Thursday, January 31, 2019

যুক্তরাষ্ট্রে তাপমাত্রা মাইনাস ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ১২ মৃত্যু

ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডা গ্রাস করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপশ্চিমাঞ্চলকে। মেরু অঞ্চলের বরফঠাণ্ডার প্রকোপে এরই মধ্যে কমপক্ষে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, গ্রেট লেকের অংশবিশেষে তাপমাত্রা কমে দাঁড়াতে পারে মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কোথাও কোথাও এরই মধ্যে এর চেয়ে নিচে নেমে গেছে তাপমাত্রা। এ অবস্থায় পোস্টাল সার্ভিস তাদের গুরুত্বপূর্ণ ডেলিভারি পর্যন্ত বন্ধ রেখেছে। একই অবস্থা বিরাজ করছে কানাডায়ও। বুধবারও একই অবস্থা অব্যাহত ছিল। এমন হিম ঠান্ডার মধ্যে ঘুমের রাজ্যে গেছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, বৃটেনসহ মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি দেশগুলো।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রে কমপক্ষে তিন জন মারা গেছেন। সব মিলে সেখানে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্টের শিকাগো সহ মিডওয়েস্ট হিসেবে পরিচিত অঞ্চলগুলোতে বুধবার ও বৃহস্পতিবার সব ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বরফে ঢাকা রয়েছে মহাসড়কগুলো। এ অবস্থায় উচ্চ মাত্রায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছে পুলিশ। মিশিগানে বৃহস্পতিবার সব অফিস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্টের ইউএস পোস্টাল সার্ভিস ডাকোটা থেকে ওহাইও পর্যন্ত তাদের ডেলিভারি স্থগিত করেছে। এমন ঘটনা বিরল।
শনিবার থেকে মিশিগান, আইওয়া, ইন্ডিয়ানা, ইলিনয়, উইসকনসিন এবং মিনেসোটায় ঠান্ডাজনিত কারণে মারা গেছেন ওই কমপক্ষে এক ডজন মানুষ। ইলিনয়ের একটি ভাড়া করা বাসের ডিজেল শূণ্য ডিগ্রি তাপমাত্রার অনেক নিচে নেমে যাওয়ায় ঠান্ডায় জমে যায় অবার্ন এলাকায়। এতে বাসটি আটকা পড়ে যায়। এর ভিতর আটকে পড়া ২১ জনকে উদ্ধার করেছে ইলিনয় স্টেট পুলিশ।
ডেট্রোয়েট পুলিশের এক মুখপাত্র বলেছেন, আবাসিক এলাকার রাস্তায় বুধবার তারা মৃত অবস্থায় পেয়েছেন ৭০ বছর বয়স্ক একজনকে। এ সময় তিনি শুধু ঘুমানোর পোশাক পরা ছিলেন। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রকে বুধবার সকালের দিকে ক্যাম্পাসের একটি ভবনের বাইরে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তার নাম জেরাল্ড বেলজ। শিকাগোর রাস্তাঘাট দৃশ্যত ফাঁকা। ভয়াবহ ঠান্ডার কারণে দু’একজন মানুষ বাইরে বেরুচ্ছেন সেখানে।
মিনিয়াপোলিসও থর থর করে কাঁপছে। সেখানে তাপমাত্রা মাইনাস ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেখানে অনেকেই দেখতে পাচ্ছেন রাস্তার গাড়ি গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে নিচে।
মিনেসোটার পার্ক র‌্যাপিডসে তাপমাত্রা নেমে এসেছে মাইনাস ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। নর্থ ডাকোটায় মাইনাস ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এ অবস্থায় শিকাগো ও’হারে এবং শিকাগো মিডওয়ে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কয়েক হাজার বিমানের ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে বুধবার। আমট্রাক রেল সার্ভিসের সব ট্রেন শিকাগো আসা ও যাওয়া বাতিল করা হয়েছে।

পাতায়ায় যৌনতার আড়ালে অন্যরকম চুরি

থাইল্যান্ডের পাতায়া। রাতের পাতায়া হলে তো কথাই নেই। সেখানে নানা রঙের আলোর ঝলকানিতে যে কত রকমের মানুষের জমায়েত তার কোনো ইয়ত্তাই নেই। এখানে ওখানে দেহপসারিণীদের বিকিকিনি। বারে বারে নাচছে নতর্কী। নানা রকম উৎসব। আর রাস্তায় দাঁড়ানো যৌনকর্মী। তাদের অনেকেই নিতান্ত যৌনকর্মী।
আবার অনেকে আছেন, যারা যৌনকর্মীর আড়ালে বড় কোনো চুরির ফাঁদ পাতেন। তেমনই একজন নারী কাম পাখাম (৪৮)। এক রাতে তিনি পাতায়ার রাস্তায় অপেক্ষায় ছিলেন খদ্দের ধরার জন্য। একটি হোটেলের বাইরে দাঁড়িয়ে এমন প্রস্তাব দিয়ে পেয়ে গেলেন বৃটিশ ডানিয়েল বুথ (২৭)কে। তারপর দু’জনে ফিরে গেলেন হোটেলে। যা হবার তাই হলো। উদ্দামতায় মেতে উঠলেন দু’জনেই। ঘুমিয়ে পড়লেন ডানিয়েল। ততক্ষণে সর্বনাশটা যে হয়ে গেছে তা টের পেলেন ঘুম থেকে উঠে। চোখ খুলেই দেখতে পান তার ঘড়ি আর মোবাইল নেই। নেই কাম পাখামও। বুঝে গেলেন ঘটনা। তিনি পুলিশে খবর দিলেন। তাদেরকে জানালেন শনিবার রাতে এক থাই নারীর সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। বলেছেন, ওই নারী তাকে দু’বার পানীয় পরিবেশন করেছেন। এরপর তিনি অচেতন হয়ে গেছেন। হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ ধরে তদন্তে নামে পুলিশ। তাতে রাস্তায় সন্দেহজনকভাবে হাঁটতে দেখা যায় পাখামকে। এক পর্যায়ে তার হদিস পায় পুলিশ। তার কাছাকাছি যেতেই পাখাম পালিয়ে যান। তিন দিন পরে তাকে সোই বুখাওয়ের একটি বারের বাইরে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তখন পাখাম অন্য ধনী বিদেশী খদ্দের ধরার চেষ্টা করছিলেন।
এরপর জিজ্ঞাসাবাদে পাখাম পুলিশকে বলেছেন, তিনি খদ্দের বাছাই করেন দেখেশুনে। যেসব বিদেশীর গলায় স্বর্ণের চেইন দেখতে পান, হাতে আছে দামী ঘড়ি তাদেরকে যৌনতা প্রস্তাব করেন। তার ভাষায়, আমি এই কাজ এ পর্যন্ত তিন-চারবার করেছি। আমি পুরুষদের বাছাই করি দামী জিনিস দেখে। তাদের সঙ্গে রুমে মেতে উঠি। তারপর পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে দিই ঘুমের ওষুধ। তারা ঘুমিয়ে গেলে ঘড়ি, মোবাইল ফোন আর নগদ অর্থ চুরি করি।
তার এ স্বীকারোক্তির পর তদন্তকারীরা কাম পাখামের রুমে তল্লাশি চালিয়েছেন। এ সময় তারা কমপক্ষে ১০ট বিলাসি দামী ঘড়ি ও স্মার্টফোন উদ্ধার করেছেন। এমন চুরির জন্য তার ২০০০০ থেকে ১০০০০০ থাই বাথ জরিমানা হতে পারে।

ভেনিজুয়েলায় ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে’ -গাইডোকে ট্রাম্প

ভেনিজুয়েলার সেনাবাহিনীর সঙ্গে গোপনে মিটিং হয়েছে বলে দাবি করেছেন নিজেকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ঘোষণাকারী বিরোধী দলীয় নেতা হুয়ান গাইডো। ওই মিটিংয়ে তিনি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে উৎখাতে সেনাবাহিনীর সমর্থন চেয়েছেন বলেও দাবি করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক মতামত কলামে তিনি এসব বলেছেন। তবে ভেনিজুয়েলার সেনাবাহিনীর তরফ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয় নি। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রতি এই সেনাবাহিনীর রয়েছে অকাট্য আনুগত্য। যদি হুয়ান গাইডোর দাবি সত্যি হয় তাহলে মাদুরোর জন্য বিপদ সংকেত হিসেবে দেখা যেতে পারে ওই বৈঠককে। কারণ, যদি হুয়ান গাইডো সেনাবাহিনীর ভিতরে বিভেদ সৃষ্টি করে তাতে বিদ্রোহ ঘটাতে পারেন তাহলে স্পষ্ট দুই ভাগ হয়ে যাবে সেনারা। আর তা হলে দেশের জন্য আরো বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
সমাজ বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এমনটা হলে তাতে দেশে অস্থিরতা বাড়বে। দেখা দিতে পারে গৃহযুদ্ধ। পুরো সেনাবাহিনীকে গাইডো তার অধীনে আনতে পারবেন এমনটা ভাবা বোকামি। হয়তো কিছু সেনা তাকে সমর্থক করতে পারেন। ফলে পরিস্থিতি ভাবিয়ে তুলেছে বিশ্লেষকদের।
জানুয়ারির শুরুতে গাইডো নিজেকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা দেন। তারপর আত্মগোপনে রয়েছেন। তাকে সমর্থন করেছে যুক্তরাষ্ট্র সহ কমপক্ষে ২০ টি দেশ। অন্যদিকে মাদুরোর পিছনে রয়েছে রাশিয়া, চীন, তুরস্ক, ইরানের মতো দেশ। তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে ভেনিজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালালে তার পরিণাম ভয়াবহ হবে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, তা থেকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনাও ঘটতে পারে।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প টুইটে বলেছেন, তিনি গাইডোর সঙ্গে কথা বলেছেন। তার ‘ঐতিহাসিক প্রেসিডেন্সির’ সূচনাকে তিনি সমর্থন জানান। দ্বিতীয় আরেকটি টুইটে তিনি লিখেছেন ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে’।
ওদিকে বৃটেন সহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ নিকোলাস মাদুরোকে আট দিনের সময় দিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে অবাধ, সুস্থ ও নিরপেক্ষ নতুন নির্বাচন দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। যদি তিনি তা করতে ব্যর্থ হন তাহলে তারা গাইডোকে সমর্থন দেবে বলেও জানিয়ে দিয়েছে। এরই মধ্যে বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি একটি আহ্বান জানাবেন বলে মনে করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার এমন আহ্বানে তিনি মাদুরো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অবরোধ দেয়ার ডাক দিতে পারেন। এর আগে বুধবার হুয়ান গাইডোর সঙ্গে তার কথা হওয়ার কথা।
ওদিকে মারাত্মক অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে এরই মধ্যে ৩০ লাখ মানুষ ভেনিজুয়েলা থেকে পালিয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বৃদ্ধি পেয়েছে সহিংস উত্তেজনা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা চালানোর ভয়ে আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ। গত ১০ই জানুয়ারি মাদুরো শপথ নিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। তখন থেকেই দেশজুড়ে বিক্ষোভ চলছে। তারই এক পর্যায়ে গাইডো নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করে বসেন। দু’জনের মধ্যে সেই থেকে ক্ষমতা নিয়ে লড়াই চলছে। আর এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিশ্ব স্পষ্টতই দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে।
গাইডো লিখেছেন, সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের বেশকিছু সদস্যের সঙ্গে আমার গুপ্ত বৈঠক হয়েছে। মাদুরোর ওপর থেকে সেনাবাহিনীর সমর্থন প্রত্যাহার সরকার পরিবর্তনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে সেনাবাহিনীতে থাকা সংখ্যাগরিষ্ঠই একমত হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে যদি সেনাবাহিনীর কাউকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে অপরাধী হিসেবে পাওয়া যায় তাদেরকে সাধারণ ক্ষমা দেবে বর্তমানের বিরোধী দল।
ভেনিজুয়েলার ন্যাশনাল এম্বেলির প্রধান হিসেবে হুয়ান গাইডো বলেছেন, প্রেসিডেন্ট যখন অবৈধ হয়ে যান তখন সংবিধান তাকে অস্থায়ী ভিত্তিতে ক্ষমতা পরিচালনার অধিকার দিয়েছে। অ্যনদিকে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট গাইডোকে দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তার সব ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করেছে।

