Saturday, April 2, 2016

আমি কোন নির্বাচন দেখিনি -নুরুল কবীর

সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে দ্যা নিউ এজের সম্পাদক নুরুল কবীর বলেছেন, আমি কোন নির্বাচন দেখিনি। ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভি’র সুলতানা রহমানের উপস্থাপনায় ‘বাংলাদেশ এখন’ অনুষ্ঠানে তিনি এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন অন্তর্ধান করেছে ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের ৫ তারিখে। যেদিন নির্বাচন ছাড়াই অনেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়েছিল। যে নির্বাচন বাংলাদেশে ৭০ সালে হয়েছিল, সেখানেও এদেশের মানুষ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পেরেছিল। আর স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পেরেছিল বলেই বাংলাদেশের মানুষ বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদকে সামনে নিয়ে তার পছন্দের প্রতিনিধিকে নিরঙ্কুশভাবে নির্বাচিত করতে পেরেছিল। এ ব্যাপারটা তখনকার পশ্চিম পাকিস্তান মেনে নেয়নি বলেই বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ নির্ভয়ে নির্বিবাদে তার পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে। আর যখনই বাংলাদেশের মানুষ তার পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য একটি পরিপূর্ণ নিরপেক্ষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা পরিবেশ পায়নি প্রকৃতপক্ষে তখনই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের যেটা অন্যতম প্রধাণ স্তম্ভ বা অঙ্গীকার ছিল সেটা ধুলোর সাথে মিশে গেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস টেনে নুরুল কবীর আরও বলেন, ১৯৭১ সালের অগাস্ট মাসে পাকিস্তানের ইয়াহিয়া খানরা স্বাধীনতা যুদ্ধ বানচাল করার জন্য একটা উপনির্বাচন দিয়েছিল, সেই নির্বাচনেও পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় ৫০ জন প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করেছিল। অপরদিকে স্বাধীন বাংলাদেশেও ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের ৫ তারিখে ১৫৩ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিল কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই। এছাড়া নির্বাচন শুরুর আগে বহু অভিযোগ নির্বাচন কমিশনারের কাছে গেলেও তিনি এসব অভিযোগ আমলে নেননি। তিনি আরও বলেন, যেদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল স্লোগান দেয় যে উন্নয়ন আগে, গণতন্ত্র পরে। সেদিনই মূলত বাংলাদেশের আত্মাকে হত্যা করা হয়। এই ভাষা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলের নয়, বরং এই ভাষা ছিল আইয়ুব খানের। নুরুল কবীর বলেন, হ্যা, নির্বাচন অনিয়মের এই ধারাবাহিকতা বিএনপি আমলেও হয়েছে, এরশাদের আমলেও হয়েছে, এরশাদের আমলের আগেও হয়েছে। কিন্তু আজকে যারা ক্ষমতায় আছেন তারা যদি পূর্বের ধারার সাথে বয়ে চলেন তাহলে তাদের মুখে আর স্বাধীনতা চেতনার কথা মানায় না। এটা বাংলাদেশের স্বাধীনতা চেতনা ও অঙ্গীকারের বিরুদ্ধে হয়ে যায়।

মাদকাসক্তি প্রতিরোধে গণসচেতনতা by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

ইসলামের দৃষ্টিতে মাদকদ্রব্যের ব্যবহার শরিয়ত-গর্হিত একটি জঘন্য সামাজিক অপরাধ। মাদকদ্রব্যের অপকারিতা এবং এর ব্যবহারকারীর করুণ পরিণতির জন্য ইসলাম এগুলো দ্ব্যর্থহীন ভাষায় হারাম বা নিষিদ্ধ করেছেন। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মাদকাসক্তি অপবিত্র, ক্ষতিকর ও শয়তানের নিকৃষ্ট কর্মকাণ্ড, যা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। তাই ইসলাম মদ্যপান, জুয়াখেলা প্রভৃতি অনৈতিকতাকে অবৈধ ঘোষণা করেছে এবং ধন-সম্পদ অসৎ পন্থায় ব্যয় করতে নিষেধ করে মানব জাতিকে নৈতিক অধঃপতন থেকে রক্ষার তাগিদ দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ওহে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্য নির্ণায়ক তীর হচ্ছে ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কারসাজি। সুতরাং তোমরা এসব বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’ (সূরা-আল মায়িদা, আয়াত-৯০)
ইসলামের সুস্পষ্ট বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও কিছু লোক অজ্ঞতাবশত এবং নানা কুমন্ত্রণা, প্ররোচনা ও অসৎ সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের বর্জনীয় ও ক্ষতিকর বস্তু গ্রহণ করে নিজেদের, পরিবারের ও সমাজের সর্বনাশ ডেকে আনে এবং মারাত্মক বদঅভ্যাসের দাসে পরিণত হয়। মাদকাসক্তি এ ধরনের একটি কু-অভ্যাস। মাদকাসক্তি মানে মাদকদ্রব্যের দ্বারা আসক্তি বা নেশা সৃষ্টি হওয়া। যেসব খাদ্য, পানীয় বা বস্তু সুস্থ মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটায়, জ্ঞানবুদ্ধি ও স্মৃতিশক্তি লোপ করে দেয় এবং যা নেশা সৃষ্টি করে সেগুলো মাদকদ্রব্যের অন্তর্ভুক্ত। মাদকদ্রব্য প্রাকৃতিক হোক বা রাসায়নিক হোক, পরিমাণে অল্প হোক আর বেশি হোক, পান করা হোক বা অন্য কোনোভাবে গ্রহণ করা হোক, নেশা ও চিত্তভ্রমকারী হলেই তা হারাম বা নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে শরিয়তের একটি মূলনীতি প্রদান করে বলেছেন, ‘নেশাজাতীয় যেকোনো দ্রব্যই মাদক, আর যাবতীয় মাদকই হারাম।’ (মুসলিম)
ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুতি যুবসমাজে ভয়ানক মাদকাসক্তি বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। জীবনবিধ্বংসী মাদকে অনেক তরুণের জীবন নেশাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। প্রকৃতই মাদকাসক্তি মানুষের দেহের মারাত্মক বিনাশ সাধন করে। নেশাগ্রস্ত যুবকদের উল্লেখযোগ্য অংশ সিরিঞ্জের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করে; এ কারণে মরণব্যাধি এইডসের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। নিজের সত্তা, ধর্ম-কর্ম সবকিছু ভুলে গিয়ে মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা নিছক কল্পনার জগতে বিচরণ করতে থাকে। ‘যে ব্যক্তি মাদকদ্রব্য গ্রহণ করে, সে কখনো বেহেশতে প্রবেশাধিকার পাবে না’ এ মর্মে নবী করিম (সা.) সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। (বুখারি)
মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা মাদকের ব্যয় সঙ্কুলানের জন্য নানা রকম দুর্নীতি, অসামাজিক ও অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িত হয়ে পড়ে। একজন নেশাখোর মাদকের অর্থ জোগাতে গিয়ে সাধারণত চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইলিং ও চোরাকারবারে লিপ্ত হয়। নিজের পরিবার-পরিজন থেকে শুরু করে সমাজের আর দশজনের টাকা-পয়সাও লুটে নিয়ে সমাজজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এভাবে মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিকৃষ্টতর অনৈতিক কর্মকাণ্ডে ও অনাচারে বাধ্য হয়। মাদকদ্রব্য ব্যবহারে মানুষ চিত্তবিভ্রম, অস্থির, উচ্ছৃঙ্খল ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয় তথা ব্যভিচার এবং নরহত্যার মতো ন্যক্কারজনক অপরাধগুলোর অধিকাংশই মাদকাসক্তির ভয়াবহ পরিণাম। সড়ক দুর্ঘটনা প্রায় ক্ষেত্রেই মাদকাসক্ত চালকের কারণে ঘটে থাকে। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে নবী করিম (সা.) কঠোর শাস্তির ভীতি প্রদর্শন করে ঘোষণা করেছেন, ‘মাদকদ্রব্য সব অপকর্ম ও অশ্লীলতার মূল।’ (মুসলিম)
দেশের আশা-ভরসা ও মূল্যবান সম্পদ তথা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যুবসমাজকে ধ্বংস করার এক ভয়ংকর ক্ষতিকারক হাতিয়ার মাদকদ্রব্য। এ ছাড়া অনেক লোক মাদকসেবনকারীর সঙ্গে ওঠা-বসার দ্বারা মাদক গ্রহণ করতে পারে, ফলে পরিবেশ দূষিত হয়। উপরন্তু মাদকাসক্তি মানুষকে ব্যবহারিক জীবনে ইসলামের পঞ্চস্তম্ভ তথা কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতসহ আল্লাহ তাআলার বিধিবদ্ধ দৈহিক ও আর্থিক ইবাদত থেকে দূরে রাখে এবং পাপাচারে লিপ্ত করে। এতে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলা অসন্তুষ্ট হন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই শয়তান মদ ও জুয়ার দ্বারা তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে বিরত রাখতে চায়, তবুও কি তোমরা নিবৃত্ত হবে না?’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত-৯১)
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মাদকাসক্তি যেমন একটি চরম অপরাধ, তেমনি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি জঘন্য পাপাচার; সমাজ, দেশ ও জাতিকে বিধ্বস্তকারী মারাত্মক ব্যাধি। মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন না থাকায় সমাজের অর্থলিপ্সু চক্রের মদদের জন্য মাদকাসক্তির বিস্তার ঘটছে। তাই সমাজজীবনে এ হেন ঘৃণ্য মাদকদ্রব্যের ব্যবহার ও প্রসার রোধ করা অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে যারা মাদকদ্রব্য প্রস্তুত, এর প্রচলন ও সরবরাহের কাজে জড়িত, তাদের দেশ ও জাতির স্বার্থে এ অনৈতিক কাজ বর্জন করা উচিত। যুবসমাজকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল করার জন্য মাদকসংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম থেকে তাদের বিরত থাকতে হবে। মুসলিম পরিবারের প্রধানের দায়িত্বে নিয়োজিত পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও অভিভাবকেরা নিজেদের সন্তানদের মাদকদ্রব্যের ভয়াবহতা সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত করবেন এবং তাদের মধ্যে এ কু-অভ্যাস যেন কোনোমতেই গড়ে না উঠতে পারে, এ ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকবেন। ভঙ্গুর পরিবারের ছেলেমেয়েরা অধিকতর মাদকাসক্ত হয়ে ওঠে; সে জন্য তারা যাতে অসৎ, দুশ্চরিত্র ও নেশাগ্রস্ত বন্ধুবান্ধব ও সঙ্গী-সাথির সঙ্গে মেলামেশা না করতে পারে, সেদিকে সুদৃষ্টি রাখবেন এবং ইসলামের আলোকে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় করবেন।
দেশের প্রায় তিন লাখ মসজিদের ইমাম-খতিবরা যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ বিশেষ করে জুমার খুতবার ভাষণে মাদকদ্রব্যের ক্ষতিকর দিকগুলো উপস্থাপন করেন, তাহলে সমবেত মুসল্লিরা মাদক গ্রহণ না করার ব্যাপারে সজাগ হয়ে যাবেন এবং তাদের বিপথগামী সন্তানদেরও মাদক গ্রহণে নিরুৎসাহিত করবেন। সমাজের ধর্মীয় পণ্ডিত ব্যক্তিরা তথা আলেম-ওলামারা বিভিন্ন মিলাদ-মাহফিলে ওয়াজ-নসিহত ও উপদেশ প্রদানের মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে মাদকদ্রব্যের কুফলসমূহ বর্ণনা করবেন। সরকার মাদকের প্রতিকার ও প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে কঠোর আইন প্রণয়ন করবে এবং তা প্রয়োগ করবে। যারা মাদক আমদানি ও পাচারের সঙ্গে জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করলে যুবসমাজ মাদকমুক্ত হতে পারে। সেই সঙ্গে সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরাসহ, সকল শ্রেণীর লোক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে মাদকদ্রব্যের প্রসার রোধে দেশব্যাপী সামাজিক আন্দোলন গড়ে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা চালালে সমাজ থেকে মাদকদ্রব্যের ব্যবহার বন্ধ হবে। ইসলামের বিধি-বিধান তথা পবিত্র কোরআন ও হাদিসে মাদকদ্রব্যের ভয়াবহতা সম্পর্কে যেসব সাবধানবাণী আছে, জনগণকে সেগুলো শোনাতে ও বোঝাতে হবে এবং মাদকের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা ও তীব্র ঘৃণা জন্মাতে হবে। আসুন, ‘আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস’ (২৬ জুন) সামনে রেখে আমরা সমবেত কণ্ঠে সব ধরনের নেশা জাতীয় মাদককে ‘না’ বলি।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমি, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়। পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহাম্মদ (সা.)। dr.munimkhan@yahoo.com

সামগ্রিক অর্জন ম্লান করে দিয়েছে: সিইসি

দ্বিতীয় ধাপের ভোটে কিছু ইউনিয়ন পরিষদের অনিয়ম-সহিংসতায় সামগ্রিক সফলতাকে ম্লান করে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। তবে প্রথম ধাপের তুলনায় দ্বিতীয় ধাপের ভোট একটু ভালো হয়েছে বলে জানান তিনি। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সোয়া ৭ টায় ইসির মিডিয়া সেন্টারে ভোট শেষে প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। কাজী রকিব বলেন, প্রথম ধাপের অভিজ্ঞতার আলোকে দ্বিতীয় ধাপে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছি। কিছু ব্যবস্থা গৃহীত হওয়ায় প্রথম ধাপের তুলনায় এবার একটু ভালো হয়েছে। তবে কয়েকটি ইউপিতে কিছু ঘটনা সামিগ্রিক অর্জনকে ম্লান করে দিয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ৬৩৯ ইউপিতে ভোট হয়। ভোটের সময় ও পরবর্তীতে অন্তত ৬ জনের প্রাণহানি হয়েছে। অনিয়মের কারণে ৩৩ টি ভোটকেন্দ্র’র ভোট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান সিইসি। কেরানীগঞ্জে এক শিশু নিহতের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশের পাশাপাশি ভোলায় এক সাংবাদিক গুলিবিদ্ধের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। এসময় উপস্থিত ছিলেন, সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম, অতিরিক্ত সচিব মোখলেছুর রহমান, যুগ্ম সচিব জেসমিন টুলী।

