Friday, August 3, 2018

আশ্রিত রোহিঙ্গাদের চোখে মুখে অন্ধকার হতাশাই সঙ্গী by কায়সার হামিদ মানিক

যদি অধিকার ফিরে পাই, নিজ দেশ মিয়ানমান ফিরে যাব কথাগুলো বলছিলেন সাবেক শিক্ষক মোহাম্মদ রহিম (৫০)। কুতুপালং উদ্বাস্তু শিবিরের একটি ছোট্ট গলিতে তার বসবাস। সেখানে তিনি পান-সুপারি বিক্রি করেন। বললেন, ‘তবে আমার প্রথম প্রয়োজন ন্যায়বিচার।’
১৯৮০’র দশকে তৎকালীন মিয়ানমারের সেনাশাসিত জান্তা সরকার এক আইনের বলে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়। কয়েক প্রজন্ম ধরে রাখাইনে বসবাস করে এলেও তাদেরকে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী বলে চিহ্নিত করে চালানো হয় কাঠামোবদ্ধ সেনা প্রচারণা। ধাপে ধাপে সেখানকার মানুষদের মাঝে রোহিঙ্গাবিদ্বেষী মনোভাব গড়ে তোলা হয়।
সর্বশেষ গত বছর নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনে সহিংসতা জোরালো করলে বাংলাদেশ পালিয়ে আসে লাখ লাখ রোহিঙ্গা।
সহিংস দমন অভিযানের ১১ মাস পর বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোতে বসবাসরত উদ্বাস্তুরা এখন তাদের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবছে। যদিও তারা মিয়ানমারের নৃশংসতা থেকে পালিয়ে এসে এখন বাংলাদেশে আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে, কিন্তু অনেকেই বাড়ি ফেরা নিয়ে কথা বলছে।
আন্তর্জাতিক চাপে এসব রোহিঙ্গাকে ফেরাতে গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করলেও এখনও একজন রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে নেয়নি। এমন বাস্তবতায়, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে গত মে মাসের শেষ নাগাদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
চুক্তিটি গত ২৯ জুন ফেসবুকে ফাঁস হয়ে যায়। এরপর থেকে রোহিঙ্গা নেতারা তা প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। তারা বলছেন, এতে রোহিঙ্গাদের জন্য নাগরিকত্বের নিশ্চিয়তা দেয়া হয়নি। মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের জাতীয় আইনের আওতায় তারা নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত নয়।
আমি উখিয়ার ক্যাম্পগুলোর সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কিছু শুনতে চেয়েছিলাম। এ কারণে তারা ফিরে যেতে কেন আগ্রহী তা জানতে চেয়েছিলাম।
নূর (২২) নামের একজন থাকেন একটি ছোট্ট ঘরে। সাথে থাকেন তার ভগ্নিপতি। তিনি বলেন, ‘আমি আমার ভবিষ্যৎ জানি না। আমি শুনেছি, আমাদেরকে দেশে ছুড়ে ফেলার কথা হচ্ছে। কিন্তু আমার কাছে কোনো নথিপত্র নেই। তার স্বামীকে মিয়ানমারে হত্যা করা হয়েছে। তার নবজাতক সন্তানকেও তিনি বাঁচাতে পারেননি। নূর ৮ বছর বয়সে স্কুল ত্যাগ করেছিলেন। তার সামনে ভবিষ্যত বলে কিছু নেই। তবে তিনি আশা করছেন, তার ছেলে হয়তো পড়াশোনা করতে পারবে।
তিনি বলেন, তাকে স্কুলে পাঠানোর জন্যই আমি ফিরতে চাই। আশা করি, একদিন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারবে। সন্তানরা স্কুলে যেতে না পারার কারণে অনেকেই মিয়ানমারে ফিরে যেতে আগ্রহী।
নাসিম (৪৭) নামের এক নারী, তিনি ৫ সন্তানের মা, বলেন, আমরা এখনো কোনোমতে টিকে আছি। আমি চাই, আমার সন্তানেরা যেন পড়াশোনা করতে পারে।
উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে বসবাসকারী সাত লাখ লোকের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই শিশু। তাদেরকে বাংলাদেশের স্কুলে ভর্তি হতে দেয়া হয়নি। আবার মিয়ানমারও তাদের জাতীয় কারিকুলাম উদ্বাস্তু ক্যাম্পগুলোতে চালানো নিষিদ্ধ করেছে।
ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামে ফিল্ড মনিটরিং এ কর্মরত জয়নাল আবেদীন সুজন বলেন, প্রতি চারটি রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর তিনজনই শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত। একটি প্রজন্ম হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মানে হলো, তিন লাখ ২৭ হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিভিন্ন এনজিও ও জাতিসংঘ পরিচালিত অস্থায়ী স্কুলগুলোতে প্রায় ১,৩৭,০০০ রোহিঙ্গা শিশু ভর্তি হলেও তারা আশঙ্কা করছে, তাদের শিক্ষাকে স্বীকৃতি দেয়া হবে না।
বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জি ব্লকের নুরুল আমিন (৩৫) বলেন, এখানকার শিক্ষা কেন্দ্রগুলো সত্যিকারের স্কুল নয়। এগুলোতে দুই ঘণ্টার জন্য মাত্র পড়াশোনা করানো হয়।
তিনি বলেন, আমি চাই আমার সন্তানেরা স্কুলে গিয়ে যথাযথ শিক্ষা লাভ করুক। তারা যদি আমাদের স্বাভাবিক জীবনের প্রতিশ্রুতি দেয়, আমাদের হত্যা না করার প্রতিশ্রুতি দেয়, তবে আমি আমার পরিবারকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেব। তবে এখন আমি শঙ্কিত। তবে মিয়ানমারের রাখাইনের শিক্ষাব্যবস্থাও করুণ দশায় রয়েছে। রাখাইনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মুসলিম ছাত্রদের ভর্তি হওয়া অসম্ভব ব্যাপার। তাছাড়া তাদের চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। আর কেউ যদি ভর্তি হতেও পারে, তবে তাকে অনেক অর্থ দিতে হয়।
৩২ বছর বয়স্কা হামিদা বলেন, আমরা সন্তানদের শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করতে পারি না।তারপরও তিনি বলেন, আমি চাই না, আমার সন্তানদের জীবন ধ্বংস হয়ে যাক। তারা বড় হচ্ছে, তাদের শিক্ষার প্রয়োজন। তবে মিয়ানমারে তাদের কখনো স্কুলে ভর্তি নেয়া হবে না। তাহলে কি বাংলাদেশে আপনি ভালো আছেন, আমি জানতে চাইলাম।
হামিদা তার অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে তাকিলে বললেন, আপনার কী তাই মনে হয়?
তিনি বলেন, এখানে আমরা বিদেশী। মিয়ানমার আমাদের আবাসস্থল। তবে সামরিক বাহিনী আমাদের জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে। আমার আর বাড়ি বলে কিছু নেই। তবে তারা যদি আমার জমি আর মূল্যবান সামগ্রী ফিরিয়ে দেয়, শান্তিতে বাস করার সুযোগ দেয়, তবে আমি অবশ্যই ফিরে যাব।
জাতিসংঘ প্রত্যাবর্তন চুক্তিতে সাবেক বাড়িঘর ফিরিয়ে দেয়ার নিশ্চয়তা দেয়া হয়নি। ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা যায়, তাদেরকে তাদের বাড়িঘরে কিংবা নিকটতম নিরাপদ স্থানে ফিরিয়ে নেয়া হবে। অনেকে আশঙ্কা করছে, তাদেরকে হয়তো স্থায়ী কোনো ক্যাম্পে রাখা হবে।
শিক্ষার অনুপস্থিতি কেবল একটি বাধা। তারা চায় মর্যাদার সাথে মিয়ানমারে ফিরতে। তাদের বেশির ভাগই বাড়িঘর হারিয়েছে। ফলে তাদের বাড়িঘর ফিরিয়ে না দিলে তারাও ফিরতে পারবে না। এছাড়া রয়েছে ন্যায়বিচার ও ধর্ম পালনের অধিকার।
সাবেক শিক্ষক মোঃ ঈসমাইল বলেন, তারা আমাদের মা-বোনদের ধর্ষণ করেছে। আমাদেরকে ধর্ম পালন করতে দেয়নি। আমরা ধার্মিক মানুষ, আমরা আমাদের ধর্ম অনুসরণ করতে চাই। আমাদের প্রয়োজন জাতীয়তা। তারা যদি এ দুটি অধিকার দেয়, তবে আমি এখনই সোজা ফিরে যাব।ক্যাম্প গুলোতে আমি যত রোহিঙ্গার সাথে কথা বলেছি,তারা চায়,তাদের অধিকার ও সুরক্ষা প্রদান করা হলে,মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্কীকার করা হলে তারা ফিরে যেতে রাজি।

ইসরাইলি কারাগারে এক ফিলিস্তিনি বন্দির শাহাদাত

উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে ইহুদিবাদী ইসরাইলের কারাগারে আটক একজন ফিলিস্তিনি বন্দি শাহাদাতবরণ করেছেন। ফিলিস্তিনি তথ্যকেন্দ্র জানিয়েছে, হোসেইন হাসানি আতাউল্লাহ নামের ওই বন্দি ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও তাকে মুক্তি দেয়নি ইহুদিবাদীরা।
অন্যদিকে ইসরাইলের বন্দি বিষয়ক এক আইনের কারণে তাকে উপযুক্ত চিকিৎসা সেবাও দেয়নি তেল আবিব। এ অবস্থায় শনিবার আতাউল্লাহ ইসরাইলি কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন।
ফিলিস্তিনি বন্দিদের অন্যতম আইনজীবী ইউসুফ নাসাসারা কিছুদিন আগে আতাউল্লাহ’র শারিরীক অবস্থা জানিয়ে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ইহুদিবাদীরা তার চিকিৎসা করাতে কিংবা তাকে মুক্তি দিতে রাজি হয়নি।
অধিকৃত জর্দান নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত নাবলুস শহরের অধিবাসী আতাউল্লাহ ছিলেন ছয় সন্তানের পিতা। ইসরাইলের একটি আদালত তাকে ৩৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল যার মধ্যে ২১ বছর তিনি ইহুদিবাদীদের জেলখানায় অতিবাহিত করেন।
সম্প্রতি ফিলিস্তিনি বন্দিদের তথ্যকেন্দ্র  জানিয়েছে, ইসরাইলি কারাগারে আটক ১৮৫ অসুস্থ ফিলিস্তিনি বন্দির অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। তাদেরকে হয় উপযুক্ত চিকিৎসা করানো উচিত অথবা মুক্তি দেয়া উচিত যাতে তারা নিজেরাই উন্নত চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারেন।
বর্তমানে ইসরাইলি কারাগারগুলো প্রায় সাত হাজার ফিলিস্তিনি আটক রয়েছেন।

ইসরাইলি কারাগারের দুঃসহ স্মৃতি তুলে ধরলেন অহেদ তামিমি

ফিলিস্তিনের সংগ্রামী তরুণী অহেদ তামিমি ইহুদিবাদী ইসরাইলের কারাগারের দুঃসহ দিনগুলোর কথা প্রকাশ করেছেন। ইরানের প্রেস টিভিকে দেয়া সাক্ষাৎকার তিনি জানিয়েছেন, ইসরাইলের কারাকর্তৃপক্ষ তার হাতে হ্যান্ডকাফ ও পায়ে ডানণ্ডাবেড়ি পরিয়ে রেখেছিল। একই অবস্থা করেছিল তার মাকেও।
১৭ বছর বয়সী অহেদ তামিমি বলেন, “জিজ্ঞাসাবাদের প্রথম থেকেই আমি নানা কষ্টকর পরিস্থিতির মুখে পড়ি। জিজ্ঞাসাবাদকারীরা আমাকে হুমকি দেয় এবং বলে যে, তারা আমার পরিবারের ক্ষতি করবে।”
তামিমি বলেন, “এমনকি একজন জিজ্ঞাসাবাদকারী আমাকে অপদস্ত করে। সে বলেছিল যে, আমার চুল সুন্দর এবং এ ধরনের আরো মন্তব্য করেছে। আমি বয়সে ছোট হলেও জিজ্ঞাসাবাদের সময় আমার কাছে আমার পরিবারের কাউকে থাকতে দেয়া হয় নি।”
এ তরুণী জানান, ১০ জনের সঙ্গে তাকে ছোট্ট একটি সেলে রাখা হয় এবং সেই সেলে মাত্র ছয়টি বিছানা ছিল।
তিনি আরো বলেন, “বেশি লোকজন থাকার কারণে আমি বাথরুম ব্যবহার করতে পারছিলাম না এবং মেয়েরা কারাকক্ষের মেঝেতে ঘুমাতো। সেলের ভেতরে আমরা নড়াচড়া করতে পারতাম না। আমরা হাঁটতে পারতাম না। সেলে বেশি জানালা ছিল না। যখন আমি জেগে উঠতাম তখন মনে হতো আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না।”
গত ডিসেম্বর মাসে অধিকৃত ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে অভিযান চালিয়ে ইসরাইলের বর্বর সেনারা আটক করেছিল ফিলিস্তিনের এ তরুণীকে। সে সময় তামিমি ইসরাইলের দুই সেনার মুখে থাপ্পড় মারেন এবং সেই ভিডিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাইরাল হয়ে পড়ে। ফিলিস্তিনিদের অনেকের কাছেই তিনি এখন মুক্তি সংগ্রামের প্রতীক।
তামিমির বিরুদ্ধে সেনাদের ওপর হামলা, উসকানি দেয়া এবং ইসরাইলি সেনাদের কাজে বাধা দেয়াসহ ১২টি অভিযোগ আনা হয়। ২৯ জুলাই তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। মুক্তির পর তিনি অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেছেন, ইহুদিবাদী ইসরাইলের দখলদারিত্ব অবসানের লক্ষ্যে তিনি সংগ্রাম অব্যাহত রাখবেন।

লাদেন যোদ্ধা ছিলেন না, যুদ্ধে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন: সাবেক সৌদি গোয়েন্দা প্রধান

