Sunday, September 28, 2014

আবারও লাশের অমর্যাদা !

লোকটা যেন রিকশায় বসে আছেন। বাঁশের সঙ্গে বাঁধা বস্তায় ভরা দেহটি, বাঁশের দুই প্রান্ত রিকশার সঙ্গে বাঁধা। তার ওপর আগাগোড়া সাদা কাপড়ে মোড়ানো। কাপড়ের নিচের অংশে (পায়ের দিকে) ছোপ ছোপ কালচে রক্তের দাগ। এভাবেই রিকশায় বেঁধে একটি মৃতদেহ কমলাপুরের রেলওয়ে থানা থেকে আজ রোববার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিয়ে আসা হয়। রিকশা চালিয়ে লাশটি মর্গে নিয়ে আসেন রেলওয়ে পুলিশের অস্থায়ী ডোম বিহারি।

১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কারওয়ান বাজার মাছের আড়তসংলগ্ন রেললাইনে দুই ট্রেনের মাঝে পড়ে পাঁচজন নিহত হন। এরপর বস্তায় ভরে বাঁশ বেঁধে নিহত একজনের লাশ বহনের ছবি পরের দিন প্রথম আলোতে ছাপা হয়। ছবির ক্যাপশন ছিল ‘জীবনের প্রয়োজনে যিনি ছুটছিলেন দিনরাত, মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ চরম অমর্যাদায় বস্তায় ভরে ছুটছেন রেল পুলিশের ভাড়া করা বাহকেরা।... রেলপথে প্রাণ হারানো মানুষের মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার সম্মানজনক কোনো রীতি কি রেল কর্তৃপক্ষের নেই?’ এরপর আজও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল।
আজ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে লাশটি নিয়ে আসার পর লাশ বহনের প্রক্রিয়া দেখে অবাক মর্গের কর্মীরাও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মী বলেন, লাশটি বস্তায় ভরে বস্তার সঙ্গে বাঁশ দিয়ে বাঁধা হয়েছে। এই অবস্থায় রিকশায় বসিয়ে সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। লাশ দেখে এখানে সবাই অবাক। অনেকে মুঠোফোনে ছবিও তুলে রাখেন। মর্গে আসার পথে যাঁরাই বিষয়টি দেখেছেন, তাঁরাই একবার করে ঘুরে তাকিয়েছেন।
লাশ বহনের এই প্রক্রিয়া নিয়ে জানতে চাইলে পুলিশের রেলওয়ে রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক কামরুল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টা আমি শুনেছি। এভাবে বাঁশ দিয়ে বেঁধে রিকশায় বসিয়ে লাশ বহন করা ঠিক হয়নি। মৃত ব্যক্তিকে যথাযথ সম্মান দিয়ে লাশ বহন করা নিয়ম। সারা দেশে সাধারণত ভ্যানগাড়িতে করে লাশ বহন করা হয়। আমরা খোঁজ নিয়ে দেখছি কী কারণে এভাবে রিকশায় বসিয়ে লাশ বহন করতে হলো। এর জন্য ডোম না সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা দায়ী তা-ও দেখা হচ্ছে।’
ওই লাশটি উদ্ধারকারী রেল পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) জাহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, গত শনিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে টিটিপাড়া রেললাইন এলাকায় নারায়ণগঞ্জগামী একটি ট্রেনের ধাক্কায় লাইনে পড়ে আনুমানিক ৬০ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি নিহত হন। লাইনের ওপর পড়ে ওই ব্যক্তির ডান হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর সন্ধ্যা ছয়টার দিকে রেল পুলিশ লাশ উদ্ধার করে প্রথমে কমলাপুরে জিআরপি থানায় নিয়ে যায়। এরপর আজ সকালে লাশ মর্গে পাঠানো হয়। আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত ওই ব্যক্তির পরিচয় মেলেনি। তাঁর পরনে ছিল চেক লুঙ্গি ও সবুজ শার্ট।
এএসআই জাহিদুল বলেন, ‘সাধারণত ডোমের দায়িত্বে লাশ পাঠানো হয়। লাশ পরিবহনের জন্য ডোমকে তিনবার ভ্যান কিনে দেওয়া হলেও সেগুলো চুরি হয়ে গেছে। পরে সেই ডোম না বুঝেই লাশ রিকশায় করে মর্গে নিয়ে যান। এভাবে লাশ বহন অবশ্যই অন্যায় হয়েছে, আমি স্বীকার করছি আমার দোষ হয়েছে। তবে এ রকম আর হবে না। ওসি স্যার ভ্যানের অর্ডার দিয়েছেন, কালকেই চলে আসবে।’

মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার ৪ বছরের জেল

অকস্মাৎ মাথা নিচু করলেন জে. জয়ললিতা। কালো হয়ে গেল তার মুখ। যেন স্থবির হয়ে পড়লেন কিছু সময়ের জন্য। তার বিরুদ্ধে বেঙ্গালুরু’র এক আদালত দুর্নীতির দায়ে ৪ বছরের জেল ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে ১০০ কোটি রুপি জরিমানা করা হয়েছে। কারাভোগের পর ৬ বছর নির্বাচন করতে পারবেন না। এর মধ্য দিয়ে (৪+৬) দশ বছরের জন্য রাজনীতি থেকে নির্বাসিত হলেন তিনি। এ সাজা ভোগের পর তার যে বয়স হবে তখন তিনি ৭৬ বছরে পৌঁছাবেন। এ বয়সে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যত নেই বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গতকাল রায় ঘোষণার পর তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদ হারিয়েছেন। তাকে রাখা হয়েছিল পুলিশ হেফাজতে। তিনি তামিলনাড়ু রাজ্যের ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রী। তার বিরুদ্ধে এমন রায়ে তিনি হতচকিত।  রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তার রাজ্যে সমর্থকরা ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এক সমর্থক গায়ে আগুন দেয়ার চেষ্টা করে। নেতাকর্মীরা বিজেপি নেতার কুশপুত্তলিকা দাহ করে। বিরোধী বিজেপি প্রধান ও মামলার বাদী সুব্রামনিয়ান স্বামীর বাসভবনে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। বিভিন্ন স্থানে সড়কে অবরোধ সৃষ্টি করে। অনেক স্থানে জয়ললিতার এআইএডিএমকে দল ও বিরোধীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে। লাঠিচার্জ করেছে। এ সময় দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন কারখানা ছুটি দিয়ে দেয়া হয়। পরিস্থিতি এক নাজুক অবস্থা ধারণ করে। ১৮ বছর আগের মামলায় গতকাল জয়ললিতার বিরুদ্ধে ওই রায় দেয়া হয়। গতকাল ব্যাঙ্গালোরের আদালত তার উপস্থিতিতে মামলার রায় ঘোষণা করে। অভিযুক্ত হয়ে সাজা পাওয়ায় তাকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করতে হবে এখন। তবে জয়ললিতা এ রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করবেন। মামলায় হাজিরা দিতে জয়ললিতা গতকাল সকালে চেন্নাই থেকে বেঙ্গালুরু যান বিমানযোগে। সেখানে কেন্দ্রীয় জেলখানায় তৈরি করা একটি আদালতে মামলার শুনানি হয়। ১৮ বছর আগে তার বিরুদ্ধে এ মামলা করেন সুব্রামানিয়ান স্বামী। তিনি বর্তমানে বিজেপি’র একজন নেতা। জয়ললিতার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ৬৬ কোটি ৬৫ লাখ রুপির দুর্নীতি করেছেন। এ অভিযোগে তার সঙ্গে সঙ্গে আরও অভিযুক্ত হয়েছেন তার তিন সহযোগী- এন. শশীকলা, জে. এলাবারাসি এবং ভিএন সুধাকরণ। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১২০ (বি), দুর্নীতি বিরোধী আইনের ১৩ (১) ধারার অধীনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিচারক মাইকেল ডি’কুনহা তাদের বিরুদ্ধে এ রায় দেন। গতকাল এ রায় প্রকাশের পর ভারতের মিডিয়াগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে এ রিপোর্ট প্রকাশ করে। কোন কোন টেলিভিশন চ্যানেল তাদের নিয়মিত সম্প্রচার স্থগিত করে এ বিষয়টি প্রাধান্য দেয়। জয়ললিতার বয়স এখন ৬৬ বছর। তিনি ভারতের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ব্যক্তিত্ব। তার রয়েছে ব্যাপক পরিচিতি। তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। সেখানে তার দীর্ঘ বিচরণ। এর ফলে তৈরি হয়েছে তার সমর্থকগোষ্ঠী। এরপর যোগ দেন রাজনীতিতে। রাজনীতিতে এসে তিনি বড় একটি জায়গা করে নিয়েছেন নিজের জন্য। হয়েছেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ২০০১ সালে স্বল্প সময়ের জন্য ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত একই পদে আসীন ছিলেন। ১৮ বছর আগে জয়ললিতার বিরুদ্ধে মামলা হলেও ডিএমকে ক্ষমতায় এসে তা আমলে নেয়। তারা জয়ললিতার বিরুদ্ধে মামলাটি সামনে এগিয়ে নেয়। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি প্রথম দফায় ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অসাঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ উপার্জন করেছেন। প্রসিকিউশন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে যে, তিনি যখন প্রথম দফায় মুখ্যমন্ত্রী হন তখন মাত্র এক রুপি বেতন নিয়েছিলেন। কিন্তু তার এ ক্ষমতার মেয়াদে তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ আয় করেছেন। এর পরিমাণ কমপক্ষে ৬৬ কোটি রুপি। এর মধ্যে রয়েছে ২০০০ একর জমি, ৩০ কেজি স্বর্ণ ও ১২০০০ শাড়ি। জয়ললিতার দাবি, এ মামলা রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেয়ার জন্য করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ক্ষমতাসীন হওয়ার আগে তার যেসব সম্পদ ছিল প্রসিকিউশন তা কম করে দেখিয়েছে। অন্য যে সব উৎস থেকে তিনি আয় করেছেন সেগুলোকে তারা অন্তর্ভুক্ত করেনি। তার সহায়-সম্পদের দাম যে বৃদ্ধি পেয়েছে তা এড়িয়ে গেছে। এ বছর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তার দল এআইএডিএমকে রাজ্যে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। লোকসভার ৩৯টি আসনের মধ্যে তারাই জিতে নেয় ৩৭টি আসন। জয়ললিতার বিরুদ্ধে মামলাটি ২০০১ সালে স্থানান্তরিত হয় বেঙ্গালুরু’র আদালতে। ওই সময়ে জয়ললিতা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসেন। বিরোধী ডিএমকে’র এক নেতা তখন যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, যেহেতু রাজ্যে ক্ষমতাসীন এআইএডিএমকে, তাই সেখানে সুবিচার পাওয়া যাবে না। ফলে আদালত স্থানান্তরিত হয় বেঙ্গালুরুতে। ওদিকে জয়ললিতার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করার পর তামিলনাড়ুর বিভিন্ন স্থানে তার সমর্থকরা রাজপথে নেমে পড়ে। কোয়েমবাটুর-এ সড়কে অবরোধ করে। বিজেপি নেতা সুব্রামনিয়ান স্বামীর বাসভবনের দিকে পাথর ছুড়ে মারে। এক পর্যায়ে চেন্নাইয়ের লয়েড রোডে দু’গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এ সময় বেশির ভাগ দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন কারখানা ছুটি ঘোষণা করে।

১১ নম্বর প্রেমে বাঁধা পড়লেন জর্জ ক্লুনি

প্রেমের শহর ভেনিসে আগামীকাল বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন হলিউডের হার্টথ্রব নায়ক জর্জ ক্লুনি ও  লেবানিজ বংশোদ্ভূত বৃটিশ আইনজীবী আমাল আমালুদ্দিনের। এ জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ভেনিস শহর ভরে গেছে হলিউডের নামকরা তারকায়। তাদের মধ্যে আছেন কেট ব্লাশেট থেকে ব্র্যাঞ্জেলিনা, সান্দ্রা বুলক থেকে ম্যাট ডেমন। গত ২০ বছরে জর্জ ক্লুনি প্রেম করেছেন ১০টি। এবার ১১ নম্বর প্রেমে এসে বাঁধা পড়ছেন। তাই বিয়ের অনুষ্ঠানকে স্মরণীয় করে রাখতে ভেনিসে নেয়া হয়েছে রাজকীয় আয়োজন। একটি ৫ তারকা হোটেল পুরোটা ভাড়া নেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ওই হোটেলকে খামারবাড়ির চেহারা দিতে হবে। তা সম্পন্ন হয়েছে এরই মধ্যে। প্রস্তুত ড্যান্স ফ্লোর। সেখানে হলিউডের নামীদামি সেলিব্রেটিরা নাচের ধোঁয়া ছোটাবেন। এ এক ভিন্ন রকম আয়োজন। পাত্রী আমালের বিয়ের পোশাক বানিয়েছেন সারাহ বার্টনের নকশার পোশাক। এই সারাহ বার্টনের ডিজাইন করা পোশাক পরে বিয়ে হয়েছিল বৃটিশ রাজবধূ কেট মিডলটনের। এ বিয়েতে কে কি পরবেন, কিভাবে সাজবেন, কিভাবে ক্যামেরায় ধরা দেবেন যেন শেষ মুহূর্তে চলছে সেই প্রস্তুতি। কারণ, যে সে বিয়ে তো নয়! বিয়ের বাঁধনে বাঁধা পড়ছে সামপ্রতিক কালে হলিউডের সব চেয়ে আলোচিত প্রেম। জর্জ ক্লুনি ও আমাল আলামুদ্দিন। সাম্প্রতিক সময়ে তাদেরকে প্রায়শই একসঙ্গে দেখা গিয়েছে। কখনও কোন পাঁচতারা হোটেলের লবিতে চুম্বনরত অবস্থায়। কখনও বা রেড কার্পেটে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে। গুঞ্জনও ছিল, খুব শিগগিরই গাঁটছড়া বাঁধছেন তারা। তাই আগামীকাল সোমবার ভেনিসের গ্র্যান্ড ক্যানালের ধার ঘেঁষে চৌদ্দ শতকের একটি প্রাসাদে বিয়ে করছেন ৫৩ বছরের ক্লুনি ও তার চেয়ে সতেরো বছরের ছোট বৃটিশ লেবানিজ তরুণী আমালে। গত এপ্রিল মাসে এই ইতালিতেই ক্লুনির সঙ্গে প্রথম দেখা তার। আইনজীবী হিসেবে যথেষ্টই সুনাম রয়েছে তার। উইকিলিকস-এর প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের মতো মানুষ আমালের মক্কেল। মানবাধিকার কর্মী হিসেবেও কাজ করেন তিনি। কাজের সূত্রেই আমালের আলাপ হয়েছিল জাতিসংঘের দূত জর্জ ক্লুনির সঙ্গে। প্রথম পরিচয়েই দানা বেঁধেছিল প্রেম। ক্লুনিও তখন ‘সিঙ্গেল’। টালিয়া বালসামের সঙ্গে তার বিয়ে ভেঙে গিয়েছিল সেই ১৯৯৩ সালে। তার পর গত কুড়ি বছরে অন্তত খান দশেক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন ক্লুনি। কখনও তার পাশে বৃটিশ মডেল, কখনও আবার ইতালীয় অভিনেত্রী। এক সময় আবার তার প্রেমিকা ফরাসি টিভি তারকা সেলিন বালিট্রান। কিন্তু কোন সম্পর্কই বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় নি। মাঝে এমনও শোনা গিয়েছিল, কোন দিনই বিয়ে করবেন না তিনি। বিয়েতে আপত্তি রয়েছে ক্লুনির। তবে আমালের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পর, ক্লুনি নিজেই স্বীকার করে নিয়েছিলেন সে কথা। বিয়ের ইচ্ছেও প্রকাশ করেন। কিছু দিন আগেই এক অনুষ্ঠানে ক্লুনি বলেছিলেন-  ‘আমাল, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি তোমায় ভালবাসব। কবে তোমাকে স্ত্রী হিসেবে পাব। অপেক্ষায় দিন গুনছি।’

