Showing posts with label রাজনৈতিক আলোচনা. Show all posts
Showing posts with label রাজনৈতিক আলোচনা. Show all posts

Saturday, November 8, 2014

৭ নভেম্বরের বিপ্লবে দেশ এগোলো না পেছাল?

৭ নভেম্বর কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে যদি অভ্যুত্থান না হতো, তাহলে এই বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়ার মতো রক্তাক্ত হতো। কিন্তু অভ্যুত্থানের নায়ক তাহেরকেই প্রতিবিপ্লবীরা হত্যা করে। এর জন্য দায়ী প্রতিবিপ্লবীদের প্রতিনিধি সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। আজ শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সড়ক দ্বীপে এক আলোচনা সভায় এই অভিমত দেন আলোচকেরা। ৩৯তম সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে কর্নেল তাহের সংসদ এ আলোচনার আয়োজন করে। আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্যমন্ত্রী ও জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু। সভায় ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানে দেশ এগিয়েছে না পিছিয়েছে, সে প্রশ্নও ওঠে।

>>৩৯তম সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে কর্নেল তাহের সংসদ আয়োজিত ‘ফিরে দেখা: সাত নভেম্বর’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা। ছবি: প্রথম আলো
সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এম এম আকাশ বলেন, ‘৭ নভেম্বরের বিপ্লবের আউটকাম খুবই খারাপ হয়েছে। বিপ্লবের নায়ক ফাঁসিতে মারা গেলেন, এটা শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজেডি। তাহলে ৭ নভেম্বরের বিপ্লবে দেশ এগোলো না পেছালো?’
এ প্রসঙ্গে তৎকালীন জাসদ আর বর্তমান জাসদের কিছু পরিবর্তনের উল্লেখ করে এম এম আকাশ বলেন, আজকের জাসদ আর তখনকার জাসদ এক নয়। তখন জাসদের প্রধান স্লোগান ছিল বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। এখন তা নয়। এখন জাসদ হয়তো ধর্মনিরপেক্ষ কর্তৃত্ববাদী পুঁজিবাদের পক্ষ নিয়েছে। তিনি বলেন, তখন আওয়ামী লীগ ছিল জাসদের শত্রু, এখন মিত্র। তাতে একটা প্রশ্ন জাগে, কর্নেল তাহেরের আদর্শ অনুসরণ করব, না জাসদ করব। দুটো একসঙ্গে চলতে পারে কি না, এর তিক্ত আত্মসমালোচনা দরকার। আওয়ামী লীগ জাসদকে ব্যবহার করছে, না জাসদ আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করছে, এটি এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন।
পরে হাসানুল হক ইনু তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে জাসদের আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘আমরা আন্দোলন করেছি বলেই কি বঙ্গবন্ধু মারা গেছেন? বামপন্থীরা, সিপিবি কি আন্দোলন করেনি? নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করা কি পাপ?’ তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমান একজন মীরজাফর। বঙ্গবন্ধু এই মীরজাফরকে চিনতে পারেননি। আমরাও চিনতে পারিনি। বঙ্গবন্ধু প্রাণ দিয়ে কাফফারা দিয়েছেন। আমরা জিয়ার সঙ্গে কোনো আঁতাত করিনি। কিন্তু জিয়া কেন ক্ষমতায় গেল তার জন্য আমাদের দোষারোপ করা হচ্ছে।’
ওই সময় জাসদের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্নজনের সমালোচনার প্রতি ইঙ্গিত করে হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘যাঁরা শেখ হাসিনা-খালেদাকে এবং জাসদ-খালেদাকে এক পাল্লায় মাপছেন, তাঁরা কোনদিন বুঝতে পারবেন না, ১৫ আগস্টের পর মাথা নিচু করে নির্যাতন সহ্য করার দল জাসদ না। আমাদের মাথা উঁচু করে প্রথম শক্ত প্রতিবাদের প্রচেষ্টা ছিল সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান।’ তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা ব্যর্থ হয়েছি। কিছুক্ষণ ক্ষমতায় ছিলাম। এর মানে এই নয় যে দেশকে পিছিয়ে দিয়েছিলাম।’
ইনু আরও বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে আমি নব্য রাজাকার বলি। যাঁরা জঙ্গিবাদ নিপাত যাক স্লোগান দিতে পারেন, রাজাকারের সমালোচনা করতে পারেন, তাঁরা নব্য রাজাকার খালেদা জিয়ার নাম উচ্চারণ করে তাঁকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে বলতে পারেন না কেন?’ তিনি বলেন, ‘এই জায়গাটা হচ্ছে আপসের ধূসর জায়গা। যেখানে কতিপয় কালো কোটপরা নামকরা বুদ্ধিজীবী হাঁটছেন।’
আলোচনায় হাসানুল হক ইনু জেনারেল খালেদ মোশাররফকে ‘জঘন্য আঁতাতকারী’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, খালেদ মোশাররফই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিদেশে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন। তাই যাঁরা খালেদা মোশাররফকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা করছেন, তাঁদের সতর্ক হতে বলব।
কর্নেল তাহেরের ভাই ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন, এ কে খন্দকার একটি বই লিখেছেন, বইটি নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সমস্যা শুধু একে খন্দকার নয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব সেনা কর্মকর্তা স্বেচ্ছায় বা অবস্থার চাপে পড়ে যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন, তাঁদের একটা অবস্থান আছে। তিনি বলেন, সেনানায়কেরা যখন বই লিখেন, তখন তাঁরা ৭ নভেম্বর, একাত্তরকে হঠাৎ করে আসা ঘটনা মনে করেন।
এম এম আকাশের বক্তব্যের রেশ ধরে আনোয়ার হোসেন বলেন, জাসদের পরিবর্তনগুলোকে স্থান-কাল-পাত্রের দৃষ্টিতে দেখতে হবে। এখন জাসদ মহাজোট সরকারে যোগ দিয়ে মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হচ্ছে কি না, তা দেখতে হবে।
কর্নেল তাহের সংসদের সহ-সভাপতি মোশতাক হোসেন ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও জাসদের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন প্রকাশনার কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘সিরাজুল আলম খানেরা মুখ খুলছেন না। এই অবস্থায় আজ এ নিয়ে অনেকে রগরগে উপন্যাস, বইপত্র লিখছেন। একসময় আমাদের দলও করত, এসব কুলাঙ্গারেরা এখন মিথ্যাচার করছে।’
সভাপতির বক্তব্যে হায়দার আকবর খান রনো বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে, ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে একটি বিপ্লবী প্রয়াস ছিল। কিন্তু প্রতিবিপ্লবীদের কাছে সে প্রয়াস পরাজিত হয়। জিয়াউর রহমান প্রতিবিপ্লবী ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন। আমার মতে, পরাজয়ের অনেক কারণের মধ্যে বড় ভুল ছিল জিয়ার ওপর আস্থা স্থাপন করা।’

