Thursday, June 13, 2019

রুহানি ও অ্যাবের যৌথ সংবাদ সম্মেলন: ইরানি তেল কেনা অব্যাহত রাখতে চায় জাপান

অ্যাবে (বামে) ও রুহানি (ডানে)
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে বুধবার রাতে তেহরানে দুই দফা বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেছেন। এ সময় ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে। তিনি দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। শিনজো অ্যাবে ইরানের তেল আমদানি অব্যাহত রাখতে আগ্রহী বলেও তিনি জানান। রুহানি বলেন, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষ করে চবাহার বন্দরে জাপানি বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
রুহানি বলেন, আমরা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও উত্তেজনা হ্রাসের বিষয়ে আলোচনা করেছি। দুই দেশই মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় বলে জানান তিনি। ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, আমি জাপানি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি আমরা মধ্যপ্রাচ্যে কোন যুদ্ধের সূচনাকারী হব না এমনকি আমেরিকার সঙ্গেও না। কিন্তু যদি কোনো যুদ্ধ আমাদের বিরুদ্ধে শুরু করা হয় তাহলে আমরা অত্যন্ত কঠোর জবাব দেব।
রুহানি বলেন, জাপানি প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যতের ব্যাপারে অত্যন্ত আশাবাদী এবং তিনি জানিয়েছেন ইতিবাচক পরিবর্তন অত্যাসন্ন। জাপানি প্রধানমন্ত্রী ইরানের পরমাণু সমঝোতার প্রতি আবারও সমর্থন জানিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন রুহানি। তিনি বলেন, জাপান পরমাণু সমঝোতাকে মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। তিনি বলেন, দুই দেশই শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহারের পক্ষে এবং পরমাণু অস্ত্রের বিরোধী। দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যতে এ ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্ভাবনার কথা জানান রুহানি।
ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, জাপানি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে তার উৎস হলো ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার অর্থনৈতিক যুদ্ধ। এই অর্থনৈতিক যুদ্ধ বন্ধ হলে মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাবে।
এ সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে বলেন, ইরানকে ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে তা নিরসনে জাপান ভূমিকা রাখতে চায়। এ সময় তিনি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে গোটা বিশ্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।

মুক্তি পাচ্ছেন সজল ওসিকে শোকজ

রাজশাহীতে ‘বড় ভাইয়ের বদলে’ গ্রেপ্তার হওয়া ডাব বিক্রেতা সজল মিয়া (৩৪)কে দায় থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে আসামি না হয়েও কেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া আসামি হিসেবে সজলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তার জবাব দিতে রাজশাহী মহানগর পুলিশের শাহমখদুম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম মাসুদ পারভেজকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেয়া হয়েছে।  গতকাল বিকাল ৩টায় রাজশাহীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মনসুর আলম এ আদেশ দেন। আদেশ অনুযায়ী, ওসি মাসুদ পারভেজকে ৭ দিনের মধ্যে আদালতে স্বশরীরে হাজির হয়ে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
এর আগে গত ৩০শে এপ্রিল সজলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সজলের বাড়ি নগরীর ছোটবনগ্রাম পশ্চিমপাড়া মহল্লায়। তিনি তোফাজ উদ্দিনের ছেলে। সজলের বড় ভাইয়ের নাম সেলিম ওরফে ফজল। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি মামলায় ২০০৯ সালে ফজলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।
রায় ঘোষণার আগে থেকেই তিনি পলাতক। গত ৩০শে এপ্রিল শাহমখদুম থানা পুলিশ সজলকে গ্রেপ্তার করে। এরপর ফজল হিসেবে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
সজলকে যখন আদালতে উপস্থাপন করা হয় তখন তার নাম ফজল বলেই পুলিশের গ্রেপ্তারি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। দুইজন সাক্ষী এ ব্যাপারে এফিডেফিট করে দেয়ায় তাকে সেদিন কারাগারে পাঠানো হয়। কিন্তু গত ২৬শে মে সজল আসামি নন দাবি করে আইনজীবীর মাধ্যমে নিজের মুক্তির জন্য আবেদন করেন। এরপর মঙ্গলবার শুনানির জন্য দিন ধার্য করা হয়। এ দিন আদালত না বসায় গতকাল আবারও শুনানি হয়। প্রায় দেড় মাস কারাভোগের পর গতকাল তিনি অব্যাহতি পেলেন। আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০১ সালে আসামি ফজলের বয়স ছিল ২৭ বছর। বর্তমানে তার বয়স হবে ৪৫ বছর। কিন্তু সজলের জন্ম নিবন্ধন অনুযায়ী তার বর্তমান বয়স ৩৫ বছর।
এছাড়া আসামি ফজল মামলার রায়ের আগে একবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তখন তার শারিরীক গঠন রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে সংরক্ষণ করা হয়। এখন আবার পর্যাবেক্ষণ করে দেখা যায়, গ্রেপ্তার সজলের সঙ্গে সে বর্ণনার উল্লেখযোগ্য তারতম্য রয়েছে। পুলিশ ভুল করে তাকে ফজল  ভেবে গ্রেপ্তার করেছে। এদিন সজলের ছয় ভাই-বোন আদালতে এফিডেফিট করে জানান যে, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ফজল দীর্ঘ দিন ধরেই নিখোঁজ রয়েছেন। তারা ফজলের কোনো খোঁজ জানেন না। তিনি বেঁচে আছেন কি না তারা সেটিও জানেন না। আর ফজল হিসেবে যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তিনি আসলে সবার ছোট ভাই সজল। এসব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই সজলকে দায় হতে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত। তবে আদালতের আদেশের পর তাকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারেই নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আদালত  থেকে আদেশের অনুলিপি সেখানে পাঠানো হবে। এরপর কারা কর্তৃপক্ষ যাচাই করে দেখবে তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে কি না। তা না থাকলে সজলকে মুক্তি দেয়া হবে।
গতকাল আদালত থেকে সজল হাসিমুখেই কারাগারে গেছেন। তবে পুলিশ তার সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের কথা বলতে দেয় নি। অবশ্য আগের দিন শুনানির জন্য আদালতে আনা হলে হাজতে ঢোকানোর সময় সজল সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। ওই দিন তিনি বলেন, ‘কোনো দোষ করিনি। আমি আসামি না। তারপরেও আমি কয়েদি!’ সজল বলেন, ‘পুলিশ আমাকে বিনাদোষে জেলে পাঠিয়েছে। জেলে কয়েদি হিসেবে কাঠমিস্ত্রিও কাজ করতে হয়। বিনাদোষে এসব সহ্য করতে হচ্ছে।’
সজলের আইনজীবী মোহন কুমার সাহা বলেন, অপরাধী না হয়েও সজল কয়েদি হিসেবে সাজা  ভোগ করেছেন। তার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। ওসির শোকজের জবাব পাওয়ার পর আদালত এ ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত দেবেন সেটির জন্য আমরা অপেক্ষা করব। তারপর প্রয়োজনে মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে আমরা ভুক্তভোগী সজলের জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি করে আদালতে আবেদন করব।
বিনাদোষে গ্রেপ্তার করায় শাহমখদুম থানার ওসি এসএম মাসুদ পারভেজের শাস্তি দাবি করেছেন সজলের ভাই মো. বাবু। তিনি বলেন. সজলকে গ্রেপ্তারের পর আমরা অনেক বুঝিয়েছি। ওসি  কোনো কথা শোনেননি। ছেড়ে দেয়ার আশ্বাসে সন্ধ্যা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত বসিয়ে  রেখেছিলেন থানায়। তারপর সকালে আসতে বলেন। আমরা আবার ভোর ৬টায় থানায় যাই। দুপুর পর্যন্ত বসিয়ে রেখে সজলকে আদালতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। দেড় মাস ধরে আমরা হয়রানি হলাম। তাই ওসির শাস্তি চাই।
আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোজাফফর হোসেন বলেন, নির্দোষ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর জন্য ওসির শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু এখানে দুজন সাক্ষী ওসিকে এফিডেফিট করে দিয়ে বলেছিলেন, এটাই আসামি। তাই ওসির জবাবের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তারপর আদালতই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেবেন।
এ ব্যাপারে শাহমখদুম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম মাসুদ পারভেজের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘স্যারের কক্ষে আছেন, পরে কথা বলা হবে’ বলে কেটে দেন।

বৃটেনে কনজার্ভেটিভ পার্টিতে নেতৃত্বের লড়াই শুরু

বৃটেনে তেরেসা মে’র যুগ অতীত হয়ে গেছে। এখন ক্ষমতাসীন কনজার্ভেটিভ পার্টি ও প্রধানমন্ত্রীর হাল ধরার জন্য চলছে দলের মধ্যে লড়াই। এতে অবতীর্ণ ১০ জন শক্তিধর নেতা। তাদের ভিতর থেকে দলের নতুন নেতা ও পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করা হবে। আজ বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টের নিন্মকক্ষ হাউজ অব কমন্সে প্রথম দফায় এই দশ প্রার্থীর ওপর গোপন ব্যালটে ভোট হওয়ার কথা। বৃটেনের স্থানীয় সময় দুপুর একটায় এ ভোটের ফল ঘোষণা হওয়ার কথা। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
১০ জন প্রতিযোগীর মধ্য থেকে যদি কেউ কমপক্ষে ১৭ ভোট না পান তাহলে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা থেকে তিনি বাতিল হয়ে যাবেন। আজকের ভোটে কোনো প্রার্থী বাতিল হলে বাকি প্রার্থীদের ওপর দ্বিতীয় দফায় একই রকম ভোট হবে আগামী সপ্তাহে।
সেই ভোটে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে একজন প্রার্থীকে পেতে হবে কমপক্ষে ৩৩ ভোট। এর কম ভোট পেলেই তিনি বাতিল হবেন। তবে যদি সব প্রার্থীই ৩৩ ভোটের বেশি পান তাহলে সবচেয়ে কম ভোট যিনি পাবেন তিনিই এ প্রক্রিয়া থেকে ছিটকে পড়বেন। এ প্রক্রিয়া চলতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত প্রার্থী দু’জন না হন। তারপর ওই দুই প্রার্থীর ওপর ভোট হবে। তাতে যিনি সবচেয়ে বেশি ভোট পাবেন তিনিই হবেন কনজার্ভেটিভ দলের পরবর্তী নেতা এবং তিনিই হবেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র উত্তরসূরি। তার জন্য বরাদ্দ হয়ে যাবে ১০ ডাউনিং স্ট্রিট। বিজয়ী এমন সৌভাগ্যবানের নাম ঘোষণা করা হতে পারে ২২ জুলাই।
নেতৃত্বের এই লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত যারা টিকে আছেন তার ১০ জন হলেন পরিবেশমন্ত্রী ও ২০১৬ সালে ব্রেক্সিটের পক্ষে জোরালো অবস্থানকারী মাইকেল গভ। তিনি বলেছেন, তিনি ব্রেক্সিট প্রক্রিয়াকে আরো বিলম্বিত করাবেন। প্রতিযোগিতায় আছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক, সাবেক চিপ হুইফ মার্ক হারপার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন, হাউজ অব কমন্সের সাবেক নেতা আন্দ্রেয়া লিডসম, কর্ম ও পেনশন বিষয়ক সাবেক মন্ত্রী এস্থার ম্যাকভি, ব্রেক্সিট বিষয়ক সাবেক মন্ত্রী ডমিনিক রাব ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী রোরি স্টিওয়ার্ট।
এর মধ্যে নেতৃত্বের প্রচারণা বুধবার শুরু করেছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। তাকে নির্বাচনে ফ্রন্ট রানার হিসেবে ধরা হচ্ছে। যেকোনো প্রার্থীর চেয়ে তিনি বেশি এমপির সমর্থন পাবেন বলে মনে করা হয়। তিনি এমপিদের কাছে কথা দিয়েছেন, আগামী অক্টোবরের শেষ নাগাদ বৃটেনকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বের করে আনবেন। তবে কি পরিকল্পনায় তিনি এটা করবেন সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেন নি। কোনো চুক্তি ছাড়া বৃটেনকে বের করে আনার ইচ্ছা তার নেই বলে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি কখনো কোকেন সেবন করেছেন কিনাÑ এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি তা এড়িয়ে যান।
বরিস জনসনের প্রতিদ্বন্দ্বী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ। তিনিও বুধবার প্রচারণা শুরু করেছেন। তিনি বরিস জনসনকে ‘গতকালের খবর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বলেছেন, আমাদের প্রয়োজন আগামীদিনের, আজকের নেতা। একই পুরনো মুখ দিয়ে একই ঘর ভরতে চাই না আমরা। আমরা চাই একটি নতুন প্রজন্ম, যার থাকবে নতুন এজেন্ডা।  প্রথম দফা ভোটে উৎরে পরবর্তী ধাপে কোয়ালিফাই করতে পারেন সাজিদ জাভিদ, মাইকেল গভ, ডোমিনিক রাব ও জেরেমি হান্টও। বাকি ম্যাট হ্যানকক, রোরি স্টিওয়ার্ট, আন্দ্রেয়া লিডসম, মার্ক হার্পার ও এস্থার ম্যাকভি ভাল ফল করার আশা করছেন।
কনজার্ভেটিভ পার্টির রয়েছে ৩১৩ জন এমপি। এর মধ্যে মাত্র এক চতুর্থাংশের সামান্য বেশি ভোট দিতে পারবেন প্রার্থী নির্বাচনে। তারা প্রকাশ্যে কাকে সমর্থন দিচ্ছেন তা বলতে পারবেন। কিন্তু ভোট হবে গোপন ব্যালটে। ফলে ভোট দেয়ার সময় একজন এমপি তার মানসিকতা পরিবর্তন করে ফেলতে পারেন।

ওয়াশিংটন-তেহরান উত্তেজনা কমাতে পারবেন শিনজো আবে!

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক। রয়েছে আন্তর্জাতিক অবরোধ। এমন সময়ে বুধবার থেকে ইরান সফরে রয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। এই সফরের উদ্দেশ্যের মধ্যে অন্যতম হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ইস্যুতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের উত্তেজনা কমিয়ে আনা। তবে এক্ষেত্রে শিনজো আবে কতটা সফল হবেন তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে রয়েছে সংশয়। তারা মনে করছেন, জাপানে নির্বাচন আসন্ন। ফলে তার ইরান সফরের মধ্য দিয়ে একজন বৈশ্বিক নেতা হিসেবে তার ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করেন তারা। চার দশকের মধ্যে জাপানি কোনো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার ইরান সফরে যাচ্ছেন শিনজো আবে।
এই সফরে তিনি ইরানের সুপ্রিম নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি এবং প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে বৈঠক করবেন।  এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
সরকারিভাবে এ বছর ইরান ও জাপান তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৯০তম বার্ষিকী উদযাপন করছে। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জাপান সফরের অল্প পরেই শিনজো আবের এই ইরান সফর। ২০১৫ সালে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল তা প্রত্যাহার করে নেয় ট্রাম্প প্রশাসন। তারপর থেকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমশ উত্তেজনায় পূর্ণ হয়ে উঠছে। এমন কি তা যুদ্ধের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যখন পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধবিমান বহনকারী যুদ্ধজাহাজ পাঠায়, তখন এই উত্তেজনার পারদ ফুটতে থাকে। নতুন একটি যুদ্ধের আশঙ্কায় কাঁপতে থাকে মধ্যপ্রাচ্য। এ পরিস্থিতিতে ইরান সফরে বের হওয়ার একদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ফোন করেন জাপানি প্রধানমন্ত্রী। এ সময়ে তারা ইরান সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিনিময় করেন বলে জানিয়েছেন শিনজো আবের মুখপাত্র।
পারমাণবিক চুক্তি কি
২০১৫ সালে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। বিনিময়ে তার ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়ার কথা বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নেতৃত্বে ওই চুক্তি হলেও গত বছর তা বাতিল করে দেন ট্রাম্প। তিনি একতরফা সিদ্ধান্তে ওই চুক্তি বাতিল করেন। তবে ইউরোপিয় ইউনিয়ন, রাশিয়া ও চীন মনে করে ওই চুক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করার আশা এখনও করা যায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে অবরোধ দেয়ার প্রতিশোধ হিসেবে গত মাসে ইরান ঘোষণা দেয়, তারা পারমাণবিক অস্ত্র বিষয়ে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার স্থগিত করবে। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বলেছে, ইরান ওই প্রতিশ্রুতি স্থগিত করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বৃদ্ধি করেছে।
এতে জাপানের কি?
ইরানের সঙ্গে ওই চুক্তিতে টোকিও কখনোই কোনো অংশীদার ছিল না। এর অর্থ হলো ওই চুক্তিতে জাপানের কোনো ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। তবে ইরান থেকে তেল আমদানি করে তারা। যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ দেয়ার পর তারা ওয়াশিংটনের কাছে মাথা নত করেছে এবং তেল আমদানি বন্ধ করেছে। টোকিওর টেম্পল ইউনিভার্সিটির এশিয়ান স্টাডিজের পরিচালক প্রফেসর জেফ কিংসটন বলেছেন, ২০১৫ সালের চুক্তিতে সমর্থন আছে জাপানের। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা প্রত্যাহার করায় অসন্তুষ্ট জাপান। তারা মনে করে, এটি একটি বড় ভুল। তবে এ বিষয়ে বাস্তবেই কিছু বলার নেই জাপানের। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যখন অবরোধ আরোপ করেছে, তখন এটা বিস্ময়ের কোনো ব্যাপার নয় যে, জাপান তা অনুসরণ করবে।
টোকিও এখন ইরানের তেল ছাড়া চলতে পারছে যেহেতু, তাই মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো যুদ্ধের জন্য এই তেলের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে এবং তাতে জাপানকে প্রাকৃতিকভাবেই বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। এ জন্যই টোকিও সবার সঙ্গে কথা বলছে। সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখছে। এবং নিশ্চিত করছে তারা যেন তেল পায়।

