Showing posts with label শিশুহত্যা. Show all posts
Showing posts with label শিশুহত্যা. Show all posts

Sunday, June 28, 2026

গাজায় তাঁবুতে হামলা চালিয়ে ঘুমন্ত শিশুদের হত্যা

গাজায় বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবুতে ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় আরো এক ফিলিস্তিনি শিশুসহ বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন। গাজার কিছু অংশকে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ ঘোষণা করে ‘যুদ্ধবিরতি’ চললেও ইসরাইল এই হামলা অব্যাহত রেখেছে।

চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, শনিবার দুটি অস্থায়ী তাঁবুতে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় দুই ভাই-বোন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন ১৫ বছর বয়সি ইসলাম মুসা এবং তার ৩০ বছর বয়সি ভাই আবদুল্লাহ মুসা।

গাজার সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, খান ইউনিসের পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এলাকার ওই হামলার স্থান থেকে সাতজন আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের নাসের হাসপাতাল ও রেড ক্রস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হাসপাতালের আঙিনায় সাদা কাফনে জড়ানো ভাই-বোনের লাশের পাশে আত্মীয়-স্বজনদের কাঁদতে দেখা গেছে।

এর আগে দক্ষিণ গাজায় ইসরাইলি বোমাবর্ষণে আহত হওয়া ১০ বছর বয়সি আরো এক ফিলিস্তিনি শিশু মারা গেছে।

নাসের হাসপাতালের একটি সূত্র আনাদোলু বার্তা সংস্থাকে জানিয়েছে, দিনকয়েক আগে আল-মাওয়াসিতে ইসরাইলি হামলায় আহত হওয়া ওয়ালিদ ইউসুফ আবু জাজার নামের ওই শিশুটি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

আল-শিফা হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি সামরিক বাহিনী পশ্চিম গাজা শহরে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় নেওয়া আরেকটি তাঁবুতেও আঘাত হেনেছে। এতে অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন।

ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির অ্যাম্বুলেন্স সেবা জানিয়েছে, আহতদের বেশিরভাগই নারী এবং তাদের মধ্যে দু’জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

গাজা শহর থেকে আল জাজিরার তারেক আবু আজুম জানিয়েছেন, ‘যুদ্ধবিরতি’ সত্ত্বেও ইসরাইল তাদের হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘গত বছর যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর থেকেই সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করা ইসরাইলি নীতির মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

তিনি আরো জানান, ‘গত কয়েক ঘণ্টায় আমরা খবর পেয়েছি যে ইসরাইলি ড্রোনগুলো আল-মাওয়াসি এলাকার অস্থায়ী তাঁবুতে আঘাত হেনেছে। যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী এই এলাকাটিকে হাজার হাজার ফিলিস্তিনির জন্য নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল।’

আজুম বলেন, ‘আমরা ড্রোন হামলার তীব্রতা বৃদ্ধির সাক্ষী হচ্ছি এবং এখনও মাথার ওপরে ড্রোনের শব্দ শোনা যাচ্ছে।’

শিশুদের লক্ষ্য করে ইসরাইলের পরিকল্পিত হামলা

জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে গাজায় শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টি নথিভুক্ত করার পর ইসরাইলের ফিলিস্তিনি শিশু হত্যার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত নিহতদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশই শিশু।

শিশুদের অধিকারকর্মী রাচেল আকুরসো (মিস রাচেল নামে পরিচিত) এই প্রতিবেদনের একজন সহ-লেখকের সাথে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ড থামাতে বিশ্ব ব্যর্থ হয়েছে।

শুক্রবার তিনি বলেন, ‘আমরা দেখছি আমাদের নিজেদের সন্তানদের মতো শিশুরাই একটি গণহত্যার মধ্যে টিকে থাকার চেষ্টা করছে, তবুও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, কোনো জবাবদিহিতা নেই।’

প্রতিবেদনের সহ-লেখক এবং জাতিসংঘের কমিশনার ক্রিস সিডোটি এই প্রতিবেদনের ফলাফলকে ‘একেবারে হৃদয়বিদারক’ বলে অভিহিত করেছেন।

সিডোটি আরো বলেন, ‘রাষ্ট্রগুলোর পদক্ষেপ নেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আমাদের সাড়ে তিন বছর আগেই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল, তবে শুরু করার জন্য এখনও খুব বেশি দেরি হয়ে যায়নি।’

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৭৩ হাজার ৪৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং ১ লাখ ৭৩ হাজার ৪১৭ জন আহত হয়েছেন।

মন্ত্রণালয় আরো জানায়, গত অক্টোবরে ‘যুদ্ধবিরতি’ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইসরাইলি বাহিনী ১ হাজার ৩১ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং ৩ হাজার ৩০৯ জনকে আহত করেছে।

সূত্র: আল-জজিরা

গাজায় তাঁবুতে হামলা চালিয়ে ঘুমন্ত শিশুদের হত্যা
ছবি: এএফপি

Monday, July 14, 2025

গাজায় পানির খোঁজে যাওয়া ছয় শিশুকে হত্যা করল ইসরায়েল

গাজায় খাবার পানি সংগ্রহ করতে গিয়েও ইসরায়েলি নৃশংসতার শিকার হচ্ছে ফিলিস্তিনিরা। নির্বিচার গুলি ও বোমাবর্ষণ করা হচ্ছে তাঁদের ওপর। আজ রোববার পানি সংগ্রহের সময় নতুন করে অন্তত ১০ জনকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। তাদের মধ্যে অন্তত ৬ জন শিশু। গাজায় খাবার ও পানির তীব্র সংকটের মধ্যেই এ হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে ইসরায়েল।

ঘটনাটি ঘটেছে মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থীশিবিরে একটি পানি সরবরাহকেন্দ্রে। এই শিবিরে সরবরাহ করা পানি পানযোগ্য নয় বলে আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। আজকের হামলায় সেখানে আরও ১৬ জন আহত হয়েছেন। এ নিয়ে বিগত কয়েক মাসে প্রায় ১০ বার পানি সংগ্রহ করতে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালাল ইসরায়েল।