Saturday, July 5, 2014

চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায় by ফরহাদ মজহার

শ্রদ্ধাভাজন ডক্টর জাফর উল্লাহ্ চৌধুরী একবার আলোচনা সভায় বলেছিলেন, শেখ হাসিনা একটি রাজনৈতিক কৌশল নিয়েছেন। তার সারকথা হচ্ছে : বাংলাদেশে শেখ হাসিনা চাইছেন শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে শুধু জামায়াতে ইসলামী থাকুক। বিএনপি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক। শেখ হাসিনা ভাবছেন, এভাবে রাজনীতি সাজালেই তার সুবিধা। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষে বিভক্ত রাখলে শেখ হাসিনার সমালোচনা এখন যারা করছে, তারা মন্দের ভালো বলে আওয়ামী লীগের পতাকাতলেই দাঁড়াবে। বিএনপি যদি এটা না বুঝতে পারে তাহলে এ দলটি আসলেই বিলীন হয়ে যাবে। এটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বদল ঘটাবে, তাতে বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হবে। বিচার ব্যবস্থা এখনই দুর্বল এবং ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক নির্দেশনার বাইরে তাদের যাওয়ার জায়গা সংকুচিত হয়ে রয়েছে, বিচারব্যবস্থার দুর্দশা আরও বাড়বে। বিনিয়োগ, মুদ্রাব্যবস্থা ও সামগ্রিকভাবে ব্যাংক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর দলীয় হস্তক্ষেপ ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে নগ্ন লুটপাট যেভাবে চলছে তাতে সহনশীল উন্নয়ন সুদূরপরাহত হয়ে রয়েছে। অর্থনৈতিক শৃংখলা বলে কিছুই থাকবে না। আর আইনশৃংখলার অবনতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন ইত্যাদি এখন যা দেখছি তার চেয়েও আরও তীব্র হবে। ধনী-গরিবের ব্যবধান বাড়তেই থাকবে। সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সহনশীলতা আরও কমবে। বাড়া তো দূরের কথা।
এগুলো নতুন কথা নয়। তিনি ঠিক এভাবে বলেছেন, সেই দাবি আমি করব না। সেদিন তার বক্তব্যটি ছিল চমৎকার, সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের উৎকণ্ঠার জায়গা তার কথায় যেমন ধরা পড়েছিল, একই সঙ্গে তিনি এই পরিস্থিতিতে বিএনপির কর্তব্য সম্পর্কে খুবই গঠনমূলক কিছু প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিএনপির নেতৃবৃন্দ সেই সভায় হাজির ছিলেন। সেই পরামর্শ তাদের কেমন লেগেছিল জানি না, কিন্তু তিনি কেন বিএনপি বিলীন হয়ে যাবে বলেছেন, তাতে অনেকেই উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন। অথচ জাফর উল্লাহ্ চৌধুরীর বক্তৃতাই ছিল একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিএনপিকে সতর্ক করা, বিএনপির অতীতের সফলতা-ব্যর্থতার খতিয়ান মনে রেখে বাংলাদেশে একটি সহনশীল রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কিভাবে জারি রাখা যায়, তিনি সেই দিকে নজর রেখেই কথা বলছিলেন।
তার একটি পরামর্শ মনে আছে। বলেছিলেন, সুপ্রিমকোর্টে বিএনপির আইনজীবীরা আছেন। তারা দুর্বল নন। তারা তো নিদেনপক্ষে প্রধান বিচারপতির কাছে এই প্রার্থনা জানাতে পারেন যে, গত নির্বাচনে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে, নাগরিকদের ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। অতএব প্রধান বিচারপতির উচিত স্বপ্রণোদিত হয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে একটা ব্যাখ্যা চাওয়া। এটি প্রধান বিচারপতি শুনবেন সেটা আশা করা যায় না। কিন্তু জাফর ভাইয়ের যুক্তি ছিল বিএনপি রাস্তায় দাঁড়াতে পারছে না। তার বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন চলছে। তাহলে তাকে এমন কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত যাতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে নেতারা বসে নেই। আইনি কাঠামোর মতো যা করা সম্ভব সেটা নেতারা করছেন। নিদেনপক্ষে এই তৎপরতাটুকু জারি রাখা জরুরি। অর্থাৎ কোনোভাবেই আন্দোলনে বিরতি দেয়া ঠিক হবে না। সেটা হবে আত্মঘাতী। কিন্তু জাফর ভাই বিএনপি বিলীন হয়ে যেতে পারে কেন বলেছেন, তাতেই সেদিন বিএনপির কয়েকজন নেতা রুষ্ট হয়ে গিয়েছিলেন। বিএনপি যদি বিলীন হয় তো দলটির সমালোচনায় নেতাদের রুষ্ট হওয়ার এটাও একটি কারণ। যারা এখনও মনে করে, বিএনপি বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশের জনগণকে সাময়িক হলেও মুক্তি দিতে পারবে, তাদের পরামর্শ না শোনা।
যে কোনো দলই বিলীন হয়ে যেতে পারে। চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়। ঐতিহাসিক বাস্তবতা যদি বিচার করি তাহলে আওয়ামী লীগেরই বরং বিলীন হওয়ার সম্ভাবনা ছিল প্রবল। কিন্তু আওয়ামী লীগ দাঁড়িয়ে গেছে প্রথমত মতাদর্শিক লড়াইকে গুরুত্ব দেয়ার কারণে। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের লালন-পালন করার প্রতি আওয়ামী লীগের নিষ্ঠার তুলনায় বিএনপি কিছুই না। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ব্যাপারটা আসলে কী সেটা বিএনপি তার নিজের কর্মীদেরও বোঝাতে পারেনি। নেতাদের জিজ্ঞাসা করলে তারা এর ব্যাখ্যা করে বলতে পারবেন কি-না সন্দেহ। আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে যে চারটি স্তম্ভ খাড়া করেছে সেটা সব সময়ই তাদের খুঁটির মতো কাজ করেছে। ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র। এই আদর্শের বিপরীতে বিএনপির আরও অগ্রসর আদর্শ নিয়ে দাঁড়ানো ছিল জরুরি। বাকশালি আমলকে এ দেশের মানুষ প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়ে মূলত আওয়ামী লীগের মতাদর্শকেই জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদীরা এর বিপরীতে কোনো মতাদর্শ খাড়া করতে পারেনি। ফলে এই দলটির রাজনীতির সারবস্তু হয়ে উঠেছিল আওয়ামী লীগ এবং দিল্লির আধিপত্যবাদের বিরোধিতা। এটা দিয়ে বেশিদূর যাওয়া যায় না। বিএনপি গিয়েছিল, কারণ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি তাদের পক্ষ ছিল। আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রবাদী অর্থনীতির বিপরীতে বিএনপি অবাধ বাজার ব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়িয়েছিল।
জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা নির্বিশেষে বাংলাদেশের সবাই নাগরিক, তার মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি হিসেবে বাঙালি জাতি একটি মাত্র জাতি। বাংলাদেশের আরও ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রয়েছে। জিয়াউর রহমান এই দৃষ্টিভঙ্গিতে রাষ্ট্রের পরিপ্রেক্ষিতে নাগরিকতা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও আত্মপরিচয়ের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয়তা আলাদা- এ সত্যটা ধরতে পেরেছিলেন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তার জন্য তা ছিল অগ্র পদক্ষেপ। কিন্তু তিনি নিজে এর গণতান্ত্রিক তাৎপর্য কতটুকু বুঝেছিলেন বলা মুশকিল। জাতি অর্থে বাঙালি ও রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশী হওয়ার মধ্যে কোনো স্ববিরোধিতা নাই- এটা বিএনপির রাজনীতিতে কখনোই স্পষ্ট ছিল না, এখনও নাই। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে দুটিই হতে পারে এবং এই ধারণাটা কেন গুরুত্বপূর্ণ কিংবা জাতীয় পরিচয় থেকে বাংলাদেশী কথাটা আলাদা করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য কেন জরুরি, এটা জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের জনগণকে বোঝাতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। আওয়ামী লীগের রাজনীতির বিরোধিতা করার একটা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। যা একসময় ব্যাকফায়ার করেছে। কারণ বাঙালি জাতিসত্তাকে যারা একই সঙ্গে তাদের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় পরিচয় গণ্য করে, তারা ভেবেছে এটা বাঙালি হিসেবে তাদের জাতিসত্তা ও আত্মপরিচয়ের ওপর আঘাত। আশির দশকের পর থেকে তারা জাতীয়তাবাদী চেতনার জায়গা থেকে সংগঠিত হতে পেরেছে। একেই তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হিসেবে দাবি করতে শুরু করে এবং বিএনপির রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রমাণ করতে ধীরে ধীরে তারা সক্ষম হয়ে ওঠে। বুদ্ধিবৃত্তিক বা মতাদর্শিকভাবে একে মোকাবেলা করার কোনো শক্তি বিএনপির ছিল না। এখনও নাই।
জাতি পরিচয় ও নাগরিক পরিচয় যদি বাঙালির ক্ষেত্রে আলাদা হয়, তাহলে সেটা অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার বেলাতেও সত্য। কিন্তু বোঝাবুঝির ক্ষেত্রে বিএনপির অস্পষ্টতার জায়গা সহজে ধরা পড়ে অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিসত্তার প্রতি বিএনপির রাজনীতিতে। বিএনপি একে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের সমস্যা ও সংকট হিসেবে না দেখে সংখ্যালঘু জাতিসত্তার বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জাতির স্বার্থ রক্ষার দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখেছে। পক্ষাবলম্বন করেছে বাঙালিদের প্রতি। শেখ মুজিব তাদের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষগুলোকে বাঙালি হয়ে যেতে বলেছেন, জিয়াউর রহমান ও বিএনপি তাদের বাংলাদেশী হতে বলেছেন- এটাই পার্থক্য, কিন্তু তাদের জাতিসত্তার স্বীকৃতি ও সম্পত্তিতে তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার মেনে নেননি। ফল হয়েছে সশস্ত্র যুদ্ধ। বলাবাহুল্য, এ ক্ষেত্রে ভারতের যতই হাত থাকুক, সংখ্যালঘু জাতিসত্তা নিপীড়তই হয়েছে। বিএনপি শেখ মুজিবুর রহমানের সাম্প্রদায়িক ও জাতীয়তাবাদী বর্ণবাদকেই চর্চা করেছে। সেটা করেছে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের নামে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, নতুন মতাদর্শ ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি পরিগঠনের যে সম্ভাবনা ছিল, বিএনপি তা অংকুরেই নষ্ট করেছে। এর পর জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য ইসলামী দলের সঙ্গে তার আঁতাতে বিএনপি নিজেকে জামায়াত ঘেঁষা দল হিসেবে ক্রমে ক্রমে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এর কারণ হচ্ছে, একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা সম্পর্কে বিএনপির নিজের কোনো মূল্যায়ন নেই, জামায়াতে ইসলামীও এই ভূমিকার কারণে বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনীতির গণতান্ত্রিক বা উদারনৈতিক বিকাশ কিভাবে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় তাকে গুরুত্ব দেয়নি। আজও দেয় না। ইসলামপন্থীদের জন্য এটা এক বিরাট বোঝা।
জামায়াতে ইসলামী রাজনীতিতে যতই দৃশ্যমান হয়েছে, সমান তালে ও তার চেয়েও অধিক মাত্রায় বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে সংঘবদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনের জন্য জামায়াতে ইসলামী নামে জামায়াত নেতৃবৃন্দের রাজনীতি অব্যাহত রাখাই বিশেষভাবে দায়ী। জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে বিএনপির অভ্যন্তরীণ অন্তর্দ্বন্দ্ব^ও শুরু হয়। এখনও জারি আছে। অবস্থা অনুযায়ী তা প্রকটও হয়।
এরপরও বিএনপি জিয়াউর রহমানের ভাবমূর্তি বিনিয়োগ করে চলছিল, খালেদা জিয়া রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আপসহীন নেত্রী হিসেবে যে ভাবমূর্তি গড়ে তোলেন, সেটাও বিএনপির কাজে লাগে। কিন্তু বিএনপি জিয়াউর রহমানের ভাবমূর্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের অভিযোগের জবাব দিতে ব্যর্থ হয়। তাদের অভিযোগ হচ্ছে, বিএনপির জন্ম ক্যান্টনমেন্টে। কারণ জিয়াউর রহমান সৈনিক। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাঘটনের ফলাফলেই জিয়াউর রহমানের উত্থান। তিনি টিকে গিয়েছেন কারণ সাতই নভেম্বরে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানে তিনি এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ ও সাধারণ সৈনিকদের মৈত্রীর প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। জিয়াউর রহমান নিজেও তার এই ঐতিহাসিক তাৎপর্য বোঝেননি। যদি বুঝতেন তাহলে তিনি ক্ষমতায় গিয়ে বাহাত্তরের সংবিধান মেনে নিতেন না। ফেলে দিয়ে নতুন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু করতেন।
দুটি কারণে তার উচিত নতুন সাংবিধানিক সভা ডাকা ও নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন করা। প্রথম কারণ হচ্ছে, বাহাত্তরের সংবিধান আওয়ামী লীগের দলীয় মতাদর্শের ভিত্তিতে রচিত। এতে বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষার কোনো প্রতিফলন নাই। কারণ এই সংবিধান প্রণয়নের জন্য কোনো সংবিধান প্রণয়নী সভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। পাকিস্তানের সংবিধানের অধীনে যারা পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য নির্বাচিত হয়েছিল, তারাই ডক্টর কামাল হোসেন লিখিত ও ডক্টর আনিসুজ্জামান অনূদিত রচনাকে সংবিধান হিসেবে গ্রহণ করে। এখনও বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধান ডক্টর কামাল হোসেন লিখেছেন। যদি তাই হয়, তাহলে ব্যক্তির রচনা কিভাবে জনগণের ইচ্ছা ও সংকল্পের অভিপ্রায় হয়? কিন্তু বাংলাদেশে এটা সম্ভব হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, এই সংবিধান স্বাধীনতার ঘোষণার মূল যে তিন নীতি তার ভিত্তিতে প্রণীত হয়নি। সেটা আওয়ামী লীগের চার স্তম্ভ নয়। বরং সেই ঘোষণা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ইনসাফ। জিয়াউর রহমান মুক্তিযোদ্ধা হয়েও বাহাত্তরের সংবিধান বাতিল করে নতুন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া গ্রহণ করেননি। তিনি বলতে পারতেন, স্বাধীনতার ঘোষণার ভিত্তিতেই তিনি ও বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র হাতে নিয়েছে, বাংলাদেশের জনগণ রক্ত দিয়েছে। এর ভিত্তিতে নতুন সংবিধান বা গঠনতন্ত্র প্রণীত হবে। সেটা তিনি করেননি। এটা ছিল তার চরম অনভিজ্ঞতা ও অদূরদর্শিতার পরিচয়। তার মূল্য তিনি দিয়েছেন।
এই মূল্যায়ন তাহলে অমূলক নয় যে তিনি সামরিক বাহিনী থেকে এসেছেন বলে সংবিধান স্থগিত রেখে সামরিক শাসন জারি করে শাসন করেছেন। সামরিক শাসনের অধিক কিছু ভাবতে পারেননি। ততটুকুই তিনি সংবিধান সংশোধন করেছেন, যতটুকু তার সামরিক শাসনকে বৈধ করার কাজে দরকার বোধ করেছেন। সামরিক শাসক হিসেবে বাহাত্তরের সংবিধান মেনে নিয়ে তিনি বাহাত্তরের সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকেই মেনে নিয়েছেন। সাম্প্রতিককালে তার আমলের সংবিধান সংশোধন আদালত অবৈধ বলেছে। একেই আমি বলছি অদূরদর্শিতার জন্য মূল্য পরিশোধ। আদালতের রায় তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে।
বিএনপির দুর্বলতা বোঝার জন্য আমি সাম্প্রতিক রাজনীতির ওপর জোর দিতে চাই না। ফলে গোড়ার কয়েকটি বিষয় নিয়ে বললাম। কারণ গোড়ায় না গেলে বিএনপির পক্ষে কোনো উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্ম দেয়া অসম্ভব। নিজের ইতিহাস পর্যালোচনা করেই বিএনপিকে দাঁড়াতে হবে। যদি সেই পর্যালোচনার সামর্থ্য তার থাকে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে নির্বাচনপন্থী উদার রাজনীতি আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীনদের পক্ষে এখন বলাবলি শুরু হয়েছে, গণতন্ত্র দিয়ে কী করব, দরকার ভালো শাসনব্যবস্থা। অন্যদিকে যেসব দেশে ইসলাম সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম, সেসব দেশে জনগণ উদার রাজনীতির ওপর কতদিন ভরসা করে থাকবে, সেটাই সন্দেহ। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার অনেক দেশে সাম্প্রতিককালে যা ঘটছে, বাংলাদেশের জনগণের ওপর তার প্রভাব পড়ছে। বলাবাহুল্য, ইরাকের সাম্প্রতিক ঘটনা এ দেশের জনগণের চিন্তা-চেতনায় গভীর প্রভাব ফেলবে। ফেলতে বাধ্য।
আমরা দুনিয়াতে কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বাস করি না। পরিবর্তন ঘটতে কতক্ষণ? হাওয়া বদলায়।
চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়!
৪ জুলাই ২০১৪। ২০ আষাঢ় ১৪২১। শ্যামলী।

