Wednesday, August 26, 2020

ডিম কি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নাকি এটি হৃদরোগের কারণ?

আদর্শ খাবার বলে যদি কিছু থেকে থাকে তাহলে সে তালিকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সবার আগে এগিয়ে থাকবে ডিম। কারণ ডিম হাতের নাগালেই পাওয়া যায়, রান্না করাও সহজ, দামও কম এবং প্রোটিনে ভরপুর।
"দেহ গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদানই রয়েছে ডিমে, আর তাই স্বাভাবিকভাবেই এটি অত্যন্ত পুষ্টি সমৃদ্ধ," বলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কানেক্টিকাটের পুষ্টিবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ব্লেসো।
অন্যান্য খাবারের সাথে ডিম খেলে তা আমাদের শরীরে বেশি পরিমাণে পুষ্টি শোষণের ক্ষমতা বাড়িয়ে দিতে সহায়তা করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, সালাদের সাথে ডিম খেলে তা সালাদ থেকে ভিটামিন এ গ্রহণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
কিন্তু উচ্চ মাত্রায় কোলেস্টেরল থাকার কারণে দশকের পর দশক ধরে, ডিম খাওয়া নিয়ে বিতর্ক রয়েছে-অনেক গবেষণার ফলাফলে বলা হয় যে, ডিম খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
একটি ডিমের কুসুমে প্রায় ১৮৫ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকে, যা মার্কিন খাদ্য নীতিতে থাকা দৈনিক গ্রহণযোগ্য কোলেস্টেরলের মাত্রার অর্ধেক। এই নীতি অনুযায়ী প্রতিদিন ৩০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল গ্রহণ করা যায়।
তার মানে কি এটা যে, ডিম আসলে আদর্শ খাবারের তুলনায় আমাদের ক্ষতিই বেশি করছে?
কোলেস্টেরল বা এক ধরণের হলুদাভ চর্বি যা আমাদের যকৃত এবং অন্ত্রে তৈরি হয়, তা সব মানুষের দেহকোষেই পাওয়া যায়।
সাধারণত আমরা একে 'খারাপ' মনে করি। কিন্তু কোষের মেমব্রেন বা পর্দা গঠনের অন্যতম উপাদান কোলেস্টেরল। দেহে ভিটামিন ডি এবং টেসটসটেরন ও অয়েস্ট্রোজেন হরমোনের উৎপাদনেও এটি দরকারি।
আমাদের দরকারি সব কোলেস্টেরল আমাদের দেহেই তৈরি হয়। তবে প্রাণীজ খাবার যেগুলো আমরা গ্রহণ করি যেমন গরুর মাংস, চিংড়ি, ডিম, পনির এবং মাখনেও কোলেস্টেরল পাওয়া যায়।
রক্তের লাইপোপ্রোটিন অণু আমাদের দেহে কোলেস্টেরল বহন এবং স্থানান্তরিত করে। প্রত্যেক মানুষের দেখে এসব লাইপোপ্রোটিনের আলাদা আলাদা ধরণ থাকে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হবে কিনা তা নির্ধারণ করে এ ধরণের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের উপর।
কম ঘনত্বের লাইপোপ্রোটিন বা এলডিএল কোলেস্টেরলকে খারাপ কোলেস্টেরল হিসেবে ধরা হয়-যা কিনা যকৃত থেকে ধমনী এবং কোষে পরিবাহিত হয়। গবেষকরা বলেন যে, এর ফলে রক্তনালীতে কোলেস্টেরল জমা হয় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তবে গবেষকরা অবশ্যই কোলেস্টেরল গ্রহণের মাত্রার সাথে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার কোন সংশ্লিষ্টতা আছে বলে উল্লেখ করেননি। এ কারণেই, মার্কিন খাদ্য বিধিতে কোলেস্টেরল গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়নি; যুক্তরাজ্যেও এমন কোন নিষেধাজ্ঞা নেই।
এর পরিবর্তে, সম্পৃক্ত চর্বি খাওয়া কমানোর উপর জোর দেয়া হয়েছে, এর কারণে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে বলে সতর্ক করা হয়। যেসব খাবারে ট্র্যান্স ফ্যাট বা কৃত্রিমভাবে তৈরি চর্বি থাকে, সেগুলো বেশি পরিমাণে এলডিএল থাকে।
যদিও কিছু ট্র্যান্স ফ্যাট পশু থেকে প্রাপ্ত বা উৎপাদিত খাবারে প্রাকৃতিক ভাবেই পাওয়া যায়, তবুও এ ধরণের চর্বির বেশিরভাগই কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা হয়। সবচেয়ে বেশি মাত্রায় এ চর্বি পাওয়া যায় মার্গারিনস, স্ন্যাক্স এবং ডুবো তেলে ভাজা এবং বেক করা খাবার যেমন পেস্ট্রি, ডোনাট এবং কেক-এ।
