঙ্গিগোষ্ঠী উত্থানের সুযোগ পেয়েছে। প্রথমে ইরাকে আল কায়দা, এখন আইএস এবং পরে ইরাকের সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে আল কায়দার সীমানা বিস্তৃত হয়েছে। ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের শিয়া সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে জনরোষের কারণে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে সিরিয়ায়ও। আরব বসন্তে অনুপ্রাণিত হয়ে অধিক স্বাধীনতা ও সুন্নি শাসিত সরকার প্রতিষ্ঠার অনিশ্চিত প্রত্যাশায় তিউনিসিয়া, মিসর, সিরিয়ার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে; কিন্তু আসাদ সরকার ইরানের অকৃত্রিম সমর্থনে শক্তিশালী বিদ্রোহী সেনাদের সঙ্গে সংঘাত চলমান রাখে। সিরিয়া জড়িয়ে পড়ে গৃহযুদ্ধে, এতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয় এবং সাম্প্রদায়িক বিভক্তি আরও বেড়ে যায়। সুন্নিপন্থী জঙ্গিরা স্থানীয় এলাকার বেপরোয়া ও রগচটা যুবকদের নিয়োগ দিয়ে সংঘাতের সম্প্রসারণ আরও ত্বরান্বিত করেছে।
এই শিয়া-সুন্নি বিভাজনের কারণে আইএসের নিয়োগদাতা এবং নেতারা ইসলামের রক্ষাকর্তা হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। এমনকি ইসলামের মতাদর্শ ও ধর্মীয় শত্রু, বিশেষ করে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মৌলবাদী ইসলাম ও পশ্চিমাদের মধ্যে একটি স্নায়ুযুদ্ধ-শৈলী মতাদর্শগত সংগ্রামের নিরিখে সৃষ্ট, এ জন্য শুধু ‘বাইনারি’ আখ্যান দ্বারা এ জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না ট্রাম্প। বরং তিনি বারবার এটাই উচ্চারণ করে যাবেন যে, আইএস নিয়োগকর্তারা বিভিন্ন হামলাকে সমর্থন করছে। সত্য হল, সাধারণ মুসলমানরা যারা মনেপ্রাণে আইএসের ধ্বংসাত্মক মতাদর্শকে প্রত্যাখ্যান করেন, তারা ইসলামোফোবিয়াকে উসকে দেয়া ট্রাম্পের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্যের নিন্দা জানাচ্ছেন। কিন্তু আইএসের স্বনিয়োগকৃত আমীর আবুবকর আল বাগদাদী ও তার সহযোগীদের কানে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় বাজানো সুর পৌঁছেছে। এটা খুবই খারাপ হচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে আইএসের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে, আর ট্রাম্প জঙ্গি সংগঠনগুলোকে শক্তির মাত্রায় বৃহত্তর ক্ষমতাধর হিসেবে গড়ে তোলার মন্ত্র পাঠ করছে। আদতে ট্রাম্পের অবদানে এটাই সাব্যস্ত হচ্ছে যে, আইএস আসলে যা তার থেকে বেশি শক্তিসম্পন্ন মনে করছে নিজেদের এবং এতে জঙ্গি নিয়োগকর্তারা আনন্দে বগল বাজাচ্ছে। সম্প্রতি সিরিয়ায় দূরপাল্লার বিমান হামলার জন্য রাশিয়াকে বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে ইরান। এ জন্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিনের সঙ্গে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ বন্ধে মতৈক্যে পৌঁছানোর পথে পাহাড়সম বাধা উপলব্ধি করছেন ওবামা। আইএসকে পরাস্ত করতে আসাদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছেন ট্রাম্প। আসাদকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে বাইরের হস্তক্ষেপে সিরীয় বা সুন্নি মুসলিমরা আরও ক্ষিপ্ত। এ সুযোগে আইএসের নিয়োগকর্তারা তাদের সক্ষমতাকে আরও উর্বর করতে পারছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের মূল শক্তিধর দেশগুলোর সঙ্গে (রাশিয়া, ইরান, চীন- যারা সিরিয়ার সেনাদের প্রশিক্ষণ দেয়) সখ্য গড়তে পারত, তবে আইএসের বিরুদ্ধে এ সমরসখ্যে যুদ্ধরত দেশগুলোর পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারত। তবে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে ‘মার্কিন সম্পর্ক’ আরও জোরালো হতো। ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর বিশ্বের যুবাদের প্রত্যাশা পূরণে যুক্তরাষ্ট্রের এটাই সঠিক সময়। মধ্যপ্রাচ্যের উদ্বেলিত আগুন নেভাতে, আবারও ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানের সংস্কার এবং জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কূটনৈতিক ও সামাজিক বিনিয়োগে অংশীদার করা প্রয়োজন। মধ্যপ্রাচ্যে আরও একটি বেপরোয়া মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রবক্তা হতে পারেন ট্রাম্প।
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে ভাষান্তর : সালমান রিয়াজ
ফাওয়াজ এ জার্গিস : লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক

ওয়ালশই হচ্ছেন বোলিং কোচ

হিথ স্ট্রিক চলে যাওয়ার পর তার শূন্য আসন কাকে দিয়ে পূরণ করা হবে এ নিয়ে গবেষণা কম হয়নি। হালফিল উঠে এসেছিল ‘সাদা বিদ্যুৎ’ খ্যাত অ্যালান ডোনাল্ডের নাম। হাইপারফরম্যান্স ইউনিটের (এইচপি) সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সময় থাকা আকিব জাভেদের নামও ইতস্তত শোনা গেছে। শেষমেশ তার চেয়েও বড় নাম প্রতিভাত হয়েছে। সাবেক ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক কোর্টনি ওয়ালশই বাংলাদেশ দলের নতুন বোলিং কোচ হতে চলেছেন। খেলোয়াড়ি জীবনে এই ক্যারিবীয় ফাস্ট বোলার সুখ্যাতি পেয়েছিলেন ‘হুইসপারিং ডেথ’ নামে। তার রানআপের সময় আম্পায়ার কোনো শব্দ পেতেন না বলে এই নামে ডাকা হতো ওয়ালশকে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের গৌরবোজ্জ্বল সময়ের সারথি সেই ওয়ালশের বোলিং কোচ হওয়া প্রায় নিশ্চিত। এ নিয়ে অবশ্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নিশ্চুপ। ওয়ালশও কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। তাই বলে থেমে নেই ফিসফিসানি। তার নিঃশব্দ রানআপের মতোই মুস্তাফিজ-তাসকিনদের বোলিং কোচ হওয়ার বিষয়টিও অনুচ্চারিত। গোটা ছবি পরিষ্কার হবে সামনের সপ্তাহে। যখন হিথ স্ট্রিকের জুতায় পা গলানোর জন্য ঢাকায় আসবেন ১৩২ টেস্টে ৫১৯ উইকেট নেয়া ওয়ালশ। ২০৫টি ওডিআইতে ২২৭ উইকেট পাওয়া এই সাবেক ডান-হাতি ফাস্ট বোলার আগামী ৩০ অক্টোবর ৫৪-তে পা রাখবেন।
তার আগেই পেয়ে যাবেন তিনি জন্মদিনের সেরা উপহার। দেড় দশক আগে টেস্টে সে সময়ের শীর্ষ উইকেট শিকারি বোলার হিসেবে অবসর নেয়া ওয়ালশ খেলোয়াড়-উত্তর জীবনে এই প্রথম বড়সড় দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন। ২০০১-এ খেলা ছেড়ে দেয়ার পর তিনি যে ক্রিকেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন তা নয়। টুকরো টাকরা কাজ করেছেন। কখনও ওয়েস্ট ইন্ডিজের নির্বাচক হিসেবে। আবার সিপিএলে সাকিব আল হাসানের দল জ্যামাইকা তালাওয়াহসের মেন্টর হিসেবেও কাজ করেছেন। এর বাইরে তাকে দেখা গেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ম্যানেজার হিসেবে। অতি সম্প্রতি তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের নির্বাচক প্যানেলের সদস্য ছিলেন। বোলিং কোচ হিসেবে ওয়ালশ যোগ দিলে বাংলাদেশের ক্রিকেটে আবারও ফিরে আসবে ক্যারিবীয় সুবাস। সাবেক ওয়েস্ট ইন্ডিজ ওপেনার গর্ডন গ্রিনিজ টাইগারদের কোচ ছিলেন। ’৯৭ আইসিসি ট্রফি জয়ের সিঁড়ি বেয়ে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অভিষেক হয়েছিল ১৯৯৯-তে। সেই অভিষেকলগ্ন বাংলাদেশ রাঙিয়েছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে ৬২ রানের ঐতিহাসিক জয়ের মধ্য দিয়ে। ক্যারিবীয় কৌলীন্যের কালের উজ্জ্বল সারথি গর্ডন গ্রিনিজের পর ওয়ালশের বাংলাদেশের ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এক অবিস্মৃত প্রাপ্তি হতে চলেছে।

সন্তানদের দেওয়ার মতো সময় কোথায়? by উম্মে মুসলিমা

প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগের পর এসবের কারণ ও ফলাফল নিয়ে নতুন নতুন গবেষণা ও বিশ্লেষণ উঠে আসে। এখন বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমস্যা হয়ে উঠেছে জঙ্গি তৎপরতা। সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়া কিশোর-তরুণদের অবস্থা ও অবস্থান, তাদের মানসিকতা, শিক্ষা, বন্ধুত্ব, পরিবারের ভূমিকা ইত্যাদি নিয়ে দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে আলোচনার ঝড় উঠেছে। সন্তান সন্ত্রাসী হয়ে ওঠার পেছনে পারিবারিক বন্ধনের শৈথিল্যকেও দায়ী করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে উন্নয়ন-শিল্পায়ন-বিশ্বায়নের এ যুগে নাগরিক জীবনে অণু পরিবার ব্যবস্থা যেখানে প্রায় অবশ্যম্ভাবী, সেখানে সন্তানদের সঙ্গদানের জন্য সময় দেওয়া বাস্তবে কতটা সম্ভব? যৌথ পরিবারের ভালো ও মন্দ দিক দুটোই রয়েছে। যৌথ পরিবার ভাঙনের শুরুতে আমার সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল বলে প্রফুল্ল রায় তাঁর নাটকে বুক চাপড়ে কান্নাকাটি করেছেন। তাঁর সে নাটকের মঞ্চায়নের সফলতা বা দর্শকপ্রিয়তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাতে কি ভাঙন ঠেকানো গেছে? গ্রাম পুড়লে দেবালয় এড়ায়? এককালে যৌথ পরিবারে বাস করা আজকের প্রবীণদের অনেকেই পুরোনো দিনের কথা মনে করে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। বলেন আহা! কী দিন কাটিয়েছি আমরা! দুপুরে একসঙ্গে পঁচিশটা পাত পড়ত। ঈদে-উৎসবে পুরো বাড়ি যেন মেলার ময়দান। মনে আছে, আমাদের যৌথ পরিবারে বিবাহিত ফুফুরা একসঙ্গে তাঁদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে বেড়াতে আসতেন। ফুফাতো ভাইবোনদের আগমনবার্তার আনন্দেই আমাদের রাতে ঘুম হতো না।
আসার পর তো আর কথাই নেই। ফুফুরা বাপের বাড়ি নাইওরে আসতেন দু-এক মাস আরাম করার জন্য। আমরা খেলাধুলা, গল্পগুজব, গান, নাটক, গল্পের বই নিয়ে মেতে থাকতাম। কিন্তু ওই রাবণের গুষ্টির রান্নার আয়োজন, রান্না, খাওয়ানো, গোছানো, পিঠে পুলি তৈরি এমনকি শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাওয়ার আগে ফুফুদের জন্য চিড়া-মুড়িমুড়কি-নাড়ু-আচার-মসলা বানিয়ে বস্তা বাঁধতে হতো আমাদের মা-চাচিদের। তাঁরা চলে যাওয়ার পর মা-চাচিরা রীতিমতো