Monday, May 25, 2015

জ্যোতির্বিজ্ঞানী এ আর খান আর নেই

দেশে বিজ্ঞানচর্চার প্রসারের অন্যতম পথিকৃৎ ও বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. আনোয়ারুর রহমান খান (এ আর খান) আর নেই। আজ সোমবার বাংলাদেশ সময় ভোর পাঁচটার দিকে যুক্তরাজ্যের সেন্ট মেরি হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
এ আর খানের পরিবারের সূত্রে জানা গেছে, ছোট মেয়ে নিশাত শরীফকে দেখতে গত ৯ মে লন্ডনে এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক। গত ২১ মে তিনি লন্ডনের একটি পাতাল রেলওয়ে স্টেশনে মাথা ঘুরে পড়ে যান। তারপর থেকেই তিনি লন্ডনের পেডিংটনের সেন্ট মেরিস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বাবার দুর্ঘটনার খবর পেয়ে বড় মেয়ে ইরফাত খান শনিবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে লন্ডনে এসেছেন।
এ আর খানের ছোট মেয়ে নিশাত শরীফ প্রথম আলোকে জানান, গত ২১ মে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাঁর বাবাকে নিয়ে লন্ডনের সাইথ ব্যাংকে একটি অনুষ্ঠান দেখতে গিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে সাইথ ব্যাংক থেকে এমবেঙ্কমেন্ট স্টেশনে এসে তাঁরা অন্য একটি ট্রেনে উঠতে যাচ্ছিলেন। তখন প্রায় রাত পৌনে এগারোটা রাজে। এ সময় কিছুটা পেছনে থাকা নিশাত দেখেন, তাঁর বাবা ট্রেনে উঠতে গিয়ে পেছনের দিকে পড়ে গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্সযোগে তাঁকে নিকটস্থ পেডিংটনের সেন্ট মেরিস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। মস্তিষ্কে প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার লন্ডনের স্থানীয় সময় রাত ১১টা ৫০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় ভোর পাঁচটা) তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
নিশাত শরীফ জানান, আগামী শুক্রবার সাউথ হলের সেন্ট্রাল জামে মসজিদে জুম্মার নামাজের পর এ আর খানের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। লন্ডনের পাওয়ার মিল লেন কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।
নিশাত শরীফ জানান, বড় মেয়ে ইরফাত খানকে দেখতে ১০ জুন থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত তাঁর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে থাকার কথা ছিল। সেখান থেকে আবার লন্ডন হয়ে ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ফেরার কথা ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. আনোয়ারুর রহমান খানের।
এ আর খানের জন্ম ১৯৩২ সালে, ঢাকার বিক্রমপুরে। তিনি ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৬০ সালে কলম্বো পরিকল্পনার ফেলো হিসেবে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরি ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেভেন্ডিস ল্যাবরেটরিতে গবেষক হিসাবে কাজ করেন। পরে ১৯৬২ সালে লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজে যোগ দেন এবং সেখান থেকে পিএইচডি ডিগ্রি করে দেশে ফেরেন। এরপর প্রথমে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ ও পরে ফলিত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে (অধুনা তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগ) অধ্যাপনা করেন।
দেশে বিজ্ঞান চর্চা ও বিশেষ করে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার প্রসারে ড. খান আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। ১৯৭৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর বাসভবনের গ্যারেজে প্রতিষ্ঠা করেন অনুসন্ধিৎসুচক্র বিজ্ঞান সংগঠন। তিনি গড়ে তোলেন বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি। ১৯৯৫ ও ২০১১ সালে বাংলাদেশের হিরণ পয়েন্ট ও পঞ্চগড় থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ দলের নেতৃত্ব দেন। গ্রামীণ বিজ্ঞান শিক্ষকদের মানোন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতি ও বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের যৌথ আয়োজন সত্যেন বসু বিজ্ঞান শিক্ষক ক্যাম্পের সূচনা করেন। ১৯৭৬ সাল থেকে বিভিন্ন দৈনিকের জন্য রাতের আকাশ চিত্র তৈরি করে দিতেন।
সর্বশেষ তিনি হাইস্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য সিটি ব্যাংক ও প্রথম আলো আয়োজিত বিজ্ঞান জয়োৎসবের উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
ড. খানের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী, বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক এফ আর সরকার, বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতির সভাপতি ও ড. খানের ছাত্র অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল প্রমুখ।

১৪ বছর পর দেশে ফিরলেন পাচারের শিকার ৩ নারী

ভারতে পাচারের শিকার তিন নারীকে ১৪ বছর পর বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে বিএসএফর সদস্যরা। সোমবার বিকাল ৫টার দিকে বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে তাদের তিন জনকে বিজিবি সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করে পেট্রাপোল বিওপির বিএসএফ সদস্যরা। ফেরত আসা ৩ নারী হলেন, খুলনার ইমান আলীর মেয়ে মাফরুজা (৩৫), ফরিদপুরের মহিম শাহাজুদ্দিনের মেয়ে জোহরা খাতুন (৫৬) ও সাতক্ষীরার শেখ নেসার আলীর মেয়ে মনু শেখ (৪৭)। আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের ভারতের মাদার তেরেসা আশ্রয় কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল।
বেনাপোল চেকপোস্টের আইসিপি ক্যাম্পের নায়েব সুবেদার নজরুল ইসলাম জানান, ১৪ বছর আগে অবৈধ ভাবে সীমান্ত পেরিয়ে এই ৩ নারী কাজের সন্ধানে দালালের মাধ্যমে ভারতে যায়। দালালরা তাদেরকে ভারতের মুম্বাই শহরের দালালদের হাতে তুলে দেয়। তারপর তাদের ভাগ্যে যা ছিল তাই হয়েছে। একপর্যায়ে মুম্বাই পুলিশ তাদের উদ্ধার করে জেল হাজতে পাঠায়। জেল জীবন শেষে তাদের ঠাঁই হয় দিল্লির মাদার তেরেসা আশ্রয় কেন্দ্রে । শেষ পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে চিঠি চালাচালি শেষে আজ বিকালে ৩ নারীকে বিএসএফ সদস্যরা বেনাপোল চেকপোষ্ট দিয়ে দেশে ফেরত পাঠায়। দেশে ফেরত আসা ওই ৩ নারীকে খুলনা মিশনারি অব চ্যারিটির কর্মীদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। ওই সংগঠন তাদের নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেবে। মাদার তেরেসার কর্মকর্তা সিস্টার জুলেট এমসি জানান, তিন নারী এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি। খুলনাতে তাদের চিকিৎসা শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

‘কোন গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেননি সালাহউদ্দিন’

ভারতের শিলংয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ কোন গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেননি বলে জানিয়েছেন দলটির মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন। নিখোঁজের দীর্ঘ ৬২ দিন পর উদ্ধার হওয়ার এই নেতাকে নিয়ে মনগড়া প্রতিবেদন প্রকাশ না করারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গণমাধ্যমে পাঠানো বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক আসাদুল করিম শাহীন স্বাক্ষরিক এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইদানীং বিভিন্ন গণমাধ্যম বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদকে অনেক ক্ষেত্রে উদ্ধৃত করে মনগড়া সব প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। যার ফলে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে বলে তার পরিবার আমাদের জানিয়েছেন। মূলত হাসপাতালে স্থানান্তরের সময় দু’একদিন তিনি দেশী-বিদেশী গণমাধ্যমের কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন যা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে। রিপন বলেন, বর্তমানে শিলংয়ে অবস্থানরত সালাহউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ জানিয়েছেন, আইন অনুযায়ী ও ভারতের স্থানীয় নর্থ ইস্টার্ন ইন্দিরা গান্ধী রিজিওনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথ এন্ড মেডিকেল সায়েন্স (নেগ্রিমস্) হাসপাতালের একজন চিকিৎসার্থী হিসেবে তার কোন গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। তিনি দলকে নিশ্চিত করেছেন, তার স্বামী বিদেশের কোন গণমাধ্যমকে কোন প্রকার সাক্ষাৎকার প্রদান করার বা দেয়ার কোন প্রশ্নই উঠে না। অথচ কোন কোন গণমাধ্যম সালাহউদ্দিন আহমেদেরর নামে কল্পিত একান্ত সাক্ষাৎকারও প্রকাশ করেছেন যার বাস্তবের সঙ্গে আদৌ কোন সম্পর্ক নেই। বিএনপির এই মুখপাত্র বলেন,  শিলং থেকে সদ্য প্রত্যাগত বিএনপি’র সহ-দপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি হাসিনা আহমেদের বরাত দিয়ে দলকে বলেছেন, ‘এ ধরনের সাক্ষাৎকার দেয়ার ঘটনাটি পুরোপুরি কাল্পনিক। বিএনপি গণমাধ্যমের কাছে প্রত্যাশা করে- সালাহউদ্দিন আহমেদ সম্পর্কিত কোন মনগড়া প্রতিবেদন বা তাকে উদ্ধৃত করে কোন সংবাদ যেন প্রকাশ বা প্রচার না করে। এতে বিভ্রান্তির কোন সুযোগ থাকবে না। এ ব্যাপারে তার পরিবারের সঙ্গে সবাইকে যোগাযোগের জন্য দলের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা গেল। বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে দেখারও অনুরোধ জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমেদের পরিবার।

চীনে পড়াশোনার সুযোগ দিচ্ছে হুয়াউয়ে

বাংলাদেশে হুয়াউয়ের গ্লোবাল সিএসআর প্রোগ্রাম চালুর ঘোষণা
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা
(সিএফও) জ্যাকি লি, পাবলিক অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড
কমিউনিকেশন ডিপার্টমেন্ট পরিচালক কাজী মোবাশ্বের
হোসেন, পিআর ব্যবস্থাপক খায়রুল আনাম এবং
হুয়াউয়ের অন্যান্য কর্মকর্তারা। ছবি: হুয়াউয়ের সৌজন্যে।
বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য হুয়াউয়ে টেকনোলজিস (বাংলাদেশ) লিমিটেড ‘সিডস ফর দ্য ফিউচার’ নামে একটি প্রতিযোগিতা শুরু করতে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতায় বিজয়ী দশজন চীনে হুয়াউয়ের প্রধান কার্যালয়ে পড়ালেখা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন।
প্রতিযোগিতায় বিজয়ীরা ফাইভজি, এলটিই ও ক্লাউড-কম্পিউটিংয়ের মতো অত্যাধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার নানা বিষয় নিয়ে হুয়াউয়ের স্টেট অব দ্য আর্ট ল্যাবে পড়ালেখার সুযোগ পাবেন। প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে তথ্য-প্রযুক্তি ক্ষেত্রের নতুন ধারণা ও সেবা উদ্ভাবন করতে হবে। আজ ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে হুয়াউয়ে কর্তৃপক্ষ এই প্রোগ্রাম বা কর্মসূচি গ্রহণের কথা জানিয়েছে।
চীন ভিত্তিক হুয়াউয়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় তথ্যপ্রযুক্তি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত। আজ সংবাদ সম্মেলনে হুয়াউয়ে তাদের গ্লোবাল সিএসআর প্রোগ্রামের আওতায় বাংলাদেশে এই কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। এর মাধ্যমে হুয়াউয়ে স্থানীয় তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের প্রতিভাবানদের পৃষ্ঠপোষকতা, জ্ঞান বাড়ানো, মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া ও টেলিযোগাযোগে আগ্রহ বৃদ্ধিতে কাজ করে।
হুয়াউয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, চুয়েট, কুয়েট এবং ইসলামিক প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাবেন। তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে নতুন নতুন ধারণা, মানুষের জীবন বদলাতে পারে এমন ই-সার্ভিস তৈরিতে যাঁরা কাজ করছে সেই তরুণ শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করবে হুয়াউয়ে।
২০০৮ সাল থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছে হুয়াউয়ে। এবারই প্রথম বাংলাদেশে এই কর্মসূচি চালু করল হুয়াউয়ে।
হুয়াউয়ের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) জ্যাকি লি, পাবলিক অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ডিপার্টমেন্ট পরিচালক কাজী মোবাশ্বের হোসেন, পিআর ব্যবস্থাপক খায়রুল আনাম এবং হুয়াউয়ের অন্যান্য কর্মকর্তারা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
জ্যাকি লি বলেন, ‘বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নানা সাফল্য প্রশংসার দাবিদার। শিক্ষা ও কর্ম উভয় ক্ষেত্রে তাঁদের আরও উৎসাহ দিতে হুয়াউয়ে বাংলাদেশে এই প্রতিযোগিতা চালু করেছে। বিজয়ীরা একটি আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশে শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা লাভ করার সুযোগ পাবেন। এই প্রতিযোগিতা জুন মাসের প্রথমার্ধে শুরু হবে।’
প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার নিয়মাবলি প্রতিযোগিতা শুরুর আগে বিস্তারিত জানাবে হুয়াউয়ে কর্তৃপক্ষ।