গর্ভেই বিক্রি সন্তান: দুই দিন বয়সি শিশুকে নিতে এসে সোনিয়া থানা হাজতে

মাতৃগর্ভে থাকাবস্থায়ই বিক্রি হয়ে গেছে মুসা। ২ দিন বয়সের এ শিশুকে নিতে এসে  ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আটক হয়েছেন সোনিয়া নামের এক নারী। বুধবার  রাত ৮টার দিকে হাসপাতালের ১০৬ নং গাইনি ওয়ার্ড  থেকে ২৮ বছর বয়সের সোনিয়াকে আটক করা হয়। ওই ওয়ার্ডে ভর্তি জোসনা নামে এক মহিলার সদ্যোজাত সন্তান নিতে এসেছিলেন তিনি।  যে শিশুর নাম মুসা। জোসনার স্বামীর নাম টুকু মিয়া। তারা গাজীপুর টঙ্গীর রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় ফুটপাতে থাকেন। জোসনা  বলেন, এক সময় আমি কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকায় দোকানে দোকানে পানি দেয়ার কাজ করতাম। তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা থাকাবস্থায় সেখানে সোনিয়া নামের এক নারীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়।
আমরা গরিব মানুষ। সোনিয়া ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে আমার পেটের সন্তানকে কেনার প্রস্তাব দেয়। গরিব বিধায় টাকার বিনিময়ে সন্তান বিক্রি করতে রাজি হই। অগ্রিম হিসাবে সোনিয়া আমাকে তিন হাজার টাকাও দেয়। মঙ্গলবার সিজারের মাধ্যমে আমার ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। নাম রেখেছি মুসা। বুধবার রাতেই সোনিয়া হাসপাতালে আমার সন্তানকে নিতে আসে। এসময় তাকে সন্তান না দেয়ার কথা বলে অগ্রিম তিন হাজার টাকা ফেরত নিয়ে যাওয়ার কথা বলি। কিন্তু সোনিয়া তারপরও জোর করে আমার সন্তান নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে হাসপাতালের লোকজন তাকে আটক করে। সোনিয়া তার স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজারের নাসির উদ্দিন সরদার লেনের একটি বাসায় থাকেন। তিনি জোসনার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এক সময় জোসনা আমার বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতো। গরিব মানুষ বিধায় তাকে আমি নগদ টাকা দিয়ে সাহায্য করেছি। তার সন্তান জন্মের কথা শুনে তাকে হাসপাতালে দেখতে এসেছি মাত্র। এর বেশি কিছুই জানি না। হাসপাতালের ১০৬ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বরত নার্স কামরুন নাহার ও টুম্পা হাওলাদার বলেন, হঠাৎ সোনিয়া নামের ওই নারী নবজাতকটিকে কোলে নিয়ে ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে গেটের দিকে যেতে থাকলে আমরা তাকে আটক করি। কারণ অনেক নিয়ম-কানুন মেনে নবজাতক নিয়ে হাসপাতাল ছাড়তে হয়। এসব কিছু না করেই সোনিয়া নবজাতককে নিয়ে দ্রুত হাসপাতালে ত্যাগের চেষ্টা করলে তাকে আটক করা হয়।
ঢামেক হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্লকের ওয়ার্ড মাস্টার মোহাম্মদ রিয়াজ জানান, সোনিয়াকে আটক করার পরপরই শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেও অবগত করা হয়েছে। এ বিষয়ে শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ভোজন বিশ্বাস  বলেন, নবজাতকের মা জোসনা বলেছেন, তাদের মধ্যে টাকা-পয়সা নিয়ে একটা লেনদেনের ব্যাপার ছিল।

ইসি দাবি করলেই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে এমন কোনও কথা নেই

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কি খুবই সন্তোষজনক হয়েছে? এই ক্ষেত্রে পাবলিক পারসেপশন কি? তা নিজেদের কাছেই জিজ্ঞেস করতে হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। আগারগাঁওস্থ ইটিআই ভবনে ঢাকা উত্তর সিটি মেয়রের শূন্য পদে স্থগিত নির্বাচন, উত্তর ও দক্ষিণ সিটির নবগঠিত ৩৬টি ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে স্থগিত নির্বাচন এবং  উত্তর সিটির ৯ ও ২১ নং সাধরণ ওয়ার্ড কাউন্সিলরের শূন্য পদে  নির্বাচন উপলক্ষে  রিটার্নিং ও সহকারি রিটার্নিং অফিসারদের প্রশিক্ষণ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আজ বৃহস্পতিবার সকালে এ কথা বলেন তিনি। 
মাহবুব তালুকদার বলেন, বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তথ্য উপাত্ত নিয়ে আমি কিছুটা পড়াশুনা করার চেষ্টা করেছি। এর অভিজ্ঞতা কিঞ্চিত আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারি। যা আপনাদের সহায়ক হতে পারে। আমাদের নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে মূলত দুই প্রধান শক্তির উপর নির্ভরশীল। একদিকে নির্বাচন কর্মকর্তা বা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আমি এখন পর্যন্ত যেসব কাগজপত্র দেখেছি।
তাতে রিটার্নিং অফিসার থেকে শুরু করে পর্যবেক্ষক পর্যন্ত সকলের প্রতিবেদনে দুটি শব্দ অতিমাত্রায় ব্যবহৃত হয়েছে। একটি শব্দ হচ্ছে সন্তোষজনক এবং অন্য শব্দটি হচ্ছে আমাদের নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব মূলত দুই প্রধান শক্তির উপর নির্ভরশীল। একদিকে নির্বাচন কর্মকর্তা বা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তিনি বলেন, আমি এখন পর্যন্ত যেসব কাগজপত্র দেখেছি। তাতে রিটার্নিং অফিসার থেকে শুরু করে পর্যবেক্ষক পর্যন্ত সকলের প্রতিবেদনে দুটি শব্দ অতিমাত্রায় ব্যবহৃত হয়েছে। একটি শব্দ হচ্ছে সন্তোষজনক এবং অন্য শব্দটি হচ্ছে স্বাভাবিক। তার মানে কি আমাদের নির্বাচন খুবই সন্তোষজনক হয়েছে? এই ক্ষেত্রে পাবলিক পারসেপশন কি, তা নিজেদের কাছেই জিজ্ঞেস করতে হবে। তিনি আরো বলেন, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ করার বিষয়ে আমি সবসময় গুরুত্বারোপ করেছি। এই গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অবশ্যই দৃশ্যমান হতে হবে। নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি করলেই যে তা সুষ্ঠু হয়ে যাবে এমন কোনো কথা নেই। জনতার চোখ বলে একটা কথা আছে। আমাদের ও আপনাদের সকলের কর্মকান্ড জনতার চোখে পরীক্ষিত হবে। সুতরাং যথার্থ একটি গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করার জন্য আমাদের সবাইকে অঙ্গিকারাবদ্ধ হতে হবে।
নিজের ভারত সফরের বিষয়ে তিনি বলেন,  কয়েকদিন পূর্বে আমি ভারতে ছিলাম। সেখানে একটি পত্রিকায় নির্বাচনি ব্যবস্থাপনা নিয়ে লেখা একটি আর্টিকেল পড়ি। তাতে দুয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা ছিল। এতে লক্ষ্য করা যায়। নির্বাচনি দায়িত্বে যারা নিয়োজিত সেই নির্বাচনি কর্মকর্তাগণ নির্বাচন সুষ্ঠু করার বিষয়ে অনড় ছিলেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনিয়ম সম্পর্কে তারা কঠোর অবস্থান গ্রহন করতে পিছপা হননি। আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারত যে অনেক বৈপরিত্য সত্ত্বেও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা সমুন্নত রেখেছে। তার পেছনে ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের অবদান কম নয়।
নিজের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনে আমার দুই বছরের অভিজ্ঞতা বলে, বিভিন œ প্রতিবেদনে বিশেষত, নিজস্ব পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদনে সাধারণত কোনো নেতিবাচক বিষয় লিপিবদ্ধ করার বিষয়ে  আমরা দ্বিধান্বিত। সবাই যেনো কাগজে পত্রে গা বাঁচিয়ে চলতে চান। যদি কেউ তথ্য উপাত্ত দিয়ে আমার কথার বিরোধীতা করতে পারেন। তাহলে আমি খুশি হবো। আমি মনে করি, নির্বাচনে প্রকৃত চিত্রটি সকল প্রতিবেদনে উঠে আসা উচিত।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সম্মান ও মর্যাদা এর কার্যক্রমের উপরে নির্ভর করে। এর সম্মান ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে শুধু  নির্বাচন কমিশন নয়, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়সহ মাঠপর্যায়ের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারিদের দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।  সকল প্রার্থীর প্রতি সমআচরণের মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠানের সম্মান, মর্যাদা ও পবিত্রতা অক্ষুন্ন রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর।  আসন্ন সিটি নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন  যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তাকে আমি নাতিশীতষ্ণ নির্বাচন বলবো। কারণ এই নির্বাচনের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার কথা ছিল। যে উত্তাপ ও উষ্ণতা থাকার কথা ছিল এখন পর্যন্ত অবস্থার দৃষ্টি মনে হয় তা হবে না। কেবল কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কিছুটা উষ্ণতা আশা করা যায়। আসন্ন নির্বাচনের শৈত প্রবাহ তাতে কেটে যাবে বলে  আমরা মনে করতে পারি।
তিনি বলেন, গত উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় প্রধান বিরোধী প্রার্থী সমান সুযোগ না থাকার কথা বলে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নেন। যদিও সত্যিকার অর্থে এবারের নির্বাচনে মেয়র পদে প্রধান বিরোধী দলের কোনো প্রার্থী নেই। তবুও নির্বাচনে অনিয়মের কথা বলে প্রার্থীতা প্রত্যাহারের ঘটনা যে ঘটবে না তা বলা যায় না। এক্ষেত্রে আমাদের উচিত হবে একটি শুদ্ধ, আইনানুগ নির্বাচন করা। যাতে নির্বাচনকে কেউ প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ না পান। তিনি আরো বলেন, ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর ঢাকার এই নির্বাচনের দিকে দেশবাসি এমনকি উন্নয়ন সহযোগিরা তাকিয়ে আছেন। আমরা কি ধরনের নির্বাচন উপহার দেই তা দেখার জন্য। নির্বাচনকালে আমরা কোনো চাপ, কোনো ভয়ভীতি বা প্রলোভনের কাছে নতি স্বীকার করবো না। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- অন্যায় যে করে, আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেনো তৃণ সমদহে। এ উক্তি উল্লেখ করে রাজধানীবাসীকে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে হবে বলে জানান তিনি। ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে  প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা, নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম, বেগম কবিতা খানম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী এতে উপস্থিত ছিলেন।