গাজার চিকিৎসা সূত্র থেকে জানা গেছে, পানি সংগ্রহ করতে যাওয়া ১০ জনসহ আজ ইসরায়েলের হামলায় উপত্যকাটিতে ৫৯ জন নিহত হয়েছেন। আর আগের দিন শনিবার নিহত হয়েছেন অন্তত ১১০ জন। এর মধ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) ত্রাণকেন্দ্রে খাবারের আশায় গিয়ে হামলায় নিহত হন ৩৪ জন।

অনাহারে ৬৭ শিশুর মৃত্যু


ইসরায়েল টানা ১১ সপ্তাহ গাজা অবরোধ করে রাখার পর গত ২৬ মে উপত্যকাটিতে ত্রাণ সরবরাহ শুরু করে বিতর্কিত সংস্থা জিএইচএফ। এর পর থেকে সংস্থাটির ত্রাণকেন্দ্রে খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে হত্যার শিকার হয়েছেন আট শতাধিক ফিলিস্তিনি। জিএইচএফের ত্রাণ সরবরাহের পদ্ধতি ও খাবারের মান নিয়ে সমালোচনা করে আসছে জাতিসংঘও।

গাজা থেকে আল-জাজিরার সংবাদিক হানি মাহমুদ বলেন, জিএইচএফ থেকে একজনকে পুরো পরিবারের খাবারের একটি পার্সেল দেওয়া হচ্ছে। এই খাবার ক্ষুধার্ত শিশু ও পরিবারের সদস্যদের জন্য যথেষ্ট নয়।’ শনিবার গাজার জনসংযোগ কার্যালয় জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর পর থেকে গাজায় অনাহারের কারণে অন্তত ৬৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

খাদ্য ও পানির অভাবে গত মার্চ থেকে গাজায় অপুষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার পরিমাণ বাড়ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউ। সে সময় থেকে উপত্যকাটি অবরোধ করে রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী। এর পর থেকে সেখানে বাইরে থেকে কোনো ত্রাণসহায়তা নিয়ে আসতে পারেনি ইউএনআরডব্লিউএ।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় হামাস। এতে দেশটিতে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয় এবং ইসরায়েল থেকে প্রায় আড়াই শ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে আসা হয়। সেদিন থেকেই উপত্যকাটিতে নৃশংস হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এতে এখন পর্যন্ত গাজায় ৫৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ।

হামাসকে দোষারোপ ইসরায়েলের

গাজায় চলমান নৃশংসতার মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মধ্যস্থতাকারীরা। এ লক্ষ্যে ৬ জুলাই থেকে কাতারের রাজধানী দোহায় পরোক্ষ আলোচনায় বসেছিল হামাস ও ইসরায়েল। দুই পক্ষই ৬০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি নিয়ে আশার কথা শুনিয়েছিল। তবে সূত্রের বরাতে এএফপি জানতে পেরেছে, ইসরায়েলের কারণে ওই আলোচনায় বাধা এসেছে।

সূত্র বলেছে, যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহার চায় হামাস। তবে আলোচনার সময় উপত্যকাটিতে ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন নিয়ে কিছু মানচিত্র উপস্থাপন করেছে ইসরায়েল। হামাস মনে করছে, ওই মানচিত্র থেকে বোঝা গেছে যে সেগুলোর মাধ্যমে গাজায় উল্টো নতুন করে সেনা মোতায়েন করা হবে। তাই হামাস এটি মেনে নেবে না।

এমন পরিস্থিতিতে দুই পক্ষকে আলোচনা স্থগিত রাখতে বলেছে মধ্যস্থতাকারীরা। সূত্র জানিয়েছে, দোহায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সফরের আগপর্যন্ত আলোচনা স্থগিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে আলোচনা থেমে যাওয়ার জন্য হামাসকে উল্টো দোষারোপ করেছে ইসরায়েল। তারা বলেছে, হামাস আলোচনায় ছাড় দিতে রাজি হচ্ছে না।

এএফপির কাছে পাঠানো এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের এক কর্মকর্তা বলেন, আলোচনায় নমনীয়তা দেখানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইসরায়েল। তবে হামাস একগুঁয়ে আচরণ করছে। একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য মধ্যস্থতাকারীরা যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তা হামাসের অবস্থানের কারণে বাধার মুখে পড়ছে।

ইসরায়েলের হামলায় আহত এক শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আজ রোববার মধ্য গাজার আল–আওদা হাসপাতালে
ইসরায়েলের হামলায় আহত এক শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আজ রোববার মধ্য গাজার আল–আওদা হাসপাতালে। ছবি: এএফপি

Sunday, April 13, 2025

যুদ্ধবিরতি ভাঙার পর গাজায় ৫০০ শিশু হত্যা করেছে ইসরায়েল

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকাজুড়ে ইসরায়েলের নৃশংস হামলা থামছে না। যুদ্ধবিরতি ভেঙেও হামলা চলছে। ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞ থেকে বাদ পড়ছে না শিশুরাও। গাজার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ শনিবার জানিয়েছে, ১৮ মার্চ যুদ্ধবিরতি ভাঙার পর গাজায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৫০০ শিশু নিহত হয়েছে।

গাজার স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৫১ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত সোয়া ১ লাখ মানুষ। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৫ হাজারের বেশি শিশু রয়েছে বলে চলতি মাসের শুরুর দিকে জানিয়েছিল জাতিসংঘ শিশু তহবিল—ইউনিসেফ। আহত হয়েছে ৩৪ হাজারের বেশি শিশু।

গাজায় চলমান নৃশংসতার মধ্যে গত ১৯ জানুয়ারি যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। পরে সেই যুদ্ধবিরতি ভেঙে ১৮ মার্চ আবার হামলা শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। শনিবার গাজা সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পর থেকে গাজায় অন্তত ৫০০ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এই সময়ে নিহত মোট ফিলিস্তিনির সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি।

শনিবারও গাজার বিভিন্ন প্রান্তে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। উত্তর গাজার তুফা, মধ্য গাজার বেইত লাহিয়া এবং দক্ষিণে খান ইউনিসের কিজান আন-নাজ্জার ও আল মাওয়াসি এলাকায় আকাশপথে হামলা হয়েছে। এতে এক নবজাতকসহ ১৫ জন নিহত হয়েছেন। বেত লাহিয়ায় ইসরায়েলের হামলায় নিহত ওই শিশুর একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টা পর মৃত্যু হয় তার।

