Friday, June 5, 2015

দক্ষিণ এশিয়ায় টাকা ও পেশিশক্তির বিস্তার ঘটেছে -বিশেষ সাক্ষাৎকারে : সীতারাম ইয়েচুরি by সোহরাব হাসান ও প্রতীক বর্ধন

সীতারাম ইয়েচুরি
সীতারাম ইয়েচুরি কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (মার্ক্সিস্ট) সাধারণ সম্পাদক। তাঁর জন্ম ১৯৫২ সালে। ইয়েচুরি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থায় তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। সম্প্রতি ইয়েচুরি মৌলবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এক সেমিনারে ঢাকায় এলে তাঁর এই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাব হাসান ও প্রতীক বর্ধন
প্রথম আলো : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন বাংলাদেশ সফর থেকে আমরা কী প্রত্যাশা করতে পারি?
সীতারাম ইয়েচুরি : ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করবেন, এটা ভালো কথা। আমরা আশা করি, এই সফরের কারণে দেশ দুটির মধ্যকার আন্তসম্পর্ক ও সহযোগিতা আরও বাড়বে। আমরা সিপিএমের পক্ষ থেকে সফরটিকে খুবই মূল্যবান মনে করি। যাক, শেষমেশ স্থল সীমান্ত চুক্তি হয়ে গেছে, এতে আমরা খুশি। এর আগে মনমোহন সিংয়ের সরকার এই বিল পেশ করেছিল, তখন বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস এর বিরোধিতা করেছিল। এখন আবার বিজেপিই এই বিল পেশ করেছে। এবার সবাই এ বিষয়ে একমত ছিল।
প্রথম আলো : সীমান্ত চুক্তি তো হলো, কিন্তু তিস্তার পানি বণ্টনের কী হবে?
সীতারাম ইয়েচুরি : তিস্তার পানি বণ্টনের আলোচনায় আমরা সিপিএমের পক্ষ থেকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলাম। মনমোহন সিং যখন ঢাকা সফরে এসেছিলেন, তখনই এটা হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কথা ছিল, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সফরসঙ্গী হয়ে ঢাকায় আসবেন। কিন্তু তিনি শেষ মুহূর্তে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ায় সেবার তিস্তা চুক্তি হয়নি। এই চুক্তির ভাগ্যে কী আছে, তা আমরা জানি না। কোনো বিষয়ে মতানৈক্য থাকলে বসে আলোচনা করে তার সমাধান বের করতে হবে। সমাধানের পথে এগোতে হবে, এটাই আমাদের কথা।
প্রথম আলো : বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী ভারতীয় প্রদেশ, যেমন: পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরায় অন্য দল ক্ষমতায় আছে, বিজেপি নয়। বিজেপির তো নিজস্ব রাজনীতি আছে। সে ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়নে কোনো সমস্যা দেখা দিতে পারে কি?
সীতারাম ইয়েচুরি : দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়ন কীভাবে হবে, তা নির্ভর করবে পারস্পরিক সহযোগিতা ও বোঝাপড়ার ওপর। তবে আমরা সে পথে আছি বলেই মনে হয়। কিন্তু কিছু সমস্যাও আছে, বিশেষ করে ভারতে। বিজেপি অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রচারণা শুরু করেছিল। স্থল সীমান্ত চুক্তির মতো দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ রক্ষা হয় এমন কিছু করতে আমরা তাদের চাপ দেব। তবে অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের ব্যাপারে সরকারের অবস্থানের সঙ্গে আমরা একমত নই।
প্রথম আলো : ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ মারা পড়ছে। এই সমস্যার সমাধান কীভাবে সম্ভব?
সীতারাম ইয়েচুরি : এটা খুবই বড় সমস্যা, মানবিক সমস্যা। কারণ যা-ই হোক না কেন, প্রচুর মানুষ এমন অবৈধভাবে আসা-যাওয়া করে। দুই দেশের স্বার্থেই এটা হ্রাস করতে হবে।
প্রথম আলো : নির্বাচনের আগে ও পরে বিজেপির অবস্থানে বড় ধরনের পার্থক্য লক্ষ করেন কি?
সীতারাম ইয়েচুরি : হ্যাঁ, নির্বাচনের আগে তারা স্থল সীমান্ত চুক্তির বিরোধী ছিল, এখন তারা এর পক্ষে।
প্রথম আলো : ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও কি তেমন পরিবর্তন দেখছেন?
সীতারাম ইয়েচুরি : অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও তারা এমন করছে। যেমন তারা অনেক বিষয়েই শক্তিশালী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেগুলো কীভাবে সরকারি নীতি হিসেবে গৃহীত হবে, সেটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। আমরা সংসদে এগুলোর বিরোধিতা করছি, ফলে তাদের পক্ষে এটা করা সহজ হবে না। আমাদের দৃষ্টিতে যেটা ভারতীয় জনগণের স্বার্থবিরোধী মনে হবে, আমরা সেটার বিরোধিতা করব। ফলে বিজেপিকেও বিরোধীদের সঙ্গে বোঝাপড়ায় আসতে হবে।
প্রথম আলো : ভারতীয় রাজনীতিতে এখন বামফ্রন্টের অবস্থা কী?
সীতারাম ইয়েচুরি : আমরা সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছি পশ্চিমবঙ্গে। কেরালায়ও আমরা কিছুটা ধাক্কা খেয়েছি, তবে সেখানে আমরা তা কাটিয়ে উঠতে পারব। পশ্চিমবঙ্গে পতনের কারণ ত্রিমুখী। প্রথমত, পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের কিছু ভুল ছিল, কিছু প্রশাসনিক ভুল ছিল আর কিছু সাংগঠনিক দুর্বলতাও ছিল। আমরা সেগুলো চিহ্নিত করেছি, সংশোধনের চেষ্টাও আমরা করছি। পশ্চিমবঙ্গে আমাদের স্লোগান হচ্ছে, প্রথমত আমাদের জনপ্রিয়তা কমার কারণগুলো বন্ধ করতে হবে। জনপ্রিয়তা কমা শুরু হয় ২০০৯ সাল থেকে। সে বছরের লোকসভা ও ২০১০ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে এটা শুরু হয়। কারণ চিহ্নিত করে আমাদের জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধার করতে হবে, এরপর তা পুনর্নির্মাণ করতে হবে। সর্বশেষ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ২০০৯ সালের পর এই প্রথম আমাদের ভোট কমেনি। এমনকি লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় আমাদের ভোট কিছু বেড়েছেও। তবে সময় লাগবে। কারণ পশ্চিমবঙ্গে আমাদের নেতা-কর্মীদের ওপর ব্যাপক আক্রমণ হয়েছে। এই পাঁচ বছরে আমাদের প্রায় ৫০০ কর্মী মারা গেছে। হাজার হাজার নেতা-কর্মী বাড়িতেই থাকতে পারছে না। হাজার হাজার কর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে।
প্রথম আলো : সংসদে এখন বামদের প্রতিনিধিত্ব খুবই দুর্বল?
সীতারাম ইয়েচুরি : লোকসভায় সিপিএমের ১১ জন ও রাজ্যসভায় নয়জন সাংসদ আছে। আর দুই কক্ষেই একজন করে সিপিআইয়ের আছে দুজন সদস্য। এই হচ্ছে সংসদে বামদের প্রতিনিধিত্ব। স্বাধীনতার পর এটাই সর্বনিম্ন।
প্রথম আলো : বামপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে, তারা শুধু ভাগ হয়ে যাচ্ছে।
সীতারাম ইয়েচুরি : না, এখন ব্যাপারটা ঘুরে গেছে। আগে আমাদের বামফ্রন্টে চারটি দল ছিল, এখন আছে ছয়টি। খুব শিগগির বাম শক্তিকে আরও ঐক্যবদ্ধ দেখবেন।
প্রথম আলো : কংগ্রেসের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে কি? অন্তত সাম্প্রদায়িকতা ঠেকানোর লক্ষ্যে?
সীতারাম ইয়েচুরি : না, কংগ্রেসের সঙ্গে আমাদের নীতিগত ঐক্য হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে ইস্যুভিত্তিক ঐক্য হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যেমন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র রক্ষার দাবিতে আমরা একতাবদ্ধ হতে পারি। আবার জনগণের সুস্পষ্ট দাবিতেও আমরা একতাবদ্ধ হতে পারি, যেমন ভূমি অধিগ্রহণ আইন। এ অবস্থায় বামপন্থীদের অনেক কিছু করার আছে। ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা ও ভূমি অধিগ্রহণ বিলের ক্ষেত্রে কংগ্রেসসহ বিরোধীরা একত্র হয়েছে, এটা সরকারকে প্রতিহত করবে। এসব ছাড়া বিজেপি সংসদীয় রীতিনীতিও পায়ে মাড়াচ্ছে। তারা সংসদকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
প্রথম আলো : আপনারা তো সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেও লড়ছেন। কিন্তু ভারতে তো বর্তমানে একটি সাম্প্রদায়িক সরকার ক্ষমতায়, সে ক্ষেত্রে এই লড়াইয়ে কীভাবে সফল হবেন?
সীতারাম ইয়েচুরি : উপায় একটাই, জনগণের সমর্থন। একই সঙ্গে আমাদের দলের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে হবে। বাম দলগুলোর ঐক্যও আমরা শক্তিশালী করতে চাই। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আমরা সব বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে আহ্বান জানাব, আসুন ভারতকে এই সাম্প্রদায়িক শক্তির হাত থেকে বাঁচাই। একই সঙ্গে আমরা তাদের অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধেও কথা বলব, এই অর্থনৈতিক নীতি আমাদের জনগণের কাঁধে বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে।
প্রথম আলো : বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ভালো থাকলে কি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে?
সীতারাম ইয়েচুরি : সেটা হওয়া উচিত নয়। অন্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক যা-ই হোক না কেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উন্নয়ন হতেই হবে। আর অন্য প্রতিবেশীদের ক্ষেত্রেও আমরা মনে করি, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হওয়া উচিত। আমাদের মধ্যে বিতর্ক থাকতে পারে, সেটা আলোচনা করা যেতে পারে। আর প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে হবে, নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে।
প্রথম আলো : পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কী বলবেন?
সীতারাম ইয়েচুরি : একই কথা প্রযোজ্য। ভারতের ধারণা হচ্ছে, পাকিস্তান ভারতে সন্ত্রাসবাদ রপ্তানি করে। পাকিস্তান বলছে, তারা সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে বড় শিকারে পরিণত হয়েছে। ফলে তারা এই অভিযোগ অস্বীকার করে। কিন্তু আমাদের গোয়েন্দা তথ্যানুসারে, তারা সেটা করে যাচ্ছে। পাকিস্তানের কিছু জায়গায় এই সন্ত্রাসীদের প্রশিক্ষণ শিবির রয়েছে। আমরা চাই পাকিস্তান এটা বন্ধ করুক।
প্রথম আলো : মোদি সরকারের এক বছর পূর্ণ হলো। আপনার দৃষ্টিতে তাঁর সফলতা বা ব্যর্থতা?
সীতারাম ইয়েচুরি : গত এক বছরে জনগণের ওপর চাপ বেড়েছে। সরকার তার প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেনি। এই বিবেচনায় তারা জনগণের আস্থার বরখেলাপ করেছে, এটা প্রতারণা। তারা গত সরকারের যেসব সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিল, সেগুলোই তারা এখন বাস্তবায়ন করছে। আক্রমণটা তিন ক্ষেত্রে হচ্ছে। প্রথমত, তারা মনমোহন সিং সরকারের অর্থনৈতিক নীতি আরও কট্টরভাবে অনুসরণ করছে। এর অর্থ হচ্ছে জনগণের ওপর আরও বোঝা চাপানো। অসমতা বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, তারা আরএসএসের রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। তৃতীয়ত, তারা কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েমের পথে হাঁটছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তারা যথাযথ সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই সংসদে ৫০টি বিল পাস করেছে। এটা খুব বিপজ্জনক।
প্রথম আলো : কিন্তু গত এক বছরে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আসেনি।
সীতারাম ইয়েচুরি : এটা বলা যায় হানিমুন পিরিয়ড। কোনো সরকারের প্রথম বছরে দুর্নীতির অভিযোগ আসে না। গত কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধেও কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে সাত বছরের মাথায়।
প্রথম আলো : বাংলাদেশের বর্তমান গণতন্ত্রকে কীভাবে দেখছেন?
সীতারাম ইয়েচুরি : দেখুন, আমি এটাকে আঞ্চলিক পরিপ্রেক্ষিতে দেখি। বাংলাদেশে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে সেটা এই অঞ্চলের জন্যই ভালো। আমরা শুধু আশা করতে পারি, আপনারা এই সংগ্রামে জয়ী হবেন। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে কে শাসন করবে, সেটা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের জনগণ। সে বিষয়ে ভারতের বা সিপিএমের কিছু বলার নেই। আমরা সব রকম হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে।
প্রথম আলো : দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার নানা দেশ, যেমন মালদ্বীপ ও থাইল্যান্ডেও গণতন্ত্রের সংগ্রাম চলছে। তো এই বিষয়কে কীভাবে দেখছেন?
সীতারাম ইয়েচুরি : এই অঞ্চলে টাকা ও পেশিশক্তির বিস্তার ঘটেছে, আমরা সেটা মোকাবিলার চেষ্টা করছি। আমরা চাই বাংলাদেশে গণতন্ত্র স্থিতিশীল ও সুরক্ষিত হোক। আমি মনে করি, উপমহাদেশে মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে লড়তে পারে শুধু বামেরাই। সমস্যা কিছু আছে, কিন্তু সমস্যা ও সুযোগ হাত ধরাধরি করে আসে। চীনা এক প্রবাদ আছে এ রকম: প্রতিটি সংকটের সঙ্গে সুযোগও আসে। আমরা সেই সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি। আমরা নিজেদের আরও শক্তিশালী করতে চেষ্টা করছি।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
সীতারাম ইয়েচুরি : আপনাকেও ধন্যবাদ।

