Sunday, February 21, 2016

‘বাঙালি, আমাকে বাঁচাও’ by আবু এন এম ওয়াহিদ

ভাষা শহীদদের স্মরণে কলকাতায় স্মারক প্রতিষ্ঠা
মারা যাওয়ার মাত্র ৯ মাস আগে, জানুয়ারি ২৫, ২০১২ সালে আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল। বাংলা ভাষার এই স্বনামধন্য এবং সুপরিচিত কবি ও ঔপন্যাসিক প্রবন্ধটা লিখেছিলেন কন্নড় ভাষার এক মহাকবির গুণকীর্তন করে। সুনীল যার সম্পর্কে লিখেছিলেন তিনি সাহিত্য জগতে কুয়েমপু ছদ্মনামে পরিচিত। তার আসল নাম যেমনি অনেকের কাছে অজানা তেমনি উচ্চারণে বড়ই কঠিন- কুপ্পালি ভেঙ্কাটাপাগোডা পুট্টাপা। সম্ভবত পিতামাতার দেয়া এ রকম একটা দাঁতভাঙা নামের কারণেই কবি একটা সহজ ছদ্মনাম বেছে নিয়েছিলেন। আসলে এ নামেও একটা জটিলতা আছে। ইংরেজিতে কুয়েমপু লিখতে গেলে শুরুতে একটা ‘ভি’ অক্ষর আছে, কিন্তু উচ্চারণে সেটা উহ্য থাকে। কুয়েমপু কর্নাটকের একজন অত্যন্ত খ্যাতিমান কবি। কন্নড় ভাষায় এম গোবিন্দ পাইর পরেই তার স্থান।
কুয়েমপু সম্পর্কে তার সে লেখার কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, কুয়েমপু কন্নড় ভাষায় লিখলেও বাংলা ও বাংলা ভাষার সাথে ছিল তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, যোগাযোগ ও মনের টান। রবীন্দ্র যুগে জন্মে, রবীন্দ্রভক্ত হয়েও তিনি ছিলেন স্বকীয়তায় পরিপূর্ণ। কুয়েমপুর সাহিত্যকর্ম এতই নিখাদ ও নিখুঁত যে, নিজের সাথেই কেবল তার তুলনা চলে; অন্য কারো সাথে নয়। ঘরকুনো এ মানুষটা ১৯২৯ সালে কলকাতায় এসেছিলেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সাথে তার দেখা হয়েছিল কি না, তা কেউ জানে না। কুয়েমপু স্বীকার করেছেন যে, সাহিত্য চর্চায় তিনি রবীন্দ্রনাথকে অনুসরণ করতেন। তার ওপর রবিঠাকুরের প্রভাব এতই প্রবল ছিল যে, রবীন্দ্রনাথের শান্তি নিকেতনের অনুকরণে কুয়েমপু তার গ্রামের বাড়িতে একটা আশ্রমের মতো বানিয়েছিলেন।
কুয়েমপুর জন্ম ১৯০৪ সালে এবং মৃত্যু ১৯৯৪ সালে। দীর্ঘ ৯০ বছরের জীবদ্দশায় তিনি লিখেছেন প্রচুর। কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, অনুবাদ, শিশু সাহিত্য, জীবনী প্রভৃতি ক্ষেত্রে তার ছিল বিস্তর ও স্বচ্ছন্দ বিচরণ। সাহিত্যের এসব ক্ষেত্রে তিনি সফলতার উজ্জ্বল নজির রেখে গেছেন। কুয়েমপুর অনেক লেখা ভারতীয় বিভিন্ন এবং বিদেশী ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। তার যে গ্রন্থটি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তা হলো, ‘রামায়ণ দর্শন’। এ বিশাল বইটাও ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। এখানে তিনি সীতার অগ্নিপরীক্ষার মতন রামকেও অগ্নিপরীক্ষায় ফেলেছেন। কুয়েমপু খুব প্রচারবিমুখ মানুষ ছিলেন। বিদেশ যাওয়া তো দূরের কথা, নিজের কর্মস্থল ছাড়া ভারতবর্ষের ভেতরেও অন্য কোনো রাজ্যে তিনি সহজে যেতে চাইতেন না। তাই সাধারণ পাঠকের মধ্যে তার পরিচিতি একটু কম বৈকি। কিন্তু জনপ্রিয় না হলেও অন্য এক দিক থেকে কুয়েমপু ছিলেন খুবই ভাগ্যবান। জীবনে তিনি উদার ও পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক এবং সরকারি স্বীকৃতি পেয়ে ধন্য হয়েছেন। জ্ঞানপীঠ ও ভারতরত্ন উপাধি পাওয়া সে দেশের যেকোনো কবি-সাহিত্যিকের জন্য চাট্টিখানি কথা নয়! অন্য আরো অনেক স্বীকৃতির সাথে কুয়েমপু এ দুটো গৌরবেরও অধিকারী।
কথা বলতে বলতে অনেক বলা হয়ে গেল। আমার আজকের নিবন্ধের বিষয়বস্তু কিন্তু কুয়েমপু নন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও নন। ভিন্নধর্মী, সম্পূর্ণরূপে অন্য এক বিষয় নিয়ে এ লেখায় আলোকপাত করার ইচ্ছা আছে। তবে কেন এখানে কুয়েমপুকে নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এ রচনার ভূমিকা টানলাম, এক্ষুনি পাঠকদের কাছে তা খোলাসা করে বলছি। কুয়েমপুকে নিয়ে আলোচ্য প্রবন্ধের শেষে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘বিমানবন্দরে অলস চিন্তা’ শিরোনামে মাত্র ছোট্ট একটা প্যারা লিখেছেন। ওই প্যারার সাথে তার মূল রচনার কী সম্পর্ক এবং কী তাৎপর্য অনেক কসরত করেও আমি তার কোনো হদিস পাইনি। পাঠকদের সুবিধার জন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃতিটা হুবহু তুলে ধরছি-
‘কর্নাটকের মানুষ তাদের ভাষাকে খুব ভালবাসে। রাজ্য পরিচালনার অনেক ক্ষেত্রে কন্নড় ভাষার প্রয়োগ হয়। বেঙ্গালুরুর অতি আধুনিক, অতি সুদৃশ্য বিমানবন্দরে বসে কফি খেতে খেতে দেখতে পাচ্ছি, সমস্ত লিখিত নির্দেশিকাতেই ইংরেজি হিন্দির সঙ্গে কন্নড় ভাষাও স্থান করে নিয়েছে। বাইরে অলসভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি লাগল। আমাদের কলকাতায় তো খুব শিগগিরই সম্পূর্ণ আধুনিক এবং বেশ বড় আকারের বিমানবন্দরের উদ্বোধন হবে। সেখানে কি একটাও বাংলা অক্ষর থাকবে? সন্দেহ হচ্ছে কেন? মনে কেন কুডাক ডাকছে! কাউকে তো দাবি জানাতে হবে। সবাই যেন কেমন ঝিমিয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে বাংলা ভাষার অপব্যবহার দেখি, কেউ কোনও প্রতিবাদ করে না। তাই আমি আবার এই প্রশ্ন তুলছি : কলকাতার নতুন বিমানবন্দরে কি একটাও বাংলা অক্ষর দেখা যাবে?’
পাঠকেরা এবার বুঝতে পারছেন, কত বড় আফসোস নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো একজন বড় মাপের বাঙালি লেখক এমন প্রশ্ন তুলতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গ একটা স্বাধীন দেশের স্বশাসিত স্বাধীন রাজ্য। বাংলা ভারতবর্ষের একটা অতি উন্নত ও সমৃদ্ধ ভাষা। বাংলা ছাড়া ভারতের অন্য কোনো ভাষার লেখক নোবেল পুরস্কার আনতে পারেননি, কিংবা অন্য কোনো উপায়েও এত বড় বিশ্বস্বীকৃতি কেউ পাননি। তারপরও ভারতের বাঙালিরা গোটা দেশে দূরে থাক, খোদ পশ্চিমবঙ্গে, এমনকি তার রাজধানী কলকাতাতেও দীর্ঘ ৬৪ বছরেও বাংলা ভাষাকে মর্যাদার সাথে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। আমি কখনো কলকাতা যাইনি। যারা গিয়েছেন তাদের দেখায়, তাদের লেখায়, তাদের কথায় হরহামেশাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।
দৈনিক আমার দেশের সিনিয়র সাংবাদিক সঞ্জীব চৌধুরী কলকাতা থেকে ফিরে এসে নিজ পত্রিকায় ডিসেম্বর ১৭, ২০১১ সালে ‘এপারে বাংলা ওপারে হিন্দি’ শিরোনামে একটা উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ লিখেছেন। ওই নিবন্ধে সঞ্জীব চৌধুরীর মূল বক্তব্য একটাই। অর্থাৎ, দিনে দিনে কলকাতায় বাংলা ভাষা এবং বাঙালি কণ্ঠ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে। আর বাংলার জায়গাটা হিন্দি দ্রুত দখল করে নিচ্ছে। তার মতে, কলকাতায় এখন বাংলার চেয়ে ইংরেজির প্রচলন বরং বেশি। এখনো কলকাতায় যেটুকু বাংলা শোনা যায়, তার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশের ভিজিটর, যারা লেখাপড়া, চিকিৎসা, ব্যবসাবাণিজ্য কিংবা আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের দেখতে যান তাদের জন্য। কলকাতায় বাংলা ভাষার হাল যে এমন হবে, তার আলামত অনেক আগে থেকেই পাওয়া যাচ্ছিল। সঞ্জীব চৌধুরী তার নিবন্ধের শুরুতে তা খুব সুন্দর করে উপস্থাপন করেছেন। ১৯৭৪ সালে তার এক বন্ধু দীপক কলকাতায় বেড়াতে গিয়ে বন্ধুদের নিয়ে এক পানশালার আড্ডায় কাটিয়েছিলেন কিছুক্ষণ। যতক্ষণ তিনি সেখানে বসেছিলেন, ঠাণ্ডা-গরম পানীয় পরিবেশনের সাথে গিটারের সুরে একের পর এক চলছিল হিন্দি সঙ্গীতের সুর। একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে দীপক একটা বাংলা গান শোনার আরজি পেশ করেছিলেন। তখন গিটার বাদক জবাবে বলেছিলেন, ‘দাদা আপনি কি জয় বাংলার লোক?’ দীপক মুচকি হেসে হ্যাঁসূচক মাথা নাড়ালে ওই বাদক গিটারে নতুন সুর তুলেছিলেন, ‘আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান...’। উনিশ শ’ চুয়াত্তরে কলকাতায় দীপকের অভিজ্ঞতা এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সে দিনকার আফসোস থেকে বোঝা যায়, হিন্দির দৌরাত্ম্যে কলকাতার ‘বাংলা’ শরীরে বিষের ক্রিয়া পুরো মাত্রায় শুরু হয়ে গেছে। সীমান্ত পেরিয়ে মাত্র ক’মাইল দূরে সে বিষের যন্ত্রণা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মন-মগজে অনুভূত হতে কি খুব বেশি দেরি? বাংলা ভাষার মুখে যদি কোনো ভাষা থাকত তাহলে আজ কেঁদে কেঁদে চিৎকার করে বলত, ‘বাঙালি, আমাকে বাঁচাও’!