গাজায় নারী ও শিশুরা ইসরায়েলের চালানো হামলার বড় লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিএইচআর) মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি  শুক্রবার বলেছেন, ১৮ মার্চ থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত গাজায় ২২৪টি বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৩৬টি হামলার ঘটনায় নিহত ব্যক্তিরা সবাই নারী ও শিশু।

জাতিসংঘের মুখপাত্রের এই তথ্যের পর ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠন আল-হক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছে, তারা এবং জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন ইসরায়েলের দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড এবং পূর্ব জেরুজালেমে তদন্ত করেছে। তাতে দেখা গেছে, ইসরায়েল উদ্দেশ্যমূলকভাবে নারী ও শিশুদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। আধুনিক ইতিহাসে কোনো সংঘাতে নারী, শিশু—এমনকি নবজাতকদের নিশ্চিহ্ন করার এমন তৎপরতা দেখা যায়নি।

আটকে ফেলা হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের

ইসরায়েলের গত ১৮ মাসের হামলায় একাধিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন গাজার ২৩ লাখ বাসিন্দার অধিকাংশ। গত ১৯ জানুয়ারি যুদ্ধবিরতি শুরুর পর তাঁদের অনেকে নিজ এলাকায় ফেরা শুরু করেছিলেন। তবে ১৮ মার্চ ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ভাঙার পর আবার গাজার বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এই সময়ে নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৪ লাখের বেশি মানুষ।

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউ) গত শুক্রবারের হিসাবে, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পর থেকে গাজার বাসিন্দাদের এলাকা ত্যাগ করতে ২১টি নির্দেশনা দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। তাঁদের এমন ক্ষুদ্র এলাকার মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলা হচ্ছে, যেখানে পানি, খাবার, আশ্রয়ের মতো জীবন বাঁচানোর জন্য জরুরি পণ্য একেবারেই নেই বা খুব সামান্য পরিমাণে আছে।

শুক্রবারও গাজা নগরী ও খান ইউনিসের বিভিন্ন এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বাসিন্দাদের। গাজা নগরীর শুজাইয়া এলাকা ঘিরে রেখেছে ইসরায়েলের ট্যাংক। ওই এলাকায় অনেকেই আটকা পড়েছেন। সেখানকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, শুজাইয়ায় এখনো অবস্থান করা ব্যক্তিরা চলাচল করতে গেলে তাঁদের ওপর গুলি চালানো হচ্ছে। একই ধরনের ভয়াবহ চিত্র খান ইউনিসেও।

জাতিসংঘের ত্রাণ ও মানবিক সহায়তাসংক্রান্ত সংস্থা (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, গাজার দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা থেকে হয় বাসিন্দাদের তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, না হয় ওই এলাকায় যেতে দেওয়া হচ্ছে না। বাকি একাংশে তাঁদের আবদ্ধ করা হচ্ছে। শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেছেন, ‘এমন পরিস্থিতির পরিণতি হতে পারে প্রাণঘাতী।’

ঘিরে ফেলা হয়েছে রাফা

যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন করে হামলা শুরুর পর গাজার বিভিন্ন এলাকা দখলে নিচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। শনিবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্র্রী ইসরায়েল কাৎজ জানিয়েছেন, দক্ষিণ গাজার ‘মোরাগ করিডর’ অবরুদ্ধ করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী। দক্ষিণ গাজার রাফা থেকে উপত্যকাটির বাকি এলাকাকে আলাদা করেছে এই পথ।

এক বিবৃতিতে ইসরায়েল কাৎজ বলেন, মোরাগ করিডর অবরুদ্ধ করার মধ্য দিয়ে রাফাকে ‘ইসরায়েলের নিরাপত্তা অঞ্চলে’ পরিণত করা হয়েছে। এটিই হামাসকে বিতাড়িত করার একমাত্র উপায়। এর মধ্য দিয়ে জিম্মিদের মুক্ত করা যাবে। ফলে যুদ্ধ শেষ হবে। আর হামাস যদি ইসরায়েলের কথায় কান না দেয়, তাহলে গাজার ‘বেশির ভাগ এলাকায়’ অভিযান চালাবে ইসরায়েল।

তবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে একমত নন লন্ডনের কিংস কলেজের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রভাষক রবার্ট গেইস্ট পিনফোল্ড। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ইসরায়েল যদিও বলছে হামাসকে পরাজিত করতে তারা মোরাগ করিডর সৃষ্টি করেছে, তবে এটি হলো গাজা নিয়ন্ত্রণে ইসরায়েলের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এই করিডরগুলোর মাধ্যমে তারা গাজার শহর এলাকাগুলো বিচ্ছিন্ন করতে চাইছে, যেন পরে ইচ্ছা অনুযায়ী এলাকাগুলো কাজে লাগানো যায়।

গাজার অবস্থা ‘বিপর্যয়কর’

গাজায় যুদ্ধবিরতি মধ্যেই ২ এপ্রিল থেকে উপত্যকাটিতে কোনো ত্রাণ প্রবেশ করতে দিচ্ছে না ইসরায়েল। এতে উপত্যকাটিতে খাবার, পানি, জ্বালানিসহ জরুরি পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিকে ‘বিপর্যয়কর’ বলে উল্লেখ করেছেন ওসিএইচএর কর্মকর্তা ওলগা চেরেভকো। আল-জাজিরাকে জাতিসংঘের এই কর্মকর্তা বলেন, ৪০ দিনের বেশি সময় ধরে তাঁদের হাতে কোনো ত্রাণ এসে পৌঁছায়নি। আগের মজুত প্রায় সব শেষ হয়ে গেছে। চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট চলছে। উপত্যকাটির ৩৮টি হাসপাতালের মধ্যে ৩৪টিই ধ্বংস হয়ে গেছে।

গাজা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার ৯০ শতাংশের বেশি পানি সরবরাহ অবকাঠামো ধ্বংস করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। সেগুলো মেরামত করতেও বাধা দিচ্ছে তারা। এ ছাড়া চলতি মাসের শুরুর দিকে গাজায় ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান মেকোরোত পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। এতে উপত্যকাটির ৭০ শতাংশ পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।

