Showing posts with label তুষার আবদুল্লাহ. Show all posts
Showing posts with label তুষার আবদুল্লাহ. Show all posts

Saturday, September 7, 2019

সমাজ চিন্তা- প্রতিবাদের ঠোঁটে নিখুঁত সেলাই by তুষার আবদুল্লাহ

ভোলেনি। ভুলে যাওয়া অসম্ভব। কারণ বিষয়টি এমন নয়, সমাজের অপরিচিত চরিত্র বা ঘটনা। প্রতিদিনই আমরা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছি। কিন্তু মুখ বুজে থাকি, ঠোঁট সেলাই করে রাখি। অনেকটাই আরও বড় বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। আর কিছুটা, সমাজ যেন জানতে না পারে। সমাজ জানতে পারাও আরো বড় বিপদের। আঙুল তাক করে দেখাবে—ও-তো ওদের শিকার হয়েছিল? নিশ্চয়ই ওর দিক থেকেও উসকানি ছিল। চলাফেরায় ছিল না সংযত। তাই সমাজকে না জানানোই ভালো। এটি আমাদের অভিজ্ঞতাগত ধারণা। তাই অভ্যাসবশত চুপ করে যাই।
আমাদের ঠোঁটে সেলাই দেখে ওরা বলবান হয়, ক্ষিপ্র হয় হায়েনার মতো। ভয়ে আরও চুপসে যাই আমরা। এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েও আড়াল নিলেন না রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক রাশেদুল ইসলাম। তার সামনেই স্ত্রীকে বখাটেদের হাতে উত্ত্যক্ত হতে হচ্ছিল। প্রতিবাদ করায় বখাটের হাতে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে শিক্ষক দম্পতিকে। ঘটনাটি সমাজের আড়ালে ঘটেনি। দিনে দুপুরে প্রকাশ্যে ঘটেছে। প্রকাশ্যে ঘটলেও শিক্ষক দম্পতির সাহায্যে, বখাটেদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এগিয়ে আসেননি কেউ। সবাই ছিলেন বখাটেপনার মুগ্ধ দর্শক। লাঞ্ছিত দম্পতি অপমানে, লজ্জায়, ক্ষোভে গা ঢাকা দেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি জানান শিক্ষক রাশেদুল ইসলাম নিজেই। ঘটনার বীভৎসতার কথা, মুগ্ধ দর্শকদের কথা জানিয়ে তিনি একথাও জানালেন—উচ্চ শিক্ষার পর দেশে  ফিরে আসার যে তার প্রবল ইচ্ছা ছিল, সেখানে কিছুটা হলেও ভাটা পড়েছে। এমনিতেই মূল্যায়ন ও যথাযথ সুযোগ না দেওয়ার কারণে আমাদের মেধাবী সন্তানরা দেশ ছাড়ছে। যার প্রভাবে সংকট বিদ্যায়তনে। সংকট সব পেশায়। এই বাস্তবতায় রাশেদুল ইসলামের অভিমান আমাকে শঙ্কিত করে তোলে।

