Monday, March 31, 2025

মার্কিন যুদ্ধবিমান এবং ইরান : ভারত মহাসাগরে কী ঘটতে চলেছে?

পরমাণু চুক্তি নিয়ে মার্কিন ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একটি নতুন সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারত মহাসাগরের ব্রিটিশ দ্বীপ ডিয়েগো গার্সিয়াতে ৪টি ‘স্টিলথ বি-টু স্পিরিট’ বোমারু বিমান পাঠিয়েছে।

এই পদক্ষেপটি ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে সংবাদমাধ্যম এপি এ তথ্য জানায় এবং পাশাপাশি ২৯ মার্চ সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে একই তথ্য পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বি-টু স্টিলথ বোমারু বিমান মার্কিন অস্ত্রাগারের অত্যন্ত শক্তিশালী ও উন্নত বিমানগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই বিমানটি প্রচলিত এবং পারমাণবিক বোমা বহন করতে সক্ষম এবং এটি বিশেষভাবে প্রতিপক্ষের দেশের গভীরে প্রবেশ করে ধ্বংসাত্মক আক্রমণ চালানোর জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এর স্টিলথ প্রযুক্তির কারণে এটি প্রচলিত শনাক্তকরণ ব্যবস্থায় সহজে ধরা পড়ে না, যা বিমানের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়।

ডিয়েগো গার্সিয়াতে মোতায়েন করা বিমানগুলোর মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরান বা তার সমর্থক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারে, কারণ এই বিমানগুলো প্রায় দুই হাজার মাইল দূরে থেকে ইরানকে আঘাত করতে সক্ষম। আর এটি এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যাতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার না করেও বিমানগুলো ব্যবহার করা যায়, ফলে তা ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী বা অন্যান্য আক্রমণের আওতার বাইরেও থাকতে পারে।

ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও খামেনির প্রতিক্রিয়া

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে উদ্দেশ্য করে কঠোর বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইরানকে তার পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি বাতিল করতে হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করতে হবে। ট্রাম্পের এই হুঁশিয়ারির পর ইরানের নেতারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, মার্কিন চাপের কাছে তারা মাথা নত করবে না।

এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে, যুক্তরাষ্ট্রের বি-টু স্টিলথ বোমারু বিমান ইরানের দোরগোড়ায় মোতায়েন করা হয়েছে, যা পরিস্থিতি আরও তীব্র করে তুলছে।

ডিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটিতে যুদ্ধবিমান মোতায়েন

সম্প্রতি, ডিয়েগো গার্সিয়াতে ৩টি যুদ্ধবিমান দেখা গেছে এবং কান পাবলিক ব্রডকাস্টার উল্লেখ করেছে, এগুলো ইরানে আঘাত করার জন্য প্রস্তুত। বিমানগুলো এমন এক স্থানে মোতায়েন করা হয়েছে, যেখানে থেকে তাদের মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের সামরিক ঘাঁটি ছাড়াই ব্যবহার করা সম্ভব। এটি বিমানগুলোকে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে সহায়ক হতে পারে।

বিশ্ব মিডিয়ার রিপোর্ট ও ইরানের প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডেইলি টেলিগ্রাফ এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আরটি নিউজ জানায় যে, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে এই দ্বীপে বি-টু বোম্বার ও সি-সেভেনটিন কার্গো বিমান মোতায়েন করেছে এবং বিমানগুলোর জ্বালানি জোগান দিতে ১৮টি রিফুয়েলিং ট্যাংকারও পাঠানো হয়েছে।

এদিকে, ইরানও মার্কিন এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দেশটির জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা টেলিগ্রাফকে বলেন, যখন সময় ঘনিয়ে আসবে, তখন কোনো পার্থক্য করা হবে না- কোনো মার্কিন, ব্রিটিশ বা তুর্কি ঘাঁটি ব্যবহার করুক, ইরানে হামলার জন্য যে ঘাঁটি ব্যবহার হবে, সেটি লক্ষ্য করেই পাল্টা হামলা হবে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্য পদক্ষেপ

তারও আগে বাইডেন প্রশাসন গত বছর ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে কনভেনশনাল বোমাসহ বি-টু বিমান ব্যবহার করেছিল। বর্তমানে, বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস হ্যারি এস ট্রুম্যান ব্যবহার করে লোহিত সাগর থেকে হুতিদের ওপর আক্রমণ করা হচ্ছে।

আরও উল্লেখযোগ্য যে, বর্তমানে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইউএসএস কার্ল ভিনসন নামক একটি বিমানবাহী রণতরী মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে, যা পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করতে পারে।

মার্কিন যুদ্ধবিমান ডিয়েগো গার্সিয়াতে মোতায়েন এবং ইরানকে লক্ষ্য করে সামরিক প্রস্তুতির এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন বিপর্যয়ের ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে। এটি শুধু ইরানকে নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থির করে তুলবে এবং এই সংকটের ভবিষ্যৎ পরিণতি পুরো বিশ্বকে উদ্বিগ্ন রাখবে।

ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ভারত মহাসাগরের ব্রিটিশ দ্বীপ ডিয়েগো গার্সিয়াতে ৪টি ‘স্টিলথ বি-টু স্পিরিট’ বোমারু বিমান পাঠিয়েছে। ছবি : সংগৃহীত
ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ভারত মহাসাগরের ব্রিটিশ দ্বীপ ডিয়েগো গার্সিয়াতে ৪টি ‘স্টিলথ বি-টু স্পিরিট’ বোমারু বিমান পাঠিয়েছে। ছবি : সংগৃহীত

মোগল আমলে যেমন ছিল ঢাকার ঈদ by সাদিয়া মাহ্‌জাবীন ইমাম

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর থেকে প্রকাশিত একটি পোস্টকার্ডে দেখা যায়, সতেরো শতকের শুরুতে নায়েব নাজিমদের ঈদ উদ্‌যাপন, ঈদ মিছিলের দৃশ্য। সেখানে তৎকালীন ঢাকার প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র চকবাজার, বড় কাটরার ফটক ও মীর জুমলার কামান ‘বিবি মরিয়ম’ দৃশ্যমান।

ছবির সেই ঈদের মিছিলটি নিমতলী প্রাসাদ থেকে বের হয়ে হোসেনি দালান, বেগমবাজার, চকবাজার ঘুরে আবার নিমতলীতে গিয়ে শেষ হয়। জলরঙে আঁকা শিল্পী আলম মুসাওয়ারের এসব চিত্রকলায় ধরা আছে শত শত বছর ধরে পুরান ঢাকায় মোগল ঐতিহ্যের পরম্পরার কথা।

একই সময়ের মোগল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রের একটি দৃশ্য দেখা যাক। হাতি এনে বসানো হলো বাদশাহর সামনে। পাশে হাওদায় রাখা রত্নখচিত শৈল্পিক কেদারায় বসলেন বাদশাহ। কেদারা তুলে দেওয়া হলো হাতির পিঠে। হাতিযোগে বাদশাহ আর পদযোগে রাজকর্মচারীরা চললেন দিল্লির ঈদগাহ অভিমুখে নামাজ পড়তে। মোগল আমলের শেষ দিকের ঈদ মিছিলের এমন বর্ণনা পাওয়া যাবে মুন্সি ফাইজুদ্দিনের ‘বাজম-ই আখির’ নামের লেখা উর্দু কাব্যগ্রন্থে। সতেরো শতকে লেখা হয় এই কাব্যগ্রন্থ।

মূলত মোগলদের ঈদের দুই ধারার বর্ণনা পাওয়া যায়। রাজ্য বিজয়ের জন্য যখন ঘোড়ার খুরের সঙ্গে পথে পথে ছন্দ মেলাতে হতো অথবা শত্রুর আক্রমণ থেকে পালিয়ে বাঁচতে হতো, তখন ঈদের উৎসব হতো না। কিন্তু যখন ঈদ উৎসব করতে চেয়েছেন, তখন তা হয়েছে শত শত বছর পরও স্মরণ করার মতোই জাঁকজমকপূর্ণ ইতিহাস। তবে এর সবই ছিল মোগল বাদশাহ, সুবেদার ও বিত্তবানদের জন্য। সাধারণ মানুষের জীবনে সে প্রভাব কমই পড়েছে মোগল আমলে। হোক দিল্লিতে অথবা ঢাকায়।

ঈদ গণমানুষের উৎসব ও অংশগ্রহণের হয়েছে ব্রিটিশ শাসন শেষ হওয়ার পর। তখন পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে আবার ফিরে এসেছে মোগলরীতির ঈদ ঐতিহ্য। গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের পুরান ঢাকার ঈদে ছিল সেই ছাপ, যা এখনো বর্তমান এখানকার প্রবীণদের শৈশবস্মৃতিতে। এক মাস সিয়াম সাধনার পর রোজার ঈদের দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতো চাঁদ দেখা দিয়ে।

একই চাঁদ দিল্লি আর ঢাকার আকাশে

দিল্লির লালকেল্লায় চাঁদ দেখার খবর সম্রাটের কানে পৌঁছানোর পর ‘নাকাখানা’ থেকে তোপধ্বনি করার মাধ্যমে তা জানিয়ে দেওয়া হতো শহরবাসীকে। তবে চাঁদটি যে কেল্লা থেকে দেখা যাবেই, এমন নিশ্চয়তা ছিল না। তাই মোগল বাদশাহরা নিশ্চিত হতে ঘোড়সওয়ার পাঠিয়ে দিতেন শহরের নানা দিকে। অশ্বারোহীরা দূরে দূরে বিভিন্ন টিলায় উঠে যেতেন চাঁদ দেখতে।

সত্যি চাঁদ দেখা গেছে কি না, এ জন্য আবার কাজিকে সাক্ষী মানতে হতো। সেই হুলুস্থুল ব্যাপার ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়েছে ক্ষমতার পালাবদলে। একসময় খোদ বাহাদুর শাহ জাফরকে ঈদের নামাজ আদায় করতে হয়েছে ইংরেজ শাসকদের নজরদারিতে। তবে মোগল বাদশাহর মতো এত জাঁকজমক না থাকলেও পুরান ঢাকার বিত্তবানদের শখও কম ছিল না চাঁদ দেখা নিয়ে।

এই আয়োজনের বর্ণনা পাওয়া যায় ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত হেকিম হাবীবুর রাহমানের ‘ঢাকা পাচাস বারাস পাহ্লে’ গ্রন্থে। তিনি বলেছেন, ‘অতি শৌখিন লোকেরা নৌকার সাহায্যে মধ্য নদীতে গিয়ে চাঁদ দেখতেন। কিশোর ও যুবক সবাই যেত। বিশেষ করে বৃদ্ধ বয়সী লোকেরা নিজের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করার জন্য অবশ্যই যেতেন...অবশেষে চাঁদ দেখা গেল। বন্দুকের গুলি ছোড়া হলো। তোপধ্বনি করা হলো। এমন সরব হলো যে বধিরও জানতে পারল যে চাঁদ উঠেছে।’

এ বর্ণনা ১৯৪৫ সালের আগের ঢাকার। কিন্তু এখন আর চাঁদ দেখতে না যেতে হয় ঘোড়া নিয়ে দূরের টিলায়, না যেতে হয় বুড়িগঙ্গায়। দিল্লি বা ঢাকা সব জায়গাতেই চাঁদ উঠলে দেখতে পারে সবাই। তবু কিন্তু চাঁদ দেখা গেল কি গেল না, তা নিয়ে উন্মাদনার কমতি ঘটেনি এখনো।

মোগল রীতির প্রভাবের একটি বড় উদাহরণ স্থাপত্য, যার সাক্ষী হয়ে আছে এ অঞ্চলের কয়েকটি শাহি ঈদগাহ। যেখানে ঈদের নামাজ আদায় করতে যাওয়াই ঈদের সকালের প্রথম আনুষ্ঠানিকতা।

স্থাপনায় মোগল ইতিহাস

ঢাকার প্রথম শাহি ঈদগাহ নির্মাণের সময় বহু আগের। বাংলা মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে আসার ৪৪ বছর পর ১৬৪০ সালে। সম্রাট শাহজাহানের ছেলে শাহ সুজার প্রধান অমাত্য মীর কাশিম নির্মাণ করেছিলেন বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত পুরাকীর্তি ধানমন্ডির ঈদগাহটি। এখানে একসময় অনুষ্ঠিত ঈদের প্রধান জামাতে আসতেন সুবা বাংলার সুবাদার, নায়েবে নাজিম ও তাঁদের পরিষদেরা। সাধারণ মানুষ এই মসজিদে নামাজ আদায়ের সুযোগ পেয়েছেন অনেক পরে।

৩০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেটের শাহি ঈদগাহটিও মোগল আমলের। সপ্তদশ শতকের গোড়ার দিকে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে এই ঈদগাহ নির্মিত হয়েছিল। ওই সময় সিলেটের ফৌজদার ছিলেন ফরহাদ খাঁ। তাঁরই তত্ত্বাবধানে ঈদগাহ নির্মিত হয় বলে জানা যায়। পরে অনেক রকম পরিবর্তন হয়েছে, তবে মূল স্থাপত্য নকশা আছে সেই সুপ্রাচীন আদলেই। ফলে এই ঈদগাহও মোগল স্থাপত্যের নিদর্শন। সাধারণ মানুষের জীবনে সে আমলে ঈদের উৎসবের কথা সেভাবে জানা না গেলেও মোগলদের তৈরি বিভিন্ন স্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঈদের স্মৃতি।

আরেকটি ছিল ঈদ মিছিল। তখন রাজনির্দেশেই আয়োজিত হতো ঈদের মিছিল। যার অনুকরণে ঢাকায়ও হয়েছে মিছিল, যার উদাহরণ রয়েছে পোস্টকার্ডে।

ঈদ মিছিলের আয়োজন

মুহম্মদ সাকি মুস্তক খান ও মির্জা মুহম্মদ কাজিম প্রণীত ‘মসির ই আলমগিরি’ নামে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের জীবনীতে উল্লেখ পাওয়া যায়, তাঁর অধিকাংশ বিজয় রোজার মাসে হয়েছে। প্রথম দিকে তাই এ মাসে শুরু হয়েছিল উদ্‌যাপন। সংযমের মাস বিবেচনায় পরে উৎসব সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ঈদের দিন সকাল থেকে পরবর্তী ১০ দিন পর্যন্ত।

মোগল আমলের শেষ দিকের ঈদ বর্ণনা স্থান পেয়েছে ‘বাজম-ই আখির’ বইতে। বইটি উর্দু থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ভারতের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও স্থাপত্য নিয়ে গবেষণা করা প্রখ্যাত লেখক রানা সাফভি। রানা সাফভির ‘হাউ দ্য বাদশাহস অব দিল্লি সেলিব্রেটেড ঈদ ডিউরিং দ্য ফাইনাল ইয়ারস অব দ্য মোগল এম্পায়ার’ প্রবন্ধে উল্লেখ পাওয়া যায়, ঈদ মিছিলের কথা। সেখানে উল্লেখ আছে বাহাদুর শাহ জাফর হাতির পিঠে ওঠার জন্য কেদারায় বসার পর তাঁর পাশে বসলেন বাদশাহর ছেলেরা। ঈদগাহ অভিমুখে ঈদের প্রথম জামাত আদায়ের সে যাত্রাই হতো ঈদ মিছিল। মোগল আমলের এই ঐতিহ্য ঢাকা শহরেও এসেছে মোগল আমলেই। প্রসঙ্গত, ঢাকার চকবাজারের শাহি মসজিদ আর দিল্লির জামা মসজিদের নির্মাণকালের মধ্যে ব্যবধান মাত্র ৩০ বছরের মতো।

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর থেকে প্রকাশিত পোস্টকার্ডে সতেরো শতকের শুরুতে নায়েব নাজিমদের ঈদ উৎসব উদ্‌যাপন, ঈদ মিছিলের দৃশ্য আমরা আগেই বর্ণনা করেছি। তবে তখনো ঈদ শুধু বিত্তবানদের। রাজধানী ঢাকাতে সবাইকে নিয়ে ঈদ মিছিলের জমকালো আয়োজন আবার শুরু হয় দেশভাগের পর পাকিস্তান আমলে। তবে সে মিছিল থেকে সামাজিক সচেতনতা, প্রশাসকদের ব্যর্থতা নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপের কথাও উঠে আসে। ফলে ঈদ মিছিল অনেকটা জড়িয়ে ছিল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের সেই ঈদ মিছিলের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে ঢাকা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আজিম বখশ প্রথম আলোকে বললেন, ঈদের নামাজের ক্ষেত্রে ভাগ ছিল তখনো। আহলে হাদিসের অনুসারীরা ঈদের জামাত পড়তে যেতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে। পুরান ঢাকার ঈদগাহতে নামাজ শেষে এলাকার বিশিষ্টজনেরা যেতেন পঞ্চায়েত সরদারের বাড়িতে। তখন নারীরা ঈদের নামাজ বাড়িতেই পড়তেন।

খাবারে মোগল প্রভাব

উর্দু রোডের বাসিন্দা লেখক হুমায়রা হুমা প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘সুপারি কাটার সরতা দিয়ে চিকন করে কেটে রাখা হয় খুরমা। সেটা ভিজিয়ে রাখা হয় দুধের মধ্যে। বাড়ির মা-খালা, স্ত্রী কাজটি আগের রাতে করে রাখেন। পুরুষেরা সেই খাবার মুখে দিয়ে যান নামাজ পড়তে। এই প্রচলন বহুকালের।’

ঈদ উৎসবের মোগল ঐতিহ্যের অনেক কিছু হারিয়েছে এভাবে। তবু রয়েছে রসনাবিলাসের পরম্পরা। মোরগ পোলাও থেকে কাচ্চি বিরিয়ানি, কোরমা থেকে কোপ্তা—এর সবকিছুতে মোগলদের রসুইঘরের মতো পেস্তাবাদাম, দুধ, ঘি, জাফরানের ব্যবহার প্রাধান্য পায় পুরান ঢাকার ঈদের রান্নায়।

উর্দু রোড, আগামসি লেন, বংশালসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন মহল্লার পুরুষেরা ঈদের সকালে নামাজ পড়তে যান দুধে ভেজানো খোরমা খেয়ে। এর নাম শির খোরমা। কোনো কোনো বাড়িতে সকালেই হয় দুধ সেমাই, জর্দা, লাচ্ছা সেমাই। ফিরে এসে খান পোলাও বা খিচুড়ির সঙ্গে নানা পদের মাংস। এই মিষ্টি মুখে দিয়ে নামাজে যাওয়া মোগল আমলের পরম্পরা।

বংশালের কয়েকজন ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা বললেন, তাঁদের ছোটবেলায় ঘরে পিতলের তৈরি সেমাইয়ের কল দিয়ে সেমাই বানানো হতো। এর নাম ছিল চুটকি। সেটাই রান্না করা হতো ঈদের দিন সকালে। পানি ঠান্ডা করার কায়দা ছিল কর্পূর, ফিটকিরি। ঈদের রান্নার মসলা করে রাখা হতো আগের রাতে। এখন এসব কল্পনা মনে হয়। সময় কোথায় মানুষের!

