Friday, June 6, 2014

ধর্ষণের বিরুদ্ধে নগ্ন প্রতিবাদ

বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে। হক কথা? না, নিভৃতে কেঁদে যে বিচার পাওয়া যায় না, তা ভারতের মানুষ ঠেকে শিখেছে বা বলা ভালো ঠেকে শিখছে। এই সোচ্চার প্রতিবাদের বাণী দেশের কিছুসংখ্যক মানুষকে বোধহয় চোখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে শিখিয়েছিলেন ভারতের মণিপুরের সাহসী নীরা। সেনা জওয়ানের হাতে ধর্ষণ এবং নিগ্রহের প্রতিবাদে নগ্ন মিছিল করেছিলেন মণিপুরের রাজপথে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সহ্যশক্তি এবং লজ্জার পরত জমতে থাকে প্রতিবাদের ভাষার ওপর। কিন্তু মানুষ যে এখনো নধরকান্তি মেষশাবক হয়ে যায়নি তা আরও একবার প্রমাণ করলেন নির্ভয়া। মৃত্যুর আগে নিজের মধ্যে জ্বলতে থাকা প্রতিবাদের আগুন সঞ্চারিত করেছিলেন আমজনতার মধ্যে। তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল সারাদেশ। কিন্তু তাতে পৈশাচিকতায় কোনো ভাটা পড়েনি।

কথায় বলে রক্ষকই ভক্ষক। কিন্তু সেই রক্ষককের শরীরে যদি পড়ে ধর্ষণের আঁচড়? তখন কোথায় মুখ লুকায় গণতন্ত্র? সেই প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলেও একদল সাহসী মহিলা আইনজীবী যে তাদের সহকর্মীর ওপর হওয়া পৈশাচিক অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করে নেবেন না তা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন। হোক না সেই সহকর্মী অপরিচিত। তাতে কি যায়-আসে! মনুষ্যত্বের কর্তব্য তো অপরিচিত নয়। সেই কর্তব্যের তাগিদেই উত্তর প্রদেশের মহিলা বিচারকের সঙ্গে হওয়া ধর্ষণের প্রতিবাদে কেরল-এর হাইকোর্টের মহিলা আইনজীবীরা নগ্ন হয়ে পথে হাঁটলেন। গায়ের ওপর আলগা হয়ে পড়ে রইল সাদা, গেরুয়া এবং সবুজ কাপড়। পাশাপাশি দাঁড়ালে তবেই যে পূর্ণ হয় ভারতের পতাকা। কিন্তু একজনও ছিটকে গেলে হারিয়ে যায় পতাকার বা দেশের অস্তিত্বও। কোচির রাজপথ সাক্ষী থাকল এই ধিক্কারের। বদল কি আসবে? নাকি ক্রমেই আরও বিপন্ন হয়ে উঠবে এদেশের বুকে নারীদের অস্তিত্ব। প্রশ্নটা এলোমেলো হয়ে ঘুরে বেড়ায় এদেশেরই পথেঘাটে।

ইরানি নারীর গোপন জানালা- ডয়েচ ভেলে

রাষ্ট্রের আইন আর ধর্মের শাসন ডিঙিয়ে ইরানি নারীদের জন্য সাইবার সমাজে এক গোপন জানালা খুলে দিয়েছেন প্রবাসী এক তরুণী, যাঁর পথ ধরে শতাধিক নারীর খোলা চুলে স্পর্শ করেছে মুক্তির আলো৷

যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাংবাদিক মাসিহ আলিনেজাদ গত মাসের শুরুতে ফেসবুকে একটি ছবি পোস্ট করেন, যেখানে তাঁকে হিজাববিহীন অবস্থায় ইরানের একটি শহরে গাড়ি চালাতে দেখা যায়৷ গত এক মাসে তাঁর ফেসবুক পৃষ্ঠা মাই স্টেলথি ফ্রিডম পছন্দ (লাইক) করেছেন ৪ লাখ ৩৬ হাজার মানুষ৷ মাসিহ আলিনেজাদের ডাকে সাড়া দিয়ে সেই পৃষ্ঠায় নিজেদের হিজাববিহীন ছবি পোস্ট করেছেন শতাধিক নারী৷

আলিনেজাদ ওই ফেসবুক পৃষ্ঠায় লিখেছেন, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে এই উদ্যোগের কোনো সম্পর্ক নেই৷ আইন ও সামাজিক বিধিনিষেধের বেড়াজালে বন্দি ইরানি নারীদের মুক্তির প্রত্যাশা থেকেই এর শুরু৷

১৯৭৯ সালে ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হওয়ার পর নারীদের প্রকাশ্যে চলাফেরার ক্ষেত্রে হিজাব বা মাথা ঢাকা পোশাক ধারণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়৷ এ নিয়ম ভাঙার কারণে বহু নারীকে জেল-জরিমানারও শিকার হতে হয়েছে৷

এর বিরুদ্ধে ফেসবুকে প্রথম প্রতিবাদ দানা বাঁধতে থাকে ২০১২ সালে৷ ইরান লিবারেল স্টুডেন্ট অ্যান্ড গ্র্যাজুয়েট নামের একটি সংগঠন আনভেইল উইমেনস রাইট টু আনভেইল শিরোনামে একটি প্রচারণা শুরু করে, যা ৬৫ হাজার লাইক পায়৷ আর এবার মাসিহ আলিনেজাদের স্টেলথি ফ্রিডম সেই আন্দোলনকে দিয়েছে নতুন মাত্রা৷

ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ইরানি নারীরা আসলে কেমন, বিশ্বের কাছে তা তুলে ধরতেই এ আয়োজন৷ এখানে যাঁরা নিজেদের স্কার্ফবিহীন ছবি দিয়েছেন, তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি৷ নিজেদের ছবিগুলোও তাঁরা তুলেছেন গোপনে৷ হিজাব নিয়ে তাঁদের মতামত এবং মুক্ত জীবনের প্রত্যাশার কথা সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে ছবির সঙ্গে৷

একটি ছবিতে এক নারীকে দেখা যায় পাহাড়ের ওপরে দাঁড়িয়ে স্কার্ফ খুলে তুলে ধরেছেন দুই হাতে৷ ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, পাহাড় কখনো নিজেকে অবগুণ্ঠনে আড়াল করে না৷ তাই পাহাড়ে এসে আমিও নিজেকে আড়ালে রাখিনি৷

মাই স্টেলথি ফ্রিডম পৃষ্ঠায় যাঁরা ছবি দিয়েছেন, তাঁরা অনেকেই ছবি তুলেছেন পেছন থেকে, যাতে চেহারা দেখা না যায়৷ কারো কারো মুখ দেখা গেলেও তাঁরা পরে নিয়েছেন চোখ ঢাকা সানগ্লাস৷ অবশ্য তেহরানের কেন্দ্রীয় স্বাধীনতা চত্বর এবং সাবওয়ে স্টেশনেও কেউ কেউ হিজাব খুলে ক্যামেরার সামনে এসেছেন৷

একটি ছবিতে কালো পোশাকের এক নারীকে দেখা যায় মরুভূমিতে পেছন ফিরে দাঁড়ানো৷ তাঁর মাথা ঢাকার লাল স্কার্ফ উড়ছে তাঁর হাতে৷ তিনি লিখেছেন, এ ধরনের একটি আন্দোলনের জন্য আমি বহু বছর অপেক্ষা করেছি৷ আমার বিশ্বাস, শিগগিরই সেই দিন আসবে, যখন আমাদের এই মুক্তির আনন্দ আর গোপন করে রাখতে হবে না৷

ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ইরানি নারীদের এই মুক্তির স্বপ্নকে আলোয় আনলেও ইরানের আইন আর বিধিনিষেধ নিজস্ব গতিতেই চলছে৷ সম্প্রতি বাড়ির ছাদে ফ্যারেল উইলিয়ামসের বিখ্যাত হ্যাপি গানের সঙ্গে হিজাববিহীন অবস্থায় নাচার পর সেই ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করে জেলে যেতে হয়েছে তেহরানের ছয় তরুণ-তরুণীকে৷ অবশ্য পরে তাঁরা দুঃখ প্রকাশ করে জামিনে মুক্তি পান৷

মাই স্টেলথি ফ্রিডম আন্দোলনের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেও ফেসবুকে মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ৷ এঁদের মধ্যে একজন বলেছেন, হিজাবের চেয়ে আরো অনেক বড় সমস্যা ইরানি নারীদের জীবনে রয়েছে৷ লুকিয়ে ছবি তুলে ফেসবুকে দেয়ার এ বিষয়টিকে স্ববিরোধী বলেও আখ্যায়িত করেছেন একজন৷

মাসিহ আলিনেজাদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, সব মতের নারী-পুরুষের খোলামেলা আলোচনার এরকম একটি জায়গাই আমি তৈরি করতে চেয়েছি, যেখানে তাঁদের সেন্সরশিপের ভয় করতে হবে না, মুক্তচিন্তা প্রকাশের জন্য শাস্তির মুখে পড়তে হবে না৷

ইরানের মতো একটি দেশে যেখানে ইন্টারনেটের ওপর কড়া নজরদারি চলে, সেখানেও প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার লাইক পড়ছে আলিনেজাদের ফেসবুক পৃষ্ঠায়৷ আর শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আর ভার্চুয়াল দুনিয়াতেই আটকে থাকছে না৷

হ্যাপি গানের সঙ্গে ইরানি তরুণীর নাচের ভিডিও নিয়ে শোরগোলের পর ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এক বার্তায় বলেন, আনন্দ প্রকাশের অধিকার আমাদের জনগণের রয়েছে৷ আর আনন্দ প্রকাশ করতে গিয়ে কারো আচরণ নিয়ে খুব বেশি কঠোর হওয়া আমাদের উচিত নয়৷ অবশ্য মজলিসে শুরার বৈঠকে বা কোনো রাষ্ট্রীয় ফরমানে তিনি এ কথা বলেননি৷ ইরানি প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য এসেছে টুইটারের মাধ্যমে৷

মির্জা ফখরুল কাউকে অবৈধ বলার এখতিয়ার রাখেন না

বিএনপিকে অবৈধ দল উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ এমপি বলেছেন, বিএনপির জন্ম হয়েছিল অবৈধ ভাবে।তাই অবৈধ দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল অন্য কাউকে অবৈধ বলার এখতিয়ার রাখেন না। বাজেট নিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় শুক্রবার দুপুরে কুষ্টিয়ার মিরপুরে উপজেলা যুবলীগের দ্বি-বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দেয়ার আগে তিনি সাংবাদিকদের কাছে এসব কথা বলেন।
এসময় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী, মিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান কামারুল আরেফিন, জেলা যুবলীগের আহবায়ক রবিউল ইসলামসহ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে ফখরুল বলেছিলেন, এ সরকার অবৈধ। তাই এ সরকারের দেয়া বাজেটও অবৈধ। এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় হানিফ বলেন, দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে অবৈধভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে বিএনপি গঠন করেছিলেন। তাই বিএনপিই অবৈধ দল। তিনি বলেন, ফখরুলের মধ্যে যদি নূন্যতম নৈতকতাবোধ থাকে তাহলে অবৈধ দল বিএনপিকে আগে বিলুপ্ত করার প্রস্তাব দিক।
এই আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, ঘোষিত বাজেট স্বাধীনতা উত্তোরকালের সবচেয়ে যুগপোযোগি বাজেট। এ বাজেট ভিশন টোয়েন্টি-টোয়েন্টি ওয়ান রূপকল্প বাস্তবায়নের বাজেট। তিনি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে জড়িত -এ কথা সবাই জানে। তিনি বেঁচে থাকলে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামী হতেন, তার বিচার করা হতো।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব নয় : সিপিডি

২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে উদ্দীপনাহীন বাজেট অভিহিত করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)র সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য বলেছেন, বাজেটে জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কোন যৌক্তিক ভিত্তি নেই। বিশাল ঘাটতির এ বাজেট বৈদেশিক ঋণসহায়তা ছাড়া বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।তিনি বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।
শুক্রবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার বাজেট পরবর্তী ব্রিফিংয়ে এ মন্তব্য করেন তিনি। এসময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান, আনিসাতুল ফাতেমা।
আর্থিক ও সামষ্টিক কাঠামোর সমন্বয় না থাকায় বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব নয় এমন মন্তব্য করে ড. দেবপ্রিয় বলেন, এ বাজেটের মাধ্যমে ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকে বর্জন করা হয়েছে। ৭ম ও ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার কোনো ইঙ্গিতও ছিল না বাজেটে। নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে বড় ধরনের উদ্দীপনামূলক কিছু ছিল না এতে।
বাজেট যে কোনো সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের হাতিয়ার এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, বাজেটে অর্থমন্ত্রী নিরবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছেন যা কাঙ্খিত নয়।
ড. দেবপ্রিয় আরো বলেন, এ বাজেট চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বিরাজমান অর্থনেতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার বাজেট। কিন্তু যখন রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে, মূদ্রার বিনিময় হার ভালো, পণ্যের দাম কমার মতো যেমন ইতিবাচক কিছু রয়েছে। তেমনি বিনিয়োগের পতনের ধারা, রাজস্ব আদায়ের বড় ধরনের ঘাটতি, ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীলতাও রয়েছে।
তিনি বলেন, এই অবস্থায় আর্থিক সঙ্গতি ফিরিয়ে নিয়ে আসা, অথনৈতিক প্রবৃদ্ধি তরণ পুনর্জীবিত করা, ব্যক্তি বিনিয়োগ ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তাবনা থাকা উচিত ছিল।
এসময় বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আর্থিক খাতের সংস্কারের জন্য চারটি কমিশন গঠনের প্রস্তব দেয়। কমিশনগুলো হলো- কৃষি খাতের কৃষি মূল্য কমিশন গঠন, স্বাধীন পরিসংখ্যান কমিটি গঠন, স্থানীয় সরকার অর্থায়ন কমিশন গঠন ও সরকারি ব্যয় কমিশন গঠন।

ক্ষমতায় টিকে থাকতে বিদেশ সফর করছেন প্রধানমন্ত্রী: ফখরুল

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আওয়ামী সরকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাই ক্ষমতায় টিকে থাকতে প্রধানমন্ত্রী বিদেশিদের সমর্থন যোগাতে বিভিন্ন দেশে সফর করছেন। কিন্তু এতে কোনো লাভ হবে না। কারণ তারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন। তাদের প্রতি জনগণের কোনো আস্থা নেই।
শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে এক আলোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতি ও শহীদ জিয়া’ শীর্ষক আলোচনা সভা এবং জিসাস নতুন তারা পদক -২০১৪ উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জিয়া সাংস্কৃতিক সংগঠন (জিসাস)।
বিএনপিকে বিলুপ্ত করতে হবে’ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফের এমন বক্তব্যের জবাবে আলোচনা সভায় মির্জা ফখরুল বলেন, হানিফের বক্তব্য প্রমাণ করে আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে। তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না বলেই এমন কথা বলছে।
তিনি বলেন, হানিফের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সরকারের ফ্যাসিবাদি চরিত্র ফুটে উঠেছে। একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলকে বিলুপ্ত করার কথা কেউ বলতে পারে না। স্বৈরাচারী চিন্তা থেকেই তারা এ ধরনের বক্তব্য দিচ্ছে।
বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার অবৈধ। গত নির্বাচন ছিল অবৈধ। অবৈধ ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সরকারএকটি বাজেট দিয়েছে। এই বাজেটের কোন ভিত্তি নেই।
জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করে ফখরুল বলেন, জিয়াউর রহমান উপলদ্ধি করেছিলেন শিশুরাই আগামী দিনে নেতৃত্ব দেবে। তাই তিনি শিশুদের মেধা বিকাশের জন্য শহীদ জিয়া শিশু একাডেমি, শিশু পার্ক ও শিশু মন্ত্রণালয় করেছেন।
সংগঠনের চেয়ারম্যান আবুল হাশেম রানার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিএনপির অর্থনীতি বিষয়ক সম্পাদক আব্দুস সালাম, সংগঠনের মহাসচিব মতিয়র রহমান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

কিছু লোকের হাতে গণতন্ত্র কুক্ষিগত হয়ে আছে : ড. কামাল হোসেন

বিশিষ্ট আইনজীবী সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, কিছু লোকের হাতে আজ গণতন্ত্র বন্দি। গণতন্ত্রকে কুক্ষিগত হতে দেয়া যাবে না। দেশের নাগরিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে দেশকে ও দেশের গণতন্ত্রকে রক্ষার জন্য তরুণ সমাজকে জেগে উঠতে হবে। শহীদ নূর হোসেনের আদর্শকে বুকে ধারণ করে গণতন্ত্রের জন্য আরেকবার মাঠে নামতে হবে। তা না হলে দেশের ভবিষ্যত অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে। শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ইয়ুথ মুভমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজিত ‘মানবাধিকার? গণতন্ত্র? জেগে উঠো বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।

ড. কামাল হোসেন বলেন, দেশের সকলকে অসুস্থ রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দেশে ফরমালিনমুক্ত রাজনীতির প্লাটফর্ম এখনো আছে। সেখান থেকে আন্দোলন জোরদার করতে হবে। নারায়ণগঞ্জের মানুষ যেভাবে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে সেভাবে সবাইকে আসতে হবে। তিনি বলেন, সরকার দেশের অস্ত্র জনগণের স্বার্থে ব্যবহার না করে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। এর ফল কোনোদিন ভালো হয়নি। তিনি নারায়ণগঞ্জের উপ-নির্বাচনে যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিকে বিজয়ী করার আহবান জানান। অনুষ্ঠানে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, দেশে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের নামে ভণ্ডামী করা হয়েছে। এতে কেউ কেউ মনে করছেন যে শেখ হাসিনাকে আর ক্ষমতা থেকে নামানো যাবে না। কিন্তু এটি ভুল কথা। প্রধানমন্ত্রী ওসমান পরিবারের সঙ্গে থাকার কথা বলে মূলত র‌্যাবের পক্ষেই সাফাই গেয়েছেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম শাখাওয়াত হোসেন, সাংবাদিক নাইমুল ইসলাম খাঁন, সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজুল্লাহ, ব্যারিস্টার তুহিন মালিক, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিলারা বেগম ও নাগরিক ঐক্যের সুকুমার বড়ুয়া। সভাপতিত্ব করেন ইয়ুথ মুভমেন্ট ফর ডেমোক্রেসির প্রেসিডেন্ট শ্যামা ওবায়েদ।