নাচনেওয়ালি কনা

‘রেশমি চুড়ি’ গানের ভিডিওতে কনা
সেটের বাইরে এসে থামল গাড়ি। নামলেন কনা। বাজনা ও দৃশ্য ধারণ শুরু হলো একই সঙ্গে। বাজনার ওপারের কথাগুলো ছিল ‘কিনে দে কিনে দে রে তুই রেশমি চুড়ি, নইলে করব তোর সাথে আড়ি’। সামনে নাচের মুদ্রায় দিলশাদ নাহার কনা, পেছনে সহশিল্পীরা। আর আশপাশজুড়ে বাজিয়েরা। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে বাংলাদেশি গানের শিল্পী কনাকে পাওয়া গেল নাচনেওয়ালি হিসেবে। ইউটিউবে আপলোড করা হয়েছে তাঁর নতুন গানের ভিডিও ‘রেশমি চুড়ি’। তাতে গান গাওয়ার পাশাপাশি কনা নেচেছেনও। চার বছর পর প্রকাশিত হয়েছে কনার নতুন গানের এই ভিডিওটি। বেশ কিছুদিন মঞ্চ ও চলচ্চিত্রের গান নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন এই সংগীতশিল্পী। নতুন গান ও ভিডিও নিয়ে কনা বলেন, ‘এবার বেশ আয়োজন করে এই ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে। ছন্দময় দোলের এই গান শ্রোতাদের খুব ভালো লাগবে। হয়তো গানের সুরে সুরে নিজের অজান্তে দর্শক-শ্রোতারাও নেচে উঠবেন। সামনে পয়লা বৈশাখ, শ্রোতাদের জন্য বৈশাখী উপহার হিসেবে গানটি প্রকাশ করলাম।’ কনার গাওয়া নতুন গানটির কথা লিখেছেন প্রিয় চট্টোপাধ্যায়, সুর ও সংগীত পরিচালনা করেন আকাশ সেন। গানটির ভিডিও তৈরি করেছেন শিবরাম শর্মা। তাঁরা তিনজনই কলকাতার। গানটি তৈরি হয়েছে ইভনেক্স সলিউশনসের ব্যানারে।

এমার পরামর্শ

এমা ওয়াটসন
কিছুদিন আগেই এমা বলেছিলেন, পড়াশোনার জন্য অভিনয় থেকে একটু বিরতি নেবেন তিনি। মন দেবেন নারী অধিকারবিষয়ক পড়াশোনায়, সেই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষার বই পড়েও নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করবেন এই অভিনেত্রী। কথা অনুযায়ী, এমা কিন্তু পড়াশোনাও শুরু করে দিয়েছেন। শুধু পড়ছেনই না, সেই সঙ্গে টুইটারে তাঁর ভক্ত-অনুরাগীদের বই পড়ার ব্যাপারে উৎসাহ ও পরামর্শও দিচ্ছেন। বিভিন্ন সময় এমার পরামর্শ দেওয়া বইগুলোর একটি তালিকা সম্প্রতি প্রকাশ করেছে বিজনেস ইনসাইডার নামের একটি সংবাদমাধ্যম। বিজনেস ইনসাইডার এমা ওয়াটসনের বিগত কয়েক মাসের টুইট ঘেঁটে ও সাক্ষাৎকার থেকে ১৭টি বইয়ের একটি তালিকা তৈরি করেছে। এই তালিকায় আছে জন গ্রিনের দ্য ফল্ট ইন আওয়ার স্টারস, স্টিফেন মেয়ারের টোয়ালাইট সিরিজ, খালেদ হোসেনির আ থাউজেন্ড স্প্লেন্ডিড সান এবং মার্কিন সংগীতশিল্পী ও গীতিকার প্যাটি স্মিথের লেখা জাস্ট কিডস। ব্রিটেনের মেয়ে এমা ২০১৪ সালে ব্রাউন ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক করেন। সেই সময় থেকে বই পড়ার প্রতি অনুরাগ বাড়ে, যখন তাঁর বয়স ২১ বছর। স্নাতকের পর থেকেই তিনি বই পড়ার প্রতি তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষী ও ভক্তদের উৎসাহ জোগাতে শুরু করেন। একই বছর এমা ওয়াটসন জাতিসংঘের নারীবিষয়ক শুভেচ্ছাদূত হিসেবে নিযুক্ত হন। স্বভাবতই এমার আগ্রহের তালিকায় যোগ হয় নারীবিষয়ক প্রবন্ধ ও বইও।

আইরিনের‘বাষ্পস্নান’

আইরিন
নতুন একটি ছবিতে অভিনয় করছেন আইরিন। গতকাল শুক্রবার রাজশাহীতে এই ছবির শুটিং শুরু হয়েছে। বাষ্পস্নান নামের এই ছবির পরিচালক সৈয়দ অহিদুজ্জামান ডায়মন্ড। বাষ্পস্নান ছবিতে আইরিনের বিপরীতে অভিনয় করছেন কলকাতার অভিনেতা সমদর্শী দত্ত। তিনি ভূতের ভবিষ্যৎ, খোলা হাওয়া, ইচ্ছেসহ আরও বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করে বাংলা সিনেমার দর্শকের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন। তাঁর অভিনীত ২০১০ সালে মুক্তি পাওয়া সোমনাথ গুপ্তর আমি আদু ছবিটি ভারতের ৫৮তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা বাংলা ভাষায় নির্মিত ছবির পুরস্কার জেতে। আইরিন তাঁর নতুন ছবিতে সহশিল্পী হিসেবে সেই সমদর্শীকে পেয়ে খুশি। বললেন, ‘তাঁর কয়েকটি ছবি আমার দেখা হয়েছে। তাঁর অভিনয় ভালো লাগে। ভালো লাগার অভিনয়শিল্পী এখন আমার সহশিল্পী, বিষয়টি সত্যিই আনন্দের। আশা করছি, আমাদের কাজ দর্শকের পছন্দ হবে।’ বাষ্পস্নান আইরিন অভিনীত ৮ নম্বর চলচ্চিত্র। এই ছবি নিয়ে আইরিন বললেন, ‘শুটিং চলছে। এর বেশি কিছুই জানাতে পারব না। পরিচালকের নিষেধ আছে। তবে এটুকু বলতে পারি, অন্য রকম একটি গল্পের ছবিতে অভিনয় করছি। দর্শক এই ছবিতে ভিন্ন এক আইরিনকে খুঁজে পাবেন। গল্পটি পড়ে আমিও বেশ তৃপ্ত।’ রাজশাহীর বিভিন্ন জায়গায় এ মাসের ২৫ তারিখ পর্যন্ত চলবে বাষ্পস্নান ছবির শুটিং। একসময় র্যাম্পে কাজ করতেন আইরিন। ইদানীং চলচ্চিত্রে ব্যস্ত তিনি। তাঁর প্রথম ছবি দেবাশীষ বিশ্বাস পরিচালিত ভালোবাসা জিন্দাবাদ।

গল্পটি এক রাতের!

পলায়নবিদ্যা নাটকের দৃশ্যে জোভান ও সাবিলা
দুজন জুটি হয়ে এখন পর্যন্ত দুটি নাটকে অভিনয় করেছেন। তানিম পারভেজের বাকরখানি এবং ‘ক্লোজআপ: কাছে আসার গল্প’ ক্যাম্পেইনের শতডানার প্রজাপতি নাটকে। এই দুটি নাটকের দর্শক-সাড়াই সম্ভবত জোভান ও সাবিলাকে আবারও জুটি হিসেবে নিয়ে এসেছে পর্দার সামনে। নাটকের নাম পলায়নবিদ্যা। রচনা ও পরিচালনা করছেন ইফতেখার আহমেদ। পুরো নাটকের গল্প এক রাতের। তাই যথারীতি শুটিং হয়েছেও রাতভর। সারা রাত জেগে শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা সাবিলা নূরের খুব বেশি নেই। বললেন, ‘আমি সাধারণত রাত জেগে শুটিং করি না। তবে এবারের গল্পটি ভালো লাগায় রাজি হয়েছি। তবে শুটিংয়ে অংশ নিয়ে বুঝেছি, বিয়ের পোশাক পরে সারা রাত শুটিং করা খুবই কঠিন। আমি বারবারই ঘুমিয়ে পড়ছিলাম। তবে কষ্ট হলেও রাত শেষে কাজটি কিন্তু ভালো হয়েছে।’ পরিচালক জানালেন, নাটকের গল্পটিই এমন। বিয়ের আসর থেকে বউয়ের সাজে পালাবে মেয়েটি। তাকে নিয়ে সেই সাজেই শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াবে তার প্রেমিক। সেই ঘুরে বেড়ানোর গল্পটিই দেখানো হবে পলায়নবিদ্যা নাটকে। রাতভর শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা জানিয়ে জোভান বললেন, ‘আমরা শুটিং করেছি মহাখালী ফ্লাইওভার, ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশন, মিরপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায়। রাত নয়টা থেকে শুরু করে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত চলেছে শুটিং। এটা একটা অন্য রকম অভিজ্ঞতা।’ পলায়নবিদ্যার শুটিং শেষ করতে এখনো এক রাত বাকি। পরিচালক জানালেন, আজ শনিবার রাতে ঢাকার মিরপুরে হবে বাকি অংশের শুটিং।

অভিনয় ছাড়ছেন নিপুণ?

নিপুণ
অভিনয়শিল্পী নিপুণ কি তবে অভিনয়কে বিদায় জানিয়েছেন? প্রায় মাস দু-এক হবে; নতুন কোনো বড়পর্দার কাজ হাতে নেননি নিপুণ। নাটকে অভিনয় করছেন? তেমনটাও শোনা যাচ্ছে না। এমনটাই জানা গেছে নির্মাতাদের কাছ থেকে। কেন? এ প্রসঙ্গে আজ শনিবার সকালে নিপুণ বলেন, ‘এখন আমি ব্যস্ত টিউলিপ নেইলস অ্যান্ড স্পা নিয়ে। এখানেই বেশির ভাগ সময় থাকি। নিজের ব্যবসা। যথেষ্ট সময় দিতে হচ্ছে। এত চাপ এখানে, নিজে সরাসরি যুক্ত না থাকলে ব্যবসা পরিচালনা জটিল হয়ে যাবে। আর কাজটাও দারুণ উপভোগ করছি। শিগগিরই একটি কফি শপ চালু করছি। সেখানেও সময় দিতে হবে।’ তাহলে অভিনয়? নিপুণ বললেন, ‘তেমন কোনো কাজ করছি না। দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর “বায়ান্ন থেকে একাত্তর” ছবির কাজ শেষ করেছি। এরপর আর কোনো ছবির কাজ হাতে নিচ্ছি না। কয়েকজন পরিচালক যোগাযোগ করেছেন। সবাইকে বুঝিয়ে বলছি। আর ঈদের জন্য দুই-তিনটা নাটক হয়তো করব। আসলে যে কাজটা না করলেই নয়, সেটাই করব।’ জানালেন, অভিনয় থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেও দেশে আর দেশের বাইরে বিভিন্ন শো করছেন তিনি। দুই মাস আগে রাজধানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউতে ‘টিউলিপ নেইলস অ্যান্ড স্পা’ চালু করেন নিপুণ। আবার এখন এর পাশে একটি কফি শপও চালু করছেন। নিপুণ বলেন, ‘কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউতে চতুর্থ তলার ফ্লোরটি ৪৩৩৪ বর্গফুট। এর মধ্যে টিউলিপ নেইলস অ্যান্ড স্পা প্রতিষ্ঠানটি সাজানো হয়েছে ৩০০০ বর্গফুটে। বাকি অংশে এবার কফি শপ হবে। আর এখানে থাইল্যান্ডের কফি পরিবেশন করা হবে। থাইল্যান্ড থেকে অভিজ্ঞদের এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।’

অনামিকা বলবে কথা...

প্রিয়াঙ্কা চোপড়া
প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে কতজনকে নিয়েই না গুজব ছড়িয়েছে! কখনো শহীদ কাপুর, কখনো হোয়াটস ইউর রাশি ছবির সহ-অভিনেতা হারমান বাওয়েজা। এমন গুজবও ছড়িয়েছিল যে শাহরুখ খানও নাকি প্রিয়াঙ্কার প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছিলেন একসময়। কিন্তু প্রিয়াঙ্কার আদৌ কি কোনো প্রেমিক আছে? এই প্রশ্নে কখনোই মুখ খোলেননি ‘কোয়ান্টিকো’ তারকা পি সি। বরং তাঁর প্রেমিকের কথা জানতে চাইলে প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘আমি মুখে কিছুই বলব না। যা বলার তা বলবে আমার অনামিকা!’ কিছুদিন আগে ভারতের ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেম বিষয়ে নানা কথা বলেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। তিনি বলেন, ‘আমি তত দিন এ বিষয়ে কোনো কথা বলব না, যত দিন পর্যন্ত আমার অনামিকায় কেউ আংটি না পরিয়ে দেয়। যেদিন আমার অনামিকায় কেউ আংটি পরিয়ে দেবে, সেদিনই সবাইকে বলে দেব আমার প্রেমিকের নাম। এর আগ পর্যন্ত কেউ আমাকে কারও জীবনসঙ্গী বা প্রেমিকা বলে দাবি করতে পারবে না।’

মা হচ্ছেন শ্রেয়া ঘোষাল?

শ্রেয়া ঘোষাল
ভারতের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী শ্রেয়া ঘোষাল গত বছর হুট করেই বিয়ে করে চমকে দিয়েছিলেন সবাইকে। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, দীর্ঘদিনের প্রেমিক শিলাদত্ত মুখার্জির সঙ্গে একদম ঘরোয়া ভাবেই বিয়ের কাজটি সেরেছিলেন শ্রেয়া। আর এর পরদিনই ফেসবুকে ছবি পোস্ট করার পর সবাই তাঁর বিয়ের কথা জানতে পারেন। শ্রেয়ার একটি সূত্র জানিয়েছে, খুব শিগগিরই নাকি পরিবারে নতুন অতিথির মুখ দেখতে যাচ্ছেন এই দম্পতি। গান নিয়ে ব্যস্ততার মধ্যেই দিন কাটছিল এই গায়িকার। এ বছর ফিল্মফেয়ার পুরস্কারসহ আরও বেশ কয়েকটি পুরস্কার জমেছে তাঁর ঝুলিতে। তবে এর চেয়েও বড় সুসংবাদটি হলো, মা হতে যাচ্ছেন এই ৩২ বছর বয়সী সংগীত শিল্পী। নিজের বিয়ের খবর যেমন আগে থেকে গণমাধ্যমে ঢাক ঢোল পিটিয়ে জানান দেননি, এবারও ঠিক তেমনটিই করছেন। তবে সম্প্রতি তাঁকে দেখে অনেকেই আঁচ করতে পেরেছেন যে তিনি অন্তঃসত্ত্বা। এখন কেবল শ্রেয়া নিজে আনুষ্ঠানিক ভাবে এ কথা জানালেই বিষয়টা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

কাটাপ্পা কেন মেরেছিলেন বাহুবলীকে?