লেখক : অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র
এডিটর, জার্নাল অব ডেভেলপিং এরিয়াজ
Email : wahid2569@gmail.com

সাংবাদিকতা কোনো অপরাধ নয় by কামাল আহমেদ

‘মামলা করাই তাঁর নেশা ও পেশা’ শিরোনামে প্রথম আলোয় একটি খবর ছাপা হয়েছিল ১৯ নভেম্বর ২০১৪ সালে। ওই প্রতিবেদনটি যাঁকে নিয়ে করা হয়েছিল, তিনি জননেত্রী পরিষদ নামের একটি সংগঠনের সভাপতি, এ বি সিদ্দিকী। তিনি প্রথম আলোকে তখন বলেছিলেন যে সারা দেশে সংগঠনকে পরিচিত করার লক্ষ্যে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মামলা করে যেতে চান তিনি। তবে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, গরিব মানুষ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর আনুকূল্য পেতেই তাঁর এই চেষ্টা। এ বি সিদ্দিকীর ভাষ্য ছিল, অন্যরা আলোচনা সভা ও মানববন্ধনের মাধ্যমে যেভাবে নিজেদের সংগঠনের গুরুত্ব তুলে ধরে, তিনি মামলা করে তাঁর সংগঠনকে সেভাবে তুলে ধরছেন। আলোচনা সভা ও মানববন্ধন করতে যেহেতু অনেক টাকা লাগে, সেহেতু বিকল্প হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন মামলাবাজি। মামলা করার টাকা পান কোথায় জানতে চাইলে এ বি সিদ্দিকী প্রতিবেদককে বলেছিলেন, ‘টাকা লাগে না তো। আমি মামলা করতে চাইলেই আইনজীবীরা এগিয়ে আসেন। তাঁরা আগ্রহ দেখিয়ে আমার মামলা নেন, শুনানি করেন। পরে মিডিয়ায় বক্তৃতা দেন। এতে তাঁরাও হাইলাইটেড হন।’ বরং যেসব আইনজীবী তাঁর মামলায় লড়েন, কখনো কখনো তাঁরাই তাঁকে টাকা দেন।
ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে সারা দেশে এ পর্যন্ত মামলা হয়েছে পঁচাত্তরটির মতো। সারা দেশে এ বি সিদ্দিকীর দেখানো কৌশল অনুসরণের হিড়িক দেখে আমাদের ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। যাঁরা মামলা করছেন, তাঁরা কী চান, সেটা বোঝার জন্য সিদ্দিকীর ওই সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনটি মূল্যবান দৃষ্টান্ত হতে পারে। এঁদের সবার মূল উদ্দেশ্য প্রায় নিঃখরচায় প্রচার পাওয়া এবং দলীয় প্রধান বা প্রভাবশালী নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ। এ বি সিদ্দিকী নিজেও বলেছেন যে তিনি মামলা করেন প্রধানমন্ত্রীর কৃপাদৃষ্টির আশায়। তবে গণমামলার প্রতিযোগিতার আরেকটি কারণ হতে পারে— কোনো নেপথ্যচারী গোষ্ঠীর সংগঠিত উদ্যোগ।
হাজার হাজার কোটি টাকার মানহানির মামলার খবর আসতে থাকায় অনেকেই জানতে চেয়েছেন যে এসব মামলার জন্য মামলাকারীদের খরচ জোগাচ্ছেন কারা? নিশ্চয়ই অনেক টাকা খরচ করতে হচ্ছে? ক্ষতিপূরণের মামলায় কত টাকা খরচ লাগতে পারে, তার উত্তর আছে ১৮৭০ সালের কোর্ট ফি অ্যাক্টে। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে সর্বশেষ সংশোধনীর পর আইনটি যে অবস্থায় আছে, তাতে দেওয়ানি আইনে মানহানির মামলা করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ যত টাকাই দাবি করা হোক না কেন, তার জন্য সর্বোচ্চ ফি দিতে হবে ৩৫ হাজার টাকা। সুতরাং, হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি করা খুব ব্যয়বহুল নয়। তবে সেই টাকাও এসব মামলাকারী খরচ করেননি। তাঁরা দেওয়ানি মামলার পথেই হাঁটেননি। উদ্দেশ্য যেহেতু রাজনৈতিক ফায়দা আদায় এবং একজন সম্পাদককে হয়রানি করা, সেহেতু তাঁরা মামলাও করেছেন ফৌজদারি আইনে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা ক্ষতিপূরণের মামলা করেন দেওয়ানি আইনে। রাষ্ট্রদ্রোহের তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না, যদি না জেনারেল সিসির মিসর অথবা জেনারেল প্রয়ুথ চান-ওচার থাইল্যান্ডের মতো দেশ হয়।
মাহ্ফুজ আনাম যদি সত্যিই কোনো অপরাধ করে থাকেন, তবে তাঁর বিচার হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু জেলায় জেলায়, কোথাও কোথাও উপজেলায় এবং ক্ষেত্রবিশেষে একই মুসাবিদার কপি ব্যবহার করে (ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের মামলার কপিতে এমনটি দেখা গেছে। কুমিল্লায় যে পাঁচটি মামলা হয়েছে, তার প্রতিটিতে মামলাকারীদের নাম-ঠিকানা ছাড়া পুরোটা হুবহু এক) একাধিক মামলার বহর দেখে বোঝা যায়, মামলাকারীদের অন্যতম লক্ষ্য মাহ্ফুজ আনামকে হয়রানি করা এবং ভয় দেখানো। দিনের পর দিন এক জেলা থেকে আরেক জেলায় আদালতে গিয়ে হাজিরা দিতে তাঁকে বাধ্য করা। যেসব আইনজীবী এসব মামলায় তাঁদের মক্কেলদের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন, তাঁরা কোন বিবেচনায় সেটি করছেন, তার উত্তর আমরা খুঁজে পাচ্ছি না।
শুরুতে যে এ বি সিদ্দিকীর কথা বলেছিলাম, তাঁর আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন খলিলুর রহমান। সে সময় খলিলুর রহমান প্রথম আলোকে বলেছিলেন, এ বি সিদ্দিকীর মামলাগুলো পরিচালনায় তিনি কোনো অর্থ নেন না। শুধু গণমাধ্যমে তাঁর নাম আসে—এতেই তিনি সন্তুষ্ট। সারা দেশে প্রায় পঁচাত্তরজন আইনজীবী কি শুধু প্রচার পাওয়ার আশাতেই এসব মামলায় যুক্ত হয়েছেন? আইনের শাসন বা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই যদি বিবেচ্য হতো, তাহলে এভাবে গণহারে মামলা করা থেকে আইনজীবীরা তাঁদের মক্কেলদের কি নিরুৎসাহিত করতেন না? এ কথা তো সবাই জানেন যে অপরাধ যদি কিছু হয়েই থাকে, তাহলেও এক অপরাধের বারবার বিচার চলে না।
মাহ্ফুজ আনাম তাঁর কাগজে ২০০৬-০৮ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ছাপানো কিছু খবরের বিষয়ে একটি টিভি টক শোতে যে মন্তব্য করেছেন, তাকে কেন্দ্র করেই এসব মামলার হিড়িক। টক শোতে তিনি বলেছেন যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সেই সময়ে সামরিক গোয়েন্দা সূত্র থেকে পাওয়া কিছু অভিযোগ তাঁরা ছাপিয়ে ভুল করেছেন। কেননা, সেগুলো অন্য কোনো সূত্র থেকে যাচাই না করেই ছাপা হয়েছিল। তাঁর সম্পাদিত ডেইলি স্টার-এর পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাঁর সম্পাদকজীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে যেটি ছিল তাঁর স্বেচ্ছামূলক স্বীকারোক্তি। স্বভাবতই তাঁর ভুল স্বীকারের সাহসকে স্বাগত জানিয়েছেন অনেকে, যাঁদের মধ্যে তথ্যমন্ত্রীও রয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়টিতে কোনো নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে না। তবে সরকারের ঘনিষ্ঠ সমর্থকদের মধ্যে যেন একধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। একদল দৌড়েছে আদালতে, আরেক দল দাবি করছে সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে তাঁর পদত্যাগ। এর মধ্যে লক্ষণীয় হচ্ছে, রাষ্ট্রপক্ষের আইন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন এমন কয়েকজনও মাহ্ফুজ আনামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলার আবেদন করেছেন। আর সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের মধ্যে সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন সংবাদপত্রে নিবন্ধ লিখে অথবা টক শোতে অংশ নিয়ে সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে মাহ্ফুজ আনামের পদত্যাগ দাবি করেছেন।
দেশের সর্বাধিক প্রচারিত ইংরেজি দৈনিক, যাকে বিবিসির দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সংবাদদাতা জাস্টিন রোলাট ‘বাংলাদেশের নিউইয়র্ক টাইমস’ বলে অভিহিত করেছেন, সেই ডেইলি স্টার সম্পাদকের বিরুদ্ধে এসব মামলা দায়েরের নিন্দা জানিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সম্পাদক পরিষদ একটি বিবৃতি দিয়েছে। সংবাদপত্র সম্পাদকদের সংগঠনটি বিবৃতিটি দিতে সপ্তাহ খানেক সময় নেওয়ায় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনেকে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। তবে সম্পাদকদের তাড়াহুড়া না করারই কথা। কিছুটা সময় নিয়ে ভেবেচিন্তে বিবৃতি দিয়ে তাঁরা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘এ ধরনের ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী।’
মানহানির মামলা কিংবা সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগের দাবি এবং সম্পাদক পরিষদের বিবৃতি—এসবের মধ্যে অবশ্য যে প্রশ্নটি হারিয়ে যাচ্ছে, তা হলো, ভয়মুক্ত ও নীতিনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ কী? সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যে ভীতিকর পরিবেশের কারণে নিরপেক্ষ সূত্র থেকে যাচাই না করেই খবর ছাপা হতো, সেই একই ধরনের খবর ছাপা বন্ধ হবে কবে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র থেকে সরবরাহ করা কত তথ্যই না ছাপা হচ্ছে, টিভিতে প্রচারিত হচ্ছে। স্বতন্ত্র কোনো সূত্র থেকে তথ্য যাচাই-বাছাই করার কাজটি কজন করছেন? নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে দেওয়া কথিত স্বীকারোক্তি ছাপা বা প্রচার করা কি বন্ধ হয়েছে? ক্রসফায়ারে নিহত ব্যক্তিদের খবরগুলোর কথা ভেবে দেখুন! র্যাব-পুলিশের ভাষ্যের বাইরে স্বতন্ত্র সূত্র থেকে খবর যাচাই করেন কজন? গোপনে ধারণ করা টেলিকথনের (মান্নার সঙ্গে খোকার, খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর, খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথিত অমিত শাহর) কথা নিশ্চয়ই কেউ বিস্মৃত হননি!