সাবেক আল-কায়েদা প্রধান নিহত ওসামা বিন লাদেন বিভিন্ন ভিডিও বার্তায় অস্ত্র হাতে হাজির হতেন। তার হাতে থাকতো অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন সিল বাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার প্রায় সাত বছর পর সৌদি আরবের সাবেক গোয়েন্দা প্রধান প্রিন্স তুর্কি আল-ফয়সাল জানান, ওসামা যোদ্ধা ছিলেন না, আফগানিস্তানে একবার যুদ্ধের সময় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি একথা জানিয়েছেন।
১৯৭৭ সাল থেকে ২০০১ সালের ১ সেপ্টেম্বর (৯/১১ হামলার মাত্র দশদিন আগে) পর্যন্ত সৌদি আরবের গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন প্রিন্স ফয়সাল। সম্প্রতি দ্য গার্ডিয়ানের সঙ্গে জেদ্দাতে নিজের ভিলায় কথা বলেন।
ওসামা বিন লাদেন সম্পর্কে প্রিন্স ফয়সাল বলেন, দুজন ওসামা বিন লাদেন রয়েছেন। একজন আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখল শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত। আরেকজন এরপরের। প্রথমজন ছিলেন আদর্শবাদী মুজাহিদ। তিনি যোদ্ধা ছিলেন না। নিজেই (ওসামা) স্বীকার করেছেন, একবার যুদ্ধে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। যখন তিনি জ্ঞান ফিরে পান ততক্ষণে তাদের অবস্থানে সোভিয়েত হামলা পরাজিত হয়েছে।
ওসামা যখন আফগানিস্তান থেকে সুদানে যান তখন সৌদি আরবের সঙ্গে তার সংযোগের কথা আলোচিত হতে থাকে। তখন প্রিন্স ফয়সাল সৌদি আরবের হয়ে ওসামার সঙ্গে কথা বলেন। ৯/১১ হামলার পর ওসামার সঙ্গে প্রিন্সের এই সরাসরি যোগাযোগ গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হয়। হামলার প্রায় ১৭ বছর পর নিউ ইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে নিহত ২,৯৭৬ জন ও আহত ছয় সহস্রাধিক মানুষ বিশ্বাস করেন না যে দেশ রক্ষণশীল চিন্তা-ভাবনার জন্ম দিয়েছে, এই হামলায় তাদের কোনও দায় নেই।
নিশ্চিতভাবেই ওসামা আফগানিস্তানে গিয়েছিলেন সৌদি আরবের সমর্থন নিয়েই। কারণ আফগানিস্তানে সৌভিয়েত দখলের বিরোধিতা করে আসছিল সৌদি আরব। সোভিয়েত দখলের বিরুদ্ধে যারা লড়াই করছিল যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় সৌদি আরব তাদের সমর্থন ও অস্ত্র সরবরাহ করছিল। তরুণ মুজাহিদ ওসামা নিজের সম্পদের সামান্য অংশ সঙ্গে নিয়ে আফগানিস্তানে পাড়ি দেন। প্রভাব বিস্তারে তিনি এই সম্পদ ব্যবহার করেন। কিন্তু যখন তিনি আফগানিস্তান থেকে পুনরায় জেদ্দায় ফিরেন সোভিয়েতকে পরাজিত করে তখন তিনি অন্য মানুষের পরিবর্তিত হয়েছেন।
প্রিন্স ফয়সাল বলেন, ‘১৯৯০ সাল থেকে অনেক বেশি রাজনৈতিক আচরণ গড়ে উঠে ওসামার মধ্যে। তিনি কমিউনিস্টদের উৎখাত করতে চাইছিলেন। ইয়েমেন থেকে দক্ষিণ ইয়েমেনি মার্কসবাদীদের উৎখাত করতে চেয়েছিলেন। আমি তাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলাম। বলেছিলাম এসবের সঙ্গে জড়িয়ে না পড়ার জন্য। ওই সময় জেদ্দার মসজিদগুলো আফগান উদাহরণ তুলে ধরছিল।’ এর মধ্য দিয়ে সৌদি আরবে তালেবানদের আদর্শ ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দেন এই গোয়েন্দা প্রধান। তিনি আরও বলেন, ‘ওসামা সৌদি আরবের মুসল্লিদের উসকানি দিচ্ছিলেন। তাকে এসব থামানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।’
সাবেক সৌদি গোয়েন্দা প্রধান বলেন, ‘ওসামার নির্বিকার মুখ ছিল। তিনি কখনও মুখ বিকৃত করতেন না বা হাসতেন না। ১৯৯২, ১৯৯৩ সালে পাকিস্তানের পেশাওয়ারে নওয়াজ শরিফের সরকার অনেকগুলো বড় বড় বৈঠক আয়োজন করে।’ ওই সময় ওসামাকে আফগান উপজাতি নেতারা শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দিয়েছেন। প্রিন্স ফয়সাল বলে চলেন, বিশ্বের মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান ছিল ওই বৈঠকগুলোতে। একে অপরের গলাকাটা থেকে মুসলিম বিশ্বের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এক বৈঠকে আমি ওসামাকে দেখতে পাই। আমাদের চোখে চোখে দেখা হয়, কিন্তু কথা হয়নি। এরপর তিনি সৌদি আরব যাননি। সুদান চলে যান। সেখানে তিনি মধুর ব্যবসা শুরু করেন এবং একটি সড়ক নির্মাণে অর্থায়ন করেন।
বিদেশে থাকা অবস্থায় ওসামার ধর্মীয় নির্দেশনা বাড়তে থাকে। প্রিন্স ফয়সালের ভাষায়, তিনি সবাইকে ফ্যাক্স করে বিবৃতি পাঠাতেন। খুবই সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তার। পরিবার থেকে তাকে বোঝানোর নিরন্তর চেষ্টা করা হয়েছিল, অনেক প্রতিনিধি পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সবকিছুই ব্যর্থ হয়। সম্ভবত তিনি ভাবছিলেন সরকার তাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছিল না।’
১৯৯৬ সালে লাদেনকে আফগানিস্তানে ফিরিয়ে আনা হয়। প্রিন্স জানান, সৌদি আরব জানত ওসামা একটি বড় সমস্যা এবং তাকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল। তিনি আফগানিস্তানের কান্দাহার যান এবং তৎকালীন তালেবান প্রধান মোল্লা ওমরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। “তিনি (ওমর) বলেন, ‘আমি তাকে (ওসামা) হস্তান্তরের কেউ নই, কিন্তু তিনি আফগান মানুষের জন্য অনেক উপকার করেছেন।’ তিনি বলেন যে ওসামাকে ইসলামি আইনে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে।”
দুই বছর পর ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রিন্স ফয়সাল আবার আফগানিস্তান যান। এবার তাকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যাত হতে হয়। ওমরের সঙ্গে ওই বৈঠকের কথা জানিয়ে প্রিন্স ফয়সাল বলেন, “তখনকার বৈঠকে ওমর ছিলেন একেবারে বদলে যাওয়া এক মানুষ। অনেক বেশি রক্ষণশীল, ঘামছিলেন সারাক্ষণ, যৌক্তিক কারণ না শুনে তিনি (ওমর) বলেন, ‘মুসলিমদের সাহায্যের জন্য যে ব্যক্তি নিজের জীব ন উৎসর্গ করেছেন তাকে আপনারা কিভাবে বিচারের মুখোমুখি করতে চান?’”
আফগানিস্তানের জনগণের ক্ষতি করছেন বলে মোল্লা ওমরকে সতর্ক করে প্রিন্স ফয়সাল চলে যান।
পরের বছর যখন ওসামার পরিবার কান্দাহারে গিয়ে সাক্ষাৎ করে তার কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ওই হামলা চালানো হয়েছিল ওসামার অবস্থানকে টার্গেট করে। তাঞ্জানিয়া ও কেনিয়ায় মার্কিন দূতাবাসে আল-কয়েদার হামলার ঘটনায় পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে এই হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময় পরিবার ওসামার অবস্থান ও খোঁজ তাৎক্ষণিকভাবে পেলেও সৌদি আরব ও পশ্চিমা গোয়েন্দাগুলো পায়নি।
ওয়াশিংটন, লন্ডন ও রিয়াদের কর্মকর্তাদের কাছে বিশ্বের সন্ত্রাসদমনের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন ওসামা। যে ওসামা সৌদি নাগরিকদের হামলায় ব্যবহার করে পশ্চিমা ও পূর্বের সভ্যতার মধ্যে ফাটল ধরান।
এক ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ওসামা ইচ্ছাকৃতভাবেই যে ৯/১১ হামলার জন্য সৌদি নাগরিকদের নির্বাচন করেছেন, এতে কোনও সন্দেহ নেই। তিনি মনে করেছিলেন, এর মধ্য দিয়ে পশ্চিমাদের তার দেশের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো যাবে। ওসামা একটি যুদ্ধের উস্কানি দিতে পেরেছিলেন, কিন্তু ঠিক তিনি যে যুদ্ধ চেয়েছিলেন তা নয়।
সাবেক সৌদি গোয়েন্দা প্রধান দাবি করেন, ৯/১১-এর কয়েক মাসে তার সংস্থার সংগৃহীত তথ্যের মাধ্যমে তারা জানতে পেয়েছিলেন ভয়ংকর কিছুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ২০০১ সালের গ্রীষ্মে আমি মার্কিন, ব্রিটিশ, ফরাসি ও আরবদের একটি সতর্ক বার্তা পাঠাই। আমরা জানতাম কোথায় ঘটবে কিন্তু জানতাম যে কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
সৌদি আরবের কিছু অংশে এখনও জনপ্রিয় ওসামা। তার কাজের প্রশংসা করেন অনেকে। তবে তাদের এই সমর্থনের গভীরতা কতটুকু পরিমাপ কার মুশকিল। ওসামার নিজের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দুই স্ত্রীকে সৌদি আরবে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এদের একজন অ্যাবোটাবাদে নিহতের সময় তার সঙ্গে ছিলেন। দুই স্ত্রী ও তাদের সন্তানরা এখন জেদ্দাতে বাস করছেন।

হঠাৎ চুমু খেতে চাইলেন...

পরির সেটে প্রথম আলাপ তাঁদের। তখন রজত ছিলেন ‘রজত স্যর’ আর এখন তিনি রজত! সময়ের খেলায় হাল এমন যে রজতকে চুমু খেতে চান ঋতাভরী চক্রবর্তী...
কখনও তিনি সিঙ্গল, কখনও কমিটেড, কখনও আবার কমিটেড নন...এ ভাবেই ইচ্ছেমতো জীবনটাকে বেছে নিয়েছেন ঋতাভরী। মন খারাপ হলেই তিনি লিখতে বসেন। আঘাত পেলেই গল্প তৈরি হয় তাঁর মধ্যে, আর সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে নানা রকম ভাবনা। এই ভিন্ন ভাবনার ফসল ছিল ‘নেকেড’ শর্ট ফিল্ম। এখন আবার ‘Hwo about kiss?’ কুড়ি-পঁচিশ মিনিটের এই শর্ট ফিল্মের জন্য নিজেই চিত্রনাট্য লিখেছেন।
‘‘রজতের সঙ্গে আলাপ হওয়ার বেশ কিছু দিন পরে ওকে এই শর্ট ফিল্মের স্ক্রিপ্ট পাঠাই। ওর পছন্দ হয়। সেখান থেকেই কাজের শুরু। মা (শতরূপা সান্যাল) ছবিটা পরিচালনা করছে। জুলাইতে শুট হয়েছে।’’ উত্তেজিত ঋতাভরী।
এক প্রফেসর আর ছাত্রীর সম্পর্ক নিয়ে এই ছবি। ‘‘পড়াশোনার ওই সময়টায় অনেকেই নিজেকে হারিয়ে ফেলে। একা হয়ে যায়। দিশা পায় না। এমনই এক মেয়ের জীবনে তার প্রফেসর আলো, ভরসা আর প্রেম নিয়ে আসে...’’, ছবির ভাবনাটা বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন ঋতাভরী।
কিন্তু তাঁর জীবনে এ রকম কোনও ঘটনা কি ছিল? ‘‘না, ও ভাবে ডিরেক্ট কিছু ছিল না। তবে এই ছবিতে পরি যখন প্রফেসরকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। প্রফেসর কি ছাত্রীর সঙ্গে তাঁর প্রেম মেনে নেন?...ভালবাসার এই দ্বন্দ্বের মধ্যে যে যন্ত্রণা আছে সেটা আমি অনুভব করতে পারি’’, বললেন ঋতাভরী। যদিও রজত এই ছবি প্রসঙ্গে প্রকাশ্যেই বলেছেন, ছাত্রবেলায় বায়োলজি আর ইংরেজি শিক্ষিকা তাঁর ক্রাশ ছিল। থিয়েটারের টানে মাঝেমধ্যে কলকাতায় এলেও আপাতত তিনি ঋতাভরীর টানেই হাজির ছিলেন তাঁর প্রিয় শহর কলকাতায়।
‘‘ফ্রেন্ডস্ কমিউনিকেশনের ফিরদৌসাল হাসান এই ছবিটা প্রযোজনা করতে রাজি হয়ে যান আর গৈরিক ক্যামেরা করেছে,’’ বললেন ঋতাভরী।
কিন্তু চুমুর বিষয়টা কী?
‘‘আরে ছবিতে সম্পর্কটা এমন একটা নির্ভরতার জায়গায় যায় যে মেয়েটি প্রফেসরকে স্পর্শ করতে চায়, চুমু খেতে চায়...আর প্রফেসর উচিত-অনুচিতের স্পেসে চলে যায়? না চুমু খায়? তার পর কী হয় জানতে গেলে ছবিটা দেখতে হবে,’’ হাসলেন ঋতাভরী।
‘হিংলিশ’ এই গল্পে মেয়েটি ‘পরি’ আর প্রফেসর ‘আনন্দ’। যারা একে অপরকে ছুঁতে চায়!
কিন্তু আসলে তো তারা ঋতাভরী আর রজত...।
সূত্র: আনন্দবাজার

মৃত্যুর এই উপত্যকা by মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আমি দুর্বল প্রকৃতির মানুষ। মাঝে মাঝেই আমি খবরের কাগজের কোনও কোনও খবর পড়ার সাহস পাই না। হেডলাইনটা দেখে চোখ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। যেন চোখ সরিয়ে নিলেই খবরটা অদৃশ্য হয়ে যাবে। খবর অদৃশ্য হয় না, থেকে যায়। তখন সাহস সঞ্চয় করে একটু একটু করে খবরটা পড়তে হয়। এয়ারপোর্ট রোডে বাস ধাক্কা দিয়ে রাজীব আর মীম নামে দুটি কিশোর-কিশোরীকে মেরে ফেলার খবরটি সেরকম একটি খবর। খবরের কাগজে তাদের ছবি দেখে বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠেছে। আমার অনেক বয়স হয়েছে, কিন্তু কেন জানি সবসময় মনে হয়— আমার বয়সটা এই বয়সী ছেলেমেয়েদের বয়সের সঙ্গে আটকে আছে। এদের দেখলে মনে হয় আমি এদের বয়সী, এরা কীভাবে কী কল্পনা করে আমি বুঝি অনুমান করতে পারি। তাই এই দুটি কিশোর-কিশোরীর ছবিটা দেখার পর থেকে খুব মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হলে নানাভাবে মৃত্যুকে মেনে নিতে হয়, আমরা মেনে নিই। কিন্তু খুনকে মেনে নিতে হয় কে বলেছে? সবাই কি জানে, আমাদের দেশে যে ঘটনাগুলোকে ‘সড়ক দুর্ঘটনা’ বলে সেগুলোর বেশিরভাগ দুর্ঘটনা নয়, সেগুলো পরিষ্কার খুন? ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে একজনকে মেরে ফেলা আর দুটি বাস একটি আরেকটির সঙ্গে কম্পিটিশন করে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কতগুলো কিশোর-কিশোরীর ওপর সেই বাসটি তুলে দেওয়ার মাঝে যে কোনও পার্থক্য নেই সেটি কি সবাই জানে? সবাইকে জানতে হবে। দুর্ঘটনার ওপর কারও হাত নেই, আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুর্ঘটনাকে মেনে নিই, কিন্তু বাংলাদেশের ‘সড়ক দুর্ঘটনা’গুলো তো দুর্ঘটনা নয়, সেগুলো কেন আমরা দিনের পর দিন মেনে নিই?
আমি সিলেট থাকি। মাঝে মাঝেই নানা দরকারে ঢাকা আসতে হয়। বেশিরভাগ সময় গাড়িতে আসি। হিসাব করে দেখেছি, ঢাকা-সিলেট না করে যদি সোজা গাড়ি চালিয়ে যেতাম তাহলে এতদিনে পুরো পৃথিবীকে অন্তত কুড়িবার পাক খেয়ে আসতে পারতাম। যতবার সড়কপথে গিয়েছি, একবারও হয়নি যখন মনে হয়নি, আর একটু হলে একটা ভয়ঙ্কর কিছু ঘটে যেত! দৈত্যের মতো বাস-ট্রাক উল্টো দিক থেকে সোজাসুজি আসতে থাকে, ছোট গাড়িকে সরে যেতে হয়। বেশিরভাগ সময় সরে যাওয়ার জন্য রাস্তায় যথেষ্ট জায়গা থাকে না, তখন রাস্তার পাশে উঠে যেতে হয়। দৈত্যের মতো বড় বড় বাস-ট্রাক প্রবল প্রতাপে রাস্তা দখল করে চলে যায়। তাদের কেউ কখনও বলেনি— রাস্তায় গাড়ি চালানোর নিয়মকানুনে আছে, অন্য গাড়িকে রাস্তা থেকে সরিয়ে ওভারটেক করা যাবে না। কেউ তা করে ফেললে কখনও সেজন্য শাস্তি দেওয়া হয়নি। পথে-ঘাটে নিয়মকানুনগুলো জোর করে সবাইকে মানতে বাধ্য করা হলে অনেক মানুষ বেঁচে যেত। বাংলাদেশের পথে-ঘাটে প্রতিদিন কমপক্ষে বারোজন গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যায়। আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি তাই দুর্ঘটনা শব্দটা ব্যবহার করি। যে ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব সেটি দুর্ঘটনা নয়, সেটি অপরাধ। যদি সে কারণে কেউ মারা যায় সেটি খুন।
শেষবার যখন ঢাকা থেকে সিলেট আসছি তখন হঠাৎ রাস্তায় গাড়ির জ্যাম। একটু এগিয়ে দেখলাম এইমাত্র বাস-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে। রাস্তার পাশে সারি সারি মৃতদেহ শুইয়ে রাখা হয়েছে। পৃথিবীর অন্য যেকোনও দেশে একজন মানুষ হয়তো সারাজীবনে এ রকম একটি ঘটনা একবার দেখে। আমি অনেকবার দেখেছি। যারা আহত তাদের বাঁচানোর জন্য হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। যারা মারা গেছে তাদের নিয়ে কোনও ব্যস্ততা নেই। তারা রাস্তার পাশে শুয়ে থাকে। নারী-পুরুষ ও শিশু। একমুহূর্ত আগেও তারা জানত না তাদের মেরে ফেলা হবে! মুহূর্তের মাঝে সবকিছু ওলোট-পালোট হয়ে যায়, পুরোপুরি জীবন, স্বপ্ন ও আশায় ভরপুর একজন মানুষের সবকিছু শেষ হয়ে যায়।
যারা মারা যায় আমরা তাদের সংখ্যা নিয়ে কথা বলি। যারা আহত হয় তাদের কী হয়? কেউ কেউ পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে যায়, কেউ কেউ সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। রাজীব আর মীম যে ঘটনায় মারা গেছে সেখানে আরও নয়জন আহত হয়েছে। তারা কেমন আছে? অন্ততপক্ষে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থাটুকু করা হয়েছে তো?
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। আমি আমার অফিসে কাজ করছি, হঠাৎ একটা ফোন এলো। ফোন করেছে আমার প্রাক্তন ছাত্র ও বর্তমান সহকর্মী। টেলিফোনে সে ঠিক করে বলতে পারছিল না, হাহাকারের মতো শব্দ করছিল। কষ্ট করে কথা বলে বুঝতে পারলাম ভয়ঙ্কর মুখোমুখি একটা বাস দুর্ঘটনায় পড়েছে। সে বাসের ভেতর, চারপাশে আহত ও মৃত মানুষ। একজন রিকশাওয়ালা বাসের জানালা দিয়ে একজন একজন করে আহত মানুষকে বের করে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। সেভাবে সেও শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে পৌঁছেছে, তখন যোগাযোগ করে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় আনা হয়েছিল। ঢাকায় দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর সুস্থ হয়েছে।
আমার খুব ইচ্ছে ছিল, আমার সেই সহকর্মীকে নিয়ে নরসিংদীর সেই এলাকায় গিয়ে খুঁজে খুঁজে সেই রিকশাওয়ালাকে বের করে তার হাত ধরে ধন্যবাদ জানিয়ে আসি, যে একা কারও সাহায্য না নিয়ে সেই বাস দুটির ভেতর থেকে একজন একজন করে আহত মানুষদের বের করে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত সেই কাজটি আর করা হয়নি। মাঝে মাঝেই দুঃখ হয়, জীবনের অনেক কাজই শেষ পর্যন্ত আর করা হয়ে ওঠে না।
আমি অনেকদিন থেকে ভেবেছি যে, এ রকম বড় দুর্ঘটনার পর বাসের মালিকদের নামে মামলা করা উচিত। প্রায় সবসময়ই দেখা যায় যে, দুর্ঘটনাগুলো সত্যিকারের দুর্ঘটনা নয়। এগুলো বাসের মালিক ও বাসের ড্রাইভারদের এক ধরনের দায়িত্বহীনতার জন্য ঘটেছে। যদি মামলা করে বাসের মালিকদের ক্ষতিপূরণের জন্য বাধ্য করা হয়, শুধু তাহলেই হয়তো তারা সতর্ক হবে। মানুষের প্রাণ বাঁচানোর জন্য নয়, নিজেদের টাকা বাঁচানোর জন্য তারা একটুখানি দায়িত্বশীল হবে। আমার সেই সহকর্মীকে মামলা করার কথা বলেছিলাম। সে রাজি হয়েছিল ও শেষ পর্যন্ত বাস কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। বাস কোম্পানির অবহেলার অনেক কারণ ছিল এবং সেই অবহেলার কারণে একজন নয়, দুইজন নয়, ষোলোজন মানুষ মারা গিয়েছিল। কতজন আহত হয়েছিল ও শেষ পর্যন্ত কতজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিল তার হিসাব নেই।
আমাদের দেশে মামলা শেষ হতে চায় না। ঠিক সেভাবে এই মামলার রায় পেতেও অনেক বছর চলে গিয়েছে। শেষ পর্যন্ত মামলার রায় হয়েছে। কিন্তু সেটি আমার সহকর্মীর পক্ষে নয়! আমি অবশ্য হাল ছেড়ে দেইনি। আশা করে আছি, কোনও একবার ঠিকভাবে বাস মালিক নামের এই প্রবল প্রতাপশালী মানুষগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করে তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হবে। একবার এই দেশে সেই নিয়ম চালু হয়ে গেলে বাস ড্রাইভারদের এই ভয়ঙ্কর দায়িত্বহীনতা হয়তো একটুখানি হলেও বন্ধ হবে। মানুষের প্রাণের জন্য কারও কোনও মায়া-মমতা নাও থাকতে পারে, কিন্তু টাকার জন্য মায়া-মমতা নিশ্চয়ই আছে।
আমরা সবাই দেখেছি, আমাদের দেশে পরিবহন শ্রমিকদের অনেক ক্ষমতা। তাদের দুর্ব্যবহারের উদাহরণের কোনও শেষ নেই। একজন যাত্রীর সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হলে তারা অবলীলায় ধাক্কা দিয়ে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দিতে পারে। একজন ড্রাইভার ঠাণ্ডা মাথায় একজন পথচারীর ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেয়। ড্রাইভার, কন্ডাক্টর, হেলপার মিলে বাসের ভেতর একটি মেয়েকে ধর্ষণ করেছে কিংবা ধর্ষণ করে খুন করেছে সেরকম উদাহরণও আছে। মাত্র সেদিন একজন আহত কলেজছাত্রকে নিয়ে ঝামেলা হতে পারে ভেবে তাকে খুন করে পানিতে ফেলে দিয়েছে। পৃথিবীর যে কোনও সভ্য দেশে ওপরের যেকোনও একটি ঘটনা পুরো প্রতিষ্ঠানের জন্য অস্তিত্বের সংকট হয়ে দাঁড়াতো।আমাদের দেশে কিছুই হয় না। একজন শক্তিশালী মন্ত্রী তাদের নেতৃত্ব দেন এবং অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি, এই পরিবহন শ্রমিকরা সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও আন্দোলন করেছে।
কলেজের ছাত্রছাত্রী রাজীব ও মীম মারা যাওয়ার পর আমাদের মন্ত্রী মহোদয়ের প্রতিক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত বিচিত্র। তিনি কয়েকদিন আগে ভারতবর্ষে ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে সবাইকে (হাসিমুখে) জানিয়েছেন, তারা যদি সেই ঘটনা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করে আমরা কেন সেটি নিয়ে এত ব্যস্ত হয়েছি! যে সহজ বিষয়টি তার নজর এড়িয়ে গেছে সেটি হলো, ভারতবর্ষে ঘটনাটি ছিল একটি দুর্ঘটনা। আমাদের ঘটনাটি দুর্ঘটনা নয়, সেটি এক ধরনের হত্যাকাণ্ড। একটুখানি দায়িত্বশীল হলেই এ ঘটনা ঘটতো না।
আমি যখন এই লেখাটি লিখছি তখন সারাদেশের কলেজের ছাত্রছাত্রীরা পথে নেমে এসেছে। তাদের দাবিটি অত্যন্ত মানবিক। আমরা সবাই দীর্ঘদিন ধরে এই একই দাবি জানিয়ে আসছি। আমাদের সেই কথাগুলো কখনও কেউ গুরুত্ব দিয়ে শোনেনি। কলেজের ছেলেমেয়েরা সেই কথাগুলো শেষ পর্যন্ত সবাইকে শোনাতে পেরেছে। আশা করছি, তাদের অত্যন্ত মানবিক দাবিগুলো শোনা হবে। আমাদের দেশটিকে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মৃত্যুর উপত্যকা হিসেবে দেখতে চাই না।
লেখক: অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