সোমবার বিয়ের অনুষ্ঠান। তার আগেই গন্ডোলা নগরীতে সাজ সাজ রব। গ্র্যান্ড ক্যানালের আশেপাশে পাঁচতারা হোটেলগুলোয় শুরু হয়ে গেছে প্রি-পার্টি। নিমন্ত্রিত অতিথি ১৩৬ জন। কিন্তু তাতে কি? উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছেন ভেনিসের বাসিন্দারাও। নিজেরাই বলছেন, বছরের সেরা পার্টির জন্য সাজছে তাদের শহর। স্থানীয় ওয়াটার-ট্যাক্সির চালক ব্রুনো বার্তোলিনি’র মুখেই শোনা গেল সে কথা। বললেন, এখানে সবার মুখে একটাই নাম ক্লুনি। বিশেষ করে মেয়েরা। যদি এক ঝলকও দেখা যায়, সেই আশায় তারা ভিড় করছেন ক্যানালের দু’ধারে। শুক্র থেকে সোম, অনুষ্ঠান হবে টানা চার দিন। সে জন্য একাধিক পাঁচতারা হোটেল বুক করেছেন হবু দম্পতি। হলিউড থেকে আসা অতিথিরা উঠেছেন গিডেকা দ্বীপপুঞ্জের একটি হোটেলে। ক্লুনিদের প্রস্তাব মতো ৭৯টি ঘরের ওই হোটেলটিকে আগামী কয়েক দিনের জন্য খামারবাড়ির চেহারা দেয়া হয়েছে। সুবিশাল হল ঘরটিতে লাগানো হয়েছে বড় বড় ঝাড়বাতি। শনিবারের পরিকল্পনাটা একেবারে আলাদা। ক্যানালের ধার ঘেঁষে অন্য একটি হোটেলে রিসেপশন পার্টি। অতিথিদের পুলিশ- বোটে করে নিয়ে যাওয়া হবে সেখানে। দুপুরে ওই হোটেলের বাগানেই চাঁদোয়া টাঙিয়ে ভোজের আয়োজন করা হয়েছে। খানাপিনার দায়িত্বে রয়েছেন ইতালীয় শেফ। পাঁচ ধরনের খাবার থাকছে ভোজের তালিকায়। তবে পদের সংখ্যা কত, জানা যায়নি সে সব। সন্ধ্যা নামলেই বদলে যাবে পার্টির চেহারা। পাঁচতারা হোটেলের রেস্তরাঁ তখন হবে নাইটক্লাব। ডান্স ফ্লোরে ঝড় তুলবেন সেলিব্রেটিরা। তবে আকর্ষণের কেন্দ্র সোমবার। ওই দিনই টাউন হলে বিয়ে। শোনা যাচ্ছে, ক্লুনি পরবেন আরমানি স্যুট। আর আমালের পরনে থাকবে সারা বার্টনের নকশা করা গাউন। এই সারাই বৃটিশ রাজবধূ কেটের বিয়ের পোশাক তৈরি করেছিলেন। দুপুর বারোটা নাগাদ শুরু হবে বিয়ের অনুষ্ঠান। চলবে দু’ঘণ্টা ধরে। ইতিমধ্যেই হবু দম্পতি পৌঁছে গিয়েছেন ভেনিসে। ছবি-শিকারি ও ভক্তদের হাত থেকে বাঁচতে এখন থেকেই আঁটোসাঁটো প্রহরা। গোপনীয়তা রাখতে চুক্তি হয়েছে হোটেলগুলোর সঙ্গে। সেই সব হোটেলের ধার দিয়ে এখন স্পিড বোট বা নৌকো নিয়ে যাওয়াও নিষিদ্ধ। পোজও দিলেন হাসিমুখে। তবু ভক্তদের কাছে তো অধরাই তারা। অগত্যা দূর থেকেই অনেকে ছবি তুলে রাখছেন টাউন হলের। এখানেই যে বিয়ে হবে তাদের স্বপ্নের নায়কের!  

এক ছাদের নিচে মসজিদ, চার্চ ও সিনেগগ

জার্মানির বার্লিন শহরে পেত্রিপালট্জ-এ নির্মিত হচ্ছে ‘হাউজ অব ওয়ান’। এক ছাদের নিচে তিন ধর্মের উপাসনালয়। বিশ্বব্যাপী যখন ধর্মীয় দ্বন্দ্ব-বিবাদ চলছে, তখন মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের মধ্যে একতা আনার উদ্দেশ্যে অভিনব এ ধারণাটি প্রস্তাব করেন রেভারেন্ড গ্রেগর হোবার্গ (৪৬)। প্রোটেস্ট্যান্ট এ ধর্মযাজকের বিশ্বাস এ পদক্ষেপটি প্রতিধ্বনিত হবে বার্লিনের সীমান্ত পেরিয়ে। তারা এ উপাসনালয়ের নাম দেবেন ‘হাউজ অব ওয়ান’। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়য়ের শিক্ষা থেকে এ ধারণাটি নিয়েছেন গ্রেগর। যে স্থানটিতে নতুন এ উপাসনালয় নির্মিত হচ্ছে সেখানে প্রতীকী ইট হাতে নিয়ে একসঙ্গে দেখা যায় রেভারেন্ড গ্রেগর হোবার্গ, র‌্যাবাই তোভিয়া বেন-চোরিন ও ইমাম কাদির সানচিকে। শহরের কর্মকর্তাদের অনুমোদনের পর প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে বেছে নেয়া হয় একটি নকশা। নির্মাণকাজের জন্য তহবিল গঠনে চলছে প্রচারণা। আয়োজকদের প্রত্যাশা দুই বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে। এ পরিকল্পনা নতুন একটি উদ্যোগের অংশ, যার উদ্দেশ্য অভিনব ধর্মীয় যোগসূত্র স্থাপন। এর মধ্যে একটি উদ্যোগ হলো যুক্তরাষ্ট্রের ওমাহাতে ‘ট্রাই ফেইথ ইনিশিয়েটিভ’। তিন ধর্মের এ উদ্যোগের অধীনে, সম্প্রতি নির্মিত একটি সিনেগগের পাশাপাশি একটি চার্চ ও একটি মসজিদ নির্মাণের প্রচেষ্টা চলছে। বার্লিনের ‘হাউজ অব ওয়ান’ সম্ভাবনার অগ্রগতি হলেও, অভিনব এ প্রকল্প ইতিমধ্যে ব্যাপক প্রতিবন্ধকার সম্মুখীন হয়েছে। সবগুলো ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেই এ প্রকল্পটি উল্লেখযোগ্য মানবিক সমর্থন অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে। পক্ষান্তরে রয়েছে সমালোচনাও। বার্লিনের তুর্কি মুসলিম জনসংখ্যার অনেকে প্রগতিশীল ওই ইমামের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অন্য ধর্মের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিনি কোরআন লঙ্ঘন করেছেন বলে তাদের অভিযোগ। শহরের অন্য মুসলিমরা এদিকে ‘ফোরাম ফর ইন্টারকালচারাল ডায়ালগ’-এর সঙ্গে ইমামের সংশ্লিষ্টতার কারণে সন্দেহ পোষণ করেছেন। কেননা ওই ফোরামের অনারারি চেয়ারম্যান হলেন ফেতুল্লাহ গুলেন- যিনি ভিন্ন মতাবলম্বী একজন তুর্কি ধর্মীয় নেতা। বার্লিনের খ্রিষ্টান ও ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যেও আপত্তি রয়েছে। এর মধ্যে অনেকের দাবি, যে নকশাটি বাছাই করা হয়েছে সেটা বেশি দেখতে মসজিদের মতো। সম্ভবত সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, চূড়ান্ত ধর্মনিরপেক্ষ ইউরোপের এ শহরটিতে মানুষের ধর্ম-অনীহা জয় করা। এ শহরের বেশির ভাগ বাসিন্দা আজকাল কোন ধর্মের অনুসারী নয়। বার্লিনের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির আধুনিক ইতিহাস বিষয়ের অধ্যাপক মানফ্রেড গাইলুস বলেন, ‘আমি মনে করি এ প্রকল্পের জন্য কিছু সমর্থন রয়েছে। কিন্তু আপনি যদি বর্তমান পরিস্থিতির ওপর দৃষ্টিপাত করেন তাহলে দেখবেন, অনেক মানুষ আজকাল ধর্ম নিয়ে তেমনটা পরোয়া করে না। হয়তো কিছু মানুষ বলছে, ওহ এটা দারুণ একটা ধারণা। কিন্তু অনেকেই প্রশ্ন করবে, আসলে এর কি কোন প্রয়োজন আছে? আর এতে কত ব্যয় হবে।’ উপাসনালয়টি নির্মাণে প্রয়োজন ৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। আর এ তহবিল গঠন করতে গিয়ে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছেন আয়োজকরা। তার পরও তাদের বিশ্বাস নির্মাণকাজ শুরু করতে প্রয়োজন ১ কোটি ২৭ লাখ ডলার দুই বছরের মধ্যে জোগাড় করা সম্ভব। জুলাইতে শুরু হওয়া প্রচারণায় এ পর্যন্ত তহবিলে জমা হয়েছে মাত্র ১ লাখ ২ হাজার ডলার। এই হারে চলতে থাকলে প্রয়োজনীয় তহবিল গঠনে দুই দশকেরও বেশি সময় লাগবে। তবে ‘হাউজ অব ওয়ান’ সমর্থকেরা দারুণ আশাবাদী। তারা বলছেন, লক্ষণীয় হলো প্রকল্পটি এত দূর পর্যন্ত এসেছে। নির্মাণের জন্য ঐতিহাসিক একটি স্থান নিশ্চিত করতে পেরেছে। শহর কর্তৃপক্ষের সমর্থন রয়েছে। তিন ধর্মের পক্ষ থেকে সমর্থন মিলেছে। সব মিলিয়ে তাদের বিশ্বাস এ প্রকল্পটি আর্থিক ও আধ্যাত্মিক যাবতীয় প্রতিবন্ধকতাই উৎরে যাবে। প্রকল্পটি এখন প্রধান তিন একেশ্বরবাদী ধর্মবিশ্বাসের ধর্মযাজকদের কেন্দ্র করে এগুচ্ছে। একজন খ্রিষ্টান রেভারেন্ড যিনি পূর্ব জার্মানির দমন-পীড়ন প্রত্যক্ষ করেছেন। দেখেছেন বার্লিনের পতনের পর একতার ক্ষমতা। আছেন একজন উদীয়মান মুসলিম ইমাম। যিনি জন্মেছেন ফ্রাঙ্কফুর্টে। যিনি মুসলিম ও নন-মুসলিমদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করতে আগ্রহী। আর আছেন জার্মান বংশোদ্ভুত ইহুদি রাবাই যিনি ইসরাইলের হয়ে তিনটি যুদ্ধে লড়েছেন। এখন পুরনো ক্ষত নিরাময়ে আত্মনিয়োগ করেছেন। হাউজ অব ওয়ানের নকশা এমনভাবে করা হয়েছে যেন প্রতিটি ধর্মানুসারীরা পৃথক কক্ষে উপাসনা করতে পারেন। তিন ধর্মের তিন ধর্মযাজক, গ্রেগর, বেন-চোরিন ও কাদির সানচি জানালেন, এখন পর্যন্ত সব থেকে কড়া সমালোচনা এসেছে বার্লিনের মুসলিমদের পক্ষ থেকে। ইমাম কাদির সানচি এ উদ্যোগে সামিল হওয়ার আগে অনেক ইমাম ‘হাউজ অব ওয়ান’ এ যোগ দেয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। তিনি যোগ দেয়ার পর টুইটার, ফেসবুকে নানা নেতিবাচক মন্তব্য পেয়েছেন। তার পরও আত্মবিশ্বাসী ইমাম কাদির সানচি।
সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট

হাসিনা জানেন এখন নির্বাচন হলে তাঁর দল জিতবে না -ডয়েচে ভেলে

মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির সঙ্গে সংলাপের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা৷ বাংলাদেশে এই বক্তব্য মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে৷

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের জন্য আমেরিকা সফররত প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কিসের মধ্যবর্তী নির্বাচন? এমন কি সমস্যা হয়েছে যে মধ্যবর্তী নির্বাচন? কার জন্য মধ্যবর্তী নির্বাচন? অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী জিয়াউর রহমানের দলকে ক্ষমতায় আনতেই মধ্যবর্তী নির্বাচন?

নিউইয়র্কের বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে এই সংবাদ সম্মেলনে এক প্রবাসী সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বিএনপির সঙ্গে সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ করে তার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী পাল্টা প্রশ্ন রাখেন৷ বিরোধী দলের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দল সংলাপে বসবে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, সংলাপটা আবার কী? সংলাপ কার সাথে? বিরোধী দল? কে বিরোধী দল? সংসদীয় গণতন্ত্রে কারা বিরোধী দল? এর ডেফিনেশন কি?

প্রধানমন্ত্রীর এমন মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহেদুজ্জামান ডয়চে ভেলেকে বলেন, নৈতিকতার ভিত্তি যখন দূর্বল হয়ে পড়ে তখন কোন সরকার প্রধান এমন কথাই বলেন৷ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছিলেন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার জন্য এই নির্বাচন৷ নির্বাচনের পরে সবার সঙ্গে আলোচনা করে নতুন নির্বাচনের দিনক্ষন ঠিক করা হবে৷ এখন তিনি উল্টো কথা বলছেন৷

শাহেদুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেও জানেন এখন কোন নির্বাচন হলে তার দলের পক্ষে জেতা হবে না৷ কারণ জনগন তাদের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে৷ তাই তিনি বলে ফেলেছেন, কার জন্য মধ্যবর্তী নির্বাচন? বিএনপিকে ক্ষমতায় আনতেই মধ্যবর্তী নির্বাচন?