এরমধ্যে, চিংড়ি ছাড়া ডিম হচ্ছে একমাত্র খাবার যাতে উচ্চমাত্রায় কোলেস্টেরল থাকে কিন্তু সম্পৃক্ত চর্বি থাকে নগণ্য মাত্রায়।
"যদিও ডিমে মাংস এবং অন্যান্য প্রাণীজ খাবারের তুলনায় কোলেস্টেরল বেশি থাকে, তবুও সম্পৃক্ত চর্বি রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। বহু বছর ধরে অনেক গুলো গবেষণায় এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে," বলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কানেক্টিকাটের পুষ্টিবিজ্ঞানের অধ্যাপক মারিয়া লুজ ফার্নান্দেজ। যার সম্প্রতি এক গবেষণায় বলা হয়েছে যে, ডিম খাওয়ার সাথে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার কোন সম্পর্ক নেই।
ডিমের স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনা একটু ভিন্ন খাতে গড়িয়েছে। কারণ আমরা যে কোলেস্টেরল গ্রহণ করি তা পুষিয়ে নিতে সক্ষম আমাদের দেহ।
"এর জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে শরীরে, তাই বেশিরভাগ মানুষের জন্য খাদ্য তালিকায় কোলেস্টেরল থাকাটা কোন সমস্যা নয়," বলেন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের ট্রাফটস ইউনিভার্সিটির পুষ্টিবিজ্ঞানের গবেষণা বিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক এলিজাবেথ জনসন।
২০১৫ সালে ৪০টি গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করেন জনসনের নেতৃত্বে একদল গবেষক। তারা খাদ্য তালিকায় কোলেস্টেরল থাকার সাথে হৃদরোগের কোন ধরণের সম্পর্ক খুঁজে পাননি।
"খাবারের সাথে মানুষ কোলেস্টেরল গ্রহণ করলে তখন যে বিষয়টি ঘটে তা হলো দেহ কোলেস্টেরল উৎপাদন কমিয়ে দেয়," তিনি বলেন।
আর এটি যখন ডিমের ক্ষেত্রে হয়, তখন বলা যায় যে, এই কোলেস্টেরল সাধারণ স্বাস্থ্য ঝুঁকির চেয়েও কম ঝুঁকিপূর্ণ। কোলেস্টেরল যখন আমাদের ধমনীতে জারিত হয় তখন এটি আরো বেশি ক্ষতি করে। কিন্তু ডিম থেকে পাওয়া কোলেস্টেরল জারিত হয় না, বলেন ব্লেসো।
"কোলেস্টেরল যখন অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে ভাঙে বা জারিত হয়, তখন এটি প্রদাহ সৃষ্টি করে, আর ডিমে সব ধরণের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে যা একে জারিত হওয়া থেকে রক্ষা করে," তিনি বলেন।
এছাড়া, কিছু কিছু কোলেস্টেরল আমাদের জন্য ভালো। উচ্চ ঘনত্বের লাইপোপ্রোটিন বা এইচডিএল কোলেস্টেরল যকৃতে পরিবাহিত হয়, যেখানে এটি ভেঙ্গে যায় এবং শরীর থেকে নির্গত হয়ে যায়। ধারণা করা হয় যে, এইচডিএল রক্তে কোলেস্টেরল জমতে দেয় না বিধায় এটি হৃদরোগ প্রতিরোধে প্রভাব রাখে।
"রক্তে কি ধরণের কোলেস্টেরল প্রবাহিত হচ্ছে সে সম্পর্কে মানুষের জানা উচিত। তা না হলে হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে," বলেন ফার্নান্দেজ।
দেহে এইচডিএল এবং এলডিএলের পার্থক্যের হার কত তা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এলডিএল এর ক্ষতিকর প্রভাবকে রুখে দেয় এইচডিএল।
যাই হোক, আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই আমরা যে কোলেস্টেরল খাই সেটিকে যকৃতে উৎপন্ন কোলেস্টেরলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও ব্লেসো বলেন যে, এক তৃতীয়াংশ মানুষ খাবারের সাথে কোলেস্টেরল গ্রহণ করলে তাদের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা ১০% থেকে ১৫% বেড়ে যায়।
পরীক্ষায় পাওয়া যায় যে, রোগা এবং স্বাস্থ্যবান মানুষদের মধ্যে খাবারের মাধ্যমে কোলেস্টেরল গ্রহণ করলে তাদের রক্তে এলডিএলের পরিমাণ বাড়ে। কিন্তু যাদের অতিরিক্ত ওজন রয়েছে, স্থূলকায় এবং ডায়াবেটিক রয়েছে তাদের রক্তে এলডিএল কম পরিমাণে বাড়ে, কিন্তু এইচডিএল বেশি পরিমাণে বাড়ে, ব্লেসো বলেন।