প্রধানমন্ত্রীর শ্লেষ, কোথায় কখন হাসতে হয় তাও জানেন না? by শফিকুল ইসলাম

রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দুর্ঘটনায় রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় অনেকের মতো মর্মাহত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। এ দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ পর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি ও নৌমন্ত্রী শাজাহান খান সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায়  হেসে হেসে কথা বলায় সারাদেশে যে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে তাতে বিরক্ত প্রধানমন্ত্রীও। দুর্ঘটনার দু’দিন পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এক নিহত শিক্ষার্থীর বাসায় সমবেদনা জানাতে পাঠানোর পাশাপাশি নৌপরিবহনমন্ত্রীকে ডেকে সংযত হয়ে কথা বলার নির্দেশ দিয়ে শ্লেষের সুরে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘কোথায় কখন হাসতে হয় তাও জানেন না?’ সোমবার (৩০ জুলাই) মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক শেষে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানকে ডেকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
গত ২৯ জুলাই রাজধানীর কালশী ফ্লাইওভারের অদূরে র‌্যাডিসন হোটেলের উল্টোদিকে সিএমএইচ স্টপেজে দাঁড়ানো অবস্থায় দ্রুতগামী বাসের চাপায় পিষ্ট হয়ে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত এবং আরও ১০/১২ জন গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় দায়ী বাসচালক ও সহকারীর বিচার ও সড়কে নিরাপত্তার দাবিতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা পরপর তিনদিন মহাসড়কে নেমে এলে সরকার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে। এ দুর্ঘটনায় আর সবার মতো মর্মাহত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। তিনি মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালকে নিহত দিয়া খানমের বাসায় পাঠিয়ে তার পরিবারকে সমবেদনা জানান এবং এই ঘটনায় দায়ীদের শাস্তির বিষয়ে পরিবারটিকে আশ্বাস দেন। 
তবে এর আগে গতকাল সোমবার (৩০ জুলাই) মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক শেষে শাজাহান খানকে ডেকে নেন প্রধানমন্ত্রী। একটি বিশেষ সূত্র জানিয়েছে, শাজাহান খানকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার বিব্রত হয় –এমন যে কোনও মন্তব্য পরিহার করতে হবে। কথা বলার সময় আরও সতর্ক থাকতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ না করে এর কাউন্টার হিসেবে মহারাষ্ট্রের সড়ক দুর্ঘটনার রেফারেন্স দেওয়া ঠিক হয়নি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্য এক সূত্রের দাবি, এসময় শাজাহান খানের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কোথায় কখন হাসতে হয়, তাও জানেন না!’
উল্লেখ্য, রবিবার (২৯ জুলাই) দুপুরে বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনার বিষয়ে সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকরা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি হিসেবে নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি হেসে হেসে এ বিষয়ে দায়ীদের শাস্তির কথা জানানোর পাশাপাশি এ দুর্ঘটনার সঙ্গে ভারতের মহারাষ্ট্রে এক সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩ জন নিহত হওয়ার তুলনা করেন। পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের নেতা হিসেবে নৌ-মন্ত্রীর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বাসের চালক ও হেলপাররা স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠছে –এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রবিবার শাজাহান খান হেসে হেসে বলেন, ‘আজকের বিষয়ের সঙ্গে এটি রিলেটেড নয়। মহারাষ্ট্রে এক দুর্ঘটনায় ৩৩ জন নিহত হলেও কোনও হৈ চৈ হয় না। অথচ বাংলাদেশে সামান্য কিছুতেই হৈ চৈ হয়।’
হেসে হেসে নৌমন্ত্রীর এমন মন্তব্য করা দেখে খোদ সরকারের অনেকেই আশ্চর্য হন; অনেকে এ নিয়ে সমালোচনাও করেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি দুঃখ প্রকাশ করতে পারতেন। এ দুর্ঘটনায় মন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ করার কথা। অথচ তিনি উল্টো হাসেন। এ কি করে সম্ভব! তিনি কি সুস্থ আছেন?
আওয়ামী লীগ ও সরকারের অনেকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এটাও বলেন যে, অন্য দল থেকে আসা শাজাহান খান আওয়ামী লীগের সুনাম নষ্ট করছেন। সামনে নির্বাচন –এমন সময় তার এমন আচরণ দলকে নানা প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের একজন সিনিয়র মন্ত্রী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দাঁত বের করে হাসলেই হয় না। হাসার স্থান-কাল-পাত্র বুঝতে হয়।’
শাজাহান খানের হাসি ও মন্তব্য নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। ফেসবুকে সাংবাদিক মিলটন আনোয়ার এক স্ট্যাটাসে লিখেন, ‘একটি হাসি সারা জাতির অপমান।’
মো. মাহবুব আলম সরকার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন, ‘আমি বড় পুকুরিয়ার কয়লা দিয়ে দাঁত মাজি। তাই তো আমার এত সুন্দর হাসি।’
মিলন খান নামে অন্য এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেন, ‘দুই শিক্ষার্থীর প্রাণ গেলো, আর এক মন্ত্রী দাঁত কেলিয়ে বিবৃতি দিলো! জনগণ কেন এদের ভোট দেয়?’
সাংবাদিক আজাদ সুমন তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন, ‘কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা পিষ্ট হয় বাসের চাপায়, আর শাজাহান কাকায় হাসে।’
রাজিউর রহমান রুমি লিখেন, ‘অন্যের কষ্টে যাদের মুখে হাসি, তারা দেশি না প্রবাসী?’
এ ব্যাপারে সোমবার (৩০ জুলাই) শাজাহান খান নিজে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি সবসময়ই হাসি, আমার কালো মুখ কেউ দেখেনি। এটা কি দোষের?’
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ও দেশজুড়ে শুরু হওয়া সমালোচনায় নরম সুরে কথা বলতে শুরু করেন শাজাহান খান। হাসি-মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে প্রকাশ্যে ক্ষমাও চান। প্রতিশ্রুতি দেন, এই দুর্ঘটনার বিচারে বাসচালকের শাস্তি হলে তিনি সাংগঠনিকভাবে কোনও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবেন না। মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত বিবৃতিও পাঠানো হয় সংবাদ মাধ্যম অফিসগুলোয়।
এদিকে, বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থীর নিহতের প্রতিবাদে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়কে নামেন শিক্ষার্থীরা। তারা নিরাপদ সড়কের দাবিতে মানববন্ধন করেন। একইসঙ্গে তারা গাড়িচাপায় শিক্ষার্থী হত্যার বিচার ও শাজাহান খানের পদত্যাগ দাবি করেন। এর জবাবও নরম সুরে দেন শাজাহান খান। সোমবার (৩০ জুলাই) নিজ দফতরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘পদত্যাগ সমস্যার সমাধান নয়। মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করলেই তো আর সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে না। পদত্যাগ করলে যদি সব সমস্যার সমাধান হয়, তাহলে আমার পদত্যাগ করতে কোনও অসুবিধা নাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা দোষী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলে আমাদের মালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে কোনও প্রতিবাদ আমরা করতে রাজি নই। এসবের দায়-দায়িত্ব আমরা নেবো না।’ এসময় দুই ছাত্র নিহত হওয়ার বিষয়টি খুবই মর্মান্তিক এবং দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আজ মঙ্গলবার (৩১ জুলাই) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল নিহত শিক্ষার্থী মিমের বাসায় যান। আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘ঘটনাটি দুঃখজনক, আমরা মর্মাহত। প্রধানমন্ত্রীও দুঃখ পেয়েছেন, কষ্ট পেয়েছেন। সে কারণে তিনি আমাকে পরিবারটির খোঁজখবর নেওয়ার জন্য পাঠিয়েছিলেন। এ বিষয়ে তিনি খুবই কঠোর।’
রাস্তায় ছাত্রদের বিক্ষোভ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘ছাত্ররা বিক্ষোভ করছে, এটি তারা করতেই পারে। কারণ, তারা তাদের সহপাঠীকে হারিয়েছে, বন্ধুকে হারিয়েছে। তাদের আবেগ আছে, তাই তারা বিক্ষোভ করছে। আমি ছাত্রদের এই বিক্ষোভকে সমর্থন করি।

আগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নামলে সব দোষ আমার গায়ে চাপিয়ে দেওয়া হতো: ইলিয়াস কাঞ্চন

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে না থাকার অভিযোগ তুলে ফেসবুকে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিচসা) আন্দোলনের নেতা ইলিয়াস কাঞ্চনের সমালোচনা হচ্ছে। এই সমালোচনার জবাব দিয়ে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেছেন, ‘শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছে, তাদের পাশে সরাসরি আমি না থাকার কারণে অনেকে ফেসবুকে বলেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন কই, তিনি কোথায় আছেন? তাদের উদ্দেশে আমি বলতে চাই, আমি যা করি, বিবেক বুদ্ধি বিবেচনা দিয়েই করি। পেছনের দিকে আমি তাকিয়ে দেখি। এদেশে কী হয়, কী হয়েছিল, কীভাবে অন্যান্য আন্দোলন থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমি সেই আন্দোলনগুলোর নাম বলতে চাই না। আমিও যদি এই শিক্ষার্থীদের পাশে থাকতাম তাহলে এই সব দোষ আমার গায়ে চাপিয়ে দেওয়া হতো। এই আন্দোলনটিকে বানচাল করা হতো। আজ তারাই (শিক্ষার্থীরা) তাদের নেতৃত্বে আন্দোলন করছে। এই সন্তানেরা আমাদের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। ইলিয়াস কাঞ্চন যে ডাক দিয়েছে, ২৫ বছর ধরে যে আন্দোলন করছে, আমার সন্তানরা আমাকে ভুলে যায়নি। নিরাপদ সড়ক চাই দাবি নিয়েই তারা রাস্তায় নেমেছে। অন্য কিছু নিয়ে নয়।'
শুক্রবার (৩ আগস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে তিনি এসব কথা বলেন। সড়ক দুর্ঘটনারোধে কার্যকর পদক্ষেপ ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আজ শুক্রবার (৩ আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনের আয়োজন করে ইলিয়াস কাঞ্চনের সংগঠন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা)। সকাল সোয়া ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত এই মানববন্ধন হয়। সরকারকে আগামী রবিবার থেকে নিরাপদ সড়ক সংক্রান্ত ৯ দফা দাবি বাস্তবায়নের শর্ত দিয়ে শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। দাবিগুলো বাস্তবায়ন না হলে এরপর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রাস্তায় নামার কথা জানিয়েছেন তিনি।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ কীভাবে পালিত হবে তা জানতে চেয়েছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই, আপনার এই নির্দেশনা কারা, কীভাবে বাস্তবায়ন করবে এটি জাতি জানতে চায়। সারা দেশের মানুষ এই দাবির পক্ষে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী একদিকে আমাদের সন্তানদের ঘরে যেতে বলছেন, অন্যদিকে পরিবহন শ্রমিকরা ধর্মঘট করছে। তাহলে কোনটা চলবে?’
মানববন্ধন শেষে সমাবেশে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই, যে পরিবহন সেক্টরের ভয়ে আপনারা আইন প্রণয়ন করতে পারেন না, নতুন আইন করতে পারেন না, আমাদের কোমলমতি সন্তানরা রাস্তায় নেমে তাদের বিষয়ে আজ একটি সুযোগ করে দিয়েছে। আপনারা কঠোর আইন প্রয়োগ করুন। সড়কে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ফিরিয়ে আনুন। আপনারা যে ব্যবস্থা নেবেন হয়তোবা পরিবহন সেক্টরের কিছু মানুষ তার বিরোধিতা করতে পারে। কিন্তু সারাদেশ আপনাদের পক্ষে থাকবে। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, সারা দেশ যদি আপনাদের পাশে থাকে তাহলে কিন্তু আইন প্রয়োগ করা ও নতুন আইন তৈরি করা আপনাদের জন্য কষ্টের বিষয় হবে না।’
ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘২৫ বছর আগে রক্তক্ষরণ নিয়ে স্বজন হারিয়ে আমি এ আন্দোলন শুরু করেছিলাম। যাতে আমার সন্তানের মতো, আমার মতো এই ৩০ লাখ শহীদের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশের মানুষ যেনও আর সড়কে নিষ্পেষিত না হয়। আজকে এই অবস্থা থেকে বাঁচতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এসেছে। আজকের এই মানববন্ধনের মাধ্যমে আমি সরকারকে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই, এটি মানুষের প্রাণের দাবি। এদেশের মানুষ আর সড়কে মরতে চায় না। পঙ্গুত্ববরণ করতে চায় না। আমরা যে নির্দেশনাগুলো দিয়েছিলাম সড়ক নিরাপত্তার জন্য, সেটি যদি আগে থেকে বাস্তবায়ন করা হতো, তাহলে আজ এই পরিণতি দাঁড়াতো না।’
ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, 'আগামী ৫ তারিখে আমার সন্তানের কাছে যাওয়ার কথা ছিল। সেটা আমি ক্যানসেল করেছি। আমি আমার একজন সন্তানের কাছে যাচ্ছি না, আমি আমার এদেশের হাজারো সন্তানের কাছে দাঁড়িয়ে আছি। যে কমিটি হয়েছে সেই কমিটিতে থেকে যেন সুষ্ঠু বিচার আনতে পারি সেজন্য আমি যাওয়া বন্ধ করেছি।’