Tuesday, February 18, 2014

মত দ্বিমত- আস্থা কমে যাওয়া অশনিসংকেত by রাশেদা কে চৌধূরী

পিপিআরসি যে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা খুবই প্রয়োজনীয় কাজ। তবে কোনো গবেষণাই পূর্ণাঙ্গ না। কোনো একটি গবেষণা থেকে সব প্রশ্নের উত্তরও আশা করা যায় না। সব গবেষণার কিছু শক্তিশালী দিক থাকে, কিছু সীমাবদ্ধতাও থাকে।
এখানে সেই শক্তির দিক যেমন আছে, তেমনি কিছু দুর্বলতাও নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। এ ধরনের গবেষণাকে জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটা প্রয়াস হিসেবে দেখা যায়। মানুষ কী মনে করে সেই তথ্যগুলো আমাদের জানা দরকার; সেটা জানানো হয়েছে। এটা শুরু, ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই এ ধরনের কাজ আরও হবে।

এই গবেষণা প্রতিবেদনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থার অভাব জোরালোভাবে দেখা গেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি নতুন প্রজন্মের অনীহা জন্মানো একটা অশনিসংকেত। আমাদের কাজের অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্যভাবে জানি যে এতে সত্যের প্রতিফলন ঘটেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি নৈরাজ্য সৃষ্টি করেন বা নৈরাজ্য বন্ধ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে মানুষের আস্থা ধাক্কা খাবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এ ধরনের অবস্থা বিরাজ করে অনেকের ধারণা। কিন্তু এ রকম অবস্থা দীর্ঘকাল ধরে চলতে পারে না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব দায়বদ্ধ, গণমুখী ও স্বচ্ছ ভূমিকা পালন করলে যেকোনো কিছু করে পার পেয়ে যাওয়া বা পার করে দেওয়ার সংস্কৃতির অবসান হবে। এর জন্য যে অঙ্গীকার দরকার, তা রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিক থেকেই আসতে হবে। আরেকটা বিপজ্জনক প্রবণতা হলো, দেশের চেয়ে দল বড় হয়ে যাচ্ছে। এই কারণেই তো শতকরা ৭০ ভাগের মতো মানুষের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে দলীয় রাজনীতি প্রবেশ করানো হয়েছে।
বিচারব্যবস্থা নিয়ে বলার ক্ষেত্রে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। যে রীতি ও ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে, তার মধ্য থেকে বেশি কিছু বলা যায় না। কিন্তু এ ব্যাপারে করণীয় নির্ধারণের প্রয়োজন, তা এই গবেষণা থেকে উপলব্ধি করা যায়। র‌্যাবের ব্যাপারে যা বলা হয়েছে, তাকেও পূর্ণাঙ্গ বলা যায় না। অনেক ঘটনার তো খবরই হয় না। মোট ঘটনার শতকরা ২০ ভাগ যেখানে খবর হয়, সেখানে সুশাসন নিশ্চিত করার দরকারে সম্পূর্ণ চিত্রটা জানতে ও জানাতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করায় এটা জরুরি। এই জবাবদিহি জনগণের কাছে, দলের কাছে না। তবে প্রতিবেদনে জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ বিশেষ নেই।
জবাবদিহি নিশ্চিত করায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা থাকা দরকার ছিল। অথচ প্রার্থীদের হলফনামা প্রকাশের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন নিজেই লুকোচুরি খেলছে। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী তথ্য জানার অধিকার আমাদের আছে। ইসি যখন সেই তথ্য দিচ্ছে না বা দিতে চাইছে না, তখন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাজ করার ছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে তথ্য অধিকার কমিশনেরও কোনো ভূমিকা আমরা দেখিনি। এ ব্যাপারে আরও আলোকপাত করা দরকার।
পুলিশের বিষয়ে ক্রমাগতভাবে মানুষের আস্থা কমছে। এটা নতুন না, প্রতিটা দশকে এই আস্থা কমছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে, সরকারের চাপের কারণে দায়িত্ব পালনে বাধা পায়, সেই বিষয়টা গবেষণায় অনুপস্থিত। তাদের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্যও তারা যথাযথভাবে কাজ করতে পারে না। এর বাইরে ঢালাওভাবে দলীয় নিয়োগের ব্যাপার তো রয়েছেই। আমরা দেখেছি যে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে তারা দাগি আসামিকেও ছেড়ে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্য ও দলীয়করণ গভীর হয়েছে। এসব বিষয় যখন জনগণের দৃষ্টির মধ্যে আসে, তখন তো তারা আস্থা হারাবেই।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকলাপ যেমন র‌্যাবের বিষয়ে, বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়ে আরও আলোকপাত করতে হবে। জনগণের
অর্থেই তারা প্রতিপালিত হয়। তাদের দোষ-ত্রুটির কথা যদি আরও আসত তাহলে জনগণও সচেতন হতো এবং র‌্যাব-পুলিশও হয়তো তাদের জবাবদিহির ঘাটতির জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে পারত। এ কারণে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক গবেষণার কথা ভাবা যেতে পারে।
ছাত্ররাজনীতির মধ্যে যে কলঙ্ক আমরা দেখতে পাই, সেটা নিরসনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বাণী শুনি, কিন্তু সমাধানের কোনো ভূমিকায় তাঁরা নেই। সন্ত্রাসীদের বহিষ্কার করা হলেও আইনি শাস্তি হতে দেখছি না। বহিষ্কৃত ব্যক্তিরা কিছুদিন পরে আবার দলে ফিরে আসেন। ভবিষ্যতে যে নেতারা আসবেন, তাঁদের চরিত্র তো আমরা ছাত্ররাজনীতির দিকে তাকালেই বুঝতে পারি। এদিকেও আশা করার সুযোগ কম। সব ক্ষেত্রেই এমন হচ্ছে।
সুশীল সমাজের বিভিন্ন অংশ যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপের মধ্যে থাকে, সেটা উঠে না আসা এই গবেষণার আরেকটি সীমাবদ্ধতা। প্রত্যক্ষভাবে তো গণমাধ্যম বন্ধই করে দেওয়া হয়, পরোক্ষভাবে নানা রকম চাপের কারণে মিডিয়া যে জবাবদিহির চাপ তৈরি করবে, সেটাও করতে ব্যর্থ হয়।
এ ধরনের গবেষণা মানুষের ধারণার ওপর ভিত্তি করে করা হয়। তারপরও এই প্রয়াসটা গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের গবেষণা চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