ছিটমহলবাসীর ইচ্ছাতেই নাগরিকত্ব নির্ধারণ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আজ সোমবার
মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা
বাংলাদেশ ও ভারতের ছিটমহলে বসবাসকারীদের নাগরিকত্ব নির্ধারণে নাগরিকদের ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা। আজ সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত স্থল সীমান্ত চুক্তি অনুসমর্থনের যে প্রস্তাব অনুমোদন হয়েছে, তাতে এ কথা বলা হয়েছে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করার সময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের ছিটমহল যে দেশে অবস্থিত, বসবাসকারী নাগরিকেরা সেই দেশের নাগরিক হওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রাথমিকভাবে ধরে নেওয়া হচ্ছে, ছিটমহলটি যে দেশে অবস্থিত, বসবাসকারীরা সেই দেশেরই নাগরিক হতে চাইবেন। তবে, কেউ চাইলে তাঁদের পূর্ববর্তী দেশের নাগরিক হওয়ারও সুযোগ থাকবে।
সম্প্রতি ভারতের লোকসভায় ১৯৭৪ সালের স্বাক্ষরিত ভারত-বাংলাদেশ স্থল সীমান্ত চুক্তি অনুমোদন হয়। ওই বছরের ২৮ নভেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে চুক্তিটি অনুমোদন হলেও ভারতের লোকসভায় তা অনুমোদন হয়নি।
২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে এ সংক্রান্ত প্রটোকল সই হয়। ভারতের লোকসভায় স্থল সীমান্ত চুক্তি অনুমোদন না হওয়ায় প্রটোকলটি এত দিন কার্যকর হয়নি। সম্প্রতি ভারতের লোকসভায় চুক্তিটি অনুমোদন হওয়ায় আজ বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় প্রটোকলটি অনুমোদন হয়েছে।
ছিটমহলে বসবাসরতদের নাগরিকত্বের ব্যাপারে নাগরিক অভিপ্রায় প্রাধান্য পাবে—এমনটা জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের ১১১টি ছিটমহলে মোট জমির পরিমাণ ১৭ হাজার ১৬০ দশমিক ৬৩ একর। জনসংখ্যা ৩৭ হাজার ৩৮৬ জন। অন্যদিকে, ভারতের ভেতরে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের আয়তন সাত হাজার ১১০ দশমিক ২ একর। জনসংখ্যা ১৪ হাজার ৯০ জন। অর্থাৎ, বাংলাদেশ ছিটমহলের ১০ হাজার ৫০ দশমিক ৬১ একর জমি বেশি পাবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বেশির ভাগ জায়গা চিহ্নিত থাকলেও ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার এলাকা চিহ্নিত করা ছিল না। পঞ্চগড়, মৌলভীবাজার ও ফেনীর কিছু এলাকায় এই সীমানা এত দিন চিহ্নিত ছিল না। এ ছাড়া তিন বিঘা করিডোর ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে বলেও জানান তিনি।
দুই দেশের অবৈধ দখলে থাকা জমি প্রসঙ্গে সচিব বলেন, ভারতের দখলে ছিল বাংলাদেশের ২ হাজার ২৬৭ দশমিক ৮৮ একর জমি। আর ভারতের জমি বাংলাদেশের দখলে ছিল ২ হাজার ৭৭৭ দশমিক ১৪ একর জমি। অর্থাৎ ৫০৯ দশমিক ২৬ একর বেশি জমি বাংলাদেশের দখলে ছিল। তিনি আরও বলেন, দুই দেশের অনুমোদন চূড়ান্ত হয়েছে, এখন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আসন্ন বাংলাদেশ সফরের সময় এ বিষয়টির অগ্রগতি হবে বলে জানান তিনি।

ফেসবুকে সরকারের ‘সমালোচনা’, ভূমি কর্মকর্তা বরখাস্ত

ফেসবুকে সরকারের সমালোচনার অভিযোগে গাজীপুরের একজন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে কেন বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে না, সে সম্পর্কে জবাব দিতে বলা হয়েছে তাকে। কাপাসিয়া উপজেলার বারিষাব ইউনিয়নের কুশদী ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুজ্জামান সরকার ও প্রশাসন নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য ও সমালোচনা করায় গত ২০শে মে জেলা প্রশাসন তাকে সাময়িক ভাবে বরখাস্ত করে। কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো, আনিছুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা কামারুজ্জামান তার ফেসবুকে বর্তমান সরকার ও প্রশাসন সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য পোষ্ট করেছেন। এ জন্য তাকে ইতোপূর্বে কারণ দর্শানের নোটিশ দেয়া হয়। তাকে সাময়িক বরখাস্তসহ তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
বরখাস্ত হওয়ার পরে ওই কর্মকর্তা তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন, ‘আজ আমি সত্যিই ভীষণ মর্মাহত। কারণ আমার জীবনে আজ এমন এক ঘটনা ঘটে গেল যা কাউকে বলতেও পারছিনা আবার সইতেও পারছিনা! এমনকি স্ত্রী, মা-বাবার কাছেও বলতে পারিনি.....আজ আমি বুঝতে পারছি কষ্ট কাকে বলে ! মানুষ কেন আত্মহত্যা করে?’ এর পর শুক্রবার তিনি তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন, ‘সকলের সদয় অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, আমার প্রিয় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেইসবুকে দীর্ঘদিনের পথচলায় আমার কোন লাইক/কমেন্ট/শেয়ারিং/আপলোডিং দ্বারা যদি কোন ব্যক্তি/সংস্থা/রাজনৈতিক সংগঠন মর্মাহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন তাহলে আমি বিশেষ ভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। আশা করি নিজ গুনে ক্ষমা করে দিবেন।’
এদিকে মোহাম্মদ কামারুজ্জামান গাজীপুর নামের ফেসবুক আইডিতে গিয়ে দেখা যায়, এতে সে সমসাময়িক বিষয়ে কিছু মন্তব্য পোষ্ট করেছে। যে গুলোর মধ্যে আছে, ‘উন্নয়নের যানযটে তটস্থ আমরা গাজীপুরবাসী ! (জয়দেবপুর রেলক্রসিং)’ ‘দেশ এখন খাদের কিনারে!! (ইছালী টু নীলেরপাড়া সড়ক দেখলেই বুঝা যায়)’
‘উন্নয়নের জ্বরে, না থুক্কু, উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নীলেরপাড়া টু ইছালী সড়ক !’ ‘গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা টু বাজার রোডের বেহাল অবস্থা! দ্রুত সংস্কার ও প্রসস্তকরণ দরকার। (প্রায় আধ ঘন্টা জ্যামে আছি)’ ‘ভাবতে অবাক লাগে কাপাসিয়া সদর রোডেও জ্যামে থাকতে হয়!!!!’ ‘রমজানে দাম বাড়বেনা পেঁয়াজের!! (কারণ রমজানের প্রায় ০১ মাস পূর্বেই ২৪টাকার পেঁয়াজ এখন ৪৮ টাকা) সুতরাং বেতন বাড়িয়ে লাভ কি যদি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে না থাকে ?’ ‘এ জ্যামে থাকবো কত আর?? দেশে চলছে উন্নয়নের জোয়ার, তবুও জয়দেবপুর রেলক্রসিংয়ে নেই কোন বাইপাস/ফ্লাইওভার! ইষ্ট হচ্ছে প্রতিদিন গাজীপুরবাসীর গড়ে আট শ্রম ঘণ্টার। তবু বেহায়া নেতা-নেত্রীদের বুলি, তারা নাকি উন্নয়নের রূপকার! এই লজ্জা কার?’ ‘বিংশ শতাব্দির মধ্যে এবং মানবজাতির গোটা ইতিহাসে সবচেয়ে বৃহত্তম ‘মানুষের ভীড়’। তার এমন সব স্ট্যাটাসের সাথে সড়কের নানা বেহাল অবস্থার ছবি ও ছিল। এছাড়াও সম্প্রতি কারাগারে বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন পিন্টুর মৃত্যু এবং চিকিৎসা নিয়েও একটা মন্তব্য তিনি লিখেছেন।
এ বিষয়ে কামরুজ্জামান বলেন, ফেসবুকে তিনি সরকারের বিরুদ্ধে কোন কথা লিখেননি। শুধু কিছু ব্যক্তিগত মতামত শেয়ার করেছেন। ডিজিটাল যুগে মুক্তভাবে স্বাধীন ভাবে মতামত তুলে ধরা যাবে না এমনটা তার জানা ছিল না। তিনি আরও জানান, তিনি বাংলাদেশ ভূমি অফিসার্স কল্যাণ সমিতি, গাজীপুর জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক। আসন্ন সম্মেলনে তিনি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক পদ প্রার্থী। ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবেই হয়তো ঊর্ধতন কর্মকর্তারা মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মাতলুব, প্রথম সহসভাপতি শফিউল

২০১৫-১৭ বছরের জন্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সভাপতি হলেন নিটল-নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান মাতলুব আহমাদ। প্রথম সহসভাপতি হিসেবে বিজিএমইএয়ের সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন এবং সহসভাপতি হচ্ছেন চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম।
জানা গেছে, আজ সোমবার বিকেল তিনটা পর্যন্ত এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি, প্রথম সহসভাপতি এবং সহসভাপতি পদের ফরম জমা ও কেনার শেষ সময় ছিল। এ সময়ের মধ্যে সভাপতি পদে আবদুল মাতলুব আহমাদ, প্রথম সহসভাপতি পদে শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন এবং সহসভাপতি পদে মাহবুবুল আলম ছাড়া আর কেউ ফরম কেনেন নি। তাই তারাই আগামী দুই বছরের জন্য ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ এই সংগঠনটির নেতৃত্ব দেবেন।
এর আগে গত শনিবার এফবিসিসিআইয়ের ২০১৫-১৭ দ্বিবার্ষিক মেয়াদের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে নিটল-নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান মাতলুব আহমাদের নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন পরিষদ। ওই দিন এফবিসিসিআই নির্বাচনে চেম্বার ও এসোসিয়েশন গ্রুপের নির্বাচিত ৩২ পরিচালক পদের বিপরীতে তিনটি প্যানেলে ৬৩ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। এর মধ্যে এফবিসিসিআই’র বর্তমান প্রথম সহ-সভাপতি মনোয়ার হাকীম আলীর নেতৃত্বাধীন চেম্বার গ্রুপ থেকে ‘স্বাধীনতা ব্যবসায়ী পরিষদ’ থেকে ১৪ জন এবং সৈয়দ মোয়াজ্জেম ও ড. কাজী এরতেজা হাসানের নেতৃত্বাধীন ‘ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদ’ থেকে ১৬ জন, মাতলুব আহমাদের নেতৃত্বাধীন, ‘উন্নয়ন পরিষদ’ থেকে চেম্বার ও এসোসিয়েশন গ্রুপ মিলে ৩২ জন এবং এসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন জাকিয়া সুলতানা মিথিলা।

মালয়েশিয়ায় ১৩৯টি গণকবর ও ২৮টি বন্দিশিবিরের সন্ধান

থাইল্যান্ডের সঙ্গে মালয়েশিয়ার উত্তরাঞ্চলের সীমান্ত এলাকায় মোট ১৩৯টি গণকবর ও ২৮টি বন্দিশিবিরের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। আজ এ খবর জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। এক সংবাদ সম্মেলনে দেশটি জাতীয় পুলিশ বাহিনীর প্রধান খালিদ আবু বকর এসব তথ্য জানান। ধারণা করা হচ্ছে, এসব গণকবর ও বন্দিশিবির সাগর পথে থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমানো রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী অভিবাসীদের। এ মাসের শুরুর দিকে থাইল্যান্ডে রোহিঙ্গা গণকবর ও বন্দিশিবিরের সন্ধান পাওয়া যাবার পর, এ অঞ্চলে অভিবাসী সঙ্কট তীব্র হয়ে উঠে। তখন মালয়েশিয়ায় গণকবর ও বন্দিশিবির থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে দেশটির কর্মকর্তারা। কিন্তু এবার মালয়েশিয়ায়ও গণকবর ও বন্দিশিবিরের সন্ধান পাওয়া গেল। যদিও সঙ্কট শুরু পর দেশটিতে এবারই প্রথম এসবের সন্ধান মিলল।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ প্রধান খালিদ বলেন, কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত ১৩৯টি গণকবরের সন্ধান পেয়েছে। এর প্রত্যেকটিতে ঠিক কতটি করে লাশ রয়েছে, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে মৃতদেহের সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই ১০০ ছাড়াবে। গণকবর ছাড়াও থাইল্যান্ডের সঙ্গে মালয়েশিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তের ৫০০ মিটারের মধ্যে ২৮টি বন্দিশিবির পাওয়া গেছে। এসব শিবিরেও কয়েক শ’ লোক থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় শিবিরটিতে প্রায় ৩০০ লোক থাকতে পারে। আরেকটি শিবিরে শতাধিক লোক থাকার অনুমান করা হচ্ছে। ১১ই মে থেকে ২৩ই মে পর্যন্ত মালয়েশিয়ান পুলিশী অভিযানে এসব গণকবর ও বন্দিশিবিরের সন্ধান মেলে।