রাশেদুল ইসলাম দম্পতিকে অভিনন্দন, তারা এই নিগ্রহের কথা বলতে পেরেছেন। আমরা অনেকেই বলতে পারিনি, পারছি না। ঘরের দুয়ার থেকে শুরু করে কাজের জায়গা, স্কুল-কলেজ, বাজার-হাট, অবকাশ কেন্দ্র, কোথায় আমরা বখাটেদের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছি না। ঘরের ভেতরে থেকেও নিরাপদ আমরা, নিতে পারছি না নিশ্চিত নিশ্বাস। এই বখাটেরা নানা বয়সী। তবে সারাদেশেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কিশোর ও উঠতি তরুণরা। এরা লেখাপড়ার বাইরে তা নয়। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতায় নাম রয়েছে এমন কিশোর তরুণরাই যৌন নিপীড়নকারী বলে চিহ্নিত। মহল্লায় যৌন নিপীড়নের নানা কাজ করেও তারা কোনও শাসন ও বাধার মুখে পড়ছে না। বিদ্যায়তনে নয়, পথেও কেউ এদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেখাচ্ছে না। শুধু এদের সহিংস রূপের কারণে কেউ প্রতিরোধ করছে না, এমন নয়। এদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করা, প্রতিবাদ করা সহজ। একটা সময় ছিল প্রতিবাদ বা শাসন করলে এরা ভয় পেতো। চুপ হয়ে যেতো। দ্বিতীয়বার এ ধরনের কাজে দেখা যেত না। তখন সমাজ ছিল ঐক্যবদ্ধ। পেশার মানুষেরা ছিলেন একজোট। ফলে একজন আক্রান্ত হলে, বাকিদের একই অনুভূতি হতো। এখন সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, পেশা বিভক্ত হয়েছে। নিপীড়ন এখন এককের। অন্যদের মধ্যে তা প্রবাহিত হয় না। বখাটেরা এই সুযোগটিই নিচ্ছে। তারা জানে সমাজে দর্শকের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতিবাদের ঠোঁটে নিখুঁত সেলাই দেওয়া। অতএব রাজ্য এখন  তাদের। সেই সঙ্গে তাদের আছে রাজনৈতিক ও আর্থিক ভগবান। সেই আশীর্বাদে বখাটেরা এখন গোত্র খুলে বসেছে। অসভ্যকালের গোত্র প্রথার রোগগুলো এখন সমাজে দৃশ্যমান। সেই দৃশ্য আমরা কেউ সয়ে যাচ্ছি। কেউ করছি উপভোগ। আমরা বুঝতে চাইছি না যে সহিংসতাকে আমরা উপভোগ করছি, সেই সহিংসতার শিকার আমিও হতে পারি আজ বা কাল। আমাদের দর্শক সারিতে বসে থাকার সময় মনে হয় শেষ। সময় এসেছে ঠোঁটের সেলাই খুলে নেওয়ারও।

না হলে কী হবে? আমাজন পুড়ছে। কেন পুড়ছে? ক্ষোভে। পৃথিবীকে ভালোবাসতে পারিনি আমরা। পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যতটুকু যত্ন নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, ততটুকু আমরা করতে পারিনি। মাটি-জলের দখল নিতে গিয়ে পৃথিবীকে উষ্ণ করে তুলেছি। সবাই যে কাজটা করেছে তা নয়। বাহুবল-অস্ত্রবল যাদের ছিল, তারাই শুষে নিয়েছে, লুটে নিয়েছে পৃথিবীর রূপ রস। বাকিরা পালন করেছে মৌনব্রত। পৃথিবী যে বিপন্ন হলো, টিকে থাকার সংকটে পড়লো, এজন্য মৌনব্রত পালনকারীরাও সমানভাবে দায়ী। কারণ মোড়ল রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে বাকিরা একজোট হতে পারেনি। যেমন আমরা দাঁড়াতে পারিনি, পারছি না বখাটে বা নষ্টদের বিরুদ্ধে। আজ আমাজনে যেমন ক্ষোভের প্রকাশ ঘটেছে, তেমনি আমাদের সমাজের বেলায়ও তেমনটি হওয়ার আলামত দৃশ্যমান। রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিকদেরও তাই সরব হওয়ার সময় এসেছে। এবং অবশ্যই সেটি রাজনৈতিক বিভক্তিকে সিন্দুকে পুরে।
তুষার আবদুল্লাহ
>>>লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

