Friday, November 20, 2020

বাংলাদেশের গর্ব পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার

পাহাড়পুর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে বাংলাদেশের একটি গর্ব। পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার বা সোমপুর বিহার বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার। পালবংশের দ্বিতীয় রাজা শ্রী ধর্মপালদেব অষ্টম শতকের শেষের দিকে বা নবম শতকে এই বিহার তৈরি করেছিলেন। ১৮৭৯ সালে স্যার কানিংহাম এই বিশাল কীর্তি আবিষ্কার করেন।
পাহাড়পুরকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহার বলা যেতে পারে। পুন্ড্রবর্ধনের রাজধানী পুন্ড্রনগর এবং অপর শহর কোটিবর্ষ’র মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত ছিল সোমপুর মহাবিহার। এর ধ্বংসাবশেষ বর্তমান বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজশাহীর অন্তর্গত নওগাঁ জেলার বদলগাছি উপজেলার পাহাড়পুর গ্রামে অবস্থিত। স্থানীয়রা এটিকে ‘গোপাল চিতার পাহাড়’ আখ্যায়িত করতো। সেই থেকে এর নাম হয়েছে পাহাড়পুর, যদিও এর প্রকৃত নাম সোমপুর বিহার।

বৌদ্ধ বিহারটির ভূমি-পরিকল্পনা চতুষ্কোনাকার। এর চারদিক চওড়া সীমানা দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল। সীমানা দেয়াল বরাবর অভ্যন্তর ভাগে সারিবদ্ধ ছোট ছোট কক্ষ ছিল। উত্তর দিকের বাহুতে ৪৫টি এবং অন্য তিন দিকের বাহুতে রয়েছে ৪৪টি করে কক্ষ। সবশেষ যুগে ৯২টি কক্ষে মেঝের ওপর বিভিন্ন আকারের বেদী নির্মাণ করা হয়। কক্ষগুলোর প্রতিটিতে দরজা আছে। এগুলো ভেতরের দিকে প্রশস্ত, কিন্তু বাইরের দিকে সরু হয়ে গেছে।

বিহারের উত্তর বাহুর মাঝ বরাবর রয়েছে প্রধান ফটক। প্রধান ফটক ও বিহারের উত্তর-পূর্ব কোণের মাঝামাঝি আরেকটি ছোট প্রবেশপথ ছিল। উত্তর বাহুর প্রবেশপথের সামনে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত একটি পুকুর ছিল। প্রথম নির্মাণ যুগের পরবর্তী আমলে এই পুকুর খনন করা হয়। পরে এটি ভরাট করে দেওয়া হয়।

কেন বসবাস জীবন্ত আগ্নেয়গিরির ঠিক নিচেই?

কেপ ভার্দের আগ্নেয়গিরি -স্যাটেলাইট ছবি
আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিমে আটলান্টিকের বুকে একটি দ্বীপপুঞ্জের নাম কেপ ভার্দে। অসংখ্য সক্রিয় আগ্নেয়গিরিতে ঘেরা এই দেশের দ্বীপগুলো, আর তা থেকে অগ্ন্যুৎপাতও হয়ে থাকে নিয়মিত।
সম্প্রতি কেপ ভার্দেতে একটি আগ্নেয়গিরি থেকে লাভা নি:সরণের পর তা নিচের গ্রামগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।
লাভার স্রোত ঢুকে পড়েছে বহু লোকের বসার ঘরে পর্যন্ত, কিন্তু তারপরও তারা সেই বাড়িঘর ছেড়ে যেতে চাইছেন না।
সাবেক ব্রিটিশ প্যারাঅলিম্পিয়ান অ্যাথলিট এড অ্যাডেপশিয়ান দেখা করতে গিয়েছিলেন কেপ ভার্দের এমনই একজন বাসিন্দার সঙ্গে।
আসলে আমি বা আপনি কি একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরির পাদদেশে থাকতে রাজি হব? উত্তরটা নিশ্চয়ই হবে না।
অথচ কেপ ভার্দের অনেক লোকজন কিন্তু ঠিক সেটাই করছেন - আর তাদেরই একজনের বাড়িতে গিয়ে একেবারে তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলেন সাবেক প্যারা-অ্যাথলিট এড অ্যাডেপশিয়ান।
রামিরোর বাড়ির ভেতর তার সঙ্গে প্যারা-অ্যাথলিট অ্যাডেপশিয়ান (বাঁয়ে)
রামিরোর বাড়িতে ঢুকেই তিনি দেখেন, ড্রয়িং রুমের জানালা দিয়ে ঢুকে পড়েছে জমাট লাভাস্রোত।
বিস্ময় চাপতে না-পেরে তিনি বলে ওঠেন, "এটা কী করে সম্ভব? এ তো অবিশ্বাস্য! দেওয়ালে পর্যন্ত ফাটল ধরে গেছে লাভার চাপে।"
ওই বাড়ির মালিক, ব্যবসায়ী রামিরো কিন্তু বলছিলেন, "যখন অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয় আমরা একেবারেই ভাবিনি যে সেটা এত ভয়ঙ্কর হবে।"
"তবুও আমাদের সৌভাগ্য বলতে হবে ও আমি ও আমার ছেলে মিলে বাড়িতে যা সব দামী জিনিসপত্র ছিল তার প্রায় সবই বের করে নিতে পেরেছিলাম।" 
আগ্নেয়গিরির পাদদেশে কেপ ভার্দে দ্বীপপুঞ্জ
জমাট লাভা থেকে একটা পাথরের টুকরো হাতে তুলে নিয়ে অ্যাডেপশিয়ান বলতে থাকেন, "বিশ্বাস করা যায় এটা একটা আগ্নেয় শিলা?"
"ভাবুন তো, নিজের ড্রয়িং রুমে বসে আপনি টিভিতে ইস্টএন্ডার দেখছেন আর রিল্যাক্স করছেন - এমন সময় হঠাৎ গরম লাভার স্রোত হুড়মুড় করে আপনার ঘরের জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ল!"
"আমি তো ভেবেই স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছি - বিশ্বাসই করতে পারছি না এমন কিছু কখনও ঘটতে পারে।"
কেপ ভার্দের ফোগো আইল্যান্ডে 'পিকো দো ফোগো' আসলে একটি খুবই সক্রিয় আগ্নেয়গিরি, আর এই সাঙ্ঘাতিক কান্ডটি সেই ঘটিয়েছে।
সেটির অগ্ন্যুৎপাতে আচমকা ভেসে গেছে নিচের দুটি গ্রাম - কিন্তু তার পরও রামিরো ও তার বন্ধুরা কিছুতেই সেই গ্রাম থেকে সরতে রাজি নন।
আগ্নেয়গিরির পাদদেশে এই সেই ফোগো আইল্যান্ড
ওই গ্রামের লাভাবিধ্বস্ত রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে অ্যাডেপশিয়ান তাকে জিজ্ঞেস না-করে পারেন না, "মাথার ওপর এত বিশাল একটা আগ্নেয়গিরি থেকে যে কোনও সময় উদ্গীরণের ভয় - সেই আতঙ্ক মাথায় নিয়ে এই গ্রামে কীভাবে পড়ে থাকতে পারেন?"
রামিরো নির্বিকারভাবে জবাব দেন, "আমি আসলে জীবনে দু-দুবার সাঙ্ঘাতিক অগ্ন্যুৎপাত দেখেছি - দেখেছি কীভাবে গরম ফুটন্ত লাভার স্রোত সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।"
"কিন্তু বিশ্বাস করুন কখনও দেখিনি সেই অগ্ন্যুৎপাতে কাউকে মারা যেতে - আর সেটাই আমাকে এখনও এই গ্রামে রয়ে যাওয়ার ভরসা জুগিয়েছে, আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে।"
কেপ ভার্দের আগ্নেয়গিরি - স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবি

Tuesday, November 17, 2020

যৌন আনন্দের জন্য গাঁজা ব্যবহার করেন যে লোকেরা

যৌন আনন্দ বাড়ানোর জন্য গাঁজাকে ব্যবহার
কিছুদিন আগেই 'বিনোদনমূলক নেশার সামগ্রী' হিসেবে গাঁজা বৈধ করা হয়েছে কানাডায়, আরো অনেক দেশেই ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা বিতর্ক চলছে। এর মধ্যেই এক ধরণের গাঁজাসেবী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে - যারা গাঁজা ব্যবহার করছেন যৌন আনন্দ বাড়ানোর জন্য।
এই ধরণের লোকদের বলা হচ্ছে 'ক্যানাসেক্সুয়াল' - শব্দটা তৈরি হয়েছে গাঁজার ইংরেজি নাম ক্যানাবিসের প্রথম অংশটা নিয়ে।
এর বিচিত্র সব পদ্ধতি অবলম্বন করছেন - যার মধ্যে আছে শয়নকক্ষে গাঁজা মেশানো মোমবাতি জ্বালানো, বা মেয়েদের গোপন অঙ্গে গাঁজার তেল ছিটিয়ে দেয়া।
বিবিসির সাংবাদিক আয়মান আল-জুজি লিখছেন, শুনতে অদ্ভূত শোনালেও অনলাইনে এধরণের নানা রকম পণ্য বিক্রি ক্রমশই বাড়ছে - যার মধ্যে আছে গাঁজা থেকে তৈরি তেল, স্প্রে, মোমবাতি, এমনকি গাঁজা গাছের ফুল।
সত্যিকথা বলতে কি, যৌন সুখের জন্য গাঁজার ব্যবহার বহু প্রাচীন। ভারতবর্ষে ঐতিহ্যাশ্রয়ী হিন্দুদের অনেকে বিশ্বাস করেন গাঁজা থেকে তৈরি পানীয় - যাকে বলা হয় 'ভাঙ লাচ্ছি' - তা পান করলে যৌন ইচ্ছা বৃদ্ধি পায়।
প্রাচীন মিশরে মহিলারা তাদের যৌনাঙ্গে প্রয়োগ করতেন গাঁজা মেশানো মধু - যার উদ্দেশ্য ছিল তাদের ভাষায় 'জরায়ুকে ঠান্ডা করা।'
তার মানে কি 'ক্যানাসেক্সুয়াল' মোটেও নতুন ব্যাপার নয়?
ক্যানাসেক্সুয়াল কথাটা প্রথম ব্যবহার করেন ক্যালিফোর্নিয়ার এ্যাশলি ম্যান্টা। তিনি ২০১৩ সালে গাঁজা নামের 'যাদুকরী ক্ষমতাসম্পন্ন' গাছের ওপর ভিত্তি করে নানা ধরণের সেক্স থেরাপি সেবা চালু করেছিলেন। তখনও গাঁজা যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ ছিল।
অনলাইনে ক্যানাসেক্সুয়ালদের জন্য বিক্রি হচ্ছে নানা রকম পণ্য
কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্রেরও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গাঁজার ব্যবহার বৈধ করা হয়েছে । নিষেধাজ্ঞা প্রথম তোলা হয় উরুগুয়েতে, আর যুক্তরাজ্যে চিকিৎসার ক্ষেত্রে গাঁজার ব্যবহার বৈধ করার ব্যাপারটা পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।
ব্রিটেনের লুটন শহরের বাসিন্দা এ্যাডাম এবং ডোনিয়া (ছদ্ম নাম)। তারা গত তিন বছর ধরেই ক্যানাসেক্সুয়াল - অর্থাৎ যারা গাঁজা-জাত সামগ্রীকে যৌন আনন্দ বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করছেন।
ডোনিয়া বলেন, "আমার শরীরের গঠন নিখুঁত নয়। কিন্তু গাঁজা ব্যবহার করলে আমার এসব চিন্তা মাথা থেকে চলে যায়, দেহ-মন রিল্যাক্সড হয়। আমি একটা উত্তাপ অনুভব করি, যৌনমিলনে অধিকতর আনন্দ অনুভব করি।"
ইন্টারনেটে পাওয়া নির্দেশিকা দেখে তিনি নিজেই গাঁজা-মেশানো অলিভ অয়েল তৈরি করে নিয়েছেন।
আমেরিকার একটি প্রতিষ্ঠান বলছে, এসবের চাহিদা এত বাড়ছে যে তারা সরবরাহ করে কুলাতে পারছে না।
কিন্তু গাঁজার এধরণের ব্যবহার সম্পর্কে কোন জরিপ হয় নি, এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও প্রমাণিত নয়।
বরং কিছু জরিপে দেখা গেছে উল্টোটা। একটি জরিপে দেখা গেছে, পুরুষরা গাঁজা ব্যবহার করলে তাদের যৌনমিলনের সক্ষমতার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। আরেকটি জরিপ বলেছে, যারা প্রতিদিন গাঁজা খান তাদের যৌন সমস্যায় ভোগার সম্ভাবনা দ্বিগুণ বেড়ে যায়।
ব্রিটিশ যৌনস্বাস্থ্য এবং এইচআইভি সমিতির একজন কনসালট্যান্ট ড. মার্ক লটন বলছেন, যৌনমিলনের সময় এ্যালকোহল বা অন্য কোন ধরণের মাদকদ্রব্য ব্যবহার করার ক্ষেত্রে লোকের সতর্ক হওয়া উচিত।
অবশ্য এ্যাশলি ম্যান্টা মন করেন, এটা ঠিক যে এ ব্যাপারে আরো গবেষণা দরকার, এবং এসব পদ্ধতি হয়তো সবার জন্য নয়।
কিন্তু তিনি বলেন, তার নিজের যৌনজীবনে গাঁজা ব্যবহার করে তিনি ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছেন।
গাঁজার এধরণের ব্যবহারের পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলে নি

Sunday, November 15, 2020

গল্প- বুদাপেস্টকে আঘাত করে by নো ভায়োলেট বুলাওয়ায়ো

অনুবাদ : অদিতি ফাল্গুনী। [ভূমিকা ও লেখক পরিচিতি: 'নো ভায়োলেট বুলাওয়ায়ো' লেখকের ছদ্মনাম। তার প্রকৃত নাম এলিজাবেথ জান্ডিল টেশেলে। তিনি ১৯৮১ সালের ১২ অক্টোবর জিম্বাবুয়ের শলোতসো শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ‘ভায়োলেট’ লেখকের মায়ের নাম আর জিম্বাবুয়ের লোকভাষায় ‘নো’ অর্থ ‘সঙ্গে’। লেখক তার ছদ্মনাম গ্রহণ করার সময় মা ভায়োলেটের নাম নিয়ে এটাও জানিয়ে দেন যে, তিনি প্রয়াত ভায়োলেটের সঙ্গে আছেন। আর ‘বুলাওয়ে’ জিম্বাবুয়ের সেই শহর যেখানে তিনি বড় হয়ে ওঠেন।