গাছে বেঁধে নির্মম নির্যাতন, গৃহবধূর গর্ভপাত

শেরপুরের নকলায় জমি নিয়ে বিরোধের জেরে অন্তঃসত্ত্বা এক গৃহবধূকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের ফলে গর্ভপাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার করা মামলায় এক নারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ওই নির্যাতনের একটি ভিডিও চিত্র গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয়দের মুঠোফোনে ছড়িয়ে পড়েছে।
গ্রেপ্তার নারীর নাম নাসিমা আক্তার। তিনি উপজেলার ভূরদী গ্রামের আবদুল মোতালেবের মেয়ে। বুধবার দুপুরে নকলা থানা-পুলিশ তাঁকে ভূরদী গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে। ‘নির্যাতনের শিকার’ ওই গৃহবধূর নাম ডলি খানম (২২)। তিনি উপজেলা সদরের কায়দা এলাকার মো. শফিউল্লাহর স্ত্রী ও স্থানীয় চন্দ্রকোনা কলেজের স্নাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, গৃহবধূ নির্যাতনের ওই ঘটনাটি ঘটেছে ১০ মে। পরে এ ঘটনায় দুটি মামলা হয়। প্রথম মামলাটি হয় ৩ জুন শেরপুরের সি. আর আমলি আদালতে। এ মামলায় ডলির স্বামী শফিউল্লাহ তাঁর তিন ভাই ও ভাবিসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৫ থেকে ৭ জনকে আসামি করেন। বিচারক শরীফুল ইসলাম খান মামলাটি তদন্ত করে ১০ কার্য দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের জন্য জামালপুরের পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেন। দ্বিতীয় মামলাটি করেন ডলি নিজে। আজ বুধবার সকালে নয়জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৩ থেকে ৪ জনকে আসামি করে নকলা থানায় মামলা করেন।
মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কায়দা এলাকার মৃত হাতেম আলীর ছোট ছেলে মো. শফিউল্লাহর সঙ্গে জমি নিয়ে তাঁর বড় ভাই আবু সালেহ, সলিমউল্লাহ ও নেছার উদ্দিনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ ও মামলা চলে আসছিল। এর জেরে গত ১০ মে সকালে শফিউল্লাহর দখলে থাকা জমির বোরো ধান জোর করে কাটতে যান সালেহ ও তাঁর লোকজন। এ সময় শফিউল্লাহ প্রথমে বাধা দেন। তবে প্রতিপক্ষের ধাওয়ায় তিনি পিছু হটে নকলা থানায় যান। একপর্যায়ে সালেহর লোকেরা ধান কাটা শুরু করলে শফিউল্লাহর তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ডলি খানম তাঁদের বাধা দিতে যান। এ সময় সালেহর নির্দেশে সলিমউল্লাহ, নেছারউদ্দিন ও তাঁর স্ত্রী লাকি আক্তারসহ অন্যান্যরা ডলিকে ঘেরাও করেন। একপর্যায়ে তাঁরা ডলির চোখে-মুখে মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে দেন। এরপর তাঁরা ডলিকে টেনে-হিঁচড়ে পাশের খেত সংলগ্ন ইউক্যালিপটাস গাছের সঙ্গে দুই হাত এবং অন্য একটি গাছের সঙ্গে দুই পা বেঁধে ফেলেন।
মামলার এজাহারের আরও বলা হয়, গাছের সঙ্গে বাঁধার পর ডলির শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধর করা হয়। এতে ডলি গুরুতর আহত হন এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর গর্ভপাত হয়। সংবাদ পেয়ে নকলা থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। এ সময় পুলিশ গুরুতর অবস্থায় ডলিকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায় এবং ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে সালেহ ও তাঁর ছোট ভাইয়ের স্ত্রী লাকিকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। তবে আটক করার কিছুক্ষণ পরে ওই দুজনকে পুলিশ ছেড়ে দেয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১০ মে থেকে ১৬ মে পর্যন্ত নকলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং ১৬ মে থেকে ২২ মে পর্যন্ত জেলা সদর হাসপাতালে ডলিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। জেলা সদর হাসপাতাল থেকে ২২ মে রোগীর দেওয়া ছাড়পত্রে উল্লেখ করা হয় শারীরিক নির্যাতনের ফলে ডলির গর্ভপাত হয়েছে।
মঙ্গলবার (১১ জুন) বিকেলে ডলির স্বামী মো. শফিউল্লাহ প্রথম আলোর কাছে অভিযোগ করেন, জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে তাঁর ভাই-ভাবীরাসহ তাদের ভাড়াটে লোকজন নির্যাতন করে তাঁর স্ত্রীর গর্ভের সন্তান নষ্ট করেছেন।
শফিউল্লাহর বড় ভাই নেছার উদ্দিন ডলিকে গাছের সঙ্গে বাঁধার কথা স্বীকার করেন। তবে ডলিকে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, শফিউল্লাহ ও ডলি তাঁদের সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য এ ধরনের অভিযোগ করেছেন।
নকলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী শাহনেওয়াজ বলেন, জমি নিয়ে ভাইদের মধ্যে বিরোধ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামার আশঙ্কার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়ে দুপক্ষকে শান্ত করা হয়েছিল। তবে ঘটনার দিন গৃহবধূকে নির্যাতনের বিষয়ে কেউ অভিযোগ করেনি। তবে আজ বুধবার ডলি খানম থানায় মামলা করেছেন। ইতিমধ্যে এজাহারভুক্ত আসামি লাকি আক্তারের বড়বোন নাসিমা আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।
এ ব্যাপারে পিবিআই, জামালপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সীমা রাণী সরকার আজ বুধবার বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, আদালত থেকে আজ তারা মামলার কাগজপত্র পেয়েছেন। তদন্ত করে দ্রুত আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
ডলিকে নির্যাতনের ঘটনায় ধারণ করা ভিডিও চিত্রের আংশিক প্রকাশ পেয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। ভিডিওতে দেখা যায় ডলিকে দুটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। নকলা, শেরপুর, মে ১২। ছবি: সংগৃহীত

সোয়া ৫ লাখ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন আজ: করের আওতা বাড়ছে

নতুন অর্থবছরের জন্য প্রায় সোয়া পাঁচ লাখ কোটি টাকার বাজেট পেশ হবে আজ। বাজেটে করের আওতা বাড়ানো, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, পুঁজিবাজারে প্রণোদনা, সঞ্চয়পত্রে উৎসে কর বৃদ্ধি, বেকারদের জন্য ঋণ তহবিল, কৃষকের জন্য পরীক্ষামূলক বীমা প্রকল্প, প্রবাসীদের জন্য বীমা সুবিধার ঘোষণা দেবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন উপলক্ষে ইতিমধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছে সংসদ সচিবালয়। বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার। এ বাজেট পাস হবে আগামী ৩০শে জুন। চলতি  অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে প্রস্তাবিত বাজেট ১২.৬১ ও সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১৮.২২ শতাংশ বড়।
সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, আজ বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের মূলতবি অধিবেশন শুরু হবে। এটি দেশের ৪৮তম, আওয়ামী লীগ সরকারের ২০তম ও অর্থমন্ত্রী হিসেবে আ হ ম মুস্তফা কামালের প্রথম বাজেট।
বাজেট বক্তৃতায় এবার ডিজিটাল ডিসপ্লের সঙ্গে যুক্ত হবে একটি ভিডিও চিত্র। ভিডিও চিত্রে বর্তমান সরকারের সামগ্রিক সাফল্য তুলে ধরা হবে। তার আগে সংসদ ভবনে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন করা হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর তা প্রেসিডেন্ট অনুমোদন করবেন। এদিন সংসদ ভবনে উপস্থিত থাকবেন  প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ।
অর্থমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাজেট বক্তৃতার নামকরণ করা হয়েছে, ‘সমৃদ্ধির সোপানে বাংলাদেশ, সময় এখন বাংলাদেশের, সময় এখন আমাদের।’ বাজেট পেশের দিন বক্তৃতাসহ ১২টি বাজেট ডকুমেন্ট সংসদ সদস্যের হাতে দেয়া হবে। আগামীকাল শুক্রবার বিকাল ৩টায় বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী গণমাধ্যমের মুখোমুখি হবেন বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। অন্যান্য বারের চেয়ে এবারের বাজেট বক্তৃতা অনেকটাই সংক্ষিপ্ত হবে। যার আভাস অর্থমন্ত্রী আগেই দিয়েছিলেন। সূত্র জানায়, অর্থমন্ত্রী ইতিমধ্যে বাজেটের সবকিছু চূড়ান্ত করেছেন। বাজেটের সব ডকুমেন্ট ছাপা হয়েছে। বাজেট বক্তৃতার বই ছাপার কাজ শেষ পর্যায়ে। আজ সকালেই তা পৌছে যাবে সংসদ সচিবালয়ে। অধিবেশন শুরুর আগে তা পৌঁছে দেয়া হবে এমপিদের টেবিলে।
সংসদে ছিলেন অর্থমন্ত্রী:
কয়েক দিন জ্বরে ভোগার পর গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে যান ৭২ বছর বয়সী অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে রাতে তিনি হাসপাতালেই থেকে যান। সংসদে বাজেট পেশের দু’দিন আগে অর্থমন্ত্রীর অসুস্থতার খবরে উদ্বেগ তৈরি হলেও গতকাল বুধবার বিকেলে তিনি সংসদ অধিবেশনে যোগ দেন। বাজেট প্রস্তাবনা উত্থাপনে তিনি ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছেন বলে মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে।
সূত্র জানায়, আসন্ন বাজেটে যেসব খাতে ব্যাপক সংস্কারের প্রস্তাব করা হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- করের আওতা বাড়ানো, ব্যাংকিং খাত, পুঁজিবাজার, সঞ্চয়পত্র ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো উদ্যোগ থাকবে বেকারদের জন্য ঋণ তহবিল (স্ট্যাট আপ ফান্ড)। এ তহবিল থেকে স্বল্পসুদে সহজ শর্তে ঋণ নিয়ে ব্যবসা কবতে পারবেন বেকাররা। এ ছাড়া কৃষকের জন্য ‘পাইলট প্রজেক্ট’ হিসেবে চালু করা হবে শস্যবীমা। প্রাথমিকভাবে বেছে নেয়া হবে একটি জেলাকে। এ ছাড়া নতুন উদ্যোগের মধ্যে থাকছে প্রবাসীদের জন্য বীমা সুবিধা।
প্রথম বাজেট প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, আগামী বাজেট এমনভাবে প্রণয়ন করা হবে যা সাধারণ মানুষকে স্পর্শ করবে। নানা ধরনের জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ থাকবে। নতুন করে কারও ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হবে না। তবে করের আওতা বাড়ানো হবে। বাজেট হবে এক বছরের আয় ও ব্যয়ের হিসাব।
করের বোঝা নয় আওতা বাড়ছে: নতুন বাজেটে ভ্যাট খাতে বড় সংস্কার হবে। আগামী ১লা জুলাই থেকে বহুল আলোচিত ভ্যাট আইন কার্যকর করা হবে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে জনগণের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে করের আওতা বাড়ানো হচ্ছে। সেজন্য নতুন করে ৮০ লাখ করদাতা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়া হবে। বর্তমানে কর দিচ্ছে দেশে এমন লোকের সংখ্যা ২০ লাখ। ফলে করের আওতায় ১ কোটি লোককে আনা হবে। করের আওতা বাড়াতে সারাদেশে জেলা ও উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৯ লাখ হাট-বাজারের করযোগ্য ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে এর আওতা বাড়ানো হবে। এছাড়া দেশব্যাপী করযোগ্য হলেও যারা কর দিচ্ছেন না, তাদের শনাক্ত করে করের আওতায় আনা হবে।
সঞ্চয়পত্র: প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে করের হার বাড়ানো হতে পারে। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে। বর্তমানে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রাখা হয়। গ্রাহকেরা যখন সঞ্চয়পত্রের মুনাফার টাকা উঠিয়ে নেন, তখন উৎসে কর কাটা হয়। এর আগে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটা হতো। সঞ্চয়পত্র গ্রাহকদের কিছুটা স্বস্তি দিতে ২০১৬ সালের পর এই হার ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। এবারের বাজেটে তা আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেয়া হতে পারে। বর্তমানে পাঁচ ধরনের সঞ্চয়পত্র আছে। সঞ্চয়পত্রে বার্ষিক গড় সুদের হার সাড়ে ১১ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ২৭ হাজার কোটি টাকা নিতে চায় সরকার। মূলত বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে থাকে।
প্রবাসীদের বীমার আওতায় আনার উদ্যোগ: এবারের বাজেটে আরেকটি নতুন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সেটি হলো- প্রবাসীদের জন্য বীমা সুবিধা। বর্তমানে বিদেশে প্রায় ১ কোটি প্রবাসী রয়েছে। এছাড়া প্রতিবছর নতুন করে ৮ থেকে ৯ লাখ মানুষ বিদেশে যাচ্ছে। এদের বীমার আওতায় আনা হবে। বিভিন্ন ঝুঁকির কারণে তাদের বীমার আওতায় আনা হচ্ছে।
বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী ও আমার গ্রাম আমার শহর: আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী পালনের বিশেষ দিকনির্দেশনা থাকছে। ২০২০ সালের ১৭ই মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী। এরই মধ্যে সরকার ২০২০ সালের ১৭ই মার্চ থেকে ২০২১ সালের ১৭ই মার্চ পর্যন্ত বছরব্যাপী ‘মুজিব বর্ষ’ ঘোষণা করেছে। আগামী ১৭ই মার্চের আগে এটি শেষ বাজেট হওয়ায় এই বাজেটে বেশকিছু নতুন উদ্যোগ নেয়া হবে, যেন বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী যথাযথভাবে পালন করা যায়। এছাড়া আগামী বাজেটে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ নামে আরেকটি নতুন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ প্রকল্পের আওতায় গ্রামে ইন্টারনেট, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ নানা ধরনের নাগরিক সেবা পৌঁছে দেয়ার জন্য আগামী অর্থবছরে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হবে।
বাড়ছে সামাজিক সুরক্ষা খাতের আওতা: আগামী বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হচ্ছে। নতুন করে প্রায় ১৩ লাখ গরিব মানুষকে নতুনভাবে এ সুরক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে। এতে সুবিধা পাবেন প্রায় ৮৯ লাখ গরিব মানুষ। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাজেটে ৫ হাজার ৩২১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।
ব্যক্তিশ্রেণীর আয়কর সীমা ও করপোরেট কর অপরিবর্তিত থাকছে: বর্তমানে ব্যক্তিশ্রেণীর আয়কর সীমা ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি বছরে এই পরিমাণ অর্থ আয় করলে তাকে কোনো আয়কর দিতে হয় না। গত চার বছর ধরে ব্যক্তি আয়কর সীমা একই আছে। আগামী অর্থবছরেও তা অপরিবর্তিত থাকছে। অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরে করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানো হয়েছে। আগামী অর্থবছরে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও তালিকা বহির্ভূত করপোরেট কর আড়াই থেকে ৫ শতাংশ কমানোর জন্য ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। তবে আগামী বাজেটে করপোরেট কর অপরিবর্তিত থাকছে বলেই জানা গেছে।
বাজেটে আয়: প্রস্তাবিত বাজেটের চূড়ান্ত আকার ধরা হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এটি জিডিপির ১৮.১ শতাংশ। এতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। ৪ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা বৈদেশিক অনুদানসহ আয় হবে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে আয় ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১১ শতাংশ। এনবিআর বহির্ভূত রাজস্ব আয় ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫ শতাংশ। আর কর বর্হিভূত রাজস্ব আয় ৩৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। এটি জিডিপির ১.৩ শতাংশ। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। আগামী বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে ৩৮ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা।
বাজেটে ব্যয়: বাজেটে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১০ হাজার ২৬২ কোটি টাকা, উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ২ লাখ দুই হাজার ৭২১ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন করা হয়েছে। এছাড়া ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে ৫৭ হাজার ৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধে ৫২ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা এবং বিদেশ থেকে নেয়া ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে ৪ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা।
বাজেটে ঘাটতি: আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ (অনুদানসহ) ১ লাখ ৪১ হাজার ২১২ কোটি টাকা। বৈদেশিক অনুদান বাদে ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। মোট ঘাটতি বাজেটের পরিমাণ ২৭.৭৯ শতাংশ এবং তা জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যেই থাকছে। এই ঘাটতি মোকাবিলায় বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হবে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। ২৭ হাজার কোটি টাকা নেয়া হবে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে এবং অন্যান্য উৎস থেকে নেয়া হবে ৩ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হয় ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা। ফলে আগামী অর্থবছরে ঋণের পরিমাণ বাড়ছে ৫ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। আর সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে নেওয়া হয় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।
আগামী বাজেটে জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি: আগামী বাজেটে ৮.২০ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য ধরা হয়েছে। চলতি অর্থবছর ধরা হয় ৮.১৩ শতাংশ। এছাড়া, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম কম থাকবে। এদিকে নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৫.৫ শতাংশ।
জিডিপির আকার: চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে জিডিপির আকার প্রাক্কলন করা হয়েছিল ২৫ লাখ ৩৭ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই অর্থবছরজুড়ে দেশে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হবে, তার আর্থিক মূল্য হবে এটি। সংশোধিত বাজেটে জিডিপির আকার কমিয়ে ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ১৭৭ কোটিতে নামানো হয়। নতুন অর্থবছরের জন্য আকার প্রাক্কলন করা হচ্ছে ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা।
বাড়ছে ভর্তুকি: আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও ঋণ খাতে বরাদ্দ বাড়ছে। এসব খাতে চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বরাদ্দ ছিল ৩৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ বরাদ্দ ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা বেড়ে হচ্ছে ৫০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার থেকে এই অধিবেশন শুরু হয়েছে, যা আগামী ১১ জুলাই শেষ হবে।

পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের নিরিখে আগামী বাজেট by ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের মতে, ‘জ্ঞানের উন্মেষ ঘটে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে, এরপর তৈরি হয় উপলব্ধি আর তা শেষ হয় যুক্তি দিয়ে। যুক্তির ঊর্ধ্বে কিছুই নেই’। গত আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে আমি জাতীয় বাজেট বিশ্লেষণে সক্রিয়ভাবে যুক্ত আছি। আর তা করতে গিয়ে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে অনেক যুক্তিযুক্ত বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তবে সাধারণত: সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে তেমন যৌক্তিক সাড়া পাইনি। এবার দুই ধাপ (কান্টের মতে) পিছিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি মানুষের ইন্দ্রিয়কে উদ্দীপ্ত করলে যোগাযোগ আরও কার্যকর হয় কি না, তা বোঝার জন্য।
প্রাত্যহিক জীবনে পঞ্চ ইন্দ্রিয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের সার্বিক উপলব্ধি তৈরিতে একটি ইন্দ্রিয় অন্যটির ওপর নির্ভরশীল।
পঞ্চ ইন্দ্রিয়গুলোর অনুক্রমের সমানুতার বিষয়ে কোনো সর্বসম্মত মতামত না থাকলেও, দর্শনেন্দ্রিয় বা চক্ষু সর্বোচ্চে অবস্থান করে। 
তাই প্রথমেই দেখা যাক, জাতীয় বাজেট নিয়ে আমাদের দর্শনেন্দ্রিয় কি বলে? আমি মনে করি, এটা হলো জাতীয় বাজেটের আর্থিক কাঠামো। যা নির্ধারিত হয় সরকারের আয়, ব্যয় ও ঘাটতির ওপর ভিত্তি করে। গত এক দশক ধরে বাংলাদেশ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখলেও, পদ্ধতিগতভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর ও কর-বহির্ভূত রাজস্ব সংগ্রহে ব্যর্থ হয়েছে। জিডিপির অনুপাতে দেশের মোট রাজস্বের পরিমান বিশ্বে সর্বনিম্ন দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম! উপরন্তু, প্রত্যক্ষ  করের পরিমাণ মোট রাজস্বের এক-চতুর্থাংশ মাত্র এবং এই কর আদায়ের গতি উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। ভ্যাট সংক্রান্ত নতুন আইনের কার্যকর প্রয়োগ অবশ্যই এক্ষেত্রে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে যোগ হবে।
এ অবস্থায় নিজস্ব উদ্বৃত্ত রাজস্ব দ্বারা উচ্চাকাঙ্ক্ষী বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অর্থায়ন সরকারের পক্ষে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। সৌভাগ্যক্রমে, এডিপি বাস্তবায়ন এখন পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার নিচে রয়েছে। ফলে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এডিপির আওতাধীন প্রকল্পগুলোর গুণগত মান ও বাস্তবায়ন প্রতি বছরই আমাদের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। বর্তমানে, বেতন ও ভাতা খাতে সরকারের ব্যয় পৌনপুনিকভাবে অন্যান্য খাতের চেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বাজেট ঘাটতি কীভাবে সামাল দেওয়া হয়? সরকার প্রতি বছরই অভ্যন্তরীণ ঋণের জন্য উচ্চ সুদের সঞ্চয়পত্র এবং উচ্চ সুদের বৈদেশিক ঋণের দ্বারস্থ হচ্ছে, যদিও বিদেশি অনুদান ও অল্প সুদে ঋণ নেওয়ার সুযোগ বিদ্যমান। সরকারের ঋণের বোঝা যে বাড়ছে তার প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তাই এটা পরিষ্কার যে দীর্ঘ মেয়াদে জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য যে শক্তিশালী আর্থিক কাঠামো দরকার তা ক্রমশই দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাই আগামী বাজেটে আর্থিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য সরকার বিশ্বাসযোগ্য কী প্রস্তাব দেয়, আমরা তা দেখার অপেক্ষায় আছি।
আসন্ন বাজেটকে অনুধাবনের জন্য আমি দ্বিতীয় যে ইন্দ্রিয়ের কথা বলবো তা হলো- সাউন্ড বা শব্দ। যদিও এক্ষেত্রে সাউন্ড বা শব্দের অর্থ হলো কোলাহল, মিউজিক বা সংগীত নয়। আর ব্যাংকিং খাত এবং পুঁজিবাজার থেকে সৃষ্টি হচ্ছে উচ্চস্বরের সেই কোলাহল। ডেব্‌ট মার্কেট বা ঋণবাজার এবং ইকুইটি মার্কেট উভয়েই ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় রয়েছে যা আভ্যন্তরীণ পর্যায়ে বেসরকারি বিনিয়োগে হতাশাজনক পারফরমেন্সের ক্ষেত্রে প্রধান কারণগুলোর অন্যতম। গত চার বছর ধরে জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে বেসরকারি বিনিয়োগের হার স্থবির হয়ে আছে। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের চিত্রও নিষ্প্রভ। ক্রমবর্ধমান ঋণ খেলাপির মধ্যেও সম্প্রতি সুদের হার নিয়ে সরকার যে নয়-ছয় করলো, তাতে এই খাতের মূল সমস্যা, ত্রুটিপূর্ণ শাসন ব্যবস্থা মোকাবেলা করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারকে সঠিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে, প্রথাগত আর্থিক প্রণোদনার বাইরে, আসন্ন বাজেটে সরকার নীতিগত কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা আমরা দেখার অপেক্ষায় রইলাম।
দর্শন ও শ্রবণেন্দ্রিয়ের আপেক্ষিক গুরুত্বের বিপরীতে, অবশিষ্ট তিনটি ইন্দ্রিয়- যেমন স্পর্শ, স্বাদ ও ঘ্রাণের ক্রম সর্ম্পকে (গুরুত্বের বিবেচনায়) সর্বসম্মত কোন মতামত নেই। যাহোক, আমি উপরে উল্লিখিত ক্রম অনুসারেই বলছি।
আগামী বাজেটে যে খাতে সরকারের সূক্ষ্ম স্পর্শের প্রয়োজন তা হলো বহির্খাত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহ থাকা সত্ত্বেও আমদানির উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য নেতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। সরকারের লেনদেনের ভারসাম্য ও চলতি হিসাব উভয়ই নিম্নগামী। আর আগেও বলেছি, সরকারের ঋণভার যে বাড়ছে তার পূর্বলক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ার লক্ষণও পরিষ্কার। সে জন্য টাকার বিনিময় হার চাপের মুখে আছে। মুদ্রা অবমূল্যায়নেরও প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতির চিন্তা করে সরকার টাকার মান না কমিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশি ও রপ্তানিকারকদের আর্থিক প্রণোদনা দিতে পারে। ব্যাপারটা হলো, ব্যালান্স অব পেমেন্ট নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে তাতে সরকারকে সূক্ষভাবে মোকাবেলা করতে হবে। বাজেটে সরকার এই বিষয়ে কী নীতি গ্রহণ করে তার মধ্য দিয়েই স্পর্শেন্দ্রিয়ের ব্যাপারটা বোঝা যাবে।
উৎপাদনশীল খাতের জন্য সরকার কী প্রস্তাব পেশ করে তার মধ্য দিয়েই আগামী বাজেটের স্বাদ বোঝা যাবে; বিশেষ করে দেশীয় বাজারভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সরকার কী উদ্যোগ নেয়, তা দেখে ব্যাপারটা বোঝা যাবে। চলতি বছরে দুটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রথমত, পাট খাতের দুরাবস্থার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রায়াত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্থিতিশীল অবস্থার প্রকাশ পেয়েছে। এক্ষেত্রে, আসন্ন বাজেট কি পুঁজি সরবরাহের বাইরে উদ্ভাবনী কোন কর্মসূচী প্রস্তাব করবে? দ্বিতীয়ত, অতি অবহেলিত কৃষি খাত, যেখানে কৃষকেরা ধানের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তাদের জন্য সরকার কী করে। এখানেও নতুনত্বের দরকার। বিপুল পরিমানে ও অধিক কার্যকরভাবে ধান কেনার প্রতিশ্রুতির বাইরেও বাজেটে কি বাজার ব্যবস্থা কৃষকের অনুকূলে আনার কোনো কার্যকর প্রস্তাব দেয়া হবে?
পরিশেষে আসা যাক, সর্বশেষ ইন্দ্রিয়ে। আগামী বাজেট কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হয় তা দিয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে বাজেট সুগন্ধ না কটু গন্ধযুক্ত। সামগ্রিক মানব উন্নয়ন সূচকের প্রেক্ষাপটে প্রধান উদ্বেগের বিষয় হলো শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব। এছাড়াও আয় ও সম্পদের বৈষম্য বেড়ে চলছে, যার ফলাফল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার ঘাটতিতে সুস্পষ্ট। এখন দেখার বিষয়, স্বাস্থ্য বাজেট জিডিপির ১ শতাংশ ও শিক্ষা বাজেট জিডিপির ২ শতাংশের কোটা থেকে বেরোতে পারে কিনা? সার্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কোন অগ্রগতি হয় কি না, অনেকে আবার তাও দেখতে চাইবেন।
দেশের অর্থনীতিতে বিদ্যমান নানা চ্যালেঞ্জের কারণে আমাদের উচ্চ মধ্যম-আয়ের দেশ হওয়ার যাত্রাপথ বন্ধুর হয়ে যেতে পারে, মসৃণ ও টেকসই উত্তরণ ব্যাহত হতে পারে। এমনকি পঞ্চেন্দ্রিয়-নির্ভর একটি জাতীয় বাজেটের পক্ষেও তা করা সম্ভব হবে না, যদিও অনেকে এ নিয়ে আমার সঙ্গে তর্ক করতে পারেন। পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে যা অনুভব করছি তার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, আমাদের ব্যাপক সংস্কারের দিকে যেতে হবে। এই অপশাসনের যারা অন্তর্নিহিত সুবিধাভোগী, তাদের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে এই সংস্কার প্রয়োজন। এর জন্য, আমাদের নতুন অর্থমন্ত্রী এ ব্যাপারে কী ‘ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের’ পরিচয় দেন, তা দেখার জন্য রহস্যোপন্যাস পাঠের মতো অধীর আগ্রহ নিয়ে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
লেখক: সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি), ঢাকা

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিথ্যাচার করছে মিয়ানমার

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ‘মিথ্যাচার’ করছে বলে অভিযোগ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। বুধবার রাষ্ট্রীয়    অতিথি ভবন পদ্মায় এক কূটনৈতিক ব্রিফিং শেষে মন্ত্রী এ অভিযোগ করেন। বলেন, মিয়ানমার বলেছে, বাংলাদেশের কারণে নাকি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দেরি হচ্ছে। এটা মিথ্যাচার। তাদের ধারাবাহিক প্রোপাগাণ্ডার অংশ। প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ এক পায়ে খাড়া উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, তারা তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে রাখাইনে এখনও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করেনি। আমরা প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক পর্যন্ত আশাবাদী ছিলাম, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সেখানে তারা পরিস্থিতি উন্নয়নে এবং প্রত্যাবাসনের জন্য কোন কিছুই করছে না। এ অবস্থায় আমরা কূটনীতিক এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের বলেছি, আপনারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়ান।
আমরা এ-ও বলেছি, সেখানে কেবল রোহিঙ্গা মুসলমানরা আক্রান্ত হয়। মানবতা আক্রান্ত। তারা মাত্র দুটি গ্রাম দেখিয়ে বলছে সব ঠিক আছে এটা্‌ও মিথ্যাচার।
আমরা স্বার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোকে বলেছি, মানবতার প্রতি যদি আপনাদের নূন্যতম দরদ থাকে তাহলে মিয়ানমারের ওপর চাপ দিন। তাদের মিথ্যাচারে কান না দিতেও অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী। রোহিঙ্গা পরিস্থিতির সর্বশেষ আপডেট জানাতে গতকাল ওই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে সরকার। এতে পররাষ্ট্র মন্ত্রী ছাড়াও সরকারের সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর দমন অভিযান শুরুর পর ২০১৭ সালের অগাস্ট থেকে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তার আগে গত কয়েক দশকে এসেছে আরও চার লাখ রোহিঙ্গা। মোট ১১ লাখ রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে রয়েছে। মন্ত্রী বলেন, তারা এই সংখ্যা নিয়েও মিথ্যাচার করছে। বলছে, ৫ লাখ রোহিঙ্গা না-কী বাংলাদেশে এসেছে! ’১৭ সালের আগস্টের আচমকা রোহিঙ্গা ঢলের পর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই করে। চুক্তি মতে, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ওই প্রত্যাবাসন শুরুর কথা থাকলেও তা পিছিয়ে গত নভেম্বরে নেয়া হয়।
এ সময়ে রাখাইন প্রস্তুত করার কথা বলা হয়। কিন্তু সেটিও হয়নি। যদিও বাংলাদেশের তরফে সব রকম প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল। ওই সময়ে রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে রোহিঙ্গাদের মনে আস্থা পুণঃপ্রতিষ্ঠিত না হওয়ায়, বিশেষ করে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা থাকায় তারা কেউ ফিরে যেতে রাজি হয়নি। এটিও অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রত্যাবাসন ঝুলে যাওয়ার অন্যতম কারণ। গত মে মাসের সমাপনীতে জাপানে অনুষ্ঠিত ‘ফিউচার অব এশিয়া সম্মেলনের একটি সেশনে মিয়ানমারের একজন মন্ত্রী অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের অসহযোগিতায় রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তারা প্রস্তুত কিন্তু বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাচ্ছে না। ওই সম্মেলনে সরকার প্রধানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ অংশ নিয়েছিল। মিয়ানমারের ওই ‘মিথ্যাচার’ এর ব্যাখ্যা দিতেই গতকাল বিদেশি কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে ব্রিফিং করা হয়। ব্রিফিং শেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রী উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, এটা ‘ডাহা মিথ্যা’।
প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার কথা ছিল। কিন্তু ৮০০ গ্রামের মধ্যে মাত্র দুটির পরিস্থিতি ভালো দেখিয়ে মিয়ানমার বলছে, সেখানে কোনো সমস্যা নেই। মন্ত্রী বলেন, তারা যে ‘কথা রাখেনি’ সেটাই আমরা দুনিয়াকে জানিয়েছি। মিয়ানমার বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে ‘মিস ইনফরমেশন’ ছড়ায় অভিযোগ করে মন্ত্রী বলেন, তারা আমাদের প্রতিবেশী। আমরা রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই। কূটনীতিকদের জবাব প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, তারা (বিদেশি কূটনীতিক) আমাদের বলেছেন যে, তারা আমাদের সাথে আছেন। আমরা তাদেরকে বলেছি, মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়ান, যাতে তারা সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতে বাধ্য হয়। এতে প্রায় সবাই একমত পোষণ করেছেন বলেও দাবি করেন মন্ত্রী। এ সময় বাংলাদেশে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি সুদীপ্ত মুখার্জি সাংবাদিকদের বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। আমরা বলেছি, বাংলাদেশের পাশে আছি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ভারত, কানাডা, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন,ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা ব্রিফিংয়ে অংশ নেন।

‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’ কার্যকরের চেষ্টা ঘোর অশনি সঙ্কেত: ড. সাইফুল্লাহ

মুসলিমদের ব্যক্তিগত আইনের পক্ষে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পারসনাল ল বোর্ড-এর বিক্ষোভ (ফাইল ফটো)
ভারতে ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’ কার্যকর করার চেষ্টাকে ‘ঘোর অশনি সঙ্কেত’ বলে মন্তব্য করেছেন পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কোলকাতার আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক ড. সাইফুল্লাহ। গত শুক্রবার রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ওই মন্তব্য করেছেন।
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করার দাবিতে এক জনস্বার্থ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার দিল্লি হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন কমিশনকে নোটিশ জারি করেছে। 
আগামী ৮ জুলাই ওই আবেদনের পরবর্তী শুনানির আগে কেন্দ্রীয় সরকারকে নোটিশের জবাব দিতে হবে। বিজেপি নেতা ও আইনজীবী অশ্বিনী উপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে আদালতে ওই আবেদন করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. সাইফুল্লাহ বলেন, ‘বিষয়টি অনেকদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে। সংবিধানে এরকম একটা বক্তব্য বলা হয়েছে যে অভিন্ন দেওয়ানি আইন আগামীদিনে চালু হবে যা প্রত্যাশিত। কিন্তু সংবিধানের সদর্থক দিক আমরা আজকে আর কতটুকু গ্রহণ করছি তা নিয়ে আমাদের ঘোর সংশয় আছে। সেজন্য বিষয়টাকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক মেরুকরণে  নিয়ে যেতে চাচ্ছি। ভারতের বহু ভাষা, বহু জাতির যে ঐতিহ্য তা প্রশ্ন চিহ্নের মুখোমুখি হবে এ ধরণের আইন প্রবর্তিত হলে তা আমরা খুব ভালো করেই জানি। আর জানি বলেই দীর্ঘদিন এটা নিয়ে সেভাবে নাড়াচাড়া করেনি। কিন্তু কখনও কখনও এ নিয়ে খুব মাথাব্যথা হয় এবং এখনকার পরিবর্তিত যে রাজনৈতিক প্রেক্ষিত তার সাপেক্ষে বিশেষত সদ্য যে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডার মধ্যে ওই ইস্যুটি রয়েছে। এই অবস্থায় একজন আইনজীবী যখন এটাকে চাচ্ছেন তখন সেটাকে আমাদের কাছে ‘ঘোর অশনি সঙ্কেত’ বলে মনে হয়। আমরা মনে করছি যে এটার মধ্যে স্বচ্ছ ভারত, আগামীদিনের স্বপ্নের ভারত গড়ার চেয়েও রাজনৈতিক মেরুকরণের লক্ষ্যটাই বোধ হয় বড় হয়ে উঠছে এবং একটা সম্প্রদায় একটা সমাজ আরও বেকায়দায় পড়ুক এবং তাদেরকে অস্বস্তির মধ্যে  রাখাই বোধ হয় এধরণের আবেদনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে আমার মনে হয়। এক্ষেত্রে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারক রয়েছেন নিশ্চয় তারা বিষয়টি নিয়ে ভাববেন। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে কী হলফনামা দেয়া হয় বা কী বক্তব্য উপস্থাপন করা হয় সেটার দিকে লক্ষ্য রাখব।’ 
দিল্লি হাইকোর্টে এক জনস্বার্থ আবেদনে বলা হয়েছে, দেশের পারস্পরিক ঐক্য,  ভ্রাতৃত্ব ও জাতীয় অখন্ডতাকে উন্নীত করার জন্য একই নাগরিক বিধি বাস্তবায়ন করা জরুরি। আবেদনকারী বলছেন, সংবিধানের ১৪, ১৫ ও ৪৪ ধারায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।  কিন্তু সরকার এপর্যন্ত এটি তৈরি করেনি।
প্রসঙ্গত, ভারতে ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’ কার্যকর করার ইস্যু অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে আগেও টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। এরকম অবস্থায় হাইকোর্টে করা আবেদনের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার কী জবাব দেয় সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতে সর্বাধিক ব্যক্তিগত আইন ধর্মের ভিত্তিতে তৈরি। হিন্দু, শিখ, জৈন ও বৌদ্ধ হিন্দু আইনের অধীনে আসে। কিন্তু মুসলিম ও খ্রিস্টান ধর্মের নিজস্ব আইন রয়েছে। মুসলিমদের ব্যক্তিগত আইন শরীয়া ভিত্তিক। অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আইন ভারতীয় সংসদের সংবিধানের উপর ভিত্তি করে গঠিত।

ঘুষ লেনদেনকারী কেউ ছাড় পাবে না -সংসদে প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ঘুষ গ্রহণকারীর পাশাপাশি ঘুষ প্রদানকারীও ছাড়  পাবেন না। ঘুষ দেয়া ও নেয়া-দুটোই অপরাধ। তাই সকল অপরাধীকেই শাস্তি পেতে হবে। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত অর্থশালী-বিত্তশালীদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, সাধারণ ছোট-খাটো চোর ধরতে পারবে, কিন্তু বড় অর্থশালী-বিত্তশালী হলে তাদের হাত দেয়া যাবে না, ধরা যাবে না-এটা তো হয় না। আমার চোখে অপরাধী যে অপরাধীই। তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যদি কোনো ধরণের অপরাধের সঙ্গে আমাদের দলেরও কেউ সম্পৃক্ত থাকে, আমি তাদেরকে ছাড় দিচ্ছি না, ছাড় দেব না।
আর অন্য কেউ যদি করে তারা তো ছাড় পাবেই না। শাসনটা ঘর থেকেই করতে হবে,আমিও তাই করছি। এমনকি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সংস্থার কেউ এ ধরণের অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকে,সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং এটা অব্যাহত থাকবে। কারণ এটা সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বুধবার সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত ত্রিশ মিনিটের প্রশ্নোত্তর পর্বে দুইজন সংসদ সদস্য’র পৃথক সম্পুরক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জাতীয় পার্টির বেগম রওশন আরা মান্নানের সম্পুরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন,সব সময় নিজেকে বাংলাদেশের জনগণের একজন সেবক মনে করি। প্রধানমন্ত্রীত্বটা হল মানুষের জন্য কাজ করার একটা সুযোগ। আমি সার্বক্ষণিক চেষ্টা করি সেই সুযোগটুকু কাজে লাগিয়ে  দশের মানুষের কতটা উন্নয়ন করা যায়। দেশের মানুষের আর্থ সামাজিক উন্নতি কতটা করা যায়। অন্যায় অবিচারের হাত থেকে দেশের মানুষকে কীভাবে রক্ষা করা যায়? তিনি বলেন, শুধু আমাদের দেশেই নয়, সব দেশেই দেখা যায়- একটা  দেশ যখন অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়নে অগ্রযাত্রা শুরু করে তখন কিছু কিছু ক্ষেত্রে এধরনের টাউট বাটপার বা বিভিন্ন ধরনের লোক সৃষ্টি হয়। কিন্তু তাদের দমন করা এটা শুধু আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে সম্ভব না। এটা সামাজিকভাবেও করতে হবে। জঙ্গী-সন্ত্রাস-মাদক ও দুর্নীতি দমনে জনসচেনতা সৃষ্টির বিষয়টি ইতোমধ্যে গুরুত্ব দিয়েছি। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী গোয়েন্দা সংস্থা সবাইকে কাজে লাগাচ্ছি। পাশাপাশি আমাদের সমাজের বিভিন্ন মানুষ যেমন শিক্ষক, অভিভাবক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সবাইকে নিয়ে বিশিষ্টজন জনপ্রতিনিধি আছে তাদেরকে বলব-প্রত্যেকটা এলাকায় এলাকায় একটা কমিটি করা।
যাতে এ ধরণের কোন অন্যায়কে কেউ প্রশ্রয় না দেয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতি  ও  সামাজিক যে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে। সমাজ থেকে অন্যায় অবিচার দূর করতে হবে। শুধু বাহিনীর উপর নির্ভরশীল তা নয়, সামাজিকভাবে সচেতন করতে হবে। দুর্নীতি আমরা করব না, কাউকে দুর্নীতি করতে দেব না। ঘুষ যে গ্রহণ করবে, ঘুষ যে দেবে- তারা উভয়ই অপরাধী। দুইজনকেই ধরা হবে। শুধু ঘুষ নিলে তাকে ধরা হবে তা নয়, যে দেবে তাকেও ধরা হবে। কারণ ঘুষ দেয়াটাও অপরাধ।
সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তমের সম্পুরক প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা বলেন, কেউ বলতে পারবেন না সবাই একশ’ভাগ সৎ হবে। ঈদের আগে যখন দেশের বাইরে ছিলাম তখন কিছু বড় বড় জায়গায় হাত দেয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলো। এটা আমার কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য ছিল না। মনে হয় এমন অনেক বড় জায়গায় আছে যাতে হাত দিলেই হাতটা পুড়ে যাচ্ছে। যারা ধরতে যায় তারাই অপরাধী হয়ে যায়। কিছু পত্র-পত্রিকা লেখা-লেখি শুরু করে। তবে আমাদের সচেতন থাকতে হবে, কে কি বললো তাতে কান দেয়ার দরকার নেই। তিনি বলেন, খুব নামিদামী জায়গা তাদের যে কোন খারাপ কিছু হবে না বা তাদের যারা মালিক তারাও তো এ ব্যাপারে গ্যারান্ট্রি দিতে পারবে না। সেখানে কেনো পরীক্ষা করা যাবে না।
জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজীর সম্পুরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষটা ছিল পরিকল্পিত। এই ঘটনার যিনি মুল হোতা ছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল জিয়াউর রহমান তাকে খাদ্যমন্ত্রী করেছিলেন। তার পুত্র বিএনপির এখনও বড় নেতা। বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য বেগম রওশন আরা মান্নানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার টানা তৃতীয়বার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের জনগণের কল্যাণে এবং দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করা, জনসচেনতামূলক কার্যক্রম জোরদার এবং আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতি পরিধি ক্রমান্বয়ে শূণ্যের কোঠায় নামিয়ে আনার বিশেষ পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।
এর মাধ্যমে সরকার দুর্নীতির বিষ বৃক্ষ সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলে দেশের প্রকৃত আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণে একটি সুশাসন ভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন করতে বদ্ধপরিকর। সংসদ নেতা বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন ও স্বশাসিত সংস্থা। কমিশন নিরপেক্ষভাবে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্ত করে। বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন এনফোর্সমেন্ট টিমের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন দপ্তরে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করছে। এর ফলে বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতির প্রবণতা কমে আসছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/দপ্তরে দুর্নীতির মাত্রা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী দুদককে শক্তিশালী করতে গৃহীত নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে বলেন, এ বাস্তবতায় দুর্নীতি দমনে আলাদা কোন সংস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন আছে মর্মে প্রতীয়মান হয় না। এছাড়া বর্তমানে বিভিন্ন ক্যাডার সার্ভিস থেকে কমিশনের চাহিদা মোতাবেক প্রয়োজনীয় জনবল প্রেষণে দুর্নীতি দমন কমিশনে পদায়ন করা হচ্ছে। ফলে, দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশন কার্যকর অবদান রাখতে পারছে।
তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন সংস্থা। বিভিন্ন এলিট ফোর্স থেকে লোকবল নিয়ে দুর্নীতি দমনের লক্ষ্যে নতুন সংস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নেই। সরকার দলীয় সংসদ সদস্য গ্লোরিয়া ঝর্ণা সরকারের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষকরা যাতে ধানসহ সকল ধরণের ফসলের ন্যায্যমূল্য পায় এবং মধ্য স্বত্বভোগীরা যাতে কৃষকদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে সে লক্ষ্যে আমরা কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছি। তিনি জানান, কৃষকরা যাতে ধানের ন্যায্যমূল্য পায় সে লক্ষ্যে সরকার চলতি মৌসুমে দেড় লাখ মেট্রিক টন ধান কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি প্রতি কেজি ২৬ টাকা দরে ক্রয় করছে। বাজার দর বৃদ্ধির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ৩৫ টাকা কেজি দরে দেড় লাখ মেট্রিক টন আতপ চাল এবং ৩৬ টাকা কেজি দরে ১০ লাখ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। গত ২৫শে এপ্রিল ২০১৯ তারিখ থেকে সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

নোয়াবের অবস্থান: নবম সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ডের সুপারিশ কতটা বাস্তব?