রাশেদা কে চৌধূরী: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা।

মত দ্বিমত- আস্থা কমে যাওয়া অশনিসংকেত by রাশেদা কে চৌধূরী

পিপিআরসি যে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা খুবই প্রয়োজনীয় কাজ। তবে কোনো গবেষণাই পূর্ণাঙ্গ না। কোনো একটি গবেষণা থেকে সব প্রশ্নের উত্তরও আশা করা যায় না। সব গবেষণার কিছু শক্তিশালী দিক থাকে, কিছু সীমাবদ্ধতাও থাকে।

Sunday, January 26, 2014

সিপিডির পর্যালোচনা- অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে

একটি সুষ্ঠু, আস্থাভাজন, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
তার মতে, সঙ্কট দূর করতে হলে রাজনৈতিক বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। আর গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হলে বিনিয়োগেও আস্থার সঙ্কট কাটবে না। গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০১৩-১৪ দ্বিতীয় অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনা বিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। এতে উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক ড. ফাহমিদা হক ও খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন। গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অস্থিরতা না কাটলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের দ্বিধা থেকে যাবে। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান না হলে আস্থার সঙ্কট কাটবে না। আর এটা যদি না হয় তবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হবে না। তিনি আরও বলেন, জনসমর্থনের অভাব ও আস্থার অভাব থাকলে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, আপাতত শান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অনেক বন্ধ ছোটখাটো প্রতিষ্ঠান সচল হচ্ছে। কিন্তু এতে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে বলে মনে হয় না। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে নীতি সঙ্কট দূর করতে হবে, অচলাবস্থার নিরসন করতে হবে। তিনি বলেন, জনপ্রত্যাশার কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনে সমঝোতার মাধ্যমে একটি নির্বাচনের প্রত্যাশা সিপিডি’র। ড. দেবপ্রিয় বলেন, গত ছয় মাসে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি ও দেশীয় শিল্পখাত ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এ জন্য শুধু রপ্তানিমুখী শিল্পকে নয় বরং সব ধরনের শিল্পকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে। দেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতি। এর মধ্যে পোল্ট্রি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিশেষ প্রণোদনার আওতায় নিয়ে এসে কৃষি ঋণ বৃদ্ধি ও ভাতার ব্যবস্থা করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে অর্থবছরের প্রথমার্ধে ৪ খাতের আর্থিক ক্ষতির হিসাব তুলে ধরে তিনি বলেন, রেল ও সড়ক যোগাযোগ খাতে ১৬ হাজার ৬৮৯ কোটি, কৃষি ও কৃষিজাত শিল্পখাতে ১৫ হাজার ৮২৯ কোটি, রপ্তানিমুখী বস্ত্রশিল্পে ১৩ হাজার ৭৫০ কোটি ও পর্যটন খাতে ২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে। সিপিডি’র পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে ক্ষতির এই আর্থিক মূল্যায়ন তৈরি করা হয়েছে। মোস্তাফিজুর রহমান গবেষণাপত্র উপস্থাপনের শুরুতেই বলেন, জনপ্রত্যাশা ও অর্থনীতির শক্তির ভিত্তিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধির যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল, সেটি হারিয়ে গেছে। উচ্চ প্রবৃদ্ধির সেই সম্ভাবনা ফিরিয়ে আনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনীতিকে মাশুল দিতে হচ্ছে। বর্তমানে অর্থনীতির গতি একেবারে শ্লথ হয়ে পড়েছে। ঘোষিত বাজেটের আয় ও ব্যয় উভয় অনেক কমে গেছে। নানা সঙ্কটের কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্যের সহজলভ্য থাকলেও বাংলাদেশের খাদ্য মজুত কমেছে। অপরদিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়ে গেছে। এছাড়া, নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে ব্যাংকিং খাত নাজুক অবস্থা পার করছে। এদিকে অস্থিরতার কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ায় সরকারের রাজস্ব আয়েও বড় ধরনের ধসের মধ্যে পড়েছে।
গবেষণাপত্রে বলা হয়, অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে সরকারের রাজস্ব আদায়, বিদেশী বিনিয়োগ, বৈদেশিক অনুদানসহ বিভিন্ন খাতে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় অনেক কম হলেও ব্যয়ের মাত্রা কম থাকায় ঘাটতি নেই। এটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই আয় এবং ব্যয়ের কাঠামোকে পুনর্গঠন করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাজেটবহির্ভূত ব্যয় বাড়ানো দরকার।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে খাদ্য মজুত সাড়ে ৯ লাখ টন, যা গত বছরের তুলনায় ৩৮ শতাংশ কম। কৃষি ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হলেও তা শুধু ধান উৎপাদনে। বাকি শস্যের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি অনেক কমেছে। শাকসবজির ক্ষেত্রে উৎপাদনকারীরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আবার ভোক্তা বাজার থেকে বেশি মূল্যে তা কিনেছে। পোল্ট্রি ও দুগ্ধ খামারিরা ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
সিপিডি’র দাবি, বিশ্বব্যাপী চালের দাম অনেক কম হলেও বাংলাদেশে তা বেশি। এ জন্য মজুত কমেছে। যাতে ভবিষ্যতে খাদ্য ঘাটতি না হয়, সেজন্য কম দামে বিদেশে বাজার থেকে চাল আমদানির ওপর গুরুত্ব দেয় সিপিডি।
গবেষণায় বলা হয়েছে, গত কয়েক মাসে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়ে পড়ায় রাজস্ব আহরণে ঘাটতি হয়েছে। সার্বিকভাবে রাজস্ব খাতে প্রবৃদ্ধি ২৫.৩ শতাংশ ধরা হলেও গত ৫ মাসে এখাতে মাত্র ১৪.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
এনবিআরের হিসাব মতে, ৫ মাসে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে ৮৫০০ কোটি টাকা। ব্যক্তি করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি করা, বিভিন্ন খাতকে করসুবিধা ও করহার হ্রাসের কারণে ঘাটতি বেড়েছে। সার্বিকভাবে রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলেও রাজস্ব আদায়ে ৩০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। যেটি খুবই দুরুহ কাজ। বছর শেষে রাজস্ব আদায়ে ১৮ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হবে বলে মনে করছে সিপিডি।
ব্যাংকিং খাতের বিষয়ে সিপিডি বলছে, বেশ কিছু সমস্যার মধ্য দিয়ে চলছে ব্যাংকিং খাত। উচ্চ মাত্রার ঋণ নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঋণ জালিয়াতির পরিমাণ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। নতুন ব্যাংক এলেও চাহিদা অনুযায়ী প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায়নি। সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক স্থবিরতা থাকায় ঋণের চাহিদা বাড়েনি। কেউ বিনিয়োগ করছে না। ফলে ঋণ নেয়ার মতো কেউ নেই। এ কারণে ব্যাংকগুলোতে তারল্য বাড়ছে, যা ব্যাংকিং খাতকে বেকায়দায়, এমনকি লোকসানের মুখে ফেলতে পারে। গত ৬ মাসে ব্যাংকগুলোতে তারল্য বেড়েছে ৭৩.৮ শতাংশ। এছাড়া, ১৬ শতাংশের বেশি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও ব্যাংকগুলো মাত্র ১১ শতাংশ বিতরণে সক্ষম হয়েছে।
এদিকে অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্যে বিদেশী এবং স্থানীয় উভয় বিনিয়োগই অনেক কমে গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর প্রান্তিকে এফডিআই হয়েছে ৫৩৮ মিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের তুলনায় মাত্র ১.৩ শতাংশ বেশি। কিন্তু বিনিয়োগ বোর্ডে নিবন্ধিত হওয়ার হার হ্রাস পেয়েছে। স্থানীয় কোম্পানির বিনিয়োগ ২৭ শতাংশ এবং বিদেশী মালিকানা কোম্পানির বিনিয়োগ ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তবে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে উল্লেখ করে বলা হয়, অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও তা শুধু তৈরী পোশাক শিল্পেই বেশি। তৈরী পোশাক শিল্প ছাড়া বাকি সবখাতে মাত্র ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। মার্কিন ও ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তুলনায় ভারত, ভিয়েতনাম ও কম্ব্বোডিয়া তাদের পণ্যের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি তিন গুণ বৃদ্ধি করেছে। আর বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধি কিছুটা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হলেও লভ্যাংশ পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে।
পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রে বলা হয়, এ সময় পুঁজিবাজারে আইপিও’র সংখ্যা বাড়লেও নতুন উদ্যোক্তা কমেছে ১০ শতাংশ। এছাড়া, গবেষণাপত্রে বলা হয়, চলতি অর্থবছরের জুলাই মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিবহন, কৃষি, তৈরী পোশাক ও পর্যটন খাতে ৪৯ হাজার ১৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। যা মোট দেশজ উৎপাদনের ৪.৭ শতাংশ। এর মধ্যে পরিবহনে ১৬ হাজার ৬৮৮ কোটি ৬৫ লাখ, কৃষিতে ১৫ হাজার ৮২৯ কোটি, পোশাক খাতে ১৩ হাজার ৭৫০ কোটি এবং পর্যটন খাতে ২৭৫০ কোটি টাকার লোকসান হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। অর্থনৈতিক বর্তমান অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে বছরে শেষে ৫.৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে বলে মনে করছে সিপিডি।