Saturday, May 5, 2018

তাসফিয়া, আদনান এবং সমাজ by তুষার আবদুল্লাহ

শবেবরাতে স্কুলছাত্রী তাসফিয়ার সাথে -অতঃপর হত্যা
চট্টগ্রামে যাওয়া হয়েছিল মাস চারেক আগে। ছুটির দিন বিকেলে আড্ডা জমে উঠেছিল চট্টলার বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে। পেশাগত আলাপের সঙ্গে আড্ডার প্রতিপাদ্য হয়ে উঠেছিল বন্দর নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। আড্ডা উদ্বিগ্ন হয় মাদক বাণিজ্য ও সেবনের প্রকাশ্য হাট দেখে। ওই বিকেলের আড্ডায় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কয়েকজন বড় কর্তাও যোগ দিয়েছিলেন। তারা আমাদের উদ্বেগের মাত্রা বাড়িয়ে দিলেন এই তথ্য জানিয়ে- স্বয়ং চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ আতঙ্কিত সেখানকার স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে। আরেকটু প্রসারিত করে বলা যায় উঠতি তরুণদের নিয়ে। পুলিশ কর্তারা বলছিলেন, সবচেয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে নগরীর কিশোর-কিশোরীরা। তারা যেমন ইংরেজি মাধ্যম পড়ুয়া, তেমনি বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীও আছে। এদের সামনে থাকা কিশোর-কিশোরীরা নগরীর উচ্চবিত্ত শ্রেণির সন্তান। ধনকুবেরদের সন্তানেরা মাদকসহ নানা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে।  সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হচ্ছে ক্ষমতা প্রদর্শন করতে গিয়ে তারা প্রতিপক্ষ, কখনও নিজ বন্ধুকেও হত্যা করছে। মাদক ব্যবসা এবং প্রেমজনিত কারণে হত্যার ঘটনা ঘটছে বেশি। এই বয়সীদের আবার প্রশ্রয় দিচ্ছে রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত তরুণরা, তাদের ভাষায় 'বড় ভাই'রা। স্কুল পড়ুয়া এই শিক্ষার্থীরা কাউকেই পরোয়া করছে না। কাউকে কাউকে আটক করলে তাদের ধনবান অভিভাবকরা এসে ধমক দিয়ে বা আপসের মাধ্যমে ছাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এই কিশোর-তরুণদেরই নগরীর রাজপথ চিড়ে বিকট শব্দে মোটরযান নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। তাদের আস্ফালন চোখে পড়ে নগরীর আলো ঝলমল রেস্টুরেন্টে।
সম্প্রতি সানশাইন গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী তাসফিয়া হত্যা ঘটনায় মনে পড়লো পুলিশ কর্মকর্তাদের সেই উদ্বেগের কথা। সেদিনের সেই আড্ডায় ভয় ও উৎকণ্ঠা এসে ভর করেছিল আমরা যারা সন্তানের অভিভাবক তাদের সবার কাঁধে।
ঢাকায় আমরা উত্তরার কথা জানি। সেখানে কিশোর বয়সীদের একাধিক গোত্র আছে। এক দল, অপর দলের এলাকা দখলের জন্য রণসজ্জায় নেমে পড়ে পথে। এরাও উচ্চবিত্তের সন্তান। তবে বলে রাখা ভালো, সকল এলাকাতেই উচ্চবিত্তের সন্তানেরা টাকার বিনিময়ে নিম্নমধ্যবিত্ত বা বিত্তহীন পরিবারের ছেলেমেয়েদের দখলে রাখে। তাদের মাধ্যমেই মাদক কেনাবেচা হয়। অস্ত্রের জোগান আসে। কাউকে হত্যার জন্য ওই শ্রেণির সন্তানদের ব্যবহার করা হয়। যেন উচ্চবিত্ত রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরেই।  