প্রশ্ন উঠতে পারে, জনগুরুত্ব বিবেচনায় নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য কি কখনোই প্রচার করা যায় না? সব সময় যে এক স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম চলবে, এটি নিশ্চয়ই কেউ দাবি করবেন না। আলাদা আলাদা ঘটনার জন্য আলাদা আলাদা বিবেচনা কাজ করে। যে ধরনের স্বীকারোক্তিভিত্তিক সংবাদের কারণে মাহ্ফুজ আনামের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা হচ্ছে, সেই একই রকম খবর তো ক্ষমতাচ্যুত বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধেও ছাপা হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতারা কি মানবেন যে বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে ছাপানো ওই সব খবরও ভুল এবং উদ্দেশ্যমূলক ছিল?
সংবাদপত্র সব সময় শতভাগ নির্ভুল হবে, এমনটি আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু ভুল সংশোধন এবং তার প্রতিকারের ব্যবস্থা কী হবে? বাংলাদেশে সংবাদপত্রশিল্পের মালিক ও সাংবাদিকেরা অনেক দিন ধরেই দাবি করে আসছেন যে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতাবিষয়ক সব অভিযোগ নিষ্পত্তির কাজটি হোক প্রেস কাউন্সিলে। কিন্তু প্রেস কাউন্সিলের কাজ ও দায়িত্ব সম্পর্কে হয় অনেকে জানেন না, নয়তো প্রতিষ্ঠানটির প্রতি তাঁরা আস্থা রাখতে পারেন না। আর মামলার উদ্দেশ্য যদি হয় কাউকে হয়রানি করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়া, তাহলে সেই মামলাকারী প্রেস কাউন্সিলে যে যাবেন না, সেটাই স্বাভাবিক। সুতরাং, সাংবাদিকতার জন্য হয়রানি বন্ধে কার্যকর আইনগত সংস্কারের উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রেস কাউন্সিলকেও যুগোপযোগী করা প্রয়োজন, যাতে সাধারণ নাগরিকেরা প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আস্থা স্থাপন করতে পারে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক দিক দিয়ে অনুগত ব্যক্তিদের ওপর নির্ভরশীল থাকলে সেই প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাবে।
সবচেয়ে বড় কথা, গণমাধ্যমকেই নিজেদের আচরণবিধি ও আদর্শ নীতিমালা ঠিক করতে হবে। এ কাজ সম্পাদক পরিষদের মতো ফোরামের পক্ষেই সম্ভব। দেশে দেশে সে রকমটিই হয়ে থাকে। এক-এগারোর সরকারের আমলে সাংবাদিকতায় যে চর্চা হয়েছে, সেটি যেমন প্রথম নয়, তেমনি তা শেষও নয়। আবার সাংবাদিকতায় ভুলভ্রান্তিমুক্ত থাকাও জরুরি।
আল-জাজিরা টেলিভিশনের একটি স্লোগান আমাদের অনেকেরই খুব পছন্দ। মিসরে তাদের তিনজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে জেনারেল সিসির সরকার যখন বিচারের মুখোমুখি করেছিল, তখন তারা ওই স্লোগান তোলে। স্লোগানটি হচ্ছে, ‘জার্নালিজম ইজ নট এ ক্রাইম’। সাংবাদিকতা কোনো অপরাধ নয়। সুতরাং, সাংবাদিকতাকে অন্য দশটা ফৌজদারি অপরাধের মতো শ্রেণীকরণ করা হবে অন্যায়। আর সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সম্পাদকেরাই নেতৃত্ব দেবেন, সেটা নিশ্চয়ই দুরাশা নয়।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

ভারতেই শুধু নয়, বাংলাদেশেও আছে রাষ্ট্রদ্রোহ নাটক

এ মাসের বিশেষ বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ। ভারতে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে বলিয়ান একটি ‘বলিষ্ঠ’ সরকার তরুণ কানহাইয়া কুমারের বিরুদ্ধে হাফিজ সাঈদদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ঠেলে দেয়ার অভিযোগ এনেছে। একটি ভুয়া টুইটার অ্যাকাউন্টের ওপর ভিত্তি করে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছে।
পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশ আরও একধাপ এগিয়েছে। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের সম্মানিত সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে বহু রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছে। বাংলাদেশের শাসক দল আওয়ামী লীগ সর্বশক্তিধর। বিএনপির বয়কট করা জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি হওয়া রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে গঠিত দেশটির বন্ধুভাবাপন্ন বিরোধী দল!
সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে আওয়ামী লীগ প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠেছে। মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তার পত্রিকায় ২০০৭-০৮ সালে প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদের কারণে। তখন টেকনোক্রাটদের দ্বারা গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশ চালাচ্ছিল।
ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই উপনিবেশিক আমলের আইন ব্যবহার করছে নিজেদেরই নাগরিকের বিরুদ্ধে। ১৯৯০ সালে বৃটেন নিজেই এ আইন বিলুপ্ত করেছে। একে ভাবা হয় অতীত যুগের ধ্বংসাবশেষ, যার এ যুগে কোনো স্থান নেই। বাংলাদেশে রাষ্ট্রদ্রোহের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-, অপরদিকে ফৌজদারি মানহানি মামলার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছরের কারাদ-।
পরিহাসের বিষয়, মাহফুজ আনাম নিজেই এসব নিজের ঘাড়ে টেনে এনেছেন। ৩রা ফেব্রুয়ারি একটি টেলিভিশন টকশো’তে তিনি নিজের অতীত সম্পাদকীয় বিবেচনার ত্রুটি নিয়ে কিছু মন্তব্য করেন। তারই পত্রিকায় প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদন নিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, যেগুলো ছাপা হয়েছিল সরকারি সূত্রের সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে। এর মধ্যে ছিল বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলা সম্পর্কিত প্রতিবেদনও। মাহফুজ আনাম স্বীকার করেন, এসব ছিল তার সম্পাদকীয় বিবেচনার ত্রুটি, কেননা তার পত্রিকা তখন এসব তথ্য স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করতে পারেনি।
তার এই সরল অন্তদর্শনের ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, যখন প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ এসব নিয়ে তার ফেসবুক পেইজে মন্তব্য করেন। তখন তিনি বলেন, মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হওয়া উচিত। এর ফলে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনে ব্যাকুল আওয়ামী সমর্থকদের জন্য সব দ্বার খুলে যায়। দেশের সর্বত্র এ সম্পাদকের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়ের করা হয়েছে। এতে কোনো সাজা না হলেও মাহফুজ আনামকে আগামী কয়েক বছর কেবল এ আদালত থেকে ওই আদালতে দৌড়াতে হবে। এসব চলতে পারে বছরের পর বছর।
এটি সত্য যে, মাহফুজ আনাম ২০০৭-০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সমর্থন দিয়েছিলেন। দুই বেগম শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার দ্বন্দ্ব ও দুর্নীতির অভিযোগের ফলে, তখন একটি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল যাতে দুই নেত্রীই রাজনীতি ত্যাগ করেন। ফলে উভয় জাতীয় রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। সেনাবাহিনী তখন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান মুহম্মদ ইউনূসকে সামনে আনার চেষ্টা করছিল। তাকে ঘিরে একটি পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক দল তৈরির প্রচেষ্টাও নেয়া হয়েছিল। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যকার দ্বন্দ্ব বন্ধেই এ ধারণা সামনে আসে। এর ফলে দেশজুড়ে বিভক্তি ও অচলাবস্থা নেমে আসে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অভ্যুত্থানের সঙ্গে অপরিচিত নয়। ২০০৭ সালে প্রাথমিক প্রচেষ্টা ছিল ক্ষমতা দখল। এটা হতে পারতো সামরিক অভ্যুত্থান। কিন্তু জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কারণে তা হয়নি। জাতিসংঘ সতর্ক করে দেয়, বাংলাদেশ সেক্ষেত্রে শান্তিরক্ষী মিশনে নিজেদের সেনা আর পাঠাতে পারবে না। অনেক কিছু বিবেচনার পর সেনাবাহিনী অভ্যুত্থানের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। পরিবর্তে, অনেক টেকনোক্রাটকে সরকারে বসায় সেনাবাহিনী। কিন্তু নেপথ্যের কলকাঠি থেকে যায় তাদের হাতেই। ওদিকে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্য থেকেই নতুন একটি রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের জন্য কাজ শুরু হয়। ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়, শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়ার সুনাম ধ্বংসের প্রচেষ্টা হাতে নেয়া হয়। এ বেগমদের পরিত্যাগ করতে দুই দলের প্রভাবশালী নেতাদের চাপ দেয়া হয়। তবে বিশ্বস্তরা মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকে। উভয় নেত্রীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন খবর ছাপাতে ব্যবহার করা হয় গণমাধ্যম। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়, পত্রিকাগুলোকে এ বিষয়ে তথ্য সরবরাহ করা হয়। অনেক পত্রিকার মতো তখন ডেইলি স্টারও এসব খবর ছেপেছিল। কিন্তু বাকি সম্পাদকরা কিছু স্বীকার না করলেও, মাহফুজ আনাম সেসব খবর ছাপানোর সিদ্ধান্তকে ত্রুটি হিসেবে স্বীকার করেন। কারণ, সেগুলো স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা যায়নি।
মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে এই ‘উইচ-হান্টে’র সমালোচনা করছেন দেশের সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, লেখক এবং বিএনপি। বিরোধী দলটি বিশ্বাস করে, শেখ হাসিনা সরকার সব ধরনের যৌক্তিক সমালোচনার কণ্ঠরোধ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. শান্তনু মজুমদার বলেন, ‘এটা একটা মূর্খতাপূর্ণ সিদ্ধান্ত। মাহফুজ আনাম ‘মাইনাস টু’ প্রকল্প ও সামরিক বাহিনীকে সমর্থন দিয়েছিলেন, যার বিরোধিতা আমি করি। কিন্তু সরকার তার পেছনে যেভাবে লেগেছে, তাতে আমি হতবিহ্বল। নিশ্চিতভাবেই নিজের অতীত ভুল স্বীকারের সততা প্রদর্শনের জন্য এসব তার প্রাপ্য নয়। আমি তার সাহসকে স্যালুট জানাই।’ তবে শান্তনু মজুমদারের আশা, শিগগিরই এ পাগলামির অবসান ঘটবে।
(সীমা গুহ ভারতের একজন সাংবাদিক। এ লেখাটি ভারতীয় নিউজ ওয়েবসাইট ফার্স্টপোস্টে প্রকাশিত তার নিবন্ধের অনুবাদ। ভাষান্তর: নাজমুল আহসান।)

বঙ্গে জোট হলেও এখনো ‘অ্যাডভান্টেজ’ মমতা by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রায় অসাধ্যই সাধন করলেন বঙ্গজ কমিউনিস্টরা। সিপিএমের কট্টর ‘কেরালা লবি’কে হারিয়ে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের সঙ্গে কৌশলগত সমঝোতার অনুমোদন ছিনিয়ে এই প্রথম তাঁরা ‘বেঙ্গল লাইন’কে এক অনাস্বাদিত জয় এনে দিলেন। এপ্রিল-মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনও অতঃপর পেয়ে গেল অন্য ধরনের গুরুত্ব।
সিপিএমের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা বেশ কিছুদিন ধরেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে তৃণমূল কংগ্রেসের মোকাবিলা তাঁদের তো নয়ই, কারও একার পক্ষেই করা সম্ভব নয়। তৃণমূল কংগ্রেসের ‘দৌরাত্ম্যে’ রাজ্যে যাদের ‘নাভিশ্বাস’ উঠেছে, তাদের সবার হাত ধরাও সিপিএমের পক্ষে সম্ভব নয়। বেঁচে থাকা ও টিকে থাকার একমাত্র উপায় কংগ্রেসের সঙ্গে জোট। কিন্তু সেখানেও আদর্শ ও নীতিগত নানান বাধা। একই হাল রাজ্য কংগ্রেসেরও। যে সিপিএমের অত্যাচারে তারা একটানা ৩৪ বছর রক্তাক্ত হয়েছে, তাদেরই হাত ধরে কী করে বাঁচার কথা ভাবা যায়? অথচ ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু রাজ্য কংগ্রেসের কাছে সেটাই শেষ পাড়ানির কড়ি। কারণ, রাজ্যের চতুর্থ শক্তি বিজেপি দুই দলের কাছেই অচ্ছুত। অতএব অতীত ভুলে সেই অবলম্বনকেই আঁকড়ে ধরার অমোঘ ও একমাত্র তাগিদ দুই দলের রাজ্য নেতৃত্বকে কাছাকাছি টেনে আনে। বাকি ছিল শুধু শেষ বাধা টপকানো। সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির দুই দিনের বৈঠকে বঙ্গজ কমিউনিস্টরা সেই অসাধ্যই সাধন করলেন।
কংগ্রেসের সঙ্গে সরাসরি জোটের অনুমোদন না দিলেও কেন্দ্রীয় কমিটি জানিয়ে দিল, পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্রের স্বার্থে সিপিএম সব ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক দলের সঙ্গেই কথা বলবে, সমঝোতার চেষ্টা করবে। কংগ্রেসকে সিপিএম যে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ দল বলে মনে করে, সে কথা দলীয় সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকের পর জানিয়ে দিতেও কুণ্ঠিত হননি।
প্রকাশ কারাটের আমলে যা ছিল স্বপ্নাতীত, সীতারাম ইয়েচুরির রাজত্বে তা সম্ভব হলো। প্রকাশের তুলনায় সীতারাম বরাবরই বেশি ‘বাস্তববাদী’। তিনি ‘নীতিবাগীশ ও ঘরকুনো’ নন। রাজনীতির আঙিনায় খোলামেলা মেলামেশায় ক্লান্তিহীন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে বঙ্গজ কমিউনিস্টদের ‘যন্ত্রণা’ তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তা ছাড়া, কেরালা ও ত্রিপুরার ২২টি লোকসভা আসনের জন্য পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনকে বলি দেওয়ার যুক্তিও তিনি মেনে নিতে পারেননি। নীতির কেন্দ্রীকরণের দরুন পশ্চিমবঙ্গ থেকে দলটাকে মুছে দিতে তাঁর মন সায় দেয়নি। ফলে নীতির বিকেন্দ্রীকরণের দাবি তিনি মেনে নিয়েছেন। মোটামুটি যা আভাস, তাতে এই পথেরই পথিক হতে চলছে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও। অর্থাৎ বিয়ে না করে পশ্চিমবঙ্গে ঘর বাঁধতেই চলেছে কংগ্রেস ও সিপিএম।
প্রদেশ কংগ্রেস নেতারা প্রায় সমস্বরেই সিপিএমের সঙ্গে জোট করার প্রয়োজনীয়তার কথা রাহুল ও সোনিয়া গান্ধীকে বোঝাতে পেরেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও কংগ্রেস হাইকমান্ড আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে চায়নি। না চাওয়ার কারণ সিপিএমের অতীত। ১৯৯৬ সালে এই সিপিএমই জ্যোতি বসুকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি। জ্যোতি বসু পরবর্তীকালে নিজেই বলেছিলেন, সেটা ছিল তাঁর দলের পক্ষে এক ‘ঐতিহাসিক ভুল’। প্রকাশ গোঁ ধরায় পরমাণু চুক্তির বিরোধিতা করে ২০০৮ সালে ইউপিএ সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিল সিপিএম। এই নীতিপরায়ণতা শেষ পর্যন্ত জোটের পথে অন্তরায় হয় কি না, সেটাই রাহুল-সোনিয়া দেখে নিতে চেয়েছেন। আগ বাড়িয়ে কোনো রায় তাই তাঁরা দিতে চাননি। এখন সিপিএমের সবুজসংকেতের পর কংগ্রেসও কৌশলে জোটের পথ প্রশস্ত করবে বলেই সব মহলের ধারণা। যা করার তা খুল্লামখুল্লা নয়, কৌশলেই করতে হবে। কারণ, কেরালা ও ত্রিপুরার তীব্র আপত্তি। এই সেদিন ত্রিপুরায় অমরাপুরের উপনির্বাচনে কংগ্রেস নেমে গেছে দুই থেকে চার নম্বরে। দুইয়ে উঠে এসেছে বিজেপি ক্ষুব্ধ কংগ্রেসিদের সমর্থনে।
সিপিএম-কংগ্রেসের এই মাখামাখি মমতার কাছে কতখানি চিন্তার? কংগ্রেস-সিপিএম ‘জোট’ কি মমতার পায়ের তলার জমি ঝুরঝুরে করে দিতে পারবে? উত্তরটা আপাতত খুবই সহজ। এই জোট মমতার মসনদ এবার অন্তত টলাতে পারবে না। যদিও তাঁকে কিছুটা চিন্তায় রাখবে।
পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালে যে পরিস্থিতি ছিল, ২০১৬ সালের পরিস্থিতি কিন্তু তেমন নয়। পাঁচ বছর আগে সিপিএমকে হঠাতে রাজ্যে একটা রংধনু জোট তৈরি হয়েছিল। মমতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সেই জোটে শামিল হয়েছিল কংগ্রেস, বিক্ষুব্ধ সিপিএম ও অন্য বামপন্থীরা, মাওবাদীসহ অতি বাম শক্তি, বিজেপি, নাগরিক সমাজ ও অরাজনৈতিক সব সংগঠন। লক্ষ্য, সিপিএমের শাসন শেষ করা। পাঁচ বছর পর আজ মমতার জৌলুশ কিছুটা ফিকে হলেও তাঁকে সরাতে সর্বস্তরে সেই অদম্য বাসনার জন্ম কিন্তু হয়নি। এখনো রাজ্যে সাধারণ মানুষের কাছে মমতা জনপ্রিয়। প্রশাসনকে তিনি জেলায় জেলায় নিয়ে গেছেন। জেলার মানুষ অনবরত তাঁকে দেখতে পাচ্ছে। পৌঁছাতে পারছে। বুঝতে পারছে তিনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন। গজদন্ত মিনারে বসে রাজ্য শাসন করছেন না। প্রশাসনিক ত্রুটি-বিচ্যুতি যে নেই, তা নয়। কিন্তু মানুষের হাল এখনো ডাঙায় তোলা মাছের মতো খাবি-খাওয়া হয়নি। বরং একটু টাল খেলেও বিশ্বাস এখনো অটল।
তা ছাড়া, সিপিএমের বিরুদ্ধে যে রকম সর্বস্তরে জোট গড়ে উঠেছিল, মমতার বিরুদ্ধে তেমন জোট গড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ বিজেপি। বিজেপির হাত ধরা এখন আর তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষেও সম্ভব নয়। রাজ্যের ৩০ শতাংশ মুসলমান তার কারণ। কাজেই নিছক পাটিগণিতের অঙ্কেও মমতার আসন হারানোর কোনো কারণ এবারের ভোটে অন্তত নেই। তা ছাড়া, রাজ্যে আর কোনো দলেই মমতার মতো একজনও নেতা বা নেত্রী নেই, যাঁকে কেন্দ্র করে একটা বিরোধী জোট গড়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ কংগ্রেস-সিপিএম হাত ধরাধরি করলেও টেনিসের ভাষায় বলা যায়, এখন পর্যন্ত ‘অ্যাডভান্টেজ মমতা’।
তাহলে কি ধরে নিতে হবে মমতার কপালে চিন্তার কোনো ভাঁজ নেই? কিংবা হারানো সম্ভব নয় জেনেও কেন দুই বিপরীতধর্মী দল পরস্পরের সান্নিধ্য পেতে এতখানি মুখিয়ে?