সংবাদপত্রের মালিকেরা সব সময় সাংবাদিক-কর্মীদের আর্থিক সুরক্ষা ও বেতন-ভাতা দেয়ার চেষ্টা করে থাকেন। সে জন্য কষ্ট হলেও কিছু সংবাদপত্র সরকার ঘোষিত মজুরি বোর্ডের রোয়েদাদ বাস্তবায়নের চেষ্টা করে চলেছে। কিন্তু বর্তমানে সংবাদপত্রশিল্প অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে   কঠিন সময় পার করছে। এই পরিস্থিতিতে নবম সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডের অবাস্তব প্রস্তাব এই শিল্পের জন্য একটি বড় সংকট তৈরি করবে। নবম সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান এককভাবে মজুরি বোর্ডের রোয়েদাদ চূড়ান্ত করে এ সংক্রান্ত সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন। সুপারিশ চূড়ান্ত করার জন্য একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিও এ নিয়ে সম্প্রতি উদ্যোগী হয়েছে।
উল্লেখ্য, সপ্তম ও অষ্টম সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডও এভাবে একতরফাভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল। জুন ২০০৮ সালে সপ্তম মজুরি বোর্ডে মূল বেতনের ৮৯.৬% বৃদ্ধি করা হয়েছিল।
সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালে অষ্টম মজুরি বোর্ডে বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ৭৫%। যে কারণে গুটিকয়েক পত্রিকা ছাড়া অন্যরা অষ্টম মজুরি বোর্ড বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এ অবস্থায় নবম (২০১৯) মজুরি বোর্ড কমিটি ৮৫% বেতন বৃদ্ধিসহ একটি অবাস্তব সুপারিশ জমা দিয়েছে, যা বাস্তবায়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অতীতে যে গুটিকয়েক পত্রিকা মজুরি বোর্ড বাস্তবায়ন করত, তারাও এখন বাস্তবায়ন করতে পারবে না। নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) নবম মজুরি বোর্ডের রোয়েদাদ প্রস্তাব বাস্তব নয় বলে মত প্রকাশ করেছে।
সারা বিশ্বেই সংবাদপত্রের ছাপা কাগজের সংখ্যা কমছে। আমাদের দেশে ৮-১০% হারে প্রিন্ট মিডিয়ার সার্কুলেশন/বাজার সংকুচিত হচ্ছে। বেসরকারি বিজ্ঞাপন আয় বার্ষিক প্রায় ২০% হারে কমেছে। ২০১৯ সালেও সেই ধারা অব্যাহত আছে। তা ছাড়া বর্তমানে ছাপা কাগজকে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে টেলিভিশন, অনলাইন পোর্টাল, সোশ্যাল মিডিয়াসহ অন্যান্য মিডিয়ার সঙ্গে। বর্তমানে বিজ্ঞাপন বাজারের বড় এক অংশই সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন পোর্টাল, ফেসবুক ও গুগলের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে সরকারি বিজ্ঞাপনের হার অত্যন্ত কম। তারপরও সরকারের কাছে ১৫টি পত্রিকার মোট প্রায় ৮৫ কোটি টাকার বিজ্ঞাপন বিল পাওনা রয়েছে। পাশাপাশি বার্ষিক প্রায় ১০% হারে সরকারি বিজ্ঞাপন কমছে। এ ছাড়া সংবাদপত্রের প্রধান কাঁচামাল নিউজপ্রিন্টের ওপর আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট মিলে ল্যান্ডেড কস্ট হিসাবে প্রায় ২৬% পরিশোধ করতে হচ্ছে। সম্ভবত সংবাদপত্রই একমাত্র পণ্য, যার উৎপাদন খরচ পণ্যের বিক্রয় মূল্যের থেকে ৩ গুণ বেশি। বিজ্ঞাপন আয় কমে যাওয়ায় এই ঘাটতি পূরণ করে প্রতিষ্ঠান চালানো অসম্ভব পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। এ অবস্থায় নবম মজুরি বোর্ডের অবাস্তব সুপারিশ বাস্তবায়ন সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেবে। উল্লেখ্য, সরকার ঘোষিত ৪২টি শিল্পের মধ্যে কোনো শিল্পেরই বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডের মতো নয়।
সর্বশেষ দুটি সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ডের বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ১৬৫%। সর্বশেষ দুটি তৈরি পোশাক শিল্পের ওয়েজ বোর্ডে বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ ৭০%। অর্থাৎ সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডে বেতন বৃদ্ধির পরিমাণই সবচেয়ে বেশি। এরপরও ৯ম সংবাদপত্র মজুরি বোর্ড কমিটি ৮৫% বেতন বৃদ্ধির অবাস্তব প্রস্তাব করেছে।
গ্রেড    ৮ম ওয়েজ বোর্ড অনুসারে গ্রেডের শুরুর মোট বেতন (বর্তমান)
        ৯ম ওয়েজ বোর্ড অনুসারে গ্রেডের শুরুর মোট বেতন (প্রস্তাবিত)
১    ৬৭,৬৪৫    ১,১৬,০৯৫
২    ৫১,৯৮০    ৯০,০৯৫
৩    ৩৮,০৭৩    ৬৭,১১২
৪    ২৫,৪২০    ৪৪,৯৬২
৫    ২২,৫৯৫    ৩৯,৮৮৯
৬    ২০,২৩১    ৩৫,৬৭০
বর্তমান অষ্টম সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডের অধীনে সর্বনিম্ন গ্রেডের (গ্রেড-৬: পিয়ন, দারোয়ান, মালি) মোট বেতন ২০,২৩১ টাকা। যেখানে একই রকম কাজের জন্য বর্তমান সরকারি বেতন স্কেলে সর্বনিম্ন গ্রেডের (গ্রেড-২০) মোট বেতন ১৫,৩৫০ টাকা। অর্থাৎ সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডে সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতন সরকারি বেতন স্কেলের তুলনায় প্রায় ৫,০০০ টাকা বেশি। আর ব্যতিক্রম ছাড়া, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সর্বনিম্ন গ্রেডের মোট বেতন গড়ে ১০-১২ হাজার টাকার বেশি নয়। এ অবস্থায় নবম সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডে সর্বনিম্ন (গ্রেড-৬) গ্রেডের বেতন ৩৫,৬৭০ টাকা সুপারিশ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একেবারেই অবাস্তব মনে করে নোয়াব।
অষ্টম সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী একজন রিপোর্টার গ্রেড-৩-এ যোগদান করেন ৩৮,০৭৩ টাকা বেতনে। যেখানে বর্তমান সরকারি বেতন স্কেলের অধীনে সেরা ছাত্ররা একজন সিভিল ক্যাডার শুরুতে গ্রেড-৯-এ যোগদান করেন ৩৫,৬০০ টাকা বেতনে। এবং একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক শুরুতে গ্রেড-৮-এ যোগদান করে মোট বেতন পায় ৩৭,১৫০ টাকা। অর্থাৎ এখানেও সংবাদপত্র মজুরি বোর্ড অনুসারে একজন রিপোর্টার একজন সরকারি প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার চেয়ে প্রায় ২,৪৭৩ টাকা বেশি বেতন পাচ্ছেন। আর ব্যতিক্রম ছাড়া, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই লেভেলের মোট বেতন গড়ে ২৫-৩০ হাজার টাকার বেশি নয়। এ অবস্থায় নবম সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডে গ্রেড-৩-এর একজন রিপোর্টারের শুরুর বেতন ৬৭,১১২ টাকা সুপারিশ করা হয়েছে। এই বেতন দেয়া যেকোনো সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানের জন্য অসম্ভব ব্যাপার।
কেননা, সরকার সংবাদপত্রশিল্পের কর্মরত সাংবাদিকদের জন্য মজুরি বোর্ড ঘোষণা করে। আর সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব আয় বাড়িয়ে এই মজুরি বোর্ডের ব্যয়ভার বহন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বিশেষ সহায়তা ও অনুদান থাকে না। উল্লেখযোগ্য কোনো সুযোগ-সুবিধাও থাকে না। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এবং ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে চাইলেই সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠান নিজস্ব আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে পারে না।
বিবিএস ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী অষ্টম সংবাদপত্র মজুরি বোর্ড বাস্তবায়নের পর থেকে এ পর্যন্ত মোট মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ ৩৬.৩৪%। এই সময়কালে অষ্টম সংবাদপত্র মজুরি বোর্ড অনুসারে শুধু একটি করে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট হিসাব করলেও প্রায় ২৮.৮০% বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাস্তবে বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ আরো অনেক অনেক বেশি। যোগ্য কর্মীদের ধরে রাখতে বা চাকরিতে উৎসাহিত করতে অনেক সময় অতিরিক্ত বেতন বৃদ্ধি করতে হয়। তাই নবম সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডে ১০-১২%-এর বেশি বেতন বৃদ্ধি বাস্তব নয় বলে নোয়াব মনে করে।
এ ছাড়া নবম সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডে এমন কিছু বিষয় ও সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, যেগুলোও রুগ্‌ণ সংবাদপত্রশিল্পের জন্য বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। যেমন-
* সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডে গ্রেড সংখ্যা ৬। সরকারের জাতীয় বেতন স্কেলে ২০টি। ব্যাংক-বিমাসহ দেশের অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গ্রেডের সংখ্যা ১৮ থেকে ২২ পর্যন্ত। সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডে গ্রেড সংখ্যা কম থাকার কারণে প্রতিষ্ঠান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
* বাংলাদেশ শ্রম আইনের ২(১০) ধারায় প্রতি বছর চাকরির জন্য ১টি গ্র্যাচুইটির বিধান আছে। অন্যান্য শিল্পেও গ্র্যাচুইটি বছরে ১টির বেশি নেই। অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রম আইনের এই বিধানও অনুসরণ করে না। সেখানে মজুরি বোর্ডে প্রতি বছরের জন্য ২টি গ্র্যাচুইটির বিধান একটি অবাস্তব আর্থিক চাপ।
* ইনকাম ট্যাক্স অর্ডিন্যান্স ১৯৮৪ অনুযায়ী যার আয় তাকেই আয়কর বহন করার নিয়ম। কিন্তু সংবাদপত্র মজুরি বোর্ড অনুসারে সংবাদপত্রের সব সাংবাদিক ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর আয়কর সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠান থেকে দিতে হয়। সরকারিসহ অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা নিজে তার আয়কর প্রদান করেন। দেশে এমন কোনো আইন উচিত নয়, যেটা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়।
* নবম সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ডে বাড়িভাড়া দেয়া আছে ৬৫%। কিন্তু ইনকাম ট্যাক্স অর্ডিন্যান্স ১৯৮৪-এর বিধি ৩৩(এ) অনুযায়ী বাড়িভাড়া ৫০% আয়করমুক্ত। অবশিষ্ট ১৫% ব্যক্তির আয় হিসাবে ব্যক্তি খাতের আয়করের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।
* সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডে প্রতি ৩ বছর পরপর এক মাসের মোট বেতন ও ৩০ দিনের বিনোদন ছুটির বিধান রাখা হয়েছে। সরকার ঘোষিত অন্যান্য শিল্পে এই সুবিধা নেই।
* এ ছাড়া কিছু প্রান্তিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে যেগুলো বাস্তব নয় বা কেউ বাস্তবায়ন করে না, সেগুলো ওয়েজ বোর্ড থেকে বাদ দেয়া জরুরি। যেমন: দায়িত্ব ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, কারিগরি ভাতা, চক্ষু ঝুঁকি ভাতা, কেমিক্যাল পয়জনিং ভাতা, আউটফিট ভাতা, পোশাক ও ধোলাই ভাতা ইত্যাদি।
* সংবাদপত্র সেবা শিল্প হওয়া সত্ত্বেও এর করপোরেট ট্যাক্স ৩৫%।
* সংবাদপত্রশিল্প ভ্যাট অ্যাক্ট ১৯৯১-এর শিডিউল-২ (অব্যাহতিপ্রাপ্ত সেবার তালিকায়) তে থাকার পরও ১৫% ভ্যাট দিতে হচ্ছে।
* ভ্যাট অ্যাক্ট ১৯৯১-এর ৫৩(কে) অনুসারে সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন আয়ের ওপর ৪% টিডিএস/এআইটি দিতে হচ্ছে। অপরদিকে কাঁচামাল আমদানি পর্যায়ে উৎসস্থলে ৫% টিডিএস দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে ৯% টিডিএস দিতে হচ্ছে। অথচ অনেক সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশই ৯% হয় না।
বিগত সপ্তম ও অষ্টম ওয়েজ বোর্ডে নোয়াব সদস্যরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করলেও নোয়াব সদস্যদের অতীত অভিজ্ঞতা ভালো নয়। সব মজুরি বোর্ডেই উল্লিখিত বিষয়গুলো নোয়াব থেকে তুলে ধরা হয়েছে। বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা না করে প্রায় একতরফাভাবে মজুরি বোর্ড ঘোষণা করা হয়েছে। নোয়াবের প্রত্যাশা ছিল, এবার নবম মজুরি বোর্ড প্রণয়নের সময় অন্তত মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম আলোচনার মাধ্যমে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত নবম মজুরি বোর্ডের ক্ষেত্রেও এই অভিজ্ঞতা ভিন্ন হয়নি।
সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডে মালিকপক্ষের মতামত বিবেচনায় না নেয়ায় মজুরি বোর্ড শুধু বেতন-ভাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে, যা দিন দিন এই শিল্পকে রুগ্‌ণ করছে। অবাস্তব আর্থিক চাপ সামলাতে না পেরে প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীর সংখ্যা কমানো, ওয়েজ বোর্ড না দেয়া বা আংশিক দেয়া এবং সর্বোপরি প্রতিষ্ঠান বন্ধের পর্যায়ে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
সর্বশেষ (০৩/০৬/২০১৯) চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের নিরীক্ষা শাখার প্রতিবেদন অনুযায়ী সারা দেশে মোট ৬৮৪ (ঢাকা ৩৪৬ + মফস্বল ৩৩৮)টি পত্রিকার মধ্যে ১৫৮ (ঢাকা ১০৯ + মফস্বল ৪৯)টি (প্রায় ২৩%) পত্রিকা অষ্টম মজুরি বোর্ড বাস্তবায়ন করেছে। যদিও এই প্রতিবেদনের সঙ্গেও বাস্তবতার কোনো মিল পাওয়া যায় না। নোয়াবের জানামতে, অল্প কিছু সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানই কেবল পুরোপুরি মজুরি বোর্ডের রোয়েদাদ বাস্তবায়ন করে।
তাই নবম সংবাদপত্র মজুরি বোর্ডের প্রজ্ঞাপন জারির পূর্বে মালিক-সাংবাদিক উভয়পক্ষের সঙ্গে আলোচনা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত রোয়েদাদ ঘোষণা দেয়া প্রয়োজন। একটি শিল্পের ভালো থাকার সঙ্গে ওই শিল্পের কর্মরত কর্মীদের ভালো থাকা নির্ভরশীল।

সাত ফাঁসির আসামির ‘আত্মসমর্পণ’- নেপথ্যে বাণিজ্য by হারুন আল রশীদ

পাবনায় গত এপ্রিলে চরমপন্থীদের জমা দেওয়া অস্ত্র
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকা অনুযায়ী গত এপ্রিলে জয়পুরহাট জেলার ৮০ জন ‘চরমপন্থী’ আত্মসমর্পণ করেছেন। তালিকাভুক্ত সাতজন ফাঁসির আসামি, যাঁরা কারাবন্দী অথবা পলাতক। আছেন সন্ত্রাসী আর মাদক ব্যবসায়ী। তাঁদের নেতা আবার জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাও।
স্থানীয় পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতারা প্রথম আলোকে বলেন, আদতে এঁদের কেউ চরমপন্থী নন। তালিকাভুক্ত কয়েকজন বলেছেন, চরমপন্থী সেজে আত্মসমর্পণ করলে ঝুটঝামেলা থাকবে না, টাকা পাওয়া যাবে—এই লোভ তাঁদের দেখিয়েছিলেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও আওয়ামী লীগের দুই নেতা। প্রথমজনই চরমপন্থী নেতা পরিচয়ে আত্মসমর্পণ করেছেন। এই নেতারা ‘আর্থিক প্রণোদনা’র বখরা নিতে তাঁদের চরমপন্থী সাজিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের সূত্রের কাছ থেকে পাওয়া তালিকাটি ধরে প্রথম আলো সরেজমিন অনুসন্ধান করেছে। এই প্রতিবেদক কথা বলেছেন জয়পুরহাটের বিভিন্ন স্তরের পুলিশ কর্মকর্তা, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নানা পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে।
যাচাই-বাছাই করে দেখা যায়, তালিকার অন্তত ২২ জন ছাত্রদল, যুবদল বা বিএনপির নেতা-কর্মী। বাদবাকি প্রায় সবাই যুবলীগ বা স্বেচ্ছাসেবক লীগ করেন, যাঁদের বেশ কয়েকজন অতীতে বিএনপি-জামায়াতের ঘরে ছিলেন।
আত্মসমর্পণের ইতিবৃত্ত
চরমপন্থী আন্দোলনে দীর্ঘকাল যুক্ত একজন রাজনৈতিক নেতা প্রথম আলোকে বলেছেন, ১৯৬৯ সালে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল লাল পতাকা) এ দেশে সমাজতন্ত্র কায়েমের জন্য চরমপন্থার সূচনা করে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে উত্তরে নওগাঁ পর্যন্ত তাদের তৎপরতা ছিল। ১৯৯৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী সরকারের কাছে তাদের একটি বড় অংশ আত্মসমর্পণ করেছিল।
বর্তমান সরকারের উদ্যোগে সর্বশেষ গত ৯ এপ্রিল ১৬ জেলার ৫৯৫ জন চরমপন্থী পাবনার শহীদ আমিন উদ্দীন স্টেডিয়ামে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তাঁদের মধ্যেই জয়পুরহাটের ৮০ জনের নাম ছিল। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র বলেছে, আর্থিক প্রণোদনা হিসেবে সরকার প্রত্যেক আত্মসমর্পণকারীকে ১ লাখ এবং দলনেতাকে ১০ লাখ টাকা দিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় কারাবন্দীদের সম্পর্কে কিছু বলা নেই। তবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলে তাঁকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার কথা। পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, আত্মসমর্পণের পর সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যাঁরা কারাবন্দী ছিলেন, তাঁদের আত্মসমর্পণস্থলে হাজির করা হয়নি।
আত্মসমর্পণ পরিকল্পনার কথা সংবাদমাধ্যমে এসেছিল এপ্রিলের গোড়ায়। মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষ বলেছে, এ পরিকল্পনার দায়িত্বে ছিল একটি গোয়েন্দা সংস্থা।
জেলা পুলিশের পদস্থ কর্মকর্তারা বলেন, আইনগতভাবে চরমপন্থীদের তালিকা তৈরি পুলিশের কাজ। কিন্তু তাঁরা শুধু কাগজপত্রে সই করেছেন। পুলিশ সুপার (এসপি) রশিদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের জানামতে, জয়পুরহাটে কোনো চরমপন্থী বা চরমপন্থীদের সংগঠন নেই। তা সত্ত্বেও আমরা ৭১ জনের একটি তালিকা পেয়েছি। সেটাই পাবনায় পাঠানো হয়েছে।’
তবে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, পাবনায় গোয়েন্দা সংস্থাটি ৮০ জনের তালিকা জমা দেয়। তখনই ফাঁসির আসামিসহ কয়েকজনের নাম ঢোকানো হয়।
জয়পুরহাটের তালিকায় সমস্যার কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানেন। তবে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘চরমপন্থীদের এই তালিকা পুলিশ করেনি। এটি করেছে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। সেই তালিকা অনুযায়ী চরমপন্থীরা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আমি সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলাম।’
মন্ত্রী বলেন, এ আত্মসমর্পণের নীতি বা প্রক্রিয়ার কিছুই তাঁর জানা নেই। তবে কারও নামে মামলা থাকলে অবশ্যই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে। এপ্রিলের গোড়ায় পুলিশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারাও বলেছিলেন, আত্মসমর্পণের পর মামলা-মোকদ্দমা খতিয়ে দেখে পুনর্বাসন করানো হবে।
ফাঁসির দণ্ড, খুনের আসামি
জয়পুরহাট পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রথম তালিকায় সাত ফাঁসির আসামির নাম ছিল না। তাঁরা হচ্ছেন সদর উপজেলার বম্বু ইউনিয়নের ওয়াজেদ আলী, আবু হাসান (ওয়াজেদের ছেলে), মহির উদ্দিন, চৈতন্য, সাফাদুল ইসলাম, আনিছুর রহমান ও মন্টু মিয়া।
যুবলীগ নেতা আবদুল মতিন হত্যা মামলায় নিম্ন আদালত তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। সদর থানা বলেছে, উচ্চ আদালতে তাঁদের আপিল মামলা চলছে। মন্টু মিয়া আগাগোড়া পলাতক, বাকিরা গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে আছেন। তাঁরা সবাই ইউনিয়ন বিএনপির নেতা ছিলেন।
আসামি ওয়াজেদ আলীর ছেলে জুয়েল রানা বলেন, ‘বাবা কখনো চরমপন্থী ছিলেন কি না, তা জানি না। এলাকার বড় ভাই মাহবুব আলম পুরো বিষয়টি দেখাশোনা করেছেন।’
একই হত্যা মামলায় মাহবুব আলম যাবজ্জীবন সাজা পেয়েছেন। তিনি এখন জামিনে আছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের নামে অনেক মামলা আছে। সরকারি দলের লোকজন বলেছেন, চরমপন্থী সেজে আত্মসমর্পণ করলে মামলা থেকে খালাস পাওয়া যাবে। সে জন্য আমরা আত্মসমর্পণ করেছি।’
আত্মসমর্পণকারীরা আওয়ামী লীগ ও বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত।
এ জেলায় কখনো চরমপন্থী ছিল না।
তালিকায় অন্তত নয়জন হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলার আসামি আছেন। তাঁদের মধ্যে আসলাম হোসেন এলাকায় সন্ত্রাসী হিসেবে সুপরিচিত। রাজীব হোসেনের নামে হত্যাসহ ডজনখানেক মামলা আছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকাভুক্ত সেবা কুমার দাসের নামে একটি হত্যাসহ ছয়টি মামলা আছে।
পুলিশের নথি বলছে, তালিকাভুক্ত অন্তত ছয়জন চরমপন্থী আদতে সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী। তাঁদের মধ্যে ইসমাইল হোসেনের নামে ১৭টি মামলা আছে।
সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, চরমপন্থী হোক বা না হোক, ফাঁসির আসামিসহ সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের দণ্ড মওকুফ বা স্থগিত অথবা বাতিল করার ক্ষমতা একমাত্র আদালতের। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মামলা উচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকলে সেখানেই এর ফয়সালা হবে। সব শেষে থাকবে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগ।
তালিকার নেপথ্যে
পাবনায় আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ১৬ জেলার ১৬ চরমপন্থী নেতা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। জয়পুরহাটে নেতৃত্ব দেন রমজান আলী, নেতা হিসেবে যিনি প্রণোদনার টাকা পান ১০ লাখ। কিন্তু এই রমজান আবার জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও বহাল আছেন। তাঁর বিরুদ্ধে থানায় অস্ত্র ও মাদক আইনে মামলা রয়েছে।
এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতারা প্রথম আলোকে বলেন, রমজান একসময় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলার চেয়ারম্যান এস এম সোলায়মান আলীর মোটরসাইকেলচালক ছিলেন। তিনি শহরের মাস্টারপাড়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সভাপতিও বটে।
জয়পুরহাট পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র নন্দলাল পার্শি আওয়ামী লীগ জেলা কমিটির সদস্য। আত্মসমর্পণকারী কয়েকজন বলেন, তিনিও লোকজন গোছানোর প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। তাঁরা বলেছেন, গোয়েন্দা সংস্থাটির লোকজনেরও সম্পৃক্ততা ছিল।
নন্দলাল পার্শি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের এলাকায় চরমপন্থী নেই। কিন্তু রমজান তাঁকে বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকারদলীয় লোকজনকে ছোটখাটো মামলা থেকে অব্যাহতি দেবে, আর্থিক সহায়তা দেবে। নন্দলাল তাই তালিকায় কিছু ছেলের নাম দিয়েছেন। রমজান আলী অবশ্য এ বিষয়ে ‘ভালো-মন্দ’ কোনো কথাই বলতে রাজি হননি।
রমজানের ভাই সেলিম বাবুর নামে একাধিক অস্ত্র মামলা আছে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মামলা থেকে রেহাই পেতে আরও তো অনেক ছেলে চরমপন্থী সেজেছে। সুতরাং তালিকায় আমার নাম থাকলে সমস্যা কী?’
রোমানুর রহমান জেলা যুবলীগের সদস্য। তাঁর নামে একটি হত্যা মামলা আছে। এলাকার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী রোমানুর বলেন, রমজান ও নন্দলাল পার্শির পরামর্শে তিনি তালিকায় নাম দেন। কিন্তু পাবনায় যাওয়ার পর জানতে পারেন তিনি ‘চরমপন্থী’। রোমান বলেন, পুরো তালিকাই ভুয়া।
তালিকাভুক্ত অন্তত দুই ব্যক্তির নামে থানায় কোনো মামলা নেই। তাঁদের একজন হচ্ছেন মুক্তা বিশ্বাস, যিনি নন্দলাল পার্শির ভাগনে। অন্যজন নুরুজ্জামান বাবু, স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মী।
ভাগনের ব্যাপারে নন্দলাল বলেন, মুক্তা রমজানের বন্ধু হিসেবে তালিকায় স্থান পেয়েছেন। আর নুরুজ্জামান বাবু বলেন, ‘আমার নেতা রমজান তালিকায় নাম দিয়েছেন। বলেছেন এক লাখ টাকা পাওয়া যাবে। তাই রাজি হয়েছি।’
টাকার জন্য চরমপন্থী সেজেছেন? নুরুজ্জামান বলেন, ‘কী করব! কষ্টে আছি, টাকার যে খুব দরকার।’
কাদামাটির মানুষ
জেলা নেতৃত্বের একাংশের অভিযোগ, সন্ত্রাসীদের ছাড় দেওয়ার এই অভিনব প্রক্রিয়া সভাপতি ও সাংসদ সামছুল আলম এবং সাধারণ সম্পাদক সোলায়মান আলীর সমর্থনপুষ্ট। সাংসদ অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সোলায়মান আলীও বলেছেন, তিনি বিশেষ কিছু জানেন না।
জয়পুরহাটের কথিত চরমপন্থীরা আত্মসমর্পণ করেন কাদামাটি সংগঠনের নেতা-সদস্য হিসেবে। স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, এটি একটি নামসর্বস্ব রাতারাতি ভুঁইফোড় ভুয়া সংগঠন।
জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি গোলাম হাক্কানীও বলেন, ‘এই জেলায় এলেমাটি, বেলেমাটি, কাদামাটি, দোআঁশ মাটি—সবই আছে। কিন্তু কাদামাটি নামের কোনো চরমপন্থী সংগঠনের নাম কোনোকালে শুনিনি।’
ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও জয়পুরহাট জেলার সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক কয়েক যুগ ধরে বাম রাজনীতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনিও একই কথা বলেন। আর বলেন, তাঁর জানামতে জয়পুরহাটে কখনো চরমপন্থীদের তৎপরতা ছিল না।

থেরেসা মের উত্তরসূরি নির্বাচন, দলের ভোটে দেশের প্রধানমন্ত্রী

যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন ১০ জন। গত সোমবার আনুষ্ঠানিক মনোনয়নপত্র জমার দিনে আলোচিত ১১ প্রার্থীর মধ্যে একমাত্র স্যাম গাইমা শেষ মুহূর্তে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন।
মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার আগেই আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট, সাবেক ব্রেক্সিট-বিষয়ক মন্ত্রী ডোমিনিক রাব, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকোক এবং পরিবেশবিষয়ক মন্ত্রী মাইকেল গোভ। এঁরা প্রত্যেকেই চূড়ান্ত তালিকায় আছেন।
অন্য প্রার্থীরা হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন, সাবেক চিফ হুইপ মার্ক হারপার, সাবেক কমন্স লিডার অ্যান্ড্রিয়া লিডসম, সাবেক কর্ম ও অবসর ভাতা-বিষয়ক মন্ত্রী এস্টার ম্যাকভি এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী রোরি স্টুয়ার্ট। এসব প্রার্থীর কেউ কেউ আজ মঙ্গলবার নিজ নিজ ইশতেহার ঘোষণা করেন। তবে প্রার্থীরা ব্রেক্সিটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে গণমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি অবস্থান তুলে ধরছেন বেশ আগ থেকেই।
ব্রেক্সিট নিয়ে দলীয় গৃহবিবাদের জের ধরে কনজারভেটিভ দলের নেতৃত্ব ছাড়েন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। যে কারণে কনজারভেটিভ দলে এই নতুন নেতা নির্বাচন। নিয়ম অনুযায়ী ক্ষমতাসীন দলের নেতাই হন প্রধানমন্ত্রী। এর ফলে নতুন নেতার কাছে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব বুঝিয়ে দেবেন মে। তাই প্রার্থীদের সামনে বিশেষ সুযোগ—শুধু দলীয় ভোটে উতরে যেতে পারলেই দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন।
তবে কনজারভেটিভ দলের নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া অত সহজ নয়। প্রথম ধাপে ১৩, ১৮, ১৯ ও ২০ জুন দলীয় আইনপ্রণেতারা ভোট দেবেন। দলটির ৩১৩ জন আইনপ্রণেতা দফায় দফায় ভোট দিয়ে প্রার্থী সংখ্যা দুইয়ে নামিয়ে আনবেন। এতে প্রতি পর্বে সবচেয়ে কম ভোট পাওয়া প্রার্থী বাদ পড়বেন। দলটির সাম্প্রতিক পরিবর্তিত নিয়ম অনুযায়ী প্রথম রাউন্ড পার হতে কমপক্ষে ১৬ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন লাগবে। আর দ্বিতীয় রাউন্ড পার হতে লাগবে ৩২ ভোট।
সর্বশেষ টিকে থাকা দুই প্রার্থী হাজির হবেন দলটির তৃণমূল সদস্যদের সামনে। সদস্যদের কাছে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি তাঁদের মুখোমুখি বিতর্কে অংশ নিতে হবে। দলটির প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার সদস্যের ভোটে নির্ধারিত হবেন নতুন নেতা। জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে ঘোষিত হবে ফলাফল।
বিবিসির বেন রাইট বলছেন, আগামী নির্বাচনে দলকে বিজয়ী করতে পারবেন, নিজেদের আসনগুলো রক্ষা করতে পারবেন, এমন প্রার্থীকেই প্রাধান্য দেবেন কনজারভেটিভ দলের আইনপ্রণেতারা। তাই দেশের নিত্য বিষয়গুলোতে নতুন প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান কী, সেটি তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না।
শুরু থেকে আলোচিত বরিস জনসন ধনীদের বড় ধরনের কর ছাড়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তুমুল বিতর্ক ছড়িয়েছেন। ২০১৬ সালের নেতা নির্বাচনে জনসনের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ানো মাইকেল গোভ এবারও তাঁর প্রতি কামান দাগিয়েছেন। জনসন এখনো গণমাধ্যম কিংবা জনগণের মুখোমুখি হাজির হননি। তাই জনসনকে ইঙ্গিত করে গতকাল সোমবার গোভ বলেন, বাঙ্কারে বসে দেওয়া অবাস্তব প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করলে ভুল হবে।

কাশ্মীরে ফের গাড়িবহরে হামলা, সিআরপিএফের ৫ জওয়ান নিহত

চার মাস আগে আক্রান্ত হওয়ার পর ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরে ফের দেশটির কেন্দ্রীয় আধা সামরিক পুলিশ বাহিনীর (সিআরপিএফ) গাড়ি বহরে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। হামলায় সিআরপিএফের পাঁচ জওয়ান নিহত ও আরো দু'জন আহত হয়েছেন।
বুধবার কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলায় টহলের সময় সিআরপিএফের গাড়িবহর আক্রান্ত হয়। আহতদের মধ্যে দেশটির পুলিশের এক পরিদর্শক ও এক বেসামরিক নাগরিক রয়েছেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, সিআরপিএফের গাড়ি বহরে হামলা চালানো দুই সন্ত্রাসীর মধ্যে একজন নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছে।
কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার কেপি রোডের কাছে ওই হামলা হয়। স্বয়ংক্রিয় রাইফেল থেকে সন্ত্রাসীরা সিআরপিএফের গাড়িবহর লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ার পাশাপাশি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
হামলায় আহতদের মধ্যে অনন্তনাগ পুলিশ স্টেশনের কর্মকর্তা আরশাদ আহমেদ রয়েছেন। তাকে চিকিৎসার জন্য শ্রীনগরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে কাশ্মীরের পুলওয়ামায় দেশটির কেন্দ্রীয় এই আদা সামরিক পুলিশ বাহিনীর গাড়িবহরে জঙ্গি হামলা হয়। এতে অন্তত ৪০ জওয়ানের প্রাণহানি ঘটে। ভারতের জাতীয় নির্বাচনের আগে হওয়া এই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
পরে কয়েকদিন পর পাকিস্তানের বালাকোটে ঢুকে জঙ্গিগোষ্ঠী জয়েশ-ই-মোহাম্মদের আস্তানায় অভিযান পরিচালনা করে ভারতীয় বিমানবাহিনী। এ নিয়ে পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিবেশি দুই দেশের মাঝে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হলেও পরে তা শান্ত হয়।