তাই আপনি যদি স্বাস্থ্যবান হয়ে থাকেন তাহলে ডিম খাওয়াটা স্থূলকায় ব্যক্তির তুলনায় আপনার জন্য বেশি ক্ষতিকর। কিন্তু যেহেতু আপনার স্বাস্থ্য ভালো তাই আপনার রক্তে এইচডিএলের মাত্রাও বেশি থাকবে, তাই এলডিএলের মাত্রা বাড়াটা খুব ক্ষতিকর হবে না।
তবে চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রকাশিত গবেষণা, ডিম যে আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়, এমন ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। গবেষকরা ৩০ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে ১৭ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করেন। তারা দেখেন যে, প্রতিদিন অর্ধেক ডিম বেশি খেলে তা উল্লেখ জনক হারে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় এমনকি মৃত্যুও ঘটায়। (অবশ্য এ পরীক্ষায় তারা পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, স্বাস্থ্য ও শারীরিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে যাতে করে তাদের উপর ডিমের প্রভাব আলাদা করে লক্ষ্য করা যায়।)
"আমরা দেখেছি যে, কোন ব্যক্তি প্রতি ৩০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল অতিরিক্ত গ্রহণ করলে, তা সে যে খাবার থেকেই হোক না কেন, তা তার হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে ১৭%, মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ে ১৮%," বলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ের নর্থ-ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির প্রিভেনটিভ মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক নরিনা অ্যালেন।
"আমরা আরো পেয়েছি যে, প্রতিদিন অর্ধেক পরিমাণ ডিম বেশি খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি ৬% এবং মৃত্যু ঝুঁকি ৮% বাড়ে।"
যদিও এটি এ খাতের বড় গবেষণাগুলোর একটি ছিলো, যা কিনা ডিম এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বিষয় দুটির মধ্যে নির্দিষ্ট সম্পর্ক খুঁজে পায়, তবুও এটি ছিলো আসলে পর্যবেক্ষণমূলক একটি গবেষণা। এটিতে কারণ এবং প্রভাব সম্পর্কে তেমন কিছু বলা হয়নি।
এটি তৈরি করা হয়েছিলো একমাত্র অংশগ্রহণকারীদের স্ব-প্রণোদিত হয়ে দেয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে-এখানে অংশগ্রহণকারীদের জিজ্ঞাসা করা হতো যে, তারা আগের মাসে বা বছরে কি খেয়েছিলো, তারপর বিগত ৩১ বছরে তাদের স্বাস্থ্য বিষয়ে খোঁজ নিয়েছিলো।
তার মানে হচ্ছে, অংশগ্রহণকারীরা কি খাচ্ছে, গবেষকরা তার আংশিক জানতে পেরেছিলো, যদিও সময়ের সাথে সাথে আমাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তিত হয়।
এই গবেষণা আগের গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিলো। অসংখ্য গবেষণা রয়েছে যেখানে বলা হয়েছে যে ডিম স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। চীনে ৫ লাখ মানুষের উপর পরিচালিত এক বিশ্লেষণ যা ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয়, সেখানে ওই গবেষণার পুরো উল্টো চিত্র পাওয়া গেছে।
এতে বলা হয় যে, ডিম খাওয়া হৃদরোগের ঝুঁকিকে কমিয়ে দেয়। যারা প্রতিদিন ডিম খান তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি ১৮% কমে যায়। একইসাথে যারা ডিম খান না তাদের তুলনায় স্ট্রোকের কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি কমিয়ে দেয় ২৮%।
তবে আগের মতোই এই গবেষণাটিও ছিলো পর্যবেক্ষণমূলক-অর্থাৎ কারণ এবং প্রভাব আলাদাভাবে বোঝাটা আসলে খুবই কঠিন ছিলো। (চীনের স্বাস্থ্যবান লোকেরা বেশি ডিম খান নাকি ডিম তাদেরকে বেশি স্বাস্থ্যবান করে?) এটি আসলেই বিভ্রান্তির একটি বড় অংশ হতে পারে।