এমন দুর্দশার মধ্যে শুক্রবার ইউএনআরডব্লিউএর প্রধান ফিলিপ লাজারিনি বলেছেন, ‘কিছু মানুষকে চাপে রাখার জন্য আপনি যদি অভাবে থাকা মানুষকে (সহায়তা) সরবরাহ বন্ধ করেন, তখন আপনি কিন্তু ত্রাণ সহায়তাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন।’ আর জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘ত্রাণ ফুরিয়ে যাওয়ায় বিভীষিকার দ্বার আবার খুলে গেছে। গাজা এখন মানুষ হত্যার ক্ষেত্র এবং বেসামরিক লোকেরা অন্তহীন মৃত্যুফাঁদে আটকা পড়েছেন।’

ফিলিস্তিনিদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। প্রাণ বাঁচাতে তাই পরিবার-পরিজন নিয়ে পালাচ্ছেন তাঁরা। ঘরবাড়ি ছাড়ার সময় স্কুলব্যাগে নিজেদের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়েছে শিশুরা। গত শুক্রবার গাজা নগরীতে
ফিলিস্তিনিদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। প্রাণ বাঁচাতে তাই পরিবার-পরিজন নিয়ে পালাচ্ছেন তাঁরা। ঘরবাড়ি ছাড়ার সময় স্কুলব্যাগে নিজেদের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়েছে শিশুরা। গত শুক্রবার গাজা নগরীতে। ছবি: এএফপি

Sunday, January 14, 2018

শিশু হত্যা ও ধর্ষণের নেপথ্যে সিরিয়াল কিলার : উত্তাল পাকিস্তান

পাকিস্তানে জয়নব আনসারী নামে ৬ বছরের একটি মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে সারা দেশ জুড়ে। এ নিয়ে দাঙ্গা-সহিংসতায় দু জন নিহতও হয়েছে। কিন্তু পুলিশের নথিপত্র থেকেই এখন জানা যাচ্ছে, শুধু পাঞ্জাবের কসুর শহরেই ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে একই ধরণের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ১০টি। গত ৪ঠা জানুয়ারি কোরান শিক্ষার ক্লাসে যাবার পথে নিখোঁজ হয় জয়নব আনসারি। কয়েক দিন পর তার মৃতদেহ পাওয়া যায় শহরের একটি আবর্জনা ফেলার জায়গায়। বলা হয়, তাকে ধর্ষণের পর গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশের ওই দিনের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে জয়নবকে শেষবার জীবিত অবস্থায় দেখা গেছে। তাতে দেখা যায় একজন অচেনা লোকের হাত ধরে জয়নব হেঁটে যাচ্ছে। বিবিসির সিকান্দার কিরমানি কসুর থেকে জানাচ্ছেন, তদন্তকারীরা গত এক বছরের মধ্যে ঠিক এই রকম ১০টি ঘটনা চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে ৬টি নিহত মেয়ের দেহে একই ব্যক্তির ডিএনএ পেয়েছেন তদন্তকারীরা। স্থানীয় লোকেরা সন্দেহ করছেন, আক্রমণকারী একই ব্যক্তি এবং সে কাছাকাছি এলাকাতেই থাকে। এই নিহতরা সবাই অল্পবয়েসী মেয়ে, এবং তারা সবাই তাদের বাড়ির খুব কাছাকাছি এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়। ছয় জন মেয়ের সবার মৃতদেহই একই ভাবে আবর্জনার স্তুপ, বা পরিত্যক্ত বাড়িতে ফেলে দেয়া অবস্থায় পাওয়া যায়। সব ক্ষেত্রেই তাদের পরিবারের বাস দু'মাইল এলাকার ভেতরে। প্রথম দিকে ধর্ষিত ও নিহতদের একজন পাঁচ বছরের আয়েশা বিবি। সে নিখোঁজ হয় ২০১৭-র জানুয়ারির ৭ তারিখ। সেদিন ছিল তার পিতা আসিফ বাবার জন্মদিন। তিনি মেয়েকে সেদিন যে টেডি বেয়ার উপহার দিয়েছিলেন, সেটি এবং তার অন্য পুতুল ও স্বুলে যাবার পোশাক এখনো রেখে দিয়েছেন। আসিফ বলছেন,‘আমার বাড়ি এখন কবরখানা হয়ে গেছে। আর জয়নবের ঘটনাটি জানার পর আমার মনে হচ্ছে আমিই যেন আরেকবার আমার মেয়েকে হারিয়েছি। অন্য আরো কয়েকটি মেয়ে - যাদের একইভাবে মারা হয়েছে - তাদের সময়ও আমার একই রকম লেগেছিল। আমার অনুভুতি বর্ণনা করার জন্য ক্রোধ শব্দটি যথেষ্ট নয়।’ তিনি জানাচ্ছেন, পুরো কসুর শহরে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। ’বাচ্চারা এখন বাথরুমে যেতেও ভয় পায়, দরজা বন্ধ করে না। মা-কে বলে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে’ - বলছিলেন আসিফ বাবা।  একইভাবে নভেম্বর সাসে নিখোঁজ হয় ৬ বছর বয়েসের কাইনাত। সে তার বাড়ির কাছেই দোকান থেকে দই কিনতে গিয়েছিল। তার চাচা ইরফান আলি বিবিসিকে জানান, এর পর নিকটবর্তী একটি কবরখানায় তাকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। সে তখনও বেঁচে ছিল। এসব ঘটনা থেকে একমাত্র কাইনাতই বেঁচে ফিরতে পেরেছে। তবে সে এখনো হাসপাতালে, তবে সে এখন সম্পূর্ণ পঙ্গু, কথা বলতে পারে না, কাউকে চিনতে পারে না।
ইরফান আলি বলেন, তিনি নিশ্চিত যে এই আক্রমণকারী স্থানীয় কোন লোক। তবে এতগুলো ঘটনা সত্বেও জয়নবের ধর্ষণ ও হত্যা কেন এতটা জনরোষ তৈরি করেছে - তা খুব একটা স্পষ্ট নয়। কাইনাতের চাচা বিবিসিকে বলছিলেন, জয়নবের পরিবার বড়লোক, এবং তাদের রাজনৈতিক যোগাযোগ আছে। বাকিরা সবাই গরিব, তাদেরকাছে কোন রাজনীতিবিদ আসে না। তাদের কি হলো তাতে কারো কিছু আসে যায় না। বিবিসির সংবাদদাতা বলছেন, মনে হয় বিরোধী দলের রাজনীতিবিদরা এ ঘটনাটিকে নওয়াজ শরিফের মুসলিমে লিগের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছেন, কারণ তাদের ঘাঁটি হচ্ছে এই পাঞ্জাব প্রদেশ - কসুর যার অংশ। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ - তিনি নওয়াজ শরিফের ভাই এবং যাকে মনে করা হয় ভাবী প্রধানমন্ত্রী - তিনি জয়নবের বাবার সাথে দেখা করে আশ্বাস দিয়েছেন যে তিনি ন্যায়বিচার পাবেন। আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এতে জয়নবের হাসিমাথা মুখের ছবি, এবং আবর্জনার স্তুপে পড়ে থাকা তার মৃতদেহের ছবি অনলাইনে 'ভাইরাল' হয়, এবং জনগণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টিতে বিরাট ভুমিকা রেখেছে। আরো একটি বড় কারণ হলো গত এক বছরে এতগুলো হুবহু একই রকম ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু পুলিশ কিছুই করতে পারে নি, খুনিকে ধরতে পারে নি। আসিফ বাবা বলছিলেন, পুলিশ কয়েকবার বিভিন্ লোককে ধরে এনে বলেছে এরাই খুনি, ওই লোকেরাও স্বীকার করেছে। কিন্তু আমরা এসব কথা বিশ্বাস করি না। ‘কারণ পুলিশের হাতে আক্রমণকারীর ডিএনএ আছে। ডিএনএ রিপোর্ট পাবার পর দেখা গেছে তাদের সাথে এগুলো মিলছে না’। বাবা বলছিলেন, পুলিশ এরকম শত শত লোককে আটক করেছে, কিন্তু তাদের সন্দেহ পুলিশ আসল খুনিকে ধরার পরিবর্তে ঘুষ নেবার ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী। তবে এখন পুলিশ বলছে, তারা খুনিকে থরার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। কাইনাতের চাচা বলছিলেন, আমরা চাই না আরো একটি মেয়ের ভাগ্যে এমনটা ঘটুক।

