Showing posts with label মহান বিজয় দিবস. Show all posts
Showing posts with label মহান বিজয় দিবস. Show all posts

Monday, December 16, 2024

অন্য রকম এক বিজয়ের দিন

মহান বিজয় দিবস আজ। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি শাসন-শোষণ থেকে পুরো মুক্ত হয়েছিল জাতি। এবার ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে হাজির হয়েছে এই বিজয় দিবস। নতুন পরিবেশে উদ্‌যাপন হবে বিজয়ের এই বার্ষিকী। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পর এই প্রথম উদ্‌যাপন হতে যাচ্ছে বিজয় দিবস। জুলাই আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে প্রায় দেড় হাজার মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছেন। আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেছেন কয়েক হাজার মানুষ। তাদের এই ত্যাগের বিনিময়ে স্বৈরাচারী শাসকের পতনকে অনেকে দ্বিতীয় স্বাধীনতা বলে আখ্যা দিয়েছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে সূচনা হওয়া আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে পরিণত করতে এতে যুক্ত হয়েছিলেন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। সবার সম্মিলিত ত্যাগ আর আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। শান্তিতে  নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে  গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রের সংস্কার ও একটি জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে কাজ করছে। ৫ই আগস্টের অভ্যুত্থানের পর এবার ভিন্ন এক পরিবেশ দেশে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রায় সবাই আত্মগোপনে। অনেকে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে। দলটির কর্মীরাও আর দৃশ্যপটে নেই। বিএনপি, জামায়াতসহ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত রাজনৈতিক দলগুলো এবং তাদের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা এবার স্বাধীনভাবে বিজয় দিবস উদ্‌যাপনের সুযোগ পেয়েছেন। আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসন আমলে নানা বিধি-নিষেধের মধ্যে বিজয় দিবস উদ্‌যাপন করতে হয়েছে তৎকালীন বিরোধী দলগুলোকে। গ্রেপ্তার-নির্যাতন ও হয়রানির ভয়ে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানেও অংশ নিতে পারেননি অনেকে।

তাই এবার নতুন প্রেক্ষাপটে নতুন উদ্দীপনায় উদ্‌যাপন হতে যাচ্ছে বিজয় দিবস। এবারের এই দিবসে মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে। পাশাপাশি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে জীবন দেয়া শহীদদেরও স্মরণ করবে পুরো দেশ। জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে  স্বৈরাচারী সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলি, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হামলায় আহত অনেকে এখনো হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন। কেউ হাত হারিয়েছেন, কেউ পা। কারও চোখের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে স্বৈরাচারের বুলেট। আহত এই মানুষদের রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি। যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তারা সরকার পতনের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তা পূরণে এবারের বিজয় দিবসে আবারো শপথ নেবে সর্বস্তরের মানুষ।  বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ে ছাত্র-জনতা আবারো মুষ্টিবদ্ধ শপথ নেবে বিজয় দিবসে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশকে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চেতনায় গড়ে তোলার যে স্বপ্ন ছিল বিগত সময়ে নানা কারণে তা পুরো অর্জিত হয়নি। রাজনৈতিক হানাহানি, দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের কারণে মলিন হয়ে পড়েছিল বিজয়ের ক্যানভাস। ৫ই আগস্টের পর বৈষম্যমুক্ত নতুন এক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়েছে ছাত্র-জনতার তরফে। নতুন বাংলাদেশ গড়তে একগুচ্ছ সংস্কার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। গঠন করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্কার কমিশন। সংস্কারে সায় দিয়েছে প্রায় সব রাজনৈতিক দল। তাই অপার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে নতুন করে দেশ গড়ার।

জাতীয় নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা না হলেও আগামী বছরই একটি নির্বাচন আয়োজনের চাপ আছে সব পক্ষ থেকে। গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার শেষে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সেই সরকার ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণে আত্মনিয়োগ করবে এমন প্রত্যাশা সামনে রেখেই এবার উদ্‌যাপন হচ্ছে বিজয় দিবস। দেশে আর যাতে কোনো শাসক স্বৈরাচারী হতে না পারে। লুটপাট করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিদেশে পাচার করতে না পারে। নাগরিক হিসেবে সবাই সমান অধিকার ভোগ করতে পারে- এমনটিই হবে এবারের বিজয় দিবসের অঙ্গীকার।