শয্যাশায়ী হয়ে পড়তেন। আবার অন্যদিকে ফুপুরাও শ্বশুরবাড়িতে তাঁদের ননদদের জন্য প্রাণপাত করতেন। তার মানে যত মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা সবই নারীর। প্রফুল্ল রায় যতই কান্নাকাটি করুন, সময়ের প্রয়োজনে অণু পরিবার বানের জলের মতো অবিরল গতিতে নগরজীবনে প্রবেশ করেছে এবং অনবরত করছে। বিশ্বব্যাংকের ২০১০ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির ৩৯ দশমিক ৯ শতাংশ নারী। তৈরি পোশাকশিল্প খাতে ৩০ লাখ শ্রমিকের ৯০ শতাংশই নারী, যাঁরা শহরে বাস করেন। কর্মজীবী বিবাহিত নারীদের সন্তানেরা শিক্ষার্থী। যেসব নারী রোজগেরে নন, তাঁরা সন্তানদের স্কুলে ঢুকিয়ে মাদুর বিছিয়ে ছুটি পর্যন্ত বসে থাকেন, যাঁরা কাছেপিঠে থাকেন তাঁরা বাসার কাজ সেরে নিতে আসেন। অফিস বা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীর সংখ্যা খুবই কম, সন্তানদের স্কুলে আনা-নেওয়া করা বাবার সংখ্যা আরও কম। কারণ, বাবাদের অফিস-আদালতে কাজ করতেই নাভিশ্বাস উঠে যায়।
বাড়ি ফিরে তাঁদের একটু আরাম না করলে চলে? কিন্তু কর্মজীবী নারীর সে উপায় নেই। সমাজসৃষ্ট শ্রম বিভাজনের জাঁতাকলে পড়ে তাঁকে ঘরে-বাইরে সবখানেই কাজ করতে হয়। তাহলে সন্তানদের সময় দেবেন কারা? সময় দেওয়ার কী আছে? টিভি, কার্টুন, স্মার্টফোন, ট্যাব, ইন্টারনেট আছে না? এগুলো নিয়েই তো তারা দিব্যি আছে। তা ছাড়া স্কুল আর কোচিং করেই তারা হাঁপিয়ে ওঠে, মা-বাবার সঙ্গে কাটানোর মতো সময় কোথায় তাদের? ফেসবুকের বদৌলতে গণমাধ্যমে না আসা সংবাদও খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যেমন, এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী একটা প্ল্যাকার্ড হাতে বাবা-মা, এবারের ঈদের কেনাকাটায় টাকা চাই না, সময় চাই লিখে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিকে মা-বাবাদের এসব নিয়ে জিজ্ঞাসা করলে তাঁরা বলেন, টাকাপয়সা কামাই করছি তো ওদের জন্যই। শুধু সময় খেলে পেট ভরবে? আবার সব বয়সের ছেলেমেয়েই মা-বাবার অতিরিক্ত সময় দেওয়াটাকে ভালোভাবে নেয়, তা-ও বলা যাবে না। কারণ, সমবয়সী বন্ধুর চাহিদা মেটানো মা-বাবার পক্ষে সম্ভব নয়। দেখা গেল, মা সন্তানের সামনে বসে বেদবাক্য আওড়ে যাচ্ছেন, আর সন্তান মোবাইল বা আইপ্যাডে চোখ রেখে ক্রমাগত হুঁ-হাঁ করে যাচ্ছে। একদিন বিকেলে এক মা তাঁর চার-পাঁচ বছরের শিশুকে নিয়ে হাঁটছিলেন। শিশুটি মাকে ক্রমাগত এটা-ওটা জিজ্ঞাসা করে যাচ্ছে। মায়ের এক কানে মোবাইল, আরেক হাতে তসবি। তাঁর মনোযোগ নষ্ট করে দেওয়ার জন্য তিনি মাঝে মাঝেই সন্তানের মাথায় চাঁটি মারছিলেন।
কর্মজীবী মা বলবেন, সারা দিন খেটেখুটে বাড়ি ফিরে আবার রাঁধতে বসি। তারপর খাওয়ানো, ধোয়াধুয়ি। বাচ্চাদের সময় দেব কখন? গৃহব্যবস্থাপক মায়েরা বলেন, যাদের সময় দেব তাদেরই-বা সময় কোথায়? তাদের হয় স্কুল, নয় কোচিং, নয় প্রাইভেট। বাবারা কী বলেন? বাচ্চারা মায়ের সঙ্গেই বেশি স্বচ্ছন্দ। বাবাদের সান্নিধ্য ওদের এমন পছন্দ নয়। কিন্তু সময় বের করা আসলে কঠিন নয়। রবীন্দ্রনাথকে শুধু লেখালেখি ছাড়াও হাজারো সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সংশ্লিষ্ট থাকতে হয়েছে। তাই বলে কি তিনি কখনো লেখালেখির সময় পাচ্ছিনে বলেছেন? খ্যাতিমান এক লেখকের লেখা