এক জিনিয়াসের মহাপ্রয়াণ

সড়ক দুর্ঘটনা বিদায় নিলেন গণিতবিদ জন ফোর্বস ন্যাশ জুনিয়র। বিশ্ববিখ্যাত এ গণিতবিদের অসামান্য জীবন-কাহিনী নিয়েই নির্মিত হয়েছে অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘অ্যা বিউটিফুল মাইন্ড’। নোবেলজয়ী ফোর্বস ন্যাশ ছিলেন আমেরিকার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের শিক্ষক। শনিবার ওই দুর্ঘটনায় জন ফোর্বস ন্যাশের সঙ্গে তার স্ত্রীও পরলোকগমন করেন। ন্যাশ (৮৬) ও তার স্ত্রী অ্যালিসিয়া ন্যাশ (৮২) ট্যাক্সিতে করে মনরো টাউনশিপের কাছে ঘুরছিলেন। সে সময়ই ঘটে যায় দুর্ঘটনা। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় উভয়ের। এ খবর দিয়েছে সিএনএন। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা গণিতবিদ হিসেবে ভাবা হয় ফোর্বস ন্যাশকে। ‘গেইম থিওরি’ নিয়ে তার অবদানের জন্যই তিনি বিশ্বখ্যাত। নিজের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৪ সালে নোবেল পান ফোর্বস। ১৯২৮ সালে জন্মগ্রহণকারী ফোর্বস ন্যাশের বাবা ছিলেন একজন প্রকৌশলি ও লাতিন ভাষা শিক্ষক। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায়ই গণিতে নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন ফোর্বস। তিনি ছিলেন জর্জ ওয়েস্টিংহাউস অ্যাওয়ার্ডজয়ী ১০ জনের একজন। ফলে কার্নেগি ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলোজিতে স¤পূর্ন বৃত্তি পেতে তার কোনো অসুবিধাই হয়নি। সেখানেই তিনি প্রথমবারের মতো ‘জিনিয়াস’ খ্যাতি লাভ করেন। বাস্তবিক অর্থে তিনি ছিলেন সত্যিই জিনিয়াস। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে তার হয়ে এক অধ্যাপক যখন সুপারিশপত্র লেখেন, সেখানে লেখা ছিল মাত্র একটি লাইন। সে লাইনে লেখা ছিল: এই লোকটি জিনিয়াস! ১৯৫০ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত ও অর্থনীতির ওপর গবেষণা করে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ১৯৫১ সালে ক্যামব্রিজের ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলোজিতে যোগ দেন তিনি। সেখানেই তার সঙ্গে পরিচয় ঘটে অ্যালিসিয়ার। অ্যালিসিয়া ছিলেন তার অ্যাডভান্সড ক্যালকুলাস ক্লাসের শিক্ষার্থী। এরপর বহুদিন আড্ডা, দীর্ঘ প্রেম; অত:পর বিয়ে। কিন্তু এরই মাঝে তাকে আঁকড়ে ধরে জটিল মানসিক রোগ। জীবনের একটি বড় অংশ ফোর্বস ন্যাশ লড়াই করেছেন প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়া নামের জটিল ওই রোগের বিরুদ্ধে। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় স্তরে থাকার সময়ই রোগে আক্রান্ত হন তিনি। এ সময় তার পাশে ছিলেন পদার্থবিদ স্ত্রী অ্যালিসিয়া ন্যাশ। জন ফোর্বসের জীবন রক্ষার জন্য এ নারীকেই তাই বেশি কৃতিত্ব¡ দেয়া হয়। তার আত্মজীবনীকার তাই বলেছেন, ফোর্বস বুঝেছিলেন, বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় এক নারীর দরকার। এবং তিনি সেরা নারীটিকেই বেছে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। রোগে আক্রান্ত থাকা অবস্থায় ক্রমাগত ঘরেই থাকতে হচ্ছিল ফোর্বসকে। এক পর্যায়ে ১৯৬৩ সালে অ্যালিসিয়া ও ফোর্বসের ঘর ভেঙ্গে যায়। অবশ্য পরে আবার ফিরে আসেন তিনি। এরপর ফোর্বসকে আর কখনই ছেড়ে যাননি অ্যালিসিয়া। নিজের আত্মজীবনি অ্যা বিউটিফুল মাইন্ড-এ জীবনের এ অংশটি ফুটে উঠলেও, হলিউড মুভিতে ফুটে উঠেনি। একপর্যায়ে রোগের বিরুদ্ধে লড়াই শেষে ফিরে আসেন ফোর্বস। নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন নিজের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী একজন গণিতবিদ হিসেবে। নোবেল ছাড়াও ১৯৭৮ সালে মর্যাদাবান জন ভোন নিউম্যান থিওরি পুরষ্কার, ১৯৯৯ সালে আমেরিকান ম্যাথম্যাটিক্যাল সোসাইটির স্টিলে পুরষ্কার লাভ করেন তিনি। গত সপ্তাহেই তিনি মর্যাদাপূর্ন অ্যাবেল পুরষ্কার লাভ করেন। কিন্তু সপ্তাহ না যেতেই পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেন তিনি। ২০০১ সালে তার জীবনকাহিনী নিয়ে নির্মিত অস্কারজয়ী চলচ্চিত্রটি ছুঁয়ে নিয়েছিল অগনতি মানুষের হৃদয়। ছবিটিতে ফোর্বসের চরিত্রে রাসেল ক্রো ও অ্যালিসিয়ার চরিত্রে জেনিফার কোনেলে অভিনয় করেন। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন অনেকে। কিন্তু বহুদিনের এক সহকর্মীই হয়তো যথার্থভাবে শোক প্রকাশ করতে পেরেছেন। তিনি লিখেছেন, পৃথিবী এক জিনিয়াসের মহাপ্রয়াণ চাক্ষুষ করেছে। পৃথিবীর জন্য এ এক ভয়াবহ ক্ষতি।

‘বাংলাদেশে চলছে মোড়লী শাসন’ -আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ by মনির হায়দার

আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগরখ্যাত বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ কখনো আধুনিক সুশাসনের দেখা পায়নি। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে চলছে মোড়লী শাসন। তিনি বলেন, এই পদ্ধতিতে দেশ চালাতে গিয়ে আমরা ব্রিটিশদের দিয়ে যাওয়া সুশাসনের ব্যবস্থাগুলোও ধ্বংস করে দিয়েছি। আর তাই বাংলাদেশ এখন সবচেয়ে খারাপ সময়টা পার করছে। নীতি-নৈতিকতা বা মূল্যবোধ বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকছে না।  জাতীয় জীবনে আমাদের অবস্থা এখন  মাত্সন্নাই  এর মত। বড় মাছ ছোট মাছগুলোকে খেয়ে ফেলছে।
স্থানীয় সময় গত শনিবার রাতে নিউ ইয়র্ক এর জ্যাকসন হাইটস এ বইমেলা ও বাংলা উৎসবের অনুষ্ঠান মঞ্চে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।  ভবিষ্যত বাংলাদেশ  বিষয়ক এই অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের কন্যা শারমিন আহমেদ, নাট্য ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, সাংবাদিক গোলাম মোর্তজা প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রবাসী সাংবাদিক নিনি ওয়াহেদ। বক্তৃতার সময় বার বার চিরকুট দিয়ে আব্দুল্লাহ আবু সয়ীদকে বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করতে তাগিদ দেওয়ায় তিনি প্রচন্ড বিরক্তি প্রকাশ করেন।
অন্য বক্তাদের বক্তব্যের সুত্রে তিনি বাংলাদেশে সুশাসন প্রসঙ্গে বলেন, আমরা আসলে কখনই সুশাসনের সঙ্গে পরিচিত হতে পারিনি। স্বাধীনতার আগে আমদের সমাজব্যবস্থা ছিল মূলত মোড়লী পদ্ধতি নির্ভর। স্বাধীনতার পর আমরা সেই মোড়লী ব্যবস্থাটাকেই জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং আজও সেই ধারায় চলছে।  সে কারণে সুশাসন ব্যাপারটা আমরা কখনো বোঝারই সুযোগ পাইনি।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই আমরা রয়েছি স্বৈর শাসনের মধ্যে।  কখনো সামরিক স্বৈর শাসন। কখনো বেসামরিক স্বৈর শাসন।  ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত আমরা ছিলাম আনুষ্ঠানিক স্বৈর শাসনের মধ্যে।  সেটার একটা সুবিধা ছিল যে, সমাজের খুব বেশি মানুষ প্রকাশ্যে সেই শাসনকে সমর্থন করত না।  সে ধরনের শাসকদের সমর্থন করার ক্ষেত্রে সবার মধ্যে একটা সংকোচ কাজ করত।  তাই তারা সব সময় পতনের আতংকে থাকত।  কিন্তু নব্বই সালের পর থেকে আমরা যে নির্বাচিত স্বৈর শাসনের মধ্যে প্রবেশ করেছি  এটা আরো ভয়াবহ।  কারণ, এই স্বৈরশাসকদের সমর্থনে কথা বলার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ দাড়িয়ে গেছে।  এ কারণে নির্বাচিত স্বৈর শাসকরা অনেক বেশি বেপরওয়া হয়ে উঠছে।  বাকি জনগোষ্ঠী তাদের কাছে হয়ে পড়ছে মারাত্মক অসহায়।
উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনের প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, যে যাই বলুক ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দায়ভার বাঙালিদেরকেই নিতে হবে। কারণ, মীর জাফর, উমিচাঁদ ও রায় দুর্লভরা বাংলারই লোক ছিল এবং তাদের সহযোগিতা নিয়েই ইংরেজরা ভারতবর্ষে চেপে বসার সুযোগ পায়। তবে ইংরেজ শাসনেরও অনেকগুলো ভালো দিক ছিল। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা সুশাসনের বেশ কিছু ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করে যায়। সেই সময় একটা পদ্ধতি তারা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। হয়তো তারা পুলিশ দিয়ে দেশ শাসন করেছে এবং সেই ক্ষেত্রে দারোগার ঘুষ খাওয়ার ব্যাপারটা অনেকটা প্রচলিত ছিল। কিন্তু মিলিটারী কোথায় থাকতো, তা সাধারণ মানুষ এমনকি জানতও না। দুর্ভাগ্য হলো, ব্রিটিশরা যেটুকু সুশাসনের ব্যবস্থা রেখে গিয়েছিল, স্বাধীন হওয়ার পর আমরা সেইটুকুও ধ্বংস করে দিয়েছি।  আমরা আবার পুরোপুরি মোড়লী শাসনে ফিরে গেছি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন তার সবচেয়ে খারাপ সময়টা পার করছে । মানুষ বড় অসহায় । সমাজে নীতি-নৈতিকতা ধংসের চরম সীমায় গিয়ে ঠেকেছে । জাতীয় জীবনে আমরা এখন  মাত্সন্নাই  অবস্থার মধ্যে আছি । বড় মাছ ছোট মাছগুলোকে খেয়া ফেলছে । এতসব সত্বেও বাংলাদেশ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার অনেক কিছু আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে নানা অঙ্গনেই বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে, আরও এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এটার কৃতিত্ব পুরোপুরি দেশের সাধারণ মানুষের। এসব সাধারণ মানুষের চেষ্টায়ই বাংলাদেশ একদিন বদলাবে।  তিনি বলেন, আমার ছাত্রসহ অনেকেই প্রশ্ন করেন যে, সেই বদলানো কি আমরা দেখে যেতে পারব ? তখন আমি তাদের পাল্টা প্রশ্ন করি এই বলে যে, আমরা দেখে যেতে পারব কি-না, এই চিন্তা করে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে কি চলবে ? তিনি বলেন, দেশে এখন যে সর্বগ্রাসী দুর্নীতি সুপ্রতিষ্ঠিত রয়েছে, আমরা সেটার নির্মূল চাইনা, আমরা বলি এটাকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার কথা। কিন্তু সেরকম কোনো চেষ্টাও নেই।
এর আগে স্থানীয় সময় গত শুক্রবার রাতে নিউ ইয়র্ক এ বইমেলা ও বাংলা উত্সব উদ্বোধনকালে অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা মোটেই বইপড়ামুখী নয়, পুরো ব্যবস্থাটাই পরীক্ষামুখী। কেবলমাত্র পরীক্ষায় পাশের জন্য যেটুকু দরকার সেটুকুই পড়তে উত্সাহিত করা হয়। এ কারণে মানুষ শিক্ষিত হলেও পড়ুয়া হয়ে উঠে না। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী একবার আমাকে ডেকে বললেন, ডিজিটাল পদ্ধতিতে বই পড়ার কার্যক্রম হাতে নিতে। আমি তাকে বললাম, যখন কাগজের বই ছিল না, তখনও মানুষ বই পড়েছে।  আবার যখন কাগজের বই থাকবে না তখনও মানুষ বই পড়বে। আসল বিষয় হলো মানুষের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা।  কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা সেই কাজটি করতে পারছে না। বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা না গেলে বিশেষ কোনো পদ্ধতির বই দিয়ে কাজ হবে না।

খালেদা জিয়া দুই মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণ ১৮ই জুন

রাজধানীর বকশিবাজারে অস্থায়ী আদালতে আজ
দুর্নীতি মামলায় হাজিরা দিতে যান বিএনপির
চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ছবি: সাজিদ হোসেন
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ও চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ আগামী ১৮ই মে নির্ধারণ করা হয়েছে।  আজ বিশেষ আদালতে খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের পর বিচারক নতুন তারিখ নির্ধারণ করে দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩-এর বিচারক আবু আহমেদ জমাদার। এর আগে গত ৫ই মে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বাদীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। আজ আদালতে আসামি পক্ষ খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে নেয়া জবানবন্দি বাতিলের আবেদন করেন। তবে এ নিয়ে শুনানির পর আদালত না নামঞ্জুর করেন।

মাইক্রোবাসে ধর্ষণের ঘটনায় হাইকোর্টের রুল

রাজধানীতে মাইক্রোবাসে তুলে এক গারো তরুণীকে গণধর্ষণের ঘটনায় রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। রুলে ধর্ষণের ঘটনায় মামলা নিতে বিলম্ব কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, অবহেলার জন্য দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেয়া হবে না এবং ধর্ষিতাকে কেন ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠনের দায়ের করা একটি রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করে। এছাড়া থানায় ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ ও জন্ম পরিচয় নির্বিশেষে বৈষ্যমহীনভাবে সবার সেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র সচিব, আইজিপি ও পুলিশ কমিশনারকে একটি প্রজ্ঞাপণ জারির নির্দেশ দিয়েছে আদালত। যৌন হয়রানি ও যৌন সহিংসতা রোধে বিদ্যমান আইন ও প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করার জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, আইনজীবী ও নারী অধিকারকর্মীদের নিয়ে একটি কমিটি করতে রিটকারীদের কাছে নামের তালিকা চেয়েছে হাইকোর্ট। আগামী ৩১শে মে’র মধ্যে এই তালিকা আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে। নারীপক্ষ, মহিলা পরিষদ, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, আইন ও শালিস কেন্দ্র এবং ব্লাস্ট রোববার এই রিট আবেদন দায়ের করে। রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার সারাহ হোসেন। তার সঙ্গে ছিলেন জেড আই খান পান্না ও মেহবুবা জুঁই। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আমাতুল করিম ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নুসরাত জাহান।

আশ্রিত বাংলাদেশীদের শিগগিরই ফেরত পাঠাবে ইন্দোনেশিয়া

শিগগিরই আশ্রিত বাংলাদেশীদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করবে ইন্দোনেশিয়া। দেশটির একজন মন্ত্রী এ কথা জানিয়েছেন। আচেহ প্রদেশে ৭০০ বাংলাদেশী অভিবাসীকে আশ্রয় দিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। আন্দামান সমুদ্রে তাদের বহনকারী নৌকা পাচারকারীরা ফেলে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক চাপে তাদের উদ্ধার করে ইন্দোনেশিয়া। এ খবর দিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। আচেহ প্রদেশে এক সফরে ইন্দোনেশিয়ার সামাজিক স¤পর্ক মন্ত্রী খোফিফাহ ইন্দার পারাওয়ানসা বলেন, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে তার সরকার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে। খুব শিগগিরই বাংলাদেশীদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করা হবে। আগামী ৩-১০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশীরা ট্রাভেল ডকুমেন্ট পেয়ে যাবে। এরপর উত্তর সুমাত্রা প্রদেশের রাজধানী মেদান থেকে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। ট্রাভেল ডকুমেন্ট প্রস্তুত হবার ২-৩ মাসের মধ্যেই তাদের বিমান টিকেট হাতে পাওয়া যাবে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশীদের ভ্রমনের সমস্ত খরচ আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা (আইওএম) বহন করবে।

মেহেরপুর আওয়ামী লীগের রাজনীতি- কার্যালয় বন্ধ আট বছর, দলে তিন ধারা by তুহিন আরন্য

মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়টি কার্যত আট বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। দলীয় কর্মকাণ্ডে গতি আনতে ১৩ বছর পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের নতুন কমিটি হয়েছে। কিন্তু কার্যালয়ের হাল একই রয়েছে। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলে তিনটি ধারা থাকার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
মেহেরপুর শহরের পাসপোর্ট অফিসের সামনে জেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়। সেখানে সাইনবোর্ড ঝুলছে, কিন্তু তালাবদ্ধ। কার্যালয় ভবনের সামনের দিকে কয়েকটি দোকানঘর। জানতে চাইলে স্থানীয় কয়েকজন বলেন, সর্বশেষ কবে তাঁরা কার্যালয়টি খোলা দেখেছেন, তা মনে করতে পারছেন না।
ওই ভবনের মালিক শহিদ ইকবাল ওরফে লিমন জানান, ২০০৭ সালে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুরোধে ভবনটি ভাড়া দেন। তিনি অফিসটি ৮ থেকে ১০ দিন খুলতে দেখেছেন। এ পর্যন্ত কোনো ভাড়া পাননি। ভবনটি ছাড়তে বলতেও পারছেন না।
আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলের তিনটি ধারার মধ্যে একাংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মেহেরপুর-১ আসনের সাংসদ ও জেলা সভাপতি ফরহাদ হোসেন। তাঁর সঙ্গে আছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেক। আরেক অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জেলা পরিষদের প্রশাসক আইনজীবী মিয়াজান আলী। আর তৃতীয় অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম রসুল।
আওয়ামী লীগের ৮ থেকে ১০ জন নেতা-কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দলের আগের সভাপতি ও সম্পাদককে বাদ দিয়ে তিন মাস আগে নতুন জেলা কমিটি হয়েছে। সেখানে কাউন্সিলরদের মতামত নেওয়া হয়নি। প্রত্যাশা ছিল নতুন সাংসদ দলে সুস্থ রাজনীতির চর্চা শুরু করবেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এ কারণে আগের মতো এখনো টেন্ডারবাজি, দখল, হামলা, নিয়োগ বাণিজ্য ভিন্ন কৌশলে চলছে।
নতুন কমিটি সবে দায়িত্ব নিয়েছে। কার্যালয় খোলা হবে কি না, চিন্তাভাবনা চলছে-আবদুল খালেক, সাধারণ সম্পাদক দলীয় কার্যালয় না খোলা এবং দলের তিনটি ধারার বিষয়ে সাংসদের অনুসারী বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেক বলেন, নতুন কমিটি সবে দায়িত্ব নিয়েছে। সবকিছু বিবেচনা করা হচ্ছে। কার্যালয় খোলা হবে কি না, চিন্তাভাবনা চলছে।
জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও একটি ধারার নেতা মিয়াজান আলী বলেন, কাউন্সিলের পর দলীয় মিছিল-মিটিং বন্ধ। সবকিছু হয় সাংসদের ইচ্ছেমতো। তিনি বলেন, সময়মতো এর জবাব দেওয়া হবে। মিয়াজানের দাবি, তাঁর সঙ্গে দলের সাবেক সভাপতি ও সাবেক সাংসদ জয়নাল আবেদীন, শহর আওয়ামী লীগ ও জেলা যুবলীগ রয়েছে। তাঁর এই দাবির বিষয়ে শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ইয়ারুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, রাজনীতি নেই, চলছে হরিলুট। বেশি কিছু বললে পদও থাকবে না। তাই রাজনীতি নিয়ে নিশ্চুপ তাঁরা।
নিজে জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক থাকার সময় দলীয় কার্যালয় না খোলা প্রসঙ্গে মিয়াজান আলী বলেন, ‘নেতারা সবাই নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিগত কার্যালয়ে বসতেন বলে দলীয় কার্যালয় খোলা হয়নি।’
দলের তৃতীয় অংশের নেতা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম রসুল দাবি করেন, তাঁর সঙ্গে জেলা ছাত্রলীগসহ একাধিক অঙ্গসংগঠন রয়েছে। সাংসদ নেতাদের ডাকেন না। নেতারা সাংসদের কাছে যান না। কাউন্সিলের পর নেতাদের নিয়ে বসে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কেন্দ্রীয় নির্দেশ ছিল। সাংসদ সেটাও করেননি। তবে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে গ্রুপিংয়ে বিশ্বাস করি না। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নির্দেশনা মেনে সংগঠন পরিচালনা করি।’

যুক্তরাজ্যের নির্বাচন থেকে আমরা যা শিক্ষা নিতে পারি by মহিউদ্দিন আহমদ

যুক্তরাজ্যের সদ্য সমাপ্ত সাধারণ নির্বাচনে ১২ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী লড়েছিলেন। এঁদের তিনজন বিজয়ী হয়েছেন—রুশনারা আলী, টিউলিপ সিদ্দিক ও রূপা হক। তিনজনই লেবার পার্টির ও উচ্চশিক্ষিত; রুশনারা পড়েছেন অক্সফোর্ডে, রূপা কেমব্রিজে এবং টিউলিপ কিংস কলেজে। তাঁদের কেউ সরকারি দল কনজারভেটিভ পার্টির এমপি নন; কিন্তু তাই বলে তাঁদের প্রতি সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা বৈষম্য করবেন না। আর দল-নির্বিশেষে তাঁদের নির্বাচনী এলাকার প্রত্যেক নাগরিকই এই এমপিদের কাছ থেকে সমান সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান পাবেন; তাঁরা সমানভাবে আদৃতও হবেন। কোনো নাগরিক এমপির সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তাঁর দলীয় পরিচয় কখনোই জানতে চাওয়া হয় না।
উল্লেখ করা প্রয়োজন যে প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকায় প্রত্যেক এমপির অফিস ও স্টাফ থাকে। এমপি সাহেব সপ্তাহের কোন কোন দিন কয়টা থেকে কয়টা পর্যন্ত এই অফিসে থাকবেন, তা নির্বাচনী এলাকার সবাইকে আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়।
টিউলিপ এই নির্বাচনে জয়ের ব্যবধান বাড়িয়েছেন। ২০১০-এর নির্বাচনে টিউলিপের হ্যাম্পটেড অ্যান্ড কিলবার্ন আসনে লেবার-দলীয় প্রার্থী অস্কার পুরস্কার বিজয়ী অভিনেত্রী গ্লেন্ডা জ্যাকসন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থীর চেয়ে মাত্র ৪২ ভোট বেশি পেয়েছিলেন। টিউলিপ এবার ১ হাজার ১৩৮ ভোট বেশি পেয়েছেন। এই ব্যবধান বাড়ানোটা তাঁর কৃতিত্ব। রুশনারার ভোটের ব্যবধান এই তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৪ হাজার ৩১৭; আর সবচেয়ে কম রূপার মাত্র ২৭৪ ভোট।
উন্নত গণতন্ত্রে এই ফিগারগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয় নির্বাচনের পর। নির্বাচনে সবগুলো আসনে কোন দল জাতীয়ভাবে মোট কত ভোট পেল, মোট ভোটের শতাংশ হারে তা কত, ৬৫০টি আসনের কোনটিতে কত ভোট, এক পার্টি থেকে অন্য পার্টিতে ‘সুইং’ করেছে, কেন এমনটি হলো, কী কী ব্যর্থতা ছিল, পরের নির্বাচনে তা কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যাবে, এমন শত শত প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ও বিশ্লেষণ চলতে থাকবে। এমন সব আলোচনা-বিশ্লেষণের জন্য পেশাজীবী বিশ্লেষক, অভিজ্ঞ ও পণ্ডিত ব্যক্তিদেরও সাহায্য নেওয়া হবে।
এবারের নির্বাচনে বড় চমক হলো স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি, স্কটল্যান্ডের জন্য নির্ধারিত ৫৯টি আসনের মধ্যে ৫৬টিতেই বিজয়ী হয়। ২০১০-এর নির্বাচনে তাদের আসনসংখ্যা ছিল মাত্র ৬। গত নির্বাচনে যেখানে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্যসংখ্যা ছিল ৫৭, এবারে নেমে এসেছে ৮-এ। এই আটজনকে বহন করার জন্য মাত্র দুটি ট্যাক্সিই যথেষ্ট, এমন উপহাসও করা হচ্ছে এই দলটিকে নিয়ে।
কিন্তু কট্টর অভিবাসী ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন-বিদ্বেষী যে ‘ইউকিপ’ ‘ইউনাইটেড কিংডম ইনডিপেনডেন্টস পার্টি’ মোট ভোট পেয়েছে প্রায় ৩৯ লাখ, তার প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছে মাত্র একটি আসনে। অথচ তার বিপরীতে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির মোট ভোটসংখ্যা হচ্ছে প্রায় ১৫ লাখ, কিন্তু আসনসংখ্যা ৫৬।
দুই...
রাজনীতি কেমন নিষ্ঠুর ও ‘ব্লাড স্পোর্ট’ হতে পারে, আমরা তা পাকিস্তান আমলে, পরে বাংলাদেশেও অনেকবার দেখেছি। যুক্তরাজ্যের এই নির্বাচনেও তা আবার দেখা গেল। যখন পরিষ্কার হতে থাকল যে সব জনমত জরিপকে ভুল প্রমাণ করে কনজারভেটিভ পার্টির ডেভিড ক্যামেরন আবার প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন, স্কটল্যান্ডে লেবার পার্টি নিশ্চিহ্ন হতে যাচ্ছে; লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির বিপর্যয় ঘটেছে, ‘ইউকিপ’-এর নেতা নাইজেল ফারাজ নিজেই জিততে পারেননি; তখন থেকেই এই শেষ তিন দলের তিন নেতার পদত্যাগের জল্পনা শুরু হয়। দুপুরের মধ্যেই লেবার পার্টির নেতা এড মিলিব্যান্ড লিব-ডেমের নেতা নিক ক্লেগ ও নাইজেল ফারাজ পদত্যাগের ঘোষণা দেন। পদ আঁকড়ে ধরে রাখার সংস্কৃতি একদম নেই সেসব দেশে; যেমন আছে আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। ‘অ্যাপ্রে মোয়া, ল ডিলুজ’, (আমি না থাকলে দেশে মহাপ্লাবন ঘটে যাবে) এই ফরাসি প্রবাদের কোনো স্থান নেই পশ্চিমা দেশগুলোতে, যেমনটি বিশ্বাস করেন এই অঞ্চলের নেতা-নেত্রীরা।
আমাদের নেতা-নেত্রীদের কাছে দলের অন্য সবাই জিম্মি থাকেন। দলের কে কোন পদে থাকবেন, কোন নির্বাচনে দলের কে কোথায় মনোনয়ন পাবেন, তা ঢাকা থেকে নেত্রী-নেতারাই ঠিক করে দেন। কিন্তু যুক্তরাজ্যে তা হয় না। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নেতা-নেত্রীদের বন্দনা থাকে না এমপিদের বক্তৃতার শুরুতে বা শেষে। টিউলিপের আসনে আগের লেবার এমপি গ্লেন্ডা জ্যাকসন তাঁর নেতা প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের প্রকাশ্যে তীব্র বিরোধিতা করে বারবার মনোনয়ন পেয়েছেন। কারণ, তিনি তাঁর কাছে জিম্মি ছিলেন না। গ্লেন্ডা জ্যাকসনকে ওই আসন থেকে মনোনয়ন দিয়েছে লেবার পার্টির ওই নির্বাচনী এলাকার স্থানীয় শাখা, লেবার পার্টির হেড অফিস লন্ডন থেকে নয়। একইভাবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে টিউলিপ, রুশনারা ও রূপাকেও তাঁদের নিজ নিজ এলাকার শাখা থেকে। আর একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কথা। এড মিলিব্যান্ড ও নিক ক্লেগের দল দুটি পরাজিত হয়েছে; তাঁরা ইতিমধ্যে পদত্যাগও করেছেন দলের নেতৃত্ব থেকে। কিন্তু নির্বাচনের পরদিন ব্রিটিশ সময় বেলা তিনটায় বিবিসি টিভিতে দেখি, তাঁরা দুজন প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের সঙ্গে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির ৭০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে নিহত-আহতদের প্রতি সম্মান জানিয়ে সেন্ট্রাল লন্ডনের একটি স্মৃতিসৌধে ফুল দিলেন। প্রকৃত গণতন্ত্রে জাতীয় ইস্যুতে তো এমনই হওয়ার কথা।
তিন...
যুক্তরাজ্য সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে। আমাদের গণতন্ত্রচর্চা যুক্তরাজ্যের ধারেকাছেও নেই। আমার মনে পড়ছে স্কটল্যান্ডের একটি আসন থেকে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত লেবার পার্টির প্রার্থী সুমন হকের কথা। মনোনয়ন পাওয়ার পর যখন জানা গেল, সুমন হক মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালাতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন, তখন লেবার পার্টি মনোনয়নটি প্রত্যাহার করে নেয়। কোনো আসামি বা দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সেখানে মনোনয়ন দেওয়ার কথা কোনো দল ভাবতেই পারে না। এই সুমন হকের বিপরীতে আমাদের সাংসদদের তুলনা করুন। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় তাঁদের দেওয়া হলফনামাগুলো দেখুন।
কক্সবাজারের এমপি আবদুর রহমান বদি, মিরপুরের এমপি ইলিয়াস মোল্লাহ ও যশোরের এমপি ‘বিড়ি’ আকিজের ছেলে শেখ আফিল উদ্দিন—তিনজনই খোদ পুলিশ পিটিয়েই খবরের শিরোনাম হয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযুক্ত হওয়ার পর এমপি বদি যখন ঢাকা থেকে বিমানে কক্সবাজার যান, তখন তাঁর দল আওয়ামী লীগ থেকেই তাঁকে বিমানবন্দরে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। কক্সবাজার ও টেকনাফ সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মানব পাচারের কারণে দেশ-বিদেশের বড় বড় খবরের কাগজে, টিভি-রেডিওতে খবরের শিরোনাম হয়েছে। শত শত নিরীহ বাংলাদেশি বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার গণকবরে ঠাঁই পেয়েছেন। তো, এই মানব পাচার বন্ধে এলাকার এমপি বদির ভূমিকাটা কী?
আমাদের দেশে অনুষ্ঠানে এলাকার স্থানীয় এমপিকে দাওয়াত দিয়ে প্রধান বা বিশেষ অতিথি না করলে তাঁর সন্ত্রাসীরা মঞ্চে ভাঙচুর চালায়, আয়োজকদের মারধর করে। কিন্তু সন্ত্রাস দমনে, মানব পাচার রোধে এই নির্বাচিত প্রতিনিধির ভূমিকাটা কী? যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে স্থানীয় এমপিরা বিপদে–আপদে মানুষের পাশে দাঁড়ান, যদিও সেখানে প্রধান বা বিশেষ অতিথি বানানোর রীতি বা সংস্কৃতি নেই।
পয়লা বৈশাখের সন্ধ্যায় টিএসসির পাশে নারী লাঞ্ছনার প্রতিবাদে ডিএমপি কমিশনারের কার্যালয় ঘেরাওয়ের মিছিলে পুলিশ ছাত্রছাত্রীদের পিটিয়েছে। আমাদের এমপিরা পুলিশ পেটান আর পুলিশ পেটায় ছাত্রছাত্রীদের! কিন্তু আমাদের জাতীয় সংসদে তো ৫০ জন সদস্য আছেন মহিলাদের সংরক্ষিত আসনে। তাঁদের একজনও কি পয়লা বৈশাখের টিএসসির লাঞ্ছিত নারীদের পক্ষে গত এক মাসে একটিও কথা উচ্চারণ করেছেন? পিছিয়ে পড়া নারীসমাজের জন্য কাজ করতেই তো বিশেষ বিবেচনায় এই ৫০টি সংরক্ষিত আসন। কিন্তু এই ৫০ জনকে এই ইস্যুতে একেবারে বোবা, বধির ও অন্ধ দেখতে পাচ্ছি। টিউলিপ সিদ্দিকের নির্বাচনী এলাকায় এমন যদি একটি ঘটনাও ঘটত, তিনি তোলপাড় সৃষ্টি করতেন। নির্বাচিত প্রতিনিধির তাই তো কাজ। মনে হচ্ছে নারী লাঞ্ছনার প্রতিকারে এখন আমাদের এই তিন ব্রিটিশ তরুণী এমপির সাহায্য চাইতে হবে।
উদাহরণ আরও আছে। নড়াইলে ববিতা খানমকে হাত-পা বেঁধে, পরে গাছের সঙ্গে আর একবার বেঁধে যারা মারধর করে আহত করেছে, তাদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন আমাদের হাইকোর্ট। তো এই ববিতা খানমেরও তো একজন এমপি আছেন, আছেন একজন উপজেলা চেয়ারম্যান, দু-দুজন ভাইস চেয়ারম্যান—এঁদের মধ্যে একজন কিন্তু নারী, একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানও। প্রশ্ন, এসব নির্বাচিত প্রতিনিধি ববিতা খানমের জন্য কে কী করেছেন? সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও তার এত অঙ্গ সংগঠনের নেতা-নেত্রীরা কী করেছেন? আমাদের জেলা প্রশাসক, এমপি, ইউএনও, থানার দারোগা, তাঁদের কে কী করলেন? তাঁদের জবাবদিহি কোথায়? কার কাছে? কোনো নারী সংগঠন বা সহস্র নাগরিক কমিটিও কি ৫০ জন মহিলা এমপিকে তাঁদের দায়িত্ব পালনের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে? বা সুশীল সমাজের আর কেউ? কক্সবাজারের হাজার হাজার বিপন্ন মানুষের চেয়ে কম গুরুত্বের এমন কোনো ঘটনা ঘটলে ব্রিটিশ হাউস অব কমন্সের বিশেষ অধিবেশন ডাকা হতো।
যুক্তরাজ্যে একজন এমপির কী কী দায়িত্ব, তাঁরা কীভাবে তা পালন করেন, সে সম্পর্কে আমাদের জাতীয় সংসদের সদস্যদের পরামর্শ দেওয়ার জন্য ওই তিন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এমপিকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসা যেতে পারে।
আমাদের সাংসদেরা ডিউটি ফ্রি গাড়ি আমদানি করবেন, টেন্ডার ভাগাভাগিতে থাকবেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে ভাগ চাইবেন, সংসদের পাঁচ বছর মেয়াদকালে প্রত্যেকে ২০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ পাবেন, এসবের কিছুই যুক্তরাজ্যের এমপিদের নেই। তার পরও নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে তাঁদের সব দায়িত্বই তাঁরা পালন করে থাকেন। এতে ব্যর্থ হলে হয়তো পার্টিই তাঁকে পরের নির্বাচনে মনোনয়ন দেবে না বা দিলেও তিনি নির্বাচিত হবেন না। এমপি পার্লামেন্টে কত দিন উপস্থিত থাকেন, বিভিন্ন সংস্থা তা-ও মনিটর করে পরের নির্বাচনকালে তা প্রকাশ করে।
ওসব দেশে ‘পলিটিকস ইজ ভেরি ক্রুয়েল’।
মহিউদ্দিন আহমদ: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সচিব, কলাম লেখক।
Mahiuddinahmed1944@yahoo.com

