Tuesday, February 11, 2020

ও পৃথিবী, এবার এসে বাংলাদেশ নাও চিনে

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মায়াবী সুখের ছবি ছকে বাঁধা দৈনন্দিন জীবনে জুড়িয়ে দিতে পারে মনপ্রাণ। অরণ্যে কিংবা সমুদ্রবিলাসে ডুবে থাকতে ভালো লাগে সবারই। প্রাচীন যুগের ইতিহাস, শিল্প-সংস্কৃতি, সাহিত্য ও প্রথার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ঐতিহাসিক স্থান দেখার জন্য পর্যটকরা ঘুরে বেড়ান।
বাংলাদেশের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য, বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি, দৃষ্টিনন্দন জীবনাচার মন কাড়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, বৈচিত্র্যময় প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শন, ঐতিহাসিক মসজিদ-মিনার, নদী, পাহাড়, অরণ্যসহ হাজারও সুন্দরের রেশ ছড়িয়ে আছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার আনাচে-কানাচে। পণ্য, খাবার, পর্যটন আকর্ষণ কিংবা সাংস্কৃতিক বা লোকজ ঐতিহ্যে বাংলাদেশের জেলাগুলো স্বতন্ত্রমণ্ডিত। সবুজের বুকে রক্তিম এই দেশের সবটুকুই ছড়িয়ে থাকা রূপবতী প্রকৃতি।
সমুদ্রসৈকত
সাগরের জলরাশি আর বালুময় সৈকতে গেলেই মন ভালো হয়ে যায় সবার! তাই ভ্রমণপ্রেমীদের সবসময় কাছে টানে সাগরপাড়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশে অতুলনীয় সমুদ্রতট আছে। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার আমাদেরই। অন্য সৈকতগুলো হলো পতেঙ্গা, পারকী, টেকনাফ, সেন্টমার্টিন, কুয়াকাটা, কটকা ও সিলেটের তারুয়া।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ধর্মীয় স্থাপনা
পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, মহাস্থানগড়, ময়নামতি, সোনারগাঁও পানাম সিটি, উয়ারি-বটেশ্বর, লালবাগ কেল্লা, ভিটাগড়, বড় কাটরা, ছোট কাটরা, জগদ্দলা মহাবিহার, নোয়াপাড়া-ঈশানচন্দ্রনগর, আহসান মঞ্জিল। ধর্মীয় স্থাপনার মধ্যে ধানমন্ডিতে মোগল ঈদগাহ, ষাটগম্বুজ মসজিদ, বাঘা মসজিদ, কান্তজির মন্দির, বুদ্ধ ধাতু জাদি, আর্মেনিয়ান গির্জা অন্যতম।
পাহাড় ও দ্বীপ
পার্বত্য জেলার তালিকায় আছে হ্রদ জেলা রাঙামাটি, হ্রদ শহর কাপ্তাই, বান্দরবান, পাহাড়ি শহর খাগড়াছড়ি, সৌন্দর্যের রানি সাজেক। দ্বীপগুলো হলো- সেন্টমার্টিন প্রবাল দ্বীপ, মহেশখালী, ছেঁড়া দ্বীপ, ভোলা, মজু চৌধুরীরহাট পর্যটন কেন্দ্র, হাতিয়া, কুতুবদিয়া, মনপুরা, নিঝুম দ্বীপ, সন্দ্বীপ, সোনাদিয়া দ্বীপ, নাফ নদীর মোহনায় জালিয়ার দ্বীপ।
ঐতিহাসিক স্থান
জাতির পিতার সমাধিসৌধ, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, জাতীয় কবির সমাধিসৌধ, কার্জন হল, নর্থব্রুব হল, বলধা গার্ডেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, পুরাতন হাইকোর্ট ভবন, বাহাদুর শাহ পার্ক, দীঘাপতিয়া রাজবাড়ি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কবরস্থান, শিলাইদহ কুঠিবাড়ি, সাগরদাড়ি, মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ, ত্রিশাল, গান্ধী আশ্রম।
বন ও জলাভূমি
ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, ভাওয়াল, লাউয়াছড়া বন, রাতারগুল জলাবন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমির মধ্যে আরও আছে সিলেটের জাফলং, লালাখাল ও বিছনাকান্দি।
অন্যান্য আকর্ষণ
জাতীয় সংসদ ভবন, বঙ্গভবন, শাঁখারীবাজার, সদরঘাট, রমনা পার্ক, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান, জাতীয় চিড়িয়াখানা, জাতীয় উদ্যান, বাটালি পাহাড়, যমুনা সেতুসহ বাগান, জাদুঘর, প্রাসাদ, উদ্যান, নদী। জলপ্রপাত তিনটি হলো সিলেটের হাম হাম ও মাধবকুণ্ড আর বান্দরবানের থাঞ্চি উপজেলার নাফা-খুম। এছাড়া পর্যটকদের মন কাড়ে এমন অনেক মনোরম জায়গা আছে দেশজুড়ে প্রতিটি জেলায়। এসব নিয়ে গর্ব করে গানের মতো বলা যায়, ‘ও পৃথিবী এবার এসে বাংলাদেশ নাও চিনে।’