গত বছর মুক্তির পরপরই বলিউডে সাড়া ফেলে দিয়েছিল মহাকাব্যিক গল্পের ছবি ‘বাহুবলী’। প্রথম পর্বটিতে এই কাহিনি যেন শেষ হয়েও হয়নি শেষ। আর এ ছবির দর্শকদের অপেক্ষার পালাও যেন শেষ হচ্ছে না। কী হবে পরের পর্বে? বাহুবলীকে আগের জন্মে কেনইবা মেরেছিলেন কাটাপ্পা? এমন সব প্রশ্নের উত্তরে এ ছবির নির্মাতা রাজামৌলি সম্প্রতি জানিয়েছেন বেশ কিছু তথ্য। ‘বাহুবলী’ ছবির শেষ পর্ব ‘বাহুবলী-দ্য কনক্লুশন’ মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে ২০১৭ সালের ১৪ এপ্রিল। অপেক্ষার পালা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। আর অনেক কৌতূহল উদ্দীপক প্রশ্নের মতো একটি প্রশ্ন হলো, কাটাপ্পা কেনো মেরেছিল বাহুবলিকে? উত্তরটা জানার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে আর বছরখানেক। তবে, বাহুবলীর পেছনে যিনি, সেই নির্মাতা এসএস রাজামৌলির কাছ থেকেই অবশেষে এ সব প্রশ্নের কিছু সদুত্তর পাওয়া গেছে। ইউটিউবে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে রাজামৌলি জানিয়েছেন, কাটাপ্পা আসলে বাহুবলীর মনের ইচ্ছাই পূরণ করেছেন। বাহুবলীই নাকি কাটাপ্পাকে বলেছিলেন তাঁকে (বাহুবলীকে) মারতে! যা হোক এ কাহিনিতে আসলেই কী ঘটেছিল, আর কেনই বা এমনটি বলেছিলেন বাহুবলী— তা জানতে হলে অপেক্ষায় থাকতে হবে আরও এক বছর। ‘বাহুবলী-দ্য কনক্লুশন’ ছবিটির মুক্তির পরেই মিলবে এর যথার্থ উত্তর।

বিয়ে করছেন বিপাশা বসু

বিপাশা বসু ও করন সিং গ্রোভার
আর লুকোচুরি নয়, অনেকই তো হলো! এবার নিজেদের প্রেমের সম্পর্ক স্বীকার করে নিয়ে খুব শিগগিরই গাঁটছড়া বাঁধতে যাচ্ছেন বলিউডের তারকা অভিনেত্রী বিপাশা বসু ও অভিনেতা করন সিং গ্রোভার। গত দুই বছর চুটিয়ে প্রেম করেছেন এই দুই তারকা। একসঙ্গে দুজন দেশের বাইরে ছুটিও কাটিয়ে এসেছেন। তবে গণমাধ্যমের কাছে সব সময়ই লুকিয়ে রাখতে চেয়েছেন তাঁদের প্রকৃত সম্পর্ক। নিজেদের সম্পর্ককে ‘শুধুই ভালো বন্ধু’ বলে চালিয়ে দিয়েছেন এত দিন। এবার নিজেদের ভালোবাসাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে যাচ্ছেন বিপাশা ও করন। ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে, চলতি মাসের শেষের দিকেই বাঙালি হিন্দু রীতিতে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করতে যাচ্ছেন এই জুটি। এপ্রিলের ২৮ তারিখে মেহেদির অনুষ্ঠান দিয়ে বিয়ের উৎসব শুরু হবে। পরদিন হবে বিবাহোত্তর সংবর্ধনা। তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠানে শিল্পা শেঠিসহ আরও অনেক বলিউড তারকাদের উপস্থিতি থাকবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। বিপাশার বিয়ের পোশাক নকশা করবেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু, ডিজাইনার রকি এস। ৩৭ বছর বয়সী অভিনেত্রী বিপাশার এটি প্রথম বিয়ে হলেও করনের এটি তৃতীয় বিয়ে। এর আগে টেলিভিশন অভিনেত্রী শ্রদ্ধা নিগম ও জেনিফার উইঙ্গেটের সঙ্গে সংসার করেছিলেন তিনি। এ দিকে বিপাশা এর আগে বিভিন্ন সময় ডিনো মোরিয়া, জন আব্রাহাম, হারমান বাওয়েজার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছেন।

কনকচাঁপায় মুগ্ধ ফেরদৌসী রহমান

ফেরদৌসী রহমান ও কনকচাঁপা।
অনেক গুণে গুণান্বিত সংগীতশিল্পী কনকচাঁপা। কিন্তু তাঁর এই গুণের কথা অবশ্য খুব কম মানুষই জানেন। গান তিনি যেমন ভালো গাইতে পারেন; তেমনি ছবি আঁকেন, গান-কবিতা লেখেন, আরও কত কিছুই যে পারেন। বাংলাদেশের সংগীতের জনপ্রিয় এই মানুষটির কাজে মুগ্ধ হয়েছেন গুণীজন ফেরদৌসী রহমান। শুক্রবার ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমির চিত্রশালার চার নম্বর গ্যালারিতে কনক চাঁপার একক চিত্র প্রদর্শনী দেখে বের হওয়ার সময় প্রথম আলোকে তাঁর এই মুগ্ধতার কথা জানান ফেরদৌসী। ফেরদৌসী রহমান বলেন, ‘আমি সাধারণত খুব একটা বাইরে বের হই না। কিন্তু কনক চাঁপার দাওয়াতটা ফেলতে পারিনি। আমি তো তাঁর আঁকা ছবিগুলো দেখে রীতিমতো মুগ্ধ না হয়ে পারিনি। প্রথমত সে খুব ভালো গান গায়। গান গাওয়ার পাশাপাশি সে যে ছবি আঁকাতেও এতটা পারদর্শী তা জানতাম না।’ তিনি বলেন, ‘শুনেছি সে খুব ভালো গানও লেখে, কবিতা লেখে, নকশিকাঁথা সেলাই করতে পারে; এমনকি খুব ভালো রান্নাও নাকি করে। একটা মেয়ে এত কিছু বেশ দক্ষতার সঙ্গে করতে পারে, বিষয়টি ভাবা যায়! ওর জন্য আমার অনেক দোয়া।’ কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপার গত ৪০ বছরে আঁকা কিছু ছবি নিয়ে শুক্রবার বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির চিত্রশালার ৪ নম্বর গ্যালারিতে শুরু হয়েছে তাঁর প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী ‘দ্বিধার দোলাচল ২০১৬’। এটি উৎসর্গ করা হয়েছে প্রয়াত শিল্পী খালিদ মাহমুদ মিঠুকে। কনকচাঁপার এই চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। এ ছাড়াও, এ সময় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কনকচাঁপা চাকমা, আফজাল হোসেন, মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান, শহীদুল্লাহ ফরায়েজীসহ আরও অনেকে। আজ শনিবার ও কাল রোববার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত প্রদর্শনী চলবে।

ক্রান্তিকালে মনুষ্যত্বের রক্তপাত

ছেলেটি মেয়েটিকে বিয়ে করতে রাজি হয়নি। একপর্যায়ে মেয়েটি আবিষ্কার করল, ছেলেটি আরও কয়েকজন মেয়ের সঙ্গেও প্রেম করত, তাদের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কও গড়ে তুলেছিল, যার ভিডিও রেকর্ড ছেলেটির ল্যাপটপে খুঁজে পায় সে, তার নিজেরটাসহ। এই প্রতারণা সহ্য করতে না পেরে মেয়েটি শুধু ছেলেটিকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তার বুক চিরে হৃৎপিণ্ড বের করে আনে সে, দেখতে চেয়েছিল, ছেলেটির হৃদয় কত বড়! একবার ভাবুন পাঠক, আমরা কোথায় চলে গেছি। ২০১৪ সালে খুলনায় ঘটেছিল এটি। মেয়েটি আদালতের কাছে সব স্বীকারও করেছে। এতে সম্প্রতি তার ফাঁসির আদেশ হয়েছে। দেশের সংবাদমাধমে এ খবর প্রকাশিত হয়। প্রেমের সম্পর্ক এখন যেন ডালভাতে পরিণত হয়েছে। চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যমেও ব্যাপারটা কমবেশি সেভাবেই উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর সঙ্গে হৃদয়বৃত্তি ও বুদ্ধিবৃত্তির ব্যাপার আর আছে বলে মনে হয় না। পুরোটাই যেন এক বিকৃত মজা নেওয়ার ব্যাপার। সে কারণেই যখন-তখন এই সম্পর্ক ভাঙতে-গড়তে অসুবিধা হচ্ছে না। তবে সবাই যে আবার সেটা মেনে নিতে পারে, তাও নয়। এ ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক তা-ই হয়েছে। মেয়েটি এই প্রতারণা মানতে পারেনি, আবার তা হজমও করতে পারেনি। ফলে সে এমন বীভৎসভাবে প্রতিশোধ নেয়। সভ্যতার কিছু রীতিনীতি ও মানদণ্ড আছে, একটি আধুনিক সমাজের মানুষকে তা মেনে চলতে হয়। তা না হলে সমাজে নৈরাজ্য দেখা দেয়। আমরা স্বাধীন, কিন্তু স্বাধীনতার মানে এই নয় যে আমরা যা খুশি তা-ই করতে পারি। বরং উল্টো। স্বাধীন হতে হলে মানুষকে আরও দায়িত্বশীল হতে হয়। সেটা যেমন আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বেলায় সত্য, তেমনি ব্যক্তিগত সম্পর্কের বেলায়ও। এই শিক্ষা লাভ করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হচ্ছে পরিবার, তারপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যেখানে মানুষ একধরনের বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। সম্প্রতি কিশোরী মেয়ে ঐশীর হাতে তার মা-বাবার খুনের মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, আমাদের এই বন্ধন আলগা হয়ে গেছে। আবার যে মা এত কষ্ট করে সন্তান লালন-পালন করেন, সেই মা-ও নিজ হাতে সন্তানকে হত্যা করছেন। সবকিছু যেন ভেঙে পড়ছে। এটা আসলে মূল্যবোধের ব্যাপার। যেটা একসময় আসত ধর্ম থেকে, তার সঙ্গে সমাজ ও পরিবার তো ছিলই। মানুষ এখন ধর্ম পালনের ব্যাপারে আগ্রহী হলেও তার নীতি-নৈতিকতা মানছে না। অন্যদিকে নগরায়ণের কারণে মানুষ একা হয়ে পড়ছে, পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, আবার মানুষ সেই একাকিত্ব নিয়ে সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ফলে সে উভয় সংকটে পড়েছে। এটা এক ক্রান্তিকাল। আমাদের পরিবারগুলো আর কিছুর দিকে না তাকিয়ে সন্তানদের আত্মপ্রতিষ্ঠার শিক্ষা দিচ্ছে, যেটা আবার বুমেরাং হয়ে পরিবারেই ফিরে আসছে। অর্থাৎ সন্তান আত্মপ্রতিষ্ঠার মোহে মা-বাবার খোঁজ নিচ্ছে না। বাবার চেয়ে বাবার সম্পদই যেন সন্তানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই আত্মকেন্দ্রিকতার নানা রূপ দেখা যায়, তার জন্য যেমন নিজের মা-বাবাকে মানুষ ভুলে যায়, তেমনি প্রেমিকা ও সন্তানও তার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়। সে কারণেই পশ্চিমে মা-বাবা দিবস পালন শুরু হয়েছে, কারণ বছরের ওই একটি দিনই সন্তান মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসে। বছরের বাকি দিনগুলো বুড়ো-বুড়ি একাই থাকেন। সেখানে তুষারপাতের সময় কোনো নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা একা মরে পড়ে থাকলেও তাঁর খোঁজ নেওয়ার কেউ থাকে না, দুই-তিন দিন পর পৌরসভার লোক এসে হয়তো তাঁদের মৃতদেহ উদ্ধার করে। সম্পর্ক আসলে লালন করার ব্যাপার, তার মধ্যে যেমন ভালোবাসা থাকে, তেমনি থাকে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ। প্রেমিক-প্রেমিকা বা মা-বাবা-সন্তানের সম্পর্ক থেকে শুরু করে সব সম্পর্কের ক্ষেত্রেই এ কথা খাটে। এটাই সেই মূল্যবোধ। সেই ব্যাপারটা হারিয়ে যাচ্ছে, যার অভিঘাত পড়ছে ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। ব্যক্তি বা পরিবার—কেউই তাকে কাউন্সেলিং করছে না। ফলে সে হারাচ্ছে মানসিক ভারসাম্য, হয়ে উঠছে বিকৃত; যার রূপ আমরা দেখি এই রক্তপাতের মধ্য দিয়ে।