থাইল্যান্ডে গণকবর ও ‘ফোরটুয়েন্টি’ ধারা by মো. খুরশীদ আলম খান

থাইল্যান্ডের গণকবরে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির সন্ধানলাভের হৃদয়বিদারক খবর আমাদের প্রচলিত আইনের আওতায় প্রতারণা ও জালজালিয়াতির বিচারের কার্যকারিতাকে জ্বলন্ত প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। কারণ, গণকবর ট্র্যাজেডি ইঙ্গিত করছে যে মানব পাচার চক্র, যাদের সচেতন মহল ‘ফোরটুয়েন্টি’ হিসেবেই জানে, তারা নিরীহ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে নিরাপদ থাকার এক স্বর্গরাজ্য রচনা করেছে। এ প্রসঙ্গে আমি ২০১৩ সালে দুদক তফসিলে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারাটি অন্তর্ভুক্ত করার ওপর বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। এ ধারা এখন মৃতবৎ, থেকেও নেই। আদালতে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন আইনি ব্যাখ্যার সম্মুখীন। ৪২০ ধারায় মামলা কার্যত বন্ধই হয়ে গেছে। সর্বস্তরের প্রতারকেরা তাই উল্লাসে নৃত্য করছে। কারণ, প্রতারণা ও জাল-জালিয়াতির কোনো মামলা নিচ্ছে না থানা ও মহানগর দায়রা আদালত। প্রতারণা, ঘুষ, জমি জাল-জালিয়াতির অভিযোগ আমলে নেওয়ার সব দায় দুদকের, অথচ লোকবিহীন সংস্থাটি বাস্তবে নিধিরাম সর্দার।
যেসব ধারা দুদক আইনের তফসিলভুক্ত করা হয়েছে, সেগুলো হলো সরকারি কর্মচারী হয়ে ঘুষ নেওয়া, ঘুষ দেওয়া, ঘুষ নিয়ে প্রভাব সৃষ্টি, বেআইনিভাবে নিলাম ডাকসংক্রান্ত অপরাধ। কাউকে বাঁচাতে সরকারি কর্মচারীদের আইন ভঙ্গ বা ভুয়া দলিল প্রণয়ন করা, সরকারি কর্মচারীদের বিশ্বাস ভঙ্গ, ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অবহেলা, প্রতারণার মাধ্যমে দলিল জাল করা ও তার ব্যবহার। এর সবটাই জামিন অযোগ্য করা হয়েছে।
দেশে থানায় যত মামলা হয়, তার এক-তৃতীয়াংশই জমির দলিল জালিয়াতি, মানব চোরাচালান ও ভুয়া চাকরিসংক্রান্ত। থাইল্যান্ডের গণকবরের ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে যে এসব আইনের কার্যকর প্রয়োগ কতটা জরুরি। পুলিশ বা সিআইডি এসব বিষয়ে তাদের আইনের আওতায় তদন্ত করবে কি না, তা নিয়ে বিভ্রান্তি চলছে। কারণ সংশোধিত দুদক আইন বলছে, এসব কাজ করবে দুদক। কিন্তু তদন্ত করার মতো পর্যাপ্ত জনবল দুদকের নেই। এতে একমাত্র লাভবান হচ্ছে আসামিরা আর বিভ্রান্ত হচ্ছেন অভিযোগকারীরা।
এই দ্বৈত ব্যবস্থা মামলা দায়েরে ও তদন্তে জটিলতা তৈরি করেছে। যদিও থানার এসব মামলা নিতে আইনি বাধা নেই। আবার ২০১৩ সালের সংশোধনীর আগেও থানা এসব মামলা নিয়ে তদন্তের জন্য দুদকেই পাঠাত। যেমন: ৪০৮, ৪০৯, ৪২০, ৪৬২ ধারার মামলা। তাহলে এখন দুদক আইনের তফসিলের অজুহাতে কেন পুলিশ মামলা গ্রহণ করবে না? উভয় পক্ষ মিলেমিশে কাজ করলে অবশ্য বিদ্যমান অচলাবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটতে পারে।
বেশ কিছুদিন আগে সোনা উদ্ধারের একটি মামলা রেকর্ড করে দুদকে পাঠিয়ে দেওয়ার উদাহরণও আছে। সুতরাং বলা যায়, মামলা নেওয়া না-নেওয়ার বিষয়টি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তাদের ওপর। এর জন্য দুদক আইন বা ফৌজদারি আইন মুখ্য নয়, থানার কর্মকর্তাদের ইচ্ছাই প্রধান। যদিও আইনে কোন পর্যায়ে এসে মামলা হস্তান্তর করা হবে, তার কোনো নীতিমালা নেই। বিপত্তিটা এখানেই। দেখা যাবে, এতে জটিলতা না কমে বরং তা বেড়ে যাবে বহুগুণে।
দুদক আইন অনুযায়ী এসব মামলার বিচারের এখতিয়ার এখন বিশেষ জজ আদালতের। এর ফলে এ ধরনের মামলায় হাকিম আদালতগুলো জামিন ও হাজিরা গ্রহণ করছেন না। এমনকি উচ্চ আদালত থেকে অন্তর্বর্তী জামিনে থাকা আসামির জামিনের আবেদনও অনেক ক্ষেত্রে গ্রহণ করছেন না হাকিম আদালত। কারণ, বতর্মান আইনে কোনো আদেশ দেওয়ার এখতিয়ার মহানগর হাকিমদের রাখা হয়নি। প্রতারণার মাধ্যমে ৫০০ টাকা কিংবা ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ—এ দুই ধরনের অভিযোগের বিষয়েই এখন দুদকের আশ্রয় নিতে হবে, আর জটিলতা সেখানেই।
সংশোধিত আইনের ফলে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে মামলাগুলো দায়রা জজ আদালতে চলে যাবে। ফলে দায়রা আদালতে মামলার সংখ্যা বাড়বে। এ কারণে দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির কাজ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তা ছাড়া দায়রা জজ আদালতেও মামলার সংখ্যা বাড়বে।
সামগ্রিক দিক বিবেচনায় এ বিষয় নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করা অত্যন্ত জরুরি এবং বিষয়টি জনগুরুত্বসম্পন্ন। ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার বিরাট সর্বনাশ ঘটছে। এখন অধিকাংশ ঘটনায় জালিয়াতি ও প্রতারক চক্রকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দর এলাকায় জাল-জালিয়াতি ও প্রতারক চক্রকে নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। সর্বশেষে চোরাই সোনা ও পুলিশের তিন সদস্যসহ চারজনকে গ্রেপ্তারের পর মামলা করতে দুদকের কাছে লিখিত অনুমতি চায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। অনুমতি না পাওয়ায় ওই চারজনকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এটা তো চলতে পারে না।
জালিয়াতি করে বিদেশে গমনে ইচ্ছুকদের হাতেনাতে গ্রেপ্তারের পরও তাৎক্ষণিক দুদকের অনুমতি না পাওয়ায় এখন অনেক ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় করে ৫৪ ধারা ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে পুলিশ। বিমানবন্দরে নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থা এসব ব্যক্তিকে আটক করে। এরপর তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের জন্য দুদকে চিঠি দেওয়া হয়। এখনো বিমানবন্দরে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের ব্যাপারে দুদক কোনো মতামত দেয়নি। অনুমতি পাওয়ার অপেক্ষার জন্য তো আসামি হাতে রাখা যায় না, তাই বাধ্য হয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এ কারণে জালিয়াতি ও প্রতারণা করেও ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় আসামি হওয়ায় তারা সুবিধা পাচ্ছে। অনেকে জামিনে ছাড়াও পাচ্ছে।
ঢাকা মহানগরে বর্তমানে তদন্তাধীন সাড়ে তিন হাজারের বেশি মামলার মধ্যে ১ হাজার ২০০ মামলাই জালিয়াতি ও প্রতারণাসংক্রান্ত ধারায়। এসব মামলার তদন্তের ভার দুদকের ওপর ন্যস্ত হওয়ায় এটি প্রতিষ্ঠানটির মূল স্পিরিটের সঙ্গেও মানানসই নয়। এমনকি প্রতিনিয়ত শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে জালিয়াতি ও প্রতারণার ঘটনা ঘটে, অথচ সর্বত্র দুদকের নেটওয়ার্ক নেই। তাই এসব ধারায় মামলা নিয়ে গ্রামের বাসিন্দারা বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে ও পড়বে।
এতে লক্ষণ ফুটে উঠেছে যে সংসদ ও সরকারব্যবস্থা কার্যকারিতা হারিয়েছে। তা-ই যদি না হবে, তাহলে যে দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪২০-এর আওতায় কমপক্ষে হাজারের বেশি মামলা হয়, সে দেশের সংসদ কী করে পুলিশের এখতিয়ার রহিত করে তা দুদককে দিতে পারে? সন্দেহ নেই যে ২০১৩ সালের নভেম্বরে দুদক আইনে সংশোধনী এনে তুঘলকি নীতি অনুসরণ করা হয়েছে।
তবে বলা হচ্ছে, ওই পদক্ষেপের পরেই উল্লিখিত অভিযোগ ও মামলা নিয়ে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, ওই সংশোধনীর আগেও এ ধরনের অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া গতিসম্পন্ন ছিল, তা বলা যাবে না।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কয়েক দিন আগেই বলেছিলেন, বিষয়টি তিনি অবগত আছেন। কিন্তু এরই মধ্যে অনেক সময় চলে গেছে। বিষয়টির এখনই সুরাহা প্রয়োজন। দণ্ডবিধির ৪২০ ধারা দুদক তফসিলে থাকবে কি না, থাকলে কতটুকু থাকবে, সেটার সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। দিন যতই যাচ্ছে, ততই আইনি জটিলতা বাড়ছে। ইদানীং নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায়ও দণ্ডবিধির ৪২০ ধারা সংযুক্ত করা হচ্ছে, সেখানেও আইনি নানা ব্যাখ্যার উদ্ভব হচ্ছে। কাজেই বিষয়টির এখনই সমাধান দরকার। কারণ আদালতের প্রতিটি কার্যদিবসেই এ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে দুদক আইনজীবীদের।
এবার ৪০৮ ধারা নিয়ে বলি। যে ব্যক্তি কেরানি বা চাকর হয়ে বা অনুরূপ ক্ষমতায় কোনো সম্পত্তির ওপর কোনো প্রকার আধিপত্যের ভারপ্রাপ্ত হয়ে ওই সম্পত্তি সম্পর্কে অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গ করেন, তাঁর অনূর্ধ্ব সাত বছর জেল হবে। এই অপরাধ দুদক আইন, ২০০৪ আসার আগে আদালতের অনুমতি নিয়ে আপসযোগ্য ছিল। একজন কর্মচারী অর্থ আত্মসাতের দায়ে অভিযুক্ত হওয়ার পর যদি আদালতে বিচার চলাকালে দোষ স্বীকার করে টাকা ফিরিয়ে দিত, তাহলে আদালত রাজি হতেন। কারণ মামলার বাদী টাকা ফেরত পেলে তাঁরও কোনো অভিযোগ থাকত না। কিন্তু এখন ধারাটি দুদকের তফসিলভুক্ত হওয়ার কারণে আর মামলা আপসের সুযোগ নেই। এখন এ ধারার মামলার তদন্ত করছে দুদক, বিচার চলে বিশেষ আদালতগুলোয়। অথচ আপস না হলেও মামলার বাদীরা আগের মতোই টাকা ফেরত পেলে তিনি আর মামলায় সাক্ষ্য দিতে বা মামলার তদবিরও করতে চান না। অভিযুক্ত ব্যক্তিরও অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ নেই।
একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থায় অপরাধীকে শোধরানোরও সুযোগ দিতে হবে। সার্বিক দিক বিবেচনায় অবিলম্বে ৪২০ ও ৪০৮ ধারা দুদকের তফসিল থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানাই।
মো. খুরশীদ আলম খান: জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, দুদক ও সম্পাদক, ডিএলআর।