নাটক শেষে পাকিস্তানের হার

বিশ্বকাপের ১১ ভেন্যুর মধ্যে টন্টনের স্কোরিং গড় সবেচেয়ে বেশি (৬.৭৪)। সেই তুলনায় গতকাল অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহটা গণ্ডির মধ্যেই রাখতে পেরেছিল পাকিস্তানি বোলাররা। তবে পরে পাকিস্তান দেখায় ঠুনকো ব্যাটিং। শেষ দিকে দুই টেইল এন্ডারের ব্যাটে ম্যাচে নাটকীয়তা ফিরলেও শেষ রক্ষা হয়নি পাকিস্তানের। এদিন টন্টনে পাকিস্তানকে ৩০৮ রানের টার্গেট দেয় অস্ট্রেলিয়া। ৩০০ রান তাড়া করতে ব্যাট হাতে যেমন মুন্সিয়ানা দেখানোর দরকার তাতে পাকিস্তানিরা ব্যর্থ। এতে শেষ পর্যন্ত বড় ব্যবধানেই হার দেখে তারা।
বিশ্বকাপে নিজেদের চতুর্থ ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৪১ রানে জয় পায় অস্ট্রেলিয়া। ইনিংসের অর্ধেকটা শেষে জয়ের সম্ভাবনা উজ্বলই দেখাচ্ছিল পাকিস্তানের।
কিন্তু মিডলঅর্ডারে ধস নিয়ে সম্ভাবনা লোপ পায় তাদের। ২৫ ওভার শেষে পাকিস্তানের সংগ্রহ ছিল ১৩৬/২। কিন্তু পরের মাত্র ২৪ রানের ব্যবধানে চার উইকেট খোয়ায় তারা (ইমাম উল হক, মোহাম্মদ হাফিজ, শোয়েব মালিক, আসিফ আলী)। আর ২৬ বল বাকি রেখেই ২৬৬ রানে গুঁড়িয়ে যায় পাকিস্তানের ইনিংস। লেজের দিকে ব্যাট হাতে ম্যাচ জমিয়ে তোলেন হাসান আলী ও ওয়াহাব রিয়াজ। এ দুজনের ব্যাটে পাকিস্তানের স্কোর বোর্ডে যোগ হয় ৭৭ রান।
বিশ্বকাপে ১০ সাক্ষাতে চার জয়ের বিপরীতে পাকিস্তানের এটি ষষ্ঠ হার। আসরে চার ম্যাচে তিন জয় নিয়ে পয়েন্ট তালিকার দ্বিতীয় স্থানে উঠে এলো শিরোপাধারী অস্ট্রেলিয়া। তিন ম্যাচে সমান ৬ পয়েন্ট নিয়ে নেট রান গড়ে শীর্ষে গতবারের রানার্সআপ নিউজিল্যান্ড। অস্ট্রেলিয়ার কাছে পাকিস্তানের হারে তালিকায় একধাপ উন্নতি দেখছে বাংলাদেশ। চার ম্যাচে দু’দলেরই সংগ্রহ ৩ পয়েন্ট। তবে নেট রান গড়ে এগিয়ে তালিকার ৭ নম্বরে অবস্থান বাংলাদেশের। তিন ম্যাচে ৩ পয়েন্ট নিয়ে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। টন্টনের কাউন্টি গ্রাউন্ড ভেন্যুতে বড় টার্গেটে ইনিংসের শুরুটা খারাপ ছিল না পাকিস্তানের। শুরুর ১০ ওভারে ৫০/১ এবং ২৫ ওভার শেষে পাকিস্তানের সংগ্রহ ছিল ১৩৬/২। কিন্তু ৩০ ওভার শেষে পাকিস্তানের সংগ্রহ দাঁড়ায় ১৬০/৬-এ।
এদিন দলকে একবারে শুরুতেই চাপে ফেলেন ফখর জামান। দলীয় মাত্র ২ রানে উইকেট খোয়ান এ পাকিস্তানি ওপেনার। প্যাট কামিন্সের বলে কেন রিচার্ডসনের হাতে ক্যাচ দেন ৩৮ ওয়ানডেতে ৪ সেঞ্চুরি ও ১০ হাফসেঞ্চুরি হাঁকানো ফখর জামান। দ্বিতীয় উইকেটে ৫৪ রানের জুটি গড়েন ইমাম উল হক ও বাবর আজম। মাত্র ২৭ বল মোকাবিলায় ৭ চারের সাহায্যে ৩০ রান নিয়ে ফর্ম দোখাচ্ছিলেন বাবর। তবে অজি পেসার কুল্টার নাইলের ডেলিভারিতে অহেতুক বড় শট হাঁকাতে গিয়ে নিজের সর্বনাশ ডাকেন ক্যারিয়ারে ৬৬ ম্যাচে ৫১.৩৪ ব্যাটিং গড়ের বাবর আজম। তৃতীয় উইকেটে ইমাম উল হক ও মোহাম্মদ হাফিজের জুটিতে আসে ৮০ রান। তবে মাত্র ১০ রানের ব্যবধানে দুজনের বিদায়ে ২৭ ওভার শেষে পাকিস্তানের সংগ্রহ দাঁড়ায় ১৪৬/৪-এ। অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান শোয়েব মালিক ব্যাট হাতে ‘ডাক’ মেরে শঙ্কায় ডোবান পাকিস্তানকে। আর অল্প ব্যবধানে আসিফ আলীর বিদায়ে ম্যাচ থেকে অনেকটাই ছিটকে যায় ১৯৯২’র বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নরা।
শেষের দিকে মূলত দুই বোলারের ব্যাটে আশা জাগে পাকিস্তানের। আট নম্বরে ব্যাট হাতে ১৫ বলে ৩২ রানের বিস্ফোরক ইনিংস খেলেন হাসান আলী। হাসান আলী হাঁকান তিনটি করে চার-ছক্কা। আর ৯ নম্বর ব্যাটসম্যান ওয়াহাব রিয়াজ করেন ৩৯ বলে ৪৫ রান। অষ্টম উইকেটে অধিনায়ক সরফরাজের সঙ্গে ৬৩ বলে ৬৪ রানের জুটি গড়েন ওয়াহাব রিয়াজ। তবে ৪৫তম ওভারে জোড়া উইকেট তুলে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার জয় নিশ্চিত করেন মিচেল স্টার্ক। ৪৫.৪তম ওভারে রানআউটের হতাশা নিয়ে ক্রিজ ছাড়েন সরফরাজ ।  কামিন্স তিন ও অপর দুই পেসার স্টার্ক ও রিচার্ডসন নেন দুটি করে উইকেট। আসরে আমিরের পেছনে সমান ৯ উইকেট শিকার স্টার্ক ও কামিন্সের।
ওয়ার্নারের সেঞ্চুরি, আমিরের পাঁচ উইকেট
এবারের বিশ্বকাপটা দুজনের জন্যই চ্যালেঞ্জের। তবে ব্যাটে-বলে জবাব দিলেন মোহাম্মদ আমির ও ডেভিড ওয়ার্নার। গতকাল ব্যাট হাতে সেঞ্চুরি হাঁকান ডেভিড ওয়ার্নার। আর বল হাতে পাঁচ উইকেট নেন পাকিস্তানি পেসার মোহাম্মদ আমির।  জুটির রেকর্ডে গতকাল সাকিব-মুশফিকের কীর্তি ছাড়িয়ে যান অ্যারন ফিঞ্চ-ডেভিড ওয়ার্নার। এতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৩০০ রানের পুঁজি পায় অস্ট্রেলিয়া। তবে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহটা বড় হতে পারতো আরো। বল হাতে দুরন্ত নৈপুণ্যে অজিদের লাগাম টানেন মোহাম্মদ আমির। এতে ৬ বল বাকি রেখেই ৩০৭ রানে অলআউট হয় অস্ট্রেলিয়া। ক্যারিয়ার সেরা নৈপুণ্যে ১০ ওভারের স্পেলে ৩০ রানে পাঁচ উইকেট নেন আমির।
৫৪ ম্যাচের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে আমিরের এটি প্রথম পাঁচ উইকেট। ওয়ানডেতে আমির ইনিংসে ৪ উইকেটের দেখা পান একবারই। তাও ১০ বছরের পুরনো ঘটনা। ২০০৯-এ ক্যারিয়ারের পঞ্চম ওয়ানডেতে কলম্বোয় স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৯ ওভারের স্পলে ২৮ রানে চার উইকেট নিয়েছিলেন আমির। গতকাল টন্টনে টসে জিতে অজিদের ব্যাটিংয়ে পাঠান পাকিস্তান অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদ। আর ওপেনিংয়ে ১৪৬ রানের জুটি গড়েন ফিঞ্চ-ওয়ার্নার। চলতি বিশ্বকাপের যে কোনো উইকেটে এটি সর্বোচ্চ রানের জুটি। এতে তারা ছাড়িয়ে যান সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহীমের গড়া ১৪২ রানের কীর্তিকে। আসরে নিজেদের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তৃতীয় উইকেটে ১৪২ রানের জুটি গড়েছিলেন সাকিব-মুশফিক। গতকাল নিজের উইকেট দেয়ার আগে ১১১ বলে ১০৭ রান করেন ডেভিড ওয়ার্নার। আর অজি অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চের ব্যাট থেকে আসে ৮২ রান।
তবে তাদের বড় ইনিংস খেলার পেছনে ছিল পাকিস্তানি ফিল্ডারদের ভূমিকাও। ইনিংসে ‘জীবন’ পান দুজনেই। তাদের ক্যাচ ফেলে দেন বিশ্বকাপের আগে সন্তান হারানো আসিফ আলী। ২২তম ওভার পর্যন্ত ওভার প্রতি গড়ে সাড়ে ছয়ের ওপরে রান তোলেন তারা। ব্যক্তিগত ৩০ রানে ‘জীবন’ পান ফিঞ্চ। ক্যাচ ফেলেন আসিফ আলী। ব্যক্তিগত ৪৪ রানে দ্বিতীয় জীবন পান পাকিস্তান অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদের হাতে। ২৩তম ওভারের প্রথম বলে ফিঞ্চকে তুলে নিয়ে জুটি ভাঙেন মোহাম্মদ আমির ।
ওয়ার্নার অন্য প্রান্তে প্রায়শ্চিত্ত করেছেন আগের ইনিংসের। আগের ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে মন্থর ফিফটির জন্য সমালোচিত হয়েছিলেন তিনি। এমনকি ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে ওয়ার্নারের ইনিংসটির দিকে আঙুল তোলেন খোদ অজি অধিনায়ক ফিঞ্চ। গতকাল ৫১ বলে ফিফটির পর ১০২ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ওয়ার্নার। নিষেধাজ্ঞা থেকে ফেরার পর ওয়ানডেতে এটা তার প্রথম সেঞ্চুরি। গত বছর মার্চে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বল টেম্পারিংয়ের দায়ে এক বছরের নিষেধাজ্ঞা কাটান ওয়ার্নার ও স্টিভেন স্মিথ। ওই ঘটনায় বিশ্বকাপেও দর্শকদের দুয়ো ধ্বনি শুনছেন স্মিথ-ওয়ার্নার। গতকাল আসিফ আলীর হাতে জীবন পান ওয়ার্নারও। অবশ্য ততক্ষণে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেছেন অজি ওপেনার। ব্যক্তিগত ১০৪ রানে থার্ডম্যানে ওয়ার্নারের সহজ ক্যাচ ফেলে দেন আসিফ। পাকিস্তান দলের গ্রাউন্ড ফিল্ডিংটাও ছিল ভুলে ভরা। ১ রানকে ২ রান বানাতে তেমন কষ্ট হয়নি অজি ব্যাটসম্যানদের । ইনিংসে ১১টি চার ও একটি ছক্কা হাঁকান ওয়ার্নার। আর ৮৪ বলের ইনিংসে ফিঞ্চ হাঁকান ৬ বাউন্ডারি ও চারটি ছক্কা। এ দুই ওপেনারের ব্যাটিংয়ে এক সময় হয়তো ৪০০-র স্বপ্ন দেখছিল অস্ট্রেলিয়া। এরপর বল হাতে জ্বলে ওঠেন আমির। আর ধীরে ধীরে গতি কমে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের।
৩০তম ওভার পর্যন্তও গড়ে সাড়ে ছয়ের কাছাকাছি রান ছিল অস্ট্রেলিয়ার।  পরে মোহাম্মদ হাফিজকে উইকেট দেন স্টিভ স্মিথ (১০)। ইনিংসের ৩৪তম ওভারে দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের (১০ বলে ২০) স্টাম্প উপড়ে নেন   তরুণ পেসার শাহিন আফ্রিদি। এরপরই কমে আসে রানের গতি। ৩৮তম ওভারে শাহীন আফ্রিদি ওয়ার্নারকে সাজঘরে ফেরানোর পর বাকি কাজ সারেন আমির। ৪২তম ওভার শেষে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ছিল ২৭৭/৪। তবে  শেষ ৩০ রানে ছয় উইকেট খোয়ায় অস্ট্রেলিয়া। একে একে উসমান খাজা, শন মার্শ, অ্যালেক্স ক্যারি ও মিচেল স্টার্ককে সাজঘরে ফিরিয়ে আমির পূর্ণ করেন নিজের পাঁচ উইকেট শিকার। 
২০১০’র ইংল্যান্ড সফরে স্পট ফিক্সিংয়ের দায়ে পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা পোহান মোহাম্মদ আমির। আর এবারের বিশ্বকাপের আগে চিকেন পক্সে আক্রান্ত আমিরের খেলাটা হয়ে পড়েছিল অনিশ্চিত। চলতি আসরে তিন ম্যাচে ১০ উইকেট নিয়ে সর্বাধিক শিকার আমিরেরই। আসরে ৪ ম্যাচে ২৫৫ রান নিয়ে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে উঠে এলেন ওয়ার্নার। ব্যাট হাতে তিন ম্যাচে ২৬০ রান নিয়ে তালিকার শীর্ষে বাংলাদেশের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান।

নতুন কৌশল গ্রহণ করছে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী! by ফারহান বুখারি

মঙ্গলবারের বার্ষিক বাজেট ঘোষণাকে সামনে রেখে পাকিস্তানের প্রভাবশালী সশস্ত্র বাহিনী ও প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সরকার আগামী বছরের জন্য সামরিক বাহিনীর ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
লেনদেনের ভারসাম্যজনিত সঙ্কট নিরসন করতে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের কাছ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলার ঋণ গ্রহণের ভিত্তি প্রস্তুতের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান সম্ভবত প্রথমবারের মতো এই অস্বাভাবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে।
বুধবার ইমরান খান এক টুইটে স্বীকার করেন যে নানা নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আমাদের মারাত্মক আর্থিক পরিস্থিতির কারণে সশস্ত্র বাহিনী স্বেচ্ছায় তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় হ্রাস করানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
এর এক দিন আগে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল আসিফ গফুর বলেন, প্রতিরক্ষা বাজেট স্বেচ্ছায় হ্রাস করা হলেও তা প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার মূল্যে করা হবে না। আমরা সম্ভাব্য সব হুমকি মোকাবিলায় কার্যকর সাড়া দিয়ে যাব।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাজেট দেশটির মোট সরকারি ব্যয়ের (২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুনে ছিল ৪২ বিলিয়ন ডলার) প্রায় এক পঞ্চমাংশ। পাকিস্তান তার ৫ লাখ সদস্যবিশিষ্ট সামরিক বাহিনীকে রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। বিশেষ করে কাশ্মির নিয়ে বিরোধের জের ধরে দেশটি নিরাপত্তা বাহিনীকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
ভারত-অধিকৃত কাশ্মিরে ফেব্রুয়ারিতে একটি সন্ত্রাসী হামলার পর দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা বাড়ে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার জানিয়েছে, হামলাটি চালিয়েছে পাকিস্তানভিত্তিক একটি ইসলামি গ্রুপ। তবে ইমরান খানের সরকার তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার উত্তেজনা পাশ্চাত্যের দেশগুলোর জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়। উভয় দেশই পরমাণু শক্তির অধিকারী।
তালেবান গ্রুপের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অভিযানে অন্যতম ভূমিকা পালন করছে দেশটির সামরিক বাহিনী। এখন পর্যন্ত তালেবানের প্রধান প্রধান শক্তিকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে সেনাবাহিনী, তারা আফগান সীমান্তের ‘উপজাতীয় এলাকাগুলোতে’ থাকা পকেটগুলোতে তাদের পশ্চাদপসরণে বাধ্যও করেছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর আগামী বছরের জন্য ন্যূনতম মাত্রায়ও সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি না করার সিদ্ধান্তটি আসলে দেশটির মারাত্মক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকেই স্বীকার করে নেয়ার সামিল। ওই সঙ্কটের কারণে ইসলামাবাদকে আইএমএফের কাছ থেকে নতুন করে ঋণ গ্রহণ করতে বাধ্য হতে হয়েছে।
সিঙ্গাপুরের ন্যানিয়াঙ টেকনলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো জেমস দরসি বলেন, পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর অর্থনীতি, পতনের মুখে থাকা অর্থনীতি নয়।
তিনি বলেন, আইএমএফের ঋণের জন্য প্রয়োজন কৃচ্ছ্রমূলক পদক্ষেপ। এটা জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি বলেন, এটা বেদনাদায়ক কর্মসূচি হতে যাচ্ছে। জনসাধারণের মধ্যে এর প্রতিক্রিয়া কী হবে, তা জানা যাচ্ছে না।
উল্লেখ্য, প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, আইএমএফের ঋণের জের ধরে আয়কর সংগ্রহ নজিরবিহীন মাত্রায় বাড়ানো হবে, সরকারি ব্যয় ব্যাপকভাবে হ্রাস করা হবে।
ইসলামাবাদে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, পাকিস্তানের সামরিক প্রতিশ্রুতির কারণে সশস্ত্র বাহিনীর ব্যয় হ্রাস করার একটি সীমা আছে।
তিনি বলেন, ব্যয় ব্যাপকভাবে কমানো হলে বা প্রচলিত প্রতিরক্ষা কেনা হ্রাস করা হলে স্বাভাবিকভাবেই হুমকি বাড়বে।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী একটি বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে বিশেষ করে কাশ্মির প্রশ্নে ভারতের সাথে সমঝোতা না হলে দীর্ঘ মেয়াদে পাকিস্তান এ ধরনের অবস্থা সামাল দিতে পারবে না।
তবে অনেক বিশেষজ্ঞ এর সাথে একমত নন। সুইডেনের স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসাচৃ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র গবেষক ন্যান তিয়ান বলেন, পাকিস্তানের ব্যয় হ্রাস করার আশু কোনো প্রভাব দেশটির অস্ত্র ক্রয়ের ওপর পড়বে না।
তিনি বলেন, ২০২০ সালে কোনো চুক্তিতে সই হলে তার মূল্য পরিশোধ করতে হবে কয়েক বছর পর। সাথে সাথেই মূল্য পরিশোধ করতে হয় না।
পাশ্চাত্যের কূটনীতিকরা বলছেন, সামরিক সরঞ্জামের জন্য পাকিস্তান ক্রমবর্ধমান হারে চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী। অতীতে যুক্তরাষ্ট্রই পাকিস্তানের বেশির ভাগ অস্ত্রের যোগান দিত।
বেইজিংয়ের সাথে ইসলামাবাদের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্কের ফলে দেশটির সাথে বড় বড় চুক্তি হচ্ছে। এসবের মধ্যে রয়েছে এক দশকের মধ্যে চীনের কাছ থেকে আটটি সনাতন সাবমেরিন ক্রয়, পাকিস্তানে স্থানীয়ভাবে জেএফ-১৭ থান্ডার জঙ্গিবিমান নির্মাণ চুক্তি। এই বিমান পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রধান অবলম্বন হতে যাচ্ছে।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে পাশ্চাত্যের এক কূটনীতিক নিক্কিইকে বলেন, পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে আমি নিশ্চিত, পাকিস্তানের সামরিক ঋণগুলো চীন পুনঃতফসিল করতে আগ্রহী হবে।
নিক্কিই এশিয়ান রিভিউ/সাউথ এশিয়ান মনিটর