বুলাওয়ে তার অল্প বয়সেই পরিবারের অনেক নিকটজনের এইডস রোগে মৃত্যু হতে দেখেছেন। স্বল্প বয়সেই অনেক মৃত্যুতে প্রচুর স্বজন হারানো ও ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের অভিশাপে পীড়িত জিম্বাবুয়েতে বড় হওয়া এই লেখক তাই তার আখ্যান রচনা করেন একদমই অলঙ্কারবর্জিত, ছিপছিপে ও নির্মেদ এক ভাষায়। অথচ, তারই পরতে পরতে এক ধরনের কালো রহস্যময়তা ও খুব নির্মেদ ভাষাতেই কোনো কোনো শব্দ ব্যবহারে বিশেষ কৌশল ব্যবহার করে পাঠককে দেন অতীন্দ্রিয়তার আস্বাদ।

যেমন ‘হিটিং বুদাপেস্ট’ গল্পটির কথাই ধরা যাক—গল্পে বুলাওয়ে শহরের কয়েকটি ছেলে ও মেয়েশিশু অভিজাতপাড়া ‘বুদাপেস্ট’-এ যাচ্ছে খাবার চুরি করতে। শিশুদের কারো নাম ‘বেজন্মা (বাস্টার্ড),’ কারো নাম ‘খোদা জানে (গড নোজ)’ আবার কারো নাম ‘প্রিয়া (ডার্লিং)’। বেজন্মার ছোট বোনের নাম আবার ‘ভগ্নাংশ (ফ্র্যাকশন)’। আছে আমাদের দেশেও, সমাজের দরিদ্র শ্রেণিতেই ‘মরা’, ‘পচা’ এমন নানা নাম শিশুদের রাখা হয়। আছে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত নাম ‘স্টিনো’ আবার নিখাদ আফ্রিকীয় নাম ‘চিপো’ বা ‘সবহো।’ এই ছ’টি ছেলে ও মেয়ে শিশু ‘স্বর্গ’ (প্যারাডাইস) নামক তাদের বস্তিতে মায়েদের চোখের সামনে থেকে বেরিয়েই দূরে শহরের বিত্তশালী বা অভিজাত এলাকায় যাচ্ছে খাবার খুঁজতে। যেহেতু  মায়েরা চুল আঁচড়ানোয় আর কথা বলায় ব্যস্ত থাকে তাই তারা বাচ্চাদের খেয়াল করে না । বাচ্চাদের খেয়াল করে না জাকারান্দা গাছের নিচে দাঁড়ানো বস্তির বয়সী পুরুষেরাও। তাদের চোখ তাস খেলাতেই আটকে থাকে। আর সেই ফাঁকে বস্তির বাচ্চারা ছুটছে অভিজাত এলাকা ‘বুদাপেস্ট’-এ খাবার চুরির আশায়। আমাদের ‘গুলশান-বনানী-উত্তরা-বারিধারা’র মতই জিম্বাবুয়ের বুলাওয়ে শহরের অভিজাত এলাকা ‘বুদাপেস্ট’। বুদাপেস্ট কেমন? বস্তির মতোতো নয় একেবারেই। দুগ্ধ ফেননিভ সব বিশাল বাড়ি, কংক্রিটের দেয়াল আর কাঁচের জানালা, বাড়িগুলোর সামনে অনেক ফল বা ফুলের গাছ। তবে বুদাপেস্টে ঢুকলে মনে হয় যেন এক বিরাণ বা শূন্য এলাকা। এখানকার মানুষেরা সব যেন পাসপোর্ট হাতে বিদেশ চলে গেছে। হ্যাঁ, আফ্রিকার বিত্তশালীরা তো আমাদের বিত্তশালীদের মতোই আরো নিরাপদে থাকতে উন্নত পশ্চিমে পাড়ি জমায়। বাচ্চাগুলো বিত্তশালীদের বাড়ির পেয়ারা চুরি করে খায়। পেয়ারা খেয়েই পেট ভরে যায় ওদের। এই বাচ্চাদের কারোর ‘সুজন কাকা (আঙ্কল পোলাইট)’ বিদেশে গিয়ে শুরুতে এটা-সেটা পাঠালেও এখন আর চিঠিও লেখে না। কারো বয়স্কা কোনো আত্মীয়া আমেরিকায় কাজ করে। চিপো নামের দশ বছরের মেয়েটি তার পিতামহের হাতেই গর্ভবতী হয়েছে বলে আগের মতো সেরা দৌড়বিদ আর নেই এই শিশুদের ভেতর। তবু, সে-ও বের হয়েছে পেয়ারা চুরির অভিযানে। পেট ভরে পেয়ারা খাবার পর বস্তির পাশের কবরখানার পেছনে এক ঝোপের আড়ালে শিশুগুলো দ্যাখে এক নারীর লাশ। শিশুগুলোর দলপতি ‘বেজন্মা’ নামের ছেলেটি মৃতার হাতের ঘড়ি চুরি করে বাজারে বিক্রির মাধ্যমে একটি বা দেড়টি রুটি পাওয়া যেতে পারে বলে জানায়।...সব বলে দিলাম নাকি? অনুনকরণীয় ক্রোধ ও রহস্যে লেখা এই গল্পটি ২০১১ সালে ‘আফ্রিকার ম্যানবুকার প্রাইজ’ হিসেবে পরিচিত ‘কেইন প্রাইজ ফর আফ্রিকান রাইটিং’ পুরস্কার অর্জন করে।

জিম্বাবুয়েতে জন্ম নেওয়া ও বড় হওয়া এই লেখক নজুবে হাইস্কুলে পড়াশোনা করার পর মিজিলকাজি হাইস্কুলে এ লেভেল পড়তে যান। মিজিলকাজি সড়কের নাম এই অনূদিত গল্পে আছে। মার্কিন যুক্তরাস্ট্রে কলেজের পড়া শেষ করে তিনি কালামাজু ভ্যালি কম্যুনিটি কলেজে ভর্তি হন এবং ইংরেজিতে ব্যাচেলর ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন যথাক্রমে টেক্সাসের এ এ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটি কমার্স ও সাউদার্ন মিডল-ইস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে। ২০১০ সালে তিনি কর্নেল ইউনিভার্সিটি থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে ‘মাস্টার অফ ফাইন আর্টস’ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং সেখানে তাকে ট্রুম্যান কাপোটে ফেলোশিপ দেয়া হয়। ‘হিটিং বুদাপেস্ট’ গল্পটিই তার ‘উই নিড নিউ নেমস’ উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদ হিসেবে আবির্ভূত হয়। উপন্যাসটি ২০১৩ সালের ম্যান বুকার পুরস্কারের জন্য শর্ট-লিস্টেড হয়েছিল। এছাড়াও তিনি এতিসালাত প্রাইজ ফর লিটারেচার ও হেমিংওয়ে ফাউন্ডেশন/পেন এওয়ার্ড পেয়েছেন)। জিম্বাবুয়ের এই লেখক স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্টেগনের ফেলো (২০১২-১৪)। ২০১২ সালে ‘দ্য ন্যাশনাল বুক ফাউন্ডেশন’ তাকে ৩৫ জন সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্যক্তির তালিকাভুক্ত করে।]

আমরা বুদাপেস্ট যাবার পথে চলেছি: ‘বেজন্মা’ এবং ‘চিপো’ আর ‘খোদা জানে’ ও ‘সবহো’ আর ‘স্টিনা’ এবং ‘আমি।’ আমরা তো রাস্তায় হেঁটে চলেছি যদিও এমনকি মিজিলিকাজি সড়ক পার হবারও অনুমতি নেই আমাদের, যদিও কিনা বেজন্মার দায়িত্ব হলো ওর ছোট বোন ভগ্নাংশকে দেখে রাখা, আরযদিও মা আমাকে বাইরে বের হতে দেখলে খুন করবে; তবু আমরা চলেছি। বুদাপেস্টে চুরি করার জন্য প্রচুর পেয়ারা আছে আর ঠিক এক্ষণি পেয়ারার জন্য আমি মারা যাবো, অথবা পেয়ারার জন্য দরকারী এমন যে কোনো কিছুর জন্য। পেটের ভেতরটা এমন করছে যেন কেউ বেলচা দিয়ে খুঁড়ে নাড়ি-ভুড়ি সব বার করে এনেছে।

‘স্বর্গ’ থেকে বের হয়ে আসা খুব কঠিন নয় যেহেতু আমাদের মায়েরা এখন তাদের চুল ঠিক করা আরকথা বলায় ব্যস্ত। আমরা তাদের পাশ দিয়ে আসার সময় তারা আমাদের একবার দেখে নিয়ে আবার দূরে তাকায়। জাকারান্দা গাছের নিচে দাঁড়ানো পুরুষেরা অবশ্য আমাদের দিকে তাকায় না এবং তাদের চোখ কখনোই তাস খেলা থেকে অন্য দিকে সরে না। শুধুমাত্র বস্তির একদম গেঁড়ি বাচ্চাগুলো আমাদের দিকে তাকায় এবং আমাদের পিছু পিছু ওরা আসতেও চায়, কিন্তু বেজন্মা শুধু সামনের উলঙ্গ বাচ্চাটির মাথায় তার মুঠি দিয়ে একটি ঘা বসায় আর তারপর বাচ্চারা সবাই পিঠ ফিরিয়ে দৌঁড় দেয়।

এই ঝোপ-ঝাড় পরিষ্কার করতে করতে আমরা ছুটে চলেছি; বেজন্মা সবার সামনে যেহেতু সে আজখেলায় জিতেছে আর ও মনে করছে ওর হাতেই সব ক্ষমতা, আর তারপর আমি আর খোদা জানে, স্টিনা এবং সবার শেষে আসে চিপো যে আগে ‘স্বর্গ’-এ দৌড়ে সবার সেরা হতো তবে ওর দাদাজান ওকে গর্ভবতী করার পর থেকে আর পারে না।

মিজিলিকাজি সড়ক পার হবার পর আমরা আর একটি ঝোপের ভেতর দিয়ে হড়কাতে হড়কাতে চলি, বিশাল স্টেডিয়ামের পাশে আশা সড়কের কাছ থেকে জোরে ছুটি যেখানে কিনা আবছা আলোয় সব বেঞ্চি পাতা যদিও আমরা সেসব বেঞ্চিতে কখনো বসবো না। চিপোর বিশ্রামের জন্য আমাদের একবার থামতে হবে।

‘তোমার বাচ্চাটা কখন হবে?’ বেজন্মা জিজ্ঞাসা করে। চিপোর জন্য আমাদের থামতে হলে বেজন্মা একদম পছন্দ করে না। আমরা যেন ওর সাথে একদমইনা খেলি, সে চেষ্টাও সে করেছে।

‘হবে একদিন।’

‘কবে? কাল? বৃহস্পতিবার? আগামী সপ্তায়?’

‘আহা দেখতে পাচ্ছিস না ওর পেট এখনো ছোট? বাচ্চাটাকে আগে তো বাড়তে হবে।’

‘বাচ্চা তো পাকস্থলীর বাইরেই বাড়ে। সেজন্যই তারা জন্ম নেয়। সেজন্যই তাদের জন্ম হয়।’

‘ঠিক আছে, এখনো সময় হয়নি। সেজন্যই এখনো ওর পেট বড় হয়নি।’     

‘এটা কী ছেলে না মেয়ে হবে?’

‘ছেলে। প্রথম বাচ্চা ত’ ছেলেই হয়।’

‘কিন্তু তুমি তো মেয়ে। তুমি তো তোমার মা’র প্রথম বাচ্চা।’

‘আমি বলেছি আর কি ধরো তেমনটা হতে পারে।’

‘উফ্ মুখটা বন্ধ করো, এ যেন তোমার নিজের পেট নয়।’

‘আমার মনে হয় এটি একটি মেয়ে। আমার পেটের ভেতর কোনো লাথি তো পাই না।’

‘ছেলেরা পেটের ভেতর লাথি মারে, ঘুষি মারে আর মাথা দিয়ে গুঁতোয়।’

‘তুমি কি ছেলে চাও?’

‘না। মানে হ্যাঁ। কি জানি হতে পারে।জানি না আসলে।’

‘বাচ্চা ঠিক কোথা থেকে আসে শুনি?’

‘যেভাবে এটা পেটের ভেতর ঢোকে।’

‘ঠিক কিভাবে এটা পেটের ভেতরে ঢোকে?’

‘প্রথমত, খোদাকে সেখানে বাচ্চা রাখতে হয়।’

‘না, কোনো খোদা না। একটি পুরুষকেই সেখানে বাচ্চা রাখতে হয়। আমার খালাতো ভাই মুসা আমাকে বলেছে। তোমার দাদাজানই কি তোমার পেটে বাচ্চা রাখেননি, চিপো?’

চিপো এবার মাথা নেড়ে মেনে নেয়।

‘তারপর একটি পুরুষ যদি সেখানে বাচ্চা জন্মই দেয়, সে কেনো সেটি বের করে নেয় না?’

‘কারণ মেয়েরাই বাচ্চার জন্ম দেয়, মোটা মাথা কোথাকার। এজন্যই ওদের বুক থাকে যাতে বাচ্চারা দুধ খেতে পারে।’

‘কিন্তু চিপোর বুক এখনো ছোট। পাথরের মতো।’

‘বাচ্চা এলেই বড় হয়ে যাবে। তাই না চিপো?’