মমতার চিন্তা বিরোধী ভোটের দুই শিবিরের কাছাকাছি আসা নিয়ে। বামপন্থীদের ভোট নেই নেই করেও এখনো ৩০ শতাংশের বেশি। কংগ্রেসের ১০ শতাংশের কিছু কম। সমর্থন একই থাকলে দুইয়ের প্রাপ্ত ভোট ৪০ শতাংশ ছাড়াবে। আসন প্রাপ্তির নিরিখে তা কতখানি, সে কথা বলা ভোটের হারের নিরিখে সম্ভব নয়। ১৯৮৭ সালে ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েও কংগ্রেস মাত্র ৪২টি আসন পেয়েছিল। এবারেও যখন জোট নিয়ে রাজ্য সরগরম, তখন নেওয়া এক জনমত সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, জোট হলে কংগ্রেস-সিপিএমের প্রাপ্ত ভোট হবে ৪৩ শতাংশ, তৃণমূল কংগ্রেসের ৪৪ শতাংশ। কিন্তু মাত্র ১ শতাংশের হেরফেরেও তৃণমূল ১৮২ আসন নিয়ে সরকার গড়বে।
তাহলে কেন এত সান্নিধ্য-প্রত্যাশা? কংগ্রেস-সিপিএম মনে করছে, যৌথভাবে তারা তৃণমূলের ‘সন্ত্রাস’ রুখতে পারবে। ক্রমেই এক শক্তিশালী বিকল্প হয়ে উঠবে। তৃণমূলের ‘বীতশ্রদ্ধ’ নেতারা জোটে ভিড়বেন। পুলিশ-প্রশাসনও কিছুটা সংযত হবে।
এখনো সোনিয়া-রাহুল মুখ খোলেননি। খুললেও ‘অ্যাডভান্টেজ’ এখনো মমতারই। তাঁর কপালে তাই দুশ্চিন্তার কোনো গভীর ভাঁজ এখনো পড়েনি।
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি।

আবদুল আলী বাগালের কীর্তিনামা by নূরুল ইসলাম মনি

হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার রশিদপুর ও ফয়জাবাদ চা বাগানের কোলঘেঁষে নিভৃত এক গ্রাম সুন্দ্রাটিকি। বাহুবল সদর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরের এ গ্রামের অধিকাংশ লোকই শ্রমজীবী। কাজ করেন চা বাগান ও লেবু বাগানে। অন্যান্য টুকটাক কাজও করেন কেউ কেউ। অবস্থাপন্ন কিছু পরিবারও রয়েছে এ গ্রামে। আলাদা কোনো বিশেষত্ব না থাকায় আশপাশের দশ গ্রাম ছাড়া সুন্দ্রাটিকির তেমন পরিচিতি ছিল না। তবে নৃশংস এক ঘটনায় দেশজুড়ে পরিচিত হয়ে উঠেছে নিভৃত এ গ্রামটি। গ্রামের একটি বিল থেকে চার শিশুর মাটিচাপা লাশ উদ্ধারের পর রাতারাতি গ্রামটি পরিচিত হয়ে উঠে দেশজুড়ে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে গ্রামটি। আলোচনায় আছেন গ্রামটির বাসিন্দা আবদুল আলী বাগাল ও তার পরিবার।
কে এই আবদুল আলী বাগাল: সুন্দ্রাটিকি গ্রামের মৃত আবদুল জব্বারের ছেলে আবদুল আলী। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে অনেক বছর আগে তিনি ফয়জাবাদ চা বাগানে  পাহারাদারের কাজ নেন। স্থানীয়ভাবে যার পরিচিতি ‘বাগাল’। দীর্ঘদিন বাগালের কাজ করায় তার নামের সঙ্গেই জুড়ে যায় বাগাল শব্দটি। এ পেশায় যুক্ত থাকার সুবাদে ইতিমধ্যে তিনি কৌশলে চা বাগানের বেশ কিছু ভূমি দখল করে ফল বাগানও প্রতিষ্ঠা করেছেন। এছাড়াও চা বাগানের গাছ পাচারে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ আছে।
বড় বড় কীর্তিগাথাও জড়িয়ে আছে আবদুল আলীর নামের সঙ্গে। প্রায় ২৫ বছর আগে সুন্দ্রাটিকি গ্রামে খুন হয়েছিলেন আবদুল জলিল নামে এক ব্যক্তি। তখন অভিযোগের আঙুল উঠেছিল আবদুল আলীর দিকেও। এর ৫ বছর পর আরও একটি হত্যার ঘটনা ঘটে সুন্দ্রাটিকি গ্রামে। রশিদপুর চা বাগানের নাচঘরের পাশ থেকে উদ্ধার হয় ভাদেশ্বর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান মতাচ্ছির মিয়ার ভাই মোশাহিদ মিয়ার লাশ। এ ঘটনায়ও জড়িত থাকার অভিযোগ উঠে আবদুল আলীর বিরুদ্ধে। অবশ্য দুটি খুনের ঘটনাতেই আপসরফার মাধ্যমে বেঁচে যান আবদুল আলী বাগাল ও সুন্দ্রাটিকির বাসিন্দারা। এ দুটো মামলা থেকে বেঁচে গেলেও জেলের গেট দিয়ে ঠিকই তাকে মাথা নিচু করে ঢুকতে হয়েছিল। প্রায় ২২ বছর পূর্বে ফয়জাবাদ হিলসে শ্রীমঙ্গলের বাসিন্দা জনৈক শিপার মিয়ার একটি ফল বাগান জোরপূর্বক দখল করতে চেয়েছিলেন। এ ঘটনায় তাকে কিছু দিন হাজতবাসও করতে হয়েছে।
আবদুল আলী বাগালের প্রথম স্ত্রী হালিমা বাগান দখলের ঘটনায় তার স্বামীর কিছুদিন কারাবাসের কথা স্বীকার করলেও ঘটনাটিকে সাজানোই বলেন। হালিমা বেগমের ভাষ্য, তার স্বামী আপাদমস্তক ভালো মানুষ। ‘হক কথা’ বলেন, তাই তাকে অনেকে পছন্দ করেন না।
আবদুল আলী বিয়ে করেছেন দুটো। ৭ ছেলেমেয়ের পিতা তিনি। প্রথম স্ত্রী হালিমা বেগমের ঘরেই সব সন্তানের জন্ম। দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরা বেগম নিঃসন্তান। সন্তানদের মধ্যে ৫ জনই ছেলে। এরা হলো বিলাল মিয়া, জয়নাল মিয়া, ফেরদৌস মিয়া, জুয়েল মিয়া ও রুবেল মিয়া। দুই মেয়ের নাম খেলা বানু ও নাসিমা বেগম।
কম যান না আবদুল আলী বাগালের ছেলেরাও। গেল দুর্গাপূজায় বিসর্জনের আগের দিন আবদুল আলীর বাগালের এক ছেলে কিছু বখাটেসহ রশিদপুর চা বাগানে পূজানুষ্ঠানে যায়। সেখানে তাদের হাতে যৌন হয়রানির শিকার হন এক নারী চা শ্রমিক। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিসর্জনের পরদিন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ভাঙচুর চালানো হয় চা শ্রমিকদের বাড়িঘরে।
৩১শে অক্টোবর স্কুলের ছাত্রীদের যৌন হয়রানির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফয়জাবাদ হাইস্কুলে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার নেতৃত্বে ছিল আবদুল আলী বাগালের ছেলে ওই স্কুলের ছাত্র রুবেল মিয়া, যে চার শিশু হত্যার দায় স্বীকার করে এখন কারাগারে। রুবেল ও তার বন্ধুরা মিলে প্রায়ই ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করতো। এমন অভিযোগে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের শাসন করলে রুবেল ও তার সঙ্গীরা স্কুলে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায়।
সুন্দ্রাটিকি গ্রামের বাসিন্দা ইদ্রিছ আলী অভিযোগ, বছরখানেক আগে তার বাড়িতে সংঘটিত ডাকাতির ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিল আবদুল আলীর ছেলে বিলাল মিয়া ও তার ভাতিজারা। এ ঘটনায় ইদ্রিস আলী তাদের বিরুদ্ধে মামলাও করেছেন।
সহযোগী থেকে পঞ্চায়েত প্রধান
সুন্দ্রাটিকি গ্রামে আবদুল আলী একটি পঞ্চায়েতের প্রধান হিসেবে পরিচিত। তিনি এ পরিচয় কৌশলে বাগিয়ে নেন। তিনি এক সময় ছিলেন গ্রাম পঞ্চায়েত আবদুর রউফের সহযোগী। আবদুর রউফ মারা গেলে গ্রামের রীতি অনুযায়ী ঐ পঞ্চায়েতের প্রধান হন তার ছেলে আবদুল মঈন সুমন। কিন্তু চতুর, বাকপটু ও কৌশলী আবদুল আলী বাগাল কৌশলে সুমনকে সরিয়ে এ দায়িত্ব দখল করে নেন। এ নিয়ে এখনও ওই পঞ্চায়েতের মধ্যে দ্বন্দ্ব টিকে আছে। প্রায় ৪ হাজার জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত সুন্দ্রাটিকি গ্রামে আরও ৭টি পঞ্চায়েত রয়েছে। এসব পঞ্চায়েতের নেতৃস্থানীয়রা হলেন, সুন্দ্রাটিকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আবদুল খালিক তালুকদার, মধু মিয়া, নূর আলী ওরফে নূরাই মিয়া, আবদুল মঈন সুমন, ফরিদ মিয়া, সেলিম আহমেদ, টেনু মিয়া, আবদুল হাই, উস্তার মিয়া, আকল মিয়া।
বিরোধ ভালোবাসেন আবদুল আলী
নানা বিষয়ে সুন্দ্রটিকি গ্রাম পঞ্চায়েতের মুরুব্বিরা ঐকমত্যে পৌঁছলেও আবদুল আলী বাগাল একাই থেকে যান ভিন্ন মত ও পথে। ফলে গ্রামের নানা বিরোধ পঞ্চায়েতে শেষ হয়েও হয় না। অনেকে বিষয়ই ফের জিইয়ে উঠে। সুন্দ্রাটিকি গ্রাম পঞ্চায়েতের হেফাজতে কয়েক একর সরকারি পতিত ভূমি রয়েছে। যা গোচারণ ভূমি, খেলার মাঠ ও কবরস্থান হিসেবে যুগের পর যুগ ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, উক্ত ভূমি তারা সরকারের নিয়ম মেনে লিজ নিয়েছেন। সম্প্রতি উক্ত ভূমি থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ ভূমি ১৩ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। উক্ত টাকা দিয়ে গত বছরের শেষের দিকে স্থানীয় খেলার মাঠে শিরনির আয়োজন করা হয়। ৯টি গরু ও ১০টি খাসি জবাই করে উক্ত শিরনিতে সুন্দ্রাটিকি গ্রামবাসী ছাড়াও আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামের লোকজন ভূঁরিভোজ করেন। এতে প্রায় ৪ হাজার লোককে আপ্যায়ন করা হয়েছিল বলে গ্রামবাসীর দাবি। এতে প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ হয়। এ টাকার হিসাব-নিকাশ নিয়ে অন্য মুরুব্বিদের মাথা ব্যথা না থাকলেও আবদুল আলী বাগালের সন্দেহ-অবিশ্বাস ছিল। এ নিয়ে গ্রাম পঞ্চায়েতে তিনি দেনদরবার চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এসব বিষয় নিয়ে গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্য মুরুব্বিদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে আবদুল আলী বাগালের।
সর্বশেষ সুন্দ্রাটিকি গ্রামের মৃত মারফত উল্লার ছেলেদের সঙ্গে রইছ উল্লার ছেলেদের সীমানা নিয়ে বিরোধ বাধে। নিজের পঞ্চায়েতের আওতায় না হওয়ার পরও এ বিরোধে নিজেকে জড়িয়ে নেন আবদুল আলী। অনেকের সন্দেহ, এই বিরোধের জের ধরেই ৪ শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
উত্তাল বাহুবল, আরও একজন গ্রেপ্তার