অধ্যাপক শাহেদুজ্জামান বলেন, অনেক নিরপেক্ষ বিশ্লেষকও এখন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেছেন৷ দিন যত যাবে সরকারের ভিত্তি ততই দূর্বল হয়ে পড়বে৷

বিএনপির আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি হয়তো এখন সে ধরনের কোন আন্দোলন করতে পারেনি, তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে, বিএনপি কিন্তু ভেঙেও যায়নি৷ দলটি শক্তভাবে মাঠে নামলে জনগণ তাদের আন্দোলনে সাড়া দেবে৷ ফলে এখনই প্রধানমন্ত্রীকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে৷ সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় এমন একটা নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে৷

নিউইয়র্কের সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়ায় জাতীয় পার্টি এখন বিরোধী দল হিসাবে রয়েছে৷ বিএনপির মতো একটি রাজনৈতিক দলের সংসদের বাইরে থাকা নিয়ে প্রবাসী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, বাইরে আছে তো, বাইরে আছে৷ আমি কি করবো? নির্বাচন করে নাই- তো করে নাই৷ রাজনীতিতে কেউ ভুল সিদ্ধান্ত নিলে তার খেসারত তাকেই দিতে হবে৷

সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে মানবতা বিরোধী অপরাধে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমে আমৃত্যু কারাদণ্ড হওয়ার পর সরকারি দলের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আঁতাতের যে অভিযোগ উঠেছে তাও উড়িয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী৷ এই প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা পাল্টা প্রশ্ন করেন, আঁতাত হলে বিচার হয়? মৃত্যুদণ্ড হবে কি না- সে সিদ্ধান্ত নেবে বিচার বিভাগ৷ বিচার বিভাগে তো হস্তক্ষেপ করতে পারি না৷

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী এম কে আনোয়ার ডয়চে ভেলেকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী এ পর্যন্ত যত কথা দিয়েছেন তার একটিও রাখেননি৷ ১৯৮৬ সালেও চট্টগ্রামে একটি সমাবেশে শেখ হাসিন বলেছিলেন, এরশাদের অধীনে যারা নির্বাচনে যাবে তারা জাতীয় বেঈমান৷ এর পরদিন ঢাকায় এসে তিনি নির্বাচনের যাওয়ার ঘোষণা দিলেন৷

এম কে আনোয়ার বলেন, এবার শেখ হাসিনা নিজেই বললেন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার জন্য নির্বাচন৷ নির্বাচনের পরই সবার সঙ্গে আলোচনা করে নতুন নির্বাচনের দিনক্ষণ ঠিক করা হবে৷ এবারও তিনি কথা রাখলেন না৷

আন্দোলন করে সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমরা জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলতে চাই না৷ তাই নরম কর্মসূচী পালন করছি৷ ঈদের পর টানা আন্দোলনে যাবো৷ সরকার যদি আমাদের আন্দোলনে বাধা দেয় তাহলে আমরাও সেভাবেই জবাব দেব৷ আন্দোলন করেই সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামানো হবে৷

যাঁদের কথা ভুলে গেছে বাংলাদেশ by নাহিদ হাসান

‘আমাদের অনেক দুঃখ আছে। কতবার কতজনকে জানালুম, আর কত বলব বাবু? আমরা যে রুজি পাই, তাতে পরিবারের খরচ কুলায় না। কাপড়চোপড় দিতে পারি না। ছেলেপিলেদের যত্ন নিতে পারি না, শিক্ষা দিয়ে মানুষ করতে পারি না। আমরা যে রেশন পাই, তাতে খোরাক চলে না। সপ্তাহে দুই দিন উপবাস দিতে হয়। শীতের কাপড় কিনতে পারি না, ছেঁড়া বস্তা দিয়ে শীত কাটাই।’
কথাগুলো একজন চা-শ্রমিক ১৯৫৬ সালের ২৫ নভেম্বর, তৎকালীন শ্রমমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে শুনিয়েছিলেন। তারপর পাকিস্তান গেল, হলো বাংলাদেশ। গণসংগীতশিল্পী আবসার আহম্মেদের গানের ভাষায়, ‘উঠল সুরুজ-আঁধার গেল না’র মতো দুটি পাতা একটি কুঁড়ির নিচে ঘন অন্ধকার একটুও কমল না। মাথাপিছু আয় বাড়ল, দিকে দিকে কত শান-শওকত, কিন্তু চা-বাগানের ভেতর যদি কুছ পরোয়া নেহি বলে ঢুকে পড়তে পারেন, তাহলে বুঝবেন, সাদা চামড়া আর কালো চামড়ার শাসনদণ্ডের ভেদ এখানে লুপ্ত হয়ে গেছে।
রবীন্দ্রনাথের ‘দুয়ারে এঁকেছি রক্ত রেখায় পদ্ম আসন’-এর মতো বরাক উপত্যকার চা-বাগানের ইতিহাসও রক্তরেখায় ভেজানো। যখন বরাক উপত্যকায় চা-বাগান করা হলো, তখন ক্রীতদাস প্রথার অভিনব সংস্করণ হাজির করা হলো এখানে। হাজার হাজার মানুষ দাসত্বের শিকলে আটকা পড়ে গেল ভিনদেশের চা-বাগানের জেলখানায়। কোথাও কেউ নেই, আত্মীয়স্বজন নেই, বন্ধু-সখা কেউ নেই। বুটের লাথি আর চাবুকের প্রহারে যখন চা-বাগানের কন্দরে-কন্দরে, গুহায় ও ছড়ায় তাঁরা ডুকরে উঠেছেন, তখন কেউ শোনেনি। যখন মারা গেছেন, খবর রাখেনি কেউ। অসহ্য যন্ত্রণায় মাঝে মাঝে বিদ্রোহ করেছেন তাঁরা।
১৯২১ সালে যখন ভারতজুড়ে অসহযোগ আন্দোলন চলছিল, তাঁরাও এই ফাঁকে বিদ্রোহে ফেটে পড়েন। উদ্যোগ নেন নিজ নিজ অঞ্চলে ফিরে যাওয়ার, কিন্তু বরাক উপত্যকা থেকে বিহার, উড়িষ্যা, মাদ্রাজ ও উত্তর প্রদেশে ফিরে যাওয়া সহজ ছিল না। গোলামির শিকল ছেঁড়া যে কতটা কঠিন, তাঁরা টের পেলেন কুমিল্লার চাঁদপুর ঘাটে এসে। পুলিশ ঠেকিয়ে দিল, চলল গুলি। মরলেন শত শত আর আহত হলেন হাজারে হাজার। বাকিদের জোর করে শিকল পরিয়ে ফেরত পাঠানো হলো। রচিত হলো মূলক রাজ আনন্দ-এর বিখ্যাত উপন্যাস দুটি পাতা একটি কুঁড়ি। গঠিত হলো তিনটি কমিশন—১৯২১ সালে রয়েল কমিশন, ১৯৩৪ সালে দেশ কমিশন এবং জোন্স মিশন নামে মেডিকেল কমিশন। ভারত ভাগের আগে ১৯৪৬ সালে একটি সরকারি তদন্ত কমিটি সরেজমিনে তদন্ত করে রিপোর্ট দিয়েছিল, ‘চা-বাগানের মজুরদের কোনো রকমের স্বাধীনতা নেই। বাগানের মধ্যে ট্রেড ইউনিয়নের কাজকর্ম চালানো সম্ভব নয়।’
বাংলাদেশে চা-শিল্পে নিয়োজিত মূলধনের মোট পরিমাণ জানা না গেলেও ব্রিটিশ মূলধনের ওপর নির্ভর করেই এ দেশে চা-শিল্প গড়ে উঠেছে। পাকিস্তান আমলের এক হিসাব থেকে জানা যায়, চা-শিল্পের মুনাফা বছরে ২৮ থেকে ৩২ কোটি টাকা লন্ডনে পাঠানো হতো। চা-শিল্পের জায়গাজমির মালিকানাও ছিল ব্রিটিশ চা কোম্পানিগুলোর। ১৯৮৩ সালের এক হিসাব থেকে দেখা যায়, ১৫২টি চা-বাগানগুলোর অধীনে দুই লাখ ৮০ হাজার একর জমি রয়েছে।
বর্তমানে শ্রমিকদের ঘর-দরজার দুরবস্থা, পানি-শিক্ষা-চিকিৎসার কোনো সুবিধা নেই। ওভার টাইমের দ্বিগুণ মজুরির কোনো সুবিধা শ্রমিকেরা পান না। ফ্যাক্টরিগুলোর ভেতরে কী চলছে কেউ জানি না। এখানে বয়স নির্ধারণ করা হয় মালিকদের মর্জিমতো। কম মজুরি দেওয়ার উদ্দেশ্যে ২৫ বছরের যুবকদের বয়স লিখে রাখা ১৫, ১৬ অথবা ১৭ বছর। আবার কখনো ২৫ বছরের যুবকের বয়স হয়ে যায় ৪৩ বছর। এতে প্রয়োজনে অবসর দেওয়ার সুবিধা হয়। অস্থায়ী ঠিকা শ্রমিক ও স্থায়ী শ্রমিকদের একযোগে কাজে মোতায়েন করে দ্বিগুণ-তিনগুণ শ্রমশক্তি ও শ্রম দিবস মালিকেরা কাজে লাগান। বাগানে অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকদের কোনো পেনশন নেই, বৃদ্ধ বয়সে ভিক্ষা করে চলতে হয়।
জনৈক শ্রমিক তাঁর জবানিতে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ তো বানাইলাম বাবু, কিন্তু আমাদের কী হইল? হামরা বাঙালি নাই, তবু তো জয় বাংলা বললাম। “জয় বাংলা”য় বাঙালি বাবু ম্যানেজার সাহেব আইল, কিন্তু হামাদের পেটে ভাত নাইক্যা, পরনে কাপড় নাইক্যা, দিনকে দিন হামরা মরতে বসেছি। হামাদের জোয়ান মাইয়া গিলা বস্তি, গেরামে যাইকে মাটি কাটে, শরম ঢাকতে পারে না। হামাদের দিকে কেউ চায় না বাবু। কষ্ট তো খালি বাড়তেই আছে। ইউনিয়ন বাবুরা হামাদের জন্য কিচ্ছু করে না। বিল্ডিংয়ে থাকে, গাড়ি হাঁকায় আর চান্দা কাটাই করে নিয়ে যায়। কোনো দিন বাগানেও আসে না।’
শ্রমিকেরা আজকের বাজারে ৬৯ টাকা মজুরি পান, এটা ভাবা যায়? ৩০০ টাকা মজুরি, পূর্ণাঙ্গ রেশন, সাপ্তাহিক ছুটির দিনের মজুরি, এমবিবিএস ডাক্তার, মহিলা শ্রমিকদের জন্য মহিলা ডাক্তার, মন্দির-মসজিদ সংস্কারের দাবিতে এই কর্মবিরতি চলছে। আমরা তাঁদের কোন কোন দাবিকে অস্বীকার করব? এর মধ্যে ভাড়াটে শ্রমিক দিয়ে বাগান চালানোর চেষ্টা হয়েছে, পুলিশের সামনে শ্রমিকদের পিটিয়েছে মালিকপক্ষ। সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা কি এখানে প্রযোজ্য নয়? তাঁরা কি সাংবিধানিক অধিকার পাবেন না? হাইকোর্ট কী বলেন? চা-বাগানের গহিন অন্ধকারে তাঁরা কি সত্যিই হারিয়ে যাবেন?
সোনারগাঁও হোটেলের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, ব্রেকফাস্ট টি ১২০ টাকা, দার্জিলিং টি ১২০ টাকা, গ্রিন টি ১২০ টাকা, অলিম্পিক টি ১৮০ টাকা, আইস টি ১৪০ টাকা ছিল কয়েক দিন আগে। এখন সবগুলোর দাম বেড়ে ১৯৪ টাকা হয়েছে। কিন্তু যাঁরা এই চায়ের উৎপাদক, তাঁরা কি দুই কাপ চায়ের দামও পাবেন না? তাঁরা পাতা শুকিয়ে বড়ি বানিয়ে চিনির বদলে লবণ দিয়ে চা খান। টেলিভিশনের ক্যামেরায় সাজানো বাগানে হাস্যরত মালির অভিনয় দেখি, সংসদে ইতিহাস দখলের লড়াই দেখি, কিন্তু চোখের সামনে জীবন্ত মানুষ মরে মরে যে ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে; আমরা তা দেখব না?

নাহিদ হাসান: প্রধান সমন্বয়ক, রেল-নৌ যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি, কুড়িগ্রাম।
nahiduttar@yahoo.com

কাশ্মীর সমস্যার সমাধান বিশ্ব সম্প্রদায়ের দায়িত্ব

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ গতকাল শুক্রবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে কয়েক দশক ধরে চেষ্টা চলছে। এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব। খবর এনডিটিভি ও ডনের। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রায় ১৫ মিনিট স্থায়ী ভাষণে বলেন, পাকিস্তান কাশ্মীর নিয়ে আলোচনার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। নওয়াজ বলেন, পাকিস্তান একটি শান্তিপূর্ণ অঞ্চল গড়ে তোলার প্রত্যাশা করে ও এ জন্য সচেষ্ট। আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন অত্যাবশ্যক। সম্প্রতি ভারত পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক বাতিল করায় হতাশার কথা জানিয়ে নওয়াজ শরিফ বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কম নয়, বরং বেশি আলোচনা ও কূটনৈতিক লেনদেন প্রয়োজন।’ পাকিস্তানই গোল বাধিয়েছে: এদিকে এনডিটিভি জানায়, শান্তি আলোচনা থমকে যাওয়ার জন্য আবার পাকিস্তানকে দায়ী করেছে ভারত। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ গতকাল নিউইয়র্কে বলেন, পাকিস্তানি হাইকমিশনার কাশ্মীরের হুরিয়াত নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেই সমস্যা বাধিয়েছেন। সুষমা স্বরাজ বলেন, গত মাসে পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের নির্ধারিত বৈঠকের আগে আগে পাকিস্তানের হাইকমিশনার হুরিয়াত নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেই গোলটা বাধিয়েছেন। 
পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা সারতাজ আজিজ বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কেই কমনওয়েলথ ও সার্ক পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের আগে বলেন, ভারত যেহেতু আলোচনা বাতিল করেছে, সেহেতু তাদেরই আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে। এ বিষয়ে সাংবাদিকেরা প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে সুষমা স্বরাজ ওই কথা বলেন। তিনি বলেন, এটা প্রথম দ্বিতীয়র ব্যাপার নয়। সারতাজ আজিজ বলেন, হুরিয়াত নেতাদের সঙ্গে দিল্লিতে পাকিস্তানের হাইকমিশনারের বৈঠকের ব্যাপারে ভারত অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। হুরিয়াত নেতাদের সঙ্গে বৈঠক নতুন কিছু নয়। ভারত ও চীন সীমান্ত সমস্যার সমাধান: এদিকে ভারত ও চীন সীমান্তের লাদাখে অচলাবস্থার সমাধান হয়েছে বলে জানিয়েছেন সুষমা স্বরাজ। তিনি গতকাল বলেন, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই দুই দেশ সীমান্তে নিজ নিজ দেশের সেনা প্রত্যাহার করে নেবে। ভারত অভিযোগ করেছে, ১১ সেপ্টেম্বর চীনের এক হাজার সেনা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের ভেতর ঢুকে পড়ে।

ইচ্ছামতো ছুটি!