‘আমি চাই না আমার বুক বড় হোক। আমি বাচ্চা চাই না। আমি অন্য কিছু চাই না, শুধু পেয়ারা খেতে চাই,’ চিপো বলে এবং আবার ছোটা শুরু করে।আমরা ওর পিছ পিছ দৌড়াই।দৌড়াতে দৌড়াতে বুদাপেস্ট শহরের মাঝামাঝি এসে আমরা থামি। বুদাপেস্ট যেন একটি আলাদা দেশ।এমন একটি দেশ যেখানে এমন মানুষেরা থাকে যারা ঠিক আমাদের মতো না।

তবে এই দেশটি আরদশটা সাধারণ দেশের মতোও নয়—দেখে মনে হয় যেন কোনো একদিন এই দেশের সবাই ঘুম থেকে উঠে তাদের ফটক, দরজা, জানালা সব বন্ধ করে, পাসপোর্ট হাতে নিয়ে আরো ভালো কোনো দেশে চলে গেছে। এমনকি বাতাসও কেমন ফাঁকা; কিছু পুড়ছে না, রান্না করা খাবারের কোনো গন্ধ নেই বা কোনো কিছু পচছেও না, শুধু সাদা বাতাস যেখানে আরকিচ্ছুটি নেই।

বুদাপেস্ট বড়, নুড়ি বিছানো যত উঠোন আর দীর্ঘ যত বেড়া এবং কংক্রিটের নানা দেয়াল আর ফুল ও সবুজ গাছে ভরা, গাছগুলো ফলে ভরা যারা কিনা ঠিক আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছে যেহেতু এখানে আশপাশের কেউই বোধ করি জানে না যে ফল কি কাজে লাগে।এই ফলগুলোই আমাদের সাহস দেয়, নয়ত আমরা এখানে আসার সাহসই করতাম না। মনে হচ্ছে এই না বুঝি এখানকার রাস্তাগুলো থুতু মেরে আমাদের আবার বস্তিতেই ফিরে যেতে বলে।

আমরা চিপোর চাচার গাছ থেকে ফল চুরি করতাম, তবে সেই চুরি যেন ঠিক চুরি ছিলনা। চিপোর চাচার গাছের সব ফল চুরি করার পর আমরা অন্য অপরিচিত মানুষদের গাছের ফল চুরি করা শুরু করলাম।এত সব বাড়ির গাছ থেকে আমরা ফল চুরি করেছি যে আমি সব গুণতেও পারবো না। আমাদের ভেতর খোদা জানে এই সিদ্ধান্ত নিল যে আমরা নির্দিষ্ট যে কোনো একটি রাস্তা বেছে নেবো এবং সেই সড়কের প্রতিটি বাড়ি দেখা শেষ করে তবেই আমরা অন্য পথে যাবো। যেন আমরা গুলিয়ে না ফেলি যে কোথায় ছিলাম এবং কোথায় যাবো। এটা একটা কৌশল আরখোদা জানে বলে এভাবেই কেবল আমরা আরো ভালোভাবে চুরি করতে পারবো।

আজআমরা আরএকটি নতুন সড়কধরেছি এবং তাই সতর্কতার সাথে চারপাশ খুঁটিয়ে দেখছি। আমরা অতিক্রম করলাম এসএডিস সড়ক, যেখানে কিনা সপ্তাহ দুই আগে আমরা প্রতিটা পেয়ারা গাছ থেকে ফল চুরি করেছি। আমরা দেখতে পাই যে সাদা পর্দা সরে যায় এবং মাখনের মতো যে বাড়িটায় একটি ডানাঅলা, তবে প্রশ্রাব করতে থাকা, বালকের মূর্তি আছে, সেই বাড়ির জানালা থেকে একটি মুখ দেখা যায়। আমরা দাঁড়াই এবং তাকিয়ে থাকি, অপেক্ষা করি এই মুখটি কি করবে যখন কিনা জানালাটি খুলে যায় এবং আমাদের দিকে একটি ক্ষীণ কণ্ঠের চেঁচানি শোনার জন্য প্রতীক্ষা করি। আমরা দাঁড়িয়ে থাকি। এজন্য নয় যে জানালার পাশের মুখটি আমাদের থামতে বলেছে। কারণ আমাদের কেউই এখনো দৌড় শুরু করিনি। কারণ গলার স্বরটি অত বিপজ্জনক শোনায় না। জানালা থেকে সঙ্গীত গলিয়ে সড়কে চুঁইয়ে পড়ছে; এটা কাইতো নাচের গান নয়, কোনো নাচের হলঘর নয়, আমাদের জানা-শোনার পরিধির ভেতর কিছু নয়।

এক দীর্ঘকায়া, ক্ষীণাঙ্গী নারী দরজা খোলেন এবং ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। তিনি কিছু খাচ্ছেন এবং আমাদের দিকে যেন ঢেউ তুলে এগিয়ে আসেন। ইতোমধ্যে মহিলার ভয়ানক রুগ্ন স্বাস্থ্য দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমরা এমনকি দৌড়ও দেব না। আমরা মহিলার জন্য অপেক্ষা করি, যাতে আমরা দেখতে পাই যে তিনি কেনো আমাদের দিকে বা আদৌ আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছেন কিনা; ‘স্বর্গ’-এ কেউ আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসে না। শুধুমাত্র হাড়ের মা ছাড়া যিনি কিনা সবার দিকেই তাকিয়ে হাসেন। মহিলা ফটকের পাশে থামেন; এটা তালা দেয়া এবং তিনি তার সাথে এটা খোলার চাবি আনেননি।

‘জিজ, আমি এত গরম সইতে পারছি না। পায়ের নিচে মাটি কি শক্ত, তোমরা বাবা কিভাবে যে সব সও?’ অ-বিপজ্জনক কণ্ঠস্বরে মহিলা বলেন।তার হাতের খাবারটিতে একটি কামড় দিয়ে তিনি হাসেন। একটি সুন্দর, গোলাপী রঙের ক্যামেরা তার গলা থেকে ঝুলছে। দীর্ঘ স্কার্টের নিচ থেকে বের হয়ে আসা ভদ্রমহিলার পা জোড়ার দিকে আমরা তাকাই। শিশুর পায়ের মতো পরিষ্কার ও সুন্দর এক জোড়া পা। তিনি তার পায়ের আঙুলগুলো নাড়াচ্ছেন। আমি মনে করতে পারি না যে আমার পা কখনো অমন সুন্দর দেখিয়েছিল কিনা। হতে পারে যখন আমি জন্মেছিলাম, তখন আমার পা জোড়াও অমন সুন্দর ছিল।

তারপর আমি মহিলার লাল আর কিছু একটা চিবুতে থাকা মুখের দিকে তাকালাম। তার গলার পাশের শিরা আর যেমনভাবে তিনি তার বড় ঠোঁটগুলো চাটছিলেন, তাতেই বুঝতে পেরেছিলাম যে তিনি যা খাচ্ছেন তা’ সত্যিই মজাদার।

আমি তার হাতের দিকে তাকালাম, দেখতে চাইলাম তিনি ঠিক কি খাচ্ছেন। এটা সমতল তবে বাইরের দিকটা শক্ত। উপরের দিকটা আবার মাখনের মতো নরম এবং এর উপর মুদ্রার মতো কিছু একটা, গাঢ় গোলাপী যেন পুড়ে যাওয়া কোনো ক্ষতস্থান। আমি দেখলাম খাবারটির উপরে লাল, সবুজ ও হলুদের কিছু ছিটা আর সবার শেষে আছে সেই ফুস্কুড়ির মতো বাদামী রঙা কি একটা যেন।

‘ওটা কি?’ চিপো মহিলার হাতে ধরা জিনিষটির দিকে এক হাত বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে আর এক হাতে তার পেট ঘষতে থাকে। পেটে বাচ্চা আসার পর থেকে চিপো কথা বলার সময় পেটে হাত ঘষে খেলতে ভালোবাসে। ওর পেটটি ঠিক যেন একটি ফুটবলের মতো, খুব বড় না। আমরা সবাই মহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি এবং শুনতে চেষ্টা করি যে তিনি কি বলেন আমাদের।

‘ওহ, এটা? এটা তো একটা ক্যামেরা,’ মহিলাটি বলেন যা আমরা জানি।

স্কার্টের উপর হাত মুছে ভদ্রমহিলা ক্যামেরায় মৃদু চাপড় মারেন। তারপর তার হাতের খাবারের বাকি অংশটুকু দরজার পাশের ময়লা রাখা ঝুড়িটার দিকে ছুঁড়ে মারেন,কিন্তু খাবারটা ঝুড়িতে পড়েনি। তিনি হাসেন।তবে আমি বুঝতে পারি না যে এতে মজার কি আছে। ভদ্রমহিলা আমাদের দিকে তাকান। হতে পারে যে তিনি চান যে আমরাও হাসি যেহেতু তিনি হাসছেন, তবে আমরা তার হাত থেকে মাটিতে পড়ে যাবার আগে উড়তে থাকা মৃত পাখির মতো খাবারটির দিকে তাকিয়ে থাকি। আমরা এর আগে কাউকে এভাবে খাবার ছুঁড়তে দেখিনি। আমি চিপোর দিকে তাকাই।

‘তোমার বয়স কত?’ মহিলা চিপোকে জিজ্ঞাসা করেন। ওর পেটের দিকে এমনভাবে তাকান যেন তিনি এর আগে কোনো গর্ভবতী মেয়েকে দেখেনি। কিন্তু চিপো শুনছেও না, সে মাটির উপরে পড়ে থাকা বস্তাটির দিকে তাকাতেই ব্যস্ত।

‘ওর বয়স দশ,’ খোদা জানে চিপোর হয়ে উত্তর করে, ‘আমাদের নয় বছর, ‘যমজ বোনের মতো একই বয়স আমাদের,’ খোদা জানে আমাকে দেখিয়ে বলে, ‘আর বেজন্মার বয়স এগারো, সবহোর আট এবং স্টিনার বয়স আমি ঠিক জানি না।’

‘ওহ,’ মহিলাটি বলেন, হাতের ক্যামেরাটি নাড়া-চাড়া করতে করতেই।

‘আর তোমার কত বয়স?’ খোদা জানে মহিলাকে জিজ্ঞাসা করে। ‘আর কোথা থেকে এসেছ তুমি?” আমি ভাবছিলাম খোদা জানে কত কথাই না বলে।

‘আমি?আমার বয়স হচ্ছে ৩৩, আমি লন্ডন থেকে এসেছি। এই প্রথম আমি আমার বাবার দেশ ঘুরতে এসেছি।’

‘আমি একবার লন্ডন থেকে আনা কিছু মিষ্টি খেয়েছিলাম। সুজন কাকা যখন প্রথম সেখানে যান তখন মিষ্টিগুলো পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সে অনেক দিন আগের কথা।এখন উনি একটা চিঠিও পাঠান না,’ খোদা জানে বলে। তার পাকানো মুখ এখন চিবুনো বন্ধ করে। আমি যেন মহিলার সাথে সমান তালেই ঢোক গিলি।

‘তোমাকে তো পনেরোর বাচ্চার মতো দেখায়,’ খোদা জানে বলে। আমি ভয় পাচ্ছিলাম যে বকবকানি খোদা জানেকে মহিলা না একটা চড় মারে! উত্তরে ভদ্রমহিলা বরং শুধু হাসেন। যে হাসিতে মনে হয় যে তাকে গর্ব বোধ করার মতো কিছু বলা হয়েছে।

‘ধন্যবাদ,’ মহিলা বলেন।আমি তার দিকে তাকিয়ে ভাবি যে এতে ধন্যবাদ দেবার কি আছে? অন্যদের দিকেও তাকাই। আমি জানি ওরাও আমার মতো মহিলাকে একটু বিচিত্রই ভাবছে। মহিলা তার মাথার চুলে হাতবোলান যা কিনা জটা ধরা ও ময়লা দেখতে; আমি যদি বুদাপেস্টে থাকতাম তবে আমি প্রতিদিন আমার পুরো শরীর ধুতাম এবং সুন্দর করে আমার চুল আঁচড়াতাম। গোটা পৃথিবীকে দেখাতাম যে আমি সত্যিকারের জায়গায় থাকা এক সত্যিকার মানুষ।

‘বাচ্চারা—তোমরা কিছু মনে করবে না তো যদি আমি তোমাদের একটা ছবি তুলি?’

আমরা একথার উত্তর করি না। কারণ প্রাপ্তবয়ষ্করা কোনো কিছুর জন্য আমাদের কাছে অনুমতি চাইবে এমন অভিজ্ঞতা আমাদের নেই।

আমরা দেখলাম মহিলা মাত্র কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন, আমরা দেখলাম তার তেজি চুলের গোছা, হাঁটার সময় মাটি ঝাড়-দিয়ে চলা তার লম্বা স্কার্ট, সুন্দর চীনে পা, বড় বড় গয়না, বড় বড় চোখ আর তার মসৃণ বাদামী ত্বক যেখানে কিনা একটি ক্ষত চিহ্নও নেই যাতে কিনা বোঝা যেত যে সে একজন জীবন্ত ব্যক্তি।তার নাকে একটি নথ ছিল অবশ্য। গায়ের টি-শার্টে লেখা ‘সেভ দার্ফুর।’

‘বাচ্চারা—এদিকে এসো—বলো—চীজ, চীজ, চীইইইইইইইইইইজ,’ মহিলা উদ্দীপনা যোগান আর সবাই বলতে থাকে, ‘চীইইইজ।’ আমি অবশ্য ঠিক বলি না কারণ আমি মনে করার চেষ্টা করি যে ‘চীজ’ অর্থ ঠিক কি এবং আমার মনে পড়ে না।  গতকাল হাড়ের মা আমাকে বলেছে ডুডু পাখির গল্প।সেই পাখি যে কিনা একটি নতুন গান শিখেছিল এবং গেয়েছিল একটি নতুন গান যার শব্দগুলোর অর্থ সে পুরো জানে না এবং পাখিটাকে পরে ধরা হয়, মেরে ফেলা হয় আর রাতের খাবারের জন্য রান্না করা হয়। কারণ গানটিতে পাখিটি আসলে তাকে মেরে না ফেলা এবং রান্না না করার জন্য অনুরোধ করছিল। মহিলা আবার আমার দিকে আঙুল বাড়ান, মাথা নাড়ান এবং আমাকে আবার ‘চীইইইইইইইইইইজ’ বলতে বলেন এবং আমি তাই করি যেহেতু তিনি অনেক দিনের পরিচিতার মতো আমার দিকে তাকিয়ে হাসছেন।

আমি প্রথম আস্তে বলা শুরু করি, বলি, ‘চীজ’ এবং ‘চীজ,’ এবং তারপর বলতেই থাকি ‘চীইইইইইইইইইইজ’ এবং সবাই বলছে ‘চীইইইইইইইইইইজ’ এবং আমরা সবাই গান গাইছি আর ক্যামেরা ক্লিক ক্লিক ক্লিক করছে তো করছেই। এরপরই স্টিনা, যে কখনো কোনো কথা বলে না, সহসা হাঁটা শুরু করে। মহিলা এবার ছবি তোলা বন্ধ করেন এবং কথা বলেন, ‘তুমি ঠিক আছ?’ কিন্তু স্টিনা থামে না। এরপর চিপো স্টিনার পিছু পিছু হাঁটতে থাকে। ওর পেট ঘষতে ঘষতেই। তারপর আমাদের সবাই তার পিছু পিছু হাঁটে। ছবি তোলারত মহিলাকে রেখে আমরা সামনে এগোই বেজন্মা এসএডিসি সড়কের এক কোণে থামে এবং মহিলার দিকে গালি দেয়া শুরু করে। এবং তখন আমার সেই খাবারের টুকরোটির কথা মনে পড়ে যায় যা আমরা খেতে চাই কিনা এমনটা জিজ্ঞাসা না করেই মহিলা ছুঁড়ে ফেলেছিলেন এবং তখন আমিও স্টিনার সাথে মিলে চেঁচানো শুরু করি, এবং সবাই এই চেঁচানোয় যোগ দেয়। আমরা চেঁচাই এবং চেঁচাই এবং চেঁচাই; মহিলা যা খেয়েছিলেন আমরা সেটা খেতে চাই, আমরা বুদাপেস্টে আওয়াজ তুলতে চাই, আমরা চাই আমাদের পেটে যেন আর খিদে না থাকে। মহিলা আমাদের চেঁচানোয় বিভ্রান্ত হয়ে তাড়াহুড়ো করে ঘরে ঢুকে গেলেন এবং আমরা তার দিকে চেঁচাতেই থাকলাম।

আমরা কর্কশভাবে চেঁচাতেই থাকি। আমাদের গলা চুলকাতে থাকে। মহিলা যখন তার বাড়ির দরজা আটকে অদৃশ্য হয়ে যান, আমরা চেঁচানো থামাই এবং পেয়ারা খুঁজতে যাই।

বেজন্মা বলে যে আমরা যখন বড় হব তখন আমরা পেয়ারা চুরি থামাবো এবং বড়লোকদের বাড়ির ভেতরে আরো বড় জিনিষ চুরিতে হাত দেব। তবে তেমন সময় আসতে আসতে আমার হয়ত এখানে আর আসা হবে না; আমি তখন আমেরিকায় ফস্টালিনা আন্টির কাছে থাকব, আরো ভালো নানা কাজ করব।কিন্তু এখনকার কাজ হল পেয়ারা চুরি করা। আমরা আইএমএফ সড়কে যাবার কথা ঠিক করি। সেখানে একটি সাদা রঙের বাড়ি।এত বড় যে পাহাড়ের মতো লাগে দেখতে। সামনে একটি বিশাল সুইমিং পুল, তার চারপাশে অনেকগুলো ফাঁকা চেয়ার পাতা। এই সুন্দর বাসাটির ভালো দিক হল বাড়ির উঠোনের অনেক পেছনে পাহাড় এবং আমাদের হাতের কাছে পেয়ারা গাছ। যেন বা পেয়ারাগুলো জানত যে আমরা আসছি আর সেটা শুনে ওরা দৌড়ে আমাদের কাছে ছুটে এসেছে।

কংক্রিটের দেয়ালের উপর উঠতে আসলে খুব বেশি সময় লাগে না। সময় লাগে না গাছের উপর উঠে, প্লাস্টিক ব্যাগে পেয়ারা ভরতে। এই পেয়ারাগুলো বড়, মানুষের হাতের মুঠির সমান এবং নিয়মিত পেয়ারার মতো হলুদ হয়ে পাকে না; বাইরে থেকে তাদের সবুজ দেখায় ও ভেতরে গোলাপী ও তুলতুলে। এই পেয়ারাগুলো খেতে এতই ভালো যে আমি বলে বোঝাতে পারবো না।

*****

‘স্বর্গ’-এ ফিরে আমরা আর দৌড়াই না। আমরা খুব ভালোভাবে হাঁটি যেন বুদাপেস্ট এখন আমাদের নতুন দেশ, পেয়ারা খেয়ে এবং সারা পথে পেয়ারার খোসা ছড়িয়ে সেখানে আমরা পথ নোংরা করে রাখব। এইউ সড়কের পাশে এসে চিপোর বমির জন্য আমাদের থামতে হয়। আজতার বমি দেখাচ্ছে প্রস্রাবের মতো, তবে গাঢ়তর। আমরা সেই বমি না ঢেকেই সেখানে রেখে আসি।

‘একদিন আমি এখানে থাকবো, এমন একটা বাসায়,’ একটি শক্ত পেয়ারা চিবুতে চিবুতে সবহো বলে। সে বাম দিকে তাকায় এবং একটি বড় নীল বাড়ির দিকে আঙুল তুলে দেখায় যেখানে আছে প্রচুর সিঁড়ি এবং বাড়িটার চারপাশে অনেক ফুল। সবহোর গলা শুনে মনে হয় সে জানে যে সে কি নিয়ে কথা বলছে।

‘তুমি এটা কিভাবে করবে?’ আমি জিজ্ঞাসা করি।

সবহো রাস্তায় পেয়ারার খোসা ছাড়ায় আর ওর বড় দুই চোখ মেলে বলে, ‘আমি এটা জানি।’

‘সে স্বপ্নে সেই বাসায় থাকবে,’ বেজন্মা সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলে এবং সবহোর কল্পনার সেই ভবিষ্যত বাড়ির দিকে একটি পেয়ারা ছুঁড়ে মারে। পেয়ারাটা ফেটে গিয়ে বাড়িটার দেয়াল গোলাপী হয়ে যায়। আমি একটি মিষ্টি পেয়ারায় কামড় দিই। তবে এই গোলাপী পেয়ারার বীজ আবার শক্ত যা চিবুতে আমার ভালো লাগে না এবং অনেক সময়ও নেয়। কাজেই আমি ধীর-স্থিরভাবে পেয়ারা চিবুতে থাকি এবং মাঝে মাঝে আস্ত পেয়ারাই গিলে ফেলি যদিও জানি এর পর কি হবে।

‘তুমি এমনটা করলে কেনো?’ সবহো তার কল্পনার আগামী দিনেবাড়িটার এই মূহূর্তে ময়লা হয়ে যাওয়া কংক্রিটের দেয়ালের দিকে তাকায়। তারপরই তাকায় বেজন্মার দিকে।

বেজন্মা হাসে, আর একটা পেয়ারা ছুঁড়ে মারে। কংক্রিটের দেয়ালে ধাক্কা না খেলেও বাড়ির দরজায় পেয়ারাটা লাগে। দরজাটি কোনো শব্দ করে না যেমনটা সাধারণত: কোনো দরজায় কিছু একটা ঠোক্কর লাগলে হয়।

‘কারণ আমি পারি।কেননা আমি যা করতে চাই, তাকরতে পারি। এছাড়া এটা আরএমন কী?’

‘কারণ তুমি আমাকে বলতে শুনেছিলে যে আমি বাড়িটা পছন্দ করি, কাজেই এই বাড়িটার কোনো ক্ষতি তোমার করা উচিত নয়। অন্যকোনো বাড়িতে পেয়ারা ছোঁড়ো না যেটার বিষয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই?’

‘ভালো কথা, তাই বলে এটা তোমার বাড়ি না, তাই না?’ বেজন্মা একটি কালো রঙের ট্রাক স্যুট পরেছেযা ও কখনো গা থেকে খোলে না, এছাড়াও ওর গায়ে একটি কমলা রঙের টি-শার্ট যেখানে লেখা ‘কর্নেল’। বেজন্মা তার কর্নেল টি-শার্টটি গা থেকে খুলে মাথার উপর বেঁধে ফেলে এবং আমি জানি না কিসে তাকে কদর্য বা সুন্দর দেখায়, তাকে সত্যিই নারী বা পুরুষের মতো দেখায়। বেজন্মা ঘুরে দাঁড়িয়ে পেছন দিকে ফিরে হাঁটতে থাকে যাতে সে সবহোর দিকে মুখ করে হাঁটতে পারে।সে সবসময়ই যার সাথে ঝগড়া করবে তার দিকে তাকিয়ে হাঁটতে পছন্দ করে। সে স্টিনা ছাড়া আমাদের সবাইকেই পিটিয়েছে।

‘এছাড়াও বুদাপেস্ট কোনো বাথরুম নয় যে এখানে যে কেউই ঢুকে হাঁটতে পারবে। তুমি এখানে কোনোদিনই বাস করতে পারবে না।’

‘আমি বুদাপেস্টের কোনো পুরুষকে বিয়ে করবো। সে আমাকে স্বর্গ থেকে নিয়ে যাবে, আমাকে সরিয়ে নিয়ে যাবে এইসব খুপড়ি ঘর এবং স্বর্গপথ ও ফামবেকি নামের সব বস্তি আর এই সব কিছু থেকে,’ সবহো বলে।

‘হা হা। তোমার মনে হয় কোনো পুরুষ তোমার মতো একফোকলা দেঁতো মেয়েকে বিয়ে করবে? এমনকি আমিই তো তোমাকে বিয়ে করব না,’ খোদা জানে বলে। গলার স্বর চড়িয়ে। সে আর চিপো এবং স্টিনা আমাদের সামনে থেকে হাঁটে বা হেঁটে যায়। আমি খোদা জানের শার্টের দিকে তাকাই, পিঠের দিকে ছেঁড়া আর তার আলকাতরার মতো কালো পাছা সূতির সাদা, ময়লা প্যান্টের ভেতর থেকে এক জোড়া অবাক চোখের মতো যেন তাকিয়ে আছে।

‘আমি তোমার সাথে কথা বলছি না মাথা মোটা!’ সবহো খোদা জানের দিকে তাকিয়ে চেঁচায়, ‘এছাড়া, আমার দাঁত তো আবার হবে। মা বলেছে তখন আমি দেখতে আরো সুন্দর হবো।’

খোদা জানে এবার তার হাত ছুঁড়ে এবং ‘যাহোক’ ভঙ্গিতে হাত নাচায়। কারণ এবিষয়ে তার কিছুই বলার নেই।

সবাই জানে যে সবহো দেখতে সুন্দর, সুন্দর আমাদের সবার চেয়ে, ‘স্বর্গের সব শিশুর থেকেই সবহো সুন্দর।মাঝে মাঝে আমরা ওর সাথে খেলতে রাজি হই না যতক্ষণ না ও এসব কথা বলা বন্ধ করে যা আমরা সবাই জানি।

‘যাক, আমি এসব নিয়ে ভাবি না। আমি এদেশ থেকে দ্রুতই বের হয়ে যাব। আমি অনেক টাকা বানাবো এবং দেশে ফিরে আসব আর বুদাপেস্ট অথবা লস এ্যাঞ্জেলসে বা এমনকি প্যারিসেও একটি বাড়ি কিনবো,’ বেজন্মা বলে।

‘আমরা যখন স্কুলে যেতাম, তখন আমাদের শিক্ষক মিস্টার গোনো বলতেন যে টাকা আয়ের জন্য শিক্ষা দরকার, এটাই তিনি বলতেন, আমার নিজের শিক্ষক।’ চিপে তার পেটে হাত বুলাতে বুলাতে এমনভাবে বলে যেন মিস্টার গোনো তার নিজের বাবা।যেন বা মিস্টার গোনো বিশেষ কেউ, যেন বা মিস্টার গোনোই তার পেটের ভেতর রয়েছে।

‘কিন্তু এখন তুমি কিভাবে টাকা বানাবে যখন আমরা আর স্কুলে যাচ্ছি না?’ চিপো বলে।

‘টাকা বানাতে স্কুলে যাওয়া লাগে না।কোন বাইবেলে পড়েছ যে টাকা বানাতে স্কুলে যেতে হয়?’ বেজন্মা চিপোর দিকে তাকিয়ে চেঁচায় আর নিজের মুখটা চিপোর মুখের এত কাছে আনে যেন ওর নাকটা ছিঁড়েই ফেলবে।

চিপো ওর পেটের উপর হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বাকি পেয়ারাটা শান্তভাবে চিবোয়। সে আমাদের থেকে দ্রুতগতিতে হাঁটে।

‘আমি আমার আন্টি ফস্টালিনার সাথে থাকতে যাচ্ছি; খুব বেশি দিন নয়, তোমরা দেখতে পাবে,’ আমি বলি, গলা চড়িয়ে বলি যেন ওরা সবাই শুনতে পায়। আমি আর একটা নতুন পেয়ারা চিবুনো শুরু করেছি; এটা এত মিষ্টি যে আমি তিন কামড়েই শেষ করে ফেলি। এমনকি পেয়ারার বীচিগুলো চিবুনোরও আর চেষ্টা করি না।

‘আমেরিকা বহু দূরে,’ বেজন্মা বলে, সে বিরক্ত বোধ করছে। ‘আমি এত দূরে কোথাও যেতে চাই না যেখানে বিমানে করে যেতে হয়।যদি সেখানে গিয়ে তুমি আটকে যাও আর ফিরে আসতে না পারো? আমি গেলে ঐ দক্ষিণ আফ্রিকা আর বোতসোয়ানা পর্যন্ত যেতে চাই, এভাবে, যখন অবস্থা খারাপ হবে, আমি কারো সাথে কথা না বলেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে যাবো; যেখানেই যাও না কেনো, সেখান থেকে চাইলে সহজে ফিরে আসার রাস্তা যেন তোমার থাকে।’

আমি বেজন্মার দিকে আবার তাকাই এবং বুঝে উঠতে পারি না তাকে কি বলব। আমার মাড়ির পাশের একটি দাঁত ও মাড়ির ভেতরে আঠার মতো আটকে আছে একটি পেয়ারার বীজ। বীজটা ছাড়াতে শেষমেশ আমি আমার একটি আঙুল ব্যবহার করি। এটা কানের খইলের মতো লাগে।

‘আমেরিকা সত্যি অনেক দূর,’ চিপো বলে, বেজন্মার সাথে সে একমত।

চিপো এবার হাঁটা থামায়, তার হাত তার পেটের নিচে, যাতে আমরা তাকে ধরতে পারি। ‘কি হবে যদি তোমার প্লেনে কিছু হয়? যখন তুমি প্লেনের ভেতরে আছো, তখন সন্ত্রাসীদের সাথে তুমি কি করবে?’