Wednesday, March 15, 2017

তামিমকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়

উল্লাপাড়ার বহুল আলোচিত শিশু তামিমকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। উল্লাপাড়ার চকপাঙ্গাশী গ্রামের সোলেমান হোসেনের ছেলে তামিম (৭)গত ১০ই ফেব্রুয়ারি খুন হয়। পরদিন নরসিংহপাড়া গ্রামের পাশের মাঠে একটি সরিষার গাদার ভেতর থেকে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে। তামিম নরসিংহপাড়া গ্রামে তার নানা রফিকুল ইসলামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। এদিন সন্ধ্যায় নানা বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তামিম হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লাপাড়া থানার উপ-পরিদর্শক সাচ্চু বিশ্বাস জানান, হত্যার সঙ্গে জড়িত নরসিংহপাড়া গ্রামের আব্দুল মান্নান, তার ছেলে ফিরোজউদ্দিন ও একই গ্রামের হাফিজুল ইসলামকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তারা সিরাজগঞ্জ জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম নজরুল ইসলামের আদালতে সোমবার ১৬৪ ধারায় দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছে, হাফিজুল সন্ধ্যায় তামিমকে তার নানার বাড়ি থেকে ডেকে আবদুুল মান্নানের বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে রাতে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। হাফিজুল তামিমের গলায় গামছা পেঁচায়। এ সময় মান্নান ও তার ছেলে ফিরোজ মিলে দুই দিক থেকে গামছা টেনে তামিমকে হত্যা করে। হত্যার সময় তামিমের মুখও গামছা দিয়ে বাঁধা হয়। পরে তারা গভীর রাতে লাশ বাড়ির অদূরে সরিষার গাদার মধ্যে ঢুকিয়ে পালিয়ে যায়। জমিজমা নিয়ে পূর্ব বিরোধের জের ধরে গ্রামের জহুরুল ইসলাম ও হাসানুর রহমান হাসুর দলের মধ্যে দু’দফা সংঘর্ষে মকবুল হোসেন ও সাইফুল ইসলাম নামের দুই ব্যক্তি খুন হন। এই ঘটনায় জহুরুল ইসলামের ভাই শহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে উল্লাপাড়া থানায় হাসানুর রহমানের দলের ৫২ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। তামিম হত্যা মামলার বাদী তামিমের নানা রফিকুল ইসলাম স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে অভিযোগ করেছেন, জহুরুল ইসলাম সংঘর্ষের জের ধরে তার গ্রামের বিপক্ষ দলকে ফাঁসানোর জন্য নিজের লোকজন দিয়ে শিশু তামিমকে হত্যা করিয়েছে। এ ব্যাপারে তদন্তকারী কর্মকর্তা সাচ্চু বিশ্বাস জানান, তামিম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে পরোক্ষভাবে আরো কয়েকজন জড়িত। তবে গ্রেপ্তারের স্বার্থে এই মুহূর্তে তাদের নাম প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। খুব শিগগিরই তামিম হত্যার সঙ্গে জড়িত সব আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন সাচ্চু বিশ্বাস।