চন্দরনগরে ফরাসী পুনর্নির্মাণ মিশনের কাজ শুরু by সুদেশনা ব্যানার্জি

সাউথ এশিয়ান মনিটর, জুন ১২, ২০১৯: ফরাসী একটি দল শুক্রবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চন্দরনগর সফর করে সেখানকার রেজিস্ট্রি অফিসটি পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। এই অফিসটি একসময় একটি ফরাসি আদালতকক্ষ ছিল যেটা বহুদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে।
ফরাসী পক্ষের এটা প্রথম সফর। ফরাসী সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারি জেনারেল হার্ভি বার্বারেটের নেতৃত্বে এই প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। এর আগে ফ্রান্স ও বাংলার মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় যে সাবেক ফরাসি কলোনি চন্দরনগরের ঐতিহ্যগুলো পুনরুজ্জীবিত করার জন্য যৌথ প্রচেষ্টা নেয়া হবে।
চন্দরনগরে ফরাসী সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারি জেনারেল হার্ভি বার্বারেট
বার্বারেট মেট্রোকে জানান, “ভবিষ্যতে মন্ত্রী পর্যায়ের সফরের প্রস্তুতি হিসেবে এটা একটা তথ্য সন্ধানী মিশন। চন্দরনগর একটা সুন্দর জায়গা যেটার একটা শক্তিশালী ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রয়েছে”। মন্ত্রণালয়ের ইউরোপিয়ান ও আন্তর্জাতিক বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর ফ্রাঁসোয়া লরেন্টকে সাথে পাঁচ দিনের সফরে আছেন বার্বারেট।
টিমে আরও আছেন কলকাতার নিযুক্ত ফ্রান্সের কনসাল জেনারেল ভার্জিনি কোর্টেভাল এবং অলিয়েস ফ্রসেসের ডিরেক্টর ফেব্রিস প্ল্যাঙ্কন, দূতাবাসের কালচারাল অ্যাটাশে অ্যালিস ব্রুনোট ও কনস্যুলেটের প্রেস অ্যাটাশে অঞ্জিতা রায় চৌধুরী।
তাদের সাথে ছিলেন দুজন কনজার্ভেশান স্থপতি যারা রেজিস্ট্রি অফিস পুনর্নির্মাণ প্রকল্পে ফরাসি টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞ টিমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সমঝোতা স্মারকের অংশ হিসেবে, ফরাসীদের এখানে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়ার কথা রয়েছে।
রাফায়েল গান্তেবোইস তিন বছর ধরে সরকারকে পন্ডিচেরির বিষয়ে উপদেষ্টা হিসেবে পরামর্শ দিচ্ছেন, যাকে নিয়োগ দিয়েছে ফরাসী সরকার। স্মার্ট সিটি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ প্রকল্পে কাজ করছেন তিনি। অন্যদিকে শহরে ঐতিহাসিক অবকাঠামোগুলো চিহ্নিত করার কাজ করছেন ঐশ্বরিয়া টিপনিস। স্থানীয় সম্প্রদায়ের সূত্রে রেজিস্ট্রি অফিসটি পুনরায় ব্যবহারের বিষয়টি তাদের নজরে আসে।
পুনর্নির্মাণ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলছেন কনজার্ভেশান স্থপতি রাফায়েল গান্তেবোইস ঐশ্বরিয়া টিপনিস
দুজনে এরপর ভবনটি পরিদর্শন করেন, এর বর্তমান কাঠামোগত অবস্থা যাচাই করেন এবং এর ভিত্তিতে রাজ্য সরকারের কাছে একটি রিপোর্ট দেন। টিপনিস বলেন, “প্রকল্পের ব্যাপারে বিস্তারিত পরিকল্পনা করতে সময় লাগবে। তাছাড়া আসন্ন বর্ষা মওসুমে ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে জরুরি মেরামতের প্রয়োজন রয়েছে ভবনের”।
গাস্তেবোইস আরও বলেন, “পুনরায় মেরামত শুরুর আগে ভবনের বেশ কিছু প্রস্তুতির বিষয় রয়েছে। কিছু অংশের অবস্থা নাজুক এবং সেগুলো ভেঙে ফেলতে হবে। যতটা পারা যায় আমরা রক্ষার চেষ্টা করছি যাতে বিদ্যমান ঐতিহ্যের অংশগুলোকে যতটা পারা যায় ব্যবহার করা যায়”।

হিন্দি ঠেকাও আন্দোলন : বিপাকে মোদি!

ভারতে নতুন এক শিক্ষানীতি সব স্কুলে হিন্দিকে 'তিনটি ভাষার একটি' হিসেবে চালু করতে সুপারিশ করার পর এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে দক্ষিণ ভারতে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়েছে।
বিশেষ করে তামিলনাডুতে প্রায় সব রাজনৈতিক দল বলছে তারা সর্বশক্তিতে এই প্রস্তাব রুখবে।
পাশাপাশি সেখানে সোশ্যাল মিডিয়াতেও দারুণভাবে ট্রেন্ড করছে 'হ্যাশট্যাগ স্টপহিন্দিইম্পোজিশন', অর্থাৎ 'হিন্দি চাপিয়ে দেয়া ঠেকাও'।
এই বাধার মুখে কেন্দ্রীয় সরকারও এখন সাফাই দিচ্ছে যে মানুষের মতামত না-নিয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
বস্তুত হিন্দি ভাষাকে কেন্দ্র করে ভারতে বিভক্তির ইতিহাস অনেক পুরনো, এখন সেই বিতর্কই আবার নতুন আকারে মাথাচাড়া দিচ্ছে।
ভারতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেয়ার ঠিক পর দিনই সরকারের কাছে জমা পড়ে নতুন একটি শিক্ষানীতির খসড়া, যা প্রস্তুত করেছে দেশের নামী মহাকাশবিজ্ঞানী কে কস্তুরীরঙ্গনের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল।
ওই 'খসড়া জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১৯'-এ বলা হয়, বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে ভারতের স্কুলগুলোতে যে 'তিন ভাষা ফর্মুলা' চালু আছে সেটা শুধু বহাল রাখাই যথেষ্ট নয় - তা এখন বাচ্চাদের জন্য আরো অনেক কম বয়সে চালু করা দরকার।
এখন যেহেতু এই তিনটি ভাষার একটা অবশ্যই হিন্দি হতে হবে, এবং ভারতে যে বাচ্চাদের মাতৃভাষা হিন্দি নয় তাদেরও খুব কম বয়স থেকে হিন্দি শেখাটা বাধ্যতামূলক হবে - তাই দক্ষিণ ভারতে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়ে যায়।
হিন্দির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াইয়ের দীর্ঘ ইতিহাস আছে তামিলনাড়ুর দল ডিএমকে-র।
তাদের শীর্ষস্থানীয় নেত্রী ও এমপি কানিমোজি বিবিসিকে বলছিলেন, "এভাবে ঘুরপথে হিন্দি চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা আমরা কিছুতেই মানব না।"
"হিন্দি ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনে আমাদের দল আদালতে যেতেও প্রস্তুত", জানাচ্ছেন তিনি।
কানিমোজির বাবা ও প্রবাদপ্রতিম তামিল রাজনীতিবিদ এম করুণানিধি নিজেই ছিলেন তামিলনাডুতে হিন্দি-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ।
ডিএমকে-র সেই অবস্থান আজও যেমন অপরিবর্তিত, তেমনি কমল হাসান, ভাইকো, রামোদাসের মতো তামিলনাডুর অন্য রাজনীতিবিদরাও নতুন করে হিন্দির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন।
এমন কী, তামিলনাডুতে ক্ষমতাসীন দল এআইডিএমকে বিজেপির শরিক, কিন্তু তাদের শিক্ষামন্ত্রীও জানিয়ে দিয়েছেন কেন্দ্র যা-ই বলুক, তারা রাজ্যে দুই ভাষা ফর্মুলাই জারি রাখবেন - অর্থাৎ বাচ্চাদের শুধু তামিল ও ইংরেজিই শেখাবেন।
কিন্তু কেন দাক্ষিণাত্যে হিন্দির বিরোধিতা এত তীব্র?
কেরালার রাজনীতিবিদ ও তিরুবনন্তপুরম থেকে টানা তিনবার জিতে আসা কংগ্রেস এমপি শশী থারুরের ব্যাখ্যা হলো, "ভারতের মতো বহুভাষী একটা দেশে একটাই জাতীয় ভাষা বা রাষ্ট্রভাষা চালু করার সুবিধা যেমন আছে, তেমনি বিপদও কিন্তু আছে।"
"উত্তর ভারতে যে শুক্লা, সিং, শর্মারা জন্ম থেকে হিন্দি শিখে বড় হয়েছেন তারা যখন দেখেন তাদের পছন্দের ভাষাই প্রশাসনিক কাজে, অফিস-আদালতে জাতীয় ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে তখন তারা ভীষণ খুশি হতে পারেন।"
"কিন্তু মনে রাখতে হবে, সেই মুহুর্তেই কিন্তু দক্ষিণ ভারতের সুব্রহ্মণ্যম, রেড্ডি বা মেনন - যারা কখনও হিন্দি শেখেননি - তাদের আপনি দেশের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানিয়ে দিচ্ছেন।"
"ফলে ঐক্যের বদলে যখনই আপনি ইউনিফর্মিটি বা একই ধরনের জিনিসে বেশি গুরুত্ব দেবেন, ভারতকেও কিন্তু তখনই ধ্বংস করে ফেলবেন!", বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি থারুর।
বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসা বিজেপিকে বহুদিন পর্যন্ত শুধু হিন্দি বলয়ের দল হিসেবেই দেখা হয়ে এসেছে, একটা সময় তাদের স্লোগানও ছিল 'হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান'।
তাদের নতুন মেয়াদের শুরুতেই মাথাচাড়া দেওয়া এই হিন্দি-বিতর্ককে মোদি সরকার অবশ্য দ্রুতই চাপা দেয়ার চেষ্টা করেছে।
ক্যাবিনেট মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর জানাচ্ছেন, "সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি - জনমত যাচাইয়ের পরই নতুন শিক্ষানীতি নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে।"
"কাজেই এটা নিয়ে কোনো ভুলবোঝাবুঝি কাম্য নয়।"
"আর মোদি সরকার সব ভারতীয় ভাষারই প্রসারের পক্ষপাতী, সুতরাং কোনো ভাষাই কারো ওপর চাপিয়ে দেয়ার প্রশ্ন ওঠে না।"
চুয়ান্ন বছর আগে হিন্দি-বিরোধী দাঙ্গায় তামিলনাডুতে প্রায় ৭০ জন নিহত ওয়ার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু কথা দিয়েছিলেন, হিন্দিভাষী নয় দেশের এমন কোনো রাজ্যেই জোর করে হিন্দি চাপানো হবে না।
কিন্তু এখন বিজেপি জমানায় কেন্দ্র সেই প্রতিশ্রুতি আদৌ রাখবে কি না, দক্ষিণের রাজ্যগুলো কিন্তু সেই সংশয়ে ভুগতে শুরু করেছে।
সূত্র : বিবিসি

চাঞ্চল্যকর তথ্য, সমুদ্রে ফ্রান্সের তুলনায় প্লাস্টিকের আয়তন তিনগুণ!

বর্তমানে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের অধিকাংশই প্লাস্টিকের তৈরি। প্লাস্টিকের জিনিসপত্র ছাড়া এখন জীবন কল্পনাই করা যায় না।
প্লাস্টিকের ব্যবহার এতটাই বেড়েছে যে, একুশ শতকের সভ্য সমাজের মাথাব্যথার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এটি!  হাজার চেষ্টা করেও বন্ধ করা যাচ্ছে না এই মারণ জিনিসের ব্যবহার। মানবজাতির মধ্যে সচেতনতা বাড়ার বদলে বরং দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে প্লাস্টিকের ব্যবহার। আর সেটা এতটাই মাত্রা ছাড়া যে সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন ‘গ্রেট প্যাসিফিক গারবেজ প্যাচ’।
গবেষণা বলছে, প্রতি বছর সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক জমা হয় বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্রে। নদীর জলের সঙ্গে ভেসে আসে এই সমস্ত প্লাস্টিক। আর সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক জমা হয়েছে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ এবং ক্যালিফোর্নিয়ার মাঝের বিস্তৃত অংশে। এই প্লাস্টিকের স্তূপের নামই বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন ‘গ্রেট প্যাসিফিক গারবেজ প্যাচ’। যা আয়তনে টেক্সাসের দ্বিগুণ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমেরিকার তিনটি বৃহত্তম শহরের মধ্যে অন্যতম হলো টেক্সাস। তবে এখানেই শেষ নয়। ফ্রান্সের তুলনায় এই গারবেজ প্যাচ আয়তন তিনগুণ বড়। এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই আঁতকে উঠছেন বিশ্ববাসী।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, প্রতি বছর নদী থেকে সাগরে এসে জমা হয় ১.১৫ থেকে ২.৪১ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক পরিমাণ প্লাস্টিকের ঘনত্ব জলের তুলনায় বেশি। ফলে সমুদ্রের বুকে জমা হলেও তা ডোবে না। গবেষকরা জানাচ্ছেন, যেহেতু এ জাতীয় প্লাস্টিক জলে ডুবে বা মিশে যায় না, ফলে খোলা জায়গায় সূর্যের তাপে নানা বিক্রিয়ার মাধ্যমে এরা মাইক্রোপ্লাস্টিক জাতীয় জিনিসে ভেঙে যায়। আর প্লাস্টিকে থাকা অণু-পরমাণু একবার ভাঙতে শুরু করলে পরিবেশের জন্য তা হয়ে দাঁড়ায় আরও ক্ষতিকর। সমগ্র সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমের জন্য ত্রাস হয়ে যায় এই মাইক্রোপ্লাস্টিক।
সম্প্রতি একটি রিপোর্টে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, প্যাসিফিক গারবেজ প্যাচের উপর যত প্লাস্টিক ভেসে থাকে তার পরিমাণ প্রায় ১.৮ ট্রিলিয়ন। ওজনে এই বর্জ্য প্রায় ৮০ হাজার টন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ওজন প্রায় ৫০০টি জাম্বো জেটের সমান। আর দিনদিন এই নন-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকের পরিমাণ প্যাসিফিক গারবেজ প্যাচে বেড়েই চলেছে।
সামুদ্রিক জীবনেও এর প্রভাব মারাত্মক। বিভিন্ন জলজ প্রাণী এবং মাছেরা হামেশাই এইসব প্লাস্টিককে নিজেদের খাবার ভেবে ভুল করে। আর দিনের পর দিন খাবার ভেবে প্লাস্টিক খাওয়ার ফলে কার্যত মড়ক লাগে জলজীবনে। কারণ জমা জঞ্জালের মধ্যে প্রায় ৮৪ শতাংশ আবর্জনাই থাকে মারাত্মক বিষাক্ত। আর এই বিষ শরীরে প্রবেশ করলে মৃত্যু অবধারিত। ফলে বেঘোরে মারা যায় বহু মাছ এবং সামুদ্রিক প্রাণী। এমনকী এই প্লাস্টিকের দৌলতেই বিলুপ্তির পথেও পৌঁছে যায় সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমের বেশ কিছু প্রাণী। বহু বছর ধরে চলা অসংখ্য গবেষণার ফলে দেখা গিয়েছে, প্রায় ৭০০ ধরণের সামুদ্রিক প্রজাতি প্রতিনিয়ত মেরিন ডেবরিস (সামুদ্রিক ধ্বংসাবশেষ)-এর সংস্পর্শে আসে। যার মধ্যে ৯২ শতাংশ প্রাণীই এই ক্ষতিকর প্লাস্টিকের সংস্পর্শেই থাকে।
ভয়ঙ্কর দাবানল যেমন যত দিন যায় ততই বাড়তে থাকে। ছড়িয়ে পড়ে জঙ্গলের ভিতর। পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় অরণ্যের জীবন। ঠিক ততটাই মর্মান্তিক পরিণতি ঘটাবে এই ‘গ্রেট প্যাসিফিক গারবেজ প্যাচ’। তেমনটাই বলছেন বিজ্ঞানীরা।
সূত্র: দ্য ওয়াল