মিসরে সুপ্রিম কোর্ট শুদ্ধিকরণ!by মিজানুর রহমান খান

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নটি যেকোনো একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না, সেটা মিসর আরেকবার দেখিয়ে দিল। মিসরের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ৩১ জন বিচারপতিকে অপসারণ করেছে। মিসরে বেশ কিছুদিন ধরে ‘সরকারবিরোধী’ বিচারপতিদের বিরুদ্ধে একধরনের ‘পরিচ্ছন্নতা অভিযান’ চলছে। অভিযোগ হচ্ছে, দেশটির প্রথম নির্বাচিত ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট মুরসিকে ২০১৩ সালে অপসারণে সামরিক বাহিনী যে অভ্যুত্থান করেছিল, এই বিচারকেরা তার বিরোধিতা করেছিলেন। ইসলামি ব্রাদারহুডের নির্বাচিত নেতা মুরসি ও সামরিক নেতা জেনারেল সিসির শাসন প্রমাণ রাখছে যে, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র চাইলে একটি জাতিকে তার সাংস্কৃতিক মান উন্নয়নে নজর দিতে হবে। ক্ষমতাকেন্দ্রিক সামাজিক বিভাজন, প্রতিপক্ষ দলন ও অব্যাহত অসহনশীলতার রাজনীতি একটি জাতিকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলতে পারে। বিদেশি শক্তি কারও ক্ষমতায় থাকা না–থাকায় প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্তু তারা দুর্দশাগ্রস্ত জাতিকে পরিত্রাণ দিতে পারে না। শুধু ভোট দিয়ে একটা সরকার প্রতিষ্ঠা করা কিংবা তার ব্যর্থতা মোকাবিলায় অসাম্প্রদায়িক সামরিক শাসন কায়েম করা কোনোটিই শান্তি ও স্থিতির রক্ষাকবচ নয়। মিসরে অপসারিতদের মধ্যে অন্তত দুজন বিচারকের বিরুদ্ধে মুরসির সাংবিধানিক সরকারের পক্ষে রাজপথে গড়ে ওঠা ‘জনতার মঞ্চে’ অংশ নেওয়ার অভিযোগ আছে। তাঁরা প্রকাশ্যে ব্রাদারহুডের সমর্থনে রাজপথে নেমেছিলেন, যা বিচারকের পদমর্যাদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না। সে জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ ওঠা হয়তো স্বাভাবিক। কিন্তু অন্যদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ এবং কীভাবে তাঁদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। আবার মিসরের বিচার বিভাগের স্বাধীনতার তল মাপতে হলে একটি তথ্য মনে রাখাই বোধ করি যথেষ্ট, আর সেটা হলো মাত্র একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার দায়ে আদালত ৫২৯ জন বিরোধীদলীয় কর্মীকে ফাঁসি দিয়েছেন (গার্ডিয়ান, ১৪ মার্চ ২০১৪)। সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতিকে অপসারণের প্রক্রিয়া নিশ্চয় কোনো একটি দেশের নিছক ‘অভ্যন্তরীণ’ বিষয় হিসেবে গণ্য হতে পারে না। কারণ, বিচারক সর্বজনীন মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনকে সুরক্ষা দেন। তাই এটা একটি আন্তর্জাতিক বিষয়। তাঁদের বিরুদ্ধে যেকোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হোক না কেন, তার স্বচ্ছতা থাকতে হবে। সাম্প্রদায়িক কি অসাম্প্রদায়িক, গোঁড়া নাকি উদারনৈতিক—এসব জারিজুরি এখানে একদম চলবে না। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক অপসারণের প্রক্রিয়া অবশ্যই সর্বজনীনভাবে বোধগম্য ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে। মিসর সরকার যদি সুপ্রিম কোর্টের বিচারক অপসারণে ‘ডিউ প্রসেস’-এর গ্যারান্টি না দিতে পারে, তাহলে তাকে কেবল ধর্মরাষ্ট্র গঠনের প্রবক্তা ব্রাদারহুডবিরোধী বা ব্রাদারহুডবিনাশী সরকার হিসেবে বাহবা দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, তা টেকসই নয়। আর তাহলে এই আশঙ্কাটাই প্রবল হয়ে উঠবে যে মিসরের সেক্যুলার সামরিক সরকার তার ‘মৌলবাদী’ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমাতে সত্যি জুলুম চালাচ্ছে। এই যুক্তি দুর্বল নয় যে, মিসরের সুপ্রিম কোর্টের যেসব বিচারক কোনোভাবে ‘রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়’ জড়িয়ে পড়েছিলেন, তাঁদের পক্ষে আর বিচারিক পদে অধিষ্ঠান থাকা কাম্য নয়। কোনো বিচারক তা তিনি যত বড়ই হোন, যদি ‘সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনে’ জড়িয়ে পড়েন, তাহলে তাঁর শপথ ভঙ্গ ঘটে। তিনি নিরপেক্ষতা হারান। সুতরাং মিসরের যেসব বিচারক, যার সঠিক সংখ্যা আমরা জানি না, মুরসির ‘গণতান্ত্রিক’ সরকার ও সংবিধান রক্ষায় ‘রাজনীতিতে’ জড়িয়ে পড়েছিলেন, তাঁদের অপসারণের প্রতি নীতিগত সমর্থন না দিয়ে উপায় নেই। সাংবিধানিক সরকার রক্ষার নামে আর যা-ই হোক, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের তরফে আইনবহির্ভূত ‘অ্যাকটিভিস্ট’ ভূমিকা প্রত্যাশিত নয়। কিন্তু মিসরে গত দুই বছরে চল্লিশের বেশি বিচারপতিকে বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল কমিশন ফর জাস্টিস (আইসিজে) অব্যাহতভাবে এর নিন্দা ও প্রতিবাদ করে চলেছে। আইসিজে অবশ্য সংবিধান ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে দেওয়া বিচারকদের একটি জনবিবৃতিকে ‘বাকস্বাধীনতা’র অনুশীলন হিসেবে সমর্থন করেছে। ওই বিবৃতি মুরসির ‘নির্বাচিত সরকার’ উৎখাতের বিরোধিতা করেছে। মুরসির পক্ষে বিচারকদের একটি অংশ ‘জাজেস ফর ইজিপ্ট’ আন্দোলনে গেছে। কেউ কেউ মুরসির ‘বৈধতা’ ব্যাখ্যা করে টিভিতে বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু এর কোনো কিছুই এটা সমর্থন করে না যে জেনারেল সিসি সরকারের আমলে অভিযুক্ত বিচারকেরা আত্মপক্ষ সমর্থন করতে মাত্র দুই পৃষ্ঠা করে খরচ করতে পারবেন। মনে হচ্ছে বিচারকেরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তঁারা সামরিক বিচার সংস্কৃতির শিকার। পাকিস্তানে এর আগে আমরা গণহারে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণ ও পাল্টাপাল্টি প্রতিস্থাপনের ঘটনা দেখেছি। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের উদ্যোগ একটা বড় মাপের স্পর্শকাতর বিষয়। অনেক দেশে শতাব্দীতে দু-একজনকে অপসারণের ঘটনা ঘটে। যে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যত উন্নত, সেই দেশের উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ ততটাই কম। সুতরাং নিকট ইতিহাসে পাকিস্তান ও মিসরে পাইকারি হারে বিচারক অপসারণ বিশ্ববাসীকে উদ্বিগ্ন করছে। আমাদের এসব স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে ভাইমার (বর্তমান জার্মানি) নামে একটি রিপাবলিক ছিল। সুপ্রিম কোর্ট ভেঙে গিয়েছিল বলে দেশটি ভেঙে গিয়েছিল। সুতরাং সাধু সাবধান! ২০১৩ সালের ক্ষমতার পটপরিবর্তন থেকে মিসরের সুপ্রিম কোর্টের বিপুলসংখ্যক বিচারপতির দুর্দিন শুরু হয়। এটা স্পষ্ট যে বর্তমান সামরিক সরকারের মধ্যে সর্বস্তরে ‘আমাদের লোক’ রাখতে যাঁরা আগ্রহী, তাঁরাই বিচার বিভাগে ভিন্নমত ও পথ অনুসরণকারীদের শুদ্ধিকরণে অতি উৎসাহ দেখান। ‘যথাযথ প্রক্রিয়া’ অনুসরণ না করে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণ করা হয়ে থাকলে তা একটি জাতির জন্য চরম দুর্ভাগ্যের বিষয়। যত ভালো কাজের অজুহাতে তা করা হোক না কেন, এর ফল বিপরীত হতে বাধ্য। এটা মিসরের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার উত্তরণকে তা আরও বাধাগ্রস্ত ও বিপৎসংকুল করতে পারে। কারণ, মিসর সরকার স্পষ্টতই কোনো প্রকারের স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণের তোয়াক্কা করছে না। সুপ্রিম কোর্টের ৩১ জন বিচারপতির অপসারণের ঘটনা রাষ্ট্রীয় বেতারের সংক্ষিপ্ত বুলেটিনে মামুলি খবর হিসেবে প্রচারিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে সরকার বদল হলে গোটা সিভিল সার্ভিস বদলে যায়। মিসর কি বিচার বিভাগে সেই পথ দেখাচ্ছে? সামরিক সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘মৌলবাদী’ বা ‘জঙ্গি’ বলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্বিচারে শায়েস্তা করার যে উন্মাদনা মিসরজুড়ে চলছে, তা থেকে জেনারেল সিসির কর্তৃত্ববাদী সরকারের ‘সুপ্রিম কোর্ট ক্লিনজিং’ বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে প্রতীয়মান হয় না। যতই অনাচার চলুক, শাসকগোষ্ঠী মানুষকে ব্রাদারহুডের জঙ্গিপনার দোহাই দিয়ে ভয় দেখাচ্ছে। কিন্তু তার নিজের ক্ষমতাদর্পী জঙ্গিপনা দেশকে রসাতলে নিচ্ছে। তারা প্রমাণ রাখছে, আইনের শাসন না দিতে পারাটা একটা হাত বাছাই করা বিষয় হতে পারে না। একটি বলদর্পী, অগণতান্ত্রিক ও ক্ষমতাগৃধ্নু প্রশাসন ‘আমাদের’ জন্য সুশাসন, আর ‘তাদের’ জন্য কুশাসন দিতে পারে না। ২৯ মার্চ ৩১ বিচারকের অপসারণের খবর প্রকাশ করে বিলাতের দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে যে, ‘ধর্মনিরপেক্ষ অথচ ভিন্নমতাবলম্বী বা সরকারবিরোধী তারাও ব্রাদারহুডের মতোই দমন-পীড়নের শিকার।’ বিচারপতিদের অপসারণের প্রক্রিয়া মিসরের সরকারের তরফে বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা না হলে মিসরের বিচার বিভাগে যা চলছে, তা মিসরীয় জনগণ ও বিশ্বশান্তির জন্য একটা উদ্বেগজনক সুপ্রিম কোর্ট ক্লিনজিং হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে।

প্রথম বেসামরিক প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন

প্রতিবেশী মিয়ানমারে গত বুধবার একজন বেসামরিক ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন, এবং আজ দেশটিতে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরিত হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত একটি বেসামরিক সরকারের কাছে। প্রেসিডেন্ট থিন কিউ ও মিয়ানমারের জনসাধারণের প্রতি আমাদের আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা রইল। অং সান সু চির প্রয়াত স্বামী ও জীবিত দুই সন্তান বিদেশি (ব্রিটিশ) নাগরিক—এই অজুহাতে তাঁর প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহণে সাংবিধানিক বাধা থাকায় তাঁরই ইচ্ছায় তাঁর শৈশবের বন্ধু ও ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা থিন কিউ এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তবে সাধারণভাবে এটা স্পষ্ট যে অং সান সু চিই নতুন সরকারের প্রধান নীতিনির্ধারক। মিয়ানমারের যে জনসাধারণ গত নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে সু চি ও তাঁর দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিকে (এনএলডি) বিপুল ভোটে ভূমিধস বিজয় এনে দিয়েছেন, তাঁরাও মনেপ্রাণে তাঁকেই প্রধান নেতা হিসেবে মানেন। অং সান সু চি চারটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকবেন। প্রেসিডেন্ট থিন কিউ শপথ গ্রহণের পর বলেছেন, তাঁর নতুন সরকার একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নেবে, যেটা সত্যিকারের গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বলা বাহুল্য, মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক বিকাশের পথে এটি হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, কেননা দেশটির সংবিধানে অনেক অগণতান্ত্রিক বিধান রয়ে গেছে। পার্লামেন্টের ২৫ শতাংশ আসন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত, প্রধান সেনাপতি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্য থেকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ দেবেন, এবং সর্বোপরি সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর ভেটো প্রদানের ক্ষমতা—এসব বিধান যত দিন সংবিধানে থাকবে, তত দিন রাষ্ট্র পরিচালনায় গণতান্ত্রিক রীতিনীতি গড়ে ওঠা কঠিন। তবে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত একটি বেসামরিক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের অর্ধশতকের বেশি সময়ের নিরঙ্কুশ সামরিক নিয়ন্ত্রণের অবসান অবশ্যই দেশটিতে এক নতুন যুগের সূচনা। এরপর থেকে জাতীয় সংহতি, শান্তি, শিক্ষাবিস্তার, দারিদ্র্য লাঘব, রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও সংস্কৃতি বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে গণতান্ত্রিক বিকাশের পথের বাধাগুলোও অপসারিত হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। একই সঙ্গে আমাদের প্রত্যাশা যে দেশটিতে রোহিঙ্গাসহ সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোর ওপর বৈষম্যমূলক নীতির অবসান ঘটবে।