আদায় করে নেওয়ার জন্য জনৈক প্রকাশক সব ব্যয় বহন করে তাঁকে কোনো নিরিবিলি স্বাস্থ্যকর স্থানে পাঠিয়েছিলেন। দুই মাস পর লেখা আদায় করতে গিয়ে এক পাতা লেখাও পাননি। নিরবচ্ছিন্ন অবসরও সৃষ্টিশীলতার অন্তরায়। আমরা বাঙালি জাতি আড্ডাপ্রিয়। নির্ভেজাল আড্ডা মারি। অবশ্য আড্ডা থেকে তাৎক্ষণিক লাভ না হলেও সৃষ্টিশীল মানুষ তঁাদের শিল্প-সাহিত্যের জন্য অনেক রসদ পেয়ে যান বলে দাবি করেন। কয়েক দিন আগে এ দেশে বেড়াতে আসা মেলিসা টেনিসন নামের মার্কিন এক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে আড্ডার জন্য বাসায় ডাকলাম। সবাই গোল হয়ে বিছানায় বসে আড্ডার প্রস্তুতি নিচ্ছি, মেলিসা তার জাদুর ঝুলি খুলে বসল। হাত-কান-গলার গয়না বানানোর হাজারটা খুচরো জিনিস মেলে ধরল। সবাইকে বলল যে যার খুশিমতো হাতে গয়না বানাও আর মুখে আড্ডা পেটাও।
প্রবাদে আছে, সাধারণ মানুষ সময় কাটায় আর বুদ্ধিমানেরা সময় ব্যবহার করে । প্রথম আলোয় গত ২৫ আগস্ট প্রকাশিত মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক ক্লাস লেখাটি এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ভ্রাম্যমাণ পাঠাগারে সম্পৃক্ত হতে ছেলেমেয়েদের উৎসাহিত করতে হবে। কেবল জিপিএ–৫ পাওয়ার জন্য পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য কোনো বই পড়তে না দিলে যত ভালো রেজাল্টই হোক, প্রত্যাশিত উচ্চশিক্ষার স্বপ্নপূরণ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। খেলাধুলা ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানবিক বিকাশের সহায়ক। মানবিকতাহীন পাণ্ডিত্য সমাজের সম্পদ না হয়ে আপদে পরিণত হয়। একইভাবে উগ্র ধর্মান্ধ মানুষের মধ্যেও ধর্মজ্ঞানের পাণ্ডিত্য তাকে মানবিকতার দীক্ষা থেকে বঞ্চিত করে। এ ব্যস্ততার যুগে প্রয়োজনের বাইরে এতসব করার সময় কোথায় যাঁরা বলেন, বিখ্যাত লেখক এইচ জ্যাকসন ব্রাউন তাঁদের বলেন, বোলো না যে তুমি সময় পাও না। কারণ, প্রতিদিন তুমি যে কয় ঘণ্টা সময় পাও, ঠিক সে কয় ঘণ্টাই পেয়েছিলেন হেলেন কেলার, মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, মাদার তেরেসা, লেওনার্দো দা ভিঞ্চি, টমাস জেফারসন ও আলবার্ট আইনস্টাইন। পরিবারে সন্তানদের গুণগত সময় দেওয়ার কথাও বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন। আবার কেবল সন্তানদেরই সময় দিয়ে সংস্কৃতিমান করে তুললে হবে না, বাবা-মা বা অভিভাবকদের পারস্পরিক সম্পর্কেও সুসময় বিরাজ রাখা বাঞ্ছনীয়।
উম্মে মুসলিমা: কথাসাহিত্যিক।
muslima.umme@gmail.com

বইয়ের বন্ধুত্ব সীমানা ছাড়িয়ে by মাজহারুল ইসলাম

আজ ১ সেপ্টেম্বর কলকাতার রবীন্দ্র সদনের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে শুরু হচ্ছে ১০ দিনব্যাপী বাংলাদেশ বইমেলা কলকাতা । ষষ্ঠবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই বইমেলা। এবারের মেলার প্রতিপাদ্য বইয়ের বন্ধুত্ব সীমানা ছাড়িয়ে । সত্যিই তো, জ্ঞানের আধার যে বই, সে তো কোনো ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই বইমেলা? এই প্রশ্নের উত্তরে এককথায় বলা যায়, বাংলাদেশের বই এবং লেখকদের ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পরিচিত করানোর উদ্দেশ্যেই এই আয়োজন। এটা তো দিবালোকের