শুধু উত্তরার কথা বলছি কেন, ধানমন্ডি, গুলশান, মীরপুর, ডিওএইচএস, বনশ্রী, বাড্ডা, পুরাতন ঢাকা- কোথায় ওদের এখন দেখা যায় না? এই বয়সী কিশোর তরুণদের উদ্ধত আচরণে কোণঠাসা সবাই। প্রকাশ্যে উদ্ধত আচরণ করে যাওয়ার পরও কেউ বাধা দেওয়ার সাহস দেখাতে পারছে না।  দুই-একজন এগিয়ে গিয়েছিলেন, তাদের প্রাণ দেওয়ার কথাও সবার জানা। পুলিশ প্রশাসনও যেন অসহায়। কারণ এদের পেছনে বিত্ত, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব অসীম। ফলে এই অসীম অসুরদের সামনে সাহস করে দাঁড়াতে পারছে না কেউ।
গ্রীষ্মের ফুলের টানে ইদানিং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যাওয়া হচ্ছে। বিকেলের দিকে যেদিন যাই, সেদিন ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে। গর্জন করে মোটর সাইকেল ও গাড়ির যাওয়া আসা বুক কাঁপিয়ে দিয়ে যায়। বাহনের গর্জনের সঙ্গে আছে আরোহীদের বিভৎস চিৎকার। বাহন ছাড়াও যারা পথ চলছে তারাও এই বিভৎস উৎসবের বাইরে নয়। বয়সে সবাই বড় জোর কলেজ পড়ুয়া। অনেকের শিক্ষার সঙ্গে কোনও যোগাযোগই নেই। এদের কেউই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয়। আশপাশের আবাসিক এলাকার। কিন্তু দিনের পর দিন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পরিবেশ দূষণ করে যাচ্ছে তারা।  বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীরা কী করে, কেন এই তাণ্ডব সয়ে যাচ্ছে? কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন করেও সদুত্তোর পাইনি।
তাসফিয়ার আগেও অনেক নাম এসেছে। আমরা অনেক সন্তানকে হারিয়েছি। হারানোর জন্য সন্তানদের দায় যতো, তারচেয়ে বেশি দায় আমাদেরই, অভিভাবকদের। সন্তানের বন্ধু হচ্ছে কে, কারা? মুঠোফোনে, ইন্টারনেটে সন্তান কার সঙ্গে, কী নিয়ে ব্যস্ত থাকছে তা আমরা খেয়াল রাখছি কতটুকু? আমাদের সম্পদ, প্রতিপত্তি প্রকাশের বাহন বা মাধ্যম হিসেবে কি সন্তানদের ব্যবহার করছি? ব্যবহার করতে গিয়ে কিংবা ছাড় দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত আর তাদের আয়ত্ত্বে রাখতে পারছি না। নিজ সন্তানদের কাছেই জিম্মি হয়ে পড়ছি। ভুল পথে গিয়ে সন্তানরা অপরাধী হয়ে উঠছে, যার পরিণামে তাদের গন্তব্য হচ্ছে মৃত্যু। তাসফিয়ার মৃত্যু রহস্যের পুরোটা এখনও উন্মোচিত হয়নি। আদনান কতটা জড়িত তাও চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। তবে নবম শ্রেণির একটি মেয়ের ফেসবুক প্রেম, বন্ধুর সঙ্গে রেস্টুরেন্টে গিয়ে সময় কাটানো এবং আদনানের অস্ত্র মামলার আসামির সঙ্গে বন্ধুত্ব, কোনোটাই শিক্ষার্থী ও কৈশোর সুলভ নয়। এখানে এলোমেলো, অগোছালো ও অনিয়ন্ত্রিত কৈশোর এবং দায়িত্বহীন অভিভাবকত্বের ছায়া স্পষ্ট। তাই তাসফিয়ার মৃত্যু এবং আদনানকে ঘিরে থাকা সন্দেহের বলয়-কোনোটির দায় থেকেই সমাজের মুক্তি নেই।
তুষার আবদুল্লাহ

