Wednesday, November 27, 2013

নির্দলীয় সরকারের দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি আরো ১২ ঘণ্টা বাড়িয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দল।

অবরোধের দ্বিতীয় দিন বুধবার বিকালে নয়া পল্টনে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই ঘোষণা দেন।

তিনি বলেন,গত দুই দিনে সারাদেশে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্রকর্মীদের গুলিতে আটজন নিহত, অসংখ্য আহত  ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে অবরোধ কর্মসূচি ১২ ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে।

সহিংসতার মধ্যদিয়ে বিরোধী দলের অবরোধ কর্মসূচি চলছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় শেষ হওয়ার কথা ছিল, এখন তা শেষ হবে সেদিন সন্ধ্যা ৬টায়।

অবরোধের দুই দিনে সহিংসতায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৪ জন, যার মধ্যে এক বিজিবি সদস্য এবং কয়েকজন নিরীহ মানুষও রয়েছেন।


রেলপথে নাশকতার পাশাপাশি অর্ধশতাধিক গাড়ি পোড়ানো হয়েছে, ভাংচুর হয়েছে অসংখ্য।

রিজভী জানান, অবরোধে বিরোধী দলের নিহত কর্মীদের স্মরণে শুক্রবার জুমার নামাজের পর সারাদেশে গায়েবানা জানাজা হবে।

গত ২৫ নভেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ জাতির উদ্দেশে ভাষণে দশম সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন।

নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসা ১৮ দল এই তফসিল প্রত্যাখ্যান করে ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি ডাকে। কর্মসূচি ঘোষণার দিনই সহিংসতায় নিহত হন দুজন।

ইদানীং রাজনীতি- ‘দলে দলে কলাগাছে ভোট দিন’ by শাহদী...

ইদানীং রাজনীতি- ‘দলে দলে কলাগাছে ভোট দিন’ by শাহদী...: ‘আপনারা দলে দলে কলাগাছে ভোট দিন’ এটাই মনে হচ্ছে ইদানীংকালের আওয়ামী লীগের উদাত্ত আহ্বান— ভোটারদের প্রতি।

যে কারণে নির্বাচনে অনড় সরকার

বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা না হলেও নির্বাচনের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে সরকার। প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই ইতিমধ্যে ২৯ সদস্যের নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হয়েছে।
নির্বাচনী প্রস্তুতিতে কমতি নেই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের। নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি, মনোনয়নপত্র বিক্রি, দলীয় প্রার্থী বাছাই, দলীয় সভানেত্রীর নির্বাচনী সফর্- সবকিছুই চলছে পুরোদস্তুর।

হরতাল-অবরোধসহ বিরোধী দলের কঠোর আন্দোলন, আন্তর্জাতিক চাপ ও সুশীল সমাজের সমালোচনার পরও নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনড় আওয়ামী লগের নেতৃত্বাধীন সরকার। তাদের এই অনড় অবস্থান নিয়ে কৌতূহল রয়েছে দেশের নানা মহলে। ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারণী মহলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ও দলীয় সূত্রে এর পেছনের কয়েকটি কারণের কথা জানা গেছে। নানা চাপ থাকা সত্ত্বেও মূলত এই কারণগুলোর জন্যই নিজেদের অবস্থান থেকে আপাতত সরছে না সরকার বা সরকারি দল।

রোলমডেল হতে চান প্রধানমন্ত্রী
নির্বাচিত সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের পর শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে রোলমডেল হতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বেশ কবার বলেছেন, “দেশে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের রীতি এখনো গড়ে ওঠেনি। আমাদের একবার না একবার এই রীতি শুরু করতে হবে। আর এর যাত্রা আওয়ামী লীগের হাত দিয়েই শুরু হোক।”

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম নতুন বার্তা ডটকমকে বলেন, “আওয়ামী লীগ ইতিহাস সৃষ্টি করে। আওয়ামী লীগের হাত দিয়েই দেশে স্বধীনতা এসেছে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। জয়-পরাজয় বড় কথা নয়। অবাধ সুষ্ঠ নির্বাচন উপহার দিয়ে নজির সৃষ্টি করতে চায় আওয়ামী লীগ।”

তৃতীয় পক্ষকে সুযোগ না দেয়া
এই মুহূর্তে দেশে কোনো অনির্বাচিত শক্তিকে ক্ষমতায় দেখতে চাইছে না আওয়ামী লীগ। দলটির নীতিনির্ধারণী মহল মনে করছে, তত্ত্বাবধায়কের নামে অনির্বাচিত কোনো সরকার এলে দেশে আবার এক-এগারোর মতো সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে। সেই সরকার আবারও রাজনীতি থেকে রাজনীতিবিদদের মাইনাস করা ও জেল-জুলুমের কারণ হতে পারে।

রাজনীতিবিদদের নিয়ে কাউকে কোনো ধরনের খেলার সুযোগ দিতে চাইছে না ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগও। তাই নির্বাচনের বিকল্প ভাবছে না দলটি। দলের সভাপতি শেখ হাসিনাও বলেছেন, তিনি কেবল আরেকটি নির্বাচিত সরকারের হাতেই ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। অনির্বাচিত করো কাছে ক্ষমতা দেবেন না।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী ইশেতেহার। এ কাজে সরকারকে অনেকটা সফল বলেও স্বীকার করে অনেকে। নির্বাচনে এই ইস্যু কাজে লাগাতে চায় তারা।

দলটির নীতিনির্ধারণী একটি মহল মনে করেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন ও তাদের রাজনীতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হলে আওয়ামী লীগকেই আবার ক্ষমতায় আসতে হবে। তা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ও স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী যেসব শক্তি এই ইস্যুতে এখনো সরকারের পক্ষে রয়েছে, তারাও চাইছে সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে অসম্পন্ন কাজগুলো সম্পন্ন হোক।

বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের মনোবল ভাঙা
নির্বাচনী দৌড়ে এগিয়ে থাকার কৌশল হিসেবেও সরকারি দলের বর্তমান কঠোর অবস্থানের অন্যতম কারণ। আর তাই নানাভাবে বিএনপিসহ আন্দোলনকারী দলগুলোর নেতা-কর্মীদের মনোবল ভাঙতে চাইছে সরকার। দলের সিনিয়র নেতাদের গ্রেফতার করে বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতাদের মনোবল ভেঙে দেয়ার কৌশল নিয়েছে সরকার। ইতিমধ্যে বিএনপির সিনিয়র কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সরকারবিরোধী আন্দোলনের মাত্রা বাড়লে গ্রেফতারের সংখ্যাও বাড়বে। এমনই সিদ্ধান্ত সরকারের।

সরকারসংশ্লিষ্ট মহল জানায়, এ কঠোর অবস্থান আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে সরকার, যাতে নির্বাচন ঠেকাতে বড় কোনো আন্দোলন নিয়ে মাঠে নামতে না পারে বিরোধী দল।

নিজ দলের নেতাকর্মীদের চাঙা রাখা
সরকারের এ অবস্থানকে সমর্থন করে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগও। বিরোধী দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিতে প্রথমেই বড় নেতাদের ধরপাকড় শুরু করেছে সরকার। সরকার ও সরকারি দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, হঠাৎ করে গ্রেপ্তার অভিযান শুরু হলেও এটি পূর্বপরিকল্পিত। দল ও সরকারের যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই এ অভিযান চালানো হচ্ছে।

কয়েকজন মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্বশীল নেতা জানান, পরিবেশ-পরিস্থিতি বুঝে সরকারের কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতারাও মাঠে থাকবে সার্বক্ষণিক।

বিএনপির নেতাদের নির্বাচনে আসার সম্ভাবনা
নির্বাচনে দল অংশ না নিলেও বিএনপির কিছু নেতা অংশ নিতে পারেন- এমনটাই মনে করছে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহল। তারা বলছে, বিএনপির  নেতাকর্মীরা নির্বাচনের জন্যে মুখিয়ে আছেন। বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ না নিলেও দলটির অনেক নেতা অন্য কোনো দলের ব্যানারে নির্বাচনে আসবেন।

জাতীয় সংসদের বিগত অধিবেশনে ‘রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট-২০১৩’ পাস হয়েছে। বিলের একটি ধারা বিলুপ্ত করার মাধ্যমে সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হওয়ার জন্য ন্যূনতম তিন বছর ওই দলের সদস্য থাকার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে যে কেউ কোনো দলে যোগ দিয়েই সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন।

আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড মনে করছে, বিএনপির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতা নির্বাচনে এলে, তখন আর নির্বাচনকে একতরফা বলা যাবে না। বিভিন্ন আসনে বিএনপির নেতারা অন্য দল বা স্বতন্ত্র নির্বাচন করলে ভোটের হারও বাড়বে বলে ধারণা করছেন তারা।
তবে সরকারের এ নির্বাচনী পথচলা মসৃণ হবে না মোটেই। একদিকে বিরোধী দলের কঠোর আন্দোলনের আশঙ্কা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপ। এর সঙ্গে রয়েছে দেশের সুশীল সমাজের সমালোচনা। আর দেশের জনগণও চায় সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক।

বিদেশী চাপের বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল আলম লেনিন নতুন বার্তা ডটকমকে বলেন, “আমরা বিদেশী কোনো শক্তির চাপে নেই। তাদের কথা কেন শুনতে হবে। আমাদের দেশের সমস্যা আমরাই সমাধান করব।

তফসিলের পর সহিংসতায় নিহত ১৬ অবরোধের দ্বিতীয় দিনে নিহত ৭

দশম জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রতিবাদে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের ডাকা ৪৮ ঘণ্টার অবরোধের দ্বিতীয় দিন বুধবার সারাদেশের সহিংসতার এখন পর্যন্ত ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
তাদের মধ্যে সাতক্ষীরায় জামায়াত কর্মী ও গৃহবধূ, সিরাজগঞ্জে জামায়াত কর্মী ও ছাত্রদল নেতা, চট্টগ্রামে টেম্পোচালক, গাজীপুরে আওয়ামী লীগ কর্মী  নিহত হযেছেন। এছাড়াও মঙ্গলবার ঢাকায় ককটেল হামলায় আহত ব্যাংক কর্মচারী আজ ভোরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন। সবমিলিয়ে তফসিল ঘোষণার পর এ পর্যন্ত সারাদেশে সহিংসতায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে বুধবারের অবরোধে চট্টগ্রামে ৩০টি ট্রাক ও অর্ধশতাধিক দোকান ভাঙচুর করা হয়। চট্টগ্রাম, মিরসরাই, গাজীপুর ও গোয়ালন্দে আগুন দেয়া হয় পাঁচটি গাড়িতে। রাজশাহী, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, সীতাকুণ্ড, গাজীপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জে পিকেটার-পুলিশ সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছে। পুলিশ আটক করেছে ৩৪ জনকে। এ ছাড়া চাঁদপুর ও সিরাজগঞ্জে রেলপথে নাশকতার ঘটনা ঘটেছে।

সিরাজগঞ্জে জামায়াত ও ছাত্রদল কর্মী নিহত
সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলা সদরের মুকুন্দগাঁতী বাজারে বুধবার দুপুরে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে পুলিশ-আওয়ামী লীগের সংষর্ষে দুজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। নিহতরা হলেন- চাঁদমিটুয়ানী গ্রামের সামসুল আলম সরকারের ছেলে ও ৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের যুগ্ন-সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ (২৫) এবং ধুকুরিয়াবেড়া গ্রামের রিয়াজ উদ্দিন ফকিরের ছেলে ও জামায়াত নেতা মাওলানা আব্দুল জলিল (৫৫)।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলা আওয়ামী লীগ অবরোধের বিপক্ষে উপজেলা সদরে একটি মিছিল বের করে। এর কিছুক্ষণ পর বেলা ১১টার দিকে কল্যাণপুরে জড়ো হয়ে জামায়াত-বিএনপি একটি মিছিল শেরনগর হয়ে বেলকুচির সদরের মুকন্দগাঁতি বাজারের দিকে আসতে থাকে। খবর পেয়ে পুলিশ মুকুন্দগাঁতী বাজার ওয়াপদা রোডের মুখে অবস্থান নেয়। জামায়াত-বিএনপির মিছিলটি মুকন্দগাঁতি বাজার এলাকার পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কাছে আসা মাত্র আগে থেকেই অবস্থান নেয়া বিপরীত দিক থেকে পুলিশ মিছিলটিকে ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট ছুড়তে থাকে। একই সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও গুলি চালিয়ে ওই মিছিলের ওপর হামলা চালায় বলে জামায়াত-বিএনপি ও স্থানীয়রা অভিযোগ করেছে। এক পর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে।  এ সময় র্যা ব ও বিজিবি ঘটনাস্থলে এসে পুলিশের সঙ্গে যৌথভাবে টিয়ারসেল, রাবার বুলেট ও গুলিবর্ষণ করে। এ ঘটনায় মাসুম বিল্লাহ  ও আব্দুল জলিল গুলিতে নিহত হন। এ সময় অন্তত ২৫ জন আহত হন।

সাতক্ষীরায় জামায়াত কর্মী ও গৃহবধূ নিহত
১৮ দলের টানা ৪৮ ঘণ্টা অবরোধের দ্বিতীয় দিন বুধবার সাতক্ষীরায় এক গৃহবধূসহ দুইজন নিহত হয়েছেন। বুধবার ভোররাত চারটার দিকে সদর উপজেলার শেয়ালডাঙ্গা গ্রামে পুলিশ, র্যা ব ও বিজিবির সঙ্গে সংঘর্ষে শামছুর রহমান (৩৫) নামে এক ব্যক্তি মারা যান। বেলা ১২টার দিকে সাতক্ষীরা-যশোর সড়কের কলারোয়া উপজেলার গোপিনাথপুর মোড়ে অবরোধ করার জন্য কাটা গাছের ডাল মাথায় পড়ে মারা যান গৃহবধূ আম্বিয়া খাতুন।

নিহত শামছুর শেয়ালডাঙ্গা গ্রামের আব্দুল মাজেদের ছেলে। তিনি পেশায় রাজমিস্ত্রি ছিলেন। তাকে নিজেদের কর্মী বলে দাবি করেছেন জেলা জামায়াতের আমির আব্দুল খালেক মণ্ডল।

চট্টগ্রামে টেম্পোচালক নিহত
চট্রগ্রামের পটিয়া উপজেলার ফকিরনিরহাট এলাকায় বুধবার সকাল আটটার দিকে টেম্পোচালক এরশাদ আলীকে (২৬) ধাওয়া করেন পিকেটারেরা। তারা টেম্পোতে ওঠে চালককে মারধর করে। এক পর্যায়ে তিনি টেম্পো নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পিকেটারেরা ধাওয়া দিতে থাকেন। টেম্পোটি উল্টে গেলে তিনি আহত হন। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে দুপুর ১২টার দিকে কর্তব্যরত চিকিত্সক মৃত ঘোষণা করে।

হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) জহিরুল ইসলাম এ তথ্য জানান। নিহতের ভাগ্নে তৈয়ব আলী জানান, এরশাদের বাড়ি পটিয়ায়। পিকেটারদের লাগানো আগুনে সিএনজিচালিত অটোরিকশার যাত্রী আবদুল আলম দগ্ধ হয়েছেন।

গাজীপুরে আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত
গাজীপুরের কালীগঞ্জে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মীদের সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগের কর্মী।

সকালে টঙ্গী থেকে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা একটি মিছিল নিয়ে চেরাগআলী এলাকায় গিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধের চেষ্টা করে এবং যানবাহন ভাঙচুর করে। এ সময় তারা একটি বাসে অগ্নিসংযোগ করে। এক পর্যায়ে পিকেটারদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া- পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

ঢাকায় আহত ব্যাংক কর্মচারীর মৃত্যু
অবরোধের প্রথম দিনে ককটেল হামলায় আহত ন্যাশনাল ব্যাংকের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী আনোয়ারা বেগম আজ ভোরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন।

প্রসঙ্গত, তফসিল ঘোষণার পরে ১৮ দলর ডাকা টানা ৪৮ ঘন্টার অবরোধে প্রথমদিন সোমবার ৯ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে কুমিল্লায় বিজিবি সদস্য, ছাত্রদল কর্মী ও এক রিকশাচালক, সাতক্ষীরায় যুবলীগ ও ওলামা লীগ নেতা, বগুড়ায় যুবদল নেতা, সিরাজগঞ্জে পথচারী, বরিশালে কাঁচামাল ব্যবসায়ী এবং ঢাকায় একজন নিহত হন। সবমিলিয়ে তফসিল ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সপ্তাহের হালচাল- ‘কাল নয়, আজও নয়, এখনই’ by আব্দুল কাইয়ুম

পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন শেষ পর্যন্ত যে একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছে, তা বিশ্বের জন্য স্বস্তির কথা। সম্মেলনের শুরু থেকেই কয়েকটি বিষয় নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছিল।

রাজনীতি- শর্শিনা, আটরশি থেকে হাটহাজারী by আলী ইমাম মজুমদার

বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু। পাশাপাশি তারা অন্য ধর্মমতের প্রতি সহনশীল। দেশটির জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৯০ ভাগই মুসলমান। তাদের একটি বড় অংশ অলি-আউলিয়াদের মাজার জিয়ারত করে থাকে।

পরমাণু চুক্তি- ইরান কী পাবে? by মশিউল আলম

গত রোববার ভোররাতে জেনেভায় ইরান ও বিশ্বের শক্তিধর ছয়টি রাষ্ট্রের মধ্যে এক সমঝোতা চুক্তি সই হয়েছে, যেটিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। চুক্তিটিকে বলা হচ্ছে অস্থায়ী বা অন্তর্বর্তীকালীন।

রাজশাহীতে ভয়াবহ সংঘর্ষ, মেয়রসহ আহত ৫০

অবরোধ এবং আধা বেলার হরতাল চলাকালে আজ বুধবার রাজশাহীতে পুলিশের সঙ্গে হরতালকারীদের সংঘর্ষে সিটি করপোরেশনের মেয়রসহ ৫০ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় পুলিশ ১১ জনকে আটক করেছে।

অবরোধের দ্বিতীয় দিনে সহিংসতায় নিহত ৭- যশোরে জামায়াত নেতাকে গুলি করে হত্যা

যশোর উপশহর ইউনিয়নের জামায়াত  সেক্রেটারি বুলবুল আহমেদকে (৩২) বাসায় ঢুকে মাথায় গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। বুধবার রাত  পৌনে ৮টায় এ ঘটনা ঘটে।

‘প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নৈতিক ক্ষমতা আছে’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, একতরফা কোন নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিগত ত্রিশ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় একতরফা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো নজির নেই। ৮৬ সালের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি।
৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারির নির্বাচন হতে যাচ্ছিল তাও গ্রহণযোগ্যতা পেত না। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। গতকাল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা নাগরিক হিসাবে উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগের যায়গা থেকেই প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়েছি। আমরা প্রেসিডেন্টের কাছে একই সুরে কথা বলেছি। আমাদের মূল আহ্বান ছিল একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়ে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমেই এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা আমরা স্পষ্ট করেছি। সন্ত্রাস, সংঘর্ষ ও সহিংস কর্মসূচিগুলো অবস্থার অবনতি ঘটছে তাও আমরা তুলে ধরেছি। আমরা মনে করি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু সমাধানের আগেই নির্বাচনে সিডিউল ঘোষণা হয়েছে। এটা আমাদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আপনাদেরকে প্রেসিডেন্ট কি আশার বাণী শুনিয়েছেন এমন প্রশ্নে বিশিষ্ট এ নাগরিক বলেন, প্রেসিডেন্ট আমাদের কথা ধৈর্য ধরে শুনেছেন। তাঁর সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন। তার সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নৈতিক ক্ষমতা আছে। অভিভাবক হিসাবে তার ভূমিকা নেয়ার আছে। এগুলো আমরা উল্লেখ করেছি। প্রেসিডেন্ট আমাদেরকে জানিয়েছেন, বিরোধী দলের দাবিগুলো সরকারি দলকে তিনি অবগত করেছেন। এ সময় আমরা বলেছি, আপনার এই উদ্যোগের ফলোআপ অব্যহত রাখবেন বলে আমরা আশা করি। সংকট সমাধানে লেগেথাকা প্রয়োজন।

শর্শিনা, আটরশি থেকে হাটহাজারী

গণতান্ত্রিক শক্তির অনৈক্যই পতিত
শাসকের রাজনীতি টিকিয়ে রেখেছে
বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু। পাশাপাশি তারা অন্য ধর্মমতের প্রতি সহনশীল। দেশটির জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৯০ ভাগই মুসলমান। তাদের একটি বড় অংশ অলি-আউলিয়াদের মাজার জিয়ারত করে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও সেসব মাজারে এসে প্রার্থনা করে। আবার মুসলমানদের অনেকেই যান পীর-দরবেশদের কাছে। এমন বিশ্বাসের প্রতি বৈরী একটি শ্রেণীও রয়েছে।
এ সত্ত্বেও এসব বিশ্বাসে তারা তেমন ফাটল ধরাতে পারেনি। উল্লেখ করা যায়, এ ভূখণ্ডে ইসলাম প্রচার ও প্রসারে অলি-আউলিয়াদের নিরলস ভূমিকা কাজ করেছিল। আচরণের দিক থেকে তাঁরা ছিলেন অন্য ধর্মমতের প্রতি সহনশীল ও মধ্যপথাবলম্বী। তাই কেউ কোনো বিশ্বাস থেকে এ ধরনের মাজারে যাওয়াকে দোষণীয় বলা যাবে না। ইসলাম ধর্মের বিধানাবলি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন পীর, আলেম, ওলামারা। তাঁরা নিরন্তর চর্চা করেন এসব বিধান অনুসরণের। সুতরাং এসব জানতে ও শিখতে তাঁদের দরবারে যাওয়ায়ও আপত্তির কিছু থাকতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন থাকে, যখন এসব দরবার রাজনৈতিক ভূমিকায় থাকে, তখন। আবার কোনো রাজনীতিক যখন এসব দরবার ব্যবহার করেন, সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। অতি সম্প্রতি দেখা গেল, সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় গিয়ে সেখানকার অধ্যক্ষ ও হেফাজতে ইসলামের প্রধান আল্লামা শফীর দোয়া নিচ্ছেন। কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক একটি আন্দোলন হেফাজতে ইসলাম। তার নেতা আল্লামা শফী। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁর অনেক অনুরাগী-সমর্থক আছেন। তবে তাঁর দু-একটি বিতর্কিত বক্তব্য আর গত মে মাসে তাঁদের আন্দোলনটি বিতর্কের ঝড় তুলেছিল। আর তাঁদের ১৩ দফা দাবির বিষয়টি গুরুতর প্রশ্নবিদ্ধ। এসব দাবির বেশ কিছু সংবিধান ও প্রচলিত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। দোয়া নিতে গিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি ক্ষমতায় গেলে এসব দাবি সুবিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি নয় বছর ক্ষমতায় ছিলেন। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও তাঁর দল দেশের প্রধান দুটি দলের কাছেই সমাদৃত। তাঁর অতীত বলে, তিনি কথা দিয়ে সাধারণত কথা রাখেন না। এটা আল্লামা শফীসহ তাঁর অনুসারীরা নিশ্চয় ভালোভাবে জানেন। জানেন এ পতিত শাসকের ইতিহাস। তা সত্ত্বেও একজন ধর্মীয় নেতা তাঁকে দোয়া করলেন।
কার্যত সমর্থন করলেন তাঁর রাজনীতি। অন্তত সাধারণ মানুষ তা-ই ধরে নেয়। অবশ্য পরে হেফাজতে ইসলামের নেতা বাবুনগরী বলেছেন, ‘এরশাদ বদদোয়া নিয়ে গেছেন।’ এটা অবশ্য অভিনব নয়। এ শাসকের সময়কালে আমরা তাঁকে আটরশি দরবার শরিফে বারবার যেতে দেখেছি। তখনকার গদিনশিন পীর তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, এমনটাই জনরব ছিল। ব্যাপারটা অনেকটা দৃশ্যমানই ছিল, এটা বললেও অত্যুক্তি হবে না। তাঁর শাসনকালে এ শাসক কী করে বেড়াতেন, তা এ দেশের মানুষের স্মৃতি থেকে এখনো মুছে যায়নি। আটরশি দরবার শরিফের তদানীন্তন পীর একজন কামেল লোক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। ইন্তেকালের পরেও তাঁর দরবার শরিফে হাজার হাজার অনুরাগী এসে থাকেন। এত মানুষ যাঁকে বিশ্বাস ও সম্মান করেন, তাঁকে সবারই সম্মান করতে হয়। তবে সেই দরবার শরিফে এরশাদের অস্বাভাবিক ঘন ঘন গমন ও অবস্থানে লাভবান হয়েছেন তিনি। প্রশ্নের সামনে নিয়ে এসেছেন একজন সাধককে। উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে এ দরবার শরিফে অবস্থানকালীন তিনি আকস্মিক একটি ‘পুত্রসন্তান জন্মের’ খবর ঘোষণা করেন। খবরটি সাদামাটা। আর অস্বাভাবিক কিছুও নয়। তবু সংগত কারণে দেশবাসী এটা বিশ্বাস করেনি। তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির পর ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে এসব মিথ্যাচার নিয়ে। বেআইনিভাবে ক্ষমতা আরোহণ করে এ শাসক নয় বছর টিকে ছিলেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, তিনি জাতির বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা অর্জন করতে কখনোই সক্ষম হননি। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রতি ধর্মীয় নেতাদের দোয়া শুধু এ দুটি ক্ষেত্রে নয়, আরও অনেক ক্ষেত্রেই থাকে। দেশে পীর, দরবেশ অনেক আছেন। তবে সবাই সমান খ্যাতি অর্জন না করায় এসব বিষয় গণমাধ্যমের নজর এড়িয়ে যায়। একটু পেছনের ইতিহাসে যেতে হয়। একসময় খ্যাতনামা ছিল পিরোজপুর জেলার শর্শিনা দরবার শরিফ। এটা শতাব্দীপ্রাচীন। পাশাপাশি তাদের রাজনৈতিক সংযোগের বিষয়টিও সমধিক প্রচারিত। বরাবর তারা অবস্থান নিয়েছে প্রতিক্রিয়াশীলদের পক্ষে। মোনায়েম খান সেই দরবারে গেছেন অনেকবার। আইয়ুব খানও একবার গেছেন। উল্লেখ করা যায়, শর্শিনা দরবার শরিফে বংশানুক্রমে গদিনশিন হয়েছেন অনেকে। তাঁরা ইসলামি শিক্ষা প্রসারের জন্য অবদানও রেখেছেন। এ ধরনের দরবার শরিফে অর্থবিত্তও আসে প্রচুর। হয়তো বা অনেক ক্ষেত্রেই জনকল্যাণকর কাজে ব্যয় হয় এসব টাকা। কিন্তু নগদ জমা টাকার পরিমাণ ক্ষেত্রবিশেষে বিস্ময়করভাবে বেশি। এ বিষয়ে একটি তথ্য পাওয়া যায় পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত শেষ ইংরেজ আইসিএস কর্মকর্তা হ্যাচ বার্নওয়েলের আত্মজীবনী থেকে। সাতচল্লিশে দেশ বিভাগের সময় তিনি বরিশালের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। সেই বরিশাল জেলা ছিল আজকের বরিশাল বিভাগ। ছয়টি জেলার সমন্বয়ে গঠিত। পিরোজপুরও তার একটি।
দেশ বিভাগের কিছুদিন পর পুরোনো ১০০ টাকার নোট বাতিল করে ট্রেজারি থেকে নতুন নোট দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। তাঁর লেখা থেকে জানা যায়, নির্ধারিত দিনে জেলার একজন প্রখ্যাত পীর পুরোনো ১০০ টাকার নোটভর্তি অনেক বস্তা বড় নৌকায় ভর্তি করে পাল্টানোর জন্য জেলা সদরে পাঠান। একাত্তরে শর্শিনা দরবার আলোচনার দাবি রাখে। তখন এ দরবার, সংলগ্ন মাদ্রাসা, ছাত্রাবাসসহ সব স্থাপনা একটি ক্যান্টনমেন্টের রূপ নেয়। এখানকার ছাত্ররা রাজাকার ও আলবদরে যোগ দিয়ে এখানেই প্রশিক্ষণ নিত। এখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, মানবতাবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হতো। উল্লেখ্য, এ পিরোজপুর তখন ছিল একটি মহকুমা। মহকুমা পুলিশের কর্মকর্তা পাকিস্তান হানাদারদের হাতে নিহত হন। তাঁরই কৃতী সন্তান হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল প্রমুখ। তাঁরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। যেকোনো সময় হানাদারদের হাতে পড়তে পারেন। পরিবারটির একজন শুভাকাঙ্ক্ষী শর্শিনা দরবার শরিফের মুরিদ ছিলেন। এ দুই ভাইকে তিনি পীর সাহেবের কাছে নিয়ে গেলেন সাময়িক আশ্রয়ের জন্য। ব্যর্থ হয় সেই সজ্জন ব্যক্তির প্রচেষ্টা। স্বাধীনতার পর গদিনশিন পীর গ্রেপ্তার হন দালাল আইনে। মুক্তি লাভ করেন বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমার আওতায়। ‘কৃতজ্ঞ জাতি’ সেই পীর আলহাজ মাওলানা শাহ আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহকে ১৯৮০ সালে শিক্ষার জন্য দেয় স্বাধীনতা পদক। উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক, সে বছর শিক্ষার জন্য পুরস্কার আরেকজন পেয়েছিলেন, মরণোত্তর। তিনি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। নির্মম পরিহাস। পীর, অলি, আউলিয়া, গাউস, কুতুব, আলেমরা সমাজের শিরোমণি।
তাঁদের দলমত-নির্বিশেষে সবাই সম্মান করেন। তাঁরাও গুটি কয়েক ব্যতিক্রম ছাড়া কোনো বিতর্কিত বিষয়ে নিজেদের জড়িত করেন না। তবে ইসলামের বিধিবিধানের প্রসঙ্গ যখন আসে, তখন অবশ্যই মতামত দেবেন। অন্যদিকে, রাষ্ট্রনেতাদের বিবেচনায় রাখতে হয়, দেশটি জাতিধর্ম-নির্বিশেষে সবার। সুতরাং সব পক্ষ সংযত না হলে অকারণ সংঘাত বাড়ায়। আর এসব অনৈক্য ও সংঘাতের সুযোগ নেয় একশ্রেণীর কুচক্রী রাজনীতিক। তাঁরা ধর্মের দোহাই দেন। তাঁদের দাবির প্রতি সহানুভূতি দেখান। তবে অনেকের ব্যক্তিগত জীবন ধর্মের মৌলিক আদর্শের বিপরীতে। আমাদের দেশটিতে ৪৩ বছরে এ ক্ষতিকর কাজটি করে চলছে কিছু লোক। এর আগেও তারা করেছিল। এরা সুযোগ পায় ও সংহত হয় গণতান্ত্রিক শক্তির অনৈক্যের কারণে। আমাদের দুর্ভাগা দেশটিতে বরাবর তা-ই ঘটে চলছে। গণতান্ত্রিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ হলে এমনটা ঘটত না। অন্যদিকে, যাঁরা স্বাধীনতার চেতনা আর উদার সমাজ প্রতিষ্ঠার দাবিদার, তাঁদের কারও কারও অগণতান্ত্রিক আচরণ নজরে আসার মতো। প্রশ্ন আসে, তাঁরা নিজেরাই কি সে চেতনায় বিশ্বাসী? তাঁদেরও কেউ কেউ ধর্মীয় নেতাদের দোয়া পাওয়ার জন্য ছোটাছুটি করেন। পেলে ধন্যও হন। এরই সুযোগ নিয়ে ধর্মকে রাজনীতিতে নিয়ে আসতে চায় কিছু লোক। তাদের সমর্থন দেয় রাজনীতিবিদদের একটি অংশ। তাই এমনটা হয়। না হলে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে শর্শিনা দরবারের রাজনৈতিক আধিপত্য ধুলায় লুটিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার স্থান আবার একই রূপে অন্য দরবার লাভ করে কীভাবে? ঠিক তেমনি গণতান্ত্রিক শক্তির অনৈক্যই গণ-অভ্যুত্থানে পতিত শাসকের রাজনীতি টিকিয়ে রেখেছে আড়াই দশক। আর এ ধরনের অনৈক্য চলতে থাকলে এগুলো আরও জোরদার হবে।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

আজাওজা সরকার ও মহা জুয়া খেলা

আজাওজা সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে
এরশাদের মুখোমুখি শেখ হাসিনা
জগতে কখনোই একই জাতীয় দুটি বা তারও বেশি ঘটনা এক রকম হয় না। স্থানবিশেষে, সময়ের কারণে এবং কাদের দ্বারা তা নিয়ন্ত্রিত, তার ওপর ঘটনার চরিত্র ভিন্ন হয়। স্থান, কাল, পাত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেমন মহাযুদ্ধ দুটোই, কিন্তু প্রথম মহাযুদ্ধের সঙ্গে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পার্থক্য বিরাট। যদি তৃতীয় মহাযুদ্ধ হয়, তারও চরিত্র হবে আগের দুটি থেকে অন্য রকম। কোনো দেশের রাজনৈতিক সংকটের ক্ষেত্রেও তাই। উনসত্তরের গণ-আন্দোলন আর নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন এক রকম ছিল না। যদিও দুটোই ছিল একনায়কত্বের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের আন্দোলন। ছিয়ানব্বইয়ের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন আর ২০১৩-র আন্দোলনও এক চরিত্রের হবে না। ২০০৬-এর আন্দোলনের সঙ্গেও এবারের আন্দোলন মিলবে না। সময় ভিন্ন, পরিস্থিতি ভিন্ন, সংকটের চরিত্র ভিন্ন, সুতরাং এবারের সংকট ও তার থেকে বের হওয়ার পথও হবে ভিন্ন। সেই ‘ভিন্নতা’টা যে কী, তা এই মুহূর্তে অনুমানে বলা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। পৃথিবীর গত ৮০০ বছরের ইতিহাসে বাংলার মানুষই বিচিত্র ধরনের সরকার দ্বারা শাসিত হয়েছে। শাসিত হওয়া মানে শোষিত, নির্যাতিত ও নিপীড়িত হওয়া। বাংলার প্রথম উদ্দীনীয় সরকার এবং দ্বিতীয় উদ্দীনীয় সরকার দুটোই ছিল সামরিক শাসক। প্রথম উদ্দীনীয় সরকার ছিল ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজির সরকার। দ্বিতীয় উদ্দীনীয় সরকার ছিল ফখরুদ্দীন-মইন উ-র সরকার।
তাদের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ৮০০ বছর। কিন্তু চরিত্রগত দিক থেকে তারা ছিল একই রকম। মূলত সামরিক একনায়কত্ব। সবশেষে বাংলাদেশে যে সরকার গঠিত হয়েছে, তাকে অনেকে নাম দিয়েছেন ‘সর্বদলীয়’ সরকার বা ‘নির্বাচনকালীন’ সরকার। এই নামকরণ সম্পূর্ণ ভুল। এই সরকারের সঠিক নাম হলো আজাওজা সরকার (আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টি-ওয়ার্কার্স পার্টি-জাসদ সরকার—সংক্ষেপে আ-জা-ও-জা)। সামরিক একনায়কত্ব ও বেসামরিক একনায়কত্বের মধ্যে পার্থক্য হলো কালো চুল ও সাদা চুলের মধ্যে যে পার্থক্য, তা-ই। জিনিস একই, শুধু রংটা আলাদা। আমরা অনেক সময় শব্দের অর্থ করতে ভুল করি। একটিকে বুঝতে অন্যটি বুঝি। আম আর আমড়া যেমন এক জিনিস নয়, আতাফল ও সরিফাও এক ফল নয়। Cabinet এবং Council of ministers এক জিনিস নয়। ১৯৫৬ সালে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিপরিষদ আর ১৯৭১-এর ডাক্তার আবদুল মোত্তালিব মালিকের মন্ত্রিপরিষদ এক জিনিস নয়। ১৯৭৩ সালের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিপরিষদ আর ১৯৭৫ সালের রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক আহমদের মন্ত্রিপরিষদ দুই জিনিস। ২০০৯ সালে গঠিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রিপরিষদ আর ২০১৩-র নভেম্বরে গঠিত তাঁর মন্ত্রী-উপদেষ্টা পরিষদ এক জিনিস নয়। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে সরকার, সেটাই কেবিনেট। কোনো সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রভু হিসেবে তাঁর আস্থাভাজন বা প্রিয় কয়েকজন ব্যক্তিকে মন্ত্রিত্ব পদে নিয়োগ দিলে তাকে কাউন্সিল অব মিনিস্টার্স বলা যেতে পারে, কিন্তু তাঁরা সংঘবদ্ধভাবে কেবিনেট পদবাচ্য নন। ১৯৮০ ও নব্বইয়ের দশকে জাহানারা ইমাম ও আমি হপ্তায় তিন দিন বিকেলে হাঁটতে যেতাম। কোনো দিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, কোনো দিন সংসদ ভবন চত্বরে।
আরও অনেকেই হাঁটতেন। প্রফেসর আহমদ শরীফ খুবই নিয়মিত। একদিন খালাম্মা উল্টো দিক থেকে আসা এক ভদ্রলোককে দেখিয়ে বললেন, এই লোকটি গভর্নর মালিকের মন্ত্রী ছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে একপর্যায়ে কিছুক্ষণ জিরাতে হতো। শরীফ স্যার উদ্যানের গোলচত্বরে বসে অনুরাগীদের সঙ্গে তর্ক করতেন। কখনো আমিও যোগ দিতাম। খালাম্মা একটুখানি দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিতেন। অপারেশনের পরে তিনি বেশিক্ষণ খুব জোরে হাঁটতে পারতেন না। একদিন ওই বিশ্রামের সময় আমি ওই ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি রাজনীতি করেন? বললেন, একসময় করতাম। বললাম, কখনো কি মন্ত্রী হয়েছিলেন? বললেন, হ্যাঁ। একাত্তরে মন্ত্রী ছিলাম। তথ্যমন্ত্রী। কথাটি বললেন খুব স্বাভাবিকভাবে। তাঁর মধ্যে অনুশোচনার লেশমাত্র নেই। আমি বললাম, ওই ভয়াবহ সময় মন্ত্রী হয়েছিলেন, কাজটা কি ঠিক করেছিলেন? তিনি খুব সাবলীল ভঙ্গিতে বললেন, কেন ঠিক করিনি, অবশ্যই ঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। যা হোক, সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। সাধারণত যাঁরা মন্ত্রী হন, তাঁরা মনে করেন জীবনের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি ঘটল। জীবন পূর্ণ হলো। মন্ত্রিত্ব চলে গেলেও অভিধাটির আগে ‘সাবেক’ কথাটি বসবে আমৃত্যু। সাবেক শব্দটি আর সরাতে পারবে না কেউ। এমনকি মৃত্যুর পরেও সন্তান-সন্ততি ও বংশধরদের বিয়েশাদি উপলক্ষে মন্ত্রী ছিলেন—সে প্রসঙ্গ উঠবেই। মন্ত্রিত্বের মধু বড়ই মিষ্টি মধু।
এক নব মন্ত্রী (প্রথমবার মন্ত্রী) বলেছেন, ‘গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার রাজনৈতিক দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি সর্বদলীয় সরকারে যোগ দিয়েছেন।’ [সমকাল] সর্বদলীয় সরকার নয়, আজাওজা সরকারে জাতীয় পার্টির যোগদান ও ব্যাপক প্রাপ্তিযোগে অনেক কাগজের প্রতিবেদক ও কলাম লেখকেরা কিঞ্চিৎ বিস্ময় প্রকাশ করেছেন দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। আজাওজা সরকারে যোগ না দিলেই বরং তা হতো শতাব্দীর সেরা বিস্ময়। পটুয়া কামরুল হাসানকে হাজার সালাম। জীবনের অন্তিম স্কেচটির শিরোনাম দিয়েছিলেন ‘বিশ্ব বেহায়া’। আজ বেঁচে থাকলে ওই শিরোনাম কেটে তিনি লিখতেন, ‘মহাবিশ্বের মেগা বেহায়া’। আওয়ামী লীগ সরকারকে প্রকাশ্যে তীব্র সমালোচনা করে গোপনে রোডম্যাপের অংশীদার হয়ে পাঁচ-পাঁচটি উজির ও এক উপদেষ্টা উপহার পাওয়া শুধু তাঁর পক্ষেই সম্ভব। তাঁর রাজনৈতিক বেইমানিতে দলের এক নেতার হূদ্যন্ত্রের বৈকল্য দেখা দিয়েছে। এবং হাসপাতালের শয্যা থেকে তিনি এক বিবৃতিও দিয়েছেন। তিনি ‘ফ্যামিলি মেম্বার’ হলেও দলের যে মেম্বার থাকবেন, সে ভরসা কম। সম্রাট আকবরের নবরত্নের সংখ্যা ছিল নয়জন। বর্তমান আজাওজা প্রশাসনের রত্নের সংখ্যা দুটি বেশি। এগারো জন। সংখ্যা ক্রমাগত আরও যে বাড়বে না, সে গ্যারান্টি একেবারেই নেই। উপমহাদেশে ভাত ছিটালে কাকের অভাব হয় না।
বাংলার মাটিতে পদ ছিটালেও লোকের অভাব হয় না। মন্ত্রিত্বের পদ হোক, উপদেষ্টার পদ হোক, সচিবের পদ হোক বা যেকোনো বড় পদ হোক—ছিটালে লোকের অভাব হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বর্তমান মহাজোট সরকার পদ-পদবি উপহার দিতে পৃথিবীর ইতিহাসেই অদ্বিতীয়। আজাওজা সরকার শুধু বাদ রেখেছে একটিমাত্র গোত্রকে পদ ও প্রমোশন দেওয়া। সে গোত্রটি হলো উপসম্পাদকীয় লেখক। ধারণা করি, নির্বাচনের আগে আজাওজাপন্থী কলাম লেখকেরা, যাঁরা সরকারের কার্যকলাপকে সমর্থন দিয়ে হপ্তায় তিন-চারটি কাগজে কলাম লেখেন, তাঁদের দেওয়া হবে উপমন্ত্রীর মর্যাদা। অন্যদিকে যাঁরা সরকারকে সমালোচনা করে লেখেন, তাঁদের দেওয়া হবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পদমর্যাদা। মুড়িমুড়কির মতো এত প্রমোশন ও পদমর্যাদা বিতরণের পর ভোট আর যাবে কোন দলে? কিছুদিন যাবৎ আমার নিজের একটি প্রত্যয় জন্মেছে যে ১৯৮০ সালের আগে থেকে যাঁরা আওয়ামী লীগ করছেন, তাঁরা যদি শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই সরকার চালাতেন— পরিস্থিতি এই পর্যায়ে পৌঁছাত না। রোডম্যাপ তৈরি হয়েছে আওয়ামী লীগের বাইরে থেকে। তা বাস্তবায়নের দায়িত্বটা বর্তেছে শেখ হাসিনার ওপর। তিনি তা স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছেন। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে নির্বাচনের বা ক্ষমতার বাইরে রাখার পূর্বপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকবে। সেই সিদ্ধান্তে উৎসাহ যাঁরা জুগিয়েছেন, কেউই আওয়ামী লীগের মূল লোক নন। স্বনিয়োজিত আওয়ামীবন্ধু।
দেশের বা আওয়ামী লীগের বড় বিপর্যয় ঘটলে, তখন তাঁরা রং বদলাবেন এবং সব দোষ চাপাবেন সরকারপ্রধানের ঘাড়ে। পঁচাত্তরের ১৬ আগস্ট থেকে আমরা তা দেখেছি। দেশ-বিদেশের মিডিয়া ও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যেই যা আলোচনা করছে, তা হলো ভারত শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখতে চায়। বাংলাদেশের অনেক প্রখ্যাত প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরাও তা চান। স্বনামধন্য কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিকেরাও তা চান। সে লক্ষ্যে তাঁরা প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে বহু ব্যয়বহুল কর্মকাণ্ড করছেন। তাঁদের এককথা: শেখ হাসিনার সরকার না থাকলে বাংলাদেশ আধুনিক, ডিজিটাল, ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল থাকবে না। অন্যদিকে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যদি মনে করে, তারা অল্প আধুনিক, অল্প মাত্রায় ধর্মনিরপেক্ষ ও অল্পস্বল্প প্রগতিশীল থাকবে—তাতেই বা তাদের দোষ দেব কেন? ঘাড় ধরে কোনো জনগোষ্ঠীকে সেক্যুলার, আধুনিক ও প্রগতিশীল করা সম্ভব নয়—যদি না তারা নিজেরা তা না হয়ে ওঠে। আজাওজা সরকার একটি সুপরিকল্পিত সরকার। এখনো সময় আছে। আগামী ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সংসদ আছে। একটি সমঝোতায় পৌঁছা সম্ভব। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করে যদি এই বর্তমান প্রশাসন জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে—ইতিহাসে তার জায়গা হবে একরকম। তা না হলে আজাওজা প্রশাসনই যদি টিকে যায়, তাহলে মানুষ শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে প্রশাসক হিসেবেই অভিহিত করবে। বিএনপির নীতি-আদর্শ কী জানি না।
তাদের যোগ্যতা-দক্ষতা সম্পর্কেও আমার কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। মহাজোটের প্রতি বিরূপতা থেকে তাদের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে তা হতে পারে। সরকারের মনোবাসনা পূরণ করে যদি তারা নির্বাচন বর্জন করে, তা হবে আজাওজা সরকারের জন্য মহা আনন্দের। তখন যে নির্বাচন হবে, তাতে বিশেষ কারচুপির প্রয়োজন হবে না। নির্বাচন কমিশনও কিছু ঝামেলা থেকে বাঁচে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সময়টি ক্লাইভ-মীর জাফরের সময়ের চেয়ে ভালো—এ কথা যাঁরা প্রচুর উপসম্পাদকীয় রচনা লেখেন, তাঁরা বিশ্বাস করলেও আমার মতো নাদান বিশ্বাস করে না। সম্ভবত কিছু বিশিষ্টজন ছাড়া জনগণের একটি বিরাট অংশও বিশ্বাস করে না। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, দেশের বিখ্যাত বিদ্বানদের একটি অংশ যদি দাসত্বকেই স্বাধীনতা ও যুক্তি মনে করেন, তখন জনগণের দুঃখের আর শেষ থাকে না। বাংলাদেশকে নিয়ে একটি ‘গ্রেট গেম’ বা মহা জুয়া খেলা চলছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা সেই জুয়ার একটি উপাদানে পরিণত হয়েছে। আজাওজা মহাজোট ওই জুয়া খেলায় না জড়ালেই পারত। দেশ আজ আর জনগণের অধিকারে নেই। বাংলাদেশকে আবার ঠিক জায়গায় আনতে জনগণকে কত ত্যাগ স্বীকার করতে হবে, তা কেউ জানে না। তবে এ কথা ধ্রুব সত্য যে, কোনো জনগোষ্ঠীকে খুব বেশি দিন ‘দাবায়ে রাখতে’ পারে না কোনো শক্তি। হেমন্ত ও শীতের পরে সব জনপদেই বসন্ত আসে। বাংলার বসন্তও খুব বেশি দেরিতে আসবে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

ইন্টারনেট রপ্তানি কার স্বার্থে?

দেশে আবার ব্যান্ডউইথ বিক্রির চেষ্টা-তদবির দেখে কিছুটা বিচলিত। বিদেশ থেকে ঋণ করে দেশের উন্নয়নের জন্য এই ইন্টারনেট সেবা আমরা কিনে এনেছি। নিজেরা ব্যবহার করতে পারছি না—এই অজুহাত দেখিয়ে ‘ফেলে রাখা’ ইন্টারনেট বিদেশে রপ্তানি করা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা চিন্তা করা দরকার। যাঁরা আমাদের ইন্টারনেট সেবাসুবিধা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁরাই ‘ফেলে রাখা’ বা ‘উদ্বৃত্ত’ শব্দ দুটি ব্যবহার করছেন। ইন্টারনেট সেবা দিয়ে এই দেশের কী উপকার করা সম্ভব, তা বোঝার জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা তাঁদের নেই। তাঁরা সরকারকে ভুল বুঝিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে দিতে চাইছেন, যাতে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ রূপকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশে ইন্টারনেট মোটেই উদ্বৃত্ত নেই। চাহিদার সামান্য অংশ মাত্র আমাদের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে। ইন্টারনেটের বিতরণব্যবস্থা যাঁদের হাতে, তাঁরাই বাড়ি, শিক্ষাকেন্দ্র আর কর্মস্থলে সেই সেবা পৌঁছাতে টালবাহানা করছেন। সময়ক্ষেপণের কৌশলে প্রমাণ করতে চাইছেন দেশে চাহিদা নেই, বিদেশে বিক্রি করে দেওয়া ভালো! বিতরণব্যবস্থার অসংগতির কারণে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি ভাগ্য উন্নয়নে। ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকল্পে কৌশলগত বাস্তবায়ন নির্দেশনা না থাকায় বিটিসিএল হাস্যকর আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইন্টারনেট সেবা সংযোগ দিয়ে যাচ্ছে। ব্রডব্যান্ডের (উচ্চগতির সংযোগ) ক্ষেত্রে দরখাস্ত করতে হবে। তারা যাচাই-বাছাই করে ‘ডিমান্ড নোট’ দেবে।
সেই কাগজ নিয়ে নির্ধারিত ব্যাংকে টাকা জমা দিলে বিটিসিএল সংযোগ দেবে। এর মধ্যে চলে যাবে অন্তত দুই মাস! তাও ঠিক আছে, কিন্তু সংযোগ পেতে হলে আপনার কর্মস্থল পর্যন্ত নিজ খরচে তার টেনে নিতে হবে বিটিসিএল এক্সচেঞ্জ থেকে—তা যত কিলোমিটার দূরত্বই হোক! সঙ্গে আপনাকে কিনে দিতে হবে সংযোগের জন্য প্রয়োজনীয় দুই পাশের আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি। সঙ্গে চলতে থাকবে তদবির! শেষে ঢাকা মগবাজার এক্সচেঞ্জ থেকে আইপি নিতে বলবে। আবার দরখাস্ত, আবার ডিমান্ড নোট। আইপি পেলেন তো সংযোগ নেই, সংযোগ আছে তো আইপি ঠিক নেই। এ রকম করে করে ন্যূনতম ছয় মাস সময়ে আপনি ১ এমবি (বা বেশি) সংযোগ পেলেও পেতে পারেন। সহজপ্রাপ্য এমন একটি স্বল্প গতির (শেয়ারড) সেবা দিতে বিটিসিএল চালু করেছে এডিএসএল পদ্ধতি। আপনার বাড়িতে যদি বিটিসিএল ফোন থাকে তাহলে কোনো তার না টেনেই একটি মডেম কিনে আপনি এই সংযোগ পেতে পারেন। কিন্তু এই সেবা দেয় একটি বেসরকারি কোম্পানি। সেখানেও ওই আবেদন, সঙ্গে নানা কাগজপত্র। লাইন চালু হলে মডেম কিনে নেবেন, বিল আসবে টেলিফোন বিলের সঙ্গে। সেবা পেতে মোট লাগবে সাত থেকে ১৫ দিন (তা-ও নির্ভর করে আপনার ফোন লাইন ঠিক আছে কি না, তার ওপর)। এভাবে সময়ক্ষেপণ ও গ্রাহকের ভোগান্তির উৎপাদন মূল্য কত? সরকার কর্জের টাকায় সাবমেরিন সংযোগ সেবা এনেছে, তার অনেক অংশ শোধ করেছে জনগণ কিন্তু সেবাপ্রাপ্তির অঙ্গীকার কোথায়?
বিটিসিএলের সবগুলো ইন্টারনেট সেবার ক্ষেত্রে একই পরিস্থিতি। দেশের বেশির ভাগ মানুষকে ইন্টারনেট প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করে আপনি দাবি করতে পারেন না যে আপনার কাছে পর্যাপ্ত ইন্টারনেট ‘উদ্বৃত্ত’ আছে, যা রপ্তানিযোগ্য। যে যে ক্ষেত্রে ইন্টারনেট সেবা আমাদের জীবনের চাকা ঘুরিয়ে দিতে পারে, তার কোনো নির্দেশনা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশের’ রূপকল্পে নেই। বিশেষ করে, সেবা খাতে (স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ অন্যান্য পরিষেবা) উচ্চগতির ইন্টারনেট বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন ছিল, সুযোগও ছিল। ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্রের নামে ইন্টারনেট সেবার কথা প্রচার করা হয়েছে, যা কোনোক্রমেই বেশির ভাগ মানুষের চাহিদা পূরণ করেনি। এসবের মাত্র কয়েকটি বিটিসিএলের সাময়িক সংযোগ পেয়েছে (STM-1 MUX) যা ঘোষিত পাঁচ হাজার ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্রের বা তদূর্ধ্ব সংখ্যার তুলনায় খুবই সীমিত। বেশির ভাগ ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্র ব্যবহার করে মোবাইল ফোনের মডেম, যা ব্যয়সাশ্রয়ী নয় ও খুবই স্বল্পগতির। শিক্ষাকেন্দ্রে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণী ব্যবস্থাপনায় ইন্টারনেট অপরিহার্য। যে কয়েকটি পাইলট প্রকল্প হয়েছে, সেখানে বিকল্প হিসেবে অফ লাইন শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে চিন্তা হচ্ছে, মোবাইলের মডেম দিয়ে ইন্টারনেট দেওয়ার অকার্যকর চিন্তা চলছে। বিটিসিএলের দাবি সারা দেশে ৪৬ জেলায়, ৫৬ উপজেলায় ইন্টারনেট ও ব্রডব্যান্ড সেবা বিস্তৃত করা হয়েছে। তাহলে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা থেকে বেশির ভাগ অঞ্চল বঞ্চিত কেন? উপজেলা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোয় সরকারের দেওয়া মোবাইল ফোনকে ‘টেলিমেডিসিন’ সেবা বলে প্রচার করা হলো। এক্সচেঞ্জ থেকে এই কেন্দ্রগুলোয় ফোন-সুবিধা নিয়ে জাতীয় স্বাস্থ্য ডেটাবেইস/নেটওয়ার্ক করে নিতে পারতাম। সহজে বড় ডাক্তারদের পরামর্শ গ্রাম পর্যায়ে বিস্তৃত করে নিতে পারতাম।
স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মসূচি স্বল্পমূল্যে গ্রামে গ্রামে সম্প্রসারণ করে নিতে পারতাম। বিটিসিএল বলছে, সারা দেশে ইতিমধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটারের মতো অপটিক্যাল ফাইবার কেব্ল বিস্তৃত হয়েছে, আইপিভিত্তিক সেবা দেওয়ার জন্য ৪২ জেলার দেড় শতাধিক নোডে মোট ৪৬ হাজার ক্ষমতাসম্পন্ন এডিএসএল এক্সেস নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে। তাহলে গ্রাহক ফল পাচ্ছে না কেন? ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত বিটিসিএলের ৭৪৭টি এক্সচেঞ্জের (৬৪ জেলার) সবগুলোতেই অপটিক্যাল ফাইবার সংযুক্ত আছে। দেশে টেলিফোনের সংযোগ ক্ষমতা ১৪ লাখের মতো হলেও তার মাত্র ৬৫ শতাংশ ব্যবহূত হচ্ছে। এই ৬৫ ভাগের অর্ধেকও যদি এডিএসএল সংযোগ পায়, তাতেও চার থেকে পাঁচ লাখ সংযোগের চাহিদা রয়েছে। দেশব্যাপী ইন্টারনেট সেবার চাহিদা নিরূপণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি কখনো? সরকারের কাছে আবেদন, ইন্টারনেট বিস্তৃতির যে অবকাঠামো ইতিমধ্যেই তৈরি আছে, তা কাজে লাগিয়ে দেশব্যাপী সেবা সম্প্রসারণ করুন। স্বল্পমূল্যে সেবার পরিধি বাড়ান। বিটিসিএলের প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার সক্ষম ব্যবহার জরুরি। এ ক্ষেত্রে দরকার বাস্তবসম্মত গ্রামমুখী ইন্টারনেট বিতরণ নীতি। নতুন বিনিয়োগ না বাড়িয়েও নিজেদের মজুত ইন্টারনেট আমরা বিশ্বভুবনে ঠাঁই করায় বিনিয়োগ করতে পারি।
রেজা সেলিম: পরিচালক, আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প।

শেয়ারবাজার ও সরকার

গত রোববার পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নিজস্ব ভবনের ফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেয়ারবাজার সম্পর্কে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করবে না। তিনি বলেছেন, শেয়ারবাজারের সঙ্গে সরকারের তেমন কোনো সম্পৃক্ততা নেই। গত পাঁচ বছরে শেয়ারবাজার নিয়ে সরকারের বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য কতটা সমর্থন করে, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সংশয় আছে। শেয়ারবাজারের সঙ্গে যদি সরকারের সম্পৃক্ততাই না থাকবে, তাহলে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশই (আইসিবি) বা কেন এর অন্যতম প্রধান বিনিয়োগকারী হলো? কেনই-বা সঞ্চয়পত্রের সুদের হার হঠাৎ করে কমিয়ে দেওয়া হলো? এমনকি বাজার যখন অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছিল, তখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ব্যক্তির মূলধনি মুনাফার ওপর করারোপের প্রস্তাব করা সত্ত্বেও সরকার নাকচ করে দিয়েছিল। অস্বীকার করার উপায় নেই, শেয়ারবাজার একটি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা। এতে লাভের সুযোগ যেমন থাকে, তেমনি লোকসানের ঝুঁকিও কম নয়। তদুপরি বাংলাদেশের মানুষের হুজুগে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রবণতাও রয়েছে। কিন্তু সেই হুজুগকে সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের কি কোনো দায়িত্ব নেই? নাকি হুজুগ উসকে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব? শেয়ারবাজারের সঙ্গে সরকারের সম্পৃক্ততা না থাকলে রোড শো করে, গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ব্রোকারেজ হাউস খুলতে কেন তারা উৎসাহিত করেছে? ২০০৯-১০ সালে যখন শেয়ারবাজার চাঙা হয়েছিল, তখন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা এর কৃতিত্ব নিয়েছেন।
তাহলে কেন ধসের দায় নেবেন না? ২০১০ সালে শেয়ারবাজারের ধসের কারণ অনুসন্ধানে সরকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করলেও এর সুপারিশগুলো আমলে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। সরকারের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী শেয়ারবাজারের কারসাজির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে কমিটির তদন্তে বেরিয়ে আসে। প্রধানমন্ত্রী শেয়ারবাজারে লাভ হলে নিজের, আর লোকসান হলে সরকারের দায় বলে যে মন্তব্য করেছেন, সেটি আংশিক সত্য। পুরো সত্য হলো, তদন্ত কমিটির সুপারিশ সত্ত্বেও শেয়ারবাজারের কারসাজির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ শেষের উপলব্ধিটি শুরুতে জানতে পারলে হয়তো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা সতর্ক হতেন। অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে তাঁর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আস্থা অটুট থাকার কথা বলেছেন। কিন্তু একজন সফল অর্থমন্ত্রীকে যে কেবল প্রধানমন্ত্রীর আস্থার ওপর নির্ভর করলেই চলে না, তাঁকে দেশের লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীকেও আস্থায় নিতে হয়, সেই সত্যটি তিনি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। শেয়ারবাজারের বিপর্যয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী বাঙালির হুজুগে প্রবণতা এবং অর্থমন্ত্রী আগের সরকারের ভুল নীতিকে দায়ী করলেও নিজেদের দায়টি যথারীতি অস্বীকার করে গেছেন। দায় অস্বীকারের এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে শুধু শেয়ারবাজার নয়, অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রেও স্থিতি ও গতি আনা কঠিন হবে।

বিশ্বশক্তি আত্মসমর্পণ করেছে : ইসরাইল

ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে ইয়ালুন ছয় জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের পরমাণু চুক্তিকে তেহরানের কাছে বিশ্ব শক্তিগুলোর আত্মসমর্পণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইসরাইলি দৈনিক জেরুজালেম পোস্ট লিখেছে, ইয়ালুন এক বিবৃতিতে ইরানের পরমাণু চুক্তিকে ঐতিহাসিক ভুল হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, এ চুক্তির ফলে ইরানের পরমাণু প্রকল্পের আর কোনো ক্ষতি করা যাবে না। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এভিগডোর লিবারম্যানও ইরানের সঙ্গে ছয় জাতিগোষ্ঠীর পরমাণু চুক্তির প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, এ চুক্তি ইরানের জন্য বিরাট কূটনৈতিক বিজয় এবং এর মাধ্যমে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। পরমাণু চুক্তির ফলে ইরানের পরমাণু তৎপরতাকে আর থামানো যাবে না উল্লেখ করে ইসরাইলের অর্থমন্ত্রীও বলেছেন, এ চুক্তি থেকে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক সমাজ ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে আলোচনার ব্যাপারে ইসরাইলের অবস্থানকে সমর্থন করে না। ডিসেম্বরেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার শুরু করবে ইইউ : ইউরোপীয় ইউনিয়ন আগামী মাসে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে শুরু করবে বলে খবর দিয়েছেন ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরা ফ্যাবিয়াস। জাতিসংঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্যদেশ ও জার্মানিকে নিয়ে গঠিত ছয় জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের পরমাণুবিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার একদিন পর সোমবার এ ঘোষণা দিলেন ফ্যাবিয়াস।
এএফপি। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সোমবার ইউরোপ ওয়ান রেডিও চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাতকারে বলেছেন, আগামী দু’এক সপ্তাহের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইইউ’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে বসবেন। ইইউ’র পক্ষ থেকে আরোপিত কোনো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য এর ২৮টি সদস্যদেশের সবগুলোর অনুমোদন প্রয়োজন। ফ্যাবিয়াস বলেন, সীমিত পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে এবং তা ডিসেম্বর থেকেই কার্যকর হতে পারে। তবে এসব নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজনে আবার আরোপ করা হতে পারে বলেও হুমকি দিয়েছেন তিনি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য হ্রাস : ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সমঝোতা চুক্তি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে গেছে। সোমবার এশিয়ার বাজারে অশোধিত তেলের দাম কমেছে ২ শতাংশ। প্রতি ব্যারেল তেলে ২.৮৪ ডলার কমে যায়। ইরান কিছু শর্তে তার দেশের পরমাণু প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখতে রাজি হওয়ায় দেশটির ওপর আরোপ করা অবরোধ শিথিল করে পশ্চিমা দেশগুলো। ফলে এর প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে। যদিও তেল রফতানির ক্ষেত্রে ইরানের ওপর আরোপ করা অবরোধ আগামী ৬ মাস পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। অর্থাৎ এ সময়ের মধ্যে দেশটি তেল রফতানি করতে পারবে না।
তারপরও এ চুক্তি তেল উৎপাদনকারী অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা লাঘব করবে এমন আশায় তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। ইরান বিশ্বের চতুর্থ তেল মজুদকারী দেশ। তবে পরমাণু প্রকল্প ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইস্যু নিয়ে বিরোধের জের ধরে পশ্চিমা বিশ্ব দেশটির তেল রফতানির ওপর কঠোর অবরোধ আরোপ করে। এতে বিশ্ব বাজারে ইরানের তেল রফতানি বাধাগ্রস্ত হয়। চুক্তিতে ইরানের ওপর আরোপ করা অনেক অবরোধই শিথিল করা হয়েছে যার মাধ্যমে ইরান আবারও তেল রফতানি করতে পারবে। তবে সমঝোতা হলেও তেল রফতানির ক্ষেত্রে আরও ৬ মাস এ নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। এ সময়ের মধ্যে ইরান চুক্তির শর্ত পূরণ করতে সক্ষম হলে দেশটির ওপর তেল রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে পশ্চিমা বিশ্ব। বিবিসি, এএফপি, রয়টার্স, টেলিগ্রাফ।
ইরানি মুখে বিজয় হাসি
এক দশকের সায়ুযুদ্ধে জয়ের কেতন উড়িয়ে দেখে বিজয় হাসি তার ফুটে উঠেছে ইরানি জনগণের মুখে। মিষ্টি বিতরণ সহ দেশব্যাপী বিচ্ছিন্ন বিজয় র‌্যালিতে বিজয় র‌্যালিতে রোববার ব্যস্ত ছিল ইরানের রাজপথ। সোমবারও সে জোয়ারে-ভাটা আসেনি। ৬ জাতির সঙ্গে ইরানের এ সমঝোতা চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে দেশটির জনগণ। ইরানের পরমাণু আলোচক দলের প্রতিনিধিরা রোববার রাতে দেশে ফিরলে তেহরানের মেহেরাবাদ বিমানবন্দরে তাদের অভিনন্দন জানায় শত শত সমর্থক। জাতীয় পতাকা ও ফুল হাতে নিয়ে আসেন সমর্থকরা। তারা পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফের ভূমিকার প্রশংসা করেন। এ সময় তারা ‘কোন যুদ্ধ, অবরোধ, আত্মসমর্পণ বা অপমান নয়’ বলে স্লোগান দেন।
ওবামা-নেতানিয়াহু ফোনালাপ
তেহরানের পরমাণু কর্মসূচির ব্যাপারে বিশ্বশক্তি ৫+১’র (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন, রাশিয়া ও জার্মানি) সঙ্গে ইরানের ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তির ব্যাপারে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। হোয়াইট হাউস সূত্র জানিয়েছে, ক্রমেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা ইরানের লাগাম টানতে পারায় নেতানিয়াহুর সঙ্গে এই আলাপ করেন ওবামা। হোয়াইট হাউসের উপ-মুখপাত্র জোশ আর্নেস্ট সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের একই লক্ষ্যের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেছেন দুই নেতা। ফোনালাপে ইরান ইস্যুতে সুদূরপ্রসারী সমাধানের জন্য ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহুর কাছে পরামর্শ চেয়েছেন ওবামা। আর্নেস্ট বলেন, নেতানিয়াহুকে প্রেসিডেন্ট জোর দিয়ে বলেছেন, এ চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরে আসবে। ইরানের পরমাণু প্রকল্পের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ ও নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই দীর্ঘস্থায়ী, শান্তিপূর্ণ ও সমন্বিত সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করবে পাওয়ার সিক্স।

চীনের আকাশ আকাক্সক্ষা বিপজ্জনক : অ্যাবে

পূর্ব চীন সাগরের বিতর্কিত দ্বীপপুঞ্জকে চীন নিজের আকাশ প্রতিরক্ষা সীমানার আওতায় নিয়ে আসার ঘোষণা দিয়ে আকাশসীমা বৃদ্ধি আকাক্সক্ষার যে বহিঃপ্রকাশ করেছে তা ওই অঞ্চলের জন্য বিপজ্জনক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে। চীনের এ ধরনের তৎপরতার কোনো বৈধতা নেই। সোমবার পার্লামেন্টে দেয়া ভাষণে তিনি একথা বলেন। বিরোধপূর্ণ এ দ্বীপপুঞ্জ চীনে ‘দিয়াইয়ু’ এবং জাপানে ‘সেনকাকু’ নামে পরিচিত। শনিবার এ দ্বীপপুঞ্জকে নিজের আকাশ প্রতিরক্ষা সীমানার আওতায় নিয়ে আসার ঘোষণা দেয় বেইজিং। ওই ঘোষণায় বলা হয়, এ এলাকার আকাশসীমায় কোনো বিমান প্রবেশ করলে তাকে চীনের আইন মানতে হবে। এর অন্যথায় তার বিরুদ্ধে জরুরি ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ঘোষণার পর এই প্রথম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন অ্যাবে। তিনি সোমবার জাপানের সংসদকে বলেন, চীনের এ বিপজ্জনক পদক্ষেপে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটতে পারে বলে জাপান গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে চীনকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান অ্যাবে। এর আগে, জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশটির কাছে চীনের এ ঘোষণার কোনো বৈধতা নেই।
জাপান-আমেরিকার বিরুদ্ধে চীনের ক্ষোভ : পূর্ব চীন সাগরের বিতর্কিত দ্বীপপুঞ্জকে বেইজিংয়ের আকাশ প্রতিরক্ষা সীমানার আওতায় নিয়ে আসার বিরুদ্ধে আমেরিকা ও জাপানের প্রতিক্রিয়ার ক্ষোভ প্রকাশ করেছে চীন। বেইজিংয়ের মার্কিন ও জাপানি দূতাবাসে এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ পাঠানো হয়েছে বলে সোমবার চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, বেইজিংয়ের পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে যে সব সমালোচনা করা হয়েছে তা ভিত্তিহীন এবং অযৌক্তিক। প্রতিবাদলিপিতে বিতর্কিত দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে জাপানের সঙ্গে চলমান বিরোধে না জড়াতে আমেরিকা প্রতি আহ্বান জানানো হয়। ২৩ নভেম্বর পূর্ব চীন সাগরের বিতর্কিত দ্বীপপুঞ্জকে নিজের আকাশ প্রতিরক্ষা সীমানার আওতায় নিয়ে আসার ঘোষণা দেয় চীন। ওই ঘোষণায় বলা হয়, এ এলাকার আকাশসীমায় কোনো বিমান প্রবেশ করলে তাকে চীনের আইন মানতে হবে। এর অন্যথায় তার বিরুদ্ধে জরুরি ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিরোধপূর্ণ এ দ্বীপপুঞ্জ চীনে ‘দিয়াইয়ু’ এবং জাপানে ‘সেনকাকু’ নামে পরিচিত।