মতোই স্পষ্ট যে পশ্চিমবঙ্গের বই ও পত্রিকা বাংলাদেশে সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের লেখকেরাও এ দেশের পাঠকদের কাছে পরিচিত। প্রবীণ কথাসাহিত্যিক, কবি, প্রাবন্ধিক তো বটোই; পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত ছোট কাগজ এবং পত্রিকাগুলোর শারদীয় সংখ্যায় প্রকাশিত নতুন কোনো লেখকের লেখা ভালো লাগলে এ দেশের পাঠক আগ্রহভরে বইয়ের স্টলগুলোতে তাঁদের বইয়ের খোঁজ করেন। এর বিপরীত চিত্র দেখা যায় কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গে। সেখানে বাংলাদেশের বই ও পত্রিকা সহজলভ্য নয়। বাংলাদেশের হাতে গোনা অল্প কয়েকজন কথাসাহিত্যিক, কবি ও প্রাবন্ধিক পরিচিত ওখানকার পাঠকদের কাছে। তাই পশ্চিমবঙ্গের পাঠকেরা যাতে বাংলাদেশের বই সহজে পেতে পারেন এবং এ দেশের নবীন-প্রবীণ লেখকদের লেখার সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন বা একটি ধারণা পেতে পারেন—এই উদ্দেশ্যেই মূলত বাংলাদেশ বইমেলা কলকাতা র আয়োজন করা হচ্ছে। এই আয়োজন তখনই সফল হবে,
যদি আমরা গ্রন্থসেতু নির্মাণ করতে পারি। বলাই বাহুল্য, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের লেখক, পাঠক, প্রকাশক, সমালোচক ও নীতিনির্ধারকদের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা থাকতে হবে। বিষয়টির একটু ব্যাখ্যা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের লেখকেরা যদি পরস্পরের লেখা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন এবং তা স্বদেশের পাঠকদের জানান, তাহলে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের লেখক এবং তঁাদের বইয়ের একটি পরিচিতি গড়ে উঠবে। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, গত শতকের সত্তরের দশকের প্রথমার্ধে সেই সময়ের উদীয়মান তরুণ লেখক হুীমায়ূন আহমেদের একটি উপন্যাস পড়ে ভালো লাগার পরিপ্রেক্ষিতে সেই বইটি সম্পর্কে দেশ পত্রিকায় লিখেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। একইভাবে এ দেশের গল্পকার হাসান আজিজুল হক সম্পর্কেও পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য সমালোচকেরা নানা সময়ে নানা লেখা লিখেছেন। ফলে এই দুজন কথাসাহিত্যিকের অনুরাগী পাঠকগোষ্ঠী পশ্চিমবঙ্গে গড়ে উঠেছে। প্রকাশকদের ভূমিকা সম্পর্কে বলা যায় যে তাঁদের পেশাদার ও আন্তরিক হতে হবে। এমন কোনো কাজ বা কর্মকাণ্ড তাঁরা করবেন না, যাতে বাংলাদেশ কিংবা পশ্চিমবঙ্গের বইয়ের মূল প্রকাশকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। একসময় গত শতকের সত্তর-আশির দশকে বাংলাদেশের বটতলার প্রকাশকেরা পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় লেখকদের (ফাল্গুনী, নীহার, আশুতোষ, নিমাই, সুনীল, শীর্ষেন্দু, সমরেশ) অসংখ্য নকল বই প্রকাশ করেছিলেন। পাশাপাশি আবার ওই সময়েই নওরোজ সাহিত্য সংসদের (নসাস) মতো পেশাদার প্রকাশক সত্যজিৎ রায়ের বই তাঁর অনুমতিক্রমে প্রকাশ করেছিলেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তখন অসাধু প্রকাশকের অস্তিত্ব ছিল না।