Friday, July 9, 2010

আবদুস শহীদের বাড়িটি রক্ষা করুন by অদিতি ফাল্গুনী

‘...চকিত দৃষ্টিতে দেখলাম, খাপড়ার প্রায় পঞ্চাশটি জানালায় বন্দুকের নল লাগিয়ে সিপাহীরা দাঁড়িয়ে আছে। আমি তৎক্ষণাৎ উপুড় হয়ে বালিশের নীচে মাথা গোঁজার সঙ্গে সঙ্গে রাইফেলের গর্জনে খাপড়ার ভিত যেন ফেটে চৌচির হতে চাইল। গেটের দিকে একটু চোখ পড়তেই দেখলাম ফিনকি দিয়ে রক্ত একেবারে ছাদ পর্যন্ত উঠছে। আমার মাথা একটা সাপোর্টিং ওয়ালের আড়ালে বালিশের নীচে গোঁজা ছিল, পা-কনুই বাইরে ছিল। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম হাঁটু দু’ফাঁক করে স্পিলিন্টার ঢুকে গেল। বালিশের নীচে থেকেই দেখলাম পাশেই কমরেড হানিফের বাহুর উপরিভাগ ছিঁড়ে গেছে এবং সেখান থেকে অঝোরে রক্ত ঝরছে। একটু পরেই কমরেড হানিফকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখি। যেন দেখলাম আমার অদূরেই কুষ্টিয়ার কমরেড নন্দ সান্যাল রক্তাক্ত শরীরে মেঝের উপর লুটিয়ে পড়ছে। আমার হুঁশ হারাবার পূর্বে যতটুকু মনে আছে দেখলাম খাপড়া ওয়ার্ডে রক্তের স্রোত বইছে। আমার শরীর বুক পর্যন্ত রক্তে ডুবন্ত।’ (কারাস্মৃতি, আবদুস শহীদ, প্রথম প্রকাশ, মে ১৯৭৭, মুক্তধারা)
এই প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের কাছে কমরেড আবদুস শহীদ প্রায় অপরিচিত একটি নাম। ‘খাপড়া ওয়ার্ড’ শব্দবন্ধটি আরও বেশি অপরিচিত হওয়ারই সম্ভাবনা। পাকিস্তান আমলের শুরুর দিকে রাজশাহী জেলে বন্দী কমিউনিস্ট নেতা-কর্মীদের ওপর তদানীন্তন মুসলিম লীগ সরকারের কারা প্রশাসন গুলিবর্ষণ করলে এক দিনেই নিহত হয়েছিলেন বিজন সেন (রাজশাহী), হানিফ শেখ (কুষ্টিয়া), দেলওয়ার (কুষ্টিয়া), কম্পরাম সিং (দিনাজপুর), আনোয়ার (খুলনা), সুখেন ভট্টাচার্য্য (ময়মনসিংহ) ও সুধীন ধর (রংপুর)। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ ও আহত হয়ে যে ২৯ জন বেঁচে যান, তাঁদের ভেতর কয়েকজন চিরতরে পঙ্গু ও বিকলাঙ্গ হয়ে যান। কমরেড আবদুস শহীদ চোখের সামনে সহযোদ্ধাদের এই মর্মান্তিক মৃত্যু ও আহত হওয়ার স্মৃতি লিখেছেন তাঁর ‘কারা সাহিত্য’মূলক গ্রন্থ কারাস্মৃতিতে।
বরিশালের চাখার উপজেলায় রুশ বিপ্লবের বছর ১৯১৭ সালে জন্ম কমরেড শহীদের। একটি সম্ভ্রান্ত ও রক্ষণশীল পীর বংশে জন্ম নিয়েও তিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছেন প্রগতি ও মানবমুক্তির লড়াইয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা নিয়েও সরকারি-বেসরকারি নানা দামি চাকরির মোহ ত্যাগ করে প্রথম যৌবনের সুদীপ্ত নয়টি বছর (১৯৪৮—৫৭) তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন জেলখানার গরাদের ভেতরে। জীবিকা ছিল শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা। জেলখানা থেকে মুক্তির পরও ১৯৫৮ থেকে ১৯৭০ সাল অবধি গ্রামের কৃষকদের ভেতর কাজ করেছেন আবদুস শহীদ, অংশ নিয়েছেন ১৯৭১-এর গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধে।
জীবনের শেষ বছরগুলো স্কুলে শিক্ষকতা ও বিভিন্ন সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা করে, বই লিখে পার করেছেন আবদুস শহীদ। অবশ্য উপার্জনের অধিকাংশই তিনি ব্যয় করেছেন সামাজিক নানা কাজে ও রাজনৈতিক লেখালেখি, প্রকাশনায়। ১৯৯৬ সালে মৃত্যু হয় তাঁর। এই প্রয়াত সাংবাদিক, লেখক ও মুক্তিযোদ্ধা বরিশালে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে এবং ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ১৫ লাখ টাকায় স্ত্রী ও সন্তানসন্ততির জন্য একটি বাড়ি এই ঢাকা শহরে রেখে যেতে সমর্থ হন। ৫৮/১ উলন, রামপুরায় অবস্থিত ও হাতিরঝিলের পাশে বাড়িটি যেকোনো মুহূর্তে বুলডোজারের আঘাতে ধসে পড়ার আশঙ্কায় আশঙ্কিত। আবদুস শহীদের বিধবা স্ত্রী, দুই মেয়ে ও একমাত্র অসুস্থ ছেলের মাথা গোঁজার এই আশ্রয়টুকুতে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়েও ২০০৮ সালে হাতিরঝিল উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় উচ্ছেদ নোটিশ পাঠানো হয়। ভবিষ্যতে এই বাড়িটি অধিগ্রহণের জন্য কর্তৃপক্ষ লাল নিশানও টাঙিয়ে দেয়। আবদুস শহীদের স্ত্রী রাজিয়া শহীদ এই উচ্ছেদ নোটিশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। হাইকোর্ট প্রথম দফায় ২০০৯-এর ৩১ আগস্ট ও দ্বিতীয় দফায় ২০০৯-এর ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত রিট পিটিশনের মেয়াদ মঞ্জুর করলেও আর বুঝি এই ত্যাগী ও আদর্শবাদী পরিবারের শেষ আশ্রয়টুকু থাকছে না। এ পর্যন্ত এ দেশের ২১৬ জন খ্যাতনামা সম্পাদক, কলাম লেখক ও সাংবাদিক এই বাড়িটির উচ্ছেদ-প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে সরকারের কাছে স্বাক্ষরসংবলিত আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মানববন্ধনের আয়োজন করেছেন। তবুু শেষ রক্ষা বুঝি আর হয় না!
এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের ৭ তারিখ পূর্ত প্রতিমন্ত্রী, রাজউকের চেয়ারম্যান, এসি ল্যান্ড ও হাতিরঝিল প্রকল্পের প্রকল্পপ্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাঈদ এসে বাড়িটি রক্ষা পাবে বলে আশ্বাস দিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক নানা নিয়মকানুনের সঙ্গে তাঁরাও পেরে উঠছেন না। পার্শ্ববর্তী যেসব পরিবার সরকারের কাছে জায়গাজমি বা বসতবাড়ি ছেড়ে দিয়েছে, তারা প্রতি কাঠা জমিতে দুই লাখ ২৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে, যদিও এই এলাকায় প্রতি কাঠা জমির দাম চার লাখ টাকা বলে আবদুস শহীদের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়।
সরকার থেকে এরই মধ্যে প্রস্তাবিত হাতিরঝিল রাস্তায় শহীদ পরিবারের যেটুকু জমি এবং যতগুলো ভাড়া দেওয়া টিনের ঘর আছে, তার পরিমাণ দুই কাঠা। সেই দুই কাঠা জমি শহীদ পরিবার সরকারি ক্ষতিপূরণের সমমূল্যেই ছেড়ে দিতে রাজি। শুধু বাকি দুই কাঠার ওপর নির্মিত দোতলা বাড়িটি নিয়েই তাদের যত উদ্বেগ।
‘আমার ছেলে পাভেল কয়েক বছর ধরে বিষণ্নতার রোগী। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করতে পারল না বলে কাজও পাচ্ছে না। বড় মেয়ে তানিয়া ব্যাংকে একটি চাকরি করছে। ব্যাংক থেকে লোন করে যে বাড়ি বানিয়েছি, তার মাসিক কিস্তি শোধ করতেই তানিয়ার বেতন ফুরিয়ে যায়। ছোট মেয়ে জয়া গৃহবধূ, ঘরসংসার ও দুই মেয়ের বাচ্চাদের সামলায়। জয়ার স্বামী একটি ব্যবসা সবে শুরু করেছে। কিন্তু এটা লাভজনক হতে এখনো দেরি আছে।’ রাজিয়া শহীদ বললেন।
‘সরকার যদি এখন আমাদের উচ্ছেদ করে, আমরা কোথায় দাঁড়াব? বড় বোনের বেতনে লোন শোধ করি। আর বাড়ির কিছু অংশ ভাড়া দিয়ে মাসের অন্যান্য খরচ চালাই। এই যে দ্যাখেন, আমাদের বাসায় আসতে এই যে নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোটা পার হলেন, আর চারপাশে কচুরিপানার দঙ্গল...কেউ এ বাসায় আসতেও চায় না! তবু এটাই আমাদের শেষ আশ্রয়! দেশে যেহেতু একটি নির্বাচিত সরকার এসেছে, আমরা সরকারের কাছে, বিশেষত, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে দেশের এক ত্যাগী সন্তানের শেষ আশ্রয় ও স্মৃতিটুকু রক্ষা করার জন্য আকুল আবেদন জানাই।’ বললেন আবদুস শহীদের কনিষ্ঠা তনয়া জয়া শহীদ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদেরও আকুল আবেদন, কোনোভাবেই কি রক্ষা করা যায় না এই ত্যাগী পরিবারের শেষ আশ্রয়টুকু? যে অসম্ভব মাতৃস্নেহে প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রতিক সময়ে নিমতলীর অগ্নিদগ্ধ পরিবারগুলোর বিয়ের জন্য বাগ্দত্তা তিন তরুণীকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গণভবনে ডেকে বিয়ে দিয়েছেন, তেমনি ব্যক্তিগত মমতা দিয়ে এই অসহায় পরিবারটির পক্ষেও তিনি নিশ্চয়ই দাঁড়াতে পারেন।
অদিতি ফাল্গুনী: কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক।

দুঃসংবাদ আর সুসংবাদ চলেছে পাশাপাশি by আব্দুল কাইয়ুম

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. মোসলেহ উদ্দিনের সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে দেখা করতে গিয়েছি। আকাশ জুড়ে ঘন কালো মেঘ। আগের রাতে ঝুমবৃষ্টি হয়ে গেছে। সকালেও এক পশলা। মজার ব্যাপার হলো, বেশ কিছুক্ষণ মুষলধারে বৃষ্টি হয়, তার পরই আকাশ পরিষ্কার। মেঘ ও রোদের খেলা। ঢাকায় যখন বিরক্তিকর গরম, সিলেটে তখন প্রাণজুড়ানো বৃষ্টি। চারদিক সবুজে সবুজ।
সৌজন্য সাক্ষাতে গিয়েছি। কুশলবিনিময় করে চলে যাব সুনামগঞ্জের পথে। উপাচার্য বললেন, পত্রপত্রিকায় একটি খবর দেখে সকাল থেকে মনটা খারাপ হয়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংসতা প্রায় নেই। অথচ আগের দিনের একটি সামান্য ঘটনার সংবাদ পত্রিকায় এমনভাবে লেখা হয়েছে, যেন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটে গেছে। ছাত্রলীগ ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মীদের মধ্যে কথাকাটাকাটি, ধাক্কাধাক্কি হয়েছে, হয়তো সামান্য মারামারিও হয়েছে। কিন্তু এর জের ধরে তো সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েনি। অর্থাৎ ঘটনা তত বড় কিছু ছিল না। আমরা তাঁর কথা মেনে নিলাম। পরে খোঁজ নিয়েছি। ঘটনা ছোটই ছিল, কিন্তু এর রাজনৈতিক তাৎপর্য বিবেচনায় হয়তো সংবাদটি গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশন করা হয়েছে।
উপাচার্য আক্ষেপ করে বললেন, সব শুধু নেতিবাচক খবর, দেশে কি ভালো খবর কিছু থাকে না? আপনারা না লিখলে চলবে কেন?
এটা ঠিক যে অনেক সময় দুঃসংবাদগুলোই বড় হয়ে ওঠে। এ ব্যাপারে কিছু করার নেই। ঘটনা খারপ বা ভালো যা-ই হোক, তার খবর সবার কাছে বস্তুনিষ্ঠভাবে পৌঁছে দেওয়াই তো পত্রিকার কাজ। যাঁরা দেশ পরিচালনা করেন বা বিরোধী দলে থাকেন, তাঁরা কি দেশকে ভালো কিছু দিতে পারছেন? সিলেটে প্রধান দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। তারাই ঘুরেফিরে ক্ষমতায় আসে। বলা হয়, সিলেটে যে দল জিতে, তারাই দেশের সরকার গঠন করে। বিগত দিনে সিলেটে মূল প্রভাব ছিল বিএনপির, এখন আওয়ামী লীগের। অথচ এই দল দুটির অবস্থা খুব করুণ। কোনো দলেরই পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। বিএনপি দুই গ্রুপে বিভক্ত। কয়েক দিন আগে তাদের দুই প্রতিপক্ষ প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। আওয়ামী লীগের মধ্যেও চলছে নেতৃত্বের কোন্দল। দুই দলেরই কর্মীদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ।
বিভিন্ন কোচিং সেন্টার ও মেয়েদের স্কুল-কলেজের আশপাশে বখাটেদের উৎপাত সারা দেশের মতো সিলেটেও আছে। কয়েক দিন আগে বখাটেরা একজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষককে হত্যা করে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সেই সঙ্গে কোতোয়ালি থানার ওসিকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
বিএনপি সরকারের সময় মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান বলতেন, তিনি বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কিছু করতে পারছেন না। কিন্তু এখন তো তাঁদেরই সরকার। দেড় বছর হয়ে গেল। তেমন কিছু তো করতে পারলেন না। জলাবদ্ধতা এখন সিলেটের স্থায়ী সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কারণ পানি নেমে যাওয়ার খালগুলো (ছড়া) অবৈধ দখলদারদের খপ্পরে চলে গেছে। মহানগরের মধ্য দিয়ে নয়টি ছড়া সুরমা নদীতে মিশেছে। যে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ছড়া দখল করে রাখছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে করপোরেশন কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। মেয়র যদি অন্যায়, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে না দাঁড়ান, তাহলে মানুষের জীবনে স্বস্তি আসবে কীভাবে?
এ রকম অনেক সমস্যা সিলেটে রয়েছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সেখানে মন ভালো করার মতো ঘটনা নেই। উৎসাহিত হওয়ার মতো অনেক খবরও আছে। এই শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই ধরা যাক। অনলাইন ও মোবাইল ফোনে ভর্তি ফরম বিতরণ থেকে শুরু করে ভর্তি চূড়ান্ত করার যাবতীয় ব্যবস্থা তো এই বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রথম করেছে। এখানে প্রায় সারা বছরই পড়াশোনার সুষ্ঠু পরিবেশ থাকে। এই টেন্ডারবাজির যুগে এটা কম কথা নয়।
আমরা অনেকে খোঁজ রাখি না, সিলেটের আবদুল বাছিত সেলিম নামের একজন কৃষি-অন্তপ্রাণ ব্যক্তি রয়েছেন। তিনি সিলেট অঞ্চলের লুপ্তপ্রায় ৬০ জাতের ধানের চাষ করছেন। প্রায় ৪০০ একর জমিতে চাষ হয়। সুগন্ধি চালই রয়েছে ৪০ জাতের। বিরইন চালই প্রায় ১০ জাতের। আমরা বিন্নি (বিরইন) ধানের চালের কথা কবিতায় পড়েছি। কিন্তু সেই চালও যে এত রকমের তা কে জানত। আমরা জীববৈচিত্র্য রক্ষার কথা বলি। কিন্তু আমাদের দেশি জাতের কত ধান যে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, তার খবর কয়জন রাখি? সিলেটের এক কৃষি-পরিবারের সন্তান গ্রামবাংলায় ঘুরে ঘুরে দেশি জাতের ধান সংরক্ষণ করছেন, আবাদ করছেন, এটা কি কম কথা? সেলিম সাহেব বললেন, তিনি নিজের ব্যবস্থাপনায় কয়েক একর জমিতে চাষ করেন। এর বাইরে কৃষকদের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে উৎপাদন হয়। কৃষকদের বীজ, সার ও উৎপাদন প্রযুক্তি সরবরাহ করেন তিনি। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, তিনি কোনো রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন না। সব সবুজ সার ও গোবর। এতে দেশি জাতের চালের গন্ধ ও স্বাদ অটুট থাকে। তাঁদের চালের চাহিদাও প্রচুর। বিদেশে রপ্তানি হয়। ভালো দাম পান। তবে এখন রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা থাকায় শুধু পোলাওয়ের চালই সীমিত পরিমাণে রপ্তানি করা হয়।
সেলিম সাহেবের এই কৃষি কার্যক্রমের বিস্তৃত পরিচয় গত বছর ১৪ নভেম্বর প্রথম আলোয় ‘সেলিমের সুগন্ধি ধান’ শিরোনামে শনিবারের বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী তাঁর খামারে গিয়েছেন। চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তাপ্রধান শাইখ সিরাজও তাঁর খামারে গিয়েছেন, গণমাধ্যমে তুলে ধরেছেন তাঁর সাফল্যের কথা।
সুনামগঞ্জেরও আছে অনেক সাফল্যগাথা। সবচেয়ে বড় খবর হলো, সেখানে ছিনতাই, রাহাজানির উৎপাত প্রায় নেই। এটা কম কথা নয়। সুনামগঞ্জ নাগরিক সমাজের সবাই বললেন, গণমাধ্যম যেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার থাকে। তাঁরা চান, প্রথম আলোর পাতায় যেন প্রতিদিন একজন করে কুখ্যাত দুর্নীতিবাজের পরিচয় তুলে ধরা হয়। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সুনামগঞ্জের আলোকিতজনেরা সে কথাটাই স্মরণ করিয়ে দিলেন।
আমাদের বৈদেশিক মুদ্রাভান্ডারে যে প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি ডলার জমা হয়েছে, তার একটা বড় অংশই আসে লন্ডনপ্রবাসী সিলেটের অধিবাসীদের পাঠানো অর্থ থেকে। অথচ এই প্রবাসীরা দেশে এসে নানা ঝুট-ঝামেলায় পড়েন। সিলেটের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকে মনে করেন, ‘প্রবাসী আদালত’ স্থাপন করতে হবে। কারণ, দেশে জমির মামলা-মোকদ্দমার জন্য কেউ হয়তো লন্ডন থেকে আসেন, কিন্তু দিনের পর দিন মামলা চলতে থাকে, ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায় অথবা চাকরি থাকে না। তাই এ ধরনের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রবাসী আদালতের বিশেষ ব্যবস্থা দরকার। বাস্তবে এটা কতটা সম্ভব তা কেবল আইন বিশেষজ্ঞরাই বলতে পারেন। তবে সমস্যাটা বাস্তব। এর একটা সমাধান দরকার।
আইনজীবী বদরুল আহমেদ চৌধুরী বিশেষভাবে অনুরোধ করলেন, প্রথম আলো যেন সিলেটকে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরে। এখান থেকে দেশের প্রচুর আয় বাড়ানো সম্ভব।
তবে সবচেয়ে বড় সুসংবাদ দিয়েছেন সিলেটের মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। মেয়র হিসেবে তাঁর কাজের ভুলত্রুটি, অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার খবর যে আমরা বিভিন্ন সময় ছাপিয়েছি, সে কথা তো আগেই বলেছি। সাংবাদিকতার কর্তব্য হিসেবেই সেটা আমরা করি। কিন্তু এসব অপ্রীতিকর বিষয়ের ধারেকাছেও তিনি যাননি। শুধু বলেছেন, প্রথম আলোর কাছে বস্তুনিষ্ঠ খবর চাই, কাউকে ছোট করার জন্য নয়, ভুল শুধরে দেওয়ার জন্য প্রতিবেদন চাই। তাঁর কৌশলী শব্দচয়ন লক্ষ করার মতো। তাঁর শেষ কথাটি ছিল, ‘পত্রিকাটা আমাদের!’
>>>আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।

আমার সাম্প্রতিক মিডিয়া ভাবনা by এবিএম মূসা

লন্ডনভিত্তিক কমনওয়েলথ প্রেস ইউনিয়ন একসময় সংবাদপত্র-জগতের জাঁদরেল একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। দায়িত্ব ছিল মূলত কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সংবাদপত্রের প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থরক্ষা। এ ছাড়া ছিল সাংবাদিকতার পেশাগত মানোন্নয়ন কর্মসূচি এবং এই লক্ষ্যে ১৯৬০ সাল থেকে তখনকার ৫০টি কমনওয়েলথভুক্ত দেশের সাংবাদিকদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ দান করে আসছিল। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি ছিল সেসব দেশে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ‘ওয়াচ ডগ’। শেষোক্ত কারণে তারা কমনওয়েলথ দেশগুলোর সংবাদপত্র-জগতে বিদ্যমান পরিস্থিতির নিয়মিত খোঁজখবর করত। প্রতিষ্ঠানটি (সিপিইউ) কমনওয়েলথভুক্ত দেশে সাংবাদিক নির্যাতিত হলে অথবা সংবাদপত্রের ওপর কোনো আঘাত এলে সম্মিলিত প্রতিবাদ জানাত। সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র-সরকারপ্রধানদের সম্মেলনের আলোচ্যসূচি অন্তর্ভুক্ত করত। কালক্রমে ব্রিটিশ কমনওয়েলথের বন্ধন শিথিল হয়ে এলে সিপিইউ স্থবির হয়ে পড়ে, প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। প্রসঙ্গত, বিশ্বে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সংরক্ষণে সাংবাদিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকা গ্রহণ করত আইপিআই তথা জেনেভাভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউট। ইউরোপিয়ান কমিশন গঠিত হওয়ার পর এই প্রতিষ্ঠানটি মিডিয়ার ক্ষেত্রে অনেকখানি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।
বর্তমানে টিমটিম করে সিপিইউর বাতি যাঁরা জ্বালিয়ে রেখেছেন, মেরি ওয়াকার তাঁদের অন্যতম। আমি ১৯৬১ সালে সিপিইউ ফেলোশিপ নিয়ে ব্রিটেনে যাই। কর্মভিত্তিক তথা হাতে-কলমে পেশাগত মানোন্নয়নে বিভিন্ন পত্রিকায় হাতে-কলমে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন, অক্সার্ডের কুইন এলিজাবেথ হাউসে বিভিন্ন কর্মশালায় অংশগ্রহণ ছিল প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত। আমার পরের বছর গিয়েছিলেন বর্তমান ইনডিপেনডেন্ট-এর সম্পাদক মাহবুব আলম। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর গিয়েছেন এ এম মোফাজ্জল, পারভিন সুলতানা, নাসিমুন্নাহার নিনি ও রওশন আরা জলি। সিপিইউ প্রশিক্ষণই আমার সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদান রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। কমনওয়েলথ প্রেস ইউনিয়নের শাখা বা চ্যাপ্টার ছিল প্রতি সদস্যদেশে। এই চ্যাপ্টার সংশ্লিষ্ট দেশের সংবাদপত্রের ও সাংবাদিকতার পরিস্থিতি সম্পর্কে লন্ডনের প্রধান দপ্তরে নিয়মিত খবরাখবর পাঠাত। সিপিইউ সারা বিশ্বে সেই খবর ছড়িয়ে দিত। দীর্ঘদিন বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি ছিলেন আহমদুল কবির, সম্পাদক ছিলাম আমি।
প্রতিষ্ঠানটি এখন বিখ্যাত সংবাদপত্রপাড়ার ফ্লিট স্ট্রিটের দ্বিতল ভবন থেকে ল্যান্ডার স্ট্রিটে ছোট্ট একটি কামরায় অন্তরীণ। বছর দুই আগে লন্ডনে গিয়েছিলাম সিপিইউর একটি আমন্ত্রণ পেয়ে। প্রতিষ্ঠানের হতশ্রী দুই কামরার কার্যালয়ে দেখা হলো মেরির সঙ্গে। ’৬১-তে যুবতী মেরি ছিলেন সহকারী কর্মকর্তা। এবার তাঁকে পেলাম সহকারী পরিচালক পদে। আমি ছাড়াও আরও দু-একটি দেশের প্রাক্তন ফেলো আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন। বিশেষ ছোটখাটো সম্মেলনটির উদ্দেশ্য ছিল সিপিইউর সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন। প্রস্তাবিত সম্মেলনে ৫০ বছর ধরে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের অনেকে উপস্থিত ছিলেন। প্রসঙ্গত, সিপিইউ চলত কমনওয়েলথ দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় অনুদান ও কমনওয়েলথ সচিবালয়ের আর্থিক সহায়তায়। এখন সেই সাহায্য-সহায়তা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। তার পরও কমনওয়েলথ ইউনিয়ন তো আছে। প্রতিষ্ঠানটি সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করবে। বৈঠকের ফলাফল নিয়ে আলোচনা করব না। প্রতিষ্ঠানটির অতীত নিয়ে লেখাও আমার বর্তমান প্রতিবেদনের মুখ্য বিষয় নয়। এত দিন পর সিপিইউ প্রসঙ্গ নিয়ে কেন লিখছি তা ব্যাখ্যা করার জন্যই প্রতিষ্ঠানটির পশ্চাৎপট বর্ণনা করলাম।
গত রোববার দুপুরে প্রেসক্লাবে গিয়েছিলাম। দেখলাম সাংবাদিকদের বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ‘মানববন্ধন’ আর নাতিবৃহৎ সমাবেশ। ক্লাবে প্রবেশ করলাম, পরে বেরিয়েও এলাম। বের হওয়ার সময় কতগুলো ব্যানার, ফেস্টুন আর ছোটবড় সমাবেশ দেখে একটু থমকে দাঁড়ালাম। কারণ, সেদিনের মানববন্ধন আর প্রতিবাদসভার সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের পেশাজীবনের হালহকিকত ও অতীতের পেশাগত ঐতিহ্য জড়িত ছিল। তাই বর্তমান প্রজন্মের সাংবাদিক ভাইদের রাস্তায় দেখে জেনে নিলাম ব্যাপার কী। শুনলাম, আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক গ্রেপ্তার, চ্যানেল ওয়ানের সম্প্রচার নিষিদ্ধকরণ, যমুনা টিভির সম্প্রচার নিয়ে সরকারের তেলেসমাতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে।
আজ থেকে নয়, আমার সাংবাদিকতার কৈশোরকাল পঞ্চাশের দশক থেকেই তো সব জানি, সমসাময়িক কখন কোন সরকার, কী কারণে, কোন অজুহাতে গণমাধ্যমের ওপর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ উপায়ে কীভাবে ক্ষিপ্ত ‘ব্যবস্থা গ্রহণ করে।’ সেসব অপব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নানা পন্থায় সরাসরি অথবা কৌশলী আন্দোলন করেছি। অহংবোধও হচ্ছে আমার, এসবে নেতৃত্বও দিয়েছি। তাই বাসায় এসে অবাক হয়ে ভাবছিলাম, কত ধরনের, কত চরিত্রের, কত বেশে, কত সরকার আসে আর যায়। কিন্তু গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সবার কাছেই কেন এক সময়ে অসহনীয় হয়। গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করতে নানা অজুহাত তৈরি করে।
বিকেলে মেরির টেলিফোন পেয়ে অবাক হলাম। তিনি জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার বিপন্ন পরিস্থিতি সম্পর্কে যেসব খবর পাচ্ছেন, সবই সত্যি কি না। যাক, এদ্দিন পরে সিপিইউ, সাংবাদিকতার তথা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিপত্তি নিয়ে আবার মাথা ঘামাচ্ছে। মেরির প্রশ্নটির উত্তর দিতে গিয়ে বিপাকে পড়লাম। আমি কি তাঁদের এ-সম্পর্কীয় খবরের সত্যাসত্য ও প্রকৃত অবস্থার বিস্তারিত বিবরণ পাঠাতে পারি? প্রশ্নটি শুনে সকালে দেখা বিভিন্ন ‘প্রতিবাদ’ কর্মসূচির কথা মনে হলো। মেরির প্রশ্নে একটু বিব্রতও বোধ করলাম। স্বৈরতান্ত্রিক ও সামরিক শাসনকালেও আমাকে তৎকালীন ‘সংবাদপত্রের’ হালহকিকত নিয়ে প্রতিবেদন পাঠাতে হয়েছে। সেগুলোর সত্যতা ও বিশ্বস্ততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। কিন্তু গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায় কোনো ধরনের অজুহাতে স্বাধীন মত প্রকাশে বাধা প্রক্রিয়ায় বিভিন্নতা ও কৌশলিক প্রক্রিয়ার বিবরণ তাঁদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে কি? কারণ, সংবাদপত্র বন্ধ করা, পরোক্ষ হুমকি, সাংবাদিক ঠ্যাঙানোর বর্তমান পন্থাগুলো পরোক্ষ হওয়ার কারণে সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন প্রদানে পক্ষে-বিপক্ষে যা বলব, তা মেরি বা সিপিইউ সদস্যদের স্বল্প দু-চার কথায় বোঝাতে পারব না। বলতে পারব না বাইরে থেকে সিপিইউ, আমেরিকান সাংবাদিক ফেডারেশন যতই উদ্বেগ প্রকাশ করুন, আমাদের সামগ্রিক সাংবাদিক সমাজের মধ্যে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, যেমনটি আমাদের কালে ছিল। দেশের বহুধাবিভক্ত সাংবাদিকদের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের কেন ধার নেই, তা কীভাবে ব্যাখ্যা করব?
শেষোক্ত বিষয়টি অর্থাৎ বর্তমানে বিভাজিত সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের অবস্থানের প্রেক্ষাপটে স্মরণ করছি এ রকম পরিস্থিতিতে আমরা কী করতাম। এসব ক্ষেত্রে সমগ্র পাকিস্তানের সাংবাদিক, সংবাদপত্র কর্মচারী, সম্পাদক ও মালিক এককাট্টা হতেন। ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচিতে যাঁরা নেতৃত্ব দিতেন, তাঁদের নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাস ছিল। দলবাজি করতেন না। বর্তমানে সাংবাদিকেরা আপন রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রাধান্য দিয়ে সাংবাদিকতা করেন, মিডিয়া পরিস্থিতি সে আলোকে বিবেচনা করেন। আমাদের সময় তো এমনটি ছিল না। ’৬২-তে আইয়ুবের কালাকানুনের বিরুদ্ধে সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট পত্রিকার মালিক অশীতিপর মওলানা আকরম খাঁ আমাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। দলমতের ব্যবধান, রাজনৈতিক মতাদর্শের বিভিন্নতা ভুলে সমগ্র পাকিস্তানের তখনকার দিনের কয়েক শ সম্পাদক-সাংবাদিক, মালিক করাচিতে সম্মিলিত বিক্ষোভ জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আইয়ুবের শাসনের সমর্থক ছিলেন অনেকেই। এখন একটি সংবাদপত্রের ওপর আঘাত এলে প্রশ্ন ওঠে, ‘কোন দলের’। সাংবাদিক খুন হলে, মাথা ফাটালে বা ঠ্যাং ভাঙলে বলা হয়, ‘অমুক দলের ইউনিয়ন করে তো, বেশ হয়েছে।’
সাংবাদিক সমাজের বহুধাবিভক্ত নেতৃত্ব ক্ষেত্রবিশেষে কোনো অবস্থান নেওয়ার আগে নিজের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাকে প্রাধান্য দেন। সাংবাদিক সমাজের এই অবক্ষয়ের সূচনা হয়েছিল বিএনপি সরকারের আমলে, তাদেরই ইন্ধনে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের বিভক্তকরণের মাজেজা এখন তাদের সমর্থক-মিডিয়া হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। এ নিয়ে বিস্তারিত কাহিনি বর্ণনা করতে হলে অনেক অপ্রিয় সত্য বলতে হয়। বলব না, ওপরের দিকে থুথু ফেললে নিজের গায়ে পড়ে। তবুও বলব, আমার পেশা অনুসারী অনুজদের ও তাদের ‘মাঝখানে দেয়াল’ প্রতিষ্ঠানের দুরবস্থার জন্য তারা নিজেরাই দায়ী। তাই তাদের বলছি, মানববন্ধন আর বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ মিছিল করার আগে এই দেয়ালটি ভাঙুন।
আসল প্রসঙ্গে আসি। ভাবছিলাম, মেরির প্রশ্নের একটি উত্তর তো দিতে হবে। বিস্তারিত বর্ণনা এড়িয়ে আমি তাঁকে বললাম, ‘তোমার কি মনে আছে, ৫০ বছর আগে লন্ডনে প্রশিক্ষণরত সাংবাদিকদের সিপিইউর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান লর্ড গ্যাভিন অ্যাস্টার কী বলেছিলেন?’ মেরির মনে থাকার কথা নয়। লর্ড অ্যাস্টার প্রতিটি দেশের প্রশিক্ষণগ্রহীতাদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোমাদের দেশে কি সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা আছে (ডু ইউ হ্যাভ ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন)?’ যে যার দেশের অবস্থা বর্ণনা করল। দেশে তখন আইয়ুবের মার্শাল ল। সংবাদ প্রকাশ নিয়ন্ত্রিত। ইত্তেফাক-এর সম্পাদক জেলে, পত্রিকার ছাপাখানায় তালা দেওয়া হয়েছে। সংবাদ আর অবজারভার রোষানলে পড়ে বিজ্ঞাপনবহির্ভূত। এই দেশে ফিরতে হবে, তাই আমি অতি কৌশলী উত্তর দিয়েছিলাম, ‘ইয়েস, মাই লর্ড, উই হ্যাভ ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন।’ এটা বলেই শেষ লাইনে যোগ করলাম, উই আর ওয়ারিড অ্যাবাউট ফ্রিডম ‘আফটার’ এক্সপ্রেশন। মেরিকে জানালাম, আগের দিনই বর্তমান সরকারের তথ্যমন্ত্রী সংসদে একটি বিবৃতি দিয়েছেন, ‘দেশে এখন সংবাদপত্র পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছে।’ দীর্ঘ ৫৫ বছর সব ধরনের সরকারের আমলে যেমনটি শুনেছি, তেমনটি আমার লর্ড অ্যাস্টারকে দেওয়া উত্তরটির সঙ্গে বিবৃতির কোনো সামঞ্জস্য মেরি খুঁজে পেলেন কি না, তা জানা হয়নি। তবে মেরিকে কোনো প্রতিবেদন পাঠাইনি, বলতে পারিনি সংবাদপত্রের বর্তমান বিচিত্র সংকটের জন্য মালিকের সম্পাদক বনে যাওয়া আর ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক, আর্থিক ও রাজনৈতিক স্বার্থে পত্রিকা, সংবাদ ও মত প্রকাশের প্রাধান্য সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা জগতে ভিন্ন পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। সাংবাদিকতার বর্তমান দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির জন্য বর্তমান সরকারকে যতখানি দোষারোপ করা যাবে, তার চেয়ে অধিকতর দায়ী করব কতিপয় সাংবাদিকের বশংবদ সাংবাদিকতা।
প্রতিবেদনের মধ্যিখানে সংবাদপত্র তথা মিডিয়ার বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আমাদের সাংবাদিক সমাজের হাল অবস্থার একটুখানি বর্ণনা দিয়েছি। আমার বিভাজিত অনুজ সাংবাদিকদের একজন জার্মান বুদ্ধিজীবীর একটি আক্ষেপের গল্প বলেই আলোচনা সমাপ্ত করছি। কাহিনিটি হিটলারের নাৎসি শাসনামলের। ওই বুদ্ধিজীবীর প্রতিবেশীকে হিটলারের গেস্টাপো বাহিনী ধরে নিয়ে গেল। মহাত্মন ভাবলেন, ‘আমার কী করার আছে, আমাকে তো নেয়নি।’ তার পরদিন উঠিয়ে নিয়ে গেল তাঁর মতাদর্শী একজন দার্শনিককে। বুদ্ধিজীবী ভাবলেন, ‘আমার কিছু হবে না।’ তারপর একে একে উধাও হয়ে গেলেন তাঁর মতো আদর্শবাদী, স্বাধীন, প্রতিবাদী, পেশাজীবী আরও অনেকে। অবশেষে গেস্টাপো এসে তাঁর বাড়ির দরজার কড়া নাড়ল। যখন ধরে নিয়ে যায়, তিনি আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘হায় রে! আজ আমার পাশে দাঁড়াবার কেউ নেই।’
এবিএম মূসা: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

শেয়ারবাজারে বিদেশি প্রতারক চক্র -বিনিয়োগের সময়ই সতর্কভাবে যাচাই জরুরি

দেশের শেয়ারবাজারে ক্রমেই জুয়াবাজ আর প্রতারক চক্রের তৎপরতা বাড়ছে। অতি উৎসাহী কিছু দেশি ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বিদেশ থেকেও এসব চক্রের লোকজনকে এই বাজারে ভিড়িয়েছে নিজেদের অতি মুনাফা লাভের আশায়। প্রতারকেরা কৃত্রিমভাবে ফুলে ওঠা বাজার থেকে নিজেদের বিনিয়োগ মুনাফাসহ নিয়ে কেটে পড়ছে। ফলে বাজার হয়ে পড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিদেশি উদ্যোক্তা হিসেবে নাম রয়েছে অখ্যাত এক প্রতিষ্ঠানের। আর এই প্রতিষ্ঠানের দুই মালিক আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের ফেরারি আসামি। ২০০৯ সাল থেকে তাঁদের বিরুদ্ধে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়। অথচ এই দুজন দিব্যি বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে টাকা খাটিয়ে বাজার থেকে ২৫০ কোটি টাকা তুলে নিয়ে গেছেন নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে।
এ ঘটনাটি গভীর সমুদ্রে হিমশৈলের চূড়া দেখার মতো। এটা থেকে আবারও প্রতীয়মান হয় যে আন্তর্জাতিকভাবে শেয়ারবাজারের প্রতারক চক্রের দৃষ্টি পড়েছে বাংলাদেশে। দেশীয় প্রতারক চক্রের সঙ্গে যোগসাজশে মানুষকে প্রলুব্ধ করে শেয়ারবাজারে টেনে এনে নিজেরা সময়মতো বাজার থেকে মুনাফা তুলে নিয়ে যাবে। মাঝখান থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীকে মাথায় হাত দিতে হবে তাঁর সীমিত পুঁজি খুইয়ে। ফলে একটি শক্তিশালী ও পরিণত পুঁজিবাজারে রূপ নেওয়ার বিষয়টি আর সেভাবে বাস্তবায়িত হবে না, যা দীর্ঘ মেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য বিরাট ক্ষতির কারণ হবে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বাজারে ঘোষণা দিয়েই এসব শেয়ার বিক্রি করা হয়েছে। তার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কেউ তাঁদের সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে দায় এড়াচ্ছেন। খবর পাওয়ার পর পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা তদন্ত করবে বলে গৎবাঁধা বুলি আওড়েছে। যাবতীয় লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে, সেই এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষের দাবি, বিদেশ থেকে টাকা আসা-যাওয়ার বিষয় দেখবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বোঝাই যাচ্ছে, কে বা কারা বাজারে এসে বিনিয়োগ করছেন, সেটা তাদের কাছে কোনো বিষয় নয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, কে বা কারা বিনিয়োগ করতে আসছেন, তা অবশ্যই বিবেচনার বিষয়। গত বছরও কেম্যান দ্বীপের এক অখ্যাত প্রতিষ্ঠানকে এ দেশে বিনিয়োগ করানোর নামে টাকা তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। নেপথ্যে ছিয়ানব্বইয়ের শেয়ার কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত ও দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ব আর্থিক সংকটে বিপাকে পড়া একটি বিদেশি ব্যাংকের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। কিন্তু দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)—কেউই এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আর এটা দেশি-বিদেশি প্রতারকদের সক্রিয় হয়ে ওঠার সংকেত দিয়েছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। দেশের আর্থিক খাতের ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতার স্বার্থে, ইতিবাচক পুঁজিবাজার দাঁড় করানোর দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর নজরদারি আরও কঠোর করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ নিশ্চয়ই প্রত্যাশিত কিন্তু বাছ-বিচার ছাড়া তা ঢুকতে দেওয়া ঠিক হবে না।

নেপালে জোট সরকার গঠনের জন্য আরও সময় চায় দলগুলো

নেপালে নতুন জোট সরকার গঠনে আলোচনার জন্য দেশটির প্রেসিডেন্টের কাছে আরও কিছু দিন সময় চেয়েছেন রাজনৈতিক দলের নেতারা। গতকাল বুধবার তাঁরা এ কথা জানান। খবর এএফপির।
বিরোধী রাজনৈতিক দল মাওবাদীদের প্রবল চাপে গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী মাধব কুমার নেপাল পদত্যাগে বাধ্য হলে দেশটি রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। নেপালের প্রেসিডেন্ট রাম বরণ যাদব জাতীয় মতৈক্যের সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে গতকাল পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। সমঝোতায় পৌঁছাতে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনা ব্যর্থ হয়।
মাওবাদীরা প্রশাসনে নেতৃত্ব ও নেপালের সংবিধানের খসড়া তৈরির তত্ত্বাবধান করার ব্যাপারে পীড়াপীড়ি করছে।
প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো জানায়, অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করার জন্য সময় চেয়ে তারা প্রেসিডেন্টের কাছে আবেদন করবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি ঠিক বলেছেন -সন্ত্রাসীদের ধরার নির্দেশ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পেছনে সক্রিয় ছিল চাঁদাবাজি ও জমির দখল বুঝে নেওয়ার ঘটনা। এ কাজ তারা বহুদিন ধরেই চালিয়ে আসছিল। সরকারের কেউ জানতেন না, তাও নয়। তাঁরা জেনেশুনেই সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি। ফলে দিনে দিনে সন্ত্রাসীরা পরিণত হয়েছে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে, যে কারণে দেশের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠটি মাঝেমধ্যেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। জাহাঙ্গীরনগরের ঘটনা সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে দায় এড়ানোর চেষ্টা রয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘সন্ত্রাসের সঙ্গে যারাই জড়িত, তাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পরও কিছু ঘটে গেলে কী করার আছে?’
তাঁর এ বক্তব্যে সন্ত্রাসীরা আশকারা পাবে সন্দেহ নেই। সন্ত্রাসীদের ধরার নির্দেশ দিলেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সেই নির্দেশ পালিত হচ্ছে কি না, সেটি দেখার দায়িত্বও তাঁর। এ কথা অন্য কোনো মন্ত্রী বললে না-হয় মানা যেত। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বে নিয়োজিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কীভাবে সে দায় এড়াতে পারেন? আসলে মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশে কী বলেন, সেটি বিবেচ্য নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সরকারের মনোভাবটি বুঝতে চান। তাঁরা যদি দেখেন, সরকার দলমতনির্বিশেষে সব সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী, তাহলে তাদের সাধ্য নেই কাউকে রেহাই দেওয়ার। ছাত্রলীগের স্থলে অন্য কোনো সংগঠনের নেতা-কর্মীরা এভাবে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে কি একই কথা বলতেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী?
বিশ্ববিদ্যালয় বিদ্যাচর্চার স্থান, মারামারি করার নয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা অন্তর্দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন এবং কিছুদিন পরপরই তাঁরা আত্মঘাতী সংঘর্ষে লিপ্ত হন। তা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ কী? এ ব্যাপারে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। দল ও প্রশাসনকে আলাদা ভাবতে না পারলে শিক্ষাঙ্গনসহ কোথাও সংঘাত-সংঘর্ষ বন্ধ করা যাবে না।
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও সন্তোষজনক নয়। কারা ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য দায়ী, সেটি নিশ্চয়ই তাদের অজানা নয়। ১৭ জনকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত দোষীরা এর আওতায় এসেছে কি না, সে প্রশ্ন উঠেছে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক বলেছেন, গ্রেপ্তার হওয়া নেতা-কর্মীদের ছাড়া হবে না। তাঁর এ প্রত্যয়ের প্রতি আস্থা রেখেও যে কথাটি বলা প্রয়োজন তা হলো, বারবার সংঘর্ষে লিপ্ত ছাত্রলীগ নামধারী এই নেতা-কর্মীরা এত দিন বাইরে ছিলেন কীভাবে? নিজ দলের বা সমর্থক নেতা-কর্মীর অপরাধ আড়াল করে অন্যদের বিরুদ্ধে চালিত অভিযান কখনো সফল হবে না, শিক্ষাঙ্গনে শান্তিও আসবে না। অতএব, আইনকে নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। সাময়িক বহিষ্কার বা লোক দেখানো গ্রেপ্তার না করে শিক্ষাঙ্গনে শান্তি বিঘ্ন সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থাই পারে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে।

একটি আফগান এলাকা ছাড়ছে ব্রিটিশ সেনারা

আফগানিস্তানের হেলমন্দ প্রদেশের সাঙ্গিন এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্ব মার্কিন সেনাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন ব্রিটিশ সেনারা। ২০০১ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ওই এলাকায় ৯৯ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হয়েছেন। কাজেই তালেবানেরা এটাকে বিদেশি সেনাদের পরাজয় হিসেবেই দেখবে।
চলতি বছরের শেষ নাগাদ দায়িত্ব হস্তান্তর করা হতে পারে বলে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিয়াম ফক্স দেশটির পার্লামেন্ট সদস্যদের জানাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ বাহিনী দাবি করেছে, আরও ভালোভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য দায়িত্বের এই পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে। এখন ওই এলাকায় আরও বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হবে। তবে তালেবানেরা অবশ্যই এটাকে বিদেশি সেনাদের পরাজয় হিসেবে দেখবে।
হেলমন্দ প্রদেশের নেতৃত্বের দায়িত্ব গত মাসে এক মার্কিন জেনারেলের হাতে ছেড়ে দেয় ব্রিটিশ বাহিনী। গত ১ জুন থেকে এই দায়িত্ব নিয়েছেন মার্কিন মেরিন কোরের মেজর জেনারেল রিচার্ড মিলস।
হেলমন্দ প্রদেশের উত্তর ও দক্ষিণাংশের দায়িত্ব মার্কিন বাহিনীর হাতে তুলে দিয়ে ব্রিটিশরা এখন প্রদেশের কেন্দ্রের দিকে বেশি নজর দেবে—ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিয়াম ফক্স এমন ঘোষণা দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিবিসি জানিয়েছে, হেলমন্দ প্রদেশে আরও বেশি ব্রিটিশ সেনা পাঠানো হতে পারে। সামরিক সূত্রমতে, নতুন সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম আনা হতে পারে সাইপ্রাসে মোতায়েন থিয়েটার রিজার্ভ ব্যাটালিয়ন থেকে।
কাবুল থেকে বিবিসির প্রতিনিধি কুয়েন্টিন সমারভেইল জানিয়েছেন, সাঙ্গিন থেকে প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গে হেলমন্দে আরও বেশি ব্রিটিশ সেনা মোতায়েন সাময়িক পদক্ষেপ বলে মনে হচ্ছে। তবে বিবিসির প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রতিনিধি জনাথন বেইল জানিয়েছেন, হেলমন্দে আরও সেনা মোতায়েন করতে হলে শুধু সাঙ্গিনে নিহত ব্রিটিশ সেনাদের পরিবার থেকে নয়, আরও অনেক দিক দিয়ে বিরোধিতার মুখে পড়বেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। জনথন বলেন, নিহত সেনাসদস্যদের পরিবার বলতে পারে ‘সাঙ্গিনের দায়িত্ব যদি আমেরিকানদের হাতে ছেড়ে দিতেই হবে, তাহলে এত ক্ষয়ক্ষতির শিকার হওয়া কী জন্য?’ বিবিসি অনলাইন ও দ্য গার্ডিয়ান।

যুক্তরাষ্ট্রে দাবদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত একজনের মৃত্যু

যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য-গুলোতে তীব্র দাবদাহ শুরু হয়েছে। ভার্জিনিয়া থেকে ম্যাসাচুসেটস পর্যন্ত তীব্র গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত। দাবদাহে অসুস্থ হয়ে ফিলাডেলফিয়া নগরে একজন মারা গেছেন। অসুস্থ অর্ধশতাধিক লোককে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার নিউজার্সির নুয়ার্ক নগরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪০ দশমিক ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট)। নিউইয়র্কের ছায়াঘেরা সেন্ট্রাল পার্কেও দিনের মধ্যভাগে তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত এক দশকে এটি সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।
গত রোববার দাবদাহ শুরুর হওয়ার পর বেশ কিছু নগরে জনসাধারণের জন্য সরকারি উদ্যোগে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র খোলা হয়েছে। যেসব নাগরিকের ঘরবাড়িতে তাপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র নেই, তাঁরা পার্কে বা সরকারি কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন।
নিউইয়র্ক-নিউজার্সির সাগর তীরে এখন প্রচণ্ড ভিড়। প্রয়োজন ছাড়া লোকজন বাইরে বের না হওয়ায় দাবদাহ বয়ে যাওয়া নগরগুলোর রাস্তাঘাট অনেকটাই ফাঁকা। যানবাহন চলাচলও কমে গেছে।
নিউইয়র্ক নগরে বাংলাদেশি ক্যাবচালকেরা জানান, তাঁদের ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছে। আবহাওয়া বিভাগ জানায়, আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত দাবদাহ চলতে পারে।

মাওবাদীদের ভারত বনেধর প্রথম দিন শান্তিপূর্ণ

ভারতে মাওবাদীদের ডাকা দুই দিনব্যাপী বনেধর প্রথম দিন গতকাল বুধবার শান্তিপূর্ণভাবে অতিবাহিত হয়েছে। তবে বন্ধ্ শুরুর আগের দিন পুলিশের চর সন্দেহে দুই ব্যক্তিকে হত্যা করেছে মাওবাদীরা।
অন্ধ্র প্রদেশের মাওবাদী নেতা চেরিপুরি রাজকুমার ওরফে আজাদকে ‘হত্যা’র প্রতিবাদে মাওবাদীরা এই বনেধর ডাক দেয়। প্রথম দিন মাওবাদী-প্রভাবিত রাজ্যগুলোতে বনেধর প্রভাব পড়লেও অন্য রাজ্যগুলো মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। বন্ধেক ঘিরে নাশকতা ঠেকাতে মাওবাদী-প্রভাবিত রাজ্যগুলোতে আগাম সতর্কতা জারি করা হয়।
বিভিন্ন সূত্র জানায়, মাওবাদী-প্রভাবিত পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খন্ড, ছত্তিশগড়, অন্ধ্র প্রদেশ, বিহার, ওডিশা ও মহারাষ্ট্রে ভালোভাবেই বন্ধ্ পালিত হয়। এসব রাজ্যে প্রধান প্রধান সড়কে কোনো যানবাহন চলেনি। দোকানপাটও বন্ধ থাকে। ওডিশার কোরাপুট, মালকানগিরি, রায়গাড়া, গজপতি, সুন্দরগড়, কেওনঝাড় জেলার মাওবাদী অঞ্চলে বন্ধ্ শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়। এই অঞ্চলে যানবাহন ও দোকানপাট বন্ধ থাকে।
পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, বাঁকড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার জঙ্গল মহলে কঠোরভাবে বন্ধ্ পালন করা হয়। এই অঞ্চলে রাতে চলাচলকারী সব ধরনের ট্রেন বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এই অঞ্চলে বেসরকারি কোনো বাসও চলাচল করেনি।

কারফিউয়ে কাশ্মীরের জনজীবন অচল

কারফিউয়ের কারণে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে জনজীবন অচল হয়ে পড়েছে। ক্রমে বেড়ে ওঠা বিক্ষোভ মোকাবিলায় গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরসহ বেশ কয়েকটি শহরে কারফিউ জারি করা হয়। এসব শহরে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং কাশ্মীরের সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকেন।
মধ্য ও উত্তর কাশ্মীর এবং শ্রীনগরে কারফিউ উপেক্ষা করে শত শত বিক্ষোভকারী গতকাল বুধবার রাস্তায় নেমে আসে। কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যম কর্মীদের কারফিউ পাস বাতিল করায় টেলিভিশন চ্যানেল এনডিটিভির কার্যালয়সহ সাংবাদিকদের কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়।
মধ্য কাশ্মীরের বুদগাম জেলা থেকে পাওয়া খবরে জানা যায়, ছাদোরা ও বীরওয়াহ এলাকায় গতকাল ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা জনগণকে রাস্তায় ৪৮ ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচি পালন করার আহ্বান জানান। বিক্ষোভকারীদের জন্য লঙ্গরখানা খুলতে অর্থ সংগ্রহ করছেন বিচ্ছিন্নতাবাদীরা।
বিক্ষোভ মোকাবিলায় রাজধানী শ্রীনগরে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। গত মঙ্গলবার শ্রীনগরে পুলিশের গুলিতে তিন বেসামরিক লোক নিহত হওয়ার পর সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়।
গত জুন থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে কমপক্ষে ১৪ বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে। অনেকগুলো হত্যাকাণ্ডের জন্য আধাসামরিক সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সকে দায়ী করা হয়ে থাকে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীর উপত্যকার বেশির ভাগ এলাকায় হয়তো কারফিউ বলবৎ রয়েছে, কিংবা বন্ধ্ পালিত হচ্ছে।

হাফিজ আহমেদ এনসিসি ব্যাংকের অতিরিক্ত এমডি

গোলাম হাফিজ আহমেদ সম্প্রতি এনসিসি ব্যাংক লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। এর আগে তিনি এ ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন।
গোলাম হাফিজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৮৩ সালে সিনিয়র অফিসার হিসেবে পূবালী ব্যাংকে যোগ দিয়ে ব্যাংকিং কর্মজীবন শুরু করেন।
২৬ বছরের ব্যাংকিং জীবনে তিনি এনসিসি ব্যাংক ছাড়াও ব্যাংক ইন্দোসুয়েজ ও ঢাকা ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। এনসিসি ব্যাংকে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে তিনি করপোরেট ব্যাংকিং, পরিচালন ও ঝুঁকি-ব্যবস্থাপনা বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন।

শিক্ষিত বেকারদের জন্য বিসিকের প্রশিক্ষণ

ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (স্কিটি) দেশের শিক্ষিত বেকার যুবক ও যুব মহিলাদের জন্য ১১ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত ‘নতুন ব্যবসা সৃষ্টিতে উদ্যোক্তা উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি প্রশিক্ষণ কোর্সের আয়োজন করছে।
এ প্রশিক্ষণের কোর্স ফি নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার টাকা। ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি। আসনসংখ্যা সীমিত। আগ্রহীদের ১১ জুলাইয়ের মধ্যে আবেদন করতে হবে এবং ওই দিনই নির্বাচনী সাক্ষাৎকারের পর প্রশিক্ষণ শুরু হবে।
যোগাযোগের ঠিকানা: শিল্পোদ্যোক্তা উন্নয়ন অনুষদ, স্কিটি, বিসিক, প্লট-২৪/এ, রোড-১৩/এ, সেক্টর-৬, উত্তরা, ঢাকা। ফোন: ৮৯১৩৬৮৪ (অধ্যক্ষ), ৮৯৩৩৬৬১, মোবাইল: ০১৭২১৪৮৬৪১১, ০১৯১৫১৬৭০২৪।

নবীগঞ্জে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের এসএমই শাখা উদ্বোধন

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার শেরপুর রোডের স্কাই লাইট টাওয়ারে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের একটি এসএমই/কৃষি শাখা খোলা হয়েছে।
ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাংসদ মো. আবদুল জলিল প্রধান অতিথি হিসেবে সম্প্রতি শাখাটির উদ্বোধন করেন। এতে সম্মানিত অতিথি ছিলেন ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান এম আমানউল্লাহ, পরিচালক মো. মনসুরুজ্জামান ও এ কে এম সাহিদ রেজা। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী দেওয়ান মুজিবুর রহমান, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল জলিল চৌধুরী, শাখা ব্যবস্থাপক নিসার আহমেদ, নবীগঞ্জ পৌরসভার মেয়র তোফাজ্জল ইসলাম চৌধুরী এবং স্থানীয় সমাজসেবক আলমগীর চৌধুরী, ব্যবসায়ী আবদুল আহাদ ও মো. মোহন মিয়া।

এফবিসিসিআই সরকারের কাছে ৩০ কোটি টাকা চেয়েছে

নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের কাছে ৩০ কোটি টাকা চেয়েছে দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষস্থানীয় সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই)।
ব্যবসা-বাণিজ্য তথা শিল্পোন্নয়নে ভূমিকা রাখতে এফবিসিসিআইকে আধুনিক সংস্থা হিসেবে গড়ে ওঠা জরুরি—এ কথা উল্লেখ করে সংগঠনটি কারওয়ানবাজারের বহুতলবিশিষ্ট জনতা টাওয়ারটিও এফবিসিসিআইয়ের নামে বরাদ্দ দিতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে।
গতকাল বুধবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে এফবিসিসিআইয়ের নবনির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খানের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব দাবি উত্থাপন করেন।
এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি এ কে আজাদের নেতৃত্বে ৪০ সদস্যের প্রতিনিধিদলে অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন সংগঠনের প্রথম সহসভাপতি জসিম উদ্দিন, সহসভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী, পরিচালক আবদুল হক, হারুন উর রশিদ, হেলাল উদ্দিন, এম এ মোমেন প্রমুখ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মনোজ কুমার রায় এবং শওকত আলী ওয়ারেছী এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
এফবিসিসিআইয়ের নেতারা তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের ব্যবসায় উৎসে কর কমানো, রপ্তানিতে নগদ সহায়তা দেওয়া, ব্যাংক সুদের হারকে এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনা, শিল্প পুলিশ গঠন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন, রাষ্ট্রায়ত্ত লোকসানি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া, অবকাঠামোগত সহায়তা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের সহযোগিতা দাবি করেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান ব্যবসায়ীদের দাবির মধ্যে অনেকগুলোই বিবেচনাযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। তিনি একটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে ব্যবসার পরিবেশকে আরও উন্নত করার জন্য ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব এবং সুপারিশগুলো বাস্তবসম্মত করে আগামী সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে পেশ করার পরামর্শ দেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য কিছু লোক সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। বিশেষ করে পোশাকশিল্পের কারখানাগুলোতে অব্যাহতভাবে হামলা চালিয়ে এ শিল্পকে অস্থির করে তুলছে একটি গোষ্ঠী। এ দেশের সাধারণ শ্রমিকেরা এর সঙ্গে জড়িত নন উল্লেখ করে তাঁরা এ ব্যাপারে সরকারের জোরালো সহযোগিতা চান।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সবাই না থাকলেও দ্রব্যমূল্য বাড়ানোর সঙ্গে অনেক ব্যবসায়ীই জড়িত থাকেন। এ ধরনের কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। সভায় গত দেড় বছরে কোনো পণ্যের দাম বাড়েনি বলে দাবি করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
ফারুক খান বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ সব পণ্যের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। তবে চিনির দাম কিছুটা বেড়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, চিনির দাম ৪০ থেকে বেড়ে ৬৫ টাকা হয়েছিল। পরে আবার তা ৪০ টাকায় নেমে আসে। গত বছর অক্টোবরের দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়াই এর কারণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার সারা বছরের জন্যই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের কাজ করছে। এ ছাড়া ব্যবসায়ীদের জন্য ভালো পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে ব্যাংক সুদের হার কমানো এবং টিসিবির মাধ্যমে পণ্য আমদানির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ বছরের শেষদিকে টিসিবি এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করবে।

চট্টগ্রাম বন্দরে দরপত্রের মাধ্যমে ছয় জেটিতে অপারেটর নিয়োগ

চট্টগ্রাম বন্দরে সাধারণ কার্গো বার্থের (জেসিবি) ছয়টি জেটিতে ছয়টি অপারেটর নিয়োগ করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে তাদের এ কাজ দেওয়া হয়েছে।
তবে কন্টেইনার জেটির দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতার কাগজপত্রে গরমিল থাকার অভিযোগ তুলে কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। এই ছয়টি কন্টেইনার জেটিতে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, আজ বৃহস্পতিবার বন্দরের ৮ নম্বর জেটিতে এমভি পেনথেরা জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হবে সদ্য নিয়োগ পাওয়া বেসরকারি অপারেটরদের। পর্যায়ক্রমে অন্য পাঁচটি সাধারণ জেটিতে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ শুরু হবে।
বন্দরের কর্মকর্তাদের হিসাব মতে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের কারণে এই ছয়টি জেটিতে আগামী তিন বছরে পণ্য ওঠানো-নামানো বাবদ বন্দরের সাশ্রয় হবে ১১০ কোটি টাকা। নতুন নিয়োগ পাওয়া ছয় অপারেটরকে আগামী তিন বছর ১৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা পরিশোধ করবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। অথচ দরপত্র ছাড়াই আগের দরের হিসাবে কাজ করলে বন্দরের ব্যয় হতো ১২৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।
আইনি জটিলতার কারণে গত ১০ মে রাত থেকে সাধারণ পণ্য খালাসের এই ছয়টি জেটি (জেসিবি) এবং আরও ছয়টি কন্টেইনার জেটিতে বন্দরের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ শুরু হয়।
এর আগে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জরুরি অবস্থা জারির পর এই ১২টি জেটির কাজ কোনো প্রকার দরপত্র আহ্বান ছাড়াই ১২টি বার্থ অপারেটর ও তাঁদের সহযোগী সংস্থাকে দেওয়া হয়েছিল।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) কে এম মোয়াজ্জেম হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, আগামী তিন বছর ছয়টি বার্থে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজে ১১০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বন্দরের। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে কাজ দেওয়ার কারণে এই সাশ্রয় হচ্ছে।
বন্দরের কর্মকর্তারা জানান, কর্তৃপক্ষ পণ্য ওঠানো-নামানোসহ নানা খাতে আমদানিকারক ও শিপিং এজেন্ট থেকে সরাসরি মাশুল আদায় করে। সেই মাশুল থেকে বেসরকারি অপারেটরদের বিল পরিশোধ করা হয়।
প্রসঙ্গত, ২০০৭ সালের ১৬ মে থেকে দরপত্র ছাড়াই স্টিভেডোরস প্রতিষ্ঠানগুলো ছয়টি সাধারণ পণ্য ওঠানো-নামানোর জেটি ও ছয়টি কন্টেইনার জেটিতে অপারেটর হিসেবে কাজ শুরু করে।
৮ নম্বর জেটিতে নিয়োগ পাওয়া বেসরকারি অপারেটর পঞ্চরাগ উদয়ন সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পারভেজ আহমেদ প্রথম আলোকে জানান, সকালে জেটিতে জাহাজ ভেড়ার পরপরই তাঁরা কাজ শুরু করবেন। তিনি বলেন, বর্তমানে বন্দরের ব্যবস্থাপনায় যেসব শ্রমিক পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ করছেন, তাঁরা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় নতুনভাবে কাজ করবেন।
নতুন নিয়োগ পাওয়া অন্য পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে রুহুল আমিন অ্যান্ড ব্রাদার্স, এ ডব্লিউ খান অ্যান্ড কোম্পানি, ইউনাইটেড ট্রেডিং কোম্পানি, কসমস এন্টারপ্রিনিয়ার্স ও ফোর জুয়েলস স্টিভেডোরিং সিন্ডিকেট।

বেহাল অবস্থায় চলছে আরজেএসসি

কিছু কার্যক্রম কম্পিউটারভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির আওতায় আনা হলেও যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের কার্যালয়ের (আরজেএসসি) বেহাল দশা এখনো কাটেনি। কোম্পানির নামের ছাড়পত্র ও নিবন্ধন বর্তমানে অনলাইনে করা যায়। কিন্তু বেশির ভাগ সময় বন্ধ থাকে আরজেএসসির ওয়েবসাইট।
রাজধানীর উত্তরায় আরজেএসসির আরেকটি কার্যালয় হওয়ার কথা। এতে ২৫ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। বিষয়টি সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় ঝুলে আছে দুই বছর। তবে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়োগ নীতিমালা থাকলেও আরজেএসসির তা নেই। তাদের নীতিমালা অনুমোদন হওয়ার পর নিয়োগ-প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
এদিকে, গত ১ জুন আরজেএসসির প্রধান কার্যালয় রাজধানীর মতিঝিল থেকে কারওয়ান বাজারের টিসিবি ভবনের ষষ্ঠ তলায় নিয়ে আসা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ তা জানে না। আবার নতুন কার্যালয়ে এসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফাইল খুঁজে পাচ্ছে না আরজেএসসি।
সংস্থার কর্মকর্তারা অবশ্য এই সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তাঁরা এও বলছেন, কার্যালয় স্থানান্তরের কারণে ফাইল খুঁজে পেতে একটু সমস্যা হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যে তা ঠিক হয়ে যাবে।
নামের ছাড়পত্রের জন্য পরীবাগের অধিবাসী মিনহাজুল আবেদীন গত বৃহস্পতিবার আরজেএসসির সাবেক কার্যালয়ে যান। বিরক্তি নিয়ে প্রথম আলোকে তিনি জানান, ‘এত গুরুত্বপূর্ণ একটি কার্যালয় স্থানান্তরিত হয়েছে। অথচ জনগণকে তা জানানো হয়নি। এটি নিতান্তই সরকারের দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তিই বাড়ছে।’
এদিকে কোম্পানির নামের ছাড়পত্র ও নিবন্ধনের কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির আওতায় আনা হয়েছে ১৬ মাস আগে। তবে বাস্তব অবস্থা একেবারেই উল্টো। বছরের বেশির ভাগ সময়ই এই ওয়েবসাইট খোলা যায় না। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে এক সপ্তাহ ধরে চেষ্টা করে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের নিবন্ধক আহমেদুর রহিম গত রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাতের বেলায় বন্ধ থাকলেও দিনে ওয়েবসাইট খোলা থাকে। বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে এমনটি ঘটছে। টিসিবির চেয়ারম্যান আশ্বাস দিয়েছেন, এক মাসের মধ্যে সব ব্যবস্থা করবেন।’
২০০৯ সালের ১৬ মার্চ আরজেএসসিএফ কার্যালয়ে প্রধান অতিথি হিসেবে বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান অনলাইনে কোম্পানির নিবন্ধন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
ওই দিন বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ‘অহেতুক বিড়ম্বনা ও হয়রানি দূর করতে অনলাইন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এখন আর মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হবে না। ঘরে বসেই অনলাইনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে তা করা যাবে।’
সূত্র জানায়, আরজেএসসিতে ২০০৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে অনলাইনের মাধ্যমে নামের ছাড়পত্র গ্রহণ ও নিষ্পত্তি শুরু হয়। ৮ মার্চ থেকে অনলাইনের মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয় নিবন্ধন প্রক্রিয়া। তবে ১৬ মার্চ থেকে এ প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু।
আরজেএসসির কর্মকর্তারা জানান, নামের ছাড়পত্র গ্রহণ ও কোম্পানি নিবন্ধনের জন্য গ্রাহকেরা টাউট-বাটপারদের মাধ্যমে নানাভাবে নাজেহাল হতেন। তাই অনলাইন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।
ওয়েবসাইটে (www.roc.gov.bd) বিদ্যমান কোম্পানির নামগুলো পরীক্ষা করার সুযোগ রাখা হয়েছে। আবেদনকারী নিজের জন্য নতুন একটি নাম পছন্দ করে অনলাইনে আবেদন করতে পারবেন।
আরজেএসসি কার্যালয় সরেজমিন পরিদর্শনকালে গতকাল মিরপুরের নাজমা সুলতানা প্রথম আলোকে জানান, ‘আরজেএসসির অনলাইন কার্যক্রম নামে চালু করা হলেও প্রকৃত চিত্র ভিন্ন। অনলাইন কার্যক্রম ইচ্ছে করে বন্ধ রাখা হয়েছে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করার জন্য। এখনো দালাল চক্রের মাধ্যমেই চলে আরজেএসসি।’
জানা যায়, রেগুলেটরি রিফর্মস কমিশনের (আরআরসি) পরামর্শ এবং ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) আর্থিক সহযোগিতায় গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে আরজেএসসির কার্যক্রমে কিছু সংস্কার এসেছে।
বর্তমানে একই নামে অন্য কোনো কোম্পানি না থাকলে আরজেএসসি এক ঘণ্টার মধ্যেই গ্রাহককে তা জানিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু লোকবল সংকটে কাজগুলো ঠিকমত করতে পারছে না আরজেএসসি। এরপর ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে রসিদটি নিবন্ধকের কার্যালয়ে এসে কাউন্টারে জমা দিলেই কাজ শেষ। বর্তমানে সর্বোচ্চ দুই দিনের মধ্যে অনলাইনে নামের ছাড়পত্র পাওয়ার কথা।
তার পরের ধাপই হলো কোম্পানির নিবন্ধন। একই ওয়েবসাইটে প্রাইভেট লিমিটেড ও পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির জন্য আলাদা সংঘস্মারক ও সংঘবিধির ফরম দেওয়া রয়েছে। এগুলো পূরণ করে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের টিআইএন সনদসহ তিন কপি আবেদনপত্র জমা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে ফির পরিমাণ নির্ভর করবে অনুমোদিত মূলধনের ওপর। কখন কী করতে হবে, অনলাইনেই জানিয়ে দেওয়া হবে। সাত দিনের মধ্যেই শেষ হবে নিবন্ধন প্রক্রিয়া।
সূত্র জানায়, আইএফসি শুরুর দিকে যেসব কাজ করে দেবে বলে চুক্তি করেছিল, পরে তা কাটছাঁট করে। এ জন্য কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ওয়েবসাইট যে খোলা যায় না, তাও আইএফসির কাটছাঁটেরই কারণে।
সাবেক বাণিজ্য সচিব ফিরোজ আহমেদ এর আগে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ‘কোম্পানি আইনের বিধিবিধান পরিবর্তন না হলে আরজেএসসির নিবন্ধন প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে এনেও খুব বেশি লাভ হবে না।’ তাঁর মতে, রিটার্ন ও সার্টিফিকেটকেও অনলাইন পদ্ধতির আওতায় আনতে হবে। তবে এ সময় বেশি জরুরি হলো আরজেএসসির জনবল সংকট দূর করা।
টিসিবি চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান বলেন, ‘আরজেএসসি সম্প্রতি একটি চিঠি পাঠিয়েছে রাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বা জেনারেটরের ব্যবস্থা করার জন্য, যাতে তাদের ওয়েবসাইট কাভারেজ পাওয়া যায়। শিগগিরই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

লংকাবাংলার বিদেশি উদ্যোক্তাদের শেয়ার লেনদেন তদন্ত হবে

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের বিদেশি উদ্যোক্তাদের শেয়ার বিক্রিতে অনিয়ম খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) গতকাল বুধবার এ কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয়।
এসইসির নির্বাহী পরিচালক এ টি এম তারিকুজ্জামান ও উপপরিচালক আবুল কালামের সমন্বয়ে গঠিত এ কমিটিকে আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে কমিশনের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে এসইসির চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খোন্দকার বলেন, লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের বিদেশি উদ্যোক্তার শেয়ার বিক্রি নিয়ে প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কোম্পানির উদ্যোক্তাদের শেয়ার বিক্রিতে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখবে এ কমিটি।
গত শুক্রবারের প্রথম আলোতে ‘ইন্টারপোলের দুই ফেরারি আসামি শেয়ারবাজার থেকে নিয়ে গেছে ২৫০ কোটি টাকা’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ দুই ফেরারি আসামির একজন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক রাফাত আলী রিজভী ও অপরজন মিসরীয় বংশোদ্ভূত সৌদি নাগরিক হিশাম আল ওয়ারাক।
পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোল প্রতারণার দায়ে তাঁদের ধরিয়ে দিতে ২০০৯ সালে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করে। তাঁদেরই মালিকানাধীন ফার্স্ট গালফ এশিয়া হোল্ডিংস লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার।
সম্প্রতি এ প্রতিষ্ঠানটি তাদের মালিকানাধীন বড় অংশ শেয়ার বিক্রি করে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা নিয়ে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের বেশ কিছু ব্যাংক হিসাব স্থগিত রাখা থাকলেও এ দেশ থেকে তারা অনায়াসেই টাকা বের করে নিতে সক্ষম হয়েছে। বিষয়টি সংবাদপত্রে আসার পরই টনক নড়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

তার পরও উরুগুয়ে স্বপ্নহীন

তাহলে উরুগুয়ে পুরোনো দিন আবার ফিরেই পাচ্ছে? আবার বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তি হয়ে উঠবে লাতিন আমেরিকার ছোট্ট এই দেশটি?
পরাশক্তি! ফুঁহ! অস্কার তাবারেজ স্রেফ অবজ্ঞাভরে উড়িয়ে দিলেন কথাটা, ‘উরুগুয়ে আবার ফুটবলের পরাশক্তি হবে, এ কথা বলা আর কল্পনায় স্বর্গরাজ্য তৈরি করা একই কথা।’ তাবারেজ তাহলে উরুগুয়েকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন না!
কথায় কথায় উরুগুয়ের লোকজনের স্বভাব-চরিত্র, তাদের ফুটবল-প্রেম নিয়ে বড়াই করেন দেশটির ফুটবল কোচ তাবারেজ। স্বপ্নও দেখেন। কিন্তু তাঁর স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এসে বাস্তবতা।
ফুটবলের এই বাস্তবতার নাম ডলার, পাউন্ড বা ইউরো! প্রথম বিশ্বের অর্থের ঝনঝনানি নিষ্ঠুর বাস্তবতা হয়ে এসে কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে লাতিন ফুটবলারদের। কোনোক্রমে বল নিয়ে একটু কারিকুরি দেখাতে পারলেই তাঁকে বিভিন্ন ইউরোপিয়ান ক্লাবের স্কাউটরা তুলে নিয়ে নিয়ে মেসি, ফোরলান বানিয়ে ফেলছেন। উরুগুয়ে তো বটেই, খোদ ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাও এই সমস্যায় এখন খাদের কিনারে চলে গেছে।
৩৪ লাখ মানুষের ছোট্ট দেশ উরুগুয়ে। এর চেয়ে ঢের বেশি ফুটবলার আছে পাশের ব্রাজিলেই। সেই ব্রাজিলের ঘরোয়া ফুটবলের অবস্থাই এখন যাচ্ছেতাই। উরুগুয়ের ঘরোয়া ফুটবলের অবস্থা তো আরও খারাপ।
দক্ষিণ আমেরিকান লিবোর্তোদোরেস কাপে উরুগুয়ের যে দুটি দল পেনারোল ও ন্যাসিওনালের জয়জয়কার ছিল একসময়, তাদের নামই এখন খুঁজে পাওয়া ভার। উরুগুয়ের কোনো দেশ সর্বশেষ এই ট্রফি জিতেছে ১৯৮৮ সালে।
দেশে প্রথম বিভাগের যে খেলা হয়, তার বেশির ভাগেই হাজার খানেক দর্শকও খুঁজে পাওয়া ভার। দেশটির বেশির ভাগ স্টেডিয়াম ও দলের সাংগঠনিক কাঠামো ইউরোপিয়ান দেশগুলোর সেমি-পেশাদার ক্লাবগুলোর চেয়েও খারাপ।
এই কাঠামোর দিকেই ইঙ্গিত করে তাবারেজ বললেন, ‘আমার মনে হয় না অতীত সাফল্য কোনো দেশকে পরাশক্তিতে পরিণত করতে পারে। সে জন্য দরকার আসলে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক তৎপরতা।’
দেশে ভালো অবকাঠামো গড়ে ওঠা বা সাংগঠনিক তৎপরতা তৈরি হওয়াটা নিশ্চয়ই বড় শর্ত। কিন্তু উরুগুয়ের ফুটবল বিকশিত হওয়ার বড় শর্ত আসলে দেশীয় ফুটবলারদের দেশে ধরে রাখা।
যৎসামান্য এই লোকেদের মধ্য থেকে উরুগুয়েতে যা ফুটবলার তৈরি হয়, তাদের মূল লক্ষ্য থাকে বিমানবন্দর। ফোরলান, সুয়ারেজের মতো কারও কারও ইউরোপে ঠাঁই মেলে। আবার বেশির ভাগ পাড়ি জমান মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা, চিলি, পেরু বা কলম্বিয়ার মতো দেশে।
অবশ্য তাবারেজ নিজেদের মহাদেশকে দায় না দিয়ে, ফুটবলার ধরে রাখতে না পারার দায়টা দিচ্ছেন ইউরোপকেই, ‘বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে একটা সময় ছিল উরুগুয়ে বিশ্বকাপে ম্যাচ হারত না। সেই পৃথিবীটা বদলে গেছে। উরুগুয়েও বদলে গেছে। দিন দিন প্রথম বিশ্ব আর তৃতীয় বিশ্বের মধ্যে পার্থক্যটা বড় হচ্ছে। ফুটবলাররা এখন ইউরোপেই খেলে, বসবাস করে। এটাই আমাদের ফুটবলের বড় দুর্বলতা। তারা খুবই অল্প বয়সে ফুটবলারদের নিয়ে যাচ্ছে। ফলে আমাদের তৃতীয় বিশ্বের লিগগুলো দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, কমে যাচ্ছে আমাদের খেলোয়াড় সরবরাহের প্রক্রিয়া।’
সব মিলিয়ে তাবারেজ যে ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন উরুগুয়ের জন্য, লাতিন আমেরিকার জন্য, সেটা সুখকর কিছু নয়।

‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’

ঠিক যেন কোনো ছোটগল্প। ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’। জাবুলানি নিয়ে বিতর্ক নিভু নিভু করে জ্বলতে জ্বলতে আবারও যেন জ্বলে উঠল দপ করে। বিশ্বকাপের শেষ প্রান্তে এসে আবারও উঠল সেই একই প্রশ্ন—জাবুলানি বলটা কি আসলে খারাপ?
অ্যাডিডাসের তৈরি এবার বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল জাবুলানি নিয়ে বিতর্কের জাল বোনা হচ্ছে সেই টুর্নামেন্টের পর্দা ওঠার আগে থেকেই। পারদের মতো কখনো সেই বিতর্কের মাত্রা চড়েছে, কখনো নেমেছে। মাঝখানে অবশ্য খেলার উত্তেজনায় বিতর্ক যেন ধামাচাপাই পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আবারও নতুন করে সেটি জমে উঠল বলে!
কারণ এবার প্রশ্নটা তোলা হয়েছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ দুটি পক্ষ থেকে। গবেষণাগারে জাবুলানি নিয়ে বিশদ গবেষণার পর মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার রায়, ঘণ্টায় ৪৪ মাইলের বেশি গতিতে ছোটার সময় জাবুলানি বলটি কেমন আচরণ করবে, সেটি পুরোপুরি অনিশ্চিত!
বিতর্কের কোনো সমাধান হচ্ছে না দেখেই কি না, নাসা বিশ্বকাপের বলটিকে নিয়ে গিয়েছিল তাদের অ্যামেস ইনভেস্টিগেশন সেন্টারে। এই গবেষণাকেন্দ্রটি বায়ুগতিবিদ্যা (অ্যারোডায়নামিক্স) নিয়ে গবেষণার জন্য স্বনামধন্য। গবেষণা শেষে তাদের মতামত, দক্ষিণ আফ্রিকার বেশির ভাগ ভেন্যু সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গড়ে এক হাজার মিটারেরও বেশি উঁচুতে হওয়ায়ও জাবুলানি বলটি মাঝেমধ্যে অপ্রত্যাশিত আচরণ করছে।
নাসার এ খবরটি সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ছেপেছে ইংলিশ মিডিয়া। ভাবখানা এমন—কী, আগেই বলেছিলাম না। বরাবরের মতো এবারও ইংল্যান্ডের ভরাডুবির পেছনে হাজারটা অজুহাত খাড়া করছে ইংলিশ মিডিয়া। কারও কারও চোখে এক নম্বর আসামি জাবুলানি বলটাই। এই বলের সবচেয়ে নির্মম শিকার আসলে তাদের গোলরক্ষক রবার্ট গ্রিনই। যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচে হাত থেকে ফসকে গিয়ে বলটা ঢুকে গিয়েছিল জালে। অদ্ভুতুড়ে ওই গোল নিয়ে তখন থেকেই শোরগোল।
অবশ্য আরও আগে থেকে জাবুলানিকে নিয়ে চলে আসছিল কথার লড়াই। বিশেষ করে গোলরক্ষকেরা ভুভুজেলার মতো কানের কাছে একটা কথাই বাজিয়ে আসছিলেন, এই বল গোলরক্ষকের জন্য রীতিমতো হন্তারক। ব্রাজিলের হুলিও সিজার তো বলেই বসলেন, বলটা স্রেফ বাজারি, ‘সুপার মার্কেট বল’। সেই বিতর্কে শামিল হলেন জিয়ানলুইজি বুফন, ইকার ক্যাসিয়াসরাও। গত বিশ্বকাপের সেরা গোলরক্ষক বুফন মন্তব্য করলেন, ‘এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক, বিশ্বকাপের মতো একটা আসরে এমন ত্রুটিপূর্ণ একটা বল দিয়ে খেলা হচ্ছে।’
ক্ষণে ক্ষণে এভাবে বিতর্ক চাড়া দিয়ে উঠেছে, আর সঙ্গে সঙ্গে আত্মপক্ষ সমর্থন করে অ্যাডিডাসকে দিতে হয়েছে বিবৃতি। ‘কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা’ তো তারাই। বলটা যে অ্যাডিডাসই বানিয়েছে, বলের পেছনে আছে তাদের কোটি কোটি ডলারের লগ্নি। অ্যাডিডাসের পক্ষ থেকে তখন বলা হলো, প্রতিটি বিশ্বকাপের আগেই অফিসিয়াল বল নিয়ে গোলরক্ষকেরা অহেতুক একটা আতঙ্কে ভোগেন। এবারও তা-ই হচ্ছে। একজন তো এমন বললেন, ‘গোলরক্ষকদের বানাতে দিলে ওরা আসলে একটা লোহার বলই বানাবে, যে বল মাঝমাঠ থেকে সরানো মুশকিল!’
কিন্তু শুধু গোলরক্ষক নন, খেলা মাঠে গড়ানোর পর থেকে স্ট্রাইকারও যোগ দিলেন এই বিতর্কে। ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার লুইস ফ্যাবিয়ানো বললেন বলটি নাকি ‘অতিপ্রাকৃত’। আর তাঁরই আক্রমণসঙ্গী রবিনহো আরও আক্রমণাত্মক ভাষায় বললেন, ‘আমি বাজি ধরে বলতে পারি, বলটা যারা বানিয়েছে, জীবনেও ফুটবল খেলে দেখেনি।’ আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি, যাঁর পায়ের জাদুতে অনায়াসে বশ মানে বল, সেই মেসিও বললেন, ‘বলটি আসলে গোলরক্ষক এবং আমাদের (ফরোয়ার্ড) দুই ধরনের খেলোয়াড়ের জন্যই জটিল।’
সব খেলোয়াড়ই যে এর বিপক্ষে ছিল এমনও নয়। কাকা যেমন রীতিমতো বিবৃতি দিয়ে জাবুলানির পক্ষে দাঁড়ালেন। কাকা আবার অ্যাডিডাসের পণ্যদূত। দুইয়ে দুইয়ে চারও মেলানো হলো, অ্যাডিডাসের ভাবমূর্তি রক্ষার দায় তো তাঁর আছেই। সবচেয়ে মোক্ষম প্রশ্নটা করলেন এক পক্ষ, ‘কী দরকার প্রতিটা বিশ্বকাপে নতুন বল দিয়ে খেলার?’
আবারও হাজির হতে হলো অ্যাডিডাসকে। তাদের গবেষণাগারে জাবুলানি যে সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে আধুনিক বল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, সেটি জানাতে বিলম্ব করল না। এও জানিয়ে দেওয়া হলো, নতুন বলটির সঙ্গে সবাই যেন মানিয়ে নিতে পারে এ জন্য সেই জানুয়ারি থেকেই সবগুলো দলকে এই বল দিয়ে দেওয়া হয়েছে যথেষ্ট পরিমাণে।
মাঝখানে ভুভুজেলার তীব্র চিৎকারে ধামাচাপা পড়ে গিয়েছিল জাবুলানি। নাসার গবেষণার ফল আবারও তুলে আনল আলোচনার টেবিলে। এবং সেই বিতর্কে ভালো রসদের জোগান দিলেন ক্রেগ জনস্টন। লিভারপুলের এই সাবেক ফুটবলার অ্যাডিডাসের সঙ্গে প্রিডেটর ফুটবল বুট নিয়ে কাজ করেছিলেন। সেই জনস্টনকেও হয়তো পোড়াচ্ছিল জাবুলানির কাণ্ডকীর্তি। চুপটি মেরে বসে থাকতে না পেরে এবার ফিফা সভাপতি সেপ ব্ল্যাটারকে ১২ পাতার বিশাল এক খোলা চিঠি লিখেছেন। যেখানে চোখে আঙুল তুলে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে জাবুলানির দোষত্রুটি।
অবশেষে ফিফাও নড়েচড়ে বসেছে। ফুটবলের অভিভাবক সংস্থাটি জানিয়েছে, বিশ্বকাপের পর পরই অংশ নেওয়া ৩২ দলের কোচ আর খেলোয়াড়দের সঙ্গে বসে জাবুলানি সম্পর্কে মতামত নেওয়া হবে। এর পরই ঠিক হবে, ভবিষ্যতের বল হিসেবে জাবুলানিই নির্বাচিত হবে, নাকি হবে নির্বাসিত।
সেই রায় আসতে এখনো বাকি। বিশ্বকাপেরও কিন্তু বাকি আছে আরও দুটো ম্যাচ। এই ম্যাচে আবার এমন কিছু যেন না ঘটে, ‘কাদম্বিনী’কে যেন মরিয়া প্রমাণ করিতে না হয় যে সে মরে নাই!

জার্মানিকে চায় হল্যান্ড

স্পেন কিংবা জার্মানি—প্রতিপক্ষ হিসেবে দুদলই কঠিন। তবে সেমিফাইনালের আগ পর্যন্ত যা পারফরম্যান্স ছিল জার্মানির, তাতে জার্মানিকে প্রতিপক্ষ হিসেবে চাইবে না কেউই। কিন্তু হল্যান্ড চাইছে। পুরোনো হিসাব চুকানোর একটা ব্যাপার যে সামনে চলে এসেছে!
ফাইনালে কোন দলকে পাচ্ছে হল্যান্ড, এই লেখা পড়ার সময় আপনাদের জেনে যাওয়ার কথা। কিন্তু ডাচরা কথাগুলো বলেছেন নিজেদের সেমিফাইনাল শেষে। ৩২ বছর পর আবার ফাইনালে উঠেই ডাচদের মনে পড়ছে প্রথম ফাইনালের কথা। ১৯৭৪ বিশ্বকাপ হল্যান্ডের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবের এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে আক্ষেপের অধ্যায়। ‘টোটাল ফুটবলের’ অবিস্মরণীয় জাদুতে পুরো বিশ্বকে বিমোহিত করেছিল ডাচরা, ফুটবল দেখেছিল ইয়োহন ক্রুইফ নামের এক জাদুকরকে। ফাইনালে ক্রুইফের দল মুখোমুখি হয়েছিল ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের জার্মানির। কারও ভাবনায় ছিল না হল্যান্ড হারবে, জার্মানরা ছাড়া জার্মানদের জয় চায়নি আর কেউই। কিন্তু জার্মান-যন্ত্রে পিষে যায় ডাচ-স্বপ্ন।
এবার যদি আবার ফাইনালে জার্মানিকে পায় হল্যান্ড, তাহলে এটিকে ‘প্রতিশোধের ম্যাচ’ বলে সহজেই শিষ্যদের উজ্জীবিত করতে পারেন বার্ট ফন মারউইক। হল্যান্ড কোচ অবশ্য প্রতিশোধ-তত্ত্বটাকে উড়িয়ে দিচ্ছেন। তা দিন, কিন্তু তাঁর কথায় প্রতিশোধের গন্ধই যেন পাওয়া যাচ্ছে, ‘প্রতিশোধ নিয়ে আমি ভাবি না। আমরা দুর্দান্ত খেলেছিলাম (১৯৭৪-এর ফাইনালে), তবুও জার্মানির কাছে হারতে হয়েছে। কিন্তু আমাদের জেতা উচিত ছিল। ইয়োহান ক্রুইফের নেতৃত্বে সেটা ছিল আমাদের অনন্য একটি প্রজন্ম। দীর্ঘদিন পরে আবার ফাইনালে উঠে জার্মানিকে পেলে তাই তা হবে দারুণ।’
১৯৭৪ বিশ্বকাপের মতো আলোড়ন এবার হয়তো তুলতে পারেনি হল্যান্ড, তবে মারউইকের দলও অসাধারণ খেলছে। এই বিশ্বকাপে এখনো পর্যন্ত সব ম্যাচ জিতেছে একমাত্র ডাচরাই। সর্বশেষ ম্যাচটি হেরেছে তারা ২০০৮ ইউরোতে। অপ্রতিরোধ্য এই দলের পক্ষে প্রতিশোধ নেওয়া অসম্ভব মনে হচ্ছে না।
রবিন ফন পার্সি অবশ্য ইতিহাস বা প্রতিশোধ নিয়ে ভাবতে রাজি নন। তবে জার্মানির বিপক্ষে খেলাই তাঁর দলের চূড়ান্ত চ্যালেঞ্জ বলে ধরে নিচ্ছেন। এ জন্যই ফাইনালে জার্মানিকে চান হল্যান্ড স্ট্রাইকার, ‘আমার কেন যেন মনে হচ্ছে জার্মানি ফাইনালে উঠবে। যদি তা-ই হয়, তাহলে তা হবে আমাদের জন্য দারুণ এক চ্যালেঞ্জ।’
আরিয়েন রোবেনের কাছে অবশ্য জার্মানি বড় একটা চ্যালেঞ্জ। তবে ভিন্ন কারণে, ‘জার্মানি ও স্পেন দুটোই ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী দল। তা হোক, এই টুর্নামেন্টের ফলাফলে জার্মানিকেই এগিয়ে রাখতে হবে। জার্মানি উঠলে জয়ের জন্য আমি আরও বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকব। জার্মানির বিপক্ষে কোনোভাবেই হারা যাবে না। হারলে বায়ার্ন মিউনিখে আমার সতীর্থরা আমাকে সারা বছর খেপিয়ে মারবে!’

‘চারে’র আশায় স্নাইডার

‘যখন কারও সুসময় যায়, তখন সব বলই তার কাছে আসে, কীভাবে কীভাবে গোলও হয়ে যায়’—নিজের দুঃসময় আর ডেভিড ভিয়ার সুসময় নিয়ে কদিন আগে বলেছিলেন ফার্নান্দো তোরেস। উরুগুয়ের বিপক্ষে ওয়েসলি স্নাইডারের গোলটি যেন মনে করিয়ে দিল তোরেসের কথাটিই। বক্সের ডান দিক থেকে শর্ট নিয়েছিলেন, খুব বেশি জোরও ছিল না। কিন্তু উরুগুয়ে ডিফেন্ডার ম্যাক্সিমিলানো পেরেইরার পায়ে লাগায় বোকা বনে গেলেন গোলকিপার, বল জড়াল জালে।
এই বিশ্বকাপে এটি স্নাইডারের পঞ্চম গোল। কালকের সেমিফাইনালের আগ পর্যন্ত গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে ডেভিড ভিয়ার সঙ্গে শীর্ষে ছিলেন তিনি। পরশুর গোলটায় যে ভাগ্যের একটু অবদান আছে এটা মানছেন স্নাইডারও, ‘একটু ভাগ্যের ছোঁয়া তো আছেই। আমি স্রেফ শটটা নিয়েছিলাম, এক ডিফেন্ডারের পায়ে লেগে বল জালে গেল।’
তবে গোলটা যেভাবেই হোক, ম্যাচে যে তিনি অসাধারণ খেলেছেন, তার প্রমাণ আবারও ম্যাচ-সেরার পুরস্কার। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কী হবে সেটা সময়ই বলবে, তবে ম্যাচ-সেরায় তিনি এখন সবার ওপরে। পরশু চতুর্থবারের মতো সেরা হলেন, পেছনে ফেলে দিলেন তিনবার করে সেরা হওয়া কেইসুকে হোন্ডা, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও ডিয়েগো ফোরলানকে। চারবার ম্যাচ-সেরা হয়েছেন, এবার স্নাইডারের সামনে হাতছানি আরও বড় একটি ‘চার’-এর।
ক্লাব দল ইন্টার মিলানের হয়ে এবার সিরি ‘আ’, লিগ কাপ ও চ্যাম্পিয়নস লিগের ‘ট্রেবল’ জিতেছেন স্নাইডার। বিশ্বকাপ জিতলে পেয়ে যাবেন ‘কোয়াড্রপল’, চার নম্বর শিরোপা। স্নাইডারের কাছে অবশ্য বিশ্বকাপের কাছে পাত্তা পাচ্ছে না অন্য কিছু, ‘ক্লাব পর্যায়ে আমি এবার প্রচুর সাফল্য পেয়েছি। যেকোনো ফাইনাল খেলাই দারুণ রোমাঞ্চকর। ক্লাব পর্যায়ে সবচেয়ে বড় ম্যাচ চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল। ইন্টারের হয়ে আমার সেই অভিজ্ঞতা ইতিমধ্যেই হয়েছে। কিন্তু বিশ্বকাপের ফাইনাল মানে অন্য কিছু, আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে। আমি সবাইকে বলেছি এটা অসাধারণ একটা অর্জন, সবার এটা উপভোগ করা উচিত। ফাইনালের এখনো কয়েকটা দিন বাকি আছে। এই অর্জনটা আমরা আগে প্রাণভরে উপভোগ করব, এরপর ফাইনালের দিকে মনোযোগ দেব।’
গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে তো আছেনই, গোল্ডেন বলেরও জোরালো দাবিদার। শিরোপার পাশাপাশি ব্যক্তিগত লক্ষ্যগুলোও নিশ্চয়ই পূরণ করতে চাইবেন স্নাইডার? ‘এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিরোপা জয়। আমরা খুব কাছে চলে এসেছি। বিশ্বকাপের চেয়ে বড় কিছু নেই’—স্নাইডার জানিয়ে দিলেন তিনি আপাদমস্তক ‘টিমম্যান’।

দেল বস্কের মেসি-বন্দনা

দল বিদায় নিয়েছে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে। লিওনেল মেসির ঝলকটা অপূর্ণই যেন রয়ে গেছে। পাঁচ ম্যাচে একটিও গোল নেই। এই বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার দৌড়ে আর্জেন্টাইন তারকা পেছনেই পড়ে গেলেন। কিন্তু ভিসেন্তে দেল বস্ক বিচারক হলে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারটা সম্ভবত মেসিকেই দিয়ে দিতেন!
সেমিফাইনালের আগে সংবাদ সম্মেলনে এসে মেসিকে প্রশংসায় ভিজিয়েছেন দেল বস্ক। সরাসরি সেরা বলেননি, তবে স্পেন কোচ মেসিকে অন্যতম সেরা খেলোয়াড় বলে রায় দিয়েছেন।
দেল বস্ক বলছেন, ‘মেসি দেখিয়েছে, সে কতটা ভালো খেলোয়াড়। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সটা তখনই ঔজ্জ্বল্য ছড়ায়, যখন দলীয় সাফল্য আসে। সে ছিল এই টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। দলের অবস্থার কারণে কিছুটা সে ঢাকা পড়ে গছে।’
বস্কের এই বন্দনায় সুর মিলিয়েছেন মেসির বার্সেলোনার সতীর্থ আন্দ্রেস ইনিয়েস্তাও। ক্লাব সতীর্থ সম্পর্কে স্পেন মিডফিল্ডারের কথা, ‘আমি সব সময়ই মনে করি লিও ভালো খেলেছে। একজন ভালো খেলোয়াড়ের পক্ষে খারাপ খেলাটা কঠিন। হয়তো গোল করার সৌভাগ্য তার হয়নি। কিন্তু সে সব সময়ই আর্জেন্টিনার মধ্যমণি ছিল।’
‘আমি ওর কোচ নই। আমি জানি না কোচ ওকে কী বলেছে। আমি শুধু জানি, মেসির খেলা দেখা সব সময়ই আনন্দের’—মেসিতে এমনই মুগ্ধ ইনিয়েস্তা।

ফ্রান্সকে বিদায় বলে দিলেন ভিয়েরা

ইচ্ছে ছিল আরেকটা বিশ্বকাপ খেলার। প্যাট্রিক ভিয়েরার সেই ইচ্ছেটা পূরণ হয়নি। রেমন্ড ডমেনেখের ২০১০ বিশ্বকাপ দলে ছিলেন না ফ্রান্সের সাবেক অধিনায়ক। বয়স হয়ে গেছে ৩৪, আগামী বিশ্বকাপে খেলারও সুযোগ নেই তাঁর। এ কারণেই কিনা কে জানে, ‘বিদায় ফ্রান্স’ বলে দিলেন ভিয়েরা।
গত জানুয়ারিতে যোগ দিয়েছেন ম্যানচেস্টার সিটিতে। সেটিই এখন তাঁর ধ্যানজ্ঞান। ‘আমার সব মনোযোগ এখন শুধু সিটিকে ঘিরে। এ ক্লাবটির জন্য আমি আমার সেরাটা দিতে চাই। ম্যানেজার রবার্তো মানচিনির বিশ্বাসের প্রতিদান দিতে চাই আমি’—বলেছেন ফ্রান্সের হয়ে ১৯৯৮ বিশ্বকাপ জেতা ভিয়েরা।
সুযোগ পাননি, তবে বিশ্বকাপে দলের শুভকামনাই করেছিলেন। তাঁর সেই শুভকামনায় বিশেষ ফল হয়নি। ফ্রান্সের জার্সি গায়ে ১০৭টি ম্যাচ খেলা ভিয়েরা খুব হতাশ, ‘আর সব ফরাসির মতো ফ্রান্সের লজ্জাজনক পারফরম্যান্সে আমিও খুব হতাশ।

হরভজনের কথা বললেন মুরালি

সব সময় মুখে হাসি লেগে থাকে তাঁর। চেহারায় নিরীহ ভাব, কথাবার্তায় খুব বিনয়ী। এই হচ্ছেন মুত্তিয়া মুরালিধরন। কিন্তু নিরীহ, হাসিখুশি আর বিনয়ী মুরালিধরনের চেহারাটা বিশ্বজোড়া ব্যাটসম্যানদের কাছে দুঃস্বপ্নের অপর নাম। মুরালিধরনকে সামলাতে হবে, এ নিয়ে আতঙ্কে ভোগেননি এমন ব্যাটসম্যান কজন আছেন?
এই দুঃস্বপ্ন, এই আতঙ্কের যবনিকাপাত হতে চলেছে। অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন শ্রীলঙ্কান অফ স্পিনার। গলে ভারতের বিপক্ষে শ্রীলঙ্কার প্রথম টেস্ট শেষেই বিদায় নেবেন মুরালিধরন। তাঁর অবসরের ঘোষণায় ব্যাটসম্যানদের মধ্যে নিশ্চয়ই স্বস্তির আবহ। অস্ট্রেলিয়ার মাইকেল ক্লার্ক যেমন বলেছেন, ‘তার (মুরালিধরন) মুখোমুখি আর হতে হবে না, আমার মনে হয়, এটা শুনে বিশ্বের অনেক ব্যাটসম্যানই খুব খুশি হবে।’
এক দশকের চেয়েও বেশি সময় ধরে ব্যাটসম্যানদের দুঃস্বপ্ন হয়ে ছিলেন দুজন স্পিনার। মুরালিধরনের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ান লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্ন। নব্বইয়ের দশক পেরিয়ে আরও প্রায় ৬-৭ বছর বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আলোচনা ছিল—ওয়ার্ন না মুরালিধরন, টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি উইকেটের মালিকানাটা থাকবে কার? দুই মহারথীর লড়াইয়ের সেই সময়টার কথা স্মৃতিচারণা করেছেন ওয়ার্ন, ‘শচীন টেন্ডুলকার না ব্রায়ান লারা—ব্যাটিংয়ে যেমন এ রকম একটা প্রতিযোগিতা ছিল, তেমনই বোলিংয়ে ছিল আমার আর মুরালির মধ্যে। তবে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিন্তু ইতিবাচকই ছিল।’
মুরালি-ওয়ার্নের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমাপ্তি হয়েছে ওয়ার্নের ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর মধ্য দিয়ে। এরপর থেকে মুরালিধরনের একক রাজত্বই। এখন মুরালিধরনও চলে যাচ্ছেন। এমন কেউ কি আছেন, মুরালিধরনের এই কীর্তিকে ছাপিয়ে যেতে পারেন?
একজন আছেন। ভারতের অফ স্পিনার হরভজন সিং। আর কেউ নয়, হরভজনের নামটা বললেন মুরালিধরন নিজেই। ‘আমার ধারণা, একমাত্র হরভজনই এটা করতে পারে। আমি ঠিক জানি না, তার বয়স কত বা সে আর কত দিন খেলবে। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে আমার রেকর্ড ভাঙার মতো এই একজনই আছে বলে মনে হয়’—বলেছেন ওয়ানডেতে ৫১৫ ও টেস্টে ৭৯২ উইকেটের মালিক মুরালিধরন।

লামের পক্ষে লো

কিছু হয়নি, সবকিছু ঠিকঠাকই আছে—গত পরশু জার্মানির ম্যানেজার অলিভার বিয়েরহফ সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছিলেন এ কথা। বিয়েরহফ বললেই হলো? কিছুই ঠিক নেই—সংবাদমাধ্যমের ধারণা মনে হয় এমনই! তাই তো জার্মানির ‘অধিনায়কত্ব’ ঝামেলা নিয়ে কাল আবার অনেক খবর বেরোল। আর সেসব খবরের মূল কথা একটাই—জার্মানি দলে অধিনায়কত্ব নিয়ে মহাগণ্ডগোল।
জার্মানির কোনো পত্রিকা লিখেছে, মাইকেল বালাককে জার্মানির শিবির থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। আবার কোনোটিতে ছাপা হয়েছে, কোচ জোয়াকিম লো-ও আর বালাককে চাইছেন না, সমর্থন দিচ্ছেন লামকেই। এক পত্রিকা এমনও লিখেছে, লোথার ম্যাথাউস নাকি বালাককে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নেওয়ারই পরামর্শ দিয়েছেন।
ঝামেলার শুরু বিল্ড পত্রিকাকে দেওয়া জার্মানির বিশ্বকাপ অধিনায়ক ফিলিপ লামের একটি সাক্ষাৎকারের কিছু কথা নিয়ে। যাতে লাম বলেছেন, নিজের দিক থেকে অধিনায়কত্ব ছাড়ার কোনো ইচ্ছাই তাঁর নেই। ওই সাক্ষাৎকার ছাপা হওয়ার দিনই জার্মানি দল ছেড়ে চলে যান বালাক।
পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে, লামের ওই কথাই বালাকের চলে যাওয়ার কারণ। কিন্তু ম্যানেজার বিয়েরহফ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘এটা আসলে কাকতাল। বালাকের এমনিতেই এদিন চলে যাওয়ার কথা ছিল। জার্মানি ফাইনালে উঠলে ও আবার আসবে।’
তা বালাক নিজে কী বলেন? এসেনসিয়াল পত্রিকা জিজ্ঞেস করেছিল তাঁকে, কিন্তু এ নিয়ে কোনো কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বালাক, ‘আমি এ বিষয়টি নিয়ে কোনো কথাই বলতে চাই না।’ তবে কথা বলেছেন জার্মানির কোচ লো। তাতে লামের প্রতি পরিষ্কার সমর্থন, ‘ও মনের কথাটাই শুধু বলেছে। এই বাড়তি দায়িত্বটা সে উপভোগ করছে এবং কাজটা ভালোভাবেই করছে। অধিনায়কত্বটা উপভোগ করছে আর ইচ্ছে করে ছাড়বে না, ও এটা যেমন বলেছে, তেমনই এটাও তো বলেছে, পুরো ব্যাপারটাই কোচের ওপর।’
স্পেনের বিপক্ষে সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে হঠাৎই জার্মান শিবিরে এই অনাহূত বিতর্ক। ম্যাচ-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে লো অবশ্য দাবি করলেন, ‘এ ব্যাপারটা আমাদের মোটেই ভাবাচ্ছে না।’

উইং ব্যবহারের সুফল পেল হল্যান্ড

লাতিন দেশগুলো মাঝখান দিয়ে আক্রমণে যাওয়ার চেষ্টা করে বেশি। ইউরোপিয়ানরা তা নয়। এর তরতাজা প্রমাণ পরশু উরুগুয়ের বিপক্ষে হল্যান্ড। উরুগুয়েকে হারিয়ে হল্যান্ড ফাইনালে গেল কার্যকর উইং প্লের সুফল ঘরে তুলে।
মাঝখান দিয়ে আক্রমণে গেলে বেশি বাধার সম্মুখীন হতে হয়। ডাচরা সে পথে না গিয়ে উইং দিয়ে বেশি খেলেছে। সুবাদে প্রচুর ক্রস করেছে বক্সে। ডিফেন্ডারদের ভুল করার সুযোগ এই ক্ষেত্রে বেশি থাকে। বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে কখনো বাইরে মারে, কখনো কর্নার হয়ে যায়। আর বাতাসে হেরে গেলে তো বড় বিপদ, গোলের সম্ভাবনা তৈরি হয়ে যায়। এই কাজটা শুধু হল্যান্ড নয়, সব দেশই কম-বেশি করে। হল্যান্ড একটু বেশিই করল এই যা।
আরিয়েন রোবেন একবার বাঁয়ে গেছে, একবার ডানে। চরকির মতো ঘুরে প্রান্ত বদল করেছে সে। এভাবে পজিশন বদলানোয় প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডাররা বিভ্রান্ত হয়েছে। রক্ষণ আর জমাট থাকেনি। হল্যান্ডের জয়ের এটা একটা বড় কারণ।
স্নাইডারের কাছে যা আশা করেছিলাম, সেটা করতে পারেনি বা করতে দেওয়া হয়নি। এদিন ঘাটতিটা পূরণ করে দিয়েছে ফন পার্সি। এই বিশ্বকাপে সেমিফাইনালেই তাকে বেশি সক্রিয় দেখা গেছে। একজনের ঘাটতি আরেকজন পুষিয়ে দেওয়ার এই যে ফুটবল, এটির ফলই পেয়েছে হল্যান্ড।
রোবেন দৌড়াদৌড়ি করেছে অনেক। কিন্তু কখনো কখনো বল পায়ে রেখেছে বেশি। দ্রুত কাট করে ভেতরে ঢুকে নিজে শট নেওয়া বা সুন্দর পাস দেওয়া রোবেনের বিশেষত্ব। কিন্তু সেটি এদিন তেমন দেখলাম না। তবে দলের প্রয়োজনে এদিন প্রান্ত বদল করার পাশাপাশি পেছনে এসে রক্ষণও করেছে। কোনো না কোনোভাবে অবদান রাখায় লাভবান হয়েছে তার দল।
গতিময় ফুটবল, সুন্দর ফুটবল নিয়ে এখন দলগুলো আর তেমন ভাবে না। সেটি বিশ্বকাপের ফাইনালে যাওয়ার লড়াই হোক—তাতে কী! দুদলই খুব সাবধানে শুরু করল ম্যাচটা। হুট করে একটা পাস দিলাম, প্রতিপক্ষ বল নিয়ে আক্রমণে গেল—এটা যেন না হয় সে জন্য খুবই সতর্ক ছিল দুদল। ম্যাচটা তাই উপভোগ্য হয়নি। এবারের বিশ্বকাপে এ ম্যাচেই সবচেয়ে বেশি মিস পাস দেখলাম।
মূল স্ট্রাইকার সুয়ারেজের অভাব অনুভব করেছে উরুগুয়ে। অধিনায়ক লুগানোর না থাকাও রক্ষণে চাপ বাড়িয়েছে। মাঝমাঠ থেকে ওপরের দিকে নেতা ছিল ডিয়েগো ফোরলান। কিন্তু সুয়ারেজ না থাকায় তাকে অতিরিক্ত চাপ নিতে হয়েছে। ফ্রি-কিক, কর্নার সব ও-ই নিয়েছে। বাড়তি চাপ পড়ে যাওয়ায় শেষ দিকে আর পারছিল না ফোরলান। যেটা তার দলকে নিয়ে গেছে পরাজয়ের দিকে।
হল্যান্ডকে নিয়ে আলোচনায় টোটাল ফুটবল প্রসঙ্গটা চলে আসছেই। এই হল্যান্ড সেই পথে কতটা আছে? সবাই আক্রমণে যাবে, সবাই রক্ষণ করবে—মোটা দাগে টোটাল ফুটবল বলতে তো আমরা এটাই বুঝি। এখন আসলে সবাই একই ধাঁচের ফুটবল খেলে। ব্যাপারটা হলো, মান এবং সামর্থ্যের প্রয়োগ মাঠে যারা ভালো করবে জয় তাদেরই। হল্যান্ড তাদের সামর্থ্যের প্রয়োগটা মাঠে করতে পারছে।
সেমিফাইনালে হল্যান্ডের জয় যোগ্যতর দল হিসেবেই।