কারাগারে ১০৭ দিন by পিয়াস সরকার

ফয়সাল আহমেদ, বয়স ২৫। এই শিক্ষার্থী একজন রাজনৈতিক দলের কর্মী। গত ৮ই ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তারের পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় প্রথমে বংশাল থানায়। সেখান থেকেই শুরু তার ভয়াবহ দিন। বংশাল থানা থেকে স্থানান্তর করা হয় চকবাজার থানায়। চকবাজারে রিমান্ডসহ কাটাতে হয় তিন দিন। হাজতের প্রকোষ্ঠে কাটানো প্রথম রাতে ক্ষুধা এবং মশার কামড় সেই সঙ্গে উৎকণ্ঠায় কেটে যায় সারারাত। তিনি বলেন, ‘আমার কাটানো দীর্ঘতম রাত। ধারণাও ছিল না কি হতে যাচ্ছে?’ তারা সেরাতে ১৩ জন কাটান হাজতে। এরপর নেয়া হয় কোর্টে। তার ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হলে আদালত তার দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ফয়সাল বলেন, ‘রিমান্ড না বলে একে বলা যেতে পারে ডিমান্ড।’ তার পরিবারের সঙ্গে কয়েক হাজার টাকায় রিমান্ডের ডিমান্ড পূরণ হয়। এরপর শুরু কারাগারের জীবন।
কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার। কারাগারে পা রাখার পর দেখেন স্থানের তুলনায় রাখা হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি বন্দি। প্রথম কয়েকদিন তাকে কাটাতে হয় ফ্লোরে, গণরুমে। যাকে সেখানের ভাষায় বলা হয় ‘আমদানি’। রাতে শোয়ার স্থান ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ। প্রচণ্ড গরম সেই সঙ্গে একজনের পা আরেকজনের মাথায় লেগে যেত। কারাগারে রয়েছে সপ্তাহব্যাপী বিভিন্ন প্যাকেজ। সেসব প্যাকেজে মেলে শোয়ার স্থান, ভালো খাবারসহ নানান সুবিধা।
কারাগারে টাকার লেনদেন নিষিদ্ধ। আবার টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয় না সেখানে। টাকার পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় সিগারেটের প্যাকেট (হলিউড সিগারেট)। সিগারেটের প্যাকেট কিনতে হয় ৭৫ টাকা দিয়ে কিন্তু দেয়ার সময় তার মূল্য ধরা হয় ৫০ টাকা। তিনি বলেন, ‘কেউ সাক্ষাৎ করতে আসলে প্যাকেট, গোসল করতে চাইলে প্যাকেট, বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকলে প্যাকেট।’
পরিবার থেকে টাকার প্রয়োজন হলে দায়িত্বরত ব্যক্তির মোবাইলে বিকাশের মাধ্যমে আসে টাকা। ১ হাজার টাকা পাঠালে অ্যাকাউন্টে (পিসি) জমা হয় ৯শ’ টাকা কখনো বা ৮শ’ টাকা।
খাবারের কথা উঠতেই বলেন, ‘যে খাবার কারাগারে সেরা, ওই খাবার বাইরে বিনামূল্যে দিলেও কেউ খাবে না।’ সকালের খাবারে মেলে ১ টুকরা রুটি এবং সামান্য একটু গুড়। দুপুরে ভাতের সঙ্গে থাকে কিঞ্চিত সবজি। রাতে পাঁচ দিন থাকে আঙ্গুলের সমান ছোট এক টুকরা মাছ। আর বাকি দুই দিন সবজি। এসব খাবারে না থাকে ঝাল-না লবণ কিংবা কোনো স্বাদ। অত্যন্ত ময়লা এবং দুর্গন্ধময় স্থানে রান্না করা হয় যা খুবই অস্বাস্থ্যকর। খাবার গ্রহণের সময় প্রায়শই মেলে চুল, ময়লা। ভাতে ছোট পাথর থাকা যেন খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। তবে, টাকা গুনলে সেখানেও ব্যবস্থা আছে ভালো খাবারের। ক্যান্টিনে সব ধরনের খাবারের মূল্য ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি। কারাগারে মেলে সব ধরনের মাদক। ইয়াবা থেকে শুরু করে প্রায় সব।
কারাগারে টাকার ব্যবহার আইনানুগভাবে নিষিদ্ধ কিন্তু কারা ক্যান্টিনে নগদ অর্থ ছাড়া দেয়া হয় না কোনো পণ্য। নিয়ম অনুযায়ী অ্যাকাউন্ট (পিসি) থেকে নেয়ার কথা ছিল টাকা। এসব অনিয়ম কর্তৃপক্ষের সামনে হলেও তারা নির্বাক।
গণরুম থেকে ওয়ার্ডে, ফয়সালের গুনতে হয়েছে ৫শ’ টাকা। ওয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতা ২৫ জনের। কিন্তু সেখানে রাখা হতো ৪০-৪৫ জন। কারাগারে ফজরের পর থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত বন্দিরা বাইরে থাকতে পারেন। এই সময়টাতে ক্যান্টিনে খাওয়া, ব্যায়াম করা, খেলাধুলা ইত্যাদির সুযোগ মিলতো তাদের। এখানেও রয়েছে সমস্যা, সিনিয়র কারাবন্দির কথা মান্য করে চলতে হয়। ব্যতিক্রম হলেই মাঠে চক্কর দেয়া, খাবার খেতে না দেয়া, দাঁড় করিয়ে রাখা ইত্যাদির মতো শাস্তি।

সড়ক দুর্ঘটনা: ক্ষতিপূরণ আর মেলে না by মরিয়ম চম্পা

মামলার রায় হয়, আপিল হয়। কিন্তু শেষ হয় না। পায় না ক্ষতিপূরণ। সড়ক দুর্ঘটনায় হওয়া বেশ কিছু মামলা পর্যবেক্ষণ করে মিলেছে এমন তথ্য। এমনিতেই বেশির ভাগ মানুষ মামলায় যায় না। যারা যায় তাদের বছরের পর বছর ঘুরতে হয় আদালতের বারান্দায়।
১৯৮৯ সালে দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মন্টু মতিঝিলে বাংলাদেশ বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন। তার স্ত্রী রওশন আরা আর্থিক ক্ষতিপূরণ চেয়ে বাংলাদেশ বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে মামলা করেন। নিম্ন আদালত আর্থিক ক্ষতিপূরণের রায় দেন। ২৫ বছর পর ২০১৪ সালের ২০শে জুলাই সাংবাদিক মন্টুর পরিবারকে ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখে আপিল বিভাগ। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত কাউকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা দেশে এটাই প্রথম যদিও দুর্ঘটনার দীর্ঘ ২৭ বছরেও ক্ষতিপূরণ পায়নি এই পরিবার। বাদী রওশান আরা বলেন, ‘দুর্ঘটনার সময় আমাদের বড় ছেলের বয়স ৯ বছর আর ছোট ছেলে ছিল ৫ বছরের। তখনই আমি মামলা করেছিলাম। এই ২৭ বছরেও আমরা ক্ষতিপূরণ পাইনি। উল্টো ১৯৯১ সালে নিম্ন আদালতের রায় দেয়া ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ কমতে কমতে ১ কোটি ৬৯ লাখে এসে ঠেকেছে। গত ২৭ বছরে এই মামলা চালাতে গিয়ে সব হারিয়েছি। কিছুই পাইনি। এখনও মামলা চলছে।’
২০১১ সালের ১৩ই আগস্ট মানিকগঞ্জের জোঁকা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও চিত্রগ্রাহক-সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ কয়েকজন। নতুন চলচ্চিত্র কাগজের ফুল-এর শুটিংয়ের স্থান দেখতে তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর সহকর্মীদের নিয়ে মানিকগঞ্জে যান। ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তারা। ২০১৪ সালের ২৯শে নভেম্বর কাওরান বাজার এলাকায় বাস থেকে নামতে গিয়ে পেছনের চাকায় পিষ্ট হয়ে নিহত হন বার্তা সংস্থা বাসসের সাবেক প্রধান সম্পাদক জগলুল আহমেদ চৌধুরী। সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। তিন মাসের মধ্যে বাস মালিক, চালক ও সংশ্লিষ্ট বীমা প্রতিষ্ঠানকে এই টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে বাসচালক ৩০ লাখ, বাস মালিক ৪ কোটি ৩০ লাখ ৯৫ হাজার ৪৫২ ও রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্সকে ৮০ হাজার টাকা দিতে হবে। এই রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা লিভ টু আপিল বর্তমানে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
আইনে বলা আছে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা আহত হওয়ার ঘটনায় দায়ীদের শাস্তি চাওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ চেয়েও আদালতে মামলা করতে পারেন পরিবার ও স্বজনরা। তবে বিভিন্ন আইনের সীমাবদ্ধতা ও অতিরিক্ত কোর্ট-ফির কারণে ক্ষতিপূরণ মামলার সংখ্যা কম। এ বিষয়ে দেশের আইনজীবীরাও তেমন আগ্রহ দেখান না বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের মামলা হচ্ছে এবং নিজেদের পক্ষে রায়ও পাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
রওশন আরার আইনজীবী খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশে ক্ষতিপূরণ মামলা করার প্রচলন তেমন নেই। কারণ ক্ষতিপূরণ মামলা মূলত টর্ট আইনেই করতে হয়। এই আইনের মাধ্যমে মামলা দায়ের করে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ আদায় করা সম্ভব, তবে আইনজীবীদের অনীহার কারণে তা ফলপ্রসূ হয় না।’ সাধারণ অর্থে টর্ট বলতে বোঝায় কোনো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ প্রদান। তাই টর্ট আইনেই সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের মামলা করা আইনের সবচেয়ে ভালো দিক। টর্ট আইনে ক্ষতিপূরণ মামলা করার নিয়ম, ‘যদি কোনো ব্যক্তি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন, তার পরিবার বা স্বজনরা এক্ষেত্রে দুটি মামলা করতে পারে না, একটি নিহতের ঘটনায় বিচারের আর্জি। অন্যটি ক্ষতিপূরণ মামলা।’ মামলা করার ক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তির পেশা, আয় ও আয়ু বিবেচনা করা হয়। তবে টাকার অঙ্ক বেশি হলে কোর্ট ফি বেশি হয়। টাকার অঙ্কের ওপর এই ফি নির্ধারণ করা হয়। এর ক্যাটাগরি করা আছে। এই ফি এতই বেশি যে অসচ্ছলদের পক্ষে ক্ষতিপূরণ মামলা করা অসম্ভব। এ কারণেই অনেকে ক্ষতিপূরণ মামলা করতে যায় না। তাছাড়া সময়ক্ষেপণও হয়।’ মামলার পর কবে নাগাদ ক্ষতিপূরণ পাবেন, তা আসলে নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারবে না।
এ কারণেই মানুষের মধ্যে এই মামলা করার ব্যাপারে তেমন একটা আগ্রহ দেখা যায় না।’ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির ক্ষেত্রে অপরাধীর শাস্তি হওয়ার নজির কম। আবার কখনও কখনও ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে সালিশ বৈঠকের মাধ্যমেও মীমাংসা হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এর আগে সড়ক পরিবহন ও চলাচল আইন ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৫-এর খসড়ায় মোটরযান চালিয়ে অপর ব্যক্তির মৃত্যু ঘটালে তিন থেকে সাত বছর পর্যন্ত শাস্তির বিধান ছিল। এ ছাড়া নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীকে পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং চালকের দোষসূচক পয়েন্ট কাটার প্রস্তাবও করা হয়েছিল। আর কেউ আহত করলে পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল এবং আহত ব্যক্তিকে এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের বিধান ছিল। তবে নতুন আইনে এগুলো নেই। অভিযোগ উঠেছে, গাড়ির মালিক ও চালকদের চাপে এগুলো বাদ পড়েছে। এর আগে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গাড়িচালকদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মামলা না করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ৩০২ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ নিহত হলে মামলা হবে ৩০৪(খ) ধারায়। এই ধারায় সর্বোচ্চ সাজা তিন বছরের কারাদণ্ড।
যাত্রীদের অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী একটি সংগঠন জানায়, বাংলাদেশে ৮০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা মামলা করেন না। সংগঠনটি বলছে, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের ভয়ে এবং মামলার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের আইনের আশ্রয় নেয়ার প্রবণতা কম। ঢাকার রাস্তায় যাত্রীবাহী বাসের বিশৃঙ্খল প্রতিযোগিতায় একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, রাস্তার নৈরাজ্য নিয়ে সরকারের কোন প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নিচ্ছে না, সেটাও অত্যন্ত উদ্বেগের। সম্প্রতি বাসের ধাক্কায় আহত কমিউনিটি পুলিশ সদস্য আলাউদ্দিন সুমনের মৃত্যু হয়। নগরীর একটি ফ্লাইওভারে বাসের ধাক্কায় পা থেঁতলে যাওয়ার পর আলাউদ্দিন সুমন হাসপাতালে পাঁচদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। একই ফ্লাইওভারে কয়েকদিনের মাথায় দু’টি বাসের প্রতিযোগিতায় বাসের ধাক্কায় একটি ইংরেজি দৈনিকের বিজ্ঞাপন বিভাগের কর্মকর্তা নাজিম উদ্দিনের মৃত্যু হয়।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের কোনো ঘটনা আলোচিত হলেও দীর্ঘ সময় পর দু’একটির বিচার হতে দেখা গেছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্তরা আইনের আশ্রয় নেন না। প্রতিদিন আমাদের সড়ক-মহাসড়কে গড়ে ৬৪ জন মানুষ মারা যাচ্ছে। একদিকে ট্রাফিক আইনের দুর্বল ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগের শিথিলতা। অন্যদিকে, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো প্রভাবশালী হওয়ায় সাধারণ যাত্রীরা তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে সাহস করেন না। অথবা কেউ যদি মামলা করেন, তার দীর্ঘসূত্রিতার কারণেও অনেকে বিচার চাইতেও আগ্রহী হন না। সড়ক দুর্ঘটনার ৮০ শতাংশই কিন্তু আপস নিষ্পত্তি হয়ে যায়। যে ২০ শতাংশ মামলা পর্যন্ত গড়ায়, তারও ৯৯ ভাগ ক্ষেত্রে আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। যার কারণে কেউ মামলা করতে আগ্রহী হন না।
সাবেক আইনমন্ত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, এই জাতীয় মামলার ক্ষেত্রে আইনজীবীদের অনেক বেশি আন্তরিক ও উজ্জীবিত হতে হবে। তাদের আন্তরিকতার কোন বিকল্প নেই। তাদের চেষ্টা করতে হবে যাতে করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা শেষ করা বা ফয়সালা করা যায়। এবং ক্ষতিপূরণ আদায় করা। অর্থাৎ এই পুরো প্রক্রিয়াই নির্ভর করছে আইনজীবীদের সদিচ্ছার ওপর।
সুপ্রিম কোর্টের সাবেক রেজিস্ট্রার ও সাবেক জেলা জজ ইকতেদার আহমেদ বলেন, দুর্ঘটনা মামলা পরবর্তী সময়ে সাক্ষী যদি কোর্টে না আসে তাহলে তো বিচার কার্যক্রম ব্যাহত হবেই। এই মামলার বিচার পেতে বাদীপক্ষকে তার সাক্ষীসহ অন্য প্রমাণাদি নিয়ে যথাসময়ে আদালতে উপস্থিত থাকতে হবে। এছাড়া বাদী বিবাদী অনেক সময় কোর্টের বাইরে নিজেরাই আপস-মীমাংসা করে ফেলে এটাও দুর্ঘটনা মামলার বিচার না হওয়ার একটি কারণ। মামলার ক্ষতিপূরণ সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। মামলার বিষয়বস্তু, কি পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং বিমা বা ইন্স্যুরেন্সের ওপর ভিত্তি করে আদালত ক্ষতিপূরণের টাকার অঙ্ক বা পরিমাণ নির্ধারণ করে। তাছাড়া ক্ষতিপূরণের অর্থ যত বেশি হবে মামলার ফিও তত বেশি হবে। ফলে অনেক ভুক্তভোগী শুরুতে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করলেও তা শেষ পর্যন্ত চালাতে পারেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অপরাধ বিজ্ঞানী তৌহিদুল হক বলেন, দেশের অন্য মামলাগুলোর সাক্ষী এবং বাদী এত বেশি তৎপর সেই তুলনায় দুর্ঘটনার মামলার বাদী বিবাদী খুব একটা তৎপর নয়। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে মামলা শুরুর কিছুদিন পরেই বাদী বিবাদী নিজেরা মিউচ্যুয়াল করে। এবং ভিক্টিম বা তার পরিবারকে কনভিন্স করে ফেলে। কাজেই মামলা হওয়ার পরপরই যদি মিউচ্যুয়াল হয়ে যায় তখন কিন্তু সেটি বেশিদূর আর যাওয়ার সুযোগ থাকে না।