সিপিডির পর্যালোচনা- অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে

একটি সুষ্ঠু, আস্থাভাজন, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

Sunday, January 19, 2014

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নজর দিন

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে অর্থনীতির- এ নিয়ে দ্বিমত প্রকাশের অবকাশ কম। চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এ লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী- এমন অভিমত বিভিন্ন মহল থেকে করা হয়। তাদের অনুমানের কারণ নিকট অতীতের অভিজ্ঞতা। গত কয়েক বছর ধরেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরে নিয়ে যেতে সংকল্প প্রকাশ করেছে। কিন্তু লক্ষ্য অর্জন করা যায়নি। এ ধরনের উচ্চ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য যে মাত্রায় বিনিয়োগ প্রয়োজন, সেটা আসেনি। এবারে রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আরও সমস্যা হবে- এমনই ধারণা। শিল্প-বাণিজ্যের কর্মকাণ্ডে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তি এবং চেম্বারের নেতারা ইতিমধ্যে এ বিষয়ে তাদের অভিমত প্রকাশ করেছেন, যাতে উদ্বেগ যথেষ্ট। ইতিমধ্যে অর্থবছরের যে অর্ধেক সময় অতিক্রান্ত হয়েছে, তার বেশিরভাগ জুড়ে ছিল হরতাল-অবরোধ ও রাজনৈতিক সহিংসতা। একদিকে বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি শ্লথ, অন্যদিকে রাজস্ব বিভাগ শুল্ক-কর আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। বিশ্বব্যাংকের তরফে বলা হয়েছে, প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের কম হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় অবশ্য ততটা নিরাশ নয়। তারা এ হার কমিয়ে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ নির্ধারণ করবে- এমন ধারণা মিলেছে। কিন্তু সরকারের লক্ষ্য তো দ্রুতগতিতে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা। সাম্প্রতিক নির্বাচনের সময়ে দলীয় ইশতেহার ঘোষণা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ বিশ্বের সারিতে নিয়ে যাওয়ার সংকল্প ব্যক্ত করেছেন। সেখানে পেঁছাতে হলে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির হারে বাড়তি গতি আনতেই হবে। এ জন্য আরও করণীয়- বিনিয়োগকারীদের উদ্বুদ্ধ করা এবং তার অপরিহার্য শর্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন। শনিবার সমকাল 'পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক কৌশলপত্র তৈরি হচ্ছে' শিরোনামের প্রতিবেদনে বলেছে, রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে হুমকির মুখে পড়া অর্থনীতি পুনরুদ্ধারকেই নতুন সরকার বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছে। এ জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কৌশলপত্র তৈরির কাজ চলছে। স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি উভয় ধরনের কর্মসূচি তাতে স্থান পাবে। শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী মহল তাদের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য কিছু প্রস্তাব সরকারের কাছে ইতিমধ্যে পেশ করেছে। সরকারের দিক থেকেও তাদের শুল্ক-কর এবং ব্যাংকিং ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা প্রদান করা হবে- এমন কথা বলা হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাও গুরুত্বপূর্ণ। এ কাজ সহজ হবে না। নতুন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে। এ জন্য প্রধান দুটি দলের মধ্যে সমঝোতা হতেই হবে। এ কাজে বিলম্ব হলে কিংবা ফের সংঘাতপূর্ণ রাজনীতির শঙ্কা থাকলে বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হবে না। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশকে স্বল্প হার সুদে ও দীর্ঘ মেয়াদে আর্থ-সামাজিক প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা প্রদান করে, তাদের সঙ্গে পদ্মা সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অর্থায়ন বিষয়ে সমঝোতায় পৌছানোও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে উৎপাদনমূলক খাতে বেসরকারি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতেও মনোযোগী হতে হবে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যদি রাজনীতির জন্য অর্থনীতির ক্ষতি হতে না দেওয়ার বিষয়ে একমত হতে পারে, তাহলে দেশি ও বিদেশি উভয় অঙ্গনেই বিনিয়োগকারীরা একটি ইতিবাচক বার্তা পাবে। কিন্তু তেমন বার্তা কি প্রদান করা সম্ভব হবে? আমাদের রাজনীতি কি হিংসার আবর্ত থেকে বের হয়ে আসতে পারবে? রাজনীতিকরা কি জনগণের কাছে এমন সুবার্তা দিতে পারবেন যে, অর্থনীতির ক্ষতি হয় এমন কাজ থেকে তারা বিরত থাকবেন?

Sunday, January 5, 2014

নয়া গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশ by অমিত রহমান

বাংলাদেশে ভোট কলঙ্কিত হয় বরাবরই। মাঝখানে চারটি নির্বাচন তুলনামূলকভাবে কলঙ্কমুক্ত ছিল। নব্বই দশকের পর ’৯৬ সালে ভোট হয়েছিল একতরফা এবং গায়েবি।

নয়া গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশ by অমিত রহমান

বাংলাদেশে ভোট কলঙ্কিত হয় বরাবরই। মাঝখানে চারটি নির্বাচন তুলনামূলকভাবে কলঙ্কমুক্ত ছিল। নব্বই দশকের পর ’৯৬ সালে ভোট হয়েছিল একতরফা এবং গায়েবি।
যে নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী বয়কট করেছিল। এ অবস্থায় ভোট পড়েছিল ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ। ভোটের ইতিহাসে উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে কম। কাল যে ভোট হতে যাচ্ছে সেখানে কত ভাগ ভোট পড়বে। বিভিন্ন জেলা থেকে যেসব খবরাখবর আসছে তাতে মনে হয় ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। বেশিও হতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শাসক দলের একজন দায়িত্বশীল নেতা বলেন, ভোটার আনার জন্য প্রয়োজনে টাকা খরচ করতে বলা হয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীদের বলা হয়েছে ভোটকেন্দ্রে হাজির হয়ে ব্যালটের প্রতি সুবিচার করতে। শাসক দলের এমপি শেখ আফিলউদ্দিন তো প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন ভোটারের দরকার নেই। ১০০ কর্মী পর্যায়ক্রমে ভোটকেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে। বাকি কাজটা নির্বাচনী এজেন্টরা সেরে ফেলবে। এরকমই কিছু ঘটতে যাচ্ছে ৫ই জানুয়ারির ভোটে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেই এই নির্বাচনে। জামায়াতে ইসলামীও নেই। এরশাদের জাতীয় পার্টি আছে এবং নেই। প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে সরে গেছেন এরশাদ। পরিণতিতে হাসপাতাল নামক আধুনিক জেলখানায়। খাঁচায় বন্দি থেকেও গলফ খেলে দুনিয়াকে দেখাচ্ছেন ভোট বয়কট করাটা কত বিপজ্জনক। খালেদা বন্দি ৭৯, গুলশানে। ইকোনমিস্টের ভাষায়, এটাই হচ্ছে বাংলাদেশী গণতন্ত্রের নমুনা। খালেদা সহসা মুক্তি পাবেন এমনটা মনে করার কোন কারণ নেই। যদিও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে সরকারের ওপর। তবে আন্তর্জাতিক চাপে সরকার টলবে না। নির্বাচন বাতিলে আন্তর্জাতিক চাপ ছিল। সরকার কি তা শুনেছে? ভবিষ্যতেও শুনবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন অবরোধ দিলেও কাজ হবে না। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যদি বিষয়টি উত্থাপন করে তখনও ভাববে এমনটা এখন কেউ আর বিশ্বাস করতে পারছেন না। দুনিয়া কি বললো, দেশের মানুষ কি বললো, তাতে কি যায় আসে! ক্ষমতায় আছি, ক্ষমতায় থাকবো, এটাই শেষ কথা। ৫ই জানুয়ারি থেকে ২৪শে জানুয়ারি, এই ১৯ দিন বাংলাদেশী রাজনীতির জন্য নতুন কোন ইতিহাস লেখা হতে পারে। সন্ত্রাস দমনের নামে ভয়ঙ্কর দমন-পীড়ন হতে পারে। এমন একটা ছকের কথা পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ জানিয়েছেন। বলেছেন, দুই সপ্তাহের মধ্যে সন্ত্রাস নির্মূল করা হবে। সেনাবাহিনীকে আরও দীর্ঘসময় মাঠে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগে কথা ছিল ৯ই জানুয়ারি পর্যন্ত। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নানারকম কথাবার্তা চালু রয়েছে শাসক মহলে। যত কথাই বলা হোক না কেন, ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনী ফল দিয়ে শেখ হাসিনা দেশ শাসন করতে চাইবেন। আরেকটি নির্বাচন খুব দ্রুত হবে এমন আশা যারা করছেন তারা হতাশ হবেন অল্পদিন পরেই। বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা হবে। জামায়াত নির্মূল হবে। মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। প্রশাসন আরও দলীয়করণে আবদ্ধ হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভিন্ন দায়িত্ব পাবে। বাকশাল কায়েম হবে অন্য এক মোড়কে। সর্বোপরি মানবাধিকারের সংজ্ঞা পরিবর্তন হবে। গণতন্ত্র বন্দি হয়ে যাবে চার দেয়ালে। অবিশ্বাস্য বা নাটকীয় কিছু ঘটলে হয়তো অন্ধকার থেকে আলো আসবে। তা না হলে বাংলাদেশীরা একপর্যায়ে আত্মসমর্পণ করবেন অন্য শক্তির কাছে। কোনদিন টের পেলেও শুধু আফসোস করা ছাড়া কিছুই থাকবে না। অনেকেই বলছেন, খালেদার নির্বাচনে যাওয়া উচিত ছিল। নির্বাচনে কিভাবে যেতেন খালেদা? শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে রাজি হলেও নির্বাচন হতো কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় ছিল এবং আছে। কারণ, শাসক দল গোড়া থেকেই বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে চায়নি। তারা জানে যেনতেন নির্বাচনেও হেরে যেতে হবে। তাই খালেদাকে নির্বাচনমুখী করতে দেয়নি তারা। তত্ত্বাবধায়ক বাতিলের চিন্তা গত নির্বাচনের পরপরই নেয়া হয়। বিশেষ কমিটির আলোচনা ছিল লোকদেখানো। আদালতের রায় শেখ হাসিনাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। বিচারপতি খায়রুল হক জানতেন ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার কথা। সে কারণে রায় লেখার সময় তিনি বড্ড বেশি কৌশলী ছিলেন। খালেদা ভুল করেছেন, না শুদ্ধ করেছেন তা এখনই হয়তো মূল্যায়ন করা যাবে না। তবে তার সংলাপে যাওয়া উচিত ছিল। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশবাসীকে বলতে পারতেন আলোচনা অর্থহীন। সরকার বিরোধী দলকে চায় না সেটা আরও স্পষ্ট করে বলতে পারতেন। তা না করে আবেগ আর জেদ দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে চেয়েছেন। জামায়াত-নির্ভর হওয়া যে মস্ত বড় ভুল হয়েছে সেটা বোধ করি তিনি এখন বুঝতে পারছেন। লাভের মধ্যে লাভ হয়েছে সন্ত্রাসী দল হিসেবে জামায়াত দুনিয়াব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছে। কিছুটা হলেও আঁচ লেগেছে বিএনপি’র গায়ে। সরকার এখানে ভূমিকা রেখেছে এতে কোন সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হলো, বিএনপি নেত্রী কেন বুঝতে পারলেন না এতে তার দলের মডারেট অবস্থার পরিবর্তন হয়ে যাবে। তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে ৭০ ভাগ মানুষের সমর্থনপুষ্ট একটি দলের চেহারা এরকম হবে কেন? রাস্তায় জনগণকে শামিল করা গেল না কেন? তার সঙ্গে যেমন আন্তর্জাতিক শক্তি আছে, তেমনি সরকারের সঙ্গেও রয়েছে আন্তর্জাতিক শক্তি। খালেদার পক্ষের শক্তিরা হতাশা আর উদ্বেগ প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করেছে। আর সরকারের পক্ষের শক্তিরা সরব ছিল অ্যাকশনে। লবিও করেছে আন্তর্জাতিক মহলে। এখনও তারা সোচ্চার। বৃহৎ শক্তিগুলোর দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। খেলাটা কি তা খুব দ্রুত পরিষ্কার হয়ে যাবে। তবে সেটা যে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের পরিপন্থি হবে তা বলা যায় অনায়াসে।