Tuesday, April 10, 2018

সংস্কৃতির দূষণ by তুষার আবদুল্লাহ

তুষার আবদুল্লাহ
বাংলা নববর্ষ বরণে বাণিজ্যের প্রজাপতি উড়ছে দশক দুই ধরে। প্রজাপতির পাখার রঙ ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে। ধীরে ধীরে সর্বজনীন এই উৎসবের প্রতীক হয়ে উঠেছে লাল-সাদা। যার পিড়ানের রঙে লাল-সাদা নেই, তার যেন অধিকার নেই উৎসবে যোগ দেওয়ার। পোশাককে ঘিরে বড় বাজার তৈরি হয়েছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে অলঙ্কার, খাবার। উৎসবটি গ্রামীণ। কৃষক ও কৃষি শ্রমিকের উৎসব। এই উৎসবের আচারগুলো বাঙালির আবহমানকালের। বাঙালির অভ্যাসের বাইরে গ্রামীণ উৎসবে কোনও উপকরণ যোগ হয়নি। পান্তা-ইলিশ নিয়ে নগরবাসীর যে হা-পিত্যেস, তার সঙ্গে গ্রামের গৃহস্তের কোনও সম্পর্ক ছিল না। কৃষক পরিবার কখনও বর্ষবরণে পান্তা ইলিশ খায়নি। তার পরিধানে সেদিন ওঠেনি নতুন পিরান। লাল-সাদা রঙ তো অনেক দূর ভাবনা। নগরে মানুষ এসেছে রোজগারে। ফেলে এসেছে তার গ্রামের জীবন। সেই স্মৃতি থেকেই নাগরিক মানুষেরা শহরে বর্ষবরণ আয়োজন করে। অভ্যাসের চৈত্রকে, সংক্রান্তিকে, বৈশাখকে নিজের মতো করে শহুরে বানানো হয়েছে। বিচ্ছিন্ন মানুষদের গানের সুরে বৃক্ষতলে জড়ো করার প্রয়াস। গ্রামের বটতলার মেলা গ্রাম ছেড়ে এসেছে শহরের সাজ পোশাক পরেই। নগর মানুষ গ্রামীণ মনটাকে বদলে ফেলতে চায়নি। নতুন রঙ, পোশাক বদলে দিতে পারেনি মনের রঙ। তাই এই উৎসবকে তারা গ্রামের ঢঙেই সব ধর্মের মানুষের করতে সফল হয়েছে। উৎসব হয়ে উঠেছে সর্বজনীন। একথা এখন স্বীকার না করে উপায় নেই মুসলমান, সনাতন, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান উৎসবগুলোর চেয়ে বর্ষবরণ উদযাপন নিয়ে বাঙালির উন্মাদনা কম নেই। যদি বাণিজ্যিক অঙ্ক মেলাই, দেখবো এই উৎসবে কেনাকাটার পরিমাণও অন্য উৎসব গুলোকে অতিক্রমের পর্যায়ে রয়েছে।
বাণিজ্যের কর্কট রোগ আছে। এই রোগ সংস্কৃতিতে অর্থাৎ মানুষের অভ্যাস চট করে বদলে দেয়। বাড়িয়ে দেয় ভোগের তাড়না। বর্ষবরণ উৎসব এখন পণ্য উৎপাদক ও বাজারজাতকারীদের জন্য একটি মোক্ষম লগ্ন হয়ে উঠেছে। তারা বাঙালিকে একপ্রকার বুঝিয়ে ফেলতে পেরেছে কী কী পরিধান না করলে, জিভে চেখে না দেখলে তাদের পক্ষে ষোলআনা বাঙালি হওয়া সম্ভব নয়। কৃষকের ঘর যে উৎসবের আঁতুড় ঘর, সেই কৃষকও নিজের বটতলার আড়ংয়ের কথা ভুলে গিয়ে লোভাতুর হয়ে তাকিয়ে থাকে নগর থেকে আসা পসরার দিকে। মাটির সানকি, পুতুল, ঘোড়া, হাতির কথা ভুলে সে চমকে ওঠে রকমারি যান্ত্রিক পসরায়। নিজ ঘরে মাটির পুতুল সরিয়ে সেই যন্ত্রকে আলগোছে জায়গা করে দিচ্ছে। উৎসবে এখন নাগরিক জৌলুস।
সংস্কৃতিকে প্রবাহমান নদীর সঙ্গে তুলনা করেন অনেকে। উজান থেকে জল নেমে আসবে,তার সঙ্গে খড়কুটো ভেসে আসবে সঙ্গে। আবার ভেসেও যাবে সেই খড়কুটো। আমাদের সংস্কৃতিতে বরাবরই এমন খড়কুটো ভাসতে দেখা গেছে। আবার সেগুলো ভাসতে ভাসতে চলে গেছে দূর সমুদ্দুরে। তবে এখনকার অবস্থা যেন ভিন্ন। ঠিক বাংলাদেশের নদীর মতোই। নাব্য কমে গেছে। নদী প্রবাহমান না থাকায় খড়কুটো পচে নদীর তলদেশ ভরাট করে ফেলেছে। কমে গেছে আমাদের সংস্কৃতির গভীরতা। নগর মানুষের চলন-বলন যদি দেখে,যদি তাকাই নগরের মধ্যবিত্তের দিকে, উচ্চবিত্তের দেয়াল টপকে চোখ যদি যায় অন্দরে, নগরে যারা বুদ্ধিজীবী বলে আওয়াজ তুলছেন, তাদের দিকে যদি কান পাতি দেখতে পাবো কেমন সংস্কৃতি ও রুচির সংকটে পড়েছি আমরা। একপ্রকার রুচির দূষণে আছি। আমাদের নদী যেমন দূষিত হয়ে পড়েছে। তেমনি সংস্কৃতিও। সেদিন সংবাদপত্রের পাতার সঙ্গে একটি লিফলেট ঢুকে পড়লো বাড়িতে। রঙিন লিফলেটে জানান হয়েছে ঢাকার একটি গ্যালারিতে বৈশাখী মেলা ১৪২৫ আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে যে পণ্য সুলভ হবে বলে তালিকা তুলে দেওয়া হয়েছে, সেখানে রয়েছে–‘জুয়েলারি, কসমেটিক্স, ইন্ডিয়ান ড্রেস, পাকিস্তানি ড্রেস, ক্যাটালগ ড্রেস, শাড়ি, কুর্তি, লেহেঙ্গা,ব্যাগ, জুতা, হিজাব ও আরও ফ্যাশনেবল এক্সসোরিজ’। সংস্কৃতির দূষণের কথা যে বললাম, এই ফর্দে দূষণের কোনও ‘কণা’ কি দেখতে পেলেন? জানি না ১৪২৫ উদযাপনে আমরা প্রবহমান সংস্কৃতিকে কতটা দূষণমুক্ত রাখতে পারবো বা কতটা দূষিত করবো।