একজন ভাওয়াইয়ার সাধক by সফিউল আলম রাজা

নুরুল ইসলাম জাহিদ
এই তো সেদিনের কথা। উত্তরাঞ্চলের মাঠঘাট-প্রান্তরজুড়ে যাঁর সুর ছড়িয়ে থাকত। যার মিষ্টি সুরের গান একটিবার শুনতে আগ্রহী আর ব্যাকুল হয়ে থাকত পথে-প্রান্তরের সহজ-সরল মানুষগুলো। যাঁর গান শুনে মানুষ যেমন কাঁদতেন, হাসতেন, তেমনি দারুণভাবে উজ্জীবিত হতেন। তিনি ভাওয়াইয়ার কিংবদন্তি গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী নুরুল ইসলাম জাহিদ। সাড়ে তিন হাজারের অধিক গানের গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী তিনি। ভাওয়াইয়া গানের পাশাপাশি তিনি লিখেছেন অসংখ্য আধুনিক, পল্লিগীতি, মারফতি, মুর্শিদি, ভাটিয়ালি ও দেশের গান। মুক্তিযুদ্ধেও ছিল তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ। মুক্তিযুদ্ধের সময় কোচবিহারের Welfare Centre for Evacuee Children-নর্থবেঙ্গল জোন থেকে প্রশিক্ষণ শেষে ক্যাম্পে ক্যাম্পে নিজের লেখা ও সুরারোপিত গান শুনিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করেছেন। তাঁর সহযোদ্ধারা যুদ্ধ শেষে সার্টিফিকেট গ্রহণ করলেও তিনি মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক গান লিখেছেন; এ ছাড়া দেশের বিশেষ দিনগুলো নিয়ে অসাধারণ সব গান লিখেছেন তিনি। তাঁর গান চলচ্চিত্র ও নাটকেও ব্যবহৃত হয়েছে। অনেক গানই এখনো বেতার ও টেলিভিশনে বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে পরিবেশিত হয়ে আসছে। দীর্ঘ চার বছর রোগভোগের পর গত বছরের ১ এপ্রিল গুণী এই মানুষটি চলে গেছেন না-ফেরার দেশে।  সংগীতাঙ্গনের গুণী এই ব্যক্তিকে পেয়েছিলাম আপনজন হিসেবে। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াকালীন চিলমারী থানা পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গিয়ে তাঁর প্রথম সান্নিধ্য পাই। আমার গান শুনে কাছে টেনে নিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি অনেক ভালো করবে, চর্চা করো।’ সুযোগ পেলে তাঁর কাছে যেন যাই। এরপর কতবার যে তাঁর কাছে গিয়েছি, মুগ্ধ হয়ে গান শুনেছি, শিখেছি, গুরুজির রচনা নতুন নতুন গান দেখেছি, গানের ভাব বোঝার চেষ্টা করেছি, গান লেখার কলাকৌশল শিখেছি। তিনি একটি বেসরকারি সংস্থায় শিক্ষকতা করতেন। চাকরির সুবাদে চিলমারীতে থাকতে হতো তাঁকে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে দুটি রাত থাকতেন কুড়িগ্রামে নিজের পরিবারের সঙ্গে। এভাবেই কেটেছে দীর্ঘ ২২ বছর।
ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাস উদ্দীনের সেই গানের চিলমারী বন্দরের মানুষ ভাওয়াইয়ার কিংবদন্তি নুরুল ইসলাম জাহিদকেও আপন করে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। রংপুর বেতারের নিয়মিত অনুষ্ঠান ‘তিস্তা পাড়ের গানের অনুষ্ঠান ভাওয়াইয়া’ মানেই নুরুল ইসলাম জাহিদের বিশেষ ধারার, ভিন্ন গায়কি আর মিষ্টি সুরের গান। তিনি ছিলেন স্বভাব-গীতিকবি। একদিন বিকেলে তাঁর সঙ্গে বসেছিলাম, হঠাৎ একটি পায়রা (কবুতর) উড়ে এসে ঘরের চালে বসল। পায়রাটি চালে বসেই বাকবাকুম বাকবাকুম করে যেন অস্থির করে ফেলল। আর অমনি গুরুজি লিখে ফেললেন, ‘আরে তুই ক্যানে একেলায় পায়রা রে/ ও পায়রা আসিলু ঘুরিয়া / ওরে মোর মতন কি তোরো জোড়া গেইছে রে ভাঙিয়া...।’ ভাওয়াইয়ার প্রচলিত ধারার গানগুলোতে সুর ও কথার ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। প্রচলিত গানগুলো দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তা পেলেও শিক্ষিত গীতিকারদের অবদানও কম নয়। সে ক্ষেত্রে গীত রচয়িতা হিসেবে নুরুল ইসলাম জাহিদের বিশেষ কৃতিত্ব রয়েছে। শব্দ ও সুরের নির্বাচনে তাঁর পারদর্শিতা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সংসারের টানাপোড়েন ও অসংগতিগুলো সহজেই উঠে এসেছে তাঁর গানে। গানে তিনি মাঠের চাষি, গাড়িয়াল বন্ধু, নারীর প্রেম ও দীর্ঘশ্বাস তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। কালা, গাড়িয়াল কিংবা গাড়িয়াল বন্ধুর প্রেম-বিরহের একঘেয়েমি ছকবাঁধা গান থেকে তাঁর গান ভিন্ন স্বাদের, যা ভাওয়াইয়ার পরিধিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। লোকসংস্কৃতির ভান্ডারকে করেছে সমৃদ্ধ। তিনি প্রথম রংপুর বেতারে ঈদ, পূজা, নবান্ন, পিঠা, বৈশাখসহ বিশেষ দিনগুলো নিয়ে ভাওয়াইয়া রচনা করেন এবং তা সুর দিয়ে বেতারে পরিবেশন করেন। শিল্পী, সুরকার ও গীতিকার পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি লোকগানের একজন নিবিষ্ট গবেষক। ঐতিহ্য ও লোকসংগীত বিষয়ে তাঁর লেখাও কম নয়। বিভিন্ন পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকার এবং ‘গ্রামবাংলার চিরায়ত সংগীত-পল্লিগীতি’, ‘কুড়িগ্রাম হামার জেলা বাহে’ প্রভৃতি লেখায় পল্লিজীবন ও পল্লিগানের নিষ্ঠাবান গবেষক সত্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বিভিন্ন সময় গুরুজির মুখ থেকে অনেক অভিমানের কথা শুনেছি। ভাওয়াইয়া নিয়ে তাঁর নিজের কর্মপরিকল্পনা ও বেতার কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কথাও শুনেছি। তাঁর সাড়ে তিন হাজার গানের মধ্যে কতগুলো গান বেতারে সংরক্ষিত আছে? রংপুর বেতারে পাওয়া গেল মাত্র ৩৫টি। অথচ গুরুজির শতাধিক গান আমার অন্তরেই গেঁথে আছে। আর পাঁচ শতাধিক ভাওয়াইয়া গান আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে। তাঁর বড় ছেলে সজীবের সংগ্রহেও দুই হাজারের অধিক গানের কথা আছে, কিন্তু সমস্যা হলো সুরগুলো তো ধারণ করা নেই। যে বেতারে থাকার কথা সেই বেতারে তো নেই। যে মানুষটি দেশের জন্য, মানুষের জন্য পুরো জীবনটা কাটিয়ে দিলেন; এককথায় নিঃশেষ করে দিলেন, তাঁর জন্য এই দেশ, এই সমাজের কি কিছু করার নেই! নুরুল ইসলাম জাহিদ ছাড়া তাঁর পুরো পরিবারটি এখন বিধ্বস্ত। গুরুজির প্রথম প্রয়াণ দিবসে আমাদের প্রথম দাবি, রংপুর বেতারে রেকর্ড করা সাড়ে তিন হাজার গানের অধিকাংশই কে নষ্ট করল তা খুঁজে বের করা হোক। দ্বিতীয়ত, বাংলা একাডেমির মাধ্যমে তাঁর সাড়ে তিন হাজার গানের পাণ্ডুলিপি কয়েক খণ্ডে বই আকারে প্রকাশ করা হোক।

আমরা ক্রিকেট দলের সঙ্গে আছি

বাংলাদেশ কেমন খেলল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে? আমরা এক দিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে বিশ্ব শীর্ষ তালিকায় সাত নম্বর দল। পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, জিম্বাবুয়ের ওপরে। টেস্টে আমরা ৯ নম্বর দল, জিম্বাবুয়ের আগে। টি-টোয়েন্টিতে আমাদের অবস্থান ছিল ১১ নম্বর, বিশ্বকাপের পরে এক ধাপ এগিয়েছি, হয়েছি ১০ নম্বর, আফগানিস্তান এখনো আমাদের ওপরে। বাংলাদেশের সঙ্গে যখন ভারতের
খেলা হচ্ছে, তখন আমরা ১১ নম্বর দল, খেলছি বিশ্বের এক নম্বর দলের সঙ্গে!
এরপরেও আমাদের প্রত্যাশা ছিল বেশি। এবং আমরা প্রত্যাশা পূরণের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম। আর মাত্র একটা রান। ইশ্। একটুর জন্য! একটুর জন্য কত কিছু হয়নি। একটুর জন্য আমরা পাকিস্তানকে হারিয়ে এশিয়া কাপের চ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি। একটুর জন্য এবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বিশ্বের এক নম্বর দলটিকে হারাতে পারিনি। আমার সঙ্গে কতজনের কথা হলো, কত জ্ঞানী-গুণী বিশিষ্টজন থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক, এখনো বলেন, ভাই, ওই একটা রানের কথা ভুলতে পারি না, যতবার মনে হয়, ততবারই কষ্ট হয়, এখনো ঘুমের মধ্যে দেখি, মাহমুদউল্লাহ ছয় মারার চেষ্টা না করে এক নিচ্ছেন। এই যে আমাদের আত্মবিশ্বাস ছিল, আমরা যেকোনো একটা বড় দলকে হারাতে পারব, এমনকি এও ভেবেছিলাম যে হয়তো আমরা সেমিফাইনালে যেতে পারব, সেটা ভিত্তি পেয়েছিল বিশ্বকাপের ঠিক আগে আগে শেষ হওয়া এশিয়া কাপ থেকে। টি-টোয়েন্টিতে আমরা ভালো নই, সেই কথা মিথ্যা প্রমাণ করে মাশরাফির দল হারিয়ে দিল শ্রীলঙ্কাকে, পাকিস্তানকে। আর এশিয়া কাপের ফাইনালের দিনে খেলা শুরুর আগে আগে বয়ে গেল দুর্ভাগ্যের বাতাস, টসে আমরা হেরে গিয়েছিলাম, আর ম্যাচটা হলো স্বল্পদৈর্ঘ্যের। আর ছিল মুস্তাফিজের না খেলতে পারা। সেখান থেকে দল গেল ভারতের ধর্মশালায়। একদমই কোনো বিশ্রাম পাননি আমাদের খেলোয়াড়েরা। এশিয়া কাপের ফাইনাল শেষই হয়েছে মধ্যরাতের পর। না ঘুমিয়ে ছেলেরা ভোরবেলা গেলেন এয়ারপোর্ট। সেখান থেকে দীর্ঘযাত্রা, ট্রানজিট বিরতির ধকল পেরিয়ে ধর্মশালা। বাংলাদেশ যে এশিয়া কাপের ফাইনালে যেতে পারে, এটা কর্তৃপক্ষ ভাবেইনি। বিশ্বকাপের আগে তাঁদের যেদিন অনুশীলন ম্যাচটা ছিল, সেদিন বাংলাদেশ ফাইনাল খেলেছে ভারতের সঙ্গে। মধ্যখানে এক দিন বিরতি দিয়েই মাশরাফি বাহিনী নেমে পড়ল বিশ্বকাপের প্রথম পর্বে। সেই তিনটা খেলায় বাংলাদেশ যে ভালো খেলেছে, দুটোতে সরাসরি জয়লাভ করেছে, সেটা বাংলাদেশ নিতান্তই বড় দল বলেই পেরেছে। ক্রিকেট মনের খেলা। জিততে পারি—এই আত্মবিশ্বাস থাকলেই জেতা সম্ভব। ধর্মশালা থেকে দিল্লি হয়ে উড়ে যেতে হলো কলকাতা। অথচ আগের সূচি অনুযায়ী পাকিস্তানেরই উড়ে আসার কথা ধর্মশালায়। পাকিস্তান নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ধর্মশালায় গেল না। ফলে বিমানে চড়তে হলো বাংলাদেশকে। এক দিন পরেই খেলা। এশিয়া কাপের পরে একটা দিনের জন্যও কি বিশ্রাম পেয়েছিল বাংলাদেশ দল? এরই মধ্যে এল সেই অপ্রত্যাশিত আঘাত। যাঁরা খেলে গেলেন এশিয়া কাপে, কোনো আম্পায়ার যাঁদের নিয়ে বিন্দুমাত্র প্রশ্ন তুললেন না, সেই তাসকিন আর আরাফাত সানির বোলিং অ্যাকশন নিয়ে রিপোর্ট করলেন আম্পায়াররা। প্রথম খেলার পরেই। প্রিয়তম খেলোয়াড়দের হারানোর শঙ্কায় মাশরাফি কেঁদে ফেললেন সংবাদ সম্মেলনের পর, জানা গেল। এই অবস্থায় দল ভালো খেলে কী করে! আর আমাদের টস–ভাগ্য! এক ভারতের সঙ্গে খেলার দিন ছাড়া একটা দিনও আমরা টসে জিতলাম না। এরপরও মাশরাফিরা ভালো খেলেছেন অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে এবং ভারতের বিরুদ্ধে। আমি বলব, ভাগ্য একেবারেই আমাদের পক্ষে ছিল না। কী হতো যদি—
. তাসকিন ও সানির বিরুদ্ধে অভিযোগ না করা হতো, তাঁরা যদি খেলতে পারতেন।
২. যদি মুস্তাফিজ খেলার উপযুক্ত থাকতেন।
৩. যদি আমরা টসে জয়লাভ করতাম।
৪. যদি অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে খেলার দিন তামিম ইকবাল অসুস্থ হয়ে না পড়তেন। এগুলোর একটারও ওপর মাশরাফির কোনো হাত ছিল না। এটাকে আমরা বলব, নেহাতই দুর্ভাগ্য। আর গ্রামের বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়া হলো শুভাগত হোম ও সাকলাইন সজীবকে। ওঠ ছেড়ি তোর বিয়ে। তাঁরা সড়কপথে রওনা দিলেন শাহজালাল বিমানবন্দরের দিকে। পথে যানজট। সজীব কি ফ্লাইট মিস করবেন? শেষরাতের ফ্লাইট ধরলেন তাঁরা। মধ্যখানে জাহাজ বদল। তারপর বেঙ্গালুরু। বিমান থেকে নেমে তাঁরা সরাসরি চলে গেলেন মাঠে, অনুশীলনে। তারপরের দিনই খেলা। সেই খেলায় নাসিরকে না খেলিয়ে কেন দুজন ভ্রমণক্লান্ত খেলোয়াড়কে নামানো হলো, সেই বিস্ময় অনেকেরই যায় না। তারপরও বাংলাদেশ ভালো খেলেছে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। আর ভারতের বিরুদ্ধে। শেষ ওভারে মুশফিকুর রহিম পরপর দুই বলে মারলেন দুটো চার। এরপর তিন বলে দরকার ২ রান। ১ রান হলে ম্যাচ টাই। তখন সুপার ওভার খেলতে হবে। আমরা পারিনি। মুশফিক উঠিয়ে মারতে গেলেন। ছক্কা ভেবে যাঁরা লাফিয়ে উঠেছিলেন, তাঁদের স্তব্ধ করে দিয়ে মুশফিক তালুবন্দী। কিন্তু আমাদের মনে তখনো আশা। কারণ, বাংলাদেশের সবচেয়ে ঠান্ডা মাথার ব্যাটসম্যান মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ তখন স্ট্রাইকিং প্রান্তে। না, আর মনে করতে চাই না সেই দুঃস্বপ্নের রাতটিকে। আমরা যে পারিনি, সেটা বাংলাদেশ অভিজ্ঞতায় ভারতের চেয়ে অনেক পিছিয়ে বলে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে খেলার দিন কোহলি কীভাবে ম্যাচটাকে বের করে আনলেন। মুশফিকের মতো তিনিও পরপর চার মেরে চাপমুক্তি উদ্যাপন করেছিলেন। কিন্তু তিনি ম্যাচটা বের করে আনতে পেরেছিলেন, আমরা পারিনি। পারলে আমরা খুব খুশি হতাম, উদ্বেলিত হতাম, সন্দেহ নেই। পারিনি যে, তা নিয়ে আমাদের আফসোস আছে, হাহাকার আছে, কিন্তু কোনোÿ ক্ষোভ নেই। ওডিআইতে বাংলাদেশ ভারতকে সিরিজে হারিয়েছে, পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করেছে, জিম্বাবুয়েকেও তা-ই। কিন্তু জিম্বাবুয়ের সঙ্গে টি-টোয়েন্টিতেই আমরা ২-২ ড্র করেছি, এটা মনে রাখলে এ কথা বলা আর কঠিন হবে না যে এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আমরা ভালো করেছি। আমাদের মনে রাখতে হবে, টি–টোয়েন্টিতে আমরা আফগানিস্তানের কাছে হেরেছি, হংকংয়ের সঙ্গেও আমাদের হারের ইতিহাস আছে। এশিয়া কাপের ধকলের পর বিশ্বকাপের প্রথম পর্বের তিনটা ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ দল ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তাসকিন ও সানি-কাণ্ডের পর দলের মন গিয়েছিল ভেঙে। মুস্তাফিজ ও তামিমকে সব ম্যাচে না খেলাতে পারায় আমরা পূর্ণশক্তি দেখাতে পারিনি। তা না হলে আমরা আরও ভালো করতাম। কিন্তু যা করেছি, তা নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট না হতে পারি, ক্ষুব্ধ বা হতাশ হব না। তামিম সেঞ্চুরি করেছেন, রানের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন, সাকিব বল ও ব্যাটে ভালো করেছেন, মুস্তাফিজ বিশ্বের সবচেয়ে ভালো বোলার হিসেবে গণ্য হচ্ছেন, এমনকি ব্রেট লির কাছে। মাশরাফির অধিনায়কত্বের প্রশংসা ভারতের সঙ্গে খেলার দিন করেছেন সবাই, এমনকি সুনীল গাভাস্কার পর্যন্ত। জেতা ম্যাচ হেরে গেছি, সেই বেদনা আমাদের যাবে না। কিন্তু ম্যাচটা যে জেতার পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন মাশরাফিরা, সেই গৌরববোধও আমাদের আছে। গতস্য শোচনা নাস্তি। অতীত নিয়ে দুঃখ করে লাভ নেই। এটা আমাদের দলের অভিজ্ঞতার ভান্ডারকে ঋদ্ধ করবে। ভবিষ্যতে আমরা এ রকম পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারব বলে আশা করা যায়। এ কথা আবারও বলব যে বাংলাদেশ যে ক্রিকেটে ভালো করছে, তা এই দেশের মানুষের জীবনের সব ক্ষেত্রেই জয়ের জন্য মরিয়া চেষ্টারই একটা অংশমাত্র। ব্যক্তিমানুষ নিজের পরিশ্রম ও সৃজনশীলতা দিয়ে নিজেদের ভাগ্য বদলানোর সংগ্রাম করছেন, তা-ও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দেশকে। ক্রিকেটও তাই। মুস্তাফিজের উদাহরণ আমরা বারবার স্মরণ করব। সাতক্ষীরা শহর থেকেও ৩৫ কিলোমিটার দূরে তাঁর বাড়ি। ছেলে মাঠে যান, বাবা চান ছেলে পড়াশোনা করুক, চারটা গৃহশিক্ষক রেখে দিয়েছেন। তবু ছেলে ছুটে যান মাঠে। সেজো ভাই তাঁকে মোটরসাইকেলের পেছনে বসিয়ে নিয়ে যান ৩৫ কিলোমিটার দূরের সাতক্ষীরা শহরে। সেখানে সুন্দরবন ক্রিকেট একাডেমিতে গিয়ে মুস্তাফিজ ক্রিকেট অনুশীলন করেন। সেই ছেলে, প্রায় কিশোর, আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নেমেই নাম লিখিয়ে ফেললেন বিশ্ব রেকর্ডের খাতায়, কি টেস্টে, কি ওডিআইতে, এখন দেখা যাচ্ছে টি-টোয়েন্টিতেও। ওই মুস্তাফিজই বাংলাদেশ। মাশরাফির দুই হাঁটুতে বাটির মতো কী যেন লাগানো—ট্রাউজারের বাইরে থেকেও তা বোঝা যায়। ওই হার না-মানা মাশরাফিই বাংলাদেশ। তামিমের সদ্যোজাত পুত্রসন্তান ছিল ব্যাংককের হাসপাতালে। সেখান থেকে উড়ে এসে তিনি নেমে পড়লেন এশিয়া কাপের খেলায়। এশিয়া কাপে তেমন ভালো করতে পারেননি, কিন্তু দেখিয়ে দিলেন বিশ্বকাপে। আর সাকিব আল হাসান। পৃথিবীর এক নম্বর অলরাউন্ডার। ভারতের বিরুদ্ধে খেলায় আইপিএল খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে পাশে দাঁড়ালেন ক্যাপ্টেনের। মাশরাফির পজিশনে ফিল্ডিংয়ে দাঁড়ালেন, ১ ঠেকানোর জন্য। ধোনির জন্য ফিল্ডিং সাজিয়ে সিঙ্গেল ঠেকিয়ে তিনি যে হাসিটা দিয়েছিলেন, তা দেখেই তো মন ভরে গিয়েছিল। সাব্বির তো নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারের চলমান বিজ্ঞাপন, ওর দাঁড়ানোর ভঙ্গি আর উঁচানো কলারই বলে দেয়, এই বাংলাদেশ নতুন বাংলাদেশ। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ তো নির্ভরতার নাম। মুশফিক ফর্ম ফিরে পেতে শুরু করেছেন। আল আমিন বল হাতে সফল হচ্ছেন। সৌম্য সরকার তাঁর আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলেই দুর্দান্ত হয়ে উঠবে দলটা। মাশরাফি বাহিনীকে তাই বলব, তোমরা এগিয়ে যাও, আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি। আমাদের স্লোগান তো ‘হারি জিতি বাংলাদেশ’। এবং বাংলাদেশের দর্শকদের প্রশংসা আমাদের করতেই হবে, তাঁরা আনন্দ-বেদনা ভাগাভাগি করে নিতে জানেন। ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে একজন-দুজন একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেন বটে, সেই জায়গাতেও আমাদের হয়ে উঠতে হবে শোভন ও সুন্দর, এর বাইরে মোটের ওপর বাংলাদেশের দর্শক-সমর্থকেরা যথেষ্ট পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েই আসছেন।
বাংলাদেশের ক্রিকেট দলকে বলব, ওয়েল ডান বয়েজ। ভালো খেলেছ। ভবিষ্যতে আরও ভালো খেলবে। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন তোমরা ভালো কোনো টুর্নামেন্টে খুব বড় কোনো বিজয় ছিনিয়ে এনে আমাদের এনে দেবে গৌরবের মুহূর্ত, আনন্দের উপলক্ষ। আমরা তোমাদের সঙ্গেই আছি।

ইউপি নির্বাচন আমাদের কোথায় নিচ্ছে?

বাংলাদেশের নির্বাচনী সহিংসতাকে আর কেবল ভোটকেন্দ্রিক সহিংসতার উপলক্ষ হিসেবে গণ্য করা কঠিন হবে। এটা সম্ভবত হিংসাশ্রয়ী একটি সমাজ তৈরির উদ্বেগজনক উৎস হয়ে থাকবে। কোথাও সরকারি দলের কোনো প্রার্থী প্রশাসনের সহযোগিতা না পেয়ে ভোট বর্জন করেননি। হানাহানিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। কারণ আমরা একজন নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করেছি। একজন বিশ্ববিদ্যালয়-ছাত্রকে হত্যা করেছি। এ পর্যন্ত দুই পর্বে অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে আহত ব্যক্তিদের সংখ্যা এতটাই ব্যাপক যে, প্রথম আলো লিখেছে, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ আহত হয়েছেন কয়েক শ মানুষ।’ সমকাল লিখেছে, ৪৪ জন গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন দুই শতাধিক। প্রথম পর্বে ১১ ও দ্বিতীয় পর্বে ৯ জন নিহত হয়েছে। দুজনের কম প্রাণহানির ঘটনাই কি নির্বাচন কমিশনকে এই দাবি করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে যে, প্রথম পর্বের চেয়ে কম সহিংসতা ও জবরদস্তি ঘটেছে। তাদের এই দাবি যথেষ্ট দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য বলে গণ্য হওয়ার আশঙ্কাটাই বেশি করি। কারণ নির্বাচনে সহিংসতা বা হানাহানি প্রধানত সেখানেই ঘটে, যেখানে দুই বিবদমান পক্ষ মোটামুটি শক্তিধর হিসেবে গণ্য হয়। এরকম অবস্থা খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। সুতরাং এই নির্বাচন অবাধ হয়েছে কি হয়নি, তা বুঝতে হলে সব থেকে বড় মাপকাঠি হলো ক্ষমতাসীন দল দলীয় প্রার্থী কী করে বাছাই করেছিল, সেদিকে নজর দেওয়া। এতে সন্দেহের অবকাশ কম যে, মনোনয়ন-প্রক্রিয়াই অবাধ নির্বাচনের ধারণাকে পর্যুদস্ত করেছে। এটা শাসক দলের বেলাতেই নয়, বিএনপির তরফেও কমজোরি সত্য। গতকালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ২৪ ও বিএনপির ৩ জন বিদ্রোহী প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। আর সার্বিকভাবে ৬৩৯টির মধ্যে যে ২০৪টির ফল পাওয়া গেছে, এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৪৮ ও বিএনপি ১৯টিতে জয় পেয়েছে। এখন এটা বলা অতিরঞ্জিত হবে না যে, বাংলাদেশের সমাজ ১৪৮: ১৯ অনুপাতে বিভক্ত নয়। সমাজ যে বিভক্ত তা কেউ অস্বীকার করেন না। বিএনপি তার দেউলেপনায় বিপর্যস্ত তা নিয়েও খুব মতপার্থক্য দেখি না। পরিহাসের ছলে একটা কথা বলি। সেটা হলো যত যা কিছুই ঘটুক, আমাদের গ্রামীণ সমাজে ১৬৭ (১৪৮+১৯) জন মানুষের মধ্যে ১৪৮ জন আওয়ামী লীগ এবং মাত্র ১৯ জন বিএনপি করে, সেটা বাস্তবতা নয়। আসন বা মাথা গণনা কোনো হিসাবেই এটা চলে না। সুতরাং নির্বাচন একটা সামাজিক মরণব্যাধি হিসেবে দেখা দিয়েছে। সব থেকে লক্ষণীয় যে, সমাজে গুলিবিদ্ধ হওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে এই নির্বাচন। কিন্তু আবারও আমরা জানলাম না যে, পুলিশ কোথাও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রথমে কাঁদানে গ্যাস কিংবা রাবার বুলেট ব্যবহার করেছে এবং তাতেও সামলাতে না পেরে একান্ত নিরুপায় হয়ে গুলি ছুড়তে হয়েছে—এমন খবর জানা গেল না। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে ঐতিহ্যগতভাবে দুই মারমুখো প্রতিপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার লক্ষ করা যেত। কিন্তু সেই দৃশ্যপট ভীষণ রকম বদলে যাচ্ছে। আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। মঠবাড়িয়ায় দেখেছি পুলিশ নামমাত্র সতর্কতা কিংবা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা ছাড়াই গুলি চালিয়ে পাঁচজন মানুষকে হত্যা করেছে। এবং এটা তারা জেনেশুনে করেছে যে, যাদের ওপর তারা গুলি ছুড়ছে, তারা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থক। আবার এবারে আমরা দেখলাম ভোলায় পুলিশ এনটিভির একজন স্টাফ রিপোর্টারকে পায়ে গুলি করেছে। অন্যদিকে আগের পর্বে মহেশখালীতে শত শত রাউন্ড গুলি হয়েছে। সেখানে অন্তত ৩০ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। পুলিশ ও জনতা উভয়ে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে। এখন আমরা অনুমান করতে পারি যে, যেসব এলাকায় হিংসা-হানাহানির ঘটনা ঘটেছে, সেখানে একধরনের প্রতিকারের দরকার পড়বে। বিষয়টিকে কেবলই নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটা সামগ্রিকভাবে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ার ইঙ্গিতবহ। মানুষ আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। দেখা যাচ্ছে নালিশ জমা পড়ার সংখ্যা খুবই কম। অবশ্য কম কি বেশি তা বোঝার উপায় নেই। পুলিশ বলুক তারা সারা দেশে কত অভিযোগ পেয়েছিল আর কত প্রতিকার তারা দিয়েছে। সিইসি বলুন, তাঁরা কত নালিশ পেয়ে কতটার সুরাহা দিয়েছেন। এটা না থাকলে মানুষ তো আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখাবে! আমাদের বিরাট ভাগ্য বলতে হবে, কারণ সিইসি বলেছেন, সামগ্রিক দিক বিবেচনায় ‘অর্জন’ ম্লান হয়ে গেছে।  আসলে তাঁদের স্বীকার করতে হবে সামাজিক নিরাপত্তা ও সংহতি অধিকতর দুর্বল বা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। নির্বাচন এভাবেই শেষ হবে। কিন্তু আগামী পাঁচ বছর ধরে এই বিরোধের জের চলবে। তাই একটা রিকনসিলিয়েশন লাগবে। সেটা কীভাবে সম্ভব তা আমার জানা নেই। শুধু জানি ভোট দেশের বহুস্থানে দীর্ঘমেয়াদি রেষারেষির প্রজনন উৎস হয়ে থাকবে। গ্রাম আদালত আরও কম কার্যকর হবে। প্রবীণ ও বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে যে সালিস ব্যবস্থা, সেটাও আরও দুর্বল হবে। গ্রামে-গঞ্জে আগ্নেয়াস্ত্রের নিনাদ মিলিয়ে যাবে না। এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট আইআরআইরের একটি সমীক্ষা রিপোর্ট পড়লাম ডেইলি স্টারে। বাংলাদেশ সঠিক পথে যাচ্ছে, আশাজাগানিয়া খবর বটে। এটা বৈষয়িক উন্নতির মাপকাঠিতে হলে কথা নেই। কিন্তু নৈতিক বা টেকসই উন্নতির দিক থেকে হলে বলব এটা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আমরা সঠিক পথে চলছি না। আইআরএ বলছে, ৮৩ ভাগ বাংলাদেশি মানুষ মনে করে সামাজিক নিরাপত্তা খুবই ভালো কিংবা মোটামুটি ভালো। আর ৭৭ ভাগ মনে করছে রাজনৈতিকভাবে দেশটা স্থিতিশীল। গত দুই পর্বের নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী ও ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও হানাহানি বিবেচনায় নিলে আমরা সামাজিক নিরাপত্তাকে উত্তম বিবেচনা করতে পারি না।
আমরা কোথায় যাচ্ছি? দলীয় ইউপি নির্বাচন আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

ইসলামে প্রতিবন্ধীদের অধিকার by শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী

মহান আল্লাহ তাআলা সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা। তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্যে কিছু সৃষ্টিকে আমরা কখনো অস্বাভাবিক দেখতে পাই। এতে তাঁর বিশেষ উদ্দেশ্য ও মহান রহস্য বিদ্যমান। কোরআন ও হাদিসের আলোকে এই সৃষ্টির রহস্য হলো প্রথমত, বান্দা যেন তাঁর ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারে, তিনি যেমন স্বাভাবিক সুন্দর সৃষ্টি করতে সক্ষম, তেমনি এর ব্যতিক্রমও করতে সক্ষম। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ যাকে বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদ রেখেছেন; সে যেন নিজের ওপর আল্লাহর দয়া ও অনুকম্পাকে স্মরণ করে তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। কারণ, আল্লাহ চাইলে তার ক্ষেত্রেও সে রকম করতে পারতেন। তৃতীয়ত, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা এই সমস্যার বিনিময়ে তাঁর সন্তুষ্টি, দয়া, ক্ষমা ও জান্নাত দিতে চান। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি যার প্রিয় চোখ নিয়ে নিই, অতঃপর সে ধৈর্য ধারণ করে এবং নেকির আশা করে; আমি তার জন্য এর বিনিময়ে জান্নাত ছাড়া অন্য কিছুতে সন্তুষ্ট হই না।’ (তিরমিজি, হাদিস নম্বর ১৯৫৯)। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির করণীয় প্রথমত, ধৈর্য ধারণ করবে এবং সন্তুষ্ট থাকবে। কারণ, এটি তার ভাগ্যের লিখন। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘পৃথিবীতে এবং তোমাদের ওপর কোনো বিপদ আসে না; কিন্তু তা জগৎ সৃষ্টির আগেই কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ। এটা এ জন্য, যাতে তোমরা যা হারাও, তাতে দুঃখিত না হও এবং তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, তাতে উল্লসিত না হও। আল্লাহ উদ্ধত ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা হাদিদ, আয়াত: ২২-২৩)। দ্বিতীয়ত, বিশ্বাস রাখবে, আল্লাহ যখন কোনো মুমিনকে পরীক্ষায় ফেলেন, তখন তিনি তাকে ভালোবাসেন এবং অন্যদের থেকে তাকে অগ্রাধিকার দেন। তাই তিনি নবীদের সবচেয়ে বেশি বিপদ-আপদের মাধ্যমে পরীক্ষা করেছিলেন। নবী করিম রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নবীরা সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত হন, অতঃপর তাঁদের থেকে যাঁরা নিকট স্তরের। মানুষকে তার বিশ্বাস অনুযায়ী পরীক্ষা নেওয়া হয়। যদি তার ইমান শক্তিশালী হয়, তাহলে তার পরীক্ষা কঠিন হয়। আর যদি তার ইমান দুর্বল হয়, তাহলে তার পরীক্ষাও সে অনুযায়ী হয়। বিপদ বান্দার পিছু ছাড়ে না। পরিশেষে তার অবস্থা এমন হয় যে সে পাপমুক্ত হয়ে জমিনে চলাফেরা করে।’ (তিরমিজি, হাদিস নম্বর ১৪৩ ও ইবন মাজাহ)। তৃতীয়ত, মনে রাখবে যে দয়ালু আল্লাহ মুমিন ব্যক্তিকে তার প্রতিটি কষ্টের বিনিময় দেন, যদি সেই কষ্ট নগণ্যও হয়। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘মুসলিম ব্যক্তিকে কষ্ট, ক্লান্তি, দুঃখ, চিন্তা, আঘাত, দুশ্চিন্তা গ্রাস করলে এমনকি কাঁটা বিঁধলেও আল্লাহ তাআলা সেটা তার পাপের কাফ্ফারা করে দেন।’ (বুখারি ও মুসলিম)। চতুর্থত, মুমিন ব্যক্তি যেন তার নির্দিষ্ট প্রতিবন্ধিতাকে ভুলে গিয়ে শরীরের বাকি অঙ্গগুলোকে কাজে লাগায়। কারণ, কোনো এক অঙ্গের অচলতা জীবনের শেষ নয়। দেখা গেছে, যার কোনো একটি ইন্দ্রিয় বা অঙ্গ অচল, তার বাকি ইন্দ্রিয় বা অঙ্গগুলো বেশি সক্রিয় ও সচল। প্রতিবন্ধীদের জন্য আমাদের করণীয় নিজের সুস্থতা ও পূর্ণতার জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং প্রতিবন্ধী ভাইবোনদের জন্য দোয়া করা। যথাসম্ভব প্রতিবন্ধীদের সাহায্য-সহযোগিতা করা। প্রতিবন্ধীর দেখাশোনা করা তার অভিভাবকের কর্তব্য হলেওসমষ্টিগতভাবে তা সমাজের সবারই দায়িত্ব। ইসলামে প্রতিবন্ধীর গুরুত্ব ও মর্যাদা ইসলামের দৃষ্টিতে সব মানুষ সমান। ইমান ও তাকওয়া হচ্ছে মানুষের মর্যাদার মানদণ্ড। যে যত বেশি মুত্তাকি, আল্লাহ তাকে তত বেশি ভালোবাসেন। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে; পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন, যে বেশি মুত্তাকি।’ (সূরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা তোমাদের শরীর ও আকৃতির দিকে দেখেন না; বরং তিনি তোমাদের অন্তরের দিকে দেখেন।’ (মুসলিম)।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! কোনো পুরুষ যেন অপর কোনো পুরুষকে উপহাস না করে; কেননা, যাকে উপহাস করা হয়, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোনো নারী যেন অপর কোনো নারীকে উপহাস না করে; কেননা, যাকে উপহাস করা হয়, সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে।’ (সূরা হুজুরাত, আয়াত: ১১)। প্রতিবন্ধীদের সামাজিক স্বীকৃতি প্রিয় নবী রাসুলুল্লাহ (সা.) একাধিকবার তাঁর অনুপস্থিতির সময় মদিনার মসজিদে নববিতে ইমামতির দায়িত্ব এক প্রতিবন্ধী সাহাবির ওপর অর্পণ করে তাদের সমাজের সর্বোচ্চ সম্মানে অধিষ্ঠিত করার নজির তৈরি করেন। তিনি সেই প্রতিবন্ধী সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-কে আজান দেওয়ার কাজেও নিযুক্ত করেছিলেন। (বুখারি, অধ্যায়: মাগাজি, অনুচ্ছেদ: বদর ও ওহুদের যুদ্ধ)। প্রতিবন্ধীদের জন্য ছাড় ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ বিধানে প্রতিবন্ধীদের জন্য রয়েছে সহজতা ও সহনশীলতা। তাই এমন প্রতিবন্ধী, যে ইসলামের বিধান পালনে একেবারে অক্ষম, যেমন পাগল ও জ্ঞানশূন্য ব্যক্তি, তার ওপর ইসলাম কোনো বিধান জরুরি করে না। আর আংশিক প্রতিবন্ধী যে কিছুটা করতে সক্ষম, তার প্রতি অতটুকুই পালনের আদেশ দেয়। ফরজ বিধান যা মহান আল্লাহ মানুষের জন্য নির্ধারণ করেছেন, যদি মানুষ তা পালনে সক্ষম হয়, তাহলে তার প্রতি তা আবশ্যিক হবে। আর যদি সে তাতে অক্ষম হয়, তাহলে তা থেকে সে মুক্তি পাবে। অর্থাৎ, যে পরিমাণ পালন করতে সক্ষম হবে, সে পরিমাণ তাকে পালন করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনো কাজের ভার দেন না।’ (সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬)। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘যখন আমি তোমাদের কোনো আদেশ করি, তখন তা বাস্তবায়ন করো, যতখানি সাধ্য রাখো।’ (বুখারি ও মুসলিম)। ইসলামে প্রতিবন্ধীদের অধিকার নবী করিম রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দাও, অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজখবর নাও এবং বন্দীকে মুক্ত করে দাও।’ (বুখারি)। ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে সদাচরণ করা, সাহায্য-সহযোগিতা করা এবং তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া আবশ্যক। প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়ানো মানবতার দাবি ও ইমানি দায়িত্ব। প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে অসদাচরণ বা তাদের উপহাস, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ বা ঠাট্টা-তামাশা করা স্রষ্টাকে তথা আল্লাহকে উপহাস করার শামিল। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘বান্দা যতক্ষণ তার ভাইকে সাহায্য করে, আল্লাহ ততক্ষণ বান্দাকে সাহায্য করেন।’ (মুসলিম)। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, ‘আর তাদের ধনসম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিত ব্যক্তিদের হক বা অধিকার রয়েছে।’ (সূরা জারিয়াত, আয়াত: ১৯)। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহর পরিজন। আল্লাহর কাছে প্রিয় সৃষ্টি সে, যে তাঁর সৃষ্টির প্রতি সদয় আচরণ করে।’ প্রিয় নবী (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ক্ষুধার্তকে অন্ন দান করে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে ফল খাওয়াবেন। যে তৃষ্ণার্তকে পানি পান করায়, আল্লাহ জান্নাতে তাকে শরবত পান করাবেন। যে কোনো দরিদ্রকে বস্ত্র দান করে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে উত্তম পোশাক দান করবেন।’ (তিরমিজি)। জন্মগত প্রতিবন্ধী হোক কিংবা দুর্ঘটনাজনিত প্রতিবন্ধীই হোক; ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের বিভেদ ভুলে তাদের সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসা আমাদের কর্তব্য। প্রিয় নবী (সা.) দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-কে তাঁর অপার ভালোবাসায় ধন্য করেছেন। তিনি যখনই তাঁকে দেখতেন, তখনই বলতেন, ‘স্বাগত জানাই তাকে, যার সম্পর্কে আমার প্রতিপালক আমাকে সতর্ক করেছেন।’ পরে মহানবী (সা.) এই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সাহাবিকে দুবার মদিনার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। প্রতিবন্ধীদের প্রতি ভালোবাসা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় সুন্নত। (মুসলিম)।

যে বার্তা ছিল মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারির সফরে by মিজানুর রহমান

ঢাকায় প্রায় ৩ দিন কাটিয়ে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নাগরিক নিরাপত্তা বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ড. সারাহ সুয়ল ও তার টিম। সফরকালে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে তার। বক্তৃতা করেছেন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। মতবিনিময় করেছেন নাগরিক সমাজ ও ইএসএআইডি ঘোষিত শান্তির দূত এবং হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে। সব বৈঠকেই তার আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল গণতন্ত্র, মানবাধিকার পরিস্থিতি, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ দমন তথা সার্বিক নাগরিক নিরাপত্তা।
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে এ বিষয়গুলোই দেখভাল করেন ড. সারাহ। বাংলাদেশে আসার আগে ব্যাংককে তিন দিন কাটিয়ে এসেছেন তিনি। এখান থেকে বৃহস্পতিবার সরাসরি ওয়াশিংটনে ফিরে গেছেন। ড. সারাহ যখন ঢাকায় ব্যস্ত ঠিক সেই সময়ে দেশটির হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি এলান বার্সিনের নেতৃত্বাধীন আরেকটি টিম আসে। ওই টিমের সদস্যরা এখানে নিরাপত্তা, বিশেষ করে এভিয়েশন সিকিউরিটি নিয়ে আলোচনা করছেন। এটা এ মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। তিনি যেদিন বিমানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন সেদিনই বাংলাদেশের বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নয়নে বৃটেন তথা পশ্চিমা দুনিয়ার বেঁধে দেয়া ডেটলাইন শেষ হয়। অবশ্য সরকার পরিস্থিতি উন্নয়নে ত্বরিত ব্যবস্থা হিসেবে বৃটেনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আগে চুক্তিবদ্ধ হয়। ওই প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে কাজও শুরু করেছে। মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি এবং এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারির নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের কাছাকাছি সময়ে ঢাকা সফর নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে বিস্তর আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগের মধ্যে সফর দুটি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে কি বার্তার আদান-প্রদান হলো সেটিরও চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। বিশ্লেষকরা দুটি সফরকেই তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন। কারণ হিসেবে তারা মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারির ঢাকার তৎপরতাকে বিবেচনায় নিচ্ছেন। আন্ডার সেক্রেটারি ড. সারাহ সরকারি পর্যায়ে বৈঠকের আগে তরুণ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে একটি বক্তৃতা করেছেন। ওই বক্তৃতায় তিনি সন্ত্রাস বা উগ্রপন্থার উত্থানের সঙ্গে যে গণতন্ত্র চর্চা, আইনের শাসন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গভীর যোগসূত্র আছে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তিনি তার কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেছেন, মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করে ভিন্নমত বা বিরোধীদের ঘায়েল করা, কথায় কথায় জেলে পাঠানো এবং তাদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হলে সাধারণ জনগণের মধ্যে উগ্রপন্থার দিকে ধাবিত হওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এটি যে এই প্রথম, মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি বললেন তা কিন্তু নয়। কাউন্টার টেরোরিজম নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বরাবরই এটি বলেন। সন্ত্রাস বা উগ্রপন্থা ঠেকানোর পাশাপাশি ওই বিষবৃক্ষ যেন নতুন নতুন সম্প্রদায়কে আক্রান্ত করতে না পারে সে জন্য সমাজ বা রাষ্ট্রের সর্বস্তরে সুশাসন নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন ওবামা প্রশাসনের ওই কর্মকর্তা।
তিনি মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং অবাধ গণতন্ত্রচর্চার সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকারগুলোর দায়িত্বই বেশি বলে উল্লেখ করেছেন। এটি যে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লাড়াইয়ে সবচেয়ে কার্যকর দাওয়াই সেটি বোঝানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। ঢাকা ছাড়ার পর তার বক্তৃতায় সেই অংশটিই টুইট বার্তায় তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কিভাবে সহায়তা করে সেটিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বলেছেন ড. সারাহ। তিনি তার ঢাকা সফর নিয়ে একাধিক টুইট করেছেন। সেখানে হিন্দু-বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের একাধিক ছবিও পোস্ট করেছেন। তার সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে করা টুইট বার্তায় মার্কিন ওই কর্মকর্তা ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশের চমৎকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশংসা করেছেন। তবে তার উদ্বেগ সব ধর্মের লোকজনের সুরক্ষায় সমানভাবে আইন প্রয়োগের বিষয়ে। এক বার্তায় তিনি বলেন, ধর্মীয় স্বাধীনতা সমাজগুলোকে শক্তিশালী করে। কিন্তু এটার জন্য দরকার হচ্ছে সব ধর্মের লোকজনের সমান সুরক্ষা। বাংলাদেশের ব্লগার ও ধর্মীয় সমপ্রদায়ের ওপর আক্রমণের ঘটনাগুলোর নিন্দা করেছেন তিনি।
তার মতে, এটি বাংলাদেশে ভিন্ন ধর্ম-বিশ্বাসের লোকজনের শান্তিপূর্ণ বসবাসের যে ঐতিহ্য রয়েছে তার ওপর  কঠিন আঘাত। তিনি বাংলাদেশিদের গণতন্ত্র, মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের মূল্যায়ন জানতে চেয়েছেন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনায়। সেই আলোচনায় ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন প্রসঙ্গও ছিল। ওই নির্বাচনটি বিরোধী জোট ও দলগুলোর বর্জনের কারণে একতরফা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা অনেক দেশ এটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে ছিল। সরকারের সঙ্গে ওই দেশগুলো কাজ করলেও নির্বাচন প্রশ্নে তাদের সেই অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে এমন কোনো ঘোষণা এখনও নেই।
আন্ডার সেক্রেটারির সঙ্গে আলোচনায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অবশ্য সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন। জানিয়েছেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলেও এখন তারা স্থানীয় সব নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। আন্ডার সেক্রেটারি এ নিয়ে কোনো বক্তব্য বা মন্তব্য না করে সরকারের ব্যাখ্যা শোনায় বেশি মনোযোগী ছিলেন বলে জানিয়েছেন ওই সব আলোচনায় অংশ নেয়া ঢাকার কর্মকর্তারা। সরকারি প্রতিনিধিরা এ সফরকে অতীতের যে কোনো সফরের চেয়ে ব্যতিক্রম এবং সম্পর্কের নতুন পথচলা হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, অতীতে মার্কিন কর্মকর্তারা বিরোধী দলের প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা করলেও এবার তারা সরকারের বাইরে নাগরিক সমাজ এবং সংখ্যালঘু নেতাদের সঙ্গে আলোচনায়ই সীমাবদ্ধ ছিলেন। এটি এবারের নতুনত্ব হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ।

সিম রেজিস্ট্রেশনের যদি এবং কিন্তু

জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে সরকার যে অনেক কিছুই করতে পারে, তা আমরা সবাই জানি। সুতরাং, জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে মোবাইল ফোনের সিম রেজিস্ট্রেশনের একধরনের বাধ্যবাধকতা নাগরিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকারের আদেশের বৈধতা নিয়ে আদালতে একটি রিটও হয়েছে এবং সরকারের প্রতি কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি হয়েছে। কিন্তু যেহেতু আদালত রেজিস্ট্রেশন বন্ধ করতে বলেননি, তাই সরকারের তরফে কাজটি দ্রুততার সঙ্গে শেষ করার একটা চেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কোনো কাজ অপরিহার্য হলে সব নাগরিকের জন্যই তাতে সহযোগিতা করার প্রশ্ন আসে এবং সে কারণে আমরাও সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই। তবে এই সহযোগিতা নিঃশর্ত হতে পারে না। অনেক ‘যদি’ এবং ‘কিন্তু’র কোনো জবাব না পেলে এই আদেশ পালন করার চেয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহারের অভ্যাস ত্যাগ করাই শ্রেয় হতে পারে। প্রথমত, বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন আসলে কী এবং এর মাধ্যমে কীভাবে সরকার জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করবে, প্রশ্নটি দেখে নেওয়া যাক। বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন হচ্ছে গ্রাহকের শুধু নাম-ঠিকানার পরিচয় নথিবদ্ধ করা নয়, তার সঙ্গে আঙুলের ছাপ পর্যন্ত মিলিয়ে নেওয়া। যেহেতু প্রতিটি সিমের বিপরীতে ওই সিমগ্রহীতা গ্রাহকের বায়োমেট্রিক পরিচয় তথ্যভান্ডারে সংরক্ষিত থাকবে, সেহেতু কোনো সিমের সঙ্গে কোনো অপরাধের যোগসূত্র পাওয়া গেলে ওই অপরাধীকে চিহ্নিত করা সহজ হয়ে যাবে। যুক্তি হিসেবে এটি ভালোই। তাহলে নিশ্চয়ই বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু আছে? নাকি আমরাই প্রথম এ রকম একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করলাম? জঙ্গিবাদী হুমকির বাস্তবতায় এটি নিশ্চয়ই খুব কার্যকর হাতিয়ার? বিশ্বে জঙ্গিবাদীদের সবচেয়ে বড় এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলা সন্ত্রাসী ঘটনাগুলো কোথায় ঘটেছে এবং সেসব দেশে কি এ ধরনের ব্যবস্থা চালু আছে? সন্ত্রাসবাদ যে নতুন বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে, তার সূত্রপাত ঘটে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, যা নাইন-ইলেভেন নামে পরিচিত। তারপর থেকে গত ১৫ বছরে বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তেই জঙ্গিবাদীরা আঘাত হেনেছে। লন্ডনে সেভেন সেভেন বা মেট্রোরেলে হামলা, স্পেনে​ মাদ্রিদে রেলে হামলা, প্যারিসে কনসার্ট হলে হামলা এবং সাম্প্রতিক ব্রাসেলসের বিমানবন্দর এবং মেট্রোরেলে হামলা বিশ্বব্যাপী বহুলভাবে আলোচিত। এ ছাড়া ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া ও আফগানিস্তানের মধ্য যুদ্ধপীড়িত রাষ্ট্রগুলোর বাইরে সন্ত্রাস বারবার আঘাত হেনে চলেছে পাকিস্তানে। এসব দেশের কোন কোনটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে মোবাইল ফোন গ্রাহকদের বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করেছে তা কি আমরা জানি? ইউরোপ, আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ায় যাঁরা গেছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই সাক্ষ্য দিতে পারবেন যে সেসব জায়গায় এ ধরনের বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশনের বালাই নেই। ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের প্রায় সব জায়গাতেই মোবাইল ফোনের সেবা পাওয়ার দুটো উপায়। একটি মাসিক চুক্তি আর অন্যটি যতটুকু ব্যবহার ততটুকু ব্যয়। মাসিক চুক্তিতে সেবা নিতে হলে সেবাদাতা কোম্পানির কাছে পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য আবাসিক ঠিকানা এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণ দিতে হয়। আবাসিক ঠিকানা প্রমাণের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স অথবা পাসপোর্টের কপি কিংবা অন্য কোনো সেবা কোম্পানি যেমন বিদ্যুৎ বা পানির বিল দেখালেও চলে। সেখানে কেউ বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশনের কথা বলে না। আর যদি পে অ্যাজ ইউ গো নামে পরিচিত যতটুকু ব্যবহার ততটুকু খরচের চুক্তিতে গ্রাহক হন, তাহলে কোনো নাম-পরিচয় প্রমাণের বালাই নেই। চাইলে পরে আমাদের টেলিযোগাযোগ বা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কর্তৃপক্ষের যে কেউ লন্ডনের অভিজ্ঞতা যাচাই করে নিতে পারেন। তাঁরা ওই দেশে আমাদের দূতাবাসগুলোতেও এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। সেখানে বিমানবন্দরে পৌঁছালে লাইকা, লিবরা, সিম্পলকল ইত্যাদি নানা নামের মোবাইল সেবাদানকারী কোম্পানি আপনাকে বিনা পয়সায় সিম অফার করবে। ওই সিমে সৌজন্য হিসেবে নিখরচায় পাঁচ পাউন্ড মূল্যের ফোন করার সুবিধাও থাকে। তারা ওই সিম বিক্রি করে এই আশায় যে এরপর আপনি যতটা সময় (টকটাইম) বা ডেটা কিনবেন, তাতে তাদের খরচ উঠে আসবে। ওই লিবরা ও লাইকা মোবাইলের সিম আমি সুইজারল্যান্ডের জেনেভাতেও কিনেছি এবং ইউরোপের অন্য কিছু শহরেও তাদের অস্তিত্ব দেখেছি। বার্লিনে ভোডাফোনের পে অ্যাজ ইউ গো সিম পেতেও আমার কোনো রেজিস্ট্রেশন প্রয়োজন হয়নি। তাহলে কি আমরা ধরে নেব আমাদের দেশে সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকি ওই সব পশ্চিমা দেশের চেয়েও বেশি? নাকি তাদের গোয়েন্দা কার্যক্রমের যে দক্ষতা ও যোগ্যতা আছে, আমাদের তা নেই? তবে হ্যাঁ, বায়োমেট্রিক আপডেট নামক একটি ওয়েবসাইট জানাচ্ছে চারটি দেশে বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশনের তথ্য দেওয়া আছে। ওই দেশ চারটি হচ্ছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান। সৌদি আরব, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে সন্ত্রাসের ঘটনা যে বন্ধ হয়নি, সে প্রমাণ সাম্প্রতিক বিভিন্ন হামলার সূত্রে আমরা জানি। সুতরাং, বায়োমেট্রিক সিম রেজিস্ট্রেশন যে ওই দুই দেশে নিরাপত্তা রক্ষায় কাজে এসেছে তা কিন্তু প্রমাণ হয়নি। সংযুক্ত আরব আমিরাতে সন্ত্রাসের ঘটনা খুব একটা শোনা না গেলেও সেখানে রাজতন্ত্রের কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতা বজায় রাখার প্রয়োজনে সবকিছুর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ নতুন কিছু নয়। কিন্তু আমরা কেন সন্ত্রাসপীড়িত আফগানিস্তান-পাকিস্তান অথবা দুই আরব রাজতন্ত্রের নিরাপত্তা কৌশলকে অপরিহার্য ভাবব? জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে আমাদের উপমহাদেশে সবচেয়ে বেশি কড়াকড়ি যাকে অনেকে বাড়াবাড়িও বলে থাকেন, সেটা দেখা যায় ভারতে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে মুম্বাই ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক। মুম্বাইতে ২০০৮ সালে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলায় দেড় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল এবং তারপর থেকে ভারতের অন্যান্য শহরের তুলনায় সেখানকার নিরাপত্তা কড়াকড়ি অনেক বেশি। প্রথম দিন দুপুরে মুম্বাই পৌঁছানোর পর মোবাইল সিম কীভাবে পাওয়া যাবে তা নিয়ে খোঁজখবর করার পর জানা গেল যে পাসপোর্টের কপি জমা দিয়ে তা পাওয়া যাবে। তবে দুটো সমস্যা আছে। প্রথমত, স্থানীয় কোনো ব্যক্তির (হোস্ট) মোবাইল ফোন নম্বর প্রয়োজন হবে, যেটিতে তাঁরা সিম সক্রিয় করার বার্তা পাঠাবেন। আর দ্বিতীয়ত, সিম সক্রিয় হতে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। সৌভাগ্যক্রমে ট্যাক্সিওয়ালার মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে মাত্র ঘণ্টা চারেকের মধ্যেই আমার মোবাইল চালু হয়ে গেল। সেখানেও বায়োমেট্রিকের কোনো প্রশ্ন আজ পর্যন্ত ওঠেনি। ভোটার তালিকায় নাম নথিভুক্ত করা এবং জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়ার সময় বায়োমেট্রিক তথ্য সংরক্ষণের একটি জাতীয় ব্যবস্থা এখন দেশে চালু আছে। বলা হচ্ছে, মোবাইল কোম্পানিগুলো গ্রাহকের আঙুলের ছাপ ওই তথ্যভান্ডার থেকে যাচাই করে নেবে। তবে জাতীয় তথ্যভান্ডারে তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। কোনো তথ্যভান্ডারে নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও সীমিত প্রবেশাধিকার থেকেও যে তথ্য হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব, সে কথা নিশ্চয়ই আর কাউকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নিয়ন্ত্রিত কম্পিউটার সিস্টেমে হ্যাকিংয়ের পর নিশ্চয়ই আর কেউ গ্যারান্টি দিতে পারেন না যে আমাদের সব জাতীয় তথ্যভান্ডার অভেদ্য। আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডারের প্রতি আগ্রহী গোষ্ঠী যে শুধু দেশের ভেতরে আছে তাও নয়। বিদেশের অপরাধী চক্র, রাষ্ট্রীয় অথবা অরাষ্ট্রীয় (স্টেট অ্যান্ড নন-স্টেট অ্যাক্টরস) গোষ্ঠী কাউকেই হিসাবের বাইরে রাখা যায় না। সরকার মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোকে ব্যবসার লাইসেন্স দেওয়ার সময় জনস্বার্থে সরকারি বার্তা প্রচারের বাধ্যবাধকতা আরোপ করে একটি শর্ত দিয়েছিল এবং এ কারণে মাঝেমধ্যেই সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং দপ্তরের বাণী আমরা আমাদের মোবাইল ফোনে পেয়ে থাকি (যদিও গত দেড় বছরে আমি যতগুলো বার্তা পেয়েছি তার অধিকাংশই হচ্ছে সরকারি প্রচারণা—জনগুরুত্বের নিরিখে খুব একটা প্রাসঙ্গিক নয়)। এগুলোর যৌক্তিকতা নিয়ে খুব একটা প্রশ্ন নাহয় না-ই করলাম। কিন্তু এখন যে গড়ে দৈনিক গোটা দশেক বার্তা পাই, সেগুলোর সবই আসে বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। নুডলস বিক্রেতা, বলিউড তারকাদের কনসার্ট, হোটেল চেইন, ট্রাভেল কোম্পানি, ব্যাংক, বিমা, ফ্ল্যাট বিক্রেতা—কে নয়? এঁরা সবাই আমাকে গ্রাহক হিসেবে পেতে চান এবং আমার মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠান। আবার দেখা যায় চার ডিজিটের শর্ট কোড ব্যবহারকারী কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান হঠাৎ হঠাৎ ফোন করে। আপনি হয়তো তখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে আছেন। অথবা বিদেশ থেকে কোনো জরুরি ফোনের অপেক্ষায় আছেন। তখন ওই সব নম্বর থেকে ফোন করে আপনাকে বলা হয় আপনি অমুক শিল্পীর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে অমুক ডিজিট চাপুন, গান শুনতে চাইলে অমুক ডিজিট...। আমাদের টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় কিংবা টেলিফোন সেবার নিয়ন্ত্রক সংস্থা কি বলতে পারবে এসব বেসরকারি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান কোন সূত্র থেকে আমার নম্বর হস্তগত করেছে? এদের অনাকাঙ্ক্ষিত এসব ফোনের যন্ত্রণা থেকে গ্রাহকদের রক্ষা করার কথা কি তারা আজ পর্যন্ত ভেবেছে? ইউরোপের দেশগুলোতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অযাচিত ফোনকল এবং বার্তা পাঠানোর শাস্তি কতটা কড়া, তঁারা চাইলেই তা খোঁজ নিয়ে জেনে নিতে পারেন।
গ্রাহকদের প্রত্যেকেরই স্বাধীনতা আছে তাঁর ফোন নম্বর তিনি কাকে দেবেন আর কাকে দেবেন না সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার। কিন্তু সেই অধিকার উপেক্ষা করে গ্রাহকদের নম্বরগুলো বাণিজ্যিক বিবেচনায় একের পর এক হাতবদল হয়ে চলেছে। আমার নম্বর গোপন রাখার অধিকার যখন রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি, তখন এই প্রশ্ন ওঠা কি স্বাভাবিক নয় যে বায়োমেট্রিক তথ্যের গোপনীয়তারও কোনো গ্যারান্টি থাকবে না? এসব বিতর্কের পর আইনের প্রশ্নটিই বা কীভাবে উপেক্ষা করা যায়? মোবাইল ফোনের সিমের বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন কোন আইনের আওতায় হচ্ছে সেই প্রশ্নটি এখন আদালতে বিবেচনাধীন। আইনগত অধিকার, গ্রাহকের অধিকারের সুরক্ষা, ক্ষমতার সম্ভাব্য অপব্যবহারের প্রতিকার ইত্যাদি বিষয়ে আইনগত অবস্থান নির্ধারণ ছাড়া সিম রেজিস্ট্রেশনের জন্য পীড়াপীড়ি না করলেই কি নয়?