তৎপর ‘ক্ষুদে ট্রাফিকরা’ আইন সবার জন্য সমান

বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে পারেননি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও। আইন সবার জন্য সমান-এমনটি তুলে ধরতে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে শিক্ষার্থীরা সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা, বিচারক, সচিব, আমলা, পুলিশের ডিআইজি, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের গাড়ি ও চালকের লাইসেন্স পরীক্ষা করেন। কাগজপত্র না থাকায় অনেকের গাড়ি আটকে দেয়া হয়। তাদের কেউ কেউ দুঃখ প্রকাশ করে ছাড়া পান। কারও কারও বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে।
গতকাল দুপুরের দিকে একজন বিচারপতির গাড়িচালকের লাইসেন্স না থাকায় শিক্ষার্থীরা গাড়িটি আটকে দেয়। তখন ওই বিচারক শিক্ষার্থীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করলে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। দুপুর ১২টার দিকে লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি গাড়ির চালকের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা গাড়ি আটকে চালকের লাইসেন্স দেখতে চায়। দেখা যায়, লাইসেন্সটি মেয়াদোত্তীর্ণ। এরপর সেখানে কর্তব্যরত সার্জেন্ট জাফর ইমাম লাইসেন্স নবায়ন না করায় একটি মামলা করেন। কাওরানবাজার-ফার্মগেট সড়কে নৌ পুলিশের ডিআইজি’র গাড়ি আটকে দেয় আন্দোলনকারীরা। গাড়িতে ‘পুলিশ’- লেখা দেখে শিক্ষার্থীরা কাগজপত্র দেখতে চাইলে গাড়িচালক কাগজপত্র  দেখাতে পারেননি। এমনকি গাড়ির চালক তার ড্রাইভিং লাইসেন্সও  দেখাতে পারেননি।
এ ঘটনায় উপস্থিত সকলেই বিস্মিত হন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি গাড়িতে (ঢাকা মেট্রো-ঘ-১১-৬৭৬০) রং দিয়ে ‘আমার লাইসেন্স নাই’ সহ বিভিন্ন মন্তব্য লিখে দিয়েছে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। রাজধানীর ধানমন্ডির ২ নম্বর রোডে সিটি কলেজের পশ্চিম পাশে  গাড়িটির কাগজপত্র না পেয়ে ওই গাড়িটিতে লেখা হয় নানান মন্তব্য। লাইসেন্স না থাকায় ধর্ম মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের গাড়িতেও ‘ভুয়া’ লিখে দেয় শিক্ষার্থীরা। কাগজপত্র ঠিক না থাকায় অপর এক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবকে বাংলামটরে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয় আন্দোলনকারীরা। পরে রিকশা নিয়ে তিনি সচিবালয়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন।
বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথের গাড়িও আটক করে শিক্ষার্থীরা। গাড়ির চালক ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখাতে না পারায় এমপি পঙ্কজ  দেবনাথকে অবরুদ্ধ করে রাখেন বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা। শনিরআখড়া এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে। ছাত্রলীগের স্থানীয় এক নেতা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়ালে তাকে মারধর করে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে এমপি’র গাড়ির বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা দেয়ার পর গাড়ি ছেড়ে দেয়া হয়।

ভর মৌসুমেও ইলিশের আকাল by মো. আব্দুল লতিফ

ইলিশের নদীখ্যাত রায়পুরের মেঘনায় ভরা মৌসুমেও চলছে ইলিশের আকাল। শ্রাবণের শেষ পর্যায়ে এসেও ইলিশ ধরা পড়ছে না জেলেদের জালে। মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর ভরাট, পানিদূষণ, যত্রতত্র ডুবো চর, কারেন্ট জালের ব্যবহার ও সুষ্ঠু নীতিমালার অভাবে ভরা মৌসুমেও মেঘনায় ইলিশের আকাল দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে কয়েক বছরের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের ইলিশ সমৃদ্ধ নদীগুলোতে ইলিশের দেখা মিলবে না। প্রতিনিয়ত সমুদ্র ও মুক্ত জলাশয় থেকে যেভাবে মাছ শিকার করা হচ্ছে, তাতে এই অঞ্চলে শুধু ইলিশই নয় অন্যান্য জাতের মৎস্য সম্পদের দেখাও মিলবে না। নদীর স্রোত কমে যাওয়ায়, নদীতে বাঁধনির্মাণ ও নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রজনন মৌসুমে সাগর থেকে বড় বড় নদীর মোহনায় ইলিশ আসতে পারছে না। এশিয়ার বৃহত্তম মৎস্য প্রজনন রায়পুর কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অহিদুর রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বিশেষ করে তাপমাত্রার আধিক্যের কারণে ইলিশের মৌসুমেরও পরিবর্তন ঘটছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি, খাবারের অপর্যাপ্ততা, পানিদূষণ, ইলিশ মাছের প্রজননকে ব্যাহত করছে। এই দিকে ভরা মৌসুমে ইলিশ না মেলায় জেলেরা বেকার দিন পার করছেন। নদীপাড়ের জেলে সোহবান আলী বলেন, এই বছর শ্রাবণ মাস শেষ হতে চললেও আমরা মাছ ধরতে নদীতে নামতে পারছি না। পরিবার নিয়ে না খেয়ে দিন পার করতে হচ্ছে। সামনে ঈদ, জানি না কেমনে পরিবারপরিজন নিয়ে ঈদ করব। জেলে আনোয়ার আলী অভিযোগ করে বলেন, নদীর মোহনায় ভারতীয় জেলেরা বিশেষ কারেন্ট জাল দিয়ে বেড় দেয়ায় ইলিশ মাছ আসতে পারছে না। মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি মোস্তফা বেপারী বলেন, সবার আগে প্রয়োজন ছোট মাছ ধরার উপকরণ নিষিদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনিস্টিটিউটের ইলিশ গবেষণা কেন্দ্র, চাঁদপুরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, নদীর প্রবাহ হ্রাস, দূষণ ও সাগরের মাছের খাদ্য সংকট এবং পানির গভীরতা কমে যাওয়ায় মাছের আবাসস্থলের পরিবর্তন হচ্ছে। জাটকা নিধন পুরোপুরি বন্ধ করতে পারলে ইলিশের বংশবিস্তার বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। তবে শ্রাবণ মাসের শেষেও পরিমান মতো বৃষ্টিপাত এখনও হয়নি। আরো বর্ষণ শুরু হলে মিঠা পানি পান করতে এলে প্রচুর পরিমানে ইলিশ ধরা পড়বে। রায়পুর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন বলেন, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেই কিছুদিনের মধ্যে ইলিশের ঝাঁক নদীতে আসতে শুরু করবে। এবার জাটকা নিধনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করায় ইলিশের উৎপাদন অতীতের চেয়ে অনেক বেশি হবে।
ইন্দুরকানী (পিরোজপুর) প্রতিনিধি: ইলিশের ভর মৌসুমেও দক্ষিণাঞ্চলের খ্যাতনামা পাড়েরহাট মৎস্য বন্দর ইলিশশূন্য। শুধু সাগর নয় স্থানীয় নদনদীতেও চলছে ইলিশের বড় আকাল। উপজেলার কচা ও বলেশ্বর নদীতে ইলিশের ভরা মৌসুমেও ইলিশ ধরা পড়ছে না। কোনো কোনো জেলে দু-একটা ইলিশ পেলেও তা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। অপরদিকে এ উপজেলার চন্ডিপুর, কলারণ, খোলপটুয়া, টগড়া, বালিপাড়া ও পাড়েরহাট জেলেপল্লীর জেলেরা মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে ট্রলার ও জাল নিয়ে বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকারে গেলেও ইলিশ না পাওয়ায় তারা হতাশ হয়ে পড়েছেন। একদিকে মহাজনের দাদন নেয়া অপরদিকে পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণ নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। তাই ইলিশ আহরণ মৌসুমে (আষাঢ়-আশ্বিন) সাগরে জেলেদের জালে ইলিশ ধরা না পড়ায় ইলিশ শূন্য হয়ে পড়েছে পাড়েরহাট মৎস্য বন্দর। স্থানীয় নদনদীতে ধরা পড়া দু-একটি ছোট ইলিশ ছাড়া এ এলাকার হাট-বাজারেও ইলিশ দেখা যায় না। ফলে দারুণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন ইন্দুরকানীর বিভিন্ন এলাকার জেলেপল্লীর বাসিন্দারা। কলারণ গ্রামের জেলে আব্দুর রহমান জানান, ইলিশের ভরা মৌসুমেও সাগরে ইলিশ না পাওয়ায় আমরা জেলে পরিবারগুলো দেনার দায়ে অসহায় হয়ে পড়েছি।
পাড়েরহাট মৎস্য বন্দরের আড়ৎদার ইকবাল হোসেন জানান, স্থানীয় নদনদীতে এবং সাগরে জেলেদের জালে ইলিশ ধরা না পড়ায় জেলেরা সমস্যায় আছেন। গত কয়েক দিন ধরে সাগর উত্তাল থাকায় জেলেরা সাগরে জাল ফেলতে পারছেন না। একটা ট্রলার খাবার ও বরফ নিয়ে একটা খ্যাপে একবার সাগরে গেলে লাখ টাকা খরচ হয়। কিন্তু এবার ইলিশ না পড়ায় ট্রলার মালিকদের অনেক লোকসান হচ্ছে। অপরদিকে জেলে পরিবারগুলো ধার-দেনা করে সংসার চালাচ্ছে।

‘এনআরসি ইস্যু বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ধ্বংস করে দেবে’

সতর্কতা উচ্চারণ করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বললেন, এনআরসি বা ভারতের নাগরিকত্ব ইস্যুতে সৃষ্ট উত্তেজনা বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে ধ্বংস করে দেবে। তিনি ভারত সরকারের প্রতি প্রশ্ন তুলেছেন, ভারতে বড় সংখ্যায় তো নেপালি নাগরিকরাও আছেন। তাহলে কেন শুধু বাংলাদেশের অবৈধ নাগরিকদের ফোকাস করছে সরকার। ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের বহুল বিতর্কিত আসামের এনআরসি বাস্তবায়ন নিয়ে নিজের সমালোচনা ক্ষুরধার করে এমন মন্তব্য করেছেন মমতা। ৩০শে জুলাই আসামের এনআরসির চূড়ান্ত খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।
তাতে ৪০ লক্ষাধিক মানুষকে তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ তারা ভারতের নাগরিক নন। এসব মানুষকে বলা হচ্ছে বাংলাদেশের অবৈধ অভিবাসী। এর বেশির ভাগই হলেন বাংলাভাষী মুসলিম। এ ইস্যুতে ভারতের রাজনীতি, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে উত্তেজনা বিরাজ করছে। অনলাইন দ্য স্টেটসম্যানের রিপোর্টে মমতার ওই সতর্কতার কথা উঠে এসেছে। মমতা বলেছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চান না। তবে সব বিরোধী দল মিলে যদি একত্রিত হয় তাহলে বিজেপিকে পরাজিত করা যাবে এবং সেটাই এখন প্রধান অগ্রগণ্য। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের একটি চমৎকার সম্পর্ক বিদ্যমান এ বিষয়টি সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরে মমতা ওই সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এনআরসি তালিকায় যে ৪০ লাখ মানুষের নাম নেই, তাদের মধ্যে মাত্র শতকরা এক ভাগ হতে পারেন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। কিন্তু বিজেপি দেখাতে চেষ্টা করছে তারা সবাই অনুপ্রবেশকারী।
এতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ধ্বংস হবে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ কোনো সন্ত্রাসী দেশ নয়। স্বাধীনতার পর গুজরাট, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাবে এসেছেন বহু পাকিস্তানি। বাংলাদেশ থেকেও ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও আরও অনেক রাজ্যে এসেছেন মানুষ। তারা অনুপ্রবেশকারী বা সন্ত্রাসী নন। বাংলাদেশ ও আমরা (পশ্চিমবঙ্গ) একই মাতৃভাষায় কথা বলি এটাই কি অপরাধ? বিজেপি মনে করে, যারাই বাংলা ভাষায় কথা বলেন তারাই বাংলাদেশি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় সরকারকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, অবৈধ অভিবাসী ইস্যুটি একটি এক সময়ের জন্য একটি বিচ্ছিন্ন ইস্যু নয়। সীমান্তটা শুধু রাজ্য সরকারের সঙ্গে নয়, সীমান্ত তো কেন্দ্রীয় সরকারেরও (অর্থাৎ সীমান্তের দায় কেন্দ্রীয় সরকারেরও)। তিনি এ কথার মধ্যদিয়ে স্পষ্ট করে দেন যে, সীমান্ত নিরাপত্তা রাখার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের ওপরও বর্তায়। বিজেপি এনআরসি ইস্যু নিয়ে ভোটব্যাংক রাজনীতির খেলা খেলছে বলে অভিযোগ করেন মমতা। তিনি বলেন, যারা বিজেপির ভোটার হবেন তাদের ওই (এনআরসি) তালিকায় রাখা হবে। যারা ভোটার হবেন না তাদের নাম ওই তালিকা থেকে বাদ রাখা হবে। তিনি সরকার তথা বিজেপিকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন রাখেন, বাংলাদেশি নাম দিয়ে কি আপনারা প্রত্যেককে বের করে দেবেন?
সব বিরোধী দলকে আসামে প্রতিনিধিদল পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন মমতা। তিনি বলেন, এনআরসির সব কাজ করছে বিজেপি। তারা কেন্দ্রে ও আসামের শাসন ক্ষমতায়। এ কাজে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে। তারা জনগণকে বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন করতে চায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি আবারও সতর্কবার্তা দিয়েছেন। বলেছেন, এতে দেশ রক্তপাত ও গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হবে।
নয়া দিল্লি সফরের তৃতীয় দিনে বুধবার মমতা সাক্ষাৎ করেছেন বিরোধীদলীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে। এর মধ্যে রয়েছেন ইউপিএ চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধী ও কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর ছেলে রাহুল গান্ধী। এ সময়ে তিনি বিজেপিকে আটকাতে ঐক্যবদ্ধ একটি বিরোধী দল গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন। শুধু কংগ্রেসই নয়। এ দিন মমতা সাক্ষাৎ করেন টিডিপি, এসপি, জেডি-এস, ওয়াইএসআর (কংগ্রেস), ডিএমকে, আরজেডি ও এনসিপি দলের নেতাদের সঙ্গে। এ ছাড়া বিজেপির ভিন্নমতাবলম্বী নেতা এলকে আদভানির সঙ্গেও তার সাক্ষাৎ হয়। মমতা সাক্ষাৎ করেন শিবসেনার এমপি সঞ্জয় রাউতের সঙ্গেও। এসব নেতার বেশির ভাগের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয় পার্লামেন্ট হাউজে।
আগামী ১৯শে জানুয়ারি কলকাতায় র‌্যালি করবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই র‌্যালিতে অংশ নিতে শিবসেনা প্রধান উদ্ভব থাকরে সহ বিরোধীদলীয় নেতাদের প্রতি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তিনি। ওই র‌্যালিকে ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর একটি ঐক্যবদ্ধ ও সবচেয়ে জোরালো, মেগা শোডাউন বলে দেখা হচ্ছে।
বুধবার ১০ জনপথের বাসভবনে সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর মমতা সাংবাদিকদের বলেন, বিরোধী দলগুলো ঐক্যবদ্ধ। ২০১৯ সালে বিজেপি শেষ হয়ে যাবে। আমরা সম্মিলিতভাবে নেতৃত্বের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবো। তিনি জানান, এসব বৈঠকে এনআরসি ইস্যুতে কথা হয়েছে। তাছাড়া বিজেপিকে মোকাবিলা করতে কিভাবে বিরোধীরা এক হয়ে কাজ করতে পারে তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তার কাছে এ সময় প্রশ্ন করা হয়, প্রস্তাবিত বিজেপি বিরোধী ফ্রন্টের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী করা হবে কাকে? এমন প্রশ্নের জবাবে মমতা বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে পরে। প্রথম অগ্রাধিকার হবে বিজেপিকে পরাজিত করা।
এনআরসি ইস্যুতে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করে বলেছেন, আসামে এনআরসি থেকে যেসব মানুষের নাম বাদ দেয়া হয়েছে তারা বিহার, উত্তর প্রদেশ, তামিলনাড়ু, গুজরাট ও পশ্চিমবঙ্গের। আমরা চাই তাদের শান্তিতে বসবাস করতে দেয়া হোক। তাদের অনেকে আসামে ১০০ বছর ধরে ৫ প্রজন্ম পর্যন্ত বসবাস করছেন। কিভাবে তাদের ক্ষেত্রে আপনারা এটা করতে পারেন?
মমতা বিজেপিকে আরো ঘায়েল করেন। তিনি বলেন, ক্ষমতায় ফিরে না এল বিজেপি জানে ২০১৯ সালে তাদের কী ঘটবে। এজন্যই তারা এ ইস্যুতে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে চেষ্টা করছে।