দিবসটি উপলক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, সশস্ত্র বাহিনী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বিস্তারিত কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ভোরে তোপধ্বনি ও জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে শুরু হবে দিবসের কর্মসূচি। প্রত্যুষে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। এরপর যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, প্রধান বিচারপতি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। প্রেসিডেন্ট ও প্রধান উপদেষ্টার শ্রদ্ধা নিবেদনের পর জাতীয় স্মৃতিসৌধের ফটক খুলে দেয়া হবে সর্বসাধারণের জন্য।

দিবসটি উপলক্ষে সারা দেশে সরকারি, আধা-সরকারি ও বেসরকারি অফিস ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। রাতে গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হবে। আজ সরকারি ছুটির দিন।

দিবসটি উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান উপদেষ্টা পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বিজয় দিবসে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন বাণীতে দুর্নীতি ও শোষণমুক্ত দেশ গড়ার পাশাপাশি ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চেতনা ও মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে আরও অবদান রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। এ বছরের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ যে বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল, তা শিগগিরই বাস্তবায়িত হবে, এমন আশাও প্রকাশ করেন তিনি।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাণীতে ছাত্র, শ্রমিক ও জনগণের গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ায় একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও সুশাসিত বাংলাদেশ গড়তে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর শহীদদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিজয় দিবস শুধু আমাদের গর্বের উৎস নয়, আমাদের শপথ দিবসও। তিনি আরও বলেন, শপথ হলো ঐক্যবদ্ধ থাকা, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখার। বিজয় দিবসকে বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত গৌরবময় ও স্মরণীয় দিন হিসেবে উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ের মধ্যদিয়ে জাতি হিসেবে স্বাধীনতা ও আত্মপরিচয়ের স্বাদ পেয়েছি।