ছাত্র হত্যায় উত্তপ্ত সিলেট মেডিকেল কলেজ বন্ধ

সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী তাওহীদুল ইসলামকে হত্যার ঘটনায় আগামী ১২ জুন পর্যন্ত কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। নগরীতে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সহিংসতা ঠেকাতে ক্যাম্পাস ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ। কলেজ কর্তৃপক্ষ ঘটনা তদন্তে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
তাওহীদকে নিজেদের কর্মী দাবি করে তার হত্যার প্রতিবাদে বুধবার রাতেই কলেজে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ডাকে ছাত্রদল। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতারের দাবিতে আগামী রোববার সিলেট মহানগরে আধাবেলা হরতাল ডেকেছে বিএনপি।
তাওহীদের চাচা আনোয়ার হোসেন মাতব্বর বৃহস্পতিবার কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত আরও ৮-১০ জনকে আসামি করে সিলেট কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করেছেন। তবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করেনি পুলিশ।
ছাত্রলীগ নেতাদের দাবি করা চাঁদা না দেয়ায় তাওহীদকে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ছাত্রদলের নেতারা। গত বুধবার সন্ধ্যায় চৌহাট্টার আবু সিনা ছাত্রাবাসের ১০০৩ নম্বর কক্ষে তাওহীদকে কুপিয়ে ও বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর আহত করে দুর্বৃত্তরা। পরে তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে রাত পৌনে ৯টায় তাকে মৃত ঘোষণা করেন কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী। তাওহীদ ওসমানী মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। বৃহস্পতিবার ময়নাতদন্ত শেষে তাওহীদের লাশ শরীয়তপুরের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান স্বজনরা। তাওহীদ হত্যার ঘটনায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের সার্জারি বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. একেএম মোশাররফ হোসেনকে প্রধান করে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী জানান, বৃহস্পতিবার কলেজের একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে এক সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কলেজ বন্ধ রাখারও সিদ্ধান্ত হয়। তিনি জানান, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হবে।
তাওহীদের চাচার করা মামলায় মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগ নেতা রাফিকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হল : কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি সৌমিক দে, সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হাই, ছাত্রলীগ নেতা হাফিজ, পাঠান, অন্তর, ফাহিম, শরীফুল, জুবায়ের ইবনে খায়ের ও রিপন। এসআই সিরাজুল ইসলামকে মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ১০টায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ মসজিদ মাঠে তাওহীদের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বেলা সোয়া ১১টার দিকে কলেজ ক্যাম্পাসে বিএনপি ও ছাত্রদল নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে দ্বিতীয় জানাজা হয়। জানাজায় অংশ নেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সভাপতি এমএ হক, সহসভাপতি বদরুজ্জামান সেলিম, সাংগঠনিক সম্পাদক আলী আহমদ, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আবদুল আহাদ খান জামালসহ অন্য নেতাকর্মীরা। এরপর তাওহীদের মরদেহ তার গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাওহীদ শরীয়তপুরের জাজিরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শামসুর রহমান মাতব্বরের ছেলে।
ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় আহত ১০ : তাওহীদ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সিলেটে মহানগর বিএনপির কর্মসূচি চলাকালে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে যুবলীগ-ছাত্রলীগের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনায় ১০ জন আহত হয়েছে। এ সময় যুবলীগকর্মীদের হাতে ওসি (তদন্ত) শ্যামল দত্ত লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা ঘটে। গতকাল বিকালে কোর্টপয়েন্ট এলাকায় বিএনপির পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি চলছিল। একই সময় জিন্দাবাজার এলাকা থেকে বাজেটকে স্বাগত জানিয়ে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের পৃথক দুটি মিছিল ওই এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় বিএনপির মিছিল থেকে ‘ধর ধর, ছাত্রলীগ ধর’ স্লোগান দিয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়। এতে ত্রিমুখী ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ লাঠিচার্জ করে বিএনপি, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ ঘটনায় অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনার কিছু সময় পর মহানগর যুবলীগ নেতাকর্মীরা একটি মিছিল নিয়ে এসে ওসি (তদন্ত) শ্যামল দত্তকে লাঞ্ছিত করে। তারা যুবলীগ-ছাত্রলীগ কর্মীদের লাঠিপেটা করায় ওসির ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে তারা শ্যামল দত্তকে মারতে উদ্যত হলে ওসি আতাউরসহ অন্য পুলিশ সদস্যরা তাদের নিরস্ত্র করেন।

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ আর দেয়া হবে না : অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ আর থাকছে না।মন্ত্রী বলেন, গত বছর কালো টাকা সাদা করার জন্য মাত্র ৩৪ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছি।এবার সে সুযোগ আর থাকছে না। এখন থেকে কালো টাকা সাদা করার সুযাগ আর দেয়া হবে না। শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অর্থমন্ত্রী ২০১৪-১৫ বাজেট উত্তর সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সহিংসতা পরিহার করতে হবে। সহিংসতা কখনো প্রতিবাদের ভাষা নয়। এটা একটি দুষ্টু কালচার। বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে রাজনীতিবিদদের এগিয়ে আসতে হবে। তিনি  বলেন, বাজেট উচ্চাভিলাসী নয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে অবশ্যই বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
অর্থমন্ত্রী কর আদায় স্থিতিশীল রাখতে রাজনৈতিক সহিংসতা পরিহারের আহবান জানিয়ে বলেন, রাজনৈতিক হানাহানির কারনে কর আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। তবে বাজেট বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাধা হবে না বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী।  মন্ত্রী বলেন, বৈদেশিক সহায়তা ছাড়ের জন্য দক্ষতা দেখাতে পারিনি। তবে বাজেট ঘাটতি পুরনে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়ার দরকার হবে না। দেশে উন্নয়নের মাধ্যমে ক্রমেই দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমেছে। ডিসেম্বরের মধ্যে পে- কমিশনের রিপোর্ট পাওয়া যাবে। এরপর বাস্তবায়ন করা হবে।
 তিনি বলেন, করমুক্ত আয়ের সীমা আমাদের দেশে যেভাবে বাড়ানো হয় সেভাবে বিশ্বের কোনো দেশে বাড়ানো হয় না। বিশ্বের ধনী দেশেও এভাবে বাড়ানো হয় না।
মন্ত্রী বলেন, দুই লাখ ২০ হাজার টাকা আগামী ১০ বছরের জন্য নির্ধারণ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর আপত্তির কারণে তা সম্ভব হয়নি।
মুহিত বলেন, মোবাইল সেটে যে কর বসানো হয়েছে তাতে কেউ আপত্তি করবেন না বলে আমার ধারণা।এক প্রশ্নের জবাবে তাৎক্ষনিকভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল ঘোষণা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এবছর টাকা সাদা করার জন্য মাত্র ৩৪ কোটি টাকা ট্যাক্স পেয়েছি। এটা আর চলতে পারে না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীতে সব সময় বিরোধীদল বাজেট পেশের সময় সংসদে অনুপস্থিত থাকতো। এবার যেমনই হোক একটা বিরোধীদল ছিল। তাদের উপস্থিতিতে সংসদে বাজেট ঘোষণা করেছি।
এক প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, আমরা গত ৫ বছর সরকার পরিচালনায় দক্ষতা অর্জন করেছি। সুতরাং নতুন বাজেট বাস্তবায়নে কোন সমস্যা হবে না। পরিকল্পনা মন্ত্রী আহম মোস্তফা কামাল বলেন, বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা পুরনে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। আমাদের রাজস্ব আদায় এক লাখ কোটি টাকার ওপরে। চলতি অর্থবছরে কোন সমস্যা না হলে দেড় লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।
অবৈধ সরকারের বাজেট প্রসঙ্গে অর্থপ্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান বলেন, আমরা সংবিধান মেনে ঝুকি নিয়ে নির্বাচন করে সরকার গঠন করেছি। আমাদের ধারণা জনগণ আামদের সরকারকে গ্রহণ করেছে। 
অর্থমন্ত্রী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা মশিউর রহমান, আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী, এনবিআর চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা উপস্থিত আছেন।

মোদির সাহায্য চান অভিনেত্রী জিয়ার মা by রুমি খান

ভারতের নতুন সরকার প্রধান নরেন্দ্র মোদির কাছে মেয়ে হত্যার বিচার চাইলেন বিশিষ্ট অভিনেত্রী জিয়া খানের মা রাবেয়া আমিন। তিনি মোদি সরকারকে পুনরায় এই মামলার তদন্ত করার আহ্বান জানান। রাবেয়ার আশা এতে আসল ঘটনা বের হয়ে আসবে। জিয়া খানের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে অয়োজিত এক স্মরণ সভায় তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, জিয়া আত্মহত্যা করেননি, তাকে খুন করা হয়েছে। চেলসি টাউন হলে এ স্মরণসভায় রাবিয়াসহ জিয়ার দুই বোন ও পরিবারের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন৷ রাবিয়া আরও বলেন, ঘটনার প্রথমদিন থেকেই আমি নিশ্চিত যে আত্মহত্যা নয়, ঠান্ডা মাথায় খুন করা হয়েছে আমার মেয়েকে৷ আমি চাই মোদি সরকার এর পুনরায় তদন্ত শুরু করুক। সিবিআই, এফবিআই কিংবা সিট যারাই হোক না কেন, গোটা ঘটনার পুর্নতদন্ত চাই আমি৷ রাবেয়া বলেন, নতুন সরকারের গুছিয়ে নিতে একটু সময় লাগবে৷ তবে, আমি আশাবাদী তারা বিষয়টি অগ্রাহ্য করবে না। তিনি আরও অভিযোগ করেন, তদন্তের ক্ষেত্রে অন্তর্ঘাতের পিছনে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদেরই হাত রয়েছে৷ এর আগে জিয়া খানকে হত্যার অভিযোগে বোম্বে উচ্চ আদালতে মামলা করেছিলেন তাঁর মা রাবেয়া আমিন। মেয়েকে হত্যার পর আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন তিনি। মামলার অভিযোগে জিয়া খানের মৃত্যু যে আত্মহত্যা নয়, তার ১০টি কারণও উল্লেখ করেছেন রাবেয়া। উল্লেখ্য, গত বছরের ৩ জুন মুম্বাইয়ের জুহুতে নিজ বাসা থেকে জিয়া খানের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। কয়েক দিন পর প্রেমিক সুরজ পাঞ্চোলিকে দায়ী করে জিয়ার লেখা সুইসাইড নোট খুঁজে পান তাঁর বোন। পরে সেটি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করলে আত্মহত্যায় প্ররোচনার দায়ে সুরজকে গ্রেপ্তার করে মুম্বাই পুলিশ। কিছুদিন বন্দী থাকার পর জামিনে মুক্তি পান বলিউডের প্রভাবশালী ও বিতর্কিত অভিনেতা আদিত্য পাঞ্চোলির ছেলে সুরজ। জিয়া খান প্রথম অভিনয় শুরু করেন শিশুশিল্পী হিসেবে। ১৯৯৮ সালে তার অভিনিত প্রথম ‘দিল সে’ ছবি মুক্তি পায়। এরপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ২০০৭ সালে অভিনয় করেন রাম গোপাল ভার্মার ‘নিঃশব্দ’ ছবিতে। ছবিটিতে অমিতাভ বচ্চনের বিপরীতে অভিনয় করে আলোচনায় আসেন জিয়া। পরে অভিনয় করেন ‘গজনি’ (২০০৮) ও ‘হাউসফুল’ (২০১০) ছবিতে। ২৫ বছর বয়সী জিয়া খানের বড় হন যুক্তরাজ্যে। থাকতেন জুহু বিচ-সংলগ্ন সাগর সংগীত নামের একটি অ্যাপার্টমেন্টে। >>রুমি খান

সীমান্তে উত্তেজনা ও রোহিঙ্গা সমস্যা by এম সাখাওয়াত হোসেন

প্রায় ১৫ বছর পর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত পুনরায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে৷ এর আগে ১৯৯১ সালের ২১ ডিসেম্বর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নাইক্ষ্যংছড়ির রেঙ্গুপাড়া বিওপিতে রাতের অন্ধকারে মিয়ানমারের নাসাকা আধা সামরিক বাহিনী তৎকালীন বিডিআরের বিওপিতে অতর্কিতে হামলা চালিয়েছিল৷ ওই হামলায় বিডিআরের একজন সদস্য নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছিলেন৷ লুট হয়েছিল বিওপির বেশ কিছু অস্ত্র, যা পরে বাংলাদেশের চাপে মিয়ানমার সরকার ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছিল এবং ওই ঘটনা ভুল–বোঝাবুঝির কারণে হয়েছিল বলে দুঃখ প্রকাশ করেছিল৷
ওই সময়ে ওই ঘটনার পরপরই বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল৷ সেনাবাহিনীকে সমর্থন জোগাতে প্রস্তুত ছিল বাংলাদেশ বিমানবাহিনী এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কয়েকটি রণতরি৷ স্বাধীন বাংলাদেশে সেটাই ছিল কোনো আন্তর্জাতিক সীমান্তে বাংলাদেশের সেনাসমাবেশ৷ ওই ঘটনার মূলে ছিল মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলের সংখ্যালঘু মুসলমান জনগোষ্ঠী, যারা রোহিঙ্গা নামে পরিচিত৷ প্রায় তিন মাস পর বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের নির্দেশে সামরিক বাহিনী অপসারিত হওয়ার পরপরই মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চল, বিশেষ করে সীমান্ত নিকটবর্তী বুথিডং ও মঙ্গডোও এলাকা থেকে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল, যার প্রায় সিংহভাগ এখনো বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলায় উদ্বাস্তু শিবিরে আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে অবস্থান করছে৷

১৯৯১ সালের ওই ঘটনার পেছনেও, মিয়ানমারের ভাষ্য মোতাবেক, ছিল রোহিঙ্গা ইনসারজেন্ট বা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় দল রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও)৷ রেঙ্গুপাড়া বিওপিতে হামলার নেপথ্য কারণ হিসেবে মিয়ানমার থেকে বলা হয়েছিল, ১৯৯১ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আরএসওর একটি দল রেঙ্গুপাড়ার দক্ষিণ-পূর্ব মিয়ানমারের একটি সীমান্তচৌকিতে হামলা করে ক্ষয়ক্ষতির প্রত্যুত্তরে৷ আরএসও ক্যাম্পের বদলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিওপিতে হামলা চালিয়েছিল৷ যা-ই হোক, ওই সময়ে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে সামরিক উত্তেজনা প্রশমিত হলেও ‘রোহিঙ্গা’ ইস্যু এখনো তেমনই রয়ে গেছে৷
ওপরের প্রেক্ষাপট এ কারণে বর্ণনা করা হলো, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের প্রায় ২০০ মাইল সীমান্তে থেকে থেকে যে কারণে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, তার কিছু সম্যক ধারণা পেতে৷ বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সময় সময়ের উত্তেজনার মূলে রয়েছে উত্তর রাখাইন অঞ্চলের মিয়ানমার মুসলমান-রোহিঙ্গাদের অবস্থান নিয়ে৷ উল্লেখ্য, বিগত ৬০ বছরেরও অধিক সময় এ অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের প্রথমে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির দাবি, পরে স্বাধিকার ও নাগরিকত্ব নিয়ে একাধিক বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে কথিত সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সঙ্গে থেকে থেকে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে৷ মিয়ানমার সরকারের তরফ থেকে বর্তমানে প্রতিবারই বাংলাদেশকে এই বিদ্রোহীদের সহযোগিতা ও আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ উত্থাপিত হয়ে আসছে৷ বর্তমানে উত্তর আরাকানে রোহিঙ্গা নিধনের এবং বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের পুনর্বাসনের যে চেষ্টা চলছে, তার বিরোধিতায় সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছে প্রায় সাতটি পরিচিত-অপরিচিত গোষ্ঠী৷ এদের মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ গোষ্ঠী বলে বিবেচিত আরএসও৷
২০১৪ সালের ২৮ মে সীমান্ত পিলার ৫১-৫২ সন্নিকটে বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা ও বিজিবির তথ্যমতে, নিয়মিত টহল দলের ওপর মিয়ানমারের নাসাকা অন্তর্ভুক্ত বর্ডার গার্ড পুলিশ বা বিজিপি বিনা উসকানিতে অতর্কিতে হামলা করেছে৷ এ হামলায় শহীদ হয়েছেন নায়েক মিজানুর রহমান, যিনি একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান৷ তাঁর বাবা নায়েক আবদুল হাফিজ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন৷ শহীদ নায়েক মিজানুর রহমানের মৃতদেহ প্রায় দুই দিন জোর কূটনৈতিক তৎপরতার পর মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ফেরত দিয়েছিল৷ পরে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়৷
যদিও কেন এই অতর্কিতে হামলা, তার বিশদ ব্যাখ্যা বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ এখনো খোলাসা করেনি বা তেমন তথ্য প্রকাশিত হয়নি; তবে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়েছে বলে তথ্যে প্রকাশ৷ অপর দিকে, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, মিয়ানমারের সঙ্গে ভুল–বোঝাবুঝির অবসান হয়েছে৷ কী নিয়ে বা কী কারণে ভুল–বোঝাবুঝি হয়েছে, তার ব্যাখ্যা তিনি দেননি৷ কাজেই মিয়ানমারের এ ধরনের আচরণের কারণ পরিষ্কার নয়৷ অপর দিকে, সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায় মিয়ানমারের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও অনলাইন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য থেকে৷
মিয়ানমার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের, নেপিডোর ভাষ্যমতে, গত ১৭ মে মঙ্গডোও অঞ্চলের মাইওমা পুলিশ ফাঁড়ির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সীমান্ত পিলার ৫২, ২৮ মের ঘটনাস্থলসংলগ্ন বানডোলা চৌকির দিকে যাওয়ার পথে সন্দেহভাজন আরএসওর ৪০ জন রোহিঙ্গা বিদ্রোহীর আক্রমণে টহল দলের চারজন পুলিশ সদস্য নিহত ও দুজন নিখোঁজ হন এবং দলের প্রধান ক্যাপ্টেন নওয়ে উ মুয়াঙ্গ গুরুতরভাবে আহত হন৷ পরে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা বাংলাদেশের দিকে পালিয়ে যায়৷ এ ঘটনার পর থেকে ওই অঞ্চলে বিজিপির শক্তি বৃদ্ধি করা হয় এবং রাখাইন অঞ্চলের পার্লামেন্ট সদস্য মি. ক্লিন স ওয়েই মিয়ানমার পার্লামেন্টে ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করার দাবি জানান৷ তাঁর এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গডোও অঞ্চলের সেনাবাহিনীকেও সতর্ক করে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করা হয়৷
মিয়ানমার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনার দিন কয়েকজন কথিত বিদ্রোহী ভিন্ন রঙের ইউনিফর্মে সীমান্ত অতিক্রম করলে বিজিপি গুলি ছুড়লে একজনের মৃত্যু হয়, অপর একজন পালিয়ে যায়৷ তারা (মিয়ানমার মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে) কোনোভাবেই বিজিবির সদস্য বলে শনাক্ত হয়নি৷ কারণ, তাদের পরিধেয় ইউনিফর্ম বিজেবির অনুরূপ ছিল না, এমনকি কাঁধে চিহ্নও ছিল না৷ এ বিষয় নিয়ে ইয়াঙ্গুনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের কাছে কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানায় মিয়ানমার সরকার৷ অপর দিকে, বাংলাদেশের প্রতিবাদকে অগ্রহণযোগ্য ও বাস্তব ঘটনাবিবর্জিত বলে মতামত ব্যক্ত করে৷ এ বক্তব্য বাংলাদেশের অনলাইন পত্রিকা ‘বিডি নিউজ ২৪ ডট কম’-এর ২ জুন দুপুরের সংস্করণেও প্রকাশিত হয়েছে, তবে বাংলাদেশ সরকারের কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি৷
এ তথ্য যদি মিয়ানমার সরকারের ভাষ্য হয়, তবে প্রশ্ন থাকে, মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের ৫২ নম্বর পিলার সন্নিকটে আরএসওর কথিত আক্রমণ এবং হতাহত হওয়ার ঘটনার কোনো গোয়েন্দা প্রতিবেদন বিজিবি অথবা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ছিল কি না? এ ধরনের প্রতিবেদন থাকলে অবশ্য বিজিবির সতর্কতাসহ অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে ওই অঞ্চলে শক্তি বৃদ্ধি করা যেত এবং উচিত হতো৷ ওই ঘটনার পরপর মিয়ানমারের মঙ্গডোও অঞ্চলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় সামরিক শক্তি বৃদ্ধির সংবাদেও বাংলাদেশের তরফ থেকে আরও সতর্কতা অবলম্বন করা যেত৷ এসব তথ্য প্রকাশিত না হওয়ায় ২৮ মে বিজিবির টহল দলের ওপর মিয়ানমার বিজিপির অতর্কিত হামলার কারণ জনগণের কাছে স্পষ্ট নয়৷ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে বিশদ তদন্ত এবং এর বিবরণ সংসদের মাধ্যমে জনগণের জ্ঞাতার্থে প্রকাশ করলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে সরকারের ভূমিকা জনসমর্থন অর্জন করবে৷