বাংলাদেশ পাকিস্তান নয় by এম জে আকবর

এই সপ্তাহান্তে আমরা একটি ভুল ধারণার অবসান ঘটাতে পারি, যে ধারণাটি ১৯৪৭ সাল থেকে উপমহাদেশের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করছে। মুসলিম লীগ-ব্রিটিশ প্রকল্পে ভারত ভাগ হওয়ার পর থেকেই এটি জারি আছে। পাকিস্তান যে মুসলিম জাতি হিসেবে গড়ে উঠছে, সেটা ভারতের জন্য সমস্যা নয়। সমস্যা হচ্ছে, পাকিস্তান অতীতেও ভারতবিরোধী সন্ত্রাসবাদে মদদ দিয়েছে, এখনো দিয়ে যাচ্ছে।
পাকিস্তানের প্রাথমিক নীতি ছিল ‘অন্য উপায়ে যুদ্ধ’, তা শিগগিরই ‘যেকোনো উপায়ে যুদ্ধের’ বৃহৎ কাঠামোয় রূপান্তরিত হয়। বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলমান। দেশটি ১৯৭১ সালের আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের অংশ ছিল। পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের সঙ্গেই ভারতের সীমান্ত বড়। লন্ডনের নিয়োজিত ব্রিটিশ আইনজীবী সিরিল র্যাডক্লিফ তাঁর অনভ্যস্ত হাতে যাচ্ছেতাইভাবে সীমানা চিহ্নিত করতে গিয়ে এই দেশভাগের ক্ষতকে আরও গভীর করে তুলেছিলেন।
এই সপ্তাহে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করবেন। এর ফলে কাশ্মীর সমস্যার সমবয়সী এক সমস্যার সমাধান হবে। অতি ব্যবহারের কারণে ‘ঐতিহাসিক’ শব্দবন্ধটি ম্যাড়মেড়ে হয়ে গেছে। তারপরও এই চুক্তির ব্যাপারে আমাদের সমীহ থাকা উচিত, এটা তার প্রাপ্য।
আমরা সফলতার ব্যাপারে হয় আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠি, না হয় নৈরাশ্যজনক হয়ে উঠি। আর খারাপ খবরে আমরা এত সম্মোহিত হয়ে যাই যে গণমাধ্যমও এতে মজে যায়। তারপরও প্রধান টেলিভিশন চ্যানেলগুলো এত দিল্লিকেন্দ্রিক যে আমরা ভুলেই যাই, ভারতে অন্যান্য প্রদেশও আছে। গণমাধ্যমে রাজধানীর পৌরসভার কোনো সমস্যা এত গুরুত্ব পায় যে বাংলার মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনাও তার তুলনায় সামান্যই গুরুত্ব পায়।
ঢাকা চুক্তির গুরুত্ব খাটো করা ঠিক হবে না। যে দেয়ালটির নির্মাণ ইট দিয়ে শুরু হয়েছিল, সেটি পাথর হয়ে কংক্রিটে রূপ নিচ্ছিল, সেটি এখন ভেঙে পড়ছে। ভারত ও বাংলাদেশ তাদের অতীতকে পেছনে ফেলে আসতে পারলে পূর্বাঞ্চল নিজেদের ভবিষ্যৎ খুঁজে নিতে পারবে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐকতানের মাধ্যমে।
অর্থনীতি রাজনীতির সীমানা ছাড়িয়ে যেতে পারে, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তা প্রমাণ করেছে। কিন্তু এটা বৈরিতা ভাঙতে পারে না। অর্থনৈতিক সফলতা সব সময়ই দ্রুতগতিতে অর্জিত হয়, আর সহযোগিতা থাকলে তা পেতেও কম মূল্য দিতে হয়।
বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সমৃদ্ধি অর্জনের পথে স্বাভাবিকভাবেই একে অপরের সঙ্গী হতে পারে। কিন্তু শুধু বিশ্বাসের মাধ্যমেই অংশীদারি অর্জন করা যায়, আর বিশ্বাস গড়ে উঠতে পারে স্রেফ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।
মোদি ২০১৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়নের পথেও এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সেটি হচ্ছে, পূর্বাঞ্চলের পুনর্জাগরণ, এই অঞ্চল সমগ্র ভারত থেকে নানা কারণে পিছিয়ে আছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, পশ্চিম বাংলায় মার্ক্সবাদীদের ৩৫ বছরের শাসন। এই মার্ক্সবাদীদের চিন্তা বন্ধ্যা ও কাঠামোবদ্ধ, ফলে তারা কিছু করতে পারেনি। আর মোদি যেমন নীরবে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বাধা টপকাচ্ছেন, তাতে তাঁর নেতৃত্বের গুণ প্রমাণিত হয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা মোদির আহ্বানে সাড়া দিচ্ছেন। তিনি বারবার বলেছেন, জনস্বার্থকে দলের রাজনীতির ওপরে স্থান দিতে হবে। সে কারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ঢাকা যাবেন। লড়াই হয়েছে নির্বাচনের সময়, কিন্তু সেটা শেষ হয়ে গেলে রাজ্য ও কেন্দ্র উভয়কেই ভারতের সেবা করতে হবে।
রাজনৈতিক দলগুলো সব হজম করে ফলতে পারে। তারা এই মানসিকতায় আটকা পড়েছে, যেমন কংগ্রেস ও বামপন্থীরা অনুর্বর ডিম ছাড়া আর কিছু পাড়তে পারে না। পররাষ্ট্রনীতি তত দূরই যেতে পারে, দেশের ভেতরের মতামত তাকে যত দূর নিয়ে যেতে পারে। ভারতীয়রা ঢাকার সঙ্গে চুক্তি করতে ইচ্ছুক, কিন্তু তারা ইসলামাবাদের ব্যাপারে খুব সতর্ক কেন?
রাষ্ট্রের মূলনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে মৌলিক ব্যবধান রয়েছে, কিন্তু জনগণের কাছে সবকিছু খোলাখুলি প্রকাশ করা হয় না বলে সেটা তাদের কাছে তেমন পরিষ্কার হয় না। শেখ হাসিনা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই করে যাচ্ছেন, এটা ভারতীয়দের মনে ছাপ ফেলেছে। তিনি বিশ্বাসভিত্তিক রাজনীতিকে ধারণ করতে পেরেছেন, সন্ত্রাসবাদী চরমপন্থীদের ওপর খড়্গহস্ত হয়েছেন।
এভাবে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি বদলে দিয়েছেন, আর সেটা উৎখাত করাও কঠিন হবে। এর বিপরীতে সন্ত্রাসবাদ ইসলামাবাদের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে, তা সেখানে যে-ই ক্ষমতায় থাকুক না কেন।
পাকিস্তান রাষ্ট্র তার জন্মের পরদিন থেকেই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাসবাদের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যাচ্ছে। পেছনে ফিরে তাকালে অবাক হতে হয়, দেশভাগজনিত মানবীয় দুর্ভোগ ও হঠাৎ জন্মের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও দেশটির নেতারা সে পথ থেকে সরে আসেননি।
ক্ষমতায় আসার কয়েক দিন পরেই জিন্নাহ ও লিয়াকত আলী খান রাজাশাসিত জম্মু ও কাশ্মীর অবৈধভাবে দখলের ষড়যন্ত্র করেন। সেই অভিযান শুরু হয় ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে, এখনো তা শেষ হয়নি। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান রাহিল শরিফ যখন বলেন, কাশ্মীর দেশভাগের এক অসমাপ্ত এজেন্ডা, তখন তিনি সেটা আরও নিশ্চিতই করেন। পাকিস্তান যদি জম্মু ও কাশ্মীরের সমস্যা মেটাতে যুদ্ধের পথ বেছে না নিত, তাহলে এই সমস্যার সমাধান আলোচনার টেবিলেই হতো। তারা ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারত বা পাকিস্তান কোনো রাষ্ট্রেই যোগ দেয়নি, আর যেহেতু ব্রিটিশ সংসদের আইনে ভারত স্বাধীনতা পেয়েছিল, সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই সমস্যার সমাধান আলোচনার টেবিলেই হওয়া সম্ভব ছিল। পাকিস্তান এভাবে বহু বছরের জন্য শান্তির সম্ভাবনা নস্যাৎ করে দিয়েছিল।
বাংলাদেশ যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করেছে। এটা পাকিস্তান থেকে স্রেফ ভৌগোলিক বিচ্ছেদ ছিল না, এটা আদর্শিক পরিবর্তনও ছিল বটে। এর ফলে বাংলাদেশ বিভিন্ন মানদণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে তার জাতীয় স্বার্থ অর্জনের লক্ষ্যে এগোতে সক্ষম হয়। ভারতের সঙ্গে তাদের ভিন্নতা আছে। তবে হিন্দু ও মুসলমানরা পরস্পর অনিঃশেষ যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে—দেশ দুটির মধ্যকার ভিন্নতা এই পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে নেই।
সবকিছু ঠিকমতো চললে ভারত ও বাংলাদেশ একসঙ্গে হাঁটবে এবং কাজ করবে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; টাইমস অব ইন্ডিয়া থেকে নেওয়া।
এম জে আকবর: ভারতীয় সাংবাদিক ও বিজেপির মুখপাত্র।

মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী by আন্দালিব রাশদী

মন্ত্রী হতে চাওয়া কি কোনো দোষের ব্যাপার?
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সেজে সরকারের সচিব হতে চাওয়া দোষের নয়, ছাত্রনেতাদের ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হতে চাওয়া দোষের নয়, রিকশার মালিকানা ছাড়াই মালিক সমিতির সভাপতি হওয়া দোষের নয়, আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার সম্পাদক হতে চাওয়া দোষের নয়, টাকার জোরে কদাকার চেহারা নিয়ে সিনেমার নায়ক হতে চাওয়া দোষের নয়। তাহলে জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়ার পরও মন্ত্রী হতে চাওয়া দোষের কেন হবে?
কিন্তু যখনই মুখ খুলে বললাম, মন্ত্রী হতে চাই; তিনি আঁতকে উঠলেন।
আমি মোটেই ভয়ংকর কিছু বলিনি। আমাদের পার্টির এক নম্বর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ছানাউল্লাহ তরফদার ফিসফিস করে বললেন, আরে মিয়া আস্তে কথা বলো। দেয়ালেরও কান আছে। অন্য কেউ শুনলে একান-ওকান ঘুরে কথাটা লিডারের কানে চলে যাবে।
আমি বললাম, সে জন্যই তো বললাম। তিনি শুনলেই না আমাকে মন্ত্রী করার ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে শুরু করবেন।
তোমার কথা ঠিকই। কিন্তু অভিজ্ঞতারও তো কিছু দাম আছে, তাই না? তা হলে শোনো, পঁচিশ বছর আগে আমিও মন্ত্রী হতে চেয়েছিলাম। লিডার তাড়াহুড়া করে আমাকেই প্রেসিডিয়াম মেম্বার বানালেন। এখন তো পা একটা কবরে। তবু আশায় আছি দেশের প্রেসিডেন্টের পদটা যদি কোনো দিন খালি হয়, বয়সের কারণে লিডার যদি আমাকে যথেষ্ট বৃদ্ধ এবং এত দিন পার্টির সঙ্গে লেগে থাকার পুরস্কারস্বরূপ অনুগত মনে করেন, হয়তো এক নম্বর পদে বসিয়েও দিতে পারেন, কিন্তু মুখ খুলে কাউকে বলি না। এই যে মুখ না খুলে থাকা, অপেক্ষা করা—এটাই আনুগত্য।
আবার এটাই যে একমাত্র ফর্মুলা, তা-ও নয়। আমাদের সবচেয়ে ত্যাগী বুড়ো ভাই মাহমুদ উল্লাহ একানব্বই বছর আশায় আশায় থেকে বিরানব্বইতম জন্মদিনে নিজের হাতে কেক কাটলেন, নিজের হাতে আমার মুখেও এক টুকরা তুলে দিলেন। মাঝরাতে সেই যে ঘুমোতে গেলেন, আর উঠলেন না। তাতে আমার সুবিধে হলো, দুই নম্বর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট থেকে এক নম্বরে প্রমোশন পেলাম। আমার একাশি চলছে, বুড়ো ভাইয়ের মতো আয়ু তো আর পাব না। বুঝলে আবদুজ জাহের, অপেক্ষা করো। সবুর করো। গৌতম বুদ্ধও অপেক্ষা করতে বলে গেছেন। তিনি বলেছেন, ওয়েট, থিঙ্ক, ফাস্ট। অপেক্ষা করো, চিন্তা করো, উপবাস করো।
পার্টির মহাসচিবকে বললাম, বদি ভাই, গরিবের কথাটা একটু মনে রাখবেন। প্রথমবার বাপ-দাদার জমিজমা বেঁচে এমপি হলাম, কিছুই তো দিলেন না।
আমি দেওয়ার কে? দেয় তো জনগণ। তোমাকেও দিয়েছে—এমপি খেতাব। তোমাকে দিয়েছে জনগণের খেদমত করার সুবর্ণ সুযোগ। এই খেতাবটার জোরে যদি কিছু করতে না পারো, আমার কী করার আছে।
বদি ভাই, টানা পাঁচ বছর বসে বসে বুড়ো আঙুল চুষলাম। এলাকার জনগণকে তো আর মুখ দেখাতে পারি না। এবার যে আর মন মানছে না। শুনছি, শিগগিরই নাকি মিনিস্ট্রি রিশাফলিং হচ্ছে।
মহাসচিব বদিউল আলম খান মিন্টো রোডের লাল বাড়ির দেয়ালে ঝিম মেরে আঁকড়ে থাকা পেটে ডিমওয়ালা টিকটিকির দিকে চোখ রেখে আমাকে বললেন, আবদুজ জাহের, এটা তো তোমার সেকেন্ড টার্ম, নাকি ভুল বললাম?
বদি ভাই, আপনি পার্টির মহাসচিব। সেক্রেটারি জেনারেল। পার্টির দুজন মহাসচিব দেশের প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত হয়েছেন। সেই মহাসচিব ভুল করতে পারেন?
এটা ঠিক বলোনি আবদুজ জাহের। ম্যান ইজ মর্টাল। মানুষ মাত্রই ভুল করে।
বদি ভাই, পার্টির মহাসচিবের পাশাপাশি আপনি আমাদের সিনিয়র মন্ত্রীও। আপনি তো তবু কিছু পেয়েছেন। স্বাধীনতার পর আপনার পার্টি থেকে আমিই আমাদের নির্বাচনী এলাকার প্রথম এমপি। প্রথমবার তো ওদের দলের শক্তিশালী প্রতিমন্ত্রী কাউসার আহমেদকে হারিয়েছি। আপনিই বলুন, আমি কি এখনো যোগ্য হয়ে উঠিনি?
অবশ্যই তুমি যোগ্য। তবে এটাও মনে রেখো, আমাদের পার্টিতে পরপর নয়বার এমপি হয়েছেন, এমন একজন; পরপর আটবার হয়েছেন, এমন চারজন; পরপর সাতবার, এমন নয়জন এমপিকে মন্ত্রী করা হয়নি। পঁয়তাল্লিশ বছর বুড়ো আঙুল চুষলে সে আঙুলের আর থাকে কী—তুমিই বলো। তোমার তো কেবল পাঁচ বছর গিয়ে ছয়ে পড়ল। আসলে কে বুড়ো আঙুল চুষবেন আর কে মন্ত্রী হবেন, এটা লিডার নিজেই ঠিক করে থাকেন। লিডার যা করেন, ঠিকই করেন। আমরা হাততালি দিয়ে সব সময়ই তাঁকে সমর্থন জানাই। এটাই গণতন্ত্র। হাততালি কম দিলেই গণতন্ত্রের দুশমন। আমাদের দলে এক লক্ষ তালি গণনাকারী রয়েছে, ভুলো না।
নয় বছর আগে পার্লামেন্টারি পার্টির একটা বিদেশ সফরে আমরা একসঙ্গে ছিলাম উড়োজাহাজের সব যাত্রী, যার যার আসনে বসে বেল্ট বেঁধে ফেলেছে। এর মধ্যে নুরুল্লাহ ভাইয়ের নাম মাইকে ঘোষণা করা হলো। কে শোনে কার ডাক। আমি বললাম, এয়ারপোর্টের সব বাথরুমের দরজায় গিয়ে নাম ধরে চেঁচালে যদি না ঘুমিয়ে থাকেন, বের হবেন। গ্রাউন্ড স্টাফ কোনোভাবে তাঁকে টেনে বের করলে তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, বাথরুম থেকে মানুষ টেনে বের করা—এটা কোন ভদ্রতা। পাজামার ফিতে বাঁধতে বাঁধতে যখন তিনি উড়োজাহাজে ঢুকলেন, যাত্রীরা সবাই ঘাড় উঁচিয়ে তাঁকে দেখতে থাকল। ফিতের গিঁট ঠিক হয়নি, আচমকা পাজামাটা খুলে যায়।
বলেন বদি ভাই, লিডার কি আর এমন লোককে মন্ত্রী বানাবেন?
মহাসচিব বললেন, মন্ত্রিসভার বৈচিত্র্যের জন্য এমন দু-একজন থাকা দোষের কিছু নয়। ঠিকই বলেছেন, মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে একবার পাশাপাশি তিন মন্ত্রী ঘুমাচ্ছিলেন। লিডার নাকি বলেছেন, তাঁদের ডিস্টার্ব করার দরকার নেই। স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ার কারণে তিনজনের কেউই বাসায় ঘুমোতে পারছেন না। মিটিংটাই নিরাপদ। দর্শনার্থীরও ভিড় থাকে না। মহাসচিব বললেন, আমাদের এত সব গোপন কথা তোমাদের কাছে কে ফাঁস করে? যাকগে, তোমার কথা আমার মনে থাকবে। প্রথম দফায় যখন বাদ পড়েছ, ওয়েট করো। যাঁরা লিডারের সঙ্গে চব্বিশ ঘণ্টা থাকেন, তাঁদেরও দু-একজনকে ধরো। কার কথায় কাজ হয় বলা যায় না। কাছের একজনই তো মন্ত্রিসভার নাম ঘোষণার আগে আমাকে চামড়া-ছিলা করে পঁচিশ লাখ টাকা নিয়ে নিলেন। বললেন, মন্ত্রী হওয়া নিশ্চিত, কোন মন্ত্রণালয় চান, মুখ খুলে বলুন। কিন্তু পুরো টাকাটাই গচ্চা গেল। মহাসচিব বললেন, তখনই তো তোমার বোঝা উচিত ছিল হবে না। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নমিনেশনে দলের সাপোর্ট দিতে এরা যেখানে চল্লিশ-পঞ্চাশ লাখ আদায় করে, মন্ত্রীর জন্য মাত্র পঁচিশ লাখ! তোমার মন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা নেই। কী বলেন বদি ভাই, আমার না হয় ম্যানপাওয়ারের ব্যবসা আছে, ইমপোর্ট আছে—দু-এক কোটিতে আমার তেমন ক্ষতি হবে না। কিন্তু পার্টির পুরোনো ত্যাগী নেতারা কী করবেন? তাঁরা টাকা পাবেন কোথায়?
মহাসচিব বললেন, আহাম্মক কোথাকার। পার্টিতে পুরোনো ত্যাগী নেতাদের কেউ আছেন নাকি? তোমাদের কনুইয়ের ধাক্কায় সেই কবে তাঁরা ছিটকে পড়েছেন, তাঁদের আর খবর আছে নাকি?
আমি দম নিয়ে বললাম, বদি ভাই, ইয়াং জেনারেশনকে টেনে তুলবেন না? আমাদের টানা আটবারের এমপি আবুল কালাম মুহাম্মদ নুরুল্লাহ—বয়সের ভারে এখন আর দিন-রাতের দিশা পান না, কোথায় আছেন তা-ও বোঝেন না। কদিন আগে এমপি হোস্টেলে তাঁর ঘরের অ্যাটাচড বাথরুমের কমোডে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। দরজায় হাতুড়িপেটা করার পরও সেই ঘুম ভাঙেনি। মরেই গেছেন ধরে নিয়ে পাশের রুমের এমপি হিসেবে আমাকে দরজা ভাঙার হুকুম দিতে হয়। কেয়ারটেকার দরজা ভাঙে। হঠাৎ চোখ খুলে তিনি বললেন, কী হইছে মিয়া? বাথরুমে ঢুকছ ক্যান? লজ্জাশরম দুনিয়া থাইক্যা উইঠা গেছে নাকি? তোমরা শান্তিতে হাগামুতা করতেও দিবা না?
মহাসচিব বললেন, নুরুল্লাহ ভাই আমারও মুরুব্বি। তিনিও ভুল বলেননি। ঘুম ভাঙলে নিজেই কমোড থেকে উঠে আসতেন। তোমাদের এত তাড়াহুড়া করার দরকার ছিল না। বাথরুম থেকে বেরোনোর একটাই তো দরজা। দিশা হারানোর সুযোগ কোথায়?
কিসের দিশা, বদি ভাই?
নুরুল্লাহ ভাই যতই ঘুমান, তাঁর দিশা ঠিকই আছে। মাটি কামড়ে পড়ে আছেন। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করা গুণবান পুত্র থাকার পরও রাজনীতির জোয়ালটা নিজের কাঁধ থেকে নামাচ্ছেন না। লিডার তাঁকে বলেছেনও, ছেলেকে পলিটিকসে নিয়ে আসেন, আমাদের ব্লেসিংস থাকবে। কিন্তু তিনি জানেন, ছেলে মন্ত্রী হওয়া আর নিজে মন্ত্রী হওয়ার মধ্যে কী দুস্তর ফারাক। বদি ভাই, আমার যে অত ধৈর্য নেই। সে জন্যই তো ডিসকোয়ালিফায়েড হয়ে যাচ্ছ। আপনি যদি আশ্বাস দেন, রিশাফলিংয়ের সময় আমার কথা মনে রাখবেন, তাহলে ধৈর্যচ্যুতি ঘটাব না। তিনি বললেন, আশ্বাস দিতে পারব না, সে ক্ষমতাও তো নেই। জনগণকে পাশে রাখবে। আর বেফাঁস কিছু বলবে না।
বদি ভাই, আর কিছু?
মহাসম্মেলনে পারফরম্যান্স দেখাও।
আমি তো আর ডায়াসে জায়গা পাব না। বক্তৃতা দেওয়ার জন্যও আমাকে ডাকবেন না। পারফরম্যান্স দেখাব কোথায়?
আমি বেরিয়ে আসি।
আমাদের দলের একটা বিশেষ বাড়ি আছে, সেখানে লিডারের দু-একজন আপনজন বসেন। মন্ত্রী কে হবেন না হবেন, এ নিয়ে তাঁরাও ভূমিকা রাখেন। তাঁদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ক্ষীণ। ক্ষীণ হওয়ার কারণও আছে। কেবল এমপি আর মন্ত্রীর মধ্যে ফারাকটা দুস্তর। এমপি নেন আর মন্ত্রী দেন। ঘূর্ণিদুর্গতদের জন্য টিন চাই, বানভাসা মানুষের জন্য চাল চাই, গম চাই, মসজিদ, মন্দির, গোরস্থান, রাস্তা, কালভার্ট, স্কুল—এসবের জন্য বরাদ্দ চাই। দলের ছেলেদের এটা-ওটা খাওয়ানোর জন্য চাই, খুনের মামলার আসামিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার স্বীকার বলে তার মুক্তি চাই, ওসি কথা শোনে না বদলি চাই, নদী ভাঙছে তাই বালুর বস্তা আর সিমেন্টের ব্লক চাই, নামগোত্রহীন স্কুলে এমপিও চাই...শুধুই চাই—এ নিয়ে মন্ত্রীদের সঙ্গে দেনদরবার। আমি আর নিতে চাই না, দিতে চাই। আমাদের অভিভাবক হচ্ছেন চিফ হুইপ। বছর দুয়েক আগে আমাদের একজন মাঝবয়সী সদস্যের কক্ষে একজন যৌনকর্মী আবিষ্কৃত হয়েছে বলে বিরোধীদলীয় একটি পত্রিকা দাবি করলে তিনি সেই পত্রিকার সাংবাদিককে বললেন: তোমাদেরটা কোনো নিউজই হয়নি। কম বয়সীদের জন্য তো গার্লফ্রেন্ডরাই আছে, বুড়োদের আছে কম বয়সের অ্যাডভেঞ্চারের স্মৃতি। স্ত্রীর অত্যাচারে মাঝবয়সীদের যে দুঃসহ জীবন, তাদের ঘরেই তো যৌনকর্মী না কী যেন বলো, ওদেরই ঢোকার কথা। নিউজ করার আগে আমাদের প্রয়োজনের দিকটাও মাথায় রেখো। তরুণ কারও রুমে পাওয়া গেলে লিখতে পারতে—ব্যাটা এমনই অপদার্থ একটা গার্লফ্রেন্ডই বাগাতে পারল না, কনস্টিটিউয়েন্সি ম্যানেজ করবে কেমন করে। বুড়ো কারও রুমে পাওয়া গেলে লিখতে পারবে, নিশ্চয়ই তার প্রোস্টেট গ্ল্যান্ড বড় হয়ে গেছে। তা ছাড়া তোমাদের কি ধারণা, যৌনকর্মীর ভোটের দাম অন্য কারও ভোটের চেয়ে কম?
আমাদের সেই চিফ হুইপ ডাক্তার সাদাত আলীর সঙ্গে দেখা করে নিজের কষ্টের কথা বললাম। আমার যোগ্যতা নিয়ে তাঁর মনে কোনো প্রশ্ন আছে কি না, জিজ্ঞেস করলাম।
উল্টো জিজ্ঞেস করলেন, আবদুজ জাহের, আমার যোগ্যতা নিয়ে তোমার মনে কোনো প্রশ্ন আছে?
আমি বললাম, আপনার মতো চিফ হুইপ বাংলাদেশ আগে কখনো পায়নি। তিনি বললেন, ধ্যাৎ, আমি কি তা-ই জানতে চেয়েছি? আমার কি মন্ত্রী হওয়ার কোনো যোগ্যতা নেই? তোমরা না হয় আমাকে মানো, কিন্তু আমার নির্বাচনী এলাকার লোকজন, আমার পার্টির লোকজন, থানার ওসি, সেকেন্ড অফিসার, ইউএনও, ম্যাজিস্ট্রেট কি এসব বোঝে?
আমার মন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নের কথা তাঁকে বলা হলো না; বরং তাঁর মন্ত্রী না হওয়ার দুঃখের কথাই শুনলাম। বেরোতে বেরোতে বললাম, ডাক্তার ভাই, দোয়া করবেন। আপনার দোয়া নিতে এসেছিলাম। তিনি বললেন, আরে দাঁড়াও, দাঁড়াও এক মিনিট। দোয়া চাইছ কেন? বাতাস-টাতাস পেয়েছ নাকি?
কিসের বাতাস?
আমাদের মাহতাব সকালেই না দোয়া নিয়ে গেল। বলল, বাতাস পেয়েছে। শপথের জন্য তৈরি হতে বলেছে। আমি বলি, সেকি! আপনি সেদিনই না এত বড় একটা স্ক্যান্ডাল থেকে মাহতাবকে রক্ষা করলেন। তার রুম থেকে নাকি মেয়েছেলে বের হয়েছে। ঠিক করে বলো আবদুজ জাহের, বলো যৌনকর্মী। মাহতাব বলেছে, এই ঘটনাই তাকে লাইমলাইটে নিয়ে এসেছে। এখন সবার মুখে তার নাম। তোমার-আমার নাম কজন জানে? একটা কিছু করে তোমাকে লাইমলাইটে আসতে হবে। আমার বয়স ভাটির দিকে, তোমার তো সবে শুরু। সময় আছে, পারবে। তাহলে আসি। দাঁড়াও। দেখি, তোমার চোখ এত হলদে কেন? জন্ডিস? সোজা কোনো প্যাথোলজিক্যাল ক্লিনিকে চলে যাও। সিরাম বিলিরুবিনটা করিয়ে নিয়ে এসো। জন্ডিস ইজ আ ডেঞ্জারাস ডিজিজ। পলিটিশিয়ানদেরই বেশি জন্ডিস হয়। আমি আবার চিফ হুইপের রুমে ঢুকে অ্যাটাচড বাথরুমের দরজা খুলি। সুইচ টিপতেই ভেতরটা এমনই আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠে যে আমার চোখ বলতে গেলে ঝলসে যায়। আমি রঙের ভেদজ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আয়নাটা ঝাপসা মনে হয়। পকেটের রুমাল বের করে আয়না মুছি। চোখ বড় করে আয়নার দিকে তাকাই। আমার চোখ হলদে নয়, লাল। বিনা শুল্কে আনা লেক্সাসে চেপে শেরেবাংলা নগরের দিকে রওনা হই। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর কাছে এসে হাতের ডানে অসাধারণ স্থাপত্যের পার্লামেন্ট ভবনটা চোখে পড়ে।
পার্লামেন্ট নিয়ে মহামতি লেনিন কী রকম জঘন্য একটা কথা বলেছেন। কথাটা না-ই বললাম।
আমি মাননীয় স্পিকারের সাক্ষাৎ প্রার্থনা করি। তিনি ব্যস্ত। আমি বললাম, স্যার, আপনি নিরপেক্ষ স্পিকার হলেও আমাদের দলের অন্যতম কান্ডারি। এত ত্যাগের পরও আমাকে মন্ত্রী করা হয়নি, এ নিয়ে আমার দুঃখ নেই। কিন্তু সামনের রিশাফলিংয়েও যদি আমার নামটা না আসে, এলাকায় মুখ দেখাতে পারব না।
তিনি বললেন, কে শপথ নেবে আর কে হাততালি দেবে, তা আমি ঠিক করি?
তবু স্যার, আপনি লিডারের সবচেয়ে কাছের মানুষ, বিপদে-আপদে আপনাকেই তো সবার আগে ডাকেন। লিডারের পরই তো আপনি।
তিনি বললেন, লিডার আমাকে ডাকুন বা না-ই ডাকুন, তুমি যখন আমাকে তাঁর কাছের মানুষ মনে করো, এটাই আমার জন্য অনেক। লিডারের পর আমি—সেটা তো ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে; তুমিই বলো, বাদশা বাবরের পর কে? তাঁর পুত্র বাদশাহ হুমায়ুন। লিডারের পর লিডারের ছেলে, তারপর...তারপর...। আর এর সঙ্গে গণতন্ত্রের কোনো বিরোধ নেই। লিডারের ইচ্ছে ব্যক্ত হওয়ার আগেই আমরা দুই হাত তুলে সমর্থন জানাই—একেবারে নিরঙ্কুশ সমর্থন।
তাহলে থাক স্যার, মন্ত্রী যখন বানাবেনই না, ফিরে যাই।
তিনি বললেন, থাকবে কেন, চেষ্টা চালিয়ে যাও। চেষ্টায় কী না হয়। তোমার বয়স কম, চেষ্টাই যদি করতে হয়, প্রতিমন্ত্রী হতে চেষ্টা করো। তাহলে তোমার মন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন একদিন হয়তো সফল হবে। দু-একটা রিশাফলিংয়ের পরই তোমাকে ফুল মিনিস্টার বানিয়ে দেবেন। আর যদি মিনিস্টার হওয়ার পর স্বপ্নটা ছেঁটে না ফেলো, আরও বড় কিছু হতে চাও, যেদিন লিডার টের পাবেন, সেদিনই তোমাকে ছেঁটে ফেলবেন।
আমি আমার স্বপ্ন এক ধাপ নামিয়ে প্রতিমন্ত্রীতে নিয়ে এলাম। চেষ্টা চালিয়ে যাব। এরপর পলিটিক্যাল সেক্রেটারিকে প্রতিমন্ত্রী হওয়ার বাসনার কথা বলতে যাব। দ্রুত লুই আই কানের এই মায়াবী দালান থেকে বেরোনোর সিঁড়ি খুঁজছি। এই দালানে যাঁরা একবার ঢোকেন, তাঁরা জানেন, লিফট বন্ধ থাকলে বেরোনোর সিঁড়ি খুঁজে পাওয়া কতটা দুরূহ ব্যাপার।

বার কাউন্সিলের সংস্কার দরকার by মিজানুর রহমান খান

বার ও বেঞ্চকে তুলনা করা হয় রথের সঙ্গে। রথ চলে দুই চাকায় ভর করে। যেকোনো একটি চাকা না চললে রথ চলতে পারে না। একে এক নদীর দুই তীরের সঙ্গেও তুলনা করা হয়, এক তীর না থাকলে ‘বিচারের স্রোত’ বইতে পারে না। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা আইনজীবীদের অদক্ষতার কারণে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মামলায় বিচারপ্রার্থীদের হার ঘটে বলে মন্তব্য করেছেন। প্রায় একই সময়ে আমাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বার কাউন্সিলের ৪৮ হাজার ৪৬৫ জনের ভোটার তালিকায় গুরুতর অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে বিচারক নিয়োগে নীতিমালা প্রণয়নের দাবি তুলেছে। শাহদীন মালিক প্রধান বিচারপতির মন্তব্যকে সমর্থন করে প্রথম আলোয় একটি নিবন্ধ লিখেছেন, যেখানে তিনি আইন শিক্ষার উন্নতি ও বার কাউন্সিলে বর্তমান ১০০ নম্বরের পরীক্ষা দশ গুণ বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন। সামগ্রিক বিচারে বিচার বিভাগে যে বড় ধরনের সংস্কার দরকার, সে বিষয়ে আর সংশয় থাকে না।
আজ যিনি আইনজীবী, কাল তিনিই বিচারপতি। হাইকোর্টের বিচারক হতে সংবিধানে বলা আছে ‘অন্যূন দশ বৎসরকাল অ্যাডভোকেট’ বা একই সময় কোনো ‘বিচার বিভাগীয় পদে অধিষ্ঠান’ থাকলেই চলবে। যেহেতু ৯০ শতাংশের বেশি হাইকোর্টের বিচারক আইনজীবী কোটা থেকে আসেন, তাই বার কাউন্সিলের কার্যক্রমে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত থাকা দরকার। বার কাউন্সিলের আচরণবিধি বলছে, আইনজীবী পেশা ‘মানি মেকিং ট্রেড’ নয়। দক্ষতার ভিত্তিতে উপযুক্ত ফি নিতে হবে। মক্কেল ধনী হলেও বেশি টাকা নেওয়া বারণ। আইনজীবীর বিরুদ্ধে মামলা চলে বার কাউন্সিলের সদস্য চালিত ট্রাইব্যুনালে। অধিকাংশ মামলাই এখানে খারিজ হয়, ভুক্তভোগীরা বিচার পান না।
গত ৯ এপ্রিল প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকার ভিত্তিতে বৈধ প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করা হয়। এরপর সর্বসম্মতভাবে ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অথচ সরল প্রশ্ন, ভোটার তালিকা অবৈধ হলে প্রার্থীর তালিকা কী করে বৈধ হয়? এক আইনজীবী দেশের যেকোনো জেলায় ওকালতি করতে পারেন। সে জন্য কেউ চাইলে ৮১টি বারের সবটিরই সদস্য হতে পারেন। কিন্তু যখন কেন্দ্রীয় বার কাউন্সিল নির্বাচন হবে, তখন এক বার-এক ভোট হবে। কিন্তু তা হয়নি। এক ব্যক্তির নাম অন্তত দুটি বা তিনটি বার থেকে ছাপা হয়েছে। তাই বর্তমান নির্বাহী কমিটির আওয়ামী লীগ–সমর্থিত পাঁচ সদস্য যথার্থই ভোটার তালিকার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন । কিন্তু এই ত্রুটির প্রকৃতি টেকনিক্যাল। এর বাইরে এনরোলড আইনজীবীদের মূল তালিকার শুদ্ধতা ও বৈধতা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তুলতে চাই। কারণ, সাড়ে ৪৮ হাজার ভোটারের মধ্যে কেবল দ্বৈত ভোটারের মামুলি সমস্যার চেয়ে বড় সমস্যা হলো এখানে বিপুলসংখ্যক ‘নন–প্র্যাকটিসিং’ সদস্য রয়েছেন। গত চার দশকে কখনো এ প্রশ্ন তোলা হয়নি। এ প্রশ্নের সুরাহা ছাড়া গঠিত কোনো বার কাউন্সিল সংবিধানসম্মত বলে দাবি করতে পারে না। এনরোলমেন্ট বা সদস্যভুক্তির সময় একজন আইনজীবী হলফ করে বলেন, আমি অন্য কোনো পেশায় নেই। কিন্তু পরে অনেকেই পেশা বদলান, অনেকেই নিয়মিত প্র্যাকটিসে থাকেন না।
বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে কয়েক বছর সক্রিয় থাকা এক আইনজীবীর কাছে জানতে চাইলাম, ‘নন–প্র্যাকটিসিং লইয়ার্স লিস্ট’ তৈরি হয় কি? তিনি বললেন, না। তাদের সংখ্যা কত হতে পারে? তিনি একবাক্যে বললেন, কমপক্ষে ১০ হাজার। বিএনপি আমলের এক সাবেক মন্ত্রী বলেন, এটা ১৮ হাজারের কম নয়। এখন ভোটার তালিকার ত্রুটিজনিত যে প্রশ্ন উঠেছে, সেখানে হয়তো বেশি হলে তিন হাজার নাম একাধিকবার ছাপা হওয়ার প্রশ্ন জড়িত। ২৪ মে আপিল বিভাগের শুনানিকালে প্রায় ১ হাজার ৬০০ নাম বাদ পড়া নতুন মুদ্রিত ভোটার তালিকা বার কাউন্সিল জমা দিয়েছে।
আমরা মনে রাখব, নন–প্র্যাকটিসিং আইনজীবী, যাঁদের সংখ্যা বহুগুণ বেশি বলেই অনুমেয়, তদন্ত করে তাঁদের নাম বার কাউন্সিলের খাতা থেকেই খারিজ করা দরকার, সে বিষয়ে কোনো দাবি তোলা হয়নি। বিএনপি নীরব। আওয়ামী লীগ নীরব। উভয়কে এই নীরবতা ভাঙতে আবেদন জানাই। নীরবতা ভেঙে তাদের করণীয় কী, সে জন্য তাদের চিন্তার খোরাক দিচ্ছি।
২০০৩ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বার ‘এক বার-এক ভোট’ বিধান চালু করে। ২০০৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এলাহাবাদ হাইকোর্টের একটি রায়ে লেখা দেখি: ২০০৩ সালের ১০ নভেম্বর হিন্দুস্তান টাইমস লিখেছে: এটা একটা প্রহসন। গণতান্ত্রিক নির্বাচনের নামে একটি প্যারোডি ঘটছে, যেখানে বাইরে থেকে আইনজীবী নামধারীদের পাচার করে আনা হয়, মন্তব্য করেছেন একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, যিনি হাইকোর্ট বার সমিতির নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হতে রাজি হননি। বার সমিতির নির্বাচন টাকা বানানোর (এতে ১ কোটি রুপি খরচ হয়) খেলায় পরিণত হয়েছে। তারা তাই যত খুশি তত সংখ্যায় বারের সদস্য বানায়। এক দিনের জন্য এরা ভোট দিয়ে বাতাসে মিলিয়ে যায়। বার সমিতি ‘মানিব্যাগ দ্বারা ছিনতাইয়ের শিকার’। প্র্যাকটিসিং আইনজীবীরা রিট করে বলেছেন, ‘নন–রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেটরা’ কেবল ভোটের বাজারের ফড়িয়া হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন। বার নির্বাচন তার প্রতিনিধিত্বশীল বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে।
কর্মরত আইনজীবীদের সঙ্গে পেশা ত্যাগী বা ঘুমন্তদের একটা পার্থক্য টানা নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন সুপ্রিম কোর্ট বারের কক্ষ (কিউবিকেলস) বরাদ্দ নিয়ে অনেক সক্রিয় জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর দুঃখ–কষ্ট দীর্ঘদিনের। অনেক ব্যস্ততম সদস্য কক্ষ পান না। এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট ১৮৬০ সালের সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের আওতায় একজন সহকারী রেজিস্ট্রারকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তদন্ত কমিটি গুরুতর অনিয়ম দেখতে পায় এবং এর প্রতিকারের জন্য যে সুপারিশ করেছে, তা আমাদের দেশেও অনুসরণ করা চলে। এটা সম্ভব হলে কেবল ঢাকাভিত্তিক কেন্দ্রীয় বার কাউন্সিল নির্বাচনই নয়, দেশের ৮১টি বারের নির্বাচনই স্বচ্ছ ও প্রতিনিধিত্বশীল হবে। নির্বাচিত হওয়ার পরে ভুয়া সনদের অভিযোগে কারও কারও সদস্যপদ খারিজের ঘটনাও ঘটেছে।
তাই ওই তদন্ত কমিটির সুপারিশের আলোকে বলব, প্রতিবছর তালিকা হালনাগাদ হতেই হবে। এটা প্রকাশের আগে প্রতিবছর জুলাই মাসে নির্ধারিত ফরম পূরণ করে আইনজীবীরা তাঁদের পেশায় সক্রিয় থাকার জানান দেবেন। তালিকায় আইনজীবীর ছবিও মুদ্রিত হবে, যা বার কাউন্সিলের সচিব সত্যায়িত করবেন। আমাদের ইতিহাসে এই প্রথম একজন কর্মরত জেলা ও দায়রা জজকে প্রেষণে বার কাউন্সিলের সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং তাঁকে এ দায়িত্ব দিতে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়।
এলাহাবাদের রায়টি পড়ে আরও একটি ধাঁধা পরিষ্কার হলো। কে সক্রিয় আইনজীবী আর কে ঘুমন্ত আইনজীবী, তা নিরূপণের মানদণ্ড কী হবে। তালিকাভুক্তরা না হয় প্রতিবছর ঘোষণা দিলেন, চাঁদাও শোধ করলেন, কিন্তু কারা নন–প্র্যাকটিসিং আর কারা প্র্যাকটিসিং তা কী করে বুঝব। ওই তদন্ত কমিটি তারও একটি উপায় বাতলেছে এবং আশা করছি আমাদের বিজ্ঞ আইনজীবীদের যাঁরা স্বচ্ছতার দাবি তুলেছেন, তাঁরা তা বিবেচনায় নেবেন। আর সেটা হলো: আইনজীবীরা তাঁদের পেশাগত বার্ষিক ঘোষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বছরে তাঁদের দ্বারা ওকালতনামা স্বাক্ষরিত মামলাগুলোর একটি তালিকা দেবেন। এরপর বার কাউন্সিল এই তথ্য হাইকোর্টের রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে যাচাই করে নেবেন। আইনজীবী তাঁর মাসিক সদস্য চাঁদা তাঁর ব্যাংক হিসাবের অনুকূলে চেকে পরিশোধ করবেন। আয়কর রিটার্ন জমা দেবেন। এসব শর্ত পূরণ করে যাঁরা বার্ষিক বিবৃতি দিতে ব্যর্থ হবেন, তাঁদের সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। ইংল্যান্ডে ব্যারিস্টাররা প্রতি ঘণ্টার প্র্যাকটিসের রেকর্ড সংরক্ষণ করেন। নবাগতদের জন্য প্রথম তিন বছরে ৪৫ সিপিডি (কন্টিনিউইং প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট) ঘণ্টার প্রাকটিস বাধ্যতামূলক। আর আমাদের দেশে অনেকে হাইকোর্ট বারে এনরোলড হয়ে রাঙামাটি কি পাথরঘাটায় গিয়ে প্র্যাকটিস করেন। তাঁদের নাম ফলকে ‘আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট’ দেখে মানুষ বিভ্রান্ত হন।
এলাহাবাদ হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ তাঁর পর্যবেক্ষণে আরও বলেন, বার কাউন্সিলে এনরোলড আছেন, কিন্তু আইন পেশায় নেই। কিংবা যিনি নিয়মিত প্র্যাকটিসে নেই, তাহলেও কি আদালতে তাঁর প্রবেশাধিকার থাকবে? না থাকবে না। কারণ, এনরোলড আইনজীবী মানে হলো তিনি দায়িত্ব পালনে যোগ্য, ব্যস এটুকুই। তাই এনরোলড হওয়া মানেই কোনো আদালতে তাঁর প্রবেশ অবাধ নয়।
২০০৫ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট নতুন বিধি করেছেন, যাঁরা সাধারণভাবে নিয়মিত প্র্যাকটিস করেন, তাঁদের মৌলিক তথ্যসংবলিত একটি তালিকা হবে প্রধান বিচারপতির তদারকিতে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যে এই ব্যবস্থা চালু করেছেন। আমাদের আপিল বিভাগের আইনজীবীদের জন্য এমন ব্যবস্থা কার্যকর আছে, হাইকোর্টেও দরকার।
বারে নাম লেখানো তো সারা জীবনের অক্ষয় পদবির ব্যাপার নয়। সংবিধানে ওই যে ১০ বছর বলা আছে, সেটা কীভাবে গণনা হবে, তা নিয়ে বিতর্ক আছে, কিন্তু সুরাহা নেই। ইংল্যান্ডের রীতি ও এলাহাবাদ হাইকোর্টের ওই রায় অনুসরণ একটি দিশা দিতে পারে। দশ বিচারকের মামলায় বর্তমান প্রধান বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ বেঞ্চ এই দশ বছর গণনা নিয়ে আক্ষেপ করেছিলেন। ওই বেঞ্চ সাফ বলেছিলেন, এই ১০ বছর ধরে শুধু নাম লিখিয়ে রাখলে চলবে না, প্র্যাকটিসিং চরিত্র সর্বদা বজায় রাখতে হবে।
সমগ্র ভারতে এ নিয়ে বড় সমস্যা সৃষ্টি হলে গত জানুয়ারিতে ভারতের বার কাউন্সিল তার বিধি সংশোধন করেছে। এই সংশোধনীতে প্রতিটি বারের জন্য প্রতিবছর ‘নন-প্র্যাকটিসিং লইয়ার্স লিস্ট’ প্রকাশ বাধ্যতামূলক করেছে। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলকে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ও প্রতিনিধিত্বশীল তখনই বলা যাবে, যখন তারা শত শত ‘নন-প্র্যাকটিসিং’ সদস্যমুক্ত একটি ভোটার তালিকার ভিত্তিতে নির্বাচন করতে সক্ষম হবে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

ছয় সন্তানকে মেরে ফেলতে রাষ্ট্রপতির অনুমতি চান বাবা

নিজের ছয় সন্তানকে মেরে ফেলতে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির কাছে আবেদন জানাতে যাচ্ছেন এক বাবা। বিরল রোগে ভুগতে থাকা শিশুদের চিকিৎসাসহ নানা প্রয়োজন মেটাতে না পারার ব্যর্থতা থেকে মুক্তি পেতেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। ৪২ বছরের ওই অসহায় ব্যক্তি ভারতের আগ্রার বাসিন্দা। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি’তে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওই ব্যক্তির ছেলেমেয়ের সংখ্যা আট। এদের ছয় জনই ‘কানাভান’ রোগে ভুগছে। এ রোগে আক্রান্তদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি হয় না এবং এক পর্যায়ে তারা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়। নাজিরের ওই ছয় ছেলেমেয়েও পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়েছে। এ অস্বাভাবিক শিশুদের ভার বহন করতে পারছেন না বাবা নাজির। তিনি বলেন, ‘আমি এখন খুব ক্লান্ত। আর ওদের দেখভাল করতে পারছি না। কীভাবে করব বলুন। আমি একজন সামান্য মিষ্টির দোকানদার। নিজের সামান্য রোজগার দিয়ে তো কুলিয়ে উঠতে পারছি না।’
এসব অথর্ব শিশুদের নিয়ে চিন্তিত মা তাবাসসুমও। তিনি বলেন, ‘আমার শিশুরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়। ওরা অন্য শিশুদের মতো খেলাধুলাও করতে চায়। কিন্তু ওদের যে সে ক্ষমতা নেই।’ তার আট সন্তানের সবার বড় এক ছেলে আর মেয়েই কেবল স্বাভাবিক। এসব কারণে এখন সন্তানদের মেরে ফেলার চিন্তা করছেন নাজির। তিনি এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি লেখারও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাষ্ট্রপতির অনুমতি না দিলে তিনি তার সন্তানদের চিকিৎসার জন্য সরকারের সহযোগিতার আবেদন করবেন বলে জানিয়েছেন। ২০১১ সালে ভারতের সুপ্রিমকোর্ট দুরারোগ্যব্যাধিতে আক্রান্তদের মৃত্যুর অধিকার সংক্রান্ত একটি নির্দেশিকা অনুমোদিন করেছিল। তবে ওই নির্দেশিকায় নাজিরের ছয় সন্তান পড়ে কিনা তা জানা যায়নি। এদিকে, আগ্রার অতিরিক্ত জেলা মেজিস্ট্রেট রাজেশ শ্রীবাস্তব এনডিটিভিকে বলেছেন, এর মধ্যে সরকারি কর্মকর্তারা নাজিরের ছয় সন্তানকে দেখতে তার বাড়ি গিয়েছিল। তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

জীবিত উদ্ধারে আর আশা নেই!

আইপ্যাডে স্বামীর ছবির দিকে তাকিয়ে ডুঁকরে ডুঁকরে কেঁদে উঠছেন চেন সুহা। গড়িয়ে পড়া চোখের জলে স্মরণ করছেন মাত্র কয়েকমাস আগেই যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে ৯ দিন স্বামীর সঙ্গে জাহাজে কাটিয়েছেন। কিউবার উদ্দেশে পাল তোলা সেই জাহাজের সুখস্মৃতি ডুবে গেছে চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় নদী ইয়াংজে। ৪৫৮ আরোহী নিয়ে অথৈ পানিতে ডুবে গেছে ‘ইস্টার্ন স্টার’ নামের এক প্রমোদ তরী। গত সোমবার সন্ধ্যায় ওই জাহাজডুবির পর বুধবার শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত (বাংলাদেশ সময় ৬.৩৭ মিনিট)
১৮ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। জীবিত উদ্ধার করা গেছে ১৪ জন। চেন সুহার স্বামীসহ ৪ শতাধিক এখনও নিখোঁজ। ৭৮ বছর বয়সী স্বামীর ছবি দেখিয়ে ৭৩ বছরের চেন বলেন, ‘দেখুন, ওকে দেখতে ৭৮ বয়সের মনে হয় না। ও খুব শক্তিশালী ভালো সাঁতার জানে।’ দুর্ঘটনার দু’দিন পার হওয়ার পর বেনের মতো অনেকেই তাদের প্রিয়জনকে ফিরে পাবেন বলে আর ভরসা করতে পারছেন না। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নিভছে আশার আলো। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, সম্ভবত টর্নেডোর আঘাতে জাহাজটি ডুবে গেছে এবং এটি উল্টে যেতে এক মিনিটেরও কম সময় লেগেছে। উল্টে যাওয়া নৌযানটি থেকে শব্দ শুনতে পেরেছেন উদ্ধারকারীরা। ডুবে যাওয়ার আগে নৌযানটি থেকে কোনো ধরনের সাহায্য সংকেত পাঠানো হয়নি বলে জানা গেছে। বার্তা সংস্থা এএফপিকে ওয়্যাং নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা জানিয়েছে, সোমবার রাতের ওই ঝড় গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল। এ দুর্ঘটনা গত ৭০ বছরের মধ্যে চীনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে ২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি ফেরি ডুবে অধিকাংশ শিশুসহ মোট ৩০৪ যাত্রীর মৃত্যু হয়। পূর্ব এশিয়ায় ওই ঘটনাকেও ছাড়িয়ে যাবে চলতি দুর্ঘটনাটি, এমন আশংকাই রয়েছে। এদিকে, উদ্ধার হওয়া ক্যাপ্টেন জানান, হঠাৎ ঝোড়ো বাতাসে উল্টে গিয়ে ডুবে যায় জাহাজটি। এর অধিকাংশ যাত্রী ছিলেন ৫০ থেকে ৮০ বছর বয়সী। সঙ্গে ক্রু ও কয়েকজন ট্রাভেল এজেন্সির কর্মী। প্রমোদ বিহারে ছিলেন যাত্রীরা। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেসিয়াং জানিয়েছেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে ২০০ ডুবুরির একটি দল কাজ করে যাচ্ছে। এ ঘটনা তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। উদ্ধার তৎপরতার কিছু দৃশ্য টেলিভিশনে দেখানো হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, টেলিভিশন কর্মীরা উল্টে যাওয়া জাহাজের যে পাশটি পানির ওপরে কিছুটা ভেসে আছে, সেখানে দাঁড়িয়ে ফুটেজ নিচ্ছেন এবং ডুবুরিরা তাদের কাজ করে চলেছে।

ভারত অবৈধভাবে কাশ্মীর দখলে রেখেছে : পাকিস্তান

ভারত অবৈধভাবে জম্মু ও কাশ্মীর দখলে রেখেছে বলে অভিযোগ করেছে পাকিস্তান। বুধবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র এ কথা বলেন। ইসলামাবাদ নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের গিলগিট ও বালতিস্তানের নির্বাচন নিয়ে নয়াদিল্লির আপত্তির প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘ভারত কাশ্মীরের জনগণের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার স্বীকার করে না। তারা অবৈধভাবে জম্মু-কাশ্মীর দখলে রেখেছে। বিতর্কিত এই এলাকার চূড়ান্ত সুরাহা এখন জাতিসংঘের হাতে।’ জিনিউজ জানায়, এর আগে গিলগিট ও বালতিস্তানের ভোটের মুখে ওই দুটি এলাকাকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে নয়াদিল্লি। আগামী ৮ জুন পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত এ দুটি এলাকায় সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
‘কাশ্মীর দেশবিভাগের অসমাপ্ত এজেন্ডা’পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরিফ বলেছেন, পাকিস্তান ও কাশ্মীর অবিচ্ছেদ্য। ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হওয়ার এত বছর পরও কাশ্মীর ইস্যু এখনও ‘অমীমাংসিত’ রয়ে গেছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। রাহিল শরিফের মতে কাশ্মীর হচ্ছে দেশবিভাগের ‘অসমাপ্ত এজেন্ডা’। পাকিস্তানের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটিতে এক অনুষ্ঠানে বুধবার রাহিল এ কথা বলেছেন। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ বিভাগের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আসিম বাজওয়া টুইটারে এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানান। সেনাপ্রধান বলেন, ‘এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য আমরা জাতিসংঘের প্রস্তাব ও কাশ্মীরের জনগণের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী কাশ্মীর ইস্যুর সমাধান চাই। আমরা অন্য কোনো দেশকে আমাদের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চাই না।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রচ্ছন্ন যুদ্ধকে উসকে দিতে ও আমাদের দেশকে অস্থিতিশীল করতেই আমাদের শত্র“রা সন্ত্রাসীদের মদদ দিচ্ছে। তবে তাদের অসৎ উদ্দেশ্য ব্যর্থ করে দিতে আমরা বদ্ধপরিকর।’

আত্মীয়তার বন্ধনে রাজনীতি-১১, কাজী-মুন্সী পরিবার by কাফি কামাল

৫৬ হাজার বর্গমাইল আয়তনের দেশ বাংলাদেশ। আবহমানকাল ধরেই এদেশের মানুষ লড়াই করে আসছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে। মোগল, বৃটিশ ও পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে বারবার ছিনিয়ে এনেছে বিজয়। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে এ অঞ্চলের মানুষ বারবার রাজনৈতিক ঘেরাটোপে বন্দি ও সংগ্রামের মাধ্যমে সে বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসেছে। ফলে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী পরিবারগুলোর আদর্শগত পরিবর্তন হয়েছে সময়ের পরিক্রমায়। এতে এককালে রাজনৈতিক মিত্র পরবর্তী সময়ে পরিণত হয়েছে শত্রুতে। তবুও শেকড়ের মতো ছড়িয়ে রয়েছে পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী রাজনীতিকদের সামাজিক বন্ধন। অতীতের ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়েও পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে আত্মীয়তার সম্পর্ক।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানের পিতা আবদুল মোমেন খান ছিলেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও জিয়াউর রহমান সরকারের খাদ্যমন্ত্রী। ড. মঈন খানের সম্পর্কে জামাতা (ফুফাতো বোনের মেয়ের জামাই) হলেন বিএনপির সহ-আইনবিষয়ক সম্পাদক ও নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি তৈমূর আলম খন্দকার। আবার তৈমূর আলম খন্দকারের সঙ্গে ত্রিমাত্রিক আত্মীয়তা রয়েছে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী বরকত উল্লাহ বুলুর। একদিকে তৈমূরের স্ত্রীর সম্পর্কে চাচা হলেন বুলু, আরেকদিকে বুলুর স্ত্রীর সম্পর্কে ভাই হলেন তৈমূর। এছাড়া, বুলুর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ব্যারিস্টার রিদওয়ানের কাছে মেয়ে ব্যারিস্টার মার-ই-য়াম খন্দকারকে বিয়ে দিয়েছেন তৈমূর। আবার তৈমূরের ছোট ভাই মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ হলেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবদল আহ্বায়ক ও নাসিকের কমিশনার এবং মেয়ে ব্যারিস্টার মার-ই-য়াম খন্দকার শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় আইন সম্পাদক। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি শামীম ওসমানের ফুফা হলেন মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা, সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ও বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম।
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার কাজী পরিবারের সন্তান জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও এরশাদ সরকারের সাবেক মন্ত্রী কাজী ফিরোজ রশীদের পিতা কাজী মোজাফফর হোসেন ছিলেন গোপালগঞ্জ সাবডিভিশন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। কাজী ফিরোজ রশিদের বেয়াই হলেন টঙ্গী পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আজমত আলী খান। তিনি ফিরোজ রশীদের ছোট ছেলের শ্বশুর। গোপালগঞ্জের আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক এমপি আবদুর রশীদ হলেন কোটালীপাড়ার কাজী পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। আবার কাজী ফিরোজের চাচাতো ভাই হলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি কাজী আকরামউদ্দিন আহমেদ। তাদের ভাতিজি জামাই হলেন বিএনপি নেতা কাজী পান্নু। আর পান্নুর মামা হলেন বিএনপির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক ও ছাত্রদলের প্রথম আহ্বায়ক কাজী আসাদুজ্জামান।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও এরশাদ সরকারের সাবেক অর্থ উপমন্ত্রী এএফএম ফখরুল ইসলাম মুন্সীর ছেলে হলেন বর্তমান সরকারের হুইপ রাজী মোহাম্মদ ফখরুল। ফখরুল ইসলাম মুন্সীর ভাই এএফএম তারেক মুন্সী জেলা আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা। ফখরুল মুন্সীর মামা হলেন সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম গোলাম মোস্তফা। আবার ফখরুল মুন্সীর সঙ্গে কুমিল্লার বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর সম্পর্ক হচ্ছে চাচাতো-জেঠাতো ভাইয়ের। মঞ্জুরুল মুন্সীর স্ত্রী মাজেদা মুন্সীও বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় এবং ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির টিকিটে লড়েছেন। আবার গোলাম মোস্তফার ভায়রা হলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী। তার আরেক ভায়রা হলেন সাবেক পরিকল্পনা সচিব নুরুল হুদা। আর ইনাম আহমেদের শ্বশুর ছিলেন পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের বিচারক এমআর খান। আর ইনাম চৌধুরীর ছোট ভাই সাবেক সচিব মাসুম চৌধুরীর শ্বশুর ও দুই চাচা শ্বশুর মনসুরুল আমিন, বদরুল আমিন ঢাকা ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আসম হান্নান শাহ’র বাবা ফকির আবদুল মান্নান ছিলেন ঢাকা বারের প্রেসিডেন্ট ও পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী। হান্নান শাহ’র বোন জামাই মোহাম্মদ ইদ্রিস ছিলেন ঢাকা বারের প্রেসিডেন্ট। মোহাম্মদ ইদ্রিসের ভাতিজা হলেন বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত জিল্লুর রহমান। বিএনপির তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক, বিএনপি সরকারের সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা খানম বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়। সৈয়দ ওয়াহিদের সম্পর্কে ভাগনে হলেন বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে শরিক কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মে. জে. (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক। ইবরাহিমের চাচির ভাই হলেন ওয়াহিদ। আবার ইবরাহিমের শ্বশুর প্রয়াত সিরাজুদ্দীন ভূঁইয়া ছিলেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। ইবরাহিমের ভায়রা হলেন প্রয়াত মে. জে. (অব.) মতিউর রহমান বীরপ্রতীক। ইবরাহিমের মামা শ্বশুর গুলবক্স ভূঁইয়ার ছেলে সুলতান ভূঁইয়া ছিলেন এরশাদ সরকারের এমপি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ফুফা হলেন মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি ও আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী একে খন্দকার। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, ডাকসুর সাবেক ভিপি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী আমানউল্লাহ আমানের ছেলের নানা শ্বশুর হলেন জিয়া সরকারের এমপি ঢাকার নবাবগঞ্জের আতাউদ্দিন খান। আবার চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি নুরুল ইসলাম বিএসসির বেয়াই হলেন এরশাদ সরকারের এমপি ও পরে আওয়ামী লীগ নেতা শিল্পপতি ইঞ্জিনিয়ার আফসারউদ্দিন আহমেদ। হবিগঞ্জের বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি শেখ সুজাত মিয়ার বেয়াই হলেন এরশাদ সরকারের সাবেক এমপি খলিলুর রহমান চৌধুরী। সুজাত মিয়ার মেয়ের শ্বশুর হলেন খলিল চৌধুরী।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব, এরশাদ সরকারের মন্ত্রী ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা জিয়াউদ্দিন বাবলু। ডাকসুর সাবেক জিএস বাবলুর নানাবাড়ি হচ্ছে চট্টগ্রামে। একে খান তার চাচাতো নানা। বাবলুর মামা সেকান্দার হায়াত খান চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও মামি জোবায়দা হায়াত খান এবং নানা সালেহ আহমেদ খান আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন। বাবলুর আরেক মামা চৌধুরী হারুনুর রশীদ চট্টগ্রামের সাবেক এমপি ছিলেন। জিয়াউদ্দিন বাবলুর চাচাতো মামা হলেন বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী জহিরউদ্দিন খান ও খালাতো মামা হলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খান। আবার চট্টগ্রামের বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা ও পাকিস্তান আমলের রাজনীতিক ও এমএলএ ব্যারিস্টার ডক্টর মোহাম্মদ সানাউল্লাহ হলেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য, এরশাদ সরকারের পররাষ্ট্র ও বর্তমান সরকারের পানিসম্পদমন্ত্রী মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। এছাড়া বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০দলীয় জোটের শরিক জাতীয় পার্টি (জাফর) সভাপতি ও এরশাদ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদের জামাতা হলেন ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ও চট্টগ্রাম সিটি কলেজের সাবেক ভিপি অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ইফতু।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী প্রয়াত ড. ওয়াজেদ মিয়ার নাতনী ও বর্তমান সরকারের হুইপ মাহবুব আরা গিনির স্বামী হলেন শাহ মাইনুল ইসলাম শিল্পু। তার বড় ভাই শাহ বদরুল ইসলাম সাজুর নানা শ্বশুর হলেন বাংলাদেশের প্রথম স্পিকার ও আওয়ামী লীগ নেতা শাহ আবদুল হামিদ। গিনির ভাসুর শাহ বদরুল ইসলাম সাজু বিএনপির টিকিটে জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সাজুর চাচাতো ভাই শাহ শরিফুল ইসলাম বাবলু গাইবান্ধা জেলা জাসদের সভাপতি। বাবলুর পিতা শাহ কফিলউদ্দিন ছিলেন পাকিস্তান সরকারের এমএলএ। আবার শাহ আবদুল হামিদের আরেক নাতি হলেন জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক রাগীব হাসান চৌধুরী হাবুল।
বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক এমপি হাসানউদ্দিন সরকারের বড় দাদা নিজামউদ্দিন সরকার ছিলেন টঙ্গী ইউনিয়ন বোর্ডের দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান। তার একই সঙ্গে চাচাতো ভাই ও মামাতো বোনের জামাই হলেন গাজীপুর জেলা বিএনপি নেতা ও টঙ্গীর সাবেক পৌর মেয়র সালাহউদ্দিন সরকার। তার আরেক চাচাতো ভাই সাহাজউদ্দিন সরকার ছিলেন টঙ্গী পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান। হাসান সরকারের বড় ছেলের শ্বশুর হলেন ত্রিশাল পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রশিদ। আবার হাসান সরকারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হলেন টঙ্গীর সাবেক এমপি কাজী মোজাম্মেল।
অন্যদিকে কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমানের মেয়ের জামাই হলেন স্বাচিপ নেতা ডা. আরিফ। কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম বেবু, শহীদুজ্জামান সাজু ও মহিলা দলের আহ্বায়ক রেহেনা খান হলেন ভাইবোন। তাদের সম্পর্কে জামাতা হলেন জেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ সম্পাদক মীম নাজমুল ক্রাউন। বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য জেবা রহমানের পিতা ঝালকাঠির ব্যারিস্টার আক্তার হোসেন ছিলেন মুসলিম লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা। আর জেবা রহমানের শ্বশুরপক্ষীয় ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হলেন ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ, আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক এমপি নাজমুল হাসান জাহেদ ও বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হোসেন জীবন।

জলবায়ু চুক্তি নিয়ে দুর্ভাবনা by এম আসাদুজ্জামান

এ বছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে প্যারিসে একটি জলবায়ু চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আশা করা হচ্ছে, সেখানে বিশ্বের মোটামুটি ১৯৪টি দেশ এ চুক্তির অধীনে বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ একটি মেয়াদি ভিত্তিতে কমিয়ে আনবে, যাতে এ নিঃসরণের পরিমাণ ২১০০ সালের মধ্যে মোটামুটি বন্ধ বা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে উষ্ণায়নের মাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে থাকবে।
একই সঙ্গে উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং অস্থিরতার জন্য যেসব বিরূপ অভিঘাত হচ্ছে বা হবে, তা অভিযোজন, অর্থাৎ স্তিমিত বা দূরীকরণে পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর সঙ্গে এ জন্য যেসব প্রযুক্তি উদ্ভাবন বা হস্তান্তর প্রয়োজন হবে, তা এবং অন্যান্য কারণে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হবে। সবশেষে কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হবে এসব কর্মকাণ্ডের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক জোগানের ব্যবস্থা। এ চুক্তি ২০২১ সাল থেকে কার্যকর হবে এবং সে সময় থেকে বিশ্বব্যাপী এ জন্য প্রতিবছর অন্তত ১০ হাজার কোটি ডলার অর্থ জোগান হবে। কিন্তু এসবই নির্ভর করবে চুক্তিটি হবে কি হবে না, হলেও সেটা স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের জন্য কতটা উপযোগী হবে, তার ওপর।
ইতিমধ্যে গত ফেব্রুয়ারি মাসে জেনেভায় যে জলবায়ু সম্মেলন হয়েছে, তাতে ওপরে উল্লিখিত চুক্তির একটা খসড়া পাওয়া গেছে। অন্যবারের মতো এ দলিলও বহু বিকল্পধারা, উপধারা, উপ-উপধারা এবং তৃতীয় ব্রাকেটে কণ্টকিত—গত ডিসেম্বরে লিমায় এটির প্রাথমিক খসড়া হয়, তখন এর আকার ছিল ২৮–২৯ পৃষ্ঠার মতো, তা বেড়ে হয়েছে ৯০ পৃষ্ঠা। একে মার্জিত রূপ দিতে যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হবে। আর মোটামুটি এক সপ্তাহের মধ্যে বন শহরে এটা পরিমার্জনের কাজ শুরু হবে। বাংলাদেশ ও তার মতো দেশগুলো এসব নিয়ে যদি পূর্ণ হুঁশিয়ার না থাকে, তাহলে তাদের স্বার্থরক্ষা কতটুকু হবে, বলা মুশকিল। কিন্তু এসবের চেয়েও বড় অশনিসংকেত আছে। ব্যাপারটা একটু খোলাসা করে বলা দরকার।
১৯৬৯ সালে ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক চুক্তি-সংক্রান্ত একটি কনভেনশন হয় এবং ১৯৮০-৮১ সাল থেকে তা কার্যকর হয়। সাধারণভাবে যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি এ কনভেনশনের কাঠামোয় হওয়ার কথা, তবে চুক্তিবদ্ধ দেশগুলো চাইলে সর্বসম্মতিক্রমে তার ব্যত্যয়ও হতে পারে। যাহোক, জেনেভায় যে খসড়া হয়েছে, তাতে সূচনায় ভিয়েনা কনভেনশনকে স্মরণ করা হয়েছে। এর অর্থ এই যে যদি এ ধারাটি টিকে যায় তবে যেসব দেশ এ চুক্তি স্বাক্ষর বা অনুমোদন করেনি, তারা সম্ভবত জলবায়ু চুক্তির আওতার বাইরে থাকবে এবং স্বাভাবিকভাবেই তা হলে ওই চুক্তির আওতাধীন সহায়তা, অর্থপ্রাপ্তিসহ পাওয়ার উপযুক্ত বিবেচিত হবে না।
এখন পর্যন্ত ১১৪টি দেশ ভিয়েনা কনভেনশন সই করেছে—৪৫টি দেশ সই করলেও অনুমোদন করেনি। দ্বিতীয় গ্রুপে আছে যুক্তরাষ্ট্র; আর প্রথমটিতে আছে বাংলাদেশ, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, নরওয়ে এবং আশ্চর্যজনক হলেও ফ্রান্স, যে ফ্রান্সের নেতৃত্বে প্যারিসে চুক্তি হওয়ার কথা। এখন মোদ্দা কথা হচ্ছে যে ভিয়েনা কনভেনশনের ধারা যদি জলবায়ু চুক্তিতে বলবৎ থাকে, তবে কি বাংলাদেশ জলবায়ু চুক্তিটিতে সই করতে পারবে? সম্ভবত না এবং এটি একটি বড় দুর্ভাবনা।
তবে ভিয়েনা কনভেনশন সম্পর্কিত সমস্যা ছাড়াও আরও বড় সমস্যা আছে। জলবায়ু চুক্তির ধরন, তার বাস্তবায়নের পদ্ধতি ইত্যাদি নিয়ে জেনেভা খসড়ায় একটা অংশ আছে। এবং তার এক জায়গায় বলা হয়েছে, কনভেনশনের যেসব পার্টি আইনগত বাধ্যবাধকতায় মিটিগেশন বা গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাবে, কেবল সেসব কনভেনশনের পার্টিই জলবায়ু চুক্তিতে সদস্য হতে পারবে।
কথা হচ্ছে যে জলবায়ু কনভেনশন অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কোনো নিঃসরণ হ্রাসের দায়িত্ব নেই; পরবর্তী সময়ে বালি ও ডারবানে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাতে স্বল্পোন্নত দেশগুলো নিঃসরণ কমালেও তা সাধারণভাবে কনভেনশনের বা অন্যভাবে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় হবে। অর্থাৎ, নিঃসরণ হ্রাসের আইনি বাধ্যবাধকতা যদি থাকেও, তা হবে শর্তাধীন। কিন্তু ওপরের প্রস্তাবিত ধারায় কোনো শর্তের কথা বলা হয়নি। অর্থাৎ এ ধারা যদি টিকে যায়, তবে বাংলাদেশ আক্ষরিক অর্থেই ফাটা বাঁশের মধ্যে পড়বে। আইনি বাধ্যবাধকতায় নিঃসরণ কমানোতে রাজি না থাকলে চুক্তি সই করতে পারবে না। আর চুক্তি সই না করতে পারলে শর্তাধীন নিঃসরণ কমানোর কথা বলা যাবে না।
অবশ্য এ কথা ঠিক যে খুব সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র কোনো আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে যেতে চাইছে না। কারণ, প্রেসিডেন্ট ওবামা রিপাবলিকান কংগ্রেসে তা অনুমোদন করাতে পারবেন না। আর ভারত যত দূর জানা যায়, অনুরূপভাবে অনাগ্রহী। এ দুটি বড় দেশ সই না করলে এ চুক্তির বিশেষ সার্থকতা থাকে না; তাতে খানিকটা সময় হয়তো পাওয়া যাবে। কারণ, প্যারিসে চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসবে।
সে যা-ই হোক, প্যারিসে না হলেও আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে চুক্তি হয়তো শেষ পর্যন্ত একটা হবে। কিন্তু তার জন্য বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য জোর গলায় কথা বলতে হবে। যেখানে যেখানে প্রয়োজন, প্রতিটি বিকল্পধারা বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন দিতে হবে এবং কথা বলতে হবে, বিশেষ করে জলবায়ু চুক্তির সদস্য হওয়ার শর্ত নিয়ে। বাংলাদেশ সরকার কী এ জন্য প্রস্তুত?
এম আসাদুজ্জামান: প্রফেসরিয়াল ফেলো, বিআইডিএস।