আমার মনে হয় যে, সমতল মুখ, ফুটবলাকৃতি পেটের চিপো এসব কথা বলছে নিছকই বেজন্মাকে সুখী করতে যেহেতু কুচ্ছিত মুখের বেজন্মা একটু আগেই ওর দিকে চেঁচিয়েছে। আমি ওর দিকে কথাভরা চোখে তাকালেও আমার মুখ পেয়ারা চিবিয়েই চলে।

‘আমার কিছু যায় আসে না, আমি যাচ্ছি,’ আমি বলি এবং খোদা জানে আর স্টিনাকে ধরতে ছুট দেই। কারণ আমি জানি এসব কথার শেষ কোথায় যদি চিপো আর বেজন্মা আমার উপর চড়াও হয়।

‘ঠিক আছে, যাও, আমেরিকা যাও এবং নার্সিং হোমে গিয়ে কাজ করো আর রোগীদের পাছা ধুইয়ে দাও। তুমি মনে করো আমরা এসব গল্প জানি না?’ বেজন্মা আমার পিছন পিছন চেঁচায় তবে আমি হাঁটতেই থাকি।

আমি ভাবি ডান দিকে ফিরে বেজন্মাকে একটা মার লাগাই। আমার আমেরিকা সম্পর্কে ওভাবে বলার জন্য।আমি ওকে চড় মারবো, ওর বড় কপালে গুঁতো দিবো, তারপর আমার হাতের মুঠি ওর মুখের ভেতর জোরে ঢোকাবো এবং ওর দাঁত ওর থুতুর সাথে ফেলতে বাধ্য করবো।আমি ওর পেটে এমনভাবে মারবো যে ও যতটা পেয়ারা খেয়েছে তার সবটুকুই বমি করে ফেলে দেবে এবং তারপর ওকে মাটিতে ফেলে দেবো। ওর পিঠে আমার হাঁটু দিয়ে খোঁচা দেবো, ওর হাত জোড়া ওর পেছন দিকে শক্ত করে বাঁধবো এবং তারপর ওর মাথা টেনে তুলবো যতক্ষণ না ও প্রাণ ভিক্ষা চায়। তবে আমি এসব কিছুই করি না আর চুপ করে হাঁটতে থাকি। আমি জানি ও হিংসা করছে।কারণ ওর আসলে আমেরিকায় কেউ নেই। কারণ আন্ট ফস্টালিনা ওর আন্ট নয়। কারণ সে বেজন্মা আরআমি প্রিয়া।

*****

যে সময় নাগাদ আমরা ‘স্বর্গ’-এ ফিরে আসি, ততক্ষণে আমাদের পেয়ারাগুলো খাওয়া শেষ এবং পেট এতটাই ভরা যে পারলে হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটি। রাতে আমরা শুধু পানি খাবো এবং হাড়ের মা আমাদের একটি গল্প বলবেন যা আমরা শুনবো এবং তারপর ঘুমোতে যাবে। আজ রাতে ঝোপের আড়ালে আর হাগু করবো না। করতে হলে খুব বেশি রাত হবার আগেই করতে হবে। নয়তো হাগু করতে যাবার সময় তোমার পাশে কে থাকবে? ঝোপের পাশে যেতে হলে তো ঐ কবরখানাটা পার হতে হয় আর সেখানে তোমার সাথে একটা ভূতের দেখা হয়ে যেতে পারে।

হাগু করার সময় আমরা সবাই ঝোপের আড়ালে ঠিক একটি জায়গা খুঁজে নিই, আর আমি, আমি একটি পাথরের পেছনে উবু হয়ে বসি।পেয়ারা খাওয়ার সবচেয়ে খারাপ দিক এইটিই। তুমি যখন খুব বেশি পেয়ারা খাও, তখন এর বীজগুলোর চাপে হাগু বন্ধ হয়ে আসে। তবু জোর করে হাগু হওয়াতে গেলে এত ব্যথা হয় যেন তুমি আস্ত একটা দেশ জন্ম দেবার কষ্ট করছো। মিনিটের পর মিনিটের পর মিনিট পার হয় অথচ কেউ একবার চেঁচিয়ে বলবে না, ‘আমার হয়ে গেছে, তোমরা তাড়াতাড়ি করো।’

আমরা সবাই ওভাবেই উবু হয়ে বসে আছি, ভিন্ন ভিন্ন নানা জায়গায়, আর আমি আমার উরুতে একটা টান লাগায় হাতের মুঠি দিয়ে টান লাগার জায়গায় পেটাচ্ছি যেন ব্যথাটা কমে যায়। আর তখনি কে যেন চেঁচালো। চেঁচানোটা ঠিক সেই সময়ের না যখন তুমি নিজের তলপেটে নিজেই খুব চাপ দিচ্ছ হাগু হবার জন্য আর একটি পেয়ারার বীজ তোমার হাগু বের হবার রাস্তা দিয়ে বের হবে; বরং এটা বলছে, ‘এসো এবং দেখো,’ কাজেই আমি তলপেটে হাগু হবার জন্য ধাক্কা দেয়া বন্ধ করি, প্যান্টটা টেনে তুলে পাথরের আড়াল থেকে উঠে দাঁড়াই।

উঠে দাঁড়িয়ে দেখি, খোদা জানে উবু হয়ে বসা অবস্থাতেই ভয়ানক চেঁচাচ্চে। সামনের ঘন গাছপালার দিকে আঙুল তুলে দেখায় এবং আমরা দেখি লম্বা কিছু একটা গাছ থেকে ঝুলছে।

‘কি ওটা?’ কেউ একজন, আমি জানিনা কে, ফিসফিস করে।

কেউ উত্তর করে না। তবে আমরা ইতোমধ্যেই দেখে ফেলেছি যে এটা কে? সবুজ একটি দড়ি থেকে এক মহিলা ঝুলছে। সন্ধ্যা নেমে আসার আগে ঠিক এই সময়টায় সূর্য যেন গাছের পাতার ফাঁক থেকে সঙ্কুচিত হয়ে দেখা দিচ্ছে আর সবকিছুই একটি অদ্ভুত বর্ণ ধারণ করছে, যা কিনা নারীটির গায়ের চামড়ায় এমন এক আভা ছড়াচ্ছে যে মনে হচ্ছে তার ভেতরে টকটকে লাল কয়লা জ্বলছে।

মহিলার রোগা হাত দু’টো দু’পাশে নিস্তেজ হয়ে ঝুলছে, আর তার হাত ও পা দু’টো মাটিতে ঠেকেছে, যেন বা কেউ তাকে সেখানে টেনে নিয়েছে, বাতাসে একটি সরল রেখা ঝুলছে।

এই মহিলার চোখ জোড়া তার দেহের সবচেয়ে ভীতিকর অংশ। এত বেশি সাদা দেখতে যে বলার নয়, আর মুখটি হাঁ করে বের করা। মহিলা একটি হলুদ পোশাক পরে এবং তার জুতোর ডগায় ঘাস যেন চাটছে।

‘চল্ দৌড়াই.’ স্টিনা বলে। সেই দেশি খেলার পর থেকে এই প্রথম স্টিনা কোনো কথা বললো। স্টিনা যখন কোনো কথা বলে, তখন বুঝে নিতে হবে যে সত্যিই গুরুতর কিছু ঘটেছে এবং আমি দৌড় দেবার জন্য প্রস্তুত হই।

‘ভীতুর দল, দেখতে পাচ্ছ না যে মহিলা নিজেই নিজের গলায় দড়ি দিয়েছে আর এখন সে মৃত?” বেজন্মা একটি পাথর তুলে ছুঁড়ে মারে; এটা মহিলার উরুতে আঘাত করে। আমার মনে হলো কিছু একটা ঘটবে তবে কিছুই ঘটে না।মহিলা নড়েন-চড়েন না।

‘দ্যাখো, আমি তো তোমাকে বলেছিলাম যে উনি মারা গেছেন।’ বেজন্মা বলে, সে এখন সেই গলায় কথা বলছে যে গলায় কথা বলে সে মনে করিয়ে দিতে চায় যে আমাদের ভেতর কে দলনেতা।

‘এভাবে মরা মানুষের গায়ে পাথর ছুঁড়লে খোদা তোমাকে শাস্তি দেবে,’ খোদা জানে বলে।

বেজন্মা তবু আর একটি পাথর ছোঁড়ে। এটা মৃত মহিলার পায়ে ‘খু’ জাতীয় একটা শব্দ করে আঘাত করে। তবু মহিলার কোন নড়ন-চড়ন নেই।আমার প্রচণ্ড ভয় লাগছে; মনে হচ্ছে যেন মহিলা আমার দিকে তার সাদা, কোটর থেকে বেরিয়ে আসা চোখ জোড়া দিয়ে দেখছেন। তিনি যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছেন আর অপেক্ষা করছেন যেন আমি কিছু একটা করব! তবে আমি জানি না আমি কি করব।

‘খোদা এখানে থাকেন না, নির্বোধ কোথাকার,’ বেজন্মা বলে। সে আর একটি পাথর ছোঁড়ে যা মহিলার হলুদ পোশাকে গড়িয়ে পড়ে এবং আমি খুশি হই যে পাথরটি গড়িয়ে পড়ে যায়।

‘আমি এখন বাসায় যাব আরমা’কে সব বলবো,’ সবহো বলে, তার গলার স্বর কেমন যেন কান্না কান্না। স্টিনা চলে যাবার জন্য হাঁটা শুরু করে, তবে তার পেছন পেছন সবহো এবং খোদা জানেও হাঁটতে থাকে। বেজন্মা কিছুক্ষণের জন্য পিছিয়ে থাকলেও একটু পরেই আমার কাঁধের উপর থেকে তাকিয়ে দেখি সে ঠিক আমার পেছনে। আমি জানতাম যে সে ঐ ঝোপের আড়ালে একটি মৃতদেহের সাথে সারাজীবন থাকতে পারবে না যদিও সে হাব-ভাব করে যেন আমাদের ‘স্বর্গ’ নামক বস্তির সে রাষ্ট্রপতি। আমরা আবার একসাথে হাঁটা শুরু করি, কিন্তু তখন বেজন্মা ঠিক আমাদের সামনে যেন লাফ দিয়ে এলো।

‘একমিনিট, তোমরা কে কে রুটি খেতে চাও?’ বেজন্মা বলে, মাথার উপর তার ‘কর্নেল’ লেখা টি-শার্টটা সে শক্ত করে বাঁধে। বেজন্মার বুকের উপর ক্ষতটির দিকে চোখ গেল আমার, ওর বাঁ দিকের বুকের নিচেই।পেয়ারার ভেতর গোলাপী রঙের মতোই ওর এই ক্ষত।

‘রুটি কোথায় পাবো?’ আমি জিজ্ঞাসা করি।

‘শোনো, তুমি লক্ষ্য করোনি যে মহিলার জুতাজোড়া একদম প্রায় নতুন? জুতোজোড়া হাতাতে পারলে, বাজারে বিক্রি করে আমরা একটা রুটি বা এমনকি দেড়টা রুটিও কিনতে পারি। কি বলো?’

আমরা সবাই ঘুরে দাঁড়াই এবং বেজন্মার পিছু পিছু আবার ঝোপের ওখানে যাই যেখানে সেই লাশটা ঝুলছে।আমরা তখন ছুটছি, তারপর আবার দৌড়াচ্ছি, তারপর আবার দৌড়াচ্ছি আর হাসছি, আর হাসছি, আর হাসছি।

পাথর খায়, মল ত্যাগ করে বালি

প্রাণী জগতে বৈচিত্রের শেষ নেই। প্রতিনিয়ত বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করছেন আর চমকে যাচ্ছেন। এবারো ঘটলো তেমনটি। নতুন প্রজাতির এক ঝিনুক আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা যেটি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের। এই এই ঝিনুক খায় পাথর। আবার যখন মল ত্যাগ করে তখন বের হয় বালি। অর্থাৎ পাথর খেলে বালি বানিয়ে ফেলে এই প্রাণী। এই ঝিনুক এক প্রজাতির ‘শিপ ওয়ার্ম’। একে সমুদ্রের উইপোকা বলেও অভিহিত করেন অনেকে।
দেখতে ঝিনুকের মতো না হলেও এটি আসলে এক প্রকার ঝিনুক; কিন্তু দেহের আকার বড়ো হওয়ায় খোলসের মধ্যে নয়, বাইরেই থাকে সাদা জেলির মতো দেহাংশ। শিপওয়ার্মের আকার মূলত ১ থেকে ৫ ফুট হয়। লিথোরেডো অ্যাবাটানিকার আকার প্রায় ৪ ফুট। রয়েছে কয়েক ডজন দাঁতও।
ফিলিপাইনের আবাতান নদীতে ২০০৬ সালে প্রথম এ ঝিনুকটিকে দেখতে পান ফ্রান্সের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ন্যাচরাল হিস্ট্রির সদস্যরা। ঝিনুকটি আদতে ‘শিপ ওয়ার্ম’ গোত্রের। সেই সময় তারা এ শিপ ওয়ার্মটিকে ‘টেরেদিনিদি’ গোত্রের বলে মনে করেছিলেন।
এই গোত্রের কীট বা ঝিনুকগুলো মূলত নোনা জলে বাস করে। এর নামকরণও হয়েছে তাদের খাদ্যাভাসের উপর ভিত্তি করেই। শিপ ওয়ার্ম নাম থেকেই বোঝা যায়, এরা মূলত জাহাজে বা বন্দরের কাঠের পাটাতনে খোলসের মধ্যে থাকে এবং কাঠ খেয়েই জীবনযাপন করে।
সম্প্রতি ফিলিপাইনের জীব বৈচিত্র অভিযানে এ শিপ ওয়ার্মটিকে পাথরের ভিতরে দেখতে পান গবেষকরা। চমকের শুরু তখন থেকেই। শিপ ওয়ার্ম হলে তা পাথরের মধ্যে কী করছে? এরপর নানা পরীক্ষা চালিয়ে দেখা যায়, যেটিকে তারা শিপ ওয়ার্ম ভাবছিলেন, সেটি আসলে এক নতুন প্রজাতির ঝিনুক। চমকের পরের ধাপে তারা দেখেন, এ ঝিনুকটি পাথর খাচ্ছে এবং মল হিসাবে বালি বের করছে! গবেষকরা এর নাম দিয়েছেন লিথোরেডো অ্যাবাটানিকা।
ফিলিপাইনের আবাতান নদীর পাড়ে তিন থেকে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যেই দেখা মিলছে এ শিপ ওয়ার্মের। এটির নামে ওয়ার্ম থাকলেও এটিকে এক প্রকার ঝিনুক বলে দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা।
দেখতে ঝিনুকের মতো না হলেও এটি আসলে এক প্রকার ঝিনুক - ছবি : সংগৃহীত

Saturday, November 14, 2020

বাংলাদেশের পতিতাপল্লীর দুঃখগাঁথা

বাংলাদেশে যৌনকর্মীরা বৈষম্যের শিকার। সমাজের মূলধারা থেকে তাদেরকে আলাদা করে দেখা হয়। সমাজের চোখে যৌনকর্মীদের কোনো সম্মান থাকে না। তারা সব সময়ই সামাজিক অসম্মানের মুখোমুখি হন। সম্মানজনক ব্যক্তি হিসেবে তাদেরকে দেখা হয় না। বাংলাদেশে এই পেশাকে দেখা হয় চরিত্রহীনদের কাজ হিসেবে। পরিবার সহ সমাজের কেউই তাদেরকে গ্রহণ করতে চায় না। কারণ, তারা সমাজ ও সংসাদের জন্য লজ্জা বয়ে আনেন।