ভালো ডিম

যদিও এসব গবেষণা আমাদের শরীরে ডিম থেকে পাওয়া কোলেস্টেরলের প্রভাব নিয়ে বিতর্ককে উস্কে দিয়েছে, তবু কিছু উপায় রয়েছে যা আমাদের রোগের ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে।
এদের মধ্যে একটি হচ্ছে কোলাইন নামে এক ধরণের ডিম যা আলঝেইমার রোগ থেকে আমাদের বাঁচাতে পারে। এটা যকৃতকেও সুরক্ষা দেয়।
কিন্তু এটার নেতিবাচক প্রভাবও থাকতে পারে। কোলাইন ভালো মাইক্রোবায়োটার মাধ্যমে বিপাকিত হয়ে টিএমও নামে অণুতে পরিণত হয়। যা পরে মানুষের যকৃতে শোষিত হয়। এই রূপান্তরিত টিএমএও এমন এক ধরণের অণুতে পরিণত হয় যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
ব্লেসো বিস্ময় প্রকাশ করেন যে, ডিম থেকে বেশি পরিমাণে কোলাইন খেলে তা টিএমএও-এর উন্নয়ন ঘটায় কিনা। তিনি এক গবেষণায় দেখেন যে, ডিম খাওয়ার পর মানুষ ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত টিএমএও-র মাত্রার উন্নয়ন ঘটায়।
ডিম খাওয়া এবং টিএমএও নিয়ে এক গবেষণায় এ পর্যন্ত যা পাওয়া গেছে তা হলো, এতে টিএমএও সাময়িকভাবে বাড়ে। যাই হোক, শুধুমাত্র প্রাথমিক পর্যায়েই হৃদরোগের সাথে টিএমএও-এর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, যা শুধু রোজার সময়ই সনাক্ত করা সম্ভব।
এর থেকে ব্লেসো দেখেন যে, কার্বোহাইড্রেট খাওয়ার পর কিভাবে আমাদের রক্তে শর্করা বেড়ে যায়, কিন্তু রক্তে শর্করার বৃদ্ধি শুধু ডায়াবেটিকের সাথে যুক্ত যা একটি চলমান প্রক্রিয়া।
এর কারণ এটি হতে পারে যে, যখন আমরা ডিম খাই, তখন কেবল ডিমের কোলাইনের ইতিবাচক সুবিধা পাই আমরা, তিনি বলেন।
"সমস্যা হয় যখন রক্তে মেশার পরিবর্তে কোলাইন বৃহদন্ত্রে চলে যায় যেখানে এটি প্রথমে টিএমও এবং পরে টিএমএও-তে পরিণত হয়," ফার্নান্দেজ বলেন।
"কিন্তু ডিমে, কোলাইন শোষিত হয় এবং বৃহদন্ত্রে যায় না, তাই এটি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় না।"
এরইমধ্যে বিজ্ঞানীরা ডিমের অন্যান্য স্বাস্থ্যকর দিক সম্পর্কে ধারণা পেতে শুরু করেছেন। লুটিনের সবচেয়ে ভালো উৎস হচ্ছে ডিমের কুসুম। চোখে দেখা এবং চোখের রোগ নিয়ন্ত্রণের সাথে সম্পর্কিত লুটিন।
"চোখের রেটিনায় দুই ধরণের লুটিন পাওয়া যায়, যা নীল আলোর ফিল্টার হিসেবে কাজ করে আলো থেকে রোখের রেটিনাকে রক্ষা করে, কারণ আলো চোখের জন্য ক্ষতিকর," জনসন বলেন।
তবে ডিম কেন আমাদের উপর আলাদা আলাদা ভাবে প্রভাব ফেলে তা বুঝতে এখনো ঢের বাকি গবেষকদের, সম্প্রতি পরিচালিত অনেকগুলো গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, ডিম স্বাস্থ্যের প্রতি কোন ঝুঁকি হিসেবে কাজ করে না, উল্টো স্বাস্থ্যের জন্য এটি ভালো।
এরপরেও, প্রতিদিন সকালের নাস্তায় ডিম রাখাটা স্বাস্থ্যকর কোন বিকল্প হতে পারে না যদি না অন্যসব খাবার বাদ দিয়ে শুধু ডিমকেই প্রাধান্য দেয়া হয়।

একজন অনন্য চাচা ও ভাতিজার পারস্পরিক ভালোবাসার অমর কাহিনী

ইমাম হুসাইন (আ) তাঁর জীবনের শেষ রাতে যখন সঙ্গীদের জানালেন, জালিম ও বলদর্পী খোদাদ্রোহী শত্রুরা শুধু তাঁকেই (ইমামকে) চায় হত্যা করতে। তাঁর কাছ থেকে জোর করে ইয়াজিদের জন্য আনুগত্য আদায় অথবা তাঁকে হত্যা করাই তাঁদের মূল টার্গেট। তাই অন্যরা চাইলে সবাই তাঁকে ত্যাগ করতে পারেন জীবন বাঁচানোর জন্য।

তাঁর একদল ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও সঙ্গী যাদের সংখ্যা ১০০’রও কিছু কম বা সামান্য বেশি ছিল- তাঁদের সবাই যখন সকলেই এক জায়গায় ও এক বাক্যে সুস্পষ্ট ভাষায় তাঁদের নিষ্ঠা ও আনুগত্যের ঘোষণা দিলেন এবং বললেন যে, আমরা কখনো আপনাকে ছেড়ে চলে যাবো না, তখন সহসাই পট পরিবর্তিত হয়ে গেলো।

ইমাম (আঃ) বললেন, ব্যাপার যখন এই, তখন সকলেই জেনে রাখো যে, আমরা নিহত হতে যাচ্ছি। তখন সকলে বললো, আলহামদুলিল্লাহ-আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করছি যে, তিনি আমাদেরকে এ ধরনের তাওফীক দান করেছেন। এটা আমাদের জন্য এক সুসংবাদ, একটি আনন্দের ব্যাপার।

ইমাম হুসাইনের (আ) মজলিসের এক কোণে একজন কিশোর বসে ছিলেন; বয়স বড় জোর তেরো বছর হবে। এ কিশোরের মনে সংশয়ের উদয় হলোঃ আমিও কি এ নিহতদের অন্তর্ভুক্ত হবো? যদিও ইমাম বলেছেন ‘তোমরা এখানে যারা আছা তাদের সকলে’,কিন্তু আমি যেহেতু কিশোর ও নাবালেগ, সেহেতু আমার কথা হয়তো বলা হয় নি। কিশোর ইমাম হুসাইনের দিকে ফিরে বললেন: অর্থাৎ,চাচাজান! আমিও কি নিহতদের অন্তর্ভুক্ত হবো? এ কিশোর ছিলেন হযরত ইমাম হাসানের (আ) পুত্র হযরত কাসেম।