mzamin

Sunday, December 17, 2017

যুদ্ধাপরাধীমুক্ত দেশ গড়ার প্রত্যয়

মহান বিজয় দিবসে শনিবার সাভার স্মৃতিসৌধে বীর
শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পর শপথ নেয় জনতা -যুগান্তর
যথাযথ মর্যাদায় শনিবার মহান বিজয় দিবস পালিত হয়েছে। শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়েছে জাতি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নেয়া এবং ক্ষুধা-দারিদ্র্য-সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়, শপথ ও দাবির মাধ্যমে দিনটি পালন করে গোটা জাতি। সব যুুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে বাংলাদেশকে যুদ্ধাপরাধী মুক্ত করার দাবি জানায় সর্বস্তরের মানুষ। বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় বাঙালি জাতি ভালোবাসা আর অহংকারের প্রতীক জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুলেল শ্রদ্ধায় কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের।
ভোরে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে (পুরনো বিমানবন্দর) ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে বিজয় দিবসের সূচনা হয়। দিনটি উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারসহ বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সংবাদপত্রগুলো বের করে বিশেষ ক্রোড়পত্র। জাতীয় স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়। এদিন ছিল সরকারি ছুটি। সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হয়। প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপগুলো সাজানো ছিল জাতীয় পতাকা ও রং-বেরঙের কাগজে। জেলখানা, হাসপাতাল, এতিমখানা ও শিশু সদনগুলোয় পরিবেশন করা হয় উন্নত খাবার। সকাল ৬টা ৩৪ মিনিটে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিন বাহিনীর একটি চৌকস দল এ সময় সালাম জানায়। শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধাবনত জাতি ফুলে ফুলে ভরে দেয় সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের বেদি। সেখানে সর্বস্তরের লাখো মানুষের ঢল নামে। এ ছাড়া দেশের সব বিভাগ, জেলা ও উপজেলা শহরের চিত্রও ছিল প্রায় অভিন্ন। মানুষে মানুষে বৈষম্য ভুলে সাম্প্রদায়িকতা প্রতিহত করে নতুন এক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ছিল শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের চোখে-মুখে। শিশুকিশোর ও তরুণ-তরুণীদের হাতে, কারও গালে কিংবা কপালে আঁকা ছিল রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা, প্রিয় মাতৃভূমির মানচিত্র। তরুণ প্রজন্মের ছেলেদের গায়ে ছিল জাতীয় পতাকার রঙে শার্ট, পাঞ্জাবি বা গেঞ্জি এবং মেয়েদের পরনে ছিল লাল-সবুজের শাড়ি অথবা সালোয়ার-কামিজ। বিজয় দিবসে আনন্দ-উৎসবের আলোয় সাজে ঢাকাসহ পুরো দেশ। পতাকায় সজ্জিত রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোর প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপ।
সচিবালয়সহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থান আলোর ঝলকানি। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের দেয়ালে লাল-সবুজের ছাপ। আলোর সাজে সাজানো হয় জাতীয় সংসদ ভবনও। মূল ভবন আর আশপাশের সব ভবনে জ্বলে লাল-সবুজ আলো। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ভবনের পাশাপাশি সাজানো হয় রাজপথের দুই পাশ। সন্ধ্যার পর রং-বেরঙের আলোকচ্ছটায় ঝলমলিয়ে ওঠে এলাকাগুলো। আলো দিয়ে তৈরি করা হয় প্রিয় লাল-সবুজ পতাকা। মনকাড়া এমন আলোকসজ্জায় মুগ্ধ সবাই। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তস্নাত লাল-সবুজের পতাকা হাতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণের শপথ আর পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্র রুখে দেয়ার প্রত্যয়। চোখে ছিল একাত্তরের ঘাতক রাজাকার-আলবদর-যুদ্ধাপরাধী ও তাদের দোসরদের প্রতি তীব্র ঘৃণা-ধিক্কার। কুয়াশার চাদরে মোড়ানো সকালে সূর্য ওঠার আগেই জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে ছিল মানুষের দীর্ঘ লাইন। দিনের আলোর উজ্জ্বলতা যতই বাড়তে থাকে জনতার ভিড়ও তত বাড়তে থাকে। দিনটি পালনে সকাল ৮টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। স্বাধীনতার মহান স্থপতির স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এরপর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলীয়প্রধান হিসেবে দলের সিনিয়র নেতাকর্মীদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। ৪৭তম বিজয় দিবস উপলক্ষে ১০ টাকার স্মারক ডাকটিকিট ও উদ্বোধনী খাম অবমুক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে পাঁচ টাকা মূল্যমানের একটি ডাটা কার্ড এবং ডাক বিভাগের ইস্যুকৃত একটি স্মারকগ্রন্থ তিনি অবমুক্ত করেন। সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সম্মিলিত বাহিনীর দৃষ্টিনন্দন কুচকাওয়াজে সালাম গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি। এ সময় প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। বিকালে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বঙ্গভবনে এক সংবর্ধনার আয়োজন করেন রাষ্ট্রপতি। এতে প্রধানমন্ত্রীসহ একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্যরা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এতে বিজয় দিবসের কেক কাটেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। বঙ্গভবনের বিশাল চত্বর ঘুরে ঘুরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন। আগত অতিথিদের সঙ্গেও কুশল বিনিময় করেন তারা। বিজয় দিবস উপলক্ষে দেশের সব মুক্তিযোদ্ধাকে (এফএফ) শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এবারও তিনি নগরীর মোহাম্মদপুরের গজনবী রোডে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন কেন্দ্রে ফুল, ফল ও মিষ্টি পাঠিয়েছেন। মহান বিজয় দিবসে রাজধানীজুড়ে ছিল নানা আয়োজন। বিকালে রাজধানীতে বিশাল আনন্দ শোভাযাত্রা করে আওয়ামী লীগ। ৩ কিলোমিটারের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় লাখো মানুষ অংশ নেন। ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে এ শোভাযাত্রা শুরু হয়ে শেষ ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর। দিনের শুরুতে বাঙালির অধিকার সংগ্রামের অন্যতম সূতিকাগার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিজয় শোভাযাত্রা ও পতাকা মিছিলের আয়োজন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও শিশু একাডেমি। তরুণ-তরুণী একসঙ্গে শপথ নেয় অসমাপ্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার। মুক্তি সেনাদের মতো তারাও দেশ মাতৃকার জন্য আমুত্যু লড়াই করে বাঙালির কাক্সিক্ষত বিজয় ছিনিয়ে আনতে প্রস্তুত। বিজয় শোভাযাত্রাটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বের হয়ে দোয়েল চত্বর, বাংলা একাডেমি, টিএসসি, জাতীয় গণগ্রন্থাগার অধিদফতরের সামনে দিয়ে ঘুরে যায়। সকালে রাজধানীর হাতিরঝিলে বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগে সাইকেল র‌্যাবলি অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া শিখা চিরন্তনে শহীদদের আত্মদানের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন ও তরুণ প্রজন্মের হাতে পতাকা হস্তান্তর অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম। বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে ছায়ানটের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। সকাল থেকেই ঢাকার রাজপথে চলে লাল-সবুজের মেলা। রিকশা, সাইকেল, মোটরসাইকেল, বাস কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে সবাই মেতেছেন উৎসবের রঙে। কেউ হাতে পতাকা নিয়ে কেউ বা গালে কিংবা কপালে পতাকা একেছেন। মহান বিজয় দিবসে বিজয়ের গৌরবগাঁথা নিয়ে পৃথক আলোচনা সভা, বক্তৃতা, রচনা প্রতিযোগিতা, কবিতা আবৃত্তি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও দোয়ার আয়োজন করে রাজধানীর বেরাইদের বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এগুলো হল- বেরাইদ গণপাঠাগার, বেরাইদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠন, একেএম রহমত উল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, রওশনআরা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বেরাইদ মুসলিম হাইস্কুল, আলহাজ রহিমউল্লাহ মাদ্রাসা ও এতিমখানা, বেরাইদ মোহাম্মদিয়া দাখিল মাদ্রাসা এবং বেরাইদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে জাতীয় স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় স্কেটিং র‌্যালি।

