Friday, March 24, 2023

সদকাতুল ফিতর কেন দেবেন by মাহবুবুর রহমান নোমানি

যাদের ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব তাদের জাকাত-ফেতরা দেওয়া যাবে না। মা, বাবা, দাদা, দাদি এবং তাদের বাবা-মাকে জাকাত-ফেতরা দেওয়া যাবে না। এভাবে নিজের ছেলেমেয়ে, নাতি-পুতিকে জাকাত-ফেতরা দেওয়া জায়েজ নয়। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে জাকাত-ফেতরা দিতে পারবে না। ধনী ব্যক্তির নাবালক সন্তান এবং অমুসলিমকে জাকাত-ফেতরা দিলে আদায় হবে না।
সদকাতুল ফিতর আমাদের সমাজে ‘ফেতরা’ নামেই অধিক পরিচিত। দ্বিতীয় হিজরিতে ঈদুল ফিতরের মাত্র দুই দিন আগে রাসুলুল্লাহ (সা.) জনগণের উদ্দেশে খুতবা প্রদানকালে প্রথমবারের মতো সদকাতুল ফিতর আদায়ের নির্দেশ প্রদান করেন। এ সদকার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে রোজার ত্রুটিবিচ্যুতির ক্ষতিপূরণ এবং ঈদের দিন গরিব-অসহায়দের খাবারের ব্যবস্থা করা। এদিন যেন তারা খাদ্য সংকটে কষ্ট ভোগ না করে। এ মর্মে রাসুল (সা.) বলেন, ‘ঈদের দিন ফকির-মিসকিনকে আহারের সন্ধানে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানো থেকে মুক্তি দাও।’ (দারাকুতনি : ২১৩৩)। আবু দাউদ শরিফের বর্ণনায় রয়েছেÑ ‘ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সদকাতুল ফিতর আবশ্যক করেছেন রোজা পালনে ত্রুটিবিচ্যুতি, অহেতুক কথা-বার্তা, অশ্লীল কাজ-কর্ম ইত্যাদির ক্ষতিপূরণ এবং গরিব-মিসকিনদের আহারের চাহিদা পূরণস্বরূপ। আমাদের হানাফি মাজহাব মতে সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। রোজা রাখতে না পারলেও সদকাতুল ফিতর আদায় করা আবশ্যক।
সদকাতুল ফিতর কার ওপর ওয়াজিব
ঈদের দিন সকালে যার কাছে জাকাত ওয়াজিব হওয়া পরিমাণ অর্থ বা সম্পদ থাকে তার ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব। তবে জাকাতের নিসাবের ক্ষেত্রে ঘরের আসবাবপত্র, জায়গা-জমিন ইত্যাদি ধরা হয় না। কিন্তু সদকাতুল ফিতরের ক্ষেত্রে অতি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ব্যতীত অন্যান্য আসবাবপত্রের মূল্য ধর্তব্য। সুতরাং সেসব জিনিসপত্রের মূল্য সাড়ে বায়ান্না তোলা রুপার মূল্য পরিমাণ হলে সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। সদকাতুল ফিতর নিজের পক্ষ থেকে এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের পক্ষ থেকে আদায় করা জরুরি। স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের ফেতরা দেওয়া বাবার ওপর আবশ্যক নয়। তবে তিনি তাদের পক্ষ থেকে আদায় করে দিলে শুদ্ধ হবে। সদকাতুল ফিতর ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় ওয়াজিব হয়। সুতরাং যে সন্তান ঈদের দিন সুবহে সাদিকের কিছু সময় পর জন্মগ্রহণ করেছে তার ফেতরা দেওয়া আবশ্যক নয়। কেননা সে সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার সময় অনুপস্থিত ছিল। হ্যাঁ, ঈদের রাতে জন্মগ্রহণকারী সন্তানের ফেতরা আদায় করতে হবে। কারণ এ সন্তান সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার সময় বাবার সংসারে উপস্থিত।
সদকাতুল ফিতর কী দিয়ে আদায় করবে
রাসুলুল্লাহ (সা.) এর যুগে সাধারণত খেজুর, যব, কিশমিশ, ঘি এবং গম দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করা হতো। সুতরাং কেউ যদি এসব খাদ্য দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করতে চায়, তাহলে সেই পরিমাণ আদায় করতে হবে, যা নবীযুগে আদায় করা হতো। হাদিসের বর্ণনায় পাওয়া যায়, নবীজির যুগে খেজুর, যব, কিশমিশ এবং ঘি ‘এক সা’ (৩ কেজি ১৮৪ গ্রাম) পরিমাণে দেওয়া হতো। আর গমের ক্ষেত্রে এক সা এবং আধা সা দুই বর্ণনাই পাওয়া যায়। অতএব গম বা আটা দ্বারা ফেতরা আদায় করতে চাইলে ‘আধা সা’ (১ কেজি ৬৬২ গ্রাম) গম, আটা বা তার মূল দিলেই যথেষ্ট হবে। কিন্তু অন্য জিনিসের বেলায় এক সা (৩ কেজি ১৮৪ গ্রাম) খাদ্য বা তার মূল্য আদায় করতে হবে। এ নীতিমালা অনুযায়ী ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এ বছর ফেতরা নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বনিম্ন ৭০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯৮০ টাকা। জাকাত-ফেতরা আদায়ের ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উপকারের প্রতি লক্ষ করে জাকাতযোগ্য সম্পদের মূল্য পরিমাণ অর্থ দান করা উত্তম। এটি ইমাম আবু হানিফা ও তার অনুসারীদের অভিমত। সুতরাং কাপড়, খাদ্য ইত্যাদি দ্বারা জাকাত-ফেতরা না দিয়ে টাকা প্রদান উত্তম।
যাদের সদকাতুল ফিতর দেওয়া যাবে না
যাদের ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব তাদের জাকাত-ফেতরা দেওয়া যাবে না। মা, বাবা, দাদা, দাদি এবং তাদের বাবা-মাকে জাকাত-ফেতরা দেওয়া যাবে না। এভাবে নিজের ছেলেমেয়ে, নাতি-পুতিকে জাকাত-ফেতরা দেওয়া জায়েজ নয়। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে জাকাত-ফেতরা দিতে পারবে না। ধনী ব্যক্তির নাবালক সন্তান এবং অমুসলিমকে জাকাত-ফেতরা দিলে আদায় হবে না।
যাদের সদকাতুল ফিতর দেওয়া যাবে
যাদের ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব নয় তারা জাকাত, ফেতরা, কোরবানির চামড়ার অর্থ এবং সদকার টাকা গ্রহণ করতে পারবে। কারণ তাদেরই শরিয়তে ফকির বা মিসকিন বলা হয়েছে। আপন ভাইবোন, চাচা-চাচি, খালা-খালু, ফুফা-ফুফু, মামা-মামি, শ্বশুর-শাশুড়ি-জামাই প্রভৃতি লোক গরিব হলে জাকাত-ফেতরা দেওয়া যাবে। বরং এতে আত্মীয়তার হকও আদায় হবে। সবচেয়ে উত্তম দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে গরিব তালিবুল ইলমদের দান করা। এতে সদকায়ে জারিয়ার সওয়াব পাওয়া যাবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেনÑ ‘দান-খয়রাত ওইসব গরিব লোকের জন্য, যারাা আল্লাহর রাস্তায় আবদ্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে জীবিকার সন্ধান করতে পারে না।’ (সূরা বাকারা : ২৭৩)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরে মারেফুল কোরআনে বলা হয়েছেÑ ‘যারা ধর্মীয় কাজে নিয়োজিত থাকার কারণে জীবিকা উপার্জনের উদ্দেশ্যে অন্য কোনো কাজ করতে পারে না এখানে তারাই উদ্দেশ্য।’
সদকাতুল ফিতর আদায়ের উত্তম সময়
হাদিসের বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে সদকাতুল ফিতর আদায় করা উত্তম ও মুস্তাহাব। এ মর্মে হজরত ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে সদকাতুল ফিতর আদায়ের নির্দেশ দিতেন।’ (সুনানে তিরমিজি : ৬৭৭)। তবে ঈদের নামাজের আগে সদকাতুল ফিতর আদায় করতে না পারলেও ওয়াজিব রহিত হবে না। বরং অনতিবিলম্বে তা আদায় করতে হবে। পক্ষান্তরে ঈদের রাতের আগে সদকাতুল ফিতর আদায় করলে নির্ভরযোগ্য মতানুসারে আদায় হয়ে যাবে। এমনকি রমজানের শুরুতে আদায় করলেও শুদ্ধ হবে। পুনরায় আদায় করা জরুরি নয়। (তুহফাতুল আলমায়ি : ২/২০৮)।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া উসমানিয়া দারুল উলুম, সাতাইশ, টঙ্গী

Thursday, March 23, 2023

চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বের সুযোগ যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতছাড়া হয়েছিল

গৃহযুদ্ধের সময় শানবেইতে মাও জে দং, ১৯৪৭
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আমেরিকা আশা করেছিল ভবিষ্যতে সংঘাত এড়াতে যুদ্ধকালীন তাদের মিত্র দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
বিশেষ করে চীনের ওপর বিরাট ভরসা ছিল আমেরিকার। ওয়াশিংটন আশা করেছিল চীন তাদের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক এবং বাণিজ্যিক মিত্র হবে।
ফলে ১৯৪৫ সালে চীনে যখন গৃহযুদ্ধ শুরু হলো, আমেরিকা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো। মধ্যস্থতা করার জন্য বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম সমর নায়ক জেনারেল জর্জ মার্শাল, যিনি কূটনীতিতেও কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন, তাকে চীনে পাঠানো হয়।

গৃহযুদ্ধের সূচনা

১৯৪৫ সালে চীনে জাপানের দখলদারিত্ব শেষ হওয়ার পর সেখানে কম্যুনিস্ট এবং জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে পুরনো শত্রুতা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।
ইতিহাসবিদ ড্যানিয়েল কুর্টজ ফিলান বিবিসির কাছে ঐ সময়কার চীনের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন - চীনে তখন জাতীয়তাবাদী নেতা চাং কাই শেকের সরকার। তিনি পুরো চীনের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন।
অন্যদিকে কম্যুনিস্টরা তখন উত্তর-পশ্চিমের ইউনানে বসে চাং কাই শেককে চ্যালেঞ্জ করছিলো।
চীনের বাইরে বাকি পৃথিবী তখনও আদর্শের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে পড়েনি। "যুদ্ধ বিধ্বস্ত বিশ্বে তখন সবার মধ্যেই উদ্বেগ অনিশ্চয়তা চলছিল ঠিক কোন পথে রাজনীতি গড়াবে।"
চীনের পরিস্থিতি নিয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি জেনারেল মার্শালকে পাঠান। কিন্তু তখনকার পত্রপত্রিকায় জেনারেল মার্শালের সেই কূটনৈতিক মিশনকে 'বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন মিশন বলে বর্ণনা করা হয়েছিল।
ড্যানিয়েল কুর্টজ ফিলানের কথায়, "জেনারেল মার্শাল অবসরে যাওয়ার পরদিনই প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান তাকে ফোন করে বলেন জেনারেল আপনার কাছ থেকে শেষবারের মতো সাহায্য চাই। আমি চাই আপনি চীনে গিয়ে জাতীয়তাবাদী এবং কম্যুনিস্টদের মধ্যে লড়াই থামানোর ব্যবস্থা করুন, চীনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠান জন্য একটি পটভূমি তৈরি করুন যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আমেরিকার মিত্র হবে। এবং আমি চাইনা সোভিয়েতরা চীনের পরিস্থিতির সুযোগ নিক এবং কম্যুনিস্টরা জিতুক। কিন্তু একইসাথে আমি চাইনা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধুক।"
চাং কাই শেক ও তার স্ত্রীর সাথে জেনারেল মার্শাল, বেইজিং, ১৯৪৬
প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান জেনারেল মার্শালকে আশ্বস্ত করলেন, কয়েক মাসের বেশি তার হয়তো লাগবে না।
সেনা কর্মকর্তা হেনরি বায়রেড জেনারেল মার্শালের চীন মিশনে তার সঙ্গী হয়েছিলেন। ১৯৪৫ সালের ক্রিসমাসের ঠিক আগে তারা বেইজিং পৌঁছান।
১৯৬৯ সালে হেনরি বায়রেড তার এক স্মৃতিচারণে বলেছিলেন, "চীনা কম্যুনিস্ট সেনা বাহিনীকে ভেঙ্গে দিতে না পারলে আমাদের পক্ষে সাফল্য পাওয়া অসম্ভব ছিলো।"
মাও জেদংয়ের নেতৃত্বে চীনা কম্যুনিস্টরা তখন দেশের উত্তর পশ্চিম অংশের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। সেই ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার জন্য কম্যুনিস্টদের রাজী করানোটাই ছিল জেনারেল মার্শালের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ঐতিহাসিক ড্যানিয়েল কুর্টজ ফিলান বলেন, "জেনারেল মার্শাল তখন এমন এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন যে অনেকেই আশা করেছিলেন চীনে গিয়ে তিনি বিবদমান দুপক্ষকে কর্তৃত্বের সুরে বলবেন কী তাদের করতে হবে। কিন্তু তার বদলে তিনি দুপক্ষের সাথে বসলেন। শান্তির জন্য কী তারা চান সেটা তাদের কাছে জানতে চাইলেন।"
চীনে পৌঁছুনোর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জেনারেল মার্শাল জাতীয়তাবাদী এবং কম্যুনিস্টদের লড়াই বন্ধ করতে রাজী করালেন।
ড্যানিয়েল কুর্টজ ফিলান বলেন, এই সাফল্যের পেছনে ছিল জেনারেল মার্শালের অসামান্য ব্যক্তিত্ব এবং তখনকার সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্টালিনের সহযোগিতা।
"স্টালিন মাও জেদং এবং অন্যান্য চীনা কম্যুনিস্টদের নেতাদের বলেন, মার্শাল এত বড় ব্যক্তিত্ব যে তাকে সহযোগিতা করাই সমীচীন হবে। স্টালিন তাদের বলেন, চাং কাই শেকের বিরুদ্ধে জেতা কঠিন হবে। ফলে আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন দুটো দেশই চীনের বিবদমান দু পক্ষের ওপরই মীমাংসার জন্য চাপ তৈরি করে। মার্শাল দুপক্ষের মূল নেতৃত্বের সাথে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেন।"
প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান। চীনকে আমেরিকার প্রভাব বলয়ে রাখতে অনেক চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন মাও জে দংয়ের ডেপুটি চৌ এন লাই।
জেনারেল মার্শালের সফরসঙ্গী এবং সহযোগী জর্জ আন্ডারউড ১৯৭০ সালে তার এক স্মৃতিচারণায় চৌ এন লাই সম্পর্কে বলেছিলেন, "চৌ এন লাই এমন একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষ ছিলেন যিনি অনায়াসে জেনারেল মোটরস বা আইবিএমের মতো কোম্পানি চালাতে পারতেন। কিন্তু একইসাথে তিনি ছিলেন বেপরোয়া মিথ্যাচারী।"
ড্যানিয়েল কুর্টজ ফিলানের মতে চৌ এন লাই ছিলেন প্রচণ্ড সম্মোহনী শক্তিসম্পন্ন একজন নেতা। খুবই চতুর এবং একইসাথে অত্যন্ত বুদ্ধিমান। "তিনি এবং মার্শাল নিজেদের মধ্যে একটি সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেছিলেন।"
তবে মার্শালের সাথে চীনের জাতীয়তাবাদী নেতা চাং কাই শেকের সম্পর্ক ছিল ভিন্ন মাত্রার। "চাং কাই শেক এবং তার স্ত্রী দুজনেই অসামান্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তারা জেনারেল মার্শালকে ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকী তিনি কি ধরনের ককটেল পছন্দ করেন সেটাও তারা জেনে নিয়েছিলেন।"

জাতীয়তাবাদী এবং কম্যুনিস্টদের সন্ধি

যা আগে কখনই ধারণা করা যায়নি, জেনারেল মার্শালের চীন সফরে সেটাই সম্ভব হতে চলেছিল। জাতীয়তাবাদী এবং কম্যুনিস্টরা নিজেদের মধ্যে একটি বোঝাপড়ায় রাজী হয়ে যায়।
সামরিক বাহিনীর চরিত্র কী হবে, সে ব্যাপারে একটি সর্বসম্মত ফর্মুলা তৈরি হয়। সবাইকে অবাক করে চৌ এন লাই তাতে সায় দেন।
গৃহযুদ্ধ শেষে হওয়ার ঘোষণা দিতে চৌ এন লাই, মার্শাল এবং জাতীয়তাবাদীদের পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি একসাথে চীন জুড়ে এক সফরে বের হন। সাব্যস্ত হয় - কম্যুনিস্ট এবং জাতীয়তাবাদীদের সমন্বয়ে চীনে একটি নতুন গণতান্ত্রিক সরকার কায়েম হবে।
ঐ সফরে ইউনানে জেনারেল মার্শালের সাথে দেখা হয় মাও জেদংয়ের।
ড্যানিয়েল কুর্টজ ফিলান বলেন, "ইউনানে জেনারেল মার্শালের ২৪ ঘণ্টা অবস্থানকালে তারা যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সাথে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন। কীভাবে মাও জে দং এবং কম্যুনিস্টরা জাতীয়তাবাদীদের নেতৃত্বে সরকারে যোগ দেবে তা নিয়ে তারা কথা বলেন। সোভিয়েত কম্যুনিজমের প্রসার ঠেকানো নিয়ে কথা হয়।"

চার্চিল ফ্যাক্টর

তবে এসব যখন হচ্ছিল তখন ইউনানের কম্যুনিস্টরা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের আমেরিকা সফরের ওপর নজর রাখছিল। চার্চিল তখন আমেরিকাতে গিয়ে বলছেন, ইউরোপে কম্যুনিস্টরা লোহার পর্দা ফেলছে। এ ধরণের বক্তব্যে সন্দিহান হয়ে পড়তে শুরু করেন মাও জে দং এবং তার সঙ্গীরা।
"মাও হয়তো বুঝতে পারছিলেন যুদ্ধকালীন মিত্ররা যে পৃথিবী আশা করেছিলেন ভবিষ্যতের পৃথিবী তার থেকে অনেক আলাদা হবে। শীতল যুদ্ধের সূচনা হচ্ছিল এবং কম্যুনিস্টরা আত্মবিশ্বাসী ছিল যে তারা এই যুদ্ধ করতে প্রস্তুত।"
ফলে চীনে গৃহযুদ্ধ বন্ধের চুক্তি দ্রুত ভেঙ্গে পড়লো।
পরিস্থিতি আয়ত্তে রাখার জন্য মার্শাল কয়েক মাস ধরে চেষ্টা করেন। হেনরি বায়রড তার স্মৃতিচারণায় বলেন, "হার মেনে নেওয়ার লোক ছিলেন না মার্শাল। দিনের পর দিন চীনারা এসে তার দরজায় টোকা দিয়ে ঢুকে তাকে অনুরোধ করছিলেন তিনি যেন চলে না যান, কারণ শান্তির জন্য তিনিই শেষ ভরসা।"
কিন্তু একটা সময় পর হতাশ হয়ে দেশে চলে যান জেনারেল মার্শাল। তার দু বছর পর চাং কাই শেককে হারিয়ে কম্যুনিস্টরা পুরো চীনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।
চীনকে নিজের প্রভাব বলয়ে ধরে রাখার চেষ্টা ব্যর্থ হয় আমেরিকার।
গৃহযুদ্ধ বন্ধে জে মার্শালের চেষ্টার পক্ষে ইংরেজি এবং চীনা ভাষায় পোস্টার পড়ছেন দুজন সৈন্য