Friday, January 3, 2014

গদ্যকার্টুন- ভালা করি ঘর বানায়া কয় দিন? by আনিসুল হক

আচ্ছা, আপনাদেরও কি এই রকম হয়? ধরুন, একটা কাজ করতে হবে। ধরা যাক, আপনি কাউকে একট চিঠি লিখবেন, বা কোনো একটা বিল জমা দেবেন,
কোনো একটা কিছুর জন্য আবেদন করবেন। কাজটা করার জন্য আরও তিন মাস সময় হাতে আছে। আপনি প্রথমে ভাবলেন ঠিক আছে, দুই মাস সময় হাতে রেখেই কাজটা করে ফেলব। এক মাস যায়, দুই মাস যায়, তারপর যখন তিন মাস যায় যায়, তখন আপনার হুঁশ হয়, এবং একেবারে শেষের দিন গিয়ে কাজটা সারেন?
যদি আপনার এই রকম হয়ে থাকে, তাহলে বুঝবেন, আপনি আমারই দলে। এবং আমার ধারণা, বেশির ভাগ মানুষই আসলে কাজ ফেলে রাখে, এবং শেষ মুহূর্তের আগে কাজ শেষ করে না। আপনারা যাঁরা আমার মতোই শেষ দিনের আগে কাজ শেষ করেন না, তাঁদের জন্য নিউ ইয়ার রেজুলেশন, নতুন বছরের অঙ্গীকার:
নতুন বছরে আমি হব ভালো ছেলে
সময়ে সারব কাজ রাখব না ফেলে।
আপনার মূল্যবান সময় কি ফেসবুকে অপব্যয়িত হচ্ছে? তাহলে আসুন, নতুন বছরে এই প্রতিজ্ঞা করি:
নতুন বছরে আমি এই পণ করি
ফেসবুক না পড়ে যেন সত্যি বই পড়ি।
আমার ওজন বেড়ে যাচ্ছে। ভুঁড়ি সামলাতে পারছি না। জিমনেসিয়ামে যাবার জন্য বার্ষিক কার্ড করেছিলাম, টাকা ব্যয় হয়েছে, ক্যালরি খরচ হয় নাই। একটা মেশিন কিনেছি, ব্যায়ামের যন্ত্র, সেটা ঘরের একটা কোণে অযত্নে পড়ে আছে, প্রথম দুই-তিন দিনই যা শরীরচর্চা হয়েছে, তারপর বেমালুম ভুলে গেছি সেই যন্ত্রের কথা। আপনাদেরও কি এই রকম হয়?
তাহলে আসুন, প্রতিজ্ঞা করি:
নতুন বছরে আমি এই করি পণ
খাওয়া কম ব্যায়াম বেশি কমাব ওজন।
ইনশা আল্লাহ, আগামী নতুন বছর পর্যন্ত যদি বেঁচে থাকি, আগামী বছরেও এই প্রতিজ্ঞাগুলোই নতুনভাবে উচ্চারণ করতে পারব। মানুষ প্রতিজ্ঞা করে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করার জন্যই।
এই জন্যই তো লোকে বলে, সিগারেট ছাড়া খুব সোজা। আমি আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে বহুবার সিগারেট ছেড়েছি।
আমি অবশ্য ধূমপান করি না। এই প্রতিজ্ঞা তাই আমাকে করতে হয় না, এই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করবারও দরকার পড়ে না।
***

এই পর্যন্ত পড়ার পর অনেকেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবেন। দেশের পরিস্থিতি ভয়াবহ। একতরফা একটা নির্বাচন সামনে। বিরোধী জোট সেই নির্বাচন বর্জন করেছে। অর্ধেকের বেশি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হয়নি। দেশে চলছে লাগাতার অবরোধ, লাগাতার হরতাল, লাগাতার বোমাবাজি, লাগাতার অগ্নিসংযোগ। দ্যাশ শ্যাষ। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ, কৃষকদের কপাল পুড়ে ছাই, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রবৃদ্ধি ৫-এর নিচে নেমে যেতে বাধ্য। নেতাদের আছে শুধু ক্ষমতাপ্রীতি। কেউ দেশের কথা ভাবছে না। এই অবস্থায় আপনি রসিকতা করেন। এই অবস্থায় তুমি মিয়া ক্যালরি, কোলেস্টেরল, ফেসবুক নিয়া ঘ্যানর ঘ্যানর করো।
তিন বছর ধরে একই কথা বলছি। বলছি যে, একতরফা নির্বাচন চাই না, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাই। বলছি, ভোটে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন চাই। কেউ আমার কথা শুনেছে?
গতকাল একজন সাবেক রাষ্ট্রদূত বললেন, বাংলাদেশে আছে আসল গণতন্ত্র। বকাওয়ালা বকে যাচ্ছে, লেখাওয়ালা লিখে যাচ্ছে, শোনাওয়ালা শুনে যাচ্ছে, করাওয়ালা নিজের মতো করে যাচ্ছে। এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।
প্রথম আলো লিখেছে, হাল ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। আশ্চর্য একটা দল। জরিপ বলছে, তারা জনপ্রিয়। জরিপ বলছে, তাদের দাবি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বেশির ভাগ মানুষই চায়। তার পরেও তাদের আন্দোলনে লোক হয় না। দেড় কোটি মানুষের শহরে দেড় লাখ না হোক, ১৫ হাজার লোক পথে নামবে না? নামবে কেন, কোনো নেতা নেমেছেন? নামবেন কী করে, সব নেতা তো কারাগারে। কথা কি সত্য? টিভি টক শোতে তো এখনো বিএনপির নেতাদের দেখি। কারণ হলো, বিএনপি সর্বহারাদের দল নয়। তাঁদের শরীরে মেদ আছে। নড়তে-চড়তে কষ্ট হয়।
শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকা কোনো গণতন্ত্রের জন্য বড় দুঃসংবাদ। আমরা এখন সেই দুঃসংবাদের মধ্যে আছি।
***