প্রবৃদ্ধি: সম্ভাবনা ও প্রতিকূলতা by রডরিগো কুবেরো

বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বহু সম্ভাবনার পাশাপাশি বাংলাদেশ কিছু প্রতিকূলতারও সম্মুখীন। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি এখনো কিছুটা মধ্যম গতির ও অসম, উন্নত দেশগুলোয় অর্থনৈতিক গতিধারা ঘুরে দাঁড়ালেও প্রধান কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দরপতন ও প্রধান মুদ্রাগুলোর বিনিময় হারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী কিছু দেশ লাভবান হলেও কিছু দেশ লোকসানেরও সম্মুখীন হচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে এ বৈপরীত্যের প্রেক্ষাপটে এশিয়া মহাদেশ প্রবৃদ্ধির নেতৃত্বে রয়েছে। আমাদের সর্বশেষ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস (Regional Economic Outlook: Asia and Pacific) অনুযায়ী, ২০১৫ সালে এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির হার ৫.৬ শতাংশে স্থিত থাকার আশা করা হচ্ছে, যা ২০১৬ তে সামান্য হ্রাস পেয়ে ৫.৫ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। দৃঢ় শ্রমবাজার, ঐতিহাসিকভাবে বিদ্যমান নিম্ন সুদহার এবং জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক দরপতন অভ্যন্তরীণ চাহিদায় চাঙাভাব থাকার পূর্বাভাসের সহায়ক হবে। উন্নত বিশ্বে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও মুদ্রার দুর্বল বিনিময় হারের কারণে কয়েকটি দেশের রপ্তানিও লাভবান হবে।
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বৃহৎ দেশগুলোয় প্রবৃদ্ধির গতিধারা মিশ্র হবে বলে আশা করা হচ্ছে। চীনের অর্থনীতি টেকসই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে শ্লথ হয়ে যাবে। ২০১৫ সালে চীনের অর্থনীতি ৬.৮ শতাংশে বৃদ্ধি পাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে এবং আবাসন খাতে সংশোধন অব্যাহত থাকায় ২০১৬ সালে তা ৬.৩ শতাংশে দাঁড়াবে। অন্যদিকে, ভোক্তা চাহিদা ও রপ্তানি বৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে জাপানের অর্থনীতি ২০১৫ সালে ১ শতাংশ ও ২০১৬ সালে ১.২ শতাংশ হারে পুনরুদ্ধার হতে পারে। সাম্প্রতিক নীতি সংস্কার ও তেলের নিম্ন মূল্যের প্রভাবে ভারত দ্রুতহারে বিকাশমান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে একটি হবে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে দেশটির অর্থনীতি ৭.৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যদ্রব্যের মূল্য কম থাকায় এ অঞ্চলের অধিকাংশ অর্থনীতিতে আয় বাড়বে ও মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাবে। তবে এর প্রভাবে পণ্যদ্রব্য রপ্তানিকারক দেশ, যেমন অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এসব ঘটনাপ্রবাহের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যহ্রাসের ফলে তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সুবিধা ভোগ করছে। উপরন্তু ভারতের দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতিতে বাংলাদেশের রপ্তানির সুযোগ সম্প্রসারিত হচ্ছে। অন্যদিকে টাকার প্রকৃত বিনিময় হারে দীর্ঘমেয়াদি উপচিতি, বিশেষত ইউরোর বিপরীতে টাকার মূল্যবৃদ্ধির কারণে, প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। চীনের অর্থনীতির শ্লথগতির জন্য দেশটিতে রপ্তানির সম্ভাবনা কমতে পারে, কিন্তু চীনের জনগণের প্রকৃত আয় বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বৃদ্ধির সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
একইভাবে, অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ বিভিন্ন অনুকূল ও প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন। জানুয়ারি ২০১৪ নির্বাচনের পর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালেও, জানুয়ারি ২০১৫ থেকে আরম্ভ হওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ইতিমধ্যে এর প্রভাবে কতিপয় অর্থনৈতিক কার্যক্রম নির্দেশক শ্লথ হয়ে পড়েছে। তা সত্ত্বেও সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বিরাজমান। প্রাজ্ঞ মুদ্রানীতির ফলে মূল্যস্ফীতি প্রশমিত হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তা পুনরায় বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বৃদ্ধি অব্যাহত থাকার ফলে বাহ্যিক অবস্থান সুদৃঢ় থাকবে। রাজস্ব আদায় পরিস্থিতিতে দুর্বলতা থাকলেও, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দরপতনের কারণে তেল খাতে ভর্তুকি হ্রাস বর্তমান আর্থিক বছরে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আংশিক সহায়তা করেছে। সরকারি ঋণের পরিমাণও সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের আশপাশে হতে পারে, যা রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকতা ফিরে এলে এবং শান্তভাব বিরাজ করলে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বৃদ্ধি পেয়ে ৬.৫ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে আশা করা যায়।
তবে প্রবৃদ্ধির এ হার অর্জনের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে সৃষ্ট কয়েকটি ঝুঁকি বিদ্যমান। রাজনৈতিক অস্থিরতা তীব্র ও স্থায়ী হলে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ভিত্তি দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতিতে আস্থার অভাব দেখা দিতে পারে। ব্যাংকিং খাতে বিরাজমান দুর্বলতার কারণে সরকারি রাজস্ব খাত ও আর্থিক খাতে মধ্য মেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, যা কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনকে বাধাগ্রস্ত করবে।
বিগত কয়েক বছর ধরে, বর্ধিত ঋণসুবিধা ব্যবস্থার আওতায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সরকারের সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে দেশটির সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে, যার মেয়াদ প্রায় সমাপ্তির পথে। আগামী দিনগুলোতে প্রাজ্ঞ সরকারি রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতি অব্যাহত থাকলে সুদৃঢ় প্রবৃদ্ধি ও টেকসই দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব হবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে রাজস্ব আদায় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাত হিসাবে অত্যন্ত কম (২০১৩-১৪ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় ছিল জিডিপির মাত্র ৮.৫ শতাংশ) এবং এ অনুপাত বৃদ্ধিতে অগ্রাধিকারমূলকভাবে কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন। সরকারি রাজস্ব আদায় বাড়লে অত্যাবশ্যক বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ পরিকাঠামো ব্যবস্থা এবং লক্ষ্যমুখী সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।
২০১২ সালে সংসদে গৃহীত নতুন মূল্য সংযোজন কর আইন এসব গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সম্পদের জোগান দিতে পারে। এ ছাড়াও নতুন আইনটিতে দরিদ্র পরিবারগুলোর স্বার্থ রক্ষার্থে অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্যগুলোকে মূল্য সংযোজন করের আওতামুক্ত রাখার বিধান রয়েছে। পাশাপাশি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে মূল্য সংযোজন করের নিবন্ধনসীমা উচ্চহারে নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইনের সহজীকরণ, অভিন্ন কর হারে স্বতঃ নিয়ন্ত্রিত নিবন্ধন ও সহজে কর পরিশোধ ব্যবস্থার বিধান করার ফলে করদাতাদের হয়রানি হ্রাস পাবে এবং ব্যবসায়ীদের কর পরিশোধ ব্যয় হ্রাস পাবে।
ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন এবং আর্থিক খাতে তত্ত্বাবধান ও সুশাসন সুদৃঢ় করার প্রয়াস অব্যাহত রাখা টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জন নিশ্চিত করার জন্য একান্তভাবে আবশ্যক। বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সরকারের এসব অগ্রাধিকারমূলক নীতি বাস্তবায়নে সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে প্রস্তুত রয়েছে।
রডরিগো কুবেরো: বাংলাদেশের মিশন প্রধান, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল।

মানুষ বেচে কোটিপতি by রাসেল চৌধুরী

ওরা কারবারি। মানুষ নিয়েই কারবার তাদের। মানুষ বেচাকেনা করে সংসার চালায়। কোটিপতি হয়। কিন্তু যাদের নিয়ে তাদের কারবার সেই মানুষ যে বিভীষিকার অতল গহ্বরে পড়ে নিঃশেষ হচ্ছে সেদিকে তাদের খেয়াল নেই। আর খেয়াল করার দরকারও নেই। কারণ, মানুষ তাদের কাছে পণ্য। মানুষকে পণ্য করেই তারা বানাচ্ছে অট্টালিকা। আয়েশি জীবন তাদের। এমনই একজন টেকনাফ পৌর এলাকার মধ্যম জালিয়াপাড়ার বাসিন্দা জাফর আলম ওরফে টিটি জাফর। বয়স ৪৫। তাকে সবাই চেনে মানব পাচারের সূচনা পুরুষ হিসেবে। মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া পর্যন্ত তার নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। মানব পাচারের সুবিধার জন্য ভাড়ায় একাধিক ট্রলার নিয়েছেন তিনি। মানব পাচার করে রাতারাতি কোটিপতি তিনি। উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের পাইন্নাসিয়া গ্রামে দুই বছর আগে এসে জায়গা কিনে বসতি করেন সানাহ উল্লাহ (৪০)। ঝুপড়িঘরসহ ভিটে কিনে তিনি এখন ওই এলাকার আলোচিত ব্যক্তি। রাতারাতি অনেক টাকার মালিক। ঝুপড়ি ঘর এখন আলিশান প্রাসাদ। শুধু তিনি নন, তাকে ঘিরে অসংখ্য ব্যক্তি এখন কোটি টাকার মালিক। কিভাবে এলো এতো টাকা? মানব পাচার করেই তিনি রাতারাতি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এ পর্যন্ত মানব পাচারবিরোধী অভিযানে অনেক চুনোপুটি ধরা পড়লেও সানাহ উল্লাহরা রয়েছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
আদম পাচার কাজে জড়িত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত আরেক শীর্ষ মানব পাচারকারী কোটিপতি ফয়েজ। উখিয়া সদর স্টেশনের পশ্চিম পাশে রয়েছে একটি বিলাসবহুল বাড়ি। জালিয়াপালং ইউনিয়নের মনখালী এবং জুম্মাপাড়ায় রয়েছে আরো ২টি বিলাস বহুল বাড়ি। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে রয়েছে কোটি কোটি টাকার জায়গা জমি। এত অপকর্ম করার পরও তিনিও অদ্যাবধি অধরা। জাফর, ফয়েজ, সানা উল্লার মতোই অল্প সময়ের ব্যবধানে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছে মানব পাচারকারী শতাধিক গডফাদার-দালাল। ইতিমধ্যে ‘ক্রসফায়ারে’ মারা যাওয়া ধলু হোসেন, নুর আহাম্মদও বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক ছিলেন। তাদের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনরাও রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন।
টেকনাফ থেকে কক্সবাজার আসার পথে লেদা এলাকায় মূল সড়ক ঘেঁষেই সুরম্য অট্টালিকা তৈরি করেছেন ‘ক্রসফায়ারে’ মারা যাওয়া ইয়াবা ব্যবসায়ী নুর আহাম্মদের ভাই নুরুল হুদা। মাত্র তিন বছর আগেও তিনি ছিলেন ট্রাকের হেলপার। ইয়াবা ব্যবসা ও মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এখন তিনি কোটিপতি। মন্ত্রণালয়ের তালিকায় নাম থাকার কারণে আপাতত গা-ঢাকা দিয়েছেন চোরাকারবারি নুরুল হুদা।
মানব পাচার বিরোধী অভিযানে এ পর্যন্ত ৬ জন মানব পাচারকারী নিহত ও অর্ধশতাধিক আটক হয়েছেন। কিন্তু জাফর, সানাহ উল্লাহ, ফয়েজের মতো সাগরপথে মানবপাচারকারী চক্রের বড় একটি অংশ এখনও রয়েছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
মানব পাচার প্রতিরোধে কর্মরত স্থানীয় এনজিও সংস্থা হেলপের নির্বাহী পরিচালক এম আবুল কাশেম বলেন, ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত উখিয়া-টেকনাফে উপকূলীয় বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানের প্রায় ৫০ হাজারের অধিক লোকজন মালয়েশিয়া পাড়ি দিয়েছে। এর মধ্যে অনেকেরই সমুদ্রে সলিল সমাধি হয়েছে বলে জেনেছি। কিছু লোক থাইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়ার জেলে বন্দি অবস্থায় মানবেতর দিন যাপন করছে।
এ ব্যাপারে উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম খান বলেন, মানব পাচারকারীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ সার্বক্ষণিক তৎপর। রাত-দিন পাচারকারীদের বাড়িঘরে অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে তারা আত্মগোপনে থাকার কারণে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে না।
পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ডের পাশাপাশি স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার মূল ঘাঁটি টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ। এছাড়া পাচারের রুট হিসেবে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া, ফিশারিঘাট, নাজিরারটেক, সমিতিপাড়া,  কলাতলী, মাঝিরঘাট, সদর উপজেলার ঈদগাহ, খুরুশকুল, চৌফলদন্ডী, পিএমখালী, রামু উপজেলার হিমছড়ি, দরিয়ানগর, পেচারদ্বীপ, মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া, গোরকঘাটা, কুতুবজোম ও ধলঘাটা।
উখিয়ার সোনারপাড়ার মানবপাচার প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব আবদুল হামিদ জানান, উখিয়ার সোনারপাড়ার বাদামতলীঘাট, রুস্তম আলীঘাট,  রেজুনদী, ইনানী, ছেপটখালী, মনখালী, শফিরবিল পাচারের নিরাপদ রাস্তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখনও এখানে পাচারের কাজে ব্যবহৃত ট্রলারগুলো রয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তোফায়েল আহমেদ জানান, কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলের ৪৫টি পয়েন্টকে মানব পাচারকারী বিভিন্ন চক্র ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে। জেলার সাড়ে চার শতাধিক পাচারকারীকে ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলছে।