Friday, December 17, 2010

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হোক- মহান বিজয় দিবস

আজ মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার জন্য শুরু হয়েছিল যে প্রাণপণ যুদ্ধ, তার অবসান ঘটে ১৬ ডিসেম্বর: আমাদের চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এ বিজয় এসেছিল এক সাগর রক্তের বিনিময়ে। তাই বিজয়ের আনন্দের বিপরীতে আছে স্বজন হারানোর বিষাদ। বিজয় দিবসের প্রভাতে শহীদদের উদ্দেশে আমরা বলি: আমরা তোমাদের ভুলব না। যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সহযোগিতা জুগিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের, তাঁদের সবাইকে জানাই বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের আবির্ভাব ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা। সেই সময়ের বিশ্বপরিস্থিতিতে নতুন কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের আবির্ভাব খুব সহজ ছিল না। কিন্তু সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিচল প্রত্যয়, অশেষ ত্যাগ স্বীকার, মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের সুযোগ্য ভূমিকা এবং ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সার্বিক সহযোগিতায় সেই অসম্ভবকে সম্ভব করা গিয়েছিল। বাংলাদেশের নিপীতিড় মুক্তিকামী জনগণের লড়াই সে সময় বিশ্বব্যাপী বিপুল আবেগ সঞ্চার করেছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এ-দেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস প্রভৃতি ঘাতক বাহিনীর গণহত্যা বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে নিন্দিত হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফার স্বাধিকার দাবি থেকে একাত্তরের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসমুদ্রের গর্জন স্বাধীনতার দাবিকে অনিবার্য করে তুলেছিল। সোনার বাংলার স্বপ্নে বাংলার ছাত্রসমাজ ও শ্রমিক, কৃষক, নারী, মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবীসমাজ এমনই উদ্দীপ্ত হয়েছিল যে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নকে নস্যাৎ করা কারও পক্ষেই সম্ভব ছিল না। এবং সেই স্বপ্ন ছিল একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।
প্রত্যেক বিজয় দিবসে আমাদের সুযোগ আসে সেই গৌরবময় ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা স্মরণ করার, দেশের মঙ্গলের জন্য নিবেদিতপ্রাণে কাজ করার অঙ্গীকার নবায়নের।
স্বাধীনতা অর্জনের পর রাজনৈতিক নেতৃত্বের নানা ভুলের কারণে বারবার সামরিক অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয়ের কারণে গণতন্ত্র ব্যাহত হয়েছে। আবার জনগণের গণতান্ত্রিক চেতনা, উৎপাদনমুখিতা ও দৃঢ় প্রত্যয়ের ঘাটতি ঘটেনি। দারিদ্র্য পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার ঘটেছে, উৎপাদন-ভিত্তি কিছুটা জোরালো হয়েছে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে। অবশ্য রাজনীতি ও প্রশাসনের সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়নি। দুর্নীতি কমেছে, তাও বলা যায় না।
একাত্তরের গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য দেশব্যাপী প্রবল জনমত গড়ে উঠেছে, কিন্তু সরকার বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করলেও তা প্রত্যাশিত গতি লাভ করেনি। এটা খুব দুঃখের বিষয় যে ৩৯ বছরেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা যায়নি। শতাব্দীর ভয়াবহতম গণহত্যা যারা চালিয়েছে, তাদের বিচার অবশ্যই করতে হবে। এবং সে কাজে আর বিলম্ব করার কোনো সুযোগ নেই। এমনিতেই অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে।