Thursday, March 19, 2026

ইরানে হামলা নিয়ে মুফতি তাকি উসমানির বিশেষ বার্তা

শিয়া-সুন্নি বিরোধ উসকে না দিয়ে আগ্রাসী শক্তির মোকাবিলায় মুসলিমদের এক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্বখ্যাত ইসলামি স্কলার ও পাকিস্তানের বরেণ্য আলেম মুফতি তাকি উসমানি।

তিনি বলেছেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মুসলমানদের এক থাকা। যদিও ইরানের অধিকাংশ মানুষ শিয়া মতের অনুসারী এবং আমাদের সঙ্গে তাদের আকিদাগত মতভেদ আছে, কিন্তু কোন সময়ে কোন কথা বলা উচিত সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। এখন কি সেই সময় যে শিয়া-সুন্নি বিরোধকে উসকে দেওয়া হবে? আমেরিকা কি এজন্য ইরানে হামলা করেছে যে তারা আমাদের আকিদার বিরুদ্ধে ছিল? না, বরং তিনি (খামেনি) একজন মুসলমানের প্রতিনিধি হিসেবে ধরা হতো বলেই তার উপর আক্রমণ হয়েছে। আর তারা এর মোকাবিলায় দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তাই এদিক বিবেচনায় আমাদের তাদের সমর্থন করা উচিত।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা ও দেশটির সর্বোচ্চ নেতার হত্যাকাণ্ড নিয়ে সম্প্রতি পাকিস্তানের করাচি দারুল উলুমে দেওয়া বক্তব্যে মুফতি তাকি উসমানি এসব কথা বলেন।

বিশ্ববরেণ্য এ আলেম বলেন, বিশেষ করে এই সময়ে উম্মতে মুসলিমার জন্য দোয়ার খুব দরকার। কারণ গত কয়েক দিনে উম্মতে মুসলিমা ভয়ংকর ফিতনার শিকার হয়েছে। আপনারা সবাই জানেন যে ইসরায়েল ও আমেরিকা ইরানে হামলা করেছে। এই হামলা করতে কোনো লজ্জা-শরমেরও বালাই করেনি তারা। দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছিল এবং ইরান তাদের কিছু কথা মেনেও নেয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার টেবিল থেকে উঠে গিয়ে সরাসারি ইরানের ওপর হামলা করে বসলো।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমন আচরণকে বৈশ্বিক গুন্ডামি আখ্যা দিয়ে তাকি উসমানি বলেন, এখন এক ধরনের বৈশ্বিক গুন্ডামি শুরু হয়েছে যে ট্রাম্প যখন ইচ্ছা তখন কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের বাসায় বোমাবর্ষণ করে তাকে হত্যা করে ফেলবেন এবং সেই দেশ দখল করে নেবেন। ভেনেজুয়েলায়ও এমন করা হয়েছে। এবং প্রকাশ্য ঘোষণা করা হচ্ছে যে আমার অধিকার আছে যেকোনো দেশের উপর এভাবে হামলা করার। না কোনো জাতিসংঘ, না কোনো আন্তর্জাতিক আইন, না কোনো নৈতিকতা, না কোনো সহনশীলতা কিছুই মানা হবে না। আমিই সর্বেসর্বা, যেখানে ইচ্চা সেখানে গিয়ে বোমাবর্ষণ করব এবং যাকে চাই তাকে টার্গেট কিলিং করব।

সবাইকে ইরানের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ইরানের উপর হামলা করে ইসরাইল ও আমেরিকা উম্মতে মুসলিমার বিরুদ্ধে বড় ধরনের চক্রান্ত করছে। এর উদ্দেশ্য হলো মুসলমানরা যেন এক না হতে পারে। মুসলমানদের মুসলমানদের সঙ্গেই লড়িয়ে দেওয়া। আমার দুঃখ হয় যে কিছু মানুষ বলাবলি করছে, আরে তারা তো শিয়া ছিল, ইরানের সঙ্গে আমাদের মতভেদ আছে ইত্যাদি। আল্লাহর বান্দারা! আমেরিকা ও ইসরাইল তাকে (খামেনি) এজন্য মারেনি যে তিনি শিয়া ছিলেন। তারা হামলা করেছে এজন্য যে তাকে মুসলিম বিশ্বের একজন প্রতিনিধি মনে করা হতো।

ইরানের রাষ্ট্রীয় বিষয়ে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের চেষ্টারও সমালোচনা করেন বিশ্ববরেণ্য এ আলেম।

তিনি বলেন, ইরানের নেতাকে টার্গেট কিলিং করে হত্যা করা হয়েছে এখন তারা যখন নতুন নেতা নির্বাচন করতে চায়, তখন ট্রাম্প বলছেন, আমাকে এই পরামর্শে অন্তর্ভুক্ত করো যে তোমাদের নতুন নেতা কে হবে। তোমরা যাকে নির্বাচন করেছ তাকে আমি মেনে নিচ্ছি না। এর চেয়ে বড় বৈশ্বিক ধোঁকাবাজি, গুন্ডামি আর কী হতে পারে?

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মুসলমানদের এক থাকা। যদিও ইরানের অধিকাংশ মানুষ শিয়া মতের অনুসারী এবং আমাদের সঙ্গে তাদের আকিদাগত মতভেদ আছে, কিন্তু কোন সময়ে কোন কথা বলা উচিত সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। এখন কি সেই সময় যে শিয়া-সুন্নি বিরোধকে উসকে দেওয়া হবে? আমেরিকা কি এজন্য ইরানে হামলা করেছে যে তারা আমাদের আকিদার বিরুদ্ধে ছিল? না, বরং তিনি (খামেনি) একজন মুসলমানের প্রতিনিধি হিসেবে ধরা হতো বলেই তার উপর আক্রমণ হয়েছে। আর তারা এর মোকাবিলায় দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তাই এদিক বিবেচনায় আমাদের তাদের সমর্থন করা উচিত। আমাদের সরকারও এই ব্যাপারে ইরানের সঙ্গে সমন্বয়ের ঘোষণা দিয়েছে; এটি প্রশংসার দাবি রাখে।

মুফতি তাকি উসমানি বলেন, ইসরায়েল ও আমেরিকা এই চেষ্টায় আছে যে যেভাবেই হোক মুসলমানদের ধ্বংস করে দেবে এবং মুসলমানরা যেন নিজেদের মধ্যে লড়াই করে তাদের শক্তি শেষ করে ফেলে। এখন আমাদের বেশি বেশি দোয়া করা দরকার যে হে আল্লাহ! আমাদের হাতে তো কিছুই নেই। আমরা শুধু আপনার দরবারে এই আবেদন করতে পারি হে আল্লাহ! আপনার রহমতের মাধ্যমে আমাদের এই ফিতনা থেকে বের করে দিন এবং উম্মতে মুসলিমার ঐক্যের যে স্বপ্ন আছে, হে আল্লাহ, তা বাস্তবতা দান করুন। পুরো মুসলিম উম্মাহ যদি এক হয়ে যায়, তাহলে না আমেরিকা, না ইসরাইল, না ভারত, না অন্য কোনো শত্রু কেউই আমাদের কিছু করতে পারবে না। 

পাকিস্তানের বরেণ্য আলেম মুফতি তাকি উসমানি। ছবি : সংগৃহীত
পাকিস্তানের বরেণ্য আলেম মুফতি তাকি উসমানি। ছবি : সংগৃহীত

হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে ‘যথাযথ প্রচেষ্টায়’ যোগ দিতে প্রস্তুত যুক্তরাজ্যসহ ৬ দেশ

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ‘যথাযথ প্রচেষ্টায়’ যোগ দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে ছয় দেশ। একই সঙ্গে তারা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

দেশগুলো হলো—যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও জাপান। আজ বৃহস্পতিবার এক যৌথ বিবৃতিতে তারা নিজেদের অবস্থান জানায়।

যৌথ বিবৃতিতে পারস্য উপসাগরের দেশগুলোর জ্বালানি স্থাপনায় ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়ে তা অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। দেশগুলো বলেছে, উৎপাদন বৃদ্ধি ও বাজার স্থিতিশীল করতে তারা নির্দিষ্ট কিছু জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশের সঙ্গে কাজ করবে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা এই (হরমুজ) প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে যথাযথ প্রচেষ্টায় অবদান রাখার প্রস্তুতি ব্যক্ত করছি। যেসব দেশ এ বিষয়ে প্রাথমিক পরিকল্পনায় যুক্ত আছে, তাদের অঙ্গীকারকে আমরা স্বাগত জানাই।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে হামলা শুরু করে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। যুদ্ধের আগে এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি করা হতো।

ইরান বারবার বলেছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ নয়, খোলা। তবে হামলা বন্ধ না করলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এবং তাদের মিত্রদের কোনো জাহাজকে প্রণালি পার হতে দেওয়া হবে না। পার হতে চেষ্টা করলে হামলা চালানো হবে। এ পর্যন্ত সেখানে অন্তত ১৬টি জাহাজ ও ট্যাংকারে হামলা হয়েছে। তবে, যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের অনুমতি নিয়ে ভারত, তুরস্ক ও পাকিস্তানের কয়েকটি ট্যাংকার প্রণালিটি পার হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম হু হু করে বাড়ছে। প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা যুদ্ধ আগের তুলনায় ৪০ ডলারের বেশি।

জ্বালানির দাম বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হয়েছে। তাই যুদ্ধের শুরু থেকে ন্যাটো ও এশিয়ার মিত্রদের হরমুজে যুদ্ধ জাহাজ পাঠাতে আহ্বান জানিয়ে আসছেন ট্রাম্প। কয়েক দফা আহ্বান সত্ত্বেও যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, গ্রিস, স্পেসসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রায় কোনো দেশ ট্রাম্পের আহ্বানে এখন পর্যন্ত সাড়া দেয়নি। এগুলো সব ন্যাটোভুক্ত দেশ।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসা জ্বালানির অধিকাংশ আসে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। এশিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ জাপান ও অস্ট্রেলিয়াও হরমুজে জাহাজ পাঠাবে না বলে জানিয়েছে। শুধু দক্ষিণ কোরিয়া বলেছে তারা ট্রাম্পের আহ্বান বিবেচনা করে দেখবে।