রিচার্ড ব্র্যানসন। ছবি: ভার্জিন গ্রুপের সৌজন্যে
ভার্জিন’ গ্রুপের প্রধান রিচার্ড ব্র্যানসন যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর ১৭০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তাঁদের যখন ইচ্ছা এবং যত সময় ইচ্ছা ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। খবর এনডিটিভির। স্যার উপাধি পাওয়া ব্র্যানসন তাঁর ওয়েবসাইটে লিখেছেন, কর্মী কখন কয়েক ঘণ্টা, দিন, এক সপ্তাহ বা এক মাস ছুটি নিতে চান, তা তাঁর ওপরই নির্ভর করবে। এ জন্য তাঁদের আগে থেকে জানাতেও হবে না।
শুধু খেয়াল রাখতে হবে, নিজের কাজটা ঠিক সময়মতো করছেন কি না বা অফিসের কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না। ব্র্যানসন বলেছেন, সংস্কৃতি বদলে গেছে। নয়টা-পাঁচটার নিয়ম আর মানা হয় না। তাহলে বার্ষিক ছুটির ক্ষেত্রেই বা তা হবে না কেন? ৫০টি দেশে ব্যবসা করা ভার্জিনের কর্মীর সংখ্যা ৫০ হাজার। ফল প্রত্যাশা মতো হলে ভার্জিনের অধীন প্রতিষ্ঠানেও এ ছুটির পদ্ধতি চালু করতে বলা হবে।

আইএসবিরোধী হামলায় অংশ নেবে যুক্তরাজ্য

ইরাকে জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে বিমান হামলায় অংশ নেবে যুক্তরাজ্য। গতকাল শুক্রবার এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে অনুমোদিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের প্রস্তাব নিয়ে প্রায় ছয় ঘণ্টা আলোচনার পর তা ৫২৪-৪৩ ভোটে পাস হয়। তিনটি প্রধান ব্রিটিশ রাজনৈতিক দলই এই প্রস্তাব সমর্থন করে। ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিমান হামলা অব্যাহত আছে। গতকাল মার্কিন সেনা কর্মকর্তারা সিরিয়ায় টানা চতুর্থ রাতের হামলায় আইএসের চারটি ট্যাংক ধ্বংস এবং একটি ক্ষতিগ্রস্ত করার কথা জানিয়েছেন। আইএসের যোদ্ধারা গতকাল সিরিয়ার সীমান্তবর্তী কোবানি শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। খবর বিবিসি, এএফপি ও রয়টার্সের। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পার্লামেন্টে তাঁর বক্তব্যে আইএসকে যুক্তরাজ্যের জন্য সরাসরি হুমকি বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, সামরিকভাবে এদের মোকাবিলা করা যুক্তরাজ্যের দায়িত্ব। আর ইরাকি সরকারের সুস্পষ্ট সামরিক সহযোগিতার আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতেই তাঁর দেশ এই অভিযানে অংশ নিচ্ছে। আইএসবিরোধী হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান মিত্র যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, পার্লামেন্টের এই অনুমোদন শুধু ইরাকে অভিযানে অংশ নেওয়ার জন্য, সিরিয়ায় অভিযান চালানোর জন্য নয়। তিনি এটাও নিশ্চিত করে বলেন, এই অভিযানে যুক্তরাজ্যের সেনারা কোনো দেশের মাটিতে পদার্পণ করবে না। তবে এই অভিযান দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে বলে তিনি সতর্ক করে দেন। গত বছরের আগস্টে সিরিয়ায় সামরিক অভিযান চালানো-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট নাকচ করে দেয়। সে বিবেচনায় এবারের ভোটের ওপর পর্যবেক্ষকদের নজর ছিল।
তবে আইএসের হাতে একজন অপহৃত ব্রিটিশ ত্রাণকর্মীর শিরশ্ছেদের ঘটনা এবং আটক অন্তত আরেকজনকে হত্যার হুমকি এই অভিযানের পক্ষে অন্তত রাজনৈতিক মতৈক্য গঠনে সহায়তা করেছে। যুক্তরাজ্যের অন্তত ছয়টি টর্নেডো যুদ্ধবিমান সাইপ্রাস থেকে উড়ে গিয়ে ইরাকে আইএসের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার প্রস্তাবকে সমর্থন করে বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা এড মিলিব্যান্ড বলেন, নিষ্ক্রিয়তা আরও প্রাণহানির কারণ হয়ে উঠতে পারে। তবে ৪৩ জন এমপি এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। তাঁরা যুক্তরাজ্যের আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ার পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে লেবার পার্টির এমপি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রুশনারা আলী এই প্রস্তাবে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। তিনি প্রস্তাবটি পাসের প্রতিবাদে লেবার পার্টির ছায়া মন্ত্রিসভার শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগও করেন। ইরাকে আইএসবিরোধী বিমান হামলায় যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের প্রতিবাদে গত বৃহস্পতিবার ডাউনিং স্ট্রিটে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কাছে কয়েক শ ব্রিটিশ বিক্ষোভ করেন। আইএসের পক্ষে তিন হাজার ইউরোপীয়: এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সন্ত্রাসবাদবিরোধী বিভাগের প্রধান জিল দি কেরশভ বলেছেন, ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসের পক্ষে তিন হাজারের বেশি ইউরোপীয় যোদ্ধা লড়াই করছে। ইউরোপের শীর্ষ এই সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ আরও বলেছেন, আইএসের ওপর পশ্চিমা বিশ্বের হামলার কারণে ইউরোপে জঙ্গি সংগঠনটির হামলার আশঙ্কা বেড়ে গেছে। আইএসের পক্ষে যুদ্ধে যাওয়া ইউরোপীয়দের কেউ কেউ ফিরে এসেছে, আবার অনেকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয়েছে।

শিক্ষা- এ অবস্থা এক দিনে তৈরি হয়নি by আলী রীয়াজ

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সম্প্রতি একটা হাহাকার রব উঠেছে, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের এক বড় অংশই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। কলা অনুষদের ইংরেজি বিভাগের পরীক্ষায় যখন মাত্র দুজন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন, তখন অনেকের টনক নড়েছে। এর আগে কয়েক বছর ধরে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাগুলোয় পাসের হার যখন অস্বাভাবিক রূপ নিয়েছিল এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল কথিত জিপিএ-৫ পাওয়ার মহোৎসব, তখন যাঁরা একে শিক্ষার্থীদের চেয়ে সরকার ও শিক্ষা প্রশাসনের সাফল্য বলে আনন্দিত হয়েছিলেন, তাঁদের একাংশ এখন এ নিয়ে যে উদ্বেগ দেখাচ্ছেন, তা নিঃসন্দেহে লক্ষ করার মতো। এসব পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনাকে অস্বীকারের মধ্য দিয়ে যাঁরা একে কার্যত প্রণোদিত করেছিলেন, তাঁরা এখন যে ব্যাখ্যাই দেন না কেন, তাঁদের নিজেদের নিশ্চয় জানা আছে যে ছাত্রছাত্রীদের এই অবস্থার জন্য তাঁদের দায়িত্ব এড়ানোর উপায় নেই।

গত কয়েক দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে যে আলোচনার ঝড়, সেটা যাঁরা অনুসরণ করেননি, তাঁদের জন্য এই তথ্যগুলো জানিয়ে রাখি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় বিজ্ঞান অনুষদ বা ‘ক’ ইউনিটে অকৃতকার্যের হার ৭৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, কলা অনুষদ বা ‘খ’ ইউনিটে পরীক্ষায় ফেলের হার ৯০ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং বাণিজ্য অনুষদ বা ‘গ’ ইউনিটে অনুত্তীর্ণের হার ৭৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। সব মিলিয়ে কত শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছেন, তা নিশ্চয় পাঠকেরা হিসাব করে বের করতে পারবেন। এই ফলাফল যে কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটেছে তা কিন্তু নয়, সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও ঘটেছে। ফলে এ কথা বলার সুযোগ নেই যে এর পেছনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ভূমিকা রয়েছে। ফলাফলের কারণে সব মিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর অভাব হবে, তা নয় (ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, যেমন ইংরেজি বিভাগ)। বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট আসনের চেয়ে বেশি ছাত্রছাত্রী এখনো প্রতিযোগিতায় টিকে আছেন।
এসব ফলাফল ইঙ্গিত নয়, বরং সুস্পষ্ট সাক্ষ্য দেয় যে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও মানের প্রতিফলন ঘটায়নি। এই অবস্থা যে এক দিনে তৈরি হয়নি, সেটা বুঝতে কারোই অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। গত কয়েক বছরে এই অবস্থার অবনতি হয়েছে, কিন্তু তার ভিত্তিভূমি তৈরি হয়েছে অনেক দিন ধরেই। কাঠামোগতভাবেই এই পরিস্থিতি তৈরি করার মতো অনুকূল অবস্থা ছিল এবং আছে। আমরা এখন কেবল তার অনিবার্য ফল দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছি। এই কাঠামোগত বিষয়গুলোর কয়েকটা উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধা হবে। এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ের শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার মান, অর্থাৎ পাঠ্যক্রম এবং শিক্ষা প্রদানের মানের পর্যবেক্ষণের কী ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা থেকে বাংলাদেশের মানুষ জানতে পারেন যে এই ক্ষেত্রের অবস্থা কী? কী ধরনের সূচক ও পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় মান নির্ধারণ এবং মান পর্যবেক্ষণের জন্য, তা কি দেশের সব অভিভাবক জানেন? কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মান অনুসরণ না করা হলে তার প্রতিবিধান কী? কেবল এমপিও তালিকা থেকে বাদ দেওয়াই কি একমাত্র ব্যবস্থা হতে পারে? এসব বিষয়ে আলোচনায় আমরা কখনোই উৎসাহী ছিলাম না; কিন্তু এখন যখন বছরের পর বছর ধরে চলা এবং ক্রমবর্ধমান সমস্যা আমাদের একবারে খাদের কিনারে নিয়ে এসেছে, তখন অনেকেই হাহাকার রব তুলে নিজেদের হতাশা ব্যক্ত করছেন।
আরও অনেক সমস্যা রয়েছে; তার কিছু নিয়ে বিস্তর আলোচনাও হয়। তথাকথিত কোচিং ব্যবসা এবং স্কুল পর্যায় থেকে শিক্ষা বোর্ড, এমনকি মন্ত্রণালয় পর্যন্ত, দুর্নীতি নিয়ে আমরা প্রায়ই শুনতে পাই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, পাঠাগার, গবেষণাগার, এমনকি ক্ষেত্রেবিশেষে শ্রেণিকক্ষ না থাকায় শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার অত্যাবশ্যকীয় দিক থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে তাদের কাছ থেকে জ্ঞান আশা করার কোনো কারণ নেই। তাদের কাছ থেকে যদি কেবল পাবলিক পরীক্ষায় ভালো ফল আশা করা হয়, তবে তারা এর চেয়ে বেশি কিছু দিতে পারবে না। আর সেই ভালো ফল দেওয়ার জন্য যেনতেন উপায় বেছে নিতে উৎসাহিত করার লোকের অভাব না থাকলে এ অবস্থাই হওয়ার কথা। সমাজ ও রাজনীতিতে যখন এই আদর্শ প্রতিষ্ঠিত যে প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি বিবেচ্য বিষয় নয়, বিবেচ্য হলো ফল, তখন শিক্ষার্থীরা কেন কষ্ট স্বীকার করতে আগ্রহী হবে? এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে আমি শিক্ষার্থীদের এই ধরনের আচরণকে সমর্থন করছি। বরং এটা স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে শিক্ষার্থীরা কেবল বই বা ক্লাস থেকেই শেখে না, তারা সমাজ থেকেও শিক্ষা লাভ করে।
শিক্ষার সঙ্গে দৈনন্দিন রাজনীতিকে জড়িয়ে ফেলার যে কুফল, সেটা এখন আমাদের চোখের সামনে হাজির হয়েছে। যত দিন পর্যন্ত পাবলিক পরীক্ষাগুলোর ফলাফলের সঙ্গে সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতাকে যুক্ত করে রাখা হবে, যত দিন পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী ফলাফল প্রকাশের দিন তা জানাতে সরকারপ্রধানের দপ্তরে হাজির হবেন, তত দিন পর্যন্ত এই বৃত্তচক্র ভাঙা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। শিক্ষার বিস্তার সরকারের দায়িত্ব। সুযোগ বলুন, অধিকার বলুন, সেটার নিশ্চয়তার বিধান করা সরকারের কর্তব্য। শিক্ষার উপকরণ সবার হাতে যাওয়ার ব্যবস্থা করা প্রশাসনিক দায়িত্ব। শিক্ষার মান নির্ধারণ এবং তার পর্যবেক্ষণসংশ্লিষ্ট স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার বিষয়; কিন্তু ফলাফল একান্তভাবেই একজন শিক্ষার্থীর বিষয়। একজন শিক্ষার্থী যেন তার সব সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে ভালো ফল করতে পারে, সেটা দেখা সমষ্টির কাজ হতে পারে, তার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার দায়িত্ব সমাজ ও রাষ্ট্র নিতে পারে। কিন্তু তার ফলের কৃতিত্ব রাষ্ট্রের হতে পারে বলে আমি মনে করি না। সেটা করলেই দেখা যায় যে শিক্ষার্থীরা আর ‘শিক্ষার্থী’ থাকে না, হয়ে ওঠে ভিন্ন কিছুর উপাদান। আমার কাছে মনে হয়েছে, এখন বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে ফলের কৃতিত্ব নিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে ফেলা হয়েছে। এর পরিণতি যে কেবল ব্যক্তি হিসেবে শিক্ষার্থীরা বইবে এবং নিকটজন হিসেবে তাদের পরিবারগুলো বইবে তা নয়, এটা বইতে হবে গোটা জাতিকে। আশার বিষয় এই যে বর্তমান অবস্থা যেমন নিয়তি–নির্ধারিত ছিল না, তেমনি এটা অপরিবর্তনীয়ও নয়।

আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

ভূরাজনীতি- ইউরোপে কট্টরপন্থার ভূতের আছর by জোসেফ ই স্টিগলিৎজ

প্রাচীনকালে বলা হতো, ‘বাস্তবতা যদি তত্ত্বের সঙ্গে না যায়, তাহলে তত্ত্ব পরিবর্তন করতে হবে।’ কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, তত্ত্ব পরিবর্তনের চেয়ে তথ্য পরিবর্তন করা সহজ। জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলসহ অন্য কট্টরপন্থী ইউরোপীয় নেতারা এ তত্ত্বে বিশ্বাস করেন বলেই মনে হয়। যদিও প্রকৃত ঘটনা মুখের ওপর বলে দিচ্ছে তাঁরা ঠিক নন, তাঁরা ক্রমাগত বাস্তবতা অস্বীকার করে যাচ্ছেন।
কট্টরপন্থা ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এর প্রবক্তারা দুর্বলতম সাক্ষ্যের ভিত্তিতেও নিজেদের জয় দাবি করে যাচ্ছেন: অর্থনীতিতে ধস নামছে না, ফলে কট্টরপন্থা কাজ করছে। সেটাই যদি মানদণ্ড হয়, তাহলে খাদের কিনার থেকে লাফ দেওয়া পাহাড় থেকে নামার সবচেয়ে ভালো উপায়, কারণ এতে অন্তত পতন ঠেকানো যায়।
কিন্তু প্রতিটি নিম্নমুখী প্রবণতারও শেষ আছে। শেষ পর্যন্ত পুনর্গঠন হয়, এটা দিয়ে কোনো কিছুর সফলতা নির্ণয় করা যায় না। বরং কত তাড়াতাড়ি পুরো ব্যাপারটিকে আমলে নেওয়া যায়, তার ভিত্তিতে সফলতা নির্ধারণ করা হয়। আর মন্দার কারণে কী পরিমাণ ক্ষতি হলো, সেটাও বুঝতে হবে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে দেখলে বোঝা যায়, কট্টরপন্থা একটি ঘোরতর ও চরম বিপর্যয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো আবারও মন্দার মুখে পড়েছে, যদিও সেটা তেমন দীর্ঘমেয়াদি কোনো ব্যাপার নয়। ইউরোপে বেকারত্বের হার রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে, আর জনপ্রতি প্রকৃত দেশজ উৎপাদন (মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয়ের পর) মন্দাপূর্ব সময়ের চেয়েও কম। এমনকি জার্মানির মতো সবচেয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশেও ২০০৮ সালের মন্দার পর প্রবৃদ্ধির হার এত কম যে অন্য কোনো সময় হলে সেটা নীরস হিসেবে বিবেচিত হতো।
সেই মন্দায় সবচেয়ে পীড়িত দেশগুলো এখনো তা কটিয়ে উঠতে পারেনি। স্পেন বা গ্রিসের মতো দেশগুলোর কথা কী আর বলব। সেসব দেশে প্রতি চারজনে একজন ও তরুণদের অর্ধেকেরই কোনো কাজ নেই। বেকারত্বের হার কয়েক পয়েন্ট কমেছে বা প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়েছে—এ যুক্তি দিয়ে যদি বলা হয় ওষুধে কাজ হয়েছে, তাহলে তা মধ্যযুগের শিরা কেটে রক্তপাতের মাধ্যমে চিকিৎসায় রোগী মারা যায়নি বলে এর সফলতা দাবি করার শামিল।
১৯৮০-এর দশক থেকে ইউরোপের শ্লথ প্রবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে হিসাব করে দেখেছি, ২০০৮ সালের মন্দা না হলে ইউরো অঞ্চলের আজ যে পরিমাণ উৎপাদন হওয়ার কথা, তার চেয়ে এখন তা ১৫ শতাংশ কম। এ বছরই ক্ষতি হয়েছে ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার, আর সম্মিলিতভাবে তা ৬ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। আরও চিন্তার বিষয় হচ্ছে, এই পার্থক্য ক্রমেই বাড়ছে, কমছে না (অথচ একটি মন্দার পর সাধারণভাবে সে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রবৃদ্ধির হার বেশি হওয়ার কথা)।
সহজভাবে বললে, ইউরোপের এই দীর্ঘ মন্দা মহাদেশটির সম্ভাবনা বিনষ্ট করে দিচ্ছে। তরুণেরা নিজেদের দক্ষতা বাড়াবে, সেটাই স্বাভাবিক, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটছে না। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে, তাদের জীবদ্দশায় মোট উপার্জনের পরিমাণ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, সার্বক্ষণিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তাদের জীবনে আসলে এই উপার্জন আরও অনেক বেশি হতো।
এদিকে জার্মানির নীতির কারণে দেশটির প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে গেলেও তারা অন্যদের সেটা অনুসরণ করতে বাধ্য করছে। তাদের গণতন্ত্রও এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জনগণ ক্রমাগত এই নীতি পরিবর্তনের পক্ষে মত দিচ্ছে, কিন্তু তাদের যখন সব সময় বলা হয়, এসব বিষয় অন্যত্র নির্ধারিত হয় বা তাদের কোনো গত্যন্তর নেই, তখন গণতন্ত্র ও ইউরোপীয় প্রকল্প দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ, যেসব নীতি মানুষের জীবনযাত্রার মান হ্রাস করে, সেগুলো তারা গ্রহণ করে না।
তিন বছর আগে ফ্রান্স এসব পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিল। এর বদলে ভোটারদের ব্যবসাবান্ধব কট্টরপন্থার ডোজ দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিতে ব্যালান্সড বাজেট মাল্টিপ্লায়ার নামে বহু পুরোনো একটি ধারণা রয়েছে। সে ধারণা অনুযায়ী কর ও ব্যয় বাড়ানো হলে অর্থনীতিতে গতি আসে। করের লক্ষ্যবস্তু যদি ধনীরা হয় আর ব্যয়ের লক্ষ্যবস্তু হয় গরিবেরা, তাহলে মাল্টিপ্লায়ার অনেক উচ্চ হয়। কিন্তু ফ্রান্সের তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক সরকার করপোরেট কর ও ব্যয় হ্রাস করছে। এ নীতিতে অর্থনীতি নিশ্চিতভাবে শ্লথ হয়ে পড়বে, কিন্তু জার্মানরা এর প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
করপোরেট করের হার কমানো হলে বিনিয়োগ বাড়বে। এটা খুবই বাজে কথা। চাহিদা কম থাকার কারণে উৎপাদন ব্যাহত (ইউরোপ ও আমেরিকা উভয় স্থানেই) হচ্ছে, করের কারণে নয়। কথা হচ্ছে, বিনিয়োগ হয় সাধারণত ঋণের টাকায়, আর এই ঋণের সুদ করযোগ্য, ফলে করপোরেট কর বিনিয়োগে খুব কম প্রভাবই ফেলে।
একইভাবে, ইতালিতে বেসরকারীকরণ উৎসাহিত করা হচ্ছে। কিন্তু দেশটির প্রধানমন্ত্রী মাতেও রেনজি জানেন, বাজারমূল্যের কম দামে জাতীয় সম্পদ বিক্রি করে কোনো লাভ নেই। স্বল্পমেয়াদি জরুরি অবস্থার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিবেচনায় বেসরকারি খাত পরিচালিত হওয়া উচিত। কোথায় সবচেয়ে দক্ষতার সঙ্গে কাজটি করা যায়, তার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, যেটা অধিকাংশ জনগণের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে।
পেনশন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়ে কোনো লাভ হয়নি, যারা এ কাজ করেছে, তারা ভুগেছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য খাত প্রায় পুরোটাই বেসরকারি, এটা দুনিয়ার সবচেয়ে অদক্ষ। এসব বড়ই জটিল প্রশ্ন। কিন্তু পানির দামে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বেচে দিয়ে কোনো লাভ হয় না, এটা প্রমাণ করা সহজ। এটা আর্থিক খাতের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে কোনো সুফল বয়ে আনতে পারে না।
ইউরোপ আজ যে দুর্দশায় পড়েছে, সেটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। ফলে সেটা বিয়োগান্ত হয়ে উঠেছে। কিছু মানুষের ধূর্ততার কারণে এটা হয়েছে। কট্টরপন্থায় কোনো কাজ হচ্ছে না, এর সপক্ষে প্রমাণের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। তার পরও জার্মানি ও তার সমমনারা এই নীতি আরও কঠিনভাবে আঁকড়ে ধরছে। ফলে ইউরোপের ভবিষ্যৎ দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের আরও প্রমাণ দিয়ে লাভ কী?

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
জোসেফ ই স্টিগলিৎজ: নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ।

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ঋণের মোহ by মইনুল ইসলাম

২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বরের পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে, আইএমএফ তাদের ইসিএফ (এক্সটেনডেড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি)-এর ঋণ কর্মসূচির অধীনে বাংলাদেশকে আরেকটি ঋণ প্রদানের প্রস্তাব দিলেও অর্থমন্ত্রী ওই ঋণ বাংলাদেশ এখন নেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে নতুন করে আইএমএফের কর্মকর্তাদের সঙ্গে চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন বোধ করছেন তিনি। এই বিলম্বিত আত্মোপলব্ধির জন্য অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ।

প্রকৃতপক্ষে, যে ইসিএফ ঋণটা কিস্তিতে কিস্তিতে এখন বাংলাদেশকে দেওয়া হচ্ছে এবং যে ঋণের ছয়টি কিস্তির মধ্যে চারটি কিস্তি এর মধ্যেই ছাড় করা হয়েছে, ওটার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। ওই এক বিলিয়ন ডলার ঋণ অনুমোদনের সময় আমি প্রথম আলোয় এক কলামে মন্তব্য করেছিলাম, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের ঋণ পাওয়া গেলেই মহা খুশিতে গদগদ হয়ে তা গ্রহণের যে বদখাসলত প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের সময় পরিলক্ষিত হতো, তা পরিহারের মানসিকতা আমাদের সরকারের নীতিপ্রণেতাদের গড়ে তুলতে হবে। কারণ, আমাদের অর্থনীতি পুরোনো দিনের খয়রাত-নির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান এখন এ দেশের জিডিপির ২ শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে। তথাকথিত ‘সফট লোনের’ নামে একগাদা অপমানজনক শর্তের জালে জাতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলার এই সাম্রাজ্যবাদী কৌশল বুঝে-শুনে হজম করার আর প্রয়োজন নেই।
আপাতবিচারে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ঋণের সুদের হার কম দেখিয়ে এগুলোকে ‘সফট লোন’ আখ্যা দেওয়া হলেও শর্তের বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় এগুলো প্রায়ই উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশের সরকারি নীতি গ্রহণের সার্বভৌমত্ব খর্বকারী হয়ে থাকে। দুঃখজনক হলো, আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের ঋণের শর্তগুলো সরকার কখনো জনগণকে জানায় না। কেন এই শর্তগুলো ‘স্টেট সিক্রেট’ হবে, জনগণকে তার কোনো ব্যাখ্যা প্রদানের প্রয়োজনীয়তা এ দেশের কোনো সরকারই উপলব্ধি করেনি। সংসদের কোনো সদস্য কোন ঋণের সঙ্গে কী কী শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, সংসদে তা জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কোনো দিন জানতে চেয়েছেন বলেও মনে পড়ে না। অথচ এটা জানার সাংবিধানিক অধিকার তাঁর রয়েছে। এমনকি স্বয়ং অর্থমন্ত্রীরাও চুক্তি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর্যায়ে সেগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ে দেখেন কি না, সে সন্দেহ খোদ অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যেই পরিলক্ষিত। তিনি বলেছেন, বর্তমান ইসিএফ ঋণের শর্ত মোতাবেক মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আইন সংস্কারের বিলম্বের যে অভিযোগ আইএমএফ বারবার তুলছে, তা ঋণের ‘কন্ডিশনালিটির’ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কথাটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আসলে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের সময় ব্যাপারটা হয়তো তাঁর চোখ এড়িয়ে গেছে। কারণ, আইএমএফ ঋণের শর্তের জাল বিস্তৃত হতে হতে সরকারের ভ্যাটনীতি সংস্কার পর্যন্ত যে পৌঁছে যেতে পারে, তা হয়তো তিনি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেননি। এখন বিষয়টি জানার পর তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলছেন, এটা তাদের ব্যাপার নয়। বাজেট সাপোর্ট হিসেবে গৃহীত ঋণের শর্তাবলি সরকারের যেকোনো কার্যক্রমেই আইএমএফের হস্তক্ষেপের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে—এটুকু অর্থমন্ত্রীর অজানা থাকার কথা নয়।
গত ২৫ নভেম্বরের পত্রপত্রিকার খবর, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনও এই ইসিএফ ঋণের শর্তপূরণ করতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ঋণের ‘কন্ডিশনালিটি’র বহর সুপরিকল্পিতভাবে ক্রমেই বিস্তৃত করা হচ্ছে ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর তাবৎ নীতি প্রণয়নকে এসব সংস্থার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার জন্য। অভ্যন্তরীণ ঋণবাজার থেকে ঋণ নিলে সুদের হার বেশি পড়বে, এটাই আমাদের অর্থমন্ত্রীদের বরাবরের যুক্তি। অপমানজনক শর্ত হজম করাটা হয়তো তাঁদের ধাতস্থ হয়ে গেছে!
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ঋণের তথাকথিত ‘সফট লোনের’ শর্তের বহর হু হু করে বাড়তে শুরু করেছিল গত শতাব্দীর সত্তর ও আশির দশক থেকে, যখন দু-দুটো তেলসংকটের অভিঘাত উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলো সুচতুরভাবে তেল আমদানিকারক উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাঁধে ন্যস্ত করে দেওয়ায় ওসব দেশ তাদের ব্যালান্স অব পেমেন্টসে লাগাতার ঘাটতির কারণে ঋণের জন্য এই দুটো সংস্থার কাছে ধরনা দিতে বাধ্য হয়েছিল। ঠিক ওই পর্যায়েই মুক্তবাজার অর্থনীতি, সাপ্লাই সাইড ইকোনমিকস, নিউ লিবারেলিজম—এ ধরনের হরেক কিসিমের নাম নিয়ে কট্টর দক্ষিণপন্থী পুঁজিবাদী মতাদর্শের ধ্বজাধারীরা ‘বাজার মৌলবাদ বা মার্কেট ফান্ডামেন্টালিজম’কে সারা বিশ্বের উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার জন্য যুদ্ধংদেহী তৎপরতা জোরদার করেছিল।
ষাট ও সত্তরের দশকের ভিয়েতনাম যুদ্ধ, গোল্ড ক্রাইসিস বা ডলার ক্রাইসিস, ১৯৭৩ সালের প্রথম তেলসংকট এবং ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় তেলসংকটের পরিপ্রেক্ষিতে পুঁজিবাদী বিশ্ব যখন যুগপৎ মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের সমস্যায় হাবুডুবু খেতে শুরু করেছিল, তখন ‘রাষ্ট্র ব্যর্থতা’ এবং কিন্সীয় সামগ্রিক চাহিদা ব্যবস্থাপনার অকার্যকারিতার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ওপর ভর করে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যানের নেতৃত্বে এই বাজার মৌলবাদী চিন্তাধারা শক্তিশালী হতে শুরু করেছিল। ১৯৭৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ, আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক এ ব্যাপারে একটা ত্রিপক্ষীয় সমঝোতায় উপনীত হয়েছিল, যেটাকে ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন উইলিয়ামসন ১৯৮৯ সালে ‘ওয়াশিংটন কনসেনসাস’ বলে অভিহিত করার পর একাডেমিক জগতে তা বহুল পরিচিতি অর্জন করেছে।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার ১৯৭৭ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর বাজার মৌলবাদী নীতি সংস্কার ব্রিটেনে একের পর এক প্রয়োগের ধারা জোরদার হয়, যে জন্য ওই দক্ষিণপন্থী র্যাডিকেল পরিবর্তনগুলোকে ‘থ্যাচারিজম’ নামে অভিহিত করা হতে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৮০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী রোনাল্ড রিগ্যান হুংকার তুললেন, ‘জনগণের কাঁধ থেকে সরকারের বোঝা নামাও’ (গেট দ্য গভর্নমেন্ট অব দ্য ব্যাক অব দ্য পিপল)। তাঁর পক্ষেÿ সমর্থনের জোয়ার উঠল নির্বাচনে, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট কার্টারকে হারিয়ে তিনি জিতে গেলেন। ১৯৮১ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত আট বছর প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন তাঁকে শিখণ্ডী হিসেবে সামনে রেখেই কখনো ‘সাপ্লাই সাইড ইকোনমিকস’ আবার কখনো ‘মুক্তবাজার অর্থনীতির’ ধুয়া তুলে এই কট্টর দক্ষিণপন্থী বাজার মৌলবাদীরা সারা বিশ্বে পুঁজিবাদের এই সর্বশেষ সংস্করণটি প্রতিষ্ঠা করার আগ্রাসন চালিয়ে গেছে। সে জন্য এই সংস্কারগুলোর আরেকটা নামও চালু হয়ে গেছে ‘রিগ্যানোমিকস’। অপর দিকে, ওই আশির দশকেই ধসে পড়েছে সমাজতন্ত্রের কথা বলে ‘রাষ্ট্রতন্ত্র’ (স্ট্যাটিজম) কায়েম করা পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো এবং ১৯৯১ সালে খোদ সোভিয়েত ইউনিয়ন। ফলে বিশ্ব পুঁজিবাদী-ব্যবস্থা ক্রমেই সারা বিশ্বের একক মতাদর্শিক ব্যবস্থা হওয়ার তোড়জোড় বেড়ে যায় নাটকীয়ভাবে। প্রাইভেটাইজেশন, ডিরেগুলেশন, লিবারেলাইজেশন এবং গ্লোবালাইজেশন—এই চারটি ডাইমেনশনে ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’ প্রতিষ্ঠা সব দেশের যাবতীয় অর্থনৈতিক সমস্যার ‘সর্বরোগহর ধন্বন্তরি সমাধানের’ মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়ে যায় আশির দশক থেকেই।
‘ওয়াশিংটন কনসেনসাস’-এর অন্তর্ভুক্ত নীতি সংস্কারগুলো ১৯৭৯ সাল থেকেই বাংলাদেশের ওপর নাজিল হতে শুরু করেছিল আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ঋণের ‘কন্ডিশনালিটির’ মাধ্যমে, যেগুলোকে আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে ‘কাঠামোগত বিন্যাস কর্মসূচি’ (স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম) বলে অভিহিত করা হচ্ছে। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের সরকার দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টসের মারাত্মক ঘাটতি মেটানোর জন্য আইএমএফের এক্সটেন্ডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি (ইএফএফ)-এর অধীনে একটা ঋণের জন্য আবেদন করায় ১৯৮০ সালে আইএমএফ বাংলাদেশকে ৮০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ মঞ্জুর করেছিল, সঙ্গে ছিল বিরাট একটা শর্তের তালিকা। শর্তগুলো এতই কঠিন ছিল যে জিয়াউর রহমানের সরকার ওই পর্যায়ে শর্তগুলো বাস্তবায়নে ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। তাই, শুধু প্রথম কিস্তির ২০ মিলিয়ন ডলার ছাড় করার পর আইএমএফ কুপিত হয়ে পুরো ঋণটাই বাতিল করে দিয়েছিল।
আমরা অনেকেই হয়তো ভুলে গেছি যে ওই ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে এ দেশের অর্থনীতির বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান-নির্ভরতা মারাত্মক বিপজ্জনক পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। অধ্যাপক রেহমান সোবহান তাঁর বিশ্বখ্যাত বই দ্য ক্রাইসিস অব এক্সটারনাল ডিপেনডেন্স-এর নবম পৃষ্ঠার সারণিতে দাবি করেছেন যে ওই বছর এ দেশের বৈদেশিক সাহায্যনির্ভরতা জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল। তাই আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দাতা সংস্থা ও দাতা দেশের দাদাগিরি দেখানোর সুযোগ যে ওই সময়ে তুঙ্গে ছিল, তা বোঝাই যায়। ১৯৮২ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ আমলে ‘নিউ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি’ প্রণয়নের মাধ্যমে ওই প্রেসক্রিপশনগুলো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া জোরদার করেছিল বাংলাদেশ। তারপর একে একে ১৯৮২-৮৫ পর্বের টিআইপি প্রকল্প, ১৯৮৬ সালের রিভাইজড ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি, ১৯৮৬-৮৭ অর্থবছরের আমদানি নীতি উদারীকরণ এবং ১৯৯০ সালে আইএমএফের পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক পেপার স্বাক্ষরের মাধ্যমে মুক্তবাজার অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার ডামাডোলে শরিক হয়ে গেছি আমরা। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ দেশে মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রেসক্রিপশনগুলো আরও জোরেশোরে বাস্তবায়নের ধারা সূচিত হয়। ১৯৯৬ সালে আাওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়ে ওই নির্বিচার উদারীকরণ ও বাজারীকরণের কিছুটা লাগাম টেনে ধরেছিল। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় ফিরে এসে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশন অনুসরণের পুরোনো ধারা চালু করে দেয় আবার।
২০০৮ সালে পুঁজিবাদী দেশগুলোতে ভয়াবহ মন্দাবস্থা শুরু হওয়ার পর বাজার মৌলবাদের জারিজুরি ফাঁস হতে শুরু করে। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ ই স্টিগলিৎজ ও পল ক্রুগম্যানের নেতৃত্বে দুই দশক ধরে বাজার মৌলবাদের বিরুদ্ধে যে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তা এখন ‘বাজার বনাম রাষ্ট্র’ বিতর্ককে ভুল প্রমাণ করে দিচ্ছে। কিন্তু আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশনে এখনো বাজার মৌলবাদের ভূত চেপে বসে রয়েছে। কিন্তু ২০০৯ সালে ক্ষমতাসীন সরকারের অর্থনৈতিক নীতিমালা তো এই পরিত্যক্ত দক্ষিণপন্থী মতাদর্শ দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কথা নয়। বিশেষত, সংবিধানে অন্যতম রাষ্ট্রনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার খবরটা কি প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর কাছে কোনো তাৎপর্য বহন করে না? নাকি সংবিধানে যা-ই থাক, তাঁরা মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রেমে মজে থাকবেন?