শ্যাম শরনের দৃষ্টিতে বিশ্ব এবং তাতে ভারতের স্থান by স্বপ্ন কনা নাইডু

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্মৃতিকথা লিখছেন। এগুলো যেমন তাদের সময়ের অসাধারণ রাজনৈতিক ভাষ্য, একইভাবে এগুলোর বিশেষ সাহিত্যিক মূল্যও রয়েছে। এই দিক থেকে রাষ্ট্রদূত শ্যাম শরন তার সময়কে ধরে রেখেছেন। গোপনীয়তার আবরণে মোড়া পেশাগত জীবনে কী বললেন, আর কী বললেন না, উভয়টারই বিপুল তাৎপর্য রয়েছে। এ ধরনের স্মৃতিকথা তাই কিছুটা বিতর্ক সৃষ্টি করবেই। আবার অনেক না-জানা কাহিনীর প্রকাশ ঘটাবে। অবশ্য ভারত কোন দৃষ্টিতে বিশ্বকে দেখে তা ব্যক্তিগত জীবনের সাথে পুরোপুরি সম্পর্কহীন। এ কারণে বইটি প্রকাশের পরও শরন নিজে অজানা থেকে গেছেন।
সম্প্রতি ইংলিশ হিস্টরিক্যাল জার্নালে ভ্রমণ কাহিনী লেখার দক্ষতা নেই এমন কূটনীতিকদের ভ্রমণকাহিনী লেখা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু শ্যাম শরনের বইটি ওই সমালোচনা উড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে শরনের চীনা সংস্কৃতি সম্পর্কে ব্যাখ্যা সত্যিকারের প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার। এতে চীনা শিনজিয়াংয়ের কাশগরে ভারতীয় মুদ্রা নিয়ে গল্প রয়েছে, তার চিনি বাগ সফরের কথা আছে। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো ম্যান্ডারিন শিক্ষকের সাথে তার আলাপচারিতা। এখানে সময় সম্পর্কে চীনা ধারণা প্রচলিত মতকে উল্টে দেয়। তাতে দেখা যায়, অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, ভবিষ্যতকে দেখতে পাই না বলে, সেটি আছে পেছনে।
শরন নানা গুরুভার বহন করেছেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ভারতের আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করা। তিনি অনেক দিন ধরেই চাপে থাকার ধারণাটি বাদ দিয়ে আমরা আরো ভালো করতে পারি- ধারণাটি গ্রহণের কথা বলে আসছিলেন। বিষয়টি তিনি বেশ ভালোভাবেই তুলে ধরতে পেরেছেন। এই দিক থেকে বইটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
তবে এই বইটির প্রকৃত মূল্য সম্ভবত নিহিত রয়েছে এর মূল প্রতিবাদ্যকে ধারণা করা বিষয়ে। তিনি ঋগবেদ, কৌটিল্য, তুকিডিদেস, ওটো ভন বিসমার্ক, জন স্ট্রেসি, ওয়াল্টার রাসেল মিড, হেনরি কিসিঞ্জার ও অমর্ত্য সেনের মতো বিভিন্ন উৎসের ওপর আলোকপাত করেছেন। তিন ধারার রচনাকে এক ঐতিহ্যের অংশের মতো করে তুলে ধরেছেন। তিনি তার বইয়ের মাধ্যমে প্রাচীন ভারতের কূটনৈতিক তত্ত্বকে ২০ শতকের পাশ্চাত্য ঘরানার বিশ্ব রাজনীতির সাথে সম্পর্কযুক্ত করেছেন।
এই বইয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কূটনৈতিক তত্ত্বের ওপরও আলোকপাত করেছে। লেখক বলেছেন, কূটনীতির ধারণাটি কেবল রাজনীতির হাতিয়ারই নয়, বরং এটি রাজনীতির আকারও গড়ে দেয়। কারণ আমরা জানি, কূটনীতি পরিচালনা করেন কূটনীতিবিদেরা। এর মাধ্যমে তারা বিশ্ব রাজনীতির স্বরূপই উন্মোচন করেন।
বইটিতে এমনসব বিষয় রয়েছে, যা আমরা কোনোভাবেই এড়াতে পারি না। পাকিস্তানের সাথে কিংবা চীনের সাথে ভারতের সম্পর্ক, কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো কি আমরা দূরে সরিয়ে রাখতে পারি?
শরনের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্টতই বিপুল বিস্তৃত। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি তিনি যত্ন করে তুলে ধরেছেন।
চীনা কূটনৈতিক বিভাগে ছোট একটি বিদ্রোহ, পরমাণু সরবরাহ গ্রুপে আলোচনা কিংবা জলবায়ু নিয়ে জাতিসংঘ কাঠামোগত কনভেশনের মতো বিষয় রয়েছে বইটিতে। এসব বিষয়ে ফলাফল কী হয়েছিল, আমরা সবাই তা জানি। কিন্তু নেপথ্যে কী কী ঘটেছিল, সেসব অজানা কাহিনীই এই বইতে স্থান পেয়েছে।
বইটিতে শরন দুটি থিমের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তবে কোনো বিষয়েই বিস্তারিত বর্ণনার দিকে পা বাড়াননি। প্রতিটি অধ্যায়ে ভারতের পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ করেছেন। কিন্তু কোনোটিতেই বিস্তারিত বিবরণ দেননি।
এই বইয়ে সবচেয়ে উদ্দীপ্ত এবং পূর্ণ সম্ভাবনাময় বিষয় হলো শরনের এই ‘গভীর উপলব্ধি যে কোনো জাতির শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন অবশ্যই স্বকীয়তার বাইরেও কিছু বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত থাকে।’ রাষ্ট্রদূত পর্যায়ের লোকজনের কাছে এটি সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়। বইটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ভারতীয় কূটনৈতিক কোরের রয়েছে বিপুল ঐতিহ্য।
এই বইয়ে বলা হয়েছে, একুশ শতকের ভারতকে অবশ্যই তার উচ্চাভিলাষকে জাগাতে হবে। তবে তাকে সেইসাথে এটিও স্বীকার করে নিতে হবে, বিশ্ব এখন নতুন এবং অপরিচিত ধরনের বিপদের মুখে রয়েছে। এই ধরনের যুক্তিকে অপছন্দ করা কঠিন। আর শরনের প্রিয় হেনরি কিসিঞ্জার একবার বলেছিলেন, সত্য বলার মধ্যে বাড়তি কিছু সুবিধা রয়েছে।
লেখক: বর্তমান এলএসই আইডিইএএস, লন্ডনে অনাবাসিক ফেলো। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা সমীক্ষা, শান্তিরক্ষা এবং ভারতের পররাষ্ট্র বিষয়ে তার আগ্রহ রয়েছে।