প্রণালিটি নিরাপদ রাখতে সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে চীনের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। স্বাভাবিকভাবে চীন তাতে সাড়া দেয়নি। মিত্র ও অন্যান্যদের সাড়া না পেয়ে বেশ হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন ট্রাম্প।

যুদ্ধ শুরুর বাজার স্থিতিশীল করতে প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) ৪০ কোটি ব্যারেল কৌশলগত মজুত জ্বালানি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাগরে জাহাজে থাকা রাশিয়ার তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা ৩০ দিনের জন্য স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করতে সাগরে থাকা ইরানি তেলের ওপর থেকে বিধিনিষেধ শিথিল করতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্র। ফক্স বিজনেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ খবর জানান।

বেসেন্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে তাদের নিজস্ব তেলের মজুত থেকেও তেল বাজারে ছাড়তে পারে।

ছয় দেশের যৌথ বিবৃতিতে কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলা হয়, ‘আমরা জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল করতে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে নির্দিষ্ট কিছু উৎপাদনকারী দেশের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি অন্যান্য পদক্ষেপ নেব।’

সূত্র: আল-জাজিরা ও এএফপি

হরমুজ প্রণালি
হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স


ইরানে হামলা ও ইসরায়েলি বিলবোর্ডের ‘বারো ভাইয়া’ by সারফুদ্দিন আহমেদ

প্রকাশ ০৫ মার্চ ২০২৬ঃ গত বছরের জুনের শেষের দিকে গাজায় যখন ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছিল, ঠিক তখন ইসরায়েলের হাইফা ও জেরুজালেমের মতো বড় বড় শহরে একটি বিশেষ ছবিসহ বিলবোর্ড ওঠে।

গেল শনিবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের রাজধানী তেহরানে প্রায় দুই শ জঙ্গি বিমান নিয়ে হামলা চালায় ঠিক সে মুহূর্তেও জায়ান্ট স্ক্রিনের সেই বিলবোর্ড দেখা যাচ্ছিল। বিলবোর্ডের এই ছবিটা খেয়াল করে দেখা দরকার।

ছবিতে ১২টি মাথা দেখা যাচ্ছে। মাঝখানের সবচেয়ে বড় মাথাটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের।

ট্রাম্পের ডানে (পাঠকের দিক থেকে বাঁয়ে) আছেন সৌদি আরবের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মাদ বিন সালমান। তারপর একে একে রয়েছেন-মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারা (এর আগে এই ব্যক্তি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস-এর নেতা ছিলেন। তখন তাঁকে সবাই আবু মোহাম্মাদ আল-জোলানি নামে চিনত। যুক্তরাষ্ট্র তাঁর মাথার দাম এক কোটি ডলার ঘোষণা করেছিল।), লেবাননের সেনাপ্রধান (তাঁকে ‘লেবাননের প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়) জোসেফ আউন এবং জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ।

ট্রাম্পের বাঁয়ে (পাঠকের দিক থেকে ডানে) আছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

তারপর একে একে রয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের আমির শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, সুদানের ডি ফ্যাক্টো রাষ্ট্রপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল বুরহান, মরক্কোর বাদশাহ ষষ্ঠ মুহাম্মদ এবং কাতারের আমির হামাদ বিন খলিফা আল থানি।

ছবির মাঝখানে শিরোনামের মতো করে লেখা ‘দ্য আব্রাহাম অ্যালায়েন্স’। তার নিচে লেখা ‘ইট ইজ টাইম ফর আ নিউ মিডল ইস্ট’। সোজা বাংলায় অর্থ দাঁড়ায়, ‘আব্রাহাম জোট: এখন সময় নতুন মধ্যপ্রাচ্যের’।

এই বিলবোর্ড টাঙিয়েছে ‘কোয়ালিশন ফর রিজওনাল সিকিউরিটি’ নামের একটি ইসরায়েলি উদ্যোগ।

জেরুজালেমসহ আরও কিছু শহরে বিশাল বিশাল পোস্টার লাগানো হয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন। তাঁদের পেছনে বড় ইসরায়েলি পতাকা এবং পোস্টারে লেখা: ‘ইসরায়েল প্রস্তুত।’

প্রশ্ন হলো, ইসরায়েল কীসের জন্য ‘প্রস্তুত’? জবাবটা দেওয়া আছে বিলবোর্ডেই। সেখানে লেখা আছে—‘ইট ইজ টাইম ফর আ নিউ মিডলইস্ট’।

মানে, ভারতের আরএসএস সমর্থিত মোদি সরকার যেভাবে ‘অখণ্ড ভারত’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে এবং বাংলাদেশসহ আশপাশের ভূখণ্ডকে নিজের ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত করার ধারনাসংবলিত মানচিত্র তাদের পার্লামেন্ট ভবনে টাঙিয়ে রেখেছে; ঠিক সেভাবে গাজার পুরোটা, পশ্চিম তীরের বড় একটি অংশ এবং জর্ডান উপত্যকা দখল করে ইসরায়েলকে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বানিয়ে নেতানিয়াহু একটি ‘নিউ মিডলইস্ট’ প্রতিষ্ঠা করতে চান।

আর তার জন্য ইসরায়েল ‘প্রস্তুত’। এই লক্ষ্যে বিলবোর্ডের ওই ১২ জন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব করা ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ বা ‘ইব্রাহিম চুক্তি’ বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডস-এর মধ্য দিয়ে যে বার্তা দেওয়া হচ্ছে, তা হলো, যেহেতু ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলমান—এই তিন ধর্মের অনুসারীরা নবী ইব্রাহিম (আ.) (পশ্চিমারা যাঁকে বলেন ‘আব্রাহাম’ বা ‘অ্যাব্রাহাম’)-এর বংশধর; সেহেতু তারা ‘ভাই ভাই’। সুতরাং ‘আব্রাহামের সন্তান’ হিসেবে তাদের মধ্যে শান্তিচুক্তি হওয়া দরকার।

এর মধ্য দিয়ে আরব দেশগুলোর কাছ থেকে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের স্বীকৃতি আদায় করতে হবে এবং মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ‘নরমালাইজ’ করতে হবে।

মুসলমান-ইহুদি-খ্রিষ্টান-এই তিন সম্প্রদায়েরই ধর্মীয় ভাষ্যমতে, ইসরায়েল রাষ্ট্রটি যে পয়গম্বরের নামে হয়েছে, সেই হজরত ইসরাঈলের (ফিলিস্তিনের কেনান এলাকার বাসিন্দা ইয়াকুব নবীর ডাকনাম ‘ঈসরাইল’) ১২ পুত্র ছিলেন। তাঁদের বংশধররাই আজকের সেমেটিক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের পূর্বপুরুষ।

যেহেতু ইসরায়েলের প্রশাসন সাধারণত প্রতিটি পদক্ষেপ নেওয়ার পেছনে তাদের ধর্মীয় ইঙ্গিতবাহী প্রতীক ব্যবহার করে, সেহেতু বিলবোর্ডের ‘১২’ সংখ্যাটিকে তারা ইসরাঈলের ১২ পুত্রের ভ্রাতৃত্বকে একটি ‘বিবলিক্যাল মেটাফোর’ হিসেবে উপস্থাপন করে থাকতে পারে।

২০২০ সালে ট্রাম্প যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার ছিলেন তাঁর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সিনিয়র উপদেষ্টা। তিনি সে সময় মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কুশনার নিজে একজন কট্টর জায়নবাদী ইহুদি।

সে কারণে তিনি স্বাভাবিকভাবেই ইসরায়েলের স্বার্থে কাজ করতে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর উদ্যোগ নেন। তাঁকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেন তাঁর শ্বশুর ডোনাল্ড ট্রাম্প।

আরও একজন এই আব্রাহাম অ্যাকর্ড বাস্তবায়নে বড় ভূমিকা রেখেছেন। তিনি হলেন জ্যারেড কুশনারের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ বন্ধু সৌদি সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও কার্যত রাষ্ট্রপ্রধান মোহাম্মাদ বিন সালমান।

মোহাম্মাদ বিন সালমানের নিজস্ব উদ্যোগে ২০২০ সালেই চারটি মুসলিম প্রধান দেশ ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। দেশগুলো হলো-সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদান এবং মরক্কো।

ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার কয়েক মাস পরই ২০২০ সালের ডিসেম্বরে মরক্কোকে আইএমএফ দেয় ৫.৮ বিলিয়ন ডলার।

আর ২০২১ সালের জানুয়ারিতে সুদানকে আইএমএফ দেয় আড়াই বিলিয়ন ডলার এবং বিশ্বব্যাংক দেয় দেড় বিলিয়ন ডলার। ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিনিময়ে ‘নগদ নারায়ন’ হিসেবে তারা এই অর্থ সহায়তা পায়।

ওই সময় সৌদি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে বলা হয়েছিল, ধীরে ধীরে সমগ্র আরব বিশ্ব এবং আরব বিশ্বের বাইরের মুসলিম দেশগুলো যাতে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়ে দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে, সে জন্য সৌদি সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের মতো যেসব অপেক্ষাকৃত অসচ্ছল মুসলিম দেশ শ্রমিক বা জনশক্তি ইস্যুতে বা অন্য কোনো কারণে সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীল, সেসব দেশকে এই ‘নরমালাইজেশন’ প্রক্রিয়ায় সৌদি আরব শামিল করতে কাজ করবে বলে খবর বেরিয়েছিল।

খেয়াল করার মতো ঘটনা হলো, আগে বাংলাদেশের পাসপোর্টে লেখা থাকত, ‘দিস পাসপোর্ট ইজ ভ্যালিড ফর অল কান্ট্রিজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড এক্সসেপ্ট ইসরায়েল’ (ইসরায়েল ব্যতীত এই পাসপোর্ট বিশ্বের সব দেশের জন্য বৈধ)।

২০২০ সালে আব্রাহাম অ্যাকর্ড স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ওই বছরই শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার দেশে চালু করা নতুন ই-পাসপোর্ট থেকে ‘এক্সেপ্ট ইসরায়েল’ বা ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ কথাটি বাদ দিয়েছিল। এই চুক্তি সাক্ষরের সঙ্গে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ কথাটি বাদ দেওয়ার মধ্যে সম্পর্ক ছিল নাকি এই দুটি ঘটনা ঘটার সময়কাল কাকতালীয় তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

এর কারণ সে সময় বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে এ বিষয়ে কোনো ঘোষণাও দেওয়া হয়নি। পরে ২০২১ সালের ২২ মে জেরুজালেম পোস্ট যখন এক প্রতিবেদনে বলে, ‘ইসরায়েল ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিচ্ছে বাংলাদেশ’; তখন পাসপোর্ট থেকে ‘এক্সেপ্ট ইসরায়েল’ কথাটি বাদ দেওয়ার বিষয়টি সবার নজরে আসে। (হাসিনা সরকারের পতনের পর সদ্য বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অবশ্য ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশি পাসপোর্টে ‘এক্সেপ্ট ইসরায়েল’ আবার ফিরিয়ে এনেছে)

প্রশ্ন হলো: যে আরব নেতারা শপথ নিয়েছিলেন, ফিলিস্তিনিদের স্বীকৃতি এবং ফিলিস্তিনকে ১৯৬৭ সালের আগের সীমানা ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখা হবে না, সেই আরব দেশগুলোর নেতারা কেন শপথ ভঙ্গ করে ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মেলালেন?

বিশেষ করে ইসরায়েলের শহরগুলোতে টাঙানো বিলবোর্ডের এই আরব নেতারা এত দিন কেন নিজেদের দেশের মাটিতে সেই মার্কিন ঘাঁটি তুলতে দিয়েছেন যা কিনা মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি ইসরায়েলি স্বার্থকে সুরক্ষা দিয়ে আসছে?

ওয়াশিংটন পোস্ট এক খবরে বলেছে, সৌদি যুবরাজ নিজেই ইরানে হামলার জন্য ট্রাম্পের কাছে লবিং করেছেন। আর তাঁর সঙ্গে ইসরায়েল তো ছিলই। তার ফল ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের যৌথ হামলা।

আর তার প্রতিক্রিয়ায় ইরান সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা।

এই দেশগুলোতে যাঁরা ক্ষমতাসীন তাঁদের প্রায় সবাই কর্তৃত্ববাদী শাসক এবং আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র। এই শাসকেরা জানেন, গণতন্ত্রহীনতার প্রশ্নে দেশের ভেতরের জনগণ এবং বাইরের দুনিয়ার নেতাদের কাছে তাঁদের নৈতিক অগ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

আমেরিকা ও ইউরোপের মতো পশ্চিমা শক্তিগুলো সেই অগ্রহনযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে সহজেই দেশের জনগণকে খেপিয়ে তুলতে পারে এবং তাঁদের গদি থেকে নামিয়ে দেওয়ায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

এসব আরব নেতাদের এই ভয়কে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা তাঁদের ‘নিরাপত্তা’ দিতে এসব দেশে ঘাঁটি গড়েছে। এসব ঘাঁটিতে থাকা সামরিক শক্তির জোরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে যুক্তরাষ্ট্র অলিখিত কলোনিতে রূপান্তরিত করেছে। ক্ষমতাসীন আরব নেতারা বংশ পরম্পরায় ক্ষমতা ভোগ করছেন।

উসমানীয় খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা এবং ব্রিটেন-ফ্রান্সসহ পশ্চিমা শক্তিগুলোর সহযোগী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে কিছু আরব নেতা উসমানীয় সাম্রাজ্যকে ১৯১৬ সালে ভেঙে দেওয়ায় ভূমিকা রেখেছিলেন।

১৯১৬ সালের মে মাসে গোপনে ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়েছিল। এই চুক্তির নাম সাইকস-পিকো চুক্তি।

এর মূল উদ্দেশ্য ছিল অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে আরব ভূমিগুলো কীভাবে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হবে, সেটি আগে থেকেই ঠিক করে ফেলা।

সোজা কথায়, সাইকস-পিকো চুক্তি ছিল মধ্যপ্রাচ্য ভাগাভাগির নকশা। চুক্তিতে ঠিক হলো: উসমানীয় খেলাফত ভাঙার পর ফ্রান্স পাবে বর্তমান সিরিয়ার উত্তরাংশ, লেবানন, দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের কিছু অংশ ও উত্তর ইরাক (মসুল অঞ্চল)।

ব্রিটেন পাবে বর্তমান ইরাকের দক্ষিণাংশ (বাগদাদ ও বসরা), বর্তমান কুয়েত এবং জর্ডান নদীর পশ্চিমে উপকূলীয় অঞ্চল (ফিলিস্তিন বাদে)।

বলা যায় সেই চুক্তির ধারাবাহিকতায় উসমানীয় খেলাফত ভেঙে ফেলতে সহায়তাকারী আরব নেতাদের ‘বখশিস’ হিসেবে আরবের বিভিন্ন অঞ্চলের শাসক পদে বসানো হয়েছিল।

মূলত তাঁদের বংশধরেরা আজও পশ্চিমাদের ‘নিরপত্তা’ নিয়ে ক্ষমতা ধরে রেখেছেন। উসমানীয় খেলাফতের পতনের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনের মাটিতে ‘ইসরায়েল’ নামক যে হাইব্রিড রাষ্ট্রটির জন্ম হয়েছিল সেই রাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে এই আরব নেতারা যাবেন না, এমন একটি অলিখিত অঙ্গীকারেও তাঁরা আবদ্ধ।

কিন্তু মুসলিম উম্মাহের নৈতিক চাপ থেকে বাঁচতে এই নেতারা ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলে আসছিলেন। তবে সাম্প্রতিক ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’ সেই সমর্থনের জায়গাটুকুকেও মুছে দিয়েছে।

আরব দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরান যে হামলা চালিয়েছে, সৌদি আরবসহ আরবের অন্য দেশগুলো তার জন্য ইরানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগের হুমকিও দিয়েছে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের মতো একটি সার্বভৌম দেশে ঢুকে তাদের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করল—তা নিয়ে আরব নেতারা নিন্দা জানাননি।

এর সঙ্গে কি ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে টাঙানো সেই ১২ ‘ভাইয়ের’ বিলবোর্ডে দেওয়া বার্তার কোনো সম্পর্ক আছে?

>>> ২.

দুনিয়ায় ৫৭টি মুসলিম দেশ আছে। কিন্তু কী এমন কারণ যে ইসরায়েলকে তাদের সবাইকে বাদ দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে লেগে থাকতে হচ্ছে।

কেনই বা যুক্তরাষ্ট্র আরব দেশগুলোকে, বিশেষ করে তাদের নেতৃত্ব দেওয়া সৌদি আরবকে এইভাবে মদদ দিয়ে যাচ্ছে। এই বিষয় বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে।

১৯৩৯ সাল। সবগুলো দেশের সামনে স্রেফ দুটো পথ খোলা—হয় তুমি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পক্ষে; নয়তো হিটলারের পক্ষে। ওই সময় আরব ও উপসাগরীয় দুনিয়ার বেশির ভাগ দেশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পক্ষ নিল। কিন্তু ইরানের সে সময়কার বাদশাহ রেজা শাহ পাহলভি হিটলারের সঙ্গে হাত মেলালেন।

ব্যাপারটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মোটেও পছন্দ হলো না। তারা ১৯৪১ সালে চারদিক থেকে ঘিরে ইরানের ওপর হামলা চালানো শুরু করল। তারা সহজেই ইরানের ভূখণ্ড একের পর এক দখল করতে থাকল।

হেরে যেতে হবে বুঝে বাদশাহ একপর্যায়ে ব্রিটিশরাজের কাছে মাফ চাইলেন। ব্রিটিশদের দিক থেকে বলা হলো, ‘তোমাকে গদি ছাড়তে হবে এবং সেখানে তোমার ২২ বছরের ছেলে মোহান্মদ রেজা পাহলভিকে বসাতে হবে।’ পাহলভি গদিতে বসলেন। কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের হাতের পুতুল হয়ে বসলেন।

রেজা পাহলভি ইংরেজদের এতটাই ভক্ত হয়ে উঠেছিলেন যে, তিনি চাইতেন ইরানিরা ইংরেজদের মতো পোশাক আশাক পরুক, ইংরেজদের মতোই পশ্চিমা জীবনযাপনে অভ্যস্ত হোক, আর ইরানের আদি ঐতিহ্য ভুলে যাক।

তিনি এক বিশদ সংস্কারের দিকে হাঁটলেন। তিনি ইরানে হিজাব নিষিদ্ধ করলেন। বহু মসজিদ-মাদ্রাসা বন্ধ করে দিলেন। ইরানের বড় বড় আলেমকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠালেন। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে পশ্চিমা ধাঁচের পার্টির আয়োজন করতে লাগলেন।

রেজা পাহলভি ওই সময় সৌদি বাদশাহ ফয়সালকে বলেছিলেন, ‘আপনি পশ্চিমাদের মতো সৌদি আরবকে আধুনিকতায় ঢেলে সাজান।’ বাদশাহ ফয়সাল তাঁকে বলেছিলেন, ‘সৌদি আরব পশ্চিমাদের দাস না।’

কী মজার কথা, আজ সেই সৌদি আরব আজকের ইরানকে বলছে, ‘তুমি আমার মতো লিবারেল হও’, আর ইরান বলছে, তা সম্ভব না।

ওই সময় ইরানের যেসব বড় আলেম মসজিদে খুতবায় রেজা শাহ পেহেলভির কাজকারবারের সমালোচনা করছিলেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সরব ছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি।

খোমেনি জনগণের ওপর ওতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিলেন যে, পাহলভির সরকার ১৯৬২ সালে আয়াতুল্লাহকে গ্রেপ্তার করে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়।

আয়াতুল্লাহ চলে যান ইরাকে। সেখান থেকে প্যারিসে। তিনি বিদেশে বসে নিজের বক্তব্য ক্যাসেটে রেকর্ড করে তা গোপনে ইরানে পাঠাতে থাকেন। ইরানের সরকারবিরোধীরা সেইসব ক্যাসেট শুনে উজ্জীবিত হন। কিন্তু পাহলভিকে হটানো সহজ ছিল না। কারণ তাঁর পেছনে ছিল আমেরিকা।

আমেরিকার মদদ পেয়ে পাহলভি নিজেকে অজেয় ভেবে বসেছিলেন। নিজের শান শওকত পশ্চিমের বন্ধুদের দেখানোর জন্য ১৯৭৯ সালে তিনি এক জমকালো পার্টির আয়োজন করেন।

ওই সময় পর্যন্ত সেটি ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ও জমকালো পার্টি। আয়োজনটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ফ্লেমস অব পার্সিয়া’। ওই পার্টিই তাঁর কাল হয়েছিল।

পাহলভি ঘোষণা দেন হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী পারস্য সাম্রাজ্যকে পুনর্জীবীত করতে তিনি এই পার্টির আয়োজন করেছেন। তিনি নিজেকে ‘পারস্যের বাদশাহ’ হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য দুনিয়ার সব বড় বড় রাষ্ট্রের নেতা ও সেলিব্রেটিকে দাওয়াত করে আনলেন।

অতিথিদের আনা নেওয়ার জন্য ছয় শ লিমোজিন গাড়ি কিনলেন। ডাইনিং হলে অতিথিদের আক্ষরিক অর্থে সোনার প্লেটি খাবার খেতে দেওয়া হলো।

আক্ষরিক অর্থে সোনা দিয়ে বানানো সিংহাসনে মোহান্মদ রেজা পাহলভি গিয়ে এমনভাবে বসলেন, যেন তিনি কোনো প্রাচীন পারস্যের একচ্ছত্র সম্রাট। বিদেশি অতিথিরা হাত তালি দিলেন।

এই পুরো দৃশ্য টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হলো। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যজর্জর ইরানিরা দেখল, তারা খেতে পায় না আর তাদের শাসক সোনার প্লেটে খাবার খান। তারা ক্ষেপে গেল।

বিদেশ থেকে আয়াতুল্লাহ খোমেনি ইরানের জনগণের উদ্দেশে নতুন ভাষণের ক্যাসেট পাঠালেন। সেই ভাষণে তিনি ইরানিদের রাস্তায় নেমে আসতে ডাক দিলেন। মানুষ নেমে এল পতঙ্গের মতো।

পাহলভি বুঝলেন, তাঁর সামনে পালানো ছাড়া গতি নেই। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহায়তা চাইলেন। কিন্তু আমেরিকা কোনো সাহায্য করতে পারল না। পাহলভি দেশ ছেড়ে আমেরিকায় আশ্রয় নিলেন।

অন্যদিকে ১৪ বছর পর আয়াতুল্লাহ খোমেনি দেশে ফিরলেন। তাঁকে স্বাগত জানাতে তেহরানে ৭০ লাখ লোক জড়ো হয়েছিল। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সময় কোনো নেতাকে স্বাগত জানানোর জন-উপস্থিতির সংখ্যার দিক থেকে এটি এখনো বিশ্বরেকর্ড হয়ে আছে।

ইমাম খোমেনি ইরানে পা রাখতেই ইরানের মাটিতে প্রথমবারের মতো রাজপথে ‘আমেরিকা মুর্দাবাদ’ ‘ইসরায়েল নিপাত যাক’ স্লোগান উচ্চারিত হলো।

খোমেনির বিপ্লবী সরকার তেহরানে মার্কিন দূতাবাসের সব কর্মীকে আটক করল। খোমেনির সমর্থকেরা ঘোষণা করলেন, যতক্ষণ আমেরিকা পাহলভিকে ইরানের হাতে তুলে না দেবে ততক্ষণ এই মার্কিন নাগরিকদের ছাড়া হবে না।

এই ঘটনার পর ইরানের সঙ্গে আমেরিকার শত্রুতা গভীর থেকে গভীরতর হয়ে গেল। এরপর খোমেনি আরব এবং উপসাগরীয় এলাকায় আমেরিকা ও ইসরায়েলের নানা পরিকল্পনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেন।

আগেই বলেছি, সৌদি আরবসহ আজকের আরব বিশ্বের প্রায় সব দেশে যে শাসকেরা রয়েছেন, তাঁদের পূর্বসূরিরা নিজেদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দিয়ে ক্ষমতায় বসেননি।

তাঁদের ব্রিটিশ-আমেরিকান শক্তিগুলো প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আনুগত্যের বিনিময়ে গদিতে বসিয়েছিল। আনুগত্যের সেই লিগ্যাসি এসব আরব নেতাদের মধ্যে এখনো প্রবলভাবে রয়ে গেছে। এ কারণে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কখনোই মুখ খোলেন না।

বাস্তবতা হলো, সৌদি আরবের শাসকদের গদির নিরাপত্তা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এটিকে পশ্চিমারা কাজে লাগাচ্ছে। ওয়াশিংটন চায় সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক খোলাখুলিভাবে স্বাভাবিক হোক।

এতে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানবিরোধী আঞ্চলিক জোট শক্তিশালী করা যাবে। আর সৌদি আরবও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকে নিজের নিরাপত্তার জন্য সহায়ক মনে করছে। এর জন্য সৌদি সরকার বলা যায় সবকিছুই করতে রাজি আছে।

একটা সময় ছিল যখন সৌদি বাদশাহ ফয়সাল ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রশ্নে সোচ্চার ছিলেন।

ফিলিস্তিনিদের পক্ষ নিতে গিয়ে তিনি আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে প্রবল শত্রুতায় জড়িয়েছিলেন। নিজের ভাতিজার গুলিতে বাদশাহ ফয়সালের নিহত হওয়ার পেছনে সিআইএ-মোসাদের হাত ছিল বলেও শোনা যায়।

কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সৌদি রাজপরিবারে শাসকের বদল হয়েছে। সৌদি নীতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে।

নীতির দিক থেকে নজিরবিহীন পরিবর্তন এনেছেন আজকের সৌদি বাদশাহ সালমানের ছেলে মোহাম্মাদ বিন সালমান। সংক্ষেপে অনেকে তাঁকে ‘এমবিএস’ বলেন। তিনি সৌদি আরবকে ‘আধুনিক’ প্রমাণে এক রকম মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

এমবিএস মনে করেন, সৌদি আরবকে আরব বিশ্বের বাইরে, পশ্চিমা বিশ্বেও প্রভাব রাখতে হবে। পশ্চিমের সঙ্গে পশ্চিমা ভাবধারায় তাল মেলাতে হবে।

ক্রিস্টিস নামের একটি নিলামকারী প্রতিষ্ঠান ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর নিউইয়র্কে ‘সালভাতর মুণ্ডি’ নামের একটি পেইন্টিং নিলামে বিক্রি করেছিল।

এটি যিশুখ্রিষ্টের একটি ছবি। এই যিশুর চেহারার সঙ্গে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসার মতো। এটি লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা বলে ধারণা করা হয়।

ছবিটি নিলামে ৪৫০.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়। আজ পর্যন্ত এত দামে কোনো পেইন্টিং বিক্রি হয়নি। আর এত দাম দিয়ে এই ছবিটি কিনে নেন মোহাম্মাদ বিন সালমান।

বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, ‘সালভাতর মুণ্ডি’ এত দাম দিয়ে কেনাটা শুধুমাত্র একটি শিল্প বিনিয়োগ না।

এটি এমবিএসের আন্তর্জাতিক, আধুনিক ও আংশিকভাবে পশ্চিমা ভাবধারার প্রতীকী প্রকাশ। যিশুর ছবি কেনার মধ্যে দিয়ে তিনি খ্রিষ্টিয়ানিটির প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা দিয়েছেন বলেও ধারণা করা হয়।

গত বছরের এপ্রিলে যখন গাজায় ভয়াবহ আক্রমণ চলছিল তখন ১৯ এপ্রিল সৌদি আরবের জেদ্দার কর্নিশ সার্কিটে অনুষ্ঠিত ফর্মুলা১ গ্র্যান্ড প্রি ইভেন্টের অংশ হিসেবে মার্কিন পপ তারকা জেনিফার লোপেজ একটি কনসার্টে পারফর্ম করছিলেন।

ফর্মুলা১ গ্র্যান্ড প্রি ইভেন্টের পরপরই তিন দিনব্যাপী কনসার্ট সিরিজ চলে। এই অনুষ্ঠানে লোপেজ ছাড়াও উশার ও ডিপলোসহ অনেক আন্তর্জাতিক তারকা পারফর্ম করে গেছেন।

এই ধরনের নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে এমবিএস সৌদি সরকারের বিশ্বদর্শন তো বটেই, এমনকি আরব দর্শনেরও খোলনলচে বদলে দিচ্ছেন। তিনি সৌদি অর্থনীতিকে তেল নির্ভরতা থেকে বের করে আনতে চান।

সেখানে বিশ্বমানের শিল্প, প্রযুক্তি খাত যোগ করতে চান। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরানের উত্থান সৌদি নীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে গেছে। ফলে সৌদি এখন ইসরায়েলকে সম্ভাব্য কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখছে।

যেহেতু ইসরায়েলের প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, কৃষি, সাইবার নিরাপত্তা, ও উদ্ভাবনী খাত বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ে।

সেহেতু সৌদি আরব মনে করছে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে এই প্রযুক্তিগত ও বিনিয়োগ সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ প্রকল্প ত্বরান্বিত করা যাবে।

২০১৮ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের সিবিএস টেলিভিশনের প্রোগ্রাম সিক্সটি মিনিটস-এ সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় উপস্থাপক নোরা ও’ডোনেল মোহাম্মাদ বিন সালমানকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনি যে সংস্কারের পথে হাঁটছেন, তা থেকে কেউ কি আপনাকে থামাতে পারবে?’ জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘একমাত্র মৃত্যু আমাকে থামাতে পারবে।’

এমবিএস মনে করেন, ইসরায়েলের বিরোধিতা করলে পশ্চিমের দিক থেকে যে চাপ আসবে তা তাঁর ভিশন-২০৩০-কে বাধাগ্রস্ত করবে। ফলে ফিলিস্তিন নিয়ে তিনি উচ্চবাচ্য করতে চান না। ২০২২ সালে দ্য আটলান্টিক পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমবিএস বলেন, ‘আমরা ইসরায়েলকে শত্রু হিসেবে দেখি না; আমরা দেশটিকে একটি সম্ভাব্য মিত্র হিসেবে দেখি।’

সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য এমবিএস ইতিমধ্যেই কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। যেমন: ইসরায়েলি বিমানগুলোকে সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার করতে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

নেতানিয়াহু যে ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ গড়ার ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে দৃশ্যত সৌদি সরকারের আপত্তি নেই। আর সৌদির আপত্তি না থাকলে আরব জাহানের বাকি শাসকদের আপত্তি জানানো কঠিন।

মার্কিন টিভি উপস্থাপক টাকার কার্লসন সম্প্রতি ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবির সাক্ষাৎকার নেন। সেখানে হাকাবি বলেছেন, বাইবেলে ইহুদিদের জমি ঠিক করাই আছে। তাদের জন্য প্রতিশ্রুত ভূমি রয়েছে। সে কারণে ইসরায়েল যদি মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সীমানা বাড়ায়, এমনকি গোটা মধ্যপ্রাচ্য দখলে নিয়ে নেয়, তা হলেও তো অসুবিধার কিছু দেখি না।

আসলে কার্লসন-হাকাবি সাক্ষাৎকার তাই কেবল এক রাষ্ট্রদূতের দৃষ্টিভঙ্গি নয়; এটি এক বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রকল্পের ইঙ্গিত। সেই প্রকল্পের পথে সবচেয়ে বড় বাধা ইরান। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে এ বাধা ইসরায়েলকে সরাতেই হবে। তার জন্য একযোগে কাজ করবে ‘বিলবোর্ডের বারো ভাইয়া’!

* সারফুদ্দিন আহমেদ, প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-03-04%2F6tyz3prw%2Fbillboard.jpg?rect=49%2C0%2C681%2C454&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গাজায় যখন ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছিল, ঠিক তখন ইসরায়েলের হাইফা ও জেরুজালেমের মতো বড় বড় শহরে এই বিলবোর্ড ওঠে। তেলআবিবের মতো ওয়াশিংটনেও দেখা যায় একই ধরনের বিলবোর্ড। ছবি: রয়টার্স

পাথরের গ্রামে এখন মাঠভরা ফসল, পুকুরভরা মাছ, সব কৃতিত্ব মনিরের by সুমনকুমার দাশ

প্রকাশ ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ দিগন্তজোড়া হলুদ শর্ষে ফুল আর শাকসবজির বাগান। ডানে-বাঁয়ে বাতাসে দোল খাচ্ছে গম, ধান, ভুট্টা গাছের সবুজ পাতারা। খেতঘেঁষা এক ঘরে ওড়াওড়ি করছে কবুতর। পাশেই দুই পুকুরে লাফাচ্ছে মাছ। খামারে হাম্বা হাম্বা করছে গরু। কাছের এক ঘরে উৎপাদিত হচ্ছে জৈব সার।

সমন্বিত আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির এই দৃশ্য দেখা গেছে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রাধানগর গ্রামে। দেশের বৃহত্তম পাথরকোয়ারি ভোলাগঞ্জ–সংলগ্ন এ গ্রামের মানুষ কয়েক বছর আগেও পাথরকেন্দ্রিক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁরা আমন ধান ছাড়া কিছুই চাষ করতেন না। এখন গ্রামটিতে রীতিমতো সবুজের বিপ্লব চলছে। এর নায়ক মো. মনিরুজ্জামান। তাঁর দেখানো পথেই গ্রামের প্রায় সবাই চাষাবাদে এগিয়ে এসেছেন।

৪০ ছুঁই ছুঁই মনিরুজ্জামানের বাড়ি উপজেলার পূর্ব ইসলামপুর ইউনিয়নের কালীবাড়ি গ্রামে। বাড়ির পাশেই পাথরকোয়ারি। আশপাশের অনেকের মতো তিনিও ছিলেন পাথর ব্যবসায়ী। স্থানীয় পাথর কেনার পাশাপাশি তিনি পাথর আমদানিকারকও ছিলেন। ২০১৮ সালে যখন সরকারি নির্দেশনায় কোয়ারির পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে পড়ে, তখন অনেকের মতো তিনিও বেকার হয়ে পড়েন। তাঁর বন্ধুবান্ধব আর পরিচিতজনেরা কাজের আশায় যেতে থাকেন ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে। মনিরুজ্জামান কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না।

ঘরে স্ত্রী আর ছোট তিন সন্তান। তাদের ফেলে রেখে প্রবাসী হওয়ার বিষয়টিও মনিরের মনে সায় দিচ্ছিল না। ওই সময়টাতে একদিন কালীবাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের রাধানগর গ্রামে যান। সেখানে দেখেন, বিঘার পর বিঘা অনাবাদি জমি। এসব জমি চাষাবাদের আওতায় আনার পরিকল্পনা তাৎক্ষণিক তাঁর মাথায় আসে। যেই ভাবা, সেই কাজ। কয়েক দিনের মধ্যে কিছু জমি কিনে আর কিছু জমি বর্গা নিয়ে শুরু করেন চাষাবাদ।

শুরুর দিকটায় রাধানগর গ্রামের বাসিন্দারা মনিরের কাজকে ‘অসাধ্য ও পাগলামি’ বলে মনে করতেন; কিন্তু পরিশ্রম আর একাগ্রতায় অসাধ্য সাধন করেন তিনি। এখন ‘পাথরের পৃথিবী’খ্যাত সীমান্তবর্তী রাধানগর গ্রামে ফোটালেন ফুল, ঘটালেন সবুজের বিপ্লব। স্বপ্ন এখন তাঁর হাতের মুঠোয় বন্দী। স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ পেরিয়ে তিনি এখন চাইছেন, রাধানগর গ্রামটি কৃষিজ আর প্রাণিজ সম্পদের এক আধারে পরিণত করবেন।

শুরুর গল্প

শুরুটা ২০১৯ সালে। রাধানগর গ্রামে তিনি পরিত্যক্ত একটা দোতলা বাড়ি কম দামে কেনেন। আটটি কবুতর কিনে সে বাড়িতে তৈরি করেন খামার। কিছুদিন পর সিলেটের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে কম টাকায় কেনেন মিসরীয় ফাউমি মুরগি। ধীরে ধীরে তাঁর পসার বাড়ে। এরপর কেনেন গ্রামের কিছু অনাবাদি জমি। বর্গাও নেন কিছু পরিত্যক্ত পতিত জমি। সেসব জমিতে ধানের পাশাপাশি শুরু করেন শাকসবজির ফলন।

প্রথম বছরেই সাফল্য আসে। মনিরুজ্জামানের উৎপাদিত শাকসবজি কিনতে পাশের হাটবাজার থেকে পাইকারেরা আসেন। মুখে মুখে সে খবর রটে। চাহিদা বাড়ে তাঁর মুরগি আর সবজির। পরের বছর আরও অনাবাদি জমির ইজারা নেন। সেখানে শর্ষে, গম, ভুট্টা, লালশাক, ঝিঙা, মিষ্টিকুমড়া, লাউ, আলু, খিরা, শসা, সূর্যমুখী, রসুন, পেঁয়াজসহ নানা সবজি ফলান। বস্তার মধ্যে উৎপাদন করেন আদা। এ ছাড়া আমনের পাশাপাশি আউশ ও বোরো ধানের আবাদও করেন। তাঁর হাত ধরে যেন সোনা ফলে। সব চাষেই ধরা দেয় অভাবনীয় সাফল্য।

মনিরকে সাফল্যের নেশায় পেয়ে বসে। কৃষিতে সাফল্য পেয়ে তৈরি করেন গরুর খামার। সেখানেও পান সফলতা। এরপর প্রায় মরা দুটি পুকুর খনন করে মাছের পোনা ছাড়েন। কয়েক মাস যেতেই তাঁর পুকুরজুড়ে লাফালাফি করতে থাকে হাজারো কার্ফু, ব্রিগেড, রুই, কাতলা, তেলাপিয়া, গ্রাস কার্প। মাছ যত লাফায়, মনিরের মুখের হাসি তত চওড়া হয়। এখন তো উপজেলা ছাড়িয়ে জেলায়ও তিনি এক আদর্শ চাষি হিসেবে সুপরিচিত। এরই স্বীকৃতি মেলে ২০২৫ সালে। সেবার তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তাঁকে দিয়েছে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি। সবাইকে ডিঙিয়ে তিনি হয়েছেন প্রথম।

পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু

যেখানেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই সফলতা পেয়েছেন মনির। তিনি বলেন, এখন দুটি পুকুরে তিনি মাছের চাষ করছেন। এসব মাছ পাইকারি দরে ব্যবসায়ীরা এসে কিনে নিয়ে যান। মাছের ব্যবসায় লাভ বেশি। অল্প দামে পোনা কিনে পুকুরে ছেড়ে দিলে পরে বেশি দামে বেচা যায়। এ জন্য কয়েক দিন আগে আরেকটি পরিত্যক্ত পুকুর খনন করেছেন। কিছুদিনের মধ্যে সেখানেও মাছ চাষ শুরু করবেন।

মনির বলেন, তিনি কিছুদিন আগে পুকুরে ১৬ হাজার টাকার মাছের পোনা ছেড়েছিলেন। এরই মধ্যে ওই পোনা কেনার সমপরিমাণ টাকার মাছ বিক্রি করেছেন। পুকুরে আরও এক লাখ টাকার বেশি মাছ আছে। মাছের ব্যবসা লাভজনক হওয়ায় তিনি রেণু পোনা উৎপাদনও শুরু করবেন। এসব রেণু পোনা তাঁর পুকুরে ছাড়ার পাশাপাশি আশপাশের এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির পরিকল্পনাও তাঁর আছে।

বর্তমানে তাঁর খামারে ১০টি গরু আছে। এসব গরুর দুধ আশপাশের এলাকায় বিক্রি হয়। এ ছাড়া বড় পরিসরে ৮ শতাংশ জায়গার মধ্যে একটি খামার তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে আছে। দ্রুতই এখানে আরও গরুর পাশাপাশি ছাগল পালনও শুরু করবেন। এসব গরু, ছাগল পাইকারি দরে বেচবেন।