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সম্প্রতি এমন প্রকাশকের কথা আমরা জানি, যিনি বিনা অনুমতিতে হুেমায়ূন আহমেদ, গোলাম মুরশিদসহ কয়েকজন লেখকের বই প্রকাশ করেছেন এবং সেসব বই দেদার বিক্রি হচ্ছে কলেজ স্ট্রিট থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত। এতে বইগুলোর মূল প্রকাশক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বাংলাদেশের বইয়ের প্রকাশকেরা কলকাতার সেই প্রকাশককে সতর্ক করলেও তিনি তাতে কর্ণপাত করেননি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের প্রকাশকদের সচেতন হতে হবে এবং ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নীতিনির্ধারকদেরও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা থাকতে হবে দুই বাংলার বইয়ের বাজার প্রসার ও লেখকদের পাঠকের কাছে পরিচিত করার বিষয়ে। বাংলাদেশে অবশ্য ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বইয়ের বাজার গড়ে উঠেছে। এ দেশের ঈদসংখ্যায়ও পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় লেখকদের লেখা ঠাঁই পায়। কবিতা উৎসবসহ নানা সাহিত্য আয়োজনে পশ্চিমবঙ্গের কবি-লেখকদের আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং তাঁদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে ঋদ্ধ হন এ দেশের লেখক ও পাঠকেরা। বলাই বাহুল্য, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। পশ্চিমবঙ্গের নীতিনির্ধারকেরও অনেক ক্ষেত্রে তা করছেন। বিশেষত বাংলাদেশ বইমেলা কলকাতা আয়োজনে তাদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে এবং যাচ্ছে। তাঁদের সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশ বইমেলা কলকাতা প্রতিবছর আয়োজন করা সম্ভব হতো না।
উল্লেখ্য, গত পাঁচ বছর বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সহযোগিতায়, কলকাতার বাংলাদেশ উপদূতাবাসের ব্যবস্থাপনায় এবং বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির আয়োজনে বাংলাদেশ বইমেলা কলকাতা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। প্রায় ৫০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশগ্রহণ করছে। এবারের বইমেলার উদ্বোধক ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। প্রধান অতিথি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মাধ্যমিক ও স্কুল শিক্ষামন্ত্রী ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়। সম্মানীয় অতিথি বিশিষ্ট কবি ও প্রাবন্ধিক শঙ্খ ঘোষ। অন্যান্যবারের মতো এবারও প্রতিদিন সন্ধ্যায় মেলার মঞ্চে বাংলাদেশের বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করবেন। মেলার সময়টায় রবীন্দ্র সদনের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ সব সময়েই পরিণত হয় একখণ্ড বাংলাদেশে। এবারের মেলায় পাঁচটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। বাঙালি জাতি ও জাতীয় নায়ক , গ্রন্থসেতু নির্মাণ: লেখক, পাঠক, প্রকাশক ও নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা , প্রসঙ্গ: লালনসংগীত , প্রকাশনায় নারী এবং দুই বাংলার শিশুসাহিত্য: রহস্য, রোমাঞ্চ ও অ্যাডভেঞ্চার । আশা করছি, এবারও মেলার ১০টি দিন বইপ্রেমীদের পদচারণে আনন্দমুখর হয়ে থাকবে।
মাজহারুল ইসলাম: বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সহসভাপতি ও অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী।