Saturday, August 3, 2013

উদ্যত অস্ত্র, শঙ্কিত জীবন by সাযযাদ কাদির

মাথায় সাদা টুপি। পরনে সাদা পাঞ্জাবি ও পায়জামা। যেন এক সফেদ মুসল্লি, তারাবি নামাজ সেরে বেরিয়েছেন ঈদের কেনাকাটায়। এক হাত দিয়ে কানে ধরে রেখেছেন সেলফোন, কথা বলছেন কারও সঙ্গে।

একজন হামিদ মীর ও আমাদের সংবাদ মাধ্যম by আমিনুল ইসলাম

পলাশীর যুদ্ধের সেই বিশ্বাসঘাতকদের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই? হঠাৎ করে শত বছর আগের ইতিহাসে ফেরত যাওয়াতে অবাক হচ্ছেন, তাই তো? ওই যুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমেই কিন্তু আমাদের শত বছরের ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থাকে মেনে নিতে হয়েছিলো।

শুধু মুজিবকোটে কেউ বঙ্গবন্ধু হয় না by অজয় দাশগুপ্ত

নীরদ সি চৌধুরীকে চেনেন না এমন বাঙ্গালি বিরল। যারা লেখালেখি করেন বা সাহিত্য সংস্কৃতির খবরা খবর রাখেন তাদের মনোজগতে নীরদ সি সর্বভূতে বিরাজমান।

যুদ্ধাপরাধীর বিচারে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার ভূমিকা একপেশে

মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীর বিচার বিষয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার ভূমিকা একপেশে। এমন মন্তব্য করেছেন নারী নেত্রী খুশি কবির।