বংশালের এই বাসিন্দাদের অনেকের সন্তান এখন থাকেন বর্ধিত ঢাকায়। তাঁরা ঈদের দিন বংশালের বাড়িতে যান। তবে ঐতিহ্য রক্ষার বাধ্যবাধকতা নেই তাঁদের দ্রুতগতির জীবনে। এখানকার বাসিন্দারা অভিযোগ করলেন, পুরান ঢাকার ঐতিহ্য বলে অনেক কিছু চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে এখন, যা আদতে পুরান ঢাকার নয়। যেমন চকবাজারের ইফতারের আইটেমের নাম বলে অনেক কিছু বিক্রি হয়। কিন্তু একসময় মানুষ কি কেনা খাবারের ওপর নির্ভরশীল ছিল?

ইতিহাসবিদ ও গবেষক হাশেম সূফী প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঢাকার ঐতিহ্য হাজার বছরের পুরোনো হলেও বর্তমান পুরোনো ঢাকার ঐতিহ্য মোগল আমল থেকে। সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন শুরু হয়েছে পাকিস্তান আমলের শেষ সময় থেকে। এ সময় রেস্তোরাঁয় খাওয়ার প্রচলন শুরু হয়। এরপর বাংলাদেশের জন্মের অনেক পরে শুরু হয় হোটেলে বসে ইফতারের সুযোগ।’

ঢাকার নবাবদের আয়োজনে হতো বাহারি ঘোড়দৌড়। ঈদ উৎসব তখনও আমজনতার হয়নি
ঢাকার নবাবদের আয়োজনে হতো বাহারি ঘোড়দৌড়। ঈদ উৎসব তখনও আমজনতার হয়নি। ছবি: সংগৃহীত

ঈদের দিনেও গাজায় হামলা, নিহত কমপক্ষে ৬৪

পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিনেও গাজায় ভয়াবহ হামলা করেছে ইসরাইল। এতে কমপক্ষে ৬৪ জন নিহত হয়েছেন। তার মধ্যে বেশির ভাগই শিশু। প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি উদ্ধার করেছে আটজন স্বাস্থ্যকর্মীর মৃতদেহ, ৫ জন বেসামরিক প্রতিরক্ষাকর্মী এবং জাতিসংঘের একজন কর্মীর মৃতদেহ। এক সপ্তাহ আগে গাজার দক্ষিণে রাফা সীমান্তের কাছে ইসরাইলি হামলার শিকার হয় তাতে বহনকারী গাড়ি। এই হত্যার কড়া নিন্দা জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস এবং রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। তারা বলেছে, ২০১৭ সালের পর বিশ্বের একটি একক ঘটনায় এটাই তাদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি।
mzamin

পঞ্চান্ন বছর আগের ‘ঝিনুক’ ঈদসংখ্যা by হোসাইন মোহাম্মদ জাকি

৩০ নভেম্বর ১৯৭০। পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন। ঈদ উপলক্ষে ‘ঝিনুক’ ঈদসংখ্যা ডিসেম্বর ১৯৭০ প্রকাশিত হয়। ‘ঝিনুক’ ঈদসংখ্যায় প্রধান কার্যালয় হিসেবে ২ নন্দলাল দত্ত লেন, লক্ষ্মীবাজার, ঢাকা-১ এবং চট্টগ্রাম কার্যালয় হিসেবে কাজীর দেউড়ী  সেকেন্ড লেন, চট্টগ্রাম-এর কথা উল্লেখ রয়েছে। ১৯৬৬ সালের নভেম্বরে চলচ্চিত্র-সাহিত্য পত্রিকা ‘ঝিনুক’ এর যাত্রা। ঈদসংখ্যাটি ছিল ১ম বর্ষ, ১১শ/১২শ’ সংখ্যা। আসিরুদ্দীন আহমদ ছিলেন পত্রিকার সম্পাদক। পত্রিকাটি শামিম প্রিন্টিং ওয়ার্কস, ২ নন্দলাল দত্ত লেন, ঢাকা-১ থেকে আসিরুদ্দীন আহমদ কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত হতো। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গ্রাহকদের জন্য ২৮৮ পৃষ্ঠার ঈদসংখ্যার মূল্য ধার্য করা হয়েছিল দুই টাকা পঞ্চাশ পয়সা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য তিন টাকা।

১২ নভেম্বর ১৯৭০ সালে সংঘটিত হওয়া বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সাইক্লোনের ক্ষত তখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি ভোলার আপামর জনতা। তাইতো পত্রিকার শুরুতেই ‘আমাদের কথা’ শিরোনামে পুরো পৃষ্ঠা নিয়ে  লেখা ছিল, ‘যার কেউ নেই, কিছু নেই, আপনি কি পারেন না তার কেউ হতে, তাকে কিছু দিতে? সর্বহারাদের সাহায্যে আপনার সাধ্যানুযায়ী দান আরো দানের অংকের সাথে  যোগ হয়ে বিরাট আকার ধারণ করতে পারে। আপনার বাহুল্য ব্যয় সাময়িকভাবে পরিহার করলে কিছু আসবে যাবে না, কিন' ঐ অর্থ দ্বারা অন্তত একজন দুর্গত মানুষের অশেষ উপকার হবে। আপনার দৈনন্দিন ব্যয়-বরাদ্দ  থেকে কিছু হলেও বাঁচিয়ে তা দুস' মানবতার  সেবায় নিয়োজিত করুন। দক্ষিণ বঙ্গের উপকূলবর্তী সহায়-সম্বলহীন মানুষের জন্য মুক্তহস্তে দান করুন।’

ঈদ সংখ্যাটিতে মোট ৩১টি সাদাকালো ও রঙিন বিজ্ঞাপন স'ান পেয়েছে। পূর্ণ, অর্ধ ও সিকি পৃষ্ঠা জুড়ে ছিল এসব বিজ্ঞাপন। তন্মধ্যে ছিল ‘মায়ার বাঁধন’, ‘বাংলার বধূ’, ‘বড় বউ’, ‘চৌধুরী বাড়ি’, ‘প্রিয়তমেষু’, ‘সামনের পৃথিবী’, ‘পলাশের রং’, ‘জল ছবি’, ‘কাঁচ কাটা হীরে’ ও ‘দীপ নেভে নাই’ চলচ্চিত্র এবং বেঙ্গল মোশান পিকচার্স স্টুডিওজ লিঃ-এর বিজ্ঞাপন। এসব বিজ্ঞাপন  দেখে সিনেমা শিল্পের জনপ্রিয়তা তখন কতোটা তুঙ্গে ছিল, তা বেশ অনুমান করা যায়। পাশাপাশি অনুধাবন করা যায়, কতোটা সুন্দর ও রুচিশীল নামের ছায়াছবি নির্মিত হয়েছিল সত্তর দশকে। তবে ষাটের দশকেই রচিত হয়েছিল সুন্দর সত্তরের ভিত্তি। আশির দশকেও তা বিরাজ করেছে। সত্তর দশকের ছবি শিখিয়েছে পারিবারিক মূল্যবোধ,  শ্রেণিবৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা এবং সাহিত্যভিত্তিক ছবির গুরুত্বসহ আরও নানা দিক। ‘মায়ার বাঁধন’ এবং ‘বাংলার বধূ’ চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠাংশে ছিলেন শাবানা-উজ্জ্বল। ‘চৌধুরী বাড়ি’ ও ‘প্রিয়তমেষু’ চলচ্চিত্রের  শ্রেষ্ঠাংশে ছিলেন শাবানা-রাজ্জাক। এ ছাড়া রাজ্জাক-কবরী, ফারুক-কবরী, সুচন্দা-আজিম ছিলেন সেসময়ের বেশ জনপ্রিয় জুটি।

ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত পশ্চিম পাকিস্তান সংশ্লিষ্ট দু’টি বিজ্ঞাপন ছিল চোখে পড়ার মতো। একটি সেন্ট্রাল ডাইরেক্টরেট অব ন্যাশনাল  সেভিংস ইসলামাবাদ কর্তৃক প্রচারিত ‘প্রাইজ বন্ডস’ এবং অপরটি কেন্দ্রীয় জাতীয় সঞ্চয় দপ্তর ইসলামাবাদ কর্তৃক প্রচারিত ‘ডিফেন্স  সেভিংস সার্টিফিকেটস’। এ ছাড়া লালবাগ  কেমিক্যাল এন্ড পারফিউমারী ওয়ার্কস-এর লক্ষ্মীবিলাস ভেষজ কেশ তৈল, এলিট  কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের এলিট পেইন্ট, ইস্টার্ন ফেডারেল ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স কোং লিঃ, দি গ্রেট ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড এবং তিতাস গ্যাস-এর বিজ্ঞাপন ছিল উল্লেখযোগ্য। সাইক্লোন আক্রান্ত মানুষের জন্য পূর্ব পাকিস্তান শিল্পোন্নয়ন কর্পোরেশন-এর বিজ্ঞাপনের ভাষা পূর্ণতা পায় এভাবে, ‘গগনবিদারী শোকের পাথার কাঁপায় নিখিল ধরা/ভাষাও আজিকে মৌন নীরব হৃদয় আকুল করা!’ এতো গেল বিজ্ঞাপনের আলাপ। এবার প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র বিষয়ে পর্যালোচনা।

রূপ ও বাণীর প্রথম চিত্রার্ঘ্য ‘দীপ নেভে নাই’ ছবির নায়িকা কবরী ও নায়করাজ রাজ্জাককে নিয়ে ছিল ঈদসংখ্যার প্রচ্ছদ বিন্যাস। যা আমাদের অনেকের নিকট এখন অবিশ্বাস্য বলে মনে হবে। কারণ প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে আমাদের বিনোদনের ধারা বদলে গেছে। বিনোদন মাধ্যম বলতে আজ আমরা বুঝি ওটিটি, ইউটিউব, স্পটিফাইয়ের মতো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফরম। টেলিভিশন চ্যানেলও বুঝি পুরনো হয়ে গেছে। অথচ বেশিদিন আগের কথা না, সিনেমা প্রচারের অন্যতম মাধ্যম ছিল  রেডিও। ঘরে ঘরে তখনো টিভি এসে  পৌঁছেনি। দুই ব্যান্ডের রেডিও ছিল কিছু মানুষের হাতে। কখনো বা সেথায় দুই বা ততোধিক শ্রোতাও থাকতো। সেই রেডিওর প্রধান আকর্ষণ ছিল মুক্তি আসন্ন সিনেমার প্রচারণা। শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে এই বিজ্ঞাপন শুনতো। বিজ্ঞাপনে কণ্ঠ দিয়ে নাজমুল হুসাইন এবং মাজহারুল ইসলাম নামের দু’জন তো একপ্রকার তারকা খ্যাতিই অর্জন করে ফেলেছিলেন। স্বাধীন বাংলা  বেতারকেন্দ্রের শিল্পী ছিলেন নাজমুল হুসাইন। হ্যাঁ ভাই, আসিতেছে... আসিতেছে... আগামী শুক্রবার ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন  প্রেক্ষাগৃহে...। ঈদ মানেই ছিল তখন নতুন সিনেমা। টিকিট ব্ল্যাক হওয়া ছিল সাধারণ বিষয়। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে ঈদ উপলক্ষে ‘দীপ নেভে নাই’ চলচ্চিত্রটি একযোগে শুভ মুক্তি পেয়েছিল ঢাকার বলাকা, মধুমিতা, স্টার, নিশাত, আনারকলি ও রাণীমহল, নারায়ণগঞ্জের গুলশান, চট্টগ্রামের আলমাস, খুলনার চিত্রালী ও পিকচার প্যালেস এবং বগুড়ার উত্তরায়। প্রযোজক ও পরিচালনায় ছিলেন ‘মিতা’ এবং সংগীতে ছিলেন ‘সত্য সাহা’। পরিণত বয়সীরা দল  বেঁধে যেতেন সিনেমা হলগুলোতে। ঈদ উপলক্ষে রাতব্যাপী বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যবস'া হতো, যা খ্যাত ছিল ‘ফুল-সিরিয়াল’ হিসেবে।

সিনেমা হলে ছবি দেখা নিয়ে কি উন্মাদনাই না ছিল সেকালে! হলগুলোতে নতুন চলচ্চিত্র মুক্তি পেলে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তা ফলাও করে জানান দেয়া হতো। ২৮ মার্চ ১৯৬৫ সালে দৈনিক আজাদ-এর শিরোনাম ছিল, ‘মহানগরের টিকিট ক্রয়ের জন্য নজিরবিহীন ভিড়, জনতার উপর পুলিশের লাঠিচার্জের ফলে ১৪১ জন আহত’। রাষ্ট্রপ্রধান একে ফজলুল হক বন্ধু-বান্ধব নিয়ে নিয়মিত সিনেমা হলে গিয়ে মুভি দেখতেন। শুধু তাই নয়, দাপ্তরিক প্যাডে সেই মুভি (পুকার) সম্পর্কে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত মতামত প্রকাশ এবং প্রশংসা (২৬.০১.১৯৪০) করেছেন অকুণ্ঠ চিত্তে।  সেসময় নারীদের বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল এই সিনেমা হল। এ বিষয়ে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন একান্ত সাক্ষাৎকারে জানান, “সিনেমা হলে তখন  মেনে চলা হতো কঠোর পর্দা প্রথা। সিনেমা হল থেকে রাস্তা পর্যন্ত দুইদিকে কালো পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখা হতো। সিনেমা শুরু হওয়ার পর হল অন্ধকারাচ্ছন্ন হওয়ার পরেই কেবল পর্দা সরিয়ে ফেলা হতো। নারীদের জন্য আসন ব্যবস'া ছিল পুরুষদের থেকে একেবারেই পৃথক। বিরতির সময় ঝি’রা (গৃহকর্মী) হাতে করে নিয়ে আসতো শাহী শরবতের গ্লাস, ফল বা বেকারী সামগ্রী। যারা এসব পাঠাতো তারা নাম বলে দিতেন। ঝি চড়া গলায় বলতো, কেঠা রহিমন নেছা আছো, কেঠা ভুবনেশ্বরী দাশ... দেখা যেতো রহিমন নেছা শরবত যখন খেয়ে সেরেছে, তখন দেখা গেল আরও একজন ছিল ঐ নামের। শরবতের মালিক ছিল সে।” তরুণ-তরুণীদের হাঁটাচলা এমনকি পোশাকেও ছিল চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকাদের প্রতিচ্ছবি। নায়ক জাফর ইকবাল আর রাজ্জাক স্টাইলের ডিভাইডার প্যান্ট আর চুলগুলো আঁচড়ে এক পাশ করে রাখা, নায়িকা ববিতার মতো প্যাঁচিয়ে শাড়ি পরা আর সুচন্দার মতো গালে তিল আঁকা-এসবই ছিল সেকালের সিনে সংস্কৃতির সামাজিক বাস্তবতা।
প্রযোজক-পরিচালক মুস্তাফিজ-এর সাক্ষাৎকারের জবাবে ‘আলোচনা প্রসঙ্গে’ শিরোনামে জহির রায়হানের একটি অমূ্‌ল্য নিবন্ধ সংযুক্ত হয়েছে সূচিপত্রের প্রারম্ভেই। এই নিবন্ধ সেকালের চলচ্চিত্র পরিচালকদের সম্পর্কে অনেক মূল্যবান ও অজানা তথ্য জানার সুযোগ করে দিয়েছে। জহির রায়হান লিখেছেন, “এদেশে চলচ্চিত্র শিল্পের জনক আব্দুল জব্বার খান নিজে একজন নাট্যকার। এদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে, বিশেষ করে মঞ্চের সঙ্গে দীর্ঘদিন তিনি জড়িত ছিলেন। পরিচালক ফতেহ লোহানী, মহীউদ্দিন, সালাহউদ্দীন এঁরা উচ্চশিক্ষিত-প্রত্যেকের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে একটি বিশেষ অবদান আছে। ফতেহ লোহানী ছবি পরিচালনার আগে সাহিত্যিক ও সাংবাদিক হিসেবে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। পরিচালক মহীউদ্দিন দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করেছেন এবং চলচ্চিত্রে  যোগদানের আগে রেডিও পাকিস্তানের  প্রোগ্রাম প্রোডিউসার হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। পরিচালক সালাহউদ্দীন বামপনি' রাজনৈতিক আন্দোলনে বিশিষ্ট ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন এবং এদেশের নাট্যশিল্পের সঙ্গে তাঁর সক্রিয়  যোগাযোগ ছিল। এদেশের চলচ্চিত্র-শিল্পের সূচনাতে উপরোল্লিখিত ব্যক্তিরা ছাড়া আরও দু’জন ব্যক্তি জড়িত ছিলেন। একজন খান আতাউর রহমান। দ্বিতীয়জন আমি। খান আতাউর রহমান চলচ্চিত্রে প্রবেশের আগে কবি, সমালোচক ও সংগীতজ্ঞ হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। নিজের কথা বলবো না। শিক্ষিত রুচিবান সংস্কৃতিসেবীদের হাতে এদেশের চলচ্চিত্র-শিল্পের যখন সূচনা হয়, তখন দু’জন ঠিকাদার এসে এই শিল্পের অঙ্গনে প্রবেশ করেন। একজন মুস্তাফিজ, আর একজন তাঁর ভ্রাতা এহতেশাম। এঁদের শিক্ষা-দীক্ষা কিংবা ঐতিহ্য বলতে কিছুই ছিল না। এদেশে চলচ্চিত্র-শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল বুদ্ধিজীবীদের হাতে। তাঁদের চিন্তা ছিল ভালো ছবি তৈরি করা।...বুদ্ধিজীবী পরিচালকেরা যখন ভালো ছবি তৈরির প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন, তখন উল্লিখিত ভ্রাতৃদ্বয় সস্তা চটকদার ছবি বানিয়ে অর্থ উপার্জনের বাজার মাত করার  চেষ্টা করেছিলেন এবং তাঁদের এই সস্তা চটকদার ছবিগুলোর সঙ্গে ভালো ছবিগুলোর ব্যবসায়িক পাল্লা দেয়া স্বাভাবিক কারণেই সম্ভবপর হলো না। পরিবেশকরা চটকদার ছবির নির্মাতাদের নিজের ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি চরিতার্থের প্রয়োজনে দু’হাতে আলিঙ্গন করে কাছে টেনে নিলেন এবং ভালো ছবির নির্মাতাদের অবহেলার সঙ্গে দূরে ঠেলে দিলেন। এই দুই চটকদার ছবি নির্মাতার দাপটে ‘আসিয়া’র মতো ভালো ছবি বানিয়েও ফতেহ লোহানী বেকার হয়ে গেল। পরিচালক মহীউদ্দিন আর সালাহউদ্দীন জীবন সংগ্রামের কঠিন ধাক্কায় জর্জরিত হলেন। চলচ্চিত্র-শিল্পের সূচনাতে যদি এঁদের আবির্ভাব না হতো, তাহলে এদেশের চলচ্চিত্র-শিল্পের গতি অন্যরকম হতো। তাহলে ‘আসিয়া’র পরিচালক ফতেহ লোহানীকে ‘সাতরং’ ছবি বানাতে হতো না। ‘মাটির পাহাড়’ আর ‘শীত বিকেলের’ পরিচালক মহীউদ্দিনকে ‘গাজী কালু চম্পাবতী’ বানাতে হতো না। ‘যে নদী মরুপথে’, ‘সূর্যস্নান’ আর ‘ধারাপাত’-এর পরিচালক সালাহউদ্দীনকে ‘রূপবান’ বানাতে হতো না। ‘সুতরাং’ আর ‘আয়না অবশিষ্ট’-এর পরিচালক সুভাষ দত্তকে ‘পালাবদল’ বানাতে হতো না। ‘অনেক দিনের চেনা’ আর ‘নবাব সিরাজদ্দৌলা’র পরিচালক খান আতাউর রহমানকে ‘সাত ভাই চম্পা’ বানাতে হতো না। ‘কখনো আসেনি’ আর ‘কাঁচের  দেয়ালে’র পরিচালককেও ‘বেহুলা’ বানাতে হতো না। পরিচালক মুস্তাফিজ ও এহতেশাম ভ্রাতৃদ্বয় শুধু যে এদেশে ভালো ছবি তৈরির পথ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়েছিলেন, তাই নয়, একটার পর একটা চটকদার উর্দু ছবি নির্মাণ করে এদেশে বাংলা ছবির ভবিষ্যৎ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলেছিলেন...”।

সে আমলের প্রখ্যাত শিল্পী এবং চিত্র নায়ক-নায়িকাদের দুর্দান্ত সব ছবি স'ান করে নিয়েছে আলোচ্য সংখ্যাটিতে। ২৮৮ পৃষ্ঠার এই ঈদ সংখ্যায় চলচ্চিত্র গবেষক ও সাংবাদিকদের নানামুখী চিন্তার খোরাক রয়েছে। প্রতি সংখ্যাতেই ছিল ঝিনুক শব্দ প্রতিযোগিতার আয়োজন। সমাধান পাঠানোর শেষ তারিখ ধার্য করা থাকতো। শব্দ প্রতিযোগিতার জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও শর্তের উল্লেখ করা হতো। সঠিক উত্তর প্রদানের জন্য আর্থিক পুরস্কারেরও ব্যবস'া ছিল। ‘সচিত্র চিত্র-কাহিনী’ শিরোনামে ‘দীপ নেভে নাই’ চলচ্চিত্রের কাহিনী সংক্ষেপ বর্ণনা করা হয়েছে। পাশাপাশি স'ান পেয়েছে কবরী, রাজ্জাক, রোজী, আনোয়ার হোসেন, মাস্টার ববি ও হাসমত-এর রঙিন ছবি। ববিতা, শাবানা, কবিতা ও শাহানা এই চারজনকে নিয়ে ‘আপন ভুবনে চার-কুমারী’ শিরোনামে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। পঞ্চান্ন বছর আগের এই ছবিগুলো পাঠক-পাঠিকাদের নিঃসন্দেহে স্মৃতিকাতর করে তুলবে। এ ছাড়া সূচিপত্রের প্রথম অংশে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে- মেসবাহুল হকের একটি সম্পূর্ণ উপন্যাস ‘নটীর মৃত্যু’, সা’দত হাসান মান্টোর বড় গল্প ‘পুস্তকের সারমর্ম’ (অনুবাদ: আখতার-উন-নবী), বুলবুল আজাদের  ছোটগল্প ‘অন্ধকার ঘরে’, কুমার শচীন  দেববর্মণের ধারাবাহিক আত্মকথা: ‘আমার জীবনে আমি’, মিয়া মতীনের ব্যক্তিগত আলেখ্য (ধারাবাহিক): ‘ফেলে-আসা দিনগুলো’, চিত্র সমালোচনা, পশ্চিম পাকিস্তানের চিত্র সংবাদ।

সূচিপত্রের প্রথম অংশে শিল্পী পরিচিতি শিরোনামে জাফর ইকবাল ও লায়লা আর্জুমান্দ বানু সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু তথ্য রয়েছে। জাফর ইকবাল সম্পর্কে শিল্পী পরিচিতিতে ক্যাপশন হিসেবে লেখা হয়েছে, ‘নায়ক সমস্যার যুগে জাফর ইকবালের আগমন একটি চ্যালেঞ্জস্বরূপ। পর পর দুটো ছবি মুক্তি পাবার পর আজ তার হাতে অনেক ছবি। একে নিয়ে বিভিন্ন নায়িকার সঙ্গে জুটি বাঁধবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন পরিচালক-প্রযোজকরা।’ অসামান্য ও বিরল প্রতিভার অধিকারী সংগীতশিল্পী লায়লা আর্জুমান্দ বানু। ঝিনুক ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত তাঁর ছবিটি বর্তমানে বেশ দুষ্প্রাপ্য। তাঁকে নিয়ে নানা তথ্যে সমৃদ্ধ এই নিবন্ধটি। পাঠক-পাঠিকাদের স্মৃতিরোমন'ন ও ভাবনার জাগরণে এর বিশেষ-বিশেষ অংশ হুবহু তুলে ধরা হলো:

“প্রায় একশ’ বছর আগেকার কথা। সৈয়দ  গোলাম মুস্তাফা ছিলেন তাঁর দাদার বাবা অর্থাৎ পরদাদা। টপ্পা গানের প্রতি তাঁর সাংঘাতিক ঝোঁক ছিল। তখনকার যুগে গান-বাজনার যে খুব একটা প্রচলন ছিল, তা নয়। তবে বড় বড় জমিদারদের বাড়ীতে শুধু গানের জলসা বসতো। অবসর সময়ে গ্রামের মানুষ পল্লীগীতি গাইতো। সেইসব গানের  কোনো ধরাবাঁধা সুর ছিল না। তখন থেকেই তাঁদের বাড়ীতে সঙ্গীতের প্রবেশ। তারপর ধীরে ধীরে এলো বাবার যুগ। সৈয়দ তৈফুর তাঁর বাবা। তিনি ছিলেন সাব-রেজিষ্ট্রার। এই  সৈয়দ বংশেই জন্মগ্রহণ করেন লায়লা আর্জুমান্দ বানু। তাঁরা তিন বোন। বড় বোন লুলু বিলকিস বানু বর্তমানে লণ্ডনে রয়েছেন। তিনি কিছুদিন ভিকারুননেসা নূন স্কুলের প্রিন্সিপাল ছিলেন। ছোট বোন মালেকা পারভিন বানুও ভালো গায়িকা। আর তিনি  মেঝো। বাবা সৈয়দ তৈফুর সাহেব  চেয়েছিলেন তাঁর বড় মেয়ে লুলু বিলকিস বানু ভালো গায়িকা হোক। কিন' গানের দিকে  ঝোঁক ছিল না তাঁর। ঝোঁক ছিল লায়লা আর্জুমান্দ বানুর প্রবল। তখন তাঁর বয়স মাত্র চার। রমণীমোহন ভট্টাচার্যের কাছে বড় বোন গান শেখেন। আর বসে বসে তন্ময় হয়ে শুনতেন তিনি।...শেষ পর্যন্ত রমণীমোহন বাবু তাঁকেই গান শেখাতে শুরু করলেন।

...তেইশ বছর একনাগাড়ে শিখেছেন ওস্তাদ  গোলাম মুহম্মদের কাছে।...১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৩৯ সনের এক সন্ধ্যায় তাঁর গান প্রথম এ  দেশবাসী বেতারে শুনতে পায়। সে দিনটি ছিল ঢাকা বেতারের ‘খেলাঘর’-এর উদ্বোধনী দিবস।...নজরুলের আর একটি গানও সেদিন তিনি গেয়েছিলেন-‘নহে নহে প্রিয় এ নয় আঁখিজল।’...‘খেলাঘর’-এ যতদিন  গেয়েছেন, ততদিন বেতার কর্তৃপক্ষ তাকে  কোনো পারিশ্রমিক দেননি। তবে ১৯৪১ সনে বড়দের সাথে গান গাইবার সুযোগ যখন এলো, তখন তাঁকে পাঁচ টাকা করে পারিশ্রমিক দেয়া হতো।...তখন গানের  প্রোডাকশনে জড়িত ছিলেন প্রভাত মুখার্জী ও নির্মল ভট্টাচার্যের মতো মানুষ। উৎপলা সেন, কল্যাণী মজুমদারের মতো মেয়েও তখন  রেডিওতে গাইতেন। ১৯৪০ সালের কথা। ...নজরুল ইসলাম আর শচীন দেববর্মণ মিলে করলেন ‘পূর্বাণী’ বলে এক ‘মিউজিক্যাল  স্কেচ’। সেই ‘পূর্বাণী’তে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন।

...বাংলাদেশে তখন বিত্তশালী পরিবারে গ্রামোফোন ছিল চিত্তবিনোদনের প্রধান সহায়ক। কলের গানের চোঙার চারপাশে শহর-গ্রামের লোক ভিড় জমাতো। সে যুগ ছিল ‘আবু হোসেন আলীবাবার’ রেকর্ড নাটকের যুগ। সে যুগ ছিল আশ্চর্যময়ী, বিনোদিনী দাসী, আঙ্গুরবালা ও ইন্দুবালা এবং  কে. মল্লিকের যুগ। সে যুগে যে-সমস্ত মেয়ে গান রেকর্ড করতেন, তাঁরা ছিলেন সমাজের বাইরে। সমাজ তাঁদের গান শুনতো, আনন্দ উপভোগ করতো। কিন' সমাজে কখনও তাঁরা আসন পাননি। মুসলমানরা তখনও এগিয়ে আসেনি রেকর্ড করতে। কে. মল্লিক কাসেম মল্লিক বলে কোনও রেকর্ড প্রথম দিকে করেননি বলে মুসলমান সমাজ তাঁকে মুসলমান বলে জানতেই পারেনি। যেমন তালাত মাহমুদকে তপন কুমার নাম নিয়ে  রেকর্ড করতে হয়েছিল। কারণ, মুসলমান সমাজ তাদেরকে সমাজচ্যুত করতো। কিন' ১৯৩৪ সালের দিকে বাংলাদেশের একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের মুসলমান মেয়ে কণ্ঠ দিয়েছিলেন গ্রামোফোন রেকর্ডে। মানিকগঞ্জ মহকুমার পারিল নওয়াধার মরহুম আলী আহমদ হামিদুল্লাহ সাহেবের কন্যা আশরাফী খানম। আমাদের অতি পরিচিত ও প্রখ্যাত সঙ্গীত-শিল্পী আফসারী খানমের বড় বোন। তারপর সুদীর্ঘ ৮ বছর আর কোনও বাঙালী মুসলমান মেয়ের রেকর্ড বের হয়নি। তাঁর নিজের কতোটি রেকর্ড আছে, এ প্রশ্নের জবাবে বললেন, খুব বেশি হলে ১৫ থেকে ২০টি রেকর্ড হবে। আজকের বায়তুল  মোকাররমের পাশে যে ইসলামিক একাডেমী অবসি'ত, সেই ইসলামিক একাডেমী ছিল বিধবা আশ্রম। সেই বিধবা আশ্রমে একবার ‘এইচ. এম. ভি কোম্পানী’ উঠেছিলো। ১৯৪৬ সনের কথা। তখন চিন্ময় লাহিড়ীর পরিচালনায় তাঁর কয়েকটি গান রেকর্ড করা হয়েছিল। তারপর ১৯৪৮ সনে আবার যখন ‘এইচ. এম. ভি কোম্পানী’ এসেছিল, তখন কয়েকটি গান রেকর্ড করিয়েছিলেন তিনি। ১৯৫৫ সনে লাহোরের ‘কিসমৎ’ ছবির প্লে-ব্যাক করেছিলেন তিনি। এটিই হচ্ছে তাঁর জীবনের প্রথম নেপথ্যে কণ্ঠদান। ...১৯৪৯ সনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি. এ. পাস করেছেন আর ১৯৬০ সনে বিয়ে করেছেন তৎকালীন বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক শামসুল হুদা চৌধুরীকে। ...১৯৫২ সনে তুরস্কে, ১৯৫৪ সনে আশুতোষ কলেজে রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলনে, ১৯৫৫ সনে ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত সাউথ-ইষ্ট এশিয়া রিজিওনাল কনফারেন্সে, এরপর ১৯৬০ সনে ইরানে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কো কনফারেন্সে, ১৯৬৩ সনে সোভিয়েট রাশিয়া, ১৯৬৬ সনে কাবুল, ইংল্যান্ড, ১৯৬৮ সনে ইরান প্রভৃতি  দেশে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গেয়েছেন। ...তিনি বাংলা, উর্দু, পার্শি ও রাশিয়ান ভাষায় গান গাইতে পারেন।...”

সূচীপত্রের দ্বিতীয় অংশে বিশেষ রচনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে-‘আমার চোখে ফিল্ম-ইন্ডাস্ট্রি:এবার বলেছেন মশিহুর রহমান’, ‘অন্তরঙ্গ আলোকে:ফতেহ লোহানী’, ‘আমার প্রতিবিম্বে আমি: রেশমা’, ‘আমার কথা: সুচন্দা’ এবং ‘মুস্তাফার প্রেম’। নিয়মিত বিভাগ ছাড়াও ‘ইতিহাস কথা কও’ এবং ‘বিশ্ব বিচিত্রা’ শিরোনামে দুটি অধ্যায় সংযুক্ত হয়েছে আলোচ্য ঈদসংখ্যায়। পঞ্চান্ন বছর পর আসিরুদ্দীন আহমদ সম্পাদিত ‘ঝিনুক’ ঈদসংখ্যাটি আপামর পাঠকের দৃষ্টিতে কিরূপে ধরা দিলো তার বিচার পাঠকের হাতেই ছেড়ে দিলাম।

mzamin

পানির বোতল কত দিন পরপর পরিষ্কার করা উচিত

পানির বোতলে প্রতি চুমুক পানি খাওয়ার মানে হলো, প্রতিবারই বোতলের ভেতর ব্যাকটেরিয়া জমা করা। আর এভাবে সারা দিন চলতে থাকলে লাখ লাখ ব্যাকটেরিয়া জমা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে করণীয় কী, সে ব্যাপারে হয়েছে নানা গবেষণা।

তেমনই একটি গবেষণা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যনিরাপত্তা–বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কার্ল বেহেনকে। নিজের পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতলটি কতটা পরিষ্কার, তা নিয়ে ভাবনা থেকেই গবেষণায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। শুরুতে বোতলের ভেতরে কিছু টিস্যু পেপার ঢুকিয়ে নাড়াচাড়া করে দেখেছিলেন বেহেনকে। এরপর যা দেখলেন, তাতে তিনি হতভম্ব হয়ে যান।

বেহেনকে বলেন, টিস্যুগুলো বের করে আনার আগপর্যন্ত এগুলো সাদা ছিল। তিনি বুঝতে পারেন, বোতলের ভেতরের গায়ে যে পিচ্ছিল ভাব মনে হচ্ছিল, তা বোতলের ধরনের কারণে নয়, বরং সেখানে ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর কারণে এমন হয়েছে।

এরপর গবেষণার পরিকল্পনা তৈরি করেন বেহেনকে। এর অংশ হিসেবে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি করিডরে পথচারীদের থামাতে থাকেন এবং তাঁদের কাছ থেকে পানির বোতলগুলো চেয়ে নেন। বোতলগুলো কতটা পরিষ্কার, সেটা পরীক্ষা করে দেখার জন্য এগুলো সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায় যে বোতলগুলো ব্যাকটেরিয়ায় ভরপুর।

২০২৪ সালের হিসাব অনুসারে, বিশ্বব্যাপী পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতলের বাজারের আকার প্রায় এক হাজার কোটি ডলার। ইতালীয় স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, তাঁদের অর্ধেকই পুনর্ব্যবহারযোগ্য বোতল ব্যবহার করেন। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে যে ৫০ থেকে ৮১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বোতল ব্যবহার করেন।

পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতলে আসলে কী থাকে

যুক্তরাজ্যের লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক প্রিমরোজ ফ্রিস্টোন বলেন, রান্নাঘরের কল থেকে বোতলে পানি ভরে কয়েক দিন রেখে দিলে তাতে ব্যাকটেরিয়া জন্মায়। তিনি বলেন, ঘরের তাপমাত্রায় (প্রায় ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) যতক্ষণ পর্যন্ত একটি পানিভর্তি বোতলকে ফেলে রাখা হবে, তত বেশি ব্যাকটেরিয়া জন্মাবে।

সিঙ্গাপুরে ফোটানো পানি নিয়েও একটি গবেষণা হয়েছিল। পানি ফোটানোর সময় বেশির ভাগ ব্যাকটেরিয়া মরে যাওয়ার কথা। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, দিনভর ব্যবহারের পর বোতলের ভেতর ফোটানো পানিতেও দ্রুত ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে।

গবেষকেরা দেখেছেন, প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের ব্যবহৃত বোতলের ভেতরের পানিতে সকালের দিকে গড়ে প্রতি মিলিলিটারে প্রায় ৭৫ হাজার ব্যাকটেরিয়া ছিল, যা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতি মিলিলিটারে ১০ থেকে ২০ লাখের বেশি হয়ে গেছে।

ফ্রিস্টোনের মতে, ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি কমানোর একটি উপায় হলো, বোতল থেকে পানি পানের মধ্যবর্তী বিরতিতে তা ফ্রিজে সংরক্ষণ করা। তবে এতে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি কমলেও পুরোপুরি বন্ধ হবে না।

পানির বোতলে ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর পেছনে ওই পানির কিছু দায় থাকলেও বেশির ভাগ দূষণ তৈরি হয় ব্যবহারকারীর মাধ্যমেই। ফ্রিস্টোন বলেন, কর্মস্থলে, ব্যায়ামাগারে, এমনকি বাড়িতে যেখানেই পানির বোতল নিয়ে যাওয়া হোক না কেন, বোতলের বাইরের অংশে অনেক জীবাণু থাকে। এসব জীবাণু সহজেই বোতলের ভেতরে স্থানান্তরিত হয়। এ ছাড়া প্রতিবার চুমুক দিয়ে পানি পানের সময় ব্যবহারকারীর মুখ থেকে বোতলের পানিতে ব্যাকটেরিয়া ছড়ায়।

পানির বোতল ব্যবহারকারীদের যাঁরা নিয়মিত হাত পরিষ্কার করেন না, তাঁদের বোতলে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে বলেও মত দিয়েছেন এ বিশেষজ্ঞ।

ব্যাকটেরিয়া কী প্রভাব ফেলে?