Monday, March 20, 2023

বাংলার স্থাপত্যে ঐতিহাসিক নিদর্শন শাহী মসজিদ by নাকিবুল আহসান নিশাদ

অতীতের স্থাপত্য বর্তমানের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। বাংলাদেশ এদিক দিয়ে বেশ সমৃদ্ধ। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এর প্রমাণ পাওয়া যায়। উত্তরবঙ্গে সম্ভবত এগুলো বেশি। বারো আউলিয়ার মাজার শরীফ, ভিতরগড় দুর্গনগরী, গোলকধাম মন্দির, কান্তজির মন্দির, নয়াবাদ মসজিদসহ অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে দেশের এই অংশে।
এমনই একটি স্থাপনা মির্জাপুর শাহী মসজিদ। পঞ্চগড়ের আটোয়ারির মির্জাপুরে এটি অবস্থিত। দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনকে সমৃদ্ধ করেছে এই মসজিদ। দৃষ্টিনন্দন কারুকাজখচিত মার্বেল পাথরের শৈল্পিক স্থাপনাটির নির্মাণ প্রসঙ্গে রয়েছে ভিন্ন মত।
মির্জাপুর শাহী মসজিদ
ঐতিহাসিকদের অভিমত, মোগল আমলে প্রতিষ্ঠিত হয় মির্জাপুর শাহী মসজিদ। কারও কারও ধারণা, মির্জাপুর গ্রামের মালিক উদ্দিন এই মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। কেউ কেউ মনে করেন, দোস্ত মোহাম্মদ নামের এক ব্যক্তি মসজিদটির নির্মাণকাজ শেষ করেন। তবে মসজিদের শিলালিপি ঘেঁটে প্রত্নতত্ত্ববিদরা ধারণা করেন, ১৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে মোগল শাসক শাহ সুজার শাসনামলে এটি গড়ে তোলা হয়।
তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মির্জাপুর শাহী মসজিদের দৈর্ঘ্য ৪০ ফুট, প্রস্থ ২৫ ফুট। দেয়ালে টেরাকোট ফুল ও লতাপাতার বিভিন্ন খোদাই করা নকশা আছে, যা মূলত লাল ও সাদা রঙের কালি দিয়ে করা হয়েছে।
মসজিদটির মূল আকর্ষণ গম্বুজের চার কোণের চারটি মিনার। সামনের দেয়ালের দরজার দু’পাশে গম্বুজের সঙ্গে মিল রেখে দুটি মিনার দৃশ্যমান। মসজিদের দেয়ালে কারুকার্য ও বিভিন্ন আকৃতির নকশা। দেয়ালের চারপাশ ইসলামি টেরাকোটা ফুল ও লতাপাতার নকশায় অলঙ্কৃত। সামনের অংশের টেরাকোটাগুলো ভিন্ন ভিন্ন। ভেতরের দেয়ালে বিভিন্ন রঙের খোদাই করা কারুকার্য ও বিভিন্ন ফুল, লতাপাতাসহ পবিত্র কোরআনের ক্যালিওগ্রাফি তুলির ছোঁয়ায় সজ্জিত। এগুলো দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

সম্পূর্ণ মসজিদ তিন ফুট উঁচু দেয়ালে ঘেরা। এতে প্রবেশের তিনটি বড় দরজা আছে। প্রধান দরজার ঠিক সামনেই একটি তোরণ। সেটি অতিক্রম করে মসজিদে প্রবেশ করতে হয়। প্রধান দরজার ঠিক ওপরেই ফরাসি ভাষায় লিখিত কালো বর্ণের একটি ফলক ও ফলকের লিপি। ভাষা থেকে অনুমান করা যায়, মসজিদটি মোগল সম্রাট শাহ আলমের শাসনমালে নির্মিত। এছাড়া ১৬৭৯ সালে ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে নির্মিত মসজিদের সঙ্গে এর অনেকাংশে মিল পাওয়া যায়। সেটিও মোগল আমলে নির্মিত।
শাহী মসজিদের সামনের অংশে নামাজ পড়ার জন্য কিছু জায়গা রাখা হয়েছে। প্রায় ৩৬৩ বছরের পুরনো এই মসজিদে এখনও নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া হয়। মসজিদের ঠিক পাশেই একটি মাদ্রাসা ও মক্তব। যেখান থেকে ভেসে আসে পবিত্র কোরআনের মিষ্টি সুর।

যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে দিনরাত বাসে সরাসরি আটোয়ারি যাওয়া যায়। সেখান থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে মির্জাপুর। ব্যাটারিচালিত অটোতে চড়ে মির্জাপুর বাজারে পৌঁছে ভ্যানে উঠতে হবে। এক কিলোমিটার পরে পূর্ব দিকে মির্জাপুর শাহী মসজিদ।
ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে দিনাজপুর পর্যন্ত যাওয়া যায়। সেখান থেকে আটোয়ারি রেলস্টেশন হয়ে বাস বা ব্যাটারিচালিত অটোতে চড়ে মির্জাপুর যেতে হবে। তারপর ভ্যানে উঠে মির্জাপুর শাহী মসজিদ।
কোথায় থাকবেন
পঞ্চগড় শহরে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে। এগুলোতে এসি/নন-এসি সিঙ্গেল বা ডাবল কক্ষ পাওয়া যায়। ভাড়া ১২০ টাকা থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে।

Wednesday, March 15, 2023

গল্প- বাবার কিছু ঋণ ছিল by ইমদাদুল হক মিলন

৫ অক্টোবর ২০১৭ সকালবেলা

স্যার, একজন লোক আসছে।

কোত্থেকে?

বাইন্নানগর। ইয়ে মানে বানিয়ানগর। পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকা।

চোখ তুলে জিন্নাহর দিকে তাকালাম। কী নাম?

রশিদুল।

বানিয়ানগর থেকে এসেছে শুনেই বুঝেছিলাম, রশিদুলই হবে। আমার কিশোরবেলার বন্ধু। বহু বছর তার সঙ্গে দেখা নেই, যোগাযোগ নেই। অথচ একটা সময়ে আমরা দুজন দুজনার জন্য পাগল ছিলাম। দিনের বেশিরভাগ সময় একসঙ্গে। কত রাত রশিদুলের সঙ্গে ওদের বাড়িতে ঘুমিয়েছি।

বসিয়েছিস?

জি স্যার।

চা-নাশতা দে। আসছি।

ড্রয়িংরুমের কোনার দিককার একটা সোফায় বসে আছে রশিদুল। সামনে চা-বিস্কুট-মিষ্টি। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। কেমন আছ, দিপু?

ভালো আছি, ভালো আছি। দাঁড়ালে কেন? বসো, চা খাও।

রশিদুল বসল। চায়ে চুমুক দিলো। আমি বসলাম মুখোমুখি সোফায়। অপলক চোখে রশিদুলের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ওকে আর চেনাই যায় না। শরীর একেবারেই ভেঙে গেছে। হলুদের কাছাকাছি রঙের ময়লা ফুলহাতা শার্ট পরা। কালো প্যান্টটাও যাচ্ছেতাই রকমের ময়লা। পায়ের স্যান্ডেল নতুন। তবে খুবই সস্তা ধরনের। আমি যে-রশিদুলকে দেখেছি, কে বলবে এই মানুষটাই সে।

পাকা শবরি কলার মতো রং ছিল রশিদুলের। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় থেকে ব্যায়াম করতো। কী সুন্দর স্বাস্থ্য! চেহারা ফুটফুটে। দামি প্যান্ট-শার্ট পরতো। পকেটে সব সময় টাকা। দুহাতে আমার জন্য খরচা করতো। বাড়ির ছোট ছেলে। অবস্থাপন্ন। মা বাবা বড় দুইভাই খুবই আদর করতো। সদরঘাটে কাপড়ের দোকান ছিল চারটা না পাঁচটা। বড় দুই ছেলে নিয়ে রশিদুলের বাবা চালাতেন। পকেটে পয়সা না থাকলেই দোকানে গিয়ে নিয়ে আসতো রশিদুল। নারিন্দার মোরগ-পোলাও খাওয়াতো আমাকে। আলাউদ্দিন রোডে নিয়ে হাজির বিরিয়ানি খাওয়াতো। সোনা মিয়ার দোকানের দই মিষ্টি, গরমের দিনে গস্নলাসের পর গস্নলাস লাচ্ছি, সালাউদ্দিনের দোকানের সরভাসা চায়ের সঙ্গে পরোটা, বাকরখানি। আমার তখন শুধুই খিদা পেত। অভাবের সংসার। এতগুলো ভাইবোন। বাবার ছোট চাকরি। নিজে না খেয়ে কতদিন রশিদুল আমাকে খাইয়েছে। দুপুরের পর বা রাতের বেলা রশিদুল আমাকে নিয়ে গেছে ওদের বাড়িতে। খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেছে। ছোট ছেলের খাবার ঢেকে রেখেছেন ওর মা। একজনের খাবার দুজনে ভাগ করে খাইনি আমরা। রশিদুল বলেছে, তুমি খাও দিপু। আমার খিদা নাই …

তুমি আছো কেমন, রশিদুল?

ভালোই আছিলাম। হঠাৎ একটু বিপদে পড়ছি।

কী করছো এখন?

ওই সেই কাজটাই।

কী যেন করতে তুমি? আমি ভুলে গেছি।

ভুইলা যাওয়ারই কথা। তুমি এত ব্যস্ত লোক। এতদিন দেখা-সাক্ষাৎ নাই। আমি অনেকবার তোমারে ফোন করছি। ধরো নাই। ব্যস্ত ছিলা বা বিদেশে ছিলা। হয়তো আমার ফোন নম্বরও তোমার কাছে সেভ করা নাই।

না সেভ করা আছে। ইচ্ছা করেই ধরিনি।

একটা টাইমে আমি সেইটা বুজছি। এই জন্য আর ফোন করি নাই।

তুমি আমার এমন বন্ধু, তোমার ফোন আমি ধরছি না, তোমার মনে হয়নি, কেন তোমার ফোন আমি ধরছি না?

হয়তো কোনো কারণে আমার উপরে রাগ হইছো।

সেটা তোমার জানতে ইচ্ছা করেনি?

রশিদুল চুপ করে রইল। চায়ে শেষ চুমুক দিলো।

শুধু চা খেলে কেন?

আমি নাশতা কইরা আইছি। তুমি আসার আগে এইখান থিকা একটা মিষ্টিও খাইছি।

ডায়াবেটিস নাই তো?

না। অসুখ-বিসুখ নাই। শরীর ভালোই আছে।

আমিও আলস্নলাহর রহমতে ভালো আছি।

সেইটা তোমারে দেইখাই বুঝা যায়।

তবে তোমার শরীর ভেঙে গেছে।

হ ভাঙছে। নানান অসুবিধায় থাকি। তুমি কাজের কথা জানতে চাইছিলা। আমি বড়লোকদের বাড়ির লনে, কোনো কোনো মিলকারখানার সামনের লনে, পিছনের বাগানে মূর্তি বানাইয়া দেই। ফোয়ারা বানাইয়া দেই। এই সমস্ত কাজ করি।

তাতে চলতে পারো?