‘ক্ষেতে-ক্ষেতে ঝরিতেছে’ ফসল

এক বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, রাধানগর গ্রামটি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। ওপাশে ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি। ওই চেরাপুঞ্জির আকাশ আর পাহাড়ের সম্মিলন পেরিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে নৈসর্গিক পরিমণ্ডলে রাধানগর গ্রামের অবস্থান। গ্রামের যেখানে শেষ, এর পরেই মনিরুজ্জামানের কৃষিজমি শুরু।

গ্রামের শেষ সীমানার মেঠো রাস্তায় দাঁড়িয়ে মনিরুজ্জামান দেখান তাঁর কৃষিজমি। জানান, প্রায় ৬০০ শতাংশ জায়গায় তিনি নানা ধরনের ফসল উৎপাদন করছেন। আমন, আউশ ও বোরো ধান চাষের পাশাপাশি অন্তত ২০ প্রজাতির সবজি ফলাচ্ছেন। এক দিনের জন্যও কোনো জমি অনাবাদি রাখছেন না। ধান কাটা শেষ হলেই পরদিন ওই জমিতে শাক কিংবা শসার বীজ ফেলছেন, আবার শর্ষে কাটার পরদিনই বুনছেন অন্য কোনো ফসল। যখন যে কৃষিপণ্য উৎপাদনের সময়, তখনই তিনি সেটিই ফলাচ্ছেন।

পানির তীব্র সংকটের কারণে শুরুর দিকটায় চাষাবাদ খুব মুশকিল ছিল বলে মনিরুজ্জামান জানান। তিনি বলেন, ‘পানি ছাড়া চাষাবাদ কঠিন। রাধানগর গ্রাম থেকে নদীও অনেক দূরে। ২০২৩ সালে সরকারি উদ্যোগে এখানে মাটির নিচ থেকে পানি উত্তোলনের একটি সংযোগ চালু করে। ওই সংযোগ থেকে আটটি সাব-সংযোগ আশপাশের জমিতে নেওয়া হয়। যেহেতু আমার দেখাদেখি এখন অনেকেই পতিত জমি আবাদের আওতায় নিয়ে আসছেন, ফলে এসব চাষিও এখন ওই পানি ব্যবহার করে ফলন ভালোভাবে করতে পারছেন।’

মনির একই জমিতে একসঙ্গে একাধিক ফসল ফলানোর চেষ্টা করছেন। ভুট্টার পাশাপাশি লালশাক করেছেন। এখন এক বিঘা জমিতে ধানের পাশাপাশি একই সঙ্গে কলা গাছও রোপণ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এ ছাড়া আগামীতে কুল ও পেয়ারাসহ নানা ধরনের ফলের আবাদের চিন্তা আছে তাঁর।

আরও যত সফলতা

সবজি, মাছের চাষ বা গরু, কবুতর ও মুরগির খামার ছাড়াও অনেক কাজে সফলতা পেয়েছেন মনির। তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কোম্পানীগঞ্জের সহায়তায় ৩ শতাংশ জায়গায় ভার্মি কম্পোস্ট (জৈব সার) উৎপাদন করছেন। মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহার নিশ্চিত করতেই এক বছর আগে এ উদ্যোগ নেন তিনি।

মনিরুজ্জামান বলেন, গত এক বছরে তিনি চারবার জৈব সার উৎপাদন করেছেন। জমিতে জৈব সার ব্যবহার করায় তাঁর ফলন বেড়েছে। বিষমুক্ত এ সার ব্যবহারের কারণে তাঁর উৎপাদিত শাকসবজি ও কৃষিপণ্যের চাহিদাও পাইকারি ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ ছাড়া নিজের জমিতে ব্যবহারের পর অতিরিক্ত সার তিনি গ্রামের অন্য চাষিদের কাছে বিক্রি করছেন। ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে জৈব সার বিক্রির জন্য তিনি উৎপাদন আরও বাড়াবেন বলে ভাবছেন।

ছোট একটি অটো রাইসমিলও বসিয়েছেন মনির। এখানে ধান থেকে চাল করার পাশাপাশি ভুট্টা, গম, হলুদ, মরিচ ও জিরাগুঁড়া করেন। রাধানগর গ্রামসহ আশপাশের মানুষেরা অল্প টাকায় এ মিল ব্যবহার করেন। এ ছাড়া শর্ষে থেকে তেল করার জন্য ছোট একটি মেশিনও আছে তাঁর। এর বাইরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে ভর্তুকি মূল্যে আধুনিক বেশকিছু কৃষি যন্ত্রপাতি কিনেছেন। কিছু যন্ত্রপাতি সরকারিভাবে বিনা মূল্যে পেয়েছেন। সেসব তিনি গ্রামবাসীকেও ব্যবহার করতে দিচ্ছেন।

আলোর দিশা পেলেন অন্যরাও

রাধানগর গ্রামের একাধিক বাসিন্দা বলেন, মনির এক ফসলি জমিকে একাধিক ফসলি জমিতে রূপ দিয়েছেন। সফলতা আসায় তাঁর দেখাদেখি এখন অন্যরাও চাষাবাদে উৎসাহী হচ্ছেন। বিশেষ করে চলতি বছর গ্রামের অনেকে শর্ষে চাষ করেছেন। শতাধিক চাষি অন্তত ১৫ হাজার শতাংশ জমিতে শর্ষে চাষ করেছেন।

রাধানগর গ্রামের কৃষক মো. ইয়াসিন বলেন, তিনি মনিরুজ্জামানকে দেখে উৎসাহিত হয়ে চলতি বছর পাঁচ বিঘা জমিতে শর্ষে আবাদ করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে ফসল কাটবেন। লাভ হলে আগামীতে আরও বড় পরিসরে শর্ষের পাশাপাশি অন্যান্য সবজি চাষের চিন্তা আছে তাঁর।

মো. এনামুল হক নামের আরেক কৃষক জানান, তিনি ৬০ শতাংশ জমিতে শর্ষে চাষ করেছেন। মনিরুজ্জামানের হাত ধরে কৃষিতে যে সফলতা এসেছে, সেটি এখন রাধানগরসহ আশপাশের গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন অনেকেই পতিত জমিকে আবাদের আওতায় নিয়ে আসছেন।

রাধানগর গ্রামের মানুষ জানলেন, একজন আদর্শ কৃষকের পাশাপাশি মনির সমাজকর্মীও। তাঁদের কয়েকজনের অর্থায়নে স্থানীয়ভাবে একটি মসজিদ পরিচালিত হচ্ছে। বেশ কয়েকটা দুস্থ পরিবারের ভরণপোষণও করছেন তাঁরা কয়েকজন। মনিরুজ্জামান কোম্পানীগঞ্জ টুরিস্ট ক্লাবের সভাপতি। এ ছাড়া সিলেট স্বপ্ন রক্তদান ও সমাজকল্যাণ সংস্থার একজন সদস্য হিসেবে এ পর্যন্ত রক্তদান করেছেন ৪২ বার।

তৈরি করতে চান অ্যাগ্রো রিসোর্ট

আগামী বর্ষার মধ্যে একটি অ্যাগ্রো রিসোর্ট (কৃষি খামার ও পর্যটনের সংমিশ্রণ) তৈরির পরিকল্পনা আছে বলে জানান মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমি নিজের গ্রাম কালীবাড়ি থেকে মোটরসাইকেল চালিয়ে প্রতিদিন সকালে রাধানগরে আসি। দুপুরে বাড়িতে খেতে যাই। পরে বিকেলে আবার আসি। ফিরি সন্ধ্যা সাতটা কিংবা রাত আটটার দিকে। আসলে সীমান্তলাগোয়া এ জায়গার মায়ায় পড়ে গেছি। কী সুন্দর জায়গা!’

মনির বলেন, ‘সামনে তাকালেই মেঘালয়ের সারি সারি সুউচ্চ পাহাড়। বর্ষায় সেই পাহাড়ের চূড়ায় মেঘ ভেসে বেড়ায়। তখন পুরো এলাকাটি অপরূপ সৌন্দর্যে রূপ নেয়। এটি মাথায় রেখেই অ্যাগ্রো রিসোর্ট তৈরি করতে চাই। মানুষ এখানে এসে প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগের পাশাপাশি নির্ভেজাল শাকসবজি, মাছ, মাংস খাবেন। বিশুদ্ধ বাতাসে প্রাণভরে শ্বাস নেবেন। এরই মধ্যে জায়গাও প্রস্তুত করেছি। দ্রুতই রিসোর্ট তৈরির কাজ শুরু করব।’

আক্ষেপহীন সুন্দর জীবন

মনির বলেন, ‘পাথরের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অনেকেই বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। কেন আমি গেলাম না, এ নিয়ে তখন সাময়িক সময়ের জন্য আক্ষেপ ছিল; কিন্তু এখন আর আক্ষেপ নেই। নির্ঝঞ্ঝাট সুন্দর জীবন আমার। প্রাকৃতিক পরিবেশে মনের আনন্দে নিজের কাজ করছি। বিদেশে গেলে অন্যের দোকানে কাজ করতে হতো, এখন আমার এখানে তিনজন শ্রমিক স্থায়ীভাবে কাজ করছেন। প্রতিদিন সাত থেকে আটজন শ্রমিক অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করছেন। অন্যের কর্মসংস্থানের উপলক্ষ আমি হতে পারছি, এর চেয়ে আনন্দের আর কী আছে?’

বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা ভ্রমণ করেছেন জানিয়ে মনির বলেন, ‘দেশ ঘোরা আমার নেশা। প্রতিটি জেলা সফর করেছি। অন্তত ২১টি জেলায় নানা ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদনের বিষয়ে হাতে–কলমে পাঠ নিয়েছি। সেসব আমার চাষাবাদ-পরিকল্পনায় প্রয়োগও করছি। সফলতার এটিও একটি কারণ।’

মনিরুজ্জামানের সাফল্যের প্রশংসা করলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেটের অতিরিক্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ আনিছুজ্জামান। তিনি বলেন, যে এলাকার সবাই কমবেশি পাথরের ব্যবসা কিংবা উত্তেলনের সঙ্গে জড়িত, সেখানে অনাবাদি জমিকে আবাদের আওতায় এনে বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করেছেন মনিরুজ্জামান। পরিত্যক্ত জমিও তিনি চাষাবাদের আওতায় এনেছেন। তাঁর মতো কৃষকই আমাদের আদর্শ। তিনি এখন অনেকেরই অনুপ্রেরণা।

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রাধানগর গ্রামে সারা বছর অনাবাদি জমিতে ফসল ফলান মো. মনিরুজ্জামান
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রাধানগর গ্রামে সারা বছর অনাবাদি জমিতে ফসল ফলান মো. মনিরুজ্জামান। ছবি: আনিস মাহমুদ

ইরান যুদ্ধে আমাদের জড়াতে কে অনুমতি দিল: বন্ধু ট্রাম্পকে আমিরাতের ধনকুবেরের প্রশ্ন by হাসান ফেরদৌস

প্রকাশ ১৪ মার্চ ২০২৬ঃ সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষ ব্যবসায়ী খালাফ আহমদ আল-হাবতুর। হোটেল, বিলাসবহুল ভবন, শিক্ষা ও নির্মাণ খাতে তাঁর বিনিয়োগ ও ব্যবসা বলতে গেলে একচেটিয়া। মোট সম্পদের পরিমাণ ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার বা তার চেয়েও বেশি। তাঁর অন্য পরিচয়, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বন্ধু।

একসময় এই দুজন দুবাইয়ের পাম জুমেইরাতে ‘ট্রাম্প টাওয়ার’ বানানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। নানা পাকচক্রে ফল ফলেনি। তবে দুজনের বন্ধুত্বে ফাটল ধরেনি। ২০১৬ সালে ট্রাম্প যখন প্রথম প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করেন, তখন আল-হাবতুর পত্রিকায় কলাম লিখে মন্তব্য করেছিলেন, ট্রাম্প একজন কর্মবীর।

এই আল-হাবতুর হঠাৎ নিজের এক্স হ্যান্ডেলে ট্রাম্পের উদ্দেশে এক খোলাচিঠি লিখেছেন। হুট করে ইসরায়েলের সঙ্গে আঁতাত করে ট্রাম্প ইরানে হামলা করে বসেছেন। সাত দিন যেতে না যেতে সেই যুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলোর ত্রাহি অবস্থা।

আল-হাবতুর মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে প্রশ্ন রেখেছেন, ‘ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধে আমাদের অঞ্চলকে জড়াতে আপনাকে কে অনুমতি দিয়েছে? কিসের ভিত্তিতে এমন মারাত্মক সিদ্ধান্ত আপনি নিলেন?’

যুদ্ধের আঁচ শুধু আল-হাবতুরের আরব আমিরাতে নয়, আশপাশের দেশগুলোয়ও ছড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তাঁদের সবার রাজত্ব ধসে যেতে পারে। সেই ভয় থেকেই এই চিঠি।

আল-হাবতুর আরও লিখছেন, ‘যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনি কি এর মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব মাথায় রেখেছিলেন? একথা কি আপনি বিবেচনা করেছিলেন, এই যুদ্ধ বিস্তৃত হলে সবার আগে পুড়ে মরবে উপসাগরীয় দেশগুলো? এই অঞ্চলের জনগণের এ কথা জিজ্ঞাসা করার অধিকার রয়েছে, যুদ্ধটা কি আপনার একার সিদ্ধান্ত, নাকি নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকারের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত?’

ট্রাম্প নিজেকে শান্তির মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত করতে ভালোবাসেন, সে লক্ষ্যে সম্প্রতি তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ গঠনের কথাও ঘোষণা করেছেন। কিছুটা উষ্মা, কিছুটা বিদ্রূপের সুরে আল-হাবতুর লিখেছেন, শান্তির নামে যে ‘বোর্ড অব পিস’ তিনি ঘোষণা করলেন, তার কালি শুকানোর আগেই ট্রাম্প কেন এমন এক যুদ্ধ বাঁধিয়ে বসলেন, যে কারণে বিপদে পড়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য। তাহলে সেসব শান্তি উদ্যোগের কী হলো? শান্তির নামে যে অঙ্গীকার তিনি করলেন, তার পরিণতিই–বা কী?

আল- হাবতুর লিখেছেন, যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে প্রকৃত নেতৃত্ব ধরা পড়ে না। তা ধরা পড়ে প্রজ্ঞা, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও শান্তি অন্বেষায়।

কেন এই চিঠি গুরুত্বপূর্ণ

উপসাগরের শাসক বলুন বা ব্যবসায়ী, তাঁরা কেউ-ই ঘুণাক্ষরেও ট্রাম্পের ব্যাপারে মুখ খোলেন না। ব্যবসায়িক স্বার্থ দিয়েই তাঁদের সম্পর্ক নির্ধারিত। এবার সেই স্বার্থে টান পড়েছে বলেই আল-হাবতুর মুখ খুলেছেন। তিনি আরব আমিরাতের কর্তাব্যক্তিদের অতি ঘনিষ্ঠ, তাঁদের সঙ্গে সলাপরামর্শ না করে এমন খোলাচিঠি তিনি লিখবেন, তা ভাবা যায় না।

এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো কী বিপদে পড়বে, তার একটা সরল হিসাব দিয়েছে যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস। তারা জানিয়েছে, চলতি যুদ্ধের ফলে যে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে উপসাগরের কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার কথা ভাবছে।

সেই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে—কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য অনুসারে, এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের বিনিয়োগ চুক্তির যে দায়দায়িত্ব রয়েছে, তা থেকে সরে আসার কথা ভাবছে।

যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, যুদ্ধ বা অন্য বড় কোনো অর্থনৈতিক সংকটের মুখে চুক্তিপত্র পরিবর্তনের আইনসম্মত বিধিব্যবস্থা রয়েছে।

চতুর্মুখী সংকট

শুধু উপসাগর নয়, এই যুদ্ধ বিশ্বের সব দেশের জন্য চার ধরনের হুমকি তৈরি করেছে।

প্রথমত, ইরানের সমুদ্রসীমায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এই করিডর বর্তমানে কার্যত বন্ধ। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় সবচেয়ে বিপদে পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো, যারা এই প্রণালি ব্যবহার করে গ্যাস-তেল রপ্তানি করে থাকে।

কাতার ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, চুক্তির মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের যে অঙ্গীকার তারা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে করেছে, তা রক্ষা করা সম্ভব হবে না। একই কারণে সৌদি আরব তাদের তেল উৎপাদন কমিয়ে এনেছে। এসব কারণে তেলের দাম আগামীতে ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, তেল রপ্তানি বন্ধ বা সীমিত হয়ে এলে চীন, ভারত, জাপানসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ মন্দাবস্থার মুখে পড়বে। এসব দেশ তাদের জ্বালানি প্রয়োজন মেটায় আমদানি করে। এর ফলে মুখ থুবড়ে পড়বে উৎপাদন খাত ও কৃষি। দেখা দেবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, এমনকি বিপ্লব।

তৃতীয়ত, তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভর করে উপসাগরের দেশগুলো তাদের বিশাল জাতীয় সম্পদ তহবিল গড়ে তুলেছে, যার মোট পরিমাণ প্রায় চার লাখ কোটি ডলার। তেল-গ্যাসই যদি রপ্তানি না করা যায়, তাহলে আংশিক হলেও এই জাতীয় তহবিল লিকুইডেট বা গুটিয়ে ফেলতে হতে পারে।

চতুর্থত, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল হিসাব করে বলছে, উপসাগরের চার দেশের জাতীয় সম্পদ তহবিল বিনিয়োগের প্রায় দুই লাখ কোটি ডলার রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। এই তহবিল গুটিয়ে নিলে সেটাও ধাক্কা খাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ধস নামতে পারে পুঁজি বাজারে।

বাণিজ্য শুল্কের কারণে এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, মানুষের দৈনন্দিন ক্রয়ক্ষমতাও কমে আসছে। এসবের প্রভাব যে এ বছর নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে পড়বে, তা একরকম নিশ্চিত।

সত্তর দশকের পুনরাবৃত্তি

ইরান যুদ্ধ নিয়ে যে অর্থনৈতিক সংকট, তা আমাদের সত্তরের দশকের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধকালীন সংকটের কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো ‘তৈল অবরোধ’ঘোষণা করায় জ্বালানি তেলের দাম প্রায় চার গুণ বেড়ে যায়। ফলে একদিকে মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি সারা বিশ্বকে গ্রাস করে।

এ রকম অবস্থাকেই অর্থনীতিবিদেরা ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা মন্দাস্ফীতি নামে অভিহত করে থাকেন। অনেকেই বলছেন, বিশ্ব আবার সেই পথেই হাঁটছে। সত্তর দশকের সেই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বৃহৎ অর্থনীতি তাদের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক বহিঃসম্পর্ক পুনর্গঠন করলেও মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীলতা মোটেই কমাতে পারেনি।

এই সংকট শুধু জ্বালানি তেলের উৎপাদন ও রপ্তানির কারণে নয়। উপসাগরীয় দেশগুলোর আর্থিক পেশিশক্তি এখন বিশ্বের অর্থনীতির প্রধান ধমনি। বিশ্বের প্রতিটি প্রধান বাজারে রয়েছে তাদের বিনিয়োগ। তাতেই যদি আঘাত পড়ে, ছোট–বড় কেউ-ই রেহাই পাবে না।

এ কথা অজানা নয় যে উপসাগরীয় দেশগুলোর শান-শওকতের একটা বড় কারণ বিনিয়োগের নিরাপদ স্থান হিসেবে বিশ্বজুড়ে তাদের ব্যাপারে আস্থা। এই যুদ্ধের ফলে সেই আস্থায় বড় ধাক্কা লাগল। এখন থেকে এই অঞ্চলে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের ব্যাপারে অনেকেই দুইবার ভাববেন।

যুদ্ধ শুরু সহজ, শেষ করা নয়

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর তার গতিপ্রকৃতি কী হবে, আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সে কথা বিবেচনায় এনেছিলেন—সে রকম ভাবার কোনো কারণ নেই। মার্কিন গোয়েন্দারা বলেছিল, যুদ্ধে যাওয়া সহজ হবে, কিন্তু বেরোনো মোটেই সহজ হবে না। মার্কিন গোয়েন্দাদের সে সতর্কতায় কান দেননি ট্রাম্প।