মাটি, বায়ু বা দেহ—আমাদের চারপাশেই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি। তবে বেশির ভাগ ব্যাকটেরিয়াই ক্ষতিকর নয়, বরং উপকারী। যে পানিতে ই. কোলাই–এর মতো ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি থাকে, তা পান করলে ডায়রিয়া বা বমি হতে পারে। তবে সব সময়ই যে এমনটা ঘটবে, তা নয়। ই. কোলাই হলো এমন এক ব্যাকটেরিয়া, যা প্রাকৃতিকভাবে পরিবেশে বিরাজমান। তবে মানুষের অন্ত্রেও এ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি থাকে। এটি কেবল তখনই ঘটে, যখন ব্যাকটেরিয়া রোগজীবাণুতে পরিণত হয়।

ফ্রিস্টোন বলেন, বেশির ভাগ অণুজীবই মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি হতে পারে। এ ছাড়া পেটে জীবাণুর সংক্রমণের কারণে অসুস্থ হলে কিছু ক্ষেত্রে অন্ত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন হতে পারে। তবে ফ্রিস্টোন মনে করেন যে পানির বোতলে থাকা ব্যাকটেরিয়া থেকে খাদ্যে বিষক্রিয়া হলে শরীরে কখনোই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে না।

এ ছাড়া যেসব মানুষ সম্প্রতি অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করেছেন এবং যা তাদের পেটের অণুজীবের ওপর প্রভাব ফেলেছে, তাদের শরীরেও বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তারা অন্য সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

কীভাবে বোতল পরিষ্কার করতে হবে

পানি পানের সঙ্গে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া শরীরে যেন প্রবেশ না করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হলে নিয়মিত ও যথাযথভাবে বোতল পরিষ্কার করতে হবে।

ফ্রিস্টোন মনে করেন, ঠান্ডা পানি দিয়ে বোতল ধোয়াটা যথেষ্ট নয়। কারণ, এতে বোতলের ভেতরে থাকা ব্যাকটেরিয়া দূর হয় না।

পুনর্ব্যবহারযোগ্য বোতলগুলো গরম পানি (৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি) দিয়ে পরিষ্কার করার সুপারিশ করেছেন ফ্রিস্টোন। তাঁর মতে, বোতলগুলো তরল ডিশওয়াশার দিয়ে নাড়াচাড়া করে ১০ মিনিট রেখে দিতে হবে। এরপর গরম পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। এরপর বোতলে ব্যাকটেরিয়া জন্মানো ঠেকাতে এটিকে বাতাসে শুকিয়ে নেওয়াটাই সবচেয়ে ভালো। কারণ, অণুজীবগুলো আর্দ্র পরিবেশ পছন্দ করে।

ফ্রিস্টোন মনে করেন, প্রতিবার ব্যবহারের পরই এ প্রক্রিয়ায় বোতল পরিষ্কার করা উচিত। অন্ততপক্ষে সপ্তাহে কয়েকবার বোতল পরিষ্কার করতে হবে। বোতল থেকে দুর্গন্ধ বের না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এ বিশেষজ্ঞের মতে, বোতল থেকে দুর্গন্ধ বেরোতে শুরু করার মানে হলো, এটি ফেলে দেওয়ার সময় এসে গেছে।

বোতল ধোয়া হলে এটি ধরার আগে হাত পরিষ্কার করার বিষয়টিও মাথায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

পানির বোতল ব্যবহারকারীদের যাঁরা নিয়মিত হাত পরিষ্কার করেন না, তাঁদের বোতলে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে বলেও মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা
পানির বোতল ব্যবহারকারীদের যাঁরা নিয়মিত হাত পরিষ্কার করেন না, তাঁদের বোতলে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে বলেও মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

অল্প বয়সেও কেন হার্ট অ্যাটাক হয় by ডা. আফলাতুন আকতার জাহান

কম বয়স বা পঁয়তাল্লিশের আগে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার হার কম হলেও এখন আমাদের জীবনযাত্রা, পরিবেশের পরিবর্তন ও কিছু জেনেটিক কারণে কম বয়সে হার্ট অ্যাটাক দিন দিন বাড়ছে।
কয়েক দিন আগে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে মাত্র ২৩ বছরের এক ছাত্র এসেছেন, বুকে ব্যথা নিয়ে। ইসিজি করে দেখা গেল হার্ট অ্যাটাক। মা–বাবা কোনোভাবেই মানতে পারছেন না, এত অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাক! অবাক লাগলেও সত্যি, অনেক কম বয়সেও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। আজকে আমরা জানব, কেন অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাক হয়?

অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা

ধূমপান

অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাকের একটি বড় কারণ ধূমপান। ধূমপানে রক্তনালিতে ক্ষত তৈরি হয় এবং রক্তনালির ভেতর চর্বি জমাট বাঁধার প্রবণতা বেড়ে যায়।

মাদকাসক্তি

হার্ট অ্যাটাকের আরেকটি বড় কারণ মাদকাসক্তি। কোকেন, ইয়াবা, গাঁজা, ইন্ট্রাভেনাস অ্যাবিউজিং ড্রাগ হার্টের রক্তনালির ক্ষতি করে এবং হৃৎস্পন্দন এলোমেলো করে, যা হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারে।

মানসিক চাপ

অতিরিক্ত উদ্বেগ, মানসিক চাপ হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

স্থূলতা

হার্ট অ্যাটাকের আরেকটি বড় কারণ ওবেসিটি বা স্থূলতা। অতিরিক্ত ওজনের কারণে উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে চর্বি জমা বা কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়াসহ অনেক ধরনের অসুস্থতার ঝুঁকি থাকে।

অপর্যাপ্ত ঘুম

দিনে কমপক্ষে ৮ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে।

অলস জীবনযাপন

নিয়মিত শরীরচর্চা করলে হার্টের কাজ করার ক্ষমতা যেমন বাড়ে, তেমনি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও রক্তের চর্বির পরিমাণও কমে। অলস জীবন যাপন করলে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা বেড়ে যায়।

অস্বাস্থ্যকর খাবার

এখন অল্প বয়সীদের মধ্যে ঘরের বাইরে বা রেস্টুরেন্টে খাওয়ার প্রবণতা বেশি। বাইরের খাবারে অস্বাস্থ্যকর স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ট্রান্স ফ্যাট, অতিরিক্ত লবণ ও চিনি থাকে। এ খাবারগুলোর কারণে রক্তনালিতে চর্বি জমাট বাঁধাসহ হার্টের ক্ষতি হতে পারে।

বংশগত কারণ


পরিবারে হৃদ্‌রোগের ইতিহাস থাকলে কম বয়সেও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি থাকে। তাই রোগীর পারিবারিক ইতিহাস জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাবা, বড় ভাই বা চাচাদের কেউ হার্টের অসুখে ভুগলে এর কারণ জানতে হবে এবং বংশগত কিছু আছে কি না দেখতে হবে।

ব্যায়াম করতে হবে নিয়মিত... 

* ধূমপান ও মাদকদ্রব্য পরিহার করতে হবে।

* নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই গড়ে তুলতে হবে।

* স্বাস্থ্যকর খাবার, যেমন ফলমূল, শাকসবজি ও মাছ খেতে হবে এবং চর্বিযুক্ত খাবার, যেমন গরু ও খাসির মাংস, ফাস্ট ফুড ইত্যাদি খাওয়া কমাতে হবে।

* পরিবারের হৃদ্‌রোগের ইতিহাস থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে।

* ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

* মানসিক চাপ কমাতে মেডিটেশন করা যেতে পারে।

ডা. আফলাতুন আকতার জাহান, মেডিসিন স্পেশালিস্ট, ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগ, স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেড, ঢাকা।

হার্ট অ্যাটাক হলে হঠাৎ প্রচণ্ড বুকে ব্যথা হয়, এই ধারণাটুকু কমবেশি সবারই আছে
হার্ট অ্যাটাক হলে হঠাৎ প্রচণ্ড বুকে ব্যথা হয়, এই ধারণাটুকু কমবেশি সবারই আছে। মডেল: টুটুল। ছবি: প্রথম আলো

রেড রোডে নামাজের মঞ্চ থেকে মুসলমানদের আশ্বস্ত করেছেন মমতা

পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে খুশির ঈদ পালিত হচ্ছে উৎসাহের সঙ্গে। পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় মসজিদ ও ইদগায় জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে কলকাতার রেড রোডে অনুষ্ঠিত হয়েছে এই উপমহাদেশের বৃহত্তম জামাত। প্রায় ৮ লক্ষ মুসলমান এই জামাতে অংশ নেন। জামাতে অংশ নিয়ে শাকিল আহমেদ বলেন, এক মাস রোজা রাখার পর আজ আমরা ঈদুল ফিতর পালন করছি। ছোট বড় সকলে পরস্পরকে আলিঙ্গন করে খুশির বার্তা দিচ্ছে।

প্রতিবারের মত এবারও রেড রোডের নামাজে উপস্থিত ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী তথা রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গে ছিলেন সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও মন্ত্রী জাভেদ খান। সোমবার নামাজের মঞ্চ থেকে দেওয়া ভাষণে মমতা রাজ্যের মুসলমানদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, আপনাদের সাথে গোটা সরকার আছে। আমি আছি।
নিজের ভাষণে সর্বধর্ম সমন্বয়ের কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। জানান, সব ধর্মের প্রতিই তিনি সমান শ্রদ্ধাশীল। উপস্থিত সকলকে সাবধান করে জানান, কেউ কেউ গোলমাল পাকানোর চেষ্টা করছেন। প্ররোচনায় যেন কেউ পা না-দেন।
এদিন রাখ ঢাক না করে প্রথম থেকেই নাম না করে হিন্দুত্ববাদী শক্তিকে আক্রমণ করেন মমতা। তিনি বলেন,আপনারা এটা ভাববেন না যে, আপনারা একা। আমরা সবাই সবরকমভাবে আপনাদের সাথে আছি। আপনারা কেউ ভাববেন না কোথাও কেউ বলল সেই নিষেধাজ্ঞা আপনাদের মেনে চলতে হবে।
বিভাজনের রাজনীতির সমালোচনা করে মমতা সিপিএম-বিজেপিকে একই বন্ধনীতে ফেলে আক্রমণ করেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, লাল আর গেরুয়া এক হয়ে অশান্তি করছে। আমরা বিভাজনের রাজনীতি করি না। ধর্মের নামে ব্যবসা করে কিছু রাজনৈতিক দল। তিনি বলেন , আমার জীবন দেশের জন্য উৎসর্গিত। সঙ্গে আমার জীবন সমস্ত ধর্ম - জাতির জন্য, সমস্ত সম্প্রদায়, সমস্ত পরিবারের জন্য। আপনারা ভালো থাকলেই আমি ভালো থাকব।
এদিন মমতা স্পষ্ট করে দেন, মুসলিমদের সঙ্গে তিনি নিজে ও তাঁর গোটা সরকার আছে। তিনি বলেন, আমি দাঙ্গা চাই না। কেউ প্ররোচনা দিলে তার পায়ে পা লাগাবেন না। এটাই ওদের পরিকল্পনা। এটা ওদের প্ল্যান্টেড গেম। এই ফাঁদে পা দেবেন না। ওদের ছোঁয়াও উচিত নয়। ওরা আপনাকে কিছু বললে মনে রাখবেন দিদি আপনাদের সাঙ্গ আছেন। আপনাদের সঙ্গে গোটা সরকার আছে। আপনারা এটা ভাববেন না যে আপনাদের  কেউ কিছু করতে পারবে। যারা চিৎকার করে তাদের চিৎকার করতে দিন। কিন্তু ওদের ছোঁবেন না। ওদের ছুঁলে ওরা গুরুত্ব পেয়ে যায়।
ঈদ উপলক্ষে অশান্তির আশঙ্কায় রাজ্যের সর্বত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

mzamin

কলকাতার রেড রোডে ঈদের ঐতিহাসিক জামাত অনুষ্ঠিত

পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতজুড়েই আজ সোমবার উদ্‌যাপিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। প্রতিবছর প্রধান ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে কলকাতার ধর্মতলার রেড রোডে। এবারও সেই রেড রোডে আয়োজন করা হয়েছে এই জামাতের। আজ বৃষ্টিহীন কলকাতায় আবহাওয়াও কিছুটা ঠান্ডা। এই পরিবেশে ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা মনের আনন্দে ঈদের খুশিতে নামাজ আদায় করেছেন। নামাজ শেষে মুসল্লিরা শুভেচ্ছা বিনিময়, কোলাকুলি করেছেন যথারীতি একে অপরের সঙ্গে। সেই সঙ্গে দেশের উন্নয়ন ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করার আহ্বান জানিয়েছেন।

আজ সকালে কলকাতার রেড রোডের ঈদের জামাতে উপস্থিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন মুসল্লিদের সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা–কর্মীরা।

মমতা তাঁর শুভেচ্ছা ভাষণে বলেন, ‘সকলে শান্তিতে থাকুন। ধর্মের নামে এখানে কাউকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে দেওয়া হবে না।’ তিনি বলেন, ‘সব ধর্ম রক্ষা করার জন্য আমি জীবন দিতেও প্রস্তুত।’

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেন, ‘ধর্মের ব্যবসা করে এখানকার একটি রাজনৈতিক দল। প্ররোচনা দেয়। দাঙ্গার ওই সব প্ররোচনায় পা দেবেন না। আজ লাল-গেরুয়া এক হয়ে গেছে। আমরা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নই। কেউ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে চাইলে মনে করবেন এই দিদি আপনাদের পাশে আছেন।’

মমতা বলেন, ‘একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার জন্য মাঠে নেমেছে। ওরা আজ দাঙ্গার প্ররোচনা দিচ্ছে। অশান্তি সৃষ্টি করতে চাইছে। কারও দাঙ্গার প্ররোচনায় পা দেবেন না। আমরা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি করি না।’

আজকের অনুষ্ঠানে আরও যোগ দেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সংসদ সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

আজ রেড রোড ছাড়া কলকাতায় বেশ কয়েকটি বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে পার্ক সার্কাস ময়দান, টিপু সুলতান মসজিদ, মেটিয়াব্রুজ, খিদিরপুর, মল্লিক বাজার, রাজাবাজার, এন্টালি, বেলগাছিয়া, আনোয়ার শাহ রোডসহ শহরের বিভিন্ন মসজিদ ও ঈদগাহ ময়দানে।

প্রতিবছরের মতো এবারও কলকাতার প্রধান ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে নগরীর ধর্মতলার রেড রোডে
প্রতিবছরের মতো এবারও কলকাতার প্রধান ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে নগরীর ধর্মতলার রেড রোডে। ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

কলকাতার রেড রোডের ঈদের জামাতের পর সেখানে উপস্থিত হয়ে ঈদের শুভেচ্ছা জানান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
কলকাতার রেড রোডের ঈদের জামাতের পর সেখানে উপস্থিত হয়ে ঈদের শুভেচ্ছা জানান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

ট্রাম্পের যত ‘বিতর্কিত সিদ্ধান্ত’: আদালতে একের পর এক হেরে চলেছেন

সাম্প্রতিক দিনগুলোয় অনেকের মনেই এ ধারণা জন্মেছে যে ট্রাম্প প্রশাসন বাধাহীন জয়ের ধারায় ছুটে চলেছে, তাদের লাগাম মনে হয় আর টেনে ধরা যাবে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও তাঁর সহযোগীরা (বিশেষ করে ইলন মাস্ক) হাজার হাজার ফেডারেল কর্মীকে গণহারে ছাঁটাই করা থেকে শুরু করে সরকারি নথিপত্রে ‘লিঙ্গ’, ‘ঝুঁকিতে’ ও ‘মেক্সিকো উপসাগর’-এর মতো শব্দ নিষিদ্ধ করা পর্যন্ত একের পর এক ক্ষোভ সৃষ্টিকারী এবং অযৌক্তিক নীতির স্রোত বইয়ে দিয়েছেন।

আরও খারাপ বিষয় হলো, দৃশ্যত এসব নিয়ে কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যদের তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, আগ্রহের সঙ্গেই নির্বাহী শাখার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করছেন তাঁরা। নির্বাচিত ডেমোক্র্যাট সদস্যরাও খুব বেশি কিছু করতে পারছেন না এবং অনেক করপোরেট নেতা ট্রাম্পের কাছে মাথা নোয়াচ্ছেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের লাগাম টেনে ধরা যাবে না—এ ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। ইতিমধ্যে ট্রাম্পের নীতি আদালতে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। দেশজুড়ে ফেডারেল বিচারকেরা তাঁর প্রশাসনের বিতর্কিত কার্যক্রমের কোনো কোনোটির বাস্তবায়ন হয় ব্যর্থ করে দিচ্ছেন, নয়তো অন্তত বিলম্বিত করছেন। কিছুটা আশ্চর্যজনক হলেও এসব কার্যক্রম নিয়ে দায়ের করা মামলার অনেকগুলোই যেখানে বিচারাধীন, সেই সুপ্রিম কোর্টও প্রেসিডেন্টের সব চাওয়া পূরণ করছেন না।

এ অবস্থায় কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে ট্রাম্প আদালতের আদেশ অমান্য করতে পারেন, সেই আশঙ্কা বাড়ছে (যদিও তাঁর দাবি, এমন কিছু করবেন না)। অবশ্য এখন পর্যন্ত আদালত ট্রাম্প সরকারের নির্বাহী শাখার যা ইচ্ছা, তা করার বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করে চলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন তার কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আদালতের কাছে যেসব বড় ধাক্কা খেয়েছে, তার কয়েকটি তুলে ধরা হলো:

ফেডারেল কর্মীদের চাকরিতে ফেরত

ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ‘দ্য অফিস অব পার্সোনেল ম্যানেজমেন্ট’ মার্কিন ফেডারেল সংস্থাগুলো থেকে হাজার হাজার প্রবেশনারি কর্মীকে চাকরিচ্যুত করার নির্দেশ দেন।

পরে ১৩ মার্চ দুজন ফেডারেল বিচারক কৃষি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, স্বরাষ্ট্র, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ ১৯টি সরকারি সংস্থাকে ‘অবিলম্বে’ বরখাস্ত ওই কর্মীদের চাকরিতে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন। সরকারের নির্বাহী শাখার তথ্য অনুযায়ী, আদালতের নির্দেশের পর প্রায় ২৪ হাজার ফেডারেল কর্মীকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হচ্ছে।

এ দুজনের একজন নর্দান ডিস্ট্রিক্ট অব ক্যালিফোর্নিয়ার বিচারক উইলিয়াম অ্যালসুপ। কর্মচারী ইউনিয়নগুলোর দায়ের করা মামলার পক্ষ নেন তিনি। বলেন, দুর্বল কর্মদক্ষতার কথা বলে প্রবেশনারি কর্মীদের গণহারে ছাঁটাই করা বেআইনি।

বিচারক অ্যালসুপ বলেন, ‘সরকার ভালো কর্মীদের বরখাস্ত করবে আর বলবে, এটা তাঁদের অদক্ষতার কারণে করা হয়েছে—এটা শোনা দুঃখজনক। কেননা তাঁরা ভালো করেই জানেন, এটা মিথ্যা।’

একই দিন ডিস্ট্রিক্ট অব মেরিল্যান্ডের বিচারক জেমস ব্রেডার একই রকমের আদেশ দেন। ১৯ অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলদের করা একটি মামলায় তিনি এ আদেশ দেন।

দুই বিচারকের এ আদেশে সাময়িকভাবে স্বস্তিতে আছেন ফেডারেল কর্মীরা। কেননা কোনো বিচারকই চূড়ান্ত রায় দেননি। কর্মীদের যেভাবে চাকরিতে ফেরানো হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়াও বিশৃঙ্খলাপূর্ণ। ফেডারেল সংস্থাগুলো এখনো ব্যাপকভাবে তাদের কর্মীদের ছাঁটাই করতে পারবে, সে ক্ষেত্রে শুধু আইন অনুসরণ করতে হবে।

জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা

প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের শুরুর প্রথম দিনই ট্রাম্প জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে এক নির্বাহী আদেশ জারি করেন। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অভিবাসী মা-বাবার সে দেশে জন্মগ্রহণ করা সন্তানের স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ বাতিল করা হয়। তবে শর্তে বলা হয়, এমন সন্তানের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পেতে তার অভিভাবকদের অন্তত একজনকে হয় স্থায়ী মার্কিন নাগরিক, নয় বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।

ট্রাম্পের এ আদেশ এখনো কার্যকর হয়নি। ফেডারেল আদালতে একাধিকবার এটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে মেরিল্যান্ডের একজন ফেডারেল বিচারক এ আদেশের ওপর প্রাথমিক স্থগিতাদেশ দেন। তিনি বলেন, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর লঙ্ঘন। পরে ওয়াশিংটন, ম্যাসাচুসেটস ও নিউ হ্যাম্পশায়ারের বিচারকেরাও একই ধরনের পদক্ষেপ নেন।

আদালতের এসব আদেশের বিরুদ্ধে কয়েক দফায় ব্যর্থ আপিল চেষ্টার পর ১৩ মার্চ ট্রাম্প প্রশাসন জরুরি ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। ট্রাম্পের শিবির এতে সফল হলে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ওপর তাঁর নিষেধাজ্ঞা দ্রুতই কার্যকর হতে পারে। তবে ট্রাম্পের ওই নীতি নিয়ে বিচারপতিরা স্বেচ্ছায় আদেশ দিচ্ছেন না। পলিটিকো বলছে, ট্রাম্প প্রশাসনের চাহিদামাফিক সুপ্রিম কোর্ট কোনো আদেশ দিলে তা এ প্রশাসনের সব নীতি আটকে দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতগুলোর কর্তৃত্ব খর্ব করতে পারে।

অনেকে ধারণা করেন, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের আদেশের বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ জানানো হলে ট্রাম্প প্রশাসন হারবে। কেননা তাঁর এ আদেশ পুরোপুরি অসাংবিধানিক।

ফেডারেল সরকারের অর্থায়ন বন্ধের পদক্ষেপ স্থগিত

গত জানুয়ারিতে ‘অফিস অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বাজেট’ একটি চিঠিতে বিশ্বজুড়ে মার্কিন কেন্দ্রীয় সরকারের সব অনুদান ও ঋণ সাময়িকভাবে স্থগিত করে। বলা হয়, এসব সহায়তা নিয়ে পর্যালোচনার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা স্থগিত থাকবে। এতে দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। কয়েক দিনের মধ্যে চিঠিটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। যদিও হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, এটি এখনো কার্যকর আছে।

ফেব্রুয়ারি মাসে ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ার ফেডারেল ডিস্ট্রিক্ট আদালতের বিচারক লরেন আলিখান এ সহায়তা বন্ধের আদেশ আটকে দেন। ট্রাম্পের এ-সংক্রান্ত উদ্যোগ কার্যকর হওয়ার অল্প সময় আগে আদালত এ স্থগিতাদেশ দেন। বিভিন্ন সংগঠনের জোটের পক্ষ থেকে একটি চ্যালেঞ্জ দাখিলের প্রেক্ষাপটে এ স্থগিতাদেশ দেন আদালত।

আশ্রয়প্রার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে আসার প্রক্রিয়া (কারিগরি) পুনর্বহাল

ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প ‘ইউএস রিফিউজি অ্যাডমিশন প্রোগ্রাম’ স্থগিত করা এবং এই কর্মসূচি সংশ্লিষ্ট অর্থায়ন বন্ধে এক নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন।
এ আদেশের ওপর ওয়াশিংটনের ডিস্ট্রিক্ট জজ জামাল হোয়াইটহেড ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি প্রাথমিক স্থগিতাদেশ জারি করেন। এতে সরকারকে রিফিউজি অ্যাডমিশন আবার শুরু করা ও আশ্রয়প্রার্থীদের সহায়তায় নিয়োজিত সংগঠনগুলোকে অর্থায়ন চালু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

বিচারক হোয়াইটহেড বলেন, কয়েক দশক ধরে চলা এ কর্মসূচি একতরফা বন্ধ করে দেওয়ার কর্তৃত্ব দৃশ্যত ট্রাম্প প্রশাসনের নেই।

আটকে গেল ফিলিস্তিনি কর্মী মাহমুদ খলিলের প্রত্যর্পণ

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিলিস্তিনি কর্মী মাহমুদ খলিলকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। তিনি দেশটির বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই স্নাতক শিক্ষার্থী গত বছর এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ আয়োজনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।

৮ মার্চ খলিলকে গ্রেপ্তার করেছে ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ। ট্রাম্প বলেছেন, ‘তাঁকে দিয়ে প্রথম শুরু করা হলো, সামনে আরও অনেককে গ্রেপ্তার করা হবে।’ খলিল ও ফিলিস্তিনপন্থী অন্য বিক্ষোভকারীদের ‘সন্ত্রাসের সমর্থক, ইহুদিবিরোধী ও মার্কিনবিরোধী তৎপরতায়’ যুক্ত বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

আটকের এ সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন খলিল। তাঁর আবেদনের ওপর আদালত কর্তৃক পরবর্তী পদক্ষেপ না আসা পর্যন্ত তাঁকে প্রত্যর্পণ সাময়িকভাবে আটকে দেন ম্যানহাটন ডিস্ট্রিক্ট আদালতের বিচারক জেসি ফারম্যান। ১৯ মার্চ খলিলের মামলাটি নিউ জার্সির আদালতে পাঠিয়ে দিয়েছেন বিচারক। নতুন রায় না আসা পর্যন্ত এই ফিলিস্তিনি লুইজিয়ানায় থাকবেন।

ইউএসএআইডির বিল পরিশোধের নির্দেশ

হোয়াইট হাউসের দায়িত্ব নেওয়ার অল্প পরেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সব মানবিক ও উন্নয়নকাজে তহবিলের জোগান দেওয়া বন্ধ করে দেন। পরে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ধনকুবের ইলন মাস্কের ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট ইফিসিয়েন্সি (ডিওজিই)’ ইউএসএআইডিকে ভেতর থেকে ভেঙে দেওয়া শুরু করে। উন্নয়ন সংস্থাটির জন্য আর্থিক সহায়তা বন্ধ ছাড়াও প্রযুক্তিগতভাবে কর্মীদের অফিস থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এতে কর্মীরা ওয়াশিংটনে সংস্থাটির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প ইউএসএআইডিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর হাতে ন্যস্ত করেন। পরে সংস্থার ৮৩ শতাংশ কর্মসূচি বন্ধ করার ঘোষণা দেন রুবিও। বাকি কর্মসূচি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিচালনা করবে বলে জানান তিনি।

এ পদক্ষেপের ওপর ১০ মার্চ প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা দেন ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ার ফেডারেল আদালতের বিচারক আমির আলী। তিনি রায় দেন, কংগ্রেস অনুমোদিত বিদেশি সহায়তা তহবিলের জন্য বরাদ্দ করা প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের ওপর প্রশাসন হস্তক্ষেপ করতে পারে না। ওই সংস্থার ১৩ ফেব্রুয়ারির আগে সম্পন্ন হওয়া কাজের জন্য সরকারকে অর্থ দিতে হবে।

সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। এতে বিচারক আমির আলীর দেওয়া আদেশ বহাল রইল। এ ছাড়া ১৮ মার্চ আরেকজন ফেডারেল বিচারক থিওডর চুয়াং রায় দেন যে ডিওজিইর ইউএসএআইডি ভেঙে দেওয়ার পদক্ষেপ নানাভাবে সংবিধান লঙ্ঘন করে থাকতে পারে।

মুসলিম বিশ্বে ঈদ আসে, গাজায় ঈদ আসে না

জেরুজালেমের গ্র্যান্ড মুফতি শেখ মোহাম্মদ আল হুসাইন স্থানীয় সময় শনিবার (২৯ মার্চ) সন্ধ্যায় ঘোষণা দেন, রোববার (৩০ মার্চ) মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন হবে।

মুসলিম বিশ্ব যখন উৎসবের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন ফিলিস্তিনের গাজায় ঈদের কোনো আনন্দ নেই। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই ভূখণ্ডের মানুষের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বেঁচে থাকা।

যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে গাজা

প্রায় দেড় বছর ধরে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলায় গাজা পরিণত হয়েছে এক ধ্বংসস্তূপে। গত ১৮ মার্চ থেকে নতুন করে শুরু হওয়া হামলায় এখন পর্যন্ত ৯২০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ২ হাজারেরও বেশি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ৫০ হাজারেরও বেশি, আর আহতের সংখ্যা পৌঁছেছে ১ লাখ ১৪ হাজারে।

গাজার উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ঈদের খুশি যেন এক মরীচীকা। ঈদ মানে নতুন পোশাক, মিষ্টি খাবার, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো। কিন্তু গাজার মানুষের কাছে এসব এখন বিলাসিতা।

‘আমাদের ঈদ নেই’

গাজার বাসিন্দা মোহামেদ আল সারকা বলছিলেন, ঈদ আমাদের জন্য নয়। আমাদের শিশুদের জন্যও নয়। তাদের জন্য একটি নতুন কাপড়ও কিনতে পারিনি। যেখানে খাবার জোটানোই দুষ্কর, সেখানে ঈদের আয়োজনের কথা ভাবাই অসম্ভব।

তিনি আরও জানান, ইসরায়েলি হামলায় তার তিন সন্তান নিহত হয়েছে। এখন বেঁচে থাকা চার সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

৪৭ বছর বয়সী নোয়া আবু হানি যুদ্ধের কারণে উদ্বাস্তু হয়েছেন। তিনি আগে জাবালিয়া ক্যাম্পে ছিলেন, কিন্তু ইসরায়েলি হামলায় ক্যাম্প বিধ্বস্ত হওয়ায় এখন আশ্রয় নিয়েছেন উনরোয়া ক্যাম্পে।

স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আগে ঈদের সময় কা’ক (ফিলিস্তিনের ঐতিহ্যবাহী কুকিজ) তৈরি করতাম। সেগুলো বিক্রি করতাম রোজার শেষ দিনে, রাস্তার পাশে ছিল উৎসবের আমেজ। কিন্তু এখন কিচ্ছু নেই। শুধু বেঁচে থাকার লড়াই।

ফিলিস্তিনি শিশুরাও ভুলে গেছে ঈদের আনন্দ

সাত বছরের হানিন তার পোড়া ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। কারণ জিজ্ঞেস করতেই সে বলল, ‘আমার জামা নেই, পুতুল নেই, আমাদের ঘরও নেই। আমি ঈদ পছন্দ করি না।’

শুধু হানিন নয়, গাজার শত শত শিশুর মুখে হাসি নেই। তারা জানেই না ঈদের খুশি কেমন হতে পারে। খাদ্য সংকটের কারণে তাদের ঈদের দিনে বিশেষ কিছু খাওয়ার সুযোগও নেই।

যুদ্ধের মধ্যে সামান্য আনন্দের চেষ্টা

উম্মে মোহামেদ নামের এক ফিলিস্তিনি মা তার সন্তানদের জন্য সামান্য কিছু কুকিজ বানানোর চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, বাচ্চাদের মুখে সামান্য হাসি ফোটাতে চাচ্ছি। ঈদ নেই, কিন্তু ঈদের কথা ভুলিয়ে দিতে পারি না।

গাজার পরিস্থিতি এমন যে ঈদের দিনও মানুষ খাবার-পানির সংস্থানের জন্য সংগ্রাম করছে। নতুন পোশাকের পরিবর্তে এখন সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস হলো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি।

গাজার ঈদ : বেঁচে থাকার সংগ্রাম

গাজার প্রতিটি পরিবার আজ নিদারুণ কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ইসরায়েলের অবরোধের কারণে খাদ্যের দাম বেড়ে গেছে, বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই, আশ্রয়ের অভাব চরমে। ঈদ তাই এখন গাজার মানুষের জন্য আরেকটি কঠিন দিন, যেখানে আনন্দের বদলে বুকভরা বেদনা আর বেঁচে থাকার যুদ্ধই একমাত্র বাস্তবতা।

‘ঈদ আসে, ঈদ যায়। কিন্তু গাজায় ঈদ আসে না।’—এভাবেই দীর্ঘশ্বাস ফেলেন গাজার এক বাসিন্দা, যেন তার কথায় ফুটে ওঠে পুরো ফিলিস্তিনের যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি।
সূত্র : মিডল ইস্ট মনিটর ও গালফ নিউজ

যুদ্ধের মাঝে ‘বেঁচে থাকাটাই’ ফিলিস্তিনিদের ঈদ আনন্দ

মুসলিমদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর আবারও দরজায় কড়া নাড়ছে, তবে অন্যান্য দেশের মতো ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে না ফিলিস্তিনিরা। এবারও গাজা উপত্যকায় যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিনি নাগরিকরা ঈদ উদযাপন করবে। তবে, এই ঈদ তাদের কাছে আলাদা—তারা স্বজনদের লাশ কাঁধে বয়ে ঈদ উদযাপন করবে, এমনকি অনেকের কাছে বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘর্ষের মধ্যেই ১৮ মার্চ যুদ্ধবিরতি ভেঙে ইসরায়েলি বাহিনী নির্বিচারে বোমাবর্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৯০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে, ফিলিস্তিনিদের জন্য ঈদের আনন্দ কতটুকু থাকবে, সেই প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।

এদিকে, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র জানিয়ে দিয়েছে, গাজা উপত্যকায় ঈদ উপলক্ষে কোনো যুদ্ধবিরতি হবে না। ফলে ফিলিস্তিনিরা ঈদ উদযাপনে আর কিছু ভাবতে পারছে না।

ঈদে সাধারণত যে প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয়, সেই খাওয়ার চিন্তা এখন ফিলিস্তিনিদের জন্য অবাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাজার খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। খাদ্য উপকরণ থাকলেও সেগুলো রান্না করার পরিস্থিতি নেই। গাজায় বিদ্যুৎ বন্ধ, জ্বালানি সংকট এবং যুদ্ধের কারণে কৃষি ব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ার ফলে খাবার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

ঈদের সকালে ফিলিস্তিনিরা ঐতিহ্যবাহী সুম্মাকিয়া রান্না করে থাকে—যেখানে ভেড়ার মাংস, গরুর মাংস, তিল, ছোলা এবং শাক দিয়ে একটি বিশেষ ঝোল তৈরি করা হয়। তবে এই খাবারটি তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ এখন গাজার বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না।

যখন তাদের মাতৃভূমি থেকে নির্মূল হওয়ার চেষ্টা চলছে, তখন ফিলিস্তিনিরা তাদের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। প্রতিদিনই তারা তাদের স্বজনদের জীবনের নিরাপত্তা হারাতে দেখছে। তারপরও, এ ধরনের কঠিন পরিস্থিতিতে নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে তাদের চেষ্টার কোনো কমতি নেই।

ঈদের দিন, গাজার ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো অনেক কষ্টের মধ্যে তাদের ছোট ছোট সন্তানদের জন্য ঈদের আনন্দ তৈরি করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। কিন্তু, অধিকাংশ শিশু এক বেলা খেয়েই ঈদের দিন কাটাবে। খাদ্য সংকট এবং যুদ্ধের কারণে তাদের আনন্দের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে শুধু বেঁচে থাকা, আর তাই তাদের জন্য এবারের ঈদ কোনো প্রীতিভোজ নয়, বরং জীবন বাঁচানোর এবং শোক প্রকাশের দিন।
সূত্র : আল জাজিরা

ঈদের জামাতে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার ফিলিস্তিনিরা। ছবি : সংগৃহীত
ঈদের জামাতে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার ফিলিস্তিনিরা। ছবি : সংগৃহীত



কাঁদতে কাঁদতে গাজার বাসিন্দা বললেন, ‘আমরা তো সব হারিয়েছি, ঈদটা কষ্টের’

ফিলিস্তিনের গাজায় রোববার পালিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। তবে ইসরায়েলের নৃশংস হামলায় বিধ্বস্ত উপত্যকাটিতে ছিল না উৎসবের আমেজ। এ দিনও সেখানে নির্বিচারে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। মুসলিমদের খুশির দিনটিতে গাজায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৩৫ ফিলিস্তিনি।

দীর্ঘ ১৭ মাস ধরে চলা হামলায় গাজায় আর কোনো মসজিদ অবশিষ্ট নেই বললেই চলে। রোববার তাই উপত্যকাটির বাসিন্দাদের ঈদের নামাজ আদায় করতে হয়েছে ধ্বংস হয়ে যাওয়া মসজিদের বাইরে। আগের দিনে গাজার যেসব শিশু নতুন পোশাক পরে আনন্দ করত, তারা এখন ক্ষুধায়-আতঙ্কে কাতর। ঈদ উপলক্ষে নেই তেমন রান্নার আয়োজন।

ইসরায়েলের হামলা শুরুর আগে গাজার ফিলিস্তিনিরা ঈদের সকালে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উদ্‌যাপন করতেন। তবে এখনকার চিত্র ভিন্ন। বহু গাজাবাসী তাঁদের পরিবারের সদস্যকে হারিয়েছেন। রোববার অনেককে দেখা যায় প্রিয়জনের কবরের পাশে। অনেকে হাজির হন হাসপাতালের মর্গে—শেষবারের মতো কাছের মানুষের মরদেহটি দেখতে।

ইসরায়েলের হামলায় গাজার বাসিন্দা আদেল আল-শায়ের তাঁর পরিবারের ২০ সদস্যকে হারিয়েছেন। মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় ঈদের নামাজ শেষে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বলেন, ‘এই ঈদটা কষ্টের। আমরা আমাদের ভালোবাসার মানুষগুলোকে হারিয়েছি। আমাদের সন্তান, আমাদের জীবন, আমাদের ভবিষ্যৎ—সবকিছু... আমরা তো সব হারিয়েছি।’

রোববার ঈদের নামাজ আদায় করেছেন গাজার আরেক বাসিন্দা সায়েদ আল-কুর্দ। তিনি বলেন, ‘এখানে হত্যা করা হচ্ছে। মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। সবাই ক্ষুধার্ত। আমাদের অবরোধ করে রাখা হয়েছে। শিশুদের খুশি করার জন্য শুধু আমরা বাইরে বেরিয়েছি। তবে ঈদের আনন্দের কথা বলতে গেলে—এখানে কোনো ঈদ নেই।’

২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের নৃশংসতা শুরুর পর থেকে গাজার ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা পুরো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বিগত ১৭ মাসে উপত্যকাটিতে নিহত হয়েছেন ৫০ হাজার ২৭৭ জন। আহত ১ লাখ ১৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি। তাঁদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ।

এরই মধ্যে গত ১৯ জানুয়ারি থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। এরপর কিছুটা স্বস্তিতে ছিলেন সেখানকার ফিলিস্তিনিরা। কথা ছিল ১ মার্চ যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ শেষে দ্বিতীয় ধাপ শুরু হবে। তবে এ নিয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি ইসরায়েল ও হামাস। পরে পবিত্র রমজান ও ইহুদিদের পাসওভার উৎসবের কারণে আগামী ২০ এপ্রিল পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি করে ইসরায়েল।

তবে ১৮ মার্চ যুদ্ধবিরতি ভেঙে গাজায় আবার হামলা শুরু করে ইসরায়েল। তখন থেকে প্রতিদিন নির্বিচারে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। ঈদের দিনও দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস ও রাফাসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালানো হয়েছে। লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে ফিলিস্তিনিদের তাঁবু ও বাসাবাড়ি। স্থানীয় চিকিৎসকদের সূত্রে জানা গেছে, এদিন অন্তত ৩৫ জন নিহত হয়েছে। সংখ্যাটা আরও বাড়ছে।

ঈদের দিন ভোরের আলো ফোটার আগে খান ইউনিসে ইসরায়েলের হামলার বর্ণনা দিচ্ছিলেন ওমর আল-কাদি। তিনি বলেন, ‘কখন ভোর হবে, ঈদ উদ্‌যাপন শুরু হবে, সেই অপেক্ষায় ছিল শিশুরা। তবে রাত সাড়ে ১২টার দিকে নিরাপরাধ-শান্তিপ্রিয় বাস্তুচ্যুত মানুষদের তাঁবুতে শত্রুদের যুদ্ধবিমান হামলা চালায়।’

খান ইউনিসের আরেক বাসিন্দা আহমাদ আল-নাজ্জার কাছে এবারের ঈদুল ফিতরকে তাঁর জীবনের সবচেয়ে ‘মর্মান্তিক’ সময় বলে মনে হয়েছে। তিনি বলেন, খান ইউনিসের শিশুরা ঈদুল ফিতর উদ্‌যাপনের জন্য তাঁদের সবচেয়ে সুন্দর পোশাকগুলো খুঁজে বের করছিল। তবে কিন্তু এই বোমাবর্ষণের কারণে অনেকেই সেগুলো পরার সুযোগ পাবে না।’

এদিকে গত ২ মার্চ থেকে গাজার ক্রসিংগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েল। সেখানে কোনো ত্রাণসহায়তা প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে। ফলে গাজায় যে খাবারের মজুত ছিল তা প্রায় শেষের পথে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, তাদের কাছে খাবারের যে মজুত আছে, তা আর মাত্র ১০ দিনের মতো চলতে পারে।

খাদ্যের পাশাপাশি গাজায় পানির সংকটও সৃষ্টি হয়েছে। উত্তর গাজার জাবালিয়ায় মজুত থাকা পানি শেষ হয়ে গেছে। সেখানকার বাসিন্দা ইনশিরাহ হানোউনেহ বলেন, ‘আজ ঈদ। তবে এই তিক্ত জীবনের কারণে শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই কষ্টে রয়েছে। এই দিন তাদের জন্য খুশি আনেনি... গত রাত থেকে পানি নেই। পান করার মতো এক ফোটা পানিও পাইনি..যথেষ্ট্ঠ যুদ্ধ হয়েছে। শান্তি চাই।’

রোববার যখন গাজায় ঈদের নামাজ আদায় করা হচ্ছিল, তখনো ভেসে আসছিল কামানের গোলার শব্দ। আকাশে ধেয়ে আসছিল ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ড্রোন। খান ইউনিসের ২৮ বছর বয়সী মা নাহলা আবু মাতার বলেন, ‘এক সময় ঈদ ছিল পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার এবং বেড়াতে যাওয়ার একটি দিন। তবে এখন তা শেষ বিদায়ের এবং নিহতদের দাফন-কাফনের দিনে পরিণত হয়েছে।’

ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ঈদের নামাজ আদায় করছেন উত্তর গাজার জাবালিয়া এলাকার ফিলিস্তিনিরা
ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ঈদের নামাজ আদায় করছেন উত্তর গাজার জাবালিয়া এলাকার ফিলিস্তিনিরা। ছবি: রয়টার্স

ঈদ, তাই খেলায় মেতেছে দুই শিশু
ঈদ, তাই খেলায় মেতেছে দুই শিশু। ছবি: রয়টার্স

Sunday, March 30, 2025

ঈদ যেন গাজাবাসীর জন্য নয়

ফিলিস্তিনিদের ঈদ উদ্‌যাপন বলে কিছুই নেই। ইসরায়েলি হামলার মধ্যে গাজাবাসীর জন্য এটা হবে দ্বিতীয় ঈদ।

গাজা এখন ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এক নগরী। এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও ফিলিস্তিনি জনগণ ঈদ পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পবিত্র রমজান মাস ফিলিস্তিনিদের কেটেছে দুঃসহ কষ্টে। ১ মার্চ ইসরায়েলের সঙ্গে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের প্রথম দফার যুদ্ধবিরতি শেষ হয়। এর পর থেকে গাজায় আবার হামলা শুরু করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। রোজার মধ্যেও খাবার নেই, মাথা গোঁজায় ঠাঁই নেই তাঁদের। কষ্টে, অনাহারে কাটছে মানুষের জীবন।

হামাসের ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে এ মাসের শুরু থেকে গাজায় ত্রাণসহায়তা পৌঁছাতে দেয়নি ইসরায়েল। ফলে আবার গাজা ছেড়ে পালাতে হয়েছে অনেক পরিবারকে। এই অনাহার ও কষ্টের মধ্যেও ঈদ পালন করতে যাচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা। রোজার মাস শেষ হতে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে আজ ঈদ উদ্‌যাপিত হবে। কিন্তু ঈদ যেন গাজাবাসীর জন্য নয়। ফিলিস্তিনিরা বলছেন, ‘তাঁদের উদ্‌যাপনের কিছুই নেই’।

১৮ মার্চ ইসরায়েল গাজায় নতুন করে হামলা শুরু করেছে। এতে গত ১১ দিনে ৮৯০ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলা শুরুর পর থেকে ইতিমধ্যে ইসরায়েলি হামলায় ৫০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন। নিহতদের অধিকাংশ নারী ও শিশু। এ ছাড়া কয়েক সপ্তাহ ধরে গাজা উপত্যকায় কোনো খাবার বা ত্রাণ প্রবেশ করতে পারেনি। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত অস্থিতিশীল।

ইসরায়েলি হামলার মধ্যে গাজাবাসীর জন্য এটা হবে দ্বিতীয় ঈদ। প্রথম ঈদের সময় ইসরায়েলি ভয়াবহ হামলার রেশ এবারও তাঁদের টানতে হচ্ছে। কিন্তু এবার আশায় বুক বেঁধেছিলেন তাঁরা। ভেবেছিলেন যুদ্ধবিরতি হবে। ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে হামলা কিছুটা কমেছিল। তবে ১৮ মার্চ থেকে গাজায় আকস্মিক হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি ভেঙে ফেলে ইসরায়েল। তাদের হামলায় কয়েক শ মানুষ মারা যান। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ হামলার নির্দেশ দেন।

ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ আরও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। এ সময় হামাসের হাতে থাকা ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দিতে চাপ দেওয়া হয়। হামাসের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের দাবি করা হয়। এতে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ও একযোগে সব জিম্মিকে মুক্তির কথা বলে হামাস। ইসরায়েলি প্রস্তাবে হামাস রাজি না হওয়ায় গাজায় ত্রাণসহায়তা বন্ধ করে দেয় ইসরায়েল।

একটি নাজুক যুদ্ধবিরতির মধ্যে রোজা পালন শুরু করেছিলেন গাজাবাসী। তাঁদের আশা ছিল স্থায়ী যুদ্ধবিরতির দিকে যাবে হামাস ও ইসরায়েল। কিন্তু যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ায় ফিলিস্তিনিদের ভাগ্য আবার বদলে গেল।

অ্যাম্বুলেন্সে হামলা

বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, ইসরায়েলের সেনাবাহিনী শনিবার স্বীকার করেছে, গাজার অ্যাম্বুলেন্সগুলোকে তারা সন্দেহজনক যান হিসেবে চিহ্নিত করে এগুলোতে গুলি চালিয়েছে। হামাস একে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সে হামলায় অন্তত একজন নিহত হয়েছেন। গত রোববার রাফার তাল আল-সুলতানে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনা ছাড়াও গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ২৭৭।

বাস্তুচ্যুত এক ফিলিস্তিনি নারী পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী খাবার কুকিস তৈরি করছেন। গত শুক্রবার গাজা নগরীতে
বাস্তুচ্যুত এক ফিলিস্তিনি নারী পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী খাবার কুকিস তৈরি করছেন। গত শুক্রবার গাজা নগরীতে। ছবি: এএফপি

আজ ঈদ মধ্যপ্রাচ্যে: একটু থামুন, ছবিটা দেখুন তো!

একটু থামুন। রিপোর্টের এই ছবিটার দিকে একবার ভালো করে লক্ষ্য করুন তো! কী দেখছেন! সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ দেশ যখন পবিত্র রমজান পালন শেষে ঈদের আনন্দে, তখন গাজার এই শিশুরা জীবন বাঁচাতে একটু খাবারের জন্য এভাবে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে। তাদের কারো পিতা নেই। কারো মাতা নেই। ভাইবোন নেই। একেবারে এতিম। আল্লাহর দয়া আর মানুষের করুণার ওপর ভর করে বেঁচে আছে তারা। একবার ভাবুন তো এই শিশুদের ঈদের কথা! তাদের জীবনে ঈদ মানে কি আনন্দ? তাদের কাছে ঈদ মানে মুক্তি, স্বাধীনতা। বেঁচে থাকার স্বাধীনতা। একটুকরো স্বাধীন জন্মভূমি। সেই অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করে গণহত্যার উল্লাসে মেতে উঠেছে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। পবিত্র ঈদের দিনেও রক্ষা পায়নি গাজা আর এর শিশুরা। আজ সেখানে ঈদুল ফিতর। এর মধ্যেই সেখানে বোমা হামলা চালিয়েছে জায়নবাদী ইসরাইল। এতে কমপক্ষে ৯ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে আবার ৫ জনই শিশু।

ওদিকে মিশর ও কাতার নতুন একটি যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে। হামাস তা গ্রহণ করার কথা বলার পর নেতানিয়াহুর অফিস থেকে বলা হয়েছে, তারা একটি পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছে।

ওদিকে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বলেছে, তাদের হাতে যে পরিমাণ খাদ্য মজুদ আছে তাতে গাজায় মাত্র ১০ দিনের সরবরাহ দেয়া সম্ভব। এর মধ্যে ইসরাইলের অব্যাহত অবরোধ তুলে না নিলে মানুষ না খেয়ে মারা যাবে। হাজার হাজার মানুষের কোনো খাবার থাকবে না। গাজায় এরই মধ্যে পুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্যের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। তাদের কাছে যে ইর্মাজেন্সি মজুদ আছে তা মাত্র ৪১৫০০০ মানুষের পুষ্টি বিষয়ক বিস্কুট। এ অবস্থায় বেসামরিক লোকজনের প্রয়োজন পূরণে অগ্রাধিকার দেয়ার জন্য সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি। আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার বিষয়ক কর্মী ও জাতিসংঘের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রালয়ের হিসাবে ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর থেকে ইসরাইলি হামলায় নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫০,২৭৭ জন ফিলিস্তিনি। আহতের সংখ্যা ১১৪০৯৫। অন্যদিকে গাজার মিডিয়া অফিস প্রায় দুই মাস আগে বলেছে, নিহতের সংখ্যা কমপক্ষে ৬১,৭০০। হাজার হাজার মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন। অনলাইন আল জাজিরা বলছে, দখলীকৃত পশ্চিম তীরের তাম্মুন শহরে ২২ বছর বয়সী একজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইলিরা। এ হত্যার কথা নিশ্চিত করেছে ইসরাইল। তাদের অভিযোগ, ওই ব্যক্তি ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালাবেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছিল।

ওদিকে গত ২৪ ঘন্টায় লোহিত সাগরে তিন দফা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ হ্যারি ট্রুম্যানে হামলা চালিয়েছে হুতিরা। তারা বলেছে, শত্রুদের যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে তাদের যোদ্ধারা হামলা করেছে। টেলিগ্রামে হুতির এক মুখপাত্র বিবৃতিতে বলেছেন, গাজায় আগ্রাসন বন্ধ ও অবরোধ তুলে না নেয়া পর্যন্ত ফিলিস্তিনি নিষ্পেষিত জনগণের অধিকারের প্রতি অব্যাহত সমর্থন থেকে কোনোভাবে পিছপা হবে না তারা।

ওদিকে পবিত্র ঈদ উপলক্ষ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন ইয়েমেনে হুতি নেতা আবদুল মালিক বদর আল দিন আল হুতি। তিনি পবিত্র ঈদের দিনে গাজায় ইসরাইলের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের জন্য এবং তাদের সুরক্ষার জন্য সব সময় দ্ব্যর্থহীনভাবে সমর্থন দিয়ে যাবেন ইয়েমেনের মানুষ।

mzamin

যুক্তরাষ্ট্রের পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করলেন উমামা ফাতেমা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সকল নারীদের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র স্টেট ডিপার্টমেন্টের ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ’। তবে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা।

শনিবার (২৯ মার্চ) রাতে পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে জানিয়েছেন।

ফেসবুকে স্ট্যাটাসে উমামা বলেছেন, ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ’ অ্যাওয়ার্ড ২০২৫ এর পক্ষ থেকে জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নারী আন্দোলনকারীদের বিশেষ পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। এই অ্যাওয়ার্ডের অধীনে ‘ম্যাডেলিন অলব্রাইট অনারারি গ্রুপ অ্যাওয়ার্ড’ হিসেবে জুলাই অভ্যুত্থানের সকল নারীদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে দেওয়া লেখাটি নিজের পোস্টে উদ্ধৃত করেন তিনি।

তিনি বলেন, আগামী ১ এপ্রিল, ২০২৫ যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট মার্কো রুবিও এবং ফার্স্ট লেডি মিলানিয়া ট্রাম্প পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করবেন।

কেন তিনি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন- সে বিষয়ে উমামা বলেন, নারী আন্দোলনকারীদের কালেক্টিভ স্বীকৃতি আমাদের জন্য অত্যন্ত সম্মানজনক। তবে ২০২৩ সালের অক্টোবরে ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলের নারকীয় হামলাকে প্রত্যক্ষভাবে এন্ডোর্স করে যাওয়ার জন্য এ অ্যাওয়ার্ডটি ব্যবহৃত হয়েছে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা যুদ্ধকে অস্বীকার করে পুরস্কারটি ইসরায়েলের হামলাকে যে প্রক্রিয়ায় জাস্টিফাই করেছে তা পুরস্কারের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যেখানে ফিলিস্তিনি জনগণ তাদের মৌলিক মানবাধিকার(ভূমির অধিকার) থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। তাই ফিলিস্তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সম্মান রেখে এই পুরস্কার আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যাখ্যান করলাম। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের অফিসিয়াল সিলমোহর (বায়ে) ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা (ডানে)। ছবি : সংগৃহীত
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের অফিসিয়াল সিলমোহর (বায়ে) ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা (ডানে)। ছবি : সংগৃহীত

তিন সন্তানের লাশের ভার নাসির উদ্দিন কীভাবে বইবেন

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় নাসির উদ্দিনের বাড়িতে সবাই আহাজারি করছেন। বাড়ির সদস্যরা তো বটেই, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী যাঁরা এসেছেন, তাঁরাও কাঁদছেন। এই বাড়ির তিন সন্তান আজ শনিবার সকাল পৌনে ৮টার দিকে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার সোনার বাংলা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। একসঙ্গে তিন সন্তানের লাশের ভার নাসির উদ্দিন কীভাবে বইবেন, মুঠোফোনে বিলাপ করে বলছিলেন তিনি।

নাসির উদ্দিন শ্রমিকের কাজ করতে গেছেন রাঙামাটি। তিন ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে সেখান থেকে রওনা দিয়েছেন তিনি। পথে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে তিন ছেলে হারানোর কষ্টের কথা বলছিলেন, আর হাউমাউ করে কাঁদছিলেন।

নিহত তিন ভাই হলেন মো. নাঈমুজ্জামান খান ওরফে শুভ (২২), মো. শান্ত খান (১৪) ও মো. নাদিম খান (৮)। পাথরঘাটার টিকিকাটা ইউনিয়নের বাইশকুরা গ্রামে তাঁদের বাড়ি। দুর্ঘটনার পরপরই তিন ভাইয়ের লাশ উদ্ধার করে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। সেখান থেকে তাঁদের লাশ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আনা হয় মঠবাড়িয়ার গুলশাখালী গ্রামে তাঁদের নানাবাড়িতে। এ সময় সেখানে মাতম শুরু হয়। বিকেল সাড়ে ৪টায় শেষ খবর অনুযায়ী, লাশ তিনটি নিয়ে স্বজনেরা বাইশকুরা গ্রামে পৈতৃক বাড়িতে রওনা দিয়েছেন। সেখানেই তাঁদের লাশ দাফনের প্রস্তুতি চলছে।

এলাকার লোকজন ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নাঈমুজ্জামানকে গ্রামের সবাই শুভ নামেই বেশি চেনেন। ঢাকার সাভারে একটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিক ছিলেন তিনি। তাঁর ছোট ভাই শান্ত গুলশাখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র এবং নাদিম গুলশাখালী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। তাঁদের ছোট আরেক ভাই ছিল। সাত মাস বয়সী ওই ভাইটি গত বছর পানিতে ডুবে মারা গেছে। ফলে একই পরিবারের চার ভাইয়ের কেউ রইল না।

শুভ মাত্র চার দিনের ছুটি পেয়ে ঈদ করতে এসেছিলেন বাড়িতে। তবে তাঁর সহকর্মী বন্ধু রাকিব ঈদে ছুটি পাননি। শুভ ঢাকা থেকে আসার সময় রাকিব নিজের পরিবারের সদস্যদের জন্য কেনা নতুন পোশাক শুভকে দিয়েছিলেন পৌঁছে দেওয়ার জন্য। রাকিবের বাড়ি পাশের পাথরঘাটা উপজেলার মানিকখালী গ্রামে।

ঢাকা থেকে শুভ বাড়িতে পৌঁছান গতকাল শুক্রবার রাতে। আজ শনিবার সকালে মোটরসাইকেলে বেরিয়েছিলেন রাকিবের বাড়ি পাথরঘাটার উদ্দেশে। সঙ্গে নিয়েছিলেন ছোট ভাই শান্ত ও নাদিমকে। পাথরঘাটা-মঠবাড়িয়া সড়কের সোনার বাংলা এলাকায় ঢাকাগামী রাজীব পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে তাঁদের মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

বাবা নাসির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার জীবনের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। আমার মতো হতভাগা আর কে আছে। আজকে একসঙ্গে আমার তিন ছেলে মারা গেল, গত বছর আমার ছোট ছেলে (৭ মাস) পানিতে ডুবে মারা গেছে। আমার জীবনের কী অপরাধ ছিল জানি না। আমার চার ছেলে আজকে কেউ নাই। আমি শ্রমিকের কাজ করি। আমার সংসারের জন্য বড় পোলারে চাকরি করতে দিছি সাভারে। আমি ছিলাম রাঙামাটি, এহন বাড়ির পথে।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. মঞ্জু বলেন, ‘এর আগে আমাগো গ্রামে একসঙ্গে তিনজনের লাশ কেউ দেখি নাই। নাসির তার পরিবার নিয়ে আমাদের এখানে বাস করত। সে শ্রমিক হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে কাজ করে। তার চার ছেলে। গত বছর তার ছোট ছেলে পানিতে ডুবে মারা গেছে। আমরা এ গ্রামের মানুষ আগে কখনো তিনজনের লাশ একসঙ্গে দেখি নাই।’

রাকিবের বাবা হিরু হাওলাদার বলেন, ‘আমার ছেলে রাকিব আর শুভ একসঙ্গে ঢাকায় চাকরি করে। রাকিব এবার ঈদে ছুটি পায় নাই। এ জন্য শুভর কাছে আমাদের জন্য কিছু কাপড় কিনে দিছে। সেগুলো দেওয়ার জন্য আজ সকালে আমাদের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলে সোনার বাংলা এলাকায় সে আর তার দুই ছোট ভাই বাসচাপায় মারা গেছে। আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই আজকে এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটবে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পিরোজপুর বাসমালিক সমিতির সভাপতি আলমগীর হোসেন বলেন, ‘কোনো দুর্ঘটনাই আমাদের কাম্য নয়। মঠবাড়িয়া সড়কটি ব্যস্ত সড়ক হওয়ার পরও এটি প্রশস্ত নয়। রাস্তা প্রশস্ত না হওয়া এবং বাস ও মোটরসাইকেল উভয়ে বেপরোয়া গতির হওয়ার কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।’

পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফুল আলম খান বলেন, ‘তিন ভাইয়ের দাফনের ব্যবস্থা করতে পরিবারের সদস্যরা আবেদন করলে আমরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের জন্য একটি অনুদানের ব্যবস্থা করব।’ 

বরগুনার পাথরঘাটায় বাসের চাপায় মোটরসাইকেলের আরোহী তিন ভাই নিহত হয়েছেন। শনিবার সকালে উপজেলার সোনার বাংলা এলাকায় দুর্ঘটনাস্থলে
বরগুনার পাথরঘাটায় বাসের চাপায় মোটরসাইকেলের আরোহী তিন ভাই নিহত হয়েছেন। শনিবার সকালে উপজেলার সোনার বাংলা এলাকায় দুর্ঘটনাস্থলে। ছবি: প্রথম আলো

মুসলিমদের ঘরে ঘরে আনন্দের হাওয়া: গাজায় ক্ষুধা, রক্ত, আর্তনাদ

সারাবিশ্বে মুসলিম সম্প্রদায়ের বড় আনন্দ উৎসব সমাগত। ঈদের আনন্দ ঘরে ঘরে শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু গাজার মানুষের ঈদ নেই। তাদের আছে আর্তনাদ। রক্ত। ক্ষুধা। বোমার অব্যাহত আঘাত। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের (আইসিসি) আদেশে যুদ্ধাপরাধী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অব্যাহতভাবে সেখানে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। এই পবিত্র রমজান ও ঈদের আনন্দকেও তারা রক্তের নদীতে মিশিয়ে দিয়েছে। স্বাধীনতাযোদ্ধা হামাসের সঙ্গে প্রথম দফা যুদ্ধবিরতি ইসরাইল ভেঙে দেয় ১৮ই মার্চ। তারপর থেকে অব্যাহতভাবে নির্বিচারে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। ১৮ই মার্চ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৯০০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইল। এ সময়ে আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৯৮৪ জন। সারাবিশ্বের চোখের সামনে ঘটে যাচ্ছে এ ঘটনা। কিন্তু কারো মুখে কোনো রাঁ নেই। যেন ইসরাইলকে লাইসেন্স দিয়ে দেয়া হয়েছে গাজার মানুষদের মেরে মরুভূমি বানিয়ে দেয়ার। হাত-পা হারানো, পিতা-মাতা, ভাইবোন হারানো ছোট্ট ছোট্ট শিশুর যে বীভৎস ছবি, ভিডিও প্রকাশ পাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, টেলিভিশনের পর্দায়- তাকে কারো বিবেক সামান্য পরিমাণে আন্দোলিত হচ্ছে না। পাশাপাশি নভেম্বরে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ার পর প্রথমবারের মতো লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ভয়াবহ বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। দক্ষিণ লেবাননেও তারা অব্যাহত হামলা চালাচ্ছিল। গাজায় সব রকম মানবিক সহায়তা ও খাদ্য সরবরাহ কমপক্ষে তিন সপ্তাহ বন্ধ করে দিয়েছে ইসরাইল।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করেছে যে, এ কারণে ফিলিস্তিনে হাজার হাজার মানুষ ভয়াবহ অনাহারে ভুগছেন। পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন। বিশ্বজুড়ে যখন মুসলিমের ঘরে ঘরে আনন্দের হাওয়া, তখন ফিলিস্তিনিরা কোনোমতে উদোরপুর্তি করার জন্য খাবার পাচ্ছে না। এরই মধ্যে ইসরাইলের হামলায় নিহতের সংখ্যা ৫০,২০৮ ছাড়িয়ে গেছে। আহত হয়েছেন ১,১৩,৯১০ জন। তবে গাজার মিডিয়া অফিসের হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৬১,৭০০। এই সংখ্যা কয়েকগুন বাড়তে পারে। কারণ, ধ্বংসস্তূপের নিচে যে অসংখ্য গাজাবাসী আটকা পড়ে আছেন তাদেরকে এই সংখ্যার মধ্যে ধরা হয়নি। মুসলিম বিশ্বে না হলেও ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে পালিত হয়েছে আল কুদস দিবস। পবিত্র রমজান মাষের শেষ শুক্রবারকে জুমাতুল বিদা ও আল কুদস দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এটি হলো জায়নবাদী ইভেন্টের বিরুদ্ধে এবং ফিলিস্তিনপন্থি একটি ইভেন্ট। শিকাগোর বিক্ষোভ থেকে স্লোগান দেয়া হচ্ছিল- ‘বর্ণবাদ: দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য খারাপ, ফিলিস্তিনের জন্যও খারাপ’। বিক্ষোভের আশপাশে অনেক মানুষ ছিলেন। তারা বলেছেন, ভয়ে তারা অংশ নিতে পারেননি। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসন বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তার প্রশাসন এই বিক্ষোভ থেকে বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করে দেশ থেকে বের করে দিতে পারে। এরই মধ্যে মাহমুদ খলিল নামে একজন সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে প্রশাসন। তাদেরকে দেশে ফেরত পাঠানো হবে। তবু যারা বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন তারা গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গের জন্য ইসরাইলকে দায়ী করছিলেন।

ওদিকে মিশিগানের কংগ্রেসওমেন রাশিদা তায়েব সহ মিশিগান রাজ্যের মন্ত্রী এবং অন্য নির্বাচিত কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটির কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন অভিবাসন বন্দিশিবির থেকে মাহমুদ খলিলকে মুক্তি দিতে। এ মাসের শুরুর দিকে খলিলকে আটক করা হয়। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে ফিলিস্তিনপন্থি শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদে যোগ দেয়ার অপরাধে তাকে আটক করা হয়। রাশিদা তায়েব সহ অন্যরা যৌথ স্বাক্ষরে লেখা এক চিঠিতে বলেছেন, খলিলকে আটক একই সঙ্গে তার অধিকার ও আত্মমর্যাদার জন্য অপমানজনক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে চাইলে এটা তার বিরুদ্ধে হুমকি। আইনকে লঙ্ঘন করে মাহমুদ খলিলকে টার্গেট করার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে দায়ী করা হয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, গাজায় ইসরাইলি সরকার সব রকম শাস্তি আরোপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভে অংশ নেয়ার কারণে খলিলকে টার্গেট করা হয়েছে এটা পরিষ্কার। তাকে টার্গেট করা হয়েছে কারণ, তিনি একজন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিনি। তাকে টার্গেট করা হয়েছে তার জাতীয়তার জন্য।

ওদিকে ইসরাইলের অব্যাহত হামলায় গাজায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। অবরোধ দেয়ার ফলে কোনো চিকিৎসা সরঞ্জাম পৌঁছাতে পারছে না সেখানে। হাসপাতালগুলো ভরে যাচ্ছে হতাহত মানুষে। নেই ওষুধ। জীবন বাঁচাতে রক্তের ভীষণ প্রয়োজন। আহতদেরকে কোনোমতে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রাণপণ লড়াই করছেন চিকিৎসকরা। ওদিকে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজ ইসরাইল বিরোধী অবস্থান নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর প্রেক্ষিতে, ওই সেন্টারটির একাডেমিক লিডারশিপ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

mzamin

শহীদ পরিবারে ঈদ নেই by ফাহিমা আক্তার সুমি

ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর এবার মুক্ত পরিবেশে ঈদ উদ্‌যাপনের সুযোগ পাচ্ছে সাধারণ মানুষ। কিন্তু যাদের ত্যাগে এই ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের অবসান হয়েছে সেই শহীদদের পরিবারে নেই ঈদের আনন্দ। ঈদের আনন্দের পরিবর্তে বিষাদের কালো ছায়া, শোকের আবহ। প্রিয় স্বজনকে ছাড়া ঈদ কাটবে শহীদদের পরিবারে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে কেউ হারিয়েছেন সন্তান, কেউ স্বামী, কেউ ভাই, কেউবা বাবা-মাকে। স্মৃতিকাতর পরিবারগুলোতে এবারের ঈদ এসেছে শুধুই হাহাকার নিয়ে। কারও মুখে হাসি নেই। নেই কোনো ঈদ আয়োজন। গেল বছরগুলোতে এসকল শহীদরা স্বজনদের নিয়ে কেনাকাটা করেছেন। কিন্তু এবারের ঈদে তারা কেবলই স্মৃতি। ঈদের দিনে প্রিয়জনদের কবরের পাশে আর্তনাদে কাটবে স্বজনদের সময়। অনেক শহীদের বাড়িতে রান্না হবে না বিশেষ কোন খাবার। অনেকে পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন। অনেকে আবার কান্নায় ভেঙে পড়েছেন গেল বছরগুলোর স্মৃতি মনে করে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে স্বজন হারানো পরিবারগুলোর অনেকের সঙ্গে কথা হয় মানবজমিনের। তারা বলেছেন, তাদের জীবনে ঈদ-রোজা বলে কিছু নেই। সবকিছু যেন এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। তাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে রমজান ও ঈদের আনন্দ।

মেহেদী হাসান (২৬)। তিনি একজন গণমাধ্যমকর্মী ছিলেন। গত বছরের ১৮ই জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিতে মারা যান। তার দুই শিশু সন্তান রয়েছে। সন্তানদের নিয়ে তার স্ত্রী কেরানীগঞ্জে ভাড়া বাসায় থাকেন। মেহেদীর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম পপি বলেন, ঈদের আনন্দ-খুশি আমার জীবনে আর নেই। নিভে গেছে আমার ঘরের আলো। সবকিছু এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। জীবন থেকে হারিয়ে গেছে ঈদের আনন্দ। প্রত্যেকবার ঈদে দুইবার কেনাকাটা করতাম। সে রোজার আগে কেনাকাটা করে আমাদের গ্রামের বাড়িতে পাঠাতো। নিজে ঢাকা থেকে যাওয়ার আগে আমাদের সবার জন্য কেনাকাটা করে আবার নিয়ে যেতো। তাকে ছাড়া এ বছর মনে হচ্ছে না আমার জীবনে ঈদ নামে কিছু আছে। ইফতারের সময় প্রতিদিন ফোন করে খবর নিতো। সেহ্‌রির সময় হলে আবার ফোন করতো। রমজান ঈদ ঘিরে পরিবারের মধ্যে একটা আনন্দ বয়ে যেতো। এবার আর অন্যবারের মতো আয়োজন নেই। কখনো ভাবতে পারিনি তাকে ছাড়া এভাবে ঈদ করতে হবে। পুরো পৃথিবী আমাকে দিয়ে দিলেও তার অভাব কখনো পূরণ হবে না। বড় মেয়েটা বাবাকে অনেক বুঝতো কিন্তু ছোট বাচ্চাটার বোঝার মতো বয়স হয়নি। বড় মেয়েটা সবসময় বাবার কথা বলে সে কখনো মানতেই পারে না যে তার বাবা আর কোনো দিন আসবে না। ওদের বাবা ১৫ দিনের মতো বাসায় রোজার ইফতার করার সুযোগ পেতো। এবার কোনো আনন্দ আমাকে ছুঁয়ে যাবে না। মেয়েদের এখনো ঈদের নতুন পোশাক কিনে দেইনি। আমার মনে হয় এমন ঈদের সকাল যেন না আসুক। আমাকে আর কেউ নতুন নতুন খাবার তৈরির জন্য বলবে না। মেয়েদের তাদের বাবার মতো আনন্দ হয়তো দিতে পারবো না তবুও তাদের শান্তনা দিয়ে রাখি। ঈদের নামাজ শেষে মেয়েকে নিয়ে পার্কে ঘুরতে যেতো। মেয়েদের খুশি রাখতে কিছুটা তাদের জন্য কেনাকাটা করবো কিন্তু সেটি আর আগের মতো খুশি মনে হবে না।

ওয়াসিম শেখ (৩৮)। শনির আখড়ায় ফুটপাথে প্যান্ট বিক্রি করতেন। গত বছরের ১৮ই জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিতে মারা যান। তার ৯ মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। ওয়াসিমের স্ত্রী রেহানা বলেন, এইবার ঈদ অন্যবারের মতো হবে না। রমজান মাসটাই খুব কষ্টে যাচ্ছে। আমার এগারো মাসের একটি মেয়ে আছে। ঈদে কোনো কিছু কেনাকাটাও করিনি। মেয়ের জীবনে এবার প্রথম ঈদ। অন্যান্য বছর রমজানের মধ্যে ঈদের কেনাকাটা সেরে ফেলতো ওর বাবা। কিন্তু এবার ঈদ হবে না আমাদের। কোনো আনন্দ নেই আমাদের মাঝে। ওয়াসিমের বোন তামান্না বলেন, এই ঈদ তো আমাদের জীবনে দুঃখ নিয়ে এসেছে। আমার ভাইকে হারিয়েছি, সে আমাদের পরিবারের একমাত্র আয় করতো। বাবা-মা এবং তার স্ত্রী-সন্তানকে সেই দেখেশুনে রাখতো। বাবাও ভাই মারা যাওয়ার আগে মারা যায়। সবাই ওই ভাইটার দিকে চেয়ে থাকতো। ঈদ আসলে সে সবাইকে ঈদের পোশাক কিনে দিতো। তাকেও আমরা পোশাক কিনে দিতাম। সবাই মিলে অনেক আনন্দ করতাম। এবার তার একমাত্র মেয়ের জীবনে প্রথম ঈদ, সেই ঈদেই সে বাবা হারা হয়েছে। অথচ ভাই যদি বেঁচে থাকতো এই মেয়েটাকে নিয়ে কতোই না আনন্দ করতো। যখন মারা যায় তখন মাত্র দেড় মাস বয়স ছিল মেয়েটির। আমার মাও তার সন্তান হারিয়ে পাগলের মতো হয়ে গেছে। তার জীবনে আশা-ভরসা সব হারিয়েছে। ওয়াসিমের স্ত্রীও অনেক ভেঙে পড়েছে। জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে কিছু টাকা পেয়েছে। ভাইয়ের স্ত্রী-সন্তান ও মা একসঙ্গে থাকে।

১৮ বছর বয়সী রুবেল মিরপুর-১০ নম্বরে ভ্যানে সবজি বিক্রি করতেন। গত বছরের ৫ই জুলাই গুলিতে নিহত হন। মিরপুরে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতেন রুবেল। পড়ালেখা করা হয়নি তার। বাবাকে তার উপার্জনের টাকা দিয়ে সহযোগিতা করতেন। রুবেলের বাবা মো. ইদু বলেন, ছেলেটার বয়স খুব কম ছিল। সে আমার তিন ছেলে সন্তানের মধ্যে তৃতীয়। সংসারে আমাকে অনেক সহযোগিতা করতো। এর আগের বছরগুলোতে রমজান আসলে আমাদের নিজে থেকে ভালো ভালো খাবার কিনে খাওয়ায় দিতো। সব সময় জানতে চাইতো কি খেতে ইচ্ছে করছে। প্রতি ঈদে বাবা-মা বোনকে নিয়ে ঈদের পোশাক কেনাকাটা করতো। এখন তো আমার ছেলে নেই, সে আর ফিরে আসবে না। ওই সন্তানই আমার সংসার দেখে রাখতো। ওর মা সারাক্ষণ খেতে গেলে, ঘুমাতে গেলে ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে। তাকে বোঝানো যায় না। এবার ছেলের জন্য ঈদের পোশাক কিনে এক অসহায় ছেলেকে দিয়েছি। কিন্তু ঈদের দিনে তাকে তো কোনোভাবে ভুলে থাকতে পারবো না। মুখে কোনো খাবার যদিও যায় চোখের পানি তো ধরে রাখা যাবে না। ঈদের দিন সন্তানের কবর জিয়ারত করতে যাবো। আমার সন্তান সবজি বিক্রি করে আসার সময় গুলিবিদ্ধ হয় মিরপুর-১০ নম্বরে। গুলিটি তার বুকে এসে লাগে। এ খবর শুনতে পেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। সন্তানের সব স্মৃতি বুকে চেপে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে আর্থিক সহযোগিতা করেছে। রুবেল ঈদের দিনে খুব ঘুরতে পছন্দ করতো, আমাদের নিয়ে ঈদে ঘুরতে যেতো।