Friday, June 11, 2010

একটি চাঞ্চল্যকর শিশুহত্যা মামলার শুনানি by মিজানুর রহমান খান

একটি সবুজ সুপারিগাছ। ছোট্ট অর্ণব গাছটির কচি ডগা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে চেক শার্ট, প্যান্ট। পায়ে স্কুলের জুতো। আমার কাছে অর্ণবের এটাই পরিচয়। ৫ মে ছিল তার জন্মদিন। টিয়া পাখি দেওয়ার নাম করে অর্ণবকে ডেকে নিয়েছিল মুকুল গাজী। অর্ণব ফিরেছিল লাশ হয়ে। তখন তার বয়স ছিল নয় বছর। ক্লাসে প্রথম হতো সে।
সাতক্ষীরার চম্পাফুল ইউনিয়নের উজিরপুর গ্রাম। এর বাঁশবাগানের নালায় পড়ে ছিল অর্ণব দাসের লাশ। প্রতিহিংসায় ক্ষতবিক্ষত। তার ডান হাত কাঁধ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। দুই চোখ ও চোয়াল উপড়ানো। মাথার খুলি ও দাঁতগুলো ভাঙা। দুই পায়ের রগ কাটা। তার ডান হাতটি আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
আমি অর্ণবকে দেখেছি ছবিতে। ১৮ জুন হবে তার গুপ্তহত্যার ১০ বছর পূর্তি। হাইকোর্টে এখন শুধু ২০০৫ সালের ডেথ রেফারেন্সের শুনানি চলছে। হাইকোর্ট ক্রমানুসারে ডেথ রেফারেন্স বা হত্যা মামলার আপিল শুনে থাকেন। প্রধান বিচারপতির আদেশ, হাইকোর্ট বেঞ্চ ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডিভিশন বেঞ্চে গ্রহণযোগ্য মৃত্যুদণ্ডাদেশ কনফারমেশনের রেফারেন্স’ শুনবেন। এখানে অগ্রাধিকার মানে হলো, ২০০৫ সালের মামলা এড়িয়ে এর পরের মামলার শুনানি করা যাবে না। অনেক আইনজীবী অবশ্য কদাচিৎ এমন উদ্যোগ নেন। দু-একটি ক্ষেত্রে হাইকোর্ট তা মঞ্জুরও করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক অতীতে নিয়ম ভেঙে পেপারবুক তৈরি হয়েছে বলে জানা যায় না।
২৪ নভেম্বর ২০০৯। বিচারপতি মো. আরায়েস উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ তখন মৃত্যুদণ্ডাদেশ শুনতেন। এই বিচারক ইতিমধ্যে অবসরেও গেছেন। ২৪ নভেম্বরে তিনি একটি বিরল আদেশ দেন। এতে ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে অর্ণব হত্যা মামলার পেপারবুক তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়।
অর্ণব হত্যা একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা। অর্ণব হত্যার বিচারের দাবিতে সাতক্ষীরায় বিরাট গণমিছিল বেরিয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. নাসিম এলাকা সফর করেছিলেন। আসামিদের প্রতি পক্ষপাত দেখানোর দায়ে ওসিসহ তিন কর্তাকে বরখাস্ত করেছিলেন। শিশু অর্ণবকে কেন খুন হতে হলো?
একটি ভাষ্যমতে, অর্ণবের বাবা ভূমিদস্যুদের চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। সাতক্ষীরার এ অঞ্চলটি সাদা সোনার জন্য প্রসিদ্ধ। অনেক রাঘববোয়াল। শত শত বিঘা খাসজমিতে তাঁরা চিংড়িঘের করেন। অর্ণবেরা সম্পন্ন গেরস্থ। তাঁর বাবা জমিজমা ভালো বোঝেন। ওই খাসজমি উদ্ধারে ভূমিহীনদের দিয়ে তিনি মামলা করান। এ ছাড়া আছে একটি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনসংশ্লিষ্ট তিক্ততা। অর্ণবের বড় চাচা ১৯৯৬ সালে ইউপি চেয়ারম্যান পদে দাঁড়ান। অল্প ভোটে হারেন। সেবার চেয়ারম্যান হন মতিয়ার রহমান। তিনি চম্পাফুল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি।
অর্ণব হত্যা মামলায় খলিলুর রহমান ওরফে খলিল ও গোলাম ফারুকের মৃত্যুদণ্ড হয়। এরাই এখন জেলে। আরও চারজন পান যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তাঁরা হলেন উল্লিখিত আওয়ামী লীগের নেতা মতিয়ার রহমান, আবদুস সাত্তার সর্দার, সুশীল কুমার রায় ও মুকুল গাজী। প্রায় ১৬ বছরের মুকুল (চুরি ও বালিকার শ্লীলতাহানির দায়ে কৈশোরেই কুখ্যাত) টিয়া পাখি দেওয়ার কথা বলে অর্ণবকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। মুকুল ধরা পড়ে। জামিনে গিয়ে রায় ঘোষণার আগেই পালিয়ে যায়। ২০০১ সালের জুলাইয়ের চার্জশিটভুক্ত আসামি ছিলেন আটজন। ২৮ নভেম্বর ২০০৭ রায় হয়। দুজন খালাস পান।
এ মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত তিনজন কীভাবে হাইকোর্ট থেকে জামিন পান এবং কীভাবে পেপারবুক তৈরি হলো, পাঠক সেটা লক্ষ করুন। ১ জুলাই ২০০৮। বিচারপতি মো. আরায়েস উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ আবদুস সাত্তার সর্দারকে জামিন দেন।
নব্বইয়ের দশকেও পাঁচ-সাত বছরের বেশি কারও জেল হলে আইনজীবীরা তাঁদের জন্য জামিন চাইতে দ্বিধায় থাকতেন। দীর্ঘ সময় বন্দিদশায় না থাকলে তাঁদের জন্য পারতপক্ষে জামিন চাওয়াই হতো না। এখন রীতি আগেরটাই আছে। কিন্তু অনুশীলনে বদল ঘটেছে ভীষণ রকম। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তদের গণজামিন দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। বিচার বিভাগ যদিও পৃথক হয়েছে।
বিচারক আরায়েস উদ্দিন অর্ণব হত্যা মামলার রায় ঘোষণার সাত মাসের মাথায় প্রথমে ওই সাত্তারকে জামিন দেন। এবং আশ্চর্যজনকভাবে এ ঘটনার চার মাসের বিরতিতে একই বিচারকের আদেশেই জামিন পান যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত এবং কারাগারে থাকা অন্য দুই আসামি মতিয়ার রহমান ও সুশীল কুমার রায়।
বিচারক আরায়েস উদ্দিনের বেঞ্চে দুটি জামিন আদেশে তিনজনকে মুক্ত করার পর আসামিদের বিচক্ষণ আইনজীবীরা তৃতীয়বারের মতো তাঁর কাছেই প্রতিকারের জন্য ধরনা দেন। তাঁরা আসামিদের আপিল আবেদনের চূড়ান্ত ফয়সালার জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ নেন। বিচারক আরায়েস উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে পেপারবুক দাখিলের নির্দেশ দেন। বিদ্যুৎগতিতে তা তামিল করা হয়। বিজি প্রেস ছেপে দেয় কাঙ্ক্ষিত পেপারবুক। এভাবে পেপারবুক তৈরির বিষয়ে একই ধরনের কিছু আদেশের কথা আমরা জানি। সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট দপ্তর তা মান্য করেনি। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার শুনানিতেও ক্রমিকের ব্যত্যয় ঘটানো সম্ভব হয়নি।
অর্ণব হত্যা মামলার ঘটনাপ্রবাহের পেপারবুক পর্যায় থেকে আমি নজর রাখি। ‘আপনারা এত দ্রুত পেপারবুক তৈরি করলেন, অন্য ক্ষেত্রে তো করেন না’, কর্মকর্তাদের কাছে এ প্রশ্ন করে কোনো সদুত্তর পাই না। আমাকে বলা হয়, এর সঙ্গে শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীরা রয়েছেন। ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা ধারণা পান, বিচারক আরায়েস উদ্দিন অবসরে যাওয়ার আগেই তাঁরা এর শুনানি শেষ করতে আগ্রহী। ১৮ মাসে বিচারক আরায়েস উদ্দিনের বেঞ্চ তিনবার ভেঙে যায়। যাবজ্জীবন দণ্ডিত তিন ব্যক্তি দুই দফায় জামিন নেন। এবং সবার মূল আপিলগুলোর চূড়ান্ত শুনানি শুধু তাঁর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চেই সম্পন্ন করার প্রয়াসও আমরা দেখতে পাই।
মধ্য ডিসেম্বরে হাইকোর্টের ওই বেঞ্চের আইন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলি। কী কারণে দুই বছর ডিঙিয়ে অর্ণব হত্যা মামলার শুনানি ঠিক হতে পারল? ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদউল্লাহ কিসলু বলেন, ‘আমরা যথারীতি এর বিরোধিতা করেছি।’ এখন ২০০৫ সালের মামলার শুনানি চলছে। ২০০৭ সালের মামলার শুনানি করতে রাষ্ট্রপক্ষ প্রস্তুত নয়। প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহ্বুবে আলমও এ কথায় সায় দেন।
১৭ ডিসেম্বর ২০০৯। বিচারপতি মো. আরায়েস উদ্দিনের বেঞ্চ। এর দৈনিক কার্যতালিকায় অর্ণব হত্যা মামলা ১ নম্বরে উল্লিখিত হিসেবে মুদ্রিত। এদিন উভয় পক্ষের শুনানি কিংবা রাষ্ট্রপক্ষের প্রবল বিরোধিতায় আদালত মামলাটি না শোনার সিদ্ধান্ত নেন। মামলাটি আউট অব লিস্ট হয়।
এরপর ধারণা হয়েছিল, অর্ণব হত্যা মামলা প্রধান বিচারপতির শর্তমতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতেই শুনানির জন্য আসবে। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতির একটি লিখিত আদেশের ফটোকপি পাই। এতে লেখা আছে, মৃত্যুদণ্ডাদেশ কনফারমেশন পেপারবুক হবে ক্রমিকানুসারে। তবে ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে আদালতের আদেশের কথাও আছে। গত ৪ মার্চ অর্ণব হত্যা মামলাটি নতুন একটি বেঞ্চে হঠাৎ শুনানির জন্য আসে। এবারের পর্বে আরও অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ে।
বিচারক মাশুক হোসেন আহমদ ও বিচারক মো. মিজানুর রহমান ভূঁইয়ার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। গত ২১ মার্চে শুনানির জন্য এ বেঞ্চে মামলাটি আবার আসে। এদিনই খবর পাই, সুপ্রিম কোর্ট বারের তৎকালীন সভাপতি এ এফ এম মেসবাহউদ্দিন আহমেদ (সাবেক অতিরিক্ত বিচারক) পড়ন্ত বিকেলে আদালতে হাজির হন। তিনি মামলাটি আংশিক শ্রুত হিসেবে গণ্য করার আবেদন জানান এবং তা মঞ্জুর হয়।
উভয় পক্ষের অংশগ্রহণে শুনানি হয়। কোনো মামলার শুনানি শুরুর পর তা শেষ না হলে তা ‘আংশিক শ্রুত’ হিসেবে গণ্য হয়। কোনো মামলা একবার আংশিক শ্রুত হিসেবে চিহ্নিত হলে একটা বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। ওই বেঞ্চ ভেঙে গেলেও সংশ্লিষ্ট বিচারকদেরই সে মামলায় রায় দেওয়ার অধিকার জন্মায়।
২২ মার্চে জ্যেষ্ঠ আইন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমার কথা হয়। এদিনের কার্যতালিকা দেখে অবাক হই। কারণ আংশিক শ্রুত হিসেবে অর্ণব হত্যা মামলাটি ছাপা হয়েছে। আমি কর্মকর্তাদের বলি, ‘ডিসেম্বরে বাদ দেওয়া এই মামলার শুনানি আদালত নতুন করে চাইলে নিশ্চয়ই হতে পারে। কিন্তু যার কোনো শুনানি হলো না, তা কী করে আংশিক শ্রুত বলে গণ্য হতে পারে?’ পরে শুনেছি, আইন কর্মকর্তারা বিষয়টির প্রতি আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
পরদিন দেখি, দৈনিক কার্যতালিকায় আংশিক শ্রুত কথাটির বিলোপ ঘটেছে। এর লিখিত কারণ নথিতে থাকাটা স্বাভাবিক। কেন ও কীভাবে আংশিক শ্রুত হলো। কেনই বা ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তা মুছে গেল? আমরা এখনো তা জানতে পারিনি।