এক্ষেত্রে পতিতাবৃত্তি শব্দটাকেও ব্যবহার করা হয় অসম্মান অর্থে। যে সমাজের সদস্যরা এসব যৌনকর্মীর সেবা নেন, তারা পর্যন্ত এই পেশাকে কলঙ্কিত করেন। এদের নিয়ে খারাপ খারাপ কথা বলেন। বাংলাদেশে পতিতাবৃত্তি নিয়ে বিদেশি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে এসব কথা বলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, কাঙ্খিত কোনো পেশা পতিতাবৃত্তি নয়। অনেক পতিতাই এই পেশা ছেড়ে জীবনকে বাঁচাতে চান। মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন টেরে ডেস হোমসের মতে, দরিদ্র্যতা, বঞ্চনা, জুলুম এবং নির্যাতানের শিকার হয়ে যৌনকর্মে পা বাড়ান যৌনকর্মীরা। এমনকি কিছু নারীর সামনে উজ্বল ভবিষ্যত থাকা সত্ত্বেও তার জীবন বিক্রি হয়ে যায় পতিতাবৃত্তিতে। যেসব নারী বিক্রি হয়ে যান তারা হন বন্ডেড প্রস্টিটিউট। এসব নারীর কোন স্বাধীনতা থাকে না বললেই চলে। নিজেদেরকে মুক্ত করার জন্য তাদেরকে প্রচুর অর্থ আয় করতে হয়। এরপরই তারা সিদ্ধান্ত নেন যে, এই পেশা ছেড়ে যাবেন নাকি আত্মনির্ভরশীল হবেন। তবু তাদের বিগত জীবনের পচে যাওয়া অধ্যায়ের কারণে নতুন করে জীবন শুরু করা খুবই কঠিন। তাদের সঙ্গে সঙ্গে যেন কলঙ্কও ছুটতে থাকে। এ জন্য সমাজ তাদেরকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকে পতিতাপল্লীতে ফিরে যান জীবন বাঁচানোর তাগিদে। তাদেরই একজন বলেছেন, যদি আমার মৃত্যুও হয় এতে, তবু আমি পরোয়া করি না। আমাকে তো অর্থ উপার্জন করতে হবে।
অনেক যৌনকর্মী গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ পিল ওরাডেক্সন সেবন করেন। এর ফলে তাদের শারীরিক গঠন আকর্ষণীয় হয়। এতে খদ্দের আকর্ষিত হয়। তারা অধিক অর্থ আয় করতে পারেন। কিন্তু এই ওষুধ দীর্ঘ সময় ব্যবহার করলে তাদের বিভিন্ন অঙ্গ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু পতিতাপল্লীর নারীরা এ ঝুঁকির কথা জানা সত্ত্বেও তা সেবন করেন।
বাংলাদেশের সংবিধান বিরোধী যৌনকর্ম। তবে ২০০০ সালে যৌনকর্মকে বৈধতা দিয়েছে হাইকোর্ট। সে অনুযায়ী একজন যৌনকর্মীর ন্যূনতম বয়স হতে হবে ১৮ বছর এবং নিজেই নিজেকে পতিতা হিসেবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ঘোষণা দিতে পারেন। ফলে তারা যৌনকর্মী হওয়ার পেশা নিজেরাই স্বাধীন ইচ্ছার ওপর বেছে নিতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশের যৌনকর্মীরা এ পেশায় আসেন তাদের অসহায়ত্বের কারণে। তারা বেঁচে থাকার জন্য এ পেশা বেছে নেন। আদর্শগতভাবে তারা এটা বেছে নিতে চান না। তাদের কাছে এ পেশা একান্তই জীব বাঁচানোর অপরিহার্য মাধ্যম। ব্যক্তিগত সুখ বা আনন্দ পাওয়ার জন্য তারা এ পেশায় আসেন না। তাদের কাছে পতিতালয় হলো জেলখানা। সেখানে বয়সের কোনো ফারাক নেই। সবাইকে জীবন গঠনের জন্য এই পেশায় কাজ করতে হয়। বাংলাদেশের আইনে অপ্রাপ্ত বয়সী মেয়েদের যৌনকর্মে প্রলুব্ধ করা অথবা একাজে তাদেরকে বিক্রি করে দেয়া বৈধ নয়। ৩৬৪এ, ৩৬৬এ এবং ৩৭৩ ধারা অনুযায়ী এসব কাজ ফৌজদারি অবরাধ এবং এতে মৃত্যুদ-ের সম্ভাবনা আছে।
কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বড় পতিতালয়গুলোর অন্যতম দৌলতদিয়া পতিতালয়। সেখানে বয়স কোনো ব্যাপারই নয়। গড়ে সেখানে নতুন পতিতাদের বয়স ১৪ বছর। এর কারণ, মানবপাচার। বিশেষ করে শিশুদের পাচার করে নিয়ে যৌনকাজে বিক্রি করে দেয়া। এ জন্য অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালিকাদের অপহরণ করে বাংলাদেশের বিভিন্ন পতিতালয় অথবা হোটেলে আটকে রাখা হয়। তাদের কাউকে কাউকে সৎমা অথবা প্রেমিক বিক্রি করে দেয়। অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের বাংলাদেশে যৌনকর্মে বিক্রি করে দেয় তার নিকটতম আত্মীয়রা। আবার এসব মানুষই তাদেরকে নিয়ে উপহাস করে এবং সমাজের বাইরে রাখে। এতে সমাজে যৌনকর্মীদের প্রতি যে মনোভব তার একটা হীনতা প্রকাশ পায়। যৌনকর্মীদের সম্মান দেখাতে অস্বীকৃতি করে যে সমাজ, সেই সমাজের ব্যক্তিরাই এই পেশার সার্ভিস নেয়।
ইউএনএইডসের ২০১৬ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে কমপক্ষে এক লাখ ৪০ হাজার যৌনকর্মী আছেন। তার মধ্যে প্রায় ১৬০০ নারী দৌলতদিয়ায় যৌনকর্মে লিপ্ত। তাদের বেশির ভাগই অপ্রাপ্ত বয়স্ক। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে চোখ বন্ধ করে আছে। এই দৌলতদিয়ায়ই জন্ম নেয় অনেক যুবতী। তাদেরকে পরিবারের সদস্যরা যৌনকর্মী হিসেবেই বড় করে তোলে। বাকিদেরকে পাচার করে নেয়া হয় এবং তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে পতিতালয়ের মালিক ‘ম্যাডাম’। যখন অল্প বয়সীদের অপহরণ করা হয় তাদের বেশির ভাগকেই যৌন বাণিজ্যে পাচার করা হয়। এসব বিপন্ন শিশুদের সহায়তা করার পরিবর্তে লোকজন তাদেরকে দেখে লজ্জাহীন হিসেবে। আর এর মধ্য দিয়ে তাদেরকে বিপথগামী হতে অনুমোদন দেয়া হয়।
পতিতাপল্লীতে অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের চাহিদা বেশি। তাদের মূল্যও বেশি। কারণ তারা বেশি ইয়াং থাকে এবং কুমারী থাকে। এসব বালিকার অবমাননা সত্ত্বেও তারা কতটা খাঁটি তার মূল্যায়ন করার চেষ্টা করে তারা। অধিক যুবতী যৌনকর্মীদের কাছ থেকেই দেহসঙ্গ ভোগ করতেই পছন্দ করেন খদ্দেররা বেশি। অর্থাৎ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যৌনকর্মীদের চাহিদা কমতে থাকে। তাদের খদ্দের কমতে থাকে। এর ফলে তাদের আয়ও কমে যেতে থাকে। দৌলতদিয়া পতিতালয়ের পতিতারা ভাড়া পরিশোধ করেন। নানা রকম বিল পরিশোধ করেন। এ ছাড়া আরো কিছু খরচপাতি আছে। এসব খরচ কাটিয়ে তাদেরকে জীবনধারণ করতে হয়। সন্তানদের লালন পালন করা হয়। যখনই বয়স বেড়ে যাওয়া পতিতাদের খদ্দের কমতে থাকে, এর প্রভাব পড়ে তাদের জীবন ধারণের ওপর।
এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশে রয়েছে বাল্য বিয়ের সর্বোচ্চ হার। এসব বালিকার বেশির ভাগের বয়স ১৫ বছরের কম। কিন্তু পতিতাপল্লীতে নিয়োজিত এসব অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালিকার বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এর ফলে শিশুদের দিকে কুদৃষ্টি নিয়ে যৌনচক্রের অসাধু ব্যক্তিরা সুবিধা পাচ্ছে। তারা ১০ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের প্রতি হাত বাড়ায়।
যৌনকর্মীদের কলঙ্কা তাদের সন্তানদের ওপরও প্রভাব ফেলে। যখন তাদের কেউ সন্তান সম্ভাবা হন তখন তিনি মনে করেন, তার একটি মেয়ে হলে তাকে যৌনকর্মী বানানো যাবে। এতে বাড়তি অর্থ আসবে। তাই দৌলতদিয়ায় একটি কন্যাশিশু জন্মগ্রহণ করলেই তার ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই কন্যা শিশুদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান তার পিতা। দক্ষিণ এশিয়ায় এ জন্য মেয়ে সন্তানের চাহিদা সংসারে কম। দেখা গেছে, একটি বালিকা ১২ বছর বয়সেই যৌনকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করে। সমাজ তাকে অন্যভাবে দেখতে শুরু করে। এসব কথা একজন অল্প বয়সী যৌনকর্মীর ভাইয়ের ।
যৌনকর্মীদের শিক্ষার ক্ষেত্রে রয়েছে বিধিনিষেধ। যৌনকর্মীদের সন্তানরা যে স্কুলে যায় সেই একই স্কুলে দৌলতদিয়া এলাকার পিতামাতারা তাদের সন্তানদের পাঠান না। ১৯৯৭ সালে সেভ দ্য চিলড্রেন একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছে। দৌলতদিয়া পতিতালয়ে জন্মগ্রহণ করেছে এমন শিশুদের জন্য মুলত এই স্কুল। এই স্কুলে পড়াশোনা ও উন্নত জীবনের সুযোগ এনে দেয়। কম বয়সী মেয়ে ও ছেলেরা এখন আর যৌনজীবনে বাধ্য নয়। এই স্কুলের মাধ্যমে তাদেরকে যৌনজীবন এবং মাদক থেকে দূরে রাখা গেছে। তা সত্ত্বেও এসব ছেলেমেয়ের বিরুদ্ধে বৈষম্য বন্ধ করা যায় নি। তাদেরকে নিয়ে উপহাস করা হয়। তারা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। তাদেরকে পতিতার সন্তান এমন বাক্য শুনতে হয়। এর ফলে ওইসব শিশু মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এ জন্য সেখানে দৌলতদিয়ার অবসরপ্রাপ্ত যৌনকর্মীদের নিয়োগ দিয়েছে এই স্কুল। তারা যৌনকর্মীদের এই পেশা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ করে দিচ্ছেন।



ডায়াবেটিসের ঝুঁকি সম্পর্কে যেসব জানা জরুরি

অল্প বয়সেই টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিস হতে পারে
বহুমূত্র রোগ, মধুমেহ বা ডায়াবেটিস মেলিটাস।
লাস্ট আপডেট- ১৩ নভেম্বর ২০১৮: ডায়াবেটিস এমন একটি শারীরিক অবস্থা যা সারা জীবনের জন্যে বয়ে বেড়াতে হয় এবং সারা বিশ্বে এর কারণে প্রতি বছর ১০ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।
এছাড়া যে কোন ব্যক্তিই এই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন।
শরীর যখন রক্তের সব চিনিকে (গ্লুকোজ) ভাঙতে ব্যর্থ হয়, তখনই ডায়াবেটিস হয়। এই জটিলতার কারণে মানুষের হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক হতে পারে।
এছাড়াও ডায়াবেটিসের কারণে মানুষ অন্ধ হয়ে যেতে পারে, নষ্ট হয়ে যেতে পারে কিডনি এবং অনেক সময় শরীরের নিম্নাঙ্গ কেটেও ফেলতে হতে পারে।
সারা বিশ্বেই এই সমস্যা বেড়ে চলেছে। বর্তমানে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৪২ কোটিরও বেশি। ৩০ বছর আগের তুলনায় এই সংখ্যা এখন চার গুণ বেশি- এই হিসাব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার।
চিকিৎকরা বলছেন, ডায়াবেটিসের এতো ঝুঁকি থাকার পরেও যতো মানুষ এই রোগে আক্রান্ত তাদের অর্ধেকেরও বেশি এই রোগটি সম্পর্কে সচেতন নয়।
তবে জীবন যাপনের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম নীতি মেনে চললে অনেক ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসকে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এখানে তার কিছু উপায় তুলে ধরা হলো।

ডায়াবেটিস কেন হয়?

আমরা যখন কোন খাবার খাই তখন আমাদের শরীর সেই খাদ্যের শর্করাকে ভেঙে চিনিতে (গ্লুকোজ) রুপান্তরিত করে। অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নামের যে হরমোন নিসৃত হয়, সেটা আমাদের শরীরের কোষগুলোকে নির্দেশ দেয় চিনিকে গ্রহণ করার জন্যে। এই চিনি কাজ করে শরীরের জ্বালানী বা শক্তি হিসেবে।
শরীরে যখন ইনসুলিন তৈরি হতে না পারে অথবা এটা ঠিক মতো কাজ না করে তখনই ডায়াবেটিস হয়। এবং এর ফলে রক্তের মধ্যে চিনি জমা হতে শুরু করে।

কি কি ধরনের ডায়াবেটিস আছে?

ডায়াবেটিস বিভিন্ন ধরনের।
টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিসে অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। তখন রক্তের প্রবাহে গ্লুকোজ জমা হতে শুরু করে।
বিজ্ঞানীরা এখনও বের করতে পারেন নি কী কারণে এরকমটা হয়। তবে তারা বিশ্বাস করেন যে এর পেছনে জিনগত কারণ থাকতে পারে। অথবা অগ্ন্যাশয়ে ভাইরাসজনিত সংক্রমণের কারণে ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলো নষ্ট হয়ে গেলেও এমন হতে পারে।
যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের ১০ শতাংশ এই টাইপ ওয়ানে আক্রান্ত।
অন্যটি টাইপ টু ডায়াবেটিস। এই ধরনের ডায়াবেটিসে যারা আক্রান্ত তাদের অগ্ন্যাশয়ে যথেষ্ট ইনসুলিন উৎপন্ন হয় না অথবা এই হরমোনটি ঠিক মতো কাজ করে না।
সাধারণত মধ্যবয়সী বা বৃদ্ধ ব্যক্তিরা টাইপ টু ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। বয়স কম হওয়া সত্ত্বেও যাদের ওজন বেশি এবং যাদেরকে বেশিরভাগ সময় বসে বসে কাজ করতে হয় তাদেরও এই ধরনের ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
বিশেষ কিছু এলাকার লোকেরাও এই ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে আছে। তার মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়া।
সন্তানসম্ভবা হলে পরেও অনেক নারীর ডায়াবেটিস হতে পারে। তাদের দেহ থেকে যখন নিজের এবং সন্তানের জন্যে প্রয়োজনীয় ইনসুলিন যথেষ্ট পরিমানে তৈরি হতে না পারে, তখনই তাদের ডায়াবেটিস হতে পারে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে ৬ থেকে ১৬ শতাংশ গর্ভবতী নারীর ডায়াবেটিস হতে পারে। ডায়েট, শরীর চর্চ্চা অথবা ইনসুলিন নেওয়ার মাধ্যমে তাদের শরীরে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা গেলে তাদের টাইপ টু ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।

ডায়াবেটিসের উপসর্গ কী

সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে:
  • খুব তৃষ্ণা পাওয়া
  • স্বাভাবিকের চাইতেও ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া। বিশেষ করে রাতের বেলায়।
  • ক্লান্ত বোধ করা
  • কোন কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
  • প্রদাহজনিত রোগে বারবার আক্রান্ত হওয়া
  • দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া
  • শরীরের কোথাও কেটে গেলে সেটা শুকাতে দেরি হওয়া
চিকিৎসকরা বলছেন, টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিসের লক্ষণ শৈশব থেকেই দেখা দিতে পারে এবং বয়স বাড়ার সাথে সেটা আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বয়স ৪০ বছরের বেশি হওয়ার পর থেকে টাইপ টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে দক্ষিণ এশিয়ার লোকজনের মধ্যে এই ঝুঁকি তৈরি হয় তাদের ২৫ বছর বয়স হওয়ার পর থেকেই।
যাদের পিতামাতা, ভাই বোনের ডায়াবেটিস আছে, অথবা যাদের অতিরিক্ত ওজন, দক্ষিণ এশিয়ার কোন দেশের মানুষ, আফ্রো-ক্যারিবিয়ান অথবা কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান তাদেরও এই ঝুঁকি বেশি থাকে।

ডায়াবেটিস কি প্রতিরোধ করা সম্ভব?