ড. মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি।

তালপট্টির নিচে ১০০ টিসিএফ গ্যাস! by বদরূল ইমাম

গত ৭ জুলাই আন্তর্জাতিক আদলত কর্তৃক বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সমুদ্রসীমানা বিরোধ নিষ্পত্তি মামলার রায় প্রকাশ হওয়ার পর বাংলাদেশে সমুদ্র বিজয় উৎসব বা সভা–শোরগোল হতে দেখা যায়নি, যেমনটি দেখা গিয়েছিল দুই বছর আগে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সমুদ্রসীমানা বিরোধ মামলার রায় প্রকাশ হওয়ার পর। সামগ্রিকভাবে সমুদ্রের জলসীমানা পাওয়া না-পাওয়ার বিষয়টি বাদ দিয়ে কেবল তেল-গ্যাস ব্লক বিবেচনায় আনলে এটি অনস্বীকার্য যে মিয়ানমারের সঙ্গে নতুন সীমানা নির্ধারণের ফলে বাংলাদেশের দাবিকৃত ছয়টি গভীর সমুদ্র ব্লক মিয়ানমারের হাতে চলে যায় এবং তার ফলে বাংলাদেশ ওই সমুদ্র এলাকা হারায়। বিষয়টি বিজয় উল্লাসের ডামাডোল ও শোরগোলে কেবলই ঢাকা পড়ে থাকে। তবে ভারতের সঙ্গে নতুন নির্ধারিত সমুদ্রসীমানায় তেল-গ্যাস ব্লক বিবেচনায় বাংলাদেশ প্রকৃতই বিজয়ী হয়। এখানে ভারতের দাবি করা কোনো গ্যাস ব্লকই বাংলাদেশের হাতছাড়া হয়নি। ভারতের সঙ্গে সীমানা নির্ধারণে প্রকৃতপক্ষে বিজয়ী হলেও এ নিয়ে বিজয় উৎসব বা সভা শোরগোল না করার সিদ্ধান্তটি সরকারি মহলের অধিকতর কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় হোক অথবা ভারতকে বিব্রত না করার মানসিকতাই হোক, বাংলাদেশের এই সংযত আচরণ কূটনৈতিক মহলে কিছুটা হলেও প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।

তবে এবার শোরগোল উঠেছে অপর এক বিষয়ে। ভারতের একটি সংবাদমাধ্যমের সূত্রে প্রচারিত একটি খবর এবার বিতর্ক আলোচনায় স্থান পায়। যে সংবাদটিকে কেন্দ্র করে নতুন এই বিতর্ক, তার সূত্র একটি ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল। ভারতের নয়াদিল্লি টেলিভিশন (এনডিটিভি) তার প্রচারিত একটি অনুষ্ঠানে দাবি করে যে তাদের কাছে সরকারি অভ্যন্তরীণ নথির সূত্রে খবর রয়েছে যে সাগরে নিমজ্জিত তালপট্টি দ্বীপটির স্থানে ভূগর্ভে ১০০ টিসিএফ গ্যাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এনডিটিভি এ তথ্য কোনো তেল কোম্পানি বা অনুসন্ধানী সংস্থার সূত্র থেকে জানা গেছে কি না, সে বিষয়ে কিছু জানায়নি। কেবল আবিষ্কারটি ২০০৬ সালে ঘটেছে বলে প্রচার করেছে।
১৯৭০ সালে প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের পর তালপট্টি দ্বীপটি সমুদ্র থেকে জেগে ওঠে। আর এর অবস্থানটি হলো ভারত–বাংলাদেশ সীমান্ত নদী হাড়িয়াভাঙ্গা যেখানে সাগরে এসে মিশেছে, ঠিক তার মুখে। বিগত প্রায় ৪০ বছর ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই সমুদ্র সীমানা নিয়ে যেমন পরস্পর বিরোধপূর্ণ অবস্থায় ছিল, তালপট্টি দ্বীপটি আবির্ভারের পর থেকে উভয় দেশই এটিকে তার নিজের বলে দাবি করে আসে। তালপট্টি দ্বীপটি ২০১০ সালে সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত হয়ে যায়। তবে আন্তর্জাতিক আদালত কর্তৃক সমুদ্রসীমানা বিরোধ মামলার রায় অনুযায়ী ওই দ্বীপের স্থানটি ভারতের অংশে পড়েছে। তাই বিতর্ককারীদের অভিমত এই যে তালপট্টির অস্তিত্ব না থাকলেও তার নিচে পাওয়া ১০০ টিসিএফ গ্যাস হাতছাড়া হওয়াটা বাংলাদেশের জন্য বিরাট বড় ক্ষতি।
কোনো এক স্থানে ১০০ টিসিএফ গ্যাস থাকা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তা বিশাল পরিমাণ। বাংলাদেশ বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় এক টিসিএফ গ্যাস ব্যবহার করে বা চাহিদা আছে এবং সে হিসাবে ১০০ টিসিএফ গ্যাস ১০০ বছরের জোগান। বাংলাদেশের গ্যাসের বর্তমান মজুত প্রায় ১২ টিসিএফ, ভারতের প্রায় ৫০ টিসিএফ (আলোচিত ১০০ টিসিএফ না ধরে), মিয়ানমারের ১০ টিসিএফ এবং পাকিস্তানের ২৫ টিসিএফ। সম্প্রতি মিয়ানমার সমুদ্রবক্ষে তিনটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হওয়ার পর থেকে তা পাওয়ার জন্য ভারত ও চীন যে প্রতিযোগিতা ও রাজনীতি কূটনীতির চাল চালে, তা লক্ষণীয়। আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়া সংবাদ সূত্রে জানা যায়, শেষ পর্যন্ত চীন ৩০ বছরের চুক্তির মাধ্যমে মিয়ানমারের এ গ্যাস কিনতে জয়ী হয়েছে। উল্লেখ্য, মিয়ানমারের ওই গ্যাস মজুতের পরিমাণ পাঁচ থেকে ছয় টিসিএফ। সম্প্রতি ভারতের অন্ধ্র প্রদেশে চেন্নাই উপকূলে প্রাপ্ত গ্যাসক্ষেত্রগুরলো ভারতের গ্যাস আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য হয়েছে। ভারত এই আবিষ্কারের পর তাকে ভারতের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বড় গ্যাস আবিষ্কার হিসেবে গণ্য করে, সামগ্রিকভাবে যার মোট পরিমাণ ২০ থেকে ২৫ টিসিএফ বলে দাবি করা হয়। উপরিউক্ত তথ্যগুলো থেকে এটি স্পষ্টতই অনুধাবন করা যায় যে, কোনো একটি স্থানে ১০০ টিসিএস মজুতের সন্ধান এককভাবেই আলোচনার দাবিদার।
কোনো এলাকায় তেল-গ্যাস আবিষ্কৃত হলে, কোন তেল কোম্পানি (বা কোম্পানি গোষ্ঠী) এটি আবিষ্কার করেছে, কারাই-বা সেখানে প্রাথমিক ও চূড়ান্ত জরিপ করল, কত বছর যাবৎ কোম্পানিটি জরিপকাজ চালিয়েছে, কত গভীরতায়, কোন ভূতাত্ত্বিক গঠনে গ্যাসের অবস্থানটি নিশ্চিত করা গেল ইত্যাদি তথ্য বিশ্বের নানাবিধ পেট্রোলিয়াম মনিটরিং এজেন্সির মাধ্যমে তৎক্ষণাৎ জানা যায়। কেবল তা-ই নয়, ছোট বা বড় আবিষ্কারের পরপরই আবিষ্কারক নিজের স্বার্থে তার আবিষ্কারকে পারলে আরও বড় করে সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরতে চায়, যাতে শেয়ারবাজারে তার মূল্য বৃদ্ধি পায় বা সে আরও সুযোগ্য বলে নিজেকে প্রমাণ করতে পারে। গ্যাস আবিষ্কার কোনো সামরিক কর্মকাণ্ড নয়, তাই পৃথিবীর কোথাও এটি গোপনে করা হয় না; অধিকন্তু খোলা আকাশের নিচে অনুসন্ধানের বিশাল কর্মযজ্ঞ গোপনে করাও যায় না। ভারতীয় টিভি চ্যানেল এনডিটিভি ১০০ টিসিএফ গ্যাসের ব্যাপারে এ বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি।
বিশ্বের আন্তর্জাতিক পেট্রোলিয়াম কার্যক্রম মনিটরিং এজেন্সিগুলোর সূত্রে তালপট্টির নিচে গ্যাস আবিষ্কার বা অনুসন্ধান কার্যক্রমের কোনো খবর পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ-ভারত বিতর্কিত সীমান্তে তালপট্টিতে বড় আকারের গ্যাস অনুসন্ধান খনন ও আবিষ্কার বাংলাদেশে দৃশ্যমান হবে তা নিশ্চিত; কিন্তু এ ধরনের কোনো কার্যকলাপ কখনো লক্ষ করা যায়নি। সর্বোপরি, ভারতের পেট্রোলিয়াম মিনিস্ট্রির অধীনে তেল-গ্যাস ব্যবস্থাপনা, পর্যবেক্ষণ ও নথিভুক্তকরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ডাইরেক্টর জেনারেল অব হাইড্রোকার্বনের সমূহ রেকর্ডে (ওয়েবসাইটেও প্রকাশিত) তালপট্টি এলাকায় কোনো গ্যাস অনুসন্ধান খনন বা আবিষ্কারের তথ্য নেই। উল্লেখ্য, সংস্থাটি ভারতের যেকোনো স্থানে যেকোনো গ্যাস-তেল অনুসন্ধান ও আবিষ্কারের তথ্য নথিভুক্ত করে প্রকাশ করে। অর্থাৎ, এনডিটিভি সূত্রে প্রচারিত তালপট্টি ১০০ টিসিএফ গ্যাসের খবরের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা দৃশ্যমান সূত্র নেই। তথাপি, তর্কের খাতিরে এর সত্যতা গ্রহণ করলেও প্রশ্ন ওঠে যে ভারত যেখানে তীব্র গ্যাস চাহিদা সামলাতে অস্থির এবং তারা যখন বাংলাদেশ বা মিয়ানমারের গ্যাস আমদানি করতে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, সে অবস্থায় তালপট্টিতে ২০০৬ সালে আবিষ্কৃত এত বিশাল গ্যাস মজুতের উত্তোলন ও সরবরাহ করে গ্যাস-সংকট কাটায় না কেন? এর কারণ কি এই যে গ্যাস আবিষ্কারের এই সংবাদ বাস্তবতাবর্জিত।
এখন আরেকটি বিষয় আলোচনায় আনা যেতে পারে। তালপট্টি বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গব্যাপী বিস্তৃত একটি ভূতাত্ত্বিক বেসিনের (যার নাম বেঙ্গল বেসিন) পশ্চিম অংশে অবস্থিত। এই বেসিনে বিগত ৫০ বছরে অনেক অনুসন্ধান কূপ খননের মাধ্যমে এর বিভিন্ন অংশে গ্যাস-তেল পাওয়া ও পাওয়ার সম্ভাবনার তুলনামূলক ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় যে বেসিনের পূর্বাংশই (কুমিল্লা-চট্টগ্রাম ও তার সংলগ্ন সমুদ্র জলসীমা) অধিকতর গ্যাস সম্ভাবনাময় ও এখানেই অধিকাংশ বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। পক্ষান্তরে এই বেসিনের পশ্চিমাংশে (বাংলাদেশের পশ্চিম অঞ্চল ও সমুদ্রসীমা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও তার সমুদ্রসীমা অপেক্ষাকৃত কম সম্ভাবনাময়। প্রকৃতপক্ষে এই পশ্চিমাংশে (ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ) এখন পর্যন্ত একটি গ্যাসক্ষেত্রও আবিষ্কৃত হয়নি। তাই এই পশ্চিমাংশের একটি স্থানে ১০০ টিসিএফ গ্যাস থাকা অস্বাভাবিক ও তা ইতিমধ্যে জ্ঞাত ভূতাত্ত্বিক গঠন ও বিন্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, তালপট্টির ১০০ টিসিএফ গ্যাস আবিষ্কারের প্রচার কি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত? যদি তা-ই হয়, তবে কারা বা কী উদ্দেেশ্য এটি করা হয়েছে? ভারত–বাংলাদেশ সমুদ্রসীমানা বিরোধ মামলার রায়ে ভারত সমুদ্র এলাকার যে দাবি করেছিল, তা অর্জন করতে প্রায় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকার মধ্যে প্রায় ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার পেয়েছে বাংলাদেশ, যা কিনা মোট আয়তনের পাঁচ ভাগের চার ভাগ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জয় ও ভারতের পরাজয়কে ভারতীয় কূটনীতিকেরা হাসিমুখে মেনে নিলেও জনগণের কাছে ভারত সরকারের দায়বদ্ধতা কমে যায়নি, বরং এটি ভারত সরকারের ওপর ভেতর থেকে চাপ হিসেবেই বিদ্যমান বয়েছে। আর এ চাপ লাঘব করতে জনগণকে কোনো বিকল্প পন্থায় আশ্বস্ত করা প্রয়োজন। তাই তালপট্টি দ্বীপ নিমজ্জিত হলেও ওই স্থান ভারতের পক্ষে পাওয়ার ফলে ১০০ টিসিএফ গ্যাস তো ভারতের পাওনা হলো—এ ধরনের প্রচারণা দিয়ে কি ভারত সরকার তার জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাইছে? কূটনৈতিক শাস্ত্রমতে এ সম্ভাবনা যতটা না সত্য বলে মনে হতে পারে, গ্যাস ভূবিজ্ঞানের সূত্রে তা অধিকতর সত্য প্রতীয়মান হয়।