যেভাবে সন্ত্রাসীরা দখল করে আব্রাহাম ক্রুশের বাড়ি by রুদ্র মিজান

বাসার বাইরে সশস্ত্র সন্ত্রাসী। সঙ্গে পুলিশ। ছোট্ট বাসার ভেতরে তপন ক্রুশ, স্ত্রী তৃষ্ণা মারিয়া ক্রুশ ও বোন পুতুল সিসিলিয়া ক্রুশ। ভয়ে কাঁপছিলেন তারা। দরজায় ক্রমাগত বাড়তে থাকে লাথির শব্দ। একপর্যায়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পাঁচ-সাত যুবক। বাইরে দাঁড়ানো আরো ৩০-৩৫ জন। তপনকে মারধর করে তারা। টানাহেঁচড়া করে তৃষ্ণা ও পুতুলকে। মুহূর্তের  মধ্যেই বাসার টেলিভিশন, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল, সোফা লুট করে নিয়ে যায়।  মারধর করে বাসা থেকে বের করে দেয় তাদের। এভাবেই দখল করে নেয় বাড়ি। ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৬ সালের অক্টোবরে রাজধানীর পূর্বতেজতুরি বাজার এলাকায়।
সেদিনের পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তপন ক্রুশের পিতা আব্রাহাম ক্রুশ জানান, বাড়িটি হারানোর পর থেকে বিচ্ছিন্নভাবে আত্মীয়স্বজনদের বাসায় থাকছেন আব্রাহামের পরিবারের সদস্যরা। বাড়িটি উদ্ধারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। ঢাকা শহরে এই বাড়ি ছাড়া কিছুই নেই আমার। একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে চাকরি করেন আব্রাহাম ক্রুশ। আব্রাহাম জানান, দখলের দিন সকালে বাসার বাইরে ছিলেন তিনি। ফোনে ছেলে তপন ক্রুশের কাছ থেকে সংবাদ পেয়ে দ্রুত বাসায় ছুটে যান। গিয়ে দেখেন সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। বাসার টিন পর্যন্ত খুলে নিয়েছে তারা। এ নিয়ে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ালে আব্রাহাম ক্রুশকে মারধর করে সন্ত্রাসীরা। বাসার সামনে তেজগাঁও থানার উপ-পরিদর্শক সুজিতসহ বেশ কয়েক পুলিশ সদস্য। তাদের সামনেই ঘটছিল ঘটনা। পুলিশ আব্রাহামকে জানায় কোর্টের রায় আছে, তাই দখল বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে সাইফ উল্যাকে। উত্তরা তিন নম্বর সেক্টরের পাঁচ নম্বর সড়কের ১৬ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা সাইফ উল্যার গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। আব্রাহাম থানায় ছুটে যান। মারধর, মেয়েদের লাঞ্ছনার অভিযোগে একটি জিডি বা মামলা করতে চান। কিন্তু পুলিশ জিডি বা মামলা নেবে না। আব্রাহাম ক্রুশ বলেন, থানার ওসি বলেছেন, আমাদের কিছু করার নেই। আপনার অভিযোগ নেয়া যাবে না।
এভাবেই নিজের বাসাটি হারিয়ে যায় আব্রাহামের। আদালতের রায় সম্পর্কে জানা গেছে, আদালতে সাইফ উল্যা’র দায়েরকৃত ৬৮৮/১৫ মামলার রায়ে আব্রাহামের ৪৬/২ নম্বর বাসার কথা উল্লেখ নেই। ওই মামলায় ডকলেজ এ গমেজের দখলে থাকা সাড়ে তিন কাঠা জায়গা সম্পর্কে রায় দেয়া হয়েছে। আব্রাহাম বলেন, আমার বাসার জায়গা নিয়ে কোনো মামলাই ছিল না। রায় থাকবে কিভাবে। ডকলেজ এ গমেজের জায়গা দখল করার সময় কৌশলে তারা আমার বাসাটি দখল করেছে। পুলিশও তাদের সহযোগিতা করেছে। এ বিষয়ে তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আদালতের। এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।
আব্রাহাম ক্রুশ জানান, তেজতুরি বাজার মৌজার ১৪৫৯ ও ১৪৬০ নম্বর দাগের সোয়া তিন কাঠা জায়গার মালিক তার স্ত্রী পারুল মারিয়া ক্রুশ। পৈত্রিক সূত্রে এই জায়গা পান পারুল মারিয়া। বৃটিশ আমল থেকেই তাদের পূর্বসূরিরা এখানে বসবাস করছেন। ২০১৩ সালে পারুল মারিয়া ক্রুশ মারা যাওয়ার পর থেকে ওই বাড়িতে বসবাস করতেন আব্রাহাম ও তার দুই ছেলে, দুই মেয়ে ও বড় ছেলের স্ত্রী। 
হঠাৎ করেই সাইফ উল্যার দৃষ্টি পড়ে এই বাসার ওপর। প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় সফলও হন তিনি। অন্যদিকে, থানা পুলিশের সহযোগিতা না পেয়ে আদালতে যান আব্রাহাম ক্রুশ। আদালত ওই জায়গার ওপরে স্থিতিতাদেশ দেন। সোমবার পূর্ব তেজতুরি বাজারের ৪৬/২ নম্বরের ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজের উল্টো দিকে রাস্তার পাশের কয়েক বাড়ি পরেই এই বাড়িটি। সামনের গেটে সার্বক্ষণিক রয়েছেন একজন নিরাপত্তাকর্মী। গেটের ভেতরে বেশ কয়েক কোচিং সেন্টার ও একটি মাদরাসা ভাড়া দেয়া হয়েছে। এর মধ্যেই আব্রাহামের বাড়ি। ছোট্ট বাড়িটি ভাঙ্গা ধ্বংসস্তূপ অবস্থায় পড়ে আছে। পাকা কয়েক পিলার ও ক্রংক্রিটের ভাঙ্গা দেয়ালের ভেতরে রয়েছে ভাঙাড়ি জিনিসপত্র।
তেজগাঁওয়ের হলি রোজারি চার্চের ফাদার কমল কোড়াইয়া জানান, বাড়িটি দখল হওয়ার পর দীর্ঘদিন চার্চে আশ্রয় নিয়েছিলেন আব্রাহাম। তারপর থেকে কোথায় আছেন জানা নেই তার। এ বিষয়ে আব্রাহাম বলেন, গরিব মানুষ। বাসা ভাড়া দিয়ে থাকার মতো টাকা নেই। বাড়িটি হারানোর পর ছেলে ও ছেলের স্ত্রী এক আত্মীয়ের বাসায় থাকছে। ছোট ছেলে মেসে থাকে। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। আর আব্রাহাম থাকেন মহাখালীতে আত্মীয়ের বাসায়। এভাবেই দিনাতিপাত করছেন তারা।
আব্রাহাম ক্রুশ জানান গ্যাস, বিদ্যুৎ বিল এখনও তার স্ত্রী পারুল মারিয়া ক্রুশের নামেই আসে। ২০১৭ সালের ৯ই জুলাই সিটি করপোরেশনের করও পরিশোধ করেছেন তিনি।
এ বিষয়ে সাইফ উল্যার বক্তব্যের জন্য তার ফোন নম্বরে বারবার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এক পর্যায়ে তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

জেনে অবাক হবেন

জেনে অবাক হবেন যে- ক্ষুদ্র প্রাণি মশার রয়েছে ৪৮টি দাঁত, ১০০টি চোখ, ৩টি পূর্ণাঙ্গ হৃৎপিণ্ড ও ৬টি ডানা। তাদের নাকের নিচে রয়েছে ৬টি ধারালো ছুরি। মশা অন্ধকারেও লক্ষবস্তু নির্ধারণ করতে পারে। মশার আছে রক্ত পরিমাপক যন্ত্র যা দিয়ে মশা রক্ত পছন্দ করে। কারণ তারা সব রক্ত খায় না এবং স্ত্রী মশাই শুধু কামড়ায়। বিশ্বজুড়ে তিন হাজার ৫শ’ প্রজাতির মশা রয়েছে। মশা সেকেন্ডে ৩০০-৬০০ বার ডানা ঝাপটাতে পারে। প্রতিবছর মশার কামড়ে বিশ্বে দুই মিলিয়ন মানুষ মারা যায়। তবে, বিপদজনক প্রাণিটির জীবনকাল মাত্র তিন দিন।

ঘোষণা ছাড়াই দূরপাল্লার বাস বন্ধ, ভোগান্তি

হঠাৎ করে গণপরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গতকাল দিনভর ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। রাস্তা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সড়কে গাড়ি চলবে না বলে জানিয়েছেন বাস মালিকরা। ছাত্ররা তো গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখতে বলেনি, রাস্তায় গাড়ি নেই, মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে এই প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, আমাদের নিরাপত্তার জন্য গাড়ি বন্ধ রাখা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা ৩শ’ গাড়ি ভাঙচুর করেছে। ৫টিতে আগুন দিয়েছে। এরমধ্যে তার নিজের গাড়িও আছে বলে তিনি  উল্লেখ করেন। মহাসচিব বলেন, ভয়ের কারণে গাড়ি চালাচ্ছেন না তারা।
সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা ও নগর বাস টার্মিনালের বাস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম এ বিষয়ে মানবজমিনকে বলেন, আতঙ্ক ও অস্থিরতার মধ্যে আছি। গুজব ছড়াচ্ছে যে, চালকদের ধরছে। মালিকরা গাড়ি বন্ধ রাখেনি। তবে চালকরা ভয়ে গাড়ি চালাতে চাচ্ছেন না। যাদের লাইসেন্স নেই তারা তো আসছেন না। আর যাদের বৈধ লাইসেন্স আছে তারাও ভয় পাচ্ছেন শিক্ষার্থীদের। বিভিন্ন পয়েন্টে শিক্ষার্থীরা ব্রেক দিয়ে গাড়ি আটকাচ্ছেন এমন খবরে টার্মিনালে কোনো গাড়ি আসেনি বৃহস্পতিবার। অথচ এই টার্মিনালে দৈনিক গড়ে ১৫ থেকে ১৭শ’ গাড়ি চলাচল করে। তিনি আরো বলেন, আমরা রাস্তা স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় আছি। স্বাভাবিক  হলেই গাড়ি পুরোদমে চলবে। এ প্রসঙ্গে মহাখালী বাস টার্মিনাল সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক মানবজমিনকে বলেন, সড়কে আমরা গাড়ি চালাতে চাই। সড়কের যে পরিস্থিতি তাতে গাড়ি চালানো সম্ভব না। রাস্তা নিরাপদ ও স্বাভাবিক হলে আমরা গাড়ি রাস্তায় নামাবো। তিনি বলেন, আমরাও জনদুর্ভোগ চাই না। শৃঙ্খলা চাই। মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার গাড়ি ছাড়ছেন না কেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাস্তা স্বাভাবিক হলে গাড়ি চলবে। এই টার্মিনাল থেকে দৈনিক দেশের বিভিন্ন জেলায় ৭ থেকে ৮শ’ গাড়ি চলাচল করলেও বৃহস্পতিবার এই সংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসে বলে তিনি উল্লেখ করেন। যে সব গাড়ি টার্মিনালে ঢুকেছে সেগুলোও ছেড়ে যায়নি।
এদিকে গতকাল রাস্তায় বাসের সংখ্যা ছিল খুবই সামান্য। ফলে বিপাকে পড়েছে মানুষ। বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় বিচার চেয়ে রাজপথে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের জের ধরে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রাজধানীতে দেখা গেছে গণপরিবহনের তীব্র সংকট। ছিল না দূরপাল্লার গাড়িও। হাতেগোনা কিছু বাস দেখা গেছে রাস্তায়। সেগুলোতেও ছিল উপচেপড়া ভিড়। বেশির ভাগ মানুষ হেঁটেই কর্মস্থলের দিকে গেছেন এবং বাসায় ফিরেছেন। কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যানবাহন না পেয়ে রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের মোটরবাইক ব্যবহার করে অফিসে গেছে তারা। অল্পকিছু লোকাল বাস চলাচল করেছে। আর সেগুলোতেও রয়েছে উপচেপড়া ভিড়। মিরপুর, কাজীপাড়া, শ্যাওড়াপাড়া, তালতলায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে শ’ শ’ অফিসগামী মানুষকে। দূর থেকে কোনো বাস আসতে দেখলেই তারা অপেক্ষা করেছেন।
কাছে আসতেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে সেগুলো বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি অফিসের স্টাফ বাস। ফলে বারবার আশাহত হয়েছেন এসব এলাকার অপেক্ষমাণ যাত্রীরা। পরে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা করে সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা রিকশায় কর্মস্থলে পৌঁছতে চেষ্টা করেছেন তারা। আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, র‌্যাংগস ভবন, কাকরাইল, শাহবাগ, সাতরাস্তার মতো ব্যস্ত এলাকাগুলোও ছিল তুলনামূলক ফাঁকা। ফুটপাথে ছিল হেঁটে রওনা হওয়া মানুষের ভিড়। তবে বেশির ভাগ মানুষের মধ্যেই দেখা যায়নি তেমন বিরক্তি। অবশ্য অনেকে এসব বিষয়ে কথাই বলতে চাননি। মাহমুদ নামের এক যাত্রী জানান, গত চারদিন ধরেই কষ্ট হচ্ছে। তবু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে কোনো বিরূপ মনোভাব নেই তার। গত ২৯শে জুলাই রাজধানীর এয়ারপোর্ট রোডে দুই কলেজ শিক্ষার্থী বাসচাপায় নিহত হন। এরপর থেকে ৯ দফা দাবি বাস্তবায়নে প্রতিদিন সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। নিরাপত্তার অজুহাতে বৃহস্পতিবার ঢাকার সঙ্গে বিভিন্ন জেলা এবং ঢাকার মধ্যে বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা।