মাদক বহনে সুন্দরী নারী, আন্তর্জাতিক চক্রের ৫ সদস্য গ্রেপ্তার

আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্রে জড়িত থাকার অভিযোগে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এদের মধ্যে তিন নারীও রয়েছে। সোমবার রাতে রাজধানীর কাউলা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলো- শরিয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কোদালপুর গ্রামের ইমাম হোসেনের মেয়ে ফাতেমা ইমাম তানিয়া (২৬), চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার গাছুয়া গ্রামের আশরাফ উল্লাহর মেয়ে আফসানা মিমি (২৩), মানিকগঞ্জ সদরের সরুপাই গ্রামের সালাম মিয়ার মেয়ে সালমা সুলতানা (২৬), বগুড়া সদরের জহুরনগর গ্রামের তফাজ্জল শেখের ছেলে শেখ মোহাম্মদ বাঁধন ওরফে পারভেজ (২৮) এবং শরিয়তপুর জেলার সখীপুরের চরভাগা গ্রামের মো. নাছিরের ছেলে রুহুল আমিন ওরফে সায়মন। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে ১৯৭০টি ইয়াবা, বিদেশি মুদ্রা ও পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে। গতকাল কাওরান বাজারের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন সংস্থাটির মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান।
তিনি বলেন, গ্রেপ্তারকৃতরা আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্রের সঙ্গে জড়িত। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা তাদের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছে।
এ চক্রের নেতৃত্বে আছে আরিফ ও রেহেনা নামে দুই বাংলাদেশি। আফগানিস্তান থেকে মাদক সরবরাহ করে কয়েকটি দেশ ঘুরে চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে তা শ্রীলঙ্কায় পাচার করে আসছে। তিনি বলেন, গত বছরের ডিসেম্বরে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে বিশেষ অভিযানে ২৭২ কেজি হেরোইন ও ৫ কেজি কোকেনসহ মো. জামাল উদ্দিন ও রাফিউল ইসলাম নামে দুই বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হয়। তার কয়েকদিন পর ৩২ কেজি হেরোইনসহ বাংলাদেশি নাগরিক সূর্যমণি গ্রেপ্তার হয়। ১ মাসের মধ্যে হেরোইন ও কোকেনসহ বাংলাদেশি গ্রেপ্তারের ঘটনাটি তদন্তে বাংলাদেশে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।
টাস্কফোর্সের অভিযানে গত ১২ই জানুয়ারি আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে চয়েজ রহমান নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তার বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা করা হয়। সেই মামলার ছায়া তদন্তে নামে র‌্যাব। এরই ধারাবাহিকতায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার রাজধানীর বিমানবন্দরের পাশে কাউলা এলাকা থেকে অভিযান চালিয়ে ৫ জনকে  গ্রেপ্তার করা হয়। মুফতি মাহমুদ খান বলেন, স্মার্ট সুন্দরী তরুণীদের প্রলোভনে ফেলে তাদের দিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে শ্রীলঙ্কায় মাদক পাচার করতো আন্তর্জাতিক মাদক পাচারচক্র। তিনি বলেন, এরা বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে খালি হাতে যেত, এরপর ওই দেশ থেকে লাগেজে করে মাদক নিয়ে যেত শ্রীলঙ্কায়।
মুফতি বলেন, মাদক পাচারে কয়েকটি রুটের তথ্য আমরা পেয়েছি। এগুলো সাধারণত আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান হয়ে শ্রীলঙ্কা এবং আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান ও মালয়েশিয়া হয়ে শ্রীলঙ্কায় যেত। এ ছাড়াও মালয়েশিয়া থেকে চীন হয়ে শ্রীলঙ্কা রুটের কথাও জানা  গেছে। এ আন্তর্জাতিক চক্রে একটি বাংলাদেশি গ্রুপ সক্রিয়। যার নেতৃত্বে আরিফ ও রেহানা নামে দুই ব্যক্তির কথা জানা গেছে। রেহানা মাদকসহ চীনে গ্রেপ্তার হয়ে সেখানকার কারাগারে আছে। আরিফ কোনো এক দেশে আত্মগোপন করে রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তিনি বলেন, মাদকগুলো আফগানিস্তান-পাকিস্তান হয়ে অন্যান্য দেশ ঘুরে শ্রীলঙ্কা গেলেও রুট হিসেবে বাংলাদেশ ব্যবহূত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বাংলাদেশিদের এই গ্রুপটি দেশের অভ্যন্তরে ইয়াবা পাচার সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। তাদের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রমের বিষয়টিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে মুফতি বলেন, আটক ৫ জনের মধ্যে ৪ জনই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশে মাদক চালানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এদের মধ্যে তানিয়া নিজ এলাকা শরীয়তপুরে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। তিনি অনলাইন ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। ২০১৬ সালে রাজধানীর তাজমহল রোডে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কোচিং করার সময় ফারহানা ও রুহুল আমিনের মাধ্যমে রেহানার সঙ্গে পরিচয় হয় তানিয়ার।
রেহানা হলেন ফারহানার বড় বোন। বিদেশে অল্পদিনের ভ্রমণেই লাখ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব এমন প্রলোভনে আন্তর্জাতিক মাদক পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে যায় তানিয়া। সে ওই বছর রেহানার সঙ্গে মালয়েশিয়া গিয়ে ১০ দিন থাকে। সেখান থেকে শ্রীলঙ্কা গিয়ে ৩-৪ দিন অবস্থান করে বাংলাদেশে ফেরত আসে। এরপর ২০১৭ সালে আরিফের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে ২ বার ভারত, ৩ বার চীন এবং ৮-১০ বার মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কা ভ্রমণ করেছে। র‌্যাবের দাবি, চক্রের সদস্যরা বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার সময় খালি হাতে যায় এবং অন্য দেশে গিয়ে লাগেজসহ মাদক বহন করে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার কাজ করে। এ ছাড়াও অন্য রুটে আসা মাদকও তারা সংগ্রহ করে তা বণ্টনের কাজ করতো। এক্ষেত্রে তারা মাদকের শুধু বাহক হিসেবেই নয়, চক্রের সক্রিয় সদস্য হিসেবে বিভিন্ন ভূমিকা পালন করতো বলেও জানান মুফতি মাহমুদ খান।
মুফতি বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া আফসানা মিমি বিভিন্ন জায়গায় ডিজে নাচ ও গান করতো। একটি বেসরকারি  টেলিভিশন চ্যানেলে কাজ করতে গিয়ে সায়মনের সঙ্গে তার পরিচয়। এরপর সায়মনের মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক মাদক পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে মিমি। শ্রীলঙ্কার যে বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ বাংলাদেশি নাগরিক সূর্যমণিকে আটক করা হয়, সে বাড়িটি মিমির নামেই ভাড়া নেয়া হয়েছিল। সেই বাসাটি সাধারণত সিন্ডিকেটের সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সেখানে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মাদক বিস্কুট ও কেকের প্যাকেটে করে সাপ্লাই করা হতো। মিমি ২০১৭ সালে আরিফের সঙ্গে প্রথম মালয়েশিয়া যান এবং সেখান থেকে শ্রীলঙ্কা যান।
২০১৮ সালে দ্বিতীয়বারের মতো শ্রীলঙ্কা গেলে আরিফ তাকে সূর্যমণির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। র‌্যাব বলছে, আটক সালমা সুলতানা ২০১০ সালে এইচএসসি পাস করে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ শুরু করে। এ সময় তানিয়ার সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে রেহানার সঙ্গে পরিচয় হয়। এরপর এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সে। বেশ কয়েকবার ভারত, চীন ও শ্রীলঙ্কা ভ্রমণ করেছে। এ ছাড়া আটক সায়মন একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে কাজ করে। সে সুবাদে মেয়েদেরকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে চক্রে জড়িয়ে ফেলতো  সে। আটক পারভেজের কর্মসূত্রে আরিফের সঙ্গে পরিচয় হয়। ২০১৮ সালে দুইবার শ্রীলঙ্কায় গিয়ে সে প্রায় ১ মাস অবস্থান করে। সে সময় মাদকদ্রব্য সংগ্রহ, প্যাকেজিং ও সরবরাহে জড়িত ছিল  সে। এ চক্রের সঙ্গে জড়িত  দেশি-বিদেশি আরো বেশ কয়েকজনের নাম পাওয়া  গেছে। তদন্তের অগ্রগতি সাপেক্ষে পরবর্তীতে  বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে বলেও জানান মুফতি মাহমুদ খান।

দ্রুতগতিতে ড্রাইভিং বৃটিশ এমপির কারাদণ্ড

বৃটেনে ব্যাপক নিন্দিত সাবেক লেবার এমপি ফিওনা অনাসানিয়াকে ৩ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। তাকে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো ও জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে ভুল তথ্য দেয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ইংল্যান্ডের পিটারবোরো থেকে নির্বাচিত এই এমপিকে ওই ঘটনার পরই লেবার পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়।
তার নির্ধারিত গতির মাত্রা অতিক্রমের ঘটনাটি ২০১৭ সালের জুলাই মাসের। বৃটেনের আইন অনুযায়ী কোনো এমপি যদি ১২ মাস বা এক বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন তাহলে তাকে পদত্যাগ করতে হবে এবং ওই আসনে পুনরায় নির্বাচন দেয়া হবে। কিন্তু ফিওনা অনাসানিয়া ৩ মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ায় তাকে পদত্যাগ করতে হচ্ছে না। কিন্তু দেশজুড়ে সমালোচনার জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। তার আইনভঙ্গের দায় নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাকে বরখাস্ত করেছে তার দল লেবার পার্টি।
রায় ঘোষণার সময় বিচারপতি তাকে তিরস্কার করে বলেন, আপনি শুধু নিজেকে নয় আপনার পেশা ও বৃটেনের পার্লামেন্টকেও হেয় করেছেন।
ঘটনার দিন ৩৫ বছর বয়সী এই নারী এমপি ঘণ্টায় ৬৮ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালান। থর্নি নামের একটি গ্রামের যে সড়কে তিনি গাড়ি চালাচ্ছিলেন তার সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারিত ছিল ৪৮ কিলোমিটার। এ নিয়ম ভঙ্গ করায় তখন তাকে আটক করে দেশটির পুলিশ। কিন্তু নিজেকে বাঁচাতে তিনি তার ভাইয়ের সঙ্গে চুক্তি করে অপরাধের দায় তার ওপর দিয়ে দেন। এতে তার ভাইয়ের তখন ১০ মাসের জেল দেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে তদন্তকারী দল সঠিক তথ্য উদঘাটন করায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। কারাদণ্ড ছাড়াও রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তাকে লেবার পার্টি বহিষ্কার করলেও পদত্যাগ না করে তিনি স্বতন্ত্র হিসেবে পার্লামেন্টে থেকে যান। বৃটিশ গণমাধ্যম জানিয়েছে, এর কারণ হচ্ছে এ ছাড়া তার আর কোনো আয়ের উৎস নেই।
২০১৭ সালের জাতীয় নির্বাচনে ফিওনা অনাসানিয়া লেবার পার্টির হয়ে তার আসনে ৬০৭ ভোটে জয়ী হয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এদিকে কিছু বৃটিশ গণমাধ্যম জানিয়েছে, তার পদত্যাগের দাবি তুলছেন তার আসন পিটারবোরোর মানুষ। এ বিষয়ে লেবার পার্টির একজন মুখপাত্র বলেছেন, অনাসানিয়া তার এলাকার মানুষদের ছোট করেছেন। যখনই তার দোষ প্রমাণিত হয়েছে তার উচিত ছিল তখনি পদত্যাগ করা। যদি তিনি পদত্যাগ না করেন তাহলে লেবার পার্টি তার আসনের জনগণকে সমর্থন দেবে। পাশাপাশি কনজারভেটিভ পার্টিও তাকে পদত্যাগ করতে আহবান জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে দলটি জানায়, তিনি কারাগার থেকে তার এলাকার দেখভাল করতে পারবেন না। তাই তার উচিত দ্রুত পদত্যাগ করা। যদি তিনি পদত্যাগ না করেন তাহলে কনজারভেটিভ দল একটি রিকল পিটিশনের মাধ্যমে পিটারবোরোতে আরেকটি নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রচারণা চালাবে।

যে জেলখানায় কয়েদিরা পতিতাসঙ্গ ভোগ করে

জেলখানা মানেই অন্যরকম এক কঠিন শাস্তিময় স্থান। সেখানে মাদক ব্যবসায়ী, অস্ত্রধারী অপরাধী, ভয়াবহ সব সিরিয়াল খুনি সহ দুর্ধর্ষ অপরাধীদের আশ্রয়। পানামার একটি সরকারি জেলখানায়ও একই রকম অপরাধীতে গাদাগাদি। কিন্তু এর বাইরে আবার সেখানে ভিন্ন চিত্র। বন্দিরা সেখানে ভোগ করে নানা রকম সুবিধা। তারা পিজা দিয়ে উৎসব করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপ দিয়ে চ্যার্টি করতে পারে। ৩১০ পাউন্ড দিয়েই কিনে নিতে পারে অস্ত্র।
আরও যে সুবিধা তারা ভোগ করে তা হলো নারী সঙ্গ। চাইলেই তারা অর্থের বিনিময়ে নারীদের সঙ্গে রাত্রিযাপন করতে পারে। অর্থের বিনিময়ে এমন দেহদানকারী নারীদের বলা হয় এসকর্ট বা পতিতা।
বৃটেনের একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে ওই জেলখানার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সঙ্গে যোগ করা হয়েছে বেশ কিছু ছবি ও ভিডিও। এর একটি ক্লিপে দেখা যায়, অপরিচ্ছন্ন একটি মেঝেতে খালি গায়ে শুয়ে আছে এক বন্দি। এটি একটি ৫ বেডের সেল। সেখানে অবস্থান করে আরও ৬ জন। আরেকটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, ভগ্ন স্বাস্থ্যের কয়েকজন কয়েদি খুবই নি¤œমানের খাবার খাচ্ছেন। তৃতীয় আরেকটি ক্লিপে ফুটে উঠেছে, জেলখানার ভিতরে কয়েদিদের আঁকা ছবি। তারা দেয়ালে বাচ্চাদের মতো এঁকেছে এসব। আর একটি ক্লিপে একজন কয়েদিকে দেখা যায় কাগজে মোড়ানো কিছু একটা সংগ্রহ করছে। আসলে এটা কয়েদিদের মল। তারা যখন বাথরুমে যাওয়ার লম্বা লাইনে পড়ে তখন মেঝেতে কাগজ বিছিয়ে তার ওপর সারে প্রাকৃতিক কাজ। এরপর তা মুড়িয়ে জানালা দিয়ে ফেলে দেয় বাইরে। এমন অনেক আবর্জনা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে সেখানে। সেই মোড়ানো কাগজ সংগ্রহ করছিল ওই কয়েদি। এসব ভিডিও  ক্যামেরায় ধারণ করেছে সিরিয়াল খুনি ইউলিয়াম ‘ওয়াইল্ড বিল’ হোলবার্ট। সে অবৈধ উপায়ে সংগৃহীত মোবাইল ফোন ব্যবহার করে ধারণ করেছে এসব ভিডিও ও ছবি। হোলবার্ট বলেছে, বন্দিরা প্রাকৃতি কর্ম সারতে এই উপায় অবলম্বন করতে বাধ্য হয়। কারণ, সেলের যেসব টয়লেট আছে তা শুধু নির্দিষ্ট সময়ে ফ্লাশ করা হয়। তাই বন্দিরা এই উপায় অবলম্বন করতে বাধ্য হয়।
ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে একটি টিনেজ বালক সহ ৫ মার্কিন নাগরিককে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত হোলবার্ট। অর্থের প্রয়োজনে সে বোকাস ডেল টরোতে হত্যা করেছিল ওইসব মানুষকে। তারপর সে নিজে পরিচালনা করে এমন একটি হোস্টেলের মাটির নিচে পুঁতে রেখেছিল মৃতদেহ। তার সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলেছেন বৃটিশ ওই পত্রিকাটির সাংবাদিক। এ সময় সেলের ভিতরে বসেই প্রশ্নের উত্তর দেয় হোলবার্ট। সে জানায়, সে এবং অন্য অভিযুক্তরা যা ইচ্ছা চাইলেই করতে পারে জেলের ভিতরে। শুধু প্রয়োজন অল্প কিছু অর্থ। তার ভাষায়- এখানে সব কিছুই হয় অর্থে। আমরা প্রকৃতপক্ষেই ভাল আছি। আমি যে সেলে আছি এখানে আমার সঙ্গে আছে একটি শিশু। তার বিরুদ্ধে আছে অস্ত্র রাখার অভিযোগ। অন্যরা রাস্তায় মাদক দ্রব্য ব্যবহার বা বিক্রির দায়ে অভিযুক্ত। তবে এই জেলে আপনি একটি কাজই করতে পারবেন না। তা হলো সীমা লঙ্ঘন করতে পারবেন না এবং জেল থেকে বেরুতে পারবেন না।
এই জেলে ১০০ ডলার হলে একজন বন্দি পেতে পারে ২৪টি শক্তিশালী বিয়ারের একটি কেস। হোলবার্ট বলেছে, শুধু তাই নয়। তারা নারীদের সঙ্গে রাত্রিযাপন করতে পারে। চাইলে তাদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। এর জন্য ওই যে অর্থ, সেটা প্রয়োজন। তার ভাষায়, আপনি যা চাইবেন তার সবই পাবেন। আপনি যদি চান যে, আপনার স্ত্রী আপনার কাছে আসবেন এবং তিনদিন আপনার সঙ্গে থাকবেন, তাও করতে পারবেন আপনি। এর জন্য প্রয়োজন শুধু অর্থ। হোলবার্ট বলেছে, যখন আমি সিঙ্গেল ছিলাম তখন আমার কাছে মেয়েরা আসতো। আবার ভোর ৪টায় তারা চলে যেতো। জেলখানার প্রহরীদের দিকে ইঙ্গিত করে হোলবার্ট বলেছে, তারা ওইসব মেয়েকে আপনার সেলে রাত ৮টার দিকে দিয়ে যাবে। ভোরে যখন কয়েদি গণনা করা হয় তার আগেই ভোর ৪টায় ওই যুবতীকে সেল থেকে বেরিয়ে যেতে হয়। তার ভাষায়, এটা এখানে খুবই স্বাভাবিক বিষয়।

ভেনিজুয়েলা কি আরেকটি সিরিয়া হতে চলেছে? by স্বরাজ সিং

আন্তর্জাতিক আইনের কোনোই তোয়াক্কা না করে পশ্চিমা দেশগুলো নগ্নভাবে ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছে। তারা কোনো সন্দেহই অবশিষ্ট রেখে দেয় নি যে, তারাই ভেনিজুয়েলার ভাগ্য নির্ধারণ করতে চাইছেন। বিরোধী দলীয় নেতা হুয়ান গাইডো নিজেকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করার কয়েক মিনিটের মধ্যে তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর সেই পথ অনুসরণ করেছে কানাডা, বৃটেন, ফ্রান্স ও লাতিন আমেরিকার ডানপন্থি কিছু সরকার। লাতিন আমেরিকার ওই দেশগুলো হলো পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদী দেশগুলোর হাতের পুতুল। তারা দুই ঘন্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে। তবে রাশিয়া, চীন, ইরান, তুরস্ক, কিউবা, বলিভিয়া ও মেক্সিকো একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশের বিরুদ্ধে এভাবে পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদী দেশগুলোর হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। এই হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
তারা সমর্থন দিয়েছে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে। পশ্চিমা দেশগুলোর এমন উদ্যোগের সবচেয়ে কড়া নিন্দা জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এর জন্য করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে। ইকুয়েডরের সাবেক প্রেসিডেন্ট রাফায়েল কোরেয়াও সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মদতপুষ্ট সামরিক হামলার বিরুদ্ধে। বলেছেন, এমন হামলা চালালে তাতে সৃষ্টি হবে একটি গৃহযুদ্ধ।
যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা অন্য দেশগুলোর জোরপূর্বক অন্যদের ওপর তাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়ার দীর্ঘ ইতিহাস আছে। লাতিন আমেরিকাকে সব সময়ই যুক্তরাষ্ট্র দেখে এসেছে তার ঘরের পিছনের জায়গা বা ব্যাকইয়ার্ড হিসেবে, যেখানে তারা যা খুশি তাই করতে পারবে। গত দুই শতাব্দীতে কিউবা বাদে সত্যিকার অর্থে লাতিন আমেরিকার কোনো দেশ স্বাধীন হতে পারে নি। সংশ্লিষ্ট দেশের মানুষের স্বার্থের চেয়ে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। যখনই এই দুটি স্বার্থের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হয়, তখনই শক্তি প্রয়োগ করতে কখনোই দ্বিধাবোধ করে না যুক্তরাষ্ট্র। উদাহরণ হিসেবে ডা. সালভাদর অ্যালেন্ডের কথাই ধরা যাক। তিনি চিলির নির্বাচিত মার্কসপন্থি প্রেসিডেন্ট। তিনি তার দেশের সম্পদ তার জনগণের স্বার্থে ব্যবহার করতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭৩ সালে তার বিরুদ্ধে জেনারেল পিনোচেটকে দিয়ে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তার থেকে মুক্ত হতে কালক্ষেপণ করে নি যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭৫ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকা থেকে বামপন্থি শক্তিগুলোতে নির্মূল করার পর্যায়ক্রমিক একটি অপারেশন কন্ডোর পরিচালনা করে। সেখানে তারা ডানপন্থি একনায়কদের শক্তিশালী করার চেষ্টা করে।
বার বার হুগো শাভেজের কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। হুগো শাভেজ ১৯৯৯ সাল থেকে ২-১৩ সাল পর্যন্ত ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তেল বিক্রির অর্থে তিনি তার দেশবাসীর ভাগ্য উন্নয়নে অব্যাহতভাবে চেষ্টা করে গেছেন। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেল উত্তোলনকারী দেশগুলোর মধ্যে ভেনিজুয়েলা অন্যতম। হুগো শাভেজ ক্যান্সারে মারা যাওয়ার পর নিকোলাস মাদুরো দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু তার কবল থেকে বার বার মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে প্রতিবারই তিনি টিকে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও তেলের মূল্য পতনের ফলে বাস্তবেই ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি কঠিন অবস্থায়। প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে দায়ী করার জন্য এটাকে একটি অজুহাত হিসেবে বেছে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। তবে এবার মাদুরোকে সমর্থন করছে তার সেনাবাহিনী। আরেকটি ফ্যাক্টর খুব গুরুত্বপূর্ণ, যার জন্য মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানো খুব কঠিন। তা হলো, কর্মজীবী মানুষের জন্য বড় একটি ভিত্তি রচনা করে গেছেন হুগো শাভেজ। এ ছাড়া রাশিয়ার সরবরাহ দেয়া এক লাখ একে-৪৭ রাইফেল তুলে দিয়েছেন তার অনুসারীদের হাতে। ফলে যদি মাদুরোর সমর্থক ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত হুয়ান গাইডোর সমর্থকদের মধ্যে একটি সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হয় তাহলে তা হয়ে উঠবে চরম মাত্রায় রক্তক্ষীয়। এই যুদ্ধ বিপর্যয়কর হবে বলে যথার্থই সতর্কতা দিয়েছেন ভøাদিমির পুতিন।
এমন একটি যুদ্ধ হলে তাতে রাশিয়ার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লোকসানটা বেশি হবে। যদি তাতে যুক্তরাষ্ট্র হেরে যায় তাহলে সম্ভবত সেটা হবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেস্টিজের জন্য একটি ভয়াবহ আঘাত। এমনকি যদি এই যুুদ্ধে আমেরিকা বিজয়ী হয় তাহলে দীর্থে মেয়াদে এর ফল তাদের জন্য সহায়ক হওয়ার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। ইউরোপে নিজের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে রাশিয়াকে বড় রকমের বিজয় অর্জন করতে হবে এবং তার মধ্য দিয়ে তাদেরকে প্রেস্টিজ ও বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে হবে।  ইউক্রেন ও পোল্যান্ডের মতো দেশের জন্য একটি বড় রকমের আঘাত দিতে হবে তাদেরকে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাতিন আমেরিকায় বিজয়ী হওযার চেয়ে ইউরোপে পরাজিত হওয়া হবে অনেক বেশি খারাপ।
এরই মধ্যে সিরিয়ার পরাজয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেস্টিজ ও মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাবের মারাত্মক ক্ষতি করেছে। ভেনিজুয়েলা যুদ্ধের পরিণাম সিরিয়া যুদ্ধের চেয়ে অনেক বেশি বিপর্যয়কর হতে পারে। যদি মাদুরো টিকে যান, তারপর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের মতো টিকে থাকেন তাহলে তা হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় ক্ষতি। আবার এমন যদি হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে সফলতার সঙ্গে সরিয়ে দিলো তাহলে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক ভয়াবহভাবে, সম্ভবত অপূরণীয় ক্ষতি হবে। এতে সংঘাত ইউরোপের দিকে ছড়িয়ে পড়াটা সারা বিশ্বের জন্য হবে অত্যন্ত বিপদজনক। ইউরোপে এমন সংঘাত বা যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে তা থেকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। দুটি বিশ্বযুদ্ধ কিন্তু শুরু হয়েছিল ইউরোপ থেকে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষোভের বিষয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে তিনটি দেশ রাশিয়া, চীন ও ভারত। রাশিয়া পারে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিকে ভারসাম্যে আনতে। চীন পারে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তিতে ভারসাম্য আনতে। ভারত পারে যুদ্ধবিরোধী সেন্টিমেন্ট কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সৃষ্টি করতে। সুয়েজ খাল নিয়ে যখন যুদ্ধ শুরু হয়েছিল তখন খুবই ভাল ইতিবাচক ভূমিকা নিয়েছিল ভারত। ওই সময় কূটনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের জয় পেয়েছিল ভারত। এবং তারা এ আন্দোলনের একজন নেতা হয়ে উঠেছিল। এর ফলে গড়ে উঠেছিল নেহরু-নাসের বন্ধুত্ব। আর তাই পুরো আরব বিশ্ব ভারতকে তাদের বেস্ট ফ্রেন্ড হিসেবে দেখা শুরু করে। ভারতের এখন উচিত সেই একই রকম বিশ্বাসযোগ্য ভূমিকা নেয়া। বিশ্বে প্রকৃত শান্তিরক্ষায় তার প্রেস্টিজ উন্নত করা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাদের ঝুঁকে পড়ায় প্রথাগত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
আসুন আমরা প্রত্যাশা করি, সব পক্ষই রিবত থাকবে। এই সঙ্কটকে এমনভাবে উত্তেজনাকর করে তুলবেন না যাতে ভয়াবহ একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ভেনিজুয়েলা সিরিয়ার মতো গৃহযুদ্ধে যেন প্রবেশ না করে।
(স্বরাজ সিং ওয়াশিংটন স্টেট নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান। তার এ লেখাটি রাশিয়ার অনলাইন প্রাভদা’য় প্রকাশিত হয়েছে)

যেভাবে জলবায়ু-অভিবাসীদের শহরে রূপান্তরিত হচ্ছে ঢাকা

তখনও জাগেনি ভোরের সূর্য। তবে জাগতে হয়েছে গোলাম মোস্তফাকে। একটু পরেই ছুটতে হবে জীবিকার উদ্দেশে। ঘুমিয়ে থাকার উপায় নেই তার। রাজধানী ঢাকার একটি ইটের কারখানা তার কর্মক্ষেত্র। দিনে ‌১৫ ঘণ্টা করে সপ্তাহের সাতদিন বাধ্যতামূলক শ্রমযাপন তার নিয়তি। তবে সবসময় জীবন এমন ছিল না। যেখানে তার জন্ম-বেড়ে ওঠা আর জীবিকার নিশ্চয়তা ছিল, দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলীয় সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার সেই গ্রাম ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় আসতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। প্রাণ-প্রকৃতিভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই নিয়তির গল্প বলেছেন মোস্তফা
ঢাকায় বস্তি আর উঁচু স্থাপনার সহাবস্থান
২৪ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) প্রকাশিত প্রতিবেদনের জন্য সাক্ষাৎকার নিতে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের সাংবাদিকদের যেতে হয় মোস্তফার কাছে। বস্তির ছোট্ট একটা ঘরে গাদাগাদি করে আরও ১৪ জনের সঙ্গে তার বসবাস। মাথার ওপরে স্বল্প ভোল্টের এক বৈদ্যুতিক বাতি। কাজে যেতে স্বল্প আলোতেই দ্রুত শর্টস আর টি-শার্ট পড়ে নেন তিনি। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিককে বলেন, ‘যদি নদীভাঙনে আমাদের জমি ভেসে না যেত, তবে এখানে থাকতে হতো না।’
আন্তর্জাতিক দুনিয়া জানে, শিল্পোন্নত দুনিয়ার কার্বন মচ্ছবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষস্থানে। যে দক্ষিণাঞ্চলে মোস্তফার ঘর-জমি আর স্বপ্ন ছিল, ইতোমধ্যেই সেখানে বৈশ্বিক উষ্ণতার ভয়ঙ্কর প্রভাব পড়েছে। বেড়েছে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার প্রচণ্ডতা। উষ্ণতা বৃদ্ধি কী জিনিস, মোস্তফা কখনও তা শোনেননি। জলবায়ুর চিরাচারিত পরিবর্তনের সঙ্গে এখনকার পরিবর্তনের পার্থক্য কী তাও জানেন না তিনি। তাই বুঝে উঠতে পারেন না, নদীগর্ভে তার কৃষিজমি বিলীন হয়ে যাওয়ার জন্য মানুষের কর্মকাণ্ডই দায়ী। মোস্তফা জানেন না, শিল্প বিপ্লবের পর থেকে জারি থাকা সুদূর পাশ্চাত্যের মুনাফালোভী উৎপাদন ব্যবস্থা কী করে তার জীবিকার অবলম্বনকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।
বুড়িগঙ্গা তীরে জলবায়ু-অভিবাসীদের কর্মকাণ্ড, ছবি: পপি ম্যাকপার্সন
সুনির্দিষ্ট সময় পর পর প্রাকৃতিক ধারাবাহিকতায় বদলে যায় জলবায়ু। মানুষ সৃষ্ট কারণেই এই স্বাভাবিক বদলের ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। বিশ্ব বহুদিন থেকে এক আকষ্মিক পরিবর্তনের মুখোমুখি। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন, শিল্পবিপ্লব পরবর্তী যুগে উন্নত দেশগুলোর মাত্রাতিরিক্তি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বৈশ্বিক উষ্ণতার মাত্রাকে ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। উষ্ণায়নের কারণে গলছে হিমবাহের বরফ, উত্তপ্ত হচ্ছে সমুদ্র, বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ব্যহত হচ্ছে স্বাভাবিক ঋতুচক্র। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি, স্থানচ্যুত হচ্ছে মানু্ষ। অভিবাসী কিংবা শরণার্থীতে রূপান্তরিত হচ্ছে তারা। বাংলাদেশে এই বাস্তবতা এরইমধ্যে ভয়াবহভাবে দৃশ্যমান।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের জবাবদিহিতা সংক্রান্ত দফতর (ইউনাইটেড স্টেট গভর্নমেন্ট’স অ্যাকাউন্টিবিলিটি অফিস) থেকে গত সপ্তাহে  প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও খরা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, জলবায়ু পরির্তন কৃষি ও মৎস চাষের ওপর প্রভাব সৃষ্টি করায় মানুষ নিজেদের এলাকা ছেড়ে উপকূলবর্তী অঞ্চলে আবাস গড়ছে। অথচ ওই উপকূলীয় অঞ্চলগুলোও জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব মোকাবেলা করছে। ইন্টারন্যাশনাল ডিসপ্লেসমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সেন্টারের তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে দুর্যোগজনিত কারণে বাংলাদেশে ঘর হারিয়েছে প্রায় সাড়ে নয় লাখ মানুষ।   
বন্যার পানি থেকে বাঁচতে খড় নিয়ে ছুটছেন বাংলাদেশের নারী
ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার প্রকাশিত জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে বিগত এক দশকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় সাত লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ২০০৯ সালে এই সংখ্যা বেড়ে যায়। সেবছর আইলার আঘাতে ২০০ জন প্রাণ হারিয়েছেন, আর ঘর ছেড়েছেন ১০ লাখেরও বেশি মানুষ। কিন্তু অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল আবহাওয়ার মধ্যেও মানুষ ঘর ছেড়েছে। বাস্তুচ্যুত এতো এতো মানুষ কোথায় গেছে?  ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদন বলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, ভূমিক্ষয়, পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি কিংবা ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনায় এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে মানুষ। গোলামের মতো করেই ওইসব মানুষের একটা বড় অংশ অভিবাসী হয়েছে রাজধানী ঢাকায়।
উপকূল থেকে বেশিরভাগ মানুষ পালিয়ে নগরের বস্তি এলাকায় আশ্রয় নেয়। আসলেই অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আসবে এমন ধারণা থেকে সবাই ঢাকায় পাড়ি জমায়। দারিদ্র, স্বাস্থ্য সংকটসহ অন্যান্য কারণে প্রতি বছর নিম্ন আয়ে ৪ লাখ মানুষ ঢাকায় পাড়ি জমান। পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ২০ কোটি অভিবাসী তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০১৮ সালের মার্চে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদনে আশঙ্কা করা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে ১ কোটি ৩৩ লাখ বাংলাদেশি বাস্তুচ্যুত হতে পারে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক বলছে, ঢাকা যেন সেই অদেখা বিশ্ববাস্তবতার ছোটখাট একটা আভাস।ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এর পরিচালক ও দেশের অন্যতম শীর্ষ পরিবেশ বিজ্ঞানী সালিমুল হক বলেন,  আমরা নিশ্চিত হয়েই বলতে পারি উপকূলে এখন অনেক মানুষ যেই পরিস্থিতি বসবাস করছে কিছুদিন পরে সেটা থাকবে না। সালিম হক বলেন, গ্রামে সাগর কিংবা নদীভাঙনে ভিটে হারিয়েছেন এমন মানুষেই আজ ঢাকা পূর্ণ। আরও কয়েক লাখ আসলে তাদের জায়গা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।
উপকূলীয় এলাকার জলবায়ু অভিবাসীদের সাধারণ গন্তব্য ইটভাটা। ছবি: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে নগর পরিকল্পনাবিদ, নীতিনির্ধারক, বিজ্ঞানী ও কৃষক সবাই বাঁধ দেওয়ার কথা বলছেন। তারা নতুন করে বাড়ি বানাচ্ছেন, আশ্রয়কেন্দ্র বানাচ্ছেন, বলছে লবণসহিষ্ণু ধানের বীজ উৎপাদনের কথা। তবে সেসবে ভরসা না দেখে মোস্তফার মতো অনেকেই গ্রাম থেকে রাজধানীতে অভিবাসী হতে বাধ্য হচ্ছেন।
মোস্তফা স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে জানান, তার শিশুকালেই ঝড়ে ভেঙে যায় তাদের আবাস। খুব ভালো করে মনেও নেই সেই বিভীষিকার কথা। কেবল মনে পড়ে বন্যায় তারে বাড়ি ভেঙে যায়, বাবার ফলের গাছ ভেঙে পড়ে, সংসার চালানোর সম্বল ছোট দোকান থেকে চা ও চালও ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তিনি তখন মায়ের সঙ্গে প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নেন। কিছুদিন পর সেই বাড়িও ভেসে যায়। এরপপর নদীর পার থেকে অন্ধকারের দিকে ছুটতে থাকেন তারা।  এরপর কয়েকবছর কেটে যায়, আবারও সেই বিভীষিকা, আবারও ঝড়ের আঘাতে ধ্বংস হয় বাড়ি। তারপর মাথা তুলে সেখানে বসবাসের স্বপ্ন দেখছিলো গোলামের পরিবার। তবে তৃতীয়বার ঘুর্ণিঝড় আইলার তাণ্ডবে শুধু বাড়ি না, তার সহায়-সম্বল সবই হারিয়ে যায়।
ঢাকার পরিবর্তে মংলায় আসা অনেক জলবায়ু অভিবাসীর একজন কবির হোসেন। ভ্যানই তার জীবিকার একমাত্র উৎস। ছবি: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
আইলার পর মোস্তফার পরিবারের মাথা থেকে হারিয়ে যায় নিজস্ব ছাদ। কৃষিজমির সঙ্গে সঙ্গে নদীতে বিলীন হয়ে যায় অনেকখানি আশা আর স্বপ্ন।  পানিতে লবণ বৃদ্ধি পাওয়ায় মাছও আগের মতো নেই। তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করা যুবক মোস্তফার সামনে তখন আর পথ থাকে না। পরিবারের খাবার জোগাড়ে ইটের কারখানায় যোগ দিতে বাধ্য হন তিনি। মোস্তফার ভাষ্য, ‘আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন কেউই কাজের জন্য এখানে আসতো না। আর এখন আমার গ্রামে প্রায় প্রত্যেক পরিবার থেকেই একজন ঢাকা আসছে।’ মোস্তফার নিজের পরিবার থেকে এসেছে দুজন। বছর দুয়েক আগে তার ছোট ভাইও এসে জুটেছে। প্রতি ছয়মাসে আয় হয়  ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
বৃষ্টিদিনে ইটভাটা কাজের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। প্রকৃতির বরষা আসে আশীর্বাদ হয়ে। গোলামি থেকে খানিকটা সময়ের ছুটি মেলে গোলাম মোস্তফাদের। তখন বাসে চেপে সোজা বিমানবন্দর চলে যান সাথীদের নিয়ে। দূর আকাশে তাকিয়ে দেখতে থাকেন বিমানের যাওয়া-আসা। ভাবতে থাকেন, কোথায় তাদের উদ্দেশ।

যৌন নির্যাতনকারী যখন নারী, বাড়ছে তাদের সংখ্যা

বৃটেনে শিশু ও টিনেজ বালক বালিকাদের ওপর যৌন নির্যাতনকারী নারীর সংখ্যা বাড়ছে। তাদেরকে অভিযুক্ত করে সাজা দেয়া হলেও এ প্রবণতা থামছে না। মঙ্গলবার সোফি এলমস নামের ১৮ বছর বয়সী একজন নারীকে এমন অভিযোগে ৭ বছর ১০ মাসের জেল দিয়েছে আদালত। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দুটি শিশুর ওপর ভয়াবহ যৌন নির্যাতন করেছেন তিনি। ওই দুটি শিশুর একটির বয়স দুই বছর। অন্যজনের তিন। এভাবে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনকারীদের ইংরেজিতে বলা হয় পায়েডোফাইল। সোফি এলমস এমন নির্যাতনকারী একাই নন, বৃটিশ আইন মন্ত্রণালয়ের নতুন এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে রেকর্ড সংখ্যাক নারী যৌন নির্যাতনের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন।
ওই বছরে ১৪২ জন নারী ও যুবতীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ গঠন করা হয়। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে শিশুদের ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, তাদের সঙ্গে বিভিন্ন রকম যৌনতা সংশ্লিষ্ট আচরণ। এর দুই বছর আগে যে পরিমাণ নারী ও যুবতী এসব অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন ২০১৬ সালের সংখ্যা তার দ্বিগুন। লন্ডনের একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে এ খবর দেয়া হয়েছে। এ প্রবণতা বা পরিসংখ্যানকে অস্বস্তিকর বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে এতে। তাতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, নারী যৌন নির্যাতনকারীর সংখ্যা কি বাস্তবেই বেড়ে চলেছে?
সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ এমন সব ঘটনা ঘটেছে, যাতে যৌন নির্যাতনকারী নারী। তারা শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের সরাসরি জড়িত অথবা সম্পৃক্ত। এর মধ্যে সবচেয়ে হাই প্রোফাইল যৌন নির্যাতনকারী হলেন ভ্যানেসা জর্জ। তিনি সোফি এলমসের মতো একজন নার্সারি নার্স। তবে সোফি এলমসের মতো এই নির্যাতনের ঘটনা তিনি শিশুদের যতœ নেয়ার কেন্দ্রে ঘটান নি। তাকে শিশুদের পিতামাতা নিরপরাধী হিসেবে দেখতেন। বর্তমানে তার বয়স ৪৮ বছর। তাকে বলা হয় লন্ডনে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনকারী সবচেয়ে নিকৃষ্ট অপরাধী। ২০০৯ সালে তিনি স্বীকার করেন যে, তার তত্ত্বাবধানে থাকা শিশুদের ওপর নির্যাতন করেছেন। এর পরই তাকে অনির্দিষ্টকালের জেল দেয়া হয়েছিল। একটি গ্যাং, যারা শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন করে তাদের ‘মিস্ট্রেস’ বা রক্ষিতা হওয়ার ফলে নরউইচের একটি আদালত ২০১৫ সালে যাবজ্জীবন জেল দেয় ৩৪ বছর বয়সী যুবতী মেরি ব্লাককে। ওই রায় দিয়ে বিচারক বলেছিলেন, তিনি ওই সময় পর্যন্ত যত মামলার রায় দিয়েছেন এটি ছিল তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ।
ওদিকে মঙ্গলবার একজন শিক্ষিকাকে দুই বছরের বেশি জেল দেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ১৫ বছর বয়সী একটি স্কুলছাত্রীর সঙ্গে ৯ মাস ধরে যৌন সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। ২০১৫ সালে ৩২ বছর বয়সী টিচিং এসিসট্যান্ট চার্লোটি পারকারকে শিক্ষকতা থেবে নিষিদ্ধ করা হয়। তিনি স্বীকার করেন,  এসেক্সে তার স্কুলের ১৪ বছর বয়সী একজন ছাত্রীকে তিনি হাজার হাজার যৌন উত্তেজক ম্যাসেজ পাঠিয়েছেন। তারপর ওই ছাত্রীর বয়স ১৫ বছর হলে তার সঙ্গে গড়ে গোলেন যৌন সম্পর্ক। এরপরই তার বিরুদ্ধে ওই শাস্তি ঘোষণা করা হয়।
এর এক বছর পরে লরেন কক্স নামে ২৭ বছর বয়সী ভূগোলের শিক্ষিকাকে এক বছরের জেল দেয়া হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ১৩ বছর বয়সী একজন ছাত্রের সঙ্গে তার সাক্ষাত হয়। তার পর তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে ওই ছাত্রের বয়স যখন ১৬ বছর, তখন তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে শারীরিক সম্পর্ক।
একজন শিক্ষার্থীকে আপত্তিকর শব্দ সম্বলিত কার্ড পাঠানোর জন্য ৪৯ বছর বয়সী শিক্ষিকা ইয়েঅনি প্রেসটনকে পেশা থেকে বহিষ্কার করা হয়।
ব্রিস্টলে ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ডের অপরাধবিজ্ঝানের সহযোগী প্রফেসর ও যৌন অপরাধ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ড. কিয়েরান ম্যাকারটান। তিনি যৌন নির্যাতনকারী নারীর সংখ্যা নিয়ে বলেছেন, এই সংখ্যা মহামারী নয়। তবে এটা সংস্কৃতি পরিবর্তনের ফল। আমার মনে হয় সমাজে একটি পরিবর্তন ঘটেছে। আর সেজন্যই নির্যাতিতরা আস্থার সঙ্গে সামনে এগিয়ে আসছে এবং কথা বলছে। পুলিশের মধ্যে যৌন অপরাধের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তারা এর তদন্ত করছে। বেশির ভাগ মামলার তদন্ত শেষে আদালতে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে।

নিউ ইয়র্কে কাতারবিরোধী স্লোগান দিয়েছিলেন ভাড়াটে বিক্ষোভকারীরা

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের বাইরে সম্প্রতি অবরুদ্ধ কাতারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশগ্রহণকারীরা উপসাগরীয় দেশটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন। কিন্তু এসব বিক্ষোভকারীকে অর্থের বিনিময়ে ভাড়া করা হয়েছিল। তাদের সবাইকে দেয়া হয়েছে ১০০ ডলার করে। বৃটিশ অনলাইন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। বিক্ষোভে অংশ নেয়া এক নারী সংবাদ মাধ্যমটির কাছে বিক্ষোভ আয়োজনের এই তথ্য ফাঁস করেছেন। ফেসবুকে একটি অস্পষ্ট পোস্টের মাধ্যমে তিনি ওই বিক্ষোভের বিষয়ে জানতে পারেন। এতে ব্রুকলিনের স্থানীয় অধিবাসীদের জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে শান্তির পক্ষে স্লোগান দিতে ও শান্তির পতাকা উড়াতে বলা হয়।
এর বিনিময়ে অর্থ প্রদানের প্রস্তাবও দেয়া হয় ওই পোস্টে। কিন্তু সেখানে কাতারের কথা গোপন রাখা হয়। ওই নারী জানান, পোস্টের নির্দেশনা অনুসারে ২৫শে সেপ্টেম্বর দুপুর ২টার দিকে নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত হন। কিন্তু বুঝতে পারেন, এটা মূলত কাতারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ। সেখানে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে ১০০ ডলার দেয়া হয়। হাতে ধরিয়ে দেয়া হয় কাতারবিরোধী স্লোগান সংবলিত ব্যানার। নাম গোপন রাখার শর্তে ওই নারী আরো জানান, সেখানে অন্তত ৪০ জন ছিল। যারা একইভাবে ফেসবুকের পোস্ট দেখে এসেছেন। পরে তাদেরকে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একই রকম ব্যানার- ফেস্টুনসহ আরেকটি বিক্ষোভকারী দল দেখতে পান। সম্ভবত, তাদেরকে আগেই জড়ো করা হয়েছে। নেজা তাগমতি নামের এক ব্যক্তি ফেসবুকের মাধ্যমে এসব বিক্ষোভকারীকে সংগঠিত করেছেন। বিক্ষোভকারীদের কাছে পাঠানো তার ফেসবুক মেসেজ ইন্ডিপেন্ডেন্টের হাতে এসেছে। যাতে তাগমতি লিখেছেন- ‘বিশ্ব শান্তিকে উৎসাহিত করার জন্য আমি একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করছি। জাতিসংঘ দপ্তরের সামনে এই অনুষ্ঠানে শান্তির জন্য বক্তৃতা ও সংগীত পরিবেশন করা হবে। আমার কিছু লোক দরকার যারা শুধু বক্তৃতা শুনবে ও হাততালি দিয়ে অনুপ্রেরণা দেবে। তাদের হাতে থাকবে বিশ্বের সব দেশের পতাকা। অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেককে ১০০ ডলার করে দেয়া হবে।’
এ বিষয়ে কাতারের একজন কূটনীতিক বলেন, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন থেকে বিরত রাখার জন্য কাতার অব্যাহতভাবে বিভিন্ন দুরভিসন্ধিমূলক প্রচারণার শিকার হচ্ছে। ভাড়াটে লোকদের মাধ্যমে কাতারের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ গোটা বিশ্বে কাতারের সুনাম নষ্ট করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
ধারণা করা হচ্ছে, এই নেজা তাগমতিই বৃটিশ পার্লামেন্টের সামনে কাতারবিরোধী ভুয়া বিক্ষোভের আয়োজন করেছিলেন। তবে এই বিক্ষোভ আয়োজনের মূল হোতা কারা, সে বিষয়টি পরিষ্কার না। ২০১৭ সাল থেকে কাতারের ওপর অবরোধ আরোপ করে রেখেছে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় ৪ দেশ। কাতারবিরোধী যেকোনো কর্মকাণ্ডেই সন্দেহের আঙুল তোলা হয় সৌদি জোটের বিরুদ্ধে।

নয় বছর বয়সে কলেজছাত্র খাইরান

মাত্র ৯ বছর বয়সে কলেজে ভর্তি হয়ে মার্কিন মুলুকে তো বটেই, বিশ্বে এক চমক সৃষ্টি করেছে খাইরান আমান কাজী। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে সে ভর্তি হয়েছে কলেজে। তার মা জুলিয়া কাজী। বাবা মুস্তাহিদ কাজী। খাইরান আমারন কাজীর কাছে স্কুলের পড়াশুনাই যথেষ্ট ছিল না। এক সেমিস্টারের পড়া সে দুই সপ্তাহেই শেষ করে ফেলতো। শিক্ষকরা ব্ল্যাকবোর্ডে অঙ্ক লেখার সঙ্গে সঙ্গে সমাধান করে ফেলে সে। কাজের মধ্যেই ব্যস্ত থাকতে চায় খাইরান।
নয়বছর বয়সে সে পদার্থ বিদ্যার সূত্র অনুসরণ করে গবেষণা করে, অর্থনীতির সূত্র জেনে বাজেট পরিকল্পনা করে। এই প্রখর মেধাবী শিশুকে অগত্যা ওর বাবা-মা কলেজে ভর্তি করানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। খাইরান বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন আমেরিকান।
নিউ ইয়র্ক সিটিতে বাংলা ভাষায় যারা পত্রিকা প্রকাশনা শুরু করেছিলেন তাদের একজন পথিকৃৎ গজনফর আলী। তার মেয়ে জুলিয়া কাজী, তার একমাত্র সন্তান। দুইবছর বয়সে বাংলাদেশের মৌলভীবাজার থেকে আমেরিকা গিয়ে প্রথমে নিউ ইয়র্ক শহরেই থাকতেন জুলিয়া। এস্টোরিয়া-জ্যামাইকায় বড় হয়েছেন। পরে মুস্তাহিদ কাজীকে বিয়ে করে সানফ্রান্সিসকো বে’তে থিতু হন। ২০০৯ সালের ২৭শে জানুয়ারি জন্ম হয় খাইরানের। জাপানি মিথলোজি থেকে ছেলের নাম রাখা হয় খাইরান। যার মানে সাগরের নিচে এক দরজা থেকে আরেক দরজা খুলে যাওয়া।
সেই খাইরান ফোর্থ গ্রেডে উঠতেই কলেজে পড়ার সুযোগ পেলো। এখনও সেখানে গণিত ও রসায়ন এই দুই বিষয়ে এসোসিয়েট করছে। তবে ওর শিশুসুলভ চপলতা যাতে হারিয়ে না যায়, সেজন্য স্কুলের পড়াও অব্যাহত রাখা হয়েছে। দিনে হিলিয়স গিফটেড স্কুল, রাতে লাস পসিটাস কলেজ। তারপর সপ্তাহান্তে পিয়ানো বাদন, মান্দারিন ভাষা শেখা, কারাতের ব্ল্যাক বেল্ট স্কুল আছে। নয়বছর বয়সে সে বারোটি কম্পিউটার কোডিং ল্যাংগুয়েজ শিখে ফেলেছে।
খাইরান ভালো বাংলা বলতে পারে। তার প্রিয় টিভি প্রোগ্রাম হলো ‘ইয়াং চিলড্রেন’। প্রিয় রং নীল। প্রিয় অভিনেতা হ্যারি পটার সিরিজের নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন যিনি, সেই ড্যানিয়েল র‌্যাডক্লিফ। প্রিয় খেলা- বাস্কেটবল।
বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ নিয়ে ভাবে খাইরান। বিশেষত রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশা ওর মনকে আবেগ আক্রান্ত করে। ওর মা জুলিয়া কাজী বলেছেন, তার ছেলের আবেগ খুব বেশি। ওর যখন আড়াই বছর বয়স তখন মিশরে ‘আরব বসন্ত’ আন্দোলন চলছে। অতটুকু ছেলে সেই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেল। এবং ওর প্রাইমারি ডাক্তারকে এই বিষয় নিয়ে ওর ভাবনার কথা বললো। যে বয়সে বেশির ভাগ শিশু একটা বাক্য সম্পূর্ণ বলতে পারে না, তখন সে অন্য দেশের আন্দোলন নিয়ে নিজের চিন্তাকে প্রকাশ করছে, ভাবা যায়! ডাক্তার সেদিন আমাকে আর ওর বাবাকে ডেকে বললেন, দেখুন, ‘আপনার ছেলে অতি মেধাবী। এমন শিশু দশ লাখে একজন পাওয়া যায়। আপনাদের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ। কারণ ওর মতো প্রখর মেধাসম্পন্ন মানুষকে গাইড করা সহজ নয়।’
জুলিয়া কাজী পেশায় ওয়াল স্ট্রিট এক্সিকিউটিভ। স্বামী মুস্তাহিদ কাজী বাংলাদেশের মানিকগঞ্জের ছেলে। উনি একজন ইঞ্জিনিয়ার। দু’জনের আয় যথেষ্ট ভালো। আর যদি সেটা ভালো না হতো, তাহলে কিভাবে এই কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতেন, জানেন না তারা। আমেরিকায় অটিস্টিক, মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের বলে ‘স্পেশাল’। তাদের জন্য প্রচুর সুযোগ-সুবিধা দেয় সরকার। এক অর্থে খাইরান কাজীও এক ধরনের ‘স্পেশাল’। কারণ সে অতি মেধাবী। কিন্তু তার মেধা কিভাবে বিকশিত হবে এইজন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য পাওয়া যায় না।
খাইরান কাজীকে আড়াই বছর বয়সে নানা ধরনের পরীক্ষা করে বোঝা গেল, ওর যে শুধু ‘আই কিউ’ বেশি তা নয়, ওর ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ও খুব বেশি। যে কোনো ঘটনায় খুব বেশি আক্রান্ত হয় সে। সেই অর্থে সামাজিক নয়। কারো সঙ্গে কথা বলতে বা চোখে চোখ রাখতে পছন্দ করে না।
ডাক্তারের পরামর্শে খাইরানকে আড়াই বছর বয়সেই স্কুলে ভর্তি করান ওর বাবা-মা। টিচারদের সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হতো ওকে। শিক্ষকরা বোর্ডে লেখার সঙ্গে সঙ্গে সে বুঝে ফেলে। স্কুল ওর কাছে ‘বোরিং’ লাগতে লাগল। জুলিয়া কাজী জানালেন, ‘ওর মতো শিশুদের মস্তিষ্ক সারাক্ষণ চলতে থাকে। এক টপিক থেকে আরেক টপিকে চলে যায়। তাই অনেক সময় ওকে থেরাপি দেয়া হতো স্কুলে। কিংবা জিমে নিয়ে গিয়ে দৌড়াতে বলা হতো। থার্ড গ্রেড শেষ হওয়ার পরে ওকে এখন যে স্কুলটাতে দিয়েছি সেটা গিফটেড স্কুল। ওখানে বেশির ভাগ মেধাবী শিশুই পড়ে। আর রাতে তো কলেজ আছেই।
খাইরানের প্রিয় বিষয় হলো গণিত। সে ভবিষ্যতে দিনে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সে কাজ করতে চায়। আর রাতে কলেজে পড়ানোর ইচ্ছা রাখে। আর অবশ্যই সে গণিতের শিক্ষক হতে চায়।