ডায়াবেটিস যদিও জেনেটিক এবং আপনার জীবন যাপনের স্টাইলের ওপর নির্ভরশীল তারপরেও আপনি চেষ্টা করলে রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে পারেন।
সেজন্যে আপনাকে খাবার গ্রহণের বিষয়ে বিশেষভাবে সচেতন থাকতে হবে এবং আপনাকে হতে হবে অত্যন্ত সক্রিয় একজন মানুষ।
প্রক্রিয়াজাত খাবার ও পানীয় এড়িয়ে চলতে হবে। মৃসন শাদা আটার রুটির পরিবর্তে খেতে হবে ভুষিওয়ালা আটার রুটি। এটাই প্রথম ধাপ।
এড়িয়ে চলতে হবে হোয়াইট পাস্তা, প্যাস্ট্রি, ফিজি ড্রিংকস, চিনি জাতীয় পানীয়, মিষ্টি ইত্যাদি।
আর স্বাস্থ্যকর খাবারের মধ্যে রয়েছে শাক সব্জি, ফল, বিন্স এবং মোটা দানার খাদ্য শস্য।
স্বাস্থ্যকর তেল, বাদাম খাওয়াও ভালো। ওমেগা থ্রি তেল আছে যেসব মাছে সেগুলো বেশি খেতে হবে। যেমন সারডিন, স্যামন এবং ম্যাকেরেল।
এক বেলা পেট ভরে না খেয়ে পরিমানে অল্প অল্প করে বিরতি দিয়ে খাওয়া দরকার।
শরীর চর্চ্চা বা ব্যায়াম করার মাধ্যমে রক্তে চিনির মাত্রা কমিয়ে রখা সম্ভব।
চিকিৎসকরা বলছেন, প্রতি সপ্তাহে আড়াই ঘণ্টার মতো ব্যায়াম করা দরকার। তার মধ্যে দ্রুত হাঁটা এবং সিড়ি বেয়ে ওপরে ওঠাও রয়েছে।
ওজন কম রাখলেও চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। যদি ওজন কমাতে হয় তাহলে সেটা ধীরে ধীরে করতে হবে। সপ্তাহে আধা কেজি থেকে এক কেজি পর্যন্ত।
ধূমপান পরিহার করাও জরুরী। নজর রাখতে হবে কোলস্টেরলের মাত্রার ওপর। এর মাত্রা বেশি হলে হৃদ রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ডায়াবেটিসের কারণে কী ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে?

রক্তে চিনির পরিমাণ বেশি হলে রক্তনালীর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
শরীরে যদি রক্ত ঠিক মতো প্রবাহিত হতে না পারে, যেসব জায়গায় রক্তের প্রয়োজন সেখানে যদি এই রক্ত পৌঁছাতে না পারে, তখন স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
এর ফলে মানুষ দৃষ্টি শক্তি হারাতে পারে। ইনফেকশন হতে পারে পায়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অন্ধত্ব, কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়া, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ইত্যাদির পেছনে একটি বড় কারণ ডায়াবেটিস।

কতো মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে ১৯৮০ সালে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১১ কোটি। ২০১৪ সালে সেটা বেড়ে হয় ৪২ কোটিরও বেশি।
১৯৮০ সালে ১৮ বছরের বেশি বয়সী মানুষের ডায়াবেটিস হওয়ার হার ছিল ৫ শতাংশেরও কম কিন্তু ২০১৪ সালের তাদের সংখ্যা বেড়ে দা*ড়িযেছে ৮ দশকি ৫ শতাংশ।
ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশন বলছে, প্রাপ্ত বয়স্ক যেসব মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশের, যেখানে খুব দ্রুত খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ঘটছে।
সংস্থাটি বলছে, ২০১৬ সালে ডায়াবেটিসের কারণে প্রায় ১৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

Wednesday, November 11, 2020

ইতিহাসের সাক্ষী: ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যুর আসল কারণ কী ছিল?

ইয়াসির আরাফাত
২০০৪ সালে এক আকস্মিক অসুস্থতার পর প্যারিসের একটি হাসপাতালে মারা গিয়েছিলেন ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত। তার বয়েস হয়েছিল ৭৫।
এর আগে তিনি অবরুদ্ধ ছিলেন ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের শহর রামাল্লায় - তার প্রধান কার্যালয়ে। ২৫ অক্টোবর মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার ক'দিন পর তাকে বিমানে করে প্যারিসের কাছে একটি সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় ।
সেখানে ১৩ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১১ নভেম্বর ভোরবেলা মারা যান ইয়াসির আরাফাত। মৃত্যুর আগে ৮ দিন সংজ্ঞাহীন ছিলেন তিনি।
ইয়াসির আরাফাত ১৯৭৪ সালে
"তার দেহে এমন কোন পরীক্ষা বাকি ছিল না যা ফরাসী ডাক্তাররা করান নি। কিন্তু কোন সংক্রমণের চিহ্ন পাওয়া যায় নি। ডাক্তাররা বলছিলেন, মনে হচ্ছে যেন তার দেহে বাইরে থেকে কিছু একটা 'অনুপ্রবেশ' করেছে কিন্তু তা যে কি এবং কোথায় তা ডাক্তাররা বের করতে পারেন নি" - এ কথা বলেছেন আরাফাতের শেষ দিনগুলোর সাক্ষী লায়লা শাহিদ ।
সংশয় কাটাতে ৯ বছর পর তার দেহাবশেষ কবর থেকে তুলে সুইৎজারল্যান্ডে পরীক্ষা করানো হয়। তখন তাতে তেজষ্ক্রিয় পোলোনিয়ামের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, কিন্তু বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেন নি।
তাহলে কেন এবং কিভাবে মৃত্যু হয়েছিল ইয়াসির আরাফাতের?
আরাফাতের জীবনের শেষ দিনগুলোয় যে অল্প কয়েকজন ফিলিস্তিনি তার পাশে ছিলেন - তাদের একজন হলেন লায়লা শাহিদ। ১৯৬০-এর দশক থেকেই ইয়াসির আরাফাতকে চিনতেন তিনি। লায়লা শাহিদের সাথে কথা বলেছেন বিবিসির লুইস হিদালগো।
রামাল্লায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের দফতরে নিজের অফিস কক্ষে ইয়াসির আরাফাত
"আমি তখন ছিলাম ফ্রান্সে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত। তাকে প্যারিসে নিয়ে আসার সপ্তাহখানেক আগে আমি একটা ফোন পেলাম। ফোনটা করেছিলেন ফিলিস্তিনি প্রধানমন্ত্রী। তিনি বললেন, যে ডাক্তাররা ইয়াসির আরাফাতকে দেখছেন, তাদের সবা্রই মত হলো যে এটা কোন সাধারণ অন্ত্রের সংক্রমণ নয় এবং তার অবস্থা খুবই সংকটজনক। তাকে এখন হাসপাতালে পাঠানো খুবই প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে" - বলছিলেন লায়লা শাহিদ।
কিন্তু আরাফাত হাসপাতালে যেতে চাইছিলেন না।
"তিনি চিন্তিত ছিলেন যে ইসরায়েলের সাথে ফিলিস্তিনিদের সম্পর্ক এত খারাপ হয়ে পড়েছে যে তিনি যদি একবার পশ্চিম তীর ছেড়ে যান তাহলে তাকে আর ফিরতে দেয়া হবে না। ফ্রান্স কি এক্ষেত্রে কোনভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারবে?"
"প্রধানমন্ত্রী আমাকে বললেন যে ফরাসী প্রেসিডেন্ট শিরাককে আরাফাত খুবই পছন্দ করেন। তাই তাকে আপনি একবার জিজ্ঞেস করে দেখুন যে ফ্রান্সে আরাফাতের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায় কিনা। আমি বললাম, আমি চেষ্টা করবো। প্রেসিডেন্ট শিরাককে বলতেই তিনি বললেন, অবশ্যই আমরা এটা করবো।"
"আরাফাতও তখন নিশ্চিন্ত হলেন যে প্রেসিডেন্ট শিরাকের মধ্যস্থতায় তার চিকিৎসাও হবে এবং তিনি ফিলিস্তিনে ফিরে আসতে পারবেন এ গ্যারান্টিও মিলবে। আরাফাত কখনো ভাবেন নি যে তিনি মারা যাবেন।"
লায়লা শাহিদ যখন লেবাননে ছাত্রী তখন তার সাথে পরিচয় হয়েছিল ইয়াসির আরাফাতের। তখন ফিলিস্তিনিদের সশস্ত্র সংগ্রামের একজন নেতা হিসেবে আরাফাত সবে মাত্র পরিচিত হয়ে উঠছেন। তখন তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বেশ কিছু আক্রমণ সংগঠিত করেছেন।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাতের প্রথম মন্ত্রিসভা
"সে সময় পিএলও ছিল একটা ছোট সংগঠন। তাই আমাদের সবার সাথেই এর নেতাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তা ছাড়া আমাকে বলতেই হবে যে আরাফাত সবসময়ই উৎসাহ দিতেন যেন ফিলিস্তিনি মেয়েরা আরো বেশি করে আন্দোলনে জড়িত হয়। আমি যে এই আন্দোলনের সাথে লেগে ছিলাম এবং পরে প্রথম মহিলা রাষ্ট্রদূত হয়েছিলাম - তার এক বড় কারণ ছিল এটাই। তা ছাড়াও আমরা ছিলাম পরস্পরের খুবই ভালো বন্ধু।"
ইয়াসির আরাফাত যখন মারা যান তখন তিনি পরিণত হয়েছেন এক আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বে। তার ভক্ত এবং নিন্দুকেরও কোন অভাব ছিল না।
তার সমর্থকদের চোখে আরাফাত ছিলেন ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদের পিতা। অন্যদিকে বহু ইসরায়েলির চোখে তিনি ছিলেন একজন সন্ত্রাসবাদী যিনি আসলে কখনো বদলান নি। তাদের চোখে তিনি ছিলেন কয়েক দশক ধরে চালানো বহু আক্রমণের জন্য দায়ী - বিশেষ করে আত্মঘাতী আক্রমণের জন্য যাতে শত শত ইসরায়েলির মৃত্যু হয়েছিল।
অসলো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পর সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল - তা উবে গিয়ে নব্বইয়ের দশকের শেষ বছরগুলোয় আরো সহিংসতা এবং বৈরিতার সৃষ্টি হয়েছিল।
জীবনের শেষ দুটি বছর ইয়াসির আরাফাতকে রামাল্লায় তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখে ইসরায়েল। এটি পরিণত হয়েছিল কার্যত এক কারাগারে - যার সাথে বাইরের দুনিয়ার সংযোগ ছিল বিচ্ছিন্ন।
শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী র‍্যাবিনের সাথে আরাফাত
ওই অবস্থাতেও সত্তরোর্ধ বয়েসের আরাফাত তার স্বাস্থ্য ঠিক রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন, বলছিলেন লায়লা শহিদ।
"তিনি বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন। তিনি কখনো কফি খেতেন না, এ্যালকোহল তো নয়ই। সন্ধ্যেবেলা বেশি খাওয়া দাওয়া করতেন না। শুধু চা খেতেন মধু দিয়ে, আর একটুখানি পনির। স্বাস্থ্যের ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুবই যত্নশীল।"
"তিনি এতটাই স্বাস্থ্য সচেতন ছিলেন যে তার দফতরে বন্দী অবস্থায় আমি যখন প্রায়ই তার কাছ থেকে নির্দেশনা নিতে যেতাম - তখন তিনি বলতেন, 'লায়লা কিছু মনে করো না, আমরা কি বসে বসে এই মিটিং করার পরিবর্তে এই টেবিলটার চারদিকে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলতে পারি? দেখছো তো যে আমি এই অফিস থেকে বেরোতে পারি না, কিন্তু আমার যে বয়স তাতে হাঁটাচলা করা খুবই প্রয়োজন।' ফলে আমরা ৪৫ মিনিট ধরে ওই ঘরটার মধ্যেই হাঁটতাম। টেবিলটার চারদিকে হাঁটতে হাঁটতেই আমরা কথা বলতাম, আমাদের যে আলোচনা তা সেরে নিতাম।"
লায়লা শাহিদ খুব কাছে দেখেছেন - কি ভাবে ওই সংকীর্ণ দফতরের মধ্যে অবরুদ্ধ অবস্থায় ইয়াসির আরাফাত দীর্ঘ দিন কাটিয়েছেন।
তিনি বলছিলেন, যখন তিনি জানতে পারলেন যে আরাফাতকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিতে হবে, তখন তিনি অবাক হননি। বরং তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন অন্য একটি বিষয়ে।
"আমি যখন তাদের কাছে জানতে চাইলাম যে প্যারিস থেকে যে বিমান তাকে আনতে যাবে তাতে কি ধরণের চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকতে হবে - তখন আমাকে বলা হলো - রক্তের সমস্যার জন্য দরকার হয় এমন সব চিকিৎসা সামগ্রী লাগবে। আমরা জানলাম যে তার দেহে রক্তের কোন একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে।"
কয়েকদিন পর যখন প্যারিসের কাছে সামরিক বিমানবন্দরে ইয়াসির আরাফাতের সাথে লায়লা শাহিদের দেখা হলো - তখন আরো একটা ব্যাপার তাকে বিস্মিত করলো।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবার সময় ইয়াসির আরাফাত
"আমি যা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম - তা হলো, তার গায়ের চামড়ায় ফোস্কা পড়েছে - যেমনটা রোদে পুড়ে গেলে হয়। আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, 'আবু আম্মার, আপনি খালি গায়ে রোদে বসে ছিলেন কেন?' তিনি বললেন, 'কি বলছো লায়লা! আমি দু বছর ধরে আমার অফিসে বন্দী, রোদ কোথায় পাবো?' তখন আমি একটু অপ্রস্তুত হলাম। ভাবলাম হয়তো তিনিই তার চামড়ার সমস্যাটা ঠিক বুঝতে পারেন নি। হাসপাতালে যাবার পর আমি ডাক্তারকে বললাম, তার এই যে ত্বকের সমস্যাটা দেখছি এটা তো তিন মাস আগে ছিল না।"
রামাল্লায় সেটাই ছিল তাদের শেষ সাক্ষাৎ। কিন্তু প্যারিসের হাসপাতালে আরাফাত বেশ উৎফুল্লই ছিলেন।
লায়লা শাহিদ বলছিলেন, "তিনি হাসিখুশি ছিলেন সবার সাথে ঠাট্টা-তামাশা করছিলেন। তাকে নিয়ে যেসব খবর বেরিয়েছিল তার বেশিরভাগই ভুল। তাকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে নেয়া হয় নি, ডাক্তাররা তাকে রেখেছিলেন সাধারণ ইউনিটে, কারণ তার সেরকম কিছুর দরকারই ছিল না। তার যে রক্তের সমস্যা ছিল - তা নিয়ে ডাক্তাররা ভেবেছিলেন যে তাকে ডায়ালাইসিস করাতে হবে।"
কিন্তু আরাফাতের তো পেটের সমস্যাও ছিল। সেটার ব্যাপারে দিনি নিজে কি বলছিলেন?
"তিনি বলছিলেন, যে তিনি পেটে কিছু রাখতে পারছেন না। ভীষণ ডায়রিয়া, দেহে পানিশূন্যতা, কিছু খেতে পারছেন না।"
বাঁ থেকে লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি, পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাত, মিশরের প্রেসিডেন্ট নাসের ও জর্ডনের বাদশাহ হোসেন, ১৯৭০
"ডাক্তার বলছিলেন এক্সরেতে দেখা গেছে যে ইয়াসির আরাফাতের গলা থেকে অন্ত্র পর্যন্ত ভেতরটা মনে হচ্ছে যেন পুড়ে গেছে। মনে হচ্ছিল যেন তিনি এমন কিছু খেয়েছেন যাতে তার পরিপাকতন্ত্রটার ভেতর দিকটা পুড়ে গেছে।"
তার পরেও লায়লা বলছিলেন, হাসপাতালে তার প্রথম পাঁচ দিন পর্যন্ত আরাফাত বেশ ভালোই ছিলেন। তিনি বিছানার ওপর উঠে বসেছিলেন, তিউনিসিয়ায় থাকা তার মেয়ের সাথে কথা বলেছিলেন। বিদেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ফোন ধরছিলেন। এমনকি রামাল্লায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কর্মচারীদের বেতন দেবার ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী সালাম ফায়াদকে নির্দেশনাও দিয়েছিলেন।
"সালাম ফায়াদ আমাকে বলেছিলেন, লায়লা, আমার সাথে কথা বলার সময় আবু আম্মার একাউন্টের যে হিসেব দিচ্ছিলেন তা ছিল একেবারে নির্ভুল। তার মানে তিনি তো মানসিকভাবে পুরোপুরি সচেতন আছেন"।
"আমি বললাম, হ্যাঁ, তার দেহে তো কোন নল লাগানো হয়নি, আশপাশে কোনো অক্সিজেনের যন্ত্রপাতিও নেই। আমি আশা করছি তিনি শিগগীরই সেরে উঠবেন। তিনি নিজে এবং ডাক্তাররাও তাই মনে করেছিলেন।"
কিন্তু তা হয় নি। নভেম্বরের ৩ তারিখ ইয়াসির আরাফাত সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললেন। পুরোপুরি 'কোমা'য় চলে গেলেন, যেখান থেকে তিনি আর ফিরে আসতে পারেন নি।
স্ত্রী সুহা এবং কন্যা জাইওয়ার সাথে আরাফাত
"সেদিন ভোর তিনটের সময় হাসপাতালের লোকেরা আমাকে ঘুম থেকে জাগালো। বললো, দয়া করে হাসপাতালে আসুন, কারণ তার অবস্থা ভালো নয়। তখন তিনি অর্ধ-অচেতন অবস্থায়, তার শরীরটায় কাঁপুনি হচ্ছে। স্টাফরা বললেন, তার একটা স্ক্যান করাতে হবে, এসময় আমরা তার কাছের কেউ একজনকে পাশে রাখতে চাই। বলা হলো পরদিন সকাল ছ'টার সময় ডাক্তাররা এসে স্ক্যানের রিপোর্ট দেখবেন।"
"আমরা অধীরভাবে অপেক্ষা করছিলাম সকালের জন্য। ডাক্তাররা যখন এলেন, তারা রিপোর্ট দেখে বললেন, তারা রিপোর্টে এমন কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না যাকে রোগীর এ অবস্থার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। কোন সংক্রমণ বা ব্যাকটেরিয়া নেই, লিউকেমিয়া, বা এইচআইভি - কিছুই নেই। তারা এর কারণ কি, তার শারীরিক অবস্থার এত অবনতি কেন হলো তা বের করার জন্য তাকে আরো গভীর কোমায় রেখে দিলেন।"
তার মানে, এমন কোন পরীক্ষা বাকি ছিল না যা ফরাসী ডাক্তাররা করান নি।
ইয়াসির আরাফাতের কবরে পুষ্পস্তবক দিচ্ছেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস
"কিছুই বাকি ছিল না। এমনকি কোন বিষক্রিয়া ঘটেছে কিনা তার পরীক্ষা করার জন্য হাসপাতালের বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞও আনা হয়েছিল। একমাত্র সমস্যা দেখা গিয়েছিল তার রক্তের প্লেট কমে গিয়েছিল, কিন্তু তার জন্য তার দু বার ডায়ালিসিস করা হয়েছিল, প্লেট দেয়া হয়েছিল। কিন্তু দু'দিন পর নতুন রক্তেরও একই অবস্থা হলো।"
"ডাক্তাররা বলছিলেন মনে হচ্ছে যেন তার দেহে বাইরে থেকে কিছু একটা অনুপ্রবেশ করেছে কিন্তু তা যে কি এবং কোথায় - আমরা চিহ্নিত করতে পারছি না।"
ইয়াসির আরাফাত ২০০৪ সালের নভেম্বরের ১১ তারিখে ভোরবেলা মারা গেলেন।
"তার দেহের প্রতিটি প্রত্যঙ্গ অকেজো হয়ে যাচ্ছিল - একটার পর একটা। এর কারণ হিসেবে আরাফাতের ডেথ সার্টিফিকেটে যেটা লেখা হয়েছিল তা হলো - নির্ণয় করা যায় নি এমন এক কারণে তার মৃত্যু ঘটেছে।"
"আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম যে এই অনির্ণীত কারণের অর্থ কি?"
ইয়াসির আরাফাত তার জীবদ্দশাতেই পরিণত হয়েছিলেন ফিলিস্তিনি আন্দোলনের প্রতীকে
"ডাক্তাররা বললেন, আমরা তার কোন নির্দিষ্ট রোগ চিহ্নিত করতে করতে পারি নি। এবং এ কারণেই ডাক্তারদের মনে হয়েছিল যে আরাফাতের দেহে 'বাইরে থেকে আসা' কোন কিছুর 'অনুপ্রবেশ' ঘটেছে।"
"বলা যায় নি এটা কি বাইরে থেকে আসা কোন বিষ, বা কোন সংক্রমণ ছিল কিনা।"
ইয়াসির আরাফাতের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কায়রোতে - সেখানে এক রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যানুষ্ঠান হয়, তার পর রামাল্লায় তা সমাহিত করা হয়।
এর নয় বছর পর, ২০১৩ সালে - কবর থেকে তার দেহাবশেষ তোলা হয়, এবং সুইস বিজ্ঞানীদের পরীক্ষায় সেই দেহাবশেষে উচ্চমাত্রার তেজষ্ক্রিয় পদার্থ পোলোনিয়াম পাওয়া যায়।
তবে বিজ্ঞানীরা এটাও বলেছিলেন যে তাদের পরীক্ষার এই ফল পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
তরুণ বয়সে ইয়াসির আরাফাত

Monday, November 9, 2020

আপনার বাড়ির কোন কোন জায়গায় সবচেয়ে বেশি জীবাণু

হাত ধোয়া স্বাস্থ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ
বাড়িঘর পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত রাখতে গিয়ে অনেকেই বেশি নজর দেন সেই জায়গাগুলোর দিকে - যেগুলো দেখতে 'ময়লা' দেখায়। পরিষ্কার করার সময় সেগুলোর ওপরই আগে হাত দেন তারা।
কিন্তু আসলে ব্যাপারটা তা নয়। পরিষ্কার করতে হবে বাড়ির সেই অংশগুলো - যেখান থেকে ক্ষতিকর মাইক্রোব বা অনুজীব ছড়ায় - তা যদি এমনিতে দেখতে 'পরিষ্কার' দেখায় তা হলেও ।
এক জরিপে দেখা গেছে: হাত ধোয়া, কাপড়চোপড় এবং বাড়ির বিভিন্ন অংশ ঠিক সময়ে পরিষ্কার করা - এগুলোই বাড়িতে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ রক্ষার জন্য আসল দরকারি জিনিস।
কিন্তু প্রতি চারজনের একজনই এগুলো গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না।

বাড়িতে স্বাস্থ্যকর পরিবেশন রাখতে কি করা উচিত?

প্রথমে আপনার এই তালিকাটি দেখতে হবে যাতে কোন্‌ কাজগুলোর সময় তা থেকে স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে - তা বলা হয়েছে।
যে চপিং বোর্ডের ওপর মাংস কাটছেন তা পরিষ্কার রাখতে হবে।
১. খাবার রান্না এবং তা হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করা।
২. হাত দিয়ে খাবার খাওয়া।
৩. টয়লেট ব্যবহারের পর।
৪. আপনার আশপাশে কেউ যখন হাঁচি-কাশি দিচ্ছে বা নাক ঝাড়ছে।
৫. ময়লা কাপড়ে হাত দেয়া এবং তা ধোয়া।
৬. পোষাপ্রাণীর যত্ন নেয়া।
৭. ময়লা আবর্জনা হাত দিয়ে ধরা এবং তা ফেলার জন্য নিয়ে যাওয়া।
৮. পরিবারের কারো কোন রোগসংক্রমণ হলে তার যত্ন নেয়া।
বিশেষ করে এর মধ্যে ১, ৩, ৪, ৬ এবং ৮ নম্বরের ক্ষেত্রে পরিষ্কার করে হাত ধোয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
রান্না ঘরের মধ্যে যেখানে আপনি কাঁচা মাংস কাটছেন, মোছামুছির জন্য যে কাপড় বা স্ক্রাবার ব্যবহার করছেন - তার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক সময় ঘরের মেঝে বা আসবাবপত্র ময়লা দেখায় - কিন্তু এগুলোতে যে মাইক্রোব বা অণুজীব থাকে তা তেমন কোন স্বাস্থ্য-ঝুঁকির কারণ নয়।

কী ভাবে ব্যাকটেরিয়া দূর করবেন?

জিনিসপত্র কাটাকুটির বোর্ড বা থালা-বাটি ধোয়ার জন্য ব্যবহার করুন সাবান-মেশানো হাত-সওয়া গরম পানি।
তবে ব্যাকটেরিয়া স্থায়ীভাবে মারতে হলে আপনাকে ব্যবহার করতে হবে ৭০ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের বেশি গরম পানি, এবং তা বেশ খানিকটা সময় ধরে ব্যবহার করতে হবে।

পরিষ্কার করার জন্য কি ধরণের সাবান-জাতীয় পদার্থ ব্যবহার করবেন?

এগুলো হয় তিন ধরণের। একটা হলো ডিটারজেন্ট, যা সাবান-জাতীয়। এটা পরিষ্কার করে, তেলজাতীয় ময়লা দূর করে কিন্তু ব্যাকটেরিয়া নিধন করতে পারে না।
পোষা প্রাণীর যতন নেবার সময় ব্যাকটেরিয়া ছড়ানোর ঝুঁকি অনেক বেশি
আরেকটা হচ্ছে ডিসইনফেকট্যান্ট - যা ব্যাকটেরিয়া মারতে পারে কিন্তু তৈলাক্ত জায়গা্য় এটা ভালো কাজ করে না।
অন্যটি হলো স্যানিটাইজার - এগুলো একই সাথে পরিষ্কার করে এবং জীবাণু নাশ করে।
তাই এ জাতীয় প্রোডাক্ট কেনার সময় ভালো করে জেনে নেবেন কী কিনছেন, প্যাকেটের তথ্যগুলো পড়ে নেবেন।

'পরিষ্কার' আর 'স্বাস্থ্যসম্মত' - দুটো যে আলাদা জিনিস তা অনেকেই বোঝেন না

ব্রিটেনের রয়াল সোসাইটি ফর পাবলিক হেলথ বা আরএসপিএইচ বলছে, ময়লা, জীবাণু, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, এবং স্বাস্থ্য - এই শব্দগুলোর অর্থের যে পার্থক্য আছে তা অনেক লোকই ঠিকমত বোঝেন না।
দুই হাজার লোকের ওপর চালানো এক জরিপের রিপোর্টে বলা হয়, ২৩ শতাংশ লোক মনে করেন যে বাচ্চাদের ক্ষতিকর জীবাণুর সংস্পর্শে আসা দরকার, কারণ তা হলে তাদের রোগ-প্রতিরোধী ক্ষমতা জোরালো হবে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা একটা ক্ষতিকর ধারণা - কারণ এতে শিশুদের দেহে বিপজ্জনক সব সংক্রমণ ঘটে যেতে পারে।
তাদের কথা ঘর, টয়লেট, রান্নাঘর - এগুলো শুধু পরিষ্কার নয়, বরং স্বাস্থ্যসম্মত রাখাটাই সংক্রমণ ঠেকানোর কার্যকর উপায়।
টয়লেট, রান্নাঘর - এগুলো শুস্বাস্থ্যসম্মত রাখাটাই সংক্রমণ ঠেকানোর কার্যকর উপায়