রাস্তা বন্ধ, রাষ্ট্রের মেরামত চলছে

অভাবনীয়। বিস্ময়কর। বাংলাদেশ কেন? পৃথিবীর ইতিহাসেই কী কখনো এমন ঘটনা ঘটেছে? নিষ্পাপ, নির্দলীয়। রাজপথে হাজার-হাজার শিশু-কিশোর। বুক তাদের বাংলাদেশের হৃদয়। মুখে স্লোগান। উই ওয়ান্ট জাস্টিস। ইনসাফের দাবি নিয়ে এসেছে ওরা। তার চেয়ে বড় কথা ওরা আমাদের, বড়দের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এই রাষ্ট্র, সমাজে কীভাবে পচন ধরেছে। আমরা হয়তো জানতাম। কিন্তু অতটা কখনোই নয়। এই রাষ্ট্রের ক্ষমতাবানরা সব আইনের ঊর্ধ্বে। তাদের কোনো লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় না। না, কোনো কিছুতেই নয়। সম্ভবত প্রথম একটি শিশুর দীপ্ত উচ্চারণ ফেসবুকে ভাইরাল হয়। লাইসেন্স আছে। না, নেই। তাহলে এই গাড়ি যাবে না। এরপর শুরু হয়েছে নতুন এই সংস্কৃতি। এই শিশুরাই এখন নিয়ন্ত্রণ করছে রাজপথ।
শুরু হয়েছিল মর্মন্তুদ দুটি মৃত্যুকে ঘিরে। দুই শিক্ষার্থীকে মেরে ফেলা হয় বাসচাপায়। বাংলাদেশে অবশ্য এটা নতুন কোনো ঘটনা নয়। বাসচালকরা বরাবরই বেপরোয়া। তাদের ওপরে রয়েছে ক্ষমতাবানদের বিশাল ছায়া। পুরো পরিবহন সেক্টরই মাফিয়াতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে। এবারের ভিলেন জাবালে নূর পরিবহনের মালিকানায়ও রয়েছে ক্ষমতাতন্ত্রের স্পষ্ট সংযোগ। দুই বন্ধুর নিষ্ঠুর মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ, বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা। রাজপথে নেমে আসে তারা। এরই মধ্যে ক্ষমতাবান এক মন্ত্রীর বক্র হাসি আন্দোলনকারীদের আরো ক্ষুব্ধ করে তোলে। তারা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান মন্ত্রীর নিষ্ঠুরতা দেখে। একে একে আন্দোলনে যোগ দেয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শিক্ষার্থী। পরিস্থিতি সামাল দিতে নানা কৌশল আর উদ্যোগ নেয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। শাসক দলের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে অভিযোগ করা হয়েছে, এ আন্দোলনে স্বার্থান্বেষী বিরোধী মহল ইন্ধন যোগাচ্ছে। আন্দোলনে যেকোনো কিছু ঘটে যেতে পারে বলেও সতর্কবার্তা উচ্চারণ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ঘরে ফিরে যাওয়ার জন্যও বারবার বলা হচ্ছে। 
বৃহস্পতিবার বন্ধ ছিল দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু শিক্ষার্থীদের উত্তাঙ্গ ঢেউ তাতে কমেনি, বরং আরো বেড়েছে। এ দিন ঢাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিল দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে। রাজধানী শহর ছিল অচল। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে জেলায় জেলায়। অবরোধে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে মানুষকে। তবে তারা তা মেনে নিয়েছেন হাসি মুখেই। এ আন্দোলনের পরিণতি যা-ই হোক না কেন, এই শিশুরা এরই মধ্যে রচনা করেছে নতুন ইতিহাস। তাদের কিছু কিছু দাবি আর স্লোগান নতুন চিন্তা আর নতুন এক বাংলাদেশের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাস্তা বন্ধ, রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে। সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত। এই প্ল্যাকার্ড জন্ম দিয়েছে বিপুল আলোচনার। জনপ্রতিনিধিদের সপ্তাহে অন্তত তিন দিন গণপরিবহনে যাতায়াত করতে হবে- এ দাবি বড়রা তোলার হিম্মত না পেলেও এই শিশুরা-কিশোররা সে সাহস দেখিয়েছে।
যন্ত্রটি অবিরাম চলছে। স্বাধীনতার পর তা কোনো দিনই বন্ধ হয়নি। নাম দেয়া হয়েছে ষড়যন্ত্র। শাসকেরা এ যন্ত্র খুঁজতে খুবই ভালোবাসেন। কখনো তা সত্য হয়, কখনো মিথ্যা। শিশু-কিশোরদের অভাবনীয় এ আন্দোলন ঘিরেও কিছু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আবিষ্কার হয়েছে। তার সত্য-মিথ্যা হয়তো কোনো দিন জানা যাবে অথবা জানা যাবে না। কিন্তু এই সত্য সম্ভবত, কেউ অস্বীকার করবেন না; এই আন্দোলনের প্রায় শতভাগ মুখই নিষ্পাপ। তাদের আমরা ভাবতাম ফেসবুক প্রজন্ম। কিন্তু তারা দেখিয়েছে অসীম সাহস, তারা ত্যাগ স্বীকার করতে জানে। পচতে বসা সমাজের পতন ঠেকানোর এক ঐতিহাসিক শক্তি তাদের মধ্যে রয়েছে। মন্ত্রী, সচিব, রাজনীতিবিদ, পুলিশ, সাংবাদিক সমাজের প্রভাবশালী একটি বড় অংশ যেকোনো আইনের তোয়াক্কা করেন না, আইনি ব্যবস্থা যে এখানে বহুলাংশে ভেঙে পড়েছে এই শিশুরা আমাদের সেদিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। না, তাদের কোনো নেতা নেই, কোনো দল নেই। তারা অবিচল, তারা নিষ্কম্প। তারাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। এই রাষ্ট্রের মেরামত আসলেই জরুরি। আসুন, ওদের কথা শুনি। এতে কোনো ক্ষতি নেই।
এদিকে অবরোধ-বিক্ষোভে গতকালও অচল ছিল ঢাকা। নিরাপদ সড়কের দাবিতে চলা শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ হয়েছে সারা দেশে। টানা কর্মসূচি চলার মধ্যে কোনো কারণ ছাড়াই দূরপাল্লার বাস বন্ধ করে দিয়েছেন পরিবহন মালিকরা। তারা বাস বন্ধে নিরাপত্তার কথা বললেও শিক্ষার্থীরা মহাসড়কে দূরপাল্লার কোনো বাসে হামলা করেছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। এদিকে রাজধানীতেও গণপরিবহন চলেনি। বড় ধরনের বিক্ষোভের আশঙ্কায় গতকাল সরকারি ঘোষণায় সারা দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। তবে বিক্ষোভে আগের দিনের চেয়ে বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেয়। পুরো রাজধানীতে বিভিন্ন সড়কের মোড়ে স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেয়। আন্দোলনে নামা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ সড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কাজ করে। তারা নিজেদের মতো করে যানবাহনকে সারিবদ্ধভাবে লেন ধরে চলতে বাধ্য করে।
এমনকি রিকশা চালকদেরও সারিবদ্ধ হয়ে চলতে দেখা যায় সড়কে। এ ছাড়া মোড়ে মোড়ে সব ধরনের যানবাহনের কাগজপত্র পরীক্ষা করে শিক্ষার্থীরা। পঞ্চম দিনে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিব, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকেও গাড়ির কাগজপত্র না থাকায় আটকে দেয় শিক্ষার্থীরা। যানবাহনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে শিক্ষার্থীদের চেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ। পরিবহন না থাকায় রাজধানীতে লাখ লাখ মানুষ হেঁটে, রিকশায় বা বিকল্প যানে দুর্ভোগ সঙ্গী করে চলাচল করলেও এতটুকু বিরক্তি ছিল না কারও। সাধারণ মানুষ বলছেন দুর্ভোগ সহ্য করে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরলে এটি হবে দেশের জন্য একটি বড় অর্জন। এদিকে শিক্ষার্থীদের তল্লাশিতে সরকারি যানবাহনের কাগজপত্র ও লাইসেন্স না থাকার বিষয় ধরা পড়া এবং তা ব্যাপক হারে প্রচার হওয়ায় গতকাল সরকারের পক্ষ থেকে গাড়িতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মৌখিকভাবে এ নির্দেশনা দিয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও স্কুল বা কলেজের পোশাক এবং পরিচয়পত্র গলায় ঝুলিয়ে সকাল থেকে বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। তারা কেউ কেউ জড়ো হয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছিলেন। আবার কেউ কেউ সড়কে নেমে যানবাহনের কাগজপত্র পরীক্ষা করছিলেন। কেউ যানবাহনকে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে চলতে সহযোগিতা করেন। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিকাল পর্যন্ত কর্মসূচি পালন করেন। দিনের কর্মসূচি শেষে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয়া হয়েছে বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে। এদিকে সরকারের তরফে বলা হয়েছে শিক্ষার্থীদের সব দাবি মেনে নেয়া হয়েছে। রাস্তা ছেড়ে ক্লাশে ফিরে যাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। এদিকে পুলিশের পক্ষ থেকেই একই ধরনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
শাহবাগ থেকে ফার্মগেট: সকাল ১১টায় বৃষ্টি উপেক্ষা করে শাহবাগ মোড়ে জড়ো হতে থাকেন বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। ঝুম বৃষ্টির মধ্যেই শিক্ষার্থীরা পঞ্চম দিনের মতো প্রধান সড়ক অবরোধ করে। যানবাহন আটকিয়ে চালকদের লাইসেন্স পরীক্ষা করে তারা। লাইসেন্সবিহীন চালকদের আটকে রেখে ট্রাফিক সার্জেন্টদের কাছে সোপর্দ করেন। গতকাল শাহবাগ মোড়ে অন্তত অর্ধশতাধিক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে অংশ নেন। সকাল থেকে বৃষ্টি থাকায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম থাকলেও বৃষ্টি থামার পরপরই নগরীর বিভিন্ন এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ঢল নামে।
শাহবাগ মোড়ে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল ইডেন মহিলা কলেজ, আইডিয়াল কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, ন্যাশনাল মহিলা কলেজ, সলিমুল্লাহ কলেজ, বদরুন্নেসা কলেজ, টিএনটি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, টিএনটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, নাখালপাড়া হোসেন আলী উচ্চ বিদ্যালয়, তেজগাঁও মহিলা কলেজ, গুলশান কমার্স কলেজ, টিএনটি মহিলা ডিগ্রি কলেজ, সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজ, বিএফ শাহিন কলেজ, তেজগাঁও ইউনিভার্সিটি কলেজ, সিটি কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নবাবপুর সরকারি কলেজ, মাইলস্টোন কলেজ, দনিয়া কলেজ, সাউদার্ন সিটি কলেজ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ওয়ারী উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকা পলিটেকনিক, আদমজি হাবিবুল বাশার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সাভার কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ, ঢাকা উদ্যান সরকারি কলেজ, শহীদ বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি কলেজ, ঢাকা নার্সিং কলেজ, নটরডেম কলেজ, মুন্সি আব্দুর রউফ কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ নুর মোহাম্মদ কলেজ, ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ, সেন্ট জোসেফ, ন্যাশনাল পলিটেকনিক, শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, কেন্দ্রীয় মোহাম্মদপুর কলেজসহ আরো বেশকিছু কলেজের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি আদায়ের এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে একাত্মতা প্রকাশ করতে এসেছিলেন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকসহ অনেকে।
অবরোধে আসা শিক্ষার্থীরা এ সময় নানা স্লোগান দিতে থাকেন ‘রাস্তা বন্ধ রাষ্ট্রের মেরামত চলছে’ ‘সড়ক কেন মৃত্যু ফাঁদ’ ‘বিচার চাই-বিচার চাই ছাত্র হত্যার বিচার চাই’ ‘আমার ভাই কবরে খুনিরা কেন বাহিরে’ ‘আমার বোন কবরে খুনিরা কেন বাহিরে’ ‘পুলিশ-ছাত্র ভাই ভাই ছাত্র হত্যার বিচার চাই’ ‘ছাত্র-সাংবাদিক ভাই ভাই নিরাপদ সড়ক চাই’ ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ ‘উই মাস্ট গেট জাস্টিস’ ‘এবার তোরা মানুষ হ’ ‘শিক্ষকের হাতে বেত নাই পুলিশের কেন মার খাই’-এসব স্লোগানে পুরো এলাকা মুখরিত ছিল। বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে শাহবাগ থেকে কাওরানবাজার, মৎস্যভবন, কাঁটাবন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে ওই এলাকা দিয়ে চলাচলকারী যাত্রীদের বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়। তবে রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সকে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই চলাচলে সহযোগিতা করেন। এর বাইরে যে কয়টি মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কারসহ অন্যান্য যানবাহন চলাচল করেছে সেগুলোর চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করে শিক্ষার্থীরা ছাড়ে।
যাদের কাছে বৈধ লাইসেন্স ছিল তাদের বেলায় কোনো সমস্যা হয়নি তবে যাদের কাছে লাইসেন্স ছিল না তাদেরকে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। কাউকে ঘণ্টাখানেক সময় আটকে রাখা হয়। আবার অনেককে সার্জেন্ট ডেকে এনে মামলা নিয়ে যেতে হয়েছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছে পুলিশ সদস্যদের বহনকারী ভ্যান, বিজিবির পণ্য বহনকারী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গাড়িকে। বৃষ্টি থামার পরপরই মৎস্যভবন এলাকা থেকে পুলিশের একটি ভ্যান গাড়ি শাহবাগ মোড়ের দিকে আসে। তখন সেই ভ্যানটিকে ঘিরে ধরে চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখতে চান শিক্ষার্থীরা। তখন দেখা যায় চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে তিন মাস আগে। প্রায় ২ শতাধিক শিক্ষার্থী ওই চালককে ঘিরে ধরলে সেখানে ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা উপস্থিত হন। তখন শিক্ষার্থীরা মামলা চাই-মামলা চাই বলে স্লোগান দিতে থাকেন।
ট্রাফিক সার্জেন্ট ইমাম ওই চালককে ২০০ টাকার একটি মামলা দেন। দুপুরের দিকে বারডেম হাসপাতালের সামনের সড়ক দিয়ে শাহবাগ চত্বরের দিকে আসতে থাকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) পণ্য পরিবহনের একটি গাড়ি। শিক্ষার্থীরা তখন ওই গাড়িটিকে ঘিরে ধরে চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখতে চায়। চালকের কাছে ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকায় বিপাকে পড়তে হয় ওই চালক ও গাড়িতে বসা বিজিবির অন্য সদস্যদের। মামলা চাই মামলা চাই বলে শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিতে থাকে। একইভাবে বিকালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি কার শিক্ষার্থীদের তোপের মধ্যে পড়ে। শিক্ষার্থীরা ওই গাড়ির বডিতে মার্কারস্প্রে দিয়ে লাইসেন্স নাই লিখে দিয়ে ঘণ্টাখানেক আটকে রেখে দেয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন মোটরসাইকেল চালকদেরও তোপের মুখে পড়তে হয়। অবরোধ চলাকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও বারডেম জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি অনেক রোগীর জন্য রক্তের প্রয়োজন হলে শিক্ষার্থীরা সঙ্গে সঙ্গে তা ব্যবস্থা করে দেন। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন দুপুরের দিকে দুর্বৃত্তরা তাদের অবরোধের মধ্যে প্রবেশ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে। দুর্বৃত্তরা বিকালে বিআরটিসির একটি দুতলা বাস ভাঙচুর করেছে বলেও কিছু শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন। বিকাল চারটার দিকে শিক্ষার্থীরা তাদের অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ান। পরে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়। আগামীকাল সকাল থেকে আবারো তারা জড়ো হওয়ার কথা জানান। শাহবাগ ছাড়াও কাঁটাবন মোড়, বাংলামোটর, ফার্মগেট এলাকায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা স্লোগান দেন এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করেন। প্রধান সড়ক আটকে আন্দোলন করায় যানবাহন চলাচল করতে পারেনি।  
ডেমরা-যাত্রাবাড়ী-চিটাগাং রোড: সকাল ১০টা থেকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় অবস্থান নেন ডেমরা, যাত্রাবাড়ী এলাকার বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা। এর আগে স্থানীয় হাজী হোসাইন প্লাজা মার্কেটের সামনে সমাবেশ করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা। কিছুক্ষণের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা সড়কের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা এই সড়ক দিয়ে যাতায়াতকারী ট্রাক, বাস, লেগুনাসহ বিভিন্ন যানবাহনের কাগজপত্র ও সংশ্লিষ্ট চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে কি না তা তদারক করেন। একপর্যায়ে ডেমরা-যাত্রাবাড়ী সড়ক, ডেমরা টু রামপুরা ব্রিজ লিংক রোডসহ আশপাশের সকল সড়ক বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা সড়কের মাঝখানে অবস্থান নিয়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে নানা স্লোগান দেয়।
অনেকের হাতে ছিল ব্যানার। সেখানে লেখা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিজ’, ‘মাগো তোমার ছেলে রাজপথে, দাবি শুধু ৯টি’, ‘আমাদের ৯ দফা দাবি মানতে হবে’। পুরো সময়টিতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের শান্ত ও সংযত থাকার আহ্বান জানান। তবে, শিক্ষার্থীরা জানান, তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। এ সময় এই সড়ক দিয়ে কিছু যানবাহন চলাচলের চেষ্টা করলেও শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে চালকেরা উল্টোপথে ফেরত যেতে বাধ্য হয়। তবে, তাদেরকেও লাইলেন্স দেখিয়ে তবেই পার পেতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ বারবার শিক্ষার্থীদের সড়ক থেকে সরে যেতে অনুরোধ করতে থাকে।
কিন্তু শিক্ষার্থীরা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। এরই মধ্যে একটি বাস স্টাফ কোয়ার্টার থেকে যাত্রাবাড়ী অভিমুখে যেতে চাইলে তা আটকে দেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় ছাত্রদের কয়েকজন হ্যান্ড মাইকে কোনো ধরনের যানবাহন ভাঙচুর না করার আহ্বান জানান। তারা বলেন, তাদের আন্দোলন নিরাপদ সড়কের জন্য, যারা বেপরোয়াভাবে বাস চালিয়ে শিক্ষার্থীদের পিষ্ট করেছে তাদের বিচারের জন্য। কেউ যেন কোনো গাড়ি ভাঙচুর না করে। আর যদি কারো ড্রাইভিং লাইসেন্স বা গাড়ির কাগজপত্র না থাকে তাহলে তাকেও যেন কোনো আঘাত না করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়।
বেলা ২টার পরে চিটাগাং রোড যাত্রাবাড়ী অভিমুখী সড়কে দেখা যায় তীব্র যানজট। তুমুল বৃষ্টির মধ্যে শিক্ষার্থীরা এই সড়কের সানারপার, সাইনবোর্ড, যাত্রাবাড়ী মোড়ে অবস্থান নিয়ে যানবাহনের কাগজপত্র ও চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখেন। কেউ কেউ সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক কন্ট্রোলও করেছেন। চালকদের লাইসেন্স সঙ্গে নিয়ে সাবধানে গাড়ি চালানোর জন্য শিক্ষার্থীরা তাগাদা দিয়েছেন। যাত্রাবাড়ী মোড়েও ছিল প্রায় একই চিত্র। বৃষ্টির মধ্যেও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন যানবাহনে কাগজপত্র ও চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে কি না তা তদারকি করেন।
মিছিল-স্লোগানে উত্তাল ছিল বাড্ডা-রামপুরা: সকাল থেকেই রাজধানীর এয়ারপোর্ট থেকে কুড়িল হয়ে আসা প্রগতি সরণির রাস্তাটিতে যানবাহনশূন্য ছিল। ১০টার কিছু পরেই নতুন বাজার এলাকায় ধীরে ধীরে অবস্থান নেয় শিক্ষার্থীরা। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এ সময় বনানী বিদ্যানিকেতন, গুলশান মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সাউথ পয়েন্ট স্কুলসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা নতুন বাজার এলাকার পুরো রাস্তাটিতে অবস্থান নেন। মিছিল স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠে বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে।
শুধু স্কুল কলেজ নয়, নতুন বাজারের পাশে ইউআইটিএস-এর শিক্ষার্থীরাও তাদের আন্দোলনে যোগ দেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা জানান,  ছোট ছোট স্কুল কলেজের ছাত্ররা এই কয়দিন রাজপথে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করে যাচ্ছে। তাদের আন্দোলনের সঙ্গী হওয়াটা আমাদের অনেক আগেই উচিত ছিল। এই দাবিগুলো শুধু ওদের নয়। পুরো নগরবাসী আজ সড়কের এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির কাছে জিম্মি। দুপুর একটার দিকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পুরো রাস্তা নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়।
‘উই ওয়ান্ট জাস্টিজ’, ‘আমার ভাই কবরে...খুনি কেন বাইরে’ এসব স্লোগানে মুখরিত নতুন বাজার শাহজাদপুর, সুবাস্তু নজর ভ্যালি উত্তরবাড্ডা, হোসেন মার্কেটসহ পুরো প্রগতি সরণি এলাকা। এর মাঝে দেখা যায়, বাঁশতলা রোড হয়ে আসা মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, পিকআপ ভ্যান, সিএনজি চালিত অটোরিকশা, বাস মিনি বাসসহ সব ধরনের যানবাহনের  চালকও তাদের গাড়ির লাইসেন্স চেক করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। যে কয়টি যানবাহনের লাইসেন্স পায়নি সবক’টিই ট্রাফিক সার্জেন্টের কাছে সোপর্দ করেন তারা। এ সময় দায়িত্বরত একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার মোটরসাইকেলও আটক করেন। নতুনবাজার ক্যামব্রিয়ান কলেজের সামনে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে মোটরসাইকেল ও নিজেদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় মামলা দেয়া হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, দেশের কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
সবাইকে আইনের আওতায় আসতে হবে। পুলিশের যদি গাড়ি লাইসেন্স না থাকে তাকেও লাইসেন্স করতে হবে। আইন সবার জন্য সমান। একই অবস্থা বাড্ডার লিংক রোডেও। এই  অবরুদ্ধ করে রাখেন গুলশান কমার্স কলেজ ও ন্যাশনাল কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় তাদের দেখা যায়, রাস্তায় বেশকিছু  যানবাহন আটকে রেখে আন্দোলন করছেন। কিছু সময় পরে দেখা যায় কলেজ দুটির শিক্ষার্থীরা সড়কের ওপর থেকে সরিয়ে সাধারণ পথচারীদের ফুটপাথে  চলাফেরার জন্য অনুরোধ করেন। সবাইকে চলাচলে ফুটপাথ ব্যবহারে সচেতন করেন।
সাধারণ পথচারীরাও তাদের এই কাজটিকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, এটা ওদের করার কথা নয়। আমাদের সচেতন হওয়াটা আমাদেরই কাজ। আমরা আসলেই অনেক অনিয়ম করি। ওই এলাকায় কর্মসূচি চলে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত।
মহাখালী থেকে উত্তরা: সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মহাখালী আমতলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী মহাখালীর মোড়ে গিয়ে সড়কের মধ্যে বসে পড়েন। তারা অবিলম্বে নৌমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন। এ সময় তারা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলে স্লোগান দিতে থাকে।
এ সময় শিক্ষার্থীরা সড়কে আটকে থাকা গাড়িগুলোর লাইসেন্স দেখতে চান। কাগজপত্র না থাকলে গাড়ি আটকে দেয়া হয়। অ্যাম্বুলেন্স, বিদেশগামী এবং হজযাত্রীদের গাড়িগুলো আন্দোলনকারীরা নিরাপদে ছেড়ে দেন। সেখানে নৌমন্ত্রীর কুশলিকাপত্ত দাহ করা হয়। সকাল ১০টায় উত্তরার জসীম উদদীন রোড থেকে শুরু করে হাউস বিল্ডিং পর্যন্ত উত্তরার রাজউক মডেল কলেজ, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, স্কলাস্টিকা, উত্তরা কমার্স কলেজ ও খিলক্ষেত মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী বিক্ষোভে অংশ নেন।
সায়েন্সল্যাব-মিরপুর রোড: ধানমন্ডি এলাকার সায়েন্স ল্যাব-সিটি কলেজ মোড়, ধানমন্ডি-২৭ নম্বর মোড়, মানিক মিয়া এভিনিউ, জিগাতলা বাস স্ট্যান্ড, সংকরসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
এ সময় ধানমন্ডি এলাকার প্রায় সব রাস্তায়ই যানবাহন শূন্য হয়ে পড়ে। হাতেগোনা কিছু ব্যক্তিগত গাড়ি ও রিকশা ছাড়া কিছুই চলতে দেখা যায়নি রাস্তায়। তবে যেই কয়টি ব্যক্তিগত গাড়ি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়ি, মোটরসাইকেল রাস্তায় নেমেছে, তার সব কয়টিরই লাইসেন্স পরীক্ষা করে দেখেছেন ছাত্ররা। কিছু কিছু জায়গায় গাড়ির কাগজ না থাকায় গাড়ির চাবি নিয়ে রাস্তার পাশে সারিবদ্ধ দাঁড় করিয়ে রাখলেও বেশির ভাগ স্থানে পুলিশ সার্জেন্ট ডেকে মামলা করায় তারা। ল্যাব এইড হাসপাতালের অদূরে পুলিশের এক সার্জেন্টের মোটরসাইকেলের কাগজ দেখতে চান শিক্ষার্থীরা।
পোশাক পরিহত সার্জেন্ট কাগজ না দেখিয়ে উল্টো ছাত্রদের সঙ্গে তর্কে জড়ান। এ সময় বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা তার দিকে ছুটে যান। ঘটনার এক পর্যায়ে সার্জেন্ট দৌড়ে পালালে ছাত্ররা তার মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। সায়েন্স ল্যাব মোড়ে আন্দোলনের শুরুতে কাগজ দেখাতে না পাড়ায় মিরপুর টু আজিমপুর চলাচলকারী বিহঙ্গ পরিবহনের দুটি বাস, মেঘলা ট্রানসপোর্ট কোম্পানির একটি বাসে ভাঙচুর চালায় ছাত্ররা। আন্দোলন চলাকালে খামার বাড়ি মোড় থেকে শুরু করে নীল ক্ষেত মোড় পর্যন্ত পুরো রাস্তাটিই ছিল  শিক্ষার্থীদের দখলে।

মিরপুরে ছাত্রদের ওপর হামলা

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বিকালে মিরপুর-১৩ নম্বর বিআরটিএ’র কার্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশের সঙ্গে এই হামলায় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা অংশ নেয় বলে আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শী জানান, কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ লাঠিচার্জ করে পুলিশ। এ সময় পুলিশের সঙ্গে লাঠি ও রড হাতে ছাত্রলীগ, যুবলীগের স্থানীয় কর্মীরা অংশ নেয়। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা  পাল্টা হামলা চালালে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। বিকাল ৪টার দিকে মিরপুর-১০ এর গোলচত্বর থেকে ১৩ ও ১৪ নম্বরের মধ্যে বিআরটিএ থেকে কাফরুল থানা হয়ে পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টের গেইট পর্যন্ত সড়কে এই ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে একপর্যায়ে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন আহত হয়েছেন। মিরপুর কলেজের ছাত্র আন্দোলনকারী সাহিল আহমেদ জানান, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলাম। কোনো কারণ ছাড়াই পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের স্থানীয় নেতাকর্মী হামলা করেছে। আমরা কোনো থানা বা বিআরটিএ ঘেরাও করতে যাইনি। পুলিশ এ ধরনের মিথ্যা অভিযোগ করেছে। প্রত্যক্ষদর্শী শান্তা মারিয়াম ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আদনান ভূঁইয়া জানান, বিআরটিএ’র সামনে পুলিশের একটি গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করতে গেলে ছাত্রদের ওপর ক্ষিপ্ত হন এক পুলিশ সদস্য। এ সময় এক ছাত্রকে মারধর করলে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারী ছাত্রদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও পরে সংঘর্ষ ঘটে। তখন মিরপুর-১০ এর গোলচত্বরে যানবাহন চলাচলের জন্য আলাদা আলাদা সারি তৈরি করেছিলো ছাত্ররা। রিকশা ও বাসের জন্য আলাদ লেন। গাড়ির কাগজ ও ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করছিলো তারা। সেইসঙ্গে নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্লোগান দিচ্ছিলো তারা। এ সময় এক ছাত্রকে মারধর করা হয়েছে এই খবর ছড়িয়ে পড়লে তারা স্লোগান  দিতে দিতে বিআরটিএ’র দিকে এগিয়ে যায়। বিআরটিএ’র সামনে অবস্থান নিয়ে স্লোগান দিতে থাকে।
শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে ওই সময়ে পুলিশ তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় জয় বাংলা স্লোগান দিতে দিতে পুলিশের সঙ্গে লাঠি-রড হাতে অর্ধশত যুবক শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে। শিক্ষার্থীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই ছাত্র আহত হয়। শিক্ষার্থীদের একাংশ ওভার ব্রিজে আশ্রয় নিলে সেখানেও লাঠিচার্জ করে পুলিশ। এ সময় আতঙ্কে দোকানপাট বন্ধ করে দেন ব্যবসায়ীরা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ হামলাকারী ছাত্রলীগ যুবলীগের কর্মীরা আশপাশের স্থাপনায় ভাঙচুর করে। এ সময় পুলিশ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ফাঁকা গুলিও ছোড়ে।
আসাদুজ্জামান রিপন নামে এক ব্যবসায়ী জানান, হামলায় স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীরাও জড়িত। ৫টার দিকে সংঘর্ষ থেমে গেলেও শিক্ষার্থীরা তখনও বিআরটিএ’র সামনে অবস্থান নিয়েছিলো। ঘটনাস্থলে এ সময় ইটের টুকরো ও আগুন জ্বালানোর আলামত দেখা গেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিরপুর জোনের সহকারী অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার রহুল আমিন বলেন, শিক্ষার্থীরা কোনো কারণ ছাড়াই কাফরুল থানায় হামলার চেষ্টা করেছিলো। তারা পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রধান ফটকের ভেতরে ঢুকে যায়। তারা নাশকতার চেষ্টা করছিলো। তারা পুলিশের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে। বাধ্য হয়েই পুলিশ তাদের ধাওয়া দিয়ে সরিয়েছে। কোনো রাবার বুলেট বা ফাঁকা গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেনি বলে জানান তিনি।

চীনের শীর্ষ বৌদ্ধ ভিক্ষুর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ

নানদের যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে চীনের উচ্চ পদস্থ এক বৌদ্ধ ভিক্ষু অ্যাবোট সুয়েচেঙয়ের বিরুদ্ধে। বলা হয়েছে, তাদেরকে মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সেক্সে আসক্ত করেছেন তিনি। তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওই ভিক্ষু। বেইজিংয়ে লংকুয়ান প্যাগোডায় দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ওই প্যাগোডার অন্য দু’জন ভিক্ষু তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে যৌনতার ওই অভিযোগ তুলেছেন। যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে ‘মি টু’ আন্দোলন ক্রমশ জোরদার হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে। তার মধ্যে চীন অন্যতম। তারই অংশ হিসেবে ওই ভিক্ষুর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তোলা হয়েছে। ভিক্ষু অ্যাবোট সুয়েচেঙ হলেন চীনের বুদ্ধিস্ট এসোসিয়েশনের প্রধান। এ পদে তিনিই এ যাবত সবচেয়ে কম বয়সী। একই সঙ্গে তিনি সরকারের একজন রাজনৈতিক উপদেষ্টা। চীনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম উইবো’তে তার রয়েছে ১০ লক্ষাধিক অনুসারী। প্যাগোডার পক্ষ থেকে উইবো’তে দেয়া একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তারা উত্থাপিত অভিযোগ তদন্ত করবে। এ জন্য একটি তদন্ত দল গঠন করা হবে। তবে বলা হয়েছে, ভিক্ষু অ্যাবোট সুয়েচেঙয়ের সুনাম নষ্ট করার উদ্দেশে বানোয়াট অভিযোগ তোলা হয়েছে।
তবে তার বিরুদ্ধে সরকারের কাছে ওই প্যাগোডার যে দু’জন ভিক্ষু রিপোর্ট লিখেছেন তারা হলেন সিয়ানজিয়া এবং সিয়ানকি। তাদের অভিযোগ নানদের কাছে রগরগে যৌনতা সংশ্লিষ্ট ম্যাসেজ পাঠিয়েছেন ভিক্ষু অ্যাবোট সুয়েচেঙ। এ ছাড়া তাদেরকে যৌন সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আরো বলা হয়েছে, কমপক্ষে ছয়জন নান’কে তিনি যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে প্রলুব্ধ করেছেন না হয় হুমকি দিয়েছেন। তাদের মধ্যে চারজন তার অনুরোধে সাড়া দিয়েছেন। এ ছাড়া নান’দেরকে তিনি যৌনতায় আসক্ত করতেন ম্যাসেজ পাঠিয়ে। তাতে বলতেন, যৌন সম্পর্ক হলো বৌদ্ধ রীতি গবেষণার অংশ। এসব বার্তা দিয়ে নান’দের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। ভিক্ষু অ্যাবোট সুয়েচেঙয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়া হয়েছে ৯৫ পৃষ্ঠার। তা আবার ফাঁস হয়ে গেছে অনলাইনে। নির্যাতিত নানদের একজন জুনে ভিক্ষু অ্যাবোট সুয়েচেঙয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন পুলিশে। তাতে তিনি দাবি করেছেন তাকে যৌন হয়রান করা হয়েছে। অভিযোগকারী ভিক্ষুরা বলেছেন, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বেইজিংয়ে অবস্থান করা একজন নান তাদেরকে ভিক্ষু অ্যাবোট সুয়েচেঙয়ের পাঠানো যৌনতা সংশ্লিষ্ট বার্তা দেখান। এরপর তারা এ বিষয়ে অনুসন্ধান করতে থাকেন। এরপর তারা যে রিপোর্ট দিয়েছেন তাতে বলা হয়েছে, লংকুয়ান প্যাগোডাকে নিজের নিয়ন্ত্রিত স্থান বানিয়ে ফেলেছেন ভিক্ষু অ্যাবোট সুয়েচেঙ। তিনি নিয়মকানুন নিজের মতো করে তৈরি করে নিয়েছেন। এসব অভিযোগের পর ভিক্ষু অ্যাবোট সুয়েচেঙকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি- অরুণ জেটলি

ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনসংখ্যাকে সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি বল অভিহিত করেছেন ভারতের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স বিষয়ক মন্ত্রী অরুণ জেটলি। আরো বলেছেন, আসামে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৩.৯ গুন। এর ফলে তারা আসামকে বাংলাদেশের সঙ্গে একীভূত করার দাবি তুলতে পারেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে অনলাইন ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস। এতে বলা হয়, আসামে বহুল বিতর্কিত নাগরিকত্ব বিষয়ক এনআরসি ইস্যুতে এর পক্ষে বুধবার কথা বলেছেন অরুণ জেটলি। তিনি বলেছেন, আসাম রাজ্যে হিন্দু জনসংখ্যার চেয়ে মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি অনেক বেশি। অরুণ জেটলি ভারত সরকারের সবচেয়ে সিনিয়র মন্ত্রীদের মধ্যে অন্যতম। তিনি একটি ব্লগে লিখেছেন, ১৯৬১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ৫০ বছরে আসামে সংখ্যাগুরু জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ২.৪ গুন। অন্যদিকে সংখ্যালঘুদের (মুসলিম) সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৩.৯ গুন। এর ফলে জনসংখ্যাতত্ত্বে বড় ধরনের একটি প্রভাব পড়েছে। তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও সমালোচনা করেন। বলেন, নাগরিকত্ব নির্ধারণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। অভিবাসীদের দ্বারা জনসংখ্যা তত্ত্ব যে পরিবর্তন ঘটছে তার থেকে দূরে নেই তিনিও।