পারি। মাঝে মাঝে ভালোই কাজ থাকে হাতে। মাঝে মাঝে থাকে না। কোনো কোনো পার্টি টাকা-পয়সা নিয়া ঘুরায়। তখন বিপদে পড়ি। এইবার সেইরকম একটা বিপদে পড়ছি। নতুন একটা কাজও পাইছি। আড়াই-তিন লাখ টাকার কাজ হইব। এইসব কাজের শুরুর সময় নিজের কিছু ইনভেস্ট করতে হয়। হাতে নাই কিছুই। বড় মেয়েটা আইএ পরীক্ষা দিব, ওর লেইগাও কিছু টাকার দরকার …

তোমার তো দুটোই মেয়ে?

হ। আমি বিয়া করলাম অনেক দেরি কইরা। বড় মেয়েটা আইএ পড়ে, ছোটটা পড়ে ক্লাস নাইনে …

আর আমি দাদা হয়ে গেছি। নাতনির বয়স আট বছর।

তাই নাকি? গগনের মেয়ের আট বছর বয়েস?

হ্যাঁ। সে হচ্ছে আমার জান। সারাক্ষণ দাদার সঙ্গে। ওর জন্যই গগনকে বিজনেস বুঝিয়ে দিয়েছি। কিছুই আমি দেখি না। গগন আর ওর বউ দেখে। আমার বউমার নাম অনন্যা। সেও অস্ট্রেলিয়া থেকে এমবিএ করে এসেছে। গগনের সঙ্গেই পড়তো। দারুণ মেয়ে। যেমন হিসাবি, তেমন সংসারি। ওরা দুজন বিজনেস সামলায় আমি আর শাহিন আছি নাতনি নিয়ে। নাতনির নাম জাইমা।

তোমার ছেলের নাম গগন, এইটা আমার মনে আছে। কাকার ডাকনাম আছিল গগন। এইজন্য তুমি তোমার ছেলের নাম রাখছো।

বাবার কথা মনে হলেই আমার দীর্ঘশ্বাস পড়ে। এখনো পড়ল। কী অমানুষিক কষ্ট একজন মানুষ তাঁর সংসার-ছেলেমেয়েদের জন্য করে গেছেন। আজকালকার দিনে সেটা ভাবাই যায় না। আমার ভাইবোনরা সবাই ভালো আছে। কেউ দেশে, কেউ আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ায়, কেউ ইতালিতে, কেউ ওমানে। বাবার কষ্টের কথা, আমাদের অতীতের কথা মনেও রাখেনি। এমনকি বাবার মৃত্যুদিনটির কথাও মনে রাখে না কেউ কেউ।

আমি রেখেছি। যখনই নিজের ছেলেটিকে দেখি, নাম ধরে তাকে ডাকি না, ডাকি বাবা বলে, সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে বাবার কথা। বেঁচে থাকলে বাবার বয়স হতো এখন বিরানববই বছর। এই বয়সের কত মানুষ আছে চারদিকে। বেঁচে থাকলে বাবা দেখে যেতে পারতেন তাঁর ছেলেমেয়েরা কেমন আছে। তাঁর দিপু কেমন আছে। আহা রে, আমার বাবাকে আমি বুকে তুলে রাখতাম।

রশিদুল, তুমি এখনো সেই বাড়িতেই আছো?

হ ভাই। ওই বাড়িতেই আছি। কই আর যামু, কও? সব মিলাইয়া পোনে চাইর কাঠার মতন জায়গা। লম্বা আর চিপা। দুইজন মানুষ পাশাপাশি হাঁটতে পারে না।

মনে আছে, মনে আছে। দোতলা টিনের ঘরটা আছে?

না, ওইসব কিছুই নাই। ভাগ-বাটোয়ারা হইয়া গেছে। আমার তো একটাই বইন আর আমরা তিন ভাই। বইনের অংশটা বড়ভাই কিনা রাখছিল। দুই ভাই সামনের অংশ নিছে, আমি পাইছি পিছনের অংশ। এক কাঠার মতন হইব। খালি আমার ঘরটাই টিনের। বড় ভাইরা দোতলা বিল্ডিং করছে। বড়ভাই মারা গেছে। তার ছেলেরা আছে। দুই ছেলে। ওরা থাকে। অবস্থা তেমন ভালো না। সদরঘাটের ফুটপাতে দোকানদারি করে। মাজারো ভাই সৌদিতে আছিল। কিছু টেকা-পয়সা আছে। ওর এক মাইয়া। বিয়া হইয়া গেছে। জামাই কিছু করে না। এক ছেলে এক মেয়ে নিয়া মাইয়া আমগো বাড়িতে থাকে। জামাইটা নেশা করে। ফেনসিডিল খায়।

তোমাদের একসময় খুবই ভালো অবস্থা ছিল। এমন হলো কেন? সদরঘাটের দোকানগুলোর কী হলো?

বাবা মারা যাওয়ার পর আসেত্ম আসেত্ম সব গেছে। দোকানে লোকসান হয়। ভাইরা যে যার মতন টাকা সরায়। মা হিসাব চাইলে ঝগড়া করে। আমি কথা কইলে মারামারি লাগনের দশা হয়। মায় মরণের আগেই একটা একটা কইরা গেল পাঁচটা দোকান। এখন নাই কিছুই। তাও ওই বাড়ি না থাকলে কই যে ভাইসা যাইতাম!

রশিদুল কাতর চোখে আমার দিকে তাকালো। দিপু, বিপদে পইড়া তোমার কাছে আইছি ভাই।

আমি রশিদুলের কথার ধার দিয়েও যাই না। তোমার সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই কত বছর হবে, রশিদুল?

আমার বিয়ার পরপরই। বাইশ-তেইশ বছর হইব।

ঠিক তেইশ বছর। তেইশ বছর পর তোমার সঙ্গে দেখা। বিয়ের আগেও তোমার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। ফোনে কথা হতো। দেখা হতো মাঝে মাঝে। তোমাদের বাসায় ফোন ছিল না। পাশের বাড়ির একটা নাম্বার ছিল আমার কাছে। ওই নাম্বারে ফোন করলে ওরা ডেকে দিতো।

মনে আছে। তখন মোবাইল আসে নাই দেশে। বিয়ার আগে তো যোগাযোগ আছিলই, বিয়ার পরও কিছুদিন আছিল। তারপরই যোগাযোগ বন্ধ হইয়া গেল। আমার বিয়াতে তোমরা যাইতে পারো নাই। শাহিনরে নিয়া তুমি গেছিলা আমরিকায়।

ঠিক। একদম ঠিক। আমেরিকা থেকে এসে তোমাদের বাড়িতেও একদিন গিয়েছিলাম। তোমার বউ দেখলাম। তাকে সোনার একটা চেন দিলাম। তোমার বউকে বললাম আমরা কী রকম বন্ধু। আমি বললাম তুমিও বললে। তার পরও তোমার বউ …

রশিদুল তীক্ষ্ণচোখে আমার দিকে তাকালো। সায়রা কী করছিল?

বলবো, বলবো। এতদিন পর তুমি যখন এসেছই, সে-কথা অবশ্যই বলবো। তোমাকে দেখে বাবার কথা মনে পড়ল। আমার বাবাকে তুমি কাকা বলতে। আজো বললে। ভালো লাগল খুব। ছেলের নাম গগন রেখেছি বাবার কথা ভেবে। বাবা ডাকি। যেন আমার বাবা বেঁচে আছেন, আমার সঙ্গেই আছেন। অফিস থেকে ফিরে এলে আমি যেমন সারাক্ষণ বাবার সঙ্গে সঙ্গে থাকতাম, বাবা বাবা করে শুধু ডাকতাম, ছেলে বাড়ি থাকলে ওকে যখন বাবা বাবা বলে ডাকতে থাকি, মনে হয় আমি আমার বাবাকেই ডাকছি।

কাকায় তোমারে সবথিকা বেশি আদর করতো। তুমিও কাকার জন্য পাগল আছিলা। কও দিপু, সায়রা কী করছিল?

তার আগে তুমি আমার দুয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দাও। এই যে এতগুলো বছর কেটে গেল, তুমি কখনো আমার কাছে আসোনি কেন বা জানতে চাইলে না কেন, কী কারণে আমি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি না?

ভাবছি কোনো কারণে তুমি আমার উপরে রাগ হইয়া রইছো।

যদি তাও হতো, সেই রাগ ভাঙাবার চেষ্টা করবে না? তুমি আমার এমন বন্ধু!

ওই যে বললাম, ভাবছি তুমি ব্যস্ত মানুষ, এতবড় ব্যবসা করো। বিদেশে থাকো বেশিরভাগ সময়, তোমারে বিরক্ত না করি। তারপর সংসারের চাপ, ভাইগো লগে বাড়ি লইয়া ঝগড়া-বিবাদ। কামকাইজের চাপ, সব মিলাইয়া জীবনডা আগের দিনের মতন নাই। এই আর কি! দুই-চাইরবার তোমারে ফোন কইরা দেকলাম। তুমি আমার ফোনও ধরো না, কাইটা দেও, কলব্যাকও করো না। মনে করলাম, তুমি বড় মানুষ, ছোটবেলার গরিব বন্ধুরে হয়তো মনে রাখতে চাও না, এই জন্য আর চেষ্টা করি নাই। ঠিক আছে, থাকি যে যার মতন।

আমি কিন্তু তোমার খবর রাখতাম। যদিও গেণ্ডারিয়ায় যাওয়া হয় না বহু বছর। নিজেদের বাড়ি আমাদের ছিল না। ভাড়ায় থাকতাম। শাহিনদের বাড়ি ছিল। মাঝে মাঝে সেই বাড়িতে যেতাম। তাও এক দুবছরে এক-আধবার। সেই বাড়ি ডেভেলপারকে দিয়ে দেওয়া হলো। শাহিনের একটা ফ্ল্যাট আছে। ভাড়া দেওয়া। শাহিনও সেই বাড়িতে আর যায় না। কেউ নেই তো! ওর চাচা-ফুফুরা, ভাইরা সবাই ওই এলাকা ছেড়েছে। কেউ উত্তরায় কেউ গুলশান বনানী বারিধারা বা বসুন্ধরায়। আর যেরকম ট্রাফিক জ্যাম! পুরান ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কটা শেষই হয়ে গেছে আমাদের। তবে পুরনো দিনের বন্ধুদের খোঁজখবর আমি রাখি। কে কেমন আছে, জানি। তোমার খবরও রাখতাম। দুই মেয়ে নিয়ে মোটামুটি দিন চলছে তোমার, এসব জানতাম। তোমার বউর কারণে সম্পর্কটা আর রাখতে চাইনি।

কী করছিল সে এইটা আমারে কও ভাই। আমি কিছুই বুঝতে পারতাছি না।

তোমার বিয়ের মাস তিন-চারেক পরের ঘটনা। আমি বিজনেস শুরু করেছিলাম তিন বন্ধুর সঙ্গে। অর্থাৎ আমরা চারজন পার্টনার। ওদের কাউকে তুমি চেনো না। আমার অন্য সার্কেলের বন্ধু। টাকা বেশি ওদেরই। গার্মেন্টস করলাম একটা। সেখান থেকে এখন আঠারোটা প্রতিষ্ঠান আমাদের। যখন শুরু করি, তখন থাকি মগবাজারের ফ্ল্যাটে। তারপর উত্তরায় এই বাড়ি করে চলে এলাম। যা হোক, আমার ছেলেটা ছোট। ভাইরা যে যাকে নিয়ে আছে। তাদের অবস্থা ভালো। বোনদের অবস্থা ভালো। বিজনেস নিয়ে খুবই  ব্যস্ত থাকি আমি। বিজনেসে আমাকে হেলপ করার বা পাশে থেকে একটু সহযোগিতা করার কেউ নেই। ওদিকে তুমি বিয়ে করেছ কিন্তু তোমার সেভাবে চলার অবস্থা নেই। ভাবলাম, একা একা দৌড়াদৌড়ি করি, তোমাকে রাখি সঙ্গে। আমি বিদেশ-টিদেশ গেলে তুমি সব দেখলে। যদিও পরে সেটা শাহিন করতো। আমি চাইনি আমার বউ বিজনেসে ইনভলভ হোক। পরে বাধ্য হয়ে তা করতে হলো। আমি দেশে না থাকলে শাহিন অফিসে যেত, ফ্ল্যাক্টরিতে যেত। ওই জায়গাটায় আমি তোমাকে চেয়েছিলাম। শাহিনও তাই বলেছিল। এক দুপুরে তোমাকে ফোন করলাম। পাশের বাড়ির সবাই আমাকে চেনে। তোমাকে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে ডেকে দেয়। সেদিনও ডাকলো। তুমি ধরলে না, ফোন ধরলো তোমার বউ। বললাম, রশিদুলকে একটু ডেকে দাও। জরুরি কথা আছে। তোমার বউ বেশ রুক্ষ ভঙ্গিতে সরাসরি বললো, এখন ডেকে দেওয়া যাবে না। সে ঘুমায়। আমি বেশ বড় রকমের একটা ধাক্কা খেলাম। বললাম, তুমি গিয়ে আমার কথা বলো, আমার কথা বললে সে উঠে এসে ফোন ধরবে। তখন সে আরো রুক্ষ হলো। তার দরকার কী? আপনেই পরে ফোন কইরেন। রাখি এখন।

রশিদুল ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়েছিল। কোনো রকমে বলল, কও কী?

হ্যাঁ, এইভাবেই বলেছিল এবং ফোন রেখে দিয়েছিল। কেন, তুমি জানো না?

না।

না মানে? তোমাকে সে বলেনি?

না।

আমি ফোন করেছিলাম, বলেনি?

না।

বলো কী?

হ। আমারে বলে নাই। তুমি ফোন করছিলা এইটা আমি জানিই না।

নিশ্চয় বলেছে। তুমি ভুলে গেছ। তেইশ বছর আগের কথা।

যত বছর আগের কথাই হোক, তোমার ব্যাপারে কোনো কথা আমি ভুলুম না। সে আমারে কিছুই বলে নাই। কথাটা আইজ, এই পয়লা আমি শোনলাম।

আমি হতবাক হয়ে রশিদুলের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আশ্চর্য ব্যাপার! তোমার বউর ব্যবহারে আমি তো অবাক হয়েইছিলাম, তারপর আরো অবাক হলাম যখন দেখলাম তুমি আমাকে ফোন করছো না, যোগাযোগ করছো না। ভাবলাম নিশ্চয় আমার কথা তুমি আর সেভাবে মনে রাখতে চাইছো না বা কোনো ব্যাপারে তুমি এবং তোমার বউ দুজনেই আমার ওপর বিরক্ত। এসব নিয়ে শাহিনের সঙ্গে কথা বললাম। সে একটা অদ্ভুত কথা বললো। বললো যে, রশিদুলভাই আর তার বউ বিয়েতে হয়তো আমাদের কাছ থেকে বড় রকমের কোনো কিছু আশা করেছিল। যখন দেখলো তেমন কিছু হলো না, তখন দুজনেই বিরক্ত হয়েছে। বিরক্ত থেকে হয়েছে রাগ। আশাহত হলে এমন রাগ মানুষের হতেই পারে। আমি তুমি একসঙ্গে থাকলে অন্যদিকে খেয়াল থাকে না আমাদের। বউরা কিন্তু অনেক কিছু খেয়াল করে। আমেরিকা থেকে এসে আমি আর শাহিন গেলাম তোমার বউ দেখতে। বায়তুল মোকাররম থেকে একটা চেন কিনে নিয়ে গেলাম। শাহিন সেটা দিলো তোমার বউকে। আমি খেয়াল করিনি, শাহিন খেয়াল করেছে, চেনের জন্য ছোট্ট মখমলের একটা থলি দেয় সোনার দোকান থেকে, সেই থলি থেকে চেনটা বের করে তোমার বউ নাকি হাতের তালুতে নিয়ে সেটার ওজন বোঝার চেষ্টা করছিল। সোনার জিনিস গিফট পেলে মেয়েদের মুখ আনন্দে ঝলমল করে ওঠে। তার কিছুই তোমার বউর হলো না, বরং মুখে একটু অসন্তুষ্টি দেখা গেল। অর্থাৎ সে মোটেই খুশি হলো না। শাহিন পরে আমাকে বলেছে, মানে ফোনের ঘটনা শুনে বলেছে, রশিদুলভাইয়ের বউ আমাদের ওপর বিরক্ত। নিশ্চয় রশিদুলভাইকে নানা রকম কথা বলে তোমার ব্যাপারে তার মন বিষিয়ে দিয়েছে। নয়তো সে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করছে না কেন? কিশোর বয়স থেকে তোমরা এত ঘনিষ্ঠ বন্ধু!

রশিদুল আগের মতোই হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। চোখের পলক ফেলতেও যেন ভুলে যাচ্ছে।

তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে শোনার পর থেকেই ভেবে রেখেছিলাম, তোমাকে আমার সঙ্গে রাখবো। যে-কাজ করো ওই করে জীবন চলবে না। ধীরে ধীরে তোমার জীবনটা আমি বদলে দেবো। এজন্য তোমার বিয়ে নিয়ে সেভাবে আমি ভাবিনি। ভেবেছি তুমি তোমার মতো বিয়েটা সেরে ফেলো। তারপর তোমার চলার ভালো একটা পথ আমি করে দেবো। নয়তো তোমার বিয়েতে লাখখানেক টাকা তো আমি দিতেই পারতাম।

আমার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। ভাবলাম এক, হয়ে গেল আরেক।

রশিদুল কাতর গলায় বললো, আমার কপাল। কপালের দোষ।

তারপর তুমি যখন এক-দেড় বছর পর, হঠাৎ হঠাৎ ফোন করতে, আমি বুঝতাম, নিশ্চয় আর্থিক অসুবিধায় পড়ে ফোন করেছো। এজন্য তোমার ফোন ধরতাম না। কেটে দিতাম। শাহিনকে তোমার ফোনের কথা বলতাম। শাহিন বলতো, রশিদুলভাই থাকুক তার বউ নিয়ে। আমাদের কী দরকার তাকে নিয়ে ভাববার? যে আমাদের কথা ভাববে না তার কথা আমরা কেন ভাবব? তুমি তো চেয়েই ছিলে তার জীবন বদলে দিতে, বউটার জন্যই হলো না।

রশিদুল হাহাকারের গলায় বলল, আহা রে, আহা। কোথায় থিকা কী হইয়া গেল! কপাল, সব আমার কপাল!

এ-সময় জাইমার গলা শোনা গেল। দাদু, দাদু। কোথায় তুমি?

আমি উঠে দাঁড়ালাম। এই তো, এখানে। দাঁড়াও, আসছি।

রশিদুলের দিকে তাকিয়ে বললাম, আজ ছুটির দিন। নাতনিটা বেলা করে উঠেছে। আমি একটু ওর সঙ্গে দেখা করে আসি। আমাকে না দেখা পর্যন্ত হাতমুখ ধোবে না, খাবে না। তুমি বসো। আরেক কাপ চা দিতে বলব?

না ভাই। যেই জন্য আইছি …

বসো, বসো।

জাইমা না ডাকলেও অবশ্য আমি উঠতাম। রশিদুল কেন এসেছে তা শুরুতেই বুঝেছি। শাহিনকেও ঘটনাটা বলা দরকার। সে অবশ্য জানে না রশিদুল এসেছে। সব শোনার পর নিশ্চয় দেখা করতে আসবে। তাকে বলে দেবো বিষয়টা যেন না তোলে। তাহলে রশিদুল লজ্জা পাবে। রশিদুলকেও বলা দরকার, শাহিন এলে তাকে যেন ওসব বিষয়ে কিছুই না বলে।

দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে এলাম। ব্যাপারটা তাকে বুঝিয়ে বললাম। রশিদুল মাথা নাড়লো।

জাইমা আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে সিঁড়ির সামনে। বললো, কোথায় ছিলে তুমি? আমি এতক্ষণ ধরে ডাকছি? শুনতে পাওনি?

পেয়েছি তো। তোমার ডাক শুনেই তো ছুটে এলাম।

আমার গলা শুনে শাহিন বেরিয়ে এলো। জাইমাকে সে ডাকে প্রিন্সেস। বলল, প্রিন্সেস তো পাগল হয়ে গেল তোমার জন্য? কে এসেছে তোমার কাছে?

রশিদুলের কথা বললাম। শুনে সে খুবই অবাক। রশিদুলভাই এত বছর পর?

সংক্ষেপে ঘটনা তাকে বললাম। সে অবাক। বলো কী?