গল্প- একজন সীমাবদ্ধ ভাগ্যের মানুষ by এ টি এম হায়দার খান

এক শ উনিশ বছর আগের কথা। ১৮৯৬ সালের বসন্তের প্রায় শেষদিক। ভারতবর্ষের চারিদিকে দুর্ভিক্ষ জেঁকে বসেছে। চারিদিকে হাহাকার ও রোগশোকের ছড়াছড়ি। সদ্য মেডিকেল পাশ করে হেমন্ত ব্যানার্জি বিলেত থেকে এই রকম সময়ে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। তখন সমসাময়িক যে কজন বিলেত ফেরত ডাক্তার কলকাতায় ছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম মেধাবী হেমন্ত ব্যানার্জি।
সকলের ধারণা ছিল দেশে ফিরে হেমন্ত বাবু নিজ শহর কলকাতাতেই রোগী দেখবেন। কলকাতা ভারতের পশ্চিম দিকের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র। চিরাচরিত নিয়মে ডাক্তারি প্রতিভা দেখিয়ে হেমন্ত বাবুর কাড়ি কাড়ি টাকা আয়ের সমূহ সম্ভাবনা দেখতে আরম্ভ করেছিলেন তার আত্মীয় ও স্থানীয় লোকেরা। কিন্তু সবার ভাবনাকে আশ্চর্য ভাবে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সম্পূর্ণ নিজ খরচে ও বিনা বেতনের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি দাতব্য চিকিৎসালয় খুললেন তিনি। তার স্বাধীনচেতা মন কখনো তার কার্যকলাপ সম্পর্কে কাউকে প্রশ্ন তোলার সুযোগ পর্যন্ত দেয়নি কোনো দিন। তার দেশন্তপ্রায় হৃদয় সব সময় নিজের দেশের মানুষের কল্যাণে সর্বদা ব্যতিব্যস্ত থাকত। আর সাধারণ মানুষও তার এই উদার হৃদয়ের কৃতজ্ঞতা খুব শ্রদ্ধাভরেই স্মরণ করত। বলাবাহুল্য, হেমন্ত একা বসবাস করতেন। রক্তের কোনো টান তার ছিল না। ১৮৮৯ সালে তিনি বিলেত পাড়ি জমানোর দু বছরের মাথায় তার বাবার মৃত্যু হয়। তাই নিজের একাকিত্বকে তিনি গণ্ডির মধ্যে গুমরে ওঠার সুযোগ না দিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে নিজেকে ভাগ করে নিতেন। যদিও দিন শেষে আবার তাকে একা থাকতেই হতো। বাবাই ছিল তার একমাত্র সম্বল। ১৮৮০ সালের ওলার ভয়ংকর কবল থেকে তার বাবা নিজেকে কোনোরকমে বাঁচিয়েছিলেন। কিন্তু পরিবারের আর কাউকে সেই মৃত্যু ক্ষমা করেনি।
যা হোক কিছুদিনের মধ্যে অবিবাহিত হেমন্ত বাবু কন্যাদায়গ্রস্ত বাবাদের কাছে বেশ চাহিদাসম্পন্ন হয়ে উঠলেন। এদের মধ্যে স্থানীয় কালেক্টর বাবু অন্যতম। তার সাত ছেলে ও একমাত্র কন্যা প্রিয়বাসিনীকে নিয়ে সংসার। ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের কর্মকর্তা হিসেবে তার প্রতিপত্তি নেহাত কম ছিল না।
এমন একজন ক্ষমতাধর মানুষের উপযুক্ত জামাই হিসেবে হেমন্ত বাবুর তুলনা তখন ছিল না। সুতরাং হেমন্ত একদিন কালেক্টর বাবুর নিমন্ত্রণও পেয়ে গেলেন।
১৭ বছর বয়স্কা প্রিয়বাসিনীকে আপন করে পাওয়ার জন্য সত্যি কিছুটা ভাগ্যের ও যোগ্যতারও দরকার ছিল। কেননা তার রূপ আর গুণের কাছে তার বাবার সমস্ত ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি সব ফিকে হয়ে যেত। ধূসর আয়ত চোখ আর সপ্তাদশি যৌবন, এক কথায় অতুলনীয়া করে তুলেছিল তাকে। গোলাকার মুখচ্ছবি, সুগঠিত নাক, টানা ভ্রু যুগল, গোলাপি ঠোঁট আর আকর্ষণীয় কটিদেশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সাবলীল হাসি, সমুদ্রের মতো গভীর দৃষ্টি। কিন্তু তার পরেও তার ক্ষুরধার বুদ্ধির ছটা বেশ ভালোভাবে টের পাওয়া যেত। তার হাসিতে ছিল নিখুঁত শান্ত সমুদ্রের মতো মৌনতা। হাসলে সাধারণের মতো তার গাল ফুলে ওঠে না, নিচের ঠোঁট কিছুটা নিচে সরে আসে। কিন্তু তার সেই হাসির আড়ালে বুদ্ধিদীপ্ত সত্বাকে সহজেই খুঁজে পাওয়া যেত। চোখ দুটি শীতল, উষাকালে সূর্য ওঠার আগে এবং চাঁদ অস্তমিত হওয়ার সময় আকাশে যে কমল নীল বর্ণ প্রকাশ পায়, প্রিয়বাসিনীর চোখের বর্ণ ছিল তেমন। কারুকার্য খচিত দেহ এবং সেই দেহে স্থিরতা ছিল না। কানে হিরের অলংকার আর গলায় রাজকীয় হীরক মালা। নতুন পাশ্চাত্য অনুষঙ্গ ব্যবহারে তার কুণ্ঠাবোধ তো ছিলই না বরং স্বর্ণকেশী সেজে থাকতেই সে ভালোবাসত। তার মুখের কমনীয়তা রেশমি চুলের সঙ্গে মিলেমিশে তাকে অপ্সরা করে দিয়েছিল।
গ্রিক দেবী ভেনাসের মতো দেহসৌষ্ঠব আর অত্যাধুনিক সাজ পোশাকের সঙ্গে তার উচ্চমার্গীয় রুচিবোধের সংমিশ্রণ যেকোনো পুরুষের হৃদয় বিদীর্ণ করে দিতে যথেষ্টর থেকে কিছুটা বেশিই ছিল। আর সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টির তীর হেমন্ত বাবুরও হৃদয়ে আলোড়ন তুলল। তিনি প্রিয়বাসিনীর প্রেমে না পড়ে পারলেন না।
কালেক্টর বাবু বুদ্ধিমান লোক। হেমন্ত বাবুর মতো পাত্র লাখে একটা মেলে, এটা তিনি বেশ ভালোই বুঝেছিলেন। তাই হেমন্ত বাবুর প্রস্তাবে দ্বিমত তো করলেনই না বরং তাকে একটি বেশ মোটা রকমের যৌতুকের সঙ্গে কলকাতাতেই একটি যুগোপযোগী হাসপাতালের বন্দোবস্ত করে দেওয়ার প্রস্তাব রাখলেন। কিন্তু আধুনিক মনমানসিকতায় বড় হওয়া হেমন্ত বাবু সে প্রস্তাব বিনম্র ভাবে ফিরিয়ে দিলেন। কালেক্টর বাবু এ নিয়ে আর কথা বাড়ালেন না। পরবর্তীতে একটা সুরাহা করবেন মনে মনে এমন ভাবনা রেখে কথা পাকাপাকি করে ফেললেন। প্রিয়বাসিনী আর হেমন্ত বাবুর গাঁটছড়া তিনি বেশ ঘটা করেই বেধে দিলেন। অনেক মিষ্টি মধুর স্বপ্নে বিভোর হয়ে শুরু হলো নবদম্পতির স্বপ্ন বোনার পথচলা।
কিন্তু ওই যে, মানুষের ভাগ্য, নিয়তি, স্থান, কাল, পাত্র সব যিনি নিয়ন্ত্রণ করেন, তিনি হয়তো অন্যরকম কিছুই ঠিক করে রেখেছিলেন। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেওয়া প্রিয়বাসিনী নিজেকে হেমন্ত বাবুর সাধারণ জীবনযাপনে মানিয়ে নিতে পারল না। তার ক্রমবর্ধমান বিলাসী চাহিদা অপূর্ণই থেকে যেতে লাগল। উপরন্তু হেমন্ত বাবু যখন শ্বশুরের প্রস্তাব বারবার ফিরিয়ে দিতে লাগলেন তখন তা গোদের ওপরে বিষফোড়া হয়ে দেখা দিল। হেমন্ত বাবুর আত্মবিশ্বাস অটুট থাকল বারবার। নিজের চেষ্টায় ভালোভাবে চলাটা তার লক্ষ্যে পরিণত হয়ে গেছে তত দিনে। এভাবে বছর দু-এক চলার পর প্রিয়বাসিনী গর্ভধারণ করল। এত দিনের ছাইচাপা আগুনে এই খবরটা ঘি হয়ে পড়ে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। দিনে দিনে প্রিয়বাসিনীর বিতৃষ্ণার ভাবটা আরও বেড়ে গেল। তার কোল আলো করে আসা পুত্র সন্তানও তার মনোভাব স্থির করাতে পারল না। ফলে ছয় দিনের শিশু বাচ্চাকে ফেলে রেখেই প্রিয়বাসিনী হেমন্তের ঘর ছাড়ল।
হেমন্ত বাবু জানতেন যে, তাকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য প্রিয়বাসিনীর যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তাই তিনি প্রতিবাদ করেননি। তার মনের কোণে তবুও কোথাও যেন কিছু ভালোবাসা অবশিষ্ট থেকে গিয়েছিল, যেটা তাকে প্রিয়বাসিনীর ফিরে আসার ব্যাপারে স্বপ্ন দেখাত। তিনি মানিয়ে নিলেন নিজেকে। আর প্রিয়বাসিনীও তার কাঙ্ক্ষিত জীবনসঙ্গী পেয়ে আবার নতুন করে সংসার পাতল। যদিও তৎকালীন সমাজে পুনর্বিবাহ নিষিদ্ধ ছিল, তবে তা প্রিয়বাসিনীর মতো ধনী বাবার মেয়েদের জন্য নয়। সে তার অতীত ভুলে নতুন সংসারে মন দিল।
হেমন্ত বাবু কিন্তু আর দ্বিতীয় বি​য়ে করলেন না। প্রিয়বাসিনী যাওয়ার আগে তাকে দিয়ে গেছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি রত্ন। তার ছেলে শিশির। হেমন্ত বুঝেছিলেন, অভাব তার সংসার ভেঙ্গেছে। তাই তিনি শিশিরকে অভাব বোধ করতে দিলেন না কখনোই। শিশির কলকাতার ভালো প্রতিষ্ঠানে উচ্চ শ্রেণির হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করত।
ইতিমধ্যে কেটে গেছে ১৭টি বসন্ত। শিশির বড় হয়েছে। প্রিয়বাসিনীর নতুন সংসারে আরও একটি ছেলে ও দুটি কন্যা সন্তান হয়েছে। সে শিশিরের খোঁজ নেয়নি কোনো দিন। আর হেমন্ত বাবুও শিশিরকে নিষেধ করেছিলেন তার মা সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করতে।
এক শরতে দুর্গা পূজার ছুটিতে শিশির তার বাবাকে দেখতে এল। প্রিয়বাসিনীও তার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে বাবার বাড়িতে এল পূজা উপলক্ষে। গ্রামে ধনী পরিবার বলতে কালেক্টর বাবুর পরিবারই সব থেকে উঁচুতে। তাই প্রধান দুর্গোৎসবটা সেখানেই হয়। আগে গ্রামের বাইরে থাকায় শিশির কখনোই সেখানে যায়নি। তাই বন্ধুরা যখন জোর করল সেও আর না করল না। তার এক দূরসম্পর্কের দাদা ঠাকুর একদিন কথায় কথায় বলেছিলেন তার মামা বাড়ি ওদিকেই কোথাও। তাই শিশিরের মনে ক্ষীণ আশা জাগল, দশম জন্মতিথিতে বাবার দেওয়া মায়ের একমাত্র ছবির আদলে মাকে যদি খুঁজে পাওয়া যায়। ঠাকুর তাকে নিরাশ করলেন না। কালেক্টর বাবুর মন্দিরে আরতিলগ্নে এক কোণে সে তার মাকে দেখতে পেল। ছবির মতো নয়, কিন্তু ছেলের চোখে মায়ের মুখ অচেনা থাকল না। মনের মধ্যে তীব্র ভাবে জেগে ওঠা মা ডাকার নেশাটাও তার কাছে মিথ্যে মনে হলো না। দু চোখে এক সমুদ্র পিপাসা নিয়ে সে দেখতে লাগল তার মায়ের হাসিমুখ।
প্রিয়বাসিনী চকিতে দেখলেন একটা অল্পবয়সী ছেলে তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। তিনি ভয় পেলেন কারণ ইদানীং বাবার মুখে শুনেছেন গ্রামে চোর-ডাকাতের উৎপাত বেড়েছে খুব। সে নিজেকেই ধিক্কার দিতে লাগল সব থেকে দামি গয়নাগুলো পরেছে বলে। ও ব্যাটা নির্ঘাত চোর-ডাকাত, না হলে চোরের সাগরেদ হবে। তার গয়নার লোভে অমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। সন্ধ্যাও হয়ে এসেছে প্রায়। আলো থাকতে থাকতেই সে ঘরমুখো হলো।
পুজোমণ্ডপ পাহারায় থাকা পাইকগুলো আশপাশেই ছিল। ওরা দেখল একটি ছেলে মেম সাহেবের পিছু নিয়েছে।
শিশির নিজের মাকে প্রথমবার দেখছে। তার মনে আজ প্রশান্ত মহাসাগরের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। মাকে আরও কাছ থেকে দেখার লোভ সামলাতে পারল না সে। তাই মার পিছু পিছু চলল সে। ব্যাগ থেকে ছবিটা বের করে দেখাতে হবে মাকে। বলতে হবে সে তার ছেলে। অন্তত একবার ডাকবে মা বলে।
বাড়ির সদর দরজা পর্যন্ত যেতে পারল সে। তারপর পেয়াদাদের ভয়ে এগোতে সাহস পেল না। কিন্তু মনের মধ্যে অশান্ত ভাবটা ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠল তার। তাই সবার অলক্ষ্যে রাতে প্রাচীর টপকিয়ে বাড়ির ভেতর গেল শিশির।
ছেলেটাকে দেখার পর থেকেই কেমন অস্থির লাগছিল প্রিয়বাসিনীর। ঘুমাতে না পেরে ব্যালকনিতেই বসে ছিল। আর সেখান থেকেই দেখল সন্ধ্যায় দেখা ছেলেটাকে দেয়াল টপকাতে। এবার সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেছে তার কাছে। এতক্ষণ শুধু শুধুই মায়া লাগছিল ওর জন্য। বেটা চোর ছাড়া আর কিছুই নয়। নইলে এত রাতে বাড়িতে দেয়াল টপকে আসে। দোতলা থেকেই চিৎকার দিল সে জোর গলায়। পূজার সময়, তাই বাড়িতে লোকের অভাব নেই। তার এক ডাকেই চারিদিকের ঘর থেকে লোক এসে ঘিরে ধরল শিশিরকে আর বেধড়ক মারতে শুরু করল। বেদম গণপিটুনির চোটে শিশির একটা কথাও বলতে পারল না। প্রিয়বাসিনী ওপর থেকেই সব দেখছিলেন। পরে নিচে নেমে এলেন। ততক্ষণে কোনো একজনের লাথিতে শিশিরের ঘাড় মটকে গেছে। কথা বেরোচ্ছে না প্রায় আর। প্রিয়বাসিনী গেলেন শিশিরের কাছে।
ওদিকে হেমন্ত বাবু শিশিরের বন্ধুদের থেকে খবর পেয়ে প্রায় দৌড়েই আসছিলেন শিশিরকে এই এলাকা থেকে নিয়ে যেতে। পরে খোঁজাখুঁজি করতে করতে শ্বশুরের বাড়ির সামনে এসে হট্টগোল শুনে উঁকি দিয়ে দেখেন রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে তার ছেলে, আর তার প্রাক্তন স্ত্রী এগিয়ে যাচ্ছেন মৃতপ্রায় ছেলের দিকে। প্রিয়বাসিনী শিশিরের কাছে এসে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এতো কম বয়সে তার কীভাবে চুরির অভ্যাস হলো। কিন্তু শিশিরের পক্ষে কথা বলা কঠিন ছিল। এক মুখ রক্ত বমি করে সে বলল, আপনি দেখতে আমার মায়ের মতো। প্রিয়বাসিনী শিশিরের জবাবের ভিত্তি জানতে চাইলেন। আরও একবার রক্ত বমি করে শিশির তার মায়ের ছবিটি বের করে দেখাল। তৎক্ষণাৎ প্রিয়বাসিনী যা বোঝার বুঝে নিয়েছেন। পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে ভাবতে লাগলেন শিশিরের কাছে মা হয়ে ক্ষমা চাইবেন নাকি মায়ের মমতা দিয়ে শিশিরকে বুকে তুলে নিবেন। হেমন্ত দূর থেকে চিত্কার করে ছেলেকে ডাকলেন। কিন্তু বাবার ডাক শিশিরের কানে পৌঁছানোর আগেই এবং প্রিয়বাসিনী কোনো স্থির চিন্তা করার আগেই শিশির ইহকাল ছেড়ে পরকালে গমন করল। হেমন্ত বাবু ছেলের নিথর দেহটি কোলে তুলে নিয়ে আর একটি কথাও না বলে অনেক শান্ত স্বাভাবিক ভাবে নিজের বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা করলেন।
পুনশ্চ: হেমন্ত বাবু এর পর আর দু বছর বেঁচে ছিলেন। নিজের ছেলের বিয়োগে প্রিয়বাসিনী কতটুকু দুঃখিত হয়েছিলেন জানি না। কিন্তু হেমন্ত বাবুর মারা যাওয়ার খবর জানিয়ে তাকে টেলিগ্রাম করা হয়েছিল। কিন্তু তার কোনো জবাব আসেনি!
(লেখক যুক্তরাজ্যের লন্ডনপ্রবাসী)