তবে সেই থেকে প্রতিদিনের কার্যতালিকায় অর্ণব হত্যা মামলাটি মুদ্রিত হচ্ছে। গতকালও দেখেছি। গত ১৮ এপ্রিল নতুন অতিরিক্ত বিচারকেরা শপথ নেন। বেঞ্চ ভাঙে। বিচারক মাশুক আহমেদের সঙ্গে কনিষ্ঠ বিচারক হিসেবে এসেছেন অতিরিক্ত বিচারক আবদুর রব। এদিন রাষ্ট্রপক্ষ এক সপ্তাহ সময় নেয়। যদিও এ বেঞ্চের দায়িত্বপ্রাপ্ত আইন কর্মকর্তারা আমাকে জোর দিয়ে বলেন, তাঁরা তাঁদের নীতিগত অবস্থান থেকে সরে যাননি। তাঁরা এখনো মনে করেন, ২০০৫ ও ২০০৬ সালের সব ডেথ রেফারেন্স শেষ হলেই তবে ২০০৭ সালের মামলা শুনানির জন্য আসতে পারে। আইন কর্মকর্তারা এ কথা অবশ্য আদালতেও বারবার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু তাঁরা ১৮ এপ্রিল হঠাৎ আদালতের কাছ থেকে এক সপ্তাহ সময় নেন। তাই প্রকারান্তরে মামলা শুনানির প্রক্রিয়ায় ঢুকে পড়লেন কি না, সেটা আমার মনে কাঁটার মতো বিঁধছে।
অর্ণব হত্যা মামলার দণ্ডিতদের মধ্যে একটি পারিবারিক, তথাকথিত রাজনৈতিক এবং বিএনপি ও আওয়ামী লীগ ঘরানার প্রভাবশালী যোগসূত্র দেখতে পাই।
প্রথমত, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত গোলাম ফারুক হলেন সেই গোলাম ফারুক, যিনি জাতীয়তাবাদী একজন দাপুটে ছাত্রনেতা। খুলনার বিএল কলেজের ছাত্রদলের সাবেক নেতা। ক্যাম্পাসে শিবির কর্মী খুন ও পৃথক একটি অগ্নিসংযোগের মামলার তিনি আসামি ছিলেন। অন্যদিকে অপর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত খলিল হলেন গোলাম ফারুকের চাচাতো ভাই। খলিল আবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ও বর্তমানে জামিনে থাকা সাত্তারের ছেলে।
দ্বিতীয়ত, ৩ এপ্রিল ২০০৬ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘মূলত রাজনৈতিক কারণে হয়রানিমূলকভাবে’ দায়ের করা কালীগঞ্জ থানার অর্ণব হত্যা মামলা থেকে সাত্তার ও খলিলের নাম প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেয়। আওয়ামী লীগের নেতা মতিয়ার তখন এ সুযোগ পাননি।
তৃতীয়ত, ২০০১ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত হাইকোর্টের আদেশে বিচার ঠেকে থাকে। অভিযুক্ত ও দণ্ডিত ব্যক্তিদের আইনজীবীদের বুলি একই। মামলার যেসব দুর্বলতার কথা বলে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা জামিন নেন, মামলার বিচার স্থগিত করান, দণ্ডিত হয়েও তাঁরা সেই একই কথা বলে জামিন নিয়েছেন। প্রায় একই যুক্তিতে পেপারবুক করান। জরুরি শুনানি চান। অথচ এসব কারণ হাইকোর্ট অনেক আগেই অগ্রাহ্য করেন। ২০০৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বিচার স্থগিত রাখার আদেশ বাতিল করেন। এর ৯০ দিনের মধ্যে ওই দুজনের নাম প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল জোট সরকার। আমরা এই সাত্তার ও খলিলের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে দেখেছি প্রয়াত বার সভাপতি ওজায়ের ফারুক ও নিজামুল হক নাসিমকে। বিচারপতি নিজামুল হক এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান। এরপর এক-এগারো। ক্ষমতার পালাবদল ঘটল। বিচারিক আদালত ২০০৬ সালের ২০ নভেম্বর দুজনের নাম প্রত্যাহারের আবেদন নাকচ করেন। জরুরি অবস্থায় হতভাগ্য অর্ণব পরিবারের কাছে এ রায় ছিল বিরাট সান্ত্বনা।
চতুর্থত, বড় দুই দলের হেভিওয়েট আইনজীবী প্যানেলের যৌথ চেষ্টা। ধারণা করা যায়, চিংড়িঘেরের ধনবান অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হিসাব কষেই বড় দুই দলকে একমঞ্চে এনেছেন। আরও একটি বিষয় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নির্বাচিত বার সভাপতিকে সব সময় পছন্দ করেছেন। ২০০৮ সালের জুলাই। দণ্ডিত ওই সাত্তারের জন্য জামিন নেন টি এইচ খান (বিএনপির চেয়ারপারসনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা)। অবশ্য এর ঠিক চার মাস পর অক্টোবরে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত অপর দুই আসামি মতিয়ার ও সুশীলের জামিন নেন তৎকালীন বার সভাপতি শফিক আহমেদ (বর্তমানে আইনমন্ত্রী) ও হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী (বর্তমানে বিচারপতি)। অর্ণব হত্যা মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তিদের মধ্যে এরপর জেলের বাইরে রইল বাকি দুই। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুজনের জন্য এরপর এলেন সুপ্রিম কোর্ট বারের আওয়ামীপন্থী সভাপতি এ এফ এম মেসবাহউদ্দিন। তবে তিনি একা নন। তাঁর সঙ্গে সক্রিয় আছেন সাবেক বিচারপতি টি এইচ খান চেম্বারও।
আমরা অর্ণব হত্যা মামলার স্বাভাবিক শুনানি চাই। অর্ণবের চাচা নিশান চন্দ্র দাস মামলার বাদী। তিনি ২০০৩ সালে মামলার তদবির করতে ঢাকায় এসে চাপাতির কোপ খেয়েছেন। সবশেষে আমাদের শ্রদ্ধেয় কবি বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের কথায় বলি: ‘খুন নিমখুন গুমখুন সব খুনই/ অপরাধ, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই/ রাষ্ট্র বাদী হয়ে তার কিনারা করবেই-/ না পারলে, তার মর্যাদা হবে ক্ষুণ্ন/ প্রজা ভাববে বৃথাই রবরবা, ক্ষমতা যে তার শূন্য’।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com