শৈশব বনাম গ্যাজেট by হাসান ইমাম

ডিজিটাল বিশ্ব এখন বাস্তবতা। এ এমন এক বাস্তবতা, যাকে আঁকড়ে ধরা বা এড়িয়ে যাওয়া—কোনোটাই আর কারো ইচ্ছাধীন নয়; মেনে নেওয়াই নিয়তি। এই ‘বিরাট’ বাস্তবের ছোট্ট উদাহরণ বুঝি হাতের মুঠোয় থাকা কয়েক ইঞ্চির স্ক্রিন (বা পর্দা), যাতে ঠিক এঁটে গেছে গোটা বিশ্ব মায় বহির্বিশ্ব! আক্ষরিক অর্থেই দুনিয়া আজ হাতের মুঠোয়। মানুষে মানুষে যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন, খবরাখবর, তত্ত্বতালাশ থেকে শুরু করে নিখাদ বিনোদন—এমন কিছুই নেই, যার দায়িত্ব স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপকে দেওয়া হয়নি।

প্রযুক্তি জীবনকে কতটা সহজ-সাবলীল, গতিশীল করেছে, তা নিক্তিতে হয়তো পরিমাপযোগ্য নয়। তবে তার ব্যাপকতা এতটাই যে, এখন জীবন অনেকটাই নির্ভার করেছে প্রযুক্তি। তাই বলে শিশুদের ভবিষ্যত্ গড়ার ভারও কি গ্যাজেটের ওপর ছেড়ে দেওয়া চলে? সমাজ যেন সেই কাজটিই করছে; শৈশব সাজানোর দায়িত্ব গছিয়ে দিচ্ছে প্রযুক্তির কাঁধে।

প্রযুক্তিময় বিশ্বে এটা বলা অন্যায় হবে না যে, চোখ ফোটার পর থেকেই শিশু আসক্ত হচ্ছে গ্যাজেটে। তা সে অক্ষর চেনার জন্যই হোক, ভুলিয়ে-ভালিয়ে রাখা বা খাবার গলাধঃকরণের জন্যই হোক। ভাবনা কী, আছে নির্ভাবনার গ্যাজেট! কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মুশকিল-আসানের সহজ তরিকা কি অন্য কোনো জটিল মুসিবত ডেকে আনছে না?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) যা বলছে, তাতে শঙ্কিত হওয়ার কারণ ষোলো আনা ছাড়িয়ে আঠারো আনা। সম্প্রতি সংস্থাটি তাদের হালনাগাদ পর্যালোচনায় সাফ বলেছে, দুই থেকে চার বছরের শিশুদের দিনে এক ঘণ্টার বেশি ডিজিটাল স্ক্রিনের সামনে থাকতে দেওয়া চলবে না; কোনো অজুহাতেই না। স্ক্রিন আছে এমন যে কোনো ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেওয়া ঠিক হবে না আরো কমবয়সিদের, নাড়াচাড়া তো দূরের কথা। ডব্লিউএইচও তাদের গবেষণায় বলছে, বিশ্বের একটি বড়ো অংশের শিশুদের হাতে কোনো না কোনোভাবে স্মার্টফোনের মতো সহজলভ্য গ্যাজেট সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে। যেকোনো সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে সমাধানের পথে তো হাঁটছেই না, উলটো মনোযোগ দিচ্ছে হাতে থাকা স্ক্রিনে। ফলে শৈশব থেকে বিদায়ঘণ্টা বাজছে আবেগের; মনোজগতের দুয়ার বন্ধই থাকছে।

শিশুর মানসিক বিকাশের এই পর্বে বিষয়টি যে অত্যন্ত উদ্বেগের, তাতে বোধ করি কারো ভিন্নমত থাকার কথা নয়। উপরন্তু, স্ক্রিনের সামনে টানা বসে থাকার প্রবণতায় বাড়ছে স্থূলতা। অনিদ্রার মতো সমস্যার বাড়বাড়ন্তও ঘটছে সমানতালে, যা একইসঙ্গে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অর্থাত্, সমস্যা এতটাই প্রকট যে, চোখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় নেই। আমাদের উপেক্ষার মাশুল গুনবে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম।

মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা বা শারীরিক সমস্যার ক্ষেত্রে স্মার্টফোনের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে তবু কিছু আলাপ-আলোচনা হয় বিভিন্ন ফোরাম, প্ল্যাটফরমসহ গণমাধ্যম বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। কিন্তু সমাজবিচ্ছিন্নতায় স্মার্টফোনের অবদান নিয়ে তেমন কোনো আওয়াজ কালেভদ্রেও তোলা হয় না। অথচ দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাবের কথা ভাবলে গা শিউরে ওঠে।

প্রযুক্তির রমরমা এই ‘আধুনিক-প্লাস’ বিশ্বে শিশুরা বড়োই একা। যৌথ পরিবারের ধারণা আমাদের মনোজগত্ থেকে এখন ‘মাইনাস’ হয়েছে। ছোটো হতে হতে পরিবার এখন স্রেফ মা ও বাবায় সীমাবদ্ধ। তার ওপর তাদের উভয়ের কর্মজীবন, উদয়াস্ত ব্যস্ততা, ক্যারিয়ার গ্রাফ। যে নিরাপদ পারিবারিক বেষ্টনী শিশুকে এযাবত্ কাল ঘিরে রাখত পরম যত্নে, তা ক্রমে ভেঙে পড়ছে। এমন ‘অরক্ষিত’ শিশুই শিকার হচ্ছে গ্যাজেটের। অর্থাত্, গ্যাজেটে মগ্ন-মত্ত শিশু আরও বেশি সমাজ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, নিঃসঙ্গ হচ্ছে।

দুটি কারণ পাশাপাশি একটি অন্যটিকে পুষ্টি জুগিয়ে চলেছে। দরকারি সাহচর্য, বিনোদন, শিক্ষা—সবকিছুই স্ক্রিনে পেয়ে পারস্পরিক মেলামেশা ও লেনাদেনার তাগিদ হারাচ্ছে শিশু। কোনো কিছুই আর অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে শিখছে না সে। অন্যদিকে, তার বৌদ্ধিক বিকাশও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সঙ্গে ফাউ হিসেবে শারীরিক ক্ষতি তো আছেই।

স্ক্রিনসর্বস্ব জীবনে শিশু নিজের কল্পনা ঝালিয়ে নেওয়ার অবসর পায় না, সুযোগও ঘটে না। স্ক্রিনটিই নানা রঙিন মোড়কে তার কল্পনাটিকে বাস্তবে এনে ফেলে। ফলে স্ক্রিনে দেখা গল্পকে, ভাবনাকেই সে নিজস্ব কল্পনা বলে ভাবতে থাকে। বছর কয়েক আগেও ঠাকুমার ঝুলি, দৈত্যদানো বা লালকমল-নীলকমলের গল্প শুনে সে নিজের মনে কতগুলো অবয়ব রচনা করত। যে কোনো গল্পের সার্থকতাও সেখানে।

কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যমে সেই গল্পের বাহারি ভিডিও শিশুর নিজস্ব কল্পনার জগিটকে স্রেফ গুম করে ফেলছে। শিশুমন কল্পনা আর বাস্তবের ফারাক করতে পারছে না। কাগুজে ধারণা হয়ে থাকছে শিশুর কল্পনাশক্তির উন্মেষ, মনোজগতের বিস্তার। আগামী প্রজন্মের একটা বড়ো অংশকে কি আমরা এমন ‘জড়ভরত’ হিসেবে দেখতে চাই?

>>>লেখক :সাংবাদিক

আসুন, এখন দেখি প্রেম জিনিশটা কী? -আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এর প্রেম থেকে

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
অনেকদিন ধরে আমি নানান অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করছি, কিন্তু বক্তৃতা দেবার অস্বস্তি আজও গেল না। এই অস্বস্তি আমার নার্ভাস স্বভাবের জন্য। এ আমার জন্মগত। বহু চেষ্টা করেও এ থেকে রেহাই পাই নি। দেখুন (উঁচু করে গ্লাস দেখিয়ে) মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ানোর আগে আমি কিন্তু পানির গ্লাসটা ঠিকই সঙ্গে এনেছি। না, তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে নয়; গলা শুকিয়ে গেলে দু-এক ঢোক গলায় ঢেলে সাহসটা ফিরিয়ে আনার জন্যে। দেখুন, এখনই, আমার বক্তব্যের সমর্থনে, আমি আপনাদের সামনেই এক ঢোক খেয়ে নিচ্ছি। [পানি খাওয়া ও সবার হাসি।] আমার নার্ভাস হওয়ার কথা শুনলে সবাই খেঁকিয়ে ওঠে।
বলে, নখরা। নার্ভাস হলে টিভিতে অমন চটাং চটাং কথা বল কী করে! আমি তাদের বলি: স্টুডিওতে একবার এলেই দেখতে পেতে প্রতিটা কাট্-এর ফাঁকে আমাকে ক-গ্লাস পানি খেতে হয়।

একবার অভিনেতা গোলাম মোস্তফা আমার স্টুডিওতে এসেছিলেন, আমি সত্যি নার্ভাস হই কিনা দেখার জন্যে। দেখার পরে স্বীকার করেছিলেন আমার নার্ভাস হওয়ার ব্যাপারটা শুধু গালগল্প নয়, আসলেই সত্যি। বলেছিলেন: আসলে ব্যাপারটা কী হয় জানেন? নার্ভাস হয়ে মরিয়া অবস্থায় মুখে যা আসে আপনি বলতে থাকেন। লোকে ভাবে, কথার তুবড়ি ছুটছে।

টেলিভিশনে যা-ই হোক, সভায় অনুষ্ঠানে কথা বলতে ভয় আমার আরও বেড়ে যায়। একে তো সেখানে মানুষ অনেক, তার ওপর যত মানুষ তার দ্বিগুণ সংখ্যক চোখ আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে-এই চাপ আমি সহ্য করতে পারি না। আমার ভালো লাগে বন্ধুবান্ধব মিলে নিশ্চিন্তে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জমজমাট আড্ডা দিতে। সুধীবৃন্দ, আপনাদের অনেকের মতো কর্মবীর বা জাগতিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত আমি নই। আমার জীবনের অর্ধেক সময় নষ্ট হয়েছে অর্থহীন আড্ডায়। এতে আমার ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু তাতে আমার দুঃখ নেই। আড্ডার ফূর্তিতে জীবন মৌ মৌ করেছে।
আপনাদের অভিষেক অনুষ্ঠানের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কী নিয়ে কথা বলি, তা নিয়ে আমিও ভেবেছি। কিন্তু বিষয় কী হবে বের করতে পারিনি। পরশু আপনাদের প্রেসিডেন্ট শাকুর চৌধুরী আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্ড দিতে গিয়েছিলেন। তাঁকে বললাম, সেদিন গিয়েছিলাম রোটারি ক্লাব অফ ঢাকা ওয়েস্ট-এর অভিষেকে। সেখানকার সবাই আমার মতো বুড়ো। তাদের কাছে বার্ধক্য বিষয়ে কথা বলেছি। আপনাদের এখানে কী নিয়ে বলি বলুন তো? উনি বললেন, অভিষেক তো উৎসবের দিন। সবাই থাকবে ফূর্তির মেজাজে। আর আমাদের মেম্বারদের বয়সও অল্প। ফূর্তির আমেজ বাড়ে এমন কিছু বলুন। আমি বললাম, সবার ফূর্তি বাড়ে এমন একটা বিষয়ই আছে পৃথিবীতে। তার নাম প্রেম। তাহলে প্রেম নিয়েই আপনাদের অনুষ্ঠানে কিছু বলি, কেমন? উনি রাজি হলেন। তাঁর নির্দেশে আমি এই অনুষ্ঠানে প্রেম নিয়ে বলছি।

সুধীবৃন্দ, প্রেমের ব্যাপারে আগ্রহ নেই পৃথিবীতে এমন মানুষ নেই। যার জীবনে প্রেম আসেনি তার এ-ব্যাপারে যেমন আগ্রহ, যার এসেছে তারও তেমনি; যার জীবনে প্রেম নেই, কোনোদিন আসবেও না তার আগ্রহও তেমনি। প্রেমেন্দ্র মিত্র লিখেছিলেন: ‘শুনেছি দন্তহীন বৃদ্ধ তার যৌবনের প্রেমকে নিয়ে পরিহাস করছে।’ কিন্তু আমার ধারণা, একটা ভালোরকম প্রেমের গল্প ফেঁদে বসতে পারলে সব দন্তহীন বৃদ্ধই তা কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করবে।

আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন কোনো ঘুড্ডি যখন কাটা যায় তখন বহু লোক তা ধরার জন্যে পেছনে দৌড়ায়। কেন দৌড়ায় বোঝা ভার। ঘুড্ডি তো এমন কোহিনূর মণি নয় যা পেলে কোটিপতি হওয়া যাবে। তবু মানুষ দৌড়ায়। কারো দৌড়াতে মজা লাগে তাই দৌড়ায়, হয়ত সবাই দৌড়াচ্ছে তাই সবাই দৌড়ায়। হয়ত কেউ দৌড়ায় গৌরবের আশায়, স্বপ্নের জন্যে। যারাই ঘুড্ডিটা দেখে তারাই দৌড়ায়। কারো হাতে লম্বা সরু বাঁশ, যেন আকাশে গিয়ে ঠেকেছে, কারো বাঁশ মাঝারি সাইজের, কারো হাতে শুধু ছোটখাটো লাঠি, কারো হাতে কিছুই নেই, শুধু খালি দুটো হাত-তবুও দৌড়াচ্ছে। সবারই আশা ঘুড্ডিটা সে-ই পাবে। প্রেম ওই ঘুড্ডিটার মতো বন্ধুরা। সবাই ভাবে: একে পাব। সবাই একে চায়। যার নেই সেও চায়, যার আছে সেও চায়। যার চলে গেছে, আর কোনোদিন আসবে না, সেও চায়; যার কখনো যাবে না, হয়ত আসবেও না, সে-ও চায়।