নতুন বছরে তাই আমরা কতগুলো রেজুলেশন নিতে পারি।
১. আগামী এক বছরে বাংলাদেশের সব জমি কিনে ফেলব।
২. আগামী এক বছরে বাংলাদেশের সব নদী ভরাট করে ফেলব।
৩. আগামী এক বছরে বাংলাদেশের সব গাছ কেটে ফেলব।
৪. আগামী এক বছরে প্রত্যেক সরকারি নেতার জন্য দুইটা করে টেলিভিশন চ্যানেল, পাঁচটা করে ব্যাংক, ছয়টা করে বিমা বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করব।
রসিকতা করছি। বুঝতেই পারছেন।
এবার একটা সিরিয়াস কথা। গত বছরের সবচেয়ে স্মরণীয় উক্তি হলো: ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না।’
***

না না, রাজনৈতিক আলোচনা বাদ। এখানে রাজনৈতিক আলোচনা নিষিদ্ধ। যে প্যাঁচ আপনি-আমি লাগাই নাই, যে সুতার কোনো অংশ, না ডগা, না মাঝখানেরটা, আপনার আমার ধরাছোঁয়ার মধ্যে নাই, সেই প্যাঁচ আমরা খুলব কীভাবে। যারা প্যাঁচ লাগিয়েছেন, কেবল তাঁরাই খুলতে পারবেন।
বরং আসুন, আমরা গান-বাজনা করি। হাসন রাজার গানটা গাই।
লোকে বলে বলে রে ঘরবাড়ি ভালা না আমার।
কী ঘর বানামু আমি শূন্যেরও মাঝার।
ভালা করি ঘর বানায়া কয় দিন রমু আর,
আয়না দিয়া চায়া দেখি পাকনা চুল আমার।

আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

গদ্যকার্টুন- ভালা করি ঘর বানায়া কয় দিন? by আনিসুল হক

আচ্ছা, আপনাদেরও কি এই রকম হয়? ধরুন, একটা কাজ করতে হবে। ধরা যাক, আপনি কাউকে একট চিঠি লিখবেন, বা কোনো একটা বিল জমা দেবেন,

Wednesday, January 1, 2014

‘বাংলাদেশের ভবিষ্যত অনিশ্চিত’

সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন আসন্ন। বাংলাদেশের ভবিষ্যত অনিশ্চিত বলেই প্রতীয়মান। এর বেশ কিছু কারণ বিগত দিনের সহিংসতার মধ্যে নিহিত।
লন্ডনের সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের সিনিয়র ফেলো ও কিংস কলেজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শ্রীনাথ রাঘবনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদক অশীষ যেচুরি। ‘১৯৭১: এ গ্লোবাল হিস্ট্রি অব দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থের লেখক শ্রীনাথ বাংলাদেশ সৃষ্টির বিষয়টিকে বৈশ্বিক ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশ সৃষ্টিতে বৈশ্বিক প্রভাব ছিল এবং ইসরাইলের সম্পৃক্ততার কথাও তিনি তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ১৯৭১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত প্রত্যক্ষ স্বাধীনতার কথা ব্যক্ত করেনি আওয়ামী লীগ।
নিচে সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো:
আপনার গ্রন্থটির নাম ‘১৯৭১: এ গ্লোবাল হিস্টি অব দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ’। বৈশ্বিক কেন?
সাধারণভাবে, বাংলাদেশ সৃষ্টির বিষয়টি উপমহাদেশের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একে দ্বিতীয় দেশ-বিভাজন হিসেবে দেখা হয়। এটা আমার কাছে খুব সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি মনে হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের যে ব্যাপক সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং এর মাধ্যমেই যে নিষ্পত্তির বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে, সংকীর্ণ এ দৃষ্টিভঙ্গিতে তা বিবেচনা করা হয় না। এটা ছিল বৈশ্বিক ঘটনা, অংশগ্রহণকারীরা নিজেরাও মনে করেছিলেন তাদের বৈশ্বিক সমর্থন নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল।
আপনার যুক্তিতে বাংলাদেশ সৃষ্টি অনিবার্য কোন বিষয় ছিল না। কিন্তু ১৯৭১ সালে বিভিন্ন পরিস্থিতি আপনি তালিকাভুক্ত করেছেন, যা বাংলাদেশ সৃষ্টিতে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল। আপনি এ বিষয়টি কিভাবে সমন্বয় করবেন?
একত্রিত পাকিস্তানের অস্তিত্ব ছিল নড়বড়ে। ভৌগোলিকভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায়। একই দেশের দুটি ডানা ভারতের মাধ্যমে পৃথক হয়েছে। বাঙালি ও পশ্চিম পাকিস্তানি অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য, ভিন্ন সংস্কৃতি এবং ভারসাম্যহীন ক্ষমতা-বণ্টনের বিষয়গুলো নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য ছিল। আমার যুক্তি হচ্ছে, স্বায়ত্তশাসন কিভাবে স্বাধীনতার দাবিতে রূপান্তরিত হলো, তা অনুধাবনের জন্য প্রকৃত অর্থেই পেছনের দৃশ্যপট আপনার জানার কোন প্রয়োজন নেই। বিষয়টি বুঝতে আমাদের প্রয়োজন আরও উদার দৃষ্টিভঙ্গি।
পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া যদি এতো জোরালো না হতো, তবে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি হতো না বলে কি মনে করেন আপনি?
আপনি একটি দুর্বল বন্ধনযুক্ত রাষ্ট্র পেতেন, যা কিছু ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবুর রহমান চেয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাস পর্যন্তও আওয়ামী লীগ প্রত্যক্ষ স্বাধীনতার কথা ব্যক্ত করেনি। তারা পূর্ব পাকিস্তানের কাছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরসহ একটি দুর্বল সম্পর্ক চেয়েছিলেন। আশা ছিল যে, দুর্বল সম্পর্কের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু একটি নির্বাচন হলে, বাঙালিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগবে। আর, সেটা হলে পূর্ব পাকিস্তান অধিক ক্ষমতার পাশাপাশি তাদের ন্যায্য হিস্যা বুঝে পেতো।
‘১৯৬৮ সালের চেতনা’র সঙ্গে এ বিষয়টিকে সম্পৃক্ত করার কারণ কি?
আমার দৃষ্টিতে ১৯৬৮ সালের ছাত্র-আন্দোলন পাকিস্তানের ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। ১০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন আইয়ুব খান। বৈষম্য ও সম্পদ পুঞ্জিভূত করার সমস্যার মধ্যেও পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে ভাল অবস্থায় ছিল। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে ছাত্র আন্দোলন পরিবর্তন ত্বরান্বিত করেছিল। ছাত্র আন্দোলন ছিল একটি বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ। আমি সিআইএ’র একটি নথি উদ্ধৃত করছি যেখানে তারা বলছে, এটা ছিল বৈশ্বিক ঘটনা। পাকিস্তানের ওই শিক্ষার্থীরা ছিল ভিন্ন প্রজন্মের। ১৯৪০-এর দশকে শেখ মুজিবুর রহমান নিজে একজন ছাত্রনেতা ছিলেন। ভিন্ন আকাক্সক্ষা নিয়ে তিনি পাকিস্তানের পক্ষে লড়াই করেছিলেন। ছাত্র আন্দোলনের আমূল সংস্কার আওয়ামী লীগকে বাধ্য করেছিল তাদের নমনীয় অবস্থান থেকে সরে আসতে।
এসব ঘটনা প্রবাহের মধ্যে ইসরাইল জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি আপনি উল্লেখ করেছেন। এ সম্পর্কে আরও কিছু বলবেন কি?
ভারতে অস্ত্র সরবরাহের ইতিহাস রয়েছে ইসরাইলের। ১৯৬৫ সালে ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে ভারতে অস্ত্র পাঠিয়েছিল ইসরাইল। ইসরাইলের সঙ্গে ভারতের গোপন লেনদেন ছিল। ১৯৭১ সালে ইসরাইল যে ভারতে অস্ত্র সরবরাহ করেছিল, সে সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র জানতো এমন কোন ইঙ্গিত নেই। ভারতের কাছ থেকে পূর্ণ কূটনৈতিক স্বীকৃতি ইসরাইলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ, সে সময় ইসরাইল বেশ বিচ্ছিন্ন ও একঘরে হয়ে পড়েছিল। তারা ভেবেছিল, ভারতে অস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি তাদের সহযোগিতা করবে।

‘বাংলাদেশের ভবিষ্যত অনিশ্চিত’

সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন আসন্ন। বাংলাদেশের ভবিষ্যত অনিশ্চিত বলেই প্রতীয়মান। এর বেশ কিছু কারণ বিগত দিনের সহিংসতার মধ্যে নিহিত।

রাজনৈতিক বিরোধ ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি by ওয়াহিদ উদ্দীন মাহমুদ

এবারের বছর শুরুতে অর্থনীতি নিয়ে ইতিবাচক ভাবনার সুযোগ খুব নেই, বিশেষত স্বল্প মেয়াদের সম্ভাবনা নিয়ে। দেশের রাজনীতি এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে অর্থনীতিও। চলমান রাজনৈতিক সংকটের কী করে রাত-দিনে সমাধান হবে। সে সম্বন্ধে বিবদমান দুই পক্ষের নেতৃত্ব যারা দিচ্ছেন তাদেরও কোনো ধারণা আছে বলে মনে হয় না। তাদের তৈরি সংকটের কারণে দেশের অর্থনীতিকে যে কত বড় মূল্য দিতে হতে পারে, সে সম্বন্ধে তাদের তেমন ভাবনা-চিন্তা আছে বলেও দেখা যাচ্ছে না। অর্থনীতির সাময়িক ক্ষয়ক্ষতি তো আছেই। তবে বিগত প্রায় দুই দশকের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা কতখানি ঝুঁকির মুখে যাচ্ছে, সেটি এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত প্রায় দুই দশকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের নানা সূচকের বিচারে বাংলাদেশে অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৯০ সাল থেকে বাংলাদেশ বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাবে উন্নয়নশীল বিশ্বের গড় হারের তুলনায় অনেক এগিয়ে আছে। দারিদ্র্যের হার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। জনসংখ্যার গড় আয়ু, শিশুমৃত্যুর হার, মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার হার, সক্ষম দম্পতিদের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের হার ইত্যাদি সামাজিক উন্নয়নের সূচকে বাংলাদেশ সমপর্যায়ের উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশ, এমনকি প্রতিবেশী ভারতকেও অনেক পেছনে ফেলতে সমর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশের এ অর্জন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ একটা কারণে_ বাংলাদেশ শুধু যে একটি মুসলিম প্রধান দেশ তাই নয়, এটি উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর ভারতবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত এমন একটি অঞ্চলের অংশ_ যেখানে রয়েছে মেয়েদের প্রতি বৈষম্যমূলক পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। এ কারণেই বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নের সূচকগুলোর এ অগ্রগতিকে একটি 'উন্নয়নের বিস্ময়' বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এর পেছনে কাজ করেছে জনগণের উন্নয়ন সচেতনতা, গোত্র-বর্ণের ভেদাভেদহীন সমাজ এবং সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর নানা কার্যকর কর্মসূচি ও সামাজিক উদ্যোগ। এর মাধ্যমে নানা ধর্মীয় গোঁড়ামিকেও ক্রমান্বয়ে অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছে। এখন ধর্মের নতুন করে রাজনীতিকরণ বাংলাদেশের এ নীরব সামাজিক বিপ্লবকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। নব্বইয়ের দশক থেকে যে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এ পর্যন্ত আমরা টিকিয়ে রাখতে পেরেছি_ আর্থসামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে তারও একটা ইতিবাচক প্রভাব নিশ্চয়ই আছে। আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে, দুর্নীতি, দলীয়করণ ও স্বেচ্ছাচারিতা অর্থনৈতিক সুশাসনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তা সত্ত্বেও নব্বই-পরবর্তী প্রতিটি সরকারকে মেয়াদান্তে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের সম্মুখীন হতে হয়েছে। দুর্নীতি ও অপশাসনের একটা অলিখিত সীমারেখা অতিক্রম করার কারণে জনগণ প্রতিবার ক্ষমতাসীন সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে। জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে নিজেরা অন্যায় সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন; কিন্তু নির্বাচনকে সামনে রেখে কিছুটা হলেও জনকল্যাণ সাধনের তাগিদ অনুভব করেছেন। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবীদ অমর্ত্য সেনের মতে, 'গণতন্ত্রে দারিদ্র্য নিরসন করা না গেলেও বড় ধরনের খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষ হয় না।' বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে শুধু খাদ্য নিরাপত্তারই উন্নতি হয়নি, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মৌসুমি খাদ্যাভাব বা মঙ্গার সমস্যারও অনেকাংশেই নিরসন হয়েছে। নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন গণমাধ্যম এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করে সরকারকে জবাবদিহি করতে পেরেছে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকারেরও কৃতিত্ব আছে। এর আগের জাতীয় নির্বাচনগুলো ঘিরেও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল এবং তাতে অর্থনীতি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে যে আন্দোলন হয় তাতে টানা হরতালের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর দুই মাস কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। তা কাটিয়ে উঠতে পরবর্তী সময় অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। তবে নানা কারণে এবারের রাজনৈতিক সংকটের জন্য অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও অনেক ব্যাপক ও গভীর হওয়ার আশঙ্কা আছে। অতীতের তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতির আকাশ যেমন বড় হয়েছে, তেমনি বিশ্ববাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ততাও অনেক বেড়েছে। বিভিন্ন খাতের উৎপাদনের মধ্যে পরস্পর নির্ভরশীলতাও বেড়েছে। এর ফলে পণ্য উৎপাদন, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও জাহাজীকরণ_ এসব কিছু নিরবচ্ছিন্নভাবে সচল রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এর কোথাও বিঘ্ন ঘটলে একাধিক খাতের ক্ষতির বোঝা পুঞ্জীভূত হয়ে অর্থনীতির ওপর বড় আঘাত আসতে পারে। চলমান সহিংস রাজনৈতিক বিরোধের ফলে তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতি তো আছেই, সেই সঙ্গে আছে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ও দেশের ভাবমূর্তির প্রশ্ন। লক্ষণীয়, অবরোধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই কিন্তু সম্ভাব্য রাজনৈতিক বিরোধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত সূচকগুলোর অবনতি শুরু হয়েছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের হিসাব থেকে দেখা যায়, বৈদেশিক সাহায্যের ব্যবহার। বিদেশি বিনিয়োগ, রেমিট্যান্স প্রবাহ_ সবই নিম্নমুখী। রফতানির প্রবৃদ্ধি এখনও ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও এর ওপর বিলম্বিত প্রভাব পড়বে। দেশের তৈরি পোশাক শিল্প এমনিতেই বিশ্বজুড়ে ভাবমূর্তির সংকটে আছে, তার ওপর আছে শ্রমিক অসন্তোষ। যুক্তরাষ্ট্র সে দেশের বাজারে জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়ার জন্য শর্ত বেঁধে দিয়েছে। আরও আশঙ্কার বিষয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নও আমাদের পোশাক রফতানির শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিলের বিষয়ে বিবেচনা করছে। এ মুহূর্তে আমাদের দরকার শক্তিশালী অর্থনৈতিক কূটনীতি, কিন্তু দেশে শক্ত গণতান্ত্রিক সরকার ছাড়া তা সম্ভব নয়। এবারের সংঘাতময় রাজনৈতিক সংঘাতের আরেকটা বৈশিষ্ট্য হলো_ এটা ঢাকাকেন্দ্রিক না হয়ে ছোট ছোট শহরে ও গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ছে। এ কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলে উৎপাদনের উপকরণ সরবরাহ ও উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ দুটোই বিঘি্নত হচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য হলো যে, বাজার ব্যবস্থার প্রচলিত কাঠামো দিয়ে এটি তেমন নিয়ন্ত্রিত হয় না, বরং এর ভিত্তিগুলো সামাজিক অনুশাসন ও ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে ব্যক্তিগত আস্থার সম্পর্ক। অর্থনীতির ভাষায় এটা হলো এক ধরনের সামাজিক মূলধন_ যা গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়া সহিংস রাজনৈতিক বিরোধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা হলো, গোত্র-বর্ণ দ্বারা বিভাজিত সমাজে গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। আশঙ্কার বিষয় হলো, আমাদের সমাজের রাজনৈতিক বিভাজন এখন গোত্র-বর্ণের বিরোধের পর্যায়ে গিয়ে পেঁৗছেছে।
গত দুই দশকের আমাদের অভিজ্ঞতা হলো, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্ততপক্ষে একটা চলনসই গণতন্ত্র হলেই চলে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুশাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই ক্রমে আরও শক্তিশালী করতে হবে। তবে সুষ্ঠু প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জবাবদিহির নূ্যনতম ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন আশু জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষ শুরুতে এটিই এখন জাতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ, অর্থনীতি ও রাজনীতি দুই ক্ষেত্রেই। হ লেখক
অর্থনীতিবিদ
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

Tuesday, December 24, 2013

সহজিয়া কড়চা- বঙ্গীয় হলফনামা by সৈয়দ আবুল মকসুদ

গণতন্ত্রের সঙ্গে হলফনামার কোনো সম্পর্ক আগে ছিল না। এই শব্দটিই আগে ভোটাররা শোনেননি। কেউ, যদি তিনি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হন, তাঁর সম্পদ ও অর্থকড়ি মাসে কত গুণ বাড়বে তা তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার।

Tuesday, November 26, 2013

সহজিয়া কড়চা- আজাওজা সরকার ও মহা জুয়া খেলা by সৈয়দ আবুল মকসুদ

জগতে কখনোই একই জাতীয় দুটি বা তারও বেশি ঘটনা এক রকম হয় না। স্থানবিশেষে, সময়ের কারণে এবং কাদের দ্বারা তা নিয়ন্ত্রিত, তার ওপর ঘটনার চরিত্র ভিন্ন হয়।

Wednesday, November 13, 2013

নারীস্বার্থ- রাষ্ট্র, সরকার ও বিরোধী দলের কাছে কী চাই by মালেকা বেগম

দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় সবাই অতীতের সূত্র ধরে বর্তমান আর আগামীর কথা বলছেন। প্রধানমন্ত্রী আর বিরোধী দলের নেতা দুজনেই অতীতের প্রসঙ্গে পরস্পরের প্রতি দোষারোপের বারুদ ছিটিয়ে দিয়েছেন ফোনালাপে।

Friday, November 1, 2013

অরণ্যে রোদন- নেতাদের কাছে আকুল আবেদন by আনিসুল হক

কী কী ঘটতে পারে আগামী কয়েক দিনে? কেউ জানে না। এই প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে নেই। ছয় মাস আগে যদি কোনো মন্ত্রীকে পেয়ে কোনো সাংবাদিক জিজ্ঞেস করতেন, কী হবে, জানেন কিছু?

Monday, October 14, 2013

সময়চিত্র- জরিপ এবং আগামী নির্বাচন by আসিফ নজরুল

ক্ষমতাসীন দল শেষ বছরগুলোতে এসে জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে। উন্নয়নশীল বহু দেশের মতো বাংলাদেশেরও এটি চিরন্তন বৈশিষ্ট্য। এবার আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও তা স্বাভাবিক ছিল।

নির্বাচন- ‘উন্নয়নে’ ভোট মেলে না by এ কে এম জাকারিয়া

মেয়াদের শেষ বছরে এসে আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতাসীন মহাজোট যখন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে, তখন তাদের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার বিষয়টি নানাভাবেই পরিষ্কার হয়ে ওঠে।