ড. বদরূল ইমাম: অধ্যাপক, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

কিসের নির্বাচন খুনি জিয়ার দলকে ক্ষমতায় আনার জন্য -নিউ ইয়র্কে সাংবাদিকদের হাসিনা

মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা সম্পূর্ণরূপে নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার সরকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবছে কিনা- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে কিছুটা রাগান্বিত ভঙ্গিতে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, কিসের জন্য মধ্যবর্তী নির্বাচন? খুনি জিয়ার দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য? যারা নির্বাচনে অংশ নেয়নি, তাদের সঙ্গে কোন সংলাপ হবে না বলেও সাফ জানিয়ে দেন তিনি। শুক্রবার নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশ মিশনে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা প্রবাসী সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা তুলছেন কেন? আপনারা কি আবার ছেঁচা খেতে চান? অগণতান্ত্রিক শক্তিকে ক্ষমতায় আনতে চান? সে সব হবে না, দেশ চলবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. এ কে আবদুল মোমেন প্রমুখ।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে যোগদানের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে নিউ ইয়র্ক সফর করছেন। নিউ ইয়র্কের স্থানীয় সময় শনিবার সকাল ১০টায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তৃতা করবেন তিনি। অন্যদিকে একই দিন ম্যানহাটনের সেন্ট্রাল পার্কে অনুষ্ঠেয় গ্লোবাল সিটিজেনস ফেস্টিভ্যালে শেখ হাসিনা অংশ নেবেন না বলে জানানো হয়েছে। তবে হঠাৎ কি কারণে তার এ কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে, সে ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। অথচ কিছুদিন ধরে সরকারের পক্ষ থেকে বেশ ঘটা করেই প্রচার চালানো হয়েছিল, দারিদ্র্য বিমোচন সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দেবেন।
দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে অর্থবহ সংলাপের জন্য জাতিসংঘের অব্যাহত তাগিদের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা তো সংসদের বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপ করছিই। পার্লামেন্টারি রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিরোধী দলের সঙ্গেই সংলাপ হয়, অন্য কারও সঙ্গে নয়। কেউ ভুল করে থাকলে ভুলের খেসারত তাকেই দিতে হবে। তাদের ভুলের খেসারত আমরা দিতে যাবো কেন?
বেশির ভাগ আসনে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ না থাকায় ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে টিভি টকশোতে কেউ কেউ মন্তব্য করছেন- এমন প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেউ ভোট দিতে না গেলে এটা তার ব্যর্থতা। আসলে অসাংবিধানিক সরকার ক্ষমতায় এলে এক ধরনের লোকের গুরুত্ব বাড়ে। তারা চেয়ার পায়। পয়সাপাতি কামানোরও সুযোগ পায়। এ জন্য তারা সব সময় অগণতান্ত্রিক সরকারের জন্য অপেক্ষা করে। কিন্তু অগণতান্ত্রিক সরকার তো হাইকোর্ট বাতিল করে দিয়েছে। জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখল হাইকোর্টে অবৈধ হয়ে গেছে। জিয়াই তো এ দেশে সব অপকর্মের মূল। ’৫৮ সালে আইয়ুব যা করেছে ৭৫-৭৬-এ জিয়া তাই করেছে। জিয়া জামায়াতকে রাজনীতির সুযোগ করে দিয়েছে। পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে যারা চলে গিয়েছিল তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে রাজনীতির সুযোগ দিয়েছে জিয়া।
টকশোর আলোচকদের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের মন্ত্রী হওয়ার খায়েশ থাকলে তারা নির্বাচনে আসেন না কেন? তাদের জায়গা তো বেসরকারি টেলিভিশন। কিন্তু তারা একবারও ভেবে দেখে না বেসরকারি টিভি কে দিয়েছে। আমিই আগেরবার ক্ষমতায় থাকতে বেসরকারি টিভি দিয়েছি। আমার সরকার খারাপ হলে তাদের উচিত বেসরকারি টিভি বর্জন করা। আবার এখন আমি বিদ্যুৎ দিয়েছি। সেই বিদ্যুৎ খরচ করে তারা টকশোতে কথা বলে। আমরা যদি এতই খারাপ তাহলে আমার দেয়া বিদ্যুৎ ব্যবহার না করলেই হয়। তিনি বলেন, আমরা সেবা করতে এসেছি। আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতন। পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্ব ব্যাংক টাকা বন্ধ করে দেয়। আমি চ্যালেঞ্জ দিলাম সেখানে কোন দুর্নীতি হয়নি। এখন সেটা প্রমাণ হয়েছে।
‘জনগণের রোষানল থেকে বাঁচতে হলে শেখ হাসিনাকে ভিসা রেডি করে রাখতে হবে’- খালেদা জিয়ার এমন মন্তব্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি কেন ভিসা রেডি রাখবো? আমার জন্ম তো এ দেশেই, একদম টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। আর তিনি তো এসেছেন ভারতের শিলিগুড়ি চা বাগান থেকে, তার জন্ম সেখানে। কাউকে যদি ভিসা নিয়ে যেতে হয় তো খালেদা জিয়াকেই যেতে হবে। তিনি তো পোঁটলা বেঁধে সব সময় রেডিই থাকেন। জরুরি অবস্থার সময় তাকে যখন দেশ থেকে বের করে দেয়ার চেষ্টা চলেছে, আমি তখন এ যুক্তরাষ্ট্র থেকেই তার প্রতিবাদ করেছি। একমাত্র আমি তার দেশত্যাগের বিরোধিতা করেছি। তিনি তো প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। শুধু শর্ত দিয়েছিলেন, তার দুই ছেলেকেও যেতে দিতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নত হচ্ছে। প্রবাসীরা এখন ভাল কথা শোনেন। নেগেটিভ কথা শোনেন না। আমরা শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছি। এসএসসিতে ৯২ ভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে। যাতে ৯৮ ভাগ পাস করতে পারে আমি সে নির্দেশনা দিয়েছি। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা সমস্যারও সমাধান করেছি। সব সম্পদ কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করেছি। ভারতের সঙ্গে ল্যান্ড বাউন্ডারি সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি। ফেনীতে ৬৫ একর জমি উদ্ধার করেছি। জিয়া, এরশাদ ও মিসেস জেনারেল ক্ষমতায় ছিলেন। কেউ তো এ সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসেননি। আমরা এখন পানি সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছি। পানি রিজার্ভ করার চিন্তা করছি। এ জন্য নদীতে ক্যাপিটাল ও মেইনটেনেন্স ড্রেজিং করবো।
জাতিসংঘের ৬৯তম সাধারণ অধিবেশনে অংশ নিতে গত ২২শে সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্ক সফরে আসেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সফরকালে এ পর্যন্ত তিনি নরওয়ে, বেলারুশ ও নেপালের প্রধানমন্ত্রী এবং কমনওয়েলথ মহাসচিবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন। গত ২৩শে সেপ্টেম্বর জলবায়ু বিষয়ক এক সেমিনারে অংশ নেন তিনি। এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান ও ইউরোপীয় কয়েকটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা অংশ নেন। একই দিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামার আমন্ত্রণে বিশ্বনেতাদের এক নৈশভোজে যোগ দেন শেখ হাসিনা। গত শুক্রবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন তিনি। আজ শনিবার ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কথা রয়েছে।
যুদ্ধমুক্ত বিশ্ব গড়ার আহ্বান: বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ ও সংঘাত বন্ধে মুখ্য ভূমিকা  নেয়ার জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে শুক্রবার নিউ ইয়র্কে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুনের উপস্থিতিতে দেয়া বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও সংঘাত বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আমি বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানাই। আমার প্রত্যাশা যুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘ মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। আসুন আমরা যুদ্ধকে নাকচ করি এবং শান্তির জন্য কাজ করি। যুদ্ধমুক্ত বিশ্ব গড়তে বাংলাদেশ সবার সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, জাতিসংঘ ও বাংলাদেশের একটি অভিন্ন লক্ষ্য রয়েছে। আর তা হলো জনগণের ক্ষমতায়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিশ্বকে নিরাপদ করা। এ সময় জাতিসংঘে বাংলাদেশের আগামী দিনের কর্মকাণ্ডের একটি রূপরেখা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগামী দিনগুলোতেও আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নে কাজ করার প্রতিশ্রুতিতে বাংলাদেশ অবিচল থাকবে। “বিপদাপন্ন বেসামরিকদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নেতৃত্বশীল ভূমিকা পালন করে যাবো আমরা। যুদ্ধ, সংঘাত ও সশস্ত্র সহিংতার ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে জাতিসংঘের সক্ষমতা বাড়াতে সদস্য  দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করতে আমরা বদ্ধপরিকর।” জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ এজেন্ডা বাস্তবায়নে সামনের কাতারে  থেকে কাজ করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। পাশাপাশি তিনি বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াই এবং সহিংস উগ্রপন্থা, মানব-মাদক ও বন্যপ্রাণী পাচারের বিরুদ্ধে কাজ করে যাওয়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যৌন নিপীড়ন ও গণহত্যার মতো অপরাধের বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরও কঠোর হওয়ার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সঙ্গে কাজ করতে বাংলাদেশ সর্বদাই প্রস্তুত রয়েছে। বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন রোধ, অটিস্টিকদের সহায়তাসহ সমাজে বিরাজমান নানা সমস্যা এবং এ থেকে উত্তরণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। এসব ক্ষেত্রে সব দেশকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ওপর আরও জোর দেয়ার পাশাপাশি ২০১৫ সাল পরবর্তী উন্নয়ন রূপরেখায় অর্জনযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণে মতৈক্য গড়তে কাজ করার ঘোষণা দেন। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক অভিবাসন, সমুদ্র সম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সুবিধা আদায়ে জাতিসংঘের সঙ্গে কাজ করার ঘোষণাও এসেছে। ১৯৭৪ সালের ২৪শে  সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে সম্পৃক্ত হওয়ার ৫০ বছর পূর্তির আগে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নে জাতিসংঘ ও সদস্য  দেশগুলোকে পাশে থাকার আহ্বান জানান। এ সময় স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সমর্থনের সন্ধানে থাকা বাংলাদেশের জাতিসংঘের সদস্যপদ অর্জনে সহায়তার জন্য ভারত ও রুশ ফেডারেশনের কথাও স্মরণ করেন তিনি। “এ দুটি দেশই ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছে এবং জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্যপদ লাভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।” এছাড়া, বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর জন্য যুক্তরাজ্য ও জার্মানিসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করেন শেখ হাসিনা।
শান্তিরক্ষায় নেতৃত্ব দিতে সক্ষম বাংলাদেশ: ওদিকে শুক্রবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে শান্তি সম্মেলনে  দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জাতিসংঘের  কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এবং বিভিন্ন শান্তি মিশনে  নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। ওই শান্তি সম্মেলনের কো-চেয়ার হিসেবে দেয়া বক্তৃতায় বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘকে দেয়া বাংলাদেশের সহযোগিতা অব্যাহত রাখারও ঘোষণা  দেন শেখ হাসিনা। শান্তিরক্ষার পথে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ দেখা দিচ্ছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী এবং জাতিসংঘের জন্যই এটি এখন অনেক বেশি জটিল এবং বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। নতুন এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শান্তিরক্ষী বাহিনীতে কর্মরত সৈন্য ও পুলিশ সদস্যদের ব্যয়বহুল ও সমন্বিত প্রশিক্ষণের দরকার। যে কোন জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে দ্রুততার সঙ্গে শান্তিরক্ষী মোতায়েন করে বাংলাদেশ এ কাজে নির্ভরযোগ্য একটি দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বে শান্তিরক্ষায় পরীক্ষিত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এক্ষেত্রে বিভিন্ন  দেশের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। সহযোগীদের সঙ্গে মিলে শান্তিরক্ষীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও দক্ষ করে গড়ে তুলতেও আগ্রহী। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের যে কোন স্থানে স্বল্প সময়ের  নোটিশে তার আকাশ শক্তি, হেলিকপ্টার, যুদ্ধবিমান মোতায়েনের পাশাপাশি প্রকৌশলী, চিকিৎসক দল, নৌসেনা ও কর্মী মোতায়েনে সক্ষম বলে জানান শেখ হাসিনা। এছাড়াও জাতিসংঘ সদর দপ্তর ও এর মাঠ পর্যায়ের মিশনে নেতৃত্ব দিতে বাংলাদেশ আগ্রহী জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা আফ্রিকান পিসকিপিং র‌্যাপিড রেসপন্স পার্টনারশিপসহ বিভিন্ন মিশনে শান্তিরক্ষীদের জন্য সরঞ্জাম এবং সেবা সরবরাহ কাজের অংশ হতে চাই। শান্তিরক্ষীদের, বিশেষ করে নারীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে দক্ষ করে তুলতে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট ফর পিস সাপোর্ট অপারেশন্স অ্যান্ড ট্রেনিং (বিপসট)-কে বিশ্বমানে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি তার বক্তৃতায় বিভিন্ন সময় শান্তি মিশনে নিহত ১১৯ জন বাংলাদেশীর কথা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন।
বাংলাদেশ ও প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা: বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি-মুন। শুক্রবার নিউ ইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল ‘তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে খাদ্য উদ্বৃত্তের  দেশে পরিণত হয়েছে’ বলে প্রশংসা করেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের ৪০ বছরপূর্তি উপলক্ষে নিউ ইয়র্কস্থ সদর দপ্তরে ওই অনুষ্ঠান হয়। সেখানে শেখ হাসিনার প্রশংসা করা ছাড়াও বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী বাহিনীর অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেন মুন। অনুষ্ঠানে নবীন কূটনীতিক হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন এসাইমেন্টে দায়িত্ব পালনের অতীত অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন জাতিসংঘ মহাসচিব। অনুষ্ঠানে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এক সময় বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে সাহায্য চাইতো। এখন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সমস্যা সমাধানে আমরা বাংলাদেশের সহযোগিতা চাই। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার আশা প্রকাশ করে নিশা দেশাই বিসওয়াল বলেন, “এটা শুধু সরকারের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক না। জনগণের সঙ্গে জনগণের, নাগরিকের সঙ্গে নাগরিকের এবং বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর সম্পর্ক।” অনুষ্ঠানে রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্র মন্ত্রী জেনাদি গাতিলভ বাংলাদেশের সঙ্গে তার দেশের গভীর সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। অনুষ্ঠানে মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশের প্রশংসা করেন ইউএনডিপির প্রশাসক হেলেন ক্লার্ক। ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা  বোকোভা বলেন, ৪০ বছর আগে বাংলাদেশের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষণ রেখেছিলেন- মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে। আজ নারী ও শিশু শিক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রশংসনীয়। যুক্তরাষ্ট্রে বৃটিশ রাষ্ট্রদূত পিটার ওয়েস্টমেকট এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিনোদ কুমার অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ‘বাংলাদেশ ফরটি ইয়ারস্‌ ইন ইউনাইটেড  নেশনস্‌’ নামে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন শেখ হাসিনা।
সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে জিরো টলারেন্স
সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থা নির্মূলে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সকল ধর্মের মানুষের স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের প্রতি সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। গতকাল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৯তম অধিবেশনে দেয়া এক ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সন্ত্রাসবাদ এবং চরমপন্থা বিশ্বশান্তি ও উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায় উল্লেখ করে তিনি বলেন,  আমার সরকার সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ, সহিংস চরমপন্থা, উগ্রবাদ এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রতি জিরো টলারেন্স নীতিতে বিশ্বাসী। এসময় প্রতিবেশী বা অন্যদের বিরুদ্ধে যে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী কার্যক্রমে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে না দেয়ার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন তিনি। দেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি রাষ্ট্রের প্রগতিশীল এবং উদার চরিত্রকে নস্যাৎ করতে সদা তৎপর রয়েছে এমন অভিযোগ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা সুযোগ পেলেই ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং সহিংসতা ছড়িয়ে দেয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে ২০০১-০৬ পর্যন্ত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বোমা ও গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে অসংখ্য উদার রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যা করেছে।’ ওই হামলাগুলো তাকে দেশ থেকে সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে আরও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত তিন বছরে আমরা সংশোধিত সন্ত্রাস বিরোধী আইন ২০১৩ এবং অর্থ পাচার আইন ২০১২-সহ সর্বোচ্চ সন্ত্রাস বিরোধী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।  শাসন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তার সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ কারণে নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য কমিশনকে শক্তিশালী করেছে সরকার। তার সরকার শান্তি ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখা এবং দণ্ড-অব্যাহতির সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একাত্তরে যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। অত্যন্ত স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে গঠিত স্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর বিচারকাজ সম্পন্ন করেছে দাবি করে তিনি জনগণের দীর্ঘদিনের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতি আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের পূর্ণ সমর্থন প্রত্যাশা কামনা করেন। বাংলাদেশ বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের বৈধ রক্ষক হিসেবে জাতিসংঘের ভূমিকার প্রতি দৃঢ়ভাবে আস্থাশীল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শান্তির পক্ষে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সর্বোচ্চ সৈন্য ও পুলিশ সদস্য প্রেরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের অবস্থান আবারও সুদৃঢ় হয়েছে। এ পর্যন্ত আমরা ৫৪টি মিশনে ১ লাখ ২৮ হাজার ১৩৩ জন শান্তিরক্ষী প্রেরণ করেছি। এছাড়া শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ সংখ্যক মহিলা পুলিশ প্রেরণ করেছে। স্থায়ী শান্তি এবং নিরাপত্তা ব্যতিত আমরা টেকসই উন্নয়ন অর্জন সম্ভব নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক উন্নয়নে অস্থিতিশীল বৈশ্বিক নিরাপত্তা অবস্থা এখনও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ বিশ্বাস করে, বিশ্বের যেকোন স্থানে শান্তি বিঘ্নিত হলে তা গোটা মানবজাতির জন্য হুমকিস্বরূপ। আমাদের নীতিগত অবস্থানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমরা ফিলিস্তিনি জনগণের আত্ম-নিয়ন্ত্রণ অধিকারের বৈধ সংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সংহতি ঘোষণা করছি। তিনি সমপ্রতি গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী কর্তৃক ফিলিস্তিনি নারী ও শিশুসহ শত শত সাধারণ নাগরিক হত্যার তীব্র নিন্দা জানান। এবং ১৯৬৭-পূর্ব সীমানার ভিত্তিতে আল কুদস আল শরীফ-কে রাজধানী করে একটি স্বাধীন এবং স্থায়ী ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে আমরা এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের টেকসই সমাধান প্রত্যাশা করেন।