আল-হাবতুর তাঁর খোলাচিঠিতে এই কান না-দেওয়া কতটা ভুল, সে কথাই ধরিয়ে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন, ‘এই যুদ্ধ কার স্বার্থে’। ট্রাম্পের গোঁড়া সমর্থক হিসেবে পরিচিত ভাষ্যকার টাকার কার্লসন মন্তব্য করেছেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে টেনে নিয়ে গেছে, তারা মরবে না। মরবে সাধারণ মানুষ। তারা এই যুদ্ধ চায় না। আগামী নির্বাচনে তাদের সে মনোভাবের প্রতিফলন থাকবে।

ট্রাম্প সে কথা জানেন না, তা নয়। তবে ময়দানে নেমে তিনি ফেঁসে গেছেন। সম্প্রতি ফ্লোরিডায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, যুদ্ধ শেষ হল বলে। আবার এমন কথাও বলেছেন, ‘আমি ইরানের ওপর এমন আঘাত করব যে তাদের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে।’

দেখা যাক, যুদ্ধ কোন দিকে গড়ায়।

আরব আমিরাতে শীর্ষ ব্যবসায়ী খালাফ আহমদ আল-হাবতুর
আরব আমিরাতে শীর্ষ ব্যবসায়ী খালাফ আহমদ আল-হাবতুর। ছবি: রয়টার্স

এপস্টিন নথি: ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কিশোরীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠে এল

প্রকাশ ০৬ মার্চ ২০২৬ঃ যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ গতকাল বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর (এফবিআই) আরও কিছু নথি প্রকাশ করেছে। যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিন–সংক্রান্ত এসব নথিতে এক অজ্ঞাতনামা নারীর সাক্ষাৎকারের সারসংক্ষেপ উল্লেখ করা আছে। তিনি অভিযোগ করেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে কিশোর বয়সে যৌন নিপীড়নের চেষ্টা করেছিলেন।

২০১৯ সালে এফবিআই চারবার ওই নারীর জবানবন্দি নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে দোষী সাব্যস্ত যৌন নিপীড়নকারী জেফরি এপস্টিনের বিরুদ্ধে তদন্তের অংশ হিসেবে ওই জবানবন্দি নেওয়া হয়েছিল।

এর আগে বিচার বিভাগ কেবল জবানবন্দি নেওয়ার কথা নিশ্চিত করে একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। তখন ওই চারটি সাক্ষাৎকারের মধ্যে কেবল একটি সাক্ষাৎকারের সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রকাশ করা হয়েছিল। সেখানে ওই নারী অভিযোগ করেছিলেন, কিশোরী বয়সে এপস্টিন তাঁর ওপর যৌন নিপীড়ন চালিয়েছিলেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার মার্কিন বিচার বিভাগের ওয়েবসাইটে নতুন নথিগুলো প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, ওই নারী দাবি করেছেন, ১৯৮০-এর দশকে নিউইয়র্ক বা নিউজার্সিতে এপস্টিন তাঁকে ট্রাম্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। ওই সময় তাঁর বয়স ছিল ১৩-১৫ বছর। পরে ট্রাম্প তাঁকে জোর করে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করার চেষ্টা করেছিলেন।

এ ব্যাপারে হোয়াইট হাউসের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেছিল রয়টার্স। তবে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া পাওয়া যায়নি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকো খবরটি প্রথম প্রকাশ করেছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট বলেছেন, এই নারীর অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এর কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই।

কিছু নথিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও উসকানিমূলক দাবি থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ। রয়টার্স স্বাধীনভাবে ওই নারীর অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। এফবিআইয়ের নথি থেকে জানা গেছে, সংস্থার কর্মকর্তারা ২০১৯ সালে তাঁর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে লিখেছে, বৃহস্পতিবার যেসব নথি প্রকাশ করা হয়েছে, তা ভুলবশত ‘প্রতিলিপি’ হিসেবে চিহ্নিত করা ১৫টি নথিরই অংশ। ‘প্রতিলিপি’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার কারণে এগুলো আগে প্রকাশ করা হয়নি।

বিচার বিভাগ কংগ্রেসের নজরদারির মধ্যে আছে। কারণ, এপস্টিন তদন্তের নথি প্রকাশ করা তাদের বাধ্যবাধকতা। ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ করে আসছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ট্রাম্প–সম্পর্কিত কিছু নথি লুকাচ্ছে।

ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ট্রাম্প–সম্পর্কিত কিছু নথি লুকাচ্ছে। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের একটি কমিটি অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডিকে সমন পাঠিয়েছে, যাতে আইনপ্রণেতারা জানতে পারেন, সরকার কীভাবে এসব নথি পরিচালনা করছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনার্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনার্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

হাসির আড়ালে কত কিছুই–না লুকিয়ে রাখতে সুমন ভাই...

প্রকাশ ১৮ মার্চ ২০২৬ঃ গতকাল মঙ্গলবার হঠাৎ মৃত্যু হয়েছে অভিনেতা শামস সুমনের। এই অভিনেতার মৃত্যু ঘিরে অভিনয় অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শোকে স্তব্ধ সহকর্মী ও ভক্তরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিচ্ছেন সহশিল্পীরা। স্মৃতিচারণা, শ্রদ্ধা আর চির বিদায়ের বেদনায় ভরে উঠেছে টাইমলাইন। প্রিয় সহকর্মীকে স্মরণ করে কে কী লিখেছেন?

এক সপ্তাহ আগে একসঙ্গে ইফতারের একটি ছবি পোস্ট করে অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয় লিখেছেন, ‘সপ্তাহ খানিক আগে একসঙ্গে ইফতারিটা করেছিলাম। চ্যানেল আইতে তাঁর সঙ্গে কথা হতো না এমন দিন খুবই কমই আছে। মৃত্যুর আগের দুই মাস অনেক গল্প হয়েছে অনেক কিছু জেনেছি তাঁর কাছে। তাঁর যাপিত জীবন সম্পর্কে। তাঁর জীবন অনেক কাছ থেকে দেখেছি। পবিত্র এই দিনে চলে গেলি ভাই। ইনশা আল্লাহ ইনশা আল্লাহ তুই বেহেস্তি।’

একসঙ্গে অনেক কাজ করেছেন। সেই সহকর্মীকে হারিয়ে অভিনেতা গোলাম ফরিদা ছন্দা লিখেছেন, ‘শামস সুমন ভাই এটা কী করে হলো! কিছুতেই মানতে পারছি না! তুমি এভাবে চলে যেতে পারো।’ শামস সুমনের সঙ্গে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে অভিনেত্রী তাহমিনা সুলতানা মৌ লিখেছেন, ‘২০০২/ ২০০৩ সালের কথা। এমনই এক রোজার মাসে ঈদের নাটকের শুটিং চলছিল জাহাজে। আমার সঙ্গে যে কো-আর্টিস্ট ছিল, সে সেটে এসে আমাকে দেখে হঠাৎ করেই শুটিং ছেড়ে চলে যায়। তখন আপনাকে খবর দেওয়া হলো। আপনি স্পিডবোটে করে এসে লঞ্চে উঠলেন এবং একেবারে নতুন এক মেয়ের সঙ্গে অভিনয় করলেন—সেই মেয়েটিই ছিলাম আমি। নতুন কারও সঙ্গে কাজ করতে আপনার কখনো কোনো দ্বিধা ছিল না। বরং সাহস আর ভরসা দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তারপর তো আপনার সঙ্গে আরও কত কাজ, কত স্মৃতি…আজ সেসবই শুধু মনে পড়ছে।’

অভিনেত্রী বিজরী বরকত উল্লাহ লিখেছেন, ‘যে ছিল আমাদের আড্ডার মধ্যমণি। শুটিংয়ের দিনগুলোতে হাসিঠাট্টায় ভরিয়ে রাখত সারাটা দিন। তোমার গল্পে শুটিংয়ের ক্লান্তিদায়ক দিনটি কেটে যেত কত সহজে। কত শত স্মৃতি, কত শত মজার ঘটনা, ঠাট্টা–তামাশা, কত পরিকল্পনা, কত বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তা। তোমার সেই প্রাণ খোলা হাসি। হয়তো তার আড়ালে কত কিছুই–না লুকিয়ে রাখতে। আমরা যারা তোমাকে খুব কাছ থেকে চিনতাম তাদের স্মৃতিতে, হৃদয়ে তোমার হাসিমাখা মুখটি থাকবে চিরজীবন। সুমন ভাই, তোমার অনন্তযাত্রা যেন শান্তিময় হোক।’

প্রিয় সহকর্মীদের হারানোর খবরটা অনেকের কাছেই ছিল অবিশ্বাস্য। শাহনাজ খুশি লিখেছেন, ‘কী শুনলাম? সুমন ভাই, আপনি আর ইহজগতে নাই? এটা আমরা কোন সহকর্মী বিশ্বাস করতে পারছি না! কি অনিশ্চিত এ জীবন? আপনার সব সময়ের হাসিমুখ চোখে রয়ে যাবে সুমন ভাই। অনন্তলোকে আপনি ভালো থাকেন।’

অভিনেতা আনিসুর রহমান মিলনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয় ছিল শামস সুমনের। তাঁর প্রয়াণের কথা শুনে মিলন লিখেছেন, ‘শামস ভাইও চলে গেলেন। ১৯৯৯ সালে প্রথম সুমন ভাইয়ের সঙ্গে কাজ হয় আমার। সেই থেকে তাঁর জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত এক মানুষই ছিলেন, সেই স্নেহ সেই ভালোবাসা সুন্দর পরামর্শ আর হাসিঠাট্টা দিয়ে তাঁর সরব উপস্থিতি জানান দেওয়া। যেখানেই থাকবেন ভালো থাকবেন সুমন ভাই।’

গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা শামস সুমনের মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬১ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। এই অভিনেতার জানাজা আজ বুধবার সকাল ১১টায় চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়।

 শামস সুমন। ছবি: ফেসবুক থেকে
শামস সুমন। ছবি: ফেসবুক থেকে