স্টাফ রিপোর্টার, হবিগঞ্জ ও বাহুবল প্রতিনিধি জানান, হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার সুন্দ্রাটিকি গ্রামে চার শিশু হত্যার ঘটনায় সালেহ আহমেদ (২৭) নামে আরও এক যুবককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করছে এলাকাবাসী। মিছিল-সমাবেশে উত্তাল হয়ে উঠেছে বাহুবল। সূত্র জানায়, গতকাল সকাল ১০টায় স্থানীয়রা সন্দেহভাজন হিসেবে তাকে আটক করে বাহুবল থানায় খবর দেন। পরে পুলিশ ওই এলাকায় গিয়ে তাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। বাহুবল থানার ওসি মোশারফ হোসেন জানান, সন্দেহভাজন হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সালেহ আহমেদকে আটক করা হয়েছে। এর আগে তার ভাই বশির আহমেদকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এদিকে ৪ শিশুর লাশ পাওয়ার দিন বুধবার রাতে গ্রেপ্তারকৃত আবদুল আলী বাগাল ও তার ছেলে জুয়েল মিয়াকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির ওসি সৈয়দ মোক্তাদির হোসেন জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে আসছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। ডিবির ওসি সৈয়দ মোক্তাদির হোসেন জানান, আবদুল আলী ও জুয়েল মিয়া পেশাদার অপরাধী। তারা কোনো তথ্য দিচ্ছে না এবং কারও নামও বলছে না। তিনি আরও জানান, সোমবার আদালতে রুবেল, বশির ও আরজুর রিমান্ড মঞ্জুর হলে তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আলোচিত এ ঘটনার অন্যতম নায়ক ও সিএনজি-অটোরিকশাচালক বাচ্চু মিয়ার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। বাচ্চুর পরিবার দাবি করছে, র‌্যাব তাকে নিয়ে গেছে। কিন্তু শ্রীমঙ্গলের র‌্যাব-৯-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনির হোসেন জানান, সময় হলে সবকিছুু তিনি জানাবেন। এদিকে সুন্দ্রাটিকি গ্রামে নিহতদের পরিবারের লোকজন অনাহার, অনিদ্রা আর গোসল ছাড়াই দিনাতিপাত করে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি অ্যাডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী প্রতিদিনই তাদের খোঁজখবর নিচ্ছেন। তার উদ্যোগে বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে একটি মেডিকেল টিম সেখানে কাজ করছে। গতকালও তিনি মেডিকেল টিম নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন। নিহত ৪ শিশুর হত্যার ঘটনায় আসামিদের গ্রেপ্তার ও স্বীকারোক্তিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে নিহতদের পরিবারে। হারানো মানিককে ফিরে না পেলেও যারা তাদের হত্যা করেছে তাদের ফাঁসি দেয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। শনিবার সকালে সুন্দ্রাটিকি গ্রামে গেলে দেখা যায়, গত এক সপ্তাহের অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরে আসতে চেষ্টা করছেন লোকজন। নিহত শুভর মা পারুল বেগম বলেন, ছেলে হারাইয়াছি। সে ত আর আসবে না। এখন হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই। ইসমাইলের মা আমিনা বেগম, মহিলা এমপি কেয়া চৌধুরীকে দেখে নিয়ে আসেন ইসমাইলের বই-খাতা। খাতা বের করে দেখান ইসমাইল মারা যাওয়ার আগে তার শেষ লেখাটি। খাতার একটি পাতায় ইসমাইল লেখে ‘মন’ শব্দটি। আর সুন্দর ও নির্ভুল করে লেখে তার নাম। এমপি কেয়া চৌধুরী নিহতদের এ স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য একটি আলমারি দেয়ার ঘোষণা দেন। আমিনা বেগম আরও বলেন, ইসমাইল ভালো ছাত্র ছিল। লেখাপড়ায় খুবই মনোযোগ ছিল তার। কী দোষ ছিল তার? এমপি কেয়া চৌধুরী বলেন, বাহুবলের সন্তান হিসেবে তিনি লজ্জিত। দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি প্রতিদিন এলাকায় ছুটে আসছেন। বিশেষ করে বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ডাক্তার এবং নার্সরা তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে যেভাবে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন তার জন্য তিনি সবাইকে ধন্যবাদ জানান। নিহতদের পরিবার ও এলাকাবাসী হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে সাংবাদিকদের সহযোগিতার কথা স্বীকার করেন এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। শুক্রবার রাতে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কৌশিক আহমেদ খোন্দকারের আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিকালে গ্রেপ্তারকৃত আসামি রুবেল মিয়া হত্যার দায় স্বীকার করে। স্বীকারোক্তিতে জানা যায়, সুন্দ্রাটিকি গ্রামে বাগাল পঞ্চায়েত এবং তালুকদার পঞ্চায়েতের বিরোধকে কেন্দ্র করেই এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এক মাস আগে বাগাল ও তালুকদার পঞ্চায়েতের মধ্যে উভয় পঞ্চায়েতের সীমানায় থাকা একটি বড়ইগাছ কাটা নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। পরে বিষয়টি সামাজিকভাবে নিষ্পত্তি করা হলেও সিএনজিচালক বাচ্চু মিয়া ও গ্রেপ্তারকৃত আরজু প্রচণ্ডভাবে সামাজিক হেয়প্রতিপন্ন হয়। এরপর থেকেই তারা পরিকল্পনা করে বাগাল পঞ্চায়েতের শিশুদের হত্যা করবে। ১২ই ফেব্রুয়ারি শুক্রবার বিকালে পূর্বভাদেশ্বর গ্রামে ৪ শিশু ফুটবল খেলা দেখতে যায়। বৃষ্টির জন্য খেলা না হওয়ায় যখন শিশুরা মাঠে ঘুরাফেরা করছিল, তখন পূর্ব থেকে ওত পেতে থাকা বাচ্চু মিয়া তাদের বাড়িতে নিয়ে যাবে বলে সিএনজি-অটোরিকশাতে উঠতে বলে। ৪ শিশু সিএনজি-অটোরিকশায় উঠলে তাদের চেতনানাশক দিয়ে অজ্ঞান করে বাচ্চু মিয়ার গ্যারেজে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আরজু, রুবেলসহ ৬ জন মিলে তাদের গলাটিপে শ্বাসরুদ্ধে হত্যা করে। হত্যার পর লাশগুলো গ্যারেজেই লুকিয়ে রাখা হয়। পরে গভীর রাতে যে স্থান থেকে লাশগুলো উদ্ধার করা হয় সেখানেই গর্তে পুঁতে রাখা হয়।
উত্তাল বাহুবল: ৪ শিশু হত্যার ঘটনায় উত্তাল বাহুবল উপজেলা। গতকাল উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংগঠন নিহতদের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে। শনিবার সকাল ১১টায় বাহুবল-মিরপুর সড়কে বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে মিরপুর উন্নয়ন সংস্থা। একই সময় উপজেলার মিরপুর সানশাইন প্রি-ক্যাডেট অ্যান্ড হাইস্কুলের শিক্ষার্থী মানববন্ধন করেছে। স্কুলের শত শত শিক্ষার্থী ফেস্টুন হাতে নিয়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এ ছাড়া মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে বাহুবল ডিগ্রি কলেজ, ফয়জাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় ও বাহুবলের তৌহিদী জনতা।
স্কুলে আসতে শুরু করেছে শিক্ষার্থীরা
কেয়া চৌধুরীর নানা উদ্যোগ: বাহুবলের সুন্দ্রাটিকি গ্রামে দুষ্কৃতকারীদের হাতে নিহত ৪ শিশুর পরিবারের সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক পুনর্বাসনে সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী এ বিষয়ে নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে চলেছেন। প্রতিদিন তিনি ওই গ্রামে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের মানসিক সাহস জোগাচ্ছেন। এ ছাড়া তিনি, ইতিমধ্যে ওই পরিবারগুলোকে একটি করে সেলাই মেশিন দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তার প্রচেষ্টায় শুক্রবার মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি উপস্থিত হয়ে প্রত্যেক পরিবারকে ৫০ হাজার করে অর্থ অনুদান দিয়েছেন। কেয়া চৌধুরী জানান, ওই পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের লক্ষ্যে তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সহায়তার জন্য যোগাযোগ করে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান মালয়েশিয়ার

মালয়েশিয়া সরকারের বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ স্থগিত করার ঘোষণা ‘আইওয়াশ’ বলে বাংলাদেশি এক কর্মকর্তা যে মন্তব্য করেছিলেন তা প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশটির উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব বেগম শামসুন্নাহার মন্তব্য করেছিলেন, দেশটিতে যারা বিদেশি কর্মী নিয়োগ চান না তাদেরকে শান্ত করার জন্য মালয়েশিয়া সরকার নিয়োগ স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। স্বাক্ষরিত স্মারক অনুযায়ী, বাংলাদেশ মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানো শুরু করবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। তার এমন মন্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করেছেন মালয়েশিয়ার উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুর জাজলান মোহামেদ। মালয়েশিয়ার অনলাইন পত্রিকা দ্য মালয়েশিয়ান ইনসাইডারকে তিনি বলেন, এটা সত্যি নয়। তিনি আরও বলেন, শুক্রবার দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী আহমেদ জাহিদ হামিদি শ্রমিক নিয়োগ স্থগিতের যে ঘোষণা দিয়েছেন তা শুধু বাংলাদেশ নয় সকল ‘সোর্স কান্ট্রির’ জন্য প্রযোজ্য।