ধামরাইয়ে শিশু খুনের লোমহর্ষক বর্ণনা

ধামরাইয়ে তিন অপহরণকারী ৭ লাখ টাকার দেনা পরিশোধ করতে  ব্যবসায়ী সোনা মিয়া ওরফে কালা চান মিয়ার পাঁচ বছরের শিশু মনিরকে অপহরণ করে। এরপর মোবাইল ফোনে তার বাবার কাছে মুক্তিপণ হিসেবে  ১০ লাখ টাকা দাবি করে। মুক্তিপণের টাকা না পেয়ে মুখে টেপ পেঁচিয়ে হত্যার পর বস্তার ভেতর ভরে বাঁশ ঝাড়ের ভেতর মাটির নিচে পুঁতে রাখে। অপহৃতের বাড়ির পাশেই মাটি চাপা দেয়া হয়। গতকাল সকালে শিশু মনির হত্যার লোমহর্ষকর বর্ণনা দিয়েছে খুনিরা। শিশু অপহরণের পরিকল্পনা ছিল তাদের এক মাস আগে থেকে। প্রধান খুনি ওই শিশুর বাবার কাছ থেকে টাকাও ধার নিয়েছিল। এদিকে, এলাকাবাসী ওই খুনিদের ফাঁসির দাবি করে এলাকায় বিক্ষোভ করেছে।
মনিরের বাবা সোনা মিয়া জানান, গত শনিবার বিকাল সাড়ে ৫টায় বাড়ির পাশে সালাম মেম্বারের ধানের চাতালে খেলতে যায় মনির। সন্ধ্যা পর্যন্ত মনির বাড়ি ফিরে না এলে বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেন তারা।
কিন্তু কোথাও তাকে না পেয়ে পরেরদিন রোববার ধামরাই থানায় জিডি করেন। এরপর সোমবার বিকালে মনিরের বাবার মোবাইলে ফোন করে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। কিন্তু কোথায় মুক্তিপণের টাকা দিবে তা তারা জানায়নি। পরে বিষয়টি ধামরাই থানা পুলিশকে জানানো হয়। এরপর প্রযুক্তির সহায়তায় সোমবার রাতেই পুলিশ একই গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে মুদি ব্যবসায়ী মাজেদুল ইসলাম (২৭) ও তার মামাতো ভাই পাশের কুল্লা গ্রামে আবদুল হামিদের ছেলে মানছুর রহমানকে (২৫) গ্রেপ্তার করে। রাতভর ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের পর তারা দুইজনসহ প্রতিবেশী মিশু মিয়ার ছেলে রাব্বি (২০) মিলে মনির হোসেনকে মুখে টেপ ও শ্বাসরোধে হত্যার পর মাটিচাপা দিয়ে রাখার কথা স্বীকার করে। মঙ্গলবার সকালে গ্রেপ্তারকৃত ওই খুনিকে সঙ্গে নিয়ে তাদের দিয়েই ধামরাইয়ের আশুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মুনিরদের বাড়ির পাশের পুকুর পাড় থেকে মাটি খুঁড়ে শিশু মনির হোসেনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় নিহতের পরিবারসহ পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। সকলের মুখে একটাই প্রশ্ন, পাঁচ বছরের শিশু মনিরের কি দোষ ছিল। তাকে এভাবে কেন হত্যা করা হলো?
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ধামরাই থানা চত্বরে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) সাইদুর রহমান জানান, গ্রেপ্তারকৃত মাজেদুল ইসলাম ৫ লাখ, মানছুর রহমান ৫০ হাজার ও রাব্বি মিয়া দেড় লাখ টাকা এলাকার বিভিন্ন মানুষের কাছে দেনা ছিল। সেই টাকা পরিশোধের জন্যই শিশু মনির হোসেনকে অপহরণের পরিকল্পনা করে এক মাস আগে। শনিবার রাতে মনিরকে অপহরণের পর ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। কিন্তু শিশু মনির হোসেন তাদের পূর্ব পরিচিত হওয়ায় ঘটনা ফাঁস হওয়ার ভয়ে তার মুখে টেপ পেঁচিয়ে ও গলা টিপে তিনজনেই তাকে হত্যার পর লাশ বস্তায় ভরে বাড়ির পাশে বাঁশ ঝাড়ে রেখে দেয়। পরেরদিন রোববার রাতে মনিরের লাশ বাড়ি থেকে দুইশ’ গজ দূরেই আশুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে পুকুর পাড়ে মাটিচাপা দিয়ে রাখে। এরপর তারা মনিরের বাবার মোবাইল ফোনে আবার ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল। পরে পুলিশ প্রযুক্তির সহায়তায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
ধামরাই থানার ওসি দীপক চন্দ্র সাহা বলেন, এ ঘটনায় গত মঙ্গলবার নিহত মনিরের বাবা সোনা মিয়া বাদী হয়ে ধামরাই থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ তার লাশ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্ত শেষে সন্ধ্যা ৭টার দিকে লাশটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানান।

সব বিষয়ে চাই জাতীয় ঐকমত্য: প্রেসিডেন্ট, সমালোচনায় বাধা দেয়া হবে না: প্রধানমন্ত্রী

নিয়মিত কার্যক্রমের মধ্যদিয়ে শুরু হলো একাদশ জাতীয় সংসদের পথচলা। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের এটি টানা তৃতীয় সংসদ। গতকাল একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের সূচনা দিনে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ জাতীয় ঐকমত্য গড়ার উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। রেওয়াজ অনুযায়ী অধিবেশনের দেয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট বলেন, জাতীয় ঐকমত্য ব্যতীত শান্তি ও সমৃদ্ধি স্থায়ী রূপ পেতে পারে না।
গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন ও অব্যাহত আর্থসামাজিক উন্নয়নের মতো মৌলিক প্রশ্নে সকল রাজনৈতিক দল, শ্রেণি ও পেশা নির্বিশেষে সবার ঐকমত্য গড়ে তোলার সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য আমি উদাত্ত আহ্বান জানাই। এদিকে অধিবেশনে দেয়া সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সংসদে বিরোধী দল যথাযথভাবে সরকারের সমালোচনার সুযোগ পাবে। তাদের কোনো বাধা দেয়া হবে না। এদিকে সরকারের সঙ্গে নির্বাচন করা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন জানিয়েছেন, সংসদে তার দলের অবস্থান নিয়ে তিনি বিব্রত।
দশম জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়ার সভাপতিত্বে বেলা ৩টায় নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে। এরপরই নির্বাচন করা হয় স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার। একাদশ জাতীয় সংসদেও স্পিকারের দায়িত্ব পালন করবেন রংপুর-৬ আসন থেকে নির্বাচিত ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। আর ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া। দশম জাতীয় সংসদেও তারা এ পদে ছিলেন। এদিকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর তাদেরকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য দেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
অধিবেশন শুরুর পরপরই স্পিকার পদে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এটি সমর্থন করেন চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন। স্পিকার পদে আর কোনো নাম না থাকায় কণ্ঠ ভোটে তা পাস হয়। স্পিকার নির্বাচনের পর সংসদের অধিবেশন ৩০ মিনিটের জন্য মুলতবি রাখা হয়। মুলতবির এই সময়ে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ নবনির্বাচিত স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে শপথবাক্য পাঠ করান। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনাসহ সরকার এবং বিরোধী দলের সিনিয়র সদস্যরা এসময় উপস্থিত ছিলেন। এরপর আবার সংসদ অধিবেশনের কাজ শুরু হয়। এসময় দায়িত্ব পালন করেন স্পিকার। শুরুতে তিনি ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালনা করেন। এসময় ডেপুটি স্পিকার পদে অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়ার নাম প্রস্তাব করেন হুইপ আতিউর রহমান আতিক। আর সমর্থন করেন অপর হুইপ ইকবালুর রহিম।
পরে কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিক্রমে তাকে ডেপুটি স্পিকার হিসেবে নির্বাচন করা হয়। এদিকে সংসদ অধিবেশন চলাকালে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদের কাছ থেকে শপথ বাক্য পাঠ করেন। অধিবেশনের শুরুতে স্পিকার হিসেবে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন স্পিকার। এসময় তিনি ৩০শে ডিসেম্বর নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে অংশ নেয়ায় সবাইকে ধন্যাবাদ জানান। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় একাদশ জাতীয় সংসদ বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। উন্নয়নের অভিষ্ঠ লক্ষ্য অর্জনে একাদশ জাতীয় সংসদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আসুন আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি।
এর আগে সংসদ ভবনের নবম তলায় অবস্থিত সরকারি দলের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় স্পিকার, ডেপুটি স্পিকারের নাম চূড়ান্ত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার পদে নির্বাচনের পর তাদের অভিনন্দন জানায় নতুন সংসদ। পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেন। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় উপনেতা ও জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের, প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু আলোচনায় অংশ নেন।
বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের নবনির্বাচিত স্পিকারকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, সংখ্যায় কম হলেও আমরা মনে করি সঠিকভাবে আমাদের কথা এখানে তুলে ধরতে পারলে সংসদ প্রাণবন্ত ও কার্যকর হবে। মানুষ সংসদকে গুরুত্ব দেবে। সংসদ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রাণকেন্দ্র পরিণত হবে। তিনি প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনার প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আমরা সংসদে কথা বলবো। সরকারের ভুল ত্রুটি তুলে ধরবো। আমাদের কথা গুরুত্ব দিলে সংসদ প্রাণবন্ত ও কার্যকর হবে।
ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার আহ্বান প্রেসিডেন্টের:
একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন ও অব্যাহত আর্থসামাজিক উন্নয়নের মতো মৌলিক প্রশ্নে সকল রাজনৈতিক দল, শ্রেণী ও পেশা নির্বিশেষে সবার ঐকমত্য গড়ে তোলার সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, জাতীয় ঐকমত্য ব্যতীত শান্তি ও সমৃদ্ধি স্থায়ী রূপ পেতে পারে না। নতুন প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, কর্মচঞ্চল, সুখী, সুন্দর ও উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ সবার কাম্য। ইতিহাসের সাহসী সন্তানেরা লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়ে গেছেন। আমাদের দায়িত্ব এ দেশ ও জাতির অগ্রযাত্রাকে বেগবান করা। একাত্তরের শহীদদের কাছে আমাদের অপরিশোধ্য ঋণ রয়েছে। আসুন, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এবং দল-মত-পথের পার্থক্য ভুলে জাতির গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ও দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার মধ্য দিয়ে আমরা লাখো শহীদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করি। তিনি বলেন, ২০২০ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে মধ্য-আয়ের দেশ হিসেবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবো।
আমাদের দৃষ্টি ২০২১ সাল ছাড়িয়ে আরও সামনের দিকে, ২০৪১ সালে বিশ্বসভায় বাংলাদেশ একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত হবে- এটাই জাতির প্রত্যাশা। আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী, মানবাধিকার, সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ণ এবং সমাজের সব স্তরে প্রত্যক্ষ জনসম্পৃক্তির মধ্যদিয়ে আমরা নির্ধারিত লক্ষ্যসমূহ অর্জনসহ একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে সক্ষম হব। চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করায় শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে প্রেসিডেন্ট বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এবং সার্চ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী গঠিত বর্তমান নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়, যা দেশ-বিদেশে সব মহলে প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের বিপুল সমর্থনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। জনগণের এ রায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জননন্দিত নির্বাচনী ইশতেহার ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’-এর প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ। সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে বর্ণিত প্রতিশ্রুতিসমূহ বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর।
সংসদের চিফ হুইপ ও হুইপ নিয়োগ
একাদশ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য নূর ই আলম চৌধুরী লিটন (লিটন চৌধুরী)। তার সঙ্গে হুইপ পদে থাকছেন আতিউর রহমান আতিক শেরপুর-১ আসন, ইকবালুর রহিম দিনাজপুর-৩ আসন ও মাহবুব আরা গিনি গাইবান্ধা-২ আসন থেকে নির্বাচিত। নতুনদের মধ্যে আছেন খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য পঞ্চনন বিশ্বাস, জয়পুরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন ও চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য শামসুল হক চৌধুরী। সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ সংসদ নেতা শেখ হাসিনার পরামর্শক্রমে প্রধান হুইপ ও হুইপদের নিয়োগ আদেশ চূড়ান্ত করার পর গতকাল বুধবার এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়। চিফ হুইপ পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যদা ও হুইপবৃন্দ প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা ভোগ করে থাকেন। গতকাল থেকেই তারা দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। বিকাল ৩টায় একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। মাদারীপুর-১ আসন থেকে ৬ বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য নবম সংসদের হুইপ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ছিলেন লিটন চৌধুরী। দশম সংসদে অনুমিত হিসাব কমিটির সভাপতি ছিলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নে।
সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন
প্রথম দিনেই নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলীর মনোনয়ন দেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। এরা হলেন- আবুল কালাম আজাদ, অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু, এবি তাজুল ইসলাম, ফখরুল ইমাম এবং সাগুফতা ইয়াসমিন। স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে তারা সংসদ অধিবেশন পরিচালনা করবেন। গত ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে ২৯৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ একাই জয়ী হয় ২৫৮টিতে। ২২টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসে জাতীয় পার্টি। দশম জাতীয় সংসদে এই দলটি ৩৪টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধীদলের আসনে বসেছিল।
নির্বাচনের পর ৩রা জানুয়ারি নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপির ছয়জন এবং গণফোরামের দুজন এবং আরও চারজন বাদে বাকিরা এদিন শপথ নেন। ওইদিনই টানা ত্বতীয়বারের মতো সংসদ নেতা নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হয়েও রেকর্ড সৃষ্টি করেন শেখ হাসিনা। এবার প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসা জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ হন বিরোধীদলীয় নেতা। যদিও দশম জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা ছিলেন তার স্ত্রী ও জাতীয় পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থাকায় একাদশ সংসদের প্রথম দিন অনুপস্থিত ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। অন্যদিকে ব্যাংককে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করায় কিশোরগঞ্জ-১ আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম শপথ নিতে পারেননি। আগামী ২৮শে ফেব্রুয়ারি এ আসনে উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বোন সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে লড়ছেন এই নির্বাচনে।
সমালোচনায় বাধার সৃষ্টি করবো না-প্রধানমন্ত্রী: গণতান্ত্রিক ধারায় সমালোচনা সব সময় গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমি এইটুকু আশ্বাস দিতে পারি এই সমালোচনা আমাদের বিরোধী দলে যারা আছেন, তারা যথাযথভাবে করতে পারবেন। এখানে আমরা কোনো বাধা সৃষ্টি করবো না। কোনো দিন বাধা আমরা দেইনি, দেবো না। গতকাল বিকালে একাদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে টানা তৃতীয়বারের মতো স্পিকার নির্বাচিত হওয়ায় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে অভিনন্দন জানাতে গিয়ে সংসদ নেতা একথা বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত অনেক চড়াই-উৎরাই পার হয়ে আমরা একটা গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছি। কারণ এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ মা বোনেরা, প্রথম যারা ভোটার তারা, তরুণ ভোটাররা সকলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছে। একটি সফল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এই সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই এবং কৃতজ্ঞতা জানাই। তিনি বলেন, সংসদ নেতা হিসেবে আমার দায়িত্ব সংসদের সকল সদস্যের অধিকার যেমন দেখা এবং সেই সঙ্গে আপনি স্পিকার হিসেবে সকল সদস্য যাতে সমানভাবে সুযোগ পায়, এখানে সরকারি দল বিরোধী দল সকলেই যেন পায় অবশ্যই আপনি সেটা দেখবেন। এ ব্যাপারে আমরা আপনাকে সব রকমের সহযোগিতা করবো। সংসদ নেতা বলেন, গণতন্ত্রই একটি দেশকে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় আর তা আজ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রমাণিত সত্য। আজ আমরা আর্থ সামাজিক ভাবে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেয়ে আমরা এখন উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছি। এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বাংলাদেশের জনগণকে একটি ক্ষুধা মুক্ত, দারিদ্রমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করে আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে স্বপ্ন, যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি এ দেশকে স্বাধীন করেছিলেন, সেই ক্ষুধা মুক্ত, দারিদ্র্য মুক্ত সোনার বাংলা আমরা ইনশাআল্লাহ গড়ে তুলবো।
সেটাই আমাদের লক্ষ্য। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ যেহেতু ভোট দিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচিত করে এবং আমরা যারা প্রতিনিধিরা বসেছি সকলেই কিন্তু আমরা বিভিন্ন জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এসেছি। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে এখানে আমরা আমাদের স্ব স্ব দায়িত্ব পালন করবো। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে আমাদের ভোটাররা, যারা নির্বাচিত করে এখানে পাঠিয়েছে তাদের সার্বিক উন্নয়ন, তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং দেশে দেশে যেন একটা শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করে। বাংলাদেশ জঙ্গিমুক্ত, মাদকমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ যেন গড়ে ওঠে এবং দেশের মানুষের জীবনে যেন শান্তি-নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় সেটাই আমাদের সব সময় লক্ষ্য রাখতে হবে। শেখ হাসিনা বলেন, অতীতে একটা চমৎকার পরিবেশে সংসদ পরিচালিত হয়েছিল বলেই আমরা মানুষের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছিলাম। আবার আমরা যেহেতু সংসদে নির্বাচিত হয়ে এসেছি অবশ্যই জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে বাংলাদেশকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাব। এটাই আমাদের লক্ষ্য।
শোক প্রস্তাব, আশরাফের স্মৃতিচারণ: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবেগজড়িত কন্ঠে বলেন, সৈয়দ আশরাফকে নিজের ভাইয়ের মতোই দেখতাম। সৈয়দ আশরাফ অত্যন্ত সৎ ও মেধাবী রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। সে আমার পরিবারের সদস্যদের মতো ছিল, আমাকে বড় বোনের মতো শ্রদ্ধা করতো। গতকাল সংসদে শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এর আগে আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুতে জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাব আনা হয়। এরপর সংসদে তার জীবনীর ওপর আলোচনা হয়। তার সম্মানে সংসদের বৈঠক ৩৫ মিনিট মুলতবি রাখা হয়। এরপর শুরু হয় প্রেসিডেন্টের বক্তব্য। শোক প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি ক্ষেত্রে সে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে। রাজনৈতিক জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও অসাধারণ মেধাসম্পন্ন নেতা ছিল সৈয়দ আশরাফ।
তিনি বলেন, ওয়ান ইলেভেনের সময় আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিল সৈয়দ আশরাফ। আজ আমরা যে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছি সেক্ষেত্রে সৈয়দ আশরাফেরও বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। অসম্ভব সোজা সরল ছিল সে। ভাইদের হারিয়ে যে ক’জনকে ভাইয়ের মতো পেয়েছিলাম, সৈয়দ আশরাফ তাদের একজন। তার বাবা দেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন, সৈয়দ আশরাফও দীর্ঘদিন মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু সবসময় অসম্ভব সৎ জীবন-যাপন করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওর টাকা নেই, পয়সা নেই। কষ্ট করে চলতে হতো। তার চিকিৎসার জন্য যা যা করার আমি তা করেছি। তার মতো একজন প্রজ্ঞাবান ও জ্ঞানী রাজনীতিকের চলে যাওয়ার ক্ষতি কোনোদিন পূরণ হবার নয়। তার মৃত্যু দল হিসেবে আওয়ামী লীগের এবং দেশের জন্য সৈয়দ আশরাফের চলে যাওয়া অপূরণীয় ক্ষতি হলো। কিশোরগঞ্জবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, সৈয়দ আশরাফের সততা ও নিষ্ঠার কারণে অসুস্থতা সত্ত্বেও তাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে। তার বোন ডা. লিপিকে উপ-নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়েছি।
আমরা আশা করি, সৈয়দ আশরাফের স্মৃতি ধরে রাখতে ডা. লিপিকে ভোট দিয়ে কিশোরগঞ্জবাসী নির্বাচিত করবেন। শোক প্রস্তাবের ওপর আরো আলোচনা করেন আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মোহাম্মদ নাসিম, কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক এবং সাবেক বিরোধী দলের নেতা জাতীয় পার্টির বেগম রওশন এরশাদ। এ ছাড়াও শোক প্রস্তাবে সাবেক সংসদ সদস্য খন্দকার আবদুল বাতেন, নুরুল আলম চৌধুরী, তরিকুল ইসলাম, ড. ফজলে রাব্বী চৌধুরী, মাওলানা নুরুল ইসলাম, আশরাফুন নেছা মোশাররফ ও বোরহান উদ্দিন খান, কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা, গীতিকার ও চিত্রনাট্যকার, অভিনয়শিল্পী এবং লেখক আমজাদ হোসেন, বরেণ্য সঙ্গীতশিল্পী, সুরকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, উপমহাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃণাল সেন, নারী মুক্তিযোদ্ধা বীরপ্রতীক তারামন বিবি, জাতীয় প্রতীকের নকশাকার মোহাম্মদ ইদ্রিস, প্রখ্যাত সাংবাদিক শাহরিয়ার শহীদ, ভাষাসৈনিক সৈয়দ আবদুল হান্নান, একাত্তরের বীরযোদ্ধা ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার কুলদীপ সিং চাঁদপুরী, চলচ্চিত্র নির্মাতা সাইদুল আনাম টুটুল এবং প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেনের ও সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর স্ত্রী মেহজাবিন চৌধুরীর মৃত্যুতে সংসদ গভীর শোক প্রকাশ করেছে।
সংসদে ভূমিকা নিয়ে বিব্রত মেনন: জাতীয় সংসদে নিজেকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আমরা আনন্দিত। তবে এই আনন্দের সঙ্গে আমরা একটু বিব্রতও বটে। আজকে ঢোকার মুখেও আমাকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। জানতে চেয়েছে সংসদে আপনাদের অবস্থান কী হবে? এ প্রসঙ্গে দলীয় ফোরামে প্রধানমন্ত্রীর একটি মন্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে মেনন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তার দলের বৈঠকে একটি মন্তব্য করেছেন।
তিনি বলেছেন, এই সংসদে সরকারি দল যেমন মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের হবে, তেমনি বিরোধী দলও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের হবে। আমি মনে করি প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য অত্যন্ত যৌক্তিক। কিন্তু বিষয়টিকে কেন্দ্র করে শেষ পর্যন্ত যেটা দাঁড়িয়ে গেছে...। আমাদের বলা হচ্ছে, আপনারা কেন বিরোধী দলে গিয়ে বসছেন না। বিষয়টি নিয়ে তো আমাদের কেউ জিজ্ঞাসা করবে, প্রশ্ন করবে বা আলোচনা করবে কিন্তু তা হয়নি। মনে হয় এই সিদ্ধান্ত যেন আমাদের ওপর...। মনে হচ্ছে, সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হবে।’ রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘আমরা সরকারের সব উন্নয়ন কাজের প্রশংসা করবো। সঙ্গে সঙ্গে ত্রুটি-বিচ্যুতি যা থাকবে সেটা যদি বিরোধিতার প্রয়োজন হয় তা অবশ্যই করবো।

পাটের লেমিনেশন ব্যাগ

পাটজাত পণ্যের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত পাটের লেমিনেশন ব্যাগ  তৈরি করছে দেশের বৃহত্তম পাটকল খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিল। এ জন্য মিলে স্থাপন করা বিশেষ ইউনিটের নাম প্রিমিয়াম লেমিনেশন প্ল্যান্ট (পিএলপি)। অন্য ইউনিটগুলোতে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে লোকসান হলেও লেমিনেশন ব্যাগে লাভের মুখ দেখেছে মিলটি। তবে সক্ষমতা অনুযায়ী অর্ডার নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পিএলপি ইউনিটের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৮ সালের জুলাই মাসে কাজ শুরু করা হলেও বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায় আগস্ট মাসে। এই ইউনিটে ৩০-৩৫ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ শ্রমিক কাজ করছে। মিলের তাতে তৈরি হেশিয়ান চটের ওপর পিএলপি মেশিনের মাধ্যমে লেমিনেটিং করে পাটের লেমিনেশন ব্যাগ তৈরি করা হচ্ছে। নতুন এই ইউনিটে উৎপাদন হচ্ছে লেমিনেটেড ব্যাগ এবং স্লাইবার ক্যানশীট নামে দু’ধরনের পণ্য।
বীজ সংরক্ষণের জন্য দুই ধরনের লেমিনেটেড ব্যাগ তৈরি করা হচ্ছে। এর একটি ১০ কেজি ও অন্যটি ২০ কেজি ওজনের। ১০ কেজি ওজনের ব্যাগের মূল্য ৫১ টাকা এবং ২০ কেজি ওজনের ব্যাগের মূল্য ৬১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। দু’দফায় প্রায় ৩ লাখ পিস লেমিনেশন ব্যাগ উৎপাদন করছে ইউনিটটি। প্রথম দফায় বিএডিসির কাছ থেকে দুই প্রকারের ১ লাখ ৫২ হাজার পিস পাটের লেমিনেশন ব্যাগ অর্ডার আসে। বিএডিসিকে সেই ব্যাগ প্রদান করা হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় বিএডিসি গত সপ্তাহে ১০ কেজি ওজনের ১ লাখ ৪০ হাজার পিস ব্যাগের অর্ডার দিয়েছে। এসব ব্যাগ উৎপাদনে কাজ চলছে। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে এসব পণ্য প্রদান করা হবে। শুধু ব্যাগই নয়, পিএলপি প্লান্টটিতে তৈরি হচ্ছে স্লাইভার ক্যানশীট। যা পাটকলগুলোতে সুতা রাখার কাজে ব্যবহৃত হয়। এই স্লাইবার ক্যানশীট খুলনা-যশোর অঞ্চলের ৯টি পাটকলের চাহিদা পূরণ করে বাইরে বিক্রি করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন মিল কর্তৃপক্ষ। ক্রিসেন্ট জুট মিলের ডেপুটি ম্যানেজার (উৎপাদন) ও পিএলপি ইউনিট ইনচার্জ গোলাম রসুল রাকিব বলেন, ইউসেফ থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে এখানকার শ্রমিকদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলে কাজ করানো হচ্ছে। বিএডিসিকে এই পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। এই লেমিনেটেড ব্যাগে জলীয় বাষ্প প্রবেশ করতে পারে না। পণ্যের গুণগত মান ভালো থাকে। ফলে গম, ধানের বীজ, চিনি, ফিস ফিড, পোল্ট্রি ফিড, সার, আটা-ময়দা ও কীটনাশক মোড়কে পাটের লেমিনেশন ব্যাগ খুবই উপযোগী। বিক্রি বাড়লে মিলের এই ইউনিটটি আরো বেশি লাভজনক হবে। বিএডিসির শতভাগ অর্ডার নেয়ার সক্ষমতা এই ইউনিটের রয়েছে বলে তিনি জানান। ক্রিসেন্ট জুট মিলের মহাব্যবস্থাপক গাজী শাহাদাত হোসেন জানান, বিজেএমসির উৎপাদিত অন্য সব পণ্যে লোকসান হলেও এই প্লান্টটিতে উৎপাদিত লেমিনেশন ব্যাগ বিক্রি করে লাভ হচ্ছে। প্রথম দফায় কত টাকা লাভ হয়েছে তা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এছাড়া বিজেএমসির পাটকলগুলোতে স্লাইভার ক্যানশীট নামে একটি পণ্যের প্রয়োজন হয়। এই স্লাইভার ক্যানশীটে সাধারণত সূতা রাখা হয়। এটাও এই প্লান্টে তৈরি করা হচ্ছে। শুধু ক্রিসেন্ট জুট মিলই নয়, খুলনা-যশোর অঞ্চলের ৯টি মিলের চাহিদা মিটিয়েও বাইরে বিক্রি করার সক্ষমতা রয়েছে। তিনি জানান, প্রথম দফায় উৎপাদিত পাটের লেমিনেশন ব্যাগ বিক্রি করে লাভ হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় অর্ডার পেয়েছি। ফেরুয়ারিতে এই পণ্য বিএডিসিকে প্রদান করা হবে। তবে এই ইউনিটের উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী অর্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। অবশ্য বিক্রি বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই পণ্যের বিষয়ে জানানো হয়েছে। রাজধানীতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় বিজেএমসির অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে পাটের লেমিনেশন ব্যাগ প্রদর্শন করা হচ্ছে।

ক্যাপশন নিউজ: হাইকোর্টে আগাম জামিন প্রার্থীদের ভিড় কমছেই না by শাহীন কাউসার

হাইকোর্টে আগাম জামিন প্রার্থীদের ভিড় কমছেই না     -ছবি: শাহীন কাউসার

বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য সরাসরি এসে পড়ছে ধলেশ্বরী নদীতে by জীবন আহমেদ