আরব বসন্ত ও মিসর : গন্তব্য কোথায়? by আকমল হোসেন

মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুড ও সামরিক জান্তা নিয়ন্ত্রিত সরকারের মধ্যে যে মাত্রায় সহিংসতা চলমান, তা ধীরে ধীরে গৃহযুদ্ধে রূপ নিচ্ছে। এক বছর আগে অবাধ ভোটের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত ব্রাদারহুড নেতা মুরসি ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে প্রতিপক্ষের বিরোধিতা মোকাবেলা করেছেন। আদর্শগতভাবে প্রেসিডেন্ট মুরসিকে প্রত্যাখ্যান করে তার প্রশাসনের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য নির্বাচনের পর বিরোধীরা আন্দোলন শুরু করে দেয়। ইসলামী ভাবাদর্শের ব্রাদারহুড মোবারকবিরোধী গণআন্দোলনে অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে অংশগ্রহণ করলেও তার ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারেনি। তাহরির স্কয়ারে যারা সমবেত হয়ে মোবারকের বিরোধিতা শুরু করেছিল, তাদের মধ্যে রাজনৈতিক আদর্শ, পেশা, বয়স প্রভৃতি নিরিখে অনেক ভাগ ছিল। তরুণরা সূত্রপাত করলেও সমাজের অন্যান্য অংশ থেকে মানুষ এসে সমাবেশে অংশ নিয়েছিল। উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ‘আরব বসন্ত’ নামে পরিচিত গণআন্দোলনে তরুণরাই প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সূত্রপাত ঘটায় তাদের তারুণ্যের শক্তিতে নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই করার সর্বজনীন মানসিকতা দিয়ে। তবে আন্দোলনের মুখে মোবারকের পতনের পর মিসরের রাজনীতিতে এক শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে ব্রাদারহুড ও সালাফি আল নূর পার্টি উঠে আসে। পার্লামেন্ট নির্বাচনে এ দুটি ইসলামী দল মিলে ৬৯ শতাংশ আসন জিতে তাদের শক্তির পরিচয় দিয়েছিল। এর পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ব্রাদারহুড প্রার্থী জয়ী হওয়ায় তাদের শক্তি আরও সংহত হয়।
যেভাবে ‘আরব বসন্ত’ শব্দগুচ্ছ সংবাদপত্রের পাতায় ব্যবহার করা হয়েছিল, তাতে মনে হতে পারে এসব দেশে গণআন্দোলনে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের ফলে গণতন্ত্রের ফুল ফুটতে যাচ্ছে। শীতকালীন নির্জীব অবস্থা কেটে জীবনের সূত্রপাত হতে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং রাজনৈতিক অস্থিরতা যেমন বেড়েছে, তেমনি ভবিষ্যৎও হয়ে পড়ছে অনিশ্চিত।
মোহাম্মদ মুরসি সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। রাজনৈতিক শক্তির দিক থেকে তার বিরোধীরা প্রায় সমান ছিল। মুরসি প্রস্তাবিত সংবিধানের বিরোধিতা করেছে তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী অসাম্প্রদায়িক লিবারেল ধারার রাজনৈতিক দলগুলো। কপটিক খ্রিস্টানরা এ সংবিধানের অধীন নিজেদের নিরাপদ মনে করতে পারেনি যেমন, তেমনি নারী অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন গোষ্ঠীও তাতে নারী স্বাধীনতার প্রতি হুমকি দেখতে পেয়েছে। প্রস্তাবিত সংবিধানে শরিয়া আইন প্রচলনের বিষয়ে বিরোধিতার সূত্রপাত। পরবর্তীকালে প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতা কেন্দ ীভূত করার চেষ্টা বিরোধীদের ক্ষোভ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
বর্তমানে মিসরে যে রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা ব্রাদারহুডের একাধিপত্য আরোপের নীতি থেকে তৈরি হয়েছে বললে অতি কথন হবে না। মিসরে দীর্ঘকালের অগণতান্ত্রিক-স্বৈরাচারী ব্যবস্থায় সমাজের সব মানুষ পীড়িত হয়েছিল। সে ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে তাই সব শ্রেণী-পেশা ও রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল। মিসরের সামরিক বাহিনী থেকে স্বৈরাচারী শাসকরা আসতেন বলে সামরিক বাহিনী সেই শাসন ব্যবস্থার অংশীদার ও সমর্থক ছিল। ইসরাইলের সঙ্গে দ্বন্দ্ব থাকায় দেশ রক্ষার নামে সামরিক বাহিনী সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে জাতীয় ক্ষেত্রে একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে গড়ে উঠেছিল। সামরিক বাহিনী মোবারকের পেছনে দাঁড়াতে চাইলেও শেষ রক্ষা করতে পারেনি। তবে মোবারকের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদের নামে তাদের হাতে ক্ষমতা থেকে যায়। পার্লামেন্ট নির্বাচনে ইসলামপন্থীরা বিজয়ী হলে সামরিক বাহিনীর চাপে তা বাতিল ঘোষণা করা হয়। অন্যদিকে ব্রাহারহুড নির্বাচনে জয়ী হওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি তাকে মেনে নিতে চায়নি, যেহেতু তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্রাদারহুডের প্রায় সমান ছিল। এবং তারাও মোবারককে বিতাড়ন করার ‘বিপ্লবে’ অংশগ্রহণ করেছে। ব্রাদারহুড গণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতায় এলেও মিসরীয় সমাজ যে বিভক্ত তা আমলে না নেয়ায় তাকে ক্ষমতা সংহত করতে শক্তি প্রয়োগ করতে হয়েছে শেষ অবধি। এবং অন্য রাজনৈতিক শক্তিকে আস্থায় নিয়ে ক্ষমতা প্রয়োগের নীতিতে বিশ্বাসী না হওয়ার মনোভাব তার জন্য ইতিবাচক পরিণতি নিয়ে আসেনি।
মুসলিম ব্রাদারহুড (ইখওয়ানুল মুসলিমিন) মিসরের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল, যার জš§ হয়েছিল ১৯২০-এর দশকে মিসর যখন ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। দলটি মধ্যপ্রাচ্যে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপের যেমন বিরোধী ছিল, তেমনি পাশ্চাত্য জীবনধারার বিরোধী ছিল। রাজনৈতিক আদর্শ ও সাংগঠনিক ক্ষমতার কারণে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন সরকার এবং নাসেরের জাতীয়তাবাদী সরকারের সময় সংগঠনটি রাষ্ট্রের কোপানলে পড়ে নিষিদ্ধ ছিল। সে সময় উভয় পক্ষ পরস্পরের প্রতি সহিংসতায় লিপ্ত হয়েছিল। নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় সংগঠনটি তার শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পেরেছিল এবং ভিন্ন নামে (ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি) রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করেছে। মোবারক-পরবর্তী নির্বাচনে ব্রাহারহুড ভালো ফলাফল করায় দলটির সাংগঠনিক ক্ষমতার প্রকাশ পাওয়া গেছে। অবশ্য কোনো ‘হেজিমনিক’ শক্তি না হওয়ায় এবং অন্যদের সঙ্গে তার রাজনৈতিক প্রভেদ বিশাল হওয়ায় তাদের পক্ষে এককভাবে দেশ শাসন করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। মুরসির বিরোধিতায় অপর ইসলামী দল আল নূর পার্টিরও সক্রিয় ভূমিকা মিসরীয় সমাজে রাজনৈতিক বিভেদকে স্পষ্ট করে তোলে।
মিসরের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রভাব জামাল আবদুল নাসের কর্তৃক রাজা ফারুক বিরোধী অভ্যুত্থানের সময় থেকে। নাসেরসহ পরবর্তী সব প্রেসিডেন্ট সামরিক বাহিনী থেকে এসেছেন। নাসের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও জাতীয়তাবাদী শাসক ছিলেন। কিন্তু তার উত্তরসূরি সাদাত ও মোবারক কেউ সে স্থান ধরে রাখতে চাননি। তারা বরং মার্কিন সমর্থনপুষ্ট থাকতে চেয়েছেন। নাসের অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতি ত্যাগ করে তারা মিসরকে মার্কিন প্রভাব বলয়ে নিয়ে গেছেন। মার্কিন প্রভাবে মিসর ইসরাইলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। এর বদলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার দুয়ার খুলে যায় মিসরের জন্য। অন্যদিকে মিসরের সামরিক বাহিনী সব সময় ধর্মীয় রাজনীতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ইসরাইলের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও ধর্মীয় রাজনীতির বিরোধিতা মিসরের সামরিক বাহিনীকে ব্রাদারহুড নিয়ন্ত্রিত সরকারের সঙ্গে সংঘাতে নিয়ে গেছে। ব্রাদারহুডের ক্ষমতারোহণ প্রতিবেশী ইসরাইলের জন্য স্বস্তিদায়ক ছিল না। এ সরকারের সঙ্গে হামাস গোষ্ঠীর সখ্য তাদের নজরে ছিল। মুরসির অপসারণকে তাই ইসরাইলের শাসকদের জন্য স্বস্তির বিষয় হিসেবে দেখা যেতে পারে।
মিসরের সামরিক বাহিনী সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা নেয়নি স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সামরিক হস্তক্ষেপের নতুন নিয়ম ও ধারার সঙ্গে মিল রেখে। নব্বইয়ের দশকের পূর্ববর্তী সময়ে এশিয়া-আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় যখন কোনো সামরিক অভ্যুত্থান হতো, তখন তার প্রতি পাশ্চাত্যের বিশেষ করে মার্কিন সমর্থন প্রায় খোলামেলা ছিল। নতুন সামরিক শাসকরা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে রাজনৈতিক প্রশ্রয় পেতেন। তাদের জন্য মার্কিন অর্থনৈতিক-সামরিক সহায়তার নিশ্চয়তা থাকত। তখনকার আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বে এসব সামরিক শাসক মার্কিন সমর্থক বনে যেতেন। কিন্তু বর্তমান যুগে সামরিক শাসনের প্রতি শক্তিশালী বিরোধিতা থাকায় সামরিক বাহিনী সরাসরি শাসনক্ষমতা হাতে নেয় না। রাজনীতিকদের মধ্য থেকে কাউকে বেছে নিয়ে পরোক্ষভাবে সামরিক বাহিনী ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। মিসরের বেলায় এবার তা-ই দেখা যাচ্ছে। লক্ষ্য করার বিষয়, মিসরে ক্ষমতার পরিবর্তন সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কোনো মন্তব্য করছে না। এ পরিবর্তনকে সামরিক অভ্যুত্থান বলেও কোনো মন্তব্য করেনি। কারণ তার আইন অনুযায়ী যে রাষ্ট্রে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা নেয়, সেখানে সামরিক সহায়তা সে দিতে পারে না। মিসরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সখ্যের কারণে সে সহায়তা দেয়ার কথা রয়েছে।
মুরসিকে বিরোধিতা করে তার প্রতিপক্ষরা যে সমাবেশ করছিল, তা মোকাবিলার জন্য মুরসি সরকার ও ব্রাদারহুড শক্তি প্রয়োগের যে নীতি গ্রহণ করেছিল, তাতে কোনো সমাধান আসেনি। সরকারকে পরিস্থিতি সামলাতে সামরিক বাহিনী ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে পরে নিজেরা হস্তক্ষেপ করে বসে। এতে রাজনৈতিক সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে অতীতের সামরিক হস্তক্ষেপের ভ্রান্ত উদাহরণের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। কিন্তু মিসরে সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত সরকার গঠন করে পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে মুরসির পক্ষাবলম্বনকারী দু’শর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে। ব্রাদারহুডের সমর্থকরা রাজপথে থেকে যেভাবে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছে, তাতে মনে হয় না তারা সহজে হার মানবে। বরং দেশটি গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়। এ রকম কিছু মিসরবাসীর জন্য কোনোভাবেই মঙ্গলজনক হতে পারে না। এ পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য সামরিক হস্তক্ষেপের অবসান ঘটিয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে আলোচনা শুরু করতে হবে। বৃহত্তর সমঝোতার ভিত্তিতে সরকার গঠনের মাধ্যমে অস্থিতিশীলতার অবসান হতে পারে।
ড. আকমল হোসেন : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এ কেমন উদারতা? by বিমল সরকার

আমাদের দেশে শিক্ষা ক্ষেত্রে অনেক বিশৃংখলা, দৈন্যদশা এবং সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিখ্যাত সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম তো অনেক আগে থেকেই ছাত্র নামধারী সশস্ত্র ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। সিলেবাস কমানো, পরীক্ষার তারিখ পেছানো, ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করে কিংবা পরীক্ষায় ফেল করেও ভর্তি করানো, নির্বাচনী পরীক্ষা না দিয়ে বা পরীক্ষায় ফেল করেও চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগদান, পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপন বা স্থানান্তরকরণ,বহিষ্কারের আদেশ প্রত্যাহার এবং ফেল করা শিক্ষার্থীকে পাস করিয়ে দেয়া- কোনো ইস্যুতে নামিদামি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় প্রতিনিয়ত তথাকথিত আন্দোলনের নামে তুলকালাম হচ্ছে। আর ভর্তি ফি কমানো, কম টাকায় ফরমপূরণের সুযোগদান, জরিমানা বা শাস্তি মওকুফ এসব তো তাদের কাছে একেবারেই মামুলি ইসু। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এসব অবাঞ্ছিত-অনভিপ্রেত দাবি-দাওয়ার কাছেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেক সময় নতি স্বীকার করতে হয়। আর শিক্ষা ক্ষেত্রে একবার একটি অনিয়মকে প্রশ্রয় দিলে ভবিষ্যতে তা কীরূপ অসুবিধা ও বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে একমাত্র ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ বোধকরি বলতে পারবে না। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, শিক্ষক-কর্মকর্তাবৃন্দ, শিক্ষা বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কিংবা কর্তৃপক্ষের এই বিষয়টি খুব ভালো করে জানার কথা।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ২০১১ সালের অনার্স প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষার ফলাফলকে কেন্দ্র করে যে কাণ্ডটি সম্প্রতি ঘটেছে বা ঘটানো হয়েছে তা শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের দৈন্যদশা কিংবা অন্তঃসারশূন্যতার আরও একটি দলিল হিসেবেই অনেকদিন পর্যন্ত চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ১৭ জুলাই প্রকাশিত ওই ফলাফলে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীদের মধ্যে শতকরা ৫৪ ভাগ উত্তীর্ণ হয়েছে। উত্তীর্ণদের স্বাভাবিকভাবে দ্বিতীয় বর্ষে উন্নীত বলে ঘোষণা করা হয়। আর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অর্থাৎ ৪৬ ভাগ পরীক্ষার্থীই হয় অকৃতকার্য। এই বিপুলসংখ্যক ফেল করা পরীক্ষার্থী তাদের পাস করিয়ে দ্বিতীয় বর্ষে উন্নীত করার দাবিতে প্রথমে নিজ নিজ কলেজে এবং পরে রাজপথে বিক্ষোভ, অবরোধ, সমাবেশ ও মানববন্ধন করে। টায়ার জ্বালিয়ে অগ্নিসংযোগ এবং যানবাহন ভাংচুর করে। এমনকি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাখা শিক্ষক-কর্মকর্তাদের পরিবহনে ব্যবহƒত গাড়ি ভাংচুর করে অন্তত ১০-১২টি। টানা ৪-৫দিন দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাজপথে এসব আচার বা অনাচার সংঘটিত হতে থাকলে ২১ জুলাই রাতে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মোট ৬ অথবা ৭টি বিষয়ের মধ্যে ৫টিতে যারা এফ গ্রেড পেয়েছে বা ফেল করেছে তাদের আপাতত পাস দেখিয়ে দ্বিতীয় বর্ষে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিজ্ঞান অনুষদের বিভিন্ন বিভাগে যারা ৭টি কোর্সের মধ্যে ২টি আর কলা, সামাজিক বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদভুক্ত বিভাগগুলোর ৬টি কোর্সের মধ্যে একটিতে পাস করেছে তাদের দ্বিতীয় বর্ষে উন্নীত হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়। ওই সিদ্ধান্তের ফলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষায় পাসের হার ৫৪ থেকে এক লাফে ৯৩.৭৪-এ উন্নীত হয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই ‘অতি-উদার’ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরও প্রায় আট হাজার পরীক্ষার্থী অনুত্তীর্ণই থেকে যায়। পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থীদের প্রমোশনের দাবিতে আন্দোলনের নামে তাণ্ডবের মুখে নতি স্বীকারের বিষয়টি সচেতন সব মহলে নানা আলোচনা-সমালোচনার জš§ দিয়েছে।
এখানে আমি পাঠক সাধারণের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করব এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে যে, আমাদের দেশে শিক্ষার, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার মান কী পরিমানে নিচে নেমেছে। ২০১১ সালের অনার্স প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত ওই পরীক্ষাটিতে অংশগ্রহণকারী সব শিক্ষার্থী (পাস, বিশেষ বিবেচনায় পাস এবং চূড়ান্ত বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত ফেল আট হাজারসহ) ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত এইচএসসি বা সমমান এবং ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত এসএসসি বা সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। এসএসসিতে ৯ বোর্ডে গড়ে তাদের পাসের হার ছিল ৭২.১৮। সারাদেশ থেকে মোট জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৫২ হাজার ৫০০ জন। আর এইচএসসিতে ১০ বোর্ডে গড় পাসের হার ৭৪.২৮। এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায় ২৮ হাজার ৬৭১ জন। উচ্চশিক্ষা লাভের আশা নিয়ে যারা ২০১১ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বিভিন্ন কলেজে অনার্স কোর্সে ভর্তি হয়, স্বাভাবিকভাবেই তাদের মধ্যে অধিকাংশই বিগত দুটি পাবলিক পরীক্ষায় কমপক্ষে জিপিএ-৩ কিংবা ৪ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। অনেকে আবার জিপিএ-৫ও পেয়েছে। বোর্ড-বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবেচনায় নিশ্চয়ই তারা সবাই মেধাবী। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অনার্স কোর্সের ওইসব শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪০ শতাংশই প্রথম বর্ষের ৬০০ নম্বরের ৬টি বিষয়ের ৫টিতেই ফেল করেছে! এ ছাড়া তাদের মধ্যে প্রায় আট হাজার শিক্ষার্থী এক বছর পড়াশোনা করার পরও একটি বিষয়েও ৪০ শতাংশ নম্বর অর্জন করতে পারেনি! দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ বর্ষে আরও ১৮০০ কিংবা তারও বেশি নম্বরের বিশাল কোর্স তো তাদের সামনে এখনও পড়েই রয়েছে। ফেল করে পরবর্তীতে বিশেষ বিবেচনায় দ্বিতীয় বর্ষে উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা নাকি এক লাখের কাছাকাছি। মজার ব্যাপার হচ্ছে- প্রথম বর্ষ থেকে বিশেষ বিবেচনায় প্রমোশন দেয়া শিক্ষার্থীদের শর্তজুড়ে দিয়ে কর্তৃপক্ষ আশা করছে যে, এফ গ্রেড পাওয়া বিষয়গুলোতে পরবর্তীতে পরীক্ষা দিয়ে তাদের অবশ্যই পাস করতে হবে। অর্থাৎ দ্বিতীয় বর্ষে নির্ধারিত ৭০০ নম্বরের সঙ্গে প্রথম বর্ষে ফেল করা আরও ৫০০ নম্বর যোগ হয়ে মোট ১২০০ নম্বরের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে তাদের। আশংকার বিষয় হল, ওইসব শিক্ষার্থী পরে একই দাবিতে আর কোনো ধরনের লংকাকাণ্ড না জানি ঘটায়। কারণ তাদের মনে এতদিনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, এখানে চাইলেই পাওয়া যায়। আগেরবার, ২০১০ সালেও অনার্স প্রথম বর্ষে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা ৫ বিষয়ে ফেল করে দ্বিতীয় বর্ষে প্রমোশন আদায় করে নিয়েছিল। পূর্বসূরিদের অনুসরণ করতে ওদেরই উত্তরসূরিরা এখন থেকেই তৈরি হচ্ছে না, এরই বা নিশ্চয়তা কোথায়?
যে কোনো পরীক্ষায় পাস এবং ফেলের মধ্যে ব্যবধান আকাশ আর পাতাল। পাসের আনন্দ আর ফেলের বেদনা একমাত্র ভুক্তভোগী ছাড়া সঠিকভাবে আর কারও পক্ষে বোঝার কথা নয়। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে করল কী? বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থীর পাস আর ফেলের অনুভূতিটিকে একেবারে একাকার করে ফেলেছে! এ ছাড়া পাস-ফেলের মধ্যকার ব্যবধানকে আকাশ আর পাতালের সঙ্গে তুলনা করা হলেও ৫টি বিষয় আর ৬টি বিষয়ে ফেলের ব্যবধান সামান্যই, বড়জোর উনিশ-বিশ। ৫টি বিষয়ে ফেল করে যদি দ্বিতীয়বর্ষে ৭টিসহ মোট ১২০০ নম্বরের কোর্স সম্পন্ন করা যায়, তাহলে ৬টি বিষয়ে ফেলওয়ালাদেরও দ্বিতীয়বর্ষে ১৩০০ নম্বর সম্পন্ন করা একেবারে অসম্ভব কিছু নয়। অনার্স শিক্ষার্থীদের পাস-ফেলের বাছবিচার না করে আকস্মিক সিদ্ধান্তে ঢালাওভাবে দ্বিতীয়বর্ষে প্রমোশন দেয়ায় পরীক্ষা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা বা যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। এমন মন্তব্যও করা হয়েছে যে, সবাইকে যদি প্রমোশন দিতে হয় তাহলে পরীক্ষকদের বলে দিলেই হয় যে, কাউকেই ফেল করানো যাবে না। শতভাগ পাস করাতে হবে।
ওইসব শিক্ষার্থীর অনার্স এবং মাস্টার্স কোর্স সম্পন্ন করতে নিয়ম অনুযায়ী ৫ বছর এবং বাস্তবে কমপক্ষে ৮ বছর সময় লাগার কথা। কিন্তু উচ্চশিক্ষা অর্জনের শুরুতেই তারা শক্ত হোঁচট খেল। আর বিপুলসংখ্যক ফেল করা শিক্ষার্থীকে ঢালাও প্রমোশন দিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় করল গোটা জাতির সঙ্গে একটি তামাশা। এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোঃ বদরুজ্জামান বলেন, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সার্বিক দিক বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কর্তা ব্যক্তিদের কাছে আমাদের জিজ্ঞাসা- অযৌক্তিক দাবি নিয়ে ভাংচুরকারী ফেল করা শিক্ষার্থী এবং এ ব্যাপারে ‘সম্পূর্ণ নীরব’ অভিভাবকদের স্বার্থ বড়, নাকি জাতীয় স্বার্থ বড়? বঙ্গবন্ধুর আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ১৯৭৩ সালের বিএ (পাস) পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ১৩.৪ ভাগ। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭৪ সালে ছিল ৬.১ ভাগ আর ১৯৭৫ সালে ৬.৫ ভাগ। তখন শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের স্বার্থ কোথায় ছিল? আমাদের আরও জানতে ইচ্ছে হয়, উচ্চশিক্ষার দ্বার বাংলাদেশের মতো পৃথিবীর আর কোনো দেশে এত উন্মুক্ত আছে কি?
বিমল সরকার : কলেজ শিক্ষক

পোস্টারসর্বস্ব নেতা ও আগামীর নেতৃত্ব by অরবিন্দ রায়

‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে? কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।’ কবিতার চরণ দুটি নেয়া হয়েছে কবি কুসুমকুমারী দাসের ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতা থেকে। কবির এ ‘কবে’-এর জবাব কবে মিলবে তা বিধাতাই জানেন। তবে এরই মধ্যে তরুণ প্রজন্মর মধ্যে নতুন এক অনুসর্গ দেখা দিয়েছে। কবি আজ বেঁচে থাকলে অকর্মাদের বাগাড়ম্বরসর্বস্ব পুরনো অনুসর্গের সঙ্গে নবীন অনুসর্গটিকেও যোগ করতেন। কেননা চলমান এ উদ্ভট কর্মকাণ্ডের কারণে কেবল মহানগরীর সৌন্দর্যই নষ্ট হচ্ছে না, সেই সঙ্গে দেশ ও জাতি তার ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি গঠনেও হিমশিম খাচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এসব কর্মকাণ্ড যোগ্য নেতা সৃষ্টির পথে বড় অন্তরায়। দেশের ভাবী কাণ্ডারিদের এসব কার্যকলাপে বীতশ্রদ্ধ হয়ে কবি হয়তো লিখতেন, ‘আমাদের দেশে হবে সেই নেতা কবে? পোস্টারে না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।’ সেই কাজের নেতা কবে দেখতে পাব? জবাব, সদিচ্ছা থাকলে অচিরেই দেয়া সম্ভব। এর জন্য চাই সরকারি ও বিরোধী দলসহ অন্যান্য দলের হাইকমান্ডে থাকা ব্যক্তিদের শুধু একটি নির্দেশনা। তা হচ্ছে ‘উঠিয়ে ফেলো, আর না’।
দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে যুগে যুগে অনেক নেতার আবির্ভাব ঘটেছে। তাদের মধ্যে চীনের মাও জে দং, ভিয়েতনামের হো চি মিন, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, বলিভিয়ার চে গুয়েভারা, ভেনিজুয়েলার হুগো শাভেজ, বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক, কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা অন্যতম। তারা দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে নিজ জীবন ও যৌবনকে তুচ্ছ করে সংকটময় পরিস্থিতি থেকে জাতিকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তাদের এ সুকর্মের সৌরভ সময়ের সীমা ছাড়িয়ে, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রশ্ন জাগে, তাদের এ কর্মগুণ দেশ-মহাদেশে ছড়িয়ে দিতে তারাও কি বিলবোর্ড আকারের পোস্টার শহরের মোড়ে মোড়ে টাঙ্গিয়ে রেখেছিলেন? যদি তাই না হয়ে থাকে, তাহলে বর্তমানে আমাদের দেশে যারা ‘গাঁয়ে মানে না, আপনি মোড়ল’ স্টাইলে নিজেদের প্রচার করছেন, তাদের এসব কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য কী? উদ্দেশ্য যাই-ই হোক, তার সঙ্গে যে সততার কোনো সম্পর্ক নেই তা হলফ করেই বলা যায়। আর এই মোটা বুদ্ধির কার্যক্রমকে নীতিনির্ধারকরা কিভাবে দুই যুগ ধরে সায় দিচ্ছেন তা বোধগম্য নয়। এসব প্রশ্রয়ধর্মী কর্মকাণ্ডে দেশ ও সমাজ কোন রসাতলের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে, আজ সে কথা ভাবার সময় এসেছে।
বলা যায় টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া হেন জায়গা নেই, যেখানে স্বঘোষিত জনদরদি ও সমাজসেবক নামধারীদের চন্দ্র মুখ প্রদর্শিত হচ্ছে না। এ ধরনের পোস্টার প্রচারে কোনোরকম নীতি-নৈতিকতা ও আইনগত বাধা না থাকায় যে যেভাবে পারছে দলীয় ঊর্ধ্বতন নেতাদের লেজ ধরে নিজেদের জনসমক্ষে উপস্থাপিত করছেন। ঈদ, নববর্ষ বা পদপ্রাপ্তির শুভেচ্ছা জানানোর আড়ালে প্রকারান্তরে তারা নিজেদেরই জাহির করছেন। ফলে দেশ ও সমাজের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দেয়ার মানস নিয়ে মাঠে নামা ত্যাগী নেতার বদলে বর্তমানে যাদের দেখা যাচ্ছে, তাদের কতকটা কাগজের চাইনিজ গোলাপের সঙ্গে তুলনা করা যায়। কৃত্রিম টবসহ ফুল পাতা কুঁড়ির এমন সব চাইনিজ গোলাপ আজকাল পাওয়া যায়, যা মাটিতে লাগানো গোলাপের চেয়েও প্রাণবন্ত বলে মনে হয়। কিন্তু কোনো ঘ্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না। ইদানীং এ ধরনের প্রচার কার্যক্রমের ইঁদুর দৌড়ে মহল্লার পাতিনেতা থেকে শুরু করে অনেক জাতীয় নেতাকেও শামিল হতে দেখা যাচ্ছে। বুক মাপের ছবি বাঁশের খুঁটিতে জিআই তার দিয়ে বেঁধে গলির মোড়ে, বিপণিবিতানের সামনে, গুরুত্বপূর্ণ চৌপথি ছাড়াও বাসের বডিতে, রিকশার হুডের তলায়, বৈদ্যুতিক খুঁটিতে প্রদর্শিত হতে দেখা যায়। রকমারি ভঙ্গিমায় তোলা ছবিগুলোর দিকে তাকালে বড় করুণা হয়। কথায় বলে মুখচ্ছবি হচ্ছে মনের আয়না। মনের ইচ্ছা-অনিচ্ছাগুলোই মুখচ্ছবিতে ভেসে ওঠে। কাজেই অনেক ছবির দিকে তাকালে তাদের চাহনির সঙ্গে মুরগির দিকে শেয়ালের চাহনির অনেকটাই মিল পাওয়া যায়। এখানে মুরগি হচ্ছে দেশ ও দশের স্বার্থ। অনেকের দৃষ্টির মধ্যে দেশ ও দশের স্বার্থ লুটেপুটে খাওয়ার ইঙ্গিত মেলে।
প্রাসঙ্গিক বিধায় উল্লেখ্য, ইউরোপের বেশ ক’টি দেশ ভ্রমণের সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সেসব দেশে বাস ও রেলপথে হাজার হাজার মাইল ভ্রমণ করার পরও কোথাও কোনো নেতা-নেত্রীর ছবিসহ পোস্টার আমার চোখে পড়েনি। তাই বলে কি ধারণা করা যৌক্তিক হবে যে, ইউরোপে কোনো যোগ্য নেতা-নেত্রী নেই? আসলে ইউরোপের ওরা কাজে বিশ্বাসী। আর আমরা বিশ্বাসী ভং-এ। তারা সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী বলেই নিজেদের উপস্থাপন করে কাজ ও সেবার মাধ্যমে। আর আমাদের দেশে উদীয়মান আগামীর নেতারা নিজেদের উপস্থাপন করছেন বড় বড় পোস্টারে। একটি জাতিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য দক্ষ নেতার প্রয়োজন, যিনি নেতৃত্ব দিয়ে শিকড় পর্যায়ের নেতাদের মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের জনহিতৈষী কাজগুলো করিয়ে নেবেন। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নেতার দৃষ্টি কাড়ার প্রতিযোগিতা হবে ভালো কাজের ও মার্জিত আচার-আচরণের। কিন্তু এখন অধিকাংশ নেতাই ভালো কাজ ও মার্জিত আচার-আচরণের পথ পরিহার করে বিলবোর্ড মাপের পোস্টার দিয়ে কেন্দ্রের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। ফলে দেশ ও সমাজকে ভালোবাসা ও জনসেবার বিষয়টি গৌণই থেকে যায়। কতকটা চতুর্থ বিষয় বা অপশনাল সাবজেক্টের মতো। ফেল করলেও কোনো যায় আসে না তাতে। কিন্তু দেশ ও সমাজের মঙ্গলার্থে কাজ না করলে কি যোগ্য নেতা হওয়া সম্ভব? বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশ ও সমাজসেবার পথ এড়িয়ে আজ যারা পোস্টারীয় প্রচারে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছেন, এসবের মাধ্যমে তারা যোগ্য নেতা হওয়া দূরে থাক, পুরনো কোনো প্রতিষ্ঠিত নেতার সহকারী হওয়ারও যোগ্যতা অর্জন করতে পারবেন কি-না সন্দেহ। এ সংক্রান্ত আরও একটি কথা না বললেই নয়। যারা পোস্টারে ছবি জাহিরের চেয়ে কাজে বিশ্বাসী, তাদের কথা যদি না বলি তাহলে লেখাটির চৌদ্দ আনাই অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। আজ যারা নীরবে নিভৃতে কাজ করে যাবেন বলে মনস্থির করেছেন, তারা কিন্তু পোস্টারের ভিড়ে অন্তরালেই থেকে যাচ্ছেন। প্রকারান্তরে তারা দলের হাইকমান্ডের চোখে আনুগত্যহীন বা ভিলেন হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন। উপর মহল এলাকায় এসে যখন মুলোর মতো দাঁত কেলানো হাসিমাখা মুখের পোস্টারীয় নেতাকে দেখতে পান, তখন তাকেই এলাকার একনিষ্ঠ কর্মী ভেবে কাছে ডেকে ফিসফাঁস করে চলে যান। ফলে সত্যিকার কর্মীরা কেন্দ্রীয় নেতাদের অবজ্ঞার শিকার হয়ে তুষের আগুনের মতো জ্বলতে থাকেন। এভাবে জ্বলতে জ্বলতে এক সময় তিনি নিজেও সঠিক পথের প্রতি আস্থা হারিয়ে অগত্যা যুগের গড্ডলিকায় গা ভাসিয়ে দিতে বাধ্য হন। কিন্তু ততক্ষণে সময় অনেক পেরিয়ে গেছে। কেননা সময়ের অনেক আগেই সেই চীনা গোলাপটি কেন্দ্রীয় নেতার মনের বাগানে স্থান করে নিয়েছে। সেই রূপকথার গল্পের মতো। রাজকুমারী ‘কাজল রেখা’ স্নান সেরে এসে বিধিমতো রাজকুমারকে জাগিয়ে তোলার আগেই কুটনি দাসী রাজকুমারকে জাগিয়ে তুলে কাজল রেখার আসন দখলে নিয়েছে। আর এভাবেই ভুল পথে ভুল নেতা সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজে একের পর এক কাহিনীর সৃষ্টি হচ্ছে। সেই সঙ্গে আনুপাতিক হারে বাড়ছে জনদুর্ভোগ। এ দুর্ভোগ কেবল জনগণের একার নয়। এ দুর্ভোগ পথ চলাচলকারী নেতা ও নেত্রীদেরও। কাজেই সরকার ও নেতা-নেত্রীদের প্রতি বিনীত অনুরোধ, তারা যেন অবিলম্বে তাদের অনুসারীদের ভণ্ড পোস্টার নীতির পথ পরিহার করে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনেন। পোস্টার কেবল নির্বাচনকালীন নমিনেশন প্রাপ্তরাই লাগানোর অনুমতি পাবেন। তাও নমিনেশন প্রাপ্তির পরদিন থেকে নির্বাচনের সময় পর্যন্ত। নির্বাচন শেষ হওয়ার তিন দিনের মাথায় তা নিজ নিজ দায়িত্বে সরিয়ে ফেলে নগরীর সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনবেন। এটা করার জন্য সবার সদিচ্ছাই যথেষ্ট বলে মনে হয়। এ ব্যাপারে সব দলের হাইকমান্ড থেকে ও সরকারি নির্দেশসহ ঘোষণা আসা প্রয়োজন। যারা যেখানে যে উদ্দেশ্যেই পোস্টার ঝুলিয়ে রাখেন না কেন, তা যেন স্ব স্ব ব্যক্তি অবিলম্বে খুলে ফেলেন। তা না হলে যার পোস্টার পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে সরকার বা দলীয় উচ্চ নির্দেশকরা বাধ্য হবেন। যেহেতু আইন অমান্যকারীর ছবি ও ঠিকানা দেয়াই থাকবে, তাই তাকে ত্বরিত আইনের আওতায় নিয়ে আসা খুব কঠিন হবে বলে মনে হয় না। এটা করা গেলে ‘যত বড় নেতা নয়, তত বড় পোস্টার’- এ রেওয়াজ থেকে উদীয়মান নেতারা রক্ষা পাবেন। সেই সঙ্গে যোগ্য নেতা পরিমাপের জন্য পোস্টারের আকার ও সংখ্যা বিবেচনায় না এনে কর্ম ও গুণকে প্রাধান্য দেয়ার রেওয়াজটি রক্ষা পাবে বলে মনে হয়।
সরকারের তরফ থেকে যদি ঘোষণা নাও আসে, কেউ সত্যিকারের নেতা হতে চাইলে তাকে নিজ দায়িত্বে নিজের ছবিওয়ালা পোস্টারগুলো সরিয়ে নিয়ে জনসেবামূলক কাজে লেগে যেতে হবে। এতেই তিনি হয়ে উঠবেন সত্যিকারের নেতা। জনগণের মানসপটে থাকবে তার নাম। কেননা আমজনতা এতটা বেঈমান নয়। আপনি যদি মানুষের জন্য কাজ করেন, তাহলে দেখবেন মানুষ আপনার ছবি ঘরে ঘরে ঝুলিয়ে রাখবে। আপনাকে টাকা খরচ করে বিলবোর্ড বানাতে হবে না। তখন আপনার সঙ্গে গলির মোড়ের বাঁশের খুঁটিতে লটকানো পোস্টারসর্বস্ব নেতার তুলনা করা হলে আপনি পাবেন নিরানব্বই ভোট। আর তিনি পাবেন মোটে একটি। অর্থাৎ নিজেরটি।
অরবিন্দ রায় : একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি পরিচালক

আমার শরীরে সেক্স ফুরিয়ে গেলে কী রকম অনুভব করবো জানি না: তসলিমা নাসরিন

কাল একটা পত্রিকা থেকে একজন সাংবাদিক আমাকে ফোন করে পঞ্চাশ হওয়ার পর জীবন কেমন বোধ হচ্ছে জানতে চাইলেন। পঞ্চাশ নিয়েই একটা স্টোরি লিখছেন কাগজে।

না, না-লেখার মাঝে কষ্টই বেশি by বদিউর রহমান

ইংরেজ কবি জন মিল্টন ‘প্যারাডাইজ লস্ট’ লিখে টের পেয়েছিলেন যে, অতঃপর ‘প্যারাডাইজ রিগেইন্ড্’ না লিখলে হয়তো তার আত্মা অতৃপ্ত থেকে যাবে। তাই স্বর্গ হারানোর পর স্বর্গের পুনঃপ্রাপ্তির চমৎকার কাব্যিক রচনা তিনি মানবসমাজকে উপহার দিয়েছিলেন। ভুলের খেসারতে স্বর্গ হারানো পরবর্তী সময়ে বড় হয়ে দেখা দেয়নি, বরং ভুলের অনুতাপ আর অনুশোচনার সুফল হিসেবে আবার স্বর্গপ্রাপ্তিই বড় হয়েছিল। মিল্টন মহাকাব্যে বিখ্যাত হলেন, মানবজাতি সৃষ্টি-রহস্য থেকে বাস্তবমুখিতায় স্বর্গ হারানো আর স্বর্গ পুনঃপ্রাপ্তির খেসারত ও তৃপ্তি উপলব্ধি করে মহাতৃপ্ত হল। আমরা বুঝতে সক্ষম হলাম যে, হারানোতে অস্থির হতে নেই, পুনঃপ্রাপ্তির সুযোগ রয়েছে। মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে/হারা শশির হারা নিশি অন্ধকারেই ফিরে আসে- কী এক চিরন্তন অমোঘ বাণী! ফেইলিওর ইজ দ্য পিলার অব সাকসেস- এটাও কি কম মূল্যবান? অতএব হতাশ হয়ে লাভ কী, বরং ক্ষতিই বেশি। রবার্ট ব্র“স না হয় সব সময় সবার পক্ষে হওয়া সম্ভব নাও হতে পারে, কিন্তু তার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করতে দোষ কিসের? আমিও ভাবলাম, দেশসেবার জন্য আমার তো আর ‘নন্দলাল’ হলে চলবে না; ভুল-ভ্রান্তিবিহীন নখ-কেশ না হয়ে হাত-পা হয়েই তো কাজ করতে হবে। ভুলভ্রান্তি তো যে কাজ করে তারই হবে। আশাবাদী মানুষের চিরন্তন সজীবতা আমি ধরে রাখতে চাই। চির নতুনেরে দিল ডাক-এর মধ্যে থাকাই বেশ উত্তম মনে হয়।
অনেক চিন্তাভাবনা করে দেখলাম, নন্দলাল হয়ে ঘরে বসে থাকলে দেশসেবা হয় না। ভয়কে জয় করে বেরুতেই হয়। আমি একজন না লিখলে জগৎ-সংসারের কিছুই আসে যায় না। কেউ কারও জন্য থেমে থাকবে না। অক্ষমতাজনিত কারণে লেখা সম্ভব না হলে সে ভিন্ন কথা। লেখকের যেমন কমতি নেই, পত্রপত্রিকারও সংখ্যা কম নয়; ভালো-মন্দে পত্রিকার পৃষ্ঠা ভরতে হয়, হবেও; অতএব মূল ফসলের সঙ্গে আগাছাও থাকবে। তারপরও ধান ও ভুসিতে সহঅবস্থান থাকে। বাতাসে ভুসিমুক্ত না করা পর্যন্ত শুধু ধান পাওয়া যাবে না। এটা লেখকের বেলায় যেমন সত্য, তেমনি অন্য পেশার বেলায়ও প্রযোজ্য। রাজনীতির বেলায় ‘ধান-ভুসির’ ছড়াছড়ি তো আমাদের দেশে কেবল দেখেই চলেছি। অতএব না লিখলে ধান-ভুসির আলাদাকরণ যে বিঘিœত হবে, এ সত্য অস্বীকার করা যাবে না। ধান-ভুসি, গাছ-অগাছ, শেক্সপিয়র-ওভারসিয়ার সবগুলোকে এক পাল্লায় এক ভেবে চুপ করে হজম করে নিয়ে না লেখার মাঝে কষ্টই বেশি। অতএব লিখতে হবে, না-লেখার মাঝে আনন্দ যা-ই থাকুক, তার থেকে লেখার মাঝেই আনন্দ বেশি এটা মেনেই নিজকে সচল রাখতে হবে।
কিছু বিষয় ভেতরে জমাট বেঁধে থাকে। বলে কিংবা লিখে নিজেকে হালকা না করলে এ জমাট বিষয়ের সে কী জ্বালা! কান ঝালাপালা করানো টকশো না হোক, মোগল সাম্রাজ্যের দুনিয়া কাঁপানো প্রেমের উপাখ্যান না হোক, গামছাওয়ালার না-পাওয়ার হতাশা থেকে উদ্ভূত প্যাঁচাল না হয় নাইবা হল, ‘আগাচৌ’ কিংবা ‘বউ’র সাপ্তাহিক-পাক্ষিক রাজা-উজির মারা কিছু না হোক, অন্তত জমির দলিলে বৃদ্ধাঙ্গুলির ছাপ দেয়ার মতো কিছু একটা হলেই বা মন্দ কী? না লিখলে কি এটা বলা যেত যে, আলী (আওয়ামী লীগ) বোধহয় এবার একটু ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে চাচ্ছে। তা না হলে সাংবাদিক পেটানো সংসদ সদস্য কি আর গ্রেফতার হতেন! লোকে বলে, এ গ্রেফতারের সায় দিয়ে আলী এক ঢিলে দু’পাখি মারার কৌশল নিয়েছে। সামনে এখনও সম্ভাব্য ও প্রত্যাশিত জাতীয় নির্বাচন। এক্ষেত্রে ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে হলে চমকপ্রদ কিছু করা প্রয়োজন। সুযোগ যখন এলো, অমনি কাজে লাগানো! দীর্ঘদিন ধরে নিজ দল আলী এবং নিজ নেতা হাসিনাকে যেভাবে এ সংসদ সদস্য বিব্রতকর অবস্থায় ফেলছিলেন, তা আর কত মানা যায়? টকশো এবং লেখায় এমন একটা ভাব তুলে ধরছিলেন যে, তিনি একজন আদর্শ-বোদ্ধা রাজনীতিক, তিনি অন্যায়ে আপসে নেই। বস্তুত কোনো এক ‘মাত্রা’র অনুষ্ঠানে এ সংসদ সদস্য ধীরস্থিরভাবে গুছিয়ে কথা বলে একটা ‘ভাব’ সৃষ্টি করতেও যে সক্ষম হয়ে অনেক শ্রোতার মনে আসন করে নিয়েছিলেন, তা স্বীকার করতেই হয়। অতএব এবার তাকে ‘সাইজ’ করতে হবে, দেখ বাবা, হাউ মেনি রাইস ইন হাউ মেনি পেডি! দ্বিতীয়ত, জাতীয় নির্বাচনের আগে আলীর তথা সরকারের ভাবমূর্তি সৃষ্টির জন্য দেখতে হবে যে নিজ দলের চৌকস সংসদ সদস্য হলেও আইনের কাছে ছাড় নেই। অতএব নূরুননবী শাওন পার পেয়ে গেলেও এ বেচারা ধরা খেলেন। জনমনে একটা ধারণা স্পষ্ট আছে যে, দলীয় হাইকমান্ড না চাইলে রনি সাহেবও পার পেয়ে যেতেন, গ্রেফতার অন্তত হতেন না। পুলিশ এবং বিচার ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা যে পর্যায়ে এসেছে, তাতে এমন ধারণা হয়তো অমূলক নয়। ইব্রাহিম হত্যায় শাওনকে গ্রেফতার করা হলে তখনকার পুলিশ কমিশনারের আল্লাহকে হাজির-নাজির মেনে শাওনকে নির্দোষ দাবির কসম না খেলে; লিমন-ঘটনায় দায়ী আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী সদস্য গ্রেফতার হলে, লোক-পেটানো সংসদ সদস্য বদির বিষয়ে আগেই আইনি ব্যবস্থা নেয়া হলে আলীকে আজ এমন ভাবমূর্তি শূন্যতায় পড়তে হতো না। টেন্ডারবাজ-অস্ত্রবাজ ছাত্রলীগ-যুবলীগ ‘সূর্য-সন্তান’দের বা সোনার ছেলেদের কথা তো বলাই ‘অপরাধ’ হয়ে যেতে পারে। তবুও বলতে চাই, এ নজিরটা ভালো হল, আলীর ভাবমূর্তিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। এ কথাগুলো না লিখতে পারলে কষ্টই বেশি হতো, তা-ই লেখা হল।
ভালো কথা, সৈয়দ আশরাফের পদত্যাগ নিয়ে পত্রিকার খবর তো তিনি অস্বীকার করলেন। অনেক আগেই দৈনিক সমকালে একবার এমন ‘বদল’ প্রত্যাশিত মর্মে মত ব্যক্ত করেছিলাম। এবার শেষ মুহূর্তে সৈয়দ সাহেব হয়তো ‘মওকা’ বুঝে কেটে পড়তে চেয়েছিলেন; পাঁচ সিটির পরাজয় মেনে নিয়ে কেটে পড়া তার মতে হয়তো জাতীয় নির্বাচনে পরাজয় মেনে নেয়ার চেয়ে অনেক বেহেতের। কিন্তু শেখ হাসিনা কি অবুঝ যে পাঁচ সিটির ফলে ডুবুডুবু নৌকার এ দুঃসময়ে তাকে ছেড়ে দেবেন? তাকে যেতে দিলে দলের এক মহাবিপর্যয় হয়তো দেখা দিত। আশরাফবিহীন অবস্থায় হয়তো অনেক অজানা কথা বেরিয়ে যেত, দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব-মতদ্বৈধতা হয়তো আরও প্রকাশ্য হতো। অতএব যায় দিন যাক, ডুবি-ভাসি একসঙ্গেই থাকি, নতুন করে থলের বিড়াল বের করে নতুন ফ্রন্ট খোলার দরকার কী? সৈয়দ সাহেবের পদত্যাগ-প্রস্তাবের সঙ্গে (বাস্তবই হোক আর গুঞ্জনই হোক) দলনেত্রীর সম্মত না হওয়ার আরেকটি মোক্ষম কারণও রয়েছে বলে অনেকের ধারণা। সেটা হচ্ছে, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এখন আবার কাকে সাধারণ সম্পাদক করবেন? দল গোছানোর জন্য দক্ষ ও সাংগঠনিক শক্তিসম্পন্ন প্রবীণ কাউকে এ পদে আনা হলে তাতে হিতে-বিপরীত যদি হয়ে যায়? তার প্রভাব যদি দলনেত্রীর একচ্ছত্র প্রভাবকে কিছুটা হলেও ‘মলিন’ করে দেয়? আলীর মধ্যে নেতা তো ধরতে গেলে একজনই এবং তিনি খোদ শেখ হাসিনাই! সৈয়দ সাহেবের যত সমালোচনা আর আলীর মতো বড় দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যত ব্যর্থতাই থাকুক, শেখ হাসিনা তো তাকে নিয়ে সন্তুষ্ট ও স্বস্তিতে রয়েছেন, নাকি? এজন্যই তো গত কাউন্সিলে আবার সৈয়দ সাহেবকে স্বপদে বহাল রেখেছেন নেত্রী।
আলী ও বাজাদের (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল) মধ্যে একটা বড় মিল হচ্ছে, দুই নেত্রীই গণতান্ত্রিকভাবে স্বেচ্ছাচারী, একক ক্ষমতালিপ্সু এবং অন্য নেতৃত্বের বিষয়ে অসহিষ্ণু। অপরদিকে বড় অমিলটা হচ্ছে, বাজাদ-নেত্রী যথাসম্ভব ‘মাইকের’ কাজ করিয়ে নিতে চান সাধারণ সম্পাদক বা অন্য নেতাদের দ্বারা। তিনি অনেক বিষয়েই গালে আঙুল ঠেকিয়ে বসে থেকে ‘নেত্রীসুলভ’ নীরবতায় আগ্রহী। অতএব মির্জা ফখরুল গং যথেষ্ট গলাবাজি আর চাপাবাজি হরদম চালিয়ে যান, নেত্রী থাকেন নিরাপদ। এর বিপরীতে আলীর দলনেত্রী নিজে হরহামেশা ‘মাইকের’ কাজ করতে ভালোবাসেন, ‘জুতা সেলাই থেকে চণ্ডিপাঠ পর্যন্ত’ রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রেই তার একক রাজত্ব-কর্তৃত্ব, সাধারণ সম্পাদক থাকেন নীরব। সৈয়দ সাহেব ঘুমিয়ে থাকেন বা ‘কেমন-কেমন’ হয়ে থাকেন, তাতেই বরং নেত্রী সন্তুষ্ট। তিনি একাই আলী, তিনিই সব। অতএব তার প্রভাব-প্রতিপত্তি সামান্যতমও ক্ষুণœ হোক, তা নেত্রী চাইবেন কেন? চাইলে তো গত কাউন্সিলেই সাধারণ সম্পাদক পদে অন্তত একজন যোগ্য, দক্ষ, সাংগঠনিক ক্ষমতাসম্পন্ন নেতাকে আনতে পারতেন, নাকি? দেশবাসীর প্রিয় দল আলীকে অধঃপতনে নেয়ার ষোল আনা দায় কি একা শেখ হাসিনার, সৈয়দ সাহেবের কিছুটাও থাকবে না? এ কথাগুলো লিখতে না পারলে পেটে হয়তো ‘বদহজম’ হতো, তাই লিখে হালকা হলাম।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে আলী কী খেলা খেলতে চায়, তা নিয়ে বোধকরি আলাদাভাবেই লেখা শ্রেয়। এখন সংক্ষেপে শুধু এটুকু বলা যায় যে, এ বিচারটাই এখন আলীর আগামী নির্বাচনের জন্য হাতের পাঁচ (যা আগেও বলেছি)। আলী হয়তো ভাবছে, এ বিচার দীর্ঘায়িত করে অসম্পন্ন কাজ সম্পন্ন করার দোহাই দিয়ে আবার ভোট চাওয়া যাবে। ইস্যুটাকে জিইয়ে রেখে ফায়দা হাসিল করা যাবে। বিলম্বিত রায়, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং আপিলের সময়ক্ষেপণ দেখে আমজনতার তেমন ধারণা হয়তো অমূলক নয়। কিন্তু এমন যদি কেউ ভেবে থাকেন যে, এ মেয়াদে এ বিচারের দৃশ্যমান বড় অংশ শেষ করে রায় কার্যকর করতে পারলেই জনগণ আলীকে বেশি বিশ্বাস করবে- তখন কি এ ধারণা উড়িয়ে দেয়া যাবে? এ স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আলাদাভাবে পরেই লিখি। কারণ না-লেখার মাঝে কষ্টই বেশি।
বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান