Thursday, August 13, 2009

কবির জন্য, কবিতার জন্য by মৌলি আজাদ

সেদিন ২০০৪ সালের ১২ আগস্ট। আমাদের বাবা লেখক হুমায়ুন আজাদ তখন জার্মানিতে। আমাদের তিন ভাইবোনের প্রতি তাঁর হূদয়-নিংড়ানো ভালোবাসার কথা তিনটি পৃথক চিঠিতে লিখে সেদিন তিনি এক নির্জন কক্ষে ঘুমাতে গিয়েছিলেন। জানি না ঘুমাতে যাওয়ার আগে কী ভাবছিলেন তিনি। হয়তো আমাদের কথা বা তিনি পরবর্তী সময়ে লিখবেন এমন কোনো বইয়ের কথা। সেই ভাবনাই ছিল তাঁর শেষ ভাবনা। না, এরপর আর তাঁকে আর কোনো কিছুই ভাবতে হয়নি। ভাবতে হবেও না কোনো দিন। কারণ সেই নির্জন কক্ষের নিদ্রাই ছিল তাঁর শেষ নিদ্রা। বাবা যে চিরঘুমের দেশে চলে গিয়েছেন তা আমরা জানতে পারি ১৩ আগস্ট। সাত সকালে হতেই জার্মান দূতাবাসের কর্মকর্তাদের নিমীলিত চোখ দেখেই আমরা তিন ভাইবোন বুঝতে পারলাম, হঠাত্ এক অজানা ঝড়ে বাবা হারিয়ে গেছেন। আর আমরা হারালাম আমাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। তারপর একে একে কেবল সময় বয়ে যাওয়া। কষ্ট আর সান্ত্বনাই হলো আমাদের সম্বল। এর মধ্যেই চলছিল আমাদের ভেতরে ভেতরে লড়াই—একটু উঠে দাঁড়ানোর। নিজেদের জন্য, বাবার জন্য। কারণ বাবার স্মৃতিকে কাজের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখতে হবে যে! চিন্তা করলাম কীভাবে তাঁকে নতুন প্রজন্মের কাছে বাঁচিয়ে রাখা যায়। সে সময় তাঁর লিখিত নানা কবিতা, গল্প, উপন্যাসই কেবল চোখের সামনে ভাসছিল। কিন্তু দেখলাম, শেষ পর্যন্ত তাঁর স্বল্প কিন্তু অমর সৃষ্টি কিছু কবিতার লাইন, যেমন ‘আমি জানি সবকিছু নষ্টদের অধিকার যাবে।/কড়কড়ে রৌদ্র আর গোলগাল পূর্ণিমার রাত/নদীরে পাগল করা ভাটিয়ালি খড়ের গম্বুজ/শ্রাবণের সব বৃষ্টি নষ্টদের অধিকারে যাবে—বারবার মাথায় পেরেক ঠোকার মতো করে বাজতে লাগল। মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিলাম, হ্যাঁ, একমাত্র কবিতাই পারে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখতে। কবিতা সব সময়ই ছিল তাঁর প্রাণে। প্রেম, ভালোবাসা, সংগ্রাম, আকাঙ্ক্ষা—সবকিছুই তিনি কবিতার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। কিন্তু কীভাবে কবিতা পারবে তাঁকে বাঁচাতে? হ্যাঁ, পারবে। পারবেই। সিদ্ধান্ত নিলাম, ২০১০ সাল থেকে কবিতার (ড. হুমায়ুন আজাদের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী সামনে রেখে ১১ আগস্ট ২০০৯-এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে) জন্য হুমায়ুন আজাদ পুরস্কার প্রদান করা হবে। এই পুরস্কার বরাদ্দ থাকবে দেশে ও প্রবাসে বসবাসরত অসাধারণ তরুণ কবিদের জন্য। এই পুরস্কারটি হবে এমন, যেখানে লেখকের চেয়ে লেখকের বইটিই বেশি পাদপ্রদীপের আলোয় আসবে। এই পুরস্কারটি হবে একদম স্বচ্ছ, নির্ভেজাল ও দলাদলিমুক্ত। বিচারক হিসেবে কাজ করবেন দেশের স্বনামধন্য কবিরা। সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুরু করা এই পুরস্কারটি হয়তো একদিন বুকার পুরস্কারের মতোই পরিগণিত হবে, এই আশা রাখি। দেশে ও প্রবাসে অবস্থানরত তরুণ কবিদের বলছি, আশা করছি কবিতার জন্য হুমায়ুন আজাদ পুরস্কার ঘোষণার পর আপনারা আপনাদের মূল্যবান কবিতার বই/বইগুলো মূল্যয়নের জন্য আমাদের কাছে পাঠাবেন। এভাবেই গড়ে উঠতে পারে একজন প্রথাবিরোধী কবি হুমায়ুন আজাদ থেকে লাখো প্রথাবিরোধী কবি হুমায়ুন আজাদ। আশ করি আপনারা আমাদের পাশে থাকবেন।
মৌলি আজাদ: ড. হুমায়ুন আজাদের কন্যা।

টিপাইমুখ: একটি বইয়ের খোঁজে -তথ্যভাণ্ডার by শাহদীন মালিক

শুরুতেই দুটো পুরোনো কথা। কেচ্ছা-ঘটনা। কেচ্ছা এ জন্য যে সঠিক দিন-ক্ষণ-তারিখ-সময় মনে নেই। আর ঘটনা এ জন্য যে ঘটনাটা আসলেই ঘটেছিল। অবশ্যই কোনোটাই বিরাট কিছু নয়, কিছুটা ব্যক্তিগত বটে। তাই পাঠক খুব বেশি পুলকিত নাও হতে পারেন।
প্রথম ঘটনা কমবেশি বছর দশেক আগের। গ্যাস নিয়ে সারা দেশে অনেক দিন ধরে মহা হুলস্থুল চলছিল। গ্যাস গেল রে, গ্যাস গেল রে বলে আকাশ-বাতাস ধ্বনিত হচ্ছিল প্রায় সর্বক্ষণ। লং, শর্ট, উল্টো-সিধা অনেক মার্চেই দেশ টইটম্বুর। তখনো টিভি চ্যানেলে টক শোর উত্পাত শুরু হয়নি। বক্তৃতা-বিবৃতি সব পত্রপত্রিকায়।
বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য অনেক দরপত্র-ইজারা। কেউ বলেন, দেশের যা গ্যাস, তাতে যুগ যুগ চলবে। অনেকের সন্দেহ, এক যুগও চলবে না। কেউ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গ্যাস বিক্রির পক্ষে, কেউ ৫০ বছরের রিজার্ভ রাখার ঘোষণায় বিভোর।
গ্যাসের ব্যাপারে আমি তখনো এবং এখনো নিরেট-নিখাদ অজ্ঞ। চতুর্দিকে গ্যাস নিয়ে এত হইচই—কত আর চোখ-কান বন্ধ করে থাকা যায়। তখন আমার বেশির ভাগ সময় কাটে একটা এনজিওতে। দরখাস্ত ঠুকলাম সরকার-বাহাদুর বরাবর। সাদামাটা কথা। দুটি সদ্য পাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী তরুণকে তিন-চার মাসের জন্য নিয়োগ দেব। তাদের কাজ হবে গ্যাসসংক্রান্ত যত বইপত্তর, জার্নাল, প্রবন্ধ, রিপোর্ট পাওয়া যায় সব জোগাড় করা অর্থাত্ কেনা। তারপর ওই প্রকাশিত-জ্ঞানের একটি তালিকা করা। কথা নাই, বার্তা নাই আবেদনে সাড়া মিলল। তিন লাখ টাকা অনুদান পেলাম। আগেই বলেছি, সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মনে নেই। দুই-চার হাজার টাকা কমও হতে পারে। তবে বড় দাগে তিন লাখ টাকার অনুদান ছিল, সেটা আমি নিশ্চিত।
যেহেতু তিন-চার মাসের চাকরি, তাই পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিইনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূতত্ত্ববিজ্ঞান বিভাগে খোঁজখবর লাগালাম। কপাল ভালো। সদ্য ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে পাস করা দুজনকে পেয়ে গেলাম। ঠিকমতো পাক্কা চাকরি পাওয়ার আগে দুই-চার মাস আমার সঙ্গে কাজ করবে। কাজ বুঝিয়ে দিতে সময় লাগল অল্পই। গ্যাস নিয়ে যা পাও, তা-ই ক্রয় করবে।
হাজার ছয় টাকা খরচ করে বড় গোছের বইয়ের শোকেস কিনলাম। আমার গ্যাস বোঝার দরকার নেই, কিন্তু কেউ যদি গ্যাস বুঝতে চায়, তাহলে ওই এনজিওতে এলেই হবে। গ্যাস-পাঠাগার বা তথ্যকেন্দ্র গড়ার উদ্দেশ্যেই ওই প্রকল্প বা অনুদানের তিন লাখ। ভেবে রেখেছিলাম সব বই-পুস্তক-জার্নাল-রিপোর্ট জোগাড় এবং সেগুলোর সারাংশসহ তালিকা হয়ে গেলে একটা ছোটখাটো অনুষ্ঠান করে সবাইকে জানিয়ে দেব। গ্যাস সম্পদ সম্পর্কে জানাতে চাইলে সব বই-পত্তর এখানে আছে।
নিয়োগ দিলাম, শেলফ কিনলাম। তারপর আমি সপ্তাহ দুয়েক ঢাকার বাইরে। তিন সপ্তাহ গেল—শেলফটা তখনো একদম খালি। দুই তরুণ ভূতত্ত্ববিজ্ঞানীকে তলব করলাম। বই কোথায়? বোঝা গেল তারা এ-অফিস ও-অফিস দৌড়াদৌড়ি করছে। নিউমার্কেট, নীলক্ষেতসহ সব বই-বাজারে যাচ্ছে। কিন্তু ফলাফল শূন্য। ‘স্যার, বই নেই।’
হতেই পারে না। ৪০ বছর ধরে দেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে। সেই ষাটের দশকেই ছাতকের সিমেন্ট আর ফেঞ্চুগঞ্জের সার কারখানা হয়েছে গ্যাস সম্বল করে। আশুগঞ্জ বিদ্যুত্। সবই তো গ্যাসে চলছে কয়েক দশক ধরে। গ্যাস ছাড়া রান্না-খাওয়া কিছুই হবে না। তা ছাড়া গ্যাস রপ্তানি নিয়ে নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে এত হুলস্থুল। গ্যাসে আগুন জ্বলে—রাজনীতির ময়দান উত্তপ্ত তো হবেই। আর বলে কিনা বই নেই।
ঠিক মনে পড়ছে না। অনুদানের কিছু টাকা বোধ হয় ফেরত গিয়েছিল। বই পাওয়া যায়নি। অধ্যাপক বদরুল ইমামের একটি বইয়ে বাংলাদেশের গ্যাস সম্পদ নিয়ে পৃষ্ঠা তিরিশেকের একটা অধ্যায় ছিল। বুয়েটের দুই অধ্যাপকের নাম মনে পড়ছে—দুটো করে প্রবন্ধ পাওয়া গিয়েছিল। সব মিলিয়ে জ্ঞানের পরিধি সোয়া শ পৃষ্ঠার মতো। তবে বিভিন্ন সাপ্তাহিকে দুই-চার পৃষ্ঠা করে রিপোর্ট-কলাম পাওয়া গিয়েছিল এন্তার। সাংবাদিক-রিপোর্টার ভাইবোনেরা তো আর ভূতত্ত্ববিজ্ঞানী নয়। তাই সাপ্তাহিক বা পত্রিকায় প্রকাশিত দু-চার পৃষ্ঠার বয়ান তো জ্ঞান হতে পারে না।
আমাদের গ্যাস সম্পদ নিয়ে তথ্য-জ্ঞানকেন্দ্র করার আমার মহাপরিকল্পনা, বলাবাহুল্য ভেস্তে গেল। গ্যাস নিয়ে গত ১০ বছরে আমাদের জ্ঞানভাণ্ডার বিকশিত হয়েছে কি না, তার খোঁজ আর রাখিনি। তবে আমি নিশ্চিত, গ্যাস-তেলসংক্রান্ত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর এ সংক্রান্ত জ্ঞানভাণ্ডার আমাদের চেয়ে শত গুণে বেশি সমৃদ্ধ। গ্যাস-তেলসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক জার্নালে নিশ্চয়ই প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে আমাদের গ্যাস নিয়ে। অন্যরা জানে, আমি বোধ হয় কিছুই জানি না।
আমার দ্বিতীয় কেচ্ছা-ঘটনা আরও আগের। সম্ভবত তখন ১৯৯৩ সাল। লন্ডনে থাকি। হঠাত্ একদিন মোটামুটি নামীদামি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আমার খোঁজ করল। তাদের মোদ্দাকথা—শেখ মুজিবুর রহমানের একটা এক শ-দেড় শ পৃষ্ঠার জীবনী তারা প্রকাশ করতে চায়, ইংরেজি ভাষায়। কারণ, ইংরেজি ভাষায় কোনো জীবনী রচিত হয়নি। তখন দেশ স্বাধীন হওয়ার দুই দশক পেরিয়ে গেছে। অথচ বঙ্গবন্ধুর ইংরেজিতে জীবনী নেই।
বলাবাহুল্য, তাদের আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়ার বিদ্যা-বুদ্ধি তখনো ছিল না, এখনো নেই। তবে অবস্থার বিরাট উন্নতি হয়েছে। ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের অশেষ উন্নতি হয়েছে। সত্যিকার অর্থে জীবনী বলতে যা বোঝায়, সে গোছের ইংরেজি ভাষায় বই এখন আছে একটি। এস এ করিমের লেখা, বছর তিনেক আগে প্রকাশিত।

------২.-----
টিপাইমুখ নিয়ে এখন তাই বই খুঁজছি। দরখাস্ত করিনি, কোনো অনুদানও পাইনি। তাই স্রেফ একে ওকে জিজ্ঞেস করছি। টিপাইমুখ নিয়ে কোনো বইয়ের হদিস এখনো পাইনি।
পাব বলেও বিশেষ ভরসা নেই। গত কয়েক সপ্তাহের হুলস্থুলে বুঝতে পারছি, ভারতের টিপাইমুখ নামক জায়গায় কিছু একটা হচ্ছে। এই কিছু একটা হলে বাংলাদেশের জন্য সমূহ বিপদ। চট্টগ্রাম থেকে সিলেট পর্যন্ত দেশের বিরাট অংশ মরুভূমিও নাকি হয়ে যাবে।
‘কিছু একটা’ শব্দদ্বয় ব্যবহার করছি এ জন্যই যে নেতাদের টেলিভিশন টক শোর বাণী থেকে বুঝলাম, টিপাইমুখে হয় বাঁধ হচ্ছে, না-হয় সেচ প্রকল্প হচ্ছে অথবা জলবিদ্যুত্ কেন্দ্র হচ্ছে। যাঁরা লং মার্চ-শর্ট মার্চ করবেন তাঁরাও জানেন না কী হচ্ছে। অবশ্য অকপটে স্বীকারও করছেন যে তথ্য-উপাত্ত দরকার, আরেক দলের জ্ঞান-গরিমা বোধ হয় এত সাংঘাতিক যে এক চক্কর মারলেই সব মালুম হয়ে যাবে। মরুভূমি হতে ৫০ বছর না ৩৩ বছর, তিন মাস নয় দিন বা আড়াই সপ্তাহ—তা এক চক্করেই বোধগম্য হবে।
গত কয়েক সপ্তাহে আন্তর্জাতিক নদী আইন আর ফারাক্কা চুক্তির একটা ধারা বাজারে বেশ চালু হয়েছে। ফারাক্কা চুক্তি নিয়ে এক যুগ ধরে হালুম-হুলুম প্রচুর হয়েছে। বই কি লেখা হয়েছে? আন্তর্জাতিক নদী আইন নিয়ে বাজারে কি কোনো বই আছে? পররাষ্ট্র অথবা নদ-নদী মন্ত্রণালয়ে কি কোনো বই আছে।
হাটে হাঁড়ি সম্পূর্ণ ভাঙব না। তাই একটু রাখঢাক করে বলি। ইদানীং যেসব মন্ত্রণালয় নিয়ে মহা হইচই, সে রকম একটি মন্ত্রণালয়ে আমার অতি পরিচিত অনুজ আইনজীবী কাজ করেছিলেন কয়েক মাস। আইনগত দিকগুলোর কিছুটা দেখভাল করার জন্য। ওই মন্ত্রণালয়ের যেটা প্রধান বিবেচ্য বা দায়িত্ব—ধরুন মরুভূমি, সে সংক্রান্ত দেশে বেশ কিছু আইন আছে, সেই পরিচিত তরুণ আইনজীবীকে জিজ্ঞেস করে আমার কিছুটা হলেও জ্ঞানার্জন হয়েছিল। জ্ঞানটা হলো—পুরো মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিস্ট প্রকল্প অফিসে কোথাও সেই মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে কোনো আইনের কোনো কপি নেই।
নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছি। আইন তো থাকবে আইন মন্ত্রণালয়ে।
আন্তর্জাতিক নদী আইন, ফারাক্কা চুক্তির একটা বিশেষ ধারা বা শর্ত, আর এর সঙ্গে ইদানীং যুক্ত হয়েছে ‘তথ্য-উপাত্ত’, সম্বল-কম্বল তো মনে হচ্ছে এসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

--------৩.------
দেশের বয়স তো ৪০ হতে আর বেশি বাকি নেই। কিন্তু দেশ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের বয়স বোধ হয় বারো কি তেরো।
আমার ধারণা পুনরাবৃত্তি করছি, নিছক ধারণা—মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভালো-মন্দ সব মিলিয়ে বইয়ের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার-লাইব্রেরি-গবেষণাকেন্দ্র এখনো হয়নি। এমন কোনো লাইব্রেরি এখনো নেই, যেখানে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা যাবে সহজেই।
এ লাইব্রেরি, ও লাইব্রেরি, বইয়ের দোকান, বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে ধার করে মুক্তিযুদ্ধের বই পড়া যায়। কিন্তু দৌড়াদৌড়িতে সময় ব্যয় হবে বই পড়ার সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।
টিপাইমুখে বাঁধ না সেচ প্রকল্প, নাকি জলবিদ্যুত্ কেন্দ্র হচ্ছে, সেটা জানা দরকার। কোথা থেকে আসা, কত সের পানি, কোন দিকে দিক পরিবর্তিত হবে অথবা জমিয়ে রাখা হবে সেটা বোধ হয় জানা দরকার। এতকাল এই পানি, কত পানি—কোন দিকে যেত। সুরমা-কুশিয়ারায় এখন কত মণ পানি আসে। এর থেকে কত দিনে কত সের কমলে আমাদের কী অসুবিধা হবে, সেটা কি আমাকে বলার কেউ আছেন?
জানতে পারলে সংগ্রাম-আন্দোলনটা ঠিকভাবে করা যেত। তাই একটা বই খুঁজছি।
>>>>শাহদীন মালিক: অ্যাডভোকেট সুপ্রিম কোর্ট, ডাইরেক্টর স্কুল অব ল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।

মেহসুদ কি সত্যিই মারা গেছেন -পাকিস্তান by হামিদ মীর

পাকিস্তানে চালকবিহীন মার্কিন বিমান হামলা জনপ্রিয় নয়। তবে এই প্রথমবারের মতো তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের প্রধান বায়তুল্লাহ মেহসুদের নিহতের খবরে অনেক পাকিস্তানিই খুশি। ৫ আগস্ট পাকিস্তানের দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে মার্কিন বিমান হামলায় তিনি নিহত হন বলে খবরে জানা যায়। বায়তুল্লাহ মেহসুদ ছিলেন পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’। একই সঙ্গে পাকিস্তানিদের কাছে তিনি নৃশংস ব্যক্তি হিসেবেও পরিচিত। দেশজুড়ে কয়েক ডজন আত্মঘাতী হামলার পেছনে তাঁর ভূমিকা রয়েছে। তবে পাকিস্তান সরকারও তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করার ব্যাপারে দ্বিধায় আছে।
গত শুক্রবার মার্কিন গণমাধ্যমে বায়তুল্লাহর মৃত্যুর খবরটি বের হয়। গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কোরেশিও বায়তুল্লার মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত করেন। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেহমান মালিক বক্তব্য দেন সতর্কতার সঙ্গে। গত শনিবার সকালে দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের একজন জ্যেষ্ঠ সিনেটর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেন, বায়তুল্লাহ নিহত হননি। আর এ কারণে বায়তুল্লার মৃত্যুর ঘটনা এখনো নিশ্চিত করেননি রেহমান মালিক। জ্যেষ্ঠ তালেবান কমান্ডার হাকিমুল্লাহ মেহসুদেরও দাবি, বায়তুল্লাহ নিহত হননি। অনেক পাকিস্তানিরই ধারণা, পাকিস্তানের ৬২তম স্বাধীনতা দিবসের ঠিক কয়েক দিন আগে বায়তুল্লাহ মেহসুদ নিহত হয়ে থাকলে তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে একটি বড় ধরনের উপহার হবে। তবে একই সঙ্গে সাধারণ কিছু প্রশ্নও সামনে এসেছে।
গত বছর থেকেই পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী বলা শুরু করে, বায়তুল্লাহ মেহসুদ মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের স্বার্থে কাজ করছিলেন। তাই চালকবিহীন মার্কিন বিমান থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে কখনোই হামলা চালানো হয়নি। এ ষড়যন্ত্রতত্ত্বই পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে আত্মঘাতী হামলার সংখ্যা বাড়িয়েছিল। ২০০৭ সালে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা বায়তুল্লাহ মেহসুদকে লক্ষ্য করে হামলা করার জন্য বহুবার মার্কিন বাহিনীকে অনুরোধও করেছিল। কিন্তু তাতে মার্কিন বাহিনীর মন গলেনি। উপরন্তু মার্কিন বাহিনীর ধারণা ছিল, মৌলভী নাজির, হাফিজ গুল ও সিরাজউদ্দিনের মতো জঙ্গিদের খুঁজে বের করতে আইএসআই ঠিকমতো সহযোগিতা করেনি। এসব জঙ্গিনেতা আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে। আফগানিস্তানে যুদ্ধ করছে এমন জঙ্গিনেতাদের সঙ্গেই কেবল পাকিস্তান শান্তি চুক্তি করেছিল। তবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে শীর্ষস্থানীয় পদে রদবদলের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে শুরু করে।
তালেবান ও আল-কায়েদাবিরোধী সমন্বিত অভিযানের শুরুটা ছিল কয়েক মাস আগে। বায়তুল্লাহর মাথার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ৫০ লাখ ডলার এবং পাকিস্তান পাঁচ কোটি রুপি পুরস্কারও ঘোষণা করে। কয়েক সপ্তাহ আগে দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের কারি জায়েনউদ্দিন পাকিস্তানি গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন। ওই সাক্ষাত্কারে তিনি দাবি করেন, বায়তুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের পক্ষে কাজ করছেন। বিদ্রোহী জঙ্গিনেতা হিসেবে জায়েনউদ্দিন পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমর্থনপুষ্ট। তাঁর এমন দাবি বেশ বিভ্রান্তিরও জন্ম দিয়েছিল। ওই সাক্ষাত্কারের কয়েক দিনের মধ্যেই দারা ইসমাইল খানে বায়তুল্লাহ হত্যা করেন জায়েনউদ্দিনকে। সেটা গত ২৩ জুনের ঘটনা। আর এর মধ্য দিয়ে বায়তুল্লাহর বার্তা ছিল, পাকিস্তানে যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে যে কেউ তাঁর লক্ষ্য হতে পারে।
কারি জায়েনউদ্দিনের মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পর এখন পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা দাবি করছে, চালকবিহীন মার্কিন বিমান হামলায় বায়তুল্লাহ নিহত হয়েছেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকাভুক্ত বায়তুল্লাহকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য পাকিস্তান সরকার কি সিআইএকে পাঁচ কোটি রুপি দেবে? মার্কিন বিমান হামলায় দুর্ঘটনাবশত কি এ নিহতের ঘটনা? পাকিস্তানের গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ছাড়া সিআইএ এ হামলা চালাতে পারে না। তাই সিআইএর কাছ থেকে পাকিস্তানের কে পাবে ৫০ লাখ ডলার? পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী কি প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ধন্যবাদ জানাবেন? কিংবা তাঁরা কি পাকিস্তানে চালকবিহীন মার্কিন বিমান হামলার নিন্দা জানাবেন?
অতীতে আস্থার কিছু ঘাটতি থাকলেও এখন এটা স্পষ্ট যে, মার্কিন ও পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা পরস্পর ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে তিন দিক থেকে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী বায়তুল্লাহকে ঘিরে ফেলেছিল। আর সিআইএকে কারও দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তিনি মার্কিন বিমান হামলার শিকার হন। কিছু পাকিস্তানির গোপন সহযোগিতার ভিত্তিতেই যে মার্কিন বিমান হামলা চলছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সরকার বরাবরই এসব হামলার নিন্দা করে আসছে। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় পাকিস্তানের এখন প্রয়োজন স্বচ্ছ ও জোরদার নীতি। আমরা যদি মার্কিন বিমান হামলায় সহযোগিতাই করি, তবে প্রকাশ্যে সরকারের এর নিন্দা করা উচিত নয়। এতে কেবল বিভ্রান্তিই তৈরি হয়। আর পাকিস্তান সরকারও বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। বিশ্বাসযোগ্যতা ছাড়া একটি সরকার সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করতে পারে না। বায়তুল্লাহ মেহসুদ যদি নিহত হন আর আমাদের সরকার যদি খুশি হয়, তাতে পাকিস্তানে চালকবিহীন মার্কিন বিমান হামলা বৈধতাই পাবে। আর ভবিষ্যতে ওই হামলার নিন্দা জানানোরও সুযোগ হারাবে সরকার। এ কারণেই হয়ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে বলেছিলেন, ‘বায়তুল্লাহ মেহসুদ নিহত হলেও আমি পাকিস্তানে চালকবিহীন মার্কিন বিমান হামলাকে নিন্দা করি।’
আমাদের অবশ্যই অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে। বায়তুল্লাহ মেহসুদ পাকিস্তানি কায়েমি গোষ্ঠীরই তৈরি তা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। ২০০৫ সালে ফেব্রুয়ারিতে আব্দুল্লাহ মেহসুদের বিরুদ্ধে বায়তুল্লাহ মেহসুদের সমর্থন পেতে আমরা ব্রিগেডিয়ার (অব.) কাইয়ুম শেরকে ব্যবহার করেছিলাম। তখন বায়তুল্লাহ মেহসুদের সঙ্গে প্রথম শান্তিচুক্তি অনুমোদন করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল সফদার হুসাইন। আর সেই চুক্তির ভিত্তিতে বায়তুল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের সেনা প্রত্যাহার করতে সম্মত হয়। সেনা প্রত্যাহারের পাঁচ মাসের মাথায় বায়তুল্লাহ শান্তিচুক্তি ভেঙে দেন। আর পরের মাসেই তিনি ২৪৩ পাকিস্তানি সেনাকে অপহরণ করেন। ২০০৭ সালের ৪ নভেম্বর বায়তুল্লাহর সঙ্গে আরেকটি গোপন সমঝোতার মাধ্যমে ওই সেনাদের ছাড়িয়ে আনতে বাধ্য হন মোশাররফ। পরের বছর জানুয়ারিতে পাকিস্তানি কায়েমি গোষ্ঠীর সঙ্গে বায়তুল্লাহর আবারও সমঝোতা হয়। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা ভেঙে যায়। প্রতিটি সমঝোতাই ছিল গোপন। জঙ্গিদের সঙ্গে আমরা আর কোনো গোপন সমঝোতা চাই না। শান্তিচুক্তির যদি প্রয়োজনই হয়, তবে তা প্রথমে পার্লামেন্টেই আলোচনা করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, নিজেদের দেশে একটি বেসরকারি মিলিশিয়ার বিরুদ্ধে আরেকটি মিলিশিয়া গঠন করা উচিত নয়। পাকিস্তানের সংবিধানের ২৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এমন যেকোনো সংস্থা অবৈধ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আমরা আবারও সোয়াত, বুনের ও দিরে বেসরকারি মিলিশিয়া গঠন করছি। এসব মিলিশিয়া আরও বায়তুল্লাহ মেহসুদের জন্ম দেবে।
আমি এখনো বিশ্বাস করি, বায়তুল্লাহ মেহসুদের মৃত্যুর খবরে আমাদের উল্লসিত হওয়া ঠিক হবে না। তাঁর নেটওয়ার্ক এখনো অক্ষত। তিনি নিহত হলে আমাদের শহরগুলোতে শিগগিরই তাঁর বাহিনী হামলা চালাবে। শারীরিকভাবে তাঁকে সরানো কোনো বিজয় নয়। আমি মনে করি, গোটা দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রচলিত বিধান প্রতিষ্ঠার মধ্যেই আছে প্রকৃত বিজয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, ওই এলাকায় আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। বায়তুল্লাহ জীবিত না মৃত তা আমরা নিশ্চিত নই। তবে আমার কাছে তিনি এখনো জীবিত। দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে সব বিদ্যালয় ভবনে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমেই বোঝা যাবে তিনি মৃত। আর এতে কোনো ভয়-ভীতি ছাড়াই শিক্ষার্থীরা ১৪ আগস্ট উদ্যাপন করবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
হামিদ মীর: ইসলামাবাদে জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক।
hamid.mir@geo.tv

সব ধরনের বাধা দূর করতে উদ্যোগ নিন -লেবাননে নারীশ্রমিকদের সমস্যা

লেবাননে গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া বাংলাদেশি নারীশ্রমিকদের অনেকেই নানাভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন। দেশে ফিরে আসা নারীশ্রমিকদের বক্তব্যে এর প্রমাণ মিলেছে। এ ছাড়া দুর্বিষহ জীবন থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন প্রিয়জনদের কাছে। লক্ষাধিক টাকা খরচ করে বিদেশে গিয়ে যদি কোনো দরিদ্র পরিবারের নারীর করুণ পরিণতি হয়, তবে এর চেয়ে হতাশাজনক আর কী হতে পারে!
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যবান অবদান রেখে চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে নারীশ্রমিকদের বিদেশে যাওয়ার হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো সূত্রে জানা গেছে, গত সাত মাসে ১১ হাজার ২৭৬ জন নারী বিভিন্ন দেশে কাজ করতে গেছেন। এর মধ্যে শুধু লেবাননেই গেছেন সাত হাজার ৯৫ জন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, লেবাননে বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস নেই। ফলে নারীশ্রমিকেরা কোনো সমস্যায় পড়লে তাঁদের হয়রানির শেষ থাকে না। কিন্তু সরকার এ বিষয়ে নিশ্চুপ।
আমাদের দেশ থেকে বিদেশে যাওয়া নারীশ্রমিকদের প্রধান সমস্যা, তাঁরা বেশির ভাগই স্বল্পশিক্ষিত। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর নারী অভিবাসন তথ্যকেন্দ্র থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, তাঁরা বিদেশ যাওয়ার আগে যেন প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র পরীক্ষা করে নিয়োগকারী দেশের ভাষা কিছুটা জেনে তবেই সে দেশে যান।
দারিদ্র্য ও কাজের অভাব এ দেশের মানুষকে বিদেশ যেতে উদ্বুদ্ধ করে তুলছে। আর এ সুযোগে প্রতারকচক্র লোকজনকে বিদেশ পাঠানোর নামে প্রতারণা করছে। ভাগ্যান্বেষণে বৈধভাবে বিদেশ গিয়ে কেউ এ রকম বিপদের মুখে পড়বে, এটা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। কাজের আশায় এ দেশের মানুষ বিদেশে যাবে—এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু তারা যেন প্রতারণার শিকার না হয় এবং বিদেশ গিয়ে যাতে বিপদে না পড়ে, তা লক্ষ রাখা সরকারের একান্ত কর্তব্য। আমরা আশা করব, লেবাননে নারীশ্রমিকদের হয়রানির বিষয়টি সরকারের পররাষ্ট্র ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। পাশাপাশি বিদেশে যাওয়া নারীশ্রমিকদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি দূতাবাসগুলো এবং জনশক্তি রপ্তানি ব্যবস্থাপনাকে আরও অধিক মাত্রায় জেন্ডার-সংবেদনশীল করার দিকে মনোযোগী হতে হবে।

কোনো আশ্বাসই কাজে আসছে না -বাজারদর ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারদর নিয়ে যত কথা হচ্ছে, ততই যেন বাজার অশান্ত হয়ে উঠছে। সরকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছে। ব্যবসায়ীরা রমজান মাসে দাম না বাড়ানোর আশ্বাস দিচ্ছেন। তাতে ক্রেতা-ভোক্তার স্বস্তি মিলছে না। ডাল-তেল, পেঁয়াজ-রসুন, আলু-চিনি—সবকিছুর দাম প্রতিদিন কিছু না কিছু হারে বাড়ছে। এই দাম বাড়ার সঠিক কারণ যেমন নির্ণয় করা যাচ্ছে না, তেমনি কেউই এর দায় নিতেও রাজি নন। পাইকারি ব্যবসায়ীরা দোষ চাপান আমদানিকারক ও উত্পাদকদের ঘাড়ে, খুচরা বিক্রেতারা আঙুল তুলছেন পাইকারদের দিকে, আর জোগানদারেরা অজুহাত দিচ্ছেন আন্তর্জাতিক বাজারদরের, কখনো বা দেশের ভেতর প্রতিকূল আবহাওয়ার।
চাহিদার বিপরীতে জোগানের ঘাটতি দেখা দিলে দাম বাড়াটা যৌক্তিক বলে প্রতীয়মান হতে পারে। কিন্তু সেই বৃদ্ধির হার কতটা? বাজারে পণ্য সরবরাহের যে চিত্র পাওয়া যায়, তাতে তো ঘাটতি হওয়ার কোনো কথাই নয়। গত সপ্তাহে প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনেই জানা গেছে, রমজান মাসে ব্যবহার্য ছোলা, মটর ও চিনির মজুদ এখন চাহিদার তুলনায় দুই থেকে আড়াই গুণ বেশি রয়েছে। আমদানি বেড়েছে ডাল ও ভোজ্যতেলের। এর পরও আমদানিমূল্যের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি দাম দিয়ে ভোক্তাদের এসব পণ্য কিনতে হচ্ছে বলে প্রতিবেদন থেকে জানা যায়। স্পষ্টতই এখানে ব্যবসায়ীচক্র উচ্চ মুনাফা তুলে নিচ্ছে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সমস্যা হলো, এ বিষয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ করার কার্যত কোনো ক্ষমতাই নেই। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (টিসিবি) দিয়ে বাজারে পণ্য সরবরাহ বাড়ানোর প্রচেষ্টা এখনো ফলপ্রসূ হয়নি। আর তাই খুচরা ও পাইকারি বাজারে দৈনিক দর লিখে টাঙিয়ে রাখার মতো অগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। বাণিজ্যমন্ত্রী কখনো কঠোর ভাষায় শাসিয়ে, কখনো বা নীতিবাক্য আউড়ে ব্যবসায়ীদের দাম সহনীয় রাখার জন্য আদেশ-অনুরোধ করছেন। বলেছেন, দাম বাড়ালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কীভাবে ও কবে সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এর অবশ্য কোনো আভাস মেলেনি আজও। ফলে সরকার হুমকি-ধমকি দিলেও তা একটা অর্থহীন বিষয়ে পর্যবসিত হচ্ছে। এ রকম চলতে থাকলে রমজান মাস শুরুর আগে দাম এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকবে যে রমজান মাসে আর দাম না বাড়ালেও চলবে।
তাই বলে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে নিশ্চয়ই চলবে না। সরকারের উচিত হবে মজুদ পণ্য যত দ্রুত সম্ভব বাজারে আনার ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি টিসিবিকে সক্রিয় করে খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি বাড়ানো—যেন সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ
তৈরি হয়।

শেয়ারবাজারে উল্লাস এবং কেলেঙ্কারি by আবু আহমেদ

২০০১ সালের কথা, যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার বড়ই চড়া। সবাই শেয়ারবাজার নিয়ে বড় মাতামাতি করছিল। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ঋণের দরজাকে খুলে দিয়েছিল। এমবিএ গ্র্যাজুয়েটরা ওয়ালস্ট্রিটের ব্রোকারেজ ও বিনিয়োগ ফার্মগুলোতে উচ্চ বেতনের চাকরিতে প্রবেশ করছিলেন। ওই সময় ওয়ারেন বাফেটকে কিছু লোক জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি এখন শেয়ার কিনছেন না?’ ওয়ারেন বাফেট মুচকি হেসে বললেন, ‘না, আমি কিনছি না। আগে আপনারা কিনতে কিনতে ক্লান্ত হয়ে পড়ুন, পরে আমি শেয়ার কিনব।’
ওয়ারেন বাফেট সেই কথাগুলো বলেছিলেন ব্যক্তিগত পর্যায়ে। পাবলিকলি বললে ওয়ালস্ট্রিটে বড় রকমের পতন ঘটতে পারত। কিন্তু দেয়ালেরও কান আছে। বাফেটের ওই ভাবনা কয়েক মাস পরই ওয়ালস্ট্রিটে ছড়িয়ে পড়ল। মার্চ-এপ্রিলে ওয়ালস্ট্রিটের শেয়ারবাজারে ধস নামে। ওদের টেকনোলজি শেয়ারমূল্য সূচক নাসদাক-এর (Nasdaq) পতন ঘটে মাত্র এক সপ্তাহে ২০০০ পয়েন্টস। এরপর আরও নিচে পড়ে যায়। সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। শুরু হয়ে যায় দোষারোপের পালা। কংগ্রেসও নড়েচড়ে বসল। তারা পতন ঠেকাতে পারল না বটে, তবে নতুন আইন করল, যাতে সামনে আর কেলেঙ্কারি না ঘটে। মূল্য পতন হলে অনেক দোষ বের হয়ে পড়ে। নামকরা অডিটিং ফার্ম আর্থার এন্ডারসনের দোষ ছিল অন্যতম বৃহত্তম অ্যানার্জি কোম্পানি এনরনের ঋণগুলোকে ওই ফার্ম লুকিয়ে ছিল।
আর্থার এন্ডারসেন চিরতরে অডিটিং পেশা থেকে বিদায় নিয়েছেন। আর এনরনের বড় এক্সিকিউটিভরা জেল খেটেছিলেন। আইন করা হলো, অডিটররা পরামর্শক হিসেবে কাজ করতে পারবেন না। ওয়ারেন বাফেট সব সময়ই একজন সফল বিনিয়োগকারী ছিলেন। বাজার গড় মুনাফা যেখানে ১৬ শতাংশ ছিল, বাফেট তাঁর বিনিয়োগকারীদের ২০ শতাংশ করে দিতেন। বাফেট হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বয়স কম বলে ওই বিজনেস স্কুল তাঁকে ছাত্র হতে দেয়নি। পরে তিনি বিখ্যাত সিকিউরিটি অ্যানালিস্ট বেনজামিন গ্রাহামের ছাত্র হয়েছিলেন। গ্রাহাম বলতেন, পরিসংখ্যানে কী আছে দেখো। আর বাফেট পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ, তবে ম্যানেজমেন্টের গুণগত মান আরও গুরুত্বপূর্ণ।
বাফেট বলতেন, তিনি শেয়ার কিনলে স্টক এক্সচেঞ্জ বন্ধ হয়ে গেলেও কোনো ক্ষতি নেই। তাঁর চুক্তি ছিল তিনি শেয়ার কিনেছেন সহসা বেচার জন্য নয়। ওই সব শেয়ারই তিনি কিনেছেন যেগুলোর ভ্যালু সময়ে কেবল বাড়বে। বাফেট বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় ধনী লোক। বাফেট যখন বলছিলেন, অন্যরা শেয়ার কিনে ক্লান্ত হোক, তারপর উনি শেয়ার কিনবেন— এর দ্বারা তিনি এই কথা বোঝাতে চেয়েছেন যে এখন শেয়ারের অনেক বেশি দাম। একদিন অতি উত্সাহ থেমে যাবে, যখন শেয়ারমূল্য ইতিহাস কর্তৃক দেয় গড় মূল্যের কাছাকাছি এসে যাবে, তখন শেয়ার কেনা যাবে।
বাফেটের কথা সত্য হতে বেশি দিন লাগেনি। টেকনোলজি শেয়ার মূল্যসূচক শেষ পর্যন্ত ঐতিহাসিক গড়ের স্তরে চলে আসে। তবে ততক্ষণে লাখ লাখ আমেরিকাবাসীর সম্পদের মূল্য দুই-তৃতীয়াংশ হাওয়া হয়ে গেল, যাদের মধ্যে সদ্য পাস করা হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের গ্র্যাজুয়েটসরাও ছিলেন। তাঁদের অনেকের ঋণ ছিল। একদিকে মন্দার কারণে তাঁরা চাকরি হারিয়েছেন, অন্যদিকে ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে তাঁদের আজও ঘুরতে হচ্ছে। তাঁদের চাকরি হয়তো হবে, তবে তাদের ঋণের বোঝা সহজে শেষ হওয়ার নয়।
ওয়ালস্ট্রিট যখন অতি তুঙ্গে, তখন বিনিয়োগবিমুখ অনেক লোককেও শেয়ার কিনে ধনী হওয়ার স্বপ্ন ঘিরে ধরেছিল। বার্নাড মেড্ফ ছিলেন একসময়ে ন্যাসদাকের চেয়ারম্যান। সবাই তাকে জানত একজন টাকা বানানোর জাদুকর হিসেবে। মেডফ যখন অবসরে যান, তখন তিনিও একটি বিনিয়োগ ফার্ম দিয়ে বসলেন। শত শত লোক শুধু মেডফের নামের ওপর তাঁকে অর্থদিতে লাগল, তার মাধ্যমে বিনিয়োগ করে উচ্চ মুনাফা পাওয়ার উদ্দেশে। কিন্তু মেডফ ছিলেন ধুরন্ধর এক ব্যক্তি। সবাইকে বাইরে থেকে জানান দিতেন আপনাদের দেয় অর্থ ঠিকই আছে, সময়ে ফল পাবেন। অবশেষে মেডফ ধরা পড়ে গেলেন। বিনিয়োগকারীরা খোঁজ নিয়ে দেখলেন, মেডফ তাঁদের অর্থকে কোথাও বিনিয়োগ করেননি, বরং তিনি তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে মিলে দুই হাতে খরচ করছেন। মেডফের বিরুদ্ধে মামলা হয়। মেডফ কোর্টে দাঁড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বললেন, ‘আমাকে মাফ করবেন, আমি আপনাদের অর্থকে নষ্ট করে ফেলেছি।’
মেডফের যাবজ্জীবন জেল হয়েছে। তাঁর আইনজীবীরা সাজা কমানোর বা মওকুফের জন্য আর কোনো চেষ্টাই করেননি। মেডফকে বিশ্বাস করে বিনিয়োগকারীরা ৬৫ বিলিয়ন হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ওই সব বিনিয়োগকারীর মধ্যে সিএনএনের বিখ্যাত ভাষ্যকার ও উপস্থাপক ল্যারি কিংও আছেন।
দেশে দেশে অতীতেও ‘পুঞ্জি স্কিমে’র বা অতি দ্রুত অর্থ বানানোর ভুয়া প্রকল্পের বহু উদাহরণ ছিল, আজও আছে। কিন্তু মানুষ ভুলে গিয়ে অতি দ্রুত ধনী হতে গিয়ে অনেক বেকায়দার পড়ে। প্রত্যেক শেয়ারবাজারেই জুয়া আছে। আমাদের বাজারেও আছে। অনেকেই মনে করে, জুয়া না থাকলে শেয়ারবাজার কেন, বসে বসে এক দামের দ্রব্য বেচলেই তো হলো। অনেকে আবার জুয়া আর স্পেকুলেশনকে গুলিয়ে ফেলে। স্পেকুলেশন সব ব্যবসাতেই আছে। তবে জুয়াকে রোধ করা হয়, কারণ জুয়া বাজারকে দমিয়ে দিতে পারে বা ধ্বংস করে দিতে পারে। রেগুলেশন ভালো। আবার অতি রেগুলেশন ভালো নয়। কিন্তু সঠিক রেগুলেশন এবং অতি রেগুলশনের মধ্যে বৈধ রেখা টানা মুশকিল। রেগুলেশনের মাত্রা নিয়ে বিতর্ক আগেও ছিল, সামনেও থাকবে।
শেয়ারবাজারকে ঘিরে মামলাও প্রচুর হয়। তবে দেখা যায়, বিনিয়োগকারীরাই ‘ঠগবাজদের’ বিরুদ্ধে মামলা করছে। কিন্তু আমাদের এই বাজারে ব্যাপারটা উল্টো। ঠগবাজেরাই মামলা করে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে আটকে দিয়েছে। ঢাকার শেয়ারবাজারে বিরাট একটা অংশ এখন কোর্টের এখতিয়ারে। কেউ জানে না ওইসব আটকে পড়া ব্যাংকিং কোম্পানি, বীমা কোম্পানি এবং মিউচুয়াল ফান্ডগুলো কখন কোর্ট থেকে ছাড়া পাবে। বিনিয়োগকারীরা শুধু অপেক্ষায় আছেন। এই ছোট্ট বাজারটার আজ যেটা বড় সমস্যা, সেটা হলো এইখানে ক্রেতা আছে অনেক, কিন্তু শেয়ার বিক্রেতা কম। ফলে শেয়ারবাজারের মূল্যসূচক বাড়লে অনেকের ভয় ধরে যায়। সমাধান হলো শেয়ার সরবরাহ বাড়ানো। আমরা এ ব্যাপারে সরকারকে বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।
আবু আহমেদ: অর্থনীতিবিদ; অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

‘মানবিক বিপর্যয়ে’র পরিহাস -জাতিসংঘ ভাষণ by নোয়াম চমস্কি

আজকের দুনিয়ায় যখনই কাউকে রক্ষার দায়িত্ব (রেসপনসিবিলিটি টু প্রোটেক্ট) বা এর জ্ঞাতি ভাই ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’-এর (হিউম্যানেটারিয়ান ইন্টারভেনশন) আলোচনা আসে, তখনই সিন্দুকে বন্দী ইতিহাসের কঙ্কাল খটাখট নড়ে ওঠে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এসবের নামে সংঘটিত হওয়া অজস্র বিব্রতকর মানবতাবিরোধী ঘটনার।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমগ্র ইতিহাসজুড়ে অল্প কয়েকটি নীতি সর্বত্র পালিত হয়ে আসছে। গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডাইডেসের একটি প্রবচন আছে, শক্তিমান যা ইচ্ছা তা করে আর দুর্বলেরা ভোগে অপরের ইচ্ছায়। আয়ান ব্রাউনলিও এ রকমই বলেছেন: শক্তিমানের ইচ্ছাই আইন। ইংল্যান্ডে একসময়ে সব নীতি ঠিক করা হতো ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিকদের স্বার্থে, যদিও তার পরিণতি ভোগ করতে হতো সাধারণ মানুষকে আর দখলাধীন ভারতবর্ষকে।
‘রক্ষার দায়িত্বের’ কথা বলেই জাপান মাঞ্চুরিয়া দখল করে নিয়েছিল, হিটলার আগ্রাসন চালিয়েছিলেন চেকোস্লাভাকিয়ায় আর মুসোলিনি দখল করেন ইথিওপিয়া। অবশ্য এঁদের প্রত্যেকেই তাঁদের অপকর্মের পক্ষে যুক্তি ও মানবিক অজুহাত খাড়া করেছিলেন। বর্তমানকালেও এই ধারার কার্যকলাপ অব্যাহত আছে। এটাই হয়ে আছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির চলতি নিয়ম।
আমেরিকা দখল করার কারণ হিসেবে ইউরোপীয় দখলদারেরা বলেছিল, তারা আসলে সেখানকার আদিম মানুষকে পাপের পথ থেকে রক্ষা করছে। আফ্রিকায় তারা উপনিবেশ স্থাপন করেছে কালো মানুষকে সভ্য করার কথা বলে। আজকের দুনিয়াতেও একই কাজ হয়ে চলেছে। ক্ষমতাবানেরা বলে পেছনের দিকে না তাকিয়ে সামনের দিকে তাকাতে। কিন্তু দুর্বলের জন্য এটা বুদ্ধির কাজ নয়।
আজ থেকে ৬০ বছর আগে আন্তর্জাতিক আদালত সিদ্ধান্ত দেন, ‘অবস্থাদৃষ্টে দেখা যাচ্ছে, হস্তক্ষেপের অধিকার কেবল শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর জন্যই সংরক্ষিত এবং এটা সহজেই আইনের শাসনকে নষ্ট করে ফেলে।’ ২০০০ সালে ১৩৩টি দেশের উপস্থিতিতে সাউথ সামিটে একই কথা উচ্চারিত হয়। এই সম্মেলনের ঘোষণায় সার্বিয়ায় ন্যাটোর বোমাবর্ষণকে জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন বলে ঘোষণা করা হয়। ২০০৬ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ দেশগুলোর মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও আরব বিশ্বের চিরাচরিত নিপীড়িত রাষ্ট্রগুলো এ ধরনের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে। দেখা যায়, এ ধরনের হস্তক্ষেপের অধিকার কেবল ন্যাটোরই রয়েছে, লাতিন আমেরিকার জোট ওএএস বা আফ্রিকীয় ইউনিয়নের সেই অধিকার নেই। একদিকে বলকান দেশগুলো, অন্যদিকে আফগানিস্তান-পাকিস্তানের ওপর ন্যাটো তার মর্জিমতো এখতিয়ার ঘোষণা করেছে। মানবাধিকার কিংবা স্থানীয় মানুষকে রক্ষায় তারা এসব অঞ্চলে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে এবং এই দেশগুলো ন্যাটোর সদস্য নয়। কিন্তু এই ন্যাটোই তার সদস্যদেশগুলোর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনকে চরম আশকারা দিয়ে থাকে। তুরস্ক ১৯৯০ সাল থেকে সেখানকার কুর্দিদের ওপর চরম নিপীড়ন চালালেও ক্লিনটন প্রশাসন তুরস্ককে সাহায্য-সহযোগিতা করে যায়। এর বাইরে পাশ্চাত্যগামী যেকোনো তেলের পাইপলাইন বা সমুদ্রপথে কোনো বাধা সৃষ্টি হলে সেসব স্থানেও হস্তক্ষেপের একচেটিয়া ক্ষমতা কেবল তারাই সংরক্ষণ করে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোও তাদের ক্ষমতার ছায়ার নিচে।
ইরাকে মানবতার ধ্বংস তাদের বিচলিত করে না। নিরাপত্তা পরিষদের অবরোধে ইরাকের লাখ লাখ শিশু মারা যায়, কঙ্গোতে কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধায় ধুঁকছে। জাতিসংঘের তেলের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির দুই পরিচালক ইরাকে অন্যায় অবরোধের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন। তাঁরা একে মানবতাবিরোধী ও ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যায়িত করেন। অথচ আমেরিকা ও ব্রিটেন নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তে মানবতাকে রক্ষার কথা বলে দেশটিতে আগ্রাসন চালায়।
একইভাবে গাজার জনসাধারণকে রক্ষার কোনো চিন্তা এদের মধ্যে দেখা যায় না। অথচ এটাও ছিল জাতিসংঘের দায়িত্ব। জাতিসংঘের দায়িত্ব ছিল জেনেভা কনভেনশন দ্বারা রক্ষিত অন্যান্য জনসাধারণকে রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়া। যেমন বিবিসির প্রতিবেদন অনুসারে পূর্ব কঙ্গোতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে মূল্যবান খনিজ সম্পদের বেআইনি ব্যবসা চালাচ্ছে এবং সেই ব্যবসা নিরাপদ রাখতে ভয়ঙ্করতম সংঘাত জিইয়ে রাখায় তহবিল জোগান দিচ্ছে।
জাতিসংঘ সম্প্রতি দরিদ্র দেশগুলোর ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা শত কোটি ছাপিয়ে গেছে বলে ঘোষণা করেছে। এদের রক্ষায় কোনো মানবিক হস্তক্ষেপের চিন্তা পাশ্চাত্য রাষ্ট্রশক্তির কল্পনাতেও আসে না। পাশাপাশি জাতিসংঘ বৈশ্বিক খাদ্য কর্মসূচির তহবিল কমিয়ে আনে। কারণ, ধনী দেশগুলো এ খাতে চাঁদা কমিয়ে দিয়েছে। মন্দায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের চেয়ে তারা আর্থিক বিপর্যয়ের জন্য দোষী ব্যাংকগুলোকেই বিরাট তহবিল দিচ্ছে। কয়েক বছর আগের হিসাবে দৈনিক ১৬ হাজার শিশু ক্ষুধায় মারা যাচ্ছে, সামান্য রোগেই মরে যাচ্ছে আরও অনেকে। এই মৃত্যু ঠেকানো খুবই সহজ, কিন্তু সেদিকে কারও মনোযোগ নেই।
মানবিক হস্তক্ষেপের সবচেয়ে ঘৃণ্য উদাহরণগুলোর মধ্যে ইরাক ছাড়া সার্বিয়া অন্যতম। নেলসন ম্যান্ডেলা এর চরম সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু দুর্বলের সমালোচনা উপেক্ষণীয়। ন্যাটোর বোমাবর্ষণ সার্বিয়ার সংঘাতকে কমাতে পারেনি, যেমন ন্যাটো বাহিনী ইরাক বা আফগানিস্তানে হানাহানিকে আরও বাড়িয়েছে মাত্র।
গত ২৫ বছরে আমেরিকা ৪৩, রাশিয়া চার, যুক্তরাজ্য ১০ এবং চীন ও ফ্রান্স তিনটি ভেটো দিয়েছে। বিশ্বশান্তির স্বার্থেই এই ভেটো ক্ষমতা রদ হওয়া উচিত। এসব কারণেই বিশ্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা অপ্রাসঙ্গিকতায় পর্যবসিত হয়েছে। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো এগুলো মানে না। তা হলেও বিশ্ববাসীর প্রচেষ্টাই পারে আবার এসবকে তাত্পর্যপূর্ণ করে তুলতে।
(জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গত ২৩ জুলাই দেওয়া ভাষণের সংক্ষিপ্ত অনুবাদ।)
নোয়াম চমস্কি: শান্তিবাদী মার্কিন বুদ্ধিজীবী ও ভাষাতাত্ত্বিক।

শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি ও আইসিইউ ভবন চালু করা হোক -সিলেট ওসমানী হাসপাতাল

অনিয়মের সমার্থক হয়ে উঠেছে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সিলেট বিভাগের প্রায় দেড় কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় নির্ভরতা সিলেটের প্রধান এই হাসপাতাল। সিলেট ছাড়াও বিভাগের সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার সাধারণ মানুষজন এই হাসপাতালকে নিজেদের প্রধান অবলম্বন মনে করে। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, এই হাসপাতালে সর্বত্র অযত্ন-অবহলোর ছাপ। একটি বিভাগীয় হাসপাতালের এমন প্রতিচ্ছবি হতে পারে না।
এই হাসপাতালের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি নিয়ে স্থানীয় মানুষের বিস্তর অভিযোগ। হাসপাতালের মেঝে, করিডরসহ সবখানে রোগীর ছড়াছড়ি। জরুরি বিভাগ থেকেই শুরু হয় রোগীর বিড়ম্বনার পর্ব। দালালদের দৌরাত্ম্য থেকে চুরি-ছিনতাই এখানকার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সিলেটবাসী এ হাসপাতালের চিকিত্সাসেবার মান নিয়ে শঙ্কিত। তারা এ অবস্থা থেকে মুক্তি চায়।
১০ বছর আগে হাসপাতালটি ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৯০০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও লোকবল, ভৌত অবকাঠামো কিংবা সুযোগ-সুবিধার কোনো উন্নতি হয়নি। প্রতিদিন এখানে গড়ে ১২০০ রোগী চিকিত্সা নিয়ে থাকে। ফলে প্রতিনিয়ত রোগীদের ভোগান্তি বেড়েই চলেছে। এ হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণ ভিন্ন এ সমস্যার সমাধান করা কঠিন।
আধুনিক চিকিত্সাসেবার সুযোগ নিশ্চিত করতে ছয় কোটি ৭৪ লাখ টাকা ব্যয়ে শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত তিনতলা আইসিইউ ভবন নির্মাণ করে স্থাপন করা হয়েছে আধুনিক যন্ত্রপাতি। চারদলীয় জোট সরকারের ক্ষমতা ছাড়ার শেষ মুহূর্তে ঘটা করে এর উদ্বোধন করা হলেও এখনো চালু হয়নি আইসিইউ ভবন। বিস্ময়কর হচ্ছে, আইসিইউ ভবনের সামনে এখন গরু চরে বেড়াতে দেখা যায়। এটি যেন এ হাসপাতালের প্রতীকী চিত্র। আমাদের নীতিনির্ধারকেরা ভবন নির্মাণের ব্যাপারে যতটা আগ্রহী, সেবা কার্যক্রম নিয়ে ততটা আগ্রহী নন।
দেশের সার্বিক উন্নয়নে সিলেটের অবদান অনস্বীকার্য। সিলেট বিভাগের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালটি এভাবে অনাদর-অবহেলায় রুগ্ণ হতে দেওয়া যায় না। অবিলম্বে হাসপাতালটির আইসিইউ ভবন চালু এবং শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রস্তুতির এখনই সময় -জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশ

মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় যে দুর্যোগ হামাগুড়ি দিয়ে আসছে, তা হলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয়। বিশেষ করে বাংলাদেশেই এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি হবে বলে জাতিসংঘের আইপিসিসি বিশেষজ্ঞ ও জলবায়ুবিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির একটি সমীক্ষার বরাত দিয়ে গত রোববার প্রথম আলো জানিয়েছে, বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যেও বড়সড় নৈরাজ্য ডেকে আনতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন থাকতে পারে বলে তাঁরা ধারণা করছেন। এ অবস্থা বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের কারণ।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ যদি সত্য হয়, তাহলে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা ডুবে যাবে, লবণাক্ত হয়ে পড়বে অনেক মিঠা পানির অঞ্চল। দেখা দেবে নতুন নতুন রোগ। বেড়ে যাবে বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষে।
জলবায়ু বিপর্যয়ের জন্য জাতিসংঘের সংস্থা আইপিসিসি দায়ী করেছে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন ও জার্মানির মতো অতিমাত্রায় জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতির দেশ এবং পাশ্চাত্যের অতিভোগী জীবনযাপনকে। কিন্তু উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে পড়ার মতো করে ধনী দেশগুলোর পরিবেশবিনাশী কার্যকলাপের খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো গরিব দেশগুলোকে। অথচ দারিদ্র্য ও নিম্নপ্রযুক্তিগত ক্ষমতার কারণে এ পরিস্থিতি মোকাবিলার সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। তাই যাদের দায় বেশি, তাদেরই খেসারত দিতে বাধ্য করতে হবে। এর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার তিনটি ক্ষেত্র, যথা—তথ্য আদান-প্রদান, অভিন্ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং অভিন্ন তহবিল গঠনে সফল হতেই হবে। সার্কের অবস্থান থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে বিশ্ব-সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করে এ অঞ্চলের স্বার্থে নীতি প্রণয়ন এবং দায়ী দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য সোচ্চার হওয়ারও বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ একেবারে বসেও নেই। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি জাতীয় কমিটি গঠন, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে একটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সচিবালয়, ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন (নাপা) প্রভৃতি পদক্ষেপ হাতে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসবের জন্য প্রয়োজন বিপুল অর্থ। গত বছর ঢাকায় সার্ক দেশগুলোর বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশমন্ত্রীদের বৈঠকে আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তোলায় ‘ঢাকা ঘোষণা’ প্রণয়ন নিশ্চয়ই আশাবাদী পদক্ষেপ। এ ছাড়া সরকারি উদ্যোগে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে লন্ডনে বাংলাদেশকে রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে যুক্তরাজ্য সরকার বাংলাদেশকে ১৩২ মিলিয়ন ডলারের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ২০০১ সালে মরক্কোয় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে শিল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষ থেকে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে দুই বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা এখনো আসেনি। পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনায় কিয়োটো প্রটোকলে স্বাক্ষর না করা দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষায় দায়ী দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ, সস্তায় পরিবেশবান্ধব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তি পাওয়ার নিশ্চয়তাও প্রয়োজন।
এ বিপর্যয় সরাসরি জাতীয় উন্নয়ন ও দারিদ্র্য নিরসন কর্মসূচিকে আঘাত করবে। সুতরাং সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে উন্নয়ন না থমকিয়েই বিপর্যয় মোকাবিলার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলী পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। জনগণ ও তৃণমূল পর্যায়ের প্রশাসনকে সচেতন করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে বিশেষ সুরক্ষাবলয় বানাতে হবে।
তবে বিপর্যয়ের সুযোগে জলবায়ু ব্যবসা ও সামরিকায়নের যেসব প্রয়াস পশ্চিম গোলার্ধের ক্ষমতাবান রাষ্ট্রগুলো নিচ্ছে, তার ফাঁদও এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। দুর্যোগ, অশান্তি ও মহামারি আজ বহুজাতিক কোম্পানি ও যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রের মুনাফা বৃদ্ধি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের পন্থা। সেদিকেও প্রখর দৃষ্টি রাখা চাই।

আমিও চাই হাসতে, মানুষের সঙ্গে মিশতে

মার্ক ভারমিউলেন
রগচটা, বদমেজাজি, সোজা বাংলায় মাথার ঠিক নেই—তাঁর সম্পর্কে সবাই দেখি এসবই বলে! ক্রিকইনফো ওয়েবসাইটের প্রোফাইলেও পরিষ্কার বলা, ২০০৪ সালে ইরফান পাঠানের বলে আঘাত পেয়ে মস্তিষ্ক এলোমেলো হওয়ার অনেক আগে থেকেই এলোমেলো জিম্বাবুয়ের এই ব্যাটসম্যানের জীবন! তাহলে গত পরশু শেষ বিকেলের আলোয় কুইন্স স্পোর্টস ক্লাব মাঠের সবুজ ঘাসে বসা যে তরুণকে অনেক স্পর্শকাতর বিষয়ও স্পর্শ করল না, তিনি কে? এ কোন মার্ক ভারমিউলেন!
দারুণ একটা কামব্যাক ইনিংস খেলার জন্য অভিনন্দন। ক্রিকেটটা নিশ্চয় খুব উপভোগ করছেন আবার?
মার্ক ভারমিউলেন: ক্রিকেট তো সব সময়ই উপভোগ করি। আবার আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে পেরে ভালো লাগছে। এই সিরিজের আগে আমি অনেক কষ্ট করেছি। প্রায় এক মাস ধরে নেটে অনুশীলন করেছি। এর আগে ঘরোয়া টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ রান ছিল আমার। একটা সেঞ্চুরি আর বেশ কয়েকটা ফিফটি... এই পারফরম্যান্সই আমাকে বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের দলে সুযোগ করে দিয়েছে। আমিও আত্মবিশ্বাস নিয়েই ফিরেছি।
২০০৪ সালে ইরফান পাঠানের একটা বলে আঘাত পাওয়ার পর থেকেই তো সমস্যার শুরু?
ভারমিউলেন: হ্যাঁ... বলটা আমার ডান চোখের ওপর আঘাত করেছিল। কপাল ফেটে গিয়েছিল। ডাক্তাররা বলতে গেলে পুরো মাথাই খুলে ফেলেছিলেন অপারেশনের সময়..., মুখ-টুখ সব আলাদা করে ফেলেছিলেন (হাসি)। অপারেশনের সময়ই আমার চোখে বড় ধরনের সমস্যা হয়। ডান চোখটা অন্ধই হয়ে যাচ্ছিল বলতে পারেন। ভাগ্য ভালো যে সেটা হয়নি শেষ পর্যন্ত। মস্তিষ্কের ইনজুরি সাধারণত মানুষের হতাশার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। আমার বেলায়ও এর পর থেকেই বাজে বাজে সব ঘটনার শুরু। আমি এ ধরনের ইনজুরি বা অসুস্থতার লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন ছিলাম না। পরে চিকিত্সা নেওয়া শুরু করলে আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠি। এখন তো পুরোপুরিই ভালো হয়ে গেছি বলতে পারেন।
এ রকম একটা ধাক্কার পর নিজেকে আবার ফিরে পেলেন কীভাবে?
ভারমিউলেন: এ ধরনের ইনজুরির সঙ্গে ভালোভাবে পরিচিত এমন সব ডাক্তারের চিকিত্সা নিয়েছি। তাঁরা এর প্রতিক্রিয়াটা ভালোভাবে জানতেন। আমিও যখন বুঝতে পারলাম এসব কেন হচ্ছে, সমস্যাটা নিয়েই বেশি মনোযোগী হলাম। এরপর ওষুধ আর সঠিক চিকিত্সাই সারিয়ে তুলেছে আমাকে।
২০০৬ সালের ঘটনাটা একটু বলবেন... জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট একাডেমিতে আগুন লাগালেন। কার ওপরে রাগ থেকে এটা ঘটিয়েছিলেন?
ভারমিউলেন: (দীর্ঘশ্বাস। এরপর হাসতে হাসতে...) কী যে ঘটেছিল আমি নিজেও জানি না। পুরোটাই আসলে হতাশা থেকে। ওই সময়টাতে আমি বুঝতে পারছিলাম না আমার আসলে কী করা উচিত, আমার ভবিষ্যত্ কী। সামনে শুধুই অন্ধকার দেখছিলাম। জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের বাইরে থাকার হতাশায় বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলাম। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম, যার শেষটা হলো অগ্নিকাণ্ড দিয়ে (আবার হাসি)।
পুলিশ তো ওই ঘটনার পর আপনাকে গ্রেপ্তার করেছিল।
ভারমিউলেন: হ্যাঁ, পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছিল আমাকে। ঘটনা ঘটার পর তো জেলে নিয়েই ঢোকাল, এরপর জামিনে বেরিয়ে আসি। তিন দিন ছিলাম জেলে। দেড় বছরের মতো মামলা লড়েছি। অসুস্থতার সপক্ষে ডাক্তারি কাগজপত্র দেখিয়েছি আদালতে। অস্ট্রেলীয় যে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আমার অস্ত্রোপচার করেছেন, জিম্বাবুয়েতে যে মনোবিদ আমাকে দেখতেন তাঁরা অনেক সাহায্য করেছেন।
জেলজীবন কেমন ছিল?
ভারমিউলেন: (হেসে) দীর্ঘ তি-ন দিন...। অনেক বড় পরীক্ষা ছিল সেটা। চরিত্র গঠনের সময়ও বলতে পারেন। কেউ তো আর এ ধরনের জায়গায় শখ করে যেতে চায় না। তবে ওখানে থাকা আসামিদের মধ্যে খুব বেশি মানুষ আমাকে চিনতে পারেনি। দু-একজনকে পেয়েছি যারা আমাকে ক্রিকেটার হিসেবে চিনত। অন্যরা ক্রিকেটের খোঁজখবর রাখত বলে মনে হয়নি।
ক্রিকেটে এলেন কীভাবে?
ভারমিউলেন: আমার বয়স তখন আট-দশ হবে। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে টেলিভিশনে অস্ট্রেলিয়ার খেলা দেখতে বসলাম। খেলাটাকে কী কারণে জানি ভালো লেগে গেল তখন। এর পরই আমি জীবনে প্রথম ক্রিকেট খেলি। নিছকই উত্তেজনার বশে ব্যাট হাতে নিয়েছিলাম। ভালো লাগা থেকেই শুরু।
আপনি নিজেই বলেন ক্রিকেট আপনার জীবন। এখন কি মনে হয় না সে জীবনের আসল সময়টাই হারিয়ে গেছে?
ভারমিউলেন: অবশ্যই... এর আগে সর্বশেষ খেলেছি পাঁচ বছর হয়ে গেছে। পাঁচ বছর অনেক সময়। অনেক ক্রিকেটই আমি মিস করেছি। কিন্তু অতীত নিয়ে ভেবে তো আসলে কোনো লাভ নেই। আমার বয়স এখন ৩০ বছর... চেষ্টা করলে আরও অনেক বছর খেলতে পারব।
ব্যক্তিগত জীবনের কথা বলুন। কে কে আছে পরিবারে?
ভারমিউলেন: এখনো একাই আছি। তবে একসময় কেউ একজন ছিল আমার...। ২০০৬ সালের ওই ঘটনার মাসখানেক আগে তার সঙ্গে সম্পর্ক হয়। আর ঘটনা ঘটার পর সে সম্পর্ক ছুটে গেল। এখন অবশ্য ওসব নিয়ে ভাবি না। আগে ক্যারিয়ারটা দাঁড় করাতে চাই। রান-টান করে যদি দলে জায়গা করে নিতে পারি, সুখী হব তখনই। তবে এমনিতে জীবনটা ভালোই উপভোগ করছি।
জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটে কঠিন সময় যাচ্ছে। আপনার কি মনে হয় আবার আগের অবস্থানে ফেরা সম্ভব?
ভারমিউলেন: এটা ঠিক কঠিন একটা সময় যাচ্ছে আমাদের। অস্ট্রেলিয়ার দিকে তাকান... চার-পাঁচজন ক্রিকেটার অবসরে চলে যাওয়ার পরই তারা আর আগের মতো নেই। আর জিম্বাবুয়ে তো একসঙ্গে ১৫-২০ জন ক্রিকেটারকে হারাল! তবে এখন আবার সবকিছু সঠিক পথে এগোচ্ছে। জিম্বাবুয়েতে অনেক প্রতিভা আছে। তাদের তুলে আনতে হবে। এত দিন এই প্রতিভাদের প্রতি সুবিচার করা হয়নি।
পুরোনো অনেকেই তো আবার বিভিন্ন ভূমিকায় ফিরে আসছেন জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটে।
ভারমিউলেন: এটা ভালো লক্ষণ। অভিজ্ঞ লোকদের দরকার আছে। তাদের কাছ থেকে নতুনেরা অনেক কিছু শিখতে পারবে। মনে আছে আমি যখন প্রথম জিম্বাবুয়ে দলে আসি কোচ আমাকে বললেন, ‘অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের কাছে যাও। তার সঙ্গে কথা বলে জেনে নাও স্পিন বলে কীভাবে খেলতে হয়।’ নিজের চোখে কাউকে খেলতে দেখে তার কাছ থেকে শেখা অন্য জিনিস। আপনি তখন আরও বেশি জানবেন, নিজেকে তার সঙ্গে মেলাতে পারবেন। আমাদের তরুণদের সামনে এখন এই সুযোগটা নেই।
এখানে অনেককেই বলতে শুনেছি আপনি খুব রাগী। কিন্তু এতক্ষণ কথা বলে তো উল্টোটাই মনে হলো! বাইরে এই ভুল প্রচার কেন?
ভারমিউলেন: মানুষ আসলে আপনার বিপক্ষের জিনিসটাই বেশি নেবে। আপনি যদি ইন্টারনেটে আমার নাম টাইপ করেন, প্রথমেই ভেসে আসবে আমার হাতকড়া পরা ছবি আর আগুন লাগানোর গল্প। দুর্ভাগ্যজনকভাবে মানুষের কাছে এখন আমার এটাই ভাবমূর্তি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমিও চাই জীবনটাকে উপভোগ করতে, হাসতে, মানুষের সঙ্গে মিশতে।

বোলিং মাইলফলক ব্যাটিংয়ে উদ্যাপন

সাকিবের হাতে এখন সোনা ফলছে।
ব্যাট হাতে নিলে পাচ্ছেন রান আর
বল হাতে উইকেট।কাল ক্যারিয়ারের
তৃতীয় ওয়ানডে সেঞ্চুরির পর
দলের সূচনাটা ভালো হয়েছিল বলেই ব্যাটিং অর্ডারে নিজেকে এক ধাপ ওপরে তুলে এনেছিলেন। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে চেয়েছিলেন, তা-ই দিলেন সাকিব আল হাসান। রান-ছয়ের ফুলঝুরি ছুটিয়ে ৬৪ বলে ১০৪ রান। ৪৭তম ওভারের প্রথম বলে রান আউটের দুর্ভাগ্যে কাটা না পড়লে ইনিংসটি নিশ্চিত আরও ঝলমলে হয়।
যা হয়েছে, সেটিই বা কম কী! মাত্র ৬৩ বলে সেঞ্চুরি, ওয়ানডে ক্রিকেটে ২৮৭১ ম্যাচের ইতিহাস এর চেয়ে কম বলে সেঞ্চুরি দেখেছে মাত্র ৭টি। ওয়ানডেতে সাকিবের তৃতীয় সেঞ্চুরি, অধিনায়কের ভূমিকায় প্রথম। যেটিকে বলা যেতে পারে, বোলিংয়ে নতুন মাইলফলক ছোঁয়াটাকে ব্যাটিংয়ে উদ্যাপন। আগের দিনই ওয়ানডে বোলারদের র্যাঙ্কিংয়ে উঠে এসেছেন দুই নম্বরে, পরদিন এই ঝোড়ো সেঞ্চুরি—সাকিব আল হাসান জানিয়ে দিলেন ব্যাটিং-বোলিং দুটিই তাঁর সমান আদরের। অলরাউন্ডারদের তো এমনই হতে হয়!
গত কিছুদিনে সাফল্যের স্বাদ পেয়েছেন অনেক, কালকের দিনটি তবু অন্য রকম হয়ে থাকবে সাকিবের কাছে। তিন অঙ্ক ছোঁয়া যেকোনো ব্যাটসম্যানের জন্যই আরাধ্য, সেটি যদি হয় ইতিহাসের দ্রুততম সেঞ্চুরিগুলোর একটি, তাহলে তো কথাই নেই। আমস্টেলভিনে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সনাত্ জয়সুরিয়ার করা ৬৪ বলের সেঞ্চুরিকে ৯ নম্বরে ঠেলে দিয়ে সাকিবের ৬৩ বলের সেঞ্চুরি এখন ওয়ানডে ইতিহাসের অষ্টম দ্রুততম।
বেশ কিছুদিন ধরেই ব্যাটে-বলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম সাকিব। গত বছরের শেষে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ থেকে ওয়ানডেতে ১৫ ইনিংসে ৪৫.৫০ গড়ে তাঁর রান ৫৪৬, কালকের সেঞ্চুরি ছাড়াও আছে ৫টি হাফ সেঞ্চুরি। এ সময়ে উইকেট নিয়েছেন ২৪টি। মাঠের পারফরম্যান্সের প্রতিফলন স্বাভাবিকভাবেই পড়েছে র্যাঙ্কিংয়েও। আইসিসি র্যাঙ্কিংয়ে টেস্ট এবং ওয়ানডেতে ব্যাটসম্যান-বোলার-অলরাউন্ডার, প্রতিটি বিভাগেই বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে সবচেয়ে ওপরে তাঁর নাম। বছরের শুরু থেকেই ওয়ানডের অলরাউন্ডারদের র্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বরে। বোলিংয়ে এখন দুই নম্বর, ব্যাটিংয়ে আছেন ২৯ নম্বরে। এটি কালকের ওই মহাকাব্যিক ইনিংস খেলার আগের হিসাব, সেরা দশেও নিয়ে আসতে পারে এই ৬৪ বলে ১০৪। টেস্ট বোলিংয়ে ২১ ও ব্যাটিংয়ে ৪৫ নম্বরে, কিন্তু অলরাউন্ডারদের র্যাঙ্কিংয়ে ঠিকই আছেন সেরা পাঁচে (৪ নম্বরে)। এসবের সঙ্গে দলের অন্যতম সেরা ফিল্ডারও তিনি, এ তথ্যটি যোগ করলে যা পাওয়া যায়, সেটি একজন পরিপূর্ণ অলরাউন্ডারের প্রতিচ্ছবি।
এর সঙ্গে হঠাত্ পাওয়া অধিনায়কত্বের চাপটাও বিবেচনায় নিলে সাকিবের কৃতিত্বটা আরও বাড়ে। চাপ! কিসের চাপ? ‘চাপ’ বলে কোনো শব্দই যেন নেই সাকিবের অভিধানে। এর প্রমাণ ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর থেকেই দিতে শুরু করেছেন। দিচ্ছেন জিম্বাবুয়েতেও। ‘অধিনায়ক সাকিবে’র চাপে ‘অলরাউন্ডার সাকিব’-এর হারিয়ে না যাওয়াটাকেই বলতে পারেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য স্মরণকালের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। পরিসংখ্যানেও প্রমাণ—অধিনায়ক হওয়ার পর ৫টি ওয়ানডে ম্যাচের ৪ ইনিংসে ১টি সেঞ্চুরি ও ২টি হাফ সেঞ্চুরি। উইকেট নিয়েছেন ৬টি।
ব্যাটিংয়ের সময় কাল রানার চেয়েও পাননি প্রতিপক্ষ অধিনায়কের আপত্তিতে। এই ক্ষোভ থেকেই এমন ধুন্ধুমার ব্যাটিং কি না, কে জানে। তবে এটাই যদি সত্যি হয়, পুরো সিরিজে তাঁকে নিশ্চয়ই আর খেপাতে চাইবেন না প্রসপার উতসেয়া!

মালয়েশিয়ান পাম অয়েলের কুইজের পুরস্কার বিতরণ

মালয়েশিয়ান পাম অয়েল কাউন্সিল আয়োজিত সেল ফোন/ ওয়েবসাইটভিত্তিক সাপ্তাহিক কুইজ প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ করা হয়েছে। ডিজিটাল কারিগরি প্রযুক্তি ব্যবহার করে বছরব্যাপী এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে মালয়েশিয়ান পাম অয়েল কোম্পানি।
রাজধানীর একটি হোটেলে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে এ কুইজ প্রতিযোগিতার গত এপ্রিল থেকে জুলাই পর্বের বিজয়ীদেরকে পুরস্কার দেওয়া হয়। এতে কারিগরি সহযোগিতা দেয় নেক্সট নেট লিমিটেড।
পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মালয়েশিয়ান হাইকমিশনার জামালউদ্দিন সাবেহ। বিশেষ অতিথি ছিলেন সাইম ডার্বি প্ল্যান্টেশন এসডিএন বিএইচডি, মালয়েশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক দাতো আজহার আবদুল হামিদ ও বোর্ড সদস্য দাতো হেনরি বার্লো। এ ছাড়া মালয়েশিয়ান পাম অয়েল কাউন্সিলের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক এ কে এম ফখরুল আলমসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
গত জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত এই প্রতিযোগিতায় তিন লক্ষাধিক প্রতিযোগী অংশ নেয়।

ক্ষুদ্রঋণের সুদ আরও কমানো সম্ভব- আইএনএমের কর্মশালায় অভিমত

দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বের হতে বড় ধরনের অস্ত্র ক্ষুদ্রঋণ। তবে এর সুদের হার নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে। অর্থনীতিবিদেরা এ বিষয়ে একেক ধরনের মত দেন। তবে তাঁরা এ-ও বলেন, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সুদের হার কমেছে। ভবিষ্যতে তা আরও কমানো সম্ভব।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর পিকেএসএফ ভবনে ইনস্টিটিউট অব মাইক্রোফিন্যান্স এবং মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্ষুদ্র ঋণের সুদের হার ও স্বচ্ছতা’ শীর্ষক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব অভিমত তুলে ধরেন।
এতে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আর বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান।
আইএনএমের চেয়ারম্যান ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সঞ্চালনায় এতে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক এম এ বাকী খলীলী। অন্যান্যের মধ্যে এমআরএর ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাজহারুল হক, পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মেজবাহউদ্দিন আহমেদ, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা মাইক্রোফিন্যান্স ট্রান্সপারেন্সির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চাক ওয়াটারফিল্ড বক্তব্য দেন।
‘দারিদ্র্য দূরীকরণে ক্ষুদ্রঋণ বড় ধরনের অস্ত্র’ বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেন, দারিদ্র্যের সঙ্গে নিত্য যুদ্ধ চলছে। এ যুদ্ধে জয়ী হতে হলে ক্ষুদ্রঋণ বড় একটি অস্ত্র, তবে একমাত্র অস্ত্র নয়। তার সঙ্গে অবশ্য মানবসম্পদের উন্নয়নও দরকার।
ক্ষুদ্রঋণের সঙ্গে যুক্তদের সুদখোর বলার খুব বেশি যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ক্ষুদ্রঋণের যত বেশি প্রসার হয়েছে, সুদের হার তত কমেছে। আর উত্পাদন থাকলে ঋণ থাকবেই। ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, চলতি মূলধন ছাড়া তারা কিছুই করতে পারে না।
অর্থমন্ত্রী এক সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে অন্য সংস্থার ঋণ পরিশোধ করার যে প্রবণতা গড়ে উঠেছে, তা রোধ করা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেন।
আতিউর রহমান বলেন, ক্ষুদ্রঋণ না থাকলে গ্রাম থেকে মানুষ দলে দলে শহরে এসে ভিড় জমাত।
তিনি বলেন, দেশের ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার থেকে অনেক দূরে। অথচ তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচ কমাতে সহায়তা করবে।
গভর্নর আরও বলেন, ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। বিশেষ করে এর সুদের হার নিয়ে অর্থনীতিবিদেরাও একমত হতে পারছেন না। তবে যাঁরা সুদের হার বেশি বলে অভিযোগ করে থাকেন, তাঁদের উচিত প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক খরচ, মূল্যস্ফীতি ও টাকার অবমূল্যায়নকে বিবেচনায় নেওয়া।
অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ব্যাংকের বড় ঋণখেলাপিদের সুদ মওকুফ করা হলে ব্যাংক প্রকৃতপক্ষে কত সুদ পায় তা বোঝা যায় না। স্বচ্ছতার খাতিরেই তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের কাছে প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা এবং মহাজনী অর্থলগ্নি সুদের ব্যবসা থেকে ক্ষুদ্রঋণের পরিচয়কে আলাদা করার স্বার্থেই সুদের হার সম্পর্কে স্বচ্ছতার দরকার রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সবাই জানেন সাড়ে ১২ শতাংশ সুদ মানে প্রকৃত সুদ দ্বিগুণ বা ২৫ শতাংশ। সাপ্তাহিক কিস্তির বদলে এখন ষান্মাসিক কিস্তিও চালু। সুতরাং বার্ষিক কার্যকর সুদের হার কত তা বের করার উপায় বের করতে হবে। পিকেএসএফ থেকেও তা সমর্থন করা হচ্ছে।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ক্ষুদ্রঋণের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এর সুদের হার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। সামনে আরও কমানো সম্ভব। তবে সুদের হার নিয়ে লুকোচুরির কোনো কারণ নেই।
পিকেএসএফের এমডি কাজী মেজবাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অল্প টাকা দিয়ে শুরু করা ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম এখন মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ক্ষুদ্রঋণ অর্থনীতির প্রকৃত খাতকে স্পর্শ করে না—এমন ধারণা বর্তমানে অচল বলে মনে করেন তিনি।

রাজশাহীতে শেয়ার ব্যবসা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, তবে সমস্যাও বাড়ছে

রাজশাহীতে শেয়ার ব্যবসা দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও সরকারি প্রতিষ্ঠান আইসিবির অনলাইন ডিসপ্লে বা লেনদেনের চিত্র প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে। প্রতি ঘণ্টায় চার থেকে পাঁচবার কম্পিউটার বন্ধ হয়ে যায়, তাই সময়মতো দাম দেখে শেয়ার কেনাবেচা করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ ক্রেতা-বিক্রেতাদের।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) রাজশাহী শাখা সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনই শেয়ারবাজারে স্থানীয় বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে লেনদেনের পরিমাণও। গত তিন বছরে রাজশাহীতে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বেড়ে বর্তমানে প্রায় ১১ হাজারে দাঁড়িয়েছে। এখানে শেয়ার লেনদেন হয় পাঁচ থেকে সাত কোটি টাকার।
জানা গেছে, রাজশাহীতে ১৯৮৪ সালে আইসিবির শাখা খোলা হয়। এখানে আইসিবির সঙ্গে প্রায় পাঁচ হাজার বিনিয়োগকারী শেয়ার কেনাবেচা করে থাকেন। কিন্তু ডিসপ্লে বোর্ড বারবার বন্ধ হয়ে যায় বলে বিনিয়োগকারীরা তাত্ক্ষণিকভাবে শেয়ারের দর দেখে কেনাবেচা করতে পারছেন না। ফলে তাঁদের আর্থিক ঝুঁকি নিয়েই লেনদেন করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের অনেকেই ঝুঁকে পড়েছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে।
এ ছাড়া বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে নতুন টার্মিনালের দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন।
বিনিয়োগকারীদের দাবির মুখে সম্প্রতি আইসিবি কর্তৃপক্ষ নগরের গাফ্ফার প্লাজায় নতুন টার্মিনাল চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে নতুন টার্মিনালটির অবকাঠামোগত কাজ শেষে সাজসজ্জার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
আগামী মাসের প্রথম দিকেই নতুন ট্রেডিং টার্মিনালটি চালু করা সম্ভব হবে বলে রাজশাহী আইসিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সরকারি প্রতিষ্ঠান আইসিবি ও এর সহযোগী দুটি প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড এবং আইসিবি সিকিউরিটিজ ট্রেডিং লিমিটেডের মাধ্যমে প্রায় ১১ হাজার বিনিয়োগকারী রয়েছেন।
আইসিবি সিকিউরিটিজ ট্রেডিং লিমিটেডের অনলাইন ডিসপ্লে বোর্ড রয়েছে মাত্র একটি। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত ডিসপ্লে বোর্ড দেখে শেয়ার কেনাবেচা করেন বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু জায়গাটি অপরিসর বলে ঠাসাঠাসি পরিবেশেই লেনদেন করতে হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের। ফলে বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারের খোঁজখবর নিয়ে সময়মতো কেনাবেচা করতে পারছেন না।
অন্যদিকে, সরকারি অন্য দুটি প্রতিষ্ঠানে ডিসপ্লে বোর্ড না থাকায় বিনিয়োগকারীরা ভিড় করছেন আইসিবি সিকিউরিটিজ ট্রেডিংয়ের ডিসপ্লে বোর্ডের সামনে। স্থান সংকুলানের অভাবে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের।
খুদে বিনিয়োগকারী শরীফ মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, ‘আইসিবির ডিসপ্লে বোর্ড তিন-চার ঘণ্টার মধ্যে ১০-১৫ বার বন্ধ হয়ে যায়। কীভাবে রেট বাড়ছে তা দেখে কেনাবেচা করা যায় না।’
এদিকে আইসিবির রাজশাহী কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মাহমুদ মিজানুর রহমান জানান, ডিসপ্লে বোর্ডের ব্যাপারে তাঁদের কিছু করার নেই। কারণ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সঙ্গে এ বিষয়ে এক্স-নেট এবং র্যাংক্স আইটির চুক্তি হয়েছে। তারাই বিষয়টি বলতে পারবে।
আর আইসিবির ট্রেডিং টার্মিনালে জায়গার স্বল্পতার ব্যাপারে তিনি বলেন, আইসিবি কর্তৃপক্ষ বৃহত্ পরিসরে একটি নতুন টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে, যেটি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই চালু হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবিলায় চুক্তি না করলে পরিণতি হবে ভয়াবহ

জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবিলায় বিশ্বনেতারা যদি একটি কার্যকর চুক্তিতে না পৌঁছাতে না পারেন, তাহলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। তিনি বলেন, ‘বিশ্বনেতারা চাইলে এই বিপর্যয় এড়াতে পারেন। তবে সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবিলায় আমাদের সামর্থ্য আছে। এখনই তা কাজে লাগাতে হবে।’
জাতিসংঘ মহাসচিব গতকাল মঙ্গলবার দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচিয়ন শহরে এক পরিবেশবিষয়ক ফোরামে এই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন। তিনি ১০ দিনের ব্যক্তিগত সফরে বর্তমানে তাঁর নিজের দেশে অবস্থান করছেন। ১৮ আগস্ট তিনি নিউইয়র্কে ফিরে যাবেন।
আগামী ডিসেম্বরে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে বিশ্বনেতারা গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন হ্রাসের ব্যাপারে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবেন বলে জাতিসংঘ আশা করছে।
বান কি মুন বলেন, ‘কোপেনহেগেনের ওই সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে আমাদের অবশ্যই একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে, যা আমাদের সবার অভিন্ন ভবিষ্যত্ রক্ষা করবে।’

ফাতাহর নেতৃত্বে নতুন প্রজন্মের নেতারা

ইসরায়েলি কারাগারে আটক এক জঙ্গি নেতাসহ নতুন প্রজন্মের নেতাদের দলের নেতৃত্বে নিয়ে এসেছেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের ফাতাহ দলের প্রতিনিধিরা। ২০ বছরের মধ্যে দলটির প্রথম প্রতিনিধি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো।
গতকাল মঙ্গলবার ফাতাহ কর্মকর্তারা জানান, মারওয়ান বারগুতি ফাতাহ দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। জনপ্রিয় এই ফিলিস্তিনি নেতা ইসরায়েলি কারাগারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন। ২০০৪ সালে ইসরায়েলে পাঁচটি ভয়াবহ হামলায় জড়িত থাকার দায়ে তাঁকে এই দণ্ড দেওয়া হয়। তিনি পশ্চিম তীরে ফাতাহর মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও কখনোই কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন না।
২১ সদস্যের এই শক্তিশালী কমিটিতে রয়েছেন সাবেক ফিলিস্তিনি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রধান জিবরিল রাজুব এবং গাজায় ফাতাহর লৌহমানব মোহাম্মদ দাহলান।
শীর্ষ ফিলিস্তিনি আলোচক আহমেদ কোরেই কেন্দ্রীয় কমিটিতে তাঁর জায়গা হারিয়েছেন। আগের কেন্দ্রীয় কমিটির মাত্র তিনজন নেতা বর্তমান কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। ১২০ সদস্যের বিপ্লবী পরিষদেও নতুন নেতাদের প্রাধান্য।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের বেথলেহেম শহরে ফাতাহর প্রতিনিধি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় দুই হাজার প্রতিনিধি ভোট দিয়ে দলের নেতৃত্ব নির্বাচন করেন। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে এই প্রথম দলটির প্রতিনিধি পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো।
গত শনিবার মাহমুদ আব্বাসকে দলের প্রধান হিসেবে পুনর্নির্বাচিত করা হয়। ২০০৪ সালে ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যুর পর থেকেই তিনি এই দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

সাড়ে ছয় লাখ উট হত্যা করবে অস্ট্রেলিয়া

নিরীহ প্রাণী উটও আধুনিক সভ্যতার নিষ্ঠুরতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার মরু এলাকা আউটব্যাকে সাড়ে ছয় লাখের বেশি উট মেরে ফেলার পরিকল্পনা নিয়েছে সে দেশের সরকার। এ জন্য তারা আড়াই কোটি ডলারের বাজেটও ঘোষণা করেছে।
আউটব্যাকে উটের সংখ্যা অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় সেখানকার মানব বসতিগুলোয় পানি ও খাদ্যের সন্ধানে উত্পাত করছে প্রাণীগুলো। স্থানীয় বাসিন্দারা এ বিষয়ে সরকারের কাছে অভিযোগ করায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান সরকারি কর্মকর্তারা। হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে উটগুলোকে হত্যা করা হবে। তবে অস্ট্রেলীয় সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন পশুপ্রেমীরা।
আউটব্যাকের স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, উটগুলো পানির সন্ধানে সেখানকার আদিবাসীদের বাড়িঘরে ঢুকে পড়ছে, পানির পাইপ ভেঙে ফেলছে, স্নানঘরের ভেতর ঢুকে পড়ছে, কমোড ভেঙে ফেলছে। প্রতি আট থেকে নয় বছরে সেখানে উটের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় উটের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ।
অস্ট্রেলিয়ার মরু অঞ্চলে মালামাল বহনের জন্য ১৮৪০ সালে অভিযাত্রীরা অস্ট্রেলিয়ায় উট আনেন। এর পর থেকে সেগুলো সেখানে বাস করছে এবং বংশবৃদ্ধি করছে।
উটের সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় এখন সেগুলো অস্ট্রেলীয় সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই নিধনের মাধ্যমে উটের সংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। এ ব্যাপারে ক্যানবেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনভাসিভ অ্যানিমেলস কো-অপারেটিভ রিসার্চ সেন্টারের প্রধান নির্বাহী টনি পিকক বলেন, হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে উট হত্যার বিষয়টি নিষ্ঠুরতা মনে হলেও, আসলে এটিই বরং অনেক বেশি মানবিক।
তবে এ সিদ্ধান্তের বিরোধীরা বলছেন, হত্যা করে সংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা এ সমস্যার একটি স্বল্পমেয়াদি সমাধান। পশুপ্রেমীরা এ সমস্যা সমাধানে উটের জন্মনিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি মাংসের জন্য বাণিজ্যিকভাবে উটের খামার করার পরামর্শ দিয়েছেন অনেক উদ্যোক্তা।
ওয়াইল্ড লাইফ প্রিজারভেশন সোসাইটি অব অস্ট্রেলিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্ক পিটারসন বলেন, হাজার হাজার উট ধরে সেগুলো রপ্তানি করার পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত নয়। বরং সেগুলোর জন্মনিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা যেতে পারে।
অস্ট্রেলীয় সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চার বছর ধরে এসব উট হত্যা করা হবে।
আউটব্যাক অঞ্চলে উটের উত্পাতে সেখানকার সম্পত্তির মালিক ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের বছরে এক কোটি ৪০ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়।

তাইওয়ানে ভূমিধসে শত শত মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা

তাইওয়ানে টাইফুন মোরাকটের ফলে সৃষ্ট ভূমিধসে শত শত মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ছাড়া বন্যায় কমপক্ষে ৪১ জনের মৃত্যু ও ৬০ জন নিখোঁজ রয়েছে। এদিকে চীনের পূর্বাঞ্চলে ভূমিধসে সাতটি ভবন বিধ্বস্ত হয়েছে। ভবনের ধ্বংস্তূপের নিচে ২৮টি পরিবার চাপা পড়েছে। এদিকে জাপানে টাইফুন এতায়ুর আঘাতের ফলে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে কমপক্ষে ১৩ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৪৩ জন। খবর এএফপি, বিবিসি ও এপির।
তাইওয়ান কর্তৃপক্ষ গতকাল মঙ্গলবার জানায়, দক্ষিণাঞ্চলের সিয়াও লিনের প্রত্যন্ত গ্রামে গত রোববার সকালে ভয়াবহ ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। গ্রামটিতে এক হাজার ৩০০ বাসিন্দা ছিল। এ পর্যন্ত ২৬০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, সে সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। ভূমিধস ও বন্যায় গ্রামটির সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সেনাবাহিনী উদ্ধার তত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার ওই অঞ্চলের আকাশে চক্কর দিচ্ছে। সেখান থেকেই আটকেপড়া মানুষদের খোঁজা হচ্ছে। হেলিকপ্টার থেকে জনগণের জন্য খাবারের প্যাকেট ফেলছেন সেনাসদস্যরা। কিন্তু ভূমিধসের ফলে বিপজ্জনক হওয়ায় হেলিকপ্টার সেখানে অবতরণ করতে পারছে না।
স্থানীয় বাসিন্দা লিন চিয়েন-চাং জানান, পাহাড়ের একটি অংশ ধসে পড়ে ৬০০ জনেরও বেশি মানুষ মাটিচাপা পড়েছে ধারণা করা হচ্ছে। ভূমিধসে গ্রামের বেশির ভাগ অংশই চাপা পড়েছে। তবে ঠিক কতজন চাপা পড়েছে, কর্তৃপক্ষ তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানায়, টাইফুন মোরাকটের প্রভাবে গত সোমবার রাতে ঝিজিয়াং প্রদেশের পেংজিতে ভূমিধসে সাতটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ধসে পড়ে। এতে ওই ভবনের ২৮টি পরিবার ধ্বংস্তূপের নিচে চাপা পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে দুজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া জীবিত ছয়জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। উদ্ধারকাজ চলছে।
টাইফুন মোরাকটের ফলে সৃষ্ট বন্যায় চীনের শত শত গ্রাম ও শহর প্লাবিত হয়েছে। এতে ছয় হাজারেরও বেশি বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। দেশটির দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে ভারী বর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। ওই অঞ্চলের ১০ লাখ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার জাপানে টাইফুন এতায়ুর প্রভাবে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসের পর সেনাবাহিনী উদ্ধার তত্পরতা শুরু করেছে। বন্যায় সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে সাওতে। এখানেই ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে অন্তত ১৮ জন। আটকেপড়া মানুষদের উদ্ধারে সেনাবাহিনীর ৪০০ সদস্য অংশ নিয়েছেন।

পাকিস্তানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে তিনবার হামলা চালিয়েছে সন্ত্রাসীরা

গত দুই বছরে পাকিস্তানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে কমপক্ষে তিনবার হামলা চালিয়েছে দেশটির চরমপন্থী সন্ত্রাসীরা। তবে এসব হামলার ঘটনা প্রকাশ পায়নি।
যুক্তরাজ্যের ব্রাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শন গ্রেগরি পরমাণু স্থাপনাগুলোতে হামলার ঘটনাগুলো চিহ্নিত করেছেন। অধ্যাপক গ্রেগরি পাকিস্তান সিকিউরিটি রিসার্চ ইউনিটের প্রধান। তিনি জানান, প্রথম হামলাটি ঘটে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর। ওই দিন সারাগোদায় পাকিস্তানের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ কেন্দ্রে হামলা চালানো হয়। ২০০৭ সালের ১০ ডিসেম্বর কামারায় পরমাণু বিমানঘাঁটিতে দ্বিতীয় হামলাটি চালায় এক আত্মঘাতী হামলাকারী। সবচেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ হামলাটি চালানো হয় ২০০৮ সালের ২০ আগস্ট। সেদিন ওয়াহ সেনানিবাসের একটি অস্ত্রাগারের বেশ কয়েকটি প্রবেশপথ উড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি তালেবানের আত্মঘাতী জঙ্গিরা। ওয়াহ সেনানিবাসকে পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান পরমাণু অস্ত্রাগার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অধ্যাপক গ্রেগরি বলেন, সম্ভাব্য হামলা, বিশেষ করে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে যেকোনো সম্ভাব্য হামলা থেকে নিজেদের পরমাণু অস্ত্র নিরাপদ ও সুরক্ষিত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে পাকিস্তান। কিন্তু তা সত্ত্বেও এসব হামলা হয়েছে।
পাকিস্তান বারবার বলে আসছে, তাদের পরমাণু অস্ত্র পুরোপুরি নিরাপদ। চরমপন্থী বা সন্ত্রাসীদের হাতে সেগুলো পড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
অধ্যাপক গ্রেগরি বলেন, পাকিস্তানের প্রধান পরমাণু স্থাপনাগুলো যেসব এলাকায় অবস্থিত, ওই সব এলাকায় আল-কায়েদা ও তালেবানের আধিপত্য রয়েছে। তিনি বলেন, সত্তর ও আশির দশকে পাকিস্তান যখন পরমাণু স্থাপনাগুলো তৈরি করছিল তখন দেশটির প্রধান উদ্বেগ ছিল, স্থাপনাগুলো যদি পাক-ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় স্থাপন করা হয় তাহলে যেকোনো সংঘাতের সময় এতে হামলা চালাতে পারবে ভারত। যার ফলে কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া পরমাণু স্থাপনা গড়ে তোলার জন্য দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলকে বেছে নেয় পাকিস্তান। পাকিস্তানের অধিকাংশ পরমাণু স্থাপনাই ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডির আশপাশে গড়ে উঠেছে। ওয়াহ, ফতেহগঞ্জ, গোলরা শরিফ, কাহুতা, সিহালা, ইসা খেল চারমা, তারওয়ানাহ ও তক্ষশিলায় গড়ে তোলা হয়েছে পরমাণু স্থাপনাগুলো।
বহিঃশত্রুর হামলা থেকে নিজেদের পরমাণু অস্ত্র ও স্থাপনা রক্ষা করতে পাকিস্তান যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে সেগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন অধ্যাপক গ্রেগরি। তিনি বলেন, নিজেদের পরমাণু অস্ত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ব্যাপক ব্যবস্থা গ্রহণ করে পাকিস্তান। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রকে অনুকরণ করেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও পরমাণু স্থাপনাগুলোতে হামলা হয়েছে।