কিন্তু যেসব মানুষ দলে দলে ঘুড্ডির পেছনে দৌড়ায়, তাদের কাউকে কি কখনো সেই ঘুড্ডি পেতে দেখেছেন আপনারা? না, দেখেন নি। আসলে ওই ঘুড্ডি কেউ পায় না। (সে যে চমকে বেড়ায়, দৃষ্টি এড়ায়, যায় না তারে বাঁধা)। হয়ত মাটিতেই পড়ে না ঘুড্ডি, উঁচু গাছের আগায় আটকে যায়, নয়ত পড়ে গিয়ে কোনো পানা-পুকুরের একেবারে মাঝখানে, নয়তো কেউ পেলেও বাকিরা একসঙ্গে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সেটাকে ছিঁড়ে ফেলে। কাউকে পেতে দেয় না কেউ। পায় না কেউ শেষ পর্যন্ত। প্রেমও এমনি। একে কেউ পায় না, কেবল পাওয়ার জন্যে ছোটে। ছোটে আর কাঁদে। এ বড় দুঃখের জিনিশ বন্ধুরা। ভুল করেই মানুষ ভাবে এ সুখের। হিন্দি-উর্দুওয়ালারা প্রেমের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছে, এ হচ্ছে ‘দিল্লিকা লাড্ডু, যো খায়া ও ভি পস্তায়া, যো নেহি খায়া ও ভি পস্তায়া।’ খাও আর না-খাও পস্তানো এতে আছেই। যেন প্রেমের যত সাধ, যত আকুলতা শুধু হাহাকারের জন্যেই।

-----২-----
আসুন, এখন দেখি প্রেম জিনিশটা কী?
ছেলেবেলায় আমাদের বাসায় মাঝেমধ্যে লাল ডুরে-শাড়িপরা এক পাগলি আসত। তার মাথা কামানো। মাথায় ইয়া বড় ঘোমটা। এসেই উঠোনে দাঁড়িয়ে প্রথমে একচোট বকবক করে নিত সে। তারপর হঠাৎ করেই গান ধরত:
লাইলি কান্দে বনে বনে
মজনু কান্দে ফুলবাগানে
কেন দেখা হয় না রে?...
প্রথম দুটো লাইন সে কবিতার মতো করেই বলত। কিন্তু তৃতীয় লাইনটা এলেই তার আবেগ এসে যেত। ডানহাতে ঘোমটার প্রান্ত ধরে একটা পুরো চক্কর ঘুরে সে সুর করে গেয়ে উঠত: ‘কেন দেখা হয় না রে?’ সুধীবৃন্দ, এই-যে দুজনের দেখা হয় না, এই-যে একজন থাকে বনে, একজন ফুলবাগানে, দুজন দুজনকে দেখতে না পেয়ে কাঁদে-এই কান্নাই প্রেম। এই-যে দূরত্ব, এই-যে বিচ্ছেদ, এই বিচ্ছেদই প্রেম। যতক্ষণ পাওয়া যায়নি ততক্ষণই প্রেম। নজরুলের কবিতার মধ্যে আছে:
হারিয়ে গেছ অন্ধকারে-পাইনি খুঁজে আর
আজকে তোমার আমার মাঝে সপ্ত পারাবার!
এই-যে সপ্তপারাবারের বিচ্ছিন্নতা, এই বিচ্ছিন্নতার জন্যেই না এ প্রেম হয়েছে! রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বর্ষার দিনে’ কবিতায় লিখেছেন:
এমন দিনে তারে    বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়-
এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝরঝরে
তপনহীন ঘন তমসায়॥
কাকে বলা যায়? সে কি কাছে না সপ্তপারাবারের ওপারে? সে দূরে, অনেক দূরে। দূরে বলেই তার জন্যে এত কষ্ট। বিচ্ছিন্নতার এই যন্ত্রণা আর দীর্ঘশ্বাসই হল প্রেম। আসলে প্রেম মানেই না-পাওয়া। কেন লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদের মধ্যে এত প্রেম? কারণ তারা একজন আরেকজনকে পায়নি। পায়নি বলেই পরস্পরের জন্যে এত আকুলতা। পায়নি বলেই এত কবিতা, এত গান, এত মোনালিসা, তাজমহল, মেঘদূত। পেয়ে গেলে সব কষ্ট, সব মাধুরী চলে যেত। বিয়ের পর সাতদিনও পার হত না, তারা ঝগড়া করত।

অনেকেই বলবেন, ‘না-পাওয়ার মধ্যে প্রেমের তীক্ষè ছোবল টের পাওয়া যায় এটুকু না হয় মানলাম, কিন্তু পাওয়ার মধ্যে প্রেম থাকবে না এটা কেমন কথা! দুজন কাছাকাছি হলেই কি প্রেম চলে যাবে? প্রেমিক-প্রেমিকারা যখন দুজন দুজনকে বুকের ভেতর পায় তখন কি তাদের প্রেম চলে যায়? বিবাহিত জীবনে প্রেম দুর্লভ মানি, তবু এমন অনেক দম্পতিও কি নেই যাদের মধ্যে গভীর প্রেম রয়েছেÑজীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যারা পরস্পরের জন্যে উন্মুখ হয়ে কাটায়?’ তাঁদের কথার উত্তরে আমি আগের কথাটাকে ফিরিয়ে এনেই বলব, ‘মানুষের প্রেম আসলে না-পাওয়াতেই। দুজনের দূরত্বেই প্রেমের বসবাস। যদি পাওয়ার মধ্যে কোথাও প্রেম দেখা যায় তবে বুঝতে হবে ওই পাওয়ার মধ্যেও, কোথাও-না-কোথাও ‘না-পাওয়ার’ যন্ত্রণা কাজ করছে। কাছে থাকলেও তাদের মধ্যে রয়েছে এমন এক অসীম দূরত্ব যাকে তারা কিছুতেই অতিক্রম করতে পারছে না। এই জন্যেই এত মরিয়া আর উৎকণ্ঠিত হয়ে রয়েছে পরস্পরের জন্যে।’