মুনসুর মিয়া মোহাম্মদপুরে একটি পেট্রোলপাম্পে কাজ করতেন। গত বছরের ১৯শে জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত হন। তার দশ বছরের একটি ছেলে সন্তান রয়েছে সে একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। মোহাম্মদপুরে বছিলাতে নিজ বাড়িতে পরিবার নিয়ে থাকতেন। মুনসুরের স্ত্রী রিমা আক্তার বলেন, ওর বাবাকে ছাড়া কষ্ট করে চলছি। সে ছাড়া এই প্রথম ঈদ আমাদের। রমজান মাসটায় সারাক্ষণ তার কথা মনে পড়েছে। একজন সন্তান তার বাবাকে ছাড়া কীভাবে কাটাচ্ছে। কীভাবে তাকে ছাড়া আমার সন্তান আনন্দ করবে। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের কষ্ট চাপিয়ে রেখে তার জন্য অল্প কিছু কেনাকাটা করেছি। আমার সন্তানটি এতিম তাকে তো আর তার বাবাকে ফিরিয়ে এনে দিতে পারবো না। মা হিসেবে নিজে সব কষ্ট চেপে রেখে তাকে খুশি রাখতে চেষ্টা করি। ওর বাবা থাকলে অন্যবারের মতো নামাজ শেষে আমাদের নিয়ে ঈদে ঘুরতে যেতো। ঈদ ঠিকই আসবে কিন্তু আমাদের জীবনে আর আনন্দ নিয়ে আসবে না।

বাপ্পী (৩৫)। স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য। দেশে ফিরে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ শুরু করেন। বাপ্পীর ৪ বছরের একটি শিশু সন্তান রয়েছে। দেড় বছর আগে বাপ্পীর স্ত্রী মারা যান। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে সন্তান ছিলেন তিনি। পরিবার নিয়ে মিরপুরে বসবাস করতেন। গত বছরের গণ-অভ্যুত্থানে হাতিরঝিল এলাকায় তার লাশ পাওয়া যায়। তিনি ৫ই আগস্ট গুলিতে মারা যান। বাপ্পীর বোন উমাইমা বলেন, ভাইয়াকে ছাড়া কোনোরকম কেটে যাচ্ছে। সে প্রতি বছর বাবা-মা, আমাকে এবং মেয়েকে কেনাকাটা করে দিতো। সবাইকে ঈদের সালামি দিতো। খুব পছন্দের খাবারগুলো তৈরি করতে বলতো। নিজে রান্নার সময় দেখিয়ে দিতো। খুব খাবার প্রিয় একজন মানুষ ছিল ভাইয়া। আমার ভাতিজি সবসময় বলতে থাকে বাবা কোথায়? আমার ঈদের শপিং করে দিবে না। তোমরা আমাকে ঈদের শপিং করে দিচ্ছো না কেন? ও তো জানে না ওর বাবা মারা গেছে। ও মনে করে ওর বাবা বিদেশ ঘুরতে গেছে ওর জন্য চকলেট, খেলনা নিয়ে আসবে।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গত বছরের ১৯শে জুলাই  রামপুরাতে গুলিতে মারা যান আব্দুল্লাহ ইফতি। গুলিটা তার মাথায় লাগে। পরিবারের সঙ্গে ঢাকার মেরাদিয়ায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। তিনি একটি গাড়ির গ্যারেজে কাজ করতেন। ইফতির বাবা ইউনুস সরদার বলেন, ইফতি আমার একমাত্র ছেলে সন্তান ছিল। সে যখন বেঁচে ছিল তখন প্রতি ঈদে তার মা ও আমাকে নিয়ে শপিং করতো ঈদের। একমাত্র মেয়েটি বিয়ে দিয়েছি। এখন আমরা দু’জন থাকি। ঈদের কোনো আনন্দ নেই। এ বছর এখনো ঈদের কেনাকাটা করা হয়নি। কখনো মন টানছে না ছেলেকে ছাড়া ঈদের নতুন পোশাক কিনতে যেতে। ইফতি থাকলে রোজার কয়েকটা হলেই কেনাকাটা শুরু করে দিতো। এর আগের ঈদগুলোতে সে অনেক আনন্দ করতো। ঘটনার দিন গুলি লাগার দুই ঘণ্টা পর আমি জানতে পারি। ইফতি ছাড়া আমাদের জীবনে আর ঈদ ফিরে আসবে না। 

mzamin

ভূমিকম্পে মিয়ানমারে ধ্বংসযজ্ঞ: মৃত্যু ১০০০ ছাড়ালো

ভূমিকম্পে মিয়ানমার যেন মৃত্যুপুরী। শুক্রবারের প্রলয় সৃষ্টিকারী এই ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে এক হাজার। হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। শুধু মিয়ানমারই নয়, থাইল্যান্ডসহ প্রতিবেশী বেশ কয়েকটি দেশেও এই কম্পন বড় রকম প্রভাব ফেলেছে। প্রতিবেশী থাইল্যান্ডে নিহতের সংখ্যা দেড় শতাধিক। সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছেন মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহৎ শহর মান্দালয়ে। এই শহরটি ভূমিকম্পের উৎসস্থলের একেবারে কাছে। ঘটনার পর থেকে উদ্ধারকর্মীরা অবিরাম মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে জীবিতদের সন্ধান করছেন। অসংখ্য মানুষ এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন। তাদের পরিণতি কী হয়েছে- তা কেউ জানেন না। একজন উদ্ধারকর্মী মান্দালয় থেকে বিবিসিকে বলেছেন, তারা খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে লোকজনকে উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে একটি হাইরাইজ ভবন ধসে পড়েছে। ভবনটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। সেখানেও উদ্ধার অভিযান চলছে। সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রায় ১০০ শ্রমিক আটকা পড়ে আছেন। তাদের কোনো খোঁজ মিলছে না। সেখানে মারা গেছেন কমপক্ষে ৬ জন। পরিস্থিতির শিকার হয়ে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য আবেদন করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমা দেশগুলোর একের পর এক নিষেধাজ্ঞায় ন্যূব্জ দেশটির অর্থনীতি এবং শাসকরা দৃশ্যত একঘরে হয়ে আছেন। এমন অবস্থায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শাসকদের পক্ষ থেকে সহায়তা চাওয়ার ঘটনাও বিরল। দেশটি সেনাবাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাছাড়া আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন নাগরিক সমাজের মধ্যে অক্ষমতার কারণে সেখানে আসলে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা বোঝা খুবই কঠিন। বিভিন্ন দেশ থেকে এরই মধ্যে ত্রাণ সহায়তা পাঠানো শুরু হয়েছে।

নিরাপদ আছেন সুচি
ভয়াবহ ভূমিকম্প মিয়ানমারকে তছনছ করে দিয়েছে। ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে সেখানে শুক্রবার নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ১০০২ জন। এই সংখ্যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে। কারণ, যেসব মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছিলেন, তাদের অনেককে উদ্ধার করা হচ্ছে মৃত অবস্থায়। তবে মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী বলে পরিচিত অং সান সুচি নিরাপদে আছেন। জেল কর্তৃপক্ষের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র বিবিসিকে বলেছেন, সুচি অক্ষত আছেন। রাজধানী  নেপিড’তে অবস্থিত একই জেলের অন্যরাও নিরাপদে আছেন। উল্লেখ্য, ২০২১ সালের শুরুতে ১লা ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন অং সান সুচি। তারপর থেকেই তিনি জেলে আছেন। ২০২৩ সালে তাকে জেল থেকে গৃহবন্দি করা হয়। পরে আবার রাজধানীতে একটি জেলে নিয়ে যাওয়া হয়।

বুকফাটা আর্তনাদ নারুয়েমোলের
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক। সেখানে ধসে পড়েছে বহুতল একটি ভবন। তার কয়েক মিটার দূরেই একটানা কেঁদে চলেছেন এক নারী। তিনি বলছেন, তাকে আমি একবার দেখতে চাই। সে কি অবস্থায় আছে আমি জানতে চাই। এই নারীর নাম নারুয়েমোল। তার ৪৫ বছর বয়সী স্বামী ওই ভবনটির নির্মাণকাজে যোগ দিয়েছিলেন। শুক্রবারের ভূমিকম্পে ভবনটি ধসে পড়েছে। তার নিচে চাপা পড়েছেন নারুয়েমোলের স্বামী। এ খবর জানার পর তিনি বুকফাটা আর্তনাদে চিৎকার করছেন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তার স্বামীর কোনো খোঁজ মেলেনি। তবু তিনি আশা ছাড়েননি। মনে করছেন, এখনও তার স্বামী বেঁচে আছেন এমন অন্তত একটি খবর পাবেন। চিৎকার করে তিনি বলছেন, সে ছিল পুরো পরিবারের আয়ের উৎস। তার আর্তনাদের সঙ্গে সমানতালে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষ সরাচ্ছিল মেশিন। উদ্ধারকর্মীরা ইট-লোহার বিশাল বিশাল চাঁই সরাচ্ছিলেন।

‘মুহূর্তেই পুরো বাড়ি ধসে পড়লো আমার ওপর’
ভূমিকম্পের সময় মিয়ানমারের মান্দালয়ের একজন অধিবাসী অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন। তিনি বর্ণনা করেছেন কী ঘটেছিল শুক্রবার। তার ভাষায়- ভূমিকম্পের সময় বাথরুমে ছিলাম। আকস্মিক পায়ের তলায় সবকিছু ভয়াবহভাবে দুলতে থাকে। কমপক্ষে ১০ সেকেন্ড দুলতে থাকে। পুরো বাড়িটা আমার চোখের সামনে ধসে পড়ে। বাড়িটা ধসে পড়ার আগে আমি পিঠের ওপর ভর করে শুয়ে পড়লাম। নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ পরে সাহায্যের জন্য আর্তনাদ করি। আমার পিতা ও এক চাচা এসে উদ্ধার করেন আমাকে। ৫ থেকে ৬ জন তাদের সঙ্গে যোগ দেন। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধারের কয়েক সেকেন্ড পরেই আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত করে। আমাদের ভবনটি আরও ধসে যেতে লাগলো। ভয়ে শুকিয়ে গেলাম। বেদনায় মুষড়ে পড়লাম। হাঁটার শক্তি হারিয়ে ফেললাম। আমার পিতা আমাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেলেন। আমাদের বাড়িতে সাতজনের বসবাস। তার মধ্যে আমার দুই আন্টিকে উদ্ধার করা হয়েছে আমার সঙ্গে। তার একজন মারা গেছেন। অন্যজন হাসপাতালে। আমার দাদা, চাচি ও চাচাদের এখনও পাওয়া যায়নি। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন তারা। তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা শতকরা শূন্য ভাগ। এ সবই ঘটে গেছে আমার চোখের সামনে। 

mzamin

মিয়ানমার ভূমিকম্পের শক্তি ৩৩৪টি পরমাণু বোমার সমান

মিয়ানমারে ভয়াবহ ভূমিকম্পের শক্তি ছিল ৩৩৪টি পারমাণবিক বোমার সমান। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতত্ত্ববিদ জেস ফনিক্সকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিএনএন। তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের ভূমিকম্প যে পরিমাণ শক্তি নির্গত করেছে, তা প্রায় ৩৩৪টি পারমাণবিক বোমার সমান। সতর্ক করেছেন তিনি। বলেছেন, আরও অন্তত দু’মাস মিয়ানমার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকবে। ইন্ডিয়ান টেকটোনিক প্লেট এবং ইউরেশিয়ান টেকটোনিক প্লেটের ওপর মিয়ানমারের অবস্থান। এ দু’টি প্লেটের স্থানান্তরের কারণেই ভূমিকম্প হয়েছে। এই স্থানান্তর আরও ২ মাস পর্যন্ত চলবে। এ কারণে আগামী দু’মাস ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকবে মিয়ানমার। শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মিয়ানমারে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় শহর মান্দালয় থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে ছিল ভূমিকম্পের কেন্দ্র বা এপিসেন্টার। ইউএসজিএস জানিয়েছে,  মিয়ানমারে ৭.৭ এবং ৬.৪ মাত্রার দু’টি ভূমিকম্প হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন ধ্বংস্তূপ থেকে ১ হাজারের  বেশি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে ২ হাজার ৩৭৬ জনকে। এছাড়া ৩০ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। ব্যাপক এই ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হয়েছে প্রতিবেশী থাইল্যান্ড, দক্ষিণ-পশ্চিম চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া ও বাংলাদেশেও।  এই ৭ দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে থাইল্যান্ডের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। রাজধানী ব্যাংককে কয়েকটি বহুতল ভবন ধসে পড়ায় এখনও নিখোঁজ আছেন শতাধিক মানুষ। এছাড়া  দেশটিতে এ পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে ১০ জনের দেহ। এরা সবাই ভূমিকম্পে ভবন ধসে মারা  গেছেন। ভূমিকম্প বিধ্বস্ত  নেপিডো, সাগাইং, মান্দালয়, ম্যাগওয়ে, বাগো ও পূর্ব শান্ত এই ছয় প্রদেশ ও অঞ্চলে ইতিমধ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে সামরিক সরকার। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, শক্তিশালী কম্পনে ন্যাপিডো, সাগাইং, মান্দালয়সহ পাঁচটি শহরে ভবন ধসে পড়েছে। এ ছাড়া একটি সেতু ও একটি  রেলসেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গণমাধ্যম ও সামাজিক  যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, ইরাবতি নদীর ওপর আভা সেতু ধসে পড়েছে।  সেতুটি ভেঙে পানির মধ্যে হেলে পড়েছে।
mzamin

বিশ্বকে বদলে দিতে বড় স্বপ্ন দেখতে হবে

বিশ্বকে বদলে দিতে শিক্ষার্থীদের বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র শেখার জায়গা নয়, এটি স্বপ্ন দেখারও জায়গা। স্বপ্ন দেখতে পারা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি। আপনি যদি স্বপ্ন দেখেন, তবে তা ঘটবেই। আপনি যদি স্বপ্ন না দেখেন, তবে তা কখনো ঘটবে না। অতীতের দিকে নজর দিলে দেখবেন যা কিছু ঘটেছে, কেউ না কেউ আগে তা কল্পনা করেছিল। কল্পনা যেকোনো কিছু থেকে বেশি শক্তিশালী। গতকাল চীনের বেইজিংয়ে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় সম্মেলন কক্ষে এক অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। ভাষণের আগে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে। অনুষ্ঠানে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের চেয়ারম্যান হে গুয়াংচাই ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট গং চিহুয়াং বক্তব্য রাখেন। প্রফেসর ইউনূস শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং অকল্পনীয় বিষয়ে স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করেন। যদিও অনেক সময় এটি অসম্ভব মনে হতে পারে। তিনি বলেন, মানব সভ্যতার যাত্রা হলো অসম্ভবকে সম্ভব করা। সেটাই আমাদের কাজ। আর আমরাই তা করতে পারি। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের ঘর মনে করি। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়টির সম্মানসূচক প্রফেসর হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি। পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, উদ্ভাবন ও উৎকর্ষতার কেন্দ্র হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি গ্রহণ করতে পেরে আমি গর্বিত। এই সম্মাননা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় সেই প্রতিশ্রুতির কথা, যা আমি গত বছর বাংলাদেশে রূপান্তরকারী পরিবর্তনের অগ্রভাগে থাকা লাখ লাখ যুবকের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য করেছি।

ড. ইউনূস বলেন, তাদের স্বপ্ন ছিল একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার, যে দেশটি দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত হবে। প্রধান উপদেষ্টা তার সরকারের সংস্কার কর্মসূচি তুলে ধরে বলেন, একটি গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যেখানে উদ্যোক্তা বিকাশকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, মানুষ জন্মগতভাবে দরিদ্র নয়, বরং ভুল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে দরিদ্র হয়ে পড়ে, যেখানে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকে না। তিনি বলেন, সমাজে প্রচলিত অনেক ভুল ধারণার কারণেই মানুষ কষ্ট ভোগ করে। প্রফেসর ইউনূস বলেন, মানুষ জন্মগ্রহণ করে চাকরি খোঁজার জন্য নয়, বরং তারা সৃষ্টিশীল। মানুষকে চাকরিপ্রার্থী না হয়ে উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করতে হবে। নারীদের বিপুল সম্ভাবনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ড. ইউনূস বলেন, এমনকি বাংলাদেশের দরিদ্রতম নারীও মাত্র ২০ মার্কিন ডলার ঋণ নিয়ে উদ্যোক্তা হতে পারে। তিনি বলেন, নারীরা বিশ্বের যেকোনো জায়গায় উদ্যোক্তা হতে পারেন। শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ড. ইউনূস বলেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিত? শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো- সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে বিশ্বকে পরিবর্তন করা। বিশ্বকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে কার্বনমুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টা তার ‘তিন শূন্য তত্ত্ব’- শূন্য কার্বন নির্গমন, শূন্য দারিদ্র্য এবং শূন্য বেকারত্ব ও সামাজিক ব্যবসার ওপরও আলোকপাত করেন, যা সমাজের সমস্যাগুলো সমাধান করে। তিনি বলেন, সকলেরই নিজেদেরকে ‘তিন শূন্য’ ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তোলা উচিত।

চীন সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধান উপদেষ্টা: এদিকে চারদিনের সরকারি সফর শেষে চীন থেকে দেশে ফিরেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টা ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী এয়ার চায়নার একটি বাণিজ্যিক বিমান শনিবার স্থানীয় সময় বিকাল ৪টা ৫৭ মিনিটে বেইজিং ক্যাপিটাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী মন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের চিফ প্রোটোকল অফিসার হং লেই বিমানবন্দরে প্রধান উপদেষ্টাকে বিদায় জানান। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত ২৭শে মার্চ চীনের হাইনান প্রদেশে আয়োজিত বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া (বিএফএ) সম্মেলনে যোগ দেন। সম্মেলনের ফাঁকে তিনি বেশ কয়েকটি বৈঠকও করেন। প্রধান উপদেষ্টা ২৮শে মার্চ বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। তিনি টেকসই অবকাঠামো ও জ্বালানি বিনিয়োগ, বাংলাদেশ ২.০ উৎপাদন ও বাজার সুযোগ এবং সামাজিক ব্যবসা, যুব উদ্যোক্তা এবং তিন শূন্যের বিশ্ব- এসব বিভিন্ন বিষয়ের ওপর তিনটি গোলটেবিল বৈঠকেও যোগ দেন।

mzamin