এদিকে, গতকালই দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রী রিচার্ড রায়ট বলেছেন, বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ স্থগিত করার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের বৈধতার ওপর প্রভাব পড়বে না। এক বিবৃতিতে তিনি এ কথা বলেন। তবে বিষয়টি তিনি খোলাসা করেন নি। এ খবর দিয়েছে মালয়েশিয়ার দ্য স্টার ও বার্তা সংস্থা বার্নামা। মন্ত্রী রিচার্ড রায়ট বলেছেন, ‘বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ স্থগিতের বিষয়ে আরও বিস্তারিত শিগগিরই সরকার ঘোষণা করবে।’ উল্লেখ্য, বাংলাদেশ থেকে ১৫ লাখ কর্মী নেয়ার বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার একদিন পরই মালয়েশিয়া বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। ওই ঘোষণা দেয়ার সময় দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী আহমাদ জাহিদ হামিদি বলেন, তার দেশের শিল্প খাতগুলোতে কর্মীর প্রকৃত চাহিদা নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত সকল ‘সোর্স কান্ট্রি’ থেকে শ্রমিক নিয়োগ স্থগিত থাকবে। বৃহস্পতিবার ঢাকায় স্বাক্ষরিত হওয়া সমঝোতা স্মারকে মালয়েশিয়ার পক্ষে স্বাক্ষর করেছিলেন রিচার্ড রায়ট। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, আগামী ৫ বছরে কয়েক ধাপে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিয়োগের কথা ছিল মালয়েশিয়ার। ৫ বছর সময় পার হওয়ার পর চুক্তিটি পর্যালোচনা করার কথা। কিন্তু একদিন পরই মালয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ স্থগিত করার ঘোষণা দেন। এরপর বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠে। শ্রমিক নিয়োগ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের বৈধতার ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না- গতকাল মন্ত্রী রিচার্ড রায়ট এমন মন্তব্য করলেও বিষয়টি স্পষ্ট করেন নি। 
মালয়েশিয়া ইনসাইডারের রিপোর্টে উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুর জাজলানকে উদ্ধৃত করে আরও বলা হয়েছে, সমঝোতা অনুযায়ী, শ্রমিক নিয়োগ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত ঢাকাকে জানাতে বাধ্য নয় মালয়েশিয়া। ওই সমঝোতায় শ্রমিক নেয়ার ক্ষেত্রে তিন থেকে পাঁচ বছরের একটি সময়সীমার কথা উল্লেখ আছে। তিনি আরও বলেছেন, ১৫ লাখ শ্রমিকের প্রস্তাব করেছিল বাংলাদেশ। মালয়েশিয়ার তরফ থেকে এ অনুরোধ জানানো হয় নি। এটা বাংলাদেশের প্রস্তাব আর গ্রহণ করা না করা তাদের বিষয় উল্লেখ করে নুর জাজলান বলেন, আমরা সমঝোতা বাতিল করছি না। আমরা শুধু বলছি, সাময়িক সময়ের জন্য সকল ‘সোর্স কান্ট্রি থেকে শ্রমিক নেয়া স্থগিত থাকবে। কতদিন শ্রমিক নিয়োগ স্থগিত থাকবে সে বিষয়ে তিনি বলেন, হয়তো আরও তিন থেকে ছয় মাস, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা সন্তুষ্ট না হচ্ছি।
ওদিকে, বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়া ইস্যুতে মালয়েশিয়া সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশটির সাবেক মন্ত্রী রাফিদা আজিজ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শিল্পবিষয়ক সাবেক এ মন্ত্রীর মতে, বাংলাদেশি শ্রমিক নেয়ার প্রস্তাব থেকে সরে আসায় মালয়েশিয়া সরকারের ওপর থেকে জনগণের আস্থা কমবে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, কি এমন হয়েছে? একটি প্রস্তাব বা নীতি ঘোষণা দেয়ার আগে কি তা নিয়ে স্টাডি বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় নি? সবার দৃষ্টিভঙ্গি আমলে নিতে সংশ্লিষ্ট সব মহলের সঙ্গে কি আলোচনা করা হয় নি? স্টার অনলাইনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তার অভিমত উঠে এসেছে। এতে সরকারের সমালোচনা করেন রাফিদা আজিজ। তিনি প্রশ্ন রাখেন, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ভালো হোক বা খারাপ হোক এসব শ্রমিক নেয়ার ফলে কি প্রভাব পড়বে তা কি যাচাই করা হয় নি? শুক্রবার ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, বেসরকারি খাত সন্দিগ্ধ ও উদ্বিগ্ন। শ্রমিক ইস্যুতে সরকার যা বলছে তারা তা মেনে নিতে পারছে না।
উল্লেখ্য, জিটুজি পদ্ধতিতে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে নতুন করে ১৫ লাখ শ্রমিক নেয়ার প্রসঙ্গ প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই সেদেশের বিভিন্ন মহল এর বিরোধিতা করে আসছে। মালয়েশিয়ার বেশকিছু নাগরিক ও বাণিজ্য গোষ্ঠী বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক গ্রহণের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট ছিল না। সরকারের কাছে তাদের দাবি ছিল, নতুন শ্রমিক আমদানির বদলে বিদ্যমান অবৈধ অভিবাসী শ্রমিকদেরই বরং বৈধ করা হোক।

তারা যেনো শান্তিপূর্ণভাবে চলে যায় -মাহফুজ আনামকে হয়রানী বিষয়ে ড. কামাল

বিশিষ্ট আইনজীবী ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে জাতীয় ঐক্য গড়তে মাঠে নেমেছি। এই দেশ সকলের, কোন ব্যক্তি গোষ্টি বা পরিবারের নয়। নিয়োগ বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য সভ্য সমাজে চলতে পারে না। এসব থেকে মুক্ত হতে জাতীয় ঐক্য অবশ্যই হবে। গতকাল শনিবার রাজধানীর পল্টনে শিশু কল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ঐক্যবদ্ধ ছাত্র সমাজ আয়োজিত আলোচনাসভায় তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের নামে হয়রানিমূলক মামলার বিরুদ্ধে সারা পৃথিবীতে আওয়াজ ওঠেছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্বাধীন সংবাদপত্রের পক্ষে। সংবিধানেও বাক স্বাধীনতার কথা লেখা আছে। যারা এসব হয়রানি করছে, তারা যেন শান্তিপূর্ণভাবে চলে যান। তা না হলে কী শিক্ষা দিতে হবে মানুষ তা জানে।  ড. কামাল বলেন, ৭০’র নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ছিলাম। ঢাকার পাঁচটি আসনের দায়িত্ব ছিল আমার উপর । আমার সেক্রেটারি হিসাবে তখন কাজ করেছেন ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ। পাঁচটি আসনে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করেছি। কিন্তু কোন ছাত্র টাকা নেয়নি। তারা বড় জোর চা-বিস্কুট খেয়েছে। আর এখনকার ছাত্র নেতারা টাকার মালিক হয়। এটা শুনে লজ্জা হয়। তিনি বলেন, ৭৩ এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু আমাকে ২০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। নির্বাচনের পর খরচ থেকে বেঁচে যাওয়া ১৩ হাজার টাকা উনাকে ফেরত দিয়েছি।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ডাকসুর সাবেক ভিপি ও আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ বলেন, ১৪ই ফেব্রুয়ারি জাফর, জয়নালের রক্তের বিনিময়ে ৯০ সালে গণতন্ত্র ফিরে আসে। অথচ সংবাদপত্রে এ ব্যাপারে কোন সংবাদ দেখলাম না। কোন সংগঠনের কর্মসূচিও ছিল না। অথচ ওইদিন বিশ্ব ভালবাসা দিবস পালন করা হয়ছে। বিশ্ব ভালবাসার নামে ইতিহাস মুছে দেয়া হচ্ছে। অথচ তাদের রক্তের বিনিময়ে গত ২৬ বছর ধরে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দেশ শাসন করছেন। সানজিদ রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনাসভায় আরও বক্তব্য রাখেন এডভোকেট  সুব্রত চৌধুরী, জগলুল হায়দার, পৃথি শর্মা, নাজমূল হাসান প্রমুখ।

বিনম্র শ্রদ্ধায় ভাষা শহীদদের স্মরণ