হ্যাঁ। দেখো তো কী কা-! একটা ফোন আর রশিদুলের বউয়ের ওইটুকু কথায় কোথা দিয়ে কী হয়ে গেল! তুমি গিয়ে রশিদুলের সঙ্গে কথা বলো। আমি জাইমাকে একটু সময় দিয়ে আসছি।

জাইমা বলল, সময় আবার কী? আমাকে ব্রেকফাস্ট করিয়ে তারপর যাবে।

ওকে মাই ডিয়ার, ওকে।

মিনিট পনেরো পর ড্রয়িংরুমে এলাম। জাইমাকে ব্রেকফাস্ট করিয়ে নিজের বেডরুম ঘুরে এসেছি। জাইমাও আসতে চেয়েছিল এই রুমে। তাকে ট্যাব ধরিয়ে দিয়েছি। ওই জিনিস নিয়ে এখন গেমস খেলবে।

ড্রয়িংরুমে এসে দেখি ভালোই গল্প করছে শাহিন আর রশিদুল। আমি আসার পর শাহিন উঠল। তোমরা আড্ডা দাও। আমি যাই। রশিদুলভাই, দুপুরে আমাদের সঙ্গে খেয়ে যাবেন।

রশিদুল বিনীত গলায় বলল, না বইন, আইজ না। আরেকদিন আইসা খামুনে। আইজ তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হইব। অসুবিধা আছে।

শাহিন সিঁড়ির দিকে চলে গেল। রশিদুল উঠে এসে দুহাতে আমার ডানহাতটা জড়িয়ে ধরল। সায়রার কথা তুমি মনে রাইখো না ভাই। ওর হইয়া আমি তোমার কাছে মাফ চাইতাছি।

আরে না না, মাফ চাওয়ার কিছু নেই। যা হওয়ার হয়ে গেছে। তুমি বসো।

বসনের আর টাইম নাই ভাই। দুইদিন ধইরা বাড়িতে বাজার নাই। মাইয়া দুইটার শুকনা মুখ আমি আর সহ্য করতে পারতাছি না। কত জায়গায় চেষ্টা করলাম, দুইশো টাকাও জোগাড় করতে পারি নাই। উপায় না দেইখা তোমার কাছে আইছি। অন্তত পাঁচ হাজার টাকা তুমি আমারে দেও। কামকাইজ পাইলে টাকাটা আমি ফিরত দিমু। মাইয়া দুইটার মুখের দিকে আমি তাকাইতে পারি না। দিপু …

রশিদুল হু-হু করে কাঁদতে লাগল। আর আমার তখন অদ্ভুত একটা ব্যাপার হলো, রশিদুলের কান্নায় আমি আমার বাবার মুখটা দেখতে পাই। রশিদুলের মেয়েদের শুকনা অনাহারি মুখের কথা ভেবে দেখতে পাই আমার বোনদের অনাহারি শুকনা মুখ। আমার চোখ চলে যায় বহু বহু বছর পিছনে ফেলে আসা এক জীবনে। বাবার চাকরি নেই। বাড়িভাড়া দিতে পারছেন না। বাজার করতে পারছেন না। ছেলেমেয়েদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারছেন না তিনবেলা। ধারের আশায় অনাহারি মানুষটা কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন! এক দুপুরে খেতে বসেছেন। সামান্য ভাত আর ডাল। মা করুণ মুখে বসে আছেন সামনে। ভাত মুখে তুলতে গিয়ে এই রশিদুলের মতো করে কাঁদতে লাগলেন বাবা। চোখের পানি টপটপ করে পড়তে লাগল ভাতের থালায়। ছেলেমেয়েদের খেতে দিতে পারেন না এই কষ্টে কাঁদছিলেন মানুষটা …

রশিদুলের কান্নার সঙ্গে বাবার সেই কান্না মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। আমার বুক উথাল-পাথাল করছিল। চোখে পানি আসছিল। একহাতে রশিদুলকে বুকে জড়িয়ে ধরা গলায় বললাম, কেঁদো না, কেঁদো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।

বেডরুমে ঢুকেছিলাম টাকার জন্য। পঞ্চাশ হাজার টাকার একটা বান্ডিল খামে ভরে নিয়ে এসেছি। ট্রাউজার্সের পকেটে খামটা ছিল। বের করে রশিদুলের হাতে দিলাম। এখানে পঞ্চাশ হাজার টাকা আছে। এটা দিয়ে চলো। পরে আমি তোমার সঙ্গে কথা বলবো। দেখা যাক কী হয়।

রশিদুল তখনো কাঁদছে আর আমার মন চলে গেছে বহু বছর পিছনে ফেলে আসা একটি দিনে।

১৯৬৮ সালের কোনো একদিন

রশিদুলকে দেখার পর থেকে একটা ঘটনা খুব মনে পড়ছে।

শাহিন আমার দিকে তাকালো। বিকেলবেলা আমরা দুজন আমাদের বেডরুমের সঙ্গের বারান্দায় মাঝে মাঝে বসি। চা খাই, টুকটাক গল্প করি। কখনো কখনো জাইমা থাকে আমাদের সঙ্গে। স্থির হয়ে তো আর বসে না। একবার দৌড়ে আসে, আবার দৌড়ে চলে যায়। কত রকমের ব্যস্ততা তার।

আজ জাইমা বাড়িতে নেই। ছুটির দিন বিকেলে গগন আর অনন্যা মেয়েকে নিয়ে বেড়াতে যায়। রাতে নামকরা রেস্টুরেন্টে ডিনার করে ফেরে।

আজো সেরকম কোথাও গেছে।

জাইমা বাড়িতে না থাকলে পুরো বাড়ি ফাঁকা লাগে। নির্জন লাগে। মনে হয় বাড়িতে লোকজনই নেই।

শাহিন বলল, কোন ঘটনা বলো তো? তোমার জীবনের সব ঘটনাই আমাকে বলেছো। আমি জানি প্রায় সবই।

এটা বোধহয় জানো না। এটা তোমাকে বলা হয়নি। আমিই ভুলে গিয়েছিলাম। আজ রশিদুলকে দেখার পর মনে পড়ল।

বলো শুনি।

আটষট্টি সালের কথা। আমি আর রশিদুল ক্লাস এইটে পড়ি। বাবার চাকরি নেই। সংসারে তীব্র অভাব। কোনো কোনো দিন বাজারই হয় না। আক্ষরিক অর্থেই আমরা না খেয়ে থাকি। সারাদিন এদিক-ওদিক ঘুরে বাবা কিছু জোগাড় করতে পারলে …

তোমার এসব কষ্টের কথা শুনলে তোমার জন্য আমার খুব মায়া লাগে। মনে হয় তোমার মাথায় একটু আদর করে দিই।

শোনো, ওরকম একদিনের ঘটনা। আমি কখনো স্কুল কামাই দিতাম না। তারও একটা কারণ ছিল। স্কুলে খুব ভালো টিফিন দিত। বড় একটা মালপোয়া পিঠা, লুচি-হালুয়া, জিলাপি। কোনো কোনো দিন ওই খেয়ে আমার দিনরাত কেটে গেছে। আমার টিফিন খাওয়াটা খেয়াল করে দেখতো রশিদুল। বুঝতো সকালে আমার কিছুই খাওয়া হয়নি। সে তার টিফিনটা আমাকে দিয়ে দিত। দিত এমন করে, যেন আমি কিছু মনে না করতে পারি। অনাহারি মধ্যবিত্ত মানুষের এক ধরনের অহংকার থাকে। আড়ষ্টতা আর লজ্জা থাকে। রশিদুল ভাবতো, সরাসরি তার টিফিনটা আমাকে দিয়ে দিলে আমি নাও নিতে পারি। বুদ্ধি করে কাজটা সে করতো। টিফিন হাতে নিয়ে খেতো না। হঠাৎ আমার সামনে এসে বলতো, দিপু, আমার টিফিনটাও তুমি নেও। খাইতে ভাল ল্লাগতাছে না। স্কুলে আসার আগে মায় জোর কইরা বেশি ভাত খাওয়াইয়া দিছে। একেকদিন এরকম একেক অজুহাত। আমি আড়ষ্ট ভঙ্গিতে ওর টিফিন নিতাম। আমাকে তৃপ্তি করে খেতে দেখে গভীর আনন্দে চকচক করতো রশিদুলের চোখ।

আমার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল।

মিতু মেয়েটা এসময় বিকালের চা-নাশতা নিয়ে এলো। পাপড় ভাজা আর লিকার চা। আমি একটা পাপড় নিয়ে মুখে দিলাম। চায়ে চুমুক দিলাম। সেদিন সকাল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি। বাসায় একমুঠ মুড়িও ছিল না। সাড়ে দশটার দিকে স্কুলে এসেছি। সাধারণত আমি আর রশিদুল একসঙ্গে স্কুলে আসতাম। বানিয়ানগর থেকে ও আসতো ডিস্টিলারি রোডে, আমাদের বাসায়। তারপর দুজনে হাঁটতে হাঁটতে স্কুলে যেতাম। ধূপখোলা মাঠের দক্ষিণ দিককার রাস্তা দিয়ে, সাধনা ঔষধালয়ের ওখান দিয়ে সোজা গেণ্ডারিয়া হাইস্কুল। সেদিন রশিদুল দেরি করছিল দেখে আমি একা একাই স্কুলে চলে এসেছি। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে টুকটাক কথা হয়েছে। সে খেয়াল করছিল আমার মুখটা শুকনা। বুঝে গিয়েছিল নিশ্চয় আমার কিছু খাওয়া হয়নি। আমাদের সংসারের অবস্থা সে জানতো। টিফিনের সময় ওরকম একটা অজুহাত তৈরি করে ওর টিফিনটা আমাকে দিলো। সেদিন টিফিন ছিল লুচি-হালুয়া। বড় একটা লুচির ভিতর এক চামচ হালুয়া ঢুকিয়ে ভাঁজ করে ছাত্রদের দিত। খুব টেস্টি হতো খাবারটা। দুটো লুচি খেয়ে ভালোই পেট ভরেছে আমার। তার পরও ছুটির পর রশিদুল আমাকে ওদের বাড়িতে নিয়ে গেল। চলো দিপু, বাড়িত গিয়া দুইজনে মিলা ভাত খাইয়া ধূপখোলা মাঠে খেলা দেখতে যামুনে। আইজ ইসটেন কেলাবের (ইস্ট এন্ড ক্লাব) খেলা আছে। যতক্ষণ স্কুলে থাকি, ভালো থাকি। রশিদুলের সঙ্গে থাকি, ভালো থাকি। বাসায় গেলেই মার শুকনা মুখ। ভাইবোনদের করুণ  ক্ষুধার্ত মুখ। বাবা হয়তো হতাশমুখে বাসায় ফিরেছেন …। গেলাম রশিদুলের সঙ্গে। ওদের বাড়িতে ভালো মাছ রান্না হয়, গরু-খাসির মাংস প্রচুর তেল দিয়ে রান্না হয়। বড় বড় টুকরা মাংসের। মুরগি রান্না হলে রান রেখে দেওয়া হয় রশিদুলের জন্য। রশিদুল সেসব আমাকে খাওয়ায়। তখন পর্যন্ত রশিদুলের বাবার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। ওর মার সঙ্গে হয়েছে, ভাইদের সঙ্গে হয়েছে। শুধু বাবার সঙ্গেই দেখা হয়নি বা পরিচয় হয়নি। তিনি দোকানপাট ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। সেদিন বাড়িতে ছিলেন। জ্বর। বাড়িতে ঢুকেই সামনের ঘরে আমাকে বসিয়েছে রশিদুল। এই ঘরটা বসার ঘর, আবার রশিদুলের পড়ারও ঘর। টিনের দোতলা ঘরের নিচতলা।

অনেকক্ষণ পর কথা বলল শাহিন। ওই ঘরটা আমি দেখেছি। বিয়ের পর তোমার সঙ্গে একদিন গিয়েছিলাম। রশিদুলভাইয়ের বিয়ের পরও তো গেলাম।

হ্যাঁ। যাহোক যা বলছিলাম। বাড়িতে ঢুকেই রান্নাঘরে গিয়েপেস্নলটে করে ভাত নিয়ে এলো রশিদুল। বিকাল সাড়ে চারটার মতো বাজে। গরমের দিন। পেস্নট ঠেসে ভাত এনেছে রশিদুল। খাসির মাংসের বড় দুটো টুকরা দিয়েছে আমাকে। ঝোল আলু দিয়েছে। নিজে নিয়েছে একটু কম। আমরা খাওয়া শুরু করিনি, রশিদুলের বাবা ডাকলেন, রশিদুল, ওই রশিদুল, হুইন্না যা। তুমি তো বোধহয় জানোই রশিদুলরাও আমাদের মতোই, বিক্রমপুরের লোক। ওই ভাষায়ই কথা বলে। রশিদুল অবশ্য আগে আমাকে একদিন বলেছিল আমার বাবা ওদের বাড়িতে অনেকবার গিয়েছেন। ওর বাবাকে আমার বাবা ‘দাদা’ ডাকেন। রশিদুলের বাবা বয়সে বড়। বিক্রমপুরে ভাইশ্রেণির বড়দের দাদা ডাকারই নিয়ম। আর সেই জন্যই রশিদুল আমার বাবাকে কাকা ডাকে। তো, বাবার ডাক শুনে রাশিদুল বলল, বাবায় ডাকতাছে। লও দিপু, বাবার লগে তোমার পরিচয় করাইয়া দেই। তারবাদে আইসা ভাত খামুনে। গেছি রশিদুলের পিছন পিছন। রশিদুলের বাবা কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে আছেন খাটে। রশিদুলকে দেখে বললেন, তুই কেমুন পোলা? আমার জ্বর। ইশকুল থিকা আইয়া একবার খবরও লইলি না? রশিদুল কথাটা তেমন গায়ে মাখলো না। বললো, আর কিছু কইবেন? আমার খিদা লাগছে। আমি অহন ভাত খামু। এই যে দিপু। আমার বন্ধু। গগন কাকার পোলা। বাবার কথা শুনে রশিদুলের বাবা তীক্ষ্ণচোখে আমার দিকে তাকালেন। তুই গগনের পোলা? ও আইচ্ছা। আরে তর বাপে তো আমার কাছ থিকা একশটা টেকা ধার নিছিল কয়দিন পরে দেওনের কথা কইয়া। টেকাডা তো আর দিলোই না, আমার লগে দেহাও করে না। শুনে আমার মনে হলো কেউ যেন ঠাস করে আমার গালে একটা চড় মেরেছে। লজ্জায় মুখটা চুন হয়ে গেল। রশিদুল আমার দিকে তাকাল। আমার মুখ দেখে যা বোঝার বুঝে গেল। বললো, দিপু, তুমি গিয়া বহো। আমি আইতাছি। আমি চুপচাপ বেরিয়ে এলাম। আসতে আসতে শুনি রশিদুল তার বাবার ওপর বেশ চোটপাট করছে। আপনে গগন কাকার কাছে টেকা পাইবেন হেইডা দিপুরে কইলেন ক্যা? ও শরম পাইলো না? ওরে আমি লইয়াইছি ভাত খাওয়াইতে আর আপনে ওরে এইসব কইলেন! রশিদুলের বাবা কী কী বললো সে-কথা আর আমার কানে গেল না। আমার তখন খুব কান্না পাচ্ছিল। দুহাতে চোখ মুছতে মুছতে রাস্তায় বেরুলাম। খাসির মাংস আর ভাত পড়ে রইল। পেটে খিদা। তাও সেই খাবারের কথা মনে হলো না। বিষণ্ণমুখে বাসায় এসে বই রেখে ধূপখোলা মাঠের দিকে চলে গেলাম। অনেকক্ষণ পর রশিদুল আমাকে খুঁজতে খুঁজতে এলো। কত রকমভাবে যে আমাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করলো! কত কিছু যে আমাকে বোঝালো! বাবার সঙ্গে সে ঝগড়া করেছে – ওসবও বললো। মনে আছে, একটা সময়ে আমি বলেছিলাম, চাকরি হলে তোমার বাবার টাকা আমার বাবা শোধ করে দেবেন। যদি বাবা না দিতে পারেন বড় হয়ে আমি দিয়ে দেবো। ওই বয়সে যেমন বলে সেনসেটিভ কিশোর ছেলেরা। রশিদুলের বাবার সেই একশ টাকা বাবা দিতে পারেননি, আমি জানি। বছর দুয়েক পর বাবার চাকরি হলো। তারপর বছরখানেক বেঁচে ছিলেন। একাত্তর সালে মারা গেলেন। আজ রশিদুলকে দেখার পর থেকে ঘটনাটা আমার বারবার মনে পড়ছে। বাবা মারা যাওয়ার পর কতদিন কেটে গেছে! রশিদুলের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধুত্ব তেইশ বছর আগ পর্যন্ত চলছিল। টাকা-পয়সাও অনেক সময় ওকে আমি দিয়েছি।
পাঁচ-দশ হাজার, বিশ হাজার। তবে একদম দায়ে না পড়লে ও কখনো আমার কাছে চাইতো না। চাইলেই বুঝতাম, একেবারেই অপারগ হয়ে চেয়েছে। আমি দিতাম। ও আরেকটা কথা বোধহয় তোমাকে বলা হয়নি। ছেলেবেলা থেকেই বিচিত্র স্বভাব ছিল রশিদুলের। নানা রকমের পাখি পালতো।

বলেছো বলেছো। আমি জানি। রশিদুলভাই অনেক রকমের পাখি পালতো। টিয়া ময়না ছিল তার। কবুতর ছিল অনেক রকমের। পোষা শালিক ছিল একটা। খাঁচায় থাকতো না শালিকটা। বাইরে থাকতো। রশিদুলভাই ডাক দিলেই তার কাঁধে এসে বসতো।

ঠিক। তোমার ভালোই তো মনে আছে। শালিকটা বিড়ালে খেয়ে ফেলেছিল। বিড়ালটাও রশিদুলের পোষাই ছিল। তারপর সেই বিড়াল আর রাখেনি সে। খুবই রেগে ছিল বিড়ালের ওপর। রশিদুল খরগোশ পালতো, সাদা ইঁদুর পালতো।

ওগুলোকে বলে বিলাতি ইঁদুর।

রাইট। পোষা বেজি ছিল একটা। আশ্চর্য ব্যাপার, রশিদুল একবার একটা সাপও পুষতে শুরু করেছিল।

বলো কী? সাপ?

হ্যাঁ। তবে বিষাক্ত সাপ না। একটা খাঁচায় আটকে রাখতো। জ্যান্ত ছোট ইঁদুর ধরে এনে সাপের খাঁচায় ঢুকিয়ে দিত। সেটা প্যাঁচ দিয়ে বা থাবা দিয়ে ধরে খেতো সাপটা। অদ্ভুত ছেলে ছিল রশিদুল। ঝাঁকে ঝাঁকে কবুতর ওড়াতো আকাশে। একবার সেই আমলে দেড়শো টাকা দিয়ে একটা মোরগ কিনে আনলো। বিশাল মোরগ। পায়ের নখ লম্বা, ধারালো। ঠোঁট তীক্ষ্ণ। ওই মোরগের নাম ‘আসলি’। ফাইটার মোরগ। রশিদুল সেই মোরগ কোলে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় মোরগের লড়াই করাতে নিয়ে যেত। দশ টাকা বিশ টাকা বাজিতে চলতো মোরগের লড়াই। আমি সেই লড়াই দেখতে কয়েকবার গেছি রশিদুলের সঙ্গে। কখনো কখনো মোরগের পায়ে ছোট্ট ধারালো চাকু এমনভাবে বেঁধে দিত, মোরগ যখন পা দিয়ে অন্য মোরগটাকে আঘাত করতো, চাকুতে ফালা ফালা হতো সেই মোরগের পা, মুখ, মাথা।

অদ্ভুত ব্যাপার।

সত্যি অদ্ভুত ব্যাপার। এবার আরেকটা অদ্ভুত ঘটনা শোনো। রশিদুল এক কোরবানি ঈদে গরুর ছোট্ট এক টুকরা সলিড কাঁচা মাংস চিবিয়ে খেয়েছিল। ওদের বাড়িতেই। আমার সামনে।

শাহিন মুখ কুঁচকে ওয়াক করলো। ছি, কী বলছো?

সত্যি। রশিদুল ওই টাইপই ছিল। তবে ওর মধ্যে একটা শিল্পী মন ছিল। মাটি দিয়ে অনেক কিছু বানাতে পারতো। নানা রকমের পুতুল। হাতি ঘোড়া বাঘ ভালুক। কাঠ দিয়েও বানাতে পারতো। কোথাও শেখেনি। নিজে নিজেই পারতো। নেশা ছিল। সেই নেশাই শেষ পর্যন্ত ওর পেশা হয়ে গেল।

কথার ফাঁকে ফাঁকে চা শেষ করেছি আমরা। আমি শেষ বিকেলের আকাশের দিকে তাকিয়ে পিছনে ফেলে আসা সেই জীবনে চলে গেছি। রশিদুলকে নিয়ে কতদিনকার কত কথা মনে পড়ছে। বাবার মৃত্যুর দিন থেকে একটানা চারদিন বাড়িতে যায়নি রশিদুল। সারাটাক্ষণ আমার সঙ্গে। আমাকে বুক দিয়ে আগলে রাখছিল। কত রকমের প্রবোধ, সান্তবনা। আমার চোখে পানি দেখলেই দুহাতে আমার মাথাটা বুকে চেপে ধরতো। আমার এমন বন্ধু! ওর বউর  আচরণে আমি তেইশ বছর সরে থাকলাম। এটা আমারও উচিত হয়নি। রশিদুলের কান্নাটা ভুলতে পারছি না। রাজপুত্রের মতো জীবন ছিল রশিদুলের। আর আমি ছিলাম … সময় পুরো ব্যাপারটাই উলটে দিয়েছে।

শাহিন।

বলো।

আমি একটু রশিদুলদের বাড়িতে যেতে চাই। দুয়েকদিনের মধ্যেই। তুমি যাবে আমার সঙ্গে?

চলো যাই। কতদিন ওদিকটায় যাই না।

তারপর রশিদুলকে নিয়ে কিছু পরিকল্পনার কথা শাহিনকে বললাম। শাহিন হাসিমুখে বলল, বন্ধুর জন্য তো করা উচিতই। করো তুমি যা করতে চাইছো।

সাত মাস পর

কাঠাখানেক জমির পুরোটাই কাজে লাগানো হয়েছে। সুন্দর দোতলা বিল্ডিং হয়েছে। ছোট ছোট চারটা রুম একতলা-দোতলা মিলে। নিচতলায় একপাশে ছোট্ট রান্নাঘর আর বাথরুম। বাড়ির পিছনের অংশ রশিদুলের। ওদিক দিয়ে গেটও করা হয়েছে। চিপা একটা গলি আছে গেটের বাইরে। ওদিক দিয়েও চলাচল করা যায়। মূল গেট সামনের দিকে। সেই আগের মতোই বাড়িটা। দুজন মানুষ পাশাপাশি হেঁটে ঢুকতে পারবে না।

শাহিন আমার আগে আগে হাঁটছিল। বাড়িতে বেশ একটা সাজসাজ রব। আজ নিজের বিল্ডিংয়ে উঠবে রশিদুল। মিলাদের ব্যবস্থা হয়েছে। রশিদুল আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।

যে ধোলাইখালে বর্ষাকালে আমি আর রশিদুল সাঁতার কেটেছি সেই ধোলাইখাল এখন বিশাল রাস্তা। রশিদুলের গলিতেও গাড়ি ঢোকে। আমরা নেমেছিলাম সামনের গেটে। শাজাহান ড্রাইভার জায়গাটা এখন ভালোই চেনে। এই নিয়ে কয়েকবার এলো সে।

সাত মাস আগে রশিদুল যেদিন আমার কাছে গিয়েছিল তার দুদিন পরই বিকেলবেলা শাহিনকে নিয়ে রশিদুলের বাড়িতে এসেছিলাম। বাড়ির পিছনদিককার প্রায় ভেঙেপড়া টিনের ঘরটায় দুই মেয়ে আর বউ নিয়ে থাকে রশিদুল। ওর যে এত খারাপ অবস্থা তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। বউটা একসময় দেখতে মন্দ ছিল না। সেই মহিলা ভেঙেচুরে একেবারে শেষ হয়ে গেছে। মেয়ে দুটোর নাম মুন্নি আর তিন্নি। হামিদুলের চেহারা আর প্রথম জীবনের গায়ের রং পেয়েছে। মিষ্টি চেহারা। সেই চেহারায় দারিদ্র্য হতাশা আর বিষণ্ণতা। এত মায়া লাগছিল মেয়েদুটোর মুখ দেখে। ওই ঘরেই আমরা বসেছিলাম। সায়রা বারবার সেই টেলিফোনের ব্যাপারটা নিয়ে মাফ চাইলো, মুখে আঁচল চেপে কাঁদলো। কাঁদতে কাঁদতে বললো, আমার জইন্য আপনের বন্ধুর জীবন নষ্ট হইয়া গেছে ভাই। আমি তার জীবনডা নষ্ট কইরা দিছি। আমার বড় অন্যায় হইছিল, বড় ভুল হইছিল আপনের লগে ওই রকম ব্যবহার করা। আপনের বাড়ি থিকা আইসা সে যখন সব বলল, বইলা কান্নাকাটি করল, আমার দুই মাইয়ায় আমারে খুব বকলো। তুমি এইডা ক্যান করছিলা মা? আমার বাবার জীবন নষ্ট করছো, আমগো জীবন নষ্ট করছো। তয় আপনের বন্ধু কিন্তু আমারে কিছু বলে নাই। সে খুব ভালো মানুষ। জীবনে আমার লগে খারাপ ব্যবহার করে নাই।

সায়রা আমার পা জড়িয়ে ধরতে এলো। আপনে আমারে মাপ কইরা দেন ভাই।

শাহিন তাকে জড়িয়ে ধরল। আরে এ কী! ওসব ভুলে যাও। সব ঠিক আছে। মানুষের জীবনে অনেক রকমের ভুল হয়। বসো, বসো তুমি।

রশিদুল দাঁড়িয়ে ছিল এককোণে। মুখটা নিচু করে আছে। টপটপ করে চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। মেয়েদুটো বাবার দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে। বাবাকে কাঁদতে দেখে ওরাও কাঁদতে লাগল। বোঝা গেল বাবার জন্য পাগল দুই মেয়ে।

আমি উঠে গিয়ে রশিদুলের কাঁধে হাত রাখলাম। কেঁদো না রশিদুল, কেঁদো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি আছি।

মেয়েদুটোকেও সান্তবনা দিলাম।

শাহিনকে আর আমাকে দেখে, আমাদের দামি গাড়ি দেখে রশিদুলদের বাড়িতে বেশ একটা সাড়া পড়েছে। রশিদুলের বড় দুই ভাইয়ের পরিবারের লোকজন, বাচ্চাকাচ্চারা উঁকিঝুঁকি মারছিল। গেটের বাইরেও দেখা যাচ্ছে কাউকে কাউকে। ড্রাইভারকে এটা-ওটা জিজ্ঞেস করছে।

সেদিনই পরিকল্পনাটা আমি রশিদুলকে বলে এসেছিলাম। এই পাড়াতেই তুমি একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নাও। আমাদের ফ্যাক্টরির সিকিউরিটির লোকজনের, কেয়ারটেকারদের কোয়ার্টার তৈরির কাজ করে একজন কন্ট্রাক্টর। ওর নাম গোলাম হোসেন। তাকে আমি পাঠাবো। এইটুকু জায়গার মধ্যেই দেখবে কী সুন্দর দোতলা একটা বিল্ডিং করে দিয়েছে সে। কোনো কিছুই তোমাকে ভাবতে হবে না। তুমি শুধু কাজের তদারকি করবে। কাজটা ঠিকমতো হলো কি না দেখবে। ফ্ল্যাট ভাড়া, তোমার সংসার খরচ, মেয়েদের পড়াশোনা সব মিলিয়ে মাসে তোমার কত টাকা করে লাগবে আমাকে জানাবে। তোমার দায়িত্ব আমার। তোমার মেয়েদের পড়ালেখা বিয়েশাদি কোনো কিছু নিয়েই তুমি ভাববে না। লেখাপড়া শেষ করে ওরা চাকরি-বাকরি করবে। আমি বেঁচে না থাকলে গগন ওদের দেখবে।

রশিদুল কথা বলতে পারেনি। বারবার চোখ মুছছিল।

তারপর গত সাত মাসে তিনবার আমি এসেছি। বাড়ির কাজ কতটা হলো দেখে গেছি। গত সপ্তাহে কিছু ফার্নিচার কিনে দিয়েছি রশিদুলকে। বাড়ি গোছগাছ হয়ে গেছে। আজ ওরা উঠবে। আমি আর শাহিন এসেছি গৃহপ্রবেশে।

রশিদুলদের আত্মীয়স্বজন, পাড়ার লোকজন যাঁরা মিলাদ পড়তে এসেছিলেন প্রত্যেকে আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আজকালকার দিনে এরকম বন্ধুত্বের নজির পাওয়া যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি বলছিল। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে রশিদুলকে দেখছিলাম, সায়রা আর ওদের দুই মেয়েকে দেখছিলাম। বিষণ্ণ মুখগুলোয় যে কী অপূর্ব এক আলো খেলা করছে! এই আলো যে দেখে তাঁর অন্তরটাও আলোকিত হয়।

ফেরার সময় শাহিনকে বললাম, শাহিন, রশিদুলের জন্য এত কিছু কেন করলাম, জানো?

শাহিন আমার দিকে তাকালো। কেন বলো তো?

আমি আসলে বাবার সেই ঋণটা শোধ করলাম। যেখানে রশিদুলের বিল্ডিংটা হয়েছে ঠিক ওখানকার ঘরটায় শুয়েই আমার বাবার কাছে একশটা টাকা পাওনা থাকার কথা বলেছিলেন রশিদুলের বাবা। বাবার সেই ঋণটা বহু বহু বছর পর অন্যভাবে শোধ করলাম আমি। রশিদুল আমার জন্য সেই কিশোর বয়সে যা করেছে সেই ঋণও শোধ করলাম।

শাহিন হাসল। অদ্ভুত কথা বললে তুমি। বন্ধুত্বের ঋণ, ভালোবাসার ঋণ কি শোধ করা যায়? যেরকম ভালোবেসে, আবেগে আর মমতায় রশিদুলভাই সেই বয়সে নিজে না খেয়ে তোমাকে খাইয়েছে, তোমাকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছে, ওইটুকু একটা বাড়ি করে দিয়ে বা কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে তুমি সেই বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করবে? এটা হয়? হয় না দিপু। তোমার অসহায় সময়ে যে তোমার পাশে দাঁড়িয়েছে, তার অসহায়ত্বের সময় তুমি তার পাশে দাঁড়িয়েছ, এইভাবে ভাবো। বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করেছ, তা কখনো ভেবো না। বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করা যায় না। ভালোবাসার ঋণ শোধ করা যায় না। বাবার ঋণ শোধ করলে সেটা ভাবতে পারো।

শাহিনের কথা শুনে খুবই ভালো লাগলো। বললাম, ঠিকই বলেছ তুমি। বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করা যায় না।