বাংলাদেশের আলোচিত অঞ্চলে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তকে খুব স্বাভাবিক বলে আখ্যায়িত করা যায় না৷ প্রায় সময়ই উত্তেজনা বিরাজমান, যার কেন্দ্রে রয়েছে উত্তর আরাকানের সীমান্তবর্তী মিয়ানমার অঞ্চলে রোহিঙ্গা সমস্যা৷ হালের জনশুমারি বর্জন করছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী৷ কারণ, ওই জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা নয়, বরং বাঙালি হিসেবে শুমার করতে চায় মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ৷ আর এ বিষয় নিয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারের জাতিগত ও ধর্মগত উত্তেজনা বিরাজমান৷
তথ্যে প্রকাশ, মিয়ানমার ২৮ মের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শুধু সেনাসংখ্যাই বৃদ্ধি করেনি, বরং বাংলাদেশসংলগ্ন অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজের চলাচলও বৃদ্ধি করেছে৷ অপর দিকে, বেশ কয়েক বছর আগেই সিতওয়ে, পুরোনো আকিয়াব বন্দর শহরের বিমানঘাঁটি সংস্কার করে মিয়ানমার বিমানবাহিনী ১২টি মিগ-২৯বি জঙ্গি বিমান মোতায়েন করেছে৷ প্রতিরক্ষা জোরদার করার পাশাপাশি সীমান্তের প্রায় ৭০ মাইল কাঁটাতারের বেষ্টনী সম্পন্ন করেছে৷ বাকি অংশেও বেষ্টনী গড়ে তোলার পথে রয়েছে৷ তৈরি করেছে সীমান্ত এলাকায় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের পথ৷ টহলের এবং ত্বরিতগতিতে শক্তি বাড়ানোর জন্য সীমান্ত যোগাযোগব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি করেছে৷ টহল ও পর্যবেক্ষণ চৌকিগুলোর মধ্যে যোগাযোগের জন্য কাঁটাতারের বেষ্টনীসহ উত্তর-পূর্বে চওড়া পাকা রাস্তার ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়েছে৷ এক কথায়, বর্তমানে মিয়ানমার বাংলাদেশের সীমান্তে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তাব্যবস্থা তিন স্তরে উন্নীত করেছে৷ পেছনে রয়েছে সেনাচৌকি, বিশেষ করে বুথিডংয়ের মঙ্গডোও অঞ্চলে আঞ্চলিক সেনাছাউনি গড়ে তোলা হয়েছে৷
মিয়ানমার ১৯৯২ সালের পর থেকে সার্বিকভাবে শুধু সামরিক শক্তি বৃদ্ধিই নয়, বাংলাদেশ সীমান্তে প্রতিরক্ষার যে ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, সে তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই৷ হালে বর্তমান সরকার ওই অঞ্চলে একটি নতুন সেনাছাউনি গড়ে তোলার কাজ হতে নিয়েছে৷ তবে সীমান্তরক্ষী বিজিবির বিওপিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির কোনো পরিকল্পনা নিয়েছে কি না, জানা যায়নি৷ এক্ষুনি যা প্রয়োজন, অতিরিক্ত সেনাছাউনি, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে শুধু বিজিবির শক্তি বৃদ্ধিই নয়, প্রতিটি বিওপির সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন৷ যদিও কাজটি ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য কিন্তু দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় দেশের প্রতিরক্ষা ও জনগণের নিরাপত্তা জন্য সরকারের প্রাথমিক দায়িত্বের মধ্যে এ কাজ বর্তায়৷ শুধু পশ্চিম থেকে পূর্ব সীমান্তচৌকি বা বিওপিগুলোর পার্শ্বাভিমুখী যোগাযোগব্যবস্থাই নয়, এসব বিওপিকে সব সময় ও সব মৌসুমে সরবরাহের জন্য চট্টগ্রাম-টেকনাফ মহাসড়কের সমান্তরাল বান্দরবান অঞ্চল থেকে দক্ষিণমুখী সড়কযোগে নাইক্ষ্যংছড়িসহ প্রস্তাবিত সীমান্তসড়কের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনার জন্য সড়কের পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন৷ এসবই সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জোরদার করার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ৷
গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হিসেবে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের উন্নতি অবশ্যই প্রয়োজন৷ তবে সম্পর্কের উন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জোরদার করার বিকল্প নেই৷ ১৯৯২ সালের মিয়ানমার আর ২০১৪ সালের মিয়ানমারের মধ্যে প্রচুর তফাত রয়েছে৷ মিয়ানমার এখন আরও মারমুখী বলে মনে হয়৷ সমুদ্রসীমা সমস্যার নিষ্পত্তি হলেও সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, যা মিয়ানমারের ভাষায় উনদ্বীপ, হাতছাড়া হওয়ার বিষয়টি মিয়ানমারের কট্টরপন্থী সামরিক নেতারা সহজে মেনে নেয়নি বলে বিভিন্ন তথ্যে প্রকাশ৷ তার পরও বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে বিজয় উৎসব ইয়াঙ্গুনের আঁতে ঘা লেগেছে বলে মনে হয়৷ মিয়ানমার বিগত দুই দশকে সামরিক শক্তিতে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গিয়েছে, তা সীমান্ত তৎপরতা থেকে অনুমেয়৷ বিষয়টি সরকার ও জাতীয় নিরাপত্তা বিশারদদের মনে রাখা উচিত৷
বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন দুটি দেশের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির জন্য অত্যাবশ্যক, তবে তা কোনোভাবে জাতীয় নিরাপত্তার বিনিময়ে নয়৷ মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক উন্নয়নের অন্যান্য খাতে কোনো সমস্যা না থাকলেও যত দিন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের সমস্যা মিয়ানমার শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান না করবে, তত দিন মিয়ানমার-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার নয়৷ আর এ সমস্যা আজকের নয়৷ মিয়ানমার স্বাধীন হওয়ার আগ থেকেই ওই অঞ্চলে বিদ্রোহীদের তৎপরতা শুরু হয়েছিল, যা আজও অব্যাহত রয়েছে৷ রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও সীমান্ত নিরাপত্তার অন্তরায়৷ প্রয়োজনে এ সমস্যার সমাধানকল্পে দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার বিকল্প নিয়ে ভাবতে হবে৷ আন্তর্জাতিক সাহায্যের প্রয়োজন হলে সেই পথও অবলম্বন করতে হবে৷ এ সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে উত্তেজনা অব্যাহত থাকবে৷
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

ময়লা থাকে সাবানে by আনিসুল হক

পৃথিবীটা কতই সুন্দর হতো, দিনরাতগুলো কতই না নির্ভার হতো, জীবন কতই না মধুময় হতো, যদি সংবাদমাধ্যম না থাকত! পৃথিবীতে যত সমস্যার মূল হলো সংবাদ৷ আপনি ততক্ষণ ভালো, যতক্ষণ আপনি কোনো সংবাদ না জানছেন৷ নো নিউজ ইজ গুড নিউজ৷ আমাদের দেশে যাবতীয় সমস্যার মূলে আসলে সংবাদমাধ্যমগুলো৷ তারা আমাদের দেয় দুঃসংবাদ, এবং অবশ্যই তা দেয় ভুলভাবে, বানিয়ে, মিথ্যাকারে, অতিরঞ্জিত করে৷ যদি সংবাদমাধ্যম না থাকত, তাহলে আমরা অনেক ভুল-খারাপ খবর সম্পর্কে অনবহিতই থেকে যেতাম৷ ফলে, আমাদের দিবারাত্রিগুলো হতো পরম সুখময়৷ ধরা যাক, ডাক্তার আপনাকে বলল, আপনার লিভারে ক্যানসার হয়েছে, আপনার লিভার বদলাতে হবে৷ আপনার ঘুম হারাম৷ টাকাপয়সা লাগবে, লিভার বদলাবেন, তার পরও আপনি বাঁচবেন, আপনি নিশ্চিত নন৷ এই অবস্থায় আপনি গেলেন আরেকজনের কাছে, তিনি বললেন, কে বলেছে তোমার ক্যানসার, কিছুই হয়নি৷ যাও, তিন গেলাস পানি খাও, তুমি সেরে যাবে৷ আপনার জন্য ব্যাপারটা কী রকম স্বস্তির, কী রকম মুক্তির, কী রকম শান্তির বার্তা বয়ে আনবে৷

সংবাদমাধ্যমগুলো সেই সব ভুয়া চিকিৎসকের মতো, যারা আপনাকে সারাক্ষণ বলছে, আপনার অসুখ৷ এই অবস্থায় আপনাকে যেতে হবে তাঁর কাছে, যিনি বলবেন, কিছুই হয়নি৷ কিছুটা ষড়যন্ত্র ছাড়া৷ আপনি ভালো আছেন, ভালো থাকবেন৷ আমাদের পরম সৌভাগ্য যে আমাদের মাথার ওপরে ছায়া হয়ে আছেন এমনই সুসংবাদদাতারা৷ যাঁরা আমাদের পরম হতাশায় জোগান আশার আলো৷ যাঁরা আছেন বলেই আমরা জানতে পারি, আমরা শেষ হয়ে যাইনি, আমাদের আশা আছে, ভবিষ্যৎ আছে, মুক্তি আছে৷
যেমন ধরুন সোনায় ১৫ আনা খাদ মিশিয়ে আমরা দিয়েছি বিদেশি বন্ধুদের, এই ধরনের একটা বাজে খবরে আমাদের মুখটা বিস্বাদ হয়ে গিয়েছিল৷ আমরা খুবই বিব্রত হয়ে পড়েছিলাম৷ সেখান থেকে উদ্ধারের কোনো পথই আমরা খঁুজে পাচ্ছিলাম না৷ ঠিক সেই সময় পাওয়া গেল মধুরতম আশ্বাস, এসে গেল উজ্জ্বল উদ্ধার৷ সোনা কতটুকুন আছে এই নিয়ে কথা না বললেই তো হয়৷ বিদেশি বন্ধুদের তো আমরা অঙ্গীকার করিনি, কত তোলা সোনা আমরা দেব৷ এই নিয়ে খবর প্রকাশ করলেই তো আমাদের মাথা হেঁট হয়ে যায়৷ খবর প্রকাশ না করলেই হয়৷
তেমনিভাবে একটি পরিবারের বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা নানা অপবাদ দিয়ে আসছিল আমাদের গণমাধ্যমগুলো, আর ওই এলাকার লোকেরাও সেসব কথা বিশ্বাস করে তাঁকে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকেছিল৷ আমাদের বুকে জগদ্দল পাথরের মতো এই ব্যাপারটা চেপে বসেছিল, আমাদের গলায় বেঁধা মাছের কাঁটার মতো অস্বস্তি দিচ্ছিল৷ এক দলা সাদা ভাত গিললেই যেমন মাছের কাঁটা নেমে যায়, তেমনিভাবে নেমে গেল অস্বস্তিটা৷ আসলে তো ওই পরিবারটি সম্পর্কে অপপ্রচার করা হয়েছে, ষড়যন্ত্র করা হয়েছে৷ আসলে তো তিনি ফুলের মতো পবিত্র৷ তাঁকে বর্জন নয়, প্রতিরোধ নয়, তাঁকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে পরম মমতায়৷ ভালোবাসায়৷ এই রকম একটা চমৎকার সাহসী ব্যবস্থাপত্র পেয়েই মুহূর্তেই আমাদের দিনরাতগুলো মধুময় হয়ে উঠল৷
আসলে সংবাদমাধ্যমে ক্রমাগত মিথ্যাচারে আমাদের মধ্যে একটা ধারণা জন্মায়৷ আমরা সেই ধারণা নিয়ে চলি৷ আমরা কেউই জানি না, মীরজাফর আসলে মীরজাফরি করেছিল কি না৷ কেউই প্রত্যক্ষদর্শী নই৷ কিন্তু আমরা একটা ধারণা দিয়ে চালিত হই৷ এই ধারণা তো ভুলও হতে পারে৷ ভালো-মন্দ বিচারেই তো সমস্যা থাকতে পারে৷ এখন আমরা জানি, আমরা ভুল জানতাম৷ ভুল জানাটা দুঃখজনক, সবচেয়ে দুঃখজনক ভুলটা ভাঙিয়ে দেওয়ার পরেও সংশোধিত না হওয়া৷ আমরা অবশ্যই সংশোধিত হব৷ আমরা আর ওই পরিবারটিকে নিয়ে কোনো রকমের সন্দেহ প্রকাশ করব না৷ টুঁ শব্দটিও করব না৷ আমরা ওই পরিবারের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করব৷ তাদের মঙ্গলের জন্য নিজেদের সর্বস্ব বিসর্জন দেব৷
পণ্ডিতদের কথাও সব সময় শুনতে হয় না৷ এক পণ্ডিত, নাম অমর্ত্য সেন, বলেছেন, যে দেশে গণতন্ত্র আছে, আর যে দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা আছে, সে দেশে দুর্ভিক্ষ হতে পারে না৷ তিনি বলেছেন, দেশের কোথাও খাদ্যাভাব দেখা দিলে তা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হবে, আর সরকারকে যেহেতু ভোটের জন্য আগামীবার জনগণের দুয়ারে হাজিরা দিতে হবে, কাজেই সরকার দ্রুতই অভাবী অঞ্চলে খাদ্যশস্য পৌঁছানোর জন্য ব্যবস্থা নেবে৷ কাজেই দুর্ভিক্ষ হতে পারে না৷ তিনি পণ্ডিত মানুষ৷ সরলহৃদয়৷ বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের নিম্নমান সম্পর্কে তিনি ধারণাই রাখেন না৷ বাংলাদেশের কোনো অঞ্চলে কখনোই খাদ্যাভাব দেখা দিতে পারে না৷ যদি কোনো সংবাদমাধ্যম এই জাতীয় খবর প্রচার বা প্রকাশ করে, তার মানে হলো, তারা মিথ্যা বলছে এবং ষড়যন্ত্র করছে৷ তখন দেশপ্রেমিকের কর্তব্য ওই এলাকায় খাদ্যশস্য প্রেরণ করা নয়, এই জাতীয় খবর প্রচারের পেছনের ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটিত করে তাদের কালো হাত গুঁড়িয়ে দেওয়া৷ কে কোন হীনস্বার্থে এই ধরনের মিথ্যা খবর রচনা ও রটনা করতে পারে, তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ও সক্রিয় হওয়া৷ আর ভবিষ্যতে ভোটের জন্য এলাকাবাসীর কাছে যাওয়া, আমরা এতটাই স্মার্ট যে সেই কাজ আমাদের করতে হয় না৷ ভোটের জন্য আমাদের কারও দুয়ারে যাওয়ার দরকারই পড়ে না৷
পরিশেষে আমরা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন থেকে শিক্ষা নেব৷ ঈশ্বরচন্দ্র ছেলেবেলায় কলকাতায় একটা বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন৷ সেখানে তাঁর বাবাও থাকতেন, এলাকা থেকে লোকজনও এসে সেখানেই উঠত৷ রান্না করতেন বালক ঈশ্বরচন্দ্র৷ কলকাতার ঘুপচি গলির অন্ধকারের নিচতলায় তাঁদের আশ্রয়৷ দিনের বেলাতেও কিছুই যেন দেখা যায় না৷ একদিন সবাই মিলে খেতে বসেছেন৷ পরিবেশন করছেন বালক বিদ্যাসাগর নিজে৷ হঠাৎ বিদ্যাসাগর দেখলেন, খাবারের হাঁড়িতে একটা তেলাপোকা৷ এখন এই তেলাপোকার জন্য পুরো খাবার ফেলে দিলে সবাই মিলে অভুক্ত থাকতে হবে৷ ঈশ্বরচন্দ্র এক থাবা দিয়ে তেলাপোকাটা তুলে নিয়ে মুখে পুরলেন এবং চিবিয়ে খেয়ে ফেললেন৷ এটাই হওয়া উচিত আমাদের আদর্শ৷ আমরা যদি দেখি কোথাও কোনো তেলাপোকা, তাহলে সেটা রাষ্ট্র করে বেড়াব না৷ সেটা আমরা গিলে খেয়ে ফেলব৷
তাহলেই আমাদের দিনরাত্রিগুলো নিরুপদ্রব, নিষ্কণ্টক, আনন্দময় ও নির্বিঘ্ন হবে৷
আপনি পরিষ্কার হাত নিয়ে বেসিনে যান, আর হাতে সাবান দিন৷ ময়লা বের হবেই৷ কাজেই ময়লা হাতে থাকে না, ময়লা থাকে সাবানে৷
আমরা সাবান বর্জন করব৷
আমরা সুখে থাকব৷
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

পুলিশের আটক-বাণিজ্য- দায়ী ব্যক্তিদের আগে ধরুন, পরে মধ্যস্থতাকারী

পুলিশের আটক-বাণিজ্য ও টাকাপয়সা লেনদেনের মাধ্যমে আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি যে সরকারিভাবেই স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে, তা আগেই স্পষ্ট হয়েছে। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে এর সঙ্গে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি এই আটক-বাণিজ্যে ঘুষ লেনদেনের কাজে মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের নির্দেশনা কতটুকু ফল দেবে। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নির্দেশনার পর এই আটক-বাণিজ্যের মূল দায় যাদের, সেই পুলিশ বিভাগের সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া ও এ পর্যন্ত যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা খুবই দায়সারা।

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে দেওয়া চিঠিতে ১৭৫ জন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ নিজেদের মতো তদন্ত করে মাত্র ২৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে এবং সেটাও এখনো ‘বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ’ পর্যায়ে ঠেকে আছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তা খুবই গুরুতর। পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যদি এ ধরনের কাজে জড়িয়ে পড়েন, তবে শুধু রুটিন বা দায়সারা বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে ফল পাওয়া কঠিন। এ ধরনের অভিযোগের তদন্ত হওয়া উচিত স্বাধীন তদন্ত কমিটির মাধ্যমে এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি হওয়া উচিত দৃষ্টান্তমূলক।
পুলিশের এই বাণিজ্যে যাঁরা মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন জনপ্রতিনিধি ও পুলিশের সোর্স থেকে শুরু করে অসাধু সাংবাদিক পর্যন্ত। বোঝা যায় যে মিলেমিশে দুর্নীতি, অন্যায় ও অপকর্ম করার শিকড় কতটা বিস্তৃত। এখন পুলিশের আটক-বাণিজ্যের মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে র্যাবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ বাহিনীর যাঁরা আটক-বাণিজ্য করলেন, ঘুষ নিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ছেড়ে দিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে যেহেতু এখনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়, তাই ঘুষ লেনদেনে মধ্যস্থতা করেছেন যাঁরা, তাঁদের বিরুদ্ধে নেওয়ার বিষয়টি কতটা কাজে দেবে, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। অন্যদিকে, আটক-বাণিজ্যে যাঁদের বিরুদ্ধে দালালির অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে যে নতুন কোনো বাণিজ্য হবে না, সেটা কি নিশ্চিত করে বলা যাবে?
আমরা মনে করি, সরকার যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ ধরনের অপকর্ম ও অভিযোগ থেকে মুক্ত রাখতে চায়, তবে এর দায়ী সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দায়সারা তদন্ত বা ধামাচাপা দেওয়ার যে রীতি আমাদের দেশে চলে আসছে, তা থেকে অবশ্যই সরে আসতে হবে। বাহিনীগুলোর ভাবমূর্তির স্বার্থেই এটি করতে হবে। পুলিশের আটক-বাণিজ্যের বিষয়টিকে সরকার গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে বলেই নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দুই দফা এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলো। কিন্তু পুরোনো প্রক্রিয়ায় এসব উদ্যোগ কোনো কাজেই দেবে না।

ফুটবল ও রাজনীতি- ফুটবল, গণতন্ত্র ও বিরোধী দল by এ কে এম জাকারিয়া

বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র কী? ভারত, নাকি ফুটবল? ভারতের নির্বাচন শেষ হয়েছে। মোদির শপথ, নতুন সরকার গঠন—এসব কাজও সারা। ভারতকে আপাতত আমরা একটু রেহাই দিই। এখন বিশ্বকাপের সময়, মানে ফুটবলের। সবই এখন ফুটবলময়। ফুটবলই এখন সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র। গত বিশ্বকাপের (২০১০) আগে ফুটবল-বন্দনা করতে গিয়ে টাইম সাময়িকী তাদের সম্পাদকীয় কলামে ফুটবলকে ‘সবচেয়ে গণতান্ত্রিক খেলা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। তাদের যুক্তিটা ছিল অনেকটা এ রকম: ‘এটা যেকোনো জায়গায় প্রায় যেকোনো বস্তু দিয়ে খেলা সম্ভব। ফুটবল না পাওয়া গেলে একটি টিনের ক্যান, এক টুকরা পাথর বা এক জোড়া মোড়ানো মোজা—ফুটবল খেলার জন্য সবই সই। এ খেলা খেলতে কোনো সাজসরঞ্জাম লাগে না, কোনো প্যাড বা হেলমেটেরও দরকার নেই। এমনকি এর জন্য কোনো খেলোয়াড়ের ছয় ফুট আট ইঞ্চি লম্বা হওয়ারও দরকার নেই। আপনাকে শুধু একটু ক্ষিপ্রগতির আর তুখোড় হলেই হবে। আর থাকতে হবে প্রচুর প্র্যাকটিস করার ইচ্ছা। দুনিয়ার যেকোনো দেশ, যেকোনো ধর্ম, যেকোনো গোত্র বা যেকোনো অর্থনৈতিক অবস্থা থেকেই উঠে আসুক না কেন, ফুটবলে গ্রেট খেলোয়াড় হতে তা কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।