অমর ২১শে ফেব্রুয়ারি আজ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। মায়ের ভাষার দাবিতে বাঙালির আত্মত্যাগের মহিমান্বিত এক দিন। বাঙালির আত্মগৌরবের স্মারক অমর একুশের প্রথম প্রহর থেকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হচ্ছে মহান ভাষা শহীদদের। মধ্যরাতের পর মানুষের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসার ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় শহীদ মিনার। একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দিনটিকে ঘিরে দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে নানা কর্মসূচি। মধ্যরাতের পর থেকে সারা দেশের শহীদ মিনারে শুরু হয় ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ। সকালে খালি পায়ে প্রভাত ফেরির মাধ্যমে শহীদদের জানানো হয় শ্রদ্ধা। একুশের প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ১ মিনিটে প্রথমে প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ এবং পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় অমর একুশের কালজয়ী গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ বাজানো হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১২টা বাজার কিছু সময় আগেই শহীদ মিনারে পৌঁছান। প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ ১২টা বাজার পূর্ব মুহূর্তে শহীদ মিনারে পৌঁছান। এরপর প্রথমে প্রেসিডেন্ট ও তারপর প্রধানমন্ত্রী পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা পরে মন্ত্রিবর্গ ও দলের  জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে দলের পক্ষ থেকে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় মন্ত্রিসভার সদস্যরা, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, কূটনীতিক বর্গ এবং উচ্চপদস্থ  সামরিক ও বেসামরিক ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতৃবৃন্দ শহীদ বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। ১৪ দলের পর বিরোধী দলীয়  নেতা রওশন এরশাদ ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। রাত দেড়টার দিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া শহীদদের স্মৃতি প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। দলের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে এ সময় তিনি শহীদ বেদীতে কিছুক্ষণ নিরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এর আগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকদের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শহীদ মিনার সবার জন্য খুলে দেয়া হয়। এরপরই ঢল নামে সাধারণ মানুষের। নানা শ্রেণি পেশার মানুষ ফুল হাতে সারি বেঁধে এগিয়ে যান শহীদ বেদির দিকে। শ্রদ্ধা নিবেদনকে ঘিরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা গতকাল থেকেই ছিল নিñিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে ঘেরা। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সঙ্গে সারা দেশের শহীদ মিনারগুলোতেও একুশের প্রথম প্রহর থেকে চলে শ্রদ্ধা নিবেদনের পালা। সবার কণ্ঠে ছিল অমর সেই গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে  ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি..।’
দিবসটি উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। আজ সরকারি ছুটির দিন। দিবসটি উপলক্ষে রেডিও, টেলিভিশন বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করছে। জাতীয় দৈনিকগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র।
মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় ১৯৫২-এ জীবন দিয়েছিল সালাম, বরকত, জব্বার, রফিক, শফিউল্লাহসহ নাম না জানা অনেকে। তাদের রক্তের বিনিময়েই আজকে মুখে মুখে বাংলা ভাষা। বাংলায় রচিত হচ্ছে হাজারো গান, কবিতা, নাটক, উপন্যাস আর অজস্র কথামালা। আজকের দিনটি শুধু সেই বীর ভাষাসৈনিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর, যারা ভাষার জন্য অকাতরে নিজের প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিলেন। আজকের দিনটি কেবল বাংলাদেশে নয়। বিশ্বের সব প্রান্তে পালিত হবে বীরের রক্তস্রোত আর মায়ের অশ্রুভেজা অমর একুশে। বাঙালির রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্বীকৃতি দিয়ে জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। এরপর থেকেই যথাযোগ্য মর্যাদায় সারা বিশ্বে একযোগে পালিত হয়ে আসছে দিনটি।
৬৪ বছর আগের এই দিনে বাংলার সংগ্রামী ছেলেরা যে ত্যাগ ও গৌরবগাথা রচনা করেছিলেন, তারই পথ ধরে আমরা মুখোমুখি হই স্বাধীনতা সংগ্রামে। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। লাভ করি লাল সবুজের পতাকা। ১৯৫২ সালের এই দিনে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ঘোষিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলনরত বাঙালি রাজপথ রক্তে রঞ্জিত করে। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিবাদ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে হরতালের প্রস্তুতি চলতে থাকে। সরকার ২০শে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ছয়টায় একটানা এক মাসের জন্য ঢাকা জেলার সর্বত্র হরতাল, সভা, মিছিলের ওপর ১৪৪ ধারা জারি করে। এসব নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ছাত্ররা দলে দলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জমায়েত হয়। ঐতিহাসিক আমতলায় ছাত্রদের সভা থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরিকল্পনা করা হয়, চারজন চারজন করে মিছিল নিয়ে বের হওয়ার। ছাত্ররা মিছিল শুরু করলে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে ট্রাকে তুলতে থাকে। বিকাল ৩টায় গণপরিষদের অধিবেশনের আগেই শুরু হয়ে যায় ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ। বিকাল ৪টায় পুলিশ ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে ছাত্রদের ওপর গুলি চালায়। বুলেট কেড়ে নেয় জব্বার ও রফিকের প্রাণ। গুলিবিদ্ধ আবুল বরকত রাত পৌনে আটটায় হাসপাতালে মারা যান। তাদের মৃত্যু সংবাদে বাংলা ভাষার প্রাণের দাবি সারা দেশে স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে। শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। এরপর থেকেই একুশে ফেব্রুয়ারি অমর ভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। শহীদদের স্মরণে সারা দেশে তৈরি হয় অসংখ্য শহীদ মিনার।
ভাষা শহীদদের প্রতি খালেদার শ্রদ্ধা, দোয়েল চত্ত্বরে বাঁধা: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। একুশে ফেব্রুয়ারি রাত দেড়টার দিকে এই শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতৃবৃন্দ। ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে রাত ১২টা ২০ মিনিটে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর তার গুলশানের বাসা থেকে বেরিয়ে শহীদ মিনারের রওনা হয়। রাত ১ টা ৫ মিনিটে তার গাড়ি বহরটি দোয়েল চত্ত্বরে এসে পৌঁছায়।
এসময় সেখানে দায়িত্বরত পুলিশের সদস্যরা তার গাড়িটিকে বাঁধা দেন। তারা ওই গাড়ি বহরটিকে পলাশী হয়ে ঢুকতে বলেন। এসময় চেয়ারপারসনের সঙ্গে থাকা নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে পুলিশ তর্কে জড়িয়ে পড়েন। পুলিশ বিষয়টি  উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালে পরে তার গাড়িবহরের সামনে থেকে ব্যারিকেড তুলে নেয়। এসময় গাড়ির সামনে অবস্থান নেয়াকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের নেতাকর্মীরা হাতাহাতিতে লিপ্ত হয়। সিনিয়র নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। পরে খালেদা জিয়া সিনিয়র নেতাদের নিয়ে শহীদ মিনারে দেড়টার দিকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এসময় শহীদ মিনারে শৃংখলা ভেঙে পড়ে।
খালেদা জিয়ার সঙ্গে এসময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, মাহবুবুর রহমান, তরিকুল ইসলাম, আ.স.ম হান্নান শাহ, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান প্রমুখ।
গত বছর ফেব্রুয়ারিতে নিজের ডাকা লাগাতার অবরোধের মধ্যে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে যাননি বিএনপি চেয়ারপারসন।
নিশ্চদ্র নিরাপত্তা: শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য গতকাল বিকাল থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা ছিল নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা। শহীদ মিনারমুখী সব রাস্তায় ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের সতর্ক পাহারা। তাদের সঙ্গে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দায়িত্ব পালন করে বিশ্ববিদ্যালয় বিএনসিসি ও রোভার স্কাউটের কয়েক হাজার সদস্য। সন্ধ্যার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকার ছাড়া কোনো গাড়ি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঢুকতে দেয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, অমর একুশে উদযাপনের জন্য শহীদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে পুরো রাজধানীতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার থাকবে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা দিতে পুরো এলাকায় ছিল চার স্তরের নিরাপত্তা। সব মিলিয়ে ৯০০০ পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন পুরো এলাকায়। এছাড়া র‌্যাব সদস্যরাও পুরো এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। দিবসটি উপলক্ষে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করা হবে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামীকাল বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিকাল তিনটায় অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা। এতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করবেন।