ইতিহাস লিখেছে, এ সময় হযরত ইমাম হুসাইন (আ) স্নেহশীলতার পরিচয় দেন। তিনি প্রথমে জবাব দানে বিরত থাকেন, এরপর কিশোরকে জিজ্ঞেস করেন, ভাতিজা! প্রথমে তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দাও, এরপর আমি তোমার প্রশ্নের জবাব দেবো। তুমি বলো, তোমার কাছে মৃত্যু কেমন; মৃত্যুর স্বাদ কী রকম? কিশোর জবাব দিলেন,আমার কাছে মধুর চেয়েও অধিকতর সুমিষ্ট। আপনি যদি বলেন যে, আমি আগামী কাল শহীদ হবো তাহলে আপনি আমাকে সেই সুসংবাদই দিলেন। তখন ইমাম হুসাইন (আঃ) জবাব দিলেন, হ্যাঁ, ভাতিজা! কিন্তু তুমি অত্যন্ত কঠিন কষ্ট ভোগ করার পর শহীদ হবে। কাসেম বললেন: আল্লাহর শুকরিয়া, আল-হামদুলিল্লাহ-আল্লাহর প্রশংসা যে, এ ধরনের ঘটনা ঘটবে।

এবার আপনারা ইমাম হুসাইন (আঃ) এর এ ভূমিকা নিয়ে চিন্তা করে দেখুন যে, পরদিন কী বিস্ময়কর এক বাস্তব কঠিন দৃশ্যের অবতারণা হওয়া সম্ভব! হযরত আলী আকবরের শাহাদাতের পর এই তেরো বছরের কিশোর হযরত ইমাম হাসানের পুত্র ইমাম হুসাইন (আঃ) এর নিকট এগিয়ে এলেন। যেহেতু তিনি ছিলেন নাবালেগ কিশোর, তার শরীরের বৃদ্ধি তখনো সম্পূর্ণ হয় নি, তাই তার শরীরে অস্ত্র ঠিকভাবে খাপ খাচ্ছিলো না;কোমরে ঝুলানো তলোয়ার ভূমি স্পর্শ করে কাত হয়ে ছিলো। আর বর্মও ছিলো বড়, কারণ বর্ম পূর্ণ বয়স্ক পুরুষদের জন্য তৈরি করা হয়েছিলো, কিশোরদের জন্য নয়। টুপি বড়দের মাথার উপযোগী, ছোট বাচ্চাদের উপযোগী নয়। কাসেম বললেন, চাচাজান! এবার আমার পালা। অনুমতি দিন আমি রণাঙ্গনে যাই।

কোনো কোনা বর্ণনায় এসেছে, ইমাম হাসান (আ) যখন শহীদ হন তখন কাসেমের বয়স ছিল মাত্র তিন বছর। সেই থেকে তিনি চাচা হুসাইন (আ)'র ঘরে তাঁরই সান্নিধ্যে থেকে কিশোর বয়স পর্যন্ত বড় হয়েছেন। তাই ভাইয়ের নয়নের মনি ছিল তাঁরও স্নেহের ধন। চাচা কখনও যুদ্ধে যেতে অনুমতি দিবেন না তা জেনে কাসেম ফুপু যাইনাবের শরণাপন্ন হন। ফুপু জানান যে তাঁর চাচার কাছে প্রিয় কিশোর ভাতিজার যুদ্ধ-যাত্রার অনুমতি আদায় করার মত মানসিক অবস্থা তাঁরও (যাইনাবের) নেই। এক পর্যায়ে কাসেম লক্ষ্য করেন তার বাহুতে তাবিজের মত কিছু একটা আছে। কৌতুহল বশে তা খুলে দেখেন যে তাতে রয়েছে ভবিষ্যতের কারবালা যুদ্ধ সম্পর্কে বাবা ইমাম হাসানের ওসিয়ত। তাতে কাসেমকে বলা হয়েছে, তোমার চাচা তোমাকে যুদ্ধে যাবার অনুমতি দিবেন না, কিন্তু তুমি মাথা ও ঘাড়  নিচু করে বার বার অনুরোধ করলে শেষ পর্যন্ত তোমার চাচা তোমাকে অনুমতি দেবেন। কাসেম ওই ওসিয়ত চাচা হুসাইনকে দেখালে তিনি খুব কাঁদেন।

এখানে উল্লেখ্য যে,আশুরার দিনে ইমাম হুসাইন (আঃ) এর সঙ্গী সাথীদের কেউই তার কাছ থেকে অনুমতি না নিয়ে রণাঙ্গনে যান নি। প্রত্যেকেই তাঁর কাছে এসে তাকে সালাম করেন এবং এরপর অনুমতি চান; বলেন: ‘‘আস-সালামু ‘আলাইকা ইয়া আবা আবদিল্লাহ। আমাকে অনুমতি দিন।’’

ইমাম হুসাইন (আঃ) সাথে সাথেই কাসেমকে অনুমতি দিলেন না। তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। কাসেম ও তাঁর চাচা পরস্পরকে বুকে চেপে ধরে কাঁদতে লাগলেন। ইতিহাসে লেখা হয়েছে:  অর্থাৎ,অতঃপর তিনি (কাসেম) তাঁর (ইমাম হুসাইনের) হাত ও পা চুম্বন করতে শুরু করলেন। ‘‘মাক্বাতিল’’ গ্রন্থে এ সম্পর্কে লেখা হয়েছে: ‘‘তাকে যতক্ষণ না অনুমতি দেয়া হয় ততক্ষণ পর্যন্ত কিশোর তার (ইমাম হোসেনের) হাত ও পা চুম্বন অব্যাহত রাখেন।’’ (মাকতালু খরাযমী,খণ্ড: ২,পৃষ্ঠা: ২৭)

এ ঘটনার অবতারণা কি এ উদ্দেশ্যে হয়নি যাতে ইতিহাস পুরো ঘটনাকে অধিকতর উত্তম রূপে বিচার করতে পারে? কাসেম অনুমতির জন্য পীড়াপীড়ি করেন আর ইমাম হুসাইন (আঃ) অনুমতি দানে বিরত থাকেন। ইমাম মনে মনে চাচ্ছিলেন কাসেমকে অনুমতি দেবন এবং বলবেন,যদি যেতে চাও তো যাও। কিন্তু মুখে সাথে সাথেই অনুমতি দিলেন না। বরং সহসাই তিনি তার বাহুদ্বয় প্রসারিত করে দিলেন এবং বললেন, এসো ভাতিজা! এসো, তোমার সাথে খোদা হাফেযী করি। কাসেম ইমাম হুসাইন (আঃ)-এর কাঁধের ওপর তাঁর হাত দুটো রাখলেন এবং ইমামও কাসেমের কাঁধের ওপর হাত দুটি রাখলেন। এরপর উভয়ে কাঁদলেন। ইমামের সঙ্গী সাথীরা ও তাঁর আহলে বাইতের সদস্যরা এ হৃদয় বিদারক বিদায়ের দৃশ্য দেখলেন। ইতিহাসে লেখা হয়েছে, উভয়ে এতই ক্রন্দন করলেন যে, উভয়ই অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। এরপর এক সময় তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন এবং কিশোর কাসেম সহসাই তাঁর ঘোড়ায় আরোহণ করলেন।

ইয়াযীদী পক্ষের সেনাপতি ওমর ইবনে সা‘দের সেনাবাহিনীর মধ্যে অবস্থানকারী বর্ণনাকারী বলেন,সহসাই আমরা একটি বালককে দেখলাম ঘোড়ায় চড়ে আমাদের দিকে আসছে যে তার মাথায় ধাতব-টুপির পরিবর্তে একটি পাগড়ী বেধেছে। আর তার পায়ে যোদ্ধার বুট জুতার পরিবর্তে সাধারণ জুতা এবং তার এক পায়ের জুতার ফিতা খোলা ছিলো; আমার স্মৃতি থেকে এটা মুছে যাবে না যে,এটা ছিলো তার বাম পা। তারপর বর্ণনাকারী বলেন: সে যেন চাঁদের একটি টুকরা। (মানাকিবে ইবনে শাহরে আশুব,খণ্ড: ৪,পৃষ্ঠা: ১০৬,এ’লামুল ওয়ারা, পৃষ্ঠা: ২৪২,আল-লুহুফ, পৃষ্ঠা: ৪৮, ইরশাদ-শেখ মুফিদ, পৃষ্ঠা: ২৩৯,মাকতালু মুকাররাম, পৃষ্ঠা: ২৩১,তারীখে তাবারী, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ২৫) একই বর্ণনাকারী আরো বলেন,কাসেম যখন আসছিলো তখনো তার গণ্ড দেশে অশ্রুর ফোটা দেখা যাচ্ছিলো।

সবাই অনুপম সুন্দর এ কিশোর যোদ্ধাকে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো এবং ভেবে পাচ্ছিলো না যে, এ ছেলেটি কে! তৎকালে রীতি ছিলো এই যে, কোনো যোদ্ধা রণাঙ্গনে আসার পর প্রথমেই নিজের পরিচয় দিতো যে,আমি অমুক ব্যক্ত । উক্ত রীতি অনুযায়ী কাসেম প্রতিপক্ষের সামনে এসে পৌঁছার পর উচ্চস্বরে বললেন:

"যদি না চেনো আমাকে জেনো আমি হাসান তনয় সেই নবী মুস্তাফার নাতি যার ওপর ঈমান আনা হয় ঋণে আবদ্ধ বন্দী সম এই যে হুসাইন প্রিয়জনদের মাঝে,পানি দেয়া হয় নি যাদের উত্তম রীতি মেনে।’’

কাসেম রণাঙ্গনে চলে গেলেন, আর হযরত ইমাম হুসাইন (আঃ) তার ঘোড়াকে প্রস্তুত করলেন এবং ঘোড়ার লাগাম হাতে নিলেন। মনে হচ্ছিলো যে তিনি তার দায়িত্ব পালনের জন্য যথা সময়ের অপেক্ষা করছিলেন। জানি না তখন হযরত ইমামের মনের অবস্থা কেমন ছিলো। তিনি অপেক্ষমাণ; তিনি কাসেমের কণ্ঠ শোনার জন্য অপেক্ষমাণ। সহসাই কাশেমের কণ্ঠে ‘‘চাচাজান!’’ ধ্বনি উচ্চকিত হলো। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা বুঝতে পারলাম না ইমাম হুসাইন কত দ্রুত গতিতে ঘোড়ায় আরোহণ করলেন এবং রণাঙ্গনের দিকে ছুটে এলেন। তার এ কথা বলার তাৎপর্য এই যে,ইমাম হুসাইন (আঃ) এক শিকারি বায পাখীর মত রণাঙ্গনে পৌঁছে যান।

ইতিহাসে লিখিত আছে,কাসেম যখন ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে পড়ে যান তখন শত্রুপক্ষের প্রায় দুই শত যোদ্ধা তাঁকে ঘিরে ফেলে। তাদের একজন কাশেমের মাথা কেটে ফলেতে চাচ্ছিলো। কিন্তু তারা যখন দেখলো যে, ইমাম হুসাইন (আঃ) তীব্র গতিতে ঘোড়া চালিয়ে এগিয়ে আসছেন তখন তাদের সকলেই সেখান থেকে পালিয়ে গেলো। আর যে ব্যক্তি কাশেমের মাথা কাটতে চাচ্ছিলো সে তাদেরই ঘোড়ার পায়ের নীচে পিষ্ট হলো। যেহেতু তারা খুবই ভয় পেয়ে গিয়েছিলো সেহেতু তারা তাদের বন্ধুর ওপর দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে পালিয়ে যায়। অনেক লোক একবারে ঘোড়া চালিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলো;কেউ কারো দিকে তাকাবার অবকাশ পাচ্ছিলো না। মহা কবি ফেরদৌসীর ভাষায়:

‘‘সেই বিশাল প্রান্তরে কঠিন ক্ষুরের ঘায়ে ধরণী যেন হলো ছয় ভাগ আর আসমান আট।’’ কেউ বুঝতে পারলো না যে, কী ঘটে গেলো। ঘোড়ার ক্ষুরের আঘাতে সৃষ্ট ধুলার কুণ্ডলী যখন বসে গেলো এবং হাওয়া কিছুটা স্বচ্ছ হলো তখন সবাই দেখতে পেলো যে, ইমাম হুসাইন (আঃ) কাসেমকে কোলে নিয়ে আছেন। আর কাসেম তার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো অতিক্রম করছিলেন এবং যন্ত্রণার তীব্রতার কারণে মাটিতে পা আছড়াচ্ছিলেন। এ সময় শোনা গেলো,ইমাম হুসাইন (আঃ) বলছেন: ‘‘আল্লাহর শপথ, এটা তোমার চাচার জন্য কতই না কষ্টকর যে, তুমি তাকে ডাকলে কিন্তু তার জবাব তোমার কোনো কাজে এলো না।’’