টাইম সাময়িকীর এই মন্তব্যের সূত্র ধরে তখন একটি লেখা লিখেছিলাম (ফুটবল কি ‘সবচেয়ে’ গণতান্ত্রিক খেলা? প্রথম আলো, ১৯ জুন ২০১০)। ফুটবল গণতান্ত্রিক, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। আবার ফুটবলের যে মাহাত্ম্যের কারণে আমরা একে গণতান্ত্রিক বলছি, সেই একই কারণে একে সাম্যবাদী খেলা হিসেবে ব্র্যান্ডিং করলেও ভুল হবে না। সাম্যবাদের দিনকাল এখন খারাপ, তাই গণতন্ত্রের সঙ্গে ফুটবলকে মেলানোই সম্ভবত ভালো। তবে ফুটবল ‘সবচেয়ে’ গণতান্ত্রিক কি না, সেই বিতর্কটাই ছিল এ লেখার বিষয়। কারণ, তখন এর বিরোধিতায় মাঠে (খেলার মাঠ নয়) নেমেছিলেন ম্যারাথন দৌড়বিদ এমবি ব্রুফুট৷
‘ফুটবল সবচেয়ে গণতান্ত্রিক খেলা হতেই পারে না’—টাইম সাময়িকীর সম্পাদকীয় আর লেখাগুলোর বিরোধিতা করেছেন ১৯৬৮ সালে বোস্টন ম্যারাথনে বিজয়ী এই দৌড়বিদ। তাঁর কাছে কোনটি সবচেয়ে গণতান্ত্রিক? খেলাটি অবশ্যই দৌড়। ‘দৌড়ানোর জন্য কোনো সাজসরঞ্জাম লাগে না, একাই দৌড়ানো যায়, অন্য কোনো খেলোয়াড়ের দরকার হয় না। আপনি তৈরি হবেন আর দৌড়ানো শুরু করবেন। এমনকি আপনি যদি চান বোস্টন, নিউইয়র্ক, শিকাগো, লন্ডন বা অন্য কোনো বড় ম্যারাথনেও বিশ্বসেরাদের সঙ্গে দৌড়াতে পারবেন। আরও কিছু দরকার? আপনার চারপাশে দেখবেন দৌড়াচ্ছে অসংখ্য নারী।’—এই ছিল তাঁর যুক্তি।
তবে এখন সময়টা ফুটবলের, সব পক্ষপাত ফুটবলেই থাক। ‘এটাই দুনিয়ার সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র। সবখানে ও সব ধরনের মানুষ এই খেলা খেলে, উপভোগ করে এবং তাদের মনোযোগের মধ্যে থাকে।’ ফুটবল লেখক ও বিশেষজ্ঞ জেসি ফিঙ্কের এই বক্তব্যকেই আমরা ফুটবল-পাগলামির এই সময়ে সঠিক মেনে নিই। তবে ফুটবল কি শুধু নিজেই ‘গণতান্ত্রিক’ হয়ে বসে আছে, নাকি রাজনৈতিক দুনিয়ার যে ‘গণতন্ত্র’, তার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে? গণতান্ত্রিক-রাজনৈতিক আন্দোলন বা গণতন্ত্রের বিকাশ ও সংগ্রামে ফুটবলের কোনো ভূমিকা থাকবে না, তা তো হতে পারে না!
গত বিশ্বকাপের (২০১০) আয়োজক দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা দিয়ে শুরু করি। তখন কিউবার ক্রীড়া লেখক অ্যারিয়েল বি কয়া দেশটির রাজনৈতিক অতীত এবং এর সঙ্গে ফুটবলের সম্পর্ক মিলিয়ে একটি লেখা লিখেছিলেন ‘ফুটবলের জাদুকরি শক্তি’ শিরোনামে। লেখাটি তিনি শুরু করেছেন সেই রুবেন দ্বীপ দিয়ে, কেপটাউনের মুখোমুখি যে দ্বীপে একসময় আটকে রাখা হতো সে দেশের বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামীদের। ম্যান্ডেলার সেখানে কেটেছে ১৮ বছর। অ্যারিয়েল লিখেছেন, যাঁরা রুবেন দ্বীপে পা রেখেছেন তাঁরা বলেন, এর দেয়ালঘেরা কারাগার আর তার মধ্যে জমানো স্মৃতির মতোই দ্বীপটির মাটিও যেন ধূসর। এই ধূসরতা যেন এর ইতিহাসেরই রং। ...যাঁরা সেখানে গিয়েছেন, তাঁরা এ–ও বলেন, ফুটবল খেলাকে ঘিরেই বন্দী বিদ্রোহীরা নিজেদের ফিরে পেত। বন্দিত্বের হতাশার মধ্যে সেটাই ছিল একমাত্র মুক্ত জিনিস। শ্বেতাঙ্গ জেলারদের খেলা রাগবি ও ক্রিকেটের বিরুদ্ধে তারা বেছে নিয়েছিল ফুটবল। ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার সংবিধানের খসড়া তৈরিতে অংশ নেওয়া টোকিও শেক্সওয়েল ছিলেন সেই কারা ফুটবল দলের সদস্য। তাঁর কথায়, ‘সত্যিকারভাবে বললে সেই খেলায় নিয়মকানুনের বালাই ছিল না। তবু সেই ফুটবল খেলাই আমাদের উদ্দীপ্ত ও আশাবাদী রাখত। আমরা যে বেঁচে আছি, তা এভাবেই টের পেতাম এবং ভেঙে পড়তাম না।’
ফুটবল তো শুধু গণতান্ত্রিক খেলাই নয়, প্রতিবাদেরও বড় শক্তি! বিশ্বকাপের এবারের আয়োজক দেশ ব্রাজিল। আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এক দেশ। বিশ্বকাপ আয়োজনের শক্তি-সামর্থ্য তো আর সব দেশের থাকে না। আমাদের অনেকের কাছেই ব্রাজিল আর ফুটবল মিলেমিশে একাকার। তবে ‘গণতান্ত্রিক’ খেলা ফুটবল নিয়ে এত মতামাতি যে দেশটিতে, দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেই গণতন্ত্রের বাইরেই থাকতে হয়েছে তাদের। ১৯৬৪ সালে চেপে বসা সামরিক শাসন হটেছে ১৯৮৫ সালে। সামরিক শাসকেরা এমনিতে হটে না, তাদের হটাতে হয়। এই আন্দোলনে জোরালোভাবেই শামিল ছিল ফুটবল।
১৯৮৩ সালের ঘটনা। ব্রাজিলের সাও পাওলোর মোরুম্বি স্টেডিয়ামে স্থানীয় চ্যাম্পিয়নশিপে শক্তিশালী সাও পাওলোর বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে করিন্থিয়ানস ক্লাব। দলটির খেলোয়াড়দের হাতে এক বড় ব্যানার: ‘হারি বা জিতি, আমরা সব সময় গণতন্ত্রের পক্ষে’। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ব্রাজিলজুড়ে তখন আন্দোলন জোরালো হতে শুরু করেছে। ফুটবল হয়ে ওঠে গণতন্ত্র উদ্ধারে আন্দোলনের এক বড় শক্তি।এর এক বছরের মাথায় ১৯৮৪ সালে সরাসরি ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দাবিতে ‘ডিরেক্ট (ইলেকশন) নাউ’ এই আন্দোলন চরমে পেঁৗছায়। ফলাফল, ১৯৮৫ সালে সরাসরি নির্বাচন এবং গণতন্ত্রের পথে যাত্রা।
গণতন্ত্রের আন্দোলনে মাঠে নেমেছিল যে করিন্থিয়ানস ক্লাব, সেটি ১৯৮২ সালে স্পেন বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলের নেতৃত্ব দেওয়া মেডিসিনে ডক্টরেট ‘ডক্টর সক্রেটিস’-এর দল। ফুটবল নিয়ে গণতন্ত্রের আন্দোলনের শুরুটাও করেছিলেন এই ‘অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার’। তবে দেশ নয়, সক্রেটিস শুরুতে নেমেছিলেন ক্লাবের ভেতরের ব্যবস্থাপনা, গণতন্ত্র ও নির্বাচন—এসব নিয়ে৷ দলের সহযোদ্ধাদের নিয়ে আন্দোলনে নেমে তিনি দলে গণতন্ত্র কায়েম করে ছেড়েছিলেন৷ সক্রেটিসের ভাষ্য: ‘দলের সবার ভোট দেওয়ার একই অধিকার ছিল। ক্লাবের নানা সামগ্রীর রক্ষণাবেক্ষণ যে করত, সেই ব্যক্তিটি থেকে দলের প্রেসিডেন্ট, সবার ভোটের মূল্য ছিল এক।’
গণতন্ত্রের জন্য একটি ফুটবল দলের ভেতরকার এই আন্দোলন তখন গণমাধ্যমে পরিচিতি পায় ‘করিন্থিয়ানস ডেমোক্রেসি’ হিসেবে। পরে তা দেশের গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার আন্দোলনের সঙ্গে মিলেমিশে যায়। ফুটবলের শক্তি কাজে লাগে গণতন্ত্রের সংগ্রামে। দলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর গণতন্ত্রের পক্ষে ব্যানার নিয়ে মাঠে নামা শুরু করে করিন্থিয়ানস ক্লাব। এসব নিয়ে ডেমোক্রেসি ইন ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট নামে একটি ছবি তৈরি হয়েছে গত বছর। এর পরিচালক পেদ্রো অ্যাসবেগ বিবিসিতে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত গণতন্ত্রের জন্য করিন্থিয়ানস ক্লাবের এই আন্দোলনের ঘটনা খুবই অনন্য। ফুটবলের ইতিহাসে এ ধরনের উদাহরণ
আর নেই।
‘গণতান্ত্রিক’ খেলা ফুটবল হাজির থেকেছে গণতন্ত্রের সংগ্রামেও। গণতন্ত্র ও ফুটবল নিয়ে ফুটবল লেখক ও বিশেষজ্ঞ জেসি ফিঙ্কের একটি উদ্ধৃতি আগেই উল্লেখ করেছি। ফিফার নির্বাচন নিয়ে তাঁর একটি কলামের শিরোনাম হচ্ছে, ‘ফুটবল মানে গণতন্ত্র আর গণতন্ত্রে দরকার বিরোধী পক্ষ’। বিশ্বকাপ ফুটবল, ফুটবল ও গণতন্ত্র—এসব আলোচনায় আমাদের বাংলাদেশের জায়গা কোথায়? বিশ্বকাপ উত্তেজনায় শামিল থাকলেও বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজনেও নেই, প্রতিযোগিতায়ও নেই। ‘গণতান্ত্রিক’ খেলা ফুটবল বাংলাদেশে খুব সুবিধা করতে পারছে না। কিন্তু দেশের গণতন্ত্র? তার কী অবস্থা? নব্বইয়ের পর নির্বাচন আর গণতন্ত্র—এসব নিয়ে গণতন্ত্রের বিশ্ব আসরে বাংলাদেশ যে জায়গা করে নিতে শুরু করেছিল, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন তার বারোটা বাজিয়েছে। গণতন্ত্রের জন্য ‘বিরোধী পক্ষ’ একটি দরকারি বিষয় হলেও তা থেকে বাংলাদেশ এখন অনেক অনেক দূরে।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

গুয়ানতানামোর অজানা ৭ তথ্য

আফগানিস্তানে বন্দী একজন মার্কিন সেনার বিনিময়ে পাঁচজন কুখ্যাত তালেবান জঙ্গি নেতাকে মুক্তি দিয়ে আবার আলোচনায় চলে এসেছে গুয়ান্তানামো বে। গত সপ্তাহের প্রায় পুরোটাই আলোচনা ছিল কুখ্যাত এ কারাগার নিয়ে। আফগানিস্তানে বন্দী মার্কিন সেনাসদস্য সার্জেন্ট বো বার্গদাহলকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে পাঁচজন জ্যেষ্ঠ তালেবান বন্দীর মুক্তির পর। কিউবার দক্ষিণাঞ্চলের একটি সেনাঘাঁটিতে তাঁরা বন্দী ছিলেন। মার্কিন আইনপ্রণেতারা প্রশাসনের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, বন্দীদের মুক্তি দিতে তাঁদের বাধ্যতামূলক ৩০ দিনের নোটিশ দেওয়া হয়নি। তবে মার্কিন প্রশাসন বলছে, তাঁদের দ্রুত কাজ করতে হয়েছে। কারণ বার্গদাহলের স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছিল। প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার বলেন, ‘আরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বন্দী সরানোর বিষয়টি নানা পর্যায়ে অবেক্ষাধীন রয়েছে। এ বিষয়ে চলতি বছরে ব্যাপক অগ্রগতি দেখা যাবে বলে আমি মনে করি।’

গুয়ানতানামো বে কারাগার নিয়ে যখন এত কথা হচ্ছে, তখন এ কারাগার সম্পর্কে সাতটি তথ্য জেনে নিই:

ইতিহাস
৯/১১-এর পরবর্তী সময়ে ‘শত্রু যোদ্ধা’দের আটক রাখতে ২০০২ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এ কারাগার চালু করেন। দক্ষিণ কিউবায় অবস্থিত মার্কিন সেনাঘাঁটিতে এ কারাগার অবস্থিত। ১৯০৩ সালের হাভানা চুক্তির আওতায় কিউবা থেকে ইজারা নিয়ে মার্কিন ঘাঁটি তৈরি করা হয়।
কারাগারটি চালু করার পর থেকে বেশ দ্রুত এর কুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সারা দুনিয়ায়। খাঁচার ভেতর বেড়ি ও হাতকড়া পরা কয়েদিদের ছবি প্রকাশিত হওয়ার পর এ কারাগার ঘৃণার প্রতীক হিসেবে পরিচিত হয় মানুষের কাছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বারবার এ কারাগার বন্ধ করার ঘোষণা দিলেও কংগ্রেসের বাধার কারণে তাঁর উদ্যোগ আংশিক ব্যাহত হয়। কংগ্রেস এ কারাগার যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর করতে চায়নি।
বন্দী যাঁরা
বর্তমানে ওই কারাগারে বন্দীর সংখ্যা ১৪৯ জন। এর মধ্যে ৭৮ জনকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি না হওয়ায়’ মুক্তি দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫৮ জন ইয়েমেনি, পাঁচজন তিউনিসিয়ান, চারজন আফগান ও চারজন সিরীয় নাগরিক রয়েছেন।
বাকি ৭১ জন বন্দীর ১০ জন ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ সেনা কমিশন কর্তৃক অভিযুক্ত হয়ে বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আর ৩৮ জনকে মামলা পুনর্বিবেচনা করার জন্য যোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। গত সপ্তাহে মুক্তি পাওয়া পাঁচজন তালেবান নেতা এই ৩৮ জনের মধ্যে ছিলেন।
বিচার ও দণ্ড
২০০৬ সালে বিশেষ সেনা কমিশন গঠনের পর থেকে আটজনকে বিচারের মুখোমুখি করে অভিযুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ছয়জনের অপরাধ প্রমাণিত হয়। ফেডারেল কর্তৃপক্ষ এর মধ্যে দুজনের শাস্তি মওকুফ করে। দুটি ক্ষেত্রে আপিল করা হয়। শেষ পর্যন্ত চারজনকে নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়। একমাত্র তানজানিয়ার নাগরিক আহমেদ আল ঘালিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন। ১৯৯৮ সালে আফ্রিকায় মার্কিন দূতাবাসে হামলার দায়ে অভিযুক্ত তিনি।
কোথায় গেলেন তাঁরা?
এর বাইরে যেসব বন্দী ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ১৯টি দেশের নাগরিক ছিলেন। একজনকে দেখানো হয়েছে রাষ্ট্রহীন হিসেবে। সেখানে ইয়েমেনের ৮৭, আফগানিস্তানের ১২, সৌদি আরবের ১১ জন এবং অন্যান্য দেশ—যেমন মিসর, রাশিয়া, পাকিস্তানের কয়েকজন নাগরিক ছিলেন। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়নি, তাঁদের তৃতীয় কোনো দেশে ফেরত পাঠাতে চেয়েছিল প্রশাসন, অনেক বন্দীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হলেও কাউকে কাউকে আলবেনিয়া, আলজেরিয়া, বারমুডায় গৃহবন্দী হিসেবে রাখা হয়।
ব্যয়
মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, গুয়ানতানামোয় একজন বন্দীকে রাখতে বছরে খরচ হয় ২৭ থেকে ২৮ লাখ মার্কিন ডলার। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে অত্যাধুনিক কারাগারে একজন বন্দীকে রাখতে খরচ হয় ৭৮ হাজার ডলার।
মুক্ত ব্যক্তিদের অপরাধপ্রবণতা
গুয়ানতানামো থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের ওপর কড়া নজর রাখে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েকটি পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ছাড়া পাওয়া ব্যক্তিদের ৩০ শতাংশই পশ্চিমাদের ওপর হামলার মাধ্যমে প্রতিশোধ নিতে পুরোনো জঙ্গি সংগঠনে ফেরত যান। একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, অপরাধী হিসেবে শনাক্ত এবং সন্দেহভাজন উভয়ের ক্ষেত্রেই এটা দেখা যায়। তিনি বলেন, মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের ১৬ শতাংশ যুদ্ধক্ষেত্রে ফেরত যাওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত এবং ১২ শতাংশের বিষয়ে ধারণা করা হচ্ছে।
সুপরিচিত বন্দী
এখনো গুয়ানতানামো কারাগারে বন্দী রয়েছেন কয়েকজন সুপরিচিত জঙ্গি নেতা। এঁদের একজন খালিদ শেখ মোহাম্মদ। খালিদ নিজেকে ৯/১১-এর মূল পরিকল্পক বলে দাবি করেন।
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জঙ্গি হামলায় সন্দেহভাজন আরও চারজন রয়েছেন। বন্দীদের আরেকজন সৌদি নাগরিক আবদাল রহিম আল নাসিরি। তাঁর বিরুদ্ধে ‘লিমবার্গ হামলায়’ নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আটক এ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ হতে পারে। এএফপি।