ব্যালট ও গণতন্ত্রের শক্তি by আলী ইদরিস

প্রবাদ আছে অসির চেয়ে মসি বড়। অর্থাৎ তলোয়ারের চেয়ে কলম শক্তিশালী। কিন্তু এখন তলোয়ারের যুগ নেই, তলোয়ারের জায়গা দখল করেছে বুলেট ও কামান। এখন তাই বলা যায় বুলেট ও কামানের চেয়ে কলম শক্তিশালী। কিন্তু কলমের চেয়েও শক্তিশালী ব্যালট ও গণতন্ত্র। কামান বা বোমা সরবে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে জীবন হরণ ও জনপদ ধ্বংস করে, আর গণতন্ত্র নীরবে, নিভৃতে একটি শক্তিশালী সরকার, দল, গোষ্ঠী বা সাম্রাজ্যকে ভূপাতিত করে দেয়। ব্যালটের শক্তি যে কতটা কার্যকরী যুক্তরাজ্যের সামপ্রতিক গণভোট তা প্রমাণ করে। ৩০৭ বছর যুক্তরাজ্যের অধীনে থেকে স্কটল্যান্ডের অধিবাসীরা স্বাধীনতা লাভ করতে চেয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতা লাভ করাটা সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছা কিনা তা প্রমাণ করতে ব্যালটের মাধ্যমে গণভোটের ব্যবস্থা করা হয়। গণভোটের ৫৫% স্বাধীনতা লাভের বিপক্ষে ভোট দেয় বলে স্কটল্যান্ড যুক্তরাজ্য থেকে পৃথক হতে পারেনি। এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ইচ্ছা পূরণ হয়েছে, সংখ্যালঘিষ্ঠের ইচ্ছা পূরণ হয়নি, কিন্তু গণতন্ত্র তার পূর্ণ শক্তি ও মর্যাদা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। স্বাধীনতা দাবির পক্ষ ও বিপক্ষের জনগণ মুখোমুখি হয়ে প্রকাশ্যে রাজপথে হাঁ ও না ভোটের প্রচার চালিয়েছেন, কিন্তু কোথাও কোন তর্ক-বিতর্ক বা সংঘাত-মারামারি হয়নি। স্কটল্যান্ডবাসী এবং যুক্তরাজ্য সরকার ব্যালটের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে সসম্মানে সুরক্ষা করেছে। যুক্তরাজ্য ইচ্ছা করলে অনেক রকম কূটকৌশল বা শক্তি প্রয়োগ করে এ গণভোট বিলম্বিত বা বন্ধ করে দিতে পারতো, কিন্তু গণতন্ত্রের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধার জন্যই তারা তা করে নি। কয়েক মাস আগে পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে জাতীয় নির্বাচন হয়ে গেল। সেখানে জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৫ বছর একনাগাড়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে ৩০ বছরের ব্যবধানে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিজেপিকে ব্যালটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতায় বসালো। ১২৭ কোটি লোকের দেশে নির্বাচন কর্মযজ্ঞ যে কত বিশাল এবং কঠিন সেটা অকল্পনীয়। ৮১.৪ কোটি ভোটার ৯ দফায়, ৯ দিনে, ৯ লাখ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে তাদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। ৩৭ দিন যাবৎ ৯ লাখ নির্বাচন কেন্দ্রে ভোট গণনা করা হয়। ৫০০টি রাজনৈতিক দলের প্রায় ১৫ হাজার প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। বিশাল দেশে বিশাল নির্বাচন কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন, যে কমিশনকে প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগের বিরুদ্ধে প্রশাসন বিন্দুমাত্র প্রভাব খাটায় নি এবং কমিশনও সরকারি দলের ধামাধরা কর্ম করে নিজেদের পক্ষপাতিত্ব প্রমাণ করে নি। সমগ্র প্রশাসন নির্বাচনের সময় তাদের অধীনে কাজ করেছে। বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ সহযোগী অমিত শাহ এক জনসভায় কংগ্রেস দলের বিরুদ্ধে ‘‘বদলা” নিতে তার পার্টিকে ভোট দেয়ার আহ্বান জানালে নির্বাচন কমিশনের আদেশে জেলা প্রশাসন তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এতেই বোঝা যায় ভারতের নির্বাচন কমিশন তাদের ক্ষমতা প্রয়োগে কত আন্তরিক এবং তৎপর। এমন একটি পড়শি, খাঁটি গণতান্ত্রিক দেশ থেকে আমরা কতটুকু শিক্ষা গ্রহণ করতে পেরেছি। কোন শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি নি বলেই এ দেশের নির্বাচনের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স জাল ভোটে ভরে যায়, অথবা ভোটের দিনে নির্বাচন কর্মকর্তারাই জাল ভোট দেয়, ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয় ইত্যাদি। স্বৈরাচারী এরশাদ দীর্ঘ নয় বছর গণতন্ত্রকে ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিল। এরশাদ সরকারের পতনের পর এ দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ ভোটাধিকার ফিরে পায়। অতঃপর পাঁচ বার জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, এ সমস্ত নির্বাচনে যে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, স্বচ্ছতা পাওয়া গিয়েছিল। ৫ই জানয়ারির এবং উপজেলা নির্বাচনের অরাজকতা অতীতের সব গৌরব বিনষ্ট করে দিয়েছে। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার পথে নির্বাচনের পবিত্র ভূমিকা ৫ই জানুয়ারিতে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। প্রতিবেশী বৃহৎ শক্তি ও পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ ভারত থেকে গণতন্ত্র ও নির্বাচন পদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে। ভারতের নির্বাচন পদ্ধতি অনুসরণ করলে উপজেলা নির্বাচনে এত অনিয়ম হতো না। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আর একটি শান্তিপূর্ণ, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন পদ্ধতি এবং ভোটগ্রহণের ব্যবস্থাপনা পৃথিবীর মধ্যে আর একটি অনন্য উদাহরণ। গণতন্ত্রের প্রথম এবং মূলভিত্তি নির্বাচন হলেও গণতন্ত্রকে লালন করার জন্য আরও বহুবিধ আচরণ দরকার। সুষ্ঠুভাবে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সরকারের তথা নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব। এ উদ্দেশ্যেই সংবিধানের আলোকে নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেয়া হয়। নির্বাচন পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগ নির্বাচন কমিশনের প্রধান নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও নির্দলীয়। নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রের নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। একটি গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এ দু’টি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে যথাযথ ক্ষমতা, স্বাধীনতা ও সুবিধা দিলে সে দেশের গণতান্ত্রিক, সুশাসনিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি কেউ রুখতে পারে না। নির্বাচন কমিশন, দুদক, বিচার বিভাগ ইত্যাদি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো জনমানুষের শেষ আশা-ভরসা ও আশ্রয়স্থল। এগুলো দলীয়করণ বা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকে না। ৫ই জানুয়ারির ব্যালটবিহীন, ভোটারবিহীন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন একতরফা নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রতি অবমাননা। ব্যালটের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে সত্যিকারের মর্যাদা দিলেই সে টিকে থাকবে, নতুবা ভোটাধিকার হরণ করা ভোটারগণ একদিন না একদিন গণতন্ত্রকে বাঁচানোর জন্য বিদ্রোহ করতে পারে।