মধ্যযুগের কবিতা থেকে একটা উদাহরণ দিই। কবিতাটা কবি বল্লভের। সুধীবৃন্দ, কবিতাটা বাংলা-হিন্দি মেশানো ব্রজবুলি ভাষার। আপনাদের বুঝতে অসুবিধা হতে পারে বলে এর প্রতিটি লাইনের মানে বলে-বলে বোঝাতে চেষ্টা করব। কবিতাটায় কৃষ্ণের প্রতি রাধা তার ভালোবাসার কথা বললেও আসলে সে বলছে কী? বলছে তার আর তার প্রিয়তমের মাঝখানকার অন্তহীন দূরত্বের কথা। বলছে প্রিয়তমকে এত কাছে পাওয়া হল, তবু কিছুতেই তাকে পুরোপুরি পাওয়া গেল না। সে চির-অধরা চির-অপ্রাপণীয় হয়ে রইল।

জনম অবধি হাম    রূপ নেহারলুঁ
নয়ন না তিরপিত ভেল।
‘জন্ম থেকে তার রূপ দেখে আসছি কিন্তু চোখ তবু আরও তৃপ্ত হল না।’ (অর্থাৎ এত দেখা, তবু সে অ-দেখা হয়েই রইল)।
সোই মধু বোল    শ্রবনহি সুনলু
শ্রুতিপথ পরশ না গেল।
‘তার মধুর বচন আমার শ্রবণকে বিনোদিত করল কিন্তু আমার শ্রুতি পথ পর্যন্ত পৌঁছাল না।’ অতৃপ্তির কী অপরূপ প্রকাশ! এর পরে বলছেন সবচেয়ে অনবদ্য কথাগুলো:

কত মধু যামিনি    রভসে গোঁয়াইলুঁ
    ন বুঝলুঁ কৈছন কেল।
লাখ লাখ যুগ    হিয়ে হিয়ে রাখলুঁ
    তবু হিয়া জুড়ন ন গেল।
‘কত মধুময় রাত আমরা আনন্দ-মত্ততায় উদ্যাপন করলাম কিন্তু সে কেমন তা বুঝতে পারলাম না। লাখ লাখ যুগ হৃদয় রেখে জেগে রইলাম, তবু হৃদয় আমার আজও জুড়াল না।’

এরা দেবদাস-পার্বতীর মতো দূরে নেই। দুজন রয়েছে দুজনের খুবই কাছে। হৃদয়ে হৃদয় রেখে। তবু দেখুন রাধার মধ্যে কী অসীম না-পাওয়ার অস্থিরতা কেন এই না-পাওয়া? না-পাওয়া কৃষ্ণের অমিত বিপুল ঐশ্বর্যময়তার কারণে এত অন্তহীন আর অপরিমেয় রকমে সে বৈভবশালী ও বিভামন্ডিত যে, সেই অসীমতার বিস্ময় সে শেষ করতে পারছে না। কাছে পেয়েও তাকে মনে হচ্ছে অনেক দূরে, যেন পাওয়ার সে বাইরে। এই-যে অপ্রাপ্তির অনুভূতি, এই-যে পেয়েও না-পাওয়া এটাও প্রেম। কাজেই প্রেম দুরকম হতে পারে: না-পেয়েও হতে পারে, আবার পাওয়ার ভেতর না-পাওয়ার অনুভূতি দিয়েও হতে পারে। এই দ্বিতীয় ধরনের প্রেমের কথা বলতে গিয়ে গোবিন্দ দাস লিখেছেন:
দুহুঁ কোড়ে দুহুঁ কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া।

দুজন আছে দুজনের কোলে। তবু দুজন দুজনকে হারিয়ে ফেলছে ভেবে কাঁদছে। কাজেই কাছে থাকা মানেই পাওয়া নয়। ভুক্তভোগীরা জানেন, কাছে থাকার মধ্যেও থাকতে পারে কত লক্ষ যোজনের ব্যবধান। যদি থাকে তবে তাও হবে এক ধরনের না-পাওয়া। থেকেও না-পাওয়া। কাজেই তখন তা আমাদের ভেতর প্রেমের অনুভূতি জাগাবে। যে কাছে নেই তার ব্যাপারে না-পাওয়ার অনুভূতি থাকা খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু যে রয়েছে কাছে, বুকের একান্ত ভেতরে, তাকে নিয়েও কোন না-পাওয়ার অনুভূতি মানুষের মনে? কেন মনে হয় সে নেই? কেন প্রেমে প্রতিমুহূর্তে এমন হারাই-হারাই ভাব? এত উৎকণ্ঠা? এত আতঙ্ক? কেন সবকিছু পাওয়ার পরেও মনে হয়:
ও কি এল, ও কি এল না,
বোঝা গেল না, গেল না।

------৩-----
সুধীবৃন্দ, এই বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রণাই প্রেমের যন্ত্রণা। এই আগুনই প্রেমের আগুন। একই সঙ্গে সে অসহ্য সুখ, অকথ্য কষ্ট। সুখ, যাকে ভালোবাসি সে কাছে আছে বলে; যন্ত্রণা: এমন দুর্লভ মানুষটিকে হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায় আছি বলে। চন্ডীদাসের মতে এ হল সেই শাঁখের করাত যা ‘আসিতে যাইতে কাটে’। প্রেমে তাই পেলেও দুঃখ, না-পেলেও দুঃখ। এই দুর্বিষহ যন্ত্রণার আগুনে জ্বলে জ্বলে ছাই হয়েছিল যাযাবর-এর ‘দৃষ্টিপা’ বইয়ের ‘হতভাগ্য চারুদত্তহ আধারকার’, শেক্সপিয়ারের ‘ওথেলো’। এ যুগের গানেও যে শোনা যায়: ‘লোকে বলে প্রেম আর আমি বলি জ্বালা’Ñএ কি এমনি?
প্রেমের এই দুধারী করাত যে কেমন, একটা গল্প বলে বোঝাই। গল্পটা গোপাল ভাঁড়ের।

গোপাল মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ভাঁড়। তার চাকরি হল রাজাকে হাসানো। রাজা যখন রাজকার্যের দুরূহ সমস্যা নিয়ে গম্ভীর আর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকেন তখন রঙ্গরসের জোগান দিয়ে তাঁকে খোশমেজাজে রাখা। তো, একদিন একটা সমস্যা নিয়ে রাজার মেজাজ সত্যি সত্যি খিঁচড়ে আছে। এমন খারাপ যে, হাসির কথাও তাঁর অসহ্য। ঠিক সেই সময় গোপাল গেছে রাজাকে হাসাতে। আর যায় কোথায়! রাজা একেবারে গ্রেনেডের মতো ফেটে পড়লেন। কদর্যভাবে ধমকে বললেন, ‘যাও! যাও আমার সামনে থেকে, যাও! তোমার মুখ যেন আর কোনোদিন না দেখি!’ বলে তাকে প্রায় কুকুরের মতো তাড়িয়ে দিলেন।

গোপাল ভাঁড় রাজার বয়স্য, বন্ধু। তাই এভাবে তাঁর কাছ থেকে অপমানিত হওয়ায় তার মনে খুবই চোট লাগল। সে ঠিক করল চাতুরির মাধ্যমে রাজাকে সমুচিত শিক্ষা দেবে। বাড়ি গিয়ে সে একটা লোক ভাড়া করল। বিছানায় শুয়ে শুয়ে গোপাল লোকটাকে কিছুক্ষণ পরপর একেকটা কথা শিখিয়ে দেয় আর লোকটা মহারাজের কাছে গিয়ে তাই বলে আসে। প্রথমে লোকটা গিয়ে মহারাজকে বলল, ‘মহারাজ, গোপালকে আপনি কী সব বলেছেন, সেই দুঃখে গোপাল ঠিক করেছে সে আর এ দেশেই থাকবে না। গোপালের মালপত্র বাঁধাছাদা শুরু হয়ে গেছে মহারাজ!’ গোপালের ওপর মহারাজের রাগ তখনও পড়েনি। তাই বললেন, ‘যাক, ও যেখানে খুশি যাক। বলে দিস, আমার সামনে যেন আর কোনোদিন না আসে।’ ঘণ্টাখানে পরে লোকটা আবার মহারাজের সামনে এসে হাজির, ‘জিনিশপত্র বাঁধাছাদা শেষ মহারাজ! গাড়ির জন্যে লোক পাঠানো হয়েছে। গাড়ি এলেই রওনা হয়ে যাবে।’ হাজার হলেও মহারাজ তো গোপালকে ভালোবাসেন। তাই এ খবরে তিনি ভেতরে ভেতরে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। সত্যিই চলে যাচ্ছে না কি গোপাল।

কিন্তু মুখে উদাসীন ভাব অটুট রেখে বললেন, ‘যেতে চাইলে যাবে। ওকে কী আমার পায়ে ধরে রাখতে হবে নাকি!’ কথার সুর কিছুটা নরম। আরও ঘণ্টাখানেক পরে লোকটা এসে বলল, ‘মহারাজ, মালপত্র গাড়িতে ওঠানো শেষ, গোপাল কিন্তু সত্যি সত্যি চলে যাচ্ছে।’

এবার মহারাজ সত্যি ভয় পেয়ে গেলেন। গোপালের মতো প্রিয় বন্ধুকে এভাবে কী হারানো যায়। লোকটাকে বললেন, ‘শিগগির গোপালকে ডেকে আন। বল, আমি ওকে ডাকছি।’ বিজয়ের হাসি হাসতে হাসতে গোপাল মহারাজের সামনে এসে হাজির। মহারাজ বললেন, ব্যাপারটা কি বলতো গোপাল! তোমাকে দেখলেও যে খারাপ লাগে আবার না-দেখলেও যে খারাপ লাগে!’ একগাল হেসে গোপাল বলল, ‘মহারাজ বুঝিবা আমার প্রেমে পড়েছেন।’

প্রেমের এর চেয়ে সুন্দর সংজ্ঞা আর কি হয়? প্রেম এমনি একটা ব্যাপার। সত্যি এ আসিতে যাইতে কাটে। এখানে পেলেও যন্ত্রণা, না-পেলেও তা-ই। দেখলেও খারাপ লাগে, না-দেখলেও জীবন বাঁচে না।      ( চলবে )