উচ্চশিক্ষার গণতন্ত্রায়ণ by আবু ইউসুফ মো. আবদুল্লাহ

উচ্চশিক্ষা বিষয়ে ইউনেসকোর ২০০৯ সালের বিশ্বসম্মেলনের জন্য যে প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছিল, তার শিরোনাম ছিল ‘ট্রেন্ডস ইন গ্লোবাল হায়ার এডুকেশন: ট্র্যাকিং অ্যান একাডেমিক রেভল্যুশন’। বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির গতি পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে প্রতিবেদনটি বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষেত্রে পালাবদলের জোরালো ইঙ্গিত দিয়েছিল। এ অবস্থা পরিবর্তী সময়ে শিল্প-অর্থনীতির গতিধারাকে পাল্টে দিয়ে পরিষেবামূলক শিল্প ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি বিকাশের ক্ষেত্রে বর্তমানে ভূমিকা রাখছে। এটি উচ্চশিক্ষার চাহিদা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও অতুলনীয় ভূমিকা রাখছে। এটাকে বলা যায় উচ্চশিক্ষার গণতন্ত্রায়ণ।
উচ্চশিক্ষার মুখ্য উদ্দেশ্য হলো বাজার উপযোগী জনশক্তি নির্মাণ ও তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা। এ জনশক্তি বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার জন্য কল্যাণকর।
শিল্প ও শিল্পের উৎপাদিত পণ্যের সর্বোচ্চ মান নিয়ন্ত্রণের জন্য আশির দশক থেকে পৃথিবীব্যাপী শুরু হয়েছে নানা শিল্পের বেসরকারীকরণ। শিক্ষাও একটি শিল্প। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও উচ্চশিক্ষার বেসরকারীকরণ হয়েছে এবং হচ্ছে। তাই কর্মক্ষম জনশক্তি তৈরিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকাকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই।
প্রতিটি সেক্টরে কম সময়ে উচ্চ মানসম্পন্ন সার্ভিস দেওয়ার ক্ষেত্রে যেভাবে প্রযুক্তি এগিয়ে আসছে, তাতে শুধু ভবন নির্মাণ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আমরা উদাহরণস্বরূপ ডাকব্যবস্থার কথা বলতে পারি। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে খবর পাঠানোর জন্য, টাকা পাঠানোর জন্য ব্যবহার হতো ডাকঘর। ডাকঘর ছাড়া আর কোনো মাধ্যম ছিল না। শত শত কোটি টাকা খরচ করে কয়েক হাজার ডাকঘর এ দেশেই তৈরি করা হয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহারে আজ আর ডাকঘর ব্যবহার হচ্ছে না। অল্প দিনের ব্যবধানেই প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে শত সহস্র কোটি টাকা দিয়ে তৈরি ডাকঘরের। ডাকঘরের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেও সার্ভিস বন্ধ হয়নি। বরং ওই সব সার্ভিসের মান বেড়েছে বহুগুণ, সময় ও টাকা উভয়টিই কম লাগছে। একটি ইলেকট্রনিক চিঠি (ই-মেইল) সেকেন্ডের মধ্যে শুধু দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত নয়, বরং পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে চলে যাচ্ছে। ফলে কাগজে চিঠি লিখতে গেলে যে পরিমাণ কাগজ বা কালি ব্যবহার হতো, তা আর লাগছে না। এখন ই-মেইল করতে অবশ্য কম্পিউটার লাগছে না। মুঠোফোন সেট থেকেও করা যাচ্ছে। এ সবই হচ্ছে প্রযুক্তির উৎকর্ষ।
আরেকটি উদাহরণ দিই। আগে মুদ্রিত খবরের কাগজই ছিল পাঠকের একমাত্র ভরসা। এখন অগ্রাধিকার পাচ্ছে অনলাইন পত্রিকা। পৃথিবীব্যাপী শত শত খবরের কাগজ অনলাইন পত্রিকায় রূপ নিয়েছে। এ পত্রিকা পড়ার জন্য কম্পিউটারও লাগছে না। মুঠোফোন সেট থেকেও পড়া যাচ্ছে। এ সবই হচ্ছে প্রযুক্তির ব্যবহার।
‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ একটি যুগান্তকারী ঘোষণা। এই একটি সাহসী ও উচ্চাভিলাষী উচ্চারণ দেশটিকে সমসাময়িক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সাহায্য করছে। সার্ভিস সেক্টরের প্রতিটি অধ্যায়ে আজ ডিজিটালাইজেশন জরুরি। উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রের ‘বেসরকারীকরণ’ বিপ্লবকে সত্যিকার রূপ দিতে গেলে এটির ‘ডিজিটালকরণ’-এর বিকল্প নেই।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানসম্মত শিক্ষার মাপকাঠির জন্য শুধু স্থায়ী ক্যাম্পাস চিহ্নিত করা হয়েছে। আসলে বিষয়টি কি তা-ই? আমার মনে হয়, যোগ্যতাসম্পন্ন পর্যাপ্ত শিক্ষক, উন্নত ল্যাবরেটরি, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, কর্মমুখী পাঠক্রম ও পাঠদান উপযোগী পরিবেশ—এগুলোই শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ বা মান নির্ণয়ের জন্য জরুরি। পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনের প্রতিবেদনে প্রায়ই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম সমস্যা হিসেবে শুধু স্থায়ী ক্যাম্পাসকেই উল্লেখ করা হয়। স্থায়ী ক্যাম্পাসের অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে, তাই বলে একমাত্র স্থায়ী ক্যাম্পাসই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নত মান নিশ্চিত করার একমাত্র মাধ্যম হতে পারে না।
গরিব ও মধ্য আয়ের দেশগুলোয় বর্তমানে পরিচালিত উচ্চশিক্ষা বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করার জন্য যেমন সময় বাঁচাতে হবে, তেমনি অনুৎপাদনশীল ক্ষেত্রে অযথা পয়সা খরচ করা থেকেও বিরত থাকতে হবে। পড়াশোনার জন্য ভবন অপরিহার্য বটে, কিন্তু বর্তমান প্রযুক্তির উৎকর্ষে এ ভবনগুলোও একসময় ডাকঘরের অবস্থায় পরিণত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ বা রিসোর্স ব্যবহার করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। দেখা গেছে, ছাত্র আন্দোলনের কারণে, ধর্মঘটের কারণে, হরতাল ইত্যাদির কারণে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ক্লাস হয় না। নির্ধারিত সময়ে কোর্সও শেষ হয় না, বরং সেশনজট বাড়তে থাকে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ক্লাস হয় না, কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা নির্ধারিত সময়ে তাঁদের কোর্স সম্পন্ন করার জন্য বাসায় বসে সেলফোন থেকে কোর্স-আউট লাইন ছাত্রদের কাছে অনলাইনে পাঠাচ্ছেন এবং ছাত্ররা বাসায় বসে তা সেলফোন বা কম্পিউটারে ডাউনলোড করে পড়াশোনা করছে, এমনকি অনলাইনে পরীক্ষাও দিচ্ছে। অর্থাৎ শ্রেণিকক্ষের বাইরেও পড়াশোনা হতে পারে এবং হচ্ছে।
হাজার হাজার বর্গফুট জায়গা দখল করে লাইব্রেরি সেটআপ করার প্রয়োজন হয়তো নেই বা থাকবে না। ছোট একটি কক্ষে বসে লাইব্রেরির সব বই ও জার্নালের ডিজিটাইজেশন করে ওয়েবভিত্তিক করে দিলে ছাত্ররা বাসায় বসেই লাইব্রেরির বই-জার্নাল পড়তে পারছে। এ জন্য ছাত্রদের লাইব্রেরিতে এসে ভিড় করার প্রয়োজন পড়ছে না, বাড়তি জায়গা দখলের প্রয়োজনও পড়ছে না।
প্রযুক্তি ও দ্রুত বিশ্বায়নের যুগে শিক্ষার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের বিশ্বাসী বিশেষজ্ঞরা স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য অত্যন্ত উঁচু ব্যয়ে নির্মিত ভবনসুবিধাকে একধরনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে ভাবেন। তথ্যপ্রযুক্তি, দূরশিক্ষণ ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের কারণে সনাতনী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেকেলে হতে বাধ্য। ভবনটি ভাড়া নাকি স্থায়ী, সেটি বিবেচ্য বিষয় নয়, ভবনটিতে শিক্ষার উপযোগী পরিবেশ আছে কি না, সেটিই বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত।
বিশ্বব্যাংক সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ দুর্বল ব্যবস্থাপনা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষায় উন্নয়ন করছে। এখানে উচ্চশিক্ষার বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করার জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন, দক্ষ শিক্ষক, পাঠদান পরিবেশ, সহপাঠ্যানুক্রমিক কর্মকাণ্ড বা ক্লাব, শিক্ষার মান এবং গ্র্যাজুয়েটদের কর্মযোগ্যতাকে অত্যধিক গুরুত্বারোপ করতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ভৌত কাঠামোকে অগ্রাধিকার দেওয়া নয়, শুধু তদারকি নয়, নিছক গ্র্যাজুয়েট তৈরি নয়; বরং জাতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির লক্ষ্যে প্রযুক্তির যথোপযুক্ত ব্যবহারকে গুরুত্ব দিতে হবে সবার আগে।
আবু ইউসুফ মো. আবদুল্লাহ: অধ্যাপক, আইবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।