নদীকেন্দ্রিক নিম্নবর্গ মানুষের দুঃখগাথা by বীরেন মুখার্জী

‘তিতাস একটি নদীর নাম। তার কূলজোড়া জল, বুকভরা ঢেউ, প্রাণভরা উচ্ছ্বাস। স্বপ্নের ছন্দে সে বহিয়া যায়। ভোরের হাওয়ায় তার তন্দ্রা ভাঙ্গে, দিনের সূর্য তাকে তাতায়; রাতে চাঁদ ও তারারা তাকে নিয়া ঘুম পাড়াইতে বসে, কিন্তু পারে না।’ এ কথাগুলো ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের শুরুতে লিখেছিলেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। বাংলা সাহিত্যে নদীকেন্দি ক উপন্যাসের মধ্যে নিুবর্গ মানুষের আখ্যানসমৃদ্ধ ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ অমরকীর্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। নদী অববাহিকায় বসবাসরত মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে এ উপন্যাসে। ‘ধীবর’ বা ‘মালো’ সম্প্রদায়ের মানুষ হিসেবে অদ্বৈত মল্লবর্মণ গভীর অন্তর্দৃষ্টিতে দেখেছেন এ সমাজের জীবনসংগ্রামের নিষ্ঠুর চিত্র। বলা যায়, প্রতিকূল সংঘাতে ক্ষুয়িষ্ণু ‘মালো’ জীবনের সারাৎসার তিনি আঁকতে সক্ষম হয়েছেন এ উপন্যাসে। বিশ শতকের বাংলা উপন্যাসে যে দুটি ধারা বহমান তারই একটি হচ্ছে ‘নিুবর্গ মানুষের আখ্যান’। একটু পেছন ফিরলে দেখা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘কল্লোল’ (১৯২৩) গোষ্ঠীর কথাসাহিত্যিকরা তাদের লেখায় নিুবর্গের জীবন তুলে ধরতে সচেষ্ট হন। নরেশচন্দ সেনগুপ্ত, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ মিত্র প্রমুখের রচনায় নিুবর্গের মানুষের জীবন রূপায়ণে অভিজ্ঞতাপ্রসূত ধারার সূচনা ঘটে। তবে কথাসাহিত্যে নিুবর্গের জীবনবৈচিত্র্য রূপায়ণে তিন বন্দ্যোপাধ্যায় তথা মানিক, তারাশঙ্কর ও বিভূতিভূষণের দক্ষতা অপরিসীম। গবেষক ড. মিল্টন বিশ্বাস বলেন, ‘বিংশ শতাব্দীর পরিবর্তনশীল আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে তাদের সাহিত্যকর্ম হয়ে ওঠে নবতর সমাজভাবনার শিল্পমণ্ডিত রূপ। সামাজিকভাবে নিচু কিংবা যারা উচ্চবর্গের কাছে অপ্রধান জনগোষ্ঠী, তাদের জীবনের বাস্তবতা, জৈবপ্রবৃত্তি, নর-নারী সম্পর্কে প্রচলিত নীতিশাসন-বহির্ভূত আচরণ, উচ্চবর্গের শোষণ-শাসন ও এর প্রতিক্রিয়ায় প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, জীবনাচার, সংস্কার ও জীবনযাপনের রীতি-পদ্ধতির সম্যক উন্মোচন লক্ষ্য করা যায় এসব উপন্যাসে।’ বলা যায়, অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে নিুবর্গের আখ্যান তুলে ধরা এ ধারাবাহিকতারই অংশ।
‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের বিষয়বস্তু নির্বাচন, চরিত্র-চিত্রণ এবং প্রকাশভঙ্গিগত কারণে এ উপন্যাসের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ নেই। অদ্বৈত মল্লবর্মণের জীবনীকার অধ্যাপক শান্তনু কায়সারের মতে- ‘তিতাস জীবনের শেকড় প্রাকৃত জীবনের গভীরে প্রোথিত। এ প্রাকৃত জীবনকে বাইরে থেকে যতই সরল দেখাক, এর ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে, তা বহু ভঙ্গিমা বৈচিত্র্যের অধিকারী। সারল্যের মধ্য দিয়ে এ বৈচিত্র্যের অনুসন্ধান করেছে ঔপন্যাসিক ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে। ফলে নদীকেন্দি ক বাংলা সাহিত্যের উপাদানগুলোর মধ্যে অন্য যে উপন্যাসটি প্রাকৃত জীবনকে ধারণ করেছে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত সেই ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র সঙ্গে তুলনা করলেও ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসটি অনন্য হয়ে ওঠে।’
অস্বীকার করা যাবে না, নদী অববাহিকায় বসবাসরত ধীবর সম্প্রদায়ের মানুষ মাছ ধরে নৌকা বেয়ে জীবন অতিবাহিত করে। জীবন-জীবিকার জন্য এ শ্রেণীর মানুষ দিনরাত পরিশ্রম করলেও প্রাচুর্যের মুখ কখনও দেখে না। অভাব-অনটন আর তাদের জীবন যেন একই সুতোয় গাঁথা। তবু এ দুঃখ দারিদ্র্যপূর্ণ জীবনে আসে প্রেম-ভালোবাসা। সেখানেও নিরবচ্ছিন্ন সুখ মেলে না। সংসার জীবন কাটে দুঃখ দারিদ্র্যে। অদ্বৈত মল্লবর্মণ সেই দৈন্যপীড়িত মানুষের মুখ এঁকেছেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে। এ উপন্যাসে ফুটে উঠেছে- মৎস্যজীবীদের জীবন কষ্টের হলেও নির্বিঘ্ন নয়। প্রাকৃতিক নিয়মে এক সময় নদীতে চর পড়ে। নদী তার যৌবন হারায়। সেই সঙ্গে শেষ হয় নদীর মাছ ও জলের তরঙ্গ। নিরুপায় জেলেরা বেঁচে থাকার তাগিদে তাদের যুগ-যুগান্তরের আবাস ছেড়ে জীবিকা অন্বেষণে অন্যত্র পাড়ি জমায়। আবার কেউ উপায়ান্তর না পেয়ে সেখানেই থেকে যায়। তখন তাদের দুঃখের সীমা আরও দীর্ঘায়িত হয়। এ যেন এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। অসহায় তিতাসপাড়ের এসব দরিদ্র মানুষের দীর্ঘশ্বাস চিত্রিত হয়েছে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে।
এ উপন্যাসের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে তিতাশ চৌধুরী তার ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণ ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- ‘পৃথিবীর সাহিত্যের ইতিহাসে অন্ত্যজ শ্রেণী থেকে উঠে আসা স্বশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত গাল্পিক ও ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণের মতো আর কেউ আছেন বলে আমার জানা নেই। সে জন্যই তার উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। এর সঙ্গে কারও উপন্যাসই মেলানো যায় না। গল্পও। তিনি যাদের মধ্যে থেকে বড় হয়েছেন তাদের কাহিনী নিয়েই উপন্যাসের ঘটনাবলি সাজানো হয়েছে। তিতাস নদীর তীরে জেলেদের গ্রাম। সে গাঁয়ে তারা যুগ যুগ ধরে বসবাস করে। তাদের জীবিকা নির্বাহ হয় তিতাসের বুক থেকে।’ ‘তিতাস’ যে পৃথক একটি সত্তা এবং ‘কঠিন বাস্তব ছাঁচে বানানো অপরূপ শিল্পিত জীবন গাঁথা’ সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না এ মূল্যায়নে। অদ্বৈত মল্লবর্মণ জীবন ঘষে রচনা করেছিলেন এ উপন্যাসটি। যা তাকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে গেছে। বাস্তবতা যে, তার জীবদ্দশায় উপন্যাসটি বই আকারে প্রকাশিত হয়নি।
প্রতিটি মানুষ বড় হয়ে ওঠে তার পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে। অর্জিত হয় নানা অভিজ্ঞতা। এ অভিজ্ঞতার সারাৎসার চিরন্তন রূপ দিতে পারেন শুধু দূরদৃষ্টিসম্পন্ন লেখক। অদ্বৈত মল্লবর্মণ মালোপাড়ায় জন্মেছিলেন। সেই মালোদের জীবনের সঙ্গে ছিল তার প্রাণের স্পন্দন। সঙ্গত কারণেই এ স্পন্দনকে তিনি যোগ্যতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন উপন্যাসে। রাইন, সীন বা দানিয়ুবের মতো ক্ষুদ্র নদী তীরে যেমন গড়ে উঠেছে নদীকেন্দি ক ইউরোপীয় সভ্যতা তেমনি তিতাসের তীরেও গড়ে উঠেছিল এক সৃষ্টিশীল জীবন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। উপন্যাসের ভূমিকায় যা তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও লিখেছেন- ‘কত নদীর তীরে একদা নীল-ব্যাপারীদের কুঠি-কেল্লা গড়িয়া উঠিয়াছিল। তাদের ধ্বংসাবশেষ এখনও খুঁজিয়া পাওয়া যায়। কত নদীর তীরে মোগল-পাঠানের তাঁবু পড়িয়া আছে, মগদের ছিপনৌকা রক্ত-লড়াইয়ে মাতিয়াছে- উহাদের তীরে তীরে কত যুদ্ধ হইয়াছে। মানুষের রক্তে হাতিঘোড়ার রক্তে সেসব নদীর জল কত লাল হইয়াছে। আজ হয়তো তারা শুকাইয়া গিয়াছে, কিন্তু পুঁথির পাতায় রেখা কাটিয়া রহিয়াছে। তিতাসের বুকে তেমন কোনো ইতিহাস নাই। সে শুধু একটা নদী।’
লক্ষণীয় যে, বাংলাভাষী ভূ-খণ্ডের আর্থ-সামাজিক সংস্থান, উৎপাদন কাঠামো, শ্রেণীবিন্যাস ও সমাজ বিবর্তনের ক্রমধারায় উপন্যাসে বিষয়বৈচিত্র্য ও চরিত্রচিত্রণে নিুবর্গের প্রাধান্য সুস্পষ্ট। নিুবর্গের বহুমাত্রিক আচরণ, জীবন বাস্তবতা, কৌমসংস্কৃতির সারবত্তা উপস্থাপিত হয়েছে ঔপন্যাসিকদের অনেক আখ্যানে। উপন্যাসের যাত্রালগ্নে সাধারণ মানব-মানবীর জীবন অবলোকন সূত্রে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিুবর্গের মানুষের জীবন উন্মোচিত হয়েছে। ‘আলালের ঘরের দুলাল’ এর ঠকচাচা, ‘কপালকুণ্ডলা’র নির্মম ধর্মসাধনায় নিয়োজিত কাপালিক, ‘ইন্দিরা’, ‘রজনী’, ‘বিষবৃক্ষ’ ও ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ উপন্যাসের নারী চরিত্রগুলো নিুবর্গের অন্যতম নিদর্শন। বিষবৃক্ষের হীরা দাসীর চরিত্রটি নারীর নিুবর্গত্বের ব্যতিক্রমী রূপায়ণ হিসেবে স্বীকৃত। রবীন্দ নাথ ঠাকুরের ‘চোখের বালি’র বিনোদিনী নিরাশ্রয় নারীর নিুবর্গত্বকে প্রকাশ করে। অদ্বৈত মল্লবর্মণ ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে সরাসরি মালো জীবনের দুঃখগাথা অঙ্কন করেছেন। এ সম্প্রদায়ের জীবন যথাযথ রূপায়ণের যে চেষ্টা এ উপন্যাসে দেখা যায় তা অত্যন্ত বাস্তব। তিতাস তীরবর্তী গ্রামগুলোর সবুজের ছড়াছড়ি ও পাকা ধানের মাদকতাময় গন্ধ পাঠককে নিয়ে যায় ভিন্ন এক জগতে। সেই সঙ্গে পাঠকের সামনে উন্মোচিত হয় সহজ-সরল গ্রাম্য মানুষের মুখচ্ছবি। ছোট-বড় অনেক চরিত্রের সমন্বয়ে এ উপন্যাস রচিত। অদ্বৈত সৃষ্ট কিশোর, সুবল, অনন্ত, বনমালী প্রমুখ অসংখ্য চরিত্র স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল। এ চরিত্রগুলোর মাধ্যমে মালো জীবনের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় তিনি তুলে ধরেছেন। তুলে ধরেছেন তাদের দুঃখ-দুর্দশা, অভাব-অনটনে বিপর্যস্ত জীবন। বিভিন্ন মত-পথ, ধর্ম-বর্ণের লোক কীভাবে একত্রে পরম ধৈর্যের সঙ্গে কষ্টগুলো অতিক্রম করে যেতে পারে পারস্পরিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে- তা স্পষ্ট হয় এ উপন্যাসে। চরিত্রগুলোর মুখে আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ ও যথাযথ পরিবেশ বর্ণনার চেষ্টায় সফল হয়েছেন ঔপন্যাসিক।
‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাস সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ঔপন্যাসিকের সতীর্থ অধ্যাপক সুবোধ চৌধুরী বলেন- ‘আমি তিতাস দেখেছি। আমি সমুদ্র দেখেছি, পাহাড় দেখেছি। অনেক বিচিত্রতর মানুষের সঙ্গে মিশেছি। কিন্তু অদ্বৈত মল্লবর্মণের ছিল মানুষ সম্পর্কে সুগভীর ওহংরমযঃ, এমনটি আমাদের ছিল না। আমরা দেখেছি, দর্শকের মতো, ভালো হয়তো লেগেছে। তবে অদ্বৈত সবটুকু দেখেছেন শিল্পীর চোখে। তার সত্তার সঙ্গে তিতাস ছিল মিশে। এটা পৃথক করতে পারেননি তিনি, চানওনি। তার ওপর ছিল তার উদার দৃষ্টিভঙ্গি। ...প্রথম যখন পাণ্ডুলিপি জমা দিয়েছিলেন, আমি বলেছিলাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখলেন ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, আর কি তোমার বই নেবে? অদ্বৈত বললেন- সুবোধ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বড় Artist, Master artist কিন্তু বাওনের পোলা, রোমান্টিক। আর আমি তো ‘জাউয়ার পোলা’। আর কিছু বলেননি। পরিচয়ের এ প্রত্যক্ষতাই ছিল তার গৌরবের ভিত।’
ফলে এ কথা বলা বোধ করি অত্যুক্তি হয় না, গোকর্র্ণ গ্রামের ধীবর সম্প্রদায়ের জীবনচর্চা যে আন্তরিক মমতায় অদ্বৈত মল্লবর্মণ তুলে এনেছেন তার উপন্যাসে, তার তুলনা বাংলা সাহিত্যে বিরল। লেখক তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে এক উপেক্ষিত সমাজের জীবন সংগ্রামের এ কাহিনীকে দিয়েছেন অবিনশ্বরতা। চার খণ্ড ও দুটি পরিচ্ছদে রচিত এ উপন্যাসে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ পর্বে তিতাস নদীর বৈশিষ্ট্য, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তিতাস পাড়ের মালোদের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের চিত্র বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে আছে গৌরাঙ্গসুন্দর আর নিত্যানন্দ নামে দুই মালোর জীবন সংগ্রামের কাহিনী। এরাই অনন্তের মাকে নিয়ে যায় গোকর্ণঘাটে। গৌরাঙ্গ মালোর জীবন দারিদ্র্যে পিষ্ট এবং তার দিন আর চলে না তার উপস্থাপনা রয়েছে। গৌরাঙ্গের জীবনচিত্র থেকে সহজেই বোঝা যায়, তিতাসের জলের সঙ্গে তাদের জীবন বাঁধা। তিতাসে যখন জল কম থাকে তখন মালোদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। মানুষের জীবন কীভাবে নদীর পানির সঙ্গে জড়িত তারই ইঙ্গিত ফুটে উঠেছে উপন্যাসে। কত রকম পেশায় বাংলাদেশের মানুষ জড়িত সেটিও স্পষ্ট হয়। উপন্যাসের শেষভাগে গোকর্ণ গ্রামকে করে তোলা হয়েছে যেন এক হতাশাগ্রস্ত জনপদ। দেখে চেনার উপায় নেই এখানে একদিন জনবহুল এক মালোপাড়া ছিল। মালোপাড়ায় আর মালোরা নেই আছে শুধু জল। হায়রে তিতাস! মালোদের জীবন ছিল একদিন যার সঙ্গে বাঁধা। মালো সম্প্রদায়ের মানুষ কোনো কিছুর জন্য শপথ করলে তিতাসের জল নিয়েই শপথ করত। তাদের বিশ্বাস ছিল- তিতাস তাদের সঙ্গে ছলনা করবে না। অথচ মালোদের সেই বিশ্বাসকে তিতাস রিক্ত করে দেয়। মালোরা উদ্বাস্তু হয়ে যায় তিতাস থেকে। নদী তাদের আর মায়ের মতো আশ্রয় দেয় না। তিতাসের কোলে জন্মানো তিতাসের সন্তানরা তিতাসেই হারিয়ে যায়। তিতাস পাড়ের মালোদের ঘরবাড়ি সম্পর্কে উপন্যাসের ‘শূন্য ভিটাগুলিতে বর্ণনায় আছে’- ‘গাছ-গাছড়া হইয়াছে। তাতে বাতাস লাগিয়া শোঁ শোঁ শব্দ হয়। এখানে পড়িয়া যারা মরিয়াছে, সেই শব্দে তারাই বুঝি বা নিঃশ্বাস ফেলে।’
অস্বীকারের উপায় নেই যে- ‘তিতাসের গৌরবান্বিত বর্ণনায় উপন্যাসের কাহিনী শুরু হলেও শেষ হয় দীর্ঘ হতাশ্বাসের মধ্য দিয়ে। নদী কীভাবে মানুষের কবিতা হয়ে ওঠে সেটি এ উপন্যাসে ফুটে উঠেছে। প্রায় প্রতিটি চরিত্রই শেষ পর্যন্ত হেরে গেছে তিতাসের রূপ পরিবর্তনের কাছে। তিতাসের বুকে চর জেগে ওঠায় তিতাস তার সন্তানদের মতো নুইয়ে পড়েছে।’ দেখা যায় উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাসন্তী আর পিতা রামকেশব জীবিত থাকে। দুজনেই নিঃস্ব, রিক্ত। রামকেশব তার পুত্রকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিল তা ধূলিসাৎ হয়ে যায়। কিশোর অনন্তের মাকে বিয়ে করার পর যখন স্ত্রীকে হারিয়ে পাগল হয়ে যায় তারপরও আশাভঙ্গের বেদনা নিয়ে শেষ পর্যন্ত রামকেশব বেঁচে থাকে। চোখের সামনে পুত্রের এ নির্মম পরিণতিতে বিধ্বস্ত হয় পিতা রামকেশবের দেহমন। আর অনন্তের মা শেষ পর্যন্ত ঠাহর করতে পারে কিশোরই ছিল তার স্বামী। কিন্তু যখনই সে কিশোরের সেবা শুরু করে তখনই সমাজ বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত গণপিটুনিতে দুজনই মারা যায়। সব অনুভূতি মিশে যায় তিতাসের জলে।
‘নদীর একটা দার্শনিক রূপ আছে। নদী বহিয়া চলে।... তিতাসও কতকাল ধরিয়া বহিয়া চলিয়াছে’- তিতাসের এ বয়ে চলার সঙ্গে নদীতীরবর্তী হাজারো মানুষের কান্নার রোল অনন্ত প্রবহমান, যা অস্বীকারের সুযোগ নেই। তবে মহাকালের সঙ্গে নিুবর্গ মানুষের জীবনের ইতিহাস নিয়ে অদ্বৈত মল্লবর্মণ যে দার্শনিক তত্ত্ব সৃষ্টি করেছেন, তা তাকে নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসিয়েছে।

গুম by অনুরূপ আইচ

প্রতিদিনের মতো জাহিদ অফিসে গিয়েছিল সকালে। আর ফেরেনি। দুই দিন হয়ে গেল তার। কোনো খোঁজ মিলছে না। থানা পুলিশকে খবর দেয়া হয়েছে। তারা এখন পর্যন্ত কোনো সুরাহা করতে পারেনি। সব হাসপাতালে খবর নেয়া শেষ। জাহিদের সন্ধান মেলেনি। একমাত্র মেয়ে ঐশী সারা দিন ‘বাবা’, ‘বাবা’ বলে কান্নাকাটি করছে। স্ত্রী মৌসুমীর নাওয়া-খাওয়া বন্ধ, চোখের পানিই বুঝি তার ভাগ্য লেখন। কেউ কোনো খবর দিতে পারছে না জাহিদের। বেঁচে আছে কী নেই, তাও কেউ বলতে পারছে না। দিনের পর দিন গড়াচ্ছে। জাহিদের কোনো খোঁজ নেই। প্রতিদিন থানায় যায় মৌসুমী। থানার ওসি রমজান সাহেব তেমন একটা গুরুত্ব দেন না। গুরুত্ব না দেয়ার কারণ, জাহিদ খ্যাতিমান কেউ নন। সাধারণ একজন চাকরীজীবী। একটি ডেভেলপার কোম্পানিতে চাকরি করতেন। ভালো মাইনে পেতেন। জাহিদের অফিসের বস মোস্তাফিজ সাহেবকে ভালো মানুষ বলে জানে মৌসুমী। জাহিদের মুখেই শুনেছে। উপায়ান্তর না পেয়ে মোস্তাফিজ সাহেবের সঙ্গে একদিন দেখা করতে গিয়েছিল মৌসুমী। মোস্তাফিজ সাহেব সময় নিয়ে কথা বলেছেন। মৌসুমীকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। ভরসা দিয়ে বলেছেন, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আমরা তো মরে যাইনি। জাহিদকে খুঁজে বের করবই। আমি কিন্তু শুধু বুঝতে পারছি না, কারা জাহিদকে কিডন্যাপ করতে পারে? আপনার কি কাউকে সন্দেহ হয়?
এ প্রশ্নের উত্তরে মৌসুমী বলেন, জানামতে আমার স্বামীর কোনো শত্র“ নেই। সে খুব শান্ত-শিষ্ট স্বভাবের। তাকে দিয়ে কারও কোনো ক্ষতি হতে পারে না। জাহিদ তেমন লোকই নয়।
মোস্তাফিজ সাহেব বলেন, সে কথা আমিও জানি। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে তিনি আমার কোম্পানিতে চাকরি করছেন। তিনি আমার খুবই বিশ্বস্ত। জাহিদ সাহেবের কোনো শত্র“ থাকতে পারে না। এটা আমারও বিশ্বাস। তাহলে জাহিদ সাহেবকে কারা কিডন্যাপ করল?
আমার স্বামীকে কেউ কিডন্যাপ করবে কেন? আমাদের তো অঢেল ধনসম্পদ নেই। আমি আসলে কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার মাথায় কিছু আর ঢুকছে না। এই বলে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে মৌসুমী। তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করেন মোস্তাফিজ সাহেব। তিনি কিছু টাকাও দেন মৌসুমীর হাতে। বলেন, আপনার যখন যা দরকার হয় আমাকে বলবেন।
আরও অনেক কথা বললেন মোস্তাফিজ সাহেব। তার কথার ভেতরে একটা রহস্যের গন্ধ পায় মৌসুমী।
লোকটাকে সন্দেহ হয় তার। কথাটা মৌসুমী তার বাবা মেজবাহ উদ্দীনকে বলেছে। সেটা আমলে নেননি মেজবাহ সাহেব। মেয়ের এখন মাথা ঠিক নেই। কী ভাবতে কী ভাবছে। জাহিদের বস মোস্তাফিজ সাহেবকে সন্দেহ করার কী আছে। উনি মন্দ লোক নন। মন্দ হলে কি তিনি মৌসুমীর হাতে জাহিদের বেতনের টাকা তুলে দিতেন? নিশ্চয় না।
দেখতে দেখতে এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেল। নিখোঁজ জাহিদের খোঁজ মিলল না। রহস্যের জট খুলল না। সবকিছুই ধোঁয়াশা রয়ে গেল। অবশেষে মেজবাহ উদ্দীন শরণাপন্ন হলেন তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর। বন্ধুটির নাম সোলায়মান খান। কজন খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ। এর আগে সোলায়মান খান তিনবার মন্ত্রী হয়েছিলেন। এখন আছেন বিরোধী দলে। বিরোধী দলে থাকলেও সোলায়মান খানের প্রভাব প্রতিপত্তির কমতি নেই। তিনি মেজবাহ সাহেব ও তার মেয়ে মৌসুমীর মুখে ঘটনার সব বিবরণ শুনলেন। শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। কী যেন ভাবলেন। কয়েক মিনিট পর তিনি মুখ খুললেন। বন্ধু মেজবাহ’র উদ্দেশে বললেন, তোরা বিষয়টা আমাকে আরও আগে জানাতে পারতি। দেরি করে ফেলেছিস। তারপরও আমি দেখছি। তোর মেয়ের জামাই মানে তো আমারও জামাই। আমি আজকেই কথা বলব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে। আইজি সাহেবকেও ফোন দেব। দেখি, কি করা যায়।
মৌসুমীর উদ্দেশে সোলায়মান সাহেব বলেন, চিন্তা করো না মা। বিষয়টার একটা সুরাহা করে ছাড়ব। বাসায় ফিরে যাও। আমি দেখছি, কীভাবে জাহিদের সন্ধান পাওয়া যায়।
সেদিন সন্ধ্যাবেলায় আরেক কাণ্ড ঘটল। তখন সাড়ে সাতটার মতো বাজে। মেজবাহ উদ্দীন টিভিতে খবর দেখতে বসলেন। যদি জাহিদের কোনো খবর পাওয়া যায়। জাহিদের খোঁজ পাওয়া না গেলেও জাহিদকে নিয়ে খবর হয়ে গেল সব টিভি চ্যানেলে।
ওই দিন বিকালে সোলায়মান খান পার্টি অফিসে একটা প্রেস কনফারেন্স ডাকলেন। তারপর থেকেই সারা দেশে তুলকালাম। সংবাদ সম্মেলনে সোলায়মান খান সরকারকে দোষারোপ করলেন। তিনি বললেন, আমার নিকট আত্মীয় জাহিদ হোসেনকে সরকার গুম করেছে। জাহিদ আমার দলের অন্যতম নেতা। সরকার আগামী নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার ভয়ে বিরোধীদলীয় নেতা জাহিদ হোসেনকে গুম করে পথের কাঁটা সরিয়েছে।
সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল তার ওই সংবাদ সম্মেলনের পর থেকে। সোলায়মান খান বিরোধীদলীয় সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে যদি জাহিদ হোসেনকে ফেরত না দেয় সরকার, তবে দেশ অচল করে দেয়া হবে।
মৌসুমী বুঝতে পারছেন না, কোথা থেকে কী হয়ে যাচ্ছে। তার স্বামী জাহিদ তো কখনও রাজনীতি করেনি। এমনকি সে কখনও কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থকও ছিল না। তাহলে কেন হুট করে জাহিদকে বিরোধী দলের নেতা বানিয়ে ফেললেন সোলায়মান খান। এ নিয়ে মেজবাহ উদ্দীনেরও আপত্তির শেষ নেই। কিন্তু কে শোনে কার কথা। তিনি সোলায়মান খানের সঙ্গে দেখা করে তার আপত্তির কথা জানালেন। তাতে হিতে বিপরীত হল। সোলায়মান খান মহাক্ষিপ্ত হলেন। তিনি বললেন, যদি জাহিদকে রাজনীতির আওতায় এনে হইচই না করি তবে কোনোদিনও তার খোঁজ তোরা পাবি না। জীবিত তো দূরের কথা, মৃত কিংবা কংকালও পাবি না তোরা। এবার ভেবে দেখ, আমি ভুল করেছি নাকি ভালো করেছি?
প্রতিউত্তরে কিছুই বলতে পারলেন না মেজবাহ উদ্দীন। এ মুহূর্তে যে কোনো কিছুর বিনিময়ে তার একমাত্র মেয়ের জামাইয়ের সন্ধান পাওয়া দরকার- জীবিত অথবা মৃত, যাই হোক না কেন। জাহিদকে ফিরে পেতে চায় তার পরিবার।
সন্ধ্যার পর থেকেই মৌসুমীর কাছে হাজারও ফোন আসছে। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাক্সক্ষীরা ফোন করছে। কারণ তারা এতদিন জাহিদের রাজনৈতিক পরিচয় জানত না। মৌসুমী ভেবে পায় না, সবার প্রশ্নের কী উত্তর দেবে। সে কোনো রকমে পাশ কাটিয়ে যায়। মৌসুমীও বুঝে উঠতে পারছে না, হচ্ছেটা কী। তার বাবা মেজবাহ উদ্দীন বাসায় ফিরেছেন রাত করে। ঐশী বাবার জন্য কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গেছে। বিষণ্ন বাবা তার পাশে এসে বসলেন। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকলেন। তারপর মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে উঠে গেলেন।
পরদিন থেকে পত্রপত্রিকার গরম খবর হয়ে উঠল জাহিদ। থানার ওসি রমজান সাহেব এখন নিজেই ধরণা দিচ্ছেন মৌসুমীর কাছে। প্রত্যহ সংবাদপত্রে মৌসুমীর সাক্ষাৎকার ছাপা হচ্ছে। টিভির খবরে তার কমেন্টস প্রচার করা হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে মৌসুমী এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। মৌসুমী বুঝতে পারছে না, এসব হচ্ছেটা কী। যে কোনো কিছুর বিনিময়ে সে স্বামীকে ফেরত পেতে চায়। জানে না, তার ভাগ্যে কী আছে?
খবরের পেছনের খবর তুলে আনতে সাংবাদিকরা সচেষ্ট। সে প্রচেষ্টার খাতিরে জাহিদের বস মোস্তাফিজুর রহমানও এখন বেশ আলোচিত ব্যক্তি। ইদানীং পত্রপত্রিকায় তার ছবিও ছাপা হচ্ছে। টিভি সংবাদে তার কমেন্টসও দেখানো হচ্ছে মৌসুমীর পাশাপাশি। এসবে বেজায় বিরক্ত মৌসুমী। কিন্তু প্রকাশ করছে না। এ মুহূর্তে তার একমাত্র লক্ষ্য, স্বামীকে ফিরে পাওয়া। তাই সে চুপচাপ।
সময় গড়িয়ে যায়। মৌসুমী এখন আর আগের মতো কাঁদে না। পাথর হৃদয়ে সময়োপযোগী অনেক সিদ্ধান্ত নিতে শিখেছে। ইদানীং জাহিদের বস মোস্তাফিজুর রহমান ঘনঘন ফোন করেন মৌসুমীকে। অহেতুক নানা পরামর্শ দেন। কারণ ছাড়াই বাসায় আসতে চান। টাকা দিতে চান। এসব যেন অসহ্য লাগে মৌসুমীর। লোকটার আচরণ এমনিতেই সন্দেহজনক- অন্তত মৌসুমীর চোখে। প্রমাণ ছাড়া কাউকে কিছু বলাও যাচ্ছে না। তবে মৌসুমী এটুকু বুঝতে পারছে, জাহিদ গুম হওয়ার কারণে মোস্তাফিজ সাহেব এখন বেশ আলোচিত ব্যক্তি। সাংবাদিকদেরও যেন আর কোনো কাজ নেই। হয় তারা মৌসুমীর বাসায় পড়ে থাকে। নয়তো মোস্তাফিজ সাহেবের কাছে । মোস্তাফিজ সাহেবও সে সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন। বানোয়াট, উদ্ভট সব কথা বলছেন জাহিদ সম্পর্কে। তার ওপর সোলায়মান খানের রাজনৈতিক ইস্যু জর্জরিত করে রেখেছে মৌসুমীকে।
দেশজুড়ে এখন একটাই ইস্যু- জাহিদকে গুম করল কারা। এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের বিবৃতির শেষ নেই। দেশ তোলপাড়। জনগণ দ্বিধাবিভক্ত। শুধু জাহিদ ফেরে না মৌসুমীর কাছে। এদিকে আরেক কাণ্ড বাধিয়েছেন মোস্তাফিজ সাহেব। তিনি হুট করে সাংবাদিকদের কাছে বলে বসলেন, তার ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী জাহাঙ্গীর আলম গুম করেছেন জাহিদকে। এ নিয়ে প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয়। জাহাঙ্গীর আলমকে আইনের মুখোমুখি হতে হয়। তিনি কিছুদিন হাজত খাটেন। তারপর হাইকোর্ট থেকে জামিন পান।
মাস পেরিয়ে যায়। জাহিদের সন্ধান মেলে না। জাহিদের পরিবারে অর্থকষ্ট দেখা দেয়। মোস্তাফিজ সাহেবকে অপছন্দের কারণে তার কাছ থেকে টাকা নেয় না মৌসুমী। ব্যাংকে তার অ্যাকাউন্টে যা ছিল তাও শেষের দিকে। জাহিদের অ্যাকাউন্টে কিছু টাকা রয়েছে এখনও। যার নমিনি মৌসুমী। তাই সে ব্যাংকে যায় জাহিদের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলতে। তখন ব্যাংক কর্মকর্তা জানালেন আরেক কথা। মৌসুমী এখন দেশের পরিচিত মুখ। কোথাও গেলে তাকে ভালোই সমাদর করে সবাই। ব্যাংকের কর্মকর্তারাও তাকে বেশ সমাদর করেছে। বেশ বিনয়ের সঙ্গে বলেছে, অ্যাকাউন্ট হোল্ডার নিখোঁজ রয়েছেন ঠিকই। মারা তো যাননি। অ্যাকাউন্ট হোল্ডার মারা না গেলে নমিনি টাকা তুলতে পারবেন না। মৌসুমীর হৃদয়ের ক্ষতে যেন নুনের ছিটা পড়ে। ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে সে ব্যাংক ত্যাগ করে।
সোলায়মান খানের আন্দোলন বেশ জমে উঠেছে। জাহিদ গুম হওয়ার ইস্যুতে রাজনৈতিক ময়দান বেশ গরম হয়ে উঠেছে। সরকারবিরোধী দলগুলো একাট্টা হয়েছে। তারা সবাই মিলে সরকার পতনের ডাক দিয়েছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশিল হয়ে পড়ছে। জাহিদ গুম হওয়ার ইস্যুতে বিরোধী দল ফায়দা লুটলেও কোনো ফায়দা হচ্ছে না মৌসুমীর। এখন মৌসুমীর একটাই চাওয়া, তার স্বামীকে জীবিত কিংবা মৃত ফিরে পাওয়া।
সরকার ও বিরোধী দল মৌসুমী কিংবা মোস্তাফিজ সাহেবকে দিয়ে তাদের মনগড়া একটা স্টেটমেন্ট দেয়াতে চায়। মৌসুমীকে দিয়ে কেউ কোনো মনগড়া কথা বলাতে পারেনি। বলেছেন মোস্তাফিজ সাহেব, জাহিদ সাহেব কোনো পরকীয়ার বলি হয়েছেন। এ কথায় ঘটনা আবার নতুন মোড় নিতে শুরু করে। বিরোধী দল মোস্তাফিজ সাহেবের বেফাঁস মন্তব্যের প্রতিবাদ করেছে। তার শাস্তি দাবি করেছে। পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে ওঠে। মোস্তাফিজ সাহেব তার মন্তব্যের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না। চারদিক থেকে প্রতিবাদের ঝড় উঠছে। জাহিদ নিখোঁজের ব্যাপারটা আর রাজনৈতিক বিষয় থাকল না। সামাজিক ব্যাপার হয়ে উঠল। তাতেও মৌসুমীর কিছু যায় আসে না। তার পোড়া কপালের পোড়া দাগ রয়েই গেল।
জাহিদ গুম হওয়ার বিষয়টা এখন চাপা পড়ে গেছে। এক সপ্তাহ আগে গাজীপুরে বিশতলা একটা বিল্ডিং ধসে পড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কয়েক হাজার লোক মারা গেছে। এরই মধ্যে ২৪৭ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন। ভবন ধসের ঘটনাটি এখন বিশ্ব মিডিয়ায় আলোচিত বিষয়। প্রেস ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় এখনকার তাজা খবর মানে- গাজীপুরের ভবন ধসের সর্বশেষ সংবাদ। গুম হওয়া জাহিদকে নিয়ে সবার সব মাথাব্যথা স্তিমিত হয়ে গেছে।
এভাবে আরও এক মাস পার হয়ে গেল। গাজীপুরের উদ্ধার কাজ পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হল। যদিওবা নিখোঁজদের স্বজনরা আহাজারি করে এখনও। এরই মধ্যে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে দিল যুক্তরাষ্ট্র। এটাই এখন মিডিয়ার টাটকা খবর। জাহিদ গুম হওয়ার ব্যাপারটা বেমালুম ভুলে গেছে সবাই।
এমনই একটা দিনে রীতিমতো নাটকীয়ভাবে বাসায় ফিরলেন জাহিদ। তাকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরল মৌসুমী। কান্নায় ভেঙে পড়ল। এতদিন পর বাবাকে কাছে পেয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারল না ঐশী। বারবার সে বাবাকে জিজ্ঞেস করছে, এতদিন কোথায় ছিলে বাবা? কেন তুমি এতদিন বাসায় ফেরোনি?
জাহিদ কোনোভাবে সন্তানকে বুঝ দিয়েছে। পরে সব কথা খুলে বলেছে স্ত্রীকে। ফিরে আসার খবর এখনই মিডিয়াকে জানাতে চায় না জাহিদ। তাই মৌসুমী আত্মীয়-স্বজনদের কিছু জানায়নি। শুধু বাবাকে জানিয়েছে।
সব শুনে মেজবাহ উদ্দীন সাহেব আরও দুশ্চিন্তায় পড়লেন। এখন তো আরও বড় বিপদ অপেক্ষা করছে সামনে। অনেক ভেবে-চিন্তে কোনো উপায় বের করতে পারলেন না। বন্ধু সোলায়মান খানের শরণাপন্ন হলেন মেজবাহ উদ্দীন।
সোলায়মান খানের মতো প্রভাবশালী রাজনীতিবিদরা পারেন না এমন কাজ খুব কম আছে। এবারও সোলায়মান খান রাজনৈতিক চাল চাললেন। থানা পুলিশকে গোপন সংবাদটা জানালেন। পরদিন তিনি জাহিদকে সঙ্গে নিয়ে মিডিয়ার মুখোমুখি হলেন। রাজনৈতিক নেতারা দীর্ঘদিন কারাভোগের পর মুক্তি পেলে যেমন হইচই পড়ে যায়, তেমন হইচইয়ের ব্যবস্থাও হল। মিডিয়া আবারও সরব হল। রাতারাতি অনেক বড় রাজনৈতিক নেতা বনে গেল জাহিদ। আর খারাপ কাজের পরিণতি ভোগ করতেই হল মোস্তাফিজ রহমানকে, যিনি ছিলেন জাহিদের বস।
ভাবতে অবাক লাগারই কথা। মোস্তাফিজ সাহেবের মতো লোক এমন কাজ করতে পারে! অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, মোস্তাফিজ সাহেব তা-ই করেছেন। ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী জাহাঙ্গীর আলমকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর জন্য জাহিদ গুমের নাটক বানিয়েছিলেন মোস্তাফিজ। মোস্তাফিজ সাহেব জানতেন, জাহিদ গোবেচারা মানুষ। জাহিদ গুম হলে যে সোলায়মান খানের মতো বাঘা রাজনীতিবিদের হস্তক্ষেপে পুরো বিষয়টি জাতীয় ইস্যু হয়ে যাবে তা ভাবতেও পারেননি মোস্তাফিজ।
কেউ ভাবুক আর না ভাবুক। এটাই সত্য- পাপ কখনও চাপা থাকে না। আর পাপের পরিণতি অবশ্যই ভোগ করতে হয়। মোস্তাফিজ রহমান এখন কারাগারে। জাহিদ এখন বিরোধী দলের আলোচিত নেতা। রাজনৈতিক নেতারা দীর্ঘদিন কারাভোগের পর মুক্তি পেলে যেমন হইচই পড়ে যায়, তেমন হইচইয়ের ব্যবস্থাও হল। মিডিয়া আবারও সরব হল। রাতারাতি অনেক বড় রাজনৈতিক নেতা বনে গেল জাহিদ। আর খারাপ কাজের পরিণতি ভোগ করতেই হল মোস্তাফিজ রহমানকে, যিনি ছিলেন জাহিদের বস। ভাবতে অবাক লাগারই কথা। মোস্তাফিজ সাহেবের মতো লোক এমন কাজ করতে পারে! অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, মোস্তাফিজ সাহেব তা-ই করেছেন। ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী জাহাঙ্গীর আলমকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর জন্য জাহিদ গুমের নাটক বানিয়েছিলেন মোস্তাফিজ। মোস্তাফিজ সাহেব জানতেন, জাহিদ গোবেচারা মানুষ। জাহিদ গুম হলে যে সোলায়মান খানের মতো বাঘা রাজনীতিবিদের হস্তক্ষেপে পুরো বিষয়টি জাতীয় ইস্যু হয়ে যাবে তা ভাবতেও পারেননি মোস্তাফিজ।
কেউ ভাবুক আর না ভাবুক। এটাই সত্য- পাপ কখনও চাপা থাকে না। আর পাপের পরিণতি অবশ্যই ভোগ করতে হয়। মোস্তাফিজ রহমান এখন কারাগারে। জাহিদ এখন বিরোধী দলের আলোচিত নেতা।

হাইড্রোজেন ও নাপাম বোমা বনাম ফুটবল by এম এ মোমেন

ফুটবল হুলিগানিজমের আতংক যখন চারদিকে স্ট্যানলে রুজ বললেন, হাইড্রোজেন ও নাপাম বোমা যখন গোটা পৃথিবীকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে সেখানে ফুটবল মাঠ হচ্ছে এমন একটি স্থান যেখানে মানুষের আশা ও মানসিক সুস্থতা এখনও ধর্ষণের শিকার হয়নি।
ডাফি ডোহার্থি বললেন, ফুটবল সংস্পর্শের খেলা নয়, সংঘর্ষের। নাচ হচ্ছে সংস্পর্শের খেলা। আমেরিকান নোবেলবিজয়ী
কথা-সাহিত্যিক অস্কার ওয়াইল্ড জানালেন, ফুটবল কঠোর মেয়েদের জন্য চমৎকার একটি খেলা, কোমল ছেলেদের জন্য মোটেও নয়।
অ্যামব্রোস বিয়ার্স লিখেছেন, প্রাচীন যুগের পাঠশালায় নৈতিকতা ও দর্শনের শিক্ষা দেওয়া হতো আর এ যুগের পাঠশালায় দেওয়া হয় ফুটবলের শিক্ষা। হেনরি ব্লাহা রাগবি আর ফুটবলের তুলনা করতে গিয়ে বলেছেন, রাগবি (সকার) হচ্ছে একটি জান্তব খেলা, যা ভদ্রলোকেরা খেলে থাকেন আর আমেরিকান ফুটবল হচ্ছে জন্তুদের খেলা, যা জন্তুরা খেলে থাকে।
কার্ল মার্ক্স যেমন ধর্মকে বলেছেন অপিয়াম অব দ্য মাসেস- জনগণের আফিম, এ কালে ধর্মের চর্চা কমে ফুটবলের চর্চা বেড়ে যাওয়ায় বরং ফুটবলই হয়ে উঠেছে জনগণের আফিম।
হুলিগানিজম বা গুন্ডামি ফুটবলের সঙ্গেই খাপ খায়- ফুটবল হুলিগানিজম। ক্রিকেটে হুলিগানিজম নেই এমনকি রক্তাক্ত মুষ্টিযুদ্ধও হুলিগানিজমের সঙ্গে খাপ খায় না।
গুন্ডামির রোগটার প্রথম দিককার একটি প্রকাশ ১৮৮৫ সালে। প্রেস্টন নর্থ অ্যান্ড ফুটবল ক্লাব আর্সন ভিলাকে ৫-০ গোলে হারালে লঙ্কাকাণ্ড বেধে যায়। দু’দলের খেলোয়াড় আহত হলেন। আতংকে ভিটেবাড়ি ছাড়া মানুষ। লুটপাট চলল স্টেডিয়ামের চারদিকে। পেরুর রাজধানী লিমায় ১৯৬৪ সালের ফুটবল-দাঙ্গায় নিহত হলেন কমপক্ষে ৩০০ জন, আহতের সংখ্যাও ৫০০-র কম নয়।
ফুটবলের সঙ্গে অসংকোচে জাতীয়তার বিষয়টি আলোচনা করা যায় না। ফুটবল জাতীয়বাদ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সজ্ঞায় ঠাঁই পায়নি, কিন্তু এটা এতই বাড়াবাড়ি রকমের যে তা ফ্যাসিজমের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ফুটবল গুন্ডামি বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মধ্যে বেশি হতে পারে, বাংলাদেশও কিন্তু গুন্ডামিমুক্ত নয়।
অ্যাডোয়ার্ড অ্যালবি বলেছেন, আধুনিক শিল্পনির্ভর সমাজে ফুটবল, সকার ও বাস্কেটবলসহ অন্যান্য আবেগঘেরা খেলার উদ্দেশ্য একঘেয়েমি, হতাশা, রাগ ও প্রচণ্ড ক্রোধ সামাজিকভাবে গ্রহণীয় দ্বন্দ্বে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়া। এটা হচ্ছে যুদ্ধের সাময়িক বিকল্প- এই যুদ্ধ জাতীয়তাবাদের জন্য, নিজেদের চেয়ে বড় কিছুর সঙ্গে নিজেদের শনাক্ত করার জন্য।
ফুটবল যে সহিংসতা ও ঘৃণার জন্মদেয় তা যদি বিবেচনায় আনা হয় এরমা বোমবেক মনে করেন, একজন মানুষ যদি পরপর তিনটি ফুটবল ম্যাচ দেখে ফেলেন, তাকে আইনগতভাবে মৃত ঘোষণা করা উচিত। ফ্রাঙ্ক গিলফোর্ড বলেছেন, ফুটবলমুখীনতা আণবিক যুদ্ধের মতোই- এখানে কেউ বিজয়ী নেই, আছে কেবল ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষ। বিল শ্যাঙ্কলে মজা করে বলেছেন, অনেকেই মনে করেন ফুটবল আসলে জীবনমৃত্যুর মতোই একটি বিষয়; আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি ফুটবল তার চেয়েও বেশি।
আলবেয়র কামু বলেছেন, নৈতিকতার শিক্ষা তিনি ফুটবলের কাছে পেয়েছেন। এর জবাবে ওরহান পামুক বলেছেন, ফুটবল আর যাই শেখাক নৈতিকতা শেখাতে পারে না। মার্ভলেভি সঙ্গে যোগ করেছেন, ফুটবল চরিত্র গঠন করে না, চরিত্রের স্বরূপ প্রকাশ করে দেয়। একজন অজ্ঞাতনামা লেখক ফুটবল খেলার একটি প্রেসক্রিপশন দিয়েছেন : তোমার মাকে খুন করলে তোমার মনে যে ক্রোধ আর জিঘাংসার সৃষ্টি হবে তা নিয়েই তোমাকে ফুটবল মাঠে প্রতিপক্ষের মোকাবেলা করতে হবে।
আলফ্রেড হিচকক বিপ্লবীদের ঠাট্টা করতেই সম্ভবত বলেছেন : ফুটবল আর বিপ্লবের মধ্যে অনেক তফাৎ। ফুটবল বিপ্লবের চেয়ে বেশি সময় টিকে থাকে আর অংশগ্রহণকারীরা ইউনিফর্ম পরে।
হের্ডড ব্রাউন বলেছেন, জেলখানায় যাওয়ার ভয় নেই, তোমার সব আগ্রাসি কর্মকাণ্ড ফুটবল মাঠে চালিয়ে যাও। পুরুষ মানুষের ফুটবল আসক্তি দেখে রজার সিমন বলেছেন, ঈশ্বর যদি সত্যিই চাইতেন নারী তার পুরুষকে বুঝুক তাহলে ফুটবল কখনও আবিষ্কার হতো না।
অজ্ঞাত একজন লেখক ফুটবল লড়াইয়ের মূল কারণটি আবিষ্কার করেছেন : ২২ জন খেলোয়াড়ের জন্য মাত্র একটি বল হবে কেন? প্রত্যেককে একটি করে বল দিয়ে দাও, বলের জন্য মরামারি থেমে যাবে।
ফুটবল কোচ ভিন্স বোমবার্দির মৃত্যুর পর তাকে শ্রদ্ধা জানাতে ফুটবলার হেনরি জর্ডান মন্তব্য করেন : তিনি ছিলেন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ। আমাদের সবার সঙ্গে তার ছিল একই আচরণ- কুকুরের মতো।
আলবেয়র কামু আলজেরীয় জাতীয় দলের গোলরক্ষক ছিলেন বলে বাড়াবাড়ি ধরনের একটি প্রচারণা রয়েছে। তিনি আসলে আলজিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয় জুনিয়ার্স দলের গোলরক্ষক ছিলেন, তাও দীর্ঘসময় নয়। যক্ষ্মায় আক্রান্ত হলে তাও থেমে যায়। জ্যা পল সার্ত্রে, আর্থার কোনান ডয়েল, অ্যান্থনি বার্জেন্স, জর্জ অরওয়েল, সালমান রুশদী, জুলিয়ান বার্নস কেউই এমনকি মাঝারি মাপের ফুটবলারও ছিলেন না, ফুটবল নিয়ে একটি-দুটি মন্তব্য করেছেন এই যা। মার্কিন লেখকরা ফুটবল নিয়ে যা বলেছেন বলে উদ্ধৃত হচ্ছে তার অধিকাংশই মূলত আমেরিকান ফুটবল নিয়ে- যাতে হাত-পা-কাঁধ সবই ব্যবহার করা যায়। আমেরিকান ফুটবলের যে কোনো স্বাভাবিক বিষয় ফিফা অনুমোদিত ফুটবলে রেফারিকে নিদেনপক্ষে ফাউল ঘোষণা করতে হতো। তারপর হলুদ কার্ড এবং এমনকি লাল কার্ডও দেখাতে হতো।
বিশ্বকাপে পা ও মাথার সঙ্গে হাতের ব্যবহারের নজিরও আছে। ১৯৮৬-তে মেক্সিকোতে বিশ্বকাপের প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার ম্যারাডোনা মাথার উপর দিয়ে ছুটে যাওয়া একটি বলের উপর হাত চালিয়ে প্রতিপক্ষের জালে ঢুকিয়ে দিলেন। কথা ছিল হ্যান্ডবল হওয়ার, কিন্তু রেফারি গোলের বাঁশি বাজিয়ে দিলেন। ম্যারাডোনাকে জিজ্ঞেস করা হলে বললেন, ওটা ঈশ্বরের হাত!
ওরহান পামুক বলেছেন, ফুটবল শব্দের চেয়েও দ্রুতগামী। তিনি আরও বলেছেন, একটি জাতির ফুটবল আচরণ সে জাতিকে ব্যাখ্যা করে। সাবেক পর্তুগিজ স্বৈরশাসক (আন্তনিও) সানাজার তার শাসনের হাতিয়ার হিসেবে ফুটবলকে ব্যবহার করতেন। তিনি মনে করতেন ফুটবল জনগণের আফিম- এটাই শান্তি রক্ষার পথ। আমাদের দেশে যদি তেমনটা হতো ভালোই ছিল। কিন্তু এখানে ফুটবল আফিম নয়, বরং জাতীয়তাবাদ উৎপাদনের একটি মাধ্যম, যা অন্যদেশীয়দের ঘৃণা করার একচ্ছত্রবাদী চিন্তার উৎস। আমি আরও মনে করি, ফুটবলে বিজয় নয়, বরং পরাজয়ই জাতীয়তাবাদকে উস্কে দেয়। ভূমিকম্প থেকে হোক কি যুদ্ধে পরাজয় থেকে হোক জাতীয়তাবাদের উদ্ভব হয় বিপর্যয় থেকে। তলস্তয় বলেছেন, নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে রাশিয়ার চাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ৮-০ গোলে ইংল্যান্ডের কাছে পরাজয় তুরস্কের জন্য তেমনি একটি বিপর্যয়। এই উগ্র জাতীয়তাবাদ থেকেই বিজয়ী দেশ শত্র“দেশে পরিণত হয়। আচরণের প্রশ্নে খেলোয়াড়ের উগ্রতাকে তুচ্ছ করে এগোয় সমর্থকের উগ্রতা। খেলোয়াড়কে দমিয়ে রাখার জন্য হলুদ আর লাল কার্ড আছে, কিন্তু উগ্র দর্শক দমাবেন কেমন করে?
৩১ মে, ১৯৭০ বিশ্বকাপের প্রথম পর্বের মেক্সিকো বনাম ডিএসএসআর খেলায় রুশ খেলোয়াড় লোভচেভকে বিশ্বকাপের প্রথম হলুদ কার্ডটি দেখানো হয়। আর বিশ্বকাপের প্রথম লালকার্ড দেখানো হয় জার্মানিতে ১৯৭৪-এ চিলির কার্লোস ক্যাসলেকে। সবকিছু ছাপিয়ে বিশ্বকাপ জ্বর এখন গোটা বিশ্বকেই পেয়ে বসেছে। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা তো থাকছে আরও ক’টি দেশের পতাকায় ছেয়ে যাচ্ছে দেশ। বাংলাদেশের পতাকাও উড়বে এটুকু আশাবাদ না থাকলেই নয়।

বয়ফ্রেন্ড ৩১, গার্লফ্রেন্ড ৯১!

ভালোবাসতে নাকি বয়স লাগে না! লাগবেই-বা কেন! ভালোবাসা তো সব কিছুর ঊর্ধ্বে, এ কথাটি এবার প্রমাণ করলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আগুস্টা কেইল জোন নামে এক তরুণ। কেইল জোনের বয়স এখন ৩১। আর এই বয়সে অসম বয়সী দুই-দুটো গার্লফ্রেন্ডকে একসঙ্গে সামাল দেন তিনি। তাদের একজনের বয়স ৬৫ ও অন্যজনের বয়স ৯১ বছর। কেইল ৬৫ ও ৯১ বয়সী দুই-দুইজন গার্লফ্রেন্ডকে ভালোবেসে প্রমাণ করেছেন ভালোবাসার কোনো বয়স নেই! কেইল জোনের ৯১ বয়সী গার্লফ্রেন্ডের নাম মারজোরিয়া ম্যাকল। আর ৬৮ বছরের গার্লফ্রেন্ডের নাম অ্যান্না রোনাল্দ। এ বিষয়ে কেইল বলেন, আমি কখনোই আমার বয়সী কোনো নারীর সঙ্গে ডেটিং করিনি। তার পছন্দ বয়সী নারী এবং তাদের বয়স হবে ৬০ কিংবা ৬৫ বছরের বেশি। তিনি জানান, অসম বয়সী ভালোবাসায় তার মা কোনো ধরনের বাধই সাধেননি। বরং ছেলের এমন কর্মকাণ্ডে তিনি নাকি দারুণ উল্লসিত!

দেশে ফরমালিনমুক্ত রাজনীতি আছে- ড. কামাল হোসেন

দেশে ফরমালিনমুক্ত রাজনীতি আছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। শুক্রবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে “মানবাধিকার? গণতন্ত্র?, জেগে ওঠো বাংলাদেশ” শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ মন্তব্য করেন। ইয়ুথ মুভমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি নামে একটি সংগঠন এ সেমিনারের আয়োজন করে। ড. কামাল বলেন, দেশে ফরমালিনমুক্ত রাজনীতি আছে। ফরমালিনমুক্ত রাজনীতি ছিলো বলে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশ স্বাধীন করতে পেরেছি। জনগণের অধিকার নিয়ে কথা বলতে পেরেছি। ফরমালিনমুক্ত রাজনীতি আছে বলে আজও আমরা জনগণের অধিকার নিয়ে আন্দোলন করতে পারছি। বর্তমান রাজনীতি অসুস্থ বলে রাজনীতি বাদ দেওয়া যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনীতি অসুস্থ হলেও তাকে বাদ দেওয়া যাবে না। দেশ, জনগণ ও গণতন্ত্র রক্ষায় রাজনীতি করতে হবে। তবে অসুস্থ রাজনীতিকে জবাব দিতে সুস্থ রাজনীতি করতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হতে ‘আমি’ শব্দের পরিবর্তে আমরা প্রয়োগের দাবি জানিয়ে ড. কামাল বলেন, আগে রাজনীতিবিদরা জাতির জন্য নেতৃত্ব দিয়েছেন। এখন নিজের জন্য নেতৃত্ব দেন। আমি নেতৃত্ব দেশকে ধ্বংস করে। জাতিকে নেতৃত্ব দিতে ‘আমি’র পরিবর্তে আমরা প্রয়োগ বাড়াতে হবে। ঐক্যবদ্ধভাবে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে, গণতন্ত্রের মুক্তিতে।

গণতন্ত্রের মুক্তির দাবিতে শহীদ নূর হোসেনকে স্মরণ করে তিনি বলেন, তেজদীপ্ত যুবক নূর হোসেন বুকে, পিঠে গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচারী নিপাক যাক লিখে গুলি খেয়ে শহীদ হয়েছেন। সেই গণতন্ত্র রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। নারায়ণগঞ্জের খুনের ঘটনায় অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারকে শহীদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, চন্দন সরকারের কারণে আজ নারায়ণগঞ্জসহ সারাদেশের মানুষ জেগে উঠেছে। চন্দন সরকার নূর হোসেনের মতো শহীদ হিসেবে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। রাষ্ট্র বারবার হাইজ্যাক হচ্ছে মন্তব্য করে ড. কামাল বলেন, গণতন্ত্র ক্ষমতা ভোগের জন্য নয়, দায়িত্ব পালনের জন্য। জনগণ যে রাষ্ট্রের সর্ব ক্ষমতার মালিক এটা মুছে দেওয়া যাবে না। গণতন্ত্র নড়বড়ে বলে আজ রাষ্ট্র বারবার হাইজ্যাক হচ্ছে। গণতন্ত্র রক্ষায় শহীদদের উত্তরসূরি হিসেবে তরুণদের এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি। রাজনীতি, মানবাধিকার, ক্ষমতার সুষম ব্যবহারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রে সকল নাগরিকের মানবাধিকার, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার। ক্ষমতা, অস্ত্র সবকিছুর সুষম ব্যবহার দরকার। নারায়ণগঞ্জের জনগণকে সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে ড. কামাল বলেন, জীবনের বিনিময়ে এ সুযোগ। এরকম সুযোগ বারবার আসে না। এ সুযোগের মধ্য দিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সারাদেশে প্রমাণ করতে হবে।’ সেমিনারে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, ড. তুহিন মালিক, সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ, নাঈমুর রহমান, মাহমুদুর রহমান মান্না, শামা ওবায়েদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

‘লাশ নদীতে ফেলে অপারেশনের ইতি টানি’-রানার জবানবন্দি by বিল্লাল হোসেন রবিন

নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সেভেন মার্ডারের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তা নৌবাহিনীর লে. কমান্ডার (অব.) এম এম রানা। বৃহস্পতিবার দুপুরে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক কে এম মহিউদ্দিন তার জবাববন্দি গ্রহণ করেন। দীর্ঘ পৌনে ৪ ঘণ্টার জবানবন্দিতে এম এম রানা সাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা ছাড়াও আরও কারা জড়িত, কিভাবে অপহরণ ও হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলা দেয়া হয়েছে তার বর্ণনা দেন। এর আগে বুধবার র‌্যাব-১১ এর সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) আরিফ হোসেন সাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা স্বীকার করে একই আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও বাদী পক্ষের আইনজীবী এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, বুধবার মেজর (অব.) আরিফ হোসেন সাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ২৩ জন জড়িত থাকার কথা বললেও আজ (বৃহস্পতিবার) লে. কমান্ডার (অব.) এম এম রানা বলেছেন, পুরো মিশনে ৩০-৩২ জন জড়িত রয়েছে। তবে আরিফ ও রানার বক্তব্য কাছাকাছি। র‌্যাবের একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালকের নির্দেশে ও কতিপয় রাজনৈতিক গডফাদারের সমন্বয়ে এ হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে। রানা তাদের বিস্তারিত পরিচয়ও প্রকাশ করেছেন তার জবানবন্দিতে। সাখাওয়াত হোসেন খান আরও বলেন, বর্তমানে বাদী পক্ষের আইনজীবীরা নিজেদের নিরাপত্তাহীন মনে করছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।
সাত খুনের মামলার আসামি রিমান্ডে থাকা লে. কমান্ডার (অব.) এম এম রানাকে কঠোর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ লাইন থেকে বৃহস্পতিবার সকালে তাকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কেএম মহিউদ্দিনের আদালতে হাজির করা হয়। জবানবন্দি দানে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য এম এম রানাকে এক ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন আদালত। সকাল ১০টা ২০ মিনিটে এম এম রানাকে বিচারকের খাসকামরায় নেয়া হয়। সেখানে পৌনে ৪ ঘণ্টাব্যাপী দীর্ঘ জবানবন্দি দেন আরিফ হোসেন। সূত্রমতে, দু’টি হত্যা মামলার মধ্যে নাসিক প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ ৫ জনকে অপহরণ ও হত্যা মামলায় ১৫ পৃষ্ঠা এবং সিনিয়র আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিমকে অপহরণ ও হত্যা মামলায় ১৪ পৃষ্ঠার জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন আদালত।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির ওসি মামুনুর রশিদ মণ্ডল বলেন, লে. কমান্ডার (অব.) এমএম রানা রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে সাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ায় তাকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। সূত্র জানায়, স্বীকারোক্তিতে এম এম রানা সাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা বলতে গিয়ে বলেন, র‌্যাবের একজন মহাপরিচালক ও র‌্যাব-১১-এর সিও লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদের নির্দেশ পালন করতে গিয়েই তিনি সাত খুনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তার ওপর দায়িত্ব ছিল শুধু নজরুলকে অপহরণ করা। পুরো হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় ছিলেন তারেক সাঈদ ও আরিফ হোসেন। রানা আরও বলেন, অপহরণ থেকে শুরু করে হত্যা ও পরে লাশ ফেলা পর্যন্ত পুরো মিশনে ছিল ৩০-৩২ জন। নূর হোসেনকে আমি চিনতাম না। নূর হোসেনের সঙ্গে মেজর (অব.) আরিফ হোসেনের পরিচয় ছিল। ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নূর হোসেনের সঙ্গে আরিফের মোবাইলে যোগাযোগ ছিল।
অপহরণের দিন মেজর (অব.) আরিফ হোসেনের সঙ্গে ঘটনাস্থলে এম রানা নিজেও উপস্থিত ছিলেন বলে আদালতকে জানান। কাউন্সিলর নজরুল ইসলামকে অপহরণ করার সিদ্ধান্ত ছিল। নজরুল ইসলাম সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি মামলায় উচ্চ আদালত থেকে অস্থায়ী জামিন নেন। তখন তাকে নিম্ন আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। তখন নূর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করে খবর রাখা হয় নজরুল কবে নারায়ণগঞ্জ আদালতে আসবেন। দু’দিন আদালত এলাকায় রেকি করা হয়। পরে নূর হোসেনের মাধ্যমে মেজর আরিফ নিশ্চিত হন তিনি ২৭শে এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ আদালতে স্থায়ী জামিন নিতে আসবেন। পরিকল্পনা মতে, ওই দিন আদালত প্রাঙ্গণে সাদা পোশাকে সকাল থেকে একটি গ্রুপ অবস্থান নেয়। ১১ সদস্যের দ্বিতীয় গ্রুপ অবস্থান নেয় নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা লিঙ্ক রোডের খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের সামনে। সেখানে মেজর আরিফের সঙ্গে সে (রানা) নিজেও ছিলেন। নজরুল ইসলাম একটি সাদা প্রাইভেটকার যোগে আদালত ত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে আদালতের গ্রুপটি খবর পৌঁছে দেয় মেজর আরিফ হোসেনের কাছে। নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা লিংক রোডের খানসাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়াম সংলগ্ন (ময়লা ফেলার স্থান) এলাকা থেকে নজরুল ইসলামসহ ৫ জন এবং নজরুলের গাড়ির পেছনে থাকা চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালককে র‌্যাবের গাড়িতে তুলে নেয়া হয়। গাড়িতে তুলেই তাদের প্রত্যেকের শরীরে ইনজেকশন পুশ করা হয়। এতে তারা অচেতন হয়ে পড়ে। দৃষ্টি ভিন্ন দিকে নিতে নজরুলের গাড়ি গাজীপুরের জয়দেবপুরে এবং চন্দন সরকারের গাড়ি গুলশানের নিকেতনে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়। অচেতন অবস্থায় অপহৃত সাতজনকে র‌্যাবের গাড়িতে কয়েক ঘণ্টা রাখা হয়। এক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় নরসিংদীতে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে কাঁচপুর ব্রিজের পশ্চিম পাড়ে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরভূমিতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বালু-পাথর ব্যবসাস্থল জনমানুষশূন্য করার জন্য নূর হোসেনকে ফোন দেয় মেজর (অব.) আরিফ হোসেন। মোট কথা সেখানে যেন কোন লোকজন না থাকে। গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পর র‌্যাবের গাড়ি ওই স্থানে পৌঁছায়। গাড়ির ভেতরই অচেতন প্রত্যেকের মাথা ও মুখমণ্ডল পলিথিন দিয়ে মড়ানো হয়। পরে গলা চেপে ধরার পর একে একে শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যায় সাতজন। পরে সাতজনের নিথর দেহ গাড়ি থেকে নামানো হয়। পরে নারায়ণগঞ্জ শহরের ৫নং ঘাট থেকে র‌্যাবের নির্দিষ্ট নৌকা নিয়ে যাওয়া হয় কাঁচপুর ব্রিজের নিচে। তৃতীয় গ্রুপ লাশগুলো নৌকায় উঠিয়ে শীতলক্ষ্যা নদী দিয়ে যাওয়ার পথে আদমজী ইপিজেড ঘাট থেকে লাশ গুমের উপকরণ নৌকায় তোলা হয়। লাশ যাতে ভেসে না ওঠে এজন্য নৌকার মধ্যেই একে একে প্রত্যেকটি লাশের সঙ্গে ইট বাঁধার পর লাশের পেট ফুটো করে দেয়া হয়। তারপর তিন নদীর (শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বর ও মেঘনা) মোহনায় লাশগুলো ফেলে দিয়ে অপারেশনের ইতি টানা হয়।

দুই মামলায় জবানবন্দি
আদালত সূত্রমতে, সেভেন মার্ডারের ঘটনার পর দায়ের করা দু’টি মামলাতেই জবানবন্দি দিয়েছেন এম এম রানা। দু’টি মামলার মধ্যে প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ ৫ জনকে অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বাদী হয়ে একটি মামলা করেছিলেন। এ মামলায় নাসিক কাউন্সিলর নূর হোসেন, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী ইয়াছিন মিয়াসহ ৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এডভোকেট চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিম অপহরণ ও পরে হত্যার ঘটনায় অজ্ঞাত আসামি উল্লেখ করে চন্দন সরকারের মেয়ে জামাতা বিজয় পাল বাদী হয়ে অপর মামলাটি করেন। এরমধ্যে নজরুলসহ ৫ জনের মামলায় ১৫ পৃষ্ঠা ও চন্দন সরকার ও তার গাড়ি চালকে হত্যার মামলায় ১৪ পৃষ্ঠা জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন আদালত।
৩নং সেলে আরিফ: নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের একটি সূত্র জানিয়েছে, ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়ার পর মেজর আরিফকে বুধবার বিকালে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কারাগার কর্তৃপক্ষ মেজর (অব.) আরিফকে ৩নং সেলের একটি কক্ষে রেখেছে। সেখানে রয়েছে লাগোয়া বাথরুম। রাতে শোয়ার জন্য দেয়া হয়েছে দু’টি পুরনো কম্বল। বৃহস্পতিবার সকালে কারাগারের নতুন কয়েদি হিসেবে মেজর (অব.) আরিফের ছবি তোলা হয়। তার ফিঙ্গার প্রিন্ট নেয়া হয়।
উল্লেখ্য, ২৭শে এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ আদালত থেকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার একটি মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন জামিন নিয়ে নাসিক প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার সহযোগী মনিরুজ্জামান স্বপন, সিরাজুল ইসলাম লিটন, তাজুল ইসলাম প্রাইভেটকার যোগে বাসায় ফেরার পথে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা লিংক রোড থেকে গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলমসহ ৫জনকে অপহরণ করা হয়। একই সময় একই স্থান থেকে অপহরণ করা হয় আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ইব্রাহিমকে। এ ঘটনায় ২৭ এপ্রিল রাতেই চন্দন সরকারের পরিবার নিখোঁজ উল্লেখ করে ফতুল্লা মডেল থানায় একটি জিডি করেন। ২৮শে এপ্রিল ফতুল্লা মডেল থানায় নাসিক কাউন্সিলর নূর হোসেনকে প্রধান আসামি করে নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম একটি মামলা দায়ের করেন। ৩০শে এপ্রিল বিকালে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৬ জন এবং ১লা মে সকালে একজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রত্যেকটি লাশের সঙ্গে ২৪টি করে ইট বাঁধা ছিল। এবং নাভির নিচে ফুটো করা ছিল।
এদিকে অপহরণের পর হত্যায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ স্পষ্ট হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ৫ই মে লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেনকে সেনাবাহিনী থেকে এবং নারায়ণগঞ্জ ক্যাম্পের সাবেক প্রধান লে. কমান্ডার এম.এম রানাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে ১৬ মে রাতে ক্যান্টমেন্ট থেকে লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ ও মেজর (অব.) আরিফ হোসেনকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ১৭শে মে তাদের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। একই দিন রাতে ক্যান্টমেন্ট থেকে গ্রেপ্তার করা হয় লে. কমান্ডার (অব.) এম এম রানাকে। ১৮ই মে আদালত তার ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। ২২শে মে তারেক সাঈদ ও আরিফ হোসেনকে প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাসহ ৫ জনকে অপহরণ ও হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ২৬শে মে এম রানাকেও সাত হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জর করেন। ৮ দিন রিমান্ড শেষে ৩০শে মে তারেক সাঈদ ও আরিফকে আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত তাদের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ৮ দিনের রিমান্ড শেষে এম এম রানাকে ২রা মে আদালতে হাজির করে তৃতীয় দফায় ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। চন্দন সরকার হত্যা মামলায় ৪র্থ দফায় ৫ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন তারেক সাঈদ। তাকে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ লাইনে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ছাত্রলীগের ‘টর্চার সেলে’ নৃশংস নির্যাতনে খুন তাওহীদ by ওয়েছ খছরু

আবু সিনা ছাত্রাবাসের ১০০৩ নম্বর কক্ষ। ছাত্রলীগের টর্চার সেল নামেই পরিচিত ওই কক্ষ। বুধবার বিকালে ছাত্রলীগ কর্মী রাফি পার্শ্ববর্তী রিকাবীবাজার থেকে ডেকে নিয়ে যায় ছাত্রদল নেতা তাওহীদুল ইসলামকে। বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে ওই কক্ষে বন্দি করা হয় তাকে। এরপর ওই কক্ষে তার ওপর চালানো হয় অকথ্য নির্যাতন। লোহার রড ও পাইপ দিয়ে টানা কয়েক ঘণ্টা পেটানো হয়। পাইপ দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে কোপানো হয়। ৫-৬ জন ক্যাডার মিলে টানা তিন থেকে চার ঘণ্টা চালায় এ নির্যাতন। এক সময় অজ্ঞান হয়ে পড়ে তাওহীদুল। তার শরীর পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ওই অবস্থায় সন্ধ্যায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এরপর ‘প্রাণ’ আছে দাবি করে ডাক্তার তাকে নিয়ে যান আইসিইউতে। ওখানে তাকে দুই ঘণ্টা রাখা হয়। পরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিন্সিপাল ডা. মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী মৃত ঘোষণা করেন তাওহীদুল ইসলামকে। হত্যাকাণ্ডটি প্রথমে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের হামলায় ঘটেছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু কলেজের ছাত্রদল সভাপতি আসলামুল ইসলাম রুদ্র এ ঘটনার জন্য ছাত্রলীগকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, আবু সিনা ছাত্রাবাসের ১০০৩ নম্বর কক্ষটি ছাত্রলীগের টর্চার সেল। ওখানে বহু নিরীহ ছাত্রকে ধরে নিয়ে পেটানো হয়েছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ, ছাত্রাবাস কর্তৃপক্ষ সব কিছু জানলেও মুখ খোলেননি। তিনি বলেন, কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি সৌমেন, আবু সিনা ছাত্রাবাসের ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হাই, ছাত্রলীগ কর্মী শরীফ ও অমিত সহ বেশ কয়েকজন টানা কয়েক ঘণ্টা নির্যাতন চালিয়ে খুন করেছে তাওহীদকে।

নিহত তাওহীদুল ইসলাম সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চতুর্থ বর্ষের মেধাবী শিক্ষার্থী। সে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। তার বাড়ি শরিয়তপুর জেলার জাজিরা এলাকায়। তার পিতা শামসুর রহমান একটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। তাওহীদ ওসমানী মেডিকেল কলেজের ৪৯তম ব্যাচের ছাত্র। মা ও বোনকে নিয়ে কাজল শাহ এলাকায় একটি বাসায় ভাড়া থাকতো। বোন নাহার বেগম সিলেট সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। গতকাল সহপাঠীরা জানান, বুধবার তাওহীদ কলেজে গিয়েছিল। সে নির্ধারিত পরীক্ষায় অংশও নেয়। এরপর চলে যায় বাসায়। বিকালে তাওহীদ ওসমানী মেডিকেল কলেজের আবু সিনা ছাত্রাবাসের পাশে রিকাবীবাজারে অবস্থান করছিল। এ সময় ছাত্রলীগ কর্মী রাফি তাকে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তাওহীদের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। মোবাইলে কল দেয়া হলেও কেউ রিসিভ করেনি। রাত ৮টার দিকে তারা শুনতে পান তাওহীদের ওপর হামলা হয়েছে এবং তাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৫ তলার আইসিইউতে রাখা হয়েছে। এ খবর পেয়ে তারা সেখানে  যান। কিন্তু প্রথমে তাদের সেখানে ঢুকতে দেয়া হয়নি। পরে কলেজের প্রিন্সিপাল তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কলেজের ছাত্রদল কর্মীরা জানান, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের ছাত্রলীগের কর্মীরা গত ৭ বছর ধরে চাঁদাবাজি করছে। তাদের ভয়ে হল ও ক্যাম্পাস ছাড়া শিক্ষার্থীরা নিয়মিত চাঁদা দিয়ে ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিতো। তেমনি ভাবে ছাত্রলীগ কর্মীরা তাওহীদের কাছে আড়াই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। কয়েক মাস ধরে টানা চাঁদা দাবির প্রেক্ষিতে তাওহীদ তাদের এক লাখ টাকা দেয়। বাকি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। কলেজ ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আশিকুর রহমান বিকালে ছিলেন রিকাবীবাজার এলাকায়। তিনি জানান, ছাত্রলীগ কর্মী রাফি সহ কয়েকজন তাওহীদকে রিকাবীবাজার এলাকা থেকে ধরে নিয়ে যায় আবু সিনা ছাত্রাবাস ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রিত কক্ষে। ওই ছাত্রাবাসের ১০০৩ কক্ষ ছাত্রলীগের টর্চার সেল। ওই সেলে রয়েছে বিভিন্ন রকমের অস্ত্র। খোদ ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে ওই সেলে ধরে নিয়ে ছাত্রদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। তেমনিভাবে বুধবার ওই সেলে নিয়ে যাওয়া হয় তাওহীদকে। তিনি বলেন, সেলে আটকে রেখে কয়েক ঘণ্টা চলে তার ওপর নির্যাতন। রড দিয়ে পেটানো হয় শরীরে। রক্তাক্ত করা হয় তাওহীদকে। এক পর্যায়ে তাওহীদের দেহ নিস্তেজ হয়ে পড়লে তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় সন্ধ্যার পর ওসমানী হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়। হাসপাতালের ৫ম তলার আইসিইউতে রাখা হয় তাকে। সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তাররা রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাওহীদকে মৃত ঘোষণা করেন। রাতে খবর পেয়ে তাওহীদের ছোট বোন নেহার রহমান হাসপাতালে ছুটে আসেন। ওসমানী মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি আসলামুল ইসলাম রুদ্র অভিযোগ করেন, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা তাকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে। ঘটনার পর সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. মিজানুর রহমান হাসপাতালের আইসিইউতে তাওহীদের লাশ দেখতে যান। তিনি লাশ দেখে বেরিয়ে আসার সময় বিএমএ’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিএনপি নেতা ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী পুলিশ কমিশনারের কাছে অভিযোগ করেন, ক্যাম্পাসে প্রতিদিনই কোন না কোন ছাত্রকে মারধর করছে ছাত্রলীগ কর্মীরা। তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। তিনি তাওহীদের খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান। ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, গত ৩-৪ মাস ধরে ছাত্রলীগের নির্যাতন বেড়ে গেছে। একাধিক বার ছাত্রদল কর্মীদের ধরে রুমে নিয়ে পেটায় ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা। তিনি অভিযোগ করেন, অধ্যক্ষ ডা. মুর্শেদ আহমদ চৌধুরীকে  ফোন দিয়ে তিনি বারবার এর প্রতিকার  চেয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো অধ্যক্ষ বাইরের একটি ঘটনায় ছাত্রদল কর্মীদের বহিষ্কার করেন। সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীও হাসপাতালে তাওহীদের লাশ দেখতে যান। তিনি রাজনৈতিক মনোভাবের ঊর্ধ্বে উঠে খুনিদের গ্রেপ্তারের জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. আব্দুস সালাম জানান, সন্ধ্যায় তাওহীদকে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সামান্য একটু পালস ছিল দেখে তাকে লাইফ সাপোর্টে  রেখেছিলাম। তবে তাকে বাঁচানো যায়নি। এদিকে সুরতহাল রিপোর্টে দেখা গেছে, তাওহীদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। মাথার পেছন দিকে একেবারে  থেঁতলে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। পুলিশ ধারণা করছে রড অথবা পাইপ জাতীয় কিছু দিয়ে তাকে পেটানোর ফলে তার মৃত্যু হয়। বুধবার রাতেই কলেজ ছাত্রদলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় তাওহীদকে হত্যার পর ছাত্রলীগ কর্মীরা  হোস্টেলেই ছিল। রাত ৮টার পরে হোস্টেল  ছেড়ে পালিয়ে যায়। এদিকে খুনের ঘটনার পরপরই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। রাতেই ছাত্রদলকর্মীরা সিলেট ওসমানী হাসপাতাল চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। তারা অনতিবিলম্বে ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীদের  গ্রেপ্তারের দাবি জানায়। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি আব্দুল আহাদ খান জামালের নেতৃত্বে রাতে বিক্ষোভ কর্মসূচি শেষে সমাবেশ করে ছাত্রদল। এ সময় মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি রুদ্র অনির্দিষ্টকালের জন্য ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দেন। গতকাল ওসমানী  মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হাই ছাত্রদলকর্মী তাওহীদ খুনে ছাত্রলীগ জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে খুন হয়েছে তাওহীদ। তিনি বলেন, ছাত্রদল নিজ দায় ছাত্রলীগের ওপর চাপানোর অপচেষ্টা করছে। এদিকে, গতকাল সকালে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে ছাত্রদল কর্মী তাওহীদের মরদেহের ময়না তদন্ত সম্পন্ন হয়। দুপুরে কলেজ প্রাঙ্গণে তার মরদেহের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সভাপতি এম এ হক, যুগ্ম সম্পাদক জিয়াউল গনি আরেফিন জিল্লুর, ছাত্রদল নেতা আবদুল আহাদ খান জামাল, মাহবুবুল হক চৌধুরী, সাঈদ আহমদ, রেজাউল করিম নাচন সহ সিনিয়র নেতা অংশ নেন। জানাজার পর পুলিশের প্রটেকশনে নিহত তাওহীদের লাশ পাঠিয়ে দেয়া হয় গ্রামের বাড়ি শরিয়তপুরে।
রোববার আধাবেলা হরতাল: নিহত তাওহীদের জানাজার পরপরই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মহানগর বিএনপির সভাপতি এমএ হক। এ সময় তার সঙ্গে সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। এমএ হক অভিযোগ করেন, তাওহীদের খুনি কারা তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। কিন্তু প্রশাসন তাদের গ্রেপ্তার করছে না। তিনি বলেন, তাওহীদকে পৈশাচিক কায়দায় নির্মমভাবে খুন করা হয়। ছাত্রলীগের টর্চার সেলে তাকে কয়েক ঘণ্টা আটকে রেখে খুন করা হয়। তিনি বলেন, খুনিদের গ্রেপ্তার করতে হবে। এ সময় তিনি রোববার সিলেট নগরীতে সকাল ৬টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত হরতাল কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রোববারের মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার না করলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
ছাত্রদলের বিক্ষোভ: সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে রাখা ছাত্রদল নেতা তাওহীদের লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার সহপাঠীরা। ছাত্রদলের জেলা ও মহানগর কর্মীরা কাঁদেন। জানাজা শেষে তারা তাওহীদের লাশ নিয়ে মিছিল বের করার চেষ্টা চালান। কিন্তু পুলিশের বাধার কারণে তারা লাশ নিয়ে মিছিল বের করতে পারেনি। এ সময় ছাত্রদল নেতা আবদুল আহাদ খান জামাল, মাহবুবুল হক চৌধুরী, সাঈদ আহমদ, রেজাউল করিম নাচনের নেতৃত্বে কলেজ প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। লাশবাহী গাড়ির পিছু পিছু মিছিলটি মূল ফটক পর্যন্ত আসে।
অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট চলছে:  সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের ৪৯তম ব্যাচের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র, ছাত্রদল নেতা মো. তাওহীদুর রহমানকে খুনের ঘটনার প্রতিবাদে ওসমানী মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের ডাকা অনির্দিষ্ট কালের ধর্মঘট চলছে। ছাত্রদলের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে সকল শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করে। এদিকে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ক্যাম্পাসে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। দুপুরে মিছিলে কলেজ ছাত্রদলের সঙ্গে জেলা, মহানগর ছাত্রদল ও অন্যান্য কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রদল অংশগ্রহণ করে।
ছাত্রদলের তিন দিনের কর্মসূচি: এদিকে ছাত্রদল নেতা তাওহীদ খুনের ঘটনায় সিলেটে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ছাত্রদল। গতকাল দুপুরে কলেজ ক্যাম্পাসে এক সমাবেশ থেকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি আসলামুল ইসলাম রুদ্র তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কর্মসূচির প্রথম দিন শুক্রবার বাদ জুমা রুহের মাগফেরাত কামনা করে কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদে মিলাদ মাহফিল হবে। শনিবার দুপুর ১২টায় মেডিকেল কলেজ গেইট থেকে শোক র‌্যালি নগর প্রদক্ষিণ করবে। রোববার সিলেটের সকল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট চলবে। কর্মসূচি চলাকালে হত্যাকারীদের  গ্রেপ্তার করা না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। প্রয়োজনে সমগ্র বাংলাদেশে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দেয়া হবে।
৬ দিনের বন্ধ ঘোষণা মেডিকেল কলেজ, তদন্ত কমিটি গঠন: ছাত্রদল কর্মী তাওহীদ খুনের ঘটনার পর গতকাল দুপুরে ৬ দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে কলেজ। পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকায় গতকাল সকালে হোস্টেল ছেড়ে চলে গেছে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী। ওদিকে, দুপুরে হাসপাতালের প্রশাসন বৈঠক করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি ৫ দিনের মধ্যে রিপোর্ট প্রদান করবে বলে হাসপাতাল সূত্র জানায়। একাডেমিক কাউন্সিলের বৈঠক শেষে কলেজের প্রিন্সিপাল মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী জানিয়েছেন, অধ্যাপক একেএম মোশারফ হোসেনকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কলেজ বন্ধ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।